Super User

Super User

Page 9 of 26

নীল অশ্বারোহী

ছবির ভালোবাসার গল্প

ড. মো.আমিরুল মোমেনীন চৌধুরী

 

: বৃষ্টির ভেতর এভাবে আরো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে পায়ে নির্ঘাত গাছের মতো শিকড় গজাবে।
: ভালো হবে। সূর্য উঠলে লোকে দেখবে নদীর পাড়ে নতুন দুটো গাছের জন্ম হয়েছে।
: কোন গাছ হবো?
: অশোক, না হয় নাগলিঙ্গম।
: না, পৌরাণিক কোনো গাছ নয়।
: তাহলে কী?
: অশত্থ, না হয় বট।
: ওতো মহীরুহ। ও গাছে ফুল নেই।
: ফুল দরকার নেই, ফলে ভরা গাছ। ফলভুখ পাখিগুলোর কলরবে মুখর শাখা-প্রশাখা।
: তাহলে মানুষের কী হবে! মানুষ তো ও গাছের ফল খায় না।
: মানুষ গাছের ফল মানুষ খাবে না। পথিক বিশ্রাম নেবে। হুতোমপেঁচা, বুনোহাঁস, কাঠঠোকরা, বক,
পানকৌড়ি বাসা বাঁধবে খোড়লে, বাকলেÑ সেই গাছ।
: স্তন্যপায়ীরা থাকবে না। কাঠবিড়াল, বাদুড়, বানর, কালোমুখ হুনুমান।
: এগুলোও থাকবে।
: গাছ হতে ইচ্ছা করছে না। গাছের জন্ম বৃত্তান্ত বড় কঠিন। গাছে ফুল ফুটবে, ফল হবে। পাকা ফলের বীজ মাটির নিচে পড়বে, ওই মাটির শক্ত আবরণ ভেদ করে বের হওয়া। জল আর সূর্যের আলো শরীরে মেখে শত্রু-মিত্রের চোখ ফাঁকি দিয়ে ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠা। তারপর এক জায়গায় জীবনভর ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকা।

ভাবতেই ভয় করে!
: তাহলে পাখি হও?
: সে মন্দ নয়। কী পাখি!
: আবাবিল।
: আবাবিল অনেক ছোট। এতো উঁচুতে উড়ে বেড়ায়, তাকিয়ে থাকলে চোখ লেগে যায়। ওর শিস আর ডানা ঝাঁপটানোর শব্দ ছাড়া কেউ কি দেখে ওর সবুজ শরীর।
: তাহলে আলবাট্রোস। দুটো বিশাল ডানায় ভর করে সমুদ্রের বাতাসে ভেসে বেড়াবে।
: তাও না। ও তো মৎসভোজী পাখি। মাছ আমার প্রিয় নয়। তাছাড়া অথৈ সমুদ্রের লোনা জলে ভেসে বেড়ানো, বসার ঠাঁই নেই।
: কেন, জাহাজের উঁচু মাস্তুলে বসবে।
: ওখানেও সুবিধা নেই। নাবিক আর ক্রুদের লোভী চোখ ফাঁকি দেওয়াÑ তা বড় শক্ত কাজ।
: তাহলে ছবি হবো আমি।
: সে আরো শক্ত কাজ।
: কেন?
: প্রাকৃতির সৃষ্ট কোনো কিছু ছবি নয়। মানুষ পাহাড়, আকাশ, মেঘ, নদী, চাঁদ, সূর্য।
: আর আমি!
: তুমি তো ছবির মতো সুন্দর।
: তাহলে ছবির গল্প বলো।
: শিল্পীদের ধারণা, প্রকৃতির সবকিছু ছবির মতো নিখুঁত নয়। ওই খুঁতগুলো চিহ্নিত করে, এর উপযুক্ত রূপায়ণ করে প্রকৃতির প্রকৃত সমালোচকের দায়িত্ব পালন করেন শিল্পী। ছবি নিয়ে প্রকৃতির সঙ্গে শিল্পীর এ এক অসম শক্তির লড়াই। সবকিছু ছবির মতো সুন্দর বলতে বোঝায়, প্রকৃতির সৃষ্টি আর ছবি এক নয়। ছবি হলো শিল্পী কতোভাবে নিজেকে প্রকাশ করতে পারেন এরই শেষ ফল। এটি মোটেও শিল্পীর খেয়াল-খুশির সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, বরং শিল্পী উপায় বের করেন মাত্র। মূল প্রকাশের ভাষাটি সমাজের অবকাঠামোয় স্তরীভূত। সমাজের সচেতন ও অসচেতনতার মেলবন্ধন হলো ছবি। তাই ছবিই সমাজের আত্মা। ছবির গঠন যে বিষয়বস্তু থেকে ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে শিল্পী গ্রহণ করেন তা থেকে উদ্ভূত

ভাব নিয়েই ছবির জন্ম দেন। এই সম্পর্কিত সচেতনতা থেকে বোঝা যায়, বিশেষ যে তল থেকে শিল্পী ছবি তৈরি করবে তা সমাজ বিচ্ছিন্ন হলেও এর নিয়ন্ত্রক শিল্পী নিজে এবং নিজেকে কেন্দ্রে রেখে বস্তু বিশেষের সঙ্গে একমাত্রিক বাদানুবাদ থেকে তার ছবি জন্ম নেয়। এই একমাত্রিকতার দিকটির বিশে¬ষণ দেয়া যায় বিশ শতকের চিন্তা থেকেই। ইমানুয়েল কান্ট-এর ডিজইন্টারেস্টেডনেস বা নিষ্কাম দৃষ্টির তত্ত্ব বিশ্লে¬ষণ করে ব্রিটিশ সাইকোলজিস্ট অ্যাডোয়ার্ড বুলফ বলেছেন, বস্তুকে সঠিকভাবে অনুধাবন করতে দুটি বিষয় দরকার এবং কোনো একটি বস্তুকে এর প্রায়োগিক ব্যবহার থেকে দূরে মেনে নিয়ে একটি রোহিতকরণ প্রক্রিয়ার মধ্য থেকে বস্তুটি পর্যবেক্ষণ করা। দুই. এই রোহিতকরণের ফলে যে দূরত্ব জন্ম হয় ওই দূরত্ব থেকে অভিজ্ঞতার নতুন মাত্রা আবিষ্কার শুরু করা। তা ধনাত্মক একটি প্রক্রিয়া। এই চিন্তবিদ প্রথম প্রস্থ প্রক্রিয়ার দূরত্বের কম-বেশি হয় বলে দাবি করেন অর্থাৎ কখনো বস্তুর প্রতি নিষ্কামতার মাত্রা বেশি থাকে, কখনো কম। কান্টিয়ান দর্শনের নিষ্কাম দৃষ্টি দিয়ে দেখার যে নমুনা পাওয়া যায় এর প্রতিফলন উনিশ শতকের মধ্যবর্তী সময়ের মার্কিন প্রকাশবাদীদের মধ্যে দেখা যায়। ড্রইং, রঙ, টেক্সার ছবির অনুভূতির দিকে নির্দেশ করে অর্থাৎ এই উপাদানগুলো নির্দেশবাচক বস্তু। এর মানে, ছবি মনের অনুভূতি নির্দেশ করে। সংগঠনবাদিতার মূল মনন ইমানুয়েল কান্ট বর্ণিত পথে আবিষ্কৃত হয়। বস্তুর সংগঠন কিংবা বুনটের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত এর সভ্যতার শ্রেষ্ঠত্বÑ এমনটি মনে করেন ইমানুয়েল কান্ট। উপস্থাপিত বস্তুর অনুপস্থিতিতে যে সংগঠন রয়ে যায়, বুনট স্পষ্ট হয়Ñ কান্টের মতে তা-ই ওই সভ্যতার মৌল পাওনা। এই চিন্তা পাথেয় করে গড়ে উঠেছে আধুনিকতাবাদীদের বিতরণ প্রক্রিয়া। ক্যানভাসের পরিসর থেকে অথবা এর ক্ষেত্র থেকে বাদ পড়েছে বিষয়। প্রথমে পরিচিত বিষয়, পরে জ্যামিতিক বা বিমূর্ত বিষয়ও। এই বাদ দেয়ার মূল উদ্দেশ্য তলটিই প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে উপস্থাপন করা। রঙ হচ্ছে তলের মূল বিষয়, এমনকি টেক্টাইল ভ্যালুজ অর্থাৎ তলের চরিত্রও তা-ই মূল্যবান বলে বিবেচনা করা শুরু হয়। সৃষ্টিশীল দৃষ্টিতে বস্তু বা উপাদানটি অবলোকন ও বিশে¬ষণ করে ফর্ম সম্পর্কিত স্পষ্ট ধারণার ওপর ভিত্তি করে ড্রইং প্রস্তুত করার যে মৌলিক নীতি রয়েছে এর সার্থক প্রতিফলন ঘটেছে শিল্পীদের ছবিতে। মৌলিক নীতিগুলোর মধ্যে প্রথমেই দৃষ্টির পর্যবেক্ষণ ক্ষমতাটি সুদক্ষ করতে বলা হয়েছে। শিল্পীর দৃষ্টিশক্তি কতোটা সুদক্ষ তা বলার অবকাশ নেই। প্রতিটি বিষয় বা বস্তু শিল্পী এমনভাবেই দেখেন যে, বস্তুর অবয়বগত খুটিনাটি অংশগুলো তার মনের মধ্যে প্রোথিত হয়ে যায় এবং তা তুলি বা ছেনির আঁচড়ে নির্ভুলভাবে প্রকাশ পায়। ছবিকে বুঝতে হলে এর মূল নীতিগুলো বোঝা জরুরি। পাঁচটি মূল নীতি হলো দৃষ্টির পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা সুদক্ষ করা, নিজের কর্মনৈপুণ্যের উন্নয়ন সাধন করা, ছবির প্রচ্ছন্ন সৃষ্টিধর্মিতা অবলোকনকল্পে ফর্মের সুন্দর আকার-আকৃতি সম্পর্কে নিজের কর্মনৈপুণ্য বুদ্ধি করা, ফর্ম যে স্ট্রাকচার বা আকার-আকৃতির ওপর নির্ভরশীল তা সুস্পষ্টরূপে তুলে ধরার বিষয়টি অনুধাবন করা। এ পাঁচটি মূল নীতিতে যেসব তথ্য সন্নিবিশত হয়েছে এগুলো সাধারণ মানুষের আওতার বাইরেই থেকে যায়। যারা সাধারণ তাদের দেখার পালা। আর শিল্পীর দায়িত্ব হচ্ছে সাধারণ দর্শকের দেখানোর।

