Page 4 of 7

জন্মের রহস্য

ইকবাল আজিজ

 

 

কার জীবনে কখন ঝড় আসবে তা কেউ জানে না। আরিফ ভেবেছিল, তার জীবনটা সুখ-দুঃখে কেটে যাবে। উচ্চকাক্সক্ষা তার তেমন নেই। তাই জীবন নিয়ে জুয়াও কোনোদিন খেলেনি। সহজ-সরল জীবনই ছিল তার সার, স্বপ্ন ও প্রত্যাশা। কিন্তু জীবন এক আশ্চর্য রহস্যের নাম। কারো পক্ষেই উপলদ্ধি করা সম্ভব নয় মাত্র এক মিনিট পর তার জীবন কিংবা সংসারে কী ঘটতে চলছে। সে ভাববাদী বা ভাগ্যবাদী নয়, বরং পুরোপুরি মধ্যবিত্ত মূল্যবোধ ও নিতান্তবই কর্মে বিশ্বাসী সাধারণ মানুষ। যা কখনোই ভাবেনি, ওই অনাকাক্সিক্ষত বিপর্যয়টি শেষ পর্যন্ত তার জীবনে এসে ভর করলো। এটা তেমন অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়। তবে যার জীবনে ঘটে সেই শুধু টের পায়।
১৪ বছর সংসার করার পর আরিফের ঘর ভেঙে গেছে। আরিফ ও তাদের ১৩ বছরের পুত্র তুষার এবং স্ত্রী লায়লাÑ এই নিয়ে একটি সংসার হঠাৎ ভেঙে তছনছ হয়ে গেল। তিন মাস আগে সহসাই আরিফের যৌথ জীবন ভেঙে গেছে।
বিবাহীত জীবনে আরিফ ছিল স্ত্রীর ওপর নির্ভরশীল। সংসারের সব দিকই সামলাতো লায়লা। আরিফ একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থার মালিক। তার স্ত্রী লায়লা গৃহবধূ। তবে মাঝে মধ্যে এনজিও-তে কনসালটেন্সি করে। ১৪ বছর ধরে তাদের সংসারে সুখ-দুঃখ সবই ছিল। কিন্তু চূড়ান্ত কোনো সংঘাত হয়নি। ঘটনাপ্রবাহে আরিফ ও লায়লার জীবন দুটি দিকে চলে গেল। মাঝখানে তুষার দাঁড়িয়েছিল দুটি জীবনের স্বপ্নময় প্রত্যাশা হয়ে। তার জীবনের ভবিষ্যৎও নির্ধারিত হয়ে গেছে, সে বাবার সঙ্গে থাকবে।
বিয়ে বিচ্ছেদের বিষয়ে আলোচনার জন্য তিন মাস আগে এক বিকেলে ঘনিষ্ঠ কয়েক আত্মীয় এক সঙ্গে বসেছিল আরিফ, লায়লা ও তুষারকে নিয়ে। এ কারণে ওই বিচ্ছেদের ঘনঘটায় আবদুল মালেক সেদিন ছিল অনুপস্থিত। ওই ঘরোয়া আসরে লায়লা বললো, আরিফের বিরুদ্ধে তার কোনো অভিযোগ নেই। সে বিয়ে বিচ্ছেদ চায়। তার ভরণ-পোষণ দরকার নেই। তুষারের বিষয়ে তার কোনো আলাদা দাবি নেই। সে ইচ্ছা করলে তার বাবার সঙ্গে অথবা তার কাছে থাকতে পারে লায়লার নতুন সংসারে। কিন্তু পারিবারিক বৈঠকে সবাইকে অবাক করে দিয়ে ১৩ বছর বয়স্ক তুষার বললো, ‘আমি ॥

আব্বুর সঙ্গে থাকবো। জীবনে আর কোনোদিন তার আম্মু এবং ওই কুত্তা মালেক মামাকে দেখতে চাই না।’
লায়লার বড় বোন বললো, ‘বাবা, বড়দের ওইভাবে গালি দিতে নেই। মানুষ খারাপ বলবে।’ তারপর সবাইকে চা-নাশতা দেয়ার জন্য বাড়ির কাজের মেয়েকে সে নির্দেশ দিল।
তুষার বাবার পাশে বসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। তার বড় খালাই ওই পারিবারিক অলোচনার আয়োজন করেছে। সেদিনই বিচ্ছেদের বিষয়টি চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছিল।
ঠিক হয়েছিল বিচ্ছেদ না হওয়া পর্যন্ত লায়লা শান্তিনগর তার পৈতৃক বাড়িতে থাকবে। অন্যদিকে তুষারকে নিয়ে আরিফ থাকবে সেন্ট্রাল রোডে তার ফ্ল্যাটে। যেহেতু মুসলমানের বিয়ে বিচ্ছেদ এবং মিয়া-বিবি রাজি সেহেতু আইনত তালাক কার্যকর হতে তেমন ঝামেলা হয়নি।
তিন মাস ধরে তুষার আছে তার বাবার সঙ্গে। আরিফ নিজের মানসিক বিপর্যয় অনেকখানি কাটিয়ে উঠেছে। বাবা ও পুত্রের সংসার এক নতুন এবং ব্যতিক্রমী নিয়মের আবর্তে ক্রমেই স্বাভাবিক ও স্বচ্ছন্দ। জগতে এই এক নিয়মÑ মানুষ সব পরিবর্তনেই অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। সংসারের যাবতীয় দায়িত্ব সামলানোর জন্য পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে বুয়া রাখা হয়েছে। সামান্য লেখাপড়া জানা এই নারীকে ঠিক কাজের মেয়ে না বলে বরং কেয়ারটেকার বলা যায়। ওই কেয়ারটেকার তসলিমার অধীন এক ঠিকা ঝি কাজ করে সকাল-সন্ধ্যা।

আরিফ সকালে ধানম-ির টিউলিপ ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে তুষারকে রেখে চলে যায় বনানীতে তার অ্যাড. ফার্মে। মাঝারি আকারের ‘মোনালিসা অ্যাড. ফার্ম’-এ ২৫-৩০ কর্মচারীর ভাগ্যবিধাতা সে। অফিসে পৌঁছেই ড্রাইভারকে দিয়ে গাড়ি পাঠিয়ে দিল তুষারের স্কুলে। ড্রাইভার দু’তিন ঘণ্টা অপেক্ষায় থাকে তুষারের। আগে এ দায়িত্বটা পালন করতো লায়লা। স্কুলের সামনের আঙিনায় অনেক নারীকে নিয়ে বসে থাকতো। ড্রাইভারও থাকতো গাড়ি নিয়ে।
ওই স্কুলে মালেক আসতো তার ভাগ্নিকে নিয়ে। লায়লার বয়সি মালেক প্রথম থেকেই অ্যাগ্রেসিভ ও অশালীন ধরনের। তার এ স্বভাবের কারণে মেয়েরা তাকে খুব সহজেই পছন্দ করে ফেলে। লায়লার সঙ্গে এখানেই আলাপ হয়েছিল মালেকের। তুষার ও মালেকের ভাগ্নি তিশা যখন স্কুলে ক্লাস করতো তখন লায়লা এবং তার ‘মালেক ভাই’ ৮ নম্বর রোডের ভারতীয় রেস্টুরেন্ট ‘খানা খাজানা’য় বসে দইবড়া ও চটপতি খেতো। এভাবে সম্পর্কটি গভীর হতে দেরি হয়নি।
লায়লা বাস্তবিকই প্রেমে পড়েছিল। ওই সঙ্গে অনুভব করেছিল, আরিফকে সে কোনোদিনই ভালোবাসেনি।
আচরণে রাফ অ্যান্ড টাফ স্বভাবের ব্যবসায়ী মালেকও যেন তার এক উপযুক্ত জীবনসঙ্গী খুঁজে পেয়েছিল লায়লার মধ্য দিয়ে। ওই নারী যথেষ্ট অভিজ্ঞ ও কামনিপোনা। মাঝে মধ্যে তারা ধানমন্ডি মালেকের বাসায়ও যেতো। নিভৃতে দু’এক ঘণ্টা সময় কাটাতো। ব্যাপারটি এভাবে চলতে পারতো বেশ কিছুকাল। কিন্তু জীবনের গতি শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে থামবে তা কেউ জানে না।
ইতোমধ্যে তুষারকে লায়লা পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল মালেকের সঙ্গে ‘মালেক মামা’ বলে ডাকতে। তারা তিনজন ধানমন্ডি লেকে ডিঙায় চড়ে ভেসে বেড়াতো। তুষার মজাই পেতো। তবে মাঝে মধ্যে তার খারাপ লাগতো যখন দেখতো ওই গু-ার মতো লম্ভা-চওড়া মানুষ মায়ের হাত ধরে বসে আছে। সে তখন অন্যদিকে তাকিয়ে থাকতো। ব্যপারটি আরো এগিয়ে গিয়েছিল। কারণ প্রেম-ভালোবাসা মানুষকে অনেক সাহসী করে তোলে।
শরীরের ভাষায় কথা বলতে গিয়ে লায়লা বুঝেছিল, এতোকাল সে বড় বেশি বঞ্চিত হয়েছে। আরিফের অল্প ভুঁড়িওয়ালা আয়েশি শরীরটি জীবনের অনেক ছন্দময় রহস্যে অভ্যস্ত নয়। লায়লা মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, আরিফ যদি মালেক বিষয়ে তার অপরিহার্যতা মেনে নিয়ে চুপ থাকে তাহবে আরিফের সংসারে থাকবে। তা না হলে মালেকের সঙ্গে সে নতুন করে ঘর বাঁধবে। এর মাঝামাঝি অন্য কোনো পথ নেই।
আরিফের সঙ্গে মালেকের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল লায়লা। মালেক প্রায়ই হোটেল থেকে খাবার-দাবার নিয়ে আসতো। কথনো কখনো খাবারের সঙ্গে বিদেশি হুইস্কি কিংবা রেড ওয়াইনের বোতল আনতো।
বাবা সারা দিন অফিসে, তুষার দেখতো তাদের ফ্ল্যাটে মা ও মালেক মামা বোতলের পানি খেয়ে কিছুটা অসংলগ্ন কথা বলছে। তুষার তখন তাদের কাছে গেলে দু’জনই হাসতো। মা বলতো, ‘তুষার আমার লক্ষ্মী ছেলে।’ মালেক মামা মদের ঘোরে বলতো, ‘তুষার রে আমি কাইলই আমেরিকায় পাঠাইয়া দিমু। আমার সব টাকা, ধন-সম্পদও ওরে দিয়া যামু।’ গোটা ব্যাপারটা তুষারের খারাপ লাগতো। কারণ তার বাবাকে কখনোই মদ খেতে দেখেনি সে। মাও আগে কোনোদিন খায়নি। বাবা সিগারেট পর্যন্ত খায় না। তিনি সব সময় বলেন, ‘সিগারেট, মদ খুব খারাপ জিনিস।’
আরিফ বাসায় ফিরে মালেকের সঙ্গে বসে থাকতে দেখেছে। খাবার ও পানীয়ও খেতে দেখেছে। কিন্তু নিরীহ ও নির্বিরোধী স্বভাবের আরিফ কিছু বলতে সাহস পায়নি।
লায়লা এমনিই কিছুটা তেজি ও ডোমেনেটিং স্বাভাবের। এর উপর ইদানীং সঙ্গী হয়ে জুটেছে মালেক নামে এক মাতাল ও গু-া। একদিন সেন্ট্রাল রোডের অ্যাপার্টমেন্টের বেডরুমের তারা দরজা লাগিয়ে ছিল। তুষারকে বলেছিল, টিভিতে তারা একটি বিশেষ ফিল্ম দেখবে।
তুষার নিজের ঘরে মন খারাপ করে বসেছিল। একটি বই পড়ার চেষ্টা করছিল।
আরিফ হঠাৎ বাসায় ফিরে ব্যাপারটি বুঝতে পারলো। বাইরে থেকে বেডরুমের দরজায় কড়া নেড়ে লায়লাকে ডাকলো।
কিছুক্ষণ পরে দু’জন বেরিয়ে এলো। মালেক ও লায়লা দু’জনেরই চুল অবিন্যস্ত। মালেকের শার্টের দুটি বোতাম খোলা।
লায়লা কিশুটা ক্ষুব্ধ হয়ে বললো, ‘এভাবে অসভ্যের মতো দরজা ধাক্কা দিচ্ছিলে কেন? জীবনেও ভভ্রতা শিখলে না?’
আরিফ কিছুটা সাহস করে বললো, ‘তোমরা দরজা লাগিয়ে কী করছিলে?’
এবার মালেক কেমন অদ্ভুদভাবে ভিলেইনের মতো হাসলো। তারপর সোজা আরিফের কাছে এসে তার ঘাড়ে হাত রেখে অস্ফুট স্বরে বললো, ‘এসব কথা যদি কাউকে বলো তাহলে দেন আই উইল কিল ইউ।’
আরিফ ভাবতেই পারেনি তার বাসায় এসে বাইরের কেউ তাকে এভাবে হুমকি দিতে পারে! আরিফ সরে গিয়ে একটি চেয়ারে বসলো।
তুষার বুঝতে পারলো না। শুধু দেখতে পেল বাবা খুব গভীর ও বেদর্নাত হয়ে বসে আছে।
এবার মালেকের দিকে তাকিয়ে লায়লা বললো, ‘তুমি ওই গাধাটার সঙ্গে কেন কথা বলতে গেছ।’
তুষার তাকিয়ে থেকে মায়ের কথা বলার ভঙ্গিটা দেখলো। গত কয়েক মাসে

