Super User

Super User

Page 9 of 24

নববর্ষের ঘনঘটা নিছক বিনোদনেই শেষ 

আহমদ রফিক

 

 

সময়ের সুনির্দিষ্ট সীমারেখায় বলা যায়, সালতামামিতে নতুন দিন, নতুন বছরের বরণ তাকে প্রিয়মুখ ভেবে নিয়ে, তার সাংবাৎসরিক আচরণ সম্পর্কে নিশ্চিত না জেনে। এটাই দেশ-বিদেশ নির্বিশেষে সর্বত্র ‘শুভ নববর্ষ’ সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য। যে আসছে সে কতোটা শুভ, কতোটা নয় তেমন বিচার উহ্য রেখেই বর্ষবরণের আবেগমথিত উৎসব-অনুষ্ঠানে আমরা মিলিত হই। ওই আবেগের টানে প্রকাশ্যে বা প্রচ্ছন্ন উচ্চারণ ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো...।’
নতুন বছরের উর্দি পরা সময় খ-টি আমরা এভাবেই অভিনন্দন জানাই, বরণ করে প্রাত্যহিক জীবনের ঘরে তুলে নিই। তারপর চলি, ভিন্ন চেহারার এক বর্ষ মাসের হাত ধরে। সে খ্রিস্টীয় বর্ষ মাস শীত থেকে শীতে শুরু ও শেষ। সেটি বড় কথা নয়। বড় কথা হচ্ছে, ভাষিক সংস্কৃতি, ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি নিয়ে আমাদের গর্ব ও অহঙ্কারের জায়গাটি স্ববিরোধিতায় আক্রান্ত এবং তা আমাদের জীবন আচরণে মূলত শাসনযন্ত্রের সিদ্ধান্তে।
এসব তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক বক্তব্য নিয়ে বছরের পর বছর লিখে যাচ্ছি। এতে কি সমাজ নামক বৃক্ষটির একটি পাতাও নড়ছে? মনে হয় না। তাহলে এসব লেখার কি কোনো প্রয়োজন আছে? বিবেচক ব্যক্তিদের বিধান ‘তবু লিখতে হবে, হয়তো একদিন এর সুফল মিলবে।’ কিন্তু সুফল যে মিলছে না বা মিলবে না, অন্তত মেলার সম্ভাবনা যে নেই তা আগে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক ঘটনার পূর্বাভাস বার বার জানিয়ে দিচ্ছে।


যদি গত দুই-তিন দশকের বর্ষ ভাবনার লেখা নিয়ে হিসাব মেলাতে যাই তাহলে এর নেতিবাচক দিকটাই প্রবল হয়ে প্রকাশ পায়। আজ থেকে দুই দশকেরও বেশি আগের এক বৈশাখী নববর্ষেও অঘটন উল্লেখ করতে গিয়ে লিখেছিলাম, ‘এরপর গোটা বছর ধরেই দেখেছি, একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। কাগজ খুলতেই চোখে পড়ে খুন, ছিনতাই, রাহাজানি, নারী নির্যাতন সামাজিক অস্থিরতার এক চরম ভাষ্য। সারাটা বছর তাই বিষণœতার হাত থেকে রেহাই মেলেনি। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো চিত্তবিকার ঘটেছে বলে মনে হয় না। ... আমি কি তাই বুক ঠুকে বলতে পারি, আমি ভালো আছি? কিংবা চলতি বছরের দিনগুলোতে ভালো থাকবো? এমন নিশ্চয়তা কোথায়?’
সময়ের ব্যবধানে এমন আরো দু’একটি উদাহরণ তুলে ধরা যেতো। এতে একই বক্তব্যের ভরাবৃদ্ধি ঘটতো। এর বদলে গতায়ু বছরটির সালতামামি করতে গেলে গেল ঘটনাদির বিচারে ওই একই চিত্র। রঙটা বরং আরো গাঢ়। বিশেষ করে গুম, খুন, নারী নির্যাতন এতোটাই যে, বুকে হাত রেখে বলা যাবে না সামাজিক দূষণ কমেছে। সাম্প্রদায়িক সহিংসতারও কমতি নেই। বরং এমন সত্যই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, সামাজিক ব্যাধির বিস্তার ঘটছে। সামাজিক দূষণের মাত্রা বেড়েছে। সুস্থ সামাজিক শক্তি অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ব্যক্তিক নিরাপত্তা সুতার ওপর ঝুলছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের নেশায় বুঁদ রাষ্ট্রযন্ত্রের হৃদয়ে ব্যক্তিবিশেষের (নারী বা পুরুষ কিংবা শিশু) কান্না প্রতিক্রিয়ার ঢেউ তুলছে না। আমরা যে যার অর্জনের পেছন ছুটছি। অন্যদিকে ফিরে তাকানোর সময় নেই।

 

 

বৈশাখী নববর্ষেও উৎসব-অনুষ্ঠান তাই বিনোদনের উৎসব হয়েই থাকছে। বিনোদনের অন্তর্নিহিত এর সেক্যুলার, সর্বজনীন
গণচরিত্রটি সমাজে এর নিজস্ব প্রভাব বিস্তার করতে পারছে বলে মনে হয় না। পারলে বাঙালিয়ানা নিয়ে গর্বিত বাংলাদেশের শিক্ষত শ্রেণি মানসিক সম্প্রদায়বাদী চেতনা থেকে মুক্ত থাকারই কথা ছিল।

 


‘আপ্না ভাল্/আজ না কাল্’ এটিই হয়ে দাঁড়িয়েছে জীবন যাপনের আদর্শ। এ ধারা যেমন ব্যক্তিগত তেমনি দলগত। ঘরে বসে ড্রয়িংরুম সংলাপে সমালোচনার ঝড় তুলছি। কিন্তু মাঠ-ময়দান-রাজপথে তেমন ভাবনার ঐক্যবদ্ধ প্রকাশ ঘটাই না। সুবিধাবাদী ও সুবিধাভোগী মানুষের মতো নিজের ভালো-মন্দ বুঝে নেয়ার বাইরে কিছু ভাবতে বা করতে চাই না। এমনটিই হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের বৃহত্তর নাগরিক সমাজের ধাত।
সত্যিই আমরা চোখ বন্ধ করে সামাজিক দায় এড়ানোর চেষ্টা করছি। অবশ্য সাহিত্য পাঠক বুদ্ধিজীবীর মাথায় কবির এমন পঙ্ক্তিও হানা দেয়, ‘অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে?’ কিন্তু এতো অনাচারের মধ্যেও বাংলাদেশে তেমন ‘প্রলয়’ ঘটতে দেখা যাচ্ছে না বলেই বোধহয় দুর্বৃত্তের উৎসাহে ভাটা পড়ছে না। তাদের কর্মতৎপরতা যথানিয়মে চলছে। আর সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রকাশ পাচ্ছে চরম সামাজিক হতাশা।
ওই হতাশার স্রোত এক ধরনের পিছুটান বলা চলে, জনচেতনার পিছুটান। ওই নিস্তরঙ্গ নদীতে রাজনীতির তরী সহজে তর তর করে চলতে পারে। তবু আগাছাসদৃশ ধানশীল মানুষের মন ভোলায়। ভোলায় শিক্ষিত শ্রেণির বিচারবুদ্ধি। সেখানে পার্থক্য নেই কবি, শিল্পী, লেখক, সাংবাদিক, আইনজীবীসহ পেশাজীবীদের মধ্যে। সমাজ পরিবর্তন দূরে থাক, সাংস্কৃতিক পরিবর্তনও ইতিবাচক সুফল তৈরি করছে না সুস্থ মূল্যবোদের পক্ষে।

 

ইতিবাচক সংস্কৃতির জোয়ার আমাদের রাজনীতিকে সঠিক পথের নিশানা দিয়েছে, এমন উদাহরণ এদেশে বিরল নয়।

 

দুই.
এমন এক নেতিবাচক সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবেশে আমাদের বৈশাখী নববর্ষ পালনে কোনো পিছুটান নেই। আছে প্রবল আবেগ আর উত্তেজনা, বিনোদনের প্রবল তৃষ্ণা মিটানোর তাগিদ। অশ্বত্থবটের নিবিড় ছায়া থেকে বৈশাখী নববর্ষেও রাজধানীর রাজপথে এসে ঐতিহ্যবাহী অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক চেতনার প্রকাশ শক্তিমান করে তুলেছে সন্দেহ নেই।
ওই ‘একদিন্কা সুলতান’-এর পক্ষে সামাজিক-সাংস্কৃতিক চেতনার ইতিবাচক প্রকাশ ঘটানোর সম্ভাবনা বা চেষ্টা কোনোটাই দৃশ্যমান নয়। ইতিবাচক সংস্কৃতির জোয়ার আমাদের রাজনীতিকে সঠিক পথের নিশানা দিয়েছে এমন উদাহরণ এ দেশে বিরল নয়। এক্ষেত্রে তেমন সম্ভাবনা দূর বিষয়ই হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর বড় কারণ নববর্ষের সাংস্কৃতিক উদ্দীপনা যতো প্রবলই হোক, সর্বজনীন চরিত্রের হোক, যতোটা জাতীয় চেতনার ধারক হোক তা একদিনের আবেগ উৎসারে ফুরিয়ে যায়। এর কোনো সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা থাকে না। স্বভাবতই এর ভবিষ্যৎ কোনো সামাজিক তাৎপর্য বহন করে না। বহন করে না সমাজ ও মূল্যবোধ পরিবর্তনের দিক থেকে। এখানে জাতীয় উৎসবের চরিত্র সম্পন্ন বৈশাখী নববর্ষের আড়ম্বর-সমারোহ বা জনসমাগম সত্ত্বেও এক ধরনের সীমাবদ্ধতায় বন্দি। তাই বৈশাখী নববর্ষের অনুষ্ঠান বিনোদনের উৎসব হয়েই থাকছে।
বিনোদনের অন্তর্নিহিত এর সেক্যুলার, সর্বজনীন গণচরিত্রটি সমাজে এর নিজস্ব প্রভাব বিস্তার করতে পারছে বলে মনে হয় না। পারলে বাঙালিয়ানা নিয়ে গর্বিত বাংলাদেশের শিক্ষিত শ্রেণি মানসিক সম্প্রদায়বাদী চেতনা থেকে মুক্ত থাকারই কথা ছিল। মুক্ত যে নয় নাসিরনগর, গোবিন্দগঞ্জসহ একাধিক ঘটনায় সামাজিক শান্তি বিপর্যস্ত হওয়া তেমন প্রমাণ বহন করে। এসব ঘটনার তালিকা বেশি দীর্ঘ।
নির্মোহ বিচারে মানতে হয় একুশের চেতনা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা স্বাধীনতা-উত্তর বাঙালি মুসলমান সমাজে আকাক্সিক্ষত মাত্রায় সদর্থক পরিবর্তন ঘটাতে পারেনি। আমাদের সঠিক সংস্কৃতি চর্চায় এমন পরিবর্তন প্রত্যাশিত ছিল। ওই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।

এই বৈশাখে চাই মুক্তিবৃক্ষের আশীর্বাণী

আলী যাকের

 

 


