Page 4 of 8

জলেশ্বরীর ট্রেনের বাঁশি

সৈয়দ শামসুল হক

 

 

গল্পের ঘন নীল পথের ওপর সবুজ সোনালি রঙে একটা বাঁশি এসে পড়ে। আহা, বাঁশি! ওই বাঁশি, বুকে যার সাতটি ছিদ্র। এই ছিদ্র গরম লোহার শিকে পুড়িয়ে পুড়িয়ে তৈরি।
পোড়া ছিদ্রের ভেতর থেকে আগুনের দগ্ধতা ফুলের বাগান করে স্বর্গ থেকে সুর টেনে আনে। কৃষ্ণ বাজায়, রাধা ঘর ছেড়ে যমুনার তীরে বাইরে যায়। আমাদের পল্লী গায়ক টুংসু মামুদের কণ্ঠে গান ফোটে ভাওয়াইয়া অভ্যাসের বিপরীতেÑ

‘ও লো সই, আমি কার কাছে যাই
আমি কার কাছে বা যাই।’

বাঁশির শব্দে প্রাণ করে আইঢাই। কিন্তু আমাদের গল্পপটে ওই বাঁশির ছবি এখন নয়। আমরা কানে শুনতে পাই জলেশ্বরীর দিকে আসা ট্রেনের বাঁশি।
রাজারহাট, নবগ্রাম আর জলেশ্বরীতে পাট ও সুপারির চালান অধিক হয়ে গেলে রাতদুপুরে জলেশ্বরীতে মালগাড়ি আসে। গভীর রাতে স্তব্ধতার ভেতরে আকাশের নক্ষত্র পোড়া অগ্নির নিচে মালগাড়ি এসে রাজারহাটে থামে। ফেরার পথে এখান থেকে মালের চালান তুলবে। নবগ্রামেও তুলবে না। একেবারে জলেশ্বরী এসে থামবে। তারপর মারোয়াড়িদের পাটের গাঁইট আর ব্যাপারীর বস্তা ঘুমজাগা চোখে কুলিরা মালগাড়িতে তুলতে থাকবে। বাঁশি দিয়ে গাড়ি ছেড়ে যাবে।
অসময়ের গাড়ি, মধ্যরাতের গাড়ি নবগ্রাম থেকেই তার বাঁশির আওয়াজ পাওয়া যায়Ñ অ্যা, অ্যা, অ্যা বলে সে ডাকতে থাকে, আমি আসছি। আমি আসছি।
বাঁশির তো এই কাজ। আসার খবর দেয়া। শ্যামের বাঁশি তার ভেতরেও খবর দিয়ে আধকোষার পাড়েÑ না না, যমুনার পাড়ে তমাল তলে ডেকে এনেছিল। বাঁশি দিতে দিতে গাড়ি ফিরে যায়। ক্রমেই তার বাঁশির শব্দ অন্ধকারের নক্ষত্রের ছোট্ট একটি বিন্দু হয়ে মিলিয়ে যায়।
খুব ছোটবেলা থেকেই এই বাঁশির সঙ্গে আমরা পরিচিত। সকাল ১০টায় ব্রিটিশ আমলের কাঁটায় কাঁটায় গাড়ি আসে। ১১টায় ফিরে যায় গাড়ি। আমরা মাগরিবের নামাজের পর সন্ধ্যাকালে ডিস্ট্যান্ট সিগনালের কাছে জলেশ্বরীর দিকে আসা ট্রেনের বাঁশি শুনি। তখন আমাদের পড়তে বসার সময় হয়নি। আমরা দুঃসাহসী বালকেরা কেউ কেউ মা-বাবার চোখ এড়িয়ে স্টেশনে ছুটে যাই গাড়ি দেখতে, মানুষ দেখতে। মানুষের ওঠানামা দেখতে।
ওই বালক বয়সে যাত্রীদের এই আসা-যাওয়া নিয়ে আমাদের মনে একটা ভাবের উদয় হয়। ওই ভাবের সঙ্গে স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িটি এখনই ছেড়ে যাবে। গাড়িটির বাঁশি বেজে ওঠে। সাত ছিদ্রের বাঁশি তো নয়, ইঞ্জিনের খোলের ভেতরে তামার নলের ভেতরে জমে থাকা বাষ্প। ড্রাইভারের হাতে সুতা ঝুলছে। ওই সুতো ধরে টান দিলেই নানান সুরে বেজে ওঠে ইঞ্জিনের বাঁশি। সবার হাতে ইঞ্জিনের ওই কলের বাঁশির সুর ফোটে না। সুতায় টান দিলে মনে হয়, তাদের হাতে পাগলা ঘোড়া হিঃ হিঃ করে ডেকে ওঠে। সামনে বড় চাকার নিচে সাদা বাষ্পের মেঘ তুলে নবগ্রামের দিকে রওনা হয়ে যায়।
আর ওই যে ভাবের কথা আমরা বলেছি, আমরা জানি না এর কী অর্থ। আমরা দুই চোখভরে যাত্রীদের দেখি। এ জন্যই ট্রেনের বাঁশি শুনে জলেশ্বরীর ছোট্ট স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে এসে দাঁড়াই। আমরা ওই তল্লাটের বালক বলে টিকিট মাস্টার আমাদের চ্যালেঞ্জ করেন না। যাত্রী বের হওয়ার গেইট দিয়ে আমাদের বের করে দেয় পিঠে থাবড়া মেরে হাসতে হাসতে বলেন, ‘দুই বেলা ইস্টিশানে আসিয়াও টেরেন দেখিবার হাউস না মিটিল?’
আমাদের ভেতরে দুষ্টু মোফাজ্জল বলে, ‘হাউস কি আপনার মিটিছে?’
‘তুই তো বড় নঙ্গর হইছিস রে?’
মোফাজ্জল দৌড়ে বেরিয়ে যায় টিকিট মাস্টারকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে।
ইঞ্জিনের বাঁশি বেজে ওঠে। গাড়ি ছেড়ে চলে যায়।
এর চেয়ে কতো হাসকাব্য হয়। একবার নবগ্রাম থেকে এক পোয়াতি বৌকে জলেশ্বরী হাসপাতালে আনা হচ্ছিল রাতের গাড়িতে। ব্যথা উঠেছে আর জলেশ্বরী ঘনিয়ে আসছে। ইঞ্জিনটাও বুঝি টের পেয়েছে তার গাড়িতে পোয়াতি বৌ। তীব্রস্বরে ড্রাইভার বাঁশি বাজাচ্ছে। স্টেশন মাস্টার অবাক হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন প্ল্যাটফর্মের কাছে এতো ঘন ঘন বাঁশি? তবে কি কেউ কাটা পড়েছে? আত্মহত্যা করলো কেউ? কিন্তু বাঁশি থেমে যায়। ড্রাইভার লাফ দিয়ে নামে। এদিকে গার্ড তার সাদা গাড়ি থেকেও লাফ দিয়ে নামে। আমরা দেখি স্বপ্নে, কী বাস্তবে, এই বয়সে এখন আর তা মনে নেইÑ দু’জনের হাতে দুই নবজাতক। যমজ শিশু। ইঞ্জিনের বাঁশির শব্দে ভীত ওই নারীর গর্ভ থেকে দুই সন্তান বেরিয়ে এসেছে। তাদের নাম রাখা হয় খুব গোপনে, খুব কানে কানে যেন কেউ শুনতে না পায়। ছেলেটির নাম জয়, মেয়েটির বাংলা। ১৯৭১ সাল।
এটা তো হাসকাব্য নয়। তবু যে বালকবেলায় আমাদের মনে হয়েছিল, কারণ বুঝি, জগতের আমরা তখন বুঝি কিছুই জানি না। সবখানে উজ্জ্বল অকারণ হাসির একটা লাফিয়ে ওঠা চোখেই দেখতে পাই। আমাদের ভেতরে বড় প-িতের প-িত নফলচন্দ্র দাস। সে বলে, ‘আরও শুনিয়া রাখো, টকি সিনেমা যে দেখিতে যাস, ছবির আওয়াজ তো শুনিস, কথা কয়, কাঁই কথা কয়? সিনেমার সাদা পর্দার পেছনে পিতলের থরে থরে গেলাস আর সেই গেলাসের ভেতর হতে আওয়াজ ফুটি ওঠে।’
আমাদের বিশ্বাস হয় বা হয় না। আবার মনে পড়ে, স্টেশন রোডে মিষ্টির দোকানের মালিক হানিফ ভাই বলেন, ‘বাঁশি এমন চিজ। স্তব্ধ মারি পড়ি থাকার নয়। নিশীথ রাইতে একা বাঁশি বাজি ওঠে। আগুনপোড়া বাঁশি সাত ছিদ্র হতে বুড়িয়া আঙুলের ডগার মতো সাত পরি বিরায় আর বিলাপ করে আর বাঁশি বাজায়।’
আমাদের মন বিষণœ হয়ে যায়। আমাদের ভেতরে অতি বড় হাসিওয়ালা বালকও গম্ভীর হয়ে যায়।
হানিফ ভাই রাতের শেষে গাড়িটির ছেড়ে যাওয়ার বাঁশি শুনে হাতঘড়িতে টাইম মেলানÑ ‘রাইতের এখন ১১টা। ব্রিটিশ আমল বলিয়া কথা, টাইম ধরিয়া গাড়ি আসে, গাড়ি যায়। সেই দূর নবগ্রাম হতে তার বাঁশির আওয়াজ পাওয়া যায়।’

