Page 2 of 3

এই বৈশাখে চাই মুক্তিবৃক্ষের আশীর্বাণী

আলী যাকের

 

 


চৈত্র শেষ হয়ে এলো। রৌদ্র চড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে নিদাঘের প্রচ-তায় আঁইঢাঁই প্রাণ। শুষ্ক চারিদিক। এই সময় ঘরে কিংবা বাইরে যদি তাপানুকূল পরিবেশ না থাকে তাহলে গ্রীষ্মের দাপট বেশ ভালো বোঝা যায়। একমাত্র বৃক্ষের ছায়ায় কিছুটা শান্তি মেলে বুঝি। শারীরিক স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য গ্রীষ্ম মোটেই কারো প্রিয় ঋতু হতে পারে না। তবুও কী যেন আছে এ ঋতুটির মধ্যে যা আমাকে উদাস করে দেয়। প্রসঙ্গত, রবীন্দ্রনাথের ওই বিখ্যাত গানটির কথা মনে পড়ে যায়, ‘মধ্যদিনে যবে গান বন্ধ করে পাখি/হে রাখাল, বেণু তব বাজাও একাকী... জাগায় বিদ্যুৎ ছন্দে আসন্ন বৈখাশী/হে রাখাল বেণু তব বাজাও একাকী।’
একবার আমাদের দেশের প্রখ্যাত রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, বছরের কখন শান্তিনিকেতনে যাওয়ার প্রকৃষ্ট সময়। উত্তরে বন্যা বলেছিল, ‘গুনলে বিশ্বাস করবেন না হয়তো। রবীন্দ্রনাথ বোলপুরে গ্রীষ্মকালকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন এবং তার অনেক কবিতা, গান ভরা গ্রীষ্মে রচিত।’ এই রহস্য উদঘাটনের জন্য একবার ভরা গ্রীষ্মে শান্তিনিকেতন গিয়েছিলাম। বীরভূম জেলার অন্তর্গত বোলপুরে গ্রীষ্মকালে সত্যিই প্রচ- দাবদাহ বয়ে যায়। শান্তিনিকেতনে বেশির ভাগ মানুষ সাইকেলে চলাচল করে। ওই সময় দেখেছি, তাপ প্রতিহত করার জন্য তারা মুখের ওপর কাপর জড়িয়ে নেয়। সূর্যের উত্তাপ এতোটাই হয় তখন যে, শরীর চামড়া পুড়ে যায়। কিন্তু অবাক কা-! শান্তিনিকেতনে যে বিশাল বৃক্ষরাজি এর নিচে গেলে গ্রীষ্মকে আর ততো অত্যাচারী বলে মনে হয় না। ওই গ্রীষ্মে বিশ্ব ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সর্বত্র গাছের ছায়ায় ছায়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছি আর মনে হয়েছে রবীন্দ্রনাথের কথা যেন দিব্য দৃষ্টিতে দেখতে পেয়েছি শ্মশ্রƒম-িত রবীন্দ্রনাথ, পেছনে দুই হাত, গাছের ছায়ায় ছায়ায় তার সৃষ্টি শান্তিনিকেতনের সর্বত্র মৃদুমন্দ গতিতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।


আমাদের বাংলাদেশে ছয়টি ঋতুরই আগমন ও প্রস্থান মোটামুটি বোঝা যায়। কিন্তু কোন এক অজ্ঞাত কারণে গ্রীষ্মে কথাটি মনে পড়ে সবচেয়ে বেশি। আমার বাল্যকাল কেটেছে বাংলাদেশের ছোট ছোট শহরে বাবার চাকরি সূত্রে। ওইসব জায়গায় পাকা বাড়িঘর তখন ছিল অতি নগণ্য সংখ্যায়। বেশির ভাগ জায়গা জুড়ে থাকতো বিশাল বৃক্ষরাজির বন। আম, কাঁঠাল, জারুল, সেগুন, মেহগনি, কড়ইসহ কতো বিচিত্র বৃক্ষ। স্কুল না থাকলে এসব বৃক্ষের নিচেই আমাদের সময় কাটতো বেশির ভাগ। লুকোচুরি, ডাঙ্গুলি, গোল্লাছুট ইত্যাদি খেলা নিয়ে মাতামাতি। কিসব দিন গেছে শৈশব! মাঝে মধ্যে বাড়ির কাছের পুকুর কিংবা অল্প দূরের নদীতে সুশীতল পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে শান্তিতে ভরে গেছে দেহ-মন। আরেকটু বড় হওয়ার পর আমরা তখন ঢাকায় এসে থিতু হয়েছি, গ্রীষ্মে ওই একইভাবে গাছের ছায়ায় ছায়ায় কেটেছে দিন। চৈত্র দিনের শেষে কোকিলের আহাজারি মনকে সিক্ত করে দিয়েছে। পহেলা বৈশাখে কুটির শিল্পের মেলায় বিভিন্ন খাদ্য-অখ্যাদ্যকে অমৃত বলে মনে হয়েছে। বাঙালির এই শর্তবর্ষের ঐতিহ্য সংস্কৃতি নিয়ে আমরা আজীবন বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এসেছি ঔপনিবেশিক আগ্রাসনকে। আমাদের বাল্যকাল থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত আমরা পাকিস্তানের উপনিবেশ ছিলাম। কী এক বিচিত্র দেশ ছিল সেই পাকিস্তান! এক উদ্ভট দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সেই দেশ। যে ভদ্রলোক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এই তত্ত্বের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন, তিনি বলেছিলেনÑ মুসলমানরা একটি জাতিগোষ্ঠী। তাই অন্য ধর্মালম্বীদের সঙ্গে তাদের থাকা চলবে না। তাদের জন্য চাই ভিন্ন এক দেশ। অথচ তিনিও সর্ম্পূণ মুসলমান ছিলেন না। এটা ঐতিহাসিক সত্য। তিনি নিয়মিত মদপান করতেন। বরাহ মাংস ভক্ষণ করতেন। জীবনে কোনোদিন নামাজ পড়েছেন বলে কেউ বলতে পারবে না। এমন এক ব্যক্তি কেবল ক্ষমতার লোভে একটি দেশের প্রধান হয়ে গেলেন। তার এই দ্বিজাতি তত্ত্ব যে সর্ম্পূণ ভ্রান্ত ছিল তা বুঝতে সময় নেয়নি জনগণ। সেই ১৯৪৮ সালেই ভাষার প্রশ্নে আন্দোলন শুরু করেছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ। এরপরের ইতিহাস তো আমাদের সবারই জানা। ক্রমেই আমরা পাকিস্তানের পূর্ব প্রদেশের মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিশ্চিয়ানÑ সবাই মিলে একটি পৃথক রাষ্ট্র জন্ম দেয়ার কথা ভাবতে শুরু করি। ১৯৭০ সালের র্নিবাচনের মাধ্যমে এ দেশবাসী স্পষ্ট মতো দেয় বাংলাদেশের পক্ষে। এরপর এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের সৃষ্টি হয়। এই যুদ্ধ ওই র্ধম, নীতি ও বিবেক ভ্রষ্ট পাকিস্তানের পক্ষে কতিপয় বাঙালি কুলাঙ্গার এ দেশের মানুষের ওপর চরম অত্যাচার করে। তাদের শাস্তির বিধান করা হয় যুদ্ধের পর। আমরা ইতিহাসের পাতায় দেখতে পাই, হিটলার ও তার স্যাঙ্গাতদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের বিচার করা হয় নুরেমবার্গে এবং জীবত ও মৃত অপরাধীদের যথাযথ শাস্তি প্রদান করা হয়। কম্বোডিয়ায়ও একই ধরনের বিচারিক প্রক্রিয়ার আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশেও স্বাধীনতার পর পরই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়। কিন্তু এক সুদূরপ্রসারী চক্রান্তের মাধ্যমে আমাদের জাতির পিতাকে হত্যা করে বাংলাদেশের মুক্তির পেছনে সব আদর্শ ও মূল্যবোধকে জলাঞ্জলি দিয়ে ওই
পাকিস্তানিদের দোসররা আবার একটি প্রক্রিয়া শুরু করে যাতে করে এই দেশ নব্য পাকিস্তান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এরই মধ্যে দেশের মানুষ আবার ঘুরে দাঁড়ায়। তারা সহজে এই চক্রান্তের কাছে পরাজয় বরণ করতে রাজি নয়। সর্বশেষ আজকে বাংলাদেশে অধিষ্ঠিত সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে বিধৃত যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়া শুরু করে আবার। এই প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর পরই আবারও সেই পাকিস্তানপন্থীরা সক্রিয় হয়ে ওঠে। দেশের লাখ লাখ তরুণ রাস্তায় নেমে আসে এবং প্রতিবাদমুখর হয় ওই চক্রান্তের বিরুদ্ধে। কিন্তু চক্রান্ত থেমে থাকে না।


গণমানুষের যে কোনো দাবি উচ্চারিত হলেই ‘ইসলাম খাতরে মে হ্যায়’Ñ ‘ইসলাম বিপন্ন’ এই একটি ভ-ামির আশ্রয় পাকিস্তানিরা সব সময় নিয়ে এসেছে। আজও আমরা দেখতে পাই, তাদের বাংলাদেশি দোসররা ওই একই সেøাগান দিয়ে গণমানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। কেবল বিভ্রন্ত নয়, তারা সত্যনিষ্ঠ যুব সম্প্রদায়কে আঘাত করার চেষ্টা করছে এই অভিযোগ দিয়ে যেন তারা নাস্তিক। এ অতি হাস্যকর একটি অভিযোগ এবং আমরা সবাই জানি, এই ধরনের সুবিধাবাদী কথাবার্তা ধোপে কখনোই টেকে না। একদিন বাংলাদেশের মানুষ রুখে দাঁড়াবেই এ ষড়যন্ত্রকে। শাস্তি হবেই যুদ্ধাপরাধীদের। বাংলাদেশ ফিরে পাবে তার হৃত গৌরব মুক্তবুদ্ধির দেশ হিসেবে।
এই বৈশাখের খরতাপে যখন পারিপার্শ্বিকতা বড় উষ্ণ হয়ে উঠেছে, নাগিনীরা চারদিকে ফেলেছে বিষাক্ত নিঃশ্বাস তখন আমাদের যাত্রাপথ খুব একটা মসৃণ হবে বলে আশা করা বোধ হয় ভুল হবে। ভরসা আমাদের একটি। আমাদের নেতৃত্বে রয়েছে একঝাঁক নিঃস্বার্থ মুক্তিকামী তরুণ যারা অবিরাম লড়ে যাচ্ছে আমাদের চেতনা, আদর্শ ও মূল্যবোধের পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য। অথচ এ লড়াই অস্ত্র নিয়ে নয়, এ লড়াই সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ প্রত্যয়ী মনোবলের লড়াই। তাই জয় তাদের অনিবার্য। বৈশাখের খরতাপে বিশাল মুক্তি-বৃক্ষের ছায়ায় আমাদের তরুণরা সমবেত আজ। বৃক্ষ তাদের দিচ্ছে আশীর্বাণী। দখিনা হাওয়ায় বয়ে আসছে সংগ্রামের অনুপ্রেরণা। পথ যতোই কণ্টকাকীর্ণ হোক, এগিয়ে তারা যাবেই হাতে হাত ধরে। এগিয়ে যাবে এই বৈশাখ এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযোদ্ধা সমবেতভাবে অভীষ্ট লক্ষ্যে।

এবং

প্রমিত হোসেন 

 

 

মনের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছিল বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের।
বিশ্বাস বলল, আসবে।
অবিশ্বাস বলল, আসবে না।
বিশ্বাসের দিকে অবিশ্বাস তাকাল করুণার দৃষ্টিতে।
বিশ্বাস বলল, তুমি বোকা।
অবিশ্বাস বলল, তুমি অন্ধ।
যাকে নিয়ে এই দ্বন্দ্ব সে বলেছিল বিকেল চারটের মধ্যে আসবে। বিশ্বাস বড় আশায় তার কথায় বুক বেঁধেছিল। বিশ্বাস প্রথম দিকে অবিশ্বাসকে পাত্তা দেয়নি। তখন বিশ্বাসের কাছ ঘেঁষতে পারেনি অবিশ্বাস। দূরেই ঘোরাঘুরি করছিল। কিন্তু সময় যত গড়াচ্ছিল, যে আশায় বুক বেঁধেছিল বিশ্বাস তা ক্রমশ ততই আলগা হয়ে যাচ্ছিল। যখন প্রায় চারটে বাজে আর তখনও সে আসেনি, আশার বাঁধন ঢিলে হয়ে খুলে পড়ল। এ সময় বিশ্বাসকে পেয়ে বসল অবিশ্বাস। যখন চারটে বাজল এবং সে এল না, অবিশ্বাস দেঁতো হাসি হেসে বলল, বলেছিলাম সে আসবে না?
বিশ্বাস কোনও রকমে বলল, হয়ত কোনও কারণে দেরি হচ্ছে, এসে পড়বে।
অবিশ্বাস তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, তাই নাকি! বেশ, দেখা যাক।
এক ঘণ্টা পেরিয়ে গেল। দুই ঘণ্টা। তিন। এবং চার।
অবিশ্বাস অবজ্ঞার সুরে বলল, জানতাম আসবে না।
বিশ্বাস ঢোক গিলল। মুখটা শুকনো। কোনও কথা বলতে পারল না।
বিজয়ী অবিশ্বাসের দেঁতো হাসিটা চওড়া হয়ে উঠল।


[প্রথম প্রহর/জন্মদিন-২০১৫]

অলৌকিক লোকালয়ে

ঋভু অনিকেত

 


ফাল্গুন শেষ হতে চললো অথচ এই বিকেলবেলা কেমন যেন হালকা ঠা-ার আমেজ। পশ্চিম দিকের জানালাটা খোলা। শেষ বিকেলের এক টুকরো রোদ এসে পড়েছে চেয়ারের পাশে। মৃদু শীতল এই বিকেলে রোদের হালকা উত্তাপ ভালোই লাগছিল। অন্যান্য বছর এ সময়টাতে অফিসের এই রুমে গরমে টেকা দায় হয়ে পড়ে। ঘরে একটা মাত্র ফ্যান, ফুল স্পিডে চললে মনে হয় খুলে পড়বে। উপ-পরিচালকদের রুমে কেন যে এসি দেয়া হয় না, ভেবে পায় না মামুন। এসবের মাঝেই ভাবলো আজ অফিস শেষে হাঁটতে হাঁটতে যাবে শাহবাগের আজিজ মার্কেটে। সেখানে মাঝে মাঝেই যায় সে, কবি-লেখকদের আড্ডাটা বেশ উপভোগ করে মামুন। যদিও লেখালেখির কাজটা চেষ্টা করেও শুরু করতে পারেনি সে। ভাব কেমন করে আসে জানে না সে, ভাবগুলোকে কথায় রূপান্তরিত করে কবিতা বা গদ্য লেখা তো দূরের কথা। তবে কবি-লেখকদের আড্ডায় বসে সাহিত্যের অনেক না জানা তথ্য জানা হয় ওর। আড্ডায় বোকার মতো বসে থেকে মাথা নাড়ানো আর হাঁ-হু করা ছাড়া আর কিছুই করতে পারে না সে। বন্ধুরা প্রথম প্রথম ওকে কথা বলাতে বাধ্য করতে চেষ্টা করতো। এখন তার এই চুপ মেরে থাকাটা বা আড্ডায় সক্রিয় অংশগ্রহণ না করাটা এক রকম মেনেই নিয়েছে ওরা। সাহিত্যে তার জ্ঞান-অভিজ্ঞতা সীমিত থাকার কথা বলে আড্ডায় কথা বলা মামুন এড়িয়ে গেছে সব সময়। এখন আর কেউ ওকে ঘাঁটায় না। আসলে আড্ডার জন্যও যে পড়াশোনার দরকার, এই আড্ডায় এসে উপলব্ধি করলো মামুন। আড্ডার প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে ইদানীং দু’চার লাইন কবিতা লিখতে চেষ্টা করে মামুন। বন্ধুদের দেখাতে সাহস হয় না। কেননা আড্ডার আসরে দেখা যায় ওরা ভালো ভালো কবিরও তুলোধুনো করে ছাড়ে।
‘ডাইরেক্টর স্যার আপনারে সালাম দিছে।’ পরিচালকের পিয়ন সোলায়মানের ফ্যাসফ্যাসে কণ্ঠের বিরক্তিকর শব্দ।

’ওয়ালাইকুম সালাম।’ ভাবনার মুডটা নষ্ট করে দেয়ার জন্য একটু রাগতস্বরেই বললো মামুন। সংবিৎ ফিরে পেয়ে বললো, ‘যাচ্ছি।’ সাইড টেবিলে পিরিচ দিয়ে ঢাকা গ্লাসটা থেকে পানি খেয়ে উঠে দাঁড়ালো। সামনের দেয়ালে ঝোলা ঘড়িতে দেখলো ৫টা বাজে। অফিস ছুটির সময়ে বসের ডাকাডাকি কার ভালো লাগে? নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করলো।
‘কবির, তুমি জানালা-দরজা বন্ধ করে চলে যাও। আমি ডাইরেক্টর সাহেবের রুম থেকে সরাসরি বেরিয়ে যাবো।’ নিজের পিয়ন কবিরকে নির্দেশ দিয়ে পরিচালকের রুমের দিয়ে এগোলো। সালাম দিয়ে পরিচালকের রুমে ঢুকলো মামুন।
‘আরে মামুন, বসো বসো। সোলায়মান, স্যারকে চা দাও।’ পরিচালকের গদগদ ভাব। কেন জানি এই বদখত লোকটা মামুনকে পছন্দ করে। তাই কখনোই কোনো কঠিন কথা বলে না তাকে। মামুনও মুগ্ধ শ্রোতার মতো পরিচালকের কথা শুনতে চেষ্টা করে। অসময়ে ডাকার জন্য বিরক্ত মামুন হ্যাঁ-না কিছু না বলে একটা চেয়ার টেনে বসলো। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য পরিচালক কামরুল সাহেব বললেন, ‘তোমার মধ্যে কবি কবি ভাব আছে অথচ তুমি লেখো নাÑ এটা ঠিক নয়, লিখতে বসে যাও ভায়া।’ ‘কবিতা আমার দ্বারা হবে না স্যার।’ বললো মামুন। কী জন্য যেন ডেকেছিলেন? এমন সময় সোলায়মান দু’কাপ চা সামনে রেখে গেল। কণ্ঠস্বর বিরক্তিকর হলেও চা-টা ভালোই বানায় সোলায়মান, দুধ-চিনি একেবারে পারফেক্ট পরিমাণে। চায়ে চুমুক দিতে দিতে একটা ফাইল মামুনের দিকে এগিয়ে দিল কামরুল সাহেব। ফাইল খুলে একটা কাগজ সামনে তুলে ধরলো। ডিজি ম্যাডামের হাতের লেখা। কিছু বুঝতে না পেরে মামুন বললো, এটা তো আপনিই দিয়ে ফাইল পুটআপ করতে বলেছিলেন। সমস্যাটা কী এখন? মুখে কিছু না বলে কামরুল সাহেব পাতাটা উল্টালেন। হায় হায়! এটা তো আমারই লেখা! ক’দিন ধরে কী যেন হয়েছে খালি কবিতা লিখতে ইচ্ছা করে। তাই হঠাৎ আজ দুপুরে একটা ভাব আসায় কয়েক লাইন একটা কাগজে লিখে রেখেছিল। এখন দেখছি এটা ডিজি ম্যাডামের হাতে লেখা সিøপ। বিস্মিত হয়ে মনে মনে ভাবলো। মুখে বললো, ‘সরি স্যার’।

‘আমাকে সরি বললে তো হবে না, ডিজি ম্যাডাম যদি কোনোভাবে তার ইনস্ট্রাকশনে এ রকম হিজিবিজি লেখা দেখতে পান তাহলে কী হবে, ভেবে দেখো। এমনিতেই ম্যাডাম রগচটা মানুষ।’ কী আর করবো, যা হওয়ার হয়ে গেছে। ফাইলটা ম্যাডামের কাছে পাঠিয়ে দিন। ম্যাডামের চোখে এটা নাও পড়তে পারে। আপনার ভয় নেই স্যার। যদি জিজ্ঞাসা করে আমার নাম বলে দেবেন।‘ এ জন্যই তো বলি, তুমি কবিতা ছাড়লেও কবিতা তোমাকে ছাড়ছে না। বলেই হোঃ হোঃ করে হেসে উঠলেন কামরুল সাহেব।
অফিসের দক্ষিণ দিকের গেইটটা দিয়ে বের হলো মামুন। এডি মাহবুবকে বলে এসেছে একা চলে যেতে। সে আজ আর অফিসের গাড়িতে বাড়ি ফিরছে না। মাহবুব আর মামুন একই জিপে বাড়ি ফেরে। ফুটপাথ ধরে কিছুদূর হেঁটে রাস্তা পার হয়ে হাইকোর্টের মাজারের গেইটের সামনে আসতেই জটাজুটধারী এক ফকির এসে হাত পাতলো। মামুন এসব লোককে কখনো পছন্দ করে না, ভিক্ষা দেয়ার তো প্রশ্নই আসে না। কিছু পাওয়ার অপেক্ষা না করে সেই ফকির মামুনের চোখে চেয়ে হঠাৎ বা হাতটার কব্জি ধরে বসলো। এরপর কী যে হলো, বুুঝতে পারলো না! কেমন যেন একটা ঘোরের মধ্যে চলে গেল। ফকিরটা ওর হাত ধরে মাজারের দিকে টেনে নিয়ে চললো। মোহগ্রস্তের মতো হাঁটতে থাকলো ফকিরের সাথে সাথে। গেইটে ঢোকার পর একই রকম আরেকজন ফকির এসে মামুনের ডান হাতটার কব্জিতে ধরলো। দু’জনেই এমন শক্ত করে হাত ধরেছে, রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম। দু’জনে ওকে টানতে টানতে মাজারের সামনের বট গাছটার দিকে নিয়ে যেতে থাকলো। মামুনের বোধ-বুদ্ধি সবই যেন লোপ পেয়ে গেছে। অনেকটা সম্মোহিতের মতো চলছে সে। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। সবাই বাসায় ফেরার তাড়ায় ব্যস্ত। আশপাশে অনেক লোক চলাফেরা করছে। কারোরই দৃষ্টি আকর্ষণ করছে না এই ঘটনা। মনে হচ্ছে, কেউ দেখছেই না যে, একজন ভদ্রলোককে দু’জন ফকির টেনে নিয়ে যাচ্ছে। বট গাছের নিচে একই রকম বেশ ক’জন ফকির বসা। গাঁজার ছিলিম হাত ঘুরে ঘুরে চলেছে এক হাত থেকে আরেক হাতে। বট গাছের গুঁড়ির ওপর দিয়ে হেঁটে ওই দু’জন তাকে গাছের দিকে নিয়ে যেতে থাকলো। গাঁজার ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন আধো অন্ধকারে গাছের ভেতর হঠাৎ যেন একটা দরজা খুলে গেল। তাকে নিয়ে ওরা দু’জন নিñিদ্র অন্ধকার এক ঘরে ঢুকলো। কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। অন্ধের মতো সামনের দিকে যেতে থাকলো। কিছুক্ষণ পর টের পেল দু’হাতের চাপটা আর এখন নেই। ওরা ওর হাত ছেড়ে দিয়েছে। কিছুদূর চলার পর হঠাৎ করে এক আলোক উজ্জ্বল জায়গায় এসে পড়লো যেন। একটা নদীর পাড়। সকালের সূর্যটা তীব্র আলো ছড়িয়ে দিগন্তরেখার গাছপালার ওপরে উঠে পড়েছে। নদীটা কেমন যেন চেনা চেনা লাগলো। মনে হলো, এ নদীর ধারে এর আগেও এসেছে। মনে পড়লো, দু’বছর আগে দোল পূর্ণিমায় লালনের আখড়ায় এসেছিল। এ তো গড়াই নদী। কিন্তু পরিবেশটা কেমন যেন অন্য রকম লাগছে। অনেক ঝোপঝাড়, অনেক গাছপালা। নদীর ধারের বট গাছটার পাশেই মামুন দাঁড়িয়ে। বট গাছের নিচে গেরুয়া পোশাক পরা জটাজুটধারী কিছু সাধু বসে আছেন। হঠাৎ দূর থেকে একটা গানের আওয়াজ ভেসে এলো। সুরটা বড় চেনা। দেখলো, দূরে নদীর পাড় দিয়ে দোতারা হাতে হেঁটে যেতে যেতে এক লোক গান গাইছে। কান পেতে কথা শোনার চেষ্টা করলো। সুরটা জাতীয় সংগীতের মতো মনে হচ্ছে। কিন্তু কথাগুলো...! তবে কী এ মানুষটি গগন হরকরা!
‘আমি কোথায় পাবো তারে
আমার মনের মানুষ যে রে
হারায়ে সেই মানুষে তার উদ্দেশে
আমি বেড়াই ঘুরে দেশে দেশে...’
বট গাছ ছাড়িয়ে সামনের দিকে হাঁটলো মামুন। অনেকটা জঙ্গলের মতো এলাকাটা। গাছপালার ফাঁক দিয়ে সামনে কিছুদূর এগিয়ে দেখলো জঙ্গলের ভেতর কয়েকটা খড়ে ছাওয়া ঘর। ঘরগুলোর সামনে ছাউনি দেয়া একটা উন্মুক্ত জায়গা। সেখানে একদিকে একটা আসনে সাদা পোশাক পরা একজন বসে আছেন। তার চারপাশ থেকে যেন আলোর দ্যুতি ছড়াচ্ছে। একজন সাধু পুরুষ। তাকে ঘিরে সামনে আরো কয়েকজন বসা। এর মধ্যে দু’একজনকে চেনা চেনা লাগছে। তাদের ছবি কোথাও দেখেছে সে। তাদেরই একজন গেয়ে উঠলোÑ
‘হরি দিন তো গেল সন্ধ্যা হলো পার করো আমারে
তুমি পারের কর্তা জেনে বার্তা তাই ডাকি তোমারে...’

আরে, এ তো কাঙাল হরিনাথ। তার মানে, পাশের দাড়িওয়ালা মানুষটি মীর মশাররফ হোসেন! আর ওই সাধু পুরুষ ‘লালন’! একরাশ বিস্ময় মামুনের চোখে। এ কোথায় এলো! একশ’ বছর আগের সব মহান মানুষ তার চোখের সামনে! কে যেন সাধু পুরুষ লালনকে প্রশ্ন করলো, মনে হয় মীর মশাররফ। গুরু আপনার ধর্ম নিয়ে নানাজনে নানা কথা বলে...। কথাটা শেষ হলো না। লালন গেয়ে উঠলেনÑ
‘সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে
লালন ভাবে জাতের কী রূপ দেখলাম না এই নজরে...’
গান শেষ করে লালন বললেন, ‘ধর্ম তো মানুষের অন্তরে থাকে। মানুষটা মানুষ কি না সেটিই বড় কথা। মানব ধর্মই বড় ধর্ম।’ লালন আরো বললেন, ‘আত্মাকে ভালোবেসে অনুসন্ধান করলেই পরম আত্মাকে পাওয়া যায়।’ পেছন থেকে নারী কণ্ঠে কে যেন গেয়ে উঠলোÑ
‘মানুষ ছেড়ে মন রে আমার
দেখবি তুই সব শূন্যকার
লালন বলে মানুষ আকার ভজলে ত্বরাবি
... ... ...
মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি...’
‘কী হে জ্যোতি, তুমি যে পদ্মায় বোটে বসিয়ে আমার ছবি বানাইলা, ছবিটা তো আমারে দেখাইলা না?’ সামনে বসা একজনের দিকে তাকিয়ে বললেন লালন। জ্যোতি মানে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দাদা! ভালো করে দেখলো। তাই তো ছবিতে দেখা মানুষটাকে আজ বাস্তবে দেখছে মামুন। লালন বলে চললেন, ‘তোমার ভাই রবি বিলাতে যেয়ে নাকি ইংরেজদের সাথে আমারে পরিচয় করানোর চেষ্টা করছে। আমার গান ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’ শুনাইছে ইংরেজদের? ইংরেজরা কী বুইঝবে ওইসব?’ এমন সময় দূরে গাছের আড়ালে একজনকে আবছা মতন দেখতে পেল মামুন। এই লোকটাকে কোথাও দেখেছে মামুন। চশমার কাচটা শার্টে মুছে চিনতে চেষ্টা করলো। মুখটা অস্পষ্ট হলেও চিনতে ভুল হলো না। এ তো গিনসবার্গ, মানে এলেন গিনসবার্গ। কিন্তু তিনি এখানে এলেন কী করে? লালনের মৃত্যুর অনেক পর তার জন্ম! তবে কী গিনসবার্গও মামুনের মতো দর্শক একজন যিনি লিখেছেন অভঃবৎ খধষড়হ নামে কবিতা।

Sleepless, Stay up and

think about Death

- Certainly it's nearer

than when I as ten years old

and wondered how big the 

Universe was


এমন সময় দূর থেকে অনেক মানুষের চিৎকার ভেসে এলো। হা রে রে রে করে দু’দিক থেকে দু’দল মানুষ ছুটে আসছে। সবারই আক্রমণাত্মক রূপ। তাদের হাতে লাঠি, সড়কি নানান রকম অস্ত্র। একদল ধুতি-পৈতা পরা, আরেক দলের মুখে দাড়ি, মাথায় টুপি। লালনের আখড়ার দিকে ধেয়ে আসছে ওরা। মামুন মুহূর্তেই বুঝে নিল এখানে থাকা আর ঠিক হবে না। যেদিক থেকে সে এসেছিল, সেই নদী তীরের বট গাছের দিকেই ছুটে চললো। প্রাণভয়ে খুব জোরে দৌড়ালো সে। বট গাছের গুঁড়িতে পা বেঁধে পড়ে গেল। সংবিৎ ফিরে পেয়ে দেখলো, শিক্ষা ভবনের সামনের ব্যস্ত সকালের রাস্তা। অফিসের উত্তর গেইটের সামনের ফুটপাথে পড়ে আছে মামুন। তাড়াহুড়া করে রাস্তা পার হতে গিয়ে ফুটপাথে হোঁচট খেয়ে পড়েছে সে। পায়ের একটা নখ বুঝি উপড়ে গেল। ডান পায়ের বুড়ো আঙুলটায় প্রচ- যন্ত্রণা। উঠে দাঁড়াতে যাবেÑ এমন সময় একজন এগিয়ে এলো, ‘স্যার কি বেশি ব্যথা পেয়েছেন? এ রকম অসাবধানে তাড়াহুড়ো করে রাস্তা পার হওয়াটা ঠিক হয়নি স্যার। একটা বড় অ্যাক্সিডেন্ট হতে পারতো।’ মাথা উঁচু করে দেখলো, ওরই অফিসের নিম্নমান সহকারী কুদ্দুছ। মামুনের হাত ধরে ওঠাতে চেষ্টা করছে। ‘চলেন স্যার, আপনাকে অফিসে পৌঁছে দিই।’ মামুন হাত নেড়ে জানালো, দরকার নেই। সকালবেলায় গেইট দিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অফিসে ঢুকছে। বিধ্বস্ত মামুনও পা খোঁড়াতে খোঁড়াতে সামনের দিকে এগিয়ে চললো। এই সকালবেলায় অফিসের সামনে এলো কেমন করে? রাতে বাসায় ছিল, না বাইরে ছিল? কিছুই মনে করতে পারছে না মামুন। শুধু দেখতে পাচ্ছে, কবিতার পঙ্্ক্তিরা সারবেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। মনে হচ্ছে, এখন থেকে সে কবিতা লিখতে পারবে।

 

 

ব্যক্তিসত্তা স্বাধীনতা ও রাষ্ট্র

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

 


সভ্যতার প্রাথমিক যুগে রাষ্ট্র সম্পর্কে মনীষীদের দৃষ্টিভঙ্গি কী ছিল সে সম্পর্কে আলোকপাত করা প্রাসঙ্গিক। গৌতম বুদ্ধ মহাজ্ঞান লাভের আগেই অনুভব করেছিলেন, ব্যক্তিসত্তা বিকাশের পথে রাষ্ট্র একটি দূরতিক্রম্য বাধা, একটি জটিল বন্ধন ও একটি অনাসৃষ্টি। একটি সূত্রে তিনি বলেন, রাষ্ট্রের লক্ষ্য হচ্ছে মানুষের সৃষ্টিশীলতাকে বাধাগ্রস্ত করে ক্রমে তাকে এর আজ্ঞাবহ ভৃত্যে পরিণত করা। গৌতম বুদ্ধ আরও উপলব্ধি করেন, মুক্ত মানুষকে অধীন করতে গিয়ে রাজা নিজেও অবশেষে পরিণত হন আরেক ধরনের অধীন সত্তায়। রাষ্ট্রসত্তার গোলকধাঁধা থেকে বেরিয়ে আসার লক্ষ্যেই গৌতম এক রাতে রাজ্য, স্ত্রী ও সন্তান পেছনে ফেলে বেরিয়ে পড়লেন মুক্তির সন্ধানে, সত্যের সন্ধানে। মুক্তজীবন ও সাধনার মাধ্যমে তিনি লাভ করেন মহাজ্ঞান।
আমাদের উদ্দেশ্য এখানে বুদ্ধের মহাজ্ঞানের সন্ধান নয়, বরং ইতিহাস থেকে কিছু উপাত্ত-উপমা তুলে ধরে যুক্তি প্রদান করা যে, ব্যক্তিসত্তার সঙ্গে রাষ্ট্রসত্তার বিরোধ চিরকালের।

সভ্যতার প্রাথমিক যুগে রাষ্ট্র সম্পর্কে মনীষীদের দৃষ্টিভঙ্গি কী ছিল সে সম্পর্কে আলোকপাত করা প্রাসঙ্গিক। গৌতম বুদ্ধ মহাজ্ঞান লাভের আগেই অনুভব করেছিলেন, ব্যক্তিসত্তা বিকাশের পথে রাষ্ট্র একটি দূরতিক্রম্য বাধা, একটি জটিল বন্ধন ও একটি অনাসৃষ্টি। একটি সূত্রে তিনি বলেন, রাষ্ট্রের লক্ষ্য হচ্ছে মানুষের সৃষ্টিশীলতাকে বাধাগ্রস্ত করে ক্রমে তাকে এর আজ্ঞাবহ ভৃত্যে পরিণত করা। গৌতম বুদ্ধ আরও উপলব্ধি করেন, মুক্ত মানুষকে অধীন করতে গিয়ে রাজা নিজেও অবশেষে পরিণত হন আরেক ধরনের অধীন সত্তায়। রাষ্ট্রসত্তার গোলকধাঁধা থেকে বেরিয়ে আসার লক্ষ্যেই গৌতম এক রাতে রাজ্য, স্ত্রী ও সন্তান পেছনে ফেলে বেরিয়ে পড়লেন মুক্তির সন্ধানে, সত্যের সন্ধানে। মুক্তজীবন ও সাধনার মাধ্যমে তিনি লাভ করেন মহাজ্ঞান।
আমাদের উদ্দেশ্য এখানে বুদ্ধের মহাজ্ঞানের সন্ধান নয়, বরং ইতিহাস থেকে কিছু উপাত্ত-উপমা তুলে ধরে যুক্তি প্রদান করা যে, ব্যক্তিসত্তার সঙ্গে রাষ্ট্রসত্তার বিরোধ চিরকালের। সব ব্যক্তি মিলে স্বেচ্ছায় রাষ্ট্র তৈরি করেছে- এটা তত্ত্বের কথা, ইতিহাসে আদৌ ছিল কি না তা বলা শক্ত। তবে ব্যক্তি সামষ্টিকভাবে সতর্ক না হলে রাষ্ট্রের অধীনে সবাই যে এক সত্তাহীন খড়কুটোয় পরিণত হতে পারে তা উপলব্ধি একাধিক মহাজ্ঞানী করেছেন। নিজের ব্যক্তিসত্তার স্বার্থে রাষ্ট্র থেকে দূরত্ব বজায় রাখা বুদ্ধির কাজ বলে মনে করেছিলেন চিনা দার্শনিক কনফুসিয়াস।

