Page 2 of 2

জীবিকার আশ্চর্য গণিত

মৃণাল বসুচৌধুরী

 


‘র্নিবাসন’ শব্দটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে শান্তির বিধান। আমার ক্ষেত্রে হয়তো তেমন ছিল না। ‘স্বেচ্ছানির্বাসন’ নিয়ে নিজেই নিজেকে দ- দেওয়ার ইচ্ছা হয়েছিল খুব। বিষাদ বা অভিমান নয়, উদাসীন এক ভালোবাসার হাত ধরে আমি হারিয়ে যেতে চেয়েছিলাম এই চেনা পৃথিবী থেকে। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রশ্ন করিনি তা নয়। কিন্তু প্রতিবারই মনে হয়েছিল, আলোর পেছনে ছায়া কিংবা প্রতিছায়া, জলের ভেতরে মাটি ও শ্যাওলার কাজ থেকে শুরু করে পুরো জীবন ধরে যে বঞ্চনার ইতিহাস বা ধারাবাহিক অবহেলা মলিন করে তুলেছে চরাচর তা নিয়ে প্রশ্ন করে লাভ নেই। খুঁজে লাভ নেই সোনালি অতীত কিংবা অমরাবতী, অলৌকিক সৎ উচ্চারণ, স্পষ্ট অঙ্গীকার, পারস্পরিক বিশ্বাসের সুখ। জীবন যেভাবে আসে সেভাবেই তাকে বরণ করে নেওয়ার মধ্যেই বেঁচে থাকার স্বকীয় আনন্দ।
জন্মমুহূর্ত থেকে আজ পর্যন্ত যা শিখেছি তা শিখিয়েছে জীবনই। শিখিয়েছে বেঁচে থাকার আমল কৌশল। আনন্দ-উল্লাস, সাফল্য ও সুখের পাশাপাশি দুঃখ, বিষাদ, হতাশা কিংবা ব্যর্থতার সহাবস্থানের নির্মম সত্য। তা সত্ত্বেও কখনো কখনো ওই চেনা জীবনই যেন অচেনা হয়ে সামনে দাঁড়ায়।
১৯৮৭ সালে ধারাবাহিক অবহেলা প্রকাশিত হওয়ার পর খুব দ্রুততার মধ্যেই আমায় চলে যেতে হয় বিদেশে সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর দরজায়। এমনিতেই ‘শব্দভ্রমের সন্ধান’-এর নিঃসঙ্গ একাকী পথচলা আমাকে ক্লান্ত করেছিল তখন। এর উপর দেশ ছাড়ার দুঃখ আমাকে উপহার দিয়েছিল ভুবনজোড়া অভিমান। কবিতাকে র্নিবাসন দিলাম আমার জগৎ থেকে সজ্ঞানে।
শৈশব আমার নতমুখ জীবন যাপনে অভ্যস্ত করেছিল অস্পষ্ট ব্যবধান ও স্পষ্ট আড়াল নিয়ে বুকের মধ্যে উন্মাদ আগুন পুষে রেখে মানুষের উপেক্ষা-অবহেলা সব পেরিয়ে। আলোর ভেতরে পৌঁছানোর সব রাস্তা দেখিয়েছিল। মিডিয়া বা খ্যাতি নয়, এ এক রহস্যময় পবিত্র নীলিমার

আলো। তা বিষাদ অম্লান, মায়াময়ী এক নিশিকন্যার চোখের মতো অধরা ও লোভহীন। ওই শৈশবই আমাকে শিখিয়েছিল কীভাবে পরশ্রীকাতর সাপের ছোবল এড়িয়ে ছায়াহীন পরাবাস্তবতার দিকে এগিয়ে যেতে হয় সঙ্গীহীন একা।
নিঃসঙ্গ নিজেকে মুখোমুখি বসিয়ে কথা বলা আমার পুরনো অভ্যাস। নিজের সঙ্গেই হেঁটেছি সারা জীবন। অনভ্যস্ত সুখের অসুখে, পরিশ্রমা অক্ষর বুননে এতো দিন কেটেছে সময়। এখন মুক্ত। এবার বিশ্রাম। স্মৃতির শিকড় ছিঁড়ে অক্ষরবিহীন মুগ্ধ বেঁচে থাকা। অথৈ জলের চাঁদ ও মোমের পুতুল নিয়ে মায়াবী ভ্রমণ।
পূর্ণেন্দুদা বলতেন, ‘বিছানা-বালিশে মানুষ একা। আর একা হলেই নিজের কাছে নতজানু মানুষ।’ কিন্তু আমি একা থাকলেই বিছানা, বৃষ্টি ও কুয়াশা ঠেলে ফেলে আমার দিনগুলো সামনে দাঁড়ায়। ফিরে আসতো প্রিয় মানুষের মিছিল।
দেওঘরে পূর্ণেন্দুদার সঙ্গে তুমুল আড্ডায় কেটেছিল কয়েকটি রাত। ‘খরা’ ছবির শুটিং উপলক্ষে সেখানে যাওয়া। ওম পুরি কুলভূষণ, খারাবান্দা, অরবিন্দ খোশী, ধৃতিমান চট্টোপধ্যায়, ভাস্কর চৌধুরী, শ্রীলা মজুমদার, স্নিগ্ধা বন্দ্যেপাধ্যায় অভিনয় করেছিলেন ওই ছবিতে। প্রেম ফটোগ্রাফারের ভূমিকায় ছিলাম আমি। মনে আছে, যেখানে থাকতাম আমরা সেখানে ঢোকার মুখে একটা গোলচত্বরে টেবিল সাজিয়ে আড্ডা হতো আমাদের। সারা দিন শুটিং করার পর প্রায় শেষ রাত পর্যন্ত অড্ডা চলতো কোনো কোনোদিন। কতো রকম কথাই যে বলতেন পূর্ণেন্দুদা! কখনো বুনুয়েলের প্রথম ছবি ‘আন চেন আন্দালু’ যেখানে খোলা চোখের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে ধারালো ক্ষরের ফলা, কখনো বাগম্যানের ওয়াইল্ড স্ট্রবেরিজ, কখনো কখনো সত্যজিৎ, ঋত্বিক আবার কখনো বা নিজের ছবি ‘ছোট বকুলপুরের যাত্রী’, ‘স্ত্রী পত্র’। একেকদিন শুধু গান ও কবিতা। এর মধ্যে কখনো কখনো একদম চুপ করে বসে থাকতেন তিনি। জিজ্ঞাসা করলে বলতেন, কী কী করতে চাই, করা বাকি এর একটি তালিকা তৈরি করছিলাম মনে মনে।
মনে আছে, একদিন অন্যরা ঘুমাতে গেলেও পূর্ণেন্দুদা বসে থাকলেন। আমাকেও বসিয়ে রাখলেন। কবিতা শোনালেন। এভাবে সারা রাত কবিতা শুনিয়েছিলেন সেদিন। শুরু করেছিলেন ‘কথোপকথন’-এর একটি কবিতা দিয়ে। বলেছিলেন, নন্দিনীকে পাওয়ার জন্য সারা জীবন শুভঙ্কর হয়ে থেকে গেলাম। নন্দিনীকে তো পেলামই না, পূর্ণেন্দু হয়ে ওঠা হলো না আমার। যাই হোক, শোন।
নন্দিনী আমার কী দোষ? ডেকেছি বহুবার
কিন্তু তোমার এমন টেলিফোন
ঘাটের মড়া নেই কো কোন সার।
শুভঙ্কর বাতাস ছিল, বাতাসে ছিল পাখি
আকাশ ছিল, আকাশে ছিল চাঁদ
তাদের বললে খবর দিত নাকি?
কবিতাটি শেষ করে আমার দিকে একবার তাকিয়ে হেসেছিলেন একটু। তারপর অদ্ভুদ ঘোরের মধ্যে পড়েছিলেন একের পর এক কবিতা। মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতে শুনতে দেখেছিলাম সজু অথচ বিষন্ন উচ্চারণে কীভাবে শুভঙ্কর ও নন্দিনীকে মূর্ত করে তুললেন তিনি।

কাব্যনাটকে অভিনয় করার সময় থেকেই মনে মনে ভাবতাম একদিন, কোনো একদিন আমাকেও লিখতে হবে কাব্যনাটক। পূর্ণেন্দুদার শুভঙ্কর ও নন্দিনী প্রতিদিন যেন মনে করিয়ে দিতো আমার ওই ঘুমন্ত ইচ্ছাটাকে। পারিনি। অনেক চেষ্টা করে ‘স্বর্গ থেকে নীলপাখি’ নামে একটি সংলাপ কাব্য লিখেছিলাম। পছন্দ হয়নি নিজের। কিন্তু কেন জানি না বিশিষ্ট আবৃত্তিকার পার্থ ঘোষ ও গোরী ঘোষ খুব ভালোবেসে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পড়তেন ওই লেখাটি। পরে তাদের একটি সিডিতেও এই পাঠ রেখেছিলেন। স্তর চাইান। সিডির নামই দিয়েছিলেন ‘স্বর্গ থেকে নীলপাখি’।
ছিন্নভিন্ন শিকড় বেয়েও কখনো কখনো উঠে আসে স্মৃতিমাখা হলুদ পোকাগুলো। একটার অনুষঙ্গে আরেকটি এসে দাঁড়ায়। পার্থদা গৌরীদির কথায় প্রদীপদা, প্রদীপ ঘোষের কথা আসে। আমি গত জন্মে হয়তো কিছু পুন্য করেছিলাম। তাই এ জন্মে এই তিন দিকপালের কণ্ঠে পরিবেশিত হয়েছে আমার কবিতা। এই তিনজন ও রমা সিমলাইয়ের মিলিত পরিবেশনায় ‘কুয়াশার রোদে’ নামে একটি সিডি প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু সেসব অনেক পরের কথা। এই লেখায় গৌরিদি এলেন পূর্ণেন্দুদার হাত ধরেই। ‘স্তহাচিত্র’ ছবিতে তিনি অভিনয় করেছিলেন একটি বিশেষ চরিত্রে। মনে আছে, দক্ষিণ কলকাতার একটি নার্সিংহোমে শুটিং হয়েছিল আমাদের। পূর্ণেন্দুদার সঙ্গে কাজ মানেই ভয় ও আনন্দ। ভীষণ পারফেকসনিস্ট ছিলেন বলেই কোনো অভিনেতাকেই ছেড়ে দিতেন না তিনি। এর পাশাপাশি ঠিকঠাক কাজ শেষ করতে পাললে মেতে উঠতেন গানে। শুরু হতো অনাবিল আনন্দ সভা হাসি-ঠাট্টার।
অফিসের পেছন দিকে রাস্তার ওপারে যে ফ্ল্যাটে থাকতাম এর নম্বর ছিল ৪০২। আশ্চর্যজনকভাবে এরপর যেখানেই বদলি হয়েছি সর্বত্রই ৪০২ নম্বর ফ্ল্যাটই বরাদ্দ করা হয়েছে আমাকে। এমনকি মুম্বাইয়ে ১৩ তলার ওপর আমার ফ্ল্যাটটি ছিল ১৩০২। এটিকে প্রকারান্তে ৪০২-ই বলা যায়। কাকতালীয় হয়তো। কিন্তু প্রতিবারই বেশ অবাক হয়ে যেতাম। মনে আছে, প্রথম দিন ফ্ল্যাটে এসে মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল খুব। সুন্দর আসবাবপত্রে ভরা বিশাল ফ্ল্যাটে একা থাকতে হবে ভাবতেই বিষণœ হয়ে যাচ্ছিলাম। বছরে দু’বার স্কুল ছুটির সময় তপতা ও অরুন্ধতা যেতো সেখানে। আর আমি সত্যি সত্যিই দিন গুনতাম।

অফিসে আমার সেক্রেটারি ছিলেন দক্ষিণ ভারতীয় নারী। দুবাই বিমানবন্দরে চাকরি নিয়ে তার স্বামী এসেছিলেন কেরেলা থেকে। ওই সূত্রে তার এ দেশে আসা। ম্যাডাম আনাম্মাই আমাকে প্রয়োজনীয় সবকিছুর ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। চিনিয়ে দিয়েছিলেন ভিডিও লাইব্রেরি, কেনটিকির দোকান, কিছু রেস্তোরাঁ এবং ওষুধেরে দোকান। আর এক সহযোগী অরজিত গারদে আমাকে সঙ্গ দিতেন অফিসের পর। শারজাহে বাড়ি ফিরে সন্ধ্যাবেলা কিছুই করার থাকতো না। তাই অরজিতের সঙ্গে গিয়ে দু’একদিনের মধ্যেই কিনে এনেছিলাম টিভি, ভিসিআর ও ক্যাসেট প্লেয়ার। বাড়িতে রান্না তখনো শুরু করেনি। কেননা যত অল্প টাকারই খাবার হোক, ফোন করলে বাড়িতে দিয়ে যেতো প্রায় সব রেস্তোরাঁ। টিভি আনার পর নিঃশব্দ-নির্জন ফ্ল্যাটে যেন প্রাণ এসেছিল।
কলকাতা থেকে আসার সময় রবীন্দ্রসঙ্গীতের কয়েকটি ক্যাসেট নিয়ে গিয়েছিলাম। ঘর অন্ধকার করে মাঝে-মধ্যেই শুনতাম আমার প্রিয় গানগুলো। কোনো কোনোদিন একই গান শুনতাম বারবার।


‘অল্প লইয়া থাকি তাই মোর যাহা যায় তাহা যায়
কনটুকু যদি হারায় তা লয়ে প্রায় করে হায় হায়’


দুপুর ও রাতে সময় পেলেই শুনতাম এ গানটি। কেন জানি শিল্প-সংস্কৃতি, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন সবকিছু ছেড়ে এতো দূরে একা পড়ে থাকতে ভালো লাগতো না একেভারেই। চাকরিতে উন্নতির থেকে আমার কাছে বেশি মূল্য ছিল কবিতার শব্দ-সাধনায়। এর পাশাপাশি কিছু না পেতে পেতে অর্জনরে আনন্দটাও হারাতে চাইতাম না। বিদেশে চাকরি করার সুযোগ ক’জনই বা পান।
‘ইমোশনাল স্ট্রেস’ কোনোদিনই সহ্য করতে পারি না। অথচ আমার দিনযাপনের অধিকাংশ দিনই বঞ্চনার ইতিহাস। কোনো নিঃস্ব-রিক্ত মানুষের ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়ার কাহিনী। ডিপ্রেশনের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য ঘুমের ওষুধ খাওয়ার অভ্যাস অনেক পুরনো। শারজাহে গিয়ে ঠিক করেছিলাম, যেহেতু একা থাকি সেহেতু অধিকাংশ সময় এ অভ্যাসটা ছাড়তে হবেই। কলকাতা ছাড়ার আগে আরব দেশের অনেক গল্প শুনেছিলাম। এখানে নাকি রাতে হাঁটা যায় না, মেয়েদের নিরাপত্তা নেই, রাস্তাঘাটে মাতাল ভর্তি, অপরাধ করলে কঠিন সব শাস্তি এমন ভয় দেখানো কথাবার্তা শুনে বলা বাহুল্য, একটু ভয়ে ভয়ে থাকতাম

 

প্রথম কিছুদিন। এরপর অবাক হয়ে দেখলাম, নারীরা এখানে খুব নিরাপদ। মাঝরাতে কোনো নারী ঘোরাফেরা করলেও তার বিপদ নেই। কেননা যে কোনো নারী অভিযোগ করলেই পুলিশ অভিযুক্তকে ধরে নিয়ে আসে থানায়। মনে পড়ছে, মাঝে-মধ্যে গভীর রাতে টেলিফোন আসতো বেশির ভাগ সময়ই কোনো না কোনো নারী। বুঝতে পারতাম, র‌্যান্ডম ডায়ালিং করে যাকে পায় তার সঙ্গে কথা বলা তাদের অভ্যাস। ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে দু’একটা কথা বলার পরই রেখে দিতো। পাছে কোনো সমস্যা তৈরি হয় এ ভয়ে কখনোই এসব ফোন এলে কথা বলতাম না। এই নীরবতার জন্য তাদের মুখ থেকে কটূক্তি শুনতে হয়েছে মাঝে-মধ্যে।
একদিনের কথা খুব মনে আছে। দুপুরে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম একটু। ওই সময়ই বেজে উঠেছিল টেলিফোন। রিসিভারটা তুলতেই ছোট একটি ছেলের গলা ভেসে এসেছিল। বলেছিল, ‘, তোমার সময় আছে? একটু কথা বলবে আমার সঙ্গে? বাড়িতে কেউ নেই। কাজের মালিও বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে কোথায় যেন গেছে। ভয় করছে খুব..., একটু কথা বলেন না আংকল...। না বলে পারিনি। বেশ কিছুক্ষণ কথা বলে জানতে পেরেছিলাম, তার মা মারা যাওয়ার পর বাবা আবার বিয়ে করেছেন। নতুন মা তাকে মারধর করে। কিন্তু বাবাকে সে কিছুই বলে না। কেননা তার বাবা খুব ভালোবাসেন তাকে। নামে ওই নিঃসঙ্গ শিশু অরুণের বন্ধু হয়ে গিয়েছিলাম। ফোনের বন্ধু। মাঝে-মধ্যই ফোন আসতো তার। সঙ্গীহীন ওই শিশুটির আর্তি আমাকে মনে করিয়ে দিতো আমার শৈশব। একাকিত্ব কখন যে কাকে, কীভাবে ছিন্নভিন্ন করে দেয় তা কে জানে।
রাস্তাঘাটে মাতালরা ঝামেলা করে শুনেছিলাম। শোনা কথায় না জেনে কতো কী যে বলে মানুষ! লাইসেন্স না থাকলে মদ্যপান নিষিদ্ধ ছিল শারজাহে, এমনকি বাড়িতে বসে মদ্যপান করার জন্য লাইসেন্স লাগতো। ওই ছাড়পত্র ছাড়া ওয়াইন স্টোর থেকে কিছু কেনাই যায় না। ওই দোকান ছিল শহরের বাইরে। দোকান থেকে কিনে সোজা বাড়িতে যেতে হতো ক্রেপারে। দুবাইয়ে অবশ্য শিথিল হয়েছে নিয়ম-কানুন। ড্রিংকস করে গাড়ি চালালে পুলিশ ধরতো। তারা চালিয়ে গাড়িটা নিয়ে যেতো থানায়। বসিয়ে রাখতো সারা রাত। সকালে নেশা ছুটলে ছেড়ে দিতো।
স্বর্ণের বাজার দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে প্রায়ই দেখতাম দোকান খোলা। কিন্তু ভেতরে ক্রেতা-বিক্রেতা কেউ নেই। নামাজের সময় সবাই নামাজ পড়তে গেছেন। চুরির ভয় নেই এমন একটি প্রশ্নের উত্তরে সহকর্মী বলেছিলেন, না, চোর ধরা পড়লে হাত কাটা যায়। অবাক হয়ে হেসেছিলাম। একজন বলেছিলেন, “একজন দু’বারের বেশি চুরি করতে পারবে না।” সহকর্মী যোগ দিয়েছিলেন হাসিতে ‘হ্যাঁ, দুটোর বেশি আর হাত যে নেই।’
পশ্চিম ও উত্তর দু’দিকে দুটি বারান্দা ছিল আমার ফ্ল্যাটে। পশ্চিম বারান্দায় বের হওয়া যেতো না। পুরনো আসবাপত্র, ওয়াশিং মেশিং জড়ো করা ছিল সেখানে। তাছাড়া ওই বারান্দা ছিল গোটা পনেরো পায়রার দখলে। এখানে পায়রাগুলোর রাজত্ব, ঘর-সংসার। পুরনো আসবাবপত্র বা কোনো কিছুর পুনরায় বিক্রয় মূল্য নেই ওই দেশে। সরকারি জিনিসপত্র ফেলার বিভিন্ন অসুবিধার কথা ভেবেই বোধহয় আগে যারা থাকতেন তারা আর কোনো ঝামেলায় যাননি। সুন্দর পায়রাগুলোর জন্যই রেখে গেছেন ওইসব। উত্তরের বারান্দাটি আমার খুব প্রিয় ছিল। মাঝরাতে যখন ঘুম আসতো না তখন প্রায়ই গিয়ে দাঁড়াতাম সেখানে। কখনো কখনো একটি চেয়ার টেনে বসে থাকতাম সারা রাত। শেষরাতে দু’এক ঘণ্টা কেমন জানি মায়াবী হয়ে যেতো রাস্তাঘাট। সুন্দর, উজ্জ্বল, স্বপ্নময় মনে হতো। এটিই বোধহয় স্বপ্ন নগরীর মাঠে থাকা রাস্তা। যেখানে ছড়িয়ে আছে সুখ সেখানে ছোটাছুটি করে নিষ্পাপ শিশুরা, রামধনু রঙ মেখে বেড়াতে আসে পরীদের রানী। শুধু পূর্ণিমায় নয়, সেখানে প্রতিটি রাতে জ্যোৎস্না খোলা করে। ওই জ্যোৎস্নার হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে যাই সাদার্ন মার্কেটের সামনের ট্রামলাইনে। সেখানে মধ্যনিশিথে শেষ স্ট্রাম চলে গেলে আড্ডা মারতাম আমি ও সুপ্রিয়দা।
আমি তখন কবির রোডে থাকি। পাশের বাড়িতেই থাকতো রতেœশ্বর। কবি রতেœশ্বর হাজরা। তারই সহায়তায় আমার আস্তানা খুঁজে পাওয়া। আমার সৌভাগ্য, রতেœশ্বরের অনেক কবিতারই প্রথম পাঠক ছিলাম আমি সে সময়। সুপ্রিয়দা খুব মুক্তমনের মানুষ। আমার মধ্যে যে গ্রাম্য মানসিতকা ছিল তা ঝেড়ে ফেলতে পেরেছিলাম সুপ্রিয়দার মতো মানুষের সন্নিধ্যে এসে।
কখনো কখনো একটু অবাক হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। ধন্যবাদ জানাতাম অদৃশ্য ঈশ্বরকে। পিতৃহীন হওয়ার পর যেভাবে আমার জীবন কেটেছিল এতে কখনো ভাবিনি নিজের ক্ষমতায় বিদেশে এসে চাকরি করবো। মনে আছে, এই চাকরিতে যখন জয়েন করি তখন মাইনে ছিল ২২০ টাকা। ব্রাবোর্ন রোডে ছিল আমার প্রথম অফিস। আমার বস ছিলেন মোহিত সেন। আমাকে কাজকর্ম বুঝিয়ে দিয়ে তিনি বলেছিলেন, স্পষ্ট মনে আছে ‘ইয়াংম্যান, জীবনে কোনো সমস্যা হলে আমার কাছে এসো, সাফল্যের দিনে নয়। সেগুলো সব তোমার।’ ওই অসাধারন একটি বাক্যের জন্য আজীবন নতজানু হয়ে থেকেছি তার কাছে।
পূর্ণেন্দুদার কথোপকথন ছাড়া আমার দুটি কবিতার বই ‘এই নাও মেঘ’ ও ‘ধারাবাহিক অবহেলা’ নিয়ে গিয়েছিলাম প্রথমবার। খুব মন খারাপ হয়ে গেলেও তখন কোনো কবিতার বই ছুঁয়ে দেখতাম না। কিন্তু মন কী সব সময় এসব বাধা-নিষেধ মানে! তাই দীর্ঘ একটি সোফায় শুয়ে কখনো কখনো চলে যেতাম কফি হাউসে, কলিকাতায়। আমার বস মোহিত সেনের ওই অসাধারণ কথাটির মতো আরেকজনের একটি উপদেশ এই বৃদ্ধ বয়সেও মাথায় রেখেছি। একদিন কথা প্রসঙ্গে প্রনম্য সাহিত্যিক দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যেপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘যারা তোমার প্রশংসা করবে তাদের নয়, যারা সমালোচনার সাহস দেখাবে তাদের শ্রদ্ধা করো। অবশ্যই ওই সমালোচনা যদি নিরপেক্ষ হয়...।’ ভাবতে ভালো লাগে ওই সময় আমাদের যৌবনে আমরা শিক্ষকপ্রতিম কতো মানুষকে কাছে পেয়েছিলাম।
কবিতা থেকে মুখ ফিরিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলাম রবীন্দ্রনাথের গানে। যখনই একা থাকতাম তখনই শুনতাম তার গান। একই ক্যাসেট বারবার। কিন্তু এই রবীন্দ্রনাথ তার গানের ডালি নিয়ে কবে এলেন আমার কাছে? ঠিক কোথায় পেলাম তাকে? কবেই বা তিনি হয়ে উঠলেন আমার রবীন্দ্রনাথ? ... ভাবতে ভাবতে চলে যেতাম শৈশবে যখন মায়ের গলায় ‘চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙেছে’ শুনেছিলাম।
প্রথম যেদিন স্কুলে যাই সেদিন প্রার্থনা গানের জন্য সারি সারি লাইনে দাঁড়ানো ছেলেমেয়েদের পেছনে দাঁড়াতে হয়েছিল। গানটি ছিল ‘সংকোচের বৃক্ষলতা নিজের অপমান/সংকটেরও কল্পনায় হয়ো না ম্রিয়মাণ/... মুক্ত করো ভয়...।’ সুরটি ঠিকমতো জানতাম না। মনে আছে, রতে মায়ের কাছে শিখে পরদিন গলা মিলিয়েছিলাম। মায়ের কাছেই শুনেছিলাম গানটি রবীন্দ্রনাথের। কিছুদিন পর স্কুলের একটি অনুষ্ঠানের জন্য শিখেছিলাম, ‘বরবায় বয় বেগে।’ খুব মুগ্ধ হয়ে গাওয়ার চেষ্টা করতাম

‘শৃঙ্খলে বারবার ঝন ঝন ঝঙ্কার নয়, এ তো তরুণীর ক্রন্দন শঙ্কার
বন্ধন দু’বার সহ্য না হয় আর টলেমেনও করে আজ তাই ও
হাই করে মারো মারো জিন হাঁইয়ো।’


ওই গানটি সম্পর্কে আমার মুগ্ধতার কথা জেনে আমাদের ক্লাসের দীপিকা বলেছিলেন, ‘রবীন্দ্রনাথ, তাসের দেশ।’ এরপর ময়ল স্যার। তিনি আমাদের ভূগোল পড়াতেন। তিনি শিখিয়েছিলেন দু’একটি অসম্ভব রবীন্দ্রসঙ্গীত। মাঝে-মধ্যে পাশের বাড়ির রিতুদিকে গাইতে শুনতাম, ‘যা তা আগলে বসে রইক কত আর?’ কোনো কোনোদিন হারমোনিয়াম বাজিয়ে গাইতেন, ‘চোখের আলোয় চেয়েছিলাম, চোখের বাহিরে/অঙ্করে আজ দেখব, যখন আলোক নাহি রে...।’
এভাবেই হয়তো ধীরে ধীরে রবীন্দ্রনাথ এগিয়ে এসেছিল আমার দিকে অথবা আমি তার দিকে। তখন বোধহয় ক্লাস টেনে পড়ি। রবীন্দ্রজয়ন্তী হচ্ছে স্কুলে। বিশেষ একটা বাড়ির দিকে পা বাড়াতেই কানে এলো, ‘কাল রাতের বেলা গান এলো মোর মনে/তখন তুমি ছিলে না মোর সনে...।’ ক্লাস নাইনের আত্রেয়ী গাইছিলাম। এতো দিন চেনা বন্ধু আত্রেয়ীকে অন্য গ্রহের বাসিন্দা মনে হয়েছিল। গান শেষে এগিয়ে গিয়ে কিছু না বলে একটু হেসেছিলাম। সেদিন চোখ দুটো নিশ্চয়ই জানিয়েছিল আমার দিব্য মুগ্ধতা।
এসবের মধ্যেই হঠাৎ করে যেন শেষ হয়ে গিয়েছিল স্কুল জীবন। এরপর কলেজ, কলকাতা টিউশনি, মেসবাড়ির আবর্তে, যান্ত্রিক টানাপড়েনে কাটছিল দিন। এর মধ্যেই রবীন্দ্রনাথ বেজে উঠতেন বুকের মধ্যে ‘তোমার যে বলা দিবস রজনী, ভালোবাসা, সখী ভালোবাসা কারে কয়! সে কী কেবলই যাওনাময়।’ আরেকদিন ঘোর বর্ষায় মোর বাড়ির পাশের একটা জানালা থেকে ভেসে এসেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ‘উতলধারা বাদল ঝরে/সকালবেলা একা ঘরে।’ এ রকমই টুকরো টুকরো গানের বলি নিয়ে কাটছিল আমার মন খারাপ করা দিনগুলো।

ওই সময়ই সদ্য আলাপ হওয়া বিকাশ লাবণ্য, কেটি মিত্তিরের বেশ কাটতে না কাটতেই হাতে পই ‘গোরা’। এরপর ‘চতুরঙ্গ’ চার অধ্যায়। এভাবেই আমার রবীন্দ্রনাথ শুরু। মহামানবকে আপন করে নেয়ার সামান্য প্রয়াস।
এরপরই নতুন করে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আমার জীবনে আসে তপতী। গীতবিজ্ঞানের সব গান তার কণ্ঠস্থ। তার হাত ধরেই নতুন করে আবিষ্কার করা রবীন্দ্রনাথকে। শৈশব থেকে আজ পর্যন্ত তার গানের মধ্যেই মূলত তাকে পাওয়া।শারজাহে অনেক নিঃসঙ্গ রাতের সঙ্গী ছিল রবীন্দ্রনাথের গান। আবুধাবি, দুবাই, শারজাহ, অজমান, উম্মল কোয়েন, রাস-আল- কোইমা ও ফুজিয়ারা এ সাতটি আমিরশাহীকে নিয়েই সংযুক্ত আরব আমিরশাহী। আবুধাবির রাজা বা আমির ওই সংযুক্ত আমিরশাহীর প্রেসিডেন্ট। প্রথম মাসখানেক কাজের চাপ, ফ্ল্যাট পাওয়া, গোছানো এসব কেড়েছে কিছুদিন। নতুন কাজকর্মে অভ্যস্ত হয়ে পড়ার পর অন্য শাখার সহকর্মীদের সঙ্গে মেলামেশা বাড়লো। বৃহস্পতিবার আধবেলা অফিস করার পর কারো না কারোর বাড়িতে আসর বসতো আমাদের। আঞ্চলিক অধিকর্তার অফিস ছাড়াও দেশে আমাদের ৬টি শাখা ছিল। ভারত থেকে যাওয়া অফিসারের সংখ্যা ছিল ১৬। প্রতি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যাবেলা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আসর বসতো আমাদের। আবুধাবি, দুবাই, শারজাহ সব ব্রাঞ্চের বন্ধুরা মিলে খুব আনন্দ করে কাটাতাম ওই দিনগুলো।
দুবাই শহরের মাঝখান দিয়ে একটা খাঁড়ি আছে। এই ‘আব্রা’র দু’পাশে শহর। একাধিক দুবাই। অপর পাড়ে ডেরা। মোটরবোটেই পার হয় মানুষ। গাড়ি যাওয়ার রাস্তা জলের মধ্যে দিয়ে একটা সুড়ঙ্গ আছে। প্রথম দিন যাওয়ার সময় এক বন্ধু জানিয়েছিল, ‘জানো তো, এই টানেলের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে জল...।’ বিশ্বাস হয়নি প্রথমে। ওই অসম্ভবকে সম্ভব করা হলো কীভাবে তা বুঝতেও সময় লেগেছিল কয়েকদিন।
ছুটির দিনগুলোর নিঃসঙ্গতা এড়াতে বেরিয়ে পড়তাম শারজাহে সমুদ্র কিনারে, কখনো বা দুবাইয়ের জুমেইরা বিচে। তখন জাবেলালি শিল্প কেন্দ্র গড়ে উঠেছিল আস্তে আস্তে। আবুধাবির দূরত্ব ছিল ২০০ কিলোমিটারের মতো। সারা দিন ঘোরাঘুরি করে ফিরে আসতাম রাতে। সেখানকার অ্যামিসমেন্ট পার্কটি ছিল খুব সুন্দর। তখন ওই দেশে কোনো ট্রেন ছিল না। এ জন্যই বোধহয় টয়ট্রেনে ভিড় হতো খুব। বন্ধুরা সবাই রোলার কোস্টার ও উঁচু নাগরদোলায় মজা করতাম খুব।
আরো একটি জায়গা ছিল আমার প্রিয় খরফোকান। ফুজিয়ারা আমিরশাহীর একটা শহর। গলফ অফ ওমানের তীরে ওই শহরে যাওয়ার পথে ছোট ছোট পাহাড় ছিল কয়েকটা। হিমালয়ের দেশের মানুষ আমি। তবু ওই পাহাড়গুলো আমাকে চিনতো ভীষণ। মানুষ যখন একা সঙ্গীহীন হয়ে যায় তখন বোধহয় সবকিছুই ভালো লাগে তার। আমার অন্তত তা-ই হতো। তবে শুনেছি, নিঃসঙ্গতার বোমা বইতে বইতে মানুষ যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ে তখন আর কিছুই ভালো লাগে না তাদের। সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের উটের পিঠে চড়ে মরুভূমির মধ্যে বেড়াতে বেড়াতে খুব ইচ্ছা হতো হারিয়ে যাওয়ার। আদি-অন্ত ছাড়িয়ে থাকা বালির মধ্যে মুখ গুঁজে শুয়ে থাকার মতো আনন্দ আর কিছু নেই বলেই মনে হতো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনোটাই হয়ে ওঠেনি।

আবদুল মান্নান সৈয়দের
স্মৃতির নোটবুক ও অন্যান্য

মনজু রহমান

 


আবদুল মান্নান সৈয়দকে নিয়ে খুব বেশি লেখালেখি হয়েছে বলা যাবে না। তার সাহিত্যকর্মের দিক নিয়ে অনেকেই বিচ্ছিন্নভাবে টুকটাক লিখেছেন। কিন্তু পুরো মান্নান সৈয়দকে কোনো আলোচকই টেনে আনার চেষ্টা করেননি। কারণ মান্নান সৈয়দ প্রচারমুখী লেখক ছিলেন না। অথচ তিনি বাংলা সাহিত্যের এমন কোনো মাধ্যম নেইÑ যেখানে সহজ ও সাবলীল কৃতিত্ব রেখে যাননি। এই বহুমাত্রিক লেখককে এক সময় বলা হতো সব্যসাচী লেখক। ষাটের লেখকদের মধ্যে তাকে বলা হতো সবচেয়ে উচ্চারণ সমৃদ্ধ লেখক, লেখকদের আইডল। প্রবন্ধ, নিবন্ধ, গল্প, উপন্যাস, গবেষণা, নাটক, কবিতা, সম্পাদনাÑ সাহিত্যের সব মাধ্যমে অনায়াসে বিচরণ করেছেন। যখন গল্প লিখেছেন তখন তিনি পুরোপুরি গল্পকার, উপন্যাস লিখেছেন উপন্যাসিকের চরিত্র নিয়েই, নিবিষ্ট গবেষক হিসেবে লিখেছেন বিভিন্ন গবেষণাগ্রন্থ, নাটকের ক্ষেত্রে তার স্বাতন্ত্র্যতা বজায় রেখেই নাটকে হাত দিয়েছেন, কবিতার ক্ষেত্রেও কাব্যিক ব্যঞ্জনা সানন্দে ব্যবহার করে হয়ে উঠেছেন সব্যসাচী কবি। কবিতায় তিনি পরীক্ষা-নিরীক্ষা কম করেননি। উত্তর-আধুনিকতা এবং পরাবাস্তবতার সমন্বয় ঘটিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন কবিতার নতুন দর্শন। তিনি লিখেছেন অনেক, অনুবাদেও সিদ্ধ ছিলেন। করেছেন অজস্র লিটলম্যাগ সম্পাদনা। লিটলম্যাগ তার ধ্যান-জ্ঞান ছিল। তিনি বলতেন, কোনো দৈনিক বা দৈনিকের বিশেষ সংখ্যায় লেখা না দিয়ে আমি সে লেখাটি দিতাম কোনো লিটল ম্যাগাজিনে।


দুই.
আবদুল মান্নান সৈয়দ বিভিন্ন গ্রন্থ রচনা করলেও প্রথম যৌবনে নিয়মিত ডায়েরি লিখতেন। সারা দিনের ঘটনাপঞ্জি টুকে রাখতেন নোটবুকে। তার জীবনের টুকরো টুকরো ঘটনাপ্রবাহ নিয়েই সাহিত্যের বর্ণাঢ্য ব্যক্তিত্বের একটি মাত্র গ্রন্থ ‘স্মৃতির নোটবুক’ পাঠকদের হাতে তুলে দিয়েছেন শিল্পতরুর কর্ণধার কবি আবিদ আজাদ। ওই নোটবুক তিনি শুরু করেছেন তার আঁতুড়ঘর থেকে। তার গ্রিন রোডের অনুঘণ্টক উঠে এসেছে ‘কুলিরোড’ শিরোনামে। তিনি বলেছেন, ‘বায়ান্ন বাজার আর তেপ্পান্ন গলির এই ঢাকা শহরের কুলিরোড খুঁজে পাবেন কেউ? পাবেন না। কারণ রাস্তার নামটাই আজ বদলে গেছে, হয়েছে গ্রিন রোড।’ এখানে চলত গরুর গাড়ি, চারপাশে কাঁচারাস্তা, সবুজে ঢাকা ধানক্ষেত, বিশাল বিশাল আম-কাঁঠালসহ বিভিন্ন গাছ, রাস্তাটি অবহেলায় নেমে গেছে দৃষ্টির বাইরে।
দশ ভাইবোনের মধ্যে একমাত্র লেখক আবদুল মান্নান সৈয়দ একাদশ শ্রেণিতেই কলকাতার পঞ্চপা-বের মতো পাঁচ বন্ধুর সান্নিধ্যে চলে আসেন। শুরু হয় জীবনের নতুন অধ্যায়। সিকান্দার দারা শিকোহ, মফিদুল আলম, আমিনুল ইসলাম বেদু, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ও আবদুল মান্নান সৈয়দ। ওই পঞ্চপা-বের হাতেই ছিল ঢাকা কলেজের তথা ঢাকার লিটল ম্যাগাজিনের সর্বস্ব শরীর। পরে অবশ্য এই গোষ্ঠীর বাইরে অন্য জগতের প্রান্তরে তিনি হাঁটতে থাকেন। তিনি অনেক বন্ধুর নাম তার প্রথম পর্বে উল্লেখ করেছেনÑ যারা ষাটের লিটলম্যাগ আন্দোলনের পুরধা ছিলেন।
মান্নান সৈয়দ প্রথম গল্প ‘আকাশটা কালো’ দিয়ে গল্পকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন ঢাকা কলেজে ‘কলেজবার্ষিকী’তে। কলেজের বাইরে পাঠকের সামনে আসেন সাম্প্রতিক পত্রিকায় প্রবন্ধ, মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকায় বিদেশি গল্পের নাট্যরূপ, সমকাল পত্রিকায় গ্রন্থালোচনা, উপন্যাস ও কাব্যনাট্য, পূবালী পত্রিকায় নাটক, দৈনিক ইত্তেফাকে কবিতাÑ এসবই তার প্রথম প্রকাশ।
এবার মান্নান সৈয়দের মুখে শুনিÑ ‘তারপর তো দরজা খুলে যায়। যৌন পত্রিকা থেকে গবেষণা পত্রিকাÑ কোথায় না লিখেছি, এমনকি রেডিও-টিভিতেও। জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, আসাদ চৌধুরী, রফিক আজাদ, শহীদ কাদরী, হুমায়ন কবির, আবুল হাসান, আখতারুজ্জামান ইালয়াস, হায়াৎ মামুদ, সেবাব্রত চৌধুরী, আবদুল্লাহ আল মামুন, মোমতাজ উদ্দীন, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, মোহাম্মাদ রফিকসহ কত প্রিয় বন্ধু তার জীবনে এসেছেন। যারা তার বন্ধু হিসেবে এসেছিলেন সবাই ষাটের লিটলম্যাগ আন্দোলনের মানুষ, নিজ নিজ ক্ষেত্রে আলোর দ্যুতি ছড়িয়ে দিয়েছেন বাংলা সাহিত্যের ভা-ারে। পঞ্চাশের কবিদের বিরুদ্ধে জোট বেঁধে লিটলম্যাগের মধ্য দিয়ে নিজেদের রাজত্ব কায়েম করেছেন।

তিন.
আবদুল মান্নান সৈয়দ শুধু লিখে গেছেন তা নয়, সমসায়িক অনেক অপরিচিতজনকে লেখক তৈরি করেছেন। তিনি সম্পাদনা করেছেন বহুমুখী সাহিত্যের কাগজ। শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক ছিলেন যে, তাও নয়। তিনি ঢাকার একমাত্র কবিÑ যিনি ঢাকার বাইরে ‘মফস্বল’ জেলাগুলোর লিটলম্যাগের নিয়মিত খোঁজখবর রাখতেন ও লেখালেখি করতেন। ওই সুবাদে বিভিন্ন মফস্বল জেলায় তার অনেক কবি বন্ধু হয়ে যায়।
মান্নান সৈয়দ অন্যান্য জেলার মতো উত্তরাঞ্চলের জেলা বগুড়ায়ও আসতেন। প্রয়াত কবি ও ‘বিপ্রতীক’ সম্পাদক ফারুক সিদ্দিকী, প্রয়াত কাজী রব, প্রয়াত মনোজ দাশগুপ্ত, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, অর্কেস্ট্রা সম্পাদক রেজাউল করিম চৌধুরী, বজলুল করিম বাহারদের নিয়মিত খোঁজ রাখতেন তিনি। বগুড়ায় এলেই আড্ডা দিতেন ফারুক সিদ্দিকীর ডেরায়। তিনি বলতেন, ঢাকার বাইরে সবচেয়ে উচ্চকিত কবিতার কাগজ বিপ্রতীক। অবশ্য বিপ্রতীকে ঢাকার প্রায় ষাটের কবিরা লিখতেন। কাজী রব সম্পর্কে তার মূল্যায়ণÑ ‘এদের মধ্যে কাজী রব ছিল সবচেয়ে কলকণ্ঠ, সবচেয়ে খোলামেলা। ওর কবিতা-গল্পেও ছিল জং না ধরা এক নতুনত্ব, এক অপরিমেয় আশা। বগুড়ার ষাটের দশকে লিটল ম্যাগাজিনের অন্যতম পুরোধার বহুধা শিল্পমুখিতা সবার নজর কাড়ে।’

