Super User

Super User

Page 4 of 29

আবেগ বা ইমোশন ছাড়া কি মানুষ হয়! না, কখনোই নয়! যার আবেগ নেই তিনি তো কোনো মনুষ্যকুলের ভেতরই পড়েন না। আবেগ আছে বলেই তো পৃথিবীতে এতো প্রেম,-ভালোবাসা, এতো কবিতা-গান। তবে ওই আবেগই আবার অনেক ক্ষতিরও কারণ। আবেগের বাড়াবাড়ি আছে বলেই এতো হানাহানি, রেষারেষি, আত্মহত্যা, ঝগড়া-ফ্যাসাদ, বিচ্ছেদ ইত্যাদি।
আবেগের কারণেই যেমন মানুষ আপ্লুত হয় ঠিক তেমনই আবেগ অনিয়ন্ত্রণেই ফেটে পড়ে ক্রোধ, চিৎকার, চেঁচামেচি বা লঙ্কাকা- ঘটিয়ে পারিপার্শ্বিক পরিবেশ তথা নিজের ইন্টারনাল ক্ষতিও করে থাকে। এই ইমম্যাচিউরড মেন্টালিটি পরিহার করুন। এছাড়া আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে শিখুন ও হাসি-খুশি জীবন যাপন করুন এবং নিজে বাঁচুন, অপরকে বাঁচান। ইমম্যাচিউরড মেন্টালিটি বলতে গিয়ে মনে পড়ে গেল আরেকটি কথা। তা হলো ছোট শিশুরা তাদের আবেগ নিয়ন্ত্রণে প্রায় অক্ষম থাকে। যেমন তারা একটা প্রজাপতি বা বিড়ালছানা দেখলেই হাসি-খুশি মনে ধরতে দৌড়ায় ঠিক তেমনি একটু ধমকেই ভ্যাঁ করে কেঁদেও ফেলে।

যাহোক, দেখি আবেগ কী বা আবেগের বহিঃপ্রকাশ মাধ্যম কী কী?
আবেগ ও আবেগের বহিঃপ্রকাশ হলো ভালোবাসা, ভালো লাগা, আনন্দ-বেদনা, হিংসা-বিদ্বেষ, রাগ-ক্রোধ, ঝগড়া-ঝাটি, মারামারি, খুনাখুনি, উন্মাদনা, ইগো ইত্যাদি।
ওই আবেগ নিয়ন্ত্রণ না করতে পেরে যখন কেউ কেউ রাস্তার মাঝে গাড়ি থামিয়ে জানালা নামিয়ে নিয়ম ভাঙা কাউকে উত্তেজিতভাবে গালি দিয়ে ফেলে বা রেস্টুরেন্টে প্রেমিকের সঙ্গে ঝগড়া শুরু করে আশপাশ জানিয়ে দেয় এবং শেষমেশ স্থান-কাল-পাত্র ভুলে কেঁদেই ফেলে তখন নিজে তো বোকার মতো আচরণ করেনই, এমনকি প্রেমিকসহ অন্যদেরও বিব্রত করে। এছাড়া নিজেরও বিশেষ ক্ষতি করে থাকেন যা তার অজান্তেই নিজের মধ্যে ঘটে যায় তা তিনি জানেনই না। তাই আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা অবশ্যই জরুরি। আবেগ নিয়ন্ত্রণের রয়েছে কিছু পরীক্ষিত কৌশল। যখনই কেউ ক্রোধে উন্মাদ হবেন বা রাগ-দুঃখে চুল ছিঁড়তে চাইবেন (নিজের এবং অপরের) কিংবা চিৎকার-চেঁচামেচিতে বাড়ি মাথায় করবেন অথবা কোনো দিশা না পেয়ে ধেই ধেই পাগলা নৃত্য করবেন তখনই মনে রাখুন নো কুইক রিঅ্যাকশন বা দ্রুত প্রতিক্রিয়া না দেয়া : সোজা ভাষায়, রিঅ্যাক্টিভ না হওয়া! কোনো পরিস্থিতি আবেগ দিয়ে বিবেচনা না করে যুক্তি দিয়ে বিবেচনা করতে শিখতে হবে এবং তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে ঠা-া মাথায় চিন্তা করে পদক্ষেপ নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, উগ্র বৈশিষ্ট্যের স্বভাব বা গালাগালি, ক্রোধ প্রকাশ, অশালীন ভাষার ব্যবহার যুক্তিটিকে দুর্বল করে ফেলে।


সঠিক সমাধান : আমার কাছে ব্যাপারটি সময় নিয়ে হলেও সঠিক ডিসিশন নেয়াটাটিকেই বোঝায়। যে বিষয়গুলোয় আমরা ইমোশনাল হয়ে পড়ি সেসব থেকে মন অন্যদিকে সরাতে হবে। তা না পারলে মন থেকে মুছেই ফেলতে হবে যেসব স্মৃতি বা ঘটনা আমাদের ইমোশনাল করে তোলে অথবা অন্য কিছুর প্রতি মনোযোগী হওয়া বা মত পাল্টে ফেলাও একটি সমাধান হতে পারে। খোলামেলা আলোচনার সুযোগ থাকলে যার সঙ্গে মনোমালিন্য হয়েছে তার সঙ্গে তা নিয়ে কথা বলা যেতে পারে।


সচেতনতা : সচেতনতা বৃদ্ধি বা আবেগ নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকাও একটি জরুরি ব্যাপার। কোন কোন পরিস্থিতিতে আবেগ নিয়ন্ত্রণে থাকছে না সেগুলো খেয়াল রাখতে হবে। রাগ, দুঃখ, ভালোবাসা, ভালো লাগা, ক্ষোভ, ক্রোধ, হতাশা, অস্থিরতা এসবের নেতিবাচক কারণ চিহ্নিত করতে হবে।


চিন্তার পরিবর্তন : যেসব বিষয় নিয়ে ভাবলে আবেগ নিয়ন্ত্রণে থাকে না বা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়তে হয় তা মনে পড়লে সঙ্গে সঙ্গে চিন্তা পরিবর্তন করতে হবে। ওই সময় ভালো কোনো স্মৃতির কথা মনে করা যেতে পারে। এভাবেই চিন্তাধারা ভিন্নদিকে প্রবাহিত করে আবেগাপ্লুত না হয়ে আত্মনিয়ন্ত্রণ বা আবেগ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব ।


ইতিবাচক হওয়া : ইতিবাচক চিন্তা-ভাবনা বা সিদ্ধান্ত কিংবা ভালো চিন্তা আবেগ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ভূমিকা রাখে। ভালো আচরণ দিয়ে জীবনের অর্জনগুলো ভাবতে হবে। তাহলেও পরবর্তী পদক্ষেপে ভুল হওয়ার আশঙ্কা কম থাকে।
এসব ছাড়াও তাৎক্ষণিক আবেগ নিয়ন্ত্রণেরও কিছু অব্যর্থ কৌশল আছে। তা হলো -


শ্বাস নিয়ন্ত্রণ : শান্ত হয়ে মোটামুটি নিরিবিলি কোনো জায়গা খুঁজে সেখানে বসতে হবে। কিছুক্ষণ স্বাভাবিক শ্বাস নেয়ার পর খুব ধীরে নাক দিয়ে ফুসফুসভরে শ্বাস নিয়ে তা ভেতরে ধরে রাখতে হবে এবং ১, ২, ৩ ও ৪ পর্যন্ত গুনতে হবে। এরপর ধীরে ধীরে মুখ দিয়ে নিঃশ্বাস বের করে দিতে হবে।


ইতিবাচক ভঙ্গি রপ্ত করা : চলাফেরা ও কাজেকর্ম ধীর, আত্মবিশ্বাসী ও ইতিবাচক ধ্যান-ধারণা এবং অঙ্গভঙ্গি ধরে রাখতে হবে। বসা বা দাঁড়ানো কিংবা হাঁটাচলার সময় ভগ্ন হৃদয় অ্যাবা ত্রিভঙ্গ মুরারি না হয়ে সোজা ও দৃঢ় এবং স্মার্ট ভাবটিই প্র্যাকটিস করতে হবে। সোজা কথা, তাৎক্ষণিক আবেগ নিয়ন্ত্রণে ভাবতে হবে কন্ট্রোল ইওর আবেগ বাট ডোন্ট লেট ইট কন্ট্রোল ইউ।


হালকা ব্যায়াম : এ ব্যাপারে খুবই কার্যকর ব্যায়াম। ব্যায়ামের বদলের হাঁটার অভ্যাসও করা যেতে পারে। হাঁটার ফলে এন্ড্রোফিন নামক রাসায়নিক পদার্থের সিক্রিয়েশনে মুড পজিটিভ হয়ে যায়। তবে আবেগ নিয়ন্ত্রণে তখনই হাঁটা শুরু করাটা মনে হয় সঠিক হবে না।


লেখালিখি : এটি একটি দারুণ কৌশল! লেখালিখি করে মনের আবেগগুলো বের করে দেয়া যায়। এক সপ্তাহ বা এক মাস পর সেসব পড়ে নিজেকে চিনে নিতে হবে কোন বিষয়গুলো আবেগের প্রতি প্রভাবিত করে। এবার ওইসবের নিয়ন্ত্রণ সহজ! এভয়েড অর কন্ট্রোল অর কন্ট্রোল অলটার ডিলিট।


নিজের কথাগুলো বলুন : শেয়ারিং একটি ভালো উপায়। মনের কথাগুলো, দুঃখ বোধ বা কষ্ট অন্যের সঙ্গে শেয়ার করা! ফোন দিয়ে বা মুখোমুখি বলা যেতে পারে। তবে সাবধান, বন্ধু ভেবে হিংসুটে কোনো শত্রুকে মনের ভাব বলে ফেললে ভবিষ্যতে খবর আছে।


জীবন যাপনের ভালো বিষয়গুলো সযতেœ লালন করা : সুন্দরের প্রশংসা ও চর্চা, প্রতিদিনের ছোটখাটো আনন্দের বিষয়গুলো উপভোগ করা এই অযাচিত আবেগীয় অনিয়ন্ত্রণকে নিয়ন্ত্রণ করে। এটি অবশ্য সার্বক্ষণিক আবেগ নিয়ন্ত্রণের কৌশল প্র্যাকটিস হিসাবেই কাজ করে।


