মেডিটেশন

মেডিটেশন

- শায়মা হক 

 

‘সন্ন্যাসী উপগুপ্ত

মথুরাপুরীর প্রাচীরের তলে

একদা ছিলেন সুপ্ত--’

 

রবি ঠাকুরের ‘অভিসার’ কবিতাটি পড়ার কারণে আমার চোখে সেই কিশোরীকাল থেকেই মুনি, ঋষি বা সন্ন্যাসী মানেই ওই সন্ন্যাসী উপগুপ্ত। মুদ্রিত নয়ন, মুষ্টিবদ্ধ দুই হাত, কোনো এক প্রাচীন মথুরাপুরি নগরীর প্রায় ধসে যাওয়া প্রাচীরের পাশে ধ্যানরত যোগী সন্ন্যাসী। মুনি-ঋষিরা ধ্যানের মাধ্যমেই নানান অভীষ্ট লাভ করে থাকেনÑ এমনটাই শুনেছিলাম। আরও পরে জেনেছি, ধ্যান শুধু তাদেরই একচ্ছত্র অধিকার নয়। ওই ধ্যান এখন পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তেই বসে থাকা যে কোনো মানুষেরই প্রাত্যহিক জীবনের অংশ হতে পারে। এ জন্য বনে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। সংসার, সমাজ ত্যাগ করে নির্জন-বিরল কোনো স্থানে চলে যাওয়ার দরকার নেই। এমনকি গৃহে থেকে সব থেকে আলাদা হয়ে গৃহী সন্ন্যাসী হওয়ারও কোনো কারণ নেই। দরকার শুধু নিজের জন্য কিছু সময় ও নিজের ভেতরে ডুবে যাওয়া। আজ ওই ধ্যানের কথাই লিখবো যা বড় উপযোগী এবং প্রয়োজন আমাদের আজকের এই প্রাত্যহিক জীবনের নানানরূপ মানসিক শোক, তাপ ও চাপ ডিঙিয়ে প্রশান্তিময় জীবন যাপনের জন্য।

 

আধুনিক জীবনের নানান জটিলতায় প্রায়ই অস্থির হয়ে ওঠে আমাদের দেহ ও মন। হতাশা, ক্ষোভ, কাছের মানুষের প্রতারণা, সমাজ ও রাষ্ট্রের নৈতিক অবক্ষয়Ñ এসব নিয়ে কূল-কিনারা এবং সমাধান খুঁজে পায় না যখন মন তখনই আমরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ি। ওই মানসিক চাপ আমাদের শারীরিকভাবেও অসুস্থ করে তোলে। কাজে মন বসে না, জগৎ-সংসারের সবকিছু হয়ে ওঠে রঙহীন ও বিবর্ণ। এক্ষেত্রে মানসিক প্রশান্তি ফিরিয়ে আনার এক অনন্য উপায় হতে পারে মেডিটেশন বা ধ্যান।

আসলে আমাদের আকাক্সক্ষার সঙ্গে যখন বাস্তবতার সংঘাত ঘটে তখনই আমরা ভেঙে পড়ি। ঠিক তখনই প্রয়োজন আমাদের মানসিক শক্তি বা মনের জোর। ওই মনের জোর বাড়াতে সবচেয়ে বেশি উপকারী মেডিটেশন। মেডিটেশন বা ধ্যান মূলত এক ধরনের সাধনা। এর মাধ্যমে মানুষ নিজেকে উপলব্ধি করে। ধ্যান আসলে

মনঃসংযোগের এক সুসংবদ্ধ রূপ। ওই ধ্যানের মাধ্যমেই মন নিয়ে যাওয়া যায় গভীর প্রশান্তির রাজ্যে। ওই রাজ্য পার্থিব সব কাম, ক্রোধ, লোভ, লালসার ঊর্ধ্বে। সেখানে নেই কোনো দুঃখ, বেদনা, জ্বালা বা যন্ত্রণা।

