×

Warning

JUser: :_load: Unable to load user with ID: 100
Page 1 of 3

এলো বৈশাখ

 

বয়ে যাওয়া সময়ের স্রোতে বসন্ত চলে গেল নীরবে অনেক ঘটনার সাক্ষি হয়ে। আর এই ‘চলে যাওয়া মানেই প্রস্থান নয়’, ফিরে আসার নতুন প্রস্তুতি। বসন্ত যে অপার রূপসুধা রেখে গেল প্রকৃতির ভাঁজে ভাঁজে তাকে ভিন্নমাত্রা দিতে এসেছে বৈশাখ।
ষড়ঋতুর প্রতিটি মাস স্বতন্ত্র। তবে কোথায় যেন মিশ্রিত অদ্ভুত রসায়নে। বৈশিষ্ট্যে আলাদা হলেও রূপ-বৈচিত্র্য প্রকাশে কারো কমতি নেই।

বাংলার বারোটি মাস বাজার অর্থনীতি ও সংস্কৃতির আগ্রাসনে বর্তমান নগর জীবনে তেমন প্রভাব বিস্তার করতে না পারলেও গ্রামবাংলার সামাজিক জীবনে বাংলা সন এখনো সচল। জন্ম, মৃত্যু, বিয়ের মতো সামাজিক অনুষ্ঠানগুলো এবং কৃষকের ফসল বোনা ও তোলা কর্মকা-ে বাংলা সন-তারিখ এখনো কার্যকর। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পূজা-পার্বণ, উপবাস, শ্রাদ্ধ-শান্তি- সব অনুষ্ঠানই বাংলা সন-তারিখের হিসাবে হয়ে থাকে।
মোগল সম্রাট আকবর কর আদায়ের সুবিধার্থে বাংলা সন প্রবর্তন করেছেন বলে কথিত থাকলেও এ নিয়ে বিতর্কের অবকাশ রয়েছে। হিজরি সনের ওপর ভিত্তি করা হলেও বঙ্গাব্দের গঠন পদ্ধতি ভারতীয় শকাব্দের মতো। অথচ এটি শকাব্দের সমগোত্রীয় নয়। শকাব্দ বা বিক্রমাব্দের মাস ও দিনের নামের অনুরূপ বাংলা সনের মাস ও দিনের নাম। তবে শকাব্দের প্রথম মাস চৈত্র আর বিক্রমাব্দের শুরুর মাস কার্তিক। অথচ বাংলা সনের প্রথম মাস হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে শকাব্দের দ্বিতীয় এবং বিক্রমাব্দের সপ্তম মাস বৈশাখকে। পেছনে তাকালে দেখা যাবে, বঙ্গদেশের ফসলি সনের প্রথম মাস অগ্রহায়ণের অবস্থান বাংলা সনে অষ্টম। স্মরণাতীতকাল থেকেই ধন-ধান্যে ভরা অগ্রহায়ণ মাসকে বছরের প্রথম ধরে বর্ষ গণনার রীতি প্রচলন ছিল এ অঞ্চলে। অগ্রহায়ণ হলো বছরের অগ্রে যে যায়। কৃষির দিক বিবেচনায় আনলে ফসল কাটার মাস অগ্রহায়ণ হওয়ার কথা বছরের শুরুর মাস। আবার আনন্দ-উৎসবের জন্যও গ্রীষ্মকাল শীত বা বসন্তের মতো মনোরম নয়। তাহলে নববর্ষ কেন শুরু হলো গ্রীষ্মের বৈশাখে তা এখনো রহস্যময়। তবে যিনিই বাংলা সনের প্রবর্তন করে থাকেন না কেন, তিনি যে হালখাতা ও পুণ্যাহর মাধ্যমে বাঙালির উৎপাদন ও বণ্টন ব্যবস্থার সঙ্গে অর্থনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবন চমৎকার সমন্বয়ে অচ্ছেদ্যভাবে বেঁধে দিয়েছিলেন এতে সন্দেহ নেই। তবে এটিও ঠিক সময়ে সব বাঁধনই শিথিল হয়ে যায়। অনেক ঐতিহ্য বাঙালির জীবন থেকে বিস্মৃত না হলেও ঠাঁই নিয়েছে কাগজ, গল্প ও কবিতায়।

বছরের শুরুটি উৎসবমুখর করে তুলেছেন বাঙালি সাধ্যমতো। শুরুর দিনটি অতীত ও ভবিষ্যতের মেলবন্ধনের রঙিন স্মারক করে রাখতে চায় বাঙালি ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্রীয় জীবনে। কিন্তু বাংলা নববর্ষ পালন হলো কতোটুকু বাঙালিয়ানায়? কতোটা সরে আসতে হয়েছে আবহমান ঐতিহ্য থেকে? কতোটা নিতে গিয়ে কতোটুকু হারালো বাংলা সংস্কৃতি নিজের স্বকীয়তা? এর জবাব আমরা পেয়ে যাবো ষড়ঋতুর বারো মাসে বাঙালির যাপিত জীবনের প্রতিটি দিনে। তবে নতুন বাংলা বছরটি জাতীয় জীবনে বাঙালি খুঁজে পাক আপন ছন্দ, দ্বন্দ্ব ভুলে। সকল পঙ্কিলতা ধুয়ে দেশ এগিয়ে যাক এই হোক প্রর্থনা।

 

লেখা : শাকিল সারোয়ার
মডেল : আইরিন
পোশাক : নিপুন
ছবি : ফারহান ফয়সাল

INTERSTELLAR

ফুয়াদ বিন নাসের আবির

 

 