চৈত্র শেষ হয়ে এলো। রৌদ্র চড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে নিদাঘের প্রচ-তায় আঁইঢাঁই প্রাণ। শুষ্ক চারিদিক। এই সময় ঘরে কিংবা বাইরে যদি তাপানুকূল পরিবেশ না থাকে তাহলে গ্রীষ্মের দাপট বেশ ভালো বোঝা যায়। একমাত্র বৃক্ষের ছায়ায় কিছুটা শান্তি মেলে বুঝি। শারীরিক স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য গ্রীষ্ম মোটেই কারো প্রিয় ঋতু হতে পারে না। তবুও কী যেন আছে এ ঋতুটির মধ্যে যা আমাকে উদাস করে দেয়। প্রসঙ্গত, রবীন্দ্রনাথের ওই বিখ্যাত গানটির কথা মনে পড়ে যায়, ‘মধ্যদিনে যবে গান বন্ধ করে পাখি/হে রাখাল, বেণু তব বাজাও একাকী... জাগায় বিদ্যুৎ ছন্দে আসন্ন বৈখাশী/হে রাখাল বেণু তব বাজাও একাকী।’
একবার আমাদের দেশের প্রখ্যাত রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, বছরের কখন শান্তিনিকেতনে যাওয়ার প্রকৃষ্ট সময়। উত্তরে বন্যা বলেছিল, ‘গুনলে বিশ্বাস করবেন না হয়তো। রবীন্দ্রনাথ বোলপুরে গ্রীষ্মকালকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন এবং তার অনেক কবিতা, গান ভরা গ্রীষ্মে রচিত।’ এই রহস্য উদঘাটনের জন্য একবার ভরা গ্রীষ্মে শান্তিনিকেতন গিয়েছিলাম। বীরভূম জেলার অন্তর্গত বোলপুরে গ্রীষ্মকালে সত্যিই প্রচ- দাবদাহ বয়ে যায়। শান্তিনিকেতনে বেশির ভাগ মানুষ সাইকেলে চলাচল করে। ওই সময় দেখেছি, তাপ প্রতিহত করার জন্য তারা মুখের ওপর কাপর জড়িয়ে নেয়। সূর্যের উত্তাপ এতোটাই হয় তখন যে, শরীর চামড়া পুড়ে যায়। কিন্তু অবাক কা-! শান্তিনিকেতনে যে বিশাল বৃক্ষরাজি এর নিচে গেলে গ্রীষ্মকে আর ততো অত্যাচারী বলে মনে হয় না। ওই গ্রীষ্মে বিশ্ব ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সর্বত্র গাছের ছায়ায় ছায়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছি আর মনে হয়েছে রবীন্দ্রনাথের কথা যেন দিব্য দৃষ্টিতে দেখতে পেয়েছি শ্মশ্রƒম-িত রবীন্দ্রনাথ, পেছনে দুই হাত, গাছের ছায়ায় ছায়ায় তার সৃষ্টি শান্তিনিকেতনের সর্বত্র মৃদুমন্দ গতিতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।


আমাদের বাংলাদেশে ছয়টি ঋতুরই আগমন ও প্রস্থান মোটামুটি বোঝা যায়। কিন্তু কোন এক অজ্ঞাত কারণে গ্রীষ্মে কথাটি মনে পড়ে সবচেয়ে বেশি। আমার বাল্যকাল কেটেছে বাংলাদেশের ছোট ছোট শহরে বাবার চাকরি সূত্রে। ওইসব জায়গায় পাকা বাড়িঘর তখন ছিল অতি নগণ্য সংখ্যায়। বেশির ভাগ জায়গা জুড়ে থাকতো বিশাল বৃক্ষরাজির বন। আম, কাঁঠাল, জারুল, সেগুন, মেহগনি, কড়ইসহ কতো বিচিত্র বৃক্ষ। স্কুল না থাকলে এসব বৃক্ষের নিচেই আমাদের সময় কাটতো বেশির ভাগ। লুকোচুরি, ডাঙ্গুলি, গোল্লাছুট ইত্যাদি খেলা নিয়ে মাতামাতি। কিসব দিন গেছে শৈশব! মাঝে মধ্যে বাড়ির কাছের পুকুর কিংবা অল্প দূরের নদীতে সুশীতল পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে শান্তিতে ভরে গেছে দেহ-মন। আরেকটু বড় হওয়ার পর আমরা তখন ঢাকায় এসে থিতু হয়েছি, গ্রীষ্মে ওই একইভাবে গাছের ছায়ায় ছায়ায় কেটেছে দিন। চৈত্র দিনের শেষে কোকিলের আহাজারি মনকে সিক্ত করে দিয়েছে। পহেলা বৈশাখে কুটির শিল্পের মেলায় বিভিন্ন খাদ্য-অখ্যাদ্যকে অমৃত বলে মনে হয়েছে। বাঙালির এই শর্তবর্ষের ঐতিহ্য সংস্কৃতি নিয়ে আমরা আজীবন বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এসেছি ঔপনিবেশিক আগ্রাসনকে। আমাদের বাল্যকাল থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত আমরা পাকিস্তানের উপনিবেশ ছিলাম। কী এক বিচিত্র দেশ ছিল সেই পাকিস্তান! এক উদ্ভট দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সেই দেশ। যে ভদ্রলোক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এই তত্ত্বের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন, তিনি বলেছিলেনÑ মুসলমানরা একটি জাতিগোষ্ঠী। তাই অন্য ধর্মালম্বীদের সঙ্গে তাদের থাকা চলবে না। তাদের জন্য চাই ভিন্ন এক দেশ। অথচ তিনিও সর্ম্পূণ মুসলমান ছিলেন না। এটা ঐতিহাসিক সত্য। তিনি নিয়মিত মদপান করতেন। বরাহ মাংস ভক্ষণ করতেন। জীবনে কোনোদিন নামাজ পড়েছেন বলে কেউ বলতে পারবে না। এমন এক ব্যক্তি কেবল ক্ষমতার লোভে একটি দেশের প্রধান হয়ে গেলেন। তার এই দ্বিজাতি তত্ত্ব যে সর্ম্পূণ ভ্রান্ত ছিল তা বুঝতে সময় নেয়নি জনগণ। সেই ১৯৪৮ সালেই ভাষার প্রশ্নে আন্দোলন শুরু করেছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ। এরপরের ইতিহাস তো আমাদের সবারই জানা। ক্রমেই আমরা পাকিস্তানের পূর্ব প্রদেশের মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিশ্চিয়ানÑ সবাই মিলে একটি পৃথক রাষ্ট্র জন্ম দেয়ার কথা ভাবতে শুরু করি। ১৯৭০ সালের র্নিবাচনের মাধ্যমে এ দেশবাসী স্পষ্ট মতো দেয় বাংলাদেশের পক্ষে। এরপর এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের সৃষ্টি হয়। এই যুদ্ধ ওই র্ধম, নীতি ও বিবেক ভ্রষ্ট পাকিস্তানের পক্ষে কতিপয় বাঙালি কুলাঙ্গার এ দেশের মানুষের ওপর চরম অত্যাচার করে। তাদের শাস্তির বিধান করা হয় যুদ্ধের পর। আমরা ইতিহাসের পাতায় দেখতে পাই, হিটলার ও তার স্যাঙ্গাতদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের বিচার করা হয় নুরেমবার্গে এবং জীবত ও মৃত অপরাধীদের যথাযথ শাস্তি প্রদান করা হয়। কম্বোডিয়ায়ও একই ধরনের বিচারিক প্রক্রিয়ার আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশেও স্বাধীনতার পর পরই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়। কিন্তু এক সুদূরপ্রসারী চক্রান্তের মাধ্যমে আমাদের জাতির পিতাকে হত্যা করে বাংলাদেশের মুক্তির পেছনে সব আদর্শ ও মূল্যবোধকে জলাঞ্জলি দিয়ে ওই
পাকিস্তানিদের দোসররা আবার একটি প্রক্রিয়া শুরু করে যাতে করে এই দেশ নব্য পাকিস্তান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এরই মধ্যে দেশের মানুষ আবার ঘুরে দাঁড়ায়। তারা সহজে এই চক্রান্তের কাছে পরাজয় বরণ করতে রাজি নয়। সর্বশেষ আজকে বাংলাদেশে অধিষ্ঠিত সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে বিধৃত যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়া শুরু করে আবার। এই প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর পরই আবারও সেই পাকিস্তানপন্থীরা সক্রিয় হয়ে ওঠে। দেশের লাখ লাখ তরুণ রাস্তায় নেমে আসে এবং প্রতিবাদমুখর হয় ওই চক্রান্তের বিরুদ্ধে। কিন্তু চক্রান্ত থেমে থাকে না।


গণমানুষের যে কোনো দাবি উচ্চারিত হলেই ‘ইসলাম খাতরে মে হ্যায়’Ñ ‘ইসলাম বিপন্ন’ এই একটি ভ-ামির আশ্রয় পাকিস্তানিরা সব সময় নিয়ে এসেছে। আজও আমরা দেখতে পাই, তাদের বাংলাদেশি দোসররা ওই একই সেøাগান দিয়ে গণমানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। কেবল বিভ্রন্ত নয়, তারা সত্যনিষ্ঠ যুব সম্প্রদায়কে আঘাত করার চেষ্টা করছে এই অভিযোগ দিয়ে যেন তারা নাস্তিক। এ অতি হাস্যকর একটি অভিযোগ এবং আমরা সবাই জানি, এই ধরনের সুবিধাবাদী কথাবার্তা ধোপে কখনোই টেকে না। একদিন বাংলাদেশের মানুষ রুখে দাঁড়াবেই এ ষড়যন্ত্রকে। শাস্তি হবেই যুদ্ধাপরাধীদের। বাংলাদেশ ফিরে পাবে তার হৃত গৌরব মুক্তবুদ্ধির দেশ হিসেবে।
এই বৈশাখের খরতাপে যখন পারিপার্শ্বিকতা বড় উষ্ণ হয়ে উঠেছে, নাগিনীরা চারদিকে ফেলেছে বিষাক্ত নিঃশ্বাস তখন আমাদের যাত্রাপথ খুব একটা মসৃণ হবে বলে আশা করা বোধ হয় ভুল হবে। ভরসা আমাদের একটি। আমাদের নেতৃত্বে রয়েছে একঝাঁক নিঃস্বার্থ মুক্তিকামী তরুণ যারা অবিরাম লড়ে যাচ্ছে আমাদের চেতনা, আদর্শ ও মূল্যবোধের পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য। অথচ এ লড়াই অস্ত্র নিয়ে নয়, এ লড়াই সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ প্রত্যয়ী মনোবলের লড়াই। তাই জয় তাদের অনিবার্য। বৈশাখের খরতাপে বিশাল মুক্তি-বৃক্ষের ছায়ায় আমাদের তরুণরা সমবেত আজ। বৃক্ষ তাদের দিচ্ছে আশীর্বাণী। দখিনা হাওয়ায় বয়ে আসছে সংগ্রামের অনুপ্রেরণা। পথ যতোই কণ্টকাকীর্ণ হোক, এগিয়ে তারা যাবেই হাতে হাত ধরে। এগিয়ে যাবে এই বৈশাখ এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযোদ্ধা সমবেতভাবে অভীষ্ট লক্ষ্যে।

বাংলাদেশের শাখা শিল্প ও শঙ্খ সমুদয়

বিলু কবীর

 

 


আমরা সাহিত্য বলতে স্বভাবত এক ধরনের লেখা বা পাঠ রচনা বুঝি। কিন্তু ‘সাহিত্য’ শব্দটি ব্যুৎপত্তিগত পটভূমিকায় ব্যাখ্যা করতে গেলে জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত সব বিষয়ই সাহিত্য। ‘সাহিত্য’ শব্দটি এসেছে ‘সহিত’ থেকে। অতঃপর যা কিছু আমাদের জীবনপ্রবাহের সঙ্গে প্রত্যক্ষে-পরোক্ষে, জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে প্রভাবক ও প্রভাবিত তা-ই আসলে সাহিত্য। এই যদি হয় বাস্তবতা তাহলে কি সাহিত্য ওই জটিলে না গিয়ে প্রধান ও সরল প্রশ্ন দাঁড়াতে পারে যে, কী সাহিত্য নয়। এই অর্থে শামুক-ঝিনুক-শঙ্খ বিষয়ে সব আলোচনা এক কথায় ‘শঙ্খ সাহিত্য’ বললে বেমানান তো হয়ই না, বরং বেশ মানিয়েই যায়। তা করতে গেলে অবাক হয়ে দেখতেই হবে, সামান্য গুগলি-কড়ির মতো আপাততুচ্ছরা আমাদের সৌন্দর্য বোধ, লোকবিশ্বাস, ধর্মাচার, রূপকথা, মিথ-পুরাণ, চারুশিল্প, রাজনীতি, অর্থনীতি, খাদ্য অভ্যাস, চিকিৎসা, নির্মাণ, গদ্য-পদ্য ইত্যাদিতে কী ব্যাপক পরিমাণে জায়গা দখল করে আছে।