ধ্যান বা মেডিটেশনের মূল ব্যাপারই হলো মন একাগ্রতার সঙ্গে কোনো নির্দিষ্ট স্থান, বস্তু বা যে কোনো কিছুর প্রতি নিবদ্ধ করা। তা হতে পারে কোনো ব্যক্তি অথবা কোনো ইমেজ, কাল্পনিক চরিত্র কিংবা আলোর বিন্দু বা কোনো শব্দ কিংবা যে কোনো বস্তুর প্রতি। মন স্থিরভাবে কোনো কিছুর প্রতি নিবদ্ধ রেখে কিছুক্ষণ বসে ধ্যান করে ধ্যানকারী তার আকাক্সক্ষার প্রশান্তিময় কল্পরাজ্যে হারিয়ে যেতে পারেন। এটি তাকে মানসিক প্রশান্তির পরশে অস্থিরতা থেকে অনায়াসেই মুক্তি দিতে পারে। আমাদের মনের প্রতিনিয়ত যন্ত্রণাবিদ্ধ ও ক্ষতবিক্ষত করে তোলে ষড়রিপু। মেডিটেশনের মাধ্যমে তা দমন করতে পারলেই মন এক অনির্বাচনীয় প্রশান্তিতে ভরে উঠবে। খুঁজে পাওয়া যাবে সুন্দর, সহজ, ক্লেদহীন জীবন যাপনের সত্যিকারের উপকরণ। যুগে যুগে মহাপুরুষরা ধ্যানের মাধ্যমে যেমন ইন্দ্রিয় জয় করেছেন তেমনি সন্ধান পেয়েছেন সত্য উপলব্ধির।

স্বল্প সময়ে অল্প একটু মেডিটেশন বা ধ্যান এবং সারা দিনের মানসিক প্রশান্তির জন্য কী প্রয়োজন

আগেই বলেছি, মেডিটেশনের জন্য ওই প্রাচীন সন্ন্যাসী বা মুনি-ঋষিদের মতো গৃহত্যাগের প্রয়োজন নেই। শুধু প্রয়োজন একটু খোলা জায়গা। তা হতে পারে বাড়ির সামনের এক টুকরো বাগান, বারান্দা বা খোলা ছাদ। বড় জানালা দেয়া বড় ঘরেও মেডিটেশন করা যেতে পারে।

 

আরো কিছু

  একটা ছোট কার্পেট, মাদুর বা বিছানা    সুগন্ধি মোমবাতি বা ধূপধুনো    আরামদায়ক ঢিলেঢালা জামা    হাতে অন্তত আধা ঘণ্টা সময়

  টিভি, সেলফোন, রেডিও, কলিংবেল থেকে যতোটা দূরে থাকা যায় তা খেয়াল রাখা।

 

কী করতে হবে

  সুগন্ধি মোমবাতি বা ধূপ জ্বালিয়ে বিছানা, কার্পেট বা মাদুরে আসন গ্রহণ। এক্ষেত্রে যেভাবে বসতে আরাম বোধ হয় সেভাবেই বসা উচিত। হাঁটু মুড়ে বা পদ্মাসনেও বসা যায়।

  শিরদাঁড়া সোজা রেখে কোলের ওপর হাত দুটি রাখতে হবে।

  লম্বা শ্বাস নিতে হবে। তবে শ্বাসের গতি বাড়ানো যাবে না।

  চোখ বন্ধ করে মনঃসংযোগ করতে হবে। এ সময় সাংসারিক বা জাগতিক সব চিন্তা মুক্তি দিয়ে সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য বা আকাক্সিক্ষত কোনো দৃশ্য ভাবা যেতে পারে।

  ২০-২৫ মিনিন এভাবেই কাটাতে হবে।

 

শরীরের জন্য মেডিটেশন বা ধ্যানের উপকারিতা

  ব্লাড সার্কুলেশন ইমপ্রুভ করে।

  ব্লাড প্রেশার নরমাল রাখতে সাহায্য করে।

  মাসল রিলাক্স করে এবং মাথা ধরা কমিয়ে দেয়।

  ব্লাড ল্যাক্টেট লেভেল কমায় এবং আংজাইটি অ্যাটাক কমে যায়।

  মস্তিষ্কে সেরোটনিন উৎপাদনে বৃদ্ধি ঘটায়। এটি মানুষকে ডিপ্রেশন, ইনসমনিয়াÑ এসব সমস্যা থেকে রক্ষা করে।

 

মেডিটেশন বা ধ্যানের সূচনা যদিও অতি প্রাচীনকাল থেকেই এ উপমহাদেশে প্রচলিত বলে জানা গেছে তবুও ষাটের দশকে প্রাচ্যে বিভিন্ন ধ্যান পদ্ধতি জনপ্রিয়তা পাওয়া শুরু করার কয়েক বছরের মধ্যে পাশ্চাত্যেও এর প্রভাব পড়ে। ১৯৬৮ সালে ই এম টি সহ মেডিটেশনের প্রায় অর্ধশত পদ্ধতি চালু হয়। এর মধ্যে সিলভা মেথড সবচেয়ে জনপ্রিয়। এ ছাড়া ধ্যান বা সাফল্যময় মেডিটেশনের আরো নাম বা পদ্ধতি রয়েছে।

