জীবনাঙ্ক

জীবনাঙ্ক

মাসুদা ভাট্টি

 

 

অদিতির গল্পটা বেশ সরল ছিল। ওই সরলতাটুকু সবার জানা উচিত।
অদিতি দেখতে চাঁদের মতো। এ কথা জন্মের পর থেকেই শুনে আসছে ও। প্রথম প্রথম ও মনে করতো, ওর মা ওকে আদর করে এ রকমটা বলে। কিন্তু বড় হয়ে যখন সবাই ওকে বলতে লাগলো, ও দেখতে চাঁদেরই মতো তখন ওর আসলে নিজের চেহারাটা নিয়ে ভীষণই লজ্জা হতে লাগলো। কিন্তু চেহারা তো আর লুকিয়ে রাখা যায় না! ও চাইলে বোরখা পরতে পারতো। তবে সেটি কোনো সমস্যার সমাধান হতে পারে না। এটা ওকে কেউ বোঝায়নি। ও নিজে নিজেই বুঝেছে। তাই নিজের চাঁদের মতো চেহারাটাকে নিয়েই ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া শেষ করেছে। ইচ্ছা আছে বিদেশে পড়তে যাওয়ার। কিন্তু এর ব্যবস্থা করার আগেই চাকরিটা হয়ে গেল এবং সেটিও এক বিশাল একটি বিদেশি সংস্থাতেই। বাবা বললেন, চাকরিটা শুরু করো, দেখবে ওরাই তোমাকে একদিন বাইরে পড়ার সুযোগ করে দেবে। তবে চাকরি শুরুর আগেই ওর ভিন্ন রকম জীবনটা শুরু হয়ে গিয়েছিল। শুরুটায় ওর ইচ্ছার চেয়েও অনেক বেশি কাজ করেছিল ঘটনার গতি- যে গতি নিয়ে ওর ভেতর সন্দেহ শুরু হয়েছিল প্রথম থেকেই। তারপরও অদিতি শুরু করেছিল। জীবনটা এতো সহজভাবে শুরু হয়ে যাবে, ও ভাবেনি। কিন্তু শুরু তো হয়েই গেল মনে হয়।


ওকে যে-ই দেখবে সে-ই এখন বলবে, তোমার আর কী! দেখতে সুন্দর, যেখানে গিয়ে দাঁড়াবে কেউ না করতে পারবে না। এ রকম কথা ও শুনতে শুনতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। কিন্তু ওর কখনো মনে হয়নি যে, ও খুব সহজেই সবকিছু পেয়েছে। লেখাপড়ার কথাই যদি ধরি, তাহলে অদিতি বরাবর ভালো ছাত্রী। ক্লাসে প্রথম তিনজনের মধ্যেই থেকেছে ও। এ জন্য ওকে লেখাপড়া করতে হয়নি। দিন-রাত খাটতে হয়েছে। মা নিজে পড়িয়েছেন, বাবা কখনো অদিতির সঙ্গে বই নিয়ে না বসলেও সারাক্ষণ কানের কাছে বলেছেন, ‘ভালো রেজাল্টের বিকল্প নেই। আমাদের তো অতো টাকা-পয়সা নাই মা, তোমাকে লেখাপড়া করেই ভালো থাকার চেষ্টা করতে হবে, বুঝলা?’ বাবার সঙ্গে অদিতির সম্পর্কটা খারাপ নয়। ওর ক্লাসের অন্য মেয়েদের মতো নয়। ও বাবার কাছে চাইলেই অনেক কথা বলতে পারে। আর মা তো মা-ই। জেলা শহরের সবচেয়ে পুরনো স্কুলটায় তিনি পদার্থবিদ্যা পড়ান। জীবনের সবকিছুকেই তিনি ফিজিক্সের সূত্র দিয়ে যাচাই-বাছাই করার চেষ্টা করেন। অদিতির সঙ্গে কখনো বন্ধুত্ব হয়নি ঠিকই কিন্তু অদিতি নিশ্চিত জানে, মায়ের কাছে গিয়ে দাঁড়ানোর আগেই মা বুঝতে পারবেন ওর ভেতরে কী হচ্ছে। এটা ওই ছোট্টবেলা থেকেই ও জেনে জেনে বড় হয়েছে। একটা মাত্র মেয়ে হওয়ায় মা ও বাবার সব মনোযোগ ওর দিকে ছিল। কখনো কখনো এতে ওর রাগও হয়েছে। মনে হয়েছে, আরেকটা ভাই-বোন থাকলে হয়তো তাদের ওপর মা-বাবার নজর যেতো এবং ও হয়তো একটু অন্য রকম কিছু একটা করার সুযোগ পেতো। কিন্তু ওই অন্য রকম কিছুটা কী, ও নিশ্চিত করে জানে না। তবে ও নিশ্চিত জেনেছে এবং পরে প্রমাণও পেয়েছে, যে মেয়ের বাবা তার সঙ্গে বন্ধুর মতো মিশেছে সে মেয়ে একটু অন্য রকমভাবে বড় হয়। তার ভেতর সামান্য হলেও ভিন্ন রকম ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে। এটা ওর ধারণা নয়, বিশ্বাস।
কলেজ শেষ করে যখন ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এলো তখন মা-বাবা ওকে পই পই করে কিছুই শেখায়নি, বোঝায়নি। আসলে ওকে তো ছোট থেকেই নিজের মতো করে বড় হওয়ার সুযোগ দিয়েছিলেন ওরা। নতুন করে কিছুই আর বোঝাতে হয়নি। কেবল একদিন গভীর রাতে ঘুম ভেঙে গেলে ডাইনিং টেবিলে রাখা পানির জগ থেকে পানি আনতে গিয়ে ও শুনে ফেলেছিল মা বলছেন, ‘আমার মেয়েটা এতো সুন্দর হলো কেন বলো তো? এই দেশে সুন্দর মেয়েদের একা থাকাটা ভয়ঙ্কর একটা ঝুঁকির ব্যাপার। ও একা ঢাকা থাকতে পারবে তো?’


