স্ট্রেস...

 

স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট বা মানসিক চাপ কীভাবে কমাবেন, কী করবেন...
‘ক্লান্তি আমায় ক্ষমা করো প্রভু, পথে যদি পিছিয়ে পড়ি কভু!- এ গানের কথাগুলোয় হতাশা, ভীতি, এংজাইটি ও স্ট্রেসের ছায়া কি পাওয়া যায়? নাগরিক ব্যস্ততার এই দৈনন্দিন জীবনে ওই গানের লাইনগুলো প্রায়ই কি আমাদের মনে পড়ে না কারো কারো? হ্যাঁ হতাশা, আক্ষেপ ও ক্লান্ত-শ্রান্ত হৃদয়ের থেকে বেরিয়ে আসা দীর্ঘশ্বাসটি আসলে আমাদের মধ্যে মানসিক চাপ বা স্ট্রেসেরই সৃষ্টি করে।
স্ট্রেস শব্দটি যেন আমাদের দৈনন্দিন কর্মকা-ের সঙ্গে আজ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রতিদিনের প্রতিযোগিতামূলক জীবন ভূমিকায় আমরা প্রতিনিয়ত হিমশিম খাচ্ছি, হয়ে পড়ছি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত, প্যানিকড। তবে দুশ্চিন্তা, এংজাইটি- এসব স্ট্রেস নয়। স্ট্রেস হচ্ছে, আমাদের পারিপার্শ্বিক যে কোনো পরিবর্তন যা নিজের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। এটিই হলো ‘স্ট্রেস’। আর ওই স্ট্রেস মোকাবেলা করেই যিনি যতো বেশি চলতে জানেন তিনিই হন ততো সফল। তবে কে কীভাবে স্ট্রেস মোকাবেলা করবেন তা অনেকটাই নির্ভর করে তার বংশগত জিনের ওপর। এর সঙ্গে রয়েছে মানুষের স্বীয় ব্যক্তিত্ব অনুযায়ী লড়াই করে চলার স্বভাবটিও।
ল্যাটিন শব্দ ‘স্ট্রিং’ মানে ‘টু ড্র টুগেদার’। এখান থেকেই ‘স্ট্রেস’ শব্দটি এসেছে। আরেকটি ল্যাটিন শব্দ ‘টেনসিও’ থেকে টেনশনের উৎপত্তি। শব্দটি পাশ্চাত্যের হলেও এই সমস্যায় ভুগছেন বিশ্বের প্রায় সব দেশের মানুষ। সাধারণত মানুষের মনের দুটি অবস্থা আছে। এক. স্বাভাবিক বা নরমাল এবং দুই, অস্বাভাবিক বা অ্যাবনরমাল। স্ট্রেস বা মানসিক চাপ আমাদের নিয়ে যায় ওই দু’য়ের মাঝামাঝি। আসলে শারীরিক, মানসিক কিংবা ইমোশনাল- যে কোনো বিষয় নিয়ে বাড়তি চিন্তাটিই আমাদের মনে ‘স্ট্রেস’-এর সৃষ্টি করে।

স্ট্রেসের কিছু ক্ষতিকর দিক আছে। তা হলো-

স্ট্রেসের কারণে দ্রুত রক্তচাপ বেড়ে যায়, হার্টবিট
দ্রুততর হয়।
ওজন বেড়ে যায়। কারণ তখন খাওয়াও বাড়ে।
হরমোন ডিসব্যালান্স হয়ে যায়।
মানসিক চাপে ত্বক কালো, শুষ্ক হয় ও ব্রণ জন্ম নেয়।
সোরাইসিস, রোসিয়া, অ্যাগজিমা, অ্যালার্জি বেড়ে যায়।
ত্বক প্রাণহীন ও স্পর্শকাতর হয়ে পড়ে।

