Page 6 of 8

ধনবানে কেনে বই জ্ঞানবানে পড়ে

যতীন সরকার

 

এটি হয়তো নিছক একটি গল্প। তবু এ-গল্পের ভাবসত্যটিকে না-মেনে পারা যায় না। একালের নব্যধনিক এবং লুটেরা ধনিকরা যে বই নিয়ে মাথা ঘামায় না, গল্পটিতে সে-সত্যেরই প্রকাশ ঘটেছে। বাংলায় একটি প্রবাদ আছে- ‘আনাড়ির ঘোড়া নিয়ে বুদ্ধিমান চড়ে/ধনবানে কেনে বই বুদ্ধিমানে পড়ে

 

কন্ট্রাক্টরি করে অনেক কাঁচা পয়সার মালিক হয়েছেন এমন এক ব্যক্তি নিজের জন্য একটি আলিশান বাড়ি তৈরি করলেন। খুবই আধুনিক ধাঁচের বাড়ি। দামি আসবাব দিয়ে পুরো বাড়িটি সাজানো। এক সমঝদার বন্ধুকে বাড়িটি দেখাতে নিয়ে এলেন এবং বাড়িটি সম্পর্কে তার অভিমত জানতে চাইলেন। বন্ধু বললেন, ‘হ্যাঁ, খুবই চমৎকার বাড়ি তুমি তৈরি করেছ। আর বাড়ির আসবাবপত্রগুলোও খুবই চমৎকার ও রুচিশীল বটে। কিন্তু এ রকম একটা বাড়িতে ভালো একটা লাইব্রেরি না থাকলে ঠিক মানায় না। বাড়িতে বই থাকাটা খুবই জরুরি।‘
বাড়ির মালিক কন্ট্রাক্টর ‘কুচ পরোয়া নেই’ ভঙ্গিতে বললেন, ‘ঠিক আছে, আজই আমি আহম্মদ অ্যান্ড কোম্পানিতে ৭০০ টন বইয়ের অর্ডার দিয়ে দিচ্ছি।’
চুন-বালি-সুড়কি নিয়ে যার কারবার তিনি তো সবকিছুকেই টনের মাপে বিচার করবেন। তাই বইয়ের কথায়ও তার টনের হিসাবই মনে এলো, বইয়ের সম্পর্কেও অন্য রকম কিছু তিনি ভাবতে পারেন না।
এটি হয়তো নিছক একটি গল্প। তবু এ গল্পের ভাবসত্যটিকে না মেনে পারা যায় না। একালের নব্য ধনিক ও লুটেরা ধনিকরা যে বই নিয়ে মাথা ঘামায় না, গল্পটিতে ওই সত্যেরই প্রকাশ ঘটেছে। বাংলায় একটি প্রবাদ আছেÑ ‘আনাড়ির ঘোড়া নিয়ে বুদ্ধিমান চড়ে/ধনবানে কেনে বই, বুদ্ধিমানে পড়ে।’ একালের ধনবানদের ব্যাপারে এ প্রবাদটি বোধহয় এর সত্যতা ও কার্যকারিতা একেবারেই হারিয়ে ফেলেছে।
প্রবাদটি তাহলে কখন সত্য ছিল? কখনো সত্য ছিল কি?


বিপুল ধনে ধনবান হওয়ার যেসব পথ অর্ধশতাব্দী ধরে, বিশেষ করে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেÑ এখন খুলে গেছে, সেসব পথ এর আগে তৈরি হয়নি। সে সময় এখানে ধনবান হওয়ার ভিত্তি ছিল ভুমির স্বত্ব-স্বামিত্ব। কর্নওয়ালিসের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পথ ধরে ছোট-বড়-মাঝারি যে ভুস্বামীগোষ্ঠীর পত্তন ঘটেছিল, ধনবান বলতে মূলত ওই গোষ্ঠীর মানুষকেই বোঝাতো। সরকারি-বেসরকারি চাকরি কিংবা ওকালতি, ডাক্তারি, মাস্টারি ইত্যাদি পেশার ব্যক্তিরাও ওই গোষ্ঠী থেকেই বেরিয়ে আসতেন। অর্থে-বিত্তে তারা সম্পন্নতা ও স্বচ্ছলতা অর্জন করতেন অবশ্যই। তবে একেবারে লাগাম ছাড়া ধনবান হয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ তাদের সামনে খুলে যায়নি।
এরও অনেক আগে, আঠারো শতকের শেষে সদ্য ব্রিটিশ রাজত্ব প্রতিষ্ঠার সুবাদে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত ধরে এ দেশে একটি মুৎসুদ্ধি ধনিক শ্রেণি গড়ে উঠেছিল। তাদের বলা হতো ‘হঠাৎ নবাব’। সেকালের ওই ‘হঠাৎ নবাব’দের সংস্কৃতিহীনতা ও রুচিহীনতার অনেক মিল খুঁজে পাওয়া যাবে একালের নব্য ধনিক ও লুটেরা ধনিকদের সঙ্গে। তাদের মতোই বই সংস্পর্শহীন ছিলেন সেকালের হঠাৎ নবাবরা।
হঠাৎ নবাবদের গোষ্ঠীটি সমাজমঞ্চ থেকে আস্তে আস্তে বিদায় নিতে থাকে। এ গোষ্ঠীর অনেকেই পরে ভূস্বামীতে রূপান্তরিত হন। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত থেকে উপজাত ওই গোষ্ঠীটি সম্পর্কে আমাদের বিরূপতা অবশ্যই সঠিক ও সঙ্গত। তাদের যে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের খোজা প্রহরীরূপে গড়ে তোলা হয়েছিল সে কথা মোটেই মিথ্যা নয়। পরজীবী ওই নয়া সামন্ততন্ত্রীরাই যে সমাজ প্রগতির পথে দুস্তর বাধার সৃষ্টি করে রেখেছিল এ কথাও নিশ্চয়ই সত্য। তবু না মেনে পারি না যে, এর ভেতরেই সত্যের একটি উল্টো ধারাও সক্রিয় হয়ে উঠেছিল। ওই গোষ্ঠীর ব্যক্তিরাই বইয়ের সংস্পর্শে এসেছিলেন, বইপ্রেমিক হয়েছিলেন, বই লিখেছিলেন। অর্থাৎ আগেকার ‘হঠাৎ নবাব’দের বিপরীতে তারা হয়ে উঠেছিলেন সংস্কৃতিবান ও রুচিমান। তাই তারা যেমন বই পড়তেন তেমনই অন্যদেরও পড়তে উৎসাহ জোগাতেন।


তাদের ভেতর বই পড়ায় যারা মোটেই উৎসাহী ছিলেন না তারাও কখনো কখনো নিতান্ত অনিচ্ছায় হলেও উৎসাহী পড়ুয়াদের জন্য বইয়ের জোগান দিতেন। সে সময়কার পুস্তক প্রকাশকদের কাছে দেশের সব ছোট-বড় জমিদারের তালিকা থাকতো। নতুন বই প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওই তালিকা দেখে প্রকাশকরা জমিদারদের নামে ভিপিযোগে বই পাঠিয়ে দিতেন। জমিদারের বাড়ি থেকে ভিপি ফেরত যাওয়াটাকে একান্তই অসম্মানজনক মনে করা হতো। এ রকম অসম্মানের বোঝা বইতে কোনো জমিদারই রাজি ছিলেন না। তাই অন্তত ময়মনসিংহ জেলার এমন কয়েক জমিদারের কথা শুনেছি, তারা প্রকাশকদের পাঠানো বইগুলোর তালিকা তৈরি করে সেসবের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বিশেষ কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে রেখেছিলেন। এ রকম বইয়ের সংগ্রহ নিয়েই প্রতিটি জমিদার বাড়িতে একেকটি লাইব্রেরি গড়ে উঠেছিল। সেসব লাইব্রেরিতে কোনো জমিদার বা জমিদার নন্দন প্রবেশ করুন আর না-ই করুন, জ্ঞানপিপাসু প্রজাদের অনেকেই সেগুলোয় ভিড় জমাতেন। এভাবেই এবং এ সময় থেকেই বোধহয় ‘ধনবানে কেনে বই, জ্ঞানবানে পড়ে’ প্রবাদটির প্রচলন ঘটেছে।
অনিচ্ছায় নয় শুধু। জ্ঞানবান সৃষ্টিতে অথবা জ্ঞানবানদের পৃষ্ঠপোষকতাদানে স্বেচ্ছায় যারা এগিয়ে এসেছেনÑ তেমন ধনবানের সংখ্যাও একেবারে কম ছিল না। এ রকম অনেক জমিদারই নিজেদের বাড়িতে সমৃদ্ধ লাইব্রেরি গড়ে তুলেছিলেন। ধনবাড়ী, মুক্তাগাছা ও শেরপুরের জমিদারদের লাইব্রেরির কথা তো সর্বজনবিদিত। বাড়ির বাইরে পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠায়ও অনেক জমিদার আর্থিক সহায়তা দান করেছেন। রাজশাহীর ‘বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতি’ ও এর সমৃদ্ধ পাঠাগারটি তো এ রকম বিদ্যোৎসাহী জমিদারের দানেই প্রতিষ্ঠিত। ব্রিটিশ শাসন আমলেই স্বদেশপ্রেমিক স্বাধীনতা সংগ্রামীরা বই পড়াটি স্বদেশপ্রেম ও স্বাধীনতা সংগ্রামের অপরিহার্য অঙ্গে পরিণত করে ফেলেছিলেন। তাদের উদ্যোগেই গ্রামে গ্রামে বা মহল্লায় মহল্লায় পাঠাগার প্রতিষ্ঠা একটি আন্দোলনে রূপ নেয়। ওই আন্দোলনেও তখনকার ধনবানদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের সক্রিয় সহযোগিতা ছিল।


