সুচিত্রা সেন

সুচিত্রা সেন

আলমগীর রেজা চৌধুরী

 

 

সুচিত্রা সেনের প্রেমে পড়েছিলেন আমার বাবা, আমি পড়িনি। না হলে আমাদের শহরের ‘রওশন টকিজ’ হলে সুচিত্রা ছবি এলেই মাকে নতুন কাপড় পরিয়ে রিকশায় বসে বাবা হুড তুলে ভাইবোনদের সার সার (যার যার) দাঁড়নো রিকশা ভরে নিয়ে যেতেন সুচিত্রা র্দশনে। আমি তখন সিনেমা বোঝার বয়সে পড়িনি। কিন্তু সিনেমা হলে বাবার দেয়া চানাচুর ভাজা, দুধ মালাই তো নিশ্চিত। আসি এতেই সন্তুষ্ট।
রিকশার টুনটুন বাজিয়ে মধ্যরাতে যখন ঘরে ফেরা হতো তখন বড় চাচা গলা খাকারি দিয়ে বলতেন, ‘কি রে, বই দেখে ফিরলি?’
বাবা বলতেন, ‘জি মিয়া ভাই। সুচিত্রা সেনের ছবি।’ ওই পর্যন্তই। পরে সুচিত্র সেনে প্রেমে পড়েন বড় ভাই। কলেজে ওঠার পর পর তার মাথার ভেতর রমা ঢুকে যায়। আর যাবে কোথায়? বাবার দুশ্চিন্তার শেষ নেই। সুচিত্রার বই দেখে দেখে বড় ভাই ঈষৎ রোমান্টিক, ঈষৎ বিরহ লালন করতে করতে যৌবনে অতিক্রম করেন। বাবা ও বড় ভাইয়ের আবদ্ধ নারীর সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ হয় আরো পরে। যখন স্কুল শেষ করে কলেজে উঠেছি। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ভারতীয় ছবি ‘চ্যারিটি শো’ হিসেবে প্রদর্শিত হতে থাকে সিনেমা হলগুলোয়। ঠিক তখনই সুচিত্র সেনের সঙ্গে আমার পরিচয়। ‘দীপ জ্বেলে যাই’ ছবিতে বসন্ত চৌধুরীর সঙ্গে সুচিত্রা সেন। বসন্ত চৌধুরীর সেবার দায়িত্বে নার্স সুচিত্রা সেন। সহশিল্পী পাহাড়ি সান্যাল। অসাধারণ এক নারীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যৌবনে পা দেয়া এক যুবক। অনুরণন তুলতে থাকে- ‘এই রাত তোমার আমার।’ চোখের তারায় তার ব্যাকুল নিমন্ত্রণ! সে কোনো সাধারণ নারী নয়। যুবকের ভূভাগে নারীর বাঁকা অক্ষির মোহনা চতুরতা। তা কেবল গহিন সাগরে হাবুডুবু খাওয়া কাতর ডলফিন। কণ্ঠের মদুরিমায় যে প্রকাশ এর নাম মমতাময়ী প্রেমিকা। আমি তো তার জন্যই অপেক্ষা করছি।


