Super User

Super User

Page 7 of 24

গোফ গপ্পো

 

সেই প্রস্তর যুগে পাথরের ক্ষুর দিয়ে মানুষের ক্ষৌরি করার প্রচলন শুরু হয়। সম্ভবত তখনই মানুষের মধ্যে গোঁফ নিয়ে ফ্যাশন করার ধারণার গোড়াপত্তন ঘটে। অবশ্য খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ সালে প্রথম গোঁফ রাখার খোঁজ মিলেছে। গোঁফ হলো পুরুষের নাকের নিচে এক চিলতে রোমশরেখা। তা কারো সরু, কারো মোটা, কারো গাঢ়, কারো আবার পাতলা। অথচ ওই এক চিলতে জিনিসই নারী-পুরুষের মধ্যে বিরাট পার্থক্য গড়ে দেয়ার এক মোক্ষম ‘অস্ত্র’! একই সঙ্গে আলাদা ব্যক্তিত্ব প্রকাশেরও অস্ত্র।
গ্রিক Mustak শব্দ থেকে গোঁফের ইংরেজি Moustache শব্দের উৎপত্তি। Mustak অর্থ উপরের ঠোঁট। পুরুষের মুখে ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার পর্যন্ত চুল গজায়। এর মধ্যে গোঁফে থাকে ৬০০টির মতো। গোঁফ গজানো বা কম-বেশি হওয়ার পেছনে যে হরমোনটি ‘দায়ী’ এর নাম টেস্টোস্টেরন। এই গোঁফ মহাশয় আবার বড্ড আলসে। প্রতিদিন গড়ে মোটে ০.০০১৪ ইঞ্চি করে বাড়ে। আর বছরে বাড়ে ৫-৬ ইঞ্চি করে।


আদিকাল থেকেই গোঁফ মানুষের বড় এক আলোচনার বিষয়বস্তু। জনপ্রিয় ছড়াকার সুকুমার রায় তার ‘গোঁফ চুরি’ ছড়ায় তো ঘোষণাই দিয়ে দিয়েছেনÑ

‘গোঁফকে বলে তোমার আমার, গোঁফ কি কারো কেনা?
গোঁফের আমি গোঁফের তুমি, তাই দিয়ে যায় চেনা।’

অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও তার ‘গোঁফ এবং ডিম’ প্রবন্ধে গোঁফের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।
গোঁফ নিয়ে বাংলায় প্রবাদ-প্রবচনের শেষ নেই। গোঁফ খেজুরে, গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল, গোঁফে তা দেয়া, শিকারি বিড়াল গোঁফে চেনা যায় ইত্যাদি প্রবাদ দৈনন্দিন ঘুরে বেড়ায় আমাদের মুখে। তবে শুধু শিকারি বিড়ালই নয়, গোঁফ দিয়ে চেনা যায় অসংখ্য জনপ্রিয় মানুষকেও। তাদের নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে আশ্চর্য একজোড়া গোঁফ!
যাদের আইকনিক ট্রেডমার্ক গোঁফ তাদের তালিকায় সম্ভবত সবচেয়ে উপরের দিকে থাকবেন স্যার চার্লি চ্যাপলিন ও অ্যাডলফ হিটলার। দু’জনই প্রায় একই রকম অদ্ভুতুড়ে গোঁফধারী ছিলেন। কিন্তু একজন পুরো পৃথিবীতে দিয়েছেন হাসির খোরাক, অন্যজন দিয়েছেন কান্নার উপলক্ষ। জনগণের দৃষ্টি আলাদাভাবে আকর্ষণের জন্য হিটলারের দুর্দান্ত উপায় ছিল তার ওই অদ্ভুত গোঁফের ফ্যাশন। ১৯২৩ সালে নাজি প্রেস সেক্রেটারি ড. সেজুইক অবশ্য হিটলারকে পরামর্শ দিয়েছিলেন একটি স্বাভাবিক গোঁফের ছাঁট লাগাতে। হিটলার উত্তর
দিয়েছিলেন এভাবেÑ ‘আমার গোঁফ নিয়ে একদম ভাবতে হবে না। যদিও এটি এখনো ফ্যাশন হয়নি তবুও এক সময় ঠিকই ফ্যাশন হয়ে দাঁড়াবে!’
গোঁফ থেকে বিচ্ছুরিত আত্মবিশ্বাস!!
রাজা-বাদশাহরা প্রচুর সময় নষ্ট করতেন ওই গোঁফের পেছনে। এছাড়া প্রচুর অর্থও নাকি ঢালতেন। বড় ও বাহারি গোঁফ ছিল শৌর্যের প্রতীক। মোগল বাদশাহদের ছিল শৌখিন গোঁফ। সম্রাট আকবরের গোঁফ ছিল মুগ্ধ হওয়ার মতো। তাছাড়া সুন্দর গোঁফ ছিল টিপু সুলতান, নবাব সিরাজ-উদ-দৌলারও।
বিখ্যাত গুঁফোদের মধ্যে আরো আছেন সালভাদর ডালি, জোসেফ স্টালিন, চে গুয়েভারা প্রমুখ।

 

______________________

লেখা : তিয়াষ ইসতিয়াক
মডেল : নীল
ছবি : শোভন আচার্য্য অম্বু

 

পারফিউম...

 

সুগন্ধি ব্যবহারের প্রচলন সুপ্রাচীনকাল থেকে। মানুষ এক সময় বিভিন্ন সুগন্ধি ফুল আর লতা-পাতার নির্যাস সুগন্ধি হিসেবে ব্যবহার করত। প্রাচীনকাল থেকে সুগন্ধি উদ্ভাবনের ইতিহাস খুঁজলে খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ বছর আগে মেসোপটেমিয়া সভ্যতার এক কেমিস্ট ‘টাপুট্টি’র নাম পাওয়া যায়। তাকে সর্বপ্রথম সুগন্ধি তৈরিকারক হিসেবে ধরা হয়। এরপর সভ্যতা থেকে সভ্যতার হাত ধরে এগিয়েই চলছে সুগন্ধির জয়যাত্রা।
সুগন্ধি এমন একটা অনুষঙ্গ যা মানুষের পঞ্চইন্দ্রিয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ঘ্রাণের সঙ্গে জড়িত। মন খুশিতে ভরিয়ে দিতে পারে একটি ভালো সুগন্ধি। তা এনে দিতে পারে স্নিগ্ধ একটি অনুভব।
আধুনিককালে সুগন্ধির ঊন্মেষস্থল হিসেবে একচ্ছত্র অধিপতি ধরা হয় ইউরোপের ফ্রান্সকে। ওই দেশে এখন পর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সুগন্ধি তৈরি হয়ে থাকে। সুগন্ধি উদ্ভাবন ফ্রান্সের শিল্পসত্তার বিকাশ ও অর্থনীতির সঙ্গে ওতপ্রতভাবে জড়িত। বিশ্বের নামি-দামি সুগন্ধি প্রস্তুতকারকরা ফ্রান্সের অধিবাসী। ২০০৬ সালে টমটাইকার পরিচালিত ‘পারফিউম : দি স্টোরি অফ অ্যা ম্যার্ডারার’ মুভিটি দেখেনি এমন মানুষ খুব কমই খুঁজে পাওয়া যাবে। এ মুভিটিতে আমরা খুঁজে পাই পাগলপ্রায় ঠা-া মাথার এক খুনির সুগন্ধি
উদ্ভাবনের শিহরিত পথচলা।


