Super User

Super User

Page 5 of 24

 হেয়ারকাট

 

কতো শত গান, কবিতা রচিত হয়েছে নারীর চুল ঘিরে। নারীর সৌন্দর্য বর্ণনায় চুলের উপমা থাকবেই। তবে ছেলেদের চুলের সৌন্দর্য অনেকটাই অপ্রকাশিত থেকে গেছে। মজার বিষয় হচ্ছে, সময়ের এমন পরিবর্তন এসেছে যে, নারীর চেয়ে ছেলেরা চুলের স্টাইল নিয়ে বেশি সজাগ এবং বৈচিত্র্যও অনেক।


নারীরা চুলের যত্নে হাতে গোনা কয়েকটা স্টাইলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেন। এক্ষেত্রে ছেলেরা চাইলেই তার চুলের স্টাইল চেঞ্জ করে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন লুক নিয়ে আসেন। অতীতের ছেলেদের উড়ন্ত চুল বিপ্লব ও স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে ধরা হতো। শুধু চুলই পারে কারো অবয়বের পুরোপুরি পরিবর্তন করে দিতে। হেয়ারস্টাইলের সঙ্গে যে কোনো ছেলের কুল লুক, বয় লুক, অ্যারিস্টোক্রেসি, এথলেক, ব্যক্তিত্ববান, রাফ অ্যান্ড টাফ ও জেন্টেল লুক প্রকাশিত হয়। বর্তমান ফ্যাশনে ছেলেরা নিত্যনতুন হেয়ারস্টাইল নিয়ে খুবই সজাগ। তাদের হেয়ার ফ্যাশন দু’ভাবে হতে পারে। তা হলো লম্বা ও ছোট চুলের স্টাইল।


লম্বা চুলের জন্য একটি জনপ্রিয় স্টাইল হচ্ছে মেন বান কার্ট। সহজ কথা হচ্ছে চুলে একটি ঝুঁটি বাঁধা। এটি হতে পারে সব চুল এক সঙ্গে পেছনে বাঁধা আবার শুধু হেড বটম চুলগুলো ছোট করে ঝুঁটি বাঁধা। পেছনের চুল খোলা রাখা যেতে পারে। এটি বিভিন্ন স্টাইলেও করা যায়। আপনার ফেইস অনুযায়ী নিজের কাছে যেটি মানানসই হবে সেটিই করতে পারেন।


কুল লুকের জন্য গ্লোসার কার্ল ফ্যাশনে স্থান করে নিয়েছে। এই স্টাইল চোখে পড়ার মতো ইউনিক লুক এনে দেয়। এক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতা আছে। আপনার চুল কার্লি না হলে এই কাট থেকে মন সরিয়ে নিন।
আপনার মাঝারি চুলগুলো ব্যাকব্রাশ করে ফেলুন। করপোরেটের ক্ষেত্রে এটা এনে দেয় দারুণ লুক। এ স্টাইলটিকে বলা হয় ইজি সুইফট ব্যাক। তবে এটি আপনাকে ম্যাচিউরড লুক পেতে সাহায্য করে। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে টিনএজারদের থেকেতুলনামূলকভাবে একটু বেশি বয়সের ছেলেদের এই কাট ভালো মানায়।

এবারের ঈদে তরুণদের কাছে সবচেয়ে পছন্দের কাট হচ্ছে শর্ট স্টিকিং। দু’দিক থেকে বেশি ছোট করে বটম চুল একটু বড় করে জাম্পিংয়ে রাখা। ফুটবল তারকাদের মধ্যে এ স্টাইল বেশি দেখা যায়।
শর্ট সাইড পার্ট হাল ফ্যাশনের আরেকটি স্মার্ট কাট। বামদিকে ছোট করে একটা লম্বা স্পষ্ট সিঁথি বের করে বাকি চুলগুলো আঁচড়ে নিতে হয়। হাল ফ্যাশন থেকে ছিটকে পড়েছে পাম্প স্টাইল এবং বিভিন্ন স্পাইক। চুল যখন আপনার পুরো গেটআপ পরিবর্তন করতে সক্ষম তখন একবার ভেবে নিন, এবার ঈদে আপনি কোন স্টাইল বেছে নেবেন। সেটি আগে থেকে প্ল্যান করে হেয়ার ড্রেসারের কাছে যান।

 

_______________________________


লেখা : শাফিক মালিক
স্টাইলিং : শাফিক মালিক
মডেল : তুষার, আপেল, তনয়, রাসেল
ছবি : শোভন আচার্য্য অম্বু

ঈদ উৎসব ও নন্দনতত্ত্ব

ড. মো. আমিরুল মোমেনীন চৌধুরী




ঈদ ‘আওদ’ শব্দ থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। আওদ-এর আভিধানিক অর্থ পুনরাগমন বা বার বার ফিরে আসা। অষ্টম শতকের প্রথম দিকে বাংলাদেশে মুসলমানদের আগমন ঘটে। ওই সময় সুফি, দরবেশ, তুর্কি- আরব বণিকদের মাধ্যমে বাংলাদেশে রোজা, নামাজ ও ঈদের সূত্রপাত বলে মনে করা হয়। অবশ্য তা ছিল বহিরাগত ধর্ম শাসক, ব্যবসায়ী ও ভ্রমণকারীদের ধর্মীয় উৎসব। বাংলাদেশের ধর্ম সামাজিক পার্বণ নয়। বাংলাদেশে রোজা পালনের প্রথম ঐতিহাসিক বিবরণ পাওয়া যায় ‘তাসকিরাতুল সোলহা’ গ্রন্থে। এই গ্রন্থের বিবরণ থেকে জানা গেছে, আরব দেশের শেখউল খিদা-র ৩৪১ সন মুতাবিক অর্থাৎ ৯৪১ খ্রিস্টাব্দে ঢাকায় আগমন। ঢাকায় ইসলাম ধর্ম প্রবেশের আগে শাহ সুলতান রুমি নেত্রকোনা ও বাবা আদম শহীদ বিক্রমপুরের রামপালে ইসলাম প্রচার শুরু করেন। শেখউল খিদা চন্দ্র বংশীয় রাজা শ্রী চন্দের শাসনকালে (৯০৫- ৯৫৫ খ্রিস্টাব্দ) সবুজ বদ্বীপে আগমন করেন বলে অনুমান করা হয়। তাদের প্রভাবেই বাংলাদেশে রোজা, নামাজ ও ঈদ প্রচলিত হয়েছিল- এটাও প্রমাণ সাপেক্ষ নয়। কারণ ‘নামাজ’, ‘রোজা’, ও ‘খোদা হাফেজ’ শব্দের ব্যাপক প্রচলনে বোঝা যায়, অ্যারাবিয়ানরা নন, ইরানিয়ান সুফি-দরবেশদের দ্বারাই বাংলাদেশে ইসলাম প্রচার শুরু হয়েছে। উপরোক্ত তিনটি শব্দই আরবি নয়, ফার্সি। ১৬৪০ খ্রিস্টাব্দে বাংলার সুবেদার শাহ সুজার নির্দেশে তার প্রধান আমাত্য মীর আবুল কাসেম একটি ঈদগাহ (২৪৫-১৩৭ ফিট আয়তন) নির্মাণ করেন। ভূমি থেকে ১২ ফিট উঁচু ওই ঈদগাহের চতুর্দিকে ১৬ ফিট উঁচু সুদৃশ্য প্রাচীর ঘেরা। ঈদগাহে মেহরাব ও মিনার নির্মিত হয়েছিল। মোগল আমলে রাজদরবার, আদালত, সেনা ছাউনি ও বাজারে কেন্দ্রে অবস্থান ছিল ওই ঈদগাহের। সেখানে শুধু সুবেদার, নায়েবে নাজিম, অভিজাত মুসলমান কর্মকর্তা ও তাদের স্বজনরাই এখানে ঈদের নামাজ পড়তে পারতেন। পরে ঈদগাহ ময়দান জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। ওই ঈদগাহ ময়দানের পাশে ঈদের সময় মেলা বসতো। মোগল আমলে ঈদের দিন জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান ও আনন্দ উৎসব হতো। এর প্রমাণ পাওয়া যায় বাংলাদেশে বিভিন্ন স্থানে গণমুখী শাহী ঈদগাহের উপস্থিতি দেখে। সুফি-সাধকদের ভূমিকাও ছিল এক্ষেত্রে অনন্য এবং অধিকতর জনসচেতন। উনিশ শতকের শেষ দিকে ঈদের আনুষঙ্গিক আনন্দের সঙ্গে যুক্ত হয় একটি নতুন উপাদান ‘লোকজ মেলা’। ওই মেলায় শোলার তৈরি পাখি, ফুল, কুমির, হাতি, ঘোড়া, নকশা তালপাখা, চিত্রিত শখের হাঁড়ি ছাড়াও অনেক লোকজ খেলনা পাওয়া যায়। আর দই, মিষ্টি ও জিলাপির পসরার কোনো তুলনা নেই। ওই ধারা এখনো বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিরাজমান। ঈদ যে বাংলাদেশের মুসলমানদের মহোৎসব এর বড় প্রমাণ উৎসবমুখর ঈদের বাজার। তা নি¤œবিত্ত থেকে উচ্চবিত্তের এক যোগসূত্র। এর সঙ্গে আবার যুক্ত কোরবানির মহোৎসব। ‘কোরবানি’ শব্দের অর্থ অতীব নিকটবর্তী হওয়া। কোরবানির পশুপালনের সঙ্গে যুক্ত নি¤œবিত্তের কোটি কোটি নারী-পুরুষ। বলা চলে, ঈদের প্রস্তুতি সারা বছর ধরে এবং সামাজিক ও আর্থিক উন্নয়নও ঈদ উৎসবের বাইরে নয়।

