মা হ বু ব  সা দি ক

সম্পর্কের সেতু

আলোর আড়ালে এইখানে ছমছমে নিঃসঙ্গতাÑ
নাকি একে নির্জনতা বলা ঠিক হবে?
হয়তো নির্জনতাই যথাশব্দÑ তবে তা-ও
বিশেষের অভাব-প্রসূত,
নির্বিশেষ মানুষের কোনো প্রয়োজন কোনোকালে
সভ্যতা করেনি বোধÑ এমনকি
ব্যক্তিও তাকে পরিত্যাজ্য মনে করেÑ
রক্ত-মাংসে আবেগে উত্তাল কোনো কাম্য প্রতিমার
অপেক্ষায় থাকে চিরকাল মানব হৃদয়,
তবে এই মধ্যরাতে আমিও রয়েছি জেগে
কার অপেক্ষায় কাতর?
জানি কেউ আসবে না, নিঃসঙ্গতা নিয়তি আমার;

এই কাল হারিয়েছে শাশ্বতীর মূঢ় ভালোবাসা
তারপর বেদনায় কেঁদেছে অনেকÑ
তবু সে ভুলেছে দেখো এপারে-ওপারে সেতু বাঁধা।




শ্যা ম ল কা ন্তি  দা শ

খেজুর রসের হাঁড়ি

আর ভয় নেই, আর ভয় নেই, ভয় করলেই ভয়
ওই দেখা যায় বাইশ দেউল, গরম হাওয়া বয়।
হাট পেরোলাম, বাট পেরোলাম, লোক নেই আর মাঠে
একটুখানিক জিরিয়ে নিলাম এঁদো পুকুরঘাটে।
ঘাটের জলে মাছ ভাসে আর বক ওড়ে চারপাশে
দেখতে দেখতে অবাক চোখে সন্ধ্যে নেমে আসে।
একটা-দুটো গাছ উড়ে যায়, একটা-দুটো বাড়ি
মাথার উপর দোদুল দোলে খেজুর রসের হাঁড়ি।

এবার আমি কোথায় যাবো, কোনখানে ঠিক যাই
কোথায় গেলে মাথা গোঁজার মিলতে পারে ঠাঁই!
জায়গা পেলাম বনের শেষে, মন ভরে যায় তাতে
পায়েস খেলাম হাত ডুবিয়ে শুকনো কলাপাতে।
খাওয়ার পরে গান ধরেছি, চমকে ওঠে সুর
জোনাকপোকার ফিসফিসুনি, বুক করে দুরদুর।
একটা-দুটো মেঘ উড়ে যায়, একটা-দুটো চাঁদ
মাঠের কোণায় কেউ পেতেছে ভূত নিকেশের ফাঁদ।
কোত্থেকে যে তুললো মাথা একটা পোড়োবাড়ি
বাড়ির ভিতর দুলছে ভাঙা খেজুর রসের হাঁড়ি।

 

 


প বি ত্র  মু খো পা ধ্যা য়

চেনা পৃথিবীটা ডাকছে

যতো দূরে যাই, চেনা পৃথিবীটা ডাকছে আকুল হয়েÑ
‘ফিরে আয়, ফিরে আয়।’
সেই চেনা গলা, মায়াবী কণ্ঠস্বর,
সেই রূপলোক ঝলসে উঠছে, অপরূপ সুন্দর,
গাছপালা, নদী, বর্ষা¯œাত মাঠের সান্ধ্য হাওয়া,
ছোট ছোট বাড়ি, উঠোনে ছড়ানো ধান,
পুকুরের ঘাটে মায়ের দুপুর-¯œান,
বকুলতলার ছড়ানো বকুল-গন্ধে মাতাল হাওয়া!
আমার সুদূরে হলো না এবার যাওয়া।

এ এক কঠিন বাঁধনে মন ও শরীরে পড়েছে বাঁধা
বৃষ্টির জলে পথঘাট থৈ থৈ।
মন্দির, তার নিকোনো উঠোনে খেলা করে শৈশব!
অজানা পাখির ঘরে ফেরা কলরব
থামে না। পৃথিবী রূপের অন্ধকারে
ডুব দেবে বলে আয়োজন করে, আমরাও ফিরি ঘরে।
সান্ধ্য নামলো নদীর নীরব চরে।