ঝিনুক, শঙ্খ প্রাণী হিসেবে বিস্ময়কর। এর বহিরাবরণ যেমন কঠিন, ভেতরটিও তেমনই নরম থলথলে। অতো নরমটি সুরক্ষা দিতেই কী প্রকৃতি এর বাইরে অমন শক্ত পাঁচিল করে দিয়েছে! এর দৈহিক গড়নে রকমফের, রঙ-বর্ণে বিস্ময়কর চারু সৌন্দর্য তো রয়েছেই। কিছু ক্ষেত্রে কয়েকটির বৈপরীত্য ও স্বকীয়তা বিদ্যমান। যেমন এর প্রতিটিরই খোলস শক্ত। কিন্তু সব খোলসের দরজায় পাল্লা নেই। বিশেষ করে এটি ডাঙার শামুকে দেখা যায়। শামুক যখন আত্মরক্ষার্থে বা ঘুমুনোর জন্য ওই দরকারি পাল্লাকে ছিটিয়ে দেয় তখন ভেতর থেকে এমনভাবে খিল এঁটে নেয়ে যে, সে ছাড়া অন্য কেউ তা খুলতে পারে এমন কার সাধ্যি আছে! কারো কারো আছে চিংড়ির মতো লম্বা লম্বা নলো হাত-পা। কারো আছে পা বিহীন চেটো জাতীয় চলৎশক্তি। কারো শিং আছে, চুলের মতো এঁটো ঝিল্লি-ইন্দ্রিয় আছে, কারো বা নেই। কারোর খোলসজুড়ে কতো রকেমের কাঁটা, কারো গা তেলা-মসৃণ। কেউ বহু কোণা, পেছনটি সুচালো। কেউ কোণাহীন, পেছনটি দস্তুর মতো বোঁচা, ঢ্যাপা গোলাকার। কারো কারো বহু বর্ণ, কারো এক বর্ণ, কেউ নিতান্তই বিবর্ণ। এগুলো বিস্ময়কর, ভয়ঙ্কর ও অভয়ঙ্কর।
ঝিনুক, শামুকের চরিত্র-চারিত্র্য ও স্বভাবের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলা সাহিত্যে এর অনেক প্রয়োগ দেখা যায়। বিশেষ করে লোকছড়া, ধাঁধা, সংগীত ও বাগধারায় শামুক-ঝিনুক-শঙ্খের একাধিক উল্লেখ মেলে। যেমন ‘মামারাই রাঁধে-বাড়ে/ মামারাই খায়;/ আমরা গেলি পরে/ ঘরে দুয়ের দেয়।’ যে প্রজাতির শামুকে দরজায় পাল্লা পদ্ধতি আছে সেগুলোর আচরণগত বৈশিষ্ট্য নির্দেশক ওই ধাঁধাটি বাঙালির লোকছড়ায় সমৃদ্ধি, মূল্যবান ভাব সম্পদ ও প্রাকৃতিক কুশীলবের সৌন্দর্য তুলে ধরেছে। ‘হাটে মা টিমটিম/ তারা মাঠে পাড়ে ডিম/ তাদের খাড়া দুটো শিং/ তারা হাটে মা টিমটিম।’ ডাঙার আটপৌরে শামুক নিয়ে অজ্ঞাত প্রাচীন কবির রচনায় ওই পুরনো লোকছড়াটি বাঙালি মাত্রেরই মুখস্থ। শতাব্দীর পর শতাব্দী বাঙালিদের উচ্চারণের ছান্দসিক কোষে ছড়াটির প্রথম পঙ্্ক্তি ‘হাটে মা টিমটিম’ পরিবর্তিত হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘হাট্টিমা টিমটিম’। ফলে এর অর্থ উদ্ধারের ব্যাহতিটাই জটিল হয়ে পড়েছে। মূলত এটি শামুক নিয়ে সুরচিত একটি লোকছড়া। এক ধরনের স্থলচর একরঙা শামুক যা বয়েসী বাঙালির গেঁও জীবনের পরিচিত না থেকেই পারে না। এই শামুকগুলো আকারে সামান্য বড়। এর খোলস পেছনের দিকে চোখা ও রঙ সাদা-বেগুনে ছোপ। এগুলো টিমটিমে গতিতে স্যাঁতসেঁতে মাঠে চলে-ফেরে। অতি মিনমিনে গতিতে যখন এগুলো চলে তখন এর মাংসল মাথায় মাংসেরই দুই প্রস্ত শিং দৃষ্টিগোচর হয়। বলাই বাহুল্য, এগুলোর মাঠেই ডিম পাড়ে। তবে মাঠের মধ্যে নয় ধারে-কিনারে, নিচু ডোবা, আড়ালে-নিভৃতে এবং পরিমাণে ঢের। শামুকের শ্লথের গতির সঙ্গে ধীরগতি তুলনীয় বলে বাংলা বাগধারায় ‘শম্বুক গতি’ বলে একটা কথার চল রয়েছে। ‘সাগরপাড়ে কুড়াই ঝিনুক মুক্তা মেলে না। কতো লোকের আনাগোনা তুমি এলে না।’ বয়সী বাঙালির কে না জানে, ভালোবাসার বক্তব্যে সমৃদ্ধ এই সাগরিকা ঝিনুক।
‘শাঁখের করাত’ বাঙালির আরেকটি চিরায়ত ও বহুল পরিচিতি বাগধারা। এটি সামাজিক-রাজনৈতিকসহ বহু ক্ষেত্রে উদাহরণ। টিপ্পনি, কটাক্ষ হিসেবে উচ্চারিত ও ব্যবহৃত হয়। অন্য যে কোনো করাতের চেয়ে শাঁখারি শিল্পীদের ওই করাতের বিস্ময়কর ব্যতিক্রম হলো, এটি উল্টালেও কাটে, টানলেও কাটে। দেখতে অর্ধচন্দ্রের মতো ওই করাত দড়িতে ঝুলিয়ে দুই হাতে ধরে কোনো শাঁখারি শঙ্খের গয়না ইত্যাদি বানাতে ওই করাত ব্যবহার করে থাকেন।
বাংলার ভৌগোলিক বাস্তবতার প্রকৃতিতে অনেক পাখি আছে। এগুলোর নামকরণ হয়েছে তাদের চরিত্রের প্রধান চারিত্র্যের পেিরপ্রক্ষিতে। মাছরাঙা,
কাঠঠোকরা, গাঙশালিক, মৌটুসী, কাদা খোঁচা প্রভৃতি। এমনই তিনটি পাখির নাম হলো শামুকভাঙা, শঙ্খচিল ও শামুকখোট। শক্ত ঠোঁটে এগুলো শামুক ভেঙে খায়। এগুলোর ঠোঁট শক্ত, বড় ও সুচালো। ‘বানরের গলায় মুক্তার মালা’ বাঙালির আরেকটি সামাজিক অর্থবাচক বাগধারা। এর সঙ্গে শঙ্খ-শামুকের যোগ রয়েছে।
কোনো কোনো শামুক-ঝিনুকের খোলসের দরজা আছে, পাল্লা নেই। কোনো কোনোটায় পাল্লা আছে। কিন্তু যে কথা বলার জন্য এখানে এতোটা
ইনানো-বিনানো তা হলো, এক কিছিমের ঝিনুক আছে যেগুলোর শরীরের পুরো খোলসটাতেই দরজার দুটি সমান পাল্লার মতো। একেবারে সমান দুটি বাটির কৌটাসাদৃশ। বন্ধ করলে কারো সাধ্য নেই তা খোলে। আবার যেগুলোর খোলসে দরজা আছে, পাল্লা
নেই সেগুলোর দরজা খোলা বটে কিন্তু এর মধ্যে খোলসের মালিক, মানে গেরস্ত একবার যদি ঢোকে তাহলে কারো ক্ষমতা হবে না সেটিকে বের করা যদি না নিজ থেকে বের না হয়।
শঙ্খ-শামুক-ঝিনুকের অনেক গুণাগুণ রয়েছে। ‘গুণাগুণ’ বলতে এগুলোর মধ্যে গুণ তো আছেই, অগুণও রয়েছে। হ্যাঁ, এটি মনে রেখেই শব্দটির ব্যবহার করেছি। ‘পঁচা শামুকে পা কাটা’ বলে একটি অতি প্রাচীন বাগধারা রয়েছে বাংলা সাহিত্য বাস্তবতায়। এর মধ্যে অতীতের সমাজচিত্রের অনেক বিশ্লেষণযোগ্য সংবার্তা রয়েছে। জলাভূমির প্রাচুর্য, শামুক-ঝিনুকের আধিক্য, বাঙালির নগ্ন পায়ে হাঁটা-চলা, নিচু জমিতে চাষাবাদ, পচা শামুকে পা কাটলে এর ক্ষতে অধিক ভোগান্তি হয়। আরো অপকারিতা আছে এর। অসাবধানতাবশত বেশি চুন খেয়ে ফেললে জিভ মুখ পুড়ে যায়। বাঙালির একটি বাগধারাই রয়েছে ‘চুন খেয়ে গাল পুড়েছে দই দেখে ভয়’। এর মানে, গোয়াল পোড়া গরুর সিঁদুরে মেঘে ভয় আর কী! ব্যাখ্যা সামান্যই। কিন্তু উদাহরণ প্রয়োগ এবং সামাজিক অর্থব্যঞ্জনা গভীরভাবে জীবন স্পর্শী। কালী দাস প-িত নাকি খাল-বিল-ডোবা হেঁটে পার হওয়ার সময় জুতা পরতেন, অন্য সময় খালি পা। কেন! কারণ জলের মধ্যে কোথায় যে পচা শামুক আছে তা

উল্লেখ করা দরকার, পৃথিবীতে প্রায় ৮ হাজার ৫০০ প্রজাতির শঙ্খ-ঝিনুক রয়েছে যেগুলোর সবই সামুদ্রিক। এর বাইরে রয়েছে স্থলবাসী ও অন্যবিধ জলাশয়ের ওই জাতীয় অমেরুদ-ী। এগুলোর খোলস পাত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো বা হয়। যেহেতু এখানে কথা উঠেছে সেহেতু জানা দরকার, আকৃতিতে প্রকৃতিভেদে এগুলোর লম্বায় ০.১ থেকে ১৩৭ সেন্টিমিটার পর্যন্ত দীর্ঘ হয়ে থাকে। আর ওজন? পুঁথির একটি দানার মতো ক্ষুদ্রাকার থেকে শুরু করে ৩০০ কেজি পর্যন্ত ওজন হতে পারে একটি ঝিনুকের। এর মধ্যে কয়েকটি বছরে ৫০ কোটির মতো ডিম পাড়ে। তা থেকে ঘণ্টা দশেকের মধ্যে বাচ্চা বা বাবুসোনারা জন্মগ্রহণ করে। এগুলোর ৬ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত বাঁচে বলে তথ্য পাওয়া যায়। কোনো কোনোটির চোখ-মাথা আছে, কোনোটির নেই। সবচেয়ে রোমাঞ্চকর বিস্ময়ে ভরা হলো, এগুলোর যৌনজীবন বা আতœউপগত হওয়ার বিষয়টি। এক্ষেত্রে কেঁচোর সঙ্গে এর মিল রয়েছে। কেঁচোর যেমন নারী-পুরুষ হয় না, এগুলোরও তা-ই। কেঁচো যেমন আত্মসঙ্গমী, নিজে নিজের সঙ্গে রতিরমণে মিলত হয়, শামুক-শঙ্খও তেমনই। তাই এগুলোকে বলা হয় এক লিঙ্গ বা বহু লিঙ্গ। একই দুই বলে একাই উভয়। আবার উভয়ই এক বলে একা! নিজেই নিজের বউ আবার নিজেই নিজের স্বামী। প্রকৃতি এগুলোর এই বৈধতা দিয়েছে। উভয়লিঙ্গ, জেন্ডার ভারসাম্য।

