Super User

Super User

Page 2 of 29

ঘোরের ভেতর ঘোরে

La La Land

তিয়াষ ইসতিয়াক

 

হলিউডের প্রবল বাস্তববাদী সমালোচক-দর্শক কিংবা উচ্চ হাই টেক সাই-ফাই বা কড়া অ্যাকশনে সমৃদ্ধ সিজিআইয়ে ধোয়া ঝাঁ চকচকে মুভির ভিড়ে মিউজিক্যাল ড্রামা চলচ্চিত্র আজ মৃতপ্রায়। অথচ ওই অনভ্যস্ত চোখগুলোকে সঙ্গীত নির্ভর গল্পের মাধ্যমে ড্যামিয়েন শ্যাজেল পলকহীনভাবে আটকে রাখতে পেরেছেন ‘লা লা ল্যান্ড’ মুভি দিয়ে! পঞ্চাশ-ষাটের দশকের আমেজ কী রাজকীয়ভাবেই না ফিরিয়ে এনেছেন তরুণ ওই স্বপ্নালু গল্পকার ও পরিচালক!
দুটি সরু তারের ওপর দিয়ে হাঁটতে থাকা দু’জনের অনিন্দ্য গল্প বলে চলে ওই মুভি। অভিনেত্রী হওয়ার স্বপ্নে বিভোর রেস্তোরাঁর এক ওয়েট্রেস মিয়া ডোলান। একের পর এক অডিশন দিয়েই যাচ্ছে। সবটিতেই ব্যর্থতা তার সঙ্গী।
আরেকজন সেবাস্টিয়ান ওয়াইল্ডার। জ্যাজ গানের ভক্ত গরিব পিয়ানিস্ট সে। স্বপ্ন দেখে একদিন তার নিজস্ব একটি জ্যাজের ক্লাব থাকবে। কিন্তু বাস্তবতা তাকে বসিয়ে রাখে ক্রিসমাস ক্যারোলের হালকা পার্টিতে সস্তা গোছের গানের সঙ্গে পিয়ানো বাজানোয়। ক্রমেই দুটি তার স্পর্শ করে। দুটি মানুষের মধ্যে ছোঁয়া আদান-প্রদান হয়ে যায়। কতো গল্প, গান, সুর, কল্পনায় হাঁটা, স্বপ্নে বিভোর হওয়া দু’জনায়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বাস্তবতার চোখ রাঙানিতে সুরে ছেদ আসে। ভাটা পড়ে কল্পনায় এবং স্বপ্ন ভাঙে রূঢ় জাগরণে। তারপর? এরপর আছে মুদ্রার অপর পাশটার গল্প। চোখের সামনে নদীর মতো বয়ে যাবে সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম সেরা এক সিকোয়েন্সে ঠাসা ফিনিশিং! কান্না পাবে খুব। গলার মধ্যে কী যেন একটি দলা পাকিয়ে থাকবে বেশ কিছুক্ষণ!

 


২০১৬ সালের সেরা সিনেমার সংক্ষিপ্ততম তালিকায় থাকা ‘লা লা ল্যান্ড’-এর রচয়িতা ও পরিচালককে নিয়ে কিছু বলা যাক। ড্যামিয়েন শ্যাজেল। বয়স মাত্র ৩২ বছর। এ বয়সেই ক্যামেরার পেছনে চমৎকার দুটি চোখ আর সৃষ্টিশীল এক মগজ নিয়ে দেখিয়েছেন মুনশিয়ানা। পড়াশোনা হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে। তা প্রথম প্রেম ছিল সিনেমা বানানো। কিন্তু সব সময় চাইতেন মিউজিশিয়ান হতে। মিউজিক, বিশেষত জ্যাজ মিউজিক যে বড্ড টানে তাকে তা তার মুভি হুইপ্ল্যাশ আর লা লা ল্যান্ড দেখলেই পরিষ্কার বোঝা যায়। প্রিন্সটন হাই স্কুলে পড়াকালীন জ্যাজ ড্রামার হওয়ার জন্য সংগ্রাম করেছিলেন খুব। ওই সংগ্রামের অসাধারণ গল্পই সেলুলয়েডের ফিতায় আমাদের বলেছেন হুইপ্লাশ মুভির মাধ্যমে। তবে শুরুটা অনেক আগে।
ছাত্র থাকা অবস্থায় সহপাঠী ও বন্ধু জাস্টিন হারউইটজ-কে সঙ্গে নিয়ে তৈরি করেছিলেন ‘গাই অ্যান্ড ম্যাডেলিন অন অ্যা পার্ক বেঞ্চ’। সেটি অবশ্য বানিয়েছিলেন নিজের থিসিস প্রজেক্টের অংশ হিসেবে। এটিরও বিষয়বস্তু ছিল জ্যাজ মিউজিক। লা লা ল্যান্ডের জন্মটাও ২০১০ সালে হার্ভার্ডের ডরমেটরির ছোট্ট এক কোণে প্রিয় বন্ধু জাস্টিন হারউইটজকে নিয়েই। মাত্র ২৫ বছর বয়সে যে গল্প লিখে ফেলেছিলেন, কস্মিনকালেও কী ভেবেছিলেন ওই গল্প একদিন মানুষের চোখে চোখে ভেসে বেড়াবে!
লা লা ল্যান্ডের পথচলাটিও মিয়া আর সেবাস্টিয়ানের মতো কণ্টকাকীর্ণ। এমন একটি মিউজিক্যাল ‘সেকেলে’ ধাঁচের গল্পটি অর্থায়ন করার জন্য কোনো প্রযোজক বা স্টুডিও খুঁজে পাননি হলিউডে সদ্য পা রাখা শ্যাজেল। বুঝে গিয়েছিলেন সোজা হয়ে দাঁড়াতে হলে পায়ের নিচে লাগবে শক্ত মাটি। ২০১৪ সালে বিশ্ববাসীর সামনে নিয়ে আসেন ‘হুইপ্ল্যাশ’। একরাশ মুগ্ধতা ছড়িয়ে এবার তিনি খুঁজে পান শক্তপোক্ত জমিন। এরপর আর বেগ পেতে হয়নি খুব। লা লা ল্যান্ড প্রজেক্টের জন্য এগিয়ে আসে বিখ্যাত সামিট এন্টারটেইনমেন্ট। বাকিটা ইতিহাস!

লা লা ল্যান্ডে আমাদের মুগ্ধ করে সেবাস্টিয়ান চরিত্রে রায়ান গসলিং। জাত অভিনেতা তিনি। ওই মুভির জন্য শিখলেন নাচ আর গান। টানা ২ মাস ৬ ঘণ্টা করে প্র্যাকটিস করে বশে আনলেন পিয়ানোটাও। মুভিতে পিয়ানোর প্রতিটি শট তার করা। কোনো বডি ডাবল হয়নি, দেয়া হয়নি বাড়তি ইফেক্ট। পর্দায় শ্রুতিমধুর গানগুলোও তারই গলার। ‘সিটি অফ স্টারস’ গানটি তো অস্কার, গোল্ডেন গ্লোবসহ বেশ কয়েকটি পুরস্কার বাগিয়ে নিয়েছে সেরা অরিজিনাল গান হিসেবে। একই সঙ্গে দুর্দান্ত অভিনয় তো আছেই। এতো ডেডিকেশন, পারফেকশন- দেখে মনেই হয় না রায়ান ক্যারিয়ারের মাত্র মাঝামাঝি আছেন।


আরেকজন হলেন এমা স্টোন। হলিউড তার ভবিষ্যৎ দেখছে এমার হাতেই। সদ্য ২৯ বছরে পা দেয়া অসম্ভব শক্তিশালী আর মেধাবী এই অভিনেত্রী নিজেকে পুরোপুরি ঢেলে দিয়েছেন ওই মুভিতে। ২০১৪ সালের মুভি ‘বার্ডম্যান’-এর জন্য প্রায় সব কয়টি পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন তখন। তবে শিকে ছেঁড়েনি ভাগ্যে। এবার লা লা ল্যান্ড দিয়ে সব উসুল করে নিয়েছেন। অস্কার, গোল্ডেন গ্লোব, ব্রিটিশ একাডেমি, অস্ট্রেলিয়ান একাডেমিসহ বেশকিছু সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার হাতে নিয়েছেন ওই আমেরিকান সুন্দরী। আগের সব সুঅভিনয় এবার এই মুভি দিয়ে ভেঙে-চুরে দিয়ে দাঁড়িয়েছেন এক অনন্য উচ্চতায়। মিয়া চরিত্রে আর কাউকে আসলে ভাবাই যায় না! রায়ান-এমা জুটির তৃতীয় মুভি হলো লা লা ল্যান্ড। ‘ক্রেইজি, স্টুপিড লাভ’ ও ‘গ্যাংস্টার স্কোয়াড’-এর পর এবার মহাসফল ওই মিষ্টি জুটি। একে অন্যকে চূড়ান্ত সাপোর্ট দিয়ে সুন্দর এক গল্পের মুভিটিকে প্রাণ দিয়েছেন দু’জন। অথচ ওই মুভির জন্য পরিচালক শ্যাজেলের প্রথম পছন্দ ছিল মাইলস টাইলার ও এমা ওয়াটসন!


ওই মুভিতে আরো ছিলেন জনপ্রিয় গায়ক জন লিজেন্ড সেবাস্টিয়ানের বন্ধু কিথ চরিত্রে। ছোট্ট একটি চরিত্রে ছিলেন হুইপ্ল্যাশের ওই ক্ষেপা মিউজিক টিচার জে কে সাইমন্স। লা লা ল্যান্ডের প্লট হিসেবে বেছে নেয়া হয়েছে লস অ্যাঞ্জেলেস শহরটিকে। এটি মুভির নামের মধ্যে লুকিয়ে আছে। লস অ্যাঞ্জেলেস (খ. অ.) হাজার গল্পের এক শহর। এ শহরে আছে বৈচিত্র্য। আছে ট্রাফিক, আঁকা-বাঁকা হাইওয়ে, ঋতুর পরিবর্তন, ফুল-পাখি-আকাশ। আছে বিচিত্র সব মানুষ ও তাদের কা-কারখানা। আর আছে রঙ, শত-সহস্র রঙ! শ্যাজেলের মুখেই শুনি- ‘আমার কেবলই মনে হয় ওই শহরটিতে কাব্যিক কিছু একটা আছে যে শহর তৈরি হয়েছে মানুষজনের অবাস্তব সব স্বপ্ন দিয়ে এবং তারা তাদের সর্বস্ব বাজি রাখে স্বপ্নটি মুঠোয় পুরার জন্য।’ তাই বুঝি ওই মুভিতে লস অ্যাঞ্জেলেস শহরটিকে দেখানো হয়েছে ‘শতরূপে শতবার’!


‘মিউজিক্যাল ড্রাম’ জনরার মুভি। তাই এখানে আছে প্রচুর গান ও নাচ। পরিচালকের প্রেরণা ছিল হলিউডের বেশকিছু নিখাদ ক্ল্যাসিক সিনেমা। যেমন- ‘দি আমব্রেলাস অফ চেয়ারবার্গ’, দি ইয়াং গার্ল অফ রকফোর্ট’ কিংবা ‘ব্রডওয়ে মেলোডি ১৯৪০’, ‘সিঙ্গিং ইন দি রেইন’ বা ‘দি ব্যাড ওয়াগন’। বাস্তববাদী নাক উঁচু সমালোচকরাও মুগ্ধ হবেন চমৎকার শ্রুতিমধুর সব গানে। প্রতিটি গান কানে বাজবে অনেকক্ষণ। বিশেষ করে ‘সিটি অফ স্টারস’ কিংবা ‘অ্যানাদার ডে অফ দি সান’-এর সুর ও কথাগুলো হৃদয় ছুঁয়ে যায়। ওই মুভিতে গানে গানে প্রচুর গল্প বলা হয়েছে, কথা-বার্তা হয়েছে ছন্দে ছন্দে। তা মুগ্ধতা জাগায়।


