Super User

Super User

Page 2 of 24

মূল্যবোধ পুনরুজ্জীবিত করতে হবে

আলী যাকের

 

 


বয়স যখন বাড়ে, মানুষের কর্মক্ষমতা হ্রাস পেতে থাকে তখন স্বভাবতই তারা পেছনের দিকে তাকান। অনেকে মানুষের এই অতি স্বাভাবিক আচরণের প্রতি তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে। অথচ এটিই মানুষের ধর্ম। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ কেন স্মৃতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে এ সম্পর্কে অনেকে অনেক রকম ব্যাখ্যা দিয়েছেন। আমি নিজের মতো করে বিষয়টি নিয়ে ভাবার চেষ্টা করেছি। এ বিষয়ে আমারও একটি ব্যাখ্যা আছে। আমি মনে করি, মানুষ যখন দুর্বল হয়ে পড়তে থাকে, বয়সের ভারে ন্যুজ্ব দেহ তখন সে অতীতের স্মৃতি থেকে, তার যৌবন থেকে শক্তি সঞ্চয় করার চেষ্টা করে। এতে অন্যায়ের কিছু দেখি না। আমি মনে করি, এটিই স্বাভাবিক। এই যে পেছনে ফিরে তাকানো, এই যে স্মৃতির মেলা ভিড় করে আসা আমাদের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে, এতে এমন অনেক কিছুই খুঁজে পাই স্মরণে যা থেকে আমরা বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য অনেক দিকনির্দেশনা পেতে পারি। আমার মনে পড়ে, বেশ কিছুকাল আগে এই বিষয়ের ওপর ইংরেজি একটি কলাম লিখেছিলাম। এর শিরোনাম ছিল ‘ণবংঃবৎফধু, ড়হপব সড়ৎব!’ এ শিরোনামটি অনেক বছর আগের একটি ইংরেজি গান থেকে নেয়া। এ গানটি আমাদের তারুণ্যে আমরা গুন গুন করে গাইতাম। ইংরেজিতে একটি শব্দ আছে ‘নস্টালজিয়া’। এর কোনো জুতসই বাংলা খুঁজে পাইনি। ‘স্মৃতিনির্ভরতা’ বোধহয় এর সবচেয়ে কাছাকাছি শব্দ। তবে গোল বাধিয়েছে ‘নির্ভরতা’ শব্দটি। নস্টালজিয়া বলতে মনে যে ভাবের সঞ্চার হয় সেটিকে একটি বাক্যে আমরা বর্ণনা করতে পারি এভাবেÑ ‘স্মৃতি সততই সুখের’। এই সুখস্মৃতি সব বয়সের সব মানুষের জন্যই সমান আবেদন সৃষ্টি করে বলে আমার মনে হয়। আমার মনে আছে, আমি অত্যন্ত অপরিণত বয়স থেকে স্মৃতিস্পর্শ। আমার প্রিয় একটি নীল তোয়ালে ছিল। একবার মায়ের সঙ্গে কলকাতায় নানাবাড়ি যাওয়ার সময় ট্রেন থেকে জানালা গলে ওই তোয়ালেটি বাতাসে উড়ে যায়। আমার ইচ্ছা হচ্ছিল চেইন টেনে ট্রেন থামিয়ে তোয়ালেটি খুঁজে নিয়ে আসি। ওই কাজটি করা থেকে আমাকে নিবৃত্ত করেন মা। যা ছিল, এখন নেই এর প্রতি মানুষের আকর্ষণ সর্বদাই সবচেয়ে বেশি। এ কারণেই বোধহয় চিন্তাশীল মানুষের কাছে স্মৃতি বিষয়টি এতো হৃদয়ের কাছাকাছি এসে যায়। এ রকম বেশকিছু স্মৃতি আছে অতীতের যা কখনোই ভুলে যাওয়া যায় না। মুক্তিযুদ্ধের কথাই ধরা যাক। আমাদের প্রজন্মের যারা ওই যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করেছে কিংবা এতে অংশগ্রহণ করেছে তাদের পক্ষে ওই সময়কার স্মৃতি ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়। এ রকম অনেক বিষয় আছে।


ভুলে যাওয়া সম্ভব নয় বাল্যকালের দিনগুলো। আমি নিশ্চিত, প্রত্যেকেরই বাল্যকাল নিয়ে মধুর সব স্মৃতি রয়েছে। অনেক দুঃখজনক স্মৃতিও থাকতে পারে। কিন্তু মানুষ দুঃখের কথা ভাবতে চায় না। ওই সুখস্মৃতিগুলো ধরে রাখে হৃদয়ে। আমার বাল্যকালের অধিকাংশ সময় কেটেছে খুলনা ও কুষ্টিয়ায়। থাকার জন্য খুলনায় বাবা একটা ছোট্ট কিন্তু সুন্দর বাড়ি পেয়েছিলেন খুলনা পুলিশ লাইনসের ঠিক উল্টোদিকে। প্রসঙ্গত উল্লেখ করতে হয়, ওই বাল্যকালের পর অনেকবারই যেতে হয়েছে খুলনায়। ওই শহরে গিয়ে যে ঠিকানাতেই থাকি না কেন, রিকশা করে কিংবা হেঁটে একাধিকবার ওই বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়া-আসা করেছি এবং প্রতিবারই যেন ফিরে গিয়েছি ওই বাল্যকালে। অনেক খ- স্মৃতি মনে এসেছে যেন কোনো নিñিদ্র অন্ধকার থেকে লাফিয়ে উঠে এসে উপস্থিত হয়েছে একেবারে দুই চোখের সামনে। ওই বাড়ির সামনেই পুলিশ লাইনস সংলগ্ন একটি গলি চলে গিয়েছিল ভেতর দিকে। ওই গলির মুখে একটা ছোট্ট মুদির দোকান ছিল। ওই দোকানে এক আনা পয়সা দিলে এক টুকরো গুড় পাওয়া যেতো। কোনো সময় মা আমার কোনো কাজে খুশি হয়ে যদি এক আনা পয়সা আমাকে বখশিশ দিতেন তাহলে দৌড়ে চলে যেতাম ওই দোকানেÑ এক টুকরো গুড় কিনতাম, খেতে খেতে চোখ বুজে আসতো। স্বর্গসুখ কাকে বলে ওই স্বাদ যেন পেতাম গুড়ের টুকরোর মধ্যে। অমন মিষ্টি আর জীবনে কখনো খেয়েছি বলে মনে পড়ে না। প্রাসঙ্গিকভাবে চলে আসে আমার মিষ্টির প্রতি দুর্বলতার কথা। ইংরেজিতে যাকে বলে ঝবিবঃ ঞড়ড়ঃয তা-ই আমার ছিল বাল্যকাল থেকে। আরো পরে আমাদের দল যখন নাটক করতে ঢাকার বাইরে বিভিন্ন শহরে গেছে সেখানকার নাট্যবন্ধুদের প্রথমেই জিজ্ঞাসা করতাম, আচ্ছা, তোমাদের শহরের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ মিষ্টি কী? তারপর হৈ-হুল্লোড় করতে করতে সবাই মিষ্টি খাওয়ার জন্য বেরিয়ে পড়তাম


