Super User

Super User

Page 7 of 29

মানুষের ভাগ্য

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

 

 

মানুষের ভাগ্যটি আজ রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। আর রাজনীতি নিয়ে নতুন চিন্তার যথেষ্ট কারণ আছে। তা হলো এই, বাংলাদেশের দ্বিদলীয় ব্যবস্থাটি এখন আরো অসহ্য হয়ে উঠেছে। দ্বিদলীয় ব্যবস্থাটি আসলে একদলীয়ই। যখন যে দল ক্ষমতায় আসে, রাষ্ট্র ওই দলেরই হয়ে যায়। অপর দল আগের দলের মতোই আচরণ করে। বরং বাংলাদেশের ইতিহাসে দেখা গেছে, পরের সরকার আগের সরকারের চেয়ে ভালো তো নয়ই, বরং আরো খারাপ হয়ে থাকে। দ্বিদলীয় ব্যবস্থাটি একদলীয় আরো এক অর্থে। সেটি হলো, উভয়দলই হচ্ছে বিত্তবানদের দল। সামাজিকভাবে তারা পরস্পরের পরিচিত, ক্ষেত্র বিশেষে আত্মীয়ও, অধিকাংশ সময়ই পরস্পরের ঘনিষ্ঠ, ওঠাবসা একই রকমের, আচার-আচরণও তা-ই। দুটি দল হলেও তারা উভয়ই বড়লোকদেরই দল। এ জন্য তাদের এক দলই বলা যায়। লোকে বিকল্প খোঁজে। ভাবে, এ দুই দলের বাইরে যাবে। কিন্তু যাওয়া সম্ভব হয় না।


মাঝে মধ্যে সামরিক শাসন দেখতে পাওয়া যায়- কখনো প্রকাশ্যে, কখনো ছদ্মবেশে। কিন্তু অচিরেই টের পাওয়া যায়, ভেতরে ভেতরে তারা ওই একই দলের। তারাও বিত্তবানদেরই স্বার্থ দেখে। স্বার্থ দেখার ওই কাজে যুক্ত হয় আরেক অপশক্তি। সেটি হলো ধর্মীয় মৌলবাদ। এটি আরো ভয়ানক। ওই ভয়ানক শক্তিও হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে এই দ্বিদলীয় শাসন ব্যবস্থা। এর ফল সবচেয়ে ভয়াবহ।


আমরা ব্রিটিশ আমলে ছিলাম। অবশ্যই ভালো ছিলাম না। পাকিস্তান আমলও আমাদের জন্য দুঃসহ। এখন বাংলাদেশে আছি। কিন্তু ভালো আছি- এমনটি বলা যাচ্ছে না। কেউ কেউ আছেন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, আগেই ভালো ছিলাম! কখন, কীভাবে ভালো ছিলেন সেটি নির্দিষ্ট করে বলতে পারেন না। তারা আদর্শায়িত করেন পেছনের দিনগুলোর। কারণ বর্তমান অসহ্য, ভবিষ্যৎ অন্ধকারাচ্ছন্ন। অতীতে আমরা মোটেই ভালো ছিলাম না, অসন্তুষ্ট ছিলাম। এ জন্য আন্দোলন করেছি, মুক্তি চেয়েছি। শাসক বদল হয়েছে, এমনকি রাষ্ট্রও ভেঙেছে। পরে দেখা গেছে, মানুষ যেখানে ছিল সেখানেই আছে। তাদের ভাগ্য বদলায়নি। কেবল শাসকই বদলেছে। নতুন যারা শাসক হয়েছেন তাদের কেউ কেউ অতীতে যে খারাপ অবস্থায় ছিলেন তা নয়। তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন ধনবান মানুষ এবং তারা একই দলের। একইভাবে শাসন অর্থাৎ শোষণ করছে। এটি আমরা বুঝি, কথাটি আমরা বলিও। তবে ক্ষোভ প্রকাশ ছাড়া অন্য কিছু করতে পারি না।
দেশে শিক্ষার ক্ষেত্রে অগ্রগতি ঘটেছে। তাকে উন্নতির লক্ষণ বলা হচ্ছে। কিন্তু শিক্ষার্থীরা কী শিখছে? ওই প্রশ্নটি তো থাকেই। এটি শুধু গুণগত উৎকর্ষের বিষয় নয়। বিষয় হচ্ছে শিক্ষার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নিয়ে। শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা সামাজিক মানুষ হিসেবে গড়ে উঠছে, নাকি অসামাজিক হয়ে উঠছে? অসামাজিক হওয়ার অর্থ, এখানে শুধু যে অপরাধপ্রবণ হওয়া তা নয়, বিচ্ছিন্ন হওয়া। খেয়াল করলে দেখা যাবে, শিক্ষা ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত হচ্ছে এবং ব্যক্তিকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে। এটি নতুন কোনো সমস্যা নয়। এটি আগেও ছিল। এখন উন্নতির আলোক উদ্ভাসের আড়ালে এটি আগের চেয়ে অনেক শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। শিক্ষিত মানুষ এখন কেবল নিজের স্বার্থ দেখে, অন্যের স্বার্থ দেখতে চায় না। তার মধ্যে দেশপ্রেম বৃদ্ধি পায় না। সে অসামাজিক হয়ে ওঠে। শিক্ষাকে আমরা জাতির ভবিষ্যৎ বলে বিবেচনা করি। কোন ধরনের মানুষ এ শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে তৈরি হচ্ছে? স্বার্থপর, নাকি সামাজিক- এ প্রশ্নটি প্রাথমিক হওয়া উচিত, হয় না। এই অবস্থা কেমন করে বদল করা যাবে? ছোট ছোট সংস্কার অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। সেসব সংস্কার প্রযুক্ত করতে হবে পুরো ব্যবস্থাটির পরিবর্তনের সঙ্গে। না হলে শিক্ষা ক্ষেত্রে যেমনটি হচ্ছে তেমনটি অন্যত্রও ঘটতে থাকবে এবং ঘটছেও।


বলা হয়, মানুষের চরিত্র ঠিক নেই। অভিযোগ, মানুষের মধ্যে সহনশীলতার বড় অভাব। দুটিই সত্য। কিন্তু মানুষ তার চরিত্র কীভাবে ঠিক রাখবে যেখানে সমাজ চরিত্রহীন! চরিত্রহীনরাই তো এখন সমাজের শীর্ষে রয়েছে। তাদের আদর্শেই সাধারণ মানুষ দীক্ষিত হচ্ছে। সহনশীলতা অবশ্যই নেই। কেননা সমাজে লুণ্ঠনই হচ্ছে প্রধান সত্য। ব্যক্তিগত সম্পত্তি বৃদ্ধির লালসায় এমন কাজ নেই যা করতে লোকে পিছপা হয়। মানবিক সম্পর্কগুলো চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে। রক্ষকরা ভক্ষকে পরিণত হয়েছে। আমরা যে বিকল্পের কথা বলছি সেটি নিশ্চয়ই এ সমাজ এখন যেভাবে চলছে সেভাবে চলতে দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। এ জন্য এ সমাজ ভেঙে সেখানে নতুন সমাজের প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন। এই নতুন সমাজের জন্য যথোপযুক্ত মতাদর্শ প্রয়োজন। ওই মতাদর্শের পরিপ্রেক্ষিতেই বিকল্প সমাজ গড়া সম্ভব। মতাদর্শের ব্যাপারটি দার্শনিক।