কারণ সাধারণ দর্শকের চেয়ে কোনো শিল্পী বহির্দৃষ্টিতে যেমন দেখেন তেমনই অন্তর্দষ্টিতেও দেখে থাকেন। ফলে তার দেখায় নুতন নতুন আকার, ফর্ম, রূপ ইত্যাদি উঠে আসে। মানুষকে নতুন করে বাঁচতে শেখায়, নতুন করে দেখতে শেখায়। মানুষকে যা নাড়া দেয়Ñ এমন বিষয় খুঁজে বের করাই হচ্ছে কোনো শিল্পীর দায়িত্ব। ছবি এক অপূর্ব বিদ্যা যা একমাত্র বিশেষ প্রতিভার দিয়েই নির্মাণ করা সম্ভব। সাধারণভাবে সেটিকেই ছবি বলা হয় যার বিকাশ অথবা প্রকাশ মানুষের বুদ্ধিবৃত্তির মাধ্যমে চালিত নয়, বরং একটি সুকুমার বোধ ও কল্পনা প্রতিভার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। মানুষের আদিমতম ছবিতে এর প্রথম জয়যাত্রার আনন্দ এবং উৎসাহের প্রভা ও তেজ দেখা যায়। জড়তা থেকে মুক্তি দেয়া আনন্দ ও ভোগের অধিকার দেয়া এবং মানুষকে ক্ষমতাবান করে তোলা, রস এবং রূপ সৃষ্টি বিষয়ে এই হলো ছবির মূল উদ্দেশ্য। আধুনিককালের অনেক সমালোচক ছবির তত্ত্বের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়েছেন। তারা শিল্পীর কাছে একটি নির্বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গির আশা করেছেন। ছবিটি মানুষ বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে অভ্যস্ত। প্রাচীন থেকে আধুনিকাল পর্যন্ত ছবিকে নানাভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। অবশ্য ছবির প্রকৃত সংজ্ঞা নির্ণয় খুবই দুরূহ যা মুহূর্তে মুহূর্তে মানুষের চিন্তা-ভাবনাকে গোলকধাঁধায় ফেলে। ছবি হতে পারে ধ্যান, ভাবনা, কল্পনা বা বিস্ময়ের প্রকাশ। বৈদিক ঋষিরা তাদের সুর্যমন্ত্রে বর্ণনা করেছেন, ছবি হলো ব্যক্তিত্বের লুপ্তি ও আবেগর প্রস্থান। আধুনিককালে মনস্তাত্ত্বিক গবেষকরাওÑ যেমন গেস্টাল্ট থিওরিতে বলা হয়ে থাকে, ছবি হলো মানব জীবনের আবেগ, অভিজ্ঞতা, অনুভূতি সবকিছুর মিলিত এক প্রত্যয় যা মানুষকে অপার্থিব জগতের দিকে নিয়ে যায়। অকাল্ট ম্যাজিক বা মিস্টিসিজম ইত্যাদি বিষয় প্রাচীন ছবির উৎসমুখ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ছবি অনুকরণ অর্থাৎ ইমিটেশনের প্রসঙ্গ সুপ্রাচীন। গ্রিক শব্দ ‘মাইমেসিস’ ইমিটেশন বা অনুকরণের অনুকরণ। আরেকটি তত্ত্বে ছবি হলো ইশ্বর তার পরিকল্পনা অনুযায়ী নিজস্ব প্রতিরূপ হিসেবে যে বিশ্ব সংসার তৈরি করেছেন ওই বিশ্ব সংসারেরই দ্বিতীয় প্রতিরূপ হচ্ছে ছবি। ছবির প্রেরণা হিসেবে তাঁর ধারণা ছিল, শিল্পী ছবি সৃষ্টির জন্য ঐশ্বরিক অনুভূতির ওপর নির্ভরশীল। শিল্পীর অন্তরে তাঁর নিজস্ব ‘এসেনশিয়াল ক্রিয়েটিভ স্পিরিট’টি অবিশ্বাস করলে এবং ঐশ্বরিক প্রেরণাজাত কোনো বিশেষ তাগিদ শিল্পীর ওপর ভর করলেই ছবি সৃষ্টি সম্ভব। ছবি দর্শনের ক্ষেত্রে এবং ছবির তত্ত্ব বিষয়ে প্রতীচীর দার্শনিকদের অবদান সুদূরপ্রসারী। গ্রিক দার্শনিকরা ছবিকে ভেবেছিলেন অসত্যের জগৎ হিসেবে। কেননা ছবি হচ্ছে ‘বিশেষ প্রতিভাস’-এর অনুকরণ। কিন্তু কেউ আবার ছবিকে সত্যের আধার রূপ ভেবেছিলেন অর্থাৎ ছবির মাধ্যমে মানুষ জীবনের এমন কয়েকটি শাশ্বত অথচ নির্দিষ্ট মূল্যবোধে পৌঁছে যা মানুষকে সত্যের কাছাকাছি নিয়ে যায়। অনুকরণ বিষয়ে ভিন্ন ধারণা হলো, অনুকরণ একটি ব্যাপক বিষয় অর্থাৎ শিল্পী নিছক অনুকরণ করে না, বরং এমনভাবে অনুকরণ করতে সচেষ্ট হয় যেখানে বিষয়টি শিল্পীর কল্পনার সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে একটি নতুন দিগন্তের উন্মেষ ঘটায়। ছবি হলো দৃষ্টিগোচরতায় পৃথিবীকে অনুভব করার এক আবেগময় কৌশল। ছবি একটি ব্যাপক শব্দ। এ কারণে অবস্থানগত বিভক্তি ও ছবির দর্শনে সীমারেখা নির্ণয় খুবই আপেক্ষিক ব্যাপার। কারণ ছবি কোনো হঠাৎ গজিয়ে ওঠা ব্যাপার নয়। মানব সভ্যতার ইতিহাসের সঙ্গে এর সম্পর্ক প্রায় অবিচ্ছেদ্য। সভ্যতার ঊষালগ্নে ছবি গুহামানবের জীবন সংগ্রামের অন্যতম প্রধান অবলম্বন হিসেবে কাজ করেছে। প্রাচীন মিসরীয় সভ্যতায় ছবি ছিল পারলৌকিক সাফল্যের চাবিকাঠি। মধ্যযুগীয় ধর্মীয় সমাজ ব্যবস্থায় ছবি ধর্মীয় প্রচারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। অন্যদিকে প্রাচ্য ঐতিহ্যে ইহলৌকিক নির্বাণ লাভের প্রয়োজনে ধর্মীয় কর্মকা-ের অঙ্গ হয়েছে ছবি কিংবা অন্যভাবে বলা যায়, ছবি শব্দটি প্রায় মানব সভ্যতার মতো সুপ্রাচীন। মানুষ যেদিন থেকে শিল্পচর্চা শুরু করেছিল ওইদিন থেকেই মানুষের সভ্যতার ইতিহাসের গণনা শুরু। প্রাচ্যের ঋষিদের ধারণায় ছবি প্রত্যক্ষরূপে বহ্মস্বরূপের সঙ্গে একাত্ম যার উৎস আনন্দে এবং পরিশেষও আনন্দে। প্রাচ্যেও ছবিতে ইন্দ্রিয় সংবেদনশীলতার সাহায্যে দর্শকমনে অতীন্দ্রিয় জগৎ আলোড়িত করে, মানুষের খ- ভাবনার অপূর্ণতাকে ভরিয়ে তোলে প্রতীক ও সাদৃশ্যের মাধ্যমে। অনুকরণবাদও প্রাচ্যের আচার্যরা সমর্থন দিয়েছিলেন। ভারতীয় নাট্যশাস্ত্রে অনুকরণ, অনুদর্শক, অনুকীর্তন শব্দের উল্লে¬খ রয়েছে। ছবির সূত্রেও বলা হয়েছে ‘যথা নৃত্যে তথাচিত্রে তৈলোক্যানুকৃতিঃস্মতঃ’। নন্দনতত্ত্বের আধুনিকতম মতবাদের স্রষ্টার মতে, ছবির সঠিক সংজ্ঞা হলো ছবি সংজ্ঞা বা প্রতিভা নির্ভর। ছবির উপস্থিতি চিন্তার জগতে নয়, বোধের জগতে। ছবি সত্যের সঠিক অনুলিপি নয়, প্রতীক মাত্র। ছবি এক প্রকার আত্মপ্রকাশ হলেও বিচার ও সঞ্চারের বিষয় হিসেবে শিল্পীর আত্মচরিত্র থেকে তা স্বতন্ত্র। ছবির শৈলীই শিল্পী। শিল্পীর চরিত্র যে কীভাবে শিল্পে প্রকাশিত হবে এর কোনো নির্দিষ্ট সাধারণ নিয়ম নেই। শিল্পীর ছবিতে আধুনিকতার অন্য এক মাত্রা আছে যেখানে সমন্বয় সাধনাই সব নয়। আধুনিক মনন ও জীবনের মধ্যে আছে অনেক তমশালীন গহ্বর। অনুদ্ঘাটিত ওই রহস্যময়তা সৃষ্টি জগৎকে আলোড়িত করেছে ছবি। প্রকৃতির উপস্থিতিকে সম্পূর্ণ অস্বীকার না করেও ছবি বিমূর্ততার দিকে নিয়ে যাওয়ার প্রবণতা বর্তমান প্রজন্মের শিল্পীর মধ্যে দেখা যায়। অভিব্যক্তিমূলক বিমূর্ততার একটি ধারায় নিঃসর্গ বিমূর্তায়িত হচ্ছে আবার জৈবিক কোনো রূপবন্ধ ভেঙে ভেঙে বিমূর্ততার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বিমূর্ততার সঙ্গে প্রকৃতিগতের মূল পার্থক্য এই যে, আঙ্গিক-প্রস্থান হিসেবে ততোটা প্রতিবাদের প্রেরণায় এর সৃষ্টি ও বিকাশ নয়। এর দুর্বলতার ক্ষেত্র সেটিই যেখানে প্রতিষ্ঠিত আঙ্গিক গ্রহণ করা হয়েছে। তা অনুপ্রেরণায় নয়Ñ নতুনত্ব ও অভিনবত্বের প্রত্যাশায়। এর কারণ হয়তো ছবির আত্মপরিচয় সন্ধানের পথপরিক্রমাতেই নিহিত আছে। ছবির রস আস্বাদনে শিল্পীও সাধারণ দর্শকের যে চেতনার পার্থক্য তা তার অভিজ্ঞতার ঘাটতি থেকেই হয়ে থাকে। পদ্ধতিগত শিক্ষা, অভিজ্ঞতা, মননশীলতা ও সৃজনশীল মনের জারকরসে যে কোনো বস্তু বা ভাবকে পরিবর্তন, পরিবর্ধন, পরিমার্জনের মাধ্যমে নানানভাবে উদ্ভাসিত করে তুলতে পারেন কোনো শিল্পী। এই প্রক্রিয়ায় স্বাভাবিকভাবে কোনো দর্শকের অংশগ্রহণ বাস্তব কারণে দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। এ ক্ষেত্রে কোনো দর্শকের যে ব্যাপারটি নিতান্ত প্রয়োজন তা হচ্ছে শিল্পকর্ম দেখার অভিজ্ঞতা। ছবি যেহেতু একটি দৃশ্যমান ব্যাপার সেহেতু দেখার চোখটি তৈরি থাকা চাই। আধুনিক ছবিতে অভিনব বস্তুর সঙ্গে পরিচিত হতে কোনো দর্শকের চোখটি যেমন তৈরি হয়ে ওঠে তেমনি তার অভিজ্ঞতার ঝুলিটিও ধীরে ধীরে পূর্ণ হয়ে ওঠে। দর্শকের অভিজ্ঞতার ভা-ারটি যতোই স্ফীত হতে থাকে ততোই ছবির আপাত অদ্ভুত বস্তুগুলোর সামনে থেকে অদৃশ্য মায়াবী পর্দা সরে যেতে থাকে। তখন আর বিমূর্তচিত্র অজানা গ্রহের কিম্ভূত বস্তু মনে হয় না, আধুনিক ছবি মনে হয়, চিরচেনা ছবি।
: এ তো কঠিন গল্প। আমাকে বরং তুমি ছবি এঁকে দেখাও।
: কিসের ছবি।
: আমার ছবি।
: ছবি আঁকতে কাগজ, রঙ, তুলি, ইজেল, বোর্ডÑ কতো আয়োজন। তারপর...।
: তারপর কী!
: যার ছবি আঁকা হবে, আমাকে সে ভালোবাসে কিনা তা জেনে নিতে হবে। তবেই হবে ছবি।
: আমি তো তোমাকে অনেক ভালোবাসি। তুমি যা জানো এর চেয়ে বেশি।
: পরীক্ষা দিয়ে পাস করতে হবে।
: পরীক্ষা দিলে নির্ঘাত ফেল করবো। তবে ছবি আঁকার কায়দা শিখিয়ে দিতে পারি।
: তুমি শিখিয়ে দেবে ছবি আঁকার কায়দা?
: কেন নয়। আমার সাদা শাড়ির আঁচলে আঁকবে তোমার ছবি। আমার লম্বা চুলের বেণীর ডগা তোমার তুলি। বৃষ্টির জল আর তোমার মনের সব রঙ মিশিয়ে হবে জলছবি।
: কী আশ্চর্য তোমার ছবি আঁকার কায়দা। আমাকে অবাক করলে তুমি। এভাবে কখনো ভাবিনি! ভালোবাসার পরীক্ষায় পাস করেছ।
: ছবি আঁকার কায়দা তোমার পছন্দ হয়েছে?
: হ্যাঁ হয়েছে। তবে তোমার ছবি নয়, শাড়ির আঁচলে নদীর বুকে আকাশের ছবি আঁকি।
: না, তা তো চিরচেনা ছবি হবে।
: তাহলে কিসের ছবি আঁকবো?
: আমার দুঃখের ছবি এঁকে দাও।
: দুঃখের ছবি বুঝি আঁকা যায়! বরং নীল পদ্মের ওপর প্রজাপতির পাখার ছায়ায় তুমি ঘুমিয়ে আছÑ এঁকে দিই।
: ওই ছবির দরকার নেই। আমি তো রাজার মেয়ে নই!
: তুমিও রাজার মেয়ে।
: মিথ্যা কেন বলো তুমি? তোমার মুখে মিথ্যা মানায় না।
: তাহলে ঘোড়ার ছবি আঁকিÑ নীল অভ্রের ডানা।
: এঁকে দাও ঘোড়ার পিঠে তুমি।
: আমি তো রাজপুত্র নই।
: তুমিও রাজপুত্র। শিল্পীরা ছবির রাজপুত্রÑ দ্য ব্লু রাইডার। ওই চেয়ে দেখো নীল মেঘের ভেতর থেকে ছুটে আসছে।
: নীল অশ্বারোহী!
: হ্যাঁ, নীল অশ্বারোহী। তুমিই তো অশ্বারোহী।
: আর তুমি?
: ওই নীল অশ্বÑ তোমার ছবি!