শাঁখ বা ঝিনুক যে প্রাকৃতিক মুক্তার উৎপাদক এ বিষয়টি বাংলার নিসর্গ, সাহিত্য, বাণিজ্য এবং যাকে বলে ঐতিহ্যের জন্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এছাড়া শাঁখ বা শঙ্খ দিয়ে যেসব গয়না প্রস্তুত করা হয় এর যে কারুমূল্য, কুটির শৌল্পিক ঐতিহ্য এ বিষয়টি পৃথক গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হওয়ার দাবি রাখে। আবার ধর্মীয় বিশ্বাস-অবিশ্বাস ও পৌরাণিক মিথের সঙ্গে এবং আমাদের সনাতন ধর্মে শঙ্খের অনেক যোগ রয়েছে। এমনকি রাজনৈতিক ক্ষেত্রে, আরও উল্লেখ করে বলতে গেলে ১৯৪৭ সাল-পূর্ব স্বরাজ আন্দোলনে শঙ্খানাদি বা শঙ্খধ্বনির খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহারিক ভূমিকা ছিল।
শাঁখের গয়নায় গৌরবের মুক্তা ব্যবহার করতে আমাদের আনন্দের শেষ থাকে না। কিন্তু মুক্তায় আসলে ঝিনুকের কতোটা দুঃখ-কষ্টের ফসল তা যে এর কতোটাই বেদনার লালা, কতোটাই অন্তর্বেদনার জমাট অস্থির পাথর এ কথা ক’জন ভাবে! ঝিনুকের কোনো স্বাভাবিক প্রসব নয় মুক্তা। দুর্ঘটনাবশত ঝিনুকের দেহের ভেতরে যখন কোনো শক্ত বস্তু বিঁধে (বালিকণা, ধারালো পাথরকুচি, হাড় বা অন্য কিছু আটকে যায়) তখন ঝিনুকটি আহত ও বেদনাদগ্ধ হয়। বেশ কিছুদিন ওই ক্ষত নিয়ে যন্ত্রণাসহ অনেক কষ্ট করে চলে। তখন ওই বস্তটি উগড়ে দেয়ার জন্য তার অঙ্গারাভ্যন্তরেই একটি প্রক্রিয়া চলতে থাকে। বিঁধে যাওয়া দানাটির আকর যতো বড় হয়, ঝিনুকের ওই প্রক্রিয়াটিও ততো দীর্ঘদিনের হয়ে থাকে। এ প্রক্রিয়াটি হলো ঝিনুকের ক্ষতস্থানে এক ধরনের লালা নিৎসরিত হয়ে ওই কণা বা দানা আবৃত করে করে একটা গোলাকার কিংবা প্রায় গোলাকার কঠিন পি- তৈরি করে এবং এক সময় স্বয়ংক্রিয়ভাবেই তা ঝিনুকের দেহ থেকে বিযুক্ত হয়। এটিকেই আমরা মুক্তা হিসেবে কুড়িয়ে পাই। এর মসৃণ ওপর পিঠে সুন্দর মনোহারিত্বের একশেষ। ঈষৎ গোলাপি দুধেল হয় এর চকচকে শরীর। বাংলাদেশে এক ধরনের নীলাভ বহু মূল্যবান মুক্তা কদাচিৎ পাওয়া যায়। বিল অঞ্চলের এক বিশেষ প্রজাপতির সিঞ্চন এই নীল পাথরের উৎপাদক। আধুনিককালে যে মুক্তার চাষ হয় তাও পদ্ধতিগতভাবে একই। এটি নিরীহ ঝিনুকগুলোর ওপর অমানবিক অত্যাচারেরই এক নিষ্ঠুর অর্জন। মানুষ কৃত্রিমভাবে ঝিনুকের ভেতরাঙ্গে ক্ষত সৃষ্টি করে ওই ক্ষতে বালিকণা, পাথরকুচি বা ছোট কাচের টুকরো ঢুকিয়ে ঢুকিয়ে দেয়। এবার নিরূপায় ঝিনুক যন্ত্রণাকতর হয়ে যথানিয়মে বেদনার লালায় ওই বর্জ্যটি মুড়িয়ে মুড়িয়ে মুক্তা নামের মণি নির্মাণ করে।

শাঁখার বিষয়টিও আলাদাভাবে আলোচিত হওয়া সমোচিত। শঙ্খ কেটে শাঁখা বা এক ধরনের বিশেষ চুড়ি বানানোর যে প্রাচীন শিল্প, শাঁখারি শিল্প হিসেবে তা বাঙালির অতি পুরনো একটি লোকারুর সাক্ষী। সনাতন হিন্দু ধর্মে ওই শাঁখা-সিঁদুরের বিশেষ সামাজিক বিষয়ের অভিব্যক্তি রয়েছে। মোটা সাদা শঙ্খ কেটে ওই চুড়ি তৈরি করা হয়। শঙ্খর ডায়া যতো চিকন বা মোটা হয়, তা চাক চাক করে কাটলে চুড়ি ততো চিকন বা মোটা হয়ে থাকে। যখন তা খুব চিকন নলের মতো তখন কাটলে কব্জির চুড়ির বদলে আঙুলের আংটি হয়। ওই কাটাকুটির জন্য যে করাতটি ব্যবহার কা হয় এরই ঐতিহ্যবাহী নাম ‘শাঁখের করাত’। করাত লোহার। কিন্তু শাঁখ কাটার কাজে ব্যবহৃত হয় বলে ওই রকমের নাম। ওই করাতের বৈশিষ্ট্য আগেই বলেছি যেতেও কাটে, আসতেও কাটে। এভাবে কাটার পর এতে নকশা আঁকা হয়। ওই নকশা আঁকতে নরুনের মতো ছোট বাটালি এবং এর অনুপাতে হাতুড়ি ব্যবহার করা হয়। এ থেকেই বাঙালি হাতির দাঁতে নকশা খোঁদাইয়ের কাজে এক ধাপ এগিয়ে গিয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। বিশেষত মানকা হাতির কচি দাঁতে নকশা কাটা এবং শাঁখা অলঙ্করণের ধারণাটি একই। অবিভক্ত ভারত আমলের আসাম সংলগ্নতা ব্যাহত হওয়ার পর বাংলার ওই দ- শিল্পের উঠতি কারুশিল্পের বিকাশ সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়। পলিশ করা শাঁখায় আলো পড়লে এক ধরনের ঈষৎ গোলাপি-নীলচে রঙধনুর তির্যক মৃদুতা খেলে যায়। হিন্দু নারীর সিঁদুর ও শাঁখা পরার বিষয়টি তার সধবা অবস্থার পরিচায়ক। বয়েসি নারীর হাতে শাঁখা ও কপালে সিঁদুর না থাকলে বুঝতে হবে তিনি বিধবা। আর কম বয়সীদের ক্ষেত্রে ওই শাঁখা ও সিঁদুরের অনুপস্থিতির মানে হলো মেয়েটি অবিবাহিত। এর সঙ্গে কুসংস্কার ও প্রথা বিশ্বাসের যোগ রয়েছে যে, বিবাহিত নারীর পক্ষে শাঁখা না পরা এবং বিধবার পক্ষে শাঁখা পরা অমঙ্গলের সূচক। বিশেষ করে বিবাহিতার হাত শাঁখাশূন্য হলে স্বামীর আয়ুক্ষয় বা অন্যান্য অমঙ্গল হয় বলে পৌরাণিক মিথ রয়েছে। শাঁখা নিয়ে আরো কিছু লোকবিশ্বাস বাঙালির প্রাচীন জীবন থেকে চলে আসছে। গর্ভবতী গাভী এবং সদ্য প্রসূত বাছুরের গলা একপ্রস্থ সুতায় এক চাকতি শঙ্খখ- বালার মতো করে ঝুলিয়ে দিলে গাভী-বাছুরের জাদু-টোনা, ছুৎ, নজর লাগা, ভূত-প্রেতের আশ্রয়ী ইত্যাদির প্রতিরোধ হয়। হারের লকেটের মতো করে ঝুলিয়ে দেয়া ওই শঙ্খখ-কে শঙ্খবচলয় বলা হয়। আরো একটি গ্রামীণ নাম আছে, মনে করতে পারছি না। অন্যদিকে নকশি কাজ করা সোনার পাত গেঁথে দিয়ে ঝিনুকের লকেট তৈরির শিল্পকৌশল বাঙালি মণিকারের বহু পুরনো সোনারু কর্ম। শঙ্খের পলার ওপর কাজ করা স্বর্ণের পাত বসানো কিংবা স্বর্ণের ওই পাতে মিনা করাও বাঙালির প্রাচীন স্বর্ণ-শঙ্খ শিল্পের ঐতিহ্য। ওই দক্ষতা প্রসঙ্গে এ কথা বলা যেতে পারে, আমাদের মণিকাররা স্বর্ণকারের অন্য নাম যে ‘শেঁকরা’ এটিও এসেছে ‘শাঁখারি’ থেকে। এ শাঁখারির মাতৃশব্দ হলো শঙ্খ  শাঁখ  শাঁখা। শাঁখারি হচ্ছে ওই জাত বংশ যারা শঙ্খজাত গয়নাপত্র বানিয়ে পুরুষ পরস্পরায় জাতি ব্যবসা হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। তাই বলা যেতে পারে, বাঙালি হিন্দু জাতিভেদ সৃষ্টির ক্ষেত্রে শঙ্খের মাটি, স্বর্ণ, জাল, লোহা, তাঁতের মতো একটি বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। যেমন শাঁখারি চুনারি বা চুনে তারা বংশীয় পদবিপ্রাপ্ত হয়েছেন মূলত শঙ্খ কিংবা ঝিনুক থেকে। সুন্দরবন অঞ্চলে মুসলিমদের মধ্যে ‘শামুক খোটা’ নামে একটি জনগোষ্ঠী রয়েছে। ওই গোত্রের মানুষ সুন্দরবন থেকে শামুক, ঝিনুক, শঙ্খ সংগ্রহ করে জীবিকানির্বাহ করে থাকে। যেমনটি বাওয়ালিরা গোলপাতা, মাওয়ালিরা মধু ও মোম সংগ্রহের কাজ করে থাকেন ঠিক ওই রকম।
শঙ্খধ্বনি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্ম বিশ্বাসের বিষয়। গায়ত্রী সন্ধ্যায় শাঁখ বাজানো গৃহস্থের জন্য বিশেষভাবে মাঙ্গলিক। ওই শঙ্খবিধানির বিষয়টি এতোটাই বিশ্বাসের সঙ্গে পালন করা হয় যে, তা এখনো অলঙ্ঘনীয় ধর্মাচার হিসেবে পরিগণিত। হিন্দু ধর্মের কোনো কোনো দেব-দেবী ওই শঙ্খ বা মহাশঙ্খ ধারণ করেন। যেমন বিষ্ণু ভৈরবি, কামাখ্যা, বরাহ, কুর্ম, সূর্যসহ কেউ কেউ। বিশেষ করে বিষ্ণু শঙ্খ, ক্রি, গদা ও পদ্ম ধারণ করেন বলে তার একটি নামই হয়েছে ‘শঙ্খক্রিগদা পদ্মধারী’। বিয়েতে ওই শাঁখ বাজিয়ে নবদম্পতির জীবনের সামগ্রিক মঙ্গল নিশ্চিত করা হয়। যখন ওই শঙ্খনাদকে আশীর্বাদ হিসেবে স্বর্গীয় বিবেচনা করা হয় আবার বাতাসের বিপরীতে মুখ দিয়ে ধরে শাখের পেছনের ছিদ্রে কান পাতলে যে সোঁ সোঁ গভীর আওয়াজ শ্রুত হয় তখন তা নাকি সমুদ্রের নাদ বা ক্রন্দন। এ বিষয়ে লোকবিশ্বাস নির্ভর কিংবদন্তি বা লোককাহিনীর চল রয়েছে যে, এই শঙ্খশব্দ নাকি শাঁখের সমুদ্র ব্যঞ্জনার হাহাকার রোল। আসলে শঙ্খ খোলসের মধ্যে কয়েকটি প্যাঁচ থাকে। এর ভেতর দিয়ে গতি সম্পন্ন বাতাস নির্গত হতে বাধা পায় বলেই এমন গোঙানির শব্দ হয়।


