অর্ধশতে সুখ

অর্ধশতে সুখ

 

‘মৃত্যুকে পিছিয়ে দিতে পারে আনন্দমুখর জীবন।’ বেশ কিছুদিন আগে এই সংবাদে মুগ্ধ হয়েছিলাম। ওই সংক্রান্ত গবেষণায় নাকি যুক্তরাজ্যভিত্তিক ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের গবেষকরা ৫০-৬০ বছর বয়সী ৯ হাজার নারী ও পুরুষের ওপর গবেষণা চালিয়ে দেখতে পায়, পঞ্চাশোর্ধ বয়সেও যারা সার্বক্ষণিক হাসি-খুশি থাকতে পারেন তাদের পরবর্তী সাত বছরে মৃত্যুর ঝুঁকি কমে যায় অন্তত ২৪ শতাংশ। হার্ভার্ড স্কুল অফ পাবলিক হেলথ গবেষণাটি প্রকাশ করেছিল।
ব্যাপারটি আমাকে ভাবিয়েছিল। সাধারণত আমরা দেখতে পাই, পঞ্চাশোর্ধ বয়সের যে কোনো নারী-পুরুষই যেন জীবনের ভারে ন্যুব্জ। নানান দায়িত্ববোধ, অপ্রাপ্তি, ফেলে আসা দিনের না পাওয়ার হাহাকার অথবা যেন নিজেকে জীবন যুদ্ধে পরাজিত সৈনিক ভাবেন। অথচ ব্যাপারটি এমন নয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অভিজ্ঞতার ঝুলি যেমন ভারী হতে থাকে তেমনি বাড়ে জ্ঞানের গভীরতা। কাজেই পঞ্চাশোর্ধ জীবনের মধ্যে খুঁজে পাওয়া ওইসব অর্জন কাজে লাগিয়েই শুরু হতে পারে আরেক নতুন জীবন।
সাধারণত মানুষের মনোভাব অনুযায়ী দেহে ক্ষতিকর ও উপকারী- উভয় ধরনের হরমোন নিঃসরণের মাত্রা বাড়ে-কমে। হাসি-খুশি অবস্থায় কারো শরীরে অ্যাড্রেনালিন ও কর্টিজল-এর মতো মানসিক চাপ উদ্রেককারী হরমোনের মাত্রা কমে যায়। এছাড়া মানসিক অশান্তিতে থাকলে এমনিতেই মানুষের ধূমপান ও মদপানের মাত্রা বেড়ে যায়। এসব কারণেই যারা হাসি-খুশি জীবন যাপন করতে পারেন না তাদের আয়ুষ্কাল কমে আসে বলে ধারণা করছেন গবেষকরা। কাজেই এই বয়সকাল ক্ষয়ে যাওয়ার নয়, অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের পরিধি নিয়ে শুরু করা যায় আনন্দময় পথচলা। মানুষ তার শৈশব, কৈশোর, তারুণ্য কাটিয়ে দেয় জীবন ও

জীবিকার সন্ধানে। কেটে যায় শিক্ষা জীবন, বয়ে যায় কর্মজীবনও। অনেকের মধ্যে সাহিত্য প্রতিভা বা লেখালিখির গুণাবলি থাকার পরও দেখা যায় সময় ও সুযোগের অভাবে চর্চাটি হয়ে ওঠে না। এই বয়সে এসে যারা মোটামুটি থিতু হন তারা বিগত জীবনের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের ভা-ার কাজে লাগিয়ে লেখালিখি বা সাহিত্য চর্চা করতে পারেন। লেখক মাত্রই জানেন, ওই সৃষ্টির আনন্দ। এর মধ্যেই খুঁজে পেতে পারেন জীবনের আনন্দের আরো একটি দিক। পৃথিবীতে অনেক নামকরা লেখক, এমনকি চিত্রশিল্পীদের কথাও শোনা যায় যারা অবসর জীবনে শিল্প চর্চার মধ্যে খুঁজে পেয়েছেন জীবনের আনন্দ। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যেন জীবনের বহুমুখী সমস্যাও বাড়তে থাকে। স্বাস্থ্য সমস্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পারিবারিক ও সামাজিক নানানমুখী সমস্যাতেও জর্জরিত হয়ে ওঠে কারো কারো জীবন। সুস্থ ও সুন্দর থাকার সঙ্গে আনন্দময় জীবনের সম্পর্ক থাকুক, না থাকুক- এ বয়সে হঠাৎ করেই মাঝে মধ্যে যেন বদলে যায় আজীবন বয়ে চলা লাইফস্টাইলটি। এর প্রধান কারণ হতে পারে বয়সী অসুস্থতাগুলো। ডায়াবেটিস, হৃদরোগ- এসব কারণে বদলে যায় এতো দিন বয়ে চলা জীবনের গতিধারাটি। তাই সচেতন হতে হবে এবং যে সমস্যাই আসুক না কেন, তা মেনে নিয়ে মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত হতে হবে। খাদ্য অভ্যাস বদলে ফেলা ও নিয়মিত জীবন যাপন, শরীর চর্চা, হাঁটার অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে এ সময়ের সমস্যা মোকাবেলায়। পারিবারিক সদস্যদের বিচ্ছিন্নতা বা একাকীত্বও এই বয়সটায় জীবন দুর্বিষহ করে তুলতে পারে। এ বয়সে ছেলেমেয়েরা অনেকেই চলে যায় পড়ালেখা বা কর্মক্ষেত্রে। অনেকেরই জীবনসঙ্গী বা সঙ্গিনী গত হন কিংবা বিচ্ছেদ ঘটে। ওই ব্যাপারগুলো খুব সূক্ষ্মভাবেই মানসিক চাপের সৃষ্টি করে।