দুই.
দুঃখ এই, ব্রিটিশ শাসন আমলের ধনবানদের পথে ব্রিটিশ শাসনমুক্ত দেশের ধনবানরা পা বাড়ালেন না। পাকিস্তান জমানায় নয়, স্বাধীন বাংলাদেশেও নয়। ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’-এর জিগির তুলে ওই অদ্ভুত রাষ্ট্রটি কায়েম করে যারা সেখানে রাতারাতি ধনবান হয়ে উঠেছিল তাদের ধন অর্জনের পেছনে বইয়ের কোনো ভূমিকা ছিল না। বরং বই ছিল তাদের মতলব হাসিলের পথের প্রতিবন্ধক। তাই তারা বইবিরোধী না হয়ে পারেনি। বই নয়, নির্বিবেক বিষয়-বুদ্ধিই হয়ে উঠেছিল তাদের চালিকাশক্তি। বিষয়-বুদ্ধিই তাদের ভেতর সাম্প্রদায়িক ভেদ-বুদ্ধিটিকে উসকে দিয়েছিল। ওই ভেদ-বুদ্ধি থেকে জন্ম নিয়েছিল ‘পাকিস্তান’ নামক যে সংস্কৃতিবিরোধী রাষ্ট্রটি এর পক্ষে বইভীতি হওয়াই ছিল একান্ত স্বাভাবিক।
পাকিস্তান কায়েম হয়ে যাওয়ার পর সমাজের সব মানুষই যে সংস্কৃতিহীন হয়ে গিয়েছিল তা তো নয়। অন্তত পাকিস্তানের পূর্ব অংশের বাঙালি জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল সাংস্কৃতিক রুচিঋদ্ধ। এই সংস্কৃতিমান মানুষের বইপ্রীতি পাকিস্তান রাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারক ও কর্তৃত্ববানদের একান্ত স্বস্তিহীন করে তুলেছিল। এ ব্যাপারে নাৎসিবাদী হিটলার ও তার অনুচরদের সঙ্গে পাকিস্তানবাদীদের ভাবনা একেবারে খাপে খাপে মিলে যায়। নাৎসিবাদ ও পাকিস্তানবাদÑ এ দুয়েরই লক্ষ্য ছিল সভ্যতার চাকাটা পেছন দিকে ঘুরিয়ে দেয়া। আর এ কাজে বই-ই হচ্ছে প্রধান বাধা। কারণ বই তো সভ্যতার বাহক। সভ্যতার বাহকটিকে সভ্যতাবিরোধীরা সুনজরে দেখে কী করে? নাৎসিবাদীরা সভ্যতার বাহক বইয়ের বহ্নুৎসব করেছিল প্রকাশ্যে ঢাকঢোল পিটিয়ে। পাকিস্তানবাদীরা ঠিক তেমনটি করেনি। তারা মানুষকে বই বিমুখ করার অন্য রকম একটি ধারা চালু করতে চেয়েছিল। ওই ধারাটি সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের। পবিত্র ধর্মের অপবিত্র ব্যাখ্যা দিয়ে এখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বোধ-বুদ্ধি সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের খাতে প্রবাহিত করে দেয়ার মতলব এঁটেছিল তারা। ধরেছিল বই নিষিদ্ধ করার পথ। সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষমুক্ত উদার ও মুক্তবুদ্ধি সাধকদের তারা ভয় পেতো। সমাজ বদলের প্রবক্তাদের সম্পর্কে তো তাদের ভীতি ছিল সীমাহীন। তাই যে বইয়েই প্রকাশ আছে কিংবা আছে সমাজবদলের আর্তি ও পথনির্দেশ সেসব বই-ই হয়ে উঠেছিল তাদের চোখের বালি। কিন্তু সংখ্যাধিক্য তো সে রকম বইয়েরই। কয়টা বই নিষিদ্ধ করতে পেরেছিল পাকিস্তানবাদের প্রবক্তারা? বইয়ের প্রতি পাকিস্তানবাদীদের নিষেধবিধিই বরং পাকিস্তান রাষ্ট্রের অধিকার বাঙালিদের বইপ্রেমটি আরো জোরদার করে তুলেছিল, নিষিদ্ধ বইয়ের প্রতি তাদের আকর্ষণ দুর্বার হয়ে উঠেছিল। বলা যেতে পারে, বাঙালি জাতির স্বাধিকার চেতনা ও স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম প্রেরণাটি তার বইপ্রেম থেকেই উৎসারিত হয়েছিল। হায়! রক্ত ও ইজ্জত দিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর এ রাষ্ট্র তথা এ জাতির হর্তাকর্তা, বিধাতা হয়ে বসলো যে গোষ্ঠীটি সে গোষ্ঠীর ভেতর বইপ্রেমিক সংস্কৃতিমান বাঙালি জাতির ঐতিহ্যের ছিটেফোঁটাও নেই। আগেই বলেছি, বাংলাদেশের এই নব্য ধনিক ও লুটেরা ধনিকগোষ্ঠী অষ্টাদশ শতকের কলকাতার ‘হঠাৎ নবাব’দেরই সগোত্র। হঠাৎ নবাবদের চেয়ে তারা বরং অনেক ধূর্ত ও ধড়িবাজ। আঠারো শতকের বাঙালি হঠাৎ নবাবদের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা ছিল না। কিন্তু বিশ শতকের স্বাধীন বাংলাদেশে রাষ্ট্র ক্ষমতাটি এখানকার নব্য ধনিক ও লুটেরা ধনিকরাই দখল করে নিয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানে দেশের জনগণকেই বলা হয়েছে রাষ্ট্রের ‘মালিক’। ওই মালিকানা বেহাত হয়ে যেতে বেশিদিন লাগেনি। এখন তো বাংলাদেশের জাতীয় সংসদেরও নিয়ন্তা নব্য ধনিকরাই, রাজনীতিকদের বদলে তারা সে সংসদের অধিকাংশ আসনের দখলদার হয়ে বসেছে। এ কথা তো জানাই আছে, ক্ষমতা অধিকারীদের সংস্কৃতিই হয়ে ওঠে পুরো সমাজের সংস্কৃতি। বর্তমানে এ দেশে ক্ষমতার মঞ্চে যারা অধিষ্ঠিত তাদের কি সত্যি সত্যিই কোনো সংস্কৃতি আছে? সংস্কৃতিহীন ক্ষমতাবানদের দেশটি তো সংস্কৃতিহীনই হবে। সে দেশে বইয়ের কদর করবে কে?


তিন.
ব্রিটিশ আমলে ধনবানদের পৃষ্ঠপোষকতায় এ দেশে যেসব লাইব্রেরি গড়ে উঠেছিল এর অধিকাংশই পাকিস্তান জমানায়ও টিকে ছিল। কোনো কোনোটির শ্রীবৃদ্ধি হয়েছিল। জমিদারি প্রথার বিলুপ্তি ও অনেক জমিদারের দেশত্যাগের ফলে জমিদারদের লাইব্রেরির অনেকটিই অবশ্য নষ্ট হয়ে যায়। এরপরও যেসব পাবলিক লাইব্রেরি টিকে গিয়েছিল এরও অধিকাংশ ধ্বংস হয়ে যায় একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়। এ রকম অন্তত দুটি লাইব্রেরির কথা অত্যন্ত বেদনার সঙ্গে স্মরণ করছিÑ একটি ময়মনসিংহের দুর্গাবাড়ী ধর্মসভা লাইব্রেরি ও অন্যটি ঢাকার রামমোহন লাইব্রেরি। প্রথমটি ছিল সনাতনী হিন্দুদের দ্বারা পরিচালিত ও দ্বিতীয়টি প্রগতিশীল ব্রাহ্মদের। দুটি লাইব্রেরিরই প্রতিষ্ঠাতারা ছিলেন ধর্ম আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। কিন্তু লাইব্রেরি দুটিতে ধর্মীয় বই যত ছিল এর চেয়ে বেশি ছিল ধর্মনিরপেক্ষ বই। এমন অনেক অমূল্য ও দুর্লভ বই এ দুটি লাইব্রেরিতে ছিল যেগুলোর আর কোনো কপি হয়তো কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। ময়মনসিংহের ধর্মসভা লাইব্রেরিতে তো হাতে লেখা পুঁথিই ছিল কয়েকশ’। সবই লুণ্ঠিত হয়ে মুদি দোকানের ঠোঙ্গায় পরিণত হয়েছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে এ রকম পাবলিক লাইব্রেরির পাশাপাশি কতজনের ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারের যে একই পরিণতি ঘটেছে, আমরা কেউই সেসবের খোঁজ নিইনি। এভাবে আমাদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাসের কত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-উপাত্ত যে হারিয়ে গেছে এ সম্পর্কেও আমরা অবহিত ও সচেতন হইনি বললেই চলে। এ রকম শূন্যতার মধ্যে কিছুতেই বেঁচে থাকা যায় না। অন্তত মননশীল মানুষরূপে বেঁচে থাকা তো যায় না! সত্যিকার মননশীল মানুষরূপে বেঁচে থাকার নামই যেহেতু সংস্কৃতি এবং বই যেহেতু ওই সংস্কৃতির অপরিহার্য বাহন সেহেতু বই পড়ার আয়োজনের বিস্তৃতি ঘটাতেই হবে। কীভাবে তা সম্ভব? ‘বই কিনে কেউ দেউলে হয় না’Ñ বিদগ্ধ সংস্কৃতিমান প্রমথ চৌধুরী এমন একটি কথা বলে এক সময় আমাদের আশ্বস্ত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নুন আনতে পান্তা ফুরোয়Ñ বইপ্রেমিকদের মধ্যে এমন মানুষেরই তো সংখ্যাধিক্য। এ রকম যারা প্রায় জন্মসূত্রেই দেউলে হয়ে আছে, প্রমথ চৌধুরীর আশ্বাসবাণী তাদের কতটুকু কাজে লাগবে? বই কিনে বই পড়ার আগ্রহ চরিতার্থ করা তো তাদের পক্ষে একেবারেই অসম্ভব। কাজেই সবার বইপড়ার সুযোগ অবারিত করে দেওয়ার জন্য পাবলিক লাইব্রেরির কোনো বিকল্প নেই। ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় আগেকার জমিদাররা যেভাবে পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠায় অর্থের জোগান দিতেন, এখনকার নব্য ধনিকরাও যাতে তেমনটি করে এ জন্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কায়দা-কানুন খুঁজে বের করতেই হবে। যতদিন সমাজে ধনবৈষম্য বজায় থাকবে ততদিন পর্যন্ত ‘ধনবানে কেনে বই, জ্ঞানবানে পড়ে’ প্রবাদটির সত্যতাটি অবশ্যই প্রতিষ্ঠিত রাখতে হবে। যেভাবেই হোক বই কেনার জন্য ধনবানদের উদ্বুদ্ধ অথবা প্রলুব্ধ কিংবা বাধ্য করা খুবই প্রয়োজন। লাইব্রেরি আন্দোলন বা পাঠাগার আন্দোলনের কথা এক সময় খুবই শোনা যেত। এখনো মাঝে-মধ্যে শোনা যায় বটে। কিন্তু এ আন্দোলনের আগের সেই রমরমা ভাব কিংবা উচ্ছ্বাস এখন আর অবশিষ্ট নেই। তবু লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠায় একালেও কোনো কোনো তরুণকে যখন উৎসাহিত হতে দেখি। তখন আমার উৎসাহের পালেও কিছুটা হাওয়া লাগে বৈকি। তবে সেই সঙ্গে তিক্ত অভিজ্ঞতাজাত কিছু হতাশাও মনকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। দেখেছি, লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করা যত কঠিন এর চেয়ে অনেক কঠিন তা টিকিয়ে রাখা। স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া কিংবা উঁই আর ইঁদুরের মতো প্রাকৃতিক ও জৈবিক উপদ্রবে আমাদের দেশে বইয়ের আয়ু ক্ষয় হয় খুবই দ্রুতবেগে। আবার বই পড়ি বা না পড়ি, বই অপহরণে আমরা সবাই কৃতবিদ্য। অপহরণের হাত থেকে লাইব্রেরির বই রক্ষা করা খুবই কঠিন হয়ে পড়ে। তাই দেখা যায়, জন্মের স্বল্পকাল পরই অধিকাংশ লাইব্রেরির মৃত্যু ঘটে যায়। চুপি চুপি বলি, আমি কিছু ক্ষেত্রে এবং বিশেষ শর্তাধীনে বই চুরিরও সমর্থক। কতিপয় ধনবান যখন তার উন্নত রুচির প্রমাণ প্রদর্শনের জন্য শেলফে বই সাজিয়ে রাখে কিংবা নিতান্ত খেয়ালের বশে দু’চারটি বই কিনে ফেলে অথচ সেসব বই নিজেও পড়ে না এবং অন্যকেও পড়তে দেয় না তখন ধনহীন জ্ঞানবানদের দায়িত্বই হয়ে যায় জ্ঞানহীন ধনবানের কব্জা থেকে বইগুলোকে বের করে আনা। এ জন্য প্রয়োজনে চৌর্যের আশ্রয় নেয়াটা মোটেই অবৈধ বা অসঙ্গত নয় বলেই আমার বিশ্বাস। এভাবেই বরং আমরা ‘ধনবানে কেনে বই, জ্ঞানবানে পড়ে’ প্রবাদটিকে এ যুগেও সার্থক করে রাখতে পারি। লাইব্রেরিতেই হোক কিংবা ব্যক্তিগত সংগ্রহেই হোক, বই না পড়ে আসবাবরূপে সাজিয়ে রাখা অবশ্যই অবৈধ ও অসঙ্গত। সঠিকরূপে বই পড়ে বইয়ের ভেতর থেকে এর সঠিক মর্মবস্তু যারা আহরণ করতে পারবেন তারাই হবেন যথার্থ জ্ঞানবান। ওই যথার্থ জ্ঞানবানরাই মানুষকে সমাজবদলের পথ দেখাবেন এবং তৈরি হবে এমন সমাজ যেখানে সবাই হবেন জ্ঞানবান। অন্যায় ধনে ধনবান হওয়ার পথ সে সমাজে খোলা থাকবে না।