বাবা খুব শান্ত ভঙ্গিতে বলছিলেন, ‘এতো ভাবছ কেন? হোস্টেলে থাকবে। সেখানে বাকি মেয়েরা থাকতে পারলে আমাদের মেয়েটাও পারবে। তুমি ভেবো না। মেয়ে ঠিক সামলে নেবে।’ বাবাকে অদিতি কোনোদিনই কিছু নিয়ে উত্তেজিত হতে দেখেনি। সরকারি ব্যাংকে এতো বড় পদে থেকেও ভদ্রলোক সম্পর্কে সবচেয়ে বড় সুনাম হলো, তিনি নাকি ঘুষ খান না। অনেকবার বাবাকে বলতে শুনেছে অদিতি- ‘আমার তো ঘুষ খাওয়ার প্রয়োজন নেই।


যা আছে এতেই চলে যাচ্ছে, চলে যাবে, একটাই তো মেয়ে আমাদের। আসলেই তা-ই। অদিতিদের বাড়িটা তিনতলা। দুটি ফ্লোর ভাড়া দেয়া। গ্রামের বাড়ি থেকে বছরের সব ফসল আসে, বিক্রিও নাকি হয় অনেক। এগুলো মা-ই দেখাশোনা করেন। ছুটি নিয়ে গিয়ে হলেও নিজের হাতে তিনি ধান, গম, সরিষা, মসুর, ছোলা- সব ঠিকঠাক করে আনবেন। মাঝে মধ্যে কষ্টই হয় খুব, বিশেষ করে গরমের সময় যেসব ফসল হয় সেগুলো তোলা শেষ হলে যখন তিনি ফিরে আসেন তখন চেহারার দিকে তাকানো যায় না। কয়েকবার বিছানাও নিতে হয়েছে। কিন্তু নিষেধ করলে বলবেন, ‘ও তোমরা বুঝবে না। ফসল ফলানোর আনন্দই আলাদা।’ অদিতিকে ওর মা তুমি করে বলেন। ভুল করেও কখনো মেয়েকে তুই বলেননি তিনি। বাবা অবশ্য মেয়েকে তুই করেই ডাকেন।
ছোট্ট জেলা শহর। সবাই সবাইকে চেনে। অদিতির মা-বাবাকেও যারা চেনেন তারা জানেন, মেয়ের বিয়ে নিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলা বৃথা। এতো সুন্দর মেয়েটা শহর থেকে বাইরে চলে যাবে পড়তে, কার না কার হাতে পড়ে- এ রকম দুঃখ অনেকের মনেই আছে। যারা জানেন না, তাদের কেউ কেউ ওই ইন্টারমিডিয়েটে পড়া থেকেই অদিতির মা-বাবার কাছে এসে মেয়েকে বিয়ে দেবেন কি না জানতে চেয়েছেন। তাদের সোজা উত্তর, ‘নিশ্চয়ই, বিয়ে তো দেবোই। কিন্তু ওর পছন্দের ছেলের সঙ্গে। আর ও যখন বিয়ে করতে চাইবে।’


অদিতির কলেজের বন্ধুরা ওকে সব সময়ই বলতো, আহা রে! আমাদের মা-বাবারা যদি তোর মা-বাবার মতো হতো, কী ভালো হতো, বল? একেকটা ছেলের নাম নিয়ে বলতো, ওকে নিয়ে গিয়ে সোজা মা-বাবাকে বলতাম, এর সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দাও, ব্যস, বিয়ে হয়ে যেতো। লেখাপড়া থেকে মুক্তি পেতাম। অদিতি ওদের কথা শুনে হাসতো শুধু। হাসা ছাড়া কি-ই বা বলার আছে! ওর মাঝে মধ্যেই মনে হতো, সবকিছু কেমন সুন্দর, মসৃণ, কোনো বাধা নেই কোথাও। ওর জীবনটা কি একটু বেশিই অন্য রকম? ওর ভেতরে এ রকম প্রশ্নও উঠতো।


