Super User

Super User

Page 1 of 29

বৈশাখে ঘর ও আপনি...

 

এসেছে বৈশাখ। এসেছে বাংলা নতুন বছর। প্রতি বছরের মতো এবারও বাংলা নতুন বছরটিকে সাদরে বরণ করে বাঙালিদের মধ্যে পড়ে গিয়েছিল সাজ সাজ রব। একটু চোখ-কান খোলা রাখলেই দেখা যায় শহর ও নগরে এই আসন্ন বৈশাখের আগমনী বারতার দোলা লেগেছিল যেন চারদিকেই। বিপণি বিতানগুলো সেজে উঠেছিল বৈশাখী সাজে। বৈশাখী আয়োজনে ব্যস্ত ছিল নৃত্য-গীত শিল্পীরা, কলা-কুশলী ও চিত্রকররা। বাংলাদেশি খাবার মুড়ি-মুড়কি, গজা-কদমার কারিগর ও বিক্রেতাদের মধ্যেও শুরু হয়েছিল বিশেষ কর্মতৎপরতা। বৈশাখ বা বৈশাখী মেলা উপলক্ষে শিশুদের জন্য কাঠ, শোলা, মাটি কিংবা বেতের নানান খেলনা তৈরিতে কারিগরদের মধ্যেও ছিল বৈশাখী ব্যস্ততা।

বৈশাখ বা বাংলা নতুন বছর পালন নিয়ে চারদিকে আয়োজনের যেন শেষ নেই। তবে ওই আয়োজনের সিংহভাগই বুঝি অসম্পূর্ণ থেকে যেতো যদি বাংলার রমণীকুল বৈশাখী আয়োজনে না সাজতো। তাই ওই বিশেষ দিনটি ঘিরে ছোট-বড়, ধনী-দরিদ্র- সবার ঘরেই চলেছে সাধ্যমতো আয়োজন। একটা সময় পর্যন্ত শুধু লাল পাড়-সাদা শাড়ি, কপালে লাল টিপ, খোঁপা বা বেণীতে দোলানো বেলিফুলের মালা, হাতভর্তি কাঁচের চুড়ি আর আলতা রাঙানো পা- এসবই ছিল বৈশাখের সাজ। এগুলো বাদ দিয়ে আজও বর্ষবরণের সাজ পূর্ণতা পায় না! তবে যুগের পরিবর্তনে বাঙালির সাজে শুধু ওই লাল-সাদা কনসেপ্ট ছেড়ে উঠে এসেছে কমলা, হলুদ, বেগুনি, সবুজসহ নানান বর্ণালি রঙের বাহার। আর নকশায় দেশি বাদ্যযন্ত্র আর ব্যবহার্য জিনিসের জায়গায় ধীরে ধীরে উঠে এসেছে বাংলার প্রকৃতি আর নানান কারুকার্যময় আলপনার ছবি। তো দেখা যাক কীভাবে সেজেছে বাঙালি বৈশাখী সাজে-

প্রথমেই আসি শাড়ি প্রসঙ্গে। বৈশাখে শাড়ি নির্বাচনে ম্যাটারিয়াল হিসেবে কটন বা সুতি এক বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। বৈশাখ যেহেতু প্রচ- গরমের মাস সেহেতু এই তীব্র গরমে সুতি বা তাঁতের শাড়িই সবচেয়ে বেশি উপযোগী। খাদি কাপড় একটু মোটা হলেও বৈশাখে খাদি শাড়িও থাকে কারো কারো পছন্দের তালিকায়। সুতি জামদানিরও প্রচলন রয়েছে। তবে সান্ধ্যকালীন অনুষ্ঠান বা বিশেষ জাঁকজমকপূর্ণ বৈশাখী অনুষ্ঠানে সিল্ক, মসলিন, টিস্যু বা গরদ কিংবা জমকালো জামদানি ও অন্যান্য ম্যাটারিয়ালেরও প্রচলন দেখা যায়। আগে সুতি শাড়ির পাশাপাশি গরদের কাপড়ও সমানভাবে ব্যবহার হতো। এবারেও কেউ কেউ বৈশাখে বেছে নিয়েছে সনাতনী গরদ। রঙের ক্ষেত্রে সম্প্রতি সাদা ও লালের পাশাপাশি কমলা, বেগুনি, হলুদ, সবুজ, নীলসহ নানান নকশাদার শাড়ির প্রচলন শুরু হয়েছে। বৈশাখের শাড়িতে বাড়তি সংযোজন হিসেবে ঝুনঝুনি, টারসেল, আয়না, পুঁতি, কাঁচ বা ছোট ছোট স্টোনও কেউ কেউ ব্যবহার করেছেন। শাড়ি ছাড়াও সালোয়ার-কামিজ যারা পরেছেন তারাও ম্যাটারিয়াল হিসেবে সুতিই প্রাধান্য দিয়েছেন। আর রঙের ক্ষেত্রে বেছে বেছে নিয়েছে রঙ-বেরঙের বৈচিত্র্য।


যাহোক, এবারে আসি শাড়ির সঙ্গে ব্লাউজের ডিজাইন বা নকশার ব্যাপারে। বৈশাখী সাজে ব্লাউজের ডিজাইনে থাকে গ্রামীণ আবহ। ঘটিহাতা, গলায় কুচি, লেস ফিতায় ব্লাউজ, প্রিন্ট বা চেক কাপড়ের ব্লাউজ অনায়াসে মানিয়ে যায় বৈশাখী শাড়ির সাজে।
যাহোক, ফুটপাথ থেকে শুরু করে যে কোনো প্রসাধনীর দোকানে পাওয়া যায় নানান টিপ। কাজেই নিজের পছন্দ ও চাহিদামতো টিপ চাইলেই সংগ্রহ করা কঠিন কিছু নয়। এছাড়া কুমকুম দিয়েও নিজের মনের মতো নকশা করে টিপ এঁকে নেয়া যায়। এক পাতা সাধারণ টিপ ১০ থেকে শুরু করে গুণ, মান ও নকশাভেদে ৫০, ১০০ বা ১৫০ টাকা পর্যন্ত দাম হতে পারে। শাড়ি আর চুড়ি যেন একে অন্যের পরিপূরক। শাড়ির সঙ্গে হাতে রিনিঝিনি কাচের চুড়ি না থাকলে তো সাজে পূর্ণতা আসে না! বৈশাখে লাল-সাদা চুড়ি ছাড়াও রঙ-বেরঙের চুড়ি পরতে দেখা গেছে পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে বা কনট্রাস্ট করে। কামিজের সঙ্গেও একইভাবে পরা যায় এক মুঠো রিনিক-ঝিনিক রেশমি চুড়ি। কাঁচের চুড়ি ছাড়াও অন্যান্য ম্যাটারিয়ালের চুড়িও বেশ মানিয়ে যায় বৈশাখের সাজের সঙ্গে। রেশমি চুড়ি ৫০ টাকা ডজন এবং জরি বা চুমকি বসানো কাচের চুড়ি ৫০ থেকে ৬০ টাকা ডজন। স্টিলের চুড়ির সেট ৬০ টাকা থেকে শুরু। অক্সিডাইজ ও ব্রোঞ্জের চুড়ি জোড়ার দাম শুরু ৮০ থেকে। মাটির চুড়ি জোড়া ৩০ এবং কাঠের চুড়ি জোড়া ২০ থেকে ৪০ টাকা। কাঁচাফুলের মালা বৈশাখী সাজে খোঁপা বা বেণীতে দোলানো ফুল বা ফুলের মালা যেন এক চিরায়ত সৌন্দর্যের প্রতীক। তীব্র গরমে বৈশাখী সাজে আরামদায়ক আর স্নিগ্ধ অনুভূতি আনতে খোঁপা বা বেণীতে একগুচ্ছ সাদা বেলি বা রজনীগন্ধার তুলনা হয় না। এছাড়া বাজারে পাওয়া গোলাপ, জারবেরা ফুলেও সাজিয়ে নেয়া যায় চুলের সাজটি। কাঁচাফুলের মালার দাম ফুলভেদে হয়ে থাকে ভিন্ন।

গ্রামের মেয়েদের আলতা রাঙা পা তো নিত্যদিনের প্রসাধনী। বাঙালি সাজে ওই সাজটি শহর বা নগরেও ওই বিশেষ দিনে আনা যায় বাঙালিয়ানার বৈশিষ্ট্য হিসেবে। প্রসাধনীর দোকানগুলোয় আলতা পাওয়া যায় ১০০ থেকে ২৫০ টাকায়।
পায়ের সাজে আরেকটি অলঙ্কার নূপুর বা মল। মেহেদী দিয়ে নকশা রাঙানো হাতও বাঙালিয়ানার সাজেই পড়ে। কাজেই অনেকে দু’হাত রাঙিয়ে নিয়েছেন বিশেষ দিনটিতে। এছাড়া মাটি, পুঁতি, কাঠ, বাঁশ, বেত বা নারিকেলের মালার তৈরি দুল, মালাও এই বৈশাখের সাজে মানিয়ে যায় দারুণ। এই গেল বৈশাখী সাজের গল্পগুলো। তবে শুধু নিজে সাজলেই তো চলবে না। বৈশাখী সাজে গৃহসজ্জার ব্যাপারটিও মাথায় রাখতে হবে। লাল, সাদা, নীল, হলুদ, সবুজ বা কমলায় রঙিন করে তোলা যায় গৃহকোণ এই বিশেষ দিনটিতে। গৃহসজ্জার ক্ষেত্রে যে ঘরটি প্রথমেই প্রাধান্য পায় সেটি হচ্ছে বসার ঘর। কারণ অতিথি এলে এই ঘরেই তাকে অভ্যর্থনা জানানো হয়। তাই এই ঘরটি সাজিয়েছেন আকর্ষণীয় ও রঙিন করে।