তার মতে, রাষ্ট্র হচ্ছে ক্রমে ক্রমে গড়ে ওঠা এমন একটি অস্তিত্ব যার প্রধান কাজ রাজ্যের মানুষকে বিবেক-বুদ্ধি থেকে বের করে এনে তার আজ্ঞাবহ ক্রীতদাস বানানো। তাই তিনি উপদেশ দেন যে, আপন স্বাধীনতা সমুন্নত রাখার জন্য বুদ্ধিমানদের উচিত রাষ্ট্র থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে নিজেদের মধ্যে সাংস্কৃতিক সত্তা তৈরি করা। জেরেমি বেনথাম, স্টুয়ার্ট মিল, হেনরি মেইন প্রমুখ রাজনৈতিক দার্শনিকের চিন্তার মধ্যে বারবার ফিরে এসেছে বৌদ্ধ ও কনফুসিয়াসের রাজনৈতিক দর্শন। জাঁ পল সার্তের অস্তিত্ববাদ বুদ্ধ ও কনফুসিয়াসের চিন্তাধারাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। সার্তের মতে, ব্যক্তি একটি আদি ও স্বাধীনসত্তা যা রাষ্ট্র বিনষ্ট করতে সব সময়ই তৎপর। তার মতে, ব্যক্তির সঙ্গে রাষ্ট্রের প্রধান বিরোধ এখানেই যে, রাষ্ট্রসত্তার প্রবণতা হচ্ছে ব্যক্তিসত্তাকে করায়ত্ত করা, ব্যক্তির অস্তিত্বকে অস্বীকার করা এবং মিথ্যা দেশপ্রেম সৃষ্টি করে মানুষের অধিকার হরণ করা। তার মতে, রাষ্ট্র যত বড়, ব্যক্তি তত ছোট।
প্রাচীন যুগে জনপদের মানুষ প্রকৃতিগতভাবেই অর্থাৎ আপন নিরাপত্তাবোধ থেকেই সামাজিক জীব হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। সমাজ আগে, না রাষ্ট্র আগে- এ প্রশ্ন বাতুলতা মাত্র, কেননা সমাজেরই ভিন্ন রূপ হচ্ছে রাষ্ট্র। সমাজের আদি কাঠামো অর্থাৎ আদিম স্বাধীনতাকে বিনষ্ট করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে রাষ্ট্র। রাষ্ট্র সৃষ্টির ব্যাপারে সমাজ উদ্যোগ নিয়েছে এমন কোনো প্রমাণ ইতিহাসে মেলে না। বরঞ্চ প্রমাণ আছে, রাষ্ট্র গঠনে সমাজসত্তা কোথাও কোথাও প্রতিরোধ রচনা করেছে, যদিও সে প্রতিরোধ কখনোই ফলপ্রসূ হয়নি। রাষ্ট্র গঠনের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ ব্যর্থ হওয়ার একটি প্রধান কারণ হয়তো ধর্ম। বিশ্বাস করার কারণ আছে, সমাজ রাষ্ট্রের আগে ধর্মের সঙ্গে পরিচিত হয়। যেহেতু ধর্ম এবং রাষ্ট্র উভয় সত্তাই সমাজের উদ্বৃত্তের ওপর নির্ভরশীল, সেহেতু প্রাথমিক পর্বে রাষ্ট্রের উত্থানকে ধর্ম একটি প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখেছে। অনুরূপভাবে রাজাও রাজধর্মের বাইরে অন্য ধর্মকে প্রতিপক্ষ হিসেবে গণ্য করেছে।
প্রজাতন্ত্র পতনের পর অধিকাংশ মানুষ রাষ্ট্র ও রাজন্যশ্রেণির দাসে পরিণত হয়। আগেরকার সামাজিক সাম্যের বদলে সমাজ তখন বিভক্ত হলো রাষ্ট্রীয় আমলা-পুরোহিতশ্রেণি এবং দাসে। ব্যক্তি ও সমাজসত্তাকে পদদলিত করে কীভাবে স্বৈরতন্ত্রী রাজ্য তৈরি হলো তা নিয়ে তত্ত্ব আলোচনা প্রাচীনকাল থেকেই দেখা যায়। ভারতীয় বৈদিক তত্ত্বে যেমন আছে, আলো ও অন্ধকারে মানুষকে চক্রাকারে ঘূর্ণি খেতে হবে, এটাই বিধি বা প্রকৃতির নিয়ম। বৈদিক তত্ত্বমতে প্রাকৃতিক মহাসময়ে মানুষ চারটি যুগের মধ্যে চির ঘূর্ণায়মান- সত্যযুগ, ত্রেতাযুগ, দ্বাপরযুগ ও কলিযুগ। সত্যযুগ হলো মানুষের জন্য সুন্দর ও স্বাধীন যুগ। তার পরপরই পতনের পালা। সত্যযুগ থেকে ত্রেতা, দ্বাপর হয়ে কলিযুগে এসে মানুষ হারায় সব ধরনের ন্যায়বিচার ও শান্তি। এ সময় ব্রহ্মা সব ধ্বংস করে আবার নতুন করে সৃষ্টি করেন সত্যযুগ। মিসরীয় ও গ্রিক মিথলজিতেও অনুরূপ সমাজ বিবর্তনের তত্ত্ব রয়েছে। এটা ধর্মীয় তত্ত্ব এবং এমন তত্ত্ব সব ধর্মেই রয়েছে। ভালো ও মন্দ সময়ের জন্য ঐশী শক্তি ক্রিয়াশীল- এমন তত্ত্ব ব্যক্তি ও সমাজ নিয়ন্ত্রণে শক্তিশালী অস্ত্র বটে।
মানব ইতিহাসের এটা একটা করুণ দিক যে, সময়ের ব্যবধানে ব্যক্তিসত্তা ও সামাজিক স্বাধীনতা হারিয়ে পরিশেষে মানুষ তার নিজ দেহের ওপরও অধিকার হারায়। ফলে সে শাসকশ্রেণির দাসে পরিণত হয় এবং দাস ও তার স্ত্রী-সন্তানাদি মালিকের হস্তান্তরযোগ্য সম্পত্তিতে পরিণত হয়। কীভাবে মানুষ তার আপন সত্তা হারিয়ে বিজয়ী শক্তির দাসে পরিণত হলো সে ইতিহাসের জের টেনে মার্কিন স্বাধীনতা যুদ্ধের তাত্ত্বিক টমাস পেইন রাষ্ট্রের পক্ষে মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়ার প্রবণতার ইতিহাস তুলে ধরেন তার ঐঁসধহ জরমযঃং আলোচনায়। তিনি যুক্তি দেখান, ‘রাষ্ট্রকে ব্যক্তিস্বাধীনতার পক্ষে বাধ্য না রাখতে পারলে রাষ্ট্র উল্টো কাজটি করবে। রাষ্ট্র ব্যক্তিস্বাধীনতাকে পদদলিত করে সবাইকে দাসে পরিণত করবে।’ পেইনের এ উক্তিই অন্যভাবে ব্যক্ত করেন লর্ড একটন। তার বিখ্যাত ঐরংঃড়ৎু ড়ভ খরনবৎঃু প্রবন্ধে তিনি মন্তব্য করেন, চড়বিৎ পড়ৎৎঁঢ়ঃং ধহফ ধনংড়ষঁঃব ঢ়ড়বিৎ পড়ৎৎঁঢ়ঃং ধনংড়ষঁঃবষু.
উনিশ শতকের প্রথম ভাগ থেকেই আইনগতভাবে দাসপ্রথা বিলোপ করার উদ্যোগ আসে ইউরোপ থেকেই। এর কারণ হিসেবে ইউরোপে ব্যক্তিস্বাধীনতা, মানববাদী ও উদারনৈতিক আন্দোলনগুলোকে অনেকে কৃতিত্ব দিয়ে থাকেন। কিন্তু এ ধারণা একেবারেই ভুল। মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতার পক্ষে দার্শনিক তত্ত্ব আমরা প্রাচীনকাল থেকেই পাই। কিন্তু এতে শাসকশ্রেণি ব্যক্তিকে অধীন করার প্রচেষ্টায় বিরত থেকেছে এমন প্রমাণ নেই। কোনো ধর্মই দাসপ্রথাকে স্বাভাবিক ব্যবস্থা হিসেবে মেনে নেয়নি; যদিও কোনো ধর্মই দাসপ্রথাকে নিষিদ্ধও করেনি। শাসক কর্তৃক মানুষকে অধীনে করে প্রভু হওয়ার স্পৃহা যে আদৌ গ্রহণযোগ্য নয়, সে সম্পর্কে প্রাচীনকালের হামুরাবি, উকারুগিনা, কনফুসিয়াস, কৌটিল্য থেকে আধুনিককালের টমাস পেইন, বেনথাম, মিল, কার্ল মার্কস, রবীন্দ্রনাথ প্রভৃতি মনীষী তাদের অভিমত ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু তারপরও দাসপ্রথা বরং বেড়েছে, কমেনি। উনিশ শতক থেকে দাসপ্রথা বিলুপ্তির পর্ব শুরু হওয়ার প্রধান কারণ প্রযৌক্তিক পরিবর্তন। শিল্পবিপ্লবোত্তর যুগে প্রযুক্তি এমন এক পর্যায়ে উন্নীত হলো, যখন দেখা গেল যে, দাসশ্রমিকের চেয়ে মুক্তশ্রমিক অনেক বেশি উৎপাদনশীল। এ সত্য অনুধাবন করার পরই কম উৎপাদনশীল দাসত্বপ্রথা বিলোপের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
সুলতানি সরকার অমুসলমানদের জিম্মি হিসেবে ঘোষণা করলে তারা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হয়। জিম্মিরা জিজিয়া কর প্রদান করে সামরিক বাহিনীতে যোগদান করার বাধ্যবাধকতা থেকে রেহাই পায়। মুঘল সরকার অমুসলমানদের ওপর জিজিয়া কর আরোপের ব্যাপারে বেশ নমনীয়তা দেখালেও দাসপ্রথা আরও জোরদার করে তোলে। এর প্রধান কারণ দাসশ্রমিক। মুঘল সৃষ্ট জমিদার ও ফৌজদার শ্রেণির কর্মকা- পরিচালিত হয়েছে মূলত দাসশ্রেণিকে কেন্দ্র করে।

 

সুলতানি সরকার অমুসলমানদের জিম্মি হিসেবে ঘোষণা করলে তারা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হয়। জিম্মিরা জিজিয়া কর প্রদান করে সামরিক বাহিনীতে যোগদান করার বাধ্যবাধকতা থেকে রেহাই পায়। মুঘল সরকার অমুসলমানদের ওপর জিজিয়া কর আরোপের ব্যাপারে বেশ নমনীয়তা দেখালেও দাসপ্রথা আরও জোরদার করে তোলে। এর প্রধান কারণ দাসশ্রমিক। মুঘল সৃষ্ট জমিদার ও ফৌজদার শ্রেণির কর্মকা- পরিচালিত হয়েছে মূলত দাসশ্রেণিকে কেন্দ্র করে। এ সময় ইউরোপীয় বাণিজ্যিক কোম্পানিগুলো উপকূল অঞ্চলে হানা দিয়ে যুবক-যুবতীদের ধরে নিয়ে বিদেশে বিক্রি করত এবং জাহাজের লস্কর-খালাসি হিসেবে ব্যবহার করত সুলতানি সরকার অমুসলমানদের জিম্মি হিসেবে ঘোষণা করলে তারা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হয়। জিম্মিরা জিজিয়া কর প্রদান করে সামরিক বাহিনীতে যোগদান করার বাধ্যবাধকতা থেকে রেহাই পায়। মুঘল সরকার অমুসলমানদের ওপর জিজিয়া কর আরোপের ব্যাপারে বেশ নমনীয়তা দেখালেও দাসপ্রথা আরও জোরদার করে তোলে। এর প্রধান কারণ দাসশ্রমিক। মুঘল সৃষ্ট জমিদার ও ফৌজদার শ্রেণির কর্মকা- পরিচালিত হয়েছে মূলত দাসশ্রেণিকে কেন্দ্র করে। এ সময় ইউরোপীয় বাণিজ্যিক কোম্পানিগুলো উপকূল অঞ্চলে হানা দিয়ে যুবক-যুবতীদের ধরে নিয়ে বিদেশে বিক্রি করত এবং জাহাজের লস্কর-খালাসি হিসেবে ব্যবহার করত

 

এ সময় ইউরোপীয় বাণিজ্যিক কোম্পানিগুলো উপকূল অঞ্চলে হানা দিয়ে যুবক-যুবতীদের ধরে নিয়ে বিদেশে বিক্রি করত এবং জাহাজের লস্কর-খালাসি হিসেবে ব্যবহার করত। মুঘল রাষ্ট্র এ ব্যাপারে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করার চেষ্টা করেনি। সরকারের সামরিক দুর্বলতা এর প্রধান কারণ নয়, আসল কারণ হচ্ছে, দাসপ্রথার অনুকূলে মুঘল রাষ্ট্রের চলমান নীতি।
ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি রাষ্ট্রব্যবস্থায় ব্যক্তি-মানুষের অধিকার সর্বনিম্নে পৌঁছায়। সুলতানি-মুঘল রাষ্ট্রে দাসত্বপ্রথা থাকলেও সমাজের উচ্চবর্গের লোকরা রাষ্ট্র পরিচালনায় ভূমিকা রাখত। দক্ষতা ও মর্যাদাবলে তাদের অনেকের রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আমির-উমারাহ পদে পর্যন্ত আসীন হতে পারত। নবাবি আমলের আমির-উমারাহদের একটি বড় অংশ ছিল দেশীয়। রাষ্ট্রের বিভিন্ন দপ্তরে রাষ্ট্রীয় কাজে দায়িত্ব লাভ করেছে দেশীয় অভিজাত শ্রেণির লোক। কিন্তু কোম্পানি আমলে এবং কোম্পানি শাসনের পর রাষ্ট্র পরিচালনায় দেশীয়দের অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। উনিশ শতকের প্রথম সিকি পর্যন্ত দেশীয়দের জন্য খোলা ছিল একমাত্র নিম্ন পদের কেরানি, পাইক, পেয়াদা, বরকন্দাজ, সিপাহির পদ। রাষ্ট্রের সব কর্মকা- পরিচালনা করেছে শ্বেতাঙ্গরা। শ্বেতাঙ্গ আমলাদের ওপর ন্যস্ত ছিল লাগামহীন ক্ষমতা এবং পুরো দেশ শাসিত হতো তাদের দ্বারা। ভারতবর্ষে কয়েকশ শ্বেতাঙ্গ আমলা দ্বারা কোটি কোটি মানুষের শাসনভার সম্পাদন করা সম্ভব হয়েছে শুধু এ জন্য যে, কোম্পানি আমলে ব্যক্তিমানুষ ও সমাজের সত্তা এবং অধিকারকে সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলা হয়। আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা হয়েছে সব মানুষের মধ্যে ভয়ভীতি ও ত্রাস সঞ্চারের মাধ্যমে। এ ব্যাপারে সাহায্য নেওয়া হয়েছে সাত খুনের মাফ পাওয়া অনুগত জমিদারশ্রেণির।
প্রথাগতভাবে ভূমির মালিক রায়তশ্রেণিকে বঞ্চিত করে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে দেশের প্রায় পাঁচ হাজার জমিদারকে করা হয় ভূমির একচ্ছত্র মালিক। রায়তকে পরিণত করার হয় জমিদারের ইচ্ছাধীন প্রজায়। ভূমি একটি সম্পত্তি, একটি অধিকার; যে অধিকার রায়তশ্রেণি চিরকাল ভোগ করে এসেছে। এ ঐতিহাসিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে রায়ত হলো সম্পত্তিহারা, অধিকারহারা। অপরদিকে ইউরোপের আদলে এ দেশে প্রতিষ্ঠা করা হয় একটি অনুগত জমিদারশ্রেণি ও জমিদারশ্রেণির অধীনে একটি অধিকারহীন প্রজাশ্রেণি। ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রাধীনে কোনো স্বাধীন ব্যক্তি ছিল না, ছিল শুধু সত্তাহীন অধীনে প্রজা। সে অধীনতাও ছিল আবার ওপর থেকে স্তরে স্তরে বিন্যস্ত- সরকার, জমিদার, তালুকদার, পত্তনিদার, হাওলাদার, জোতদার, কুৎকিনদার। সবাই একে অপরের মনিব এবং সব মনিবই প্রজার উৎপাদনের অংশীদার, যদিও কৃষি উৎপাদনে তাদের কোনোই ভূমিকা ছিল না।
ঔপনিবেশিক সরকার জমিদারকে প্রজার ওপর সর্বময় ক্ষমতা প্রদান করলেও রাষ্ট্র পরিচালনায় জমিদারকে সম্পূর্ণ দূরে রাখা হয়। রাষ্ট্র পরিচালনা ও দৈনন্দিন প্রশাসন ক্ষেত্রে শাসিতশ্রেণিকে সম্পূর্ণ অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। নানা সংস্কারের মাধ্যমে এ অযোগ্যতা ধীরে ধীরে তুলে নিয়ে অবশেষে ইংরেজের বিদায় ঘটল ১৯৪৭ সালে। কিন্তু ইংরেজ প্রণীত শোষণ ও বঞ্চনাভিত্তিক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা টিকে থাকল। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বিলুপ্তির পর মনিব হিসেবে জমিদারের বিদায় ঘটল বটে, কিন্তু অন্যান্য মনিব ভিন্ন অবয়বে টিকে থাকে, যা কি না বর্তমানেও বিদ্যমান। পরিসংখ্যান মতে, বর্তমান বাংলাদেশের অর্ধেকেরও বেশি মানুষ ভূমিহীন যা কি না ঔপনিবেশিক যুগের রাষ্ট্রচরিত্রকেও অতিক্রম করে গেছে। একই চিত্র বিদ্যমান নগরজীবনেও। নগরের অধিকাংশ মানুষ কর্মহীন, আশ্রয়হীন, স্বাস্থ্যহীন। খোদ রাষ্ট্র দেশি-বিদেশি নানা স্বার্থগোষ্ঠীর প্রভাবে পরিচালিত হচ্ছে। শাসনতন্ত্রে যদিও তাত্ত্বিকভাবে মানুষের মৌলিক অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এর প্রয়োগ নেই। এক কথায়, ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতাহীনতার ব্যাপারে বর্তমান বাংলাদেশ অতীতকে অতিক্রম করেছে, সামাজিক অগ্রযাত্রা সূচনা করা তো দূরের কথা।

হেলাল হাফিজ - কবিতার আশ্চর্য ফেরীঅলা

এহসান মাহমুদ 

 

 

কতোটা পথ পাড়ি দিলে পথিক হওয়া যায় ? ক-ত টুকু বাঁধা পেরোলে স্বাধীনতা ধরা দেয়, কিংবা কতোটা সময় ফেরী করে বেড়ালে একজন ফেরীঅলা হয়ে ওঠেন ? আর একজন ফেরীঅলা এক জীবনে ক’ঘরে ফেরী করতে পারেন বা তাঁর মালামাল ফুরিয়ে না গিয়ে অনবরত ফেরী করে বেড়াতে পারেন ! খুব কম সংখ্যক ফেরীঅলাই তা পারেন। আর যারা পারেন, তাঁরাই হয়ে ওঠেন আশ্চর্য ফেরীঅলা। বাংলা কবিতার ইতিহাসে হেলাল হাফিজ এমন আশ্চর্য এক ফেরীঅলা।
কবি হেলাল হাফিজের জন্ম ১৯৪৮ সালের ৭ অক্টোবর, নেত্রকোনা জেলার বড়তলী গ্রামে। শৈশবে মাকে হারিয়েছেন। স্কুল শিক্ষক বাবার কড়া শাসনে কেটেছে শৈশবের দুরন্ত সময়। ছিলেন স্কুলের সেরা খেলোয়ার। নেত্রকোনাতেই কেটেছে স্কুল এবং কলেজ জীবন। ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে ভর্তি হন বাংলা বিভাগে। তারপরেই কবিতা নামক পোঁকার আক্রমনে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। নেত্রকোনার আরেক কবি নির্মলেন্দু গুণ এবং কবি রফিক আজাদের সাথে জানাশোনা ছিল আগেই। নির্মলেন্দু গুণের সাথে পরিচয় বাবার কবিতা লেখার উছিলায়। স্কুল শিক্ষক বাবা খোরশেদ আলী তালুকদারও কবিতা লিখতেন। নির্মলন্দু গুণ এবং রফিক আজাদের সাথে বাবা কবিতা লিখতেন খালেকদাদ চৌধুরী সম্পাদিত ‘উত্তর আকাশ’ নামের পত্রিকায়। সেই সুবাদে ঢাকায় এসে নির্মলেন্দু গুন এবং রফিক আজাদের সাথে সম্পর্কটা আরও পাকাপোক্ত হয়। তারপর থেকেই কবিতায় যাপন শুরু।
১৯৬৯ সাল। গণঅভ্যুত্থানের সময়। ঢাকা শহর যেন মিছিলের নগরী। হেলাল হাফিজ লিখে ফেললেন ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ কবিতা। কবিতা নিয়ে পত্রিকায় প্রকাশের জন্য গেলেন দৈনিক পাকিস্তান’র সাহিত্য সম্পাদক কবি আহসান হাবীবের কাছে। আহসান হাবীব কবিতা পড়ে ফিরিয়ে দিলেন, আর বললেন, তোমার এ কবিতা ছাপাতে পারলাম না বলে আমার আজীবন দুঃখ থাকবে। তবে আমি বলছি- এই কবিতা লেখার পরে তোমার আর কবিতা না লিখলেও চলবে।
হেলাল হাফিজ কবিতা নিয়ে ফিরে আসেন। কিন্তু না, তিনি অগ্রজ কবির কথা ভুলে গিয়ে আবার কলম হাতে নেন। একে একে লিখে ফেলেন- ‘নিরাশ্রয়ী পাঁচটি আঙুল’ এবং ‘দুঃসময়ে আমার যৌবন’। ততদিনে দেশে শুরু হয়ে গেছে উত্তাল একাত্তর। সারা দেশ মিছিলে মিছিলে মুখর। আর দেয়ালে দেয়ালে লেখা হতে থাকলো ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ কবিতার প্রথম দু’টি চরণ -এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়/এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।
লেখালেখি শুরু করার ১৭ বছর পরে প্রকাশ করেন প্রথম এবং একমাত্র কবিতার বই যে জলে আগুন জ্বলে। ১৯৮৬ সালের বই মেলায় কবিতার বইটি প্রকাশিত হওয়ার পরেই নিজেকে আড়াল করে নেন তিনি। সুদীর্ঘ ২৫ বছর এক ধরনের স্বেচ্ছানির্বাসন অবস্থা থেকে বের হয়ে ২০১২ সালের বই মেলায় প্রকাশিত হয় তাঁর ২য় গ্রন্থ কবিতা একাত্তর। দীর্ঘ ২৫ বছরে তিনি যাপন করেছেন ভিন্ন এক জীবন। ফেরী করেছেন আশ্চর্য এক কষ্ট। প্রায় চার বছর যাবৎ বাসা বেঁধেছেন হোটেলে। পরিজনবিহীন রাজধানী ঢাকার তোপাখানা রোডের হোটেল কর্নফুলিতে এখন তাঁর নিবাস। এখন তাঁর জীবন অনেকটা হোটেল বন্দি অবস্থায় কাটে। দুই কিস্তিতে তাঁর মুখোমুখি বসি প্রেসক্লাবের গেষ্টরুমে আর তাঁর হোটেল কর্নফুলির রুমে। কবি শোনান তাঁর ‘এক জীবন’ ফেরী করার গল্প !

-কয়েকমাস পরেই আপনি পৌঁছবেন ৬৭তম জন্মদিনে। পেছনে কাটিয়ে এসেছেন জীবনের এতোটা বছর। তাই শুরুতেই জানতে চাইছি, ৬৭ বছরের জীবনে ২৫টি বছর কাটিয়ে দিলেন অন্তরালে থেকে, আজ এখন এই সময়টাতে আপনার উপলব্ধি কি ?
- জন্মদিনতো আসলে আনন্দের কোনো বিষয় নয়। বরং এটি একধরনের মন্দ লাগার কারণ। ৬৬ বছর পেছনে ফেলে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়া। ৬৬ বছর হয়তো অংকের হিসেবে বেশ দীর্ঘ একটা সময়ই বটে। কিন্তু, আমি পুরো সময়টাকে কাজে লাগাতে পারিনি। আর এই জীবন যাপন করতে গিয়ে হয়তো নতুন কোনো কষ্ট আবার বুকে জমেছে। সেগুলো আবার মাথা চারা দিয়ে উঠতে চায়। যে বেদনাবোধ, নিজের স্বপ্ন এবং প্রেম থেকে লেখা হয়েছে আমার যে জলে আগুন জ্বলে। আমার অব্যক্ত কথাগুলোই প্রকাশিত হয়েছে কবিতার বইয়ে। আবার হয়তো কিছু বেদনা জমেছে। সেগুলোকে প্রকাশ করতে হবে। আর জীবনের ২৫ বছরেরও বেশি সময় যে স্বেচ্ছা নির্বাসিত ছিলাম তার জন্য আমার কোনো অনুশোচনা নেই। ৬৬ বছর থেকে ২৫টি বছর তো এক ধরনের ঝরে যাওয়াই বলা যেতে পারে। তবে তা নিয়ে কোনো দুঃখবোধ নেই।

-এবার আমরা একটু গোড়ার দিকে যেতে চাই। কখন থেকে সিদ্ধান্ত নিলেন যে কেবল কবিতাই লিখবেন ?
-সোজাসুজি বলতে গেলে কলেজ জীবন থেকে। স্কুল জীবনে আমি খুব ভালো খেলোয়ার ছিলাম। স্কুলের হয়ে বাইরের বিভিন্ন দলের বিপক্ষে বেশ ভালো ফুটবল খেলতাম। এছাড়া লং জাম্প ছাড়াও ভলিবলটাও খুব ভালো খেলতে পারতাম। বলতে পারো যে, ভালো খেলোয়ার ছিলাম। কিন্তু সবকিছুর পরেও মাতৃহীনতার একটা শূণ্যতা আমাকে তাড়া করতো। খেলা-ধুলা আমাকে সেই হাহাকারময় অবস্থা থেকে পরিত্রান দিতে পারতো না। তখনই আমি আশ্রয় নিই কবিতার। আকড়ে ধরি কবিতাকে। কবিতাও অমাকে আশ্রয় দেয়। তারপরে ইন্টারমিডিয়েট পাশের পরে ’৬৭ এর দিকে যখন ঢাকায় চলে আসি, তখন সবকিছু যেন বদলে গেল। আর একটি ব্যাপার যেটি আমার মনে হয়, আমাদের যৌবনের সময়ে এই ভূখন্ডে বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে যা আমাদের সময়ের অনেককেই প্রভাবিত করেছে। কিছু ঘটনা যেমন- ’৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ’৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধ এইসব ঘটনাগুলো আমাদেরক প্রবলভাবে প্রভাবিত করেছে, আলোড়িত করেছে। যা আমাদেরকে কবিতা লিখতে একধরনের সহায়তা করেছে বলেই আমার মনে হয়।
-আপনার কাব্যগ্রন্থ যে জলে আগুন জ্বলে’র কবিতা বিন্যাসের দিকে তাকালে দেখি যে ’৬৯ থেকে ’৮৫ সাল পর্যন্ত বিভিন সময়ে লেখা কবিতা স্থান পেয়েছে। কাব্যগ্রন্থটিতে মোট ৫৬ টি কবিতা রয়েছে। এই সুদীর্ঘ ১৬ বছরে কি আপনি ৫৬টি কবিতাই লিখেছিলেন?
-না ... না। কবিতা জমেছিল প্রায় একশো’ কুড়িটির মতো। সেখান থেকে বাছাই করে ৫৬ টি কবিতা নেয়া হয়েছে। আর কবিতা বাছাইয়ের ক্ষেত্রে আমি চেয়েছি যেন প্রেম, দ্রোহ, সংগ্রাম, দেশ, সমাজ, ব্যাক্তিগত প্রেম বা জীবন সবকিছু যেন এক মলাটে বন্দি করা যায়। আর যে জলে আগুন জ্বলে বইটি করার জন্য কবিতা বাছাইয়ে আমি সময় নিয়েছিলাম ৬ মাসের মতো। প্রতিদিন কবিতা বাছাই করতাম। আবার রাতে শুয়ে শুয়ে ভাবতাম এই কবিতাটি বাদ দিয়ে অমুক কবিতাটি নিতে হবে। আবার পরেরদিন দেখা যেত আগের রাতের বাছাই করা কবিতাটি বাতিল করে দিতাম। অনেক সময় এমনও হয়েছে যে, কবিতা বাছাই করতে গিয়ে মনে পড়তো আচ্ছা, ঐযে সদরঘাটের বা গুলিস্তানের মিছিল থেকে আসার পরে যে কবিতাটি লিখেছিলাম সেটি বাদ দিবো কেন? নিয়ে নিই না কেন সেটি? আবার দেখা যেত কোনো এক নারীর কথা স্মরণ করে লেখা কোনো একটি কবিতা নেয়ার জন্য আবার নতুন করে কবিতা বাছাই করেছি। তাই কবিতা নির্বাচন করাটা আমার কাছে অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়েছিল।

-যে জলে আগুন জ্বলে কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতা ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’র প্রথম দু’টি লাইন আপনাকে রাতারাতি তারকা কবির পরিচিতি এনে দেয়। তখন ’৬৯ এবং ’৭১ এ আপনার এই কবিতা মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। আপনার কবিতা লেখা থাকতো দেয়ালে, দেয়ালে। তারপরে দেশ স্বাধীনেরও অনেককাল পরে ৫৬ টি কবিতা একত্রিত করে ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হলো -যে জলে আগুন জ্বলে। আর এদিকে আমাদের দেশটিও ৫৬ হাজার বর্গমাইল আয়তনের। দেশের ভূখন্ডের সাথে মিলিয়েই কি ৫৬টি কবিতা রেখেছিলেন ?
-না। এটা কাকতালীয়। আমি এমনটা করে ভাবিনি। তুমিই প্রথম যে এই বিষয়টি নিয়ে এভাবে মিলিয়ে দেখলে। আসলে ৫৬টি কবিতা রাখা হয়েছিল বইয়ের ফর্মা অনুযায়ী। এর চেয়ে বেশি কবিতা রাখা যেত না। তাই ৫৬টিই নির্বাচিত করা হয়েছে।

-কেবল একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের পরেই কেন নিজেকে আড়ালে নিয়ে গেলেন বা আড়াল করলেন ?
-নানা কারনে। তবে কিছু মান-অভিমান তো ছিলই। কিন্তু আমি কবিতা নিয়ে কখনোই ব্যবসা করতে চাইনি। কবিতাকে অর্থ উপার্জনের মাধ্যম বলেও কখনো ভাবিনি।

-এই যে একটি কাব্যগ্রন্থ দিয়ে প্রায় দুই প্রজন্মকে সমানভাবে সম্মোহিত করে রাখলেন, আপনার কবিতার কোন বিশেষ দিকটির জন্য আপনার কবিতা এখনও শুরু থেকে সমান পঠিত বলে মনে করেন ?
-আমার কবিতায় মানুষের স্বপ্ন ও আকাঙ্খাকে হয়তো প্রকাশ করতে পেরেছি। আমার স্বপ্ন ও আকাঙ্খাকে মানুষকে স্পর্শ করেছে বলেই এটা হয়েছে বলে মনে হয়। যেমন- এবার এই যে শাহবাগে আন্দোলন হলো, সেখানেও রোজ কেউ না কেউ আমার কোনো না কোনো কবিতা পাঠ করেছে আবৃত্তি করেছে। মানুষ প্রেমে পড়তে গিয়েও আমার কবিতা পড়েছে। প্রেমে মজেও পড়েছে। আবার প্রেমে প্রত্যাখাত হয়েও পড়েছে। আমার কবিতার মাঝে যেন একক আমি সকলের কথাই বলেছি। তাই হয়তো এমনটা হতে পারে।
-আপনার সমকালের অন্যান্য কবিগণ যেমন- আসাদ চৌধুরী, নির্মলেন্দু গুণ, আবুল হাসান, রফিক আজাদ, মহাদেব সাহা, আবদুল মান্নান সৈয়দ এঁদের মধ্যে কেবল আবুল হাসানের (অকাল প্রয়াত বলে) ৩টি কাব্যগ্রন্থ। কিন্তু আপনার কেবল একটি কাব্যগ্রন্থ। তারপরেও আপনি আমাদের বাংলা কবিতার ষাটের দশকের আলোচনায় বেশ আলোচিত। কিন্তু সেটি কেন ? আপনার কেবল একটি গ্রন্থ এক্ষেত্রে কোনো অন্তরায় হয়ে উঠতে পারেনি কেন ?
-কেন অন্তরায় হয়ে উঠতে পারেনি তা আমি বলতে পারবো না। আর আমার তো মনে হয় আমার নামটি অন্যসবার আগেই উচ্চারিত হয় (হা..হা..হা)। (হাসি থামিয়ে খানিক ভেবে) আমাদের ষাটের দশকের প্রথম দিকের কবি হলেন আসাদ চৌধুরী। তুমি যাদের নাম বলেছো এঁদের বাইরে প্রশান্ত ঘোষালের নামটিও উল্লেখ করার মতো।
-আপনার সময়কার অন্যান্য কবিগণ কবিতা লিখে খ্যাতির পাশাপাশি নানা পুরষ্কার ও রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পেয়েছেন। এক্ষেত্রে আপনার অবস্থানটি যদি বলেন...
-আমি কখনোই ভাবিনি যে কবিতা লিখে পুরষ্কার পেতে হবে। আর আমি এক জীবনে এতো এতো মানুষের এতো প্রেম আর ভালোবাসা পেয়েছি যে অন্য কিছু পাওয়ার কথা স্মরণে আসেনি। আর বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা দেশ এবং দেশের বাইরে থেকে নানা সময়ে সম্মাননা দিয়েছে আমাকে। তবে যেটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ সেটি হচ্ছে ভালোবাসা। আর আমার যা কিছু অর্জন সব তো কবিতার জন্যই। আর রাষ্ট্রীয় পুরষ্কার বলতে তো বাংলা একাডেমি পুরষ্কারকে বুঝায়। সেটি এখনও পাইনি। তার জন্য কোনো দুঃখ বোধও নেই।

 

’৬৫ সনে পাক-ভারত যুদ্ধের সময়েও আমাদের নেত্রকোনার সিনেমা হলে সূচিত্রা সেনের ছবি দেখানো হতো। যে সপ্তাহে সূচিত্রা সেনের ছবি থাকতো সেই সপ্তাহে পালিয়ে হলে গিয়ে ছবি দেখতাম। এমনও হয়েছে অনেকদিন আমি এবং আব্বা একইসাথে হলে বসে সিনেমা দেখেছি। কিন্তু আব্বা জানতো না যে আমিও হলের ভেতরে রয়েছি। ছবি শেষ হলে তাড়াতাড়ি বের হয়ে অন্য রাস্তা আব্বার আগে বাড়িতে পৌঁছে যেতাম। তখন থেকেই সূচিত্রা সেনের প্রতি মোহবিষ্ট হয়ে পড়েছিলাম। সেই সূচিত্রা সেনকে দেখলাম নিজেকে আড়াল করে গৃহবন্দী করে রেখেছেন

 

-আপনি প্রায় দীর্ঘ ২৫ বছর এক ধরনের স্বেচ্ছা নির্বাসন জীবন কাটালেন। এই নির্বাসিত জীবনে কি কবিতা থেকেও নির্বাসনে ছিলেন?
-আমি প্রায় নির্বাসিত জীবন কাটালেও কবিতাকে কখনো ছাড়তে পারিনি আর কবিতাও আমাকে ছেড়ে যায় নি। আর এই ২৫টি বছর আমি এই বইটির প্রতি (টেবিলে থাকা যে জলে আগুন জ্বলে দেখিয়ে) মানুষের ভালোলাগা আর ভালোবাসা অবলোকন করেছি। আমার নির্বাসিত জীবন কম্পর্কে লোকজন সঠিক কিছু জানতো না। অধিকাংশ লোকজন জানতো আমি দেশের বাইরে আছি। আবার অনেকে ভাবতো আমি মারা গেছি। তাই ২৫ বছর পরে আবার এসে আমি নতুন একটা জগতের মুখোমুখি হলাম যেন।
-আপনার এই নিজেকে আড়াল করা বা নির্বাসিত জীবন যাপনের পেছনের কথাটি যদি বলতেন....
-(খানিক ভেবে) নির্বাসনে থাকার প্রধান কারন হচ্ছে -আলস্য। এটি এখন আমার রোগে পরিণত হয়েছে। আর তাছাড়া ব্যাক্তিজীবনের নানা পরাজয়ও রয়েছে। এছাড়া আরেকটি বিষয়, যিনি আমাকে নির্বাসিত থাকতে উৎসাহী বলবো, না-কি প্রলুব্ধ করেছেন বলবো ? তিনি হচ্ছেন সূচিত্রা সেন। আমি সূচিত্রা সেনের খুব অনুরাগী। সূচিত্রা সেনের বিষয়টা বলতে হলে একটু পেছনে যেতে হবে। ’৬৫ সনে পাক-ভারত যুদ্ধের সময়েও আমাদের নেত্রকোনার সিনেমা হলে সূচিত্রা সেনের ছবি দেখানো হতো। যে সপ্তাহে সূচিত্রা সেনের ছবি থাকতো সেই সপ্তাহে পালিয়ে হলে গিয়ে ছবি দেখতাম। এমনও হয়েছে অনেকদিন আমি এবং আব্বা একইসাথে হলে বসে সিনেমা দেখেছি। কিন্তু আব্বা জানতো না যে আমিও হলের ভেতরে রয়েছি। ছবি শেষ হলে তাড়াতাড়ি বের হয়ে অন্য রাস্তা আব্বার আগে বাড়িতে পৌঁছে যেতাম। তখন থেকেই সূচিত্রা সেনের প্রতি মোহবিষ্ট হয়ে পড়েছিলাম। সেই সূচিত্রা সেনকে দেখলাম নিজেকে আড়াল করে গৃহবন্দী করে রেখেছেন। কারো সাথে কোনো প্রকার যোগাযোগ রাখছেন না। এক সময়ের তুমুল জনপ্রিয় নায়িকা নিজেকে আড়ালে নিয়ে নিলেন। আড়াল করে ফেললেন নিজেকে। সূচিত্রা সেনের মতো আমিও নিজেকে আড়ালে নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তা ২৫ বছর ধরে রাখতে পারলেও আর পারলাম না। পারছি না বলেই এখন তোমার সাথে বসে গল্প করছি (হা...হা...হা)।

-জ্বী। তাই আপনার নির্বাসন ভঙ্গের জন্য আপনাকে আরেকবার স্বাগত। (তিনি খানিক বিরতি নিলেন)। এবার আমরা আবার শুরু করি তবে ?
(তিনি মুখ বুজেই একবার হাসলেন যেন। তারপরে বললেন, ও হ্যাঁ আলোচনাটা শেষ করা দরকার।)
-কবিতায় সমকালীন রাজনৈতিক চিন্তার প্রভাব পড়ে। আপনার ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ তার উজ্জ্বল উদাহরণ। কিন্তু আবার অনেক রাজনৈতিক কবিতাই শেষ পর্যন্ত কবিতা না হয়ে শ্লোগান সর্বস্ব হয়ে ওঠে। এ বিষয়ে কিছু বলুন...
-আমার ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ নিয়ে এখন রীতিমত তর্ক-বিতর্ক চলছে। এ নিয়ে অনেকে বলেন, এটি শ্লোগান। আবার অনেকে বলছেন, কবিতাই ছিল এখন স্লোগান হয়ে গেছে। তবে আমি বলবো- এটাকে আমি কবিতা হিসেবেই লিখেছি। তুমুল জনপ্রিয়তার কারনে হয়তো অনেকে ‘শ্লোগান’ বলার পক্ষে মত দিয়েছেন।

-আপনি যে সময়টাতে কবিতা লেখা শুরু করলেন- অর্থাৎ ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ, ঐ সময়টিকে নিয়ে আপনার সময়কার প্রায় সকলেই কবিতা লিখেছেন। বিশেষকরে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আপনার কোনো কবিতা রয়েছে কিনা ?
-দেখো আমি কোনো রাজনৈতিক দলের সক্রিয় কর্মী কখনোই ছিলাম না। আর নীতিগতভাবে আমি বাম রাজনীতিকে সমর্থন করি। যদিও সারাবিশ্বে মার্কস

ইজমের পতন হয়েছে, কিন্তু আমি বিশ্বাস করি- রাষ্ট্রের সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে সম্পদের সুষম বন্ঠন করতে মার্কস ইজমের কোনো বিকল্প নেই। যাই হোক, বর্তমানে অমাদের বাংলাদেশে দুটি জিনিস পড়েছে ভল্লুকের হাতে। একটি হচ্ছে ধর্ম, অপরটি রাজনীতি। বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পরে যখন বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা লেখাটা ছিল ভয়াবহ, তখন আমি এই ভূখ-ের স্থপতি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা লিখেছি। আমার কবিতাটির নাম ‘নাম ভূমিকায়’।

-এবার আপনার ব্যাক্তিগত বিষয়ে জানতে চাইবো।
-তুমি জিজ্ঞেস করতে পারো এহ্্সান। যেটি বলার মতো বলবো। সংকোচের কিছু নেই।
-আপনার জীবন-যাপন নিয়ে বিভিন্ন কথা প্রচলিত আছে। জীবন ধারনের জন্য, জীবিকা উপার্জনের জন্য আপনি নানা বিচিত্র মাধ্যম বেছে নিয়েছিলেন। সেসব বিষয়ে যদি বলেন...
-সারাজীবনে পেশা বলতে যা বলতে বুঝায় সেটি বললে সাংবাদিকতার কথাই বলতে হবে। কিন্তু আমাদের দেশে এই পেশাটি এখনও ইন্ড্রাষ্টিরূপে দাড়ায় নি। তাই বেকার হবার একটি ঝুঁকি থেকেই যায়। আমিও আমার দীর্ঘ কর্মজীবনের প্রায় অর্ধৈকটা সময়ই চাকরিহীন অবস্থায় কাটিয়েছি। ১৯৭৪ এ যখন আমার চাকরি চলে গেল তখন আমি জুয়া খেলে জীবিকা চালাতাম। আমার জুয়া খেলার ভাগ্য খুবই ভালো ছিল। বেশিরভাগ সময়ই আমি জিততাম। ১৫ বছরেরও বেশি সময় আমি জুয়া খেলে জীবন-যাপন করেছি।
এছাড়া আরেকটি বিষয় আছে যেটিকে ইংরেজিতে বলে ‘জিগোলো’। ‘জিগোলো’ হচ্ছে সেই পুরুষ যে কিনা বিত্তশালী নারীদের এক্সট্রা ম্যারিটাল ফ্রে- হিসেবে কাজ করে। আমি সেটিও করেছি অনেকদিন। অর্থাৎ অর্থের বিনিময়ে নারীদেরকে সঙ্গ দিতাম। নারীরা আমার সঙ্গ পছন্দ করতো।
তবে এগুলো অনুসরনীয় হতে পারে না। আমি চাইনা আমার মতো করে কেউ জীবন-যাপন করুক। তবে আমার জীবন যাপনের পুরো প্রক্রিয়ায় আমি চারটি মূল বিষয়ের উপর বিশ্বাস রেখে চলেছি। এগুলোই আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। এগুলো হচ্ছে- অক্সিজেন, শস্যদানা, প্রেম এবং কবিতা। এ চারটির একটির কমতি হলে আমার বেঁচে থাকা কষ্টকর হয়ে উঠবে।

-আপনার ‘প্রস্থান’ কবিতায় আছে “একজীবনে কতোটা আর নষ্ট হবে,/ এক মানবী কতোটাই বা কষ্ট দেবে !” কবিতার এই মানবী কে ?
-কবিতার সবটাই বলাটি ঠিক হবে না। বনলতা সেন কে ছিল তুমি জানো নাকি এহ্্সান ? জীবনানন্দ কী তা বলে গেছেন (হা...হা...হা) ?

