সানগ্লাসের সময়ফের

সানগ্লাসের সময়ফের

- নবাব আমিন 

 

যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের চাল-চলনেও এসেছে নানা পরিবর্তন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ফ্যাশনেও প্রতিনিয়তই পরিবর্তন ঘটছে। এই যেমন পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে বিভিন্ন রঙের রোদচশমা (সানগ্লাস) পরা চলতি সময়ের জনপ্রিয় ফ্যাশন। নানান ডিজাইন ও রঙের রোদচশমা এখন বাজারে পাওয়া যায়। নিজের আউটলুকে খানিকটা পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে রোদচশমার কারিশমা অনস্বীকার্য। সাদামাটা একটি পোশাকের সঙ্গে রোদচশমা সহজেই এনে দেয় চমৎকার ফ্যাশনেবল লুক। এর ভক্ত কিশোর, তরুণ থেকে শুরু করে মধ্য বয়সী ও বুড়োরাও। তবে অনেকেই জানেন না এই রোদচশমা আবিষ্কারের ইতিকথা। চলুন জেনে নিই প্রিয় ওই রোদচশমা আবিষ্কারের গল্প।

প্রাচীনকালে কাচ রঙিন করে কিংবা স্ফটিক পাথর ব্যবহার করে রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে আকাশ অথবা সূর্যের দিকে তাকাতো সাধারণ মানুষ। তবে এভাবে সূর্যালোকটি জয় করার ব্যাপারটি খ্রিস্টপূর্ব ১১০০ শতকের আগ পর্যন্ত কারো মাথাতেই আসেনি।

প্রাচীন চীনে নাকি আজকের দিনের চশমার মতো এক ফ্রেম বানিয়ে এতে দুই চোখের ওপর রঙিন কাচ লাগিয়ে রোদের হাত থেকে চোখ দুটি রক্ষা করার কৌশলের উদ্ভব হয়েছিল। তাই ইতিহাসের পাতায় প্রথম রোদচশমার উৎসস্থল বলা হয়েছে চীন দেশকেই। চীনে নাকি রঙিন চশমা ব্যবহৃত হতো আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজে। কোনো অপরাধের বিচারকাজ চলার সময় বিচারকরা সাধারণত এমন রঙিন চশমা ব্যবহার করতেন। রঙিন চশমা পরে থাকলে কোনো অভিযুক্ত কিংবা সাক্ষী তার চোখের অভিব্যক্তি বুঝতে পারতো না। বিচার কাজের স্বচ্ছতার জন্যই সাধারণত প্রাচীন চীনের বিচারালয়গুলোয় বিচারকদের এই রঙিন চশমা পরার ব্যাপারটি প্রচলিত ছিল।

১৩০০ সালের দিকে চীনের বিচারকরা বিচার কাজ চালানোর সময় চোখ ‘কোয়ার্টজ’-এর কাচে ঢেকে রাখতেন যাতে তারা কী দেখছেন তা কেউ বুঝতে না পারে। মূলত তাদের চোখের দৃষ্টি আড়াল করতে ওই চশমা ব্যবহার করা হয়। এরপর ১০০ বছর ধরে রোদচশমার ব্যবহার শুধু বিচারালয়ে হতে থাকলো।

১৪৩০ সালের দিকে রোদচশমা চীন থেকে ইটালিতে পাড়ি জমায়। তারাও বিচারিক কাজে রোদচশমা ব্যবহার করতেন।

১৮০০ সালে তৈরি হয় গগলস্। এর কাজ ছিল ভ্রমণকারীদের চোখ বাতাস, ধুলো ও রোদের আলোর হাত থেকে রক্ষা করা।

আঠারো শতকের মধ্যভাগে চশমার অস্বচ্ছ লেন্স নিয়ে জেমস আয়ুসকফ গবেষণা শুরু করলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, নীল অথবা সবুজ অস্বচ্ছ কাচ নির্দিষ্ট দৃষ্টির ত্রুটি নিরাময় করতে সক্ষম হবে। সূর্যালোক প্রতিহত করার কোনো চিন্তা-ভাবনা তার মাথায় ছিল না।

