Super User

Super User

Page 3 of 24

অনন্য ইনগ্রিড বার্গম্যান

শিরিন সুলতানা

 



দায়িত্বটা নিজেই নিয়েছিলেন নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার। জন্মের তিন বছেরের মাথায় যার মা এবং ১২ বছরে বাবা মারা যায় তাকে তো এতোটুকু দৃঢ় হতেই হয়। মা ফ্রিডেল এডলর বার্গম্যান কোনো স্থায়ী স্মৃতি রাখতে পারেননি, ছোট্ট শিশুটির মনে কোনো স্থায়ী স্মৃতি রাখতে পারেননি। তবে বাবা জ্যাস্টাস স্যামুয়েল বার্গম্যান মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আগলে রেখেছিলেন মেয়েকে। ফটোগ্রাফির দোকান ছিল তার। মেয়ের প্রতিভা কিছুটা হলেও টের পেয়েছিলেন। তাই ছোট্ট শিশুর কিছু মোশন চিত্র রেকর্ড করেছিলেন তিনি। স্কুলের পাট চুকানোর পর নিজেই সিদ্ধান্ত নেন অভিনেত্রী হওয়ার।


যাকে নিয়ে এতো কথা তিনি হলেন প্রতিথযশা লাস্যময়ী অভিনেত্রী ইনগ্রিড বার্গম্যান। বলা হয়ে থাকে হলিউডকে দেয়া সে এক মহাশঙ্খ সুইডিশ উপহার। ১৯১৫ সালের ২৯ আগস্ট স্টোকহোমে জন্ম নেয়া এই তুখড় অভিনেত্রী মা-বাবা মারা যাওয়ার পর চাচার কাছেই মানুষ হয়েছিলেন। কৈশরেই তিনি বিভিন্ন ছবির এক্সট্রা হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯৩৩ সালে গ্র্যাজুয়েট শেষ করার পর স্টকহোমের রিয়াল ড্রামাটিক থিয়েটার স্কুলে স্কলারশিপ পান। এ সময় তার মঞ্চে অভিষেক ঘটে। চলচ্চিত্রে প্রথম পদার্পণ করে ‘মুন্কব্রোগ্রেভেন’ সুইডিশ ছবিটির মাধ্যমে। খুব একটা নামডাক না হলেও অভিনেত্রী হিসেবে একটা জায়গা তৈরি হয় তার।


১৯৩৬ সালে ইনগ্রিডের জীবনের মোড় ঘুরে যায় গুস্তাফ মোলান্ডারের ‘ইন্টারমেজো’ ছবিতে অভিনয় করে। দারুণ ব্যবসা সফল ছবিটি সাড়া ফেলে সুইডেনে। বিখ্যাত হন ছবির সঙ্গে ইনগ্রিডও। মুগ্ধতায় আবেশিত হয় হলিউড চলচ্চিত্র প্রযোজক ডেভিড সেলজনিকও। ছবিটি হলিউডে পুনর্নির্মাণের প্রস্তাব দেন সেলজনিক। এই একটি ছবি করেই সুইডেনে ফেরার কথা ছিল ইনগ্রিডের। সেখানে তার ডেন্টিস্ট স্বামী ডা. পিটার লিন্ডস্ট্রোম ও কন্যা পিয়াকে রেখে এসেছিলেন। এদিকে হলিউড ভার্সন ‘ইন্টারমেজো : দ্য লাভ স্টোরি’ (১৯৩৯) বক্স অফিস হিট হয়। তারকাখ্যাতি ও হলিউডে থিতু হওয়ার হাতছানি ইনগ্রিডকে মোহাচ্ছন্ন্ করে ফেলে। সেলজনিকের অনুরোধে হলিউডে থিতু হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। জহুরি চোখ ভুল করেনি। প্রযোজক ও চিত্রনাট্যকার সেলজনিক সাত বছরের জন্য চুক্তিবদ্ধ করেন ইনগ্রিডকে। ওই সাত বছরে তিনি মাত্র দুটি ছবিই নির্মাণ করেছিলেন ইনগ্রিডকে নিয়ে। ‘গান উইথ দ্য উইন্ড’ (১৯৩৯) ও ‘রেবেকা’ (১৯৪০) ছবি দুটিই একাডেমি পুরস্কার পায়। ধীরে ধীরে ইনগ্রিডের লস্যময়ী নারীসুলভ, প্রেয়সীর ইমেজের ছোট্ট চারাগাছটি মহীরুহে পরিণত হয় সমগ্র হলিউডে তথা আমেরিকায়।

১৯৪২ সালে নির্মিত হয় কালজয়ী চলচিত্র ‘ক্যাসাব্লাংকা’। ইনগ্রিডের সঙ্গে নায়কের ভূমিকায় ছিলেন হামফ্রে বোগার্ট। হলিউড চলচ্চিত্রে এই ছবিকে মাস্টারপিস হিসেবে গণ্য করা হয়। ছবিতে বোগার্টের সঙ্গে ওই অন্তরঙ্গতা, চুম্বন দৃশ্য, চাহনি, গুমরে ওঠা দীর্ঘশ্বাস সন্তর্পণে লুকানোÑ সবকিছুই যেন দর্শকের মন ও মগজে ঠাঁই করে নেয় অবলীলায়। দর্শক বুঁদ হয়ে আটকে যায় বার্গম্যানের সাবলীল অভিনয়ের ফাঁদে। এলসা নামের সারল্যমাখা রমণীর ওই চরিত্রকে ইনগ্রিডের অভিনিত শ্রেষ্ঠ চরিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তার ঐশ্বর্যময় সৌন্দর্য বহুমুখী অভিনয় প্রতিভা, কাজের প্রতি একাগ্রতা, নিয়মানুবর্তিতাÑ সবকিছুর সমন্বয়ই তাকে শিখরে পৌঁছানোর অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। ওই সময় অন্য অভিনেত্রীরা যখন মেকআপের ভারে, পোশাকের চাকচিক্যে ন্যুব্জ হয়ে থাকতেন তখন ইনগ্রিড প্রায় মেকআপহীন সাধারণ পোশাকের মহিমায় হয়েছে উদ্ভাসিত। সম্পূর্ণ বিপরীতধারা থেকেই তিনি জয় করেছেন হাজারো দর্শকের হৃদয়। চরিত্র বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও দারুণ খুঁতখুঁতে ছিলেন তিনি।


১৯৪৩ সালে একটি মাত্রই ছবি করেন বার্গম্যান। আর্নেস্ট হোমিংওয়ের উপন্যাস অবলম্বনে ‘ফর হোম দ্য বেল টোলস’ ছবির মারিয়া চরিত্রটি প্রায় লুফে নেন তিনি। চরিত্রের ক্ষুধা তখন তাকে পেয়ে বসে। ইনগ্রিডের চিরচেনা রূপ থেকে বেরিয়ে এসেও ছোট করে ছাঁটা সোনালি চুলের মারিয়া দারুণ আবেদনময়ী হিসেবে ধরা দেয়। এ ছবিতে অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর অস্কার মনোনয়ন পান তিনি। ওই বছর খালি হাতে ফিরলেও পরের বছরই শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর অস্কারটি চলে আসে তার ঝুলিতে। দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের পর ইনগ্রিড বার্গম্যান আমেরিকার সবচেয়ে বড় বক্স অফিস সেলিব্রিটি হয়ে ওঠেন। পরবর্তী দুই বছরে আলফ্রেড হিচককের ‘স্পেলবাউন্ড’ ও ‘নটরিয়াস’ ছবি দুটিতে অনবদ্য অভিনয় করেন তিনি। ফলে সাফল্যের মুকুটে হতে থাকে নতুন নতুন পালকের সাবলীল সংযোজন।