মা কতো বদলে গেছে। একটা বাইরের মানুষের সামনে আব্বুকে গাধা বলছে!
সেদিন মালেক চলে যাওয়ার পর লায়লাকে আরিফ জিজ্ঞাসা করলো, ‘তুমি আসলে কী চাও?’
লায়লা বললো, ‘আপাতত তোমকে ছাড়তে চাই। কাল শান্তিনগরে চলে যাবে। এরপর ভেবে দেখো, কী করবে?’
লায়লা তার বাপের বাড়ি শান্তিনগরে চলে যাওয়ার ক’দিন পর তুষারের বড় খালার বাসায় ঘরোয়া আলোচনার মধ্য দিয়ে সব চূড়ান্ত হয়ে গেল নির্বিবাদে।
এরপর ছ’মাস কেটে গেছে। সেন্ট্রাল রোডের অ্যাপার্টমেন্টে আরিফ ও তুষারের জীবনে স্বাভাবিক ছন্দ অনেকটাই ফিরে এসেছে। আরিফ ভাবে, বাবা ও ছেলের এ সংসার নিয়ে যদি দেশের কোনো নারীবাদী লেখিকা একটি গল্প লিখতেন তাহলে হয়তো ভালোই হতো। আরিফের মনে হয়, কোনো জীবনেরই শেষ কেউ বলতে পারে না।
তুষারও হয়তো বিপর্যয় কাটিয়ে উঠছে। তবে মাঝে মধ্যে সে একা কাঁদে। এই ছ’মাস সে একবারও মাকে দেখতে চায়নি। বরং তুষারকে লায়লা দু’বার দেখতে আসার জন্য ফোন করেছিল। তুষার বলে দিয়েছে, ‘কোনো দরকার নেই। তুমি কুত্তার বাচ্চা মালেক মামার সঙ্গেই থাকো। আর কখনো আমাকে ফোন করবে না।’
লায়লা ওপার থেকে চুপ হয়ে গেছে।
ওই বিচ্ছেদের ঘটনাটি তুষারের মানসিক বয়স অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। সে জানে, তাদের ক্লাসের দু’তিনজন বন্ধুর মা-বাবার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। কিন্তু তাদের মা-বাবা দু’জনই আবার বিয়ে করেছে। কিন্তু তার বাবা কতো ভালো! তাকে ছেড়ে মা অন্য পরুষের কাছে চলে গেছে। কিন্তু বাবা চিরকাল একা থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তুষার একদিন বলেছিলো, ‘বাবা, তুমি একটি বিয়ে করো। সারা জীবন এভাবে একা থাকবে?’
আরিফ বলেছে, আমি তো একা নই। তুই আছিস আমার সঙ্গে। তোর সঙ্গে সারা জীবন থাকবো। লেখাপড়া শেষ হলে খুব লক্ষ্মী এক মেয়ের সঙ্গে তোর বিয়ে দেবো।’
ততোক্ষণে বাবার হাত ধরে কাঁদতে শুরু করেছে তুষার। সে বুঝেছে, এ জীবনে এতো বড় আশ্রয় আর কেউ নেই। তবে রাতে বাবা ও ছেলের ঘুমানোর ঘর আলাদা। তুষারের ১০ বছর হওয়ার পর লায়লাই ছেলের আলাদা ঘুমানোর ব্যবস্থ্যা করেছিল। নিয়মটা এখনো চালু আছে। ঘুমানোর আগে বাবা ও ছেলে একে অপরকে ‘গুডনাইট’ বলে চলে যায় যার যার ঘরে। তুষার ঘুমানোর সময় অনুভব করে, তার জীবনের সবচেয়ে বড় অবলম্বন ‘আব্বু’ পাশের ঘরে ঘুমিয়ে আছে।
আরিফও ঘুমের মধ্যে উপলদ্ধি করে, তার পুত্র একমাত্র বংশধর ঘুমের মধ্যে মেঘের রাজ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তুষার তার জীবনের একমাত্র আশ্রয়, বড় আদরের সন্তান। তার বেঁচে থাকার একমাত্র প্রেরণা।
তুষার এখন অনেক দায়িত্বশীল। কাজের বুয়াকে যথাযথ নির্দেশনা দেয়ার দায়িত্বটা অনেকখানি পালন করে সে। অবশ্য এ নিয়ে বাবার সঙ্গে পরামর্শর করে। এরপর স্বাভাবিকভাবে বুয়াকে নির্দেশ দেয়, কোন বেলায় কী রাঁধতে হবে। এছাড়া এ সাপ্তাহের বিভিন্ন কাজের আগাম নির্দেশ দিয়ে রাখে।
আরিফ একটু উদাসীন প্রকৃতির মানুষ। বিয়ের পর কোনোদিনই এসব নিয়ে ভাবতে হয়নি। সবই লায়লা সামলেছে। আরিফ বুঝতে পারে, লায়লার গোছানো স্বভাব ও সাংসারিক বুদ্ধি অনেকটাই অবিকল তুষারের মধ্যে আছে। আরিফ মাঝে মধ্যে অভাক হয়ে ভাবে, এমন গোছানো স্বাভাবের বৌটা হঠাৎ সংসার ফেলে চলে গেল কেন? শরীরই কি সব? কে জানে, আর কিছু আছে কি না জীবনের অদেখা জটিল অধ্যায়?
দুপুরে স্কুল থেকে ফিরে আসে তুষার।
সাধারণত সন্ধ্যার পর নিজের অ্যাড. ফার্ম থেকে ফিরে আসে আরিফ। ছেলের কথা ভেবে ইদানীং একটু আগে ফেরে। মনে হয়, ঘরে ফিরে ছেলের সঙ্গে কথা বলে যে শান্তি তা আর পৃথিবীর কোথাও পাওয়া যায় না। আগে সাধারণত পেশাগত কারণে সে যেতো আলী জাকের, নূর ভাই কিংবা রামেন্দুদার কাছে। ব্যবসায়ী জগতের এসব শুভাকাক্সক্ষীদের সন্নিধ্যে তার ভালো লাগতো। এখন অফিসের বাইরে অন্যসব কিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে। আজও সন্ধ্যার আগে আরিফ বাসায় ফিরে এলো। হাত-মুখ ধুয়ে চা-নাশতা খাওয়ার সময় বাপ-বেটার আলাপ শুরু হলো। টিভিতে ন্যাশনাল জিওগ্রাফির অনুষ্ঠান। আরিফ-তুষার দু’জনই উৎসাহ নিয়ে দেখছে। টিভির পর্দায় ডায়নোসর মা-বাবা ও শিশু ডায়নোসর। তৃণভোজী ডায়নোসর বিশাল প্রান্তরে চরে বেড়াচ্ছে।
তুষার বললো, ‘কোটি কোটি বছর আগে এগুলো এভাবে চড়ে বেড়াতো।
আরিফ বললো, ‘বিজ্ঞানীরা তা-ই মনে করেন। তাদেরও সন্তান হতো। ডায়নোসর মা-বাবা যতœ নিতো তার সন্তানের। প্রায় ২১ কোটি বছর আগে এগুলো পৃথিবীতে এসেছিলো। এরপর কোটি কোটি বছর পৃথিবী দাপিয়ে বেড়িয়েছে। প্রায় ৭ কোটি বছর আগে এগুলো পৃখিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এর অনেক পর পৃথিবীতে মানুষ এসেছে।’

এমন সময় টিভির পর্দায় দেখা গেল সবুজ প্রান্তরে বৃষ্টি হচ্ছে। শিশু ডায়নোসর তার মা-বাবার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে। তুষার কেমন যেন করুণ মুখে সেদিকে তাকিয়ে আছে। এরপর এক সময় উঠে টিভি বন্ধ করে দিল। তারপর সে নিচের পড়ার ঘরে চলে গেল।
আরিফের কেমন যেস অস্বস্তি লাগছিল।
তুষার পড়ার ঘরে এসে বই সামনে নিয়ে ভাবছিলো অন্য কথা। সে ভাবছিল মানুষের জন্মের রহস্য কী? অনেক দিন আগে মাকে সে প্রশ্ন করেছিল, ‘মানুষের জন্ম হয় কেন? আমি কীভাবে এলাম?’
মা একটু অপ্রস্তুত হয়েছিল। তারপর বলেছিল, ‘আমরা মনের গভীরে আন্তরিকভাবে চেয়েছি। তাই তোকে পেয়েছি।’
তুষার জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘তুমি আর কে আমাকে চেয়েছিলে মা?
মা সেদিন বলেছিল, ‘আমি ও তোর বাবা।’ তিন বছর আগে সেদিন বাবাও মায়ের পাশে হাসিমুখে দাঁড়িয়েছিলেন। এখন অবশ্য তুষার অসুস্থভাবে মানুষের জন্মের রহস্য বুঝতে পারে। তবে সবটুকু নয়। সে উপলদ্ধি করেছে, ছোট্ট একটা ভ্রƒণ থেকে মায়ের জরায়ুর গভীরে ধীরে ধীরে জন্ম নেয় মানব সন্তান। এরপর তা একদিন নবজাতকের নরম শরীর হয়ে বেরিয়ে আসে। পৃথিবীতে জন্ম হয় এক নতুন মানুষের। অবশ্য তুষার অনুভব করে, তার এ শরীর ও মনের সবকিছুজুড়ে আছে ওই মানবী যে এখন চলে গেছে গু-া-মাতাল ‘মালেক মামার’ কাছে।
আরিফ আবার আগের মতো স্বচ্ছন্দ হয়ে উঠেছে তার ব্যবসা নিয়ে। দৈনন্দিন রুটিন আগের মতোই পুত্রকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে বনানীতে চলে যায় নিজের অ্যাড. ফার্মে। সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে বাবা ও ছেলের আবার দেখা হয়। শুক্রবার ছুটির দিন দু’জন কোথাও বেড়াতে যায় অথবা তুষারের বন্ধুরা আসে। সারা দিন বাসায় খুব মজা হয়।
আরিফ অনেকদিন লক্ষ্য করেছে অথবা হঠাৎ তুষারের ঘরে গিয়ে দেখতে পেয়েছে, কী যেন খুব আগ্রহ নিয়ে দেখছে তার পুত্র। বাবাকে দেখে লুকিয়ে ফেলেছে বালিশের নিচে। এ নিয়ে আর আগ্রহ প্রকাশ করেনি আরিফ। পুত্রের ব্যক্তিস্বাধীনতায় সে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়।
আরিফ কখনো হঠাৎ ভাবে লায়লার কথা। এতো মাস চলে গেল, একবারও জানা হয়নি কেমন আছে তার এক সময়ের স্ত্রী এবং বর্তমান স্বামী আবদুল মালেক! আরিফের মধ্য দিয়ে পুত্রের সব অপ্রাপ্তি ও পূর্ণতা যেন ঘুচে গেছে। তবে আরিফ জানে না, তুষারে কাছে আছে একটা স্মৃতিচিহ্ন পুরনো পারিবারিক ছবি। ওই ছবিতে তিন বছরের তুষারকে কোলে নিয়ে মা বসে আছে। ওই ছবিটিই তুষার সবার অজ্ঞাতে একা দেখে। সে মায়ের কোলো বসে থাকা শিশু বয়সটি উপলদ্ধি করে। অনুভব করে, একদিন মায়ের শরীরে মায়ের ইচ্ছায় সে অঙ্কুরিত হয়েছিল। এরপর একদিন পৃথিবীতে এসেছে। কিন্তু মা কেন চলে গেছে ওই গু-া ও মাতাল মালেক মামার কাছে?
একদিন মাঝরাতে চারদিকে মুষলধারে বৃষ্টি। তুষার নিজ ঘরে আলো জ্বেলে ওই পুরনো ছবিটি দেখছিল। ভাবছিল জন্মের রহস্যের কথা। ওই মায়ের শরীর থেকে তার জন্ম। এরপর হঠাৎ মুক্তি ও বিকাশ। সেই মা কোথায় চলে গেল? পৃথিবীতে কোটি কোটি বছর আগে ডায়নোসর এসেছিল। তারপর তারা বিলুপ্ত হয়েছে। মায়ের শরীর থেকে তার জন্ম। মা চালে গেছে তাকে ছেড়ে। কিন্তু নিচের শিকড়ের টান গভীরভাবে অনুভব করে তুষার। মাঝরাতে মায়ের ছবির দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে মা ও মায়ের কোলে বসে থাকা তিন বছর বয়স্ক নিজের আধা নিষ্পাপ চেহারার দিকে। তুষার ছবির দিকে তাকিয়ে থেকে বিড়বিড় করে বললো, ‘মা, আমার জন্মের রহস্য তুমি আবার নতুন করে বলো। আমাকে তুমি কোথায় রেখে গেলে মা? এই সাজানো সংসার, সরল-নিরীহ বাবা, অন্তহীন পুরনো স্মৃতিÑ সব আমাকে দিয়ে তুমি কোথায় গেলে মা? কেন গেলে ওই নিষ্ঠুর মালেক মামার কাছে? ওই গু-া-বদমাশটা কি আমার চেয়েও তোমার কাছে বেশি প্রিয়, মা?’
তুষার যখন মাঝরাতে বিড়বিড় করে এসব কথা বলছিল ছবিটির দিকে তাকিয়ে তখন পাশের ঘরে আরিফ ঘুমিয়ে আছে পরম শান্তিতে। বাইরে বৃষ্টির রাত। আরিফের মনে আর্শ্চয প্রশান্তি। তার একমাত্র পুত্র ও বংশধর তার কাছে পরম নির্ভর হয়ে আছে।

 

আমরা যেন না ভুলে যাই

সোহরাব হাসান



কশাইয়ের এ উৎসবেরে সাজানোর অলঙ্কার পাই কোথায়,
কী দিয়ে সাজাই এ গণহত্যা?
শোক বিলাপের রক্ত আমার চোখে পড়বে কার?
হাড্ডি যার শরীরে আমার রক্ত তো প্রায় নাই
যাও বা আছে বাকি
ক্ষমতা নাই তার প্রদীপের প্রাণ হওয়ার
পূর্ণ করতে পারবে না মদের কোনো গ্লাস
এ কোনো আগুনের ইন্ধন হতে পারে না
জš§ দিতে পারে না কোনো তৃষ্ণা।


(বাংলাদেশ : ফয়েজ আহমদ ফয়েজ)

 



১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশ ভূখ-ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা ছড়িয়ে পড়েছিল গোটা উপমহাদেশ, মহাদেশ, সারা পৃথিবীতে। মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণ ৯ মাস একটি বর্বর ও দুর্ধর্ষ বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, অকাতরে প্রাণ দিয়েছেন বহু যোদ্ধা, সম্ভ্রম হারিয়েছেন মা-বোনরা, বহু জনপদ ধ্বংস হয়েছে, মানুষের রক্তে ভেসে গেছে সবুজ প্রান্তর, আকাশ নীলিমা হারিয়েছে পাকিস্তানি বাহিনীর নিক্ষিপ্ত বোমার ধোঁয়ার কু-লীতে, শিশুরা কাঁদতে ভুলে গেছে, কিশোরীর হাসি মিলিয়ে গেছে শত্রু সেনার রূঢ় চাহনিতে, জায়নামাজে দাঁড়ানো অশীতিপর বৃদ্ধকেও গুলি করে হত্যা করেছে দখলদার

বাহিনী। তখন একাকার হয়ে গিয়েছিল মানুষের চোখের জল, শরীরের ঘাম ও শোণিত ধারা। এ লড়াই ছিল মিথ্যার বিরুদ্ধে সত্যের, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের, অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর। সেদিন বাঙালির মুক্তির লড়াইয়ে বাঙালি তো ছিলেনই, তাদের সঙ্গে সহমর্মিতার হাত বাড়িয়েছিলেন প্রতিবেশী বাঙালি, ভারতবাসী ও বিশ্ববাসী। আমরা বাংলাদেশের বাঙালি, আদিবাসী, বাংলাদেশের হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-ক্রিশ্চিয়ান সেদিন এক কাতারে দাঁড়িয়েছিলাম দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য। স্বাধীনতা আমাদের আকাক্সক্ষা ছিল, গণতন্ত্র আমাদের আরাধ্য ছিল এবং সাম্য ছিল দূরবর্তী লক্ষ্য। কতিপয় গাদ্দার আলবদর, রাজাকার মুসলিম লীগের জামায়াতি ছাড়া দেশের আপামর মানুষ এ লড়াইয়ে শামিল হয়েছিল সীমান্ত পার হয়ে। কেউ সীমান্তের ভেতর থেকেই লড়াই করেছেন। ওই সময় সবার লক্ষ্য ছিল, যতো দ্রুত সম্ভব দেশটি মুক্ত করা। এখন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যতো ভাগ হচ্ছে, দলীয়করণ হচ্ছে ওই সময় তা ছিল না। এ সময় মুক্তিযুদ্ধের একটিই স্লোগান ছিল ‘জয় বাংলা’। একজনই নেতা ছিলেন শেখ মুজিবুর  রহমান। তার নেতৃত্ব মেনেই সবাই যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মানুষের আত্মত্যাগ ছিল অপরিসীম। পৃথিবীর খুব কম জাতিকেই এতো প্রাণ ও রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করতে হয়েছে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশের বাইরে তথা বহির্বিশ্বের মানুষের ভূমিকাকেও খাটো করে দেখা যায় না।

বিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সমর্থন ছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি।লেখক, শিল্পী, সাংবাদিক থেকে শুরু করে সাধারণ শ্রমিকরা সর্বতোভাবে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তারা স্বাধীনতাকামী বাঙালির প্রতি দৃঢ় সমর্থন ব্যক্ত করেছেন। সাধ্যমতো সাহায্য-সহযোগিতাও জুগিয়েছেন। তাদের মধ্যে ছিলেন বিদেশি রাষ্ট্রনায়ক, রাজনীতিক, পার্লামেন্টের সদস্য, লেখক, শিল্পী, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, আইনজীবী, চিকিৎসক ও মানবাধিকার কর্মী। তাদের সমর্থন ও সহায়তা ছিল মানবতার পক্ষে, স্বাধীনতার পক্ষে। আমরা এ প্রবন্ধে স্বাধীনতার ওই সহযাত্রীদের কথা আকাক্সক্ষা ও ত্যাগের কথা বলবো। কৃতজ্ঞতা জানাবো আমাদের ওই দুঃসময়ে যারা পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তাদের বীরত্ব ও সাহসের কথা বিস্মৃত হওয়ার নয়।
আমরা কী করে ভুলতে পারি ফরাসি দার্শনিক আঁদ্রে মালরো’র কথা! তিনি ৭০ বছর বয়সেও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার আগ্রহ ব্যক্ত করেছিলেন। জার্মানির প্রতিরোধ যুদ্ধে তিনি ফরাসিদের উদ্বুদ্ধ করেছিলেন,