রাস্তায়। এখন অবশ্য মিষ্টি খাওয়ার কথা ভাবাও প্রায় পাপ। আমার রক্তে মিষ্টির আধিক্যে আজ মিষ্টিহীন জীবন যাপন করছি।
যাকগে সে কথা। ফিরে যাই খুলনার গুড়ের টুকরোয়। ওই মিষ্টি ছিল আমার খাওয়া শ্রেষ্ঠ মিষ্টি। খুলনায় আমরা অর্থাৎ আমি, আমার ছোট বোন ও পাশের বাড়ির নাজমা সারা দিন নানান দুষ্টুমি করতাম। সেটি মোরব্বা চুরি থেকে শুরু করে পাশের বাড়ির কিচেন গার্ডেন থেকে গাজর-মুলা চুরি, পাড়ার বন্ধুদের সঙ্গে সাত চাড়া খেলা নিয়ে ফাইট, কিং কং খেলায় সহখেলোয়াড়দের পিঠে ভীষণ জোরে টেনিস বল ছুড়ে দেয়াÑ এসব। খুলনায় পুরনো একটা সার্কিট হাউস বিল্ডিং ছিল যশোর রোডের ধারে বিশাল মাঠের একপাশে। ওই সার্কিট হাউসের সামনে একটা অ্যারোপ্লেনের কঙ্কাল পড়ে ছিল। ওই প্লেন নাকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বিধ্বস্ত হয়েছিল কাছে-পিঠে কোথাও। ব্রিটিশরা ওইখানে ফেলে রেখে গিয়েছিল। আমরা যখন ওই প্লেনের কঙ্কাল আবিষ্কার করি তখনো এর হাড়গোড় সব ক্ষয়ে যায়নি। গদিহীন সিটের খাঁচা ছিল তখনো। এরই ওপর বসে প্লেন চালানোয় মগ্ন হতাম কতো বিকালে। মনে হতো সারা বিশ্ব যেন ঘুরে বেড়াচ্ছি প্লেনে চড়ে। ওই প্লেনের ফাঁকফোকর দিয়ে নানান বুনো লতাগুল্ম মাথা উঁচিয়ে তাকাতো আকাশের দিকে। মনে পড়ে, ওই লতাগুল্মের মধ্যে একটি ঝকঝকে হলুদ কচু ফুল ফুটেছিল। রবীন্দ্রনাথ জোড়াসাঁকোয় ইটের পাঁজার মধ্য দিয়ে মাথা উঁচিয়ে ওঠা রক্তকরবী ফুল আবিষ্কার করেছিলেন। এই আবিষ্কারের অনুপ্রেরণা আমাদের এক অসাধারণ নাটক দিয়েছে ওই ফুলের নামেই। আমার ওই গাঢ় ঝকঝকে হলুদ কচু ফুল দেখলেই তা খেতে ইচ্ছা করতো। ওই প্লেনের কঙ্কালের ভেতরে বসে খেলায় আমার নিত্যসঙ্গী ছিল আমার বোন ঝুনু। তার অনুপ্রেরণা ও আমার লোভের বশবর্তী হয়ে কচরমচর করে ওই ফুল খেয়েছিলাম একবার। মনে আছে, গলা ফুলে ঢোল হয়ে গিয়েছিল। লেবু, তেঁতুল ইত্যাদির সঙ্গে মায়ের হাতে মারও খেতে হয়েছিল প্রচুর। এই মারের চেয়েও ভয়ঙ্কর ছিল কচু ফুলের কণ্ঠরোধ করা ওই বেদনা। মনে পড়ে, মা-বাবার সঙ্গে সরকারি লঞ্চে সুন্দরবনে গিয়েছিলাম একবার। বাবা পাকা শিকারি ছিলেন। তার ছিল একটি অত্যন্ত নামজাদা বিলেতি কোম্পানির তৈরি দোনলা বন্দুক। বাবা অনেক হরিণ শিকার করেছিলেন ওই যাত্রায়। হরিণ শিকার বোধহয় বৈধ ছিল তখন। মনে পড়ে, দারুণ উল্লসিত হয়েছিলাম আমরা সবাই। আজ যখন জীবনানন্দ দাশের ‘ক্যাম্পে’ কবিতাটি পড়ি, ‘ক্যাম্পে শুয়ে, শুয়ে কোনো এক হরিণীর ডাক শুনি, কাহারে সে ডাকে!’Ñ হঠাৎ একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। হরিণের জন্য প্রাণ কাঁদে। হরিণীর জন্য প্রাণ কাঁদে। জীবনের দুই-তৃতীয়াংশ পেরিয়ে এসে অনেক অতীত ভাবনা অথবা কাজ নিয়ে গ্লানিবোধ হয়। এটিই বোধহয় নিয়ম।


বাবা কুষ্টিয়ায় এলেন এরপর। কুষ্টিয়ায় আমার বোধবুদ্ধির উন্মেষ ঘটে বললে বাড়িয়ে বলা হবে না। এই একটি ব্যাপার আছে যা সবার বেলায় এক সময় বা একই পরিস্থিতিতে হয় কি না বলা মুশকিল। বুদ্ধির সঙ্গে হয়তো মানুষের বয়সের একটি সম্পর্ক থাকতে পারে। কিন্তু বোধের সম্পর্ক? মনে হয় তা সম্ভব নয়। প্রসঙ্গ যখন উঠলোই তখন বিষয়টি সম্পর্কে আরো দু’চারটি কথা বলতে চাই। সুকান্তের ওই বিখ্যাত লাইন নিশ্চয়ই অনেকের মনে আছে, ‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়’। তাই তার কাছে পূর্ণিমার চাঁদটি মনে হয়েছিল ঝলসানো রুটি। বোধের সঙ্গে মনের যেমন একটি প্রগাঢ় সম্পর্ক আছে তেমনি দেহেরও একটি সম্পর্ক আছে অবশ্যই। খেয়াল করা সম্ভব হবে, চাঁদ যতোই ঝলসানো রুটি বলে তার কাছে মনে হোক না কেন, ঝলসানো রুটির কথা মনে করে কবিতা ‘ছুটি’ দেয়ার অন্ত্যমিল সম্পর্কে তিনি সচেতন ছিলেন ঠিকই। অর্থাৎ তার দারিদ্র্য বা ক্ষুধা তাকে কাব্যবিমুখ করতে পারেনি। তবুও বলবো, কুষ্টিয়ায় আমার ওই বাল্যকালে নিসর্গের সৌন্দর্যের প্রতি আকর্ষণ এই তীব্রতা পেতো না যদি আমার উদর পূর্ণ না থাকতো। বয়সের তোয়াক্কা না করেই বোধের উন্মেষ হতে পারে। তবে বুদ্ধির স্ফুরন হয় কি না তা বলতে পারবো না। বাল্যকালের এসব স্মৃতি আমাকে আজকের এই জায়গায় আসতে সাহায্য করেছে। অবশ্য আমি স্বীকার করি, আমার জীবনে যদি ভালো কোনো কাজ করে থাকি তাহলে সেটি যে যা-ই বলুক না কেন, অকিঞ্চিৎকর কাজ।


যাহোক, এই কলামে ব্যক্তিগত কথাগুলো বললাম এ কারণে যে, আমাদের অতীত আমাদের সবার জীবনে কোনো না কোনোভাবে স্পর্শ করে যায়। একটু চিন্তা করলে দেখা যাবে, আমাদের সবারই জীবন কিছু মূল্যবোধ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল। ওই মূল্যবোধগুলো নিয়ে কথাবার্তা হয় প্রায়ই এবং দুঃখজনক হলেও সত্য, আমরা বুঝতে পারি, আমাদের জীবনে মূল্যবোধের অবক্ষয় এতো সর্বগ্রাসী হয়েছে যে, আমরা একটি বিপজ্জনক অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছি। সেদিন কোনো একটি টেলিভিশন চ্যানেলে একটি আলোচনাচক্রে আমাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, আমাদের সমাজে ক্রমবর্ধমান অস্থিরতা, দুর্নীতি ও সংঘাতের পেছনে যে পথভ্রষ্ট তরুণ সমাজ আজ ব্যাপৃত আছে এর কারণটি কী এবং এখান থেকে কীভাবে পরিত্রাণ পাওয়া যায়? বলেছিলাম, এই পথ হারানো তরুণদের পথ দেখানোর দায়িত্ব যাদের ছিল অর্থাৎ আমাদের প্রজন্মÑ তারা তাদের কাজটি ঠিকভাবে সম্পন্ন করেনি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর আমাদের প্রজন্ম কেবল অর্থ উপার্জনে নিজেদের সম্পূর্ণভাবে ব্যতিব্যস্ত রেখেছে। পরবর্তী প্রজন্মকে কখনোই তারা সঠিক পথ দেখায়নি। এই অপরাধের মাসুল আজ দেশ ও জাতিকে দিতে হচ্ছে। এখনো যদি আমরা আমাদের কর্তব্যের প্রতি উদাসীন থাকি তাহলে দুই প্রজন্ম পর এ দেশে ভালো মানুষ আর থাকবে না। অথচ আমাদের প্রজন্মের সবাই নিজের গুরুজনদের তত্ত্বাবধানে সব মূল্যবোধ সম্পৃক্ত একটি সমাজ ব্যবস্থা সম্পর্কে শুনে এসেছেন, প্রত্যক্ষও করেছেন। আমরা কেন এখনো ওই মূল্যবোধ পুনরুজ্জীবিত করে একটি সুস্থ ও সুন্দর সমাজ যেখানে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম সৎ চিন্তা নিয়ে বেড়ে উঠতে পারে ওই কাজে ব্রতী হই না?


লেখক : সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

চিহ্ন

শহীদুল হক খান

 

 


ডিভোর্সের কথা চলছিল কয়েক মাস ধরেই। পলিনা ও পরশকে প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন অনেক বোঝাতে চেষ্টা করেছে। তবে তাদের মতের পরিবর্তন হয়নি। পরশ বলেছে, আমরা একে অপরকে ভালোবেসে বিয়ে করেছি। কিন্তু বিয়ের তিন সপ্তাহ যেতে না যেতেই দেখেছি আমাদের মতের অনেক অমিল, চিন্তার অমিল, পরিকল্পনার অমিল।
বন্ধুবান্ধবরা বলেছে, তোমাদের হাসিমুখ দেখে তো তা মনে হয় না। কী চমৎকার হেলে-দুলে হানিমুন করে এলে! পরশ জবাব দিয়েছে, হানিমুন করা মানেই সুখী সংসার নয়। এক বিছানায় ঘুমানো মানেই সুখী দম্পতি নয়।
এরপর সবার অনুরোধ রাখতে গিয়ে তারা হিসাব করে করে তিনটি বছর পার করলো। তারপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো। সেদিন ছিল তাদের বিয়েবার্ষিকী। সকালে পলিনা নিজ হাতে পরশের জন্য রান্নাবান্না করে এক সঙ্গে খাবার টেবিলে বসলো।  আগে থেকেই ঠিক করা ছিল, তারা আলাদা হয়ে যাবে। কোন কোর্ট-কাচারি নয়, উকিল-ব্যারিস্টার নয়। নিজেরাই নিজেদের ডির্ভোস নিয়ে নেবে। যেহেতু কেউ কারো কাছে কোনো চাহিদা তুলবে না, পাওনা-দেনার কোনো হিসাব-নিকাশ হবে না সেহেতু ভদ্রলোকের মতো দু’জন দু’জনার সঙ্গে সর্ম্পক শেষ করে দিন শেষে দুই পথে চলে যাবে।

