যেভাবে বিচিত্রগামী, যাই আমি

‘যেভাবে বিচিত্রগামী, যাই আমি...’

প্রবীর ভৌমিক

 

শক্তি চট্টোপাধ্যায় চলে গেছেন প্রায় দুই দশক আগে। কলেজ স্ট্রিটের এক বিখ্যাত প্রকাশক একদিন কথায় কথায় বলেছিলেন, ‘যে লেখক মৃত্যুর পরও ২০-২৫ বছর ধরে জাগরুক থাকেন তার প্রতিভা সম্পর্কে কোনো সন্দেহের অবকাশ থাকে না।’ সবাই নন- কোনো কোনো কবি, সাহিত্যিক মৃত্যুর পরও হেঁটে যান, হেঁটে যেতে পারেন। শক্তি চট্টোপাধ্যায় সেই বিরলতমদের একজন। ১৯৯৫ সাল থেকে আজ পর্যন্ত অসংখ্য পত্রিকা তাকে নিয়ে সংখ্যা প্রকাশ করেছে। গবেষণা করেছেন বেশ কয়েক ব্যক্তিত্ব। তাকে নিয়ে গ্রন্থ রচনাও কম হয়নি। প্রশ্ন হলো, এর উৎস কী!
তাঁর কবিতার বাকভঙ্গি, বাকরীতি এক স্বাতন্ত্র্য ঘরানা গড়ে তোলে। এসবই এসেছে তার নিজের মতো করে, জীবন যাপনের মধ্য দিয়ে। এই জীবন যাপন উদ্দাম কিন্তু সহজ-সারল্যে ভরপুর। এই জীবন যাপনে লেগে থাকে দুঃখের অনন্য গভীরতা। কারণ সে বড় সুখের সময় নয়, সে বড় আনন্দের সময় নয়। নিজেকে ‘স্বেচ্ছাচারী’ বলতে পছন্দ করতেন তিনি। কিন্তু কেন এই স্বেচ্ছাচার! মধ্যবিত্ত মূল্যবোধের শিকড়ে কুঠারাঘাত। কখন যে তিনি কোথায় থাকতেন তার ঘনিষ্ঠরা তো ছার, মীনাক্ষী চট্টোপাধ্যায়ও জানতেন না। এই যে বিশৃঙ্খলা তার মধ্যে এই বিপুল পদ্য (তার ভাষায়) রচনা বিস্ময়কর নয় কী! তার জীবন যাপন নিয়ে যতো কাহিনী এর ৫০ শতাংশ সত্য হলেই মধ্যবিত্তের কাছে আতঙ্কের রূপকথাও বটে।


শুধু কি কবিতা রচনা? এর পাশাপাশি কবিতা বিষয়ক সংগঠন করা, বিভিন্ন সংকলন সম্পাদনা করা। একটা কথা বলা হয়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায় সামাজিক দায়বদ্ধতা নেই। এ সংজ্ঞাটি ঠিক বোধগম্য হয় না। ‘মানুষ তোমার পাশে আছি’ বলে চেঁচাতে হবে! নাকি হতে হবে কোনো রাজনৈতিক দলের দরদাম। ১৯৫৯ সাল থেকে সত্তরের দশকের প্রথম অর্ধাংশজুড়ে যে আন্দোলন ও আলোড়ন এবং তা দমন করতে যে পুলিশি সন্ত্রাস এর বিরুদ্ধে তিনি কলম ধরেছেন তার মতো করে। সত্তরের দশকের বিপ্লবের ডাক দিয়েছিলেন যে তরুণরা তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু যে নিষ্ঠুরতায় দমন করা হয়েছিল তা আজও রাষ্ট্রীয় হিং¯্রতার চরম কুৎসিত উদাহরণ হয়ে রয়েছে।
শক্তি চট্টোপাধ্যায় তখন লিখছেন-

‘বিষণœ রক্তের দাগ রেখে গেছে অন্ধকারে ফেলে
মু-হীন তরুণের উজ্বল বিমূঢ় এক দেহ
খোলা ছিল গলির গৃহস্থ জালনা আর
রোষমুক্ত তরবারি ঘাতকের হিং¯্র সাংঘাতিক...’