এ প্রসঙ্গে একটি কথা না বললেই নয়, একটা সময় ছিল যখন সুগন্ধির ব্যবহার শুধু সমাজের অভিজাত শ্রেণির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। সুগন্ধি ছিল শুধু বিলাসিতার অঙ্গ। এর পেছনে কারণও ছিল। আগে সুগন্ধি তৈরির নির্যাস ও কাঁচামাল ছিল দুর্লভ এবং অনেক দামি। এর মানে বিজ্ঞানের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে এখন কৃত্রিম উপায়েই এসব কাঁচামাল ও নির্যাস উৎপাদিত হচ্ছে। ফলে সুগন্ধি তৈরি ও এর ব্যবহার এখন অনেকটাই সহজলভ্য। তাই সুগন্ধির ব্যবহার এখন শুধু বিলাসিতার অংশ নয়, বরং সব বয়সের মানুষের কাছে ফ্যাশনের অন্যতম অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে ব্যবহৃত নিত্যনতুন সুগন্ধি তৈরির ফর্মুলা ও উপকরণ সুগন্ধি ব্যবহারের আবেদনটি বাড়িয়ে তুলেছে সবার মধ্যে।
আমাদের দেশের আবহাওয়া নাতিশীতাষ্ণ হলেও গরমের প্রভাব বেশি। গরমে ঘাম হবেÑ এটিই স্বাভাবিক। কিন্তু সুগন্ধি শুধু যে ঘামের দুর্গন্ধ এড়াতেই কাজ করে তা নয়, বরং এর পরশে আমরা হয়ে উঠতে পারি আরো সতেজ ও প্রাণবন্ত।
এ দেশে নব্বইয়ের দশকের শেষের দিক থেকে বিকশিত হয়েছে সুগন্ধির বাণিজ্য। এর আগে এ দেশের বিশ্বখ্যাত সব ব্র্যান্ডের ভালো ভালো সুগন্ধি তেমন সহজলভ্য ছিল না। অনেকেই তাদের প্রিয় সুগন্ধিগুলো বিদেশ থেকে কিনে নিয়ে আসতেন। কিন্তু এখন আমাদের দেশেই নারী-পুরুষের জন্য আছে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সুগন্ধি।
পুরুষের প্রিয় কিছু সুগন্ধির মধ্যে আছে লাকস্ত রেড, হুগো বস, বারবেরি, আজারো, আরমানি ইত্যাদি। অন্যদিকে নারীদের জন্য আছে গুচি, বুশেরন, স্যানেল, ডলসি গাবানা, এস্কাডা ইত্যাদি। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সুগন্ধি পাওয়া যায় ‘পারফিউম ওয়ার্ল্ড’-এর
আউটলেটগুলোয়।

 

_____________________
লেখা : সোনাম চৌধুরী
মডেল : রিবা হাসান
ছবি : কৌশিক ইকবাল

কিউট ইন কুর্তি

 

ফ্যাশন পরিবর্তন হচ্ছে প্রতিনিয়ত। আর এই পরিবর্তনের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বৈচিত্র্যময় ডিজাইনের পোশাক। তবে ফ্যাশনের কথা আসলেই একটা বড় অংশ জুড়ে থাকে মেয়েদের পোশাকের কথা। নিত্যনতুন ডিজাইনের পোশাকের মাধ্যমে নিজেকে আলাদা ও ব্যতিক্রমী হয়ে ওঠার চেষ্টায় ছুটছে সবাই শপিংমলগুলোতে, কিনছে মনের মতো প্রিয় পোশাক। সব শ্রেণীর মেয়েদের কাছেই সালোয়ার কামিজ বেশ জনপ্রিয়। নারীরা সেলোয়ার কামিজে অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দবোধ করে। উপরি পাওনা হিসেবে জাকজমকপূর্ণ সালোয়ার কামিজে একটি নারী হয়ে ওঠে আরও আকর্ষণীয়। শুধু উৎসবেই নয় যে কোন অনুষ্ঠানে সালোয়ার কামিজ পরে নিজেকে অতুলনীয় করে তোলা যায়। সুতরাং নিজেকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে চলুন বেঁছে নিই পছন্দের সালোয়ার কামিজ। বর্তমান ট্রেন্ড-এ সেলোয়র কামিজের ডিজাইন নিয়ে আমাদের কথা হয়েছিল ‘ক্ষনিকা’র স্বত্ত্বাধিকারী ডিজাইনার মারিয়ান ফয়সালের সাথে।

মেরুন সিল্ক
সিল্কের এই কুর্তিতে রয়েছে একটু বড় চড়ষশধ উড়ঃ এর প্রিন্ট। বল গুলোর উপরে করা স্টোন ওয়ার্ক পোশাকটিতে এনেছে পার্টি আমেজ। ভিন্নতা আনতে কালো ছাড়াও এর সাথে গোল্ডেন কালারের দোপাট্টা ও স্যাটিনের পালাজ্জো ভাল লাগবে।

হলুদ
নজর কাড়া হলুদ এই কুর্তি আপনাকে অফিস কিংবা বন্ধুদের আড্ডায় করবে স্বপ্রতিভ। ফুলস্লিভ হাতা, কর্ড পাইপিং আর ব্যান্ড কলারের সমন্বয়ে লিনেন এই কুর্তির নিচের অংশের বাম পার্শ্বে রয়েছে সাদা এমব্রয়ডারি। সাথে পরতে পারেন অফ হোয়াইট বা সাদা রঙের সেলোয়ার।

 

 

লাল
লাল মানেই মন ভাল করে দেওয়া উজ্জ্বলতা তা সে হোক ‘লাল গোলাপ’ অথবা লাল জামা। ইউনির্ভাসিটি কিংবা অফিস ও সান্ধ্যকালীন আড্ডায় যে কোন ঈড়সঢ়ষবীরড়হ-এর মেয়েকে মানিয়ে যাবে। কাফতান গলা, ফোর কোয়ার্টার হাতার চড়ষশধ উড়ঃ এর লিনেন এই কুর্তিতে রয়েছে ব্ল্যাক এমব্রয়ডারি। সাথে পরতে পারেন গাঢ় নীল বা সাদা পালাজ্জো।

সাদা
যেকোন দাওয়াতের অনুষ্ঠানে সাদা এই কুর্তি আপনার লুক-এ এনে দেবে জৌলুস। কাফতান গলা, লেস আর বাটনের কম্বিনেশনে এই কুর্তিটির গর্জিয়াস উপস্থাপন। সাথে পরতে পারেন বেইজ কালার পালাজ্জো ও দোপাট্টা।

বেগুনী
মেঘলা দিনের একঘেঁয়েমি ও উঁষষহবংং কাটাতে উজ্জ্বল বেগুনী এই কুর্তিটি পড়ে নিমিষেই নিজেকে চনমনে ও আকর্ষনীয় ভাবে উপস্থাপন করতে পারেন। মডেলের পরনে যে কুর্তিটি রয়েছে তা লিনেন কাপড়ের উপর ঈড়ৎফ পাইপিং দিয়ে করা। ইধহফ কলার আর ফুলস্লিভ হাতায় এই কুর্তির প্রধান আকর্ষন গাঢ় বেগুনীর উপর হালকা বেগুনী রঙের এমব্রয়ডারি যা অফিসে কিংবা বন্ধুদের আড্ডায় আপনার উপস্থিতি উজ্জ্বল করবে। কুর্তির সাথে পরতে পারেন বেগুনী অথবা সাদা রঙের শেডেড দোপাট্টা ও সালোয়ার।

ফ্লোরাল প্রিন্ট
ফ্লোরাল প্রিন্টেড এই কুর্তিতে লেস বসিয়ে আনা হয়েছে গর্জিয়াস লুক। যা সহজেই বিভিন্ন গেট টুগেদারে পরে যেতে পারেন। সাথে পরতে পারেন ডেনিম অথবা টাইটস্।

 