-আপনার কবিতায় কয়েকটি চরিত্র এসেছে যেমন- হিরনবালা, সবিতা সেন, হেলেন, রানা। এরা কি কাল্পনিক নাকি আপনার জীবন থেকে নেয়া নাম ?
-অনেকটাই বাস্তব চরিত্র। আর বেশি বলতে চাই না। তাহলে গবেষকদের কাজ এগিয়ে দিয়ে যাওয়া হবে।

-২০১২ বইমেলায় প্রকাশিত হলো আপনার ‘কবিতা একাত্তর’ নামের গ্রন্থটি। এটির বিষয়ে কিছু বলেন...
-‘কবিতা একাত্তর’ আসলে মৌলিক কোনো বই নয়। এতে যে জলে আগুন জ্বলে বইয়ের ৫৬টি কবিতা এবং নতুন ১৫টি মোট ৭১টি কবিতার বাংলা এবং ইংরেজি একত্রে মলাটবদ্ধরূপ। আমি দীর্ঘদিন ধরেই চেয়েছিলাম আমার কবিতা ইংরেজিতে রূপান্তর করা হোক। মূলত এটি করা হয়েছে ইংরেজি সংস্করণের জন্যই।

-নতুন কবিতা লিখছেন কিনা ?
-আমি আসলে শম্ভুক গতিতে লিখি। আর হয়তো আমি ওতো প্রতিভাবান নই। তাই আমাকে ভাবতে হয় বেশি। আর নতুন কবিতা লিখতে বসার আগে এক ধরনের ভীতি কাজ করে। এই ২৬ বছরেও আমি আমার ভীতিটা কাটিয়ে উঠতে পারিনি। ভীতিটা হচ্ছে যে জলে আগুন জ্বলে নিয়ে। প্রথম গ্রন্থটি প্রকাশ হওয়ার পরে এতো এতো প্রতিক্রিয়া পেয়েছি যে নতুন লেখায় হাত দেয়ার আগেই ভাবতে হয়- এটি কি যে জলে আগুন জ্বলে কে অতিক্রম করতে পারবে ? কিংবা কাছাকাছি থাকতে পারবে ? যদি তা না হয়, তবে লিখে কি লাভ ? এমন করতে করতেও কিছু কবিতা আবার জমেছে। দেখি কি করা যায়...

-আর কোনো বই করার ইচ্ছে আছে কি না ?
-একটি বই করবো ইচ্ছে আছে। নামও ঠিক করে ফেলেছি -‘বেদনাকে বলেছি কেঁদোনা’। দেখি কবে নাগাদ বের করতে পারি ! তবে আমি আরও সময় নিতে চাই। হতে পারে এক বছর বা দুই বছর।

-এই যে পরিবার পরিজনহীন হয়ে হোটেলবাস করছেন, শেষ বয়স নিয়ে বা মৃত্যু নিয়ে কিছু ভাবেন না ?
-শৈশবে মা মারা যাবার পর থেকেই আমি নিঃসঙ্গ। অনেকটা বিচ্ছিন্ন জীবন-যাপন করেছি ছোটবেলা থেকেই। তাই এখন নতুন করে আর কোনো সমস্যা হচেছ না। এই কর্নফুলি হোটেলে ওঠার কয়েকদিন পরে একটি কবিতা লিখেছিলাম ‘সতীন’ নামে। কবিতাটি হচ্ছে- “তুমি আমার নিঃসঙ্গতার সতীন হয়েছো !”
আর মৃত্যু চিন্তা নিয়ে চিন্তা না করে মৃত্যুকে ভালোবাসলেই হয়। রবীন্দ্রনাথের কথায় বলা যায়- “মরনরে তুহু মম শ্যাম সম।”

-আমরা একটি শব্দ ‘অমরতা’ ব্যবহার করি। এই সম্পর্কে আপনার চিন্তা কি ?
-দেখো এহ্্সান, জীবনানন্দ কিন্তু বেঁচে থাকতে জেনে যেতে পারেন নি যে তিনি কবি। আজকে তিনি বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবি। আমি কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে মাথায় রেখেই বলছি। কেবল কবিতার বিচারে জীবনানন্দ বাংলা কবিতার শ্রেষ্ঠ কবি। আর রবীন্দ্রনাথ সবকিছু মিলিয়ে রবীন্দ্রনাথ। তাই ‘অমরতা’ বিষয়টি এখানে তুমি কিভাবে ব্যাখ্যা করবে ? আর আমি আমার কথা বলতে পারি- আমি তো এক ধরনের অমরতা পেয়েই গেছি। দীর্ঘ ২৫ বছর পরে ফিরে এসেও দেখছি লোকজন আমার কবিতা পড়ছেন। আমাকে মনে রেখেছেন।

সাক্ষাতকার গ্রহনের সময় : ১ এবং ২ ফেব্রুয়ারি ২০১৫
ঢাকা।

জন্মের রহস্য

ইকবাল আজিজ

 

 

কার জীবনে কখন ঝড় আসবে তা কেউ জানে না। আরিফ ভেবেছিল, তার জীবনটা সুখ-দুঃখে কেটে যাবে। উচ্চকাক্সক্ষা তার তেমন নেই। তাই জীবন নিয়ে জুয়াও কোনোদিন খেলেনি। সহজ-সরল জীবনই ছিল তার সার, স্বপ্ন ও প্রত্যাশা। কিন্তু জীবন এক আশ্চর্য রহস্যের নাম। কারো পক্ষেই উপলদ্ধি করা সম্ভব নয় মাত্র এক মিনিট পর তার জীবন কিংবা সংসারে কী ঘটতে চলছে। সে ভাববাদী বা ভাগ্যবাদী নয়, বরং পুরোপুরি মধ্যবিত্ত মূল্যবোধ ও নিতান্তবই কর্মে বিশ্বাসী সাধারণ মানুষ। যা কখনোই ভাবেনি, ওই অনাকাক্সিক্ষত বিপর্যয়টি শেষ পর্যন্ত তার জীবনে এসে ভর করলো। এটা তেমন অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়। তবে যার জীবনে ঘটে সেই শুধু টের পায়।
১৪ বছর সংসার করার পর আরিফের ঘর ভেঙে গেছে। আরিফ ও তাদের ১৩ বছরের পুত্র তুষার এবং স্ত্রী লায়লাÑ এই নিয়ে একটি সংসার হঠাৎ ভেঙে তছনছ হয়ে গেল। তিন মাস আগে সহসাই আরিফের যৌথ জীবন ভেঙে গেছে।
বিবাহীত জীবনে আরিফ ছিল স্ত্রীর ওপর নির্ভরশীল। সংসারের সব দিকই সামলাতো লায়লা। আরিফ একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থার মালিক। তার স্ত্রী লায়লা গৃহবধূ। তবে মাঝে মধ্যে এনজিও-তে কনসালটেন্সি করে। ১৪ বছর ধরে তাদের সংসারে সুখ-দুঃখ সবই ছিল। কিন্তু চূড়ান্ত কোনো সংঘাত হয়নি। ঘটনাপ্রবাহে আরিফ ও লায়লার জীবন দুটি দিকে চলে গেল। মাঝখানে তুষার দাঁড়িয়েছিল দুটি জীবনের স্বপ্নময় প্রত্যাশা হয়ে। তার জীবনের ভবিষ্যৎও নির্ধারিত হয়ে গেছে, সে বাবার সঙ্গে থাকবে।
বিয়ে বিচ্ছেদের বিষয়ে আলোচনার জন্য তিন মাস আগে এক বিকেলে ঘনিষ্ঠ কয়েক আত্মীয় এক সঙ্গে বসেছিল আরিফ, লায়লা ও তুষারকে নিয়ে। এ কারণে ওই বিচ্ছেদের ঘনঘটায় আবদুল মালেক সেদিন ছিল অনুপস্থিত। ওই ঘরোয়া আসরে লায়লা বললো, আরিফের বিরুদ্ধে তার কোনো অভিযোগ নেই। সে বিয়ে বিচ্ছেদ চায়। তার ভরণ-পোষণ দরকার নেই। তুষারের বিষয়ে তার কোনো আলাদা দাবি নেই। সে ইচ্ছা করলে তার বাবার সঙ্গে অথবা তার কাছে থাকতে পারে লায়লার নতুন সংসারে। কিন্তু পারিবারিক বৈঠকে সবাইকে অবাক করে দিয়ে ১৩ বছর বয়স্ক তুষার বললো, ‘আমি ॥

আব্বুর সঙ্গে থাকবো। জীবনে আর কোনোদিন তার আম্মু এবং ওই কুত্তা মালেক মামাকে দেখতে চাই না।’
লায়লার বড় বোন বললো, ‘বাবা, বড়দের ওইভাবে গালি দিতে নেই। মানুষ খারাপ বলবে।’ তারপর সবাইকে চা-নাশতা দেয়ার জন্য বাড়ির কাজের মেয়েকে সে নির্দেশ দিল।
তুষার বাবার পাশে বসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। তার বড় খালাই ওই পারিবারিক অলোচনার আয়োজন করেছে। সেদিনই বিচ্ছেদের বিষয়টি চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছিল।
ঠিক হয়েছিল বিচ্ছেদ না হওয়া পর্যন্ত লায়লা শান্তিনগর তার পৈতৃক বাড়িতে থাকবে। অন্যদিকে তুষারকে নিয়ে আরিফ থাকবে সেন্ট্রাল রোডে তার ফ্ল্যাটে। যেহেতু মুসলমানের বিয়ে বিচ্ছেদ এবং মিয়া-বিবি রাজি সেহেতু আইনত তালাক কার্যকর হতে তেমন ঝামেলা হয়নি।
তিন মাস ধরে তুষার আছে তার বাবার সঙ্গে। আরিফ নিজের মানসিক বিপর্যয় অনেকখানি কাটিয়ে উঠেছে। বাবা ও পুত্রের সংসার এক নতুন এবং ব্যতিক্রমী নিয়মের আবর্তে ক্রমেই স্বাভাবিক ও স্বচ্ছন্দ। জগতে এই এক নিয়মÑ মানুষ সব পরিবর্তনেই অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। সংসারের যাবতীয় দায়িত্ব সামলানোর জন্য পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে বুয়া রাখা হয়েছে। সামান্য লেখাপড়া জানা এই নারীকে ঠিক কাজের মেয়ে না বলে বরং কেয়ারটেকার বলা যায়। ওই কেয়ারটেকার তসলিমার অধীন এক ঠিকা ঝি কাজ করে সকাল-সন্ধ্যা।

আরিফ সকালে ধানম-ির টিউলিপ ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে তুষারকে রেখে চলে যায় বনানীতে তার অ্যাড. ফার্মে। মাঝারি আকারের ‘মোনালিসা অ্যাড. ফার্ম’-এ ২৫-৩০ কর্মচারীর ভাগ্যবিধাতা সে। অফিসে পৌঁছেই ড্রাইভারকে দিয়ে গাড়ি পাঠিয়ে দিল তুষারের স্কুলে। ড্রাইভার দু’তিন ঘণ্টা অপেক্ষায় থাকে তুষারের। আগে এ দায়িত্বটা পালন করতো লায়লা। স্কুলের সামনের আঙিনায় অনেক নারীকে নিয়ে বসে থাকতো। ড্রাইভারও থাকতো গাড়ি নিয়ে।
ওই স্কুলে মালেক আসতো তার ভাগ্নিকে নিয়ে। লায়লার বয়সি মালেক প্রথম থেকেই অ্যাগ্রেসিভ ও অশালীন ধরনের। তার এ স্বভাবের কারণে মেয়েরা তাকে খুব সহজেই পছন্দ করে ফেলে। লায়লার সঙ্গে এখানেই আলাপ হয়েছিল মালেকের। তুষার ও মালেকের ভাগ্নি তিশা যখন স্কুলে ক্লাস করতো তখন লায়লা এবং তার ‘মালেক ভাই’ ৮ নম্বর রোডের ভারতীয় রেস্টুরেন্ট ‘খানা খাজানা’য় বসে দইবড়া ও চটপতি খেতো। এভাবে সম্পর্কটি গভীর হতে দেরি হয়নি।
লায়লা বাস্তবিকই প্রেমে পড়েছিল। ওই সঙ্গে অনুভব করেছিল, আরিফকে সে কোনোদিনই ভালোবাসেনি।
আচরণে রাফ অ্যান্ড টাফ স্বভাবের ব্যবসায়ী মালেকও যেন তার এক উপযুক্ত জীবনসঙ্গী খুঁজে পেয়েছিল লায়লার মধ্য দিয়ে। ওই নারী যথেষ্ট অভিজ্ঞ ও কামনিপোনা। মাঝে মধ্যে তারা ধানমন্ডি মালেকের বাসায়ও যেতো। নিভৃতে দু’এক ঘণ্টা সময় কাটাতো। ব্যাপারটি এভাবে চলতে পারতো বেশ কিছুকাল। কিন্তু জীবনের গতি শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে থামবে তা কেউ জানে না।
ইতোমধ্যে তুষারকে লায়লা পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল মালেকের সঙ্গে ‘মালেক মামা’ বলে ডাকতে। তারা তিনজন ধানমন্ডি লেকে ডিঙায় চড়ে ভেসে বেড়াতো। তুষার মজাই পেতো। তবে মাঝে মধ্যে তার খারাপ লাগতো যখন দেখতো ওই গু-ার মতো লম্ভা-চওড়া মানুষ মায়ের হাত ধরে বসে আছে। সে তখন অন্যদিকে তাকিয়ে থাকতো। ব্যপারটি আরো এগিয়ে গিয়েছিল। কারণ প্রেম-ভালোবাসা মানুষকে অনেক সাহসী করে তোলে।
শরীরের ভাষায় কথা বলতে গিয়ে লায়লা বুঝেছিল, এতোকাল সে বড় বেশি বঞ্চিত হয়েছে। আরিফের অল্প ভুঁড়িওয়ালা আয়েশি শরীরটি জীবনের অনেক ছন্দময় রহস্যে অভ্যস্ত নয়। লায়লা মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, আরিফ যদি মালেক বিষয়ে তার অপরিহার্যতা মেনে নিয়ে চুপ থাকে তাহবে আরিফের সংসারে থাকবে। তা না হলে মালেকের সঙ্গে সে নতুন করে ঘর বাঁধবে। এর মাঝামাঝি অন্য কোনো পথ নেই।
আরিফের সঙ্গে মালেকের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল লায়লা। মালেক প্রায়ই হোটেল থেকে খাবার-দাবার নিয়ে আসতো। কথনো কখনো খাবারের সঙ্গে বিদেশি হুইস্কি কিংবা রেড ওয়াইনের বোতল আনতো।
বাবা সারা দিন অফিসে, তুষার দেখতো তাদের ফ্ল্যাটে মা ও মালেক মামা বোতলের পানি খেয়ে কিছুটা অসংলগ্ন কথা বলছে। তুষার তখন তাদের কাছে গেলে দু’জনই হাসতো। মা বলতো, ‘তুষার আমার লক্ষ্মী ছেলে।’ মালেক মামা মদের ঘোরে বলতো, ‘তুষার রে আমি কাইলই আমেরিকায় পাঠাইয়া দিমু। আমার সব টাকা, ধন-সম্পদও ওরে দিয়া যামু।’ গোটা ব্যাপারটা তুষারের খারাপ লাগতো। কারণ তার বাবাকে কখনোই মদ খেতে দেখেনি সে। মাও আগে কোনোদিন খায়নি। বাবা সিগারেট পর্যন্ত খায় না। তিনি সব সময় বলেন, ‘সিগারেট, মদ খুব খারাপ জিনিস।’
আরিফ বাসায় ফিরে মালেকের সঙ্গে বসে থাকতে দেখেছে। খাবার ও পানীয়ও খেতে দেখেছে। কিন্তু নিরীহ ও নির্বিরোধী স্বভাবের আরিফ কিছু বলতে সাহস পায়নি।
লায়লা এমনিই কিছুটা তেজি ও ডোমেনেটিং স্বাভাবের। এর উপর ইদানীং সঙ্গী হয়ে জুটেছে মালেক নামে এক মাতাল ও গু-া। একদিন সেন্ট্রাল রোডের অ্যাপার্টমেন্টের বেডরুমের তারা দরজা লাগিয়ে ছিল। তুষারকে বলেছিল, টিভিতে তারা একটি বিশেষ ফিল্ম দেখবে।
তুষার নিজের ঘরে মন খারাপ করে বসেছিল। একটি বই পড়ার চেষ্টা করছিল।
আরিফ হঠাৎ বাসায় ফিরে ব্যাপারটি বুঝতে পারলো। বাইরে থেকে বেডরুমের দরজায় কড়া নেড়ে লায়লাকে ডাকলো।
কিছুক্ষণ পরে দু’জন বেরিয়ে এলো। মালেক ও লায়লা দু’জনেরই চুল অবিন্যস্ত। মালেকের শার্টের দুটি বোতাম খোলা।
লায়লা কিশুটা ক্ষুব্ধ হয়ে বললো, ‘এভাবে অসভ্যের মতো দরজা ধাক্কা দিচ্ছিলে কেন? জীবনেও ভভ্রতা শিখলে না?’
আরিফ কিছুটা সাহস করে বললো, ‘তোমরা দরজা লাগিয়ে কী করছিলে?’
এবার মালেক কেমন অদ্ভুদভাবে ভিলেইনের মতো হাসলো। তারপর সোজা আরিফের কাছে এসে তার ঘাড়ে হাত রেখে অস্ফুট স্বরে বললো, ‘এসব কথা যদি কাউকে বলো তাহলে দেন আই উইল কিল ইউ।’
আরিফ ভাবতেই পারেনি তার বাসায় এসে বাইরের কেউ তাকে এভাবে হুমকি দিতে পারে! আরিফ সরে গিয়ে একটি চেয়ারে বসলো।
তুষার বুঝতে পারলো না। শুধু দেখতে পেল বাবা খুব গভীর ও বেদর্নাত হয়ে বসে আছে।
এবার মালেকের দিকে তাকিয়ে লায়লা বললো, ‘তুমি ওই গাধাটার সঙ্গে কেন কথা বলতে গেছ।’
তুষার তাকিয়ে থেকে মায়ের কথা বলার ভঙ্গিটা দেখলো। গত কয়েক মাসে

মা কতো বদলে গেছে। একটা বাইরের মানুষের সামনে আব্বুকে গাধা বলছে!
সেদিন মালেক চলে যাওয়ার পর লায়লাকে আরিফ জিজ্ঞাসা করলো, ‘তুমি আসলে কী চাও?’
লায়লা বললো, ‘আপাতত তোমকে ছাড়তে চাই। কাল শান্তিনগরে চলে যাবে। এরপর ভেবে দেখো, কী করবে?’
লায়লা তার বাপের বাড়ি শান্তিনগরে চলে যাওয়ার ক’দিন পর তুষারের বড় খালার বাসায় ঘরোয়া আলোচনার মধ্য দিয়ে সব চূড়ান্ত হয়ে গেল নির্বিবাদে।
এরপর ছ’মাস কেটে গেছে। সেন্ট্রাল রোডের অ্যাপার্টমেন্টে আরিফ ও তুষারের জীবনে স্বাভাবিক ছন্দ অনেকটাই ফিরে এসেছে। আরিফ ভাবে, বাবা ও ছেলের এ সংসার নিয়ে যদি দেশের কোনো নারীবাদী লেখিকা একটি গল্প লিখতেন তাহলে হয়তো ভালোই হতো। আরিফের মনে হয়, কোনো জীবনেরই শেষ কেউ বলতে পারে না।
তুষারও হয়তো বিপর্যয় কাটিয়ে উঠছে। তবে মাঝে মধ্যে সে একা কাঁদে। এই ছ’মাস সে একবারও মাকে দেখতে চায়নি। বরং তুষারকে লায়লা দু’বার দেখতে আসার জন্য ফোন করেছিল। তুষার বলে দিয়েছে, ‘কোনো দরকার নেই। তুমি কুত্তার বাচ্চা মালেক মামার সঙ্গেই থাকো। আর কখনো আমাকে ফোন করবে না।’
লায়লা ওপার থেকে চুপ হয়ে গেছে।
ওই বিচ্ছেদের ঘটনাটি তুষারের মানসিক বয়স অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। সে জানে, তাদের ক্লাসের দু’তিনজন বন্ধুর মা-বাবার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। কিন্তু তাদের মা-বাবা দু’জনই আবার বিয়ে করেছে। কিন্তু তার বাবা কতো ভালো! তাকে ছেড়ে মা অন্য পরুষের কাছে চলে গেছে। কিন্তু বাবা চিরকাল একা থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তুষার একদিন বলেছিলো, ‘বাবা, তুমি একটি বিয়ে করো। সারা জীবন এভাবে একা থাকবে?’
আরিফ বলেছে, আমি তো একা নই। তুই আছিস আমার সঙ্গে। তোর সঙ্গে সারা জীবন থাকবো। লেখাপড়া শেষ হলে খুব লক্ষ্মী এক মেয়ের সঙ্গে তোর বিয়ে দেবো।’
ততোক্ষণে বাবার হাত ধরে কাঁদতে শুরু করেছে তুষার। সে বুঝেছে, এ জীবনে এতো বড় আশ্রয় আর কেউ নেই। তবে রাতে বাবা ও ছেলের ঘুমানোর ঘর আলাদা। তুষারের ১০ বছর হওয়ার পর লায়লাই ছেলের আলাদা ঘুমানোর ব্যবস্থ্যা করেছিল। নিয়মটা এখনো চালু আছে। ঘুমানোর আগে বাবা ও ছেলে একে অপরকে ‘গুডনাইট’ বলে চলে যায় যার যার ঘরে। তুষার ঘুমানোর সময় অনুভব করে, তার জীবনের সবচেয়ে বড় অবলম্বন ‘আব্বু’ পাশের ঘরে ঘুমিয়ে আছে।
আরিফও ঘুমের মধ্যে উপলদ্ধি করে, তার পুত্র একমাত্র বংশধর ঘুমের মধ্যে মেঘের রাজ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তুষার তার জীবনের একমাত্র আশ্রয়, বড় আদরের সন্তান। তার বেঁচে থাকার একমাত্র প্রেরণা।
তুষার এখন অনেক দায়িত্বশীল। কাজের বুয়াকে যথাযথ নির্দেশনা দেয়ার দায়িত্বটা অনেকখানি পালন করে সে। অবশ্য এ নিয়ে বাবার সঙ্গে পরামর্শর করে। এরপর স্বাভাবিকভাবে বুয়াকে নির্দেশ দেয়, কোন বেলায় কী রাঁধতে হবে। এছাড়া এ সাপ্তাহের বিভিন্ন কাজের আগাম নির্দেশ দিয়ে রাখে।
আরিফ একটু উদাসীন প্রকৃতির মানুষ। বিয়ের পর কোনোদিনই এসব নিয়ে ভাবতে হয়নি। সবই লায়লা সামলেছে। আরিফ বুঝতে পারে, লায়লার গোছানো স্বভাব ও সাংসারিক বুদ্ধি অনেকটাই অবিকল তুষারের মধ্যে আছে। আরিফ মাঝে মধ্যে অভাক হয়ে ভাবে, এমন গোছানো স্বাভাবের বৌটা হঠাৎ সংসার ফেলে চলে গেল কেন? শরীরই কি সব? কে জানে, আর কিছু আছে কি না জীবনের অদেখা জটিল অধ্যায়?
দুপুরে স্কুল থেকে ফিরে আসে তুষার।
সাধারণত সন্ধ্যার পর নিজের অ্যাড. ফার্ম থেকে ফিরে আসে আরিফ। ছেলের কথা ভেবে ইদানীং একটু আগে ফেরে। মনে হয়, ঘরে ফিরে ছেলের সঙ্গে কথা বলে যে শান্তি তা আর পৃথিবীর কোথাও পাওয়া যায় না। আগে সাধারণত পেশাগত কারণে সে যেতো আলী জাকের, নূর ভাই কিংবা রামেন্দুদার কাছে। ব্যবসায়ী জগতের এসব শুভাকাক্সক্ষীদের সন্নিধ্যে তার ভালো লাগতো। এখন অফিসের বাইরে অন্যসব কিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে। আজও সন্ধ্যার আগে আরিফ বাসায় ফিরে এলো। হাত-মুখ ধুয়ে চা-নাশতা খাওয়ার সময় বাপ-বেটার আলাপ শুরু হলো। টিভিতে ন্যাশনাল জিওগ্রাফির অনুষ্ঠান। আরিফ-তুষার দু’জনই উৎসাহ নিয়ে দেখছে। টিভির পর্দায় ডায়নোসর মা-বাবা ও শিশু ডায়নোসর। তৃণভোজী ডায়নোসর বিশাল প্রান্তরে চরে বেড়াচ্ছে।
তুষার বললো, ‘কোটি কোটি বছর আগে এগুলো এভাবে চড়ে বেড়াতো।
আরিফ বললো, ‘বিজ্ঞানীরা তা-ই মনে করেন। তাদেরও সন্তান হতো। ডায়নোসর মা-বাবা যতœ নিতো তার সন্তানের। প্রায় ২১ কোটি বছর আগে এগুলো পৃথিবীতে এসেছিলো। এরপর কোটি কোটি বছর পৃথিবী দাপিয়ে বেড়িয়েছে। প্রায় ৭ কোটি বছর আগে এগুলো পৃখিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এর অনেক পর পৃথিবীতে মানুষ এসেছে।’

এমন সময় টিভির পর্দায় দেখা গেল সবুজ প্রান্তরে বৃষ্টি হচ্ছে। শিশু ডায়নোসর তার মা-বাবার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে। তুষার কেমন যেন করুণ মুখে সেদিকে তাকিয়ে আছে। এরপর এক সময় উঠে টিভি বন্ধ করে দিল। তারপর সে নিচের পড়ার ঘরে চলে গেল।
আরিফের কেমন যেস অস্বস্তি লাগছিল।
তুষার পড়ার ঘরে এসে বই সামনে নিয়ে ভাবছিলো অন্য কথা। সে ভাবছিল মানুষের জন্মের রহস্য কী? অনেক দিন আগে মাকে সে প্রশ্ন করেছিল, ‘মানুষের জন্ম হয় কেন? আমি কীভাবে এলাম?’
মা একটু অপ্রস্তুত হয়েছিল। তারপর বলেছিল, ‘আমরা মনের গভীরে আন্তরিকভাবে চেয়েছি। তাই তোকে পেয়েছি।’
তুষার জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘তুমি আর কে আমাকে চেয়েছিলে মা?
মা সেদিন বলেছিল, ‘আমি ও তোর বাবা।’ তিন বছর আগে সেদিন বাবাও মায়ের পাশে হাসিমুখে দাঁড়িয়েছিলেন। এখন অবশ্য তুষার অসুস্থভাবে মানুষের জন্মের রহস্য বুঝতে পারে। তবে সবটুকু নয়। সে উপলদ্ধি করেছে, ছোট্ট একটা ভ্রƒণ থেকে মায়ের জরায়ুর গভীরে ধীরে ধীরে জন্ম নেয় মানব সন্তান। এরপর তা একদিন নবজাতকের নরম শরীর হয়ে বেরিয়ে আসে। পৃথিবীতে জন্ম হয় এক নতুন মানুষের। অবশ্য তুষার অনুভব করে, তার এ শরীর ও মনের সবকিছুজুড়ে আছে ওই মানবী যে এখন চলে গেছে গু-া-মাতাল ‘মালেক মামার’ কাছে।
আরিফ আবার আগের মতো স্বচ্ছন্দ হয়ে উঠেছে তার ব্যবসা নিয়ে। দৈনন্দিন রুটিন আগের মতোই পুত্রকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে বনানীতে চলে যায় নিজের অ্যাড. ফার্মে। সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে বাবা ও ছেলের আবার দেখা হয়। শুক্রবার ছুটির দিন দু’জন কোথাও বেড়াতে যায় অথবা তুষারের বন্ধুরা আসে। সারা দিন বাসায় খুব মজা হয়।
আরিফ অনেকদিন লক্ষ্য করেছে অথবা হঠাৎ তুষারের ঘরে গিয়ে দেখতে পেয়েছে, কী যেন খুব আগ্রহ নিয়ে দেখছে তার পুত্র। বাবাকে দেখে লুকিয়ে ফেলেছে বালিশের নিচে। এ নিয়ে আর আগ্রহ প্রকাশ করেনি আরিফ। পুত্রের ব্যক্তিস্বাধীনতায় সে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়।
আরিফ কখনো হঠাৎ ভাবে লায়লার কথা। এতো মাস চলে গেল, একবারও জানা হয়নি কেমন আছে তার এক সময়ের স্ত্রী এবং বর্তমান স্বামী আবদুল মালেক! আরিফের মধ্য দিয়ে পুত্রের সব অপ্রাপ্তি ও পূর্ণতা যেন ঘুচে গেছে। তবে আরিফ জানে না, তুষারে কাছে আছে একটা স্মৃতিচিহ্ন পুরনো পারিবারিক ছবি। ওই ছবিতে তিন বছরের তুষারকে কোলে নিয়ে মা বসে আছে। ওই ছবিটিই তুষার সবার অজ্ঞাতে একা দেখে। সে মায়ের কোলো বসে থাকা শিশু বয়সটি উপলদ্ধি করে। অনুভব করে, একদিন মায়ের শরীরে মায়ের ইচ্ছায় সে অঙ্কুরিত হয়েছিল। এরপর একদিন পৃথিবীতে এসেছে। কিন্তু মা কেন চলে গেছে ওই গু-া ও মাতাল মালেক মামার কাছে?
একদিন মাঝরাতে চারদিকে মুষলধারে বৃষ্টি। তুষার নিজ ঘরে আলো জ্বেলে ওই পুরনো ছবিটি দেখছিল। ভাবছিল জন্মের রহস্যের কথা। ওই মায়ের শরীর থেকে তার জন্ম। এরপর হঠাৎ মুক্তি ও বিকাশ। সেই মা কোথায় চলে গেল? পৃথিবীতে কোটি কোটি বছর আগে ডায়নোসর এসেছিল। তারপর তারা বিলুপ্ত হয়েছে। মায়ের শরীর থেকে তার জন্ম। মা চালে গেছে তাকে ছেড়ে। কিন্তু নিচের শিকড়ের টান গভীরভাবে অনুভব করে তুষার। মাঝরাতে মায়ের ছবির দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে মা ও মায়ের কোলে বসে থাকা তিন বছর বয়স্ক নিজের আধা নিষ্পাপ চেহারার দিকে। তুষার ছবির দিকে তাকিয়ে থেকে বিড়বিড় করে বললো, ‘মা, আমার জন্মের রহস্য তুমি আবার নতুন করে বলো। আমাকে তুমি কোথায় রেখে গেলে মা? এই সাজানো সংসার, সরল-নিরীহ বাবা, অন্তহীন পুরনো স্মৃতিÑ সব আমাকে দিয়ে তুমি কোথায় গেলে মা? কেন গেলে ওই নিষ্ঠুর মালেক মামার কাছে? ওই গু-া-বদমাশটা কি আমার চেয়েও তোমার কাছে বেশি প্রিয়, মা?’
তুষার যখন মাঝরাতে বিড়বিড় করে এসব কথা বলছিল ছবিটির দিকে তাকিয়ে তখন পাশের ঘরে আরিফ ঘুমিয়ে আছে পরম শান্তিতে। বাইরে বৃষ্টির রাত। আরিফের মনে আর্শ্চয প্রশান্তি। তার একমাত্র পুত্র ও বংশধর তার কাছে পরম নির্ভর হয়ে আছে।

 

আমরা যেন না ভুলে যাই

সোহরাব হাসান



কশাইয়ের এ উৎসবেরে সাজানোর অলঙ্কার পাই কোথায়,
কী দিয়ে সাজাই এ গণহত্যা?
শোক বিলাপের রক্ত আমার চোখে পড়বে কার?
হাড্ডি যার শরীরে আমার রক্ত তো প্রায় নাই
যাও বা আছে বাকি
ক্ষমতা নাই তার প্রদীপের প্রাণ হওয়ার
পূর্ণ করতে পারবে না মদের কোনো গ্লাস
এ কোনো আগুনের ইন্ধন হতে পারে না
জš§ দিতে পারে না কোনো তৃষ্ণা।


(বাংলাদেশ : ফয়েজ আহমদ ফয়েজ)

 



১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশ ভূখ-ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা ছড়িয়ে পড়েছিল গোটা উপমহাদেশ, মহাদেশ, সারা পৃথিবীতে। মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণ ৯ মাস একটি বর্বর ও দুর্ধর্ষ বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, অকাতরে প্রাণ দিয়েছেন বহু যোদ্ধা, সম্ভ্রম হারিয়েছেন মা-বোনরা, বহু জনপদ ধ্বংস হয়েছে, মানুষের রক্তে ভেসে গেছে সবুজ প্রান্তর, আকাশ নীলিমা হারিয়েছে পাকিস্তানি বাহিনীর নিক্ষিপ্ত বোমার ধোঁয়ার কু-লীতে, শিশুরা কাঁদতে ভুলে গেছে, কিশোরীর হাসি মিলিয়ে গেছে শত্রু সেনার রূঢ় চাহনিতে, জায়নামাজে দাঁড়ানো অশীতিপর বৃদ্ধকেও গুলি করে হত্যা করেছে দখলদার

বাহিনী। তখন একাকার হয়ে গিয়েছিল মানুষের চোখের জল, শরীরের ঘাম ও শোণিত ধারা। এ লড়াই ছিল মিথ্যার বিরুদ্ধে সত্যের, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের, অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর। সেদিন বাঙালির মুক্তির লড়াইয়ে বাঙালি তো ছিলেনই, তাদের সঙ্গে সহমর্মিতার হাত বাড়িয়েছিলেন প্রতিবেশী বাঙালি, ভারতবাসী ও বিশ্ববাসী। আমরা বাংলাদেশের বাঙালি, আদিবাসী, বাংলাদেশের হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-ক্রিশ্চিয়ান সেদিন এক কাতারে দাঁড়িয়েছিলাম দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য। স্বাধীনতা আমাদের আকাক্সক্ষা ছিল, গণতন্ত্র আমাদের আরাধ্য ছিল এবং সাম্য ছিল দূরবর্তী লক্ষ্য। কতিপয় গাদ্দার আলবদর, রাজাকার মুসলিম লীগের জামায়াতি ছাড়া দেশের আপামর মানুষ এ লড়াইয়ে শামিল হয়েছিল সীমান্ত পার হয়ে। কেউ সীমান্তের ভেতর থেকেই লড়াই করেছেন। ওই সময় সবার লক্ষ্য ছিল, যতো দ্রুত সম্ভব দেশটি মুক্ত করা। এখন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যতো ভাগ হচ্ছে, দলীয়করণ হচ্ছে ওই সময় তা ছিল না। এ সময় মুক্তিযুদ্ধের একটিই স্লোগান ছিল ‘জয় বাংলা’। একজনই নেতা ছিলেন শেখ মুজিবুর  রহমান। তার নেতৃত্ব মেনেই সবাই যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মানুষের আত্মত্যাগ ছিল অপরিসীম। পৃথিবীর খুব কম জাতিকেই এতো প্রাণ ও রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করতে হয়েছে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশের বাইরে তথা বহির্বিশ্বের মানুষের ভূমিকাকেও খাটো করে দেখা যায় না।

বিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সমর্থন ছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি।লেখক, শিল্পী, সাংবাদিক থেকে শুরু করে সাধারণ শ্রমিকরা সর্বতোভাবে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তারা স্বাধীনতাকামী বাঙালির প্রতি দৃঢ় সমর্থন ব্যক্ত করেছেন। সাধ্যমতো সাহায্য-সহযোগিতাও জুগিয়েছেন। তাদের মধ্যে ছিলেন বিদেশি রাষ্ট্রনায়ক, রাজনীতিক, পার্লামেন্টের সদস্য, লেখক, শিল্পী, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, আইনজীবী, চিকিৎসক ও মানবাধিকার কর্মী। তাদের সমর্থন ও সহায়তা ছিল মানবতার পক্ষে, স্বাধীনতার পক্ষে। আমরা এ প্রবন্ধে স্বাধীনতার ওই সহযাত্রীদের কথা আকাক্সক্ষা ও ত্যাগের কথা বলবো। কৃতজ্ঞতা জানাবো আমাদের ওই দুঃসময়ে যারা পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তাদের বীরত্ব ও সাহসের কথা বিস্মৃত হওয়ার নয়।
আমরা কী করে ভুলতে পারি ফরাসি দার্শনিক আঁদ্রে মালরো’র কথা! তিনি ৭০ বছর বয়সেও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার আগ্রহ ব্যক্ত করেছিলেন। জার্মানির প্রতিরোধ যুদ্ধে তিনি ফরাসিদের উদ্বুদ্ধ করেছিলেন,

