তুমি না থাকলে...

তুমি না থাকলে...

 

 

‘চা’ ছোট্ট এক অক্ষরের এ শব্দটিতে মিশে আছে ভোরের আয়েশি আমেজ। একই সঙ্গে রয়েছে রোজকার পত্রিকা পড়ার সময়টুকুর মধুর সঙ্গ কিংবা বিকালের অবসন্নতার নিমেষে চনমনে হয়ে ওঠা ভাবটিও। এছাড়া অফিসের কাজের ব্যস্ততা, যে কোনো ভ্রমণের ফাঁকে কিংবা বন্ধুবান্ধবের আড্ডায় চা ছাড়া ভাবাই যায় না। অন্যদিকে অতিথি আপ্যায়নে দেশ-বিদেশ, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে চা এক অপরিহার্য অনুষঙ্গ। কাজেই সোজা কথায় বলা যায়, এই চা আজ পুরো বিশ্বের মানব জাতির কাছে অতি পরিচিত ও সমাদৃত পানীয়।

অবশ্য চায়ের নানান ধরন আছে। রয়েছে স্বাদ ও গন্ধের ভিন্নতা, এমনকি চা বানানোরও আছে ভিন্ন স্বকীয়তা। দেশ অথবা জাতিভেদে চায়ের পরিবেশনাতেও রয়েছে ভিন্নতা। কিন্তু আজকের এই বহুল পরিচিত বিশ্ব জননন্দিত ও সমাদৃত ওই পানীয়টির জন্ম ইতিহাস কী, কোথা থেকেই বা ওই চা আবিষ্কৃত হয়েছিল তা কি সবার জানা আছে?

এবার বলি চা আবিষ্কারের গল্পটি : খ্রিস্টপূর্ব ২৭৩৭ সালের কথা। চায়নার সম্রাট শেন নাং তার ভৃত্য পরিবেষ্টিত হয়ে জঙ্গলে গিয়েছিলেন এক আনন্দ ভ্রমণে জুন্নান প্রদেশে। খোলা প্রান্তরে গাছের ছায়ায় বসে থাকার প্রাক্কালে সম্রাটের জলপাত্রের ফুটন্ত পানিতে হঠাৎ বাতাসের ঝাপটায় পাশের ঝোপ থেকে কিছু পাতা উড়ে এসে পড়লো। পাতাটি তুলে ফেলার আগেই তা জলের রঙ বদলে ফেললো। সম্রাট শেন কৌতূহলী হয়ে জলের ঘ্রাণ শুঁকে দেখলেন, এতে রয়েছে অন্য রকম এক মাদকতা। তিনি ওই স্বাদ নিলেন ও আনন্দিত হয়ে উঠলেন। পৃথিবীতে আবিষ্কৃত হলো এক নতুন পানীয়।
খুব অল্প সময়ের মধ্যেই চায়ের ঔষধি গুণাবলির স্বীকৃতি পেল যা পরে চায়নার প-িত কর্তৃক অমরত্বের স্পর্শমণি হিসেবে বর্ণিত হয়েছে। খ্রিস্টাব্দ ৪০০ শতকে চায়নার অভিধানে চা স্থান পায় ‘দকুয়াং ইয়া’ নামে। একই সঙ্গে বর্ণনা দেয়া হয় চা তৈরির পদ্ধতি। ৭২৫ খ্রিস্টাব্দে চীনের সম্রাট সরকারিভাবে ওই পানীয়র নাম পরিবর্তন করে নতুন নাম দেন ‘চা’। তা আজ পৃথিবীর অনেক দেশে একই বা কাছাকাছি নামে পরিচিত। কাজেই দেখা যায় চা ও ‘চা’ শব্দটির জন্মস্থান চায়নাতেই এবং চৈনিক শাসক শেন নাং প্রথম চা আবিষ্কারক।

নানান চা, পরিবেশনা, রেসিপি ও উপকারিতা
রাস্তার টঙঘরের বিশাল টগবগে কেটলি থেকে ছোট্ট ছোট্ট কাপে ঢেলে ‘র’ চা শুরু করে রাজকীয় স্বর্ণের পেয়ালায় দুধ, চিনি বা মধু মিশিয়েও তা পরিবেশনার নজির রয়েছে।