 

জলকাচ

রঞ্জনা ব্যানার্জী

 

এক ঝলকেই চিনে ফেলেছিলাম। অল্পক্ষণের দেখা। তাও ভুলিনি। মাথার ভেতর খোদাই হয়ে আছে ওই শেষ বিকেলের সূর্যের পিছলানো আলো, কনকনে ঠান্ডা জলে পাথরের খাঁজ থেকে খুঁচিয়ে বের করা গোলাপি অথবা বেগুনি ওই কাচ!
আমাদের খাবার আসতে দেরি হচ্ছিল। ডিসেম্বরের ১০ তারিখ। আমার জন্মদিন। অনেক দিন পর আমরা বাইরে খেতে এসেছি। বিয়ের পর পর বাইরেই খেতাম বিশেষ দিনগুলোয়। এক সময় বিশেষ দিনগুলো আর বিশেষ রইলো না। কাজের চাপে অদ্রিশ তারিখ নয়, বারের হিসাব রাখতো। আর গুরুত্বপূর্ণ তারিখ ঢুকে গিয়েছিল প্ল্যানারে- গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ের নিকাশে। ওইসব অতি বিশেষ দিনের ক্রমাংকে আমার বিশেষ দিনগুলো বিশেষত্ব হারিয়েছিল।
সেদিন অদ্রিশ মেনু কার্ডে চোখ বোলাচ্ছিল। আমি মেনু দেখছিলাম না। দেখার দরকার নেই। আমি জানি কী খাবো। ফিশ অ্যান্ড চিপস। এবার কন্সিভ করার পর থেকে ওই খাবারটাই আমার পছন্দের চূড়ায়।
কাচটা আসলে বেগুনি, গোলাপি নয়। এই সেদিন লকেটে বাঁধাই করে দিয়েছে অদ্রিশ। এখন আমার গলায় থাকে বুকের মধ্যিখানে গা ছুঁয়ে। ওয়েট্রেস মেনু বুঝে নেয়ার সময়ই চোখ চলে গেল অদূরে। আমার কোণাকুণি বসেছিলেন তারা। কোনো সিনিয়র ক্লাবের ক্রিস্টমাস পার্টি হবে হয়তো। কেউ কেউ মাথায় সান্টা টুপি পরেছে, কেউ রেইন ডিয়ার অ্যান্টলার। আমাদের খাবার চলে এসেছিল মিনিটেই। অদ্রিশের শর্মা আর করোনা বিয়ার। আমার হেডক ‘ফিশ অ্যান্ড চিপস’, সঙ্গে টারটার সস’ আর লেবু দেয়া জল। আমি যেখানে বসেছি সেখান থেকে তাকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। দুটি টেবিল লাগিয়ে বসেছেন তারা। দশজনের মতো। তাদের মধ্যে বেমানান এক সুকেশী তরুণীও আছে। কেবল তার মাথাতেই উৎসবমুখর কোনো টুপি নেই। পরিপাটি চুল। হঠাৎ চেহারাটা মনে পড়ে গেল। এ তো তিনি! শির শির শীত লাগছিল আমার। বিশ্বাস হচ্ছিল না!
আমার চমকানো অদ্রিশের নজর এড়ায়নি- ‘কী ব্যাপার?’ মাছের ফিলেতে সবে ছুরি কাটা গেঁথেছিলাম। জমে রইলো হাত। আমার দৃষ্টি অনুসরণ করে ঘাড় ঘুরিয়ে বোঝার চেষ্টা করছিল অদ্রিশ। পেটের ভেতর ঠিক তখনই আমার রাজকন্যা আলতো নড়ে উঠেছিল। আমি কোনোমতে বলি, ‘সেই ভদ্রলোক!’ অদ্রিশ জিজ্ঞাসু চেয়ে থাকে।
তরুণীকে দেখি জায়গা ছেড়ে ক্যাশ কাউন্টারের দিকে এগোচ্ছে। খাওয়া শেষ তাদের? আমার তর সয় না। হারানো যাবে না তাকে। অদ্রিশের অবাক দৃষ্টি উপেক্ষা করে চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়াই। চলে যাই সটান তাদের টেবিলে। তরুণী তখনো কাউন্টারে। ভণিতা না করেই জিজ্ঞাসা করি, ‘কেমন আছেন?’ তার চোখে বিভ্রান্তি। তড়বড় করে বলি, ‘জলকাচটা আমিই খুঁচিয়ে বের করেছিলাম।’ আমার দিকে তিনি ভাবলেশহীন তাকিয়ে থাকেন। ‘আপনার মনে নেই?’ ঠিক তখনই অনুভব করি আমার পিঠে অদ্রিশের হাত। টেবিলের অন্যরা অবাক তাকিয়ে! তার সামনে ছোট একটা চকোলেট কেক। ‘হ্যাপি বার্থডে টু রন’। মাঝখানের মোমবাতিটা জ্বালানো হয়নি। ম্যানেজার ছুটে আসে। তার সঙ্গে তরুণী- ‘এনিথিং রং?’ লকেটটা তুলে ধরি- ‘মনে পড়ে? এ কাচটা বিরল। কেবল সময়ের হিসাবে নয়, এটিই আমাকে অন্ধকার খাদ থেকে ফিরিয়ে এনেছিল। আমার এই দ্বিতীয় জীবন আপনার দান।’ তিনি অপলক তাকিয়ে থাকেন লকেটটার দিকে। গলা থেকে খুলে লকেট তার চোখের সামনে ধরি। তিনি হাতে নেন, দেখেন। বিড় বিড় করে বলেন, “একশ’ বছরের কাছাকাছি হবে, ভেরি রেয়ার।” আমি অবাক! তিনি জানতেন। ‘আপনি বুঝেছিলেন সেই দিন?’ তিনি মৃদু হাসেন এবং লকেটটা আমাকে ফিরিয়ে দেন। আমার মাথা কাজ করছিল না। চেনা নেই, জানা নেই আমাকে কেন দিয়েছিলেন? তরুণী ও অন্যরা অবাক তাকিয়ে! অদ্রিশ বুঝে গেছে ততক্ষণে। সেই বলে ঘটনাটা- এক কিউরেটর ওই এত্তটুকু পাথরটার জন্য তিন হাজার ডলার চেয়েছিল। ওই থেকে আমরা খুঁজছি তাকে। ‘এটা আপনার কাছে রেখে দিন’- অদ্রিশ অনুরোধ করে। আমার দিকে তিনি তাকিয়েছিলেন। অথচ আমাকে দেখছেন বলে মনে হচ্ছিল না- ‘ওটা তোমার গলাতেই মানাচ্ছে।’ স্থান-কাল ভুলে তাকে জড়িয়ে ধরি। আমার মাথায় আলতো হাত বোলান- ‘গড ব্লেস ইউ মাই চাইল্ড।’ তরুণী জানায়, তিনি তার দাদু। বাকিরা তার দাদুর বন্ধু এবং আজ তার জন্মদিন। আমার বুক ধক করে ওঠে। মনে হতে থাকে, সবকিছু অন্য কারো ছকে ঘটছে! তরুণীকে আমাদের বাড়ির ফোন নম্বর দেয় অদ্রিশ। যদি তিনি মত পাল্টান তাহলে যেন নিঃসংকোচে জানান আমাদের। ফিরে আসি নিজের জায়গায়। পেছনে তখন সবাই গাইছে- ‘হ্যাপি বার্থ ডে টুু রন।’ আমিও মনে মনে গাই, ‘হ্যাপি বার্থডে টু আস।’
তারা বেরিয়ে যাওয়ার মিনিট পাঁচেকের মধ্যে আমরাও উঠে পড়ি। ওই রাতে অনেকক্ষণ বার্কলি বিচে বসে ছিলাম দু’জন। আকাশজুড়ে হাজার তারার বুটি। ঠিক মাঝখানে গোল কাঁসার থালার মতো চাঁদটা জেগে ছিল আমাদের চোখের জলের সাক্ষী হয়ে। ওই সৈকতেই সেদিন তার সঙ্গে দেখা হয়েছিল অথবা আমার দ্বিতীয় জীবনপ্রাপ্তি হয়েছিল।
‘তুমি চাইলে রাখতে পারো। আমি বাবল দেয়া কাচ খুঁজছি’- তিনি বলেছিলেন। কথা বলার সময় সেদিনও আমাকে দেখেছিলেন। অথচ দেখছিলেন না। ভারী কাচের ভেতর দিয়ে তার চোখ আমার চোখ ছুঁতে পারেনি। দৃষ্টিহীনদের মতো আমাকে ছাড়িয়ে অন্য কোথাও ভেসে গিয়েছিল ওই দৃষ্টি। বাবল দেয়া কাচ মানে কী বুঝতে পারিনি, জানতেও চাইনি। হাত বাড়িয়ে চুপচাপ নিয়েছিলাম। গোলাপি মসৃণ ছোট ত্রিভুজ আাকৃতির স্বচ্ছ পাথর। কখনো গোলাপি কাচের পাথর দেখিনি আগে। মাঝে মধ্যে দুধসাদা বা সবুজ চোখে পড়েছে বালিতে অথবা জলের নিচে। ভদ্রলোক পাথরটি আমার হাতে গুঁজেই পা চালিয়েছিলেন উল্টোদিকে। খাকি শটস আর ক্রিম টি-শার্ট ও মাথায় হ্যাট। সূর্য ঢলার আগের তীব্র কমলা আলোয় আমার চোখ ধাঁধিয়েছিল। আমি চোখের ওপর হাত ঢেকে আলো ছেনে তার চলে যাওয়া দেখেছিলাম।
আমি একাই এসেছিলাম সেদিন। আমার কাজ ঠিক বেলা ৩টায় শেষ হয়েছিল। লাইব্রেরিতে তেমন লোকজন ছিল না। বইগুলোর কল নম্বর মিলিয়ে তাকে তুলে রাখার পর তাকে সাহায্য করেছিলাম বই বাছাইয়ে। ছেঁড়া-খোঁড়া, অতি ব্যবহারে বাঁধাই ঢিলে হয়ে যাওয়া বইগুলো ‘ফ্রেন্ডস অফ লাইব্রেরি’র চ্যারিটিতে যাবে। বেলা ১১টার দিকে দুই শিশু এসেছিল তাদের মায়েদের সঙ্গে। হল্লা হয়েছিল খানিকটা। একই পাজল নিয়ে দু’জনেই টানাটানি।
আমি অনিয়মিত। কেবল কেউ ছুটিতে গেলেই ডাক পড়ে। সাধারণত শনি-রবিবারের শিফটেই আমাকে ডাকে। ওই দু’দিন ভিড় থাকে অনেক। সেদিন বুধবার। হঠাৎ করেই আমার ডাক পড়েছিল। কেবল দু’ঘণ্টা। যার শিফট তিনি হঠাৎ অসুস্থ। অনেক দিন পর উইক ডে-তে কাজ। রাজি হয়ে গিয়েছিলাম। বাড়িতে দম বন্ধ লাগছিল।