চার.
লিটল ম্যাগাজিন পাগল আবদুল মান্নান সৈয়দ ছিলেন মূলত লিটল ম্যাগাজিনেরই লেখক। তার সংগ্রহে লিটল ম্যাগাজিনের তালিকা দেখলেই বোঝা যায়, তিনি কতটা লিটল ম্যাগপ্রিয় ছিলেন। ষাটের দশকের সারা দেশ থেকে যে লিটল ম্যাগাজিন-পঞ্জি তিনি ‘স্মৃতির নোটবুক’-এ রেখে গেছেন, সেসবের বিস্তারিত তালিকা (কোন ম্যাগাজিন কত সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে এবং কোন সংখ্যার সম্পাদক কে ছিলেন) দেখলেই অনুমান করা যায়, লিটল ম্যাগাজিনে কতটা দরদ, উদার, নিবেদিত ও যতœবান ছিলেন। সম্পাদনা করেছেন ‘শিল্পতরু’ ও ‘চারিত্র’ কাগজ দুটি। সবচেয়ে বড় দিক হলো, ষাটের দশকে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে থেকে যেসব লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয়েছে এর অধিকাংশের সঙ্গেই তিনি জড়িত ছিলেন কোনো না কোনোভাবে।
অত্যন্ত বিনয়ী, নিরহঙ্কার ও তুখোর আড্ডাবাজ ওই সব্যসাচী লেখক সহজেই যে কোনো অনুষ্ঠানের মধ্যমণি হতে পারতেন। স্মৃতির নোটবুক খুব স্বাস্থ্যবান না হলেও তার সাহিত্য জীবনের যে তথ্য-উপাত্ত এই ক্ষুদ্র গ্রন্থে দিয়ে গেছেন তা ষাটের দশকের লিটলম্যাগ আন্দোলনের পূর্ণাঙ্গ দলিল হিসেবে বিবেচনায় নিতে পারি এবং তা নির্র্দ্বিধায়।

বিদায়ের শেষ সুর

খায়রুন নাহার রুবী

 

 

প্রতিদিন ভোরে ছোট ছেলেটাকে ফোন দিয়ে ঘুম থেকে জাগাতে হয়। নতুবা উঠতে পারে না, আর না উঠতে পারলে সকালের পড়াটা নষ্ট হয়। আজও তেমন করে ফোন দিয়ে জাগিয়েছি বাবুকে। ও ফোন ধরে বললো, মা উঠেছি, এখনই পড়তে বসবো, তুমি ভেবো না। আমি আমার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। প্রতিদিনকার জীবনযুদ্ধ ঘর-বাইরের যুদ্ধ, চাকুরি ক্ষেত্রের যুদ্ধ এমনি নানা যুদ্ধ শরীর মনে বহন করতে হয়। আজ ছুটির দিন বলে যুদ্ধের ধরণ আলাদা তারপরও যেন যুদ্ধের শেষ নেই।
গত ক’দিন থেকে শরীর, মনে এত পরিশ্রম গেছে যা বলার নয়। প্রতি বছরই এই সময়টা আমাকে অনেক বেশি প্রেশারে থাকতে হয়। এই দু’চারদিন হলো সব কাজগুলো গুছিয়ে উঠেছি এখন একটু স্বস্তি। কিন্তু তারপরও যেন কাজের শেষ নেই! চাইলেও স্বস্তিতে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব হয় না। কী মনে করে ছুটির দিন বলে,কাজের ফাকে কøান্তিতে বিছানায় নয় শোফায় শুয়ে পড়লাম। হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠলো। তাকিয়ে দেখলাম ছোটছেলের ফোন। ধরতেই ‘ও’ ডুকরে কেঁদে উঠলো। আমি বুঝলাম না কেন ও অমন করে কাঁদছে?
বললাম , কী হয়েছে বাবা, কাঁদছো কেন?
ও বললো, মা! আমার বন্ধু সুদ্বীপ মারা গেছে।
আমি মুহূর্তেই হতবাক হলাম,অবাক বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, কী হয়েছিল, কী করে মারা গেল?
ও বললো, আমি ঠিক জানি না মা! তবে যে আমাকে জানিয়েছে সে বলেছে সুইসাইড করেছে।
কষ্টে মনটা বিষিয়ে উঠলো। ভাবলাম কী এমন হয়েছে যে সুইসাইড করতে হবে? এই বয়সী ছেলেমেয়েদের সমস্যা একটাই- অতি আবেগ। অতি আবেগে ওরা কী করে , কী করতে চায় নিজেরাই জানে না। খুবই আহত হলাম এ সংবাদ শুনে। ভাবলাম, এখনই ওদের বাসায় যেতে হবে। সুদ্বীপের মার সাথে আমার খুব ভালো সম্পর্ক। আমার খুব পছন্দের একটা মানুষ ওর মা। ওর মার মুখে লেগে থাকা মিষ্টি হাসিটা মুহূর্তেই ভেসে উঠলো আমার চোখে। আর বাচ্চা বাচ্চা মিষ্টি কণ্ঠস্বরটাও কানে ভেসে এলো। অস্থির হয়ে ছুটলাম ওদের বাসার দিকে।


যেতে যেতে মনটা এতই বিষণœ হলো যেন বৃষ্টি জলের মত স্যাঁত স্যাঁতে হয়ে উঠলো বুকের ভেতরটা! আমি জানি একটু পর এটা সমুদ্র জলের ধাক্কায় রূপ নেবে, নিতেই হবে। এ যে বড় কষ্টের অনুভূতি! হঠাৎ করেই বাতিঘর নিভে যাওয়া।
রিক্সা এসে থামলো ওদের বাসার সামনে। নিচতলায় তেমন লোকজন নেই, হয়ত এখনও সেভাবে জানাজানি হয়নি। শুধু দ’ুটি ছেলে একজন সুদ্বীপের আত্মীয় হবে অন্যজনকে আমি চিনি না, ওরা দু’জন হাউমাউ করে কাঁদছে। ওদের এই কান্না যে কত কষ্টের তা শুধু ওরাই বলতে পারে। কারণ যারা কাঁদে শুধু তারাই জানে কী এবং কতটা বেদনাভরা এই কান্না! অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়লে বৃষ্টির চোখ ফুলে লাল হয় কিনা আমার জানা নেই তবে এই ছেলে দু’টোর চোখ ফুলে রক্তের মত লাল হয়ে আছে।
আস্তে আস্তে সিঁড়ি ভেঙ্গে উপরে উঠলাম। বেশ কয়েকজন পরিচিত মানুষ বিরস মুখে বসে আছে। সাথে আমার ছোট্টবেলার বন্ধু! তাদের কারো মুখে কোন কথা নেই। সবারই যেন কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা! লোকজন ঠেলে ভেতরে পা রাখতেই চোখে পড়লো, সুদ্বীপের লাশের পাশে ওর বাবা বসে আছে। দেখে চেনা যায় না, একেবারে পাংশু বর্ণ ধারণ করেছে। সুদ্বীপ ওর পছন্দের, প্রিয় খাটেই শুয়ে আছে , শুধু সাদা একটা চাদর দিয়ে ওর সমস্ত শরীর ঢেকে দেয়া হয়েছে।
বাবার জন্য কত কষ্টের সন্তানের লাশ ধরে বসে থাকা। পৃথিবীতে এত কষ্ট বোধহয় আর কিছুতে নেই। মুখটা দেখবো বলে ওর খাটের পাশেই দাঁড়ালাম। কে একজন এসে চাদরটা সরিয়ে দিলে মুখটা দেখলাম।সহজ, সরল একটা মুখ, মনে হয়, যেন কোন পাপ আজও ওকে স্পর্শ করেনি।‘ও’ যেন স্বভাবতই ঘুমিয়ে আছে! গলায় হালকা একটা লালচে দাগ, আর সবই ঠিক আছে। তখনই মনে হলো,সুদ্বীপ নেই। পৃথিবীর সবটুকু মায়া ছেড়ে ও চলে গেছে, আর আসবে না। কেন যেন মনে হলো, ও কি সত্যিই চলে যেতে চেয়েছে? নাকি সবার ওপর অভিমান করে শুধু নিজের কষ্টটাকে দেখাতে চেয়েছে, মরার জন্য একাজ করেনি। পৃথিবীর সব আলো নিভে গেছে, সুদ্বীপ নিভিয়ে দিয়ে চলে গেছে।
পৃথিবীর সব মানুষেরইতো কিছু না কিছু কষ্ট থাকে, সে কষ্ট এক সময় হাওয়ায় হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়ে লেগে থাকে আকাশের বুকে! তার জন্য মরতে হবে কেন? মৃত্যুর মধ্যে কী আছে? কেন আমাদের সন্তানরা এই পথটি বেছে নেয়? কেন আমরা তাদের সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারি না? কেন ব্যর্থতার শতভাগ বোঝা নিয়ে আমাদের পড়ে থাকতে হয়? এসব প্রশ্নের উত্তর এখন আর কেউ দিতে পারবে না। যেটুকু বুঝি তা হচ্ছে, সময়টা এখন খুব খারাপ! এক এক সময় মনে হয়, অন্ধকার যুগে, বর্বর যুগে, কৃষ্ণযুগে বাস করছি। কোথাও কোন নিয়ম শৃঙ্খলার বালাই নেই। ব্যক্তি, দেশ, রাষ্ট্্র, সমাজ কোথাও যেন কোন বন্ধন নেই। যে যার মত করে চলছে। ধর্মীয় অনুভূতির বিষয়টাও এখন আর আগের মত জাগ্রত নয়। পাপ পুন্যের বিচারবোধও মানুষ এখন হারিয়ে ফেলেছে। তাই নিজের প্রতি ,পরিবারের প্রতি ক্ষোভ নিয়ে মৃত্যুর পথে এগিয়ে যায়।


ওর মার রুমে ঢুকে বুকটা ব্যথায় ভরে উঠলো। হায়রে মা! সন্তানের মঙ্গল বার্তা যতটা বুকে লেগে থাকে , অমঙ্গলের তীর কাটা হাজার গুন বুকটাকে বিদ্ধ করে। এ যন্ত্রনা থেকে আর কারো মুক্তি ঘটলেও মা’র মুক্তি নেই। যেন হাজার বছর খুচিয়ে খুচিয়ে রক্তাক্ত করে মা’র অন্তর! সুদ্বীপের মা বিলাপ করে কাঁদছিল! সবার চোখের পাতা ভিজে উঠছিল, কেউ কেউ হু হু করে দুহাতে মুখ ঢেকে কাঁদছিল। কখন যে নিজের অজান্তে আমার চোখের পাতা অশ্রুসিক্ত হলো বুঝলাম না।
অনেকটা সময় সুদ্বীপের মার পাশে বসেছিলাম। উনি হয়ত আমাকে দেখতে পাননি। এক এক সময় ওর মার কষ্টের হাহাকার এত তীব্র যে উনি মানতে চান না ওনার সন্তান পৃথিবীতে নেই। কত কথার গাথুনিতে সদ্য মৃত সন্তানকে জীবিত করে তোলেন, ছেলের আচার ,আচরণ , কথাকে জলের মাঝে কাগজের নৌকোর মত করে ভাসিয়ে রাখেন। আবার চিৎকার করে কাঁদেন ছেলের পৃথিবী থেকে চলে যাবার কথা ভেবে। আমি বাড়ির পথে পা বাড়ালাম। আমার ফোনটি বেজে উঠলো। দেখলাম, ছোট ছেলেটা আবার ফোন করেছে। ফোন ধরলাম , ও বললো, মা আমি আসছি, আমাকে নিষেধ করো না।
আমি বললাম, তোমার এ চলে আসাটাকে তোমার বাবা ভালো চোখে দেখবে না।


ও বললো, না দেখলেও যে আমার কিছু করার নেই মা! আমাকে যে আসতেই হবে। আমি ওর জানাজায় শরীক হবো। আমি আর কিছুই বলতে পারলাম না।
সময় গড়িয়ে চলছে। আমি অপেক্ষা করে আছি ছেলে আসবে। ‘ও’ ওর বন্ধুর লাশ দাফন করার জন্য খুব ঝুকির পথে আসছে। বন্ধুর জন্য হৃদয়ে এটুকু রক্তক্ষরণ হচ্ছে এবং তার জন্য ছুটে আসছে, একথা ভেবে মনে মনে সম্মান জানালাম ওকে। আমরা চাইলেও কারো জন্য তেমন কিছু করতে পারি না, তেমন কিছু করা হয়ে ওঠে না। ওর ছোট্ট মনের কোমল জায়গা থেকে এটুকু করার জন্য ছুটে আসছে এওবা কম কিসে?
ওদের আসতে আসতে আসরের নামাজের সময় হয়ে গেল। আসরের পরপরই জানাজা হলো। তারপরও লাশ রাখা হলো, ঈদগাহ মাঠে। যেখানে জানাজা হয়েছে ঠিক সেই জায়গাটায়। এটা ওদের প্রিয় জায়গা! ছোটবেলা থেকে এ মাঠে খেলে ওরা বড় হয়েছে। এর আশেপাশে ব্যস্ত সময় পাড় করেছে। সেই স্বপ্নের জায়গা প্রিয় মাঠ, ঈদগাহ ! কত বকা খেয়েছে, আমি নিজেও কত বকা দিয়েছি আমার সন্তানকে শুধু ওখানটায় যাবার জন্য তারও যেন কোন হিসাব নেই। এই সেই মাঠ যেখানে সুদ্বীপ শুয়ে আছে। আর হাজারো মানুষের পদচারণায় কেমন ভারি হয়ে উঠছে ‘ঈদগাহ’! সামনের ঈদে সুদ্বীপ আর এখানে হাঁটবেনা, বন্ধুদের নিয়ে মেতে উঠবে না হৈ হুল্লুরে!
সুদ্বীপের দূরের আত্মীয় স্বজনদের আসতে দেরি হওয়ায় আসরের পর দাফন হলো না। আমি ছেলের কারণে ব্যস্ত হয়ে আবার ছুটলাম সুদ্বীপদের বাসায়।
সন্ধ্যে তখন ছুঁই ছুঁই। চারদিক অন্ধকার-কেমন ঘুটঘুটে, অদ্ভুত বিষাদে ভারি হয়ে আছে বাড়িটা! ওর মা আত্মীয় স্বজন সব নিচে নেমে এসেছে, ডুকরে কাঁদছে মা! বাবা নিচে নামেনি খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছে।
সুদ্বীপের দ্বিতীয়বার জানাজা শেষে কবরস্থানে নেয়ার জন্য ট্রাকে তোলা হলে মুহূর্তে ট্রাক ভরে গেল বন্ধুদের জন¯্রােতে। তারপরও অনেক বন্ধু যে যার মত করে ছুটছে কবরস্থানের দিকে। বিষাদের কালো মেঘটা কেমন নিশিকালো অন্ধকার করে রাখা বাড়িটাকে ছেড়ে হাওয়ায় হাওয়ায় উড়ে চললো কবরস্থানের পথে। বিদায় সুদ্বীপ! এই পরিবারের একটি অধ্যায়ের শেষ হলো যেন আজ!
তৃতীয় দিনে মিলাদ শেষে ছোট ছেলে ঢাকা চলে যাবে রাতের গাড়িতে। আমি বার বার ফোন দিচ্ছি, কোথায়?
বাবু বললো, মা আমরা বন্ধুরা কবরস্থানে।


ভাবলাম , যাবার আগে বন্ধুকে দেখতে গেছে। বাবু কবরস্থান থেকে ফিরে এলে খুব তাড়াহুড়ো করে ওকে গাড়িতে তুলে দিতে গিয়ে দেখি- সব বন্ধুরা এসেছে বাবুকে এগিয়ে দিতে। ওদের মন খুব খারাপ! বাবুকে গাড়িতে তুলে দিয়ে বাসায় আসি। অনেক রাতে ওর রুমটা গোছাতে গিয়ে দেখি, বালিশের নিচে একটা খোলা ডায়রী। কী যেন সব লেখা। যেটা নিতে ‘ও’ হয়ত ভুলে গেছে। লেখাটা নজরে পড়লো, আমি কেমন চমকে উঠলাম! লেখাটা ঠিক এমনই ছিল ...
“আজ আকাশে চাঁদটা দেখেছিস সুদ্বীপ? আজ যখন তোকে নিয়ে ঐ ভয়ানক নির্জন জায়গাটায় গেলাম, তখন গন্ধরাজ ফুলগাছের পাতার মধ্য দিয়ে বিশাল থালার মত চাঁদটাকে দেখে বুকের ভেতরটা কেমন হু হু করছিলো। তোর কি মনে পড়ে এমনি কত রাত আমরা এক সাথে হেঁটেছি? সেদিনওতো আকাশে এমন সুন্দর চাঁদ-ই ছিলো? ভূতের গলি, ঈদ-গাহ মাঠে হয়তো আমাদের পায়ের চিহ্ন এখনো মুছে যায়নি। আর আজ কিনা তুই একা একাই চাঁদ দেখবি?
জানিস, দোস্ত ছোটবেলা থেকেই আমি লাশ দেখলে খুব ভয় পেতাম কারণ যদি রাতে স্বপ্নে ওটাকে দেখি। কিন্তু বিশ্বাস কর,আজ যদি আমি স্বপ্নে তোকে দেখি তাহলে আমি হয়তো তোকে একটা থাপ্পর দিয়ে বলবো, কোথায় গেছিলি, একবারও কারো কথা ভাবলি না?
তোকে অনেক মিস করবো রে...! তোর জায়গা কেউ কোনদিনও নিতে পারবে না। কারণ সেই জায়গা পূরণ করার ক্ষমতা নিয়ে কেউ হয়তো আর আসবে না। আল্লাহ তোকে বেহেশত নসিব করুক! আমাদের যেন জান্নাতে আবার দেখা হয়... সেদিন তুই আর আমি আবার এক সাথে চাঁদ দেখবো”...!
লেখাটা পড়ে কেমন যেন হয়ে গেলাম, কেমন একটা অনুভূতি মুহূর্তে হৃদয় ছুঁয়ে গেল, হায় কী হলো, এটাতো না হলেও পারতো!
এর এক সপ্তাহ পর আমি যাচ্ছিলাম সুদ্বীপের বাসার সামনে দিয়ে। হঠাৎ বুকটা কেঁপে উঠলো, বাড়িটা কেমন প্রাণহীন হয়ে আছে। মনে হলো, যেন আজ আর এ বাড়িতে কোন মানুষ নেই। কাঁচের জানালাগুলো খোলা, সাদা পর্দাগুলো দিশাহীনভাবে উড়ছে মুক্তির আনন্দে! ছাদের দিকে তাকালাম- পুর্তগালের একটি পতাকা উড়ছে...! আর বাটিক করা কতগুলো নীল কাপড় বাতাসে উড়ে উড়ে দড়ির গায়ে আটকে আছে। অথচ এই পরিবারের আদরের ছোট্ট সন্তানটি ভালোবাসার বন্ধনে আটকে থাকতে পারেনি...!

 

ধনবানে কেনে বই জ্ঞানবানে পড়ে

যতীন সরকার

 

এটি হয়তো নিছক একটি গল্প। তবু এ-গল্পের ভাবসত্যটিকে না-মেনে পারা যায় না। একালের নব্যধনিক এবং লুটেরা ধনিকরা যে বই নিয়ে মাথা ঘামায় না, গল্পটিতে সে-সত্যেরই প্রকাশ ঘটেছে। বাংলায় একটি প্রবাদ আছে- ‘আনাড়ির ঘোড়া নিয়ে বুদ্ধিমান চড়ে/ধনবানে কেনে বই বুদ্ধিমানে পড়ে

 

কন্ট্রাক্টরি করে অনেক কাঁচা পয়সার মালিক হয়েছেন এমন এক ব্যক্তি নিজের জন্য একটি আলিশান বাড়ি তৈরি করলেন। খুবই আধুনিক ধাঁচের বাড়ি। দামি আসবাব দিয়ে পুরো বাড়িটি সাজানো। এক সমঝদার বন্ধুকে বাড়িটি দেখাতে নিয়ে এলেন এবং বাড়িটি সম্পর্কে তার অভিমত জানতে চাইলেন। বন্ধু বললেন, ‘হ্যাঁ, খুবই চমৎকার বাড়ি তুমি তৈরি করেছ। আর বাড়ির আসবাবপত্রগুলোও খুবই চমৎকার ও রুচিশীল বটে। কিন্তু এ রকম একটা বাড়িতে ভালো একটা লাইব্রেরি না থাকলে ঠিক মানায় না। বাড়িতে বই থাকাটা খুবই জরুরি।‘
বাড়ির মালিক কন্ট্রাক্টর ‘কুচ পরোয়া নেই’ ভঙ্গিতে বললেন, ‘ঠিক আছে, আজই আমি আহম্মদ অ্যান্ড কোম্পানিতে ৭০০ টন বইয়ের অর্ডার দিয়ে দিচ্ছি।’
চুন-বালি-সুড়কি নিয়ে যার কারবার তিনি তো সবকিছুকেই টনের মাপে বিচার করবেন। তাই বইয়ের কথায়ও তার টনের হিসাবই মনে এলো, বইয়ের সম্পর্কেও অন্য রকম কিছু তিনি ভাবতে পারেন না।
এটি হয়তো নিছক একটি গল্প। তবু এ গল্পের ভাবসত্যটিকে না মেনে পারা যায় না। একালের নব্য ধনিক ও লুটেরা ধনিকরা যে বই নিয়ে মাথা ঘামায় না, গল্পটিতে ওই সত্যেরই প্রকাশ ঘটেছে। বাংলায় একটি প্রবাদ আছেÑ ‘আনাড়ির ঘোড়া নিয়ে বুদ্ধিমান চড়ে/ধনবানে কেনে বই, বুদ্ধিমানে পড়ে।’ একালের ধনবানদের ব্যাপারে এ প্রবাদটি বোধহয় এর সত্যতা ও কার্যকারিতা একেবারেই হারিয়ে ফেলেছে।
প্রবাদটি তাহলে কখন সত্য ছিল? কখনো সত্য ছিল কি?


বিপুল ধনে ধনবান হওয়ার যেসব পথ অর্ধশতাব্দী ধরে, বিশেষ করে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেÑ এখন খুলে গেছে, সেসব পথ এর আগে তৈরি হয়নি। সে সময় এখানে ধনবান হওয়ার ভিত্তি ছিল ভুমির স্বত্ব-স্বামিত্ব। কর্নওয়ালিসের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পথ ধরে ছোট-বড়-মাঝারি যে ভুস্বামীগোষ্ঠীর পত্তন ঘটেছিল, ধনবান বলতে মূলত ওই গোষ্ঠীর মানুষকেই বোঝাতো। সরকারি-বেসরকারি চাকরি কিংবা ওকালতি, ডাক্তারি, মাস্টারি ইত্যাদি পেশার ব্যক্তিরাও ওই গোষ্ঠী থেকেই বেরিয়ে আসতেন। অর্থে-বিত্তে তারা সম্পন্নতা ও স্বচ্ছলতা অর্জন করতেন অবশ্যই। তবে একেবারে লাগাম ছাড়া ধনবান হয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ তাদের সামনে খুলে যায়নি।
এরও অনেক আগে, আঠারো শতকের শেষে সদ্য ব্রিটিশ রাজত্ব প্রতিষ্ঠার সুবাদে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত ধরে এ দেশে একটি মুৎসুদ্ধি ধনিক শ্রেণি গড়ে উঠেছিল। তাদের বলা হতো ‘হঠাৎ নবাব’। সেকালের ওই ‘হঠাৎ নবাব’দের সংস্কৃতিহীনতা ও রুচিহীনতার অনেক মিল খুঁজে পাওয়া যাবে একালের নব্য ধনিক ও লুটেরা ধনিকদের সঙ্গে। তাদের মতোই বই সংস্পর্শহীন ছিলেন সেকালের হঠাৎ নবাবরা।
হঠাৎ নবাবদের গোষ্ঠীটি সমাজমঞ্চ থেকে আস্তে আস্তে বিদায় নিতে থাকে। এ গোষ্ঠীর অনেকেই পরে ভূস্বামীতে রূপান্তরিত হন। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত থেকে উপজাত ওই গোষ্ঠীটি সম্পর্কে আমাদের বিরূপতা অবশ্যই সঠিক ও সঙ্গত। তাদের যে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের খোজা প্রহরীরূপে গড়ে তোলা হয়েছিল সে কথা মোটেই মিথ্যা নয়। পরজীবী ওই নয়া সামন্ততন্ত্রীরাই যে সমাজ প্রগতির পথে দুস্তর বাধার সৃষ্টি করে রেখেছিল এ কথাও নিশ্চয়ই সত্য। তবু না মেনে পারি না যে, এর ভেতরেই সত্যের একটি উল্টো ধারাও সক্রিয় হয়ে উঠেছিল। ওই গোষ্ঠীর ব্যক্তিরাই বইয়ের সংস্পর্শে এসেছিলেন, বইপ্রেমিক হয়েছিলেন, বই লিখেছিলেন। অর্থাৎ আগেকার ‘হঠাৎ নবাব’দের বিপরীতে তারা হয়ে উঠেছিলেন সংস্কৃতিবান ও রুচিমান। তাই তারা যেমন বই পড়তেন তেমনই অন্যদেরও পড়তে উৎসাহ জোগাতেন।


তাদের ভেতর বই পড়ায় যারা মোটেই উৎসাহী ছিলেন না তারাও কখনো কখনো নিতান্ত অনিচ্ছায় হলেও উৎসাহী পড়ুয়াদের জন্য বইয়ের জোগান দিতেন। সে সময়কার পুস্তক প্রকাশকদের কাছে দেশের সব ছোট-বড় জমিদারের তালিকা থাকতো। নতুন বই প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওই তালিকা দেখে প্রকাশকরা জমিদারদের নামে ভিপিযোগে বই পাঠিয়ে দিতেন। জমিদারের বাড়ি থেকে ভিপি ফেরত যাওয়াটাকে একান্তই অসম্মানজনক মনে করা হতো। এ রকম অসম্মানের বোঝা বইতে কোনো জমিদারই রাজি ছিলেন না। তাই অন্তত ময়মনসিংহ জেলার এমন কয়েক জমিদারের কথা শুনেছি, তারা প্রকাশকদের পাঠানো বইগুলোর তালিকা তৈরি করে সেসবের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বিশেষ কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে রেখেছিলেন। এ রকম বইয়ের সংগ্রহ নিয়েই প্রতিটি জমিদার বাড়িতে একেকটি লাইব্রেরি গড়ে উঠেছিল। সেসব লাইব্রেরিতে কোনো জমিদার বা জমিদার নন্দন প্রবেশ করুন আর না-ই করুন, জ্ঞানপিপাসু প্রজাদের অনেকেই সেগুলোয় ভিড় জমাতেন। এভাবেই এবং এ সময় থেকেই বোধহয় ‘ধনবানে কেনে বই, জ্ঞানবানে পড়ে’ প্রবাদটির প্রচলন ঘটেছে।
অনিচ্ছায় নয় শুধু। জ্ঞানবান সৃষ্টিতে অথবা জ্ঞানবানদের পৃষ্ঠপোষকতাদানে স্বেচ্ছায় যারা এগিয়ে এসেছেনÑ তেমন ধনবানের সংখ্যাও একেবারে কম ছিল না। এ রকম অনেক জমিদারই নিজেদের বাড়িতে সমৃদ্ধ লাইব্রেরি গড়ে তুলেছিলেন। ধনবাড়ী, মুক্তাগাছা ও শেরপুরের জমিদারদের লাইব্রেরির কথা তো সর্বজনবিদিত। বাড়ির বাইরে পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠায়ও অনেক জমিদার আর্থিক সহায়তা দান করেছেন। রাজশাহীর ‘বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতি’ ও এর সমৃদ্ধ পাঠাগারটি তো এ রকম বিদ্যোৎসাহী জমিদারের দানেই প্রতিষ্ঠিত। ব্রিটিশ শাসন আমলেই স্বদেশপ্রেমিক স্বাধীনতা সংগ্রামীরা বই পড়াটি স্বদেশপ্রেম ও স্বাধীনতা সংগ্রামের অপরিহার্য অঙ্গে পরিণত করে ফেলেছিলেন। তাদের উদ্যোগেই গ্রামে গ্রামে বা মহল্লায় মহল্লায় পাঠাগার প্রতিষ্ঠা একটি আন্দোলনে রূপ নেয়। ওই আন্দোলনেও তখনকার ধনবানদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের সক্রিয় সহযোগিতা ছিল।


দুই.
দুঃখ এই, ব্রিটিশ শাসন আমলের ধনবানদের পথে ব্রিটিশ শাসনমুক্ত দেশের ধনবানরা পা বাড়ালেন না। পাকিস্তান জমানায় নয়, স্বাধীন বাংলাদেশেও নয়। ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’-এর জিগির তুলে ওই অদ্ভুত রাষ্ট্রটি কায়েম করে যারা সেখানে রাতারাতি ধনবান হয়ে উঠেছিল তাদের ধন অর্জনের পেছনে বইয়ের কোনো ভূমিকা ছিল না। বরং বই ছিল তাদের মতলব হাসিলের পথের প্রতিবন্ধক। তাই তারা বইবিরোধী না হয়ে পারেনি। বই নয়, নির্বিবেক বিষয়-বুদ্ধিই হয়ে উঠেছিল তাদের চালিকাশক্তি। বিষয়-বুদ্ধিই তাদের ভেতর সাম্প্রদায়িক ভেদ-বুদ্ধিটিকে উসকে দিয়েছিল। ওই ভেদ-বুদ্ধি থেকে জন্ম নিয়েছিল ‘পাকিস্তান’ নামক যে সংস্কৃতিবিরোধী রাষ্ট্রটি এর পক্ষে বইভীতি হওয়াই ছিল একান্ত স্বাভাবিক।
পাকিস্তান কায়েম হয়ে যাওয়ার পর সমাজের সব মানুষই যে সংস্কৃতিহীন হয়ে গিয়েছিল তা তো নয়। অন্তত পাকিস্তানের পূর্ব অংশের বাঙালি জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল সাংস্কৃতিক রুচিঋদ্ধ। এই সংস্কৃতিমান মানুষের বইপ্রীতি পাকিস্তান রাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারক ও কর্তৃত্ববানদের একান্ত স্বস্তিহীন করে তুলেছিল। এ ব্যাপারে নাৎসিবাদী হিটলার ও তার অনুচরদের সঙ্গে পাকিস্তানবাদীদের ভাবনা একেবারে খাপে খাপে মিলে যায়। নাৎসিবাদ ও পাকিস্তানবাদÑ এ দুয়েরই লক্ষ্য ছিল সভ্যতার চাকাটা পেছন দিকে ঘুরিয়ে দেয়া। আর এ কাজে বই-ই হচ্ছে প্রধান বাধা। কারণ বই তো সভ্যতার বাহক। সভ্যতার বাহকটিকে সভ্যতাবিরোধীরা সুনজরে দেখে কী করে? নাৎসিবাদীরা সভ্যতার বাহক বইয়ের বহ্নুৎসব করেছিল প্রকাশ্যে ঢাকঢোল পিটিয়ে। পাকিস্তানবাদীরা ঠিক তেমনটি করেনি। তারা মানুষকে বই বিমুখ করার অন্য রকম একটি ধারা চালু করতে চেয়েছিল। ওই ধারাটি সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের। পবিত্র ধর্মের অপবিত্র ব্যাখ্যা দিয়ে এখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বোধ-বুদ্ধি সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের খাতে প্রবাহিত করে দেয়ার মতলব এঁটেছিল তারা। ধরেছিল বই নিষিদ্ধ করার পথ। সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষমুক্ত উদার ও মুক্তবুদ্ধি সাধকদের তারা ভয় পেতো। সমাজ বদলের প্রবক্তাদের সম্পর্কে তো তাদের ভীতি ছিল সীমাহীন। তাই যে বইয়েই প্রকাশ আছে কিংবা আছে সমাজবদলের আর্তি ও পথনির্দেশ সেসব বই-ই হয়ে উঠেছিল তাদের চোখের বালি। কিন্তু সংখ্যাধিক্য তো সে রকম বইয়েরই। কয়টা বই নিষিদ্ধ করতে পেরেছিল পাকিস্তানবাদের প্রবক্তারা? বইয়ের প্রতি পাকিস্তানবাদীদের নিষেধবিধিই বরং পাকিস্তান রাষ্ট্রের অধিকার বাঙালিদের বইপ্রেমটি আরো জোরদার করে তুলেছিল, নিষিদ্ধ বইয়ের প্রতি তাদের আকর্ষণ দুর্বার হয়ে উঠেছিল। বলা যেতে পারে, বাঙালি জাতির স্বাধিকার চেতনা ও স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম প্রেরণাটি তার বইপ্রেম থেকেই উৎসারিত হয়েছিল। হায়! রক্ত ও ইজ্জত দিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর এ রাষ্ট্র তথা এ জাতির হর্তাকর্তা, বিধাতা হয়ে বসলো যে গোষ্ঠীটি সে গোষ্ঠীর ভেতর বইপ্রেমিক সংস্কৃতিমান বাঙালি জাতির ঐতিহ্যের ছিটেফোঁটাও নেই। আগেই বলেছি, বাংলাদেশের এই নব্য ধনিক ও লুটেরা ধনিকগোষ্ঠী অষ্টাদশ শতকের কলকাতার ‘হঠাৎ নবাব’দেরই সগোত্র। হঠাৎ নবাবদের চেয়ে তারা বরং অনেক ধূর্ত ও ধড়িবাজ। আঠারো শতকের বাঙালি হঠাৎ নবাবদের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা ছিল না। কিন্তু বিশ শতকের স্বাধীন বাংলাদেশে রাষ্ট্র ক্ষমতাটি এখানকার নব্য ধনিক ও লুটেরা ধনিকরাই দখল করে নিয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানে দেশের জনগণকেই বলা হয়েছে রাষ্ট্রের ‘মালিক’। ওই মালিকানা বেহাত হয়ে যেতে বেশিদিন লাগেনি। এখন তো বাংলাদেশের জাতীয় সংসদেরও নিয়ন্তা নব্য ধনিকরাই, রাজনীতিকদের বদলে তারা সে সংসদের অধিকাংশ আসনের দখলদার হয়ে বসেছে। এ কথা তো জানাই আছে, ক্ষমতা অধিকারীদের সংস্কৃতিই হয়ে ওঠে পুরো সমাজের সংস্কৃতি। বর্তমানে এ দেশে ক্ষমতার মঞ্চে যারা অধিষ্ঠিত তাদের কি সত্যি সত্যিই কোনো সংস্কৃতি আছে? সংস্কৃতিহীন ক্ষমতাবানদের দেশটি তো সংস্কৃতিহীনই হবে। সে দেশে বইয়ের কদর করবে কে?


তিন.
ব্রিটিশ আমলে ধনবানদের পৃষ্ঠপোষকতায় এ দেশে যেসব লাইব্রেরি গড়ে উঠেছিল এর অধিকাংশই পাকিস্তান জমানায়ও টিকে ছিল। কোনো কোনোটির শ্রীবৃদ্ধি হয়েছিল। জমিদারি প্রথার বিলুপ্তি ও অনেক জমিদারের দেশত্যাগের ফলে জমিদারদের লাইব্রেরির অনেকটিই অবশ্য নষ্ট হয়ে যায়। এরপরও যেসব পাবলিক লাইব্রেরি টিকে গিয়েছিল এরও অধিকাংশ ধ্বংস হয়ে যায় একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়। এ রকম অন্তত দুটি লাইব্রেরির কথা অত্যন্ত বেদনার সঙ্গে স্মরণ করছিÑ একটি ময়মনসিংহের দুর্গাবাড়ী ধর্মসভা লাইব্রেরি ও অন্যটি ঢাকার রামমোহন লাইব্রেরি। প্রথমটি ছিল সনাতনী হিন্দুদের দ্বারা পরিচালিত ও দ্বিতীয়টি প্রগতিশীল ব্রাহ্মদের। দুটি লাইব্রেরিরই প্রতিষ্ঠাতারা ছিলেন ধর্ম আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। কিন্তু লাইব্রেরি দুটিতে ধর্মীয় বই যত ছিল এর চেয়ে বেশি ছিল ধর্মনিরপেক্ষ বই। এমন অনেক অমূল্য ও দুর্লভ বই এ দুটি লাইব্রেরিতে ছিল যেগুলোর আর কোনো কপি হয়তো কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। ময়মনসিংহের ধর্মসভা লাইব্রেরিতে তো হাতে লেখা পুঁথিই ছিল কয়েকশ’। সবই লুণ্ঠিত হয়ে মুদি দোকানের ঠোঙ্গায় পরিণত হয়েছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে এ রকম পাবলিক লাইব্রেরির পাশাপাশি কতজনের ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারের যে একই পরিণতি ঘটেছে, আমরা কেউই সেসবের খোঁজ নিইনি। এভাবে আমাদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাসের কত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-উপাত্ত যে হারিয়ে গেছে এ সম্পর্কেও আমরা অবহিত ও সচেতন হইনি বললেই চলে। এ রকম শূন্যতার মধ্যে কিছুতেই বেঁচে থাকা যায় না। অন্তত মননশীল মানুষরূপে বেঁচে থাকা তো যায় না! সত্যিকার মননশীল মানুষরূপে বেঁচে থাকার নামই যেহেতু সংস্কৃতি এবং বই যেহেতু ওই সংস্কৃতির অপরিহার্য বাহন সেহেতু বই পড়ার আয়োজনের বিস্তৃতি ঘটাতেই হবে। কীভাবে তা সম্ভব? ‘বই কিনে কেউ দেউলে হয় না’Ñ বিদগ্ধ সংস্কৃতিমান প্রমথ চৌধুরী এমন একটি কথা বলে এক সময় আমাদের আশ্বস্ত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নুন আনতে পান্তা ফুরোয়Ñ বইপ্রেমিকদের মধ্যে এমন মানুষেরই তো সংখ্যাধিক্য। এ রকম যারা প্রায় জন্মসূত্রেই দেউলে হয়ে আছে, প্রমথ চৌধুরীর আশ্বাসবাণী তাদের কতটুকু কাজে লাগবে? বই কিনে বই পড়ার আগ্রহ চরিতার্থ করা তো তাদের পক্ষে একেবারেই অসম্ভব। কাজেই সবার বইপড়ার সুযোগ অবারিত করে দেওয়ার জন্য পাবলিক লাইব্রেরির কোনো বিকল্প নেই। ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় আগেকার জমিদাররা যেভাবে পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠায় অর্থের জোগান দিতেন, এখনকার নব্য ধনিকরাও যাতে তেমনটি করে এ জন্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কায়দা-কানুন খুঁজে বের করতেই হবে। যতদিন সমাজে ধনবৈষম্য বজায় থাকবে ততদিন পর্যন্ত ‘ধনবানে কেনে বই, জ্ঞানবানে পড়ে’ প্রবাদটির সত্যতাটি অবশ্যই প্রতিষ্ঠিত রাখতে হবে। যেভাবেই হোক বই কেনার জন্য ধনবানদের উদ্বুদ্ধ অথবা প্রলুব্ধ কিংবা বাধ্য করা খুবই প্রয়োজন। লাইব্রেরি আন্দোলন বা পাঠাগার আন্দোলনের কথা এক সময় খুবই শোনা যেত। এখনো মাঝে-মধ্যে শোনা যায় বটে। কিন্তু এ আন্দোলনের আগের সেই রমরমা ভাব কিংবা উচ্ছ্বাস এখন আর অবশিষ্ট নেই। তবু লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠায় একালেও কোনো কোনো তরুণকে যখন উৎসাহিত হতে দেখি। তখন আমার উৎসাহের পালেও কিছুটা হাওয়া লাগে বৈকি। তবে সেই সঙ্গে তিক্ত অভিজ্ঞতাজাত কিছু হতাশাও মনকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। দেখেছি, লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করা যত কঠিন এর চেয়ে অনেক কঠিন তা টিকিয়ে রাখা। স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া কিংবা উঁই আর ইঁদুরের মতো প্রাকৃতিক ও জৈবিক উপদ্রবে আমাদের দেশে বইয়ের আয়ু ক্ষয় হয় খুবই দ্রুতবেগে। আবার বই পড়ি বা না পড়ি, বই অপহরণে আমরা সবাই কৃতবিদ্য। অপহরণের হাত থেকে লাইব্রেরির বই রক্ষা করা খুবই কঠিন হয়ে পড়ে। তাই দেখা যায়, জন্মের স্বল্পকাল পরই অধিকাংশ লাইব্রেরির মৃত্যু ঘটে যায়। চুপি চুপি বলি, আমি কিছু ক্ষেত্রে এবং বিশেষ শর্তাধীনে বই চুরিরও সমর্থক। কতিপয় ধনবান যখন তার উন্নত রুচির প্রমাণ প্রদর্শনের জন্য শেলফে বই সাজিয়ে রাখে কিংবা নিতান্ত খেয়ালের বশে দু’চারটি বই কিনে ফেলে অথচ সেসব বই নিজেও পড়ে না এবং অন্যকেও পড়তে দেয় না তখন ধনহীন জ্ঞানবানদের দায়িত্বই হয়ে যায় জ্ঞানহীন ধনবানের কব্জা থেকে বইগুলোকে বের করে আনা। এ জন্য প্রয়োজনে চৌর্যের আশ্রয় নেয়াটা মোটেই অবৈধ বা অসঙ্গত নয় বলেই আমার বিশ্বাস। এভাবেই বরং আমরা ‘ধনবানে কেনে বই, জ্ঞানবানে পড়ে’ প্রবাদটিকে এ যুগেও সার্থক করে রাখতে পারি। লাইব্রেরিতেই হোক কিংবা ব্যক্তিগত সংগ্রহেই হোক, বই না পড়ে আসবাবরূপে সাজিয়ে রাখা অবশ্যই অবৈধ ও অসঙ্গত। সঠিকরূপে বই পড়ে বইয়ের ভেতর থেকে এর সঠিক মর্মবস্তু যারা আহরণ করতে পারবেন তারাই হবেন যথার্থ জ্ঞানবান। ওই যথার্থ জ্ঞানবানরাই মানুষকে সমাজবদলের পথ দেখাবেন এবং তৈরি হবে এমন সমাজ যেখানে সবাই হবেন জ্ঞানবান। অন্যায় ধনে ধনবান হওয়ার পথ সে সমাজে খোলা থাকবে না।

সুইসাইড

রফিকুর রশীদ 

 