এ প্রসঙ্গ উঠলেই বলা হয়, এটি হচ্ছে বড় বড় কথা। এ রকম ধারণার পেছনে যে যুক্তি নেই তা নয়। মতাদর্শ অনেক সময়ই বাস্তবিক সমস্যার মুখোমুখি হতে চায় না। সাধারণ মানুষ ছোট ছোট সমস্যার কারণে মতাদর্শের কথা ভাবার সুযোগ পায় না। আর মতাদর্শে বিশ্বাসীরা সাধারণ মানুষকে তাদের দৈনন্দিন সমস্যাগুলো বিবেচনায় নিয়ে কীভাবে উদ্বুদ্ধ করতে হবে এর পথ খুঁজে পান না।
মূল ব্যাপারটি সোজা। তা হলো ব্যক্তির মুক্তি ব্যক্তিগতভাবে অর্জন করা সম্ভব নয়। সেটি অর্জন করতে হলে সমষ্টিগত ব্যবস্থার পরিবর্তন দরকার। যে কিশোর একদিন মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন, যুদ্ধ শেষে তিনি পেশা নিয়েছেন শিক্ষকতা। কিন্তু দেখলেন, মুক্তি আসেনি। কারণ শাসক বদল হয়েছে ঠিকই, ব্যবস্থার বদল হয়নি। ওই শিক্ষককে আবার আন্দোলনে নামতে হয়েছে। এবার তার আন্দোলনটি পেশাগত। তিনি যে আন্দোলনরত অবস্থায় প্রাণ দিলেন এতে এটিই প্রমাণ হলো, ব্যক্তিগত মুক্তি তো বটেই, পেশাগত মুক্তিও বিদ্যমান ব্যবস্থায় অর্জন সম্ভব নয়।


আমাদের এই বদ্বীপে মাটি শক্ত নয়। তাই খুঁটি গাড়তে হয় এবং খুঁটিই অবলম্বন করা চাই। এ খুঁটি হচ্ছে ব্যক্তিগত সম্পত্তি। সমাজে এখন সবাই ওই খুঁটি গাড়তে ব্যস্ত। এ প্রতিযোগিতা নিষ্ঠুরতায় পরিণত হয়েছে। এমন ব্যাপক নিষ্ঠুরতা সমাজে আগে কখনো দেখা যায়নি। এ ব্যবস্থায় ব্যক্তি কেমন করে সৎ থাকবে! সৎ থাকতে গেলে হয় তিনি বিপদে পড়বেন, না হলে পিছিয়ে পড়বেন। আর যদি ব্যক্তি সৎ থাকতে পারে তাহলেও কি সমাজ বদল হবে? মানুষের মনুষ্যত্ব রক্ষা করার জন্য এ অসুস্থ সমাজ বদল করা চাই। এ জন্যই দরকার বিকল্প রাজনীতি। সংগঠিত আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সমাজ বদলাবে। লক্ষ্যটি থাকবে একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার। এটিকে সমাজতান্ত্রিক বললেও অন্যায় করা হবে না। কেননা এ সমাজে থাকবে অধিকার ও সুযোগের সাম্য, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং সর্বস্তরে প্রকৃত জনপ্রতিনিধিদের শাসন প্রতিষ্ঠা। আমাদের গণমাধ্যম, টেলিভিশন, আলাপ-আলোচনায় অনেক কথাই বলা হয়। সেগুলো ফুলঝুরির মতো। কিন্তু মূল সমস্যাটি যে এ অসুস্থ সমাজ বদল করা সেটি উঠে আসে না।


এখন এ সত্যটি প্রতিষ্ঠিত যে, প্রাইভেট মানেই ভালো আর পাবলিক মানেই খারাপ। এটি শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পায়ন- সর্বক্ষেত্রে দৃশ্যমান। অথচ আমরা যে মুক্তির জন্য লড়েছি তা সব সময়ই ছিল পাবলিকের কাজ, প্রাইভেটের নয়। কিন্তু এখন পাবলিক হেরে গেছে প্রাইভেটের কাছে। এ জন্যই আমাদের এমন দুর্দশা। শেয়ার মার্কেটের কথা ধরা যাক। সেখানে যে কেবল মতলববাজ ও ধড়িবাজরাই যায় তা নয়। নিরুপায় সাধারণ মানুষও ভিড় করে। এর কারণ হলো, পাবলিক বিনিয়োগের স্থান অত্যন্ত সংকুচিত। ওই ক্ষেত্রটি প্রসারিত হলে মানুষ সেখানেই যেতো। এখানে না যেতে পেরে মানুষ প্রাইভেটের কাছে যায় এবং বিপদে পড়ে।
বাংলাদেশে যা দরকার তা হলো পাবলিককে বড় করা প্রাইভেটের তুলনায়। তাহলেই প্রাইভেট নিরাপদ হবে। আসলে ব্যক্তিও তো বিবেচনার চূড়ান্ত বিন্দু। তাকেই সমৃদ্ধ ও সুখী করা চাই। কিন্তু ব্যক্তি জড়িত সমষ্টির সঙ্গে। এ জন্য সমষ্টির ভাগ্য না বদলালে ব্যক্তির ভাগ্যও বদলাবে না এবং যতোটুকু বদলাবে তা সুরক্ষিত থাকবে। বদলটি এখানেই দরকার। দেশের মানুষ এ বদলের জন্যই সংগ্রাম করেছে। বার বার তারা দেখেছেন প্রাইভেট পদদলিত করছে পাবলিককে। তাই বলতে হয়, মুক্তিযুদ্ধ মোটেই শেষ হয়নি। এ যুদ্ধটি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য চাই সমাজ বদলের লক্ষ্যে রাষ্ট্রের মূল চরিত্রের গণতান্ত্রিক পরিবর্তন।


সমাজ বদলের প্রশ্নে দু’দলই অনড়। কেননা ওই ঘটনাটি ঘটলে তাদের সুযোগ-সুবিধার ভিত্তিটাই নষ্ট হয়ে যাবে। তাই জনগণকে এগোতে হবে মুক্তির দিকে। মুক্তির ওই যাত্রায় কারা নেতৃত্ব দেবেন? তারাই নেতৃত্ব দেবেন যারা দেশপ্রেমিক ও গণতান্ত্রিক। কতো দ্রুত তারা এগিয়ে আসছেন এবং রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হচ্ছেন এর ওপরই আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। ‘বিকল্প চাই’- এ উপলব্ধিটি এখন প্রায় সর্বজনীন। কিন্তু ওই আওয়াজ যেন এর আসল প্রয়োজন সম্পর্কে আমাদের বিভ্রান্ত না করে। এ প্রয়োজনটি হলো সমাজ রূপান্তরের অর্থাৎ সমাজের বৈপ্লবিক পরিবর্তন জরুরি। তবেই মানুষের সত্যটি একদিন প্রতিষ্ঠিত হবে। মানুষের অবস্থানটি নিশ্চিত হবে সবার উপরে।

উৎসবে লাস্যময়ী ল্যাম্প

 



আলো ছাড়া একটা দিন কল্পনা করুন তো! মনে করুন, আপনার চারপাশ ঘিরে আছে অন্ধকার আর অন্ধকার! কি, ভয় লাগছে? এটি প্রমাণিত সত্য, শক্তি ও উদ্দীপনা সরবরাহ করে প্রতি মুহূর্তে আমাদের চারপাশে ঘিরে থাকে আলো। আলোর সঠিক ব্যবহারই একটি বাসস্থান দর্শনীয় করে তুলতে পারে। যে কোনো উৎসবে আপনার বাড়িতে আলোর প্রক্ষেপণ দিতে পারে ভিন্নমাত্রা। প্রাত্যহিক কাজগুলো সহজ-স্বাচ্ছন্দে করতে সঠিক মাত্রায় আলোর ব্যবহার যেমন সাহায্য করে তেমনি উৎসবে নানান আয়োজনে আপনার রুচির পরিচয় দেয় অতিথি ও বন্ধু-বান্ধবের কাছে। স্থান বুঝে আলোর উপযুক্ত ব্যবহার আপনার গৃহে দিতে পারে নিরাপদ ও আরামদায়ক পরিবেশ। বিভিন্ন লাইটের সাহায্যে ঘরে আনা যায় আলোর নতুন মাত্রা। সঠিক মাত্রায় আলোর ব্যবহারে একটি সাধারণ গৃহকোণ হয়ে ওঠে অসাধারণ ও শৈল্পিক। চাইলে আপনি সহজেই উৎসবে নতুন আর ভিন্ন লাইট স্থান বুঝে ব্যবহার করে নতুন চমক সৃষ্টি করতে পারেন। বিভিন্ন আকার, আকৃতি ও ডিজাইন অনুযায়ী সঠিক লাইটটি ব্যবহার করতে পারলে আপনার শুধু লিভিংরুমে বা বেডরুমেই নয়Ñ ঘরের সব জায়গায় বৈচিত্র্য ও রুচির অপূর্ব সমন্বয়ে সৃষ্টি করতে পারেন এক মোহময় আবহ।

