Page 4 of 8

এবং

প্রমিত হোসেন 

 

 

মনের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছিল বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের।
বিশ্বাস বলল, আসবে।
অবিশ্বাস বলল, আসবে না।
বিশ্বাসের দিকে অবিশ্বাস তাকাল করুণার দৃষ্টিতে।
বিশ্বাস বলল, তুমি বোকা।
অবিশ্বাস বলল, তুমি অন্ধ।
যাকে নিয়ে এই দ্বন্দ্ব সে বলেছিল বিকেল চারটের মধ্যে আসবে। বিশ্বাস বড় আশায় তার কথায় বুক বেঁধেছিল। বিশ্বাস প্রথম দিকে অবিশ্বাসকে পাত্তা দেয়নি। তখন বিশ্বাসের কাছ ঘেঁষতে পারেনি অবিশ্বাস। দূরেই ঘোরাঘুরি করছিল। কিন্তু সময় যত গড়াচ্ছিল, যে আশায় বুক বেঁধেছিল বিশ্বাস তা ক্রমশ ততই আলগা হয়ে যাচ্ছিল। যখন প্রায় চারটে বাজে আর তখনও সে আসেনি, আশার বাঁধন ঢিলে হয়ে খুলে পড়ল। এ সময় বিশ্বাসকে পেয়ে বসল অবিশ্বাস। যখন চারটে বাজল এবং সে এল না, অবিশ্বাস দেঁতো হাসি হেসে বলল, বলেছিলাম সে আসবে না?
বিশ্বাস কোনও রকমে বলল, হয়ত কোনও কারণে দেরি হচ্ছে, এসে পড়বে।
অবিশ্বাস তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, তাই নাকি! বেশ, দেখা যাক।
এক ঘণ্টা পেরিয়ে গেল। দুই ঘণ্টা। তিন। এবং চার।
অবিশ্বাস অবজ্ঞার সুরে বলল, জানতাম আসবে না।
বিশ্বাস ঢোক গিলল। মুখটা শুকনো। কোনও কথা বলতে পারল না।
বিজয়ী অবিশ্বাসের দেঁতো হাসিটা চওড়া হয়ে উঠল।


[প্রথম প্রহর/জন্মদিন-২০১৫]

অলৌকিক লোকালয়ে

ঋভু অনিকেত

 


ফাল্গুন শেষ হতে চললো অথচ এই বিকেলবেলা কেমন যেন হালকা ঠা-ার আমেজ। পশ্চিম দিকের জানালাটা খোলা। শেষ বিকেলের এক টুকরো রোদ এসে পড়েছে চেয়ারের পাশে। মৃদু শীতল এই বিকেলে রোদের হালকা উত্তাপ ভালোই লাগছিল। অন্যান্য বছর এ সময়টাতে অফিসের এই রুমে গরমে টেকা দায় হয়ে পড়ে। ঘরে একটা মাত্র ফ্যান, ফুল স্পিডে চললে মনে হয় খুলে পড়বে। উপ-পরিচালকদের রুমে কেন যে এসি দেয়া হয় না, ভেবে পায় না মামুন। এসবের মাঝেই ভাবলো আজ অফিস শেষে হাঁটতে হাঁটতে যাবে শাহবাগের আজিজ মার্কেটে। সেখানে মাঝে মাঝেই যায় সে, কবি-লেখকদের আড্ডাটা বেশ উপভোগ করে মামুন। যদিও লেখালেখির কাজটা চেষ্টা করেও শুরু করতে পারেনি সে। ভাব কেমন করে আসে জানে না সে, ভাবগুলোকে কথায় রূপান্তরিত করে কবিতা বা গদ্য লেখা তো দূরের কথা। তবে কবি-লেখকদের আড্ডায় বসে সাহিত্যের অনেক না জানা তথ্য জানা হয় ওর। আড্ডায় বোকার মতো বসে থেকে মাথা নাড়ানো আর হাঁ-হু করা ছাড়া আর কিছুই করতে পারে না সে। বন্ধুরা প্রথম প্রথম ওকে কথা বলাতে বাধ্য করতে চেষ্টা করতো। এখন তার এই চুপ মেরে থাকাটা বা আড্ডায় সক্রিয় অংশগ্রহণ না করাটা এক রকম মেনেই নিয়েছে ওরা। সাহিত্যে তার জ্ঞান-অভিজ্ঞতা সীমিত থাকার কথা বলে আড্ডায় কথা বলা মামুন এড়িয়ে গেছে সব সময়। এখন আর কেউ ওকে ঘাঁটায় না। আসলে আড্ডার জন্যও যে পড়াশোনার দরকার, এই আড্ডায় এসে উপলব্ধি করলো মামুন। আড্ডার প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে ইদানীং দু’চার লাইন কবিতা লিখতে চেষ্টা করে মামুন। বন্ধুদের দেখাতে সাহস হয় না। কেননা আড্ডার আসরে দেখা যায় ওরা ভালো ভালো কবিরও তুলোধুনো করে ছাড়ে।
‘ডাইরেক্টর স্যার আপনারে সালাম দিছে।’ পরিচালকের পিয়ন সোলায়মানের ফ্যাসফ্যাসে কণ্ঠের বিরক্তিকর শব্দ।

’ওয়ালাইকুম সালাম।’ ভাবনার মুডটা নষ্ট করে দেয়ার জন্য একটু রাগতস্বরেই বললো মামুন। সংবিৎ ফিরে পেয়ে বললো, ‘যাচ্ছি।’ সাইড টেবিলে পিরিচ দিয়ে ঢাকা গ্লাসটা থেকে পানি খেয়ে উঠে দাঁড়ালো। সামনের দেয়ালে ঝোলা ঘড়িতে দেখলো ৫টা বাজে। অফিস ছুটির সময়ে বসের ডাকাডাকি কার ভালো লাগে? নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করলো।
‘কবির, তুমি জানালা-দরজা বন্ধ করে চলে যাও। আমি ডাইরেক্টর সাহেবের রুম থেকে সরাসরি বেরিয়ে যাবো।’ নিজের পিয়ন কবিরকে নির্দেশ দিয়ে পরিচালকের রুমের দিয়ে এগোলো। সালাম দিয়ে পরিচালকের রুমে ঢুকলো মামুন।
‘আরে মামুন, বসো বসো। সোলায়মান, স্যারকে চা দাও।’ পরিচালকের গদগদ ভাব। কেন জানি এই বদখত লোকটা মামুনকে পছন্দ করে। তাই কখনোই কোনো কঠিন কথা বলে না তাকে। মামুনও মুগ্ধ শ্রোতার মতো পরিচালকের কথা শুনতে চেষ্টা করে। অসময়ে ডাকার জন্য বিরক্ত মামুন হ্যাঁ-না কিছু না বলে একটা চেয়ার টেনে বসলো। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য পরিচালক কামরুল সাহেব বললেন, ‘তোমার মধ্যে কবি কবি ভাব আছে অথচ তুমি লেখো নাÑ এটা ঠিক নয়, লিখতে বসে যাও ভায়া।’ ‘কবিতা আমার দ্বারা হবে না স্যার।’ বললো মামুন। কী জন্য যেন ডেকেছিলেন? এমন সময় সোলায়মান দু’কাপ চা সামনে রেখে গেল। কণ্ঠস্বর বিরক্তিকর হলেও চা-টা ভালোই বানায় সোলায়মান, দুধ-চিনি একেবারে পারফেক্ট পরিমাণে। চায়ে চুমুক দিতে দিতে একটা ফাইল মামুনের দিকে এগিয়ে দিল কামরুল সাহেব। ফাইল খুলে একটা কাগজ সামনে তুলে ধরলো। ডিজি ম্যাডামের হাতের লেখা। কিছু বুঝতে না পেরে মামুন বললো, এটা তো আপনিই দিয়ে ফাইল পুটআপ করতে বলেছিলেন। সমস্যাটা কী এখন? মুখে কিছু না বলে কামরুল সাহেব পাতাটা উল্টালেন। হায় হায়! এটা তো আমারই লেখা! ক’দিন ধরে কী যেন হয়েছে খালি কবিতা লিখতে ইচ্ছা করে। তাই হঠাৎ আজ দুপুরে একটা ভাব আসায় কয়েক লাইন একটা কাগজে লিখে রেখেছিল। এখন দেখছি এটা ডিজি ম্যাডামের হাতে লেখা সিøপ। বিস্মিত হয়ে মনে মনে ভাবলো। মুখে বললো, ‘সরি স্যার’।

‘আমাকে সরি বললে তো হবে না, ডিজি ম্যাডাম যদি কোনোভাবে তার ইনস্ট্রাকশনে এ রকম হিজিবিজি লেখা দেখতে পান তাহলে কী হবে, ভেবে দেখো। এমনিতেই ম্যাডাম রগচটা মানুষ।’ কী আর করবো, যা হওয়ার হয়ে গেছে। ফাইলটা ম্যাডামের কাছে পাঠিয়ে দিন। ম্যাডামের চোখে এটা নাও পড়তে পারে। আপনার ভয় নেই স্যার। যদি জিজ্ঞাসা করে আমার নাম বলে দেবেন।‘ এ জন্যই তো বলি, তুমি কবিতা ছাড়লেও কবিতা তোমাকে ছাড়ছে না। বলেই হোঃ হোঃ করে হেসে উঠলেন কামরুল সাহেব।
অফিসের দক্ষিণ দিকের গেইটটা দিয়ে বের হলো মামুন। এডি মাহবুবকে বলে এসেছে একা চলে যেতে। সে আজ আর অফিসের গাড়িতে বাড়ি ফিরছে না। মাহবুব আর মামুন একই জিপে বাড়ি ফেরে। ফুটপাথ ধরে কিছুদূর হেঁটে রাস্তা পার হয়ে হাইকোর্টের মাজারের গেইটের সামনে আসতেই জটাজুটধারী এক ফকির এসে হাত পাতলো। মামুন এসব লোককে কখনো পছন্দ করে না, ভিক্ষা দেয়ার তো প্রশ্নই আসে না। কিছু পাওয়ার অপেক্ষা না করে সেই ফকির মামুনের চোখে চেয়ে হঠাৎ বা হাতটার কব্জি ধরে বসলো। এরপর কী যে হলো, বুুঝতে পারলো না! কেমন যেন একটা ঘোরের মধ্যে চলে গেল। ফকিরটা ওর হাত ধরে মাজারের দিকে টেনে নিয়ে চললো। মোহগ্রস্তের মতো হাঁটতে থাকলো ফকিরের সাথে সাথে। গেইটে ঢোকার পর একই রকম আরেকজন ফকির এসে মামুনের ডান হাতটার কব্জিতে ধরলো। দু’জনেই এমন শক্ত করে হাত ধরেছে, রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম। দু’জনে ওকে টানতে টানতে মাজারের সামনের বট গাছটার দিকে নিয়ে যেতে থাকলো। মামুনের বোধ-বুদ্ধি সবই যেন লোপ পেয়ে গেছে। অনেকটা সম্মোহিতের মতো চলছে সে। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। সবাই বাসায় ফেরার তাড়ায় ব্যস্ত। আশপাশে অনেক লোক চলাফেরা করছে। কারোরই দৃষ্টি আকর্ষণ করছে না এই ঘটনা। মনে হচ্ছে, কেউ দেখছেই না যে, একজন ভদ্রলোককে দু’জন ফকির টেনে নিয়ে যাচ্ছে। বট গাছের নিচে একই রকম বেশ ক’জন ফকির বসা। গাঁজার ছিলিম হাত ঘুরে ঘুরে চলেছে এক হাত থেকে আরেক হাতে। বট গাছের গুঁড়ির ওপর দিয়ে হেঁটে ওই দু’জন তাকে গাছের দিকে নিয়ে যেতে থাকলো। গাঁজার ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন আধো অন্ধকারে গাছের ভেতর হঠাৎ যেন একটা দরজা খুলে গেল। তাকে নিয়ে ওরা দু’জন নিñিদ্র অন্ধকার এক ঘরে ঢুকলো। কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। অন্ধের মতো সামনের দিকে যেতে থাকলো। কিছুক্ষণ পর টের পেল দু’হাতের চাপটা আর এখন নেই। ওরা ওর হাত ছেড়ে দিয়েছে। কিছুদূর চলার পর হঠাৎ করে এক আলোক উজ্জ্বল জায়গায় এসে পড়লো যেন। একটা নদীর পাড়। সকালের সূর্যটা তীব্র আলো ছড়িয়ে দিগন্তরেখার গাছপালার ওপরে উঠে পড়েছে। নদীটা কেমন যেন চেনা চেনা লাগলো। মনে হলো, এ নদীর ধারে এর আগেও এসেছে। মনে পড়লো, দু’বছর আগে দোল পূর্ণিমায় লালনের আখড়ায় এসেছিল। এ তো গড়াই নদী। কিন্তু পরিবেশটা কেমন যেন অন্য রকম লাগছে। অনেক ঝোপঝাড়, অনেক গাছপালা। নদীর ধারের বট গাছটার পাশেই মামুন দাঁড়িয়ে। বট গাছের নিচে গেরুয়া পোশাক পরা জটাজুটধারী কিছু সাধু বসে আছেন। হঠাৎ দূর থেকে একটা গানের আওয়াজ ভেসে এলো। সুরটা বড় চেনা। দেখলো, দূরে নদীর পাড় দিয়ে দোতারা হাতে হেঁটে যেতে যেতে এক লোক গান গাইছে। কান পেতে কথা শোনার চেষ্টা করলো। সুরটা জাতীয় সংগীতের মতো মনে হচ্ছে। কিন্তু কথাগুলো...! তবে কী এ মানুষটি গগন হরকরা!
‘আমি কোথায় পাবো তারে
আমার মনের মানুষ যে রে
হারায়ে সেই মানুষে তার উদ্দেশে
আমি বেড়াই ঘুরে দেশে দেশে...’
বট গাছ ছাড়িয়ে সামনের দিকে হাঁটলো মামুন। অনেকটা জঙ্গলের মতো এলাকাটা। গাছপালার ফাঁক দিয়ে সামনে কিছুদূর এগিয়ে দেখলো জঙ্গলের ভেতর কয়েকটা খড়ে ছাওয়া ঘর। ঘরগুলোর সামনে ছাউনি দেয়া একটা উন্মুক্ত জায়গা। সেখানে একদিকে একটা আসনে সাদা পোশাক পরা একজন বসে আছেন। তার চারপাশ থেকে যেন আলোর দ্যুতি ছড়াচ্ছে। একজন সাধু পুরুষ। তাকে ঘিরে সামনে আরো কয়েকজন বসা। এর মধ্যে দু’একজনকে চেনা চেনা লাগছে। তাদের ছবি কোথাও দেখেছে সে। তাদেরই একজন গেয়ে উঠলোÑ
‘হরি দিন তো গেল সন্ধ্যা হলো পার করো আমারে
তুমি পারের কর্তা জেনে বার্তা তাই ডাকি তোমারে...’

