Super User

Super User

Page 7 of 26

মুনলাইট

ফুয়াদ বিন নাসের

 

ব্যারি জেনকিন্স তার ‘মুনলাইট’ ছবিটিকে খুব সহজেই তিনটি পৃথক চলচ্চিত্রের মাধ্যমে প্রকাশ করতে পারতেন। বর্তমানের প্রিক্যুয়াল-সিক্যুয়াল ও রুপালি পর্দার ব্যবসায়িক সাফল্যের যুগে হয়তো সেটিই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু ফ্লোরিডা স্টেট ইউনিভার্সিটির ফিল্ম ডিপার্টমেন্টের ছাত্র ব্যারি যশ-খ্যাতি বা অর্থ-বিত্তের হাতছানিতে সাড়া দেয়ার মানুষ নন। ‘মেডিসিন ফর মেলানকলি’ চলচ্চিত্রেই তার ওই দর্শনের অনেকটা আঁচ পাওয়া গিয়েছিল। মুনলাইট ছবিটি তিনটি পর্বে বিভক্ত- ‘লিটল’, ‘কাইরন’ ও ‘ব্ল্যাক’। তিনটি নামই ছবির মূল চরিত্রের নাম। একই মানুষের ভিন্ন তিনটি বয়সের তিনটি রূপ মায়ামির রৌদ্রস্নাত পটভূমিতে আঁকার চেষ্টা করেছেন পরিচালক ব্যারি জেনকিন্স। মাদকাসক্তি, একাকিত্ব,
সমকামিতার মতো প্রেক্ষাপট নিয়ে পরিচালক খেলা করেছেন মূল চরিত্র কেন্দ্র করে।


মুনলাইট চলচ্চিত্রটির প্রথম পর্ব ‘লিটল’ আবর্তিত হয় মায়ামির এক বস্তি অঞ্চলে যেখানে দেখা, আমাদের মূল চরিত্র কাইরন ব্ল্যাকের শৈশব। সহপাঠীদের কাছে তাড়া খাওয়া, মায়ের অবহেলা ও বাবার অভাবে নিশ্চুপ হয়ে যাওয়া ছেলেটি বাবার ছায়া খোঁজে এলাকার পান্ডা হুয়ানের কাছে। হুয়ানও এই অদ্ভুত ও চুপচাপ ওই শিশুকে পছন্দ করে ফেলে এবং নিজের বাসায় নিয়ে যায়। তাকে হুয়ানের কাছে ঘেঁষতে দিতে চায় না লিটলের মাদকাসক্ত মা। কিন্তু স্নেহের লোভে লিটল বার বার ওই হুয়ানের চৌকাঠেই ফিরে যায়। হুয়ান এলাকার মাদক ব্যবসায়ী। সবাই সমীহ করে তাকে। কিন্তু লিটলের মায়ের অবহেলা থেকে তাকে রক্ষা করতে না পেরে অসহায় বোধ করে। লিটলের জন্য সুস্থ্য-স্বাভাবিক জীবন চায় হুয়ান। আবার মুদ্রার অন্য পিঠে হুয়ানের মাদকের চালানই অন্ধকার নামিয়ে আনে লিটলের


পরিবারে। ওই চক্র চলতেই থাকে।
এরপর দেখতে পাই কৈশোরের কাইরনকে। লিটলের বয়স খানিকটা বেড়েছে। কিন্তু তার একাকিত্ব কাটেনি। সে অনুভব করে, তাকে পছন্দ করে এ রকম কেউ থাকতেই পারে না। নিজের সেক্সুয়ালিটি নিয়েও তার মধ্যে শঙ্কা কাজ করে। এলাকা ও স্কুলে সহপাঠীদের অত্যাচার এবং অপমানের শিকার কাইরন মুখ ফুটে তার আসল রূপ প্রকাশ করতে পারে না। তার কথা বলার একমাত্র সঙ্গী কেভিনের প্রতি যে আকর্ষণ বোধ করে তা নিয়েও সে সন্ত্রস্ত থাকে। তার আশপাশের জগতে সে দেখে মানুষের নরপশুসুলভ আচরণ ও হিংস্রতা। স্বাভাবিক জীবনে ফেরার শেষ আশাটুকুও ছেড়ে দেয় কাইরন।
মুনলাইট-এর শেষ পর্বে দেখি যুবক কাইরন ব্ল্যাককে। এখানেই পরিচালক ব্যারি তার সর্বোচ্চ মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। আগের দুই পর্বের সব ইতিহাস, হতাশা, আবেগ এক হয়ে পূর্ণতা লাভ করে সেলুলয়েডের অন্তিমভাগে। ব্যারি জেনকিন্স কোনো নীতিকথা প্রচার করার চেষ্টা করেননি, কোনো উপদেশ দেয়ার প্রয়াসও দেখাননি। মুনলাইটের এই শেষ অংকে বোঝা যায়, ছোট এক ছেলের বড় হয়ে ওঠার কাহিনী- কোনো পরিবারের ভালোবাসা, বন্ধুদের সমর্থন, সমাজের সাহায্য ছাড়াই। এ রকম অনেক লিটল, কাইরন ও ব্ল্যাকই অশ্রুর মতো সবার অগোচরেই মায়ামির সমুদ্রে হারিয়ে যায়। কিন্তু আমরা বার বার তাকে ফিরে আসতে দেখি সব বাধা, অবহেলা, তাচ্ছিল্য ও অপমান ডিঙিয়ে। তিন বছর বয়সের কাইরন ব্ল্যাককে রূপায়িত করেছেন এলেক্স হিবার্ট, অ্যাশটন স্যান্ডার্স ও ট্রেভান্তে রোডস। পরিচালক জেনকিন্স এখানে তিন অভিনেতার মধ্যে সমন্বয় করার চেষ্টা করেননি, বরং তিনজন তিনটি চরিত্রই রূপায়ণ করেছেন। চমৎকার সংলাপ ও সিনেম্যাটোগ্রাফির কারণে কাইরন ব্ল্যাকের বেড়ে ওঠা আমাদের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠেছে রুপালি পর্দায়। মায়ামির ঝকঝকে রৌদ্রোজ্জ্বল বালুকাবেলায় শত
হাসিমুখের ভিড়েও যে বিষণ্ণতার বীজ লুকিয়ে থাকে সেটিই পরিচালক অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে চিত্রায়িত করেছেন। সেরা ছবির পুরস্কার মুনলাইটেরই প্রাপ্য।

মহাকালের রথের ঘোড়া : সমরেশ বসু

অরিন্দম মুখার্জী বিংকু

 

 

তারাশঙ্কর থেকে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়। আবার সুনীল, শীর্ষেন্দুদের যুগ। এ দু’যুগের মাঝে সমরেশ বসু ছিলেন সেতু হিসেবে। তাঁর জীবন যাপন, ছেলেমানুষি আচরণ অনেকটাই ছিল ফরাসিদের মতো। এক মাথা ঝাঁকড়া চুল আর অপূর্ব একটা ট্রেড মার্ক হাসি। ঢাকা জেলার মুন্সীগঞ্জ মহকুমার অন্তর্গত রাজনগর গ্রামে পৈতৃক বাস্তুভিটায় ১৯২৪ সালের ১১ ডিসেম্বর জন্ম নেন সমরেশ বসু। বাবা ছবি আঁকতে ভালোবাসতেন। কাগজের ম- দিয়ে মূর্তি তৈরী করতেন। বাড়ির পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে সমরেশের আদলটা একটু আলাদা। পাঠ্য বই পড়ায় মন নেই তাঁর। বাঁধাধরা শিক্ষার বাইরের জীবন যাপনই তাঁকে বেশি টানে। তবু তাঁকে পাঠানো হলো গিরিশ মাস্টারের পাঠশালায়। পরে গে-ারিয়া গ্র্যাজুয়েট স্কুলে পড়লেন সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত। পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ায় বাবা তাঁকে পাঠালেন নৈহাটির রেল কোয়ার্টার্সে দাদা মন্মথ’র কাছে। দাদা ১৯৩৯ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি নৈহাটির মহেন্দ্র স্কুলে তাঁকে ভর্তি করালেন অষ্টম শ্রেণিতে। স্কুলের পড়াশোনা বাদ দিয়ে, নাটক অভিনয়, খেলাধুলা, শরীর চর্চা ও সাহিত্য চর্চায় মনোনিবেশ করেন। সেসময় কিছু লেখালেখিও শুরু করেন হাতে লেখা পত্রিকা বীনায়।