জনপ্রিয় টি-ব্যাগ পরিবেশনা
এক পেয়ালা গরম পানিতে টি-ব্যাগের সুতাটি ধরে চুবিয়ে দিলেই হয়ে যায় মন মাতানো রঙের সুগন্ধি চা যা খুবই সুবিধাজনক পদ্ধতি। এই টি-ব্যাগের আগের চেহারাটি মোটেও আজকের দিনের চৌকোণা টি-ব্যাগের মতো ছিল না। বরং পোঁটলা করে যেন এক গোছা চা-পাতাই বাঁধা থাকতো সেখানে। ওই টি-ব্যাগের জন্ম নিয়েও রয়েছে একটি মজার ঘটনা। ১৯০৮ সালে আমেরিকার নিউ ইয়র্কের চা ব্যবসায়ী থমাস সুলিভ্যান ছোট ছোট সিল্কের কাপড়ে তৈরি পুঁটুলিতে করে চায়ের নমুনা তার কোনো এক ক্রেতার কাছে পাঠান। সেই ক্রেতা চাসহ ওই সিল্কের পুঁটুলি গরম পানিতে দিয়ে চা বানানোর চেষ্টা করেন। এই শুনে সুলিভ্যানের মাথায় আসে টি-ব্যাগের ধারণাটি। এরপরই তিনি টি-ব্যাগের প্রচলন শুরু করেন।

 

রঙ চা (‘র’ টি)
বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় ওই কালো চা। চা আমরা সাধারণত লিকার হিসেবে অথবা দুধ-চিনি মিশিয়ে পান করে থাকি। গবেষণায় দেখা গেছে, লিকার চা স্ট্রোকের ঝুঁকি কমায়। এছাড়া এই চা নিয়মিত পান করলে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে তা হতে হবে দুধ ছাড়া চা।


সবুজ চা (গ্রিন টি)
চা গাছের সবুজ পাতা রোদে শুকিয়ে তাওয়ায় সেঁকে এই চা প্রস্তুত করা হয়। সবুজ চায়ের গুণাবিল বলে শেষ করা যাবে না। এতে উচ্চ হারে ক্যাফেইন থাকে যা আপনার স্মৃতিশক্তি উন্নত করতে সাহায্য করে। নিয়মিত এই চা পান করলে ত্বক থাকে টান টান ও সতেজ। সবুজ চায়ের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ক্ষতিকর উপাদান রোধ করে ত্বক বুড়িয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করে। সবুজ চা ত্বকের রোদপোড়া ভাব দূর করে। সবুজ চায়ের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ত্বকের ক্যানসারের সঙ্গে লড়াইয়েও রাখে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। দাঁতের ক্ষয় রোধ, মাঢ়ি মজবুত করা তো এর নিয়মিত কাজেরই একটি অংশ। শুধু তা-ই নয়, ওই চা নিয়মিত পান করলে শরীরের মেদ কোষে গ্লুুকোজ ঢুকতে পারে না। কাজেই ওই সবুজ চা ওজন কমানোর অন্যান্য যে কোনো ওষুধের চেয়ে নিরাপদ। এর কোনো
পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। সবুজ চা হাড়ের ক্ষয় রোধে বেশ কার্যকর। কাজেই লোহার মতো সবল হাড় পেতে পান করুন সবুজ চা। সোজা কথায় বলা যায়, চিরসজীব থাকতে এই চায়ের জুড়ি নেই।

 
ওলং চা
এই চা অর্ধেক গাজন করেই প্রস্তুত করা হয় অর্থাৎ প্রস্তুত প্রণালির ভিত্তিতে কালো আর সবুজ চায়ের মাঝখানে এর অবস্থান। সবুজ চায়ের মতো এর আছে বহুমুখী গুণ, বিশেষ করে চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়ার পর ওলং চায়ের লিকার পান করলে কোলেস্টেরল বাড়ার আশঙ্কা প্রায় থাকে না বললেই চলে। ওলং চা বাংলাদেশে পাওয়া যায়। তবে এটি বহুল পরিচিত নয় এবং দামও কিছুটা বেশি।