সুইসাইড

রফিকুর রশীদ 

 

অবশেষে নীপা মুখ খুলল।
আজ কদিনের মধ্যে সে মোবাইলেও কথা বলেনি কারও সঙ্গে। সত্যি বলতে কী এ পরিবারে অনভিপ্রেত অঘটনটি ঘটে যাবার পর প্রথমে তার কাছ থেকে নিজস্ব মোবাইল সেটটি কেড়ে নেওয়া হয়, তারপর ল্যাপটপটিও কৌশলে সরিয়ে নেওয়া হয় তার ঘর থেকে। এই উদ্যোগে প্রত্যাশিত কোনও ফল না পেয়ে কয়েকদিন পর সবই আবার ফিরিয়ে দেওয়া হয় নীপাকে। এসব ফেরত পাবার পর তার ভেতরে নতুন কিছু প্রতিক্রিয়া দেখতে না পেয়ে বাবা মা দুজনেই হতাশ হয়। নীপার মনের জগতে প্রবেশের আর কোনও পথই খোলা নেই বলে মনে হয়। তবু সকালে কোর্টে বেরোনোর আগে জামান উকিল এসে মেয়ের সামনে হাঁটু ভেঙে দাঁড়ান, মেয়ের মাথায় হাত রেখে বলেন,
নতুন একটা মোবাইল সেট নিবি মা?
নীপা নিরুত্তর। খেলনা পাবার সম্ভাবনায় খুশিতে নেচে উঠার বয়স অনেক আগেই সে পেরিয়ে এসেছে। বাবার মুখের দিকে চোখ তুলে তাকাতেই পারে না, কথা বলবে কী করে! দুহাতের অঞ্জলিতে মেয়ের মুখ তুলে ধরে বাবা আবারও বলেন,
যাকে ইচ্ছে ফোন করিস, আপত্তি নেই। তুই কথা বল মা, একটা কিছু বল! নীপা কিছুই বলে না, যেন বা বাজপড়া কাঠপাথর। না

না, পাথর হলে চোখের পাপড়ি ভেঙ্গে অশ্র“ গড়িয়ে পড়বে কেন! সেই অশ্র“দাহ তার বাবাকেই বা নীরবে সংক্রমিত করবে কেন! পকেট থেকে রুমাল বের করে মেয়ের চোখ মুছিয়ে দিয়ে জামান উকিল অনুনয় করে ওঠেন,
আমার সঙ্গে না হোক তোর মায়ের সঙ্গেই কথা বল নীপুমনি।

নীপার নামের এই আদুরে আদল তার বাবারই দেওয়া। কলেজে ওঠার পর ওই মিষ্টি নামটি কীভাবে যেন আড়ালে চলে যায়। দীপ্তও একদিন আদর করে ডেকেছিল ওই নামে। ভালো লাগেনি নীপার। নিষেধ করেছিল দীপ্তকে। ওটা বাবার ডাকা নাম, অপেক্ষায় থেকেছে নীপা- আবার কোনো ইচ্ছে হলে বাবাই ডাকবে ওই নামে। তো সেই সময় কি এতদিন পর পারিবারিক সংকটের এই দুর্দিনে হলো! নীপার দুর্বল শরীর কেঁপে ওঠে কী এক শিহরণে। বড় বড় দুটি চোখ বিস্ফোরিত করে তাকায় বাবার মুখের দিকে। মেয়ের চোখে চোখ পড়তেই তিনি আর্তনাদ করে ওঠেন- তুই কথা না বললে আমরা বাঁচব কী করে বল দেখি!
না, তবুও বাবার সঙ্গে কথা বলা হয় না নীপার। দিনের শেষে কথা বলে সে তার মায়ের সঙ্গে। কথা অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। খুব ছোট্ট বাক্য। কিন্তু তার ওজন এবং শক্তি ইরাক বিধ্বংসী বোমার চেয়ে মোটেই কম ভয়াবহ নয়। অথচ সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার পর কত অবলীলায় মায়ের

মুখের উপরে জানিয়ে দেয় নীপা,
আমি সুইসাইড করব মা।
আত্মহত্যা না বলে এই ইংরেজি শব্দটিই সে প্রয়োগ করে। তার মায়ের তখন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট দশা। কানের মধ্যে ভোঁ ভোঁ করে। মাথা ঘুরে ওঠে চক্কর দিয়ে। দুহাতে মেয়েকে জাপটে ধরে আর্তনাদে ফেটে পড়ে।
এ তুই কী বলছিস নীপা!
নীপা খুব সহজে খটখটে গলায় জানায়,

হ্যাঁ, আমি সুইসাইড করব।
যেনবা সুগভীর চিন্তাভাবনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত তার। অন্তর্গত সমস্ত দ্বিধার পাঁচিল অতিক্রম করে এসেছে সে। গত কয়েকদিন সে কথা বলেনি বটে কারও সঙ্গে, কিন্তু ভাবনার প্রবাহ তো রুদ্ধ হয়ে থাকেনি। যথেষ্ট বড় হয়েছে সে। বলা যায় নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিজে গ্রহণ করার মতো ঢের সময় সে পেয়েছে। তাই দ্বিধাহীন কণ্ঠে সে ঘোষণা করতে পারে, সে সুইসাইড করবে। আগাম ঘোষণা দিয়ে এ পথে কে কবে নেমেছে! আর এই প্রলয়ঙ্করী ঘোষণা শোনার জন্যই কি তার বাবা মা এতদিন কান পেতে বসে আছে?
নীপার মা সহসা যেন কোন যাদুমন্ত্রে নিজেকে সামলে নেন। মেয়ের পাশে বসে পরম সখ্যে এবং নির্ভরতায় হাত বাড়িয়ে দেন তার কাঁধে। নীপার চুলের অরণ্যে মমতার আঙুলে বিলি কাটতে কাটতে বলেন,
শোন মা, মানুষের তো একটাই জীবন। মেয়েদের সে জীবন আবার ভীষণ পলকা। সেই জীবন নিয়ে হেলাফেলা করলে চলে?
নীপার মুখে কথা নেই। সব কথার শেষ কথা যেন তার বলা হয়ে গেছে। নীপার মা এবার একটু ঘুরে মুখোমুখি বসেন। মেয়ের মুখটা তুলে ধরেন। চোখে চোখ পড়তেই মেয়েকে চেপে ধরেন,
আমাকে একটা সত্যিকথা বলবি নীপা?
নীপা তাকিয়ে থাকে উত্তরহীন অপলক।
দীপ্তকে তুই ফিরিয়ে দিলি কেন? সাতকান্ড কেলেঙ্কারির কথা জানার পরও তো সে এ বিয়ে ভেঙ্গে দিতে চায়নি! বরং আমি তো শুনেছি তার বাপমাকে পর্যন্ত সে কনভিন্স করতে চেষ্টা করেছে, বুঝিয়েছে অঘটনের পেছনে তোর কোনও হাত ছিল না। সেটা স্রেফ দুর্ঘটনা। তোর জন্যে সে নিজের মা-বাপের উপরে চাপ সৃষ্টি করেছে। তারপরও তুই আর কী চাস বল দেখি!
কী আর বলবে নীপা। মায়ের চোখ থেকে নীরবে চোখটা নামিয়ে নেয়। মা- বাবার কষ্টের জায়গাটা সে উপলব্ধি করতে পারে।