রাজনৈতিক ক্ষেত্রে শঙ্খের ব্যবহার বিষয়ের অর্থটি নিশ্চয়ই বেশ কৌতূহল উদ্দীপক। সনাতন ধর্মের বিভিন্ন দেব-দেবীর শঙ্খ ধারণের যে পৌরাণিক ঘটনা তা মূলতই রাজনীতি ও যুদ্ধবিগ্রহ সংক্রান্ত তা বলাই বাহুল্য, রাজনীতিতে রাজনীতিই। যুদ্ধ, জয়, রাজ্য, সিংহাসন, স্বর্গবিচ্যুতি এসবও অতি অবশ্যই রাজনৈতিক বিষয়। আবার তাদের যুদ্ধক্ষেত্রে শঙ্খধ্বনিও আজকের কিউগলেরই নামান্তর। যা সর্বতভাবেই রাজনৈতিক ঘটনা তা যতোই হোক না কেন, পৌরাণিক।
যাহোক, ১৯৪৭ সাল-পূর্ব ব্রিটিশবিরোধী যে ‘স্বরাজ’ আন্দোলন এতে ভারতীয়রা অভিনব প্রতীকী ভাষায় সাবধানতা অবলম্বনে নির্দেশিত ছিল। সব পরিবারে যখন ওই মহল্লায় কোনো গোড়া পুলিশ বা ইংরেজ সৈনিক তল্লাশির জন্য কিংবা রেইট করতে ঢুকবে তখনই গৃহস্থ শঙ্খ ও কাঁসর বাজাবে যেন তাদের বাড়িতে কোনো উৎসব পার্বণের কাজ চলছে। আর ওই শঙ্খধ্বনি শোনার সঙ্গে সঙ্গেই লুকিয়ে থাকা স্বরাজ কর্মী অথবা তাদের আশ্রয়দাতারা দ্রুত সাবধান হয়ে থাকেন। বিশেষ করে স্বরাজ কর্মীরা সঙ্গে সঙ্গে সরে পড়তে বা যথাযথ আতœগোপন করতে পারেন।


রাজনৈতিক ছাড়া অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও শঙ্খ, শামুক, ঝিনুক ও গুগলির উল্লেখযোগ্য ভূমিকা যে ছিল এ কথা বেশি বয়সীদের জানা থাকলেও নতুন প্রজন্মের বাঙালির কাছে জানা না থাকারই কথা। এ অঞ্চলে ধাতব মুদ্রা ও কাগুজে নোটের চল শুরু শুরুর আগে এবং দ্রব্য বিনিময় প্রথা উঠে যাওয়ার পর, মানে, ওই দুটি যুগের মাঝখানে একটা দীর্ঘ কাল ছিল। তখন টাকা বা মুদ্রা হিসেবে কড়ি ব্যবহার করা হতো। কানাকড়ি মূল্য নেই’, ‘কড়ি দিয়ে কিনলাম’, পকেটে টাকাকড়ি নেই’, ফেলো কড়ি নাও মাল’, পাঁচকড়ি বাবু’ এসবই সাক্ষ্য দেয় এক সময় কড়িই ছিল টাকা বা পয়সা।
ওই কড়ি এক প্রকার প্রাকৃতিক শঙ্খ বা ঝিনুক ছাড়া অন্য কিছুই নয়। পরে কড়ি খেলার যে চল হয় তাও কড়ি মুদ্রা আমলে। এই কড়ি খেলা ছিল ওই আমলের জুয়া।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আরো ভূমিকা রয়েছে ঝিনুক বা শঙ্খার। আগে মানুষ জলাভূমি থেকে ঝিনুক সংগ্রহ করে রাখতো। আবার স্থান বিশেষে সংশ্লিষ্ট কারখানার প্রতিনিধি নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে গৃহস্থ বা সংগ্রাহকদের কাছ থেকে ঝিনুক সংগ্রহ করে তা দিয়ে বোতাম, চুলের কাঁটা ইত্যাদি তৈরি করতো। এক সময় আমাদের পোশাক শিল্প লোহার টিপ বোতাম এবং ঝিনুকের গোল ও চৌকা দুই ছিদ্রের বোতামের ওপর নির্ভরশীল ছিল। শাঁখারি, চুনারি ও শামুকখোটাদের জীবিকার প্রধান কাঁচামালও ছিল শঙ্খ বা ঝিনুক এ কথা আগেই বলেছি। কালে কালে চুনারিদের ঘরে ঘরে ঝিনুক পোড়ানো হাঁপর বা চুলার প্রচলন বিলপ্ত হয়। কৃষিতে অপরিণামদর্শী কীটনাশক প্রয়োগের ফলে বিভিন্ন জলাশয়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত হতে থাকে ঝিনুক-শঙ্খর বিবিধ বংশ। আবার বৈজ্ঞানিক ও খামার পদ্ধতিতে মাছ, হাস-মুরগি ইত্যাদি চাষের পরিপ্রেক্ষিতে খাদ্যদ্রব্য হিসেবে শামুক, ঝিনুক ও শঙ্খর ওপর চাপও পড়ে বেশ। ফলে যে কোনো অঞ্চলে যে কোনো জলাশয়ে প্রচুর ঝিনুক-শামুক পাওয়ার ক্ষেত্রে ভাটা পড়তে থাকে। এর পরিণতি এখন চরমে। তাই চুন তৈরিতে চুনারিদের ঝিনুক জোগাড় ও ব্যবহারের পদ্ধতিই পাল্টে গেছে। এখন দেশের দক্ষিণাঞ্চলে সমুদ্রপাড় ছাড়া সুন্দরবন এলাকায় সবচেয়ে বেশি চুনা উপাযোগী ঝিনুক পাওয়া যায়। ওইসব অঞ্চলে (বাগেরহাট, সাতক্ষীরা) বড় মহাজন ভাটা করে ঝিনুক গোড়ানোর বিরাট কারখানা বসিয়েছেন। সেখান থেকে বিভিন্ন জেলায় ট্রাকভরে উৎপাদকরা পোড়া ঝিনুক ক্রয় করে নিজ নিজ জেলায় নিয়ে কেবল ঘোটাঘুটির কাজ করে পাইকারি ও খুচরা দামে কাজ থাকে।
ঝিনুক যে কেবল শাঁখারি, প্যাঁকড়া, চুনারি ও শামুক থেকে সৃষ্টির পটভূমিকা প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে তা নয়। বাংলাদেশের কোনো কোনো অঞ্চলের নামকরণ হওয়ার ক্ষেত্রেও ঝিনুক-শামুক বিশেষ অবদান রয়েছে শাঁখারীবাজার, ঝিনাইগাতি, ঝিনাইদহ, শাঁখবাড়িয়া, মুক্তাগাছা প্রভৃতি। চুনারুঘাটের নামকরণের পেছনেও ঝিনুকের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে। এছাড়া ঝিনুক, শামুক, শঙ্খ, কড়ি ইত্যাদির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশের অনেক গ্রামের নাম নিশ্চয় পাওয়া যাবে। শাঁখারীপট্টি, চুনপাড়া এসব নাম তো সিংসন্দেহে মিলবে।


ঝিনুক, শামুক, শঙ্খের দেহ গড়নই কেবল বিচিত্র সুন্দর নয়, এর রঙ মনোহারি অপূর্ব বর্ণিল। দুটি ক্ষেত্রেই এর রকমফের বিস্ময় উদ্রেককারী সুন্দর। যে প্রজাতি, রঙ, মিঠা বা নোনা পানির হোক না শঙ্খ, এমনকি যে আকৃতিরই হোক না কেন, একটি ক্ষেত্রে এর অপরিহার্য মিল দেখা যায়। প্রতিটির খোলস খুব শক্ত এবং ভেতরটি ভীষণ নরম ও নাজুক। আবার খোলসের ক্ষেত্রে মিল হলো এগুলো একরঙা-বহুরঙা, কাঁটাযুক্ত-কাঁটামুক্ত, লম্বা-বেঁটে, ঢোপা-টেপা, গোল-তেকোণা, ভোঁতা-সুচালো যে আকারেরই হোক না কেন, ওই খোলস হয় আবশ্যিক ভাবেই প্যাঁচ বিশিষ্ট। ওই প্যাঁচ একাধিক এবং অনেক ক্ষেত্রে অগণতি।
শামুক ভাঙা, শঙ্খচিল এই পাখি দুটির নাম যে শঙ্খের সঙ্গে বেশ একটা সম্পর্কিত এ কথা আগেই বলেছি। বিষ্ণু দেবতার কথাও বলা হয়েছে যে, তার আরেক পৌরাণিক নাম হলো শঙ্খক্রিগদা পদ্মধারী। এছাড়া বাংলা সাহিত্য ও শব্দ ভা-ারে কিছু উচ্চারণ রয়েছে যা শঙ্খের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। যেমন শঙ্খকার, শঙ্খচিল, শঙ্খচূড়া, শঙ্খচুনি, শঙ্খবলয়, মহাশঙ্খর তেল, সুতাশঙ্খ, শঙ্খবিষ, শঙ্খমালা, শঙ্খনীল, শঙ্খমুখ। এর প্রতিটি বিষয় ভিত্তি করে ব্যাপক আলোচনার সুযোগ রয়েছে। এ সুযোগটি এখানে বিশেষ বিবেচনায় গ্রহণ করা গেল না। যদি আলোচনা করা যেতো তাহলে নিশ্চয়ই আমাদের কাছে আরো স্পষ্ট উপভোগ হতো যে, শঙ্খ কতো বহুরৈখিক আঙ্গিকে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে অর্থবহ বিষয় হিসেবে জেঁকে আছে। শঙ্খর যে বস্তুমূল্য এর বাইরেও বহুভাবে সাহিত্যিক ও রূপকাল্পনিক ভাবমূল্য রয়েছে। এ জন্য ওই কথা বললে অত্যুক্তি হবে না, শঙ্খ বাহ্যত যতো সামান্যই হোক না কেন তা লোকপৌরাণিক, আর্থসামাজিক এবং রীতিমতো ভাবসাহিত্যিক সম্পদ হিসেবে বহুরেখায় অত্যন্ত মূল্যবান। আসলেই শঙ্খের মাহাত্ম শঙ্খের চেয়েও অনেক। শঙ্খ বাহ্যত যা, আসলে এর চেয়ে বেশি।

 

মডেল : ঐশ্বর্য্য রহমান
পোশাক ও স্টাইলিং : সহজ টিম
মেকোভার : ক্লিওপেট্রা বিউটি স্যালন
ছবি : শোভন আচার্য্য অম্বু

 

বৈশাখে লোকজ মেলা ও তারুণ্য

অঞ্জন আচার্য

 

 