দ্বৈত ও দলীয় নাচগুলো ছিল দৃষ্টিনন্দন। সিনেমার শুরুই হয়েছে এক চমৎকার ডান্স সিকোয়েন্স দিয়ে যাতে ছিল ১০০ জনেরও বেশি নৃত্যশিল্পী এবং এর শুট হয়েছে লস অ্যাঞ্জেলেসের মহাসড়কে। মুভিতে মিয়া-সেবাস্টিয়ানের চমৎকার সব নাচের দৃশ্য দেখে মুখে একটি শব্দই আসে- ‘বাহ!’ ছয় মিনিটের প্রিয়াম কারের দৃশ্যটি করতে দুই দিন লেগেছিল। কারণ দৃশ্যটি ধারণ করতে হয়েছে দিনের ম্যাজিক আওয়ার মোমেন্ট বা সূর্যাস্তের সোনালি ঘণ্টার সময়। পুরো মুভিতে আরেকটি জিনিস পাওয়া যাবে। তা হলো রঙ। মন ভালো করে দেয়া রঙের ছড়াছড়ি! নাচ-গান-রঙের সঙ্গে সঙ্গে মুভিটিতে পাওয়া যবে কিছু চূড়ান্ত বাস্তবতার কথা। দেখা যাবে স্বপ্নের খুব কাছেই পড়ে থাকা স্বপ্নভঙ্গের মৃতদেহ। পর্দা থেকে চোখ সরানো যায় না ওই মুভির কালার কম্বিনেশন দেখে। সেটের ডিজাইনে আছে ক্ল্যাসিক মঞ্চের ছোঁয়া। আছে ছবির মতো সব ড্রিম সিকুয়েন্স। শ্যাজেলের পুরনো সেই বন্ধু জাস্টিন হারউইটজের অসম্ভব সুন্দর কম্পোজিশন ও লাইনাস স্যান্ডগ্রিনের চমৎকার সিনেমাটোগ্রাফি চোখ আটকে দেবে পর্দায়। একই সঙ্গে আছে এডিটিংয়ের জাদু। খুব অর্গানাইজড ও ফাস্ট পেস এডিটিং, সাবলীল সিকোয়েন্স চেঞ্জ মুগ্ধতা জাগায় প্রতি মুহূর্তে। ‘লা লা ল্যান্ড’ মুভিটি ৮৯তম অস্কারে ১৪টি নমিনেশন পেয়ে নাম লিখিয়েছে ‘টাইটানিক’ ও ‘অল অ্যাবাউট ইভ’-এর পাশে এবং বগলদাবা করেছে ৬টি পুরস্কার। এছাড়া ৭৪তম গোল্ডেন গ্লোবে রেকর্ড সৃষ্টি করে ঘরে নিয়েছে ৭টি পুরস্কার এবং বাফটায় পেয়েছে ১১টি নমিনেশন। এর ৫টিই জিতে নিয়েছে মুভিটি।


মধুরতম গল্প আর রূঢ় বাস্তবতার মিশেল ওই অনবদ্য মুভির ‘ওগউন’ রেটিং ৮.১/১০। রোটেন টমাটোস (জড়ঃঃবহ ঞড়সধঃড়বং) দিয়েছে ৯২ শতাংশ ফ্রেশ (ঋৎবংয)। ৩০ মিলিয়ন ডলারে তৈরি লা লা ল্যান্ড মুভিটি তুলে নিয়েছে ৪৪৬ মিলিয়ন ডলার। এছাড়া জিতে নিয়েছে কোটি কোটি হৃদয়!

‘যেভাবে বিচিত্রগামী, যাই আমি...’

প্রবীর ভৌমিক

 

শক্তি চট্টোপাধ্যায় চলে গেছেন প্রায় দুই দশক আগে। কলেজ স্ট্রিটের এক বিখ্যাত প্রকাশক একদিন কথায় কথায় বলেছিলেন, ‘যে লেখক মৃত্যুর পরও ২০-২৫ বছর ধরে জাগরুক থাকেন তার প্রতিভা সম্পর্কে কোনো সন্দেহের অবকাশ থাকে না।’ সবাই নন- কোনো কোনো কবি, সাহিত্যিক মৃত্যুর পরও হেঁটে যান, হেঁটে যেতে পারেন। শক্তি চট্টোপাধ্যায় সেই বিরলতমদের একজন। ১৯৯৫ সাল থেকে আজ পর্যন্ত অসংখ্য পত্রিকা তাকে নিয়ে সংখ্যা প্রকাশ করেছে। গবেষণা করেছেন বেশ কয়েক ব্যক্তিত্ব। তাকে নিয়ে গ্রন্থ রচনাও কম হয়নি। প্রশ্ন হলো, এর উৎস কী!
তাঁর কবিতার বাকভঙ্গি, বাকরীতি এক স্বাতন্ত্র্য ঘরানা গড়ে তোলে। এসবই এসেছে তার নিজের মতো করে, জীবন যাপনের মধ্য দিয়ে। এই জীবন যাপন উদ্দাম কিন্তু সহজ-সারল্যে ভরপুর। এই জীবন যাপনে লেগে থাকে দুঃখের অনন্য গভীরতা। কারণ সে বড় সুখের সময় নয়, সে বড় আনন্দের সময় নয়। নিজেকে ‘স্বেচ্ছাচারী’ বলতে পছন্দ করতেন তিনি। কিন্তু কেন এই স্বেচ্ছাচার! মধ্যবিত্ত মূল্যবোধের শিকড়ে কুঠারাঘাত। কখন যে তিনি কোথায় থাকতেন তার ঘনিষ্ঠরা তো ছার, মীনাক্ষী চট্টোপাধ্যায়ও জানতেন না। এই যে বিশৃঙ্খলা তার মধ্যে এই বিপুল পদ্য (তার ভাষায়) রচনা বিস্ময়কর নয় কী! তার জীবন যাপন নিয়ে যতো কাহিনী এর ৫০ শতাংশ সত্য হলেই মধ্যবিত্তের কাছে আতঙ্কের রূপকথাও বটে।


শুধু কি কবিতা রচনা? এর পাশাপাশি কবিতা বিষয়ক সংগঠন করা, বিভিন্ন সংকলন সম্পাদনা করা। একটা কথা বলা হয়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায় সামাজিক দায়বদ্ধতা নেই। এ সংজ্ঞাটি ঠিক বোধগম্য হয় না। ‘মানুষ তোমার পাশে আছি’ বলে চেঁচাতে হবে! নাকি হতে হবে কোনো রাজনৈতিক দলের দরদাম। ১৯৫৯ সাল থেকে সত্তরের দশকের প্রথম অর্ধাংশজুড়ে যে আন্দোলন ও আলোড়ন এবং তা দমন করতে যে পুলিশি সন্ত্রাস এর বিরুদ্ধে তিনি কলম ধরেছেন তার মতো করে। সত্তরের দশকের বিপ্লবের ডাক দিয়েছিলেন যে তরুণরা তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু যে নিষ্ঠুরতায় দমন করা হয়েছিল তা আজও রাষ্ট্রীয় হিং¯্রতার চরম কুৎসিত উদাহরণ হয়ে রয়েছে।
শক্তি চট্টোপাধ্যায় তখন লিখছেন-

‘বিষণœ রক্তের দাগ রেখে গেছে অন্ধকারে ফেলে
মু-হীন তরুণের উজ্বল বিমূঢ় এক দেহ
খোলা ছিল গলির গৃহস্থ জালনা আর
রোষমুক্ত তরবারি ঘাতকের হিং¯্র সাংঘাতিক...’

বাংলাদেশের অনেক কবি-সাহিত্যিকই জানেন এ দেশের সাহিত্য, শিল্প সম্পর্কে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের অনুরাগের কথা। যখন বাংলাদেশ হয়নি তখনো পূর্ব পাকিস্তান। ওপারের লেখালেখি প্রায় আসতোই না। তখন অনেক শ্রম, প্রভূত কষ্টে তিনি ১৯৫৯ সালে সম্পাদনা করেছিলেন ‘পূর্ববাংলার শ্রেষ্ঠ কবিতা’। এমন পর্বে বিস্তারিত জানা গেছে, মীনাক্ষী চট্টোপাধ্যায়ের লেখা থেকে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ছিল অকুণ্ঠ সমর্থন। মানবিক গুণে শীর্ণ ওই দৃষ্টিভঙ্গি। কবি নির্মলেন্দু গুণের রচনা থেকে জানা গেছে, ওই অস্থির সময়ে তরুণ এবং তখন এপার বাংলায় প্রায় অপরিচিত বাংলাদেশের এই কবির পাশে তিনি দাঁড়িয়েছিলেন। কৃতজ্ঞতার সঙ্গে নির্মুলেন্দু গুণ এ কথা স্বীকার করেছেন। কিন্তু ওই অংশটুকু দিয়েই তার কবিতা বোঝা যাবে না। বহুমাত্রিক তার বিস্তৃতি। তার কবিতার চলন।


বিভিন্নœ সময় শক্তি চট্টোপাধ্যায় উল্লেখ করেছেন, এক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি তিনি কবিতা লিখতে এসেছিলেন। ওই চ্যালেঞ্জের প্রথম প্রকাশ ‘হে প্রেম হে নৈঃশব্দ’তে জানিয়েছিলেন, তিনি অনেক দিন থাকতে এসেছেন। দুই-তিনটি গ্রন্থের উল্কা উত্থানের ¯্রষ্টা হতে আসেননি। প্রথম দিকে আংশিকভাবে থাকলেও পরের দিকে কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা নয়- স্বতঃস্ফূর্ত, সাবলীল ও ধারাবাহিকভাবে। মাথায় চাপ নিয়ে তার পাঠককে উপস্থিত হতে হয় না।
কোনো তুলনায় যাচ্ছি না। জীবনানন্দকে বোঝাতে বুদ্ধদেব বসু ছিলেন। শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে বোঝাতে নিজেই মাঠে নেমেছেন চূড়ান্ত সপ্রতিভতায় শব্দ আর ধ্বনির তুমুল তোলপাড়ে। কেমন ছিল তার কবিতার আলোড়ন! কবি অমিতাভ দাশগুপ্তের ভাষায়- ‘শক্তি চট্টোপাধ্যায় আসরে ঢুকেই এমন হই চই শুরু করলেন- মানুষ, নিসর্গ ও সর্বোপরি ঈশ্বর নামক বহু ব্যবহারে ঢলঢলে বস্তুটিকে ত্যাগ করে এমন সব বিপজ্জনক কবিতার গোলা ছুড়তে লাগলেন যে, চারপাশের পুরনো মূল্যবোধের ঠুঁটো জগন্নাথ মার্কা বিগ্রহগুলি মাটিতে পড়ে এ-ওর মাথা ঠোকাঠুকি করতে লাগলেন। প্রথম কবিতার এই সেই তা-ব। তারপর ইন্দ্রজাল ছড়িয়ে দেয়া। দেশের এমাথা-ওমাথা থেকে নোটিশবিহীন পর্যটন আর তা থেকে কুড়িয়ে আনা অমূল্য রতœরাশি। এটা খুব সহজ কাজ

নয়। চেয়ার-টেবিলে বসে ভারী ভারী তত্ত্বের পুস্তক পাঠান্তে শক্তির কবিতা রচনা নয়। নিজেকে পুড়িয়ে একদম খাঁটি করে তুলে এই লেখা, এই পদ্য (!) রচনা।’
একদিকে কবিতার ত্রাস, আর্তনাদ, হাহাকার। অন্যদিকে জীবনকে ভালোবেসেও মৃত্যুর রহস্যময় প্রাচুর্য। রবীন্দ্রনাথের মতো মৃত্যুশক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কাছে দেবতা নয়, বরং এক অনিবার্য পরিণতি-

“কী হবে জীবন লিখে? এই কাব্য এই হাতছানি
এই মনোরম মগ্ন দীঘি, যার দু’দিকে চৌচির
ধমণী- নেহাতই টান আজীবন সমস্ত কুশল
ফাঁস থেকে ছাড়া পেয়ে এই মৃত্যুময় বেঁচে থাকা?”


তার মৃত্যুবোধ ভালোবাসা থেকে উঠে আসা। মৃত্যুবোধের বিপরীতে প্রেম। জীবনের কয়েকটা বছর নিশ্চিন্তে কাটিয়ে দিয়ে তিনি ভালোবেসে মরে যেতে চান। প্রেম যেন তার কাছে এক আলৌকিক আলো। নর-নারীর নেহাত যৌন সম্পর্ক নয়- জীবনের বন্ধনে আচ্ছাদন তার ভালোবাসা চাই, সম্পর্কের ভালোবাসা। এটি তার
কবিতাকে ক্রমেই করে তোলে নম্্র, পেলব ও মন্ত্রের মতো স্থির। তিনি বলেছেন, ‘প্রেম অনির্বাচনীয়তা পায় অবশেষে, যৌনতা সেখানে জায়গা পায় না।’ নিরিখের পেলব স্পর্শে উচ্চারণ করেন-

‘অবান্তর স্মৃতির ভিতর আছে/তোমার মুখ অশ্রু ঝলোমলো/লিখিও, উহা ফিরৎ চাহো কি না?’