____________________________________

লেখা : ফারহাতুল জান্নাত
মডেল : মহতী তাপসী ও সায়মা রুসা
পোশাক : ক্ষনিকা
মেকওভার : ক্লিওপেট্রা বিউটি স্যালন
ছবি : শোভন আচার্য্য অম্বু
সহজ স্টুডিও
কৃতজ্ঞতা : মারিয়ান ফয়সাল

 

ভাস্কর্য

একজন হামিদুজ্জামান

 

 

‘আমি যে গ্রামে বেড়ে উঠেছিলাম সেখানকার প্রায় সবাই ছিলেন শিক্ষিত। একই সঙ্গে দেশ-বিদেশের খবরাখবরও রাখতেন তারা। দৈনিক পত্রিকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ম্যাগাজিন আসতো আমাদের গ্রামে। ভারতীয় ম্যাগাজিনগুলোয় আঁকা থাকতো অনেক ছবি। ভারতীয় শিল্পীদের আঁকা ছবির সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয় এসব ম্যাগাজিনেই। আমি খুব অভিভূত হতাম, মাঝে মধ্যে আঁকার চেষ্টাও করতাম। তখন থেকেই আমার শিল্পের পথে চলার শুরু। পড়ার ফাঁকে ফাঁকে স্কুলের খাতাতেও চলতো এই চেষ্টা’-
কথাগুলো বলছিলেন বিখ্যাত ভাস্কর হামিদুজ্জামান। যার কাছে পরীক্ষার খাতাও কখনো কখনো হয়ে উঠতো ক্যানভাস।
বাবা ধার্মিক মানুষ হলেও রীতিমতো উৎসাহ দিতেন তার কর্মকা-ে। একদিন বাবার অনুরোধে পাড়ার মসজিদের ছবি আঁকলেন তিনি। অভিভূত বাবা ওই ছবি মসজিদের ইমামকে উপহার হিসেবে দিলেন। তিনিও ভারী খুশি হলেন। এরপর তার দাদার মুখাবয়বের সঙ্গে মিলে যায় এমন একটি স্কেচ এঁকে তাক লাগিয়ে দেন সবাইকে। এই ছোট ছোট বিষয়গুলো হামিদুজ্জামানের কাজে অনুপ্রেরণা যোগাতো। বাবার পাশাপাশি আশপাশের অন্য অনেকের উৎসাহে অনুপ্রাণিত হন তিনি।


এ পর্যন্ত হামিদুজ্জামান যতো ছবি এঁকেছেন এর সবই নিজের ভেতর থেকেই এসেছে। তার প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় আর্ট কলেজে ভর্তি হওয়ার পর (বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ)। তার কাছে প্রশ্ন রাখা হয়েছিল, আর্ট কলেজে ভর্তি হওয়ার বিষয়টি কি সহজ ছিল ওই সময়? তিনি উত্তর দিলেন, ‘না, তেমন সহজ ছিল না। ১৯৬২ সালে ম্যাট্রিক পাস করি। এরপর ইন্টারমিডিয়েট ভর্তি হয়েছিলাম ভৈরব কলেজে। আমার সাবজেক্ট ছিল সায়েন্স। দুই মাস ক্লাস করার পর ওই সাবজেক্ট আমার একদম ভালো লাগলো না। কিছুতেই ওইসব ফিজিক্স-কেমিস্ট্রিতে আমার মন বসছিল না। বাড়িতে এসে বাবাকে বললাম, ভালো লাগছে না একদম। আমি পড়তে পারছি না। এর মধ্যে অবশ্য জেনে গিয়েছি ঢাকার আর্ট কলেজের কথা। আর ওই সময়ের মধ্যে আঁকার হাতটা একটু ভালো হয়ে উঠেছিল। তাই বাবার কাছে এসে আর্ট কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য গো ধরলাম। আমাদের ওখানে যে পোস্ট অফিস ছিল সেখানে ভালো এক পোস্ট মাস্টার ছিলেন। তার সঙ্গে আমার বাবার খুব ভালো সখ্য ছিল। গল্পে গল্পে বাবা যখন ওনাকে জানালেন, আমি আর্ট কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য বায়না ধরেছি তখন তিনি বললেন, ছেলে যেখানে ভর্তি হতে চায় সেখানেই ভর্তি করিয়ে দিন। আবার অনেকে বললেন, চারুকলায় গেলে আমি নষ্ট হয়ে যাবো। কিন্তু সব মিলিয়ে বাবা শেষ পর্যন্ত আমাকে আর্ট কলেজে ভর্তি করার জন্য ঢাকায় নিয়ে আসেন।

আর্ট কলেজে ভর্তির ভাইভা নিয়েছিলেন জয়নুল আবেদিন স্যার।’ উচ্ছ্বসিত হয়ে তিনি বললেন ওই ঘটনা ‘আমি ও বাবা দু’জনে মিলে সরাসরি ওনার বাসায় চলে গিয়েছিলাম। ঢাকায় আসার আগে বাবা বেশ খোঁজখবর করে জয়নুল আবেদিন স্যারের বাসার ঠিকানা নিয়ে আসেন। আমরা যখন তাঁর বাসায় গেলাম দেখা করতে তখন আমাকে তিনি বললেন, দেখি তুমি কী আঁকো? তখন তাঁকে আমার কিছু আঁকা ছবি দেখালাম। এরপর তিনি সেগুলো দেখে আমাকে বললেন, তুমি কাল আর্ট কলেজে গিয়ে আমার নাম বলবে। বলবে জয়নুল আবেদিন ভর্তি করিয়ে নিতে বলেছেন। তারা তোমাকে ভর্তি করিয়ে নেবে।’
শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনকে শিক্ষক হিসেবে পাওয়াটা কম কথা নয়। আর হামিদুজ্জামানকে তিনি ভীষণ ভালোবাসতেন। এর প্রমাণ তিনি তখন পেয়েছিলেন যখন দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন- ‘হঠাৎ একদিন আবেদিন স্যার আমাকে ডাকলেন। একটু ভয় পেয়ে গেলাম। ওনার সামনে যাওয়ার পর তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার এক্সিবিশনে কতোটি ওয়াটার কালার আছে? মুখ কাচুমাচু করে বললাম, বেশ কিছু আছে স্যার। স্যার বললেন-ওগুলো দেবে, আমার ডিপার্টমেন্ট থেকে ফ্রেম করিয়ে দেবো। আমার কাছে যেগুলো ছিল সেগুলো স্যারের কাছে দিয়ে দিলাম। আমাদের প্রিন্ট মেকিংয়ের অনেক বড় বড় ফ্রেম ছিল। টিচাররা ইউজ করতেন মাঝে-মধ্যে। সেখানে গিয়ে দেখি, আমার ছবিগুলা সব ফ্রেম করা হয়ে গেছে। এরপর সেখানে আবেদিন স্যার এসে বললেন- এই শোনো, তোমার যে কয়টি ছবি আছে তা আমি কিনে নিলাম। এগুলো আমার। আমার যে বিভিন্ন গেস্ট আসে তাদের এগুলো প্রেজেন্ট করবো। তুমি অফিস থেকে পয়সা নিয়ে যেও। আমি দ্বিতীয় বর্ষে পড়ি আর আবেদিন স্যার আমার ছবি কিনেছেন! খুশিতে কেঁদে ফেলি। এটি আমার জীবনের অনেক বড় পাওয়া এবং অবশ্যই অনুপ্রেরণা তো বটেই।


