তারাশঙ্কর গণদেবতা

তারাশঙ্কর গণদেবতা

 মুতাকাব্বির মাসুদ

 

১.            ‘গণদেবতা’ উপন্যাস দু’টো ভাগে বিভক্ত। একটি ‘চন্ডীমন্ডপ’ অপরটি ‘পঞ্চগ্রাম’ দুটো অংশই স্বাতন্ত্র্যে উপস্থাপিত। ‘চন্ডীমন্ডপ’ প্রকাশ পায় ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবরে ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকায়। ‘পঞ্চগ্রাম’ প্রকাশিত হয় ১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দের জুন মাসে একই পত্রিকায়। বস্তুত ‘চন্ডীমন্ডপ‘ গ্রন্থাকারে প্রাকশের সময় ‘গণদেবতা’ শিরোনামে উপস্থাপিত হয় তারাশঙ্কর বিশশতকের আঞ্চলিক কথাসাহিত্যের অনিবার্য দ্যোতক হিসেবে বাংলা সাহিত্যে নিজের কালজয়ী অবস্থান নিশ্চিত করেন। তারাশঙ্কর তাঁর উপন্যাসে দক্ষতার সাথে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনবাস্তবতার নিখুঁত চিত্রটি তুলে ধরতে মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন। সমাজ বাস্তবতায় বিদ্যমান সত্যকে চিত্রিত করতে যেয়ে পরিপূর্ণ সমাজবোধ, ও ইতিহাসের সামগ্রিক সমন্বয়কে বর্ণনার কেন্দ্রে স্থাপন করে নিপুণ বিন্যাসের প্রয়াসের পাশাপাশি উপন্যাসে তা তুলে এনে বিজ্ঞাপিত করেছেন সমাজের অবহেলিত ও নানাভাবে নির্যাতিত অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষ আর তাঁদের দুঃখ-কাতর জীবনের নির্মম চলচিত্র। এ প্রসঙ্গে সাহিত্যিক নারায়ন গঙ্গোপাধ্যায় বলেন “তারাশঙ্কর মুখ্যত জনসাধারণের শিল্পী। এই জনসাধারণ আবার নীচের তলার মানুষ’ (নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়- বাংলা গল্প বিচিত্রা, দ্বি.স. কলকাতা, ১৯৫৭, পৃ-১২২।)

২.           ‘গণদেবতার’ কাহিনী আবর্তিত হয়েছে ‘চন্ডীমন্ডপ’কে কেন্দ্র করে। সমকালে তথাকথিত বুর্জোয়া মোড়ল শাসিত সমাজের কঠিন ও অনিয়ন্ত্রিত সংস্কারাচ্ছন্ন, সমাজজীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে স্তূপীকৃত অন্ধবিশ্বাস ও বোধ যা, জীবনবাস্তবতায় অনৈক্যের সূচনা করেছিল, সেখান থেকেই তারাশঙ্করের ‘গণদেবতা’ উপন্যাসের শুরু। বস্তুত বাইরের অনৃত শক্তির দ্বন্দ্ব-সংঘাত সমাজের মানুষগুলোর জীবন বোধের মধ্যে ঐক্য, সুখ, শাস্তির পরিবর্তে হিংসা, ক্রোধ ও মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে। লক্ষ করা যায় উপন্যাসে উপস্থাপিত ও মুদ্রিত চরিত্রগুলো যথা অনিরূদ্ধ কামার ও গিরীশ ছতারের যৌক্তিক আলোচনায় ও প্রেক্ষিত বিবেচনায় উদ্ভূত পরিবেশ থেকে একটি নতুন কালের আগাম ঢেউ এসে স্পর্শ করেছে শিবকালীপুর গ্রামে। আর এখান থেকেই সমগ্র প্রাচীন প্রথার বিরুদ্ধে তাঁদের বিদ্রোহের শুরু। এ উপন্যাসে সুকৌশলে বিন্যস্ত হয়েছে গ্রাম্যসমাজের প্রাচীন প্রথার ক্রমাগত বিলুপ্তির আলেখ্য। ওঠে এসেছে সমাজে বিদ্যমান আজন্ম লালীত সংস্কারাচ্ছন্নতার নেতিবাচক প্রভাব-চিত্র।         