পাঠক লক্ষ্য করুন, কী প্রচ- সাহস, আত্মবিশ্বাস, বেপরোয়াভাবে ‘ফিরৎ’ শব্দটির অমোঘ প্রয়োগ। আর ‘লিখিত’ না হলে ‘ফিরৎ’ হয় না। সর্বোপরি ‘তোমার মুখ অশ্রু ঝলোমলো’। নর-নারীর যৌন সম্পর্কের অনেক ক্লেদাক্ত বর্ণনা কবিতায় পড়েছি, অন্যান্যদের কবিতায়। কিন্তু নিসর্গ, নির্মোহ আর বাউলের বৈরাগ্য নিয়ে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের প্রেম মায়া ডেকে আনে ঘরের দাওয়ায়। তার ‘ভালোবাসা সব জানে, গোপনে আকণ্ঠ ভালোবাসা।’
এই যে কথা নেই, বার্তা নেই নিরুদ্দেশ যাত্রা, ঝুঁকির জীবন- এই পর্যটনগুলো নিশ্চয়ই ফুলশয্যা ছিল না। অনিশ্চিত কণ্টকের শয্যা। আর এখান থেকে, অরণ্য ও নিসর্গ থেকে শক্তি চট্টোপাধ্যায় আহরণ করেছেন ভালোবাসার ব্যতিক্রমী সব ফুল-মালা। ঈশ্বরবোধ, মৃত্যু, জীবন, প্রকৃতি, রোমান্টিকতা, স্বেচ্ছাচার ও প্রেম- এ জটিল রসায়নেই তার অনন্যতা।
ঈশ্বরবোধ, শক্তির ঈশ্বর কোনো ধর্মের গুরুঠাকুর নন, ঈশ্বরের অলৌকিকত্ব নয়- একটা নির্ভরতার অবয়ব। যতোদূর জানি, কোনো ধর্মীয় লোকাচার ছিল না তার। ওইসব ধর্ম লোকাচার পালনের সময়ই বা কোথায় তার! তার প্রধানতম ধর্ম তো কবিতা। কিন্তু ঈশ্বর আছেন-

‘ঈশ্বর থাকেন জলে/তাঁর জন্য বাগানে পুকুর/আমাকে একদিন কাটতে হবে।
আমি একা... /ঈশ্বর থাকুন কাছে এই চাই- ’

এই যে ঈশ্বর সেটি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত, মানুষের ঈশ্বর, সদর্থক ঈশ্বর। এই যে ঈশ্বর, তিনি দৈনন্দিন কার্যকলাপের মধ্যে থাকেন। মন্দিরে পাথরের বিগ্রহ নন, এমনকি কবিতাতেও-

‘কবিতাকে তার খুব কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারি
যে-জন ঈশ্বর, বাঘ, পারিজাতময়, স্বর্গ, নারী।’

কলকাতায় এখন অনেক কিছুই হয়েছে, হচ্ছে। আর কিছু না হোক- কপট আলো, বিশ্ব যুব ফুটবল, ফিল্ম উৎসব, খাদ্য উৎসব, নাচ-গান, টাকা উড়ছে। খালাসীটোলা নয়, কবিরা এখন সম্ভ্রান্ত পানশালায়। কবিদের অধিকাংশই রাজা পাল্টালে আসন টেনে নিয়ে রাজার পাশে বসেন। একজন নেই, একজন দৈব উন্মাদ, একজন বাউল। একজন ‘এই শহরের রাখাল’ যিনি কয়েক মাস স্বেচ্ছানির্বাসনে গিয়ে ‘ডুয়াস’ বা ‘কালডুংরি’ থেকে এই মধ্যরাতে কলকাতায় ফিরেছেন। নেশাগ্রস্ত এবং ভূতগ্রস্তও বটে। ক্লান্ত হয়তো। বাড়ি ফিরবেন তার বাবুই, তাতার আর ‘সোনার মাছির কাছে’। এক পা বাড়ির দিকে, আরেক পা সদ্য ফেলে আসা অরণ্যমায়ায়। যাবেন বেলঘাটার দিকে, ট্যাকসি ডাকলেন- ‘ট্যাকসি, বেলঘাটা যায়াগা।’ ট্যাকসিচালক সম্মত হলেন। এবার অদ্ভুত আচরণ- ‘যাও, চলা যাও।’ এ দৃশ্য আমার মতো আরো অনেকেই দেখেছেন।


এখন কলকাতায় সব আছে। শুধু সেই হেমন্তের অরণ্যের ‘পোস্টম্যান’ নেই যিনি অনন্ত কুয়ার জলে চাঁদ দেখতে পান। ফলে এখন হেমন্তের থেকে অস্বস্তিকর বৃষ্টি।
নেই কী! আছেন কোথাও আড়ালে-আবডালে। আছেন মগ্ন পাঠকের হৃদয়ের কাছাকাছি, মেধার কাছাকাছি। মাঝে মধ্যে দুঃখবোধে আক্রান্ত হন-

‘তোমাদের জন্য ভারি দুঃখ হয় আমার
দুঃখ হয় তোমাদের দেশে শিল্প সাহিত্যের জন্য
তাদের সামনে পিছনে তাদের রেখে যাচ্ছো?
তোমরা কি সবাই এ্যামেরিকান ট্যুরিষ্ট?’
(যে হিবরুগান তুমি)

এ কবিতার প্রসঙ্গ দেশ, কাল, সময় যাই হোক না কেন- কলকাতার ক্ষেত্রে কি বর্তমানে প্রযোজ্য নয়!
আপনার শারীরিক অনুপস্থিতি পুষিয়ে দিচ্ছে আপনার বিপুল ও বহুমাত্রিক রচনা। আপনার শব্দহীন ৮৩ বছরের গর্জন। ভালো থাকুন শক্তি চট্টোপাধ্যায়। আপনার পুরনো কলকাতায় আপনার মতো থাকুন। শ্রদ্ধেয় শঙ্খ ঘোষ তো আগেই বলেছেন, ‘এ কলকাতার মধ্যে আছে আরেকটি কলকাতা।’

 

লুপ্তপ্রায় প্রজাতি ও পিতা-পিতৃব্যদের সাবধান বাণী

জাকির তালুকদার

 


আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের বইয়ের পাতা থেকে উঠে আসা হাড্ডি খিজির শূন্যে পা ফেলে হাঁটতে হাঁটতে আমাকেও ডাকে- আহেন! এট্টু জলদি করেন! পাও দুইখান মনে লয় ইস্ক্রুপ মাইরা মাটির লগে ফিট কইরা দিছেন!
খিজিরের তাড়া, নিরন্তর তাড়াও আমাদের পা’গুলোকে এখন স্থবিরতা থেকে মুক্তি দিতে প্রতিনিয়ত ব্যর্থ হয়ে চলেছে। গতি ব্যর্থতা কি আমাদের জিন বৈশিষ্ট্য?
খিজির বিরক্ত হয়ে বলে, তাইলে হালায় বইয়া বইয়া খোয়াব দ্যাখেন! আমি যাইগা। খিজিরের তাড়া আছে। কারণ সে জানে যে, সে কোথায় যাবে। কিন্তু আমি কি আর অতো সহজে নড়তে পারি? নাকি খিজিরের কথামতো সঙ্গে সঙ্গে দৌড় লাগানো আমার সাজে? আমি তো পেস্ট দিয়ে দাঁত মাজি, ফ্যানের বাতাস ছাড়া গরমের দিনে ঘুমাতে পারি না, ঠা-া কোকাকোলা খেতে পছন্দ করি এবং মাঝে মধ্যে খাই। বাংলাদেশ দলের ক্রিকেট খেলা থাকলে ওইদিন অন্য কাজ ভালো লাগে না, প্যালেস্টাইনের ওপর ইহুদি হামলায় নিদারুণ মনঃক্ষুণœ হই এবং কেজিতে দুই-পাঁচ টাকা বেশি দিয়ে হলেও চিকন চালের ভাত খাই। আমা হেন মানুষ কি আর হাড্ডি খিজিরের কথায় হুটহাট বেরিয়ে পড়তে পারে? আমি বরং তাক থেকে বই নামিয়ে পড়তে শুরু করি। বই পড়া মানে হলো জ্ঞান অর্জন। আর জ্ঞান অর্জন হলে কোথায় যাওয়া উচিত তা বোঝা যায় এবং পদযাত্রার একটা মানচিত্রও পাওয়া যেতে পারে। খিজির আবার বলে, আরে, কীসব কিতাব-উতাব পড়বার লাগছেন! মিছিল তো দূরে চইলা যাইতাছে!
যাক, মিছিল আর কতো দূরে যাবে! তাছাড়া মিছিলে গেলেই তো শুধু হলো না, মিছিলের গতিপথ বলে দিতে হবে না? বলে দেয়ার লোক লাগবে না? গতিপথ বলে দেয়ার লোক না থাকলে মিছিল তো সোজা গিয়ে ধাক্কা খাবে পাথুরে দেয়ালে কিংবা ঝপাৎ করে পড়বে গিয়ে বঙ্গোপসাগরে।

তাছাড়া মিছিলে গিয়ে হবেটা কী? আমাদের তো শেখানো হয়েছে যে, পুঁজিবাদই মানব জাতির অনিবার্য নিয়তি। জানানো হয়েছে, মানুষের ওপর মানুষের শোষণ চলতেই থাকবে। অনাহার, অপুষ্টি, অশিক্ষা, অবর্ণনীয় দারিদ্র্য আর বিপরীতে সম্পদের পাহাড় হচ্ছে মানব জাতির অনিবার্য বিধিলিপি। বিশ্বায়নের নামে গোটা পৃথিবীটা ভাগ করে নেবে কয়েকটি বহুজাতিক কোম্পানি। মানুষে মানুষে, জাতিতে জাতিতে যে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য তা বাহুল্য বিবেচিত হবে। অধিপতি শ্রেণি যাকে সংস্কৃতি বলবে তাকেই মেনে নিতে হবে নিজেদের সংস্কৃতি বলে। আমাদের নারীদের লাবণ্য, শিশুদের পুষ্টি, প্রৌঢ়-বৃদ্ধদের প্রশান্তি, যৌবনের সৃষ্টিশীলতা- সব কিছু চিরস্থায়ী দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকবে চিরকালের জন্য। আমাদের শেখানো হয়েছে যে, এই অসাম্য থেকে মুক্তির কোনো উপায় মানব সমাজের নেই, এমনকি মুক্তির চিন্তা করাটাও অন্যায়। শেখানো হয়েছে যে, প্রতিবাদ করে কোনো লাভ নেই, প্রতিবাদ করতে গেলেই বরং আরো চেপে বসবে অত্যাচারের বজ্রমুষ্টি। বিনীত প্রার্থনা জানাতে হবে। নম্র প্রার্থনায় নতজানু হলে হয়তো কিছুটা ছাড় পাওয়া গেলেও যেতে পারে। সবাই না পাক, অন্তত কেউ কেউ পাবে। যেমন তফসিলিদের মধ্য থেকে কাউকে কাউকে মন্ত্রী পর্যন্ত বানানো হয়, সাঁওতালদের মধ্য থেকে কোনো কোনো আলফ্রেড হেমব্রম-কে যেমন ম্যাজিস্ট্র্রেট বানানো হয়। কিন্তু প্রতিবাদ করতে গেলেই তাকে মরতে হবে আলফ্রেড সরেন-এর মতো কিংবা নিখোঁজ হয়ে যেতে হবে কল্পনা চাকমার মতো। এর চেয়ে বই পড়তে পড়তে একটু অতীত থেকে ঘুরেও আসা যায়।

জলকলের ডানপাশ দিয়ে আয়ুব খানের বানানো ষাট ফুটি পিচ-পাথরের রাস্তা দূরের জেলার দিকে রওনা দিয়ে ঠিক উপজেলা পরিষদের তোরণের সামনে মিলেছে পাগলা রাজার রাস্তার সঙ্গে। পাগলা রাজার রাস্তা লম্বালম্বিভাবে অবশ্য বেশি বড় নয়। তবে বিস্তারে আয়ুব খানের রাস্তার সঙ্গে ভালোভাবেই পাল্লা দেয়। জনশ্রুতি, ওই রাস্তায় নাকি রাজার ছয় হাতি পাশাপাশি হাঁটতো মাহুতের তত্ত্বাবধানে বৈকালিক ভ্রমণে বেরিয়ে। শহরের ঘোষপাড়ার প্রতিষ্ঠাতা আদি ঘোষের ঘি খাঁটি না ভেজাল মেশানো তা নির্ণয় করেছিল রাজার কোনো এক হাতিই। খাঁটি ঘি নাকি পুং জননাঙ্গে মালিশ করার সঙ্গে সঙ্গে হাতি পেচ্ছাপ করে দেয়। এটা নাকি হাতি সমাজের এক মহান বৈশিষ্ট্য। তো খাঁটি ঘি তৈরির

সুবাদে হাতির পেচ্ছাপ করায় রাজা প্রীত হয়ে নিজে রাজবাড়ির জন্য প্রয়োজনীয় পরিমাণ ঘি পারিতোষিকসহ সংগ্রহ করার পাশাপাশি নারদ নদের দক্ষিণপাড়ে ঘোষপাড়া প্রতিষ্ঠার অনুমতি দিয়েছিলেন। রাজার রাস্তায় এখন হাতির চলাচল থাকার প্রশ্নই ওঠে না। তবে মনুষ্য চলাচল এখনো একটি প্রবহমান বাস্তবতা। পাগলা রাজার রাস্তার দু’ধারে শিরিষ গাছের সারি। হাঁটতে গেলে যদি মৃদুমন্দ বাতাস থাকে তাহলে শিরিষ সঙ্গীত শোনা যেতো নিশ্চিত। যেতো বলার কারণ হলো, এখন আর ওই শিরিষ গাছগুলো নেই। স্বাধীনতার ঘোষক দাবিদার যখন প্রথম মিলিটারি আইন প্রশাসকের দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিলেন তখন তিনি নাকি পাগলা রাজার রাস্তা সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছিলেন।