বাংলাদেশের অনেক কবি-সাহিত্যিকই জানেন এ দেশের সাহিত্য, শিল্প সম্পর্কে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের অনুরাগের কথা। যখন বাংলাদেশ হয়নি তখনো পূর্ব পাকিস্তান। ওপারের লেখালেখি প্রায় আসতোই না। তখন অনেক শ্রম, প্রভূত কষ্টে তিনি ১৯৫৯ সালে সম্পাদনা করেছিলেন ‘পূর্ববাংলার শ্রেষ্ঠ কবিতা’। এমন পর্বে বিস্তারিত জানা গেছে, মীনাক্ষী চট্টোপাধ্যায়ের লেখা থেকে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ছিল অকুণ্ঠ সমর্থন। মানবিক গুণে শীর্ণ ওই দৃষ্টিভঙ্গি। কবি নির্মলেন্দু গুণের রচনা থেকে জানা গেছে, ওই অস্থির সময়ে তরুণ এবং তখন এপার বাংলায় প্রায় অপরিচিত বাংলাদেশের এই কবির পাশে তিনি দাঁড়িয়েছিলেন। কৃতজ্ঞতার সঙ্গে নির্মুলেন্দু গুণ এ কথা স্বীকার করেছেন। কিন্তু ওই অংশটুকু দিয়েই তার কবিতা বোঝা যাবে না। বহুমাত্রিক তার বিস্তৃতি। তার কবিতার চলন।


বিভিন্নœ সময় শক্তি চট্টোপাধ্যায় উল্লেখ করেছেন, এক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি তিনি কবিতা লিখতে এসেছিলেন। ওই চ্যালেঞ্জের প্রথম প্রকাশ ‘হে প্রেম হে নৈঃশব্দ’তে জানিয়েছিলেন, তিনি অনেক দিন থাকতে এসেছেন। দুই-তিনটি গ্রন্থের উল্কা উত্থানের ¯্রষ্টা হতে আসেননি। প্রথম দিকে আংশিকভাবে থাকলেও পরের দিকে কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা নয়- স্বতঃস্ফূর্ত, সাবলীল ও ধারাবাহিকভাবে। মাথায় চাপ নিয়ে তার পাঠককে উপস্থিত হতে হয় না।
কোনো তুলনায় যাচ্ছি না। জীবনানন্দকে বোঝাতে বুদ্ধদেব বসু ছিলেন। শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে বোঝাতে নিজেই মাঠে নেমেছেন চূড়ান্ত সপ্রতিভতায় শব্দ আর ধ্বনির তুমুল তোলপাড়ে। কেমন ছিল তার কবিতার আলোড়ন! কবি অমিতাভ দাশগুপ্তের ভাষায়- ‘শক্তি চট্টোপাধ্যায় আসরে ঢুকেই এমন হই চই শুরু করলেন- মানুষ, নিসর্গ ও সর্বোপরি ঈশ্বর নামক বহু ব্যবহারে ঢলঢলে বস্তুটিকে ত্যাগ করে এমন সব বিপজ্জনক কবিতার গোলা ছুড়তে লাগলেন যে, চারপাশের পুরনো মূল্যবোধের ঠুঁটো জগন্নাথ মার্কা বিগ্রহগুলি মাটিতে পড়ে এ-ওর মাথা ঠোকাঠুকি করতে লাগলেন। প্রথম কবিতার এই সেই তা-ব। তারপর ইন্দ্রজাল ছড়িয়ে দেয়া। দেশের এমাথা-ওমাথা থেকে নোটিশবিহীন পর্যটন আর তা থেকে কুড়িয়ে আনা অমূল্য রতœরাশি। এটা খুব সহজ কাজ