পহেলা বৈশাখ বাংলা সনের প্রথম দিন, তথা বাংলা নববর্ষ। দিনটি বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিশেষ উৎসবের সাথে পালিত হয় নববর্ষ হিসেবে। এছাড়া এ উৎসবে অংশ নেয় ত্রিপুরায় বসবাসরত বাঙালিরাও। সে হিসেবে এটি বাঙালিদের একটি সর্বজনীন উৎসব। সারা বিশ্বের বাঙালিরা এ দিনে বরণ করে নেয় নতুন বছরকে, ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করে অতীত বছরের যাবতীয় দুঃখ-গ্লানি। সবার কামনা থাকে নতুন বছরটি যেন হয় সমৃদ্ধ ও সুখময়। অন্যদিকে নতুনভাবে ব্যবসা শুরু করার উপলক্ষ্য হিসেবে এ দিনটিকে বরণ করে বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা। গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জি অনুসারে ১৪ এপ্রিল পালিত হয় এ পহেলা বৈশাখ। আধুনিক বা প্রাচীন যেকোনো পঞ্জিকাতেই মিল রয়েছে এই বিষয়ে। বাংলাদেশে প্রতি বছর ১৪ এপ্রিল এই উৎসব পালিত হয়। বাংলা একাডেমি নির্ধারিত আধুনিক পঞ্জিকা অনুসারে নির্দিষ্ট করা হয়েছে এই দিন।
অনেক আগে থেকেই বাংলা বারো মাস পালিত হতো হিন্দু সৌর পঞ্জিকা অনুসারে। গ্রেগরীয় পঞ্জিকায় এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে শুরু হতো এই সৌর পঞ্জিকার। হিন্দু সৌর বছরের প্রথম দিন আসাম, বঙ্গ, কেরলা, মনিপুর, নেপাল, উড়িষ্যা, পাঞ্জাব, তামিলনাড়– এবং ত্রিপুরার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বহুদিন থেকেই পালিত হতো। এখন যেমন নববর্ষ নতুন বছরের সূচনার নিমিত্তে পালিত একটি সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে, একসময় এমনটি ছিল না। তখন নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ পালিত হতো আর্তব উৎসব তথা ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে। তখন এর মূল তাৎপর্য ছিল কৃষিকাজ। প্রযুক্তির যুগ শুরু না হওয়ায় ঋতুর ওপরই নির্ভর করতে হতো কৃষকদের।
ভারতবর্ষে মোঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর সম্রাটরা কৃষি পণ্যের খাজনা আদায় করত হিজরি পঞ্জিকা অনুসারে। কিন্তু হিজরি সন চাঁদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা কৃষি ফলনের সাথে মিলত না। এতে অসময়ে কৃষকদেরকে বাধ্য করানো হতো খাজনা পরিশোধ করতে। তবে খাজনা আদায়ে সুষ্ঠুতা প্রণয়নের লক্ষ্যে মোঘল সম্রাট আকবর প্রবর্তন করেন বাংলা সনের। তিনি মূলত আদেশ দেন প্রাচীন বর্ষপঞ্জিতে সংস্কার আনার। সম্রাটের আদেশ মতে সৌর সন এবং আরবি হিজরি সনের ওপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম বিনির্মাণ করেন তৎকালীন বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহ উল্লাহ সিরাজি। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ মার্চ বা ১১ মার্চ থেকে শুরু হয় বাংলা সন গণনা। তবে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর করা হয় আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় (৫ই নভেম্বর, ১৫৫৬) থেকে। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন। পরে তা পরিচিত হয় বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ নামে। আকবরের সময় থেকেই শুরু হয় পহেলা বৈশাখ উদ্যাপন। তখন প্রত্যেককে চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে পরিশোধ করতে হতো সকল খাজনা, মাশুল ও শুল্ক। এরপর দিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে ভূমির মালিকরা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদেরকে আপ্যায়ন করাতেন মিষ্টান্ন দিয়ে। এ উপলক্ষ্যে আয়োজন করা হতো বিভিন্ন উৎসবের। একসময় এই

 

 

লোকজ সংস্কৃতি : আড়ম্বরপূর্ণ উৎসবের মধ্য দিয়ে এদেশে উদ্যাপন করা হয় পহেলা বৈশাখ। নতুন বছরের এ উৎসবের সঙ্গে রয়েছে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কৃষ্টি ও সংস্কৃতির নিবিড় সম্পর্ক। গ্রামগঞ্জের মানুষ ভোরে ঘুম থেকে ওঠে। নতুন জামাকাপড় পরে বেড়াতে যায় আত্মীয়স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের বাড়িতে। পরিষ্কার করা হয় ঘরবাড়ি-আঙিনা, সাজানো হয় মোটমুটি সুন্দর করে। সেই সঙ্গে থাকে বিশেষ খাবারের ব্যবস্থা। কয়েকটি গ্রামের মিলিত স্থানের খোলা মাঠে আয়োজন করা হয় বৈশাখী মেলার। আবহমান বাংলার চিরায়ত ঐতিহ্য এ মেলা৷ কেবল বাংলাদেশেই বৈশাখের প্রথম সপ্তাহে অন্তত দুই শতাধিক বৈশাখী মেলার আয়োজন বসে৷ সেখানে নানা স্বাদের মুড়ি-মুড়কি আর পিঠাপুলি তো রয়েছেই, সেই আদিকাল থেকে জনপ্রিয় পুতুলনাচের আসরও এই মেলার অন্যতম আকর্ষণ৷ আর নাগরদোলায় হাওয়ায় ভেসে নববর্ষের নতুন মুহূর্তগুলোকে উপভোগ করার অনুভূতি যেন একেবারেই ভিন্ন৷ এছাড়া রয়েছে হরেক রকমের কুটিরশিল্প আর হস্তশিল্পের বাহারি প্রদর্শনী৷ দেখা মেলে বাংলার ঐতিহ্য মাটির তৈরি বিভিন্ন পণ্যেরও৷ অনেক জায়গায় ব্যবস্থা থাকে ইলিশ মাছ দিয়ে পান্তা ভাত খাওয়ার আয়োজন। এই দিনের একটি পুরনো সংস্কৃতি হলো গ্রামীণ ক্রীড়া প্রতিযোগিতা। এর মধ্যে নৌকাবাইচ, লাঠি খেলা ও কুস্তি উল্লেযোগ্য। এদেশে এরকম কুস্তির সবচেয়ে বড় আসরটি বসে ১২ বৈশাখ, চট্টগ্রামের লালদিঘী ময়দানে। এটি জব্বারের বলি খেলা নামে বিশেষভাবে পরিচিত। বৈশাখে এসব মেলা হয়ে থাকলেও মেলাগুলো বর্ষবরণ মেলা, নববর্ষের মেলা, বান্নি মেলা আবার কোথাও এলাকার নামে, ব্যক্তি বা অন্যান্য নামে পরিচিতি পেয়ে থাকে। যার অন্যতম দৃষ্টান্ত এ আবদুল জব্বারের বলি খেলাটি। এছাড়া বর্ষবরণ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে মেলা হয়ে থাকে বৈশাখের প্রথম দিন চট্টগ্রাম নগরীর ডিসি হিল, সিআরবির শিরিষ তলা চত্ত্বরসহ বিভিন্ন স্থানে। চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠিত এসব মেলায় হা-ডু-ডু, কুস্তি লড়াই, লাঠিয়াল নাচ, পুতুল নাচ, সার্কাস, মোরগ লড়াই, ঘুড়ি ওড়ানো, ষাঁড়ের লড়াইসহ থাকে মজার মজার আয়োজন। একসময় এসব মেলায় জনপ্রিয় অনুষঙ্গ ছিল বায়োস্কোপ বাক্স। কিন্তু এখন এটি আর দেখা যায় না। তবে অনেক জায়গায় আয়োজন করা হয় পুতুল নাচ, সার্কাসের। এদিকে ঈশা খাঁর সোনারগাঁওয়ে বসে এক ব্যতিক্রমী মেলা, যার নাম বউমেলা। জয়রামপুর গ্রামের মানুষের ধারণা, প্রায় ১০০ বছর ধরে পহেলা বৈশাখে আয়োজিত হয়ে আসছে এ মেলাটি। পাঁচ দিনব্যাপী এই মেলাটি বসে প্রাচীন একটি বটগাছের নিচে। যদিও হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা সেখানে সমবেত হয় সিদ্ধেশ্বরী দেবীর পূজা উপলক্ষ্যে। বিশেষ করে কুমারী, নববধূ, এমনকি জননীরা পর্যন্ত তাঁদের মনষ্কামনা পূরণের আশায় এই মেলায় এসে পূজা-অর্চনা করে থাকেন। মিষ্টি ও ধান-দূর্বার সঙ্গে মৌসুমী ফল নিবেদন করেন ভক্তরা। এছাড়া মেলাকে ঘিরে পাঁঠাবলির রেওয়াজও বেশ পুরনো। তবে কালের বিবর্তনে বদলে যাচ্ছে পুরনো অর্চনার পালা। এখন ভক্তরা কবুতর উড়িয়ে শান্তির বার্তা প্রার্থনা করেন দেবীর কাছে। অন্যদিকে সোনারগাঁ থানার পেরাব গ্রামের পাশে আয়োজন করা হয় আরেকটি মেলার, যার নাম ঘোড়ামেলা। লোকমুখে প্রচলিত আছে, যামিনী সাধক নামের এক ব্যক্তি ঘোড়ায় চড়ে নববর্ষের এই দিনে সবাইকে প্রসাদ দিতেন।

তাঁর মৃত্যুর পর ওই জায়গাতেই বানানো হয় সাধকের স্মৃতিস্তম্ভ। প্রতি বছর পহেলা বৈশাখে স্মৃতিস্তম্ভে হিন্দুরা একটি করে মাটির ঘোড়া রাখে এবং সেখানে আয়োজন করে মেলার। যার কারণে মেলাটির নাম ঘোড়ামেলা। এ মেলার অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে নৌকায় খিচুড়ি রান্না করা। এরপর সেই খিচুড়ি কলাপাতায় করে খায় আবালবৃদ্ধবনিতা সবাই। সকাল থেকেই মেলাকে ঘিরে ঘটতে থাকে নানা বয়সী মানুষের সমাগম। একদিনের এ মেলাটি জমে ওঠে মূলত দুপুরের পর থেকে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পূজা উপলক্ষ্যে এ মেলার আয়োজন করা হলেও এতে প্রাধান্য থাকে সব ধর্মের মানুষেরই। মেলায় সবচেয়ে বেশি ভিড় লক্ষ করা যায় শিশু-কিশোরদের। মেলাতে বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে রাখা হয় নাগরদোলা, পুতুলনাচ ও সার্কাসের। এছাড়া মেলার ক্লান্তি দূর করতে যোগ হয় কীর্তন গান। খোল-করতাল বাজিয়ে এ কীর্তন গানের আসর চলে মধ্যরাত পর্যন্ত। অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলায় বসবাসরত আদিবাসীদের মধ্যে চলে বর্ষবরণের নানা আয়োজন। সে অঞ্চলের প্রধান তিনটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর রয়েছে স্বতন্ত্র বর্ষবরণ উৎসব। এ উৎসবটি ত্রিপুরাদের কাছে বৈসুক, বৈসু বা বাইসু, মারমাদের কাছে সাংগ্রাই ও চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যাদের বিজু নামে পরিচিত। বর্তমানে এ তিন জাতিগোষ্ঠী একত্রে উৎসবটি পালন করে থাকে। উৎসবের নামের আদ্যাক্ষর দিয়ে যার যৌথ নামকরণ করা হয়েছে ‘বৈসাবি’। এ উৎসবের রয়েছে নানা দিক। ত্রিপুরা সম্প্রদায় শিবপূজা ও শিবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনার মধ্য দিয়ে পালন করেন ‘বৈসুক’ বা ‘বৈসু’ উৎসব। এছাড়া মারমাদের ‘সাংগ্রাই’ উৎসব চলে তিন দিনব্যাপী। উৎসবে মারমাদের সবাই গৌতম বুদ্ধের ছবি নিয়ে নদীর তীরে যান এবং দুধ বা চন্দন কাঠের জল দিয়ে স্নান করান সেটিকে। এরপর আবার ওই ছবিটিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় আগের জায়গায় অর্থাৎ মন্দির বা বাসাবাড়িতে। আদিকাল থেকে অন্যান্য সম্প্রদায় থেকে ভিন্ন আঙ্গিকে পুরনো বছরকে বিদায় এবং নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে এ সাংগ্রাই উৎসব পালন করে আসছে মারমারা। ধারণা করা হয়, ‘সাক্রাই’ মানে সাল শব্দ থেকে ‘সাংগ্রাই’ শব্দটি এসেছে, বাংলায় যা ‘সংক্রান্তি’ নামে পরিচিত। মারমারা ‘সাংগ্রাই জ্যা’র অর্থাৎ মারমা বর্ষপঞ্জি তৈরি মধ্য দিয়ে সাংগ্রাইয়ের দিন ঠিক করে থাকে। 

 

 