স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধে স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন, সময়-সুযোগ পেলে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামেও অংশ নেবেন, তার সহযোদ্ধাদের আহ্বান জানাবেন। বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ দূত রেহমান সোবহান প্যারিসে আঁদ্রে মালরোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলে আশ্বস্ত করেছিলেন, ফরাসি  সরকার যাতে পাকিস্তানের অস্ত্র সাহায্য না করে এ ব্যাপারে তিনি ফ্রাঞ্চ সরকারকে বলবেন। ... আমরা কী করে ভুলতে পারি আর্থার কে ব্ল্যাডের কথা। তিনি ঢাকায় মার্কিন কনসাল জেনারেলের পদে অধিষ্ঠিত থেকেও নিক্সন প্রশাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। মার্কিন সিনেটর অ্যাডওয়ার্ড কেনেডি পাকিস্তানে আমেরিকার অস্ত্র পাঠানোর বিরোধিতা করেছিলেন। সোভিয়েত রাষ্ট্রপতি নিকোলাস পদগোর্নি পাকিস্তানি সামরিক জান্তার প্রতি গণহত্যা বন্ধের দাবি জানিয়েছিলেন। জন কেলি জাতিসংঘের কর্মকর্তা হয়েও বাংলাদেশের মানুষের দুঃখ-দুর্দশায় বিচলিত হয়েছিলেন। ব্রিটিশ লেবার পার্টির নেতা ও পার্লামেন্টের সদস্য পিটার শোর পাকিস্তানে সব ব্রিটিশ সাহায্য বন্ধের দাবি জানিয়েছিলেন। তিনি বাঙালিদের দুঃখ-দুর্দশা দেখতে ছুটে এসেছিলেন শরণার্থী শিবিরে।
আমরা কী মনে রাখবো না ওই মুক্তিযোদ্ধা ওডারল্যান্ডকে! তিনি অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক হয়েও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন এবং বীরপ্রতীক খেতাব পান। তিনি দেশে ফিরে গিয়েও বাংলাদেশকে মনে রেখেছিলেন, পাকিস্তানি বাহিনীকে আখ্যায়িত করেছিলেন নিষ্ঠুর ও আগ্রাসী শক্তি হিসেবে। পাঠান যোদ্ধা মমতাজ খান বাঙালি মুক্তিযোদ্ধাদের ওষুধ ও সেবা দিয়ে বাঁচিয়েছিলেন। তিনি বাংলাদেশকে ভালোবেসে এখানেই থেকে গেলেন। ভারতীয় সেনাধিপতি জগজিৎ সিং অরোরা সেনাবাহিনীর পক্ষে পাকিস্তানি বাহিনীর নিঃশর্ত আত্মসমর্থন দলিলে স্বাক্ষর করেছিলেন। আমেরিকান দ্রোহি কবি অ্যালেন গিনসবার্গ পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশের শরণার্থীদের অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশা দেখে লিখেছিলেন বিখ্যাত কবিতা ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’। আমরা কী মনে রাখবো না প-িত রবিশংকর কিংবা ব্রিটিশ শিল্পী জর্জ হ্যারিসনকে! তারা ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ কনসার্টের আয়োজন করেছিলেন। বেতার শিল্পী দেব দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় উদাত্ত কণ্ঠে ৯ মাস বাঙালিকে উজ্জীবিত রেখেছেন। সব্যসাচী লেখক অন্নদাশঙ্কর রায় কলকাতায় বাংলাদেশের সমর্থনে আয়োজিত লেখক-শিল্পী সমাবেশে যোগদান শেষে লিখেছিলেন কালজয়ী পঙ্ক্তিÑ ‘যতোকাল রবে  পদ্মা, মেঘনা, গৌরী, যমুনা বহমান/ততোকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।’ ভারতের সর্বোদয় নেতা জয় প্রকাশ নারায়ণ বাংলাদেশের সমর্থনে সর্বদলীয় সম্মেলন আহ্বান করেছিলেন। আমরা কী ভুলে যাবো ব্রিটিশ সাংবাদিক অ্যান্থনি ম্যাসকারেনহাস কিংবা সাইমন ড্রিংকে। তারা পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার খবর ব্রিটিশ পত্রিকায় ছেপে বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়েছিলেন।

ওস্তাদ আলী আকবর খান বাংলাদেশের সমর্থনে সেতার বাজিয়ে মন্ত্রমুগ্ধ করেছিলেন মার্কিন দর্শক-শ্রোতাকে। আমরা কী ভুলে যাব ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কথা! তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে ইউরোপ ও আমেরিকাসহ বহু দেশ ঘুরেছেন।
তিনি আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ধাত্রীর ভূমিকা পালন করেছিলেন। সোভিয়েত নেতা লিওনেদ ব্রেজনেভ আমেরিকার সপ্তম নৌবহরের হুমকি মোকাবেলা করেছিলেন অষ্টম নৌবহর পাঠিয়ে, নিরাপত্তা পরিষদে তিনবার ভিটো প্রয়োগ করে চায়নিজ-মার্কিন দূরভিসন্ধি নস্যাৎ করেছিলেন। পাকিস্তানের কবি ফয়েজ আহমদ ফয়েজ শাসকের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে গণহত্যার প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন এবং ‘বাংলাদেশ’ শিরোনামে লিখেছিলেন মর্মস্পর্শী কবিতা। ওই কবিতা খুনির প্রতি ঘৃণা জানায় এবং স্পন্দন জাগায় অত্যাচারিতের রক্তে। আমরা কী ভুলে যাবো পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা মেঘালয়সহ প্রতিবেশী রাজ্যগুলোর লাখো-কোটি মানুষকে! তারা বাংলাদেশের আশ্রয়হীন মানুষকে আশ্রয় দিয়েছেন এবং নিজেদের বসতবাটি, স্কুল, অফিস, কমিউনিটি সেন্টার ছেড়ে দিয়েছেন। যুদ্ধের ঝুঁকি আপন কাঁধে তুলে নিয়েছেন তারা।  আমরা কি ভুলে যাবো ভারতীয় সেনাবাহিনীর সেসব কর্মকর্তা ও জওয়ানকে যারা বাংলাদেশের পক্ষে লড়াই করতে গিয়ে আত্মাহুতি দিয়েছেন? বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের কোথাও কোথাও তাদের কবর ও শ্মশান এখনো স্মারকচিহ্ন হয়ে আছে। আমরা কেন ওই শহীদদের নামে একটি শহীদ মিনার বা স্মৃতিসৌধ গড়তে পারলাম না?
আমরা কী ভুলে যাবো ভারতের বন্দরনগর মুম্বাইয়ের জুতা পলিশওয়ালাদের! তারা বাংলাদেশ সহায়তা তহবিলে নিজেদের অর্জিত আয়ের একাংশ দান করেছিলেন। কলকাতা বা আগরতলার সাধারণ মানুষ জয় বাংলার মানুষ বলে বাসের আসনটি ছেড়ে দিতেন। আমরা কি ভুলে যাবো সেসব মা-বোনের কথা যারা ভারতের বিভিন্ন স্থানে রওশন আরা ব্রিগেড গঠন করেছিলেন? আমেরিকার বন্দর শ্রমিকরা পাকিস্তানি জাহাজে অস্ত্র ওঠাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। পাকিস্তানি নাগরিক আহমদ সেলিম পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার বিরুদ্ধে কবিতা লিখে জেল খেটেছিলেন। ব্রিটিশ তরুণী মারিয়েটা বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গড়তে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন একটি সংগঠন অ্যাকশন বাংলাদেশ এবং তার বাড়িটি ছেড়ে দিয়েছিলেন ওই সংগঠনের অফিস হিসেবে।




আমরা কী ভুলে যাবো বিশ্বের লাখো-কোটি সাধারণ মানুষের কথা! তারা কায়মনোবাক্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সংগ্রামকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন দিয়েছেন এবং ধিক্কার জানিয়েছেন পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতাকে। বিবিসির সাংবাদিক মার্ক টালি এ দেশের যে কোনো রাজনৈতিক নেতার চেয়ে জনপ্রিয় হয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধের বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করে। আবদুল লতিফ খতিব মহারাষ্ট্রে জš§গ্রহণ করেও বাংলাদেশকে মাতৃভূমি হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের পক্ষে এক সাহসী কলমযোদ্ধা। মার্কিন প্রামাণ্য চলচ্চিত্রকার লেয়ার লেভিন বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরগুলোয় ঘুরে ‘জয় বাংলা’ ছবি তৈরি করেছিলেন। পরে ওই ছবি অবলম্বনে তারেক মাসুদ ও ক্যাথেরিন মাসুদ নির্মাণ করেন ‘মুক্তির গান’। মার্কিন লেখক রবার্ট পেইন বাংলাদেশের মুক্তি-সংগ্রামকে অবলম্বন করে একাধিক বই লিখেছেন। পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্টের নেতা জ্যোতি বসু বিধানসভায় ঘোষণা করেছিলেন, ‘একটি জাতিকে মিলিটারি দিয়ে পিষে মারা যায়। কিন্তু তাদের উত্থান ঠেকানো যায় না।’ ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী শচিন চন্দ্র সিংহ ষাটের দশকেই হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের সুহƒদ ও সহযোদ্ধা।
আমরা কী স্মরণ করবো না নাম না জানা অসংখ্য সুহƒদকে! তারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত সংগঠনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। আমরা কি মনে রাখবো না ওই দুঃসময়ের বন্ধুদের? যদি আমরা মনে না রাখি তাহলে সেটি হবে চরম অকৃতজ্ঞতা।
আজ নতুন প্রজš§কে জানাতে হবে ১৯৭১ সালের মরণজয়ী যুদ্ধে কারা আমাদের পক্ষে ছিলেন, কারা বিপক্ষে ছিলেন। জানাতে হবে বাঙালি হয়েও কারা বাঙালিদের মুক্তি-সংগ্রামের বিরোধিতা করেছিল, কারা সেদিন পাকিস্তানিদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল। একটি জাতির মুক্তিযুদ্ধ একটি দিন, ঘোষণা বা সামরিক ফরমানের মধ্যে আবদ্ধ থাকে না, তা ছড়িয়ে থাকে পুরো জাতির অস্তিত্ব এবং বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বরে।

জীবিকার আশ্চর্য গণিত

মৃণাল বসুচৌধুরী

 


‘র্নিবাসন’ শব্দটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে শান্তির বিধান। আমার ক্ষেত্রে হয়তো তেমন ছিল না। ‘স্বেচ্ছানির্বাসন’ নিয়ে নিজেই নিজেকে দ- দেওয়ার ইচ্ছা হয়েছিল খুব। বিষাদ বা অভিমান নয়, উদাসীন এক ভালোবাসার হাত ধরে আমি হারিয়ে যেতে চেয়েছিলাম এই চেনা পৃথিবী থেকে। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রশ্ন করিনি তা নয়। কিন্তু প্রতিবারই মনে হয়েছিল, আলোর পেছনে ছায়া কিংবা প্রতিছায়া, জলের ভেতরে মাটি ও শ্যাওলার কাজ থেকে শুরু করে পুরো জীবন ধরে যে বঞ্চনার ইতিহাস বা ধারাবাহিক অবহেলা মলিন করে তুলেছে চরাচর তা নিয়ে প্রশ্ন করে লাভ নেই। খুঁজে লাভ নেই সোনালি অতীত কিংবা অমরাবতী, অলৌকিক সৎ উচ্চারণ, স্পষ্ট অঙ্গীকার, পারস্পরিক বিশ্বাসের সুখ। জীবন যেভাবে আসে সেভাবেই তাকে বরণ করে নেওয়ার মধ্যেই বেঁচে থাকার স্বকীয় আনন্দ।
জন্মমুহূর্ত থেকে আজ পর্যন্ত যা শিখেছি তা শিখিয়েছে জীবনই। শিখিয়েছে বেঁচে থাকার আমল কৌশল। আনন্দ-উল্লাস, সাফল্য ও সুখের পাশাপাশি দুঃখ, বিষাদ, হতাশা কিংবা ব্যর্থতার সহাবস্থানের নির্মম সত্য। তা সত্ত্বেও কখনো কখনো ওই চেনা জীবনই যেন অচেনা হয়ে সামনে দাঁড়ায়।
১৯৮৭ সালে ধারাবাহিক অবহেলা প্রকাশিত হওয়ার পর খুব দ্রুততার মধ্যেই আমায় চলে যেতে হয় বিদেশে সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর দরজায়। এমনিতেই ‘শব্দভ্রমের সন্ধান’-এর নিঃসঙ্গ একাকী পথচলা আমাকে ক্লান্ত করেছিল তখন। এর উপর দেশ ছাড়ার দুঃখ আমাকে উপহার দিয়েছিল ভুবনজোড়া অভিমান। কবিতাকে র্নিবাসন দিলাম আমার জগৎ থেকে সজ্ঞানে।
শৈশব আমার নতমুখ জীবন যাপনে অভ্যস্ত করেছিল অস্পষ্ট ব্যবধান ও স্পষ্ট আড়াল নিয়ে বুকের মধ্যে উন্মাদ আগুন পুষে রেখে মানুষের উপেক্ষা-অবহেলা সব পেরিয়ে। আলোর ভেতরে পৌঁছানোর সব রাস্তা দেখিয়েছিল। মিডিয়া বা খ্যাতি নয়, এ এক রহস্যময় পবিত্র নীলিমার