‘ইন্টারস্টেলার’ মুভিটি দেখতে যাওয়ার সময় বেশ ভয়ে ছিলাম। চলচ্চিত্রটি মুক্তি পাওয়ার প্রায় দুই সপ্তাহ পর দেখতে যাচ্ছি। কাজেই মানুষের খুব প্রশংসায় এটি নিয়ে প্রত্যাশা বেড়ে গিয়েছিল দশগুণ। একজন পাঁড় নোলানভক্ত (মতান্তরে নোলানয়েড) হিসেবে এর আগেও প্রত্যাশার ভারে ইনসেপশন ভালো লাগেনি। তাই ভয়ে থাকাটা স্বাভাবিক। কেমন লাগলো তা হয়তো এখন বোঝানো যাবে না। তবে এতটুকু বলতে পারি, আমরা কয়েকজন হল থেকে বের হয়ে ১৫ মিনিট কোনো কথা বলতে পারিনি। সবার মস্তিষ্কই ব্যস্ত ছিল চলচ্চিত্রটির অন্তিম মুহূর্তগুলো হজম করার দুরূহ কাজে।
ইন্টারস্টেলার ছিল জোনাথান নোলানের মস্তিষ্ক প্রসূত একটি উচ্চাভিলাষী প্রজেক্ট। সে প্রজেক্টটি হাতে নিয়েছিলেন শিতফেন স্পিলবার্গকে মাথায় রেখে। তবে শুরুতেই জুরাসিক ওয়ার্ল্ডের শুটিংয়ে ব্যস্ত হয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিক পছন্দ হিসেবে প্রজেক্টে চলে আসে বড় ভাই ক্রিস্টোফার নোলান। ওই দুই ভাইয়ের জুটির অন্যান্য চলচ্চিত্রের মতো (মেমেন্টো, প্রেস্টিজ, ইনসেপশন, ফলোয়িং) এখানেও স্ক্রিপ্ট লেখার কাজ শুরু করে জোনাহ। ছবির বিজ্ঞান অংশ যথাযথ রাখার জন্য নিয়োগ দেয়া হয় ক্যালটেকের বিখ্যাত অ্যাস্ট্রোফিজিসিস্ট কিপ থর্নকে। কিপ থর্নকে নিয়োগ দেয়া ছিল চলচ্চিত্রটির ‘গুড’ থেকে ‘গ্রেট’ হওয়ার পথে প্রথম ধাপ। স্ক্রিপ্টের সিংহভাগ ও স্পেশাল এফেক্টের প্রায় পুরোটাই কিপ থর্নের থিওরেটিকাল গবেষণার অংশ ছিল। চলচ্চিত্রটি বক্স অফিস মাত করে দিলেও পদার্থ বিজ্ঞান পরীক্ষায় যেন ফেল না করে এ বিষয়ে নোলান আগেভাগেই নিশ্চিত করেছে এভাবেই। কিপ থর্নের মডেল অনুসরণ করে যেভাবে ওয়ার্মহোল, ব্ল্যাকহোল বা ফিফথ ডাইমেনশান নোলান আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন তা নিঃসন্দেহে শ্বাসরুদ্ধকর অভিজ্ঞতা।

মহাকাশবিদ্যাই কি এ চলচ্চিত্রটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক? অবশ্যই নয়। চলচ্চিত্রটির পটভূমিটিই বড় অদ্ভুত। ভবিষ্যতের পৃথিবী। সেখানে ভূমি এমনই ঊষর হয়ে গেছে। এতে গুটিকয়েক শস্য ছাড়া অন্য কিছুই ফলানো সম্ভব নয়। এ পৃথিবীতে মানুষের প্রধান পেশা কৃষি কাজ, জৈবজ্বালানির ভা-ার প্রায় নিঃশেষ। এর মধ্যে ক্ষণে ক্ষণে হানা দেয় ভয়ানক বালুঝড়। মানব জাতি কোনোমতে টিকে আছে পৃথিবীতে। এ রকমই একটি সময় মহাকাশচারী কুপার (ম্যাথু ম্যাককনাহে) ও তার পরিবার নিয়ে শুরু হয় ইন্টারস্টেলারের কাহিনী। ভবিষ্যতের পৃথিবীতে মহাকাশযাত্রা বন্ধ হয়ে গেছে অনেক আগেই। কাজেই সবার মতো কুপারের পেশাও কৃষি কাজ। তার বড় ইচ্ছা ছেলে ও মেয়ে দু’জনই মহাকাশ বিজ্ঞান পড়বে। কিন্তু স্কুল থেকে বলা হয়, পৃথিবীতে এখন মহাকাশচারীর থেকে কৃষক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এরই মধ্যে কুপারের মেয়ে মার্ফের (ম্যাকেঞ্জি ফয়) রুমে এক অশরীরী অস্তিত্ব প্রায়ই হানা দেয়। বই আপনাআপনি পড়ে যায় শেলফ থেকে, মাঝে মধ্যে দুর্বোধ্য সংকেত দেয়ারও চেষ্টা করে। এ রকমই এক সংকেতের মর্ম উদ্ধার করে কুপার আবিষ্কার করে নাসার এক অতি গোপনীয় প্রজেক্ট। সে জানতে পারে, মানব জাতির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার শেষ ভরসা নাসার ওই মিশন। মিশনে তার সঙ্গে যোগ দেন মিশনের হেড প্রফেসর ব্র্যান্ডের মেয়ে (অ্যান হ্যাথওয়ে)। মিশনের সবাই জানে- তারা যাচ্ছে অনেক দূরে। আমাদের এই মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি ছাড়িয়ে অজানা অন্য কোনো গ্যালাক্সিতে বসবাসযোগ্য গ্রহের সন্ধানে। সেখানে হয়তো গড়ে উঠবে মানব জাতির নতুন বাসস্থান। তারা সবাই জানে, ফিরে আসার সম্ভাবনা শূন্যের কোঠায়। যদি ফিরে আসা হয়, তাহলে পৃথিবীতে পেরিয়ে যাবে অনেক সময়। তাই নিজেদের পরিবারকে বিদায় জানিয়ে বেরিয়ে পড়েন অজানার উদ্দেশে।