একদিন বাঁশির আওয়াজ আর আসে না। ইঞ্জিনের বাঁশি আর বাজে না। কিন্তু গাড়ি আসার ঘড় ঘড় খড় খড় শব্দ পাওয়া যেতে থাকে। এতো সংকেতময় ওই শব্দ যেন সে স্তব্ধ হয়ে এগোতে পারলেই আরাম পেতো। আমরা কান পেতে থাকি। ট্রেনের বাঁশি বিকল হয়ে গেছে, নাকি এটা ভূতের গাড়ি? রাতদুপুরে আপনমনে জংশন থেকে জলেশ্বরীর দিকে আসছে?
জলেশ্বরীতে ট্রেন লাইন বসার হুকুম যখন হয় তখন পয়সার বরাদ্দে টান পড়ে। তাই রেললাইনের জন্য পুরনো ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের আঁকাবাঁকা নরম রাস্তার ওপর লাইন পাতা হয়। তাই রাজারহাট থেকে জলেশ্বরী পর্যন্ত গাড়ি সাত-আট মাইলের বেশি বেগে চলতে পারে না।
আমরা আতঙ্কে বিছানায় বসে থাকি। ঘরে ঘরে মানুষ জেগে ওঠে। তারাও জেগে বসে থাকে। যুবকরা লাঠি নিয়ে পথে নামে। তারা কী করে যেন টের পায় রংপুর থেকে মিলিটারির গাড়ি নিঃশব্দে জলেশ্বরীর দিকে আসছে শত শত খুনি পাঞ্জাবি সৈন্য নিয়ে।
গাড়ির গতি ধীর এগিয়ে আসছে। থামা নেই। এগিয়ে আসছেই। রাতের শেষ অন্ধকারেও ট্রেনের জানালা দিয়ে তাদের উঁচিয়ে ধরা রাইফেলগুলোর নল চোখে পড়ছে। যুবকরা চৌরাস্তায় বেরিয়ে এসে পুরনো দিনের কলের গানের চোঙ খুলে চিৎকার করে ডাকছেÑ ‘মা-বোনেরা, মাও-জননীরা ঘর হতে বির হয়া আসেন, পাঞ্জাবিরা আসিচ্ছে। কাউকে না ছাড়ান দিবে। যার যা আছে ঘরে থুইয়া বির হয়া আসেন।’
তারপর জলেশ্বরীর নারী-যুবতীরা দীর্ঘ সারি বেঁধে আধকোষা নদীর ওপারে ভোগডাঙায় চলে যায়। এদিকে ভোর হয়ে আসে। ভোরের আলো পাপী-পুণ্যবান সাধু বা শয়তান বিচার করে না। সবার ওপর আলো পড়ে। জলেশ্বরীর প্ল¬্যাটফর্মে খুনি ট্রেন এসে থামে। জানালায় জানালায় রাইফেলের ফলায় সূর্যের আলো পড়ে ঝিকমিক করে ওঠে যেন আলো নয়, রক্তেই ওদের পিপাসা। ঠিক তখন একাত্তরে শেষবারের মতো জলেশ্বরীর দিকে আসা ট্রেনটিতে বাঁশি বেজে ওঠে। তীব্র-তীক্ষè ওই স্বর। সঙ্গীতের স্বর নয় যেন একটি চিৎকারÑ ‘আদমি নেহি, মিট্টি চাহিয়ে, মিট্টি চাহিয়ে, আদমি নেহি। সব মুক্তিকো তালাশ কর, তালাশ কর।’ তারা সারা শহরে ছড়িয়ে যায়। তারপর থেকে জলেশ্বরীতে আসা-যাওয়া আর কোনো ট্রেনেরই বাঁশি বাজে না। নীরবে, নিস্তব্ধে জলেশ্বরী লাশ হয়ে যেতে থাকে। গানের গলা ছিল আমাদের খোকা ভাইয়ের। সে গাইতোÑ ‘শোনো একটি মুজিবরের কণ্ঠ থেকে...।’ তার গলাচেরা লাশ জলেশ্বরীর রাস্তায় পড়ে থাকে। কিন্তু তার গান আকাশ-বাতাসে মানুষের মধ্যে ভাসে।
চাঁদ বিবির পুকুরে চাঁদ বিবির লাশ পড়ে থাকে উপুড় হয়ে। হাই স্কুলের কমনরুমে মুমূর্ষু বাঙালিদের হাতের রক্তাক্ত ছাপ। কেউ একজন খুব বড় করে ‘বর্গীয় জ’ লিখেছিল। তারপর আর লিখতে পারেনি। সম্ভবত তার রক্ত ফুরিয়ে গিয়েছিল। এরপর পাশেই কে একজন শক্ত হাতে খুব বড় করে ‘অন্তস্ত অ’ লেখে। দেয়ালে ফুটে ওঠে বিশাল অক্ষরে জয়। রক্তের রঙ লাল। ওই লাল দিনে দিনে শুকিয়ে কালো হয়ে যায়। যেন পৃথিবীর সব রঙ শোষণ করে যে সাদা এর বিপরীতে এই কালো রঙ দুষ্ট-নষ্ট রঙ হয়ে পৃথিবীকে এখনো শাসন করতে চায়। পারে না।
হঠাৎ চারদিক থেকে বাঁশির শব্দ শোনা যায়। ট্রেনের বাঁশি যেন শত শত গাড়ি এখন জলেশ্বরীর দিকে। এই ট্রেনেরও জানালায় জানালায় বাংলার যুবকরা, সঙ্গে তাদের সাইকেল, সাইকেলের ডগায় নতুন সূর্যের আলো। তারা চুপ চুপ করে জলেশ্বরীতে নামে আর চিৎকার করে বলে, ‘জয় বাংলা’। এরই সঙ্গে সুর মিলিয়ে ট্রেনের শত শত বাঁশি বেজে ওঠে। পৃথিবী আচ্ছন্ন হয়ে যায়। বাঁশির ওই শব্দে ট্রেনের বাঁশি নয় যেন উত্তাল একপাল ঘোড়া আকাশের দিকে মুখ তুলে হ্রেষা নয়, বাঁশির শব্দ করছে আর একটি বাঁশি তার বুকে সাত ছিদ্র থেকে বাংলার চোখের অশ্রু আধকোষা নদীর ঢলের মতো সরছে, ঝরে পড়ছে।

(২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে হাসপাতালে লেখক রোগশয্যায় গল্পটি রচনা করেছেন।)
অনুলিখন : লেখকের স্ত্রী কথাশিল্পী আনোয়ারা সৈয়দ হক

নববর্ষের ঘনঘটা নিছক বিনোদনেই শেষ 

আহমদ রফিক

 

 

সময়ের সুনির্দিষ্ট সীমারেখায় বলা যায়, সালতামামিতে নতুন দিন, নতুন বছরের বরণ তাকে প্রিয়মুখ ভেবে নিয়ে, তার সাংবাৎসরিক আচরণ সম্পর্কে নিশ্চিত না জেনে। এটাই দেশ-বিদেশ নির্বিশেষে সর্বত্র ‘শুভ নববর্ষ’ সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য। যে আসছে সে কতোটা শুভ, কতোটা নয় তেমন বিচার উহ্য রেখেই বর্ষবরণের আবেগমথিত উৎসব-অনুষ্ঠানে আমরা মিলিত হই। ওই আবেগের টানে প্রকাশ্যে বা প্রচ্ছন্ন উচ্চারণ ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো...।’
নতুন বছরের উর্দি পরা সময় খ-টি আমরা এভাবেই অভিনন্দন জানাই, বরণ করে প্রাত্যহিক জীবনের ঘরে তুলে নিই। তারপর চলি, ভিন্ন চেহারার এক বর্ষ মাসের হাত ধরে। সে খ্রিস্টীয় বর্ষ মাস শীত থেকে শীতে শুরু ও শেষ। সেটি বড় কথা নয়। বড় কথা হচ্ছে, ভাষিক সংস্কৃতি, ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি নিয়ে আমাদের গর্ব ও অহঙ্কারের জায়গাটি স্ববিরোধিতায় আক্রান্ত এবং তা আমাদের জীবন আচরণে মূলত শাসনযন্ত্রের সিদ্ধান্তে।
এসব তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক বক্তব্য নিয়ে বছরের পর বছর লিখে যাচ্ছি। এতে কি সমাজ নামক বৃক্ষটির একটি পাতাও নড়ছে? মনে হয় না। তাহলে এসব লেখার কি কোনো প্রয়োজন আছে? বিবেচক ব্যক্তিদের বিধান ‘তবু লিখতে হবে, হয়তো একদিন এর সুফল মিলবে।’ কিন্তু সুফল যে মিলছে না বা মিলবে না, অন্তত মেলার সম্ভাবনা যে নেই তা আগে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক ঘটনার পূর্বাভাস বার বার জানিয়ে দিচ্ছে।


যদি গত দুই-তিন দশকের বর্ষ ভাবনার লেখা নিয়ে হিসাব মেলাতে যাই তাহলে এর নেতিবাচক দিকটাই প্রবল হয়ে প্রকাশ পায়। আজ থেকে দুই দশকেরও বেশি আগের এক বৈশাখী নববর্ষেও অঘটন উল্লেখ করতে গিয়ে লিখেছিলাম, ‘এরপর গোটা বছর ধরেই দেখেছি, একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। কাগজ খুলতেই চোখে পড়ে খুন, ছিনতাই, রাহাজানি, নারী নির্যাতন সামাজিক অস্থিরতার এক চরম ভাষ্য। সারাটা বছর তাই বিষণœতার হাত থেকে রেহাই মেলেনি। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো চিত্তবিকার ঘটেছে বলে মনে হয় না। ... আমি কি তাই বুক ঠুকে বলতে পারি, আমি ভালো আছি? কিংবা চলতি বছরের দিনগুলোতে ভালো থাকবো? এমন নিশ্চয়তা কোথায়?’
সময়ের ব্যবধানে এমন আরো দু’একটি উদাহরণ তুলে ধরা যেতো। এতে একই বক্তব্যের ভরাবৃদ্ধি ঘটতো। এর বদলে গতায়ু বছরটির সালতামামি করতে গেলে গেল ঘটনাদির বিচারে ওই একই চিত্র। রঙটা বরং আরো গাঢ়। বিশেষ করে গুম, খুন, নারী নির্যাতন এতোটাই যে, বুকে হাত রেখে বলা যাবে না সামাজিক দূষণ কমেছে। সাম্প্রদায়িক সহিংসতারও কমতি নেই। বরং এমন সত্যই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, সামাজিক ব্যাধির বিস্তার ঘটছে। সামাজিক দূষণের মাত্রা বেড়েছে। সুস্থ সামাজিক শক্তি অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ব্যক্তিক নিরাপত্তা সুতার ওপর ঝুলছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের নেশায় বুঁদ রাষ্ট্রযন্ত্রের হৃদয়ে ব্যক্তিবিশেষের (নারী বা পুরুষ কিংবা শিশু) কান্না প্রতিক্রিয়ার ঢেউ তুলছে না। আমরা যে যার অর্জনের পেছন ছুটছি। অন্যদিকে ফিরে তাকানোর সময় নেই।