বাংলা নববর্ষ যেহেতু বাঙালির উৎসব সেহেতু গৃহসজ্জায় বাঙালিয়ানা ছাপ রাখতে হয়। মাটির শোপিস, মাটির পুতুল, টেপা পুতুল, ঘণ্টা, মাটির চাইম, প্রদীপ, নকশিকাঁথা, হাতপাখা, আলপনা- এসব দেশীয় উপাদানের সমন্বয়ে তৈরি বৈশাখী গৃহসজ্জা। বসার আয়োজনে ভিন্নতা আসে। শীতলপাটি, নকশিকাঁথা ও রঙিন কুশন সাজিয়ে বসার আয়োজন করা যেতে পারে। ঘরের কোণে সবুজ গাছ, পটারি বা টেরিরিয়াম সাজিয়ে দেয়া যায়। দেয়ালে ঝোলানো হয় কাগজ, কাঠ, বাঁশ, বেত, মাটির নানান মুখোশ। একটি মাটির পাত্রে পানি নিয়ে পছন্দমতো ফুলের পাপড়ি ছড়িয়ে এতে জ্বালিয়ে দেয়া হয় রঙ-বেরঙের ফ্লোটিং মোমবাতি। এছাড়া ব্যবহার করা হয় নানান ল্যাম্পশেড। আলপনা ও প্রদীপ জ্বালিয়ে পূর্ণাঙ্গ করে তোলা হয় বৈশাখী সাজের বসার ঘর।
খাবার ঘরে খাবার টেবিলটি ঢেকে দেয়া হয় তাঁতের ব্লক প্রিন্ট বা হ্যান্ড পেইন্টের টেবিল কভারে। নতুনত্ব হিসেবে আদিবাসীদের রঙিন থামি (লুঙ্গি) দিয়ে টেবিল কভার বানানো যেতে পারে। টেবিল রানারটি শীতলপাটি, বাঁশ অথবা নকশিকাঁথার তৈরি হতে পারে। আদিবাসীদের তৈরি রেশমি সুতার বর্ণিল চকচকে ওড়নাও রানার হিসেবে ব্যবহার করা যায়। রানারের ওপর মাটির মোমদানি বা মাটির ফুলদানি ফুলসহ সাজিয়ে দেয়া যেতে পারে। খাবার টেবিলে তৈজসপত্রে মাটি ও কাঠের ব্যবহার আনা হয়। কাঠ, মাটি বা বেতের তৈরি বাসন-কোসনে বিকালে পরিবেশন করা যায় খৈ, মুড়ি, বাতাসা, নিমকিসহ দেশীয় মুখরোচক খাবার। রঙ-বেরঙের খাদি বা সুতি কাপড়ের পর্দার ব্যবহারও ঘরটিকে ভিন্ন মাত্রা দেয়। ঘরের দেয়ালগুলো বাঁশের ওয়াল ডেকোরেশন বা মাটির টেরাকোটা দিয়ে সাজানো হয়। শোবার ঘরের বিছানায় বিছিয়ে দেয়া হয় উজ্জ্বল রঙের বেডশিট। বিছানার চাদরের সঙ্গে মিলিয়ে পর্দার রঙেও আনা যেতে পারে বর্ণিল নকশার ব্যবহার। বিছানার ওপর বিছিয়ে দেয়া যায় শীতলপাটি। এছাড়া ফেলে রাখা যায় একটা নকশি হাতপাখা। অন্যদিকে মেঝেতে রঙিন শতরঞ্জি বিছিয়ে ঘরটি আকর্ষণীয় করে তোলা যায়। শতরঞ্জির পরিবর্তে মাদুরও বিছিয়ে দেয়া যেতে পারে। দেয়ালে ঝোলানো যায় কারুকার্যম-িত আয়না বা রঙিন পেইন্টিংস।

বৈশাখে রঙিন হয়ে উঠুক গৃহকোণসহ প্রত্যেকের অন্তর ও চারদিক। বৈশাখের ওই আনন্দে বিরাজিত হোক সব সত্য ও সুন্দর!

 

 

আয়োজন : শুভ

ছবি : কানন মাহমদুল

মেকওভার : ক্লিওপেট্রা বিউটি স্যালন

মডেল : অর্পিতা জাহারাত

লেখা : শায়মা হক

বৈশাখী বসনে অতীত-বর্তমান

 

বৈশাখ শব্দটি ঝড়োহাওয়ার মতো মন মাতানো। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের মন, দেহ ও পোশাকে পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগে। নববর্ষ বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনা তুলে ধরে। তাই মন, প্রাণ ও পোশাকে আমরা সব সময়ই বাঙালি। অতীতের বৈশাখী পোশাক যেমন বাংলার সংস্কৃতি বহন করছে তেমনি বর্তমানের বর্ণিল ও উজ্জ্বল বৈশাখী পোশাকেও রয়েছে পরিপূর্ণ সংস্কৃতির ছাপ।

ষাটের দশকে রমনার বটমূলে পহেলা বৈশাখ উৎসব পালনের শুরু থেকেই মূলত পোশাকের প্রবর্তন হয়। সেখানে মেয়েরা সাদা শাড়ি আর ছেলেরা পাঞ্জাবি পরে গান গায়। শান্তির রঙ সাদা আর নতুন দিনের সূর্যের প্রতীক লাল রঙ। আর দুইয়ের সংমিশ্রণে লালপেড়ে সাদা শাড়ি। উৎসবের পোশাক হিসেবে লাল-সাদা ধরে নিলেও নতুন শাড়ি বা নতুন পোশাকই মুখ্য ছিল সব সময়। নতুন পোশাক পরাই ছিল অন্যতম আনন্দের উৎস। মেয়েরা পরতো মোটা পাড়ওয়ালা সাধারণ সুতির শাড়ি বা ঠাসা বুননের তাঁতের শাড়ি বাগরদের শাড়ি। সালোয়ার-কামিজও ছিল ছিটকাপড়ে তৈরি অতি সাধারণ। রঙের তেমন বৈচিত্র্য ছিল না বললেই চলে। মেয়েরা ফুলের তৈরি গহনায় নিজেকে সাজাতো। পায়ে পরতো আলতা। ছিল ঘটিহাতা ব্লাউজের চল। একটু উঁচুতে কপালে টিপ আর বল খোঁপা ছিল তখনকার শৌখিন রমণীর সাজ। ছেলেদের পোশাক ছিল ধুতি, লুঙ্গি, পায়জামা আর পাঞ্জাবি। পাঞ্জাবি ছিল অতি সাধারণ সোজা-সাপটা ডিজাইন। শিশুদের পোশাকও ছিল খুব সাদাসিধা।


সময়ের পালাবদলে পোশাকের ভাবনাতেও আসে পরিবর্তন। অধুনা ওই পরিবর্তনই আজ ফ্যাশন। রঙে এসেছে বৈচিত্র্য। যুক্ত হয়েছে আনন্দের সব রঙ ও হরেক নক্শা। এবার বৈশাখী ফ্যাশনের তুঙ্গে ছিল রঙধনুর রঙে রাঙানো পোশাক। পুরো শাড়িতে রঙধনুর রঙ অথবা সাদা শাড়ির ওপর রঙধনুর ছোঁয়া। লাল-সাদা রঙ তো রয়েছেই, কিছু নতুন রঙও প্রাধান্য পেয়েছে বিগত বছরগুলোয়। যেমনÑ কমলা, হলুদ, সবুজ, সোনালি, বাসন্তী ও নীল রঙ। অনেক আগে থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছিল টেইলর মাস্টারদের ব্যস্ততা, বুটিক হাউসে নকশার সেলাই, ব্লক-বাটিকের কাজ, ডিজাইনারদের কাছে সিরিয়াল দেয়া। হয়েছে উপচে পড়া ভিড় ফ্যাশন হাউসগুলোয়। এবারও চুটিয়ে ব্যবসা করেছে কাপড় ব্যবসায়ী ও ফ্যাশন
হাউসগুলো। টপ ডিজাইনারের পোশাক এখন ফ্যাশনেবল প্রত্যেক ছেলে-মেয়ের স্বপ্ন। পহেলা বৈশাখ বর্ণিল হয়ে ওঠার দিন। তাই অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছিল এ-দোকান, ও-দোকান ঘোরাঘুরি। নিজের ও পরিবারের জন্য সাধ্যমত সকলে বেছে নিয়েছে ফ্যাশনেবল পোশাকটি। সাধারণ সাজেও বাঙালি হয়ে উঠেছিল দৃষ্টিনন্দন ও আকর্ষণীয়। একরঙা সুতির শাড়িতে চিকন পাড়, কপালে বড় টিপ বৈশাখের জন্য একটি আকর্ষণীয় সাজ। বাঙালি স্টাইলে শাড়ি পরলেও বেশ

মানায়। কেউ আবার পছন্দ করেন জামদানি, সিল্ক ও গরদ। গরমের কারণে অনেকে সালোয়ার-কামিজে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। তবে উৎসবটি একেবারেই দেশীয় সংস্কৃতির। ফলে মেয়েদের জন্য শাড়ি আর ছেলেদের জন্য পাঞ্জাবিই হবে ট্রাডিশনাল।
বৈশাখের সাজের জন্য মাটির গহনাই উত্তম। মাটির মালা হতে হবে লম্বা। আবার কাঠ, রুপা, মুক্তা বা সুবাসিত ফুলের গহনাও ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী ফ্যাশনের অন্তর্গত। বাহারি ফুলের মৌসুম এখন। তাই ফুলের গহনায় মনের মত করে সেজেছে মেয়েরা। শাড়ির পাড়ের সঙ্গে মানানসই রঙের গার্নেট বা কুন্দনের গহনাও বেশ জনপ্রিয়। হাতভর্তি চুড়ি না থাকলে বাঙালি নারীর সাজ থেকে যায় অপূর্ণ। গহনা না পরলেও হাতভর্তি রেশমি কাচের চুড়ি সাজে আনে পূর্ণতা। মাটি বা কাঠের চুড়িও বেশ জনপ্রিয়। শাড়ির রঙের সঙ্গে ম্যাচ করা টিপ, পায়ে আলতা আর মানানসই নূপুর ঝলমলিয়ে দেয় উচ্ছল তরুণীর সাজ। এমন একদল তরুণীকে দূর থেকে মনে হয় যেন একঝাঁক পরী।

মেয়েদের পছন্দের তালিকায় এখন দেখা যাচ্ছে বুকে ও হাতে রঙবেরঙের লেস দিয়ে কাজ করা এন্ডিকটন কামিজ, লং টপসের সঙ্গে ফুল কটন খাদি কামিজ, সাদা জর্জেট কাপড়ে লাল পাড় অথবা লাল জর্জেট কাপড়ে গোল্ডেন পাড়ের আনারকলি। স্কিন প্রিন্টের ওপরে সুতার কাজ অথবা কালারফুল সেডের দোপাট্টা।শাড়ির সঙ্গে ম্যাচিং চুড়ি, জুতা ও ব্যাগ এখন আর কোনো বাহুল্যতা নয়, সাজেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। হরেক রঙের কাপড়, চামড়া, জুটের তৈরি ব্যাগ ও ছোট বটুয়া বা ক্লাচ পার্স বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। কবিতা আবৃত্তি, বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথের গান ও কবিতা আবৃত্তিতে চোখে ভেসে ওঠে জামদানি শাড়ি, বেলোয়ারি চুড়ি অথবা পাথরসেটের গহনা। এছাড়া কপালে বড় টিপ, পায়ে আলতা ও নূপুর এবং হাতে মেহেদির আলপনা, চুলে বেলি ফুলের মালা। তাই অনুষ্ঠানের শিল্পীরা ওই ধরনের সাজটিকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। ইদানীং স্বামী-স্ত্রী, প্রেমিক-প্রেমিকা, ভাই-ভাই, বোন-বোন, ভাই-বোন অথবা ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মধ্যে ম্যাচিং পোশাক পরার ধুম পড়েছে বেশ। ম্যাচিংটি হয় একই রঙের অথবা কন্ট্রাস্টে।