দেবশংকর বন্দোপাধ্যায় ছিলেন তখন তাঁর ঘনিষ্ট বন্ধু। বন্ধুর বাসায় যাওয়া আসার সুবাদে প্রেমে পড়ে সমরেশ বন্ধুভগ্নি গৌরীর সাথে। ‘সমরেশ’ নামটি গৌরীরই দেয়া। তাঁরা যখন পালিয়ে বিয়ে করে সমরেশ তখন ১৮ গৌরী ২১। এই বিয়ে দুই পরিবারের কেউই মেনে নিলেন না। ফলে নৈহাটি থেকে চার মাইল দূরে আতপুরের পুলিশ ফাঁড়ির পেছনে ২ টাকায় ঘর ভাড়া নিলেন। আতপুরে সমরেশের জীবন এক বড় বাঁক নেয়। শুরু হয় জীবনযুদ্ধ। জগদ্দল আতপুরের শ্রমিকপাড়া ও জীবিকার জন্য লড়াই নৈহাটির কাঁঠালপাড়ার দিন যাপনের থেকে বহুলাংশেই আলাদা। এক পোলট্রি ফার্মের সঙ্গে কমিশনের শর্তে ডিম, মুরগি, সবজি বিক্রি করে কোনো রকমে টিকে থাকার চেষ্টায় প্রাণপাত পরিশ্রম করতে লাগলেন। সপ্তাহে ৩-৪ দিন খাওয়া জোটে, বাকি দিন অভুক্ত অবস্থায় কাটে।

বিয়ের পর শুরু হয় জীবনের আসল যুদ্ধ সপ্তাহে তিন চার দিন খাবার জোটে তো বাকি দিনগুলোতে অভূক্ত থাকতে হয়। চরম দারিদ্রতায় সাহিত্য চর্চা ছাড়েননি তিনি। ১৯৪৩ সালের জানুয়ারিতে ইছাপুর রাইফেল ফ্যাক্টরির ইন্সপেক্টরেট অব স্মল আর্মস-এর ড্রইং অফিসে ট্রেজারের চাকরি পেলেন সমরেশ। ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত ৬ বছর এখানেই কাজ করেন তিনি। ওই সময় তাঁর জীবনে অনেক ঘটনা ঘটে যায়। প্রথম সন্তান বড় মেয়ে বুলবুলের জন্ম ১৯৪৩ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি। দ্বিতীয় সন্তান বড় ছেলে দেবকুমারের জন্ম ১৯৪৫ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি। তৃতীয় সন্তান মেজছেলে নবকুমারের জন্ম ১৯৪৬ সালের ডিসেম্বর। চতুর্থ সন্তান ছোট মেয়ে মৌসুমীর জন্ম ১৯৪৮ সালের ডিসেম্বর। এর পাশাপাশি বারাকপুরে জুটফ্রন্টে পার্টির ট্রেড ইউনিয়নের কাজ করতেন। সমরেশ আর গৌরী পার্টি সদস্যপদ লাভ করলেন। সংগঠনের কাজের ফাঁকে ‘উদয়ন’ পত্রিকায় আঁকা ও লেখা শুরু করলেন। উদয়ন লাইব্রেরিতে পড়াশোনা। সাহিত্যের ক্ষেত্রে প্রথম ছোটগল্প ‘শের সর্দার’ প্রকাশিত হয় ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকায়। উদয়ন পত্রিকা তো আছেই, সবচেয়ে বড় ঘটনা ১৯৪৬ সালে শারদীয় ‘পরিচয়’ পত্রিকায় ‘আদাব’ গল্প প্রকাশের সময়। উদয়ন পত্রিকার জন্য আদাব গল্পটি তিনি লিখেছিলেন। কিন্তু বন্ধু গৌর জোর করে ‘পরিচয়’ পত্রিকায় গল্প পাঠিয়ে দেন। বাংলা সাহিত্যে ওই অর্থে সমরেশের প্রবেশ এ গল্পের মধ্য দিয়েই। ১৯৪৯ সালে কমিউনিস্ট পার্টি বেআইনি ঘোষিত হলে সমরেশ ও তাঁর পরিবারকে আবারও দারিদ্রের মধ্যে পড়তে হয়। একই বছর চৌদ্দই ডিসেম্বর সমরেশ গ্রেফতার হয়ে প্রেসিডেন্সি জেলে এক বছর কারাবাস করেন। তিনি বন্দি থাকায় সংসার অচল। মুখ্যমন্ত্রী ডাক্তার বিধান রায়ের শরণাপন্ন হয়েছিলেন বিপর্যস্ত গৌরী দেবী। তিনি বন্দি সমরেশের পরিবারের জন্য দেড়শ’ টাকা মাসোয়ারার বন্দোবস্ত করে দিয়েছিলেন। কারমুক্ত হয়ে সমরেশ নিজেকে আবিষ্কার করেন একজন নিঃসঙ্গ ও বেকার মানুষ হিসেবে। এখান থেকেই তাঁর লেখার সংকল্প জেগে ওঠে। লিখেই জীবন বাঁচাতে মনেপ্রাণে তিনি প্রস্তুত হতে থাকলেন। চারটি নাম নিয়ে সাহিত্যের ক্ষেত্রে সমরেশ পদচারণা করেছেন- সমরেশ বসু, কালকূট, অশোক ঠাকুর ও ভ্রমর।

বাল্যকালে সমরেশের দারুণ ইচ্ছা ছিল আর্টিস্ট হওয়ার। তাই ছাত্র জীবনে কয়েক বন্ধু মিলে হাতে লেখা কয়েকটা ম্যাগাজিনে গল্প, বিভিন্ন ধরনের হাতে আঁকা ছবি ছাপাতেন। বিভিন্ন পত্রিকায় অলঙ্করণও করতেন। তারপর কৈশোর থেকে যৌবন। ওই সময় সাহিত্যের দিকে ভীষণ ঝোঁক এলো। বিভিন্ন গল্প, প্রবন্ধ লিখতে শুরু করলেন। তাঁকে ছবি আঁকা থেকে
লেখালেখির জগতে নিয়ে আসেন ‘সত্য মাস্টার’। এদিক থেকে বলা যেতে পারে, ‘সত্য মাস্টার’ এর সঙ্গে সমরেশের সাক্ষাৎ বাংলা সাহিত্যেরই এক মাইলফলক। এর মধ্যেই সমরেশের প্রথম উপন্যাস ‘উত্তরঙ্গ’ প্রকাশ পায়। তিনি এর উপাদান সংগ্রহ করেছিলেন ইছাপুর রাইফেল ফ্যাক্টরির ইন্সপেক্টরেট অব স্মল আর্মস-এ চাকরিকালে। তা রূপ পেয়েছিল প্রেসিডেন্সি জেলে বন্দি থাকাকালে। ‘উত্তরঙ্গ’ উপন্যাস বিক্রি করে শোধ করলেন এক বছরের বাড়ি ভাড়া। দ্বিতীয় উপন্যাস ‘বিটি রোড়েব ধারে’। এরপর ‘শ্রীমতী কাফে’। প্রথম গল্প সংকলন ‘মরশুমের একদিন’।