অবশেষে নীপা মুখ খুলল।
আজ কদিনের মধ্যে সে মোবাইলেও কথা বলেনি কারও সঙ্গে। সত্যি বলতে কী এ পরিবারে অনভিপ্রেত অঘটনটি ঘটে যাবার পর প্রথমে তার কাছ থেকে নিজস্ব মোবাইল সেটটি কেড়ে নেওয়া হয়, তারপর ল্যাপটপটিও কৌশলে সরিয়ে নেওয়া হয় তার ঘর থেকে। এই উদ্যোগে প্রত্যাশিত কোনও ফল না পেয়ে কয়েকদিন পর সবই আবার ফিরিয়ে দেওয়া হয় নীপাকে। এসব ফেরত পাবার পর তার ভেতরে নতুন কিছু প্রতিক্রিয়া দেখতে না পেয়ে বাবা মা দুজনেই হতাশ হয়। নীপার মনের জগতে প্রবেশের আর কোনও পথই খোলা নেই বলে মনে হয়। তবু সকালে কোর্টে বেরোনোর আগে জামান উকিল এসে মেয়ের সামনে হাঁটু ভেঙে দাঁড়ান, মেয়ের মাথায় হাত রেখে বলেন,
নতুন একটা মোবাইল সেট নিবি মা?
নীপা নিরুত্তর। খেলনা পাবার সম্ভাবনায় খুশিতে নেচে উঠার বয়স অনেক আগেই সে পেরিয়ে এসেছে। বাবার মুখের দিকে চোখ তুলে তাকাতেই পারে না, কথা বলবে কী করে! দুহাতের অঞ্জলিতে মেয়ের মুখ তুলে ধরে বাবা আবারও বলেন,
যাকে ইচ্ছে ফোন করিস, আপত্তি নেই। তুই কথা বল মা, একটা কিছু বল! নীপা কিছুই বলে না, যেন বা বাজপড়া কাঠপাথর। না

না, পাথর হলে চোখের পাপড়ি ভেঙ্গে অশ্র“ গড়িয়ে পড়বে কেন! সেই অশ্র“দাহ তার বাবাকেই বা নীরবে সংক্রমিত করবে কেন! পকেট থেকে রুমাল বের করে মেয়ের চোখ মুছিয়ে দিয়ে জামান উকিল অনুনয় করে ওঠেন,
আমার সঙ্গে না হোক তোর মায়ের সঙ্গেই কথা বল নীপুমনি।

নীপার নামের এই আদুরে আদল তার বাবারই দেওয়া। কলেজে ওঠার পর ওই মিষ্টি নামটি কীভাবে যেন আড়ালে চলে যায়। দীপ্তও একদিন আদর করে ডেকেছিল ওই নামে। ভালো লাগেনি নীপার। নিষেধ করেছিল দীপ্তকে। ওটা বাবার ডাকা নাম, অপেক্ষায় থেকেছে নীপা- আবার কোনো ইচ্ছে হলে বাবাই ডাকবে ওই নামে। তো সেই সময় কি এতদিন পর পারিবারিক সংকটের এই দুর্দিনে হলো! নীপার দুর্বল শরীর কেঁপে ওঠে কী এক শিহরণে। বড় বড় দুটি চোখ বিস্ফোরিত করে তাকায় বাবার মুখের দিকে। মেয়ের চোখে চোখ পড়তেই তিনি আর্তনাদ করে ওঠেন- তুই কথা না বললে আমরা বাঁচব কী করে বল দেখি!
না, তবুও বাবার সঙ্গে কথা বলা হয় না নীপার। দিনের শেষে কথা বলে সে তার মায়ের সঙ্গে। কথা অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। খুব ছোট্ট বাক্য। কিন্তু তার ওজন এবং শক্তি ইরাক বিধ্বংসী বোমার চেয়ে মোটেই কম ভয়াবহ নয়। অথচ সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার পর কত অবলীলায় মায়ের

মুখের উপরে জানিয়ে দেয় নীপা,
আমি সুইসাইড করব মা।
আত্মহত্যা না বলে এই ইংরেজি শব্দটিই সে প্রয়োগ করে। তার মায়ের তখন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট দশা। কানের মধ্যে ভোঁ ভোঁ করে। মাথা ঘুরে ওঠে চক্কর দিয়ে। দুহাতে মেয়েকে জাপটে ধরে আর্তনাদে ফেটে পড়ে।
এ তুই কী বলছিস নীপা!
নীপা খুব সহজে খটখটে গলায় জানায়,

হ্যাঁ, আমি সুইসাইড করব।
যেনবা সুগভীর চিন্তাভাবনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত তার। অন্তর্গত সমস্ত দ্বিধার পাঁচিল অতিক্রম করে এসেছে সে। গত কয়েকদিন সে কথা বলেনি বটে কারও সঙ্গে, কিন্তু ভাবনার প্রবাহ তো রুদ্ধ হয়ে থাকেনি। যথেষ্ট বড় হয়েছে সে। বলা যায় নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিজে গ্রহণ করার মতো ঢের সময় সে পেয়েছে। তাই দ্বিধাহীন কণ্ঠে সে ঘোষণা করতে পারে, সে সুইসাইড করবে। আগাম ঘোষণা দিয়ে এ পথে কে কবে নেমেছে! আর এই প্রলয়ঙ্করী ঘোষণা শোনার জন্যই কি তার বাবা মা এতদিন কান পেতে বসে আছে?
নীপার মা সহসা যেন কোন যাদুমন্ত্রে নিজেকে সামলে নেন। মেয়ের পাশে বসে পরম সখ্যে এবং নির্ভরতায় হাত বাড়িয়ে দেন তার কাঁধে। নীপার চুলের অরণ্যে মমতার আঙুলে বিলি কাটতে কাটতে বলেন,
শোন মা, মানুষের তো একটাই জীবন। মেয়েদের সে জীবন আবার ভীষণ পলকা। সেই জীবন নিয়ে হেলাফেলা করলে চলে?
নীপার মুখে কথা নেই। সব কথার শেষ কথা যেন তার বলা হয়ে গেছে। নীপার মা এবার একটু ঘুরে মুখোমুখি বসেন। মেয়ের মুখটা তুলে ধরেন। চোখে চোখ পড়তেই মেয়েকে চেপে ধরেন,
আমাকে একটা সত্যিকথা বলবি নীপা?
নীপা তাকিয়ে থাকে উত্তরহীন অপলক।
দীপ্তকে তুই ফিরিয়ে দিলি কেন? সাতকান্ড কেলেঙ্কারির কথা জানার পরও তো সে এ বিয়ে ভেঙ্গে দিতে চায়নি! বরং আমি তো শুনেছি তার বাপমাকে পর্যন্ত সে কনভিন্স করতে চেষ্টা করেছে, বুঝিয়েছে অঘটনের পেছনে তোর কোনও হাত ছিল না। সেটা স্রেফ দুর্ঘটনা। তোর জন্যে সে নিজের মা-বাপের উপরে চাপ সৃষ্টি করেছে। তারপরও তুই আর কী চাস বল দেখি!
কী আর বলবে নীপা। মায়ের চোখ থেকে নীরবে চোখটা নামিয়ে নেয়। মা- বাবার কষ্টের জায়গাটা সে উপলব্ধি করতে পারে।

দীপ্তর মতো সুপাত্র বেহাত হবার ধাক্কা সামলে ওঠা সোজা কথা! বেহাত মানে চূড়ান্ত অর্থে নীপাই তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে, দুই পরিবারের স্বপ্নসাধ ভেঙে চুরমার করেছে, একেবারে শেষবেলায় বিয়েতে অসম্মতি জানিয়েছে; জামান উকিলের তো হিতাহিত জ্ঞান হারাবারই কথা। একমাত্র কন্যা আদরের নীপুমনির গায়ে তো আর অল্প দুঃখে হাত ওঠেনি তার। এমনিতেই তার সামাজিক মর্যাদা মাটিতে মিশিয়ে দেওয়ার জন্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ যে নোংরা খেলায় মেতেছে, তাতেই তিনি উ™£ান্ত বিপর্যস্ত। প্রতিকারের পথ না পেয়ে নিজের মাথার চুল ছেঁড়ার দশা। সেই দুঃসময়ে দীপ্ত এগিয়ে আসে। হাত বাড়িয়ে দেয়। একটু দূর সম্পর্কের চাচাতো বোনের ছেলে। ছেলেতে- মেয়েতে যেমন সম্পর্ক, বলা যায় দুই পরিবারের অনুচ্চারিত প্রশ্রয়ে তা পরিণয়ের দিকেই এগিয়েছে। এমন কি বিয়ের কথাবার্তাও পারিবারিকভাবে যখন চূড়ান্তপ্রায়, তখনই ঘটে অঘটন। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ফাঁদে আটকে পড়ে নীপা, অতপর একদিন নিরুদ্দিষ্ট রাত্রিবাস। সেই একটিমাত্র রাত্রিই সব ওলট-পালট করে দেয়। এই ঘটনা জানাজানি হলে দীপ্তর বাবা এ বিয়েতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন; স্বামী-স্ত্রী যুক্তি করে কৌশলে এড়িয়ে যেতে চান। বেঁকে বসে দীপ্ত। বাবামায়ের মুখের উপরে যুক্তি দেখায়- কিডন্যাপের শিকার হয়েছে বলে এর জন্যে তো নীপাকে দায়ী করা যায় না। তাহলে দুর্ভাগ্যের ভার সেই নীপাকেই কেন বইতে হবে!
সেই দীপ্তকে নীপাই কেন প্রত্যাখ্যান করেছে এ ব্যাখ্যা কিছুতেই খুঁজে পায়নি তার মা-বাবা। এ প্রশ্ন তারা আগেও করেছেন। এমন কী এই প্রশ্ন করতে গিয়েই তো প্রবল উত্তেজনায় অস্থির হয়ে জামান উকিল জীবনে প্রথমবারের মতো মেয়ের গালে চড় মারেন। সেই থেকে নীপা নিস্তব্ধ নির্বাক। এতদিন পর মুখ খুলতেই আবার সেই জেরা- দীপ্তকে তুই ফিরিয়ে দিলি কেন? নীপার মা বলেন ফেলেন;
তুই একবার ফোনে কথা বললেই দেখিস দীপ্ত আবার এগিয়ে আসবে।
আবার দয়া দ্যাখ্যাবে, তাই না মা?
নীপার মা চমকে ওঠেন,
দয়া! দয়ার কথা উঠছে কেন?
শুধু আমাকে নয় মা, ওরা তোমাদেরও দয়া করতে চায়। দয়া দিয়ে সংসার চলে, মা? তুমি বলো; চলে?
কী জানি বাপু কী যে বলছিস; তুই-ই জানিস। কেন একবার ফোন করেই দেখ না! মুখে দুবার চুকচুক শব্দ করে নীপা বলে,
তার মানে তোমরা দয়ার কাঙাল হয়ে বসে আছ তাই তো! তোমাদের কিডন্যাপড হওয়া মেয়েকে অনুগ্রহ করে কেউ বিয়ে করলেই তোমরা খুশি!
দয়া হবে কেন, দীপ্ত তোকে ভালোবাসে বলেই এগিয়ে এসেছিল।
ভালো তো আমিও বেসেছি তাকে। ভালোবেসেছি। বিশ্বাস করেছি। কিন্তু সে আমার উপর থেকে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে মা। বিশ্বাস হারানোর পরও কি ভালোবাসা থাকে? সেই ভালোবাসা দিয়ে কি জীবন চলে, তুমিই বলো!

এতক্ষণে ধস নামে নীপার মায়ের কণ্ঠে। আগের সেই জোর খুঁজে পান না, কেমন যেন ফ্যাসফেসে গলায় বলেন,
চলে চলে। কতভাবে যে মেয়েমানুষের জীবন চলে যায়, তুই তার কী জানিস!
ওই যে তুমি বললে- মানুষের একটাই জীবন!
শুধু আমি বলব কেন, ওটাই সত্যি।
সেই জীবনে বিশ্বাসেরও খুব দরকার মা।
এসব কথা কেন বলছিস নীপা?
নীপা এবার বিছানা ছেড়ে নেমে আসে। পায়ে পায়ে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। দূরে দৃষ্টি ফেলে কী যেন খোঁজে। আবার ফিরে আসে ঘরে। বহুদিন পর মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে বলে,
এই যে তোমরা আমাকে ভালোবাসো, ভালোবাসো বলেই বিশ্বাস করো। তাই না?
হ্যাঁ, সন্তানকে তো বিশ্বাস করতেই হয়।
সন্তান বলে নয় মা, ভালোবাসলেই বিশ্বাস করতে হয়। তোমাদের দীপ্তবাবু খুব ভালো ছেলে, কিন্তু বিশ্বাস হারিয়েছে।
তার মানে?
সে বার বার জানতে চেয়েছে গুণ্ডারা সেই রাতে আমাকে কতবার রেপ করেছে। একথা তোমরা কতবার জিগ্যেস করেছ মা?
মায়ের মুখে কথা নেই। চোখে বিস্ময়। নীপা একটু দম নিয়ে বলল, অবশ্য দীপ্ত বাবু অতিশয় দয়ালু ভদ্রজন। আমাকে সে আশ্বস্ত করেছে- তুমি সত্যি কথাটা স্বীকার করলেও এ বিয়ে হবেই। তুমি সত্যিটাই বলো- কতবার এবং কতজন....
নীপার মা এবার চিৎকার করে ওঠেন,
তুই থাম নীপা। থাম।
নীপার তখন কথায় পেয়ে বসেছে। কে থামায় তাকে! সে বলে,
থামব কেন মা? কেন থামব বলো! জীবন তো মোটে একটাই। এ জীবনে বিশ্বাসহীন ভালোবাসা আমি চাই না মা।
নীপার মায়ের কণ্ঠে ছলকে ওঠে আর্তনাদ,

 

নীপা!
সেদিন রাতে যা ঘটেছে তার সবই আমি তোমাদের বলেছি। তাকেও বলেছি। লুকাইনি কিছুই। বলতে পারো মা, তবু তার কেন মনে হলো- আমি সত্যি বলিনি?
নীপার মা কোথা থেকে আচনক এক যুক্তি খুঁজে বের করেন,
হয়ত তোকে নয়, সন্দেহ করে সে বাদলদের গ্র“পের সবাইকে। ওদের পক্ষে তো সবই সম্ভব!
কই সব সম্ভব! আমাকে নিয়ে গিয়ে রাতভর আটকে রেখেছে ঠিকই, কিন্তু আর কী করতে পেরেছে? যুবতী মেয়েকে এক রাত আটকে রাখার খবর জানাজানি হবার পর তোর বাবার কি বেইজ্জত হতে আর কিছু বাকি আছে ভেবেছিস!
না না, ওরা তো ওইটুকুই চেয়েছে। বাদলের বাবা এবার নোমিনেশন পাচ্ছে না এটা প্রায় কনফার্ম। কাজেই আমার বাবাকে ডিসর্টাব করবেই।
তাই বলে তোকে নিয়ে টানাটানি .....
ওরা তো টের পেয়েছে আমার বাবার সবচেয়ে দুর্বল জায়গা কোথায়। তো সেই দুর্বল জায়গাতেই আঘাত করতে হবে, কেমন?
বর্তমানে রাজনীতি এতটাই নোংরা হয়ে গেছে।
সেই জন্যেই তো বাবাকে আমি রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে বলি।
হ্যাঁ, তাহলেই হয়েছে। তার চোখে এখন এমপি হবার স্বপ্ন।
আচ্ছা মা, রাজনীতি করবে বাবা, আর তার জন্যে বলি হতে হবে আমাকে, এটা কেমন বিচার বলো দেখি!
নীপার মা এ প্রসঙ্গের যবনিকা টেনে বলেন,
সে কথা তোর বাপকে শুধাস। এখন চল দেখি...
না মা শোনো। এই জন্যেই ঠিক করেছি আমি সুইসাইড করব।
আবার চমকে উঠেন নীপার মা! দাঁড়িয়ে পড়েন থমকে। এতক্ষণের আলাপচারিতায় তাহলে সুইসাইডের ভূত নামেনি কাঁধ থেকে। ভেতরের আতঙ্ক লুকিয়ে রেখে বলেন, আচ্ছা সে দেখা যাবে।

এখন চল তোকে আমি নিজে হাতে কিছু খাওয়াই। মেয়ের হাত ধরে টানতে টানতে বলেন- কী খাবি বল তো মা, কী খেতে ইচ্ছে করছে?
অনেকদিন পর নীপা এক চিলতে হেসে ওঠে। দুহাতে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে বলে, তোমার হাতের কিল খেতে ইচ্ছে করছে মা।
কী খাবি!
কিল-কিল। বাবা তো সেদিন চড় দিয়েছিলেন, এবার তুমি একটা কিল দিয়ো।
নীপা এবার খিলখিল করে হেসে ওঠে। বহুদিন পর যেন পাহাড় থেকে ঝর্নাধারা নেমে আসে। নীপার মা অবাক চোখে তাকিয়ে থাকেন ঝর্নার স্ফটিকস্বচ্ছ জলের আয়নায়। ভেতরে ভেতরে ভারি আশ্বস্ত বোধ করেন- মুখে যাই বলুক, এ মেয়ে নিশ্চয় সুইসাইড করবে না।
নীপার বাবা রাতে বাসায় ফেরেন বেশ হই হই করতে করতে।
হাতে এক গোছা রজনীগন্ধা। তিন পদের মিষ্টি। নিজে বাসুদেবের দোকানে গিয়ে মেয়ের পছন্দের মিষ্টি নিয়ে এসেছেন। ও বেলাতেই নীপার মা মোবাইলে জানিয়েছে নীপা মুখ খুলেছে, কথা বলেছে, খাবার খেয়েছে; বুক থেকে পাষাণ পাথর নেমে যাবার স্বস্তি পেয়েছেন। মেয়ের গায়ে হাত তোলার পর থেকে যে আগুনে তিনি দগ্ধ হচ্ছিলেন, তাও যেন সহসা নিভে যায়। মেয়ের খবর পাবার পর সারাটা দিন তার শুভ হয়ে যায়। কোর্টে একাধিক মামলায় রায় আসে তার পক্ষে, মার্ডার কেসের আসামির পক্ষে দাঁড়াতেই জামিন হয়ে যায়। কোর্ট থেকে বেরোতে সহসা দীপ্তর বাবার সঙ্গে দেখা, এক গাল হেসে আশ্বস্ত করেছেন- ছেলেমেয়ের মান-অভিমান ফুরালেই আবার সব ঠিক হয়ে যাবে। আর এই তো কিছুক্ষণ আগে পার্টি অফিস থেকে বেরোবার মুহূর্তে ফোন এলো নোমিনেশন নিয়ে টেনশন করবেন না, রুট লেবেলে কাজ করে যান, মূল্যায়ন ঠিকই হবে। স্বয়ং কাশেম ভাইয়ের ফোন, সেন্ট্রাল কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক, তার কথার দাম আছে না? জামান উকিল তাই বাড়িতে ঢোকেন আনন্দের খই ফোটাতে ফোটাতে-
কই রে আমার নীপুমনি! মা মনি কই!
জামান উকিলের এই আনন্দ উচ্ছ্বাস কিন্তু দীর্ঘক্ষণ স্থায়ী হতে পারে না। সামনের ইলেকশনে পার্টি নমিনেশন পাবার গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ শেষ করেই তিনি চলে আসেন দীপ্তর বাবার কথায়। নীপার মাকে তিনি বলেই ফেলেন, টানাপোড়েন একটু হয়েছে বটে তবু তার বিশ্বাস, এ বিয়ে হবেই। মেয়ের মুখের দিকে একবার তাকিয়ে নীপার মা ঘোষণা করে দেয়- দীপ্তকে নীপা বিয়ে করবে না।
দীপ্তকে বিয়ে করবে না! মধ্যরাতে আকাশভাঙা মাথায় দপদপ করে জ্বলে ওঠে চাঁদি, চিৎকার করে ওঠেন নীপার বাবা- তাহলে কাকে বিয়ে করবি তুই? কে তোকে বিয়ে করবে?
নীপার ঠোঁটে বিষণœতার প্রলেপজড়ানো হাসি। সেই হাসির ভাঁজ খুলে সে ধীরে ধীরে বলে, আমি যেখানে বিয়ে করব তারা সবাই সদলবলে তোমার ইলেকশনে কাজ করবে। প্রতিপক্ষ গ্র“প স্বপক্ষে চলে এলে আর তোমার এমপি হওয়া ঠ্যাকায় কে!
এসব তুই কী বলছিস নীপা!
হ্যাঁ বাবা, আমি কথা বলে দেখি- বাদল যদি রাজি থাকে তো আমি তাকেই বিয়ে করব।
নীপার বাবা স্তম্ভিত। বাক্যহারা। নীপার মা চিৎকার করে ওঠেন,
এর চেয়ে তোর সুইসাইড করাই ভালো।
নীপার ঠোঁটের হাসি ক্রমশ প্রসৃত হয়। বিষণœতার আবরণও খসে পড়ে; অবলীলায় সে বলতে পারে-
হ্যাঁ, সুইসাইড তো করতেই চাই। বাদলকে বিয়ে করা আর সুইসাইড করার মধ্যে বিশেষ তফাৎ কী মা! দেখো আমি ঠিক সুইসাইড করব।
এরপর ঘরের ভেতরের বাতাস ভারি হয়ে আসে। প্রশস্ত ঘর। তবু তিনটি মানুষেরই যেন ভয়ানক শ্বাসকষ্ট হয়। তিনজনই ভীষণ হাফিয়ে ওঠে।

 

যদিদং হৃদয়ং তব

রঞ্জনা ব্যানার্জী

একেই বলে ‘কাল’-এর খেলা। আমার কুসুম হলুদ ভোর এক তুড়িতেই কালিঢালা রাত! দুপুর ৪টা থেকে রাত ৮টাÑ মাত্র চার ঘণ্টা। এর মধ্যেই জীবনের মোড় ঘুরে গেল। আমি চাইলেও পিঠটান দিতে পারলাম না। আর এখন আমার হাতের ওপর ভুল হাত। দুর্বার আঁটি দিয়ে আঙুলে আঙুল বাঁধা। জুড়ে যাচ্ছি আমি ‘যদেতৎ হৃদয়ং তব তদস্তু হৃদয়ং মম...!’ সামনে লকলকে আগুন জিভ ভেংচাচ্ছে।
আমার চোখ জ্বলছে না। যজ্ঞের ধোঁয়া অরূপদার চশমার কাচ ঠেলে চোখে লাগছে। টিস্যুর বক্স থেকে ফিনফিনে কাগজ উঠছে-নামছে। আমি আবছা দেখি। মা এখনো বাড়িতে। ‘বাবা ভালো আছেন, বিপদ কেটে গেছে’Ñ টুনু পিসি কানের কাছে এসে জানান দেন। অরূপদা আমার হাতে আলতো চাপ দিচ্ছেন কি? হয়তো আমারই মনের ভুল অথবা আশ্বস্ত করতে চাইছে, ‘সব ঠিক হয়ে যাবে’Ñ যেমনটা ফোনে বলেছিলেন। চার ঘণ্টার মধ্যে আমার জামাইবাবু হতে হতে অরূপদা কেমন বর হয়ে যাচ্ছেন বিধাতার বালখিল্যে। আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। তবুও এসব ঘটছে।
খুব সম্ভব কনেবদলের কথা চাউড় হয়ে গেছে। আমি টের পাচ্ছি ভিড়ের চাপ। ফিসফাস। এ গল্প চলবে অনেক দিন। ডালপালা ছড়াবে, কুসুমিত হবে। সহজে মিটবে না।
কী অবাক কা-! আমার আজ এই আসরে নাচার কথা ছিল। ‘বাজিরাও মাস্তানি’র ওই হিট গানটি ‘ইঙ্গা গা পরি পিঙ্গা গা পরি’। আহা! সুর বাজছে মাথায়। আমি, চৈতালি ও ফাক্ষিদা এক সপ্তাহ ধরে রিহার্সাল দিয়েছিলাম।
আচ্ছা, তুর্য কী করছে? সে কি আমাকে দেখে গেছে কোন এক ফাঁকে?
এই তো কিছুক্ষণ আগে প্রবীর মামার গাড়িতে ‘বকুল ফুল’ বাজছিল। গাড়িটি তার বন্ধুর। প্রবীর মামার চাল-চুলোরই ঠিক নেই, তার আবার গাড়ি! আমেরিকায় ছিলেন কিছুদিন। বছর দুয়েক। তা অনেক আগের কথা। ওপি ওয়ান-এর লটারিতে। তখনো ডিভি চালু হয়নি। ফিরে এসেছিলেন। ভালো লাগেনি আমেরিকা। সবাই সোনার হরিণ ধরার নেশায় লাইন লাগাচ্ছে আর প্রবীর মামা হেলায় ছেড়ে দিলেনÑ ‘ধুর, ওটা একটা জীবন হলো?’ তবে গাড়ি চালানোটা ভালো শিখেছিলেন। মা দূরে কোথাও গেলে ড্রাইভার নয়, প্রবীর মামাকে সঙ্গে নিতেন। আর আজ সেই প্রবীর মামার জন্যই আমার শক্ত-পোক্ত বাবার জীবন প্রায় থেমে যাচ্ছিল। বাবা যখন পড়ে গেলেন তখন বিকাল ৪টা বেজে ১৭ মিনিট। মেসেজটি এসেছিল আমার সেলফোনে।
দুপুরে আমরা দলবেঁধে পার্লারে সাজতে যাচ্ছিলাম। দিদিভাই, আমাদের তুতো বোনরা, কাকিমা, টুনু পিসি ও আমরা তিন বান্ধবীÑ সব মিলে দশজন। মাইক্রোবাসে জায়গা হচ্ছিল না বলে আমিই নেমে উঠলাম প্রবীর মামার গাড়িতে, সঙ্গে চৈতালি। ফাক্ষিদা রয়ে গেলেন। তার নেইলপলিশ শুকায়নি। জায়গা পাল্টানোর রিস্কে নেই সে। প্রবীর মামা খেপালেন আমাকেÑ ‘ছিঃ! তোকে বৌয়ের গাড়ি থেকে নামিয়ে দিল?’ আমি ক্যাসেটের ভলিউম বাড়িয়ে দিয়েছিলামÑ ‘শালুক ফুলের লাজ নাই, রাইতে শালুক ফোটে লো রাইতে শালুক ফোটে’।
এ গাড়িটি পার্লারে যাওয়ার কথা ছিল না। ছোট মামা রেগে গিয়েছিলেনÑ ‘দুই গাড়ি এক কাজে যাচ্ছে! মানে কী এসবের?’ গাড়িটি কী নিয়তিই টেনে নিল, নাকি আমিই দাবার ঘুঁটি হয়ে অন্যের চালে পা দিলাম?
সব যেন কেমন অন্য এক জীবনে ঘটেছিল মনে হচ্ছে। কী আনন্দে ভাসছিলাম! আমাদের পরিবারের প্রথম মেয়ের বিয়ে। যদিও দু’দিন আগে বাসি বিয়ের বেদি বানানো হয়েছিল তবুও তুর্য আলপনা করল কাল! চার ঘণ্টা লেগেছিল শেষ করতে। আমি আর ফাক্ষিদাও সাহায্য করেছিলাম। আমার ফেসবুক ওয়ালে ছবিও পোস্ট করেছি।

তুর্যের তোলা সেলফি। আমার ও তুর্যের প্রথম এবং শেষ ছবি। পুরো ছাদটি কী সুন্দর সাজিয়েছিল সে! ঝকমকে। একদম সিনেমার সেট। নীল গোলাপি থিম। কী অদ্ভুত! আগামীকাল সকালে দিদিভাই নন, আমার পা পড়বে ওই বেদিতে।
কাল রাতের চাঁদটা অন্য রকম ছিল। কেমন যেন নেশা লাগা। রোশনাই করে রেখেছিল আকাশটাকে। কাল সব অন্য রকম সুন্দর ছিল। তুর্য অনেক ক’টা গান গেয়েছিল। চৈতালি তো গান শুনেই কাত। তার আদিখ্যেতা দেখে আমার রাগ হচ্ছিল। তুর্য টের পেয়েছিল। খুব ক্যাজুয়ালি বললো, ‘ওই চাঁদটা দ্যাখ’! আমি ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম। ‘ওটা আকাশে থাকুক কিংবা না থাকুক, আমি তোর জন্য থাকবো যদি আকাশ থাকে।’ হাসনাহেনা গাছ নেই এ তল্লাটে। তাও ওই মুহূর্তে বাতাসে হাসনাহেনার গন্ধ ঘিরে রেখেছিল আমাকে। আর এখন সবকিছু ভয়ঙ্কর সত্য হয়ে খাড়া দাঁড়িয়ে আছে আমাকে ঘিরে। সানাইটাও বাজছে না আর। বন্ধ করে দিয়েছে কেউ অথবা কেঁদে কেঁদে নিজেই থেমে গেছে। সানাইয়ের সুরটা বেশ একটা পরাবাস্তব ইফেক্ট দিচ্ছিল। মনে হচ্ছিলÑ আমার নয়, অন্য কারো বিয়ে। এখন কেমন দমবন্ধ লাগছে সব। বাতাসের ভেতর বাতাস ফাঁস খাচ্ছে যেন!
অনেক শখ করে চুল বেঁধেছিলাম। জটিল বিনুনি। তুর্যের চোখ টেরা হয়ে যেতো আমাকে দেখলে। ঘাগরা চোলিটা অনলাইনে অর্ডার করিয়ে আনিয়েছিলাম। সাদা ও হালকা বেগুনি। পুরো লেইসের কাজ। দর্জিকে দিয়ে ফিটিং করাতে অনেক খরচা হয়েছে। এখন পড়ে আছে আমার ঘরে গতকালের গল্প হয়ে।
এসএমএসটি আসার আগেই আমরা জেনে গিয়েছি, প্রবীর মামার গাড়িতে পালিয়েছেন দিদিভাই। মাইক্রোবাসের ড্রাইভার দেখেছে। সে অতশত বোঝেনি। মনে করেছিল, কনে হয়তো আগেই ফিরছে। প্রবীর মামাই যে নাটের গুরু তা জানা গেল পরে, চিঠিটা পড়ে। আর ‘গর্ভধারিণী’ বইটার ভেতরের পাতায় আছে চিঠি। তা জেনেছি মেসেজ থেকে। অদ্ভুত হিসাবি চিঠি। তাড়াহুড়া নয়, কাটাকুটি নেই, অযথা আবেগ নেই। এক পাতায় সব বলা। মাফ চেয়েছেন মা, বাবা, এমনকি অরূপদা, অরুণ কাকুর কাছেও। আশীর্বাদের আংটিটা খামের ভেতরে রেখে গেছেন। প্রবীর মামা তার স্বামী। বিয়ে করেছেন তারা মাস দুয়েক আগে। জানানোর পরিবেশ ছিল না। ব্যস।
বিয়েটা ঠিক হয়েছিল হঠাৎই। অরুণ কাকুর সঙ্গে বাবার যোগাযোগ ছিল না অনেক বছর। লোকনাথ ব্রহ্মচারীর তিরোধান দিবসে আশ্রমে দেখা। ছেলে এসেছে ইংল্যান্ড থেকে পিএইচডি সেরে। বিয়ে করেই ফিরে যাওয়ার কথা।

দুই মাস ধরে কনে দেখা চলছে। উপযুক্ত পাত্রীর বড়ই আকাল। বছরের শেষ, বিয়ের তারিখও যাই যাই করছে। এবার না হলে কুষ্ঠি ঠিকুজির গ্রহের চক্করে পড়বে। দিদিভাইয়ের জন্যও পাত্রের সন্ধান চলছিল। মাস্টার্সের রেজাল্ট বেরিয়েছে সবে। কথায় কথায় জানা হয়ে গেল, এক গোত্র? সমস্যা সমাধানের উপায়ও আছে শাস্ত্রে। তবে আর ঠেকা কী? ছেলেকে দেখেই পছন্দ হয়ে গেল বাবার। মেয়ে দেখাদেখির কিছু নেই। অরুণ কাকু কতো এসেছেন আমাদের চাটগাঁর বাসায়!
এক্কেবারে রাজযোটক। একটু-আধটু ঝামেলা যা আছে, তা মন্ত্রে। দানে শুভ হয়ে যাবেÑ শাস্ত্রীমশাই টিকি নেড়ে বিধান দেন। এক সপ্তাহের মাথায় আশীর্বাদ। প্রদীপ মামা তার মাকে নিয়ে কলকাতায় তখন। কুমিল্লায় প্রবীর মামার মায়ের ল্যাপ্রস্কোপিক সার্জারি হয়েছিল গলব্লাডারে। কিন্তু ভেতরে পাথর রয়ে গিয়েছিল। ওই থেকে জন্ডিস। ঢাকায় বারডেমে আবার ওই পাথর খুঁজে বের করা হলো। কী ভীষণ অবস্থা! আমরাও দেখতে গিয়েছিলাম। যে ডাক্তার ওই অপারেশন করেছিলেন কুমিল্লায় তার নামে একটা প্রতিবেদন ছাপা হয়েছিল সেখানকার পত্রিকায়। প্রদীপ মামা নিউজের কাটিং দেখিয়েছিলেন আমাদের। এতে অবশ্য ডাক্তারের কিচ্ছু হয়নি। কিন্তু ভদ্রমহিলার স্বাস্থ্য আর ফিরছিলই না। তাই চেকআপ করাতে কলকাতায় গিয়েছিলেন।
আশীর্বাদের রাতে প্রদীপ মামা হাজির। উষ্ক-খুষ্ক চুল। বিধ্বস্ত অবস্থা। সকালে মাকে নিয়ে চাটগাঁ এয়ারপোর্টে নেমেছেন। সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া করে কুমিল্লায় বাড়ি পৌঁছে দিয়েই ঢাকার বাস। কিন্তু জ্যাম ঠেলে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা মরে রাত। খবর পেলেন কীভাবে? এমনিই এসে পড়েছেন। ছোট মামা খেপালেনÑ ‘খাওয়ার বাসে মন টেকেনি। তাই তো এসেছি!’
ছোট মামার মতো প্রবীর মামারও অবাধ যাওয়া-আসা এ বাড়িতে। মায়ের কাছে প্রবীর মামা অনুযোগ করছিলেন, ছেলে বিদেশে থাকে। তার খবর ঠিকঠাক আনার জন্যও তো সময় চাই। বড্ড তাড়াহুড়ার সিদ্ধান্ত! মা বলেছিলেন, ‘রোস্ট খা। যখন ছেলের বাড়ি যাবো আশীর্বাদ করতে তখন নিজেই জেরা করিস।’
পার্লারে কী ভীষণ ভিড় ছিল কাল! আমাদের অবশ্য অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেয়া ছিল। বিয়ের কনের স্পেশাল সাজ। দিদিভাই আলাদা রুমে। তার পছন্দের মেকআপ আর্টিস্টের সঙ্গে। টুনু পিসি ছিলেন সঙ্গে। শাড়ি পরার আগে ওয়াশরুমে যাওয়া জরুরি। ব্লাউজ, পেটিকোট পরা কেবল এবং ওপরে পার্লারের হাউসকোট। একাই গেলেন। পার্লারের মেয়েটা অনেকক্ষণ

অপেক্ষা করছিল শাড়ি হাতে। পরে টুনু পিসির নজরে এলো দেরিটা। আমার মুখের সাজ বাকি। চুল বাঁধা সবে শেষ। হাতে নেইলপলিশ লাগানো চলছে। এরপর মেকআপ। এর মধ্যেই টুনু পিসি হাজির। গা শিউরে উঠেছিল আমার। ‘কুর্চি! দীপা নেই’Ñ টুনু পিসি হাঁপাচ্ছেন তখনো। এতো বড় পার্লার, কে আসছে, কে যাচ্ছে এর খোঁজ কে রাখে? গয়নাগাটি পরানো হয়নি, কেবল নথ আর টিকলি।
চিঠিতে চোখ বুলিয়ে বাবা গুম ছিলেন কিছুক্ষণ। এরপরই ঢলে পড়লেন। মুখ দিয়ে ফেনা বের হচ্ছিল। যে বাবার কখনো জ্বরও হতে দেখিনি সেই বাবার হার্ট অ্যাটাক! পরের এক ঘণ্টা চূড়ান্ত হই চই, চিৎকার-চেঁচামেচি। অ্যাম্বুলেন্স এলো পাড়া কাঁপিয়ে। ভিড় ঠেলে গাড়িতে ওঠাতে বেশ সময় নিল। ছোট মামা গেলেন সঙ্গে।
অরুণ কাকুকে ফোন দিলেন টুনু পিসি। মা তখনো এক কোণে বসে মেঝের দিকে ফ্যাল ফ্যাল দৃষ্টিতে চেয়ে! ঢাকায় কী জ্যাম! অরুণ কাকু আসতে আসতেই ঘণ্টা পার। জ্যামে বসেই যা জানার জানলেন টুনু পিসির কাছে। বাড়ি এসে চিঠিটা পড়লেন বারকয়েক। বাবার খোঁজ নিলেন। বিবশ বাড়িটার শোধ ফিরতে শুরু করলো যেন। রাত ৮টায় প্রীতিভোজ। ৭টা ছুঁই ছুঁই। লগ্ন যদিও দেরিতেÑ রাত ১১ গতে ২৩ মিনিট। বাড়ি থেকেও ফোন আসছে অরুণ কাকুর সেলে। কী হবে, কী করণীয়? অরূপদা ফোনে।
হঠাৎ আমার দিকে তাকালেন কাকু। আমার বুক কেঁপে উঠলো। আমি জানি না, কীভাবে জানলাম ওই অশনি সংকেত। আমাকে কেউ যেন শক্ত করে পেরেক ঠুকে ঘটনার ভেতর আটকাচ্ছে! আমি মাথা ঝাঁকাচ্ছি। কিন্তু জগদ্দল পাথর হয়ে ঘাড়ে বসে আছে মাথা। নড়ছে না। অরুণ কাকু হাত জোড় করে বিড়বিড় করছেন কিছু। আমি কিছুই শুনতে পাচ্ছি না। কানের ভেতর বোলতা ভোঁ ভোঁ করছে বেরোনোর রাস্তা হারিয়ে। মা চোখে আঁচল চাপা দিয়ে কাঁদছেন। আমার বিনুনি বুকের একপাশে সাপের মতো বেঁকিয়ে আমার দিকে তাকাচ্ছে। বুকের ভেতর বেহুলা মাথা কুটছে। কুষ্ঠি ঠিকুজি কিচ্ছুর দরকার নেই আর। দু’বাড়ির সম্মান আগে। অতঃপর পাথর হয়ে যাই। আমার সামনে ঘটনাগুলো দুরন্ত ছোটে। থামে। কাঁদে। অনুনয় করে। ধমকায়।
অরূপদা কিছু জানতে চান। কেউ ফোন চেপে ধরে আমার কানেÑ ‘তোমার কাউকে পছন্দ?’
টুনু পিসি ভাঙা রেকর্ড হয়ে বাজতে থাকেনÑ ‘বাবাকে বাঁচাও।’
মা মুখে আঁচল চেপে থাকেন। শুভকাজে কাঁদা বারণ। আমি জেনে যাই, পৃথিবীটা আর কখনোই দু’ভাগ হবে না। সীতা ঢুকে ধরণীর দুয়ার আটকে দিয়েছে চিরতরে। দিদিভাইয়ের গয়না পরানো হয় আমাকে। টিকলি, নথ ছাড়াই বৌ হয়ে গাড়িতে উঠি। তার ছেড়ে যাওয়া বেনারসির বেমিল ব্লাউজ কায়দা করে ওড়না দিয়ে ঢাকা হয়। কেউ উলু দেয়। শাঁখে ফুঁ দিয়ে শুভযাত্রা হয়। মঙ্গল প্রদীপ ঘুরিয়ে বালাই-ষাট করে কেউ। আমি সবার বালাই মাথায় নিয়ে ফুলে ঢাকা গাড়িতে উঠি। আকাশ কাঁদে না। তুর্য আসে না। চাঁদ নির্বিকার মেঘে সাঁতরায়।
অতঃপর আমার সম্প্রদান হয়। পুরোহিতের সুরে সুর মিলিয়ে অরূপদা মন্ত্র সম্পূর্র্ণ করছেন এই মুহূর্তেÑ ‘যদিদং হৃদয়ং মম তদস্তুু হৃদয়ং তব।’
আমার হৃদয় ভাবলেশহীন দূর্বা ঘাসের বাঁধুনির ফাঁকে অবাক চোখে দেখে চন্দন কাঠের যজ্ঞে তার নিজের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার উৎসব।

নিঃসঙ্গ

খান অপূর্ব আহমদ 

 

 

কয়েকদিন ধরে তমালের মনে অস্থিরতা বিরাজ করছে। সব সময় বুক ধড়ফড় হয়। মাঝে মধ্যে বুকে চিন চিন ব্যথা করে। কখনো নিঃশ্বাস আটকে আসে। মনে হয়, এই বুঝি ফুসফুসের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাবে। এ জন্য মাথার মধ্যে নানান দুশ্চিন্তা এসে ভর করে। কিছুই ভালো লাগে না। যখন এমন হয় তখনই তমালের মা ফোন করেন। তার খোঁজখবর নেন। আর এতে সে পরিপূর্ণ সুস্থ অনুভব করে। কথায় আছে, সন্তানের কিছু হলে প্রথম মা-ই টের পান। এটি ভেবে তমাল স্বাভাবিক হয়ে যায়। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। তমালের মা ফোন করে জানতে চেয়েছেন সে ভালো আছে কি না। আজ মায়ের সঙ্গে কথা বলেও নিজের ভেতরের অস্থিরতা কাটাতে পারছে না। শুধু ভাবছে কোথাও কারো কোনো বিপদ হলো নাকি!
তমালের বদ্ধমূল ধারণা, বুক ধড়ধড় করা মানে আপনজন কারো কোনো সমস্যা হওয়া। অতীতের অনেক ঘটনায় এমন প্রমাণই পেয়েছে। ফলে ওই ধারণাটি তার মগজে বিঁধে আছে। তাই সে এ সময় মায়ের কথাই বেশি করে মনে করে। কারণ মায়ের বয়স হয়েছে। যখন-তখন তার যে কোনো সমস্যা হতেই পারে। কিন্তু তার মা তো এখন ভালো আছেন। তাহলে? এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ একটি ফোন আসে। নাম্বারটি সেইভ না খাকায় ভয়ে ভয়ে কলটি ধরে।
- হ্যালো।
কেমন আছ? ব্যস্ত নাকি?
- কে বলছেন প্লিজ!
আমি জান্নাত। চিনতে পারছ, নাকি একেবারেই ভুলে গেছ? আর ভুলে যাওয়ারই কথা। কেননা মনে রাখার মতো আমি আসলেই কিছু করিনি।
- না, তা হবে কেন?
না হলে অন্তত নাম্বার সেইভ থাকতো।
- বিষয়টি তা নয়। আসলে ফোনসেট চেঞ্জ করায় অনেক নাম্বারই সেইভ নেই। থাক, সংসার কেমন চলছে?
ভালো-মন্দ মিলিয়েই তো জীবন। আছি এক রকম। আর সংসার নেই। ডিভোর্স হয়ে গেছে প্রায় তিন বছর। নিঃসঙ্গ জীবন কাটাচ্ছি বলতে পারো।
- সত্যিই দঃখজনক। সাত বছর প্রেমের পরিণতি দু’বছরেই সব শেষ!
ওই ভ-কে বিয়ে করিনি। করেছিলাম আমার সহকর্মীকে। সেও প্রতারক। তার শিক্ষাগত যোগ্যতাসহ ফ্যামিলির অনেক কিছুই গোপন করেছিল। তাও চেষ্টা করেছিলাম মানিয়ে নিতে। ‘পারিনি।
- তোমরা কি এক সঙ্গে পড়তে?
হ্যাঁ।
- তারপরও সে এতো কিছু গোপন করলো কী করে? দেখেছ তুমি কতোটা বোকা! অথচ তুমি বিভিন্নভাবে সতর্কতা অবলম্বন করতে। মনে করতে জীবনে কখনো কিছুতেই ভুল করবে না। আমি বলতাম, তুমি খুব সরল। ওই সরলতাই তোমাকে সর্বনাশ করবে। তখন মানতে চাওনি।
এ জন্যই তোমাকে ফোন করা। কয়দিন ধরে শুধু তোমার কথাই মনে পড়ছিল। তাই অনেক দ্বিধা-দ্বন্দ্ব নিয়ে কল করলাম। ভাবছিলাম, তুমি হয়তো অ্যাভয়েড করবে। অবশ্য তোমার ওই কথাটি মনে করেই সাহস পেলাম।
- হ্যাঁ, আমি বলেছিলামÑ সুখের সময় আমাকে খুঁজো না, দুঃখ পেলে মনে করো। তবে এ কথা তুমি মনে রাখবে তা ভাবিনি।
যাক, তোমার কথা বলো।
- আমার অবস্থা একই রকম। মানে, আগের চাকরিতেই আছি। পরিবর্তন শুধু সন্তানের বাবা হয়েছি। আমার ওয়াইফ নির্ভেজাল গৃহিণী।
এখন রাখি। তোমার সঙ্গে কথা বলে মনটা বেশ ফ্রেশ লাগলো। এখন থেকে মাঝে মধ্যে তোমার সঙ্গ চাইবো। তাছাড়া তোমার ধারণা অনেকটাই সঠিক হয়। তাই কিছু সাজেশন নেবো।
- আমার বিশ্বাস হয় না। কারণ তুমি তো খেয়ালি মানুষ। কোন খেয়ালে ফোন করেছ জানি না। ঠিক আছে। তখন তোমার গত পাঁচ বছরের গল্প শোনা যাবে।