আরে, এ তো কাঙাল হরিনাথ। তার মানে, পাশের দাড়িওয়ালা মানুষটি মীর মশাররফ হোসেন! আর ওই সাধু পুরুষ ‘লালন’! একরাশ বিস্ময় মামুনের চোখে। এ কোথায় এলো! একশ’ বছর আগের সব মহান মানুষ তার চোখের সামনে! কে যেন সাধু পুরুষ লালনকে প্রশ্ন করলো, মনে হয় মীর মশাররফ। গুরু আপনার ধর্ম নিয়ে নানাজনে নানা কথা বলে...। কথাটা শেষ হলো না। লালন গেয়ে উঠলেনÑ
‘সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে
লালন ভাবে জাতের কী রূপ দেখলাম না এই নজরে...’
গান শেষ করে লালন বললেন, ‘ধর্ম তো মানুষের অন্তরে থাকে। মানুষটা মানুষ কি না সেটিই বড় কথা। মানব ধর্মই বড় ধর্ম।’ লালন আরো বললেন, ‘আত্মাকে ভালোবেসে অনুসন্ধান করলেই পরম আত্মাকে পাওয়া যায়।’ পেছন থেকে নারী কণ্ঠে কে যেন গেয়ে উঠলোÑ
‘মানুষ ছেড়ে মন রে আমার
দেখবি তুই সব শূন্যকার
লালন বলে মানুষ আকার ভজলে ত্বরাবি
... ... ...
মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি...’
‘কী হে জ্যোতি, তুমি যে পদ্মায় বোটে বসিয়ে আমার ছবি বানাইলা, ছবিটা তো আমারে দেখাইলা না?’ সামনে বসা একজনের দিকে তাকিয়ে বললেন লালন। জ্যোতি মানে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দাদা! ভালো করে দেখলো। তাই তো ছবিতে দেখা মানুষটাকে আজ বাস্তবে দেখছে মামুন। লালন বলে চললেন, ‘তোমার ভাই রবি বিলাতে যেয়ে নাকি ইংরেজদের সাথে আমারে পরিচয় করানোর চেষ্টা করছে। আমার গান ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’ শুনাইছে ইংরেজদের? ইংরেজরা কী বুইঝবে ওইসব?’ এমন সময় দূরে গাছের আড়ালে একজনকে আবছা মতন দেখতে পেল মামুন। এই লোকটাকে কোথাও দেখেছে মামুন। চশমার কাচটা শার্টে মুছে চিনতে চেষ্টা করলো। মুখটা অস্পষ্ট হলেও চিনতে ভুল হলো না। এ তো গিনসবার্গ, মানে এলেন গিনসবার্গ। কিন্তু তিনি এখানে এলেন কী করে? লালনের মৃত্যুর অনেক পর তার জন্ম! তবে কী গিনসবার্গও মামুনের মতো দর্শক একজন যিনি লিখেছেন অভঃবৎ খধষড়হ নামে কবিতা।

Sleepless, Stay up and

think about Death

- Certainly it's nearer

than when I as ten years old

and wondered how big the 

Universe was


এমন সময় দূর থেকে অনেক মানুষের চিৎকার ভেসে এলো। হা রে রে রে করে দু’দিক থেকে দু’দল মানুষ ছুটে আসছে। সবারই আক্রমণাত্মক রূপ। তাদের হাতে লাঠি, সড়কি নানান রকম অস্ত্র। একদল ধুতি-পৈতা পরা, আরেক দলের মুখে দাড়ি, মাথায় টুপি। লালনের আখড়ার দিকে ধেয়ে আসছে ওরা। মামুন মুহূর্তেই বুঝে নিল এখানে থাকা আর ঠিক হবে না। যেদিক থেকে সে এসেছিল, সেই নদী তীরের বট গাছের দিকেই ছুটে চললো। প্রাণভয়ে খুব জোরে দৌড়ালো সে। বট গাছের গুঁড়িতে পা বেঁধে পড়ে গেল। সংবিৎ ফিরে পেয়ে দেখলো, শিক্ষা ভবনের সামনের ব্যস্ত সকালের রাস্তা। অফিসের উত্তর গেইটের সামনের ফুটপাথে পড়ে আছে মামুন। তাড়াহুড়া করে রাস্তা পার হতে গিয়ে ফুটপাথে হোঁচট খেয়ে পড়েছে সে। পায়ের একটা নখ বুঝি উপড়ে গেল। ডান পায়ের বুড়ো আঙুলটায় প্রচ- যন্ত্রণা। উঠে দাঁড়াতে যাবেÑ এমন সময় একজন এগিয়ে এলো, ‘স্যার কি বেশি ব্যথা পেয়েছেন? এ রকম অসাবধানে তাড়াহুড়ো করে রাস্তা পার হওয়াটা ঠিক হয়নি স্যার। একটা বড় অ্যাক্সিডেন্ট হতে পারতো।’ মাথা উঁচু করে দেখলো, ওরই অফিসের নিম্নমান সহকারী কুদ্দুছ। মামুনের হাত ধরে ওঠাতে চেষ্টা করছে। ‘চলেন স্যার, আপনাকে অফিসে পৌঁছে দিই।’ মামুন হাত নেড়ে জানালো, দরকার নেই। সকালবেলায় গেইট দিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অফিসে ঢুকছে। বিধ্বস্ত মামুনও পা খোঁড়াতে খোঁড়াতে সামনের দিকে এগিয়ে চললো। এই সকালবেলায় অফিসের সামনে এলো কেমন করে? রাতে বাসায় ছিল, না বাইরে ছিল? কিছুই মনে করতে পারছে না মামুন। শুধু দেখতে পাচ্ছে, কবিতার পঙ্্ক্তিরা সারবেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। মনে হচ্ছে, এখন থেকে সে কবিতা লিখতে পারবে।

 

 

ব্যক্তিসত্তা স্বাধীনতা ও রাষ্ট্র

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

 


সভ্যতার প্রাথমিক যুগে রাষ্ট্র সম্পর্কে মনীষীদের দৃষ্টিভঙ্গি কী ছিল সে সম্পর্কে আলোকপাত করা প্রাসঙ্গিক। গৌতম বুদ্ধ মহাজ্ঞান লাভের আগেই অনুভব করেছিলেন, ব্যক্তিসত্তা বিকাশের পথে রাষ্ট্র একটি দূরতিক্রম্য বাধা, একটি জটিল বন্ধন ও একটি অনাসৃষ্টি। একটি সূত্রে তিনি বলেন, রাষ্ট্রের লক্ষ্য হচ্ছে মানুষের সৃষ্টিশীলতাকে বাধাগ্রস্ত করে ক্রমে তাকে এর আজ্ঞাবহ ভৃত্যে পরিণত করা। গৌতম বুদ্ধ আরও উপলব্ধি করেন, মুক্ত মানুষকে অধীন করতে গিয়ে রাজা নিজেও অবশেষে পরিণত হন আরেক ধরনের অধীন সত্তায়। রাষ্ট্রসত্তার গোলকধাঁধা থেকে বেরিয়ে আসার লক্ষ্যেই গৌতম এক রাতে রাজ্য, স্ত্রী ও সন্তান পেছনে ফেলে বেরিয়ে পড়লেন মুক্তির সন্ধানে, সত্যের সন্ধানে। মুক্তজীবন ও সাধনার মাধ্যমে তিনি লাভ করেন মহাজ্ঞান।
আমাদের উদ্দেশ্য এখানে বুদ্ধের মহাজ্ঞানের সন্ধান নয়, বরং ইতিহাস থেকে কিছু উপাত্ত-উপমা তুলে ধরে যুক্তি প্রদান করা যে, ব্যক্তিসত্তার সঙ্গে রাষ্ট্রসত্তার বিরোধ চিরকালের।

সভ্যতার প্রাথমিক যুগে রাষ্ট্র সম্পর্কে মনীষীদের দৃষ্টিভঙ্গি কী ছিল সে সম্পর্কে আলোকপাত করা প্রাসঙ্গিক। গৌতম বুদ্ধ মহাজ্ঞান লাভের আগেই অনুভব করেছিলেন, ব্যক্তিসত্তা বিকাশের পথে রাষ্ট্র একটি দূরতিক্রম্য বাধা, একটি জটিল বন্ধন ও একটি অনাসৃষ্টি। একটি সূত্রে তিনি বলেন, রাষ্ট্রের লক্ষ্য হচ্ছে মানুষের সৃষ্টিশীলতাকে বাধাগ্রস্ত করে ক্রমে তাকে এর আজ্ঞাবহ ভৃত্যে পরিণত করা। গৌতম বুদ্ধ আরও উপলব্ধি করেন, মুক্ত মানুষকে অধীন করতে গিয়ে রাজা নিজেও অবশেষে পরিণত হন আরেক ধরনের অধীন সত্তায়। রাষ্ট্রসত্তার গোলকধাঁধা থেকে বেরিয়ে আসার লক্ষ্যেই গৌতম এক রাতে রাজ্য, স্ত্রী ও সন্তান পেছনে ফেলে বেরিয়ে পড়লেন মুক্তির সন্ধানে, সত্যের সন্ধানে। মুক্তজীবন ও সাধনার মাধ্যমে তিনি লাভ করেন মহাজ্ঞান।
আমাদের উদ্দেশ্য এখানে বুদ্ধের মহাজ্ঞানের সন্ধান নয়, বরং ইতিহাস থেকে কিছু উপাত্ত-উপমা তুলে ধরে যুক্তি প্রদান করা যে, ব্যক্তিসত্তার সঙ্গে রাষ্ট্রসত্তার বিরোধ চিরকালের। সব ব্যক্তি মিলে স্বেচ্ছায় রাষ্ট্র তৈরি করেছে- এটা তত্ত্বের কথা, ইতিহাসে আদৌ ছিল কি না তা বলা শক্ত। তবে ব্যক্তি সামষ্টিকভাবে সতর্ক না হলে রাষ্ট্রের অধীনে সবাই যে এক সত্তাহীন খড়কুটোয় পরিণত হতে পারে তা উপলব্ধি একাধিক মহাজ্ঞানী করেছেন। নিজের ব্যক্তিসত্তার স্বার্থে রাষ্ট্র থেকে দূরত্ব বজায় রাখা বুদ্ধির কাজ বলে মনে করেছিলেন চিনা দার্শনিক কনফুসিয়াস।