দূরদর্শিতা : কথায় আছে, ‘ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না।’ আবেগ আপ্লুত হয়ে রাগ, দুঃখ ও ক্রোধে অন্ধ হওয়ার আগে ভাবতে হবে, ওই আবেগ আপনাকে কোথায় নিয়ে যাবে। আবেগের ফাঁদে এ জীবন সংকটে পড়বে না তো! দূরদর্শী চিন্তা-চেতনাই আবেগ নিয়ন্ত্রণে রেখে ভবিষ্যতের পথে হাঁটতে সাহায্য করবে।
এছাড়া কিছু বিষয় খেয়াল রাখতে হবে


পর্যাপ্ত ঘুম : আবেগ যখন অনিয়ন্ত্রিত হয় তখন ঘুম কমে যায় বা অনিদ্রা হয়। কারো সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদ, ব্রেকআপ এসব রাতের ঘুম হারাম করে দেয়। এটি বেশ কয়েকদিন, মাস, বছরও পার করতে পারে। এই ঘুম হারাম হওয়া ব্যাপারটিতে যেভাবেই হোক সতর্ক থাকতে হবে। পর্যাপ্ত আরামদায়ক ঘুমের পর রাগ, দুঃখ, ক্রোধ, ক্ষোভ অনেক আবেগই নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।


ভালো পরিকল্পনা : ভালো পরিকল্পনা না থাকলে যে কোনো কাজেই সফলতা পাওয়া একটু কঠিন। আর ওই অসফলতা বা ব্যর্থতাও মানুষিক অবসাদ কিংবা আবেগ নিয়ন্ত্রণ হারাতে কাজ করে। তাই ভালো পরিকল্পনাকারী হয়ে কাজ শুরু করাটাই উত্তম।
নিজের জন্য কিছু সময় ও আত্মকথন : নিজের সঙ্গে নিজের কথা বা নিজেই প্রশ্ন করা কিংবা উত্তর খুঁজে বের করা এসবও আবেগ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক। নিজের জন্য কিছু আনন্দময় কাজ খুঁজে বের করা বা একান্ত সময় কাটানোও আবেগ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। তাই তো টক টু দাইসেলফ অ্যান্ড ইনক্রিজ ইওর অন ক্রিয়েটিভিটি বা ক্রিয়েটিভ থিকিং অর থটফুল আইডিয়াস।

এবার আসি মজার এবং খুবই এফেক্টিভ একটি বিষয়ে। দিস ইজ কলড নাইটি বা টেন প্রিন্সিপাল-
টেন পার্সেন্ট অফ লাইফ ইজ মেডআপ হোয়াট হ্যাপেনস টু ইউ বাট নাইন্টি পার্সেন্ট অফ লাইফ ইজ ডিসাইডেড বাই হাউ ইউ রিঅ্যাক্ট... মানেটা কী? আমাদের জীবনে ঘটে যাওয়া অপ্রত্যাশিত ঘটনায় ১০ শতাংশের উপর নিজের কোনো হাত থাকে না, থাকে না কোনো নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু বাকি ৯০ শতাংশ আলাদা। এটি আমরা নিয়ন্ত্রণ করতেই পারি। তা কীভাবে! আমাদের রি-অ্যাকশনের মধ্য দিয়ে। মানে, আমরা কীভাবে রিঅ্যাক্ট করবো ঘটনাটির প্রতি।
একটা গল্প বলি। একদিন সুন্দর এক সকালে মা-বাবা আর ছোট্ট একটি মেয়ে সবাই মিলে আনন্দে সকালের ব্রেকফাস্ট করছিল। হঠাৎ মেয়েটি এক কাপ কফি বাবার গায়ে ফেলে দিল। বাবার অফিসের পোশাক নষ্ট হয়ে গেল। এখানে কফি পড়ে যাওয়ার ঘটনাটিতে কারো নিয়ন্ত্রণ করার উপায় ছিল না। কিন্তু এর পরের ঘটনাগুলো নিয়ন্ত্রণ করা যেতো কীভাবে তিনি রিঅ্যাক্ট করবেন এর ওপর। বাবা রেগে গেলেন। অনেক চিল্লাচিল্লি বকাঝকা! শিশুটি কান্না করতে শুরু করলো। শুধু তা-ই নয়, তাকে বকাঝকা করেও বাবার হলো না। তিনি মায়ের ওপর চড়াও হলেন, চিৎকার-চেঁচামেচি করলেন। তার জামাকাপড় বদল এবং শিশুর ব্রেকফাস্ট দেরি, স্কুলবাস মিস। তাড়াতাড়ি বাবাকে কারে করে স্কুল নিতে হলো। তাড়াহুড়ায় যে কোনো মুহূর্তে তখন অ্যাক্সিডেন্ট হয় হয়! শিশু স্কুলে মুখ গোমরা করে ঢুকলো বাবাকে কোনোই হাই অর বাই না বলেই। অফিসে পৌঁছে বাবা দেখলেন ব্রিফকেসটাই ভুলে গেছেন। সমস্ত কাজ ভ-ুল। সারা দিনটাই নষ্ট হয়ে গেল এভাবেই...। বাড়ি ফেরার পরও সবই থমথমে। কারণ সকালের ব্যবহার। কেন সারা দিন খারাপ গেল?
কফিটাই কারণ?
নাকি ওই শিশুই কারণ?
নাকি মা-ই কারণ?
নাকি বাবাই তার কারণ?


উত্তর তো সকলের জানা ৪ নম্বরটিই। এ একজনই। কফি পড়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ ছিল না কারো। কিন্তু ওই ৫ সেকেন্ডের রিঅ্যাকশন বদলে দিল সব। এটা যদি হতো এমন কফি পড়ে গেল আর বাবা বলতেন, ওহ বেবি, নেক্সট টাইম বি কেয়ারফুল। এরপর কাপড় বদলে সব ঠিকঠাক নিয়ে এসে দেখতেন শিশু নাশতা খেয়ে বাসে চলে গেছে। তাহলে তাড়াহুড়া বা দেরি হতো না অফিসে। ওই শিশু মনটা খারাপ করতো না, স্কুল বাসও মিস হতো না। বাবার ব্রিফকেস নিতে ভুল হতো না। একটু খেয়াল করলেই দেখা যায় এই পার্থক্যটা। ঘটনার শুরুটা একই হলেও শেষ হতো অন্যভাবে। কারণ ওই ১০ শতাংশে আমাদের নিয়ন্ত্রণ নেই। কিন্তু বাকি ৯০ শতাংশে আছে। কাজেই সদা ও সর্বদা মনে রাখতেই হবে, ওই ৯০ঃ১০ আবেগ নিয়ন্ত্রণ করার গূঢ় উপায়টি।


ইমোশনাল সেফ জোন : শেষ হইয়াও হইলো না শেষ...। সেফটি বলতে আমরা শুধু ফিজিকাল সেফটিই বুঝে থাকি। তাই কীভাবে অ্যাকসিডেন্ট না হবে, সিটবেল্ট বাঁধা হবে, লাইফ জ্যাকেট পরা এসব নিয়েই সচেতন থাকি। কিন্তু আমাদের ভেতরের ক্ষতি ও নিরাপত্তা বা অনিরাপত্তা বোধ এটা নিয়ে কয়জন ভাবি? হঠাৎ বা ধীরে ধীরে কিংবা যখন-তখন এই নিরাপত্তার অভাব বোধ হতে পারে। লজ্জা, ভয়, ত্রাস বা সংশয়, কষ্ট গ্রাস করে নিতে পারে। নিজের দিকে তাকিয়ে দেখুন। এই ক্ষুদ্র বা বৃহৎ জীবনে আপনি কি ইমোশনাল সেফটির প্রয়োজন বোধ করেছেন? ইচ্ছা হলে এখন থেকে একটি ডায়রি মেইনটেইন করুন। কোন কোনদিন কোন কোন ঘটনায় আপনি ইমোশনাল সেফ ফিল করেননি? সেসব নিয়ে ভাবুন। এই ইমোশনাল সেফটিটাও খুবই প্রয়োজন! জীবনে চলার পথে এসব ঘটনা থেকেই নিজের সেফটি গড়ে তুলুন। এ জন্য প্রয়োজন আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা। পরিশেষে বলবো, নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করুন। গড়ে তুলুন নিজের মধ্যে ও আশপাশের সবার জন্য দারুণ এক শারীরিক, মানসিক এবং পারিপার্শ্বিক নিরাপদ, সুখী ও সমৃদ্ধ জীবন...।

 

লেখা : শায়মা হক
মডেল : তামান্না খান
ছবি : আরাফাত

 

হাতঘড়ি

 

ফ্যাশন শুধু নারীদের- এমন ধারণা করার দিন অনেক আগেই শেষ হয়েছে। অধুনা পুরুষরাও বেশ ফ্যাশন সচেতন হয়ে উঠছেন। তবে ফ্যাশন সচেতন পুরুষ বলতে এটি বোঝায় না যে, তারা ব্র্যান্ডের পোশাক ও অ্যাকসেসরিজ ছাড়া অন্যকিছু ব্যবহার করতে চান না। একটু বুদ্ধি খাটিয়ে হাতের কাছে পাওয়া নানান জিনিস ব্যবহার করে এবং কম খরচেও অনেক ফ্যাশনেবল হয়ে ওঠা যায়। তাই পয়সা খরচ করে নয়, মাথা খাটিয়ে ফ্যাশনেবল হয়ে উঠুন। এখন চলুন দেখে নেয়া যাক পুরুষদের ফ্যাশনের জরুরি কিছু বিষয় অর্থাৎ নিজে যা পরছি তাতে ফ্যাশন বহন করতে পারছি কিনা সেটিই জরুরি।

সময় দেখার জন্য তো বটেই, ফ্যাশনের ক্ষেত্রে সমান গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ যে জিনিসটি এর নাম হাত ঘড়ি। তাই প্রয়োজন আর ফ্যাশনের অপূর্ব সমন্বয় হলো হাত ঘড়ি। আগে অবশ্য সময় দেখার জন্যই ঘড়ির ব্যবহার ছিল। কিন্তু সব কাজের কাজি মোবাইল ফোনের আবির্ভাবে ঘড়ির প্রয়োজনীয়তা কমতে কমতে প্রায় নিঃশেষ হওয়ার আগেই ফ্যাশন অনুষঙ্গ হিসেবে আবারও হাত ঘড়ির প্রচলন শুরু হয়েছে। ব্যক্তিত্ববান পুরুষের প্রয়োজন আর ফ্যাশনের সম্মিলন ঘটেছে হাত ঘড়িতে।