চলচ্চিত্রটির এই বিন্দু থেকে কাহিনী দু’ভাগে ভাগ হয়ে যায়। এক পটভূমিতে আমরা দেখি, কুপারের নেতৃত্বে মহাকাশযান এন্ডিউরেন্সের অভিযান। সেখানে সময়ের ¯্রােত ধীরে বইছে। কারণ তারা ততক্ষণে পৌঁছে গেছে একটি কৃষ্ণ গহ্বরের খুব কাছাকাছি। অন্যদিকে আমরা দেখতে পাই, পৃথিবীতে যেখানে সময় বইছে খর¯্রােতা নদীর মতো সেখানে ছোট্ট মার্ফ বড় হয়ে (জেসিকা চ্যাসটেইন) কাজ করছে অশীতিপর বৃদ্ধ প্রফেসর ব্র্যান্ডের (মাইকেল কেইন) অধীন। সে মেলানোর চেষ্টা করছে এক দুরূহ ইকুয়েশন। তা দেবে মানবমুক্তির সন্ধান। আরও মেলানোর চেষ্টা করছে তাকে তার বাবা ছেড়ে যাওয়ার বেদনা এবং বাবার প্রতি অভিমানটি এক সুরে।
ইন্টারস্টেলারের বিশ্লেষণ করতে গেলে ভবিতব্য হিসেবেই সবার প্রথম চলে আসবে কুব্রিকের ম্যাগনাম ওপাস ‘২০০১ : আ স্পেস ওডিসি’র সঙ্গে তুলনা। স্পেস ওডিসি ওই সময়ের সাই-ফাই ছবির একটি মাইলফলক ছিল। তা অনেক বছর পর্যন্ত কেউ ছুঁতে পারেনি। তেমনি নোলানের ম্যাগনাম ওপাস ইন্টারস্টেলারও এই যুগের সাইাফাই ছবির মাইলফলক হয়ে থাকবে- এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। এ চলচ্চিত্রটি মাইলফলক হয়ে থাকবে গত বছরের সেরা অভিনেতার অস্কার বিজয়ী ম্যাথু ম্যাককোনাহে, অ্যানে হ্যাথওয়ের ক্যারিয়ারেও। কারণ সেলুলয়েডের ক্যানভাসে ফুটে ওঠা বিজ্ঞানের জটিল থিওরি, ইকুয়েশন বা মহাজাগতিক সত্য ছাপিয়ে দিন শেষে উঠে এসেছে দুই বাবা ও তাদের দুই মেয়ের বিচ্ছেদ এবং তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রামের কাহিনী। মহাজাগতিক একাকিত্ব, অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনার মতো ভয়, অহানায় হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা- এ ধরনের অনন্যসাধারণ কিছু অনুভূতি নিয়ে খেলা করেছেন নোলান। তার বাছাই করা অভিনেতাদের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স সবকিছু ছাপিয়ে আবেগটিই রুপালি পর্দায় সার্থকভাবে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। অস্কারজয়ী সংগীত পরিচালক হান্স জিমারের সুরের মূর্ছনা ও নিউ ডিল স্টুডিওর চোখ ধাঁধানো স্পেশাল ইফেক্টস- সব মিলিয়ে ইন্টারস্টেলার নোলানের ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা কাজ হওয়ার জোর দাবিদার।
সবশেষে যারা এখনো ইন্টারস্টেলার দেখেননি তাদের জন্য ছোট একটা উপদেশ হলো, ছবিটি দেখার আগে ব্ল্যাকহোল, ওয়ার্ম হোল, স্পেশাল ও জেনারেল থিওরি অফ রিলেটিভিটি নিয়ে যদি কিছুমাত্রায় হোমওয়ার্ক করে যান তাহলে মুভিটি উপভোগের আনন্দ দ্বিগুণ হয়ে যাবে। এছাড়া আপনিও আমার মতো ছবি শেষ করার পর ১৫ মিনিট কোনো কথা বলতে পারবেন না- এটি গ্যারান্টি!

নবান্নের দেশে

 

 

“জমি উপড়ায় ফেলে গেছে চাষা
নতুন লাঙ্গল তার পড়ে আছে পুরানো পিপাসা
জেগে আছে মাঠের উপরে;
সময় হাঁকিয়া যায় পেঁচা ওই আমাদের তরে
হেমন্তের ধান ওঠে ফ’লে
দুই পা ছড়ায়ে বস এইখানে পৃখিবীর কোলে ”


‘রূপসী বাংলা’র কবি জীবনানন্দ দাশ তাঁর কবিতার পঙ্তিতে এঁকেছেন বাংলার শাশ্বত রূপের রঙিন অবয়ব যা গ্রাম-বাংলার প্রতিটি জনপদের পরিচিত যাপিত জীবন। সময়ের নাগরদোলায় বৈচিত্র্যে অনিন্দ্য বাংলার মাসগুলো বৃত্তাকারে ঘুরে ঘুরে আমাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক সর্বোপরি প্রাকৃতিক জীবনকে রেখেছে সচল। ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে ছয়টি ঋতুর মোড়কে বারোটি মাস জলে-স্থলে অন্তরীক্ষের ক্যানভাসে আঁকে স্বকীয় রূপ। ষড়ঋতুর এই বঙ্গে হেমন্তের অবস্থান চতুর্থ। ইংরেজী মধ্য অক্টোবর থেকে মধ্য ডিসেম্বর পর্যন্ত কার্তিক ও অগ্রহায়ণ এই দুই মাস হেমন্তের খামে বাঙালির ঘরে-বাইরে হাটে-মাঠে-ঘাটে আচার ও সংস্কৃতিতে নিয়ে আসে অভাব ও সমৃদ্ধির দ্বৈত উপহার। কার্তিক মূলত কৃষিগৃহস্থ জীবনে অভাব-অনটনের মাস হিসেবে পরিচিত। কৃষি প্রধান গ্রাম-বাংলায় এই সময় অকাল বন্যাসহ নানারকম প্রাকৃতিক দূর্যোগের ফলে কৃষকের কাজ থাকে না। গোলাঘর থাকে শূন্য। বহুমুখি ফসল উৎপাদন উপযোগী জমিও প্রস্তুত না থাকায় প্রতিটি জনপদে একরকম হাহাকার লক্ষ্য করা যেত কিছুদিন আগেও। বর্তমানে এই পরিস্থিতির খুব যে ব্যত্যয় ঘটেছে তা বলা যাবে না। শরতের শুভ্র শরীর বর্ণিল হতে থাকে হেমন্তের শুরুতে তবে অগ্রহায়ণের উপস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে দেয় প্রকৃতির দৃশ্যপট। মসৃণ ও স্পষ্টতার অনুভব নিয়ে ষড়ঋতুর এ দেশে ঋতুরানীর পরে হাজির হয় ঋতুকন্যা হেমন্ত। মৌন, শীতল ও অন্তর্মুখী হওয়া এ ঋতুর প্রধান বৈশিষ্ট্য।