তার মতে, রাষ্ট্র হচ্ছে ক্রমে ক্রমে গড়ে ওঠা এমন একটি অস্তিত্ব যার প্রধান কাজ রাজ্যের মানুষকে বিবেক-বুদ্ধি থেকে বের করে এনে তার আজ্ঞাবহ ক্রীতদাস বানানো। তাই তিনি উপদেশ দেন যে, আপন স্বাধীনতা সমুন্নত রাখার জন্য বুদ্ধিমানদের উচিত রাষ্ট্র থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে নিজেদের মধ্যে সাংস্কৃতিক সত্তা তৈরি করা। জেরেমি বেনথাম, স্টুয়ার্ট মিল, হেনরি মেইন প্রমুখ রাজনৈতিক দার্শনিকের চিন্তার মধ্যে বারবার ফিরে এসেছে বৌদ্ধ ও কনফুসিয়াসের রাজনৈতিক দর্শন। জাঁ পল সার্তের অস্তিত্ববাদ বুদ্ধ ও কনফুসিয়াসের চিন্তাধারাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। সার্তের মতে, ব্যক্তি একটি আদি ও স্বাধীনসত্তা যা রাষ্ট্র বিনষ্ট করতে সব সময়ই তৎপর। তার মতে, ব্যক্তির সঙ্গে রাষ্ট্রের প্রধান বিরোধ এখানেই যে, রাষ্ট্রসত্তার প্রবণতা হচ্ছে ব্যক্তিসত্তাকে করায়ত্ত করা, ব্যক্তির অস্তিত্বকে অস্বীকার করা এবং মিথ্যা দেশপ্রেম সৃষ্টি করে মানুষের অধিকার হরণ করা। তার মতে, রাষ্ট্র যত বড়, ব্যক্তি তত ছোট।
প্রাচীন যুগে জনপদের মানুষ প্রকৃতিগতভাবেই অর্থাৎ আপন নিরাপত্তাবোধ থেকেই সামাজিক জীব হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। সমাজ আগে, না রাষ্ট্র আগে- এ প্রশ্ন বাতুলতা মাত্র, কেননা সমাজেরই ভিন্ন রূপ হচ্ছে রাষ্ট্র। সমাজের আদি কাঠামো অর্থাৎ আদিম স্বাধীনতাকে বিনষ্ট করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে রাষ্ট্র। রাষ্ট্র সৃষ্টির ব্যাপারে সমাজ উদ্যোগ নিয়েছে এমন কোনো প্রমাণ ইতিহাসে মেলে না। বরঞ্চ প্রমাণ আছে, রাষ্ট্র গঠনে সমাজসত্তা কোথাও কোথাও প্রতিরোধ রচনা করেছে, যদিও সে প্রতিরোধ কখনোই ফলপ্রসূ হয়নি। রাষ্ট্র গঠনের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ ব্যর্থ হওয়ার একটি প্রধান কারণ হয়তো ধর্ম। বিশ্বাস করার কারণ আছে, সমাজ রাষ্ট্রের আগে ধর্মের সঙ্গে পরিচিত হয়। যেহেতু ধর্ম এবং রাষ্ট্র উভয় সত্তাই সমাজের উদ্বৃত্তের ওপর নির্ভরশীল, সেহেতু প্রাথমিক পর্বে রাষ্ট্রের উত্থানকে ধর্ম একটি প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখেছে। অনুরূপভাবে রাজাও রাজধর্মের বাইরে অন্য ধর্মকে প্রতিপক্ষ হিসেবে গণ্য করেছে।
প্রজাতন্ত্র পতনের পর অধিকাংশ মানুষ রাষ্ট্র ও রাজন্যশ্রেণির দাসে পরিণত হয়। আগেরকার সামাজিক সাম্যের বদলে সমাজ তখন বিভক্ত হলো রাষ্ট্রীয় আমলা-পুরোহিতশ্রেণি এবং দাসে। ব্যক্তি ও সমাজসত্তাকে পদদলিত করে কীভাবে স্বৈরতন্ত্রী রাজ্য তৈরি হলো তা নিয়ে তত্ত্ব আলোচনা প্রাচীনকাল থেকেই দেখা যায়। ভারতীয় বৈদিক তত্ত্বে যেমন আছে, আলো ও অন্ধকারে মানুষকে চক্রাকারে ঘূর্ণি খেতে হবে, এটাই বিধি বা প্রকৃতির নিয়ম। বৈদিক তত্ত্বমতে প্রাকৃতিক মহাসময়ে মানুষ চারটি যুগের মধ্যে চির ঘূর্ণায়মান- সত্যযুগ, ত্রেতাযুগ, দ্বাপরযুগ ও কলিযুগ। সত্যযুগ হলো মানুষের জন্য সুন্দর ও স্বাধীন যুগ। তার পরপরই পতনের পালা। সত্যযুগ থেকে ত্রেতা, দ্বাপর হয়ে কলিযুগে এসে মানুষ হারায় সব ধরনের ন্যায়বিচার ও শান্তি। এ সময় ব্রহ্মা সব ধ্বংস করে আবার নতুন করে সৃষ্টি করেন সত্যযুগ। মিসরীয় ও গ্রিক মিথলজিতেও অনুরূপ সমাজ বিবর্তনের তত্ত্ব রয়েছে। এটা ধর্মীয় তত্ত্ব এবং এমন তত্ত্ব সব ধর্মেই রয়েছে। ভালো ও মন্দ সময়ের জন্য ঐশী শক্তি ক্রিয়াশীল- এমন তত্ত্ব ব্যক্তি ও সমাজ নিয়ন্ত্রণে শক্তিশালী অস্ত্র বটে।
মানব ইতিহাসের এটা একটা করুণ দিক যে, সময়ের ব্যবধানে ব্যক্তিসত্তা ও সামাজিক স্বাধীনতা হারিয়ে পরিশেষে মানুষ তার নিজ দেহের ওপরও অধিকার হারায়। ফলে সে শাসকশ্রেণির দাসে পরিণত হয় এবং দাস ও তার স্ত্রী-সন্তানাদি মালিকের হস্তান্তরযোগ্য সম্পত্তিতে পরিণত হয়। কীভাবে মানুষ তার আপন সত্তা হারিয়ে বিজয়ী শক্তির দাসে পরিণত হলো সে ইতিহাসের জের টেনে মার্কিন স্বাধীনতা যুদ্ধের তাত্ত্বিক টমাস পেইন রাষ্ট্রের পক্ষে মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়ার প্রবণতার ইতিহাস তুলে ধরেন তার ঐঁসধহ জরমযঃং আলোচনায়। তিনি যুক্তি দেখান, ‘রাষ্ট্রকে ব্যক্তিস্বাধীনতার পক্ষে বাধ্য না রাখতে পারলে রাষ্ট্র উল্টো কাজটি করবে। রাষ্ট্র ব্যক্তিস্বাধীনতাকে পদদলিত করে সবাইকে দাসে পরিণত করবে।’ পেইনের এ উক্তিই অন্যভাবে ব্যক্ত করেন লর্ড একটন। তার বিখ্যাত ঐরংঃড়ৎু ড়ভ খরনবৎঃু প্রবন্ধে তিনি মন্তব্য করেন, চড়বিৎ পড়ৎৎঁঢ়ঃং ধহফ ধনংড়ষঁঃব ঢ়ড়বিৎ পড়ৎৎঁঢ়ঃং ধনংড়ষঁঃবষু.
উনিশ শতকের প্রথম ভাগ থেকেই আইনগতভাবে দাসপ্রথা বিলোপ করার উদ্যোগ আসে ইউরোপ থেকেই। এর কারণ হিসেবে ইউরোপে ব্যক্তিস্বাধীনতা, মানববাদী ও উদারনৈতিক আন্দোলনগুলোকে অনেকে কৃতিত্ব দিয়ে থাকেন। কিন্তু এ ধারণা একেবারেই ভুল। মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতার পক্ষে দার্শনিক তত্ত্ব আমরা প্রাচীনকাল থেকেই পাই। কিন্তু এতে শাসকশ্রেণি ব্যক্তিকে অধীন করার প্রচেষ্টায় বিরত থেকেছে এমন প্রমাণ নেই। কোনো ধর্মই দাসপ্রথাকে স্বাভাবিক ব্যবস্থা হিসেবে মেনে নেয়নি; যদিও কোনো ধর্মই দাসপ্রথাকে নিষিদ্ধও করেনি। শাসক কর্তৃক মানুষকে অধীনে করে প্রভু হওয়ার স্পৃহা যে আদৌ গ্রহণযোগ্য নয়, সে সম্পর্কে প্রাচীনকালের হামুরাবি, উকারুগিনা, কনফুসিয়াস, কৌটিল্য থেকে আধুনিককালের টমাস পেইন, বেনথাম, মিল, কার্ল মার্কস, রবীন্দ্রনাথ প্রভৃতি মনীষী তাদের অভিমত ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু তারপরও দাসপ্রথা বরং বেড়েছে, কমেনি। উনিশ শতক থেকে দাসপ্রথা বিলুপ্তির পর্ব শুরু হওয়ার প্রধান কারণ প্রযৌক্তিক পরিবর্তন। শিল্পবিপ্লবোত্তর যুগে প্রযুক্তি এমন এক পর্যায়ে উন্নীত হলো, যখন দেখা গেল যে, দাসশ্রমিকের চেয়ে মুক্তশ্রমিক অনেক বেশি উৎপাদনশীল। এ সত্য অনুধাবন করার পরই কম উৎপাদনশীল দাসত্বপ্রথা বিলোপের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
সুলতানি সরকার অমুসলমানদের জিম্মি হিসেবে ঘোষণা করলে তারা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হয়। জিম্মিরা জিজিয়া কর প্রদান করে সামরিক বাহিনীতে যোগদান করার বাধ্যবাধকতা থেকে রেহাই পায়। মুঘল সরকার অমুসলমানদের ওপর জিজিয়া কর আরোপের ব্যাপারে বেশ নমনীয়তা দেখালেও দাসপ্রথা আরও জোরদার করে তোলে। এর প্রধান কারণ দাসশ্রমিক। মুঘল সৃষ্ট জমিদার ও ফৌজদার শ্রেণির কর্মকা- পরিচালিত হয়েছে মূলত দাসশ্রেণিকে কেন্দ্র করে।

 

সুলতানি সরকার অমুসলমানদের জিম্মি হিসেবে ঘোষণা করলে তারা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হয়। জিম্মিরা জিজিয়া কর প্রদান করে সামরিক বাহিনীতে যোগদান করার বাধ্যবাধকতা থেকে রেহাই পায়। মুঘল সরকার অমুসলমানদের ওপর জিজিয়া কর আরোপের ব্যাপারে বেশ নমনীয়তা দেখালেও দাসপ্রথা আরও জোরদার করে তোলে। এর প্রধান কারণ দাসশ্রমিক। মুঘল সৃষ্ট জমিদার ও ফৌজদার শ্রেণির কর্মকা- পরিচালিত হয়েছে মূলত দাসশ্রেণিকে কেন্দ্র করে। এ সময় ইউরোপীয় বাণিজ্যিক কোম্পানিগুলো উপকূল অঞ্চলে হানা দিয়ে যুবক-যুবতীদের ধরে নিয়ে বিদেশে বিক্রি করত এবং জাহাজের লস্কর-খালাসি হিসেবে ব্যবহার করত সুলতানি সরকার অমুসলমানদের জিম্মি হিসেবে ঘোষণা করলে তারা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হয়। জিম্মিরা জিজিয়া কর প্রদান করে সামরিক বাহিনীতে যোগদান করার বাধ্যবাধকতা থেকে রেহাই পায়। মুঘল সরকার অমুসলমানদের ওপর জিজিয়া কর আরোপের ব্যাপারে বেশ নমনীয়তা দেখালেও দাসপ্রথা আরও জোরদার করে তোলে। এর প্রধান কারণ দাসশ্রমিক। মুঘল সৃষ্ট জমিদার ও ফৌজদার শ্রেণির কর্মকা- পরিচালিত হয়েছে মূলত দাসশ্রেণিকে কেন্দ্র করে। এ সময় ইউরোপীয় বাণিজ্যিক কোম্পানিগুলো উপকূল অঞ্চলে হানা দিয়ে যুবক-যুবতীদের ধরে নিয়ে বিদেশে বিক্রি করত এবং জাহাজের লস্কর-খালাসি হিসেবে ব্যবহার করত

 

এ সময় ইউরোপীয় বাণিজ্যিক কোম্পানিগুলো উপকূল অঞ্চলে হানা দিয়ে যুবক-যুবতীদের ধরে নিয়ে বিদেশে বিক্রি করত এবং জাহাজের লস্কর-খালাসি হিসেবে ব্যবহার করত। মুঘল রাষ্ট্র এ ব্যাপারে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করার চেষ্টা করেনি। সরকারের সামরিক দুর্বলতা এর প্রধান কারণ নয়, আসল কারণ হচ্ছে, দাসপ্রথার অনুকূলে মুঘল রাষ্ট্রের চলমান নীতি।
ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি রাষ্ট্রব্যবস্থায় ব্যক্তি-মানুষের অধিকার সর্বনিম্নে পৌঁছায়। সুলতানি-মুঘল রাষ্ট্রে দাসত্বপ্রথা থাকলেও সমাজের উচ্চবর্গের লোকরা রাষ্ট্র পরিচালনায় ভূমিকা রাখত। দক্ষতা ও মর্যাদাবলে তাদের অনেকের রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আমির-উমারাহ পদে পর্যন্ত আসীন হতে পারত। নবাবি আমলের আমির-উমারাহদের একটি বড় অংশ ছিল দেশীয়। রাষ্ট্রের বিভিন্ন দপ্তরে রাষ্ট্রীয় কাজে দায়িত্ব লাভ করেছে দেশীয় অভিজাত শ্রেণির লোক। কিন্তু কোম্পানি আমলে এবং কোম্পানি শাসনের পর রাষ্ট্র পরিচালনায় দেশীয়দের অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। উনিশ শতকের প্রথম সিকি পর্যন্ত দেশীয়দের জন্য খোলা ছিল একমাত্র নিম্ন পদের কেরানি, পাইক, পেয়াদা, বরকন্দাজ, সিপাহির পদ। রাষ্ট্রের সব কর্মকা- পরিচালনা করেছে শ্বেতাঙ্গরা। শ্বেতাঙ্গ আমলাদের ওপর ন্যস্ত ছিল লাগামহীন ক্ষমতা এবং পুরো দেশ শাসিত হতো তাদের দ্বারা। ভারতবর্ষে কয়েকশ শ্বেতাঙ্গ আমলা দ্বারা কোটি কোটি মানুষের শাসনভার সম্পাদন করা সম্ভব হয়েছে শুধু এ জন্য যে, কোম্পানি আমলে ব্যক্তিমানুষ ও সমাজের সত্তা এবং অধিকারকে সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলা হয়। আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা হয়েছে সব মানুষের মধ্যে ভয়ভীতি ও ত্রাস সঞ্চারের মাধ্যমে। এ ব্যাপারে সাহায্য নেওয়া হয়েছে সাত খুনের মাফ পাওয়া অনুগত জমিদারশ্রেণির।
প্রথাগতভাবে ভূমির মালিক রায়তশ্রেণিকে বঞ্চিত করে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে দেশের প্রায় পাঁচ হাজার জমিদারকে করা হয় ভূমির একচ্ছত্র মালিক। রায়তকে পরিণত করার হয় জমিদারের ইচ্ছাধীন প্রজায়। ভূমি একটি সম্পত্তি, একটি অধিকার; যে অধিকার রায়তশ্রেণি চিরকাল ভোগ করে এসেছে। এ ঐতিহাসিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে রায়ত হলো সম্পত্তিহারা, অধিকারহারা। অপরদিকে ইউরোপের আদলে এ দেশে প্রতিষ্ঠা করা হয় একটি অনুগত জমিদারশ্রেণি ও জমিদারশ্রেণির অধীনে একটি অধিকারহীন প্রজাশ্রেণি। ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রাধীনে কোনো স্বাধীন ব্যক্তি ছিল না, ছিল শুধু সত্তাহীন অধীনে প্রজা। সে অধীনতাও ছিল আবার ওপর থেকে স্তরে স্তরে বিন্যস্ত- সরকার, জমিদার, তালুকদার, পত্তনিদার, হাওলাদার, জোতদার, কুৎকিনদার। সবাই একে অপরের মনিব এবং সব মনিবই প্রজার উৎপাদনের অংশীদার, যদিও কৃষি উৎপাদনে তাদের কোনোই ভূমিকা ছিল না।
ঔপনিবেশিক সরকার জমিদারকে প্রজার ওপর সর্বময় ক্ষমতা প্রদান করলেও রাষ্ট্র পরিচালনায় জমিদারকে সম্পূর্ণ দূরে রাখা হয়। রাষ্ট্র পরিচালনা ও দৈনন্দিন প্রশাসন ক্ষেত্রে শাসিতশ্রেণিকে সম্পূর্ণ অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। নানা সংস্কারের মাধ্যমে এ অযোগ্যতা ধীরে ধীরে তুলে নিয়ে অবশেষে ইংরেজের বিদায় ঘটল ১৯৪৭ সালে। কিন্তু ইংরেজ প্রণীত শোষণ ও বঞ্চনাভিত্তিক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা টিকে থাকল। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বিলুপ্তির পর মনিব হিসেবে জমিদারের বিদায় ঘটল বটে, কিন্তু অন্যান্য মনিব ভিন্ন অবয়বে টিকে থাকে, যা কি না বর্তমানেও বিদ্যমান। পরিসংখ্যান মতে, বর্তমান বাংলাদেশের অর্ধেকেরও বেশি মানুষ ভূমিহীন যা কি না ঔপনিবেশিক যুগের রাষ্ট্রচরিত্রকেও অতিক্রম করে গেছে। একই চিত্র বিদ্যমান নগরজীবনেও। নগরের অধিকাংশ মানুষ কর্মহীন, আশ্রয়হীন, স্বাস্থ্যহীন। খোদ রাষ্ট্র দেশি-বিদেশি নানা স্বার্থগোষ্ঠীর প্রভাবে পরিচালিত হচ্ছে। শাসনতন্ত্রে যদিও তাত্ত্বিকভাবে মানুষের মৌলিক অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এর প্রয়োগ নেই। এক কথায়, ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতাহীনতার ব্যাপারে বর্তমান বাংলাদেশ অতীতকে অতিক্রম করেছে, সামাজিক অগ্রযাত্রা সূচনা করা তো দূরের কথা।

হেলাল হাফিজ - কবিতার আশ্চর্য ফেরীঅলা

এহসান মাহমুদ 

 

 