 

অন্যদিকে গ্রামীণ রুগ্ন অর্থনীতির ভয়াল চিত্রটিও তারাশঙ্কর তুলে এনেছেন দক্ষতার সাথে। উপন্যাসে চিত্রিত দ্বারকা চৌধুরীর মত প্রবীণ ব্যক্তিত্ব কিংবা নব্য আধুনিকতায় বিশ্বাসী নেতা দেবু ঘোষ পারেনি শিবকালীপুর গ্রামের ভাঙ্গন ঠেকাতে। এখানে বিদ্রোহের আরেক ধাপ গতি নিয়ে এগিয়ে চলে ধর্মীয় আচার-প্রথার বিরুদ্ধে। অনিরুদ্ধ কামার বারোয়ারী পূজায় ধর্মীয় অনাচারের অভিযোগ এনে চন্ডীমন্ডপ কেন্দ্রিক চলমান সমাজ ব্যবস্থাকেই অবশেষে অস্বীকার করে ফেলে।

একদিকে ভোগবাদী সমাজব্যবস্থায় ধনতান্ত্রিক বুর্জোয়া শ্র্রেষ্ট মানুষ এবং তথাকথিত জমিদার ও উচ্চাবিত্ত শ্রেণি অন্য প্রান্তে নির্যাতিত দরিদ্র জনগোষ্ঠী তথা নিরীহ মানুষ। এদেরে সমন্বয়ে শিবকালীপুর গ্রামের যাপিত জীবন ক্রমান্বয়ে বয়ে চলার পথে কখনো প্রাচুর্যে, ঔদার্যে, মিলনে, উৎসবে কোমল উজ্জ্বল আবার কখনো দ্বন্দ্ব সংশয়ে, ও কুসংস্কারে প্রহত ও গতিশূন্য।

৩.           বস্তুত চন্ডীমন্ডপ ছিল শিবকালীপুর গ্রামের মানুষের ঐক্যের প্রতীক। এ ‘মন্ডপে’ সকল সম্প্রদায়ের মানুষের অবাধ বিচরণের অধিকার যেমন ছিল, তেমনি চন্ডীমন্ডপ তাঁদের চিন্তা চেতনায় পুরনো সংস্কৃতি ও আচার বিশ্বাসকে নিবিড় মমতায় ধরে রাখতো। দীর্ঘদিনের এ চলমান প্রথাকে গতিশীল করার লক্ষ্যে এগিয়ে আসে শিবকালীপুর গ্রামেরই দ্বারকা চৌধুরী, ন্যায় রতœ, রাঙা দিদির মতো লোকেরা। অন্যদিকে অনিরূদ্ধ, গিরীশ, তিন কড়ি, ও পাতুর মতো লোক চলমান জীবনবাস্তবতায় সমাজে বিদ্যমান ও প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থার এরূপ অবিচল প্রথার বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করে। এখানেও আবার উভয়ের মধ্যে আপাত ঐক্যের সমন্বয়ে তৈরি করতে এগিয়ে আসে উদার দেবু ঘোষ এবং স্বার্থান্ধ ছিরু পাল।

দীর্ঘদিনের পুরনো সংস্কৃতি ও সেখানকার মানুষের বিশ্বাস-ভালবাসা আর ঐক্যের স্মারক হয়ে স্থির দাঁড়িয়ে আছে ‘চন্ডীমন্ডপ’ শিবকালীপুর গ্রামে। অবশেষে এই ঐতিহ্যবাহী মন্ডপেও পরিবর্তনের জোয়ার আসে। ছিরুপাল বদলে গিয়ে হয় শ্রীহরিঘোষ; আর সকল ঐতিহ্যের প্রতীক চন্ডীমন্ডপ তার বাইরের রূপ ও ধর্মের নতুন নন্দিত আলোয় উদ্ভাসিত হয়। শ্রীহরি ঘোষের কাছারিÑ শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ধর্মচর্চায় ব্যবহৃত হয়। এরই মধ্যে নবীভূত পরিবর্তনের দীপ্ত ছোয়ায় একটি অনবদ্য গণমানুষের পান্ডুলিপি হয়ে ওঠে ‘গণদেবতা’।