প্রত্যেক শিল্পীর কিছু স্বপ্নের চরিত্র থাকে। ‘জায়ান অফ আর্ক’ ছবির জোয়ান চরিত্রটি তেমনই ‘ড্রিম প্রজেক্ট’ ছিল ইনগ্রিডের। দরিদ্র ফরাসি জোয়ান (পরে সন্ন্যাসী হয়ে ওঠে) চরিত্র পাওয়ার জন্য যথেষ্ট কাঠখড় পুরিয়েছেন তিনি। চতুর্থবারের মতো শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর অস্কার মনোনয়ন পায় চরিত্রটি। ইনগ্রিডের পালে তখন নতুন হাওয়ায় তর তর করে এগিয়ে চলছে সাফল্যের তরী। হঠাৎই যেন জমাট মেঘের ষড়যন্ত্র। তিনি ১৯৪৮ সালে ইটালিতে পাড়ি জমান ‘স্টমবলি’ ছবির শুটিংয়ের জন্য। পরিচালক রবার্তো রসেলিনের কাজে আগে থেকেই মুগ্ধ ছিল তিনি। জীবনটা যেন ওলট-পালট হওয়ার অপেক্ষায় ছিল তার। না হলে সাফল্যের চরম শিখরে বসে, স্বামী-সন্তান তুচ্ছ করে প্রেমেই বা পড়বেন কেন রসেলিনের। তুমুল ওই প্রেমের পরিণতিতে সন্তানসম্ভাবা হয়ে পড়েন তিনি। এ খবর চাউর হতে সময় লাগে না। পুরো আমেরিকা হতবাক হয়ে পড়ে এ সম্পর্কে জানার পর। হলিউডপাড়া থেকে সিনেট পর্যন্ত তুমুল ঝড় বয়ে যায়। যাকে সাক্ষাৎ দেবীর আসনে বসিয়েছে বিশ্ববাসী, যে রমণী নারীত্বে মহিমায় উদ্ভাসিত করেছেন নিজেকে তার এমন অধঃপতন (!) দর্শক মেনে নিতে পারে না কিছুতেই। সবাই বয়কট করেন ইনগ্রিডকে। বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়ে ‘স্ট্রমবলি’ (১৯৫০)।


এমনতর প্রক্রিয়ায় ইনগ্রিড আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘মানুষ আমাকে জোয়ান অফ আর্ক হিসেবে, সন্ন্যাসী হিসেবে দেখে। আমি তা নই। আমি শুধু একজন নারী, একজন মানুষই।’ এতো ঘটনায় ইটালিতেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় তিনি। পরবর্তী সাত বছর এখানেই কাটিয়ে দেন রোসেলিনের সঙ্গে। এ সময় তাদের এক পুত্র ও যমজ কন্যা সন্তানের জš§ হয়। সাত বছর পর যেন ফিনিক্সের মতোই উঠে দাঁড়ান ইনগ্রিড। ১৯৫৬ সালে আবারও সদর্পে হাজির হন হলিউডে ‘অ্যানাস্টাশিয়া’ ছবির টাইটেল চরিত্রে অভিনয় করে। পুরো ছবিটি চিত্রায়িত হয় ইংল্যান্ডে। ততো দিনে রবার্তোকে নিয়ে স্ক্যান্ডাল স্তিমিত হয়েছে। অভিমানে মুখ ফেরানো দর্শক আবার ভালোবাসার আলিঙ্গনে বাঁধে ইনগ্রিডকে। এ ছবিতে অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর অস্কার ধরা দেয়। তার জীবনে দীর্ঘ সাত বছরের অভিশাপ যেন ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয় ছবিটি। ষাট থেকে সত্তরের দশক তিনি অক্লান্ত কাজ করে যান। পেছনের ভুল সুধরে নিতেই এ অবিরাম চলা। ১৯৭৪ সালে আবারও ওই প্রাপ্তি। ‘মার্ডার অন দ্য অরিয়েন্ট এক্সপ্রেস’ ছবিতে অভিনয় করে শ্রেষ্ঠ পার্শ্বঅভিনেত্রীর অস্কার ঘরে তোলেন। শেষ বয়সে সাফল্যের মুকুটে আরো একটি পালক যোগ হয় ‘অটাম সানাটা’ দিয়ে।
১৯৭৪ সালে ধরা পড়ে তার ব্রেস্ট ক্যানসার। কর্কট কামড়কে উপেক্ষা করেই টিভি সিরিজ ‘অ্যা ওম্যান কল্ড গোল্ড’ শেষ করে ইনগ্রিড। অবশ্য ছবির সাফল্য দেখে যেতে পারেননি। জীবন নদীর ওপার থেকে তিনি কি শুনতে পেয়েছিলেন, অ্যামি অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে দ্বিতীয়বারের মতো শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে তার নাম ঘোষিত হলো?


ক্যানসার ধরা পড়ার আট বছরের মাথায় ঠিক তার জন্মদিনেই ১৯৮২ সালে ৮৭ বছর বয়সে পরপারে পাড়ি জমান ইনগ্রিড। বরফরাজ্যে জন্ম নেয়া রাজস্বী ওই নারী আজন্মের ঠাঁই করে নিয়েছেন লাখো দর্শকের হƒদয়ে।

ছবি : ইন্টরনেট

হোয়াইট বেলুন

তিয়াষ ইসতিয়াক

 



বহু বছর ধরে ইরানের সিনেমা বিশ্ববাসীর কাছে এক বিস্ময়ের নাম! একদমই সাদামাটা কিছু গল্প যে কী করে হৃদয়ের অলিন্দে ছড়িয়ে যাবে, এক চিলতে কিছু অনুভূতি আশ্চর্য রকম ক্ষিপ্রতায় মগজের কোষে কোষে কখন যে জায়গা করে নেবে তা টেরই পাওয়া যায় না! ইরানের সিনেমাগুলোয় এই এক বৈশিষ্ট্য- দেখার সময় আপনার মনে হবে যেন পাশের বাসায় ঘটে যাওয়া গল্পটা কিংবা নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা দেখছেন।
পরিচালক রিলে ভাসিয়ে আপনাকে নিয়ে যাবে এক আশ্চর্য চেনা জগতে যেখানে সময় স্থির! জীবনটা যে কী আশ্চর্য সহজ কিন্তু রঙিন হয়ে ধরা দেয় তা কল্পনাই করা মুশকিল!
এমনই এক সিনেমার কথা বলবো আজ। এর পার্সিয়ান নাম ইধফশড়হধশব ঝবভরফ এবং ইংরেজিতে তা হয় ঞযব ডযরঃব ইধষষড়ড়হ (সফেদ বেলুন)। এটি ১৯৯৫ সালের ড্রামা সিনেমা। ইরানের অন্য দশটি ছবির মতো এটিও এক অতি সাধারণ নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের কাহিনী। ইরানে নববর্ষের মাত্র কয়েক ঘণ্টা বাকি তখন। মায়ের সঙ্গে বাজারে গিয়ে পরিবারের ছোট্ট মেয়ে রাজিয়ার চোখ আটকে যায় এক সুন্দর গোল্ড ফিশের ওপর। এরপর থেকে মায়ের কান ঝালাপালা করে দিতে থাকে ওই ১০০ তোমান (ইরানের মুদ্রা) দামের গোল্ড ফিশটির জন্য! কিন্তু মা অনড়। দারুণ হিসাবি সংসারে একটা শৌখিন মাছের জন্য ১০০ তোমান খরচ করা বড্ড বোকামি। তাছাড়া বাড়িতে কয়েকটা গোল্ড ফিশ তো আছেই। কিন্তু বাজারের গোল্ড ফিশগুলো বেশ নধরকান্তি। রাজিয়ার ভাষায় নতুন বৌয়ের মতোই সুন্দর!


অবশেষে নানান প্রলোভন দেখিয়ে ভাইকে দিয়ে মাকে রাজি করাতে পারে ছোট্ট মেয়েটি! মা ৫০০ তোমান দিয়ে বলে ৪০০ তোমান যেন ঠিক ঠিক ফিরিয়ে আনে। রাজিয়া যেন হাতে স্বর্গ পেয়ে যায়! তখনই ছুট লাগায় পছন্দের মাছটি কিনতে। পথে বেশকিছু উটকো ঝামেলা পোহানোর পর ওই কাক্সিক্ষত দোকানে পৌঁছায় সে। কিন্তু আরেক সমস্যা বাধায় দোকানি। সে এখন মাছটির জন্য দাবি করে বসেছে বাড়তি দাম। ঠিক যেন উৎসবের সময় আমাদের দেশের দোকানিদের মতো! কঠিন বাস্তবতার ওপর ভীষণ মন খারাপ করে রাজিয়া নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ আবিষ্কার করলো, ওই মহামূল্যবান ৫০০ তোমানের নোটটি উধাও!
এখন ছোট্ট মেয়েটি কী করবে! শখের মাছটা কি কেনা হবে না? বাড়ি গিয়ে মাকেই বা কী বলবে? এই ভরাবাজারে একটা নোট কীভাবে খুঁজে পাবে ছোট মানুষ রাজিয়া?