 

 

বৈশাখী নববর্ষেও উৎসব-অনুষ্ঠান তাই বিনোদনের উৎসব হয়েই থাকছে। বিনোদনের অন্তর্নিহিত এর সেক্যুলার, সর্বজনীন
গণচরিত্রটি সমাজে এর নিজস্ব প্রভাব বিস্তার করতে পারছে বলে মনে হয় না। পারলে বাঙালিয়ানা নিয়ে গর্বিত বাংলাদেশের শিক্ষত শ্রেণি মানসিক সম্প্রদায়বাদী চেতনা থেকে মুক্ত থাকারই কথা ছিল।

 


‘আপ্না ভাল্/আজ না কাল্’ এটিই হয়ে দাঁড়িয়েছে জীবন যাপনের আদর্শ। এ ধারা যেমন ব্যক্তিগত তেমনি দলগত। ঘরে বসে ড্রয়িংরুম সংলাপে সমালোচনার ঝড় তুলছি। কিন্তু মাঠ-ময়দান-রাজপথে তেমন ভাবনার ঐক্যবদ্ধ প্রকাশ ঘটাই না। সুবিধাবাদী ও সুবিধাভোগী মানুষের মতো নিজের ভালো-মন্দ বুঝে নেয়ার বাইরে কিছু ভাবতে বা করতে চাই না। এমনটিই হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের বৃহত্তর নাগরিক সমাজের ধাত।
সত্যিই আমরা চোখ বন্ধ করে সামাজিক দায় এড়ানোর চেষ্টা করছি। অবশ্য সাহিত্য পাঠক বুদ্ধিজীবীর মাথায় কবির এমন পঙ্ক্তিও হানা দেয়, ‘অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে?’ কিন্তু এতো অনাচারের মধ্যেও বাংলাদেশে তেমন ‘প্রলয়’ ঘটতে দেখা যাচ্ছে না বলেই বোধহয় দুর্বৃত্তের উৎসাহে ভাটা পড়ছে না। তাদের কর্মতৎপরতা যথানিয়মে চলছে। আর সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রকাশ পাচ্ছে চরম সামাজিক হতাশা।
ওই হতাশার স্রোত এক ধরনের পিছুটান বলা চলে, জনচেতনার পিছুটান। ওই নিস্তরঙ্গ নদীতে রাজনীতির তরী সহজে তর তর করে চলতে পারে। তবু আগাছাসদৃশ ধানশীল মানুষের মন ভোলায়। ভোলায় শিক্ষিত শ্রেণির বিচারবুদ্ধি। সেখানে পার্থক্য নেই কবি, শিল্পী, লেখক, সাংবাদিক, আইনজীবীসহ পেশাজীবীদের মধ্যে। সমাজ পরিবর্তন দূরে থাক, সাংস্কৃতিক পরিবর্তনও ইতিবাচক সুফল তৈরি করছে না সুস্থ মূল্যবোদের পক্ষে।

 

ইতিবাচক সংস্কৃতির জোয়ার আমাদের রাজনীতিকে সঠিক পথের নিশানা দিয়েছে, এমন উদাহরণ এদেশে বিরল নয়।

 

দুই.
এমন এক নেতিবাচক সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবেশে আমাদের বৈশাখী নববর্ষ পালনে কোনো পিছুটান নেই। আছে প্রবল আবেগ আর উত্তেজনা, বিনোদনের প্রবল তৃষ্ণা মিটানোর তাগিদ। অশ্বত্থবটের নিবিড় ছায়া থেকে বৈশাখী নববর্ষেও রাজধানীর রাজপথে এসে ঐতিহ্যবাহী অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক চেতনার প্রকাশ শক্তিমান করে তুলেছে সন্দেহ নেই।
ওই ‘একদিন্কা সুলতান’-এর পক্ষে সামাজিক-সাংস্কৃতিক চেতনার ইতিবাচক প্রকাশ ঘটানোর সম্ভাবনা বা চেষ্টা কোনোটাই দৃশ্যমান নয়। ইতিবাচক সংস্কৃতির জোয়ার আমাদের রাজনীতিকে সঠিক পথের নিশানা দিয়েছে এমন উদাহরণ এ দেশে বিরল নয়। এক্ষেত্রে তেমন সম্ভাবনা দূর বিষয়ই হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর বড় কারণ নববর্ষের সাংস্কৃতিক উদ্দীপনা যতো প্রবলই হোক, সর্বজনীন চরিত্রের হোক, যতোটা জাতীয় চেতনার ধারক হোক তা একদিনের আবেগ উৎসারে ফুরিয়ে যায়। এর কোনো সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা থাকে না। স্বভাবতই এর ভবিষ্যৎ কোনো সামাজিক তাৎপর্য বহন করে না। বহন করে না সমাজ ও মূল্যবোধ পরিবর্তনের দিক থেকে। এখানে জাতীয় উৎসবের চরিত্র সম্পন্ন বৈশাখী নববর্ষের আড়ম্বর-সমারোহ বা জনসমাগম সত্ত্বেও এক ধরনের সীমাবদ্ধতায় বন্দি। তাই বৈশাখী নববর্ষের অনুষ্ঠান বিনোদনের উৎসব হয়েই থাকছে।
বিনোদনের অন্তর্নিহিত এর সেক্যুলার, সর্বজনীন গণচরিত্রটি সমাজে এর নিজস্ব প্রভাব বিস্তার করতে পারছে বলে মনে হয় না। পারলে বাঙালিয়ানা নিয়ে গর্বিত বাংলাদেশের শিক্ষিত শ্রেণি মানসিক সম্প্রদায়বাদী চেতনা থেকে মুক্ত থাকারই কথা ছিল। মুক্ত যে নয় নাসিরনগর, গোবিন্দগঞ্জসহ একাধিক ঘটনায় সামাজিক শান্তি বিপর্যস্ত হওয়া তেমন প্রমাণ বহন করে। এসব ঘটনার তালিকা বেশি দীর্ঘ।
নির্মোহ বিচারে মানতে হয় একুশের চেতনা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা স্বাধীনতা-উত্তর বাঙালি মুসলমান সমাজে আকাক্সিক্ষত মাত্রায় সদর্থক পরিবর্তন ঘটাতে পারেনি। আমাদের সঠিক সংস্কৃতি চর্চায় এমন পরিবর্তন প্রত্যাশিত ছিল। ওই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।

এই বৈশাখে চাই মুক্তিবৃক্ষের আশীর্বাণী

আলী যাকের

 

 


চৈত্র শেষ হয়ে এলো। রৌদ্র চড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে নিদাঘের প্রচ-তায় আঁইঢাঁই প্রাণ। শুষ্ক চারিদিক। এই সময় ঘরে কিংবা বাইরে যদি তাপানুকূল পরিবেশ না থাকে তাহলে গ্রীষ্মের দাপট বেশ ভালো বোঝা যায়। একমাত্র বৃক্ষের ছায়ায় কিছুটা শান্তি মেলে বুঝি। শারীরিক স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য গ্রীষ্ম মোটেই কারো প্রিয় ঋতু হতে পারে না। তবুও কী যেন আছে এ ঋতুটির মধ্যে যা আমাকে উদাস করে দেয়। প্রসঙ্গত, রবীন্দ্রনাথের ওই বিখ্যাত গানটির কথা মনে পড়ে যায়, ‘মধ্যদিনে যবে গান বন্ধ করে পাখি/হে রাখাল, বেণু তব বাজাও একাকী... জাগায় বিদ্যুৎ ছন্দে আসন্ন বৈখাশী/হে রাখাল বেণু তব বাজাও একাকী।’
একবার আমাদের দেশের প্রখ্যাত রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, বছরের কখন শান্তিনিকেতনে যাওয়ার প্রকৃষ্ট সময়। উত্তরে বন্যা বলেছিল, ‘গুনলে বিশ্বাস করবেন না হয়তো। রবীন্দ্রনাথ বোলপুরে গ্রীষ্মকালকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন এবং তার অনেক কবিতা, গান ভরা গ্রীষ্মে রচিত।’ এই রহস্য উদঘাটনের জন্য একবার ভরা গ্রীষ্মে শান্তিনিকেতন গিয়েছিলাম। বীরভূম জেলার অন্তর্গত বোলপুরে গ্রীষ্মকালে সত্যিই প্রচ- দাবদাহ বয়ে যায়। শান্তিনিকেতনে বেশির ভাগ মানুষ সাইকেলে চলাচল করে। ওই সময় দেখেছি, তাপ প্রতিহত করার জন্য তারা মুখের ওপর কাপর জড়িয়ে নেয়। সূর্যের উত্তাপ এতোটাই হয় তখন যে, শরীর চামড়া পুড়ে যায়। কিন্তু অবাক কা-! শান্তিনিকেতনে যে বিশাল বৃক্ষরাজি এর নিচে গেলে গ্রীষ্মকে আর ততো অত্যাচারী বলে মনে হয় না। ওই গ্রীষ্মে বিশ্ব ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সর্বত্র গাছের ছায়ায় ছায়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছি আর মনে হয়েছে রবীন্দ্রনাথের কথা যেন দিব্য দৃষ্টিতে দেখতে পেয়েছি শ্মশ্রƒম-িত রবীন্দ্রনাথ, পেছনে দুই হাত, গাছের ছায়ায় ছায়ায় তার সৃষ্টি শান্তিনিকেতনের সর্বত্র মৃদুমন্দ গতিতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।