১৯০০ সালের দিকে বিমান আবিষ্কারের ফলে মাটির অনেক উপরে উজ্জ্বল আলো সমস্যা হয়ে ওঠে। তাই বাউস অ্যান্ড লম্ব কোম্পানিকে এয়ার কর্পস সমাধানের জন্য খবর দেন আমেরিকান আর্মি। তখন তারা সবুজ রেব্যান এভিয়েটর রোদচশমা তৈরি করেন।

 

১৯২৯ সালে আধুনিক রোদচশমা আসে। ১৯৩০ সালে আটলান্টিক সিটিতে ফস্টার-গ্রান্ট-সানগ্লাসের প্রথম জোড়া বিক্রি করেন ফস্টার গ্রান্ট কম্পানির প্রতিষ্ঠাতা স্যাম ফস্টার।

১৯৩৭ সালে প্রায় ২০ মিলিয়ন রোদচশমা আমেরিকায় বিক্রি হয়। জানা গেছে, ছেলেদের থেকে মেয়েরাই রোদচশমা ফ্যাশন হিসেবে ব্যবহার করে থাকেন। তখন শতকরা প্রায় ২৫ ভাগ মানুষ রোদচশমা শুধু রোদ থেকে চোখ রক্ষা করতেই ব্যবহার করতো।

১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে টিনটেড রোদচশমার প্রচলন শুরু হয় ইউরোপে। তখন হলিউডের তারকারা ব্যাপকভাবে এটি পরা শুরু করেন।

১৯৬৫ সালে রোদচশমার আকার ও রঙ বদলাতে শুরু করে। রোদচশমার জন্য ফটোক্রমিক লেন্স আবিষ্কার হয়। তা সূর্যের আলোটি মৃদু করে।

সত্তরের দশকে হলিউড তারকারা রোদচশমা ব্যবহারের জন্য রীতিমতো বিখ্যাত ছিলেন।

১৯৮০ সালে আরো উন্নত লেন্স আবিষ্কার হতে থাকে।

বিংশ শতাব্দীতে এসে রোদচশমা প্রাণ পায়। রোদচশমা টেকনোলজির উন্নয়নে আমেরিকার মিলিটারি ব্যাপক ভূমিকা রাখে। আমাদের দেশে মূলত আশির দশকের পর কিংবা এরও পর থেকে রোদচশমার ব্যবহার শুরু হয়। অবশ্য ওই সময় এতো ডিজাইনের রোদচশমা ছিল না। নব্বইয়ের দশকের পর এর আবেদন আস্তে আস্তে আরো বাড়তে থাকে।

বিংশ শতাব্দীর পর রোদচশমা অন্যান্য অনুষঙ্গের মতো একটি হয়ে ওঠে। কালের বিবর্তনে এটি এখন ঘুরে-ফিরে ওই পুরনো ডিজাইনের দিকেই যাচ্ছে। এখন অনেক ব্যবহারকারীই ওই সময় ব্যবহৃত রোদচশমার খোঁজ ও নিয়মিত ব্যবহার করছেন।

এরপর ইতিহাস ছেড়ে বর্তমানে এলে দেখা যায়, এখন সবার চোখেই রোদচশমা। সময়ের পরিক্রমায় এখন ঘর থেকে বের হলে রোদ ও ধুলাবালি থেকে চোখটি রক্ষা করার জন্য এর কোনো তুলনা হয় না। বর্তমানে এটি যেমন রোদ ও ধুলাবালি থেকে চোখটি রক্ষা করছে তেমনি ফ্যাশনেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তবে হ্যাঁ, ফ্যাশন আর পোশাকের ভিন্নতার ওপর নির্ভর করে এখন এর রঙ ও ধরন পালটাচ্ছে। মুখের আকৃতি ও নিজস্ব রুচির ওপর নির্ভর করে রোদচশমা পড়ছে সবাই। তরুণদের এখনকার অন্যতম অনুসঙ্গ এটি। এর আধুনিকতা থেকে বর্তমানে কেউই আর পিছিয়ে নেই।

অতীত-বর্তমান পর্যন্ত তারকা থেকে শুরু করে ক্রিকেটার, ফুটবলার, কবি, সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষের স্টাইলের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ বস্তু হলো রোদচশমা।

 

Read 565 times

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…