ঢাকায় পড়তে এসে অবশ্য এই প্রশ্নের আর সুযোগ ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয় জায়গাটাকে বাইরে থেকে যতোই উদার আর দারুণ মনে হোক না কেন, জায়গাটা মোটেই সুবিধার নয়। লেখাপড়া হয় মোটামুটি। কিন্তু সেটি নিজেরই তাগিদে করতে হয়। আর সুযোগ-সুবিধাও কম। বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে পত্র-পত্রিকায় পড়েছে অদিতি কেবল, কোনো অভিজ্ঞতা তো নেই। এরপরও মনে হয়, এতো বড় একটি বিশ্ববিদ্যালয়, এর লাইব্রেরিটা এ রকম কেন? এর শিক্ষকরাই বা এমন কেন? পড়ানোর চেয়ে কেবল সময় কাটানোই যেন মূল কাজ তাদের। যদিও কেউ কেউ চেষ্টা করেন ছাত্রছাত্রীদের পড়ানোর জন্য তবুও তাদের পক্ষে সব সময় সম্ভব হয় না। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মতো বিষয় পড়তে এসেও অদিতিকে এ বিষয়ে বই খুঁজতে খুঁজতে হয়রান হতে হয়েছে। যে শিক্ষকের কাছেই একটু বেশি বোঝার চেষ্টা করেছে তাদের কেউ কেউ যে সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করেননি তা নয়। তবে অদিতি নিজেকে সামলাতে শিখেছিল এক অসম্ভব কাঠিন্যের আড়াল দিয়ে। সব সময় ওই কঠিন চাহনি কিংবা আচরণে যে কাজ হয়েছে তা নয়, কেউ কেউ অতিরিক্ত আগ্রহী হয়ে ওকে নানানবিধ যন্ত্রণা দিয়েছে। ঠিক এ রকম সময়ে অদিতি হাঁপিয়ে উঠেছে। এ রকম সময়েই ওর মনে হতো, কী হতো আরেকটু কম সুন্দর হলে! ও খেয়াল করে দেখেছে, মেয়েদের আসলে সুন্দর-অসুন্দর বলে কিছু নেই, মেয়ে মানেই হচ্ছে লক্ষ্যবস্তু। এটা বুঝতে পেরে এক ধরনের স্বস্তিবোধ করেছে ও। নিজের ভেতরে কখনো যে প্রেম টের পায়নি তা নয়। কিন্তু ওই যে মা-বাবা নিজেরই ওপর ওর দায়-দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছিলেন বলে অদিতি সব সময় ভেবেছে, সময় তো পালিয়ে যাচ্ছে না, এ সময় পরেও আসবে। নিজেকে সামলেছে ও। তাছাড়া সহপাঠীদের কাউকে ওর কখনোই বর হিসেবে যোগ্য মনে হয়নি। সিনিয়র কিংবা শিক্ষকদের একেকজনের আচরণ, বিশেষ করে ছোঁক ছোঁক করাটা ও একদম মেনে নিতে পারেনি। এ কারণেই বিশ্ববিদ্যালয় জীবনটা ও পার করে দিতে পেরেছিল কোনো রকম ঘটনা ছাড়াই। টুকটাক যা ঘটেছে এতে ওর কোনো হাত ছিল না। এগুলো হতোই। কেবল দুঃখজনকভাবে সেটি ওর সঙ্গে হয়েছে। ওকে আড়ালে কিংবা কখনো কখনো প্রকাশ্যে কেউ কেউ ‘সুন্দরী কাঠের টুকরা’ বলেও ডাকতো। ও মনে মনে হেসেছে কেবল, কখনো কোনো প্রতিবাদ করেনি।


ওই সুন্দরী কাঠের টুকরোটাই একদিন প্রেমে পড়ে গেল ওর চেয়ে দুই বছরের সিনিয়র রওশন ইব্রাহিমের। কোনো সিনেমাটিক ঘটনায় প্রেম নয়, বরং খুব সাধারণ ওই প্রেম। রওশন নয়, অদিতিই রওশনকে বলেছিল প্রথম ভালবাসার কথা। পরিচয় থেকে প্রেম হওয়া পর্যন্ত ঘটনা এতোটাই অনুল্লেখযোগ্য যে, এটা আলাদা করে বলার কিছুই নেই। এরপরও উল্লেখ করার মতো ঘটনা হলো, প্রেম হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই রওশন বিয়ে করতে চাইলো। কারণ ওর একটা স্কলারশিপ হয়ে গিয়েছিল ততোদিনে লন্ডনের স্কুল অব ইকোনমিকসে। বিয়ে না করে বিদেশ চলে যাওয়াটা ভালো লাগেনি রওশনের। তাই দু’দিকের বাড়িতে জানিয়েই রওশন আর অদিতি বিয়ে করেছিল। খুব হঠাৎ হঠাৎ নানানবিধ ঘটনা জীবনে ঘটতে থাকে যার কোনো ব্যাখ্যা থাকে না কিংবা থাকলেও ঘটনার আকস্মিকতায় সেগুলো কেমন গুলিয়ে যায়। অদিতিরও তেমন হয়েছিল ওই সময়টায়। প্রেম হওয়া, বিয়ে হওয়া, তারপর রওশনের চলে যাওয়া। এর মধ্যেই ওর নিজের পরীক্ষা এবং চাকরি হয়ে

