এক বিশাল পুনরুত্থানের ছবি দেখি

এক বিশাল পুনরুত্থানের ছবি দেখি

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

 

 বাংলাদেশের সাহিত্য নিয়ে একটা সমালোচনা প্রায়ই শুনতে পাই’ আজকাল তেমন ভালো গল্প-উপন্যাস লেখা হচ্ছে না, মনে দাগ কাটার মতো সাহিত্য আর তৈরি হচ্ছে না। কবিতার ক্ষেত্রে সমালোচনাটা একটু বেশি এবং তার কারণটা (?) সহজবোধ্য। অনেকে আমাদের প্রবন্ধ-সাহিত্য নিয়েও আক্ষেপ করেন। প্রবন্ধে আমরা ষাট-সত্তরের চিন্তাভাবনা থেকে কি খুব এগিয়েছি? এ রকম একটি প্রশ্নের সামনে আমাকে মাঝে মধ্যেই পড়তে হয়। এই সমালোচনার যে ভিত্তি নেই তা নয়। তবে ঢালাওভাবে এটি করা হলে আমার শক্ত আপত্তি থাকবে। কবিতা অনেক লেখা হচ্ছে, অনেক কবিতাই হয়তো কয়েক পঙ্ক্তি পড়ে রেখে দিতে হয়। তাই বলে ভালো কবিতা যে লেখা হচ্ছে না তা তো নয়। ভালো কবিতা পড়তে হলে শুধু জাতীয় দৈনিকের সাহিত্যের পাতা ওল্টালে চলবে না, লিটল ম্যাগাজিনগুলোও পড়তে হবে। একই কথা খাটে গল্পের ক্ষেত্রে এবং হয়তো অনেক বেশি প্রবন্ধের ক্ষেত্রে। এই লিটল ম্যাগাজিনগুলো আমাদের সাহিত্যের বাতিঘর এবং এর বাতিওয়ালারা প্রায় সবাই তরুণ। আমাদের সাহিত্যের ভবিষ্যৎ নেই- এমন কথা যারা বলেন তাদের হয়তো মূল স্রোতের বাইরের ওই তরুণ লেখকদের সঙ্গে তেমন পরিচয় নেই। যে সাহিত্যের একটা সমৃদ্ধ অতীত আছে, একটা দ্বন্দ্বসংকুল বর্তমান আছে। এর একটা সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎও নিশ্চয়ই আছে। অতীত নিয়ে আমাদের একটা অহঙ্কার আছে। বর্তমান নিয়ে যদি ওই অহঙ্কারটি তেমন না থাকে তাহলে বুঝতে হবে, সাহিত্যের ভূমিটা হয় ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে, নয় তো সেখানে আমরা যথেচ্ছ নির্মাণ দাঁড় করিয়ে দিচ্ছি; তৈরি করছি অগোছালো নানান স্থাপনা।
সাহিত্য-সমালোচনা এই ভূমিক্ষয়ের বিষয়টি ব্যাখ্যা করে, সাহিত্যের দরদালানের নির্মাণকলা, এর ত্রুটি-বিচ্যুতি, সৌন্দর্য-অসৌন্দর্যের হিসাব নেয়। এতে ওই ভূমিটা সুরক্ষা পায়, এর ওপর গড়ে তোলা বা তুলতে যাওয়া নির্মাণগুলো মূল্য সন্ধানী ও
আত্মবিশ্লেষণী হয়। দুর্ভাগ্যের আমাদের সাহিত্য-সমালোচনা আজকাল এসবের অনুপস্থিতি দিয়েই যেন এর অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। আমাদের বর্তমানের অর্জন কম নয়। কিন্তু ওই অর্জনের মূল্য বিচার আমাদের তৃপ্তি দেবে, নাকি আরো ভালো কিছু করতে না পারার আক্ষেপটা বাড়াবে? আমরা উঁচুমানের সাহিত্য সৃষ্টি করছি, নাকি নিজেরাই এটিকে শুধু ‘বিশ্বমানের বিশ্বমানের’ বলে ঢোল পেটাচ্ছি? যদি দ্বিতীয়টিই হয় তাহলে বাস্তবতা কেন এমন হচ্ছে? এর একটি ব্যাখ্যায় তাহলে যাওয়া যায় এবং আগামী দিনের সাহিত্য নিয়ে আমার প্রত্যাশার কথাটিও এই সুযোগে বলা যায়। আমার মনে হচ্ছে, আমাদের সাহিত্যের সম্ভাবনাটি মার খাচ্ছে তিন-চার জায়গায়। আমাদের ভাষার ক্ষেত্রে চলছে