কী আছে এই সিনেমায়? হলিউডের সিনেমার মতো ঘাগু হাতে করা ক্যামেরার তাজ্জব করে দেয়া কারিকুরি নেই, সিজিআই আর স্পেশাল ইফেক্টের দুর্ধর্ষ কাজ নেই, নেই বলিউডের গ্ল্যামারের চাকচিক্য কিংবা চমকদার কৃত্রিম আবেদন। নামি-দামি কোনো অভিনেতাও নেই। আছে কয়েকটা লং, ক্লোজ ও কিছু মাস্টার শর্টের কাজ। তাহলে এই সিনেমা কেন দেখতে হবে? ওই সিনেমায় আসলে আছে জীবন। আছে আশ্চর্য প্রাণবন্ত অভিনয়! ছোট্ট রাজিয়ার ভূমিকায় আইদা মোহাম্মদখানি-র অভিনয় দেখার জন্যই ওই সিনেমা দশবার দেখা যায়! ওই সময় আইদা-র বয়স ছিল মোটে সাত বছর! সাত বছরের একটি ছোট মেয়ে কীভাবে এতো অসাধারণ অভিনয় করেছে তা ভেবে কূল পাবেন না নিশ্চিত। মিষ্টি একটা চেহারা এবং অমন নিষ্পাপ একটা চাহনি দিয়ে মন জয় করবেই আপনার! আর এক্সপ্রেশন? দশে একশ’! অনেক বড়
অভিনেতার সঙ্গে টক্কর দিতে পারবে সে।

ঠোঁট উল্টে অভিমানি একটা ভঙ্গি করে মায়ের কাছে কীভাবে যে টাকা চায়! টাকা হারিয়ে ফেলার পর তার ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার দৃশ্যগুলায় দর্শকের চোখে বাষ্প জমায়। বড্ড মায়া লাগে। ইচ্ছা হয় রাজিয়াকে মমতায় জড়িয়ে ধরে চোখ-মুছে আদর করে ১০০টি গোল্ড ফিশ কিনে দিতে! টাকাটা হাতে পাওয়ার পর দুনিয়ার সব মায়া নিয়ে এতো চমৎকার একটা হাসি দেয় যে, তা দেখার পর চোখে আরেকবার পানি আসে। এটি অভিনয় নয় যেন অন্য কিছু! কী এক্সপ্রেশন, কী ডায়ালগ থ্রোয়িং! কাঁপিয়ে দেয় ভেতরটা। এর সঙ্গে সঙ্গে আপনাকে হয়তো নিয়ে যাবে ওই ছোট্টবেলার অভিমান মিশ্রিত সব আবদারের সরল দিনগুলোয়। আরেকবার অনুভূত হবে শৈশবের পাওয়া, না পাওয়ার বেদনা। এখানেই তো সিনেমার সার্থকতা।


ইরানের মুভি মায়েস্ত্রো ও সদ্য প্রয়াত আব্বাস কিয়ারোস্তামি অনবদ্য কাহিনীতে তারই অনুসারী ইরানের নয়া স্রোতের জনপ্রিয় পরিচালক জাফর পানাহির
পরিচালনায় প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা ‘সফেদ বেলুন’। আর পহেলা সিনেমাতেই বাজিমাত! এটি বাগিয়ে নিয়েছে বেশ কয়টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার এবং নমিনেশন পেয়েছে কয়টিতে। এর মধ্যে আছে ১৯৯৫ সালের কান ফেস্টিভালের সম্মানিত ক্যামেরা ডি’ওর অর্থাৎ গোল্ডেন ক্যামেরা পুরস্কার। আরো পেয়েছে টোকিও আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভালে গোল্ড অ্যাওয়ার্ড, সাও পাওলো আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভালে জুরি পুরস্কার, কানাডার সাডবারি সিনেফেস্ট-এ সেরা আন্তর্জাতিক সিনেমা ইত্যাদি। তাছাড়া অস্কার পর্যন্ত গড়িয়েছিল এটি। দি গার্ডিয়ান পত্রিকা ওই সিনেমাটিকে সেরা ৫০ ফ্যামিলি মুভির লিস্টে রেখেছে।

দেরি না করে বসে পড়–ন ‘সফেদ বেলুন’ নিয়ে এবং দেখুন আপনার অনুভূতি নিয়ে কেমন খেলা করে সিনেমাটি!

আবিদা সুলতানা

 

 


আবিদা সুলতানার বেড়ে ওঠা একটি স্বনামধন্য সংস্কৃতিমনা পরিবারে। আর এ জন্যই শৈশব থেকেই তার সখ্য গান, নাটক, নাচসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সঙ্গে। ছোটবেলায় গানের চেয়েও নাচের প্রতি বেশি ঝোঁক ছিল তার। রাম গোপাল মহন্ত, ওস্তাদ ফুল মোহাম্মদ, আক্তার সাদমানি, বারীন মজুমদার, ওস্তাদ নারু ও ওস্তাদ সগীরউদ্দীন খানের কাছ থেকে গানের তালিম নিয়েছেন তিনি। সঙ্গীত জীবনে ওই প্রখ্যাত ওস্তাদদের প্রভাব তার গায়কীতে বিশেষভাবে লক্ষ করা যায়। রবীন্দ্র সঙ্গীত ও নজরুল সঙ্গীত- এ দুটির ওপর আবিদা তালিম নিলেও আধুনিক গানেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। পূর্ব পাকিস্তানের একটি সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হন। ১৯৬৮ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারের সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। তখন থেকেই তিনি ওই দুই মাধ্যমে নিয়মিত গান পরিবেশন করে আসছেন। ১৯৭৪ সালে তিনি সর্বপ্রথম প্লেব্যাক করেন। এ পর্যন্ত ৪৫০টিরও বেশি চলচ্চিত্রের গানে কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি।
আবিদা ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের প্রখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী রফিকুল আলমের প্রেমে পড়েন এবং ১৯৭৫ সালে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন। ‘সহজ’কে এই গুণী শিল্পী জানিয়েছেন তার আদ্যোপান্ত

সঙ্গীতের শুরু
কবে থেকে গান করেন এমন প্রশ্ন আমাকে কেউ করলে অবশ্যই বলি, মায়ের পেটে থাকতে গান গাই। এর পেছনে বড় ইতিহাস আছে। আমার গানে বাবা, মামা, খালা, নানি, চাচা অর্থাৎ আমার পরিবারের অবদান অনেক। আমার নানিবাড়িতে পহেলা বৈশাখ থেকে শুরু করে রবীন্দ্র-নজরুলজয়ন্তী, বছরের প্রথম দিন- সব সময় একটা না একটা অনুষ্ঠান থাকতো। আমার অনেক খালাতো ভাইবোন ছিল। সবাইকেই নাচ, গান, নাটক, অভিনয়, আবৃত্তি- সবকিছুই করতে হতো। এভাবেই আমাদের বেড়ে ওঠা। মায়ের অনুপ্রেরণাতেই গানে আসা। নাচটি অবশ্য আমার খুব পছন্দের ছিল। কিন্তু মা চাইতেন আমি গান করি। তাছাড়া আমাদের বাড়িটি ছিল সাংস্কৃতিক পরিম-লে মোড়ানো। আমার বাবা গান ও অভিনয় করতেন। রম্যরচনা ভালো লিখতেন, ছড়ার অনেক বই প্রকাশ হয়েছে তার। আমার মা ছোটগল্প লিখতেন। ওই সময়ে তিনি ‘বেগম’ পত্রিকায় অনেক লেখালেখি করতেন। বাসায় কোনো অনুষ্ঠান হলে মা-বাবাকে দেখতাম এক সঙ্গে গান গাইতে। না হলে কবিতা আবৃত্তি করতেন। ছোটবেলা থেকেই আমাদের রক্তের সঙ্গে মিলেমিশে আছে সাংস্কৃতিক নানান উপাদান। মা-বাবা ও বোনদের প্রভাব আছে বলেই আমি আবিদা সুলতানা এ পর্যায়ে এসেছি। তাদের উৎসাহ না পেলে শিল্পের এক্ষেত্রে কখনোই আসতে পারতাম না। আবৃত্তি করেছি। বাবার চাকরি সূত্রে আমাদের উত্তরবঙ্গে থাকা হতো। শিল্পী পরিবারের সদস্য হওয়ার কারণে সব সময়ই সঙ্গীত আর শিল্প চর্চা দেখে দেখে বড় হয়েছি।