স্ট্রেসের কারণ
ঘড়ি কাঁটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার তাড়া, অফিসে কাজের চাপ, সংসার জীবনে ক্রমাগত কাজের ভারে হাঁপিয়ে ওঠা কিংবা সামাজিক দায়বদ্ধতার মতো যে কোনো কিছুই হতে পারে কারো জন্য মেন্টাল স্ট্রেস বা মানসিক চাপের কারণ। পরীক্ষাভীতি, বেকার জীবন- এসবও স্ট্রেসের খুব সাধারণ কারণ হতে পারে। তবে প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে চলার ক্ষমতা ও টাইম ম্যানেজমেন্টে যিনি যতো বেশি দক্ষ, তিনি ততো বেশি স্ট্রেস ম্যানেজ করে চলতে পারেন।
যাহোক, স্ট্রেস ম্যানেজমেন্টের কিছু অতি সাধারণ অভ্যাস এই মানসিক চাপ বা স্ট্রেস থেকে অনায়াসেই আমাদের মুক্তি দিতে পারে। এটি নিয়ন্ত্রণে যা করতে হবে তা হলো-
সকালে নির্দিষ্ট সময়ের ১৫ মিনিট আগেই ঘুম থেকে ওঠার চেষ্টা করতে হবে। এক্ষেত্রে অলসতা অবশ্যই পরিত্যাজ্য।
মর্নিং ওয়াক করতে হবে। তা পার্ক বা উদ্যানে না হলেও নিজের বাগান, বারান্দা বা ছাদে হাঁটা যেতে পারে। সকালের বিশুদ্ধ বাতাসে হাঁটাহাঁটির অভ্যাস সারা দিনের জন্য বাড়তি মানসিক শক্তি জোগায়।
সকালের নাশতা সময় নিয়ে খেতে হবে। তাড়াহুড়ায় অনেকেই নাশতা না করে বের হয়ে যান বা অফিসেই খেয়ে নেন কিছু একটা। এটি অনেক বড় ভুল চর্চা। বরং সকালের সময়টুকু এমনভাবেই ম্যানেজ করতে হবে যাতে বেশখানিকটা সময় নিয়ে ব্রেকফাস্ট করা যায়। এতে সারা দিনের কাজে এনার্জি লেভেল দিনের শুরুতেই অর্জন করা যায়।
কর্মজীবী বা গৃহে যারা কাজ করেন তাদের জন্যই সকালে ১০ থেকে ১৫ মিনিট সময় নিয়ে কী কী কাজ করতে হবে এর তালিকা তৈরি করে ফেলা একটি ভালো উপায়।
কাজের মধ্যে বিরতি দিতে হবে। টানা কাজ মেন্টাল স্ট্রেস বাড়ায়। প্রতি এক ঘণ্টায় কাজের পর অন্তত ১০ মিনিট সিট থেকে উঠে হাঁটা উচিত।
অনুরোধে ঢেঁকি গেলার অভ্যাস পরিত্যাগ করতে হবে। অকারণে অন্যকে খুশি করা কিংবা অযাচিত ভয়ে সব কাজ মাথা পেতে নেবেন না।
স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণের একটি ভালো উপায় হলো যোগ ব্যায়াম। যেমন- দুপুরে লাঞ্চের পর যে সময় একটু ঘুম ঘুম ভাব চলে আসে, ওই সময় গভীর একটা শ্বাস নিয়ে তিন সেকেন্ড ধরে রাখুন। এভাবে পর পর পাঁচবার শ্বাস নেয়া আর ছেড়ে দেয়ার ব্যায়াম করলে শরীর বেশ চাঙ্গা হয়ে ওঠে।


