Super User

Super User

Page 2 of 26

এক বিশাল পুনরুত্থানের ছবি দেখি

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

 

 বাংলাদেশের সাহিত্য নিয়ে একটা সমালোচনা প্রায়ই শুনতে পাই’ আজকাল তেমন ভালো গল্প-উপন্যাস লেখা হচ্ছে না, মনে দাগ কাটার মতো সাহিত্য আর তৈরি হচ্ছে না। কবিতার ক্ষেত্রে সমালোচনাটা একটু বেশি এবং তার কারণটা (?) সহজবোধ্য। অনেকে আমাদের প্রবন্ধ-সাহিত্য নিয়েও আক্ষেপ করেন। প্রবন্ধে আমরা ষাট-সত্তরের চিন্তাভাবনা থেকে কি খুব এগিয়েছি? এ রকম একটি প্রশ্নের সামনে আমাকে মাঝে মধ্যেই পড়তে হয়। এই সমালোচনার যে ভিত্তি নেই তা নয়। তবে ঢালাওভাবে এটি করা হলে আমার শক্ত আপত্তি থাকবে। কবিতা অনেক লেখা হচ্ছে, অনেক কবিতাই হয়তো কয়েক পঙ্ক্তি পড়ে রেখে দিতে হয়। তাই বলে ভালো কবিতা যে লেখা হচ্ছে না তা তো নয়। ভালো কবিতা পড়তে হলে শুধু জাতীয় দৈনিকের সাহিত্যের পাতা ওল্টালে চলবে না, লিটল ম্যাগাজিনগুলোও পড়তে হবে। একই কথা খাটে গল্পের ক্ষেত্রে এবং হয়তো অনেক বেশি প্রবন্ধের ক্ষেত্রে। এই লিটল ম্যাগাজিনগুলো আমাদের সাহিত্যের বাতিঘর এবং এর বাতিওয়ালারা প্রায় সবাই তরুণ। আমাদের সাহিত্যের ভবিষ্যৎ নেই- এমন কথা যারা বলেন তাদের হয়তো মূল স্রোতের বাইরের ওই তরুণ লেখকদের সঙ্গে তেমন পরিচয় নেই। যে সাহিত্যের একটা সমৃদ্ধ অতীত আছে, একটা দ্বন্দ্বসংকুল বর্তমান আছে। এর একটা সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎও নিশ্চয়ই আছে। অতীত নিয়ে আমাদের একটা অহঙ্কার আছে। বর্তমান নিয়ে যদি ওই অহঙ্কারটি তেমন না থাকে তাহলে বুঝতে হবে, সাহিত্যের ভূমিটা হয় ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে, নয় তো সেখানে আমরা যথেচ্ছ নির্মাণ দাঁড় করিয়ে দিচ্ছি; তৈরি করছি অগোছালো নানান স্থাপনা।
সাহিত্য-সমালোচনা এই ভূমিক্ষয়ের বিষয়টি ব্যাখ্যা করে, সাহিত্যের দরদালানের নির্মাণকলা, এর ত্রুটি-বিচ্যুতি, সৌন্দর্য-অসৌন্দর্যের হিসাব নেয়। এতে ওই ভূমিটা সুরক্ষা পায়, এর ওপর গড়ে তোলা বা তুলতে যাওয়া নির্মাণগুলো মূল্য সন্ধানী ও
আত্মবিশ্লেষণী হয়। দুর্ভাগ্যের আমাদের সাহিত্য-সমালোচনা আজকাল এসবের অনুপস্থিতি দিয়েই যেন এর অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। আমাদের বর্তমানের অর্জন কম নয়। কিন্তু ওই অর্জনের মূল্য বিচার আমাদের তৃপ্তি দেবে, নাকি আরো ভালো কিছু করতে না পারার আক্ষেপটা বাড়াবে? আমরা উঁচুমানের সাহিত্য সৃষ্টি করছি, নাকি নিজেরাই এটিকে শুধু ‘বিশ্বমানের বিশ্বমানের’ বলে ঢোল পেটাচ্ছি? যদি দ্বিতীয়টিই হয় তাহলে বাস্তবতা কেন এমন হচ্ছে? এর একটি ব্যাখ্যায় তাহলে যাওয়া যায় এবং আগামী দিনের সাহিত্য নিয়ে আমার প্রত্যাশার কথাটিও এই সুযোগে বলা যায়। আমার মনে হচ্ছে, আমাদের সাহিত্যের সম্ভাবনাটি মার খাচ্ছে তিন-চার জায়গায়। আমাদের ভাষার ক্ষেত্রে চলছে

অরাজকতা, শিক্ষা ব্যবস্থায় চলছে শৈথিল্য, মনোজগৎ দখল করে নিচ্ছে দৃশ্য মাধ্যম বই নয়, দৃশ্য মাধ্যম এবং আমাদের পড়ার সংস্কৃতি পরিবর্তিত হয়ে দেখার সংস্কৃতিতে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। যে জাতির ভাষা বিপন্ন, জাতি মাতৃভাষার একটি সুশ্রী, মান সম্পন্ন প্রকাশটি কোনোভাবে আয়ত্ত করতে না পেরে এক বিকৃত, মিশ্র ভাষায় কাজ চালিয়ে যায় ওই জাতির সাহিত্য শক্তিশালী হয় না। আমি যখন দেখি, এ দেশের বিশাল সংখ্যক তরুণ মাতৃভাষায় একটি বাক্যও ইংরেজির আক্রমণ ও উচ্চারণগত বিকৃতি বাঁচিয়ে বলতে অসমর্থ তখন ভাবি, এর প্রভাবে সাহিত্য কি পাল্টাবে? পাল্টে কি যাচ্ছে না? সাহিত্যেও ঢুকবে অথবা ঢুকছে অপ্রকাশের দৈন্য, নিমপ্রকাশের বিকৃতি? তবে সবচেয়ে বড় কথা, যে ভাষা সব চিন্তার বাহন ওই ভাষা যদি সামান্য চিন্তাটিকেও সহজ ও সুন্দরভাবে প্রকাশে অক্ষম হয় তাহলে এ ভাষাভাষীর চিন্তার ক্ষেত্রেও থাকবে সংকট। পশ্চিমে দেখুন, জাপান-চীনের দিকে তাকানÑ একজন শেমাস হিনি অথবা গুন্টার গ্রাস কি তাদের ভাষা বিকৃত করে, উচ্চারণ বিকৃত করে ফরাসি-স্প্যানিশ শব্দ ঢুকিয়ে খিচুড়ি বানিয়ে পরিবেশন করছেন? লন্ডন-শিকাগোর এক পথচারীও যখন কথা বলেন তখন কি মনে হয় না এই মাত্র লিখে যেন তা তিনি পড়ছেন? এমনই সঠিক ও সুঠাম সেসব বাক্য এবং প্রকাশ। এই শক্তি কি আমাদের আছে?
আমি স্বপ্ন দেখি, আমরা প্রত্যেকে মাতৃভাষাকে ওই শক্তি, দরদ আর দক্ষতা নিয়ে ব্যবহার করছি যে শক্তির কথা রবীন্দ্রনাথ সভ্যতার একটি প্রকাশ বলে উল্লেখ করেছেন। স্বপ্ন দেখি, সারা দেশের স্কুলের শিশুরা বই পড়ছে, লাইব্রেরি থেকে গল্প-কবিতা-প্রবন্ধের বই নিয়ে বাড়ি যাচ্ছে। আমি স্বপ্ন দেখি, সারা দেশে পড়ার সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ ঘটেছে। মানুষের চিন্তা স্বচ্ছ হচ্ছে, প্রকাশ বলিষ্ঠ হচ্ছে এবং মানুষ ক্রমাগত বুদ্ধির জগতে একটার পর একটা অর্জনের পতাকা তুলে ধরছে। মানুষ পশ্চিমের পণ্য সংস্কৃতি ও মেধাহীন দৃশ্য মাধ্যমের ধূর্ত চালে বদলে যাওয়া বিকৃত বাংলা ভাষাটিকে বিদায় জানাচ্ছে। যেদিন এই হবে বাংলাদেশের অবস্থা সেদিন আমাদের সাহিত্য ক্রমাগত উঁচুর দিকে যাত্রা করবে। সেদিন এক তরুণ কবির অথবা তরুণ গল্পকারের বইয়ের প্রথম সংস্করণ ৪০-৫০ হাজার বিক্রি হয়ে যাবে। আগামী দিনের সাহিত্যের বিষয়বস্তু নিয়ে কারা, কী লিখবেন, কেমনভাবে লিখবেন, মুক্তিযুদ্ধ বিষয় হিসেবে শক্তিশালী ভূমিকা রাখবে কি না সেসব লেখায়, এতে শুধুই নগর জীবন প্রতিফলিত হবে কি নাÑ এসব নিয়ে ভাবি না। আমি ভাবি, শিক্ষা ও ভাষার ক্ষেত্রে এক পুনর্জাগরণের কথা, আত্মপ্রকাশের তীব্র শক্তি আর চিন্তার শানিত হয়ে ওঠার কথা। আমার স্বপ্নে ওই সম্ভাবনাটি নদীর স্বচ্ছ জলের নিচে নুড়িপাথরের মতো দেখতে পাই। সেটি যদি হয় তাহলে সাহিত্য নিয়ে তোলা অন্যসব প্রশ্ন কাক্সিক্ষত সমাধান পেয়ে যাবে।

আমাদের সংস্কৃতি নিয়ে গর্বের পাশাপাশি একটি উদ্বেগ কিছু কালো ছায়া ফেলে চলেছে। উদ্বেগটি তৈরি হয়েছে সমাজের মূল্যবোধে ভয়ানক কিছু পরিবর্তন থেকে। গত ৩০-৪০ বছরে সমাজে ব্যাপক দুর্বৃত্তায়ন হয়েছে, দুর্নীতি বেড়েছে; ধর্ম-ব্যবসা, রাজনীতির নামে স্বার্থ হাসিলের চর্চা এবং মানুষে মানুষে দূরত্ব বেড়েছে। এখন ভোগের সংস্কৃতিই যেন প্রধান সংস্কৃতি। আমাদের চিরায়ত সংস্কৃতিগুলোর প্রকাশেও এখন আড়ষ্টতা অথবা সেগুলো যাচ্ছে একালের মন্ত্র ‘ফিউশন’-এর রন্ধন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। আমাদের