আলো। তা বিষাদ অম্লান, মায়াময়ী এক নিশিকন্যার চোখের মতো অধরা ও লোভহীন। ওই শৈশবই আমাকে শিখিয়েছিল কীভাবে পরশ্রীকাতর সাপের ছোবল এড়িয়ে ছায়াহীন পরাবাস্তবতার দিকে এগিয়ে যেতে হয় সঙ্গীহীন একা।
নিঃসঙ্গ নিজেকে মুখোমুখি বসিয়ে কথা বলা আমার পুরনো অভ্যাস। নিজের সঙ্গেই হেঁটেছি সারা জীবন। অনভ্যস্ত সুখের অসুখে, পরিশ্রমা অক্ষর বুননে এতো দিন কেটেছে সময়। এখন মুক্ত। এবার বিশ্রাম। স্মৃতির শিকড় ছিঁড়ে অক্ষরবিহীন মুগ্ধ বেঁচে থাকা। অথৈ জলের চাঁদ ও মোমের পুতুল নিয়ে মায়াবী ভ্রমণ।
পূর্ণেন্দুদা বলতেন, ‘বিছানা-বালিশে মানুষ একা। আর একা হলেই নিজের কাছে নতজানু মানুষ।’ কিন্তু আমি একা থাকলেই বিছানা, বৃষ্টি ও কুয়াশা ঠেলে ফেলে আমার দিনগুলো সামনে দাঁড়ায়। ফিরে আসতো প্রিয় মানুষের মিছিল।
দেওঘরে পূর্ণেন্দুদার সঙ্গে তুমুল আড্ডায় কেটেছিল কয়েকটি রাত। ‘খরা’ ছবির শুটিং উপলক্ষে সেখানে যাওয়া। ওম পুরি কুলভূষণ, খারাবান্দা, অরবিন্দ খোশী, ধৃতিমান চট্টোপধ্যায়, ভাস্কর চৌধুরী, শ্রীলা মজুমদার, স্নিগ্ধা বন্দ্যেপাধ্যায় অভিনয় করেছিলেন ওই ছবিতে। প্রেম ফটোগ্রাফারের ভূমিকায় ছিলাম আমি। মনে আছে, যেখানে থাকতাম আমরা সেখানে ঢোকার মুখে একটা গোলচত্বরে টেবিল সাজিয়ে আড্ডা হতো আমাদের। সারা দিন শুটিং করার পর প্রায় শেষ রাত পর্যন্ত অড্ডা চলতো কোনো কোনোদিন। কতো রকম কথাই যে বলতেন পূর্ণেন্দুদা! কখনো বুনুয়েলের প্রথম ছবি ‘আন চেন আন্দালু’ যেখানে খোলা চোখের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে ধারালো ক্ষরের ফলা, কখনো বাগম্যানের ওয়াইল্ড স্ট্রবেরিজ, কখনো কখনো সত্যজিৎ, ঋত্বিক আবার কখনো বা নিজের ছবি ‘ছোট বকুলপুরের যাত্রী’, ‘স্ত্রী পত্র’। একেকদিন শুধু গান ও কবিতা। এর মধ্যে কখনো কখনো একদম চুপ করে বসে থাকতেন তিনি। জিজ্ঞাসা করলে বলতেন, কী কী করতে চাই, করা বাকি এর একটি তালিকা তৈরি করছিলাম মনে মনে।
মনে আছে, একদিন অন্যরা ঘুমাতে গেলেও পূর্ণেন্দুদা বসে থাকলেন। আমাকেও বসিয়ে রাখলেন। কবিতা শোনালেন। এভাবে সারা রাত কবিতা শুনিয়েছিলেন সেদিন। শুরু করেছিলেন ‘কথোপকথন’-এর একটি কবিতা দিয়ে। বলেছিলেন, নন্দিনীকে পাওয়ার জন্য সারা জীবন শুভঙ্কর হয়ে থেকে গেলাম। নন্দিনীকে তো পেলামই না, পূর্ণেন্দু হয়ে ওঠা হলো না আমার। যাই হোক, শোন।
নন্দিনী আমার কী দোষ? ডেকেছি বহুবার
কিন্তু তোমার এমন টেলিফোন
ঘাটের মড়া নেই কো কোন সার।
শুভঙ্কর বাতাস ছিল, বাতাসে ছিল পাখি
আকাশ ছিল, আকাশে ছিল চাঁদ
তাদের বললে খবর দিত নাকি?
কবিতাটি শেষ করে আমার দিকে একবার তাকিয়ে হেসেছিলেন একটু। তারপর অদ্ভুদ ঘোরের মধ্যে পড়েছিলেন একের পর এক কবিতা। মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতে শুনতে দেখেছিলাম সজু অথচ বিষন্ন উচ্চারণে কীভাবে শুভঙ্কর ও নন্দিনীকে মূর্ত করে তুললেন তিনি।

কাব্যনাটকে অভিনয় করার সময় থেকেই মনে মনে ভাবতাম একদিন, কোনো একদিন আমাকেও লিখতে হবে কাব্যনাটক। পূর্ণেন্দুদার শুভঙ্কর ও নন্দিনী প্রতিদিন যেন মনে করিয়ে দিতো আমার ওই ঘুমন্ত ইচ্ছাটাকে। পারিনি। অনেক চেষ্টা করে ‘স্বর্গ থেকে নীলপাখি’ নামে একটি সংলাপ কাব্য লিখেছিলাম। পছন্দ হয়নি নিজের। কিন্তু কেন জানি না বিশিষ্ট আবৃত্তিকার পার্থ ঘোষ ও গোরী ঘোষ খুব ভালোবেসে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পড়তেন ওই লেখাটি। পরে তাদের একটি সিডিতেও এই পাঠ রেখেছিলেন। স্তর চাইান। সিডির নামই দিয়েছিলেন ‘স্বর্গ থেকে নীলপাখি’।
ছিন্নভিন্ন শিকড় বেয়েও কখনো কখনো উঠে আসে স্মৃতিমাখা হলুদ পোকাগুলো। একটার অনুষঙ্গে আরেকটি এসে দাঁড়ায়। পার্থদা গৌরীদির কথায় প্রদীপদা, প্রদীপ ঘোষের কথা আসে। আমি গত জন্মে হয়তো কিছু পুন্য করেছিলাম। তাই এ জন্মে এই তিন দিকপালের কণ্ঠে পরিবেশিত হয়েছে আমার কবিতা। এই তিনজন ও রমা সিমলাইয়ের মিলিত পরিবেশনায় ‘কুয়াশার রোদে’ নামে একটি সিডি প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু সেসব অনেক পরের কথা। এই লেখায় গৌরিদি এলেন পূর্ণেন্দুদার হাত ধরেই। ‘স্তহাচিত্র’ ছবিতে তিনি অভিনয় করেছিলেন একটি বিশেষ চরিত্রে। মনে আছে, দক্ষিণ কলকাতার একটি নার্সিংহোমে শুটিং হয়েছিল আমাদের। পূর্ণেন্দুদার সঙ্গে কাজ মানেই ভয় ও আনন্দ। ভীষণ পারফেকসনিস্ট ছিলেন বলেই কোনো অভিনেতাকেই ছেড়ে দিতেন না তিনি। এর পাশাপাশি ঠিকঠাক কাজ শেষ করতে পাললে মেতে উঠতেন গানে। শুরু হতো অনাবিল আনন্দ সভা হাসি-ঠাট্টার।
অফিসের পেছন দিকে রাস্তার ওপারে যে ফ্ল্যাটে থাকতাম এর নম্বর ছিল ৪০২। আশ্চর্যজনকভাবে এরপর যেখানেই বদলি হয়েছি সর্বত্রই ৪০২ নম্বর ফ্ল্যাটই বরাদ্দ করা হয়েছে আমাকে। এমনকি মুম্বাইয়ে ১৩ তলার ওপর আমার ফ্ল্যাটটি ছিল ১৩০২। এটিকে প্রকারান্তে ৪০২-ই বলা যায়। কাকতালীয় হয়তো। কিন্তু প্রতিবারই বেশ অবাক হয়ে যেতাম। মনে আছে, প্রথম দিন ফ্ল্যাটে এসে মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল খুব। সুন্দর আসবাবপত্রে ভরা বিশাল ফ্ল্যাটে একা থাকতে হবে ভাবতেই বিষণœ হয়ে যাচ্ছিলাম। বছরে দু’বার স্কুল ছুটির সময় তপতা ও অরুন্ধতা যেতো সেখানে। আর আমি সত্যি সত্যিই দিন গুনতাম।

অফিসে আমার সেক্রেটারি ছিলেন দক্ষিণ ভারতীয় নারী। দুবাই বিমানবন্দরে চাকরি নিয়ে তার স্বামী এসেছিলেন কেরেলা থেকে। ওই সূত্রে তার এ দেশে আসা। ম্যাডাম আনাম্মাই আমাকে প্রয়োজনীয় সবকিছুর ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। চিনিয়ে দিয়েছিলেন ভিডিও লাইব্রেরি, কেনটিকির দোকান, কিছু রেস্তোরাঁ এবং ওষুধেরে দোকান। আর এক সহযোগী অরজিত গারদে আমাকে সঙ্গ দিতেন অফিসের পর। শারজাহে বাড়ি ফিরে সন্ধ্যাবেলা কিছুই করার থাকতো না। তাই অরজিতের সঙ্গে গিয়ে দু’একদিনের মধ্যেই কিনে এনেছিলাম টিভি, ভিসিআর ও ক্যাসেট প্লেয়ার। বাড়িতে রান্না তখনো শুরু করেনি। কেননা যত অল্প টাকারই খাবার হোক, ফোন করলে বাড়িতে দিয়ে যেতো প্রায় সব রেস্তোরাঁ। টিভি আনার পর নিঃশব্দ-নির্জন ফ্ল্যাটে যেন প্রাণ এসেছিল।
কলকাতা থেকে আসার সময় রবীন্দ্রসঙ্গীতের কয়েকটি ক্যাসেট নিয়ে গিয়েছিলাম। ঘর অন্ধকার করে মাঝে-মধ্যেই শুনতাম আমার প্রিয় গানগুলো। কোনো কোনোদিন একই গান শুনতাম বারবার।


‘অল্প লইয়া থাকি তাই মোর যাহা যায় তাহা যায়
কনটুকু যদি হারায় তা লয়ে প্রায় করে হায় হায়’


দুপুর ও রাতে সময় পেলেই শুনতাম এ গানটি। কেন জানি শিল্প-সংস্কৃতি, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন সবকিছু ছেড়ে এতো দূরে একা পড়ে থাকতে ভালো লাগতো না একেভারেই। চাকরিতে উন্নতির থেকে আমার কাছে বেশি মূল্য ছিল কবিতার শব্দ-সাধনায়। এর পাশাপাশি কিছু না পেতে পেতে অর্জনরে আনন্দটাও হারাতে চাইতাম না। বিদেশে চাকরি করার সুযোগ ক’জনই বা পান।
‘ইমোশনাল স্ট্রেস’ কোনোদিনই সহ্য করতে পারি না। অথচ আমার দিনযাপনের অধিকাংশ দিনই বঞ্চনার ইতিহাস। কোনো নিঃস্ব-রিক্ত মানুষের ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়ার কাহিনী। ডিপ্রেশনের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য ঘুমের ওষুধ খাওয়ার অভ্যাস অনেক পুরনো। শারজাহে গিয়ে ঠিক করেছিলাম, যেহেতু একা থাকি সেহেতু অধিকাংশ সময় এ অভ্যাসটা ছাড়তে হবেই। কলকাতা ছাড়ার আগে আরব দেশের অনেক গল্প শুনেছিলাম। এখানে নাকি রাতে হাঁটা যায় না, মেয়েদের নিরাপত্তা নেই, রাস্তাঘাটে মাতাল ভর্তি, অপরাধ করলে কঠিন সব শাস্তি এমন ভয় দেখানো কথাবার্তা শুনে বলা বাহুল্য, একটু ভয়ে ভয়ে থাকতাম

 

প্রথম কিছুদিন। এরপর অবাক হয়ে দেখলাম, নারীরা এখানে খুব নিরাপদ। মাঝরাতে কোনো নারী ঘোরাফেরা করলেও তার বিপদ নেই। কেননা যে কোনো নারী অভিযোগ করলেই পুলিশ অভিযুক্তকে ধরে নিয়ে আসে থানায়। মনে পড়ছে, মাঝে-মধ্যে গভীর রাতে টেলিফোন আসতো বেশির ভাগ সময়ই কোনো না কোনো নারী। বুঝতে পারতাম, র‌্যান্ডম ডায়ালিং করে যাকে পায় তার সঙ্গে কথা বলা তাদের অভ্যাস। ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে দু’একটা কথা বলার পরই রেখে দিতো। পাছে কোনো সমস্যা তৈরি হয় এ ভয়ে কখনোই এসব ফোন এলে কথা বলতাম না। এই নীরবতার জন্য তাদের মুখ থেকে কটূক্তি শুনতে হয়েছে মাঝে-মধ্যে।
একদিনের কথা খুব মনে আছে। দুপুরে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম একটু। ওই সময়ই বেজে উঠেছিল টেলিফোন। রিসিভারটা তুলতেই ছোট একটি ছেলের গলা ভেসে এসেছিল। বলেছিল, ‘, তোমার সময় আছে? একটু কথা বলবে আমার সঙ্গে? বাড়িতে কেউ নেই। কাজের মালিও বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে কোথায় যেন গেছে। ভয় করছে খুব..., একটু কথা বলেন না আংকল...। না বলে পারিনি। বেশ কিছুক্ষণ কথা বলে জানতে পেরেছিলাম, তার মা মারা যাওয়ার পর বাবা আবার বিয়ে করেছেন। নতুন মা তাকে মারধর করে। কিন্তু বাবাকে সে কিছুই বলে না। কেননা তার বাবা খুব ভালোবাসেন তাকে। নামে ওই নিঃসঙ্গ শিশু অরুণের বন্ধু হয়ে গিয়েছিলাম। ফোনের বন্ধু। মাঝে-মধ্যই ফোন আসতো তার। সঙ্গীহীন ওই শিশুটির আর্তি আমাকে মনে করিয়ে দিতো আমার শৈশব। একাকিত্ব কখন যে কাকে, কীভাবে ছিন্নভিন্ন করে দেয় তা কে জানে।
রাস্তাঘাটে মাতালরা ঝামেলা করে শুনেছিলাম। শোনা কথায় না জেনে কতো কী যে বলে মানুষ! লাইসেন্স না থাকলে মদ্যপান নিষিদ্ধ ছিল শারজাহে, এমনকি বাড়িতে বসে মদ্যপান করার জন্য লাইসেন্স লাগতো। ওই ছাড়পত্র ছাড়া ওয়াইন স্টোর থেকে কিছু কেনাই যায় না। ওই দোকান ছিল শহরের বাইরে। দোকান থেকে কিনে সোজা বাড়িতে যেতে হতো ক্রেপারে। দুবাইয়ে অবশ্য শিথিল হয়েছে নিয়ম-কানুন। ড্রিংকস করে গাড়ি চালালে পুলিশ ধরতো। তারা চালিয়ে গাড়িটা নিয়ে যেতো থানায়। বসিয়ে রাখতো সারা রাত। সকালে নেশা ছুটলে ছেড়ে দিতো।
স্বর্ণের বাজার দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে প্রায়ই দেখতাম দোকান খোলা। কিন্তু ভেতরে ক্রেতা-বিক্রেতা কেউ নেই। নামাজের সময় সবাই নামাজ পড়তে গেছেন। চুরির ভয় নেই এমন একটি প্রশ্নের উত্তরে সহকর্মী বলেছিলেন, না, চোর ধরা পড়লে হাত কাটা যায়। অবাক হয়ে হেসেছিলাম। একজন বলেছিলেন, “একজন দু’বারের বেশি চুরি করতে পারবে না।” সহকর্মী যোগ দিয়েছিলেন হাসিতে ‘হ্যাঁ, দুটোর বেশি আর হাত যে নেই।’
পশ্চিম ও উত্তর দু’দিকে দুটি বারান্দা ছিল আমার ফ্ল্যাটে। পশ্চিম বারান্দায় বের হওয়া যেতো না। পুরনো আসবাপত্র, ওয়াশিং মেশিং জড়ো করা ছিল সেখানে। তাছাড়া ওই বারান্দা ছিল গোটা পনেরো পায়রার দখলে। এখানে পায়রাগুলোর রাজত্ব, ঘর-সংসার। পুরনো আসবাবপত্র বা কোনো কিছুর পুনরায় বিক্রয় মূল্য নেই ওই দেশে। সরকারি জিনিসপত্র ফেলার বিভিন্ন অসুবিধার কথা ভেবেই বোধহয় আগে যারা থাকতেন তারা আর কোনো ঝামেলায় যাননি। সুন্দর পায়রাগুলোর জন্যই রেখে গেছেন ওইসব। উত্তরের বারান্দাটি আমার খুব প্রিয় ছিল। মাঝরাতে যখন ঘুম আসতো না তখন প্রায়ই গিয়ে দাঁড়াতাম সেখানে। কখনো কখনো একটি চেয়ার টেনে বসে থাকতাম সারা রাত। শেষরাতে দু’এক ঘণ্টা কেমন জানি মায়াবী হয়ে যেতো রাস্তাঘাট। সুন্দর, উজ্জ্বল, স্বপ্নময় মনে হতো। এটিই বোধহয় স্বপ্ন নগরীর মাঠে থাকা রাস্তা। যেখানে ছড়িয়ে আছে সুখ সেখানে ছোটাছুটি করে নিষ্পাপ শিশুরা, রামধনু রঙ মেখে বেড়াতে আসে পরীদের রানী। শুধু পূর্ণিমায় নয়, সেখানে প্রতিটি রাতে জ্যোৎস্না খোলা করে। ওই জ্যোৎস্নার হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে যাই সাদার্ন মার্কেটের সামনের ট্রামলাইনে। সেখানে মধ্যনিশিথে শেষ স্ট্রাম চলে গেলে আড্ডা মারতাম আমি ও সুপ্রিয়দা।
আমি তখন কবির রোডে থাকি। পাশের বাড়িতেই থাকতো রতেœশ্বর। কবি রতেœশ্বর হাজরা। তারই সহায়তায় আমার আস্তানা খুঁজে পাওয়া। আমার সৌভাগ্য, রতেœশ্বরের অনেক কবিতারই প্রথম পাঠক ছিলাম আমি সে সময়। সুপ্রিয়দা খুব মুক্তমনের মানুষ। আমার মধ্যে যে গ্রাম্য মানসিতকা ছিল তা ঝেড়ে ফেলতে পেরেছিলাম সুপ্রিয়দার মতো মানুষের সন্নিধ্যে এসে।
কখনো কখনো একটু অবাক হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। ধন্যবাদ জানাতাম অদৃশ্য ঈশ্বরকে। পিতৃহীন হওয়ার পর যেভাবে আমার জীবন কেটেছিল এতে কখনো ভাবিনি নিজের ক্ষমতায় বিদেশে এসে চাকরি করবো। মনে আছে, এই চাকরিতে যখন জয়েন করি তখন মাইনে ছিল ২২০ টাকা। ব্রাবোর্ন রোডে ছিল আমার প্রথম অফিস। আমার বস ছিলেন মোহিত সেন। আমাকে কাজকর্ম বুঝিয়ে দিয়ে তিনি বলেছিলেন, স্পষ্ট মনে আছে ‘ইয়াংম্যান, জীবনে কোনো সমস্যা হলে আমার কাছে এসো, সাফল্যের দিনে নয়। সেগুলো সব তোমার।’ ওই অসাধারন একটি বাক্যের জন্য আজীবন নতজানু হয়ে থেকেছি তার কাছে।
পূর্ণেন্দুদার কথোপকথন ছাড়া আমার দুটি কবিতার বই ‘এই নাও মেঘ’ ও ‘ধারাবাহিক অবহেলা’ নিয়ে গিয়েছিলাম প্রথমবার। খুব মন খারাপ হয়ে গেলেও তখন কোনো কবিতার বই ছুঁয়ে দেখতাম না। কিন্তু মন কী সব সময় এসব বাধা-নিষেধ মানে! তাই দীর্ঘ একটি সোফায় শুয়ে কখনো কখনো চলে যেতাম কফি হাউসে, কলিকাতায়। আমার বস মোহিত সেনের ওই অসাধারণ কথাটির মতো আরেকজনের একটি উপদেশ এই বৃদ্ধ বয়সেও মাথায় রেখেছি। একদিন কথা প্রসঙ্গে প্রনম্য সাহিত্যিক দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যেপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘যারা তোমার প্রশংসা করবে তাদের নয়, যারা সমালোচনার সাহস দেখাবে তাদের শ্রদ্ধা করো। অবশ্যই ওই সমালোচনা যদি নিরপেক্ষ হয়...।’ ভাবতে ভালো লাগে ওই সময় আমাদের যৌবনে আমরা শিক্ষকপ্রতিম কতো মানুষকে কাছে পেয়েছিলাম।
কবিতা থেকে মুখ ফিরিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলাম রবীন্দ্রনাথের গানে। যখনই একা থাকতাম তখনই শুনতাম তার গান। একই ক্যাসেট বারবার। কিন্তু এই রবীন্দ্রনাথ তার গানের ডালি নিয়ে কবে এলেন আমার কাছে? ঠিক কোথায় পেলাম তাকে? কবেই বা তিনি হয়ে উঠলেন আমার রবীন্দ্রনাথ? ... ভাবতে ভাবতে চলে যেতাম শৈশবে যখন মায়ের গলায় ‘চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙেছে’ শুনেছিলাম।
প্রথম যেদিন স্কুলে যাই সেদিন প্রার্থনা গানের জন্য সারি সারি লাইনে দাঁড়ানো ছেলেমেয়েদের পেছনে দাঁড়াতে হয়েছিল। গানটি ছিল ‘সংকোচের বৃক্ষলতা নিজের অপমান/সংকটেরও কল্পনায় হয়ো না ম্রিয়মাণ/... মুক্ত করো ভয়...।’ সুরটি ঠিকমতো জানতাম না। মনে আছে, রতে মায়ের কাছে শিখে পরদিন গলা মিলিয়েছিলাম। মায়ের কাছেই শুনেছিলাম গানটি রবীন্দ্রনাথের। কিছুদিন পর স্কুলের একটি অনুষ্ঠানের জন্য শিখেছিলাম, ‘বরবায় বয় বেগে।’ খুব মুগ্ধ হয়ে গাওয়ার চেষ্টা করতাম