কল্পদৃষ্টি চলে যায় দূরে, দূর থেকে বহুদূরে।
কুনো পাখি ডাকে কুব কুব বসে উচ্চ বৃক্ষচূড়ে।
আমরা ক’জন ওড়াচ্ছি ঘুড়ি নদীর ধারের মাঠে
গলিমাসি আর মায়ের গল্প পিতান্ত শৈশবে
শুনি, আনমনে হাটুরেরা পথ হাঁটছে, ছন্দ শুনি।
পায়রার জলে লাল রঙ ঢেলে সূর্য যাচ্ছে পাটে।
পাখার ঝাপটে বাতাস সরিয়ে ঘরে ফেরে টুনটুনি।
মন্দিরে বাজে শঙ্খঘণ্টা, ওঠে আজানের ধ্বনি।

সুন্দর থাকে ছড়িয়ে, জীবন জড়িয়ে। আমার চোখে
বিষাদ বহতা ¯্রােতের মতন থাকে, তার পাশাপাশি
এই পৃথিবীর অজ¯্র সুখ, আছি দুঃখ ও শোকে,
তবু বার বার ‘আয় আয়’ ডাকে, বার বার ফিরে আসি। 

 

 

 

মৃ ণা ল  ব সু চৌ ধু রী

অক্ষরবিহীন কবিতা

লোভী ইঁদুরেরা ঘুমোতে দেয়নি সারারাত
প্রতীকী শব্দেরা শুধু দিয়েছিল
                     পাপের ঠিকানা
রঙিন পাপোষ থেকে উঠে আসে
           ধুলোমাখা বহুবর্ণ সাপ
সতত উড়ালপ্রিয় পাখি
ভোর বেলা খাঁচা ভেঙে
       উড়ে যায় ধ্বনিময় নদীটির দিকে

ঘুম নেই সারারাত

নির্জন শোকের গন্ধে
মাধবীলতার পাশে স্বপ্নের সুষমা নিয়ে
                 শুয়ে আছো তুমি
অক্ষরবিহীন
            শুদ্ধতম কবিতা আমার।

 

 



আ মি নু ল  গ নী  টি টো

জীবন এক অবিরাম প্রার্থনা



এই যে উত্তর দক্ষিণ ছোটাছুটি
এ দৃষ্টিভ্রম
আমি আমাতে আবর্তিত
কেন তীর্থ চেনাতে চাও
সে ঠিকানা অনেকের জানা
অন্ধকারের দরজা-জানালা খুলে দাও
হেঁটে যাব আলোর দিকে
কোনো কিছু থেমে নেই
সরলপথ ধুয়ে দেবে সভ্যতার আলো
অন্ধ যুক্তিহীনতা এফোঁড়-ওফোঁড় হবে
আলোর রশ্মিতে
খুলে দাও কৃষ্ণগহ্বর চোখ
খুলে দাও দাসত্বের বাঁধন
আমাকে ভাসিয়ে নেবে অসীম আলো
নিষেধাজ্ঞার কপাট খুলে দাও
দ-াদেশে সকলেই ভীত
কেউ কেউ সনাতন জীবনে
নিরপেক্ষ বিশ্বাসে আবর্তিত
ধর্ম যাকে প্রতিপক্ষ মনে করে

 


টো ক ন  ঠা কু র

কথার কবিতা

কথারা আর দাঁড়াতে পারছে না
কথার গায়ে একশ’ তিন জ্বর
বলে, কথারা আর বাইরে যায় না
কথারা তাই শুয়েই আছে ঘরেÑ
কথা ঘুমোলে কবর একটা ঘর
সেই কবরে কথা শুয়ে থাকে!
কথা নিজের মধ্যে ডুুবে আছে
কথা, তোমার কী হয়েছে, বলোÑ
কী কী তোমার গেছে আর কী আছে?
বলো, না বলে কেউ স্মৃতিমগ্ন থাকে?
কথা, তোমার মন খারাপ আজ, কেন?
কথারা খুব বিষণœতায় ডোবা!
মাইর খেয়েছে অনেক কথা, তাই
কথারা তাই বাক্যহীন, বোবা?

একদিন তো অনেক কথা ছিল!
এক রাতে তো ফুরোচ্ছিলই না
কী? কথা? কী আবার সে কথা!
একদিন তো কথার পিঠে চড়ে
দুপুর থেকে দেখেছ মৈনাক
তাই কথারা কথার পাতাল খোঁড়ে
কথারা তাই অতলে নিয়ে যায়

সেখানে গেলে কী দেখা যায়, জানো?
অনেক কথা ঘুমিয়ে আছে, মরেও গেছে
অনেক, অনেক কথাই দাঁড়াতে পারে না
আবার থাকে কিছু কথারা বেঁচে