অরাজকতা, শিক্ষা ব্যবস্থায় চলছে শৈথিল্য, মনোজগৎ দখল করে নিচ্ছে দৃশ্য মাধ্যম বই নয়, দৃশ্য মাধ্যম এবং আমাদের পড়ার সংস্কৃতি পরিবর্তিত হয়ে দেখার সংস্কৃতিতে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। যে জাতির ভাষা বিপন্ন, জাতি মাতৃভাষার একটি সুশ্রী, মান সম্পন্ন প্রকাশটি কোনোভাবে আয়ত্ত করতে না পেরে এক বিকৃত, মিশ্র ভাষায় কাজ চালিয়ে যায় ওই জাতির সাহিত্য শক্তিশালী হয় না। আমি যখন দেখি, এ দেশের বিশাল সংখ্যক তরুণ মাতৃভাষায় একটি বাক্যও ইংরেজির আক্রমণ ও উচ্চারণগত বিকৃতি বাঁচিয়ে বলতে অসমর্থ তখন ভাবি, এর প্রভাবে সাহিত্য কি পাল্টাবে? পাল্টে কি যাচ্ছে না? সাহিত্যেও ঢুকবে অথবা ঢুকছে অপ্রকাশের দৈন্য, নিমপ্রকাশের বিকৃতি? তবে সবচেয়ে বড় কথা, যে ভাষা সব চিন্তার বাহন ওই ভাষা যদি সামান্য চিন্তাটিকেও সহজ ও সুন্দরভাবে প্রকাশে অক্ষম হয় তাহলে এ ভাষাভাষীর চিন্তার ক্ষেত্রেও থাকবে সংকট। পশ্চিমে দেখুন, জাপান-চীনের দিকে তাকানÑ একজন শেমাস হিনি অথবা গুন্টার গ্রাস কি তাদের ভাষা বিকৃত করে, উচ্চারণ বিকৃত করে ফরাসি-স্প্যানিশ শব্দ ঢুকিয়ে খিচুড়ি বানিয়ে পরিবেশন করছেন? লন্ডন-শিকাগোর এক পথচারীও যখন কথা বলেন তখন কি মনে হয় না এই মাত্র লিখে যেন তা তিনি পড়ছেন? এমনই সঠিক ও সুঠাম সেসব বাক্য এবং প্রকাশ। এই শক্তি কি আমাদের আছে?
আমি স্বপ্ন দেখি, আমরা প্রত্যেকে মাতৃভাষাকে ওই শক্তি, দরদ আর দক্ষতা নিয়ে ব্যবহার করছি যে শক্তির কথা রবীন্দ্রনাথ সভ্যতার একটি প্রকাশ বলে উল্লেখ করেছেন। স্বপ্ন দেখি, সারা দেশের স্কুলের শিশুরা বই পড়ছে, লাইব্রেরি থেকে গল্প-কবিতা-প্রবন্ধের বই নিয়ে বাড়ি যাচ্ছে। আমি স্বপ্ন দেখি, সারা দেশে পড়ার সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ ঘটেছে। মানুষের চিন্তা স্বচ্ছ হচ্ছে, প্রকাশ বলিষ্ঠ হচ্ছে এবং মানুষ ক্রমাগত বুদ্ধির জগতে একটার পর একটা অর্জনের পতাকা তুলে ধরছে। মানুষ পশ্চিমের পণ্য সংস্কৃতি ও মেধাহীন দৃশ্য মাধ্যমের ধূর্ত চালে বদলে যাওয়া বিকৃত বাংলা ভাষাটিকে বিদায় জানাচ্ছে। যেদিন এই হবে বাংলাদেশের অবস্থা সেদিন আমাদের সাহিত্য ক্রমাগত উঁচুর দিকে যাত্রা করবে। সেদিন এক তরুণ কবির অথবা তরুণ গল্পকারের বইয়ের প্রথম সংস্করণ ৪০-৫০ হাজার বিক্রি হয়ে যাবে। আগামী দিনের সাহিত্যের বিষয়বস্তু নিয়ে কারা, কী লিখবেন, কেমনভাবে লিখবেন, মুক্তিযুদ্ধ বিষয় হিসেবে শক্তিশালী ভূমিকা রাখবে কি না সেসব লেখায়, এতে শুধুই নগর জীবন প্রতিফলিত হবে কি নাÑ এসব নিয়ে ভাবি না। আমি ভাবি, শিক্ষা ও ভাষার ক্ষেত্রে এক পুনর্জাগরণের কথা, আত্মপ্রকাশের তীব্র শক্তি আর চিন্তার শানিত হয়ে ওঠার কথা। আমার স্বপ্নে ওই সম্ভাবনাটি নদীর স্বচ্ছ জলের নিচে নুড়িপাথরের মতো দেখতে পাই। সেটি যদি হয় তাহলে সাহিত্য নিয়ে তোলা অন্যসব প্রশ্ন কাক্সিক্ষত সমাধান পেয়ে যাবে।