কতোটা পথ পাড়ি দিলে পথিক হওয়া যায় ? ক-ত টুকু বাঁধা পেরোলে স্বাধীনতা ধরা দেয়, কিংবা কতোটা সময় ফেরী করে বেড়ালে একজন ফেরীঅলা হয়ে ওঠেন ? আর একজন ফেরীঅলা এক জীবনে ক’ঘরে ফেরী করতে পারেন বা তাঁর মালামাল ফুরিয়ে না গিয়ে অনবরত ফেরী করে বেড়াতে পারেন ! খুব কম সংখ্যক ফেরীঅলাই তা পারেন। আর যারা পারেন, তাঁরাই হয়ে ওঠেন আশ্চর্য ফেরীঅলা। বাংলা কবিতার ইতিহাসে হেলাল হাফিজ এমন আশ্চর্য এক ফেরীঅলা।
কবি হেলাল হাফিজের জন্ম ১৯৪৮ সালের ৭ অক্টোবর, নেত্রকোনা জেলার বড়তলী গ্রামে। শৈশবে মাকে হারিয়েছেন। স্কুল শিক্ষক বাবার কড়া শাসনে কেটেছে শৈশবের দুরন্ত সময়। ছিলেন স্কুলের সেরা খেলোয়ার। নেত্রকোনাতেই কেটেছে স্কুল এবং কলেজ জীবন। ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে ভর্তি হন বাংলা বিভাগে। তারপরেই কবিতা নামক পোঁকার আক্রমনে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। নেত্রকোনার আরেক কবি নির্মলেন্দু গুণ এবং কবি রফিক আজাদের সাথে জানাশোনা ছিল আগেই। নির্মলেন্দু গুণের সাথে পরিচয় বাবার কবিতা লেখার উছিলায়। স্কুল শিক্ষক বাবা খোরশেদ আলী তালুকদারও কবিতা লিখতেন। নির্মলন্দু গুণ এবং রফিক আজাদের সাথে বাবা কবিতা লিখতেন খালেকদাদ চৌধুরী সম্পাদিত ‘উত্তর আকাশ’ নামের পত্রিকায়। সেই সুবাদে ঢাকায় এসে নির্মলেন্দু গুন এবং রফিক আজাদের সাথে সম্পর্কটা আরও পাকাপোক্ত হয়। তারপর থেকেই কবিতায় যাপন শুরু।
১৯৬৯ সাল। গণঅভ্যুত্থানের সময়। ঢাকা শহর যেন মিছিলের নগরী। হেলাল হাফিজ লিখে ফেললেন ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ কবিতা। কবিতা নিয়ে পত্রিকায় প্রকাশের জন্য গেলেন দৈনিক পাকিস্তান’র সাহিত্য সম্পাদক কবি আহসান হাবীবের কাছে। আহসান হাবীব কবিতা পড়ে ফিরিয়ে দিলেন, আর বললেন, তোমার এ কবিতা ছাপাতে পারলাম না বলে আমার আজীবন দুঃখ থাকবে। তবে আমি বলছি- এই কবিতা লেখার পরে তোমার আর কবিতা না লিখলেও চলবে।
হেলাল হাফিজ কবিতা নিয়ে ফিরে আসেন। কিন্তু না, তিনি অগ্রজ কবির কথা ভুলে গিয়ে আবার কলম হাতে নেন। একে একে লিখে ফেলেন- ‘নিরাশ্রয়ী পাঁচটি আঙুল’ এবং ‘দুঃসময়ে আমার যৌবন’। ততদিনে দেশে শুরু হয়ে গেছে উত্তাল একাত্তর। সারা দেশ মিছিলে মিছিলে মুখর। আর দেয়ালে দেয়ালে লেখা হতে থাকলো ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ কবিতার প্রথম দু’টি চরণ -এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়/এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।
লেখালেখি শুরু করার ১৭ বছর পরে প্রকাশ করেন প্রথম এবং একমাত্র কবিতার বই যে জলে আগুন জ্বলে। ১৯৮৬ সালের বই মেলায় কবিতার বইটি প্রকাশিত হওয়ার পরেই নিজেকে আড়াল করে নেন তিনি। সুদীর্ঘ ২৫ বছর এক ধরনের স্বেচ্ছানির্বাসন অবস্থা থেকে বের হয়ে ২০১২ সালের বই মেলায় প্রকাশিত হয় তাঁর ২য় গ্রন্থ কবিতা একাত্তর। দীর্ঘ ২৫ বছরে তিনি যাপন করেছেন ভিন্ন এক জীবন। ফেরী করেছেন আশ্চর্য এক কষ্ট। প্রায় চার বছর যাবৎ বাসা বেঁধেছেন হোটেলে। পরিজনবিহীন রাজধানী ঢাকার তোপাখানা রোডের হোটেল কর্নফুলিতে এখন তাঁর নিবাস। এখন তাঁর জীবন অনেকটা হোটেল বন্দি অবস্থায় কাটে। দুই কিস্তিতে তাঁর মুখোমুখি বসি প্রেসক্লাবের গেষ্টরুমে আর তাঁর হোটেল কর্নফুলির রুমে। কবি শোনান তাঁর ‘এক জীবন’ ফেরী করার গল্প !

-কয়েকমাস পরেই আপনি পৌঁছবেন ৬৭তম জন্মদিনে। পেছনে কাটিয়ে এসেছেন জীবনের এতোটা বছর। তাই শুরুতেই জানতে চাইছি, ৬৭ বছরের জীবনে ২৫টি বছর কাটিয়ে দিলেন অন্তরালে থেকে, আজ এখন এই সময়টাতে আপনার উপলব্ধি কি ?
- জন্মদিনতো আসলে আনন্দের কোনো বিষয় নয়। বরং এটি একধরনের মন্দ লাগার কারণ। ৬৬ বছর পেছনে ফেলে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়া। ৬৬ বছর হয়তো অংকের হিসেবে বেশ দীর্ঘ একটা সময়ই বটে। কিন্তু, আমি পুরো সময়টাকে কাজে লাগাতে পারিনি। আর এই জীবন যাপন করতে গিয়ে হয়তো নতুন কোনো কষ্ট আবার বুকে জমেছে। সেগুলো আবার মাথা চারা দিয়ে উঠতে চায়। যে বেদনাবোধ, নিজের স্বপ্ন এবং প্রেম থেকে লেখা হয়েছে আমার যে জলে আগুন জ্বলে। আমার অব্যক্ত কথাগুলোই প্রকাশিত হয়েছে কবিতার বইয়ে। আবার হয়তো কিছু বেদনা জমেছে। সেগুলোকে প্রকাশ করতে হবে। আর জীবনের ২৫ বছরেরও বেশি সময় যে স্বেচ্ছা নির্বাসিত ছিলাম তার জন্য আমার কোনো অনুশোচনা নেই। ৬৬ বছর থেকে ২৫টি বছর তো এক ধরনের ঝরে যাওয়াই বলা যেতে পারে। তবে তা নিয়ে কোনো দুঃখবোধ নেই।

-এবার আমরা একটু গোড়ার দিকে যেতে চাই। কখন থেকে সিদ্ধান্ত নিলেন যে কেবল কবিতাই লিখবেন ?
-সোজাসুজি বলতে গেলে কলেজ জীবন থেকে। স্কুল জীবনে আমি খুব ভালো খেলোয়ার ছিলাম। স্কুলের হয়ে বাইরের বিভিন্ন দলের বিপক্ষে বেশ ভালো ফুটবল খেলতাম। এছাড়া লং জাম্প ছাড়াও ভলিবলটাও খুব ভালো খেলতে পারতাম। বলতে পারো যে, ভালো খেলোয়ার ছিলাম। কিন্তু সবকিছুর পরেও মাতৃহীনতার একটা শূণ্যতা আমাকে তাড়া করতো। খেলা-ধুলা আমাকে সেই হাহাকারময় অবস্থা থেকে পরিত্রান দিতে পারতো না। তখনই আমি আশ্রয় নিই কবিতার। আকড়ে ধরি কবিতাকে। কবিতাও অমাকে আশ্রয় দেয়। তারপরে ইন্টারমিডিয়েট পাশের পরে ’৬৭ এর দিকে যখন ঢাকায় চলে আসি, তখন সবকিছু যেন বদলে গেল। আর একটি ব্যাপার যেটি আমার মনে হয়, আমাদের যৌবনের সময়ে এই ভূখন্ডে বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে যা আমাদের সময়ের অনেককেই প্রভাবিত করেছে। কিছু ঘটনা যেমন- ’৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ’৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধ এইসব ঘটনাগুলো আমাদেরক প্রবলভাবে প্রভাবিত করেছে, আলোড়িত করেছে। যা আমাদেরকে কবিতা লিখতে একধরনের সহায়তা করেছে বলেই আমার মনে হয়।
-আপনার কাব্যগ্রন্থ যে জলে আগুন জ্বলে’র কবিতা বিন্যাসের দিকে তাকালে দেখি যে ’৬৯ থেকে ’৮৫ সাল পর্যন্ত বিভিন সময়ে লেখা কবিতা স্থান পেয়েছে। কাব্যগ্রন্থটিতে মোট ৫৬ টি কবিতা রয়েছে। এই সুদীর্ঘ ১৬ বছরে কি আপনি ৫৬টি কবিতাই লিখেছিলেন?
-না ... না। কবিতা জমেছিল প্রায় একশো’ কুড়িটির মতো। সেখান থেকে বাছাই করে ৫৬ টি কবিতা নেয়া হয়েছে। আর কবিতা বাছাইয়ের ক্ষেত্রে আমি চেয়েছি যেন প্রেম, দ্রোহ, সংগ্রাম, দেশ, সমাজ, ব্যাক্তিগত প্রেম বা জীবন সবকিছু যেন এক মলাটে বন্দি করা যায়। আর যে জলে আগুন জ্বলে বইটি করার জন্য কবিতা বাছাইয়ে আমি সময় নিয়েছিলাম ৬ মাসের মতো। প্রতিদিন কবিতা বাছাই করতাম। আবার রাতে শুয়ে শুয়ে ভাবতাম এই কবিতাটি বাদ দিয়ে অমুক কবিতাটি নিতে হবে। আবার পরেরদিন দেখা যেত আগের রাতের বাছাই করা কবিতাটি বাতিল করে দিতাম। অনেক সময় এমনও হয়েছে যে, কবিতা বাছাই করতে গিয়ে মনে পড়তো আচ্ছা, ঐযে সদরঘাটের বা গুলিস্তানের মিছিল থেকে আসার পরে যে কবিতাটি লিখেছিলাম সেটি বাদ দিবো কেন? নিয়ে নিই না কেন সেটি? আবার দেখা যেত কোনো এক নারীর কথা স্মরণ করে লেখা কোনো একটি কবিতা নেয়ার জন্য আবার নতুন করে কবিতা বাছাই করেছি। তাই কবিতা নির্বাচন করাটা আমার কাছে অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়েছিল।

-যে জলে আগুন জ্বলে কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতা ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’র প্রথম দু’টি লাইন আপনাকে রাতারাতি তারকা কবির পরিচিতি এনে দেয়। তখন ’৬৯ এবং ’৭১ এ আপনার এই কবিতা মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। আপনার কবিতা লেখা থাকতো দেয়ালে, দেয়ালে। তারপরে দেশ স্বাধীনেরও অনেককাল পরে ৫৬ টি কবিতা একত্রিত করে ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হলো -যে জলে আগুন জ্বলে। আর এদিকে আমাদের দেশটিও ৫৬ হাজার বর্গমাইল আয়তনের। দেশের ভূখন্ডের সাথে মিলিয়েই কি ৫৬টি কবিতা রেখেছিলেন ?
-না। এটা কাকতালীয়। আমি এমনটা করে ভাবিনি। তুমিই প্রথম যে এই বিষয়টি নিয়ে এভাবে মিলিয়ে দেখলে। আসলে ৫৬টি কবিতা রাখা হয়েছিল বইয়ের ফর্মা অনুযায়ী। এর চেয়ে বেশি কবিতা রাখা যেত না। তাই ৫৬টিই নির্বাচিত করা হয়েছে।

-কেবল একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের পরেই কেন নিজেকে আড়ালে নিয়ে গেলেন বা আড়াল করলেন ?
-নানা কারনে। তবে কিছু মান-অভিমান তো ছিলই। কিন্তু আমি কবিতা নিয়ে কখনোই ব্যবসা করতে চাইনি। কবিতাকে অর্থ উপার্জনের মাধ্যম বলেও কখনো ভাবিনি।

-এই যে একটি কাব্যগ্রন্থ দিয়ে প্রায় দুই প্রজন্মকে সমানভাবে সম্মোহিত করে রাখলেন, আপনার কবিতার কোন বিশেষ দিকটির জন্য আপনার কবিতা এখনও শুরু থেকে সমান পঠিত বলে মনে করেন ?
-আমার কবিতায় মানুষের স্বপ্ন ও আকাঙ্খাকে হয়তো প্রকাশ করতে পেরেছি। আমার স্বপ্ন ও আকাঙ্খাকে মানুষকে স্পর্শ করেছে বলেই এটা হয়েছে বলে মনে হয়। যেমন- এবার এই যে শাহবাগে আন্দোলন হলো, সেখানেও রোজ কেউ না কেউ আমার কোনো না কোনো কবিতা পাঠ করেছে আবৃত্তি করেছে। মানুষ প্রেমে পড়তে গিয়েও আমার কবিতা পড়েছে। প্রেমে মজেও পড়েছে। আবার প্রেমে প্রত্যাখাত হয়েও পড়েছে। আমার কবিতার মাঝে যেন একক আমি সকলের কথাই বলেছি। তাই হয়তো এমনটা হতে পারে।
-আপনার সমকালের অন্যান্য কবিগণ যেমন- আসাদ চৌধুরী, নির্মলেন্দু গুণ, আবুল হাসান, রফিক আজাদ, মহাদেব সাহা, আবদুল মান্নান সৈয়দ এঁদের মধ্যে কেবল আবুল হাসানের (অকাল প্রয়াত বলে) ৩টি কাব্যগ্রন্থ। কিন্তু আপনার কেবল একটি কাব্যগ্রন্থ। তারপরেও আপনি আমাদের বাংলা কবিতার ষাটের দশকের আলোচনায় বেশ আলোচিত। কিন্তু সেটি কেন ? আপনার কেবল একটি গ্রন্থ এক্ষেত্রে কোনো অন্তরায় হয়ে উঠতে পারেনি কেন ?
-কেন অন্তরায় হয়ে উঠতে পারেনি তা আমি বলতে পারবো না। আর আমার তো মনে হয় আমার নামটি অন্যসবার আগেই উচ্চারিত হয় (হা..হা..হা)। (হাসি থামিয়ে খানিক ভেবে) আমাদের ষাটের দশকের প্রথম দিকের কবি হলেন আসাদ চৌধুরী। তুমি যাদের নাম বলেছো এঁদের বাইরে প্রশান্ত ঘোষালের নামটিও উল্লেখ করার মতো।
-আপনার সময়কার অন্যান্য কবিগণ কবিতা লিখে খ্যাতির পাশাপাশি নানা পুরষ্কার ও রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পেয়েছেন। এক্ষেত্রে আপনার অবস্থানটি যদি বলেন...
-আমি কখনোই ভাবিনি যে কবিতা লিখে পুরষ্কার পেতে হবে। আর আমি এক জীবনে এতো এতো মানুষের এতো প্রেম আর ভালোবাসা পেয়েছি যে অন্য কিছু পাওয়ার কথা স্মরণে আসেনি। আর বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা দেশ এবং দেশের বাইরে থেকে নানা সময়ে সম্মাননা দিয়েছে আমাকে। তবে যেটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ সেটি হচ্ছে ভালোবাসা। আর আমার যা কিছু অর্জন সব তো কবিতার জন্যই। আর রাষ্ট্রীয় পুরষ্কার বলতে তো বাংলা একাডেমি পুরষ্কারকে বুঝায়। সেটি এখনও পাইনি। তার জন্য কোনো দুঃখ বোধও নেই।