তমাল একটি ফার্মে নির্বাহী পদে চাকরি করে। জান্নাত একটি ট্রাভেল এজেন্সির মার্কেটিংয়ে ছিল। ভ্রমণে যাওয়ার সুযোগ-সুবিধা জানানোর জন্য সে একদিন তমালের অফিসে এসেছিল। আর প্রথম দেখাতেই জান্নাতকে ভালো লেগেছিল তমালের। এরপর থেকে নিয়মিত তাদের সঙ্গে কথা হতো। এক পর্যায়ে তমাল বলেই ফেলে তাকে বিয়ে করার কথা। জান্নাত তখন বলেছিল, সে একজনকে ভালোবাসে এবং তাকেই বিয়ে করবে। তবে আমাদের বন্ধুত্ব আজীবন থাকবে। এরপর থেকে তাদের মধ্যে যোগাযোগ কমতে থাকে। এক সময় তা বন্ধ হয়ে যায়।

 চৈত্রের শেষ বিকেল

শায়লা হাফিজ

 

চৈত্রের শেষ দিন নববর্ষের আগমন সুখের সঙ্গে যেন মনে এনে দেয় ঋতুরাজ বসন্তের বিদায়ী ব্যথা মেশানো বিরহ বিধুর লগ্ন। তাই একটি বছরের অনেক অসন্তোষ, অনেক না পাওয়ার দুঃখ-গ্লানি ভুলে বাঙালি প্রাণ নেচে ওঠে নানা আয়োজনে বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণের আনন্দে। জীর্ণ পুরনো সব গ্লানি ধুয়ে-মুছে ‘নব আনন্দ বাজুক প্রাণে- এই মঙ্গল কামনায় বাঙালি বিদায় জানাবে কাটিয়ে দেয়া একটি বাংলা বছর।
বাংলা সনের শেষ মাসের নামকরণ করা হয়েছে চৈত্র। চৈত্র মাসের নাম ‘চৈত্র’ কীভাবে হলো? আদি পুরাণে বর্ণিত আছে, রাজা দক্ষের এক কন্যা ছিল চিত্রা। তার নাম অনুসারে এক নক্ষত্রের নামকরণ করা হয় চিত্রা নক্ষত্র। এই চিত্রা নক্ষত্র থেকে চৈত্র মাসের নামকরণ করা হয়। বাংলা সনের শেষ মাসের নামকরণ করা হয়েছে চৈত্র।
বহুকাল ধরে বাংলা বছরের সমাপনী মাস চৈত্রের শেষ দিনটিতে হিন্দু সম্প্রদায় ‘চৈত্র সংক্রান্তি’ পালন করছে। তাই বাংলা বছরের সমাপনী দিনটি ‘চৈত্র সংক্রান্তি’ নামে সমধিক পরিচিত। সংক্রান্তি কথাটির অর্থ ‘অতিত্রম করা’। সূর্য এক রাশি থেকে অন্য রাশিতে প্রবেশ করে বলেই এটিকে বলা হয় সংক্রান্তি। ফলে মাসের শেষ দিনটিকে বলা হয় সংক্রান্তি। চৈত্র সংক্রান্তি এখন কেবল কোনো ধর্ম বা মতের মধ্যে আবদ্ধ নয়, এটি রূপ নিয়েছে এক সর্বজনীন বর্ণিল উৎসবে।
চৈত্র সংক্রান্তির আসল আর্কষণ থাকে চড়ক পূজা। এটি কেন্দ্র করে দেশের অনেক জায়গায় বসে মেলা। চৈত্র সংক্রান্তির মেলায় বাঁশ, বেত, প্লাস্টিক, মাটি ও ধাতুর তৈরি বিভিন্ন তৈজসপত্র ও খেলনা, বিভিন্ন ফল ও মিষ্টি কেনা-বেচা করা হয়। বায়োস্কপ, সার্কাস, পুতুলনাচ, ঘুড়ি ওড়ানো ইত্যাদি চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থাও থাকে। অঞ্চলভেদে এই মেলা এক থেকে সাত দিন চলে। চড়ক পূজা চৈত্র সংক্রান্তির এক অন্যতম অনুষঙ্গ। লৌকিক আচার অনুযায়ী এই দিনে বিদায় উৎসব পালন করে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়। দোকানপাট ধুয়ে-মুছে বিগত বছরের যতো সব জঞ্জাল, অশুচিতা বিদূরিত করা হয়। পরদিনই খোলা হয় ব্যবসায়িক হিসাব-নিকাশের নতুন খাতা। এ উৎসবের লোকায়ত নাম ‘হালখাতা’।
বাংলার ঋতুচক্রের পালাবদলে চৈত্র আসে গ্রীষ্ম উষ্ণতা নিয়ে। প্রখর তপন তাপে আকাশ তৃষ্ণায় তৃষ্ণার্ত হয়ে ওঠে। মানব মনও তৃষিত হয় প্রকৃতি বরণ ও স্মরণ করতে। বাংলা বছরের সমাপনী মাস চৈত্র। চড়ক গাজন উৎসবের একটি প্রধান অঙ্গ। এ উপলক্ষে এক গ্রামের শিবতলা থেকে শোভাযাত্রা শুরু করে অন্য শিবতলায় নিয়ে যাওয়া হয়, একজন শিব ও একজন গৌরী সেজে নৃত্য করেন এবং অন্য ভক্তরা নন্দি, ভৃঙ্গি, ভূত-প্রেত, দৈত্যদানব প্রভৃতি সেজে শিব-গৌরীর সঙ্গে নেচে চলেন। এ সময় শিব সম্পর্কে নানান লৌকিক ছড়া আবৃত্তি করা হয়। এতে শিবের নিদ্রাভঙ্গ থেকে শুরু করে তার বিয়ে, কৃষিকর্ম ইত্যাদি বিষয় উল্লেখ থাকে। এ মেলায় সাধারণত শূলফোঁড়া, বানফোঁড়া ও বড়শিগাঁথা অবস্থায় চড়ক গাছে ঘোরা, আগুনে হাঁটা প্রভৃতি ভয়ঙ্কর ও কষ্টসাধ্য দৈহিক কলাকৌশল দেখানো হতো।

ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের বর্ষ বিদায় ও বর্ষবরণ উৎসব হলো ‘বৈসুক’। বাংলা বছরের শেষ তিন দিন পার্বত্যবাসী অতি আনন্দের সঙ্গে এই উৎসব পালন করে থাকে। অন্য সম্প্রদায় তথা সব ধর্মের মানুষ এই উৎসবে অংশগ্রহণ করে থাকে। সামর্থ্য অনুযায়ী ঘরের ছেলেমেয়েদের নতুন পোশাক দেয়া হয়, খাবার হিসেবে বিভিন্ন রকমের পিঠা ও পাঁচন তৈরি করা হয়ে থাকে। বৈসুক উৎসবের প্রধান আপ্যায়নের বস্তু হলো পাঁচন। এটি সাধারণত বন-জঙ্গলের হরেক রকমের শাকসবজির মিশ্রণ। তারা মনে করে, বছরের শেষ ঋতু পরিবর্তনের সময় বিভিন্ন শাকসবজি দিয়ে রান্না পাঁচন খেলে পরবর্তী বছরের রোগবালাই থেকে রেহাই পাওয়া যাবে। বছরের শেষ দিনের আগের দিন ‘হারি বৈসুক’ ও শেষ দিনকে বলে ‘বৈসুকমা’ এবং নতুন বছরকে বলে ‘আতাদাকি’।
হারি বৈসুকের দিনে প্রথমে তারা ফুল সংগ্রহ করে বাড়িঘর, মন্দির সাজায়। তারপর গায়ে কুচাই পানি (পবিত্র পানি) ছিটিয়ে স্নান করে আসে। এর সঙ্গে বয়োজ্যেষ্ঠদের পানি তুলে স্নান করিয়ে আশীর্বাদ নেয়। পরের দিনে পাড়ার যুবক ছেলেরা এক ওঝার নেতৃত্বে দলবেঁধে গরয়া নৃত্যের মহড়া দেয়। এই গরয়া দেবতার পূজা দিয়ে আশীর্বাদ বক্ষবন্ধনী কাপড় দিয়ে বেঁধে রাখে। তাদের বিশ্বাস, কারায়া গরয়া হচ্ছে বনের হিংস্র পশুগুলোর নিয়ন্ত্রণকারী দেবতা। তাদের পূজার আশীর্বাদ গ্রহণ করলে পরবর্তী বছরে জুম চাষ ও বিভিন্ন কাজে বন-জঙ্গলে গেলে হিংস্র পশুগুলোর আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।
মাস হিসেবে বৈশাখের প্রথম হওয়ার মর্যাদা খুব বেশি দিনের নয়। বৈদিক যুগে সৌর মতে, বছর গণনার যে পদ্ধতি প্রচলিত ছিল, সেখানেও বৈশাখের সন্ধান মেলে। বৈদিক যুগের ওই তথ্য অনুযায়ী বৈশাখের স্থান ছিল দ্বিতীয়। তৈত্তিরীয় ও পঞ্চবিংশ ব্রাহ্মণের মতে, বৈশাখের অবস্থান ছিল বছরের মাঝামাঝি জায়গায়। অন্যদিকে ব্রহ্মা- পুরাণে অনুষঙ্গপাদের একটি শ্লোক অনুসারে মাসচক্রে বৈশাখের অবস্থান ছিল চতুর্থ। তখন বাংলা সন বলতে কিছু ছিল না।

মোঘল সম্রাট আকবর ‘সুবে বাংলা’ প্রতিষ্ঠার পর বাংলাদেশে ফসল কাটার মৌসুম অনুসারে খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে নতুন একটি সনের প্রবর্তনের জন্য অনুরোধ করেন রাজ জ্যোতিষী ও প-িত আমির ফতেহউল্লাহ সিরাজীকে। সিরাজী হিজরি চন্দ্র মাসের সঙ্গে সম্রাটের সিংহাসনে আরোহণের বছর এবং ভারতীয় সৌর সনের সমন্বয়ে বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। মাসের নামগুলো সৌর মতে রেখেই পুনর্বিন্যাস করেন তিনি। এ অনুযায়ী বৈশাখ বাংলা সনের প্রথমে চলে আসে।
বাংলা সনের শেষ দিনটি বিদায় জানানোর জন্য বাঙালি যেমন প্রস্তুত হবেন তেমনি প্রস্তুত হবেন আরেকটি নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে। একই সঙ্গে খাতা খুলে কষতে বসবেন বিগত বছরের সাফল্য ব্যর্থতা ও পাওয়া, না পাওয়ার হিসাব। সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে নানান আচার অনুষ্ঠানে যেমন বিদায় জানানো হবে চৈত্রকে তেমনি প্রস্তুতি নেবেন চৈত্রের শেষ রাতের প্রহরে সূর্য উদয়ের সঙ্গে সঙ্গে বৈশাখ বরণ করে নিতে। রবীন্দ্র নাথ ঠাকুরের ভাষায় যদি বলিÑ

‘নিশি আবসান প্রায় ঐ পুরাতন বর্ষ হয় গত
আমি আজি ধুলিতলে জীর্ণ জীবন করিলাম নত॥
বন্ধু হও শত্রু হও, যেখানে যে রও
ক্ষমা কর আজিকার মতো
পুরাতন বৎসরের সাথে পুরাতন অপরাধ যত।’

চৈত্রের রুদ্র রূপ ডিঙিয়ে আমাদের মধ্যে এলো বৈশাখ। এলো আরেকটি নতুন একটি বছর। অনেক প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, চড়াই-উতরাই, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও আনন্দ-বেদনার সাক্ষী হয়ে কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে একটি বছর। নতুন বছরের পুব আকাশের নতুন সূর্যটি হোক শান্তির ও স্বপ্নের। পুরনো বছরের জীর্ণতা দূরে ঠেলে নতুন সম্ভাবনার পথে এগিয়ে চলাই হোক আমাদের মূলমন্ত্র।

 

মডেল : রিবা হাসান
পোশাক : অঞ্জনস
মেকওভার : ক্লিওপেট্রা বিউটি স্যালন
ছবি : কৌশিক ইকবাল

কুসুমকুমারী ভিআইপি ফেরি

মাসুদা ভাট্টি

 

ঘাটে ফেরিটা ভিড়েছে ঠিকই কিন্তু কোনো গাড়ি নামতে পারছে না। একেবারে ফেরিতে ওঠার মুখেই পন্টুনের ওপর একটা মালবোঝাই ট্রাক মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। দু’পাশে যতোটুকু জায়গা খালি তা দিয়ে বড় গাড়ি আসতে পারবে, কী পারবে না তা নিয়ে গবেষণা করছে লোকজন। ট্রাকটা আজ পড়েনি হয়তো। তাই কেউ কেউ বলাবলি করছেন, এর আগের ফেরি থেকেও ট্রাক এখান দিয়ে নেমে গেছে। অসুবিধী হওয়ার কথা নয়। কিন্তু বলা তো যায় না- যাত্রীভর্তি বাস, কোরবানির পশুভর্তি ট্রাক, যদি কিছু হয়ে যায়! সবাই খুব সতর্ক সে জন্য। এ রকমই জটলার ভেতর ছেলেটিকে দেখলাম আমরা। আমরা দু’জন। আমি ও সালমা। আমরা গাড়ির ভেতর বসে চারদিকে তাকাই। আমাদের ঠিক সামনেই লুঙ্গি পরা এক লোক তার অ-কোষ থেকে চুলকে ছিঁড়ে আনবে বলে মনে হয়। আমরা হা হা করে হাসি তাকে দেখে। তখন আবারও ছেলেটির দিকে চোখ যায় আমাদের।
আমাদের কথা বলি একটুখানি। আমরা চল্লিশ পেরোলাম কিছুদিন আগে মাত্র। কিন্তু এখনো আমাদের বাইরে-ভেতরে কোথাও চল্লিশের চিহ্ন পড়েনি। আমাদের যারা দেখতে পারে না তারা হয়তো বলবে বা বলেও যে, ‘আরে, সুন্তানাদি তো অয় নাই, অগো আর কী, গায়ে বাতাস লাগায়া ঘোরে-ফেরে।’ ফরিদপুর অঞ্চলের টান থাকায় সহজেই সমালোচনাকারীকে শনাক্ত করা যায়। কারণ তারা আমাদের চেনে ও জানে। আমরা স্বাবলম্বী। দু’জনই চাকরি করি ঢাকায়। আমরা একা যে যার মতো থাকি। সালমার সঙ্গে অবশ্য তার মা থাকেন। আমার সঙ্গে কেউ না। কারণ আমার আসলে কেউ নেই থাকার মতো। আজকাল অবশ্য মনে হয়, ওই কোন এক অতীতকাল থেকে আমার কেউ নেই। সালমা ইদানীং প্রায়ই বলে, ‘কেন এমুন হয় কও তো? কেউ থাকলে কী হইতো আমাদের?’ আমি সালমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। তাকে ঠিক বোঝাতে পারি না, কেউ থাকলেও এর চেয়ে যে খুব বেশি ভালো কিছু হতো তা নয়। তাই চুপ করে থাকি। ঢাকা শহরে একা মেয়েদের থাকার চল শুরু হয়েছে আমাদের হাত ধরেই। এর আগে মেয়েরা সাধারণত ছাত্রী হলে হলগুলো আর কর্মজীবী হলে মেয়ে হোস্টেলগুলোয় থাকতো। কিন্তু এখন কোনো কোনো বাড়িওয়ালা গাঁইগুঁই করলেও ভাড়া দেয়। অনেক বাড়িওয়ালাই এখন স্বীকার করে যে, ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা ঠিকমতো ভাড়া দেয় এবং ঝামেলাও আসলে কম দেয়। মানুষ মিষ্টির স্বাদ পেলে পিঁপড়ারও পাছা চুষে দেখে।

দেয়। অনেক বাড়িওয়ালাই এখন স্বীকার করে যে, ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা ঠিকমতো ভাড়া দেয় এবং ঝামেলাও আসলে কম দেয়। মানুষ মিষ্টির স্বাদ পেলে পিঁপড়ারও পাছা চুষে দেখে।
এই সেদিনও কতো প্রশ্ন শুনতে হতো বাড়ি ভাড়া নিতে গিয়ে। বাড়িওয়ালা এক ধরনের প্রশ্ন করে তো বাড়িওয়ালি আরেক ধরনের। প্রশ্নের পাহাড় ডিঙিয়ে বাড়ি ভাড়া জুটলেও হয় বাড়িওয়ালা ফোনে যন্ত্রণা দিতে শুরু করে, না হয় বাড়িওয়ালি তার স্বামীকে জড়িয়ে অহেতুক সন্দেহ শুরু করে। তখনকার ফ্যাঁকড়ার সঙ্গে কোনো যন্ত্রণারই মিল নেই। এখন এসব একটু কমেছে। মানুষ অর্থনীতি দিয়ে বিচার করতে শুরু করেছে জীবনকে। তাই যাপনের ক্ষেত্রে যেখান থেকে আদায় বেশি এবং কম ঝামেলার সেদিকেই মানুষের ঝোঁক।
সালমা একটা সফটওয়্যার ফার্মে কাজ করে। আমার নিজের ব্যবসা আছে, সেটিই দেখি। দু’জনের জন্মস্থান দেখতে গিয়েছিলাম আমরা। সেখানে বিশ্বকর্মা পূজায় নৌকাবাইচ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ক্ষমতার দ্বন্দ্বে নৌকাবাইচ তো হলোই না, দুপুর নাগাদ প্রশাসন সেখানে ১৪৪ ধারা জারি করে দিল। কারণ কী? দুই নেতার ঝগড়া- কে পুরস্কার দেবে, কার আধিপত্য বজায় থাকবে। অথচ যে হাজার হাজার মানুষ এই নৌকাবাইচ আর পূজা দেখতে আসার কথা ছিল তাদের কথা কেউই ভাবলো না। তারা বৃষ্টিতে ভিজে ফাঁকা নদীর দিকে তাকিয়ে রইলো অপলক। নদীর ওপর ভাঙাচোরা সেতুর কিনার ঘেঁষে মানুষের ঘোলা জলের দিকে তাকিয়ে থাকাটা কেমন অদ্ভুত আবহের জন্ম দিয়েছিল। আমরা অবশ্য গাড়ি থেকে নামিনি। নেমে কী হবে? শিশুকালের স্মৃতি নষ্ট হবে কেবল।
স্মৃতির কথা যখন এলোই তখন একটু স্মৃতিচারণ হোক। স্মরণ করি সেসব দিনের কথা যখন এই নদী কোনো ভটভটির আওয়াজ শোনেনি- এখন যার ভয়ঙ্কর আওয়াজে দিনমান কুমারপাড়ের এই ছোট্ট শহরটি রীতিমতো আতঙ্কিত থাকে। কিন্তু সেসব ধানের ফুল ফোটা দিনে যখন কৈ মাছের ঝাঁক লক্ষ্মীদীঘা ধানের ঝরে পড়া ফুল খেয়ে খেয়ে শরীরে হলুদ চর্বি জমাতো বলে মাছপ্রিয় মানুষ গল্প করতো। সেই সময় একদিন খুব ভোর থেকেই শুরু হতো কাঁসরের বাজনা, পাশের বিল দিয়ে নৌকা যেতো। মানুষ তখন নৌকাবাইচকেও বলতো আড়ং। আর ওই বাইচের দিনই বিক্রি হতো চালন, কুলো, পলোসহ বছরকার ব্যবহারযোগ্য জিনিসপত্র। মানুষ শুধু নৌকাবাইচ দেখতে নয়, বিশ্বকর্মার অবতার মানুষের তৈরি জিনিসপত্রও কিনতে আসতো আড়ংয়ে। এবারও দেখলাম বাজার বসেছে রাস্তার দু’পাশে, সেতুর ওপর পসরা সাজানো। কিন্তু বেশির ভাগই সস্তার প্লাস্টিক, এমনকি যে কাঠের হেলিকপ্টার ছোটবেলায় ছিল তাও আছে এবং সেটিও প্লাস্টিকের। কেবল বদলায়নি মিষ্টির দোকানগুলো। মিছরির সাজের হাতি-ঘোড়া-ময়ূর-গণেশ, জিভেগজা, আমৃত্তি, ছানার জিলেপি ও ক্ষীরের চমচম- মানুষ এখনো হুমড়ি খেয়ে পড়ছে দোকানগুলোয়। আমার এখনো ভালোবাসার রাজভোগ। আমি নামি না। জানি, নেমে সেই পুরনো মুখ দেখবো না। তারা আছেন কি না তাও তো জানি না। তাই আর রিস্ক নিই না। আনিয়ে নিই ঢাকায় নিয়ে আসার জন্য।

উৎসবের রঙ নাকি বদলায় না। হবে হয়তো। তবে একালেও সকাল থেকে ভটভটিতে প্রমাণ আকারের সাউন্ডবক্স লাগিয়ে, ডেকভর্তি করে বিরিয়ানি তুলে নিয়ে যে উচ্চতায় শব্দ পৌঁছালে কান আর কিছু শুনতে পায় না সে রকম উচ্চ শব্দে হিন্দি সিনেমার সবচেয়ে তালের গানটি দিনভর বাজে। ভটভটি, নাকি হিন্দি গান- কোনটির শব্দ কাকে খুন করে বোঝা না গেলেও আশপাশের মানুষের কানের দফা-রফা। কিন্তু তাতে কী? আনন্দ তো- মানুষ মেনে নেয়, মনে নেয় না।
বেরোতে বেরোতে বিকেল হয়ে যায় আমাদের। আর ফেরিঘাটে দিয়ে কোরবানির পশুবাহী ট্রাকের পেছনে লাইন ধরে অপেক্ষা করতে করতে সন্ধ্যা প্রায় হয়েই যায়। তারপরও পদ্মার পাড়ে অতো বিশাল আকাশকে অন্ধকার কি সহজে ঢাকতে পারে? বিকেলটা অদ্ভুত এক আলো ছড়িয়ে থমকে থাকে অনেক্ষণ যেন বা নদীর জলে শেষবারের মতো নিজেকে দেখে নেয় দিন। পদ্মা সেতুর জন্য জমানো দৈত্যের মতো পাথরের ঢিপি। মনে হয়, আচানক এখানেও পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে। ছুটির দিন বলেই কি না জানি না, ঘাটে তেমন মানুষের ভিড় নেই। তাই হয়তো ছেলেটাকে আমাদের একেবারে আলাদা করে চোখে পড়ে। আমিই দেখাই সালমাকে। বলি, ‘দ্যাখো দ্যাখো, ছেলেটা কী লম্বা দেখতে?’
সালমা বলে, ‘হ্যাঁ রে, এক্কেবারে ইরানি ইরানি চেহারা।’ বোঝা যায়, একটু ফর্সা আর লম্বা চেহারার পুরুষ এখনো এ দেশে ইরান কিংবা তুরান থেকে আসা- এই ধারণা আমাদের জীবনগত হয়ে গেছে। আমি হেসে ফেলি। তখনো আমাদের গাড়ি ফেরিতে ওঠার জন্য কসরত করে যাচ্ছে সমানে। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর চালক বেচারা অধৈর্য হয়ে উঠেছে- কখন উঠবে ফেরিতে। আর যে মুহূর্তে মনে হলো যে, মুখ থুবড়ে থাকা ট্রাকটা কোনো বাধা নয়, ঠিক ওই মুহূর্তেই হুড়মুড় করে নামতে শুরু করলো গাড়িগুলো। প্রথমে এ দেশের কথিত ভিআইপিদের গাড়ি- যারা দরকার হলে ঢাকা থেকে বেরোনোর সময় ফোন করে ফেরি আটকে রাখে। আর হাজার হাজার মানুষ না জেনে অপেক্ষা করে পরবর্তী ফেরির। সে রকমই একটি

কালো গাড়ি নেমে গেল। তারপর একের পর এক ছোট গাড়ি, ট্রাক ও বাস নামছে তো নামছেই। অথচ দূর থেকে ফেরিটিকে বেশ ছোটই মনে হয়। এতো গাড়ি তার পেটে ধরলো কী করে? আমি ভাবি।
ছেলেটির গাড়িও নিশ্চয়ই অপেক্ষা করছে কোথাও। ম্লান আলোয় ছেলেটিকে কি একটু বিষণœ দেখায়? হঠাৎই আমার মাথায় প্রশ্নটি আসে, আচ্ছা, আমার মা কী এ রকম কোনো ছেলেকে দেখে নিজের ভেতর প্রশ্ন নিয়ে ভাবতে বসতেন? সে সুযোগ কি তার হতো কিংবা সাহস? মাত্র তো চল্লিশ বছরের ফারাক। চল্লিশ বছর পরই তার কন্যা এ রকম একটি বেগানা পুরুষকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভাবতে পারছে দ্বিধাহীন- এটাকে কী অর্জন বলবো? মাও হয়তো ভাবতেন, প্রকাশ করতে পারতেন না। মানুষ তো! কতোটা আর বদল হবে। ভেতরে চিন্তার বীজ তো থাকেই, তাই না? আমরা টুকটাক কথা বলি ছেলেটাকে নিয়ে।
‘ছেলেটা কি একা? কী মনে হয়?’ সালমার দিকে তাকিয়ে জানতে চাই।
‘না মনে হয়। মাইক্রোবোঝাই লোকজন। নিশ্চয়ই তার ভিড় ভালো লাগে না। তাই নেমে আসছে।’ সালমা বলে।
ছেলেটার হাতে লম্বা আখ দাঁতে কাটছে। চুষে চুষে ফেলে দিচ্ছে মাটিতে। অন্য সময় হলে ঠিক ব্যাপারটা চোখে লাগতো- কী অসভ্য রে, খেয়ে খেয়ে জায়গা নোংরা করছে। কিন্তু ছেলেটার দিকে তাকিয়ে এসব কথা ভাবতে মন চাইছে না। আর চিবানো আখের ছোবা তো আসলে পচেই মিশে যাবে মাটিতে। এতে বরং মাটিরই উপকার। মনে মনে হেসে ফেলি। সালমার দিকে তাকাই। বুঝতে চাই, সে কী ভাবছে! কিন্তু সে দেখি প্রশ্ন করে গাড়ির চালককে- ‘কী সুমন ভাই, ফেরিতে উঠতে পারবেন তো? ওই যে দ্যাহেন পিছনে আরো ভিআইপি আইছে।’ সত্যিই তাকিয়ে দেখি পেছনে কোনো জেলা প্রশাসক কিংবা জেলা পুলিশ সুপারের গাড়িবহর। আতঙ্কিত হয়ে উঠি ভেতরে ভেতরে। কিন্তু সালমাকে সুমন আশ্বস্ত করে- ‘কোনো ভিআইপি-টিআইপি মানুম না ম্যাডাম, ঠিক টান দিয়া উইঠঠা যামু। তারপর যা হয় দেখা যাইবো।’ আমি আঁতকে উঠি যদি সত্যি সত্যিই কিছু হয়! আমার ভয়, এ পৃথিবীকে বড় ভয় আমার।
আমাদের সামনে কেবল একটি বাস দাঁড়ানো। চাইলে আমরা তারপরই উঠতে পারি। কিন্তু না, ওপার থেকে আসা সব গাড়ি নেমে যাওয়ার পর প্রথমেই বাসটিকে ডেকে নেয় ফেরির লোকজন। তারপরই দেখি, পিল পিল করে অসংখ্য গাড়ি এসে আমাদের পাশে, পেছনে জায়গা করে

দাঁড়িয়ে আছে। ডেকে ডেকে তুলছে প্রথমে বড় গাড়িগুলো যেগুলোর ভেতর বোবা পশুগুলো গায়ের সঙ্গে গা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মায়া হয় দেখে। আমার মনে হয়, যতো দ্রুত তারা উঠতে পারে ততোই ভালো। মৃত্যু যখন অনিবার্য তখন তা এগিয়ে আসাই ভালো। এরপরই শুরু হয় ‘ভিআইপি’দের জায়গা করে দেয়ার পালা। তাদের গাড়ি তুলতে তুলতে তার পেছন পেছন টান মেরে আরো কয়েকটি গাড়ি ঢুকে যায় ফোকটে। আর তখনই আমাদের চালক যেন নিজের শক্তি দিয়েই গাড়িটি টেনে ফেরিতে উঠিয়ে ফেলে। আমি আতঙ্কিত হয়ে ওঠার আগেই দেখতে পাই, আমরা ঠিক জায়গা করে নিতে পারছি। তখনই মনে হয়, আহা রে! বেচারা কি এখনো আখ খাচ্ছে? পারলো কি তাদের গাড়িটা ফেরিতে উঠতে? ফেরির পেট ভরে যাচ্ছে দ্রুতই। তখনই সালমা একটি গাড়ি দেখিয়ে বলে, ‘ওই দ্যাখো, তোমার ইরানি লোকটার গাড়ি উঠছে।’ আমি হেসে ফেলি- ‘যাহ! সে ইরানি হবে কেন? একেবারেই আখ খাওয়া বাঙালি যুবক।’ আমাদের গাড়ি থেকে পুরো ফেরিটা দেখা যায়। তাতেই আমরা দেখি, ছেলেটা তার মোবাইল ফোনটা নিয়ে ফেরির দোতলায় ওঠার সিঁড়ির মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ায়। এক মাথা চুল আর মুখভর্তি দাড়িতে তাকে একটু যিশু যিশু দেখায় বোধ করি। সালমা অবশ্য মুখ বেঁকিয়ে বলে, ‘না রে, ফিগারটা তেমন ভালো না, ক্যাংঠা!!’
আমার হাসি পায় সালমার কথায়। আবারও ভাবি, ভাবনার সত্যিই লাগাম নেই। ছেলেটা নিশ্চয়ই জানে না, তাকে নিয়ে আমরা কতো কিছু ভাবছি। ঢাকা শহর থেকে বাইরে বের হতে আমার সবচেয়ে বড় ভয়, পথে যদি বাথরুম পায়, তবে? ঢাকা শহরে না হয় কোনো রেস্টুরেন্ট কিংবা কফি শপে গিয়ে করে নেয়া যায়। কিন্তু পথে? আতঙ্কে আমার তলপেট কেবলই কুঁকড়ে আসে। এসব ভুলতে আমি কতো কিছু নিয়ে যে ব্যস্ত হওয়ার চেষ্টা করি এর শেষ নেই! কিন্তু সালমার কোনো বিকার নেই। সে বলে, ‘আমার টয়লেট পাইছে। যাই দেখি করে আসি, তুমি যাবা?’
‘পাগল তুমি? আমি এখান থেকে এক চুলও নড়বো না।’ গাড়ির জানালার কাচ নামাতে নামাতে বলি। গুমোট হাওয়া ধক করে এসে মুখে লাগে। পশুদের শরীরের গন্ধ মিশে যায় সে হাওয়ায়। ফেরিতে মানুষ বেশি উঠলো, না পশু উঠলো? অবশ্য মানুষ আর পশুতে পার্থক্য কতোটুকুই বা? গোপাল ভাঁড় আজকের দিনে হলে নিশ্চয়ই বলতেন, আধ হাত মাত্র। কারণ সামান্য দূরেই গরুভর্তি ট্রাকটা দাঁড় করানো। সালমা নেমে যাওয়ার আগে আমি তাকে বলি, ‘শোনো না, ছেলেটাকে একটু বলে যাও যে, ওই লাল গাড়ির ভেতর এক ভদ্রমহিলা বসে আছেন। আপনাকে হয়তো চেনে, একটু যাবেন ওখানে?’
সালমা চোখ বড় বড় করে আমার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘সত্যিই কবো? আমি বলতে পারি, কোনো অসুবিধা হবে না আমার। কিন্তু এখানে এলে তারে তুমি কি কবা?’
‘কী আর বলবো? বলবো, বোর হচ্ছিলাম, গল্প করার কেউ নেই। আপনাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মনে হলো, গল্পের জন্য উপযুক্ত চেহারা। তাই আসতে বলেছি। আপনার গল্প করতে ইচ্ছা না হলে যেখানে দাঁড়িয়েছিলেন সেখানে গিয়ে দাঁড়ানগে আবার’- আমি হাসতে হাসতে বলি। সালমা ধরে নেয়, আমি সত্যিই তাকে বলতে বলেছি। ঠিক সেই মুহূর্তে তার চোখ-মুখে কেমন দুষ্টুমি খেলা করে- আমি দেখতে পাই। সে গাড়ির দরজা খুলে নামে। আমাদের চালক আশপাশেই ছিল। তাকে নিয়ে সালমা সিঁড়ি দিয়ে ছেলেটার পাশ দিয়ে উপরে উঠে যায়। আমি তাকিয়ে থাকি অপলক, দেখি কিছু বলে কি না। অন্ধকার তখনো ঝাঁপিয়ে পড়েনি। তাই দেখা যায়, সালমা তাকে এড়িয়ে উপরে উঠে যায়। কিন্তু একটু পরই আবার নেমে আসে। এসে ফেরির নিচতলায় ভেতরের দিকে যায়। আমি চিন্তা করতে থাকি, উপরের টয়লেট কি বন্ধ? ছেলেটা তখন পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করে আকাশের গায়ে লেগে থাকা লাল, হলুদ, সোনালি রঙের ছবি তোলে। বাহ! ভেতরে সৌন্দর্যজ্ঞান আছে তো? কথা তাহলে বলাই যায়। যে ছেলে আকাশের রঙ বদলানো টের পায় তার সঙ্গে কথা বলতে ভালোই লাগবে মনে হয়। আমি উত্তেজিত ভেতরে ভেতরে। সালমা ফিরে আসে দ্রুতই।
সালমাও উত্তেজিত, ‘জানো, উপরের টয়লেট বন্ধ। ভিআইপিরা রুম আটকে বসে আছে। ভাবো কী ভয়ঙ্কর! আমাকে ওই ভয়ঙ্কর টয়লেটে যাইতে হইলো। নিজেরে নোংরা লাগছে। পানি দাও তো এট্টু হাত ধুই।’ আমি পানির বোতল এগিয়ে দিই আর ভাবি, এ দেশে ভিআইপি হওয়াটা বিশেষ জরুরি। না হলে বর্জ্য ত্যাগেরও সুযোগ পাওয়া যায় না। সালমা নিজেকে ধুয়ে-টুয়ে ভেতরে আসে। গাড়ির ভেতর তখন বিষগরম। নিজেকে মনে হচ্ছে, সিদ্ধ করতে দিয়েছি পাথরপোড়া গরমে। বিদেশে এটিকেই তো সাউনা বলে। আমরা গরমের দেশের লোকজনই কেবল তা বুঝতে চাই না। আমি প্রসঙ্গ বদলাই- ‘এই, তুমি ছেলেটাকে কিছু বললে না যে? ডরাইছ?”
‘ইস! কিসের ডর? আমি ভাবলাম তুমি ঠাট্টা করছ’- সালমা হাসে।
‘ধুর, ঠাট্টা ক্যান করবো? কী মজা হইতো বলো? ছেলেটার চেহারা নিশ্চয়ই বদলায়ে যেতো আমাদের সামনে এসে, তাই না?’ আমি বলি।
‘তাহলে একটা পিচ্চিকে দিয়ে আমরা খবর পাঠাই চলো। ওই যে বাদামওয়ালা আসছে। তাকে বলি।’ সালমা বাদামওয়ালাকে ডাকে- ‘এই বাদাম, এই বাদাম।’
বাদামওয়ালা তখন চেঁচাচ্ছে- ‘এই নেন বাদাম, এই যে বাদাম। লবণ-মরিচ মিশায়া খান। মজা পাইবেন।’ লোকটা এগিয়ে আসে। সালমা কিছু বলার আগে আমিই বলি, ‘কতো কইরা ভাই?’