‘শৃঙ্খলে বারবার ঝন ঝন ঝঙ্কার নয়, এ তো তরুণীর ক্রন্দন শঙ্কার
বন্ধন দু’বার সহ্য না হয় আর টলেমেনও করে আজ তাই ও
হাই করে মারো মারো জিন হাঁইয়ো।’


ওই গানটি সম্পর্কে আমার মুগ্ধতার কথা জেনে আমাদের ক্লাসের দীপিকা বলেছিলেন, ‘রবীন্দ্রনাথ, তাসের দেশ।’ এরপর ময়ল স্যার। তিনি আমাদের ভূগোল পড়াতেন। তিনি শিখিয়েছিলেন দু’একটি অসম্ভব রবীন্দ্রসঙ্গীত। মাঝে-মধ্যে পাশের বাড়ির রিতুদিকে গাইতে শুনতাম, ‘যা তা আগলে বসে রইক কত আর?’ কোনো কোনোদিন হারমোনিয়াম বাজিয়ে গাইতেন, ‘চোখের আলোয় চেয়েছিলাম, চোখের বাহিরে/অঙ্করে আজ দেখব, যখন আলোক নাহি রে...।’
এভাবেই হয়তো ধীরে ধীরে রবীন্দ্রনাথ এগিয়ে এসেছিল আমার দিকে অথবা আমি তার দিকে। তখন বোধহয় ক্লাস টেনে পড়ি। রবীন্দ্রজয়ন্তী হচ্ছে স্কুলে। বিশেষ একটা বাড়ির দিকে পা বাড়াতেই কানে এলো, ‘কাল রাতের বেলা গান এলো মোর মনে/তখন তুমি ছিলে না মোর সনে...।’ ক্লাস নাইনের আত্রেয়ী গাইছিলাম। এতো দিন চেনা বন্ধু আত্রেয়ীকে অন্য গ্রহের বাসিন্দা মনে হয়েছিল। গান শেষে এগিয়ে গিয়ে কিছু না বলে একটু হেসেছিলাম। সেদিন চোখ দুটো নিশ্চয়ই জানিয়েছিল আমার দিব্য মুগ্ধতা।
এসবের মধ্যেই হঠাৎ করে যেন শেষ হয়ে গিয়েছিল স্কুল জীবন। এরপর কলেজ, কলকাতা টিউশনি, মেসবাড়ির আবর্তে, যান্ত্রিক টানাপড়েনে কাটছিল দিন। এর মধ্যেই রবীন্দ্রনাথ বেজে উঠতেন বুকের মধ্যে ‘তোমার যে বলা দিবস রজনী, ভালোবাসা, সখী ভালোবাসা কারে কয়! সে কী কেবলই যাওনাময়।’ আরেকদিন ঘোর বর্ষায় মোর বাড়ির পাশের একটা জানালা থেকে ভেসে এসেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ‘উতলধারা বাদল ঝরে/সকালবেলা একা ঘরে।’ এ রকমই টুকরো টুকরো গানের বলি নিয়ে কাটছিল আমার মন খারাপ করা দিনগুলো।

ওই সময়ই সদ্য আলাপ হওয়া বিকাশ লাবণ্য, কেটি মিত্তিরের বেশ কাটতে না কাটতেই হাতে পই ‘গোরা’। এরপর ‘চতুরঙ্গ’ চার অধ্যায়। এভাবেই আমার রবীন্দ্রনাথ শুরু। মহামানবকে আপন করে নেয়ার সামান্য প্রয়াস।
এরপরই নতুন করে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আমার জীবনে আসে তপতী। গীতবিজ্ঞানের সব গান তার কণ্ঠস্থ। তার হাত ধরেই নতুন করে আবিষ্কার করা রবীন্দ্রনাথকে। শৈশব থেকে আজ পর্যন্ত তার গানের মধ্যেই মূলত তাকে পাওয়া।শারজাহে অনেক নিঃসঙ্গ রাতের সঙ্গী ছিল রবীন্দ্রনাথের গান। আবুধাবি, দুবাই, শারজাহ, অজমান, উম্মল কোয়েন, রাস-আল- কোইমা ও ফুজিয়ারা এ সাতটি আমিরশাহীকে নিয়েই সংযুক্ত আরব আমিরশাহী। আবুধাবির রাজা বা আমির ওই সংযুক্ত আমিরশাহীর প্রেসিডেন্ট। প্রথম মাসখানেক কাজের চাপ, ফ্ল্যাট পাওয়া, গোছানো এসব কেড়েছে কিছুদিন। নতুন কাজকর্মে অভ্যস্ত হয়ে পড়ার পর অন্য শাখার সহকর্মীদের সঙ্গে মেলামেশা বাড়লো। বৃহস্পতিবার আধবেলা অফিস করার পর কারো না কারোর বাড়িতে আসর বসতো আমাদের। আঞ্চলিক অধিকর্তার অফিস ছাড়াও দেশে আমাদের ৬টি শাখা ছিল। ভারত থেকে যাওয়া অফিসারের সংখ্যা ছিল ১৬। প্রতি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যাবেলা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আসর বসতো আমাদের। আবুধাবি, দুবাই, শারজাহ সব ব্রাঞ্চের বন্ধুরা মিলে খুব আনন্দ করে কাটাতাম ওই দিনগুলো।
দুবাই শহরের মাঝখান দিয়ে একটা খাঁড়ি আছে। এই ‘আব্রা’র দু’পাশে শহর। একাধিক দুবাই। অপর পাড়ে ডেরা। মোটরবোটেই পার হয় মানুষ। গাড়ি যাওয়ার রাস্তা জলের মধ্যে দিয়ে একটা সুড়ঙ্গ আছে। প্রথম দিন যাওয়ার সময় এক বন্ধু জানিয়েছিল, ‘জানো তো, এই টানেলের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে জল...।’ বিশ্বাস হয়নি প্রথমে। ওই অসম্ভবকে সম্ভব করা হলো কীভাবে তা বুঝতেও সময় লেগেছিল কয়েকদিন।
ছুটির দিনগুলোর নিঃসঙ্গতা এড়াতে বেরিয়ে পড়তাম শারজাহে সমুদ্র কিনারে, কখনো বা দুবাইয়ের জুমেইরা বিচে। তখন জাবেলালি শিল্প কেন্দ্র গড়ে উঠেছিল আস্তে আস্তে। আবুধাবির দূরত্ব ছিল ২০০ কিলোমিটারের মতো। সারা দিন ঘোরাঘুরি করে ফিরে আসতাম রাতে। সেখানকার অ্যামিসমেন্ট পার্কটি ছিল খুব সুন্দর। তখন ওই দেশে কোনো ট্রেন ছিল না। এ জন্যই বোধহয় টয়ট্রেনে ভিড় হতো খুব। বন্ধুরা সবাই রোলার কোস্টার ও উঁচু নাগরদোলায় মজা করতাম খুব।
আরো একটি জায়গা ছিল আমার প্রিয় খরফোকান। ফুজিয়ারা আমিরশাহীর একটা শহর। গলফ অফ ওমানের তীরে ওই শহরে যাওয়ার পথে ছোট ছোট পাহাড় ছিল কয়েকটা। হিমালয়ের দেশের মানুষ আমি। তবু ওই পাহাড়গুলো আমাকে চিনতো ভীষণ। মানুষ যখন একা সঙ্গীহীন হয়ে যায় তখন বোধহয় সবকিছুই ভালো লাগে তার। আমার অন্তত তা-ই হতো। তবে শুনেছি, নিঃসঙ্গতার বোমা বইতে বইতে মানুষ যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ে তখন আর কিছুই ভালো লাগে না তাদের। সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের উটের পিঠে চড়ে মরুভূমির মধ্যে বেড়াতে বেড়াতে খুব ইচ্ছা হতো হারিয়ে যাওয়ার। আদি-অন্ত ছাড়িয়ে থাকা বালির মধ্যে মুখ গুঁজে শুয়ে থাকার মতো আনন্দ আর কিছু নেই বলেই মনে হতো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনোটাই হয়ে ওঠেনি।

আবদুল মান্নান সৈয়দের
স্মৃতির নোটবুক ও অন্যান্য

মনজু রহমান

 


আবদুল মান্নান সৈয়দকে নিয়ে খুব বেশি লেখালেখি হয়েছে বলা যাবে না। তার সাহিত্যকর্মের দিক নিয়ে অনেকেই বিচ্ছিন্নভাবে টুকটাক লিখেছেন। কিন্তু পুরো মান্নান সৈয়দকে কোনো আলোচকই টেনে আনার চেষ্টা করেননি। কারণ মান্নান সৈয়দ প্রচারমুখী লেখক ছিলেন না। অথচ তিনি বাংলা সাহিত্যের এমন কোনো মাধ্যম নেইÑ যেখানে সহজ ও সাবলীল কৃতিত্ব রেখে যাননি। এই বহুমাত্রিক লেখককে এক সময় বলা হতো সব্যসাচী লেখক। ষাটের লেখকদের মধ্যে তাকে বলা হতো সবচেয়ে উচ্চারণ সমৃদ্ধ লেখক, লেখকদের আইডল। প্রবন্ধ, নিবন্ধ, গল্প, উপন্যাস, গবেষণা, নাটক, কবিতা, সম্পাদনাÑ সাহিত্যের সব মাধ্যমে অনায়াসে বিচরণ করেছেন। যখন গল্প লিখেছেন তখন তিনি পুরোপুরি গল্পকার, উপন্যাস লিখেছেন উপন্যাসিকের চরিত্র নিয়েই, নিবিষ্ট গবেষক হিসেবে লিখেছেন বিভিন্ন গবেষণাগ্রন্থ, নাটকের ক্ষেত্রে তার স্বাতন্ত্র্যতা বজায় রেখেই নাটকে হাত দিয়েছেন, কবিতার ক্ষেত্রেও কাব্যিক ব্যঞ্জনা সানন্দে ব্যবহার করে হয়ে উঠেছেন সব্যসাচী কবি। কবিতায় তিনি পরীক্ষা-নিরীক্ষা কম করেননি। উত্তর-আধুনিকতা এবং পরাবাস্তবতার সমন্বয় ঘটিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন কবিতার নতুন দর্শন। তিনি লিখেছেন অনেক, অনুবাদেও সিদ্ধ ছিলেন। করেছেন অজস্র লিটলম্যাগ সম্পাদনা। লিটলম্যাগ তার ধ্যান-জ্ঞান ছিল। তিনি বলতেন, কোনো দৈনিক বা দৈনিকের বিশেষ সংখ্যায় লেখা না দিয়ে আমি সে লেখাটি দিতাম কোনো লিটল ম্যাগাজিনে।