ভাস্কর্যের সঙ্গে পরিচয় হলো কবে জিজ্ঞাসা করতেই হামিদুজ্জামান বললেন, ‘এ ভাবনাটা ফাইনাল পরীক্ষা দেয়ার পর যখন বিদেশে যাই তখন মাথায় আসে। ফাইনাল ইয়ারে পড়ার সময় আমার একটা মেজর অ্যাকসিডেন্ট হয়। এতে আমার মাথায় অনেক আঘাত লাগে। এরপর মোটামুটি সুস্থ হওয়ার পর ফাইনাল পরীক্ষা দিই এবং পাস করি। এরপর লন্ডনে চলে যাই চিকিৎসার জন্য। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ডাক্তাররা আমাকে চার মাস লন্ডনে থাকতে বললেন। তবে সব থেকে মজার ব্যাপার হলো, কিছু ছবি বিক্রি করে বেশকিছু টাকা হাতে করেই লন্ডনে গিয়েছিলাম। কিন্তু চিকিৎসা করাতে আমার তেমন কোনো টাকা লাগেনি। আমি স্টুডেন্ট বলে আমাকে চিকিৎসকরা ফ্রি চিকিৎসা করিয়ে দিলেন। আর এর মধ্যে লন্ডনে বেশ কিছুদিন থাকার সুবাদে ফ্রি টাইমে ঘোরাঘুরি করা শুরু করি। এরপর মাঝে বেশ কিছুদিন সময় নিয়ে প্যারিস ও রোমেও ঘুরতে যাই। এ সময় দেখে ফেলি ব্রিটিশ মিউজিয়াম, ভিকটোরিয়া অ্যালবার্ট মিউজিয়াম, পোট্রেইট গ্যালারি, ন্যাশনাল মিউজিয়াম, প্যারিসের ল্যুভর মিউজিয়ামসহ রোমের বিখ্যাত সব গ্যালারি। মূলত ওই সময়টাতেই ভাস্কর্য আমাকে একটু আলাদাভাবে টানতে শুরু করে। বিভিন্ন স্থানে প্রতিস্থাপিত বিভিন্ন ভাস্কর্য দেখে ভাবতাম, এই মেটালের ভাস্কর্যগুলো কতো লড়াই করে প্রকৃতির ভেতর টিকে রয়েছে এবং যুগ যুগ ধরে রয়েছে বিভিন্ন ঘটনার সাক্ষী। এগুলো অনেক ঐতিহ্য বহন করতে পারে। এসব চিন্তা থেকেই ভাস্কর্যের প্রতি আমার এক ধরনের আগ্রহ তৈরি হয়।’
হামিদুজ্জামান যদিও পেইন্টিং নিয়ে পড়াওশানা করেছেন তবুও শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন ও প্রফেসর রাজ্জাকের উৎসাহে ১৯৭০ সালে আর্ট কলেজে ভাস্কর্যের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। শিক্ষক হওয়ার পর ভারতের বড়দা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কলারশিপ নিয়ে পড়াশোনা করেন তিনি।
এরপর ১৯৭৬ সালে বড়দা মহারাজা সাহাজিরাও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএফএ করেন। পরে ১৯৮২-১৯৮৩ সালে স্কাল্পচার সেন্টারে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বহুকাল চারুকলার শিক্ষকতা শেষে অবসর নেন তিনি।
পড়াতে খুব ভালোবাসতেন বলেই অনারারি প্রফেসর হিসেবে এখনো মাঝে মধ্যেই ক্লাস নেন।


দেশে-বিদেশে বহু ভাস্কর্যের জনক হামিদুজ্জামানের উল্লেখযোগ্য কাজগুলোর মধ্যে বঙ্গভবনের ‘পাখি পরিবার’, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সংশপ্তক’ এবং ১৯৮৮ সালে সিউল অলম্পিকের ‘স্টেপস’ কাজগুলো প্রচুর সুনাম এনে দিয়েছে তাকে। ওই কাজগুলো করতে গিয়ে ভাস্কর্য চর্চায় কোনো বিদেশি প্রভাব খুঁজে পেয়েছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিদেশি প্রভাব থাকবে কেন! আমাদের সংস্কৃতির চিরায়ত প্রভাব রয়েছে ওই কাজগুলোয়। এসব ভাস্কর্য বিদেশি ধাতুতে নির্মিত হলেও এতে আমাদের স্বকীয়তা রয়েছে। কারণ ভাস্কর্য চর্চা তো আমাদের কারো কাছ থেকে ধার করা নয়। ভাস্কর্য চর্চায় আমরা নতুন নই। আমাদের টেরাকোটা এ অঞ্চলের ভাস্কর্যের চিরায়ত প্রভাব বহন করে। ওই টেরাকোটা অনেক বছরের পুরনো। নিঃসন্দেহে বলতে পারি, আমাদের ভাস্কর্য চর্চার শিকড় আছে। আমরা চাইলেই আমাদের স্বকীয়তা নিয়ে কাজ করতে পারি। এ জন্য কারো দ্বারস্থ হওয়ার দরকার হয় না।’

হামিদুজ্জামান তাঁর শিল্পে সমৃদ্ধ করুন আমাদের সংস্কৃতি, তাঁর হাত ধরে আলাদা বৈশিষ্ট্য ধারণ করুক উমহাদেশের ভাস্কর্য শিল্প। হামিদুজ্জামানের দীর্ঘায়ু কামনা করছি।

 

_____________________________
সাক্ষাৎকার : শাকিল সারোয়ার
ছবি : শোভন আচার্য্য অম্বু

 

বসনে বৈশাখ

 

 

গনগনে গরমে হঠাৎ দমকা হাওয়া, এলোমেলো বৃষ্টি, সুতির শাড়িতে বৃষ্টি ফোঁটার জলকেলি, কিশোর-কিশোরীর আম কুড়ানোর উদ্দামতা, বৃষ্টিতে মনের অবগাহনে বৈশাখ যেন এভাবেই ধরা দেয় আমাদের কাছে।
ফ্যাশন সচেতন বাঙালি সারা বছর নানান পূজা-পার্বণে ভিন্ন ডিজাইন ও কাপড়ে নিজেকে রাঙিয়ে নিলেও বৈশাখ মাসে যেন সুতিকাপড় ছাড়া অন্য কিছু ভাবতেই পারেন না।
তাপদাহের মধ্যে সুতির চেয়ে আরামদায়ক বসন আর হয় না। পহেলা বৈশাখ যেমন প্রাণের উৎসব ঠিক তেমনিভাবেই লাল ও সাদা রঙটি বৈশাখ
উদযাপনের জন্য বেছে নিয়েছেন উৎসবপ্রিয় বাঙালি। তাই বাংলা ও বাঙালির জন্য বৈশাখের চিরায়ত রঙ লাল ও সাদা।
ছোট্ট ছেলেটি যেমন লাল-সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি পরে বাবার কোলে চড়ে মেলা দেখতে যায় তেমনি লাল চুড়ি ছাড়া মা ও মেয়ের বৈশাখী উৎসব অপূর্ণ রয়ে যায়।
চৈত্র মাসের বিদায় দেয়ার মাধ্যমে বাঙালি প্রস্তুত নতুন সনে বৈশাখ মাস বরণ করে নিতে। তাই রুদ্ররূপী চৈত্র ভুলিয়ে কালবৈশাখী আপন করে নিতে বাঙালি খুলে বসেন হালখাতা। একটি বছরের নানান সাফল্য, কিছু ব্যর্থতা আর প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির মেলবন্ধনে সাড়ম্ব^ড়ে পালিত হয় পহেলা বৈশাখ। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে রমনার বটমূলে ছায়ানটের ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো গানটি’ আমাদের বৈশাখ বরণের আয়োজনটি বরাবরই পূর্ণ করে। বৈশাখী মেলা, পিঠা উৎসব, নৃত্য, গান, পুতুলনাচÑ এসব কিছুই যেন বৈশাখটি প্রতি বছরই আবারও নতুনভাবে উপস্থাপন করে। চারদিকে বাঁধভাঙা জোয়ার ও কোলাহল, আনন্দিত কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে নবীন-প্রবীণের মিলিত উল্লাসে শহর এবং গ্রামে বাংলায় হয় বৈশাখ উদযাপন। এ উৎসব চিরায়ত ও জাতীয়। সাধ্যমতো প্রতিটি পরিবার আয়োজন করে পান্তা-ইলিশ, নানান ভর্তা, পায়েস, পিঠা-পুলি ইত্যাদি।