স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধে স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন, সময়-সুযোগ পেলে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামেও অংশ নেবেন, তার সহযোদ্ধাদের আহ্বান জানাবেন। বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ দূত রেহমান সোবহান প্যারিসে আঁদ্রে মালরোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলে আশ্বস্ত করেছিলেন, ফরাসি  সরকার যাতে পাকিস্তানের অস্ত্র সাহায্য না করে এ ব্যাপারে তিনি ফ্রাঞ্চ সরকারকে বলবেন। ... আমরা কী করে ভুলতে পারি আর্থার কে ব্ল্যাডের কথা। তিনি ঢাকায় মার্কিন কনসাল জেনারেলের পদে অধিষ্ঠিত থেকেও নিক্সন প্রশাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। মার্কিন সিনেটর অ্যাডওয়ার্ড কেনেডি পাকিস্তানে আমেরিকার অস্ত্র পাঠানোর বিরোধিতা করেছিলেন। সোভিয়েত রাষ্ট্রপতি নিকোলাস পদগোর্নি পাকিস্তানি সামরিক জান্তার প্রতি গণহত্যা বন্ধের দাবি জানিয়েছিলেন। জন কেলি জাতিসংঘের কর্মকর্তা হয়েও বাংলাদেশের মানুষের দুঃখ-দুর্দশায় বিচলিত হয়েছিলেন। ব্রিটিশ লেবার পার্টির নেতা ও পার্লামেন্টের সদস্য পিটার শোর পাকিস্তানে সব ব্রিটিশ সাহায্য বন্ধের দাবি জানিয়েছিলেন। তিনি বাঙালিদের দুঃখ-দুর্দশা দেখতে ছুটে এসেছিলেন শরণার্থী শিবিরে।
আমরা কী মনে রাখবো না ওই মুক্তিযোদ্ধা ওডারল্যান্ডকে! তিনি অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক হয়েও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন এবং বীরপ্রতীক খেতাব পান। তিনি দেশে ফিরে গিয়েও বাংলাদেশকে মনে রেখেছিলেন, পাকিস্তানি বাহিনীকে আখ্যায়িত করেছিলেন নিষ্ঠুর ও আগ্রাসী শক্তি হিসেবে। পাঠান যোদ্ধা মমতাজ খান বাঙালি মুক্তিযোদ্ধাদের ওষুধ ও সেবা দিয়ে বাঁচিয়েছিলেন। তিনি বাংলাদেশকে ভালোবেসে এখানেই থেকে গেলেন। ভারতীয় সেনাধিপতি জগজিৎ সিং অরোরা সেনাবাহিনীর পক্ষে পাকিস্তানি বাহিনীর নিঃশর্ত আত্মসমর্থন দলিলে স্বাক্ষর করেছিলেন। আমেরিকান দ্রোহি কবি অ্যালেন গিনসবার্গ পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশের শরণার্থীদের অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশা দেখে লিখেছিলেন বিখ্যাত কবিতা ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’। আমরা কী মনে রাখবো না প-িত রবিশংকর কিংবা ব্রিটিশ শিল্পী জর্জ হ্যারিসনকে! তারা ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ কনসার্টের আয়োজন করেছিলেন। বেতার শিল্পী দেব দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় উদাত্ত কণ্ঠে ৯ মাস বাঙালিকে উজ্জীবিত রেখেছেন। সব্যসাচী লেখক অন্নদাশঙ্কর রায় কলকাতায় বাংলাদেশের সমর্থনে আয়োজিত লেখক-শিল্পী সমাবেশে যোগদান শেষে লিখেছিলেন কালজয়ী পঙ্ক্তিÑ ‘যতোকাল রবে  পদ্মা, মেঘনা, গৌরী, যমুনা বহমান/ততোকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।’ ভারতের সর্বোদয় নেতা জয় প্রকাশ নারায়ণ বাংলাদেশের সমর্থনে সর্বদলীয় সম্মেলন আহ্বান করেছিলেন। আমরা কী ভুলে যাবো ব্রিটিশ সাংবাদিক অ্যান্থনি ম্যাসকারেনহাস কিংবা সাইমন ড্রিংকে। তারা পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার খবর ব্রিটিশ পত্রিকায় ছেপে বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়েছিলেন।

ওস্তাদ আলী আকবর খান বাংলাদেশের সমর্থনে সেতার বাজিয়ে মন্ত্রমুগ্ধ করেছিলেন মার্কিন দর্শক-শ্রোতাকে। আমরা কী ভুলে যাব ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কথা! তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে ইউরোপ ও আমেরিকাসহ বহু দেশ ঘুরেছেন।
তিনি আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ধাত্রীর ভূমিকা পালন করেছিলেন। সোভিয়েত নেতা লিওনেদ ব্রেজনেভ আমেরিকার সপ্তম নৌবহরের হুমকি মোকাবেলা করেছিলেন অষ্টম নৌবহর পাঠিয়ে, নিরাপত্তা পরিষদে তিনবার ভিটো প্রয়োগ করে চায়নিজ-মার্কিন দূরভিসন্ধি নস্যাৎ করেছিলেন। পাকিস্তানের কবি ফয়েজ আহমদ ফয়েজ শাসকের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে গণহত্যার প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন এবং ‘বাংলাদেশ’ শিরোনামে লিখেছিলেন মর্মস্পর্শী কবিতা। ওই কবিতা খুনির প্রতি ঘৃণা জানায় এবং স্পন্দন জাগায় অত্যাচারিতের রক্তে। আমরা কী ভুলে যাবো পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা মেঘালয়সহ প্রতিবেশী রাজ্যগুলোর লাখো-কোটি মানুষকে! তারা বাংলাদেশের আশ্রয়হীন মানুষকে আশ্রয় দিয়েছেন এবং নিজেদের বসতবাটি, স্কুল, অফিস, কমিউনিটি সেন্টার ছেড়ে দিয়েছেন। যুদ্ধের ঝুঁকি আপন কাঁধে তুলে নিয়েছেন তারা।  আমরা কি ভুলে যাবো ভারতীয় সেনাবাহিনীর সেসব কর্মকর্তা ও জওয়ানকে যারা বাংলাদেশের পক্ষে লড়াই করতে গিয়ে আত্মাহুতি দিয়েছেন? বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের কোথাও কোথাও তাদের কবর ও শ্মশান এখনো স্মারকচিহ্ন হয়ে আছে। আমরা কেন ওই শহীদদের নামে একটি শহীদ মিনার বা স্মৃতিসৌধ গড়তে পারলাম না?
আমরা কী ভুলে যাবো ভারতের বন্দরনগর মুম্বাইয়ের জুতা পলিশওয়ালাদের! তারা বাংলাদেশ সহায়তা তহবিলে নিজেদের অর্জিত আয়ের একাংশ দান করেছিলেন। কলকাতা বা আগরতলার সাধারণ মানুষ জয় বাংলার মানুষ বলে বাসের আসনটি ছেড়ে দিতেন। আমরা কি ভুলে যাবো সেসব মা-বোনের কথা যারা ভারতের বিভিন্ন স্থানে রওশন আরা ব্রিগেড গঠন করেছিলেন? আমেরিকার বন্দর শ্রমিকরা পাকিস্তানি জাহাজে অস্ত্র ওঠাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। পাকিস্তানি নাগরিক আহমদ সেলিম পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার বিরুদ্ধে কবিতা লিখে জেল খেটেছিলেন। ব্রিটিশ তরুণী মারিয়েটা বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গড়তে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন একটি সংগঠন অ্যাকশন বাংলাদেশ এবং তার বাড়িটি ছেড়ে দিয়েছিলেন ওই সংগঠনের অফিস হিসেবে।




আমরা কী ভুলে যাবো বিশ্বের লাখো-কোটি সাধারণ মানুষের কথা! তারা কায়মনোবাক্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সংগ্রামকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন দিয়েছেন এবং ধিক্কার জানিয়েছেন পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতাকে। বিবিসির সাংবাদিক মার্ক টালি এ দেশের যে কোনো রাজনৈতিক নেতার চেয়ে জনপ্রিয় হয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধের বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করে। আবদুল লতিফ খতিব মহারাষ্ট্রে জš§গ্রহণ করেও বাংলাদেশকে মাতৃভূমি হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের পক্ষে এক সাহসী কলমযোদ্ধা। মার্কিন প্রামাণ্য চলচ্চিত্রকার লেয়ার লেভিন বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরগুলোয় ঘুরে ‘জয় বাংলা’ ছবি তৈরি করেছিলেন। পরে ওই ছবি অবলম্বনে তারেক মাসুদ ও ক্যাথেরিন মাসুদ নির্মাণ করেন ‘মুক্তির গান’। মার্কিন লেখক রবার্ট পেইন বাংলাদেশের মুক্তি-সংগ্রামকে অবলম্বন করে একাধিক বই লিখেছেন। পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্টের নেতা জ্যোতি বসু বিধানসভায় ঘোষণা করেছিলেন, ‘একটি জাতিকে মিলিটারি দিয়ে পিষে মারা যায়। কিন্তু তাদের উত্থান ঠেকানো যায় না।’ ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী শচিন চন্দ্র সিংহ ষাটের দশকেই হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের সুহƒদ ও সহযোদ্ধা।
আমরা কী স্মরণ করবো না নাম না জানা অসংখ্য সুহƒদকে! তারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত সংগঠনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। আমরা কি মনে রাখবো না ওই দুঃসময়ের বন্ধুদের? যদি আমরা মনে না রাখি তাহলে সেটি হবে চরম অকৃতজ্ঞতা।
আজ নতুন প্রজš§কে জানাতে হবে ১৯৭১ সালের মরণজয়ী যুদ্ধে কারা আমাদের পক্ষে ছিলেন, কারা বিপক্ষে ছিলেন। জানাতে হবে বাঙালি হয়েও কারা বাঙালিদের মুক্তি-সংগ্রামের বিরোধিতা করেছিল, কারা সেদিন পাকিস্তানিদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল। একটি জাতির মুক্তিযুদ্ধ একটি দিন, ঘোষণা বা সামরিক ফরমানের মধ্যে আবদ্ধ থাকে না, তা ছড়িয়ে থাকে পুরো জাতির অস্তিত্ব এবং বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বরে।

জীবিকার আশ্চর্য গণিত

মৃণাল বসুচৌধুরী

 


‘র্নিবাসন’ শব্দটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে শান্তির বিধান। আমার ক্ষেত্রে হয়তো তেমন ছিল না। ‘স্বেচ্ছানির্বাসন’ নিয়ে নিজেই নিজেকে দ- দেওয়ার ইচ্ছা হয়েছিল খুব। বিষাদ বা অভিমান নয়, উদাসীন এক ভালোবাসার হাত ধরে আমি হারিয়ে যেতে চেয়েছিলাম এই চেনা পৃথিবী থেকে। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রশ্ন করিনি তা নয়। কিন্তু প্রতিবারই মনে হয়েছিল, আলোর পেছনে ছায়া কিংবা প্রতিছায়া, জলের ভেতরে মাটি ও শ্যাওলার কাজ থেকে শুরু করে পুরো জীবন ধরে যে বঞ্চনার ইতিহাস বা ধারাবাহিক অবহেলা মলিন করে তুলেছে চরাচর তা নিয়ে প্রশ্ন করে লাভ নেই। খুঁজে লাভ নেই সোনালি অতীত কিংবা অমরাবতী, অলৌকিক সৎ উচ্চারণ, স্পষ্ট অঙ্গীকার, পারস্পরিক বিশ্বাসের সুখ। জীবন যেভাবে আসে সেভাবেই তাকে বরণ করে নেওয়ার মধ্যেই বেঁচে থাকার স্বকীয় আনন্দ।
জন্মমুহূর্ত থেকে আজ পর্যন্ত যা শিখেছি তা শিখিয়েছে জীবনই। শিখিয়েছে বেঁচে থাকার আমল কৌশল। আনন্দ-উল্লাস, সাফল্য ও সুখের পাশাপাশি দুঃখ, বিষাদ, হতাশা কিংবা ব্যর্থতার সহাবস্থানের নির্মম সত্য। তা সত্ত্বেও কখনো কখনো ওই চেনা জীবনই যেন অচেনা হয়ে সামনে দাঁড়ায়।
১৯৮৭ সালে ধারাবাহিক অবহেলা প্রকাশিত হওয়ার পর খুব দ্রুততার মধ্যেই আমায় চলে যেতে হয় বিদেশে সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর দরজায়। এমনিতেই ‘শব্দভ্রমের সন্ধান’-এর নিঃসঙ্গ একাকী পথচলা আমাকে ক্লান্ত করেছিল তখন। এর উপর দেশ ছাড়ার দুঃখ আমাকে উপহার দিয়েছিল ভুবনজোড়া অভিমান। কবিতাকে র্নিবাসন দিলাম আমার জগৎ থেকে সজ্ঞানে।
শৈশব আমার নতমুখ জীবন যাপনে অভ্যস্ত করেছিল অস্পষ্ট ব্যবধান ও স্পষ্ট আড়াল নিয়ে বুকের মধ্যে উন্মাদ আগুন পুষে রেখে মানুষের উপেক্ষা-অবহেলা সব পেরিয়ে। আলোর ভেতরে পৌঁছানোর সব রাস্তা দেখিয়েছিল। মিডিয়া বা খ্যাতি নয়, এ এক রহস্যময় পবিত্র নীলিমার

আলো। তা বিষাদ অম্লান, মায়াময়ী এক নিশিকন্যার চোখের মতো অধরা ও লোভহীন। ওই শৈশবই আমাকে শিখিয়েছিল কীভাবে পরশ্রীকাতর সাপের ছোবল এড়িয়ে ছায়াহীন পরাবাস্তবতার দিকে এগিয়ে যেতে হয় সঙ্গীহীন একা।
নিঃসঙ্গ নিজেকে মুখোমুখি বসিয়ে কথা বলা আমার পুরনো অভ্যাস। নিজের সঙ্গেই হেঁটেছি সারা জীবন। অনভ্যস্ত সুখের অসুখে, পরিশ্রমা অক্ষর বুননে এতো দিন কেটেছে সময়। এখন মুক্ত। এবার বিশ্রাম। স্মৃতির শিকড় ছিঁড়ে অক্ষরবিহীন মুগ্ধ বেঁচে থাকা। অথৈ জলের চাঁদ ও মোমের পুতুল নিয়ে মায়াবী ভ্রমণ।
পূর্ণেন্দুদা বলতেন, ‘বিছানা-বালিশে মানুষ একা। আর একা হলেই নিজের কাছে নতজানু মানুষ।’ কিন্তু আমি একা থাকলেই বিছানা, বৃষ্টি ও কুয়াশা ঠেলে ফেলে আমার দিনগুলো সামনে দাঁড়ায়। ফিরে আসতো প্রিয় মানুষের মিছিল।
দেওঘরে পূর্ণেন্দুদার সঙ্গে তুমুল আড্ডায় কেটেছিল কয়েকটি রাত। ‘খরা’ ছবির শুটিং উপলক্ষে সেখানে যাওয়া। ওম পুরি কুলভূষণ, খারাবান্দা, অরবিন্দ খোশী, ধৃতিমান চট্টোপধ্যায়, ভাস্কর চৌধুরী, শ্রীলা মজুমদার, স্নিগ্ধা বন্দ্যেপাধ্যায় অভিনয় করেছিলেন ওই ছবিতে। প্রেম ফটোগ্রাফারের ভূমিকায় ছিলাম আমি। মনে আছে, যেখানে থাকতাম আমরা সেখানে ঢোকার মুখে একটা গোলচত্বরে টেবিল সাজিয়ে আড্ডা হতো আমাদের। সারা দিন শুটিং করার পর প্রায় শেষ রাত পর্যন্ত অড্ডা চলতো কোনো কোনোদিন। কতো রকম কথাই যে বলতেন পূর্ণেন্দুদা! কখনো বুনুয়েলের প্রথম ছবি ‘আন চেন আন্দালু’ যেখানে খোলা চোখের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে ধারালো ক্ষরের ফলা, কখনো বাগম্যানের ওয়াইল্ড স্ট্রবেরিজ, কখনো কখনো সত্যজিৎ, ঋত্বিক আবার কখনো বা নিজের ছবি ‘ছোট বকুলপুরের যাত্রী’, ‘স্ত্রী পত্র’। একেকদিন শুধু গান ও কবিতা। এর মধ্যে কখনো কখনো একদম চুপ করে বসে থাকতেন তিনি। জিজ্ঞাসা করলে বলতেন, কী কী করতে চাই, করা বাকি এর একটি তালিকা তৈরি করছিলাম মনে মনে।
মনে আছে, একদিন অন্যরা ঘুমাতে গেলেও পূর্ণেন্দুদা বসে থাকলেন। আমাকেও বসিয়ে রাখলেন। কবিতা শোনালেন। এভাবে সারা রাত কবিতা শুনিয়েছিলেন সেদিন। শুরু করেছিলেন ‘কথোপকথন’-এর একটি কবিতা দিয়ে। বলেছিলেন, নন্দিনীকে পাওয়ার জন্য সারা জীবন শুভঙ্কর হয়ে থেকে গেলাম। নন্দিনীকে তো পেলামই না, পূর্ণেন্দু হয়ে ওঠা হলো না আমার। যাই হোক, শোন।
নন্দিনী আমার কী দোষ? ডেকেছি বহুবার
কিন্তু তোমার এমন টেলিফোন
ঘাটের মড়া নেই কো কোন সার।
শুভঙ্কর বাতাস ছিল, বাতাসে ছিল পাখি
আকাশ ছিল, আকাশে ছিল চাঁদ
তাদের বললে খবর দিত নাকি?
কবিতাটি শেষ করে আমার দিকে একবার তাকিয়ে হেসেছিলেন একটু। তারপর অদ্ভুদ ঘোরের মধ্যে পড়েছিলেন একের পর এক কবিতা। মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতে শুনতে দেখেছিলাম সজু অথচ বিষন্ন উচ্চারণে কীভাবে শুভঙ্কর ও নন্দিনীকে মূর্ত করে তুললেন তিনি।

কাব্যনাটকে অভিনয় করার সময় থেকেই মনে মনে ভাবতাম একদিন, কোনো একদিন আমাকেও লিখতে হবে কাব্যনাটক। পূর্ণেন্দুদার শুভঙ্কর ও নন্দিনী প্রতিদিন যেন মনে করিয়ে দিতো আমার ওই ঘুমন্ত ইচ্ছাটাকে। পারিনি। অনেক চেষ্টা করে ‘স্বর্গ থেকে নীলপাখি’ নামে একটি সংলাপ কাব্য লিখেছিলাম। পছন্দ হয়নি নিজের। কিন্তু কেন জানি না বিশিষ্ট আবৃত্তিকার পার্থ ঘোষ ও গোরী ঘোষ খুব ভালোবেসে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পড়তেন ওই লেখাটি। পরে তাদের একটি সিডিতেও এই পাঠ রেখেছিলেন। স্তর চাইান। সিডির নামই দিয়েছিলেন ‘স্বর্গ থেকে নীলপাখি’।
ছিন্নভিন্ন শিকড় বেয়েও কখনো কখনো উঠে আসে স্মৃতিমাখা হলুদ পোকাগুলো। একটার অনুষঙ্গে আরেকটি এসে দাঁড়ায়। পার্থদা গৌরীদির কথায় প্রদীপদা, প্রদীপ ঘোষের কথা আসে। আমি গত জন্মে হয়তো কিছু পুন্য করেছিলাম। তাই এ জন্মে এই তিন দিকপালের কণ্ঠে পরিবেশিত হয়েছে আমার কবিতা। এই তিনজন ও রমা সিমলাইয়ের মিলিত পরিবেশনায় ‘কুয়াশার রোদে’ নামে একটি সিডি প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু সেসব অনেক পরের কথা। এই লেখায় গৌরিদি এলেন পূর্ণেন্দুদার হাত ধরেই। ‘স্তহাচিত্র’ ছবিতে তিনি অভিনয় করেছিলেন একটি বিশেষ চরিত্রে। মনে আছে, দক্ষিণ কলকাতার একটি নার্সিংহোমে শুটিং হয়েছিল আমাদের। পূর্ণেন্দুদার সঙ্গে কাজ মানেই ভয় ও আনন্দ। ভীষণ পারফেকসনিস্ট ছিলেন বলেই কোনো অভিনেতাকেই ছেড়ে দিতেন না তিনি। এর পাশাপাশি ঠিকঠাক কাজ শেষ করতে পাললে মেতে উঠতেন গানে। শুরু হতো অনাবিল আনন্দ সভা হাসি-ঠাট্টার।
অফিসের পেছন দিকে রাস্তার ওপারে যে ফ্ল্যাটে থাকতাম এর নম্বর ছিল ৪০২। আশ্চর্যজনকভাবে এরপর যেখানেই বদলি হয়েছি সর্বত্রই ৪০২ নম্বর ফ্ল্যাটই বরাদ্দ করা হয়েছে আমাকে। এমনকি মুম্বাইয়ে ১৩ তলার ওপর আমার ফ্ল্যাটটি ছিল ১৩০২। এটিকে প্রকারান্তে ৪০২-ই বলা যায়। কাকতালীয় হয়তো। কিন্তু প্রতিবারই বেশ অবাক হয়ে যেতাম। মনে আছে, প্রথম দিন ফ্ল্যাটে এসে মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল খুব। সুন্দর আসবাবপত্রে ভরা বিশাল ফ্ল্যাটে একা থাকতে হবে ভাবতেই বিষণœ হয়ে যাচ্ছিলাম। বছরে দু’বার স্কুল ছুটির সময় তপতা ও অরুন্ধতা যেতো সেখানে। আর আমি সত্যি সত্যিই দিন গুনতাম।

অফিসে আমার সেক্রেটারি ছিলেন দক্ষিণ ভারতীয় নারী। দুবাই বিমানবন্দরে চাকরি নিয়ে তার স্বামী এসেছিলেন কেরেলা থেকে। ওই সূত্রে তার এ দেশে আসা। ম্যাডাম আনাম্মাই আমাকে প্রয়োজনীয় সবকিছুর ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। চিনিয়ে দিয়েছিলেন ভিডিও লাইব্রেরি, কেনটিকির দোকান, কিছু রেস্তোরাঁ এবং ওষুধেরে দোকান। আর এক সহযোগী অরজিত গারদে আমাকে সঙ্গ দিতেন অফিসের পর। শারজাহে বাড়ি ফিরে সন্ধ্যাবেলা কিছুই করার থাকতো না। তাই অরজিতের সঙ্গে গিয়ে দু’একদিনের মধ্যেই কিনে এনেছিলাম টিভি, ভিসিআর ও ক্যাসেট প্লেয়ার। বাড়িতে রান্না তখনো শুরু করেনি। কেননা যত অল্প টাকারই খাবার হোক, ফোন করলে বাড়িতে দিয়ে যেতো প্রায় সব রেস্তোরাঁ। টিভি আনার পর নিঃশব্দ-নির্জন ফ্ল্যাটে যেন প্রাণ এসেছিল।
কলকাতা থেকে আসার সময় রবীন্দ্রসঙ্গীতের কয়েকটি ক্যাসেট নিয়ে গিয়েছিলাম। ঘর অন্ধকার করে মাঝে-মধ্যেই শুনতাম আমার প্রিয় গানগুলো। কোনো কোনোদিন একই গান শুনতাম বারবার।


‘অল্প লইয়া থাকি তাই মোর যাহা যায় তাহা যায়
কনটুকু যদি হারায় তা লয়ে প্রায় করে হায় হায়’


দুপুর ও রাতে সময় পেলেই শুনতাম এ গানটি। কেন জানি শিল্প-সংস্কৃতি, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন সবকিছু ছেড়ে এতো দূরে একা পড়ে থাকতে ভালো লাগতো না একেভারেই। চাকরিতে উন্নতির থেকে আমার কাছে বেশি মূল্য ছিল কবিতার শব্দ-সাধনায়। এর পাশাপাশি কিছু না পেতে পেতে অর্জনরে আনন্দটাও হারাতে চাইতাম না। বিদেশে চাকরি করার সুযোগ ক’জনই বা পান।
‘ইমোশনাল স্ট্রেস’ কোনোদিনই সহ্য করতে পারি না। অথচ আমার দিনযাপনের অধিকাংশ দিনই বঞ্চনার ইতিহাস। কোনো নিঃস্ব-রিক্ত মানুষের ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়ার কাহিনী। ডিপ্রেশনের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য ঘুমের ওষুধ খাওয়ার অভ্যাস অনেক পুরনো। শারজাহে গিয়ে ঠিক করেছিলাম, যেহেতু একা থাকি সেহেতু অধিকাংশ সময় এ অভ্যাসটা ছাড়তে হবেই। কলকাতা ছাড়ার আগে আরব দেশের অনেক গল্প শুনেছিলাম। এখানে নাকি রাতে হাঁটা যায় না, মেয়েদের নিরাপত্তা নেই, রাস্তাঘাটে মাতাল ভর্তি, অপরাধ করলে কঠিন সব শাস্তি এমন ভয় দেখানো কথাবার্তা শুনে বলা বাহুল্য, একটু ভয়ে ভয়ে থাকতাম

 

প্রথম কিছুদিন। এরপর অবাক হয়ে দেখলাম, নারীরা এখানে খুব নিরাপদ। মাঝরাতে কোনো নারী ঘোরাফেরা করলেও তার বিপদ নেই। কেননা যে কোনো নারী অভিযোগ করলেই পুলিশ অভিযুক্তকে ধরে নিয়ে আসে থানায়। মনে পড়ছে, মাঝে-মধ্যে গভীর রাতে টেলিফোন আসতো বেশির ভাগ সময়ই কোনো না কোনো নারী। বুঝতে পারতাম, র‌্যান্ডম ডায়ালিং করে যাকে পায় তার সঙ্গে কথা বলা তাদের অভ্যাস। ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে দু’একটা কথা বলার পরই রেখে দিতো। পাছে কোনো সমস্যা তৈরি হয় এ ভয়ে কখনোই এসব ফোন এলে কথা বলতাম না। এই নীরবতার জন্য তাদের মুখ থেকে কটূক্তি শুনতে হয়েছে মাঝে-মধ্যে।
একদিনের কথা খুব মনে আছে। দুপুরে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম একটু। ওই সময়ই বেজে উঠেছিল টেলিফোন। রিসিভারটা তুলতেই ছোট একটি ছেলের গলা ভেসে এসেছিল। বলেছিল, ‘, তোমার সময় আছে? একটু কথা বলবে আমার সঙ্গে? বাড়িতে কেউ নেই। কাজের মালিও বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে কোথায় যেন গেছে। ভয় করছে খুব..., একটু কথা বলেন না আংকল...। না বলে পারিনি। বেশ কিছুক্ষণ কথা বলে জানতে পেরেছিলাম, তার মা মারা যাওয়ার পর বাবা আবার বিয়ে করেছেন। নতুন মা তাকে মারধর করে। কিন্তু বাবাকে সে কিছুই বলে না। কেননা তার বাবা খুব ভালোবাসেন তাকে। নামে ওই নিঃসঙ্গ শিশু অরুণের বন্ধু হয়ে গিয়েছিলাম। ফোনের বন্ধু। মাঝে-মধ্যই ফোন আসতো তার। সঙ্গীহীন ওই শিশুটির আর্তি আমাকে মনে করিয়ে দিতো আমার শৈশব। একাকিত্ব কখন যে কাকে, কীভাবে ছিন্নভিন্ন করে দেয় তা কে জানে।
রাস্তাঘাটে মাতালরা ঝামেলা করে শুনেছিলাম। শোনা কথায় না জেনে কতো কী যে বলে মানুষ! লাইসেন্স না থাকলে মদ্যপান নিষিদ্ধ ছিল শারজাহে, এমনকি বাড়িতে বসে মদ্যপান করার জন্য লাইসেন্স লাগতো। ওই ছাড়পত্র ছাড়া ওয়াইন স্টোর থেকে কিছু কেনাই যায় না। ওই দোকান ছিল শহরের বাইরে। দোকান থেকে কিনে সোজা বাড়িতে যেতে হতো ক্রেপারে। দুবাইয়ে অবশ্য শিথিল হয়েছে নিয়ম-কানুন। ড্রিংকস করে গাড়ি চালালে পুলিশ ধরতো। তারা চালিয়ে গাড়িটা নিয়ে যেতো থানায়। বসিয়ে রাখতো সারা রাত। সকালে নেশা ছুটলে ছেড়ে দিতো।
স্বর্ণের বাজার দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে প্রায়ই দেখতাম দোকান খোলা। কিন্তু ভেতরে ক্রেতা-বিক্রেতা কেউ নেই। নামাজের সময় সবাই নামাজ পড়তে গেছেন। চুরির ভয় নেই এমন একটি প্রশ্নের উত্তরে সহকর্মী বলেছিলেন, না, চোর ধরা পড়লে হাত কাটা যায়। অবাক হয়ে হেসেছিলাম। একজন বলেছিলেন, “একজন দু’বারের বেশি চুরি করতে পারবে না।” সহকর্মী যোগ দিয়েছিলেন হাসিতে ‘হ্যাঁ, দুটোর বেশি আর হাত যে নেই।’
পশ্চিম ও উত্তর দু’দিকে দুটি বারান্দা ছিল আমার ফ্ল্যাটে। পশ্চিম বারান্দায় বের হওয়া যেতো না। পুরনো আসবাপত্র, ওয়াশিং মেশিং জড়ো করা ছিল সেখানে। তাছাড়া ওই বারান্দা ছিল গোটা পনেরো পায়রার দখলে। এখানে পায়রাগুলোর রাজত্ব, ঘর-সংসার। পুরনো আসবাবপত্র বা কোনো কিছুর পুনরায় বিক্রয় মূল্য নেই ওই দেশে। সরকারি জিনিসপত্র ফেলার বিভিন্ন অসুবিধার কথা ভেবেই বোধহয় আগে যারা থাকতেন তারা আর কোনো ঝামেলায় যাননি। সুন্দর পায়রাগুলোর জন্যই রেখে গেছেন ওইসব। উত্তরের বারান্দাটি আমার খুব প্রিয় ছিল। মাঝরাতে যখন ঘুম আসতো না তখন প্রায়ই গিয়ে দাঁড়াতাম সেখানে। কখনো কখনো একটি চেয়ার টেনে বসে থাকতাম সারা রাত। শেষরাতে দু’এক ঘণ্টা কেমন জানি মায়াবী হয়ে যেতো রাস্তাঘাট। সুন্দর, উজ্জ্বল, স্বপ্নময় মনে হতো। এটিই বোধহয় স্বপ্ন নগরীর মাঠে থাকা রাস্তা। যেখানে ছড়িয়ে আছে সুখ সেখানে ছোটাছুটি করে নিষ্পাপ শিশুরা, রামধনু রঙ মেখে বেড়াতে আসে পরীদের রানী। শুধু পূর্ণিমায় নয়, সেখানে প্রতিটি রাতে জ্যোৎস্না খোলা করে। ওই জ্যোৎস্নার হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে যাই সাদার্ন মার্কেটের সামনের ট্রামলাইনে। সেখানে মধ্যনিশিথে শেষ স্ট্রাম চলে গেলে আড্ডা মারতাম আমি ও সুপ্রিয়দা।
আমি তখন কবির রোডে থাকি। পাশের বাড়িতেই থাকতো রতেœশ্বর। কবি রতেœশ্বর হাজরা। তারই সহায়তায় আমার আস্তানা খুঁজে পাওয়া। আমার সৌভাগ্য, রতেœশ্বরের অনেক কবিতারই প্রথম পাঠক ছিলাম আমি সে সময়। সুপ্রিয়দা খুব মুক্তমনের মানুষ। আমার মধ্যে যে গ্রাম্য মানসিতকা ছিল তা ঝেড়ে ফেলতে পেরেছিলাম সুপ্রিয়দার মতো মানুষের সন্নিধ্যে এসে।
কখনো কখনো একটু অবাক হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। ধন্যবাদ জানাতাম অদৃশ্য ঈশ্বরকে। পিতৃহীন হওয়ার পর যেভাবে আমার জীবন কেটেছিল এতে কখনো ভাবিনি নিজের ক্ষমতায় বিদেশে এসে চাকরি করবো। মনে আছে, এই চাকরিতে যখন জয়েন করি তখন মাইনে ছিল ২২০ টাকা। ব্রাবোর্ন রোডে ছিল আমার প্রথম অফিস। আমার বস ছিলেন মোহিত সেন। আমাকে কাজকর্ম বুঝিয়ে দিয়ে তিনি বলেছিলেন, স্পষ্ট মনে আছে ‘ইয়াংম্যান, জীবনে কোনো সমস্যা হলে আমার কাছে এসো, সাফল্যের দিনে নয়। সেগুলো সব তোমার।’ ওই অসাধারন একটি বাক্যের জন্য আজীবন নতজানু হয়ে থেকেছি তার কাছে।
পূর্ণেন্দুদার কথোপকথন ছাড়া আমার দুটি কবিতার বই ‘এই নাও মেঘ’ ও ‘ধারাবাহিক অবহেলা’ নিয়ে গিয়েছিলাম প্রথমবার। খুব মন খারাপ হয়ে গেলেও তখন কোনো কবিতার বই ছুঁয়ে দেখতাম না। কিন্তু মন কী সব সময় এসব বাধা-নিষেধ মানে! তাই দীর্ঘ একটি সোফায় শুয়ে কখনো কখনো চলে যেতাম কফি হাউসে, কলিকাতায়। আমার বস মোহিত সেনের ওই অসাধারণ কথাটির মতো আরেকজনের একটি উপদেশ এই বৃদ্ধ বয়সেও মাথায় রেখেছি। একদিন কথা প্রসঙ্গে প্রনম্য সাহিত্যিক দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যেপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘যারা তোমার প্রশংসা করবে তাদের নয়, যারা সমালোচনার সাহস দেখাবে তাদের শ্রদ্ধা করো। অবশ্যই ওই সমালোচনা যদি নিরপেক্ষ হয়...।’ ভাবতে ভালো লাগে ওই সময় আমাদের যৌবনে আমরা শিক্ষকপ্রতিম কতো মানুষকে কাছে পেয়েছিলাম।
কবিতা থেকে মুখ ফিরিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলাম রবীন্দ্রনাথের গানে। যখনই একা থাকতাম তখনই শুনতাম তার গান। একই ক্যাসেট বারবার। কিন্তু এই রবীন্দ্রনাথ তার গানের ডালি নিয়ে কবে এলেন আমার কাছে? ঠিক কোথায় পেলাম তাকে? কবেই বা তিনি হয়ে উঠলেন আমার রবীন্দ্রনাথ? ... ভাবতে ভাবতে চলে যেতাম শৈশবে যখন মায়ের গলায় ‘চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙেছে’ শুনেছিলাম।
প্রথম যেদিন স্কুলে যাই সেদিন প্রার্থনা গানের জন্য সারি সারি লাইনে দাঁড়ানো ছেলেমেয়েদের পেছনে দাঁড়াতে হয়েছিল। গানটি ছিল ‘সংকোচের বৃক্ষলতা নিজের অপমান/সংকটেরও কল্পনায় হয়ো না ম্রিয়মাণ/... মুক্ত করো ভয়...।’ সুরটি ঠিকমতো জানতাম না। মনে আছে, রতে মায়ের কাছে শিখে পরদিন গলা মিলিয়েছিলাম। মায়ের কাছেই শুনেছিলাম গানটি রবীন্দ্রনাথের। কিছুদিন পর স্কুলের একটি অনুষ্ঠানের জন্য শিখেছিলাম, ‘বরবায় বয় বেগে।’ খুব মুগ্ধ হয়ে গাওয়ার চেষ্টা করতাম

‘শৃঙ্খলে বারবার ঝন ঝন ঝঙ্কার নয়, এ তো তরুণীর ক্রন্দন শঙ্কার
বন্ধন দু’বার সহ্য না হয় আর টলেমেনও করে আজ তাই ও
হাই করে মারো মারো জিন হাঁইয়ো।’


ওই গানটি সম্পর্কে আমার মুগ্ধতার কথা জেনে আমাদের ক্লাসের দীপিকা বলেছিলেন, ‘রবীন্দ্রনাথ, তাসের দেশ।’ এরপর ময়ল স্যার। তিনি আমাদের ভূগোল পড়াতেন। তিনি শিখিয়েছিলেন দু’একটি অসম্ভব রবীন্দ্রসঙ্গীত। মাঝে-মধ্যে পাশের বাড়ির রিতুদিকে গাইতে শুনতাম, ‘যা তা আগলে বসে রইক কত আর?’ কোনো কোনোদিন হারমোনিয়াম বাজিয়ে গাইতেন, ‘চোখের আলোয় চেয়েছিলাম, চোখের বাহিরে/অঙ্করে আজ দেখব, যখন আলোক নাহি রে...।’
এভাবেই হয়তো ধীরে ধীরে রবীন্দ্রনাথ এগিয়ে এসেছিল আমার দিকে অথবা আমি তার দিকে। তখন বোধহয় ক্লাস টেনে পড়ি। রবীন্দ্রজয়ন্তী হচ্ছে স্কুলে। বিশেষ একটা বাড়ির দিকে পা বাড়াতেই কানে এলো, ‘কাল রাতের বেলা গান এলো মোর মনে/তখন তুমি ছিলে না মোর সনে...।’ ক্লাস নাইনের আত্রেয়ী গাইছিলাম। এতো দিন চেনা বন্ধু আত্রেয়ীকে অন্য গ্রহের বাসিন্দা মনে হয়েছিল। গান শেষে এগিয়ে গিয়ে কিছু না বলে একটু হেসেছিলাম। সেদিন চোখ দুটো নিশ্চয়ই জানিয়েছিল আমার দিব্য মুগ্ধতা।
এসবের মধ্যেই হঠাৎ করে যেন শেষ হয়ে গিয়েছিল স্কুল জীবন। এরপর কলেজ, কলকাতা টিউশনি, মেসবাড়ির আবর্তে, যান্ত্রিক টানাপড়েনে কাটছিল দিন। এর মধ্যেই রবীন্দ্রনাথ বেজে উঠতেন বুকের মধ্যে ‘তোমার যে বলা দিবস রজনী, ভালোবাসা, সখী ভালোবাসা কারে কয়! সে কী কেবলই যাওনাময়।’ আরেকদিন ঘোর বর্ষায় মোর বাড়ির পাশের একটা জানালা থেকে ভেসে এসেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ‘উতলধারা বাদল ঝরে/সকালবেলা একা ঘরে।’ এ রকমই টুকরো টুকরো গানের বলি নিয়ে কাটছিল আমার মন খারাপ করা দিনগুলো।