ভাবনাটি ফ্যাশন সচেতন মানুষের মধ্যে বেশ আলোড়ন তৈরি করেছে। চেয়ে চেয়ে দেখার মতোই এক দৃশ্য যেন! বিগত বছরগুলোয় ছেলেদের পাঞ্জাবির সঙ্গে যোগ হয়েছে উত্তরীয়। পাঞ্জাবির রঙের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উজ্জ্বল রঙের উত্তরীয় বৈশাখের আমেজে বেশ মানিয়ে যায়। তরুণরা হাতে ঘড়ি অথবা পাঞ্জাবির রঙের বালা পছন্দ করছেন। ছেলেরা পছন্দ করছে পাতলা খাদি কাপড়ের ওপর বিভিন্ন রকমের প্যাচওয়ার্ক, কাঁথা ফোড়ের কাজ, বুকের প্লেটে ঘন লুপ বোতামের ডিজাইন, হাতে প্যাচওয়ার্ক কাজের পট্টি দিয়ে দৃষ্টিনন্দন নকশা। ছোটদের পোশাক মা-বোনরাই নির্বাচন করে থাকেন। তবে ছোটদের পছন্দতেও এখন অগ্রাধিকার দেয়া হয়। ছোটদের জন্যও আলাদাভাবে তৈরি হচ্ছে বৈশাখী পোশাক। অথচ ওই ভাবনা অতীতে ছিলই না।
বাঙলা নববর্ষ বাঙালির ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি। নতুন বছরটিকে বরণ করা বহু বছর ধরে এ দেশের সংস্কৃতিতে চলে আসছে। বর্ণিল পোশাক, পরিবর্তনশীল পোশাক এই সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। সংস্কৃতির ঐতিহ্য বজায় রেখেই চলে পোশাকের বিবর্তন। সরকারের একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ ‘বৈশাখী ভাতার ব্যবস্থা’। এ কারণে পোশাক নির্বাচনে এখন আর কার্পণ্য নয়। তাই, ছোট-বড় সবাই নতুন পোশাকে নিজেকে সাজিয়ে সজীব করে তুলেছে নববর্ষের আনন্দ। ১৪২৫ সনের নতুন সূর্যালোক পুরনো বছরের অন্ধকার সরিয়ে নতুন আলোয় ভরে তুলুক নতুন বছরÑ এই প্রত্যাশা করি।

 

মডেল : জেনিন, অবনী, শাকিব, সাফা
সান, লিন্ডা, হিমেল, মিষ্টি ও আদি
ছবি : স্বাক্ষর জামান
মেকওভার : পুতুল ওয়াংশা ও সুমন রাহাত
পোশাক : আর রাফিউ. রাকিব খান
লেখা : ফারজানা মুল্ক তটিনী

 

মঙ্গল শোভাযাত্রা
বাঙালির একটুকরো স্বপ্ন

জোসী চৌধুরী

 

পুবের আকাশে বিশাখা নক্ষত্রের উদয়ের সঙ্গে নিসর্গে আসে নবপ্রেরণা, চৈতালী ফসল বিক্রির ধুম পড়ে যায় গ্রাম-গঞ্জের হাট-বাজারে। জমির খাজনা, মহাজনী ঋণ, মুদি দোকানের দেনা পরিশোধ করে কৃষক পান মুক্তির আনন্দ। বৈশাখ মাসেই শুরু হয় বণিকদের হালখাতা উৎসব, দেনা-পাওনার হিসাব। অন্য এক ভাবনায় বাঙালির হালখাতা উৎসব মানেই মিঠাই-ম-া আর জিলাপি, অমৃত্তি, রসগোল্লা আর ফুলকো লুচির সমাহার। বৈশাখী উৎসব শুধু বাঙালির উৎসব নয়- চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, সাংমা, তঞ্চঙ্গা, গারো,  সাঁওতালসহ সবার কাছেই প্রিয় উৎসব। সবাই নিজস্ব ঐতিহ্য ধারণ করে যোগ দেন মঙ্গল শোভাযাত্রার সঙ্গে। বাংলাদেশের পাহাড়ে পাহাড়ে বৈশাখ ঘিরে শুরু হয় ‘বিষু’ পর্ব। ২৯ চৈত্র রাত থেকে বৈশাখের দ্বিতীয় দিন পর্যন্ত ওই উৎসব। চৈত্র সংক্রান্তির দিনে মহাধুমধামে খাওয়া হয় চিড়া-মুড়ি-দই। চাকমাদের কাছে এ পর্বের নাম ‘বিজু’, অসম বা অহোমিয়াদের কাছে ‘বিহু’, ত্রিপুরাদের কাছে ‘বৈসু’, বোমরাদের কাছে ‘কুমঠার’, খুমিদের কাছে ‘সাংক্রাইন’, রাখাইনদের কাছে ‘সাংগ্রাইন’ ও তঞ্চঙ্গাদের কাছে ‘বিষু’।


নববর্ষ উৎযাপিত হয় পৃথিবীর দেশে দেশে। নববর্ষ নিয়ে সংস্কার বা কুসংস্কারেরও অভাব নেই। ইংল্যান্ডবাসী মনে করেন, বছরের প্রথম দিন যে মানুষের সঙ্গে দেখা হবে তার মাথার চুল যদি লাল হয়, তিনি যদি অসুন্দর নারী হন তাহলে ওই বছরটি হবে অবশ্যই দুর্ভাগ্যের। কালো চুলের অধিকারী কোনো মানুষ কিংবা রুটি, টাকা অথবা হাতে লবণ নিয়ে আসা কারো সঙ্গে প্রথম দেখা হলে বুঝতে হবে তার জন্য বছরটি হবে আনন্দঘন। ইংল্যান্ডের ছেলেমেয়েরা নববর্ষে কাকডাকা ভোরে ঘুম থেকে উঠে প্রতিবেশীদের বাড়িতে গান গাইতে গাইতে যায়। প্রতিবেশীরা তাদের হাতে আপেল, মুখে মিষ্টি, পকেটে ভরে দেয় পাউন্ডের চকচকে মুদ্রা। আরেকটি মজার ব্যাপার হলো, ইংল্যান্ডের অনেক মেয়ে ভোরের প্রথম প্রহরে ডিমের সাদা অংশ ছেড়ে দেয় পানিতে সুপাত্রের সঙ্গে বিয়ে হবে বলে। লন্ডনবাসী ট্রাফালগার স্কয়ার অথবা পিকাডেলি সার্কাস-এ সমবেত হয়ে বিগবেন-এর ঘণ্টাধ্বনি শোনেন, স্বাগত জানান নববর্ষের, প্রার্থনা করেন গ্রেট বৃটেনের সমৃদ্ধির জন্য। সমুদ্র ও নদী বন্দরে নোঙর করা জাহাজে বাজতে থাকে নববর্ষের আগমনী বার্তা।


জাপানিজরা জানুয়ারি মাসের প্রথম দিন নববর্ষ হিসেবে উদযাপন করেন। শহরের সব দোকান, অফিস-আদালত বন্ধ করে তারা পরিবারের সবাইকে নিয়ে উদযাপন করেন জাপানিজ লোকসংস্কৃতির আমেজে। দড়ি দিয়ে খড়কুটো বেঁেধ ঘরের সামনে তারা ঝুলিয়ে দেন ভূত-প্রেত ও শয়তানের গৃহে প্রবেশ বন্ধ হবে বলে। নববর্ষটিকে জাপানিজরা বলেন ‘উশাগাটুসু’। সিন্টো ধর্মের মানুষ বছরের প্রথম দিন প্রার্থনা করে সুখ ও সৌভাগ্যের প্রত্যাশায়। কোরিয়ানরা নতুন বছরটিকে বলে ‘সোল-নাল’। নতুন কাপড় পরে শিশুরা পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রণাম করে আশীর্বাদের প্রত্যাশায়। তারা ‘টুক্কক’ নামক সুপ খায় চালের পিঠা দিয়ে। তাদের বিশ্বাস, সুপ খেলে বয়স বাড়ে। অনেক কোরিয়ান বয়সের হিসাব করেন নববর্ষ ধরে, জন্মের হিসাবে নয়।


আমেরিকায় আতশবাজি ও নাচ-গানের মধ্যে নিউ ইয়র্ক-এর টাইম স্কয়ারে নববর্ষের প্রতি স্বাগত জানায় উৎফুল্ল মানুষ। গাড়িতে হর্ন বাজানো হয় এবং সমুদ্র বন্দরে জাহাজের সাইরেন বাজানো হয় নাবিকদের যাত্রা শুরু হবে বলে। দক্ষিণ আমেরিকায় মধ্যরাতে নববর্ষের প্রথম প্রহরে বাড়ির জানালা দিয়ে ঘরের নোংরা পানি ছুড়ে মারা হয় যেন গত বছরের সব অশুভ শক্তি বহিষ্কার হয়ে যায়। পর্তুগিজরা রাত ১২টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে ১২টি আঙুর খান আগামী ১২ মাস যেন খেয়ে-পরে সুখে-শান্তিতে কাটে। বলিভিয়ায় বাড়ির আঙিনায় কাঠের পুতুল সাজিয়ে রাখা হয় যেন বছরটি ভালোভাবে কাটে। মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডে নববর্ষে একে অন্যের গায়ে পানি ছুড়ে দেয়া হয়। ওই পানিতে ভিজে যাওয়ার অর্থ আত্মশুদ্ধির অভিযান। চীনের মানুষ নববর্ষে ড্রাগন ও সিংহের প্রতীক নিয়ে নাচ-গান করে। ড্রাগন হচ্ছে দীর্ঘায়ু ও সিংহ বীরত্বের প্রতীক।


কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডে নববর্ষ পালিত হয় বাংলা নববর্ষের কাছাকাছি সময়। বাংলাদেশে নববর্ষ ঘিরে দুটি অনুষ্ঠান পালিত হয়- চৈত্র সংক্রান্তিতে ভূত-প্রেত ও অপদেবতা তাড়ানোর সংস্কৃতি এবং নববর্ষ উদযাপন। বাংলাদেশে আরো দুটি উৎসব পালিত হয়। তা হলো মহরমের তাজিয়া মিছিল ও জন্মাষ্টমীর মিছিল। দুটি মিছিলই প্রধানত ধর্মীয় অনুভূতিরই বহিঃপ্রকাশ। বৈশাখের শোভাযাত্রা অসাম্প্রদায়িক ও সর্বজনীন সংস্কৃতির অঙ্গ।
বাংলাদেশের মঙ্গল শোভাযাত্রা এমন বিরল একটি সাংস্কৃতিক মিছিল যার নয়ানাভিরাম রূপ, মিছিলকারীদের পোশাক, চিত্রকলার উৎকর্ষ, চারুকলার রচনাশৈলী পুরো বিশ্বে অনন্য। বাংলাদেশে বাংলা নববর্ষবরণ শোভাযাত্রা থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রার রূপান্তরের স্বপ্ন দেখার কারিগর ও আমার অগ্রজতুল্য মাহবুব জামাল শামিম। তাঁর সঙ্গে আলাপচারিতায় জানা গেল, কেন বর্ষবরণ মঙ্গল শোভাযাত্রার সূচনা যশোর থেকে এবং তা ঢাকা থেকে কেন নয়?
উত্তরে মাহবুব জামাল শামিম বলেন, ‘‘চারুশিল্পের চর্চা ও আন্দোলন চিরকাল রাজধানীকেন্দ্রিক কেন থাকবে? আমাদের প্রজন্ম আকাক্সক্ষা করেছিল দেশজুড়ে শিল্প চর্চার প্রসার ঘটবে- জেলায় জেলায়, প্রত্যন্ত অঞ্চলে।

এরই সূচনা হিসেবে প্রতীকীভাবে জেলা শহর যশোরে ‘চারুপীঠ’ নামে শিল্পের চর্চা, গবেষণা ও সমাজিকায়ন প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করেছিলাম। আমরা অনুভব করেছিলাম শিশুরাই শিল্পের বীজ বপনের উত্তম ক্ষেত্র। তাই চারুপীঠের প্রথম কর্মসূচি হলো বিশাল কলেবরে শিশুদের আঁকা-গড়ার বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা। ওই বিদ্যালয়ের প্রাণবন্ত শিশুদের নিয়ে আনন্দময় মঙ্গল শোভাযাত্রা উদ্ভাবন, স্বাধীন বাঙালির জীবনে নতুনভাবে শিল্প ও ঐতিহ্য চর্চার পথ সূচিত হলো। ঢাকার বাইরে থেকেও যে কোনো শিল্প আন্দোলনের উদ্যোগ নেয়া যায় এবং সেটি সারা দেশে গ্রহণযোগ্য হয় তা প্রমাণিত হয়ে যায়। মঙ্গল
শোভাযাত্রা আজ জাতীয় উৎসবে পরিণত এবং আন্তর্জাতিক মহলে স্বীকৃত হয়েছে।”
বর্ষবরণ মঙ্গল শোভাযাত্রা বাঙালির জীবনে শিল্প চর্চা আর হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার সার্থক উৎসব উদ্ভাবন- কোন অনুভূতি আপনাকে প্রেরণা জুগিয়েছিল।
উত্তরে শামিম বলেন, ‘ আমাদের বাঙালি জীবন আচরণে আঁকা, গড়া, নৃত্য, গীত, বাদ্য, আনন্দ, ঐতিহ্য উৎসব ফিরিয়ে আনার পথ কী হতে পারে তা নিয়ে আমরা ভাবনায় ছিলাম। তখনকার সমাজ শিল্পবিবর্জিত, ঐতিহ্য থেকে বিচ্যুত অচলায়তন। কেউ নাচতে জানে না, প্রাণখুলে গাইতে পারে না, মনের মতো সাজতে পারে না, গুণহীন জড়তায় বন্দিদশা। স্বাধীন বাংলাদেশের সবাই যেন রাজা হতে পারে এমন উৎসব চেয়েছিলাম। উৎসব ঘিরে শিল্পীকুলের বিশাল সৃষ্টিশীল ব্যস্ততা সৃষ্টি করে হারানো ঐতিহ্য ফিরে পাওয়ার এক মহাউৎসব চেয়েছিলাম। চিরকালের চেনা ছবি, মঞ্চে কয়েকজন নৃত্য, গীত করেছে আর বাকি সবাই ¯্রােতা দর্শক.... তা আর নয়। আমাদের এ নতুন উৎসবে সবাই রাজা-রানি, রাজকুমার-রাজকুমারী, নায়ক-নায়িকা, ফুল-পাখি, প্রাণী-পতঙ্গ, সরীসৃপ, যা ইচ্ছা তা-ই, সবাই অভিনেতা। অপরূপ সাজে কৌতুক উল্লাসে নাচবে, গাইবে, উপস্থাপন করবে নানান দৃশ্যপট। ঢাক-ঢোল-সানাইয়ের সুর তালে আপ্লুত হয়ে আবালবৃদ্ধবনিতা, শিশু তারুণ্য ফিরে পেয়ে জেগে উঠবে, নেচে উঠবে। এ উৎসব যাপিত জীবনে সব শিল্পের চর্চা প্রতিষ্ঠা করবে। ঐতিহ্যের সব রঙ-রূপ ধারণ করবে। জড়তামুক্ত, গুণী, রসিক প্রাণখোলা রঙিন উপভোগ্য বাঙালি জীবনের অভিযাত্রা বর্ষবরণ শোভাযাত্রা। এমন সব অনুভূতি থেকে ১৯৮৫ সালে যশোরের সব সাংস্কৃতিক সংগঠনের সমন্বয়ে চারুপীঠ ওই সামাজিক মহাউৎসব রীতির জন্ম দিয়েছিল। মুকুট-মুখোশ, লোকশিল্পের নানান মোটিফের ওই উৎসব রীতি প্রতি বছর উন্নতি সাধনের মাধ্যমে পরে ১৪০০ ও ১৪০১ বঙ্গাব্দ বরণ উৎসবে মঙ্গল শোভাযাত্রা সফলতার চূড়ান্ত মাত্রা পেয়েছিল।’

১৯৮৯-৯০ সালে চারুকলা ইনস্টিটিউটে মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রস্তুতিলগ্নে আপনার উদ্যোমী দিনগুলো দেখার মতো ছিল। এ সম্পর্কে বলুন ‘হ্যাঁ, উৎসব দেশময় ছড়িয়ে দেয়ার মিশন নিয়েই এসেছিলাম রঙ-রূপের উৎসবের আগুন জেলে দিতে।’ আপনার উৎসাহ ও উদ্দীপনায় ১৯৯০ সালে ময়মনসিংহ ও বরিশালেও মঙ্গল শোভাযাত্রা সংগঠিত হয়েছিল। তা কীভাবে, ‘চেয়েছিলাম চারুকলার শিক্ষার্থীরা তাদের নিজ অঞ্চলে ওই উৎসবের আলো ছড়িয়ে দিক। আমিও ১৯৮৯-৯০ সালে ঢাকায় মঙ্গল শোভাযাত্রার মোড়ল ছিলাম না। ঢাকা চারুকলায় মঙ্গল শোভাযাত্রা সংগঠিত করে দিয়েই যশোরে নিজের অঞ্চলে পঞ্চম ও ষষ্ঠতম শোভাযাত্রার নেতৃত্ব দেয়ার জন্য ফিরে গিয়েছিলাম। এখন পর্যন্ত বাঙালি উৎসবের দুর্গ হিসেবে যশোরেই গড়ে তোলার ধারাবাহিক সাধনা অব্যাহত রেখেছি।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলায় মঙ্গল শোভাযাত্রা আয়োজনে কারা ভূমিকা নিয়েছিলেন, এই প্রশ্নের উত্তরে  শামিম জানান, ‘তরুণ ঘোষ, শিশির ভট্টাচার্য, নিসার হোসেন, হীরণ¥য় চন্দ, ফজলুল করিম কাঞ্চন বাঙালি মুখোশের ধরন ও বাঙালি নকশা সচেতনতা গড়ে দিয়েছিলেন। সাইদুল হক জুইস পেপার ফোল্ডিং মুখোশে যুক্ত করে মঙ্গল শোভাযাত্রায় আধুনিক ও আশ্চর্য সুন্দর মাত্রা তৈরি করেছিলেন। পরে মাহবুবুর রহমান যোগ দিয়েছিলেন।’


প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং জেলায় জেলায় মঙ্গল শোভাযাত্রার কিছুটা ভিন্নতা ও বৈচিত্র্য থাকা উচিত বলে আপনি মনে করেন?
শামিম জানান, ‘হ্যাঁ। তা না হলে একঘেয়ে হয়ে যায়, শিল্প থাকে না। নড়াইলে শিল্পী এসএম সুলতানের বজরা নৌকাটির সঙ্গে শত শত নৌকা নকশা পরিকল্পনা করে চিত্রার বুকে পানিপথে মঙ্গল শোভাযাত্রার রেওয়াজ যদি হয় তাহলে কেমন হবে বুঝে নেন? জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরূপ প্রাকৃতিক পরিবেশে চলমান থিয়েটার, নৃত্য ও লোকফর্মের নানান পারফর্মিং সহযোগে বিচিত্র ভাবনা নিয়ে শোভাযাত্রা করার সুযোগ রয়েছে। ওই চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মঙ্গল শোভাযাত্রার কর্মকা- চোখে পড়ার মতো। সব অঞ্চলেরই একটু আলাদা মেজাজে হওয়ার সুবিধা তো থাকেই।’হিন্দু সৌর পঞ্জিকা অনুসারে বাংলা মাস গ্রেগরীয় পঞ্জিকার এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি থেকে গনণা করা হতো। হিন্দু সৌর বছরের প্রথম দিন আসাম, বঙ্গ, কেরল, মনিপুর, নেপাল, উড়িষ্যা, পাঞ্জাব, তামিলনাড়– ও ত্রিপুরার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে পালিত হতো। নববর্ষ তখন আর্তব বা ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে পালিত হতো। কৃষকের কাছ থেকে খাজনা আদায়ের সুষ্ঠুতা প্রণয়নের জন্য মোগল স¤্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। তিনি প্রাচীন বর্ষপঞ্জিতে সংস্কারের আদেশ দেন। ওই সময় বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেউল্লাহ সিরাজি সৌর সন এবং আরবি হিজরি সনের ওপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সন বিনির্মাণ করেন। ১৫৮৪ খৃস্টাব্দের ১০ বা ১১ মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। তবে কার্যকর হয় ১৫৫৬ খৃস্টাব্দের ৫ নভেম্বর থেকে স¤্রাট আকবরের সিংহাসনে আরোহণের সময়। প্রথমে নাম দেয়া হয় ফসলি সন, পরে বাংলা সন বা বঙ্গাব্দ।

