চৈত্রের শেষ বিকেল

 চৈত্রের শেষ বিকেল

শায়লা হাফিজ

 

চৈত্রের শেষ দিন নববর্ষের আগমন সুখের সঙ্গে যেন মনে এনে দেয় ঋতুরাজ বসন্তের বিদায়ী ব্যথা মেশানো বিরহ বিধুর লগ্ন। তাই একটি বছরের অনেক অসন্তোষ, অনেক না পাওয়ার দুঃখ-গ্লানি ভুলে বাঙালি প্রাণ নেচে ওঠে নানা আয়োজনে বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণের আনন্দে। জীর্ণ পুরনো সব গ্লানি ধুয়ে-মুছে ‘নব আনন্দ বাজুক প্রাণে- এই মঙ্গল কামনায় বাঙালি বিদায় জানাবে কাটিয়ে দেয়া একটি বাংলা বছর।
বাংলা সনের শেষ মাসের নামকরণ করা হয়েছে চৈত্র। চৈত্র মাসের নাম ‘চৈত্র’ কীভাবে হলো? আদি পুরাণে বর্ণিত আছে, রাজা দক্ষের এক কন্যা ছিল চিত্রা। তার নাম অনুসারে এক নক্ষত্রের নামকরণ করা হয় চিত্রা নক্ষত্র। এই চিত্রা নক্ষত্র থেকে চৈত্র মাসের নামকরণ করা হয়। বাংলা সনের শেষ মাসের নামকরণ করা হয়েছে চৈত্র।
বহুকাল ধরে বাংলা বছরের সমাপনী মাস চৈত্রের শেষ দিনটিতে হিন্দু সম্প্রদায় ‘চৈত্র সংক্রান্তি’ পালন করছে। তাই বাংলা বছরের সমাপনী দিনটি ‘চৈত্র সংক্রান্তি’ নামে সমধিক পরিচিত। সংক্রান্তি কথাটির অর্থ ‘অতিত্রম করা’। সূর্য এক রাশি থেকে অন্য রাশিতে প্রবেশ করে বলেই এটিকে বলা হয় সংক্রান্তি। ফলে মাসের শেষ দিনটিকে বলা হয় সংক্রান্তি। চৈত্র সংক্রান্তি এখন কেবল কোনো ধর্ম বা মতের মধ্যে আবদ্ধ নয়, এটি রূপ নিয়েছে এক সর্বজনীন বর্ণিল উৎসবে।
চৈত্র সংক্রান্তির আসল আর্কষণ থাকে চড়ক পূজা। এটি কেন্দ্র করে দেশের অনেক জায়গায় বসে মেলা। চৈত্র সংক্রান্তির মেলায় বাঁশ, বেত, প্লাস্টিক, মাটি ও ধাতুর তৈরি বিভিন্ন তৈজসপত্র ও খেলনা, বিভিন্ন ফল ও মিষ্টি কেনা-বেচা করা হয়। বায়োস্কপ, সার্কাস, পুতুলনাচ, ঘুড়ি ওড়ানো ইত্যাদি চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থাও থাকে। অঞ্চলভেদে এই মেলা এক থেকে সাত দিন চলে। চড়ক পূজা চৈত্র সংক্রান্তির এক অন্যতম অনুষঙ্গ। লৌকিক আচার অনুযায়ী এই দিনে বিদায় উৎসব পালন করে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়। দোকানপাট ধুয়ে-মুছে বিগত বছরের যতো সব জঞ্জাল, অশুচিতা বিদূরিত করা হয়। পরদিনই খোলা হয় ব্যবসায়িক হিসাব-নিকাশের নতুন খাতা। এ উৎসবের লোকায়ত নাম ‘হালখাতা’।
বাংলার ঋতুচক্রের পালাবদলে চৈত্র আসে গ্রীষ্ম উষ্ণতা নিয়ে। প্রখর তপন তাপে আকাশ তৃষ্ণায় তৃষ্ণার্ত হয়ে ওঠে। মানব মনও তৃষিত হয় প্রকৃতি বরণ ও স্মরণ করতে। বাংলা বছরের সমাপনী মাস চৈত্র। চড়ক গাজন উৎসবের একটি প্রধান অঙ্গ। এ উপলক্ষে এক গ্রামের শিবতলা থেকে শোভাযাত্রা শুরু করে অন্য শিবতলায় নিয়ে যাওয়া হয়, একজন শিব ও একজন গৌরী সেজে নৃত্য করেন এবং অন্য ভক্তরা নন্দি, ভৃঙ্গি, ভূত-প্রেত, দৈত্যদানব প্রভৃতি সেজে শিব-গৌরীর সঙ্গে নেচে চলেন। এ সময় শিব সম্পর্কে নানান লৌকিক ছড়া আবৃত্তি করা হয়। এতে শিবের নিদ্রাভঙ্গ থেকে শুরু করে তার বিয়ে, কৃষিকর্ম ইত্যাদি বিষয় উল্লেখ থাকে। এ মেলায় সাধারণত শূলফোঁড়া, বানফোঁড়া ও বড়শিগাঁথা অবস্থায় চড়ক গাছে ঘোরা, আগুনে হাঁটা প্রভৃতি ভয়ঙ্কর ও কষ্টসাধ্য দৈহিক কলাকৌশল দেখানো হতো।

ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের বর্ষ বিদায় ও বর্ষবরণ উৎসব হলো ‘বৈসুক’। বাংলা বছরের শেষ তিন দিন পার্বত্যবাসী অতি আনন্দের সঙ্গে এই উৎসব পালন করে থাকে। অন্য সম্প্রদায় তথা সব ধর্মের মানুষ এই উৎসবে অংশগ্রহণ করে থাকে। সামর্থ্য অনুযায়ী ঘরের ছেলেমেয়েদের নতুন পোশাক দেয়া হয়, খাবার হিসেবে বিভিন্ন রকমের পিঠা ও পাঁচন তৈরি করা হয়ে থাকে। বৈসুক উৎসবের প্রধান আপ্যায়নের বস্তু হলো পাঁচন। এটি সাধারণত বন-জঙ্গলের হরেক রকমের শাকসবজির মিশ্রণ। তারা মনে করে, বছরের শেষ ঋতু পরিবর্তনের সময় বিভিন্ন শাকসবজি দিয়ে রান্না পাঁচন খেলে পরবর্তী বছরের রোগবালাই থেকে রেহাই পাওয়া যাবে। বছরের শেষ দিনের আগের দিন ‘হারি বৈসুক’ ও শেষ দিনকে বলে ‘বৈসুকমা’ এবং নতুন বছরকে বলে ‘আতাদাকি’।
হারি বৈসুকের দিনে প্রথমে তারা ফুল সংগ্রহ করে বাড়িঘর, মন্দির সাজায়। তারপর গায়ে কুচাই পানি (পবিত্র পানি) ছিটিয়ে স্নান করে আসে। এর সঙ্গে বয়োজ্যেষ্ঠদের পানি তুলে স্নান করিয়ে আশীর্বাদ নেয়। পরের দিনে পাড়ার যুবক ছেলেরা এক ওঝার নেতৃত্বে দলবেঁধে গরয়া নৃত্যের মহড়া দেয়। এই গরয়া দেবতার পূজা দিয়ে আশীর্বাদ বক্ষবন্ধনী কাপড় দিয়ে বেঁধে রাখে। তাদের বিশ্বাস, কারায়া গরয়া হচ্ছে বনের হিংস্র পশুগুলোর নিয়ন্ত্রণকারী দেবতা। তাদের পূজার আশীর্বাদ গ্রহণ করলে পরবর্তী বছরে জুম চাষ ও বিভিন্ন কাজে বন-জঙ্গলে গেলে হিংস্র পশুগুলোর আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।
মাস হিসেবে বৈশাখের প্রথম হওয়ার মর্যাদা খুব বেশি দিনের নয়। বৈদিক যুগে সৌর মতে, বছর গণনার যে পদ্ধতি প্রচলিত ছিল, সেখানেও বৈশাখের সন্ধান মেলে। বৈদিক যুগের ওই তথ্য অনুযায়ী বৈশাখের স্থান ছিল দ্বিতীয়। তৈত্তিরীয় ও পঞ্চবিংশ ব্রাহ্মণের মতে, বৈশাখের অবস্থান ছিল বছরের মাঝামাঝি জায়গায়। অন্যদিকে ব্রহ্মা- পুরাণে অনুষঙ্গপাদের একটি শ্লোক অনুসারে মাসচক্রে বৈশাখের অবস্থান ছিল চতুর্থ। তখন বাংলা সন বলতে কিছু ছিল না।

মোঘল সম্রাট আকবর ‘সুবে বাংলা’ প্রতিষ্ঠার পর বাংলাদেশে ফসল কাটার মৌসুম অনুসারে খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে নতুন একটি সনের প্রবর্তনের জন্য অনুরোধ করেন রাজ জ্যোতিষী ও প-িত আমির ফতেহউল্লাহ সিরাজীকে। সিরাজী হিজরি চন্দ্র মাসের সঙ্গে সম্রাটের সিংহাসনে আরোহণের বছর এবং ভারতীয় সৌর সনের সমন্বয়ে বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। মাসের নামগুলো সৌর মতে রেখেই পুনর্বিন্যাস করেন তিনি। এ অনুযায়ী বৈশাখ বাংলা সনের প্রথমে চলে আসে।
বাংলা সনের শেষ দিনটি বিদায় জানানোর জন্য বাঙালি যেমন প্রস্তুত হবেন তেমনি প্রস্তুত হবেন আরেকটি নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে। একই সঙ্গে খাতা খুলে কষতে বসবেন বিগত বছরের সাফল্য ব্যর্থতা ও পাওয়া, না পাওয়ার হিসাব। সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে নানান আচার অনুষ্ঠানে যেমন বিদায় জানানো হবে চৈত্রকে তেমনি প্রস্তুতি নেবেন চৈত্রের শেষ রাতের প্রহরে সূর্য উদয়ের সঙ্গে সঙ্গে বৈশাখ বরণ করে নিতে। রবীন্দ্র নাথ ঠাকুরের ভাষায় যদি বলিÑ

‘নিশি আবসান প্রায় ঐ পুরাতন বর্ষ হয় গত
আমি আজি ধুলিতলে জীর্ণ জীবন করিলাম নত॥
বন্ধু হও শত্রু হও, যেখানে যে রও
ক্ষমা কর আজিকার মতো
পুরাতন বৎসরের সাথে পুরাতন অপরাধ যত।’

চৈত্রের রুদ্র রূপ ডিঙিয়ে আমাদের মধ্যে এলো বৈশাখ। এলো আরেকটি নতুন একটি বছর। অনেক প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, চড়াই-উতরাই, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও আনন্দ-বেদনার সাক্ষী হয়ে কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে একটি বছর। নতুন বছরের পুব আকাশের নতুন সূর্যটি হোক শান্তির ও স্বপ্নের। পুরনো বছরের জীর্ণতা দূরে ঠেলে নতুন সম্ভাবনার পথে এগিয়ে চলাই হোক আমাদের মূলমন্ত্র।

 

মডেল : রিবা হাসান
পোশাক : অঞ্জনস
মেকওভার : ক্লিওপেট্রা বিউটি স্যালন
ছবি : কৌশিক ইকবাল

Read 23125 times

2538 comments

Leave a comment

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

Twitter feed

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…