 

’৬৫ সনে পাক-ভারত যুদ্ধের সময়েও আমাদের নেত্রকোনার সিনেমা হলে সূচিত্রা সেনের ছবি দেখানো হতো। যে সপ্তাহে সূচিত্রা সেনের ছবি থাকতো সেই সপ্তাহে পালিয়ে হলে গিয়ে ছবি দেখতাম। এমনও হয়েছে অনেকদিন আমি এবং আব্বা একইসাথে হলে বসে সিনেমা দেখেছি। কিন্তু আব্বা জানতো না যে আমিও হলের ভেতরে রয়েছি। ছবি শেষ হলে তাড়াতাড়ি বের হয়ে অন্য রাস্তা আব্বার আগে বাড়িতে পৌঁছে যেতাম। তখন থেকেই সূচিত্রা সেনের প্রতি মোহবিষ্ট হয়ে পড়েছিলাম। সেই সূচিত্রা সেনকে দেখলাম নিজেকে আড়াল করে গৃহবন্দী করে রেখেছেন

 

-আপনি প্রায় দীর্ঘ ২৫ বছর এক ধরনের স্বেচ্ছা নির্বাসন জীবন কাটালেন। এই নির্বাসিত জীবনে কি কবিতা থেকেও নির্বাসনে ছিলেন?
-আমি প্রায় নির্বাসিত জীবন কাটালেও কবিতাকে কখনো ছাড়তে পারিনি আর কবিতাও আমাকে ছেড়ে যায় নি। আর এই ২৫টি বছর আমি এই বইটির প্রতি (টেবিলে থাকা যে জলে আগুন জ্বলে দেখিয়ে) মানুষের ভালোলাগা আর ভালোবাসা অবলোকন করেছি। আমার নির্বাসিত জীবন কম্পর্কে লোকজন সঠিক কিছু জানতো না। অধিকাংশ লোকজন জানতো আমি দেশের বাইরে আছি। আবার অনেকে ভাবতো আমি মারা গেছি। তাই ২৫ বছর পরে আবার এসে আমি নতুন একটা জগতের মুখোমুখি হলাম যেন।
-আপনার এই নিজেকে আড়াল করা বা নির্বাসিত জীবন যাপনের পেছনের কথাটি যদি বলতেন....
-(খানিক ভেবে) নির্বাসনে থাকার প্রধান কারন হচ্ছে -আলস্য। এটি এখন আমার রোগে পরিণত হয়েছে। আর তাছাড়া ব্যাক্তিজীবনের নানা পরাজয়ও রয়েছে। এছাড়া আরেকটি বিষয়, যিনি আমাকে নির্বাসিত থাকতে উৎসাহী বলবো, না-কি প্রলুব্ধ করেছেন বলবো ? তিনি হচ্ছেন সূচিত্রা সেন। আমি সূচিত্রা সেনের খুব অনুরাগী। সূচিত্রা সেনের বিষয়টা বলতে হলে একটু পেছনে যেতে হবে। ’৬৫ সনে পাক-ভারত যুদ্ধের সময়েও আমাদের নেত্রকোনার সিনেমা হলে সূচিত্রা সেনের ছবি দেখানো হতো। যে সপ্তাহে সূচিত্রা সেনের ছবি থাকতো সেই সপ্তাহে পালিয়ে হলে গিয়ে ছবি দেখতাম। এমনও হয়েছে অনেকদিন আমি এবং আব্বা একইসাথে হলে বসে সিনেমা দেখেছি। কিন্তু আব্বা জানতো না যে আমিও হলের ভেতরে রয়েছি। ছবি শেষ হলে তাড়াতাড়ি বের হয়ে অন্য রাস্তা আব্বার আগে বাড়িতে পৌঁছে যেতাম। তখন থেকেই সূচিত্রা সেনের প্রতি মোহবিষ্ট হয়ে পড়েছিলাম। সেই সূচিত্রা সেনকে দেখলাম নিজেকে আড়াল করে গৃহবন্দী করে রেখেছেন। কারো সাথে কোনো প্রকার যোগাযোগ রাখছেন না। এক সময়ের তুমুল জনপ্রিয় নায়িকা নিজেকে আড়ালে নিয়ে নিলেন। আড়াল করে ফেললেন নিজেকে। সূচিত্রা সেনের মতো আমিও নিজেকে আড়ালে নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তা ২৫ বছর ধরে রাখতে পারলেও আর পারলাম না। পারছি না বলেই এখন তোমার সাথে বসে গল্প করছি (হা...হা...হা)।

-জ্বী। তাই আপনার নির্বাসন ভঙ্গের জন্য আপনাকে আরেকবার স্বাগত। (তিনি খানিক বিরতি নিলেন)। এবার আমরা আবার শুরু করি তবে ?
(তিনি মুখ বুজেই একবার হাসলেন যেন। তারপরে বললেন, ও হ্যাঁ আলোচনাটা শেষ করা দরকার।)
-কবিতায় সমকালীন রাজনৈতিক চিন্তার প্রভাব পড়ে। আপনার ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ তার উজ্জ্বল উদাহরণ। কিন্তু আবার অনেক রাজনৈতিক কবিতাই শেষ পর্যন্ত কবিতা না হয়ে শ্লোগান সর্বস্ব হয়ে ওঠে। এ বিষয়ে কিছু বলুন...
-আমার ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ নিয়ে এখন রীতিমত তর্ক-বিতর্ক চলছে। এ নিয়ে অনেকে বলেন, এটি শ্লোগান। আবার অনেকে বলছেন, কবিতাই ছিল এখন স্লোগান হয়ে গেছে। তবে আমি বলবো- এটাকে আমি কবিতা হিসেবেই লিখেছি। তুমুল জনপ্রিয়তার কারনে হয়তো অনেকে ‘শ্লোগান’ বলার পক্ষে মত দিয়েছেন।

-আপনি যে সময়টাতে কবিতা লেখা শুরু করলেন- অর্থাৎ ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ, ঐ সময়টিকে নিয়ে আপনার সময়কার প্রায় সকলেই কবিতা লিখেছেন। বিশেষকরে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আপনার কোনো কবিতা রয়েছে কিনা ?
-দেখো আমি কোনো রাজনৈতিক দলের সক্রিয় কর্মী কখনোই ছিলাম না। আর নীতিগতভাবে আমি বাম রাজনীতিকে সমর্থন করি। যদিও সারাবিশ্বে মার্কস

ইজমের পতন হয়েছে, কিন্তু আমি বিশ্বাস করি- রাষ্ট্রের সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে সম্পদের সুষম বন্ঠন করতে মার্কস ইজমের কোনো বিকল্প নেই। যাই হোক, বর্তমানে অমাদের বাংলাদেশে দুটি জিনিস পড়েছে ভল্লুকের হাতে। একটি হচ্ছে ধর্ম, অপরটি রাজনীতি। বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পরে যখন বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা লেখাটা ছিল ভয়াবহ, তখন আমি এই ভূখ-ের স্থপতি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা লিখেছি। আমার কবিতাটির নাম ‘নাম ভূমিকায়’।

-এবার আপনার ব্যাক্তিগত বিষয়ে জানতে চাইবো।
-তুমি জিজ্ঞেস করতে পারো এহ্্সান। যেটি বলার মতো বলবো। সংকোচের কিছু নেই।
-আপনার জীবন-যাপন নিয়ে বিভিন্ন কথা প্রচলিত আছে। জীবন ধারনের জন্য, জীবিকা উপার্জনের জন্য আপনি নানা বিচিত্র মাধ্যম বেছে নিয়েছিলেন। সেসব বিষয়ে যদি বলেন...
-সারাজীবনে পেশা বলতে যা বলতে বুঝায় সেটি বললে সাংবাদিকতার কথাই বলতে হবে। কিন্তু আমাদের দেশে এই পেশাটি এখনও ইন্ড্রাষ্টিরূপে দাড়ায় নি। তাই বেকার হবার একটি ঝুঁকি থেকেই যায়। আমিও আমার দীর্ঘ কর্মজীবনের প্রায় অর্ধৈকটা সময়ই চাকরিহীন অবস্থায় কাটিয়েছি। ১৯৭৪ এ যখন আমার চাকরি চলে গেল তখন আমি জুয়া খেলে জীবিকা চালাতাম। আমার জুয়া খেলার ভাগ্য খুবই ভালো ছিল। বেশিরভাগ সময়ই আমি জিততাম। ১৫ বছরেরও বেশি সময় আমি জুয়া খেলে জীবন-যাপন করেছি।
এছাড়া আরেকটি বিষয় আছে যেটিকে ইংরেজিতে বলে ‘জিগোলো’। ‘জিগোলো’ হচ্ছে সেই পুরুষ যে কিনা বিত্তশালী নারীদের এক্সট্রা ম্যারিটাল ফ্রে- হিসেবে কাজ করে। আমি সেটিও করেছি অনেকদিন। অর্থাৎ অর্থের বিনিময়ে নারীদেরকে সঙ্গ দিতাম। নারীরা আমার সঙ্গ পছন্দ করতো।
তবে এগুলো অনুসরনীয় হতে পারে না। আমি চাইনা আমার মতো করে কেউ জীবন-যাপন করুক। তবে আমার জীবন যাপনের পুরো প্রক্রিয়ায় আমি চারটি মূল বিষয়ের উপর বিশ্বাস রেখে চলেছি। এগুলোই আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। এগুলো হচ্ছে- অক্সিজেন, শস্যদানা, প্রেম এবং কবিতা। এ চারটির একটির কমতি হলে আমার বেঁচে থাকা কষ্টকর হয়ে উঠবে।

-আপনার ‘প্রস্থান’ কবিতায় আছে “একজীবনে কতোটা আর নষ্ট হবে,/ এক মানবী কতোটাই বা কষ্ট দেবে !” কবিতার এই মানবী কে ?
-কবিতার সবটাই বলাটি ঠিক হবে না। বনলতা সেন কে ছিল তুমি জানো নাকি এহ্্সান ? জীবনানন্দ কী তা বলে গেছেন (হা...হা...হা) ?

-আপনার কবিতায় কয়েকটি চরিত্র এসেছে যেমন- হিরনবালা, সবিতা সেন, হেলেন, রানা। এরা কি কাল্পনিক নাকি আপনার জীবন থেকে নেয়া নাম ?
-অনেকটাই বাস্তব চরিত্র। আর বেশি বলতে চাই না। তাহলে গবেষকদের কাজ এগিয়ে দিয়ে যাওয়া হবে।

-২০১২ বইমেলায় প্রকাশিত হলো আপনার ‘কবিতা একাত্তর’ নামের গ্রন্থটি। এটির বিষয়ে কিছু বলেন...
-‘কবিতা একাত্তর’ আসলে মৌলিক কোনো বই নয়। এতে যে জলে আগুন জ্বলে বইয়ের ৫৬টি কবিতা এবং নতুন ১৫টি মোট ৭১টি কবিতার বাংলা এবং ইংরেজি একত্রে মলাটবদ্ধরূপ। আমি দীর্ঘদিন ধরেই চেয়েছিলাম আমার কবিতা ইংরেজিতে রূপান্তর করা হোক। মূলত এটি করা হয়েছে ইংরেজি সংস্করণের জন্যই।

-নতুন কবিতা লিখছেন কিনা ?
-আমি আসলে শম্ভুক গতিতে লিখি। আর হয়তো আমি ওতো প্রতিভাবান নই। তাই আমাকে ভাবতে হয় বেশি। আর নতুন কবিতা লিখতে বসার আগে এক ধরনের ভীতি কাজ করে। এই ২৬ বছরেও আমি আমার ভীতিটা কাটিয়ে উঠতে পারিনি। ভীতিটা হচ্ছে যে জলে আগুন জ্বলে নিয়ে। প্রথম গ্রন্থটি প্রকাশ হওয়ার পরে এতো এতো প্রতিক্রিয়া পেয়েছি যে নতুন লেখায় হাত দেয়ার আগেই ভাবতে হয়- এটি কি যে জলে আগুন জ্বলে কে অতিক্রম করতে পারবে ? কিংবা কাছাকাছি থাকতে পারবে ? যদি তা না হয়, তবে লিখে কি লাভ ? এমন করতে করতেও কিছু কবিতা আবার জমেছে। দেখি কি করা যায়...