আমার শিক্ষক
রাম গোপাল মহন্ত, ওস্তাদ ফুল মোহাম্মদ, আক্তার সাদমানি, বারীন মজুমদার, ওস্তাদ নারু ও ওস্তাদ সগীরউদ্দীন খানের কাছ থেকে গানের তালিম নিয়েছি। সঙ্গীত জীবনে ওই প্রখ্যাত ওস্তাদদের প্রভাব আমার গানেও পড়ে।

জন্মস্থান
বাড়ি মানিকগঞ্জ। এখানে সেভাবে যাওয়াই হয়নি। ছোটবেলায় বাবা চলে গিয়েছিলেন জলপাইগুড়িতে। মা ছিলেন কলকাতায়। পরে ঢাকায় এসে ওনাদের বিয়ে হয়।

পরিবার
আমাদের পরিবারের সবাই গানের সঙ্গে জড়িত। রবীন্দ্রজয়ন্তী, নজরুলজয়ন্তী- সবকিছুতে আমাদের অংশগ্রহণ করতে হতো ছেলেবেলায়। আমার গানের অনুপ্রেরণা আমার মা। আমার চাচা শিক্ষাবিদ আব্দুর রশীদ বেহালা বাজাতেন। মা ভালো লিখতেন এবং খুব ভালো আবৃত্তি করতেন। সঙ্গীতে আমার মায়ের অবদান অনস্বীকার্য। রফিকুল আলম আমাকে বোঝেন। আমাকে গান বিষয়ে নানানভাবে সহযোগিতা করেন। তার মতো একজনকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পেয়ে সত্যিই নিজেকে ভাগ্যবতী ভাবি।

বিয়ে
১৯৭৪ সালে শিল্পী রফিকুল আলমের প্রেমে পড়ি। ১৯৭৫ সালে আমাদের বিয়ে হয়। এক পুত্র রয়েছে আমাদের। রফিকুল আলম খুব কেয়ারিং ও হেলপিং। তবে ওনাকে অ্যাবসেন্স মাইন্ডেড প্রফেসর বলা যায়।

শিল্পী দম্পতির সুবিধা-অসুবিধা
অনেক বাধার সম্মুখীন হয়েছি। একই প্রফেশন দু’জন থাকলে অসুবিধার চেয়ে সুবিধাই বেশি। ওনার ও আমার কোনো ব্যাখ্যা দিতে হয় না প্রফেশনের বিষয়ে।

বাংলাদেশের সঙ্গীত নিয়ে ভবিষ্যৎ ভাবনা
আমার আসলে গান নিয়ে কোনো প্ল্যান নেই। তবে উপভোগ করি।

মিউজিকের বাইরে নিজের ইচ্ছা
এতিম শিশুদের নিয়ে কিছু করা মিউজিকের বাইরে আমার ইচ্ছা। আর উপস্থাপনার ব্যাপারে আগ্রহ বোধ করি।

ভূপেন হাজারিকার গান
যখন মাত্র ম্যাট্রিক পাস করেছি তখন ১৯৭৪ সালের কথা। বাসায় এলেন আলমগীর কবির ভাই ও ‘চিত্রালী’র সম্পাদক পারভেজ ভাই। ওনাদের সঙ্গে তখনই প্রথম পরিচয়। সীমানা পেরিয়ে ছবিতে ‘বিমূর্ত এই রাত্রে আমার’ গানটি আমার সঙ্গীত জীবনের মাইলফলক। এতো বছর ধরে গানটির জনপ্রিয়তা এতোটুকু কমেনি। এটিই আমার প্রাপ্তি।

বিভিন্ন ভাষায় গান
ক্লাস সেভেনে যখন পড়ি তখন পিটিভি ছিল। আমরা ৪৫ জন ছিলাম যাদের দিয়ে মোট ২০টি ভাষায় গান করানো হয়েছিল। আমি তখন চায়নিজ ও জার্মান ভাষায় গেয়েছিলাম। এটি এক নেশা, বিভিন্ন ভাষায় গানের নেশা। ডিপ্লোম্যাটদের গান শোনানোর সৌভাগ্য আমার হয়েছে। ওমানে ক’দিন আগে গান করে এলাম। এ পর্যন্ত ৩৫টি ভাষায় গান করেছি।

সন্তান
আমার এক ছেলে ফারশিদ আলম। সে বোহেমিয়ান ব্যান্ডে আছে। এছাড়া একটি চ্যানেলেও আছে।

সংসার
পৃথিবীর যেখানেই থাকি, সংসার খুব মিস করি। আমি সংসারে খুব বেশি ইনভলব আর সংসারের প্রতি সবসময় টান অনুভব করি। বিভিন্ন রকম রান্না করতে ভালোবাসি। আমার বাসায় কোনো পার্টি থাকলে চেষ্টা করি নিজে রান্না করতে। আমার ছোট একটি বারান্দা আছে। সেখানে বেশকিছু গাছ আছে। অবসরে সেগুলো পরিচর্যা করি। আর টিভির ভালো অনুষ্ঠানগুলো দেখার চেষ্টা করি।

সঙ্গীতের স্বীকৃতি ও পুরস্কার
আমার ঘরে প্রচুর অ্যাওয়ার্ড আছে দেশ-বিদেশের। তবে মানুষের ভালোবাসা পাওয়ার সৌভাগ্যটাই সবচেয়ে বড়। যদিও ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পাইনি তবুও পুরস্কার পেয়েছি প্রচুর।

উল্লেখযোগ্য ঘটনা
একবার ইটালির রোম থেকে দূরে একটি গ্রামে গিয়েছিলাম। সেখানে একটি পটারির দোকানে ঢুকেছিলাম। ইটালি যাওয়ার ৭ দিন আগে স্বপ্নে দেখেছিলাম ওই দোকানটি। হুবহু ওই দোকান। আমি হতবাক, যাওয়ার সাত দিন আগে দেখা স্বপ্নটি সত্যি হতে দেখা উল্লেখযোগ্য বৈকি!

গান আর সংসার- এই আমার জীবন, আমার বেঁচে থাকা। এ দুটির যে কোনো একটি ছাড়া একটি দিনও কল্পনা করতে পারি না।



ছবি : শোভন আচার্য্য অম্বু

রাতারগুল থেকে বিছানাকান্দি

হাসান তারেক চৌধুরী

 


রাতারগুল আর বিছানাকান্দি- দুটিই আজ ভ্রমণপিপাসুদের জন্য খুবই জনপ্রিয় নাম। তাই নতুন করে আর এর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়ার কোনো অর্থ হয় না। তবুও আজ লিখছি। এর একটি কারণ হলো সামনেই আসছে বর্ষা। এখন ওই দুটি স্থানে ভ্রমণের সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। অন্য কারণটি হলো ভ্রমণপিপাসুদের আরো একটি নতুন অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়া। সাধারণত যাতায়াত ও থাকার সমস্যার কথা বিবেচনা করে আমাদের ভ্রমণপিপাসুরা ওই দুটি গন্তব্য আলাদাভাবে পরিকল্পনা করেন। ফলে তারা অসম্ভব সুন্দর আরো একটি অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হন।
রাতারগুলের সৌন্দর্য বর্ণনা হয়তো অনেকেই পড়ে থাকবেন ভ্রমণ কাহিনীতে এবং পড়েছেন অপরূপ সৌন্দর্যমন্ডিত বিছানাকান্দির কথাও। কিন্তু রাতারগুল ও বিছানাকান্দি আপাতদৃষ্টিতে দুটি আলাদা অবস্থানে থাকলেও অনেকেই হয়তো জানেন না, রাতারগুল থেকে গোয়াইন নদী ধরে নৌপথেই আপনি পৌঁছে যেতে পারেন বিছানাকান্দি। আর এ পথে যেতে যেতে আপনি উপভোগ করতে পারেন গোয়াইন নদীর দু’ধারের অপরূপ সৌন্দর্য। তাই আজ আমরা আর রাতারগুল কিংবা বিছানাকান্দি নয়, রাতারগুল থেকে বিছানাকান্দি যাওয়ার ওই পথ ধরে আপনাদের নিয়ে যাবো প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের লীলাভূমিতে। চলুন ঘুরে আসি গোয়াইন নদী হয়ে বিছানাকান্দি। এরপর আবার ফিরে আসবো রাতারগুলে চেঙ্গি খালের শেষ পর্যন্ত।


