সেকেন্ড ইনিংস

সেকেন্ড ইনিংস

 

সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হলো পরিবার। পরিবার আমাদের ব্যক্তি চরিত্র বিনির্মাণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে আসছে। পরিবার ছাড়া সমাজ, এমনকি রাষ্ট্রও অলীক। তাই মানব সভ্যতার প্রাথমিক ও চূড়ান্ত স্থানটি আজও পরিবারের। দেশে দেশে পরিবার বিভিন্নতর হলেও এর মৌলিক ভিত্তি একই। যৌথ পরিবার ভেঙে ভেঙে পরিবারের বিভিন্ন আদল আমরা দেখতে পাই। এতেও পরিবারের প্রতি মানুষের আস্থা ও প্রত্যাশা কমেনি। আর এই পরিবার টিকে থাকে আস্থা, ভালোবাসা, বিশ্বাস ও নির্ভরতায়। পরিবার তৈরি এবং টিকিয়ে রাখতে বিয়ে অনিবার্য আমাদের সমাজ ব্যবস্থায়। এই বিয়ের ভবিষ্যৎ পরিবারের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। এ জন্য বিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিয়ের নানান প্রস্তুতির সঙ্গে সঙ্গে মানসিক কিছু প্রস্তুতির প্রয়োজন আছে। দেখলাম, ভালো লাগলো, ধুম করে বিয়ে করো- এসবই ভুল চিন্তা ও কাজ। এটি অস্বাস্থ্যকর দাম্পত্য জীবনের সূচনা করে। পশ্চিমা এক সাইকোলজিস্ট ও ম্যারিজ কাউন্সিলরের একটি লেখায় তিনি জোর দিয়েছেন বিয়ের আগে থেকে বিয়ে-পরবর্তী দায়িত্বগুলো নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার ব্যাপারে। পারিবারিক এবং ব্যক্তিগত পারস্পরিক দায়িত্ব গ্রহণ ও পালন এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।


বিয়ে হচ্ছে দুটি মন ও মানুষের এমন এক রসায়ন যা মিলে গেলে খুবই ভালো, না মিললেই তা হয়ে ওঠে হৃদয়বিদারক। আবার বিয়েটিকে আধা মিল ও আধা গরমিলের টান টান উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচের সঙ্গে তুলনা করলে অত্যুক্তি হবে না। খেলায় যেমন হার-জিত থাকে তেমনি সামাজিক এ সম্পর্কটিতেও হার-জিত আছে। বিয়েতে সফল হতে না পারলে বা সম্পর্ক রক্ষায় হেরে গেলে সারা জীবন মাথা হেট করে নিজেকে অসফল ভাবার কিছু নেই। জীবন তো বহতা নদী। আর সামাজিক জীব হওয়ার কারণে মানুষের পক্ষে একা থাকা সম্ভব নয়। তাই প্রথম ইনিংসে হেরে যাওয়া খেলোয়াড় অনায়াসে খুঁজে নিতে পারেন দ্বিতীয় আরেক পার্টনার।বিয়ের পর দু’জন নতুন মানুষ এক সঙ্গে থাকতে শুরু করলে সহনশীলতা খুবই দরকার পড়ে। মূলত নিজের ‘প্রাপ্তি’ বা ‘আকাক্সক্ষা’ নিয়ে বেশি বেশি ভাবলে প্রবঞ্চিত অনুভব করার আশঙ্কা থেকেই যায়। যে কোনো শূন্যতাই মানুষকে তা পূরণে তাগিদ দেয়। সেটি মানসিক হলে মানসিক এবং জৈবিক হলে জৈবিক।


অনেকে বিয়ের গাঁটছড়া বেঁধে বেশ কিছুদিন এক সঙ্গে পার করে দেয়ার পর বুঝতে পারেন তারা ভুল মানুষকে বেছে নিয়েছিলেন। অনেক দ্বিধা ও ঝক্কি-ঝামেলা পেরিয়ে আলাদা হওয়ার পর আবার নতুন করে জীবন নিয়ে ভাবতে শুরু করেন অর্থাৎ দ্বিতীয়বার নতুন কারো খোঁজ করেন।
সুন্দর একটি আদর্শ কল্পনার জগতে পুরুষ ও নারীরা বিয়ে করবেন, এক সঙ্গে দীর্ঘ ও সুখের জীবন কাটাবেন এবং প্রায় একই সময়ে এই দুনিয়া ছেড়ে চলে যাবেন। এক্ষেত্রে কখনোই দ্বিতীয় বিয়ের প্রয়োজন হবে না। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এমনটি হয় না।
আমরা এমন এক জগতে বাস করি যা নিখুঁত কিংবা আদর্শ নয়, বরং নিখুঁত থেকে অনেক দূরে। মানুষ কখনো কখনো অল্প বয়সে মারা যায় তাদের দুঃখী সঙ্গীদের একাকী পেছনে ফেলে। বেশির ভাগ বিয়েই কেবল
তালাকের মাধ্যমেই শেষ হয় না।