ওই সময়ই সদ্য আলাপ হওয়া বিকাশ লাবণ্য, কেটি মিত্তিরের বেশ কাটতে না কাটতেই হাতে পই ‘গোরা’। এরপর ‘চতুরঙ্গ’ চার অধ্যায়। এভাবেই আমার রবীন্দ্রনাথ শুরু। মহামানবকে আপন করে নেয়ার সামান্য প্রয়াস।
এরপরই নতুন করে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আমার জীবনে আসে তপতী। গীতবিজ্ঞানের সব গান তার কণ্ঠস্থ। তার হাত ধরেই নতুন করে আবিষ্কার করা রবীন্দ্রনাথকে। শৈশব থেকে আজ পর্যন্ত তার গানের মধ্যেই মূলত তাকে পাওয়া।শারজাহে অনেক নিঃসঙ্গ রাতের সঙ্গী ছিল রবীন্দ্রনাথের গান। আবুধাবি, দুবাই, শারজাহ, অজমান, উম্মল কোয়েন, রাস-আল- কোইমা ও ফুজিয়ারা এ সাতটি আমিরশাহীকে নিয়েই সংযুক্ত আরব আমিরশাহী। আবুধাবির রাজা বা আমির ওই সংযুক্ত আমিরশাহীর প্রেসিডেন্ট। প্রথম মাসখানেক কাজের চাপ, ফ্ল্যাট পাওয়া, গোছানো এসব কেড়েছে কিছুদিন। নতুন কাজকর্মে অভ্যস্ত হয়ে পড়ার পর অন্য শাখার সহকর্মীদের সঙ্গে মেলামেশা বাড়লো। বৃহস্পতিবার আধবেলা অফিস করার পর কারো না কারোর বাড়িতে আসর বসতো আমাদের। আঞ্চলিক অধিকর্তার অফিস ছাড়াও দেশে আমাদের ৬টি শাখা ছিল। ভারত থেকে যাওয়া অফিসারের সংখ্যা ছিল ১৬। প্রতি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যাবেলা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আসর বসতো আমাদের। আবুধাবি, দুবাই, শারজাহ সব ব্রাঞ্চের বন্ধুরা মিলে খুব আনন্দ করে কাটাতাম ওই দিনগুলো।
দুবাই শহরের মাঝখান দিয়ে একটা খাঁড়ি আছে। এই ‘আব্রা’র দু’পাশে শহর। একাধিক দুবাই। অপর পাড়ে ডেরা। মোটরবোটেই পার হয় মানুষ। গাড়ি যাওয়ার রাস্তা জলের মধ্যে দিয়ে একটা সুড়ঙ্গ আছে। প্রথম দিন যাওয়ার সময় এক বন্ধু জানিয়েছিল, ‘জানো তো, এই টানেলের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে জল...।’ বিশ্বাস হয়নি প্রথমে। ওই অসম্ভবকে সম্ভব করা হলো কীভাবে তা বুঝতেও সময় লেগেছিল কয়েকদিন।
ছুটির দিনগুলোর নিঃসঙ্গতা এড়াতে বেরিয়ে পড়তাম শারজাহে সমুদ্র কিনারে, কখনো বা দুবাইয়ের জুমেইরা বিচে। তখন জাবেলালি শিল্প কেন্দ্র গড়ে উঠেছিল আস্তে আস্তে। আবুধাবির দূরত্ব ছিল ২০০ কিলোমিটারের মতো। সারা দিন ঘোরাঘুরি করে ফিরে আসতাম রাতে। সেখানকার অ্যামিসমেন্ট পার্কটি ছিল খুব সুন্দর। তখন ওই দেশে কোনো ট্রেন ছিল না। এ জন্যই বোধহয় টয়ট্রেনে ভিড় হতো খুব। বন্ধুরা সবাই রোলার কোস্টার ও উঁচু নাগরদোলায় মজা করতাম খুব।
আরো একটি জায়গা ছিল আমার প্রিয় খরফোকান। ফুজিয়ারা আমিরশাহীর একটা শহর। গলফ অফ ওমানের তীরে ওই শহরে যাওয়ার পথে ছোট ছোট পাহাড় ছিল কয়েকটা। হিমালয়ের দেশের মানুষ আমি। তবু ওই পাহাড়গুলো আমাকে চিনতো ভীষণ। মানুষ যখন একা সঙ্গীহীন হয়ে যায় তখন বোধহয় সবকিছুই ভালো লাগে তার। আমার অন্তত তা-ই হতো। তবে শুনেছি, নিঃসঙ্গতার বোমা বইতে বইতে মানুষ যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ে তখন আর কিছুই ভালো লাগে না তাদের। সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের উটের পিঠে চড়ে মরুভূমির মধ্যে বেড়াতে বেড়াতে খুব ইচ্ছা হতো হারিয়ে যাওয়ার। আদি-অন্ত ছাড়িয়ে থাকা বালির মধ্যে মুখ গুঁজে শুয়ে থাকার মতো আনন্দ আর কিছু নেই বলেই মনে হতো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনোটাই হয়ে ওঠেনি।

আবদুল মান্নান সৈয়দের
স্মৃতির নোটবুক ও অন্যান্য

মনজু রহমান

 


আবদুল মান্নান সৈয়দকে নিয়ে খুব বেশি লেখালেখি হয়েছে বলা যাবে না। তার সাহিত্যকর্মের দিক নিয়ে অনেকেই বিচ্ছিন্নভাবে টুকটাক লিখেছেন। কিন্তু পুরো মান্নান সৈয়দকে কোনো আলোচকই টেনে আনার চেষ্টা করেননি। কারণ মান্নান সৈয়দ প্রচারমুখী লেখক ছিলেন না। অথচ তিনি বাংলা সাহিত্যের এমন কোনো মাধ্যম নেইÑ যেখানে সহজ ও সাবলীল কৃতিত্ব রেখে যাননি। এই বহুমাত্রিক লেখককে এক সময় বলা হতো সব্যসাচী লেখক। ষাটের লেখকদের মধ্যে তাকে বলা হতো সবচেয়ে উচ্চারণ সমৃদ্ধ লেখক, লেখকদের আইডল। প্রবন্ধ, নিবন্ধ, গল্প, উপন্যাস, গবেষণা, নাটক, কবিতা, সম্পাদনাÑ সাহিত্যের সব মাধ্যমে অনায়াসে বিচরণ করেছেন। যখন গল্প লিখেছেন তখন তিনি পুরোপুরি গল্পকার, উপন্যাস লিখেছেন উপন্যাসিকের চরিত্র নিয়েই, নিবিষ্ট গবেষক হিসেবে লিখেছেন বিভিন্ন গবেষণাগ্রন্থ, নাটকের ক্ষেত্রে তার স্বাতন্ত্র্যতা বজায় রেখেই নাটকে হাত দিয়েছেন, কবিতার ক্ষেত্রেও কাব্যিক ব্যঞ্জনা সানন্দে ব্যবহার করে হয়ে উঠেছেন সব্যসাচী কবি। কবিতায় তিনি পরীক্ষা-নিরীক্ষা কম করেননি। উত্তর-আধুনিকতা এবং পরাবাস্তবতার সমন্বয় ঘটিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন কবিতার নতুন দর্শন। তিনি লিখেছেন অনেক, অনুবাদেও সিদ্ধ ছিলেন। করেছেন অজস্র লিটলম্যাগ সম্পাদনা। লিটলম্যাগ তার ধ্যান-জ্ঞান ছিল। তিনি বলতেন, কোনো দৈনিক বা দৈনিকের বিশেষ সংখ্যায় লেখা না দিয়ে আমি সে লেখাটি দিতাম কোনো লিটল ম্যাগাজিনে।


দুই.
আবদুল মান্নান সৈয়দ বিভিন্ন গ্রন্থ রচনা করলেও প্রথম যৌবনে নিয়মিত ডায়েরি লিখতেন। সারা দিনের ঘটনাপঞ্জি টুকে রাখতেন নোটবুকে। তার জীবনের টুকরো টুকরো ঘটনাপ্রবাহ নিয়েই সাহিত্যের বর্ণাঢ্য ব্যক্তিত্বের একটি মাত্র গ্রন্থ ‘স্মৃতির নোটবুক’ পাঠকদের হাতে তুলে দিয়েছেন শিল্পতরুর কর্ণধার কবি আবিদ আজাদ। ওই নোটবুক তিনি শুরু করেছেন তার আঁতুড়ঘর থেকে। তার গ্রিন রোডের অনুঘণ্টক উঠে এসেছে ‘কুলিরোড’ শিরোনামে। তিনি বলেছেন, ‘বায়ান্ন বাজার আর তেপ্পান্ন গলির এই ঢাকা শহরের কুলিরোড খুঁজে পাবেন কেউ? পাবেন না। কারণ রাস্তার নামটাই আজ বদলে গেছে, হয়েছে গ্রিন রোড।’ এখানে চলত গরুর গাড়ি, চারপাশে কাঁচারাস্তা, সবুজে ঢাকা ধানক্ষেত, বিশাল বিশাল আম-কাঁঠালসহ বিভিন্ন গাছ, রাস্তাটি অবহেলায় নেমে গেছে দৃষ্টির বাইরে।
দশ ভাইবোনের মধ্যে একমাত্র লেখক আবদুল মান্নান সৈয়দ একাদশ শ্রেণিতেই কলকাতার পঞ্চপা-বের মতো পাঁচ বন্ধুর সান্নিধ্যে চলে আসেন। শুরু হয় জীবনের নতুন অধ্যায়। সিকান্দার দারা শিকোহ, মফিদুল আলম, আমিনুল ইসলাম বেদু, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ও আবদুল মান্নান সৈয়দ। ওই পঞ্চপা-বের হাতেই ছিল ঢাকা কলেজের তথা ঢাকার লিটল ম্যাগাজিনের সর্বস্ব শরীর। পরে অবশ্য এই গোষ্ঠীর বাইরে অন্য জগতের প্রান্তরে তিনি হাঁটতে থাকেন। তিনি অনেক বন্ধুর নাম তার প্রথম পর্বে উল্লেখ করেছেনÑ যারা ষাটের লিটলম্যাগ আন্দোলনের পুরধা ছিলেন।
মান্নান সৈয়দ প্রথম গল্প ‘আকাশটা কালো’ দিয়ে গল্পকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন ঢাকা কলেজে ‘কলেজবার্ষিকী’তে। কলেজের বাইরে পাঠকের সামনে আসেন সাম্প্রতিক পত্রিকায় প্রবন্ধ, মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকায় বিদেশি গল্পের নাট্যরূপ, সমকাল পত্রিকায় গ্রন্থালোচনা, উপন্যাস ও কাব্যনাট্য, পূবালী পত্রিকায় নাটক, দৈনিক ইত্তেফাকে কবিতাÑ এসবই তার প্রথম প্রকাশ।
এবার মান্নান সৈয়দের মুখে শুনিÑ ‘তারপর তো দরজা খুলে যায়। যৌন পত্রিকা থেকে গবেষণা পত্রিকাÑ কোথায় না লিখেছি, এমনকি রেডিও-টিভিতেও। জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, আসাদ চৌধুরী, রফিক আজাদ, শহীদ কাদরী, হুমায়ন কবির, আবুল হাসান, আখতারুজ্জামান ইালয়াস, হায়াৎ মামুদ, সেবাব্রত চৌধুরী, আবদুল্লাহ আল মামুন, মোমতাজ উদ্দীন, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, মোহাম্মাদ রফিকসহ কত প্রিয় বন্ধু তার জীবনে এসেছেন। যারা তার বন্ধু হিসেবে এসেছিলেন সবাই ষাটের লিটলম্যাগ আন্দোলনের মানুষ, নিজ নিজ ক্ষেত্রে আলোর দ্যুতি ছড়িয়ে দিয়েছেন বাংলা সাহিত্যের ভা-ারে। পঞ্চাশের কবিদের বিরুদ্ধে জোট বেঁধে লিটলম্যাগের মধ্য দিয়ে নিজেদের রাজত্ব কায়েম করেছেন।

তিন.
আবদুল মান্নান সৈয়দ শুধু লিখে গেছেন তা নয়, সমসায়িক অনেক অপরিচিতজনকে লেখক তৈরি করেছেন। তিনি সম্পাদনা করেছেন বহুমুখী সাহিত্যের কাগজ। শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক ছিলেন যে, তাও নয়। তিনি ঢাকার একমাত্র কবিÑ যিনি ঢাকার বাইরে ‘মফস্বল’ জেলাগুলোর লিটলম্যাগের নিয়মিত খোঁজখবর রাখতেন ও লেখালেখি করতেন। ওই সুবাদে বিভিন্ন মফস্বল জেলায় তার অনেক কবি বন্ধু হয়ে যায়।
মান্নান সৈয়দ অন্যান্য জেলার মতো উত্তরাঞ্চলের জেলা বগুড়ায়ও আসতেন। প্রয়াত কবি ও ‘বিপ্রতীক’ সম্পাদক ফারুক সিদ্দিকী, প্রয়াত কাজী রব, প্রয়াত মনোজ দাশগুপ্ত, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, অর্কেস্ট্রা সম্পাদক রেজাউল করিম চৌধুরী, বজলুল করিম বাহারদের নিয়মিত খোঁজ রাখতেন তিনি। বগুড়ায় এলেই আড্ডা দিতেন ফারুক সিদ্দিকীর ডেরায়। তিনি বলতেন, ঢাকার বাইরে সবচেয়ে উচ্চকিত কবিতার কাগজ বিপ্রতীক। অবশ্য বিপ্রতীকে ঢাকার প্রায় ষাটের কবিরা লিখতেন। কাজী রব সম্পর্কে তার মূল্যায়ণÑ ‘এদের মধ্যে কাজী রব ছিল সবচেয়ে কলকণ্ঠ, সবচেয়ে খোলামেলা। ওর কবিতা-গল্পেও ছিল জং না ধরা এক নতুনত্ব, এক অপরিমেয় আশা। বগুড়ার ষাটের দশকে লিটল ম্যাগাজিনের অন্যতম পুরোধার বহুধা শিল্পমুখিতা সবার নজর কাড়ে।’

চার.
লিটল ম্যাগাজিন পাগল আবদুল মান্নান সৈয়দ ছিলেন মূলত লিটল ম্যাগাজিনেরই লেখক। তার সংগ্রহে লিটল ম্যাগাজিনের তালিকা দেখলেই বোঝা যায়, তিনি কতটা লিটল ম্যাগপ্রিয় ছিলেন। ষাটের দশকের সারা দেশ থেকে যে লিটল ম্যাগাজিন-পঞ্জি তিনি ‘স্মৃতির নোটবুক’-এ রেখে গেছেন, সেসবের বিস্তারিত তালিকা (কোন ম্যাগাজিন কত সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে এবং কোন সংখ্যার সম্পাদক কে ছিলেন) দেখলেই অনুমান করা যায়, লিটল ম্যাগাজিনে কতটা দরদ, উদার, নিবেদিত ও যতœবান ছিলেন। সম্পাদনা করেছেন ‘শিল্পতরু’ ও ‘চারিত্র’ কাগজ দুটি। সবচেয়ে বড় দিক হলো, ষাটের দশকে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে থেকে যেসব লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয়েছে এর অধিকাংশের সঙ্গেই তিনি জড়িত ছিলেন কোনো না কোনোভাবে।
অত্যন্ত বিনয়ী, নিরহঙ্কার ও তুখোর আড্ডাবাজ ওই সব্যসাচী লেখক সহজেই যে কোনো অনুষ্ঠানের মধ্যমণি হতে পারতেন। স্মৃতির নোটবুক খুব স্বাস্থ্যবান না হলেও তার সাহিত্য জীবনের যে তথ্য-উপাত্ত এই ক্ষুদ্র গ্রন্থে দিয়ে গেছেন তা ষাটের দশকের লিটলম্যাগ আন্দোলনের পূর্ণাঙ্গ দলিল হিসেবে বিবেচনায় নিতে পারি এবং তা নির্র্দ্বিধায়।

বিদায়ের শেষ সুর

খায়রুন নাহার রুবী

 

 

প্রতিদিন ভোরে ছোট ছেলেটাকে ফোন দিয়ে ঘুম থেকে জাগাতে হয়। নতুবা উঠতে পারে না, আর না উঠতে পারলে সকালের পড়াটা নষ্ট হয়। আজও তেমন করে ফোন দিয়ে জাগিয়েছি বাবুকে। ও ফোন ধরে বললো, মা উঠেছি, এখনই পড়তে বসবো, তুমি ভেবো না। আমি আমার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। প্রতিদিনকার জীবনযুদ্ধ ঘর-বাইরের যুদ্ধ, চাকুরি ক্ষেত্রের যুদ্ধ এমনি নানা যুদ্ধ শরীর মনে বহন করতে হয়। আজ ছুটির দিন বলে যুদ্ধের ধরণ আলাদা তারপরও যেন যুদ্ধের শেষ নেই।
গত ক’দিন থেকে শরীর, মনে এত পরিশ্রম গেছে যা বলার নয়। প্রতি বছরই এই সময়টা আমাকে অনেক বেশি প্রেশারে থাকতে হয়। এই দু’চারদিন হলো সব কাজগুলো গুছিয়ে উঠেছি এখন একটু স্বস্তি। কিন্তু তারপরও যেন কাজের শেষ নেই! চাইলেও স্বস্তিতে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব হয় না। কী মনে করে ছুটির দিন বলে,কাজের ফাকে কøান্তিতে বিছানায় নয় শোফায় শুয়ে পড়লাম। হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠলো। তাকিয়ে দেখলাম ছোটছেলের ফোন। ধরতেই ‘ও’ ডুকরে কেঁদে উঠলো। আমি বুঝলাম না কেন ও অমন করে কাঁদছে?
বললাম , কী হয়েছে বাবা, কাঁদছো কেন?
ও বললো, মা! আমার বন্ধু সুদ্বীপ মারা গেছে।
আমি মুহূর্তেই হতবাক হলাম,অবাক বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, কী হয়েছিল, কী করে মারা গেল?
ও বললো, আমি ঠিক জানি না মা! তবে যে আমাকে জানিয়েছে সে বলেছে সুইসাইড করেছে।
কষ্টে মনটা বিষিয়ে উঠলো। ভাবলাম কী এমন হয়েছে যে সুইসাইড করতে হবে? এই বয়সী ছেলেমেয়েদের সমস্যা একটাই- অতি আবেগ। অতি আবেগে ওরা কী করে , কী করতে চায় নিজেরাই জানে না। খুবই আহত হলাম এ সংবাদ শুনে। ভাবলাম, এখনই ওদের বাসায় যেতে হবে। সুদ্বীপের মার সাথে আমার খুব ভালো সম্পর্ক। আমার খুব পছন্দের একটা মানুষ ওর মা। ওর মার মুখে লেগে থাকা মিষ্টি হাসিটা মুহূর্তেই ভেসে উঠলো আমার চোখে। আর বাচ্চা বাচ্চা মিষ্টি কণ্ঠস্বরটাও কানে ভেসে এলো। অস্থির হয়ে ছুটলাম ওদের বাসার দিকে।


যেতে যেতে মনটা এতই বিষণœ হলো যেন বৃষ্টি জলের মত স্যাঁত স্যাঁতে হয়ে উঠলো বুকের ভেতরটা! আমি জানি একটু পর এটা সমুদ্র জলের ধাক্কায় রূপ নেবে, নিতেই হবে। এ যে বড় কষ্টের অনুভূতি! হঠাৎ করেই বাতিঘর নিভে যাওয়া।
রিক্সা এসে থামলো ওদের বাসার সামনে। নিচতলায় তেমন লোকজন নেই, হয়ত এখনও সেভাবে জানাজানি হয়নি। শুধু দ’ুটি ছেলে একজন সুদ্বীপের আত্মীয় হবে অন্যজনকে আমি চিনি না, ওরা দু’জন হাউমাউ করে কাঁদছে। ওদের এই কান্না যে কত কষ্টের তা শুধু ওরাই বলতে পারে। কারণ যারা কাঁদে শুধু তারাই জানে কী এবং কতটা বেদনাভরা এই কান্না! অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়লে বৃষ্টির চোখ ফুলে লাল হয় কিনা আমার জানা নেই তবে এই ছেলে দু’টোর চোখ ফুলে রক্তের মত লাল হয়ে আছে।
আস্তে আস্তে সিঁড়ি ভেঙ্গে উপরে উঠলাম। বেশ কয়েকজন পরিচিত মানুষ বিরস মুখে বসে আছে। সাথে আমার ছোট্টবেলার বন্ধু! তাদের কারো মুখে কোন কথা নেই। সবারই যেন কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা! লোকজন ঠেলে ভেতরে পা রাখতেই চোখে পড়লো, সুদ্বীপের লাশের পাশে ওর বাবা বসে আছে। দেখে চেনা যায় না, একেবারে পাংশু বর্ণ ধারণ করেছে। সুদ্বীপ ওর পছন্দের, প্রিয় খাটেই শুয়ে আছে , শুধু সাদা একটা চাদর দিয়ে ওর সমস্ত শরীর ঢেকে দেয়া হয়েছে।
বাবার জন্য কত কষ্টের সন্তানের লাশ ধরে বসে থাকা। পৃথিবীতে এত কষ্ট বোধহয় আর কিছুতে নেই। মুখটা দেখবো বলে ওর খাটের পাশেই দাঁড়ালাম। কে একজন এসে চাদরটা সরিয়ে দিলে মুখটা দেখলাম।সহজ, সরল একটা মুখ, মনে হয়, যেন কোন পাপ আজও ওকে স্পর্শ করেনি।‘ও’ যেন স্বভাবতই ঘুমিয়ে আছে! গলায় হালকা একটা লালচে দাগ, আর সবই ঠিক আছে। তখনই মনে হলো,সুদ্বীপ নেই। পৃথিবীর সবটুকু মায়া ছেড়ে ও চলে গেছে, আর আসবে না। কেন যেন মনে হলো, ও কি সত্যিই চলে যেতে চেয়েছে? নাকি সবার ওপর অভিমান করে শুধু নিজের কষ্টটাকে দেখাতে চেয়েছে, মরার জন্য একাজ করেনি। পৃথিবীর সব আলো নিভে গেছে, সুদ্বীপ নিভিয়ে দিয়ে চলে গেছে।
পৃথিবীর সব মানুষেরইতো কিছু না কিছু কষ্ট থাকে, সে কষ্ট এক সময় হাওয়ায় হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়ে লেগে থাকে আকাশের বুকে! তার জন্য মরতে হবে কেন? মৃত্যুর মধ্যে কী আছে? কেন আমাদের সন্তানরা এই পথটি বেছে নেয়? কেন আমরা তাদের সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারি না? কেন ব্যর্থতার শতভাগ বোঝা নিয়ে আমাদের পড়ে থাকতে হয়? এসব প্রশ্নের উত্তর এখন আর কেউ দিতে পারবে না। যেটুকু বুঝি তা হচ্ছে, সময়টা এখন খুব খারাপ! এক এক সময় মনে হয়, অন্ধকার যুগে, বর্বর যুগে, কৃষ্ণযুগে বাস করছি। কোথাও কোন নিয়ম শৃঙ্খলার বালাই নেই। ব্যক্তি, দেশ, রাষ্ট্্র, সমাজ কোথাও যেন কোন বন্ধন নেই। যে যার মত করে চলছে। ধর্মীয় অনুভূতির বিষয়টাও এখন আর আগের মত জাগ্রত নয়। পাপ পুন্যের বিচারবোধও মানুষ এখন হারিয়ে ফেলেছে। তাই নিজের প্রতি ,পরিবারের প্রতি ক্ষোভ নিয়ে মৃত্যুর পথে এগিয়ে যায়।


ওর মার রুমে ঢুকে বুকটা ব্যথায় ভরে উঠলো। হায়রে মা! সন্তানের মঙ্গল বার্তা যতটা বুকে লেগে থাকে , অমঙ্গলের তীর কাটা হাজার গুন বুকটাকে বিদ্ধ করে। এ যন্ত্রনা থেকে আর কারো মুক্তি ঘটলেও মা’র মুক্তি নেই। যেন হাজার বছর খুচিয়ে খুচিয়ে রক্তাক্ত করে মা’র অন্তর! সুদ্বীপের মা বিলাপ করে কাঁদছিল! সবার চোখের পাতা ভিজে উঠছিল, কেউ কেউ হু হু করে দুহাতে মুখ ঢেকে কাঁদছিল। কখন যে নিজের অজান্তে আমার চোখের পাতা অশ্রুসিক্ত হলো বুঝলাম না।
অনেকটা সময় সুদ্বীপের মার পাশে বসেছিলাম। উনি হয়ত আমাকে দেখতে পাননি। এক এক সময় ওর মার কষ্টের হাহাকার এত তীব্র যে উনি মানতে চান না ওনার সন্তান পৃথিবীতে নেই। কত কথার গাথুনিতে সদ্য মৃত সন্তানকে জীবিত করে তোলেন, ছেলের আচার ,আচরণ , কথাকে জলের মাঝে কাগজের নৌকোর মত করে ভাসিয়ে রাখেন। আবার চিৎকার করে কাঁদেন ছেলের পৃথিবী থেকে চলে যাবার কথা ভেবে। আমি বাড়ির পথে পা বাড়ালাম। আমার ফোনটি বেজে উঠলো। দেখলাম, ছোট ছেলেটা আবার ফোন করেছে। ফোন ধরলাম , ও বললো, মা আমি আসছি, আমাকে নিষেধ করো না।
আমি বললাম, তোমার এ চলে আসাটাকে তোমার বাবা ভালো চোখে দেখবে না।


ও বললো, না দেখলেও যে আমার কিছু করার নেই মা! আমাকে যে আসতেই হবে। আমি ওর জানাজায় শরীক হবো। আমি আর কিছুই বলতে পারলাম না।
সময় গড়িয়ে চলছে। আমি অপেক্ষা করে আছি ছেলে আসবে। ‘ও’ ওর বন্ধুর লাশ দাফন করার জন্য খুব ঝুকির পথে আসছে। বন্ধুর জন্য হৃদয়ে এটুকু রক্তক্ষরণ হচ্ছে এবং তার জন্য ছুটে আসছে, একথা ভেবে মনে মনে সম্মান জানালাম ওকে। আমরা চাইলেও কারো জন্য তেমন কিছু করতে পারি না, তেমন কিছু করা হয়ে ওঠে না। ওর ছোট্ট মনের কোমল জায়গা থেকে এটুকু করার জন্য ছুটে আসছে এওবা কম কিসে?
ওদের আসতে আসতে আসরের নামাজের সময় হয়ে গেল। আসরের পরপরই জানাজা হলো। তারপরও লাশ রাখা হলো, ঈদগাহ মাঠে। যেখানে জানাজা হয়েছে ঠিক সেই জায়গাটায়। এটা ওদের প্রিয় জায়গা! ছোটবেলা থেকে এ মাঠে খেলে ওরা বড় হয়েছে। এর আশেপাশে ব্যস্ত সময় পাড় করেছে। সেই স্বপ্নের জায়গা প্রিয় মাঠ, ঈদগাহ ! কত বকা খেয়েছে, আমি নিজেও কত বকা দিয়েছি আমার সন্তানকে শুধু ওখানটায় যাবার জন্য তারও যেন কোন হিসাব নেই। এই সেই মাঠ যেখানে সুদ্বীপ শুয়ে আছে। আর হাজারো মানুষের পদচারণায় কেমন ভারি হয়ে উঠছে ‘ঈদগাহ’! সামনের ঈদে সুদ্বীপ আর এখানে হাঁটবেনা, বন্ধুদের নিয়ে মেতে উঠবে না হৈ হুল্লুরে!
সুদ্বীপের দূরের আত্মীয় স্বজনদের আসতে দেরি হওয়ায় আসরের পর দাফন হলো না। আমি ছেলের কারণে ব্যস্ত হয়ে আবার ছুটলাম সুদ্বীপদের বাসায়।
সন্ধ্যে তখন ছুঁই ছুঁই। চারদিক অন্ধকার-কেমন ঘুটঘুটে, অদ্ভুত বিষাদে ভারি হয়ে আছে বাড়িটা! ওর মা আত্মীয় স্বজন সব নিচে নেমে এসেছে, ডুকরে কাঁদছে মা! বাবা নিচে নামেনি খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছে।
সুদ্বীপের দ্বিতীয়বার জানাজা শেষে কবরস্থানে নেয়ার জন্য ট্রাকে তোলা হলে মুহূর্তে ট্রাক ভরে গেল বন্ধুদের জন¯্রােতে। তারপরও অনেক বন্ধু যে যার মত করে ছুটছে কবরস্থানের দিকে। বিষাদের কালো মেঘটা কেমন নিশিকালো অন্ধকার করে রাখা বাড়িটাকে ছেড়ে হাওয়ায় হাওয়ায় উড়ে চললো কবরস্থানের পথে। বিদায় সুদ্বীপ! এই পরিবারের একটি অধ্যায়ের শেষ হলো যেন আজ!
তৃতীয় দিনে মিলাদ শেষে ছোট ছেলে ঢাকা চলে যাবে রাতের গাড়িতে। আমি বার বার ফোন দিচ্ছি, কোথায়?
বাবু বললো, মা আমরা বন্ধুরা কবরস্থানে।


ভাবলাম , যাবার আগে বন্ধুকে দেখতে গেছে। বাবু কবরস্থান থেকে ফিরে এলে খুব তাড়াহুড়ো করে ওকে গাড়িতে তুলে দিতে গিয়ে দেখি- সব বন্ধুরা এসেছে বাবুকে এগিয়ে দিতে। ওদের মন খুব খারাপ! বাবুকে গাড়িতে তুলে দিয়ে বাসায় আসি। অনেক রাতে ওর রুমটা গোছাতে গিয়ে দেখি, বালিশের নিচে একটা খোলা ডায়রী। কী যেন সব লেখা। যেটা নিতে ‘ও’ হয়ত ভুলে গেছে। লেখাটা নজরে পড়লো, আমি কেমন চমকে উঠলাম! লেখাটা ঠিক এমনই ছিল ...
“আজ আকাশে চাঁদটা দেখেছিস সুদ্বীপ? আজ যখন তোকে নিয়ে ঐ ভয়ানক নির্জন জায়গাটায় গেলাম, তখন গন্ধরাজ ফুলগাছের পাতার মধ্য দিয়ে বিশাল থালার মত চাঁদটাকে দেখে বুকের ভেতরটা কেমন হু হু করছিলো। তোর কি মনে পড়ে এমনি কত রাত আমরা এক সাথে হেঁটেছি? সেদিনওতো আকাশে এমন সুন্দর চাঁদ-ই ছিলো? ভূতের গলি, ঈদ-গাহ মাঠে হয়তো আমাদের পায়ের চিহ্ন এখনো মুছে যায়নি। আর আজ কিনা তুই একা একাই চাঁদ দেখবি?
জানিস, দোস্ত ছোটবেলা থেকেই আমি লাশ দেখলে খুব ভয় পেতাম কারণ যদি রাতে স্বপ্নে ওটাকে দেখি। কিন্তু বিশ্বাস কর,আজ যদি আমি স্বপ্নে তোকে দেখি তাহলে আমি হয়তো তোকে একটা থাপ্পর দিয়ে বলবো, কোথায় গেছিলি, একবারও কারো কথা ভাবলি না?
তোকে অনেক মিস করবো রে...! তোর জায়গা কেউ কোনদিনও নিতে পারবে না। কারণ সেই জায়গা পূরণ করার ক্ষমতা নিয়ে কেউ হয়তো আর আসবে না। আল্লাহ তোকে বেহেশত নসিব করুক! আমাদের যেন জান্নাতে আবার দেখা হয়... সেদিন তুই আর আমি আবার এক সাথে চাঁদ দেখবো”...!
লেখাটা পড়ে কেমন যেন হয়ে গেলাম, কেমন একটা অনুভূতি মুহূর্তে হৃদয় ছুঁয়ে গেল, হায় কী হলো, এটাতো না হলেও পারতো!
এর এক সপ্তাহ পর আমি যাচ্ছিলাম সুদ্বীপের বাসার সামনে দিয়ে। হঠাৎ বুকটা কেঁপে উঠলো, বাড়িটা কেমন প্রাণহীন হয়ে আছে। মনে হলো, যেন আজ আর এ বাড়িতে কোন মানুষ নেই। কাঁচের জানালাগুলো খোলা, সাদা পর্দাগুলো দিশাহীনভাবে উড়ছে মুক্তির আনন্দে! ছাদের দিকে তাকালাম- পুর্তগালের একটি পতাকা উড়ছে...! আর বাটিক করা কতগুলো নীল কাপড় বাতাসে উড়ে উড়ে দড়ির গায়ে আটকে আছে। অথচ এই পরিবারের আদরের ছোট্ট সন্তানটি ভালোবাসার বন্ধনে আটকে থাকতে পারেনি...!

 

ধনবানে কেনে বই জ্ঞানবানে পড়ে

যতীন সরকার

 

এটি হয়তো নিছক একটি গল্প। তবু এ-গল্পের ভাবসত্যটিকে না-মেনে পারা যায় না। একালের নব্যধনিক এবং লুটেরা ধনিকরা যে বই নিয়ে মাথা ঘামায় না, গল্পটিতে সে-সত্যেরই প্রকাশ ঘটেছে। বাংলায় একটি প্রবাদ আছে- ‘আনাড়ির ঘোড়া নিয়ে বুদ্ধিমান চড়ে/ধনবানে কেনে বই বুদ্ধিমানে পড়ে

 

কন্ট্রাক্টরি করে অনেক কাঁচা পয়সার মালিক হয়েছেন এমন এক ব্যক্তি নিজের জন্য একটি আলিশান বাড়ি তৈরি করলেন। খুবই আধুনিক ধাঁচের বাড়ি। দামি আসবাব দিয়ে পুরো বাড়িটি সাজানো। এক সমঝদার বন্ধুকে বাড়িটি দেখাতে নিয়ে এলেন এবং বাড়িটি সম্পর্কে তার অভিমত জানতে চাইলেন। বন্ধু বললেন, ‘হ্যাঁ, খুবই চমৎকার বাড়ি তুমি তৈরি করেছ। আর বাড়ির আসবাবপত্রগুলোও খুবই চমৎকার ও রুচিশীল বটে। কিন্তু এ রকম একটা বাড়িতে ভালো একটা লাইব্রেরি না থাকলে ঠিক মানায় না। বাড়িতে বই থাকাটা খুবই জরুরি।‘
বাড়ির মালিক কন্ট্রাক্টর ‘কুচ পরোয়া নেই’ ভঙ্গিতে বললেন, ‘ঠিক আছে, আজই আমি আহম্মদ অ্যান্ড কোম্পানিতে ৭০০ টন বইয়ের অর্ডার দিয়ে দিচ্ছি।’
চুন-বালি-সুড়কি নিয়ে যার কারবার তিনি তো সবকিছুকেই টনের মাপে বিচার করবেন। তাই বইয়ের কথায়ও তার টনের হিসাবই মনে এলো, বইয়ের সম্পর্কেও অন্য রকম কিছু তিনি ভাবতে পারেন না।
এটি হয়তো নিছক একটি গল্প। তবু এ গল্পের ভাবসত্যটিকে না মেনে পারা যায় না। একালের নব্য ধনিক ও লুটেরা ধনিকরা যে বই নিয়ে মাথা ঘামায় না, গল্পটিতে ওই সত্যেরই প্রকাশ ঘটেছে। বাংলায় একটি প্রবাদ আছেÑ ‘আনাড়ির ঘোড়া নিয়ে বুদ্ধিমান চড়ে/ধনবানে কেনে বই, বুদ্ধিমানে পড়ে।’ একালের ধনবানদের ব্যাপারে এ প্রবাদটি বোধহয় এর সত্যতা ও কার্যকারিতা একেবারেই হারিয়ে ফেলেছে।
প্রবাদটি তাহলে কখন সত্য ছিল? কখনো সত্য ছিল কি?