আমরা জানতে পারলাম রাতারগুলের খুব কাছে মাত্র এক কিলোমিটারের মধ্যেই সোয়াম্প ফরেস্ট রোডের ওপরই ফতেহপুরে নাকি একটি রিসোর্ট হয়েছে ‘রাতারগুল হলিডে হোম’। শুনলাম, ফ্যামিলি নিয়ে থাকার জন্য জায়গাটি দারুণ। এ কথা শোনা মাত্রই বেশ কিছুদিন ধরে ভেবে রাখা ওই চিন্তাটা মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো। এর সঙ্গে জুটলো ভ্রমণপিপাসু আরো দুটি ফ্যামিলি। যে কথা সেই কাজ।


আগস্টের প্রথম সপ্তাহেই সদলবলে হাজির হলাম রাতারগুল হলিডে হোমে। দেখালাম ভুল শুনিনি। থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা এখানে আসলেই খুব ভালো। আমরা জানতে পারলাম, রাতারগুল থেকে নৌকায় করে সরাসরি বিছানাকান্দি যেতে লাগে প্রায় তিন ঘণ্টা। আবার ফিরতেও একই সময় লাগবে। তাই পরদিন সকাল ৭টার মধ্যেই আমরা রেডি হয়ে সদলবলে রওনা হলাম। পরিকল্পনা হলো, যেহেতু রাতারগুল ঘরের কাছেই সেহেতু আমরা প্রথমে রওনা হবো বিছানাকান্দির উদ্দেশে। তারপর ফেরার পথে দেখবো রাতারগুল। রাতারগুল বিট অফিসের কাছে চেঙ্গি খালের কাছেই আমরা পেয়ে গেলাম ইঞ্জিনচালিত বোট। শুরু হলো আমাদের যাত্রা।
কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের নৌকা খাল পেরিয়ে গোয়াইন নদীতে এসে পড়লো। স্বচ্ছ পানির ভেতর দিয়ে নদীর নিচ পর্যন্ত অনেকটাই দেখা যায়। আশপাশে সারি সারি নৌকা। কোনোটি ছোট আবার কোনো কোনোটি বিশাল। মাঝে মধ্যে দেখা যাচ্ছিল পাথর বহনকারী নৌকা। এগুলো আবার অনেকটাই সরু। ধীরে ধীরে আমাদের পার হয়ে যায় পাহাড় থেকে কেটে আনা সারি সারি বাঁশের ভেলা। কিছুক্ষণের মধ্যেই নদী কিছুটা সরু হয়ে ওঠে। দু’পাড়ই চলে আসে সহজ দৃষ্টিসীমায়। কোথাও দু’পাড়ে শিশুরা নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে, কোথাও বা লাল-নীল পোশাক পরে শিশুরা স্কুলের পথে। আবার কোথাও নদীর ধার দিয়ে হেঁটে যায় গরু-মহিষের পাল। বাঁকে বাঁকে জেলেরা জাল পেতে, কোঁচ ফেলে মাছ ধরছেন। এভাবে যেতে যেতেই হঠাৎ আকাশজুড়ে কালো মেঘ। আর তখনই মনে পড়লো আমাদের সঙ্গে ছাতা নেই। ঝমঝম বৃষ্টি নামলো কিছুক্ষণের মধ্যেই। নদীতে স্রোতের তোড়ে আমরা ঢুকলাম এক খালে। আর তা এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। দু’পাশে সারি সারি বাঁশের ঝাড় যেন খালের ওপর নুইয়ে পড়ে মাইলের পর মাইল গেইট তৈরি করে রেখেছে! এ দৃশ্য না দেখলে বোঝানো খুব কঠিন। কোথাও আবার খালের পাড় একেবারেই সমতল- মানুষ, গরু-মহিষ প্রায় হেঁটে পার হচ্ছে।


যাহোক, ভিজতে ভিজতে এক সময় আবার আমরা চলে এলাম মূল নদীতে। তা এক অসাধারণ দৃশ্য। দূরে পাহাড় আর আকাশ মিলিয়ে তৈরি করেছে এক অপরূপ শোভা! কিছুদূর পর পর পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে এসেছে সরু সরু কিছু। ভালো করে চোখ পেতে দেখলাম, ওগুলো আসলে পাহাড় বেয়ে নামা ঝরনা। কোথাও আবার নদীর পাড় ঘেঁষে বৃক্ষের বিশাল সারি। কিছুটা এগোতেই দেখলাম, সারি সারি সরু নৌকা একটির সঙ্গে অন্যটি বাঁধা। সামনের একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা তা টেনে নিয়ে যাচ্ছে। ঠিক যেন পানিতে চলছে নৌকার রেলগাড়ি।


আরো কিছুটা এগোতেই আমরা পড়লাম পিয়াইন নদীতে। মাঝে মধ্যে দু’পাড়ে যেন পাথরের পাহাড় করে রেখেছেন পাথর ব্যবসায়ীরা। এছাড়া দূরে দেখা যাচ্ছে মেঘালয় রাজ্যের সাতটি সুউচ্চ পর্বতের সঙ্গমস্থল।
সেখানে বহু ঝরনাধারার পানি একত্র হয়ে প্রবল বেগে আছড়ে পড়ছে পিয়াইন নদীতে। পাহাড় থেকে নেমে আসা স্রোতের সঙ্গে গড়িয়ে আসছে বড় বড় পাথর। এটিই আমাদের প্রথম গন্তব্য বিছানাকান্দি। বর্ষার দিনে বিছানাকান্দির পূর্ণ যৌবন লাভ করে। ভরাট জলে মেলে ধরে এর আসল রূপের বিস্তৃত মায়াজাল। শীতল ওই স্রোতধারার স্বর্গীয় বিছানায় আপনি পেতে পারেন প্রকৃতির মনোরম লাবণ্যের স্পর্শ।  নগর জীবনের যাবতীয় ক্লান্তি বিসর্জন দিয়ে মনের তৃষ্ণা মেটানোর সুযোগ করে দিতে পারে দু’পাশে আকাশচুম্বী পাহাড়। এর মধ্যে বয়ে চলে ঝরনার স্রোত। মনে হচ্ছিল যেন পরিষ্কার, টলটলে স্বচ্ছ পানিতে অর্ধডুবন্ত পাথরে মাথা রেখে হারিয়ে যাই ঘুমের রাজ্যে। বেশ কিছুক্ষণ ঝরনার পানিতে ঝাঁপাঝাঁপির পর পেট-পূজায় বসলাম নদীর পাড়েই ড্রাম ভেলার ওপর ‘জলপরী’ রেস্টুরেন্টে। এখানে খাবার ছিল খিচুড়ি আর ডিম ভাজি। খেতে খেতেই দেখলাম পাহাড়ে মেঘ আর সুর্যের লুকোচুরি খেলা।

এবার ফেরার পালা। ফিরলাম একই পথে। প্রায় তিন ঘণ্টার যাত্রা শেষে এবার গন্তব্য রাতারগুল। ভ্রমণপিপাসুদের জন্য একটা গা ছমছমে অনুভূতির নাম রাতারগুল। সিলেটের গোয়াইনঘাটে অবস্থিত এ বনটিকে বলা যায় বাংলাদেশের আমাজন। আমাজনের মতোই গাছগাছালির বেশির ভাগ অংশই বছরের অধিকাংশ সময় ডুবে থাকে ভারতের মেঘালয় থেকে আসা জলধারায়। গোয়াইন নদী হয়ে এই জলধারা এসে প্লাবিত করে পুরো রাতারগুল জলাবনটিকে। শীতকালে পানি অনেকটা কমে যায় বলে বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী (জুন থেকে অক্টোবর) রাতারগুল ভ্রমণের উপযুক্ত সময়। বর্ষায় এই বন অপরূপ রূপ ধারণ করে। এ সময় পানি এতোটাই স্বচ্ছ হয় যে, পানিতে বনের প্রতিবিম্ব দেখে মনে হয় যেন বনের নিচে আরেকটি বন। দেখতে পেলাম, ওই পানিতেই মাছরাঙা এবং নানান প্রজাতির বক খাবার খোঁজার চেষ্টা করছে। আরো আছে বালিহাঁস ও পানকৌড়ি। বানর ও কাঠবিড়ালি ছুটছে এ-ডাল থেকে ও-ডালে। ঘন জঙ্গলের আলো-আধারিতে গাছগুলো সব ডুবে আছে পানিতে। কোনোটি কোমর পানিতে, কোনোটির অর্ধেকই পানিতে। এতোই ঘন জঙ্গল যে, ভেতরের দিকটায় সূর্যের আলো গাছের পাতা ভেদ করে পৌঁছাতে পারে না। সব মিলিয়ে কেমন একটা ভুতুড়ে পরিবেশ! ডালপালা ছড়ানো গাছগুলো পথ রোধ করে ধরে। দু’হাত দিয়ে ডালপালা সরিয়ে এগোতে হয় সরুপথে সরু নৌকায় দুলতে দুলতে। এর উপর রাতারগুল হলো সাপের আখড়া।