উদ্যোগের চিহ্নস্বরূপ কাটা হয় শিরিষ বৃক্ষগুলো। বাকি কাজ আর এগোয়নি। ফলে পাগলা রাজার রাস্তা ধরে হাঁটতে গেলেও আমাদের প্রাক-যৌবন আর শিরিষের শির শির ধ্বনিতে মোহিত হওয়ার সুযোগ পেতো না। উপজেলা পরিষদ থেকে দক্ষিণ দিকে রওনা দিয়ে জলকলের বামপাশ দিয়ে হর্টিকালচার প্রজেক্ট পেরিয়ে ডোমপাড়া মাঠের কালভার্ট পর্যন্ত পৌঁছাতেই শেষ হয়ে যায়। কালভার্ট থেকে সরু ইট-কংক্রিটের আধুনিক রাস্তা। রাস্তার দু’ধারে বনলতা বালিকা বিদ্যালয়, সমবায় বিভাগের অফিস, রাজা প্রতিষ্ঠিত দাতব্য চিকিৎসালয় যা এখন উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র, নতুন নতুন বসতবাড়ি, ফার্নিচারের কারখানা, বরফকল, নগরবাসীর মনন চর্চার চিহ্ন হিসেবে গড়ে ওঠা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের পাশে ডা. কায়েস উদ্দিনের বিষণœ হোমিওপ্যাথির দোকান। সেখানেই আমি জীবনে প্রথম এক কমিউনিস্টকে চাক্ষুষ করি দৈনিক সংবাদ পাঠরত অবস্থায়। তখন দৈনিক ইত্তেফাকের রমরমা। বাড়িতে পেপার রাখা হবে- এতোখানি জাতে তখনো ওঠেনি আমাদের পরিবার। এখনো নয়। পাড়াতে চায়ের দোকান দুটি। একজনের নাম নবাব আলি, অন্যজনের বাবু মিয়া। রাজ-রাজড়ার শহরে একজন নবাব, অন্যজন বাবু। তারা উভয়েই কিছুটা মরমিয়া ধরনের। বুঝে ফেলেছিল চায়ের দোকান চালিয়ে তাদের সংসারের অবস্থা আর যাই হোক, রমরমা হয়ে উঠবে না। তাই দোকান চালালেও তাদের মধ্যে গা-ছাড়া ভাব। দু’দোকানেই একজন করে ছোঁকরা কর্মচারী। তারাই চা বানায়, কাপ মাজে, মাটি আর শিক দিয়ে তৈরি চুলায় দৈলা গুঁজে দেয়। বাবু আর নবাব মোটামুটি খদ্দেরদের কাছ থেকে পয়সা-কড়ি বুঝে নেয় আর বাকি-টাকির হিসাব রাখে। তো দু’দোকানেই দৈনিক ইত্তেফাক। কিছুদিন রাজনীতি করা পাড়ার স্বনামখ্যাত জুয়াড়ি সিরাজুল চাচা আমাদের সেই সেভেন-এইটে পড়ার বয়সেই বুঝিয়ে দিয়েছিলেন পেপারের শাঁস হচ্ছে এর উপ-সম্পাদকীয় কলাম। তখন উপ-সম্পাদকীয় লেখেন স্পষ্টভাষী, লুব্ধক, সুহৃদ প্রভৃতি নামের আড়ালে অতি জ্ঞানী ব্যক্তিরা। বিভিন্ন বিষয়ে লেখা হয় উপ-সম্পাদকীয়। কিন্তু একটি বিষয় থাকবেই। তা হচ্ছে কমিউনিস্টদের গালি দেয়া। একই সঙ্গে বোঝানোর চেষ্টা করা যে, কমিউনিস্টরা হচ্ছে ভয়ানক মানুষ। দেশ ও জাতির ধ্বংসই কমিউনিস্টদের একমাত্র ধ্যান-জ্ঞান, এমনকি মিলিটারিও ভয় পায় কমিউনিস্টদের। সিরাজুল চাচার কাছে জানতে চেয়েছিলাম, আমাদের শহরে কমিউনিস্ট আছে কি না। তিনি নাম বলেছিলেন এবং ঘটনাক্রমে একদিন হোমিওপ্যাথির দোকানে বসে থাকা কমিউনিস্টকে দেখিয়েও দিলেন।
আমি তো থ!

এই লোক নাকি ভয়ঙ্কর! নিরীহ গোবেচারা গোছের মানুষ, মাঝারি উচ্চতা, বয়স প্রৌঢ়ত্ব ছুঁয়েছে, মুখে সরলতার ছাপ, হেসে হেসে গল্প করছেন ডাক্তারের দোকানের বেঞ্চিতে বসে থাকা আরো জনাতিনেক লোকের সঙ্গে। হাতে দৈনিক সংবাদ।
প্রাক-তারুণ্যের ওই বয়সে ওইদিনই বুঝে গেলাম, কোনো একটি মিথ্যার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। হয় ওই কমিউনিস্ট লোক মিথ্যা, না হয় দৈনিক ইত্তেফাক মিথ্যা।
কারণ কয়েকদিন আগেই যখন পাগলা রাজার রাস্তার শিরিষ বৃক্ষনিধন পর্ব চলছিল তখন ওই লোককে দেখেছিলাম বৃক্ষনিধনের প্রতিবাদে বাড়ি বাড়ি ঘুরে স্বাক্ষর সংগ্রহ করতে। বৃক্ষের প্রতিও যাদের এতো ভালোবাসা তারা মানব জাতির এতো বড় দুশমন হয় কীভাবে? ওই লোক থেকে দূরে থাকিস! সিরাজুল চাচা তো বলেনই, আব্বাও সতর্ক করে দেন। আমাদের ব্যাচের ছয়জনের তখন টার্গেটই হয়ে যায় ওই লোকের কাছে যাওয়া। এমনকি যে আসাদ দুই মাস ধরে পড়াশোনা শিকেয় তুলে শুধু ডিসি অফিসের নাজির কুতুবউদ্দিনের মেয়ে নার্গিসকে একনজর দেখার জন্য এবং তাকে নিজেকে দেখানোর জন্য দিনে অন্তত চার পাক মারে হেমাঙ্গিনী ব্রিজ টু চাঁদমারী মাঠ পর্যন্ত সেই আসাদও এই প্রথম নার্গিস ভিন্ন অন্য কোনো বিষয়ে কৌতূহলী হয়ে ওঠে।
ওই লোকের কাছে ভিড়লে অসুবিধা কোথায়? এই প্রশ্নের উত্তরে বহুদর্শী গৃহঅন্তঃপ্রাণ বাপ-চাচারা বলেন যে, ওই লোকের কাছে গেলে তোদেরও কমিউনিস্ট বানিয়ে ছাড়বে সে। আর কমিউনিস্ট হলে তার ইহকাল-পরকাল শেষ! সর্বনাশ! এমন একটা বিপজ্জনক মানুষকে এই লোকালয়ে বাস করতে দেয় কেন শহরের মানুষ? দেয়! কারণ গণতন্ত্রের দেশ তো। কাউকে দেশ থেকে বের করে দেয়া যায় না। তবে নজর রাখা হয়। খুব কড়া নজর। এই শহরে সরকারের গোয়েন্দা বিভাগের অন্তত অর্ধেক গোয়েন্দাকেই রাখা হয়েছে শুধু ওই একটা লোককে ছায়া হয়ে পর্যবেক্ষণ করার জন্য। তাই অন্যদিকে নজরই দিতে পারে না গোয়েন্দা বিভাগ। এ কারণেই তো শহরে চুরি-ডাকাতি আর স্মাগলিংয়ের রমরমা অবস্থা। আমরা কমিউনিস্টের প্রতি এতোই আকর্ষণ বোধ করি যে, তার কাছে ঘেঁষার জন্য আমাদের মগজের মধ্যে পরিকল্পনা তৈরি হতে থাকে অবিরাম।

প্রথমে পরিকল্পনা করা হলো, তার ছেলের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলা হবে। কিন্তু তার ছেলে থাকলে তো! বিয়েই করেননি লোকটা। আমাদের অন্য পরিকল্পনাগুলোও কাজে আসে না। তখন আমরা আবার ধরি সেই সিরাজুল চাচাকেই। কিন্তু রাজি করাতে পারি না। উল্টো সিরাজুল চাচা আমাদের যে গল্প শোনান তা শুনে আমরা তো থ। এই জেলার প্রধান সরকারি নেতা- যিনি এখন জেলার হর্তা-কর্তা ও বিধাতা সেই নেতাও নাকি তার রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে ওই কমিউনিস্টেরই শিষ্য ছিলেন। কাজেই সবার চেয়ে তিনিই সবচেয়ে ভালো জানেন ওই লোক কতোখানি বিপজ্জনক। পরিস্থিতি আঁচ করতেও তার কোনো জুড়ি নেই। রাজনীতির সবচেয়ে ভালো গুরুর কাছে শিক্ষা পেয়েছেন যে! সেই নেতার একটি গল্প শোনান সিরাজুল চাচা। ওই গল্প শুনে আমরা এতোই ভয় পেয়ে যাই যে, ভয়ে আমাদের হাত-পা পেটের মধ্যে সেঁধিয়ে যেতে চায়। ফলে আমাদের আর কমিউনিস্টের কাছে যাওয়া হয়নি। সেই থেকেই মিছিলে যেতে আমাদের এতো দ্বিধা ও ভীতি। নতুন শতকের নবম বছরে গল্পটি হয় এই রকম-

নেতার দরজায় এমন ভিড় সব সময়েই থাকে। সব জায়গাতেই মাছি ওড়ে। কিন্তু যেখানে মাছির দল থকথকে হয়ে জমে থাকে, বুঝতে হবে সেখানে গুড়-চিনির সিরা আছে। তার দরজাতেও গুড়-চিনি আছে। ক্ষমতার গুড়-চিনি। তিনি যখন বাড়িতে ঢোকেন বা বাড়ি থেকে বের হন, কখনো গেটের জটলার দিকে তাকান না। কিন্তু জটলা আছে টের পান। জটলা আছে দেখে এক ধরনের তৃপ্তিও পান। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তার গাড়ির কাঁচে- স্লামালেকুম স্যার, আদাব স্যার, নমস্কার স্যার জাতীয় শব্দ এসে বাড়ি খায়। তিনি কখনো না তাকিয়ে হাত তোলেন, কখনো শুধু একটু মাথা ঝাঁকান, কখনো কানে মোবাইল ফোন চেপে ধরে ভুশ করে বেরিয়ে যান।


গেটের জটলা থেকে তার তদবির ঘরে পৌঁছাতে অনেকেরই বেশ সময় লাগে। তবে কেউ কেউ ঠিকই লেগে থেকে সুযোগ করে নিতে পারে। যেমন- আজকের ছেলেটি পেরেছে। ছেলেটিকে দেখে বাহ্যিকভাবে তার ভ্রƒ একচুলও কাঁপেনি। কিন্তু ভেতরে ভেতরে তিনি সত্যিই একটু টাল খেয়ে গেছেন। দু’দিন ধরেই খাচ্ছেন। গেটের সামনে কৃপা প্রার্থীর জটলায় ছেলেটিকে তিনি আগেই দেখতে পেয়েছেন। দেখার সঙ্গে সঙ্গেই চমকে উঠেছিলেন। এ কাকে দেখছেন তিনি! এতো চেনা চেনা লাগছে কেন?
গেট থেকে তার টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াতে ছেলেটির তিন দিন লেগেছে। তাকে খুঁটিয়ে দেখলেন তিনি। নাহ! একে তিনি দেখেননি। কিন্তু এরপরই চমকে উঠলেন ভয়ঙ্করভাবে। আরে, এ তো তিনি! তার টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি নিজে! এ কীভাবে সম্ভব! মাথাটার তখন একবার চক্কর দিয়ে ওঠা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না এবং তখনই স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ শুরু করে তার ভেতরের অপরিসীম অভিযোজন ক্ষমতা যা তাকে এতো দূর এনেছে। ফলে কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ধাতস্থ হয়ে উঠতে পারেন তিনি। বুঝতে পারেন, সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটি তিনি নন- অন্য আরেক মানুষ, আরেক যুবক। তার মধ্যে তিনি শুধু নিজের অতীতের একটুখানি ছায়া দেখতে পেয়েছেন। তার ৩০ বছর আগের অতীত যখন তিনি বিপ্ল¬বী রাজনীতি করতেন। কী সমস্যা তোমার?