বর্তমানে তরুণদের পছন্দের তুঙ্গে রয়েছে মোটা চেইন ও বড়ো ডায়ালের ঘড়ি। টিনএজাররা বরাবরই স্পোর্টস ঘড়ি পরতে বেশি পছন্দ করে। কেউ আবার পছন্দের সিলেব্রিটির পছন্দকেই নিজের পছন্দ হিসেবে বেছে নিতে চান। তাদের গেটআপ আর ঘড়ি- দুটিই যেন রপ্ত করা যায়।
চাকরিজীবী ও ছাত্রদের ফ্যাশন বরাবরই সময় সম্পর্কিত। তাই হাল ফ্যাশনে পোশাকের সঙ্গে ঘড়ি তাদের সব সময় প্রয়োজন ও অপরিহার্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে মানানসই বিষয়টি যে খুব গুরুত্বপূর্ণ তাদের কাছে, ব্যাপারটি ঠিক তেমন নয়। বেমানান বিষয়গুলোও কখনো কখনো তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাই ওই বহন করতে পারার বিষয়টি আবারও উঠে আসে এখানে। ফলে চিকন হাতে খুব ভারী বা বেল্টের ঘড়ি স্থান করে নিতে পারে অনায়াসে।
ঘড়ির বাজারে নামি-দামি ব্র্যান্ড আছে। তবে সব সময় যে নামি-দামি ব্র্যান্ডেই অন্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যাবে তা নয়, বরং অনেক সময় কম দামের ঘড়িও হতে পারে সঠিক ফ্যাশন অনুষঙ্গ। টাইটান, সিটিজেন, রাডোসহ নানান ব্র্যান্ডের ঘড়ি পাবেন ২ হাজার ৫০০ থেকে লাখ টাকার উপর পর্যন্ত। বসুন্ধরা সিটি ও যমুনা ফিউচার পার্কে এসব ঘড়ির দোকান আছে। এছাড়া বায়তুল মোকাররম মার্কেটেও ব্র্যান্ডসহ ঘড়ির অনেক দোকান রয়েছে। একেক ধরনের পোশাকের সঙ্গে একেক রকম ঘড়ি মানানসই। সময় ও পরিবেশ বুঝে পরার জন্য ক্যাজুয়াল, ফরমাল, এক্সক্লুসিভ- এই তিন ধরনের ঘড়ি রাখা যেতে পারে সংগ্রহে।
অনেক ফ্যাশন ডিজাইনারই বলেন, আসলে পার্টি বুঝে পোশাকের সঙ্গে ঘড়ির ব্যাপারে পুরোটাই নির্ভর করে নিজের ব্যক্তিত্বের ওপর। নিজেকে কোন ধরনের পোশাকে ভালো লাগছে তা আগে বুঝতে হবে। বুঝতে হবে কোথায় ও কোন পরিবেশে যাচ্ছি। এর ওপর ভিত্তি করেই হাত ঘড়ি বাছাই করে নিতে হবে। চওড়া বেল্টের হাত ঘড়ির প্রচলন বেশি বলেই যে এ ধরনের ঘড়ি পরতে হবে তা নয়। সবার আগে দেখতে হবে যে ঘড়িটি পরছি তা ভালো দেখাচ্ছে কিনা কিংবা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছি কিনা।
ক্যাজুয়াল লুকের ক্ষেত্রে চেইন ও বড় ডায়ালের ঘড়িই বেশি জনপ্রিয়। আর অফিসে ফরমাল লুকের জন্য মাঝারি ডায়ালের চামড়া চেইনের ঘড়ি মানাবে। বন্ধুদের আড্ডা বা ক্যাজুয়াল পার্টিতে বড় ডায়াল ও চওড়া বেল্টের হাত ঘড়ি পরা যেতে পারে। আবার ফরমাল অনুষ্ঠানে নিজেকে খেয়াল রাখতে হবে ভালো ব্র্যান্ডের মার্জিত সাইজের ঘড়ির দিকে।
সবশেষে বলা যায়, সব শেষ বলে আসলে কিছুই নেই। যা পরতে নিজের কাছে ভালো লাগে সেটিই হবে উপযুক্ত ফ্যাশন। আর নিজের অনন্যতা এনে দেবে নিজস্ব একটি স্টাইল। কে জানে, একদিন হয়তো নিজের স্টাইলের জোয়ারে ভাসতে পারে পুরো পৃথিবীও!

 

 লেখা : সহজ ডেস্ক 

তুমি না থাকলে...

 

 

‘চা’ ছোট্ট এক অক্ষরের এ শব্দটিতে মিশে আছে ভোরের আয়েশি আমেজ। একই সঙ্গে রয়েছে রোজকার পত্রিকা পড়ার সময়টুকুর মধুর সঙ্গ কিংবা বিকালের অবসন্নতার নিমেষে চনমনে হয়ে ওঠা ভাবটিও। এছাড়া অফিসের কাজের ব্যস্ততা, যে কোনো ভ্রমণের ফাঁকে কিংবা বন্ধুবান্ধবের আড্ডায় চা ছাড়া ভাবাই যায় না। অন্যদিকে অতিথি আপ্যায়নে দেশ-বিদেশ, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে চা এক অপরিহার্য অনুষঙ্গ। কাজেই সোজা কথায় বলা যায়, এই চা আজ পুরো বিশ্বের মানব জাতির কাছে অতি পরিচিত ও সমাদৃত পানীয়।

অবশ্য চায়ের নানান ধরন আছে। রয়েছে স্বাদ ও গন্ধের ভিন্নতা, এমনকি চা বানানোরও আছে ভিন্ন স্বকীয়তা। দেশ অথবা জাতিভেদে চায়ের পরিবেশনাতেও রয়েছে ভিন্নতা। কিন্তু আজকের এই বহুল পরিচিত বিশ্ব জননন্দিত ও সমাদৃত ওই পানীয়টির জন্ম ইতিহাস কী, কোথা থেকেই বা ওই চা আবিষ্কৃত হয়েছিল তা কি সবার জানা আছে?

এবার বলি চা আবিষ্কারের গল্পটি : খ্রিস্টপূর্ব ২৭৩৭ সালের কথা। চায়নার সম্রাট শেন নাং তার ভৃত্য পরিবেষ্টিত হয়ে জঙ্গলে গিয়েছিলেন এক আনন্দ ভ্রমণে জুন্নান প্রদেশে। খোলা প্রান্তরে গাছের ছায়ায় বসে থাকার প্রাক্কালে সম্রাটের জলপাত্রের ফুটন্ত পানিতে হঠাৎ বাতাসের ঝাপটায় পাশের ঝোপ থেকে কিছু পাতা উড়ে এসে পড়লো। পাতাটি তুলে ফেলার আগেই তা জলের রঙ বদলে ফেললো। সম্রাট শেন কৌতূহলী হয়ে জলের ঘ্রাণ শুঁকে দেখলেন, এতে রয়েছে অন্য রকম এক মাদকতা। তিনি ওই স্বাদ নিলেন ও আনন্দিত হয়ে উঠলেন। পৃথিবীতে আবিষ্কৃত হলো এক নতুন পানীয়।
খুব অল্প সময়ের মধ্যেই চায়ের ঔষধি গুণাবলির স্বীকৃতি পেল যা পরে চায়নার প-িত কর্তৃক অমরত্বের স্পর্শমণি হিসেবে বর্ণিত হয়েছে। খ্রিস্টাব্দ ৪০০ শতকে চায়নার অভিধানে চা স্থান পায় ‘দকুয়াং ইয়া’ নামে। একই সঙ্গে বর্ণনা দেয়া হয় চা তৈরির পদ্ধতি। ৭২৫ খ্রিস্টাব্দে চীনের সম্রাট সরকারিভাবে ওই পানীয়র নাম পরিবর্তন করে নতুন নাম দেন ‘চা’। তা আজ পৃথিবীর অনেক দেশে একই বা কাছাকাছি নামে পরিচিত। কাজেই দেখা যায় চা ও ‘চা’ শব্দটির জন্মস্থান চায়নাতেই এবং চৈনিক শাসক শেন নাং প্রথম চা আবিষ্কারক।

নানান চা, পরিবেশনা, রেসিপি ও উপকারিতা
রাস্তার টঙঘরের বিশাল টগবগে কেটলি থেকে ছোট্ট ছোট্ট কাপে ঢেলে ‘র’ চা শুরু করে রাজকীয় স্বর্ণের পেয়ালায় দুধ, চিনি বা মধু মিশিয়েও তা পরিবেশনার নজির রয়েছে।


জনপ্রিয় টি-ব্যাগ পরিবেশনা
এক পেয়ালা গরম পানিতে টি-ব্যাগের সুতাটি ধরে চুবিয়ে দিলেই হয়ে যায় মন মাতানো রঙের সুগন্ধি চা যা খুবই সুবিধাজনক পদ্ধতি। এই টি-ব্যাগের আগের চেহারাটি মোটেও আজকের দিনের চৌকোণা টি-ব্যাগের মতো ছিল না। বরং পোঁটলা করে যেন এক গোছা চা-পাতাই বাঁধা থাকতো সেখানে। ওই টি-ব্যাগের জন্ম নিয়েও রয়েছে একটি মজার ঘটনা। ১৯০৮ সালে আমেরিকার নিউ ইয়র্কের চা ব্যবসায়ী থমাস সুলিভ্যান ছোট ছোট সিল্কের কাপড়ে তৈরি পুঁটুলিতে করে চায়ের নমুনা তার কোনো এক ক্রেতার কাছে পাঠান। সেই ক্রেতা চাসহ ওই সিল্কের পুঁটুলি গরম পানিতে দিয়ে চা বানানোর চেষ্টা করেন। এই শুনে সুলিভ্যানের মাথায় আসে টি-ব্যাগের ধারণাটি। এরপরই তিনি টি-ব্যাগের প্রচলন শুরু করেন।

 

রঙ চা (‘র’ টি)
বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় ওই কালো চা। চা আমরা সাধারণত লিকার হিসেবে অথবা দুধ-চিনি মিশিয়ে পান করে থাকি। গবেষণায় দেখা গেছে, লিকার চা স্ট্রোকের ঝুঁকি কমায়। এছাড়া এই চা নিয়মিত পান করলে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে তা হতে হবে দুধ ছাড়া চা।