৪.           রাঢ় বাংলার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কৃষি নির্ভর জীবন ও ধর্ম নিয়ে সেকেলে ধ্যান-ধারণা ‘গণদেবতা’ উপন্যাসের মৌলিক উপাদান। তারাশঙ্কর এ সকল বিষয়কে উপজীব্য করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনবাস্তবতার নিখুঁত চিত্র দক্ষতার সাথে তুলে এনেছেন ‘গণদেবতা’য়। এ উপন্যাসে শিল্পের বহুমাত্রিক উৎকর্ষ উপস্থাপনের প্রয়াস, কল্পনায় বিনির্মানের উৎস খুঁজেছেন; তার নৈর্ব্যক্তিক চিত্ররূপে রাঢ় বাংলার নির্দিষ্ট জ্যামিতিক সীমারেখায় বিদ্যমান বৈশিষ্ট্য মৌলিকতায় বিজ্ঞাপিত হলেও উল্লিখিত ভৌগলিক রেখাচিত্রে উপস্থাপিত হয়েছে চিরকালীন ভারতের শাশ্বত জীবনবাস্তবতার সামগ্রিক নকশা। তাঁর অবিমিশ্র চেতনায় চিত্রার্পিত সত্যের যে উদ্ভাস, কল্যাণ-অকল্যাণ, আলো-আঁধার, ও বিবিধ  সত্য-ন্যায়ের বোধে তাঁকে নৈয়ায়িক মনে করা যেতে পারে। ঔপন্যাসিকের এ সত্যানুভূতি ভিত্তি পেয়েছে বিবিধ সত্যের সমন্বয়ে। উপন্যাসের মুখ্য চরিত্র দেবু ঘোষের বুদ্ধিদীপ্ত পর্যবেক্ষণেও সে সত্যের সামগ্রিক সমুদ্ভব লক্ষ করা যায়। দেবু তাঁর উপলব্ধিতে আত্মচিন্তায় বিষয়টির ব্যাখ্যা নিজেই করতে পেরেছে। একদিকে গ্রামের সাথে তাঁর মানসিক দূরত্ব বস্তুত অমীমাংসিত সত্যের কারণেই হয়েছে। সে দেখেছে মানুষ তাকে এড়িয়ে চলেছে, আঘাত করেছে, এমন কী তাঁর সাথে তুচ্ছ স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ঝগড়ায় লিপ্ত হয়েছে; সেই মানুষই তাঁকে শ্রদ্ধা করতে শিখেছে, কারামুক্তিতে তাঁর মিলেছে মহত্বের স্তুতি;

“ফুলের মালা গলায় দিয়ে ঘোষ চলেন জেলে,

অধম সতীশ লুটায় এসে তাঁরই চরণ তলে

দেবতা নইলে হায় এ কাজ কেউ পারে না” (তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, ‘গণদেবতা’, নির্বাচিত রচনা, ১ম. প্র. কলকাতা, ১৯৮৬, পৃ. ১২৮)

তবে এ আবেগ, এ সম্মান, স্বল্প সময়ের মধ্যেই স্থায়ীত্ব হারিয়েছিল। প্রসস্তির রেশটুকু কাটতে না কাটতেই সেই কঠিন বাস্তবতা, সেই পুরনো রূপে ফিরে আসে। “পরের দিন হইতে কিন্তু আবার সেই পুরনো শিবকালীপুর। সেই দীনতা-হীনতা, হিংসায় জর্জর মানুষ, দারিদ্র্য দুঃখ রোগ প্রপীড়িত গ্রাম।” (ঐ পৃ. ১২৮) বস্তুত ‘গণদেবতা’ উপন্যাসটি রাঢ় বাংলার গণমানুষের জীবনবাস্তবতার এক কঠিন ধারাবাহিক জীবনের ছবি।

        

 

রাঢ় বাংলার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কৃষি নির্ভর জীবন ও ধর্ম নিয়ে সেকেলে ধ্যান-ধারণা ‘গণদেবতা’ উপন্যাসের মৌলিক উপাদান। তারাশঙ্কর এ সকল বিষয়কে উপজীব্য করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনবাস্তবতার নিখুঁত চিত্র দক্ষতার সাথে তুলে এনেছেন ‘গণদেবতা’য়।

Read 25790 times

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…