সমরেশের প্রথম লেখা উপন্যাস ‘নয়নপুরের মাটি’। ‘উত্তরঙ্গ’-এর বহু আগে (১৯৪৬ সালে) ওই বই লেখা। সাহিত্য আসরের দরজার চৌকাঠটা তখন দূর থেকে উঁকি মেরে দেখেছিলেন তিনি। বছরখানেক ধরে উপন্যাসটির অংশ ‘পরিচয়’ মাসিক পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে ছাপা হয়েছিল। নানান কারণে তা মাঝপথেই থেমে যায়। অনেক দিন পর আবার তা বই আকারে প্রকাশিত হয়।  সমরেশ ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর ‘সাতকড়ি মাসী’ আর ‘জয়নাল’সহ বেশ কয়েকটি গল্প লিখেছিলেন ‘তরণি’ পত্রিকায়। গল্পটি দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পর পার্টির বিরাগভাজন হন। পার্টির সঙ্গে ক্রমেই তাঁর দূরত্ব বাড়তে থাকে। অবশেষে তা তলানিতে এসে ঠেকে। তাকে সাহিত্য ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত করে ‘গঙ্গা’ উপন্যাস।

১৯৫৮ সালে সমরেশ সাহিত্যে ‘আনন্দ’ পুরষ্কার পেলেন। উদ্দ্যম গতিতে এগিয়ে চলে লেখলেখির কাজ। এরই মাঝে সমরেশ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন ছোট শ্যালিকা ধরিত্রীর সাথে। সমরেশ তখন চার সন্তানের পিতা। কল্যাণীতে স্ত্রী গৌরী বসু ও ছেলেমেয়েদের নিয়ে ভরা সংসার। ওই সময়ই ছোট শ্যালিকার সঙ্গে শরীর ও মনের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। গৌরী ছিলেন বাড়ির বড় মেয়ে আর ধরিত্রী ওরফে টুনি সবচেয়ে ছোট, প্রায় সমরেশের মেয়ের বয়সীই। লোকলজ্জার কথা ভাবলে, হয়তো সব দায় ঝেড়ে ফেলে তিনি বেরিয়ে আসতেই পারতেন। কিন্তু ওই পথে হাঁটেননি। ভারতীয় প্রখ্যাত বাঙালি লেখক ও ঔপন্যাসিক সমরেশ বসু পরকীয়ার জেরে শ্যালিকাকে বিয়ে করেন ১৯৬৭ সালের ১৪ই মার্চ এবং দুই বোনকে নিয়ে একসঙ্গে সংসার করেছিলেন। এ অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন গৌরী তথা সমরেশের স্ত্রী, ধরিত্রীর দিদি। সমরেশের দ্বিতীয় বিয়েতে সম্মতি দিলেন। বুক ফেটে গেলেও মেনে নিলেন নিজের বোনের সঙ্গে স্বামীর বিয়ে।

বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধের সময় সবার মত সমরেশও আন্দোলিত হয়ে ছিলেন। তখন বাংলা সাহিত্যে রাজা বাদশা ছিল না, তিনিই ছিলেন যুবরাজ। সমরেশ বসুর মত ব্যাক্তিরা বাউ-েলে বলেই জীবনকে দেখতে পেরেছিলেন নানা বৈচিত্র্যে, তুলে আনতে পেরেছিলেন পানাপুকুর, কখনও জমিদার বাড়ির খিলান থেকে কখনও বা ট্রাক ড্রাইভারের ডেরা থেকে জীবনাবর্তন।
জীবনের বৈচিত্র্যতা খুঁজে ফেরার মাঝেই ১৯৮৮ সালের ১২ই মার্চ নিজের জীবনরে পরিসমাপ্তি ঘটে। ৪০ বছরের কিছু সময় ধরে বাংলা সাহিত্যে তাঁর ছিল অবাধ বিচরণ। হয়তো ভবঘুরে হয়েই যদি আরো কিছুকাল আনাগোনা করতেন তাহলে বাংলা সাহিত্য আরো সমৃদ্ধ হতো।

 

পেইনটিং অমিত রায়

এ জীবন সঙ্গীতেরই জীবন...

ফরিদা পারভীন

 

আমার জন্ম নাটোর জেলার সিংড়া উপজেলার শাঐল গ্রামে ১৯৫৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর। বাবা মৃত ডা. দেলোয়ার হোসেন ও মা মৃত রউফা বেগম। বাবা সরকারি চিকিৎসা পেশায় থাকার কারণে দেশের বিভিন্ন জেলাশহরে আমাদের থাকতে হয়েছে।
ছোটবেলা থেকেই গানের প্রতি আমার একটা টান ছিল। মা-বাবার একমাত্র সন্তান হওয়ায় আদর-যত্ন বেশি পেতাম। আমার আবদার তারা রাখতেন। আমাদের বাসা তখন মাগুরায়। পাশের বাড়িতে হারমোনিয়াম ছিল। আমিও বাবার কাছে হারমোনিয়াম চাইলাম। কিন্তু দিই-দিচ্ছি করে গড়িমসি করতে লাগলেন। অবশ্য ভেতরে ভেতরে চাইতেন তার একমাত্র সন্তান গানের সঙ্গে জড়িত হোক। তিনিও গান পছন্দ করতেন। এক পর্যায়ে বাড়িতে মিস্ত্রি ডেকে এনে হারমোনিয়াম বানিয়ে দিলেন। আর যার কাছে আমার হাতেখড়ি তিনি হচ্ছেন মাগুরার কমল চক্রবর্তী। তার মাধ্যমেই আমার শুরু গানের পথচলা। 


আজ পর্যন্ত কত গান গেয়েছি এর হিসাব রাখিনি। তাছাড়া সংখ্যা দিয়ে তো শিল্পীর মান বিচার করা যায় না! যেমন- বলা যেতে পারে, অনেক গান আছে। তবে শুনতে একটি গানও ভালো লাগে না। ড. আবু হেনা মোস্তফা কামালের ভাষায়- কুকুর অনেকগুলো ছানা প্রসব করে। কিন্তু সিংহের শাবক বেশি হয় না। যে কয়টা গান আজ পর্যন্ত গেয়েছি এর সংখ্যা বেশি না হলেও মানুষের মনে গেঁথে আছে। ভালোবাসা দিয়ে শ্রোতার হৃদয়ের কাছে অবস্থান করে নিয়েছে। সঙ্গীত যেহেতু গুরুমুখী বিদ্যা সেহেতু বেশ কয়েকজন ওস্তাদের কাছে আমার তালিম নেয়া হয়। ওস্তাদ ইব্রাহিম খাঁ, ওস্তাদ রবীন্দ্রনাথ রায়, ওস্তাদ ওসমান গণী, ওস্তাদ মোতালেব বিশ্বাসসহ প্রায় সবাই আমাকে ধ্রুপদী (ক্ল্যাসিকাল) গান শেখাতেন। নজরুল সঙ্গীতের গুরু হলেন ওস্তাদ আব্দুল কাদের ও ওস্তাদ মীর মোজাফফর আলী।