বাবা ও বড় ভাইয়ের ভালোবাসায় প্রান্তি ছিল। তাদের সঙ্গে সুচিত্রা সেনকে মানায়নি। আমি তার যথার্থ প্রেমিক। আকণ্ঠ তৃষ্ণা নিয়ে হাজার বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছি।
না, ওই মুখ দেখে তৃষ্ণা মেটেনি আমার। এরপর শুধু সুচিত্রা সেনকে অবিষ্কার করা। বাংলা-হিন্দি ছবি মিলিয়ে সুচিত্রা সেন অভিনয় করেছে ৬০টি ছবিতে। ৫৩টি বাংলা, বাকি ৭টি হিন্দি ছবি। প্রথম বাংলা ছবি, ‘সাত নম্বর কয়েদি’ মুক্তি পায় ১৯৫৩ সালে। শেষ ছবি ‘প্রণয়পাশা’ মুক্তি পায় ১৯৭৮ সালে। হিন্দি ছবি ‘দেবদাস’ মুক্তি ১৯৫৫ সালে। শেষ হিন্দি ছবি ‘আঁধি’ মুক্তি পায় ১৯৭৮ সালে।
সুচিত্রা সেন অভিনীত ছবির নায়করা (বাংলা)- সমর রায়, উত্তম কুমার, রবীন মজুমদার, বিকাশ রায়, অশোক কুমার, অসিত বরন, শৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, দিলীপ মুখোপাধ্যায়, প্রদীপ কুমার, নির্মল কুমার, উৎপল দত্ত, সমিত ভ- ও রঞ্জিত মল্লিক।
হিন্দি ছবির নায়করা- দিলীপ কুমার, শেখর, ভারত ভূষণ, দেব আনন্দ, ধর্মেন্দ্র ও সঞ্জীব কুমার। সুচিত্রা সেন অভিনীত সর্বাবাধিক জুটির যুক্তিপ্রাপ্ত ছবির নায়ক উত্তম কুমার। উত্তম-সুচিত্রা অভিনীত ছবি ৩০টি। সুচিত্রা সেনের ৩৫ বছর অভিনয় জীবনে উত্তম-সুচিত্র সফল ও চিরায়ত জুটি হিসিবে চিহ্নিত। কেন ও কী কারণে সফল এবং চিরায়ত ওই ব্যাখ্যা দেয়ার প্রয়োজন নেই। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, তার সময়ে বাংলা ও হিন্দি চলচিত্রের সফল তারকাদের সঙ্গে সুচিত্রা সেন অভিনয় করেছেন। বলা যায়, ভারত উপমহাদেশের সবচেয়ে সফল ও দর্শক নন্দিত নায়িকা হিসেবে সুদীর্ঘ সময় দীপ্যমান। ২০১৪ সালে দাঁড়িয়ে যে কাউতে জিজ্ঞাসা করুন, আপনার প্রিয় নায়িকা কে? অন্তত ৬০ শতাংশ দর্শক জবাব দেবেন সুচিত্রা সেন। কেন ও কী কারণে সুচিত্রার এ সফল অভিনয়শৈলী এর একটু ঠিকুজি থাকা দরকার।


সুচিত্রা সেনের জন্ম ১৯২৯ সালের ৬ এপ্রিল সিরাজগঞ্জ জেলার বেলকুচিতে তার মামাবাড়িতে। পাবনা শহরের গোপালপুর মহল্লার একতলা পাকা পৈতৃক বাড়িতে শিশুকাল, শৈশব ও কৈশোর কেটেছে। স্কুলে ভর্তি করার সময় তার নাম রাখা হয় কৃষ্ণা দাসগুপ্ত। ডাকনাম রমা। বাবা করুণাময় দাসগুপ্ত ছিলেন স্থানীয় স্কুলের প্রধান শিক্ষক। ভাইবোনদের মধ্যে সুচিত্রা পঞ্চম। ১৯৮৭ সালে ভারত-পাকিস্তান ভাগ হওয়ার পর পাবনা ছেড়ে বাবার সঙ্গে তিনি চলে যান কলকাতায়। ওই বছর তার বিয়ে হয় আদিনাথ সেনের পুত্র দিবানাথ সেনের সঙ্গে। রমা সেন ভালোবেসেই দিবানাথ সেনকে বিয়ে করেছিলেন ১৯৪৮ সালে। স্বামীর সম্মতিতেই ১৯৫২ সালে ‘শেষ কোথায়’ ছবির মাধ্যমে চিত্রজগতে আত্মপ্রকাশ তার। কিন্তু ছবিটি মুক্তি পায়নি।
সুচিত্রা সেন সম্পর্কে চিত্র পরিচালক সুকুমার দাসগুপ্ত বলেছেন, “১৯৫১ সালে ‘সাত নম্বর কয়েদি’ ছবির জন্য নতুন মুখ খুঁজছি। এমন সময় অমিত চৌধুরী বললেন, একটি ভালো ও শিক্ষিত পরিবারের মেয়ে আছে। মনে হয় সুযোগ পেলে ভবিষ্যতে নাম করবে। তার কথায় মেয়েটি কে পাঠিয়ে দিতে বললাম। প্রথম দিন তার স্বামী দিবানাথ সেনের সঙ্গে এলেছিলেন দেখা করতে আরোরা স্টুডিওতে। ছিপছিপে চেহারা, ডাগর ধরনের চোখ। চোখ দুটি ভারী সুন্দর এবং খুব এক্সপ্রেসিভ। চাহনিতে স্বচ্ছ গভীরতা। মিষ্টি হাসিতে মুখখানা যেন উচ্ছলতায় ভরে যায়। একনজরে পছন্দ হয়ে গেল। কণ্ঠস্বরও বেশ মিষ্টি। কথার মধ্যে বাঙাল টোন আছে। আমি সঙ্গে সঙ্গে তাকে নিতে রাজি হয়ে গেলাম।’
ওই সাত নম্বর কয়েদি দিয়ে শুরু। তখনো রমা সেন নামেই পরিচিত।