সবুজ চা (গ্রিন টি)
চা গাছের সবুজ পাতা রোদে শুকিয়ে তাওয়ায় সেঁকে এই চা প্রস্তুত করা হয়। সবুজ চায়ের গুণাবিল বলে শেষ করা যাবে না। এতে উচ্চ হারে ক্যাফেইন থাকে যা আপনার স্মৃতিশক্তি উন্নত করতে সাহায্য করে। নিয়মিত এই চা পান করলে ত্বক থাকে টান টান ও সতেজ। সবুজ চায়ের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ক্ষতিকর উপাদান রোধ করে ত্বক বুড়িয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করে। সবুজ চা ত্বকের রোদপোড়া ভাব দূর করে। সবুজ চায়ের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ত্বকের ক্যানসারের সঙ্গে লড়াইয়েও রাখে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। দাঁতের ক্ষয় রোধ, মাঢ়ি মজবুত করা তো এর নিয়মিত কাজেরই একটি অংশ। শুধু তা-ই নয়, ওই চা নিয়মিত পান করলে শরীরের মেদ কোষে গ্লুুকোজ ঢুকতে পারে না। কাজেই ওই সবুজ চা ওজন কমানোর অন্যান্য যে কোনো ওষুধের চেয়ে নিরাপদ। এর কোনো
পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। সবুজ চা হাড়ের ক্ষয় রোধে বেশ কার্যকর। কাজেই লোহার মতো সবল হাড় পেতে পান করুন সবুজ চা। সোজা কথায় বলা যায়, চিরসজীব থাকতে এই চায়ের জুড়ি নেই।

 
ওলং চা
এই চা অর্ধেক গাজন করেই প্রস্তুত করা হয় অর্থাৎ প্রস্তুত প্রণালির ভিত্তিতে কালো আর সবুজ চায়ের মাঝখানে এর অবস্থান। সবুজ চায়ের মতো এর আছে বহুমুখী গুণ, বিশেষ করে চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়ার পর ওলং চায়ের লিকার পান করলে কোলেস্টেরল বাড়ার আশঙ্কা প্রায় থাকে না বললেই চলে। ওলং চা বাংলাদেশে পাওয়া যায়। তবে এটি বহুল পরিচিত নয় এবং দামও কিছুটা বেশি।


আদা চা ও এর উপকারিতা
মন শান্ত করা ও মানসিক চাপ কমিয়ে আনতে আদা চায়ের ভূমিকা অতুলনীয়। আর আদা চা যে খুশখুশে কাশি, গলা ব্যথা রোধে ভীষণ কার্যকর তা বোধহয় কাউকে নতুন করে বলে দিতে হবে না। হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমিয়ে দিতেও আদা চা অনেক কার্যকর। কারণ আদায় রয়েছে ভিটামিন, মিনারাল ও অ্যামিনো এসিড। তা শরীরে রক্ত চলাচল বাড়ায় ও হৃৎপি-টি সচল রাখে। আদা চা ধমনি থেকে অতিরিক্ত চর্বি সরিয়ে ফেলতে সাহায্য করে। মাংসপেশির ব্যথা কিংবা অস্থি সন্ধির ব্যথায় আদা চা খাওয়া উপকারী। কারণ আদায় রয়েছে এমন কিছু বিশেষ উপাদান যা প্রদাহ কমিয়ে দেয়। আদা চা বানাতে পানি গরম করার সময় আদা টুকরা করে দিয়ে বেশ কিছুক্ষণ জ্বাল দিতে হয়। এরপর চা-পাতা ও চিনি দিয়ে নামিয়ে নিতে হয়। এছাড়া চা বানিয়ে এতেও আদার কিছুটা রস মিশিয়ে চা পান করা যায়।


তুলসী চা
অসাধারণ উপকারী তুলসী চা সর্দিজনিত মাথা ব্যথা, কাশি, সর্দি-জ্বর ও ঠা-া লাগা দূর করে। এটি দুশ্চিন্তা থেকে রক্ষা পেতেও সাহায্য করে। তুলসী চা বানাতে ২ থেকে ৩ কাপ গরম পানিতে ৫-৬টি তুলসী-পাতা ফুটাতে হবে। পানি ফুটে ১ কাপ পরিমাণ হয়ে এলে এতে চা পাতা দিয়ে নামিয়ে গরম গরম পান করলে কাশি, সর্দি, মাথা ব্যথার উপশম হয়। এটি এসিডিটি নিরাময়ে অনেক জনপ্রিয়।


লেবু চা
লেবু চা ওজন কমাতে অসাধারণভাবে কাজ করে। বা লিকার চায়ের তুলনায় পুষ্টিগুণে এটি বেশি উপকারী। লেবু চা বানাতে লিকার চা তৈরি করে পরিবেশনের সময় পরিমাণমতো লেবুর রস, চিনি বা মধু মিশিয়ে পান করা যায়।


পুদিনা চা
পুদিনা চা বা মিন্ট টি পেটের বাড়তি মেদ কমাতে সাহায্য করে। এছাড়া গলা বসা, গলা ব্যথা, সর্দি-কাশি ও জ্বর নিরাময়ে সাহায্য করে। পুদিনা চা বানাতে তাজা অথবা শুকনাÑ দু’রকম পাতাই ব্যবহার করা যায়। ২ কাপ পানি, দেড় কাপ তাজা পাতা অথবা ১ চা-চামচ শুকনা পাতা, স্বাদের জন্য চিনি, মধু ও লেবু দেয়া যেতে পারে। পান করার ২-৩ মিনিট আগে গরম পানিতে পাতা দিয়ে রেখে দিতে হবে নির্যাস বের হওয়ার জন্য।


মধু চা
মধু চা-ও সর্দিজনিত মাথা ব্যথা, কাশি, সর্দি, জ্বর ও ঠা-া লাগা দূর করেতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। হালকা লিকারে মধু মিশিয়ে ওই চা বানানো হয়। তবে এর সঙ্গে লেবু চিপে দিলেও শরীরের জন্য যেমন উপকারী তেমনি সুস্বাদু হয়।


জেসমিন টি
জেসমিন ফ্লাওয়ারের সুবাসযুক্ত ওই চা দারুণ জনপ্রিয়। সাধারণ সবুজ চা বা গ্রিন টিতেই জেসমিন টি বানানো যেতে পারে। শুকনা চায়ের সঙ্গে সন্ধ্যার পর পর জেসমিন ফুলের পাপড়ি তুলে মিশিয়ে রাখতে হবে এবং সকালেই তা বেছে ফেলতে হবে। এভাবে ৭ দিন পর ফ্লেভার ট্রান্সফার হয়ে যাবে।

 


লেখা : শায়মা হক
মডেল : সাদিয়া বনি
ছবি : শোভন আচার্য্য অম্বু
কৃতজ্ঞতা : মারিয়ান ফয়সাল

ব্যাগ ও ফ্যাশন

 

হ্যান্ডব্যাগ নারীর প্রয়োজনীয় ফ্যাশনেবল অনুসঙ্গ। ফ্যাশনে ও পার্টিতে হ্যান্ড ব্যাগের চাহিদা ব্যাপক। নিত্যনতুন ডিজাইনের হ্যান্ড ব্যাগের ব্যবহার শুধু সুপার মডেল, সেলিব্রিটি, ফটোশুট ও ক্যাটওয়াকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। নারীদের নিত্যপ্রয়োজনীয় অ্যাকসেসরিস হিসেবে হ্যান্ড ব্যাগের বিকল্প নেই বললেই চলে। নানাধরনের পার্টি, ফ্যাশন শো অথবা বেড়ানোর জন্য পোশাকের পরই হ্যান্ড ব্যাগের স্থান। হ্যান্ডব্যাগের মানানসই ব্যাপারটি নিয়ে বর্তমানে নারীরা এতো সজাগ যে, এর জন্য পর্যাপ্ত সময় ও অর্থ ব্যায় করে পছন্দসই ব্যাগটি সংগ্রহ করতে দ্বিধাবোধ করেন না। নারীর হ্যান্ড ব্যাগ নারীর বর্তমান সময়কে স্বপ্নময় করে তুলছে। ফ্যাশনের অনুষঙ্গ হিসেবে হ্যান্ডব্যাগের কদর থাকলেও স্থান বা বয়সের তারতম্যে এর বিভিন্নতা রয়েছে। হ্যান্ড ব্যাগ ব্যাবহার বা বহন করার ব্যাপারে নিজস্ব রুচি বা বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী পরিবেশভেদে মনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভালো জিনিসটিই ব্যবহার করা উচিত। আসলে উপযোগী ও মানানসই হাতের ব্যাগটি শরীর ও মনের প্রশান্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। ব্যাগ পছন্দের ক্ষেত্রে নারীদের অনেক সচেতন হওয়ার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কিছু কারণ রয়েছে। তা হলো- হ্যান্ডব্যাগ অনেক ক্ষেত্রে এটি নারীর সামাজিক অবস্থান নির্দেশ করে। তারা কতোটা ফ্যাশন সচেতন ও রুচিবান তা অনুমান করা যায়। তাদের সোস্যাল স্টাটাসের ইঙ্গিত করে।


শতবর্ষ আগে নারীরা বাইরে কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে খুব একটা জড়িত ছিলেন না। তখন তারা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ‘পার্স’-এ রাখতেন। আর আমাদের উপমহাদেশের সব নারীরা কাপড়ে বেঁধে রাখতেন। আর এখন দিন বদলেছে এখন গ্রামের নারীরাও বাহারী হ্যান্ডব্যাগ ব্যবহার করেন। প্রথম ষোড়শ শতকের দিকে বিলেতে বহনযোগ্য ব্যাগের ব্যবহার শুরু হয়। তখন বিভিন্ন মুদ্রা আলাদা করে রাখতে ছোট ছোট ব্যাগ ব্যবহার করা হতো। এরপর অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতকের দিকে হাতে ব্যাগ বহন আধুনিকতার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।


সারা বিশ্বের তরুণী ও বয়স্কদের মধ্যে ব্যাগ পছন্দের ক্ষেত্রে তারতম্য দেখা যায়। মধ্যবয়স্ক নারীরা লেদার, আর্টিফিশিয়াল লেদার ও বিভিন্ন কাপড়ের তৈরি অতি সাধারণ কিন্তু মানসম্পন্ন ব্যাগ বেছে নেন। তরুণীরা গর্জিয়াস অ্যাপলিং টাইপের ব্যাগ পছন্দ করেন। মিটিং, পার্টি, অনুষ্ঠানসহ অনেক ক্ষেত্রে ব্যাগ ছাড়া আপনার কাছেই নিজেকে বেমানান মনে হবে। সাজ-গোজ ও পোশাকের সঙ্গে নিজের রুচি অনুযায়ী ব্যাগের কম্বিনেশন করে নিতে হয়। আবার জুতোর সঙ্গেও মিল থাকা চাই ব্যাগ কিংবা পোশাকে। আবার এগুলোর কোনো একটি রঙ থাকতে পারে ব্যাগে- এমন পরামর্শ এখন হয়তো আর পাবেন না ফ্যাশন বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে। বর্তমানে ব্যবহারে আরামদায়ক ও নিজের সঙ্গে মানানসই ব্যাগের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে ক্রেতাদের। বাজারে চামড়া, কাপড়, পাটসহ বিভিন্ন উপাদানের ছোট, বড় ও মাঝারি আকারের ব্যাগ পাওয়া যাচ্ছে। এর পাশাপাশি পার্টি ব্যাগ ও বটুয়ার জনপ্রিয়তাও অনেক। অনুষ্ঠানে শাড়ি পরলে সঙ্গে মানিয়ে ছোট আকারের ব্যাগ, ক্লাচ বা বটুয়া নিলে দেখতে ফ্যাশনেবল দেখায়। আর এখন তো বাজারে বিভিন্ন রঙের ব্যাগ পাওয়া যায়। তাই পছন্দসই আকারের বিভিন্ন রঙের ব্যাগ নিজের কালেকশনে রাখতে ভালোই