আমাদের বাংলাদেশে ছয়টি ঋতুরই আগমন ও প্রস্থান মোটামুটি বোঝা যায়। কিন্তু কোন এক অজ্ঞাত কারণে গ্রীষ্মে কথাটি মনে পড়ে সবচেয়ে বেশি। আমার বাল্যকাল কেটেছে বাংলাদেশের ছোট ছোট শহরে বাবার চাকরি সূত্রে। ওইসব জায়গায় পাকা বাড়িঘর তখন ছিল অতি নগণ্য সংখ্যায়। বেশির ভাগ জায়গা জুড়ে থাকতো বিশাল বৃক্ষরাজির বন। আম, কাঁঠাল, জারুল, সেগুন, মেহগনি, কড়ইসহ কতো বিচিত্র বৃক্ষ। স্কুল না থাকলে এসব বৃক্ষের নিচেই আমাদের সময় কাটতো বেশির ভাগ। লুকোচুরি, ডাঙ্গুলি, গোল্লাছুট ইত্যাদি খেলা নিয়ে মাতামাতি। কিসব দিন গেছে শৈশব! মাঝে মধ্যে বাড়ির কাছের পুকুর কিংবা অল্প দূরের নদীতে সুশীতল পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে শান্তিতে ভরে গেছে দেহ-মন। আরেকটু বড় হওয়ার পর আমরা তখন ঢাকায় এসে থিতু হয়েছি, গ্রীষ্মে ওই একইভাবে গাছের ছায়ায় ছায়ায় কেটেছে দিন। চৈত্র দিনের শেষে কোকিলের আহাজারি মনকে সিক্ত করে দিয়েছে। পহেলা বৈশাখে কুটির শিল্পের মেলায় বিভিন্ন খাদ্য-অখ্যাদ্যকে অমৃত বলে মনে হয়েছে। বাঙালির এই শর্তবর্ষের ঐতিহ্য সংস্কৃতি নিয়ে আমরা আজীবন বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এসেছি ঔপনিবেশিক আগ্রাসনকে। আমাদের বাল্যকাল থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত আমরা পাকিস্তানের উপনিবেশ ছিলাম। কী এক বিচিত্র দেশ ছিল সেই পাকিস্তান! এক উদ্ভট দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সেই দেশ। যে ভদ্রলোক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এই তত্ত্বের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন, তিনি বলেছিলেনÑ মুসলমানরা একটি জাতিগোষ্ঠী। তাই অন্য ধর্মালম্বীদের সঙ্গে তাদের থাকা চলবে না। তাদের জন্য চাই ভিন্ন এক দেশ। অথচ তিনিও সর্ম্পূণ মুসলমান ছিলেন না। এটা ঐতিহাসিক সত্য। তিনি নিয়মিত মদপান করতেন। বরাহ মাংস ভক্ষণ করতেন। জীবনে কোনোদিন নামাজ পড়েছেন বলে কেউ বলতে পারবে না। এমন এক ব্যক্তি কেবল ক্ষমতার লোভে একটি দেশের প্রধান হয়ে গেলেন। তার এই দ্বিজাতি তত্ত্ব যে সর্ম্পূণ ভ্রান্ত ছিল তা বুঝতে সময় নেয়নি জনগণ। সেই ১৯৪৮ সালেই ভাষার প্রশ্নে আন্দোলন শুরু করেছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ। এরপরের ইতিহাস তো আমাদের সবারই জানা। ক্রমেই আমরা পাকিস্তানের পূর্ব প্রদেশের মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিশ্চিয়ানÑ সবাই মিলে একটি পৃথক রাষ্ট্র জন্ম দেয়ার কথা ভাবতে শুরু করি। ১৯৭০ সালের র্নিবাচনের মাধ্যমে এ দেশবাসী স্পষ্ট মতো দেয় বাংলাদেশের পক্ষে। এরপর এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের সৃষ্টি হয়। এই যুদ্ধ ওই র্ধম, নীতি ও বিবেক ভ্রষ্ট পাকিস্তানের পক্ষে কতিপয় বাঙালি কুলাঙ্গার এ দেশের মানুষের ওপর চরম অত্যাচার করে। তাদের শাস্তির বিধান করা হয় যুদ্ধের পর। আমরা ইতিহাসের পাতায় দেখতে পাই, হিটলার ও তার স্যাঙ্গাতদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের বিচার করা হয় নুরেমবার্গে এবং জীবত ও মৃত অপরাধীদের যথাযথ শাস্তি প্রদান করা হয়। কম্বোডিয়ায়ও একই ধরনের বিচারিক প্রক্রিয়ার আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশেও স্বাধীনতার পর পরই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়। কিন্তু এক সুদূরপ্রসারী চক্রান্তের মাধ্যমে আমাদের জাতির পিতাকে হত্যা করে বাংলাদেশের মুক্তির পেছনে সব আদর্শ ও মূল্যবোধকে জলাঞ্জলি দিয়ে ওই
পাকিস্তানিদের দোসররা আবার একটি প্রক্রিয়া শুরু করে যাতে করে এই দেশ নব্য পাকিস্তান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এরই মধ্যে দেশের মানুষ আবার ঘুরে দাঁড়ায়। তারা সহজে এই চক্রান্তের কাছে পরাজয় বরণ করতে রাজি নয়। সর্বশেষ আজকে বাংলাদেশে অধিষ্ঠিত সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে বিধৃত যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়া শুরু করে আবার। এই প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর পরই আবারও সেই পাকিস্তানপন্থীরা সক্রিয় হয়ে ওঠে। দেশের লাখ লাখ তরুণ রাস্তায় নেমে আসে এবং প্রতিবাদমুখর হয় ওই চক্রান্তের বিরুদ্ধে। কিন্তু চক্রান্ত থেমে থাকে না।


গণমানুষের যে কোনো দাবি উচ্চারিত হলেই ‘ইসলাম খাতরে মে হ্যায়’Ñ ‘ইসলাম বিপন্ন’ এই একটি ভ-ামির আশ্রয় পাকিস্তানিরা সব সময় নিয়ে এসেছে। আজও আমরা দেখতে পাই, তাদের বাংলাদেশি দোসররা ওই একই সেøাগান দিয়ে গণমানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। কেবল বিভ্রন্ত নয়, তারা সত্যনিষ্ঠ যুব সম্প্রদায়কে আঘাত করার চেষ্টা করছে এই অভিযোগ দিয়ে যেন তারা নাস্তিক। এ অতি হাস্যকর একটি অভিযোগ এবং আমরা সবাই জানি, এই ধরনের সুবিধাবাদী কথাবার্তা ধোপে কখনোই টেকে না। একদিন বাংলাদেশের মানুষ রুখে দাঁড়াবেই এ ষড়যন্ত্রকে। শাস্তি হবেই যুদ্ধাপরাধীদের। বাংলাদেশ ফিরে পাবে তার হৃত গৌরব মুক্তবুদ্ধির দেশ হিসেবে।
এই বৈশাখের খরতাপে যখন পারিপার্শ্বিকতা বড় উষ্ণ হয়ে উঠেছে, নাগিনীরা চারদিকে ফেলেছে বিষাক্ত নিঃশ্বাস তখন আমাদের যাত্রাপথ খুব একটা মসৃণ হবে বলে আশা করা বোধ হয় ভুল হবে। ভরসা আমাদের একটি। আমাদের নেতৃত্বে রয়েছে একঝাঁক নিঃস্বার্থ মুক্তিকামী তরুণ যারা অবিরাম লড়ে যাচ্ছে আমাদের চেতনা, আদর্শ ও মূল্যবোধের পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য। অথচ এ লড়াই অস্ত্র নিয়ে নয়, এ লড়াই সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ প্রত্যয়ী মনোবলের লড়াই। তাই জয় তাদের অনিবার্য। বৈশাখের খরতাপে বিশাল মুক্তি-বৃক্ষের ছায়ায় আমাদের তরুণরা সমবেত আজ। বৃক্ষ তাদের দিচ্ছে আশীর্বাণী। দখিনা হাওয়ায় বয়ে আসছে সংগ্রামের অনুপ্রেরণা। পথ যতোই কণ্টকাকীর্ণ হোক, এগিয়ে তারা যাবেই হাতে হাত ধরে। এগিয়ে যাবে এই বৈশাখ এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযোদ্ধা সমবেতভাবে অভীষ্ট লক্ষ্যে।

এবং

প্রমিত হোসেন 

 

 

মনের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছিল বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের।
বিশ্বাস বলল, আসবে।
অবিশ্বাস বলল, আসবে না।
বিশ্বাসের দিকে অবিশ্বাস তাকাল করুণার দৃষ্টিতে।
বিশ্বাস বলল, তুমি বোকা।
অবিশ্বাস বলল, তুমি অন্ধ।
যাকে নিয়ে এই দ্বন্দ্ব সে বলেছিল বিকেল চারটের মধ্যে আসবে। বিশ্বাস বড় আশায় তার কথায় বুক বেঁধেছিল। বিশ্বাস প্রথম দিকে অবিশ্বাসকে পাত্তা দেয়নি। তখন বিশ্বাসের কাছ ঘেঁষতে পারেনি অবিশ্বাস। দূরেই ঘোরাঘুরি করছিল। কিন্তু সময় যত গড়াচ্ছিল, যে আশায় বুক বেঁধেছিল বিশ্বাস তা ক্রমশ ততই আলগা হয়ে যাচ্ছিল। যখন প্রায় চারটে বাজে আর তখনও সে আসেনি, আশার বাঁধন ঢিলে হয়ে খুলে পড়ল। এ সময় বিশ্বাসকে পেয়ে বসল অবিশ্বাস। যখন চারটে বাজল এবং সে এল না, অবিশ্বাস দেঁতো হাসি হেসে বলল, বলেছিলাম সে আসবে না?
বিশ্বাস কোনও রকমে বলল, হয়ত কোনও কারণে দেরি হচ্ছে, এসে পড়বে।
অবিশ্বাস তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, তাই নাকি! বেশ, দেখা যাক।
এক ঘণ্টা পেরিয়ে গেল। দুই ঘণ্টা। তিন। এবং চার।
অবিশ্বাস অবজ্ঞার সুরে বলল, জানতাম আসবে না।
বিশ্বাস ঢোক গিলল। মুখটা শুকনো। কোনও কথা বলতে পারল না।
বিজয়ী অবিশ্বাসের দেঁতো হাসিটা চওড়া হয়ে উঠল।


[প্রথম প্রহর/জন্মদিন-২০১৫]

অলৌকিক লোকালয়ে

ঋভু অনিকেত

 