 


পৃথিবীর ইতিহাসে বিভিন্ন ধর্মের যে উৎসব উদযাপিত হয়, ঈদ উৎসব ওই তুলনায় কনিষ্ঠতম। কিন্তু আয়োজনের ব্যাপকতায় সবচেয়ে বড়। সমকাল থেকে ১৩৮৮ সৌর বছর আগে এই উৎযাপন শুরু হয়। ইসলামের বার্তাবাহক নবী হজরত মুহম্মদ (সা.)-এর মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের অব্যহতি পর প্রথম ঈদুল ফিতর উৎসব পালন শুরু হয়। অ্যারাবিয়ানদের ইহুদি ধ্যান-ধারণা ও জাহেলি প্রথার পরিবর্তে দুই ঈদ ছিল আল্লাহর রাসুলের পক্ষ থেকে মুসলমানদের জন্য ঘোষিত উপহার। ইসলামি আদর্শে উজ্জীবিত আরববাসী পালন শুরু করে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। এর আগে আরবে পৌত্তলিক ভাবনায় অগ্নিপূজকদের ‘নওরোজ’ ও মূর্তিবাদীদের ‘মিহিরজান’ নামে দুটি শ্রেণিবৈষম্য, অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ উৎসব পালিত হতো। এর পরিবর্তে দুই উৎসব বয়ে আনে আনন্দবার্তা। শ্রেণিবৈষম্যহীন, পবিত্র আর ধর্মানুভূতির মেলবন্ধনের মহোৎসব। ঈদুল ফিতর শব্দের অর্থ রোজা ভাঙার দিবস। ঈদুল ফিতরের আগের রাতকে ইসলামি পরিভাষায় বলা হয় ‘লাইলাতুল জায়জা’। এর অর্থ পুরস্কার রজনী। ঈদুল আজহাকে ধর্মীয় পরিভাষায় বলা হয় ‘ইয়ামুজ জায়েজ’। এর অর্থ পুরস্কারের দিবস। এছাড়া আছে আলবেনিয়ান, আরবি, বাংলা, চায়নিজ, গ্রিক, হিন্দি, হিব্রু, সিলেটি নাগরী ও তামিল ভাষায় দুই ঈদের আলাদা নাম প্রচলিত। দেড় হাজার বছরেরও বেশি ঈদ উৎসব পালিত হচ্ছে। ক্যামেরাবিহীন যুগে চিত্রশিল্পীরা ধরে রেখেছেন ঈদ উৎসবের ছবি। অবশ্য ইসলামিক অনুশাসনে ছবি আঁকা নিয়ে বিরোধ-বিতর্ক রয়েছে। ঈদ উৎসবের যতো চিত্রশিল্প রয়েছে এর মধ্যে শোভাযাত্রার ছবি বেশি। বর্ণাঢ্য সাজে সজ্জিত মানুষ দলবেঁধে ঈদগাহ ময়দানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। শোভাযাত্রায় হাতি, ঘোড়া, রাজকীয় পালকি ও নকশাদার ছাতার ব্যবহার রয়েছে। কোনো কোনো ছবিতে আতশবাজি পোড়াচ্ছেন নারীরা। বোরাকের ছবি এঁকেছেন শিল্পীরা। মাথায় চাঁদ-তারাখচিত মুকুট শোভিত বোরাকের বোরাক, ছবির ভেতর ফার্সি ও আরবি ভাষায় ক্যালিগ্রাফি। মোগল আমলের ছবিতে স¤্রাটকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। সব ছবির ভেতর ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যতা ও ঠা-া রঙ ব্যবহারের চাতুর্যতা প্রশংসনীয়। বিশ্বশিল্পে ইসলামিক চিত্রকলার একটি বিশাল স্থান রয়েছে, বিশেষ করে পার্শিয়ান ও মোগল মিনিয়েচার চিত্রশিল্প। ওই চিত্রশিল্প পর্যবেক্ষণে এর ইতিহাস জানা জরুরি।


শিল্প প্রতিভার দ্বারাই নির্মাণ করা সম্ভব। সাধারণভাবে তাকেই শিল্প বলা হয় যার বিকাশ অথবা প্রকাশ মানুষের বুদ্ধিবৃত্তির দ্বারা চালিত নয়, বরং একটি সুকুমার বোধ ও কল্পনা প্রতিভার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। প্রাচীনকাল থেকে আধুনিককাল পর্যন্ত শিল্পকে নানানভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। অস্কার ওয়াইল্ড যেমন ‘আর্ট ফর আর্ট সেক’ তত্ত্বে বিশ্বাসী ছিলেন তেমনি লিও টলস্টয় অথবা বার্নাড শ’ শিল্পের সামাজিক মূল্যমানকে শিল্পের উদ্দেশ্য মনে করেছেন। অস্কার ওয়াইল্ড বলেছেন, ‘সুন্দর সৃষ্টিই হচ্ছে শিল্পের একমাত্র লক্ষ্য- ‘দ্য আর্টিস্ট ইজ দ্য ক্রিয়েটর অ্যা বিউটিফুল থিংক’। শিল্পে নীতির প্রশ্নকে তিনি স¤পূর্ণ উপেক্ষা করেছেন- ‘দেয়ার ইজ নো সাচ থিংক অ্যাজ অ্যা মোরাল অর ইমমোরাল বুক’। লিও টলস্টয় তার ‘হোয়াট ইজ আর্ট’ গ্রন্থে লিখেছেন, শিল্পের মধ্যে প্রকাশিত হবে সেসব ‘ফিলিং ইনডিস পেনসিবল ফর দ্য লাইফ অ্যান্ড প্রগ্রেস টুওয়ার্ডস ওয়েলবিং অ্যা ইনডিভিজুয়ালস অ্যান্ড অ্যা হিউম্যানেটি’। ফ্রেজার তার ‘দ্য গোল্ডেন বাউস’ গ্রন্থে অকাল্ট ম্যাজিক ইত্যাদি বিষয়কে প্রাচীন শিল্পের উৎসমুখ বলে উল্লেখ করেছেন। শিল্পকলায় অনুকরণ অর্থাৎ ইমিটেশনের প্রসঙ্গ সুপ্রাচীন। গ্রিক শব্দ ‘মাইমেসিস’ ইমিটেশন বা অনুকরণের অনুকরণ। প্লেটোর অনুকরণতত্ত্বে শিল্প হলো ‘আর্ট ইজ ডাউলি রিমোভড ফ্রম রিয়ালিটি’ অর্থাৎ ঈশ্বর তার পরিকল্পনা অনুযায়ী নিজস্ব প্রতিরূপ হিসেবে যে বিশ্বসংসার তৈরি করেছেন এরই দ্বিতীয় প্রতিরূপ হচ্ছে শিল্পকলা। শিল্পের প্রেরণা হিসেবে তার ধারণা ছিল শিল্পী শিল্পকর্ম সৃষ্টির জন্য ঐশ্বরিক অনুভূতির ওপর নির্ভরশীল। প্লেটো শিল্পীর অন্তরে নিজস্ব ‘অ্যাসেনসিয়াল ক্রিয়েটিভ স্প্রিট’কে অবিশ্বাস করতেন। ঐশ্বরিক প্রেরণাজাত কোনো বিশেষ তাগিদ শিল্পীর ওপর ভর করলেই শিল্প সৃষ্টি সম্ভব।