দুই.
আবদুল মান্নান সৈয়দ বিভিন্ন গ্রন্থ রচনা করলেও প্রথম যৌবনে নিয়মিত ডায়েরি লিখতেন। সারা দিনের ঘটনাপঞ্জি টুকে রাখতেন নোটবুকে। তার জীবনের টুকরো টুকরো ঘটনাপ্রবাহ নিয়েই সাহিত্যের বর্ণাঢ্য ব্যক্তিত্বের একটি মাত্র গ্রন্থ ‘স্মৃতির নোটবুক’ পাঠকদের হাতে তুলে দিয়েছেন শিল্পতরুর কর্ণধার কবি আবিদ আজাদ। ওই নোটবুক তিনি শুরু করেছেন তার আঁতুড়ঘর থেকে। তার গ্রিন রোডের অনুঘণ্টক উঠে এসেছে ‘কুলিরোড’ শিরোনামে। তিনি বলেছেন, ‘বায়ান্ন বাজার আর তেপ্পান্ন গলির এই ঢাকা শহরের কুলিরোড খুঁজে পাবেন কেউ? পাবেন না। কারণ রাস্তার নামটাই আজ বদলে গেছে, হয়েছে গ্রিন রোড।’ এখানে চলত গরুর গাড়ি, চারপাশে কাঁচারাস্তা, সবুজে ঢাকা ধানক্ষেত, বিশাল বিশাল আম-কাঁঠালসহ বিভিন্ন গাছ, রাস্তাটি অবহেলায় নেমে গেছে দৃষ্টির বাইরে।
দশ ভাইবোনের মধ্যে একমাত্র লেখক আবদুল মান্নান সৈয়দ একাদশ শ্রেণিতেই কলকাতার পঞ্চপা-বের মতো পাঁচ বন্ধুর সান্নিধ্যে চলে আসেন। শুরু হয় জীবনের নতুন অধ্যায়। সিকান্দার দারা শিকোহ, মফিদুল আলম, আমিনুল ইসলাম বেদু, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ও আবদুল মান্নান সৈয়দ। ওই পঞ্চপা-বের হাতেই ছিল ঢাকা কলেজের তথা ঢাকার লিটল ম্যাগাজিনের সর্বস্ব শরীর। পরে অবশ্য এই গোষ্ঠীর বাইরে অন্য জগতের প্রান্তরে তিনি হাঁটতে থাকেন। তিনি অনেক বন্ধুর নাম তার প্রথম পর্বে উল্লেখ করেছেনÑ যারা ষাটের লিটলম্যাগ আন্দোলনের পুরধা ছিলেন।
মান্নান সৈয়দ প্রথম গল্প ‘আকাশটা কালো’ দিয়ে গল্পকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন ঢাকা কলেজে ‘কলেজবার্ষিকী’তে। কলেজের বাইরে পাঠকের সামনে আসেন সাম্প্রতিক পত্রিকায় প্রবন্ধ, মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকায় বিদেশি গল্পের নাট্যরূপ, সমকাল পত্রিকায় গ্রন্থালোচনা, উপন্যাস ও কাব্যনাট্য, পূবালী পত্রিকায় নাটক, দৈনিক ইত্তেফাকে কবিতাÑ এসবই তার প্রথম প্রকাশ।
এবার মান্নান সৈয়দের মুখে শুনিÑ ‘তারপর তো দরজা খুলে যায়। যৌন পত্রিকা থেকে গবেষণা পত্রিকাÑ কোথায় না লিখেছি, এমনকি রেডিও-টিভিতেও। জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, আসাদ চৌধুরী, রফিক আজাদ, শহীদ কাদরী, হুমায়ন কবির, আবুল হাসান, আখতারুজ্জামান ইালয়াস, হায়াৎ মামুদ, সেবাব্রত চৌধুরী, আবদুল্লাহ আল মামুন, মোমতাজ উদ্দীন, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, মোহাম্মাদ রফিকসহ কত প্রিয় বন্ধু তার জীবনে এসেছেন। যারা তার বন্ধু হিসেবে এসেছিলেন সবাই ষাটের লিটলম্যাগ আন্দোলনের মানুষ, নিজ নিজ ক্ষেত্রে আলোর দ্যুতি ছড়িয়ে দিয়েছেন বাংলা সাহিত্যের ভা-ারে। পঞ্চাশের কবিদের বিরুদ্ধে জোট বেঁধে লিটলম্যাগের মধ্য দিয়ে নিজেদের রাজত্ব কায়েম করেছেন।

তিন.
আবদুল মান্নান সৈয়দ শুধু লিখে গেছেন তা নয়, সমসায়িক অনেক অপরিচিতজনকে লেখক তৈরি করেছেন। তিনি সম্পাদনা করেছেন বহুমুখী সাহিত্যের কাগজ। শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক ছিলেন যে, তাও নয়। তিনি ঢাকার একমাত্র কবিÑ যিনি ঢাকার বাইরে ‘মফস্বল’ জেলাগুলোর লিটলম্যাগের নিয়মিত খোঁজখবর রাখতেন ও লেখালেখি করতেন। ওই সুবাদে বিভিন্ন মফস্বল জেলায় তার অনেক কবি বন্ধু হয়ে যায়।
মান্নান সৈয়দ অন্যান্য জেলার মতো উত্তরাঞ্চলের জেলা বগুড়ায়ও আসতেন। প্রয়াত কবি ও ‘বিপ্রতীক’ সম্পাদক ফারুক সিদ্দিকী, প্রয়াত কাজী রব, প্রয়াত মনোজ দাশগুপ্ত, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, অর্কেস্ট্রা সম্পাদক রেজাউল করিম চৌধুরী, বজলুল করিম বাহারদের নিয়মিত খোঁজ রাখতেন তিনি। বগুড়ায় এলেই আড্ডা দিতেন ফারুক সিদ্দিকীর ডেরায়। তিনি বলতেন, ঢাকার বাইরে সবচেয়ে উচ্চকিত কবিতার কাগজ বিপ্রতীক। অবশ্য বিপ্রতীকে ঢাকার প্রায় ষাটের কবিরা লিখতেন। কাজী রব সম্পর্কে তার মূল্যায়ণÑ ‘এদের মধ্যে কাজী রব ছিল সবচেয়ে কলকণ্ঠ, সবচেয়ে খোলামেলা। ওর কবিতা-গল্পেও ছিল জং না ধরা এক নতুনত্ব, এক অপরিমেয় আশা। বগুড়ার ষাটের দশকে লিটল ম্যাগাজিনের অন্যতম পুরোধার বহুধা শিল্পমুখিতা সবার নজর কাড়ে।’

চার.
লিটল ম্যাগাজিন পাগল আবদুল মান্নান সৈয়দ ছিলেন মূলত লিটল ম্যাগাজিনেরই লেখক। তার সংগ্রহে লিটল ম্যাগাজিনের তালিকা দেখলেই বোঝা যায়, তিনি কতটা লিটল ম্যাগপ্রিয় ছিলেন। ষাটের দশকের সারা দেশ থেকে যে লিটল ম্যাগাজিন-পঞ্জি তিনি ‘স্মৃতির নোটবুক’-এ রেখে গেছেন, সেসবের বিস্তারিত তালিকা (কোন ম্যাগাজিন কত সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে এবং কোন সংখ্যার সম্পাদক কে ছিলেন) দেখলেই অনুমান করা যায়, লিটল ম্যাগাজিনে কতটা দরদ, উদার, নিবেদিত ও যতœবান ছিলেন। সম্পাদনা করেছেন ‘শিল্পতরু’ ও ‘চারিত্র’ কাগজ দুটি। সবচেয়ে বড় দিক হলো, ষাটের দশকে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে থেকে যেসব লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয়েছে এর অধিকাংশের সঙ্গেই তিনি জড়িত ছিলেন কোনো না কোনোভাবে।
অত্যন্ত বিনয়ী, নিরহঙ্কার ও তুখোর আড্ডাবাজ ওই সব্যসাচী লেখক সহজেই যে কোনো অনুষ্ঠানের মধ্যমণি হতে পারতেন। স্মৃতির নোটবুক খুব স্বাস্থ্যবান না হলেও তার সাহিত্য জীবনের যে তথ্য-উপাত্ত এই ক্ষুদ্র গ্রন্থে দিয়ে গেছেন তা ষাটের দশকের লিটলম্যাগ আন্দোলনের পূর্ণাঙ্গ দলিল হিসেবে বিবেচনায় নিতে পারি এবং তা নির্র্দ্বিধায়।

বিদায়ের শেষ সুর

খায়রুন নাহার রুবী

 

 

প্রতিদিন ভোরে ছোট ছেলেটাকে ফোন দিয়ে ঘুম থেকে জাগাতে হয়। নতুবা উঠতে পারে না, আর না উঠতে পারলে সকালের পড়াটা নষ্ট হয়। আজও তেমন করে ফোন দিয়ে জাগিয়েছি বাবুকে। ও ফোন ধরে বললো, মা উঠেছি, এখনই পড়তে বসবো, তুমি ভেবো না। আমি আমার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। প্রতিদিনকার জীবনযুদ্ধ ঘর-বাইরের যুদ্ধ, চাকুরি ক্ষেত্রের যুদ্ধ এমনি নানা যুদ্ধ শরীর মনে বহন করতে হয়। আজ ছুটির দিন বলে যুদ্ধের ধরণ আলাদা তারপরও যেন যুদ্ধের শেষ নেই।
গত ক’দিন থেকে শরীর, মনে এত পরিশ্রম গেছে যা বলার নয়। প্রতি বছরই এই সময়টা আমাকে অনেক বেশি প্রেশারে থাকতে হয়। এই দু’চারদিন হলো সব কাজগুলো গুছিয়ে উঠেছি এখন একটু স্বস্তি। কিন্তু তারপরও যেন কাজের শেষ নেই! চাইলেও স্বস্তিতে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব হয় না। কী মনে করে ছুটির দিন বলে,কাজের ফাকে কøান্তিতে বিছানায় নয় শোফায় শুয়ে পড়লাম। হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠলো। তাকিয়ে দেখলাম ছোটছেলের ফোন। ধরতেই ‘ও’ ডুকরে কেঁদে উঠলো। আমি বুঝলাম না কেন ও অমন করে কাঁদছে?
বললাম , কী হয়েছে বাবা, কাঁদছো কেন?
ও বললো, মা! আমার বন্ধু সুদ্বীপ মারা গেছে।
আমি মুহূর্তেই হতবাক হলাম,অবাক বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, কী হয়েছিল, কী করে মারা গেল?
ও বললো, আমি ঠিক জানি না মা! তবে যে আমাকে জানিয়েছে সে বলেছে সুইসাইড করেছে।
কষ্টে মনটা বিষিয়ে উঠলো। ভাবলাম কী এমন হয়েছে যে সুইসাইড করতে হবে? এই বয়সী ছেলেমেয়েদের সমস্যা একটাই- অতি আবেগ। অতি আবেগে ওরা কী করে , কী করতে চায় নিজেরাই জানে না। খুবই আহত হলাম এ সংবাদ শুনে। ভাবলাম, এখনই ওদের বাসায় যেতে হবে। সুদ্বীপের মার সাথে আমার খুব ভালো সম্পর্ক। আমার খুব পছন্দের একটা মানুষ ওর মা। ওর মার মুখে লেগে থাকা মিষ্টি হাসিটা মুহূর্তেই ভেসে উঠলো আমার চোখে। আর বাচ্চা বাচ্চা মিষ্টি কণ্ঠস্বরটাও কানে ভেসে এলো। অস্থির হয়ে ছুটলাম ওদের বাসার দিকে।


যেতে যেতে মনটা এতই বিষণœ হলো যেন বৃষ্টি জলের মত স্যাঁত স্যাঁতে হয়ে উঠলো বুকের ভেতরটা! আমি জানি একটু পর এটা সমুদ্র জলের ধাক্কায় রূপ নেবে, নিতেই হবে। এ যে বড় কষ্টের অনুভূতি! হঠাৎ করেই বাতিঘর নিভে যাওয়া।
রিক্সা এসে থামলো ওদের বাসার সামনে। নিচতলায় তেমন লোকজন নেই, হয়ত এখনও সেভাবে জানাজানি হয়নি। শুধু দ’ুটি ছেলে একজন সুদ্বীপের আত্মীয় হবে অন্যজনকে আমি চিনি না, ওরা দু’জন হাউমাউ করে কাঁদছে। ওদের এই কান্না যে কত কষ্টের তা শুধু ওরাই বলতে পারে। কারণ যারা কাঁদে শুধু তারাই জানে কী এবং কতটা বেদনাভরা এই কান্না! অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়লে বৃষ্টির চোখ ফুলে লাল হয় কিনা আমার জানা নেই তবে এই ছেলে দু’টোর চোখ ফুলে রক্তের মত লাল হয়ে আছে।
আস্তে আস্তে সিঁড়ি ভেঙ্গে উপরে উঠলাম। বেশ কয়েকজন পরিচিত মানুষ বিরস মুখে বসে আছে। সাথে আমার ছোট্টবেলার বন্ধু! তাদের কারো মুখে কোন কথা নেই। সবারই যেন কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা! লোকজন ঠেলে ভেতরে পা রাখতেই চোখে পড়লো, সুদ্বীপের লাশের পাশে ওর বাবা বসে আছে। দেখে চেনা যায় না, একেবারে পাংশু বর্ণ ধারণ করেছে। সুদ্বীপ ওর পছন্দের, প্রিয় খাটেই শুয়ে আছে , শুধু সাদা একটা চাদর দিয়ে ওর সমস্ত শরীর ঢেকে দেয়া হয়েছে।
বাবার জন্য কত কষ্টের সন্তানের লাশ ধরে বসে থাকা। পৃথিবীতে এত কষ্ট বোধহয় আর কিছুতে নেই। মুখটা দেখবো বলে ওর খাটের পাশেই দাঁড়ালাম। কে একজন এসে চাদরটা সরিয়ে দিলে মুখটা দেখলাম।সহজ, সরল একটা মুখ, মনে হয়, যেন কোন পাপ আজও ওকে স্পর্শ করেনি।‘ও’ যেন স্বভাবতই ঘুমিয়ে আছে! গলায় হালকা একটা লালচে দাগ, আর সবই ঠিক আছে। তখনই মনে হলো,সুদ্বীপ নেই। পৃথিবীর সবটুকু মায়া ছেড়ে ও চলে গেছে, আর আসবে না। কেন যেন মনে হলো, ও কি সত্যিই চলে যেতে চেয়েছে? নাকি সবার ওপর অভিমান করে শুধু নিজের কষ্টটাকে দেখাতে চেয়েছে, মরার জন্য একাজ করেনি। পৃথিবীর সব আলো নিভে গেছে, সুদ্বীপ নিভিয়ে দিয়ে চলে গেছে।
পৃথিবীর সব মানুষেরইতো কিছু না কিছু কষ্ট থাকে, সে কষ্ট এক সময় হাওয়ায় হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়ে লেগে থাকে আকাশের বুকে! তার জন্য মরতে হবে কেন? মৃত্যুর মধ্যে কী আছে? কেন আমাদের সন্তানরা এই পথটি বেছে নেয়? কেন আমরা তাদের সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারি না? কেন ব্যর্থতার শতভাগ বোঝা নিয়ে আমাদের পড়ে থাকতে হয়? এসব প্রশ্নের উত্তর এখন আর কেউ দিতে পারবে না। যেটুকু বুঝি তা হচ্ছে, সময়টা এখন খুব খারাপ! এক এক সময় মনে হয়, অন্ধকার যুগে, বর্বর যুগে, কৃষ্ণযুগে বাস করছি। কোথাও কোন নিয়ম শৃঙ্খলার বালাই নেই। ব্যক্তি, দেশ, রাষ্ট্্র, সমাজ কোথাও যেন কোন বন্ধন নেই। যে যার মত করে চলছে। ধর্মীয় অনুভূতির বিষয়টাও এখন আর আগের মত জাগ্রত নয়। পাপ পুন্যের বিচারবোধও মানুষ এখন হারিয়ে ফেলেছে। তাই নিজের প্রতি ,পরিবারের প্রতি ক্ষোভ নিয়ে মৃত্যুর পথে এগিয়ে যায়।


ওর মার রুমে ঢুকে বুকটা ব্যথায় ভরে উঠলো। হায়রে মা! সন্তানের মঙ্গল বার্তা যতটা বুকে লেগে থাকে , অমঙ্গলের তীর কাটা হাজার গুন বুকটাকে বিদ্ধ করে। এ যন্ত্রনা থেকে আর কারো মুক্তি ঘটলেও মা’র মুক্তি নেই। যেন হাজার বছর খুচিয়ে খুচিয়ে রক্তাক্ত করে মা’র অন্তর! সুদ্বীপের মা বিলাপ করে কাঁদছিল! সবার চোখের পাতা ভিজে উঠছিল, কেউ কেউ হু হু করে দুহাতে মুখ ঢেকে কাঁদছিল। কখন যে নিজের অজান্তে আমার চোখের পাতা অশ্রুসিক্ত হলো বুঝলাম না।
অনেকটা সময় সুদ্বীপের মার পাশে বসেছিলাম। উনি হয়ত আমাকে দেখতে পাননি। এক এক সময় ওর মার কষ্টের হাহাকার এত তীব্র যে উনি মানতে চান না ওনার সন্তান পৃথিবীতে নেই। কত কথার গাথুনিতে সদ্য মৃত সন্তানকে জীবিত করে তোলেন, ছেলের আচার ,আচরণ , কথাকে জলের মাঝে কাগজের নৌকোর মত করে ভাসিয়ে রাখেন। আবার চিৎকার করে কাঁদেন ছেলের পৃথিবী থেকে চলে যাবার কথা ভেবে। আমি বাড়ির পথে পা বাড়ালাম। আমার ফোনটি বেজে উঠলো। দেখলাম, ছোট ছেলেটা আবার ফোন করেছে। ফোন ধরলাম , ও বললো, মা আমি আসছি, আমাকে নিষেধ করো না।
আমি বললাম, তোমার এ চলে আসাটাকে তোমার বাবা ভালো চোখে দেখবে না।