আমার একটি চারিত্রিক সনদপত্র দরকার। তার চোখের দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে কথাগুলো বললো ছেলেটি।  তিনিও এমনভাবেই কথা বলতেন সেই সময়। বিনয়ের আতিশয্য নেই, কৃপা প্রার্থীর কুণ্ঠা নেই। তেমনই নেই অভব্যতাও। ক্যারেক্টার সার্টিফিকেট কেন? চাকরি চাই? ছেলেটা কোনো উত্তর দেয় না।

শুধু মৃদু হাসে। দিনতিনেক না কামানো গালে ঘন হয়ে গজিয়ে ওঠা কচি ধানচারার মতো দাড়ি। জিন্সের প্যান্টের ওপর খাদির পাঞ্জাবি অপরিষ্কার না হলেও ইস্ত্রিবিহীন। তাকে ডাকছে ৩০ বছর আগের দিনগুলো। কিন্তু তার সেই অভিযোজন ক্ষমতা এখনো ক্রিয়াশীল এবং অচিরেই তা তাকে ফের বর্তমানে ফিরিয়ে আনতে পারে। তিনি তার এখনকার মনোভঙ্গি ও বাচনভঙ্গি ফেরত পান।
কিন্তু তোমাকে আমি ক্যারেক্টার সার্টিফিকেট দেবো কীভাবে? আমি তো তোমাকে চিনিই না। তুমি রাষ্ট্র বিরোধী বা গণবিরোধী কোনো কাজে জড়িত কি না তা আমি জানবো কীভাবে?
ছেলেটা কয়েক মুহূর্ত ভাবলো। তার চোখের দিকে আরো একবার তাকালো সোজাসুজি। একটু নির্মিলিত হয়ে এলো তার চোখের পাতা। যখন কথা বললো তখন কণ্ঠস্বর মন্ত্র, গাঢ়, স্তোত্র পাঠের মতো সুগভীর- আমি শপথ করে বলছি যে, পৃথিবীর কোনো অন্যায় হত্যাকা-ে আমার কোনো অংশগ্রহণ নেই! ফিলিস্তিনি নারী-শিশু ও স্বাধীনতা যোদ্ধাদের ওপর যুগ যুগ ধরে যে গুলিবর্ষণ চলছে, আমি তাতে অংশ নিইনি। অর্থনৈতিক অবরোধের মাধ্যমে যেদিন থেকে ইরাকের শিশুদের দুধ ও পুষ্টি থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে সেদিন থেকে ভাতের লোকমা মুখে তুলতে আমি অপরাধ বোধে আক্রান্ত হই।

নেলসন ম্যান্ডেলা যতো দিন কারারুদ্ধ ছিলেন ততো দিন  নিজেকেও বন্দি ভেবেছি। কবি বেঞ্জামিন মলয়েজ-এর ফাঁসির দিনটিকে আমি শোক দিবস হিসেবে পালন করি প্রতি বছর। আমেরিকার ছোড়া কুহকি ক্লাস্টার বোমাকে চকলেট ভেবে হাতে তুলে নিয়ে রক্তাক্ত হয় যে আফগান শিশুরা তাদের সঙ্গে আমিও রক্তাক্ত হই প্রতিনিয়ত। বসনিয়ার গণহত্যা ও নারী ধর্ষণের জন্য প্রতিদিন ক্ষমা প্রার্থনা করেছি আমার সহোদরাদের কাছে। আমি শপথ করে বলছি, যারা ফুলবাড়ীতে গুলি চালিয়েছে, রক্ত ঝরিয়েছে কানসাটে তাদের সঙ্গে আমি ছিলাম না। আপনি বিশ্বাস করুন, প্রতিদিন আমাদের দেশে যতো কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি হয়, যে দুর্নীতির কারণে আমাদের পুরুষরা জীবিকাহীন, নারীরা লাবণ্যহীন, শিশুরা পুষ্টিহীন সেসব দুর্নীতির সঙ্গে আমার কোনো সংস্রব নেই। আমি শপথ করে বলছি...। যুবক বলেই চলেছে। তার কণ্ঠস্বরে পুরো ঘরে নেমে এসেছে স্তব্ধতা। কিছুক্ষণ অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে যুবকের দিকে তাকিয়ে রইলেন তিনি। তারপর খস খস করে লিখলেন, এই যুবক আমাদের রাষ্ট্র ও আমাদের বিন্যাসিত সমাজের জন্য খুবই বিপজ্জনক। তাকে রাষ্ট্রের কোনো কাজে কোনোদিন নিয়োগ দেয়া চলবে না।

কারণ সিরাজুল চাচা মনে করিয়ে দেন- নেতার মনে হয়েছে, ছেলেটির মধ্যে তার পুরনো গুরুর ছায়া। গুরু এখনো এমন বিরূপ ও প্রতিকূল সময়েও মাঝে মধ্যে বানিয়ে ফেলতে পারেন এখনকার স্থিতাবস্থার জন্য ভয়ানক হুমকিস্বরূপ এমন এক-দুই বিপজ্জনক তরুণ কিংবা যুবক।

 

অদ্ভুত আবেশে সুন্দরবন

হাসান তারেক চৌধুরী

 

একাধিকবার সুন্দরবন ঘুরে এলেও সুন্দরবন নিয়ে লেখা হয়ে ওঠেনি কোনোবারই। কারণও আছে বেশ কয়েকটি। প্রথমত. সুন্দরবন ভ্রমণপিপাসুদের কাছে এতোই জনপ্রিয় একটি নাম যে, নতুন করে এটিকে পরিচয় করিয়ে দেয়ার কোনো অর্থ হয় না। দ্বিতীয়ত. সুন্দরবন এমন এক জায়গা যার প্রকৃত সৌন্দর্য না লিখে প্রকাশ করা যায়, না যায় ছবিতে ধরা। আর তৃতীয় কারণটি, না হয় কোনোরকমে জায়গাটার বর্ননা দিলাম; কিন্তু সুন্দরবনের বিশালতা, নিঃশব্দের কবিতা আর পবিত্র শান্তিময় অনুভূতি এই স্বল্প পরিসরে কীভাবে বোঝাবো। তবে এবারের সুন্দরবন ভ্রমণের পর কেন জানি কলমটি হাতে তুলেই নিলাম। ভাবলাম, যাই হোক না কেন, আমার অনুভূতি আর কিছু দৃশ্যের বর্ননা অন্তত দিতে পারি! প্রতি বছরের মতো এবারও আমাদের সুন্দরবন ভ্রমণের আয়োজন করে ট্যুর কোম্পানি ‘সাফারি প্লাস’। আমাদের গ্রুপটায় ছিলাম ৩৫ জন, সবাই বন্ধু। তাই এই সুযোগে গোটা একটা বাসই আমরা রিজার্ভ করলাম। হই চই আর নানান আনন্দের মধ্যে আমাদের যাত্রা শুরু হলো আরামবাগ থেকে। বাসটি রিজার্ভ হওয়ার সুবিধায় আমরা খুলনা না গিয়ে সরাসরি মোংলা এসে আমাদের রিজার্ভ জাহাজ ‘কোকিলমনি’তে উঠলাম। ভোর হতে না হতেই শুরু হলো আমাদের সুন্দরবন সফর। ভোরের অদ্ভুত সুন্দর আলোয় জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে পশুর নদীর দৃশ্য যে কতোটা সুন্দর তা বলে বোঝানো মুশকিল। দুপুর হতে হতেই আমরা পৌঁছে গেলাম হারবাড়িয়ায়।

এখানে রয়েছে বন বিভাগের একটা টাওয়ার যার ওপর থেকে বনের ভেতরে অনেকখানি দূর পর্যন্ত দেখা যায়। আর রয়েছে বনের ভেতর দিয়ে প্রায় মাইল দেড়েক লম্বা এক কাঠের ব্রিজ। টাওয়ার থেকে বিস্তৃত বনভূমির একটা অংশ দেখেই আমরা হাঁটা শুরু করলাম কাঠের ব্রিজ ধরে। ওই ব্রিজের সুবিধা হলো, এতে খুব কাছ থেকে গভীরভাবে বনের গাছপালা আর বেরিয়ে থাকা অদ্ভুত সুন্দর শ্বাসমূলগুলোর গঠন দেখা যায়। বের হওয়ার পথে রয়েছে লাল শাপলায় আবৃত এক দৃষ্টিনন্দন পুকুর।
হারবাড়িয়ায় সংক্ষিপ্ত সফর শেষ করে রওনা হলাম কটকার পথে। আমাদের এবারের ভ্রমণের মূল অংশ ছিল এটিই। সন্ধ্যার কিছুটা আগেই কটকায় পৌঁছে রাতের জন্য ওখানেই নোঙ্গর করলো আমাদের জাহাজ।

পরদিন সূর্য ওঠার আগেই জাহাজের সঙ্গে থাকা বড় এক নৌকা নিয়ে আমরা বের হলাম বনের সৌন্দর্য উপভোগ করতে। বনের মধ্যে ছোট ছোট খাল ধরে এগিয়ে চললো আমাদের নৌকা। কিছুক্ষণ পর পর মাথার উপর দিয়ে কিচিরমিচির করতে করতে উড়ে যাচ্ছে পাখির দল, নিচে নৌকার দাঁড়ের শব্দ। এছাড়া চারধারে শান্ত-সৌম্য এক নীরবতা। এরই মধ্যে ধীরে ধীরে আলো ফুটতে শুরু করলো। হঠাৎই শুরু হলো মাছরাঙাগুলোর ছোটাছুটি। খালের দু’ধারের গাছে লাফিয়ে বেড়াচ্ছে কাঠবিড়ালিগুলো। দূরের আকাশে ফুটে উঠেছে গোলাপি আর আকাশির রঙের অদ্ভুত কারুকাজ- ঠিক যেন কোনো নারীর শাড়ির আঁচল।
আলো পুরোটা ছড়িয়ে পড়তেই আশপাশের মনোরম দৃশ্য ফুটে উঠলো।

প্রথমেই চোখে পড়লো দু’ধারে সারি সারি গোলপাতা গাছ। অদ্ভুত সুন্দর সবুজ রঙের ওই গাছগুলো দেখতে অনেকটা নারিকেল গাছের পাতার মতো, শুধু আকৃতিতে অনেক বড়। এগুলো বনের অন্যতম আকর্ষণ। এগুলো দিয়ে এসব অঞ্চলের মানুষ ঘরের ছাওনি বা ছাদ তৈরি করে। এখন কেউ আমাকে প্রশ্ন করতেই পারেন, তাহলে লম্বা লম্বা ওই পাতার গাছের কেন গোলপাতা বলা হয়? উত্তরটা হলো, আসলে পাতার জন্য গাছের ওই নাম নয়। গাছের ফলটি একেবারে গোল। অনেকটা ৩ নম্বর সাইজের ফুটবল যেন। তাই ওই ফলটিকে স্থানীয়ভাবে ডাকা হয় গোল ফল, গাছ হলো গোল গাছ আর পাতা হলো গোলপাতা। সুন্দরবনটি আসলে ছোট ছোট খালের মধ্যে অসংখ্য দ্বীপের মতো এলাকা নিয়ে তৈরি। এর মধ্য দিয়েই এগিয়ে চলে আমাদের নৌকা। দু’ধারে কাদা-চর আর ছোট বালুকাবেলা। খালটা একটা মোড় নিয়ে সামনে যেতেই চোখে পড়লো সারি সারি লম্বা গাছ। দেখেই বুঝলাম ওইগুলো সুন্দরী গাছ। ধারণা করা হয় গাছগুলো এই বনে প্রচুর পাওয়া যায় বলেই এ বনের নাম সুন্দরবন।
চলতে চলতে হঠাৎ মনে হলো, আরে! কয়েকটা বানর যদিও দেখেছি, পাখা মেলে উড়ে যাওয়া সাদা বক

দেখলাম প্রচুর, শঙ্খচিল দেখছি এখানে-ওখানে। কিন্তু একটি হরিণও তো দেখলাম না এখনো। মনটা একটু খারাপ হলো। তবে বিধাতার কী অদ্ভুত খেলা! এটি ভাবতে ভাবতেই এক বন্ধু হঠাৎ হরিণ হরিণ করে চেঁচিয়ে উঠলো। তা এতোই উৎসাহে যে, প্রথমে ভেবেছিলাম হরিণের হার্টফেল হবে। হরিণটি চমকে উঠে চোখ মেলে আমাদের দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। ঝট করে ক্যামেরাটি তুলে হরিণটির একটি ছবি তুলে নিলাম। দৃশ্যটি ছিল বাকরুদ্ধ করা।
জাহাজে ফিরে ডেকে উঠে দাঁড়াতেই নদীর পাড়ে কেওড়া বনের দিকে চোখ পড়লো। দেখি প্রায় ডজনখানেক হরিণ, কয়েকটি বানর ও কয়েকটি বন্যশূকর নদীর ধারে পানি খাচ্ছে আর মাঝে মধ্যে বনের ভেতরে চলে যাচ্ছে। অদ্ভুত সুন্দর এক দৃশ্য! ওই কেওড়া দেখতেও দারুণ মজার। মনে হয় যে, গাছের নিচে মাইলের পর মাইল ধরে কেউ সমান করে কাঁচি দিয়ে গোল করে কেটে রেখেছে অনেকটা কাঠবাদাম গাছের আকৃতিতে। হঠাৎ দেখলে ব্যাখ্যা পেতে কঠিন হয়। কিন্তু একটু ভাবলেই বোঝা যায় আসলে তা হরিণের উচ্চতা। হরিণ ওই পর্যন্তই মাথা তুলে পাতা খেতে পারে বলে মনে হয় যেন কেউ ওভাবে কাঁচি দিয়ে কেটে রেখেছে। হরিণ, বানর আর ওই কেওড়া বনের এই অদ্ভুত মিতালি অনন্তকাল ধরে চোখ মেলে দেখা যায়। পরবর্তী গন্তব্য জামতলা সৈকত।


নৌকা করে কটকা ওয়াচ টাওয়ারে পৌঁছে তৃণভূমি আর মাঝে মধ্যে বনের ভেতর দিয়ে প্রায় পৌনে তিন কিলোমিটার হেঁটে যেতে হয় জামতলা বিচে। এখানে মাঝে মধ্যে বাঘের যাতায়াত আছে বলে একটু গা ছমছম ভাবও আছে সবার ভেতর। এরই মধ্যে গাইড জানালেন, এখানে নাকি একটা বাঘ বাচ্চা দিয়েছে। শুনেই হাত-পা ঠা-া হয়ে এলো। এর মানে, বাঘ আশপাশেই থাকবে! গাইড সাহস দিলেন, ভয় নেই। বাঘ কাছে আসবে না। আর এলেও আমি আছি। আমি একটু সাহস করে গার্ডের দিকে ঘুরে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘এলে কী করবেন? বন্দুক দিয়ে বাঘটিকে গুলি করবেন?’ তিনি হেসে বললেন, ’না, বাঘকে সরাসরি গুলি করার নিয়ম নেই। ফাঁকা গুলি করবো।’ ঘাবড়ে গিয়ে গোলমাল করে ফেললাম। জানতে চাইলাম, ‘বন্দুকে গুলি আছে তো?’ তিনি কোনো উত্তর দিলেন না।