ক্যানভাসের কবি কালিদাস

 

শিল্পরসিকদের নানাভাবে মোহবিষ্ট করার ক্ষমতা রাখেন যে চিত্রশিল্পী তিনি আর কেউ নন বাংলাদেশের প্রথিতযশা নিরীক্ষাধর্মী কাজের জন্য বিখ্যাত কালিদাস কর্মকার। এই চিত্রশিল্পীকে এখনো ছুঁতে পারেনি বার্ধক্য। তাঁর কাজে-কর্মে, শিল্পবোধে তাই ছুঁয়ে যায় তারুণ্যের উচ্ছ্বলতা। তাঁর ছবিতে মানবীয় অভিজ্ঞতা, জ্ঞাতী সম্পর্কের ভাষা ইত্যাদি মুহূর্তেই মূর্ত করে তোলেন। তার ছবির শেকড় গাঁথা এ জনপদেরই মাটিতে। অ্যাক্রিলিক, মিশ্র মাধ্যম, গোয়াশ, কোলাজ, ওয়াশি, মেটাল কোলাজ, ড্রইং, ডিজিটাল লিথো, মিশ্র- নানান মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলেন জীবনের উপজীব্য। জীবন প্রণালি, নানান ধর্মের সমন্বয়, লোকশিল্পের বিভিন্ন প্রতীক উপাদান হিসেবে চলে আসে তাঁর বিস্ময়কর শিল্প সৃষ্টিতে। তাঁর চিত্রকলায় এ জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন উত্থান উপাখ্যান ও আন্দোলনের অনুষঙ্গে এসেছে যখন হাতের যা কাছে পেয়েছেন তা দিয়েই। তাঁর ছবিতে ধরা পড়েছে মৃত্যুমুখ যোদ্ধার যন্ত্রণাকাতর অভিব্যক্তি, এসেছে আবহমান বাঙালির ষোল কলাসহ নানান বিষয়। তাঁর এসব অনবদ্য সৃষ্টির কোথাও অস্পষ্টতাও দেখা যায়নি।

এবছরে একুশে পদকে ভূষিত খ্যাতনামা এ শিল্পীর সাথে সহজের কথোপকথনে উঠে এসেছে শিল্পীজীবনের নানা উপাখ্যান। শিল্পী হয়ে ওঠার গল্পে তিনি বললেন, ‘যেহেতু আমি কর্মকার পরিবারের সন্তান সেহেতু শৈশবেই বড়দের দেখাদেখি আঁকতে শুরু করি। ওই সময় কলকাতা থেকে জয়নুল আবেদিনসহ অন্য কয়েক প্রথিতযশা শিল্পী এসে ঢাকায় আর্ট কলেজ স্থাপন করলে স্কুল জীবন শেষে ঢাকা ইনস্টিটিউট অফ আর্টস-এ ভর্তি হই এবং ১৯৬৩-৬৪ সালে চিত্রকলায় আনুষ্ঠানিক ডিগ্রি লাভ করি। এরপর কলকাতার গভর্নমেন্ট কলেজ অফ ফাইন আর্টস অ্যান্ড ক্রাফট থেকে ১৯৬৯ সালে প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান নিয়ে চারুকলায় ¯œাতক ডিগ্রি অর্জন করি।’

সহজের প্রশ্ন ছিল আপনি নিজেকে কোন ঘরানার শিল্পী বলে মনে করেন? তিনি কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে বলেন, ‘নিজেকে র্শিল্পী মনে করি না আমি। সারা জীবন নতুন কিছু করতে চেয়েছি। যা কিছু করেছি সবই নিরীক্ষা। সারা বিশ্বে ছোটাছুটি করে কাজ করতে পছন্দ করি যাতে আমাদের চিত্রশিল্প আধুনিক থেকে আধুনিক হয়ে ওঠে।’
আপনার ক্যানভাসে কী বলতে চান এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমি ছবি আঁকি নিজের জন্য, দেশের জন্য মানুষ নিয়ে আমার বেদনার কথা বলতে চাই ক্যানভাসে।

প্রদর্শনী বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে, বললেন- দেশে-বিদেশে এ পর্যন্ত আমার নির্বাচিত চিত্র প্রদর্শনীর সংখ্যা ৭১। এছাড়া আন্তর্জাতিক দলবদ্ধ বহু প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেছি।
নিরীক্ষাধর্মী কাজ করতে আপনার কেমন লাগে? তিনি বললেন, ‘আমি দেশে তো করিই। তাছাড়া ভারত, পোলান্ড, ফ্রান্স, জাপান, আমেরিকায় আধুনিক শিল্পের বিভিন্ন মাধ্যমে উচ্চতর ফেলোশিপ নিয়ে সমকালীন দেশ-বিদেশে কাজের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চলেছি। ফ্রিল্যান্স শিল্পী হিসেবে এসব করছি সেই ১৯৭৬ সাল থেকে।’
ছাপচিত্র সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে আমিই প্রথম ছাপচিত্রের প্রচলন করেছি। এটা এখন ঘরে-ঘরে হচ্ছে।’
মূর্ত ও বিমূর্ত প্রশ্নে, তিনি বলেন, ‘পৃথিবীতে বিমূর্ত বলে কিছু নেই। সবকিছুই মূর্ত। সবকিছু নির্ভর করছে আপনার চোখ ও মন ওই জিনিসটিকে কীভাবে বা কত গভীরভাবে দেখছে এর ওপর। আপনি একটি শিশির ফোঁটা একটি ঘাসের ডগাতে দেখলে তা সেভাবেই দেখেন। কিন্তু তা কখন কোন রঙের বিচ্ছুরণ ঘটায় সেটিই কোনো শিল্পী তার চিত্রে ধারণ করেন। এটিকেই আমরা বিমূর্ততা বলি। আসলে সবই মূর্ত।’

খ্যাতিমান শিল্পী হিসেবে বর্তমানে আমাদের শিল্পাঙ্গনে কীসের অভাব বোধ করেন? উত্তরে বলেন, ‘বিশ্বের সব দেশে, এমনকি সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত একটি দেশেও যে জিনিসটি রয়েছে তা আমাদের এই স্বাধীনতাপ্রাপ্তির ৪৭ বছর পরও আমরা পেলাম না। অতি দুঃখ ভরে জানাতে হচ্ছে, আমাদের দেশে কোনো জাতীয় আর্ট গ্যালারি নেই। দেশের বিখ্যাত ১০ শিল্পীর শিল্পকর্ম এক সঙ্গে দেখা যাবে- এমন কোনো চিত্রশালা বা আর্ট মিউজিয়াম নেই। অথচ জাতীয় চিত্রশালা হলো কোনো দেশের সংস্কৃতি ও সভ্যতার ধারক-বাহক। আশা করি, স্বাধীনতার পক্ষের সরকার আমাদের এ দাবিটির বাস্তবতা অনুধাবন করে দ্রুত যথাযথ ব্যবস্থা নেবে। এছাড়া এটি যেহেতু খুব বড় খরচের ব্যাপার নয় সেহেতু ব্যক্তি পর্যায়েও অনেকে এগিয়ে আসতে পারেন।’

মানুষ ধীরে ধীরে এসব প্রর্দশনী ও ললিতকলার ব্যাপারগুলো থেকে দূরে চলে যাচ্ছে এর কারণ কী বলে মনে করেন? ‘এ ব্যাপারে দারিদ্র্যকে দায়ী করা যায় না। কিন্তু আমাদের বর্তমানের অবিশ্রাম যানজট জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। কোথায় কখন পৌঁছাতে

পারবো তা আমরা কেউই জানি না। রাস্তার মধ্যেই মানুষের মন মরে যায়, সুখ উড়ে যায়- সে কীভাবে তখন বিভিন্ন প্রদর্শনীতে যাওয়ার কথা চিন্তা করবে! এই যানজট আমাদের কাজের একটা অন্তরায়। এটি শুধু আমাদেরই নয়, রাষ্ট্রীয় অনেক কাজেই স্থবিরতা নামিয়ে এনেছে। এই অঞ্চলের মানুষের মন পলির মতোই নরম। রাজনৈতিক অস্থিরতা, ক্ষমতার লড়াই, বঞ্চনার শিকার ইত্যাদি কারণে মানুষের মন বসে যাচ্ছে। তবে এত অস্থিরতার পরও শেষ পর্যন্ত মানুষ জেগে উঠছে নিজস্ব পরিক্রমাতেই।’

শিল্পী না হলে কী হতে চাইতেন প্রিয় কালিদাস? ‘আমি কর্মকার পরিবারের সন্তান। জন্মের পরই দেখেছি আমাদের পরিবারের সবাই ভালোবেসে নিজের মন থেকে শিল্প সৃষ্টির কাজ করে যাচ্ছেন এবং সবাই মানসিক আনন্দে রয়েছে। আমিও হাতে কাজ তুলে নিই। শিল্পী হিসেবে কাজ করতে থাকি। দ্বিতীয় কোনো চিন্তা-ভাবনা করার সুযোগ আসেনি, চেষ্টাও করিনি। তাছাড়া আমার ছোট দুই ভাইও শিল্পী। তারা ইউরোপে কাজ করে পুরস্কৃত হয়েছে।’

পরিবার সম্পর্কে জানতে চাইলে শিল্পী জানান, ‘আমার দুই মেয়ে। তারা দু’জনই বিদেশে রয়েছে। আমার স্ত্রী বহুদিন আগেই পরপারে চলে গেছে। আমি এখন নিঃসঙ্গ জীবন কাটাচ্ছি আর শিল্প ভাবনায় ডুবে আছি।’
পুরস্কার ও প্রাপ্তি সম্পর্কে কোনো আক্ষেপ আছে? উত্তরে ক্যানভাসের কবি কালিদাস জানান ‘মানুষের ভালোবাসাই আমার সবচেয়ে বড় পুরস্কার। শিল্পকলার ‘শিল্পী সুলতান পুরস্কার’ পেয়েছি। এ বছর (২০১৮) ‘একুশে পদক’ পেলাম। আন্তর্জাতিকভাবেও অনেক পুরস্কার পেয়েছি।’