ও বললো, না দেখলেও যে আমার কিছু করার নেই মা! আমাকে যে আসতেই হবে। আমি ওর জানাজায় শরীক হবো। আমি আর কিছুই বলতে পারলাম না।
সময় গড়িয়ে চলছে। আমি অপেক্ষা করে আছি ছেলে আসবে। ‘ও’ ওর বন্ধুর লাশ দাফন করার জন্য খুব ঝুকির পথে আসছে। বন্ধুর জন্য হৃদয়ে এটুকু রক্তক্ষরণ হচ্ছে এবং তার জন্য ছুটে আসছে, একথা ভেবে মনে মনে সম্মান জানালাম ওকে। আমরা চাইলেও কারো জন্য তেমন কিছু করতে পারি না, তেমন কিছু করা হয়ে ওঠে না। ওর ছোট্ট মনের কোমল জায়গা থেকে এটুকু করার জন্য ছুটে আসছে এওবা কম কিসে?
ওদের আসতে আসতে আসরের নামাজের সময় হয়ে গেল। আসরের পরপরই জানাজা হলো। তারপরও লাশ রাখা হলো, ঈদগাহ মাঠে। যেখানে জানাজা হয়েছে ঠিক সেই জায়গাটায়। এটা ওদের প্রিয় জায়গা! ছোটবেলা থেকে এ মাঠে খেলে ওরা বড় হয়েছে। এর আশেপাশে ব্যস্ত সময় পাড় করেছে। সেই স্বপ্নের জায়গা প্রিয় মাঠ, ঈদগাহ ! কত বকা খেয়েছে, আমি নিজেও কত বকা দিয়েছি আমার সন্তানকে শুধু ওখানটায় যাবার জন্য তারও যেন কোন হিসাব নেই। এই সেই মাঠ যেখানে সুদ্বীপ শুয়ে আছে। আর হাজারো মানুষের পদচারণায় কেমন ভারি হয়ে উঠছে ‘ঈদগাহ’! সামনের ঈদে সুদ্বীপ আর এখানে হাঁটবেনা, বন্ধুদের নিয়ে মেতে উঠবে না হৈ হুল্লুরে!
সুদ্বীপের দূরের আত্মীয় স্বজনদের আসতে দেরি হওয়ায় আসরের পর দাফন হলো না। আমি ছেলের কারণে ব্যস্ত হয়ে আবার ছুটলাম সুদ্বীপদের বাসায়।
সন্ধ্যে তখন ছুঁই ছুঁই। চারদিক অন্ধকার-কেমন ঘুটঘুটে, অদ্ভুত বিষাদে ভারি হয়ে আছে বাড়িটা! ওর মা আত্মীয় স্বজন সব নিচে নেমে এসেছে, ডুকরে কাঁদছে মা! বাবা নিচে নামেনি খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছে।
সুদ্বীপের দ্বিতীয়বার জানাজা শেষে কবরস্থানে নেয়ার জন্য ট্রাকে তোলা হলে মুহূর্তে ট্রাক ভরে গেল বন্ধুদের জন¯্রােতে। তারপরও অনেক বন্ধু যে যার মত করে ছুটছে কবরস্থানের দিকে। বিষাদের কালো মেঘটা কেমন নিশিকালো অন্ধকার করে রাখা বাড়িটাকে ছেড়ে হাওয়ায় হাওয়ায় উড়ে চললো কবরস্থানের পথে। বিদায় সুদ্বীপ! এই পরিবারের একটি অধ্যায়ের শেষ হলো যেন আজ!
তৃতীয় দিনে মিলাদ শেষে ছোট ছেলে ঢাকা চলে যাবে রাতের গাড়িতে। আমি বার বার ফোন দিচ্ছি, কোথায়?
বাবু বললো, মা আমরা বন্ধুরা কবরস্থানে।


ভাবলাম , যাবার আগে বন্ধুকে দেখতে গেছে। বাবু কবরস্থান থেকে ফিরে এলে খুব তাড়াহুড়ো করে ওকে গাড়িতে তুলে দিতে গিয়ে দেখি- সব বন্ধুরা এসেছে বাবুকে এগিয়ে দিতে। ওদের মন খুব খারাপ! বাবুকে গাড়িতে তুলে দিয়ে বাসায় আসি। অনেক রাতে ওর রুমটা গোছাতে গিয়ে দেখি, বালিশের নিচে একটা খোলা ডায়রী। কী যেন সব লেখা। যেটা নিতে ‘ও’ হয়ত ভুলে গেছে। লেখাটা নজরে পড়লো, আমি কেমন চমকে উঠলাম! লেখাটা ঠিক এমনই ছিল ...
“আজ আকাশে চাঁদটা দেখেছিস সুদ্বীপ? আজ যখন তোকে নিয়ে ঐ ভয়ানক নির্জন জায়গাটায় গেলাম, তখন গন্ধরাজ ফুলগাছের পাতার মধ্য দিয়ে বিশাল থালার মত চাঁদটাকে দেখে বুকের ভেতরটা কেমন হু হু করছিলো। তোর কি মনে পড়ে এমনি কত রাত আমরা এক সাথে হেঁটেছি? সেদিনওতো আকাশে এমন সুন্দর চাঁদ-ই ছিলো? ভূতের গলি, ঈদ-গাহ মাঠে হয়তো আমাদের পায়ের চিহ্ন এখনো মুছে যায়নি। আর আজ কিনা তুই একা একাই চাঁদ দেখবি?
জানিস, দোস্ত ছোটবেলা থেকেই আমি লাশ দেখলে খুব ভয় পেতাম কারণ যদি রাতে স্বপ্নে ওটাকে দেখি। কিন্তু বিশ্বাস কর,আজ যদি আমি স্বপ্নে তোকে দেখি তাহলে আমি হয়তো তোকে একটা থাপ্পর দিয়ে বলবো, কোথায় গেছিলি, একবারও কারো কথা ভাবলি না?
তোকে অনেক মিস করবো রে...! তোর জায়গা কেউ কোনদিনও নিতে পারবে না। কারণ সেই জায়গা পূরণ করার ক্ষমতা নিয়ে কেউ হয়তো আর আসবে না। আল্লাহ তোকে বেহেশত নসিব করুক! আমাদের যেন জান্নাতে আবার দেখা হয়... সেদিন তুই আর আমি আবার এক সাথে চাঁদ দেখবো”...!
লেখাটা পড়ে কেমন যেন হয়ে গেলাম, কেমন একটা অনুভূতি মুহূর্তে হৃদয় ছুঁয়ে গেল, হায় কী হলো, এটাতো না হলেও পারতো!
এর এক সপ্তাহ পর আমি যাচ্ছিলাম সুদ্বীপের বাসার সামনে দিয়ে। হঠাৎ বুকটা কেঁপে উঠলো, বাড়িটা কেমন প্রাণহীন হয়ে আছে। মনে হলো, যেন আজ আর এ বাড়িতে কোন মানুষ নেই। কাঁচের জানালাগুলো খোলা, সাদা পর্দাগুলো দিশাহীনভাবে উড়ছে মুক্তির আনন্দে! ছাদের দিকে তাকালাম- পুর্তগালের একটি পতাকা উড়ছে...! আর বাটিক করা কতগুলো নীল কাপড় বাতাসে উড়ে উড়ে দড়ির গায়ে আটকে আছে। অথচ এই পরিবারের আদরের ছোট্ট সন্তানটি ভালোবাসার বন্ধনে আটকে থাকতে পারেনি...!

 

ধনবানে কেনে বই জ্ঞানবানে পড়ে

যতীন সরকার

 

এটি হয়তো নিছক একটি গল্প। তবু এ-গল্পের ভাবসত্যটিকে না-মেনে পারা যায় না। একালের নব্যধনিক এবং লুটেরা ধনিকরা যে বই নিয়ে মাথা ঘামায় না, গল্পটিতে সে-সত্যেরই প্রকাশ ঘটেছে। বাংলায় একটি প্রবাদ আছে- ‘আনাড়ির ঘোড়া নিয়ে বুদ্ধিমান চড়ে/ধনবানে কেনে বই বুদ্ধিমানে পড়ে

 

কন্ট্রাক্টরি করে অনেক কাঁচা পয়সার মালিক হয়েছেন এমন এক ব্যক্তি নিজের জন্য একটি আলিশান বাড়ি তৈরি করলেন। খুবই আধুনিক ধাঁচের বাড়ি। দামি আসবাব দিয়ে পুরো বাড়িটি সাজানো। এক সমঝদার বন্ধুকে বাড়িটি দেখাতে নিয়ে এলেন এবং বাড়িটি সম্পর্কে তার অভিমত জানতে চাইলেন। বন্ধু বললেন, ‘হ্যাঁ, খুবই চমৎকার বাড়ি তুমি তৈরি করেছ। আর বাড়ির আসবাবপত্রগুলোও খুবই চমৎকার ও রুচিশীল বটে। কিন্তু এ রকম একটা বাড়িতে ভালো একটা লাইব্রেরি না থাকলে ঠিক মানায় না। বাড়িতে বই থাকাটা খুবই জরুরি।‘
বাড়ির মালিক কন্ট্রাক্টর ‘কুচ পরোয়া নেই’ ভঙ্গিতে বললেন, ‘ঠিক আছে, আজই আমি আহম্মদ অ্যান্ড কোম্পানিতে ৭০০ টন বইয়ের অর্ডার দিয়ে দিচ্ছি।’
চুন-বালি-সুড়কি নিয়ে যার কারবার তিনি তো সবকিছুকেই টনের মাপে বিচার করবেন। তাই বইয়ের কথায়ও তার টনের হিসাবই মনে এলো, বইয়ের সম্পর্কেও অন্য রকম কিছু তিনি ভাবতে পারেন না।
এটি হয়তো নিছক একটি গল্প। তবু এ গল্পের ভাবসত্যটিকে না মেনে পারা যায় না। একালের নব্য ধনিক ও লুটেরা ধনিকরা যে বই নিয়ে মাথা ঘামায় না, গল্পটিতে ওই সত্যেরই প্রকাশ ঘটেছে। বাংলায় একটি প্রবাদ আছেÑ ‘আনাড়ির ঘোড়া নিয়ে বুদ্ধিমান চড়ে/ধনবানে কেনে বই, বুদ্ধিমানে পড়ে।’ একালের ধনবানদের ব্যাপারে এ প্রবাদটি বোধহয় এর সত্যতা ও কার্যকারিতা একেবারেই হারিয়ে ফেলেছে।
প্রবাদটি তাহলে কখন সত্য ছিল? কখনো সত্য ছিল কি?


বিপুল ধনে ধনবান হওয়ার যেসব পথ অর্ধশতাব্দী ধরে, বিশেষ করে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেÑ এখন খুলে গেছে, সেসব পথ এর আগে তৈরি হয়নি। সে সময় এখানে ধনবান হওয়ার ভিত্তি ছিল ভুমির স্বত্ব-স্বামিত্ব। কর্নওয়ালিসের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পথ ধরে ছোট-বড়-মাঝারি যে ভুস্বামীগোষ্ঠীর পত্তন ঘটেছিল, ধনবান বলতে মূলত ওই গোষ্ঠীর মানুষকেই বোঝাতো। সরকারি-বেসরকারি চাকরি কিংবা ওকালতি, ডাক্তারি, মাস্টারি ইত্যাদি পেশার ব্যক্তিরাও ওই গোষ্ঠী থেকেই বেরিয়ে আসতেন। অর্থে-বিত্তে তারা সম্পন্নতা ও স্বচ্ছলতা অর্জন করতেন অবশ্যই। তবে একেবারে লাগাম ছাড়া ধনবান হয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ তাদের সামনে খুলে যায়নি।
এরও অনেক আগে, আঠারো শতকের শেষে সদ্য ব্রিটিশ রাজত্ব প্রতিষ্ঠার সুবাদে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত ধরে এ দেশে একটি মুৎসুদ্ধি ধনিক শ্রেণি গড়ে উঠেছিল। তাদের বলা হতো ‘হঠাৎ নবাব’। সেকালের ওই ‘হঠাৎ নবাব’দের সংস্কৃতিহীনতা ও রুচিহীনতার অনেক মিল খুঁজে পাওয়া যাবে একালের নব্য ধনিক ও লুটেরা ধনিকদের সঙ্গে। তাদের মতোই বই সংস্পর্শহীন ছিলেন সেকালের হঠাৎ নবাবরা।
হঠাৎ নবাবদের গোষ্ঠীটি সমাজমঞ্চ থেকে আস্তে আস্তে বিদায় নিতে থাকে। এ গোষ্ঠীর অনেকেই পরে ভূস্বামীতে রূপান্তরিত হন। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত থেকে উপজাত ওই গোষ্ঠীটি সম্পর্কে আমাদের বিরূপতা অবশ্যই সঠিক ও সঙ্গত। তাদের যে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের খোজা প্রহরীরূপে গড়ে তোলা হয়েছিল সে কথা মোটেই মিথ্যা নয়। পরজীবী ওই নয়া সামন্ততন্ত্রীরাই যে সমাজ প্রগতির পথে দুস্তর বাধার সৃষ্টি করে রেখেছিল এ কথাও নিশ্চয়ই সত্য। তবু না মেনে পারি না যে, এর ভেতরেই সত্যের একটি উল্টো ধারাও সক্রিয় হয়ে উঠেছিল। ওই গোষ্ঠীর ব্যক্তিরাই বইয়ের সংস্পর্শে এসেছিলেন, বইপ্রেমিক হয়েছিলেন, বই লিখেছিলেন। অর্থাৎ আগেকার ‘হঠাৎ নবাব’দের বিপরীতে তারা হয়ে উঠেছিলেন সংস্কৃতিবান ও রুচিমান। তাই তারা যেমন বই পড়তেন তেমনই অন্যদেরও পড়তে উৎসাহ জোগাতেন।