পছন্দ অনুযায়ী বাড়ির ভেতরে আলোর ব্যবহার ঠিক করার চেয়েও জরুরি ঘরের সাজের সঙ্গে মানানসই আলোর ব্যবহার। আপনাকে নিশ্চিত হতে হবে, যে লাইটগুলো কিনছেন তা শুধু স্টাইলিশই নয়Ñ যে জায়গাটিতে ওই লাইটগুলো ব্যবহার করবেন সেখানকার জন্য কার্যকরও বটে। উদাহরণস্বরূপÑ পেনডেন্ট লাইটগুলোর শব্দ শুনতে কিংবা দৃশ্যত এর আবেদন থাকলেও তা কিচেনের কাজে কতোটা উপযোগী বা আসলে আপনার হাতের কাজগুলোর জন্য অনুকূল কি না সেটি ভেবে দেখা জরুরি। তাই কেনার আগে লাইটের বিভিন্ন ধরন সম্পর্কে জেনে নেয়া যেতে পারে। চিলড্রেন্স রুমে আলোর ডিরেকশন চেঞ্জ করে রুমে নতুনত্বের ছোঁয়া দেয়া যায়। ঠিক তেমনি রুমে ল্যাম্পের ব্যবহার অনিন্দ্য এক চেহারা দিতে পারে আপনার ঘরের। উৎসবের আমেজে ভরিয়ে তুলতে আপনি আপনার কমন স্পেস ও সদর দরজার সামনে ওয়াল ল্যাম্প বা রিসেসড লাইট ব্যবহার করতে পারেন।

পেনডেন্ট বা ঝোলানো লাইট
এই লাইট কর্ড, চেইন বা ধাতুর সাহায্যে ছাদ থেকে ফিক্স করে ঝুলিয়ে দেয়া হয়। এই লাইটে সাধারণত একটি চেইনের শেষে বাল্ব থাকে। তাই এটি বেশি জায়গা পূরণ করতে পারে না। তবে ইদানীং বাজারে বিভিন্ন আকার ও ডিজাইনের এই লাইট সহজলভ্য। যেমনÑ সিলিন্ডার শেপ, গোলাকার শেইপ বা ফানেলের শেইপে পাওয়া যায়। এটি সাধারণত একটি ছোট, নির্দিষ্ট এলাকা তথা রান্নাঘরের মাঝখান বা ডাইনিংরুমে টেবিলের মাঝখান বরাবর সেট করলে আলোর ব্যবহার সঠিক ও যথাযথ হয়।

শ্যান্ডেলিয়ার বা ঝাড়বাতি
শ্যান্ডেলিয়ার বা ঝাড়বাতি বড় ইউনিটে মিলিত একাধিক বাল্বের চমকপ্রদ সমাহার। শ্যান্ডেলিয়ার এক অসম্ভব সুন্দর আলোর উৎস। ঐতিহ্যগতভাবে এটি সুরুচিপূর্ণ অভিজাত ও ব্যয়বহুল। তাই এর ব্যবহার অপেক্ষাকৃত কম। সাধারণত বাড়ির ভেতরে প্রবেশপথ বা ড্রইংরুম, হলরুমে
এর ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায়।  

ওয়াল স্কনস বা ওয়াল ল্যাম্প
ওয়াল স্কনস বা ওয়াল ল্যাম্প সাধারণত ব্যবহার করা হয় আলোকসজ্জায় নতুন আবহ যোগ করার জন্য। ওয়াল ল্যাম্প হচ্ছে ওয়ালে আটকানো এক ধরনের লাইট। এই লাইটে সাধারণত অল্প আলো ও কম স্পন্দনশীল আলোর ব্যবহার হয়ে থাকে। এটি হলরুমের কর্নার বা প্রবেশদ্বারের কাছাকাছি ব্যবহার করা যেতে পারে।

রিসেসড লাইট
স্পেস যদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয় তাহলে রিসেসড লাইট আদর্শ এবং অবশ্যই অসাধারণ বিকল্প। কারণ এই লাইটের জন্য মোটেও আলাদা কোনো স্পেসের দরকার না। সিলিং বা ফলস সিলিংয়ের ভেতরে সরাসরি লাইটগুলো লাগানো থাকে। এই লাইটগুলো কিচেন, লিভিংরুম ও বিশাল আকৃতির রুমে অনেক আলোর তীব্রতা বাড়ানোর জন্য ব্যবহৃত হয়ে থাকে। যেসব জায়গায় আলো বেশি দরকার বা অন্ধকার স্থানে অতিরিক্ত আলোর জন্য মেঝে ও দেয়ালগুলোয় এ লাইটগুলো লাগানো যেতে পারে। একটি সাধারণ  স্পেস অসাধারণ করে তুলতে এটি ব্যবহার করা হয়। এখানে আলোর উৎস গোপন থাকার কারণেই এটি অনেকের পছন্দ।

আলো আমাদের চারপাশ হৃদয়ঙ্গম করার ক্ষেত্রে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। কোন জায়গা কী কাজের জন্য এবং কোথায় কী ধরনের কাজের স্বাচ্ছন্দ্য হতে পারে তা বোঝা যায় ও চিনিয়ে দেয় আলোর ব্যবহারই। এমনকি আমরা যে স্থানে আছি সেখানকার আবহ এবং যে কাজ করছি এর পরিবেশ প্রভাবিত করতে পারে আলোর কার্যক্ষমতা। উৎসবে তাই গৃহের সাজে অনন্য মাত্রা দিতে আপনিও ব্যবহার করতে পারেন নানান ধরনের লাইট।

 


লেখা : সহজ ডেস্ক
ছবি : ইন্টারনেট

যে চলচ্চিত্র জীবনের কথা বলে: আলফ্রেড হিচকক

অরিন্দম মুখার্জী বিঙ্কু

 



টান টান উত্তেজনা, রহস্য, ভয় ও উদ্বেগের চলচ্চিত্র মানে আলফ্রেড হিচকক। ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলচ্চিত্রে স্বতন্ত্র ও জনপ্রিয় একটি ধারার প্রবর্তক তিনি। উদ্বেগ, ভয়, কল্পনা অথবা সহানুভূতি ফ্রেমবন্দি করে চলচ্চিত্রে নতুন মাত্রা যোগ করেন বিশ্ব সিনেমার এই অভিভাবক। ‘সাইকো’, ‘দ্য বার্ড’ কিংবা ‘রেবেকা’র মতো অসংখ্য সিনেমার জনক তিনি। এখনো তার দ্বারা প্রভাবিত বিশ্বের অনেক পরিচালক।
ব্রিটিশ চলচ্চিত্র পরিচালক ও প্রযোজক স্যার আলফ্রেড যোসেফ হিচকক ১৮৯৯ সালের ১৩ আগস্ট লন্ডনের এক রোমান ক্যাথলিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ভক্তিনিষ্ঠ ক্যাথলিক তিনি। তরকারি ও হাঁস-মুরগি বিক্রেতা উইলিয়াম হিচকক ও এমা জেন হোয়েলানের ছেলে আলফ্রেড হিচকক ছিলেন মা-বাবার দ্বিতীয় সন্তান। বড় ভাই উইলিয়াম ও  ছোট ভাই এলেন হিচককের সঙ্গে তিনি লন্ডনের পূর্বপ্রান্তে লেইটন স্টোনে বড় হয়েছেন। ছোটবেলা খুব নিঃসঙ্গতা ও একাকিত্বের মধ্যে কেটেছে তার। তিনি মোটা ছিলেন বলে কেউ তার সঙ্গে খেলতে আসতো না। আর অল্প বয়সে এ রকম অদ্ভুত পরিস্থিতিই পরবর্তীকালে সৃষ্টি করেছে তার সিনেমাজুড়ে আতঙ্ক ও সাসপেন্স। বড় হয়ে তিনি হলেন মাস্টার অব সাসপেন্স ও রহস্যের জাদুকর। দর্শককে নিয়ে পিয়ানোর মতো খেলতে ভালোবাসতেন সাইকোলজিকাল থ্রিলারধর্মী ছবির এই নির্মাতা। চলচ্চিত্র ইতিহাসে তিনিই প্রথম থ্রিলার কিংবা ভৌতিক ছবির সফল ও আধুনিক রূপকার। আজও তার মুভিগুলো দর্শক, সমালোচকদের চিন্তার খোরাক জোগায়।