দীপ্তর মতো সুপাত্র বেহাত হবার ধাক্কা সামলে ওঠা সোজা কথা! বেহাত মানে চূড়ান্ত অর্থে নীপাই তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে, দুই পরিবারের স্বপ্নসাধ ভেঙে চুরমার করেছে, একেবারে শেষবেলায় বিয়েতে অসম্মতি জানিয়েছে; জামান উকিলের তো হিতাহিত জ্ঞান হারাবারই কথা। একমাত্র কন্যা আদরের নীপুমনির গায়ে তো আর অল্প দুঃখে হাত ওঠেনি তার। এমনিতেই তার সামাজিক মর্যাদা মাটিতে মিশিয়ে দেওয়ার জন্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ যে নোংরা খেলায় মেতেছে, তাতেই তিনি উ™£ান্ত বিপর্যস্ত। প্রতিকারের পথ না পেয়ে নিজের মাথার চুল ছেঁড়ার দশা। সেই দুঃসময়ে দীপ্ত এগিয়ে আসে। হাত বাড়িয়ে দেয়। একটু দূর সম্পর্কের চাচাতো বোনের ছেলে। ছেলেতে- মেয়েতে যেমন সম্পর্ক, বলা যায় দুই পরিবারের অনুচ্চারিত প্রশ্রয়ে তা পরিণয়ের দিকেই এগিয়েছে। এমন কি বিয়ের কথাবার্তাও পারিবারিকভাবে যখন চূড়ান্তপ্রায়, তখনই ঘটে অঘটন। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ফাঁদে আটকে পড়ে নীপা, অতপর একদিন নিরুদ্দিষ্ট রাত্রিবাস। সেই একটিমাত্র রাত্রিই সব ওলট-পালট করে দেয়। এই ঘটনা জানাজানি হলে দীপ্তর বাবা এ বিয়েতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন; স্বামী-স্ত্রী যুক্তি করে কৌশলে এড়িয়ে যেতে চান। বেঁকে বসে দীপ্ত। বাবামায়ের মুখের উপরে যুক্তি দেখায়- কিডন্যাপের শিকার হয়েছে বলে এর জন্যে তো নীপাকে দায়ী করা যায় না। তাহলে দুর্ভাগ্যের ভার সেই নীপাকেই কেন বইতে হবে!
সেই দীপ্তকে নীপাই কেন প্রত্যাখ্যান করেছে এ ব্যাখ্যা কিছুতেই খুঁজে পায়নি তার মা-বাবা। এ প্রশ্ন তারা আগেও করেছেন। এমন কী এই প্রশ্ন করতে গিয়েই তো প্রবল উত্তেজনায় অস্থির হয়ে জামান উকিল জীবনে প্রথমবারের মতো মেয়ের গালে চড় মারেন। সেই থেকে নীপা নিস্তব্ধ নির্বাক। এতদিন পর মুখ খুলতেই আবার সেই জেরা- দীপ্তকে তুই ফিরিয়ে দিলি কেন? নীপার মা বলেন ফেলেন;
তুই একবার ফোনে কথা বললেই দেখিস দীপ্ত আবার এগিয়ে আসবে।
আবার দয়া দ্যাখ্যাবে, তাই না মা?
নীপার মা চমকে ওঠেন,
দয়া! দয়ার কথা উঠছে কেন?
শুধু আমাকে নয় মা, ওরা তোমাদেরও দয়া করতে চায়। দয়া দিয়ে সংসার চলে, মা? তুমি বলো; চলে?
কী জানি বাপু কী যে বলছিস; তুই-ই জানিস। কেন একবার ফোন করেই দেখ না! মুখে দুবার চুকচুক শব্দ করে নীপা বলে,
তার মানে তোমরা দয়ার কাঙাল হয়ে বসে আছ তাই তো! তোমাদের কিডন্যাপড হওয়া মেয়েকে অনুগ্রহ করে কেউ বিয়ে করলেই তোমরা খুশি!
দয়া হবে কেন, দীপ্ত তোকে ভালোবাসে বলেই এগিয়ে এসেছিল।
ভালো তো আমিও বেসেছি তাকে। ভালোবেসেছি। বিশ্বাস করেছি। কিন্তু সে আমার উপর থেকে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে মা। বিশ্বাস হারানোর পরও কি ভালোবাসা থাকে? সেই ভালোবাসা দিয়ে কি জীবন চলে, তুমিই বলো!

এতক্ষণে ধস নামে নীপার মায়ের কণ্ঠে। আগের সেই জোর খুঁজে পান না, কেমন যেন ফ্যাসফেসে গলায় বলেন,
চলে চলে। কতভাবে যে মেয়েমানুষের জীবন চলে যায়, তুই তার কী জানিস!
ওই যে তুমি বললে- মানুষের একটাই জীবন!
শুধু আমি বলব কেন, ওটাই সত্যি।
সেই জীবনে বিশ্বাসেরও খুব দরকার মা।
এসব কথা কেন বলছিস নীপা?
নীপা এবার বিছানা ছেড়ে নেমে আসে। পায়ে পায়ে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। দূরে দৃষ্টি ফেলে কী যেন খোঁজে। আবার ফিরে আসে ঘরে। বহুদিন পর মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে বলে,
এই যে তোমরা আমাকে ভালোবাসো, ভালোবাসো বলেই বিশ্বাস করো। তাই না?
হ্যাঁ, সন্তানকে তো বিশ্বাস করতেই হয়।
সন্তান বলে নয় মা, ভালোবাসলেই বিশ্বাস করতে হয়। তোমাদের দীপ্তবাবু খুব ভালো ছেলে, কিন্তু বিশ্বাস হারিয়েছে।
তার মানে?
সে বার বার জানতে চেয়েছে গুণ্ডারা সেই রাতে আমাকে কতবার রেপ করেছে। একথা তোমরা কতবার জিগ্যেস করেছ মা?
মায়ের মুখে কথা নেই। চোখে বিস্ময়। নীপা একটু দম নিয়ে বলল, অবশ্য দীপ্ত বাবু অতিশয় দয়ালু ভদ্রজন। আমাকে সে আশ্বস্ত করেছে- তুমি সত্যি কথাটা স্বীকার করলেও এ বিয়ে হবেই। তুমি সত্যিটাই বলো- কতবার এবং কতজন....
নীপার মা এবার চিৎকার করে ওঠেন,
তুই থাম নীপা। থাম।
নীপার তখন কথায় পেয়ে বসেছে। কে থামায় তাকে! সে বলে,
থামব কেন মা? কেন থামব বলো! জীবন তো মোটে একটাই। এ জীবনে বিশ্বাসহীন ভালোবাসা আমি চাই না মা।
নীপার মায়ের কণ্ঠে ছলকে ওঠে আর্তনাদ,

 

নীপা!
সেদিন রাতে যা ঘটেছে তার সবই আমি তোমাদের বলেছি। তাকেও বলেছি। লুকাইনি কিছুই। বলতে পারো মা, তবু তার কেন মনে হলো- আমি সত্যি বলিনি?
নীপার মা কোথা থেকে আচনক এক যুক্তি খুঁজে বের করেন,
হয়ত তোকে নয়, সন্দেহ করে সে বাদলদের গ্র“পের সবাইকে। ওদের পক্ষে তো সবই সম্ভব!
কই সব সম্ভব! আমাকে নিয়ে গিয়ে রাতভর আটকে রেখেছে ঠিকই, কিন্তু আর কী করতে পেরেছে? যুবতী মেয়েকে এক রাত আটকে রাখার খবর জানাজানি হবার পর তোর বাবার কি বেইজ্জত হতে আর কিছু বাকি আছে ভেবেছিস!
না না, ওরা তো ওইটুকুই চেয়েছে। বাদলের বাবা এবার নোমিনেশন পাচ্ছে না এটা প্রায় কনফার্ম। কাজেই আমার বাবাকে ডিসর্টাব করবেই।
তাই বলে তোকে নিয়ে টানাটানি .....
ওরা তো টের পেয়েছে আমার বাবার সবচেয়ে দুর্বল জায়গা কোথায়। তো সেই দুর্বল জায়গাতেই আঘাত করতে হবে, কেমন?
বর্তমানে রাজনীতি এতটাই নোংরা হয়ে গেছে।
সেই জন্যেই তো বাবাকে আমি রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে বলি।
হ্যাঁ, তাহলেই হয়েছে। তার চোখে এখন এমপি হবার স্বপ্ন।
আচ্ছা মা, রাজনীতি করবে বাবা, আর তার জন্যে বলি হতে হবে আমাকে, এটা কেমন বিচার বলো দেখি!
নীপার মা এ প্রসঙ্গের যবনিকা টেনে বলেন,
সে কথা তোর বাপকে শুধাস। এখন চল দেখি...
না মা শোনো। এই জন্যেই ঠিক করেছি আমি সুইসাইড করব।
আবার চমকে উঠেন নীপার মা! দাঁড়িয়ে পড়েন থমকে। এতক্ষণের আলাপচারিতায় তাহলে সুইসাইডের ভূত নামেনি কাঁধ থেকে। ভেতরের আতঙ্ক লুকিয়ে রেখে বলেন, আচ্ছা সে দেখা যাবে।