আদা চা ও এর উপকারিতা
মন শান্ত করা ও মানসিক চাপ কমিয়ে আনতে আদা চায়ের ভূমিকা অতুলনীয়। আর আদা চা যে খুশখুশে কাশি, গলা ব্যথা রোধে ভীষণ কার্যকর তা বোধহয় কাউকে নতুন করে বলে দিতে হবে না। হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমিয়ে দিতেও আদা চা অনেক কার্যকর। কারণ আদায় রয়েছে ভিটামিন, মিনারাল ও অ্যামিনো এসিড। তা শরীরে রক্ত চলাচল বাড়ায় ও হৃৎপি-টি সচল রাখে। আদা চা ধমনি থেকে অতিরিক্ত চর্বি সরিয়ে ফেলতে সাহায্য করে। মাংসপেশির ব্যথা কিংবা অস্থি সন্ধির ব্যথায় আদা চা খাওয়া উপকারী। কারণ আদায় রয়েছে এমন কিছু বিশেষ উপাদান যা প্রদাহ কমিয়ে দেয়। আদা চা বানাতে পানি গরম করার সময় আদা টুকরা করে দিয়ে বেশ কিছুক্ষণ জ্বাল দিতে হয়। এরপর চা-পাতা ও চিনি দিয়ে নামিয়ে নিতে হয়। এছাড়া চা বানিয়ে এতেও আদার কিছুটা রস মিশিয়ে চা পান করা যায়।


তুলসী চা
অসাধারণ উপকারী তুলসী চা সর্দিজনিত মাথা ব্যথা, কাশি, সর্দি-জ্বর ও ঠা-া লাগা দূর করে। এটি দুশ্চিন্তা থেকে রক্ষা পেতেও সাহায্য করে। তুলসী চা বানাতে ২ থেকে ৩ কাপ গরম পানিতে ৫-৬টি তুলসী-পাতা ফুটাতে হবে। পানি ফুটে ১ কাপ পরিমাণ হয়ে এলে এতে চা পাতা দিয়ে নামিয়ে গরম গরম পান করলে কাশি, সর্দি, মাথা ব্যথার উপশম হয়। এটি এসিডিটি নিরাময়ে অনেক জনপ্রিয়।


লেবু চা
লেবু চা ওজন কমাতে অসাধারণভাবে কাজ করে। বা লিকার চায়ের তুলনায় পুষ্টিগুণে এটি বেশি উপকারী। লেবু চা বানাতে লিকার চা তৈরি করে পরিবেশনের সময় পরিমাণমতো লেবুর রস, চিনি বা মধু মিশিয়ে পান করা যায়।


পুদিনা চা
পুদিনা চা বা মিন্ট টি পেটের বাড়তি মেদ কমাতে সাহায্য করে। এছাড়া গলা বসা, গলা ব্যথা, সর্দি-কাশি ও জ্বর নিরাময়ে সাহায্য করে। পুদিনা চা বানাতে তাজা অথবা শুকনাÑ দু’রকম পাতাই ব্যবহার করা যায়। ২ কাপ পানি, দেড় কাপ তাজা পাতা অথবা ১ চা-চামচ শুকনা পাতা, স্বাদের জন্য চিনি, মধু ও লেবু দেয়া যেতে পারে। পান করার ২-৩ মিনিট আগে গরম পানিতে পাতা দিয়ে রেখে দিতে হবে নির্যাস বের হওয়ার জন্য।


মধু চা
মধু চা-ও সর্দিজনিত মাথা ব্যথা, কাশি, সর্দি, জ্বর ও ঠা-া লাগা দূর করেতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। হালকা লিকারে মধু মিশিয়ে ওই চা বানানো হয়। তবে এর সঙ্গে লেবু চিপে দিলেও শরীরের জন্য যেমন উপকারী তেমনি সুস্বাদু হয়।


জেসমিন টি
জেসমিন ফ্লাওয়ারের সুবাসযুক্ত ওই চা দারুণ জনপ্রিয়। সাধারণ সবুজ চা বা গ্রিন টিতেই জেসমিন টি বানানো যেতে পারে। শুকনা চায়ের সঙ্গে সন্ধ্যার পর পর জেসমিন ফুলের পাপড়ি তুলে মিশিয়ে রাখতে হবে এবং সকালেই তা বেছে ফেলতে হবে। এভাবে ৭ দিন পর ফ্লেভার ট্রান্সফার হয়ে যাবে।

 


লেখা : শায়মা হক
মডেল : সাদিয়া বনি
ছবি : শোভন আচার্য্য অম্বু
কৃতজ্ঞতা : মারিয়ান ফয়সাল

Read 138 times

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…