১৯২০ সালের দিকে এসে আলফ্রেড হিচকক আগ্রহী হয়ে ওঠেন ফটোগ্রাফি ও চলচ্চিত্রের প্রতি। তিনি লন্ডনে ফিল্ম প্রডাক্টশনে কাজ করা শুরু করেন। ‘প্যারামাউন্ট পিকাচার-এর লন্ডন শাখায় টাইটেল কার্ড ডিজাইনার হিসেবে কিছুদিন কাজ করেন। এরপর ‘ইসলিংটন স্টুডিও’তে কাজ করেন। টাইটেল কার্ড ডিজাইনারের কাজ করতে করতে
চিত্রপরিচালক হিসেবে তিনি আত্মপ্রকাশ করেন। চলচ্চিত্র ক্যারিয়ার শুরু করেন ১৯২২ সালে। এ বছর ‘নাম্বার থার্টিন’ চলচ্চিত্রে হাত দেন তিনি। কিন্তু তার জীবনের প্রথম চলচ্চিত্রটি অসম্পূর্ণই থেকে যায়। ১৯২৫ সালে নির্মাণ করেন ‘দ্য প্লেজার গার্ডেন’। এ চলচ্চিত্রটি ছিল ব্রিটিশ-জার্মান প্রডাক্টশনের। এটি দারুণ জনপ্রিয় হয়। এরপর তাকে আর অপেক্ষা করতে হয়নি। তিনি বিভিন্ন প্রডাক্টশনের ব্যানারে একের পর এক চলচ্চিত্র নির্মাণ করে যেতে থাকেন। আর চলচ্চিত্রে ফুটিয়ে তুলতে থাকেন তার নান্দনিকতা। সেই ষাটের দশকে এই মানুষ এমন সব অসাধারণ ছবি নির্মাণ করলেন, প্রযুক্তির এই যুগে তিনি বেঁচে থাকলে অবশ্যই নাড়িয়ে দিতেন গোটা বিশ্ব!

১৯২৭ সালে মুক্তি পায় হিচককের চলচ্চিত্র ‘দ্য লডজার’। একই বছরের ডিসেম্বরে হিচকক বিয়ে করেন আলমা রিভিলিকে। হিচকক ছিলেন ব্রিটেনের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র নির্মাতা। ১৯২৯ সালে তার ‘ব্ল্যাকমেইল’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে ব্রিটেনে সবাক চলচ্চিত্রের যাত্রা শুরু হয়। ১৯৩৮ সালে তিনি নির্মাণ করেন ‘দ্য লেডি ভেনিশেস’ ও ১৯৩৯ সালে ‘জ্যামাইকা ইন’। ১৯৪০ সালে হিচকক নির্মাণ করেন ‘রেবেকা’। মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলার ‘রেবেকা’ সেরা চলচ্চিত্র হিসেবে একাডেমি পুরস্কার পেয়েছিল। তার করা এটিই একমাত্র চলচ্চিত্র যা সেরা চলচিত্রের পুরস্কার লাভ করে। ১৯৪২ সালে ‘সাবটিউর’ মুক্তির পর হলিউডে পরিচালক হিসেবে তার একটা শক্ত অবস্থান হয়। ১৯৪৩ সালে ‘শ্যাডো অফ ডাউট’টি তার পরিচালিত চলচ্চিত্রের সবচেয়ে আলোচিত চলচ্চিত্র। ১৯৪৪ সালে তার আরেকটি আলোচিত ছবি মুক্তি পায় ‘লাইফ বোট’। এতে দেখানো হয় কীভাবে একটি নৌকার আরোহীরা বেঁচে থাকার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে। ১৯৫৫ সালে প্রচারিত ‘আলফ্রেড হিচকক প্রেজেন্ট’-এর মাধ্যমেই তার পরিচিতি মানুষের কাছে বেশি পৌঁছায়। এটি ছিল মূলত একটি টিভি শো। সিরিজটি ১৯৫৫ থেকে শুরু হয়ে ১৯৬১ সাল পর্যন্ত টিভিতে চলাকালে ১৯৫৬ সালে তিনি নাগরিকত্ব পান যুক্তরাষ্ট্রের।

হিচকক ১৯৬০ সালে বিখ্যাত মনোজাগতিক বিকৃতি বিষয় নিয়ে চলচ্চিত্র ‘সাইকো’ নির্মাণ করেন যা বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ‘দ্য মোমেন্ট অফ সাইকো’ উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি করা হয় এটি। গোসলখানার ৪৫ সেকেন্ডের ওই ভয়ঙ্কর দৃশ্য দর্শককে চিরকাল আতঙ্কিত করবে। হিচককের মুভির শেষে টুইস্ট অবশ্যম্ভাবী। ভীতি, ফ্যান্টাসি, হিউমার ও বুদ্ধিদীপ্ততাÑ এই চারের কম্বিনেশনে প্লটগুলো মূলত মার্ডার, অপরাধ, ভায়োলেন্সের ওপর নির্মিত। তিনি গোল্ডেন গ্লোব, সিনেমা জাম্পো অ্যাওয়ার্ড, লরিয়াল অ্যাওয়ার্ড, ডিরেক্টরস গিল্ড অফ আমেরিকা অ্যাওয়ার্ড, আমেরিকান ফিল্ম ইনস্টিটিউট অ্যাওয়ার্ড, একাডেমি অ্যাওয়ার্ড-এর মতো পুরস্কার পেয়েছেন। তবে সেরা পরিচালক হিসেবে কখনোই একাডেমি পুরস্কার পাননি।

১৯৬৮ সাল। হিচককের ক্যারিয়ার তখন পড়তির দিকে। তার সিনেমাগুলোও ঠিক প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না। তখন তার নামের প্রতি সুবিচার করতেই শুরু করলেন ক্যালাইডোস্কপ সিনেমার কাজ। খুন, ধর্ষণ, পেশিশক্তি, সিরিয়াল কিলিংয়ে ভরপুর এক থ্রিলার। ‘দ্য বার্ডস’-এ যে রকম তেমনি এটিতেও নতুন কিছু ফিল্ম টেকনিক প্রয়োগের পরিকল্পনা আঁটলেন। চিন্তা ছিল প্রাকৃতিক আলো ব্যবহার করা, স্ট্যান্ডের বদলে ক্যামেরা হাতে নিয়ে শুট করা এবং পয়েন্ট অফ ভিউ অ্যাঙ্গেলে শুট করার মতো ভাবনাগুলো। প্রি-প্রডাকশনে প্রচ- পরিশ্রম করার পরও শেষ পর্যন্ত সিনেমাটা শেষ করতে পারলেন না তিনি। টাকার অভাবে প্রায় ঘণ্টাখানেকের ফুটেজ নিয়ে অসমাপ্ত পড়ে রইলো ক্যালাইডোস্কপ। এর কিছু অংশ অবশ্য তিনি পরে ‘ফ্রেঞ্জিতে’ (১৯৭২) ব্যবহার করেন।