এ তো গেল সর্বজনীন বৈশাখী উৎসব উদযাপনের ভূমিকা মাত্র। আমাদের আজকের বসনে বৈশাখ অপূর্ণ রয়ে যাবে যদি এতে বাঙালির বৈশাখী ফ্যাশন নিয়ে দু’কলম না লেখা হয়। বৈশাখের সঙ্গে আসে প্রচ- গরম। তাই বলে কী আর থেমে থাকবে সাজসজ্জা! বৈশাখজুড়ে বাঙালির আধুনিক সাজসজ্জা ও পোশাকে প্রতিফলিত হয় বাঙালিয়ানা। তপ্ত গরমে চিরায়ত সুতি কিংবা খাদি, একরঙা চিকন পাড়ের শাড়ির সঙ্গেও ব্লক ও বাটিক শাড়ি এখন জনপ্রিয়। লাল ও সাদা ছাড়াও ফ্যাশনে এসেছে হালকা রঙের সঙ্গে উজ্জ্বল রঙের মেলবন্ধন। একই সঙ্গে পরতে পারেন সিøভলেস ব্লাউজ কিংবা বাটিক ব্লাউজ। কানে পরতে পারেন হালকা টপ। তবে উৎসবে ঝুমকাও বেশ মানানসই। গলায় পরতে পারেন লকেট, মাটি কিংবা মেটাল ধরনের গয়না, পায়ে নূপুর, হাতে বিভিন্নরঙা চুড়ি, বালা ও ব্রেসলেট। টিপটাই বা কেন বাদ যাবে! পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে কপালে এঁকে নিতে পারেন টিপ। বাজারে নানান টিপ কিনতে পাওয়া যায়। সেখান থেকেও বেছে নিতে পারেন পছন্দের টিপ। পোশাকের সঙ্গে চুলের স্টাইল অনিবার্য। গরমে অনেকেই সামার লুকের জন্য বেছে নেন ছোট চুলের স্টাইল। আবার লম্বা চুলের মেয়েদের অনেকেই হাতখোঁপা, এর উপর গাঁদা কিংবা বেলি ফুলের সজ্জায় বেশ সাবলীল থাকেন। অন্যদিকে অনেকে এলোচুলেই স্বকীয়।
আধুনিক বাঙালির বৈশাখী ফ্যাশন মানে কিশোরী থেকে নারীÑ সবাই শাড়ি ছাড়াও সুতির আরামদায়ক বিভিন্ন ডিজাইন ও কাটের সালোয়ার-কামিজ, ফতুয়া, ম্যাক্সিড্রেস, লং স্কার্ট, ম্যাগিহাতা টপসে নিজেকে সাজিয়ে নেন।
ছেলেরা গরমে খোঁজেন আরাম। তাই তাদের ফ্যাশনজুড়ে থাকে টিশার্ট, হাফহাতা শার্ট, বারমুডা, সুতি পায়জামা-পাঞ্জাবি ও লুঙ্গি। নারী ও পুরুষÑ উভয়েই পায়ে পরেন কোলাপুরি চপ্পল কিংবা ফ্ল্যাট স্যান্ডেল আর চোখে বিভিন্ন ডিজাইনের সানগ্লাস।

বিগত বছরের দুঃখ, কষ্ট, ক্লেশ ভুলে চলুন এবারও নবআশায় সম্ভাষণ করি বৈশাখ মাসের। উৎসব আয়োজনে যেন নিজের আনন্দ উদযাপনে অন্যের কষ্টের কারণ না হই। অপরের প্রতি হই আরো সহনশীল।

‘মুছে যাক গ্লানি
ঘুচে যাক জরা
অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।’

বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি ধরে রাখার দায়িত্ব প্রত্যেক বাঙালির। এই বৈশাখে চলুন আরেকবার অঙ্গীকারবদ্ধ হই। বিভেদ ভুলে এক হয়ে যাই। এই বৈশাখে আমাদের সব আয়োজন হোক সফল ও নিরাপদ। এভাবেই জেগে উঠুক পোশাকে বাঙালিয়ানা, আপনরূপে উদযাপিত হোক বসনে বৈশাখ। সবাইকে শুভ নববর্ষ।

 

আয়োজনে : স্বাক্ষর ও বর্ণ

ছবি : কৌশিক ইকবাল

পোশাক : লা রিভ

মডেল : তৌসিফ ও নাজমি

লেখা : ফারহাতুল জান্নাত

 

নীল অশ্বারোহী

ছবির ভালোবাসার গল্প

ড. মো.আমিরুল মোমেনীন চৌধুরী

 

: বৃষ্টির ভেতর এভাবে আরো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে পায়ে নির্ঘাত গাছের মতো শিকড় গজাবে।
: ভালো হবে। সূর্য উঠলে লোকে দেখবে নদীর পাড়ে নতুন দুটো গাছের জন্ম হয়েছে।
: কোন গাছ হবো?
: অশোক, না হয় নাগলিঙ্গম।
: না, পৌরাণিক কোনো গাছ নয়।
: তাহলে কী?
: অশত্থ, না হয় বট।
: ওতো মহীরুহ। ও গাছে ফুল নেই।
: ফুল দরকার নেই, ফলে ভরা গাছ। ফলভুখ পাখিগুলোর কলরবে মুখর শাখা-প্রশাখা।
: তাহলে মানুষের কী হবে! মানুষ তো ও গাছের ফল খায় না।
: মানুষ গাছের ফল মানুষ খাবে না। পথিক বিশ্রাম নেবে। হুতোমপেঁচা, বুনোহাঁস, কাঠঠোকরা, বক,
পানকৌড়ি বাসা বাঁধবে খোড়লে, বাকলেÑ সেই গাছ।
: স্তন্যপায়ীরা থাকবে না। কাঠবিড়াল, বাদুড়, বানর, কালোমুখ হুনুমান।
: এগুলোও থাকবে।
: গাছ হতে ইচ্ছা করছে না। গাছের জন্ম বৃত্তান্ত বড় কঠিন। গাছে ফুল ফুটবে, ফল হবে। পাকা ফলের বীজ মাটির নিচে পড়বে, ওই মাটির শক্ত আবরণ ভেদ করে বের হওয়া। জল আর সূর্যের আলো শরীরে মেখে শত্রু-মিত্রের চোখ ফাঁকি দিয়ে ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠা। তারপর এক জায়গায় জীবনভর ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকা।