যাওয়া- সব মিলিয়ে অদিতি ওই পুরো সময়টা নিয়ে খুব বেশি ভাবার সময় পায়নি। ভাবলে দেখতে পেতো, ওই দ্রুত ঘটে যাওয়া ঘটনাবলির মধ্যে নানান রকম ফাঁকফোকর রয়েছে যা পূরণ করা পরে ওর পক্ষে আর কখনোই সম্ভব হয়নি।
ওদের অফিসটা গুলশানে। একটা তিনতলা বাড়ির পুরোটা। এক বিঘার প্লটের ওপর বাড়িটা। তাই অর্ধেক নানান গাছগাছালিতে ভরা। বেশ সুন্দর একটা বাগান আছে। প্রায়ই ওরা কলিগরা মিলে ওখানে বসে গল্প করে। বিদেশি সংস্থাটি এ দেশের রাজনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, স্বাস্থ্য ইত্যাদি বিষয়েই নানান গবেষণা করে আর সেগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করে। পুরোপুরি মাল্টিন্যাশনাল একটি অফিস। ওদের ঢাকাপ্রধান এক আইরিশ আমেরিকান। অদিতির লাইন ম্যানেজার ভারতীয়। ওদের ক্যান্টিনে প্রায় অনেক ধরনের খাবার রান্না হয়, দেশি-বিদেশি, হালাল। ওর অবশ্য এ বিষয়ে কোনো ধারণাই ছিল না। হালাল-হারাম সম্পর্কে অদিতি জানে না তা নয়। কিন্তু এ রকম অফিশিয়ালি বিষয়টাকে গুরুত্ব দেয়া হয় বলে ও জানতো না। আসলে ও তো এর আগে কোথাও চাকরি-বাকরি করেনি! বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ম নিয়ে অনেক বাড়াবাড়ি দেখেছে। তবে হলগুলোর ক্যান্টিনে এখনো হালাল-হারাম আলাদা করে গুরুত্ব দেয়া হয় না। অবশ্য ধরেই নেয়া হয় যে, এখানে যারা আসবে তারাই হালাল খাবে। আর অন্য ধর্মের ছেলেদের জন্য তো আলাদা হলই আছে। মেয়েদের জন্য অবশ্য আলাদা হল নেই। এখানে মেয়েরা যার যার ধর্ম নিজেই বাঁচায়। প্রাতিষ্ঠানিক কোনো দায়িত্ব নেই মেয়েদের ধর্ম রক্ষার- অন্তত খাবার-দাবার দিয়ে।
অদিতিদের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যেসব গবেষণা হয় সেগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে ধরে নেয়া যায়। অনেক সুনাম ওই প্রতিষ্ঠানের। দেশের নামকরা গবেষকরা ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকেন। এই কিছুদিন হয় ওদের প্রতিষ্ঠান তরুণ গবেষকদের নিয়ে একটি প্রকল্প শুরু করেছে। ওই প্রকল্পে একদল তরুণ গবেষককে নেয়া হয়েছে বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক গবেষণার জন্য। অফিসের একটি ফ্লোর তাদের ছেড়ে দেয়া হয়েছে ছোট ছোট কিউবিকল করে। তারা সারা দিন কাজ করে নিজেদের পছন্দমতো বিষয় নিয়ে। ওই গবেষকরা বেশির ভাগই বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লেখাপড়া করে এসেছে। অদিতি তাদের সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করছে। ওর ভাবতে মজা লাগে, বাংলাদেশ সম্পর্কে এতো বিষয় নিয়ে কাজ হচ্ছে। অথচ কেউ এগুলো নিয়ে তেমন খোঁজখবর রাখে বলে ওর জানা নেই।


ওর সহকর্মীরাও বেশ মজার। প্রত্যেকের সঙ্গেই ওর সম্পর্ক বেশ ভালো। তবে ইফতেখার নামের ছেলেটাকে ওর মনে হয়েছে কেমন যেন সম্পূর্ণ অন্য রকম। পোশাক-আশাকে তো বটেই, হার্ভার্ড থেকে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিষয়ে মাস্টার্স করেছে। পিএইচডি করার আগে অদিতির মতো কিছুদিন কাজ করবে বলে দেশে চলে এসেছে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, মুখে চাপ দাড়ি, প্যান্ট পরে ‘টাখনু’র উপরে। অফিসে দু’বার নামাজের সময় হলে সবার আগে ওজু করে নামাজ পড়তে যায় এবং প্রায়ই বাকিদেরও জোর করে। কেউ কেউ তো এখন লজ্জায় পড়েই নামাজ পড়তে যায় ওর সঙ্গে। অফিসে এসেই নাকি ইফতেখার ওই অফিসে নামাজের জায়গার তৈরির জন্য কর্তৃপক্ষকে চাপ দিতে শুরু করে। মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি এসব ক্ষেত্রে খুব উদার। প্রার্থনার জায়গা দিতে তাদের কোনোই দ্বিধা ছিল না। কেউ বলেনি এতো দিন। তাই দেয়নি। কিন্তু ইফতেখার বলার সঙ্গে সঙ্গেই আলাদা জায়গা হয়ে গিয়েছিল। অফিসের সবাই ইফতেখার সম্পর্কে আড়ালে নানান কথা বলে। ও কোনো মেয়ের দিকে তাকায় না, খুব কট্টর- এসবই বলার মতো কথা। বাকিটা কেউ জানেই না হয়তো। অদিতি ভাবে, কোনো মানুষকে নিয়ে এভাবে আড়ালে-আবডালে কথা বলার কিছুই নেই, বরং প্রশ্ন থাকলে সোজা-সাপ্টা জিজ্ঞাসা করাই ভালো। অদিতি ভেবেই রেখেছিল, একদিন ইফতেখারকে চা খেতে বলবে ওর সঙ্গে ক্যান্টিনে। হয়তো ছেলেটার সঙ্গে কেউ কথা বলে না বলে ও নিজেও কারো সঙ্গে কথা বলতে লজ্জা পায়। কারো ধর্ম আচরণ তাকে বিচার করার মাপকাঠি হতে পারে না- অদিতি ভাবে। কিন্তু এর আগেই অদিতিকে রওশন জানায় ইফতেখারের কথা। ওরা নাকি খুব ভালো বন্ধু এবং ওদের ইমেইলে পরিচয়ও করিয়ে দেয় রওশন।