১৩৫৯ খ্রিস্টাব্দের আগে থেকেই এ ‘সাক্রাই’ বা সাল গণনা করা হয়, যা ‘জ্যা সাক্রই’ নামে পরিচিত। অন্যদিকে চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যারা উৎসবটি পালন করে চৈত্রের শেষ দুই দিন ও বৈশাখের প্রথম দিন মিলিয়ে মোট তিন দিন ধরে। এর মধ্যে চৈত্রের শেষ দিনটিতে থাকে এ উৎসবের মূল আকর্ষণ। ওই দিন প্রত্যেকের ঘরে পাঁচ প্রকারের সবজি দিয়ে বিশেষ একপ্রকার খাবার রান্না করা হয়। তাদের বিশ্বাস, এই পাঁচনের দৈব গুণাবলী আছে, যা আসছে বছরের সকল রোগবালাই ও দুঃখ-দুর্দশা দূর করে থাকে। এছাড়া এদিন বিকেলে ঐতিহ্যবাহী ঘিলা, বৌচি ইত্যাদি খেলারও আয়োজন করা হয়। কিশোরী-তরুণীরা নদীর জলে ফুল ভাসায়। তিন দিনের এ উৎসবে ওই সম্প্রদায়ের কেউ কোনো জীবিত প্রাণী হত্যা করে না। ‘বৈসাবি’ উৎসবের মূল আয়োজন হলো জলখেলা। উৎসবটি পার্বত্য অঞ্চলে কমবেশি সবার কাছেই জনপ্রিয়। উৎসবে আদিবাসীরা সবাই সবার দিকে জল ছুঁড়ে আনন্দে মাতেন। তাদের মতে, এ জলের মধ্য দিয়ে ধুয়ে যায় বিগত বছরের সকল দুঃখ, পাপ। জলখেলার আগে অনুষ্ঠিত হয় জলপূজা। মারমা যুবকরা এ উৎসবে তাদের পছন্দের মানুষটির গায়ে জল ছিটিয়ে সবার সামনে প্রকাশ করে তাদের ভালোবাসার কথা। এর মধ্য দিয়ে আন্তরিক হয় পরস্পরের সম্পর্কের বন্ধন। তারুণ্যের মেলা : বৈশাখ মানেই বাঙালির উৎসবমুখর একটা দিন। বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসব বৈশাখের প্রথম দিনটি। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি নির্বিশেষে সকলেই অংশ নেয় বৈশাখী আয়োজনে। অসাম্প্রদায়িক চেতনায় ঋদ্ধ এই দিনটিকে বাঙালিরা বরণ করে নেয় অতীত বছরের সব দুঃখ-গ্লানি ভুলে। নতুন বছরটি যেন সুন্দর, সুখময় ও সমৃদ্ধ হয় এই কামনাই থাকে সবার মনে ও প্রাণে। প্রতিবারই এই সর্বজনীন উৎসবটি ভরে ওঠে তারুণ্যের উচ্ছাসে। উৎসবকে ঘিরে প্রস্তুতিরও কমতি থাকে না তরুণদের মধ্যে। রঙিন পোশাকে তরুণ-তরুণীরা হাঁটে আনন্দ-উচ্ছাসে। অস্থায়ী দোকানগুলোতে পসরা সাজানো হয় বাহারি খাবার। থাকে পান্তা-ইলিশ খাওয়া ধূম। বাঙালির ঐতিহ্যের সাথে মিশে গেছে নববর্ষে ইলিশ মাছ দিয়ে পান্তা ভাত। শহুরে জীবনে পান্তা-ইলিশ ছাড়া যেন নববর্ষ অপূর্ণ থেকে যায়। রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ ও মঙ্গল শোভাযাত্রার মধ্য দিয়েই বর্ষবরণ উদযাপন শুরু হয়। ছায়ানটের শিল্পীরা সম্মিলিত কণ্ঠে সূর্যোদয়ের সাথে সাথে গেয়ে ওঠে রবি ঠাকুরের ‘এসো হে বৈশাখ’ গানটি। এ গানের মধ্য দিয়ে বরণ করে নেয়া হয় নতুন বর্ষকে। কণ্ঠশিল্পীদের অধিকাংশই থাকে তরুণ প্রজন্মের। অন্যদিকে বৈশাখী বা নববর্ষ উৎসবের আবশ্যিক একটি অংশ হচ্ছে মঙ্গল শোভাযাত্রা। ১৯৮৯ সাল থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা পহেলা বৈশাখের অন্যতম একটি আকর্ষণ। এটাও তরুণদের একটি অন্যতম বৈশাখী সংযোজন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে যাত্রা শুরু করে এর। পায়ে পা মেলায় লাখো মানুষ। শোভাযাত্রায় ফুটিয়ে তোলা হয় আবহমান গ্রামবাংলা ও জীবনের ছবি। এ মঙ্গল শোভাযাত্রায় স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ করে বিভিন্ন রংবেরঙের মুখোশ পরে তরুণরা। ঢাক-ঢোলের আওয়াজ আর বৈশাখী নানা গানের আয়োজনে এ দিনটি হয়ে ওঠে আরও উৎসবমুখর। মূলত রমনা বটমূল এই উৎসবের কেন্দ্রস্থল। এসব অনুষ্ঠানে তুলে ধরা হয় বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে। এছাড়া বৈশাখ উপলক্ষে প্রতি বছরই মোবাইল কোম্পানিগুলো নিয়ে আসে তরুণদের জন্য হরেক রকম অফার। আর এ অফারগুলোর সঙ্গে নানা রকম উপহার সামগ্রী তো থাকেই। কী গ্রাম কী শহর সব জায়গাতেই সৃষ্টি হয় প্রাণচাঞ্চল্য। আনন্দে মাতে পুরো দেশের তারুণ্য। পহেলা বৈশাখের বেশ কিছু দিন বাকি থাকতেই শুরু হয় এর প্রস্তুতি। বৈশাখ মানে লাল-সাদার মিশেল। বৈশাখ শুধু লালকে ধারণ করে না; বরং পুরো বিশ্বের কাছে আমাদের রঙিন হওয়ার ঐশ্বর্যকে প্রথম মাত্রা দেয়। তাই বহুকাল ধরেই লাল-সাদার ধারাবাহিকতায় এই বৈশাখেও তরুণদের দিনটি হয়ে ওঠে লালের সম্ভাবনায় উজ্জ্বল, লালের ঐশ্বর্যে সুখময় আর লালের দীপ্তিতে রঙিন। ভোরের আলো ফুটতেই তরুণদের শুরু হয় সাজসজ্জা। আর বৈশাখ এলেই গায়ে ওঠে পাটভাঙা তাঁতের শাড়ি। লাল ও সাদা তো থাকেই, সঙ্গে থাকে বাহারি রং। কিংবা অন্য কোনো রঙের শাড়িতে সেজে কপালের টিপ আর হাতের চুড়িটা পরে লাল। অথবা শাড়িতে চাই কোনো বাঙালি মোটিফ। বৈশাখকে ঘিরে তরুণদের চাহিদার থাকে পাঞ্জাবি, ফতুয়া, বৈশাখী শার্ট, গামছাসহ কিছু নতুন ও ব্যতিক্রমী প্রসাধনী সামগ্রী। ফতুয়ায় বাঙালির ঐতিহ্যবাহী ঢোল, একতারার ডিজাইনগুলো কিছুটা ব্যতিক্রম ও নজরকাড়া। আর সেদিকেই ঝুঁকে অধিকাংশ ফ্যাশন-সচেতন তরুণ প্রজন্ম। পহেলা বৈশাখকে আনন্দময় করে গড়ে তুলতে থাকে বৈচিত্র্যময় আয়োজন। ‘এসো এসো এসো হে নবীন, এসো এসো হে বৈশাখ এসো আলো, এসো হে প্রাণ ডাক কাল বৈশাখীর ডাক।’ তারুণ্যের প্রতি সুকান্তের এ আহ্বানই বৈশাখকে করে তোলে আরও বেশি তরুণ। প্রতি বছরেই বৈশাখ আসে নতুন রূপে নতুন সুরে নতুনের আহ্বানে। ‘মুছে যাক গ্লানি ঘুচে যাক জরা, অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা। এসো হে বৈশাখ এসো এসো’ জীর্ণতাকে পেছনে ফেলে নতুনের পথে এগিয়ে চলার গানটি

বৈশাখের প্রথম দিনটিতে তরুণদের মুখে মুখে ফেরে। সূর্য একটু তাতিয়ে উঠলে তরুণেরা গেয়ে ওঠে ফিডব্যাকের ‘মেলা যাইরে’। বছরের সারাটা সময়ে এ আয়োজনে মেতে ওঠার অপেক্ষায় থাকে তরুণরা। আবার অনেকে বৈশাখ আসার আগেই বিভিন্ন হিসাব-নিকাশ করে রাখে বৈশাখের দিনটা কীভাবে কাটাবে ভেবে। ঢাকা কলেজের গণিত বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র অমিতের কাছে বৈশাখের প্রথম দিনটা সবসময়ই অন্যান্য দিনগুলোর চেয়ে আলাদা। এই দিনটাকে নিয়ে সবসময়ই থাকে তার আলাদা পরিকল্পনা। এ ক্ষেত্রে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়াটা প্রাধান্য পায় সবার আগে। এর সাথে যোগ হয় দিনব্যাপী ঘোরাঘুরি। আর খাওয়া-দাওয়া? সেটার কথা তো হিসাবের বাইরে। কোথায় কী খাওয়া হবে, তার নেই ঠিক। একই বিভাগের খায়রুলের দিনটা কাটে আর সবার মতোই। দারুণ আনন্দ নিয়ে সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে বন্ধুদের সাথে বেরিয়ে পড়ে সে। গন্তব্য রমনার বটমূল। তারপর রমনাতে গিয়ে সবাই মিলে পান্তা-ইলিশ খাওয়াটা তো এখন একটা রেওয়াজ। সুতরাং তার পান্তা ইলিশ চাই-ই চাই। আর মেলায় ঘোরাঘুরি ছাড়া পহেলা বৈশাখ জমেই না। তাই রোদে পুড়ে, ঘামে ভিজে বৈশাখ উপভোগ করেন শ্রাবন্তী। এদিকে ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির বিবিএ-এর শিক্ষার্থী ফারিয়া, অনিষা, নাফিম, মোনা, মৌ কথায় ওঠে আসে দিনটি উদ্্যাপনের বিবরণ। তাদের কথা, ওই দিনটি কেবলই নিজেদের মতো করে পালন করার দিন। ওই দিন আত্মীয়দের বাড়িতে যাওয়া হয়ে উঠে না কারো। তাই এ দিনটাকে বেড়ানোর কাজেই সারাদিন কাটায় ওরা। ফারিয়ার কথা, বৈশাখের প্রথমদিনে সকালে গোসল সেরে নতুন শাড়ি পরে মোটামুটি কাছের সব আত্মীয়-স্বজনদের বাসায় অল্প সময়ের একটি পরিকল্পনা করে সে। অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মিথিলা থাকে রোকেয়া হলে। সবসময় বাড়িতে যাওয়া হয়ে উঠে না তার। বৈশাখের এই দিনগুলোতে ছুটি পায় বলে বাসায় চলে যায় সে। ওখানে এই দিনটাতে সকালবেলা সবার আগে বাবা-মায়ের কাছে যায়। এরপর নাস্তা সেরে দেখা করে সব স্কুল ও পাড়ার বান্ধবীদের সাথে। এই দিনটাতে নতুন করে আড্ডায় মেতে উঠে সবাই। তারপর সবচেয়ে প্রিয় আমভর্তা তৈরি করে একসাথে খায় সবাই মিলে। সব মিলিয়ে এই দিনটা তরুণরা হৈ হুল্লর করেই কাটিয়ে দেয়।

বিচিত্র রূপের হালখাতা

সাইমন জাকারিয়া

 

 