আটকে বসে আছে। ভাবো কী ভয়ঙ্কর! আমাকে ওই ভয়ঙ্কর টয়লেটে যাইতে হইলো। নিজেরে নোংরা লাগছে। পানি দাও তো এট্টু হাত ধুই।’ আমি পানির বোতল এগিয়ে দিই আর ভাবি, এ দেশে ভিআইপি হওয়াটা বিশেষ জরুরি। না হলে বর্জ্য ত্যাগেরও সুযোগ পাওয়া যায় না। সালমা নিজেকে ধুয়ে-টুয়ে ভেতরে আসে। গাড়ির ভেতর তখন বিষগরম। নিজেকে মনে হচ্ছে, সিদ্ধ করতে দিয়েছি পাথরপোড়া গরমে। বিদেশে এটিকেই তো সাউনা বলে। আমরা গরমের দেশের লোকজনই কেবল তা বুঝতে চাই না। আমি প্রসঙ্গ বদলাই- ‘এই, তুমি ছেলেটাকে কিছু বললে না যে? ডরাইছ?”
‘ইস! কিসের ডর? আমি ভাবলাম তুমি ঠাট্টা করছ’- সালমা হাসে।
‘ধুর, ঠাট্টা ক্যান করবো? কী মজা হইতো বলো? ছেলেটার চেহারা নিশ্চয়ই বদলায়ে যেতো আমাদের সামনে এসে, তাই না?’ আমি বলি।
‘তাহলে একটা পিচ্চিকে দিয়ে আমরা খবর পাঠাই চলো। ওই যে বাদামওয়ালা আসছে। তাকে বলি।’ সালমা বাদামওয়ালাকে ডাকে- ‘এই বাদাম, এই বাদাম।’
বাদামওয়ালা তখন চেঁচাচ্ছে- ‘এই নেন বাদাম, এই যে বাদাম। লবণ-মরিচ মিশায়া খান। মজা পাইবেন।’ লোকটা এগিয়ে আসে। সালমা কিছু বলার আগে আমিই বলি, ‘কতো কইরা ভাই?’
- দশ টাকা প্যাকেট।
‘দুই প্যাকেট দ্যান ভাই।’
ততোক্ষণে আঁধার জমেছে একটু। ফেরিও ছেড়েছে বোঝা যায়। কিন্তু বাতাস নেই কোনোদিক থেকেই। বাদামওয়ালা দুই প্যাকেট বাদাম দিতে দিতে একটা ছোট পলিথিনের ব্যাগও ধরিয়ে দেয়। বলে, ‘ম্যাডাম, বাদাম ছিলা এর মইধ্যে ফালাইয়েন। এক্সটা দিলাম। ভেতরে লবণ-মরিচ আছে। মাইখ্যা খাইয়েন, মজা পাইবেন।’ আমি হেসে ফেলি- ‘ঠিক আছে, মাইখ্যাই খামু।’
- আফাদের বাড়ি কোথায়? মানে ঢাকায় কই থাকেন? বাদামওয়ালা আমাদের সঙ্গে কথা বাড়াতে চায়। আমি অন্ধকারেও তাকিয়ে থাকি তার দিকে। বোঝে কথা বাড়বে না। কিন্তু আমি এ জন্য তাকাইনি। আমি তাকে দেখতে চেয়েছিলাম। মানুষের মুখ-চোখ দেখা আমার স্বভাব। বাদামওয়ালা কী ভাবলো কে জানে? মিন মিন করে বললো, ‘আমারও বাড়ি পুরান ঢাকায়। তাই জিগাইছিলাম আর কী!’ আমাদের বাদামের প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে বাদামওয়ালা সরে যায়। আর সালমা ততোক্ষণে বাদামওয়ালাকে জিজ্ঞাসা করে ফেলে- ‘কতোক্ষণ লাগবে পার হইতে?’
- বেশিক্ষণ না আফা, কুসুমকুমারী ভিআইপি ফেরি তো। তাই আড়াই ঘুণ্টা লাগবে। এর বেশি না। আর ফেরিডাও নতুন আনছে আফা।
আমাদের জানা হয়ে যায়, আমরা কুসুমকুমারী নামক ভিআইপি এবং নতুন ফেরিটিতে উঠেছি। আমাদের মনে এক ধরনের উৎফুল্ল ভাব আসে। আর সে ভাবেই আমরা বাদামওয়ালাকে বলি, মানে, আমিই বলি- ‘ওই যে দেখছেন সিঁড়ির মাঝামাঝি একজন ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আছেন, দাড়িওয়ালা। তাকে গিয়ে বলবেন, এই গাড়ির ম্যাডাম তাকে ডাকছে। বলতে পারবেন না?’ ছেলেটা তখনো পদ্মা সেতুর জন্য জমানো পাথুরে

 

পাহাড়ের ছায়াকে মোবাইল ফোনবন্দি করছে। ওমা! পাথরের ওপর তো মানুষের অবয়বও দেখা যাচ্ছে। এক-দু’জন নয়, বেশ মানুষ উঠেছে ওই অত্ত উঁচুতে? বাদামওয়ালা হেঁটে যায়। আমরা দু’জন মূর্তির মতো বসে থাকি। মুখ থেকে গুলি বেরিয়ে গেছে। গুলিতো নয়, বাদামওয়ালা ছুটে যাচ্ছে ছেলেটার দিকে। সিঁড়ি দিয়ে উঠছে, কথা বলছে ছেলেটার সঙ্গে। ততোক্ষণে ফেরির টিমটিমে বাতিও জ্বলতে শুরু করেছে। ছেলেটি আমাদের গাড়ির দিকে তাকাচ্ছে। তারপর হাত দিয়ে চুল ঠিক করলো এবং একটু থেমে থেমে নামতে শুরু করলো। বাদামওয়ালার পেছন পেছন নেমে ছেলেটা আমাদের গাড়ির দিকে এলো আর বাদামওয়ালা অন্যদিকে। ছেলেটি এসে সালমার দিককার জানালায় দাঁড়ালো প্রথমে। তারপর একটু ঝুঁকে জিজ্ঞাসা করলো- ‘ডেকেছেন?’
সালমা আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি সপ্রতিভ হয়ে উঠি- বলি, ‘জি, ডেকেছি। মনে হচ্ছিল আপনাকে চিনি। নেমে গিয়ে জিজ্ঞাসা করতে সংকোচ হচ্ছিল। তাই আসতে বলেছি। কিছু মনে করেননি তো?’
ছেলেটি হাসে। স্বল্প আলোতেও টের পাই হাসিটা মিষ্টি। আমি বয়স ভাবার চেষ্টা করি। ত্রিশের একটু বেশি হবে। হাত চালায় চুলের ভেতর আবার। বুঝতে পারি, তারও ভেতরে প্রশ্ন। তাই চুলের ভেতর হাত দিয়ে তা তাড়ানোর চেষ্টা করছে। আমি নিজের নাম বলি। আর সালমার দিকে দেখিয়ে বলি, ‘ও সালমা। আপনার নাম কি তপু? আপনি কি কোনো টিভি চ্যানেলে আছেন? না হলে এতো পরিচিত মনে হচ্ছে কেন?‘ খুবই দুর্বল ও বানানো শোনায় শেষের প্রশ্নটি। নিজেকে খুব ন্যাকা ন্যাকা লাগে। তাই নিজেকে সংশোধন করে ফেলি দ্রুত। বলি, ‘সত্যি কথা বলি। আসলে আমাদের কথা বলতে ইচ্ছা করছিল কারো সঙ্গে। তাই আপনাকে ডেকেছি। আপনি তো একা একা দাঁড়িয়ে মোবাইল ফোনে আঁধারবন্দি করছিলেন। এ জন্য ভাবলাম, হয়তো কথা বলতে আপনারও ভালো লাগতে পারে।’
ছেলেটির চোখ-মুখে তখনো অবাক ভাব। তা কাটতে সময় নেবে বুঝতে পারি। কিন্তু এর আগেই সালমা বলে, ‘আমার কথা বলতে ইচ্ছা করে নাই কিন্তু। ওর করেছে, বুঝলেন?’
- জি, বুঝেছি। তাহলে নেমে আসুন আপনারা, কথা বলি।
বাহ! গলার স্বরটা তো বেশ। ভরাট। আমি সালমার দিকে তাকাই। বলি, ‘চলো, নেমে ফেরির পেছন দিকে যাই। উপরে তো ভিআইপিরা দরজা বন্ধ করে রেখেছে।’ সালমা বলে, ‘তোমরা নামো, আমি আসছি একটু পরে। একটা ফোন করতে হবে আমার। বুঝতে পারি, সালমা সময় নিচ্ছে। আমি দরজা খুলে নামি। পরনের শাড়িটি সামলে নামতে একটু সময় লাগে। পায়ে স্যান্ডেল গলিয়ে তারপর নামি। তখনো ফেরিজুড়ে ‘গোময়’-এর গন্ধ ম-ম করছে। ছেলেটি এগিয়ে আসে। বলে, ‘এই দিকে আসুন’- হাত দিয়ে দেখিয়ে দেয় ফেরির সামনের দিকটা। সেখানে ইতি-উতি লোকজন দাঁড়ানো। তবে জায়গা আছে ফাঁকা দাঁড়ানোর মতো। আমরা গিয়ে দাঁড়াই এবং সেই প্রথম পদ্মা থেকে বাতাস ওঠে একটুখানি, জলগন্ধ মাখানো। আমার ভালো লাগে। আমি ফিরতে থাকি পেছনে। যখন আমার ষোল, কী সতের বছর তখনকার কোনোদিন। এমন আশ্বিনও হতে পারে। তুমুল বৃষ্টি আর ঢেউ ভেঙে পদ্মা পার হতে হতে আরেকজন মানুষকে দেখছিলাম কেবলই। সেও তাকিয়েই ছিল সারাক্ষণ। কিন্তু কথা বলার সাহস আমাদের কারোরই হয়নি। অথচ আজ কী অনায়াসে আমি একটি ছেলেকে তার অবস্থান থেকে ডেকে সরিয়ে এনে গল্প করছি। নিজেকে আমার সাহাসী মনে হয় একটু। বলি, ‘আমি সত্যিই দুঃখিত আপনাকে এভাবে ডেকে বিরক্ত করার জন্য।’
- বিরক্ত হচ্ছি না, আপনি বলুন।
কী বলবো?
- কথা বলতে চাইছিলেন না?
কথা! খুঁজে পাচ্ছি না তো আর।
আমি সত্যিই কথা খুঁজে পাচ্ছিলাম না আর। তবে আমি ক্রমেই ফিরছিলাম অতীতে। মনে হচ্ছিল, আমি সেই ছেলেটির সঙ্গে কথা বলছি- যখন আমার বয়স ষোল। ছেলেটিরও হয়তো তাই। ভেতর থেকে কি কোনো দীর্ঘশ্বাস বের হচ্ছে? বুঝি না।
আমার কথা শুনে ছেলেটি আবার হেসে ওঠে- বেশ উঁচু ও দরাজ হাসি। অন্ধকার একটু একটু করে গলে পড়ে সে হাসিতে। আমি ছেলেটির মুখ দেখতে পাই না আর। কিন্তু আমার মুখের ওপর আলো পড়ছে বুঝতে পারি। চোখে এসে লাগে। তবুও দাঁড়িয়ে থাকি আমি। বলি, ‘কী নাম আপনার?’
- ওই যে বললেন তপু। আমার নাম ধরুন তপুই।
যাহ! সত্যি নয়। সত্যি নাম বলুন। আচ্ছা থাক, বলতে হবে না। আপনার নাম তপু। তা তপু, কী করেন আপনি?
- আপনিই তো বললেন, টিভি চ্যানেলে কাজ করি। ধরুন, তাই করি।
আচ্ছা, না হয় তা-ই ধরলাম। কোথায় গিয়েছিলেন বা কোথা থেকে ফিরলেন?
- আপনি কি সব সময় এ রকম করে কথা বলেন? বেশ গুছিয়ে?
নাহ বলি না, এখন বলছি ভেবে-চিন্তে ও গুছিয়ে।
ছেলেটি হাসে। ওহ, ছেলেটির নাম তপু। ‘আচ্ছা তপু, এই যে আপনাকে ডেকে আনলাম আমরা। আপনি কি যে কেউ ডাকলেই যেতেন?’
- উনি তো আমাকে ডাকেননি বললেন। আপনিই ডেকেছেন। আসতাম। কারণ আপনাদের আমি দেখেছি যখন আখ খাচ্ছিলাম তখন।
বাহ, বেশ স্মার্ট তো। আমি আগ্রহী হই। আমরা কথা বলতে থাকি। বহু পুরনো কোনো ইতিহাস খুঁড়ে আনা কথামালা। পদ্মার জলের ওপর ঝুলে থাকা আঁধার। ছলাৎ ছলাৎ ঢেউয়ের শব্দ আমাদের কথাগুলোকে আরো উজ্জীবিত করে। আমাদের চারপাশে দইওয়ালা হাঁকে। ছোট্ট ছোট্ট প্লাস্টিকের কাপে করে দই বিক্রি করছে। ছেলেটি বলে, খাবেন? আমি বলি, নিশ্চয়ই। আমরা দই কিনি। মহামিষ্টি দই। খেতে পারি না। সালমার জন্য যেটি কিনি সেটি হাতে ধরে রাখি।
হঠাৎ অন্ধকার ফুঁড়ে সালমা এসে দাঁড়ায়। বলে, ‘ঘাট এসে গেছে। চলো যাই এবার।’ সালমার হাতে দই দিতে দিতে আমরা গাড়ির দিকে এগোই। আমরা কেউ কোনো কথা না বলে যে যার মতো ফিরে যাই। গাড়িতে উঠি। কুসুমকুমারী ফেরি থেকে আমাদের গাড়িটি নামে ভিআইপিদের গাড়িরও বেশ কয়েকটি গাড়ি পর। তারপর রাস্তার ওপর ঝুঁকে থাকা গাছের সারিকে গাড়ির হেডলাইটের আলোয় বিয়ের গেইটের মতো মনে হতে থাকে আমাদের। কিন্তু ফিরতে ফিরতে আমরা দু’জনই আর সেই ছেলেটির কথা বলি না। কেন বলি না সেটি বলতে পারবো না। তবে আমার মাথায় বাদামওয়ালার কাছ থেকে বাদাম কিনে খাওয়া-পরবর্তী আর কোনো স্মৃতি নেই। কিন্তু স্মৃতি না থাকলে কী হবে, আমাদের গাড়ির পেছন ও সামনেটা ভর্তি করে নিয়ে আসি কচুশাক, ডাব, নারিকেল, মিষ্টি, পিপুল পাতা, রুম্বি কলা, আরো কতো কী! যেন পুরো শৈশব আমাদের গাড়িতে। আমরা ঢাকায় ফিরি। যে যার বাড়িতে নামি। কুসুমকুমারী ভিআইপি ফেরির কথা আর কখনো তুলি না আমরা।

 


আমার কথা শুনে ছেলেটি আবার হেসে ওঠে- বেশ উঁচু ও দরাজ হাসি। অন্ধকার একটু একটু করে গলে পড়ে সে হাসিতে। আমি ছেলেটির মুখ দেখতে পাই না আর। কিন্তু আমার মুখের ওপর আলো পড়ছে বুঝতে পারি। চোখে এসে লাগে। তবুও দাঁড়িয়ে থাকি আমি। বলি, ‘কী নাম আপনার?’
- ওই যে বললেন তপু। আমার নাম ধরুন তপুই।
যাহ! সত্যি নয়। সত্যি নাম বলুন। আচ্ছা থাক, বলতে হবে না। আপনার নাম তপু। তা তপু, কী করেন আপনি?
- আপনিই তো বললেন, টিভি চ্যানেলে কাজ করি। ধরুন, তাই করি।
আচ্ছা, না হয় তা-ই ধরলাম। কোথায় গিয়েছিলেন বা কোথা থেকে ফিরলেন?
- আপনি কি সব সময় এ রকম করে কথা বলেন? বেশ গুছিয়ে?
নাহ বলি না, এখন বলছি ভেবে-চিন্তে ও গুছিয়ে।
ছেলেটি হাসে। ওহ, ছেলেটির নাম তপু। ‘আচ্ছা তপু, এই যে আপনাকে ডেকে আনলাম আমরা। আপনি কি যে কেউ ডাকলেই যেতেন?’
- উনি তো আমাকে ডাকেননি বললেন। আপনিই ডেকেছেন। আসতাম। কারণ আপনাদের আমি দেখেছি যখন আখ খাচ্ছিলাম তখন।
বাহ, বেশ স্মার্ট তো। আমি আগ্রহী হই। আমরা কথা বলতে থাকি। বহু পুরনো কোনো ইতিহাস খুঁড়ে আনা কথামালা। পদ্মার জলের ওপর ঝুলে থাকা আঁধার। ছলাৎ ছলাৎ ঢেউয়ের শব্দ আমাদের কথাগুলোকে আরো উজ্জীবিত করে। আমাদের চারপাশে দইওয়ালা হাঁকে। ছোট্ট ছোট্ট প্লাস্টিকের কাপে করে দই বিক্রি করছে। ছেলেটি বলে, খাবেন? আমি বলি, নিশ্চয়ই। আমরা দই কিনি। মহামিষ্টি দই। খেতে পারি না। সালমার জন্য যেটি কিনি সেটি হাতে ধরে রাখি।
হঠাৎ অন্ধকার ফুঁড়ে সালমা এসে দাঁড়ায়। বলে, ‘ঘাট এসে গেছে। চলো যাই এবার।’ সালমার হাতে দই দিতে দিতে আমরা গাড়ির দিকে এগোই। আমরা কেউ কোনো কথা না বলে যে যার মতো ফিরে যাই। গাড়িতে উঠি। কুসুমকুমারী ফেরি থেকে আমাদের গাড়িটি নামে ভিআইপিদের গাড়িরও বেশ কয়েকটি গাড়ি পর। তারপর রাস্তার ওপর ঝুঁকে থাকা গাছের সারিকে গাড়ির হেডলাইটের আলোয় বিয়ের গেইটের মতো মনে হতে থাকে আমাদের। কিন্তু ফিরতে ফিরতে আমরা দু’জনই আর সেই ছেলেটির কথা বলি না। কেন বলি না সেটি বলতে পারবো না। তবে আমার মাথায় বাদামওয়ালার কাছ থেকে বাদাম কিনে খাওয়া-পরবর্তী আর কোনো স্মৃতি নেই। কিন্তু স্মৃতি না থাকলে কী হবে, আমাদের গাড়ির পেছন ও সামনেটা ভর্তি করে নিয়ে আসি কচুশাক, ডাব, নারিকেল, মিষ্টি, পিপুল পাতা, রুম্বি কলা, আরো কতো কী! যেন পুরো শৈশব আমাদের গাড়িতে। আমরা ঢাকায় ফিরি। যে যার বাড়িতে নামি। কুসুমকুমারী ভিআইপি ফেরির কথা আর কখনো তুলি না আমরা।

দুঃসাহসিক অভিযাত্রী

অরিন্দম মুখার্জী বিংকু

 

বাঙালির এক্সপিডিশন যাত্রার সূচনালগ্নেই দুঃসাহস ও অসম্ভবকে সম্ভব করতে তারা ব্যস্ত আর সেই সময় আর্বিভূত হন এক তরুণ। সাঁতার নিয়ে নিমজ্জিত থাকলেও পারিপার্শ্বিকতা এড়িয়ে চলা যায় না। জীবন তো আর ঢেউয়ের মতো নির্ভেজাল নয়। ঢেউটিকে প্রতিপক্ষ মনে করে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু জীবনের জটিলতার সঙ্গে পেরে ওঠা কঠিন। তাকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তবু এক বুক প্রত্যাশা নিয়ে শুরু হয় সাঁতার। ব্যর্থ হলে ব্যক্তিÑ তার কি-ই বা আসে যায়। তবে তার ওপর নির্ভর করছিল স্বাধীনতাকামী বাংলাদেশের সম্মান। ওই সম্মানটুকু যে করেই হোক রক্ষা করতে হবে। মনে মনে সৃষ্টিকর্তার কছে এই নিবেদন রেখে জলে নামতেই একের পর এক ক্যামেরার ক্লিক। বিশ্ব ক্রীড়া জগতে বাঙালির সাফল্যের স্বীকৃতি প্রথম আদায় করেছিলেন যে ব্যক্তি তিনি আমাদের বাংলাদেশেরই সন্তানÑ ব্রজেন দাস।
বিশ্ব জয়ের আনন্দে ইতিহাসে গৌরব উজ্জ্বল হয়ে থাকার শিরোপা ছিনিয়ে নিতে কে না চান। ওই সূত্র ধরেই অলিম্পিক গেমসের প্রতি পদক্ষেপে পুরো বিশ্ব আন্দেলিত হয়। তবে বাংলাদেশও কেন নয়। বাংলাদেশিরাও পারেন ওই অভিযাত্রার শীর্ষস্থানীয় তীর্থ যাত্রী হতে। অলিম্পিক আসরে যার কাছে পরাজিত হয়ে উত্তাল সমুদ্রের ঢেউটিকে হার মানিয়েছে, যার জয়ের ছাপ ইংলিশ চ্যানেল নীরবে মেনে নিয়েছে তিনি একজন বাঙালি, আমাদের দেশের গৌরব ও দুঃসাহসিক অভিযাত্রী সাঁতারু ব্রজেন দাস।


ইংলিশ চ্যানেল পশ্চিম ইউরোপের একটি সাগর। তা ফ্রান্স ও গ্রেট ব্রিটেন দ্বীপটিকে পৃথক করেছে এবং আটলান্টিক মহাসাগরের সঙ্গে উত্তর সাগরের যুক্ত করেছে। ফরাসি ভাষায় ইংলিশ চ্যানেলকে বলা হয় লা মঁশ। তা ‘কোর্টের হাতা’ নামে পরিচিত। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ৫৬২ কিলোমিটার এবং প্রস্থ অবস্থানভেদে সর্বোচ্চ ২৪০ থেকে সর্বনিম্ন ৩৪ কিলোমিটার হতে পারে ডোভারের প্রণালিতে। পূর্বদিকে এর বিস্তার কমে মাত্র ৩৪ কিলোমিটার হয়ে যায়। সেখানে এটি ডোভার প্রণালির মাধ্যমে উত্তর সাগরের সঙ্গে সংযুক্ত হয়। ইংলিশ চ্যানেলের প্রধান
দ্বীপগুলোর মধ্যে আছে আইল অব ওয়াইট ও চ্যানেল দ্বীপপুঞ্জ।
ইংলিশ চ্যানেল সাঁতরিয়ে গৌরবের অধিকারী দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম সাঁতারু ব্রজেন দাস। ১৯২৭ সালের ৯ ডিসেম্বর মুন্সীগঞ্জের বিক্রমপুরে কুচিয়ামোড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার বাবা হরেন্দ্র কুমার দাস ও মা বিমলা দাস। তার স্ত্রী মধুচন্দা। তাদের ঘরে তিন মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছেন।
গ্রামের স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়ি ব্রজেন দাসের। ছেলেবেলা থেকেই সাঁতারের প্রতি তার খুবই ঝোঁক ছিল। ফুটবল খেলা সবচেয়ে বেশি পছন্দ করতেন। স্কুল জীবনে ক্যাপ্টেন ছিলেন। ক্রিকেটও ছিল তার পছন্দের। কিন্তু সাঁতারটিকে কখনোই তার খেলা মনে হয়নি।


ব্রজেন দাস চলে আসেন ঢাকায়। এখানে আসার পর সাঁতারটি ছিল মজার ও আমোদের ব্যাপার। বুড়িগঙ্গা ছিল তার বাসার কাছেই। সাঁতারে হাতেখড়ি হয় ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীতে। এখানে থেকেই সাঁতারে তার উৎসাহ তৈরি হয়। আন্তঃবিদ্যালয় খেলাধুলায় সাঁতার প্রতিযোগিতায় সব সময়ই প্রথম স্থান দখল করতেন তিনি।
ব্রজেন দাস ১৯৪৬ সালে ঢাকার কেএল জুবিলি স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করে কলকাতার বিদ্যাসাগর কলেজে ভর্তি হন। কলকাতায় যাওয়ার পর বিশেষ কারণেই সাঁতারের প্রতি আগ্রহ জন্মায় তার। কারণ কলকাতায় বাড়ির কাছাকাছি ফুটবল বা ক্রিকেট খেলার মাঠ ছিল না। অথচ সুইমিং পুল ছিল। সন্তরণ ক্রীড়ার বিজ্ঞান, সাঁতারের বিভিন্ন কায়দা ইত্যাদি সেখান থেকেই শেখেন। ১৯৪৮ সালে আইএ পাস করে বিএ-তে ভর্তি হন তিনি।
ব্রজেন দাস ১৯৪৮-১৯৪৯ সালে আন্তঃবিদ্যালয় খেলাধুলায় সাঁতার প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান দখল করেন এবং প্রথম বড় ধরনের জয়ের আস্বাদ পান। ১৯৫২ সালে পশ্চিমবঙ্গে ১০০ মিটার ফ্রিস্টাইল সাঁতার প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হন।
কলকাতায় শিক্ষা জীবন শেষে ঢাকায় ফিরে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও ব্রজেন দাস পড়াশোনা শেষ করতে পারেননি। বাংলাদেশে ফিরে তিনি পূর্ব পাকিস্তান ক্রীড়া ফেডারেশনের প্রতি বার্ষিক সাঁতার প্রতিযোগিতা চালু করতে উদ্বুদ্ধ করেন। এ রকম একটি প্রতিযোগিতা প্রথম অনুষ্ঠিত হয় ১৯৫৩ সালে। ১৯৫৫ সালে পাকিস্তান জাতীয় প্রতিযোগিতায় ১০০ ও ৪০০ মিটার ফ্রিস্টাইল সাঁতারে শিরোপা জেতেন তিনি।
ব্রজেন দাস ১৯৫৫ সালে পাকিস্তান অলিম্পিকে সাঁতার প্রতিযোগিতায় প্রথম তো হন, এবং মোট চারটি খেলায় স্বর্ণপদক লাভ করেন। ১৯৫৬ সালে মেলবোর্নে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অলিম্পিকে তাকে পাঠানো হয়নি। সেখানে পাকিস্তান দল থেকে তাকে বাদ দিয়ে পাকিস্তানি সাঁতারুদের নেয়া হয়েছিল। ওই অপমানজনক পরিস্থিতিই তাকে অলিম্পিকে অংশ না নিয়েও সমতুল্য সম্মান ও সাফল্য অর্জনের চিন্তায় বাধ্য করে। মনস্থির করেন, ইংলিশ চ্যানেল তাকে সাঁতরিয়ে অতিক্রম করতেই হবে। তার ওই ভাবনায় অনুপ্রেরণার শক্তি জুগিয়েছেন ইস্ট পাকিস্তান স্পোর্টস ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক এসএম মহসিন।
১৯৫৮ সালে অনুষ্ঠিত ইংলিশ চ্যানেল সাঁতার প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে আমন্ত্রিত হন ব্রজেন দাস। এরপর চরম হতাশা কাটিয়ে ব্যক্তিগত উদ্যোগে দীর্ঘপথ সাঁতারের অনুশীলন শুরু করেন। ১২ থেকে ১৬, ১৬ থেকে ২৪ এবং ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা টানা সাঁতারের অনুশীলন করেন। শীতলক্ষ্যা ও উন্মত্ত মেঘনায় সাঁতার চর্চা করে নিজেকে তৈরি করেন। এক সময় সাঁতরিয়ে নারায়ণগঞ্জ থেকে চাঁদপুর অতিক্রম করেন তিনি। তখনকার দিনে ওই দূরত্ব অতিক্রম করতে স্টিম শিপ প্রায় আড়াই ঘণ্টা সময় নিতো।


ইংলিশ চ্যানেল সাঁতার প্রতিযোগিতায় ২৩টি বিভিন্ন দেশের প্রতিযোগী অংশ নেন। দক্ষিণ এশিয়ার সাঁতারুদের মধ্যে নারীও ছিলেন পাঁচজন। ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে অংশ নিয়েছিলেন একমাত্রÑ ব্রজেন দাস।
১৯৫৮ সালের ১৮ আগস্ট প্রায় মধ্যরাতে ফ্রান্সের তীর থেকে প্রতিযোগিতা শুরু হয়। অনেকে ক্লান্ত হয়ে মাঝপথে ক্ষান্ত দিলেও ব্রজেন দাস সংকল্পে অটুট থেকে অগ্রগামীদের একজন হয়ে সাঁতার শেষ করেন এবং ইতিহাসে নিজের নাম লেখান।
ইংলিশ চ্যানেল এমনিতেই অশান্ত থাকে। সেদিন বাড়তি ছিলÑ প্রচ- কুয়াশা। প্রতিযোগিতা ছিল- ফ্রান্সের তীর থেকে সাঁতরে ইংল্যান্ডের তীরে এসে উঠতে হবে। প্রতিযোগিতা শেষ হয়েছিল পরের দিন বিকেলে। প্রচ- প্রতিকূল পরিবেশে সাঁতার কেটে পর দিন বিকেলে প্রথম সাঁতারু হিসেবে ইংল্যান্ড তীরে এসে পৌঁছান ব্রজেন দাস। প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন। ১৯৫৮, ১৯৫৯, ১৯৬০ ও ১৯৬১ সালসহ মোট ৬ বার তিনি ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেন। ১৯৬১ সালে ১০ ঘণ্টা ৩৫ মিনিটে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে তিনি বিশ্ব রেকর্ড গড়েন। এ জন্য তাকে ‘লেটনা ট্রফি’ দেওয়া হয় ১৯৮৬ সালে। দেশের উল্লেখযোগ্য প্রায় সব সাঁতার
প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে নিজেকে সেরা সাঁতারু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। ইংরেজরা যখন পুরোপুরি শাসন শুরু করে দিয়েছিল তখন অনেক বাঙালি জীবিকার তাগিদে প্রথম ঘর ছেড়ে বাইরে বের হওয়া শুরু করেন। অনেকেই তখন বিলেতে যেতেন পড়াশোনা বা জীবিকার তাগিদে। দুঃসাহসিক কাজ বা এক্সপিডিশনের জন্য নয়। তবে ইংরেজ আমলেই বাঙালির এক্সপিডিশনের যাত্রা। দুঃসাহস আর অসম্ভবকে সম্ভব করতেই হয়তো ব্রজেন দাস বিলেত যান। ইংলিশ চ্যানেল প্রতিযোগিতার আগেই ১৯৫৮ সালের জুলাইয়ে আরেকটি সাঁতারের আমন্ত্রণ আসে। ভূমধ্যসাগরে ইটালির কাপ্রি থেকে নেপলস্ পর্যন্ত সাঁতার কেটে যেতে হবে। এটি প্রতিযোগিতা ছিল না। ফলে লন্ডন থেকে ইটালি গিয়ে ওই খেলায় অংশ নেন প্রশিক্ষণের পেশা গ্রহণের জন্য। সেখান থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতা ও সাফল্য সাঁতরিয়ে সমুদ্র পাড়ি দেয়ার জন্য তার আত্মবিশ্বাস সুদৃঢ় করে।
বিদেশ থেকে বহু আমন্ত্রণ পাওয়া সত্ত্বেও ব্রজেন দাস কোনো কিছুর মোহে স্বদেশ ছেড়ে চলে যাননি। ১৯৫৯ সালে প্রাইড অফ পারফরম্যান্স পাকিস্তান সরকার তাকে বিশেষ সম্মানে সম্মানিত করে। ১৯৭৬ সালে জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার কওঘএ ঙঋ ঈঐঅঘঘঊখ ঈযধহহবষ ঝরিসসরহম অংংড়পরধঃরড়হ ড়ভ ঃযব টহরঃবফ করহমফড়স অর্জন করেন তিনি।
১৯৯৭ সালে প্রাণঘাতী ক্যানসারে আক্রন্ত হয়ে ব্রজেন দাস বেশ কিছুদিন কলকাতায় চিকিৎসা গ্রহণ করেন। সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে ১৯৯৮ সালে ১ জুন ৭০ বছর বয়সে সেখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ৩ জুন ঢাকার পোস্তগোলায় তাকে সমাধিস্থ করা হয়। তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৯ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার (মরণোত্তর) প্রদান করে।
সাঁতারটিকে পেশা হিসেবে নিয়ে অন্য দশজনের মতো সাধারণ জীবন যাপন করেও ব্রজেন দাস ওই দুঃসাহসিক কাজ করতে পেরেছিলেন কেবল স্বপ্ন ও ইচ্ছাশক্তির জোরে। ওই সঙ্গে সহায় ছিল তার ভাগ্য।
ইচ্ছার ঢেউয়ে ফুলে ওঠে প্রতিভার নদী। ওই নদীতে সাঁতার কেটে যেন ব্রজেন দাস পাড়ি দিয়েছিলেন ইংলিশ চ্যানেল। দেখিয়ে দিয়েছিলেন পাকিস্তানের সিদ্ধান্ত কতোটা ভুল ছিল। কতোটুকু ছিল বাংলার বিপরীত। তার কাছেই তো সেদিন হয়েছিল পাকিস্তানের বড় পরাজয়।


শীতলক্ষ্যা ও বুড়িগঙ্গা নদীর মতোই মানুষ। এত উত্তাল ও খোলামেলা ঢেউ অন্য কোনো নদীর কী আছে! বিক্ষিপ্ত স্রোতে নিজেকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছেন ব্রজেন দাস ইংলিশ চ্যানেল পর্যন্ত। সেখানে বসে না থেকে বাংলাদেশের চাঁদপুরের অরুণ নন্দী ও উত্তর কলকাতার আরতি সাহাকে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেয়ার স্বপ্নে তিনি সাহস জুগিয়েছেন। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের মধ্যে গভীর সুনসান রাতে তিনি জলে ডানা ঝাপটা এক জলাশ্রয়ী মুক্তিযোদ্ধা। এমন গৌরব আছে যে জাতির সে জাতি কি পরাজয় মেনে নিতে পারে?
কৃতী সাঁতারু ব্রজেন দাসকে আজ আমরা গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি।

 

খুঁড়তে খুঁড়তে কতদূর যাও 

মনি হায়দার 

 