লাগে। বিভিন্ন উৎসব ও অনুষ্ঠানে একটু বড় আকারের পার্টি ব্যাগ ও ক্লাচ বেশ জনপ্রিয়। দেশের বিভিন্ন ফ্যাশন হাউসে এখন ফ্যাশনেবল পোশাকের পাশাপাশি ক্রেতার চাহিদার দিকে লক্ষ্য রেখে মানানসই ব্যাগও রাখা হয়। চামড়ার ওপর পাথরের নকশা ও মখমলের কাজ করা হয় পার্টি ব্যাগে। এছাড়া হাতে এমব্রয়ডারি করা পুঁতি বসানো, কাপড়ের ওপর পুঁতির কাজ করা, শীতল পাটি, পাট ও জুয়েলারি স্টোনের পার্টি ক্লাচও পাওয়া যায়। শাড়ি, স্কার্ট বা লেহেঙ্গার সঙ্গে সহজেই মানিয়ে যায় বটুয়া। কাপড়ের ওপর লেইস বসানো বা ভেলভেটের বটুয়া পাওয়া যাবে যে কোনো বুটিকে।
প্রয়োজনের চেয়ে যেন ইদানীং ফ্যাশন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এ যেন আভিজাত্য ও স্টেটাস সিম্বল। বর্তমানে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ব্যাগের ফ্যাশন। ছেলে ও মেয়ে-উভয়ের ফ্যাশনে পোশাকের সঙ্গে ম্যাচ করে মানানসই বাহারি রঙের বিচিত্র নকশার ছোট-বড় ব্যাগ অন্যতম অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে। তাই অনেকেই যে কোনো পরিবেশে একটি ফ্যাশনেবল ব্যাগ ছাড়া নিজেকে অসম্পূর্ণ মনে করেন।
বর্তমানে ব্যবহারে আরামদায়ক ও নিজের সঙ্গে মানানসই ব্যাগের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে ক্রেতাদের। বাজারে চামড়া, কাপড়, পাটসহ বিভিন্ন উপাদানের ছোট, বড় ও মাঝারি আকারের ব্যাগ পাওয়া যাচ্ছে। এর পাশাপাশি পার্টি ব্যাগ ও বটুয়ার জনপ্রিয়তাও অনেক।


অনুষ্ঠানে শাড়ি পরলে সঙ্গে মানিয়ে ছোট আকারের ব্যাগ, ক্লাচ বা বটুয়া নিলে দেখতে ফ্যাশনেবল দেখায়। আর এখন তো বাজারে বিভিন্ন রঙের ব্যাগ পাওয়া যায়। তাই পছন্দসই আকারের বিভিন্ন রঙের ব্যাগ নিজের কালেকশনে রাখতে ভালোই লাগে।
বিভিন্ন উৎসব ও অনুষ্ঠানে একটু বড় আকারের পার্টি ব্যাগ ও ক্লাচ বেশ জনপ্রিয়। দেশের বিভিন্ন ফ্যাশন হাউসে এখন ফ্যাশনেবল পোশাকের পাশাপাশি ক্রেতার চাহিদার দিকে লক্ষ্য রেখে মানানসই ব্যাগও রাখা হয়। চামড়ার ওপর পাথরের নকশা ও মখমলের কাজ করা হয় পার্টি ব্যাগে। পার্স পাওয়া যায় পার্টি কিংবা ক্যাজুয়ালে। শাড়ি কিংবা জমকালো কামিজের সঙ্গে হাতে ম্যাচ করা ঝলমলে পার্স না থাকলেই নয়।
বক্স ব্যাগ এটি শক্ত বক্স আকারের। ছোট-বড় সবই আছে। ছোট হাতল থাকে। কালো রঙের ব্যাগের ওপর থাকে সোনালি কাজ করা। এছাড়া চকলেট, বাদামি রঙগুলো বেশি চলে। আবার এখন ওপরে রাবারের মতো নতুন নকশার কিছু ব্যাগ পাওয়া যায়। সামনে থাকে লক সিস্টেম চারকোণা গড়নের।

ক্লাচ ব্যাগ ফ্যাশনে সব সময় এগিয়ে ক্লাচ ব্যাগ। চারকোণা, ডিম্বাকৃতি, গোলাকৃতি, পানপাতা, তিনকোণা, কাঠের হাতলসহ বাজারে রয়েছে নানান আকারের ক্লাচ ব্যাগ। এ ব্যাগগুলো হয় ডুয়েট স্টাইলের। হাতে নেয়া ছাড়াও সরু চেইন দিয়ে কাঁধেও ঝোলানো যায়। নকশাও নজরকাড়া। কোনো ব্যাগের শরীর ঢাকা নরম পালকে, কোনোটিতে মেটাল বা লেদার আবার কোনোটি শার্টিনের কাপড়ের নকশাদার আবরণ। তবে এখন বেশ জনপ্রিয় ছোট্ট বাক্সের মতো দেখতে ক্লাচ ব্যাগ ও চৌকো আকৃতির লেদার স্লিম ব্যাগ।

প্রয়োজনের চেয়ে যেন ইদানীং ফ্যাশন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এ যেন আভিজাত্য ও স্টেটাস সিম্বল। বর্তমানে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ব্যাগের ফ্যাশন। ছেলে ও মেয়ে-উভয়ের ফ্যাশনে পোশাকের সঙ্গে ম্যাচ করে মানানসই বাহারি রঙের বিচিত্র নকশার ছোট-বড় ব্যাগ অন্যতম অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে। তাই অনেকেই যে কোনো পরিবেশে একটি ফ্যাশনেবল ব্যাগ ছাড়া নিজেকে অসম্পূর্ণ মনে করেন।

 

লেখা : সহজ ডেস্ক
মডেল : নুসরাত শ্রাবণী
ব্যাগ ও আয়োজন : সিয়াকা
ছবি : ফারহান ফয়সাল

রবীন্দ্রনাথ আবার আসবে বলেছিল

প্রফেসর ড. মো.আমিরুল মোমেনীন চৌধুরী

 

মেয়েটা প্রথম কথা বললো
তুমি কি রঙের জাদুকর?
: জাদুকর নই। আমি শিল্পী। ছবি আঁকি।
তবে রঙ নিয়ে খেলছ যে বড়!
: খেলছি কোথায়, ছবি আঁকছি।
তোমার কাছে কাগজ নেই? তখন থেকে কোরা কাপড়ে কী ঘষছ?
: এটা কোরা কাপড় নয়, প্রিপারেশন করা সাদা ক্যানভাস। আমি তো রঙ-তুলি দিয়ে ছবি আঁকছি।
ছবি না ছাই আঁকছ। কালো রঙ শুধু খরচ হচ্ছে, কিছুই তো হচ্ছে না।
: তেলরঙের ছবি। আদল ফুটে ঊঠতে সময় লাগবে। আমার তো করার কিছুই নেই। আর কালো রঙ কোথায় দেখছ, এ তো লাল রঙ।
আমি দেখছি কালো আর তুমি বলছ লাল।
: নিশ্চয় তোমার পূর্বপূররুষ মৌমাছি ছিল।


তা হবে কেন?
: মৌমাছি লাল রঙ দেখতে পায় না। লালকে কালো দেখে। তাই তো মৌচোর মৌমাছিগুলো লাল ফুলে বসে না। আমাদের চোখে যে ফুল একই রঙের, মৌমাছির কাছে তা ধরা দেয় নানান রঙে।
আমি তো জানতাম না।
: সব কথা জানতে হবে, এর কোনো মানে নেই। আমিও অনেক কিছু জানি না।
তুমি বলছ, তোমার ছবিতে লাল রঙ।
: সে তো সবাই বলবে। তা ছাড়া কালো তো কোনো রঙই নয়।
তাহলে যে কালোকে রঙ বলি! আমার কাজল কালো চোখ, মেঘ কালো চুল, কপালের কালো টিপ সবই কি মিথ্যা?
: কোনোটাই মিথ্যা নয়।
তুমি যে বললে।
: কালো হলো সব রঙের অসমসত্ত্ব মিশ্রণ।
তাহলে সাদা রঙ?
: সাদা হলো সব রঙের সমসত্ত্ব মিশ্রণ।
তাহলে ওই রঙ ছবিতে ঘষে লাভ নেই, বরং আমার কপাল দেখো কেমন হাট হয়ে আছে। এতে লাল রঙ ঘষে দাও।
: তোমার কপালে লাল রঙ ঘষবো!
হ্যাঁ, তাই তো বলছি। দেখছ না, কপালে সিঁদুর নেই। সিঁদুর ছাড়া মেয়েদের কপাল মানায়।
: এ তো রঙ। সিঁদুর নিয়ে এসো পরিয়ে দিই।
সিঁদুরের কৌটা হারিয়ে ফেলেছি সেই কবে রবীন্দ্রনাথ যখন প্রথম এসেছিল।
: তুমি রবীন্দ্রনাথকে দেখেছ?
দেখবো না কেন! সেই তো আমাকে পতিসরে নিয়ে এলো।
: তোমার বয়স কতো? বরীন্দ্রনাথ পতিসরে এসেছিলেন ১৮৯১ সালে।
মেয়েদের বয়স জানতে নেই।
: তুমি কোথায় থাকো?
তা তো বলবো না।