 

সিলভা মেথড

এই মেথড বর্তমানে বিশ্বের ১৩১টি দেশে ৩০টি ভাষায় শিক্ষা দেয়া হয়। এর পুরো নাম সিলভা মাইন্ড কন্ট্রোল মেথড অ্যান্ড স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট।

 

কোয়ান্টাম মেথড

এটিকে বলা হয় জীবন বদলে দেয়া ও জীবনে ভালো থাকার বিজ্ঞান। এটি শুরু হয় জীবন দৃষ্টি বদলের মধ্য দিয়ে। নতুন দৃষ্টিভঙ্গি মস্তিষ্কের নিউরোনে নতুন ডেনড্রাইট সৃষ্টি করে এবং সূচিত হয় নিউরোনে নতুন সংযোগায়ন প্রক্রিয়া। ফলে মস্তিষ্কের কর্মকাঠামোয় সৃষ্টি হয় ইতিবাচক কর্মচাঞ্চল্য। এর প্রভাব পড়ে ব্যক্তির আচরণ ও দৈনন্দিন প্রতিটি কাজে। অশান্তি পরিণত হয় প্রশান্তিতে।

 

জেন মেডিটেশন

স্টিভ জবস-এর বয়স তখন মাত্র ১৯ বছর। রিড কলেজ থেকে ড্রপ আউট ওই কিশোর চলে গেলেন ভারতে। তবে ভারত থেকে যখন যুক্তরাষ্ট্রে ফিরলেন তখন তাকে দেখে সবাই চমকে গেল। সান ফ্রান্সিসকো বিমানবন্দরে অবতরণের পর তার মা-বাবা তাকে দেখে চিনতে পারলেন না। ভারতে তিনি এসেছিলেন মূলত আধ্যাত্মিক জীবনের খোঁজে। ভারতীয় উপমহাদেশের হিন্দু ধর্মগুরু কিংবা বৌদ্ধ ধর্মের আধ্যাত্মিক সাধকদের কথা তিনি আগেই শুনেছিলেন। তবে নিজেও হয়তো কখনো চিন্তা করতে পারেননি তার ওই ভারত সফরই পুরো জীবন পাল্টে দেবে। শুধু তার জীবনই নয়, পাল্টে দেবে প্রযুক্তি বিশ্বটিও। জবসের কর্মজীবনের দিকে তাকালে খুব সহজেই ‘জেন মেডিটেশন’-এর প্রভাব বোঝা যায়। ১ হাজার ৩০০ বছর ধরে জেন মেডিটেশন মানুষকে শিখিয়েছে কীভাবে সাহস করে কোনো কাজ করতে এবং কোনো কাজে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ও কঠোর হতে হয়। এর সঙ্গে এটিও শিখিয়েছে, কীভাবে সাধারণ জীবন যাপন করতে হয়।

 

ধ্যান বা মেডিটেশন ও মেডিটেশনকারীদের সাফল্যময় জীবন নিয়ে রয়েছে নানান ইতিহাস। এসবের জন্য রয়েছে কঠোর সাধনার ইতিকথাও। তবে আমাদের দৈনন্দিন কর্মক্লান্তি, মানসিক অস্থিরতা, এমনকি অনেক জটিল সমস্যার সমাধান পেতেও ওই ধ্যান বা মেডিটেশন যথেষ্ট কার্যকর। আসলে শুধু অস্থির মনেই সমস্যাগুলো জটিলতার সৃষ্টি করে। তাই সর্বপ্রথম প্রয়োজন মানসিক প্রশান্তি আনয়ন। ধ্যান বা মেডিটেশন মানসিক জোর ও শক্তি বাড়ায়। প্রাত্যহিক জীবনের স্বল্প সময়ের ওই অল্প একটু মেডিটেশন চর্চাই বাড়াতে পারে মনের জোর। ওই চর্চার মাধ্যমেই সব অস্থিরতা কাটিয়ে প্রশান্তিতে ভরিয়ে উঠতে পারে এই দেহ-মন। পরিশেষে বলা যায়, সুন্দর ও সুস্থ জীবন চর্চায় দিনের ২০ থেকে ৩০ মিনিটের মেডিটেশন হতে পারে এক অনন্য মাধ্যম।

Read 350 times

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…