তাদের ভেতর বই পড়ায় যারা মোটেই উৎসাহী ছিলেন না তারাও কখনো কখনো নিতান্ত অনিচ্ছায় হলেও উৎসাহী পড়ুয়াদের জন্য বইয়ের জোগান দিতেন। সে সময়কার পুস্তক প্রকাশকদের কাছে দেশের সব ছোট-বড় জমিদারের তালিকা থাকতো। নতুন বই প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওই তালিকা দেখে প্রকাশকরা জমিদারদের নামে ভিপিযোগে বই পাঠিয়ে দিতেন। জমিদারের বাড়ি থেকে ভিপি ফেরত যাওয়াটাকে একান্তই অসম্মানজনক মনে করা হতো। এ রকম অসম্মানের বোঝা বইতে কোনো জমিদারই রাজি ছিলেন না। তাই অন্তত ময়মনসিংহ জেলার এমন কয়েক জমিদারের কথা শুনেছি, তারা প্রকাশকদের পাঠানো বইগুলোর তালিকা তৈরি করে সেসবের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বিশেষ কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে রেখেছিলেন। এ রকম বইয়ের সংগ্রহ নিয়েই প্রতিটি জমিদার বাড়িতে একেকটি লাইব্রেরি গড়ে উঠেছিল। সেসব লাইব্রেরিতে কোনো জমিদার বা জমিদার নন্দন প্রবেশ করুন আর না-ই করুন, জ্ঞানপিপাসু প্রজাদের অনেকেই সেগুলোয় ভিড় জমাতেন। এভাবেই এবং এ সময় থেকেই বোধহয় ‘ধনবানে কেনে বই, জ্ঞানবানে পড়ে’ প্রবাদটির প্রচলন ঘটেছে।
অনিচ্ছায় নয় শুধু। জ্ঞানবান সৃষ্টিতে অথবা জ্ঞানবানদের পৃষ্ঠপোষকতাদানে স্বেচ্ছায় যারা এগিয়ে এসেছেনÑ তেমন ধনবানের সংখ্যাও একেবারে কম ছিল না। এ রকম অনেক জমিদারই নিজেদের বাড়িতে সমৃদ্ধ লাইব্রেরি গড়ে তুলেছিলেন। ধনবাড়ী, মুক্তাগাছা ও শেরপুরের জমিদারদের লাইব্রেরির কথা তো সর্বজনবিদিত। বাড়ির বাইরে পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠায়ও অনেক জমিদার আর্থিক সহায়তা দান করেছেন। রাজশাহীর ‘বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতি’ ও এর সমৃদ্ধ পাঠাগারটি তো এ রকম বিদ্যোৎসাহী জমিদারের দানেই প্রতিষ্ঠিত। ব্রিটিশ শাসন আমলেই স্বদেশপ্রেমিক স্বাধীনতা সংগ্রামীরা বই পড়াটি স্বদেশপ্রেম ও স্বাধীনতা সংগ্রামের অপরিহার্য অঙ্গে পরিণত করে ফেলেছিলেন। তাদের উদ্যোগেই গ্রামে গ্রামে বা মহল্লায় মহল্লায় পাঠাগার প্রতিষ্ঠা একটি আন্দোলনে রূপ নেয়। ওই আন্দোলনেও তখনকার ধনবানদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের সক্রিয় সহযোগিতা ছিল।


দুই.
দুঃখ এই, ব্রিটিশ শাসন আমলের ধনবানদের পথে ব্রিটিশ শাসনমুক্ত দেশের ধনবানরা পা বাড়ালেন না। পাকিস্তান জমানায় নয়, স্বাধীন বাংলাদেশেও নয়। ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’-এর জিগির তুলে ওই অদ্ভুত রাষ্ট্রটি কায়েম করে যারা সেখানে রাতারাতি ধনবান হয়ে উঠেছিল তাদের ধন অর্জনের পেছনে বইয়ের কোনো ভূমিকা ছিল না। বরং বই ছিল তাদের মতলব হাসিলের পথের প্রতিবন্ধক। তাই তারা বইবিরোধী না হয়ে পারেনি। বই নয়, নির্বিবেক বিষয়-বুদ্ধিই হয়ে উঠেছিল তাদের চালিকাশক্তি। বিষয়-বুদ্ধিই তাদের ভেতর সাম্প্রদায়িক ভেদ-বুদ্ধিটিকে উসকে দিয়েছিল। ওই ভেদ-বুদ্ধি থেকে জন্ম নিয়েছিল ‘পাকিস্তান’ নামক যে সংস্কৃতিবিরোধী রাষ্ট্রটি এর পক্ষে বইভীতি হওয়াই ছিল একান্ত স্বাভাবিক।
পাকিস্তান কায়েম হয়ে যাওয়ার পর সমাজের সব মানুষই যে সংস্কৃতিহীন হয়ে গিয়েছিল তা তো নয়। অন্তত পাকিস্তানের পূর্ব অংশের বাঙালি জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল সাংস্কৃতিক রুচিঋদ্ধ। এই সংস্কৃতিমান মানুষের বইপ্রীতি পাকিস্তান রাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারক ও কর্তৃত্ববানদের একান্ত স্বস্তিহীন করে তুলেছিল। এ ব্যাপারে নাৎসিবাদী হিটলার ও তার অনুচরদের সঙ্গে পাকিস্তানবাদীদের ভাবনা একেবারে খাপে খাপে মিলে যায়। নাৎসিবাদ ও পাকিস্তানবাদÑ এ দুয়েরই লক্ষ্য ছিল সভ্যতার চাকাটা পেছন দিকে ঘুরিয়ে দেয়া। আর এ কাজে বই-ই হচ্ছে প্রধান বাধা। কারণ বই তো সভ্যতার বাহক। সভ্যতার বাহকটিকে সভ্যতাবিরোধীরা সুনজরে দেখে কী করে? নাৎসিবাদীরা সভ্যতার বাহক বইয়ের বহ্নুৎসব করেছিল প্রকাশ্যে ঢাকঢোল পিটিয়ে। পাকিস্তানবাদীরা ঠিক তেমনটি করেনি। তারা মানুষকে বই বিমুখ করার অন্য রকম একটি ধারা চালু করতে চেয়েছিল। ওই ধারাটি সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের। পবিত্র ধর্মের অপবিত্র ব্যাখ্যা দিয়ে এখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বোধ-বুদ্ধি সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের খাতে প্রবাহিত করে দেয়ার মতলব এঁটেছিল তারা। ধরেছিল বই নিষিদ্ধ করার পথ। সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষমুক্ত উদার ও মুক্তবুদ্ধি সাধকদের তারা ভয় পেতো। সমাজ বদলের প্রবক্তাদের সম্পর্কে তো তাদের ভীতি ছিল সীমাহীন। তাই যে বইয়েই প্রকাশ আছে কিংবা আছে সমাজবদলের আর্তি ও পথনির্দেশ সেসব বই-ই হয়ে উঠেছিল তাদের চোখের বালি। কিন্তু সংখ্যাধিক্য তো সে রকম বইয়েরই। কয়টা বই নিষিদ্ধ করতে পেরেছিল পাকিস্তানবাদের প্রবক্তারা? বইয়ের প্রতি পাকিস্তানবাদীদের নিষেধবিধিই বরং পাকিস্তান রাষ্ট্রের অধিকার বাঙালিদের বইপ্রেমটি আরো জোরদার করে তুলেছিল, নিষিদ্ধ বইয়ের প্রতি তাদের আকর্ষণ দুর্বার হয়ে উঠেছিল। বলা যেতে পারে, বাঙালি জাতির স্বাধিকার চেতনা ও স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম প্রেরণাটি তার বইপ্রেম থেকেই উৎসারিত হয়েছিল। হায়! রক্ত ও ইজ্জত দিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর এ রাষ্ট্র তথা এ জাতির হর্তাকর্তা, বিধাতা হয়ে বসলো যে গোষ্ঠীটি সে গোষ্ঠীর ভেতর বইপ্রেমিক সংস্কৃতিমান বাঙালি জাতির ঐতিহ্যের ছিটেফোঁটাও নেই। আগেই বলেছি, বাংলাদেশের এই নব্য ধনিক ও লুটেরা ধনিকগোষ্ঠী অষ্টাদশ শতকের কলকাতার ‘হঠাৎ নবাব’দেরই সগোত্র। হঠাৎ নবাবদের চেয়ে তারা বরং অনেক ধূর্ত ও ধড়িবাজ। আঠারো শতকের বাঙালি হঠাৎ নবাবদের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা ছিল না। কিন্তু বিশ শতকের স্বাধীন বাংলাদেশে রাষ্ট্র ক্ষমতাটি এখানকার নব্য ধনিক ও লুটেরা ধনিকরাই দখল করে নিয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানে দেশের জনগণকেই বলা হয়েছে রাষ্ট্রের ‘মালিক’। ওই মালিকানা বেহাত হয়ে যেতে বেশিদিন লাগেনি। এখন তো বাংলাদেশের জাতীয় সংসদেরও নিয়ন্তা নব্য ধনিকরাই, রাজনীতিকদের বদলে তারা সে সংসদের অধিকাংশ আসনের দখলদার হয়ে বসেছে। এ কথা তো জানাই আছে, ক্ষমতা অধিকারীদের সংস্কৃতিই হয়ে ওঠে পুরো সমাজের সংস্কৃতি। বর্তমানে এ দেশে ক্ষমতার মঞ্চে যারা অধিষ্ঠিত তাদের কি সত্যি সত্যিই কোনো সংস্কৃতি আছে? সংস্কৃতিহীন ক্ষমতাবানদের দেশটি তো সংস্কৃতিহীনই হবে। সে দেশে বইয়ের কদর করবে কে?


তিন.
ব্রিটিশ আমলে ধনবানদের পৃষ্ঠপোষকতায় এ দেশে যেসব লাইব্রেরি গড়ে উঠেছিল এর অধিকাংশই পাকিস্তান জমানায়ও টিকে ছিল। কোনো কোনোটির শ্রীবৃদ্ধি হয়েছিল। জমিদারি প্রথার বিলুপ্তি ও অনেক জমিদারের দেশত্যাগের ফলে জমিদারদের লাইব্রেরির অনেকটিই অবশ্য নষ্ট হয়ে যায়। এরপরও যেসব পাবলিক লাইব্রেরি টিকে গিয়েছিল এরও অধিকাংশ ধ্বংস হয়ে যায় একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়। এ রকম অন্তত দুটি লাইব্রেরির কথা অত্যন্ত বেদনার সঙ্গে স্মরণ করছিÑ একটি ময়মনসিংহের দুর্গাবাড়ী ধর্মসভা লাইব্রেরি ও অন্যটি ঢাকার রামমোহন লাইব্রেরি। প্রথমটি ছিল সনাতনী হিন্দুদের দ্বারা পরিচালিত ও দ্বিতীয়টি প্রগতিশীল ব্রাহ্মদের। দুটি লাইব্রেরিরই প্রতিষ্ঠাতারা ছিলেন ধর্ম আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। কিন্তু লাইব্রেরি দুটিতে ধর্মীয় বই যত ছিল এর চেয়ে বেশি ছিল ধর্মনিরপেক্ষ বই। এমন অনেক অমূল্য ও দুর্লভ বই এ দুটি লাইব্রেরিতে ছিল যেগুলোর আর কোনো কপি হয়তো কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। ময়মনসিংহের ধর্মসভা লাইব্রেরিতে তো হাতে লেখা পুঁথিই ছিল কয়েকশ’। সবই লুণ্ঠিত হয়ে মুদি দোকানের ঠোঙ্গায় পরিণত হয়েছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে এ রকম পাবলিক লাইব্রেরির পাশাপাশি কতজনের ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারের যে একই পরিণতি ঘটেছে, আমরা কেউই সেসবের খোঁজ নিইনি। এভাবে আমাদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাসের কত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-উপাত্ত যে হারিয়ে গেছে এ সম্পর্কেও আমরা অবহিত ও সচেতন হইনি বললেই চলে। এ রকম শূন্যতার মধ্যে কিছুতেই বেঁচে থাকা যায় না। অন্তত মননশীল মানুষরূপে বেঁচে থাকা তো যায় না! সত্যিকার মননশীল মানুষরূপে বেঁচে থাকার নামই যেহেতু সংস্কৃতি এবং বই যেহেতু ওই সংস্কৃতির অপরিহার্য বাহন সেহেতু বই পড়ার আয়োজনের বিস্তৃতি ঘটাতেই হবে। কীভাবে তা সম্ভব? ‘বই কিনে কেউ দেউলে হয় না’Ñ বিদগ্ধ সংস্কৃতিমান প্রমথ চৌধুরী এমন একটি কথা বলে এক সময় আমাদের আশ্বস্ত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নুন আনতে পান্তা ফুরোয়Ñ বইপ্রেমিকদের মধ্যে এমন মানুষেরই তো সংখ্যাধিক্য। এ রকম যারা প্রায় জন্মসূত্রেই দেউলে হয়ে আছে, প্রমথ চৌধুরীর আশ্বাসবাণী তাদের কতটুকু কাজে লাগবে? বই কিনে বই পড়ার আগ্রহ চরিতার্থ করা তো তাদের পক্ষে একেবারেই অসম্ভব। কাজেই সবার বইপড়ার সুযোগ অবারিত করে দেওয়ার জন্য পাবলিক লাইব্রেরির কোনো বিকল্প নেই। ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় আগেকার জমিদাররা যেভাবে পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠায় অর্থের জোগান দিতেন, এখনকার নব্য ধনিকরাও যাতে তেমনটি করে এ জন্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কায়দা-কানুন খুঁজে বের করতেই হবে। যতদিন সমাজে ধনবৈষম্য বজায় থাকবে ততদিন পর্যন্ত ‘ধনবানে কেনে বই, জ্ঞানবানে পড়ে’ প্রবাদটির সত্যতাটি অবশ্যই প্রতিষ্ঠিত রাখতে হবে। যেভাবেই হোক বই কেনার জন্য ধনবানদের উদ্বুদ্ধ অথবা প্রলুব্ধ কিংবা বাধ্য করা খুবই প্রয়োজন। লাইব্রেরি আন্দোলন বা পাঠাগার আন্দোলনের কথা এক সময় খুবই শোনা যেত। এখনো মাঝে-মধ্যে শোনা যায় বটে। কিন্তু এ আন্দোলনের আগের সেই রমরমা ভাব কিংবা উচ্ছ্বাস এখন আর অবশিষ্ট নেই। তবু লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠায় একালেও কোনো কোনো তরুণকে যখন উৎসাহিত হতে দেখি। তখন আমার উৎসাহের পালেও কিছুটা হাওয়া লাগে বৈকি। তবে সেই সঙ্গে তিক্ত অভিজ্ঞতাজাত কিছু হতাশাও মনকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। দেখেছি, লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করা যত কঠিন এর চেয়ে অনেক কঠিন তা টিকিয়ে রাখা। স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া কিংবা উঁই আর ইঁদুরের মতো প্রাকৃতিক ও জৈবিক উপদ্রবে আমাদের দেশে বইয়ের আয়ু ক্ষয় হয় খুবই দ্রুতবেগে। আবার বই পড়ি বা না পড়ি, বই অপহরণে আমরা সবাই কৃতবিদ্য। অপহরণের হাত থেকে লাইব্রেরির বই রক্ষা করা খুবই কঠিন হয়ে পড়ে। তাই দেখা যায়, জন্মের স্বল্পকাল পরই অধিকাংশ লাইব্রেরির মৃত্যু ঘটে যায়। চুপি চুপি বলি, আমি কিছু ক্ষেত্রে এবং বিশেষ শর্তাধীনে বই চুরিরও সমর্থক। কতিপয় ধনবান যখন তার উন্নত রুচির প্রমাণ প্রদর্শনের জন্য শেলফে বই সাজিয়ে রাখে কিংবা নিতান্ত খেয়ালের বশে দু’চারটি বই কিনে ফেলে অথচ সেসব বই নিজেও পড়ে না এবং অন্যকেও পড়তে দেয় না তখন ধনহীন জ্ঞানবানদের দায়িত্বই হয়ে যায় জ্ঞানহীন ধনবানের কব্জা থেকে বইগুলোকে বের করে আনা। এ জন্য প্রয়োজনে চৌর্যের আশ্রয় নেয়াটা মোটেই অবৈধ বা অসঙ্গত নয় বলেই আমার বিশ্বাস। এভাবেই বরং আমরা ‘ধনবানে কেনে বই, জ্ঞানবানে পড়ে’ প্রবাদটিকে এ যুগেও সার্থক করে রাখতে পারি। লাইব্রেরিতেই হোক কিংবা ব্যক্তিগত সংগ্রহেই হোক, বই না পড়ে আসবাবরূপে সাজিয়ে রাখা অবশ্যই অবৈধ ও অসঙ্গত। সঠিকরূপে বই পড়ে বইয়ের ভেতর থেকে এর সঠিক মর্মবস্তু যারা আহরণ করতে পারবেন তারাই হবেন যথার্থ জ্ঞানবান। ওই যথার্থ জ্ঞানবানরাই মানুষকে সমাজবদলের পথ দেখাবেন এবং তৈরি হবে এমন সমাজ যেখানে সবাই হবেন জ্ঞানবান। অন্যায় ধনে ধনবান হওয়ার পথ সে সমাজে খোলা থাকবে না।

Page 4 of 7

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

Twitter feed

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…