ভাবতেই ভয় করে!
: তাহলে পাখি হও?
: সে মন্দ নয়। কী পাখি!
: আবাবিল।
: আবাবিল অনেক ছোট। এতো উঁচুতে উড়ে বেড়ায়, তাকিয়ে থাকলে চোখ লেগে যায়। ওর শিস আর ডানা ঝাঁপটানোর শব্দ ছাড়া কেউ কি দেখে ওর সবুজ শরীর।
: তাহলে আলবাট্রোস। দুটো বিশাল ডানায় ভর করে সমুদ্রের বাতাসে ভেসে বেড়াবে।
: তাও না। ও তো মৎসভোজী পাখি। মাছ আমার প্রিয় নয়। তাছাড়া অথৈ সমুদ্রের লোনা জলে ভেসে বেড়ানো, বসার ঠাঁই নেই।
: কেন, জাহাজের উঁচু মাস্তুলে বসবে।
: ওখানেও সুবিধা নেই। নাবিক আর ক্রুদের লোভী চোখ ফাঁকি দেওয়াÑ তা বড় শক্ত কাজ।
: তাহলে ছবি হবো আমি।
: সে আরো শক্ত কাজ।
: কেন?
: প্রাকৃতির সৃষ্ট কোনো কিছু ছবি নয়। মানুষ পাহাড়, আকাশ, মেঘ, নদী, চাঁদ, সূর্য।
: আর আমি!
: তুমি তো ছবির মতো সুন্দর।
: তাহলে ছবির গল্প বলো।
: শিল্পীদের ধারণা, প্রকৃতির সবকিছু ছবির মতো নিখুঁত নয়। ওই খুঁতগুলো চিহ্নিত করে, এর উপযুক্ত রূপায়ণ করে প্রকৃতির প্রকৃত সমালোচকের দায়িত্ব পালন করেন শিল্পী। ছবি নিয়ে প্রকৃতির সঙ্গে শিল্পীর এ এক অসম শক্তির লড়াই। সবকিছু ছবির মতো সুন্দর বলতে বোঝায়, প্রকৃতির সৃষ্টি আর ছবি এক নয়। ছবি হলো শিল্পী কতোভাবে নিজেকে প্রকাশ করতে পারেন এরই শেষ ফল। এটি মোটেও শিল্পীর খেয়াল-খুশির সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, বরং শিল্পী উপায় বের করেন মাত্র। মূল প্রকাশের ভাষাটি সমাজের অবকাঠামোয় স্তরীভূত। সমাজের সচেতন ও অসচেতনতার মেলবন্ধন হলো ছবি। তাই ছবিই সমাজের আত্মা। ছবির গঠন যে বিষয়বস্তু থেকে ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে শিল্পী গ্রহণ করেন তা থেকে উদ্ভূত

ভাব নিয়েই ছবির জন্ম দেন। এই সম্পর্কিত সচেতনতা থেকে বোঝা যায়, বিশেষ যে তল থেকে শিল্পী ছবি তৈরি করবে তা সমাজ বিচ্ছিন্ন হলেও এর নিয়ন্ত্রক শিল্পী নিজে এবং নিজেকে কেন্দ্রে রেখে বস্তু বিশেষের সঙ্গে একমাত্রিক বাদানুবাদ থেকে তার ছবি জন্ম নেয়। এই একমাত্রিকতার দিকটির বিশে¬ষণ দেয়া যায় বিশ শতকের চিন্তা থেকেই। ইমানুয়েল কান্ট-এর ডিজইন্টারেস্টেডনেস বা নিষ্কাম দৃষ্টির তত্ত্ব বিশ্লে¬ষণ করে ব্রিটিশ সাইকোলজিস্ট অ্যাডোয়ার্ড বুলফ বলেছেন, বস্তুকে সঠিকভাবে অনুধাবন করতে দুটি বিষয় দরকার এবং কোনো একটি বস্তুকে এর প্রায়োগিক ব্যবহার থেকে দূরে মেনে নিয়ে একটি রোহিতকরণ প্রক্রিয়ার মধ্য থেকে বস্তুটি পর্যবেক্ষণ করা। দুই. এই রোহিতকরণের ফলে যে দূরত্ব জন্ম হয় ওই দূরত্ব থেকে অভিজ্ঞতার নতুন মাত্রা আবিষ্কার শুরু করা। তা ধনাত্মক একটি প্রক্রিয়া। এই চিন্তবিদ প্রথম প্রস্থ প্রক্রিয়ার দূরত্বের কম-বেশি হয় বলে দাবি করেন অর্থাৎ কখনো বস্তুর প্রতি নিষ্কামতার মাত্রা বেশি থাকে, কখনো কম। কান্টিয়ান দর্শনের নিষ্কাম দৃষ্টি দিয়ে দেখার যে নমুনা পাওয়া যায় এর প্রতিফলন উনিশ শতকের মধ্যবর্তী সময়ের মার্কিন প্রকাশবাদীদের মধ্যে দেখা যায়। ড্রইং, রঙ, টেক্সার ছবির অনুভূতির দিকে নির্দেশ করে অর্থাৎ এই উপাদানগুলো নির্দেশবাচক বস্তু। এর মানে, ছবি মনের অনুভূতি নির্দেশ করে। সংগঠনবাদিতার মূল মনন ইমানুয়েল কান্ট বর্ণিত পথে আবিষ্কৃত হয়। বস্তুর সংগঠন কিংবা বুনটের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত এর সভ্যতার শ্রেষ্ঠত্বÑ এমনটি মনে করেন ইমানুয়েল কান্ট। উপস্থাপিত বস্তুর অনুপস্থিতিতে যে সংগঠন রয়ে যায়, বুনট স্পষ্ট হয়Ñ কান্টের মতে তা-ই ওই সভ্যতার মৌল পাওনা। এই চিন্তা পাথেয় করে গড়ে উঠেছে আধুনিকতাবাদীদের বিতরণ প্রক্রিয়া। ক্যানভাসের পরিসর থেকে অথবা এর ক্ষেত্র থেকে বাদ পড়েছে বিষয়। প্রথমে পরিচিত বিষয়, পরে জ্যামিতিক বা বিমূর্ত বিষয়ও। এই বাদ দেয়ার মূল উদ্দেশ্য তলটিই প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে উপস্থাপন করা। রঙ হচ্ছে তলের মূল বিষয়, এমনকি টেক্টাইল ভ্যালুজ অর্থাৎ তলের চরিত্রও তা-ই মূল্যবান বলে বিবেচনা করা শুরু হয়। সৃষ্টিশীল দৃষ্টিতে বস্তু বা উপাদানটি অবলোকন ও বিশে¬ষণ করে ফর্ম সম্পর্কিত স্পষ্ট ধারণার ওপর ভিত্তি করে ড্রইং প্রস্তুত করার যে মৌলিক নীতি রয়েছে এর সার্থক প্রতিফলন ঘটেছে শিল্পীদের ছবিতে। মৌলিক নীতিগুলোর মধ্যে প্রথমেই দৃষ্টির পর্যবেক্ষণ ক্ষমতাটি সুদক্ষ করতে বলা হয়েছে। শিল্পীর দৃষ্টিশক্তি কতোটা সুদক্ষ তা বলার অবকাশ নেই। প্রতিটি বিষয় বা বস্তু শিল্পী এমনভাবেই দেখেন যে, বস্তুর অবয়বগত খুটিনাটি অংশগুলো তার মনের মধ্যে প্রোথিত হয়ে যায় এবং তা তুলি বা ছেনির আঁচড়ে নির্ভুলভাবে প্রকাশ পায়। ছবিকে বুঝতে হলে এর মূল নীতিগুলো বোঝা জরুরি। পাঁচটি মূল নীতি হলো দৃষ্টির পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা সুদক্ষ করা, নিজের কর্মনৈপুণ্যের উন্নয়ন সাধন করা, ছবির প্রচ্ছন্ন সৃষ্টিধর্মিতা অবলোকনকল্পে ফর্মের সুন্দর আকার-আকৃতি সম্পর্কে নিজের কর্মনৈপুণ্য বুদ্ধি করা, ফর্ম যে স্ট্রাকচার বা আকার-আকৃতির ওপর নির্ভরশীল তা সুস্পষ্টরূপে তুলে ধরার বিষয়টি অনুধাবন করা। এ পাঁচটি মূল নীতিতে যেসব তথ্য সন্নিবিশত হয়েছে এগুলো সাধারণ মানুষের আওতার বাইরেই থেকে যায়। যারা সাধারণ তাদের দেখার পালা। আর শিল্পীর দায়িত্ব হচ্ছে সাধারণ দর্শকের দেখানোর।