এখন চল তোকে আমি নিজে হাতে কিছু খাওয়াই। মেয়ের হাত ধরে টানতে টানতে বলেন- কী খাবি বল তো মা, কী খেতে ইচ্ছে করছে?
অনেকদিন পর নীপা এক চিলতে হেসে ওঠে। দুহাতে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে বলে, তোমার হাতের কিল খেতে ইচ্ছে করছে মা।
কী খাবি!
কিল-কিল। বাবা তো সেদিন চড় দিয়েছিলেন, এবার তুমি একটা কিল দিয়ো।
নীপা এবার খিলখিল করে হেসে ওঠে। বহুদিন পর যেন পাহাড় থেকে ঝর্নাধারা নেমে আসে। নীপার মা অবাক চোখে তাকিয়ে থাকেন ঝর্নার স্ফটিকস্বচ্ছ জলের আয়নায়। ভেতরে ভেতরে ভারি আশ্বস্ত বোধ করেন- মুখে যাই বলুক, এ মেয়ে নিশ্চয় সুইসাইড করবে না।
নীপার বাবা রাতে বাসায় ফেরেন বেশ হই হই করতে করতে।
হাতে এক গোছা রজনীগন্ধা। তিন পদের মিষ্টি। নিজে বাসুদেবের দোকানে গিয়ে মেয়ের পছন্দের মিষ্টি নিয়ে এসেছেন। ও বেলাতেই নীপার মা মোবাইলে জানিয়েছে নীপা মুখ খুলেছে, কথা বলেছে, খাবার খেয়েছে; বুক থেকে পাষাণ পাথর নেমে যাবার স্বস্তি পেয়েছেন। মেয়ের গায়ে হাত তোলার পর থেকে যে আগুনে তিনি দগ্ধ হচ্ছিলেন, তাও যেন সহসা নিভে যায়। মেয়ের খবর পাবার পর সারাটা দিন তার শুভ হয়ে যায়। কোর্টে একাধিক মামলায় রায় আসে তার পক্ষে, মার্ডার কেসের আসামির পক্ষে দাঁড়াতেই জামিন হয়ে যায়। কোর্ট থেকে বেরোতে সহসা দীপ্তর বাবার সঙ্গে দেখা, এক গাল হেসে আশ্বস্ত করেছেন- ছেলেমেয়ের মান-অভিমান ফুরালেই আবার সব ঠিক হয়ে যাবে। আর এই তো কিছুক্ষণ আগে পার্টি অফিস থেকে বেরোবার মুহূর্তে ফোন এলো নোমিনেশন নিয়ে টেনশন করবেন না, রুট লেবেলে কাজ করে যান, মূল্যায়ন ঠিকই হবে। স্বয়ং কাশেম ভাইয়ের ফোন, সেন্ট্রাল কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক, তার কথার দাম আছে না? জামান উকিল তাই বাড়িতে ঢোকেন আনন্দের খই ফোটাতে ফোটাতে-
কই রে আমার নীপুমনি! মা মনি কই!
জামান উকিলের এই আনন্দ উচ্ছ্বাস কিন্তু দীর্ঘক্ষণ স্থায়ী হতে পারে না। সামনের ইলেকশনে পার্টি নমিনেশন পাবার গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ শেষ করেই তিনি চলে আসেন দীপ্তর বাবার কথায়। নীপার মাকে তিনি বলেই ফেলেন, টানাপোড়েন একটু হয়েছে বটে তবু তার বিশ্বাস, এ বিয়ে হবেই। মেয়ের মুখের দিকে একবার তাকিয়ে নীপার মা ঘোষণা করে দেয়- দীপ্তকে নীপা বিয়ে করবে না।
দীপ্তকে বিয়ে করবে না! মধ্যরাতে আকাশভাঙা মাথায় দপদপ করে জ্বলে ওঠে চাঁদি, চিৎকার করে ওঠেন নীপার বাবা- তাহলে কাকে বিয়ে করবি তুই? কে তোকে বিয়ে করবে?
নীপার ঠোঁটে বিষণœতার প্রলেপজড়ানো হাসি। সেই হাসির ভাঁজ খুলে সে ধীরে ধীরে বলে, আমি যেখানে বিয়ে করব তারা সবাই সদলবলে তোমার ইলেকশনে কাজ করবে। প্রতিপক্ষ গ্র“প স্বপক্ষে চলে এলে আর তোমার এমপি হওয়া ঠ্যাকায় কে!
এসব তুই কী বলছিস নীপা!
হ্যাঁ বাবা, আমি কথা বলে দেখি- বাদল যদি রাজি থাকে তো আমি তাকেই বিয়ে করব।
নীপার বাবা স্তম্ভিত। বাক্যহারা। নীপার মা চিৎকার করে ওঠেন,
এর চেয়ে তোর সুইসাইড করাই ভালো।
নীপার ঠোঁটের হাসি ক্রমশ প্রসৃত হয়। বিষণœতার আবরণও খসে পড়ে; অবলীলায় সে বলতে পারে-
হ্যাঁ, সুইসাইড তো করতেই চাই। বাদলকে বিয়ে করা আর সুইসাইড করার মধ্যে বিশেষ তফাৎ কী মা! দেখো আমি ঠিক সুইসাইড করব।
এরপর ঘরের ভেতরের বাতাস ভারি হয়ে আসে। প্রশস্ত ঘর। তবু তিনটি মানুষেরই যেন ভয়ানক শ্বাসকষ্ট হয়। তিনজনই ভীষণ হাফিয়ে ওঠে।

 

যদিদং হৃদয়ং তব

রঞ্জনা ব্যানার্জী

একেই বলে ‘কাল’-এর খেলা। আমার কুসুম হলুদ ভোর এক তুড়িতেই কালিঢালা রাত! দুপুর ৪টা থেকে রাত ৮টাÑ মাত্র চার ঘণ্টা। এর মধ্যেই জীবনের মোড় ঘুরে গেল। আমি চাইলেও পিঠটান দিতে পারলাম না। আর এখন আমার হাতের ওপর ভুল হাত। দুর্বার আঁটি দিয়ে আঙুলে আঙুল বাঁধা। জুড়ে যাচ্ছি আমি ‘যদেতৎ হৃদয়ং তব তদস্তু হৃদয়ং মম...!’ সামনে লকলকে আগুন জিভ ভেংচাচ্ছে।
আমার চোখ জ্বলছে না। যজ্ঞের ধোঁয়া অরূপদার চশমার কাচ ঠেলে চোখে লাগছে। টিস্যুর বক্স থেকে ফিনফিনে কাগজ উঠছে-নামছে। আমি আবছা দেখি। মা এখনো বাড়িতে। ‘বাবা ভালো আছেন, বিপদ কেটে গেছে’Ñ টুনু পিসি কানের কাছে এসে জানান দেন। অরূপদা আমার হাতে আলতো চাপ দিচ্ছেন কি? হয়তো আমারই মনের ভুল অথবা আশ্বস্ত করতে চাইছে, ‘সব ঠিক হয়ে যাবে’Ñ যেমনটা ফোনে বলেছিলেন। চার ঘণ্টার মধ্যে আমার জামাইবাবু হতে হতে অরূপদা কেমন বর হয়ে যাচ্ছেন বিধাতার বালখিল্যে। আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। তবুও এসব ঘটছে।
খুব সম্ভব কনেবদলের কথা চাউড় হয়ে গেছে। আমি টের পাচ্ছি ভিড়ের চাপ। ফিসফাস। এ গল্প চলবে অনেক দিন। ডালপালা ছড়াবে, কুসুমিত হবে। সহজে মিটবে না।
কী অবাক কা-! আমার আজ এই আসরে নাচার কথা ছিল। ‘বাজিরাও মাস্তানি’র ওই হিট গানটি ‘ইঙ্গা গা পরি পিঙ্গা গা পরি’। আহা! সুর বাজছে মাথায়। আমি, চৈতালি ও ফাক্ষিদা এক সপ্তাহ ধরে রিহার্সাল দিয়েছিলাম।
আচ্ছা, তুর্য কী করছে? সে কি আমাকে দেখে গেছে কোন এক ফাঁকে?
এই তো কিছুক্ষণ আগে প্রবীর মামার গাড়িতে ‘বকুল ফুল’ বাজছিল। গাড়িটি তার বন্ধুর। প্রবীর মামার চাল-চুলোরই ঠিক নেই, তার আবার গাড়ি! আমেরিকায় ছিলেন কিছুদিন। বছর দুয়েক। তা অনেক আগের কথা। ওপি ওয়ান-এর লটারিতে। তখনো ডিভি চালু হয়নি। ফিরে এসেছিলেন। ভালো লাগেনি আমেরিকা। সবাই সোনার হরিণ ধরার নেশায় লাইন লাগাচ্ছে আর প্রবীর মামা হেলায় ছেড়ে দিলেনÑ ‘ধুর, ওটা একটা জীবন হলো?’ তবে গাড়ি চালানোটা ভালো শিখেছিলেন। মা দূরে কোথাও গেলে ড্রাইভার নয়, প্রবীর মামাকে সঙ্গে নিতেন। আর আজ সেই প্রবীর মামার জন্যই আমার শক্ত-পোক্ত বাবার জীবন প্রায় থেমে যাচ্ছিল। বাবা যখন পড়ে গেলেন তখন বিকাল ৪টা বেজে ১৭ মিনিট। মেসেজটি এসেছিল আমার সেলফোনে।
দুপুরে আমরা দলবেঁধে পার্লারে সাজতে যাচ্ছিলাম। দিদিভাই, আমাদের তুতো বোনরা, কাকিমা, টুনু পিসি ও আমরা তিন বান্ধবীÑ সব মিলে দশজন। মাইক্রোবাসে জায়গা হচ্ছিল না বলে আমিই নেমে উঠলাম প্রবীর মামার গাড়িতে, সঙ্গে চৈতালি। ফাক্ষিদা রয়ে গেলেন। তার নেইলপলিশ শুকায়নি। জায়গা পাল্টানোর রিস্কে নেই সে। প্রবীর মামা খেপালেন আমাকেÑ ‘ছিঃ! তোকে বৌয়ের গাড়ি থেকে নামিয়ে দিল?’ আমি ক্যাসেটের ভলিউম বাড়িয়ে দিয়েছিলামÑ ‘শালুক ফুলের লাজ নাই, রাইতে শালুক ফোটে লো রাইতে শালুক ফোটে’।
এ গাড়িটি পার্লারে যাওয়ার কথা ছিল না। ছোট মামা রেগে গিয়েছিলেনÑ ‘দুই গাড়ি এক কাজে যাচ্ছে! মানে কী এসবের?’ গাড়িটি কী নিয়তিই টেনে নিল, নাকি আমিই দাবার ঘুঁটি হয়ে অন্যের চালে পা দিলাম?
সব যেন কেমন অন্য এক জীবনে ঘটেছিল মনে হচ্ছে। কী আনন্দে ভাসছিলাম! আমাদের পরিবারের প্রথম মেয়ের বিয়ে। যদিও দু’দিন আগে বাসি বিয়ের বেদি বানানো হয়েছিল তবুও তুর্য আলপনা করল কাল! চার ঘণ্টা লেগেছিল শেষ করতে। আমি আর ফাক্ষিদাও সাহায্য করেছিলাম। আমার ফেসবুক ওয়ালে ছবিও পোস্ট করেছি।