ব্রাউন আর গার্থ এসেছিলেন লাঞ্চের পর। তারা রোজ আসেন। দু’জনই রিটায়ার্ড। শনি বা রবিবারে তারা আসেন না। তাই আমার সঙ্গে খুব একটা দেখাও হয় না। গার্থ বেশ আলাপী। লাইব্রেরিতে বই পড়ার চেয়ে কথা বলাতেই তার আগ্রহ বেশি। সেদিন আমাকে দেখে নামটা বলার চেষ্টা করলেন বেশ ক’বার। আমার নাম স্নিগ্ধা। ছোট করার কোনো উপায়ই নেই। আমার সুপারভাইজর শুরুতে নামটি ছাঁটাই করে ‘সু’ বলে ডাকার চেষ্টা করেছিলেন। আমি সাড়া দিইনি। আমার নাম নিয়ে কেউ কারিকুরি করুক তা আমার পছন্দ নয়। ‘স্নিগ্ধা’ শেষমেশ তাদের কাছে হয়ে গেছে ‘স্নিডা’। তাও সই। তবে সু কিছুতেই নয়।
গার্থ বিপত্নীক । ছেলেমেয়ে নেই। সেদিন বলেছিলেন সরকারি হোমে চলে যাওয়ার কথা ভাবছেন। কাজের বাইরে আমাদের কথা বলা নিষেধ। সুপারভাইজর সব খেয়াল করেন। তাই গার্থের সঙ্গে কথা এগোয়নি। আসলে সেদিন তার সঙ্গে দেখা না হলে সৈকতে যাওয়া হতো না আর নিকষ কালো বিষন্নগন্ডি থেকে আমিও বের হতে পারতাম না। তিনি যাওয়ার সময় পেয়ারাগন্ধি এক ধরনের লজেন্স দিয়েছিলেন হাতে গুঁজে। তা ছোট ছোট ও দারুণ স্বাদের। আমার চোখে জল জমেছিল। ঘাবড়ে গিয়েছিলাম কোনো অনর্থ না হয়ে যায়! কাজে ইমোশন দেখানো নিষেধ। সবাইকে ছেড়ে আমাকে কেন? কেন যেন মনে হয়েছিল, তিনি জেনেছেন কোনোভাবে। আমার অগোচরে আমার মিসক্যারেজ আর মেল্ট ডাউন নিয়ে কথা হয় আমি জানি। পৃথু বৌদি সুপারভাইজরের পড়শি। পৃথু বৌদির সূত্রেই আমার এ কাজটি পাওয়া।
সে ১৩ সপ্তাহ পূর্ণ হওয়ার আগেই চলে গিয়েছিল। তাল তাল রক্ত। হাসপাতালে পুরোদিন রাখেনি, পাঠিয়ে দিয়েছিল। বাড়িতে ঢুকতেই সাপের মতো পাক খেয়ে খেয়ে ঠা-া গ্রোথ তলপেট বেয়ে উঠছিল। দরজা খুলে বাঁক নিলেই ওই ছবি। এক মাথা ঝাঁকড়া চুল, গাঢ় নীল ঘেঁষা কালো চোখ। আমি তাকাইনি। আমাকে হাতে ধরে বিছানায় দিয়ে এসেছিল অদ্রিশ। ছবিটি চুম্বকের মতো টানছিল। পায়ে পায়ে চলে গিয়েছিলাম আবার প্যাসেজে। ‘মাম্মা’- আমার কানের কাছে কেউ ফিসফিসিয়ে ডেকেছিল। আহা বাবুটা আমার! মায়ের কাছে রইলি না। আমি হাঁটু ভেঙে পড়ে গিয়েছিলাম ছবিটার সামনে। রাতে পৃথু বৌদি আর তপনদা এসেছিলেন। পৃথু বৌদি অনেক বুঝিয়েছিলেন- ‘১৩ সপ্তাহে কিছুই তৈরি হয় না। অযথাই মন খারাপ করছ।’ আমার এসব কথা একদম ভালো লাগছিল না। অদ্রিশকেই ভস্ম করছিলাম মনে মনে। কী দরকার ছিল রাজ্যের লোককে ডাকার!
স্বপ্নটি দেখতে শুরু করি আরো পরে। ফেনা ফেনা ঢেউয়ের চূড়ায় সে বসে আছে। মাথা ঘিরে দেবশিশুর মতো সবুজ শ্যাওলার মালা। মাম্মা!- দু’হাত বাড়িয়ে ডাকছে। এতো কাছে। তাও কিছুতেই তাকে ছুঁতে পারছিলাম না। ‘মাম্মা’!- ধড়মড় করে উঠে বসেছিলাম। বিছানা থেকে নেমে চলে গিয়েছিলাম ছবিটির কাছে। চুলের ডগায় জলের ফেনা লেগে আছে যেন। অদ্রিশ এসেছিল পিছু পিছু। কিছু বলেনি। লিভিংরুমে চলে গিয়েছিল। ফিরে এসেছিলাম শোয়ারঘরে একা। সারা রাত এপাশ-ওপাশ করেছি। সকালের দিকে চোখ লেগে এসেছিল। ঘুম থেকে উঠে দেখি অদ্রিশ নেই। ছবিটি যে নেই তা বুঝেছি অনেক পর। কিন্তু ফাঁকা দেয়ালজুড়ে এক মাথা ঝাঁকড়া চুলে জলের বিন্দু নিয়ে সে জেগেই রইলো। অদ্রিশকে কখনো জিজ্ঞাসা করিনি ছবিটির কথা।
আমার ঘুম হতো না রাতে। কেবল কানভরে ঢেউয়ের গর্জন আর মাম্মা ডাক। মাঝে মধ্যে নোনা জলের গন্ধ ঝাপটা দিতো নাকে। সে কী বলতে চায় আমাকে? ওই শুরু। সময় পেলেই জলের ধারে। বার্কলি বিচ আমার বাড়ি থেকে ১০ মিনিটের ড্রাইভ। পুরো সামার প্রায় প্রতিদিন গিয়েছি। কোনো কোনোদিন দু’বার। মনে হতো হেঁটে চলে যাই ঢেউয়ের চূড়ায় তার খোঁজে।
সেদিন লাইব্রেরি থেকে বেরিয়েও এসেছিলাম গোধূলিবেলায়। দিন ছোট হচ্ছে। গাড়ি পার্ক করে পাথরের সিঁড়ি ভেঙে জলের কাছে যেই এলাম সেই সূর্য ডোবার আনজাম করছে। ভদ্রলোককে শুরুতে খেয়াল করিনি। বালিটা পেরিয়ে হাঁটুজলে দাঁড়িয়েছিলাম। মাংস কেটে হিম ঢোকাচ্ছিল ঠান্ডা কনকনে জল। সূর্যটা বাম কোণায় লাল চোখে শেষ জরিপ করছে। কেউ নেই আশপাশে। মনে হলো আজই ওইদিন! এই অস্থিরতার শেষ হোক আজ। হঠাৎ দেখি তাকে। আমার ডানপাশে। একটু দূরে যেন জল ফুঁড়ে বের হলেন! উবু হয়ে জলের নুড়ির খাঁজ থেকে কিছু একটা বের করার চেষ্টা করছিলেন। আচমকা মাথা তুললেন এবং আমাকে বললেন, ‘সাহায্য করবে একটু?’ আমাকে ঝট করে কেউ যেন টেনে ফেরালো তীরে। এগিয়ে গেলাম। তিনি দেখালেন ছোট, প্রায় দেখা যায় না এমন গোলাপি আভার কাচের টুকরোটি। এবার আমার অবাক হওয়ার পালা! এতো ছোট টুকরো নজরে এলো কীভাবে? তার বাঁকানো লোহার শলাটা দিয়ে টেনে বের করতে পারছিলেন না। হাত ডুবিয়ে নখের খোঁচায় দু’তিনবারের চেষ্টায় বেরিয়ে এলো বাইরে। কী সুন্দর! আমার হাত জমে গিয়েছিল ঠান্ডায়। তিনি উঁচু করে সূর্যের দিকে মেলে ধরলেন টুকরোটি। এরপরই জানালেন, বাবল নেই এতে। চাইলে আমি রাখতে পারি। হাত পেতে নিয়েছিলাম। মুঠোবন্দি করার সঙ্গে সঙ্গে আমার হাতের ওম ফিরে এসেছিল। ভেতরে অন্য রকম প্রশান্তি অনুভব করছিলাম। চোখ তুলতেই দেখি চলে যাচ্ছেন তিনি।
বাড়ি ফিরে লাইটের আলোয় আবিষ্কার করেছিলাম কাচপাথরটি গোলাপি নয়, হালকা বেগুনি। অন্য রকম। অদ্রিশ এলেই তাকে দেখাই। সেও অবাক হয়! নাইটস্ট্যান্ডের ওপর ছোট পোর্সেলিনের বাটিটার ভেতরে রেখেছিলাম। অনেক দিন পর ওই রাতে শিশুর মতো ঘুমিয়েছিলাম। সকালে বেশ দেরি করেই ঘুম ভাঙে। চোখ খুলেই পাথরটার কথা মনে হয়। অদ্রিশ ততোক্ষণে চলে গেছে কাজে। কিন্তু পাথরটা গেল কোথায়! টেবিলের নিচে, আশপাশে তন্ন তন্ন খুঁজি। কোত্থাও নেই। হালকা সন্দেহ ছুঁয়ে যায়। ছবিটি ফেলে দিয়েছিল, কাচটাও কি?
মন খারাপ করে বসে ছিলাম। হঠাৎ মনে পড়লো, তিনি বলেছিলেন- ‘বাবল নেই, তুমি চাইলে রাখতে পারো।’ বাবল দেয়া কাচ মানে কী? আমি ল্যাপটপ নিয়ে বসি। এরপরই খুলে যায় এক অদ্ভুত দুনিয়া। কখন যে বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যা হলো তা জানতেই পারিনি। অদ্রিশ এসে আলো জ্বালে। ঘরের কাজ কিছুই হয়নি। খাওয়া-দাওয়াও না। অদ্ভুত চোখে সে দেখছিল আমাকে। কাচটির কথা আমার মনেই নেই আর। উচ্ছ্বাস চেপে রাখতে পারি না- ‘জানো, বাবল দেয়া কাচগুলোর অনেক দাম এখন। এগুলো হাতে তৈরি কাচ। গ্লাস ব্লো করে কাচের বোতল বানানো হতো তখন। গোলাপি কাচটি কেমন বেগুনে লাগছিল না? ওটা অনেক আগের। ১৯১৫ সালের পর এখানে এমন কাচ আর বানানো হয় না। এতে ম্যাঙ্গানিজ মেশানো। সাদা ছিল এক সময়। সূর্যের আলোয় এমন বেগুনি হয়ে গেছে।’ আমাকে কথায় পায়। অদ্রিশ অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ! তারপর আমার ড্রেসিংটেবিলের ওপর গয়নার বাক্স থেকে কাচের টুকরোটি বের করে হাতে দেয়। ওই অদ্ভুত প্রশান্তি ফিরে আসে।
সেদিন রাতে আমার চোখের পাতা লাগতেই স্বপ্নে দেখি গোধূলিবেলা। চিক চিক বালির ভেতর সবুজ, হলুদ, লাল- আরো কত রঙ! এরপর থেকেই আমার জলকাচের নেশা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়েছি জলের ধারে, সৈকতে। কাচ পাওয়ার সম্ভাব্য সময়গুলো জেনেছি। জেনেছি পূর্ণিমায় যখন চারপাশ ভেসে যায় তখন ঢেউ বয়ে আনে জলকাচ। ভাটার দু’ঘণ্টা আগে বা পরে বেড়ে যায় ওইসব গুপ্তধন পাওয়ার সম্ভাবনা। ভিড় ছাপিয়ে আমার মতো কাচপ্রেমীদের ক্রমেই আলাদা চিনতে শিখেছি। জেনে গিয়েছি কাচ সংগ্রাহকদের অদৃশ্য কঠোর নিয়ম। ঢেউয়ের ওই দান সবটুকু নেয়া যায় না, কিছু রেখে আসতে হয়। মাঝে মধ্যে অদ্রিশও সঙ্গী হয় আমার।
মেয়েটি ফোন দিয়েছিল দু’তিন দিন পর। তার নাম লরা। জানিয়েছিল, তার দাদু তথা রন আলঝেইমারের রোগী। প্রায় ২০ বছর আগে এক দুর্ঘটনায় ওই সাগরেই ডুবে মৃত্যু হয়েছিল তার মেয়ের। তিনি লরার মা। জলকাচের গয়না গড়তেন তিনি। দূর-দূরান্ত থেকে মেয়ের জন্য কাচ কুড়িয়ে আনতেন তিনি। কাচ নিয়ে তার অগাধ পড়াশোনা। চোখের দেখায় নির্ভুল বলে দিতে পারতেন সময় বা কাচের মূল্যমান। আলঝেইমার ধরা পড়েছিল বেশ আগে। ক্রমেই গুটিয়ে নিচ্ছিলেন নিজেকে। গত এক বছর লোকজনের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। স্টেইজ ফাইভ। এমনই হওয়ার কথা। স্মৃতি চলে গেছে এরও আগে। লরা অবাক হয়েছিল সেদিন! কেননা এক বছর পর তার দাদু পুরো অর্থপূর্ণ বাক্য বলেছেন। সে বললো, ‘কাল তোমরা আমার দাদুকেও নতুন জীবন দিলে। ধন্যবাদ তোমাদের।’ লরার ধারণা, রন তার মেয়ের ছাপ দেখেছিলেন আমার মধ্যে। তাই জেনে-বুঝেই অসাধারণ কাচটি আমাকে দিয়েছিলেন তিনি। ফোন রেখে দেয়ার পর লকেটটা হাতে নিয়ে দেখছিলাম। কেমন গাঢ় বেগুনি লাগছে যেন! হয়তো মনের ভুল।
আমার শরীরের ভেতর বাড়ছে আমার কঙ্কাবতী। ‘মাম্মা’- আমি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি। আমি জানি, সে থাকবে এবার।