গ্রামীণ সংস্কৃতি হারিয়ে যাচ্ছে পিতৃতান্ত্রিক ও ধর্মতান্ত্রিক সমাজের চাপ ও পুঁজিবাদী দৃশ্য সংস্কৃতির আগ্রাসনে। এখন পহেলা বৈশাখ বলুন, নবান্ন উৎসব বলুন- সবই তো এক আপাত বন্ধুসুলভ নগরকেন্দ্রিকতায় নিয়ন্ত্রিত। এখন বহুজাতিক কোম্পানির পৃষ্ঠপোষকতায় পালাগান, গম্ভীরা অথবা লাঠিখেলার আয়োজন হয়। বাউলশিল্পীরা সেসব কোম্পানির সাজানো মঞ্চে দাঁড়িয়ে গান পরিবেশন করেন। পুঁজির আগ্রাসন ঠেকানো মুশকিল, পুঁজির মতলবটাও বোঝা মুশকিল। সংস্কৃতির ওই বিবর্তন সময়ের বিচারে হয়তো অবধারিত। এখন দৃশ্য মাধ্যমের যুগ এবং দৃশ্য মাধ্যমের প্রধান উদ্যোক্তা ও উদ্গাতা হচ্ছে পুঁজি। আমাদের সংস্কৃতির পক্ষে এর আঁচ বাঁচিয়ে চলা মুশকিল। তাই বলে অসহায় আত্মসমর্পণ কেন? সংস্কৃতি শুধু গান-বাজনা নয়। সংস্কৃতি সার্বিক জীবন আচরণের একটি পরিশোধন প্রক্রিয়ার নামও। এই জীবন আচরণে গত ৪০ বছরে এসেছে অনেক পরিবর্তন। সমষ্টির পরিবর্তে ব্যক্তি হয়ে দাঁড়াচ্ছে প্রধান, ভাগ করার পরিবর্তে একা ভোগ করার বাসনাটি হয়ে উঠছে তীব্র। ফলে সংস্কৃতির সব প্রকাশের মধ্যে একটি উগ্র ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা যেন প্রবল হয়ে উঠছে।


সংস্কৃতি কি মানুষের বেঁচে থাকা এবং তার অধিকার ও সম্মানের কথা বলে এখন? অথবা সংস্কৃতি কি আগের মতো অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরিতে উৎসাহ দেয় আমাদের? বহুজনের অন্তর্নিহিত শক্তি এখন দুর্বল হচ্ছে প্রচার ও আচার সর্বস্বতায়। এর পাশাপাশি ভোগবাদের ফলে সংস্কৃতিও এখন সংগ্রহযোগ্য পণ্যে রূপান্তরিত হচ্ছে। কয়েক বছর আগে এক চিত্রসংগ্রাহক আমাকে জানিয়েছিলেন, তার সংগ্রহে দুটি সুলতান ও তিনটি কিবরিয়া আছে। এই প্রবণতা সংস্কৃতির সামষ্টিক অঞ্চলে ব্যক্তিমালিকানার সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেয়ার মতো। ভোগবাদের সমস্যা আরো আছে। যে পণ্যটি তাৎক্ষণিক তৃপ্তি জোগাতে ব্যর্থ হয় ওই চর্চা তা প্রত্যাখ্যান করে। সংস্কৃতির ভেতর শুধুই যে সুন্দর ও চিত্তগ্রাহী বিষয় থাকবে তা তো নয়। সংস্কৃতির ভেতর জীবনে কষ্ট, বঞ্চনা ও ক্ষোভের প্রকাশগুলোও তো থাকবে শান্তরসের পাশাপাশি বীভৎসরসের মতো। ভোগবাদের প্রকোপে তাহলে সংস্কৃতিকে কি আমরা শুধুই ইন্দ্রিয়মোহন এক বিনোদন চর্চায় রূপান্তরিত হতে দেবো? সংস্কৃতিতে অধিকার তো সবার এবং আমাদের দেশজ সংস্কৃতির সব প্রকাশের উৎস তো সেই ব্রাত্যজনের জীবন চর্চায় যারা পণ্যায়িত পৃথিবীতে চলে যাচ্ছেন আরো প্রান্তসীমায়। বস্তুত এখন ‘ব্রাত্যজনের সংস্কৃতি’ বলে সমষ্টির এক অভিন্ন উত্তরাধিকারে একটি বিভাজন রেখা টানা হচ্ছে যার একদিকে এলিট শ্রেণির সংস্কৃতি যা ‘উচ্চ সংস্কৃতি’ নামে সুবিধাপ্রাপ্ত, অন্যদিকে ওই ব্রাত্যজনের ‘অসংস্কৃতি’- ‘নিম্ন সংস্কৃতি’। এই বিভাজন রেখার একদিকে ক্ষমতা, অন্যদিকে ক্ষমতাহীনতা- এ দুই অবস্থানের দ্বন্দ্ব ক্ষমতাহীনের জন্য শোচনীয়। ‘উচ্চ সংস্কৃতি’র আবার ঝোঁক হচ্ছে পশ্চিম-আহ্লাদ, বিশ্বকেন্দ্রের সঙ্গে একটি সংযুক্তির অভিলাষ। এই সংযুক্তির একটি ধোঁকা তৈরি করছে দৃশ্য মাধ্যম। কম্পিউটারের বোতামে হাত রেখে বৈশ্বিক সাইবার সংস্কৃতির অংশ হয়ে যাওয়ার বিভ্রম পশ্চিমের একটি ধোঁকা। কারণ যে প্রযুক্তির এক শতাংশ আমি তৈরি করিনি ওই প্রযুক্তি না বাজিয়ে প্রশ্নহীন গ্রহণ করার মধ্যে একটি বিপদ থেকে যায়। ওই বিপদটি নিজের মাটি-সময়-কাল ভুলে নিরালম্ব হয়ে যাওয়ার।


সংস্কৃতি নিয়ে আমার স্বপ্নে এক বিশাল পুনরুত্থানের ছবি দেখিÑ যে পুনরুত্থান মানুষকে তার শিকড় ও মাটিতে নিয়ে যাচ্ছে; সমষ্টির জীবনের ও ভালোবাসার কাছে। তার সামান্য চাওয়া-পাওয়া, সম্মান ও বিশ্বাসের
জায়গাটায় নিয়ে যাচ্ছে। দৃশ্য মাধ্যম আমাদের উৎপাদন নয়। তবে আমরা এটিকে ব্যবহার করবো, প্রয়োজন হলে আত্মস্থ করবো। কিন্তু তা পশ্চিমের আরোপিত সূত্র মেনে নয়, বরং আমাদের চিরকালীন সৌন্দর্য, মূল্যবোধ ও ভালোবাসার সূত্র মেনে- এ রকম একটি প্রত্যাশা আমার আগামীকে নিয়ে। সংস্কৃতি নিয়ে আমার স্বপ্নের মূলে আমাদের প্রকৃতি, জনজীবন ও জনজীবনের দোলাচল। আমাদের নদীগুলো নিঃস্ব হচ্ছে। কিন্তু আমাদের জীবন কেন নিঃস্ব হবেÑ যে জীবনে জলসিঞ্চন করতে পারে আমাদের সংস্কৃতির বহতা নদী? করেই যাচ্ছে, বস্তুত? আমার স্বপ্নে স্রোতস্বিনী, শক্তিমতী এই সংস্কৃতি নদী কলকল শব্দে বয়ে যায় আগামী থেকে আগামীর পথে।

 

মৃন্ময়ী 

সাহানা খানম শিমু

 

 

         কবিতার শেষ পংক্তিটা শেষ করে আপলোড দিতেই মাথাটা কেমন ঘুরে উঠল। বিছানায় ল্যাপটপ নিয়ে শোবার অভ্যাস করেছে কয়েক বছর হলো। টেবিল চেয়ারে বসে এখন আর লেখা হয় না,কষ্ট হয়,ব্যাক পেইনের কারনে। বয়স বাড়ছে,শরিরে এটা ওটা সমস্যা তৈরি হচ্ছে। শোবার সময় সাইড টেবিলে পানি,জরুরী অসুধের ব্যাগ,চশমা,কলম,কাগজ,ছোট একটা টর্চ নিয়ে রাখে। মোবাইল থাকে আরও হাতের কাছে,বালিশের পাশে। ঘুমের  সমস্যার কারনে শোবার সময় ল্যাপটপে লেখালিখি করে,কখনও ফেসবুকে বসে,কখনওবা ইউ টিউবে গান শোনে টের পায় না,এভাবে এক সময় ঘুমািয়ে পরে। ঘুমের জন্য শুয়ে দেখেছে,এপাশ ওপাশ করতে করতে রাত প্রায় অর্ধেক পাড় করে দেয়,তবুও ঘুম ধারে কাছে আসে না। ছেলে মেয়ে দুটো বিদেশে চলে যাবার পর থেকে ঘুমের সমস্যা শুরু হয়েছে, সেই সাথে একাকিত্বটা খুব পেয়ে বসেছিল।  কিন্তু তমশা একাকিত্বের কাছে হার মানেনি,সঙ্গি করে নিয়েছে লেখালিখি। ধুলো জমেছিল কবির কল্পনায়,কবিতা তৈরির মালমশল্লায়। ভালোবাসার গভীর হাত দুটো দিয়ে প্রায় দু'যুগের ধুলো ময়লা,পোকা মাকরের ঘর বসতি সরিয়ে  নিজের ভেতরে আবার জায়গা করে দিয়েছে কবিতাকে। গড়ে তুলেছে কবিতার প্রিয় প্রাঙ্গন। 

 

     ইদানীং মাঝে মাঝে এমন হচ্ছে,গভীর মনোনিবেশ করে কোন কাজ শেষ করে উঠে দাঁড়াতে গেলে মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠে। প্রেসার বাড়ল কি? নাকি অন্য কোন সমস্যা ! দেখি ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। তমাল,তানি প্রায় প্রতিদিনই ডাক্তারের কাছে যাওয়ার জন্য বলে। আজ যাই,কাল যাই করে যাওয়া হয়ে উঠছে না। কাল সকাল হোক,অবশ্য অবশ্যই যাব,পুরো শরিরটা চেক আপ করাব,আর আলসেমি নয়,আপন মনে বলছে তমশা। 

 

     কবিতাটি কম্পোজ করাই ছিল,সপ্তাহ খানেক আগে লিখেছিল,এখন কিছু ঘসামাজা করে ফাইনাল টাচ দিয়ে ফেসবুকে আপলোড করল। কবিতা লেখার সময় কবি রুশো রায়হানের কিছু কথা অনুসরণ করে চলে তমশা। যেমন - তিনি বলছিলেন কবিতা লিখেই ছাপতে দেবে না,রেখে দেবে,ছোঁবে না। কবিতাকে জাঁক দেবে। কয়েকদিন পর যখন বের করবে দেখবে কবিতাটি কেমন মাখনের মতো কোমল কোমনীয় হয়ে উঠেছে। তখন কাটতে,ছাটতে আরাম হবে,কবিতাকে তার পরিপূর্ন রূপ দিতে সহজ হবে। আরেকদিন বলছিলেন  -খেয়াল রাখবে,কবিতার গায়ে যেন বাড়তি মেদ না জমে। কবিতা হবে মেদহীন সৌন্দর্যের আধার। 

 

     মাথার পেছনটা শিরশির করছে,মাথাটা সোঁজা করে রাখতে কষ্ট হচ্ছে,হাত দুটো অবশ লাগছে। এরকম খারাপ তো আগে কখনও লাগেনি,মাথাটা একটু চক্কর দিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। এতদিন কি জানান দিচ্ছিল -তমশা সাবধান হও। কিন্তু তমশা গায়ে মাখেনি,ভেবেছে কিছু না। 