: রবীন্দ্রনাথ পতিসরে বসে কোন কোন কবিতা, গল্প লিখেছিলেন তা তুমি জানো?
জানি। ঘরে বাইরে, শাস্তি, চৈতালীর ঋতুসংহার, চিত্রার পূর্ণিমা আর সন্ধ্যা।
: তুমি রবীন্দ্রনাথকে ভালোবাসো।
রবীন্দ্রনাথকে সবাই ভালোবাসে।
: তুমি রানু, না কাদম্বরী?
রবীন্দ্রনাথকে ভালোবাসতে রানু বা কাদম্বরী হতে হবে কেন?
: তুমি কি জানো, রবীন্দ্রনাথও বর্ণান্ধ ছিল। রবীন্দ্রনাথ সব রঙকে চিনতে পারতেন না। রঙকানা ছিলেন তোমার রবীন্দ্রনাথ।
তুমি কি আমাকে বোকা বানাচ্ছ?
: বোকা বানাবো কেন? পৃথিবীর অনেক মানুষ আছে যারা বর্ণান্ধ। বর্ণান্ধতা বা ডাল্টনিজম প্রধানত দুই ধরনের হয়। প্রথমত. শ্রেণিভুক্ত মানুষ লাল ও নীল প্রভাবিত বর্ণটি সবুজের মধ্যে দেখে এবং দ্বিতীয়ত. শ্রেণিভুক্ত মানুষ গোলাপি ও হালকা সবুজের পার্থক্য বোঝে না। আর এক ধরনের বর্ণান্ধ আছে, বিশেষ করে দুর্গম সমুদ্র উপকূলে যারা বসবাস করে এমনই উপজাতির মানুষ পৃথিবীকে সাদা-কালোয় দেখে। বর্ণান্ধতা নারীদের চেয়ে পুরুষের মধ্যে বেশি। ফিজি, নিউ গিনি ও কঙ্গোর পুরুষদের মধ্যে বর্ণান্ধতার প্রকোপ বেশি। মানুষ, বানর বা এপম্যান, মাছ, সরীসৃপ ও কীটপতঙ্গেও বর্ণানুভূতি প্রখর বিশেষ করে যেসব প্রাণীর পরাগায়ণের সঙ্গে সম্পর্ক আছে। চতুষ্পদ স্তন্যপায়ী প্রাণীর কোনো বর্ণানুভূতি নেই।
তাহলে ষাঁড় লাল কাপড় দেখলে ক্ষেপে যায় কেন?
: ষাঁড় তো লাল, নীল, সবুজ আলাদা করে চিনতেই পারে না। যে কোনো রঙের কাপড় দিয়েই ষাঁড়কে উত্তেজিত করা যায়।
তাহলে রবীন্দ্রনাথ জীবনের এতো জয়গান করলেন কী করে?
: সে প্রশ্নটি আমারও। আমারও জানতে ইচ্ছা করে রবীন্দ্রনাথ সত্যিই বর্ণান্ধ ছিলেন কি না। সমস্যা হলো...!
কী সমস্যা?
: রবীন্দ্রনাথই জানিয়েছেন, তিনি বর্ণান্ধ। লাল বর্ণ নাকি তার চোখেই পড়ে না অর্থাৎ ‘প্রটানোপিয়া’। তবু তার ছবিতে লাল বর্ণের সমাহার রোজ ম্যাডায়ার, ক্রিমসন লেক, ভারমিলিয়ন রেড, স্কারলেট রেড, ইন্ডিয়ান রেড। রবীন্দ্রনাথ নীল বর্ণও বড় একটা ব্যবহার করতে চাইতেন না। কিন্তু তার অনেক নিসর্গচিত্রে সমুদ্র বর্ণ নীল, প্রুশিয়ার নীল, কোবাল্ট নীল, আলট্রামেরিন, বিশেষ করে আকাশের পটভূমি গড়ে তুলতে ব্যবহার করেছেন। তবে লালের প্রতি আকর্ষণ সত্ত্বেও হলুদ বা সবুজ বর্ণ যথেষ্ট ব্যবহার করেছেন। যেমন নিসর্গচিত্রে প্রতিকৃতি রচনায় অথবা হলুদের ওপর সবুজ। বর্ণান্ধ থিউরিতে বলা হয়, 

"Colour Blindness is the inability to distinguish the difference between certain colours. The condition results from an absence colour-sensitive pigments in the cone cells of retina, the nerve layer at the back of eye. Most colour vision problems are inherited are present at 1 out of 12 men and 1 out of 20 women. A person with colour blindness has trouble seeing red, blue, or mixture of these colours. The most common type is red-green Colour-blindness where red and green are seen as the same colour"


রঙ নিয়ে আরো কথা আছে। বাইরের জগৎ থেকে আসা তথ্য চোখ সংগ্রহ করে এবং তা মস্তিষ্কে প্রেরণ করার আগে তাৎক্ষণিকভাবে চোখ তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে। চোখ আর মস্তিষ্কের সম্পর্ক খুবই অদ্ভুত ধরনের। চোখের আড়াল হলে মনের আড়াল হওয়া ব্যাপারটি এখানে সম্পূর্ণ উল্টো। এখানে মনের আড়াল হলে চোখের আড়াল অর্থাৎ মন না চাইলে চোখ কী করে দেখবে! এর একটা সহজ প্রমাণ হলো, সাদা কাগজের ওপর লাল রঙের একটি বৃত্ত আঁকতে হবে। এরপর কিছুক্ষণ বৃত্তটির দিকে নির্ণিশেষ তাকিয়ে থেকে হঠাৎ এক সময় দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে আরেকটি সম্পূর্ণ সাদা কাগজে দিকে তাকালে একটি আবছা সবুজ রঙের বৃত্ত দেখা যাবে। এর কারণ হলো, লাল বৃত্তটির দিকে তাকিয়ে থাকার ফলে লাল রঙের প্রতি সংবেদনশীল গ্রাহকযন্ত্র ক্লান্ত হয়ে পড়ে ও স্বল্প সময়ের জন্য তার কর্মক্ষমতা লোপ পায়। তাই আমরা যখন দ্বিতীয় সাদা কাগজটির দিকে তাকাই তখনই ওই কাগজ সমস্ত রঙ প্রতিফলিত করলেও লাল গ্রাহকযন্ত্র ক্লান্ত থাকায় এর কাজ সঠিকভাবে করতে পারে না। অপরপক্ষে নীল ও সবুজ গ্রাহকযন্ত্র সতেজ থাকায় পূর্ণশক্তিতে কাজ করে এবং মুহূর্তের জন্য আমরা লাল রঙের পরিপূরক বলে সবুজ রঙটি দেখতে পাই। এতে এটিই প্রমাণিত হয়, চোখ যে রঙ দেখতে চায়, মন ওই রঙটিই দেখায়।
রঙের এতো কথা!
: আরো কথা আছে। রঙ চিত্রশিল্পে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রঙ কখনো আলো, কখনো প্রতীক, কখনো পরিপ্রেক্ষিত এবং কখনো বিষয়। চোখ খুললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে রঙের ভুবন। অক্ষর ও সংখ্যার মতো রঙ মানুষের সহজ ও স্বাভাবিক জীবনের অঙ্গ। রঙের ভাবার্থ, ভাষা ও ব্যঞ্জনার প্রকাশ সাধারণত এভাবে করা হয়ে থাকে
সাদা : পবিত্রতা, শুভ্রতা, শান্তি, বিশ্বাস, আধ্যাত্মিকতা ও আভিজাত্য।
কালো : শ্রীহীন, মলিন, ধ্বংস, শোক ও বিকৃতি।
লাল : প্রেম, আনন্দ, সৌন্দর্য, বিপ্ল¬ব, আশা ও জীবন।
কমলা : হৃদয়াবেগ, কামনা ও উষ্ণতা।
নীল (কোবাল্ট) : সহনশীলতা, রোমান্টিকতা, অসীমতা ও জ্ঞান।
নীল (প্রুশিয়ান ) : ভয়, অস্বস্তি, উদ্বেগ ও হিংস্রতা।
সবুজ : প্রকৃতি, প্রাণ, মুক্তি, সততা, তারুণ্য ও বিশালতা।
হলুদ (লেমন) : ধর্মীয় আবেগ, প্রজ্ঞা, তাপ, আশ্বাস, নৃশংসতা, কাপুররুষতা ও প্রতারণা।


হলুদ (সোনালি) : ঐশ্বর্য, স্বাস্থ্য, বিস্ময় ও সমৃদ্ধি।
বেগুনি : হতাশা, দুঃখ ও নির্জীবতা।
বাদামি : মন্থরতা ও ঔদাসীন্য।
পিঙ্গল : বিষাদ ও বিস্মৃতি।
ধূসর : মৃত্তিকা ও শূন্য প্রান্তর।
চিত্রশিল্পে ব্যবহার উপযোগী রঙ দু’ভাবে ভাগ করা হয়েছে। তা হলো
মৌলিক (অবিমিশ্র) বা প্রাইমারি রঙ : লাল, নীল ও হলুদ।
মাধ্যমিক বা সেকেন্ডারি রঙ : কমলা, বেগুনি, ধূসর, পিঙ্গল, সবুজ, বাদামি, গোলাপি ইত্যাদি।
এবার ছবির কথা বলো। কার ছবি আঁকছ মডেল ছাড়া? তুমি কি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর?
: আমি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হতে যাবো কেন?
তাহলে যে বড় দেমাগ করে মডেল ছাড়া ছবি আঁকছ!
: রবীন্দ্রনাথ ছাড়া কেউ বুঝি মডেল ছাড়া ছবি আঁকতে পারে না?
না, পারে না।
: আমি যে মেয়েকে ভালোবাসি তাকেই আঁকবো ভেবেছি।
সেই মেয়ে কি আমি?
: তুমি নও, অন্য কেউ। তার জন্যই তো আমি এখানে এসেছি।
সে মনে হয় পালিয়ে গেছে, বরং আমার ছবি আঁকো। তোমার মডেল হবো আমি।
: তা কী করে হয়!
কেন হয় না। আমি বুঝি সুন্দর নই?
: তুমি অনেক সুন্দর। যার ছবি আঁকছি সে আরো সুন্দর।
হতেই পারে না।
: হতে পারে না কেন?
আমি বলছি, তাই। ছবি শেষ করে দেখো।
: আমার ছবি শেষ হতে সময় লাগবে।
আমি অপেক্ষা করবো।
: কোথায় যাচ্ছ তুমি? এই যে বললে অপেক্ষা করবে?
আমার বুঝি কাজ নেই? বসে বসে তোমার ছবি আঁকা দেখবো?
: এই যে বললে আমার মডেল হবে।
বয়েই গেছে তোমার মডেল হতে! ওই দেখো।
: কী?
বৃষ্টি থেমে গেছে। আকাশে রামধনু।
: আমরা বলি রঙধনু।