কিন্তু স্বাধীনতার পর আমার লালন সাঁইজির গানের গুরু হচ্ছেন মোকসেদ আলী সাঁই। তার কাছে সাঁইজির গানের শিক্ষা নিই। অনেকটা অনিচ্ছাকৃত ছিল এই তালিম। লালন সাঁইজির জীবদ্দশায় তার অনুসারীদের নিয়ে দোল পূর্ণিমায় মহাসমাবেশ করতেন। এরই ধারাবাহিকতায় এ দেশে স্বাধীনতার পর ওই অনুষ্ঠানে গান করার জন্য আমার গুরু মোকসেদ আলী সাঁই অনুপ্রাণিত করেছিলেন। সেটিও সাঁইজির একটি গান যা শিখে শ্রোতার কাছে উপস্থাপন করি। ‘সত্য বল সুপথে চল ওরে আমার মন’ গানটি তখন এতো জনপ্রিয়তা পেল যে, সঙ্গে সঙ্গেই সিদ্ধান্ত নিলাম সাঁইজির গানই গাইবো। তখন যে অনুভূতি আমার হয়েছিল সেটি বিশ্লেষণ করা যায় না। কিন্তু এখন পর্যন্ত উপলব্ধির মধ্যেই আছে। আর তখন থেকেই লালনকে লালন করে চলেছি।


আগেই বলেছি, লালন সাঁইজির গানে আমার কোনো ভালোবাসা ছিল না। আল্লাহর অভিপ্রায় ছাড়া কোনো কিছুই সম্ভব নয়। তা হলো, এখনো যেখানেই অনুষ্ঠান করি না কেন, সর্বত্রই দেশপ্রেমের গান দিয়েই শুরু করি এবং সঙ্গতকারণেই লালন সাঁইজির গান দিয়ে শেষ করি। কারণ মায়ের কাছে একাধিক সন্তান যেমন স্নেহে আবদ্ধ থাকে ঠিক তেমনি আমার কাছে দেশাত্মবোধক গান আর লালন ফকিরের গান সমানভাবে সন্তানের মতো। আবু জাফর সম্পর্কে আমার কিছু কথা বলবো। তিনি অনেক বড় মাপের গীতিকার ও সুরকার। যেসব গান লিখেছেন, সব কালজয়ী। যদিও তার গানের সংখ্যা খুব বেশি নয় তবুও বাংলা ভাষাভাষীর মানুষ যতদিন থাকবে পৃথিবীজুড়ে ততদিন তাদের কাছে আবু জাফরের দেশপ্রেম ও প্রেম পর্যায়ের গানগুলো কখনোই বিস্মৃত হবে না।


অনেক গীতিকারের গান গাওয়ার সুযোগ আমার হয়েছে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো কবি নাসির আহমেদ, সাবির আহমেদ, কবি জাহিদুল হক, যামিনী কুমার দেবনাথ অন্যতম। আমি চার সন্তানের জননী। সবার বড় হচ্ছে মেয়ে জিহান ফারিয়া মিরপুর বাংলা কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রভাষক, বড় ছেলে ইমাম নিমেরি উপল সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডের সিনিয়র অফিসার, মেজছেলে ইমাম নাহিল অস্ট্রেলিয়ান এমবাসির কর্মকর্তা ও ছোট ছেলে ইমাম জাফর নোমানী উত্তরা ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক।


সংগীতের কথা আমি সব সময়ই বলবো। কারণ সংগীত নিয়েই আমার সব জল্পনাকল্পনা। তবে সংগীতের ক্ষেত্রে বলতে হয়, বিশুদ্ধ সংগীত হলো গুরুমুখী বিদ্যা। এর সঙ্গে নিষ্ঠা, সততা তো লাগবেই, অধ্যবসায়ও জরুরি। এ জন্য গুরুর চরণ ধরে পড়ে থাকতে হয়। কোনো মানুষ- সে যে ধর্মেরই হোক না কেন, তার অভিপ্রায় ছাড়া কোনো কিছুই সম্ভব নয়। মানুষ শুধু চেষ্টা করে যেতে পারে মাত্র। গানের মধ্যে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নিয়ে কিছু কথা না বললেই নয়। অপ্রাপ্তি বলে কিছুই নেই। যা আছে, সবই প্রাপ্তি। আর তা হলো ১৯৮৭ সালে ‘একুশে পদক’, ১৯৯৩ সালে ‘জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার’ (অন্ধপ্রেম), ২০০৮ সালে এশিয়ার নোবেলখ্যাত জাপানের ‘ফুকুওয়াক কালচারাল অ্যাওয়ার্ড’ প্রাপ্তি। এছাড়া দেশ-বিদেশের অসংখ্য পদক-সম্মাননা আমার প্রাপ্তির ভা-ারটি ভরে তুলেছে। ২০১০ সালে বাংলা
একাডেমির ফেলো নির্বাচিত হই।


সঙ্গীত নিয়েই আমার যত ভাবনা। এ জীবন সঙ্গীতেরই জীবন। তাই একটি প্রতিষ্ঠান ‘ফরিদা পারভীন ফাউন্ডেশন’ গড়ে তুলেছি। এখানে বেশ কয়টি প্রজেক্ট চালু আছে। সেগুলো হলো অচিন পাখি, বাঁশি, অন্যান্য যন্ত্র (একুস্টিক), গবেষণা, স্বরলিপির কাজ, স্টাফ নোটেশন, আঁকাআঁকি ইত্যাদি। পর্যায়ক্রমে ওই ফাউন্ডেশনে লালনের দর্শন নিয়ে ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় আছি। এ প্রজন্মের গায়ক-গায়িকাদের কথা বলতে গেলে বলতে হয়, এখন শিকারি হিসেবে অনেক চ্যানেল অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। কাজটি প্রথমত ভালো। কিন্তু পরে ওই ধারা টিকে থাকছে না। এর কারণ হচ্ছে অল্পতেই অর্থ হস্তগত করা, ভালোভাবে না শিখেই নাম করার প্রবণতা। এ জন্য দায়ী করবো তাদের মা-বাবাকে। এ কথা এ কারণেই বলছি, অনেক ছেলেমেয়ে একেবারে অর্থহীনভাবে বেড়ে ওঠে। অথচ ওই পরিমাণ জ্ঞান তারা রাখে না। বলা যায়, কেউ কেউ শুধু অর্থের মোহে পড়ে রেওয়াজ করাই ছেড়ে দেয়। সঙ্গীত যে দীর্ঘ পথপরিক্রমায় প্রতিষ্ঠা পায় এ নিয়ম-নীতি ওইসব বাবা-মা তাদের সন্তানদের শেখান না। আর সন্তানরা তো চিরকালই অবুঝ! সবশেষে একটি কথা না বললেই নয়। তা হলো, সঙ্গীত আধ্যাত্মিকতার বিষয়। এটি এতো সহজে ধরা যায় না। অনেক অধ্যবসায় ও অনুশীলন দিয়েই অর্জন করা যায় সুর। আমি বলবো, আগামী প্রজন্মের যারা গান করবে তাদের বেশি করে জ্ঞান অর্জন করতে হবে। প্রতিদিন রেওয়াজ করতে হবে। সর্বোপরি সবার আগে ভালো মানুষ হতে হবে। তবেই গান হয়ে উঠবে প্রকৃত গান।

কেরালায় ক’দিন

মাসুদ আলী

 