 

    সিনঙ্গেল মা তমশা,অনেক প্রতিকুলতা,ঘাত প্রতিঘাত সয়ে বাচ্চা দুটোকে বড করেছে। ছেলে মেয়েদেরকে মানুষ করেতে যেয়ে অনেক কঠিন হতে হয়েছে। ব্যক্তি তমশা এত কঠিন স্বভাবের ছিল না। বাস্তবতা ওঁকে কঠিন করেছে। রিপন যখন ছেড়ে গেলো তখন তমালের বয়স পাঁচ আর তানি মাত্র দুই। কঠিন না হলে সিনঙ্গেল মায়ের পক্ষে জীবন চালানো সম্ভব হতো না। রিপনের সাথে সংসারের শুরুটা মধুরই ছিল। বিয়ের বেশ 'বছর পর যখন তমশা চাকরির সোপান গুলো মসৃন ভাবে অতিক্রম করছিল তখন থেকে গোলযোগটা শুরু,তবে শুরু আর শেষের ব্যবধান খুব কম। দ্রুত অতি দ্রুত বদলে গেলো রিপন এবং রিপনের ভালোবাসার মন্ত্রমুগ্ধতা। মেয়েদের স্বাধীনতায় অবিশ্বাসী ছিল না প্রেমের সময়গুলোতে। পরে তমশার মনে হয়েছে প্রেমের সময়টাতে মেয়েদের স্বাধীনতার পক্ষে থাকার সুবিধা বেশি। রিপনের সুবিধাবাদীতার ভুরি ভুরি উদাহরণ দাড্ করাতে একটুও কষ্ট হবে না তমশার। তবুও উকিলের সামনে শুধু এটুকুই বলেছে - এক ছাদের নিচে বিছানা ভাগাভাগি করে চলা আর সম্ভব নয়। তমশার এগিয়ে যাওয়ার বিরোধিতাই ছিল সম্পর্কের চিঁড ধরানোর মূল কারন। যদিও কখনই রিপন স্বীকার করেনি তমশার চাকরিতে ওর সমস্যা। রিপনের কথা হলো চাকরির সুবাদে পুরুষের সাথে বেপরোয়া মেলামেশায়। আজ পর্যায় এসেও খুব হাসি পায় তমশার,যদি সমস্যা নাই থাকত তা হলে ছাডাছাডির ছয় মাসের মধ্যে একজন অল্প বয়সি মেয়েকে ঘরের বৌ করে তুলতে তোমার রুচিতে বাঁধল না ? সে মেয়ে সত্যিকার অর্থে শুধুই ঘরের বৌ। রিপন একটা পূর্ণাঙ্গ মানুষ তোমার বৌ হোক এটা তুমি কখনই চাইতে না। তোমার ইচ্ছে মতো চলবে,হাসবে,খেলবে। তোমার কথা শুনবে এরকম একটা মেয়ে মানুষকে তোমার বৌ রূপে তুমি চেয়েছিলে। তবে আমার সাথে সম্পর্কে কেন জড়ালে  ? আসলে তোমার মানষিক বৃদ্ধি কখনই গডপডতার উপরে ছিল না। 

 

     তমশা আর মাথা সোঁজা করে রাখতে পারছে না। সব কিছু ঝাপসা লাগছে। হাত পা অবস হয়ে আসছে,খুব দুর্বল লাগছে। সারা শরির জুড়ে কি যেন বয়ে যাচ্ছে। কি হল আমার ? অনেক কষ্টে সময় দেখল রাত দেড়টা। আমার যে খারাপ লাগছে কাউকে বলা দরকার,এতো রাতে কার ঘুম নষ্ট করব? মোবাইলটা হাতে নিল, বড আপা আর মেঝ ভাই ঢাকায় থাকেন,একজন উত্তরা অন্যজন মিরপুর। আর সব ভাই বোন তো বিদেশে পাডি জমিয়েছে। এতো রাতে উনাদের ঘুম ভাঙাবো? হয়তো তেমন কিছু না। কষ্ট করে এতো দুর কলাবাগান আসতে হবে। তাছাড়া ড্রাইভার ডাকাডাকি করে না পেলে শুধু শুধু টেনশন বাড়বে আর কিছু না। তার চাইতে পাশের ফ্ল্যাটের ভাবীকে ডাকব ? নাকি আর একটু দেখব। খাটের পাশের টেবিল থেকে পানির গ্লাস হাতে নিয়ে কতকটুকু পানি খেলো। একটু মনে হয় ভালো লাগছে ! দেখি আরেকটু। 

 

    রিপনের সাথে সম্পর্ক শেষ হবার পর ভয় ছিল মনে,যদি ছেলেমেয়ে দুটোকে তমশার কাছ থেকে নিয়ে নেয়। পারবে বুকের মানিক দুটোকে ছেড়ে থাকতে? না,কখনই বাচ্চাদুটোকে ছাড়বে না,কিছুতেই ছাড়বে না। যত রকম আইনী লড়াই আছে করবে তবুও ছাড়বে না। না,লড়াই যুদ্ধ কিছুই করতে হয়নি,রিপন বাচ্চাদের দ্বায়িত নিতে চায়নি। শুধু কিছু অর্থ দিয়ে দায় মুক্ত হতে চেয়েছিল। ফিরিয়ে দিয়েছে তমশা একটা ফুটো কডিও নেয়নি। নিজে খেয়ে না খেয়ে বাচ্চাদের বড করেছে। বাচ্চাদের বড করতে করতে হঠাৎ ভয় ঘিরে ধরে,তবে এবার ভয়ের কারন রিপন নয়,নিজের আত্মজকে নিয়ে ভয়। তমশার পরিচিত একজন সিনঙ্গেল মায়ের জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনা  তমশাকে ভাবিয়ে তোলে। একা  মা অনেক কষ্ট করে তার  দুই ছেলেকে বড করে তুলছিল। ছেলে দুটোর কাছে আমেরিকা প্রবাসী বাবার ইমিগ্রেশনের টোপ,ত্যাগী মায়ের ভালোবাসার চাইতে বেশি দামি মনে হয়েছিল।  ছেলে দুটো এখন মায়ের সাথে সম্পর্ক শেষ করে আমেরিকায় বাবার কাছে চলে গেছে। মা তাকে ছেড়ে যেতে না করেছিল,এই তার অপরাধ। মা কেঁদে কেটে বুক ভাসায়,দেখার কেউ নেই। এদিক দিয়ে তমশা নিজেকে অনেক ভাগ্যবান মনে করে, তমাল, তানি মাকে ভালো বুঝতে পারে। মায়ের কষ্টের জায়গা গুলো ওদের অপরিচিত নয়। এটুকুতেই তমশার স্বস্তি। আরও খারাপ কিছুও তো হতে পারত। তমশার ছেলে মেয়েরা মায়ের খোঁজ খবর রাখে। প্রতিদিন ওরা অফিস থেকে বাড়ি ফিরে ঘুমানোর আগে মায়ের সাথে কথা বলে। তমশাও সকাল দশটার মধ্যে ছুটা বুয়া বিদায় করে ওদের ফোনের অপেক্ষার থাকে। কথা হয়,কখনও কখনও ভিডিও অন করে নাতি নাতনিদেরকে দেখায়। তমাল তানি ছুটি ছাটা পেলে দেশে আসে মাকে দেখতে,তাই বা কম কি। 

 

     তমশা তো ভালোই ছিল,হঠাৎ কি যে হল আজ বুকে কেমন চাপ অনুভব করছে,গ্যাস হলো কি ! পেটে গ্যাস হবার মতো আজ কি খেয়েছে ? কিছুতেই মনে করতে পারছে না, হ্যা মনে পড়েছে,দুপুরে ডাল ভাতের সাথে জলপাইয়ের আচার খেয়েছিল। একটা আ্যন্টাসিড খেয়ে দেখবে,ভাবছে তমশা। অসুধের ব্যাগটা কাছে নিল,একটা আ্যন্টাসিড খেয়ে দেখি,ভালো লাগতে পারে। 

 

    তমাল তানি কতবার বলেছে ওদের কাছে কানাডায় যেয়ে থাকতে। এমনকি তমাল কয়েকবার তমশাকে নিতেও এসেছিল,তমশা যেতে রাজি হয়নি,তমালকে একাই ফিরে যেতে হয়েছে। কেন যেন দেশ ছেড়ে যেতে একটুও ইচ্ছে করে না। ছেলে মেয়ে দুটো এতো চাইছে তবুও তমশার মন সায় দেয়নি। আসলে এই বয়সে এসে নিজের গন্ডি ছেড়ে নিজের পরিবেশ ছেড়ে যেতে পারেনি। তমশা জানে ওর মধ্যে  কিছু কিছু একগুয়েমি আছে,কিছুটা একরোখা ভাবও আছে। মেঝ চাচার কথাটা কানে বাজে এখনও 

     '  তমশা জিদ করিস না,এতো একরোখা মেয়ে আমি আর দেখিনি,ফিরে যা স্বামীর কাছে। স্বামী স্ত্রীর মধ্যে এমন হয়েই থাকে,রাগের মাথায় জামাই বাবাজী....' 

    বাবাহীন সংসারে মেঝ চাচার তত্বাবধানে থাকলেও তার কথা মতো আর ফিরে যায়নি রিপনের সংসারে। অল্প কিছু দিনের মধ্যে নিজের ভেতর বাইরে গুছিয়ে নিয়ে আলাদা থাকা শুরু করেছে ছেলে মেয়ে দুটোকে নিয়ে। তমশার খুব জানতে ইচ্ছে করে,রিপন তুমি আমার নামে মিথ্যে অপবাদ কেন দিলে? তুমি ভালো করেই জানতে আমি কোন সম্পর্কে জড়াই নাই,জড়ালে তো তাকে নিয়েই সংসার করতাম। তুমি সত্য কথাটা কেন বলো নাই? তোমার চেয়ে আমার এগিয়ে যাওয়াটা তোমার পক্ষে মেনে নেয়া সম্ভব ছিল না। রিপনের চেয়ে  তমশার চাকরিটা ভালো ছিল,এটা কিছুতেই মানতে পারছিল না রিপন। যদিও দুজনে সহপাঠী ছিল। নিজ যোগ্যতায় চাকরিটা পেয়েছিলো তমশা। প্রথম দিকে প্রতিদিন কথা কাটাকাটি,বিষয়টা ছিল তমশার চাকরি। কথা কাটাকাটি ঝগড়ায় রূপ নিতে বেশি সময় লাগেনি। তারই এক পর্যায় রিপনের হাত উঠে এলো তমশার গায়ে,এরপর আর এক মুহূর্ত্য দেরি করে নি। বাচ্চা দুটোকে নিয়ে চলে এসেছিল মায়ের কাছে। 

 