-আর কোনো বই করার ইচ্ছে আছে কি না ?
-একটি বই করবো ইচ্ছে আছে। নামও ঠিক করে ফেলেছি -‘বেদনাকে বলেছি কেঁদোনা’। দেখি কবে নাগাদ বের করতে পারি ! তবে আমি আরও সময় নিতে চাই। হতে পারে এক বছর বা দুই বছর।

-এই যে পরিবার পরিজনহীন হয়ে হোটেলবাস করছেন, শেষ বয়স নিয়ে বা মৃত্যু নিয়ে কিছু ভাবেন না ?
-শৈশবে মা মারা যাবার পর থেকেই আমি নিঃসঙ্গ। অনেকটা বিচ্ছিন্ন জীবন-যাপন করেছি ছোটবেলা থেকেই। তাই এখন নতুন করে আর কোনো সমস্যা হচেছ না। এই কর্নফুলি হোটেলে ওঠার কয়েকদিন পরে একটি কবিতা লিখেছিলাম ‘সতীন’ নামে। কবিতাটি হচ্ছে- “তুমি আমার নিঃসঙ্গতার সতীন হয়েছো !”
আর মৃত্যু চিন্তা নিয়ে চিন্তা না করে মৃত্যুকে ভালোবাসলেই হয়। রবীন্দ্রনাথের কথায় বলা যায়- “মরনরে তুহু মম শ্যাম সম।”

-আমরা একটি শব্দ ‘অমরতা’ ব্যবহার করি। এই সম্পর্কে আপনার চিন্তা কি ?
-দেখো এহ্্সান, জীবনানন্দ কিন্তু বেঁচে থাকতে জেনে যেতে পারেন নি যে তিনি কবি। আজকে তিনি বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবি। আমি কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে মাথায় রেখেই বলছি। কেবল কবিতার বিচারে জীবনানন্দ বাংলা কবিতার শ্রেষ্ঠ কবি। আর রবীন্দ্রনাথ সবকিছু মিলিয়ে রবীন্দ্রনাথ। তাই ‘অমরতা’ বিষয়টি এখানে তুমি কিভাবে ব্যাখ্যা করবে ? আর আমি আমার কথা বলতে পারি- আমি তো এক ধরনের অমরতা পেয়েই গেছি। দীর্ঘ ২৫ বছর পরে ফিরে এসেও দেখছি লোকজন আমার কবিতা পড়ছেন। আমাকে মনে রেখেছেন।

সাক্ষাতকার গ্রহনের সময় : ১ এবং ২ ফেব্রুয়ারি ২০১৫
ঢাকা।

জন্মের রহস্য

ইকবাল আজিজ

 

 

কার জীবনে কখন ঝড় আসবে তা কেউ জানে না। আরিফ ভেবেছিল, তার জীবনটা সুখ-দুঃখে কেটে যাবে। উচ্চকাক্সক্ষা তার তেমন নেই। তাই জীবন নিয়ে জুয়াও কোনোদিন খেলেনি। সহজ-সরল জীবনই ছিল তার সার, স্বপ্ন ও প্রত্যাশা। কিন্তু জীবন এক আশ্চর্য রহস্যের নাম। কারো পক্ষেই উপলদ্ধি করা সম্ভব নয় মাত্র এক মিনিট পর তার জীবন কিংবা সংসারে কী ঘটতে চলছে। সে ভাববাদী বা ভাগ্যবাদী নয়, বরং পুরোপুরি মধ্যবিত্ত মূল্যবোধ ও নিতান্তবই কর্মে বিশ্বাসী সাধারণ মানুষ। যা কখনোই ভাবেনি, ওই অনাকাক্সিক্ষত বিপর্যয়টি শেষ পর্যন্ত তার জীবনে এসে ভর করলো। এটা তেমন অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়। তবে যার জীবনে ঘটে সেই শুধু টের পায়।
১৪ বছর সংসার করার পর আরিফের ঘর ভেঙে গেছে। আরিফ ও তাদের ১৩ বছরের পুত্র তুষার এবং স্ত্রী লায়লাÑ এই নিয়ে একটি সংসার হঠাৎ ভেঙে তছনছ হয়ে গেল। তিন মাস আগে সহসাই আরিফের যৌথ জীবন ভেঙে গেছে।
বিবাহীত জীবনে আরিফ ছিল স্ত্রীর ওপর নির্ভরশীল। সংসারের সব দিকই সামলাতো লায়লা। আরিফ একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থার মালিক। তার স্ত্রী লায়লা গৃহবধূ। তবে মাঝে মধ্যে এনজিও-তে কনসালটেন্সি করে। ১৪ বছর ধরে তাদের সংসারে সুখ-দুঃখ সবই ছিল। কিন্তু চূড়ান্ত কোনো সংঘাত হয়নি। ঘটনাপ্রবাহে আরিফ ও লায়লার জীবন দুটি দিকে চলে গেল। মাঝখানে তুষার দাঁড়িয়েছিল দুটি জীবনের স্বপ্নময় প্রত্যাশা হয়ে। তার জীবনের ভবিষ্যৎও নির্ধারিত হয়ে গেছে, সে বাবার সঙ্গে থাকবে।
বিয়ে বিচ্ছেদের বিষয়ে আলোচনার জন্য তিন মাস আগে এক বিকেলে ঘনিষ্ঠ কয়েক আত্মীয় এক সঙ্গে বসেছিল আরিফ, লায়লা ও তুষারকে নিয়ে। এ কারণে ওই বিচ্ছেদের ঘনঘটায় আবদুল মালেক সেদিন ছিল অনুপস্থিত। ওই ঘরোয়া আসরে লায়লা বললো, আরিফের বিরুদ্ধে তার কোনো অভিযোগ নেই। সে বিয়ে বিচ্ছেদ চায়। তার ভরণ-পোষণ দরকার নেই। তুষারের বিষয়ে তার কোনো আলাদা দাবি নেই। সে ইচ্ছা করলে তার বাবার সঙ্গে অথবা তার কাছে থাকতে পারে লায়লার নতুন সংসারে। কিন্তু পারিবারিক বৈঠকে সবাইকে অবাক করে দিয়ে ১৩ বছর বয়স্ক তুষার বললো, ‘আমি ॥

আব্বুর সঙ্গে থাকবো। জীবনে আর কোনোদিন তার আম্মু এবং ওই কুত্তা মালেক মামাকে দেখতে চাই না।’
লায়লার বড় বোন বললো, ‘বাবা, বড়দের ওইভাবে গালি দিতে নেই। মানুষ খারাপ বলবে।’ তারপর সবাইকে চা-নাশতা দেয়ার জন্য বাড়ির কাজের মেয়েকে সে নির্দেশ দিল।
তুষার বাবার পাশে বসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। তার বড় খালাই ওই পারিবারিক অলোচনার আয়োজন করেছে। সেদিনই বিচ্ছেদের বিষয়টি চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছিল।
ঠিক হয়েছিল বিচ্ছেদ না হওয়া পর্যন্ত লায়লা শান্তিনগর তার পৈতৃক বাড়িতে থাকবে। অন্যদিকে তুষারকে নিয়ে আরিফ থাকবে সেন্ট্রাল রোডে তার ফ্ল্যাটে। যেহেতু মুসলমানের বিয়ে বিচ্ছেদ এবং মিয়া-বিবি রাজি সেহেতু আইনত তালাক কার্যকর হতে তেমন ঝামেলা হয়নি।
তিন মাস ধরে তুষার আছে তার বাবার সঙ্গে। আরিফ নিজের মানসিক বিপর্যয় অনেকখানি কাটিয়ে উঠেছে। বাবা ও পুত্রের সংসার এক নতুন এবং ব্যতিক্রমী নিয়মের আবর্তে ক্রমেই স্বাভাবিক ও স্বচ্ছন্দ। জগতে এই এক নিয়মÑ মানুষ সব পরিবর্তনেই অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। সংসারের যাবতীয় দায়িত্ব সামলানোর জন্য পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে বুয়া রাখা হয়েছে। সামান্য লেখাপড়া জানা এই নারীকে ঠিক কাজের মেয়ে না বলে বরং কেয়ারটেকার বলা যায়। ওই কেয়ারটেকার তসলিমার অধীন এক ঠিকা ঝি কাজ করে সকাল-সন্ধ্যা।

আরিফ সকালে ধানম-ির টিউলিপ ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে তুষারকে রেখে চলে যায় বনানীতে তার অ্যাড. ফার্মে। মাঝারি আকারের ‘মোনালিসা অ্যাড. ফার্ম’-এ ২৫-৩০ কর্মচারীর ভাগ্যবিধাতা সে। অফিসে পৌঁছেই ড্রাইভারকে দিয়ে গাড়ি পাঠিয়ে দিল তুষারের স্কুলে। ড্রাইভার দু’তিন ঘণ্টা অপেক্ষায় থাকে তুষারের। আগে এ দায়িত্বটা পালন করতো লায়লা। স্কুলের সামনের আঙিনায় অনেক নারীকে নিয়ে বসে থাকতো। ড্রাইভারও থাকতো গাড়ি নিয়ে।
ওই স্কুলে মালেক আসতো তার ভাগ্নিকে নিয়ে। লায়লার বয়সি মালেক প্রথম থেকেই অ্যাগ্রেসিভ ও অশালীন ধরনের। তার এ স্বভাবের কারণে মেয়েরা তাকে খুব সহজেই পছন্দ করে ফেলে। লায়লার সঙ্গে এখানেই আলাপ হয়েছিল মালেকের। তুষার ও মালেকের ভাগ্নি তিশা যখন স্কুলে ক্লাস করতো তখন লায়লা এবং তার ‘মালেক ভাই’ ৮ নম্বর রোডের ভারতীয় রেস্টুরেন্ট ‘খানা খাজানা’য় বসে দইবড়া ও চটপতি খেতো। এভাবে সম্পর্কটি গভীর হতে দেরি হয়নি।
লায়লা বাস্তবিকই প্রেমে পড়েছিল। ওই সঙ্গে অনুভব করেছিল, আরিফকে সে কোনোদিনই ভালোবাসেনি।
আচরণে রাফ অ্যান্ড টাফ স্বভাবের ব্যবসায়ী মালেকও যেন তার এক উপযুক্ত জীবনসঙ্গী খুঁজে পেয়েছিল লায়লার মধ্য দিয়ে। ওই নারী যথেষ্ট অভিজ্ঞ ও কামনিপোনা। মাঝে মধ্যে তারা ধানমন্ডি মালেকের বাসায়ও যেতো। নিভৃতে দু’এক ঘণ্টা সময় কাটাতো। ব্যাপারটি এভাবে চলতে পারতো বেশ কিছুকাল। কিন্তু জীবনের গতি শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে থামবে তা কেউ জানে না।
ইতোমধ্যে তুষারকে লায়লা পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল মালেকের সঙ্গে ‘মালেক মামা’ বলে ডাকতে। তারা তিনজন ধানমন্ডি লেকে ডিঙায় চড়ে ভেসে বেড়াতো। তুষার মজাই পেতো। তবে মাঝে মধ্যে তার খারাপ লাগতো যখন দেখতো ওই গু-ার মতো লম্ভা-চওড়া মানুষ মায়ের হাত ধরে বসে আছে। সে তখন অন্যদিকে তাকিয়ে থাকতো। ব্যপারটি আরো এগিয়ে গিয়েছিল। কারণ প্রেম-ভালোবাসা মানুষকে অনেক সাহসী করে তোলে।
শরীরের ভাষায় কথা বলতে গিয়ে লায়লা বুঝেছিল, এতোকাল সে বড় বেশি বঞ্চিত হয়েছে। আরিফের অল্প ভুঁড়িওয়ালা আয়েশি শরীরটি জীবনের অনেক ছন্দময় রহস্যে অভ্যস্ত নয়। লায়লা মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, আরিফ যদি মালেক বিষয়ে তার অপরিহার্যতা মেনে নিয়ে চুপ থাকে তাহবে আরিফের সংসারে থাকবে। তা না হলে মালেকের সঙ্গে সে নতুন করে ঘর বাঁধবে। এর মাঝামাঝি অন্য কোনো পথ নেই।
আরিফের সঙ্গে মালেকের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল লায়লা। মালেক প্রায়ই হোটেল থেকে খাবার-দাবার নিয়ে আসতো। কথনো কখনো খাবারের সঙ্গে বিদেশি হুইস্কি কিংবা রেড ওয়াইনের বোতল আনতো।
বাবা সারা দিন অফিসে, তুষার দেখতো তাদের ফ্ল্যাটে মা ও মালেক মামা বোতলের পানি খেয়ে কিছুটা অসংলগ্ন কথা বলছে। তুষার তখন তাদের কাছে গেলে দু’জনই হাসতো। মা বলতো, ‘তুষার আমার লক্ষ্মী ছেলে।’ মালেক মামা মদের ঘোরে বলতো, ‘তুষার রে আমি কাইলই আমেরিকায় পাঠাইয়া দিমু। আমার সব টাকা, ধন-সম্পদও ওরে দিয়া যামু।’ গোটা ব্যাপারটা তুষারের খারাপ লাগতো। কারণ তার বাবাকে কখনোই মদ খেতে দেখেনি সে। মাও আগে কোনোদিন খায়নি। বাবা সিগারেট পর্যন্ত খায় না। তিনি সব সময় বলেন, ‘সিগারেট, মদ খুব খারাপ জিনিস।’
আরিফ বাসায় ফিরে মালেকের সঙ্গে বসে থাকতে দেখেছে। খাবার ও পানীয়ও খেতে দেখেছে। কিন্তু নিরীহ ও নির্বিরোধী স্বভাবের আরিফ কিছু বলতে সাহস পায়নি।
লায়লা এমনিই কিছুটা তেজি ও ডোমেনেটিং স্বাভাবের। এর উপর ইদানীং সঙ্গী হয়ে জুটেছে মালেক নামে এক মাতাল ও গু-া। একদিন সেন্ট্রাল রোডের অ্যাপার্টমেন্টের বেডরুমের তারা দরজা লাগিয়ে ছিল। তুষারকে বলেছিল, টিভিতে তারা একটি বিশেষ ফিল্ম দেখবে।
তুষার নিজের ঘরে মন খারাপ করে বসেছিল। একটি বই পড়ার চেষ্টা করছিল।
আরিফ হঠাৎ বাসায় ফিরে ব্যাপারটি বুঝতে পারলো। বাইরে থেকে বেডরুমের দরজায় কড়া নেড়ে লায়লাকে ডাকলো।
কিছুক্ষণ পরে দু’জন বেরিয়ে এলো। মালেক ও লায়লা দু’জনেরই চুল অবিন্যস্ত। মালেকের শার্টের দুটি বোতাম খোলা।
লায়লা কিশুটা ক্ষুব্ধ হয়ে বললো, ‘এভাবে অসভ্যের মতো দরজা ধাক্কা দিচ্ছিলে কেন? জীবনেও ভভ্রতা শিখলে না?’
আরিফ কিছুটা সাহস করে বললো, ‘তোমরা দরজা লাগিয়ে কী করছিলে?’
এবার মালেক কেমন অদ্ভুদভাবে ভিলেইনের মতো হাসলো। তারপর সোজা আরিফের কাছে এসে তার ঘাড়ে হাত রেখে অস্ফুট স্বরে বললো, ‘এসব কথা যদি কাউকে বলো তাহলে দেন আই উইল কিল ইউ।’
আরিফ ভাবতেই পারেনি তার বাসায় এসে বাইরের কেউ তাকে এভাবে হুমকি দিতে পারে! আরিফ সরে গিয়ে একটি চেয়ারে বসলো।
তুষার বুঝতে পারলো না। শুধু দেখতে পেল বাবা খুব গভীর ও বেদর্নাত হয়ে বসে আছে।
এবার মালেকের দিকে তাকিয়ে লায়লা বললো, ‘তুমি ওই গাধাটার সঙ্গে কেন কথা বলতে গেছ।’
তুষার তাকিয়ে থেকে মায়ের কথা বলার ভঙ্গিটা দেখলো। গত কয়েক মাসে