আমাদের সংস্কৃতি নিয়ে গর্বের পাশাপাশি একটি উদ্বেগ কিছু কালো ছায়া ফেলে চলেছে। উদ্বেগটি তৈরি হয়েছে সমাজের মূল্যবোধে ভয়ানক কিছু পরিবর্তন থেকে। গত ৩০-৪০ বছরে সমাজে ব্যাপক দুর্বৃত্তায়ন হয়েছে, দুর্নীতি বেড়েছে; ধর্ম-ব্যবসা, রাজনীতির নামে স্বার্থ হাসিলের চর্চা এবং মানুষে মানুষে দূরত্ব বেড়েছে। এখন ভোগের সংস্কৃতিই যেন প্রধান সংস্কৃতি। আমাদের চিরায়ত সংস্কৃতিগুলোর প্রকাশেও এখন আড়ষ্টতা অথবা সেগুলো যাচ্ছে একালের মন্ত্র ‘ফিউশন’-এর রন্ধন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। আমাদের

গ্রামীণ সংস্কৃতি হারিয়ে যাচ্ছে পিতৃতান্ত্রিক ও ধর্মতান্ত্রিক সমাজের চাপ ও পুঁজিবাদী দৃশ্য সংস্কৃতির আগ্রাসনে। এখন পহেলা বৈশাখ বলুন, নবান্ন উৎসব বলুন- সবই তো এক আপাত বন্ধুসুলভ নগরকেন্দ্রিকতায় নিয়ন্ত্রিত। এখন বহুজাতিক কোম্পানির পৃষ্ঠপোষকতায় পালাগান, গম্ভীরা অথবা লাঠিখেলার আয়োজন হয়। বাউলশিল্পীরা সেসব কোম্পানির সাজানো মঞ্চে দাঁড়িয়ে গান পরিবেশন করেন। পুঁজির আগ্রাসন ঠেকানো মুশকিল, পুঁজির মতলবটাও বোঝা মুশকিল। সংস্কৃতির ওই বিবর্তন সময়ের বিচারে হয়তো অবধারিত। এখন দৃশ্য মাধ্যমের যুগ এবং দৃশ্য মাধ্যমের প্রধান উদ্যোক্তা ও উদ্গাতা হচ্ছে পুঁজি। আমাদের সংস্কৃতির পক্ষে এর আঁচ বাঁচিয়ে চলা মুশকিল। তাই বলে অসহায় আত্মসমর্পণ কেন? সংস্কৃতি শুধু গান-বাজনা নয়। সংস্কৃতি সার্বিক জীবন আচরণের একটি পরিশোধন প্রক্রিয়ার নামও। এই জীবন আচরণে গত ৪০ বছরে এসেছে অনেক পরিবর্তন। সমষ্টির পরিবর্তে ব্যক্তি হয়ে দাঁড়াচ্ছে প্রধান, ভাগ করার পরিবর্তে একা ভোগ করার বাসনাটি হয়ে উঠছে তীব্র। ফলে সংস্কৃতির সব প্রকাশের মধ্যে একটি উগ্র ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা যেন প্রবল হয়ে উঠছে।