অদিতিকে রওশন লিখেছিল, ‘ইফতেখারের কথা তোমাকে কখনো বলিনি। ও আমার খুব ভালো বন্ধু। তোমাদের অফিসেই আছে। খুব ব্রাইট রিসার্চার। ওকে সহযোগিতা করো, প্লিজ!’ একই ইমেইলে ইফতেখারকেও লিখেছিল, ‘ইফতেখার, অদিতি আমার স্ত্রী। তোমার প্রয়োজনে ও তোমাকে সব সহযোগিতা দেবে।’ ইংরেজিতে লেখা ওই ইমেইলটা অদিতির ভালো লাগেনি। ভালো বন্ধুর সঙ্গে স্ত্রীর পরিচয় করিয়ে দেয়ার ধরনটাই যেন কেমন মনে হয়েছিল ওর কাছে। এরপরও ইফতেখারের সঙ্গে ও কথা বলেছিল। এমনিতেই তো ওকে চা খাওয়ার কথা বলতে চেয়েছিল অদিতি। এর আগেই ওই সুযোগ এসে গিয়েছিল। অদিতি খেয়াল করেছিল, ইফতেখার কখনোই ওর দিকে তাকিয়ে কথা বলে না। কেউ যদি মুখের দিকে না তাকায় তাহলে তার সঙ্গে কথা বলাটা এক ধরনের শাস্তি। অদিতির খারাপ লাগছিল। ভেবেছিল, পরে কোনোদিন এটা বলবে ইফতেখারকে। এর আগেই অদিতিকে অবাক করে দিয়ে ইফতেখার বলেছিল, ‘আপনাকে একটা দায়িত্ব দেবো, আশা করি, করে দেবেন। রওশন সাহেবকে আমি বলেছি। তিনি বলেছেন, আপনি কাজটা করে দেবেন।’ রওশন সাহেব! আপনারা না বন্ধু? অদিতি একটু হালকা হওয়ার চেষ্টা করেছিল।


অদিতির ওই প্রগলভ প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ইফতেখার বলেছিল, আপনার তো আমাদের রিসার্চ ডাটাবেজের অ্যাকসেস রয়েছে, তাই না? আমাকে অ্যাকসেস পাসওয়ার্ডটা দিতে হবে। আমার প্রয়োজন। ওটা তো কাউকে দেয়া নিষেধ। আপনার কোন পেপারটা প্রয়োজন, আমাকে বলুন। আমি সেটি বের করে আপনার ফোল্ডারে জমা করে দেবো- অদিতি একটু অবাক হয়েই ইফতেখারকে বলেছে। না, আমার পাসওয়ার্ডটাই প্রয়োজন। আপনাকে এ ব্যাপারে রওশন সাহেব বলবেন। কেউ বললেই আপনাকে পাসওয়ার্ড দিয়ে দেবো তা তো হয় না ইফতেখার। আমি সেটি করবো না। আপনি করবেন এবং আপনাকে সেটি করতে হবে- ইফতেখারের গলার আওয়াজ এতোটাই ঠা-া যে, অদিতির একটু ভয়ই হলো। কিন্তু অদিতিও গলাটাকে যথাসম্ভব কঠিন করেই বললো, দেখা যাবে করি কি না। তবে আমি করবো না, সেটি ধরে রাখতে পারেন। সেদিনের ওই আলাপচারিতা নিয়ে অদিতি ভেবেছে অনেক। কারো সঙ্গে আলাপ করবে কি না সেটিও ভেবেছে। কিন্তু কী মনে করে যেন চুপ থেকেছে। বিশেষ করে পরের দিনই রওশন ফোন করে অদিতিকে বলেছে, ইফতেখার যা চাইছে, সেটি ওকে দিয়ে দাও অদিতি।


অদিতি জিজ্ঞাসা করেছে, কেন বলো তো? তিনি পাসওয়ার্ড চাইছেন কেন? আমি তো ওনাকে বলেছি, ওনার যে ফাইল দরকার সেটি ওনাকে বের করে দেবো। সেটি এমনিতেই দিতাম, দিতে আমি বাধ্য। যার যার বিষয় অনুযায়ী রিসার্চ পেপার বের করে দেয়াই তো আমার কাজ। কিন্তু তিনি পাসওয়ার্ড চাইলে তো সেটি আমার পক্ষে দেয়া সম্ভব নয়, তাই না? দেখো, আমি বলেছি বলেই তুমি পাসওয়ার্ড ওকে দেবে। না, তুমি বলেছ বলেই আমাকে পাসওয়ার্ড কাউকে দিতে হবে সেটি মনে করি না। আমার কর্মক্ষেত্রে আমার লয়ালিটি আমার কর্তৃপক্ষের প্রতি, অন্য ক্ষেত্রে হয়তো সেটি তুমি। অদিতি বেশি বাড়াবাড়ি করছ তুমি- রওশনের গলার স্বর চড়ে। অদিতি ততোটাই শান্তস্বরে বলে, না, একদম বাড়াবাড়ি করছি না। যেটি স্বাভাবিক সেটি করছি। বুঝতে পারছি না, তোমরা কেন একটা অন্যায় আবদার নিয়ে আমার সঙ্গে জোর করছ? এটা অন্যায় আবদার নয়, ওর এটা দরকার। আর তুমি এটা দেবে, ব্যস!  এটি দেবো না। দরকার হলে কালই অফিসকে জানাবো এটা। তুমি এটা করবে না অদিতি। তোমার সাহস দেখে অবাক হচ্ছি। বেশি বাড়াবাড়ি করলে এর পরিণাম ভালো হবে না বলে দিচ্ছি।  আমার তো মনে হচ্ছে কোনো ভয়ঙ্কর কারণ আছে এর পেছনে। না হলে আমাকে তুমি এভাবে হুমকি দিতে না। তোমার যা ইচ্ছে, তুমি তা-ই করতে পারো। কাউকে পাসওয়ার্ড দেবো না এবং কালই অফিসে এটা জানাবো- বলেই অদিতি ফোন রেখে দিয়েছিল।