খুব গর্বভরে নিজেদের প্রদেশ সম্পর্কে বলে God's own country. কেরালায় মজার ব্যাপার হলো পাহাড়, সমুদ্র, বৃক্ষরাজি- সবই আছে। কোচি এয়ারপোর্ট থেকে মুন্নার। আর এয়ারপোর্ট থেকেই পেতে পারেন প্রিপেইড ট্যাক্সি তিন হাজার পাঁচশত রুপিতে। সেপ্টেম্বরে নাতিশীতষ্ণ কোচি। রাস্তায় অনেক গির্জা আর যিশুর মূর্তি দেখা যায় এবং এখানকার বাড়িগুলো মোটেও উঁচু নয়। সামনে উঠান আর গাছ, প্রায় সব বাড়ি একই রকম। কিন্তু নিরিবিলি আর শান্তি শান্তি ভাব!
এখানে এক সময় পর্তুগিজরা এসেছিল। ওই প্রভাবেই হয়ত ক্রিশ্চিয়ান ধর্মের প্রভাব বেশি।

মুন্নার ভারতের কেরালা রাজ্যের ইডুক্কি জেলায় অবস্থিত। পাহাড়-প্রস্তর ঘেরা মুন্নার একটি তামিল ও মালায়লাম শব্দের মিশ্রণ যার অর্থ তিন নদী। নদীগুলোর নামও দাঁতভাঙ্গা কঠিন- মুদ্রাপূজা, নাল্লাথান্নি ও কুন্ডলি। মুন্নার সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৬০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত কেরালার একটি হিল স্টেশন। কলকাতা থেকে কোচিন যেতে সবচেয়ে ভালো হবে সপ্তাহে মাত্র একটি ট্রেন যা শনিবার হাওড়া থেকে ছাড়ে। কোচিন পৌঁছাতে মাত্র পাঁচটি স্টপেজ আছে এই ট্রেনে। এই ট্রেনে গেলে সকাল ৬টায় পৌঁছাতে পারবেন। যদি আগে থেকেই হোটেল ঠিক করা থাকে তাহলে হোটেল গিয়ে ফ্রেশ হয়ে সকাল ৮টার মধ্যে বেরিয়ে পড়বেন।  কেরালা কয়েকটি সার্কিটে ভাগ করে দেখে নেয়া যায়। এর মধ্যে প্রধান দুটি হলো আলেপ্পি-কোট্টায়ম-কুইলন-ভারকালা-ত্রিবান্দ্রাম ও কোচিন-মুন্নার-পেরিয়ার।

থিরুভানান্থাপুরাম বা ত্রিবান্দ্রাম (Thiruvananthapuram/Trivandrum) : এটি পাহাড় ও সমুদ্রে ঘেরা, প্রাচীনত্ব আর আধুনিকতার গন্ধমাখা রাজধানী শহর। ইস্টফোর্ড বাসস্ট্যান্ডের কাছে শহরের প্রধান আকর্ষণ পদ্মনাভস্বামী মন্দির। ত্রিবাংকুর রাজ্যের গৃহদেবতা অনন্তশয্যায় শায়িত বিষ্ণুর মন্দির। পুরুষদের ধুতি পরে মন্দিরে ঢুকতে হয় এবং নারীদের প্রবেশ নিষেধ। মন্দির লাগোয়া পুত্তানমালিকা প্রাসাদ। ত্রিবাংকুর রাজাদের প্রাচীন ওই প্রাসাদ এখন মিউজিয়াম। শহরের মাঝখানে নেপিয়ার মিউজিয়াম। এছাড়া রয়েছে চিড়িয়াখানা ও বোটানিক্যাল গার্ডেন, আর্ট মিউজিয়াম, শ্রীচিত্রা আর্ট গ্যালারি, ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম ও সায়েন্স মিউজিয়াম। অটো বা গাড়ি ভাড়া করে অথবা কেরালা পর্যটনের কন্ডাক্টেড ট্যুরে বেড়িয়ে নেয়া যায় শহর ও এর আশপাশ।
শহর থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে শানগুমুখম সৈকত। সৈকতের ধারে পাথরের তৈরি ৩৫ মিটার লম্বা বিশাল আকারে মৎস্যকন্যার অপরূপ ভাস্কর্য। কাছেই ভেলি ট্যুরিস্ট ভিলেজ। থিরুভানান্থাপুরাম-এর কাছেই সমুদ্র উপকূলে থুম্বায় ভারতীয় স্পেস রিসার্চ অর্গানাইজেশন ও বিক্রম সারাভাই স্পেস সেন্টার। এখানে সাধারণের প্রবেশ নিষেধ। থিরুভানান্থাপুরাম থেকে ৫১ কিলোমিটার দূরে ত্রিবাংকুর রাজাদের রাজধানী ভাস্কর্যের শহর পদ্মনাভপুরম।

কোভালাম সৈকত (Kovalam Beach) : ১৬ কিলোমিটার দক্ষিণে ভারতের অন্যতম সেরা সমুদ্র সৈকত কোভালাম। তাল, নারিকেল, পেঁপে, কলা গাছে ছাওয়া নিরালা সৈকতে শান্ত নীল সমুদ্র ছুঁয়ে যায় রুপালি বেলাভূমি।

পোনমুড়ি (Ponmuri) : থিরুভানান্থাপুরাম থেকে ৫৬ কিলোমিটার উত্তরে পশ্চিম ঘাট পর্বতে স্বাস্থ্যনিবাস পোনমুড়ি। কাছেই পিপ্পারা ওয়াইল্ডলাইফ স্যাংচুয়ারি। হাতি, সম্বর, লেপার্ড আর নানান পাখির বাসভূমি।

কুইলন বা কোল্লাম (Quilon) : থিরুভানান্থাপুরাম থেকে ৭২ কিলোমিটার দূরে অষ্টমুড়ি লেকের ধারে ব্যাকওয়াটারের দেশ কুইলন। এটি কাজুবাদাম আর মশলার রাজ্য। লেকের পাড়ে কাজুবাদাম, নারিকেল, কলা ও কাঁঠাল গাছের সারি। শহরজুড়ে লাল টালিতে ছাওয়া কাঠের বাড়িঘর। কুইলনের সেরা আকর্ষণ ব্যাকওয়াটার ট্যুর। অষ্টমুড়ি লেক, ডিটিপিসির ট্যুরিস্ট রিসেপশন সেন্টার লাগোয়া ত্রিবান্দ্রাম, আলেপ্পি, কোচি, কোট্টায়মগামী বাস মেলে। ৫ কিলোমিটার দূরে সাগরপাড়ের ছোট্ট বন্দরগাঁ থাঙ্গাসেরি এক সময় ব্রিটিশ আর পর্তুগিজদের বাণিজ্য বন্দর ছিল।

 

 

ভারকালা (Varakala) : থিরুভানান্থাপুরাম থেকে কুইলন যাওয়ার পথেই পড়ে ভারকালা। কথিত আছে, বিষ্ণুর উপাসনার জায়গা খুঁজতে এসে এখানে নারদ তার ভাল্লাকালম বা বল্কল খুলে স্থান নির্ধারণ করেন। ওই থেকেই এ নামের উৎপত্তি। ভারকালার পাপনাশক সৈকতে স্নান করলে পাপ ধুয়ে যায়- এমনটিই বিশ্বাস করে স্থানীয় মানুষ। পাপনাশক সৈকতের পথে ২ হাজার বছরের প্রাচীন শ্রীজনার্দনস্বামী (বিষ্ণু) মন্দির।