সংস্কৃতি কি মানুষের বেঁচে থাকা এবং তার অধিকার ও সম্মানের কথা বলে এখন? অথবা সংস্কৃতি কি আগের মতো অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরিতে উৎসাহ দেয় আমাদের? বহুজনের অন্তর্নিহিত শক্তি এখন দুর্বল হচ্ছে প্রচার ও আচার সর্বস্বতায়। এর পাশাপাশি ভোগবাদের ফলে সংস্কৃতিও এখন সংগ্রহযোগ্য পণ্যে রূপান্তরিত হচ্ছে। কয়েক বছর আগে এক চিত্রসংগ্রাহক আমাকে জানিয়েছিলেন, তার সংগ্রহে দুটি সুলতান ও তিনটি কিবরিয়া আছে। এই প্রবণতা সংস্কৃতির সামষ্টিক অঞ্চলে ব্যক্তিমালিকানার সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেয়ার মতো। ভোগবাদের সমস্যা আরো আছে। যে পণ্যটি তাৎক্ষণিক তৃপ্তি জোগাতে ব্যর্থ হয় ওই চর্চা তা প্রত্যাখ্যান করে। সংস্কৃতির ভেতর শুধুই যে সুন্দর ও চিত্তগ্রাহী বিষয় থাকবে তা তো নয়। সংস্কৃতির ভেতর জীবনে কষ্ট, বঞ্চনা ও ক্ষোভের প্রকাশগুলোও তো থাকবে শান্তরসের পাশাপাশি বীভৎসরসের মতো। ভোগবাদের প্রকোপে তাহলে সংস্কৃতিকে কি আমরা শুধুই ইন্দ্রিয়মোহন এক বিনোদন চর্চায় রূপান্তরিত হতে দেবো? সংস্কৃতিতে অধিকার তো সবার এবং আমাদের দেশজ সংস্কৃতির সব প্রকাশের উৎস তো সেই ব্রাত্যজনের জীবন চর্চায় যারা পণ্যায়িত পৃথিবীতে চলে যাচ্ছেন আরো প্রান্তসীমায়। বস্তুত এখন ‘ব্রাত্যজনের সংস্কৃতি’ বলে সমষ্টির এক অভিন্ন উত্তরাধিকারে একটি বিভাজন রেখা টানা হচ্ছে যার একদিকে এলিট শ্রেণির সংস্কৃতি যা ‘উচ্চ সংস্কৃতি’ নামে সুবিধাপ্রাপ্ত, অন্যদিকে ওই ব্রাত্যজনের ‘অসংস্কৃতি’- ‘নিম্ন সংস্কৃতি’। এই বিভাজন রেখার একদিকে ক্ষমতা, অন্যদিকে ক্ষমতাহীনতা- এ দুই অবস্থানের দ্বন্দ্ব ক্ষমতাহীনের জন্য শোচনীয়। ‘উচ্চ সংস্কৃতি’র আবার ঝোঁক হচ্ছে পশ্চিম-আহ্লাদ, বিশ্বকেন্দ্রের সঙ্গে একটি সংযুক্তির অভিলাষ। এই সংযুক্তির একটি ধোঁকা তৈরি করছে দৃশ্য মাধ্যম। কম্পিউটারের বোতামে হাত রেখে বৈশ্বিক সাইবার সংস্কৃতির অংশ হয়ে যাওয়ার বিভ্রম পশ্চিমের একটি ধোঁকা। কারণ যে প্রযুক্তির এক শতাংশ আমি তৈরি করিনি ওই প্রযুক্তি না বাজিয়ে প্রশ্নহীন গ্রহণ করার মধ্যে একটি বিপদ থেকে যায়। ওই বিপদটি নিজের মাটি-সময়-কাল ভুলে নিরালম্ব হয়ে যাওয়ার।


সংস্কৃতি নিয়ে আমার স্বপ্নে এক বিশাল পুনরুত্থানের ছবি দেখিÑ যে পুনরুত্থান মানুষকে তার শিকড় ও মাটিতে নিয়ে যাচ্ছে; সমষ্টির জীবনের ও ভালোবাসার কাছে। তার সামান্য চাওয়া-পাওয়া, সম্মান ও বিশ্বাসের
জায়গাটায় নিয়ে যাচ্ছে। দৃশ্য মাধ্যম আমাদের উৎপাদন নয়। তবে আমরা এটিকে ব্যবহার করবো, প্রয়োজন হলে আত্মস্থ করবো। কিন্তু তা পশ্চিমের আরোপিত সূত্র মেনে নয়, বরং আমাদের চিরকালীন সৌন্দর্য, মূল্যবোধ ও ভালোবাসার সূত্র মেনে- এ রকম একটি প্রত্যাশা আমার আগামীকে নিয়ে। সংস্কৃতি নিয়ে আমার স্বপ্নের মূলে আমাদের প্রকৃতি, জনজীবন ও জনজীবনের দোলাচল। আমাদের নদীগুলো নিঃস্ব হচ্ছে। কিন্তু আমাদের জীবন কেন নিঃস্ব হবেÑ যে জীবনে জলসিঞ্চন করতে পারে আমাদের সংস্কৃতির বহতা নদী? করেই যাচ্ছে, বস্তুত? আমার স্বপ্নে স্রোতস্বিনী, শক্তিমতী এই সংস্কৃতি নদী কলকল শব্দে বয়ে যায় আগামী থেকে আগামীর পথে।

 

Read 46 times

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…