শিক্ষকতা করার প্রসঙ্গে বলেন, ‘না, কোথাও শিক্ষকতা করিনি, এখনো করছি না তবে, যাদের না করতে পারি না তারা বাসায় এসে কাজ শেখে। শিক্ষকতা বলতে যা বোঝায় সেটি বাসাতেই করি।’
মনের মতো ছবিটি এঁকেছেন কিনা প্রশ্নের উত্তরে হেসে বললেন, ‘না, তা পারিনি। তবে বহু ভালো ছবি এঁকেছি। বেঁচে থাকলে চেষ্টা চালিয়ে যাবো।’
শিল্পীর চেষ্টা অব্যাহত থাকুক। সহজের পক্ষ থেকে তাঁর প্রতি আমাদের আন্তরিক অভিবাদন।

 

প্রশ্ন ও সম্পাদনা : সহজ ডেস্ক
অনুলিখন : রাশেদ মামুন
ছবি : আরাফাত

জেমস কেমেরন

অরিন্দম মুখার্জী বিঙ্ক

 

টাইটানিক মানেই একটি জাহাজ ডুবে যাওয়া নয়, নয় জ্যাক আর রোজের প্রেম কাহিনী। বিশাল টাইটানিক সম্পর্কে আমাদের যেটুকু ধারণা এর সিকি ভাগই জন্ম দিয়েছে জেমস ফ্রান্সিস ক্যামেরনের সিনেমা।
তার জীবনের গল্পটিও অনেকটা চিত্রনাট্যের মতোই। জেমস ফ্রান্সিস ক্যামেরনের জন্ম ১৯৫৪ সালের ১৬ আগস্ট কানাডার অন্টারিও-তে। তার ছোটবেলা কেটেছে কানাডার ছোট্ট একটি শহরে। শহরের তীর ঘেঁষে বয়ে গেছে ছোট্ট একটি নদী। সেখানে রোজ খেলতেন তিনি। নায়াগ্রা জলপ্রপাত ছিল মাত্র চার বা পাঁচ মাইল দূরে। তাই পানির সঙ্গে তার একটা ভালোবাসার সম্পর্ক ছিল যা কাজেও বার বার উঠে এসেছে। জেমস ক্যামেরনের মা ছিলেন গৃহিণী আর বাবা ছিলেন প্রকৌশলী। মায়ের সঙ্গে দেখে আসা জাদুঘরের বিভিন্ন স্মারকের অবয়ব- সেটি হোক না পুরনো কোনো যোদ্ধার হেলমেট কিংবা মিসরীয় কোনো মমি। এসব কিছু ক্যামেরনকে আবিষ্ট করে রাখত। আবার প্রকৌশল চর্চাতেও আকর্ষণ ছিল প্রচ-। হতে পারে বাবার সম্মান ও পছন্দ ধরে রাখার জন্য এটি একটি চেষ্টা ছিল জেমস ক্যামেরনের পরিবার ১৯৭১ সালে যখন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় চলে আসে তখন তার বয়স ১৭ বছর। সেখানে তিনি ফুলারটন কলেজে পদার্থ বিজ্ঞান বিষয় নিয়ে ভর্তি হন। একাদশ গ্রেডের সময় তার জীবনের জন্য

গুরুত্বপূর্ণ ছিল। জীববিজ্ঞানের শিক্ষক ম্যাকেঞ্জি ঠিক করলেন স্কুলে একটা থিয়েটার বানাবেন। স্কুলে রেসলিং, ফুটবল, বাস্কেটবলের আয়োজন থাকলেও থিয়েটার ছিল না। ক্যামেরন ওই থেকেই কাজ শুরু করলেন। পুরোটাই ছিল একটি চ্যালেঞ্জ এবং সফলও হয়েছেন। সেটি সম্ভব করেছিলেন ম্যাকেঞ্জি। এটিই তার অভিনব একটি বৈশিষ্ট্য। এ জন্যই জীবনের সঠিক সময় এমন কিছু ব্যক্তিত্বের ভূমিকা অনস্বীকার্য যারা জীবন বদলে দেবেন, ভাবনাটি এগিয়ে নিয়ে যাবেন। ছাত্র হিসেবে তিনি ভালোই ছিলেন। তার ছিল জানার প্রতি তীব্র আকর্ষণ। কখনো প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক পড়াশোনা হয়নি যে কাউকে টপকে ভালো করতে হবে! তিনি জানতে ও শিখতে চাইতেন বিজ্ঞান, ইতিহাস, গণিত- সবকিছু। কিন্তু সেখানে বেশিদিন টিকতে পারলেন না। এক বছর যেতে না যেতেই ড্রপ আউট হয়ে গেলেন কলেজ থেকে।


এরপর জেমস ক্যামেরন ট্রাক ড্রাইভারের কাজ ও লেখালেখি করতেন। ওই সময়টাই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সায়েন্স ফিকশন পড়েছেন যা বাস্তবতা ও কল্পনার মাঝের রেখাটি ধীরে ধীরে অস্পষ্ট করে তুলেছে তাকে। বই আর লেখকদের অভিনব জগৎ তাকে অদ্ভুতভাবে টানতো। আর্থার ক্লার্ক, জন ভগট, হারলান এলিসন, ল্যারি নিভেনদের মাধ্যমে তিনি প্রভাবিত হয়ে যান আস্তে আস্তে। জেমস ক্যামেরনকে সবার থেকে আলাদা বানিয়ে দেয় চারপাশের পরিবেশ ও নিজের অভিনব ক্ষমতা। জীবনের ১০টি বছর এমনভাবে কাটিয়েছেন যেখানে তাকে শুনতে হয়েছে অনেক কটাক্ষ কথা। এরপরের ২৫ বছর তার চেষ্টা ছিল শুধু নিজেকে স্বাভাবিক মানুষ হিসেবে তৈরি করা। সফলতা সেখানে সামান্যই এসেছে। যতো পরিশ্রম করবে ততোই ভাগ্য তোমার সহায় হবে। দীর্ঘ পথের অর্জনে ‘সুযোগ’ বড় কোনো কিছু নয়। কিন্তু একটি মাত্র সুযোগ সবকিছু বদলে দিতে পারে। ২৫-২৬ বছর বয়সে ঠিক করলেন ছবি বানানো নিয়ে অগ্রসর হবেন। নিজেকে ভাবতে লাগলেন ছবি বানানোর কারিগর হিসেবে, পরিচালক হিসেবে নয়। এরপর ১৯৭৭ সালে একটি ঘটনা ক্যামেরনের জীবন পুরোপুরি পাল্টে দিল। যে ছবিগুলোর তেমন কোনো বাধাধরা প্যাটার্ন নেই সেগুলোই তার পছন্দের তালিকায় এসে হাজির হয়। তিনি দেখলেন, নিয়ম-কানুন তার জন্য ঠিক কাজ করে না। যেখানে অনেক হাঙ্গামা থাকবে, শব্দ থাকবে, অস্থিতিশীলতা থাকবে, পরিপূর্ণ কিছু নয়- সেখানেই তো নিজেকে উপস্থাপনের সুযোগ মেলে। যদি সবকিছু আগে থেকেই প্রস্তুত কিংবা টিপটপ হয়ে থাকে তাহলে জাদুকরী কোনো কিছু উপহার দেয়ার জন্য দরজাটা খোলা যায় না।

পরিচালকের মন থেকে মোহনীয় জাদুর স্পর্শটি প্রতিফলিত হয় না। এটি আসে অভিনয় কুশলীর আত্মার মধ্য থেকে। তিনি আন্দোলিত হয়েছেন ‘উডস্টক’, ‘দি গ্র্যাজুয়েট’, ‘বান অ্যান্ড ক্লাইড’, ‘দি গডফাদার’, ‘স্টার ওয়ারস’ প্রভৃতি ছায়াছবি থেকে। এসব চলচ্চিত্র দেখে বুঝতে পারলেন শিল্প ও বিজ্ঞান কতোটা কাছাকাছি থাকতে পারে! এরপর ট্রাক ড্রাইভারের চাকরি ছেড়ে দিয়ে ঝুঁকে পড়লেন চলচ্চিত্রের দিকে। ক্যামেরন দুই বন্ধুকে নিয়ে ১০ মিনিটের একটি বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী ‘জেনোজেনেসিস’ (ঢবহড়মবহবংরং)-এর স্ক্রিপ্ট লিখে ফেললেন। কিন্তু শুট করার মতো যথেষ্ট টাকা তাদের হাতে নেই। শেষ পর্যন্ত বন্ধুবান্ধবকে নিয়ে চাঁদা তুলে ৩৩ মিলিমিটার ক্যামেরা, লেন্স, ফিল্ম স্টক ও স্টুডিও ভাড়া করে ফেললেন। তারা ক্যামেরাটি পুরোটা খুলে এর বিভিন্ন অংশ পরীক্ষা করে দেখলেন এটা বোঝার জন্য যে, ফিল্ম ক্যামেরা কীভাবে কাজ করে।


ছবি বানানোর কথা শুনে ক্যামেরনের পরিবার কখনোই তেমন সন্তুষ্ট হয়নি। বাবা নারাজ ছিলেন। তিনি আসলে ক্যামেরনের ব্যর্থ হওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন। যেই মুহূর্তে ক্যামেরুন জানাবেন যে, ‘আমার আসলে প্রকৌশলী’ হওয়াই উচিত ছিল। মা অবশ্য অনেক আগে থেকে এ ধরনের সৃষ্টিশীল শিল্পের ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন। তাই আশ্চার্য এক গতি ছিল সেখানে যা তাকে দীর্ঘ সময়েও ওই পথ চলতে সাহায্য করেছিল। অবশ্য তা দেখতে পাওয়া ছিল দুষ্কর।
জেমস ক্যামেরন ছিলেন জেনোজেনেসিস-এর পরিচালক, লেখক, প্রযোজক ও প্রডাকশন ডিজাইনার। এরপর ‘রক অ্যান্ড রোল হাই স্কুল’ চলচ্চিত্রে কাজ করেন প্রডাকশন সহকারী হিসেবে। কিন্তু ওই কাজের জন্য তিনি কোনো স্বীকৃতি পাননি। তবুও থেমে না গিয়ে চলচ্চিত্র বানানোর কায়দা-কানুন নিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে লাগলেন। রজার কোরম্যান স্টুডিওতে একটি ক্ষুদ্র আকৃতির মডেল বানানোর কাজ শুরু করেন সে সময়। এরপর ১৯৮১ ও ১৯৮২ সাল- এই দু’বছরে চারটি চলচ্চিত্রে আর্ট ডিজাইনার, প্রডাকশন ডিজাইনার হিসেবে কাজ করেন।