কিছুদূর যেতেই চোখে পড়লো বাঘের পায়ের ছাপ। আমি কাঁপতে কাঁপতে দ্রুত একটি ছবি তুলে নিলাম। ভয়ে আমার বুকের রক্ত হিম হয়ে আসছিল। কিন্তু আমরা মোটামুটি কোনো ঘটনা ছাড়াই নিরাপদে জামতলা বিচে পৌঁছে গেলাম।
কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা সব ভুলে গেলাম। ম্যাংগ্রোভ বনের মধ্যে ওই বালুর বিচের সৌন্দর্যে আমরা মুগ্ধ। বন আর বিচের মধ্যে দৌড়াদৌড়ি করে সময় যে কোথায় দিয়ে গড়িয়ে গেল তা আমরা বুঝতেই পারলাম না। এরপর এক সময় ফিরতি পথ ধরলাম। পুরোটাই কোনো ঝামেলা ছাড়া এলাম। কিন্তু বন পেরিয়ে প্রায় ঘাটের কাছে পৌঁছে গিয়েছি, এমন সময় তীব্র গন্ধে আমাদের গার্ড থমকে দাঁড়ালেন। আমরাও সবাই ভয়ে অ্যাটেনশন হয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম। গার্ড আস্তে আস্তে বললেন, একটু আগেই বাঘ এখান দিয়ে গেছে, এটি তারই গন্ধ। আমারা গার্ডের নির্দেশমতো লাইন করে আস্তে আস্তে হেঁটে আমরা শেষ র্যন্ত নৌকায় পৌঁছালাম।
এ ভ্রমণে আমাদের বাঘ দেখা হয়নি। ওই অদ্ভুত অভিজ্ঞতায় এখনো আচ্ছন্ন হয়ে আছি। এরপরও আমরা করমজলে গিয়ে কুমিরের প্রজনন কেন্দ্র দেখেছি। দেখলাম রোমিও-জুলিয়েট আর পিলপিল নামের তিন কুমির। সূর্যাস্ত দেখেছি ডিমের চরে। কিন্তু এখনো আচ্ছন্ন হয়ে আছি বাঘের ওই অদ্ভুত গন্ধে।

 

ছবি : লেখক

অর্ধশতে সুখ

 

‘মৃত্যুকে পিছিয়ে দিতে পারে আনন্দমুখর জীবন।’ বেশ কিছুদিন আগে এই সংবাদে মুগ্ধ হয়েছিলাম। ওই সংক্রান্ত গবেষণায় নাকি যুক্তরাজ্যভিত্তিক ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের গবেষকরা ৫০-৬০ বছর বয়সী ৯ হাজার নারী ও পুরুষের ওপর গবেষণা চালিয়ে দেখতে পায়, পঞ্চাশোর্ধ বয়সেও যারা সার্বক্ষণিক হাসি-খুশি থাকতে পারেন তাদের পরবর্তী সাত বছরে মৃত্যুর ঝুঁকি কমে যায় অন্তত ২৪ শতাংশ। হার্ভার্ড স্কুল অফ পাবলিক হেলথ গবেষণাটি প্রকাশ করেছিল।
ব্যাপারটি আমাকে ভাবিয়েছিল। সাধারণত আমরা দেখতে পাই, পঞ্চাশোর্ধ বয়সের যে কোনো নারী-পুরুষই যেন জীবনের ভারে ন্যুব্জ। নানান দায়িত্ববোধ, অপ্রাপ্তি, ফেলে আসা দিনের না পাওয়ার হাহাকার অথবা যেন নিজেকে জীবন যুদ্ধে পরাজিত সৈনিক ভাবেন। অথচ ব্যাপারটি এমন নয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অভিজ্ঞতার ঝুলি যেমন ভারী হতে থাকে তেমনি বাড়ে জ্ঞানের গভীরতা। কাজেই পঞ্চাশোর্ধ জীবনের মধ্যে খুঁজে পাওয়া ওইসব অর্জন কাজে লাগিয়েই শুরু হতে পারে আরেক নতুন জীবন।
সাধারণত মানুষের মনোভাব অনুযায়ী দেহে ক্ষতিকর ও উপকারী- উভয় ধরনের হরমোন নিঃসরণের মাত্রা বাড়ে-কমে। হাসি-খুশি অবস্থায় কারো শরীরে অ্যাড্রেনালিন ও কর্টিজল-এর মতো মানসিক চাপ উদ্রেককারী হরমোনের মাত্রা কমে যায়। এছাড়া মানসিক অশান্তিতে থাকলে এমনিতেই মানুষের ধূমপান ও মদপানের মাত্রা বেড়ে যায়। এসব কারণেই যারা হাসি-খুশি জীবন যাপন করতে পারেন না তাদের আয়ুষ্কাল কমে আসে বলে ধারণা করছেন গবেষকরা। কাজেই এই বয়সকাল ক্ষয়ে যাওয়ার নয়, অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের পরিধি নিয়ে শুরু করা যায় আনন্দময় পথচলা। মানুষ তার শৈশব, কৈশোর, তারুণ্য কাটিয়ে দেয় জীবন ও

জীবিকার সন্ধানে। কেটে যায় শিক্ষা জীবন, বয়ে যায় কর্মজীবনও। অনেকের মধ্যে সাহিত্য প্রতিভা বা লেখালিখির গুণাবলি থাকার পরও দেখা যায় সময় ও সুযোগের অভাবে চর্চাটি হয়ে ওঠে না। এই বয়সে এসে যারা মোটামুটি থিতু হন তারা বিগত জীবনের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের ভা-ার কাজে লাগিয়ে লেখালিখি বা সাহিত্য চর্চা করতে পারেন। লেখক মাত্রই জানেন, ওই সৃষ্টির আনন্দ। এর মধ্যেই খুঁজে পেতে পারেন জীবনের আনন্দের আরো একটি দিক। পৃথিবীতে অনেক নামকরা লেখক, এমনকি চিত্রশিল্পীদের কথাও শোনা যায় যারা অবসর জীবনে শিল্প চর্চার মধ্যে খুঁজে পেয়েছেন জীবনের আনন্দ। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যেন জীবনের বহুমুখী সমস্যাও বাড়তে থাকে। স্বাস্থ্য সমস্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পারিবারিক ও সামাজিক নানানমুখী সমস্যাতেও জর্জরিত হয়ে ওঠে কারো কারো জীবন। সুস্থ ও সুন্দর থাকার সঙ্গে আনন্দময় জীবনের সম্পর্ক থাকুক, না থাকুক- এ বয়সে হঠাৎ করেই মাঝে মধ্যে যেন বদলে যায় আজীবন বয়ে চলা লাইফস্টাইলটি। এর প্রধান কারণ হতে পারে বয়সী অসুস্থতাগুলো। ডায়াবেটিস, হৃদরোগ- এসব কারণে বদলে যায় এতো দিন বয়ে চলা জীবনের গতিধারাটি। তাই সচেতন হতে হবে এবং যে সমস্যাই আসুক না কেন, তা মেনে নিয়ে মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত হতে হবে। খাদ্য অভ্যাস বদলে ফেলা ও নিয়মিত জীবন যাপন, শরীর চর্চা, হাঁটার অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে এ সময়ের সমস্যা মোকাবেলায়। পারিবারিক সদস্যদের বিচ্ছিন্নতা বা একাকীত্বও এই বয়সটায় জীবন দুর্বিষহ করে তুলতে পারে। এ বয়সে ছেলেমেয়েরা অনেকেই চলে যায় পড়ালেখা বা কর্মক্ষেত্রে। অনেকেরই জীবনসঙ্গী বা সঙ্গিনী গত হন কিংবা বিচ্ছেদ ঘটে। ওই ব্যাপারগুলো খুব সূক্ষ্মভাবেই মানসিক চাপের সৃষ্টি করে।

ছেলেমেয়েদের দূরে থাকা বা সামাজিক চক্ষুলজ্জায় অনেকেই একা থেকে আরো নিজের ক্ষতি করেন। সময় এসেছে দৃষ্টিভঙ্গি বদলের। বিচ্ছেদ বা সুকঠিন সমস্যাও মোকাবেলা করে নতুন জীবন শুরু করাই বরং বুদ্ধিমানের কাজ হবে। একাকীত্ব বা সঙ্গীহীন জীবন এই বয়সে খুব একটা উপযোগী নয়। কাজেই সঙ্গী বা সঙ্গিনী বেছে নেয়াও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। আবেগের বশে বা অনাগত ভবিষ্যতের নেতিবাচক আশঙ্কায় অনেকেই নতুন করে সঙ্গী বা সঙ্গিনী নির্বাচনের ব্যাপারটি এড়িয়ে যান। এ ব্যাপারটি এড়িয়ে না গিয়ে বরং গুরুত্বসহ দেখার জন্য পরিবারের সবারই এগিয়ে আসা উচিত। আমরা প্রায়ই দেখে থাকি, এ মধ্যবয়সটায় স্বামী বা স্ত্রীকে হারিয়ে অনেকেই নির্লিপ্ত কিংবা কিছুটা অসহায় জীবনই পার করেন। এক্ষেত্রে সহযোগিতার হাত বাড়াতে পরিবারের সদস্যদের এগিয়ে আসাটা যেমন জরুরি তেমনি নিজেরও সচেতনতার প্রয়োজন আছে। চিরকুমার ব্রত নেয়া কেউ কেউ অথবা অকৃতদার ব্যক্তির জন্যও এ বয়সটি হেলাফেলার নয়, বরং নতুন সঙ্গী বা সঙ্গিনীর প্রভাব বা তাদের সান্নিধ্যে জীবন হয়ে উঠতে পারে স্বর্গীয় সুন্দর।


শুধু সাফল্যের পেছনে ছুটে চলাতেই জীবনের সব আনন্দ বা সফলতা- এমন ভাবনাই সব নয়। সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গে মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে। সময় ও সুযোগ খুঁজে নিয়ে বেরিয়ে পড়ুন প্রকৃতির কাছে। পৃথিবীর এই বিশাল যজ্ঞে অংশ নেয়ার সুযোগ না হলেও তো অপার প্রকৃতি পড়ে রয়েছে আমাদের দ্বারপ্রান্তে। রোজ না হোক, সপ্তাহে বেড়িয়ে আসুন পরিবারের সঙ্গে বাড়ির কাছাকাছি পার্ক কিংবা কোনো বড় উদ্যানে। মঞ্চ নাটক, মুভি, থিয়েটার বা সাংস্কৃতিক কর্মকা- কিংবা সমাজসেবায় অংশ নেয়া অথবা উপভোগটি শুধুই তারুণ্যের অংশ নয়, আপনিও এসবের মূল্যবান অংশীদার। কাজেই সময় এসেছে দৃষ্টিভঙ্গি বদল ও নতুন করে ভাবার। জীবন ফুরিয়ে যাওয়ার নয়, বরং তা যতোক্ষণ গতিশীল ততোক্ষণই উপভোগের। তাই পঞ্চাশোর্ধ জীবনের এই বাঁক বদলে নিজেকে বদলে ফেলুন। জীবনটিকে করে তুলুন মূল্যবান ও সুন্দর।

এখানে একটি ব্যাপার মাথায় রাখা যেতে পারে, এই বয়সে এসে বিয়ের বয়স পেরিয়ে গেছে- এমনটা অনেকেই ভেবে থাকেন। আসলে সম্ভবত এমনটি মাথায় গেঁথে রাখার কোনো কারণ নেই। জীবনের নানান কাজে বা নানা প্রয়োজনে অনেকেরই হয়তো বিয়েটা ঠিক বয়সে করা হয় না, তবে সত্যি বলতে জীবন সঙ্গিনী বেছে নিতে বা বিয়েটা এই বয়সেও করে ফেলতে তেমন কোনো বাঁধা নেই। হতে পারে একই বয়সী বা কাছাকাছি বয়সের কনে না খুঁজে পাওয়া। এতে বিয়ে বা বাকি জীবনটা একেবারে বিফলে যাবে এমন গাঁটছড়ার বাঁধনে এটিও ভাবার কোনো কারণ নেই। একটু বয়সের বৈষম্য বা বেশি বয়সের বিয়েতেও বাকি জীবন হয়ে উঠতে পারে মধুর সান্নিধ্যের।
আসলে প্রয়োজন নিজেদের মাঝে বুঝে চলা ও জীবন উপভোগের বিষয়টিকে মাথায় রাখা। কাজেই চিরকুমার ব্রত নেয়া কেউ অথবা অকৃতদার মানুষের জন্যও এ বয়সটি হেলাফেলার নয়। বরং নতুন সঙ্গী বা সঙ্গিনীর প্রভাবে বা তাদের সান্নিধ্যতায় জীবন হয়ে উঠতে পারে স্বর্গীয় সুন্দর।

 

লেখা : সহজ ডেস্ক
মডেল : এনায়েত কবির
নাহিদা আলম উচ্ছ্বাস ও অনুষা
ছবি : শোভন আচার্য্য অম্বু

রবীন্দ্রনাথ ও আমাদের সাংস্কৃতিক জটিলতা

হায়াৎ মামুদ

 