আলেপ্পি বা আলহা পূজা (Alleppey/Alhappuza): 
সমুদ্র-নদী-খাড়ি আর মাকড়সার জালের মত অজস্র খাল নিয়ে কেরালার আলেপ্পি বা আলহাপূজা প্রাচ্যের ভেনিস নামে খ্যাত। এর একপাশে আরব সাগর, অন্যদিকে কেরালার বৃহত্তম লেক ভেম্বানাদ। এক সময় ত্রিবাংকুর রাজাদের বাণিজ্য কেন্দ্র ছিল আলেপ্পি। সমুদ্র থেকেও নিচুতে বাঁধ দিয়ে চাষ হচ্ছে নারিকেল, কলা আর নানান মশলা গাছের। এছাড়া আছে বিজয়া বিচ পার্ক, সি ভিউ পার্ক। আলেপ্পির দক্ষিণে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে আম্বালাপূজা শ্রীকৃষ্ণ মন্দির। কেরলীয় গঠনশৈলী আর দশ অবতারের ভিন্নরূপ- সব মিলিয়ে প্রাচীন এক চেহারা। ৩২ কিলোমিটার দূরে নাগরাজের মন্দির। নাগরাজ স্থানীয় এক ব্রাহ্মণ পরিবারের গৃহদেবতা। লোকবিশ্বাস, অলৌকিক এই দেবমূর্তি আসলে বিষ্ণু ও শিবের মিলিত রূপ।

কোট্টায়াম : আল্লাপূজা অথবা কোচি থেকে ব্যাকওয়াটার ভ্রমণে পৌঁছে যাওয়া যায় পশ্চিম ঘাট পর্বতমালা আর ভেম্বানাদ লেকের মাঝে কোট্টায়ামে। চিরহরিৎ আর পর্নমোচি অরণ্যে ছাওয়া কোট্টায়ামে চা, কফি, কোকো, গোল মরিচ, এলাচ ও রবারের চাষ করা হয়। ১৮ শতকের মধ্যভাগে থেক্কুমকুর রাজার রাজধানী ছিল কোট্টায়াম।

কোচিন বা কোচি (Cochin) : ভেম্বানাদ হ্রদ, আরব সাগর আর ব্যাকওয়াটারের মাঝে ১০টি দ্বীপ নিয়ে কেরালার অন্যতম ব্যস্ত বাণিজ্য কেন্দ্র কোচিন। নাম বদলে এখন কোচি। উইলিংডন দ্বীপ, এর্নাকুলাম আর ফোর্ট কোচি- কোচিনের তিন প্রধান দ্রষ্টব্যস্থল। কেটিডিসি-র লঞ্চ ট্যুরে দেখানো হয় ওয়েলিংডন দ্বীপ, কোচি বন্দর, জিউস সিনাগগ, মাত্তানচেরি প্রাসাদ, ফোর্ট কোচি ও বোলগেটি দ্বীপ। ফোর্ট কোচি দুর্গটি ব্রিটিশদের সৃষ্টি। কোচিতে আরেক দর্শনীয় বিষয় হলো
ঐতিহাসিক সেন্ট ফ্রান্সিস চার্চ। মাত্তানচেরি জেটির কাছে মাত্তানচেরি প্রাসাদ। কোচির আরেক আকর্ষণ কোচি মিউজিয়াম ও হিল প্যালেস মিউজিয়াম।

সারা বছর ধরেই নানান উৎসবে মেতে থাকে কেরালার মানুষ। এর মধ্যে এপ্রিলে নববর্ষের সময় ধান কাটার উৎসব ‘ওনাম’ এবং আগস্টের দ্বিতীয় শনিবারে আলেপ্পির পম্পা নদীতে নৌকাবাইচ বিশেষ আকর্ষণীয়। মার্চ-এপ্রিল ও অক্টোবর-নভেম্বরে ত্রিবান্দ্রামের পদ্মনাভস্বামীর মন্দিরে ১০ দিন ধরে উৎসব চলে। জানুয়ারিতে ত্রিসুরে হয় বর্ণাঢ্য এলিফ্যান্ট মার্চ। এই সময় ঘুরে আসা ভ্রমন পিপাসুদের জন্য সেরা সময়।

বাসা সাজবে গৃহ উদ্ভিদে

 

 

দক্ষিণ দুয়ারি যে ঘরটায় থাকি এর বাসিন্দা রয়েছে তিনটি। এগুলোর মধ্যে মানিপ্লান্টের চারাটিই সবচেয়ে সুস্থ্য ও সজীব। এর ধারেকাছেও আমি বা আমার মা নেই। ওইটুকু একটা গাছ আর সবুজ-হলুদ পাতা কয়টায় প্রাণের কী অসম্ভব প্রকাশ! ঘরটায় বিশেষভাবে ঝোলানো ওই গাছটি জীবনের অনিন্দ্যসুন্দর প্রতীক হয়ে আছে। আপনিও ইচ্ছা করলে বারান্দা, ঘরের কোণ, জানালার তাক, বসার ঘর, এমনকি রান্নাঘরেও গৃহ উদ্ভিদ বা ইনডোর প্লান্ট রাখতে পারেন। সামান্য যত্ন ও ভালোবাসায় গৃহে আসবে সবুজের এমন এক আবহ যা আপনার জীবনটি সাজাবে নতুন নান্দনিকতায়। এ ছাড়া সবুজ প্রাণ ফ্ল্যাট বা বাসস্থান সুন্দর করে সাজাতে পারলে প্রকাশ ঘটবে আপনার সুরুচির।

গৃহ সবুজায়ন কীভাবে করবেন
গৃহ সবুজায়নের জন্য প্রথমেই চাই ইচ্ছা এবং তা বাস্তবায়নের আগ্রহ। খুব বেশি খরচের বিষয় নয় এটি। এ বিষয়ে ইতিবাচক হলে আপনার বাসস্থানে যে জায়গাগুলো গাছ রাখার উপযোগী তা প্রথমেই নির্বাচন করতে হবে। কারণ নগর জীবনে জায়গার বড়ই অভাব। নির্বাচিত জায়গার জন্য বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য নার্সারি থেকে আপনার পছন্দ এবং বাজেট অনুযায়ী গাছ নির্বাচন করবেন। একটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে, ঘরে বেশি গাছ রেখে দিলেই তা দেখতে ভাল হবে না। এক্ষেত্রে গাছ রাখার পাত্র বা টবও গুরুত্বপূর্ণ। এখন বাজারে মাটি, চিনামাটি, লোহা, পিতলসহ সুন্দর সুন্দর টব পাওয়া যায়। তা আপনি ইচ্ছা অনুসারে ব্যবহার করতে পারেন।

গাছ নির্বাচন
আপনার নির্ধারিত জায়গাগুলোয় কতটা সময় রোদ, দিনের আলো, ছায়া, বাতাস ও অন্ধকার থাকে এর ওপর গৃহ উদ্ভিদ নির্বাচন নির্ভর করবেন। ঘরের আলো বা অল্প রোদ কিংবা কৃত্রিম আলোয় ভালো থাকে- এমন অনেক গাছ এখন বাজারে কিনতে পাওয়া যায়। নানান প্রজাতির ক্যাকটাস, পাতাবাহার, এমনকি ফুল হয়- এমন ইনডোর প্লান্টও হয়। এসবের ভেতর থেকে আপনার পছন্দের গাছগুলো বেছে নিতে পারেন। তবে শুরুতেই খুব দামি বা বেশি বড় গাছ না কেনাই ভাল। এর চেয়ে ছোট গাছগুলো কিনে এনে যত্ন ও ভালোবাসায় বড় করলেই আপনার ভাল লাগবে। প্রথমে মানিপ্লান্ট, স্পাইডার প্লান্ট ও কিছু ক্যাকটাস কেনাই ভালো। 

 