মুক্তিযুদ্ধের সার্থকতার জন্য

যতীন সরকার

 

‘উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ বিরানায়, মুক্তিযুদ্ধ
হায়, বৃথা যায়, বৃথা যায়, বৃথা যায়।’
- শামসুর রাহমান

 

কবির এই খেদোক্তি মিথ্যা নয় নিশ্চয়ই। মুক্ত স্বদেশকে উদ্ভট উটের পিঠে চলতে আমরা সবাই তো দেখেছি ও দেখছি, এখনো সে চলার বিরাম হয়নি। সেই চলাকে আমরা কখনোই যে মেনে নিয়েছি, তাও নয়। উদ্ভট উটের পিঠ থেকে আমার স্বদেশকে নামিয়ে আনার চেষ্টাও আমরা করেছি। আমাদেরই মধ্যে এ রকম চেষ্টা করতে গিয়ে যার বুক-পিঠ ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিল তার নাম নূর হোসেন। মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য নূর হোসেনের আত্মত্যাগের কথা আমরা গর্বের সঙ্গে স্মরণ করি। কবি শামসুর রাহমানও তাই করেছেন। কিন্তু নূর হোসেনের হত্যাকারী ধর্মান্ধের দল এখনো আমাদের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিধর এবং সেই শক্তির প্রকাশ তারা প্রতিনিয়তই ঘটিয়ে যাচ্ছে। শামসুর রাহমানের মতো কবিকেও তাদের শক্তির লক্ষ্যবস্তু করেছিল। এ সম্পর্কে কবি আবু হাসান শাহরিয়ার লিখেছেন- 

“বুকেপিঠে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ লিখে রাজপথে প্রাণ দিয়েছিলেন নূর হোসেন। তাকে নিয়ে একটি কবিতা লিখেছিলেন শামসুর রাহমান- ‘বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়’। ওই বুক শামসুর রাহমানের নিজেরও ছিল। সেখানে সেক্যুলার মানবতার পদ্ম ফুটতো। ওই পদ্ম অসহ্য বলে ধর্মান্ধরা তাকে খুন করতে চেয়েছিল। ছেলে ফায়াজের উপস্থিত বুদ্ধির কারণে বেঁচে গিয়েছিলেন সে যাত্রায়। আরো একটি ওই রকম বুকের মানুষ ছিলেন হুমায়ুন আজাদ। সে বুকও রক্তাক্ত করেছিল ধর্মান্ধরা।”
শামসুর রাহমান ও হুমায়ুন আজাদ- দু’জনই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। কিন্তু তাদেরই মতো যাদের বুকে ‘সেক্যুলার মানবতার পদ্ম’ ফোটে তারা আজও অসহায়। ধর্মান্ধদের কাছে ওই ‘পদ্ম’টি আজও অসহ্য। অথচ ওই সেক্যুলার মানবতার পদ্মটিকে অধিগত করাই ছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
পাকিস্তানি শাসনে ওই পদ্মটি ছিল আমাদের নাগালের বাইরে। তাই ওই পদ্মটিকে পাওয়ার জন্য পাকিস্তানকেই আমরা প্রত্যাখ্যান করেছিলাম, আমরা সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামে নেমেছিলাম এবং স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে ওই সংগ্রামের সমাপ্তি
ঘটিয়েছিলাম। কিন্তু তাতে আমাদের মুক্তি সংগ্রামের সমাপ্তি ঘটেনি, বরং স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই সে সংগ্রামের প্রকৃত সূচনা ঘটেছিল। সেই সূচনাতেই আমরা একটি পাকা দলিল তৈরি করে রাষ্ট্রের ওপর আমাদের (অর্থাৎ জনগণের) মালিকানা পাকা করে

নিয়েছিলাম। সেই দলিলটির নাম ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান’। অভিজ্ঞজনরা বলেন, এমন সংবিধান নাকি পৃথিবীর খুব কম রাষ্ট্রেরই আছে। আমাদের সংবিধানটি তো আসলে লেখা হয়েছে লাখ লাখ শহীদের রক্তের অক্ষরে। এর প্রতিটি বাক্য সেই রক্তের ঋণ পরিশোধের অঙ্গীকারের ধারক। অবিরাম মুক্তি সংগ্রাম চালিয়ে গিয়েই সেই অঙ্গীকার পূরণ করা সম্ভব হতে পারে। দেশের প্রতি মানুষকে ক্ষুধা, নগ্নতা, অশিক্ষা, কর্মহীনতা ও অনিরাপত্তা থেকে মুক্তি দেয়াই অবিরাম এবং অনিঃশেষ মুক্তি সংগ্রামের লক্ষ্য। সে লক্ষ্যকে সামনে রেখেই আমরা স্বাধীন দেশে পথচলা শুরু করেছিলাম। স্বাধীনতাকে সার্থক করে তোলার প্রত্যয়ই ধারণ করেছিল আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধুই হয়েছিলেন মুক্তি সংগ্রামেরও সেনাপতি।
কিন্তু হায়, আমাদের সেনাপতিকেই সপরিবারে নিহত করে অট্টহাস্য করে উঠলো স্বাধীনতা তথা মুক্তিযুদ্ধের ঘৃণ্য দুশমনরা। তাদের অট্টহাস্যকে স্তব্ধ করে দিতে পারলাম না আমরা। কেবল নিষ্ফল ক্ষোভে আঙুল কামড়ানো ছাড়া কিছুই যেন করার রইলো না আমাদের। আমাদের সংবেদনশীল কবিদের কণ্ঠেও হাহাকার ধ্বনিত হয়ে উঠলো। এমনই এক কবি অকাল প্রয়াত রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। ‘বাতাসে লাশের গন্ধ’ অসহ্য হয়ে ওঠায় রুদ্ররোষে তিনি বলে উঠলেন-
‘স্বাধীনতা- এ কি তবে নষ্ট জন্ম?
এ কি তবে পিতাহীন জননীর লজ্জার ফসল!
জাতির পতাকা আজ খামচে ধরছে পুরনো শকুন।
বাতাসে লাশের গন্ধ-
নিয়ন আলোয় তবু নর্তকীর দেহে দোলে মাংসের তুফান।’