তুমি কী বলতে চাও? রাহুল তীব্র চোখে তাকায় মনিকার দিকে। বললেই আমি বিশ্বাস করবো? আমার কি চোখ নেই? কী মনে করো নিজেকে? আমি অফিসে থাকলেও আমার একটা চোখ থাকে তোমার দিকে।
আমার দিকে?
হ্যাঁ, তোমার দিকে।
তুমি আমাকে সন্দেহ করো?
না বললে মিথ্যা বলা হবে। হাতের গ্লাস মুখের কাছে নিয়ে এক চুমুক গ্রহণ করে মনিকার একটু কাছে আসেÑ হ্যাঁ মনিকা, তোমাকে আমি সন্দেহ করি।
আমাকে! আমাকে তুমি সন্দেহ করো? অবিশ্বাস্য চোখে তাকায় মনিকাÑ কেন আমাকে তুমি সন্দেহ করো?
করি... হ্যাঁ তোমাকে সন্দেহ করি... কারণ তুমিÑ
শেষ করো। রাহুল শেষ করোÑ কেন আমাকে তুমি সন্দেহ করো?
বলছি তো করি...
আমিও তো জানতে চাইÑ কেন করো? কী সন্দেহ করো?
রাহুল হাতের গ্লাসটা রাখে টেবিলের ওপর। একটু একটু টলছে। চোখের পাতা কাঁপছে। নিজেকে প্রাণপণে স্থির রাখার চেষ্টা করছে।
মনিকা এগিয়ে যায়। হাত বাড়ায় তার দিকে।
হাতটা সরিয়ে দেয় রাহুলÑ না, আমাকে ধরতে হবে না। আমি ঠিক আছি। তোমার কী মনে হয়, আমি মাতাল? না, আমি একদম মাতাল নই। তুমি স্কুল থেকে বাসায় ফিরতে দেরি করো কেন?
আমি স্কুল থেকে বাসায় ফিরতে দেরি করি!
হ্যাঁ, করো।
তুমি তো থাকো অফিসে। কেমন করে জানো আমি স্বুল থেকে বাসায় ফিরতে দেরি করি!
বললাম না, আমি অফিসে গেলেও একটা চোখ তোমার জন্য বাসায় রেখে যাই।
রাহুল, তুমি ঠিক আছ?
আমি রাহুল সব সময়ে ঠিক থাকি। আমার কোনো দ্বিধা নেই।
তুমি কেন আমাকে সন্দেহ করো? আমরা যদি আমাদের সন্দেহ করি তাহলে দুনিয়ায় আমাদের কেউ বিশ্বাস করবে? কেউ আমাদের মানুষ ভাববে? কোনো বন্ধু আমাদের কাছে আসবে? রাহুল, প্লিজ, বোঝার চেষ্টা করো। আমাদের জায়গা খুব কম। তুমি আর আমি ছাড়া আমাদের কেউ নেই- বলতে বলতে মনিকার গলা ধরে আসে। টেবিল ধরে নিজেকে সামলে নেয়ার চেষ্টা করে। রাহুল জানালার কাছে যায়। তাকায় রাতের ঢাকা নগরীর দিকে। স্রোতের মতো গাড়ি যাচ্ছে। গতিশীল গাড়ির আলোর ফোয়ারা ছুটে চলেছে দিগি¦দিক। হাতের গ্লাস মুখের কাছে নেয়, চুমুক দেয় না, সময় নেয়। তাকায় মনিকার দিকে। মনিকার বিষাদ কান্নাকাতর মুখ রাহুলকে একটুও আকর্ষণ করে না। অথচ মাত্র বছর দুয়েক আগেও মনিকার একটু মন খারাপ হলে দিশাহারা হতো রাহুল। দুই বছর... বছরে বারো মাস... দুই বছরে চব্বিশ মাস... একজন মানুষের জীবনে দুই বছর কি খুব বড়? পরিস্থিতির কারণে কখনো বড়, কখনো খুব ছোট হতে পারে। বাইরে থেকে ফিরে তাকায় রাহুলÑ শ্লেষের সঙ্গে প্রশ্ন করে, তুমি অস্বীকার করতে পারো, তোমার কাছে ওই লোকটা আসে না?
কোন লোকটা আসে আমার কাছে?
ন্যাকা! মনে করো তোমার ন্যাকামিতে আমি সব ভুলে যাবো? কখনোই না।
কে আসে আমার কাছে? মরিয়া হলে জানতে চায় মনিকা। লোকটার নাম বলো।
কে আবার? তোমার আগের স্বামী কুহুক।
মনিকা কোনো কথা বলে না, বলতে পারে না। রাহুলের কথায় মনিকার কথা বলার সব শক্তি হারিয়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত রাহুল এভাবে বলতে পারলো? মাত্র দু’বছরের ব্যবধানে একজন রাহুলের এতো পরিবর্তন! কিন্তু কিসের ওপর ভিত্তি করে রাহুল এমন নির্মম অসত্য বলতে পারলো? কবে থেকে সে এমন ভাবতে শুরু করেছেÑ মনিকা মনে করতে পারছে না। তবে হ্যাঁ মাস ছয়েক আগে দুপুরে স্কুলে গিয়েছিল রাহুল। হঠাৎ যাওয়ায় যেমন বিস্মিত হয়েছিল, আনন্দিতও হয়েছিল। স্কুলের প্রিন্সিপালকে বলে ছুটি নিয়ে রাহুলের সঙ্গে একটা রেস্টুরেন্টে যায়। দু’জন মিলে খেয়েছে, বিকেলে ঘুরেছে রিকশায়। সত্যিই দিনটা অদ্ভুত ভালো লেগেছিল। এ জন্যই কুহককে ত্যাগ করে কুহকেইর বন্ধু রাহুলের হাত ধরে...। সেই আসাটা কি ভুল ছিল? কোনটা ভুল আর কোনটা ফুল? কাঁটার ভেতরই তো ফুলের জন্ম। আবার ফুলের পাশেই কাঁটার অবস্থান।
কুহকের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল বছর আটেক আগে। সামান্য পরিচয় ছিল। কলেজ বন্ধু কামনার বড় ভাই কুহক। কামনাদের বাসায় গেলে দু’একবার দেখা হয়েছে। কুহক একটা বেসরকারি কলেজে পড়ায়। কামনার মা-বাবা বাসায় এসে প্রস্তাব দিলে মনিকার মা-বাবাও রাজি হয়ে যান। মনিকার কারো সঙ্গে প্রেম ছিল না। দেখতে সুন্দরী বলা যায়। গায়ের রঙ হালকা কালো। মুখ অসাধারণ লাবণ্যবালু চিকচিক করে। লম্বা লতানো শরীর। আর বড় সম্পদ তার গভীর দুটো চোখ। দুই পরিবারের যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে বেশ জাঁকজমকের সঙ্গে বিয়েও হলো। বিয়ের পর মনিকা আবিষ্কার করে, কুহক কথা কম বলে। কিন্তু যখন বলে, যা বলে তা খুবই যুক্তিযুক্ত ও পরিবেশের সঙ্গে মানানসই। যদিও গলাটা একটু ফ্যাসফেসে তবুও সহ্য করার মতো। হাসাহাসিও কম করে। এই নীরবতা মনিকার কাছে মনে হয়েছিল, অপার সৌন্দর্র্যের ভিন্ন এক রূপান্তর। যারা বেশি কথা বলে, খিলখিল করে হাসে তাদের ব্যক্তিত্ব থাকে না। কুহক শান্ত-সমুজ্জøল এক প্রসবন। বেশ জমে ওঠে সংসার...। কিন্তু বছর তিনেকের মধ্যেই হাঁপিয়ে ওঠে মনিকা। এ তো মানুষ নয়, পাথর। যে নীরবতাটি মনে হয়েছিল অম্লান সৌন্দর্যের রূপরেখা সেটিই বিষাক্ত বেদনার মতো, শ্রাবণের কান্নার মতো মনিকাকে ঘিরে রাখে। বেচারা একটু ঝগড়াও করে না, রাগ করে না। কঠিন কথাও বলে না। মনিকা কিছু বললে সামান্য দাঁত বের করে হাসে। ভাবটা যেন সে এ যুগের গৌতম বুদ্ধ।
মনিকা মন খারাপ করলে অবশ্য বিচলিত হয় কুহকÑ কি হয়েছে তোমার?
কিছু হয়নি আমার।
তাহলে মন খারাপ করে আছ কেন?
আমি মন খারাপ করে থাকলে তোমার কী?
কুহক একেবারে চুপ। মনে হয়, তার সব কথা শেষ।
মনিকা ভেবে পায় না, এই লোক ক্লাসে পড়ায় কেমন করে? কী পড়ায়? কিন্ত শুনেছে, ক্লাসে ভালোই পড়ায় এবং অনেকের প্রিয় শিক্ষকও। কোনো কাঁটা কম্পাসে মেলাতে পারে না কুহক নামক মানুষটির চরিত্র বা চরিত্র ব্যকরণ। কামনা বা শাশুড়ির কাছে জেনেছে, কুহক সব সময়ই বাসায় কম কথা বলে। এমন দিন গেছে বাসায়, ২৪ ঘণ্টায় কারো সঙ্গে একটা কথা বলেনি। কেমন করে পারে! দিন-রাত, বাসায় যতোটুকু সময় পায়, মুখের সামনে একটা বই নিয়ে বসে থাকে। পড়েও বিচিত্র ধরনের বই। যদিও কুহুক বাণিজ্যের ছাত্র, কলেজে পড়ায় বাণিজ্য সম্পর্কে তবুও পড়ে বিচিত্র প্রকারের বই। মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধুর প্রতি প্রায় প্রশ্নহীন আনুগত্য আছে, জানেও বিস্তর। কিন্তু নিশ্চুপ, মৌন।
রাতে বিছানায় বিশেষ মুহূর্তে কুহক আশ্চর্য সবল, সাবলীল। মনে হয় তেপান্তরের ধাবমান অশ্ব। সে সময়ের কুহককে খুঁজে পায় না পর মুহূর্তে। কামকাতর মুহূর্ত শেষ হলে পাশেই শুয়ে পড়ে এবং মিনিট তিনেকের মধ্যে ঘুমিয়ে যায়। মনিকা বন্ধুদের কাছে শরীরের সংরাগ নিয়ে কতো অবাক ঘটনা শুনেছে। আর সে! তার স্বামী?
বিয়ের বছরখানেক পর কুহক কক্সবাজার নিয়ে গিয়েছিল। প্রথম সমুদ্র দেখার রোমান্স নিয়ে যখন সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়ায় মনিকা তখন গোটা মন-প্রাণ-শরীর আদিগন্ত বিস্তৃত বিপুল জলরাশি দেখে কাপছে। সমুদ্র এতো সুন্দর! এতো বর্ণিল? এতো আনন্দমুখর? কুহককে ছাড়াই সমুদ্রে নেমে গেছে। নিজের মতো করে ভিজেছে। সাঁতার কেটেছে। আশ্চর্য, কুহুক একবারও সমুদ্র স্নান করেনি! অবশ্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা তীরের পানিরেখার ওপর দিয়ে হেঁটেছে। তীরে দাঁড়িয়ে ঢেউ গুনেছে।
হাত ধরে টানছে মনিকাÑ চলো, দু’জনে মিলে স্নান করি।
নাহ, আমার ভালো লাগে না। তুমি করো।
সমুদ্র স্নান ভালো লাগে না কোনো পুরষের! সম্ভবত সমুদ্র এই প্রথম শুনলো। অথচ চারপাশে কতো মানুষÑ স্বামী-স্ত্রী, প্রেমিক-প্রেমিকা, ছেলে-বুড়ো, দাদা-দাদি, নানা-নানি গোসল করছে, সাঁতার কাটছে, ঢেউয়ের বিরুদ্ধে লড়াই করছে আর কুহুক আশ্চর্য নির্বিকার। সমুদ্রপাড় থেকে এসে কুহুক হোটেলের বাথরুমে গোসল সারে। অন্তর্গত বেদনা, ক্ষোভ ও দুঃখে মনিকা ফেটে চৌচির হয়ে গেছে।
রাতে ছোট বোনের সঙ্গে সেলফোনে সমুদ্রপাড়ের অভিজ্ঞতা উচ্ছ্বাসের সঙ্গে বলে মনিকাÑ পিউ, সমুদ্র কী সুন্দর! একবার এসে দেখে যা, ভালো লাগবে। কী বিশাল ঢেউ, কতো মানুষ...
কথা শেষ হলে কুহুক মুদৃকণ্ঠে বলে, সমুদ্র দেখে এতো উচ্ছ্বাসের কী আছে?
মানে? হতভম্ব মনিকাÑ বলে কী লোকটা!
সবকিছুর উচ্ছ্বাস দেখাতে নেই।
তো মানুষের ভেতরে উচ্ছ্বাস-আনন্দ এলে কী করবে? বুকে চেপে ধরে বসে থাকবে?
তা থাকবে কেন? আমি মনে করি, আনন্দ প্রকাশের নয়, আনন্দ একান্ত করে অনুভবের। সমুদ্র দেখেছ, দেখার আনন্দ বা সুখ মনের ভেতরে ধারণ করে রাখা উচিত। অবশ্য আমার এই ধারণার সঙ্গে অধিকাংশ মানুষ একমত নয়, আমি জানি। কিন্তু এটাই আমি, আমার আমি।
এই প্রথম বিবাহিত জীবনে কুহকের ভেতরের কুহককে কিছুটা চিন্তে পারে মনিকা। কিন্তু এই চেনা দিয়ে কী করবে সে? কোথায় রাখবে? মনে হয়, তার ভেতরের চারপাশটা একেবারে ভেঙে আসছে। রুম থেকে বের হয়ে ব্যালকনিতে দাঁড়ায়। হুহু বাতাসে গোটা কক্সবাজার উড়ে যাচ্ছে। চারদিকে নিয়ন আলোর বন্যা... দূরে সমুদ্রের মাঝে টিমটিমে আলো জ্বলছে। সেগুলো মাছ ধরার নৌকাÑ দুুপুরে দেখেছে। কী সাহস জেলেদের? ভাবতে ভাবতে মনিকা অনুভব করে, তার গা ভিজে যাচ্ছে। হাত দিয়ে দেখে, চোখের পানি নামছে।
কক্সবাজার থেকে ফিরে আসার কয়েকদিন পর বন্ধু রাহলকে নিয়ে বাসায় আসে কুহক। রাহুল একেবারে কুহকের উল্টো। সামান্য কারণেও প্রচ-ভাবে হাসে। বড় বড় চোখ। হালকা চুল। চওড়া কপাল। হাসে আর সিগারেট টানে। সিগারেট একদম পছন্দ না মনিকার। গন্ধটা সহ্য করতে পারে না। ড্রয়িংরুমে বসে পরিচয়ের পর চা-নাশতা দেয় মনিকা। চায়ের সঙ্গে সিগারেট টানতে টানতে রাহুল তাকায় মনিকার দিকে। কিন্তু প্রশ্ন করে কুহককেÑ কুহক, তুই কাজটা ঠিক করিসনি?
কোন কাজ?
তুই বিয়ে করলি, আমাকে জানালি না?
কী করে জানাবো? ইউনিভার্সিটির শেষ পরীক্ষার পর আর তোর দেখা পেয়েছি? শুননেছি, তুই বিদেশে চলে গেছিস?
ঠিক শুনেছিস। আর এই ফাঁকে এমন টুকুটুকে সুন্দরী বৌ ঘরে এনেছিস?
মৃদু হাসে কুহক।
বিব্রত মনিকা।
রাহুল হাঁ হাঁ হাসেÑ ভাবী, আপনি ভাবছেন লোকটার বুঝি কা-জ্ঞান নেই। আছে, কা-জ্ঞান আছে। কিন্তু আমি সব সময় সত্যি বলি। আমার যা ভালো লাগে তা অকপটে বলি। অনেকে খারাপভাবে নেয়। তবে আমি অসহায় আমার কাছে। আমি তো আমার মতো, নাকি?
সত্যি সবাই বলতে পারে নাÑ মনিকা মৃদুকণ্ঠে বলে।
রাইট ভাবী। প্রত্যেকে দাবি করে, সে সত্যবাদী। কিন্তু নিজের বিরুদ্ধে গেলে সে ওই সত্যটাকে আর প্রকাশ করে না। বেমালুম খেয়ে ফেলে বলতে বলতে সিগারেট ধরায় রাহুল।
আপনি খুব সিগারেট খান বুঝি?
তা খাই। আপনি কি পছন্দ করেন না?
মৌন মনিকা। কেউ মানুষ সিগারেট খাবেÑ এতে তার কী আসে যায়? আর কতোক্ষণই বা থাকবে? কেন বলতে গেল কথাটা?
তার ভাবনার মধ্যে আবার প্রশ্ন করে রাহুলÑ আপনি সিগারেট খাওযা পছন্দ করেন না?
না খেলেই ভালো হয়।
ঠিক আছে, আপনার আদেশে আজকের এই প্যাকেটের সিগারেটকটা খেয়ে একদম ছেড়ে দেবো।
জগতের সবচেয়ে সহজ কাজ কী জানিস? প্রশ্ন করে কুহক।
কী কাজ?
সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দেওয়া আবার ধরা।
তুই দেখিস, আজ এই প্যাকেটের গুলো খাওয়ার পর আর খাবো না। যদি না পারি তাহলে আর তোর সামনে আসবো না।
কী আশ্চর্য! আপনাকে এতো বড় প্রতিজ্ঞা করতে কে বলেছে? মনিকা প্রতিবাদ করে।
আমিও অনেক দিন ধরে চাইছিলাম সিগারেট ছেড়ে দিই। কিন্তু কোনো ইস্যু পাচ্ছিলাম না। আপনাকে কেন্দ্র করে ইস্যু পেয়ে গেলাম।
আড্ডায় আড্ডায় বিকেল। রাহুল প্রস্তাব করেÑ কুহুক চল, নাটক দেখি।
নাটক?
মনে হয় আসমান থেকে পড়লি? তুই নাটক দেখিস না?
নাহ, ওসব আমার পোষায় না।
পোষায় না মানে কী?
ওসব সাজানো জিনিস আমার ভালো লাগে না। কিছু চোখা চোখা বাক্য থাকে নাটকের সংলাপে। যে লেখে সে ধারণাকে বমির মতো উগড়ে দেয়, চরিত্রগুলো মঞ্চে এসে উগড়ে দিয়ে যায়Ñ সেই অনাধিকালের চর্বিত চর্বণ। নতুন কিছু হলে যাওয়া যেতো।
তুই আগের মতোই রয়ে গেলি রে, কুহকভ রোবোটিক। তাকায় মনিক্রা দিকে, বুঝলেন ভাবী, ওকে আমরা কুহকভ ডাকতাম ইউনিভার্সিটিতে। তখন সোভিয়েত ইউনিয়নÑ দুনিয়া জোড়া সমাজতন্ত্রের জোয়ার, কমিউনিস্টদের মতো সে নিঃশব্দ, নির্চল...। আছে সবার সঙ্গে আবার নেই। তাই সোভিয়েত লোকজনের নাম ধার করে ডাকতাম ‘কুহকভ’। আমার ধারণা ছিল, এতো দিনে তোর পরিবর্তন হয়েছে। তুই কুহকভের জাল ছিঁড়ে বের হয়ে এসেছিস। কিন্তু আমার ধারণা ভুল, তুই এখনো কুহকভ। যাই রে...। ভাবী কি করেনÑ সংসার, না চাকরি-বাকরি কিছু করেন?
আমি একটা স্কুলে পড়াই।
কোন স্কুলে?
মনিংসান।
খুব নামি-দামি স্কুল। যাক, সারা দিন বাসায় থাকতে হয় না, কাজের মধ্যে থাকেন। এটা ভালো। কুহকভ, আমি আসি। এই নে কার্ড। দিলখুশায় আমার অফিস। সময় পেলে আসিস। আমি জানি, তুই আসবি না। কী আর করা, আমিই আসবো মাঝে মধ্যে। ভাবী, এলে বিরক্ত হবেন না তো?
আগে তো আসুন।
গুড।
হাওযার বেগে চলে যায় রাহুল। রেখে যায় মনিকার জন্য কৌতূহল, উচ্ছ্বাস আর ভাবনার ছিন্নপাতা। মানুষের একটাই জীবন। কিন্তু কতোভাবে তার প্রক্ষেপণ হতে পারে? রাহুলের বন্ধু কুহক বা কুহকের বন্ধু রাহুলÑ কতো ব্যবধান দু’জনার!
মাঝে মধ্যে রাহুল বাসায় আসে। কুহকের সঙ্গে আড্ডা দেয়। মনিকারও ডাক পড়ে। চা জোগায়। আর অবাক মনিকাÑ রাহুল সিগারেট খায় না। মনিকার বাবা সিগারেট খেতেন। মা কতো বকেছেন। কতোবার বলেছেন, ঠিক আছে, ছেড়ে দেবো। কিন্তু কোনোদিন ছাড়তে পারেননি। আর রাহুল? মনিকা কিছুটা হলেও বুঝতে পারে, রাহুল এই বাসায় আসে কেবল তার জন্য। না, কোনো প্রমাণ নেই তার কাছে। কিন্তু নারীর মনের ইন্দ্রিয় তাকে পরিষ্কার বলছে, রাহুল তোমার প্রেমে পড়েছে। সত্যি! স্বামী-সংসার থাকার পরও মনিকার ভেতরে নাম না জানা এক অলৌকিক পাখি গাইতে শুরু করে... ‘আমি চিনিগো চিনি তোমারে চিনি...।’
এই চেনা ও অচেনার দরজায় এক দুপুরে রাহুলকে মুখোমুখি আবিষ্কার করে মনিকা। স্কুল ছুটির ঠিক আগ মুহূর্তে গেইটে আসে রাহুল।
আপনি?
এই পথ দিয়ে যাচ্ছিলাম। ভাবলাম, আপনাকে দেখে যাই। কেমন আছেন?
ভালো। আপনি?
আমি? আমি আরো ভালো। কোথায় যাবেন, বাসায়?
হ্যাঁ।
যদি কিছু মনে না করেনÑ আমার সঙ্গে গাড়ি আছে। চলুন কোথাও বসি। মনিকাকে ভাবার কোনো সুযোগ না দিয়ে রাহুল গেইট পার হয়ে হাঁটতে শুরু করে। নিশ্চিত মনিকা আসবে।
হ্যাঁ মনিকা যায়, যেতে বাধ্য হয়। কে তাকে নিয়ে যায়? মনিকা জানে না। কিন্তু যেতে ভালো লাগছে...। গাড়ির দরজা খুলে দাঁড়ায় রাহুল।
মনিকা প্রবেশ করলে দরজা বন্ধ করে নিজের ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ি স্ট্রাট দেয়।
গাড়ি চলতে থাকে। কেউ কোনো কথা বলে না। মনে হচ্ছে, গাড়ি চালানো রাহুলের বড় একটা কাজ। আর মনিকা নির্বাক সামনে তাকিয়ে আছে। প্রায় ১৫-২০ মিনিট পর গাড়ি চমৎকার একটা বাড়ির সামনে থামে।
নামে মনিকা। চারপাশটা দেখে বুঝতে পারে, এটা খুব অভিজাতপূর্ণ একটা রেস্টুরেন্ট। রাহুলের ইশারায় সিঁড়ি বেয়ে তিনতলায় ওঠে। ব্যালকনির সঙ্গে চমৎকার সাজানো একটা টেবিল। বুঝতে পারে মনিকাÑ রাহুল এখানে মাঝে মধ্যে আসে। বেয়ারারা পরিচিত। দু’জন বসে। মনিকার ভেতরটা কাঁপছে। জীবনে এই প্রথম বাইরের কারো সঙ্গে...। রাহুল কি বাইরের কেউ? জানে না... মনের ভেতরে সুরের একটা কম্পন বয়ে যায়... মনিকা ভেতরে ভেতরে টুকরো টুকরো হয়ে যায়।
কী খাবেন?
আপনি এখানে আনলেন কেন?
দুপুরের খাবারের সময় না? দুপুরে প্রিয় অতিথিকে কি না খাইয়ে রাখবো? বলুন, কী খাবেন?
জানি না।
ঠিক আছে, আমিই বলছি।
নানান মাছ আর তরকারিতে ভরে যায় টেবিল। ধীরে ধীরে খায়। খেতে খেতে রাহুল জানায়, আমি দীর্ঘদিন সিঙ্গাপুরে ছিলাম। চাকরি করতাম। প্রায় ১১ বছর। মা-বাবা আছেন গ্রামে, ছোট ভাই একটা ব্যাংকের ম্যানেজার। বোন একটাইÑ বিয়ে হয়েছে। জামাইয়ের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়া থাকে। এই হচ্ছে আমার জীবন।
এসব আমাকে শোনাচ্ছেন কেন?
নিজের সব কাছের মানুষের জেনে রাখা ভালো। সিঙ্গাপুর থেকে এসে একটা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ি তুলেছি। ব্যবসা করছি আর ঘুরে বেড়াচ্ছি।
চমৎকার জীবন আপনার।
হাসে রাহুল। খাওয়া শেষে বেয়ারা সব নিয়ে যায়। দু’জনে মুখোমুখি। রাহুলের দিকে তাকাতেও ভয় পাচ্ছে মনিকা। বাসায় যাওয়া দরকার। স্কুলের পর বাইরে থাকে না মনিকা। অথচ প্রায় দু’ঘণ্টা বাইরে। কুহক ফেরে বিকেলের দিকে। অনেক সময় রাতও হয় ফিরতে। না, কেউ কিছু বলবে না লেটের জন্য। কিন্তু নিজের কাছে...
মনিকা!
রাহুলের নাম ধরে ডাকে মনিকার ভেতরটা একেবারে উল্টে যায়। ভয়ার্ত চোখে তাকায়।
তুমি নিশ্চয়ই জেনে গেছ, তোমার সামনে বসা এই রাহুল বকশী তোমায় ভালোবাসে, প্রচ- ভালোবাসে। প্রথম যেদিন তোমায় রাহুল দেখেছে কুহকের বাসায়, সেই প্রথম দৃষ্টিতে রাহুল তোমাকে ভালোবেসেছে। রাহুল বুঝে গেছে, তুমি কুহকের সংসারের বড় বেমানান একটি প্রজাপতি। রাহুলকে তোমার কি কিছু বলার আছে?
মনিকা মাথাটা টেবিলের ওপর রাখে। মাথার দু’পাশে কালো চুলের বিশাল স্তূপ।
রাহুল ঝুঁকে মাথার ওপর মুখ রাখেÑ আমি বুঝে গেছি, তুমিও রাহুলকে ভালোবাসো। আমি জানতাম। কিন্তু একটু সংশয় ছিল। সেটিও কেটে গেছে। থ্যাংক ইউ, আমি কোনোদিন তোমায় কষ্ট দেবো না। বুকের ভেতরে প্রদীপের মতো জ্বালিয়ে রাখবো তোমাকে, মনিকা। তুমি কেবল আমার অন্তরজুড়ে আলো, আলো আর আলো ছড়াবে। তোমার আলোয় আমি বেঁচে থাকতে চাই।
ঘটনা ঘটার ছয় মাসের মাথায় মনিকা ডিভোর্স দেয় কুহককে। চলে আসে রাহুলের বাসায়। বিয়ে হয়েছে কোর্টে। বিয়ের পর হানিমুনে গেছে মালয়েশিয়া। জীবন, একটাই যে জীবন সে জীবন কতো সুন্দর, কতো বর্ণাঢ্য, আলোকময় হতে পারেÑ রাহুল বুঝিয়ে দিয়েছে। আর ভালোবাসাÑ একজন নারীর জন্য একজন পুরষেরও তীব্র হতে পারে, মনিকা মর্মে মর্মে বুঝতে পারছে।
রাহুলের সঙ্গে সংসার করার মুহূর্তে মনের ভেতরে যে দ্বিধা ছিল তা একদম নেই। কয়েক মাস আগে কক্সবাজার গিয়েছিল মনিকা আর রাহুল। স্মৃতির ভেতরে দুটো পর্ব রেখে মনিকা মনে মনে নিজেকে বলেছে, কতো সার্থক-সুন্দর আর উপভোগ্য এই কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকত? রাহুল আর মনিকা মিলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সাঁতার কেটেছে। দিন-রাতে যখনই সময় পেয়েছে তখনই চলে এসেছে সমুদ্রপাড়ে সমুদ্র মন্থনে।
বাসা নিয়েছে ঢাকার অভিজাত এলাকায়। নিজের গাড়ি...। একটা চকচকে জীবনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিল। সময় কাটানোর জন্য আবার একটা স্কুলে চাকরি নিয়েছে মনিকা। কিন্তু এ কী দুর্যোগ শুরু হলো আবার?

আমি দিব্যি করে বলছি, তোমার সঙ্গে বিয়ের পর আমি এক মুহূর্তের জন্য কুহককে ভাবিনি। আমার জীবন থেকে সে হারিয়ে গেছে চিরকালের জন্য।
আমি বিশ্বাস করি না। তার সঙ্গে তুমি বাইরে যাও।
অসম্ভব।
তুমি আর সে- দু’জন মিলে রেস্টুরেন্টে খেতে যাও, হাসো, আড্ডা দাও। তোমাকে সে আদর করে.. আহ আহ, আমাকে এসবও সহ্য করতে হচ্ছে?
সব তোমার কল্পনা- রাহুল। সব তোমার কল্পনা। তোমার সঙ্গে চলে আসার সময় মা-বাবা সবাইকে ছেড়ে আসতে হয়েছে আমার। কুহকের সঙ্গে ডিভোর্স কেউ মেনে নেয়নি। তোমাকে ছাড়া কাউকে চিনি না, জানি না। তুমি নিশ্চয়ই ভুল করছ রাহুল।
রাহুল বকশী কোনোদিন ভুল করে না।
তাহলে এক কাজ করো...
কী কাজ?
আমার বলতে লজ্জা লাগছে, তারপরও বলছি- যে কুহককে নিয়ে তোমার এতো সন্দেহ, চলো তার কাছে যাই।
কেন? ওই লোকটার কাছে কেন যাবো?
কুহকের কাছে গেলে সত্যি-মিথ্যাটা বুঝতে পারবে।
না, আমি যাবো না। তোমার দরকার থাকলে তুমি যাও।
দরকারটা আবার নয়, তোমার।
না, আমি যাবো না।
হাত ধরে মনিকা বুকের সঙ্গে জড়িয়ে রাখে- চলো একবার, মাত্র একবার। যাওয়ার পর কুহক যদি বলে, তার সঙ্গে আড্ডা দিয়েছি, রেস্টুরেন্টে খেয়েছি তাহলে তুমি যা বলবে, আমি তা-ই শুনবো। যা করতে বলবে, তা-ই করবো।
ঠিক আছে। কিন্তু তার বাসায় যাওয়া যাবে না।
ওকে, চলো তার কলেজে যাই?
পরের দিন কলেজে গিয়ে জানতে পারে মনিকা আর রাহুল - কুহক বছর দুয়েক আগেই চাকরি ছিড়ে দিয়ে গ্রামের বাড়ি চলে গেছে। গ্রামটি ঢাকার উপকণ্ঠে গাজীপুরে। তারা চলে যায় গ্রামে। বাড়ি খুঁজে বের করে জানতে পারেÑ কুহক বছরখানেক আগে মারা গেছে। বাড়ির সামনেই কুহকের কবর। মনিকা হিসাব করে বুঝতে পারেÑ রাহুলের সঙ্গে বিয়ের পর মাত্র মাস তিনেক বেঁচে ছিল কুহক।

শরৎবাবু’র নারী

 

বাঙালি মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত জীবনের নিখুঁত ছবি সরল সুনিপুনতায় ফুটিয়ে তুলেছেন উপমহাদেশের ধ্রপদী কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তার উপন্যাসের পরিধি জুড়ে ছিল বৈচিত্রপূর্ণ নারীচরিত্র। শরৎবাবু’র নারী চরিত্রগুলির সঙ্গে বেশির ভাগ বাঙালিরই আশৈশব পরিচয়। হেঁশেল, অন্দরমহল, উঠোনের লাগোয়া কলতলাতেই ঘুরে ফিরে বেড়ানো সব রকমের চরিত্রের একটি দু'টি। শরৎসাহিত্য নারীত্বের পূর্ণ বিকাশ ঘটিয়েছে চেতনার উন্মেষে নির্মল প্রত্যয়ে। এককথায় তৎকালীন সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত নারী সমাজের সামাজিক রূপ তিনি গভীর মমত্ববোধ ও সহানুভূতির সঙ্গে ব্যক্ত করেছেন। তার সৃষ্টি বহুল আলোচিত চারটি নারী চরিত্র নিয়ে এবারে থাকছে সহজ -এর বিশেষ আয়োজন।

 

 

 

 

শায়লা হাফিজ

 

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৭৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর-১৯৩৮ সালের ১৬ জানুয়ারি) জনপ্রিয় বাঙালি কথাসাহিত্যিক। বাংলা সাহিত্যের অমর এই শিল্পী নারী চরিত্রের পূর্ণ বিকাশে পাঠক মনে চেতনার উন্মেষ ঘটিয়েছেন আলোকিত নির্মল প্রত্যয়ে! নারীর প্রতি সামাজিক নির্যাতন ও তার সংস্কারবন্দি জীবনের রূপায়ণে তিনি বিপ্লবী লেখক, বিশেষত গ্রামের অবহেলিত ও বঞ্চিত নারীর প্রতি তার গভীর মমত্ববোধ ও শ্রদ্ধা তুলনাহীন। সামাজিক বৈষম্য, কুসংস্কার ও শাস্ত্রীয় অনাচারের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন উচ্চকণ্ঠ। কাহিনী নির্মাণে অসামান্য কুশলতা এবং অতি প্রাঞ্জল ও সাবলীল ভাষা তার কাব্যসাহিত্যের জনপ্রিয়তা ও খ্যাতির প্রধান কারণ। বাংলাসহ ভারতীয় বিভিন্ন ভাষায় তার অনেক উপন্যাসের চিত্রনাট্য নির্মিত হয়েছে। সেগুলো অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছে। তা হলো ‘দেবদাস’, ‘শ্রীকান্ত’, ‘রামের সুমতি’, ‘দেনা-পাওনা’, ‘বিরাজবৌ’ ইত্যাদি। অবশ্য শরৎ সাহিত্য আধুনিক নারীবাদী সাহিত্য নয়! নয় প্রতিবাদী, প্রতিরোধী, বিপ্লবী সাহিত্যের নিদর্শন!
দেবদাসের চন্দ্রমুখী : শরৎ সাহিত্য প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থা ভেঙে ফেলার দিকনির্দেশিকা নয়! আবহমান সমাজ জীবনে প্রলয় আনেননি তিনি! সৎ সাহিত্যের কাজ সাহিত্যের দর্পণে সমাজ ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো ব্যক্তি মানবের চেতনায় স্পষ্ট প্রতিবিম্বিত করা! মানব জীবনের অন্তর্নিহিত মর্মবেদনা সহানুভূতির স্বরে বাজিয়ে তোলাই সাহিত্য! তার কাজ মানুষের মনুষ্যত্ব নিরন্তর জাগিয়ে রাখা! শরৎ সাহিত্য বঙ্গজীবনে ওই কাজটিই করে গেছে বরাবর। বাংলা সাহিত্যের অমর সৃষ্টি শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘দেবদাস’ (১৯১৭)। এ উপন্যাসের তিনটি চরিত্র দেবদাস, পার্বতী ও চন্দ্রমুখী। সময়ের পালাবদলে আজও তারা ফিরে আসে নতুনরূপে, নতুন আবেদনে। উপন্যাসের নায়ক দেবদাসের প্রতি ছিল চন্দ্রমুখীর যথার্থ ভালোবাসা। অনেকেই ওই উপন্যাস পড়তে পড়তে এটা ভাবতে পারেন যে, এমন নিঃস্বার্থ ভালোবাসা কেবল উপন্যাসেই সম্ভব। আবার কেউ যেন এ চন্দ্রমুখীকেই খুঁজে পেয়েছেন বাস্তবের উঠানে। পার্বতীকে দেবদাস ভালোবাসে জেনেও চন্দ্রমুখীর কোনোই ভাবান্তর হয় না। তার ভালোবাসায় বিন্দুমাত্র ভাটা পড়ে না। এমনই স্বর্গীয় অনুভবে একটি চরিত্র এঁকে জীবন্তরূপে তা পাঠকের সামনে তুলে ধরার মতো তুখোড় শিল্পী ছিলেন তিনি। ‘দেবদাস’ উপন্যাসের চন্দ্রমুখী কলকাতার চিৎপুরের পাড়ায় নাম লেখানো পতিতা। তার বয়স চব্বিশ। তার একটু হাসির জন্য বহু নামি-দামি জমিদার উন্মুখ হয়ে থাকতো। কিন্তু এর সবই সে উপেক্ষা করে দেবদাসের প্রতি অগাধ ভালোবাসার কারণে। এমনও জানে সে, কোনোদিন দেবদাসকে পাবে না। পরে ওই বৃত্তি ছেড়ে অশত্থঝুরি গ্রামে গিয়ে মাটির ঘরবাড়ি তৈরি করে বাস করতে থাকে সে। পতিতারাও নারী। কোনো নারী পতিতা হয়েও যে নারীত্বের মমত্ববোধ ধারণ করে এবং অর্থ-বিত্ত তুচ্ছ করে তার কাছেও যে কখনো কখনো ভালোবাসা অমূল্য হয়ে উঠতে পারে তা এই উপন্যাসে স্পষ্ট হয়েছে। পতিতাদেরও মন আছে, বাসনা-কামনা আছে, ভাগ্যের বিড়ম্বনা ও পতিতা জীবন যাপনের জন্য গ্লানিবোধ আছে, সমাজের গৃহবধূদের মতো মাথা উঁচুু করে থাকতে না পারার বেদনাও আছে। তা এ উপন্যাসে তিনি তুলে ধরেছেন সুনিপুনভাবে।
এ কথা ঠিক, প্রেমের অভিনয় করে খরিদ্দার ভোলায় পতিতা। বাস্তবে প্রেম করা তার বৃত্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তবুও সে মাঝে মধ্যে বৃত্তি বা পরিবেশের ঊর্ধ্বে সামাজিক পুরুষকে ভালোবেসে বসে। আর তখনই সমাজের সঙ্গে সংঘর্ষে তার কপালে জোটে দুঃসহ দুঃখ। শরৎ সাহিত্যে অধিকাংশ পতিতার অদৃষ্টে ওই দুঃখভোগ ঘটেছে। দেবদাস উপন্যাসে দেবদাসের দাসী হয়ে সঙ্গে থাকার আকাক্সক্ষাটুকুও চন্দ্রমুখীর পূর্ণ হয়নি। তবুও নিজের আকাক্সক্ষার চেয়ে দেবদাসের চাওয়া-পাওয়াটিই প্রধান্য দিয়েছে। প্রেমিকের চেয়েও ভালোবাসা বড় হতে পারে, এর প্রাপ্তির চেয়েও যে আত্মত্যাগ মনে জাগে তার জ্বলজ্বলে উদাহরণ চন্দ্রমুখী চরিত্রটি।
শরৎচন্দ্র মানব দরদি বলে মানুষের জীবনের সব মূল্যে মানুষকে বিচার করেছেন। তাই নারীর পতিতাবৃত্তি গ্রহণ তার একমাত্র পরিচয় বলে স্বীকার করেননি। অবশ্য এ কথা ঠিক, শরৎচন্দ্রের পতিতাদের চরিত্র সব সময় বাস্তবোচিত হয়নি।
শ্রীকান্তের রাজলক্ষ্মী : বাংলা সাহিত্যের আরেক অনবদ্য সৃষ্টি এই রাজলক্ষ্মী চরিত্র। রাজলক্ষ্মী সাহসী, দৃঢ়, প্রত্যয়ী, দয়াময়ী, আবেগী, সুন্দর রমণী। সামাজিক বিভিন্ন জটিলতার কারণে তাকে বাইজির কাজ বেছে নিতে হয়েছে ঠিকই কিন্তু মনে-প্রাণে সে শুধু শ্রীকান্তেরই ছিল। শ্রীকান্তের প্রতি অপরিসীম ভালোবাসা আর অভিভাবকত্ব বার বার শ্রীকান্তকে তার কাছে টেনে নিয়ে এসেছে। রাজলক্ষ্মী সব সময় চাইতো তাকে শ্রীকান্ত বিয়ে করে এই অনৈতিক জীবন থেকে মুক্ত করুক। পরবর্তী কালে শ্রীকান্তের জীবনে কমললতার আগমন রাজলক্ষ্মীকে অনেকটা দূরে ঠেলে দেয়। শ্রীকান্তকে রাজলক্ষ্মী হাসিল করতে চেয়েছিল, একান্ত নিজের করে পেতে চেয়েছিল। আর কমললতার দৃঢ় বিশ্বাস, শ্রীকান্তের অন্তরে একমাত্র সেই আছে। তার কাছ থেকে শ্রীকান্তকে কেউই দূরে নিতে পারবে না। কমললতাকে ভালোবাসা সত্ত্বেও রাজলক্ষ্মীর নির্ভয় ও নিরাপদ আশ্রয়ে নিজেকে সঁপে দিতেই ভালোবাসতো শ্রীকান্ত। তাই তো রাজলক্ষ্মীর অভিভাবকত্বের আওতায় থেকে শেষ পর্যন্ত শ্রীকান্তের মনে ছবি হয়েই রয়ে গেল কমললতার গোপন স্বপ্ন। নারীর প্রতি সশ্রদ্ধ ভালোবাসা প্রকাশে শরতের যে মনোভাব সেটি তার কাহিনিগুলোয় ছড়িয়ে আছে, বিশেষ করে পতিতার প্রেম ও বিধবার অন্তরে পরম স্নেহে লালিত ভালোবাসার পবিত্রতার তিনি যেভাবে রূপ দিয়েছেন এরই সরলরৈখিক বহিপ্রকাশ আমরা উপভোগ করি রাজলক্ষ্মীর প্রতি শ্রীকান্তের আন্তরিক ভালোবাসায়। রাজলক্ষ্মী ছিল বাল্যবিধবা। উপন্যাসটির পর্যায়ান্তরে শ্রীকান্তের বাল্যকাল শেষ হলে পিয়ারী বাইজিরূপী রাজলক্ষ্মীর সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটে। শৈশবে খেলার সঙ্গী এই রাজলক্ষ্মীকে প্রথম দেখায় চিনতে পারেনি শ্রীকান্ত। কিন্তু শ্রীকান্তকে সে ঠিকই চিনেছে। গানের আসরে সঙ্গীত ও নৃত্যে শ্রীকান্ত অভিভূত হয়ে পড়ে। পরিচয় জানতে চাইলে পিয়ারী জানায়, ‘তোমাকে চিনেছিলাম ঠাকুর, দুর্বুদ্ধির তাড়ায় আর কিসে? তুমি যতো চোখের জল আমার ফেলেছিলে, ভাগ্যি সূর্যিদেব তা শুকিয়ে নিয়েছেন, নইলে চোখের জলের একটা পুকুর হয়ে থাকতো।’ প্রথমে বিস্মিত ও হতবুদ্ধি হলেও অবশেষে শ্রীকান্ত তার বাল্যসখী রাজলক্ষ্মীকে চিনতে পারে। তার তখনকার অনুভবটা দেখে নেয়া যাকÑ ‘এ কী বিরাট অচিন্তনীয় ব্যাপার এই নারীর মনটা, কবে যে এই পিলে রোগা মেয়েটা তাহার ধামার মতো পেট এবং কাটির মতো হাত-পা লইয়া আমাকে প্রথম ভালোবাসিয়াছিল এবং বইচি ফুলের মালা দিয়া তাহার দরিদ্র পূজা নীরবে সম্পন্ন করিয়া আসিতেছিল, আমি টের পাই নাই। যখন টের পাইলাম তখন বিস্ময়ের আর অবধি রহিলো না। নভেল-নাটকে বাল্যপ্রণয়ের কথা অনেক পড়িয়াছি। কিন্তু এই বস্তুটি যাহাকে সে তাহার ঈশ্বরদত্ত ধন বলিয়া সগর্বে প্রচার করিতেও কুণ্ঠিত হইলো না, তাহাকে সে এতো দিন তাহার ঘৃণিত জীবনের শতকোটি মিথ্যা প্রণয়ের অভিনয়ের মধ্যে কোনখানে জীবিত রাখিয়াছিল। কোথা হইতে ইহাদের খাদ্য সংগ্রহ করিতো। কোন পথে প্রবেশ করিয়া তাহাদের লালন-পালন করিতো?’ রাজলক্ষ্মীর অমিত প্রেম, অকৃত্রিম নিবিড় ভালোবাসার ছবি লেখক অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে আঁকতে পেরেছেন বলেই মনে হয়। জাগতিক পাওয়া, না পাওয়ার হিসাব-নিকাশের বাইরে যে প্রেম এর বাস্তব প্রতিফলন আমরা পাই রাজলক্ষ্মীর অনুভবে। প্রবল সংযম আর বুদ্ধিমত্তা দিয়ে রাজলক্ষ্মী যেন জয় করেছে তার আরাধ্য ব্যক্তিকে। বস্তুগত অর্থে হয়তো সে পরাজিত। কিন্তু মনোগত অবস্থানে সে পেয়েছে সব! শ্রীকান্ত শেষতক দূরে সরে গেছে। অবশ্য শ্রীকান্তের কণ্ঠ থেকে আমরা শুনেছি প্রাপ্তির চেয়েও অপ্রাপ্তি বড় আনন্দের।
ভাগ্যলিপি আর সম্ভোগ বিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত শ্রীকান্ত বলেছে, ‘বড় প্রেম শুধু কাছেই টানে নাÑ ইহা দূরেও ঠেলিয়া দেয়। ছোটখাটো প্রেমের সাধ্যও ছিল নাÑ এই সুখৈশ্বর্য পরিপূর্ণ স্নেহ স্বর্গ হইতে মঙ্গলের জন্য, কল্যাণের জন্য আমাকে আজ এক পদও নড়াইতে পারিতো।’ শরৎচন্দ্র দৈহিক ভোগ-বিলাসবর্জিত এক বিশেষ মানসিকতার কথা তার সাহিত্যে প্রচার ও প্রকাশ করতে চেয়েছেন। সত্যি কথা বলতে কী, ওই সত্য উপলব্ধ জীবন দর্শনের দ্বারপ্রান্তেও আমরা আজ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারিনি। আত্মউপলব্ধির সত্যজ্ঞান শ্রীকান্তের মাধ্যমে খানিকটা সাহিত্যরূপ দেয়ার সময় হৃদয়ের আবেগ ও ভাবের গভীরতা ঢেলে দিয়েছেন লেখক। মানব চরিত্রের রহস্য প্রকাশে কোথাও কোথাও ঔপন্যাসিক প্রকৃতির বর্ণনাও করেছেন বটে। ভরা নদীতে নৌকাচালনা কিংবা অন্ধকার রাতের বিবরণ তার কবিমনের এক প্রকার বহিঃপ্রকাশ মাত্র। পিয়ারীরূপী রাজলক্ষ্মীর নবজন্ম, সামাজিকতায় হাস্যরসের বিষয়াদি, সৌন্দর্য বর্ণনায় ভাষার প্রয়োগ-চাতুর্য এবং ভাবের অভিব্যক্তিতে শরৎ এক অভিনব কাহিনী নির্মাণ করেছেন। এর আগে বাংলা সাহিত্যের পাঠক এ ধরনের রোমাঞ্চকর ও আবেগঘন কাহিনীর সঙ্গে পরিচিত হননি। রাজলক্ষ্মীর মতো দ্বৈতচরিত্রের যে ভারসাম্য তিনি দেখিয়েছেন এবং একই সঙ্গে এক নারী কেমন করে দুটি চরিত্রে মিশে যায় এর প্রতি আমাদের পরিচয়ের যে সুযোগ শরৎচন্দ্র ঘটিয়ে দিলেন তা রীতিমতো বিস্ময়কর। সেখানটায় রয়েছে আবেগ ও প্রাপ্তির আনন্দের এক অভূতপূর্ব মিশেল।
শরৎচন্দ্রের শিল্পী মননে রচিত চরিত্রে সব সময় বৈচিত্র্যের কাজ দেখা যায়। ‘নারীর মনের তল বিধাতাও পায় না’ বলে যে কথাটি প্রচলিত ওই গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে শরৎচন্দ্র তার উপন্যাসে নারী চরিত্রের মধ্যে অনুপম মাধুর্য ও আত্মবিশ্বাসের শক্তি সমান্তরালভাবে এঁকেছেন। একাধারে বস্তুগতভাবে কোনো নারীর জীবনটি উপলব্ধি করেছেন। এর পাশাপাশি মনস্তাত্ত্বিক অনুভবেও ভেসে গেছেন। নারীকে একদিকে যেমন উপভোগ্য করে তুলে ধরেছেন, অন্যদিকে তেমনি ওই নারীর ভেতর মমতার সত্তাও সমানভাবে সামনে এনেছেন। নারী চরিত্রের বিচিত্রতার যে দিকগুলো তিনি কলমের আঁচড়ে আঁচড়ে এঁকেছেন, উপন্যাসটি পড়া শেষে পাঠকের মনে এর অনুপম মাধুর্যে আছন্ন থাকতে হয়। শরৎচন্দ্রের এই অপূর্ব গুণের কারণে শুধু নারী নন, পুরুষের মনে স্থান করে নিয়েছেন স্বমহিমায়।

 

মুতাকাব্বির মাসুদ

এক.
শরৎ সাহিত্য পর্যালোচনায় নির্ণিত বিষয়ে যে সত্যটি উঠে আসে তা হলো, বঙ্কিমচন্দ্র (১৮৩৪-১৮৯১) ও রবীন্দ্রনাথের (১৮৬১-১৯৪১) মতোই ওফবধষরংঃ লেখক ছিলেন শরৎচন্দ্র (১৮৭৮-১৯৩৮)। তার সামগ্রিক রচনা পর্যালোচনায় তাকে জীবনবাদী লেখক বলা যায়। তিনি জীবন বাস্তবতায় জবধষরংঃ লেখক হিসেবেও ততোধিক পরিচিত। সমাজ বাস্তবতার কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠিত সমকালের তথাকথিত অভিজাত শ্রেণীর বিরুদ্ধে তার লেখনী ছিল উচ্চকিত। সমকালে এ সমাজে বিদ্যমান অভিজাত শ্রেণীর বেপরোয়া বিলাসবহুল জীবনযাত্রা বঙ্কিমচন্দ্রের রোমান্টিক কল্পনাটি প্রেরণার
উদ্দামপ্রবাহে উদ্দীপ্ত করেছিল। রবীন্দ্রনাথের রচনায় উদ্গত চরিত্রগুলোও গ্রহণযোগ্য মাত্রায় সমাজের উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করেছে। কিন্তু এ ধারায় শরৎচন্দ্র তার রচনায় জীবন চেতনার ব্যতিক্রমী অনুধ্যানের এক ভিন্নতা উদীর্ণ করার প্রয়াস পেয়েছেন যেখানে নিম্নবিত্ত শ্রেণী মুখ্য হয়ে উঠেছে। এই প্রথম আমরা দেখলাম সমাজে অবহেলিত একটি শ্রেণীকে অবলম্বন করেও সাহিত্য রচনা করা যায় এবং তা শিল্পমান বিচারে শতভাগ সফল। সুতরাং সমাজ চেতনার বিনির্ণিত ধারায় শরৎচন্দ্রের নতুন সমাজ বিনির্মাণে তার চেতনার অন্তর্গত সুর আমাদের বোধও জাগ্রত করে। যখন বলেন, ‘সংসারে যারা শুধু দিলে, পেলে না কিছুই; যারা বঞ্চিত, যারা দুর্বল, উৎপীড়িত; মানুষ যাদের চোখের জলের কখনো হিসাব নিলে না, সমস্ত থেকেও কেন তাদের কিছুতেই অধিকার নেই, এদের বেদনা দিলে আমার মুখ খুলে, এরাই পাঠালে আমাকে মানুষের কাছে মানুষের নালিশ জানাতে।’ শরৎচন্দ্রের এ ভাষণ যতোটা আবেগের ততোটাই হৃদয় ও অন্তরের অতলান্তিক গভীরতা থেকে উদ্গত সত্য। অনেকটা ডিকেন্সের (১৮১২-১৮৭০) ও ধস ৎিরঃরহম ভড়ৎ ঃযব যঁসধহ ৎধপব অনুভূতির সঙ্গে সমঞ্জসপূর্ণ। শরৎচন্দ্রের অন্তর ছিল উদার মানবিকতায় পরিপূর্ণ। অনেকেই বলেন, শরৎচন্দ্রের সমাজ চেতনা ও সামাজিক দৃষ্টি রবীন্দ্রনাথ থেকেও প্রগতিশীল। তীব্র আত্মজিজ্ঞাসা, প্রখর বাস্তব দৃষ্টি, সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ শক্তি মানব আদর্শ সম্পর্কে অনুসন্ধিৎসা, সুস্থ-সুন্দর-স্বাভাবিক জীবন ও সমাজের প্রতি ব্যাকুল আকাক্সক্ষা এবং তার সমাজ চেতনা পূর্বসূরিদের তুলনায় অগ্রগামী ছিল। এই স্বল্প পরিসরে উল্লিখিত প্রাসঙ্গিক বিষয়ে কেবল ‘চরিত্রহীন’ (১৯১৭)-এর নারী চরিত্র সাবিত্রী ও কিরণময়ীর ওপর সামান্যই আলোচনার প্রয়াস থাকবে।

দুই.
শরৎচন্দ্রের উপন্যাসের নারীরাই মুখ্য চরিত্রের ভূমিকায় সফল ও সমধিক উজ্জ্বল। তার রচনায় নারী চরিত্রের প্রাধান্য অস্বীকার করার সুযোগ নেই। অন্তর দিয়ে চিত্রিত করেছেন ওই নারীদের। সমাজের অসহায় নারীর ক্রন্দন তাকে ব্যথিত করেছিল। তাই নারীর ওই করুণ ক্রন্দন অন্তর দিয়ে শোনার প্রয়াস পেয়েছিলেন। যেমনটি সমকালে অন্য কারো বেলায় তা দেখা যায়নি। সমকালে নারীকে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা ও তথাকথিত সনাতন প্রথা কঠিন অনুশাসনে বন্দি করে রেখেছিল। কুসংস্কারের অনৈতিক বৃত্তে তারা আবদ্ধ ছিল। শরৎচন্দ্র প্রগতির ধারায় তাদের মুক্তির বাণী শুনিয়েছেন। একটি আলোকিত সমাজ বিনির্মাণে তাদের জাগ্রত করার চেষ্টা করেছেন।