১৯৭৭ সাল থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত হিচকক পরবর্তী প্রজন্মের লেখকদের সঙ্গে ‘দ্য শর্ট নাইট’ নিয়ে কাজ করেন যা তার মৃত্যুর পর স্ক্রিনপ্লে হয়। তার অনেক চলচ্চিত্রেই নিজের একমাত্র মেয়ে প্যাট্রেসিয়া হিচকককে দেখা যায়। ‘এন্টারটেইনমেন্ট উইকলি’ ম্যাগাজিনে বিশ্বের সেরা ১০০ চলচ্চিত্রের মধ্যে তার চলচ্চিত্র ‘সাইকো’, ‘ভারটিগো’, ‘নর্থ বাই নর্থওয়েস্ট’, ‘নটোরিয়াস’ স্থান পেয়েছে।
১৯৭৯ সালের ৭ মার্চ আলফ্রেড হিচকক আমেরিকান ফিল্ম ইনস্টিটিউট থেকে ‘লাইফ অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড’ পান।
১৯৮০ সালের ২৯ এপ্রিল আমেরিকার ক্যার্লিফোনিয়ায় হিচকক ৮০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর কয়েক মাস আগে রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ-এর কাছ থেকে ‘নাইট’ উপাধি লাভ করেন। স্যার আলফ্রেড হিচককের চলচ্চিত্র, নির্মাণকৌশল পরবর্তীকালে অনেক বিখ্যাত পরিচালককে পথ দেখিয়েছে। চলচ্চিত্র যে কতো বড় একটা শিল্প হতে পারে, মানুষের কাছে এর মাধ্যমে কতোটা গভীরে পৌঁছানো যায় তা তিনি করে দেখিয়েছেন। তাই চলচ্চিত্রে সাসপেন্স, থ্রিলিংয়ের জগৎ সৃষ্টিকারী এ চলচ্চিত্রের বিস্ময়কর নির্মাতা আলফ্রেড হিচকক আজও চলচ্চিত্র দর্শক-নির্মাতাদের কাছে বেঁচে আছেন এবং থাকবেন।

 


ছবি : ইন্টারনেট

অনন্য ইনগ্রিড বার্গম্যান

শিরিন সুলতানা

 



দায়িত্বটা নিজেই নিয়েছিলেন নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার। জন্মের তিন বছেরের মাথায় যার মা এবং ১২ বছরে বাবা মারা যায় তাকে তো এতোটুকু দৃঢ় হতেই হয়। মা ফ্রিডেল এডলর বার্গম্যান কোনো স্থায়ী স্মৃতি রাখতে পারেননি, ছোট্ট শিশুটির মনে কোনো স্থায়ী স্মৃতি রাখতে পারেননি। তবে বাবা জ্যাস্টাস স্যামুয়েল বার্গম্যান মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আগলে রেখেছিলেন মেয়েকে। ফটোগ্রাফির দোকান ছিল তার। মেয়ের প্রতিভা কিছুটা হলেও টের পেয়েছিলেন। তাই ছোট্ট শিশুর কিছু মোশন চিত্র রেকর্ড করেছিলেন তিনি। স্কুলের পাট চুকানোর পর নিজেই সিদ্ধান্ত নেন অভিনেত্রী হওয়ার।


যাকে নিয়ে এতো কথা তিনি হলেন প্রতিথযশা লাস্যময়ী অভিনেত্রী ইনগ্রিড বার্গম্যান। বলা হয়ে থাকে হলিউডকে দেয়া সে এক মহাশঙ্খ সুইডিশ উপহার। ১৯১৫ সালের ২৯ আগস্ট স্টোকহোমে জন্ম নেয়া এই তুখড় অভিনেত্রী মা-বাবা মারা যাওয়ার পর চাচার কাছেই মানুষ হয়েছিলেন। কৈশরেই তিনি বিভিন্ন ছবির এক্সট্রা হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯৩৩ সালে গ্র্যাজুয়েট শেষ করার পর স্টকহোমের রিয়াল ড্রামাটিক থিয়েটার স্কুলে স্কলারশিপ পান। এ সময় তার মঞ্চে অভিষেক ঘটে। চলচ্চিত্রে প্রথম পদার্পণ করে ‘মুন্কব্রোগ্রেভেন’ সুইডিশ ছবিটির মাধ্যমে। খুব একটা নামডাক না হলেও অভিনেত্রী হিসেবে একটা জায়গা তৈরি হয় তার।


১৯৩৬ সালে ইনগ্রিডের জীবনের মোড় ঘুরে যায় গুস্তাফ মোলান্ডারের ‘ইন্টারমেজো’ ছবিতে অভিনয় করে। দারুণ ব্যবসা সফল ছবিটি সাড়া ফেলে সুইডেনে। বিখ্যাত হন ছবির সঙ্গে ইনগ্রিডও। মুগ্ধতায় আবেশিত হয় হলিউড চলচ্চিত্র প্রযোজক ডেভিড সেলজনিকও। ছবিটি হলিউডে পুনর্নির্মাণের প্রস্তাব দেন সেলজনিক। এই একটি ছবি করেই সুইডেনে ফেরার কথা ছিল ইনগ্রিডের। সেখানে তার ডেন্টিস্ট স্বামী ডা. পিটার লিন্ডস্ট্রোম ও কন্যা পিয়াকে রেখে এসেছিলেন। এদিকে হলিউড ভার্সন ‘ইন্টারমেজো : দ্য লাভ স্টোরি’ (১৯৩৯) বক্স অফিস হিট হয়। তারকাখ্যাতি ও হলিউডে থিতু হওয়ার হাতছানি ইনগ্রিডকে মোহাচ্ছন্ন্ করে ফেলে। সেলজনিকের অনুরোধে হলিউডে থিতু হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। জহুরি চোখ ভুল করেনি। প্রযোজক ও চিত্রনাট্যকার সেলজনিক সাত বছরের জন্য চুক্তিবদ্ধ করেন ইনগ্রিডকে। ওই সাত বছরে তিনি মাত্র দুটি ছবিই নির্মাণ করেছিলেন ইনগ্রিডকে নিয়ে। ‘গান উইথ দ্য উইন্ড’ (১৯৩৯) ও ‘রেবেকা’ (১৯৪০) ছবি দুটিই একাডেমি পুরস্কার পায়। ধীরে ধীরে ইনগ্রিডের লস্যময়ী নারীসুলভ, প্রেয়সীর ইমেজের ছোট্ট চারাগাছটি মহীরুহে পরিণত হয় সমগ্র হলিউডে তথা আমেরিকায়।

১৯৪২ সালে নির্মিত হয় কালজয়ী চলচিত্র ‘ক্যাসাব্লাংকা’। ইনগ্রিডের সঙ্গে নায়কের ভূমিকায় ছিলেন হামফ্রে বোগার্ট। হলিউড চলচ্চিত্রে এই ছবিকে মাস্টারপিস হিসেবে গণ্য করা হয়। ছবিতে বোগার্টের সঙ্গে ওই অন্তরঙ্গতা, চুম্বন দৃশ্য, চাহনি, গুমরে ওঠা দীর্ঘশ্বাস সন্তর্পণে লুকানোÑ সবকিছুই যেন দর্শকের মন ও মগজে ঠাঁই করে নেয় অবলীলায়। দর্শক বুঁদ হয়ে আটকে যায় বার্গম্যানের সাবলীল অভিনয়ের ফাঁদে। এলসা নামের সারল্যমাখা রমণীর ওই চরিত্রকে ইনগ্রিডের অভিনিত শ্রেষ্ঠ চরিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তার ঐশ্বর্যময় সৌন্দর্য বহুমুখী অভিনয় প্রতিভা, কাজের প্রতি একাগ্রতা, নিয়মানুবর্তিতাÑ সবকিছুর সমন্বয়ই তাকে শিখরে পৌঁছানোর অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। ওই সময় অন্য অভিনেত্রীরা যখন মেকআপের ভারে, পোশাকের চাকচিক্যে ন্যুব্জ হয়ে থাকতেন তখন ইনগ্রিড প্রায় মেকআপহীন সাধারণ পোশাকের মহিমায় হয়েছে উদ্ভাসিত। সম্পূর্ণ বিপরীতধারা থেকেই তিনি জয় করেছেন হাজারো দর্শকের হৃদয়। চরিত্র বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও দারুণ খুঁতখুঁতে ছিলেন তিনি।