যাদের সঙ্গে আবার দেখা হবেÑ
এই ভেবেই তো চুপচাপ আছি ঘরে
ঘর একটা উড়ন্ত অ্যাম্বুলেন্স
কথার গায়ে একশ’ তিন জ্বর

সারাটা রাত ঝুঁকে আছি কথার শিয়রে।

 

টমাস ট্রান্সট্রমার-এর কবিতা

ভূমিকা ও অনুবাদ: প্রত্যয় হামিদ

 

 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর টমাস জস্টা ট্রান্সট্রমার তার জন্মস্থান সুইডেনে তো বটেই, অন্যান্য স্ক্যান্ডিনেভীয় দেশেও সবচে গুরুত্বপূর্ণ কবি হিসেবে বিবেচিত হয়। তার কবিতায় উঠে এসেছে সুইডেনের শীত ও অন্যান্য ঋতুর নান্দনিক সৌন্দর্য ও ছন্দ। তার কবিতায় প্রাত্যহিক জীবনের ভিতর ধর্মীয় চেতনার অনুপ্রবেশ লক্ষ্যণীয়। সরলতা তার কবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
টমাস ট্রান্সট্রমার একাধারে একজন কবি, মনোবিদ ও অনুবাদক। সাহিত্যে অনবদ্য অবদান রাখার জন্য তিনি ২০১১ সালে পেয়েছেন নোবেল পুরস্কার। তার কবিতা পৃথিবীর ৬০-টিরও অধিক ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এই বিখ্যাত কবি জন্মগ্রহণ করেন ১৯৩১ সালের ১৫ এপ্রিল। ৮৩ বছর বয়সে গত ২৬ মার্চ তিনি স্টকহোমে মৃত্যুবরণ করেন।

 

মৃত্যুর পর

কোন এক বিস্ফোরণ
রেখে গেল ধূমকেতুর এক ঝলমলে দীর্ঘ রেখা।
এখন গৃহবাসী সবাই। টিভিতে ভেসে আসে যতসব ঝাপসা ছবি।
বেড়ে যায় টেলিফোনের নিঃসঙ্গতা।

আজো তবু পত্রহীন গাছের ফাঁকে ফাঁকে
শীতের বরফে পড়ে স্কীর ছাপ।
মনে হয় যেন টেলিফোন ডিরেক্টরী থেকে উঠে আসা সব জীর্ণ পাতা
শীতে জবুথবু।

তবুও মনে হয় মনোহর খুব এভাবে বেঁচে থাকা
যদিও ছায়াদের কাছে ঋণী শরীরের অস্তিত্ব
যদিও বর্মের কাছে ঋণী সাহসী সেনারা।

 

বন্ধন

ওরা সুইচটা যখন অফ করল
সাদা আলো ট্যাবলেটের মত অন্ধকারের গেলাসে গেল গুলিয়ে।
তারপর জেগে উঠল সবাই।
জেগে উঠল হোটেলের সবগুলো দেয়াল রাতের আঁধারে।
ভালোবাসারা পেল তাদের প্রিয় মুহূর্তের আলিঙ্গন
মিশে গেল সব গোপন ভাষা
যেমনটি বাচ্চাদের খাতায় এলোমেলো রঙেরা
মিশে হয় একাকার।
চারিদিকে নীরব আঁধার। কিন্তু সমস্ত শহর
বড্ড বেশি কাছাকাছি আজ। পরিতৃপ্ত সারি সারি জানালা, সারি সারি ঘর।
দল দলে একাত্ম তারা যেন আজ।

শুধু যান্ত্রিক মুখগুলোয় নেই কোনো
সত্যিকারের আবেগ।

 

শহরতলি

ডোবা থেকে উঠে আসে মানুষেরা
গায়ে মেখে মাটির পোশাক।
এ জায়গা পায় না শহুরে তকমা
কিংবা গ্রামের নিখাদ মায়া।
সময়ের প্রতিকূলে গিয়ে ক্রেনগুলো ব্যর্থ হয়
গড়ে দিতে স্থায়ী কোন ভিত।
কনক্রীটের স্তুপ এখানে সেখানে পড়ে থাকে-
গড়ে উঠে না আর সুউচ্চ ইমারত।
পুরোনো গোলাগুলোর দখল নেয় কিছু দোকানঘর।
চাঁদের শুকনো পাহাড়ে যেন পড়ে থাকে কিছু তীব্র তীব্র ছায়া।

আর এভাবেই শুভঙ্করের টাকায়
বাড়তে থাকে শহরতলী-
উপেনদের ছেড়ে যাওয়া ভিটেয়
গ্রন্থিত হয় অচেনা লাশ।