নন্দনতত্ত্ব ও শিল্পের নির্মিতিকে কখনোই বিচ্ছিন্নভাবে দেখা যায়নি। এটি ভারতীয় সমাজের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর অপরিহার্য অংশ। সমাজের একদিকের পরিবর্তন অনিবার্যভাবে অপরদিককে প্রভাবিত করে। এটিই হচ্ছে ভারতীয় সমাজ, শিল্প ও শিল্প-কারখানার আন্তঃসম্পর্কের প্রকৃত ‘গতি বিজ্ঞান’। উপনিষদের সৃষ্টি ও জীবন সংক্রান্ত ‘মেটাফিজিকাল’ বা অধিবিদ্যামূলক দর্শন ও ঈশ্বর ধারণা কয়েক হাজার বছর ধরে এই উপমহাদেশে দিয়েছিল এক সাংস্কৃতিক যোগসূত্র। তা প্রতিফলিত হয়েছে সারা ভারতবর্ষের লোকশিল্প, লোকসাহিত্য, সঙ্গীত ও নৃত্যবৈচিত্র্যের মধ্যে একই সুরের খেলা, বহুর মধ্যে একই সুরের স্পন্দন। প্রায় ৫ হাজার বছর আগে আর্যদের আগমন এবং এই উপমহাদেশে আর্য ও দ্রাবিড়দের সহাবস্থানের দ্যোতক ভারতবর্ষের বেদ উপনিষদের স্বীকৃতির পর বহু জনগোষ্ঠী উপমহাদেশে এসেছে। ভারতবর্ষের মহামানবের মূল স্রোতে মিশে গেছে অনেক সময় নিজ নিজ বৈশিষ্ট্য রেখেও।


খ্রিস্টীয় দশম শতাব্দীতে মুসলমানরা এলো এক অতি উচ্চাঙ্গের সংস্কৃতি ও ধর্মবোধ সঙ্গে নিয়ে। তাদের আগমনের পূর্ব পর্যন্ত ভারতবর্ষে কোনো গ-িবদ্ধ ধর্মমত ছিল না। হিন্দু জনসমাজের মধ্যে ছিল বেদ ও উপনিষদের দর্শন। ওই দর্শনের বিস্তৃত অঙ্গনের মধ্যে বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন সময়ে নানান বিশ্বাস বা অবিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ধর্মাচারণ করতো। এই প্রথম এক জনগোষ্ঠী ভারতবর্ষে বাস স্থাপন করেও উপমহাদেশের মূল স্রোতের বাইরে নিজেদের বিশিষ্ট সংস্কৃতি ও ধর্ম নিয়ে স্বতন্ত্র পরিচয় স্থাপন করে। হিন্দু সমাজেও এই সময় ধীরে ধীরে স্বতন্ত্র বোধের উদয় হয়। বহু হিন্দু ধর্মান্তরিত হন। পশ্চিম এশিয়ার ইসলামিক দেশগুলো থেকেও ভারতবর্ষে এসে বসবাস স্থাপন করেছিল বহু জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তি-দার্শনিক, কবি, ঐতিহাসিক ছাড়াও স্থপতি, সঙ্গীতজ্ঞ, চিত্রশিল্পী ও নানান ধরনের পারদর্শী কারুশিল্পী। ধীরে ধীরে ভারতবর্ষে গড়ে ওঠে এক বর্ণাঢ্য সংস্কৃতি। ভারতীয় মুসলিমের সংস্কৃতি এবং পশ্চিম এশিয়া ও ভারতীয় শিল্প-সংস্কৃতির মিলনে গড়ে ওঠে ওই সংস্কৃতি। দুই সামন্ততান্ত্রিক দেশের নাগরিক সংস্কৃতি মুসলিম ও মুসলিম-উত্তর দরবারি শিল্প। আদিম সমাজ থেকে যখন মানুষের সামন্ততান্ত্রিক সমাজে উত্তরণ ঘটে তখন ওই সামন্ততান্ত্রিক সমাজে গ্রামীণ লোকসংস্কৃতির পাশাপাশি গড়ে ওঠে এক নাগরিক সংস্কৃতি, নতুন সমাজের নগর ও জনপদগুলো কেন্দ্র করে। ভারতবর্ষের লোকসমাজ আদিবাসী সংস্কৃতি ও মুসলিম সমাজের দরবারি সমাজ বাদ দিলে বৃহত্তর হিন্দু সমাজ জাতি-বর্ণে বিভক্ত হয়। ওই সমাজে লোকসংস্কৃতির নানান অভিব্যক্তি, বিশেষ করে লোকশিল্পের উপজাত বস্তু ৯টি শিল্পভিত্তিক বর্ণের অবদান। বৃত্তিভিত্তিক বর্ণ-বিভাগের ফলে প্রাচীন ভারতের সামন্ততান্ত্রিক সমাজের নাগরিক সংস্কৃতি
প্রয়োজনীয় সর্ববস্তু সম্ভারের জন্য বংশানুক্রমিক ভাবধারা ও অসাধারণ দক্ষতার


অধিকারী বর্ণাশ্রয়ী শিল্পীদের ওপর নির্ভরশীল ছিল। মধ্যযুগে ইসলামি শিল্প-সংস্কৃতি- যাকে দরবারি শিল্প বলা হয় এর সংস্পর্শে এলো হিন্দু নাগরিক সংস্কৃতির শিল্প। ওই মিলনের ফসল হিসেবে ভারতবর্ষের নাগরিক শিল্প এমন এক নান্দনিক গুণ অর্জনে সমর্থ হয়েছিল যে, পৃথিবীজুড়ে এর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে ওই যুগে। মোগল শাসন আমলে ভারত উপমহাদেশে মুসলমানদের যে স্থাপত্য ধারা প্রবর্তিত হয় তা দেখা যায় উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থানে প্রাসাদ, মসজিদ, দুর্গ, দরবার কক্ষ, স্মৃতিসৌধ্য, মিনার প্রভৃতির বিচিত্র বর্ণ ও অলঙ্করণের মাধ্যমে। ৭১২ খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয়ের মধ্য দিয়ে এই উপমহাদেশে মুসলমানদের আগমন সভ্যতার ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের দ্বার উন্মোচন করে। এতে দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার ক্ষেত্রে তেমন উল্লেখযোগ্য প্রভাব বিস্তার করতে না পারলেও মুসলমান এবং স্থানীয় অধিবাসীদের মধ্যে ভাব ও সংস্কৃতির আদান-প্রদান করতে পূর্ণমাত্রায় সক্ষম হয়েছিল। সিন্ধুর বিশেষ এলাকা ‘মানসুরা’য় (বর্তমানে ধ্বংস্তূপে পরিণত) নির্মিত ক্ষুদ্র পরিসরের মসজিদ ছাড়া ওই সময়ের স্থাপত্যের তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য নিদর্শন পাওয়া যায় না। তবে মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয়-পরবর্তী মুসলিম বিজয় এবং স্থায়ীভাবে তাদের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পথ অনেকটা সহজ করে দিয়েছিল। একাদশ শতাব্দীতে গজনির সুলতান মাহমুদ একাধিকবার ভারতবর্ষে প্রবেশ করেন। কিন্তু যে কোনো প্রাসঙ্গিক কারণেই হোক, তিনি স্থায়ীভাবে এখানে রাজত্ব করেননি এবং তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য নির্মাণে ব্রতী হননি। অবশ্য তিনি গজনিতে অনেক সুরম্য প্রাসাদ ও ধর্মীয় ইমারত ও বিজয়স্তম্ভ নির্মাণ করেছেন। গজনির স্থাপত্যরীতি
পরবর্তীকালে ভারতীয় মুসলিম স্থাপত্যে বহুলাংশে অনুসৃত হয়েছে। এর সাক্ষ্য বহন করে দিল্লির কুতুব মিনারের নির্মাণ কৌশল।


ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিম স্থাপত্যকে সাধারণত  প্রধান তিনটি শৈলীতে ভাগ করা যায়। তা হলো দিল্লির সুলতানি স্থাপত্যরীতি, মোগল রাজকীয় শৈলী ও প্রাদেশিক বা আঞ্চলিক স্থাপত্যশৈলী। শৈলীগত পরিবর্তন ঘটলেও মোগল স্থাপত্য অলঙ্করণে ইসলামি ধারাবিবর্জিত কোনো বিষয় রচিত হয়নি। ইসলামি শিল্পকলার অন্যতম প্রধান গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো অলঙ্করণ। ইসলামি শিল্পকলাকে মূর্তিবিবর্জিত বা আইকনিক শিল্পকলা বলা হয়েছে। অপরাপর শিল্পকলার মতো ইসলাম কেন্দ্র করে কোনো ‘আইকনিক’ বা মূর্তি শিল্প গড়ে ওঠেনি। ইসলামি শিল্পকলায় অলঙ্করণের ব্যবহার দু’দিক থেকে বিচার করা যায়- উপকরণভিত্তিক ও মোটিভভিত্তিক। অলঙ্কণের প্রকারভেদ নির্ভর করে উপকরণের ওপর। উমাইয়া যুগে পাথর ও মার্বেলের সর্বজনীন প্রয়োগের ফলে যে ধরনের অলঙ্করণের উদ্ভব হয়, আব্বাসীয় যুগে ইটের ব্যবহারে তা দেখা যায় না। এ কারণে পাথরের ওপর যে ধরনের নকশা দেখা যায় তা সাধারণত খোদাই বা স্টোন কার্ভিং ‘ফুসাইফিসা’ বা মোজাইক, ওপুস সেকটাইল বা সাদা পাথর কেটে রঙিন পাথর বসিয়ে নকশা করা। পাথরের ওপর বিভিন্ন আকারের নুড়ি, কাচ, মার্বেল প্রভৃতি বসিয়ে যে মোটিভ সৃষ্টি করা হয় তাকে মোজাইক বলে। আব্বাসীয় যুগে মোজাইকের ব্যবহার হ্রাস পেলেও সামারার ভগ্নপ্রাপ্ত বালকুয়ারা প্রাসাদ থেকে প্রচুর মোজাইক উদ্ধার করা হয়। ওপুস সেকটাইল-এর প্রয়োগ ভারত উপমহাদেশে মোগল আমলে, বিশেষ করে সম্রাট আকবরের স্থাপত্যকীর্তিতে (ফতেপুর সিক্রির জামে মসজিদ, সেকেন্দ্রায় আকবরের সমাধি, আগ্রায় ইতিমদল্লার সমাধি) দেখা যায়। এছাড়া মোগল স্থাপত্যগাত্রে ফ্রেস্কো, স্টাকো, টেরাকোটা, রঞ্জিতটালী ও পিয়েত্রা দুরার বহুল ব্যবহার করা হয়েছে। আর শিল্পের ইতিহাস বদলে দিয়েছে আবয়বিক

বিমূর্তলোকের বাসিন্দা : রশিদ আমিন

 

 

ভাবনার বিমূর্তরূপ যাঁর ক্যানভাসে মূর্ত হয়ে ওঠে তিনি রশিদ আমিন।
নিভৃতচারী এই শিল্পী মননে বিমূর্তলোকের বাসিন্দা। ধ্যানস্থ তাঁর আপন কাজে, তবে নির্লিপ্ত নন পারিপার্শ্বিক টানাপড়েনে। এই শিল্পীর মুখোমুখি হয়েছিলেন শাকিল সারোয়ার

 

আপনার শৈশব-কৈশোর কোথায় কেটেছে?
আমার শৈশব কেটেছে টাঙ্গাইলে। আমার শৈশবের টাঙ্গাইল ছিল একটি ছোট্ট মায়াবী শহর। ওই শহরেই আমার বেড়ে ওঠা। একটা চমৎকার সাংস্কৃতিক আবহ ছিল এই শহরে। নাটক, সঙ্গীত, নৃত্যানুষ্ঠানÑ এসব আয়োজনে মুখরিত থাকতো ওই শহর। ছিল অনেক শিশু সংগঠন। এ রকমই একটি শিশু সংগঠন ছিল ‘কচিকাঁচার মেলা’। এখানেই আমার ছবি আঁকার শুরু আমার শিল্পী সত্তার সূচনা।

আপনার পরিবার সম্পর্কে কিছু বলুন
আমার বাবা টাঙ্গাইলে পোস্ট মাস্টার ছিলেন। ৯ ভাইবোন আমরা। বড় একটি পরিবার। আমরা চার ভাই ও পাঁচ বোন। ভাইয়েরা সবাই প্রতিষ্ঠিত। বড় ভাই নাট্যজন মামুনুর রশীদ। মেজভাই সাংবাদিক। বর্তমানে কানাডা প্রবাসী। সেজভাই ডাক্তার। তিনি বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডা. কামরুল হাসান খান। বোনরা সবাই স্নাতক, কেউ কেউ স্নাতকোত্তর পাস এবং চাকরি করছে। বোনরা সাংস্কৃতিক জগতে আসতে পারেননি। কারণ বাবা কিছুটা রক্ষণশীল ছিলেন।

কবে থেকে ছবি আঁকার তাগিদ অনুভব করলেন এবং ছবি আঁকাই বা কেন বেছে নিলেন?
ছবি আঁকায় আমার পরিবারে কোনো পূর্বসূরি ছিলেন না। বলা যেতে পারে আমিই এক্ষেত্রে পথিকৃৎ। তবে আমার বড় ভাই নাটক করতেন। সেক্ষেত্রে কিছুটা প্রেরণা ছিল। আমি একটি শিশু সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম যা আগেই বলেছি। সেখানেই আমার ছবি আঁকার হাতেখড়ি। আমি যখন এসএসসি পরীক্ষার্থী তখন সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম আর্ট কলেজে ভর্তি হবো। তখন থেকেই আমার পেশাদার শিল্প শিক্ষার শুরু। আমার ভাইয়েরা সবাই আমাকে চারুকলায় ভর্তি হওয়ার ব্যাপারে খুব উৎসাহ দিয়েছিলেন। ছবি আঁকা বেছে নেয়ার বড় কারণ হচ্ছে, এটা এমন একটা বর্ণময় ভুবন, এই ভুবনে যে প্রবেশ করেছে তার এখান থেকে নিস্তার নেই। আমিও এই ভুবনের সঙ্গে জড়িয়ে গেলাম। তবে আরো কিছু কারণ ছিল। তা হলো, ছবির মধ্য দিয়ে নিজেকে যতো সহজে প্রকাশ করা যায়, অন্য মাধ্যমে তা সম্ভব নয়। সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম স্বাধীন পেশাদার শিল্পী হবো। তা আর সম্ভব হয়নি। শিক্ষকতায় ঢুকতে হলো। তবে এটিও আমার জন্য একটি আনন্দদায়ক অধ্যায়। আমার একটি বিশাল ছাত্রভুবন তৈরি হয়েছে। তাদের সঙ্গে শিল্প পাঠ দেয়া ছাড়াও নানান সুখ-দুঃখে জড়িয়ে গিয়েছি। তাদের কাছ থেকেও অনেক শেখার আছে।

পেইন্টিংয়ের কোন ধারাটি আপনাকে বেশি টানে?
আমি মনে করি, পেইন্টিং হচ্ছে খুব একটা ইচ্ছা-স্বাধীনের ভুবন। এর মধ্য দিয়ে আমার অন্তরের একেবারের ভেতরের নির্যাসটা বের করে নিয়ে আসতে পারি। তাই সব সময় বিমূর্তধারাটিই বেশি পছন্দ করি। অবশ্য বিমূর্তধারার শিল্পী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা খুব কঠিন। কারণ মানুষ পেইন্টিংয়ের মধ্যে সব সময় একটি আকার অথবা অবয়বই খোঁজে। যখনই দেখে নিরাবয়ব অথবা নিরাকার তখনই মুখ ফিরিয়ে নেয়। এটি একটি সংগ্রাম। মানুষের দৃষ্টি নিরাবয়বের মধ্যে টেনে নিয়ে আসা। আমার গুরু মোহাম্মদ কিবরিয়া তা পেরেছিলেন। বিমূর্তধারার সঙ্গে এক ধরনের আধ্যাত্ম চেতনার সংমিশ্রণ ঘটাতে হয়। অনেকেই ভুল বোঝেন। এটা ঠিক তথাকথিত ধর্মীয় আধ্যাত্ম নয়। এটি প্রকৃতি, বিশ্বব্রহ্মা- ও মহাশূন্যের সঙ্গে শিল্পীর এক নিবিড় খেলা।