নয়। চেয়ার-টেবিলে বসে ভারী ভারী তত্ত্বের পুস্তক পাঠান্তে শক্তির কবিতা রচনা নয়। নিজেকে পুড়িয়ে একদম খাঁটি করে তুলে এই লেখা, এই পদ্য (!) রচনা।’
একদিকে কবিতার ত্রাস, আর্তনাদ, হাহাকার। অন্যদিকে জীবনকে ভালোবেসেও মৃত্যুর রহস্যময় প্রাচুর্য। রবীন্দ্রনাথের মতো মৃত্যুশক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কাছে দেবতা নয়, বরং এক অনিবার্য পরিণতি-

“কী হবে জীবন লিখে? এই কাব্য এই হাতছানি
এই মনোরম মগ্ন দীঘি, যার দু’দিকে চৌচির
ধমণী- নেহাতই টান আজীবন সমস্ত কুশল
ফাঁস থেকে ছাড়া পেয়ে এই মৃত্যুময় বেঁচে থাকা?”


তার মৃত্যুবোধ ভালোবাসা থেকে উঠে আসা। মৃত্যুবোধের বিপরীতে প্রেম। জীবনের কয়েকটা বছর নিশ্চিন্তে কাটিয়ে দিয়ে তিনি ভালোবেসে মরে যেতে চান। প্রেম যেন তার কাছে এক আলৌকিক আলো। নর-নারীর নেহাত যৌন সম্পর্ক নয়- জীবনের বন্ধনে আচ্ছাদন তার ভালোবাসা চাই, সম্পর্কের ভালোবাসা। এটি তার
কবিতাকে ক্রমেই করে তোলে নম্্র, পেলব ও মন্ত্রের মতো স্থির। তিনি বলেছেন, ‘প্রেম অনির্বাচনীয়তা পায় অবশেষে, যৌনতা সেখানে জায়গা পায় না।’ নিরিখের পেলব স্পর্শে উচ্চারণ করেন-

‘অবান্তর স্মৃতির ভিতর আছে/তোমার মুখ অশ্রু ঝলোমলো/লিখিও, উহা ফিরৎ চাহো কি না?’


পাঠক লক্ষ্য করুন, কী প্রচ- সাহস, আত্মবিশ্বাস, বেপরোয়াভাবে ‘ফিরৎ’ শব্দটির অমোঘ প্রয়োগ। আর ‘লিখিত’ না হলে ‘ফিরৎ’ হয় না। সর্বোপরি ‘তোমার মুখ অশ্রু ঝলোমলো’। নর-নারীর যৌন সম্পর্কের অনেক ক্লেদাক্ত বর্ণনা কবিতায় পড়েছি, অন্যান্যদের কবিতায়। কিন্তু নিসর্গ, নির্মোহ আর বাউলের বৈরাগ্য নিয়ে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের প্রেম মায়া ডেকে আনে ঘরের দাওয়ায়। তার ‘ভালোবাসা সব জানে, গোপনে আকণ্ঠ ভালোবাসা।’
এই যে কথা নেই, বার্তা নেই নিরুদ্দেশ যাত্রা, ঝুঁকির জীবন- এই পর্যটনগুলো নিশ্চয়ই ফুলশয্যা ছিল না। অনিশ্চিত কণ্টকের শয্যা। আর এখান থেকে, অরণ্য ও নিসর্গ থেকে শক্তি চট্টোপাধ্যায় আহরণ করেছেন ভালোবাসার ব্যতিক্রমী সব ফুল-মালা। ঈশ্বরবোধ, মৃত্যু, জীবন, প্রকৃতি, রোমান্টিকতা, স্বেচ্ছাচার ও প্রেম- এ জটিল রসায়নেই তার অনন্যতা।
ঈশ্বরবোধ, শক্তির ঈশ্বর কোনো ধর্মের গুরুঠাকুর নন, ঈশ্বরের অলৌকিকত্ব নয়- একটা নির্ভরতার অবয়ব। যতোদূর জানি, কোনো ধর্মীয় লোকাচার ছিল না তার। ওইসব ধর্ম লোকাচার পালনের সময়ই বা কোথায় তার! তার প্রধানতম ধর্ম তো কবিতা। কিন্তু ঈশ্বর আছেন-