রামধনু বলতে দোষ কী?
: হিন্দু ধর্মের মানুষ ভাবে, ওটা রামচন্দ্রের ধনুক। তাই রামধনু।
মুসলিমরা তা মানতে নারাজ, তাই।
রঙের ধনুক রঙধনু।
: রঙের আবার জাতি-ধর্ম!
জাতি-ধর্মের নয়, ব্যাপারটি বিশ্বাসের। ইংরেজিতে এর নাম রেইনবো। বাংলা নামের অর্থের সঙ্গে এর কোনো মিল নেই। রঙধনুর সাতটি রঙ বেগুনি, নীল, আসমানি, সবুজ, হলুদ, কমলা ও লাল। ইংরেজিতে এর সংক্ষেপ ‘ভিবজিওর’ আর বাংলায় ‘বেনীআসহকলা’।
: কোথায় তুমি? আমি কার সঙ্গে কথা বলছি? ছবি আঁকা শেষ হয়ে গেছে।
ক্যানভাসের ছবির দিকে তাকিয়ে দেখো।
: কী আশ্চর্য! এ তো তোমার ছবি।
তুমি তো আমার ছবিই একেঁছ।
: আমি তো অন্য কারো ছবি আঁকতে চেয়েছিলাম। এটি কী করে সম্ভব হলো!
পৃথিবীতে অসম্ভব বলে কিছু নেই।
: আমার কাছে এসো। তোমাকে তো দেখতে পাচ্ছি না।
আমাকে আর কখনো দেখবে না তুমি।
: তা কী করে হয়!
আমি যে এ রকমই।
: আমি তো তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি।
এই যে বললে, তুমি অন্য কাউকে ভালোবালো?
: সেই মেয়ে যে তুমি তা আমিও জানতাম না।
ভালোবাসার আগে আমার মনের খবর জানা উচিত ছিল।
: তবু তোমাকেই যে আমি ভালোবেসেছি!
আমি যে ক্যানভাসের ছবি হয়ে গিয়েছি।
: ক্যানভাস থেকে বেরিয়ে এসো।
আমি যে তোমার হতে পারবো না!
: কেন পারবে না?
আমি যে অপেক্ষায় আছি!
: কার জন্য অপেক্ষা করে আছ তুমি?
রবীন্দ্রনাথের জন্য।
: রবীন্দ্রনাথের জন্য! তুমি কি পাগল? রবীন্দ্রনাথ আর কখনো আসবে না।
রবীন্দ্রনাথের জীবনে কোনো মিথ্যা নেই।
: এটি সত্য-মিথ্যার কথা নয়। একটি বড় ভুলের মধ্যে আছ তুুমি।
আমি জানি। তবুও আমার কাছে রবীন্দ্রনাথ আবার আসবে বলেছিল।
: পতিসরে অনেক খুঁজেছি তাকে। দেখা হয়নি। শুধু মনে পড়ে
‘জীবন যদি শুকায়ে যায়, করুণা ধারায় এসো, সকল মাধুরী লুকায়ে যায় গীতসুধা রসে এসো ...’

রবীন্দ্রনাথ কি সত্যি আবার আসবে? সে যে বলে গেল!

অনন্য রনবী

 

ছাত্র জীবনে শুধু সমুদ্র নিয়েই বহু কাজ করেছেন জলরঙে। সমুদ্রও আলাদা রঙে ধরা দিয়েছে তাঁর অঙ্কনে। কাজ করেছেন কক্সবাজার থেকে টেকনাফের সমুদ্রপাড়ে। পদ্মা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্রের চরে ডাইয়ের কাজ করেছেন অসংখ্য। এঁকেছেন ধূসর পদ্মা, পানি আর চিক চিক করা চর, কালো কালো নৌকার পাল। জলরঙ ছাড়াও অন্যসব মাধ্যমেও সমান বিচরণ তাঁর। প্রকৃতি ও মানুষের পাশাপাশি এঁকেছেন উড়ালডানার পাখি, নিশ্চুপ পাখি, মোরগ, মহিষ, ষাঁড়, বাউল, বানরওয়ালা কতো কী!
আর্ট কলেজে প্রথম বর্ষের ছাত্র থাকাকালেই তাঁর আঁকা ছবি স্থান করে নেয় ঢাকার বিভিন্ন প্রদর্শনীতে। দেশে-বিদেশে ওই পঞ্চাশের দশক থেকে এখন পর্যন্ত বহু প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করে নিজেকে চিনিয়েছেন এক ভিন্ন দর্পণে। বহুবিধ শিল্পবোধ শুধু রঙ-তুলিতে সীমাবদ্ধ করেননি। সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা তার কর্মে ছিল তীক্ষè ও বুদ্ধিদীপ্ত যা দশকের পর দশক মানুষকে ভাবিয়েছে, জুগিয়েছে চিন্তার খোরাক। পথশিশুর মুখে তুলে দিয়েছেন সামাজিক ও রাজনৈতিক ভাষা যা তৎকালীন আর্থসমাজ ব্যবস্থায় নাড়া দিয়েছিল প্রবল। মাসিক ‘সহজ’-এর পক্ষ থেকে এক শুক্রবার গিয়েছিলাম ওই গুণী শিল্পীর নিজ বাসভবনে। কথা প্রসঙ্গে শিল্পীজীবনের আদ্যপান্ত জানালেন চিত্রশিল্পী ও টোকাই চরিত্রের জনক প্রখ্যাত কার্টুনিস্ট রফিকুন নবী বা রনবী।

প্রথমেই শিল্পীজীবনের অর্জনের প্রসঙ্গ তুলতেই তিনি হেসে বললেন, ‘এই যে আমার কাছে ছুটে এসেছ এটিই তো বড় অর্জন। তারপরও বলি, একুশে পদক (১৯৯৩), চারুকলায় জাতীয় সম্মাননা শিল্পকলা একাডেমি অ্যাওয়ার্ড (১৯৮৯), শিশুদের বই ডিজাইনের জন্য অগ্রণী ব্যাংক অ্যাওয়ার্ড (১৯৯২ ও ১৯৯৫), ১৯৬৮ সাল থেকে ১৩ বার ন্যাশনাল বুক সেন্টার পুরস্কার, শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার, অগ্রণী ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার, বুক কভার ডিজাইনের জন্য ১৩ বার ন্যাশনাল একাডেমি পুরস্কার লাভ করেছি। বার্জার থেকে আমাকে দেয়া হয়েছে আজীবন শিল্পীখ্যাতি।’

মানুষের জীবনে প্রেম অলৌকিক ছোঁয়া। এই স্পর্শের বাইরে কেউ নয়। শিল্পী ও কবির প্রতিটি দিন-ক্ষণ প্রেমে রঙিন কিংবা বেদনায় মলিন। এই বেদনার মালিন্য কিংবা রঙ কতোটা রঙিন তা অন্তরালেই রয়ে গেল তাঁর কথায়, ‘আমাদের সময়ে মেয়েরা কঠিনভাবে গৃহে অন্তরীণই থাকতো। তারপরও যে কেউ প্রেম করিনি তা নয়। প্রেম তো চিরন্তন। তবে আমার ওই সময়ের জীবনপ্রবাহ এতো ব্যস্ততা, আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গেছে যে, সেভাবে প্রেম করা হয়ে ওঠেনি। তবে শিল্পী, লেখক, সৃজনশীল সব মানুষের জীবনে রোমান্টিক কিছু বিষয় অর্র্থাৎ ভালো লাগা, না বলা কথা এসব তো থাকেই। ওইসব গোপন জিনিস আড়ালেই থাক।’

লেখালেখির সঙ্গে রনবীর নিবিড় সম্পর্কের কথা আমাদের অনেকেরই জানা। তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম, কেন লিখেন? উত্তরে তিনি বলেন, ‘লেখালেখি আমার স্কুল জীবনের সঙ্গি।
ছোটবেলায় পত্রিকায় ছোটদের পাতায় লেখা ছাপা হতো। তা দেখে খুব মজা পেতাম। আমার এই লেখালেখি তো আর লেখক বা সাহিত্যিক হওয়ার জন্য নয়, হঠাৎ মনে হয় আর লিখে ফেলি। আবার ছবি আঁকার মুড না থাকলে লিখি। পাবলিশাররা বলে, একটা বই দেন; পত্রিকা বলে, লেখা দেন; কখনো বলে ছড়া দেন, উপন্যাস দেন, রম্য রচনা দেন, ছোটদের গল্প দেন। মন ভালো থাকলে স্টুডিওর মধ্যেই বসে যাই মনে যা আসে তা-ই লিখি। আমার টুকটাক লেখালেখির শুরু ওই স্কুল জীবনেই। আমার প্রথম লেখাটি প্রকাশিত হয় ১৯৫৭-৫৮ সালের মাঝামাঝি ইত্তেফাকের ‘কচিকাঁচার আসর’-এ। নিয়মিত পত্রিকায় কলাম লিখতাম। এখনো মাঝে মধ্যে লিখি। শিশুদের জন্য লেখা আমার প্রথম বইটি প্রকাশ হয় ১৯৯১ সালে। বছর দুয়েক সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রা’য় টিভি রিভিউ লিখতাম।’ গান সম্পর্কেও বলতে গিয়ে বললেন, ‘গান শুনি। গান আমার প্রাণ, আমার উত্তেজনা। আগে আমাদের বাড়িতে গান-বাজনা কেউ করেনি, কেউ সঙ্গীতজ্ঞ নয়। কিন্তু গান ভালোবাসে সবাই। এখন অবশ্য আমার ছোট ছেলে রাতুল ভালোই গান করে। মা-বাবা থেকে শুরু করে মামা-মামি,