ফাল্গুন শেষ হতে চললো অথচ এই বিকেলবেলা কেমন যেন হালকা ঠা-ার আমেজ। পশ্চিম দিকের জানালাটা খোলা। শেষ বিকেলের এক টুকরো রোদ এসে পড়েছে চেয়ারের পাশে। মৃদু শীতল এই বিকেলে রোদের হালকা উত্তাপ ভালোই লাগছিল। অন্যান্য বছর এ সময়টাতে অফিসের এই রুমে গরমে টেকা দায় হয়ে পড়ে। ঘরে একটা মাত্র ফ্যান, ফুল স্পিডে চললে মনে হয় খুলে পড়বে। উপ-পরিচালকদের রুমে কেন যে এসি দেয়া হয় না, ভেবে পায় না মামুন। এসবের মাঝেই ভাবলো আজ অফিস শেষে হাঁটতে হাঁটতে যাবে শাহবাগের আজিজ মার্কেটে। সেখানে মাঝে মাঝেই যায় সে, কবি-লেখকদের আড্ডাটা বেশ উপভোগ করে মামুন। যদিও লেখালেখির কাজটা চেষ্টা করেও শুরু করতে পারেনি সে। ভাব কেমন করে আসে জানে না সে, ভাবগুলোকে কথায় রূপান্তরিত করে কবিতা বা গদ্য লেখা তো দূরের কথা। তবে কবি-লেখকদের আড্ডায় বসে সাহিত্যের অনেক না জানা তথ্য জানা হয় ওর। আড্ডায় বোকার মতো বসে থেকে মাথা নাড়ানো আর হাঁ-হু করা ছাড়া আর কিছুই করতে পারে না সে। বন্ধুরা প্রথম প্রথম ওকে কথা বলাতে বাধ্য করতে চেষ্টা করতো। এখন তার এই চুপ মেরে থাকাটা বা আড্ডায় সক্রিয় অংশগ্রহণ না করাটা এক রকম মেনেই নিয়েছে ওরা। সাহিত্যে তার জ্ঞান-অভিজ্ঞতা সীমিত থাকার কথা বলে আড্ডায় কথা বলা মামুন এড়িয়ে গেছে সব সময়। এখন আর কেউ ওকে ঘাঁটায় না। আসলে আড্ডার জন্যও যে পড়াশোনার দরকার, এই আড্ডায় এসে উপলব্ধি করলো মামুন। আড্ডার প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে ইদানীং দু’চার লাইন কবিতা লিখতে চেষ্টা করে মামুন। বন্ধুদের দেখাতে সাহস হয় না। কেননা আড্ডার আসরে দেখা যায় ওরা ভালো ভালো কবিরও তুলোধুনো করে ছাড়ে।
‘ডাইরেক্টর স্যার আপনারে সালাম দিছে।’ পরিচালকের পিয়ন সোলায়মানের ফ্যাসফ্যাসে কণ্ঠের বিরক্তিকর শব্দ।

’ওয়ালাইকুম সালাম।’ ভাবনার মুডটা নষ্ট করে দেয়ার জন্য একটু রাগতস্বরেই বললো মামুন। সংবিৎ ফিরে পেয়ে বললো, ‘যাচ্ছি।’ সাইড টেবিলে পিরিচ দিয়ে ঢাকা গ্লাসটা থেকে পানি খেয়ে উঠে দাঁড়ালো। সামনের দেয়ালে ঝোলা ঘড়িতে দেখলো ৫টা বাজে। অফিস ছুটির সময়ে বসের ডাকাডাকি কার ভালো লাগে? নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করলো।
‘কবির, তুমি জানালা-দরজা বন্ধ করে চলে যাও। আমি ডাইরেক্টর সাহেবের রুম থেকে সরাসরি বেরিয়ে যাবো।’ নিজের পিয়ন কবিরকে নির্দেশ দিয়ে পরিচালকের রুমের দিয়ে এগোলো। সালাম দিয়ে পরিচালকের রুমে ঢুকলো মামুন।
‘আরে মামুন, বসো বসো। সোলায়মান, স্যারকে চা দাও।’ পরিচালকের গদগদ ভাব। কেন জানি এই বদখত লোকটা মামুনকে পছন্দ করে। তাই কখনোই কোনো কঠিন কথা বলে না তাকে। মামুনও মুগ্ধ শ্রোতার মতো পরিচালকের কথা শুনতে চেষ্টা করে। অসময়ে ডাকার জন্য বিরক্ত মামুন হ্যাঁ-না কিছু না বলে একটা চেয়ার টেনে বসলো। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য পরিচালক কামরুল সাহেব বললেন, ‘তোমার মধ্যে কবি কবি ভাব আছে অথচ তুমি লেখো নাÑ এটা ঠিক নয়, লিখতে বসে যাও ভায়া।’ ‘কবিতা আমার দ্বারা হবে না স্যার।’ বললো মামুন। কী জন্য যেন ডেকেছিলেন? এমন সময় সোলায়মান দু’কাপ চা সামনে রেখে গেল। কণ্ঠস্বর বিরক্তিকর হলেও চা-টা ভালোই বানায় সোলায়মান, দুধ-চিনি একেবারে পারফেক্ট পরিমাণে। চায়ে চুমুক দিতে দিতে একটা ফাইল মামুনের দিকে এগিয়ে দিল কামরুল সাহেব। ফাইল খুলে একটা কাগজ সামনে তুলে ধরলো। ডিজি ম্যাডামের হাতের লেখা। কিছু বুঝতে না পেরে মামুন বললো, এটা তো আপনিই দিয়ে ফাইল পুটআপ করতে বলেছিলেন। সমস্যাটা কী এখন? মুখে কিছু না বলে কামরুল সাহেব পাতাটা উল্টালেন। হায় হায়! এটা তো আমারই লেখা! ক’দিন ধরে কী যেন হয়েছে খালি কবিতা লিখতে ইচ্ছা করে। তাই হঠাৎ আজ দুপুরে একটা ভাব আসায় কয়েক লাইন একটা কাগজে লিখে রেখেছিল। এখন দেখছি এটা ডিজি ম্যাডামের হাতে লেখা সিøপ। বিস্মিত হয়ে মনে মনে ভাবলো। মুখে বললো, ‘সরি স্যার’।

‘আমাকে সরি বললে তো হবে না, ডিজি ম্যাডাম যদি কোনোভাবে তার ইনস্ট্রাকশনে এ রকম হিজিবিজি লেখা দেখতে পান তাহলে কী হবে, ভেবে দেখো। এমনিতেই ম্যাডাম রগচটা মানুষ।’ কী আর করবো, যা হওয়ার হয়ে গেছে। ফাইলটা ম্যাডামের কাছে পাঠিয়ে দিন। ম্যাডামের চোখে এটা নাও পড়তে পারে। আপনার ভয় নেই স্যার। যদি জিজ্ঞাসা করে আমার নাম বলে দেবেন।‘ এ জন্যই তো বলি, তুমি কবিতা ছাড়লেও কবিতা তোমাকে ছাড়ছে না। বলেই হোঃ হোঃ করে হেসে উঠলেন কামরুল সাহেব।
অফিসের দক্ষিণ দিকের গেইটটা দিয়ে বের হলো মামুন। এডি মাহবুবকে বলে এসেছে একা চলে যেতে। সে আজ আর অফিসের গাড়িতে বাড়ি ফিরছে না। মাহবুব আর মামুন একই জিপে বাড়ি ফেরে। ফুটপাথ ধরে কিছুদূর হেঁটে রাস্তা পার হয়ে হাইকোর্টের মাজারের গেইটের সামনে আসতেই জটাজুটধারী এক ফকির এসে হাত পাতলো। মামুন এসব লোককে কখনো পছন্দ করে না, ভিক্ষা দেয়ার তো প্রশ্নই আসে না। কিছু পাওয়ার অপেক্ষা না করে সেই ফকির মামুনের চোখে চেয়ে হঠাৎ বা হাতটার কব্জি ধরে বসলো। এরপর কী যে হলো, বুুঝতে পারলো না! কেমন যেন একটা ঘোরের মধ্যে চলে গেল। ফকিরটা ওর হাত ধরে মাজারের দিকে টেনে নিয়ে চললো। মোহগ্রস্তের মতো হাঁটতে থাকলো ফকিরের সাথে সাথে। গেইটে ঢোকার পর একই রকম আরেকজন ফকির এসে মামুনের ডান হাতটার কব্জিতে ধরলো। দু’জনেই এমন শক্ত করে হাত ধরেছে, রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম। দু’জনে ওকে টানতে টানতে মাজারের সামনের বট গাছটার দিকে নিয়ে যেতে থাকলো। মামুনের বোধ-বুদ্ধি সবই যেন লোপ পেয়ে গেছে। অনেকটা সম্মোহিতের মতো চলছে সে। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। সবাই বাসায় ফেরার তাড়ায় ব্যস্ত। আশপাশে অনেক লোক চলাফেরা করছে। কারোরই দৃষ্টি আকর্ষণ করছে না এই ঘটনা। মনে হচ্ছে, কেউ দেখছেই না যে, একজন ভদ্রলোককে দু’জন ফকির টেনে নিয়ে যাচ্ছে। বট গাছের নিচে একই রকম বেশ ক’জন ফকির বসা। গাঁজার ছিলিম হাত ঘুরে ঘুরে চলেছে এক হাত থেকে আরেক হাতে। বট গাছের গুঁড়ির ওপর দিয়ে হেঁটে ওই দু’জন তাকে গাছের দিকে নিয়ে যেতে থাকলো। গাঁজার ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন আধো অন্ধকারে গাছের ভেতর হঠাৎ যেন একটা দরজা খুলে গেল। তাকে নিয়ে ওরা দু’জন নিñিদ্র অন্ধকার এক ঘরে ঢুকলো। কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। অন্ধের মতো সামনের দিকে যেতে থাকলো। কিছুক্ষণ পর টের পেল দু’হাতের চাপটা আর এখন নেই। ওরা ওর হাত ছেড়ে দিয়েছে। কিছুদূর চলার পর হঠাৎ করে এক আলোক উজ্জ্বল জায়গায় এসে পড়লো যেন। একটা নদীর পাড়। সকালের সূর্যটা তীব্র আলো ছড়িয়ে দিগন্তরেখার গাছপালার ওপরে উঠে পড়েছে। নদীটা কেমন যেন চেনা চেনা লাগলো। মনে হলো, এ নদীর ধারে এর আগেও এসেছে। মনে পড়লো, দু’বছর আগে দোল পূর্ণিমায় লালনের আখড়ায় এসেছিল। এ তো গড়াই নদী। কিন্তু পরিবেশটা কেমন যেন অন্য রকম লাগছে। অনেক ঝোপঝাড়, অনেক গাছপালা। নদীর ধারের বট গাছটার পাশেই মামুন দাঁড়িয়ে। বট গাছের নিচে গেরুয়া পোশাক পরা জটাজুটধারী কিছু সাধু বসে আছেন। হঠাৎ দূর থেকে একটা গানের আওয়াজ ভেসে এলো। সুরটা বড় চেনা। দেখলো, দূরে নদীর পাড় দিয়ে দোতারা হাতে হেঁটে যেতে যেতে এক লোক গান গাইছে। কান পেতে কথা শোনার চেষ্টা করলো। সুরটা জাতীয় সংগীতের মতো মনে হচ্ছে। কিন্তু কথাগুলো...! তবে কী এ মানুষটি গগন হরকরা!
‘আমি কোথায় পাবো তারে
আমার মনের মানুষ যে রে
হারায়ে সেই মানুষে তার উদ্দেশে
আমি বেড়াই ঘুরে দেশে দেশে...’
বট গাছ ছাড়িয়ে সামনের দিকে হাঁটলো মামুন। অনেকটা জঙ্গলের মতো এলাকাটা। গাছপালার ফাঁক দিয়ে সামনে কিছুদূর এগিয়ে দেখলো জঙ্গলের ভেতর কয়েকটা খড়ে ছাওয়া ঘর। ঘরগুলোর সামনে ছাউনি দেয়া একটা উন্মুক্ত জায়গা। সেখানে একদিকে একটা আসনে সাদা পোশাক পরা একজন বসে আছেন। তার চারপাশ থেকে যেন আলোর দ্যুতি ছড়াচ্ছে। একজন সাধু পুরুষ। তাকে ঘিরে সামনে আরো কয়েকজন বসা। এর মধ্যে দু’একজনকে চেনা চেনা লাগছে। তাদের ছবি কোথাও দেখেছে সে। তাদেরই একজন গেয়ে উঠলোÑ
‘হরি দিন তো গেল সন্ধ্যা হলো পার করো আমারে
তুমি পারের কর্তা জেনে বার্তা তাই ডাকি তোমারে...’