বাতাসে লাশের গন্ধ এখনো মিলিয়ে তো যায়ইনি, প্রতিনিয়ত সে গন্ধ বরং বাতাসকে কেবলই দূষিত করে চলছে। সেই গন্ধের হাত থেকে কি মুক্তি মিলবে না আমাদের?
মিলবে অবশ্যই। তবে সে মুক্তি আপনাআপনিই আমাদের হাতে এসে ধরা দেবে, আমাদের কিছুই করতে হবে না- এমন ভেবে আত্মপ্রসন্ন হয়ে বসে থাকলে সেটি হবে মূর্খের স্বর্গবাস। ওরকম মেকি স্বর্গ থেকে মাটিতে নেমে আসতেই হবে। আত্মপ্রসাদের সামান্যতম অবকাশও নেই। জাতির পতাকাকে যারা খামচে ধরেছে সেই পুরনো শকুনগুলোর নোংরা হাতগুলো ভেঙে না দেয়া পর্যন্ত আমাদের পরিত্রাণ নেই। শুধু পুরনো শকুন নয়, তাদের নতুন চেলাগুলোও রেয়াত দেয়া চলবে না। মিত্রের বেশ ধরে আমাদের ভেতরে ঢুকে পড়া শত্রুদের যথাসময়ে চিনতে পারিনি বলেই অনেক বিপত্তি এতকাল ধরে পোহাতে হয়েছে। এখনো যদি শত্রু-মিত্র চিনে নিতে না পারি তাহলে সেসব বিপত্তি আরো বহু গুণিত হয়ে দেখা দেবে।
সমস্ত বিপত্তি থেকে পরিত্রাণ লাভের একমাত্র উপায়ই হলো মুক্তি সংগ্রামের মূল্যবোধের আলোয় পথচলা। আমাদের শত্রুদের লক্ষ্যই হলো সেই আলোটি নিভিয়ে ফেলা, অন্তত জনগণের দৃষ্টিসীমা থেকে আলোটিকে দূরে নিয়ে যাওয়া। সেই আলোকবর্তিকাটি আড়াল করে খোঁপ খোঁপ অন্ধকার তারা এখানে-সেখানে ছড়িয়ে দিচ্ছে। এ রকম অন্ধকারের মূল উপাদানই হলো ধর্মান্ধতা। স্পষ্ট করে বলি- ধর্ম নয়, ধর্মান্ধতা। আমাদের মানুষের ধর্মপ্রাণতা হচ্ছে ‘ধর্ম’ শব্দটির মূল মর্মের ধারক আর ধর্মান্ধতা ধর্মের মূল মর্মেরই সংহারক। ধর্মপ্রাণদের চিত্ত শুভবুদ্ধি ও মুক্তবুদ্ধিতে ভরপুর বলেই সাম্প্রদায়িকতা তাদের কাছে একান্তই ঘৃণ্য। অন্যদিকে সাম্প্রদায়িকতাই ধর্মান্ধদের আশ্রয়। জনগণের ইহলৌকিক মঙ্গলবিধায়ক অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রকেও তারা ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িকতার আওতায় নিয়ে আসার কোশেশ করে। দেশের ধর্মপ্রাণ লোকসাধারণের কাছে ধর্ম হচ্ছে তাদের অন্তরের গভীরে সুরক্ষিত অমূল্য সম্পদ। আর ‘হৃদয়ের অন্তস্তলে যে মানিক গোপনে জ্বলে সে মানিক কভু কি কেউ বাজারে বিকায়?’ অথচ ধর্মান্ধরা তো ধর্মকে বাজারের পণ্যেই পরিণত করে ফেলে।
ধর্মের এ রকম বাজারি পণ্য হওয়া রোধ করতেই আমাদের স্বাধীন রাষ্ট্রটিকে আমরা সেক্যুলার মানবতার পদ্ম দিয়ে ভরিয়ে তুলতে চেয়েছিলাম। কারণ ওরকম রাষ্ট্রেই তো ‘গণতন্ত্র’ তার সহস্র দল মেলে সবার জন্য সুবাস ছড়ায় এবং সেই গণতন্ত্রই রাষ্ট্রের সব অধিবাসীর জন্য অন্ন-বস্ত্র-শিক্ষা-বাসস্থান-কর্মসংস্থান-নিরাপত্তার নিশ্চিত ব্যবস্থা করে। কিন্তু একান্ত দুঃখ এই- সেই একান্ত বাঞ্ছিত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় আমরা চূড়ান্ত ব্যর্থ হয়েছি।
হ্যাঁ, গণতন্ত্রের একটা কাঠামো আমরা বজায় রেখেছি বটে কিন্তু তন্ন তন্ন করে খুঁজেও সেই কাঠামোর অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের অন্তঃসারের দেখা মিলবে না। জনগণ তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করে সংসদে বা অন্যত্র পাঠায়। উদ্দেশ্য- প্রতিনিধিরাই গণতন্ত্রকে সার্থক করে তুলবে। আসলে সেটি হয় কী!
হয় না যে, সে কথা বোঝানোর জন্য একটুও বাকবিস্তারের প্রয়োজন পড়ে না। এটি সর্বজনজ্ঞাত সত্য। সংসদকে ফালতু বানিয়ে তোলার ক্ষেত্রে, মাসের পর মাস সংসদে না গিয়ে সংসদ সদস্যের সব সুবিধা গ্রহণের ক্ষেত্রে, সংসদে গিয়েও জনগণের সমস্যা-সংকটের সমাধান খোঁজার বদলে নোংরা খিস্তিখেউড়ের আসর জমিয়ে তোলার ক্ষেত্রে- ‘ক’ দল আর ‘খ’ দলের মধ্যে কোনোই তফাত দেখতে পাওয়া যায় না। ভোটের আগেকার ও পরেরকার জনপ্রতিনিধিদের আচার-আচরণ দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভোটার জনগণকে বলতে হয়- ‘যে যায় লঙ্কায় সে-ই হয় রাবণ।’
এ অবস্থারও অবসান ঘটিয়ে রাষ্ট্রের ওপর জনগণের মালিকানার যথাযথ প্রতিষ্ঠা করা যায় অবশ্যই। এরই সুলুক সন্ধান আমাদের সংবিধানেই পাওয়া যায়। আমাদের সংবিধানে যে ‘বিকেন্দ্রীকরণ’-এর কথা বলা হয়েছে এর তাৎপর্য একান্তই গভীর। শাসক ব্যবস্থার প্রকৃত বিকেন্দ্রীকরণের মধ্য দিয়েই রাষ্ট্রের ওপর জনগণ তার মালিকানার প্রকৃত স্বাদ উপভোগ করতে পারে। কিন্তু সংবিধানের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে যারা ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের বদলে কেন্দ্রীকরণকেই শক্তপোক্ত করে যাচ্ছে তারাও আমাদের অচেনা নয়।
আমাদের ঐতিহ্যবাহী ছাত্র আন্দোলনের কথা এখন আমাদের স্মৃতিতেই আছে কেবল। এখনকার মূলধারার ছাত্র আন্দোলনের অবস্থান অমুক বা তমুক রাজনৈতিক দলের ছত্রচ্ছায়ায়। এসব ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে ছাত্রের চেয়ে অছাত্রেরই সংখ্যাধিক্য। তাদের মূল কাজ চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখলবাজি এবং আরো নানান ধরনের ‘বাজি’। এসব ‘বাজিকর’দের কবলে পড়ে পরিত্রাহি চিৎকার করতে হচ্ছে নিরীহ জনগণকেই। কিন্তু বাজিকররা বাজি দেখায় যাদের সুতার টানে তারা আমাদের অতিচেনা হলেও তাদের কেশাগ্র স্পর্শ করার ক্ষমতাও আমাদের কারোরই নেই।
জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী তার একটি সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রের এসব অনর্থের জন্য আমাদের সরকারগুলোর ‘সামর্থ্যরে অভাব’কে চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেছেন-
“সামর্থ্যরে অভাব যে রয়েছে তার প্রমাণ হ’ল সংসদীয় নির্বাচনে যারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসছেন, একটি জরিপে তাদের সবার জন্য একটি প্রশ্ন ছিল, নির্বাচিত হলে আপনি কী করবেন? জবাব প্রায় এক রকমেই ছিল- এলাকার রাস্তাঘাট, শিক্ষা-স্বাস্থ্য কোনো একটা বিষয়ে কিছু করা। ৩০০ জনের মধ্যে একজনও বলেননি, তিনি নতুন কোনো আইন চান বা প্রচলিত কোনো আইনের সংস্কার চান। এ থেকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তাদের চাওয়ার কোনো প্রকৃত রাজনৈতিক ভিত্তি নেই এবং আইন প্রণেতা হিসেবে তাদের কোনো প্রকৃত প্রস্তুতি নেই বা প্রকৃত যোগ্যতা নেই। অন্য কথায় আমাদের সংসদ গঠিত হয়েছে একদল আইনের প্রশ্নে অজ্ঞ ব্যক্তির সমন্বয়ে। স্বাভাবিক নিয়মে সংসদ সদস্যদের সংখ্যাগুরু অংশ আইন বিষয়ে অভিজ্ঞ হবেন। আমাদের জাতীয় সংসদে এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেছে। ফলে যা হওয়ার তাই-ই হয়েছে।”
এ রকম অবাঞ্ছিত অবস্থার অবসানের জন্য প্রয়োজন সচেতন নাগরিকদের সার্থক কর্মপন্থা গ্রহণ। এ রকম কর্মপন্থা গ্রহণের মানে হলো একটি তীব্র তীক্ষè সামাজিক আন্দোলনের সৃষ্টি করা। মুক্তিযুদ্ধকে সার্থক করে তোলার জন্য এ রকম সামাজিক আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই। এ রকম সামাজিক আন্দোলনের সাফল্যের মধ্য দিয়েই কাক্সিক্ষত বাংলাদেশের সৃষ্টি হতে পারে। সে রকমটি হলেই কোনো কবিকে আর সখেদে বলতে হবে না, ‘মুক্তিযুদ্ধ হায়, বৃথা যায়, বৃথা যায়, বৃথা যায়।’

 


লেখক : শিক্ষাবিদ ও সমাজচিন্তক

 

এলো বৈশাখ

 

বয়ে যাওয়া সময়ের স্রোতে বসন্ত চলে গেল নীরবে অনেক ঘটনার সাক্ষি হয়ে। আর এই ‘চলে যাওয়া মানেই প্রস্থান নয়’, ফিরে আসার নতুন প্রস্তুতি। বসন্ত যে অপার রূপসুধা রেখে গেল প্রকৃতির ভাঁজে ভাঁজে তাকে ভিন্নমাত্রা দিতে এসেছে বৈশাখ।
ষড়ঋতুর প্রতিটি মাস স্বতন্ত্র। তবে কোথায় যেন মিশ্রিত অদ্ভুত রসায়নে। বৈশিষ্ট্যে আলাদা হলেও রূপ-বৈচিত্র্য প্রকাশে কারো কমতি নেই।