১৯৫২ সালে রমা সেন পাল্টিয়ে সুচিত্রা সেন নামে আত্মপ্রকাশ নীরেন লাহিড়ীর ‘কাজরী’ ছবিতে। ৫ ফিট সাড়ে ৪ ইঞ্চির মতো সুচিত্রা হয়তো আজকের সুস্মিতা ও ঐশ্বর্যদের মতো দীর্ঘাঙ্গী নন। ফিতান মাপে তিনি সিøম নন, নন আন্তর্জাতিক রূপসী। তার সুগঠিত নাক, লম্বাটে ভরাট মুখম-ল, ছোট কপাল, একঢাল কালো চুল, শ্যামবরন ত্বক। নারায়ণ গঙ্গেপাধ্যায় লিখেছেন, ‘কালো মেয়ের প্রেমে পড়লে ওঠা যায় না।’ সুচিত্রা সেনের সৌর্ন্দয অনেকটা ওই ঘরনার আকৃষ্ট করে। একই সঙ্গে দূরত্বও রচনা করে- রোমান্টিক ও বিরহী।
আমার মতো লাখো প্রেমিক আছে সুচিত্রা সেনের। যে কোনো বয়সের প্রেমিক। সিনেমা জগতে এতো দীর্ঘকাল প্রেমিকা থাকা খুব কঠিন। সুচিত্রা সেন ছিলেন এবং আছেন। মনময়ূরী স্বপ্নের দেবী। কী চমৎকার রূপ, কী তার চাহনি, কী অভিনয়! যেন বার বার হৃদয় পোড়ে। সুচিত্রা সেন মানেই স্বতন্ত্র স্টাইল। বলা যায়, স্টার ইমেজ কারো ছিল না। দর্শককুল তাকে গভীর ভালোবাসে। এতে কোনো চাওয়া-পাওয়ার হিসাব নেই। কাম ও ক্রোধহীন নিষ্পাপ প্রেম। সে প্রেম কোনো পুরুষকে জীবন ভালোবাসতে শেখায়। বিরহের অনল হৃদয়ে উত্তাপ ছড়ায়, এর মধ্যে সহস্র রেণু ঝরে পড়ে। তা মানুষকে অনন্ত এক সহযাত্রীর সন্ধান দেয়।
বাংলা ছবির গ্ল্যামার কুইন সুচিত্রা। রোমান্টিক নায়িকা হিসেবে তার খ্যাতি চিরায়ত। তার দীর্ঘ রোমান্সের সমকক্ষ অভিনেত্রী সে যুগে কেউ ছিল না, এ যুগেও কেউ নেই।
তো কলেজে পড়া ঝুল বারান্দায় হাঁটাহাঁটি করে যে নারী, তিনি প্রণয় আরসে জায়িত সুন্দরী। এক রকম গহিন রহস্যের অনঙ্গ পরী, সৌন্দর্যের অনন্য উপমা- ‘দীপ জ্বেলে যাই’ দিয়ে এ নারীকে আবিষ্কার করা। সাধারণ নার্স শুভ্র বসনা। চোখের অনন্য চাহনিতে উল্টে দিয়েছিল পৃথিবীর দেয়াল। প্রেমান্ধ পরিব্রাজক আস্তে আস্তে খুঁজে পায় ‘পথে হলো দেরি’র মল্লিকা, ‘উত্তর ফাল্গুনী’র ব্যথিত মা ও কন্যা। অপূর্ব অভিনয়শৈলী হৃদয়িক মহিমায় তাকে কেবলই উচ্চ শিখরে নিয়ে গেছে।
বলা যায় উত্তম-সুচিত্রা অভিনীত ৩০টি ছবি বাংলা সিনেমায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। যখন পর্দায় দু’জনকে দেখা যেতো তখন তা আর অভিনয় থাকেনি, হয়ে উঠেছে বাঙালির জীবন কাহিনীর দৃশ্যমান সহজ চলচ্চিত্র। অসধারণ ব্যক্তিত্বে দু’জনই কিংবদন্তি- কী চলনে, কী বলনে। এখনো সুচিত্রা উত্তমের ছবি চ্যানেলগুলোয় প্রদর্শনের সময় বাংলা সিনেমার দর্শককুল দয়িতা অথবা প্রেমিক হয়ে ওঠে।