খাবার টেবিলে খেতে খেতে প্রথম কথা তুললো পলিনা। বললো, আমার দু’একটি জিনিস নেয়ার ছিল।
নির্দিধায় নিয়ে যেতে পারো। পরশ উত্তর দিলো।
- তোমার সঙ্গে যখন আমার প্রথম পরিচয় হয় তখন তোমার চোখে এই চশমাটা ছিল। আর চশমাটা ছিল বলেই তোমাকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছিল। অনেক ব্যক্তিত্ববান মনে হয়েছিল। তাই এ চশমাটা আমি নিয়ে যেতে চাই।
পরশ চোখ থেকে চশমাটা খুলে রাখলো।
পলিনা বললো, পরে দিলেই হতো, যাওয়ার সময়।
পলিনার চোখের দিকে তাকিয়ে পরশ বললো, যেটা দেয়ার তা আগে দিয়ে দেয়াই ভালো।  
দু’জন ধীরগতিতে খাবার খাচ্ছে। নীরবতা বলে দেয়, এই মুহূর্তে কারো মুখে কথা নেই। আবারও নীরবতা ভাঙলো পরশ। বললো, তোমার পরবর্তী চাওয়া?
পলিনা বললো, গত বছর বই মেলায় তোমাকে একটা হলুদ পাঞ্জাবি কিনে দিয়েছিলাম হিমু সাজার জন্য। ওই পাঞ্জাবিটা আমাকে দাও।
- ওই পাঞ্জাবি দিয়ে তুমি কী করবে? মেয়ে হিমুরা তো হলুদ শাড়ি পরে। আর মেয়েরা তো হিমু হয় না।
আমি কী করবো সেটি তো আমার ব্যাপার, তুমি দিবে কি না বলো?
- আলোচনার শুরুতেই তো বলেছি, যা খুশি তুমি নিতে পারো, আমার আপত্তি নেই।
হ্যাঁ, এ জন্যই আমি তসলিমা নাসরিনের তিনটা বই নিয়ে যাবো।
- কোন তিনটা বই?
আমার ছেলেবেলা, ক আর ফরাসি প্রেমিক।
- এই বই দিয়ে তুমি কী করবে? এগুলো তো অনেক অশ্লীল, নোংরা বই।
না, মোটেও অশ্লীল আর নোংরা বই নয়। এই বইয়ে যা লেখা আছে, সব সত্য।
- তোমার সঙ্গে একমত হতে পারলাম না।
সেটি সম্পূর্ণ তোমার ব্যাপার। কিন্তু আমার কাছে মোটেও তা মনে হয় না।
- তুমি যেহেতু তসলিমাকে পছন্দ করো, তাই এ কথা বলছ।
না, পছন্দ নয়। আমি তাকে সমর্থন করি। আমার মেয়েবেলা বইয়ে তিনি তার ছোটবেলা মামা, চাচা দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিলেন। সে কথা অবলিলায় লিখে পাঠককে জানিয়েছেন। আমি যখন ক্লাস সেভেনে পড়ি তখন আমার এক মামাতো ভাইও আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। কলেজ থেকে ফেরার পথে গাউছিয়ায় এক দুষ্ট ছেলে আমার বুকে হাত দিয়েছিল- কথাগুলো কাউকে বলতে পারিনি।
- এখন যে বলছ?
যেহেতু সর্ম্পক শেষ হয়ে যাবে সেহেতু দু’একটা কথা প্রকাশ করে দিলাম। তাসলিমা ‘ক’ বইয়ে কয়েক কবি

লেখকের সঙ্গে তার আন্তরিকতার কথা বলেছেন। বই ছাপা হওয়ার পর কতো হই চই, কতো মামলা-মোকদ্দমা! পরে দেখা গেল সব চুপচাপ।
- আর কী চাই?
বিশেষ কিছু নয়, একটা ছোট স্মৃতি।
- কী সেই স্মৃতি।
চলো কফি খেতে খেতে বলি।
কফির কাপ হাতে নিয়ে দু’জন গিয়ে বসলো বারান্দায়। কিছুক্ষণ আগে পলিনা গোসল করেছে। তার ভেজা চুলের মিষ্টি গন্ধ এবং বাগান থেকে ভেসে আসা ফুলের গন্ধ একাকার হয়ে গেছে। গাছে গাছে কেমন যেন নেশা লাগানো ভাব।
অনেকক্ষণ পর পলিনার দিকে তাকিয়ে পরশের মনে হলো, পলিনা আসলেই খুব সুন্দর। কিন্তু তার খুব বাজে ধরনের একটা মেজাজ, কোনো কিছুতে আপস না করার জেদ কোনোভাবেই স্বাভাবিক থাকতে দেয় না। ২৪ ঘণ্টার দিনকে মনে হয় যন্ত্রণার ৪৮ ঘণ্টা। অথচ তার সঙ্গে যেদিন পরিচয় হয় সেদিন পরশের এক বন্ধু বলে, তার বোন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। বাংলা বিভাগে। প্রথম দিনের আলাপে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, বাংলা সাহিত্য, বাংলা সংস্কৃতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে দেখেছে পলিনা অনেক বোঝে। শস্তা বিষয় শস্তা জনপ্রিয়তা নয়, অনেক গভীরে যেতে পারে।
পরের সাক্ষাতে আলোচনার বিষয় ছিল খেলাধুলা। এ বিষয়েও তার আগ্রহ ও অভিজ্ঞতা অনেক। তবে খেলা নিয়ে বেশি মাতামাতিটা পছন্দ করে না। যুক্তি দিয়ে দেখিয়েছে, দেশের খেলোয়াড়দের বিজয়ী হিসেবে যতো অতিরিক্ত মাথায় তুলেছে ততোই তারা পচা তালের মতো পড়ে গলে গেছে। পলিনার পরামর্শ- আমাদের সব খেলোয়াড় ভালো, অসম্ভব ভালো। তাদের মাথা নষ্ট না করে ঠিকমতো খেলতে দেয়া দরকার। রাজনীতি, দুর্নীতি নিয়ে সে কোনো মন্তব্য করতে চায়নি। দেশ সম্পর্কে তার ধারণা- এমন দেশ পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই।
প্রেম-ভালোবাসা নিয়ে কথা উঠতেই বলেছিল, কোনো এক সময় হয়তো প্রেম-ভালোবাসা বলে কিছু ছিল। এখন ওসব নেই। যা আছে তা হলো সেক্স। পয়সার বিনিময়ে, কথার বিনিময়ে, প্রেমের নামে, ভালোবাসার নামে, বিয়ের নামে টিকে আছে শুধু ওই সেক্স।
পরশকে দীর্ঘক্ষণ ভাবতে দেখে পলিনা জানতে চাইলো- কী এতো ভাবছ? সিদ্ধান্ত পাল্টাবে নাকি?
পরশ অত্যন্ত জোড় দিয়ে বললো, প্রশ্নই ওঠে না। সিদ্ধান্ত যেটা নেয়া হয়েছে, দ্যাট ইজ ফাইনাল।
- গুড, আমারও তা-ই মত। শুধু একবার তো নয়, এই তিন বছরে আমরা বুঝতে পেরেছি, আমাদের এক সঙ্গে থাকা হবে না।
আমাদের দু’জনের চিন্তা-ভাবনা, পরিকল্পনার এতো পার্থক্য, কোনো অবস্থাতেই দু’জনার এক সঙ্গে থাকা চলে না। এবার তোমার শেষ চাওয়াটা কী বলো। সময় যতো কম নষ্ট হবে ততোই ভালো।
- হ্যাঁ বলছি। তবে এর আগে বলে নিই, এতে যেন আবার সিদ্ধান্ত না বদলাও।
প্রশ্নই ওঠে না।
- তুমি তো ঘুম থেকে দেরিতে ওঠো। আমি আগামীকাল সকালে উঠেই চলে যাবো।
আগামীকাল সকালে কেন? কথা তো ছিল আজই চলে যাবে।
- হ্যাঁ, কথা ছিল। তবে একটা চিহ্ন নিয়ে যাবো।
চিহ্ন?
- হ্যাঁ, বিয়ের পর আমাকে তুমি অনেকবার সন্তান নিতে বলেছ। নিইনি।

ভেবেছি যেখানে সম্পর্কই থাকবে না সেখানে ওইসব আবেগ-অনুভূতি প্রশ্রয় দিয়ে লাভ কী?
তাহলে আজ?
- আজ মনে হলো। দোষ সব তো আমার। মেজাজ বলো, মর্জি বলো, অভিমান বলো- সব তো আমার জন্য। তাই তোমার মতো ভালো মানুষের একটা চিহ্ন যদি আমার কাছে থাকে- সে ছেলে হোক আর মেয়ে হোক, তাকে নিয়ে গর্ব করতে পারবো, অহঙ্কার করতে পারবো।