বাংলার বারোটি মাস বাজার অর্থনীতি ও সংস্কৃতির আগ্রাসনে বর্তমান নগর জীবনে তেমন প্রভাব বিস্তার করতে না পারলেও গ্রামবাংলার সামাজিক জীবনে বাংলা সন এখনো সচল। জন্ম, মৃত্যু, বিয়ের মতো সামাজিক অনুষ্ঠানগুলো এবং কৃষকের ফসল বোনা ও তোলা কর্মকা-ে বাংলা সন-তারিখ এখনো কার্যকর। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পূজা-পার্বণ, উপবাস, শ্রাদ্ধ-শান্তি- সব অনুষ্ঠানই বাংলা সন-তারিখের হিসাবে হয়ে থাকে।
মোগল সম্রাট আকবর কর আদায়ের সুবিধার্থে বাংলা সন প্রবর্তন করেছেন বলে কথিত থাকলেও এ নিয়ে বিতর্কের অবকাশ রয়েছে। হিজরি সনের ওপর ভিত্তি করা হলেও বঙ্গাব্দের গঠন পদ্ধতি ভারতীয় শকাব্দের মতো। অথচ এটি শকাব্দের সমগোত্রীয় নয়। শকাব্দ বা বিক্রমাব্দের মাস ও দিনের নামের অনুরূপ বাংলা সনের মাস ও দিনের নাম। তবে শকাব্দের প্রথম মাস চৈত্র আর বিক্রমাব্দের শুরুর মাস কার্তিক। অথচ বাংলা সনের প্রথম মাস হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে শকাব্দের দ্বিতীয় এবং বিক্রমাব্দের সপ্তম মাস বৈশাখকে। পেছনে তাকালে দেখা যাবে, বঙ্গদেশের ফসলি সনের প্রথম মাস অগ্রহায়ণের অবস্থান বাংলা সনে অষ্টম। স্মরণাতীতকাল থেকেই ধন-ধান্যে ভরা অগ্রহায়ণ মাসকে বছরের প্রথম ধরে বর্ষ গণনার রীতি প্রচলন ছিল এ অঞ্চলে। অগ্রহায়ণ হলো বছরের অগ্রে যে যায়। কৃষির দিক বিবেচনায় আনলে ফসল কাটার মাস অগ্রহায়ণ হওয়ার কথা বছরের শুরুর মাস। আবার আনন্দ-উৎসবের জন্যও গ্রীষ্মকাল শীত বা বসন্তের মতো মনোরম নয়। তাহলে নববর্ষ কেন শুরু হলো গ্রীষ্মের বৈশাখে তা এখনো রহস্যময়। তবে যিনিই বাংলা সনের প্রবর্তন করে থাকেন না কেন, তিনি যে হালখাতা ও পুণ্যাহর মাধ্যমে বাঙালির উৎপাদন ও বণ্টন ব্যবস্থার সঙ্গে অর্থনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবন চমৎকার সমন্বয়ে অচ্ছেদ্যভাবে বেঁধে দিয়েছিলেন এতে সন্দেহ নেই। তবে এটিও ঠিক সময়ে সব বাঁধনই শিথিল হয়ে যায়। অনেক ঐতিহ্য বাঙালির জীবন থেকে বিস্মৃত না হলেও ঠাঁই নিয়েছে কাগজ, গল্প ও কবিতায়।

বছরের শুরুটি উৎসবমুখর করে তুলেছেন বাঙালি সাধ্যমতো। শুরুর দিনটি অতীত ও ভবিষ্যতের মেলবন্ধনের রঙিন স্মারক করে রাখতে চায় বাঙালি ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্রীয় জীবনে। কিন্তু বাংলা নববর্ষ পালন হলো কতোটুকু বাঙালিয়ানায়? কতোটা সরে আসতে হয়েছে আবহমান ঐতিহ্য থেকে? কতোটা নিতে গিয়ে কতোটুকু হারালো বাংলা সংস্কৃতি নিজের স্বকীয়তা? এর জবাব আমরা পেয়ে যাবো ষড়ঋতুর বারো মাসে বাঙালির যাপিত জীবনের প্রতিটি দিনে। তবে নতুন বাংলা বছরটি জাতীয় জীবনে বাঙালি খুঁজে পাক আপন ছন্দ, দ্বন্দ্ব ভুলে। সকল পঙ্কিলতা ধুয়ে দেশ এগিয়ে যাক এই হোক প্রর্থনা।

 

লেখা : শাকিল সারোয়ার
মডেল : আইরিন
পোশাক : নিপুন
ছবি : ফারহান ফয়সাল

এলো বৈশাখ

 

বয়ে যাওয়া সময়ের স্রোতে বসন্ত চলে গেল নীরবে অনেক ঘটনার সাক্ষি হয়ে। আর এই ‘চলে যাওয়া মানেই প্রস্থান নয়’, ফিরে আসার নতুন প্রস্তুতি। বসন্ত যে অপার রূপসুধা রেখে গেল প্রকৃতির ভাঁজে ভাঁজে তাকে ভিন্নমাত্রা দিতে এসেছে বৈশাখ।
ষড়ঋতুর প্রতিটি মাস স্বতন্ত্র। তবে কোথায় যেন মিশ্রিত অদ্ভুত রসায়নে। বৈশিষ্ট্যে আলাদা হলেও রূপ-বৈচিত্র্য প্রকাশে কারো কমতি নেই।

বাংলার বারোটি মাস বাজার অর্থনীতি ও সংস্কৃতির আগ্রাসনে বর্তমান নগর জীবনে তেমন প্রভাব বিস্তার করতে না পারলেও গ্রামবাংলার সামাজিক জীবনে বাংলা সন এখনো সচল। জন্ম, মৃত্যু, বিয়ের মতো সামাজিক অনুষ্ঠানগুলো এবং কৃষকের ফসল বোনা ও তোলা কর্মকা-ে বাংলা সন-তারিখ এখনো কার্যকর। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পূজা-পার্বণ, উপবাস, শ্রাদ্ধ-শান্তি- সব অনুষ্ঠানই বাংলা সন-তারিখের হিসাবে হয়ে থাকে।
মোগল সম্রাট আকবর কর আদায়ের সুবিধার্থে বাংলা সন প্রবর্তন করেছেন বলে কথিত থাকলেও এ নিয়ে বিতর্কের অবকাশ রয়েছে। হিজরি সনের ওপর ভিত্তি করা হলেও বঙ্গাব্দের গঠন পদ্ধতি ভারতীয় শকাব্দের মতো। অথচ এটি শকাব্দের সমগোত্রীয় নয়। শকাব্দ বা বিক্রমাব্দের মাস ও দিনের নামের অনুরূপ বাংলা সনের মাস ও দিনের নাম। তবে শকাব্দের প্রথম মাস চৈত্র আর বিক্রমাব্দের শুরুর মাস কার্তিক। অথচ বাংলা সনের প্রথম মাস হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে শকাব্দের দ্বিতীয় এবং বিক্রমাব্দের সপ্তম মাস বৈশাখকে। পেছনে তাকালে দেখা যাবে, বঙ্গদেশের ফসলি সনের প্রথম মাস অগ্রহায়ণের অবস্থান বাংলা সনে অষ্টম। স্মরণাতীতকাল থেকেই ধন-ধান্যে ভরা অগ্রহায়ণ মাসকে বছরের প্রথম ধরে বর্ষ গণনার রীতি প্রচলন ছিল এ অঞ্চলে। অগ্রহায়ণ হলো বছরের অগ্রে যে যায়। কৃষির দিক বিবেচনায় আনলে ফসল কাটার মাস অগ্রহায়ণ হওয়ার কথা বছরের শুরুর মাস। আবার আনন্দ-উৎসবের জন্যও গ্রীষ্মকাল শীত বা বসন্তের মতো মনোরম নয়। তাহলে নববর্ষ কেন শুরু হলো গ্রীষ্মের বৈশাখে তা এখনো রহস্যময়। তবে যিনিই বাংলা সনের প্রবর্তন করে থাকেন না কেন, তিনি যে হালখাতা ও পুণ্যাহর মাধ্যমে বাঙালির উৎপাদন ও বণ্টন ব্যবস্থার সঙ্গে অর্থনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবন চমৎকার সমন্বয়ে অচ্ছেদ্যভাবে বেঁধে দিয়েছিলেন এতে সন্দেহ নেই। তবে এটিও ঠিক সময়ে সব বাঁধনই শিথিল হয়ে যায়। অনেক ঐতিহ্য বাঙালির জীবন থেকে বিস্মৃত না হলেও ঠাঁই নিয়েছে কাগজ, গল্প ও কবিতায়।

বছরের শুরুটি উৎসবমুখর করে তুলেছেন বাঙালি সাধ্যমতো। শুরুর দিনটি অতীত ও ভবিষ্যতের মেলবন্ধনের রঙিন স্মারক করে রাখতে চায় বাঙালি ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্রীয় জীবনে। কিন্তু বাংলা নববর্ষ পালন হলো কতোটুকু বাঙালিয়ানায়? কতোটা সরে আসতে হয়েছে আবহমান ঐতিহ্য থেকে? কতোটা নিতে গিয়ে কতোটুকু হারালো বাংলা সংস্কৃতি নিজের স্বকীয়তা? এর জবাব আমরা পেয়ে যাবো ষড়ঋতুর বারো মাসে বাঙালির যাপিত জীবনের প্রতিটি দিনে। তবে নতুন বাংলা বছরটি জাতীয় জীবনে বাঙালি খুঁজে পাক আপন ছন্দ, দ্বন্দ্ব ভুলে। সকল পঙ্কিলতা ধুয়ে দেশ এগিয়ে যাক এই হোক প্রর্থনা।

 

লেখা : শাকিল সারোয়ার
মডেল : আইরিন
পোশাক : নিপুন
ছবি : ফারহান ফয়সাল

 তিন কুড়িতে দেড় কুড়ি

 

 

‘আমরা নূতন যৌবনেরই দূত।

                আমরা চঞ্চল, আমরা অদ্ভুত।

                                 

 

রবি ঠাকুরের এ লেখায় মনে হতেই পারে, গতি যেমন জীবনের অনুভূতি ঠিক তেমনি চঞ্চলতা তারুণ্যের। যে চটপটে আর চঞ্চল তাকেই কম বয়সের প্রতীক ধরা হয়।

তারুণ্যের গল্প অনেকটা এ রকম হতে পারে- ‘হাই সুইটি, কাম অন লেটস ডান্স।’ ক্লাবের অনুষ্ঠানে মাহমুদ এভাবেই আহ্বান জানালেন বন্ধুপতœী সোহেলি পারভীনকে। গত জুনে মাহমুদ ৬০ অতিক্রম করে ৬১ বছরে পা দিয়েছেন! আর সোহেলি তার চেয়ে প্রায় অর্ধেক বয়স। এভাবেই মাহমুদ মত্ত থাকেন, মাতিয়ে রাখেন বন্ধুবান্ধবকে। ক্লাবের অনুষ্ঠান, পিকনিক, স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ-নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট ম্যাচ- সব জায়গাতেই তার সরব ও স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি। তিনি আসরে থাকা মানেই আসর প্রাণবন্ত। চমৎকারভাবে শরীরটাকেও ফিট রেখেছেন। মেদহীন একহারা গড়ন তার শরীরের। ভোরে নিয়মিত হাঁটেন, ব্যায়াম করেন। সন্ধ্যায় কয়েক মিনিট যোগ ব্যায়াম সেরে নেন। তাকে দেখে বোঝার উপায়ই নেই, তিনি অবলীলায় পার করেছেন তিন-তিনটি কুড়ি একযোগে।

বয়স কিংবা সময়- এ ভাবনাটি থাকে মনে কিংবা মস্তিষ্কে। সবাই বড় হতে চান। তবে কেউই বুড়ো হতে চান না। ৩০ বছর পার হতে না হতেই যদি নিজেকে বয়স্ক মানুষ ভাবতে থাকেন তাহলে দেহ ও ত্বকে এর প্রভাব অবশ্যই পড়বে। সবকিছুর দোষ বয়সের কাঁধে চাপিয়ে দেবেন না। মনের ভেতর ইচ্ছাশক্তি জাগিয়ে রাখুন। দেহ ও ত্বকে তারুণ্য ধরে রাখতে কাজ করুন। কল্পনায় ফেলে আসা দিনগুলো দেখতে থাকেন। কিন্তু কেমন হয় যদি চল্লিশের কোঠা পার হয়েও নিজের মধ্যে  ত্রিশের তারুণ্য ধরে রাখতে পারেন!