কারণ সাধারণ দর্শকের চেয়ে কোনো শিল্পী বহির্দৃষ্টিতে যেমন দেখেন তেমনই অন্তর্দষ্টিতেও দেখে থাকেন। ফলে তার দেখায় নুতন নতুন আকার, ফর্ম, রূপ ইত্যাদি উঠে আসে। মানুষকে নতুন করে বাঁচতে শেখায়, নতুন করে দেখতে শেখায়। মানুষকে যা নাড়া দেয়Ñ এমন বিষয় খুঁজে বের করাই হচ্ছে কোনো শিল্পীর দায়িত্ব। ছবি এক অপূর্ব বিদ্যা যা একমাত্র বিশেষ প্রতিভার দিয়েই নির্মাণ করা সম্ভব। সাধারণভাবে সেটিকেই ছবি বলা হয় যার বিকাশ অথবা প্রকাশ মানুষের বুদ্ধিবৃত্তির মাধ্যমে চালিত নয়, বরং একটি সুকুমার বোধ ও কল্পনা প্রতিভার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। মানুষের আদিমতম ছবিতে এর প্রথম জয়যাত্রার আনন্দ এবং উৎসাহের প্রভা ও তেজ দেখা যায়। জড়তা থেকে মুক্তি দেয়া আনন্দ ও ভোগের অধিকার দেয়া এবং মানুষকে ক্ষমতাবান করে তোলা, রস এবং রূপ সৃষ্টি বিষয়ে এই হলো ছবির মূল উদ্দেশ্য। আধুনিককালের অনেক সমালোচক ছবির তত্ত্বের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়েছেন। তারা শিল্পীর কাছে একটি নির্বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গির আশা করেছেন। ছবিটি মানুষ বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে অভ্যস্ত। প্রাচীন থেকে আধুনিকাল পর্যন্ত ছবিকে নানাভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। অবশ্য ছবির প্রকৃত সংজ্ঞা নির্ণয় খুবই দুরূহ যা মুহূর্তে মুহূর্তে মানুষের চিন্তা-ভাবনাকে গোলকধাঁধায় ফেলে। ছবি হতে পারে ধ্যান, ভাবনা, কল্পনা বা বিস্ময়ের প্রকাশ। বৈদিক ঋষিরা তাদের সুর্যমন্ত্রে বর্ণনা করেছেন, ছবি হলো ব্যক্তিত্বের লুপ্তি ও আবেগর প্রস্থান। আধুনিককালে মনস্তাত্ত্বিক গবেষকরাওÑ যেমন গেস্টাল্ট থিওরিতে বলা হয়ে থাকে, ছবি হলো মানব জীবনের আবেগ, অভিজ্ঞতা, অনুভূতি সবকিছুর মিলিত এক প্রত্যয় যা মানুষকে অপার্থিব জগতের দিকে নিয়ে যায়। অকাল্ট ম্যাজিক বা মিস্টিসিজম ইত্যাদি বিষয় প্রাচীন ছবির উৎসমুখ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ছবি অনুকরণ অর্থাৎ ইমিটেশনের প্রসঙ্গ সুপ্রাচীন। গ্রিক শব্দ ‘মাইমেসিস’ ইমিটেশন বা অনুকরণের অনুকরণ। আরেকটি তত্ত্বে ছবি হলো ইশ্বর তার পরিকল্পনা অনুযায়ী নিজস্ব প্রতিরূপ হিসেবে যে বিশ্ব সংসার তৈরি করেছেন ওই বিশ্ব সংসারেরই দ্বিতীয় প্রতিরূপ হচ্ছে ছবি। ছবির প্রেরণা হিসেবে তাঁর ধারণা ছিল, শিল্পী ছবি সৃষ্টির জন্য ঐশ্বরিক অনুভূতির ওপর নির্ভরশীল। শিল্পীর অন্তরে তাঁর নিজস্ব ‘এসেনশিয়াল ক্রিয়েটিভ স্পিরিট’টি অবিশ্বাস করলে এবং ঐশ্বরিক প্রেরণাজাত কোনো বিশেষ তাগিদ শিল্পীর ওপর ভর করলেই ছবি সৃষ্টি সম্ভব। ছবি দর্শনের ক্ষেত্রে এবং ছবির তত্ত্ব বিষয়ে প্রতীচীর দার্শনিকদের অবদান সুদূরপ্রসারী। গ্রিক দার্শনিকরা ছবিকে ভেবেছিলেন অসত্যের জগৎ হিসেবে। কেননা ছবি হচ্ছে ‘বিশেষ প্রতিভাস’-এর অনুকরণ। কিন্তু কেউ আবার ছবিকে সত্যের আধার রূপ ভেবেছিলেন অর্থাৎ ছবির মাধ্যমে মানুষ জীবনের এমন কয়েকটি শাশ্বত অথচ নির্দিষ্ট মূল্যবোধে পৌঁছে যা মানুষকে সত্যের কাছাকাছি নিয়ে যায়। অনুকরণ বিষয়ে ভিন্ন ধারণা হলো, অনুকরণ একটি ব্যাপক বিষয় অর্থাৎ শিল্পী নিছক অনুকরণ করে না, বরং এমনভাবে অনুকরণ করতে সচেষ্ট হয় যেখানে বিষয়টি শিল্পীর কল্পনার সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে একটি নতুন দিগন্তের উন্মেষ ঘটায়। ছবি হলো দৃষ্টিগোচরতায় পৃথিবীকে অনুভব করার এক আবেগময় কৌশল। ছবি একটি ব্যাপক শব্দ। এ কারণে অবস্থানগত বিভক্তি ও ছবির দর্শনে সীমারেখা নির্ণয় খুবই আপেক্ষিক ব্যাপার। কারণ ছবি কোনো হঠাৎ গজিয়ে ওঠা ব্যাপার নয়। মানব সভ্যতার ইতিহাসের সঙ্গে এর সম্পর্ক প্রায় অবিচ্ছেদ্য। সভ্যতার ঊষালগ্নে ছবি গুহামানবের জীবন সংগ্রামের অন্যতম প্রধান অবলম্বন হিসেবে কাজ করেছে। প্রাচীন মিসরীয় সভ্যতায় ছবি ছিল পারলৌকিক সাফল্যের চাবিকাঠি। মধ্যযুগীয় ধর্মীয় সমাজ ব্যবস্থায় ছবি ধর্মীয় প্রচারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। অন্যদিকে প্রাচ্য ঐতিহ্যে ইহলৌকিক নির্বাণ লাভের প্রয়োজনে ধর্মীয় কর্মকা-ের অঙ্গ হয়েছে ছবি কিংবা অন্যভাবে বলা যায়, ছবি শব্দটি প্রায় মানব সভ্যতার মতো সুপ্রাচীন। মানুষ যেদিন থেকে শিল্পচর্চা শুরু করেছিল ওইদিন থেকেই মানুষের সভ্যতার ইতিহাসের গণনা শুরু। প্রাচ্যের ঋষিদের ধারণায় ছবি প্রত্যক্ষরূপে বহ্মস্বরূপের সঙ্গে একাত্ম যার উৎস আনন্দে এবং পরিশেষও আনন্দে। প্রাচ্যেও ছবিতে ইন্দ্রিয় সংবেদনশীলতার সাহায্যে দর্শকমনে অতীন্দ্রিয় জগৎ আলোড়িত করে, মানুষের খ- ভাবনার অপূর্ণতাকে ভরিয়ে তোলে প্রতীক ও সাদৃশ্যের