ছেলেমেয়েদের দূরে থাকা বা সামাজিক চক্ষুলজ্জায় অনেকেই একা থেকে আরো নিজের ক্ষতি করেন। সময় এসেছে দৃষ্টিভঙ্গি বদলের। বিচ্ছেদ বা সুকঠিন সমস্যাও মোকাবেলা করে নতুন জীবন শুরু করাই বরং বুদ্ধিমানের কাজ হবে। একাকীত্ব বা সঙ্গীহীন জীবন এই বয়সে খুব একটা উপযোগী নয়। কাজেই সঙ্গী বা সঙ্গিনী বেছে নেয়াও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। আবেগের বশে বা অনাগত ভবিষ্যতের নেতিবাচক আশঙ্কায় অনেকেই নতুন করে সঙ্গী বা সঙ্গিনী নির্বাচনের ব্যাপারটি এড়িয়ে যান। এ ব্যাপারটি এড়িয়ে না গিয়ে বরং গুরুত্বসহ দেখার জন্য পরিবারের সবারই এগিয়ে আসা উচিত। আমরা প্রায়ই দেখে থাকি, এ মধ্যবয়সটায় স্বামী বা স্ত্রীকে হারিয়ে অনেকেই নির্লিপ্ত কিংবা কিছুটা অসহায় জীবনই পার করেন। এক্ষেত্রে সহযোগিতার হাত বাড়াতে পরিবারের সদস্যদের এগিয়ে আসাটা যেমন জরুরি তেমনি নিজেরও সচেতনতার প্রয়োজন আছে। চিরকুমার ব্রত নেয়া কেউ কেউ অথবা অকৃতদার ব্যক্তির জন্যও এ বয়সটি হেলাফেলার নয়, বরং নতুন সঙ্গী বা সঙ্গিনীর প্রভাব বা তাদের সান্নিধ্যে জীবন হয়ে উঠতে পারে স্বর্গীয় সুন্দর।


শুধু সাফল্যের পেছনে ছুটে চলাতেই জীবনের সব আনন্দ বা সফলতা- এমন ভাবনাই সব নয়। সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গে মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে। সময় ও সুযোগ খুঁজে নিয়ে বেরিয়ে পড়ুন প্রকৃতির কাছে। পৃথিবীর এই বিশাল যজ্ঞে অংশ নেয়ার সুযোগ না হলেও তো অপার প্রকৃতি পড়ে রয়েছে আমাদের দ্বারপ্রান্তে। রোজ না হোক, সপ্তাহে বেড়িয়ে আসুন পরিবারের সঙ্গে বাড়ির কাছাকাছি পার্ক কিংবা কোনো বড় উদ্যানে। মঞ্চ নাটক, মুভি, থিয়েটার বা সাংস্কৃতিক কর্মকা- কিংবা সমাজসেবায় অংশ নেয়া অথবা উপভোগটি শুধুই তারুণ্যের অংশ নয়, আপনিও এসবের মূল্যবান অংশীদার। কাজেই সময় এসেছে দৃষ্টিভঙ্গি বদল ও নতুন করে ভাবার। জীবন ফুরিয়ে যাওয়ার নয়, বরং তা যতোক্ষণ গতিশীল ততোক্ষণই উপভোগের। তাই পঞ্চাশোর্ধ জীবনের এই বাঁক বদলে নিজেকে বদলে ফেলুন। জীবনটিকে করে তুলুন মূল্যবান ও সুন্দর।

এখানে একটি ব্যাপার মাথায় রাখা যেতে পারে, এই বয়সে এসে বিয়ের বয়স পেরিয়ে গেছে- এমনটা অনেকেই ভেবে থাকেন। আসলে সম্ভবত এমনটি মাথায় গেঁথে রাখার কোনো কারণ নেই। জীবনের নানান কাজে বা নানা প্রয়োজনে অনেকেরই হয়তো বিয়েটা ঠিক বয়সে করা হয় না, তবে সত্যি বলতে জীবন সঙ্গিনী বেছে নিতে বা বিয়েটা এই বয়সেও করে ফেলতে তেমন কোনো বাঁধা নেই। হতে পারে একই বয়সী বা কাছাকাছি বয়সের কনে না খুঁজে পাওয়া। এতে বিয়ে বা বাকি জীবনটা একেবারে বিফলে যাবে এমন গাঁটছড়ার বাঁধনে এটিও ভাবার কোনো কারণ নেই। একটু বয়সের বৈষম্য বা বেশি বয়সের বিয়েতেও বাকি জীবন হয়ে উঠতে পারে মধুর সান্নিধ্যের।
আসলে প্রয়োজন নিজেদের মাঝে বুঝে চলা ও জীবন উপভোগের বিষয়টিকে মাথায় রাখা। কাজেই চিরকুমার ব্রত নেয়া কেউ অথবা অকৃতদার মানুষের জন্যও এ বয়সটি হেলাফেলার নয়। বরং নতুন সঙ্গী বা সঙ্গিনীর প্রভাবে বা তাদের সান্নিধ্যতায় জীবন হয়ে উঠতে পারে স্বর্গীয় সুন্দর।

 

লেখা : সহজ ডেস্ক
মডেল : এনায়েত কবির
নাহিদা আলম উচ্ছ্বাস ও অনুষা
ছবি : শোভন আচার্য্য অম্বু

Read 600 times

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…