আরে, এ তো কাঙাল হরিনাথ। তার মানে, পাশের দাড়িওয়ালা মানুষটি মীর মশাররফ হোসেন! আর ওই সাধু পুরুষ ‘লালন’! একরাশ বিস্ময় মামুনের চোখে। এ কোথায় এলো! একশ’ বছর আগের সব মহান মানুষ তার চোখের সামনে! কে যেন সাধু পুরুষ লালনকে প্রশ্ন করলো, মনে হয় মীর মশাররফ। গুরু আপনার ধর্ম নিয়ে নানাজনে নানা কথা বলে...। কথাটা শেষ হলো না। লালন গেয়ে উঠলেনÑ
‘সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে
লালন ভাবে জাতের কী রূপ দেখলাম না এই নজরে...’
গান শেষ করে লালন বললেন, ‘ধর্ম তো মানুষের অন্তরে থাকে। মানুষটা মানুষ কি না সেটিই বড় কথা। মানব ধর্মই বড় ধর্ম।’ লালন আরো বললেন, ‘আত্মাকে ভালোবেসে অনুসন্ধান করলেই পরম আত্মাকে পাওয়া যায়।’ পেছন থেকে নারী কণ্ঠে কে যেন গেয়ে উঠলোÑ
‘মানুষ ছেড়ে মন রে আমার
দেখবি তুই সব শূন্যকার
লালন বলে মানুষ আকার ভজলে ত্বরাবি
... ... ...
মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি...’
‘কী হে জ্যোতি, তুমি যে পদ্মায় বোটে বসিয়ে আমার ছবি বানাইলা, ছবিটা তো আমারে দেখাইলা না?’ সামনে বসা একজনের দিকে তাকিয়ে বললেন লালন। জ্যোতি মানে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দাদা! ভালো করে দেখলো। তাই তো ছবিতে দেখা মানুষটাকে আজ বাস্তবে দেখছে মামুন। লালন বলে চললেন, ‘তোমার ভাই রবি বিলাতে যেয়ে নাকি ইংরেজদের সাথে আমারে পরিচয় করানোর চেষ্টা করছে। আমার গান ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’ শুনাইছে ইংরেজদের? ইংরেজরা কী বুইঝবে ওইসব?’ এমন সময় দূরে গাছের আড়ালে একজনকে আবছা মতন দেখতে পেল মামুন। এই লোকটাকে কোথাও দেখেছে মামুন। চশমার কাচটা শার্টে মুছে চিনতে চেষ্টা করলো। মুখটা অস্পষ্ট হলেও চিনতে ভুল হলো না। এ তো গিনসবার্গ, মানে এলেন গিনসবার্গ। কিন্তু তিনি এখানে এলেন কী করে? লালনের মৃত্যুর অনেক পর তার জন্ম! তবে কী গিনসবার্গও মামুনের মতো দর্শক একজন যিনি লিখেছেন অভঃবৎ খধষড়হ নামে কবিতা।

Sleepless, Stay up and

think about Death

- Certainly it's nearer

than when I as ten years old

and wondered how big the 

Universe was


এমন সময় দূর থেকে অনেক মানুষের চিৎকার ভেসে এলো। হা রে রে রে করে দু’দিক থেকে দু’দল মানুষ ছুটে আসছে। সবারই আক্রমণাত্মক রূপ। তাদের হাতে লাঠি, সড়কি নানান রকম অস্ত্র। একদল ধুতি-পৈতা পরা, আরেক দলের মুখে দাড়ি, মাথায় টুপি। লালনের আখড়ার দিকে ধেয়ে আসছে ওরা। মামুন মুহূর্তেই বুঝে নিল এখানে থাকা আর ঠিক হবে না। যেদিক থেকে সে এসেছিল, সেই নদী তীরের বট গাছের দিকেই ছুটে চললো। প্রাণভয়ে খুব জোরে দৌড়ালো সে। বট গাছের গুঁড়িতে পা বেঁধে পড়ে গেল। সংবিৎ ফিরে পেয়ে দেখলো, শিক্ষা ভবনের সামনের ব্যস্ত সকালের রাস্তা। অফিসের উত্তর গেইটের সামনের ফুটপাথে পড়ে আছে মামুন। তাড়াহুড়া করে রাস্তা পার হতে গিয়ে ফুটপাথে হোঁচট খেয়ে পড়েছে সে। পায়ের একটা নখ বুঝি উপড়ে গেল। ডান পায়ের বুড়ো আঙুলটায় প্রচ- যন্ত্রণা। উঠে দাঁড়াতে যাবেÑ এমন সময় একজন এগিয়ে এলো, ‘স্যার কি বেশি ব্যথা পেয়েছেন? এ রকম অসাবধানে তাড়াহুড়ো করে রাস্তা পার হওয়াটা ঠিক হয়নি স্যার। একটা বড় অ্যাক্সিডেন্ট হতে পারতো।’ মাথা উঁচু করে দেখলো, ওরই অফিসের নিম্নমান সহকারী কুদ্দুছ। মামুনের হাত ধরে ওঠাতে চেষ্টা করছে। ‘চলেন স্যার, আপনাকে অফিসে পৌঁছে দিই।’ মামুন হাত নেড়ে জানালো, দরকার নেই। সকালবেলায় গেইট দিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অফিসে ঢুকছে। বিধ্বস্ত মামুনও পা খোঁড়াতে খোঁড়াতে সামনের দিকে এগিয়ে চললো। এই সকালবেলায় অফিসের সামনে এলো কেমন করে? রাতে বাসায় ছিল, না বাইরে ছিল? কিছুই মনে করতে পারছে না মামুন। শুধু দেখতে পাচ্ছে, কবিতার পঙ্্ক্তিরা সারবেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। মনে হচ্ছে, এখন থেকে সে কবিতা লিখতে পারবে।

 

 

ব্যক্তিসত্তা স্বাধীনতা ও রাষ্ট্র

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

 


সভ্যতার প্রাথমিক যুগে রাষ্ট্র সম্পর্কে মনীষীদের দৃষ্টিভঙ্গি কী ছিল সে সম্পর্কে আলোকপাত করা প্রাসঙ্গিক। গৌতম বুদ্ধ মহাজ্ঞান লাভের আগেই অনুভব করেছিলেন, ব্যক্তিসত্তা বিকাশের পথে রাষ্ট্র একটি দূরতিক্রম্য বাধা, একটি জটিল বন্ধন ও একটি অনাসৃষ্টি। একটি সূত্রে তিনি বলেন, রাষ্ট্রের লক্ষ্য হচ্ছে মানুষের সৃষ্টিশীলতাকে বাধাগ্রস্ত করে ক্রমে তাকে এর আজ্ঞাবহ ভৃত্যে পরিণত করা। গৌতম বুদ্ধ আরও উপলব্ধি করেন, মুক্ত মানুষকে অধীন করতে গিয়ে রাজা নিজেও অবশেষে পরিণত হন আরেক ধরনের অধীন সত্তায়। রাষ্ট্রসত্তার গোলকধাঁধা থেকে বেরিয়ে আসার লক্ষ্যেই গৌতম এক রাতে রাজ্য, স্ত্রী ও সন্তান পেছনে ফেলে বেরিয়ে পড়লেন মুক্তির সন্ধানে, সত্যের সন্ধানে। মুক্তজীবন ও সাধনার মাধ্যমে তিনি লাভ করেন মহাজ্ঞান।
আমাদের উদ্দেশ্য এখানে বুদ্ধের মহাজ্ঞানের সন্ধান নয়, বরং ইতিহাস থেকে কিছু উপাত্ত-উপমা তুলে ধরে যুক্তি প্রদান করা যে, ব্যক্তিসত্তার সঙ্গে রাষ্ট্রসত্তার বিরোধ চিরকালের।