১৯৪৩ সালে একটি মাত্রই ছবি করেন বার্গম্যান। আর্নেস্ট হোমিংওয়ের উপন্যাস অবলম্বনে ‘ফর হোম দ্য বেল টোলস’ ছবির মারিয়া চরিত্রটি প্রায় লুফে নেন তিনি। চরিত্রের ক্ষুধা তখন তাকে পেয়ে বসে। ইনগ্রিডের চিরচেনা রূপ থেকে বেরিয়ে এসেও ছোট করে ছাঁটা সোনালি চুলের মারিয়া দারুণ আবেদনময়ী হিসেবে ধরা দেয়। এ ছবিতে অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর অস্কার মনোনয়ন পান তিনি। ওই বছর খালি হাতে ফিরলেও পরের বছরই শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর অস্কারটি চলে আসে তার ঝুলিতে। দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের পর ইনগ্রিড বার্গম্যান আমেরিকার সবচেয়ে বড় বক্স অফিস সেলিব্রিটি হয়ে ওঠেন। পরবর্তী দুই বছরে আলফ্রেড হিচককের ‘স্পেলবাউন্ড’ ও ‘নটরিয়াস’ ছবি দুটিতে অনবদ্য অভিনয় করেন তিনি। ফলে সাফল্যের মুকুটে হতে থাকে নতুন নতুন পালকের সাবলীল সংযোজন।


প্রত্যেক শিল্পীর কিছু স্বপ্নের চরিত্র থাকে। ‘জায়ান অফ আর্ক’ ছবির জোয়ান চরিত্রটি তেমনই ‘ড্রিম প্রজেক্ট’ ছিল ইনগ্রিডের। দরিদ্র ফরাসি জোয়ান (পরে সন্ন্যাসী হয়ে ওঠে) চরিত্র পাওয়ার জন্য যথেষ্ট কাঠখড় পুরিয়েছেন তিনি। চতুর্থবারের মতো শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর অস্কার মনোনয়ন পায় চরিত্রটি। ইনগ্রিডের পালে তখন নতুন হাওয়ায় তর তর করে এগিয়ে চলছে সাফল্যের তরী। হঠাৎই যেন জমাট মেঘের ষড়যন্ত্র। তিনি ১৯৪৮ সালে ইটালিতে পাড়ি জমান ‘স্টমবলি’ ছবির শুটিংয়ের জন্য। পরিচালক রবার্তো রসেলিনের কাজে আগে থেকেই মুগ্ধ ছিল তিনি। জীবনটা যেন ওলট-পালট হওয়ার অপেক্ষায় ছিল তার। না হলে সাফল্যের চরম শিখরে বসে, স্বামী-সন্তান তুচ্ছ করে প্রেমেই বা পড়বেন কেন রসেলিনের। তুমুল ওই প্রেমের পরিণতিতে সন্তানসম্ভাবা হয়ে পড়েন তিনি। এ খবর চাউর হতে সময় লাগে না। পুরো আমেরিকা হতবাক হয়ে পড়ে এ সম্পর্কে জানার পর। হলিউডপাড়া থেকে সিনেট পর্যন্ত তুমুল ঝড় বয়ে যায়। যাকে সাক্ষাৎ দেবীর আসনে বসিয়েছে বিশ্ববাসী, যে রমণী নারীত্বে মহিমায় উদ্ভাসিত করেছেন নিজেকে তার এমন অধঃপতন (!) দর্শক মেনে নিতে পারে না কিছুতেই। সবাই বয়কট করেন ইনগ্রিডকে। বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়ে ‘স্ট্রমবলি’ (১৯৫০)।


এমনতর প্রক্রিয়ায় ইনগ্রিড আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘মানুষ আমাকে জোয়ান অফ আর্ক হিসেবে, সন্ন্যাসী হিসেবে দেখে। আমি তা নই। আমি শুধু একজন নারী, একজন মানুষই।’ এতো ঘটনায় ইটালিতেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় তিনি। পরবর্তী সাত বছর এখানেই কাটিয়ে দেন রোসেলিনের সঙ্গে। এ সময় তাদের এক পুত্র ও যমজ কন্যা সন্তানের জš§ হয়। সাত বছর পর যেন ফিনিক্সের মতোই উঠে দাঁড়ান ইনগ্রিড। ১৯৫৬ সালে আবারও সদর্পে হাজির হন হলিউডে ‘অ্যানাস্টাশিয়া’ ছবির টাইটেল চরিত্রে অভিনয় করে। পুরো ছবিটি চিত্রায়িত হয় ইংল্যান্ডে। ততো দিনে রবার্তোকে নিয়ে স্ক্যান্ডাল স্তিমিত হয়েছে। অভিমানে মুখ ফেরানো দর্শক আবার ভালোবাসার আলিঙ্গনে বাঁধে ইনগ্রিডকে। এ ছবিতে অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর অস্কার ধরা দেয়। তার জীবনে দীর্ঘ সাত বছরের অভিশাপ যেন ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয় ছবিটি। ষাট থেকে সত্তরের দশক তিনি অক্লান্ত কাজ করে যান। পেছনের ভুল সুধরে নিতেই এ অবিরাম চলা। ১৯৭৪ সালে আবারও ওই প্রাপ্তি। ‘মার্ডার অন দ্য অরিয়েন্ট এক্সপ্রেস’ ছবিতে অভিনয় করে শ্রেষ্ঠ পার্শ্বঅভিনেত্রীর অস্কার ঘরে তোলেন। শেষ বয়সে সাফল্যের মুকুটে আরো একটি পালক যোগ হয় ‘অটাম সানাটা’ দিয়ে।
১৯৭৪ সালে ধরা পড়ে তার ব্রেস্ট ক্যানসার। কর্কট কামড়কে উপেক্ষা করেই টিভি সিরিজ ‘অ্যা ওম্যান কল্ড গোল্ড’ শেষ করে ইনগ্রিড। অবশ্য ছবির সাফল্য দেখে যেতে পারেননি। জীবন নদীর ওপার থেকে তিনি কি শুনতে পেয়েছিলেন, অ্যামি অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে দ্বিতীয়বারের মতো শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে তার নাম ঘোষিত হলো?


ক্যানসার ধরা পড়ার আট বছরের মাথায় ঠিক তার জন্মদিনেই ১৯৮২ সালে ৮৭ বছর বয়সে পরপারে পাড়ি জমান ইনগ্রিড। বরফরাজ্যে জন্ম নেয়া রাজস্বী ওই নারী আজন্মের ঠাঁই করে নিয়েছেন লাখো দর্শকের হƒদয়ে।

ছবি : ইন্টরনেট

হোয়াইট বেলুন

তিয়াষ ইসতিয়াক

 



বহু বছর ধরে ইরানের সিনেমা বিশ্ববাসীর কাছে এক বিস্ময়ের নাম! একদমই সাদামাটা কিছু গল্প যে কী করে হৃদয়ের অলিন্দে ছড়িয়ে যাবে, এক চিলতে কিছু অনুভূতি আশ্চর্য রকম ক্ষিপ্রতায় মগজের কোষে কোষে কখন যে জায়গা করে নেবে তা টেরই পাওয়া যায় না! ইরানের সিনেমাগুলোয় এই এক বৈশিষ্ট্য- দেখার সময় আপনার মনে হবে যেন পাশের বাসায় ঘটে যাওয়া গল্পটা কিংবা নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা দেখছেন।
পরিচালক রিলে ভাসিয়ে আপনাকে নিয়ে যাবে এক আশ্চর্য চেনা জগতে যেখানে সময় স্থির! জীবনটা যে কী আশ্চর্য সহজ কিন্তু রঙিন হয়ে ধরা দেয় তা কল্পনাই করা মুশকিল!
এমনই এক সিনেমার কথা বলবো আজ। এর পার্সিয়ান নাম ইধফশড়হধশব ঝবভরফ এবং ইংরেজিতে তা হয় ঞযব ডযরঃব ইধষষড়ড়হ (সফেদ বেলুন)। এটি ১৯৯৫ সালের ড্রামা সিনেমা। ইরানের অন্য দশটি ছবির মতো এটিও এক অতি সাধারণ নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের কাহিনী। ইরানে নববর্ষের মাত্র কয়েক ঘণ্টা বাকি তখন। মায়ের সঙ্গে বাজারে গিয়ে পরিবারের ছোট্ট মেয়ে রাজিয়ার চোখ আটকে যায় এক সুন্দর গোল্ড ফিশের ওপর। এরপর থেকে মায়ের কান ঝালাপালা করে দিতে থাকে ওই ১০০ তোমান (ইরানের মুদ্রা) দামের গোল্ড ফিশটির জন্য! কিন্তু মা অনড়। দারুণ হিসাবি সংসারে একটা শৌখিন মাছের জন্য ১০০ তোমান খরচ করা বড্ড বোকামি। তাছাড়া বাড়িতে কয়েকটা গোল্ড ফিশ তো আছেই। কিন্তু বাজারের গোল্ড ফিশগুলো বেশ নধরকান্তি। রাজিয়ার ভাষায় নতুন বৌয়ের মতোই সুন্দর!