ফোন রেখে দিয়ে মনে শান্তি পাচ্ছিল না একদম। কী এমন কারণ হতে পারে যার জন্য রওশন এতো রূঢ় ব্যবহার করলো ওর সঙ্গে? পাসওয়ার্ড দিয়ে ওরা কী করবে? এই যে হঠাৎ করেই ইফতেখারকে রওশনের বন্ধু হিসেবে ওর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়া, এরপর প্রথম পরিচয়েই ইফতেখারের এ রকম পাসওয়ার্ড চাওয়া এবং তারপর এ জন্য ওর ওপর রওশনের এ রকম চাপ দেয়া- সব কেমন যেন গোলমেলে ব্যাপার বলে মনে হতে থাকে অদিতির। ও সিদ্ধান্ত নেয় সত্যি সত্যিই কাল অফিসে গিয়ে ওর লাইন ম্যানেজারকে বলে দেবে ঘটনাটা। এতে যা হয় হবে, পরে দেখা যাবে। এ পর্যন্ত অদিতির জীবনের গল্পটা বেশ সরল-সোজাই, পাসওয়ার্ড সংক্রান্ত ওই সামান্য টানাপড়েন ছাড়া। কিন্তু রওশনের ফোন কেটে দেয়ার মাত্র আধা ঘণ্টা পরই অদিতির জন্য যে এতো বড় বিস্ময় অপেক্ষা করছিল সেটি স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেনি।

রওশনদের ফ্ল্যাটটা সাততলায়। বারোতলা বিল্ডিংয়ের সাততলাটা পুরোটা ওদের। অদিতিকে নিয়ে রওশন উঠেছিল ওই বিশাল ফ্ল্যাটের এক পাশে। বাকি পাশটায় রওশনের মা-বাবা থাকেন ওর বোনকে নিয়ে। বোনটা অটিস্টিক, বিয়ে-থা হয়নি। অদিতির ভালো লেগেছিল এই আলাদা থাকার ব্যাপারটা। অবশ্য খাওয়া-দাওয়া সব একসঙ্গে। রওশন চলে যাওয়ার পরও ব্যাপারটা এমনই চলছে। অদিতি অফিস থেকে বাড়ি ফিরে ফ্রেশ হয়ে শ্বশুর-শাশুড়ির কাছে গিয়ে গল্প-টল্প করে। তারপর খাওয়া-দাওয়া করে নিজের ঘরে চলে আসে। সেদিনও খাওয়া-দাওয়ার পর রুমে আসার পরই রওশনের ফোন এসেছিল। ফোনটা কেটে দিয়ে খুব মন খারাপ লাগছিল অদিতির। এর চেয়েও কষ্ট দিচ্ছিল রওশনের হুমকি। অদিতি গুম হয়ে বসেছিল সোফায়। টিভিটা চলছিল তখনো। সাউন্ড অফ করা ছিল কথা বলার সময়। তখনো বাড়ায়নি সাউন্ডটা। ঠিক তখনই ওর ঘরে এসেছিলেন ওর শ্বশুর। বলেছিলেন, তোমার মোবাইল ফোনসেটটি দাও। মোবাইল ফোনসেটটি টেবিলের ওপরই ছিল। সেটি দেখতে পেয়ে ছোঁ মেরে তুলে নিলেন। এরপর বললেন, ‘কাল থেকে তোমার বাইরে যাওয়া বন্ধ।’ ভদ্রলোক গট গট করে রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন এবং অদিতির মনে হলো বাইরে থেকে রুমটা বোধহয় তালাও