তুর্যের তোলা সেলফি। আমার ও তুর্যের প্রথম এবং শেষ ছবি। পুরো ছাদটি কী সুন্দর সাজিয়েছিল সে! ঝকমকে। একদম সিনেমার সেট। নীল গোলাপি থিম। কী অদ্ভুত! আগামীকাল সকালে দিদিভাই নন, আমার পা পড়বে ওই বেদিতে।
কাল রাতের চাঁদটা অন্য রকম ছিল। কেমন যেন নেশা লাগা। রোশনাই করে রেখেছিল আকাশটাকে। কাল সব অন্য রকম সুন্দর ছিল। তুর্য অনেক ক’টা গান গেয়েছিল। চৈতালি তো গান শুনেই কাত। তার আদিখ্যেতা দেখে আমার রাগ হচ্ছিল। তুর্য টের পেয়েছিল। খুব ক্যাজুয়ালি বললো, ‘ওই চাঁদটা দ্যাখ’! আমি ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম। ‘ওটা আকাশে থাকুক কিংবা না থাকুক, আমি তোর জন্য থাকবো যদি আকাশ থাকে।’ হাসনাহেনা গাছ নেই এ তল্লাটে। তাও ওই মুহূর্তে বাতাসে হাসনাহেনার গন্ধ ঘিরে রেখেছিল আমাকে। আর এখন সবকিছু ভয়ঙ্কর সত্য হয়ে খাড়া দাঁড়িয়ে আছে আমাকে ঘিরে। সানাইটাও বাজছে না আর। বন্ধ করে দিয়েছে কেউ অথবা কেঁদে কেঁদে নিজেই থেমে গেছে। সানাইয়ের সুরটা বেশ একটা পরাবাস্তব ইফেক্ট দিচ্ছিল। মনে হচ্ছিলÑ আমার নয়, অন্য কারো বিয়ে। এখন কেমন দমবন্ধ লাগছে সব। বাতাসের ভেতর বাতাস ফাঁস খাচ্ছে যেন!
অনেক শখ করে চুল বেঁধেছিলাম। জটিল বিনুনি। তুর্যের চোখ টেরা হয়ে যেতো আমাকে দেখলে। ঘাগরা চোলিটা অনলাইনে অর্ডার করিয়ে আনিয়েছিলাম। সাদা ও হালকা বেগুনি। পুরো লেইসের কাজ। দর্জিকে দিয়ে ফিটিং করাতে অনেক খরচা হয়েছে। এখন পড়ে আছে আমার ঘরে গতকালের গল্প হয়ে।
এসএমএসটি আসার আগেই আমরা জেনে গিয়েছি, প্রবীর মামার গাড়িতে পালিয়েছেন দিদিভাই। মাইক্রোবাসের ড্রাইভার দেখেছে। সে অতশত বোঝেনি। মনে করেছিল, কনে হয়তো আগেই ফিরছে। প্রবীর মামাই যে নাটের গুরু তা জানা গেল পরে, চিঠিটা পড়ে। আর ‘গর্ভধারিণী’ বইটার ভেতরের পাতায় আছে চিঠি। তা জেনেছি মেসেজ থেকে। অদ্ভুত হিসাবি চিঠি। তাড়াহুড়া নয়, কাটাকুটি নেই, অযথা আবেগ নেই। এক পাতায় সব বলা। মাফ চেয়েছেন মা, বাবা, এমনকি অরূপদা, অরুণ কাকুর কাছেও। আশীর্বাদের আংটিটা খামের ভেতরে রেখে গেছেন। প্রবীর মামা তার স্বামী। বিয়ে করেছেন তারা মাস দুয়েক আগে। জানানোর পরিবেশ ছিল না। ব্যস।
বিয়েটা ঠিক হয়েছিল হঠাৎই। অরুণ কাকুর সঙ্গে বাবার যোগাযোগ ছিল না অনেক বছর। লোকনাথ ব্রহ্মচারীর তিরোধান দিবসে আশ্রমে দেখা। ছেলে এসেছে ইংল্যান্ড থেকে পিএইচডি সেরে। বিয়ে করেই ফিরে যাওয়ার কথা।

দুই মাস ধরে কনে দেখা চলছে। উপযুক্ত পাত্রীর বড়ই আকাল। বছরের শেষ, বিয়ের তারিখও যাই যাই করছে। এবার না হলে কুষ্ঠি ঠিকুজির গ্রহের চক্করে পড়বে। দিদিভাইয়ের জন্যও পাত্রের সন্ধান চলছিল। মাস্টার্সের রেজাল্ট বেরিয়েছে সবে। কথায় কথায় জানা হয়ে গেল, এক গোত্র? সমস্যা সমাধানের উপায়ও আছে শাস্ত্রে। তবে আর ঠেকা কী? ছেলেকে দেখেই পছন্দ হয়ে গেল বাবার। মেয়ে দেখাদেখির কিছু নেই। অরুণ কাকু কতো এসেছেন আমাদের চাটগাঁর বাসায়!
এক্কেবারে রাজযোটক। একটু-আধটু ঝামেলা যা আছে, তা মন্ত্রে। দানে শুভ হয়ে যাবেÑ শাস্ত্রীমশাই টিকি নেড়ে বিধান দেন। এক সপ্তাহের মাথায় আশীর্বাদ। প্রদীপ মামা তার মাকে নিয়ে কলকাতায় তখন। কুমিল্লায় প্রবীর মামার মায়ের ল্যাপ্রস্কোপিক সার্জারি হয়েছিল গলব্লাডারে। কিন্তু ভেতরে পাথর রয়ে গিয়েছিল। ওই থেকে জন্ডিস। ঢাকায় বারডেমে আবার ওই পাথর খুঁজে বের করা হলো। কী ভীষণ অবস্থা! আমরাও দেখতে গিয়েছিলাম। যে ডাক্তার ওই অপারেশন করেছিলেন কুমিল্লায় তার নামে একটা প্রতিবেদন ছাপা হয়েছিল সেখানকার পত্রিকায়। প্রদীপ মামা নিউজের কাটিং দেখিয়েছিলেন আমাদের। এতে অবশ্য ডাক্তারের কিচ্ছু হয়নি। কিন্তু ভদ্রমহিলার স্বাস্থ্য আর ফিরছিলই না। তাই চেকআপ করাতে কলকাতায় গিয়েছিলেন।
আশীর্বাদের রাতে প্রদীপ মামা হাজির। উষ্ক-খুষ্ক চুল। বিধ্বস্ত অবস্থা। সকালে মাকে নিয়ে চাটগাঁ এয়ারপোর্টে নেমেছেন। সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া করে কুমিল্লায় বাড়ি পৌঁছে দিয়েই ঢাকার বাস। কিন্তু জ্যাম ঠেলে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা মরে রাত। খবর পেলেন কীভাবে? এমনিই এসে পড়েছেন। ছোট মামা খেপালেনÑ ‘খাওয়ার বাসে মন টেকেনি। তাই তো এসেছি!’
ছোট মামার মতো প্রবীর মামারও অবাধ যাওয়া-আসা এ বাড়িতে। মায়ের কাছে প্রবীর মামা অনুযোগ করছিলেন, ছেলে বিদেশে থাকে। তার খবর ঠিকঠাক আনার জন্যও তো সময় চাই। বড্ড তাড়াহুড়ার সিদ্ধান্ত! মা বলেছিলেন, ‘রোস্ট খা। যখন ছেলের বাড়ি যাবো আশীর্বাদ করতে তখন নিজেই জেরা করিস।’
পার্লারে কী ভীষণ ভিড় ছিল কাল! আমাদের অবশ্য অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেয়া ছিল। বিয়ের কনের স্পেশাল সাজ। দিদিভাই আলাদা রুমে। তার পছন্দের মেকআপ আর্টিস্টের সঙ্গে। টুনু পিসি ছিলেন সঙ্গে। শাড়ি পরার আগে ওয়াশরুমে যাওয়া জরুরি। ব্লাউজ, পেটিকোট পরা কেবল এবং ওপরে পার্লারের হাউসকোট। একাই গেলেন। পার্লারের মেয়েটা অনেকক্ষণ