সভ্যতার প্রাথমিক যুগে রাষ্ট্র সম্পর্কে মনীষীদের দৃষ্টিভঙ্গি কী ছিল সে সম্পর্কে আলোকপাত করা প্রাসঙ্গিক। গৌতম বুদ্ধ মহাজ্ঞান লাভের আগেই অনুভব করেছিলেন, ব্যক্তিসত্তা বিকাশের পথে রাষ্ট্র একটি দূরতিক্রম্য বাধা, একটি জটিল বন্ধন ও একটি অনাসৃষ্টি। একটি সূত্রে তিনি বলেন, রাষ্ট্রের লক্ষ্য হচ্ছে মানুষের সৃষ্টিশীলতাকে বাধাগ্রস্ত করে ক্রমে তাকে এর আজ্ঞাবহ ভৃত্যে পরিণত করা। গৌতম বুদ্ধ আরও উপলব্ধি করেন, মুক্ত মানুষকে অধীন করতে গিয়ে রাজা নিজেও অবশেষে পরিণত হন আরেক ধরনের অধীন সত্তায়। রাষ্ট্রসত্তার গোলকধাঁধা থেকে বেরিয়ে আসার লক্ষ্যেই গৌতম এক রাতে রাজ্য, স্ত্রী ও সন্তান পেছনে ফেলে বেরিয়ে পড়লেন মুক্তির সন্ধানে, সত্যের সন্ধানে। মুক্তজীবন ও সাধনার মাধ্যমে তিনি লাভ করেন মহাজ্ঞান।
আমাদের উদ্দেশ্য এখানে বুদ্ধের মহাজ্ঞানের সন্ধান নয়, বরং ইতিহাস থেকে কিছু উপাত্ত-উপমা তুলে ধরে যুক্তি প্রদান করা যে, ব্যক্তিসত্তার সঙ্গে রাষ্ট্রসত্তার বিরোধ চিরকালের। সব ব্যক্তি মিলে স্বেচ্ছায় রাষ্ট্র তৈরি করেছে- এটা তত্ত্বের কথা, ইতিহাসে আদৌ ছিল কি না তা বলা শক্ত। তবে ব্যক্তি সামষ্টিকভাবে সতর্ক না হলে রাষ্ট্রের অধীনে সবাই যে এক সত্তাহীন খড়কুটোয় পরিণত হতে পারে তা উপলব্ধি একাধিক মহাজ্ঞানী করেছেন। নিজের ব্যক্তিসত্তার স্বার্থে রাষ্ট্র থেকে দূরত্ব বজায় রাখা বুদ্ধির কাজ বলে মনে করেছিলেন চিনা দার্শনিক কনফুসিয়াস।

তার মতে, রাষ্ট্র হচ্ছে ক্রমে ক্রমে গড়ে ওঠা এমন একটি অস্তিত্ব যার প্রধান কাজ রাজ্যের মানুষকে বিবেক-বুদ্ধি থেকে বের করে এনে তার আজ্ঞাবহ ক্রীতদাস বানানো। তাই তিনি উপদেশ দেন যে, আপন স্বাধীনতা সমুন্নত রাখার জন্য বুদ্ধিমানদের উচিত রাষ্ট্র থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে নিজেদের মধ্যে সাংস্কৃতিক সত্তা তৈরি করা। জেরেমি বেনথাম, স্টুয়ার্ট মিল, হেনরি মেইন প্রমুখ রাজনৈতিক দার্শনিকের চিন্তার মধ্যে বারবার ফিরে এসেছে বৌদ্ধ ও কনফুসিয়াসের রাজনৈতিক দর্শন। জাঁ পল সার্তের অস্তিত্ববাদ বুদ্ধ ও কনফুসিয়াসের চিন্তাধারাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। সার্তের মতে, ব্যক্তি একটি আদি ও স্বাধীনসত্তা যা রাষ্ট্র বিনষ্ট করতে সব সময়ই তৎপর। তার মতে, ব্যক্তির সঙ্গে রাষ্ট্রের প্রধান বিরোধ এখানেই যে, রাষ্ট্রসত্তার প্রবণতা হচ্ছে ব্যক্তিসত্তাকে করায়ত্ত করা, ব্যক্তির অস্তিত্বকে অস্বীকার করা এবং মিথ্যা দেশপ্রেম সৃষ্টি করে মানুষের অধিকার হরণ করা। তার মতে, রাষ্ট্র যত বড়, ব্যক্তি তত ছোট।
প্রাচীন যুগে জনপদের মানুষ প্রকৃতিগতভাবেই অর্থাৎ আপন নিরাপত্তাবোধ থেকেই সামাজিক জীব হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। সমাজ আগে, না রাষ্ট্র আগে- এ প্রশ্ন বাতুলতা মাত্র, কেননা সমাজেরই ভিন্ন রূপ হচ্ছে রাষ্ট্র। সমাজের আদি কাঠামো অর্থাৎ আদিম স্বাধীনতাকে বিনষ্ট করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে রাষ্ট্র। রাষ্ট্র সৃষ্টির ব্যাপারে সমাজ উদ্যোগ নিয়েছে এমন কোনো প্রমাণ ইতিহাসে মেলে না। বরঞ্চ প্রমাণ আছে, রাষ্ট্র গঠনে সমাজসত্তা কোথাও কোথাও প্রতিরোধ রচনা করেছে, যদিও সে প্রতিরোধ কখনোই ফলপ্রসূ হয়নি। রাষ্ট্র গঠনের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ ব্যর্থ হওয়ার একটি প্রধান কারণ হয়তো ধর্ম। বিশ্বাস করার কারণ আছে, সমাজ রাষ্ট্রের আগে ধর্মের সঙ্গে পরিচিত হয়। যেহেতু ধর্ম এবং রাষ্ট্র উভয় সত্তাই সমাজের উদ্বৃত্তের ওপর নির্ভরশীল, সেহেতু প্রাথমিক পর্বে রাষ্ট্রের উত্থানকে ধর্ম একটি প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখেছে। অনুরূপভাবে রাজাও রাজধর্মের বাইরে অন্য ধর্মকে প্রতিপক্ষ হিসেবে গণ্য করেছে।
প্রজাতন্ত্র পতনের পর অধিকাংশ মানুষ রাষ্ট্র ও রাজন্যশ্রেণির দাসে পরিণত হয়। আগেরকার সামাজিক সাম্যের বদলে সমাজ তখন বিভক্ত হলো রাষ্ট্রীয় আমলা-পুরোহিতশ্রেণি এবং দাসে। ব্যক্তি ও সমাজসত্তাকে পদদলিত করে কীভাবে স্বৈরতন্ত্রী রাজ্য তৈরি হলো তা নিয়ে তত্ত্ব আলোচনা প্রাচীনকাল থেকেই দেখা যায়। ভারতীয় বৈদিক তত্ত্বে যেমন আছে, আলো ও অন্ধকারে মানুষকে চক্রাকারে ঘূর্ণি খেতে হবে, এটাই বিধি বা প্রকৃতির নিয়ম। বৈদিক তত্ত্বমতে প্রাকৃতিক মহাসময়ে মানুষ চারটি যুগের মধ্যে চির ঘূর্ণায়মান- সত্যযুগ, ত্রেতাযুগ, দ্বাপরযুগ ও কলিযুগ। সত্যযুগ হলো মানুষের জন্য সুন্দর ও স্বাধীন যুগ। তার পরপরই পতনের পালা। সত্যযুগ থেকে ত্রেতা, দ্বাপর হয়ে কলিযুগে এসে মানুষ হারায় সব ধরনের ন্যায়বিচার ও শান্তি। এ সময় ব্রহ্মা সব ধ্বংস করে আবার নতুন করে সৃষ্টি করেন সত্যযুগ। মিসরীয় ও গ্রিক মিথলজিতেও অনুরূপ সমাজ বিবর্তনের তত্ত্ব রয়েছে। এটা ধর্মীয় তত্ত্ব এবং এমন তত্ত্ব সব ধর্মেই রয়েছে। ভালো ও মন্দ সময়ের জন্য ঐশী শক্তি ক্রিয়াশীল- এমন তত্ত্ব ব্যক্তি ও সমাজ নিয়ন্ত্রণে শক্তিশালী অস্ত্র বটে।
মানব ইতিহাসের এটা একটা করুণ দিক যে, সময়ের ব্যবধানে ব্যক্তিসত্তা ও সামাজিক স্বাধীনতা হারিয়ে পরিশেষে মানুষ তার নিজ দেহের ওপরও অধিকার হারায়। ফলে সে শাসকশ্রেণির দাসে পরিণত হয় এবং দাস ও তার স্ত্রী-সন্তানাদি মালিকের হস্তান্তরযোগ্য সম্পত্তিতে পরিণত হয়। কীভাবে মানুষ তার আপন সত্তা হারিয়ে বিজয়ী শক্তির দাসে পরিণত হলো সে ইতিহাসের জের টেনে মার্কিন স্বাধীনতা যুদ্ধের তাত্ত্বিক টমাস পেইন রাষ্ট্রের পক্ষে মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়ার প্রবণতার ইতিহাস তুলে ধরেন তার ঐঁসধহ জরমযঃং আলোচনায়। তিনি যুক্তি দেখান, ‘রাষ্ট্রকে ব্যক্তিস্বাধীনতার পক্ষে বাধ্য না রাখতে পারলে রাষ্ট্র উল্টো কাজটি করবে। রাষ্ট্র ব্যক্তিস্বাধীনতাকে পদদলিত করে সবাইকে দাসে পরিণত করবে।’ পেইনের এ উক্তিই অন্যভাবে ব্যক্ত করেন লর্ড একটন। তার বিখ্যাত ঐরংঃড়ৎু ড়ভ খরনবৎঃু প্রবন্ধে তিনি মন্তব্য করেন, চড়বিৎ পড়ৎৎঁঢ়ঃং ধহফ ধনংড়ষঁঃব ঢ়ড়বিৎ পড়ৎৎঁঢ়ঃং ধনংড়ষঁঃবষু.
উনিশ শতকের প্রথম ভাগ থেকেই আইনগতভাবে দাসপ্রথা বিলোপ করার উদ্যোগ আসে ইউরোপ থেকেই। এর কারণ হিসেবে ইউরোপে ব্যক্তিস্বাধীনতা, মানববাদী ও উদারনৈতিক আন্দোলনগুলোকে অনেকে কৃতিত্ব দিয়ে থাকেন। কিন্তু এ ধারণা একেবারেই ভুল। মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতার পক্ষে দার্শনিক তত্ত্ব আমরা প্রাচীনকাল থেকেই পাই। কিন্তু এতে শাসকশ্রেণি ব্যক্তিকে অধীন করার প্রচেষ্টায় বিরত থেকেছে এমন প্রমাণ নেই। কোনো ধর্মই দাসপ্রথাকে স্বাভাবিক ব্যবস্থা হিসেবে মেনে নেয়নি; যদিও কোনো ধর্মই দাসপ্রথাকে নিষিদ্ধও করেনি। শাসক কর্তৃক মানুষকে অধীনে করে প্রভু হওয়ার স্পৃহা যে আদৌ গ্রহণযোগ্য নয়, সে সম্পর্কে প্রাচীনকালের হামুরাবি, উকারুগিনা, কনফুসিয়াস, কৌটিল্য থেকে আধুনিককালের টমাস পেইন, বেনথাম, মিল, কার্ল মার্কস, রবীন্দ্রনাথ প্রভৃতি মনীষী তাদের অভিমত ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু তারপরও দাসপ্রথা বরং বেড়েছে, কমেনি। উনিশ শতক থেকে দাসপ্রথা বিলুপ্তির পর্ব শুরু হওয়ার প্রধান কারণ প্রযৌক্তিক পরিবর্তন। শিল্পবিপ্লবোত্তর যুগে প্রযুক্তি এমন এক পর্যায়ে উন্নীত হলো, যখন দেখা গেল যে, দাসশ্রমিকের চেয়ে মুক্তশ্রমিক অনেক বেশি উৎপাদনশীল। এ সত্য অনুধাবন করার পরই কম উৎপাদনশীল দাসত্বপ্রথা বিলোপের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
সুলতানি সরকার অমুসলমানদের জিম্মি হিসেবে ঘোষণা করলে তারা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হয়। জিম্মিরা জিজিয়া কর প্রদান করে সামরিক বাহিনীতে যোগদান করার বাধ্যবাধকতা থেকে রেহাই পায়। মুঘল সরকার অমুসলমানদের ওপর জিজিয়া কর আরোপের ব্যাপারে বেশ নমনীয়তা দেখালেও দাসপ্রথা আরও জোরদার করে তোলে। এর প্রধান কারণ দাসশ্রমিক। মুঘল সৃষ্ট জমিদার ও ফৌজদার শ্রেণির কর্মকা- পরিচালিত হয়েছে মূলত দাসশ্রেণিকে কেন্দ্র করে।