পানি বেড়ে যাওয়ায় এ সময় সাপগুলো ঠাঁই নেয় গাছের ওপর। আমরা হঠাৎ দেখলাম এমনই একটি সবুজ রঙের সাপ যেন পোজ দিয়ে আছে অপরূপ ভঙ্গিমায়। বনের মধ্যেই রয়েছে একটি ওয়াচ টাওয়ার। এর ওপর থেকে দেখলাম প্রায় পুরোটা বনভূমি। সন্ধ্যা হওয়ার কিছু আগেই রিসোর্টে ফেরার পথ ধরলাম। কারণ রাতে রয়েছে বারবিকিউ চিকেনের সঙ্গে ভাজা মাছের এক মজাদার আয়োজন।

ঈদে সাজাই ঘর

লেখা : শায়মা হক

 


ঈদ- তা হোক না ঈদুল ফিতর কিংবা ঈদুল আজহা। ঈদ মানেই ওই ছোট্টবেলা। আর ছোটবেলার আনন্দের স্মৃতিতে কিছুটা হলেও হারিয়ে যাওয়া।
ঈদের দু’একদিন আগে ঘরবাড়ি ঝেড়ে-মুছে ঝকঝকে তকতকে করে তোলার নানান প্রস্তুতি। বিছানার চাদর, টেবিল ক্লথ ইস্ত্রি করে ধোপাবাড়ি থেকে ফিরে আসা বা ঈদ উপলক্ষে শত ব্যস্ততার মধ্যেও একটু সময় করে একগোছা ফুল কেনার দৃশ্যগুলো কারই না মনে পড়ে!


শত শত বছর ধরেই ঈদ এলে অন্দর মহলে পড়ে যায় সাজ সাজ রব। অতিথি আপ্যায়নে সেমাই, ফিরনি, জর্দা, কাবাব- নানান সুস্বাদু খাদ্যদ্রব্যের সঙ্গে সঙ্গে ঘরের সাজের দিকেও থাকে যে যার সাধ্যমতো নজর। দিন বদলেছে, বদলেছে নানান আকাক্সক্ষা বা চাহিদাও। এখন শুধু ধোপাবাড়ি থেকে চাদর, পর্দা কাচিয়ে আনাতেই রুচি বা আকাক্সক্ষা সীমাবদ্ধ নয়। এখন নতুন পোশাকের পাশাপাশি উৎসবগুলোয় নতুন কুশন, পর্দা কেনাতেও অনেকেই কার্পণ্য করেন না। তাই তো ঈদের আগের রাতে ফুলের দোকানগুলোতেও দেখা যায় অনেক ভিড়। সবাই চান উৎসবের দিনে একটু তাজা ফুলের সুবাসে সুবাসিত করে তুলতে ছোট্ট গৃহকোণ। কেউ কেউ পুরো বাড়িতে নতুন করে রঙ বা আসবাবপত্র বার্নিশ করে পুরনো জিনিসে নতুনের বৈচিত্র্য এনে ফেলে।


সে যাই হোক। লিখতে বসেছিলাম ঈদের বিশেষ দিনটির বিশেষ গৃহসজ্জা নিয়ে। ঈদের বিশেষ গৃহসজ্জার শুরুটা ভাবতে হবে মূল প্রবেশপথ থেকে। এরপর বসার ঘর, খাবার ঘর, এমনকি শোয়ার ঘর থেকে টয়লেট বা বারান্দা হয়ে কিচেন পর্যন্ত কোনো অংশই অবহেলার যোগ্য নয়। প্রথমেই মূল প্রবেশপথটি সাজানোর দিকে খেয়াল রাখতে হবে এমনই ভাবে যেন সেটি অতিথিকে বাড়িতে স্বাগত জানাতে সহায়তা করে। এখানে বড় বা মাঝারি কারুকার্যময় মাটির পটারি, সবুজ-সতেজ গাছপালা, পাথর, ইদানীংয়ের টেরারিয়াম, ল্যাম্প- এসব ছাড়াও মাটির পাত্রে পানি দিয়ে ফুলের পাপড়ি ছড়িয়ে ফ্লোটিং মোমবাতি জ্বালিয়ে দেয়া যেতে পারে। প্রবেশপথের দেয়াল আয়না ও ছোট কাজ করা টেবিল এবং এতে কিছু শোপিস, ক্যাক্টাস জাতীয় গাছ বা ফোটোফ্রেম সাজিয়ে দেয়া যায়।


এরপরই আসে বসার ঘর বা ড্রয়িং রুমটি। প্রায় সবাই সাধ ও সাধ্যের সমন্বয়ে সাজান ওই ঘর। কেউ কেউ ওই ঘরটি আধুনিক সাজে সাজাতে ভালোবাসেন, কেউ বা দেশীয় উপাদান দিয়ে দেশীয় আঙ্গিকে সাজাতে ভালোবাসেন। সাজের ধরনটি যাই হোক না কেন, উৎসবে প্রতিটি সাজই হওয়া চাই স্নিগ্ধ, উজ্জ্বল, আনন্দময় ও মন ভালো করে দেয়ার মতো।
দেশীয় আঙ্গিকে সাজানো বসার ঘর : এমন একটি ঘরে কাঠ, বেত বা বাঁশের সোফা কিংবা অন্য আরামদায়ক ডিজাইনে বসার ব্যবস্থা করলে ভালো দেখাবে। সোফার কভার, কুশন কভার হতে পারে হালকা বা উজ্জ্বল রঙের। আবার সোফা ও কুশনের কালার কনট্রাস্ট হতে পারে। এখানে পর্দার রঙেরও সামঞ্জস্য থাকতে হবে। পর্দার রঙের সঙ্গে মিলিয়ে মেঝেতে শতরঞ্জি বা শীতলপাটি বিছানো যেতে পারে। দেশীয় ঢঙে সাজানো বসার ঘরে মাটি, কাঠ, বেত বা পাটের তৈরি শোপিস বেশি মানাবে। দেয়ালেও ঝোলানো যেতে পারে কাঠ, পাট বা পেপার ম্যাশের মুখোশ। পটারি ও ল্যাম্পের ব্যবহারও এ ঘরটিকে আলাদা মাত্রা দেবে। আবার ফ্লোরেও বসার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। ফ্লোরে নকশিকাঁথার ম্যাট বিছিয়ে বা শতরঞ্জি পেতে বসার আয়োজন করা যেতে পারে। এর ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা যেতে পারে কিছু রঙিন কুশন ও তাকিয়া। মাটির ফুলদানি বা সিরামিকের বড় জার দিয়ে সাজানো যেতে পারে বসার ঘরের একটা পাশ। দেয়ালে ঝোলানো যায় দৃষ্টিনন্দন আর্ট বা পারিবারিক স্মৃতির ফটোগ্রাফস। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির সামনের দোকানগুলোয় ভিন্ন ধরনের কৃত্রিম ফুল, ঝাড়বাতি, ফুলদানি, টেবিল ল্যাম্প, মাটি দিয়ে তৈরি চিত্রকর্ম ও বাঁশের তৈরি নানান সামগ্রী পাওয়া যায় যা দিয়ে দেশীয় ঢঙে ঘর সাজানো মনোরম হয়ে উঠতে পারে।