যেভাবে যত্ন নেবেন
গৃহ উদ্ভিদ বা ইনডোর প্লান্টের জন্য সারাদিন সরাসরি রোদের প্রয়োজন নেই। সামান্য রোদ আসে এবং দিনের কিছু সময় আলো-বাতাস থাকে- এমন জায়গাতেই গৃহ উদ্ভিদ ভালো হয়। প্রতিদিন পানি দেয়ার দরকার নেই। একদিন পর পর গাছের গোড়ায় অল্প করে পানি ও দু’তিনদিন পর পর পাতা স্প্রে করে দিলেই গাছ ভালো থাকবে। যখন শিকড় টবের পানি নিষ্কাশনের পথে চলে আসবে তখন টব বদলে দিতে হবে। টব পরিবর্তনের সময় সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে যাতে শিকড়ের ক্ষতি না হয়।

খুব বেশি বড় হলে ভাল লাগে না। ধারালো কাঁচি দিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী ডালপালা ছেঁটে রাখবেন। এয়ার কুলার, ওয়াশিং মেশিন, রেফ্রিজারেটরের মতো বড় বড় বৈদ্যুতিক যন্ত্রের কাছে গাছ রাখবেন না। এসব যন্ত্র থেকে বের হওয়া সার্বক্ষণিক তাপ গাছের জন্য ক্ষতিকর। শোবারঘরের গাছ রাতে বাইরে রাখবেন অথবা জানালা খোলা রাখবেন। আমরা জানি, গাছ রাতে কার্বন ডাই-অক্সাইড ছাড়ে। শিশুদের নাগালের বাইরে গাছ রাখবেন যাতে নষ্ট করতে না পারে। প্রায় প্রতিটি গাছের জাত, আকার, ধরন ইত্যাদি কারণে এগুলোর যত্নে কিছুটা পার্থক্য থাকে। তা গাছ সংগ্রহের সময় বিক্রেতার কাছ থেকে জেনে নিতে হবে।

সাকলেন্টস
সাধারণত মোটা ও পুরু পাতার উদ্ভিদটিকে সাকলেন্টস (Succlents) বলে। এগুলোর পাতা সাধারণের চেয়ে বেশি তরল ধারণ করে। যেমন- ঘৃতকুমারী বা অ্যালোভেরা এক ধরনের সাকলেন্ট প্লান্ট। বর্তমানে গৃহসজ্জায় এর রয়েছে শৈল্পিক ভূমিকা। আপনার খাবার বা পড়ার টেবিলে এ রকম দু’একটা চারাগাছ পুরো দৃশ্যপটেই এনে দেবে স্নিগ্ধতা। এখন শহরের বড় বড় নার্সারিতে নানান সাকলেন্টস পাওয়া যায়, বিশেষ করে ঢাকার মিরপুরে।

গৃহ উদ্ভিদ আপনার পরিবারের সদস্য। বাসার অন্যদেরও এগুলোর যত্ন নিতে উৎসাহিত করবেন, বিশেষ করে শিশু-কিশোরকে। ফলে তারা দায়িত্ব নেয়া যেমন শিখবে তেমনি এগুলো নষ্টও করবে না। সবুজের সঙ্গে বন্ধুত্ব তাদের সহনশীলতা বাড়াবে। আপনার আবাস সবুজ, সুন্দর ও নতুনে প্রাণবন্ত হয়ে থাক।

 

______________________

লেখা : কাজী সোহেল
ছবি : শোভন আচার্য্য অম্বু
কৃতজ্ঞতা : মারিয়ান ফয়সাল

স্ট্রেস...

 

স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট বা মানসিক চাপ কীভাবে কমাবেন, কী করবেন...
‘ক্লান্তি আমায় ক্ষমা করো প্রভু, পথে যদি পিছিয়ে পড়ি কভু!- এ গানের কথাগুলোয় হতাশা, ভীতি, এংজাইটি ও স্ট্রেসের ছায়া কি পাওয়া যায়? নাগরিক ব্যস্ততার এই দৈনন্দিন জীবনে ওই গানের লাইনগুলো প্রায়ই কি আমাদের মনে পড়ে না কারো কারো? হ্যাঁ হতাশা, আক্ষেপ ও ক্লান্ত-শ্রান্ত হৃদয়ের থেকে বেরিয়ে আসা দীর্ঘশ্বাসটি আসলে আমাদের মধ্যে মানসিক চাপ বা স্ট্রেসেরই সৃষ্টি করে।
স্ট্রেস শব্দটি যেন আমাদের দৈনন্দিন কর্মকা-ের সঙ্গে আজ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রতিদিনের প্রতিযোগিতামূলক জীবন ভূমিকায় আমরা প্রতিনিয়ত হিমশিম খাচ্ছি, হয়ে পড়ছি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত, প্যানিকড। তবে দুশ্চিন্তা, এংজাইটি- এসব স্ট্রেস নয়। স্ট্রেস হচ্ছে, আমাদের পারিপার্শ্বিক যে কোনো পরিবর্তন যা নিজের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। এটিই হলো ‘স্ট্রেস’। আর ওই স্ট্রেস মোকাবেলা করেই যিনি যতো বেশি চলতে জানেন তিনিই হন ততো সফল। তবে কে কীভাবে স্ট্রেস মোকাবেলা করবেন তা অনেকটাই নির্ভর করে তার বংশগত জিনের ওপর। এর সঙ্গে রয়েছে মানুষের স্বীয় ব্যক্তিত্ব অনুযায়ী লড়াই করে চলার স্বভাবটিও।
ল্যাটিন শব্দ ‘স্ট্রিং’ মানে ‘টু ড্র টুগেদার’। এখান থেকেই ‘স্ট্রেস’ শব্দটি এসেছে। আরেকটি ল্যাটিন শব্দ ‘টেনসিও’ থেকে টেনশনের উৎপত্তি। শব্দটি পাশ্চাত্যের হলেও এই সমস্যায় ভুগছেন বিশ্বের প্রায় সব দেশের মানুষ। সাধারণত মানুষের মনের দুটি অবস্থা আছে। এক. স্বাভাবিক বা নরমাল এবং দুই, অস্বাভাবিক বা অ্যাবনরমাল। স্ট্রেস বা মানসিক চাপ আমাদের নিয়ে যায় ওই দু’য়ের মাঝামাঝি। আসলে শারীরিক, মানসিক কিংবা ইমোশনাল- যে কোনো বিষয় নিয়ে বাড়তি চিন্তাটিই আমাদের মনে ‘স্ট্রেস’-এর সৃষ্টি করে।

স্ট্রেসের কিছু ক্ষতিকর দিক আছে। তা হলো-

স্ট্রেসের কারণে দ্রুত রক্তচাপ বেড়ে যায়, হার্টবিট
দ্রুততর হয়।
ওজন বেড়ে যায়। কারণ তখন খাওয়াও বাড়ে।
হরমোন ডিসব্যালান্স হয়ে যায়।
মানসিক চাপে ত্বক কালো, শুষ্ক হয় ও ব্রণ জন্ম নেয়।
সোরাইসিস, রোসিয়া, অ্যাগজিমা, অ্যালার্জি বেড়ে যায়।
ত্বক প্রাণহীন ও স্পর্শকাতর হয়ে পড়ে।