মা কতো বদলে গেছে। একটা বাইরের মানুষের সামনে আব্বুকে গাধা বলছে!
সেদিন মালেক চলে যাওয়ার পর লায়লাকে আরিফ জিজ্ঞাসা করলো, ‘তুমি আসলে কী চাও?’
লায়লা বললো, ‘আপাতত তোমকে ছাড়তে চাই। কাল শান্তিনগরে চলে যাবে। এরপর ভেবে দেখো, কী করবে?’
লায়লা তার বাপের বাড়ি শান্তিনগরে চলে যাওয়ার ক’দিন পর তুষারের বড় খালার বাসায় ঘরোয়া আলোচনার মধ্য দিয়ে সব চূড়ান্ত হয়ে গেল নির্বিবাদে।
এরপর ছ’মাস কেটে গেছে। সেন্ট্রাল রোডের অ্যাপার্টমেন্টে আরিফ ও তুষারের জীবনে স্বাভাবিক ছন্দ অনেকটাই ফিরে এসেছে। আরিফ ভাবে, বাবা ও ছেলের এ সংসার নিয়ে যদি দেশের কোনো নারীবাদী লেখিকা একটি গল্প লিখতেন তাহলে হয়তো ভালোই হতো। আরিফের মনে হয়, কোনো জীবনেরই শেষ কেউ বলতে পারে না।
তুষারও হয়তো বিপর্যয় কাটিয়ে উঠছে। তবে মাঝে মধ্যে সে একা কাঁদে। এই ছ’মাস সে একবারও মাকে দেখতে চায়নি। বরং তুষারকে লায়লা দু’বার দেখতে আসার জন্য ফোন করেছিল। তুষার বলে দিয়েছে, ‘কোনো দরকার নেই। তুমি কুত্তার বাচ্চা মালেক মামার সঙ্গেই থাকো। আর কখনো আমাকে ফোন করবে না।’
লায়লা ওপার থেকে চুপ হয়ে গেছে।
ওই বিচ্ছেদের ঘটনাটি তুষারের মানসিক বয়স অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। সে জানে, তাদের ক্লাসের দু’তিনজন বন্ধুর মা-বাবার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। কিন্তু তাদের মা-বাবা দু’জনই আবার বিয়ে করেছে। কিন্তু তার বাবা কতো ভালো! তাকে ছেড়ে মা অন্য পরুষের কাছে চলে গেছে। কিন্তু বাবা চিরকাল একা থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তুষার একদিন বলেছিলো, ‘বাবা, তুমি একটি বিয়ে করো। সারা জীবন এভাবে একা থাকবে?’
আরিফ বলেছে, আমি তো একা নই। তুই আছিস আমার সঙ্গে। তোর সঙ্গে সারা জীবন থাকবো। লেখাপড়া শেষ হলে খুব লক্ষ্মী এক মেয়ের সঙ্গে তোর বিয়ে দেবো।’
ততোক্ষণে বাবার হাত ধরে কাঁদতে শুরু করেছে তুষার। সে বুঝেছে, এ জীবনে এতো বড় আশ্রয় আর কেউ নেই। তবে রাতে বাবা ও ছেলের ঘুমানোর ঘর আলাদা। তুষারের ১০ বছর হওয়ার পর লায়লাই ছেলের আলাদা ঘুমানোর ব্যবস্থ্যা করেছিল। নিয়মটা এখনো চালু আছে। ঘুমানোর আগে বাবা ও ছেলে একে অপরকে ‘গুডনাইট’ বলে চলে যায় যার যার ঘরে। তুষার ঘুমানোর সময় অনুভব করে, তার জীবনের সবচেয়ে বড় অবলম্বন ‘আব্বু’ পাশের ঘরে ঘুমিয়ে আছে।
আরিফও ঘুমের মধ্যে উপলদ্ধি করে, তার পুত্র একমাত্র বংশধর ঘুমের মধ্যে মেঘের রাজ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তুষার তার জীবনের একমাত্র আশ্রয়, বড় আদরের সন্তান। তার বেঁচে থাকার একমাত্র প্রেরণা।
তুষার এখন অনেক দায়িত্বশীল। কাজের বুয়াকে যথাযথ নির্দেশনা দেয়ার দায়িত্বটা অনেকখানি পালন করে সে। অবশ্য এ নিয়ে বাবার সঙ্গে পরামর্শর করে। এরপর স্বাভাবিকভাবে বুয়াকে নির্দেশ দেয়, কোন বেলায় কী রাঁধতে হবে। এছাড়া এ সাপ্তাহের বিভিন্ন কাজের আগাম নির্দেশ দিয়ে রাখে।
আরিফ একটু উদাসীন প্রকৃতির মানুষ। বিয়ের পর কোনোদিনই এসব নিয়ে ভাবতে হয়নি। সবই লায়লা সামলেছে। আরিফ বুঝতে পারে, লায়লার গোছানো স্বভাব ও সাংসারিক বুদ্ধি অনেকটাই অবিকল তুষারের মধ্যে আছে। আরিফ মাঝে মধ্যে অভাক হয়ে ভাবে, এমন গোছানো স্বাভাবের বৌটা হঠাৎ সংসার ফেলে চলে গেল কেন? শরীরই কি সব? কে জানে, আর কিছু আছে কি না জীবনের অদেখা জটিল অধ্যায়?
দুপুরে স্কুল থেকে ফিরে আসে তুষার।
সাধারণত সন্ধ্যার পর নিজের অ্যাড. ফার্ম থেকে ফিরে আসে আরিফ। ছেলের কথা ভেবে ইদানীং একটু আগে ফেরে। মনে হয়, ঘরে ফিরে ছেলের সঙ্গে কথা বলে যে শান্তি তা আর পৃথিবীর কোথাও পাওয়া যায় না। আগে সাধারণত পেশাগত কারণে সে যেতো আলী জাকের, নূর ভাই কিংবা রামেন্দুদার কাছে। ব্যবসায়ী জগতের এসব শুভাকাক্সক্ষীদের সন্নিধ্যে তার ভালো লাগতো। এখন অফিসের বাইরে অন্যসব কিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে। আজও সন্ধ্যার আগে আরিফ বাসায় ফিরে এলো। হাত-মুখ ধুয়ে চা-নাশতা খাওয়ার সময় বাপ-বেটার আলাপ শুরু হলো। টিভিতে ন্যাশনাল জিওগ্রাফির অনুষ্ঠান। আরিফ-তুষার দু’জনই উৎসাহ নিয়ে দেখছে। টিভির পর্দায় ডায়নোসর মা-বাবা ও শিশু ডায়নোসর। তৃণভোজী ডায়নোসর বিশাল প্রান্তরে চরে বেড়াচ্ছে।
তুষার বললো, ‘কোটি কোটি বছর আগে এগুলো এভাবে চড়ে বেড়াতো।
আরিফ বললো, ‘বিজ্ঞানীরা তা-ই মনে করেন। তাদেরও সন্তান হতো। ডায়নোসর মা-বাবা যতœ নিতো তার সন্তানের। প্রায় ২১ কোটি বছর আগে এগুলো পৃথিবীতে এসেছিলো। এরপর কোটি কোটি বছর পৃথিবী দাপিয়ে বেড়িয়েছে। প্রায় ৭ কোটি বছর আগে এগুলো পৃখিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এর অনেক পর পৃথিবীতে মানুষ এসেছে।’

এমন সময় টিভির পর্দায় দেখা গেল সবুজ প্রান্তরে বৃষ্টি হচ্ছে। শিশু ডায়নোসর তার মা-বাবার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে। তুষার কেমন যেন করুণ মুখে সেদিকে তাকিয়ে আছে। এরপর এক সময় উঠে টিভি বন্ধ করে দিল। তারপর সে নিচের পড়ার ঘরে চলে গেল।
আরিফের কেমন যেস অস্বস্তি লাগছিল।
তুষার পড়ার ঘরে এসে বই সামনে নিয়ে ভাবছিলো অন্য কথা। সে ভাবছিল মানুষের জন্মের রহস্য কী? অনেক দিন আগে মাকে সে প্রশ্ন করেছিল, ‘মানুষের জন্ম হয় কেন? আমি কীভাবে এলাম?’
মা একটু অপ্রস্তুত হয়েছিল। তারপর বলেছিল, ‘আমরা মনের গভীরে আন্তরিকভাবে চেয়েছি। তাই তোকে পেয়েছি।’
তুষার জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘তুমি আর কে আমাকে চেয়েছিলে মা?
মা সেদিন বলেছিল, ‘আমি ও তোর বাবা।’ তিন বছর আগে সেদিন বাবাও মায়ের পাশে হাসিমুখে দাঁড়িয়েছিলেন। এখন অবশ্য তুষার অসুস্থভাবে মানুষের জন্মের রহস্য বুঝতে পারে। তবে সবটুকু নয়। সে উপলদ্ধি করেছে, ছোট্ট একটা ভ্রƒণ থেকে মায়ের জরায়ুর গভীরে ধীরে ধীরে জন্ম নেয় মানব সন্তান। এরপর তা একদিন নবজাতকের নরম শরীর হয়ে বেরিয়ে আসে। পৃথিবীতে জন্ম হয় এক নতুন মানুষের। অবশ্য তুষার অনুভব করে, তার এ শরীর ও মনের সবকিছুজুড়ে আছে ওই মানবী যে এখন চলে গেছে গু-া-মাতাল ‘মালেক মামার’ কাছে।
আরিফ আবার আগের মতো স্বচ্ছন্দ হয়ে উঠেছে তার ব্যবসা নিয়ে। দৈনন্দিন রুটিন আগের মতোই পুত্রকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে বনানীতে চলে যায় নিজের অ্যাড. ফার্মে। সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে বাবা ও ছেলের আবার দেখা হয়। শুক্রবার ছুটির দিন দু’জন কোথাও বেড়াতে যায় অথবা তুষারের বন্ধুরা আসে। সারা দিন বাসায় খুব মজা হয়।
আরিফ অনেকদিন লক্ষ্য করেছে অথবা হঠাৎ তুষারের ঘরে গিয়ে দেখতে পেয়েছে, কী যেন খুব আগ্রহ নিয়ে দেখছে তার পুত্র। বাবাকে দেখে লুকিয়ে ফেলেছে বালিশের নিচে। এ নিয়ে আর আগ্রহ প্রকাশ করেনি আরিফ। পুত্রের ব্যক্তিস্বাধীনতায় সে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়।
আরিফ কখনো হঠাৎ ভাবে লায়লার কথা। এতো মাস চলে গেল, একবারও জানা হয়নি কেমন আছে তার এক সময়ের স্ত্রী এবং বর্তমান স্বামী আবদুল মালেক! আরিফের মধ্য দিয়ে পুত্রের সব অপ্রাপ্তি ও পূর্ণতা যেন ঘুচে গেছে। তবে আরিফ জানে না, তুষারে কাছে আছে একটা স্মৃতিচিহ্ন পুরনো পারিবারিক ছবি। ওই ছবিতে তিন বছরের তুষারকে কোলে নিয়ে মা বসে আছে। ওই ছবিটিই তুষার সবার অজ্ঞাতে একা দেখে। সে মায়ের কোলো বসে থাকা শিশু বয়সটি উপলদ্ধি করে। অনুভব করে, একদিন মায়ের শরীরে মায়ের ইচ্ছায় সে অঙ্কুরিত হয়েছিল। এরপর একদিন পৃথিবীতে এসেছে। কিন্তু মা কেন চলে গেছে ওই গু-া ও মাতাল মালেক মামার কাছে?
একদিন মাঝরাতে চারদিকে মুষলধারে বৃষ্টি। তুষার নিজ ঘরে আলো জ্বেলে ওই পুরনো ছবিটি দেখছিল। ভাবছিল জন্মের রহস্যের কথা। ওই মায়ের শরীর থেকে তার জন্ম। এরপর হঠাৎ মুক্তি ও বিকাশ। সেই মা কোথায় চলে গেল? পৃথিবীতে কোটি কোটি বছর আগে ডায়নোসর এসেছিল। তারপর তারা বিলুপ্ত হয়েছে। মায়ের শরীর থেকে তার জন্ম। মা চালে গেছে তাকে ছেড়ে। কিন্তু নিচের শিকড়ের টান গভীরভাবে অনুভব করে তুষার। মাঝরাতে মায়ের ছবির দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে মা ও মায়ের কোলে বসে থাকা তিন বছর বয়স্ক নিজের আধা নিষ্পাপ চেহারার দিকে। তুষার ছবির দিকে তাকিয়ে থেকে বিড়বিড় করে বললো, ‘মা, আমার জন্মের রহস্য তুমি আবার নতুন করে বলো। আমাকে তুমি কোথায় রেখে গেলে মা? এই সাজানো সংসার, সরল-নিরীহ বাবা, অন্তহীন পুরনো স্মৃতিÑ সব আমাকে দিয়ে তুমি কোথায় গেলে মা? কেন গেলে ওই নিষ্ঠুর মালেক মামার কাছে? ওই গু-া-বদমাশটা কি আমার চেয়েও তোমার কাছে বেশি প্রিয়, মা?’
তুষার যখন মাঝরাতে বিড়বিড় করে এসব কথা বলছিল ছবিটির দিকে তাকিয়ে তখন পাশের ঘরে আরিফ ঘুমিয়ে আছে পরম শান্তিতে। বাইরে বৃষ্টির রাত। আরিফের মনে আর্শ্চয প্রশান্তি। তার একমাত্র পুত্র ও বংশধর তার কাছে পরম নির্ভর হয়ে আছে।

 

আমরা যেন না ভুলে যাই

সোহরাব হাসান



কশাইয়ের এ উৎসবেরে সাজানোর অলঙ্কার পাই কোথায়,
কী দিয়ে সাজাই এ গণহত্যা?
শোক বিলাপের রক্ত আমার চোখে পড়বে কার?
হাড্ডি যার শরীরে আমার রক্ত তো প্রায় নাই
যাও বা আছে বাকি
ক্ষমতা নাই তার প্রদীপের প্রাণ হওয়ার
পূর্ণ করতে পারবে না মদের কোনো গ্লাস
এ কোনো আগুনের ইন্ধন হতে পারে না
জš§ দিতে পারে না কোনো তৃষ্ণা।


(বাংলাদেশ : ফয়েজ আহমদ ফয়েজ)

 