      আর মাথাটাকে ধরে রাখা যাচ্ছে না। ঘাড়ের পেছনে শির শির করছে। বুকের বা পাশের ব্যাথাটা বুক জুড়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে। দম নিতে এতো কষ্ট হচ্ছে কেন? বাতাসে কি অক্সিজেনের ঘাটতি হচ্ছে? আমি কেন অক্সিজেন টানতে পারছি না। আমার কি হল? তবে কি আমি মরে যাচ্ছি? আমার আয়ু শেষ হয়ে আসছে? শেষ নিশ্বাসটা শুধু বাকি? তমশার মাথাটা কাত হয়ে পরে গেলো বিছানায়,মুখটা খানিক বিস্ফারিত হয়ে আছে, বাতাসের অক্সিজেন টেনে নেবার ব্যাকুলতায়। একটা হাত বিছানা থেকে ঝুলে পড়েছে। অন্য হাতটা মুঠোবন্ধ। 

দেখে মনে হচ্ছে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। 

 

    জীবন আর  মৃত্যুর বসবাস,এতো কাছাকাছি! কয়েকটা মুহূর্ত্য মাত্র,একটা মানুষ ইহলৌকিক জগত থেকে অন্য আরেক জগতে প্রবেশ করল। যে জগত থেকে আর ফিরে আসা যায় না। তার সব,সব কাছের মানুষ গুলো,প্রিয় জিনিস গুলো যেমনিভাবে ছিল তেমনি পরে রইল। রাত কতো হবে! তিনটা সারে তিনটা। নিসার দেহ পড়ে আছে বিছানায়,পাসে ল্যাপটপ খোলা পড়ে রযেছে। ফেসবুকের পাতায় সদ্য ভুমিষ্ঠ কবিতাটা যেন খল বল করে নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। পাশে জন্মদাত্রী জন্ম দানের বেদনায় নীল হয়ে পড়ে আছে। 

 

    চারিদিকে আলো ফুটতে শুরু করেছে,কয়েকটা মাছি তমশার মুখে এবং শরিরের খোলা অংশে এসে বসছে এবং উড়ছে। নিস্তব্ধ,নিঝুম,নিরব চারপাশ,খানিক পর পর  ব্লুপ ব্লুপ শব্দে ফেসবুকের  পাতায় কবিতাটিতে ক্রমাগত লাইক আর কমেন্টস পড়ছে। 

 

মৃন্ময়ী 

সাহানা খানম শিমু

 

 

         কবিতার শেষ পংক্তিটা শেষ করে আপলোড দিতেই মাথাটা কেমন ঘুরে উঠল। বিছানায় ল্যাপটপ নিয়ে শোবার অভ্যাস করেছে কয়েক বছর হলো। টেবিল চেয়ারে বসে এখন আর লেখা হয় না,কষ্ট হয়,ব্যাক পেইনের কারনে। বয়স বাড়ছে,শরিরে এটা ওটা সমস্যা তৈরি হচ্ছে। শোবার সময় সাইড টেবিলে পানি,জরুরী অসুধের ব্যাগ,চশমা,কলম,কাগজ,ছোট একটা টর্চ নিয়ে রাখে। মোবাইল থাকে আরও হাতের কাছে,বালিশের পাশে। ঘুমের  সমস্যার কারনে শোবার সময় ল্যাপটপে লেখালিখি করে,কখনও ফেসবুকে বসে,কখনওবা ইউ টিউবে গান শোনে টের পায় না,এভাবে এক সময় ঘুমািয়ে পরে। ঘুমের জন্য শুয়ে দেখেছে,এপাশ ওপাশ করতে করতে রাত প্রায় অর্ধেক পাড় করে দেয়,তবুও ঘুম ধারে কাছে আসে না। ছেলে মেয়ে দুটো বিদেশে চলে যাবার পর থেকে ঘুমের সমস্যা শুরু হয়েছে, সেই সাথে একাকিত্বটা খুব পেয়ে বসেছিল।  কিন্তু তমশা একাকিত্বের কাছে হার মানেনি,সঙ্গি করে নিয়েছে লেখালিখি। ধুলো জমেছিল কবির কল্পনায়,কবিতা তৈরির মালমশল্লায়। ভালোবাসার গভীর হাত দুটো দিয়ে প্রায় দু'যুগের ধুলো ময়লা,পোকা মাকরের ঘর বসতি সরিয়ে  নিজের ভেতরে আবার জায়গা করে দিয়েছে কবিতাকে। গড়ে তুলেছে কবিতার প্রিয় প্রাঙ্গন। 

 

     ইদানীং মাঝে মাঝে এমন হচ্ছে,গভীর মনোনিবেশ করে কোন কাজ শেষ করে উঠে দাঁড়াতে গেলে মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠে। প্রেসার বাড়ল কি? নাকি অন্য কোন সমস্যা ! দেখি ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। তমাল,তানি প্রায় প্রতিদিনই ডাক্তারের কাছে যাওয়ার জন্য বলে। আজ যাই,কাল যাই করে যাওয়া হয়ে উঠছে না। কাল সকাল হোক,অবশ্য অবশ্যই যাব,পুরো শরিরটা চেক আপ করাব,আর আলসেমি নয়,আপন মনে বলছে তমশা। 

 

     কবিতাটি কম্পোজ করাই ছিল,সপ্তাহ খানেক আগে লিখেছিল,এখন কিছু ঘসামাজা করে ফাইনাল টাচ দিয়ে ফেসবুকে আপলোড করল। কবিতা লেখার সময় কবি রুশো রায়হানের কিছু কথা অনুসরণ করে চলে তমশা। যেমন - তিনি বলছিলেন কবিতা লিখেই ছাপতে দেবে না,রেখে দেবে,ছোঁবে না। কবিতাকে জাঁক দেবে। কয়েকদিন পর যখন বের করবে দেখবে কবিতাটি কেমন মাখনের মতো কোমল কোমনীয় হয়ে উঠেছে। তখন কাটতে,ছাটতে আরাম হবে,কবিতাকে তার পরিপূর্ন রূপ দিতে সহজ হবে। আরেকদিন বলছিলেন  -খেয়াল রাখবে,কবিতার গায়ে যেন বাড়তি মেদ না জমে। কবিতা হবে মেদহীন সৌন্দর্যের আধার। 

 

     মাথার পেছনটা শিরশির করছে,মাথাটা সোঁজা করে রাখতে কষ্ট হচ্ছে,হাত দুটো অবশ লাগছে। এরকম খারাপ তো আগে কখনও লাগেনি,মাথাটা একটু চক্কর দিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। এতদিন কি জানান দিচ্ছিল -তমশা সাবধান হও। কিন্তু তমশা গায়ে মাখেনি,ভেবেছে কিছু না। 

 

    সিনঙ্গেল মা তমশা,অনেক প্রতিকুলতা,ঘাত প্রতিঘাত সয়ে বাচ্চা দুটোকে বড করেছে। ছেলে মেয়েদেরকে মানুষ করেতে যেয়ে অনেক কঠিন হতে হয়েছে। ব্যক্তি তমশা এত কঠিন স্বভাবের ছিল না। বাস্তবতা ওঁকে কঠিন করেছে। রিপন যখন ছেড়ে গেলো তখন তমালের বয়স পাঁচ আর তানি মাত্র দুই। কঠিন না হলে সিনঙ্গেল মায়ের পক্ষে জীবন চালানো সম্ভব হতো না। রিপনের সাথে সংসারের শুরুটা মধুরই ছিল। বিয়ের বেশ 'বছর পর যখন তমশা চাকরির সোপান গুলো মসৃন ভাবে অতিক্রম করছিল তখন থেকে গোলযোগটা শুরু,তবে শুরু আর শেষের ব্যবধান খুব কম। দ্রুত অতি দ্রুত বদলে গেলো রিপন এবং রিপনের ভালোবাসার মন্ত্রমুগ্ধতা। মেয়েদের স্বাধীনতায় অবিশ্বাসী ছিল না প্রেমের সময়গুলোতে। পরে তমশার মনে হয়েছে প্রেমের সময়টাতে মেয়েদের স্বাধীনতার পক্ষে থাকার সুবিধা বেশি। রিপনের সুবিধাবাদীতার ভুরি ভুরি উদাহরণ দাড্ করাতে একটুও কষ্ট হবে না তমশার। তবুও উকিলের সামনে শুধু এটুকুই বলেছে - এক ছাদের নিচে বিছানা ভাগাভাগি করে চলা আর সম্ভব নয়। তমশার এগিয়ে যাওয়ার বিরোধিতাই ছিল সম্পর্কের চিঁড ধরানোর মূল কারন। যদিও কখনই রিপন স্বীকার করেনি তমশার চাকরিতে ওর সমস্যা। রিপনের কথা হলো চাকরির সুবাদে পুরুষের সাথে বেপরোয়া মেলামেশায়। আজ পর্যায় এসেও খুব হাসি পায় তমশার,যদি সমস্যা নাই থাকত তা হলে ছাডাছাডির ছয় মাসের মধ্যে একজন অল্প বয়সি মেয়েকে ঘরের বৌ করে তুলতে তোমার রুচিতে বাঁধল না ? সে মেয়ে সত্যিকার অর্থে শুধুই ঘরের বৌ। রিপন একটা পূর্ণাঙ্গ মানুষ তোমার বৌ হোক এটা তুমি কখনই চাইতে না। তোমার ইচ্ছে মতো চলবে,হাসবে,খেলবে। তোমার কথা শুনবে এরকম একটা মেয়ে মানুষকে তোমার বৌ রূপে তুমি চেয়েছিলে। তবে আমার সাথে সম্পর্কে কেন জড়ালে  ? আসলে তোমার মানষিক বৃদ্ধি কখনই গডপডতার উপরে ছিল না। 

 

     তমশা আর মাথা সোঁজা করে রাখতে পারছে না। সব কিছু ঝাপসা লাগছে। হাত পা অবস হয়ে আসছে,খুব দুর্বল লাগছে। সারা শরির জুড়ে কি যেন বয়ে যাচ্ছে। কি হল আমার ? অনেক কষ্টে সময় দেখল রাত দেড়টা। আমার যে খারাপ লাগছে কাউকে বলা দরকার,এতো রাতে কার ঘুম নষ্ট করব? মোবাইলটা হাতে নিল, বড আপা আর মেঝ ভাই ঢাকায় থাকেন,একজন উত্তরা অন্যজন মিরপুর। আর সব ভাই বোন তো বিদেশে পাডি জমিয়েছে। এতো রাতে উনাদের ঘুম ভাঙাবো? হয়তো তেমন কিছু না। কষ্ট করে এতো দুর কলাবাগান আসতে হবে। তাছাড়া ড্রাইভার ডাকাডাকি করে না পেলে শুধু শুধু টেনশন বাড়বে আর কিছু না। তার চাইতে পাশের ফ্ল্যাটের ভাবীকে ডাকব ? নাকি আর একটু দেখব। খাটের পাশের টেবিল থেকে পানির গ্লাস হাতে নিয়ে কতকটুকু পানি খেলো। একটু মনে হয় ভালো লাগছে ! দেখি আরেকটু। 

 