মাধ্যমে। অনুকরণবাদও প্রাচ্যের আচার্যরা সমর্থন দিয়েছিলেন। ভারতীয় নাট্যশাস্ত্রে অনুকরণ, অনুদর্শক, অনুকীর্তন শব্দের উল্লে¬খ রয়েছে। ছবির সূত্রেও বলা হয়েছে ‘যথা নৃত্যে তথাচিত্রে তৈলোক্যানুকৃতিঃস্মতঃ’। নন্দনতত্ত্বের আধুনিকতম মতবাদের স্রষ্টার মতে, ছবির সঠিক সংজ্ঞা হলো ছবি সংজ্ঞা বা প্রতিভা নির্ভর। ছবির উপস্থিতি চিন্তার জগতে নয়, বোধের জগতে। ছবি সত্যের সঠিক অনুলিপি নয়, প্রতীক মাত্র। ছবি এক প্রকার আত্মপ্রকাশ হলেও বিচার ও সঞ্চারের বিষয় হিসেবে শিল্পীর আত্মচরিত্র থেকে তা স্বতন্ত্র। ছবির শৈলীই শিল্পী। শিল্পীর চরিত্র যে কীভাবে শিল্পে প্রকাশিত হবে এর কোনো নির্দিষ্ট সাধারণ নিয়ম নেই। শিল্পীর ছবিতে আধুনিকতার অন্য এক মাত্রা আছে যেখানে সমন্বয় সাধনাই সব নয়। আধুনিক মনন ও জীবনের মধ্যে আছে অনেক তমশালীন গহ্বর। অনুদ্ঘাটিত ওই রহস্যময়তা সৃষ্টি জগৎকে আলোড়িত করেছে ছবি। প্রকৃতির উপস্থিতিকে সম্পূর্ণ অস্বীকার না করেও ছবি বিমূর্ততার দিকে নিয়ে যাওয়ার প্রবণতা বর্তমান প্রজন্মের শিল্পীর মধ্যে দেখা যায়। অভিব্যক্তিমূলক বিমূর্ততার একটি ধারায় নিঃসর্গ বিমূর্তায়িত হচ্ছে আবার জৈবিক কোনো রূপবন্ধ ভেঙে ভেঙে বিমূর্ততার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বিমূর্ততার সঙ্গে প্রকৃতিগতের মূল পার্থক্য এই যে, আঙ্গিক-প্রস্থান হিসেবে ততোটা প্রতিবাদের প্রেরণায় এর সৃষ্টি ও বিকাশ নয়। এর দুর্বলতার ক্ষেত্র সেটিই যেখানে প্রতিষ্ঠিত আঙ্গিক গ্রহণ করা হয়েছে। তা অনুপ্রেরণায় নয়Ñ নতুনত্ব ও অভিনবত্বের প্রত্যাশায়। এর কারণ হয়তো ছবির আত্মপরিচয় সন্ধানের পথপরিক্রমাতেই নিহিত আছে। ছবির রস আস্বাদনে শিল্পীও সাধারণ দর্শকের যে চেতনার পার্থক্য তা তার অভিজ্ঞতার ঘাটতি থেকেই হয়ে থাকে। পদ্ধতিগত শিক্ষা, অভিজ্ঞতা, মননশীলতা ও সৃজনশীল মনের জারকরসে যে কোনো বস্তু বা ভাবকে পরিবর্তন, পরিবর্ধন, পরিমার্জনের মাধ্যমে নানানভাবে উদ্ভাসিত করে তুলতে পারেন কোনো শিল্পী। এই প্রক্রিয়ায় স্বাভাবিকভাবে কোনো দর্শকের অংশগ্রহণ বাস্তব কারণে দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। এ ক্ষেত্রে কোনো দর্শকের যে ব্যাপারটি নিতান্ত প্রয়োজন তা হচ্ছে শিল্পকর্ম দেখার অভিজ্ঞতা। ছবি যেহেতু একটি দৃশ্যমান ব্যাপার সেহেতু দেখার চোখটি তৈরি থাকা চাই। আধুনিক ছবিতে অভিনব বস্তুর সঙ্গে পরিচিত হতে কোনো দর্শকের চোখটি যেমন তৈরি হয়ে ওঠে তেমনি তার অভিজ্ঞতার ঝুলিটিও ধীরে ধীরে পূর্ণ হয়ে ওঠে। দর্শকের অভিজ্ঞতার ভা-ারটি যতোই স্ফীত হতে থাকে ততোই ছবির আপাত অদ্ভুত বস্তুগুলোর সামনে থেকে অদৃশ্য মায়াবী পর্দা সরে যেতে থাকে। তখন আর বিমূর্তচিত্র অজানা গ্রহের কিম্ভূত বস্তু মনে হয় না, আধুনিক ছবি মনে হয়, চিরচেনা ছবি।
: এ তো কঠিন গল্প। আমাকে বরং তুমি ছবি এঁকে দেখাও।
: কিসের ছবি।
: আমার ছবি।
: ছবি আঁকতে কাগজ, রঙ, তুলি, ইজেল, বোর্ডÑ কতো আয়োজন। তারপর...।
: তারপর কী!
: যার ছবি আঁকা হবে, আমাকে সে ভালোবাসে কিনা তা জেনে নিতে হবে। তবেই হবে ছবি।
: আমি তো তোমাকে অনেক ভালোবাসি। তুমি যা জানো এর চেয়ে বেশি।
: পরীক্ষা দিয়ে পাস করতে হবে।
: পরীক্ষা দিলে নির্ঘাত ফেল করবো। তবে ছবি আঁকার কায়দা শিখিয়ে দিতে পারি।
: তুমি শিখিয়ে দেবে ছবি আঁকার কায়দা?
: কেন নয়। আমার সাদা শাড়ির আঁচলে আঁকবে তোমার ছবি। আমার লম্বা চুলের বেণীর ডগা তোমার তুলি। বৃষ্টির জল আর তোমার মনের সব রঙ মিশিয়ে হবে জলছবি।
: কী আশ্চর্য তোমার ছবি আঁকার কায়দা। আমাকে অবাক করলে তুমি। এভাবে কখনো ভাবিনি! ভালোবাসার পরীক্ষায় পাস করেছ।
: ছবি আঁকার কায়দা তোমার পছন্দ হয়েছে?
: হ্যাঁ হয়েছে। তবে তোমার ছবি নয়, শাড়ির আঁচলে নদীর বুকে আকাশের ছবি আঁকি।
: না, তা তো চিরচেনা ছবি হবে।
: তাহলে কিসের ছবি আঁকবো?
: আমার দুঃখের ছবি এঁকে দাও।
: দুঃখের ছবি বুঝি আঁকা যায়! বরং নীল পদ্মের ওপর প্রজাপতির পাখার ছায়ায় তুমি ঘুমিয়ে আছÑ এঁকে দিই।
: ওই ছবির দরকার নেই। আমি তো রাজার মেয়ে নই!
: তুমিও রাজার মেয়ে।
: মিথ্যা কেন বলো তুমি? তোমার মুখে মিথ্যা মানায় না।
: তাহলে ঘোড়ার ছবি আঁকিÑ নীল অভ্রের ডানা।
: এঁকে দাও ঘোড়ার পিঠে তুমি।
: আমি তো রাজপুত্র নই।
: তুমিও রাজপুত্র। শিল্পীরা ছবির রাজপুত্রÑ দ্য ব্লু রাইডার। ওই চেয়ে দেখো নীল মেঘের ভেতর থেকে ছুটে আসছে।
: নীল অশ্বারোহী!
: হ্যাঁ, নীল অশ্বারোহী। তুমিই তো অশ্বারোহী।
: আর তুমি?
: ওই নীল অশ্বÑ তোমার ছবি!

 

Page 7 of 24

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

Twitter feed

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…