তিন.
শরৎচন্দ্রের একটি বিখ্যাত উপন্যাস ‘চরিত্রহীন’ (১৯১৭)। এর সব চরিত্রই উজ্জ্বলতায় সমানে সমান। এ উপন্যাসের নায়িকা সাবিত্রী হলেও এখানে জীবন বাস্তবতায় এক দীপ্ত উজ্জ্বল চরিত্র কিরণময়ী। তার উপস্থিতি উপন্যাসের সর্বত্রই চোখে পড়ার মতো। তার চলন, কথা-বার্তা, জীবন দর্শন সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী ধারায় উপস্থাপিত। অনেকটা পাশ্চাত্য চেতনার সূক্ষ্ম প্রভাব তার মধ্যে লক্ষ্য করা যায়। নারী স্বাধীনতা, বাকচাতুর্য, একটি ভিন্নমাত্রার জীবন দর্শন কিংবা প্রেম-ভালোবাসা সম্পর্কে তার বিশ্বাস, দর্শন আমাদের সংস্কৃতি বা সমাজ বাস্তবতায় অনেকটাই সাংঘর্ষিক। কিন্তু সে তা গায়ে মাখে না। নিজের মতো চলে। নিজের কথা অকপটে বলে। শরৎচন্দ্রের নায়িকাদের মধ্যে কিরণময়ীই নিয়তিটি অস্বীকার করার দুঃসাহস দেখিয়েছে। অন্যরা ভাগ্যের ছকটি মেনে নিয়েছে। তারা চলমান জীবনের বিদ্যমান দুঃখ-বেদনাটি অমোঘ নিয়তি বলেই মেনে নিতো। এই প্রথম প্রতিবাদী নারী হিসেবে কিরণময়ীর আবির্ভাব। পরে তা অভয়া, কমলের মধ্যেও আমরা দেখেছি। কিরণময়ী তর্ক জানে। সে তার্কিক। তার কথায় যুক্তি থাকে। অনেক সময় দার্শনিকের মতো কথা বলে। প্রেম সম্পর্কে তার অনেক যুক্তি যা তার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থেকে উৎসারিত। যেমন দেহগত কামনায় যে প্রেম সে প্রেমের পক্ষে তার অবস্থান। সে সাফ জানিয়ে দিয়েছে, নিষিদ্ধ প্রেম বলে কিছু নেই। যা সমকালে সমাজ বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে উদ্ধৃত করা ছিল প্রায় অসম্ভব। সে নিষিদ্ধ প্রেমটি যুক্তি দিয়ে গৌরবের সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত করার স্পর্ধা দেখিয়েছে। কিরণময়ী প্রতিবাদী নারী সমাজের একটি বলিষ্ঠ স্বর ও এক প্রতিনিধি। নির্যাতিত নারী সমাজের পক্ষে তার অবস্থান। তাই সমাজে বিদ্যমান তথাকথিত নীতিটি নত শিরে মেনে নেয়নি। সে বিদ্রোহ করেছে সমাজের অযাচিত নিপীড়ন ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে। তার জায়গাতে থেকেই তীব্র প্রতিবাদের মাধ্যমে সমকালে সে নির্যাতিত নারীদের পক্ষে নিজের অবস্থানও নিশ্চিত করেছে। বস্তুত শরৎ সাহিত্যে ‘চরিত্রহীন’ থেকেই প্রতিবাদী নারীর যাত্রা শুরু। আর ওই নারী হচ্ছে কিরণময়ী। তার চরিত্রের জটিল দিকগুলো পাঠককে ভাবনার ক্ষেত্রে বিভ্রান্তিতে ফেলতে পারে। দেখা যায়, তার ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যটি সমুন্নত রাখার জন্যই যেন এ আপসহীন সংগ্রাম। এখানে সে একা। তার পাশে অন্য কেউ যেমন ছিল না তেমনি সমাজ কিংবা সমাজবিধিও ছিল না। উপন্যাসে চলমান ওই সচল চরিত্র দ্রোহের এক প্রতিমূর্তি। জৈবপ্রবৃত্তির মধ্যে সগৌরবে নিজেকে সমর্পণ করে রেখেছে। সে নিষ্কাম প্রবৃত্তিতে বিশ্বাসী নয়। সকাম চেতনায় উদ্বুদ্ধ এবং এক অদৃশ্যমান কামচেতনায় তাড়িত। তা কখনোই কোনো নারী চরিত্রে এ ধরনের প্রবৃত্তিটি কেউ মেনে নিতে পারে না। সমকালীন সংস্কারাচ্ছন্ন সমাজে এরূপ অসামাজিক চেতনার কোনো স্বীকৃতি বা অনুমোদন ছিল না। তাই শরৎচন্দ্র সমকালীন সমাজ ব্যবস্থার ভেতরে থেকে কৌশলে এ চরিত্রের স্বতঃস্ফূর্ততার ভেতর মনোবিকৃতির প্রতীকী স্পর্শ দিয়ে ‘মোর্ছা’ রোগে আক্রান্ত করে কিরণময়ী চরিত্রটি স্বাভাবিক করার আপত প্রয়াসও চালিয়েছেন।
কিরণময়ীর জীবন সম্পর্কে তার যৌক্তিক পর্যবেক্ষণ অনেকটাই সরল আবার তাৎপর্যময় দার্শনীকতায় পরিপূর্ণ। জীবন সম্পর্কে হার্বাট স্পেন্সারের (১৫৫২-১৫৯৯) যুক্তি ও পর্যবেক্ষণ ওই রকমই ছিলÑ ‘কোনো মানুষের তার ন্যায্য বা মৌলিক যে অধিকার তা থেকে বঞ্চিত করা মানেই অন্যায়।’ কিরণময়ী ওই কথাটিই যুক্তির ভেতর উপস্থাপন করে বোঝাতে চেয়েছে, দিবাকরকে আরাকানে নিয়ে এসে কারো অধিকারে সে হস্তক্ষেপ করেনি। তাই অনুশোচনার কোনো কারণ সে দেখে না।

চার.
কিরণময়ী নিজের রূপ ও সৌন্দর্যের বিষয়ে সচেতন। নারীর রূপ সম্পর্কে তার পর্যবেক্ষণ অনেকটাই আধুনিক ও তাত্ত্বিক। ‘ততোক্ষণই রূপ যতোক্ষণ সে সৃষ্টি করতে পারে। এই সৃষ্টি করার ক্ষমতাই তার রূপ-যৌবন। এই সৃষ্টি করবার ইচ্ছাই তার প্রেম’Ñ অসাধারণ উদ্ধৃতি। এই হচ্ছে শরৎ সাহিত্যের নন্দিত নারী চরিত্র। স্বাধীন, কোমল ও অমায়িক আবার কখনো দ্রোহী, প্রতিবাদী ও বাকপটু। উল্লেখ্য, প্রেমটি তিনি তার মতো সংজ্ঞায়িত করেছেন। এ প্রেম তার জীবনে আসেনি। এখানে তিনি ব্যর্থ। কিরণময়ীর তথাকথিত শিক্ষিত স্বামী কখনো তাকে ভালোবেসেছে বলে মনে হয় না। তাকে ভালোবাসার বদলে প্রচুর জ্ঞান দিয়েছে অনেকটা শিষ্যেকে গুরু যেমন দিয়ে থাকেন। ফলে সে বিদুষী হয়েছে,
প্রেমিকা হতে পারেনি। ভালোবাসার পরিবর্তে সে শিখেছে প্রচুর। দর্শন, বিজ্ঞান,
হিন্দুশাস্ত্রÑ সবকিছুই সে পড়েছে। সেখান থেকেই উৎপত্তি তার পা-িত্যের। তার তর্ক ও যুক্তি শুনে প-িতই মনে হয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, সে ভালোবাসা চেয়েছে। কিন্তু পায়নি। এখান থেকেই এ নারীর বিদ্রোহী হয়ে ওঠার যাত্রা। সে আধুনিক শিক্ষিত নারী বলেই তার রূপ, সৌন্দর্য, রুচি, উদ্দাম ও উচ্ছল যৌবনটি ব্যর্থ হতে দিতে চায়নি।

বিচিত্র এই নারী চরিত্র কিরণময়ী অকপটে দিবাকরকে বলে দিয়েছে অনঙ্গ ডাক্তারের সঙ্গে তার নিষিদ্ধ সম্পর্কের আদ্যোপান্ত। শরৎচন্দ্রের এ নারী চরিত্রে কোনো ভণিতা দেখা যায়নি। যখন সে বলে, ‘কতো বৎসরের দুর্দান্ত অনাবৃষ্টির জ্বালা এই বুকের মাঝখানে জমাট বেঁধেছিল বলেই এমন সম্ভব হতে পেরেছিল, কি জানি ঠাকুরপো, যে তৃষ্ণায় মানুষ নর্দমার গাঢ় জলও অঞ্জলি ভরে মুখে দেয়, আমারও ছিল সে পিপাসা।’ একই পিপাসা আমরা বঙ্কিমের রোহিনি-তেও (কৃষ্ণকান্তের উইল-১৮৭৮) দেখেছি। এখানেই শরৎচন্দ্রের কিরণময়ীর জীবন বাস্তবতার সকরুণ ট্র্যাজেডি। উপন্যাসে বর্ণনার ধারাবাহিকতায় সুরবালার পাতিব্রত্য নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে। সুরবালার এরূপ পাতিব্রত্যের উজ্জ্বল স্পর্শ কিরণমীয়কে কিছুটা বদলে দিল। উপেনের কাছে তার ফিরে আসা, অতঃপর আত্মসমর্পণ! কিন্তু উপেনের হৃদয়ে আর কিরণময়ী নেই। কিরণময়ীকে সে অপবিত্র, নাস্তিক, ‘ভাইপার’ বলেই জানে। এভাবেই এ চরিত্রটির উত্থান-পতন। শরৎচন্দ্র নিষ্ঠতার সঙ্গে চরিত্রটি তুলে এনেছেন সমকালীন সংস্কারাচ্ছন্ন সমাজের ভেতর থেকে। সমগ্র উপন্যাসে তার সরব বিচরণ ভিন্ন মাত্রায় উপস্থাপিত হয়েছে। বলা চলে, শরৎচন্দ্রের নারী চরিত্রের মধ্যে কিরণময়ী এক ব্যতিক্রমী নারী চরিত্র।

পাঁচ.
বস্তুত ‘চরিত্রহীন’ শরৎচন্দ্রের একটি কালজয়ী উপন্যাস। এখানে ছোট-বড় সব চরিত্র ঔপন্যাসিক নিষ্ঠতায় উপস্থাপন করেছেন। উপন্যাসের বৃহত্তর পরিবেশে সাবিত্রীর বিচরণ মার্জিত। শান্ত, স্থিতধী, কোমল, মানবিক ও পতিব্রতা নারী চরিত্র সাবিত্রী। এ উপন্যাসের নায়িকাও সে। কিরণময়ীর সম্পূর্ণ বিপরীত একটি নারী চরিত্র সে। শরৎচন্দ্রের নারীদের মধ্যে এ চরিত্রটি স্বল্প পরিসরে ব্যতিক্রমী চেতনায় উপস্থাপিত। অনেকটা ভারতীয় নারী চরিত্রের শাশ্বত রূপের প্রতীকী উপস্থাপন। সে অল্প বয়সেই বিধবা। তার পেছনেও কাহিনী রয়েছে। ভগ্নিপতির প্ররোচনায় পড়ে তার কলকাতায় আসা। এখানে জীবনের প্রয়োজনে একটি মেসে ঝিয়ের কাজ নেয়া যা সে নিপুণভাবে করতে পারার স্বীকৃতিও আদায় করতে পেরেছিল। ঔপন্যাসিক সে সনদ তাকে দিয়েছেন। এ জন্য তাকে মেসের ‘ঝি’ ও ‘গিন্নি’ বলে আপাত সম্মান দেখানোরও প্রয়াস পেয়েছেন। ওই মেসেরই উচ্ছৃঙ্খল ‘বোর্ডার’ সতীশ। সতীশকে এক পর্যায়ে ভালোবেসে ফেলে সাবিত্রী। সতীশ উশৃঙ্খল মদ্যপ। তা জেনেও সাবিত্রী তাকে ভালোবাসে। তাকে তেমন যোগ্য মর্যাদা দেয়নি সতীশ। এতে সাবিত্রীর কিছু যায় এসে না। সতীশের নিরুঙ্কুশ কল্যাণ কামনাই তার জীবনের একমাত্র ধ্যান। সে প্রেমে একনিষ্ঠ নারী। বিনিময় কিংবা কোনো প্রতিদানে সে বিশ্বাসী নয়। অনেকটা ওই রকমÑ ‘সে দিতে জানে, প্রতিদানে তার কোনো মোহ নেই। সতীশের কাছে তার চাওয়ারও কিছু নেই একমাত্র ভালোবাসা ছাড়া।’ সাবিত্রীর মধ্যে প্রেম ছিল। কিন্তু তা কুৎসিত কামনার দ্বারা পরিবৃত ছিল না। তার মধ্যেও কাম ছিল। তবে তা ছিল নিষ্কাম চেতনায় পরিপূর্ণ। সে যে বিধবা এ বিষয়টি কখনো ভুলে যায়নি। এরপরও শরৎচন্দ্র এ নারী চরিত্রে মানুষসত্তার পুরোটাই ঢেলে দিয়েছেন। এ জন্যই ওই নারী শতভাগ মানবিক। প্রেম, স্নেহ, মমতা, ভালোবাসা ও বোধ-বিবেচনায় সে ততোটাই অমায়িক। সতীশ যখন সাবিত্রীকে একান্তই পেতে চেয়েছে তখন তার প্রতি শ্রদ্ধায় নিজের অপবিত্র দেহ সতীশের কাছে সমর্পণ না করে নিজেকে সংযত করে দূরে থাকার চেষ্টা করেছে। বিচিত্র এই নারী চরিত্র! তার হৃদয়ের অন্তর্গত প্রেমের অনুভূতি অনুক্ত থেকেছে। এর ব্যঞ্জনা ব্যাপক এবং এরই সঙ্গে নারীর অন্তর্গত মনের প্রণয়, ইচ্ছা, রুচিশীল, নির্বাক ও নিষ্কাম চেতনায় শৈল্পিক বিভায় দ্যোতিত হয়ে উঠেছে। সাবিত্রীর প্রতি আমাদেরও শ্রদ্ধা ও সহানুভূতি জাগ্রত হয়। সাবিত্রী সমাজবিধির অনুশাসন ও সংস্কারের প্রতি সম্মান এবং আনুগত্য দেখিয়ে সতীশকে বলতে পেরেছেÑ ‘আমি বিধবা, আমি কুলত্যাগিণী, আমি সমাজে লাঞ্ছিতা, আমাকে বিয়ে করবার দুঃখ যে কতো বড় সে তুমি বোঝোনি বটে; কিন্তু যিনি আজন্ম শুদ্ধ, অতলস্পর্শী শোকের আগুন যাকে পুড়িয়ে হীরের মতো নির্মল করেছে, তিনি বুঝেছেন বলেই এই হতভাগিণীকে আশ্রয় দিতে সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছেন।’
দেহ অশুচি হলেও মন পবিত্র। সুতরাং সাবিত্রীর অপবিত্র দেহে পবিত্র প্রেমের মিনার জীবন বাস্তবতায় ততোটাই সমুজ্জ্বল ছিল। শরৎচন্দ্রের মানবিক প্রেমের যে তত্ত্ব এরই জ্বলন্ত উদাহরণ ওই সাবিত্রী। তাই নারীর শাশ্বত চিরপ্রেম কেবল ভোগে নয়, ত্যাগেই মহিমান্বিত হতে পারে। এরই এক উজ্জ্বল বিজ্ঞাপন উদ্ধৃত হয়েছে সাবিত্রীর চরিত্রে। ফলে তার অন্তরের গভীরে লালিত বিমূর্ত প্রেমের মূর্ত সম্পদ সতীশকে তুলে দিতে পেরেছে (আরেক নারী) সরোজিনীর হাতে। এ ত্যাগের করুণ বিজ্ঞাপন বিমূর্ত হলেও আমাদের অন্তর স্পর্শ করেছে নিঃসন্দেহে। এ ত্যাগের উজ্জ্বল বিভা শরৎচন্দ্রের নারী চরিত্রের অন্তর্গত রূপের একটি আলোকিত দিক। সাবিত্রীর এ ত্যাগ সত্যই তুলনাহীন।
বস্তুত শরৎ সাহিত্যে নারীর তুলনামূলক বিচারে সাবিত্রী কোমল ও মায়াবী। অথচ নিরীহ চরিত্র। এ ধৃতাত্মা নারী জেনে-শুনে প্রেমের এক অদৃশ্যমান কঠিন পথে যাত্রা শুরু করে অবশেষে নিজেই নিজেকে বঞ্চিত করে। দেহের অশুচিতা তার মন ও প্রেমের পবিত্রতাটি কোথাও কালিমা লিপ্ত করেনি। নিষ্কাম চেতনায় বিশ্বাসী সাবিত্রী যেন প্রেমের এক ব্রতচারী নারী। নীলিমা ইব্রাহিম যথার্থই বলেছেন, ‘শরৎচন্দ্রের নায়িকাদের মধ্যে সাবিত্রী সবার চেয়ে দুর্ভাগিনী। কারণ তার জীবনের শেষ সম্বল, তার সাধনালদ্ধ ধনকেও শরৎচন্দ্র কেড়ে নিয়েছেন।’
সাবিত্রী তার আজন্ম লালিত সংস্কার আবেগের শূন্যতায় ভেঙে দিতে চায়নি। তাই এ বঞ্চনার ভেতর নিজেকে এক অন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে যা কিরণময়ী পারেনি। তাই শরৎ সাহিত্যে নারী চরিত্র পর্যালোচনায় উঠে আসে ত্যাগ, নিষ্ঠা, সেবা ও কল্যাণের আরেক নাম সাবিত্রী।

ছয়.
বস্তুত বঙ্কিমচন্দ্র যেখানে জমিদার বা অভিজাত সম্প্রদায় থেকে প্রধান চরিত্রগুলো তুলে এনেছেন, রবীন্দ্রনাথ একই ধারায় সমকালীন সমাজের অভিজাত ও উচ্চবিত্ত সম্প্রদায়ের ভেতর তার চরিত্র খুঁজে বেড়িয়েছেন সেখানে শরৎচন্দ্র সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। তার চরিত্র অন্বেষণ করেছেন সমকালীন মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত সম্প্রদায়ের ভেতর। আর সেসব মানুষকেই নিষ্ঠুরতার সঙ্গে তুলে এনে ঠাঁই দিয়েছেন সাহিত্যের পাতায়। শরৎ সাহিত্যেই প্রথম আমরা দেখতে পাই মানুষের জীবনগাথা। শরৎচন্দ্রের আগে এমন জীবন চিত্রণ কারো লেখায় খুঁজে পাওয়া যায় না। এখানেও মৌলিক কারণের যে সম্পর্ক তা ব্যক্তি বিশেষে নিজ নিজ অবস্থান অনুযায়ী পরিষ্কার। বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্রের ব্যক্তিমানস এবং শ্রেণীগত অবস্থানও ভিন্ন। বঙ্কিম ও রবীন্দ্রনাথ অভিজাত সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। নিম্নবিত্ত সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করেছেন শরৎচন্দ্র। সুতরাং তাদের প্রত্যেকেরই চরিত্র নির্বাচনে ভিন্নতা থাকাই স্বাভাবিক। শরৎচন্দ্র গ্রামীণ মধ্যবিত্ত সমাজ থেকে উঠে এসেছেন। তাই তার মানসিকতা ওই শ্রেণীরই অনুকূলে কাজ করেছে। এই জীবন বাস্তবতার মৌলিক উৎস সন্ধানে শরৎচন্দ্র ওই শ্রেণীর মানুষকে তুলে এনে সাহিত্যে নীরিক্ষণ করার চেষ্টা করেছেন। ফলে তার সাহিত্যে নিম্ন-মধ্যবিত্ত সমাজের স্তর থেকে তুলে আনা মানুষের সুখ-দুঃখ, ব্যথা-বেদনার জীবনচিত্র বিজ্ঞাপিত হয়েছে। বস্তুত এরই ধারাবাহিকতায় শরৎচন্দ্র তার আপন শ্রেণী চরিত্র ও সম্প্রদায়গত মানসিকতাটি অন্য উচ্চতায় মেলে ধরার প্রয়াস পেয়েছেন নিজের সব রচনায়। এ কারণেই শরৎ সাহিত্যে তার আঁকা চরিত্রগুলো হয় মধ্যবিত্ত অথবা নিম্নবিত্ত থেকে উঠে আসা। শরৎ সাহিত্যে নারী চরিত্রগুলো যথাক্রমে বিরাজ (বিরাজ বৌ), মাধবী (বড় দিদি), জ্ঞানদা (অরক্ষণীয়া), রমা-জেঠাইমা (পল্লীসমাজ), অন্নদা দিদি-রাজলক্ষ্মী-অভয়া-সুনন্দা-কমল লতা (শ্রীকান্ত), বিজয়া (দত্তা), সুরবালা-সরোজিনী-সাবিত্রী-কিরণময়ী (চরিত্রহীন), অচলা (গৃহদাহ), ভারতী-সুমিত্রা (পথের দাবি), ষোড়শী (দেনা-পাওনা), কমল (শেষ প্রশ্ন), বন্দনা (বিপ্রদাস)। এসব দ্যোতিত চরিত্র মধ্যবিত্ত সমাজ থেকেই শরৎ সাহিত্যে উঠে এসেছে। এ ধারায় সমকালীন সামাজিক সংস্কার রীতি-নীতির মানদ-ে শরৎ সাহিত্যে নারী সমধিক শিল্পসফল চিত্রণ।
এ ধারায় শরৎচন্দ্রের ‘চরিত্রহীন’ সম্পর্কে সমালোচক কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রাজ্ঞ পর্যবেক্ষণÑ ‘বঙ্গ উপন্যাস সাহিত্যের একটি শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ। ইহার পাতায় পাতায় জীবন সমস্যার যে আলোচনা, যে গভীর অভিজ্ঞতা, যে স্নিগ্ধ উদার সহানুভূতি ছড়ানো রহিয়াছে, তাহা আমাদের নৈতিক ও সাময়িক বিচার-বুদ্ধির একটা চিরন্তন পরিবর্তন সাধন করে।’

 

মডেলঃ আফিফা, অথৈ, সারাকা, মনিষা
পোশাকঃ রাকিব’স আর রাফিউর
স্টাইলিংঃ মোঃ রাকিব খান
মেকওভারঃ ক্লিওপেট্রা বিউটি স্যালন
ছবিঃ অনিক রহমান, অনিক ইসলাম

তিনিই আমাদের শক্তি তিনিই আমাদের প্রেরণা

আবেদ খান  

 

বঙ্গবন্ধু ও তার স্বপ্নকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য তৎপর অপশক্তি। ধর্মান্ধতা, সংকীর্ণতা, হিংসা ও ক্ষুদ্রতা আমাদের অস্তিত্বটি ধ্বংস করতে উদ্যত। এই অবস্থায় আমাদের সবাইকে, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ও আদর্শের প্রত্যেক সৈনিককে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী প্রত্যেককে আজ ঐক্যবদ্ধ হয়ে রুখে দাঁড়ানোর শপথ নিতে হবে। নিজেদের ভেতরকার অবিশ্বাসের সব প্রাচীর গুঁড়িয়ে দিয়ে এক লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

 

ইতিহাসের একটি বিচিত্র চিত্র খুব লক্ষ্য করার মতো। রাষ্ট্র বা জাতির নির্মাণে যারা মূল ভূমিকা পালন করে অবিস্মরণীয় নায়ক হয়েছেন, তাদের অধিকাংশেরই অপ্রত্যাশিত ও অনাকাক্সিক্ষত মূল্য দিতে হয়েছে। ধরা যাক উপমহাদেশের মহাত্মা গান্ধীর কথা। তিনি ভারতের জাতির জনক। কিন্তু স্বাধীনতার পর স্বাধীন ভারতে মাত্র এক বছরের মতো বাঁচতে পেরেছিলেন। উগ্রবাদী ঘাতকের নিষ্ঠুর বুলেট তার বক্ষ বিদীর্ণ করেছিল। ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতার প্রধান রূপকার আহমেদ সুকর্ণের অন্তিম সময়ের সুদীর্ঘ অংশ কেটেছে নিঃসঙ্গ অবস্থায় কারাগারে। শ্রীলংকার স্বাধীনতার মূল নায়ক বন্দরনায়েক ঘাতকের হাতে প্রাণ দিয়েছিলেন। ফরাসি শাসনের নাগপাশ ছিন্ন করে আলজেরিয়ার যে মহান পুরুষ সেখানকার জনগণকে স্বাধীনতার স্বাদ দিয়েছিলেন, সেই আহমেদ বেন বেল্লাকেও কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে শেষ দিনগুলো কাটাতে হয়েছে। ইতিহাসের বাঁক নির্মাণে ভূমিকা রাখার পরিণতিতে ঘাতকের হাতে প্রাণ গিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন, জন ফিটজেরাল্ড কেনেডি ও কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের মুক্তির প্রতীক মার্টিন লুথার কিংয়ের। কৃষ্ণ আফ্রিকার প্রথম সূর্যোদয়ের প্রতীক হিসেবে পরিগণিত প্যাট্রিস লুমুম্বাকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল মোশে শোম্বে-কাসাভুবু চক্র। কিউবা বিপ্লবের অন্যতম রূপকার চে গুয়েভারাকে প্রাণ দিতে হয়েছিল বলিভিয়ার জঙ্গলে। চিলির আলেন্দের এভাবে নিঃশেষে প্রাণদানের আরেক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত।

এ ধরনের হত্যাযজ্ঞের সবচেয়ে নির্মম দৃষ্টান্ত সৃষ্টি হয়েছে বাংলাদেশে। বাঙালি জাতিসত্তার প্রথম সফল রূপকার জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যার মাধ্যমে ওই বিচিত্র চিত্রটি ইতিহাসের কাছে ধরা দেয়। কেন এ ধরনের ঘটনা ঘটে এটা যদি বিশ্লেষণ করা হয় তাহলে দেখা যাবে তারা প্রত্যেকেই প্রচলিত স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে লড়াই করে নিজের প্রাণের বিনিময়ে সত্যের প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আরো গভীরভাবে লক্ষ্য করলে এটা বুঝতে কষ্ট হবে না, তারা প্রত্যেকেই শৃঙ্খলিত মানবতার মুক্তির প্রয়োজনে নিজ নিজ ভূমিতে দাঁড়িয়ে সংগ্রাম করেছেন যা কায়েমি স্বার্থবাদী মহলকে ক্রুদ্ধ ও ক্ষুব্ধ করেছে। ফলে তারা সময় ও সুযোগ বুঝে তাদের প্রতিহিংসা চরিতার্থ করেছে।

মানব জাতির এ লড়াই শুধু আজকের নয়Ñ সব সময়ের, সব কালের। ইতিহাসের আদি পর্ব থেকে এর সূচনা। স্পার্টাকাস ক্রুশবিদ্ধ হয়ে কালের পাতায় মহাবিদ্রোহের যে সাক্ষ্য রেখেছিলেনÑ মঙ্গল পান্ডে ও সূর্য সেনের পদচিহ্ন অনুসরণ করে তা এসে পৌঁছেছে এই গাঙ্গেয় বদ্বীপে। আর সেখানেই যার হাতে ধরে ঘটলো একটি বিশাল জাতিগোষ্ঠীর অভ্যুদয় তার নাম শেখ মুজিবুর রহমান। ফরিদপুরের এক প্রত্যন্ত গ্রামের অবস্থাপন্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান তিনি।

আজ ভাবতে অবাক লাগে, ওই অসাধারণ মানুষটি কীভাবে তিল তিল করে নিজেকে তৈরি করেছিলেন! শেখ মুজিবÑ টুঙ্গিপাড়ার সেই কৃশকায় তরুণটি কখনো কোনো বিশাল প্রাপ্তির জন্য তার পথপরিক্রমা নির্ণয় করেননি। প্রথম যে বিশ্বাস তার আত্মাকে বশীভূত করেছিল তা হচ্ছে মানবতা। ওই মানবতাই তাকে ধীরে ধীরে নিয়ে গেছে অমরাবতীর দিকে। এ মানবতাই তাকে চিনিয়েছে ন্যায়, সত্য ও অধিকারের জন্য বিরামহীন সংগ্রামের
মহাসড়কটিকে। আর ওই পথে তিনি হেঁটেছেন নিঃশঙ্কচিত্তে। অতৃপ্ত প্রতœতাত্ত্বিকের মতো মহাকালের গর্ভ থেকে টেনে এনেছেন ধূলিধূসরিত একটি বিস্মৃতপ্রায় জাতিসত্তার অস্তিত্ব। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, বিপরীত স্রোতের বিরুদ্ধে লড়াই করেই মহামানব ইতিহাসের সন্তানে পরিণত হন। তার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ছিল না। প্রতিকূল পরিস্থিতি, যুদ্ধ, ক্ষুদ্রতা, ধর্মীয় সংকীর্ণতা, জাত্যাভিমানÑ সবকিছুর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ওই মানুষটি দিনের পর দিন লড়াই করেছেন। ব্যক্তিস্বার্থ তাকে স্পর্শ করেনি। হিংসা কিংবা লোভ তাকে পরাস্ত করেনি কখনো। যেদিন থেকে তিনি রাজনৈতিক চেতনা ধারণ করলেন অন্তরে সেদিন থেকেই ভেবেছিলেন, বাঙালি জাতির আত্মপরিচয়ের সূত্রটি খুঁজে বের করতেই হবে। এই জাতিসত্তা প্রতিষ্ঠা করতে হবে ইতিহাসের পাতায়। এ জন্য প্রয়োজন একটি ভৌগোলিক ভূখ-ের। বাঙালির জন্য, বাঙালির পৃথক রাষ্ট্র ব্যবস্থার জন্য তার মতো এতো গভীরভাবে অনুভব আর কেউ করেননি। শুধু অনুভবই নয়, নিজের অন্তরের আহ্বানটি বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য এক বিশাল সংগ্রামের রূপরেখা প্রণয়ন করেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। এ জন্য কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন বার বার। মুখোমুখি হয়েছেন মৃত্যুর। কিন্তু আদর্শের প্রশ্নে, সংগ্রামের প্রশ্নে, মানবতার মুক্তির প্রশ্নে ন্যূনতম আপস করেননি। এভাবেই টুঙ্গিপাড়ার সেই শেখ মুজিব ক্রমান্বয়ে মুজিব ভাই, বঙ্গবন্ধু, বাঙালি জাতির জনক, স্বাধীন বাংলাদেশের স্রষ্টা হিসেবে ইতিহাসের অংশ হয়েছেন। প্রতিপক্ষ তার পিছু ছাড়েনি। কখনো প্রকাশ্যে, কখনো অপ্রকাশ্যেÑ প্রতি মুহূর্তে তাকে বিব্রত করেছে, আক্রান্ত করেছে, ব্যথিত করেছে। তবে কখনো পরাস্ত কিংবা বিধ্বস্ত করতে পারেনি। তাই রাতের অন্ধকারে মুখ লুকিয়ে নৃশংস আততায়ী তাকে সপরিবারে হত্যা করেছে। তারা বোঝেনি অমৃতের সন্তানকে কখনো বধ করা যায় না।

পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্টে মানবেতিহাসের অন্যতম নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ বঙ্গবন্ধুকে তার প্রিয় বাংলাদেশ কিংবা বাঙালি থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি এখনো। বরং দিনে দিনে তিনি বিশাল থেকে বিশালতর হয়ে বিশ্বমানবতার পথপদর্শক হয়েছেন। তাই প্রতিটি ১৫ আগস্ট এ জাতির কাছে সত্য ও ন্যায়ের পথে চলার, আদর্শ এবং যুক্তির পথে চলার, লড়াই ও মুক্তির পথে চলার বাতিঘর হিসেবে সবাইকে শক্তি দেয়, সাহস দেয়, প্রেরণা দেয়। আজ বাংলাদেশ এক কঠিন বাস্তবতা ও বিপর্যয়ের মুখোমুখি। নাগিনীদের বিষাক্ত নিশ্বাসে নিঃশেষিতপ্রায় শুভশক্তি। ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তৃত চারদিকে। বঙ্গবন্ধু ও তার স্বপ্নকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য তৎপর অপশক্তি। ধর্মান্ধতা, সংকীর্ণতা, হিংসা ও ক্ষুদ্রতা আমাদের অস্তিত্বটি ধ্বংস করতে উদ্যত। এই অবস্থায় আমাদের সবাইকে, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ও আদর্শের প্রত্যেক সৈনিককে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী প্রত্যেককে আজ ঐক্যবদ্ধ হয়ে রুখে দাঁড়ানোর শপথ নিতে হবে। নিজেদের ভেতরকার অবিশ্বাসের সব প্রাচীর গুঁড়িয়ে দিয়ে এক লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ আমাদের শক্তি, তার পদচিহ্ন অনুসরণেই আমাদের মুক্তি, তার স্বপ্নই আমাদের প্রেরণা।

বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রচিন্তা 

-যতীন সরকার

 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ছিলেন? রাষ্ট্রতত্ত্বের ক্ষেত্রে কোনো মৌলিক অবদানের জন্য কি তিনি দেশ-বিদেশে নন্দিত হয়েছেন? কিংবা মৌলিক কোনো তত্ত্ব দিতে না পারলেও এ যাবৎকালের রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের নানান তত্ত্বের সংশ্লেষণ ঘটিয়ে এ বিজ্ঞানের প্রয়োগিক দিকটিকে সমৃদ্ধ করেছেন?
সব প্রশ্নেরই উত্তর হবে ‘না’। অথচ শেখ মুজিবুর রহমান নামের মানুষটি আবাল্য রাষ্ট্র ও রাজনীতি নিয়েই ভাবনাচিন্তা করেছেন। শুধু অলস ভাবনাচিন্তা নয়, প্রচ- সক্রিয়তা নিয়ে নিজের সমগ্র সত্তাকে দেশের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করে দিয়েছেন। সেই রাজনীতি নিয়ে গেছে ত্যাগের পথে, দুঃখ বরণের পথে। দুঃখ তাকে বিচলিত করতে পারেনি, দেশের দুঃখ বরণের ব্রত তার নিজের দুঃখকে তুচ্ছ করে দিয়েছে। রাজনৈতিক সংগ্রাম করে করেই তাঁর দেশকে তিনি
স্বাধীনতার উপল উপকূলে পৌঁছিয়ে দিয়েছেন, একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের স্থপতি হয়েছেন এবং সেই স্বাধীন রাষ্ট্রটিকে আধুনিক ও প্রগতিশীল করে তোলার নীতিমালা প্রণয়ন করেছেন, সে নীতিমালাকে বাস্তবে রূপায়িত করার জন্য নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে করতেই আত্মবিসর্জন দিয়েছেন।
এই যে একটি নতুন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা দান এবং রাষ্ট্রটির জন্য নীতিমালা ও তার প্রয়োগ পদ্ধতি নির্ধারণ, এর পেছনে ক্রিয়াশীল ছিল তার যে রাষ্ট্রচিন্তা সেটির উৎস কী?
এক কথায় এর দ্ব্যর্থহীন জবাব ‘স্বদেশপ্রেম’। মুজিবের ছিল খাঁটি, নির্ভেজাল, নিরঙ্কুশ ও আপসহীন স্বদেশপ্রেম। সেই স্বদেশপ্রেম থেকেই তার রাষ্ট্রচিন্তার উন্মেষ ও বিকাশ ঘটেছে। বইয়ের পাতা থেকে তিনি আহরণ করতে যাননি কিংবা একান্ত মৌলিক বা অভিনব কোনো রাষ্ট্রচিন্তা দিয়ে পৃথিবীকে হকচকিয়ে দিতেও চাননি।
“মুজিব মৌলিক চিন্তার অধিকারী বলে ভান করেন না। তিনি রাজনীতির কবি, প্রকৌশলী নন। শিল্পকৌশলের প্রতি উৎসাহের পরিবর্তে শিল্পকলার প্রতি ঝোঁক বাঙালিদের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক। কাজেই সব শ্রেণি ও আদর্শের অনুসারীদের একতাবদ্ধ করার জন্য তার ‘স্টাইল’ (পদ্ধতি) সবচেয়ে বেশি উপযোগী ছিল।’’ Mujib does not pretend to be an original thinker. He is a poet of politics not an engineer. but the Bengalis temd to be more artistic than technical, any how, and this style may be just what was needed to unite all the classes and ideologies of the region) ১৯৭১ সালের ৫ এপ্রিল News Week পত্রিকায় সংবাদ ভাষ্যকারের এই মন্তব্য মুজিবের রাষ্ট্রচিন্তার স্বরূপটিকে সঠিকভাবেই অনাবৃত করেছে বলা যেতে পারে।
স্বদেশপ্রেম একটি মহৎ আবেগের নাম। আবেগহীন মানুষ স্বদেশপ্রেমিক হতে পারে না। শেখ মুজিবের সেই আবেগ প্রচুর ও প্রবলই ছিল। কিন্তু আবেগের তোড়ে ভেসে গিয়ে শুধু স্বদেশপ্রেম কেন, কোনো প্রেমেরই সফল ও কাক্সিক্ষত পরিণতি দেয়া যায় না। আবেগের ওপর কা-জ্ঞানের নিয়ন্ত্রণ চাই। শেখ মুজিবের ছিল সেই সবল কা-জ্ঞান। কা-জ্ঞান নিয়ন্ত্রিত স্বদেশপ্রেমই মুজিবের রাষ্ট্রচিন্তাকে ধাপে ধাপে পরিপক্ব করে তুলেছে। তাকে বঙ্গবন্ধু বানিয়েছে।
স্বদেশপ্রেমের আবেগেই শেখ মুজিব প্রথম যৌবনে পাকিস্তান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গেই তার সবল কা-জ্ঞানের বলে পাকিস্তানের প্রতারণাটি তিনি ধরে ফেলতে পেরেছিলেন। স্বদেশপ্রেম মানে তো স্বদেশের মাটি, মানুষ, ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্যÑ সবকিছুর প্রতিই প্রেম। সেসবের প্রতি সংগ্রাম ও তন্বিষ্ঠ দৃষ্টিপাতেই তিনি উপলদ্ধি করে ফেললেন যে, পাকিস্তানের মতো একটি অদ্ভুত ও কৃত্রিম রাষ্ট্রের থাবা থেকে মুক্ত করতে না পারলে তার স্বদেশের মুক্তিলাভ ঘটবে না। ১৯৪৮ সালে যখন বাঙালির ভাষার ওপর আঘাত এলো তখন থেকেই বিষয়টি তার চেতনাকে আলোড়িত করতে শুরু করেছিল। হাজার মাইলের ব্যবধানে অবস্থিত পাকিস্তান রাষ্ট্রটির পূর্ব-
পশ্চিমের মধ্যে বৈষম্যের পাহাড় গড়ে বাংলাকে কার্যত উপনিবেশে পরিনত করে ফেলা, ১৯৫৮ সালের সামরিক স্বৈরাচারের রাষ্ট্রীয় মঞ্চে অবতরণÑ এসব কিছু দেখে-শুনে শেখ মুজিব বাঙালির স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকেই তার রাজনৈতিক সংগ্রামের লক্ষ্যবিন্দুরূপে নির্ধারিত করে ফেলেছিলেন। তার সেই লক্ষ্যের কথাটি বোধহয় সর্বপ্রথম স্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করেছিলেন ১৯৬১ সালের নভেম্বর। অবশ্য একটি গোপন বৈঠকে। বৈঠকটি ছিল সে সময়কার গোপন কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে। আইয়ুবের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের নীতি ও কর্মপদ্ধতি স্থির করার লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত সেই বৈঠকে
কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষে উপস্থিত ছিলেন মণি সিংহ ও খোকা রায় এবং আওয়ামী লীগের পক্ষে শেখ মুজিবুর রহমান ও তফাজ্জল হোসেন মানিক মিঞা। কমরেড খোকা রায় ‘সামরিক শাসন প্রত্যাহার ও রাজবন্দিদের মুক্তিসহ মোট ৪টি জনপ্রিয় দাবির ভিত্তিতে আন্দোলন গড়ে’ তোলার অভিমত ব্যক্ত করলে শেখ মুজিব বলেন, ‘এসব দাবি-দাওয়া কর্মসূচিতে রাখুন, কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু একটা কথা আমি খোলাখুলি বলতে চাই। আমার বিশ্বাস গণতন্ত্র, স্বায়ত্তশাসনÑ এসব কোনো দাবিই পাঞ্জাবিরা মানবে না। কাজেই স্বাধীনতা ছাড়া বাঙালির মুক্তি নেই। স্বাধীনতার দাবিটা আন্দোলনের কর্মসূটিতে রাখা দরকার।’
কমিউনিস্ট পার্টি নীতিগতভাবে স্বাধীনতার প্রস্তাব সমর্থন করলেও তাদের মতে তখনো সে রকম দাবি উত্থাপনের সময় হয়নি। অনেক তর্ক-বিতর্কের পর শেখ মুজিব কমিউনিস্টদের বক্তব্যের সারবত্তা মেনে নেন। ভেতরে ভেতরে তিনি সেই চূড়ান্ত লক্ষ্যের দিকে অগ্রসর হওয়ারই প্রস্তুতি নিতে থাকেন। এরই প্রমাণ পাই ছেষট্টির ছয় দফা ঘোষণায়, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে ও একাত্তরের সেই দুনিয়া কাঁপানো দিন-মাসগুলোয় এবং ষোলোই ডিসেম্বর যুদ্ধজয়ের মধ্য দিয়ে স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায়।
বাংলাদেশই হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র ভাষাভিত্তিক জাতিরাষ্ট্র। বাঙালির এই স্বাধীন রাষ্ট্রটিকে কেন্দ্র করেই এর স্থপতি বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রচিন্তার বহুমুখী উৎসারণ ঘটতে থাকে। ভাষার দাবি প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে জাতির স্বাধীনতা আন্দোলনের সূচনা সেই বাঙালির জাতিরাষ্ট্রটির প্রকৃত মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য বাংলাকে শুধু রাষ্ট্রভাষাই করা হলো না, বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রচিন্তার একটি প্রতীকী প্রকাশ ঘটলো। বাংলা ভাষাকে দিয়ে বলতে পারি, বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘেও বাংলা ভাষাতেই ভাষণ দান করলেন। এর ভেতর দিয়ে বলতে পারি, বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রচিন্তার একটি প্রতীকী প্রকাশ ঘটলো। বাংলা ভাষাকে বাংলা ভাষার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা বাঙালি জাতি এবং বাংলার মানুষের আবহমান সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে দৃঢ়ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠাদানই ছিল বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রচিন্তার মূল লক্ষ্য। সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্যই তিনি তার নিজের মতো করে পথের সন্ধানে ব্রতী হন। এক্ষেত্রেও তার গভীর স্বদেশপ্রেম ও তীক্ষè কা-জ্ঞানই এবং অবিস্মরণীয় ভাষণটি শেষ করেছিলেন যে বাক্যটি দিয়ে সেটি ছিল ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। ৯ মাসে
স্বাধীনতার সংগ্রাম শেষ হয়েছিল অবশ্যই। কিন্তু মুক্তির সংগ্রাম তো এতো সহজে শেষ হওয়ার নয়। মুক্তির সংগ্রাম একটি স্থায়ী, দীর্ঘ ও নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া। সেই প্রক্রিয়ার অপরিহার্য অংশরূপেই বঙ্গবন্ধুর প্রবর্তনায় বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সংবিধানটি রচিত হয় এবং এতে সংযোজিত হয় জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র এ চারটি মৌলনীতি। এ নীতিগুলোর একটিও নিশ্চয়ই বঙ্গবন্ধুর মৌলিক উদ্ভাবন নয়। তবুও এর প্রতিটি সম্পর্কেই ছিল তার নিজস্ব অভিজ্ঞতা-সজ্ঞাত মৌলিক ভাবনা ও প্রয়োগ পদ্ধতি।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কোনো বই লেখেননি, তাই তার রাষ্ট্রচিন্তা তথা জীবনভাবনার স্বরূপ অন্বেষায় বিভিন্নজনের কাছে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত তার অভিমত, তার সম্পর্কে বিভিন্নজনের স্মৃতিচারণ, তার নেতৃত্বাধীন বা প্রভাবাধীন সংগঠনগুলোর ঘোষনাপত্রÑ এ রকম বিচিত্রবিধ উৎসের শরণাপন্ন হতে হয়। ওই সূত্রেই এখানে ‘মুজিববাদ’-এর লেখক খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াসের সাক্ষ্য থেকে আমরা বঙ্গবন্ধুর সম্পর্কে মোটা দাগের কিছু ধারণা পেয়ে যেতে পারি।