 অনুবাদ : হায়াৎ মামুদ

 

 

অসম্ভব বাহুর ক্বাসিদা

কিছুটা চাই না আর, শুধু বাহু ব্যতিরেকে,
সম্ভব হলে এমনকি জখ্মি হাতও,
চাই না কিছুই আর, কেবল একটি হাত,
যদিও সহ¯্র রজনী কেটেছে আমার শয্যা বিহনে।

তা হতে পারে কলমিদামের একটি কুসুম,
আমার বুকে পুরে রাখা খঞ্জন পাখি
কিংবা হতে পারে সেই প্রহরী যে আমার মৃত্যুরজনীতে
রুদ্ধ করে দেবে সমস্ত পথ চন্দ্রিমা উঁকি দেওয়ার।

কিছুই চাই না আর, শুধু ঐ বাহু ব্যতিরেকে
প্রাত্যহিক কীর্তন কিংবা দুঃখের বর্ণহীন পাঁচালি
কিছুই চাই না আর, শুধু ঐ বাহু ব্যতিরেকে
কেননা ধরে রাখবে আমার মৃত্যুর একটি ডানা।

এর বাইরে যা কিছু আছে চলে যাবে সবই।
লজ্জারাঙা হয়ে কোনো লাভ নেই।
আকাশের চিরন্তন তারারাজি জ্বলবেই।
সবকিছুই তো অন্য কিছু : বিষণœ দুখিনী হাওয়া
ঘোরে বন্বন্
উড়ে যায় লতাপাতাদল।

 

 

হুয়ান্ ব্রেবা

 

দৈত্যাকার শরীর
কুমারী বালিকার
কণ্ঠ ছিল হুয়ান্ ব্রেবার :
সেই শিহরনের কোনো তুলনা নেই।
যেন স্মিতহাস্যের আড়ালে
গান গায় মৃদু যন্ত্রনা।
নিদ্রাচ্ছন্ন মালাগা ভূমির
কমলাকুঞ্জকে সে জাগিয়ে তোলে :
তার আর্ত ধ্বনি সমুদ্রের
লোনা জলের বার্তা আনে।
যেন সে হোমার অন্ধ
গান গায়
তার কণ্ঠস্বর ধরে রাখে
নিরালোক দরিয়ার কিছু যেন,
এবং রস বের করে নেওয়া শুকনো কমলাও বটে।

 

 

 

কর্দোবার সন্নিকটে

 

তারকামালা থেকে গা বাঁচাতে
তারা আশ্রয় নেয় ঘরের ভিতরে।
রাত্রি ভেঙে পড়ে হুড়মুড় করে।
ভিতরেতে রয়ে গেল মৃত বালিকা,
তার অলকদামে লুকানো
লাল গোলাপ।
বারান্দায় তার জন্যে কেঁদে মরে
ছয়টি কোকিল।

বুকে চেপে ধরে গীটার
দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে মানুষজন।

 

 

 

মালাগুয়েইঞা

 

মরণ এসে ঢোকে
সরাইখানায়
এবং বাইরে চলে যায়।

কৃষ্ণকায় অশ্বরাজি
এবং অশুভ মানুষজন
গীটারের আওয়াজে ডোবা
পথ নধরে চলে যায়।

তীরভূমিতে ছড়ানো
লবণের গন্ধ ও রমনীশোনিত
হাইহিল জুতোয় জ্বরেতে বেহুঁশ

মরণ
এসে ঢোকে এবং
বাইরে চলে যায়
সরাইখানায়।

 

 

 স্মৃতিচিহ্ন

 

যখনই মরি না কেন
আমার গীটার সমেত আমাকে
কবর দিও বালুকাভূমির তলে।

যখনই মরি না কেন
কমলার বনে
ও পুদিনা পাতার ঝোপে

যখনই মরি না কেন
যদি মন চায়
দিও কবর হাওয়া-মোরগ যেখানে।

যেখানেই মরি না কেন আমি!

 

 

 

 

 

 

 

 

সহজ সম্পর্কে

ষড়ঋতুর প্রতিটি মাসে প্রকাশের প্রত্যয় নিয়ে ১ বৈশাখ ১৪২১ বঙ্গাব্দ, ১৪ এপ্রিল ২০১৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে সহজ এর প্রকাশনা শুরু। শিল্প, সাহিত্য, বিনোদনের পাশাপাশি ফ্যাশন ও লাইফস্টাইল সহজ ম্যাগাজিনের প্রধান উপজীব্য। .

বিস্তারিত ...

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…