শিল্পী হিসেবে বলুন, নিজের শিল্পসত্তা প্রকাশে আপনি কতোটুকু স্বাধীন?
আমি এটুকু নিশ্চিত করে বলতে পারি, আমার শিল্পসত্তা প্রকাশের ব্যাপারে পুরোপুরি স্বাধীন ও আপসহীন। নিজস্ব শিল্প-ভাবনা ও শিল্প-প্রকাশ টিকিয়ে রাখার জন্য সংগ্রাম করেছি। আজ পর্যন্তও তা করছি। অন্যের রুচি অনুযায়ী ছবি আঁকিনি। অনবরত নিজেকেই প্রকাশ করতে চেয়েছি।

স্বদেশ আপনাকে কতোটুকু টানে এবং ওই টান আপনার কাজে কতোটকু প্রভাব ফেলেছে?
স্বদেশ আমার এক গভীর প্রেরণা। যা-ই আঁকি না কেন, সেখানে স্বদেশ থাকে, থাকে স্বদেশের রঙ। সুযোগ পেলেই ভ্রমণ করি। এতো সুন্দর আমাদের দেশ! বর্ষা আমার প্রিয় ঋতু। বর্ষায় ‘বর্ষামঙ্গল’ শিরোনামে ছবি আঁকি এবং গত দুই বছরে অনেক ছবি জমেছে। ভাবছি ভবিষ্যতে একটা প্রদর্শনী করবো।

নিজের কাজে আপনার তুষ্টি কতোটুকু?
আমার কাজে মোটেই তুষ্ট নই। অনবরত একটি অতৃপ্তি কাজ করে। অনেক ছবি আছে বছরের পর বছর ফেলে রেখেছি, শেষ করতে পারি না। দেশে কিংবা বিদেশে কার কার কাজ আপনাকে মুগ্ধ করে, ভাবায় এবং প্রাণিত করে? দেশে মোহাম্মদ কিবরিয়া ও মনিরুল ইসলাম আমার প্রিয়। আসলে কিবরিয়া স্যার আমার সরাসরি শিক্ষক ছিলেন। খুব কাছ থেকে দেখেছি, একজন শিল্পী কীভাবে শিল্পের সাধক হয়ে ওঠেন। আমাকে সব সময় তাকে সন্ত শিল্পী হিসেবেই মনে হয়েছে। বিদেশে ক্যান্দেনেস্কি, মার্ক রথকো, পিকাসো, তাপিস আমার প্রিয়। তাদের কাজের ভেতর রঙ ও রেখার সঙ্গে দারুণ এক আধ্যাত্ম বোধের সংমিশ্রণ ঘটেছিল। এটিই আমাকে খুব টানে।

 

_______________________

লেখাঃ শাকিল সারোয়ার

ছবিঃ শোভন আচার্য্য অম্বু

সেকেন্ড ইনিংস

 

সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হলো পরিবার। পরিবার আমাদের ব্যক্তি চরিত্র বিনির্মাণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে আসছে। পরিবার ছাড়া সমাজ, এমনকি রাষ্ট্রও অলীক। তাই মানব সভ্যতার প্রাথমিক ও চূড়ান্ত স্থানটি আজও পরিবারের। দেশে দেশে পরিবার বিভিন্নতর হলেও এর মৌলিক ভিত্তি একই। যৌথ পরিবার ভেঙে ভেঙে পরিবারের বিভিন্ন আদল আমরা দেখতে পাই। এতেও পরিবারের প্রতি মানুষের আস্থা ও প্রত্যাশা কমেনি। আর এই পরিবার টিকে থাকে আস্থা, ভালোবাসা, বিশ্বাস ও নির্ভরতায়। পরিবার তৈরি এবং টিকিয়ে রাখতে বিয়ে অনিবার্য আমাদের সমাজ ব্যবস্থায়। এই বিয়ের ভবিষ্যৎ পরিবারের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। এ জন্য বিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিয়ের নানান প্রস্তুতির সঙ্গে সঙ্গে মানসিক কিছু প্রস্তুতির প্রয়োজন আছে। দেখলাম, ভালো লাগলো, ধুম করে বিয়ে করো- এসবই ভুল চিন্তা ও কাজ। এটি অস্বাস্থ্যকর দাম্পত্য জীবনের সূচনা করে। পশ্চিমা এক সাইকোলজিস্ট ও ম্যারিজ কাউন্সিলরের একটি লেখায় তিনি জোর দিয়েছেন বিয়ের আগে থেকে বিয়ে-পরবর্তী দায়িত্বগুলো নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার ব্যাপারে। পারিবারিক এবং ব্যক্তিগত পারস্পরিক দায়িত্ব গ্রহণ ও পালন এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।


বিয়ে হচ্ছে দুটি মন ও মানুষের এমন এক রসায়ন যা মিলে গেলে খুবই ভালো, না মিললেই তা হয়ে ওঠে হৃদয়বিদারক। আবার বিয়েটিকে আধা মিল ও আধা গরমিলের টান টান উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচের সঙ্গে তুলনা করলে অত্যুক্তি হবে না। খেলায় যেমন হার-জিত থাকে তেমনি সামাজিক এ সম্পর্কটিতেও হার-জিত আছে। বিয়েতে সফল হতে না পারলে বা সম্পর্ক রক্ষায় হেরে গেলে সারা জীবন মাথা হেট করে নিজেকে অসফল ভাবার কিছু নেই। জীবন তো বহতা নদী। আর সামাজিক জীব হওয়ার কারণে মানুষের পক্ষে একা থাকা সম্ভব নয়। তাই প্রথম ইনিংসে হেরে যাওয়া খেলোয়াড় অনায়াসে খুঁজে নিতে পারেন দ্বিতীয় আরেক পার্টনার।বিয়ের পর দু’জন নতুন মানুষ এক সঙ্গে থাকতে শুরু করলে সহনশীলতা খুবই দরকার পড়ে। মূলত নিজের ‘প্রাপ্তি’ বা ‘আকাক্সক্ষা’ নিয়ে বেশি বেশি ভাবলে প্রবঞ্চিত অনুভব করার আশঙ্কা থেকেই যায়। যে কোনো শূন্যতাই মানুষকে তা পূরণে তাগিদ দেয়। সেটি মানসিক হলে মানসিক এবং জৈবিক হলে জৈবিক।


অনেকে বিয়ের গাঁটছড়া বেঁধে বেশ কিছুদিন এক সঙ্গে পার করে দেয়ার পর বুঝতে পারেন তারা ভুল মানুষকে বেছে নিয়েছিলেন। অনেক দ্বিধা ও ঝক্কি-ঝামেলা পেরিয়ে আলাদা হওয়ার পর আবার নতুন করে জীবন নিয়ে ভাবতে শুরু করেন অর্থাৎ দ্বিতীয়বার নতুন কারো খোঁজ করেন।
সুন্দর একটি আদর্শ কল্পনার জগতে পুরুষ ও নারীরা বিয়ে করবেন, এক সঙ্গে দীর্ঘ ও সুখের জীবন কাটাবেন এবং প্রায় একই সময়ে এই দুনিয়া ছেড়ে চলে যাবেন। এক্ষেত্রে কখনোই দ্বিতীয় বিয়ের প্রয়োজন হবে না। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এমনটি হয় না।
আমরা এমন এক জগতে বাস করি যা নিখুঁত কিংবা আদর্শ নয়, বরং নিখুঁত থেকে অনেক দূরে। মানুষ কখনো কখনো অল্প বয়সে মারা যায় তাদের দুঃখী সঙ্গীদের একাকী পেছনে ফেলে। বেশির ভাগ বিয়েই কেবল
তালাকের মাধ্যমেই শেষ হয় না।

 