অপেক্ষা করছিল শাড়ি হাতে। পরে টুনু পিসির নজরে এলো দেরিটা। আমার মুখের সাজ বাকি। চুল বাঁধা সবে শেষ। হাতে নেইলপলিশ লাগানো চলছে। এরপর মেকআপ। এর মধ্যেই টুনু পিসি হাজির। গা শিউরে উঠেছিল আমার। ‘কুর্চি! দীপা নেই’Ñ টুনু পিসি হাঁপাচ্ছেন তখনো। এতো বড় পার্লার, কে আসছে, কে যাচ্ছে এর খোঁজ কে রাখে? গয়নাগাটি পরানো হয়নি, কেবল নথ আর টিকলি।
চিঠিতে চোখ বুলিয়ে বাবা গুম ছিলেন কিছুক্ষণ। এরপরই ঢলে পড়লেন। মুখ দিয়ে ফেনা বের হচ্ছিল। যে বাবার কখনো জ্বরও হতে দেখিনি সেই বাবার হার্ট অ্যাটাক! পরের এক ঘণ্টা চূড়ান্ত হই চই, চিৎকার-চেঁচামেচি। অ্যাম্বুলেন্স এলো পাড়া কাঁপিয়ে। ভিড় ঠেলে গাড়িতে ওঠাতে বেশ সময় নিল। ছোট মামা গেলেন সঙ্গে।
অরুণ কাকুকে ফোন দিলেন টুনু পিসি। মা তখনো এক কোণে বসে মেঝের দিকে ফ্যাল ফ্যাল দৃষ্টিতে চেয়ে! ঢাকায় কী জ্যাম! অরুণ কাকু আসতে আসতেই ঘণ্টা পার। জ্যামে বসেই যা জানার জানলেন টুনু পিসির কাছে। বাড়ি এসে চিঠিটা পড়লেন বারকয়েক। বাবার খোঁজ নিলেন। বিবশ বাড়িটার শোধ ফিরতে শুরু করলো যেন। রাত ৮টায় প্রীতিভোজ। ৭টা ছুঁই ছুঁই। লগ্ন যদিও দেরিতেÑ রাত ১১ গতে ২৩ মিনিট। বাড়ি থেকেও ফোন আসছে অরুণ কাকুর সেলে। কী হবে, কী করণীয়? অরূপদা ফোনে।
হঠাৎ আমার দিকে তাকালেন কাকু। আমার বুক কেঁপে উঠলো। আমি জানি না, কীভাবে জানলাম ওই অশনি সংকেত। আমাকে কেউ যেন শক্ত করে পেরেক ঠুকে ঘটনার ভেতর আটকাচ্ছে! আমি মাথা ঝাঁকাচ্ছি। কিন্তু জগদ্দল পাথর হয়ে ঘাড়ে বসে আছে মাথা। নড়ছে না। অরুণ কাকু হাত জোড় করে বিড়বিড় করছেন কিছু। আমি কিছুই শুনতে পাচ্ছি না। কানের ভেতর বোলতা ভোঁ ভোঁ করছে বেরোনোর রাস্তা হারিয়ে। মা চোখে আঁচল চাপা দিয়ে কাঁদছেন। আমার বিনুনি বুকের একপাশে সাপের মতো বেঁকিয়ে আমার দিকে তাকাচ্ছে। বুকের ভেতর বেহুলা মাথা কুটছে। কুষ্ঠি ঠিকুজি কিচ্ছুর দরকার নেই আর। দু’বাড়ির সম্মান আগে। অতঃপর পাথর হয়ে যাই। আমার সামনে ঘটনাগুলো দুরন্ত ছোটে। থামে। কাঁদে। অনুনয় করে। ধমকায়।
অরূপদা কিছু জানতে চান। কেউ ফোন চেপে ধরে আমার কানেÑ ‘তোমার কাউকে পছন্দ?’
টুনু পিসি ভাঙা রেকর্ড হয়ে বাজতে থাকেনÑ ‘বাবাকে বাঁচাও।’
মা মুখে আঁচল চেপে থাকেন। শুভকাজে কাঁদা বারণ। আমি জেনে যাই, পৃথিবীটা আর কখনোই দু’ভাগ হবে না। সীতা ঢুকে ধরণীর দুয়ার আটকে দিয়েছে চিরতরে। দিদিভাইয়ের গয়না পরানো হয় আমাকে। টিকলি, নথ ছাড়াই বৌ হয়ে গাড়িতে উঠি। তার ছেড়ে যাওয়া বেনারসির বেমিল ব্লাউজ কায়দা করে ওড়না দিয়ে ঢাকা হয়। কেউ উলু দেয়। শাঁখে ফুঁ দিয়ে শুভযাত্রা হয়। মঙ্গল প্রদীপ ঘুরিয়ে বালাই-ষাট করে কেউ। আমি সবার বালাই মাথায় নিয়ে ফুলে ঢাকা গাড়িতে উঠি। আকাশ কাঁদে না। তুর্য আসে না। চাঁদ নির্বিকার মেঘে সাঁতরায়।
অতঃপর আমার সম্প্রদান হয়। পুরোহিতের সুরে সুর মিলিয়ে অরূপদা মন্ত্র সম্পূর্র্ণ করছেন এই মুহূর্তেÑ ‘যদিদং হৃদয়ং মম তদস্তুু হৃদয়ং তব।’
আমার হৃদয় ভাবলেশহীন দূর্বা ঘাসের বাঁধুনির ফাঁকে অবাক চোখে দেখে চন্দন কাঠের যজ্ঞে তার নিজের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার উৎসব।

নিঃসঙ্গ

খান অপূর্ব আহমদ 

 

 

কয়েকদিন ধরে তমালের মনে অস্থিরতা বিরাজ করছে। সব সময় বুক ধড়ফড় হয়। মাঝে মধ্যে বুকে চিন চিন ব্যথা করে। কখনো নিঃশ্বাস আটকে আসে। মনে হয়, এই বুঝি ফুসফুসের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাবে। এ জন্য মাথার মধ্যে নানান দুশ্চিন্তা এসে ভর করে। কিছুই ভালো লাগে না। যখন এমন হয় তখনই তমালের মা ফোন করেন। তার খোঁজখবর নেন। আর এতে সে পরিপূর্ণ সুস্থ অনুভব করে। কথায় আছে, সন্তানের কিছু হলে প্রথম মা-ই টের পান। এটি ভেবে তমাল স্বাভাবিক হয়ে যায়। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। তমালের মা ফোন করে জানতে চেয়েছেন সে ভালো আছে কি না। আজ মায়ের সঙ্গে কথা বলেও নিজের ভেতরের অস্থিরতা কাটাতে পারছে না। শুধু ভাবছে কোথাও কারো কোনো বিপদ হলো নাকি!
তমালের বদ্ধমূল ধারণা, বুক ধড়ধড় করা মানে আপনজন কারো কোনো সমস্যা হওয়া। অতীতের অনেক ঘটনায় এমন প্রমাণই পেয়েছে। ফলে ওই ধারণাটি তার মগজে বিঁধে আছে। তাই সে এ সময় মায়ের কথাই বেশি করে মনে করে। কারণ মায়ের বয়স হয়েছে। যখন-তখন তার যে কোনো সমস্যা হতেই পারে। কিন্তু তার মা তো এখন ভালো আছেন। তাহলে? এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ একটি ফোন আসে। নাম্বারটি সেইভ না খাকায় ভয়ে ভয়ে কলটি ধরে।
- হ্যালো।
কেমন আছ? ব্যস্ত নাকি?
- কে বলছেন প্লিজ!
আমি জান্নাত। চিনতে পারছ, নাকি একেবারেই ভুলে গেছ? আর ভুলে যাওয়ারই কথা। কেননা মনে রাখার মতো আমি আসলেই কিছু করিনি।
- না, তা হবে কেন?
না হলে অন্তত নাম্বার সেইভ থাকতো।
- বিষয়টি তা নয়। আসলে ফোনসেট চেঞ্জ করায় অনেক নাম্বারই সেইভ নেই। থাক, সংসার কেমন চলছে?
ভালো-মন্দ মিলিয়েই তো জীবন। আছি এক রকম। আর সংসার নেই। ডিভোর্স হয়ে গেছে প্রায় তিন বছর। নিঃসঙ্গ জীবন কাটাচ্ছি বলতে পারো।
- সত্যিই দঃখজনক। সাত বছর প্রেমের পরিণতি দু’বছরেই সব শেষ!
ওই ভ-কে বিয়ে করিনি। করেছিলাম আমার সহকর্মীকে। সেও প্রতারক। তার শিক্ষাগত যোগ্যতাসহ ফ্যামিলির অনেক কিছুই গোপন করেছিল। তাও চেষ্টা করেছিলাম মানিয়ে নিতে। ‘পারিনি।
- তোমরা কি এক সঙ্গে পড়তে?
হ্যাঁ।
- তারপরও সে এতো কিছু গোপন করলো কী করে? দেখেছ তুমি কতোটা বোকা! অথচ তুমি বিভিন্নভাবে সতর্কতা অবলম্বন করতে। মনে করতে জীবনে কখনো কিছুতেই ভুল করবে না। আমি বলতাম, তুমি খুব সরল। ওই সরলতাই তোমাকে সর্বনাশ করবে। তখন মানতে চাওনি।
এ জন্যই তোমাকে ফোন করা। কয়দিন ধরে শুধু তোমার কথাই মনে পড়ছিল। তাই অনেক দ্বিধা-দ্বন্দ্ব নিয়ে কল করলাম। ভাবছিলাম, তুমি হয়তো অ্যাভয়েড করবে। অবশ্য তোমার ওই কথাটি মনে করেই সাহস পেলাম।
- হ্যাঁ, আমি বলেছিলামÑ সুখের সময় আমাকে খুঁজো না, দুঃখ পেলে মনে করো। তবে এ কথা তুমি মনে রাখবে তা ভাবিনি।
যাক, তোমার কথা বলো।
- আমার অবস্থা একই রকম। মানে, আগের চাকরিতেই আছি। পরিবর্তন শুধু সন্তানের বাবা হয়েছি। আমার ওয়াইফ নির্ভেজাল গৃহিণী।
এখন রাখি। তোমার সঙ্গে কথা বলে মনটা বেশ ফ্রেশ লাগলো। এখন থেকে মাঝে মধ্যে তোমার সঙ্গ চাইবো। তাছাড়া তোমার ধারণা অনেকটাই সঠিক হয়। তাই কিছু সাজেশন নেবো।
- আমার বিশ্বাস হয় না। কারণ তুমি তো খেয়ালি মানুষ। কোন খেয়ালে ফোন করেছ জানি না। ঠিক আছে। তখন তোমার গত পাঁচ বছরের গল্প শোনা যাবে।

তমাল একটি ফার্মে নির্বাহী পদে চাকরি করে। জান্নাত একটি ট্রাভেল এজেন্সির মার্কেটিংয়ে ছিল। ভ্রমণে যাওয়ার সুযোগ-সুবিধা জানানোর জন্য সে একদিন তমালের অফিসে এসেছিল। আর প্রথম দেখাতেই জান্নাতকে ভালো লেগেছিল তমালের। এরপর থেকে নিয়মিত তাদের সঙ্গে কথা হতো। এক পর্যায়ে তমাল বলেই ফেলে তাকে বিয়ে করার কথা। জান্নাত তখন বলেছিল, সে একজনকে ভালোবাসে এবং তাকেই বিয়ে করবে। তবে আমাদের বন্ধুত্ব আজীবন থাকবে। এরপর থেকে তাদের মধ্যে যোগাযোগ কমতে থাকে। এক সময় তা বন্ধ হয়ে যায়।

 চৈত্রের শেষ বিকেল

শায়লা হাফিজ

 