দেয়া হলো। অদিতি হতবাক কিংবা এর চেয়েও বেশি কিছু হয়ে গিয়েছিল বোধ করি। ও ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না কী হলো! ও কেমন যেন অজ্ঞান হওয়ার মতো করে নেতিয়ে রইলো সোফার ওপর। এরপর ঘুমিয়ে পড়েছিল নিশ্চয়ই। যখন ঘুম ভাঙলো তখন গভীর রাত। দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকালো- ৩টা প্রায়। টিভিটা তখনো চলছে শব্দহীন। অদিতি বসে বসে ভাবে, কী হলো! হঠাৎ কী হলো? সবদিক থেকে ওকে এ রকম আঘাত করা হলো কেন? প্রথমে রওশন, এরপর রওশনের বাবা। ওর বুঝতে কষ্ট হয় না যে, নিশ্চয়ই ভয়ঙ্কর কোনো ব্যাপার রয়েছে এর পেছনে। কিন্তু ওই ভয়ঙ্কর ব্যাপারটি ঠিক কী সেটি ধরতে পারে না অদিতি। এখন ওর হাতে কোনো মোবাইল ফোন নেই। বাইরের সঙ্গে যোগাযোগ করার ব্যবস্থা নেই। ভাবতে ভাবতেই মনে হলো, আরে! ল্যাপটপটা তো আছে। ইমেইল তো করা যেতে পারে। ও সঙ্গে সঙ্গে ল্যাপটপ খুলে বসে। দেখে ঘরের ওয়াইফাই নেটওয়ার্ক কাজ করছে না। বাকি যে নেটওয়ার্কগুলো দেখাচ্ছে- সবই পাসওয়ার্ড প্রটেক্টেড। কেবল ‘আইকন’ নামে স্থানীয় যে ইন্টারনেট সার্ভিসটি আছে সেটিতে কোনো পাসওয়ার্ড নেই। কিন্তু অদিতি জানে যে, এটাতে কানেক্ট করার পর ঠিক পাসওয়ার্ড চাইবে। অফিস থেকে ওদের সবাইকেই ওই পাসওয়ার্ড দেয়া হয়েছিল। বলেছিল, ওই পাসওয়ার্ড দিয়ে ঢুকে নিজের মতো করে পাসওয়ার্ড বদলে নিতে। অদিতি মনে করতে পারে না ও বদলেছিল কি না। মোবাইল ফোনে গ্রামীণের সার্ভিস, বাসায় ওয়াইফাই, অফিসে নিজস্ব নেটওয়ার্ক, সব সময় কোনো না কোনো নেটওয়ার্কের আওতাতেই ও থাকে। তাই আলাদা করে ওই আইকন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করার প্রয়োজন পড়েনি। কিন্তু এখন! এই ভয়ঙ্কর সময়ে মনে হচ্ছিল, আসলে প্রয়োজন থাকে। নেটওয়ার্ক যতো বাড়ানো যায় ততোই হয়তো ভালো। অদিতি আইকন নেটওয়ার্কে ক্লিক করে। ও যুক্ত হয়। নতুন উইনডো খোলে। সেখানে ইউজার নেম আর পাসওয়ার্ড চায়। অদিতি প্রথমে নিজের নাম লেখে ইউজার নেমের জায়গায়। এরপর পাসওয়ার্ড বসিয়ে কিছুক্ষণ সময় নিয়ে এন্টার চাপে। কী আশ্চর্য! আইকন ওকে ওয়েলকাম মেসেজ পাঠায়। অদিতির নিজেকে এর চেয়ে ভাগ্যবান কোনোদিন মনে হয়নি। ও দ্রুত একটা ইমেইল টাইপ করে সরাসরি ওর বসকে সবকিছু জানিয়ে। কী কারণে জানে না, ওর বরের কথা সম্পূর্ণ গোপন করে যায় অদিতি। নিজের বন্দিদশার কথা লিখবে কি না ভাবতে ভাবতে লিখেও ফেলে। এরপর মেইলটি পাঠিয়ে দিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে।


পরদিন সকালে বাসায় পুলিশ আসে। ওকে বের করে নিয়ে যায়। ঢাকায় কোথায় উঠবে ও- পুলিশ যখন ওকে এ কথা জিজ্ঞাসা করে তখনো ঠিক ভাবেনি ও আর এই বাড়িতে ফিরবে না। তাই কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। এরপর এক আত্মীয়ের বাসার ঠিকানা বলে। কিন্তু সেখানেও কি উঠবে ও? মা-বাবাই বা কী বলবে? এসব ভাবতে ভাবতে পুলিশ অফিসারের সঙ্গে কথা বলে অদিতি। গুলশান থানাতেই কথা হচ্ছিল। কতো প্রশ্ন অফিসারের। সবটির উত্তর ও জানেও না। এরপরও যা পারে বলে। তারপর অফিসে আসে। কেবল রওশন সম্পর্কে কোনো কথাই ও বলে না পুলিশকে। আশ্চর্যজনকভাবে পুলিশ অফিসারও রওশন সম্পর্কে কিছুই জানতে চায় না ওর কাছে। ততোক্ষণে অফিসে পুলিশ গেছে। ইফতেখারকে অ্যারেস্ট করেছে। মাল্টিন্যাশনাল অফিস বলে কথা! সবকিছু যেন কেমন দ্রুতই হয়ে যায়। ইফতেখারের কিউবিকল আর ড্রয়ার থেকে অসংখ্য লিফলেট ও বই জব্দ করা হলো। ওর কম্পিউটারটা নিয়ে গেল পুলিশ। বলা হলো, এই কম্পিউটারে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আছে। পরের দিনের পত্রিকাতেই বিস্তারিত খবর জানা গেল। একটি আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের হয়ে কাজ করছিল ইফতেখার, এখানে বসে কর্মী সংগ্রহ করেছিল ও। হার্ভার্ডে থাকতেই ওর ব্যাপারে পুলিশ তদন্ত শুরু করে। ও যখন বুঝতে পেরেছিল যে, ও আর ওখানে কাজ করতে পারবে না তখনই দেশে চলে আসে। হয়তো ভেবেছিল, এখানে ওকে আর কেউ ধরতে পারবে না। কিন্তু ঠিক ধরা পড়ে গেল। পুলিশ যখন ইফতেখারকে নিয়ে যাচ্ছে তখন অদিতির মনে হলো, এভাবে তো রওশনকেও পুলিশ গ্রেপ্তার করবে। আজ হয়তো ইফতেখারের জায়গায় রওশনও থাকতে পারতো কিংবা এ দেশের পুলিশ যদি ওই দেশের পুলিশকে কিছু জানায়? অবশ্য রওশন সম্পর্কে অতিরিক্ত কিছুই বলেনি পুলিশকে। কেন লুকালো এ কথা! সেও তো এক তীব্র বিস্ময়ের ব্যাপার ওর কাছে। নিজের কিউবিকলে ও মাথা নিচু করে বসে থাকে। আর তখনই মনে পড়ে কিছুদিন আগে দেখা একটা ফরাসি