উৎসব মানেই আমরা বুঝি হেমন্তকে। এর নেপথ্যে যথার্থ কারণও রয়েছে, সুজলা-সুফলা এ দেশের প্রধান ফসল ধান। বর্ষার শেষ দিকে বোনা আমন-আউশ শরতে বেড়ে ওঠে। আর হেমন্তের প্রথমে তাতে পাক ধরে। হেমন্তের প্রথম মাস কার্তিকের শেষ দিকে পাড়াগাঁয়ের মাঠে মাঠে ধান কাটার ধুম পড়ে। পাকা ধানের গন্ধে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে ম-ম গন্ধ। কবি সুফিয়া কামাল তাঁর কবিতায় সেই ফসল তোলার চিত্রটি এঁকেছেন দারুণভাবে “রিক্তের অঞ্চল ভরি, হাসি ভরি, ক্ষুধার্তের মুখে/ভবিষ্যৎ সুখের আশা ভরি দিল কৃষকের বুকে”। মাঠে মাঠে হেমন্তের ধানক্ষেতের রূপ নিয়ে কবি জসীমউদ্দীন লিখেছেন “সবুজে হলুদে সোহাগ ঢুলায়ে ধানক্ষেত,/পথের কিনারে পাতা দোলাইয়া করে সাদা সঙ্কেত। কৃষাণ কনের বিয়ে হবে, হবে তার হলদি কোটার শাড়ি/হলুদে ছোপায় হেমন্ত রোজ কচি রোদ রেখা-নাড়ি।” এছাড়াও অসংখ্য কবিতা এবং শিল্পীর রকমারি সুর অবিরত গেয়ে চলে উৎসবমুখর হেমন্তের বৈচিত্র্যময় জয়গান। শীতের আগমনী বার্তা ও তেজোদীপ্ত রৌদ্রকিরণের বিদায় নিয়ে আসে হেমন্ত। এসময় দিক পরিবর্তনে বাতাস উত্তর থেকে দক্ষিণে বইতে থাকে, নাতিশীতোষ্ণ। কার্তিকের পরের মাস চিরায়ত বাংলার আমন প্রধান অঞ্চলে অগ্রহায়ণ নিয়ে আসে আশির্বাদ। ধান কাটার ভরা মৌসুম এ অগ্রহায়ণ। ফসলি মাঠের ঢেউ উপচে পড়ে কৃষকের গোলায়, আঙিনায়, চাতালে। এই সময়ে নতুন ধানে কিষাণ-কিষানীদের আনন্দ আর ব্যস্ততার সীমা থাকে না। পুরুষরা সারাদিন মাঠে ধান কাটে। নারীরাই সেই ধান সারাদিন মাড়াই করে সেগুলোকে সেদ্ধ করে ও রোদে শুকায় আর গোলায় ভরে।


যদিও বর্তমান সময়ে কৃষিকাজের সকল ক্ষেত্রেই প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। হেমন্তের এই শেষ মাসটি সারাবছরের পরিশ্রমের ঘামে ফলানো ফসল কৃষকের মরমে সোনালি প্রলেপ মেখে দেয়। তাই যুগযুগ ধরে এই মাসটি ‘নব অন্ন’ নতুন ভাত বা ‘নবান্ন’ নামে পরিচিতি পেয়ে আসছে। এই সময় সকল কৃষকের ঘরে থাকে নতুন ধান। সেই ধানের চাল দিয়ে কৃষকপরিবার পিঠা-পুলির ধুম পড়ে যায়। অগ্রহায়ণ তখন রূপ নেয় উৎবের আমেজে। এই উৎসবে হরেক রকম পিঠা তৈরি হয়। নামের মতই বৈচিত্র্যময় পিঠাগুলো স্বাদে অনন্য, যেমন- চিতই, পাকানো, পাকোয়ান বা পাক্কন, পাটিশাপটা, কুশলি, ভাপা, পাতা, ভাত, কাটা, নকশি, পুলি, দুধ বা ভিজানো, ছিটা, লবঙ্গ, গোকুল, ম্যারা, মুঁঠা, সিদ্ধ, পুতুল, লরি, চাছি, সাগুদানা, ঝুড়িসীতা, তারাজোড়া, জামাই, জামদানি, হাদি, পাটা, তেজপাতা পিঠাসহ আরও অসংখ্য বাহারি নামের পিঠা বাড়িতে বাড়িতে তৈরি করা হয়। এই সময় আতœীয় স্বজনরা বেড়াতে আসে। তাদের নতুন চালের পিঠা দিয়ে আপ্যায়ন করানো হয়। এভাবেই গ্রাম বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে নবান্নের আমেজ। স্মরনাতীত কাল থেকেই ধন-ধান্যে ভরা অগ্রহায়ণ মাসকে বছরের প্রথম মাস ধরে বর্ষ গণনার রীতির প্রচলন ছিল এ অঞ্চলে। অগ্রহায়ণ হলো বছরের অগ্রে যে যায়। তাই অগ্রহায়ণের স্থলে গ্রীষ্মের বৈশাখ কী করে বাংলাবর্ষের প্রথম মাস হলো তা এখনো রহস্য। নতুন ধানে, নতুন অন্নে ধীমান প্রকৃতির মেজাজ বাঙালির ফসল কাটার উৎসবকে উসকে দেয় বহুগুণে। হেমন্তের শেষ মাসটিতে রোদের আঁচ কম থাকায় না শীত, না গরম এমন আরামপ্রদ তাপমাত্রায় সময়ের টানে ছোট হতে থাকে দিন। সকালে সবুজ ঘাঁস ও আমন ধানের পাতায় শিশির বিন্দু মুক্ত দানার মতো চিক চিক করে। বৃন্তচ্যুত শিউলী ফুল এসময় সৌরভ ছড়ায়। বেলি, সন্ধ্যা মালতি, দোপাটি, বক, জুঁই, কামিনী, গোলাপসহ অসংখ্য ফুল হেমন্তে ফুটে প্রকৃতিকে সুরভীত করে তুলে। বর্তমান অর্থনীতিতে বিশেষত আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে যদিও উৎপাদন বেড়েছে তবে পরিবহণের বেহাল দশা ও বাজারে মধ্যসত্ত্বভোগীদের স্বেচ্ছাচারীতার কারনে কৃষক ফসলের নায্য মূল্য থেকে প্রায়ই বঞ্চিত হয়। যার ফলে নবান্নের আনন্দ সর্বজনীন হয়ে ওঠে না। কেবল কৃষি নির্ভর গ্রাম নয়, বাংলাদেশের শহরগুলোতেও কার্তিক ও অগ্রহায়ণ স্বকীয় বৈশিষ্ট্যম-িত। নগরের ইট-কাঠ কংক্রিটের জঞ্জালে বেঁচে থাকা জীবনও সমান তাড়িত হয় কার্তিকের কৃপণতা আর অগ্রহায়ণের সুদিন সন্দেশের পরশে। অগ্রহায়ণের শুরু থেকেই শহরের রাস্তায় মৌসুমী পিঠার দোকান বসে। ভাপা, পটিশাপটা ইত্যাদি পিঠার বেচা বিক্রি নেহাত কম নয়।
আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে জ্বর, খুশখুশে কাশিসহ নানারকম রোগ-
বালাইয়ের কমবেশি প্রাদুর্ভাব দেখা যায় শহর ও গ্রামে। সনাতন ধর্মালম্বী বাড়িগুলোতে হেমন্তকালে কলেরা আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে আকাশবাতি জ্বালানোর প্রচলন ছিল। সময় বদলেছে। বর্তমানে মোটামুটি দৃঢ়তার সাথে বলা যায় খাদ্যাকালের মতো দূর্যোগ আর কলেরার মতো মহামারি বাংলাদেশের জীবন বাস্তবতায় অতীত।