এক.
জীবন যেন বহতা নদী। তো শুধু দু’কূলের শাসনে নিয়ন্ত্রিত জলধারা নয়। নদী মানে জলের স্বভাব, এর পটভূমি ও জলতলের মৃত্তিকা-চরিত্র, জলের গভীরতা, বর্ণ, চতুষ্পার্শ্বের ভূসংস্থান এবং নিসর্গ দৃশ্য- সবকিছুই। জীবনও তেমনি জড়িয়ে থাকে কোনো না কোনো জনগোষ্ঠীর জন্ম ও মৃত্যু এবং এর মধ্যবর্তী কালপরিধিতে তার আচরিত জীবনধারা নিয়ে। সংস্কৃতি ওই
জীবনপ্রবাহের ভেতরে ধীরে ধীরে তৈরি হতে হতে এগিয়ে চলে নদীর মতোই। জল ছাড়া যেমন নদী নেই, জীবন বাদ দিয়ে কোনো সংস্কৃতি নেই। কিন্তু ওই জীবন কার? মানুষেরই তো। আর মানুষ বাঁচে সময় ও ভূগোলে। নির্দিষ্ট সময় ও ভূমি চিহ্নিত সীমানায় তার অবস্থান তার জীবন নিয়ন্ত্রণ করে বলে সেটিই তার জীবনীশক্তি। এর বলে সে ক্রমেই বেড়ে ওঠে যেন কোনো বৃক্ষের বেড়ে ওঠা- পরিণত হয়, ডালপালার উন্মীলন ও পুষ্পের প্রস্ফুটনে সে ধীরে ধীরে নিজের বৈশিষ্ট্য ও চারিত্র্য অর্জন করে। ওই প্রক্রিয়া জটিল বলেই সংস্কৃতির চরিত্রও জটিল এবং প্রক্রিয়াটির মধ্যেই চলিষ্ণুতা আছে বলে কোনো জনগোষ্ঠীর যে বিশালায়তন ক্রিয়াকা-কে আমরা সংক্ষেপে ‘সংস্কৃতি’ নামে চিহ্নিত করি। তার ধমনিতে একটা গতিশীলতা থেকেই যায়। আর ওই অন্তর্নিহিত গতির আবেগ ও প্রবাহের কারণেই আমরা যে যা-ই মনে করি না কেন, ‘সংস্কৃতি’ কোনো অনড়, কালনিরপেক্ষ, ভূগোল নিরপেক্ষ, অপরিবর্তনক্ষম ঘটনা নয়- মনুষ্য জীবনের মতোই সে সর্বদা সপ্রাণ ও জঙ্গম। একক ব্যক্তি বা সম্মিলিত জনগোষ্ঠীর মতোই সংস্কৃতিরও চাওয়া-পাওয়া আছে, আশা-আকাক্সক্ষা আছে, ব্যর্থতা ও আশাভঙ্গও আছে। এ জন্যই পৃথিবীর সব জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতির ক্ষেত্রে যেমন, তেমনই বাঙালি সংস্কৃতির বেলায়ও সার্বিক বিচারে সংস্কৃতি প্রসঙ্গ নিরতিশয় জটিল। তাই এর সরলীকরণ সম্ভব নয়।


বাঙালির সংস্কৃতি কোনো সরল ও একরৈখিক ব্যাপার যে হতে পারে না তা বোঝার জন্য বেশি দূর যেতে হয় না। নতুনভাবে কোনো প-িতি গবেষণারও প্রয়োজন নেই। কেবল দুটি মৌলিক বিষয়
বিবেচনায় রাখলেই চলে- বাঙালির জন্মকাল ও স্বদেশভূমি অর্থাৎ আমরা যারা বাঙালি তাদের প্রথম আবির্ভাব কখন ও কোথায়? নিজের জন্ম পরিচয় অনুসন্ধান যেমন ব্যক্তিমানুষের আদি জিজ্ঞাসা তেমনি জনগোষ্ঠীর অপরিহার্য কৌতূহল নিঃসন্দেহে। দেখতে পাবো, প্রাগার্য একটি জাতি কয়েক হাজার বছর কতো অজস্র রকমের বিচিত্র ঘটনাপ্রবাহের ভেতরে যেতে যেতে আজ এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে যখন তার একটি অংশকে ভাবতে হচ্ছে- এতো দিন পরও সে কে বা তার পরিচয় কী? বাঙালি জাতির ওই অংশটির নাম ‘বাঙালি মুসলমান’। গত শতাধিক বছরের উপরে বাঙালি মুসলিম এই একটি অত্যন্ত মৌলিক প্রশ্ন নিয়ে বিড়ম্বিত হয়েছে- বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয় কী? প্রশ্নটি নিশ্চয়ই হাস্যকর। কেননা এর উত্তর তারও জানা যে, সে বাঙালি এবং সে মুসলমান। তবুও হাসির উদ্রেক না করে এই প্রশ্ন আমাদের যে ভাবায় এর কারণ হলো- কোনো জনগোষ্ঠীর মনে বিনা কার্যকারণে এমন প্রশ্ন দেখা দিতেই পারে না। ওই কার্যকারণের সম্বন্ধ সূত্রগুলো আমরা জানি, বহু গবেষক ও প-িত তা নিয়ে আলোচনা করেছেন। আত্মপরিচয়ের প্রশ্নে কোনো জনগোষ্ঠীর এমন সংশয় ও হীনম্মন্যতাবোধ আছে কি না জানি না- যেমন বাঙালি মুসলমানের আছে।


বাঙালি মুসলিমের আত্মপরিচয় জিজ্ঞাসা সর্বৈবভাবে সংস্কৃতি জিজ্ঞাসা। (অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে আমাকে বার বার ‘বাঙালি মুসলমান’ কথাটি ব্যবহার করতে হচ্ছে বলে আমি লজ্জিত। কারণ আমি জানি, বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে মুসলমান ছাড়াও হিন্দু, খ্রিস্টান ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা আছেন। তবু একমাত্র মুসলমান সমাজকেই প্রসঙ্গের কেন্দ্রবিন্দু করার কারণ না বললেও চলে। তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং ওই প্রাবল্যের জন্য অন্য ধর্মাবলম্বী জনসংখ্যার ওপর তার আগ্রাসী শারীরিক ও মানসিক চাপ)। বাঙালি মুসলমানের সংস্কৃতি কী? এমন অদ্ভুত প্রশ্নের উত্তর খোঁজার দায় সব সময়ই থাকছে এ জন্য যে, জনগোষ্ঠীর এক বিপুল অংশকে বহুকাল ধরে এ প্রশ্ন ভাবিয়ে তুলেছে এবং এরই উত্তর হিসেবে বাঙালি মুসলমান যেসব ক্রিয়াকা- নির্ভুল ও একমাত্র সত্য বলে বিভিন্ন সময় বিবেচনা করেছে- সময় এবং ইতিহাস সেগুলো বার বার খারিজ করে দিয়েছে। ১৯৭১ সালের সংগ্রাম ও রক্তক্ষয়ের ভেতর দিয়ে যে নবীন দেশ আবির্ভূত হলো এর নাম যে ‘বাংলাদেশ’ হবে তা নিয়ে কারো মনে বিন্দুমাত্র সংশয় বা কোনো ভাবনা-চিন্তা মাথায় আসেনি। এর কারণ হলো, আত্মরক্ষা ও স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার ওই প্রাণপণ সংগ্রামে বাঙালি হিসেবে একত্মবোধই যদি একমাত্র প্রাণশক্তি হয়ে থাকে তাহলে অর্জিত বিজয়ের নাম ‘বাংলাদেশ’ ছাড়া আর কী-ই বা হতে পারতো? সঙ্গতভাবেই আমরা ভেবেছিলাম, রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের আবির্ভাবই বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয় অনুসন্ধানের শেষ ও চূড়ান্ত ঐতিহাসিক জবাব। আমাদের নাম বাঙালি, দেশের নাম বাংলা এবং বহুজাতিক (নৃতাত্ত্বিক অর্থে) ও বহুধর্মীয় এই জনগোষ্ঠীকে যে ঐক্য সূত্র ‘বাঙালি জাতি’তে রূপান্তরিত করেছে এর নাম ‘বঙ্গ সংস্কৃতি’। দুর্ভাগ্য এই যে, ‘বাংলাদেশ’ হওয়ার পরও পুরনো প্রশ্ন বিভিন্নভাবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেখা দিচ্ছে এবং আমাদের জীবৎকালে মনুষ্যজন্মের যে সার্থকতা ‘বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠায় আমরা উপলব্ধি করেছিলাম ওই সুকৃতিকে ওই প্রশ্ন আজ উপহাস ও ধ্বংস করার জন্য উন্মুখ। এ ঘটনা বেদনার ও লজ্জার অবশ্যই। কিন্তু দুষ্টবুদ্ধিদের চক্রান্ত বলে ব্যাপারটি উড়িয়ে দিতে আমার হৃদয় ও যুক্তিবোধ সায় দেয় না। কারণ যা-ই হোক, এ কথা মানতেই হবে- আমাদের ন্যায় ও সত্য ওদের মনে আমরা প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। যারা চক্রান্তপরায়ণ তারাও যে আমাদেরই লোক অর্থাৎ বাঙালি, এটিও ভুললে চলবে না। অনেক পরিশ্রমে যে অঙ্ক কষে ‘বাংলাদেশ’ নামে উত্তর পাওয়া গেছে, ওরা আবার ওই অঙ্ক কষতে চায় কেন? অন্যতম কারণ নিশ্চয় এই যে, অঙ্কটি আমরা বোঝাতে পারিনি। বোঝানোর উপায় হচ্ছে- নিজের সংস্কৃতিকে অনুধাবন করা, ঠিকঠিক শনাক্ত করা এবং সেভাবে অন্যকে চেনানো ও বোঝানো।


আমি বাঙালি- এই পরিচয় যদি সত্য হয় তাহলে আমার সংস্কৃতিও বাঙালি। অনেকের চিন্তায় যে বিভ্রান্তি আসে এর কারণ সব সংস্কৃতির জটিলতার মতোই বঙ্গ সংস্কৃতি জটিল বলে। এ জন্যই বঙ্গ সংস্কৃতির বাহ্যিক চেহারা ও অন্তর্গত মৌলিক গড়ন সজ্ঞানে ও সচেতনভাবে অনুধাবন করা প্রয়োজন। বাঙালি মুসলমান যে দোলাচলচিত্ততার শিকার শতাধিক বছর ধরে হয়ে এসেছে ওই বিভ্রান্তি ঘুচিয়ে এটিকে স্থির প্রতিষ্ঠ হতে হলে জ্ঞান ও চিন্তার পথ ধরেই আজ অগ্রসর হতে হবে। এছাড়া বিকল্প পন্থা নেই। কেননা ভাবের পথ বেয়ে অতি সহজেই যেখানে যাওয়া যেতো, আমরা স্বআরোপিত মূঢ়তায় ওই দরজা বহু আগেই বন্ধ করে দিয়েছি।


দুই.
বাঙালির বাস যে ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে (রাষ্ট্রিক সীমানা নয়) সেটিই তাদের আদি বাসভূমি- এই সত্য সর্বাগ্রে স্মরণ রাখা জরুরি। বাঙালি এ রকম কোনো জাতি নয় যাকে বহিরাগত বলা যাবে। একটি প্রতিতুলনায় ব্যাপারটি স্পষ্ট করা যাক- মার্কিন জাতির আদি বাসভূমি আমেরিকা নয়। যে যে জনগোষ্ঠী আজ সম্মিলিতভাবে মার্কিন জাতিসত্তায় একীভূত হয়েছে তারা সবাই বহিরাগত। বাঙালি ওই রকম কোনো জাতি নয়। আমাদের পিতৃপুরুষের দল এ ভূমিরই আদি বাসিন্দা ছিল অর্থাৎ আমরা এই ভূমি থেকে উদ্ভূত। এমন নয় যে, এ মাটিকে আমাদের নিজের করে নিতে হয়েছে। আর্য আগমনের আগে এ ভূখ-ে আমরা বাঙালিরাই ছিলাম। এরপর সময়ের প্রবাহে আর্য এসেছে তাদের জীবনধারা নিয়ে, এসেছে হিন্দু। ধর্মমত বোঝাচ্ছি না, বলতে চাইছি বাংলার বাইরে ভারতীয় আবার ধর্মকে বাদ দিয়েও নয়, বাঙালি সংস্কৃতির চেহারা হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান নির্বিশেষে সব বাঙালির চিত্তলোকে সদা প্রস্ফুটিত থাকা প্রয়োজন।
বাঙালির সংস্কৃতি মানে বাংলা ভাষা, বাঙালির সামাজিক আচরণ ও জীবনধারার পদ্ধতি, ধর্মাচার, আবহমানকালের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার এবং রবীন্দ্রনাথ।