    রিপনের সাথে সম্পর্ক শেষ হবার পর ভয় ছিল মনে,যদি ছেলেমেয়ে দুটোকে তমশার কাছ থেকে নিয়ে নেয়। পারবে বুকের মানিক দুটোকে ছেড়ে থাকতে? না,কখনই বাচ্চাদুটোকে ছাড়বে না,কিছুতেই ছাড়বে না। যত রকম আইনী লড়াই আছে করবে তবুও ছাড়বে না। না,লড়াই যুদ্ধ কিছুই করতে হয়নি,রিপন বাচ্চাদের দ্বায়িত নিতে চায়নি। শুধু কিছু অর্থ দিয়ে দায় মুক্ত হতে চেয়েছিল। ফিরিয়ে দিয়েছে তমশা একটা ফুটো কডিও নেয়নি। নিজে খেয়ে না খেয়ে বাচ্চাদের বড করেছে। বাচ্চাদের বড করতে করতে হঠাৎ ভয় ঘিরে ধরে,তবে এবার ভয়ের কারন রিপন নয়,নিজের আত্মজকে নিয়ে ভয়। তমশার পরিচিত একজন সিনঙ্গেল মায়ের জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনা  তমশাকে ভাবিয়ে তোলে। একা  মা অনেক কষ্ট করে তার  দুই ছেলেকে বড করে তুলছিল। ছেলে দুটোর কাছে আমেরিকা প্রবাসী বাবার ইমিগ্রেশনের টোপ,ত্যাগী মায়ের ভালোবাসার চাইতে বেশি দামি মনে হয়েছিল।  ছেলে দুটো এখন মায়ের সাথে সম্পর্ক শেষ করে আমেরিকায় বাবার কাছে চলে গেছে। মা তাকে ছেড়ে যেতে না করেছিল,এই তার অপরাধ। মা কেঁদে কেটে বুক ভাসায়,দেখার কেউ নেই। এদিক দিয়ে তমশা নিজেকে অনেক ভাগ্যবান মনে করে, তমাল, তানি মাকে ভালো বুঝতে পারে। মায়ের কষ্টের জায়গা গুলো ওদের অপরিচিত নয়। এটুকুতেই তমশার স্বস্তি। আরও খারাপ কিছুও তো হতে পারত। তমশার ছেলে মেয়েরা মায়ের খোঁজ খবর রাখে। প্রতিদিন ওরা অফিস থেকে বাড়ি ফিরে ঘুমানোর আগে মায়ের সাথে কথা বলে। তমশাও সকাল দশটার মধ্যে ছুটা বুয়া বিদায় করে ওদের ফোনের অপেক্ষার থাকে। কথা হয়,কখনও কখনও ভিডিও অন করে নাতি নাতনিদেরকে দেখায়। তমাল তানি ছুটি ছাটা পেলে দেশে আসে মাকে দেখতে,তাই বা কম কি। 

 

     তমশা তো ভালোই ছিল,হঠাৎ কি যে হল আজ বুকে কেমন চাপ অনুভব করছে,গ্যাস হলো কি ! পেটে গ্যাস হবার মতো আজ কি খেয়েছে ? কিছুতেই মনে করতে পারছে না, হ্যা মনে পড়েছে,দুপুরে ডাল ভাতের সাথে জলপাইয়ের আচার খেয়েছিল। একটা আ্যন্টাসিড খেয়ে দেখবে,ভাবছে তমশা। অসুধের ব্যাগটা কাছে নিল,একটা আ্যন্টাসিড খেয়ে দেখি,ভালো লাগতে পারে। 

 

    তমাল তানি কতবার বলেছে ওদের কাছে কানাডায় যেয়ে থাকতে। এমনকি তমাল কয়েকবার তমশাকে নিতেও এসেছিল,তমশা যেতে রাজি হয়নি,তমালকে একাই ফিরে যেতে হয়েছে। কেন যেন দেশ ছেড়ে যেতে একটুও ইচ্ছে করে না। ছেলে মেয়ে দুটো এতো চাইছে তবুও তমশার মন সায় দেয়নি। আসলে এই বয়সে এসে নিজের গন্ডি ছেড়ে নিজের পরিবেশ ছেড়ে যেতে পারেনি। তমশা জানে ওর মধ্যে  কিছু কিছু একগুয়েমি আছে,কিছুটা একরোখা ভাবও আছে। মেঝ চাচার কথাটা কানে বাজে এখনও 

     '  তমশা জিদ করিস না,এতো একরোখা মেয়ে আমি আর দেখিনি,ফিরে যা স্বামীর কাছে। স্বামী স্ত্রীর মধ্যে এমন হয়েই থাকে,রাগের মাথায় জামাই বাবাজী....' 

    বাবাহীন সংসারে মেঝ চাচার তত্বাবধানে থাকলেও তার কথা মতো আর ফিরে যায়নি রিপনের সংসারে। অল্প কিছু দিনের মধ্যে নিজের ভেতর বাইরে গুছিয়ে নিয়ে আলাদা থাকা শুরু করেছে ছেলে মেয়ে দুটোকে নিয়ে। তমশার খুব জানতে ইচ্ছে করে,রিপন তুমি আমার নামে মিথ্যে অপবাদ কেন দিলে? তুমি ভালো করেই জানতে আমি কোন সম্পর্কে জড়াই নাই,জড়ালে তো তাকে নিয়েই সংসার করতাম। তুমি সত্য কথাটা কেন বলো নাই? তোমার চেয়ে আমার এগিয়ে যাওয়াটা তোমার পক্ষে মেনে নেয়া সম্ভব ছিল না। রিপনের চেয়ে  তমশার চাকরিটা ভালো ছিল,এটা কিছুতেই মানতে পারছিল না রিপন। যদিও দুজনে সহপাঠী ছিল। নিজ যোগ্যতায় চাকরিটা পেয়েছিলো তমশা। প্রথম দিকে প্রতিদিন কথা কাটাকাটি,বিষয়টা ছিল তমশার চাকরি। কথা কাটাকাটি ঝগড়ায় রূপ নিতে বেশি সময় লাগেনি। তারই এক পর্যায় রিপনের হাত উঠে এলো তমশার গায়ে,এরপর আর এক মুহূর্ত্য দেরি করে নি। বাচ্চা দুটোকে নিয়ে চলে এসেছিল মায়ের কাছে। 

 

      আর মাথাটাকে ধরে রাখা যাচ্ছে না। ঘাড়ের পেছনে শির শির করছে। বুকের বা পাশের ব্যাথাটা বুক জুড়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে। দম নিতে এতো কষ্ট হচ্ছে কেন? বাতাসে কি অক্সিজেনের ঘাটতি হচ্ছে? আমি কেন অক্সিজেন টানতে পারছি না। আমার কি হল? তবে কি আমি মরে যাচ্ছি? আমার আয়ু শেষ হয়ে আসছে? শেষ নিশ্বাসটা শুধু বাকি? তমশার মাথাটা কাত হয়ে পরে গেলো বিছানায়,মুখটা খানিক বিস্ফারিত হয়ে আছে, বাতাসের অক্সিজেন টেনে নেবার ব্যাকুলতায়। একটা হাত বিছানা থেকে ঝুলে পড়েছে। অন্য হাতটা মুঠোবন্ধ। 

দেখে মনে হচ্ছে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। 

 

    জীবন আর  মৃত্যুর বসবাস,এতো কাছাকাছি! কয়েকটা মুহূর্ত্য মাত্র,একটা মানুষ ইহলৌকিক জগত থেকে অন্য আরেক জগতে প্রবেশ করল। যে জগত থেকে আর ফিরে আসা যায় না। তার সব,সব কাছের মানুষ গুলো,প্রিয় জিনিস গুলো যেমনিভাবে ছিল তেমনি পরে রইল। রাত কতো হবে! তিনটা সারে তিনটা। নিসার দেহ পড়ে আছে বিছানায়,পাসে ল্যাপটপ খোলা পড়ে রযেছে। ফেসবুকের পাতায় সদ্য ভুমিষ্ঠ কবিতাটা যেন খল বল করে নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। পাশে জন্মদাত্রী জন্ম দানের বেদনায় নীল হয়ে পড়ে আছে। 

 

    চারিদিকে আলো ফুটতে শুরু করেছে,কয়েকটা মাছি তমশার মুখে এবং শরিরের খোলা অংশে এসে বসছে এবং উড়ছে। নিস্তব্ধ,নিঝুম,নিরব চারপাশ,খানিক পর পর  ব্লুপ ব্লুপ শব্দে ফেসবুকের  পাতায় কবিতাটিতে ক্রমাগত লাইক আর কমেন্টস পড়ছে। 

 

মা হ বু ব  সা দি ক

সম্পর্কের সেতু

আলোর আড়ালে এইখানে ছমছমে নিঃসঙ্গতাÑ
নাকি একে নির্জনতা বলা ঠিক হবে?
হয়তো নির্জনতাই যথাশব্দÑ তবে তা-ও
বিশেষের অভাব-প্রসূত,
নির্বিশেষ মানুষের কোনো প্রয়োজন কোনোকালে
সভ্যতা করেনি বোধÑ এমনকি
ব্যক্তিও তাকে পরিত্যাজ্য মনে করেÑ
রক্ত-মাংসে আবেগে উত্তাল কোনো কাম্য প্রতিমার
অপেক্ষায় থাকে চিরকাল মানব হৃদয়,
তবে এই মধ্যরাতে আমিও রয়েছি জেগে
কার অপেক্ষায় কাতর?
জানি কেউ আসবে না, নিঃসঙ্গতা নিয়তি আমার;

এই কাল হারিয়েছে শাশ্বতীর মূঢ় ভালোবাসা
তারপর বেদনায় কেঁদেছে অনেকÑ
তবু সে ভুলেছে দেখো এপারে-ওপারে সেতু বাঁধা।




শ্যা ম ল কা ন্তি  দা শ

খেজুর রসের হাঁড়ি

আর ভয় নেই, আর ভয় নেই, ভয় করলেই ভয়
ওই দেখা যায় বাইশ দেউল, গরম হাওয়া বয়।
হাট পেরোলাম, বাট পেরোলাম, লোক নেই আর মাঠে
একটুখানিক জিরিয়ে নিলাম এঁদো পুকুরঘাটে।
ঘাটের জলে মাছ ভাসে আর বক ওড়ে চারপাশে
দেখতে দেখতে অবাক চোখে সন্ধ্যে নেমে আসে।
একটা-দুটো গাছ উড়ে যায়, একটা-দুটো বাড়ি
মাথার উপর দোদুল দোলে খেজুর রসের হাঁড়ি।

এবার আমি কোথায় যাবো, কোনখানে ঠিক যাই
কোথায় গেলে মাথা গোঁজার মিলতে পারে ঠাঁই!
জায়গা পেলাম বনের শেষে, মন ভরে যায় তাতে
পায়েস খেলাম হাত ডুবিয়ে শুকনো কলাপাতে।
খাওয়ার পরে গান ধরেছি, চমকে ওঠে সুর
জোনাকপোকার ফিসফিসুনি, বুক করে দুরদুর।
একটা-দুটো মেঘ উড়ে যায়, একটা-দুটো চাঁদ
মাঠের কোণায় কেউ পেতেছে ভূত নিকেশের ফাঁদ।
কোত্থেকে যে তুললো মাথা একটা পোড়োবাড়ি
বাড়ির ভিতর দুলছে ভাঙা খেজুর রসের হাঁড়ি।