মজার বিষয় হচ্ছে, দ্বিতীয় বিয়ের মধ্যে তালাকের হার প্রথম বিয়ের তুলনায় বেশি। কেউ হয়তো ভাবতেই পারেন, যার বিয়ে বিচ্ছেদ হয়েছে তার একটা শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা হয়েছে। তাই হয়তো অতীতের ভুলগুলোর আর পুনরাবৃত্তি করবেন না। এক্ষেত্রে প্রায়ই তা হয় না। যারা নির্দিষ্ট চাহিদা পূরণের জন্য বিয়ে করেন কিন্তু এর পরিবর্তে নিজেরা কিছুই করতে প্রস্তুত নন তারা একই অভিপ্রায় নিয়ে সাধারণত দ্বিতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসেন। এক্ষেত্রে দ্বিতীয় বিয়ে কঠিন ঝুঁঁকিপূর্ণ রাস্তায় ঘোড়া চালানোর মতোই বিপজ্জনক ও নতুন দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।একটা সময় ছিল যখন বাঙালি সংস্কৃতির মূল সৌন্দর্য ছিল মূল্যবোধ। ওই সময় ছেলেমেয়েরা মনে করতো, পরিবারের সিদ্ধান্তই তাদের জন্য চূড়ান্ত। নিজের চাহিদা বা ভালো লাগা, মন্দ লাগার চেয়েও পারিবারিক সম্মানই তখন বড় করে দেখা হতো।


সময় পাল্টেছে এর আপন গতিতে। এখন যে কোনো কিছুর চেয়ে মানুষ নিজের ভালো লাগা, মন্দ লাগাটাকে বেশি প্রাধান্য দেয় বা দিতে চায়। আগে যেমন দেখা যেতো সন্তানরা পিতার হেঁটে যাওয়া রাস্তায় হাঁটতো, বেছে নিতো পিতার পেশা। এখন আর তা দেখা যায় না মোটেও। বিয়ের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়। এখন ছেলেমেয়েরা পরিবারের পছন্দের তুলনায় নিজেদের পছন্দেই বিয়ে করে। সমস্যা সেটি নয়, সমস্যা হলো- বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তারা বিয়ের পর মনে করে, ভুল সঙ্গীকে বেছে নিয়েছে। আর পরবর্তী সমস্যার সূত্রপাত এখন থেকেই। অতঃপর শুরু হয় নতুন সঙ্গী খোঁজার কার্যক্রম। সামাজিকভাবে প্রগতিশীল হলেও এখনো স্বাচ্ছন্দ্যে দ্বিতীয় বিয়ে মেনে নেয়ার মতো উদারতা আমাদের সংস্কৃতি দেখাতে পারেনি। যেখানে আগে মনে করা হতো বেশি বয়সে ভীমরতির কারণেই মানুষ দ্বিতীয় বিয়েতে ঝুঁকে পড়ে সেখানে বর্তমানে অল্পবয়সীদের দ্বিতীয় বিয়েও হচ্ছে উল্লেখযোগ্য হারে। মিড লাইফ ক্রাইসিসের কারণে সৃষ্ট জটিলতাই মানুষকে পরিণত বয়সে অন্য রকম ভাবতে বা সিদ্ধান্ত নিতে প্রভাবিত করে বলে মনে করা হয়। জীবনের এই দ্বিতীয় ইনিংসে যাওয়ার প্রাক্কালে অনেকেরই চোখে ঝলমলে রঙিন চশমা থাকে। তারা সামনে যা কিছু দেখেন তা সবই রঙিন। অনেকে আবার পুরনো সব ভুল শুধরে নতুন করে জীবন শুরুর স্বপ্ন দেখেন। অনেক বিখ্যাত মানুষই দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। অনেকে এর চেয়েও বেশি। এতে তাদের ভেতরকার শূন্যতা কতোটা কমেছে তা বোঝার চেষ্টা হয়তো কেউ করেননি কখনো।

তামাম দুনিয়ায় ভূরি ভূরি নমুনা আছে যেখানে কম বয়সী মেয়েকেই বেশি বয়সের পুরুষ পছন্দ করে বিয়ে করেছেন। উডি অ্যালেন ৫৬ বছর বয়সে ১৯ বছর বয়সের পারভিনের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধেন। ৩১ বছর বয়সে পা দিয়ে ক্যাথরিন জিটা জোনস ৫৬ বছর বয়সের মাইকেল ডগলাসের প্রেমে পড়েন। রুশদির সঙ্গে বিয়ের পর পদ্মালক্ষ্মীকে যখন জিজ্ঞাসা করা হয় ২৩ বছরের বড় একজনকে তিনি কেন বিয়ে করছেন? তখন পদ্মালক্ষ্মী সহাস্যে জানান, রুশদির মতো অমন বুদ্ধিদীপ্ত ফ্লার্ট করতে আর কোনো পুরুষকে তিনি দেখেননি। বিয়ে না টিকলেও রুশদির সঙ্গে কাটানো প্রেমের মুহূর্তগুলোই পদ্মালক্ষ্মীর দাম্পত্যের শেষ কথা ছিল।
৪০ বছর বয়সে জীবন শুরু করা যায় অনায়াসে- এমন কথা ইদানীং মনোবিজ্ঞানীরা বেশ জোর দিয়ে বলে থাকেন। তাই দ্বিতীয় বিয়ের জন্য চল্লিশ-ঊর্ধ্ব বয়স কোনো বাধা নয় বলেই মনে করেন তারা। পরিণত বয়সে বিয়ের সম্পর্ক যৌনতাড়নার পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্টি হয় না বলেই তাদের ধারণা।

নামকরা একটি প্রতিষ্ঠানের সাবেক কর্মী কামাল আহমেদ (৫৭) সম্প্রতি বিয়ে করেছেন ৩৫ বছর বয়সের নাসরিন সুলতানাকে। কামাল জানান,
পরিবারসহ আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব- কারোরই সমর্থন ছিল না ওই বিয়েতে। খুব কাছের বন্ধুরাও ভীমরতির অভিযোগ তুলে দূরে সরে গিয়েছিল। জগিংয়ের সময় নববিবাহিত স্ত্রী নাসরিনের মুখটি মনে করতেই যেন সব ক্লান্তি দূর হয়ে যায় এবং জগিংয়ের স্পিডটিও যায় বেড়ে- হাসিমুখে এ কথা জানান তিনি।

রাফিয়া চৌধুরীর বয়স এখন ৪০ বছর । একা থাকার পরিকল্পনা করে হঠাৎই সরকারি রিটায়ার কর্মকর্তা মোস্তফা মাহমুদের প্রেমে পড়ে যান তিনি। যখন তাদের বিয়ে হয় তখন রাফিয়ার বয়স ৩৭ ও মোস্তফা মাহমুদের ৬৩ বছর। রাফিয়ার মা-বাবাসহ পরিবারের সবাই নিষেধ করেছিলেন। বন্ধুরাও বুঝিয়েছিলেন, ওই বিয়েতে তার খুব শিগগিরই বিধবা হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কিন্তু রাফিয়া এসব কথা উড়িয়ে দিয়েছেন এই বলে, মৃত্যুর কোনো নির্দিষ্ট বয়স নেই। তাছাড়া তিনি সকাল-বিকাল আড্ডায় মাহমুদের সঙ্গে যে উষ্ণতা অনুভব করতেন ওই টান উপেক্ষা করা তার জন্য প্রায় অসম্ভব ছিল। আবেগী কণ্ঠে তিনি এটিও বলেন, মাহমুদের সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো পোশাকি যৌনতার চেয়ে ঢের ভালো।

অল্প পরিচয়ে আজকাল হুটহাট লং ড্রাইভে বেরিয়ে পড়েন অনেকেই কিংবা স্বল্প আলোয় কাটিয়ে দেন ওয়াইন চুমুকের সন্ধ্যা। এছাড়া যদি থাকে চনমনে সুন্দরী কিংবা আকর্ষণীয় সুপুরুষের সঙ্গ তাহলে আর কী চাই!