আধুনিক ঢঙে সাজানো বসার ঘর : আধুনিক ঢঙে সাজানো বসার ঘরে ঈদের সাজের ক্ষেত্রে সোফা ও কুশন কভারের রঙ ব্ল্যাক, অফহোয়াইট, চকলেট, কফি, মেরুন ইত্যাদি হতে পারে। একই সঙ্গে পর্দার রঙটিও হতে হবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে পর্দার কাপড়ের ক্ষেত্রে একটু ভারী সিল্ক, নেট বা সিল্কের সঙ্গে লেসের ভারী ডিজাইন ভালো লাগবে। সোফা ও পর্দার রঙের সঙ্গে মিল রেখে মেঝেতে বিছিয়ে দেয়া যায় পুরু কার্পেট। সেন্টার টেবিলটি চৌকোনো, ওভাল বা সার্কেল শেইপের হতে পারে। সার্কেল শেইপের সেন্টার টেবিলের মাঝে ক্রিস্টাল বোলে বেশকিছু রঙিন মার্বেল বা আশপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে শোপিস রাখা যেতে পারে। এছাড়া চৌকোণা বা ওভাল টেবিলে মোম, ছোট গাছ বা শোপিস দিয়ে সাজানো যেতে পারে। ওই সঙ্গে সিলিংয়ে ঝোলানো যেতে পারে ক্রিস্টাল ঝাড়বাতি। ঘরের কোণায় কোণায় সবুজ ইনডোর প্লান্টস ঘরটি সজীব ও প্রাণবন্ত করে তুলবে।


খাবার ঘর : ঈদের সাজে বসার ঘরের পরই ভাবতে হবে খাবার ঘরের সাজসজ্জা নিয়ে। কারণ ঈদের দিনে ওই ঘরেই অতিথি আপ্যায়ন করা হয়। ঈদের উৎসব পূর্ণতা পায় খাবার ঘিরে। তাই সুন্দর পরিবেশনার সঙ্গে সঙ্গে খাবার টেবিল ও ঘরটিকেও দিতে হবে পরিপাট্য রূপ। লম্বাটে আকৃতির টেবিলের মাঝে সুদৃশ্য রানার বিছিয়ে দেয়া যায়। একই সঙ্গে রঙিন ম্যাট বিছিয়ে দেয়া যায় আবার রানারের ঠিক মাঝখানে রাখা যেতে পারে ছোট ফুলদানিতে সতেজ ফুল বা সুদৃশ্য রঙিন মোমসহ মোমদানি। উৎসবে তো শোকেস থেকে নামিয়েই উঠিয়ে রাখা হয় সুদৃশ্য ক্রোকারিজ। খাবার টেবিলের কাছাকাছি ছোট একটা টেবিল বা র‌্যাকে প্রয়োজনীয় প্লেট, গ্লাস, চামচ রাখা যায়। টেবিলের ঠিক ওপর রঙিন ল্যাম্পশেড খাবার ঘরটিতে মায়াবী পরিবেশ সৃষ্টি করবে।


শোয়ার ঘর : ঈদের দিন সকাল বেলাটিতেই বিছানাটি চাদর বা বেড কভারে ঢাকুন টান টান করে। সাইড টেবিলে ফুলদানিতে সাজিয়ে দেয়া যায় সুগন্ধি ফুল। বেড কভারের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে পর্দার রঙ ও কাপড় নির্বাচন করা উচিত। বেড সাইড টেবিল ল্যাম্প বা ঘরের কোণে কর্নার ল্যাম্পও ঘরটিকে মায়াময় করে তুলতে পারে। মেঝেতে কার্পেট ও দেয়ালে পেইন্টিং শোবার ঘরটি করে তুলবে আরো আকর্ষণীয় এবং মনমুগ্ধকর। শিশুদের শোবার ঘরটিকে সাজানো যায় কার্টুন বেড কভার, কুশন বা মজাদার পোস্টারে। দেয়ালে কার্টুন একে দেয়া যেতে পারে। ঈদ উপলক্ষে শিশুদের ঘরের দরজা বা কর্নার নিরাপদ দূরত্বে ইলেকট্রিক সুদৃশ্য রঙিন টুনি বাল্ব দিয়ে সাজানো যেতে পারে।
রান্নাঘর : ঈদের অন্যতম আকর্ষণ খাওয়া-দাওয়া। রান্নাঘরে যেন সবকিছু হাতের নাগালেই পাওয়া যায় এদিকে বিশেষ নজর রাখতে হবে। রান্নার প্রয়োজনীয় সব জিনিস জায়গামতো গুছিয়ে রাখতে হবে। এক কোণায় রাখা যেতে পারে ছোট টব বা ফুলদানি। গান শোনার ব্যবস্থা থাকলেও রান্না করা বেশ আনন্দময় হয়। কিচেন ডোরে ঝুলিয়ে দেয়া যেতে পারে টুংটাং চাইম। চাইমের মিঠে সুর রান্নার ক্লান্তি বা পরিশ্রান্তি দূর করে দেবে।
বারান্দা ও সিড়ি বা ছাদ : বারান্দা, সিঁড়ি কিংবা ঘরের দরজার পাশে জীবন্ত গাছ সাজিয়ে দেয়া যায় কিংবা ঝুলন্ত টবে পাটের শিকায় ঝুলিয়ে দেয়া যায় লতার গাছ। টবগুলোর পাশে মাটির শোপিস কিংবা মাটির ল্যাম্প বারান্দায় আলাদা সৌন্দর্য দেবে। এছাড়া বারান্দা বা ছাদের কোণায় মাটির বড় পাত্র বা টবে নানান শোপিস ও প্লান্টস দিয়ে সাজানো যায় ফেইরি গার্ডেন। বারান্দায় সুসজ্জিত জলদেশের কাব্যে অ্যাকুরিয়াম সাজিয়ে দেয়া যায়।

সব ঘরের ঝুল ঝেড়ে ফেলতে হবে। ফ্যান, টিউব লাইট সুন্দর করে মুছে ফেলতে হবে। বসার ঘরের সোফাগুলো পরিষ্কার করে রাখতে হবে। যেসব সোফার কভার ধোয়া যায় সেগুলো ধুয়ে ফেলতে হবে। আর যেসব ধোয়া সম্ভব নয় সেসব ফার্নিচার স্প্রে দিয়ে মুছে ফেলতে হবে।  সপ্তাহখানেক অগেই বিছানার চাদর, কুশন কভার, বালিশের কভার, টেবিল ক্লথ ধুয়ে ইস্ত্রি করে রাখতে হবে। টাইলসের মেঝে পানিতে স্যাভলন বা ডিটারজেন্ট মিশিয়ে কিংবা লিকুইড ক্লিনার দিয়ে মুছে ফেলতে হবে। ঘরের আনাচে-কানাচে ও ছাদে ঝুল ঝেড়ে পরিষ্কার করে ফেলতে হবে। ফ্যান, লাইট, কিচেন ক্যাবিনেট, জানালা-বারান্দার গ্রিল, দরজার কারুকাজ, সিঁড়ি ইত্যাদি আগেই পরিষ্কার করে রাখতে হবে। ঈদের দু’তিন দিন আগে বাড়ির প্রতিটি টয়লেটের মেঝে ভালো করে ঘষে রাখতে হবে। টয়লেটে টয়লেট পেপার, লিকুইড সোপ- এসব প্রয়োজনীয় জিনিস গুছিয়ে রাখতে হবে। তাজা ফুল বা ইনডোর প্লান্ট টয়লেটের বেসিন কিংবা শেলফে রেখে দেয়া যেতে পারে। বারান্দার টবগুলো ধুয়ে-মুছে পারলে রঙ করিয়ে নিলে ভালো হয়। ঈদের আগের দিনই গ্লাস ও প্লেটগুলো নামিয়ে ধুয়ে-মুছে রেখে দিলে ঈদের দিন তাড়াহুড়া থাকবে না। টিশ্যু বক্স, এয়ার ফ্রেশনার, হ্যান্ড ওয়াশ, জরুরি ওষুধ আগেই মজুদ করে রাখা উচিত। এতে কেউ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে ঈদের ছুটিতে আশপাশের মেডিসিন শপ বন্ধ থাকলেও কোনো সমস্যায় পড়তে হবে না।


বাড়ির অন্দর গৃহকর্ত্রীর রুচিশীলতার পরিচয় দেয়। তাই এর প্রায় পুরো কৃতিত্বই দিয়ে দেয়া যেতে পারে গৃহকর্ত্রীকেই।
যাহোক, উৎসবের আনন্দে নান্দনিক গৃহসজ্জা এবং মুখরোচক খানা-খাদ্যের সমাহারে ভরে উঠুক প্রতিটি অন্তর ও হৃদয়। সবাই যে যেখানে আছেন- আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, পরিবার-পরিজন নিয়ে কাটাবেন উৎসবের এদিনটি আনন্দ-উচ্ছলতায়। নিরাপদে ও সুস্থ থাকুন সবাই। সবার প্রতি রইলো ঈদের অনাবিল শুভেচ্ছা।

জাফরানি পোলাও

 