স্ট্রেসের কারণ
ঘড়ি কাঁটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার তাড়া, অফিসে কাজের চাপ, সংসার জীবনে ক্রমাগত কাজের ভারে হাঁপিয়ে ওঠা কিংবা সামাজিক দায়বদ্ধতার মতো যে কোনো কিছুই হতে পারে কারো জন্য মেন্টাল স্ট্রেস বা মানসিক চাপের কারণ। পরীক্ষাভীতি, বেকার জীবন- এসবও স্ট্রেসের খুব সাধারণ কারণ হতে পারে। তবে প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে চলার ক্ষমতা ও টাইম ম্যানেজমেন্টে যিনি যতো বেশি দক্ষ, তিনি ততো বেশি স্ট্রেস ম্যানেজ করে চলতে পারেন।
যাহোক, স্ট্রেস ম্যানেজমেন্টের কিছু অতি সাধারণ অভ্যাস এই মানসিক চাপ বা স্ট্রেস থেকে অনায়াসেই আমাদের মুক্তি দিতে পারে। এটি নিয়ন্ত্রণে যা করতে হবে তা হলো-
সকালে নির্দিষ্ট সময়ের ১৫ মিনিট আগেই ঘুম থেকে ওঠার চেষ্টা করতে হবে। এক্ষেত্রে অলসতা অবশ্যই পরিত্যাজ্য।
মর্নিং ওয়াক করতে হবে। তা পার্ক বা উদ্যানে না হলেও নিজের বাগান, বারান্দা বা ছাদে হাঁটা যেতে পারে। সকালের বিশুদ্ধ বাতাসে হাঁটাহাঁটির অভ্যাস সারা দিনের জন্য বাড়তি মানসিক শক্তি জোগায়।
সকালের নাশতা সময় নিয়ে খেতে হবে। তাড়াহুড়ায় অনেকেই নাশতা না করে বের হয়ে যান বা অফিসেই খেয়ে নেন কিছু একটা। এটি অনেক বড় ভুল চর্চা। বরং সকালের সময়টুকু এমনভাবেই ম্যানেজ করতে হবে যাতে বেশখানিকটা সময় নিয়ে ব্রেকফাস্ট করা যায়। এতে সারা দিনের কাজে এনার্জি লেভেল দিনের শুরুতেই অর্জন করা যায়।
কর্মজীবী বা গৃহে যারা কাজ করেন তাদের জন্যই সকালে ১০ থেকে ১৫ মিনিট সময় নিয়ে কী কী কাজ করতে হবে এর তালিকা তৈরি করে ফেলা একটি ভালো উপায়।
কাজের মধ্যে বিরতি দিতে হবে। টানা কাজ মেন্টাল স্ট্রেস বাড়ায়। প্রতি এক ঘণ্টায় কাজের পর অন্তত ১০ মিনিট সিট থেকে উঠে হাঁটা উচিত।
অনুরোধে ঢেঁকি গেলার অভ্যাস পরিত্যাগ করতে হবে। অকারণে অন্যকে খুশি করা কিংবা অযাচিত ভয়ে সব কাজ মাথা পেতে নেবেন না।
স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণের একটি ভালো উপায় হলো যোগ ব্যায়াম। যেমন- দুপুরে লাঞ্চের পর যে সময় একটু ঘুম ঘুম ভাব চলে আসে, ওই সময় গভীর একটা শ্বাস নিয়ে তিন সেকেন্ড ধরে রাখুন। এভাবে পর পর পাঁচবার শ্বাস নেয়া আর ছেড়ে দেয়ার ব্যায়াম করলে শরীর বেশ চাঙ্গা হয়ে ওঠে।


অনেকে আছেন, অফিস থেকে ফিরেই সংসারের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এটি কখনোই করা যাবে না। বরং পারলে আরামদায়ক গোসল আর চা পর্ব সেরেই বাড়ির কাজে মাথা ঘামানো যেতে পারে।
নিজের জন্য আলাদা একটু সময় বের করা আমাদের মানসিক শান্তির জন্য অবশ্যই প্রয়োজন। এটি হতে পারে টিভি দেখা, বই বা পত্রিকা পড়া অথবা অন্য কোনো কিছু।
অনেকেই বলেন, রাতে ঘুম হয় না। নানান চিন্তা আসে। অনেকের কাছেই ওই রাত হলো আগামীকাল নিয়ে ভেবে ভেবে ঘুম হারামের কারণ। এ দলটিই হচ্ছে ভয়ঙ্কর মানসিক চাপের রোগী। কাজেই মানসিক চাপ তথা স্ট্রেস থেকে বাঁচতে হলে অহেতুক ভাবনা-চিন্তা মাথা থেকে বের করে ফেলতে হবে। মৃদু শান্ত সঙ্গীত কিংবা মেডিটেশনও ভালো ঘুম আনতে সহায়ক হতে পারে।
মানসিক চাপ কমাবার জন্য একটি অনন্য মাধ্যম হলো হাসি। প্রাত্যহিক জীবনে হাসির উপাদান রাখতে হবে। হাসতে পারেন এমন বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়ে দেয়া উচিত। অযথা নেতিবাচক কথাবার্তা বলা বা দূরভিসন্ধিমূলক আচরণের সঙ্গ পরিত্যগ করাই ভালো। হাসি আমাদের জীবনীশক্তি। হাসির মুভি, কমিকস- এসব উপাদানও মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে।
শিশুদের সঙ্গে সময় কাটানো অভ্যাসটিও মানসিক চাপ কমায়। শিশুদের সঙ্গে খেলা, হাসা, ছেলেমানুষি কিছুক্ষণের জন্য হলেও আমাদের স্ট্রেসমুক্ত করে তোলে।
প্রতিটি পরিস্থিতির ভালো ও খারাপ- দুটি দিকই আছে বা থাকতে পারে। পজিটিভ দিকটি দেখার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। আমাদের অবচেতন মনের সার্বক্ষণিক চিন্তাই আমাদের চেতন মনকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং ওইদিকেই জীবন ধাবিত হয়। তাই পজিটিভ দিক দেখার বিষয়টিকে প্রাধান্য দিতে হবে।
‘না’ বলতে শিখুন। মাঝে মধ্যে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে না বলার অভ্যাসটাও করুন। অবশ্য বিনয়ের সঙ্গে এবং কেন না বলতে বাধ্য হচ্ছেন ওই কারণটি সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করুন। ফলে স্ট্রেস তৈরি হওয়ার আশঙ্কা একেবারে গোড়াতেই দূর করা যাবে।

স্ট্রেসে করণীয়
স্ট্রেস ও টেনশন হলে মাথায় খুশকি হয়। চুল পড়ে যায়। এ জন্য রোজ ড্যানড্রাফযুক্ত শ্যাম্পু ব্যবহার করা উচিত। চুল পড়া কমে যাবে।
স্ট্রেস হলে হরমোন ডিসব্যালান্স হয়। ফলে মুখে ব্রণ হয়। রোজ ভালো করে হারবাল ফেসিয়াল ক্লিনজার দিয়ে মুখ পরিষ্কার করা উচিত। লবঙ্গযুক্ত ক্রিম লাগালে ব্রণ কম হবে।
টেনশন বা স্ট্রেসের কারলে মুখে পিগমেন্টেশন হয়। এতে কালো হয়ে যায় মুখ। রোজ দুধ দিয়ে মুখ ধুলে মুখ পরিষ্কার থাকবে।
স্ট্রেস বা টেনশন হলে সোরাসিস বা রোসিয়া হলে ময়শ্চারাইজার লাগাতে হবে। এ জন্য চিকিৎসককেও দেখানো উচিত।
পরিশেষে বলা যায়, দৃঢ় মানসিকতা গড়ে তুলতে হলে এবং আনন্দময় নির্মল জীবন যাপনের হাতিয়ারই হলো কিছু সুঅভ্যাস ও আত্মসচেতনতা। একটু সচেতনতার সঙ্গে প্রাত্যহিক জীবনের কর্মকা- পরিচালনা করলেই জীবন হয়ে উঠবে অনাবিল সুন্দর। সবার স্ট্রেস বা মানসিক চাপবিহীন সুন্দর জীবন কামনা করছি।

 

__________________

লেখা : শায়মা হক
মডেল : মোউশান
ছবি : স্বাক্ষর

Page 7 of 26

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…