আমি যখন সুচিত্র সেনকে খুঁজে পাই তখন তিনি প্রায় অভিনয় ছেড়ে দেয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করেছেন। অর্থাৎ সত্তর দশকের প্রথম দিকে। ১৯৭৮ সালে তার অভিনীত শেষ বাংলা ছবি ‘প্রণয়পাশা’ মুক্তি পায়। এরপর রুপালি পর্দা থেকে অবসর নিয়ে লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যান তিনি। ধর্মের প্রতি গভীর অভিনিবেশ তাকে জাগতিক চাওয়া-পাওয়ার ঊর্ধ্বে নিয়ে যায়। শেষ দিকে বলতেন, ‘এক সময় বাসনার রূপ ছিলাম। তাই এখন সরিয়ে নিয়েছি নিজেকে ওই চোখগুলো থেকে অনেক দূরে।’
প্রায় ৩৫ বছরের আলো ঝলমল জীবন তাকে ধরে রাখতে পারেনি। গৃহকোণে নিভৃতে ঈশ্বরের খোঁজে বসবাস করে সাধারণ হয়ে বাঁচতে চেয়েছেন। ১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই উত্তম কুমারের মৃত্যুর পর তার গলায় মালা রেখে গিয়েছিলেন। এরপর মিড়িয়ার সঙ্গে কথা বলেনি। একাকী নিসঙ্গ জীবন যাপন।
হলিউডের গ্রেটা গার্বো, টালিউডের সুচিত্রা সেন খ্যাতির তুঙ্গে থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছিলেন। গ্রেটা গার্বো ১৯৪১ ও সুচিত্রা ১৯৮০ সালে। প্রচারের হ্যালোজেন থেকে স্বেচ্ছায় নিবার্সিত দুই কিংবদন্তি ফিরে আসেননি রুপালি পর্দায়। তারা অধরা মাধুরী। দুই নারী ঢেকে রেখেছেন তাদের গভীর গোপন সেই অন্ধকার, পিচ্ছিল গহ্বর, ব্যক্তিগত জীবন।
২০১৪ সালের ১৭ জানুয়ারি কলকাতার এক হালপাতালে ৮৪ বছর বয়সে শেষ হয় তার বর্ণাঢ্য জীবনচরিত। রেখে যান এক মাত্র কন্যা মুনমুন সেন এবং নাতনি রিয়া সেন ও রাইমা সেন। তারা হিন্দি ছবিতে উত্তরাধিকারের উজ্জ্বল উপস্থিতি রেখেছেন।
আর আমি নামক মানুষ যে নারীর ঊর্ণনাভে জড়িয়ে মধ্যাহ্নে পৌঁছে গেছি, আজও তার প্রতি অণুরাগের এতোটুকু কমতি নেই। তাকে সন্ধান করতে করতে এক সময় মনে হয়েছে, আমার কিছুই হারায়নি। এমন মগ্নতায় কি ছল থাকে? সুচিত্রা সেন অভিনীত চরিত্রগুলো হেঁটে আসে- কখনো রমা, কখনো মল্লিকা। মল্লিকা বলছেন, ‘আমার মনে হচ্ছে আমাদের ভালোবাসা দেখার জন্য ওই কাঞ্চনজংঘার নিচে এতো সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছে...। ভাটার ফুল ঝরে যাবে, চাঁদ ডুবে যাবে। কিন্তু আজকের লগন কোনো দিন শেষ হয়ে যাবে না।’
প্রিয় সুচিত্রা সেন, আপনার চোখের মায়াময় দ্যুাতি, হৃদয়কাড়া হাসি, অব্যক্ত ক্রন্দনের দৃশ্যকল্প খুঁজে খুঁজে এতো দিন-রাতের মুগ্ধতা তা কি বিস্মরণের অকূলে হারিয়ে যেতে পারে? আপনাতে চোখের তারায় ক্রুশবিদ্ধ করেছি। বর দিন, তিন পুরুষের প্রণয়পাশার খেলোয়াড় কেমন কাঙাল হয়ে আছে।

 

 

Read 370 times

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…