অবশেষে নানান প্রলোভন দেখিয়ে ভাইকে দিয়ে মাকে রাজি করাতে পারে ছোট্ট মেয়েটি! মা ৫০০ তোমান দিয়ে বলে ৪০০ তোমান যেন ঠিক ঠিক ফিরিয়ে আনে। রাজিয়া যেন হাতে স্বর্গ পেয়ে যায়! তখনই ছুট লাগায় পছন্দের মাছটি কিনতে। পথে বেশকিছু উটকো ঝামেলা পোহানোর পর ওই কাক্সিক্ষত দোকানে পৌঁছায় সে। কিন্তু আরেক সমস্যা বাধায় দোকানি। সে এখন মাছটির জন্য দাবি করে বসেছে বাড়তি দাম। ঠিক যেন উৎসবের সময় আমাদের দেশের দোকানিদের মতো! কঠিন বাস্তবতার ওপর ভীষণ মন খারাপ করে রাজিয়া নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ আবিষ্কার করলো, ওই মহামূল্যবান ৫০০ তোমানের নোটটি উধাও!
এখন ছোট্ট মেয়েটি কী করবে! শখের মাছটা কি কেনা হবে না? বাড়ি গিয়ে মাকেই বা কী বলবে? এই ভরাবাজারে একটা নোট কীভাবে খুঁজে পাবে ছোট মানুষ রাজিয়া?

কী আছে এই সিনেমায়? হলিউডের সিনেমার মতো ঘাগু হাতে করা ক্যামেরার তাজ্জব করে দেয়া কারিকুরি নেই, সিজিআই আর স্পেশাল ইফেক্টের দুর্ধর্ষ কাজ নেই, নেই বলিউডের গ্ল্যামারের চাকচিক্য কিংবা চমকদার কৃত্রিম আবেদন। নামি-দামি কোনো অভিনেতাও নেই। আছে কয়েকটা লং, ক্লোজ ও কিছু মাস্টার শর্টের কাজ। তাহলে এই সিনেমা কেন দেখতে হবে? ওই সিনেমায় আসলে আছে জীবন। আছে আশ্চর্য প্রাণবন্ত অভিনয়! ছোট্ট রাজিয়ার ভূমিকায় আইদা মোহাম্মদখানি-র অভিনয় দেখার জন্যই ওই সিনেমা দশবার দেখা যায়! ওই সময় আইদা-র বয়স ছিল মোটে সাত বছর! সাত বছরের একটি ছোট মেয়ে কীভাবে এতো অসাধারণ অভিনয় করেছে তা ভেবে কূল পাবেন না নিশ্চিত। মিষ্টি একটা চেহারা এবং অমন নিষ্পাপ একটা চাহনি দিয়ে মন জয় করবেই আপনার! আর এক্সপ্রেশন? দশে একশ’! অনেক বড়
অভিনেতার সঙ্গে টক্কর দিতে পারবে সে।

ঠোঁট উল্টে অভিমানি একটা ভঙ্গি করে মায়ের কাছে কীভাবে যে টাকা চায়! টাকা হারিয়ে ফেলার পর তার ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার দৃশ্যগুলায় দর্শকের চোখে বাষ্প জমায়। বড্ড মায়া লাগে। ইচ্ছা হয় রাজিয়াকে মমতায় জড়িয়ে ধরে চোখ-মুছে আদর করে ১০০টি গোল্ড ফিশ কিনে দিতে! টাকাটা হাতে পাওয়ার পর দুনিয়ার সব মায়া নিয়ে এতো চমৎকার একটা হাসি দেয় যে, তা দেখার পর চোখে আরেকবার পানি আসে। এটি অভিনয় নয় যেন অন্য কিছু! কী এক্সপ্রেশন, কী ডায়ালগ থ্রোয়িং! কাঁপিয়ে দেয় ভেতরটা। এর সঙ্গে সঙ্গে আপনাকে হয়তো নিয়ে যাবে ওই ছোট্টবেলার অভিমান মিশ্রিত সব আবদারের সরল দিনগুলোয়। আরেকবার অনুভূত হবে শৈশবের পাওয়া, না পাওয়ার বেদনা। এখানেই তো সিনেমার সার্থকতা।


ইরানের মুভি মায়েস্ত্রো ও সদ্য প্রয়াত আব্বাস কিয়ারোস্তামি অনবদ্য কাহিনীতে তারই অনুসারী ইরানের নয়া স্রোতের জনপ্রিয় পরিচালক জাফর পানাহির
পরিচালনায় প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা ‘সফেদ বেলুন’। আর পহেলা সিনেমাতেই বাজিমাত! এটি বাগিয়ে নিয়েছে বেশ কয়টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার এবং নমিনেশন পেয়েছে কয়টিতে। এর মধ্যে আছে ১৯৯৫ সালের কান ফেস্টিভালের সম্মানিত ক্যামেরা ডি’ওর অর্থাৎ গোল্ডেন ক্যামেরা পুরস্কার। আরো পেয়েছে টোকিও আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভালে গোল্ড অ্যাওয়ার্ড, সাও পাওলো আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভালে জুরি পুরস্কার, কানাডার সাডবারি সিনেফেস্ট-এ সেরা আন্তর্জাতিক সিনেমা ইত্যাদি। তাছাড়া অস্কার পর্যন্ত গড়িয়েছিল এটি। দি গার্ডিয়ান পত্রিকা ওই সিনেমাটিকে সেরা ৫০ ফ্যামিলি মুভির লিস্টে রেখেছে।

দেরি না করে বসে পড়–ন ‘সফেদ বেলুন’ নিয়ে এবং দেখুন আপনার অনুভূতি নিয়ে কেমন খেলা করে সিনেমাটি!

আবিদা সুলতানা

 

 


আবিদা সুলতানার বেড়ে ওঠা একটি স্বনামধন্য সংস্কৃতিমনা পরিবারে। আর এ জন্যই শৈশব থেকেই তার সখ্য গান, নাটক, নাচসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সঙ্গে। ছোটবেলায় গানের চেয়েও নাচের প্রতি বেশি ঝোঁক ছিল তার। রাম গোপাল মহন্ত, ওস্তাদ ফুল মোহাম্মদ, আক্তার সাদমানি, বারীন মজুমদার, ওস্তাদ নারু ও ওস্তাদ সগীরউদ্দীন খানের কাছ থেকে গানের তালিম নিয়েছেন তিনি। সঙ্গীত জীবনে ওই প্রখ্যাত ওস্তাদদের প্রভাব তার গায়কীতে বিশেষভাবে লক্ষ করা যায়। রবীন্দ্র সঙ্গীত ও নজরুল সঙ্গীত- এ দুটির ওপর আবিদা তালিম নিলেও আধুনিক গানেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। পূর্ব পাকিস্তানের একটি সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হন। ১৯৬৮ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারের সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। তখন থেকেই তিনি ওই দুই মাধ্যমে নিয়মিত গান পরিবেশন করে আসছেন। ১৯৭৪ সালে তিনি সর্বপ্রথম প্লেব্যাক করেন। এ পর্যন্ত ৪৫০টিরও বেশি চলচ্চিত্রের গানে কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি।
আবিদা ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের প্রখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী রফিকুল আলমের প্রেমে পড়েন এবং ১৯৭৫ সালে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন। ‘সহজ’কে এই গুণী শিল্পী জানিয়েছেন তার আদ্যোপান্ত