 

 


প বি ত্র  মু খো পা ধ্যা য়

চেনা পৃথিবীটা ডাকছে

যতো দূরে যাই, চেনা পৃথিবীটা ডাকছে আকুল হয়েÑ
‘ফিরে আয়, ফিরে আয়।’
সেই চেনা গলা, মায়াবী কণ্ঠস্বর,
সেই রূপলোক ঝলসে উঠছে, অপরূপ সুন্দর,
গাছপালা, নদী, বর্ষা¯œাত মাঠের সান্ধ্য হাওয়া,
ছোট ছোট বাড়ি, উঠোনে ছড়ানো ধান,
পুকুরের ঘাটে মায়ের দুপুর-¯œান,
বকুলতলার ছড়ানো বকুল-গন্ধে মাতাল হাওয়া!
আমার সুদূরে হলো না এবার যাওয়া।

এ এক কঠিন বাঁধনে মন ও শরীরে পড়েছে বাঁধা
বৃষ্টির জলে পথঘাট থৈ থৈ।
মন্দির, তার নিকোনো উঠোনে খেলা করে শৈশব!
অজানা পাখির ঘরে ফেরা কলরব
থামে না। পৃথিবী রূপের অন্ধকারে
ডুব দেবে বলে আয়োজন করে, আমরাও ফিরি ঘরে।
সান্ধ্য নামলো নদীর নীরব চরে।

কল্পদৃষ্টি চলে যায় দূরে, দূর থেকে বহুদূরে।
কুনো পাখি ডাকে কুব কুব বসে উচ্চ বৃক্ষচূড়ে।
আমরা ক’জন ওড়াচ্ছি ঘুড়ি নদীর ধারের মাঠে
গলিমাসি আর মায়ের গল্প পিতান্ত শৈশবে
শুনি, আনমনে হাটুরেরা পথ হাঁটছে, ছন্দ শুনি।
পায়রার জলে লাল রঙ ঢেলে সূর্য যাচ্ছে পাটে।
পাখার ঝাপটে বাতাস সরিয়ে ঘরে ফেরে টুনটুনি।
মন্দিরে বাজে শঙ্খঘণ্টা, ওঠে আজানের ধ্বনি।

সুন্দর থাকে ছড়িয়ে, জীবন জড়িয়ে। আমার চোখে
বিষাদ বহতা ¯্রােতের মতন থাকে, তার পাশাপাশি
এই পৃথিবীর অজ¯্র সুখ, আছি দুঃখ ও শোকে,
তবু বার বার ‘আয় আয়’ ডাকে, বার বার ফিরে আসি। 

 

 

 

মৃ ণা ল  ব সু চৌ ধু রী

অক্ষরবিহীন কবিতা

লোভী ইঁদুরেরা ঘুমোতে দেয়নি সারারাত
প্রতীকী শব্দেরা শুধু দিয়েছিল
                     পাপের ঠিকানা
রঙিন পাপোষ থেকে উঠে আসে
           ধুলোমাখা বহুবর্ণ সাপ
সতত উড়ালপ্রিয় পাখি
ভোর বেলা খাঁচা ভেঙে
       উড়ে যায় ধ্বনিময় নদীটির দিকে

ঘুম নেই সারারাত

নির্জন শোকের গন্ধে
মাধবীলতার পাশে স্বপ্নের সুষমা নিয়ে
                 শুয়ে আছো তুমি
অক্ষরবিহীন
            শুদ্ধতম কবিতা আমার।

 

 



আ মি নু ল  গ নী  টি টো

জীবন এক অবিরাম প্রার্থনা



এই যে উত্তর দক্ষিণ ছোটাছুটি
এ দৃষ্টিভ্রম
আমি আমাতে আবর্তিত
কেন তীর্থ চেনাতে চাও
সে ঠিকানা অনেকের জানা
অন্ধকারের দরজা-জানালা খুলে দাও
হেঁটে যাব আলোর দিকে
কোনো কিছু থেমে নেই
সরলপথ ধুয়ে দেবে সভ্যতার আলো
অন্ধ যুক্তিহীনতা এফোঁড়-ওফোঁড় হবে
আলোর রশ্মিতে
খুলে দাও কৃষ্ণগহ্বর চোখ
খুলে দাও দাসত্বের বাঁধন
আমাকে ভাসিয়ে নেবে অসীম আলো
নিষেধাজ্ঞার কপাট খুলে দাও
দ-াদেশে সকলেই ভীত
কেউ কেউ সনাতন জীবনে
নিরপেক্ষ বিশ্বাসে আবর্তিত
ধর্ম যাকে প্রতিপক্ষ মনে করে

 


টো ক ন  ঠা কু র

কথার কবিতা

কথারা আর দাঁড়াতে পারছে না
কথার গায়ে একশ’ তিন জ্বর
বলে, কথারা আর বাইরে যায় না
কথারা তাই শুয়েই আছে ঘরেÑ
কথা ঘুমোলে কবর একটা ঘর
সেই কবরে কথা শুয়ে থাকে!
কথা নিজের মধ্যে ডুুবে আছে
কথা, তোমার কী হয়েছে, বলোÑ
কী কী তোমার গেছে আর কী আছে?
বলো, না বলে কেউ স্মৃতিমগ্ন থাকে?
কথা, তোমার মন খারাপ আজ, কেন?
কথারা খুব বিষণœতায় ডোবা!
মাইর খেয়েছে অনেক কথা, তাই
কথারা তাই বাক্যহীন, বোবা?

একদিন তো অনেক কথা ছিল!
এক রাতে তো ফুরোচ্ছিলই না
কী? কথা? কী আবার সে কথা!
একদিন তো কথার পিঠে চড়ে
দুপুর থেকে দেখেছ মৈনাক
তাই কথারা কথার পাতাল খোঁড়ে
কথারা তাই অতলে নিয়ে যায়

সেখানে গেলে কী দেখা যায়, জানো?
অনেক কথা ঘুমিয়ে আছে, মরেও গেছে
অনেক, অনেক কথাই দাঁড়াতে পারে না
আবার থাকে কিছু কথারা বেঁচে

যাদের সঙ্গে আবার দেখা হবেÑ
এই ভেবেই তো চুপচাপ আছি ঘরে
ঘর একটা উড়ন্ত অ্যাম্বুলেন্স
কথার গায়ে একশ’ তিন জ্বর

সারাটা রাত ঝুঁকে আছি কথার শিয়রে।

 

অদৃশ্য কাঠগড়ায়
দাঁড়ানো মানুষটি

জাকির তালুকদার

 

তার দিকে ঘৃণা ছুঁড়ে দিতে জমায়েত হওয়া মানুষের দিকে তাকিয়ে ছিল সে। কিন্তু দেখছিল না কিছুই। সে দেখছিল কেবল নিজের ভেতরের মানুষকে। একনাগাড়ে কথা বলছিল নিজের সঙ্গেই- আমি তো কখনো প্রেমিকাদের ছাড়া অন্য কোনো নারীকে স্পর্শ করিনি! কোনো নারীকে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে তার শরীর ও অন্তরের মধ্যে প্রবেশ করিনি। যখন কাউকে আর ভালোবাসতে পারছিলাম না তখন তো ভালোবাসার অভিনয় চালিয়ে যাইনি। তাকে অপদস্থকারীর দল চিৎকার করে গালি দিচ্ছিল- তুমি নারী নির্যাতনকারী! তোমার বিচার হবে।  নারী নির্যাতনকারী! এমন অভিযোগ তার নামে কীভাবে উত্থাপন করে লোকে? সে কাউকে মানসিক নির্যাতনও করতে চায়নি কখনো- শারীরিক নির্যাতন তো দূরের কথা। কোনো মেয়ে যে মুহূর্তে খুব দুর্বলভাবে হলেও ‘না’ শব্দটি উচ্চারণ করেছে, সঙ্গে সঙ্গে সে ওই শব্দটিকে মর্যাদা দিয়েছে। সে একবার সামনের লোকজনকে উদ্দেশ করে বলতে চায়- তোমরা কি কোনো নারীর কাছে, কোনো যুবতীর কাছে আমার এই দাবির পক্ষে সাক্ষ্য গ্রহণ করতে চাও? কোনো যুবতী যদি এমন ঘটনার পক্ষে আমার হয়ে সাক্ষ্য দিতে চায় তাহলে সেটি কি তোমরা বিশ্বাস করবে?


বলতে ইচ্ছা করলেও সে কিছুই বলে না। কারণ জানে যে, সামনের জমায়েতের কেউ কোনো যুবতীর মুখ থেকে অভিযুক্তের পক্ষে এমন বয়ান শুনলেও তা বিশ্বাস করবে না। কেননা তারা নিজেরা কোনোদিনও তার পরিস্থিতিতে মৃদু ‘না’ শব্দটিকে এতোটা গুরুত্ব দিতে পারবে না। তবে সে নিজে এই পরিস্থিতিতেও চার বছর আগেকার ঘটনাটি চোখের সামনে দেখতে পেতে থাকে।

মেয়েটির নাম তো সে কখনোই উচ্চারণ করবে না। নিজের কাছেও নয়। আগে থেকেই সময় ঠিক করা ছিল। সে অফিস থেকে বেরিয়ে এসেছিল। মেয়েটাও ইউনিভার্সিটি থেকে। মেয়েটি বলেছিল, আজ আমি আমার দেবতাকে আমার পূজার নৈবেদ্য নিবেদন করবো! উত্তরে সে বলেছিল, আমি দেবতা নই অথবা ভুল দেবতা। নৈবেদ্য উৎসর্গের পর তোমার অনুশোচনা হতে পারে। মেয়েটি বলেছিল, মানুষ চিনতে ভুল হতে পারে। কিন্তু দেবতা চিনতে ভুল হয় না। তুমি আমাকে গ্রহণ করো! আমাকে ধন্য করো! আমাকে পূর্ণ করো! তারপর পাপড়ির মতো মেলে দিতে শুরু করেছিল নিজেকে। ওই সাদামাটা সাবলেট রুমটা তখন প্রতিমুহূর্তে পরিণত হয়ে হচ্ছিল প্রেমমন্দিরে। পূজারিণী একবার হচ্ছিল বনলতা সেন, একবার হচ্ছিল হেলেন। সে কাক্সিক্ষত পুরুষের সামনে একের পর এক উন্মোচন করে চলেছিল বাৎসায়নের শৃঙ্গার অধ্যায়।

