তিন কুড়িতে দেড় কুড়ি

 তিন কুড়িতে দেড় কুড়ি

 

 

‘আমরা নূতন যৌবনেরই দূত।

                আমরা চঞ্চল, আমরা অদ্ভুত।

                                 

 

রবি ঠাকুরের এ লেখায় মনে হতেই পারে, গতি যেমন জীবনের অনুভূতি ঠিক তেমনি চঞ্চলতা তারুণ্যের। যে চটপটে আর চঞ্চল তাকেই কম বয়সের প্রতীক ধরা হয়।

তারুণ্যের গল্প অনেকটা এ রকম হতে পারে- ‘হাই সুইটি, কাম অন লেটস ডান্স।’ ক্লাবের অনুষ্ঠানে মাহমুদ এভাবেই আহ্বান জানালেন বন্ধুপতœী সোহেলি পারভীনকে। গত জুনে মাহমুদ ৬০ অতিক্রম করে ৬১ বছরে পা দিয়েছেন! আর সোহেলি তার চেয়ে প্রায় অর্ধেক বয়স। এভাবেই মাহমুদ মত্ত থাকেন, মাতিয়ে রাখেন বন্ধুবান্ধবকে। ক্লাবের অনুষ্ঠান, পিকনিক, স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ-নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট ম্যাচ- সব জায়গাতেই তার সরব ও স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি। তিনি আসরে থাকা মানেই আসর প্রাণবন্ত। চমৎকারভাবে শরীরটাকেও ফিট রেখেছেন। মেদহীন একহারা গড়ন তার শরীরের। ভোরে নিয়মিত হাঁটেন, ব্যায়াম করেন। সন্ধ্যায় কয়েক মিনিট যোগ ব্যায়াম সেরে নেন। তাকে দেখে বোঝার উপায়ই নেই, তিনি অবলীলায় পার করেছেন তিন-তিনটি কুড়ি একযোগে।

বয়স কিংবা সময়- এ ভাবনাটি থাকে মনে কিংবা মস্তিষ্কে। সবাই বড় হতে চান। তবে কেউই বুড়ো হতে চান না। ৩০ বছর পার হতে না হতেই যদি নিজেকে বয়স্ক মানুষ ভাবতে থাকেন তাহলে দেহ ও ত্বকে এর প্রভাব অবশ্যই পড়বে। সবকিছুর দোষ বয়সের কাঁধে চাপিয়ে দেবেন না। মনের ভেতর ইচ্ছাশক্তি জাগিয়ে রাখুন। দেহ ও ত্বকে তারুণ্য ধরে রাখতে কাজ করুন। কল্পনায় ফেলে আসা দিনগুলো দেখতে থাকেন। কিন্তু কেমন হয় যদি চল্লিশের কোঠা পার হয়েও নিজের মধ্যে  ত্রিশের তারুণ্য ধরে রাখতে পারেন!

তারুণ্য ধরে রাখতে শারীরিক ব্যায়াম করা যতটা জরুরি ঠিক ততটাই গুরুত্বপূর্ণ মানসিক ব্যায়াম। কিছু প্রয়োজনীয় বিষয় খেয়াল করে চলতে পারলে আপনিও ধরে রাখতে পারবেন আপনার তারুণ্য। যদি আমাদের জীবনধারা ও খাবার তালিকায় কিছু পরিবর্তন করি তাহলেই আমরা অনেক বয়স পর্যন্ত চেহারায় তারুণ্য বজায় রাখতে পারি গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর কিছু মনের ব্যায়াম এবং তারুণ্য ধরে রাখার কিছু কৌশল

তুলে ধরা হলো-

 

 

ঘুম : সঠিক সময়ে ঘুমানো, রাত না জাগা, পর্যাপ্ত ঘুম এবং ভোরে ঘুম থেকে উঠলে শরীর সতেজ রাখে। অযথাই বেশি রাত জাগবেন না। প্রতিরাতে অন্তত ৬-৭ ঘণ্টা ঘুমান।

হাসি-কান্না : অনাবিল হাসি আমাদের হার্টের জন্য উপকারী। গবেষণায় দেখা গেছে, মনখুলে হাসলে আয়ু বাড়ে। এমনকি চোখের জল ঝরানো কান্নাও যে স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে তা বহু বছর ধরেই ছিল অজানা। ইউনিভার্সিটি অফ সাউথ ফ্লোরিডা ফাউন্ড ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় দেখা গেছে, কান্নার পর যে কোনো মানুষই বেশ স্বস্তি অনুভব করে।

 

বিভিন্ন মানসিক চ্যালেঞ্জ গ্রহণ : মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে মনটাকে কাজে ব্যস্ত রাখার কোনো বিকল্প নেই। ছোটবেলায় আমারা নানান খেলার ছলে মনের ব্যস্ত রাখতাম। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের বহুবিধ মানসিক চাপ বেড়েছে। তাই মনকে নান বিষয়ে ব্যস্ত রাখতে হবে।