বিপুল ধনে ধনবান হওয়ার যেসব পথ অর্ধশতাব্দী ধরে, বিশেষ করে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেÑ এখন খুলে গেছে, সেসব পথ এর আগে তৈরি হয়নি। সে সময় এখানে ধনবান হওয়ার ভিত্তি ছিল ভুমির স্বত্ব-স্বামিত্ব। কর্নওয়ালিসের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পথ ধরে ছোট-বড়-মাঝারি যে ভুস্বামীগোষ্ঠীর পত্তন ঘটেছিল, ধনবান বলতে মূলত ওই গোষ্ঠীর মানুষকেই বোঝাতো। সরকারি-বেসরকারি চাকরি কিংবা ওকালতি, ডাক্তারি, মাস্টারি ইত্যাদি পেশার ব্যক্তিরাও ওই গোষ্ঠী থেকেই বেরিয়ে আসতেন। অর্থে-বিত্তে তারা সম্পন্নতা ও স্বচ্ছলতা অর্জন করতেন অবশ্যই। তবে একেবারে লাগাম ছাড়া ধনবান হয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ তাদের সামনে খুলে যায়নি।
এরও অনেক আগে, আঠারো শতকের শেষে সদ্য ব্রিটিশ রাজত্ব প্রতিষ্ঠার সুবাদে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত ধরে এ দেশে একটি মুৎসুদ্ধি ধনিক শ্রেণি গড়ে উঠেছিল। তাদের বলা হতো ‘হঠাৎ নবাব’। সেকালের ওই ‘হঠাৎ নবাব’দের সংস্কৃতিহীনতা ও রুচিহীনতার অনেক মিল খুঁজে পাওয়া যাবে একালের নব্য ধনিক ও লুটেরা ধনিকদের সঙ্গে। তাদের মতোই বই সংস্পর্শহীন ছিলেন সেকালের হঠাৎ নবাবরা।
হঠাৎ নবাবদের গোষ্ঠীটি সমাজমঞ্চ থেকে আস্তে আস্তে বিদায় নিতে থাকে। এ গোষ্ঠীর অনেকেই পরে ভূস্বামীতে রূপান্তরিত হন। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত থেকে উপজাত ওই গোষ্ঠীটি সম্পর্কে আমাদের বিরূপতা অবশ্যই সঠিক ও সঙ্গত। তাদের যে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের খোজা প্রহরীরূপে গড়ে তোলা হয়েছিল সে কথা মোটেই মিথ্যা নয়। পরজীবী ওই নয়া সামন্ততন্ত্রীরাই যে সমাজ প্রগতির পথে দুস্তর বাধার সৃষ্টি করে রেখেছিল এ কথাও নিশ্চয়ই সত্য। তবু না মেনে পারি না যে, এর ভেতরেই সত্যের একটি উল্টো ধারাও সক্রিয় হয়ে উঠেছিল। ওই গোষ্ঠীর ব্যক্তিরাই বইয়ের সংস্পর্শে এসেছিলেন, বইপ্রেমিক হয়েছিলেন, বই লিখেছিলেন। অর্থাৎ আগেকার ‘হঠাৎ নবাব’দের বিপরীতে তারা হয়ে উঠেছিলেন সংস্কৃতিবান ও রুচিমান। তাই তারা যেমন বই পড়তেন তেমনই অন্যদেরও পড়তে উৎসাহ জোগাতেন।


তাদের ভেতর বই পড়ায় যারা মোটেই উৎসাহী ছিলেন না তারাও কখনো কখনো নিতান্ত অনিচ্ছায় হলেও উৎসাহী পড়ুয়াদের জন্য বইয়ের জোগান দিতেন। সে সময়কার পুস্তক প্রকাশকদের কাছে দেশের সব ছোট-বড় জমিদারের তালিকা থাকতো। নতুন বই প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওই তালিকা দেখে প্রকাশকরা জমিদারদের নামে ভিপিযোগে বই পাঠিয়ে দিতেন। জমিদারের বাড়ি থেকে ভিপি ফেরত যাওয়াটাকে একান্তই অসম্মানজনক মনে করা হতো। এ রকম অসম্মানের বোঝা বইতে কোনো জমিদারই রাজি ছিলেন না। তাই অন্তত ময়মনসিংহ জেলার এমন কয়েক জমিদারের কথা শুনেছি, তারা প্রকাশকদের পাঠানো বইগুলোর তালিকা তৈরি করে সেসবের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বিশেষ কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে রেখেছিলেন। এ রকম বইয়ের সংগ্রহ নিয়েই প্রতিটি জমিদার বাড়িতে একেকটি লাইব্রেরি গড়ে উঠেছিল। সেসব লাইব্রেরিতে কোনো জমিদার বা জমিদার নন্দন প্রবেশ করুন আর না-ই করুন, জ্ঞানপিপাসু প্রজাদের অনেকেই সেগুলোয় ভিড় জমাতেন। এভাবেই এবং এ সময় থেকেই বোধহয় ‘ধনবানে কেনে বই, জ্ঞানবানে পড়ে’ প্রবাদটির প্রচলন ঘটেছে।
অনিচ্ছায় নয় শুধু। জ্ঞানবান সৃষ্টিতে অথবা জ্ঞানবানদের পৃষ্ঠপোষকতাদানে স্বেচ্ছায় যারা এগিয়ে এসেছেনÑ তেমন ধনবানের সংখ্যাও একেবারে কম ছিল না। এ রকম অনেক জমিদারই নিজেদের বাড়িতে সমৃদ্ধ লাইব্রেরি গড়ে তুলেছিলেন। ধনবাড়ী, মুক্তাগাছা ও শেরপুরের জমিদারদের লাইব্রেরির কথা তো সর্বজনবিদিত। বাড়ির বাইরে পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠায়ও অনেক জমিদার আর্থিক সহায়তা দান করেছেন। রাজশাহীর ‘বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতি’ ও এর সমৃদ্ধ পাঠাগারটি তো এ রকম বিদ্যোৎসাহী জমিদারের দানেই প্রতিষ্ঠিত। ব্রিটিশ শাসন আমলেই স্বদেশপ্রেমিক স্বাধীনতা সংগ্রামীরা বই পড়াটি স্বদেশপ্রেম ও স্বাধীনতা সংগ্রামের অপরিহার্য অঙ্গে পরিণত করে ফেলেছিলেন। তাদের উদ্যোগেই গ্রামে গ্রামে বা মহল্লায় মহল্লায় পাঠাগার প্রতিষ্ঠা একটি আন্দোলনে রূপ নেয়। ওই আন্দোলনেও তখনকার ধনবানদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের সক্রিয় সহযোগিতা ছিল।


দুই.
দুঃখ এই, ব্রিটিশ শাসন আমলের ধনবানদের পথে ব্রিটিশ শাসনমুক্ত দেশের ধনবানরা পা বাড়ালেন না। পাকিস্তান জমানায় নয়, স্বাধীন বাংলাদেশেও নয়। ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’-এর জিগির তুলে ওই অদ্ভুত রাষ্ট্রটি কায়েম করে যারা সেখানে রাতারাতি ধনবান হয়ে উঠেছিল তাদের ধন অর্জনের পেছনে বইয়ের কোনো ভূমিকা ছিল না। বরং বই ছিল তাদের মতলব হাসিলের পথের প্রতিবন্ধক। তাই তারা বইবিরোধী না হয়ে পারেনি। বই নয়, নির্বিবেক বিষয়-বুদ্ধিই হয়ে উঠেছিল তাদের চালিকাশক্তি। বিষয়-বুদ্ধিই তাদের ভেতর সাম্প্রদায়িক ভেদ-বুদ্ধিটিকে উসকে দিয়েছিল। ওই ভেদ-বুদ্ধি থেকে জন্ম নিয়েছিল ‘পাকিস্তান’ নামক যে সংস্কৃতিবিরোধী রাষ্ট্রটি এর পক্ষে বইভীতি হওয়াই ছিল একান্ত স্বাভাবিক।
পাকিস্তান কায়েম হয়ে যাওয়ার পর সমাজের সব মানুষই যে সংস্কৃতিহীন হয়ে গিয়েছিল তা তো নয়। অন্তত পাকিস্তানের পূর্ব অংশের বাঙালি জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল সাংস্কৃতিক রুচিঋদ্ধ। এই সংস্কৃতিমান মানুষের বইপ্রীতি পাকিস্তান রাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারক ও কর্তৃত্ববানদের একান্ত স্বস্তিহীন করে তুলেছিল। এ ব্যাপারে নাৎসিবাদী হিটলার ও তার অনুচরদের সঙ্গে পাকিস্তানবাদীদের ভাবনা একেবারে খাপে খাপে মিলে যায়। নাৎসিবাদ ও পাকিস্তানবাদÑ এ দুয়েরই লক্ষ্য ছিল সভ্যতার চাকাটা পেছন দিকে ঘুরিয়ে দেয়া। আর এ কাজে বই-ই হচ্ছে প্রধান বাধা। কারণ বই তো সভ্যতার বাহক। সভ্যতার বাহকটিকে সভ্যতাবিরোধীরা সুনজরে দেখে কী করে? নাৎসিবাদীরা সভ্যতার বাহক বইয়ের বহ্নুৎসব করেছিল প্রকাশ্যে ঢাকঢোল পিটিয়ে। পাকিস্তানবাদীরা ঠিক তেমনটি করেনি। তারা মানুষকে বই বিমুখ করার অন্য রকম একটি ধারা চালু করতে চেয়েছিল। ওই ধারাটি সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের। পবিত্র ধর্মের অপবিত্র ব্যাখ্যা দিয়ে এখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বোধ-বুদ্ধি সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের খাতে প্রবাহিত করে দেয়ার মতলব এঁটেছিল তারা। ধরেছিল বই নিষিদ্ধ করার পথ। সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষমুক্ত উদার ও মুক্তবুদ্ধি সাধকদের তারা ভয় পেতো। সমাজ বদলের প্রবক্তাদের সম্পর্কে তো তাদের ভীতি ছিল সীমাহীন। তাই যে বইয়েই প্রকাশ আছে কিংবা আছে সমাজবদলের আর্তি ও পথনির্দেশ সেসব বই-ই হয়ে উঠেছিল তাদের চোখের বালি। কিন্তু সংখ্যাধিক্য তো সে রকম বইয়েরই। কয়টা বই নিষিদ্ধ করতে পেরেছিল পাকিস্তানবাদের প্রবক্তারা? বইয়ের প্রতি পাকিস্তানবাদীদের নিষেধবিধিই বরং পাকিস্তান রাষ্ট্রের অধিকার বাঙালিদের বইপ্রেমটি আরো জোরদার করে তুলেছিল, নিষিদ্ধ বইয়ের প্রতি তাদের আকর্ষণ দুর্বার হয়ে উঠেছিল। বলা যেতে পারে, বাঙালি জাতির স্বাধিকার চেতনা ও স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম প্রেরণাটি তার বইপ্রেম থেকেই উৎসারিত হয়েছিল। হায়! রক্ত ও ইজ্জত দিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর এ রাষ্ট্র তথা এ জাতির হর্তাকর্তা, বিধাতা হয়ে বসলো যে গোষ্ঠীটি সে গোষ্ঠীর ভেতর বইপ্রেমিক সংস্কৃতিমান বাঙালি জাতির ঐতিহ্যের ছিটেফোঁটাও নেই। আগেই বলেছি, বাংলাদেশের এই নব্য ধনিক ও লুটেরা ধনিকগোষ্ঠী অষ্টাদশ শতকের কলকাতার ‘হঠাৎ নবাব’দেরই সগোত্র। হঠাৎ নবাবদের চেয়ে তারা বরং অনেক ধূর্ত ও ধড়িবাজ। আঠারো শতকের বাঙালি হঠাৎ নবাবদের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা ছিল না। কিন্তু বিশ শতকের স্বাধীন বাংলাদেশে রাষ্ট্র ক্ষমতাটি এখানকার নব্য ধনিক ও লুটেরা ধনিকরাই দখল করে নিয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানে দেশের জনগণকেই বলা হয়েছে রাষ্ট্রের ‘মালিক’। ওই মালিকানা বেহাত হয়ে যেতে বেশিদিন লাগেনি। এখন তো বাংলাদেশের জাতীয় সংসদেরও নিয়ন্তা নব্য ধনিকরাই, রাজনীতিকদের বদলে তারা সে সংসদের অধিকাংশ আসনের দখলদার হয়ে বসেছে। এ কথা তো জানাই আছে, ক্ষমতা অধিকারীদের সংস্কৃতিই হয়ে ওঠে পুরো সমাজের সংস্কৃতি। বর্তমানে এ দেশে ক্ষমতার মঞ্চে যারা অধিষ্ঠিত তাদের কি সত্যি সত্যিই কোনো সংস্কৃতি আছে? সংস্কৃতিহীন ক্ষমতাবানদের দেশটি তো সংস্কৃতিহীনই হবে। সে দেশে বইয়ের কদর করবে কে?


তিন.
ব্রিটিশ আমলে ধনবানদের পৃষ্ঠপোষকতায় এ দেশে যেসব লাইব্রেরি গড়ে উঠেছিল এর অধিকাংশই পাকিস্তান জমানায়ও টিকে ছিল। কোনো কোনোটির শ্রীবৃদ্ধি হয়েছিল। জমিদারি প্রথার বিলুপ্তি ও অনেক জমিদারের দেশত্যাগের ফলে জমিদারদের লাইব্রেরির অনেকটিই অবশ্য নষ্ট হয়ে যায়। এরপরও যেসব পাবলিক লাইব্রেরি টিকে গিয়েছিল এরও অধিকাংশ ধ্বংস হয়ে যায় একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়। এ রকম অন্তত দুটি লাইব্রেরির কথা অত্যন্ত বেদনার সঙ্গে স্মরণ করছিÑ একটি ময়মনসিংহের দুর্গাবাড়ী ধর্মসভা লাইব্রেরি ও অন্যটি ঢাকার রামমোহন লাইব্রেরি। প্রথমটি ছিল সনাতনী হিন্দুদের দ্বারা পরিচালিত ও দ্বিতীয়টি প্রগতিশীল ব্রাহ্মদের। দুটি লাইব্রেরিরই প্রতিষ্ঠাতারা ছিলেন ধর্ম আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। কিন্তু লাইব্রেরি দুটিতে ধর্মীয় বই যত ছিল এর চেয়ে বেশি ছিল ধর্মনিরপেক্ষ বই। এমন অনেক অমূল্য ও দুর্লভ বই এ দুটি লাইব্রেরিতে ছিল যেগুলোর আর কোনো কপি হয়তো কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। ময়মনসিংহের ধর্মসভা লাইব্রেরিতে তো হাতে লেখা পুঁথিই ছিল কয়েকশ’। সবই লুণ্ঠিত হয়ে মুদি দোকানের ঠোঙ্গায় পরিণত হয়েছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে এ রকম পাবলিক লাইব্রেরির পাশাপাশি কতজনের ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারের যে একই পরিণতি ঘটেছে, আমরা কেউই সেসবের খোঁজ নিইনি। এভাবে আমাদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাসের কত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-উপাত্ত যে হারিয়ে গেছে এ সম্পর্কেও আমরা অবহিত ও সচেতন হইনি বললেই চলে। এ রকম শূন্যতার মধ্যে কিছুতেই বেঁচে থাকা যায় না। অন্তত মননশীল মানুষরূপে বেঁচে থাকা তো যায় না! সত্যিকার মননশীল মানুষরূপে বেঁচে থাকার নামই যেহেতু সংস্কৃতি এবং বই যেহেতু ওই সংস্কৃতির অপরিহার্য বাহন সেহেতু বই পড়ার আয়োজনের বিস্তৃতি ঘটাতেই হবে। কীভাবে তা সম্ভব? ‘বই কিনে কেউ দেউলে হয় না’Ñ বিদগ্ধ সংস্কৃতিমান প্রমথ চৌধুরী এমন একটি কথা বলে এক সময় আমাদের আশ্বস্ত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নুন আনতে পান্তা ফুরোয়Ñ বইপ্রেমিকদের মধ্যে এমন মানুষেরই তো সংখ্যাধিক্য। এ রকম যারা প্রায় জন্মসূত্রেই দেউলে হয়ে আছে, প্রমথ চৌধুরীর আশ্বাসবাণী তাদের কতটুকু কাজে লাগবে? বই কিনে বই পড়ার আগ্রহ চরিতার্থ করা তো তাদের পক্ষে একেবারেই অসম্ভব। কাজেই সবার বইপড়ার সুযোগ অবারিত করে দেওয়ার জন্য পাবলিক লাইব্রেরির কোনো বিকল্প নেই। ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় আগেকার জমিদাররা যেভাবে পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠায় অর্থের জোগান দিতেন, এখনকার নব্য ধনিকরাও যাতে তেমনটি করে এ জন্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কায়দা-কানুন খুঁজে বের করতেই হবে। যতদিন সমাজে ধনবৈষম্য বজায় থাকবে ততদিন পর্যন্ত ‘ধনবানে কেনে বই, জ্ঞানবানে পড়ে’ প্রবাদটির সত্যতাটি অবশ্যই প্রতিষ্ঠিত রাখতে হবে। যেভাবেই হোক বই কেনার জন্য ধনবানদের উদ্বুদ্ধ অথবা প্রলুব্ধ কিংবা বাধ্য করা খুবই প্রয়োজন। লাইব্রেরি আন্দোলন বা পাঠাগার আন্দোলনের কথা এক সময় খুবই শোনা যেত। এখনো মাঝে-মধ্যে শোনা যায় বটে। কিন্তু এ আন্দোলনের আগের সেই রমরমা ভাব কিংবা উচ্ছ্বাস এখন আর অবশিষ্ট নেই। তবু লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠায় একালেও কোনো কোনো তরুণকে যখন উৎসাহিত হতে দেখি। তখন আমার উৎসাহের পালেও কিছুটা হাওয়া লাগে বৈকি। তবে সেই সঙ্গে তিক্ত অভিজ্ঞতাজাত কিছু হতাশাও মনকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। দেখেছি, লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করা যত কঠিন এর চেয়ে অনেক কঠিন তা টিকিয়ে রাখা। স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া কিংবা উঁই আর ইঁদুরের মতো প্রাকৃতিক ও জৈবিক উপদ্রবে আমাদের দেশে বইয়ের আয়ু ক্ষয় হয় খুবই দ্রুতবেগে। আবার বই পড়ি বা না পড়ি, বই অপহরণে আমরা সবাই কৃতবিদ্য। অপহরণের হাত থেকে লাইব্রেরির বই রক্ষা করা খুবই কঠিন হয়ে পড়ে। তাই দেখা যায়, জন্মের স্বল্পকাল পরই অধিকাংশ লাইব্রেরির মৃত্যু ঘটে যায়। চুপি চুপি বলি, আমি কিছু ক্ষেত্রে এবং বিশেষ শর্তাধীনে বই চুরিরও সমর্থক। কতিপয় ধনবান যখন তার উন্নত রুচির প্রমাণ প্রদর্শনের জন্য শেলফে বই সাজিয়ে রাখে কিংবা নিতান্ত খেয়ালের বশে দু’চারটি বই কিনে ফেলে অথচ সেসব বই নিজেও পড়ে না এবং অন্যকেও পড়তে দেয় না তখন ধনহীন জ্ঞানবানদের দায়িত্বই হয়ে যায় জ্ঞানহীন ধনবানের কব্জা থেকে বইগুলোকে বের করে আনা। এ জন্য প্রয়োজনে চৌর্যের আশ্রয় নেয়াটা মোটেই অবৈধ বা অসঙ্গত নয় বলেই আমার বিশ্বাস। এভাবেই বরং আমরা ‘ধনবানে কেনে বই, জ্ঞানবানে পড়ে’ প্রবাদটিকে এ যুগেও সার্থক করে রাখতে পারি। লাইব্রেরিতেই হোক কিংবা ব্যক্তিগত সংগ্রহেই হোক, বই না পড়ে আসবাবরূপে সাজিয়ে রাখা অবশ্যই অবৈধ ও অসঙ্গত। সঠিকরূপে বই পড়ে বইয়ের ভেতর থেকে এর সঠিক মর্মবস্তু যারা আহরণ করতে পারবেন তারাই হবেন যথার্থ জ্ঞানবান। ওই যথার্থ জ্ঞানবানরাই মানুষকে সমাজবদলের পথ দেখাবেন এবং তৈরি হবে এমন সমাজ যেখানে সবাই হবেন জ্ঞানবান। অন্যায় ধনে ধনবান হওয়ার পথ সে সমাজে খোলা থাকবে না।

সুইসাইড

রফিকুর রশীদ 

 

অবশেষে নীপা মুখ খুলল।
আজ কদিনের মধ্যে সে মোবাইলেও কথা বলেনি কারও সঙ্গে। সত্যি বলতে কী এ পরিবারে অনভিপ্রেত অঘটনটি ঘটে যাবার পর প্রথমে তার কাছ থেকে নিজস্ব মোবাইল সেটটি কেড়ে নেওয়া হয়, তারপর ল্যাপটপটিও কৌশলে সরিয়ে নেওয়া হয় তার ঘর থেকে। এই উদ্যোগে প্রত্যাশিত কোনও ফল না পেয়ে কয়েকদিন পর সবই আবার ফিরিয়ে দেওয়া হয় নীপাকে। এসব ফেরত পাবার পর তার ভেতরে নতুন কিছু প্রতিক্রিয়া দেখতে না পেয়ে বাবা মা দুজনেই হতাশ হয়। নীপার মনের জগতে প্রবেশের আর কোনও পথই খোলা নেই বলে মনে হয়। তবু সকালে কোর্টে বেরোনোর আগে জামান উকিল এসে মেয়ের সামনে হাঁটু ভেঙে দাঁড়ান, মেয়ের মাথায় হাত রেখে বলেন,
নতুন একটা মোবাইল সেট নিবি মা?
নীপা নিরুত্তর। খেলনা পাবার সম্ভাবনায় খুশিতে নেচে উঠার বয়স অনেক আগেই সে পেরিয়ে এসেছে। বাবার মুখের দিকে চোখ তুলে তাকাতেই পারে না, কথা বলবে কী করে! দুহাতের অঞ্জলিতে মেয়ের মুখ তুলে ধরে বাবা আবারও বলেন,
যাকে ইচ্ছে ফোন করিস, আপত্তি নেই। তুই কথা বল মা, একটা কিছু বল! নীপা কিছুই বলে না, যেন বা বাজপড়া কাঠপাথর। না

না, পাথর হলে চোখের পাপড়ি ভেঙ্গে অশ্র“ গড়িয়ে পড়বে কেন! সেই অশ্র“দাহ তার বাবাকেই বা নীরবে সংক্রমিত করবে কেন! পকেট থেকে রুমাল বের করে মেয়ের চোখ মুছিয়ে দিয়ে জামান উকিল অনুনয় করে ওঠেন,
আমার সঙ্গে না হোক তোর মায়ের সঙ্গেই কথা বল নীপুমনি।

নীপার নামের এই আদুরে আদল তার বাবারই দেওয়া। কলেজে ওঠার পর ওই মিষ্টি নামটি কীভাবে যেন আড়ালে চলে যায়। দীপ্তও একদিন আদর করে ডেকেছিল ওই নামে। ভালো লাগেনি নীপার। নিষেধ করেছিল দীপ্তকে। ওটা বাবার ডাকা নাম, অপেক্ষায় থেকেছে নীপা- আবার কোনো ইচ্ছে হলে বাবাই ডাকবে ওই নামে। তো সেই সময় কি এতদিন পর পারিবারিক সংকটের এই দুর্দিনে হলো! নীপার দুর্বল শরীর কেঁপে ওঠে কী এক শিহরণে। বড় বড় দুটি চোখ বিস্ফোরিত করে তাকায় বাবার মুখের দিকে। মেয়ের চোখে চোখ পড়তেই তিনি আর্তনাদ করে ওঠেন- তুই কথা না বললে আমরা বাঁচব কী করে বল দেখি!
না, তবুও বাবার সঙ্গে কথা বলা হয় না নীপার। দিনের শেষে কথা বলে সে তার মায়ের সঙ্গে। কথা অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। খুব ছোট্ট বাক্য। কিন্তু তার ওজন এবং শক্তি ইরাক বিধ্বংসী বোমার চেয়ে মোটেই কম ভয়াবহ নয়। অথচ সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার পর কত অবলীলায় মায়ের

মুখের উপরে জানিয়ে দেয় নীপা,
আমি সুইসাইড করব মা।
আত্মহত্যা না বলে এই ইংরেজি শব্দটিই সে প্রয়োগ করে। তার মায়ের তখন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট দশা। কানের মধ্যে ভোঁ ভোঁ করে। মাথা ঘুরে ওঠে চক্কর দিয়ে। দুহাতে মেয়েকে জাপটে ধরে আর্তনাদে ফেটে পড়ে।
এ তুই কী বলছিস নীপা!
নীপা খুব সহজে খটখটে গলায় জানায়,

হ্যাঁ, আমি সুইসাইড করব।
যেনবা সুগভীর চিন্তাভাবনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত তার। অন্তর্গত সমস্ত দ্বিধার পাঁচিল অতিক্রম করে এসেছে সে। গত কয়েকদিন সে কথা বলেনি বটে কারও সঙ্গে, কিন্তু ভাবনার প্রবাহ তো রুদ্ধ হয়ে থাকেনি। যথেষ্ট বড় হয়েছে সে। বলা যায় নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিজে গ্রহণ করার মতো ঢের সময় সে পেয়েছে। তাই দ্বিধাহীন কণ্ঠে সে ঘোষণা করতে পারে, সে সুইসাইড করবে। আগাম ঘোষণা দিয়ে এ পথে কে কবে নেমেছে! আর এই প্রলয়ঙ্করী ঘোষণা শোনার জন্যই কি তার বাবা মা এতদিন কান পেতে বসে আছে?
নীপার মা সহসা যেন কোন যাদুমন্ত্রে নিজেকে সামলে নেন। মেয়ের পাশে বসে পরম সখ্যে এবং নির্ভরতায় হাত বাড়িয়ে দেন তার কাঁধে। নীপার চুলের অরণ্যে মমতার আঙুলে বিলি কাটতে কাটতে বলেন,
শোন মা, মানুষের তো একটাই জীবন। মেয়েদের সে জীবন আবার ভীষণ পলকা। সেই জীবন নিয়ে হেলাফেলা করলে চলে?
নীপার মুখে কথা নেই। সব কথার শেষ কথা যেন তার বলা হয়ে গেছে। নীপার মা এবার একটু ঘুরে মুখোমুখি বসেন। মেয়ের মুখটা তুলে ধরেন। চোখে চোখ পড়তেই মেয়েকে চেপে ধরেন,
আমাকে একটা সত্যিকথা বলবি নীপা?
নীপা তাকিয়ে থাকে উত্তরহীন অপলক।
দীপ্তকে তুই ফিরিয়ে দিলি কেন? সাতকান্ড কেলেঙ্কারির কথা জানার পরও তো সে এ বিয়ে ভেঙ্গে দিতে চায়নি! বরং আমি তো শুনেছি তার বাপমাকে পর্যন্ত সে কনভিন্স করতে চেষ্টা করেছে, বুঝিয়েছে অঘটনের পেছনে তোর কোনও হাত ছিল না। সেটা স্রেফ দুর্ঘটনা। তোর জন্যে সে নিজের মা-বাপের উপরে চাপ সৃষ্টি করেছে। তারপরও তুই আর কী চাস বল দেখি!
কী আর বলবে নীপা। মায়ের চোখ থেকে নীরবে চোখটা নামিয়ে নেয়। মা- বাবার কষ্টের জায়গাটা সে উপলব্ধি করতে পারে।

দীপ্তর মতো সুপাত্র বেহাত হবার ধাক্কা সামলে ওঠা সোজা কথা! বেহাত মানে চূড়ান্ত অর্থে নীপাই তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে, দুই পরিবারের স্বপ্নসাধ ভেঙে চুরমার করেছে, একেবারে শেষবেলায় বিয়েতে অসম্মতি জানিয়েছে; জামান উকিলের তো হিতাহিত জ্ঞান হারাবারই কথা। একমাত্র কন্যা আদরের নীপুমনির গায়ে তো আর অল্প দুঃখে হাত ওঠেনি তার। এমনিতেই তার সামাজিক মর্যাদা মাটিতে মিশিয়ে দেওয়ার জন্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ যে নোংরা খেলায় মেতেছে, তাতেই তিনি উ™£ান্ত বিপর্যস্ত। প্রতিকারের পথ না পেয়ে নিজের মাথার চুল ছেঁড়ার দশা। সেই দুঃসময়ে দীপ্ত এগিয়ে আসে। হাত বাড়িয়ে দেয়। একটু দূর সম্পর্কের চাচাতো বোনের ছেলে। ছেলেতে- মেয়েতে যেমন সম্পর্ক, বলা যায় দুই পরিবারের অনুচ্চারিত প্রশ্রয়ে তা পরিণয়ের দিকেই এগিয়েছে। এমন কি বিয়ের কথাবার্তাও পারিবারিকভাবে যখন চূড়ান্তপ্রায়, তখনই ঘটে অঘটন। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ফাঁদে আটকে পড়ে নীপা, অতপর একদিন নিরুদ্দিষ্ট রাত্রিবাস। সেই একটিমাত্র রাত্রিই সব ওলট-পালট করে দেয়। এই ঘটনা জানাজানি হলে দীপ্তর বাবা এ বিয়েতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন; স্বামী-স্ত্রী যুক্তি করে কৌশলে এড়িয়ে যেতে চান। বেঁকে বসে দীপ্ত। বাবামায়ের মুখের উপরে যুক্তি দেখায়- কিডন্যাপের শিকার হয়েছে বলে এর জন্যে তো নীপাকে দায়ী করা যায় না। তাহলে দুর্ভাগ্যের ভার সেই নীপাকেই কেন বইতে হবে!
সেই দীপ্তকে নীপাই কেন প্রত্যাখ্যান করেছে এ ব্যাখ্যা কিছুতেই খুঁজে পায়নি তার মা-বাবা। এ প্রশ্ন তারা আগেও করেছেন। এমন কী এই প্রশ্ন করতে গিয়েই তো প্রবল উত্তেজনায় অস্থির হয়ে জামান উকিল জীবনে প্রথমবারের মতো মেয়ের গালে চড় মারেন। সেই থেকে নীপা নিস্তব্ধ নির্বাক। এতদিন পর মুখ খুলতেই আবার সেই জেরা- দীপ্তকে তুই ফিরিয়ে দিলি কেন? নীপার মা বলেন ফেলেন;
তুই একবার ফোনে কথা বললেই দেখিস দীপ্ত আবার এগিয়ে আসবে।
আবার দয়া দ্যাখ্যাবে, তাই না মা?
নীপার মা চমকে ওঠেন,
দয়া! দয়ার কথা উঠছে কেন?
শুধু আমাকে নয় মা, ওরা তোমাদেরও দয়া করতে চায়। দয়া দিয়ে সংসার চলে, মা? তুমি বলো; চলে?
কী জানি বাপু কী যে বলছিস; তুই-ই জানিস। কেন একবার ফোন করেই দেখ না! মুখে দুবার চুকচুক শব্দ করে নীপা বলে,
তার মানে তোমরা দয়ার কাঙাল হয়ে বসে আছ তাই তো! তোমাদের কিডন্যাপড হওয়া মেয়েকে অনুগ্রহ করে কেউ বিয়ে করলেই তোমরা খুশি!
দয়া হবে কেন, দীপ্ত তোকে ভালোবাসে বলেই এগিয়ে এসেছিল।
ভালো তো আমিও বেসেছি তাকে। ভালোবেসেছি। বিশ্বাস করেছি। কিন্তু সে আমার উপর থেকে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে মা। বিশ্বাস হারানোর পরও কি ভালোবাসা থাকে? সেই ভালোবাসা দিয়ে কি জীবন চলে, তুমিই বলো!

এতক্ষণে ধস নামে নীপার মায়ের কণ্ঠে। আগের সেই জোর খুঁজে পান না, কেমন যেন ফ্যাসফেসে গলায় বলেন,
চলে চলে। কতভাবে যে মেয়েমানুষের জীবন চলে যায়, তুই তার কী জানিস!
ওই যে তুমি বললে- মানুষের একটাই জীবন!
শুধু আমি বলব কেন, ওটাই সত্যি।
সেই জীবনে বিশ্বাসেরও খুব দরকার মা।
এসব কথা কেন বলছিস নীপা?
নীপা এবার বিছানা ছেড়ে নেমে আসে। পায়ে পায়ে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। দূরে দৃষ্টি ফেলে কী যেন খোঁজে। আবার ফিরে আসে ঘরে। বহুদিন পর মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে বলে,
এই যে তোমরা আমাকে ভালোবাসো, ভালোবাসো বলেই বিশ্বাস করো। তাই না?
হ্যাঁ, সন্তানকে তো বিশ্বাস করতেই হয়।
সন্তান বলে নয় মা, ভালোবাসলেই বিশ্বাস করতে হয়। তোমাদের দীপ্তবাবু খুব ভালো ছেলে, কিন্তু বিশ্বাস হারিয়েছে।
তার মানে?
সে বার বার জানতে চেয়েছে গুণ্ডারা সেই রাতে আমাকে কতবার রেপ করেছে। একথা তোমরা কতবার জিগ্যেস করেছ মা?
মায়ের মুখে কথা নেই। চোখে বিস্ময়। নীপা একটু দম নিয়ে বলল, অবশ্য দীপ্ত বাবু অতিশয় দয়ালু ভদ্রজন। আমাকে সে আশ্বস্ত করেছে- তুমি সত্যি কথাটা স্বীকার করলেও এ বিয়ে হবেই। তুমি সত্যিটাই বলো- কতবার এবং কতজন....
নীপার মা এবার চিৎকার করে ওঠেন,
তুই থাম নীপা। থাম।
নীপার তখন কথায় পেয়ে বসেছে। কে থামায় তাকে! সে বলে,
থামব কেন মা? কেন থামব বলো! জীবন তো মোটে একটাই। এ জীবনে বিশ্বাসহীন ভালোবাসা আমি চাই না মা।
নীপার মায়ের কণ্ঠে ছলকে ওঠে আর্তনাদ,

 

নীপা!
সেদিন রাতে যা ঘটেছে তার সবই আমি তোমাদের বলেছি। তাকেও বলেছি। লুকাইনি কিছুই। বলতে পারো মা, তবু তার কেন মনে হলো- আমি সত্যি বলিনি?
নীপার মা কোথা থেকে আচনক এক যুক্তি খুঁজে বের করেন,
হয়ত তোকে নয়, সন্দেহ করে সে বাদলদের গ্র“পের সবাইকে। ওদের পক্ষে তো সবই সম্ভব!
কই সব সম্ভব! আমাকে নিয়ে গিয়ে রাতভর আটকে রেখেছে ঠিকই, কিন্তু আর কী করতে পেরেছে? যুবতী মেয়েকে এক রাত আটকে রাখার খবর জানাজানি হবার পর তোর বাবার কি বেইজ্জত হতে আর কিছু বাকি আছে ভেবেছিস!
না না, ওরা তো ওইটুকুই চেয়েছে। বাদলের বাবা এবার নোমিনেশন পাচ্ছে না এটা প্রায় কনফার্ম। কাজেই আমার বাবাকে ডিসর্টাব করবেই।
তাই বলে তোকে নিয়ে টানাটানি .....
ওরা তো টের পেয়েছে আমার বাবার সবচেয়ে দুর্বল জায়গা কোথায়। তো সেই দুর্বল জায়গাতেই আঘাত করতে হবে, কেমন?
বর্তমানে রাজনীতি এতটাই নোংরা হয়ে গেছে।
সেই জন্যেই তো বাবাকে আমি রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে বলি।
হ্যাঁ, তাহলেই হয়েছে। তার চোখে এখন এমপি হবার স্বপ্ন।
আচ্ছা মা, রাজনীতি করবে বাবা, আর তার জন্যে বলি হতে হবে আমাকে, এটা কেমন বিচার বলো দেখি!
নীপার মা এ প্রসঙ্গের যবনিকা টেনে বলেন,
সে কথা তোর বাপকে শুধাস। এখন চল দেখি...
না মা শোনো। এই জন্যেই ঠিক করেছি আমি সুইসাইড করব।
আবার চমকে উঠেন নীপার মা! দাঁড়িয়ে পড়েন থমকে। এতক্ষণের আলাপচারিতায় তাহলে সুইসাইডের ভূত নামেনি কাঁধ থেকে। ভেতরের আতঙ্ক লুকিয়ে রেখে বলেন, আচ্ছা সে দেখা যাবে।

এখন চল তোকে আমি নিজে হাতে কিছু খাওয়াই। মেয়ের হাত ধরে টানতে টানতে বলেন- কী খাবি বল তো মা, কী খেতে ইচ্ছে করছে?
অনেকদিন পর নীপা এক চিলতে হেসে ওঠে। দুহাতে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে বলে, তোমার হাতের কিল খেতে ইচ্ছে করছে মা।
কী খাবি!
কিল-কিল। বাবা তো সেদিন চড় দিয়েছিলেন, এবার তুমি একটা কিল দিয়ো।
নীপা এবার খিলখিল করে হেসে ওঠে। বহুদিন পর যেন পাহাড় থেকে ঝর্নাধারা নেমে আসে। নীপার মা অবাক চোখে তাকিয়ে থাকেন ঝর্নার স্ফটিকস্বচ্ছ জলের আয়নায়। ভেতরে ভেতরে ভারি আশ্বস্ত বোধ করেন- মুখে যাই বলুক, এ মেয়ে নিশ্চয় সুইসাইড করবে না।
নীপার বাবা রাতে বাসায় ফেরেন বেশ হই হই করতে করতে।
হাতে এক গোছা রজনীগন্ধা। তিন পদের মিষ্টি। নিজে বাসুদেবের দোকানে গিয়ে মেয়ের পছন্দের মিষ্টি নিয়ে এসেছেন। ও বেলাতেই নীপার মা মোবাইলে জানিয়েছে নীপা মুখ খুলেছে, কথা বলেছে, খাবার খেয়েছে; বুক থেকে পাষাণ পাথর নেমে যাবার স্বস্তি পেয়েছেন। মেয়ের গায়ে হাত তোলার পর থেকে যে আগুনে তিনি দগ্ধ হচ্ছিলেন, তাও যেন সহসা নিভে যায়। মেয়ের খবর পাবার পর সারাটা দিন তার শুভ হয়ে যায়। কোর্টে একাধিক মামলায় রায় আসে তার পক্ষে, মার্ডার কেসের আসামির পক্ষে দাঁড়াতেই জামিন হয়ে যায়। কোর্ট থেকে বেরোতে সহসা দীপ্তর বাবার সঙ্গে দেখা, এক গাল হেসে আশ্বস্ত করেছেন- ছেলেমেয়ের মান-অভিমান ফুরালেই আবার সব ঠিক হয়ে যাবে। আর এই তো কিছুক্ষণ আগে পার্টি অফিস থেকে বেরোবার মুহূর্তে ফোন এলো নোমিনেশন নিয়ে টেনশন করবেন না, রুট লেবেলে কাজ করে যান, মূল্যায়ন ঠিকই হবে। স্বয়ং কাশেম ভাইয়ের ফোন, সেন্ট্রাল কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক, তার কথার দাম আছে না? জামান উকিল তাই বাড়িতে ঢোকেন আনন্দের খই ফোটাতে ফোটাতে-
কই রে আমার নীপুমনি! মা মনি কই!
জামান উকিলের এই আনন্দ উচ্ছ্বাস কিন্তু দীর্ঘক্ষণ স্থায়ী হতে পারে না। সামনের ইলেকশনে পার্টি নমিনেশন পাবার গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ শেষ করেই তিনি চলে আসেন দীপ্তর বাবার কথায়। নীপার মাকে তিনি বলেই ফেলেন, টানাপোড়েন একটু হয়েছে বটে তবু তার বিশ্বাস, এ বিয়ে হবেই। মেয়ের মুখের দিকে একবার তাকিয়ে নীপার মা ঘোষণা করে দেয়- দীপ্তকে নীপা বিয়ে করবে না।
দীপ্তকে বিয়ে করবে না! মধ্যরাতে আকাশভাঙা মাথায় দপদপ করে জ্বলে ওঠে চাঁদি, চিৎকার করে ওঠেন নীপার বাবা- তাহলে কাকে বিয়ে করবি তুই? কে তোকে বিয়ে করবে?
নীপার ঠোঁটে বিষণœতার প্রলেপজড়ানো হাসি। সেই হাসির ভাঁজ খুলে সে ধীরে ধীরে বলে, আমি যেখানে বিয়ে করব তারা সবাই সদলবলে তোমার ইলেকশনে কাজ করবে। প্রতিপক্ষ গ্র“প স্বপক্ষে চলে এলে আর তোমার এমপি হওয়া ঠ্যাকায় কে!
এসব তুই কী বলছিস নীপা!
হ্যাঁ বাবা, আমি কথা বলে দেখি- বাদল যদি রাজি থাকে তো আমি তাকেই বিয়ে করব।
নীপার বাবা স্তম্ভিত। বাক্যহারা। নীপার মা চিৎকার করে ওঠেন,
এর চেয়ে তোর সুইসাইড করাই ভালো।
নীপার ঠোঁটের হাসি ক্রমশ প্রসৃত হয়। বিষণœতার আবরণও খসে পড়ে; অবলীলায় সে বলতে পারে-
হ্যাঁ, সুইসাইড তো করতেই চাই। বাদলকে বিয়ে করা আর সুইসাইড করার মধ্যে বিশেষ তফাৎ কী মা! দেখো আমি ঠিক সুইসাইড করব।
এরপর ঘরের ভেতরের বাতাস ভারি হয়ে আসে। প্রশস্ত ঘর। তবু তিনটি মানুষেরই যেন ভয়ানক শ্বাসকষ্ট হয়। তিনজনই ভীষণ হাফিয়ে ওঠে।

 