সিনেমার কথা। সিনেমা দেখার নেশা ওর পুরনো। ব্রিটিশ কাউন্সিল, আঁলিয়স ফ্রঁসেতে নিয়মিত যাতায়াত ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়। তখন থেকেই ফিল্ম সোসাইটিতে জড়িয়েছিল ও। তাই ইউরোপিয়ান সিনেমার প্রতি ওর আলাদা ভালো লাগা তৈরি হয়েছিল। এ কারণেই নিজেই গিয়ে দেখে সিনেমা কেনে অদিতি। পাইরেটেড কপি, এতে কী! সিনেমা দেখার সুযোগ তো পাচ্ছে ও।
সিনেমাটি ফ্রান্সের মূলধারার কি না বলতে পারবে না। তবে একটি আলজেরিয়ান বংশোদ্ভূত ফরাসি ছেলের প্রেমে পড়ে এক ফরাসি মেয়ে। দুর্দান্ত আধুনিক মেয়েটির জীবন নিয়ে কোনো ভাবনা নেই, নেই কোনো পরবর্তী চিন্তাও। ভেসে থাকতেই ভালোবাসে সে। কিন্তু ওই ছেলের প্রেমে পড়ে বুঝতে পারে সে আসলে এক ভয়ঙ্কর মৌলবাদী জঙ্গি। ইউরোপকে অশান্ত করার কৌশল নিয়ে কাজ করছে। খুব দুর্বল গল্প। এর চেয়ে ঢের সিরিয়াস সিনেমা দেখেছে অদিতি। কিন্তু এ মুহূর্তে ওই সিনেমাটির গল্পটিই কেন মনে পড়লো অদিতির? ওর সঙ্গে মিল আছে বলে?


সিনেমায় গোটা পৃথিবীর ওপর বিরক্ত ছেলেটি কেবল ভালোবাসে মেয়েটির উতাল-পাথাল শরীরকে। মেয়েটি সিদ্ধান্ত নেয়, ওই শরীর দিয়েই তাকে ও বের করে আনবে ওই ধ্বংসের পথ থেকে। মেয়েটি শুরু করে। নিজেকে তৈরি করে। আরো সুন্দর করে তোলে। বিষয়টি সম্পর্কে মেয়েটি বিস্তর লেখাপড়া করে। এরপর কাজে নেমে যায়। একটি ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণ ঘটানো থেকে ছেলেটিকে সরাতেও সফল হয়। অবশ্য শেষটা অতো ভালো ছিল না। মানুষকে কি ১৮ বছরের পর আর বদলানো যায়!
অদিতির মনে পড়ে সিনেমাটির কথা ওই কিউবিকলে বসেই। কিন্তু ভেবে পায় না, রওশনকে কী করে এর থেকে বের করে আনবে ও। নিজের সঙ্গে নিজেই তর্ক শুরু করে দেয়। ইচ্ছা করলেই ওই সম্পর্ক থেকে ও বেরিয়ে আসতে পারে। একতরফা ডিভোর্স দিলেই হয়ে যায়। তবে অদিতি তো রওশনকে ভালোবেসেছে। ভালোবেসে বিয়েও করেছে। রওশনের যদি আজ কোনো কঠিন রোগ হতো তাহলে রওশনকে ও ছেড়ে চলে যেতে পারতো, নাকি যাওয়াটা ঠিক হতো? এও তো এক ভয়ঙ্কর রোগই। তাহলে?
অদিতি নিজেকে বোঝাতে শুরু করে। গোছাতেও শুরু করে। তবে ঠিক কোথায় রওশনের দুর্বলতা সেটি ঠাহর হয় না ওর। এরপরও ভেতরে ভেতরে খুঁজতে শুরু করে অদিতি। দিনটা কেটে গেছে থানায়। এখন প্রায় সন্ধ্যে। অফিসের অনেকেই চলে গেছে। মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি বলে এ নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য নেই কোথাও। নিশ্চয়ই ফিস ফিস হচ্ছে চারধারে। অদিতি উঠে দাঁড়ায়। বাথরুমে গিয়ে চোখ-মুখে জলের ঝাপটা দেয়। বাথরুমে মৃদু আলো জ্বলছে। কিন্তু সব পরিষ্কার দেখা যায়। আয়নার সামনে দাঁড়ানো অদিতি। ওর পুরো শরীরটা দেখা যায়। সে দাঁড়িয়ে থাকে অপলক আয়নার দিকে তাকিয়ে। আর তখন আবারও ওর মনে হয়, ও আসলে রওশনকে ভালোবাসে খু-উ-ব।
ভালোবাসলেই তার অনৈতিক কাজকে যেমন সমর্থন দেয়া যায় না তেমনই কেবল অনৈতিক কাজের ধুয়া তুলে ভালোবাসার মানুষকে মুখের কথাতেই ছেড়ে চলে যাওয়া যায় না! অদিতি ভাবে রওশনের কাছেই চলে যাবে কি না। ভাবতে ভাবতে বেরিয়ে আসে বাইরে।


ঢাকায় সন্ধ্যে নামছে। মানুষ বাড়ি ফিরছে। তাড়া টের পাওয়া যায় মানুষের মধ্যে, যানবাহনের মধ্যেও। ভীষণ গরম পড়েছে। তবে হালকা ঠা-ার একটা হাওয়াও বইছে। অদিতি হাঁটতে থাকে। ভেতরে ভেতরে একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে ওর ভেতরটা এখন বেশ হালকা। অন্তত দিনভর যে ভার ও বইছিল এর থেকে তো বটেই। এই প্রথম নিজেকে সুন্দরী ভেবে ওর অসম্ভব ভালো লাগে। এর আগেও যে দু’একবার লাগেনি তা নয়। কিন্তু আজকেরটা একেবারেই অন্য রকম ভালো লাগা। ওর হাঁটার গতি একটু হলেও বেড়ে যায় এ কথা ভাবতে ভাবতে।

Read 62 times

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…