 

লেখা : শাকিল সারোয়ার
মডেল : মুনমুন
পোশাক ও স্টাইলিং : মোঃ রাকিব খান
মেকওভার : ক্লিওপেট্রা বিউটি সেলুন 
ছবি : তানভীর মাহামুদ শোভন
সহযোগিতায় : আলী ইমাদ সরকার

 চৈত্রের শেষ বিকেল

শায়লা হাফিজ

 

চৈত্রের শেষ দিন নববর্ষের আগমন সুখের সঙ্গে যেন মনে এনে দেয় ঋতুরাজ বসন্তের বিদায়ী ব্যথা মেশানো বিরহ বিধুর লগ্ন। তাই একটি বছরের অনেক অসন্তোষ, অনেক না পাওয়ার দুঃখ-গ্লানি ভুলে বাঙালি প্রাণ নেচে ওঠে নানা আয়োজনে বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণের আনন্দে। জীর্ণ পুরনো সব গ্লানি ধুয়ে-মুছে ‘নব আনন্দ বাজুক প্রাণে- এই মঙ্গল কামনায় বাঙালি বিদায় জানাবে কাটিয়ে দেয়া একটি বাংলা বছর।
বাংলা সনের শেষ মাসের নামকরণ করা হয়েছে চৈত্র। চৈত্র মাসের নাম ‘চৈত্র’ কীভাবে হলো? আদি পুরাণে বর্ণিত আছে, রাজা দক্ষের এক কন্যা ছিল চিত্রা। তার নাম অনুসারে এক নক্ষত্রের নামকরণ করা হয় চিত্রা নক্ষত্র। এই চিত্রা নক্ষত্র থেকে চৈত্র মাসের নামকরণ করা হয়। বাংলা সনের শেষ মাসের নামকরণ করা হয়েছে চৈত্র।
বহুকাল ধরে বাংলা বছরের সমাপনী মাস চৈত্রের শেষ দিনটিতে হিন্দু সম্প্রদায় ‘চৈত্র সংক্রান্তি’ পালন করছে। তাই বাংলা বছরের সমাপনী দিনটি ‘চৈত্র সংক্রান্তি’ নামে সমধিক পরিচিত। সংক্রান্তি কথাটির অর্থ ‘অতিত্রম করা’। সূর্য এক রাশি থেকে অন্য রাশিতে প্রবেশ করে বলেই এটিকে বলা হয় সংক্রান্তি। ফলে মাসের শেষ দিনটিকে বলা হয় সংক্রান্তি। চৈত্র সংক্রান্তি এখন কেবল কোনো ধর্ম বা মতের মধ্যে আবদ্ধ নয়, এটি রূপ নিয়েছে এক সর্বজনীন বর্ণিল উৎসবে।
চৈত্র সংক্রান্তির আসল আর্কষণ থাকে চড়ক পূজা। এটি কেন্দ্র করে দেশের অনেক জায়গায় বসে মেলা। চৈত্র সংক্রান্তির মেলায় বাঁশ, বেত, প্লাস্টিক, মাটি ও ধাতুর তৈরি বিভিন্ন তৈজসপত্র ও খেলনা, বিভিন্ন ফল ও মিষ্টি কেনা-বেচা করা হয়। বায়োস্কপ, সার্কাস, পুতুলনাচ, ঘুড়ি ওড়ানো ইত্যাদি চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থাও থাকে। অঞ্চলভেদে এই মেলা এক থেকে সাত দিন চলে। চড়ক পূজা চৈত্র সংক্রান্তির এক অন্যতম অনুষঙ্গ। লৌকিক আচার অনুযায়ী এই দিনে বিদায় উৎসব পালন করে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়। দোকানপাট ধুয়ে-মুছে বিগত বছরের যতো সব জঞ্জাল, অশুচিতা বিদূরিত করা হয়। পরদিনই খোলা হয় ব্যবসায়িক হিসাব-নিকাশের নতুন খাতা। এ উৎসবের লোকায়ত নাম ‘হালখাতা’।
বাংলার ঋতুচক্রের পালাবদলে চৈত্র আসে গ্রীষ্ম উষ্ণতা নিয়ে। প্রখর তপন তাপে আকাশ তৃষ্ণায় তৃষ্ণার্ত হয়ে ওঠে। মানব মনও তৃষিত হয় প্রকৃতি বরণ ও স্মরণ করতে। বাংলা বছরের সমাপনী মাস চৈত্র। চড়ক গাজন উৎসবের একটি প্রধান অঙ্গ। এ উপলক্ষে এক গ্রামের শিবতলা থেকে শোভাযাত্রা শুরু করে অন্য শিবতলায় নিয়ে যাওয়া হয়, একজন শিব ও একজন গৌরী সেজে নৃত্য করেন এবং অন্য ভক্তরা নন্দি, ভৃঙ্গি, ভূত-প্রেত, দৈত্যদানব প্রভৃতি সেজে শিব-গৌরীর সঙ্গে নেচে চলেন। এ সময় শিব সম্পর্কে নানান লৌকিক ছড়া আবৃত্তি করা হয়। এতে শিবের নিদ্রাভঙ্গ থেকে শুরু করে তার বিয়ে, কৃষিকর্ম ইত্যাদি বিষয় উল্লেখ থাকে। এ মেলায় সাধারণত শূলফোঁড়া, বানফোঁড়া ও বড়শিগাঁথা অবস্থায় চড়ক গাছে ঘোরা, আগুনে হাঁটা প্রভৃতি ভয়ঙ্কর ও কষ্টসাধ্য দৈহিক কলাকৌশল দেখানো হতো।

ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের বর্ষ বিদায় ও বর্ষবরণ উৎসব হলো ‘বৈসুক’। বাংলা বছরের শেষ তিন দিন পার্বত্যবাসী অতি আনন্দের সঙ্গে এই উৎসব পালন করে থাকে। অন্য সম্প্রদায় তথা সব ধর্মের মানুষ এই উৎসবে অংশগ্রহণ করে থাকে। সামর্থ্য অনুযায়ী ঘরের ছেলেমেয়েদের নতুন পোশাক দেয়া হয়, খাবার হিসেবে বিভিন্ন রকমের পিঠা ও পাঁচন তৈরি করা হয়ে থাকে। বৈসুক উৎসবের প্রধান আপ্যায়নের বস্তু হলো পাঁচন। এটি সাধারণত বন-জঙ্গলের হরেক রকমের শাকসবজির মিশ্রণ। তারা মনে করে, বছরের শেষ ঋতু পরিবর্তনের সময় বিভিন্ন শাকসবজি দিয়ে রান্না পাঁচন খেলে পরবর্তী বছরের রোগবালাই থেকে রেহাই পাওয়া যাবে। বছরের শেষ দিনের আগের দিন ‘হারি বৈসুক’ ও শেষ দিনকে বলে ‘বৈসুকমা’ এবং নতুন বছরকে বলে ‘আতাদাকি’।
হারি বৈসুকের দিনে প্রথমে তারা ফুল সংগ্রহ করে বাড়িঘর, মন্দির সাজায়। তারপর গায়ে কুচাই পানি (পবিত্র পানি) ছিটিয়ে স্নান করে আসে। এর সঙ্গে বয়োজ্যেষ্ঠদের পানি তুলে স্নান করিয়ে আশীর্বাদ নেয়। পরের দিনে পাড়ার যুবক ছেলেরা এক ওঝার নেতৃত্বে দলবেঁধে গরয়া নৃত্যের মহড়া দেয়। এই গরয়া দেবতার পূজা দিয়ে আশীর্বাদ বক্ষবন্ধনী কাপড় দিয়ে বেঁধে রাখে। তাদের বিশ্বাস, কারায়া গরয়া হচ্ছে বনের হিংস্র পশুগুলোর নিয়ন্ত্রণকারী দেবতা। তাদের পূজার আশীর্বাদ গ্রহণ করলে পরবর্তী বছরে জুম চাষ ও বিভিন্ন কাজে বন-জঙ্গলে গেলে হিংস্র পশুগুলোর আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।
মাস হিসেবে বৈশাখের প্রথম হওয়ার মর্যাদা খুব বেশি দিনের নয়। বৈদিক যুগে সৌর মতে, বছর গণনার যে পদ্ধতি প্রচলিত ছিল, সেখানেও বৈশাখের সন্ধান মেলে। বৈদিক যুগের ওই তথ্য অনুযায়ী বৈশাখের স্থান ছিল দ্বিতীয়। তৈত্তিরীয় ও পঞ্চবিংশ ব্রাহ্মণের মতে, বৈশাখের অবস্থান ছিল বছরের মাঝামাঝি জায়গায়। অন্যদিকে ব্রহ্মা- পুরাণে অনুষঙ্গপাদের একটি শ্লোক অনুসারে মাসচক্রে বৈশাখের অবস্থান ছিল চতুর্থ। তখন বাংলা সন বলতে কিছু ছিল না।

মোঘল সম্রাট আকবর ‘সুবে বাংলা’ প্রতিষ্ঠার পর বাংলাদেশে ফসল কাটার মৌসুম অনুসারে খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে নতুন একটি সনের প্রবর্তনের জন্য অনুরোধ করেন রাজ জ্যোতিষী ও প-িত আমির ফতেহউল্লাহ সিরাজীকে। সিরাজী হিজরি চন্দ্র মাসের সঙ্গে সম্রাটের সিংহাসনে আরোহণের বছর এবং ভারতীয় সৌর সনের সমন্বয়ে বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। মাসের নামগুলো সৌর মতে রেখেই পুনর্বিন্যাস করেন তিনি। এ অনুযায়ী বৈশাখ বাংলা সনের প্রথমে চলে আসে।
বাংলা সনের শেষ দিনটি বিদায় জানানোর জন্য বাঙালি যেমন প্রস্তুত হবেন তেমনি প্রস্তুত হবেন আরেকটি নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে। একই সঙ্গে খাতা খুলে কষতে বসবেন বিগত বছরের সাফল্য ব্যর্থতা ও পাওয়া, না পাওয়ার হিসাব। সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে নানান আচার অনুষ্ঠানে যেমন বিদায় জানানো হবে চৈত্রকে তেমনি প্রস্তুতি নেবেন চৈত্রের শেষ রাতের প্রহরে সূর্য উদয়ের সঙ্গে সঙ্গে বৈশাখ বরণ করে নিতে। রবীন্দ্র নাথ ঠাকুরের ভাষায় যদি বলিÑ

‘নিশি আবসান প্রায় ঐ পুরাতন বর্ষ হয় গত
আমি আজি ধুলিতলে জীর্ণ জীবন করিলাম নত॥
বন্ধু হও শত্রু হও, যেখানে যে রও
ক্ষমা কর আজিকার মতো
পুরাতন বৎসরের সাথে পুরাতন অপরাধ যত।’

চৈত্রের রুদ্র রূপ ডিঙিয়ে আমাদের মধ্যে এলো বৈশাখ। এলো আরেকটি নতুন একটি বছর। অনেক প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, চড়াই-উতরাই, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও আনন্দ-বেদনার সাক্ষী হয়ে কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে একটি বছর। নতুন বছরের পুব আকাশের নতুন সূর্যটি হোক শান্তির ও স্বপ্নের। পুরনো বছরের জীর্ণতা দূরে ঠেলে নতুন সম্ভাবনার পথে এগিয়ে চলাই হোক আমাদের মূলমন্ত্র।

 

মডেল : রিবা হাসান
পোশাক : অঞ্জনস
মেকওভার : ক্লিওপেট্রা বিউটি স্যালন
ছবি : কৌশিক ইকবাল

হেমন্তের জলে

 