ফেরদৌসী সাবাহ পরিণত বয়সের বিয়ে নিয়ে অতি উৎসাহী। গল্পে গল্পে তিনি বললেন, নারীদের জন্য বিয়ের নির্দিষ্ট বয়স আছে। কারণ তাদের সঙ্গে মাতৃত্বের বিষয়টি জড়িত। তবে পুরুষদের ক্ষেত্রে এসব ঝামেলা নেই। তাই তারা ৬০ বছর বয়স পার করেও অনায়াসে বিয়ের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। দ্বিতীয় বিয়েতে প্রেম ও যৌনতা দৈনন্দিন জীবনে বৈচিত্র্য নিয়ে আসে এবং আটপৌরে জীবনে যোগ করে অন্য রকম মাত্রা। এখন মানুষের আয়ুর সঙ্গে বাড়ছে জীবন তৃষ্ণাও।
ফেরদৌসী সাবাহ এমন এক সময়ের অপেক্ষা করছেন যখন দ্বিতীয় বিয়ে, অসম বিয়ে, যে কোনো বয়সে বিয়ে- এসব নিয়ে কেউ আর কোনো প্রশ্ন তুলবেন না। কেউ বাঁকা চোখে তাকাবেন না কিংবা দ্বিতীয় বিয়ের পর সবার সঙ্গে মানিয়ে নেয়ার জন্য চারপাশের মানুষকে অনবরত যুদ্ধ করতে হবে না। সেটিই হবে জীবনের সহজ ধারা...। দিন গুনছেন ফেদৌসী সাবাহ।

 

_______________________________

লেখা : এনায়েত কবির
মডেল : আমানুল্লাহ হারুন ও নাহিদ
ছবি : শোভন আচার্য্য অম্বু
কৃতজ্ঞতা : রেফায়েত উল্লাহ

লিভিং ড্রাগন

শিরিন সুলতানা

 

 

বয়স তখন তার ১২ বছর। একদিন রাস্তার কিছু বখাটে ছেলে মারধর করে তাকে। এরপর শরীরের ঘা শুকালেও মনে থেকে যায় অনন্ত দহন। মূলত এই ঘটনাই পাল্টে দেয় ছেলেটির জীবন। প্রতিশোধ স্পৃহা অথবা আত্মরক্ষা যে কারনেই হোক না কেনো ছেলেটি নিজেকে তৈরী করতে থাকে অপ্রতিরোধ্য লৌহ মানব হিসেবে। মার্শাল আর্টসের দীক্ষায় নিজেকে সুরক্ষার সাথে সাথে শত্রু ঘায়েল করার নানা কৌশল নিয়ে আসে ছেলেটি তার নখদর্পনে। বলছিলাম কিংবদন্তি ব্রুস লির কথা, মার্শাল আর্টসকে যিনি নিয়ে গেছেন শিল্পের পর্যায়ে।

১৯৪০ সালের নভেম্বর মাসের ২৭ তারিখে জন্ম হওয়া এই অপ্রতিরোধ্য মার্শাল আর্টিস্টের পুরো নাম ‘ব্রুস ইয়ুন ফান লি’। জন্ম মার্কিন মুল্লুকের সান ফ্রান্সেসকোতে হলেও শরীরে ছিল পুরোটাই চিনা রক্ত। লি হোই চুয়েন এবং গ্রেস হো দম্পতির পাঁচ সন্তানের মধ্যে লি ছিলেন চতুর্থ। তার জন্মের সময়টায় চাইনিজ ক্যালেন্ডারে ড্রাগনকাল চলছিল যা কি না শক্তি ও সৌভাগ্যের প্রতীক। হংকংয়ের চায়নিজ অপেরা স্টার বাবার অনুপ্রেরণায় শৈশব থেকেই তিনি শিশু শিল্পী হিসেবে কাজ করতেন। প্রথম অভিনয় করেন মাত্র ৩ মাস বয়সে, ‘দ্য গোল্ডেন গেট গার্ল’ (১৯৪১) ছবিতে।

১২ বছর বয়সে মার খাবার পর মন প্রাণ ঢেলে মার্শাল আর্টের তালিম নিতে শুরু করেন ব্রুস। শিক্ষাগুরু হিসেবে পান ইপম্যানকে। একটানা পাঁচ বছর দীক্ষা নেবার পর লি নিজেস্ব কিছু কলাকৌশল ও দর্শন যোগ করেন কুংফুর সাথে। নাম দেন- জিৎ কুনে দো (The way of the intercepting fist) অস্বাভাবিক ক্ষীপ্রতা তখন তার শিরায় শিরায়। শুন্যে ছুড়ে দেওয়া চাউলের দানা চ্যাপিষ্টিক দিয়ে ধরে ফেলা কিংবা টেবিল টেনিসে নান চাকু দিয়ে খেলে একসাথে দুই প্রতি পক্ষকে নাকানি চুবানি খাওয়ানো ছিলো তার আমুদে খেলা।


একবার এক প্রতিযোগিতায় ১১ সেকেন্ডেই ধরাশায়ী করে প্রতিপক্ষকে। শুধু কি মারামারি? নাচেও দারুন দক্ষ ছিলেন তিনি। হংকংয়ে ঐতিহ্যবাহী ‘চা চা নৃত্যে’ জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে সবাইকে চমকে দেন লি। লিকলিকে পেশীবহুল পেটানো শরীরের মানুষটার মেজাজটাও ছিল বেশ কড়া। এজন্য হংকং পুলিশের সাথে ঝামেলাও পোহাতে হয় তাকে কয়েকবার। সেগুলো অবশ্য কিশোরোত্তীর্ণ বয়সের কথা। বাবা মা তাই ছেলেকে পাঠিয়ে দেন যুক্তরাষ্ট্রে। বয়স তখন ১৯ বছর। সদ্য যুবক লি সেখানে চায়না টাউনে এক আত্মীয়ের রেস্টুরেন্টে কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে সিয়ালটলে ইউনিভার্সিটি অফ ওয়াশিংটনে ভর্তি হন দর্শন শাস্ত্রে। জীবনে আসে নতুন বাঁক। সখ্যতা হয় একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী লিন্ডা এমেরির সাথে। পরবর্তীতে প্রেম ও সাতপাঁকে বাঁধা। সিয়াটলেই ব্রুস তার প্রথম কুংফু স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। একই সাথে টিভিতে টুকটাক কাজও করতে থাকেন। সেই সুবাদে নাম ডাক হতে শুরু করলে হলিউডের দিকে আস্তে আস্তে অগ্রসর হন লি। হলিউডের ছবিগুলোতে ষ্ট্যানম্যান ও পাশর্^ চরিত্রের কাজ করে আর্থিকভাবে কিছুটা লাভবান হলেও, সেভাবে কারো নজরে আসছিলেন না তিনি। এরপর লি তার পরিবার নিয়ে চলে আসেন হংকংয়ে। ঘরে তখন তার ফুটফুটে দুই সন্তান। ছেলে ব্রান্ডন লি এবং মেয়ে শ্যানোন লি। হংকংএ সময় বেশ কয়েকটি ছবি হয় তাকে নিয়ে। ‘দা বিগ বস’(১৯৭১), ‘ফিস্ট অফ ফিউরি’(১৯৭২) ও দ্য ওয়ে অফ দা ড্রাগন(১৯৭২) তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। শেষোল্লিখিত ছবির রাইটার ডিরেক্টর হিসেবে দুটোতেই সমান দক্ষতা দেখিয়েছিলেন লি। তার নিজের প্রডাকশন হাউজ কনকর্ড পিকচার্স থেকেই রিলিজ হয় ছবিটি।

ব্রুস লি তখন রীতিমত ষ্টার। হলিউডের ঢিসুম ঢিসুম মারামারিকে একহাত দেখিয়ে মার্শাল আর্টসের জয়জয়কার সারাবিশে^। ‘এন্টার দা ড্রাগন’ যে ছবি লি’কে হলিউডে তারকাখ্যাতি এনে দিয়েছে তার কাজ শুরু হয় ১৯৭৩ সালের জানুয়ারী মাসে, হংকংয়ে। শুটিং শেষ হয় মাস ছয়েকের মধ্যেই। সারা বিশ্ব যখন কাপঁছে ব্রুসলি জ্বরে, তখনই ঘটলো সে অপয়া ঘটনা। কয়েকদিন ধরেই মাথায় সেই পুরনো যন্ত্রনা কাতর করছিলো তাকে, সাথে পিঠের ব্যাথা। ডাক্তার অনেক আগেই সনাক্ত করেছিল সেরিব্রাল এডিমা। ব্রেনের একটা অংশে ফ্লুইড জমা হচ্ছিল। অসহ্য ব্যাথাকে পরাভূত করতে ব্যাথা নাশক এ্যাসপিরিন জাতীয় ঔষধ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েন লি। পরের সকাল আর দেখা হয় না তার। ‘এন্টার দা ড্রাগন’ ছবি মুক্তির ছয়দিন আগেই পাড়ি জমান তিনি না ফেরার দেশে। ১৯৭৩ এর ২০জুলাই, সারা পৃথিবী যেনো থমকে যায় কয়েক মুহুর্ত এ সংবাদে। অপাজেয় লি’র এরকম মৃত্যু কেউ যেন মেনে নিতে পারছিলেন না।