১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশ ভূখ-ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা ছড়িয়ে পড়েছিল গোটা উপমহাদেশ, মহাদেশ, সারা পৃথিবীতে। মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণ ৯ মাস একটি বর্বর ও দুর্ধর্ষ বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, অকাতরে প্রাণ দিয়েছেন বহু যোদ্ধা, সম্ভ্রম হারিয়েছেন মা-বোনরা, বহু জনপদ ধ্বংস হয়েছে, মানুষের রক্তে ভেসে গেছে সবুজ প্রান্তর, আকাশ নীলিমা হারিয়েছে পাকিস্তানি বাহিনীর নিক্ষিপ্ত বোমার ধোঁয়ার কু-লীতে, শিশুরা কাঁদতে ভুলে গেছে, কিশোরীর হাসি মিলিয়ে গেছে শত্রু সেনার রূঢ় চাহনিতে, জায়নামাজে দাঁড়ানো অশীতিপর বৃদ্ধকেও গুলি করে হত্যা করেছে দখলদার

বাহিনী। তখন একাকার হয়ে গিয়েছিল মানুষের চোখের জল, শরীরের ঘাম ও শোণিত ধারা। এ লড়াই ছিল মিথ্যার বিরুদ্ধে সত্যের, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের, অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর। সেদিন বাঙালির মুক্তির লড়াইয়ে বাঙালি তো ছিলেনই, তাদের সঙ্গে সহমর্মিতার হাত বাড়িয়েছিলেন প্রতিবেশী বাঙালি, ভারতবাসী ও বিশ্ববাসী। আমরা বাংলাদেশের বাঙালি, আদিবাসী, বাংলাদেশের হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-ক্রিশ্চিয়ান সেদিন এক কাতারে দাঁড়িয়েছিলাম দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য। স্বাধীনতা আমাদের আকাক্সক্ষা ছিল, গণতন্ত্র আমাদের আরাধ্য ছিল এবং সাম্য ছিল দূরবর্তী লক্ষ্য। কতিপয় গাদ্দার আলবদর, রাজাকার মুসলিম লীগের জামায়াতি ছাড়া দেশের আপামর মানুষ এ লড়াইয়ে শামিল হয়েছিল সীমান্ত পার হয়ে। কেউ সীমান্তের ভেতর থেকেই লড়াই করেছেন। ওই সময় সবার লক্ষ্য ছিল, যতো দ্রুত সম্ভব দেশটি মুক্ত করা। এখন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যতো ভাগ হচ্ছে, দলীয়করণ হচ্ছে ওই সময় তা ছিল না। এ সময় মুক্তিযুদ্ধের একটিই স্লোগান ছিল ‘জয় বাংলা’। একজনই নেতা ছিলেন শেখ মুজিবুর  রহমান। তার নেতৃত্ব মেনেই সবাই যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মানুষের আত্মত্যাগ ছিল অপরিসীম। পৃথিবীর খুব কম জাতিকেই এতো প্রাণ ও রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করতে হয়েছে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশের বাইরে তথা বহির্বিশ্বের মানুষের ভূমিকাকেও খাটো করে দেখা যায় না।

বিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সমর্থন ছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি।লেখক, শিল্পী, সাংবাদিক থেকে শুরু করে সাধারণ শ্রমিকরা সর্বতোভাবে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তারা স্বাধীনতাকামী বাঙালির প্রতি দৃঢ় সমর্থন ব্যক্ত করেছেন। সাধ্যমতো সাহায্য-সহযোগিতাও জুগিয়েছেন। তাদের মধ্যে ছিলেন বিদেশি রাষ্ট্রনায়ক, রাজনীতিক, পার্লামেন্টের সদস্য, লেখক, শিল্পী, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, আইনজীবী, চিকিৎসক ও মানবাধিকার কর্মী। তাদের সমর্থন ও সহায়তা ছিল মানবতার পক্ষে, স্বাধীনতার পক্ষে। আমরা এ প্রবন্ধে স্বাধীনতার ওই সহযাত্রীদের কথা আকাক্সক্ষা ও ত্যাগের কথা বলবো। কৃতজ্ঞতা জানাবো আমাদের ওই দুঃসময়ে যারা পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তাদের বীরত্ব ও সাহসের কথা বিস্মৃত হওয়ার নয়।
আমরা কী করে ভুলতে পারি ফরাসি দার্শনিক আঁদ্রে মালরো’র কথা! তিনি ৭০ বছর বয়সেও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার আগ্রহ ব্যক্ত করেছিলেন। জার্মানির প্রতিরোধ যুদ্ধে তিনি ফরাসিদের উদ্বুদ্ধ করেছিলেন,

স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধে স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন, সময়-সুযোগ পেলে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামেও অংশ নেবেন, তার সহযোদ্ধাদের আহ্বান জানাবেন। বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ দূত রেহমান সোবহান প্যারিসে আঁদ্রে মালরোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলে আশ্বস্ত করেছিলেন, ফরাসি  সরকার যাতে পাকিস্তানের অস্ত্র সাহায্য না করে এ ব্যাপারে তিনি ফ্রাঞ্চ সরকারকে বলবেন। ... আমরা কী করে ভুলতে পারি আর্থার কে ব্ল্যাডের কথা। তিনি ঢাকায় মার্কিন কনসাল জেনারেলের পদে অধিষ্ঠিত থেকেও নিক্সন প্রশাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। মার্কিন সিনেটর অ্যাডওয়ার্ড কেনেডি পাকিস্তানে আমেরিকার অস্ত্র পাঠানোর বিরোধিতা করেছিলেন। সোভিয়েত রাষ্ট্রপতি নিকোলাস পদগোর্নি পাকিস্তানি সামরিক জান্তার প্রতি গণহত্যা বন্ধের দাবি জানিয়েছিলেন। জন কেলি জাতিসংঘের কর্মকর্তা হয়েও বাংলাদেশের মানুষের দুঃখ-দুর্দশায় বিচলিত হয়েছিলেন। ব্রিটিশ লেবার পার্টির নেতা ও পার্লামেন্টের সদস্য পিটার শোর পাকিস্তানে সব ব্রিটিশ সাহায্য বন্ধের দাবি জানিয়েছিলেন। তিনি বাঙালিদের দুঃখ-দুর্দশা দেখতে ছুটে এসেছিলেন শরণার্থী শিবিরে।
আমরা কী মনে রাখবো না ওই মুক্তিযোদ্ধা ওডারল্যান্ডকে! তিনি অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক হয়েও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন এবং বীরপ্রতীক খেতাব পান। তিনি দেশে ফিরে গিয়েও বাংলাদেশকে মনে রেখেছিলেন, পাকিস্তানি বাহিনীকে আখ্যায়িত করেছিলেন নিষ্ঠুর ও আগ্রাসী শক্তি হিসেবে। পাঠান যোদ্ধা মমতাজ খান বাঙালি মুক্তিযোদ্ধাদের ওষুধ ও সেবা দিয়ে বাঁচিয়েছিলেন। তিনি বাংলাদেশকে ভালোবেসে এখানেই থেকে গেলেন। ভারতীয় সেনাধিপতি জগজিৎ সিং অরোরা সেনাবাহিনীর পক্ষে পাকিস্তানি বাহিনীর নিঃশর্ত আত্মসমর্থন দলিলে স্বাক্ষর করেছিলেন। আমেরিকান দ্রোহি কবি অ্যালেন গিনসবার্গ পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশের শরণার্থীদের অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশা দেখে লিখেছিলেন বিখ্যাত কবিতা ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’। আমরা কী মনে রাখবো না প-িত রবিশংকর কিংবা ব্রিটিশ শিল্পী জর্জ হ্যারিসনকে! তারা ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ কনসার্টের আয়োজন করেছিলেন। বেতার শিল্পী দেব দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় উদাত্ত কণ্ঠে ৯ মাস বাঙালিকে উজ্জীবিত রেখেছেন। সব্যসাচী লেখক অন্নদাশঙ্কর রায় কলকাতায় বাংলাদেশের সমর্থনে আয়োজিত লেখক-শিল্পী সমাবেশে যোগদান শেষে লিখেছিলেন কালজয়ী পঙ্ক্তিÑ ‘যতোকাল রবে  পদ্মা, মেঘনা, গৌরী, যমুনা বহমান/ততোকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।’ ভারতের সর্বোদয় নেতা জয় প্রকাশ নারায়ণ বাংলাদেশের সমর্থনে সর্বদলীয় সম্মেলন আহ্বান করেছিলেন। আমরা কী ভুলে যাবো ব্রিটিশ সাংবাদিক অ্যান্থনি ম্যাসকারেনহাস কিংবা সাইমন ড্রিংকে। তারা পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার খবর ব্রিটিশ পত্রিকায় ছেপে বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়েছিলেন।

ওস্তাদ আলী আকবর খান বাংলাদেশের সমর্থনে সেতার বাজিয়ে মন্ত্রমুগ্ধ করেছিলেন মার্কিন দর্শক-শ্রোতাকে। আমরা কী ভুলে যাব ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কথা! তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে ইউরোপ ও আমেরিকাসহ বহু দেশ ঘুরেছেন।
তিনি আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ধাত্রীর ভূমিকা পালন করেছিলেন। সোভিয়েত নেতা লিওনেদ ব্রেজনেভ আমেরিকার সপ্তম নৌবহরের হুমকি মোকাবেলা করেছিলেন অষ্টম নৌবহর পাঠিয়ে, নিরাপত্তা পরিষদে তিনবার ভিটো প্রয়োগ করে চায়নিজ-মার্কিন দূরভিসন্ধি নস্যাৎ করেছিলেন। পাকিস্তানের কবি ফয়েজ আহমদ ফয়েজ শাসকের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে গণহত্যার প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন এবং ‘বাংলাদেশ’ শিরোনামে লিখেছিলেন মর্মস্পর্শী কবিতা। ওই কবিতা খুনির প্রতি ঘৃণা জানায় এবং স্পন্দন জাগায় অত্যাচারিতের রক্তে। আমরা কী ভুলে যাবো পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা মেঘালয়সহ প্রতিবেশী রাজ্যগুলোর লাখো-কোটি মানুষকে! তারা বাংলাদেশের আশ্রয়হীন মানুষকে আশ্রয় দিয়েছেন এবং নিজেদের বসতবাটি, স্কুল, অফিস, কমিউনিটি সেন্টার ছেড়ে দিয়েছেন। যুদ্ধের ঝুঁকি আপন কাঁধে তুলে নিয়েছেন তারা।  আমরা কি ভুলে যাবো ভারতীয় সেনাবাহিনীর সেসব কর্মকর্তা ও জওয়ানকে যারা বাংলাদেশের পক্ষে লড়াই করতে গিয়ে আত্মাহুতি দিয়েছেন? বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের কোথাও কোথাও তাদের কবর ও শ্মশান এখনো স্মারকচিহ্ন হয়ে আছে। আমরা কেন ওই শহীদদের নামে একটি শহীদ মিনার বা স্মৃতিসৌধ গড়তে পারলাম না?
আমরা কী ভুলে যাবো ভারতের বন্দরনগর মুম্বাইয়ের জুতা পলিশওয়ালাদের! তারা বাংলাদেশ সহায়তা তহবিলে নিজেদের অর্জিত আয়ের একাংশ দান করেছিলেন। কলকাতা বা আগরতলার সাধারণ মানুষ জয় বাংলার মানুষ বলে বাসের আসনটি ছেড়ে দিতেন। আমরা কি ভুলে যাবো সেসব মা-বোনের কথা যারা ভারতের বিভিন্ন স্থানে রওশন আরা ব্রিগেড গঠন করেছিলেন? আমেরিকার বন্দর শ্রমিকরা পাকিস্তানি জাহাজে অস্ত্র ওঠাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। পাকিস্তানি নাগরিক আহমদ সেলিম পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার বিরুদ্ধে কবিতা লিখে জেল খেটেছিলেন। ব্রিটিশ তরুণী মারিয়েটা বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গড়তে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন একটি সংগঠন অ্যাকশন বাংলাদেশ এবং তার বাড়িটি ছেড়ে দিয়েছিলেন ওই সংগঠনের অফিস হিসেবে।




আমরা কী ভুলে যাবো বিশ্বের লাখো-কোটি সাধারণ মানুষের কথা! তারা কায়মনোবাক্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সংগ্রামকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন দিয়েছেন এবং ধিক্কার জানিয়েছেন পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতাকে। বিবিসির সাংবাদিক মার্ক টালি এ দেশের যে কোনো রাজনৈতিক নেতার চেয়ে জনপ্রিয় হয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধের বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করে। আবদুল লতিফ খতিব মহারাষ্ট্রে জš§গ্রহণ করেও বাংলাদেশকে মাতৃভূমি হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের পক্ষে এক সাহসী কলমযোদ্ধা। মার্কিন প্রামাণ্য চলচ্চিত্রকার লেয়ার লেভিন বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরগুলোয় ঘুরে ‘জয় বাংলা’ ছবি তৈরি করেছিলেন। পরে ওই ছবি অবলম্বনে তারেক মাসুদ ও ক্যাথেরিন মাসুদ নির্মাণ করেন ‘মুক্তির গান’। মার্কিন লেখক রবার্ট পেইন বাংলাদেশের মুক্তি-সংগ্রামকে অবলম্বন করে একাধিক বই লিখেছেন। পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্টের নেতা জ্যোতি বসু বিধানসভায় ঘোষণা করেছিলেন, ‘একটি জাতিকে মিলিটারি দিয়ে পিষে মারা যায়। কিন্তু তাদের উত্থান ঠেকানো যায় না।’ ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী শচিন চন্দ্র সিংহ ষাটের দশকেই হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের সুহƒদ ও সহযোদ্ধা।
আমরা কী স্মরণ করবো না নাম না জানা অসংখ্য সুহƒদকে! তারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত সংগঠনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। আমরা কি মনে রাখবো না ওই দুঃসময়ের বন্ধুদের? যদি আমরা মনে না রাখি তাহলে সেটি হবে চরম অকৃতজ্ঞতা।
আজ নতুন প্রজš§কে জানাতে হবে ১৯৭১ সালের মরণজয়ী যুদ্ধে কারা আমাদের পক্ষে ছিলেন, কারা বিপক্ষে ছিলেন। জানাতে হবে বাঙালি হয়েও কারা বাঙালিদের মুক্তি-সংগ্রামের বিরোধিতা করেছিল, কারা সেদিন পাকিস্তানিদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল। একটি জাতির মুক্তিযুদ্ধ একটি দিন, ঘোষণা বা সামরিক ফরমানের মধ্যে আবদ্ধ থাকে না, তা ছড়িয়ে থাকে পুরো জাতির অস্তিত্ব এবং বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বরে।

Page 4 of 8

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…