 


মজার বিষয় হচ্ছে, দ্বিতীয় বিয়ের মধ্যে তালাকের হার প্রথম বিয়ের তুলনায় বেশি। কেউ হয়তো ভাবতেই পারেন, যার বিয়ে বিচ্ছেদ হয়েছে তার একটা শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা হয়েছে। তাই হয়তো অতীতের ভুলগুলোর আর পুনরাবৃত্তি করবেন না। এক্ষেত্রে প্রায়ই তা হয় না। যারা নির্দিষ্ট চাহিদা পূরণের জন্য বিয়ে করেন কিন্তু এর পরিবর্তে নিজেরা কিছুই করতে প্রস্তুত নন তারা একই অভিপ্রায় নিয়ে সাধারণত দ্বিতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসেন। এক্ষেত্রে দ্বিতীয় বিয়ে কঠিন ঝুঁঁকিপূর্ণ রাস্তায় ঘোড়া চালানোর মতোই বিপজ্জনক ও নতুন দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।একটা সময় ছিল যখন বাঙালি সংস্কৃতির মূল সৌন্দর্য ছিল মূল্যবোধ। ওই সময় ছেলেমেয়েরা মনে করতো, পরিবারের সিদ্ধান্তই তাদের জন্য চূড়ান্ত। নিজের চাহিদা বা ভালো লাগা, মন্দ লাগার চেয়েও পারিবারিক সম্মানই তখন বড় করে দেখা হতো।


সময় পাল্টেছে এর আপন গতিতে। এখন যে কোনো কিছুর চেয়ে মানুষ নিজের ভালো লাগা, মন্দ লাগাটাকে বেশি প্রাধান্য দেয় বা দিতে চায়। আগে যেমন দেখা যেতো সন্তানরা পিতার হেঁটে যাওয়া রাস্তায় হাঁটতো, বেছে নিতো পিতার পেশা। এখন আর তা দেখা যায় না মোটেও। বিয়ের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়। এখন ছেলেমেয়েরা পরিবারের পছন্দের তুলনায় নিজেদের পছন্দেই বিয়ে করে। সমস্যা সেটি নয়, সমস্যা হলো- বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তারা বিয়ের পর মনে করে, ভুল সঙ্গীকে বেছে নিয়েছে। আর পরবর্তী সমস্যার সূত্রপাত এখন থেকেই। অতঃপর শুরু হয় নতুন সঙ্গী খোঁজার কার্যক্রম। সামাজিকভাবে প্রগতিশীল হলেও এখনো স্বাচ্ছন্দ্যে দ্বিতীয় বিয়ে মেনে নেয়ার মতো উদারতা আমাদের সংস্কৃতি দেখাতে পারেনি। যেখানে আগে মনে করা হতো বেশি বয়সে ভীমরতির কারণেই মানুষ দ্বিতীয় বিয়েতে ঝুঁকে পড়ে সেখানে বর্তমানে অল্পবয়সীদের দ্বিতীয় বিয়েও হচ্ছে উল্লেখযোগ্য হারে। মিড লাইফ ক্রাইসিসের কারণে সৃষ্ট জটিলতাই মানুষকে পরিণত বয়সে অন্য রকম ভাবতে বা সিদ্ধান্ত নিতে প্রভাবিত করে বলে মনে করা হয়। জীবনের এই দ্বিতীয় ইনিংসে যাওয়ার প্রাক্কালে অনেকেরই চোখে ঝলমলে রঙিন চশমা থাকে। তারা সামনে যা কিছু দেখেন তা সবই রঙিন। অনেকে আবার পুরনো সব ভুল শুধরে নতুন করে জীবন শুরুর স্বপ্ন দেখেন। অনেক বিখ্যাত মানুষই দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। অনেকে এর চেয়েও বেশি। এতে তাদের ভেতরকার শূন্যতা কতোটা কমেছে তা বোঝার চেষ্টা হয়তো কেউ করেননি কখনো।

তামাম দুনিয়ায় ভূরি ভূরি নমুনা আছে যেখানে কম বয়সী মেয়েকেই বেশি বয়সের পুরুষ পছন্দ করে বিয়ে করেছেন। উডি অ্যালেন ৫৬ বছর বয়সে ১৯ বছর বয়সের পারভিনের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধেন। ৩১ বছর বয়সে পা দিয়ে ক্যাথরিন জিটা জোনস ৫৬ বছর বয়সের মাইকেল ডগলাসের প্রেমে পড়েন। রুশদির সঙ্গে বিয়ের পর পদ্মালক্ষ্মীকে যখন জিজ্ঞাসা করা হয় ২৩ বছরের বড় একজনকে তিনি কেন বিয়ে করছেন? তখন পদ্মালক্ষ্মী সহাস্যে জানান, রুশদির মতো অমন বুদ্ধিদীপ্ত ফ্লার্ট করতে আর কোনো পুরুষকে তিনি দেখেননি। বিয়ে না টিকলেও রুশদির সঙ্গে কাটানো প্রেমের মুহূর্তগুলোই পদ্মালক্ষ্মীর দাম্পত্যের শেষ কথা ছিল।
৪০ বছর বয়সে জীবন শুরু করা যায় অনায়াসে- এমন কথা ইদানীং মনোবিজ্ঞানীরা বেশ জোর দিয়ে বলে থাকেন। তাই দ্বিতীয় বিয়ের জন্য চল্লিশ-ঊর্ধ্ব বয়স কোনো বাধা নয় বলেই মনে করেন তারা। পরিণত বয়সে বিয়ের সম্পর্ক যৌনতাড়নার পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্টি হয় না বলেই তাদের ধারণা।