১৯৭২ সালেই খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াসের ‘কতিপয় প্রশ্নের জবাবে’ নিজের চিন্তা সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ছাত্র জীবন থেকে আজ পর্যন্ত আমার এই সুদীর্ঘকালের রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা ও সংগ্রাম কতিপয় চিন্তাধারার ওপর গড়ে উঠেছে। এ দেশের কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী তথা সকল মেহনতী মানুষের জীবনে শান্তি, সমৃদ্ধি ও সাম্য প্রতিষ্ঠাই আমার চিন্তাধারার মূল বিষয়বস্তু। একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে আমার জন্ম। কাজেই কৃষকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থেকে আমি জানি শোষণ কাকে বলে। এ দেশে যুগ যুগ ধরে শোষিত হয়েছে বুদ্ধিজীবীসহ সকল মেহনতী মানুষ। শোষণ চলে ফড়িয়া ব্যবসায়ী ও পুঁজিবাদের। শোষণ চলে সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ ও নয়া-উপনিবেশবাদের। এ দেশের সোনার মানুষ, এ দেশের মাটির মানুষ শোষণে শোষণে একবারে দিশাহারা হয়ে পড়ে। কিন্তু তাদের মুক্তির পথ কী? এই প্রশ্ন আমাকেও দিশাহারা করে ফেলে। পরে আমি পথের সন্ধান পাই। আমার কোনো কোনো সহযোগী রাজনৈতিক দল ও প্রগতিশীল বন্ধুবান্ধব বলেন শ্রেণীসংগ্রামের কথা। কিন্তু জাতীয়তাবাদের জবাবে আমি বলি, যার যার ধর্ম তার তারÑ এরই ভিত্তিতে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের কথা। শোষণহীন সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় সমাজতন্ত্র চাই। কিন্তু রক্তপাত ঘটিয়ে নয়Ñ গণতান্ত্রিক পন্থায়, সংসদীয় বিধি-বিধানের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠা করতে চাই সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা। আমার এ মতবাদ বাংলাদেশের বাস্তব অবস্থা ও ঐতিহাসিক পরিস্থিতি বিচার-বিশ্লেষণ করেই দাঁড় করিয়েছি। সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন, যুগোস্লাভিয়া প্রত্যেকে নিজ নিজ পথে, নিজ নিজ অবস্থা মোতবেক গড়ে তুলেছে সমাজতন্ত্র। আমি মনে করি, বাংলাদেশকেও অগ্রসর হতে হবে জাতীয়বাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রÑ এ চারটি মূল সূত্র ধরে, বাংলাদেশের নিজস্ব পথ ধরে। স্বাধীনতার অব্যবহিত পর থেকে বেশ কিছুদিন বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রচিন্তা এ রকমই ছিল। কিন্তু অচিরেই তিনি তার চিন্তায় মূলগত পরিবর্তন না ঘটিয়েই এর কিছুটা পুনর্বিন্যাস করতে বাধ্য হলেন। দেশের অভ্যন্তরের চরম বিশৃঙ্খল অবস্থা ও সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রটির রিরুদ্ধে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রই বঙ্গবন্ধুকে অন্যভাবে ভাবতে বাধ্য করেছিল। সাম্রাজ্যবাদের অভিসন্ধি ও কার্যকলাপ সম্পর্কে তিনি এ সময়ে আরো গভীরভাবে সচেতন হয়ে ওঠেন। পৃথিবীটি যে শোষক ও শোষিতÑ এই দু’ভাগে ভাগ হয়ে গেছে, এ বিষয়টি স্পষ্ট উপলদ্ধি করেন এবং দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা দেন, ‘আমি শোষিতের পক্ষে।’ এই উপলব্ধিজাত ঘোষণাকে নিজের দেশের বাস্তবে রূপায়িত করে তোলার জন্যই তিনি পূর্ব ঘোষিত ‘সংসদীয় বিধি-বিধান’-এর ‘গণতান্ত্রিক পন্থা’ অন্তত সাময়িকভাবে হলেও পরিহার করেন। অবশ্য ১৯৭২ সালে প্রণীত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানটিও ব্রিটিশ ধাঁচের সংসদীয় বিধি-বিধানের গোঁড়া অনুসৃতি ছিল না। সেটিতেও গণতন্ত্রকে কণ্টককমুক্ত করা ও ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক
জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠার স্বার্থেই ধর্মনিরপেক্ষতা বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির অধিকার খর্ব করা হয়েছিল। পাকিস্তানি সাম্প্রদায়িক ভাবধারার পুনরুত্থানকে রোখার জন্যই ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা
হয়েছিল। কিন্তু এতেও খুব একটা কাজ হয়নি, বরং সাংবিধানিক নিষেধ-বিধিকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়েই পাকিস্তানপন্থী সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলো বাংলাদেশের স্বাধীনতার মর্মমূলে আঘাত হেনে যাচ্ছিল এবং এ কাজে বিভ্রান্ত বামদেরর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতা পেয়ে গিয়েছিল। এ রকম অবাঞ্ছিত, বিব্রতকর পরিস্থিতিতেই বঙ্গবন্ধু গণতন্ত্রের
প্রয়োগরীতিতে এক নতুন মাত্রার সংযোজন ঘটালেন এবং এর নাম দিলেন ‘শোষিতের গণতন্ত্র’। এ ব্যবস্থায় সংসদীয় ও মন্ত্রিসভা শাসিত গণতান্ত্রিক কাঠামোর স্থলে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার এলো, বহু দলের বদলে একদলীয় পদ্ধতি প্রবর্তিত হলো এবং এ রকম আরো বিধি-বিধান জারি করা হলো যেগুলোর সঙ্গে গণতন্ত্র সম্পর্কে আমাদের এতো দিনকার অভ্যস্ত ধারণা খাপ খায় না। তবে ষাটের দশক থেকে তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশে সা¤্রাজ্যবাদ বিরোধী রাষ্ট্রনায়কদের নেতৃত্বে প্রায় অনুরূপ শাসন ও রাষ্ট্রনীতি চালু হয়ে গিয়েছিল। এর প্রতি দৃঢ় ও সক্রিয় সমর্থন ছিল সে সময়কার সোভিয়েত নেতৃত্বাধীন সমাজতান্ত্রিক শিবিরের। এ ধরনের শাসন প্রণালির নাম দেয়া হয়েছিল ‘জাতীয় গণতন্ত্র’। অর্থনৈতিক বিচারে এটিকে বলা হতো ‘অপুঁজিবাদী বিকাশের পথ’ অর্থাৎ গণতন্ত্রকে এড়িয়ে সমাজতন্ত্রকে বিনির্মাণের পদ্ধতি।
জাতীয় গণতন্ত্র ও অপুঁজিবাদী বিকাশের তত্ত্ব-প্রচারকরূপে উইলিয়ান্ভস্তি তখন বিশেষ খ্যাতিমান হয়ে উঠেছিলেন। উইলিয়ামন্ভস্কি প্রচারিত তত্ত্বের-কিংবা মিসর ও তানজানিয়াসহ তৃতীয় বিশ্বেও কিছু কিছু দেশের শাসন-প্রণালির সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ‘শোসিতের গণতন্ত্র ও ‘দ্বিতীয় বিপ্লব’-এর কর্মসূচির কিছু কিছু সাযুজ্য থাকলেও, মর্মবস্তু ও বহিরঙ্গ উভয় দিক থেকেই এর প্রকৃতি অনেক পরিমাণে স্পষ্ট স্বতন্ত্র্যম-িত।
‘জাতীয় গণতন্ত্র’ নামে পরিচিত অনেকগুলো রাষ্ট্রের মতো বঙ্গবন্ধুও সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীতে একদলীয় শাসনের বিধান সংযোজিত করেছিলেন বটে, কিন্তু তাঁর নিজেরই এতে পুরোপুরি সায় ছিল বলে মনে হয় না। শামসুজ্জামান খান ১৯৭৫ সালের জুন মাসে ‘বঙ্গবন্ধু সঙ্গে আলাপ’-এর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জানিয়েছেন যে সে-সময়ে তাঁর ও প্রফেসর কবীর চৌধুরীর কাছে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন,
“...ভাগ্যের কি নিষ্ঠুর পরিহাস, সারাজীবন গণতন্ত্রেও জন্য আন্দোলন করলাম, কত জেল খাটলাম আর এখন এক পার্টি করতে যাচ্ছি।...আমি এটা চাইনি। বাধ্য হয়ে করতে হচ্ছে। ...অন্য কোনো পথ খোলা না দেখে আমি স্বাধীনতার পক্ষের লোকদের নিয়ে সমমনাদের একটি রাজনৈতিক মঞ্চ হিসাবে বাকশাল গঠন করছি। আমি সমাজতন্ত্র-বিরোধী ধর্মনিরপেক্ষতা-বিরোধী এবং সর্বোপরি মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী কোনো দল বা ব্যক্তিকে বাকশালে নিব না।...আমার ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার জন্য নয়, দেশকে বাঁচানোর জন্য এই পদক্ষেপ। আমি ক্ষমতা অনেক পেয়েছি, এমন আর কেউ পায় নাই। সে-ক্ষমতা হলো জনগণের ভালোবাসা ও নজিরবিহীন সমর্থন।...আমার এই একদলীয় ব্যবস্থা হবে সাময়িক। দেশটাকে প্রতিবিপ্লবের হাত থেকে রক্ষা করে আমি আবার গণতন্ত্রে ফিরে যাব। বহু দলীয় গণতন্ত্রে ফিরে যাব। তবে চেষ্টা করব আমার গণতন্ত্র যেন শোষকের গণতন্ত্র না হয়। আমার দুঃখী মানুষ যেন গণতন্ত্রেও স্বাদ পায়।”
বঙ্গবন্ধু সত্যি সত্যিই আবার বহুদলীয় গণতন্ত্রে ফিরে যেতেন কি না, সে নিয়ে অলস জল্পনা-কল্পনা করা আর একেবারেই অর্থহীন। তবে, সন্দেহ নেই, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ঘটিয়ে তিনি সমগ্র জনগণের জন্য গণতন্ত্রকে অর্থপূর্ণ করে তুলতে চেয়েছিলেন। বিচার-ব্যবস্থার এমন সংস্কারের পরিকল্পনা করেছিলেন যাতে জনগণ অতি সহজে দ্রুত ন্যায়বিচার পেতে পারে। তাঁর নিজের ভাষায়Ñ“ইডেন বিল্ডিং বা গণভবনের মধ্যে আমি শাসনতান্ত্রিক ক্ষমতা ধরে রাখতে চাইনে। আমি আস্তে আস্তে গ্রামে ইউনিয়নে থানায় জিলা পর্যায়ে এটা পৌঁছে দিতে চাই যাতে জনগণ তাদের সুবিধা পায়।”
‘শোষিতের গণতন্ত্র’ বাস্তাবায়নে বঙ্গবন্ধুর চার দফা কর্মসূচির দিকে তাকালেই তাঁর রাষ্ট্রচিন্তার মর্মকথাটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেগুলো হচ্ছে :
১. বাধ্যতামূলক বহুমুখী গ্রাম সমবায় গঠন;
২. মধ্যস্বত্বভোগী গ্রামীণ জোতদার, মহাজন, ধনিক বণিক শ্রেণীর উচ্ছেদ;
৩. উৎপাদন ব্যবস্থা ও উৎপাদন শক্তির বিকাশ সাধন;
৪. আমলাতন্ত্রের বিলুপ্তি এবং রাষ্ট্রীয় জীবনের ব্যাপক গণতন্ত্রায়ণ।
সমাজের কাক্সিক্ষত পরিবর্তনের জন্য বঙ্গবন্ধু সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছিলেন ‘বহুমুখী সমবায়’-এর ওপর। ’৭৫-এর ২৬ মার্চে স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে ওই সমবায় বা কো-অপারেটিভ জমির মালিকের জমি থাকবে। কিন্তু যে বেকার, প্রত্যেকটি মানুষ, যে মানুষ কাজ করতে পারে তাকে কো-অপারেটিভ সম্পর্কে অনেক কথা বলেছিলেনÑ
“পাঁচ বছরের প্ল্যানÑএ বাংলাদেশের ৬৫ হাজার গ্রাম কো-অপারেটিভ হবে। প্রত্যেকটি মানুষ, যে মানুষ কাজ করতে পারে তাকে কো-অপারেটিভের সদস্য হতে হবে। এগুলি বহুমুখী কো-অপারেটিভ হবে। পয়সা যাবে তাদের কাছে, ফার্টিলাইজার যাবে তাদের কাছে, টেস্ট রিলিফ যাবে তাদের কাছে, ওয়ার্কস প্রোগ্রাম যাবে তাদের কাছে। আস্তে আস্তে ইউনিয়ন কাউন্সিলের টাউটদের বিদায় দেওয়া হবে। তা না হলে দেশকে বাঁচানো যাবে না। এই জন্যই ভিলেজ কো-অপারেটিভ হবে।”
বঙ্গবন্ধু যে-সমবায়ের ভাবনা ভেবেছিলেন, উৎপাদন ও বণ্টন ব্যবস্থার তথা সমাজের কাঠামোর আমূল রূপান্তরই ছিল তার লক্ষ্য। ধনতন্ত্রের তাত্ত্বিকদের দ্বারা উদ্ভাবিত ও প্রচারিত সমবায়-ব্যবস্থার সঙ্গে বঙ্গবন্ধু পরিকল্পিত সমবায়ের কোনো মিল ছিল না। বরং বলা যেতে পারে, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের সমবায়-প্রণালির দ্বারাই গ্রাম আপন সর্বাঙ্গীন শক্তিকে নিমজ্জন দশা থেকে উদ্ধার করতে পারবে, এই আমার বিশ্বাস।” কিন্তু তিনি লক্ষ করেছিলেন, “আক্ষেপের বিষয় এই যে, আজ পর্যন্ত বাংলাদেশে সমবায়-প্রণালি কেবল টাকা ধার দেওয়ার মধ্যেই ম্লান হয়ে আছে, মহাজনী গ্রাম্যতাকেই কিঞ্চিৎ শোধিত আকারে বহর করছে, সম্মিলিত চেষ্টায় জীবিকা উৎপাদন ও ভোগের কাজে সে লাগল না।
তার প্রধান কারণ, যে শাসনতন্ত্রকে আশ্রয় করে আমলাবাহিনী সমবায়নীতি আমাদের দেশে আবির্ভূত হলো সে যন্ত্র, অন্ধ, বধির, উদাসীন।”
বঙ্গবন্ধুর সমবায়-নীতি, রবীন্দ্রনাথ-কথিত এরকম ‘আমলাবাহিনী সমবায়-নীতি’ থেকে স্বতন্ত্র, তাঁর সমবায়-নীতি ছিল সমাজতন্ত্রমুখী তথা শোষণ মুক্তির পথগামী। এ ব্যাপারে শুধু রবীন্দ্রনাথের নয় নজরুলের রাষ্ট্রচিন্তা ও সমাজ-বিপ্লবী ভাবনারও তিনি অনুসারী। ‘শ্রমিক প্রজা স্বরাজ সম্প্রদায়’ নামক একটি রাজনৈতিক দলে সদস্য রূপে নজরুল যে ইশতেহারটি রচনা করেছিলেন, তাতে ছিলÑ
“আধুনিক কলকারখানা, খনি, রেলওয়ে, টেলিগ্রাফ, ট্রামওয়ে, স্টিমার প্রভৃতি সাধারণের হিতকারী জিনিস, লাভের জন্য ব্যবহৃত না হইয়া, দেশের উপকারের জন্য ব্যবহৃত হইবে এবং এতদ্সংক্রান্ত কর্মীগণের তত্ত্বাবধানে জাতীয় সম্পত্তিরূপে পরিচালিত হইবে।
ভূমির স্বত্ব আত্ম-অভাব-পূরণক্ষম স্বায়ত্বশাসন বিশিষ্ট পল্লীতন্ত্রের উপর বর্তিবেÑএই পল্লীতন্ত্র ভদ্র-শূদ্র সকল শ্রেণীর শ্রমজীবীর হাতে থাকিবে।”
নজরুল-কাক্সিক্ষত এই ‘স্বায়ত্বশাসন বিশিষ্ট পল্লিতন্ত্রেও মর্মবাণীই ধারণ করেছিল বঙ্গবন্ধুর শোষিতের গণতন্ত্রেও কর্মসূচি।
নজরুল নন শুধু, গ্রামবাংলার চারণ কবি মুকুন্দ দাসও স্বায়ত্বশাসন বিশিষ্ট পল্লিতন্ত্রেও একটি পরিকল্পনা রচনা করেছিলেন। তাঁর পরিকল্পনাটা ছিল এরকম :
“প্রতি পাঁচখানা গ্রাম লইয়া হইবে এক একটি মৌজা; প্রতি মৌজায় থাকিবে আমানতী ব্যাংকÑএবং ব্যাংকের সাহায্য ও মাধ্যমে এই পাঁচখানি গ্রামে চলিবে যৌথভাবে চাষ, কারবার ও কুটিরশিল্প।”
চারণ কবির এই স্বপ্ন কি বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রচিন্তার মধ্যে সংক্রমিত হয়নি?
কেবল মুকুন্দদাসের মতো চারণকবির কথাই বা বলি কেন? আবহমান বাংলার লোকমানসেই তো বিদ্বেষ-বৈষম্য-মুক্ত শোষণহীন এক সমাজের স্বপ্ন-কল্পনা ও পরিকল্পনা জড়িত-মিশ্রিত হয়ে আছে। স্মরণ করতে পারি লালন ফকিরের সেই আর্তিও কথাÑ
এমন সমাজ কবে গো সৃজন হবে।
যেদিন হিন্দু-মুসলমান
বৌদ্ধ খ্রিস্টান
জাতিগোত্র নাহি রবে।
শোনায়ে লোভের বুলি
নেবে না কাঁধের ঝুলি
ইতর আতরাফ বলি
দূরে ঠেলে না দেবে॥
আমির ফকির হয়ে এক ঠাঁই
গবার পাওনা খাবে সবাই
আশরাফ বলিয়া রেহাই
ভবে কেউ নাহি পাবে॥
আমাদের জনগণের মধ্যে ব্যপ্ত এ-রকম লৌকিক আর্তিই তো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাষ্ট্রচিন্তার অমোঘ অবিচ্ছেদ্য অপরিহার্য উপাদান। কারণ তিনি যে আমাদেরই লোক।

 

হেমন্তের জলে

 

কার্তিক হেমন্তের প্রথম মাস। এই সময়ে বাংলাদেশের প্রকৃতিতে প্রগাঢ় সবুজ যেমন পাওয়া যায় তেমনি পাওয়া যায় শীতের মিষ্টি আমেজও। কাদায় মাখামখি রাস্তাঘাট ও হাড় কাঁপানো শীত যে মাসে নেই ওই মানের নামই কার্তিক। ষড়ঋতুর এই বংলায় হেমন্তের অবস্থান চতুর্থ। হেমন্তের খামে বাঙালির ঘরে-বাইরে, হাটে-মাঠে-ঘাটে আচার ও সংস্কৃতিতে নিয়ে আসে অভাব এবং সমৃদ্ধির দ্বৈতউপহার। কার্তিক মূলত কৃষি-গৃহস্থ জীবনে অভাব-অনটনের মাস হিসেবে পরিচিত। কৃষিপ্রধান গ্রামবাংলায় এই সময় অকাল বন্যাসহ প্রাকৃতিক বিভিন্ন দুর্যোগের ফলে কৃষকের কাজ থাকে না। গোলাঘর থাকে শূন্য। শরতের শুভ্র শরীর বর্ণিল হতে থাকে হেমন্তের শুরুতে। তবে অগ্রহায়ণের উপস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে দেয় প্রকৃতির দৃশ্যপট। মসৃণ ও স্পষ্টতার অনুভব নিয়ে ষড়ঋতুর এ দেশে ঋতুরানীর পর হাজির হয় ঋতুকন্যা হেমন্ত। মৌন, শীতল ও অন্তর্মুখী হওয়া এ ঋতুর প্রধান বৈশিষ্ট্য। উৎসব মানেই আমরা বুঝি হেমন্তকে। এর নেপথ্যে যথার্থ কারণও রয়েছে। সুজলা-সুফলা এ দেশের প্রধান ফসল ধান। বর্ষার শেষ দিকে বোনা আমন-আউশ শরতে বেড়ে ওঠে। আর হেমন্তের প্রথমে এতে পাক ধরে। এ ঋতুর প্রথম মাস কার্তিকের শেষ দিকে
পাড়াগাঁয়ের মাঠে মাঠে ধান কাটার ধুম পড়ে। পাকা ধানের গন্ধে তখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে ম-ম গন্ধ।

কার্তিকের পরের মাস চিরায়ত বাংলার আমনপ্রধান অঞ্চলে অগ্রহায়ণ নিয়ে আসে আশীর্বাদ। ধান কাটার ভরা মৌসুম হলো এই মাস। ফসলি মাঠের ঢেউ উপচে পড়ে কৃষকের গোলা, আঙিনা ও চাতালে। এই সময়ে নতুন ধানে কিষাণ-কিষাণীদের আনন্দ আর ব্যস্ততার সীমা থাকে না। বর্তমানে কৃষিকাজের সবক্ষেত্রেই প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। হেমন্তে সারা বছরের পরিশ্রমের ঘামে ফলানো ফসল কৃষকের মরমে সোনালি প্রলেপ মেখে দেয়। তাই যুগ যুগ ধরে এ মাসটি ‘নবঅন্ন’ নতুন ভাত বা ‘নবান্ন’ নামে পরিচিতি পেয়ে আসছে। এ সময় সব কৃষকের ঘরে থাকে নতুন ধান। ওই ধানের চাল দিয়ে কৃষক পরিবারে পিঠা-পুলি তৈরির ধুম পড়ে যায়। অগ্রহায়ণ তখন রূপ নেয় উৎবের আমেজে। এ উৎসবে হরেক রকম পিঠা তৈরি হয়। নামের মতোই বৈচিত্র্যময় পিঠাগুলো স্বাদে অনন্য। যেমনÑ চিতই, পাকানো, পাকোয়ান বা পাক্কন, পাটিশাপটা, কুশলি, ভাপা, পাতা, ভাত, কাটা, নকশি, পুলি, দুধ বা ভিজানো, ছিটা, লবঙ্গ, গোকুল, ম্যারা, মুঁঠা, সিদ্ধ, পুতুল, লরি, চাছি, সাগুদানা, ঝুড়িসীতা, তারাজোড়া, জামাই, জামদানি, হাদি, পাটা, তেজপাতাসহ অসংখ্য বাহারি নামের পিঠা বাড়িতে বাড়িতে তৈরি করা হয়। এই সময় আত্মীয়স্বজন বেড়াতে আসে। তাদের নতুন চালের পিঠা দিয়ে আপ্যায়ন করানো হয়। এভাবেই গ্রামবাংলায় ছড়িয়ে পড়ে নবান্নের আমেজ। বেলী, সন্ধ্যামালতী, দোপাটি, বক, জুঁই, কামিনী, গোলাপসহ অসংখ্য ফুল হেমন্তে ফুটে প্রকৃতিকে সুরভিত করে তোলে।
বাংলাদেশের নদীর রূপ, রঙ এক রকম এবং সাগরের অন্য রকম। কিন্তু নদী ও সাগরের যে মিলনস্থল অর্থাৎ মোহনা এর সৌন্দর্য মোহনা এলাকার মানুষ ছাড়া তেমন কেউ জানেন না। কার্তিক মাস ঠিক ওই রকম- দুই ঋতুর মোহনার মতো। এ কারণেই বাংলাদেশের প্রাণ ও প্রকৃতি দেখার সবচেয়ে সুন্দর সময় এই কার্তিক মাস।

হেমন্তে দেখা যায় অখণ্ড নীল আকাশ। শরৎ থেকে হেমন্ত খুব পৃথক নয়, শীত থেকেও তেমন বিচ্ছিন্ন নয় এর প্রকৃতি। এটি শীত-শরতের মাখামাখি একটি স্নিগ্ধ সুন্দর বাংলা ঋতু। হেমন্তের শিশির ভেজা ঘাসের ডগা যেন মুক্তার মেলা। সকাল বা সন্ধ্যায় অদৃশ্য আকারে ঝরে আকাশ থেকে। আবহমানকাল থেকে কমনীয়তার প্রতীক এই শিশির। ভোরের কাঁচারোদ, মৃদু হিমস্পর্শ প্রাণে শিহরণ জাগায়। বাংলাদেশে হেমন্ত আসে ধীর পদক্ষেপে, শীতের পরশ আলতো করে গায়ে মেখে।
স্মরণাতীতকাল থেকেই ধনধান্যে ভরা অগ্রহায়ণ মাসটিকে বছরের প্রথম মাস ধরে বর্ষ গণনার রীতির প্রচলন ছিল এ অঞ্চলে। অগ্রহায়ণ হলো বছরের অগ্রে যে যায়। তাই অগ্রহায়ণের স্থলে গ্রীষ্মের বৈশাখ কী করে বাংলা বর্ষের প্রথম মাস হলো তা এখনো রহস্য। নতুন ধান ও অন্নে ধীমান প্রকৃতির মেজাজ বাঙালির ফসল কাটার উৎসবটিকে উসকে দেয় বহুগুণে। সকালে সবুজ ঘাস ও আমন ধানের পাতায় শিশিরবিন্দু মুক্তদানার মতো চিক চিক করে। বৃন্তচ্যুত শিউলি ফুল এ সময় সৌরভ ছড়ায়। বাংলাদেশের শহরগুলোতেও কার্তিক ও অগ্রহায়ণ স্বকীয় বৈশিষ্ট্যম-িত। নগরের ইট-কাঠ কংক্রিটের জঞ্জালে বেঁচে থাকা জীবনও সমান তাড়িত হয়
কার্তিকের কৃপণতা ও অগ্রহায়ণের সুদিন সন্দেশের পরশে। তবে আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে জ্বর, খুশখুশে কাশিসহ বিিিভন্ন রোগের কমবেশি প্রাদুর্ভাব দেখা যায় শহর ও গ্রামে। সনাতন ধর্মালম্বী বাড়িগুলোয় হেমন্তকালে কলেরা আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে আকাশবাতি জ্বালানোর প্রচলন ছিল। সনাতনী হিন্দু ধর্মীয় মতে, দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎসব হিসেবে ধরা হয়ে থাকে শ্যামাপূজা, দীপান্বিতা বা দীপাবলি। কেউ কেউ এ উৎসবটিকে দেওয়ালি উৎসব বলে থাকেন। ত্রেতা যুগে ১৪ বছর বনবাস থাকার পর নবমীতে শ্রীরাম রাবণ বধের বিজয় আনন্দ নিয়ে দশমীতে অযোধ্যায় ফিরে আসেন। রামের আগমন বার্তা শুনে প্রজাকুল তাদের গৃহে প্রদীপ জ্বালিয়ে আনন্দ উৎসব পালন করে। ওই উৎসবটিকে দীপাবলি উৎসব বলে উল্লেখ করা হয়েছে। দুর্গাপূজার বিজয়ার পরবর্তী অমাবস্যার রাতেই দীপাবলির আয়োজন করা হয়। ওই রাতেই অনুষ্ঠিত হয় শ্যামা-কালীপূজা। অমাবস্যা রজনীর সব অন্ধকার দূর করে পৃথিবীকে আলোকিত করার অভিপ্রায়ে ওই প্রদীপ প্রজ্বলন। পৃথিবীর সব অন্ধকারের অমানিশা দূর করতেই ওই আয়োজন ও আরাধনা। কলুষময় পৃথিবীর আঁধার দূর করে মানুষ কালে কালে, যুগে যুগে রাজটিকা পরে বিজয়তিলক এঁকে আলোকবর্তিকা প্রজ্জ্বলন করেছে, জয় করেছে বিশ্বব্রহ্মা-। কালী বা শ্যামা অথবা আদ্যাশক্তিÑ যে নামেই ডাকা হোক না কেন, মূলত শাক্তদের দ্বারা তারা পূজিতা হন। তিনি তান্ত্রিক দশ মহাবিদ্যার প্রথমা দেবী এবং শাক্ত বিশ্বাস অনুযায়ী বিশ্ব সৃষ্টির আদি কারণ।

বাঙালি হিন্দু সমাজে মাতৃরূপে দেবী কালীর পূজা বিশেষভাবে পালিত হয়ে থাকে। হিন্দুশাস্ত্র মতে, কালিকা বাংলার অধিষ্ঠাত্রী দেবী। বাংলায় শাক্ত ধর্ম অত্যন্ত জনপ্রিয় ও কালীরূপে শক্তির আরাধনাও ব্যাপক। সমগ্র বাংলায় অসংখ্য কালীমন্দির দেখা যায়। এসব মন্দিরে আনন্দময়ী, করুণাময়ী, ভবতারিণী ইত্যাদি নামে কালী প্রতিমা পূজিত হয়। কালীর বিভিন্ন রূপভেদ রয়েছে। অমাবস্যায় দীপান্বিতা কালীপূজা বিশেষ উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পালিত হয়ে আসছে এতো দিন। অমাবস্যার ঘুটঘুটে অন্ধকারে প্রদীপ জ্বালিয়ে আলোকিত করার প্রয়াস অব্যহত থাকুক...

 

লেখাঃ শাকিল সারোয়ার
মডেলঃ সাবা সিদ্দিকা, মৌ মধুবন্তী
পোশাকঃ সহজ ওয়্যারড্রোব
মেকওভারঃ ক্লিওপেট্রা বিউটি স্যালন
স্টাইলিংঃ রিবা হাসান
ছবিঃ কৌশিক ইকবাল

একটি মৃত্যু ও তৃতীয় পক্ষ 

- লাবণ্য লিপি 

 

ঘটনাটা নাকি ঘটেছে রাত সাড়ে দশটায়। মিতুকে ফোনে খবরটা জানিয়েছে ওর এক সহকর্মী। খবর পেয়ে ওরা রাতেই গিয়েছিল। কিন্তু অত রাতে মিতুর পক্ষে সম্ভব ছিল না ওদের সঙ্গে যাওয়া। তাই ও সকালের আলো ফুটতেই বেরিয়ে পড়েছে। বাড়িটা চিনতে খুব একটা সমস্যা হলো না। যদিও মূল রাস্তা থেকে এগারো নম্বর গলিটা খুঁজে পেতে একটু সময় লেগেছিল। রিক্সা থামিয়ে দু’একজনকে জিজ্ঞেস করতেই দেখিয়ে দিল। লোকজনের আসা যাওয়া দেখেও আন্দাজ করে নেওয়া যায়। উপরন্ত বাসার সামনে বেশ কয়েকটি গাড়ি দেখে নিশ্চিত হওয়া গেল। তবু খানিকটা দ্বিধা নিয়েই সদর দরজা দিয়ে ঢুকে পড়ল মিতু। মনে তখনও ক্ষীন আশা, খবরটা যদি ভুল হয়! পৃথিবীর সব খবর সত্যি হতে হবে কেন! সত্য সব সময় প্রত্যাশিত হলেও কখনও কখনও ভুলটাও যে এত কাক্সিক্ষত হতে পারে, আজকের আগে এমন করে ওর মনে হয়নি কখনও। গেটে দাড়োয়ান ছিল না। ও সহজেই গেট দিয়ে ঢুকে গেল এবং ঢুকেই ওর পা দুটো যেন থেমে গেল। কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করতে হলো না! খবরটা যে মিথ্যে ছিল না এটা বুঝতেও সময় লাগলো না। সামনে রাখা কফিনটাই বলে দিল সব। নাকে এসে লাগলো কর্পূর- আগরবাতির গন্ধ। মৃতবাড়ির অতি পরিচিত এই গন্ধটা মানুষকে ভীষণ দৃর্বল করে দেয়। কেবলই মনে হয় আমারও বুঝি সময় হয়ে এলো। মিতুর মাথাটা হঠাৎ কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছিল। কেমন জানি অনুভূতিশূন্য। কফিনের খুব কাছে কেউ ছিল না। অল্প দূরে ছোট ছোট গ্রুপে ভাগ হয়ে কয়েকজন নিজেদের মধ্যে নিচু স্বরে কথা বলছে। মিতু কফিনটার কাছে বসে পড়ল। নিজের ভার বইবার শক্তি ওর আর অবশিষ্ট ছিল না। বরং কফিনটা হাত বাড়িয়ে আঁকড়ে ধরে সে নিজের পতন ঠেকালো। নিরুচ্চারে নিজেকেই প্রশ্ন করল, কফিনের ভেতরের এই সাদা কাপড়ে মোড়া মানুষটা কি সত্যিই আরিফ? হাসি- খুশি, উচ্ছ্বল মানুষটা এমন স্থির হয়ে পড়ে আছে! মাথা ভর্তি একরাশ রেশমি চুল। চুলগুলো প্রায়ই কপালে চলে আসত। মিতু হাত বাড়িয়ে সরিয়ে দিত। আর কী ফর্সা ওর গায়ের রঙ। রিক্সা দিয়ে রোদে ঘুরলে আরিফের মুখটা লাল হয়ে যেত। মিতু দেখে হাসতে হাসতে বলত, তুমি দেখছি মেয়েদের মতো লজ্জায় লাল হয়ে গেছ। শুনে হাসতো আরিফও। ওর হাত দুটোও কি নিষ্প্রাণ হয়ে গেছে? যে হাতে ও নিঃশব্দে আলপনা আঁকত মিতুর শরীরের ক্যানভাসে! ভীষণ অন্য রকম ছিল ছেলেটা। সব সময় হাসিÑ খুশি প্রাণবন্ত থাকলেও কথা বলতো কম। শুনতো বেশি। রিক্সায় ওরা দু’জন যখন ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকত, মিতুই কথা বলতো। আরিফ শুনতো আর হাসতো। কত গল্প যে মিতু ওর সঙ্গে করতো! ও নিরব শ্রোতা হওয়ায় মিতু মাঝে মাঝে প্রশ্ন করে যাচাই করে দেখত সত্যিই সে শুনছে কি না। যখন জানতে চাইতো, বলো তো আমি কী বলছি? আরিফ ঠিক বলে দিত। আজ কি আরিফ শুনতে পাচ্ছে না ওর নিরব কান্না! কেন আরিফ একবারও হাত বাড়িয়ে ওর হাতটা টেনে নিচ্ছে না নিজের হাতের ভেতর! এতো অভিমান! কেন এভাবে না বলে চলে যেতে হবে?  কেউ একজন এগিয়ে এসে মৃদুস্বরে জানতে চাইলো, আপনি কি মুখ দেখতে চান? মিতু চমকে উঠে দ্রুত মাথা নাড়ল, না! না! পরে দেখব। তারপর বলল, উনি কয়তলায় থাকতেন? দোতলায় চলে যান! লোকটি বলল।

সিঁড়ি দিয়ে উঠতেই বসার ঘর চোখে পড়ল। দুই পাশের সোফায় দু’জন ঘুমিয়ে আছে। একটাতে একটি শিশু। অন্যটাতে একজন বয়স্ক মানুষ। বসে কথা বলছে কয়েকজন। কয়েকজন এ ঘর ও ঘর ছোটাছুটি করছে। মিতু ঠিক বুঝতে পারছে না, কার সঙ্গে কথা বলবে। এক লোক হাঁক দিয়ে বলল, আমার পাঞ্জাবিটা দাও। আর রাস্তায় খাওয়ার জন্য কী নিচ্ছ? একটু বেশি করে নিও। লোক কিন্তু অনেক যাচ্ছে। তখন পাশের ঘর থেকে মাঝবয়সী এক মহিলা বেরিয়ে এলেন। মিতুকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বললেন, তুমি কে মা?

 

কাউকে খুঁজছো ? জ্বি, আমি আরিফের বউয়ের সঙ্গে একটু দেখা করতে চাই! মিতু বলল। সে কি আর স্বাভাবিক অবস্থায় আছে! সারারাত চিৎকার কইরা কানছে। এখন থম মাইরা বইসা আছে। মনে হয় পাথর হইয়া গেছে মেয়েটা। আহারে! সেদিন মাত্র বিয়ে হইলো। এরই মইধ্যে সব শ্যাষ! আল্লাহ জানে মেয়েটার এখন কী হইব! আর ছেলেটাতো দুধের বাচ্চা। বলতে বলতে মহিলা চোখে আঁচল চাপা দিলেন। চোখ মুছে একটা ঘর দেখিয়ে বললেন, ঐ ঘরে যাও। তারপর সে পাঞ্জাবি চাওয়া লোকটার কথার জবাব দিলেন, ভূণা খিচুড়ি আর মাংস রান্না করে নিয়েছি। অত দূরের পথ। সবার তো ক্ষিধা লাগব। ওদের কথা শুনতে শুনতেই পাশের ঘরে ঢুকলো মিতু। থমথমে মুখে বিছানার ওপর বসে আছে এক নারী। খাটের মাথার পাশের দেওয়ালে মাথা ঠেকিয়ে। চোখ খোলা। কিন্তু সে চোখে যেন প্রাণ নাই। মাছের চোখের মতো নিষ্প্রাণ! গাঢ় সবুজ রঙের সালোয়ার কামিজ পরনে। কোলে জড়ো হয়ে আছে ওড়নাটা। কেউ বলে না দিলেও মিতু বুঝতে পারলো সেই- ই আরিফের স্ত্রী। তাকে ঘিরে কয়েকজন বসে আছে। তারা নিচুস্বরে কথা বলছিল। পাশে একটা বাচ্চা ঘুমাচ্ছে। মিতু মনে মনে ভাবল, ওটাই মনে হয় আরিফের ছেলে। কী নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে শিশুটি। ও তো জানেও না কী দুর্যোগ নেমে এসেছে ওর জীবনে। বাচ্চাটা দেখতেও কী সুন্দর হয়েছে। ঠিক যেন দেবশিশু। মিতুর ভীষণ ইচ্ছে করছিল ছুটে গিয়ে বাচ্চাটাকে বুকে জড়িয়ে নিতে। হঠাৎ মনে পড়ল ওর সেই না হওয়া মেয়েটার কথা। আরিফ যার নাম রেখেছিল মায়া। সেদিন অফিস শেষে মিতু অপেক্ষা করছিল আরিফের জন্য। আরিফ ওকে দেখে জানতে চেয়েছিল, কী ব্যাপার? কী হয়েছে? তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন? মিতু রিক্সায় উঠতে উঠতে বলল, আমাদের মনে হয় একবার ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত। আরিফ বলল, কেন? তোমার কি শরীর খারাপ? আমার খুব টেনশন হচ্ছে। যদি কিছু হয়ে যায়! পিরিয়ডের ডেট পার হয়ে গেছে। আরিফ ওর কথা হেসে উড়িয়ে দিল, ধুর! কিচ্ছু হবে না। তুমি কেমন করে এত নিশ্চিত হচ্ছো? মিতু অভিমানের সুরে জানতে চাইলো। আমি জানি! আরিফের সেই একই জবাব। মিতু এবার বলল, আচ্ছা, ধরো আমাদের একটা বাচ্চা হবে। সেটা কী হবে, ছেলে না মেয়ে? আরিফ অকপটে বলল, মেয়ে। কেন? ছেলেও তো হতে পারে! মিতুর গলায় আবারও অভিমানের বাষ্প জমে। আমার মনে হয় না ছেলে হবে। মেয়েই! আরিফের জোরালো মত। এবার অনেকটা হারমানা স্বরে মিতু বলল, মেয়ে হলে ওর নাম কী রাখবে? একটু ভেবে আরিফ বলেছিল, মায়া! বাহ! কী সুন্দর নাম! আমাদের ভালবাসা থেকে জন্ম হবে মায়ার। মিতু একা একাই বিড়বিড় করে। আচ্ছা যদি সত্যিই ওদের বাচ্চাটার জন্ম হতো তাহলে এই মানুষগুলো কি ওর জন্যও এমন আফসোস করত? কিন্তু কেউ কি জানতো ওর পরিচয়? একজন মহিলা ওকে দেখিয়ে অন্যদের কী যেন বলল। আর তখনই ভেসে এলো অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন। সেই সঙ্গে শুরু হলো কান্নার রোল। বাসায় ঢোকার মুখে দেখা হওয়া সেই মহিলা এসে তাড়া দিলেন কাউকে উদ্দেশ্য করে, ও মনা! বউমা আর বাবুর জিনিস পত্র গুছিয়ে নে। অ্যাম্বুলেন্স চইলা আসছে। এখন তো যাইতে হবে। আহারে ওর মায়ের না জানি কী অবস্থা! আমরা মামী হইয়াই মাইনা নিতে পারতাছি না! বলতে বলতে তিনি আবারও কাঁদতে লাগলেন। এবার আরিফের বউও চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করল। মিতু কাউকে কিছু না বলে নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।

নিচে এখন মানুষের প্রচ- ভিড়। সবাই ব্যস্ত হয়ে ওপর নিচ করছে। বার বার গাড়ি থামার শব্দ হচ্ছে। নতুন কেউ আসছে আর থেমে যাওয়া কান্না আবার নতুন করে শুরু হচ্ছে। আবার থেমে যাচ্ছে। এভাবেই চলছে। কফিনটা  ঘিরে রেখেছে কয়েকজন। নতুন কেউ এসে শেষ বারের মতো দেখে নিচ্ছে প্রিয় স্বজনের মুখ। সবাই আফসোস করছে, ইস! কী এমন বয়স ছেলেটার! এই বয়সেই হার্ট অ্যাটাক! আহারে! বাচ্চাটা বাবার কোনও স্মৃতিই মনে করতে পারবে না! আহারে বউটার কী হবে! সংসার কেমন করে চলবে! একজন আবার জানতে চাইলো, অর অফিসের লোকজন আইছিল! তারা কি টাকা পয়সা কিছু দিবে না! দিলে সেটা কে কতটা পাবে, সেটা নিয়েও চললো মৃদু আলোচনা। লাশ নেওয়া হবে গ্রামের বাড়িতে। সেখানে আরিফের বাবা- মা থাকেন। কফিন অ্যাম্বুলেন্সে তোলার আগে সবাই আর একবার দেখে নিচ্ছে। আরও দুটো মাইক্রোবাস যাচ্ছে। যারা সঙ্গে যাবে তারা গিয়ে গাড়িতে উঠছে। এরই মধ্যে শুরু হলো বৃষ্টি। মিতু আনমনে এগিয়ে যাচ্ছিল কফিনটার দিকে। ওর একবার মনে হলো শেষ বারের মতো আরিফের মুখটা দেখি। কিন্তু পা যেন সরছে না। হঠাৎই ওর না হওয়া মেয়েটার জন্য খুব কষ্ট হতে লাগলো। চোখ ভীষণ জ্বালা করছে। ও কি তাহলে কাঁদবে। নাহ! আর দাঁড়ানো যাবে না এখানে! ভাবতে ভাবতেই ও গেট দিয়ে বেরিয়ে গেল। কেউ কেউ অবাক হয়ে দেখলো বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে একটা মেয়ে বেরিয়ে যাচ্চে। এতক্ষণে মিতুও স্বস্তি পেল। বৃষ্টি তখন পরম যতেœ ধুয়ে দিচ্ছে ওর চোখের জল।

 

Page 2 of 2

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

Twitter feed

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…