রাত নেমেছে অনেকক্ষণ। রাতের খাওয়া শেষ করে পরশ বিছানায় চলে গেছে। পলিনা প্রস্তুতি নিচ্ছে বিছানায় যাওয়ার। ঘর বাঁধার পর থেকে বিশেষ রাতে বিশেষ সময়ের জন্য বিশেষ কিছু প্রস্তুতি নিয়ে থাকে। আজও ওই প্রস্তুতি নিতে সে ভুল করলো না। আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। একের পর এক শরীর থেকে পোশাক সব সরিয়ে ফেললো। সবচেয়ে পছন্দের পারফিউমটা এখানে, সেখানে, সবখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে স্প্রে করলো। হালকা করে রেকর্ড প্লেয়ারে একটা গান বাজালো। গানটা হেমন্ত মুখপধ্যায়ের ‘এই রাত তোমার আমার’। গানের শব্দটা একটু বাড়িয়ে, একটু কমিয়ে এমনভাবে ব্যালান্স করলো যাতে বিছানায় শুয়ে  শুনতে পারে এবং এই শোনার মধ্যে যেন শুধু গান শোনা নয়, একটা গানের আমেজ থাকে, মাদকতা থাকে। পরশের পাশে পলিনা গিয়ে তার গায়ে হাত রাখলো।
পরশ বললো, এসেছ?
পলিনা বললো,  হ্যাঁ, এসেছি।
- এটাই তো শেষ আসা, তাই না?
হয়তো বা। আবার নাও হতে পারে।
- তোমাকে যখন কাছে পাই তখন মনে হয় স্বর্গটা আমার খুব কাছে।
আর যখন দূরে থাকি।
দূরে থাকা নয়, যখন তুমি আমার সঙ্গে মেজাজ করো, বাজে ব্যবহার করো, জিদ দেখাও, পাজিপনা করো তখন মনে হয় আমি যন্ত্রণার মহাসমুদ্রে হাবুডুবু খাচ্ছি।
- থাক ওসব কথা। এখন এ রাতটাকে, রাতের এ সময়টাকে তুমি শুধু সুখ দিয়ে ভরে দাও।
সুখ চাইলে কথা বন্ধ করতে হবে।
- কথা বন্ধ করলাম। আর কথা বন্ধ করবো কী? তুমি নিজেই তো ঠোঁটে আটকে দিয়ে আমার কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছ।
দু’জনার কথা থেমে গেল। বাইরে মনে হচ্ছে ঝড়োহাওয়া বার বার আছড়ে পড়ছে। এক সময় গানটা থেমে গেল। তারা দু’জন ক্লান্ত হয়ে যার যার বালিশে মাথা রাখলো। এক সময় ঘুমিয়ে পড়লো।

রাত শেষে ভোর হলো। ভোর বলতে অনেক বেলা হলো। পরশ ঘরময় খুঁজে দেখলো, পলিনা চলে গেছে। টেবিলে তার জন্য নাশতা বানিয়ে রেখে গেছে। ডিভোর্সের দলিলে নিজের দস্তখতটাও করে দিয়ে গেছে। একটা ছোট্ট কাগজে এনগেজমেন্ট রিংটা রেখে লিখে গেছে, ‘তোমার জন্য আমার পক্ষ থেকে স্মৃতিচিহ্ন। ভালো থেকো। সন্তান ছেলে হোক অথবা মেয়ে তার নামটা তুমি রাখবে।’

দুই ভূত

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

 



লালু আর ভুলুর কোনা কাজ নেই। তারা সারা দিন গল্প করে কাটায়। সবই নিজেদের জীবনের নানান সুখ-দুঃখের কথা বলে। কথা বলতে বলতে যখন আর কথা বলতে ভালো লাগে না তখন দু’জনে খানিক কুস্তি লড়ে। তাদের কুস্তিও খুব একঘেয়ে। কেউ হারে না। কেউ জেতে না। কুস্তি করে তাদের ক্লান্তি আসে না, ঘামও ঝরে না। এর কারণ হলো, লালু আর ভুলু দু’জনই ভূত। প্রায় ১৪ বছর আগে দুই বন্ধু মনুষ্য জন্ম শেষ করে ভূত হয়ে লালগঞ্জের লাগোয়া বৈরাগী দীঘির ধারে আশ-শ্যাওড়ার জঙ্গলে ঘাঁটি গেড়ে আছে। মামলা-মোকদ্দমা থেকেই বাক্য আলাপ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তবে আশ্চর্যের বিষয়, বুড়ো বয়সে মাত্র সাত দিনের তফাতে লালু আর ভুলু পটল তোলে। ভূত হয়ে যখন দু’জনের দেখা হলো তখন দু’জনের মনে হলো পুরনো ঝগড়া জিইয়ে রাখার আর কোনো মানেই হয় না। তাই দু’জনের বেশ ভালো ভাব হয়ে গেল। সময় কাটানোর জন্য তারা মাঝে মধ্যে ইচ্ছা করে ঝগড়া লাগানোর চেষ্টা করেও দেখেছে। কিন্তু দেখা গেল, ঝগড়াটা তেমন জমে না। আরো একটা আশ্চর্যের বিষয় হলো, তারা ভূত হয়ে আজ পর্যন্ত এ তল্লাটে কোথাও কখনো আর কোনো ভূতের দেখা পায়নি।
ভুলু বলে, হ্যাঁ রে লালু, গাঁয়ে গত ১৪ বছরে তো বিস্তর লোক মরেছে। তাদের ভূতগুলো সব গেল কোথায় বল তো?


সেটি তো আমিও ভাবছি, আমরা ছাড়া আর কাউকে তো কখনো দেখিনি! আরো কয়েকজন থাকলে সময়টা একটু কাটতো ভালো।
ব্যাপারটা বড্ড গোলমেলে।


আমারও ভালো ঠেকছে না! বেশিদিন এ রকম চললে আমাদের এ গাঁ ছাড়তে হবে। সেটি কী সোজা! আমি গাঁ ছাড়ার চেষ্টা করে দেখেছি, ভারী সূক্ষ্ম একটা বেড়া আছে। চোখে দেখা যায় না। এতোই মিহি যে, ওই বেড়া ভেদ করা অসম্ভব।
বটে, এ তো ভারী অন্যায় কথা! আমরা কি সব জেলখানার কয়েদি নাকি রে?
মনে হয় এক জায়গার ভূত অন্য জায়গায় গেলে হিসাবের গোলমাল হবে বলেই যমরাজা বেড়া দিয়ে রেখেছে।
তা আটপেয়ে যমরাজাটাই বা কোথায়? আজ পর্যন্ত তো তার দেখাটি পেলাম না।
হবে রে হবে। এই একঘেয়ে বসে থাকাটা আমার আর ভালো লাগছে না। বরং গাঁয়ের ভূতগুলো কোথায় গায়েব হচ্ছে সেটি জানা দরকার। আরো গোটা কয়েক হলে দিব্যি গল্প-টল্প করা যেতো। দল বেঁধে থাকতাম।
তাহলে খুঁজেই দেখা যাক।
তাই চলো।


দুই বন্ধু মিলে অতঃপর ভূত খুঁজতে বের হলো। কিন্তু খুঁজতে খুঁজতে হয়রানিই সার হলো। একটা ভূতের গায়ের আঁশও দেখা গেল না।
বড় চিন্তার কথা হলো রে লালু!
বটেই তো! এ রকম তো হওয়ার কথা নয়।
একটা কথা বলি, যতীন মুৎসুদ্দির বয়স হয়েছে। অবস্থাও ক’দিন ধরে খারাপ যাচ্ছে। এখন-তখন অবস্থা। চল তো গিয়ে তার শিয়রে বসে থাকি। আত্মাটা বের হলেই খপ করে ধরবোক্ষণ।
কথাটা মন্দ বলোনি। তাহলে চলো যাই।
দু’জনেই গিয়ে যতীন মুৎসুদ্দির শিয়রে আস্তানা গাড়লো। খুব সতর্ক চোখে চেয়ে রইলো যতীনের দিকে। যতীন বুড়ো মানুষ, শরীর জীর্ণ, শক্তিও নেই।
দু’দিন ঠায় বসে থাকার পর তিন দিনের দিন যখন গভীর রাত তখন লালু আর ভুলু দেখলো যতীনের আত্মাটা নাকের ফুটোর কাছে বসে সাবধানে বাইরে উঁকি-ঝুঁকি মারছে।
লালু চেঁচিয়ে উঠলো- ‘ওই বেরোচ্ছে। সাবধান রে ভুলু, ঘ্যাঁচ করে ধরতে হবে কিন্তু।’
হ্যাঁ, একবার বেরোক বাছাধন।