হালখাতা বাংলা নববর্ষ উদযাপনের বিচিত্র রূপ ও সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। সাধারণত বাংলাদেশের গ্রামীণ ব্যবসায়ীরা বাংলা নববর্ষ এলে হালখাতার আয়োজন করেন। তারা এ সময় মূলত নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা দোকানের সুহৃদ ক্রেতা ও বিভিন্ন লেনদেনকারী ব্যক্তিকে আমন্ত্রণের মাধ্যমে মিষ্টিমুখ করান। এই মিষ্টিমুখ করানোর ফাঁকে ব্যবসায়ীরা বিগত বছরের হিসাবের খাতার পাট চুকিয়ে নতুন খাতায় নতুন বছরের ব্যবসার হিসাব শুরু করে থাকেন। সুহৃদ ক্রেতারাও হালখাতার আয়োজনে যোগ দিয়ে সারা বছরের বকেয়া পরিশোধ করেন। হালখাতা নামটির ভেতর সংস্কৃতির এই রহস্য লুকিয়ে আছে। আসলে আরবি ‘হাল’ শব্দের সঙ্গে ফার্সি শব্দ ‘খাতা’ মিলে হালখাতা রূপ ধরেছে। আরবি ভাষার ‘হাল’ শব্দটির অর্থ হলো বর্তমান বা চলতি এবং ফার্সি ‘খাতা’ শব্দটির অর্থ হলো বই বা বহি। তাই সামগ্রিক বিচারে ‘হালখাতা’র অর্থ হলো চলতি বছরের হিসাবের খাতা বা বই। পুরনো বছরের পাট চুকিয়ে নতুন বছরের জন্য নতুন খাতা বা বইয়ে হিসাব লেখার সূচনা করার আনুষ্ঠানিক সংস্কৃতি পালনের নামই ‘হালখাতা’।
বাংলাদেশের এমন কোনো অঞ্চল হয়তো খুঁজেই পাওয়া যাবে না যেখানে বাংলা নববর্ষ উৎসবের অংশ হিসেবে হালখাতার অনুষ্ঠান হয় না। আগে ওই আয়োজন গ্রামীণ সমাজের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী এবং তাদের দরিদ্র ক্রেতার মধ্যে প্রচলিত ছিল। এখন ওই দৃশ্যপট পরিবর্তিত হয়েছে। বর্তমানে বড় ব্যবসায়ীরাও হালখাতার আয়োজন করে থাকেন। একই সঙ্গে হালখাতার আয়োজন গ্রাম ছাড়িয়ে নগর সমাজেও বিস্তৃত হয়েছে। ঢাকা মহানগরের অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে এখন বাংলা নববর্ষের সময় হালখাতার আয়োজন করতে দেখা যায়।
এক সময় গ্রামে হালখাতার আয়োজনে মিষ্টি হিসেবে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তথা দোকানের পাশেই গরম জিলাপি ভাজা হতো এবং ক্রেতারা এসে বকেয়া পরিশোধের মাধ্যমে মজা করে ওই জিলাপি খেতেন। শুধু তা-ই নয়, ক্রেতারা যখন ফিরে যেতে উদ্যত হতেন তখন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা দোকানের মালিক কর্তৃপক্ষ তাদের হাতে তুলে দিতেন বাড়ির সদস্যদের জন্য একটি জিলাপির ঠোঙা।
তাই গ্রামীণ সমাজে হালখাতার জন্য শুধু ব্যবসায়ীরা অপেক্ষা করতেন না, ক্রেতা ও তাদের পরিবারের সদস্যরাও অপেক্ষা করতেন যুগপৎ। শুধু জিলাপিই নয়, হালখাতার আয়োজনে কোথাও কোথাও স্থানীয় বিভিন্ন মিষ্টান্ন তথা ম-া-মিঠাই অভ্যাগতদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। বড়দের পাশাপাশি হালখাতার আয়োজনে শিশুদেরও সরব উপস্থিতি ঘটে। মূলত অভিভাবকদের হাত ধরেই শিশু-কিশোররা হালখাতার আয়োজনে শরিক হয়ে থাকে। বড়দের মতো শিশু-কিশোরদের জন্যও দেওয়া হয় রসে ডুবুডুবু ধবধবে সাদা বড় রাজভোগ যার ভেতরে থাকে ছোট ক্ষীরের পুঁটলিতে পোরা সুগন্ধি একটি এলাচদানা। খুব তৃপ্তি নিয়ে সব বয়সী মানুষ হালখাতার মিষ্টান্ন যেমন আহার করে থাকেন তেমনি কোথাও দেওয়া কালিজিরা ছিটানো হালকা গেরুয়া রঙের নিমকি খেয়ে কারও মন গলে যায়। নিমকির মচমচে ভাজায় অন্তর চাঙ্গা হয়ে ওঠে। কোথাও আবার গন্ধ কর্পূূর মেশানো ঠা-া এক গ্লাস পানি হৃদয়টি শীতল করে দেয়। রাজভোগের মিষ্টতার বিলাসী আবেশের সঙ্গে নোনতা নিমকির নিরপেক্ষ স্বাদ দুই বিপরীত রসের স্রোতে রসনায় বৈচিত্র্য আনে বৈকি।
হালখাতার আয়োজন উপলক্ষে নববর্ষ আসার আগের দিন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করা হয়। নববর্ষের দিন হালখাতা উপলক্ষে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সামনে দুটি বা চারটি কলার গাছ লাগিয়ে একটি প্রবেশপথ তৈরি করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন রঙিন কাগজ দিয়ে দোকান বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটি দারুণভাবে সাজানো হয়। জ্বালানো হয় সুগন্ধি আগরবাতি। ব্যবসায়ী বা তার আমন্ত্রিত ক্রেতারা ওই রঙিন ও সুগন্ধ ছড়ানো আয়োজনের মধ্যে আসেন নতুন রঙিন বা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পোশাক পরে। সব মিলিয়ে একটা ফুরফুরে ও সুন্দর ভাব সৃষ্টি হয় হাতখাতার পুরো আয়োজন ঘিরে।
আরেকটা ব্যাপার উল্লেখ করা প্রয়োজন। তা হলো, হাতখাতার এ ধরনের আয়োজনের আগেও কিছু কাজ থাকে। যেমন আমন্ত্রপত্র তৈরি, বিতরণ অথবা মৌখিকভাবে আমন্ত্রণ জানানোর বিষয়। তবে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হাতখাতার জন্য প্রস্তুতকৃত আমন্ত্রণপত্রের মাথায়, এমনকি কখনো কখনো হালখাতার জন্য সজ্জিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রবেশপথের মুখে একটা না একটা স্বস্তিবচন লেখা থাকে। ওই স্বস্তিবচন মূলত ব্যবসায়ীদের নিজস্ব ধর্ম বিশ্বাস অনুযায়ী নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে অর্থাৎ তারা ইসলাম, সনাতন, বৈষ্ণব, বৌদ্ধ, ক্রিশ্চিয়ান ইত্যাদি যে ধর্ম মতের অনুসারীই হোন না কেন, যার যার ধর্ম মতের প্রচলিত বিশ্বাস ও ভক্তিভাব অনুযায়ী স্বস্তিবচনের শিরোনাম বা বন্দনাস্তবক লেখা হয়ে থাকে। কোথাও হয়তো লেখা থাকে, ‘এলাহি ভরসা’, কোথাও ‘নমো গণেশায় নমঃ’, ‘শ্রীহরি’, ‘জয় রাধা-কৃষ্ণ’ বা ‘বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি’, ‘ধম্মং শরণং গচ্ছামি’, ‘সঙ্ঘং শরণং গচ্ছামি’ ইত্যাদি। কোথাও আবার একটা ‘ক্রুশ’চিহ্নও এঁকে দেওয়া হয়। এ ধরনের স্তবক লিখন দেখে হালখাতার অনুষ্ঠানটি ধর্ম প্রভাবিত বলা চলে না। কারণ এ ধরনের লিখনের ভেতর দিয়ে মূলত ব্যবসায়ীর নিজস্ব বা ব্যক্তিগত ধর্ম বিশ্বাস প্রতিফলিত হয়। কিন্তু আমন্ত্রণপত্রটি বিতরিত হয় সব ধর্মের ক্রেতা বা আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে।
প্রখ্যাত প-িত মুহম্মদ এনামুল হকের মতে, বর্তমানে হালখাতা ব্যবসায়িক অনুষ্ঠান হলেও আসলে এ হচ্ছে একটা কৃষি বিষয়ক অনুষ্ঠান। প্রাচীনকালে ‘দ্রব্য’ বিনিময়ের মাধ্যমে (‘মুদ্রা’ বিনিময়ের মাধ্যমে নয়) যখন ব্যবসা চলতো তখন গৃহস্বামী তার উৎপন্ন দ্রব্যের কতোটুকু নিজের জন্য রেখে অবশিষ্টটুকুর দ্বারা নিজের প্রয়োজনীয় অন্য দ্রব্য নেবেন এ সম্পর্কে একটা হিসাব। তা যে কোনো উপায় হতে পারে। যেমন রাশিতে গেরো দিয়ে, পাথর বা মাটির ঢেলার স্তূপ জমিয়ে তাকে রাখতে হতো। তারপর অনেক পরে তিনি তালের পাতায় ‘টোকা’ রেখে অথবা তুলট কাগজে ‘চোতা’ বানিয়ে ওই কাজ সেরেছেন। বর্তমানে হালখাতা এরই বিবর্তিত রূপ।
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হালখাতা এখন অনেকভাবে হয়ে থাকে। মানিকগঞ্জ ও বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে হালখাতা উপলক্ষে ‘লাঠিখেলা’, ‘বুড়া-বুড়ির সঙ’ ‘কিচ্ছা’ ইত্যাদি পরিবেশনামূলক লোকশিল্পের আয়োজন করা হয়। এতে একই সঙ্গে স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে হালখাতার নিবিড় সম্পর্ক রচিত হয়। আমাদের ধারণা, হালখাতার সঙ্গে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের এ ধরনের আয়োজন নতুনভাবে যুক্ত হয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে হালখাতার এ ধরনের সাংস্কৃতিক আয়োজন বাংলাদেশের সব অঞ্চলের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে বলেই প্রত্যাশা রাখি।

এবং

প্রমিত হোসেন 

 

 

মনের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছিল বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের।
বিশ্বাস বলল, আসবে।
অবিশ্বাস বলল, আসবে না।
বিশ্বাসের দিকে অবিশ্বাস তাকাল করুণার দৃষ্টিতে।
বিশ্বাস বলল, তুমি বোকা।
অবিশ্বাস বলল, তুমি অন্ধ।
যাকে নিয়ে এই দ্বন্দ্ব সে বলেছিল বিকেল চারটের মধ্যে আসবে। বিশ্বাস বড় আশায় তার কথায় বুক বেঁধেছিল। বিশ্বাস প্রথম দিকে অবিশ্বাসকে পাত্তা দেয়নি। তখন বিশ্বাসের কাছ ঘেঁষতে পারেনি অবিশ্বাস। দূরেই ঘোরাঘুরি করছিল। কিন্তু সময় যত গড়াচ্ছিল, যে আশায় বুক বেঁধেছিল বিশ্বাস তা ক্রমশ ততই আলগা হয়ে যাচ্ছিল। যখন প্রায় চারটে বাজে আর তখনও সে আসেনি, আশার বাঁধন ঢিলে হয়ে খুলে পড়ল। এ সময় বিশ্বাসকে পেয়ে বসল অবিশ্বাস। যখন চারটে বাজল এবং সে এল না, অবিশ্বাস দেঁতো হাসি হেসে বলল, বলেছিলাম সে আসবে না?
বিশ্বাস কোনও রকমে বলল, হয়ত কোনও কারণে দেরি হচ্ছে, এসে পড়বে।
অবিশ্বাস তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, তাই নাকি! বেশ, দেখা যাক।
এক ঘণ্টা পেরিয়ে গেল। দুই ঘণ্টা। তিন। এবং চার।
অবিশ্বাস অবজ্ঞার সুরে বলল, জানতাম আসবে না।
বিশ্বাস ঢোক গিলল। মুখটা শুকনো। কোনও কথা বলতে পারল না।
বিজয়ী অবিশ্বাসের দেঁতো হাসিটা চওড়া হয়ে উঠল।


[প্রথম প্রহর/জন্মদিন-২০১৫]

Page 9 of 24

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

Twitter feed

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…