নামকরা একটি প্রতিষ্ঠানের সাবেক কর্মী কামাল আহমেদ (৫৭) সম্প্রতি বিয়ে করেছেন ৩৫ বছর বয়সের নাসরিন সুলতানাকে। কামাল জানান,
পরিবারসহ আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব- কারোরই সমর্থন ছিল না ওই বিয়েতে। খুব কাছের বন্ধুরাও ভীমরতির অভিযোগ তুলে দূরে সরে গিয়েছিল। জগিংয়ের সময় নববিবাহিত স্ত্রী নাসরিনের মুখটি মনে করতেই যেন সব ক্লান্তি দূর হয়ে যায় এবং জগিংয়ের স্পিডটিও যায় বেড়ে- হাসিমুখে এ কথা জানান তিনি।

রাফিয়া চৌধুরীর বয়স এখন ৪০ বছর । একা থাকার পরিকল্পনা করে হঠাৎই সরকারি রিটায়ার কর্মকর্তা মোস্তফা মাহমুদের প্রেমে পড়ে যান তিনি। যখন তাদের বিয়ে হয় তখন রাফিয়ার বয়স ৩৭ ও মোস্তফা মাহমুদের ৬৩ বছর। রাফিয়ার মা-বাবাসহ পরিবারের সবাই নিষেধ করেছিলেন। বন্ধুরাও বুঝিয়েছিলেন, ওই বিয়েতে তার খুব শিগগিরই বিধবা হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কিন্তু রাফিয়া এসব কথা উড়িয়ে দিয়েছেন এই বলে, মৃত্যুর কোনো নির্দিষ্ট বয়স নেই। তাছাড়া তিনি সকাল-বিকাল আড্ডায় মাহমুদের সঙ্গে যে উষ্ণতা অনুভব করতেন ওই টান উপেক্ষা করা তার জন্য প্রায় অসম্ভব ছিল। আবেগী কণ্ঠে তিনি এটিও বলেন, মাহমুদের সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো পোশাকি যৌনতার চেয়ে ঢের ভালো।

অল্প পরিচয়ে আজকাল হুটহাট লং ড্রাইভে বেরিয়ে পড়েন অনেকেই কিংবা স্বল্প আলোয় কাটিয়ে দেন ওয়াইন চুমুকের সন্ধ্যা। এছাড়া যদি থাকে চনমনে সুন্দরী কিংবা আকর্ষণীয় সুপুরুষের সঙ্গ তাহলে আর কী চাই!

ফেরদৌসী সাবাহ পরিণত বয়সের বিয়ে নিয়ে অতি উৎসাহী। গল্পে গল্পে তিনি বললেন, নারীদের জন্য বিয়ের নির্দিষ্ট বয়স আছে। কারণ তাদের সঙ্গে মাতৃত্বের বিষয়টি জড়িত। তবে পুরুষদের ক্ষেত্রে এসব ঝামেলা নেই। তাই তারা ৬০ বছর বয়স পার করেও অনায়াসে বিয়ের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। দ্বিতীয় বিয়েতে প্রেম ও যৌনতা দৈনন্দিন জীবনে বৈচিত্র্য নিয়ে আসে এবং আটপৌরে জীবনে যোগ করে অন্য রকম মাত্রা। এখন মানুষের আয়ুর সঙ্গে বাড়ছে জীবন তৃষ্ণাও।
ফেরদৌসী সাবাহ এমন এক সময়ের অপেক্ষা করছেন যখন দ্বিতীয় বিয়ে, অসম বিয়ে, যে কোনো বয়সে বিয়ে- এসব নিয়ে কেউ আর কোনো প্রশ্ন তুলবেন না। কেউ বাঁকা চোখে তাকাবেন না কিংবা দ্বিতীয় বিয়ের পর সবার সঙ্গে মানিয়ে নেয়ার জন্য চারপাশের মানুষকে অনবরত যুদ্ধ করতে হবে না। সেটিই হবে জীবনের সহজ ধারা...। দিন গুনছেন ফেদৌসী সাবাহ।

 

_______________________________

লেখা : এনায়েত কবির
মডেল : আমানুল্লাহ হারুন ও নাহিদ
ছবি : শোভন আচার্য্য অম্বু
কৃতজ্ঞতা : রেফায়েত উল্লাহ

Read 1240 times

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…