যদিদং হৃদয়ং তব

রঞ্জনা ব্যানার্জী

একেই বলে ‘কাল’-এর খেলা। আমার কুসুম হলুদ ভোর এক তুড়িতেই কালিঢালা রাত! দুপুর ৪টা থেকে রাত ৮টাÑ মাত্র চার ঘণ্টা। এর মধ্যেই জীবনের মোড় ঘুরে গেল। আমি চাইলেও পিঠটান দিতে পারলাম না। আর এখন আমার হাতের ওপর ভুল হাত। দুর্বার আঁটি দিয়ে আঙুলে আঙুল বাঁধা। জুড়ে যাচ্ছি আমি ‘যদেতৎ হৃদয়ং তব তদস্তু হৃদয়ং মম...!’ সামনে লকলকে আগুন জিভ ভেংচাচ্ছে।
আমার চোখ জ্বলছে না। যজ্ঞের ধোঁয়া অরূপদার চশমার কাচ ঠেলে চোখে লাগছে। টিস্যুর বক্স থেকে ফিনফিনে কাগজ উঠছে-নামছে। আমি আবছা দেখি। মা এখনো বাড়িতে। ‘বাবা ভালো আছেন, বিপদ কেটে গেছে’Ñ টুনু পিসি কানের কাছে এসে জানান দেন। অরূপদা আমার হাতে আলতো চাপ দিচ্ছেন কি? হয়তো আমারই মনের ভুল অথবা আশ্বস্ত করতে চাইছে, ‘সব ঠিক হয়ে যাবে’Ñ যেমনটা ফোনে বলেছিলেন। চার ঘণ্টার মধ্যে আমার জামাইবাবু হতে হতে অরূপদা কেমন বর হয়ে যাচ্ছেন বিধাতার বালখিল্যে। আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। তবুও এসব ঘটছে।
খুব সম্ভব কনেবদলের কথা চাউড় হয়ে গেছে। আমি টের পাচ্ছি ভিড়ের চাপ। ফিসফাস। এ গল্প চলবে অনেক দিন। ডালপালা ছড়াবে, কুসুমিত হবে। সহজে মিটবে না।
কী অবাক কা-! আমার আজ এই আসরে নাচার কথা ছিল। ‘বাজিরাও মাস্তানি’র ওই হিট গানটি ‘ইঙ্গা গা পরি পিঙ্গা গা পরি’। আহা! সুর বাজছে মাথায়। আমি, চৈতালি ও ফাক্ষিদা এক সপ্তাহ ধরে রিহার্সাল দিয়েছিলাম।
আচ্ছা, তুর্য কী করছে? সে কি আমাকে দেখে গেছে কোন এক ফাঁকে?
এই তো কিছুক্ষণ আগে প্রবীর মামার গাড়িতে ‘বকুল ফুল’ বাজছিল। গাড়িটি তার বন্ধুর। প্রবীর মামার চাল-চুলোরই ঠিক নেই, তার আবার গাড়ি! আমেরিকায় ছিলেন কিছুদিন। বছর দুয়েক। তা অনেক আগের কথা। ওপি ওয়ান-এর লটারিতে। তখনো ডিভি চালু হয়নি। ফিরে এসেছিলেন। ভালো লাগেনি আমেরিকা। সবাই সোনার হরিণ ধরার নেশায় লাইন লাগাচ্ছে আর প্রবীর মামা হেলায় ছেড়ে দিলেনÑ ‘ধুর, ওটা একটা জীবন হলো?’ তবে গাড়ি চালানোটা ভালো শিখেছিলেন। মা দূরে কোথাও গেলে ড্রাইভার নয়, প্রবীর মামাকে সঙ্গে নিতেন। আর আজ সেই প্রবীর মামার জন্যই আমার শক্ত-পোক্ত বাবার জীবন প্রায় থেমে যাচ্ছিল। বাবা যখন পড়ে গেলেন তখন বিকাল ৪টা বেজে ১৭ মিনিট। মেসেজটি এসেছিল আমার সেলফোনে।
দুপুরে আমরা দলবেঁধে পার্লারে সাজতে যাচ্ছিলাম। দিদিভাই, আমাদের তুতো বোনরা, কাকিমা, টুনু পিসি ও আমরা তিন বান্ধবীÑ সব মিলে দশজন। মাইক্রোবাসে জায়গা হচ্ছিল না বলে আমিই নেমে উঠলাম প্রবীর মামার গাড়িতে, সঙ্গে চৈতালি। ফাক্ষিদা রয়ে গেলেন। তার নেইলপলিশ শুকায়নি। জায়গা পাল্টানোর রিস্কে নেই সে। প্রবীর মামা খেপালেন আমাকেÑ ‘ছিঃ! তোকে বৌয়ের গাড়ি থেকে নামিয়ে দিল?’ আমি ক্যাসেটের ভলিউম বাড়িয়ে দিয়েছিলামÑ ‘শালুক ফুলের লাজ নাই, রাইতে শালুক ফোটে লো রাইতে শালুক ফোটে’।
এ গাড়িটি পার্লারে যাওয়ার কথা ছিল না। ছোট মামা রেগে গিয়েছিলেনÑ ‘দুই গাড়ি এক কাজে যাচ্ছে! মানে কী এসবের?’ গাড়িটি কী নিয়তিই টেনে নিল, নাকি আমিই দাবার ঘুঁটি হয়ে অন্যের চালে পা দিলাম?
সব যেন কেমন অন্য এক জীবনে ঘটেছিল মনে হচ্ছে। কী আনন্দে ভাসছিলাম! আমাদের পরিবারের প্রথম মেয়ের বিয়ে। যদিও দু’দিন আগে বাসি বিয়ের বেদি বানানো হয়েছিল তবুও তুর্য আলপনা করল কাল! চার ঘণ্টা লেগেছিল শেষ করতে। আমি আর ফাক্ষিদাও সাহায্য করেছিলাম। আমার ফেসবুক ওয়ালে ছবিও পোস্ট করেছি।

তুর্যের তোলা সেলফি। আমার ও তুর্যের প্রথম এবং শেষ ছবি। পুরো ছাদটি কী সুন্দর সাজিয়েছিল সে! ঝকমকে। একদম সিনেমার সেট। নীল গোলাপি থিম। কী অদ্ভুত! আগামীকাল সকালে দিদিভাই নন, আমার পা পড়বে ওই বেদিতে।
কাল রাতের চাঁদটা অন্য রকম ছিল। কেমন যেন নেশা লাগা। রোশনাই করে রেখেছিল আকাশটাকে। কাল সব অন্য রকম সুন্দর ছিল। তুর্য অনেক ক’টা গান গেয়েছিল। চৈতালি তো গান শুনেই কাত। তার আদিখ্যেতা দেখে আমার রাগ হচ্ছিল। তুর্য টের পেয়েছিল। খুব ক্যাজুয়ালি বললো, ‘ওই চাঁদটা দ্যাখ’! আমি ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম। ‘ওটা আকাশে থাকুক কিংবা না থাকুক, আমি তোর জন্য থাকবো যদি আকাশ থাকে।’ হাসনাহেনা গাছ নেই এ তল্লাটে। তাও ওই মুহূর্তে বাতাসে হাসনাহেনার গন্ধ ঘিরে রেখেছিল আমাকে। আর এখন সবকিছু ভয়ঙ্কর সত্য হয়ে খাড়া দাঁড়িয়ে আছে আমাকে ঘিরে। সানাইটাও বাজছে না আর। বন্ধ করে দিয়েছে কেউ অথবা কেঁদে কেঁদে নিজেই থেমে গেছে। সানাইয়ের সুরটা বেশ একটা পরাবাস্তব ইফেক্ট দিচ্ছিল। মনে হচ্ছিলÑ আমার নয়, অন্য কারো বিয়ে। এখন কেমন দমবন্ধ লাগছে সব। বাতাসের ভেতর বাতাস ফাঁস খাচ্ছে যেন!
অনেক শখ করে চুল বেঁধেছিলাম। জটিল বিনুনি। তুর্যের চোখ টেরা হয়ে যেতো আমাকে দেখলে। ঘাগরা চোলিটা অনলাইনে অর্ডার করিয়ে আনিয়েছিলাম। সাদা ও হালকা বেগুনি। পুরো লেইসের কাজ। দর্জিকে দিয়ে ফিটিং করাতে অনেক খরচা হয়েছে। এখন পড়ে আছে আমার ঘরে গতকালের গল্প হয়ে।
এসএমএসটি আসার আগেই আমরা জেনে গিয়েছি, প্রবীর মামার গাড়িতে পালিয়েছেন দিদিভাই। মাইক্রোবাসের ড্রাইভার দেখেছে। সে অতশত বোঝেনি। মনে করেছিল, কনে হয়তো আগেই ফিরছে। প্রবীর মামাই যে নাটের গুরু তা জানা গেল পরে, চিঠিটা পড়ে। আর ‘গর্ভধারিণী’ বইটার ভেতরের পাতায় আছে চিঠি। তা জেনেছি মেসেজ থেকে। অদ্ভুত হিসাবি চিঠি। তাড়াহুড়া নয়, কাটাকুটি নেই, অযথা আবেগ নেই। এক পাতায় সব বলা। মাফ চেয়েছেন মা, বাবা, এমনকি অরূপদা, অরুণ কাকুর কাছেও। আশীর্বাদের আংটিটা খামের ভেতরে রেখে গেছেন। প্রবীর মামা তার স্বামী। বিয়ে করেছেন তারা মাস দুয়েক আগে। জানানোর পরিবেশ ছিল না। ব্যস।
বিয়েটা ঠিক হয়েছিল হঠাৎই। অরুণ কাকুর সঙ্গে বাবার যোগাযোগ ছিল না অনেক বছর। লোকনাথ ব্রহ্মচারীর তিরোধান দিবসে আশ্রমে দেখা। ছেলে এসেছে ইংল্যান্ড থেকে পিএইচডি সেরে। বিয়ে করেই ফিরে যাওয়ার কথা।

দুই মাস ধরে কনে দেখা চলছে। উপযুক্ত পাত্রীর বড়ই আকাল। বছরের শেষ, বিয়ের তারিখও যাই যাই করছে। এবার না হলে কুষ্ঠি ঠিকুজির গ্রহের চক্করে পড়বে। দিদিভাইয়ের জন্যও পাত্রের সন্ধান চলছিল। মাস্টার্সের রেজাল্ট বেরিয়েছে সবে। কথায় কথায় জানা হয়ে গেল, এক গোত্র? সমস্যা সমাধানের উপায়ও আছে শাস্ত্রে। তবে আর ঠেকা কী? ছেলেকে দেখেই পছন্দ হয়ে গেল বাবার। মেয়ে দেখাদেখির কিছু নেই। অরুণ কাকু কতো এসেছেন আমাদের চাটগাঁর বাসায়!
এক্কেবারে রাজযোটক। একটু-আধটু ঝামেলা যা আছে, তা মন্ত্রে। দানে শুভ হয়ে যাবেÑ শাস্ত্রীমশাই টিকি নেড়ে বিধান দেন। এক সপ্তাহের মাথায় আশীর্বাদ। প্রদীপ মামা তার মাকে নিয়ে কলকাতায় তখন। কুমিল্লায় প্রবীর মামার মায়ের ল্যাপ্রস্কোপিক সার্জারি হয়েছিল গলব্লাডারে। কিন্তু ভেতরে পাথর রয়ে গিয়েছিল। ওই থেকে জন্ডিস। ঢাকায় বারডেমে আবার ওই পাথর খুঁজে বের করা হলো। কী ভীষণ অবস্থা! আমরাও দেখতে গিয়েছিলাম। যে ডাক্তার ওই অপারেশন করেছিলেন কুমিল্লায় তার নামে একটা প্রতিবেদন ছাপা হয়েছিল সেখানকার পত্রিকায়। প্রদীপ মামা নিউজের কাটিং দেখিয়েছিলেন আমাদের। এতে অবশ্য ডাক্তারের কিচ্ছু হয়নি। কিন্তু ভদ্রমহিলার স্বাস্থ্য আর ফিরছিলই না। তাই চেকআপ করাতে কলকাতায় গিয়েছিলেন।
আশীর্বাদের রাতে প্রদীপ মামা হাজির। উষ্ক-খুষ্ক চুল। বিধ্বস্ত অবস্থা। সকালে মাকে নিয়ে চাটগাঁ এয়ারপোর্টে নেমেছেন। সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া করে কুমিল্লায় বাড়ি পৌঁছে দিয়েই ঢাকার বাস। কিন্তু জ্যাম ঠেলে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা মরে রাত। খবর পেলেন কীভাবে? এমনিই এসে পড়েছেন। ছোট মামা খেপালেনÑ ‘খাওয়ার বাসে মন টেকেনি। তাই তো এসেছি!’
ছোট মামার মতো প্রবীর মামারও অবাধ যাওয়া-আসা এ বাড়িতে। মায়ের কাছে প্রবীর মামা অনুযোগ করছিলেন, ছেলে বিদেশে থাকে। তার খবর ঠিকঠাক আনার জন্যও তো সময় চাই। বড্ড তাড়াহুড়ার সিদ্ধান্ত! মা বলেছিলেন, ‘রোস্ট খা। যখন ছেলের বাড়ি যাবো আশীর্বাদ করতে তখন নিজেই জেরা করিস।’
পার্লারে কী ভীষণ ভিড় ছিল কাল! আমাদের অবশ্য অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেয়া ছিল। বিয়ের কনের স্পেশাল সাজ। দিদিভাই আলাদা রুমে। তার পছন্দের মেকআপ আর্টিস্টের সঙ্গে। টুনু পিসি ছিলেন সঙ্গে। শাড়ি পরার আগে ওয়াশরুমে যাওয়া জরুরি। ব্লাউজ, পেটিকোট পরা কেবল এবং ওপরে পার্লারের হাউসকোট। একাই গেলেন। পার্লারের মেয়েটা অনেকক্ষণ

অপেক্ষা করছিল শাড়ি হাতে। পরে টুনু পিসির নজরে এলো দেরিটা। আমার মুখের সাজ বাকি। চুল বাঁধা সবে শেষ। হাতে নেইলপলিশ লাগানো চলছে। এরপর মেকআপ। এর মধ্যেই টুনু পিসি হাজির। গা শিউরে উঠেছিল আমার। ‘কুর্চি! দীপা নেই’Ñ টুনু পিসি হাঁপাচ্ছেন তখনো। এতো বড় পার্লার, কে আসছে, কে যাচ্ছে এর খোঁজ কে রাখে? গয়নাগাটি পরানো হয়নি, কেবল নথ আর টিকলি।
চিঠিতে চোখ বুলিয়ে বাবা গুম ছিলেন কিছুক্ষণ। এরপরই ঢলে পড়লেন। মুখ দিয়ে ফেনা বের হচ্ছিল। যে বাবার কখনো জ্বরও হতে দেখিনি সেই বাবার হার্ট অ্যাটাক! পরের এক ঘণ্টা চূড়ান্ত হই চই, চিৎকার-চেঁচামেচি। অ্যাম্বুলেন্স এলো পাড়া কাঁপিয়ে। ভিড় ঠেলে গাড়িতে ওঠাতে বেশ সময় নিল। ছোট মামা গেলেন সঙ্গে।
অরুণ কাকুকে ফোন দিলেন টুনু পিসি। মা তখনো এক কোণে বসে মেঝের দিকে ফ্যাল ফ্যাল দৃষ্টিতে চেয়ে! ঢাকায় কী জ্যাম! অরুণ কাকু আসতে আসতেই ঘণ্টা পার। জ্যামে বসেই যা জানার জানলেন টুনু পিসির কাছে। বাড়ি এসে চিঠিটা পড়লেন বারকয়েক। বাবার খোঁজ নিলেন। বিবশ বাড়িটার শোধ ফিরতে শুরু করলো যেন। রাত ৮টায় প্রীতিভোজ। ৭টা ছুঁই ছুঁই। লগ্ন যদিও দেরিতেÑ রাত ১১ গতে ২৩ মিনিট। বাড়ি থেকেও ফোন আসছে অরুণ কাকুর সেলে। কী হবে, কী করণীয়? অরূপদা ফোনে।
হঠাৎ আমার দিকে তাকালেন কাকু। আমার বুক কেঁপে উঠলো। আমি জানি না, কীভাবে জানলাম ওই অশনি সংকেত। আমাকে কেউ যেন শক্ত করে পেরেক ঠুকে ঘটনার ভেতর আটকাচ্ছে! আমি মাথা ঝাঁকাচ্ছি। কিন্তু জগদ্দল পাথর হয়ে ঘাড়ে বসে আছে মাথা। নড়ছে না। অরুণ কাকু হাত জোড় করে বিড়বিড় করছেন কিছু। আমি কিছুই শুনতে পাচ্ছি না। কানের ভেতর বোলতা ভোঁ ভোঁ করছে বেরোনোর রাস্তা হারিয়ে। মা চোখে আঁচল চাপা দিয়ে কাঁদছেন। আমার বিনুনি বুকের একপাশে সাপের মতো বেঁকিয়ে আমার দিকে তাকাচ্ছে। বুকের ভেতর বেহুলা মাথা কুটছে। কুষ্ঠি ঠিকুজি কিচ্ছুর দরকার নেই আর। দু’বাড়ির সম্মান আগে। অতঃপর পাথর হয়ে যাই। আমার সামনে ঘটনাগুলো দুরন্ত ছোটে। থামে। কাঁদে। অনুনয় করে। ধমকায়।
অরূপদা কিছু জানতে চান। কেউ ফোন চেপে ধরে আমার কানেÑ ‘তোমার কাউকে পছন্দ?’
টুনু পিসি ভাঙা রেকর্ড হয়ে বাজতে থাকেনÑ ‘বাবাকে বাঁচাও।’
মা মুখে আঁচল চেপে থাকেন। শুভকাজে কাঁদা বারণ। আমি জেনে যাই, পৃথিবীটা আর কখনোই দু’ভাগ হবে না। সীতা ঢুকে ধরণীর দুয়ার আটকে দিয়েছে চিরতরে। দিদিভাইয়ের গয়না পরানো হয় আমাকে। টিকলি, নথ ছাড়াই বৌ হয়ে গাড়িতে উঠি। তার ছেড়ে যাওয়া বেনারসির বেমিল ব্লাউজ কায়দা করে ওড়না দিয়ে ঢাকা হয়। কেউ উলু দেয়। শাঁখে ফুঁ দিয়ে শুভযাত্রা হয়। মঙ্গল প্রদীপ ঘুরিয়ে বালাই-ষাট করে কেউ। আমি সবার বালাই মাথায় নিয়ে ফুলে ঢাকা গাড়িতে উঠি। আকাশ কাঁদে না। তুর্য আসে না। চাঁদ নির্বিকার মেঘে সাঁতরায়।
অতঃপর আমার সম্প্রদান হয়। পুরোহিতের সুরে সুর মিলিয়ে অরূপদা মন্ত্র সম্পূর্র্ণ করছেন এই মুহূর্তেÑ ‘যদিদং হৃদয়ং মম তদস্তুু হৃদয়ং তব।’
আমার হৃদয় ভাবলেশহীন দূর্বা ঘাসের বাঁধুনির ফাঁকে অবাক চোখে দেখে চন্দন কাঠের যজ্ঞে তার নিজের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার উৎসব।

নিঃসঙ্গ

খান অপূর্ব আহমদ 

 

 

কয়েকদিন ধরে তমালের মনে অস্থিরতা বিরাজ করছে। সব সময় বুক ধড়ফড় হয়। মাঝে মধ্যে বুকে চিন চিন ব্যথা করে। কখনো নিঃশ্বাস আটকে আসে। মনে হয়, এই বুঝি ফুসফুসের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাবে। এ জন্য মাথার মধ্যে নানান দুশ্চিন্তা এসে ভর করে। কিছুই ভালো লাগে না। যখন এমন হয় তখনই তমালের মা ফোন করেন। তার খোঁজখবর নেন। আর এতে সে পরিপূর্ণ সুস্থ অনুভব করে। কথায় আছে, সন্তানের কিছু হলে প্রথম মা-ই টের পান। এটি ভেবে তমাল স্বাভাবিক হয়ে যায়। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। তমালের মা ফোন করে জানতে চেয়েছেন সে ভালো আছে কি না। আজ মায়ের সঙ্গে কথা বলেও নিজের ভেতরের অস্থিরতা কাটাতে পারছে না। শুধু ভাবছে কোথাও কারো কোনো বিপদ হলো নাকি!
তমালের বদ্ধমূল ধারণা, বুক ধড়ধড় করা মানে আপনজন কারো কোনো সমস্যা হওয়া। অতীতের অনেক ঘটনায় এমন প্রমাণই পেয়েছে। ফলে ওই ধারণাটি তার মগজে বিঁধে আছে। তাই সে এ সময় মায়ের কথাই বেশি করে মনে করে। কারণ মায়ের বয়স হয়েছে। যখন-তখন তার যে কোনো সমস্যা হতেই পারে। কিন্তু তার মা তো এখন ভালো আছেন। তাহলে? এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ একটি ফোন আসে। নাম্বারটি সেইভ না খাকায় ভয়ে ভয়ে কলটি ধরে।
- হ্যালো।
কেমন আছ? ব্যস্ত নাকি?
- কে বলছেন প্লিজ!
আমি জান্নাত। চিনতে পারছ, নাকি একেবারেই ভুলে গেছ? আর ভুলে যাওয়ারই কথা। কেননা মনে রাখার মতো আমি আসলেই কিছু করিনি।
- না, তা হবে কেন?
না হলে অন্তত নাম্বার সেইভ থাকতো।
- বিষয়টি তা নয়। আসলে ফোনসেট চেঞ্জ করায় অনেক নাম্বারই সেইভ নেই। থাক, সংসার কেমন চলছে?
ভালো-মন্দ মিলিয়েই তো জীবন। আছি এক রকম। আর সংসার নেই। ডিভোর্স হয়ে গেছে প্রায় তিন বছর। নিঃসঙ্গ জীবন কাটাচ্ছি বলতে পারো।
- সত্যিই দঃখজনক। সাত বছর প্রেমের পরিণতি দু’বছরেই সব শেষ!
ওই ভ-কে বিয়ে করিনি। করেছিলাম আমার সহকর্মীকে। সেও প্রতারক। তার শিক্ষাগত যোগ্যতাসহ ফ্যামিলির অনেক কিছুই গোপন করেছিল। তাও চেষ্টা করেছিলাম মানিয়ে নিতে। ‘পারিনি।
- তোমরা কি এক সঙ্গে পড়তে?
হ্যাঁ।
- তারপরও সে এতো কিছু গোপন করলো কী করে? দেখেছ তুমি কতোটা বোকা! অথচ তুমি বিভিন্নভাবে সতর্কতা অবলম্বন করতে। মনে করতে জীবনে কখনো কিছুতেই ভুল করবে না। আমি বলতাম, তুমি খুব সরল। ওই সরলতাই তোমাকে সর্বনাশ করবে। তখন মানতে চাওনি।
এ জন্যই তোমাকে ফোন করা। কয়দিন ধরে শুধু তোমার কথাই মনে পড়ছিল। তাই অনেক দ্বিধা-দ্বন্দ্ব নিয়ে কল করলাম। ভাবছিলাম, তুমি হয়তো অ্যাভয়েড করবে। অবশ্য তোমার ওই কথাটি মনে করেই সাহস পেলাম।
- হ্যাঁ, আমি বলেছিলামÑ সুখের সময় আমাকে খুঁজো না, দুঃখ পেলে মনে করো। তবে এ কথা তুমি মনে রাখবে তা ভাবিনি।
যাক, তোমার কথা বলো।
- আমার অবস্থা একই রকম। মানে, আগের চাকরিতেই আছি। পরিবর্তন শুধু সন্তানের বাবা হয়েছি। আমার ওয়াইফ নির্ভেজাল গৃহিণী।
এখন রাখি। তোমার সঙ্গে কথা বলে মনটা বেশ ফ্রেশ লাগলো। এখন থেকে মাঝে মধ্যে তোমার সঙ্গ চাইবো। তাছাড়া তোমার ধারণা অনেকটাই সঠিক হয়। তাই কিছু সাজেশন নেবো।
- আমার বিশ্বাস হয় না। কারণ তুমি তো খেয়ালি মানুষ। কোন খেয়ালে ফোন করেছ জানি না। ঠিক আছে। তখন তোমার গত পাঁচ বছরের গল্প শোনা যাবে।

তমাল একটি ফার্মে নির্বাহী পদে চাকরি করে। জান্নাত একটি ট্রাভেল এজেন্সির মার্কেটিংয়ে ছিল। ভ্রমণে যাওয়ার সুযোগ-সুবিধা জানানোর জন্য সে একদিন তমালের অফিসে এসেছিল। আর প্রথম দেখাতেই জান্নাতকে ভালো লেগেছিল তমালের। এরপর থেকে নিয়মিত তাদের সঙ্গে কথা হতো। এক পর্যায়ে তমাল বলেই ফেলে তাকে বিয়ে করার কথা। জান্নাত তখন বলেছিল, সে একজনকে ভালোবাসে এবং তাকেই বিয়ে করবে। তবে আমাদের বন্ধুত্ব আজীবন থাকবে। এরপর থেকে তাদের মধ্যে যোগাযোগ কমতে থাকে। এক সময় তা বন্ধ হয়ে যায়।

 চৈত্রের শেষ বিকেল

শায়লা হাফিজ

 

চৈত্রের শেষ দিন নববর্ষের আগমন সুখের সঙ্গে যেন মনে এনে দেয় ঋতুরাজ বসন্তের বিদায়ী ব্যথা মেশানো বিরহ বিধুর লগ্ন। তাই একটি বছরের অনেক অসন্তোষ, অনেক না পাওয়ার দুঃখ-গ্লানি ভুলে বাঙালি প্রাণ নেচে ওঠে নানা আয়োজনে বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণের আনন্দে। জীর্ণ পুরনো সব গ্লানি ধুয়ে-মুছে ‘নব আনন্দ বাজুক প্রাণে- এই মঙ্গল কামনায় বাঙালি বিদায় জানাবে কাটিয়ে দেয়া একটি বাংলা বছর।
বাংলা সনের শেষ মাসের নামকরণ করা হয়েছে চৈত্র। চৈত্র মাসের নাম ‘চৈত্র’ কীভাবে হলো? আদি পুরাণে বর্ণিত আছে, রাজা দক্ষের এক কন্যা ছিল চিত্রা। তার নাম অনুসারে এক নক্ষত্রের নামকরণ করা হয় চিত্রা নক্ষত্র। এই চিত্রা নক্ষত্র থেকে চৈত্র মাসের নামকরণ করা হয়। বাংলা সনের শেষ মাসের নামকরণ করা হয়েছে চৈত্র।
বহুকাল ধরে বাংলা বছরের সমাপনী মাস চৈত্রের শেষ দিনটিতে হিন্দু সম্প্রদায় ‘চৈত্র সংক্রান্তি’ পালন করছে। তাই বাংলা বছরের সমাপনী দিনটি ‘চৈত্র সংক্রান্তি’ নামে সমধিক পরিচিত। সংক্রান্তি কথাটির অর্থ ‘অতিত্রম করা’। সূর্য এক রাশি থেকে অন্য রাশিতে প্রবেশ করে বলেই এটিকে বলা হয় সংক্রান্তি। ফলে মাসের শেষ দিনটিকে বলা হয় সংক্রান্তি। চৈত্র সংক্রান্তি এখন কেবল কোনো ধর্ম বা মতের মধ্যে আবদ্ধ নয়, এটি রূপ নিয়েছে এক সর্বজনীন বর্ণিল উৎসবে।
চৈত্র সংক্রান্তির আসল আর্কষণ থাকে চড়ক পূজা। এটি কেন্দ্র করে দেশের অনেক জায়গায় বসে মেলা। চৈত্র সংক্রান্তির মেলায় বাঁশ, বেত, প্লাস্টিক, মাটি ও ধাতুর তৈরি বিভিন্ন তৈজসপত্র ও খেলনা, বিভিন্ন ফল ও মিষ্টি কেনা-বেচা করা হয়। বায়োস্কপ, সার্কাস, পুতুলনাচ, ঘুড়ি ওড়ানো ইত্যাদি চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থাও থাকে। অঞ্চলভেদে এই মেলা এক থেকে সাত দিন চলে। চড়ক পূজা চৈত্র সংক্রান্তির এক অন্যতম অনুষঙ্গ। লৌকিক আচার অনুযায়ী এই দিনে বিদায় উৎসব পালন করে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়। দোকানপাট ধুয়ে-মুছে বিগত বছরের যতো সব জঞ্জাল, অশুচিতা বিদূরিত করা হয়। পরদিনই খোলা হয় ব্যবসায়িক হিসাব-নিকাশের নতুন খাতা। এ উৎসবের লোকায়ত নাম ‘হালখাতা’।
বাংলার ঋতুচক্রের পালাবদলে চৈত্র আসে গ্রীষ্ম উষ্ণতা নিয়ে। প্রখর তপন তাপে আকাশ তৃষ্ণায় তৃষ্ণার্ত হয়ে ওঠে। মানব মনও তৃষিত হয় প্রকৃতি বরণ ও স্মরণ করতে। বাংলা বছরের সমাপনী মাস চৈত্র। চড়ক গাজন উৎসবের একটি প্রধান অঙ্গ। এ উপলক্ষে এক গ্রামের শিবতলা থেকে শোভাযাত্রা শুরু করে অন্য শিবতলায় নিয়ে যাওয়া হয়, একজন শিব ও একজন গৌরী সেজে নৃত্য করেন এবং অন্য ভক্তরা নন্দি, ভৃঙ্গি, ভূত-প্রেত, দৈত্যদানব প্রভৃতি সেজে শিব-গৌরীর সঙ্গে নেচে চলেন। এ সময় শিব সম্পর্কে নানান লৌকিক ছড়া আবৃত্তি করা হয়। এতে শিবের নিদ্রাভঙ্গ থেকে শুরু করে তার বিয়ে, কৃষিকর্ম ইত্যাদি বিষয় উল্লেখ থাকে। এ মেলায় সাধারণত শূলফোঁড়া, বানফোঁড়া ও বড়শিগাঁথা অবস্থায় চড়ক গাছে ঘোরা, আগুনে হাঁটা প্রভৃতি ভয়ঙ্কর ও কষ্টসাধ্য দৈহিক কলাকৌশল দেখানো হতো।

ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের বর্ষ বিদায় ও বর্ষবরণ উৎসব হলো ‘বৈসুক’। বাংলা বছরের শেষ তিন দিন পার্বত্যবাসী অতি আনন্দের সঙ্গে এই উৎসব পালন করে থাকে। অন্য সম্প্রদায় তথা সব ধর্মের মানুষ এই উৎসবে অংশগ্রহণ করে থাকে। সামর্থ্য অনুযায়ী ঘরের ছেলেমেয়েদের নতুন পোশাক দেয়া হয়, খাবার হিসেবে বিভিন্ন রকমের পিঠা ও পাঁচন তৈরি করা হয়ে থাকে। বৈসুক উৎসবের প্রধান আপ্যায়নের বস্তু হলো পাঁচন। এটি সাধারণত বন-জঙ্গলের হরেক রকমের শাকসবজির মিশ্রণ। তারা মনে করে, বছরের শেষ ঋতু পরিবর্তনের সময় বিভিন্ন শাকসবজি দিয়ে রান্না পাঁচন খেলে পরবর্তী বছরের রোগবালাই থেকে রেহাই পাওয়া যাবে। বছরের শেষ দিনের আগের দিন ‘হারি বৈসুক’ ও শেষ দিনকে বলে ‘বৈসুকমা’ এবং নতুন বছরকে বলে ‘আতাদাকি’।
হারি বৈসুকের দিনে প্রথমে তারা ফুল সংগ্রহ করে বাড়িঘর, মন্দির সাজায়। তারপর গায়ে কুচাই পানি (পবিত্র পানি) ছিটিয়ে স্নান করে আসে। এর সঙ্গে বয়োজ্যেষ্ঠদের পানি তুলে স্নান করিয়ে আশীর্বাদ নেয়। পরের দিনে পাড়ার যুবক ছেলেরা এক ওঝার নেতৃত্বে দলবেঁধে গরয়া নৃত্যের মহড়া দেয়। এই গরয়া দেবতার পূজা দিয়ে আশীর্বাদ বক্ষবন্ধনী কাপড় দিয়ে বেঁধে রাখে। তাদের বিশ্বাস, কারায়া গরয়া হচ্ছে বনের হিংস্র পশুগুলোর নিয়ন্ত্রণকারী দেবতা। তাদের পূজার আশীর্বাদ গ্রহণ করলে পরবর্তী বছরে জুম চাষ ও বিভিন্ন কাজে বন-জঙ্গলে গেলে হিংস্র পশুগুলোর আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।
মাস হিসেবে বৈশাখের প্রথম হওয়ার মর্যাদা খুব বেশি দিনের নয়। বৈদিক যুগে সৌর মতে, বছর গণনার যে পদ্ধতি প্রচলিত ছিল, সেখানেও বৈশাখের সন্ধান মেলে। বৈদিক যুগের ওই তথ্য অনুযায়ী বৈশাখের স্থান ছিল দ্বিতীয়। তৈত্তিরীয় ও পঞ্চবিংশ ব্রাহ্মণের মতে, বৈশাখের অবস্থান ছিল বছরের মাঝামাঝি জায়গায়। অন্যদিকে ব্রহ্মা- পুরাণে অনুষঙ্গপাদের একটি শ্লোক অনুসারে মাসচক্রে বৈশাখের অবস্থান ছিল চতুর্থ। তখন বাংলা সন বলতে কিছু ছিল না।

মোঘল সম্রাট আকবর ‘সুবে বাংলা’ প্রতিষ্ঠার পর বাংলাদেশে ফসল কাটার মৌসুম অনুসারে খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে নতুন একটি সনের প্রবর্তনের জন্য অনুরোধ করেন রাজ জ্যোতিষী ও প-িত আমির ফতেহউল্লাহ সিরাজীকে। সিরাজী হিজরি চন্দ্র মাসের সঙ্গে সম্রাটের সিংহাসনে আরোহণের বছর এবং ভারতীয় সৌর সনের সমন্বয়ে বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। মাসের নামগুলো সৌর মতে রেখেই পুনর্বিন্যাস করেন তিনি। এ অনুযায়ী বৈশাখ বাংলা সনের প্রথমে চলে আসে।
বাংলা সনের শেষ দিনটি বিদায় জানানোর জন্য বাঙালি যেমন প্রস্তুত হবেন তেমনি প্রস্তুত হবেন আরেকটি নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে। একই সঙ্গে খাতা খুলে কষতে বসবেন বিগত বছরের সাফল্য ব্যর্থতা ও পাওয়া, না পাওয়ার হিসাব। সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে নানান আচার অনুষ্ঠানে যেমন বিদায় জানানো হবে চৈত্রকে তেমনি প্রস্তুতি নেবেন চৈত্রের শেষ রাতের প্রহরে সূর্য উদয়ের সঙ্গে সঙ্গে বৈশাখ বরণ করে নিতে। রবীন্দ্র নাথ ঠাকুরের ভাষায় যদি বলিÑ

‘নিশি আবসান প্রায় ঐ পুরাতন বর্ষ হয় গত
আমি আজি ধুলিতলে জীর্ণ জীবন করিলাম নত॥
বন্ধু হও শত্রু হও, যেখানে যে রও
ক্ষমা কর আজিকার মতো
পুরাতন বৎসরের সাথে পুরাতন অপরাধ যত।’

চৈত্রের রুদ্র রূপ ডিঙিয়ে আমাদের মধ্যে এলো বৈশাখ। এলো আরেকটি নতুন একটি বছর। অনেক প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, চড়াই-উতরাই, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও আনন্দ-বেদনার সাক্ষী হয়ে কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে একটি বছর। নতুন বছরের পুব আকাশের নতুন সূর্যটি হোক শান্তির ও স্বপ্নের। পুরনো বছরের জীর্ণতা দূরে ঠেলে নতুন সম্ভাবনার পথে এগিয়ে চলাই হোক আমাদের মূলমন্ত্র।

 

মডেল : রিবা হাসান
পোশাক : অঞ্জনস
মেকওভার : ক্লিওপেট্রা বিউটি স্যালন
ছবি : কৌশিক ইকবাল

কুসুমকুমারী ভিআইপি ফেরি

মাসুদা ভাট্টি

 

ঘাটে ফেরিটা ভিড়েছে ঠিকই কিন্তু কোনো গাড়ি নামতে পারছে না। একেবারে ফেরিতে ওঠার মুখেই পন্টুনের ওপর একটা মালবোঝাই ট্রাক মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। দু’পাশে যতোটুকু জায়গা খালি তা দিয়ে বড় গাড়ি আসতে পারবে, কী পারবে না তা নিয়ে গবেষণা করছে লোকজন। ট্রাকটা আজ পড়েনি হয়তো। তাই কেউ কেউ বলাবলি করছেন, এর আগের ফেরি থেকেও ট্রাক এখান দিয়ে নেমে গেছে। অসুবিধী হওয়ার কথা নয়। কিন্তু বলা তো যায় না- যাত্রীভর্তি বাস, কোরবানির পশুভর্তি ট্রাক, যদি কিছু হয়ে যায়! সবাই খুব সতর্ক সে জন্য। এ রকমই জটলার ভেতর ছেলেটিকে দেখলাম আমরা। আমরা দু’জন। আমি ও সালমা। আমরা গাড়ির ভেতর বসে চারদিকে তাকাই। আমাদের ঠিক সামনেই লুঙ্গি পরা এক লোক তার অ-কোষ থেকে চুলকে ছিঁড়ে আনবে বলে মনে হয়। আমরা হা হা করে হাসি তাকে দেখে। তখন আবারও ছেলেটির দিকে চোখ যায় আমাদের।
আমাদের কথা বলি একটুখানি। আমরা চল্লিশ পেরোলাম কিছুদিন আগে মাত্র। কিন্তু এখনো আমাদের বাইরে-ভেতরে কোথাও চল্লিশের চিহ্ন পড়েনি। আমাদের যারা দেখতে পারে না তারা হয়তো বলবে বা বলেও যে, ‘আরে, সুন্তানাদি তো অয় নাই, অগো আর কী, গায়ে বাতাস লাগায়া ঘোরে-ফেরে।’ ফরিদপুর অঞ্চলের টান থাকায় সহজেই সমালোচনাকারীকে শনাক্ত করা যায়। কারণ তারা আমাদের চেনে ও জানে। আমরা স্বাবলম্বী। দু’জনই চাকরি করি ঢাকায়। আমরা একা যে যার মতো থাকি। সালমার সঙ্গে অবশ্য তার মা থাকেন। আমার সঙ্গে কেউ না। কারণ আমার আসলে কেউ নেই থাকার মতো। আজকাল অবশ্য মনে হয়, ওই কোন এক অতীতকাল থেকে আমার কেউ নেই। সালমা ইদানীং প্রায়ই বলে, ‘কেন এমুন হয় কও তো? কেউ থাকলে কী হইতো আমাদের?’ আমি সালমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। তাকে ঠিক বোঝাতে পারি না, কেউ থাকলেও এর চেয়ে যে খুব বেশি ভালো কিছু হতো তা নয়। তাই চুপ করে থাকি। ঢাকা শহরে একা মেয়েদের থাকার চল শুরু হয়েছে আমাদের হাত ধরেই। এর আগে মেয়েরা সাধারণত ছাত্রী হলে হলগুলো আর কর্মজীবী হলে মেয়ে হোস্টেলগুলোয় থাকতো। কিন্তু এখন কোনো কোনো বাড়িওয়ালা গাঁইগুঁই করলেও ভাড়া দেয়। অনেক বাড়িওয়ালাই এখন স্বীকার করে যে, ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা ঠিকমতো ভাড়া দেয় এবং ঝামেলাও আসলে কম দেয়। মানুষ মিষ্টির স্বাদ পেলে পিঁপড়ারও পাছা চুষে দেখে।