‘ঈশ্বর থাকেন জলে/তাঁর জন্য বাগানে পুকুর/আমাকে একদিন কাটতে হবে।
আমি একা... /ঈশ্বর থাকুন কাছে এই চাই- ’

এই যে ঈশ্বর সেটি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত, মানুষের ঈশ্বর, সদর্থক ঈশ্বর। এই যে ঈশ্বর, তিনি দৈনন্দিন কার্যকলাপের মধ্যে থাকেন। মন্দিরে পাথরের বিগ্রহ নন, এমনকি কবিতাতেও-

‘কবিতাকে তার খুব কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারি
যে-জন ঈশ্বর, বাঘ, পারিজাতময়, স্বর্গ, নারী।’

কলকাতায় এখন অনেক কিছুই হয়েছে, হচ্ছে। আর কিছু না হোক- কপট আলো, বিশ্ব যুব ফুটবল, ফিল্ম উৎসব, খাদ্য উৎসব, নাচ-গান, টাকা উড়ছে। খালাসীটোলা নয়, কবিরা এখন সম্ভ্রান্ত পানশালায়। কবিদের অধিকাংশই রাজা পাল্টালে আসন টেনে নিয়ে রাজার পাশে বসেন। একজন নেই, একজন দৈব উন্মাদ, একজন বাউল। একজন ‘এই শহরের রাখাল’ যিনি কয়েক মাস স্বেচ্ছানির্বাসনে গিয়ে ‘ডুয়াস’ বা ‘কালডুংরি’ থেকে এই মধ্যরাতে কলকাতায় ফিরেছেন। নেশাগ্রস্ত এবং ভূতগ্রস্তও বটে। ক্লান্ত হয়তো। বাড়ি ফিরবেন তার বাবুই, তাতার আর ‘সোনার মাছির কাছে’। এক পা বাড়ির দিকে, আরেক পা সদ্য ফেলে আসা অরণ্যমায়ায়। যাবেন বেলঘাটার দিকে, ট্যাকসি ডাকলেন- ‘ট্যাকসি, বেলঘাটা যায়াগা।’ ট্যাকসিচালক সম্মত হলেন। এবার অদ্ভুত আচরণ- ‘যাও, চলা যাও।’ এ দৃশ্য আমার মতো আরো অনেকেই দেখেছেন।


এখন কলকাতায় সব আছে। শুধু সেই হেমন্তের অরণ্যের ‘পোস্টম্যান’ নেই যিনি অনন্ত কুয়ার জলে চাঁদ দেখতে পান। ফলে এখন হেমন্তের থেকে অস্বস্তিকর বৃষ্টি।
নেই কী! আছেন কোথাও আড়ালে-আবডালে। আছেন মগ্ন পাঠকের হৃদয়ের কাছাকাছি, মেধার কাছাকাছি। মাঝে মধ্যে দুঃখবোধে আক্রান্ত হন-

‘তোমাদের জন্য ভারি দুঃখ হয় আমার
দুঃখ হয় তোমাদের দেশে শিল্প সাহিত্যের জন্য
তাদের সামনে পিছনে তাদের রেখে যাচ্ছো?
তোমরা কি সবাই এ্যামেরিকান ট্যুরিষ্ট?’
(যে হিবরুগান তুমি)

এ কবিতার প্রসঙ্গ দেশ, কাল, সময় যাই হোক না কেন- কলকাতার ক্ষেত্রে কি বর্তমানে প্রযোজ্য নয়!
আপনার শারীরিক অনুপস্থিতি পুষিয়ে দিচ্ছে আপনার বিপুল ও বহুমাত্রিক রচনা। আপনার শব্দহীন ৮৩ বছরের গর্জন। ভালো থাকুন শক্তি চট্টোপাধ্যায়। আপনার পুরনো কলকাতায় আপনার মতো থাকুন। শ্রদ্ধেয় শঙ্খ ঘোষ তো আগেই বলেছেন, ‘এ কলকাতার মধ্যে আছে আরেকটি কলকাতা।’

 

Read 160 times

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…