কার্তিক হেমন্তের প্রথম মাস। এই সময়ে বাংলাদেশের প্রকৃতিতে প্রগাঢ় সবুজ যেমন পাওয়া যায় তেমনি পাওয়া যায় শীতের মিষ্টি আমেজও। কাদায় মাখামখি রাস্তাঘাট ও হাড় কাঁপানো শীত যে মাসে নেই ওই মানের নামই কার্তিক। ষড়ঋতুর এই বংলায় হেমন্তের অবস্থান চতুর্থ। হেমন্তের খামে বাঙালির ঘরে-বাইরে, হাটে-মাঠে-ঘাটে আচার ও সংস্কৃতিতে নিয়ে আসে অভাব এবং সমৃদ্ধির দ্বৈতউপহার। কার্তিক মূলত কৃষি-গৃহস্থ জীবনে অভাব-অনটনের মাস হিসেবে পরিচিত। কৃষিপ্রধান গ্রামবাংলায় এই সময় অকাল বন্যাসহ প্রাকৃতিক বিভিন্ন দুর্যোগের ফলে কৃষকের কাজ থাকে না। গোলাঘর থাকে শূন্য। শরতের শুভ্র শরীর বর্ণিল হতে থাকে হেমন্তের শুরুতে। তবে অগ্রহায়ণের উপস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে দেয় প্রকৃতির দৃশ্যপট। মসৃণ ও স্পষ্টতার অনুভব নিয়ে ষড়ঋতুর এ দেশে ঋতুরানীর পর হাজির হয় ঋতুকন্যা হেমন্ত। মৌন, শীতল ও অন্তর্মুখী হওয়া এ ঋতুর প্রধান বৈশিষ্ট্য। উৎসব মানেই আমরা বুঝি হেমন্তকে। এর নেপথ্যে যথার্থ কারণও রয়েছে। সুজলা-সুফলা এ দেশের প্রধান ফসল ধান। বর্ষার শেষ দিকে বোনা আমন-আউশ শরতে বেড়ে ওঠে। আর হেমন্তের প্রথমে এতে পাক ধরে। এ ঋতুর প্রথম মাস কার্তিকের শেষ দিকে
পাড়াগাঁয়ের মাঠে মাঠে ধান কাটার ধুম পড়ে। পাকা ধানের গন্ধে তখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে ম-ম গন্ধ।

কার্তিকের পরের মাস চিরায়ত বাংলার আমনপ্রধান অঞ্চলে অগ্রহায়ণ নিয়ে আসে আশীর্বাদ। ধান কাটার ভরা মৌসুম হলো এই মাস। ফসলি মাঠের ঢেউ উপচে পড়ে কৃষকের গোলা, আঙিনা ও চাতালে। এই সময়ে নতুন ধানে কিষাণ-কিষাণীদের আনন্দ আর ব্যস্ততার সীমা থাকে না। বর্তমানে কৃষিকাজের সবক্ষেত্রেই প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। হেমন্তে সারা বছরের পরিশ্রমের ঘামে ফলানো ফসল কৃষকের মরমে সোনালি প্রলেপ মেখে দেয়। তাই যুগ যুগ ধরে এ মাসটি ‘নবঅন্ন’ নতুন ভাত বা ‘নবান্ন’ নামে পরিচিতি পেয়ে আসছে। এ সময় সব কৃষকের ঘরে থাকে নতুন ধান। ওই ধানের চাল দিয়ে কৃষক পরিবারে পিঠা-পুলি তৈরির ধুম পড়ে যায়। অগ্রহায়ণ তখন রূপ নেয় উৎবের আমেজে। এ উৎসবে হরেক রকম পিঠা তৈরি হয়। নামের মতোই বৈচিত্র্যময় পিঠাগুলো স্বাদে অনন্য। যেমনÑ চিতই, পাকানো, পাকোয়ান বা পাক্কন, পাটিশাপটা, কুশলি, ভাপা, পাতা, ভাত, কাটা, নকশি, পুলি, দুধ বা ভিজানো, ছিটা, লবঙ্গ, গোকুল, ম্যারা, মুঁঠা, সিদ্ধ, পুতুল, লরি, চাছি, সাগুদানা, ঝুড়িসীতা, তারাজোড়া, জামাই, জামদানি, হাদি, পাটা, তেজপাতাসহ অসংখ্য বাহারি নামের পিঠা বাড়িতে বাড়িতে তৈরি করা হয়। এই সময় আত্মীয়স্বজন বেড়াতে আসে। তাদের নতুন চালের পিঠা দিয়ে আপ্যায়ন করানো হয়। এভাবেই গ্রামবাংলায় ছড়িয়ে পড়ে নবান্নের আমেজ। বেলী, সন্ধ্যামালতী, দোপাটি, বক, জুঁই, কামিনী, গোলাপসহ অসংখ্য ফুল হেমন্তে ফুটে প্রকৃতিকে সুরভিত করে তোলে।
বাংলাদেশের নদীর রূপ, রঙ এক রকম এবং সাগরের অন্য রকম। কিন্তু নদী ও সাগরের যে মিলনস্থল অর্থাৎ মোহনা এর সৌন্দর্য মোহনা এলাকার মানুষ ছাড়া তেমন কেউ জানেন না। কার্তিক মাস ঠিক ওই রকম- দুই ঋতুর মোহনার মতো। এ কারণেই বাংলাদেশের প্রাণ ও প্রকৃতি দেখার সবচেয়ে সুন্দর সময় এই কার্তিক মাস।