 

জাফরানি পোলাও
উপকরণ : পোলাওয়ের চাল এক কেজি, তেল আধা কাপ, ঘি আধা কাপ, দারুচিনি ও এলাচ দুটি করে, তেজপাতা একটি, ঘন দুধ আধা কাপ, জাফরান এক চিমটি, লবণ একমুঠ ও গরম পানি পরিমাণমতো।
প্রণালি : পোলাওয়ের চাল ভালো করে ধুয়ে পানি ঝরাতে দিন। এবার একটা হাঁড়িতে তেল-ঘি দিয়ে এতে দারুচিনি, এলাচ, তেজপাতার ফোড়ন দিন। এবার চাল দিয়ে নাড়াচাড়া করুন। লবণ দিন। পেয়াজ বেরেস্তা ছিটিয়ে দিন। ভাজা হলে পরিমাণমতো গরম পানি দিয়ে ফুটে উঠলে দুটো ভেজা জাফরান দিয়ে দমে দিয়ে ঢেকে দিন। নামিয়ে গরম গরম পরিবেশন করুন
জাফরানি পোলাও।


বাদশাহী মোরগ মোসাল্লাম
উপকরণ : মুরগি দেড় কেজি, আদা-রসুন বাটা তিন টেবিল চামচ, টক দই ১০০ গ্রাম, কাঁচামরিচ বাটা দুই চা-চামচ, লাল মরিচ গুঁড়া দুই টেবিল চামচ, চাট মশলা চার ভাগের এক চা চামচ, কমলা রঙ চার ভাগের এক চা-চামচ, ধনিয়া এক টেবিল চামচ, জিরা এক চা-চামচ, দারুচিনি একটা, এলাচ ছোট চারটা, বড় এলাচ একটা, তেজপাতা একটা, গোল মরিচ আধা চা-চামচ, পেঁয়াজ বেরেস্তা আধা কাপ, তেল এক কাপ, ঘি আধা কাপ, কাঠবাদাম আধা কাপ, ডিম সিদ্ধ দুটি, জায়ফল-জয়ত্রী দুই চা-চামচ ও কেওড়া জল এক টেবিল চামচ।
প্রণালি : প্রথমে টক দই, কাঁচামরিচ বাটা, লাল মরিচ গুঁড়া, আদা-রসুন বাটা, চাট মশলা, কমলা রঙ এক সঙ্গে একটি বাটিতে মিক্স করতে হবে। এবার গোটা মুরগি ভালোভাবে ধুয়ে বুকের দু’পাশ ছুরি দিয়ে চিরে দিয়ে নিতে হবে। রানগুলো চিড়ে দিতে হবে। এবার দই মিক্সার দিয়ে মুরগিটাকে ভালোভাবে মেরিনেট করে রাখতে হবে চার-পাঁচ ঘণ্টা। এবার একটা প্যানে ধনিয়া, জিরা, গরম মশলা, জায়ফল, জয়ত্রী, শুকনা মরিচ গুঁড়া করে নিতে হবে। চুলায় তেল গরম হলে মশলা থেকে ঝেড়ে মুরগি সবদিকে লাল করে ভেজে নিতে হবে। ভাজার আগে মুরগির বুকের ভেতর ডিম সিদ্ধ ঢুকিয়ে দিতে হবে। এবার ওই ভাজা তেলে মেরিনেটের মশলা ও ব্লেন্ডার করা মশলা দিয়ে কষিয়ে নিতে হবে। সাজানোর মতো একটা প্লেটের মাঝখানে ভাজা গোটা মুরগি দিয়ে এর চারদিকে কষানো মশলা দিয়ে পরিবেশন করতে হবে।

শাহী খাসির কোরমা
উপকরণ : খাসির মাংস এক কেজি, আদা-রসুন বাটা তিন টেবিল চামচ, পেঁয়াজ বাটা এক টেবিল চামচ, বাদাম বাটা এক টেবিল চামচ, টক দই দুই কাপ, জায়ফল-জয়ত্রী গুঁড়া এক চা-চামচ, আলুবোখারা দু’তিনটি, লাল মরিচ গুঁড়া এক চা-চামচ, ধনিয়ার গুঁড়া দুই টেবিল চামচ, জিরার গুঁড়া এক চা-চামচ, দারুচিনি-এলাচ-লবঙ্গ দুই টেবিল চামচ, পেঁয়াজ বেরেস্তা এক কাপ, জাফরান এক চিমটি, কেওড়াজল এক চিমটি, তেল-ঘি পরিমাণমতো, চিনি এক টেবিল চামচ ও দুধ এক কাপ।
প্রণালি : প্রথমে খাসির মাংস ভালো করে ধুয়ে পানি ঝরিয়ে এতে আদা-রসুন বাটা, টক দই, বাদাম বাটা, পেঁয়াজ বাটা, জায়ফল-জয়ত্রী, আলুবোখারা, লবণ, লাল মরিচ গুঁড়া দিয়ে মেরিনেট করতে হবে এক ঘণ্টা। এবার একটি হাঁড়িতে তেল-ঘি দিয়ে এতে গরম মশলা ফোড়ন দিয়ে মাখানো মাংস ঢেকে দিতে হবে। চুলায় ভালো করে কষিয়ে নিতে হবে। এবার ব্লেন্ডারে ধনিয়ার গুঁড়া, গরম মশলা, জিরার গুঁড়া, পেঁয়াজ বেরেস্তা ও একটু পানি দিয়ে পেস্ট করে নিতে হবে। কষানোর সময় ওই পেস্টটি দিয়ে আরো কিছুক্ষণ কষিয়ে পরিমাণমতো পানি দিয়ে সিদ্ধ করে নিতে হবে। যখন প্রায় সিদ্ধ হয়ে আসবে তখন দুটি ভেজানো জাফরান দিয়ে আরো চার-পাঁচ মিনিট ঢেকে রেখে তেলের ওপর উঠলে কেওড়াজল দিয়ে কাঁচামরিচ গোটা ছেড়ে দিয়ে নামাতে হবে।



শাহী চিকেন কোফতাকারি
উপকরণ : মুরগির বুকের পিস একটা, আদা-রসুন বাটা এক টেবিল চামচ, বাদাম বাটা এক চা-চামচ, জায়ফল-জয়ত্রী এক চা-চামচ, আলু বোখারা এক-দুটি, পোস্ত বাটা এক চা-চামচ, বেরেস্তা আধা কাপ, কাঁচামরিচ কুচি এক চা-চামচ, ধনিয়াপাতা এক চা-চামচ, পুদিনাপাতা এক টেবিল চামচ, লেবুর রস দুই-তিন ফোঁটা, পাউরুটি দুই গ্লাস, তেল-ঘি আন্দাজমতো, লবণ স্বাদমতো, গরম মশলা গুঁড়া এক চা-চামচ, কেওড়াজল এক টেবিল চামচ ও ক্রিম এক টেবিল চামচ।
প্রণালি : প্রথমে একটি হাঁড়িতে মুরগির পিসের সঙ্গে আদা-রসুন বাটা, জায়ফল-জয়ত্রী, আলুবোখারা, বাদাম বাটা একটু পানি দিয়ে সিদ্ধ করে নিতে হবো। এবার বুকের পিসগুলো হাত দিয়ে চিরে নিতে হবে। একটা বাটিতে পাউরুটির পিসগুলো পানিতে ভিজিয়ে চিপে মুরগিতে দিতে হবে। এতে পেঁয়াজ বেরেস্তা, কাঁচামরিচ কুচি, ধনিয়াপাতা-পুদিনাপাতা কুচি, একটা ডিমের কুসুম, গরম মশলা গুঁড়া ও লেবুর রস দিয়ে ভালো করে মিক্স করে নিতে হবে। এবার গোল গোল বল তৈরি করে ডিমের সাদা অংশে চুবিয়ে ডুবোতেলে ভেজে নিতে হবে। এবার বাটা পেঁয়াজ, বাদাম বাটা, আদা-রসুন বাটা, গরম মশলা, টক দই এক সঙ্গে কষিয়ে বলগুলো ছেড়ে দিয়ে তেলের ওপর উঠলে কাঁচা মরিচ দিয়ে নামিয়ে বেরেস্তা ছিটিয়ে ও ক্রিম দিয়ে পরিবেশন করতে হবে।

 

____________________
 রেসিপি : সানজিদা জামান
 ছবি : ফারহান ফয়সাল

Page 3 of 24

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

Twitter feed

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…