মানসিক চাপ থেকে দূরে থাকুন : মানসিক চাপের কারণে ত্বকে, বিশেষ করে মুখের ত্বকে রিংকেল পড়তে দেখা যায়। এছাড়া চুল পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে ধরা হয় মানসিক চাপ। মানসিক চাপ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট করার বেশ বড় একটি কারণ। অন্যদিকে অনেকেই মানসিক চাপে পড়লে শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন।

সঙ্গীর সঙ্গে শারীরিক ও মানসিক সুসম্পর্ক বজায় রাখা : সঙ্গীর সঙ্গে শারীরিক ও মানসিক সুসম্পর্ক বজায় রাখাটা তারুণ্য ধরে রাখার জন্য অত্যন্ত জরুরি।

রাগ বা ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ : রাগ যতটা সম্ভব কমিয়ে ফেলুন। কারণ রাগলে মুখের চামড়ায় ভাঁজ পড়ে যায়। রাগ ও ক্রোধ মানসিক চাপ তৈরি করে, মুখে বলিরেখার সৃষ্টি করে, মানসিক স্বাস্থ্যহানি করে। তাই রাগের মতো নেতিবাচক অনুভূতি থেকে যতোটা সম্ভব দূরে থাকা উচিত।

বন্ধুত্ব : সব সামাজিক সম্পর্কের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে বন্ধুত্ব। গবেষণায় জানা গেছে, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গ

আপনাকে মানসিকভাবে চাঙ্গা করে তুলতে পারে এমনভাবে যা প্রতিদিন তিন কাপ চায়ের সমপরিমাণ এনার্জির কাজ করে। এছাড়া অবসাদগ্রস্ততা ও একাকিত্ব সরিয়ে জীবন কর্মমুখর করে তুলতে বন্ধুদের আড্ডার বিকল্প নেই। ব্রিগহাম ইয়ং ইউনিভার্সিটির ছাত্রছাত্রীদের ওপর এক গবেষণায় জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বন্ধুদের সঙ্গ আপানার পরিবেশ ও আচরণে শতকরা ৫০ ভাগ ইতিবাচক ভাবনা এবং শারীরিক সুস্থতা গড়ে তুলতে সক্ষম।

নতুন কিছু জানার আগ্রহ : সম্প্রতি ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলসের এক গবেষণায় দেখা গেছে মস্তিষ্কের উন্নয়নের ক্ষেত্রে ওয়েব ব্রাউজিং ও ওয়েব পেইজ সার্চিং বিশেষ ভূমিকা রাখতে সক্ষম। শুধু তা নয়, ভাষাগত জ্ঞানের উন্নতি সাধনেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে ওই ওয়েব সাইটগুলো।

সঠিক পরিচর্যার অভাবে অনেকেই বুড়িয়ে যান অল্প বয়সেই। উল্টোদিকে তাকালে অপেক্ষাকৃত বয়স্কদের বেশ ফিট ও ছিমছাম দেখা যায়। শুধু চেহারায় তারুণ্য ধরে রাখতে নয়, পুরো শরীরে চাঙ্গা ভাব ধরে রাখতে স্বাস্থ্য সচেতন হওয়া জরুরি।

 

এই বিষয়ে একটু জেনে নেয়া যাক -

 

প্রচুর পানি পান করুন : পানি দেহ, ত্বক ও দেহের অভ্যন্তরীণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের জন্য বিশেষভাবে জরুরি। নিষ্প্রাণ ত্বক, কিডনির ক্ষতি, দুর্বলতা এবং একই সঙ্গে মনের বার্ধক্যের জন্য দায়ী পানিশূন্যতা। প্রতিদিন নিয়মিত ৬ থেকে ৮ গ্লাস পানি পান দেহ রাখে টক্সিনমুক্ত, সুস্থ ও সবল এবং ধরে রাখে তারুণ্য।

সুষম খাবারের তালিকা : খাবারের তালিকায় টমাটো, রসুন, খেজুর জলপাই তেল বেদানা রাখুন। টমাটো বয়স ধরে রাখতে সাহায্য করে। রসুনটিকে বহু রোগের ওষুধ ধরা হয়। খেজুর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। জলপাই তেলে রয়েছে শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট পলিফেনল। তা বার্ধক্যজনিত রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে। জলপাই তেল হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকিও কমায়। এছাড়া জলপাই তেলে থাকা ভিটামিন ‘এ’ ও ‘ই’ ত্বকের কুঁচকে যাওয়া রোধ করে। নিয়মিত যে কোনো বাদাম খেলে ত্বক সতেজ ও সুন্দর থাকে।

বয়সটা বেড়েই চলেছে প্রতিনিয়ত। কোনোভাবেই যেন ধরে রাখা যাচ্ছে না। যে পোশাকই পরছেন না কেন, কিছুই যেন ঠিক মানাচ্ছে না ইদানীং। কোন পোশাক পরলে বয়সটি একটু কম দেখাবে তা নিয়ে ভাবনা-চিন্তারও শেষ নেই। সঠিক পোশাক নির্বাচন করলে আপনার বয়স কমে যাবে অনেকখানি। তাছাড়া সঠিকভাবে পোশাক পরলে আপনাকে বেশ স্লিম ও স্টাইলিশও দেখাবে।