মিলন অধ্যায়ে প্রবেশের আগে সে যুবতীকে জিজ্ঞাসা করেছিল, মিথুন মুদ্রা- কোনটি তোমার ভালো লাগবে? তোমার যা যা ভালো লাগবে, আমারও তা-ই চাই। সব চাই! সব রকম চাই! তুমি তো অভিজ্ঞ দেবতা। আমাকে বাজাও!
তাদের পৌরুষ আর নারীত্ব আবৃত করে তখন জলপাইয়ের পাতাও ছিল না। তাদের শরীরের ভেতরে ও বাইরে তখন লাভা স্রোত। তারা অপেক্ষমাণ শয্যায় চলে গিয়েছিল। মেয়েটি শৃঙ্গারে সিক্ত হতে হতে বার বার বলছিল, আরো! আরো!
সেও তখন চূড়ান্তযাত্রার জন্য প্রস্তুত। মেয়েটির হাতের মধ্যে তার উত্থিত পৌরুষ। নিচে আর ওপরে দুই শরীর এক হয়ে গেছে। ঠিক সেই সময়ে মেয়েটি বলে উঠলো, না! প্রথমে সে এই ‘না’ শব্দটির তাৎপর্য বুঝে উঠতে পারেনি। তাই জিজ্ঞাসা করেছিল, কী ‘না’? আর দেরি করা যাবে না? এখনই প্রবেশ করবো? মেয়েটি খুব মৃদুস্বরে বলেছিল, আমার খুব ভয় করছে। না করলে হয় না গো? আজ না করলে হয় না? এখন না করলে হয় না?
সে তৎক্ষণাৎ নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিল মেয়েটির ওপর থেকে। বলেছিল, অবশ্যই।


তারপর পরম যতেœ মেয়েটিকে শয্যা থেকে উঠে বসতে সাহায্য করেছিল। মেঝেতে স্তূপাকার বস্ত্রখ-গুলো এগিয়ে দিয়ে বলেছিলম তোমার কাপড় পরে নাও। মেয়েটির তখন কাপড় পরতেও যেন দ্বিধা। কী করবে তা ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। কিন্তু তার তখন কোনো দ্বিধা ছিল না। কারণ ‘না’ শব্দটি সে পরিপূর্ণভাবে শুনতে পেয়েছিল।  মেয়েটি রিকশায় উঠে রওনা হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেলফোনে পাঠিয়েছিল আর্তধ্বনি- এতোটা ভালো হতে তোমাকে কে বলেছিল! ভালো! না তো! সে তো ভালো হওয়ার জন্য নিজেকে সংবরণ করেনি। কেন করেছে তা যুবতী বোধহয় বুঝতে পারবে না। অন্য ক’জনই বা বুঝবে! তার বিচার করতে আসা এই জমায়েতেরও কেউ বুঝবে না। কারণ তাদের আছে কেবল তার প্রতি জিঘাংসা। তাকে মাটিতে মিশিয়ে দিতে পারলে তারা নিজেদের চোখে নিজেরাই ‘হিরো’ হয়ে উঠতে পারবে। সেটিই হবে তাদের কুয়ো জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

 
জমায়েত তাকে উদ্দেশ্য করে বললো, তুমি নারী নির্যাতনকারী! এ কথা স্বীকার করলে আমরা তোমার শাস্তির মাত্রা কমিয়ে দেবো। সে তাদের দিকে করুণার চোখে তাকায়। তারা তো আর জানে না যে, সে নিজেকে আত্মসমালোচনার জগতে সমর্পণ করে রেখেছে অনেক সময় আগে থেকে। জীবনের সব নারীসঙ্গ স্মৃতি আদ্যোপান্ত বিশ্লেষণ করে দেখছে নিজের অজান্তেও কোনো নারীকে কোনো ধরনের নির্যাতন করেছে কি না। জমায়েত দাবি করছে, এক যুবতী তার বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের অভিযোগ এনেছে। ৩০ বছর যার বয়স সে তো যুবতীই বটে। যুবতীকে তুমি চেনো? ব্যারিস্টারি ধরনের প্রশ্ন। চিনবো না কেন! খুব ভালো করে চিনি। তার ওপর তুমি নির্যাতন চালাচ্ছ!
এ যে দেখছি একেবারে রায় দিয়ে দিচ্ছে! অবশ্য রায় দেয়ার এখতিয়ার লোকটার আছে কি না তা নিয়েও ভাবে না সে। তার মন-মস্তিষ্ক দখল করে আছে ‘নারী নির্যাতন’ শব্দটি।  যে কি না কোনোদিন স্নেহ দেখানোর ছলেও কোনো মেয়েকে স্পর্শ করার সুযোগ নেয়নি সে করেছে নারী নির্যাতন! কোথাও কি একটা বড়সড় ভুল থেকে গেছে তার জীবনের কোনো বাঁকে?


শ্যালিকাদের সঙ্গে মানুষ ঠারে-ঠোরে ইঙ্গিতময় ঠাট্টা-ইয়ার্কি করে। নাক টেপে, গাল টেপে, সুযোগমতো বেশি কিছুও। সমাজ ও পরিবারে সেগুলোকে সহাস্য বৈধতা দেয়া আছে। কিন্তু সে তো তেমন কিছুও কোনোদিন করেনি!
আবার সন্তও সে নয়। নিজেকে আসলে কোনোদিন ওইভাবে ভাবাই হয়নি।  তার বিচারের আয়োজন করা যুবতীর কথা ভাবে সে।  মেয়েটি তাকে বলেছিল, আমাদের পরিবার এই ছোট্ট শহরে খুব ঘৃণিত। আমাদের পুরুষরা সবাই মদ্যপ, লম্পট ও অকর্মণ্য। তাই আমাদের বাড়ির মেয়েদের বাধ্য হয়ে নিজের জন্য এবং পরিবারের জন্য অনেক কিছুই করতে হয়। নিজের গতি নিজেরই করতে হয়। তাদের সবারই জীবন প্রশ্নবিদ্ধ, কণ্টকিত এবং মহল্লায় মুখরোচক আলোচনার খোরাক। আমি ওই পথে যেতে চাই না। আমাকে সাহায্য করুন। সরাসরি এভাবে কথা বলাটা ভালো লেগেছিল তার। তবে কারো জন্য কিছু করার মতো ক্ষমতাশালী ও ধনাঢ্যও সে নয়। তবু করতে পেরেছিল। সরকারি প্রাইমারি স্কুলের মাস্টার পদে নিয়োগ পেতেও লাখ লাখ টাকা লাগে। তবু সে বিনা পয়সায় সেটি করে দিতে পেরেছিল।  তারপর যুবতী এসেছিল ঋণ শোধ নয়, ঋণ স্বীকার করতে। তেমন লোভ জাগানিয়া শরীর-সৌন্দর্য নয়। তবু শরীর ছাড়া মেয়েটির দেয়ার যে আর কিছুই নেই! সে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে বলেছিল, আমি বেশ্যাগমন করি না। করিনি কখনো।

মেয়েটির চোখে পানি- আমাকে বেশ্যা বললেন! না। তোমাকে বেশ্যা বলিনি। তবে নিজেকে বেশ্যাগামী বলার কথা বলেছি। কোনো কিছুর বিনিময়ে নারীর শরীর ভোগ করা মানেই তো আমার বেশ্যাগমন করা। যুবতী প্রথমে বুঝতে পারেনি এ কথার অর্থ। খুব কমজনেই পারে।  সে তখন খোলাসা করে বলেছিল, আমার কাছে টাকা-উপহারের বিনিময়ে কোনো নারীদেহ ভোগ করা মানে বেশ্যাগমন করা।  অধীনস্থ কোনো নারীকে মুখে পদ-পদবি-প্রমোশন-অফিসে বাড়তি সুবিধার কথা না বলেও ভোগ করা মানে বেশ্যাগমন করা।  সামাজিক নিরাপত্তা বা অন্য কোনো সুরক্ষাদানের বিনিময়ে কৃতজ্ঞতার শরীর গ্রহণ মানে বেশ্যাগমন করা। পরীক্ষায় ভালো নম্বর দেয়ার কথা বলে কোনো ছাত্রীর সঙ্গে যৌনতা মানে বেশ্যাগমন করা।  কারো মুগ্ধতার সুযোগ নিয়ে তাকে ভোগ করা মানে বেশ্যাগমন করা। সোজা কথা প্রেম-ভালোবাসা ছাড়া যে কোনো নারীর সঙ্গে শোয়া মানে বেশ্যাগমন করা। সে তো কোনোদিন এই ধরনের কিছু করেনি। অথচ তাকে তারা নারী নির্যাতক বলছে কেন? সে তখন চরম বিভ্রান্ত। জমায়েত তার দিকে আঙুল তুলেছে যে মেয়েটির করা অভিযোগে- সে তার চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে সরাসরি জিজ্ঞাসা করে, আমি কি তোমার ওপর কোনো ধরনের নির্যাতন চালিয়েছি?  মেয়েটি চোখ নামিয়ে নেয়।  সে কণ্ঠস্বর তীব্র ও তীক্ষè করে মেয়েটিকে বলে, তুমি নিজে শুধু একবার বলো। আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলো। নইলে আমিই তোমার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলবো।
মেয়েটি কোনো কথা বলে না, বরং হঠাৎ করেই জমায়েত থেকে সরে যেতে থাকে। পেছন ফিরে হাঁটতে থাকে। জমায়েত তখন ভগ্ন উৎসাহ। তবু ব্যারিস্টার হাল ছাড়তে চায় না। বলে, আমি তোমাকে দেখে নেবো!  সে নির্বিকার।
 
জমায়েত ভেঙে যায়।  তার এখন নির্ভার লাগার কথা। কিন্তু তা ঘটে না। নিজেকে নির্দোষ জেনে আত্মপ্রসাদ লাভ করার কথা। কিন্তু কোনো স্বস্তির অনুভূতি আসে না।  সে বরং নিজের অতীত তন্ন তন্ন করে খুঁজতে থাকে। কোথাও কি রয়ে গেছে তার দ্বারা নারী নির্যাতনের কোনো ঘটনা কিংবা গোপন কোনো ইচ্ছা? বাইরের কোলাহল থেমে গেছে। তাকে ক্রুশবিদ্ধ করতে আসা লোকজন ফিরে গেছে বিফল মনোরথ হয়ে। কিন্তু সে নিজের কাছে নিজের উত্তর খুঁজতেই থাকবে।
তার সামনে অপেক্ষা করছে অনেক প্রহরের আত্মনিগ্রহ।

লেখকের স্বাধীনতাই
তার লেখকসত্তা

হাসান আজিজুল হক

 