তা আত্মাটা বের হলো বটে কিন্তু ধরা গেল না। শরীর ছেড়ে হঠাৎ এমন চোঁ করে এরোপ্লেনের মতোই উড়ে গেল নাকের ফুটো দিয়ে যে, লালু-ভুলু হাঁ করে চেয়ে রইলো। তারপর ‘ধর ধর’ করে ছুটলো পেছনে।
যতীন মুৎসুদ্দির আত্মা সোজা গিয়ে গণেশ গায়েনের বাড়িতে ঢুকে পড়লো। পিছু পিছু লালু আর ভুলু।
যতীনের আত্মা দেখেই গণেশ গায়েন একগাল হেসে বললো, এসেছিস? তোকে নিয়ে ‘সাত হাজার সাতশ’ পনেরোটা হলো। দাঁড়া যতেন, দাঁড়া, তোর শিশিটা বের করি। মলম-টলম ভরে একদম রেডি করে রেখেছি। এই বলে একটা দু’ইঞ্চি সাইজের শিশি বের করে যতীনকে তার ভেতরে পুরে কয়েকটা নাড়া দিয়ে ছিপি বন্ধ করে তাকে রেখে দিল। তারপর আপন মনেই বললো, আর দুটো হলেই কেল্লা ফতে। পরশু ঝুনঝুনওয়ালা লাখখানেক টাকা নিয়ে আসবে। ‘সাত হাজার সাতশ’ সতেরোটা হলেই লাখ টাকা হাতে এসে যেতো। টাইফয়েড হয়ে ১৪ বছর আগে শয্যা নিতে হলো বলে লালু আর ভুলুর ভূত দুটো হাতছাড়া হলো। না হলে আমাকে আজ পায় কে! সে দুটোকে পেলে হতো।
লালু-ভুলু দরজার আড়ালে থেকে কথাটা শুনে ভয়ে সিটিয়ে রইলো।
গণেশ গায়েন ঘুমালে তারা ঘরের তাকে জমিয়ে রাখা সাত হাজার সাতশ’ পরেরোটা শিশি ভালো করে পরীক্ষা করে দেখলো। প্রতিটিতে একটা করে ভূত মলম মেখে ঘুমিয়ে আছে।
লালু, দেখেছিস!


দেখেছি রে ভুলু, কী করবি?
আয়, শিশিগুলোকে তাক থেকে ফেলে আগে ভাঙি।
তাই হলো। দু’জন মিলে নিশুত রাতে ঝন ঝন করে শিশিগুলো ঠেলে ফেলে দিল মেঝেতে। সঙ্গে সঙ্গে ঘুমন্ত ভূতগুলো জেগে মহাকোলাহল শুরু করে দিল।
ভুলু তাদের সম্বোধন করে বললো, ‘ভাই-বোনেরা, তোমরা ভয় পেয়ো না। আমরা তোমাদের উদ্ধার করতেই এসেছি।’
সবাই আনন্দে চেঁচিয়ে উঠলো।
গণেশ গায়েনও ঘুম ভেঙে উঠে ধমকাতে লাগলো- ‘চুপ, চুপ বেয়াদব কোথাকার! তোদের তো মন্তর দিয়ে বেঁধে রেখেছি।’
কে শোনে কার কথা! ভূতগুলো মহানন্দে চিৎকার করতে করতে লালু-ভুলুর সঙ্গে চোখের পলকে হাওয়া হয়ে গেল।
গণেশ দুঃখ করে বললো, ‘সুখে থাকতে ভূতে কিলোয় রে। কতো ভালো কাজ হতো তোদের দিয়ে! ঝুনঝুনওয়ালা তোদের নিয়ে গিয়ে তার আয়ুর্বেদ ওষুধের কারখানায় চোলাই করে কর্কট রোগের ওষুধ বানাতো। তা তোদের কপালে নেই। তা আমি আর কী করবো?’

মানুষের ভাগ্য

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

 

 

মানুষের ভাগ্যটি আজ রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। আর রাজনীতি নিয়ে নতুন চিন্তার যথেষ্ট কারণ আছে। তা হলো এই, বাংলাদেশের দ্বিদলীয় ব্যবস্থাটি এখন আরো অসহ্য হয়ে উঠেছে। দ্বিদলীয় ব্যবস্থাটি আসলে একদলীয়ই। যখন যে দল ক্ষমতায় আসে, রাষ্ট্র ওই দলেরই হয়ে যায়। অপর দল আগের দলের মতোই আচরণ করে। বরং বাংলাদেশের ইতিহাসে দেখা গেছে, পরের সরকার আগের সরকারের চেয়ে ভালো তো নয়ই, বরং আরো খারাপ হয়ে থাকে। দ্বিদলীয় ব্যবস্থাটি একদলীয় আরো এক অর্থে। সেটি হলো, উভয়দলই হচ্ছে বিত্তবানদের দল। সামাজিকভাবে তারা পরস্পরের পরিচিত, ক্ষেত্র বিশেষে আত্মীয়ও, অধিকাংশ সময়ই পরস্পরের ঘনিষ্ঠ, ওঠাবসা একই রকমের, আচার-আচরণও তা-ই। দুটি দল হলেও তারা উভয়ই বড়লোকদেরই দল। এ জন্য তাদের এক দলই বলা যায়। লোকে বিকল্প খোঁজে। ভাবে, এ দুই দলের বাইরে যাবে। কিন্তু যাওয়া সম্ভব হয় না।


মাঝে মধ্যে সামরিক শাসন দেখতে পাওয়া যায়- কখনো প্রকাশ্যে, কখনো ছদ্মবেশে। কিন্তু অচিরেই টের পাওয়া যায়, ভেতরে ভেতরে তারা ওই একই দলের। তারাও বিত্তবানদেরই স্বার্থ দেখে। স্বার্থ দেখার ওই কাজে যুক্ত হয় আরেক অপশক্তি। সেটি হলো ধর্মীয় মৌলবাদ। এটি আরো ভয়ানক। ওই ভয়ানক শক্তিও হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে এই দ্বিদলীয় শাসন ব্যবস্থা। এর ফল সবচেয়ে ভয়াবহ।


আমরা ব্রিটিশ আমলে ছিলাম। অবশ্যই ভালো ছিলাম না। পাকিস্তান আমলও আমাদের জন্য দুঃসহ। এখন বাংলাদেশে আছি। কিন্তু ভালো আছি- এমনটি বলা যাচ্ছে না। কেউ কেউ আছেন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, আগেই ভালো ছিলাম! কখন, কীভাবে ভালো ছিলেন সেটি নির্দিষ্ট করে বলতে পারেন না। তারা আদর্শায়িত করেন পেছনের দিনগুলোর। কারণ বর্তমান অসহ্য, ভবিষ্যৎ অন্ধকারাচ্ছন্ন। অতীতে আমরা মোটেই ভালো ছিলাম না, অসন্তুষ্ট ছিলাম। এ জন্য আন্দোলন করেছি, মুক্তি চেয়েছি। শাসক বদল হয়েছে, এমনকি রাষ্ট্রও ভেঙেছে। পরে দেখা গেছে, মানুষ যেখানে ছিল সেখানেই আছে। তাদের ভাগ্য বদলায়নি। কেবল শাসকই বদলেছে। নতুন যারা শাসক হয়েছেন তাদের কেউ কেউ অতীতে যে খারাপ অবস্থায় ছিলেন তা নয়। তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন ধনবান মানুষ এবং তারা একই দলের। একইভাবে শাসন অর্থাৎ শোষণ করছে। এটি আমরা বুঝি, কথাটি আমরা বলিও। তবে ক্ষোভ প্রকাশ ছাড়া অন্য কিছু করতে পারি না।
দেশে শিক্ষার ক্ষেত্রে অগ্রগতি ঘটেছে। তাকে উন্নতির লক্ষণ বলা হচ্ছে। কিন্তু শিক্ষার্থীরা কী শিখছে? ওই প্রশ্নটি তো থাকেই। এটি শুধু গুণগত উৎকর্ষের বিষয় নয়। বিষয় হচ্ছে শিক্ষার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নিয়ে। শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা সামাজিক মানুষ হিসেবে গড়ে উঠছে, নাকি অসামাজিক হয়ে উঠছে? অসামাজিক হওয়ার অর্থ, এখানে শুধু যে অপরাধপ্রবণ হওয়া তা নয়, বিচ্ছিন্ন হওয়া। খেয়াল করলে দেখা যাবে, শিক্ষা ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত হচ্ছে এবং ব্যক্তিকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে। এটি নতুন কোনো সমস্যা নয়। এটি আগেও ছিল। এখন উন্নতির আলোক উদ্ভাসের আড়ালে এটি আগের চেয়ে অনেক শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। শিক্ষিত মানুষ এখন কেবল নিজের স্বার্থ দেখে, অন্যের স্বার্থ দেখতে চায় না। তার মধ্যে দেশপ্রেম বৃদ্ধি পায় না। সে অসামাজিক হয়ে ওঠে। শিক্ষাকে আমরা জাতির ভবিষ্যৎ বলে বিবেচনা করি। কোন ধরনের মানুষ এ শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে তৈরি হচ্ছে? স্বার্থপর, নাকি সামাজিক- এ প্রশ্নটি প্রাথমিক হওয়া উচিত, হয় না। এই অবস্থা কেমন করে বদল করা যাবে? ছোট ছোট সংস্কার অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। সেসব সংস্কার প্রযুক্ত করতে হবে পুরো ব্যবস্থাটির পরিবর্তনের সঙ্গে। না হলে শিক্ষা ক্ষেত্রে যেমনটি হচ্ছে তেমনটি অন্যত্রও ঘটতে থাকবে এবং ঘটছেও।