জেমস ক্যামেরনের পরিচালিত চলচ্চিত্র ৭টি। পিরানহা মুভির সিক্যুয়াল ‘পিরানহা ২’-তে কাজ করার জন্য ইটালির রোমে যান। সেখানে ফুড পয়জনিংয়ের কারণে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ অবস্থায় একদিন রাতে ভয়ানক দুঃস্বপ্ন দেখেন। তা হলো ভবিষ্যৎ থেকে একটি রোবট পাঠানো হয়েছে তাকে খুন করার জন্য। ওই স্বপ্ন থেকেই তিনি তার ‘দ্য টারমিনেটর’ চলচ্চিত্রের আইডিয়া পান। বলা যায়, এখান থেকেই তার উত্থান শুরু। টাইটানিকের আয়ের রেকর্ড ভেঙে দেয় অ্যাভাটার। ১৪টির মধ্যে ১১টি ক্যাটাগরিতেই একাডেমি পুরস্কার বা অস্কার জিতে নেয় সিনেমাটি। জেমস ক্যামেরন পান সেরা পরিচালকের পুরস্কার। টাইটানিক সিনেমার জ্যাকের মতোই ক্যামেরন অস্কারের মঞ্চে উঠে বলেছিলেন, I am the king of the World!
অ্যাভাটারের ওই জনপ্রিয়তার কারণে ২০১০ সালে হলিউডের সবচেয়ে বেশি আয় করা পরিচালকদের মধ্যে এক নম্বরে চলে আসেন জেমস ক্যামেরন। তার সম্পর্কে সমালোচকদের প্রধান যে অভিযোগ তা হলো, তার লেখা স্ক্রিপ্টগুলোর কাহিনীর গভীরতা কম। তবে যে ধরনের সিনেমা তিনি তৈরি করেন সেখানে কাহিনীর গভীরতা থাকা হয়তো অতো আবশ্যকও নয়। কিন্তু পরিচালক হিসেবে তার সমালোচক খুব বেশি নেই। অভিনয় শিল্পীদের কাছ থেকে ষোলো আনা কাজ আদায় করার ক্ষেত্রে তার জুড়ি মেলা ভার। এই কারণে তার সঙ্গে কাজ করা অনেকের কাছেই দুঃস্বপ্নের মতো। তিনি শুটিং শুরু হওয়ার আগে সবার মোবাইল ফোন বন্ধ করে রাখতে বলেন যাতে তা কাজে বিঘœ ঘটাতে না পারে। সিনেমাটি বাস্তবসম্মত করার জন্য জীবন বাজি রাখতেও দ্বিধা বোধ করেননি তিনি। নিজের কাজে ডুবে থাকার কারণে পরিবারকেও সময় দিতে পারেননি বেশি একটা।

ফলে সংসারও ভেঙে গেছে তার। তাও একবার নয়, পাঁচবার! তবুও তিনি থেমে নেই। নাসার উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য জেমস ক্যামেরন। লাল গ্রহ মঙ্গলের গায়ে এখন এলিয়েন গ্রহের তকমা নেই। মঙ্গলই হবে আমাদের আগামীর গ্রহ। সাধারণ মানুষ যারা মহাকাশের গোপন রহস্য বোঝে না তারাও আজ মঙ্গলে মানুষের প্রতিনিধি দেখে খুশি হয়। কল্পনা এখন তাদের চোখের সামনে বাস্তবতা! মানুষ স্বপ্ন দেখতো আকাশ ছোঁয়ার। ওইসব ক্ষুদ্র মানুষের স্বপ্ন এখন মহাকাশে বসবাস।
ক্যামেরন ৬২ বছর বয়সেও যেভাবে এগিয়ে চলেছেন এতে মনে হয়, ওই স্বপ্নের বাস্তবতা অসম্ভব কিছু নয়। হলিউডে আরো অনেক দিন চলবে তার রাজত্ব- এটি নির্দ্বিধায় বলে দেয়া যায়।

দ্য বেস্ট বন্ড : রজার মুর

ঋভু অনিকেত

 

চলচ্চিত্রে অভিনয় করে যেমন মানুষকে আনন্দ দিয়েছেন তেমনি ব্যক্তি বা সামাজিক জীবনেও মানুষকে আনন্দ দেয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি। তিনি আর কেউ নন- জেমস বন্ড খ্যাত রজার মুর। যুক্তরাজ্যের স্টকওয়েল-এ ১৯২৭ সালের ১৪ অক্টোবর রজার মুরের জন্ম। তার পিতা জর্জ আলফ্রেড মুর পুলিশ অফিসার ছিলেন। ভারতের কলকাতায় এক ব্রিটিশ পরিবারে তার মা লিলিয়ান জন্মগ্রহণ করেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের কারণে রজার মুরকে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন স্কুলে লেখাপড়া করতে হয়েছে। তিনি একটি অ্যানিমেশন স্টুডিওতে শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ শুরু করেন। কিন্তু কাজে ভুল করায় তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। পুলিশে চাকরির সুবাদে একটি ডাকাতির কেইস তদন্ত করতে গিয়ে চলচ্চিত্র পরিচালক ডেসমন্ড হার্স্ট-এর সঙ্গে পরিচয় ঘটে তার বাবা আলফ্রেড-এর। তার বাবার অনুরোধে হার্স্ট ‘সিজার অ্যান্ড ক্লিওপাট্রা’ মুভিতে রজার মুরকে ছোটো একটি এক্সট্রা চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ দেন। সেটি ছিল ১৯৪৫ সাল।

ডেসমন্ড হার্স্টের উৎসাহে ও আর্থিক সহায়তায় রয়েল একাডেমি অফ ড্রামাটিক আর্টে ভর্তি হন রজার মুর। সেখানেই পরিচয় ঘটে পরবর্তীকালে তার সঙ্গে জেমস বন্ড মুভিতেসহ অভিনেত্রী হিসেবে মিস হানি পেনির চরিত্রে অভিনয় করা লুইস ম্যাক্সওয়েল-এর সঙ্গে। এরই মধ্যে ব্রিটিশ বাহিনীর সদস্য হিসেবে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধেও অংশগ্রহণ করেন তিনি। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে ক্যাপ্টেন পদ পর্যন্ত পদোন্নতি লাভ করেছিলেন রজার মুর। শুরুতে ‘পারফেক্ট স্ট্রেঞ্জার্স’ (১৯৪৫), ‘সিজার অ্যান্ড ক্লিওপাট্রা’ (১৯৪৫), ‘পিকাডেলি ইনি সডেন্ট’ (১৯৪৬)-এর মতো চলচ্চিত্রে তিনি কম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেন। পঞ্চাশের দশকের শুরুতে প্রিন্ট মিডিয়ায় মডেল হিসেবেও কাজ করেছেন কিছুদিন। ১৯৪৯ সালের ২৭ মার্চে ‘দি গভর্নেস’-এর মাধ্যমে তার টেলিভিশনে অভিনয় জীবন শুরু হয়।


আত্মবিশ্বাসী ও আকর্ষণীয় চেহারার অধিকারী রজার মুর ১৯৫৩ সালের দিকে আমেরিকায় পাড়ি দেন। সেখানে টেলিভিশনে অভিনয় জীবন শুরু করেন। ১৯৫৪ সালে ‘দি লাস্ট টাইম আই সি প্যারিস’ চলচ্চিত্রে একটা ক্ষুদ্র চরিত্রে অভিনয় করার জন্য বিশ্ব বিখ্যাত প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান মেট্্েরা গোল্ডিন মেয়ারের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন তিনি। টেলিভিশন সিরিজ ‘দি সেইন্ট’-এ অভিনয়ের মাধ্যমে আন্তর্জাতিকভাবে সারা বিশ্বে রজার মুরের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৬২ সাল থেকে শুরু হয়ে টেলিভিশন সিরিজ
দি সেইন্ট’-এর ১১৮টি অ্যাপিসোড প্রচারিত হয়। এর জোয়ার আমাদের দেশেও লেগেছিল। এটি সত্তরের দশকে বাংলাদেশ টেলিভিশনও প্রচার করে। ছবিটি তখনকার তরুণদের মধ্যে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে। এরপর ‘পারসুয়েডার্স’ (১৯৭১) সিরিজটিও বাংলাদেশ টেলিভিশনে নিয়মিত প্রচারিত হতো। আমরা এসব সিরিজ দেখার জন্য অপেক্ষায় থাকতাম। এভাবে তিনি বাংলাদেশেও জনপ্রিয় হন। এছাড়া ‘আইভান হো’ (১৯৫৮), ‘দ্য আলাস্কান’ (১৯৫৯) টিভি সিরিয়ালে অভিনয় করেন তিনি।
রজার মুর দীর্ঘদিন ধরে টেলিভিশন সিরিজ ‘দি সেইন্ট’-এ অভিনয় করার কারণে চলচ্চিত্র থেকে দূরে ছিলেন। তাছাড়া ‘দ্য সেইন্ট’-এর প্রযোজক ও পরিচালক হিসেবেও ব্যস্ত ছিলেন তিনি। জেমস বন্ড চরিত্রে অভিনয়কারী আরেক বিখ্যাত অভিনেতা শ্যন কনেরি। ‘বন্ড’ হিসেবে তিনি অসম্ভব জনপ্রিয়তা লাভ করেছিলেন। ১৯৬৬ সালে এসে ঘোষণা দিলেন, বন্ড চরিত্রে আর অভিনয় করবেন না। এরপরও ১৯৭১ সালে বন্ড সিরিজ ‘ডায়মন্ডস আর ফরএভার’ মুভিতে অভিনয় করেন শ্যন কনেরি। রজার মুরকে এ সময় জেমস বন্ড সিরিজের ‘লিভ অ্যান্ড লেট ডাই’ মুভিতে অভিনয় করার প্রস্তাব দেয়া হয়। ১৯৭৩ সালে ওই মুভি মুক্তি পায়। রজার মুর তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘এই মুভিতে অভিনয় করার জন্য আমাকে চুল ছোট করতে হয়েছে, ওজন কমাতে হয়েছে।’