১৯৪৭ সালে যখন দেশ ভাগ হয়ে যায় তখন আমার বয়স বেশ কম। অনেকের ধারণা, আমি ওই বাংলা থেকে এই বাংলা এসেছি নিশ্চয় কোনো চাপের মুখে। কথাটি একেবারেই ঠিক নয়। আমি কোনো চাপের সম্মুখীন হইনি।
গ্রাম থেকেই স্কুল ফাইনাল এক্সামিনেশন দিয়েছি ১৯৫৪ সালে। তখন আর ম্যাট্রিকুলেশন বলা হতো না। ১৯৫৪ সাল থেকেই পরীক্ষার নাম হয়ে ছিল স্কুল ফাইনাল। সচ্ছল হলেও আমাদের গ্রামের একটা খ্যাতি ছিল। এই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা কাশিমবাজারের মহরাজা মণীন্দ্র চন্দ্র নন্দী। আমাদের গ্রাম ছিল তার শ্বশুরবাড়ি। গরিব ঘরের মেয়ে কাশীশ্বরী দেবীকে তিনি বিয়ে করেছিলেন। পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার ওই যবগ্রাম মহারানী কাশীশ্বরী উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয় থেকে পাস করেছি। চাপের মুখেই যদি দেশ ছাড়তাম তাহলে ১৯৪৭ সালেই ছাড়তাম। তা না করে আমি সাত বছর ওই পশ্চিমবঙ্গেই ছিলাম। এ থেকে একটা কথা স্পষ্ট, সাম্প্রদায়িকতা নগ্ন চেহারা আমার আশপাশে দেখিনি। সব জায়গাতেই সাম্প্রদায়িকতা শুরু করে চিহ্নিত কতিপয় সাম্প্রদায়িক ব্যক্তি। তারা কখনো স্বার্থ, কখনো হিং¯্রতা থেকে কাজটি করে। এটি এই বাংলাতে দেখেছি, ওপার বাংলাতেও দেখেছি।

১৯৪৬ সালে কলকাতায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় একদিনেই কয়েক লাখ লোক মারা গিয়েছিল ঠিকই কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের একেবারে পশ্চিম সীমান্তবর্তী গ্রাম হওয়ায় আমরা ওই দাঙ্গার বিষয়টি তেমন টের পাইনি। নির্বিঘেœই ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত গ্রামের স্কুলে লেখাপড়া করেছি। যাহোক, স্কুল ফাইনাল এক্সামিনেশন পাস করার পর হয়তো ওখানেই অর্থাৎ বর্ধমানে রাজ কলেজে ভর্তি হতাম। কিন্তু পাস করার পর বিশেষ কারণে এ দেশে এসেছিলাম। বিশেষ কারণ বলতে, আমার ভগ্নিপতি মাইকেল মধুসূদন দত্ত কলেজে এবং তারপর কিছুদিনের মধ্যেই দৌলতপুর বিএল

(ব্রজলাল) কলেজে ইংরেজির অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত হন। আমার একমাত্র বড় বোন ও ভগ্নিপতির ইচ্ছা হলো, আমি যেন বিএল কলেজেই ভর্তি হই। শেষ পর্যন্ত তা-ই হলো। আমি খুলনার দৌলতপুর এসে বিএল কলেজে ভর্তি হয়ে যাই, থাকি বোনের বাড়িতে। কলেজ জীবনে বহু স্মৃতি আছে। কতো স্মৃতির কথা আর বলবো! তখন থেকেই আমার লেখালিখি শুরু। এক বন্ধু জোটানো গেল। ওই বন্ধুর চার আনা আর অনেক কষ্টে জোগাড় করা আমার চার আনাÑ এই আট আনা দিয়ে আমরা কাগজ-কালি কিনতাম। ওই সময়টা দেয়াল পত্রিকার খুব চল ছিল। দেয়ালের গায়ে হাতে লেখা পত্রিকা, গল্প, কবিতা বোর্ডের মতো করে ঝুলিয়ে দেয়া হতো। সেখানে পাঠকরা পড়ে পাশে মন্তব্য লিখে যেতেন।
পত্রিকা এক সপ্তাহ পর পর পরিবর্তন করা হতো। আমি আর আমার বন্ধু বিমল মিলে দেয়াল পত্রিকা বের করতাম। একটু একটু গল্প লিখতাম, কোথাও থেকে কবিতা জোগাড় করতাম। এই মিলে দেয়াল পত্রিকা বের করতাম। ওই দেয়াল পত্রিকা থেকেই আমার সাহিত্যকর্ম শুরু। ওখানে দেখেছিলাম, আমাদের প্রিন্সিপাল এএফ ফজলুর রহমান লিখেছিলেন, ‘আই শ্যাল নট টেক মাই ক্লাস টুডে’। তখন এক ছেলে এসে ক্লাসের ‘সি’টা মুছে দেয়। এর মানে দাঁড়ায় ‘ল্যাস’, মানে বালিকাদের। খুবই  খারাপ কথা।  যখন প্রিন্সিপাল এসে দেখলেন ছাত্ররা মজা করেছে তখন তিনি ‘এল’টাও মুছে দিলেন। তখন মানেটা দাঁড়ালো, ‘আই শ্যাল নট টেক মাই অ্যাস টুডে’। ফলে ছাত্ররা সব গাধা হয়ে গেল। এমন অনেক মজার মজার স্মৃতি রয়েছে। কলেজ ছাত্ররা রাজনীতি করতো দেশের প্রয়োজনেই। কোনো পিটাপিটি-মারামারি, ভাগ বসানোÑ এসবের ব্যাপার ছিল না। স্বার্থ উদ্ধারের জন্য কেউ রাজনীতি করতো না। সম্পূর্ণ আদর্শভিত্তিক রাজনীতি। আমিও এর মধ্যে ঢুকে পড়েছিলাম। তখন সদ্য প্রতিষ্ঠিত ছাত্র ইউনিয়নের সম্ভবত

দ্বিতীয় কমিটিরই সক্রিয় সদস্য ছিলাম। এরপরই গ্রামের স্কুলে পড়াশোনা করা লাজুক ছেলেটি অল্প সময়ের মধ্যে যথেষ্ট রকমের কথাবার্তা বলতে শুরু করলাম। আমাদের কাছে তখন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী প্রধান নেতা ছিলেন। আমাদের লক্ষ্য ছিল, ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র। আমরা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করতাম, পশ্চিম পাকিস্তানে পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন। তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের সম্পূর্ণভাবে শোষণ করার জন্যই ডিভিশনটি ওয়েলকাম করেছিল। তারা তখন মনে করেছিল, এটি হলে আর কোনো সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে না। কলকাতা আর পূর্ব বাংলা একসঙ্গে থাকলে সেখানে অনেক অসুবিধা। তখন আমাদের সাহিত্য তো তেমন হয়ে ওঠেনি। যে ক’জন বড় বড় লেখক ছিলেন তারা কলকাতাতেই চাকরি করতেন। আহসান হাবীব, সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ ও সরদার জয়েন উদ্দীন। তাদের মধ্যে সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ দেশ-বিদেশ  ঘুরে বেড়াতেন। সরদার জয়েন উদ্দীনও কলকাতাতেই চাকরি করতেন। তখন একমাত্র আবু ইসহাককেই আমরা বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক বলতাম। তার ‘সূর্যদীঘল বাড়ি’ উপন্যাসটিই আমরা গৌরবের বলে মাথায় রাখতাম। আমার ওপার বাংলার সাহিত্য নিয়ে বেশি পড়াশোনার কারণ ছিল, সেখানেই আমার প্রথম শিক্ষা জীবন পার করেছি। স্কুলের লাইব্রেরি ছিল। সেখানেই প্রচুর পড়াশোনা হয়ে গেছে। শরৎচন্দ্র, বঙ্কিমচন্দ্র পড়া হয়ে গিয়েছিল। তাছাড়া মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশংকর, বিভূতিভূষণ প্রমুখ ওখানেই শেষ করি।
১৯৫৭ সালে একটি উপন্যাস ‘শামুক’ লিখেছিলাম। সেটি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মৃতি উপন্যাস প্রতিযোগিতায় দিয়েছিলাম। তা এতোকাল চাপা পড়ে ছিল। এখানে খুব বই সংগ্রাহক খোন্দকার সিরাজুল হক একদিন আমাকে দেখান, আমি যে উপন্যাসটি জমা দিয়েছিলাম সেটি তার কাছে আছে। ব্যস, ওই শুরু। তিনি আমার পেছনে লেগে গেলেন বই আকারে প্রকাশ করার জন্য। অবশেষে ২০১৫ সালের বই মেলায় তা প্রকাশ করা  হয়। বইটি বের করে কথা প্রকাশনী।
১৯৫৭ সালে লেখালেখিটা একটু করে চলছিল। ১৯৫৮ সালে যখন বাধ্যতামূলক টিসি নিয়ে আসি তখন আমার অসম্ভব দৈন্যদশা। বাবা পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানে। আমার বড় ভাই খুব ছোট চাকরি করেও দশটি করে টাকা ও অনার্সের একটি করে বই পাঠাতেন। তখন অধ্যাপক আবদুল হাই আমাকে খুব ¯েœহ করে রাজশাহী কলেজের নিরিবিলি একটা সার্ভেন্ট কোয়ার্টার দিলেন। একই সঙ্গে সব সহযোগিতার আশ্বাস দিলেন।


আত্মীয়স্বজন কেউ নেই, বড় ভাইও ঢাকায় থাকেন। তখন একা আমি। অনেক লড়াই করেছি। কিন্তু কখনো ভয়ে ভীত হইনি। কখনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত করিনি।  যারা সবচেয়ে অগ্রসর তাদের সঙ্গেই থেকেছি। প্রগতিশীল আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকতে ভয়ও পাইনি। আমার কাছে পঞ্চাশের দশকের স্মৃতিটা এক অর্থে বলতে হলে মানুষের পেশিশক্তি পাকিয়ে ওঠার মতো। আমার রাজনৈতিক চিন্তা ও দর্শনচিন্তার বিকাশ ঘটছে। এর প্রভাব আমার পরবর্তী সাহিত্য জীবনে এসে পড়েছে। তাই আমার সাহিত্যকর্মে যতো মর্মান্তিক বিষয়ই থাকুক না, কখনো কোনো ভেজা চোখ দেখা যাবে না, কখনো কোনো দুর্বলতার প্রশ্রয় পাওয়া যাবে না, রোমান্টিক ভাবালুতা মিলবে না।
১৯৬০ সালের মার্চে রাজশাহী শহরের মিয়াপাড়ার একটি ভাড়া বাড়িতে কাঠের তকতায় বুকে তুলার বালিশ দিয়ে ‘শকুন’ গল্পটি লেখা হয়েছিল। ১৯৬০ সালে ‘শকুন’ লেখার পরই মোটামুটি ঠিক করি, লেখালেখিটাই আমার মুখ্য। এখানেই থাকবো। এর পাশাপাশি অধ্যাপনা করবো। কারণ সেখানে আমার স্বাধীনতা কেউ হরণ করতে পারবে না। অন্য কোনো পেশায় তা সম্ভব নয়। তাই সিএসএস পরীক্ষা দেয়া বা অন্য কোনো বড় চাকরির ব্যাপারে চেষ্টাই করিনি, একদম করিনি। শিক্ষকতাই করবো বলে স্থির করি এবং তা-ই করেছি। লেখালেখির জীবনটা বেছে নিয়ে এর মধ্য দিয়ে আজও বেঁচে আছি।

Page 2 of 26

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…