অনেকে আছেন, অফিস থেকে ফিরেই সংসারের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এটি কখনোই করা যাবে না। বরং পারলে আরামদায়ক গোসল আর চা পর্ব সেরেই বাড়ির কাজে মাথা ঘামানো যেতে পারে।
নিজের জন্য আলাদা একটু সময় বের করা আমাদের মানসিক শান্তির জন্য অবশ্যই প্রয়োজন। এটি হতে পারে টিভি দেখা, বই বা পত্রিকা পড়া অথবা অন্য কোনো কিছু।
অনেকেই বলেন, রাতে ঘুম হয় না। নানান চিন্তা আসে। অনেকের কাছেই ওই রাত হলো আগামীকাল নিয়ে ভেবে ভেবে ঘুম হারামের কারণ। এ দলটিই হচ্ছে ভয়ঙ্কর মানসিক চাপের রোগী। কাজেই মানসিক চাপ তথা স্ট্রেস থেকে বাঁচতে হলে অহেতুক ভাবনা-চিন্তা মাথা থেকে বের করে ফেলতে হবে। মৃদু শান্ত সঙ্গীত কিংবা মেডিটেশনও ভালো ঘুম আনতে সহায়ক হতে পারে।
মানসিক চাপ কমাবার জন্য একটি অনন্য মাধ্যম হলো হাসি। প্রাত্যহিক জীবনে হাসির উপাদান রাখতে হবে। হাসতে পারেন এমন বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়ে দেয়া উচিত। অযথা নেতিবাচক কথাবার্তা বলা বা দূরভিসন্ধিমূলক আচরণের সঙ্গ পরিত্যগ করাই ভালো। হাসি আমাদের জীবনীশক্তি। হাসির মুভি, কমিকস- এসব উপাদানও মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে।
শিশুদের সঙ্গে সময় কাটানো অভ্যাসটিও মানসিক চাপ কমায়। শিশুদের সঙ্গে খেলা, হাসা, ছেলেমানুষি কিছুক্ষণের জন্য হলেও আমাদের স্ট্রেসমুক্ত করে তোলে।
প্রতিটি পরিস্থিতির ভালো ও খারাপ- দুটি দিকই আছে বা থাকতে পারে। পজিটিভ দিকটি দেখার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। আমাদের অবচেতন মনের সার্বক্ষণিক চিন্তাই আমাদের চেতন মনকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং ওইদিকেই জীবন ধাবিত হয়। তাই পজিটিভ দিক দেখার বিষয়টিকে প্রাধান্য দিতে হবে।
‘না’ বলতে শিখুন। মাঝে মধ্যে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে না বলার অভ্যাসটাও করুন। অবশ্য বিনয়ের সঙ্গে এবং কেন না বলতে বাধ্য হচ্ছেন ওই কারণটি সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করুন। ফলে স্ট্রেস তৈরি হওয়ার আশঙ্কা একেবারে গোড়াতেই দূর করা যাবে।

স্ট্রেসে করণীয়
স্ট্রেস ও টেনশন হলে মাথায় খুশকি হয়। চুল পড়ে যায়। এ জন্য রোজ ড্যানড্রাফযুক্ত শ্যাম্পু ব্যবহার করা উচিত। চুল পড়া কমে যাবে।
স্ট্রেস হলে হরমোন ডিসব্যালান্স হয়। ফলে মুখে ব্রণ হয়। রোজ ভালো করে হারবাল ফেসিয়াল ক্লিনজার দিয়ে মুখ পরিষ্কার করা উচিত। লবঙ্গযুক্ত ক্রিম লাগালে ব্রণ কম হবে।
টেনশন বা স্ট্রেসের কারলে মুখে পিগমেন্টেশন হয়। এতে কালো হয়ে যায় মুখ। রোজ দুধ দিয়ে মুখ ধুলে মুখ পরিষ্কার থাকবে।
স্ট্রেস বা টেনশন হলে সোরাসিস বা রোসিয়া হলে ময়শ্চারাইজার লাগাতে হবে। এ জন্য চিকিৎসককেও দেখানো উচিত।
পরিশেষে বলা যায়, দৃঢ় মানসিকতা গড়ে তুলতে হলে এবং আনন্দময় নির্মল জীবন যাপনের হাতিয়ারই হলো কিছু সুঅভ্যাস ও আত্মসচেতনতা। একটু সচেতনতার সঙ্গে প্রাত্যহিক জীবনের কর্মকা- পরিচালনা করলেই জীবন হয়ে উঠবে অনাবিল সুন্দর। সবার স্ট্রেস বা মানসিক চাপবিহীন সুন্দর জীবন কামনা করছি।

 

__________________

লেখা : শায়মা হক
মডেল : মোউশান
ছবি : স্বাক্ষর

Read 121 times

Leave a comment

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

Twitter feed

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…