শ্যন কনেরি অভিনীত শেষ মুভি ‘ডায়মন্ডস আর ফরএভার’-এর জনপ্রিয়তাকে ছাড়িয়ে যায় ‘লিভ অ্যান্ড লেট ডাই’। এরপর রজার মুরকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। মাঝখানে ‘শার্লক হোমস ইন নিউ ইয়র্ক’ (১৯৭৬) মুভিতে তিনি অভিনয় করেন। আর তিনিই একমাত্র অভিনেতা যিনি ‘জেমস বন্ড’ ও ‘শার্লক হোমস’- দুটি বিখ্যাত গোয়েন্দা বা থ্রিলার চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। ১৯৭৪ সালে নির্মিত হয় রজার মুর অভিনীত ‘জেমস বন্ড’-এর দ্বিতীয় মুভি ‘দি ম্যান উইথ গোল্ডেন গান’। এটি ব্যবসা সফল হলেও ‘লিভ অ্যান্ড লেট ডাই’কে ছাড়িয়ে যেতে পারেনি। এরপরের মুভি ‘দ্য স্পাই হু লাভড মি’ (১৯৭৭) বক্সঅফিসে সুপার-ডুপার হিট হয়। বন্ড চরিত্রে তার চতুর্থ মুভি ‘মুনরেকার’। এটিও ব্যবসা সফল হয়। ১৯৮১ সালে ‘ফর ইওর আইজ অনলি’ মুভি যখন মুক্তি পায় তখন তার বয়স ৫৪ ছাড়িয়ে গেছে। নতুনদের জন্য বন্ড চরিত্র ছেড়ে দিতে ইচ্ছা প্রকাশ করেন তিনি। তখন জেমস ব্রুলিন-কে ডাকা হলেও সুযোগ পাননি। তাই ১৯৮৩ সালে রজার মুরকে ‘অক্টোপুসি’ মুভিতে অভিনয় করতে হয়। শেষ পর্যন্ত ১৯৮৫ সালে ‘এ ভিউ টু কিল’ মুভিতে অভিনয়ের মাধ্যমে বন্ড চরিত্র থেকে তিনি বিদায় নেন। তিনিই একমাত্র অভিনেতা যিনি ১২ বছর ধরে টানা বন্ড চরিত্রে অভিনয় করেছেন। এই সময় তিনি সাতটি বন্ড মুভিতে অভিনয় করেন যা ছিল শ্যন কনেরির সমান।


রজার মুরই ছিলেন সবচেয়ে বেশি বয়সে বন্ড চরিত্রে অভিনয়কারী একমাত্র ব্যক্তি। ৪৫ বছর বয়সে ’লিভ অ্যান্ড লেট ডাই’ দিয়ে শুরু। ১৯৮৫ সালে যখন বন্ড চরিত্র থেকে অবসর নেন তখন তার বয়স ছিল ৫৮ বছর। জেমস বন্ড চরিত্র থেকে অবসর গ্রহণ করার বিষয়ে রজার মুরই বলেছেন, ‘বন্ডের চরিত্রে অভিনয় করার জন্য ৫৭ বছর খুব বেশি বয়স। আমার বিপরীতে যারা নায়িকার চরিত্রে অভিনয় করছেন, তাদের অনেকেই আমার মেয়ের বয়সী। তাদের সঙ্গে রোমান্টিক দৃশ্যে অভিনয় করা বেমানান।’
‘জেমস বন্ড’ মুভিতে অভিনয় করার পাশাপাশি রজার মুর অন্য চলচ্চিত্রেও অভিনয় চালিয়ে গেছেন। ‘লিভ অ্যান্ড লেট ডাই’ মুভির পর পরই উইলবার স্মিথের উপন্যাস অবলম্বনে ও পিটার হান্টের পরিচালনায় ’গোল্ড’ (১৯৭৪) মুভিতে অভিনয় করেন। এটি প্রচুর জনপ্রিয়তা লাভ করে। এই মুভির পারিশ্রমিক ছাড়াও তাকে এর লভ্যাংশ থেকে অতিরিক্ত দুই লাখ ডলার সম্মানী প্রদান করা হয়। সাফল্য যেমন আছে তেমনি ব্যর্থতাও আছে। ১৯৭৫ সালে একটি কমেডি মুভি ‘দ্যাট লাকি টাচ’-এ অভিনয় করেন রজার মুর। তা ছিল সুপার ফ্লপ।


রজার মুরের ব্যক্তিগত জীবনের গল্প : ১৯৪৬ সালে রজার মুরের বয়স যখন ১৮ বছর তখন তার চেয়ে ৬ বছর বেশি বয়সের ডর্ন ভন স্টেইন-কে বিয়ে করেন। জেমস বন্ড চরিত্রে বাঘা বাঘা ভিলেনকে কুপোকাৎ করা রজার মুরকে ওই ভদ্রমহিলা মারধর করতেন। এরই মধ্যে ১৯৫২ সালে গায়িকা ডরোথি স্কয়ার্স-কে বিয়ে করেন রজার মুর। তিনিও রজার মুরের চেয়ে ১২ বছরের বড় ছিলেন। ১৯৫৩ সালে রজার মুর ও স্টেইনের বিয়ে বিচ্ছেদ ঘটে। রজার মুর এ সময় স্কয়ার্সসহ নিউ ইয়র্ক পাড়ি জমান। কিন্তু বয়সের ব্যবধান আর উঠতি এক অভিনেত্রী ডরোথি প্রভিন-এর প্রতি আকৃষ্ট হওয়ায় তাদের দাম্পত্য জীবনে ফাটল ধরে। তারা আবার ১৯৬১ সালে যুক্তরাজ্যে ফিরে আসেন। অন্যদিকে ইটালির অভিনেত্রী লুইসা ম্যাটিওলি-এর সঙ্গে রজার মুরের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বিষয়টি জানতে পেরে একদিন রজার মুরের মাথায় গিটার দিয়ে আঘাত করে গিটার ভেঙে ফেলেন স্কয়ার্স। ওই ম্যাটিওলি-ই পরে রজার মুরের তৃতীয় স্ত্রী হন। রজার মুরের বিচ্ছেদের ক্ষোভে স্কয়ার্স মামলা পর্যন্ত করেন। ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ম্যাটিওলি ও রজার মুর লিভ টুগেদার করেন। রজার মুরকে ওই বছর ডিভোর্স দিতে সম্মত হন স্কয়ার্স। একই বছরের এপ্রিলে ম্যাটিওলি ও রজারের বিয়ে হয়।


ম্যাটিওলি-র ঘরেই রজার মুরের তিন সন্তান জন্মগ্রহণ করেন। তারা হলেন মেয়ে ডেবোরা এবং বড় ছেলে জিওফ্রি ও ছোট ছেলে ক্রিস্টিয়ান। ডেবোরাও জেমস বন্ড মুভি ‘ডাই এনাদার ডে’ (২০০২)-তে অভিনয় করেছিলেন। ওই মুভিতে বন্ড চরিত্রে ছিলেন পিয়ার্স ব্রুসনান। জিওফ্রিও তার বাবার সঙ্গে ‘শার্লক হোমস ইন নিউ ইয়র্ক’ মুভিতে অভিনয় করেছিলেন। আর ক্রিস্টিয়ান চলচ্চিত্র প্রযোজক। সুইডিশ বংশোদ্ভূত ক্রিস্টিনা কিকি থলস্ট্রাপ-এর সঙ্গে সম্পর্কের কারণে ১৯৯৩ সালে ম্যাটিওলি ও রজার মুরের ছাড়াছাড়ি হয়। তার ছেলেমেয়েরা ওই বিচ্ছেদ মেনে নিতে পারেনি। তারা দীর্ঘদিন তার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ রেখেছিল। ২০০০ সালে ২০ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে ম্যাটিওলি বিয়ে বিচ্ছেদে সম্মত হন। ২০০২ সালে থলস্ট্রাপের সঙ্গে রজার মুরের বিয়ে হয়। তার ভাষায়- ‘থলস্ট্রাপ আন্তরিক, মমতাময়ী, শান্ত প্রকৃতির নারী ছিল। সে আমার আগের স্ত্রীদের চেয়ে ভিন্ন। থলস্ট্রাপই মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমার সঙ্গেই ছিলো’।


রজার মুরকে ইউনিসেফ-এর শুভেচ্ছা দূত হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় ১৯৯১ সালে। ইউনিসেফের শুভেচ্ছা দূত হিসেবে তিনি আফ্রিকার শিশুদের জন্য তহবিল সংগ্রহ করায় উদ্যোগী হন।
রজার মুরকে ১৯৯৯ সালে ব্রিটিশ সরকার ‘কমান্ডার অফ দি অর্ডার অফ ব্রিটিশ এম্পায়ার’ ও ২০০৩ সালে ‘নাইট কমান্ডার অফ ব্রিটিশ এম্পায়ার’ উপাধি দেয় এবং জার্মান সরকার ২০০৫ সালে ‘ফেডারেল ক্রস অফ মেরিট’ প্রদান করে। ২০০৭ সালে যখন তার ৮০ বছর বয়সে ‘হলিউড ওয়াক অফ ফেম’ নির্বাচিত হন। এছাড়া অনেক পুরস্কার ও উপাধিতে ভূষিত হন তিনি। ‘লিভ অ্যান্ড লেট ডাই’ মুভির ওপর ভিত্তি করে রজার মুরের আত্মকথা ‘রজার মুর অ্যাজ জেমস বন্ড : রজার মুরস অন অ্যাকাউন্ট অফ ফিল্মিং লিভ অ্যান্ড লেট ডাই’ প্রকাশিত হয় ১৯৭৩ সালে। ওই বইয়ের মুখবন্ধ লেখেন আরেক বিখ্যাত বন্ড ও রজার মুরের বন্ধু শ্যন কনেরি। রজার মুরের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘মাই ওয়ার্ড ইজ মাই বন্ড’ ২০০৮ সালে প্রকাশিত হয়। জেমস বন্ডের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে তার স্মৃতিকথা ও ছবি নিয়ে ‘বন্ড অন বন্ড’ প্রকাশিত হয় ২০১২ সালে। এ বই বিক্রির অর্থ ইউনিসেফে প্রদান করেছিলেন তিনি।


রজার মুর ছোটবেলা থেকে নানান অসুখে ভুগেছেন। ৫ বছর বয়সে নিউমোনিয়া হয়ে মরণাপন্ন হয়েছিলেন। তার কিডনি থেকে পাথর অপসারণ ও হার্টে পেসমেকার লাগানো হয়েছিল। তার প্রস্টেট ক্যানসারও ছিল। শেষ পর্যন্ত ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করে ২০১৭ সালে ২৩ মে এই মহান অভিনেতা ৮৯ বছর বয়সে সুইজারল্যান্ডে মৃত্যুবরণ করেন। রজার মুর তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘আমি অন্য বন্ডদের মতো খুনি চরিত্রের নই, মানুষকে আনন্দ দেয়ার জন্য হাসি-আনন্দে অভিনয় করে গিয়েছি।’ সত্যি তা-ই। তিনি অভিনয় জীবনে ও এর বাইরে মানুষকে আনন্দ দেয়ার চেষ্টাই করে গেছেন নিরন্তর।

Page 1 of 29

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…