তিন.
যে কোনো জনগোষ্ঠীর নাড়ির বন্ধন যে একক সূত্রে গাঁথা হয় এর নাম ভাষা। মনে রাখতে হবে, ভাষা কোনো নিরাশ্রয়ী শব্দপুঞ্জ নয়, ভাষা মানেই হচ্ছে দেশ ও কালের সীমানায় আবদ্ধ
জনগোষ্ঠীর অস্তিত্বের বাঙ্ময় প্রকাশ। ফলে যে কোনো জাতির জন্ম ও বিকাশের লক্ষণাবলি ভাষা তার শরীরে ধারণ করে থাকে। বিভিন্ন নরগোষ্ঠীর বর্ণ সাংকর্যে যে বাঙালি জাতি গড়ে উঠেছে এর নিয়ন্ত্রক ধর্ম বিশ্বাস এ জন্যই নয়। কেননা ধর্মের ভিন্নতা বিভাজনরেখাই শুধু প্রতিষ্ঠা করে। ধর্ম নয়- যা সবাইকে একতাবদ্ধ করে তা হলো দেশের ভূগোল। ভূগোল অর্থ দেশের সামগ্রিক ভূপ্রকৃতি ও নিসর্গবিন্যাস। মানুষকে বেঁচে থাকতে হয় জীবনধারণের জন্য পরিশ্রমে অর্থাৎ মাটিকে নিয়ে। আমাদের ক্ষেত্রে জলকে নিয়েও। এর মানে হলো, জীবনধারণের সমপদ্ধতি এবং তৎসম্পৃক্ত যাবতীয় ক্রিয়া ও কল্পনা-মেধা একটি জনগোষ্ঠীকে এক পঙ্ক্তিতে বসায়। ওই বাস্তব অবস্থাই যে কোনো জাতির একমাত্র নিয়ামক শক্তি। বাঙালি সংস্কৃতির মূল কাঠামো তৈরি হয়েছে বাংলার কৃষিভিত্তিক ও নদী নির্ভর সমাজে এবং বাঙালির স্বভাব-চরিত্র তথা তার আবেগপ্রবণতা, কল্পনাবিলাস, অভিমান, সহিষ্ণুতা ও ক্ষমাপ্রবণতা- সবকিছুই তার আবাসভূমির ভৌগোলিক সংস্থানের দান। এক্ষেত্রে ধর্মের প্রভাব, অন্তত ইসলাম ধর্মের প্রভাব নিতান্তই অল্প। এমন একটি ধর্ম যার উৎপত্তিস্থল মরু অঞ্চলে। এটিকে বর্ষা প্লাবিত তৃণশ্যামল ভূমিতে রোপণ করে ফলবতী বৃক্ষের আশা করতে হলে নতুন জায়গার জল-মাটিকে স্বীকার করে নিতেই হয়। আউলিয়া-দরবেশ যারা এ দেশে এসেছিলেন বা থেকে গেছেন তারা তা জানতেন। তাই বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে ইসলামের কোনো সংঘাত অতীতে কখনো ঘটেনি।

বাঙালি মুসলমানকে কখনো ভাবতে হয়নি তারা ‘বাঙালি’, না ‘মুসলমান’। তারা জেনে এসেছেন, তারা বাঙালি বটে আবার মুসলমানও বটে। মুসলমান হতে গেলে বাঙালি থাকা যায় না- এই অযৌক্তিক চিন্তা অত্যন্ত সাম্প্রতিক কালে বিগত শখানেক বছর ধরে বাংলার মাটিতে সুকৌশলে ধীরে ধীরে ছড়ানো হয়েছে। এই আমদানি উত্তর ভারতের। মুসলমান হতে গেলে সত্যিই বাঙালি থাকা যায় না যদি ওই ‘মুসলমান’-এর অর্থ হয় উত্তর ভারতের মুসলমান। একই সঙ্গে উত্তর ভারতীয় ও বাঙালি- উভয়ই তো হওয়া সম্ভব নয় অর্থাৎ বাঙালিত্ব ও মুসলমানত্বের বিরোধের কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। সবটুকুই কল্পনাপ্রসূত সমস্যা। ভারতবর্ষীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের আচরিত ধর্মানুষ্ঠান ও ধর্মচিন্তা আরবদের কাছ থেকে আসেনি। প্রধানত তা ইরানের দান এবং এরও দেহে বার বার কলি ফিরিয়েছে এ দেশের আদি হিন্দু-বৌদ্ধ সংস্কৃতি ও জীবনাচার- এ সত্য অস্বীকারে মিথ্যা প্রশ্রয় দেয়া হয়। গুরুবাদ-পীরভক্তি, মিলাদ-মাহফিল, কথকতা ইত্যাদির সম্পর্ক সূত্র সবাইকে ভেবে দেখতে বলি। সমাধি কেন্দ্র করে ধর্মানুষ্ঠান কোন সংস্কৃতির দান? ইন্দোনেশিয়ার মুসলমানদের সংস্কৃতিতে রামায়ণের এতো প্রবল প্রভাব কেন? ভারতবর্ষের চেয়ে হিন্দু নেপাল অন্য ধরনের হিন্দু কেন? ইত্যাকার সাংস্কৃতিক প্রশ্নাবলি বিবেচনা করা দরকার। বাঙালি মুসলমানদের বিয়ে পদ্ধতির সঙ্গে বাঙালি হিন্দু বিয়ে অনুষ্ঠানের সাযুজ্য এবং ভারতবর্ষের অন্যান্য মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিয়ে আচারের সঙ্গে এর পার্থক্যও অনুধাবনযোগ্য বিষয়।
বাংলাদেশের অধিবাসী হিন্দু-মুসলিম-খ্রিস্টান-বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন ও সামাজিক জীবন চর্চায় সাযুজ্যধর্মী সাধারণ উপাদানগুলোর একত্র রূপই বাঙালির সংস্কৃতি।

চার.
বাঙালি সংস্কৃতির বিবেচনায় রবীন্দ্রনাথ বাঙালির দেশ-সমাজ-ভাষা ইত্যাদির মতো বিশালায়তন প্রসঙ্গগুলোর সমকক্ষ একটি বিষয় বলে আমার ধারণা। এর কারণ শুধু এই নয় যে, কোনো জনগোষ্ঠীর মেধা ও যুগ-যুগান্তের মননশক্তি সংহত হয়ে যার মধ্যে প্রকাশিত হয়, বাণী নির্ভর ওই শিল্পকলার সর্বশ্রেষ্ঠ এক প্রতিভূ বাঙালি জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতিতে ‘রবীন্দ্রনাথ’ নামে আবির্ভূত হয়েছেন। বঙ্গ সংস্কৃতির আলোচনায় রবীন্দ্রনাথ অপরিহার্য প্রসঙ্গ হওয়ার অন্যতম বা প্রধানতম কারণ এই যে, সাম্প্রতিক কালের ‘বাঙালি’র তিনি নির্মাতা। বাঙালি সংস্কৃতির চেহারা তিনি নিয়ন্ত্রণ করেছেন এবং তার ভেতরে এসে বাঙালি সংস্কৃতি এক নির্দিষ্ট ও বিশিষ্ট মোড় নিয়েছে। বাঙালির সামাজিক আচরণে সুরুচির দীক্ষা রবীন্দ্রনাথের দান। বঙ্গ রমণীর পোশাক-পরিচ্ছদের বিন্যাস তার এক ভ্রাতৃবধূ বাঙালিকে শিখিয়েছেন। সভা-সমিতি, অনুষ্ঠান পরিচালন পদ্ধতি, জন্ম উৎসব বা শোকসভা প্রভৃতি সামাজিক যৌথ কর্মের উপযোগিতা ও ব্যবহার আমরা রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকেই শিখেছি। ব্যক্তিগত ও সামাজিক আচরণে নান্দনিকতার সাধনা তিনি সারা জীবন যেভাবে করেছেন, পুরো বাঙালি জাতির সামনে আজ তা উদাহরণ- বাঙালির জীবনধারা ও সমাজ আচরণ, বৌদ্ধ, বহিরাগত মুসলমান ও খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী। আমরা গ্রহণ, বর্জন ও সংশ্লেষণ করতে করতে এগিয়েছি- যেমন ইতিহাসের নিয়মে সব জনগোষ্ঠী পথ চলে। আমাদের সুদূর প্রাগার্য স্মৃতি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বাংলা ভাষার শব্দাবলিতে এবং আমাদের জীবন আচরণের বহু কিছুতে। পরে সর্বাধিক দীর্ঘ সময় বাঙালি যে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিম-লে বাস করেছিল তা বৌদ্ধ। উত্তর বা দক্ষিণ ভারতীয় হিন্দু ধর্ম আচার বঙ্গ সমাজে কখনোই তেমন দৃঢ়মূল ও গভীর প্রসারী হতে পারেনি। এরও পরে এসেছে ভারতের বাইরে থেকে এবং উত্তর ভারত থেকে মুসলমানের দল।

ব্যাপক ধর্মান্তরীকরণ হয়েছে। কিন্তু ধর্মান্তরিতদের দৈনন্দিন ও সামাজিক ব্যবহার পূর্বাপর একই থেকে গেছে। তারপর এসেছে খ্রিস্টান ও ব্রাহ্ম ধর্ম এবং জীবন আচার। এ সবকিছুর মিলনে বাঙালিত্ব নিজের মতো করে ক্রমেই গড়ে উঠেছে। মনুষ্যদেহের যেমন স্বধর্ম আছে, ওই ধর্ম অনুযায়ী দেহবহির্ভূত কোনো কিছুকে গ্রহণীয় মনে করলে তা গ্রহণ করে এবং আত্তীকরণ করে নেয় আর বর্জনীয় যা তাকে কোনোক্রমেই গ্রহণ করে না- সংস্কৃতিও চলে এ জাতীয় স্বধর্মের আনুগত্য স্বীকার করে। বাঙালির কোনো ক্ষতি ইসলাম করেনি। তখনই গোলমাল বেধেছে যখন বাঙালি মুসলমান ‘অন্যদের মতো’ মুসলমান হতে চেয়েছে। আমরা কখনোই ভেবে দেখি না, কোনো বাঙালি হিন্দুর সঙ্গে উত্তর বা দক্ষিণ ভারতীয় হিন্দুর তফাত কতখানি কিংবা বাঙালি বৌদ্ধের সঙ্গে মিয়ানমার, কি চায়না-জাপান বা মঙ্গোলিয়ার বৌদ্ধের পার্থক্য। বাঙালি মুসলিম ও ইন্দোনেশিয়ার মুসলমানের প্রতিতুলনা অথবা ইরান ও আরবের মুসলমানের পার্থক্য কি আমরা একবারও চিন্তা করে দেখি? কখনো কি ভেবেছি আফ্রিকার মুসলিম ও খ্রিস্টান জনগণ ইউরোপ এবং এশিয়ার মুসলমান বা খ্রিস্টানদের থেকে কোথায় কতোখানি আলাদা ও এর কারণ কী? আমরা ক’জন জানি, বাঙালি হিন্দু রমণীরা শুভকর্মে যেভাবে উলুধ্বনি দেন, অমন উলুধ্বনি ছাড়া লিবিয়ার মুসলমানদের কোনো সামাজিক শুভ অনুষ্ঠান সম্পন্নই হয় না? সবাই কট্টর মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও আরব জগতের রাষ্ট্রগুলো সর্বদাই এ-ওর বিরুদ্ধে ছুরি শানাচ্ছে কেন? এসবের পশ্চাৎ প্রেক্ষাপটে কারণটি যা-ই থাকুক, সব ঘটনাই মৌলিক একটি সত্য প্রতিষ্ঠা করে দিচ্ছে- ধর্ম কোনো জাতিসত্তার একমাত্র নিয়ামক কখনোই হতে পারে না। বাঙালির সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশটি যখন থেকে ভাবতে শুরু করেছে যে, একমাত্র ধর্মকে নিয়ে তারা বাঁচবে বা বাঁচা উচিত তখন থেকেই তার বুদ্ধিভ্রংশতার শুরু। ধর্ম যে কোনো সংস্কৃতিরই প্রান্তিক উপাদান মাত্র, একমাত্র বা সর্বশ্রেষ্ঠ উপাদান কখনোই নয়- এই সরল সত্য তার স্মরণই হয় না। অংশ যখন সমগ্র অপেক্ষা অধিক আয়তন ও ভার দাবি করে তখন সমগ্রের ভারসাম্যহীনতায় যে বিপত্তি এবং অনাসৃষ্টি অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে, বাঙালি মুসলিম দীর্ঘকাল এর মধ্যে আবর্তিত হচ্ছে। এসব কারণেই শুধু ধর্ম নয়, সংস্কৃতি যে কৃষিভিত্তিক তা তিনি অনুধাবন করেছিলেন বলে বিভিন্ন ঋতু উৎসবের প্রবর্তনায় আমাদের সামাজিক উৎসবাদির ভেতরে সেগুলো গ্রথিত করতে পেরেছিলেন। এভাবে অজস্র সামাজিক কর্মসাধনায় তিনি স্বজাতির মনন ও কল্পনা উদ্দীপিত করে গেছেন। রবীন্দ্রনাথ যে ব্রাহ্ম ছিলেন তা আমরা মনে রাখি না। ব্রাহ্মেরা নিরাকারবাদী। এ দেশে ধর্মের অপব্যাখ্যাকারীরা রবীন্দ্রনাথকে নস্যাৎ করতে গিয়ে ওই তথ্য ভুলে যান। এমনিতে রবীন্দ্রনাথের ব্রাহ্মত্ব মনে রাখা জরুরি নয়। কিন্তু যারা ধর্মকেই ‘একমাত্র সংস্কৃতি চিহ্ন’ হিসেবে মনে করেন তারা ভুলে যান কী করে?

Page 2 of 29

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…