বলা হয়, মানুষের চরিত্র ঠিক নেই। অভিযোগ, মানুষের মধ্যে সহনশীলতার বড় অভাব। দুটিই সত্য। কিন্তু মানুষ তার চরিত্র কীভাবে ঠিক রাখবে যেখানে সমাজ চরিত্রহীন! চরিত্রহীনরাই তো এখন সমাজের শীর্ষে রয়েছে। তাদের আদর্শেই সাধারণ মানুষ দীক্ষিত হচ্ছে। সহনশীলতা অবশ্যই নেই। কেননা সমাজে লুণ্ঠনই হচ্ছে প্রধান সত্য। ব্যক্তিগত সম্পত্তি বৃদ্ধির লালসায় এমন কাজ নেই যা করতে লোকে পিছপা হয়। মানবিক সম্পর্কগুলো চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে। রক্ষকরা ভক্ষকে পরিণত হয়েছে। আমরা যে বিকল্পের কথা বলছি সেটি নিশ্চয়ই এ সমাজ এখন যেভাবে চলছে সেভাবে চলতে দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। এ জন্য এ সমাজ ভেঙে সেখানে নতুন সমাজের প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন। এই নতুন সমাজের জন্য যথোপযুক্ত মতাদর্শ প্রয়োজন। ওই মতাদর্শের পরিপ্রেক্ষিতেই বিকল্প সমাজ গড়া সম্ভব। মতাদর্শের ব্যাপারটি দার্শনিক।


এ প্রসঙ্গ উঠলেই বলা হয়, এটি হচ্ছে বড় বড় কথা। এ রকম ধারণার পেছনে যে যুক্তি নেই তা নয়। মতাদর্শ অনেক সময়ই বাস্তবিক সমস্যার মুখোমুখি হতে চায় না। সাধারণ মানুষ ছোট ছোট সমস্যার কারণে মতাদর্শের কথা ভাবার সুযোগ পায় না। আর মতাদর্শে বিশ্বাসীরা সাধারণ মানুষকে তাদের দৈনন্দিন সমস্যাগুলো বিবেচনায় নিয়ে কীভাবে উদ্বুদ্ধ করতে হবে এর পথ খুঁজে পান না।
মূল ব্যাপারটি সোজা। তা হলো ব্যক্তির মুক্তি ব্যক্তিগতভাবে অর্জন করা সম্ভব নয়। সেটি অর্জন করতে হলে সমষ্টিগত ব্যবস্থার পরিবর্তন দরকার। যে কিশোর একদিন মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন, যুদ্ধ শেষে তিনি পেশা নিয়েছেন শিক্ষকতা। কিন্তু দেখলেন, মুক্তি আসেনি। কারণ শাসক বদল হয়েছে ঠিকই, ব্যবস্থার বদল হয়নি। ওই শিক্ষককে আবার আন্দোলনে নামতে হয়েছে। এবার তার আন্দোলনটি পেশাগত। তিনি যে আন্দোলনরত অবস্থায় প্রাণ দিলেন এতে এটিই প্রমাণ হলো, ব্যক্তিগত মুক্তি তো বটেই, পেশাগত মুক্তিও বিদ্যমান ব্যবস্থায় অর্জন সম্ভব নয়।


আমাদের এই বদ্বীপে মাটি শক্ত নয়। তাই খুঁটি গাড়তে হয় এবং খুঁটিই অবলম্বন করা চাই। এ খুঁটি হচ্ছে ব্যক্তিগত সম্পত্তি। সমাজে এখন সবাই ওই খুঁটি গাড়তে ব্যস্ত। এ প্রতিযোগিতা নিষ্ঠুরতায় পরিণত হয়েছে। এমন ব্যাপক নিষ্ঠুরতা সমাজে আগে কখনো দেখা যায়নি। এ ব্যবস্থায় ব্যক্তি কেমন করে সৎ থাকবে! সৎ থাকতে গেলে হয় তিনি বিপদে পড়বেন, না হলে পিছিয়ে পড়বেন। আর যদি ব্যক্তি সৎ থাকতে পারে তাহলেও কি সমাজ বদল হবে? মানুষের মনুষ্যত্ব রক্ষা করার জন্য এ অসুস্থ সমাজ বদল করা চাই। এ জন্যই দরকার বিকল্প রাজনীতি। সংগঠিত আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সমাজ বদলাবে। লক্ষ্যটি থাকবে একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার। এটিকে সমাজতান্ত্রিক বললেও অন্যায় করা হবে না। কেননা এ সমাজে থাকবে অধিকার ও সুযোগের সাম্য, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং সর্বস্তরে প্রকৃত জনপ্রতিনিধিদের শাসন প্রতিষ্ঠা। আমাদের গণমাধ্যম, টেলিভিশন, আলাপ-আলোচনায় অনেক কথাই বলা হয়। সেগুলো ফুলঝুরির মতো। কিন্তু মূল সমস্যাটি যে এ অসুস্থ সমাজ বদল করা সেটি উঠে আসে না।


এখন এ সত্যটি প্রতিষ্ঠিত যে, প্রাইভেট মানেই ভালো আর পাবলিক মানেই খারাপ। এটি শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পায়ন- সর্বক্ষেত্রে দৃশ্যমান। অথচ আমরা যে মুক্তির জন্য লড়েছি তা সব সময়ই ছিল পাবলিকের কাজ, প্রাইভেটের নয়। কিন্তু এখন পাবলিক হেরে গেছে প্রাইভেটের কাছে। এ জন্যই আমাদের এমন দুর্দশা। শেয়ার মার্কেটের কথা ধরা যাক। সেখানে যে কেবল মতলববাজ ও ধড়িবাজরাই যায় তা নয়। নিরুপায় সাধারণ মানুষও ভিড় করে। এর কারণ হলো, পাবলিক বিনিয়োগের স্থান অত্যন্ত সংকুচিত। ওই ক্ষেত্রটি প্রসারিত হলে মানুষ সেখানেই যেতো। এখানে না যেতে পেরে মানুষ প্রাইভেটের কাছে যায় এবং বিপদে পড়ে।
বাংলাদেশে যা দরকার তা হলো পাবলিককে বড় করা প্রাইভেটের তুলনায়। তাহলেই প্রাইভেট নিরাপদ হবে। আসলে ব্যক্তিও তো বিবেচনার চূড়ান্ত বিন্দু। তাকেই সমৃদ্ধ ও সুখী করা চাই। কিন্তু ব্যক্তি জড়িত সমষ্টির সঙ্গে। এ জন্য সমষ্টির ভাগ্য না বদলালে ব্যক্তির ভাগ্যও বদলাবে না এবং যতোটুকু বদলাবে তা সুরক্ষিত থাকবে। বদলটি এখানেই দরকার। দেশের মানুষ এ বদলের জন্যই সংগ্রাম করেছে। বার বার তারা দেখেছেন প্রাইভেট পদদলিত করছে পাবলিককে। তাই বলতে হয়, মুক্তিযুদ্ধ মোটেই শেষ হয়নি। এ যুদ্ধটি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য চাই সমাজ বদলের লক্ষ্যে রাষ্ট্রের মূল চরিত্রের গণতান্ত্রিক পরিবর্তন।


সমাজ বদলের প্রশ্নে দু’দলই অনড়। কেননা ওই ঘটনাটি ঘটলে তাদের সুযোগ-সুবিধার ভিত্তিটাই নষ্ট হয়ে যাবে। তাই জনগণকে এগোতে হবে মুক্তির দিকে। মুক্তির ওই যাত্রায় কারা নেতৃত্ব দেবেন? তারাই নেতৃত্ব দেবেন যারা দেশপ্রেমিক ও গণতান্ত্রিক। কতো দ্রুত তারা এগিয়ে আসছেন এবং রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হচ্ছেন এর ওপরই আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। ‘বিকল্প চাই’- এ উপলব্ধিটি এখন প্রায় সর্বজনীন। কিন্তু ওই আওয়াজ যেন এর আসল প্রয়োজন সম্পর্কে আমাদের বিভ্রান্ত না করে। এ প্রয়োজনটি হলো সমাজ রূপান্তরের অর্থাৎ সমাজের বৈপ্লবিক পরিবর্তন জরুরি। তবেই মানুষের সত্যটি একদিন প্রতিষ্ঠিত হবে। মানুষের অবস্থানটি নিশ্চিত হবে সবার উপরে।

উৎসবে লাস্যময়ী ল্যাম্প

 