হেমন্তে দেখা যায় অখণ্ড নীল আকাশ। শরৎ থেকে হেমন্ত খুব পৃথক নয়, শীত থেকেও তেমন বিচ্ছিন্ন নয় এর প্রকৃতি। এটি শীত-শরতের মাখামাখি একটি স্নিগ্ধ সুন্দর বাংলা ঋতু। হেমন্তের শিশির ভেজা ঘাসের ডগা যেন মুক্তার মেলা। সকাল বা সন্ধ্যায় অদৃশ্য আকারে ঝরে আকাশ থেকে। আবহমানকাল থেকে কমনীয়তার প্রতীক এই শিশির। ভোরের কাঁচারোদ, মৃদু হিমস্পর্শ প্রাণে শিহরণ জাগায়। বাংলাদেশে হেমন্ত আসে ধীর পদক্ষেপে, শীতের পরশ আলতো করে গায়ে মেখে।
স্মরণাতীতকাল থেকেই ধনধান্যে ভরা অগ্রহায়ণ মাসটিকে বছরের প্রথম মাস ধরে বর্ষ গণনার রীতির প্রচলন ছিল এ অঞ্চলে। অগ্রহায়ণ হলো বছরের অগ্রে যে যায়। তাই অগ্রহায়ণের স্থলে গ্রীষ্মের বৈশাখ কী করে বাংলা বর্ষের প্রথম মাস হলো তা এখনো রহস্য। নতুন ধান ও অন্নে ধীমান প্রকৃতির মেজাজ বাঙালির ফসল কাটার উৎসবটিকে উসকে দেয় বহুগুণে। সকালে সবুজ ঘাস ও আমন ধানের পাতায় শিশিরবিন্দু মুক্তদানার মতো চিক চিক করে। বৃন্তচ্যুত শিউলি ফুল এ সময় সৌরভ ছড়ায়। বাংলাদেশের শহরগুলোতেও কার্তিক ও অগ্রহায়ণ স্বকীয় বৈশিষ্ট্যম-িত। নগরের ইট-কাঠ কংক্রিটের জঞ্জালে বেঁচে থাকা জীবনও সমান তাড়িত হয়
কার্তিকের কৃপণতা ও অগ্রহায়ণের সুদিন সন্দেশের পরশে। তবে আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে জ্বর, খুশখুশে কাশিসহ বিিিভন্ন রোগের কমবেশি প্রাদুর্ভাব দেখা যায় শহর ও গ্রামে। সনাতন ধর্মালম্বী বাড়িগুলোয় হেমন্তকালে কলেরা আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে আকাশবাতি জ্বালানোর প্রচলন ছিল। সনাতনী হিন্দু ধর্মীয় মতে, দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎসব হিসেবে ধরা হয়ে থাকে শ্যামাপূজা, দীপান্বিতা বা দীপাবলি। কেউ কেউ এ উৎসবটিকে দেওয়ালি উৎসব বলে থাকেন। ত্রেতা যুগে ১৪ বছর বনবাস থাকার পর নবমীতে শ্রীরাম রাবণ বধের বিজয় আনন্দ নিয়ে দশমীতে অযোধ্যায় ফিরে আসেন। রামের আগমন বার্তা শুনে প্রজাকুল তাদের গৃহে প্রদীপ জ্বালিয়ে আনন্দ উৎসব পালন করে। ওই উৎসবটিকে দীপাবলি উৎসব বলে উল্লেখ করা হয়েছে। দুর্গাপূজার বিজয়ার পরবর্তী অমাবস্যার রাতেই দীপাবলির আয়োজন করা হয়। ওই রাতেই অনুষ্ঠিত হয় শ্যামা-কালীপূজা। অমাবস্যা রজনীর সব অন্ধকার দূর করে পৃথিবীকে আলোকিত করার অভিপ্রায়ে ওই প্রদীপ প্রজ্বলন। পৃথিবীর সব অন্ধকারের অমানিশা দূর করতেই ওই আয়োজন ও আরাধনা। কলুষময় পৃথিবীর আঁধার দূর করে মানুষ কালে কালে, যুগে যুগে রাজটিকা পরে বিজয়তিলক এঁকে আলোকবর্তিকা প্রজ্জ্বলন করেছে, জয় করেছে বিশ্বব্রহ্মা-। কালী বা শ্যামা অথবা আদ্যাশক্তিÑ যে নামেই ডাকা হোক না কেন, মূলত শাক্তদের দ্বারা তারা পূজিতা হন। তিনি তান্ত্রিক দশ মহাবিদ্যার প্রথমা দেবী এবং শাক্ত বিশ্বাস অনুযায়ী বিশ্ব সৃষ্টির আদি কারণ।

বাঙালি হিন্দু সমাজে মাতৃরূপে দেবী কালীর পূজা বিশেষভাবে পালিত হয়ে থাকে। হিন্দুশাস্ত্র মতে, কালিকা বাংলার অধিষ্ঠাত্রী দেবী। বাংলায় শাক্ত ধর্ম অত্যন্ত জনপ্রিয় ও কালীরূপে শক্তির আরাধনাও ব্যাপক। সমগ্র বাংলায় অসংখ্য কালীমন্দির দেখা যায়। এসব মন্দিরে আনন্দময়ী, করুণাময়ী, ভবতারিণী ইত্যাদি নামে কালী প্রতিমা পূজিত হয়। কালীর বিভিন্ন রূপভেদ রয়েছে। অমাবস্যায় দীপান্বিতা কালীপূজা বিশেষ উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পালিত হয়ে আসছে এতো দিন। অমাবস্যার ঘুটঘুটে অন্ধকারে প্রদীপ জ্বালিয়ে আলোকিত করার প্রয়াস অব্যহত থাকুক...

 

লেখাঃ শাকিল সারোয়ার
মডেলঃ সাবা সিদ্দিকা, মৌ মধুবন্তী
পোশাকঃ সহজ ওয়্যারড্রোব
মেকওভারঃ ক্লিওপেট্রা বিউটি স্যালন
স্টাইলিংঃ রিবা হাসান
ছবিঃ কৌশিক ইকবাল

Lorem ipsum dolor sit amet consectetur Aliquam eget arcu magna, vel congue dui. Nunc auctor mauris tempor leo aliquam vel porta ante sodales. Nulla facilisi. In accumsan mattis odio vel luctus.

Lorem ipsum dolor sit amet consectetur Aliquam eget arcu magna, vel congue dui. Nunc auctor mauris tempor leo aliquam vel porta ante sodales. Nulla facilisi. In accumsan mattis odio vel luctus.

Lorem ipsum dolor sit amet consectetur Aliquam eget arcu magna, vel congue dui. Nunc auctor mauris tempor leo aliquam vel porta ante sodales. Nulla facilisi. In accumsan mattis odio vel luctus.

Lorem ipsum dolor sit amet consectetur Aliquam eget arcu magna, vel congue dui. Nunc auctor mauris tempor leo aliquam vel porta ante sodales. Nulla facilisi. In accumsan mattis odio vel luctus.

Lorem ipsum dolor sit amet consectetur Aliquam eget arcu magna, vel congue dui. Nunc auctor mauris tempor leo aliquam vel porta ante sodales. Nulla facilisi. In accumsan mattis odio vel luctus.

Lorem ipsum dolor sit amet consectetur Aliquam eget arcu magna, vel congue dui. Nunc auctor mauris tempor leo aliquam vel porta ante sodales. Nulla facilisi. In accumsan mattis odio vel luctus.

Page 1 of 3

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…