সঙ্গীতের শুরু
কবে থেকে গান করেন এমন প্রশ্ন আমাকে কেউ করলে অবশ্যই বলি, মায়ের পেটে থাকতে গান গাই। এর পেছনে বড় ইতিহাস আছে। আমার গানে বাবা, মামা, খালা, নানি, চাচা অর্থাৎ আমার পরিবারের অবদান অনেক। আমার নানিবাড়িতে পহেলা বৈশাখ থেকে শুরু করে রবীন্দ্র-নজরুলজয়ন্তী, বছরের প্রথম দিন- সব সময় একটা না একটা অনুষ্ঠান থাকতো। আমার অনেক খালাতো ভাইবোন ছিল। সবাইকেই নাচ, গান, নাটক, অভিনয়, আবৃত্তি- সবকিছুই করতে হতো। এভাবেই আমাদের বেড়ে ওঠা। মায়ের অনুপ্রেরণাতেই গানে আসা। নাচটি অবশ্য আমার খুব পছন্দের ছিল। কিন্তু মা চাইতেন আমি গান করি। তাছাড়া আমাদের বাড়িটি ছিল সাংস্কৃতিক পরিম-লে মোড়ানো। আমার বাবা গান ও অভিনয় করতেন। রম্যরচনা ভালো লিখতেন, ছড়ার অনেক বই প্রকাশ হয়েছে তার। আমার মা ছোটগল্প লিখতেন। ওই সময়ে তিনি ‘বেগম’ পত্রিকায় অনেক লেখালেখি করতেন। বাসায় কোনো অনুষ্ঠান হলে মা-বাবাকে দেখতাম এক সঙ্গে গান গাইতে। না হলে কবিতা আবৃত্তি করতেন। ছোটবেলা থেকেই আমাদের রক্তের সঙ্গে মিলেমিশে আছে সাংস্কৃতিক নানান উপাদান। মা-বাবা ও বোনদের প্রভাব আছে বলেই আমি আবিদা সুলতানা এ পর্যায়ে এসেছি। তাদের উৎসাহ না পেলে শিল্পের এক্ষেত্রে কখনোই আসতে পারতাম না। আবৃত্তি করেছি। বাবার চাকরি সূত্রে আমাদের উত্তরবঙ্গে থাকা হতো। শিল্পী পরিবারের সদস্য হওয়ার কারণে সব সময়ই সঙ্গীত আর শিল্প চর্চা দেখে দেখে বড় হয়েছি।

আমার শিক্ষক
রাম গোপাল মহন্ত, ওস্তাদ ফুল মোহাম্মদ, আক্তার সাদমানি, বারীন মজুমদার, ওস্তাদ নারু ও ওস্তাদ সগীরউদ্দীন খানের কাছ থেকে গানের তালিম নিয়েছি। সঙ্গীত জীবনে ওই প্রখ্যাত ওস্তাদদের প্রভাব আমার গানেও পড়ে।

জন্মস্থান
বাড়ি মানিকগঞ্জ। এখানে সেভাবে যাওয়াই হয়নি। ছোটবেলায় বাবা চলে গিয়েছিলেন জলপাইগুড়িতে। মা ছিলেন কলকাতায়। পরে ঢাকায় এসে ওনাদের বিয়ে হয়।

পরিবার
আমাদের পরিবারের সবাই গানের সঙ্গে জড়িত। রবীন্দ্রজয়ন্তী, নজরুলজয়ন্তী- সবকিছুতে আমাদের অংশগ্রহণ করতে হতো ছেলেবেলায়। আমার গানের অনুপ্রেরণা আমার মা। আমার চাচা শিক্ষাবিদ আব্দুর রশীদ বেহালা বাজাতেন। মা ভালো লিখতেন এবং খুব ভালো আবৃত্তি করতেন। সঙ্গীতে আমার মায়ের অবদান অনস্বীকার্য। রফিকুল আলম আমাকে বোঝেন। আমাকে গান বিষয়ে নানানভাবে সহযোগিতা করেন। তার মতো একজনকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পেয়ে সত্যিই নিজেকে ভাগ্যবতী ভাবি।

বিয়ে
১৯৭৪ সালে শিল্পী রফিকুল আলমের প্রেমে পড়ি। ১৯৭৫ সালে আমাদের বিয়ে হয়। এক পুত্র রয়েছে আমাদের। রফিকুল আলম খুব কেয়ারিং ও হেলপিং। তবে ওনাকে অ্যাবসেন্স মাইন্ডেড প্রফেসর বলা যায়।

শিল্পী দম্পতির সুবিধা-অসুবিধা
অনেক বাধার সম্মুখীন হয়েছি। একই প্রফেশন দু’জন থাকলে অসুবিধার চেয়ে সুবিধাই বেশি। ওনার ও আমার কোনো ব্যাখ্যা দিতে হয় না প্রফেশনের বিষয়ে।

বাংলাদেশের সঙ্গীত নিয়ে ভবিষ্যৎ ভাবনা
আমার আসলে গান নিয়ে কোনো প্ল্যান নেই। তবে উপভোগ করি।

মিউজিকের বাইরে নিজের ইচ্ছা
এতিম শিশুদের নিয়ে কিছু করা মিউজিকের বাইরে আমার ইচ্ছা। আর উপস্থাপনার ব্যাপারে আগ্রহ বোধ করি।

ভূপেন হাজারিকার গান
যখন মাত্র ম্যাট্রিক পাস করেছি তখন ১৯৭৪ সালের কথা। বাসায় এলেন আলমগীর কবির ভাই ও ‘চিত্রালী’র সম্পাদক পারভেজ ভাই। ওনাদের সঙ্গে তখনই প্রথম পরিচয়। সীমানা পেরিয়ে ছবিতে ‘বিমূর্ত এই রাত্রে আমার’ গানটি আমার সঙ্গীত জীবনের মাইলফলক। এতো বছর ধরে গানটির জনপ্রিয়তা এতোটুকু কমেনি। এটিই আমার প্রাপ্তি।

বিভিন্ন ভাষায় গান
ক্লাস সেভেনে যখন পড়ি তখন পিটিভি ছিল। আমরা ৪৫ জন ছিলাম যাদের দিয়ে মোট ২০টি ভাষায় গান করানো হয়েছিল। আমি তখন চায়নিজ ও জার্মান ভাষায় গেয়েছিলাম। এটি এক নেশা, বিভিন্ন ভাষায় গানের নেশা। ডিপ্লোম্যাটদের গান শোনানোর সৌভাগ্য আমার হয়েছে। ওমানে ক’দিন আগে গান করে এলাম। এ পর্যন্ত ৩৫টি ভাষায় গান করেছি।

সন্তান
আমার এক ছেলে ফারশিদ আলম। সে বোহেমিয়ান ব্যান্ডে আছে। এছাড়া একটি চ্যানেলেও আছে।

সংসার
পৃথিবীর যেখানেই থাকি, সংসার খুব মিস করি। আমি সংসারে খুব বেশি ইনভলব আর সংসারের প্রতি সবসময় টান অনুভব করি। বিভিন্ন রকম রান্না করতে ভালোবাসি। আমার বাসায় কোনো পার্টি থাকলে চেষ্টা করি নিজে রান্না করতে। আমার ছোট একটি বারান্দা আছে। সেখানে বেশকিছু গাছ আছে। অবসরে সেগুলো পরিচর্যা করি। আর টিভির ভালো অনুষ্ঠানগুলো দেখার চেষ্টা করি।

সঙ্গীতের স্বীকৃতি ও পুরস্কার
আমার ঘরে প্রচুর অ্যাওয়ার্ড আছে দেশ-বিদেশের। তবে মানুষের ভালোবাসা পাওয়ার সৌভাগ্যটাই সবচেয়ে বড়। যদিও ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পাইনি তবুও পুরস্কার পেয়েছি প্রচুর।

উল্লেখযোগ্য ঘটনা
একবার ইটালির রোম থেকে দূরে একটি গ্রামে গিয়েছিলাম। সেখানে একটি পটারির দোকানে ঢুকেছিলাম। ইটালি যাওয়ার ৭ দিন আগে স্বপ্নে দেখেছিলাম ওই দোকানটি। হুবহু ওই দোকান। আমি হতবাক, যাওয়ার সাত দিন আগে দেখা স্বপ্নটি সত্যি হতে দেখা উল্লেখযোগ্য বৈকি!

গান আর সংসার- এই আমার জীবন, আমার বেঁচে থাকা। এ দুটির যে কোনো একটি ছাড়া একটি দিনও কল্পনা করতে পারি না।



ছবি : শোভন আচার্য্য অম্বু

Page 7 of 29

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…