আমার ছোট ভাইবোন সবাই গান পছন্দ করে। বাড়িতে তখনকার সময়ে কলের গান ছিল। আমাদের গান শোনার চর্চা ছিল’। চিত্রকলা, কবিতা ও সঙ্গীত এ তিনটি বিষয় আপনি কীভাবে দেখেন প্রশ্নের উত্তরে রনবী সরাসরি বললেন, ‘চিত্রকলা, কবিতা আর গান তিন ভাইবোন। এগুলো যখন এক সঙ্গে থাকে তখন নানান খুনসুটিতে সংসার মেতে ওঠে। একটি ছাড়া আরেকটি সম্পূরক হয় না। কে কী রকম, কোন মাধ্যমটিতে কাজ করবে সেটিই হলো আসল কথা। যিনি লিখছেন তার যে রস, যিনি আঁকেন তারও একই রস। ভাব প্রকাশের মাধ্যমগত দিকটি শুধু ভিন্ন। এভাবে যদি বলি তো ঘটনা একই। যিনি কবিতা লেখেন তার যে রস, অনুভূতিগত চেতনা আবার লেখার ঢঙ, লেখার ধরন, লেখার টেকনিক এসবই যেমন তাদের আছে তেমনি আমাদেরও আছে। তারাও যেমন বলেন গানটা বেশ ভালো হয়েছে তেমনি আমরাও আমাদের ছবির কম্পোজিশন ভালো বলি। সব দিক থেকে ঘটনা একই। সমাজে কবি, শিল্পী, গায়ক খুবই গুরুত্ব বহন করে।’
ক্যানভাসে মূর্ত হয়ে ওঠা ছবিগুলো বোধগম্য হয়ে ওঠে দর্শকের কাছে আর বিমূর্ত ছবিগুলোয় চেয়ে থাকে শত প্রশ্নের চোখ। এক্ষেত্রে ছবিটি বোধগম্য করার জন্য আপনি কী ধরনের কাজ করেন প্রশ্নের উত্তরে রনবী বলেন, ‘আমার কাজে পারস্পেক্টিভ রাখি না। ছবি আঁকতে গেলে বিষয়ের সঙ্গে প্রকৃতি আলাদা করে ফেলি। যেটা করি তা হলো কোথাও পারস্পেক্টিভ অর্ধেক রাখবো, কোথাও রাখবো না; কোথাও বার্ডস ভিউ থেকে, কোথাও বা নিচে বসে দেখছি এই রকম ভাব আনি। তারপর যেটা করি তা হলো ভিউয়ার্সটি মনোযোগী করানো। পরিচিত দৃশ্য হলে সেগুলো আমার মতো করে সাজাই। আমার পছন্দসই দিকগুলো রাখি। আবার আলো কোথায় ফেলবো, আলোর আদৌ দরকার আছে কি না এগুলো নিয়ে ভাবি। এসব বিষয় কখনো হয়তো খুব সফল হয়, কখনো হয়ও না’।

দীর্ঘদিন সাপ্তাহিক বিচিত্রার ফটোসুন্দরী প্রতিযোগিতার বিচারক ছিলেন। ফ্যাশন সচেতন না হলে তা কী করে সম্ভব এ প্রশ্নের জবাবে, ‘হ্যাঁ ছিলাম। অনেক কাজ করেছি। ওই কাজে যে শিল্পবোধের প্রয়োজন তা হয়তো আমার ভেতরেই ছিল। তাছাড়া যুবক বয়সে আমিও কম ফ্যাশন সচেতন ছিলাম না। বিচিত্রার এ কাজের জন্য এ দেশের ফ্যাশনে এক প্রকার জোয়ার এসেছে বলা যায়। বিচিত্রার দেখাদেখি অনেক পত্রিকাও এগিয়ে এসেছে।’

আপনি কীভাবে পেয়েছিলেন টোকাইকে ‘টোকাই আমার ভাবশিশু। সে পথশিশু, অনাথ হলেও কিছুর তোয়াক্কা করে না, বেয়াদবি করে না, মজার মজার কথা বলে। এই যে টোকাই, সে শুধু সামাজিক কথাই বলে। এতে সরাসরি রাজনীতি না থাকলেও সামাজিক বাস্তবতার একটা রাজনীতির দিক থাকে। আট-নয় বছরের একটা ছেলে। পরনে চেক লুঙ্গি মোটা পেটটায় কষে বাঁধা। মাথায় ছোট করে ছাঁটা খাড়া চুল। সময় নেই, অসময় নেই চিৎকার করে গান গায়। রাস্তায় পথচারীকে কখনো অহেতুক কিছু প্রশ্ন করা আর ঘড়ি হাতে লোক দেখলেই সময় জানতে চাওয়াটা ছিল তার নিত্যদিনের অভ্যাস। রাস্তার ছিন্নমূল অন্য কয়েক শিশুর মতোই ছেলেটি টোকাই। ওই দেখা থেকেই জন্ম নিল টোকাই।’

আপনি তো শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসানদের সরাসরি ছাত্র ছিলেন। তাদের কতোটা কাছ থেকে দেখেছেন ‘শুধু জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান নন, শফিউদ্দীন আহমেদ, মোস্তফা মনোয়ার, রশিদ চৌধুরী, আবদুর রাজ্জাকসহ
বাংলাদেশের আরো যারা খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী আছেন তাদের সরাসরি ছাত্র আমি। আমার সৌভাগ্য যে, তাদের প্রত্যেকের নৈকট্য আর সাহচর্যে আসতে পেয়েছি। আর্ট কলেজে ভর্তির আগে ভাবতাম, ওখানে গেলে মনে হয় শুধু ছবি আঁকা হবে। পরে দেখি অত্যন্ত কঠিন একটা লেখাপড়ার সেশন রয়েছে। সেটি ছিল ভিন্ন এক জগৎ। শিক্ষকরা আমাদের তো শেখাতেন, একই সঙ্গে নিজেদের কাজ নিয়েও ব্যস্ত থাকতেন। তারা একেকজন একেক স্টাইলে কাজ করতেন, একেকজন একেকভাবে পড়াতেন। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন এক রকম, কামরুল হাসান আরেক রকম। আমরা প্রত্যেকের স্টাইল অনুসরণের চেষ্টা করতাম। এভাবে সবার কাজ দেখতে দেখতে কিংবা শুনতে শুনতে নিজের একটা স্টাইল তৈরি হতো।


শিল্পীদের আঁকা ছবি এখনো সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে বলে মনে করি না। শিল্পের সঙ্গে সমাজের এই দূরত্ব কীভাবে কমানো যায় ‘শিল্প সমাজে একটা স্ট্যাটাসের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। যাদের সামর্থ্য আছে তারা ছবি কেনে বা সংগ্রহ করে ইন্টেরিয়র সাজায়। অনেকে শখ করে বিশ্বের বিখ্যাত সব শিল্পীর ছবি সংগ্রহ করে। কিন্তু শিল্পরস কতোজন আহরণ করে এ বিষয়ে সন্দেহ আছে। আসলে শিল্প অনুধাবনে সমাজটিকে আরো শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হবে আমাদের।
দেশের তরুণ সমাজের প্রতি আপনার ভাবনা কেমন ‘অবাক আর মন খারাপ লাগে এটা ভেবে যে, কী এমন ঘটে, কী এমন তাদের চোখের সামনে দেখানো হয়, কেমন করে কী তাদের মাথায় ঢোকানো হয় এতো ভালো ভালো পরিবারের, লেখাপড়া জানা ছেলেরা আত্মঘাতী কাজে জড়িয়ে পড়ছে! তারা তো ধ্বংস হচ্ছেই, একই সঙ্গে নিরস্ত্র-বিপন্ন মানুষের জীবন দুর্বিষহ করে দিচ্ছে। এভাবে নিজের জীবন শেষ করে দেয়ার তাদের কোনো অধিকার নেই। তাই তরুণ প্রজন্মকে বলছি তোমরা দেশটিকে ভালোবাসো, দেশের মানুষকে ভালোবাসো। তোমাদের শিক্ষা-দীক্ষা দেশের মানুষের স্বার্থে ব্যবহার করো। জীবন তো একটা... নাকি?’
প্রিয় চিত্রকর্ম কোনটি প্রশ্নের উত্তরে রনবী বললেন, আমার প্রিয় চিত্রকর্ম বলতে গেলে অগণিত। কতো শতো ছবি আর শিল্পী এসে ভিড় করে মনের মধ্যে! এর মধ্যে অন্যতম প্রিয় ছবির কথা বলতে পারি। সেটি পাবলো পিকাসোর ‘গুয়ের্নিকা’। তিনি ছবিটি আঁকেন ১৯৩৭ সালে। এর পটভূমি স্পেনের গুয়ের্নিকা শহরের গৃহযুদ্ধ। আমার প্রিয় চিত্রকর্ম পিকাসোর গুয়ের্নিকা-র ক্যানভাসে তেলরঙ। ছবিটি আছে মুসেও রেনে সোফিয়া, মাদ্রিদ, স্পেনে। চিত্রটিতে রঙ আছে তিনটি সাদা, কালো ও ধূসর। এই তিন রঙ ব্যবহার করার কারণ হলো ছবিতে বিবর্ণতা-বিষাদ ফুটিয়ে তোলা। তেলরঙের ওই ছবিতে দেখা যায়, একটি ঘর যার বাঁ পাশে উন্মুক্ত অংশে একটি ষাঁড়, তার সামনে মৃত শিশু নিয়ে কান্নারত মা, মাঝখানে প্রচ- উন্মত্ত একটি ঘোড়া আঘাতপ্রাপ্ত। ঘোড়ার শরীরের নিচে এক সৈনিক। অশুভ চোখের আকৃতির একটি বাল্ব জ্বলছে ঘোড়ার মাথার ওপর। এছাড়া যুদ্ধের বীভৎসতা ও ধ্বংসলীলা মনে গেঁথে গেছে। মাইকেলেঞ্জেলো আর লিওনার্দো দা ভিঞ্চির ছবি দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। সুযোগ হয়েছে
‘মোনালিসা’ দেখার। দেখেছি রেমব্রান্ট, রেনোয়া, ভ্যান গগ, গগার ছবি। মাইকেলেঞ্জেলোর ‘মোজেস’ ভাস্কর্যটি অন্য রকম এক শিল্পকর্ম মনে হয়েছে। ভাস্কর্যটির একটি রেপ্লিকা রোম থেকে সংগ্রহ করেছি।

নিজের পরিবার সম্পর্কে রনবীর বললেন, ‘আমি ১১ ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে বড়। আমাদের বিয়েটা হয় পারিবারিক পছন্দে। আমার স্ত্রী নাজমা বেগম। আমাদের দুই ছেলে আর এক মেয়ে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নেয়ার পর এখন পুরোদস্তুর পারিবারিক মানুষ। আমার বড় ছেলে রাহিলুন নবী। সে এখন লন্ডনে। মেয়ে নাজিয়া তাসমেনিয়া। ছোট ছেলে রকিবুন নবী। সে এখন নেমেসিস ব্যান্ডের ভোকালিস্ট। গায়ক রাতুল নামে পরিচিত। আমি অতীতের কিছু ভুলি না। ওই শৈশবের দিনগুলো থেকে আজকের দিনটির সকাল পর্যন্ত সবই মনে আছে। ওই স্মৃতি সম্ভার চয়ন করেই বৃদ্ধ জীবন পার করছি।’


সাক্ষাৎকার : শাকিল সারোয়ার
অনুলিখন : রাশেদ মামুন
ছবি : শোভন আচার্য্য (অম্বু)

 

Page 4 of 29

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…