আলো ছাড়া একটা দিন কল্পনা করুন তো! মনে করুন, আপনার চারপাশ ঘিরে আছে অন্ধকার আর অন্ধকার! কি, ভয় লাগছে? এটি প্রমাণিত সত্য, শক্তি ও উদ্দীপনা সরবরাহ করে প্রতি মুহূর্তে আমাদের চারপাশে ঘিরে থাকে আলো। আলোর সঠিক ব্যবহারই একটি বাসস্থান দর্শনীয় করে তুলতে পারে। যে কোনো উৎসবে আপনার বাড়িতে আলোর প্রক্ষেপণ দিতে পারে ভিন্নমাত্রা। প্রাত্যহিক কাজগুলো সহজ-স্বাচ্ছন্দে করতে সঠিক মাত্রায় আলোর ব্যবহার যেমন সাহায্য করে তেমনি উৎসবে নানান আয়োজনে আপনার রুচির পরিচয় দেয় অতিথি ও বন্ধু-বান্ধবের কাছে। স্থান বুঝে আলোর উপযুক্ত ব্যবহার আপনার গৃহে দিতে পারে নিরাপদ ও আরামদায়ক পরিবেশ। বিভিন্ন লাইটের সাহায্যে ঘরে আনা যায় আলোর নতুন মাত্রা। সঠিক মাত্রায় আলোর ব্যবহারে একটি সাধারণ গৃহকোণ হয়ে ওঠে অসাধারণ ও শৈল্পিক। চাইলে আপনি সহজেই উৎসবে নতুন আর ভিন্ন লাইট স্থান বুঝে ব্যবহার করে নতুন চমক সৃষ্টি করতে পারেন। বিভিন্ন আকার, আকৃতি ও ডিজাইন অনুযায়ী সঠিক লাইটটি ব্যবহার করতে পারলে আপনার শুধু লিভিংরুমে বা বেডরুমেই নয়Ñ ঘরের সব জায়গায় বৈচিত্র্য ও রুচির অপূর্ব সমন্বয়ে সৃষ্টি করতে পারেন এক মোহময় আবহ।

পছন্দ অনুযায়ী বাড়ির ভেতরে আলোর ব্যবহার ঠিক করার চেয়েও জরুরি ঘরের সাজের সঙ্গে মানানসই আলোর ব্যবহার। আপনাকে নিশ্চিত হতে হবে, যে লাইটগুলো কিনছেন তা শুধু স্টাইলিশই নয়Ñ যে জায়গাটিতে ওই লাইটগুলো ব্যবহার করবেন সেখানকার জন্য কার্যকরও বটে। উদাহরণস্বরূপÑ পেনডেন্ট লাইটগুলোর শব্দ শুনতে কিংবা দৃশ্যত এর আবেদন থাকলেও তা কিচেনের কাজে কতোটা উপযোগী বা আসলে আপনার হাতের কাজগুলোর জন্য অনুকূল কি না সেটি ভেবে দেখা জরুরি। তাই কেনার আগে লাইটের বিভিন্ন ধরন সম্পর্কে জেনে নেয়া যেতে পারে। চিলড্রেন্স রুমে আলোর ডিরেকশন চেঞ্জ করে রুমে নতুনত্বের ছোঁয়া দেয়া যায়। ঠিক তেমনি রুমে ল্যাম্পের ব্যবহার অনিন্দ্য এক চেহারা দিতে পারে আপনার ঘরের। উৎসবের আমেজে ভরিয়ে তুলতে আপনি আপনার কমন স্পেস ও সদর দরজার সামনে ওয়াল ল্যাম্প বা রিসেসড লাইট ব্যবহার করতে পারেন।

পেনডেন্ট বা ঝোলানো লাইট
এই লাইট কর্ড, চেইন বা ধাতুর সাহায্যে ছাদ থেকে ফিক্স করে ঝুলিয়ে দেয়া হয়। এই লাইটে সাধারণত একটি চেইনের শেষে বাল্ব থাকে। তাই এটি বেশি জায়গা পূরণ করতে পারে না। তবে ইদানীং বাজারে বিভিন্ন আকার ও ডিজাইনের এই লাইট সহজলভ্য। যেমনÑ সিলিন্ডার শেপ, গোলাকার শেইপ বা ফানেলের শেইপে পাওয়া যায়। এটি সাধারণত একটি ছোট, নির্দিষ্ট এলাকা তথা রান্নাঘরের মাঝখান বা ডাইনিংরুমে টেবিলের মাঝখান বরাবর সেট করলে আলোর ব্যবহার সঠিক ও যথাযথ হয়।

শ্যান্ডেলিয়ার বা ঝাড়বাতি
শ্যান্ডেলিয়ার বা ঝাড়বাতি বড় ইউনিটে মিলিত একাধিক বাল্বের চমকপ্রদ সমাহার। শ্যান্ডেলিয়ার এক অসম্ভব সুন্দর আলোর উৎস। ঐতিহ্যগতভাবে এটি সুরুচিপূর্ণ অভিজাত ও ব্যয়বহুল। তাই এর ব্যবহার অপেক্ষাকৃত কম। সাধারণত বাড়ির ভেতরে প্রবেশপথ বা ড্রইংরুম, হলরুমে
এর ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায়।  

ওয়াল স্কনস বা ওয়াল ল্যাম্প
ওয়াল স্কনস বা ওয়াল ল্যাম্প সাধারণত ব্যবহার করা হয় আলোকসজ্জায় নতুন আবহ যোগ করার জন্য। ওয়াল ল্যাম্প হচ্ছে ওয়ালে আটকানো এক ধরনের লাইট। এই লাইটে সাধারণত অল্প আলো ও কম স্পন্দনশীল আলোর ব্যবহার হয়ে থাকে। এটি হলরুমের কর্নার বা প্রবেশদ্বারের কাছাকাছি ব্যবহার করা যেতে পারে।

রিসেসড লাইট
স্পেস যদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয় তাহলে রিসেসড লাইট আদর্শ এবং অবশ্যই অসাধারণ বিকল্প। কারণ এই লাইটের জন্য মোটেও আলাদা কোনো স্পেসের দরকার না। সিলিং বা ফলস সিলিংয়ের ভেতরে সরাসরি লাইটগুলো লাগানো থাকে। এই লাইটগুলো কিচেন, লিভিংরুম ও বিশাল আকৃতির রুমে অনেক আলোর তীব্রতা বাড়ানোর জন্য ব্যবহৃত হয়ে থাকে। যেসব জায়গায় আলো বেশি দরকার বা অন্ধকার স্থানে অতিরিক্ত আলোর জন্য মেঝে ও দেয়ালগুলোয় এ লাইটগুলো লাগানো যেতে পারে। একটি সাধারণ  স্পেস অসাধারণ করে তুলতে এটি ব্যবহার করা হয়। এখানে আলোর উৎস গোপন থাকার কারণেই এটি অনেকের পছন্দ।

আলো আমাদের চারপাশ হৃদয়ঙ্গম করার ক্ষেত্রে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। কোন জায়গা কী কাজের জন্য এবং কোথায় কী ধরনের কাজের স্বাচ্ছন্দ্য হতে পারে তা বোঝা যায় ও চিনিয়ে দেয় আলোর ব্যবহারই। এমনকি আমরা যে স্থানে আছি সেখানকার আবহ এবং যে কাজ করছি এর পরিবেশ প্রভাবিত করতে পারে আলোর কার্যক্ষমতা। উৎসবে তাই গৃহের সাজে অনন্য মাত্রা দিতে আপনিও ব্যবহার করতে পারেন নানান ধরনের লাইট।

 


লেখা : সহজ ডেস্ক
ছবি : ইন্টারনেট

যে চলচ্চিত্র জীবনের কথা বলে: আলফ্রেড হিচকক

অরিন্দম মুখার্জী বিঙ্কু

 



টান টান উত্তেজনা, রহস্য, ভয় ও উদ্বেগের চলচ্চিত্র মানে আলফ্রেড হিচকক। ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলচ্চিত্রে স্বতন্ত্র ও জনপ্রিয় একটি ধারার প্রবর্তক তিনি। উদ্বেগ, ভয়, কল্পনা অথবা সহানুভূতি ফ্রেমবন্দি করে চলচ্চিত্রে নতুন মাত্রা যোগ করেন বিশ্ব সিনেমার এই অভিভাবক। ‘সাইকো’, ‘দ্য বার্ড’ কিংবা ‘রেবেকা’র মতো অসংখ্য সিনেমার জনক তিনি। এখনো তার দ্বারা প্রভাবিত বিশ্বের অনেক পরিচালক।
ব্রিটিশ চলচ্চিত্র পরিচালক ও প্রযোজক স্যার আলফ্রেড যোসেফ হিচকক ১৮৯৯ সালের ১৩ আগস্ট লন্ডনের এক রোমান ক্যাথলিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ভক্তিনিষ্ঠ ক্যাথলিক তিনি। তরকারি ও হাঁস-মুরগি বিক্রেতা উইলিয়াম হিচকক ও এমা জেন হোয়েলানের ছেলে আলফ্রেড হিচকক ছিলেন মা-বাবার দ্বিতীয় সন্তান। বড় ভাই উইলিয়াম ও  ছোট ভাই এলেন হিচককের সঙ্গে তিনি লন্ডনের পূর্বপ্রান্তে লেইটন স্টোনে বড় হয়েছেন। ছোটবেলা খুব নিঃসঙ্গতা ও একাকিত্বের মধ্যে কেটেছে তার। তিনি মোটা ছিলেন বলে কেউ তার সঙ্গে খেলতে আসতো না। আর অল্প বয়সে এ রকম অদ্ভুত পরিস্থিতিই পরবর্তীকালে সৃষ্টি করেছে তার সিনেমাজুড়ে আতঙ্ক ও সাসপেন্স। বড় হয়ে তিনি হলেন মাস্টার অব সাসপেন্স ও রহস্যের জাদুকর। দর্শককে নিয়ে পিয়ানোর মতো খেলতে ভালোবাসতেন সাইকোলজিকাল থ্রিলারধর্মী ছবির এই নির্মাতা। চলচ্চিত্র ইতিহাসে তিনিই প্রথম থ্রিলার কিংবা ভৌতিক ছবির সফল ও আধুনিক রূপকার। আজও তার মুভিগুলো দর্শক, সমালোচকদের চিন্তার খোরাক জোগায়।