তারুণ্য ধরে রাখতে শারীরিক ব্যায়াম করা যতটা জরুরি ঠিক ততটাই গুরুত্বপূর্ণ মানসিক ব্যায়াম। কিছু প্রয়োজনীয় বিষয় খেয়াল করে চলতে পারলে আপনিও ধরে রাখতে পারবেন আপনার তারুণ্য। যদি আমাদের জীবনধারা ও খাবার তালিকায় কিছু পরিবর্তন করি তাহলেই আমরা অনেক বয়স পর্যন্ত চেহারায় তারুণ্য বজায় রাখতে পারি গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর কিছু মনের ব্যায়াম এবং তারুণ্য ধরে রাখার কিছু কৌশল

তুলে ধরা হলো-

 

 

ঘুম : সঠিক সময়ে ঘুমানো, রাত না জাগা, পর্যাপ্ত ঘুম এবং ভোরে ঘুম থেকে উঠলে শরীর সতেজ রাখে। অযথাই বেশি রাত জাগবেন না। প্রতিরাতে অন্তত ৬-৭ ঘণ্টা ঘুমান।

হাসি-কান্না : অনাবিল হাসি আমাদের হার্টের জন্য উপকারী। গবেষণায় দেখা গেছে, মনখুলে হাসলে আয়ু বাড়ে। এমনকি চোখের জল ঝরানো কান্নাও যে স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে তা বহু বছর ধরেই ছিল অজানা। ইউনিভার্সিটি অফ সাউথ ফ্লোরিডা ফাউন্ড ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় দেখা গেছে, কান্নার পর যে কোনো মানুষই বেশ স্বস্তি অনুভব করে।

 

বিভিন্ন মানসিক চ্যালেঞ্জ গ্রহণ : মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে মনটাকে কাজে ব্যস্ত রাখার কোনো বিকল্প নেই। ছোটবেলায় আমারা নানান খেলার ছলে মনের ব্যস্ত রাখতাম। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের বহুবিধ মানসিক চাপ বেড়েছে। তাই মনকে নান বিষয়ে ব্যস্ত রাখতে হবে।

মানসিক চাপ থেকে দূরে থাকুন : মানসিক চাপের কারণে ত্বকে, বিশেষ করে মুখের ত্বকে রিংকেল পড়তে দেখা যায়। এছাড়া চুল পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে ধরা হয় মানসিক চাপ। মানসিক চাপ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট করার বেশ বড় একটি কারণ। অন্যদিকে অনেকেই মানসিক চাপে পড়লে শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন।

সঙ্গীর সঙ্গে শারীরিক ও মানসিক সুসম্পর্ক বজায় রাখা : সঙ্গীর সঙ্গে শারীরিক ও মানসিক সুসম্পর্ক বজায় রাখাটা তারুণ্য ধরে রাখার জন্য অত্যন্ত জরুরি।

রাগ বা ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ : রাগ যতটা সম্ভব কমিয়ে ফেলুন। কারণ রাগলে মুখের চামড়ায় ভাঁজ পড়ে যায়। রাগ ও ক্রোধ মানসিক চাপ তৈরি করে, মুখে বলিরেখার সৃষ্টি করে, মানসিক স্বাস্থ্যহানি করে। তাই রাগের মতো নেতিবাচক অনুভূতি থেকে যতোটা সম্ভব দূরে থাকা উচিত।

বন্ধুত্ব : সব সামাজিক সম্পর্কের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে বন্ধুত্ব। গবেষণায় জানা গেছে, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গ

আপনাকে মানসিকভাবে চাঙ্গা করে তুলতে পারে এমনভাবে যা প্রতিদিন তিন কাপ চায়ের সমপরিমাণ এনার্জির কাজ করে। এছাড়া অবসাদগ্রস্ততা ও একাকিত্ব সরিয়ে জীবন কর্মমুখর করে তুলতে বন্ধুদের আড্ডার বিকল্প নেই। ব্রিগহাম ইয়ং ইউনিভার্সিটির ছাত্রছাত্রীদের ওপর এক গবেষণায় জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বন্ধুদের সঙ্গ আপানার পরিবেশ ও আচরণে শতকরা ৫০ ভাগ ইতিবাচক ভাবনা এবং শারীরিক সুস্থতা গড়ে তুলতে সক্ষম।

নতুন কিছু জানার আগ্রহ : সম্প্রতি ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলসের এক গবেষণায় দেখা গেছে মস্তিষ্কের উন্নয়নের ক্ষেত্রে ওয়েব ব্রাউজিং ও ওয়েব পেইজ সার্চিং বিশেষ ভূমিকা রাখতে সক্ষম। শুধু তা নয়, ভাষাগত জ্ঞানের উন্নতি সাধনেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে ওই ওয়েব সাইটগুলো।

সঠিক পরিচর্যার অভাবে অনেকেই বুড়িয়ে যান অল্প বয়সেই। উল্টোদিকে তাকালে অপেক্ষাকৃত বয়স্কদের বেশ ফিট ও ছিমছাম দেখা যায়। শুধু চেহারায় তারুণ্য ধরে রাখতে নয়, পুরো শরীরে চাঙ্গা ভাব ধরে রাখতে স্বাস্থ্য সচেতন হওয়া জরুরি।

 

এই বিষয়ে একটু জেনে নেয়া যাক -

 

প্রচুর পানি পান করুন : পানি দেহ, ত্বক ও দেহের অভ্যন্তরীণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের জন্য বিশেষভাবে জরুরি। নিষ্প্রাণ ত্বক, কিডনির ক্ষতি, দুর্বলতা এবং একই সঙ্গে মনের বার্ধক্যের জন্য দায়ী পানিশূন্যতা। প্রতিদিন নিয়মিত ৬ থেকে ৮ গ্লাস পানি পান দেহ রাখে টক্সিনমুক্ত, সুস্থ ও সবল এবং ধরে রাখে তারুণ্য।

সুষম খাবারের তালিকা : খাবারের তালিকায় টমাটো, রসুন, খেজুর জলপাই তেল বেদানা রাখুন। টমাটো বয়স ধরে রাখতে সাহায্য করে। রসুনটিকে বহু রোগের ওষুধ ধরা হয়। খেজুর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। জলপাই তেলে রয়েছে শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট পলিফেনল। তা বার্ধক্যজনিত রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে। জলপাই তেল হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকিও কমায়। এছাড়া জলপাই তেলে থাকা ভিটামিন ‘এ’ ও ‘ই’ ত্বকের কুঁচকে যাওয়া রোধ করে। নিয়মিত যে কোনো বাদাম খেলে ত্বক সতেজ ও সুন্দর থাকে।

বয়সটা বেড়েই চলেছে প্রতিনিয়ত। কোনোভাবেই যেন ধরে রাখা যাচ্ছে না। যে পোশাকই পরছেন না কেন, কিছুই যেন ঠিক মানাচ্ছে না ইদানীং। কোন পোশাক পরলে বয়সটি একটু কম দেখাবে তা নিয়ে ভাবনা-চিন্তারও শেষ নেই। সঠিক পোশাক নির্বাচন করলে আপনার বয়স কমে যাবে অনেকখানি। তাছাড়া সঠিকভাবে পোশাক পরলে আপনাকে বেশ স্লিম ও স্টাইলিশও দেখাবে।

আসুন তাহলে জেনে নেয়া যাক কোন পোশাক কীভাবে পরলে বয়স কিছুটা হলেও ঢেকে যাবে-

পোশাকে পরিবর্তন আনুন : একটু বয়স বেড়ে গেলে ওই পুরনো ধাঁচের পোশাক পরলে বেশ একঘেয়ে ও বয়স্ক দেখায়। তাই বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পোশাকে বেশকিছু পরিবর্তন নিয়ে আসতে হবে। যেমন- পুরনো ধাঁচের পোশাক পরতে চাইলে সঙ্গে স্টাইলিশ জ্যাকেট, ফ্যাশনেবল জুতা বা ঘড়ি অথবা হাল ফ্যাশনের কোনো ব্যাগ কিংবা বেল্ট নিয়ে নিন। এতে পোশাকের চেহারাই পাল্টে যাবে।

সঠিক মাপের পোশাক : বয়স হয়ে গেলে ঢিলেঢালা পোশাক পরেন অনেকেই। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যদি সঠিক মাপের পোশাক না পরা হয় তাহলে দেখতে আরো বয়স্ক দেখায়। তাই নিজের জন্য পোশাক কিনতে গেলে সঠিক মাপ দেখে কিনুন। পোশাক বেশি আঁটসাঁট হলেও খারাপ দেখাবে আবার বেশি ঢোলা হলেও বয়স বেশি দেখাবে।

উজ্জ্বল রঙ : আমাদের দেশে প্রচলিত আছে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পোশাকের রঙও হালকা হতে হয়। কিন্তু এটি একটি ভুল ভাবনা। বয়স বেড়ে গেলে হালকা রঙের কাপড় পরলে আরো ম্লান দেখায়। বয়সের সঙ্গে পোশাকের রঙও উজ্জ্বল হওয়া উচিত। লাল, কমলা, উজ্জ্বল নীল, সবুজ ইত্যাদি রঙগুলোর পোশাক পরলে আপনার বয়স কম দেখাবে আবার গায়ের রঙটাও বেশ উজ্জ্বল লাগবে। আপনি যদি উজ্জ্বল রঙের পোশাক পছন্দ না করে থাকেন তাহলে আপনার হালকা রঙের পোশাকটির সঙ্গে একটি উজ্জ্বল রঙের ওড়না, টাই, বেল্ট ইত্যাদি নিয়ে নিন। আনেকটাই তরুন দেখাবে আপনাকে।

কাপড়ের ধরন : পোশাকের জন্য কাপড়ের ধরনের ওপরও আপনাকে কতোটুকু তরুন দেখাবে তা নির্ভর করে। যেমন- চকচকে স্যাটিন কাপড় পরলে বয়স বেশ খানিকটা কম দেখায়। আবার একটু বড় ধরনের প্রিন্টের পোশাক পরলেও বয়স লুকনো যায় বেশখানিকটা। তাই বয়স তারুণ্যের জন্য ভিন্ন টেক্সচারের পোশাক পরে দেখুন কোনটায় আপনাকে বেশি মানাচ্ছে।

পোশাক নির্বাচন : বয়সের সঙ্গে মানানসই পোশাক নির্বাচন করাটা বেশ কষ্টসাধ্য। তাই ওই সময় কী পরা উচিত-অনুচিত তা নিয়ে অনেকেই দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগে থাকেন। সঠিক পোশাক নির্বাচন করে নিতে পারলে আপনার বয়স ঢাকার পাশাপাশি আপনাকে রুচিশীল ও ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন লাগবে। তাই সঠিক পোশাক নির্বাচন করে বয়সটি লুকিয়ে ফেলুন সহজেই।

 

পরিশেষে বলা যায়, তারুণ্য থাকে অবচেতনে যা আচরণের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। প্রকৃতির নিয়মে সময়ের সঙ্গে বেড়ে যায় বয়স। এটি জিনগত বৈশিষ্ট্য। তবে এর মধ্যে অনেকেই তারুণ্য ধরে রাখেন। তারুণ্যের কাছে হার মানে তাদের বয়স। বয়স বেড়ে যাওয়া মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে হলেও তারুণ্য ধরে রাখা একেবারেই কঠিন কাজ নয়। সহজ কিছু নিয়ম মেনে চললেই বয়সকে হার মানিয়ে আপনিও হয়ে উঠতে পারেন আরো সুন্দর, তরুণ, স্নিগ্ধ ও প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর।

 

___________________________________________________________________________

লেখা : ঋভু অনিকেত

মডেল : এনায়েত কবির  

ছবি : সাঈদ সিদ্দিকি

শোভন আচার্য্য অম্বু

 

 

 

Page 9 of 26

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…