 

সুলতানি সরকার অমুসলমানদের জিম্মি হিসেবে ঘোষণা করলে তারা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হয়। জিম্মিরা জিজিয়া কর প্রদান করে সামরিক বাহিনীতে যোগদান করার বাধ্যবাধকতা থেকে রেহাই পায়। মুঘল সরকার অমুসলমানদের ওপর জিজিয়া কর আরোপের ব্যাপারে বেশ নমনীয়তা দেখালেও দাসপ্রথা আরও জোরদার করে তোলে। এর প্রধান কারণ দাসশ্রমিক। মুঘল সৃষ্ট জমিদার ও ফৌজদার শ্রেণির কর্মকা- পরিচালিত হয়েছে মূলত দাসশ্রেণিকে কেন্দ্র করে। এ সময় ইউরোপীয় বাণিজ্যিক কোম্পানিগুলো উপকূল অঞ্চলে হানা দিয়ে যুবক-যুবতীদের ধরে নিয়ে বিদেশে বিক্রি করত এবং জাহাজের লস্কর-খালাসি হিসেবে ব্যবহার করত সুলতানি সরকার অমুসলমানদের জিম্মি হিসেবে ঘোষণা করলে তারা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হয়। জিম্মিরা জিজিয়া কর প্রদান করে সামরিক বাহিনীতে যোগদান করার বাধ্যবাধকতা থেকে রেহাই পায়। মুঘল সরকার অমুসলমানদের ওপর জিজিয়া কর আরোপের ব্যাপারে বেশ নমনীয়তা দেখালেও দাসপ্রথা আরও জোরদার করে তোলে। এর প্রধান কারণ দাসশ্রমিক। মুঘল সৃষ্ট জমিদার ও ফৌজদার শ্রেণির কর্মকা- পরিচালিত হয়েছে মূলত দাসশ্রেণিকে কেন্দ্র করে। এ সময় ইউরোপীয় বাণিজ্যিক কোম্পানিগুলো উপকূল অঞ্চলে হানা দিয়ে যুবক-যুবতীদের ধরে নিয়ে বিদেশে বিক্রি করত এবং জাহাজের লস্কর-খালাসি হিসেবে ব্যবহার করত

 

এ সময় ইউরোপীয় বাণিজ্যিক কোম্পানিগুলো উপকূল অঞ্চলে হানা দিয়ে যুবক-যুবতীদের ধরে নিয়ে বিদেশে বিক্রি করত এবং জাহাজের লস্কর-খালাসি হিসেবে ব্যবহার করত। মুঘল রাষ্ট্র এ ব্যাপারে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করার চেষ্টা করেনি। সরকারের সামরিক দুর্বলতা এর প্রধান কারণ নয়, আসল কারণ হচ্ছে, দাসপ্রথার অনুকূলে মুঘল রাষ্ট্রের চলমান নীতি।
ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি রাষ্ট্রব্যবস্থায় ব্যক্তি-মানুষের অধিকার সর্বনিম্নে পৌঁছায়। সুলতানি-মুঘল রাষ্ট্রে দাসত্বপ্রথা থাকলেও সমাজের উচ্চবর্গের লোকরা রাষ্ট্র পরিচালনায় ভূমিকা রাখত। দক্ষতা ও মর্যাদাবলে তাদের অনেকের রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আমির-উমারাহ পদে পর্যন্ত আসীন হতে পারত। নবাবি আমলের আমির-উমারাহদের একটি বড় অংশ ছিল দেশীয়। রাষ্ট্রের বিভিন্ন দপ্তরে রাষ্ট্রীয় কাজে দায়িত্ব লাভ করেছে দেশীয় অভিজাত শ্রেণির লোক। কিন্তু কোম্পানি আমলে এবং কোম্পানি শাসনের পর রাষ্ট্র পরিচালনায় দেশীয়দের অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। উনিশ শতকের প্রথম সিকি পর্যন্ত দেশীয়দের জন্য খোলা ছিল একমাত্র নিম্ন পদের কেরানি, পাইক, পেয়াদা, বরকন্দাজ, সিপাহির পদ। রাষ্ট্রের সব কর্মকা- পরিচালনা করেছে শ্বেতাঙ্গরা। শ্বেতাঙ্গ আমলাদের ওপর ন্যস্ত ছিল লাগামহীন ক্ষমতা এবং পুরো দেশ শাসিত হতো তাদের দ্বারা। ভারতবর্ষে কয়েকশ শ্বেতাঙ্গ আমলা দ্বারা কোটি কোটি মানুষের শাসনভার সম্পাদন করা সম্ভব হয়েছে শুধু এ জন্য যে, কোম্পানি আমলে ব্যক্তিমানুষ ও সমাজের সত্তা এবং অধিকারকে সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলা হয়। আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা হয়েছে সব মানুষের মধ্যে ভয়ভীতি ও ত্রাস সঞ্চারের মাধ্যমে। এ ব্যাপারে সাহায্য নেওয়া হয়েছে সাত খুনের মাফ পাওয়া অনুগত জমিদারশ্রেণির।
প্রথাগতভাবে ভূমির মালিক রায়তশ্রেণিকে বঞ্চিত করে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে দেশের প্রায় পাঁচ হাজার জমিদারকে করা হয় ভূমির একচ্ছত্র মালিক। রায়তকে পরিণত করার হয় জমিদারের ইচ্ছাধীন প্রজায়। ভূমি একটি সম্পত্তি, একটি অধিকার; যে অধিকার রায়তশ্রেণি চিরকাল ভোগ করে এসেছে। এ ঐতিহাসিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে রায়ত হলো সম্পত্তিহারা, অধিকারহারা। অপরদিকে ইউরোপের আদলে এ দেশে প্রতিষ্ঠা করা হয় একটি অনুগত জমিদারশ্রেণি ও জমিদারশ্রেণির অধীনে একটি অধিকারহীন প্রজাশ্রেণি। ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রাধীনে কোনো স্বাধীন ব্যক্তি ছিল না, ছিল শুধু সত্তাহীন অধীনে প্রজা। সে অধীনতাও ছিল আবার ওপর থেকে স্তরে স্তরে বিন্যস্ত- সরকার, জমিদার, তালুকদার, পত্তনিদার, হাওলাদার, জোতদার, কুৎকিনদার। সবাই একে অপরের মনিব এবং সব মনিবই প্রজার উৎপাদনের অংশীদার, যদিও কৃষি উৎপাদনে তাদের কোনোই ভূমিকা ছিল না।
ঔপনিবেশিক সরকার জমিদারকে প্রজার ওপর সর্বময় ক্ষমতা প্রদান করলেও রাষ্ট্র পরিচালনায় জমিদারকে সম্পূর্ণ দূরে রাখা হয়। রাষ্ট্র পরিচালনা ও দৈনন্দিন প্রশাসন ক্ষেত্রে শাসিতশ্রেণিকে সম্পূর্ণ অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। নানা সংস্কারের মাধ্যমে এ অযোগ্যতা ধীরে ধীরে তুলে নিয়ে অবশেষে ইংরেজের বিদায় ঘটল ১৯৪৭ সালে। কিন্তু ইংরেজ প্রণীত শোষণ ও বঞ্চনাভিত্তিক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা টিকে থাকল। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বিলুপ্তির পর মনিব হিসেবে জমিদারের বিদায় ঘটল বটে, কিন্তু অন্যান্য মনিব ভিন্ন অবয়বে টিকে থাকে, যা কি না বর্তমানেও বিদ্যমান। পরিসংখ্যান মতে, বর্তমান বাংলাদেশের অর্ধেকেরও বেশি মানুষ ভূমিহীন যা কি না ঔপনিবেশিক যুগের রাষ্ট্রচরিত্রকেও অতিক্রম করে গেছে। একই চিত্র বিদ্যমান নগরজীবনেও। নগরের অধিকাংশ মানুষ কর্মহীন, আশ্রয়হীন, স্বাস্থ্যহীন। খোদ রাষ্ট্র দেশি-বিদেশি নানা স্বার্থগোষ্ঠীর প্রভাবে পরিচালিত হচ্ছে। শাসনতন্ত্রে যদিও তাত্ত্বিকভাবে মানুষের মৌলিক অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এর প্রয়োগ নেই। এক কথায়, ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতাহীনতার ব্যাপারে বর্তমান বাংলাদেশ অতীতকে অতিক্রম করেছে, সামাজিক অগ্রযাত্রা সূচনা করা তো দূরের কথা।

Page 4 of 8

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…