১৯২০ সালের দিকে এসে আলফ্রেড হিচকক আগ্রহী হয়ে ওঠেন ফটোগ্রাফি ও চলচ্চিত্রের প্রতি। তিনি লন্ডনে ফিল্ম প্রডাক্টশনে কাজ করা শুরু করেন। ‘প্যারামাউন্ট পিকাচার-এর লন্ডন শাখায় টাইটেল কার্ড ডিজাইনার হিসেবে কিছুদিন কাজ করেন। এরপর ‘ইসলিংটন স্টুডিও’তে কাজ করেন। টাইটেল কার্ড ডিজাইনারের কাজ করতে করতে
চিত্রপরিচালক হিসেবে তিনি আত্মপ্রকাশ করেন। চলচ্চিত্র ক্যারিয়ার শুরু করেন ১৯২২ সালে। এ বছর ‘নাম্বার থার্টিন’ চলচ্চিত্রে হাত দেন তিনি। কিন্তু তার জীবনের প্রথম চলচ্চিত্রটি অসম্পূর্ণই থেকে যায়। ১৯২৫ সালে নির্মাণ করেন ‘দ্য প্লেজার গার্ডেন’। এ চলচ্চিত্রটি ছিল ব্রিটিশ-জার্মান প্রডাক্টশনের। এটি দারুণ জনপ্রিয় হয়। এরপর তাকে আর অপেক্ষা করতে হয়নি। তিনি বিভিন্ন প্রডাক্টশনের ব্যানারে একের পর এক চলচ্চিত্র নির্মাণ করে যেতে থাকেন। আর চলচ্চিত্রে ফুটিয়ে তুলতে থাকেন তার নান্দনিকতা। সেই ষাটের দশকে এই মানুষ এমন সব অসাধারণ ছবি নির্মাণ করলেন, প্রযুক্তির এই যুগে তিনি বেঁচে থাকলে অবশ্যই নাড়িয়ে দিতেন গোটা বিশ্ব!

১৯২৭ সালে মুক্তি পায় হিচককের চলচ্চিত্র ‘দ্য লডজার’। একই বছরের ডিসেম্বরে হিচকক বিয়ে করেন আলমা রিভিলিকে। হিচকক ছিলেন ব্রিটেনের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র নির্মাতা। ১৯২৯ সালে তার ‘ব্ল্যাকমেইল’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে ব্রিটেনে সবাক চলচ্চিত্রের যাত্রা শুরু হয়। ১৯৩৮ সালে তিনি নির্মাণ করেন ‘দ্য লেডি ভেনিশেস’ ও ১৯৩৯ সালে ‘জ্যামাইকা ইন’। ১৯৪০ সালে হিচকক নির্মাণ করেন ‘রেবেকা’। মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলার ‘রেবেকা’ সেরা চলচ্চিত্র হিসেবে একাডেমি পুরস্কার পেয়েছিল। তার করা এটিই একমাত্র চলচ্চিত্র যা সেরা চলচিত্রের পুরস্কার লাভ করে। ১৯৪২ সালে ‘সাবটিউর’ মুক্তির পর হলিউডে পরিচালক হিসেবে তার একটা শক্ত অবস্থান হয়। ১৯৪৩ সালে ‘শ্যাডো অফ ডাউট’টি তার পরিচালিত চলচ্চিত্রের সবচেয়ে আলোচিত চলচ্চিত্র। ১৯৪৪ সালে তার আরেকটি আলোচিত ছবি মুক্তি পায় ‘লাইফ বোট’। এতে দেখানো হয় কীভাবে একটি নৌকার আরোহীরা বেঁচে থাকার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে। ১৯৫৫ সালে প্রচারিত ‘আলফ্রেড হিচকক প্রেজেন্ট’-এর মাধ্যমেই তার পরিচিতি মানুষের কাছে বেশি পৌঁছায়। এটি ছিল মূলত একটি টিভি শো। সিরিজটি ১৯৫৫ থেকে শুরু হয়ে ১৯৬১ সাল পর্যন্ত টিভিতে চলাকালে ১৯৫৬ সালে তিনি নাগরিকত্ব পান যুক্তরাষ্ট্রের।

হিচকক ১৯৬০ সালে বিখ্যাত মনোজাগতিক বিকৃতি বিষয় নিয়ে চলচ্চিত্র ‘সাইকো’ নির্মাণ করেন যা বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ‘দ্য মোমেন্ট অফ সাইকো’ উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি করা হয় এটি। গোসলখানার ৪৫ সেকেন্ডের ওই ভয়ঙ্কর দৃশ্য দর্শককে চিরকাল আতঙ্কিত করবে। হিচককের মুভির শেষে টুইস্ট অবশ্যম্ভাবী। ভীতি, ফ্যান্টাসি, হিউমার ও বুদ্ধিদীপ্ততাÑ এই চারের কম্বিনেশনে প্লটগুলো মূলত মার্ডার, অপরাধ, ভায়োলেন্সের ওপর নির্মিত। তিনি গোল্ডেন গ্লোব, সিনেমা জাম্পো অ্যাওয়ার্ড, লরিয়াল অ্যাওয়ার্ড, ডিরেক্টরস গিল্ড অফ আমেরিকা অ্যাওয়ার্ড, আমেরিকান ফিল্ম ইনস্টিটিউট অ্যাওয়ার্ড, একাডেমি অ্যাওয়ার্ড-এর মতো পুরস্কার পেয়েছেন। তবে সেরা পরিচালক হিসেবে কখনোই একাডেমি পুরস্কার পাননি।

১৯৬৮ সাল। হিচককের ক্যারিয়ার তখন পড়তির দিকে। তার সিনেমাগুলোও ঠিক প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না। তখন তার নামের প্রতি সুবিচার করতেই শুরু করলেন ক্যালাইডোস্কপ সিনেমার কাজ। খুন, ধর্ষণ, পেশিশক্তি, সিরিয়াল কিলিংয়ে ভরপুর এক থ্রিলার। ‘দ্য বার্ডস’-এ যে রকম তেমনি এটিতেও নতুন কিছু ফিল্ম টেকনিক প্রয়োগের পরিকল্পনা আঁটলেন। চিন্তা ছিল প্রাকৃতিক আলো ব্যবহার করা, স্ট্যান্ডের বদলে ক্যামেরা হাতে নিয়ে শুট করা এবং পয়েন্ট অফ ভিউ অ্যাঙ্গেলে শুট করার মতো ভাবনাগুলো। প্রি-প্রডাকশনে প্রচ- পরিশ্রম করার পরও শেষ পর্যন্ত সিনেমাটা শেষ করতে পারলেন না তিনি। টাকার অভাবে প্রায় ঘণ্টাখানেকের ফুটেজ নিয়ে অসমাপ্ত পড়ে রইলো ক্যালাইডোস্কপ। এর কিছু অংশ অবশ্য তিনি পরে ‘ফ্রেঞ্জিতে’ (১৯৭২) ব্যবহার করেন।

১৯৭৭ সাল থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত হিচকক পরবর্তী প্রজন্মের লেখকদের সঙ্গে ‘দ্য শর্ট নাইট’ নিয়ে কাজ করেন যা তার মৃত্যুর পর স্ক্রিনপ্লে হয়। তার অনেক চলচ্চিত্রেই নিজের একমাত্র মেয়ে প্যাট্রেসিয়া হিচকককে দেখা যায়। ‘এন্টারটেইনমেন্ট উইকলি’ ম্যাগাজিনে বিশ্বের সেরা ১০০ চলচ্চিত্রের মধ্যে তার চলচ্চিত্র ‘সাইকো’, ‘ভারটিগো’, ‘নর্থ বাই নর্থওয়েস্ট’, ‘নটোরিয়াস’ স্থান পেয়েছে।
১৯৭৯ সালের ৭ মার্চ আলফ্রেড হিচকক আমেরিকান ফিল্ম ইনস্টিটিউট থেকে ‘লাইফ অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড’ পান।
১৯৮০ সালের ২৯ এপ্রিল আমেরিকার ক্যার্লিফোনিয়ায় হিচকক ৮০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর কয়েক মাস আগে রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ-এর কাছ থেকে ‘নাইট’ উপাধি লাভ করেন। স্যার আলফ্রেড হিচককের চলচ্চিত্র, নির্মাণকৌশল পরবর্তীকালে অনেক বিখ্যাত পরিচালককে পথ দেখিয়েছে। চলচ্চিত্র যে কতো বড় একটা শিল্প হতে পারে, মানুষের কাছে এর মাধ্যমে কতোটা গভীরে পৌঁছানো যায় তা তিনি করে দেখিয়েছেন। তাই চলচ্চিত্রে সাসপেন্স, থ্রিলিংয়ের জগৎ সৃষ্টিকারী এ চলচ্চিত্রের বিস্ময়কর নির্মাতা আলফ্রেড হিচকক আজও চলচ্চিত্র দর্শক-নির্মাতাদের কাছে বেঁচে আছেন এবং থাকবেন।

 


ছবি : ইন্টারনেট

Page 2 of 24

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

Twitter feed

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…