আসুন তাহলে জেনে নেয়া যাক কোন পোশাক কীভাবে পরলে বয়স কিছুটা হলেও ঢেকে যাবে-

পোশাকে পরিবর্তন আনুন : একটু বয়স বেড়ে গেলে ওই পুরনো ধাঁচের পোশাক পরলে বেশ একঘেয়ে ও বয়স্ক দেখায়। তাই বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পোশাকে বেশকিছু পরিবর্তন নিয়ে আসতে হবে। যেমন- পুরনো ধাঁচের পোশাক পরতে চাইলে সঙ্গে স্টাইলিশ জ্যাকেট, ফ্যাশনেবল জুতা বা ঘড়ি অথবা হাল ফ্যাশনের কোনো ব্যাগ কিংবা বেল্ট নিয়ে নিন। এতে পোশাকের চেহারাই পাল্টে যাবে।

সঠিক মাপের পোশাক : বয়স হয়ে গেলে ঢিলেঢালা পোশাক পরেন অনেকেই। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যদি সঠিক মাপের পোশাক না পরা হয় তাহলে দেখতে আরো বয়স্ক দেখায়। তাই নিজের জন্য পোশাক কিনতে গেলে সঠিক মাপ দেখে কিনুন। পোশাক বেশি আঁটসাঁট হলেও খারাপ দেখাবে আবার বেশি ঢোলা হলেও বয়স বেশি দেখাবে।

উজ্জ্বল রঙ : আমাদের দেশে প্রচলিত আছে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পোশাকের রঙও হালকা হতে হয়। কিন্তু এটি একটি ভুল ভাবনা। বয়স বেড়ে গেলে হালকা রঙের কাপড় পরলে আরো ম্লান দেখায়। বয়সের সঙ্গে পোশাকের রঙও উজ্জ্বল হওয়া উচিত। লাল, কমলা, উজ্জ্বল নীল, সবুজ ইত্যাদি রঙগুলোর পোশাক পরলে আপনার বয়স কম দেখাবে আবার গায়ের রঙটাও বেশ উজ্জ্বল লাগবে। আপনি যদি উজ্জ্বল রঙের পোশাক পছন্দ না করে থাকেন তাহলে আপনার হালকা রঙের পোশাকটির সঙ্গে একটি উজ্জ্বল রঙের ওড়না, টাই, বেল্ট ইত্যাদি নিয়ে নিন। আনেকটাই তরুন দেখাবে আপনাকে।

কাপড়ের ধরন : পোশাকের জন্য কাপড়ের ধরনের ওপরও আপনাকে কতোটুকু তরুন দেখাবে তা নির্ভর করে। যেমন- চকচকে স্যাটিন কাপড় পরলে বয়স বেশ খানিকটা কম দেখায়। আবার একটু বড় ধরনের প্রিন্টের পোশাক পরলেও বয়স লুকনো যায় বেশখানিকটা। তাই বয়স তারুণ্যের জন্য ভিন্ন টেক্সচারের পোশাক পরে দেখুন কোনটায় আপনাকে বেশি মানাচ্ছে।

পোশাক নির্বাচন : বয়সের সঙ্গে মানানসই পোশাক নির্বাচন করাটা বেশ কষ্টসাধ্য। তাই ওই সময় কী পরা উচিত-অনুচিত তা নিয়ে অনেকেই দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগে থাকেন। সঠিক পোশাক নির্বাচন করে নিতে পারলে আপনার বয়স ঢাকার পাশাপাশি আপনাকে রুচিশীল ও ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন লাগবে। তাই সঠিক পোশাক নির্বাচন করে বয়সটি লুকিয়ে ফেলুন সহজেই।

 

পরিশেষে বলা যায়, তারুণ্য থাকে অবচেতনে যা আচরণের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। প্রকৃতির নিয়মে সময়ের সঙ্গে বেড়ে যায় বয়স। এটি জিনগত বৈশিষ্ট্য। তবে এর মধ্যে অনেকেই তারুণ্য ধরে রাখেন। তারুণ্যের কাছে হার মানে তাদের বয়স। বয়স বেড়ে যাওয়া মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে হলেও তারুণ্য ধরে রাখা একেবারেই কঠিন কাজ নয়। সহজ কিছু নিয়ম মেনে চললেই বয়সকে হার মানিয়ে আপনিও হয়ে উঠতে পারেন আরো সুন্দর, তরুণ, স্নিগ্ধ ও প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর।

 

___________________________________________________________________________

লেখা : ঋভু অনিকেত

মডেল : এনায়েত কবির  

ছবি : সাঈদ সিদ্দিকি

শোভন আচার্য্য অম্বু

 

 

 

Read 2245 times

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…