শুরু হয় চারদিকে গুঞ্জন। কেউ বলে চায়নিজ মাফিয়া চক্র, কেউ বলে হংকংয়ের ফিল্ম ইন্ডাষ্ট্রির প্রভাবশালীদের হাত আছে এই মৃত্যুর পিছনে। কেউ বলে তার বান্ধবী বিষ ক্রিয়ায় মেরেছে তাকে। ঘটনা যাইহোক মাত্র ৩২ বছর বয়সেই জীবনের ইতি টানতে হয় মার্শাল আর্টসের মহারাজাকে। তার দর্শন, তার কবিতা, তার লেখনি, সবকিছুই অন্তরালে থেকে গেছে। মানুষ বুঁদ হয়ে শুধুই দেখেছে তার অস্ত্রবিহীন যুদ্ধ কৌশল। মৃত্যুর পর লি’র তিনটি ছবি মুক্তি পায়, ‘এন্টার দা ড্রাগন’, গেম অব ডেথ ও সার্কল অব আয়রন’। মার্শাল আর্টিষ্ট, প্রশিক্ষক, ছবি নির্মাতা, মানবহিতৈষী, দার্শনিক, অভিনেতা, একের মধ্যে এ যেন অনেক গুনের আষ্টেপৃষ্টে বাঁধন। এ এক অনন্য কিংবদন্তি ব্রুস লি।

 

মুনলাইট

ফুয়াদ বিন নাসের

 

ব্যারি জেনকিন্স তার ‘মুনলাইট’ ছবিটিকে খুব সহজেই তিনটি পৃথক চলচ্চিত্রের মাধ্যমে প্রকাশ করতে পারতেন। বর্তমানের প্রিক্যুয়াল-সিক্যুয়াল ও রুপালি পর্দার ব্যবসায়িক সাফল্যের যুগে হয়তো সেটিই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু ফ্লোরিডা স্টেট ইউনিভার্সিটির ফিল্ম ডিপার্টমেন্টের ছাত্র ব্যারি যশ-খ্যাতি বা অর্থ-বিত্তের হাতছানিতে সাড়া দেয়ার মানুষ নন। ‘মেডিসিন ফর মেলানকলি’ চলচ্চিত্রেই তার ওই দর্শনের অনেকটা আঁচ পাওয়া গিয়েছিল। মুনলাইট ছবিটি তিনটি পর্বে বিভক্ত- ‘লিটল’, ‘কাইরন’ ও ‘ব্ল্যাক’। তিনটি নামই ছবির মূল চরিত্রের নাম। একই মানুষের ভিন্ন তিনটি বয়সের তিনটি রূপ মায়ামির রৌদ্রস্নাত পটভূমিতে আঁকার চেষ্টা করেছেন পরিচালক ব্যারি জেনকিন্স। মাদকাসক্তি, একাকিত্ব,
সমকামিতার মতো প্রেক্ষাপট নিয়ে পরিচালক খেলা করেছেন মূল চরিত্র কেন্দ্র করে।


মুনলাইট চলচ্চিত্রটির প্রথম পর্ব ‘লিটল’ আবর্তিত হয় মায়ামির এক বস্তি অঞ্চলে যেখানে দেখা, আমাদের মূল চরিত্র কাইরন ব্ল্যাকের শৈশব। সহপাঠীদের কাছে তাড়া খাওয়া, মায়ের অবহেলা ও বাবার অভাবে নিশ্চুপ হয়ে যাওয়া ছেলেটি বাবার ছায়া খোঁজে এলাকার পান্ডা হুয়ানের কাছে। হুয়ানও এই অদ্ভুত ও চুপচাপ ওই শিশুকে পছন্দ করে ফেলে এবং নিজের বাসায় নিয়ে যায়। তাকে হুয়ানের কাছে ঘেঁষতে দিতে চায় না লিটলের মাদকাসক্ত মা। কিন্তু স্নেহের লোভে লিটল বার বার ওই হুয়ানের চৌকাঠেই ফিরে যায়। হুয়ান এলাকার মাদক ব্যবসায়ী। সবাই সমীহ করে তাকে। কিন্তু লিটলের মায়ের অবহেলা থেকে তাকে রক্ষা করতে না পেরে অসহায় বোধ করে। লিটলের জন্য সুস্থ্য-স্বাভাবিক জীবন চায় হুয়ান। আবার মুদ্রার অন্য পিঠে হুয়ানের মাদকের চালানই অন্ধকার নামিয়ে আনে লিটলের


পরিবারে। ওই চক্র চলতেই থাকে।
এরপর দেখতে পাই কৈশোরের কাইরনকে। লিটলের বয়স খানিকটা বেড়েছে। কিন্তু তার একাকিত্ব কাটেনি। সে অনুভব করে, তাকে পছন্দ করে এ রকম কেউ থাকতেই পারে না। নিজের সেক্সুয়ালিটি নিয়েও তার মধ্যে শঙ্কা কাজ করে। এলাকা ও স্কুলে সহপাঠীদের অত্যাচার এবং অপমানের শিকার কাইরন মুখ ফুটে তার আসল রূপ প্রকাশ করতে পারে না। তার কথা বলার একমাত্র সঙ্গী কেভিনের প্রতি যে আকর্ষণ বোধ করে তা নিয়েও সে সন্ত্রস্ত থাকে। তার আশপাশের জগতে সে দেখে মানুষের নরপশুসুলভ আচরণ ও হিংস্রতা। স্বাভাবিক জীবনে ফেরার শেষ আশাটুকুও ছেড়ে দেয় কাইরন।
মুনলাইট-এর শেষ পর্বে দেখি যুবক কাইরন ব্ল্যাককে। এখানেই পরিচালক ব্যারি তার সর্বোচ্চ মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। আগের দুই পর্বের সব ইতিহাস, হতাশা, আবেগ এক হয়ে পূর্ণতা লাভ করে সেলুলয়েডের অন্তিমভাগে। ব্যারি জেনকিন্স কোনো নীতিকথা প্রচার করার চেষ্টা করেননি, কোনো উপদেশ দেয়ার প্রয়াসও দেখাননি। মুনলাইটের এই শেষ অংকে বোঝা যায়, ছোট এক ছেলের বড় হয়ে ওঠার কাহিনী- কোনো পরিবারের ভালোবাসা, বন্ধুদের সমর্থন, সমাজের সাহায্য ছাড়াই। এ রকম অনেক লিটল, কাইরন ও ব্ল্যাকই অশ্রুর মতো সবার অগোচরেই মায়ামির সমুদ্রে হারিয়ে যায়। কিন্তু আমরা বার বার তাকে ফিরে আসতে দেখি সব বাধা, অবহেলা, তাচ্ছিল্য ও অপমান ডিঙিয়ে। তিন বছর বয়সের কাইরন ব্ল্যাককে রূপায়িত করেছেন এলেক্স হিবার্ট, অ্যাশটন স্যান্ডার্স ও ট্রেভান্তে রোডস। পরিচালক জেনকিন্স এখানে তিন অভিনেতার মধ্যে সমন্বয় করার চেষ্টা করেননি, বরং তিনজন তিনটি চরিত্রই রূপায়ণ করেছেন। চমৎকার সংলাপ ও সিনেম্যাটোগ্রাফির কারণে কাইরন ব্ল্যাকের বেড়ে ওঠা আমাদের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠেছে রুপালি পর্দায়। মায়ামির ঝকঝকে রৌদ্রোজ্জ্বল বালুকাবেলায় শত
হাসিমুখের ভিড়েও যে বিষণ্ণতার বীজ লুকিয়ে থাকে সেটিই পরিচালক অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে চিত্রায়িত করেছেন। সেরা ছবির পুরস্কার মুনলাইটেরই প্রাপ্য।

Page 5 of 24

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

Twitter feed

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…