দেয়। অনেক বাড়িওয়ালাই এখন স্বীকার করে যে, ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা ঠিকমতো ভাড়া দেয় এবং ঝামেলাও আসলে কম দেয়। মানুষ মিষ্টির স্বাদ পেলে পিঁপড়ারও পাছা চুষে দেখে।
এই সেদিনও কতো প্রশ্ন শুনতে হতো বাড়ি ভাড়া নিতে গিয়ে। বাড়িওয়ালা এক ধরনের প্রশ্ন করে তো বাড়িওয়ালি আরেক ধরনের। প্রশ্নের পাহাড় ডিঙিয়ে বাড়ি ভাড়া জুটলেও হয় বাড়িওয়ালা ফোনে যন্ত্রণা দিতে শুরু করে, না হয় বাড়িওয়ালি তার স্বামীকে জড়িয়ে অহেতুক সন্দেহ শুরু করে। তখনকার ফ্যাঁকড়ার সঙ্গে কোনো যন্ত্রণারই মিল নেই। এখন এসব একটু কমেছে। মানুষ অর্থনীতি দিয়ে বিচার করতে শুরু করেছে জীবনকে। তাই যাপনের ক্ষেত্রে যেখান থেকে আদায় বেশি এবং কম ঝামেলার সেদিকেই মানুষের ঝোঁক।
সালমা একটা সফটওয়্যার ফার্মে কাজ করে। আমার নিজের ব্যবসা আছে, সেটিই দেখি। দু’জনের জন্মস্থান দেখতে গিয়েছিলাম আমরা। সেখানে বিশ্বকর্মা পূজায় নৌকাবাইচ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ক্ষমতার দ্বন্দ্বে নৌকাবাইচ তো হলোই না, দুপুর নাগাদ প্রশাসন সেখানে ১৪৪ ধারা জারি করে দিল। কারণ কী? দুই নেতার ঝগড়া- কে পুরস্কার দেবে, কার আধিপত্য বজায় থাকবে। অথচ যে হাজার হাজার মানুষ এই নৌকাবাইচ আর পূজা দেখতে আসার কথা ছিল তাদের কথা কেউই ভাবলো না। তারা বৃষ্টিতে ভিজে ফাঁকা নদীর দিকে তাকিয়ে রইলো অপলক। নদীর ওপর ভাঙাচোরা সেতুর কিনার ঘেঁষে মানুষের ঘোলা জলের দিকে তাকিয়ে থাকাটা কেমন অদ্ভুত আবহের জন্ম দিয়েছিল। আমরা অবশ্য গাড়ি থেকে নামিনি। নেমে কী হবে? শিশুকালের স্মৃতি নষ্ট হবে কেবল।
স্মৃতির কথা যখন এলোই তখন একটু স্মৃতিচারণ হোক। স্মরণ করি সেসব দিনের কথা যখন এই নদী কোনো ভটভটির আওয়াজ শোনেনি- এখন যার ভয়ঙ্কর আওয়াজে দিনমান কুমারপাড়ের এই ছোট্ট শহরটি রীতিমতো আতঙ্কিত থাকে। কিন্তু সেসব ধানের ফুল ফোটা দিনে যখন কৈ মাছের ঝাঁক লক্ষ্মীদীঘা ধানের ঝরে পড়া ফুল খেয়ে খেয়ে শরীরে হলুদ চর্বি জমাতো বলে মাছপ্রিয় মানুষ গল্প করতো। সেই সময় একদিন খুব ভোর থেকেই শুরু হতো কাঁসরের বাজনা, পাশের বিল দিয়ে নৌকা যেতো। মানুষ তখন নৌকাবাইচকেও বলতো আড়ং। আর ওই বাইচের দিনই বিক্রি হতো চালন, কুলো, পলোসহ বছরকার ব্যবহারযোগ্য জিনিসপত্র। মানুষ শুধু নৌকাবাইচ দেখতে নয়, বিশ্বকর্মার অবতার মানুষের তৈরি জিনিসপত্রও কিনতে আসতো আড়ংয়ে। এবারও দেখলাম বাজার বসেছে রাস্তার দু’পাশে, সেতুর ওপর পসরা সাজানো। কিন্তু বেশির ভাগই সস্তার প্লাস্টিক, এমনকি যে কাঠের হেলিকপ্টার ছোটবেলায় ছিল তাও আছে এবং সেটিও প্লাস্টিকের। কেবল বদলায়নি মিষ্টির দোকানগুলো। মিছরির সাজের হাতি-ঘোড়া-ময়ূর-গণেশ, জিভেগজা, আমৃত্তি, ছানার জিলেপি ও ক্ষীরের চমচম- মানুষ এখনো হুমড়ি খেয়ে পড়ছে দোকানগুলোয়। আমার এখনো ভালোবাসার রাজভোগ। আমি নামি না। জানি, নেমে সেই পুরনো মুখ দেখবো না। তারা আছেন কি না তাও তো জানি না। তাই আর রিস্ক নিই না। আনিয়ে নিই ঢাকায় নিয়ে আসার জন্য।

উৎসবের রঙ নাকি বদলায় না। হবে হয়তো। তবে একালেও সকাল থেকে ভটভটিতে প্রমাণ আকারের সাউন্ডবক্স লাগিয়ে, ডেকভর্তি করে বিরিয়ানি তুলে নিয়ে যে উচ্চতায় শব্দ পৌঁছালে কান আর কিছু শুনতে পায় না সে রকম উচ্চ শব্দে হিন্দি সিনেমার সবচেয়ে তালের গানটি দিনভর বাজে। ভটভটি, নাকি হিন্দি গান- কোনটির শব্দ কাকে খুন করে বোঝা না গেলেও আশপাশের মানুষের কানের দফা-রফা। কিন্তু তাতে কী? আনন্দ তো- মানুষ মেনে নেয়, মনে নেয় না।
বেরোতে বেরোতে বিকেল হয়ে যায় আমাদের। আর ফেরিঘাটে দিয়ে কোরবানির পশুবাহী ট্রাকের পেছনে লাইন ধরে অপেক্ষা করতে করতে সন্ধ্যা প্রায় হয়েই যায়। তারপরও পদ্মার পাড়ে অতো বিশাল আকাশকে অন্ধকার কি সহজে ঢাকতে পারে? বিকেলটা অদ্ভুত এক আলো ছড়িয়ে থমকে থাকে অনেক্ষণ যেন বা নদীর জলে শেষবারের মতো নিজেকে দেখে নেয় দিন। পদ্মা সেতুর জন্য জমানো দৈত্যের মতো পাথরের ঢিপি। মনে হয়, আচানক এখানেও পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে। ছুটির দিন বলেই কি না জানি না, ঘাটে তেমন মানুষের ভিড় নেই। তাই হয়তো ছেলেটাকে আমাদের একেবারে আলাদা করে চোখে পড়ে। আমিই দেখাই সালমাকে। বলি, ‘দ্যাখো দ্যাখো, ছেলেটা কী লম্বা দেখতে?’
সালমা বলে, ‘হ্যাঁ রে, এক্কেবারে ইরানি ইরানি চেহারা।’ বোঝা যায়, একটু ফর্সা আর লম্বা চেহারার পুরুষ এখনো এ দেশে ইরান কিংবা তুরান থেকে আসা- এই ধারণা আমাদের জীবনগত হয়ে গেছে। আমি হেসে ফেলি। তখনো আমাদের গাড়ি ফেরিতে ওঠার জন্য কসরত করে যাচ্ছে সমানে। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর চালক বেচারা অধৈর্য হয়ে উঠেছে- কখন উঠবে ফেরিতে। আর যে মুহূর্তে মনে হলো যে, মুখ থুবড়ে থাকা ট্রাকটা কোনো বাধা নয়, ঠিক ওই মুহূর্তেই হুড়মুড় করে নামতে শুরু করলো গাড়িগুলো। প্রথমে এ দেশের কথিত ভিআইপিদের গাড়ি- যারা দরকার হলে ঢাকা থেকে বেরোনোর সময় ফোন করে ফেরি আটকে রাখে। আর হাজার হাজার মানুষ না জেনে অপেক্ষা করে পরবর্তী ফেরির। সে রকমই একটি

কালো গাড়ি নেমে গেল। তারপর একের পর এক ছোট গাড়ি, ট্রাক ও বাস নামছে তো নামছেই। অথচ দূর থেকে ফেরিটিকে বেশ ছোটই মনে হয়। এতো গাড়ি তার পেটে ধরলো কী করে? আমি ভাবি।
ছেলেটির গাড়িও নিশ্চয়ই অপেক্ষা করছে কোথাও। ম্লান আলোয় ছেলেটিকে কি একটু বিষণœ দেখায়? হঠাৎই আমার মাথায় প্রশ্নটি আসে, আচ্ছা, আমার মা কী এ রকম কোনো ছেলেকে দেখে নিজের ভেতর প্রশ্ন নিয়ে ভাবতে বসতেন? সে সুযোগ কি তার হতো কিংবা সাহস? মাত্র তো চল্লিশ বছরের ফারাক। চল্লিশ বছর পরই তার কন্যা এ রকম একটি বেগানা পুরুষকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভাবতে পারছে দ্বিধাহীন- এটাকে কী অর্জন বলবো? মাও হয়তো ভাবতেন, প্রকাশ করতে পারতেন না। মানুষ তো! কতোটা আর বদল হবে। ভেতরে চিন্তার বীজ তো থাকেই, তাই না? আমরা টুকটাক কথা বলি ছেলেটাকে নিয়ে।
‘ছেলেটা কি একা? কী মনে হয়?’ সালমার দিকে তাকিয়ে জানতে চাই।
‘না মনে হয়। মাইক্রোবোঝাই লোকজন। নিশ্চয়ই তার ভিড় ভালো লাগে না। তাই নেমে আসছে।’ সালমা বলে।
ছেলেটার হাতে লম্বা আখ দাঁতে কাটছে। চুষে চুষে ফেলে দিচ্ছে মাটিতে। অন্য সময় হলে ঠিক ব্যাপারটা চোখে লাগতো- কী অসভ্য রে, খেয়ে খেয়ে জায়গা নোংরা করছে। কিন্তু ছেলেটার দিকে তাকিয়ে এসব কথা ভাবতে মন চাইছে না। আর চিবানো আখের ছোবা তো আসলে পচেই মিশে যাবে মাটিতে। এতে বরং মাটিরই উপকার। মনে মনে হেসে ফেলি। সালমার দিকে তাকাই। বুঝতে চাই, সে কী ভাবছে! কিন্তু সে দেখি প্রশ্ন করে গাড়ির চালককে- ‘কী সুমন ভাই, ফেরিতে উঠতে পারবেন তো? ওই যে দ্যাহেন পিছনে আরো ভিআইপি আইছে।’ সত্যিই তাকিয়ে দেখি পেছনে কোনো জেলা প্রশাসক কিংবা জেলা পুলিশ সুপারের গাড়িবহর। আতঙ্কিত হয়ে উঠি ভেতরে ভেতরে। কিন্তু সালমাকে সুমন আশ্বস্ত করে- ‘কোনো ভিআইপি-টিআইপি মানুম না ম্যাডাম, ঠিক টান দিয়া উইঠঠা যামু। তারপর যা হয় দেখা যাইবো।’ আমি আঁতকে উঠি যদি সত্যি সত্যিই কিছু হয়! আমার ভয়, এ পৃথিবীকে বড় ভয় আমার।
আমাদের সামনে কেবল একটি বাস দাঁড়ানো। চাইলে আমরা তারপরই উঠতে পারি। কিন্তু না, ওপার থেকে আসা সব গাড়ি নেমে যাওয়ার পর প্রথমেই বাসটিকে ডেকে নেয় ফেরির লোকজন। তারপরই দেখি, পিল পিল করে অসংখ্য গাড়ি এসে আমাদের পাশে, পেছনে জায়গা করে

দাঁড়িয়ে আছে। ডেকে ডেকে তুলছে প্রথমে বড় গাড়িগুলো যেগুলোর ভেতর বোবা পশুগুলো গায়ের সঙ্গে গা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মায়া হয় দেখে। আমার মনে হয়, যতো দ্রুত তারা উঠতে পারে ততোই ভালো। মৃত্যু যখন অনিবার্য তখন তা এগিয়ে আসাই ভালো। এরপরই শুরু হয় ‘ভিআইপি’দের জায়গা করে দেয়ার পালা। তাদের গাড়ি তুলতে তুলতে তার পেছন পেছন টান মেরে আরো কয়েকটি গাড়ি ঢুকে যায় ফোকটে। আর তখনই আমাদের চালক যেন নিজের শক্তি দিয়েই গাড়িটি টেনে ফেরিতে উঠিয়ে ফেলে। আমি আতঙ্কিত হয়ে ওঠার আগেই দেখতে পাই, আমরা ঠিক জায়গা করে নিতে পারছি। তখনই মনে হয়, আহা রে! বেচারা কি এখনো আখ খাচ্ছে? পারলো কি তাদের গাড়িটা ফেরিতে উঠতে? ফেরির পেট ভরে যাচ্ছে দ্রুতই। তখনই সালমা একটি গাড়ি দেখিয়ে বলে, ‘ওই দ্যাখো, তোমার ইরানি লোকটার গাড়ি উঠছে।’ আমি হেসে ফেলি- ‘যাহ! সে ইরানি হবে কেন? একেবারেই আখ খাওয়া বাঙালি যুবক।’ আমাদের গাড়ি থেকে পুরো ফেরিটা দেখা যায়। তাতেই আমরা দেখি, ছেলেটা তার মোবাইল ফোনটা নিয়ে ফেরির দোতলায় ওঠার সিঁড়ির মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ায়। এক মাথা চুল আর মুখভর্তি দাড়িতে তাকে একটু যিশু যিশু দেখায় বোধ করি। সালমা অবশ্য মুখ বেঁকিয়ে বলে, ‘না রে, ফিগারটা তেমন ভালো না, ক্যাংঠা!!’
আমার হাসি পায় সালমার কথায়। আবারও ভাবি, ভাবনার সত্যিই লাগাম নেই। ছেলেটা নিশ্চয়ই জানে না, তাকে নিয়ে আমরা কতো কিছু ভাবছি। ঢাকা শহর থেকে বাইরে বের হতে আমার সবচেয়ে বড় ভয়, পথে যদি বাথরুম পায়, তবে? ঢাকা শহরে না হয় কোনো রেস্টুরেন্ট কিংবা কফি শপে গিয়ে করে নেয়া যায়। কিন্তু পথে? আতঙ্কে আমার তলপেট কেবলই কুঁকড়ে আসে। এসব ভুলতে আমি কতো কিছু নিয়ে যে ব্যস্ত হওয়ার চেষ্টা করি এর শেষ নেই! কিন্তু সালমার কোনো বিকার নেই। সে বলে, ‘আমার টয়লেট পাইছে। যাই দেখি করে আসি, তুমি যাবা?’
‘পাগল তুমি? আমি এখান থেকে এক চুলও নড়বো না।’ গাড়ির জানালার কাচ নামাতে নামাতে বলি। গুমোট হাওয়া ধক করে এসে মুখে লাগে। পশুদের শরীরের গন্ধ মিশে যায় সে হাওয়ায়। ফেরিতে মানুষ বেশি উঠলো, না পশু উঠলো? অবশ্য মানুষ আর পশুতে পার্থক্য কতোটুকুই বা? গোপাল ভাঁড় আজকের দিনে হলে নিশ্চয়ই বলতেন, আধ হাত মাত্র। কারণ সামান্য দূরেই গরুভর্তি ট্রাকটা দাঁড় করানো। সালমা নেমে যাওয়ার আগে আমি তাকে বলি, ‘শোনো না, ছেলেটাকে একটু বলে যাও যে, ওই লাল গাড়ির ভেতর এক ভদ্রমহিলা বসে আছেন। আপনাকে হয়তো চেনে, একটু যাবেন ওখানে?’
সালমা চোখ বড় বড় করে আমার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘সত্যিই কবো? আমি বলতে পারি, কোনো অসুবিধা হবে না আমার। কিন্তু এখানে এলে তারে তুমি কি কবা?’
‘কী আর বলবো? বলবো, বোর হচ্ছিলাম, গল্প করার কেউ নেই। আপনাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মনে হলো, গল্পের জন্য উপযুক্ত চেহারা। তাই আসতে বলেছি। আপনার গল্প করতে ইচ্ছা না হলে যেখানে দাঁড়িয়েছিলেন সেখানে গিয়ে দাঁড়ানগে আবার’- আমি হাসতে হাসতে বলি। সালমা ধরে নেয়, আমি সত্যিই তাকে বলতে বলেছি। ঠিক সেই মুহূর্তে তার চোখ-মুখে কেমন দুষ্টুমি খেলা করে- আমি দেখতে পাই। সে গাড়ির দরজা খুলে নামে। আমাদের চালক আশপাশেই ছিল। তাকে নিয়ে সালমা সিঁড়ি দিয়ে ছেলেটার পাশ দিয়ে উপরে উঠে যায়। আমি তাকিয়ে থাকি অপলক, দেখি কিছু বলে কি না। অন্ধকার তখনো ঝাঁপিয়ে পড়েনি। তাই দেখা যায়, সালমা তাকে এড়িয়ে উপরে উঠে যায়। কিন্তু একটু পরই আবার নেমে আসে। এসে ফেরির নিচতলায় ভেতরের দিকে যায়। আমি চিন্তা করতে থাকি, উপরের টয়লেট কি বন্ধ? ছেলেটা তখন পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করে আকাশের গায়ে লেগে থাকা লাল, হলুদ, সোনালি রঙের ছবি তোলে। বাহ! ভেতরে সৌন্দর্যজ্ঞান আছে তো? কথা তাহলে বলাই যায়। যে ছেলে আকাশের রঙ বদলানো টের পায় তার সঙ্গে কথা বলতে ভালোই লাগবে মনে হয়। আমি উত্তেজিত ভেতরে ভেতরে। সালমা ফিরে আসে দ্রুতই।
সালমাও উত্তেজিত, ‘জানো, উপরের টয়লেট বন্ধ। ভিআইপিরা রুম আটকে বসে আছে। ভাবো কী ভয়ঙ্কর! আমাকে ওই ভয়ঙ্কর টয়লেটে যাইতে হইলো। নিজেরে নোংরা লাগছে। পানি দাও তো এট্টু হাত ধুই।’ আমি পানির বোতল এগিয়ে দিই আর ভাবি, এ দেশে ভিআইপি হওয়াটা বিশেষ জরুরি। না হলে বর্জ্য ত্যাগেরও সুযোগ পাওয়া যায় না। সালমা নিজেকে ধুয়ে-টুয়ে ভেতরে আসে। গাড়ির ভেতর তখন বিষগরম। নিজেকে মনে হচ্ছে, সিদ্ধ করতে দিয়েছি পাথরপোড়া গরমে। বিদেশে এটিকেই তো সাউনা বলে। আমরা গরমের দেশের লোকজনই কেবল তা বুঝতে চাই না। আমি প্রসঙ্গ বদলাই- ‘এই, তুমি ছেলেটাকে কিছু বললে না যে? ডরাইছ?”
‘ইস! কিসের ডর? আমি ভাবলাম তুমি ঠাট্টা করছ’- সালমা হাসে।
‘ধুর, ঠাট্টা ক্যান করবো? কী মজা হইতো বলো? ছেলেটার চেহারা নিশ্চয়ই বদলায়ে যেতো আমাদের সামনে এসে, তাই না?’ আমি বলি।
‘তাহলে একটা পিচ্চিকে দিয়ে আমরা খবর পাঠাই চলো। ওই যে বাদামওয়ালা আসছে। তাকে বলি।’ সালমা বাদামওয়ালাকে ডাকে- ‘এই বাদাম, এই বাদাম।’
বাদামওয়ালা তখন চেঁচাচ্ছে- ‘এই নেন বাদাম, এই যে বাদাম। লবণ-মরিচ মিশায়া খান। মজা পাইবেন।’ লোকটা এগিয়ে আসে। সালমা কিছু বলার আগে আমিই বলি, ‘কতো কইরা ভাই?’

আটকে বসে আছে। ভাবো কী ভয়ঙ্কর! আমাকে ওই ভয়ঙ্কর টয়লেটে যাইতে হইলো। নিজেরে নোংরা লাগছে। পানি দাও তো এট্টু হাত ধুই।’ আমি পানির বোতল এগিয়ে দিই আর ভাবি, এ দেশে ভিআইপি হওয়াটা বিশেষ জরুরি। না হলে বর্জ্য ত্যাগেরও সুযোগ পাওয়া যায় না। সালমা নিজেকে ধুয়ে-টুয়ে ভেতরে আসে। গাড়ির ভেতর তখন বিষগরম। নিজেকে মনে হচ্ছে, সিদ্ধ করতে দিয়েছি পাথরপোড়া গরমে। বিদেশে এটিকেই তো সাউনা বলে। আমরা গরমের দেশের লোকজনই কেবল তা বুঝতে চাই না। আমি প্রসঙ্গ বদলাই- ‘এই, তুমি ছেলেটাকে কিছু বললে না যে? ডরাইছ?”
‘ইস! কিসের ডর? আমি ভাবলাম তুমি ঠাট্টা করছ’- সালমা হাসে।
‘ধুর, ঠাট্টা ক্যান করবো? কী মজা হইতো বলো? ছেলেটার চেহারা নিশ্চয়ই বদলায়ে যেতো আমাদের সামনে এসে, তাই না?’ আমি বলি।
‘তাহলে একটা পিচ্চিকে দিয়ে আমরা খবর পাঠাই চলো। ওই যে বাদামওয়ালা আসছে। তাকে বলি।’ সালমা বাদামওয়ালাকে ডাকে- ‘এই বাদাম, এই বাদাম।’
বাদামওয়ালা তখন চেঁচাচ্ছে- ‘এই নেন বাদাম, এই যে বাদাম। লবণ-মরিচ মিশায়া খান। মজা পাইবেন।’ লোকটা এগিয়ে আসে। সালমা কিছু বলার আগে আমিই বলি, ‘কতো কইরা ভাই?’
- দশ টাকা প্যাকেট।
‘দুই প্যাকেট দ্যান ভাই।’
ততোক্ষণে আঁধার জমেছে একটু। ফেরিও ছেড়েছে বোঝা যায়। কিন্তু বাতাস নেই কোনোদিক থেকেই। বাদামওয়ালা দুই প্যাকেট বাদাম দিতে দিতে একটা ছোট পলিথিনের ব্যাগও ধরিয়ে দেয়। বলে, ‘ম্যাডাম, বাদাম ছিলা এর মইধ্যে ফালাইয়েন। এক্সটা দিলাম। ভেতরে লবণ-মরিচ আছে। মাইখ্যা খাইয়েন, মজা পাইবেন।’ আমি হেসে ফেলি- ‘ঠিক আছে, মাইখ্যাই খামু।’
- আফাদের বাড়ি কোথায়? মানে ঢাকায় কই থাকেন? বাদামওয়ালা আমাদের সঙ্গে কথা বাড়াতে চায়। আমি অন্ধকারেও তাকিয়ে থাকি তার দিকে। বোঝে কথা বাড়বে না। কিন্তু আমি এ জন্য তাকাইনি। আমি তাকে দেখতে চেয়েছিলাম। মানুষের মুখ-চোখ দেখা আমার স্বভাব। বাদামওয়ালা কী ভাবলো কে জানে? মিন মিন করে বললো, ‘আমারও বাড়ি পুরান ঢাকায়। তাই জিগাইছিলাম আর কী!’ আমাদের বাদামের প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে বাদামওয়ালা সরে যায়। আর সালমা ততোক্ষণে বাদামওয়ালাকে জিজ্ঞাসা করে ফেলে- ‘কতোক্ষণ লাগবে পার হইতে?’
- বেশিক্ষণ না আফা, কুসুমকুমারী ভিআইপি ফেরি তো। তাই আড়াই ঘুণ্টা লাগবে। এর বেশি না। আর ফেরিডাও নতুন আনছে আফা।
আমাদের জানা হয়ে যায়, আমরা কুসুমকুমারী নামক ভিআইপি এবং নতুন ফেরিটিতে উঠেছি। আমাদের মনে এক ধরনের উৎফুল্ল ভাব আসে। আর সে ভাবেই আমরা বাদামওয়ালাকে বলি, মানে, আমিই বলি- ‘ওই যে দেখছেন সিঁড়ির মাঝামাঝি একজন ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আছেন, দাড়িওয়ালা। তাকে গিয়ে বলবেন, এই গাড়ির ম্যাডাম তাকে ডাকছে। বলতে পারবেন না?’ ছেলেটা তখনো পদ্মা সেতুর জন্য জমানো পাথুরে

 

পাহাড়ের ছায়াকে মোবাইল ফোনবন্দি করছে। ওমা! পাথরের ওপর তো মানুষের অবয়বও দেখা যাচ্ছে। এক-দু’জন নয়, বেশ মানুষ উঠেছে ওই অত্ত উঁচুতে? বাদামওয়ালা হেঁটে যায়। আমরা দু’জন মূর্তির মতো বসে থাকি। মুখ থেকে গুলি বেরিয়ে গেছে। গুলিতো নয়, বাদামওয়ালা ছুটে যাচ্ছে ছেলেটার দিকে। সিঁড়ি দিয়ে উঠছে, কথা বলছে ছেলেটার সঙ্গে। ততোক্ষণে ফেরির টিমটিমে বাতিও জ্বলতে শুরু করেছে। ছেলেটি আমাদের গাড়ির দিকে তাকাচ্ছে। তারপর হাত দিয়ে চুল ঠিক করলো এবং একটু থেমে থেমে নামতে শুরু করলো। বাদামওয়ালার পেছন পেছন নেমে ছেলেটা আমাদের গাড়ির দিকে এলো আর বাদামওয়ালা অন্যদিকে। ছেলেটি এসে সালমার দিককার জানালায় দাঁড়ালো প্রথমে। তারপর একটু ঝুঁকে জিজ্ঞাসা করলো- ‘ডেকেছেন?’
সালমা আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি সপ্রতিভ হয়ে উঠি- বলি, ‘জি, ডেকেছি। মনে হচ্ছিল আপনাকে চিনি। নেমে গিয়ে জিজ্ঞাসা করতে সংকোচ হচ্ছিল। তাই আসতে বলেছি। কিছু মনে করেননি তো?’
ছেলেটি হাসে। স্বল্প আলোতেও টের পাই হাসিটা মিষ্টি। আমি বয়স ভাবার চেষ্টা করি। ত্রিশের একটু বেশি হবে। হাত চালায় চুলের ভেতর আবার। বুঝতে পারি, তারও ভেতরে প্রশ্ন। তাই চুলের ভেতর হাত দিয়ে তা তাড়ানোর চেষ্টা করছে। আমি নিজের নাম বলি। আর সালমার দিকে দেখিয়ে বলি, ‘ও সালমা। আপনার নাম কি তপু? আপনি কি কোনো টিভি চ্যানেলে আছেন? না হলে এতো পরিচিত মনে হচ্ছে কেন?‘ খুবই দুর্বল ও বানানো শোনায় শেষের প্রশ্নটি। নিজেকে খুব ন্যাকা ন্যাকা লাগে। তাই নিজেকে সংশোধন করে ফেলি দ্রুত। বলি, ‘সত্যি কথা বলি। আসলে আমাদের কথা বলতে ইচ্ছা করছিল কারো সঙ্গে। তাই আপনাকে ডেকেছি। আপনি তো একা একা দাঁড়িয়ে মোবাইল ফোনে আঁধারবন্দি করছিলেন। এ জন্য ভাবলাম, হয়তো কথা বলতে আপনারও ভালো লাগতে পারে।’
ছেলেটির চোখ-মুখে তখনো অবাক ভাব। তা কাটতে সময় নেবে বুঝতে পারি। কিন্তু এর আগেই সালমা বলে, ‘আমার কথা বলতে ইচ্ছা করে নাই কিন্তু। ওর করেছে, বুঝলেন?’
- জি, বুঝেছি। তাহলে নেমে আসুন আপনারা, কথা বলি।
বাহ! গলার স্বরটা তো বেশ। ভরাট। আমি সালমার দিকে তাকাই। বলি, ‘চলো, নেমে ফেরির পেছন দিকে যাই। উপরে তো ভিআইপিরা দরজা বন্ধ করে রেখেছে।’ সালমা বলে, ‘তোমরা নামো, আমি আসছি একটু পরে। একটা ফোন করতে হবে আমার। বুঝতে পারি, সালমা সময় নিচ্ছে। আমি দরজা খুলে নামি। পরনের শাড়িটি সামলে নামতে একটু সময় লাগে। পায়ে স্যান্ডেল গলিয়ে তারপর নামি। তখনো ফেরিজুড়ে ‘গোময়’-এর গন্ধ ম-ম করছে। ছেলেটি এগিয়ে আসে। বলে, ‘এই দিকে আসুন’- হাত দিয়ে দেখিয়ে দেয় ফেরির সামনের দিকটা। সেখানে ইতি-উতি লোকজন দাঁড়ানো। তবে জায়গা আছে ফাঁকা দাঁড়ানোর মতো। আমরা গিয়ে দাঁড়াই এবং সেই প্রথম পদ্মা থেকে বাতাস ওঠে একটুখানি, জলগন্ধ মাখানো। আমার ভালো লাগে। আমি ফিরতে থাকি পেছনে। যখন আমার ষোল, কী সতের বছর তখনকার কোনোদিন। এমন আশ্বিনও হতে পারে। তুমুল বৃষ্টি আর ঢেউ ভেঙে পদ্মা পার হতে হতে আরেকজন মানুষকে দেখছিলাম কেবলই। সেও তাকিয়েই ছিল সারাক্ষণ। কিন্তু কথা বলার সাহস আমাদের কারোরই হয়নি। অথচ আজ কী অনায়াসে আমি একটি ছেলেকে তার অবস্থান থেকে ডেকে সরিয়ে এনে গল্প করছি। নিজেকে আমার সাহাসী মনে হয় একটু। বলি, ‘আমি সত্যিই দুঃখিত আপনাকে এভাবে ডেকে বিরক্ত করার জন্য।’
- বিরক্ত হচ্ছি না, আপনি বলুন।
কী বলবো?
- কথা বলতে চাইছিলেন না?
কথা! খুঁজে পাচ্ছি না তো আর।
আমি সত্যিই কথা খুঁজে পাচ্ছিলাম না আর। তবে আমি ক্রমেই ফিরছিলাম অতীতে। মনে হচ্ছিল, আমি সেই ছেলেটির সঙ্গে কথা বলছি- যখন আমার বয়স ষোল। ছেলেটিরও হয়তো তাই। ভেতর থেকে কি কোনো দীর্ঘশ্বাস বের হচ্ছে? বুঝি না।
আমার কথা শুনে ছেলেটি আবার হেসে ওঠে- বেশ উঁচু ও দরাজ হাসি। অন্ধকার একটু একটু করে গলে পড়ে সে হাসিতে। আমি ছেলেটির মুখ দেখতে পাই না আর। কিন্তু আমার মুখের ওপর আলো পড়ছে বুঝতে পারি। চোখে এসে লাগে। তবুও দাঁড়িয়ে থাকি আমি। বলি, ‘কী নাম আপনার?’
- ওই যে বললেন তপু। আমার নাম ধরুন তপুই।
যাহ! সত্যি নয়। সত্যি নাম বলুন। আচ্ছা থাক, বলতে হবে না। আপনার নাম তপু। তা তপু, কী করেন আপনি?
- আপনিই তো বললেন, টিভি চ্যানেলে কাজ করি। ধরুন, তাই করি।
আচ্ছা, না হয় তা-ই ধরলাম। কোথায় গিয়েছিলেন বা কোথা থেকে ফিরলেন?
- আপনি কি সব সময় এ রকম করে কথা বলেন? বেশ গুছিয়ে?
নাহ বলি না, এখন বলছি ভেবে-চিন্তে ও গুছিয়ে।
ছেলেটি হাসে। ওহ, ছেলেটির নাম তপু। ‘আচ্ছা তপু, এই যে আপনাকে ডেকে আনলাম আমরা। আপনি কি যে কেউ ডাকলেই যেতেন?’
- উনি তো আমাকে ডাকেননি বললেন। আপনিই ডেকেছেন। আসতাম। কারণ আপনাদের আমি দেখেছি যখন আখ খাচ্ছিলাম তখন।
বাহ, বেশ স্মার্ট তো। আমি আগ্রহী হই। আমরা কথা বলতে থাকি। বহু পুরনো কোনো ইতিহাস খুঁড়ে আনা কথামালা। পদ্মার জলের ওপর ঝুলে থাকা আঁধার। ছলাৎ ছলাৎ ঢেউয়ের শব্দ আমাদের কথাগুলোকে আরো উজ্জীবিত করে। আমাদের চারপাশে দইওয়ালা হাঁকে। ছোট্ট ছোট্ট প্লাস্টিকের কাপে করে দই বিক্রি করছে। ছেলেটি বলে, খাবেন? আমি বলি, নিশ্চয়ই। আমরা দই কিনি। মহামিষ্টি দই। খেতে পারি না। সালমার জন্য যেটি কিনি সেটি হাতে ধরে রাখি।
হঠাৎ অন্ধকার ফুঁড়ে সালমা এসে দাঁড়ায়। বলে, ‘ঘাট এসে গেছে। চলো যাই এবার।’ সালমার হাতে দই দিতে দিতে আমরা গাড়ির দিকে এগোই। আমরা কেউ কোনো কথা না বলে যে যার মতো ফিরে যাই। গাড়িতে উঠি। কুসুমকুমারী ফেরি থেকে আমাদের গাড়িটি নামে ভিআইপিদের গাড়িরও বেশ কয়েকটি গাড়ি পর। তারপর রাস্তার ওপর ঝুঁকে থাকা গাছের সারিকে গাড়ির হেডলাইটের আলোয় বিয়ের গেইটের মতো মনে হতে থাকে আমাদের। কিন্তু ফিরতে ফিরতে আমরা দু’জনই আর সেই ছেলেটির কথা বলি না। কেন বলি না সেটি বলতে পারবো না। তবে আমার মাথায় বাদামওয়ালার কাছ থেকে বাদাম কিনে খাওয়া-পরবর্তী আর কোনো স্মৃতি নেই। কিন্তু স্মৃতি না থাকলে কী হবে, আমাদের গাড়ির পেছন ও সামনেটা ভর্তি করে নিয়ে আসি কচুশাক, ডাব, নারিকেল, মিষ্টি, পিপুল পাতা, রুম্বি কলা, আরো কতো কী! যেন পুরো শৈশব আমাদের গাড়িতে। আমরা ঢাকায় ফিরি। যে যার বাড়িতে নামি। কুসুমকুমারী ভিআইপি ফেরির কথা আর কখনো তুলি না আমরা।

 


আমার কথা শুনে ছেলেটি আবার হেসে ওঠে- বেশ উঁচু ও দরাজ হাসি। অন্ধকার একটু একটু করে গলে পড়ে সে হাসিতে। আমি ছেলেটির মুখ দেখতে পাই না আর। কিন্তু আমার মুখের ওপর আলো পড়ছে বুঝতে পারি। চোখে এসে লাগে। তবুও দাঁড়িয়ে থাকি আমি। বলি, ‘কী নাম আপনার?’
- ওই যে বললেন তপু। আমার নাম ধরুন তপুই।
যাহ! সত্যি নয়। সত্যি নাম বলুন। আচ্ছা থাক, বলতে হবে না। আপনার নাম তপু। তা তপু, কী করেন আপনি?
- আপনিই তো বললেন, টিভি চ্যানেলে কাজ করি। ধরুন, তাই করি।
আচ্ছা, না হয় তা-ই ধরলাম। কোথায় গিয়েছিলেন বা কোথা থেকে ফিরলেন?
- আপনি কি সব সময় এ রকম করে কথা বলেন? বেশ গুছিয়ে?
নাহ বলি না, এখন বলছি ভেবে-চিন্তে ও গুছিয়ে।
ছেলেটি হাসে। ওহ, ছেলেটির নাম তপু। ‘আচ্ছা তপু, এই যে আপনাকে ডেকে আনলাম আমরা। আপনি কি যে কেউ ডাকলেই যেতেন?’
- উনি তো আমাকে ডাকেননি বললেন। আপনিই ডেকেছেন। আসতাম। কারণ আপনাদের আমি দেখেছি যখন আখ খাচ্ছিলাম তখন।
বাহ, বেশ স্মার্ট তো। আমি আগ্রহী হই। আমরা কথা বলতে থাকি। বহু পুরনো কোনো ইতিহাস খুঁড়ে আনা কথামালা। পদ্মার জলের ওপর ঝুলে থাকা আঁধার। ছলাৎ ছলাৎ ঢেউয়ের শব্দ আমাদের কথাগুলোকে আরো উজ্জীবিত করে। আমাদের চারপাশে দইওয়ালা হাঁকে। ছোট্ট ছোট্ট প্লাস্টিকের কাপে করে দই বিক্রি করছে। ছেলেটি বলে, খাবেন? আমি বলি, নিশ্চয়ই। আমরা দই কিনি। মহামিষ্টি দই। খেতে পারি না। সালমার জন্য যেটি কিনি সেটি হাতে ধরে রাখি।
হঠাৎ অন্ধকার ফুঁড়ে সালমা এসে দাঁড়ায়। বলে, ‘ঘাট এসে গেছে। চলো যাই এবার।’ সালমার হাতে দই দিতে দিতে আমরা গাড়ির দিকে এগোই। আমরা কেউ কোনো কথা না বলে যে যার মতো ফিরে যাই। গাড়িতে উঠি। কুসুমকুমারী ফেরি থেকে আমাদের গাড়িটি নামে ভিআইপিদের গাড়িরও বেশ কয়েকটি গাড়ি পর। তারপর রাস্তার ওপর ঝুঁকে থাকা গাছের সারিকে গাড়ির হেডলাইটের আলোয় বিয়ের গেইটের মতো মনে হতে থাকে আমাদের। কিন্তু ফিরতে ফিরতে আমরা দু’জনই আর সেই ছেলেটির কথা বলি না। কেন বলি না সেটি বলতে পারবো না। তবে আমার মাথায় বাদামওয়ালার কাছ থেকে বাদাম কিনে খাওয়া-পরবর্তী আর কোনো স্মৃতি নেই। কিন্তু স্মৃতি না থাকলে কী হবে, আমাদের গাড়ির পেছন ও সামনেটা ভর্তি করে নিয়ে আসি কচুশাক, ডাব, নারিকেল, মিষ্টি, পিপুল পাতা, রুম্বি কলা, আরো কতো কী! যেন পুরো শৈশব আমাদের গাড়িতে। আমরা ঢাকায় ফিরি। যে যার বাড়িতে নামি। কুসুমকুমারী ভিআইপি ফেরির কথা আর কখনো তুলি না আমরা।

Page 2 of 3

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…