চৈত্রের শেষ দিন নববর্ষের আগমন সুখের সঙ্গে যেন মনে এনে দেয় ঋতুরাজ বসন্তের বিদায়ী ব্যথা মেশানো বিরহ বিধুর লগ্ন। তাই একটি বছরের অনেক অসন্তোষ, অনেক না পাওয়ার দুঃখ-গ্লানি ভুলে বাঙালি প্রাণ নেচে ওঠে নানা আয়োজনে বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণের আনন্দে। জীর্ণ পুরনো সব গ্লানি ধুয়ে-মুছে ‘নব আনন্দ বাজুক প্রাণে- এই মঙ্গল কামনায় বাঙালি বিদায় জানাবে কাটিয়ে দেয়া একটি বাংলা বছর।
বাংলা সনের শেষ মাসের নামকরণ করা হয়েছে চৈত্র। চৈত্র মাসের নাম ‘চৈত্র’ কীভাবে হলো? আদি পুরাণে বর্ণিত আছে, রাজা দক্ষের এক কন্যা ছিল চিত্রা। তার নাম অনুসারে এক নক্ষত্রের নামকরণ করা হয় চিত্রা নক্ষত্র। এই চিত্রা নক্ষত্র থেকে চৈত্র মাসের নামকরণ করা হয়। বাংলা সনের শেষ মাসের নামকরণ করা হয়েছে চৈত্র।
বহুকাল ধরে বাংলা বছরের সমাপনী মাস চৈত্রের শেষ দিনটিতে হিন্দু সম্প্রদায় ‘চৈত্র সংক্রান্তি’ পালন করছে। তাই বাংলা বছরের সমাপনী দিনটি ‘চৈত্র সংক্রান্তি’ নামে সমধিক পরিচিত। সংক্রান্তি কথাটির অর্থ ‘অতিত্রম করা’। সূর্য এক রাশি থেকে অন্য রাশিতে প্রবেশ করে বলেই এটিকে বলা হয় সংক্রান্তি। ফলে মাসের শেষ দিনটিকে বলা হয় সংক্রান্তি। চৈত্র সংক্রান্তি এখন কেবল কোনো ধর্ম বা মতের মধ্যে আবদ্ধ নয়, এটি রূপ নিয়েছে এক সর্বজনীন বর্ণিল উৎসবে।
চৈত্র সংক্রান্তির আসল আর্কষণ থাকে চড়ক পূজা। এটি কেন্দ্র করে দেশের অনেক জায়গায় বসে মেলা। চৈত্র সংক্রান্তির মেলায় বাঁশ, বেত, প্লাস্টিক, মাটি ও ধাতুর তৈরি বিভিন্ন তৈজসপত্র ও খেলনা, বিভিন্ন ফল ও মিষ্টি কেনা-বেচা করা হয়। বায়োস্কপ, সার্কাস, পুতুলনাচ, ঘুড়ি ওড়ানো ইত্যাদি চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থাও থাকে। অঞ্চলভেদে এই মেলা এক থেকে সাত দিন চলে। চড়ক পূজা চৈত্র সংক্রান্তির এক অন্যতম অনুষঙ্গ। লৌকিক আচার অনুযায়ী এই দিনে বিদায় উৎসব পালন করে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়। দোকানপাট ধুয়ে-মুছে বিগত বছরের যতো সব জঞ্জাল, অশুচিতা বিদূরিত করা হয়। পরদিনই খোলা হয় ব্যবসায়িক হিসাব-নিকাশের নতুন খাতা। এ উৎসবের লোকায়ত নাম ‘হালখাতা’।
বাংলার ঋতুচক্রের পালাবদলে চৈত্র আসে গ্রীষ্ম উষ্ণতা নিয়ে। প্রখর তপন তাপে আকাশ তৃষ্ণায় তৃষ্ণার্ত হয়ে ওঠে। মানব মনও তৃষিত হয় প্রকৃতি বরণ ও স্মরণ করতে। বাংলা বছরের সমাপনী মাস চৈত্র। চড়ক গাজন উৎসবের একটি প্রধান অঙ্গ। এ উপলক্ষে এক গ্রামের শিবতলা থেকে শোভাযাত্রা শুরু করে অন্য শিবতলায় নিয়ে যাওয়া হয়, একজন শিব ও একজন গৌরী সেজে নৃত্য করেন এবং অন্য ভক্তরা নন্দি, ভৃঙ্গি, ভূত-প্রেত, দৈত্যদানব প্রভৃতি সেজে শিব-গৌরীর সঙ্গে নেচে চলেন। এ সময় শিব সম্পর্কে নানান লৌকিক ছড়া আবৃত্তি করা হয়। এতে শিবের নিদ্রাভঙ্গ থেকে শুরু করে তার বিয়ে, কৃষিকর্ম ইত্যাদি বিষয় উল্লেখ থাকে। এ মেলায় সাধারণত শূলফোঁড়া, বানফোঁড়া ও বড়শিগাঁথা অবস্থায় চড়ক গাছে ঘোরা, আগুনে হাঁটা প্রভৃতি ভয়ঙ্কর ও কষ্টসাধ্য দৈহিক কলাকৌশল দেখানো হতো।

ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের বর্ষ বিদায় ও বর্ষবরণ উৎসব হলো ‘বৈসুক’। বাংলা বছরের শেষ তিন দিন পার্বত্যবাসী অতি আনন্দের সঙ্গে এই উৎসব পালন করে থাকে। অন্য সম্প্রদায় তথা সব ধর্মের মানুষ এই উৎসবে অংশগ্রহণ করে থাকে। সামর্থ্য অনুযায়ী ঘরের ছেলেমেয়েদের নতুন পোশাক দেয়া হয়, খাবার হিসেবে বিভিন্ন রকমের পিঠা ও পাঁচন তৈরি করা হয়ে থাকে। বৈসুক উৎসবের প্রধান আপ্যায়নের বস্তু হলো পাঁচন। এটি সাধারণত বন-জঙ্গলের হরেক রকমের শাকসবজির মিশ্রণ। তারা মনে করে, বছরের শেষ ঋতু পরিবর্তনের সময় বিভিন্ন শাকসবজি দিয়ে রান্না পাঁচন খেলে পরবর্তী বছরের রোগবালাই থেকে রেহাই পাওয়া যাবে। বছরের শেষ দিনের আগের দিন ‘হারি বৈসুক’ ও শেষ দিনকে বলে ‘বৈসুকমা’ এবং নতুন বছরকে বলে ‘আতাদাকি’।
হারি বৈসুকের দিনে প্রথমে তারা ফুল সংগ্রহ করে বাড়িঘর, মন্দির সাজায়। তারপর গায়ে কুচাই পানি (পবিত্র পানি) ছিটিয়ে স্নান করে আসে। এর সঙ্গে বয়োজ্যেষ্ঠদের পানি তুলে স্নান করিয়ে আশীর্বাদ নেয়। পরের দিনে পাড়ার যুবক ছেলেরা এক ওঝার নেতৃত্বে দলবেঁধে গরয়া নৃত্যের মহড়া দেয়। এই গরয়া দেবতার পূজা দিয়ে আশীর্বাদ বক্ষবন্ধনী কাপড় দিয়ে বেঁধে রাখে। তাদের বিশ্বাস, কারায়া গরয়া হচ্ছে বনের হিংস্র পশুগুলোর নিয়ন্ত্রণকারী দেবতা। তাদের পূজার আশীর্বাদ গ্রহণ করলে পরবর্তী বছরে জুম চাষ ও বিভিন্ন কাজে বন-জঙ্গলে গেলে হিংস্র পশুগুলোর আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।
মাস হিসেবে বৈশাখের প্রথম হওয়ার মর্যাদা খুব বেশি দিনের নয়। বৈদিক যুগে সৌর মতে, বছর গণনার যে পদ্ধতি প্রচলিত ছিল, সেখানেও বৈশাখের সন্ধান মেলে। বৈদিক যুগের ওই তথ্য অনুযায়ী বৈশাখের স্থান ছিল দ্বিতীয়। তৈত্তিরীয় ও পঞ্চবিংশ ব্রাহ্মণের মতে, বৈশাখের অবস্থান ছিল বছরের মাঝামাঝি জায়গায়। অন্যদিকে ব্রহ্মা- পুরাণে অনুষঙ্গপাদের একটি শ্লোক অনুসারে মাসচক্রে বৈশাখের অবস্থান ছিল চতুর্থ। তখন বাংলা সন বলতে কিছু ছিল না।

মোঘল সম্রাট আকবর ‘সুবে বাংলা’ প্রতিষ্ঠার পর বাংলাদেশে ফসল কাটার মৌসুম অনুসারে খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে নতুন একটি সনের প্রবর্তনের জন্য অনুরোধ করেন রাজ জ্যোতিষী ও প-িত আমির ফতেহউল্লাহ সিরাজীকে। সিরাজী হিজরি চন্দ্র মাসের সঙ্গে সম্রাটের সিংহাসনে আরোহণের বছর এবং ভারতীয় সৌর সনের সমন্বয়ে বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। মাসের নামগুলো সৌর মতে রেখেই পুনর্বিন্যাস করেন তিনি। এ অনুযায়ী বৈশাখ বাংলা সনের প্রথমে চলে আসে।
বাংলা সনের শেষ দিনটি বিদায় জানানোর জন্য বাঙালি যেমন প্রস্তুত হবেন তেমনি প্রস্তুত হবেন আরেকটি নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে। একই সঙ্গে খাতা খুলে কষতে বসবেন বিগত বছরের সাফল্য ব্যর্থতা ও পাওয়া, না পাওয়ার হিসাব। সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে নানান আচার অনুষ্ঠানে যেমন বিদায় জানানো হবে চৈত্রকে তেমনি প্রস্তুতি নেবেন চৈত্রের শেষ রাতের প্রহরে সূর্য উদয়ের সঙ্গে সঙ্গে বৈশাখ বরণ করে নিতে। রবীন্দ্র নাথ ঠাকুরের ভাষায় যদি বলিÑ

‘নিশি আবসান প্রায় ঐ পুরাতন বর্ষ হয় গত
আমি আজি ধুলিতলে জীর্ণ জীবন করিলাম নত॥
বন্ধু হও শত্রু হও, যেখানে যে রও
ক্ষমা কর আজিকার মতো
পুরাতন বৎসরের সাথে পুরাতন অপরাধ যত।’

চৈত্রের রুদ্র রূপ ডিঙিয়ে আমাদের মধ্যে এলো বৈশাখ। এলো আরেকটি নতুন একটি বছর। অনেক প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, চড়াই-উতরাই, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও আনন্দ-বেদনার সাক্ষী হয়ে কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে একটি বছর। নতুন বছরের পুব আকাশের নতুন সূর্যটি হোক শান্তির ও স্বপ্নের। পুরনো বছরের জীর্ণতা দূরে ঠেলে নতুন সম্ভাবনার পথে এগিয়ে চলাই হোক আমাদের মূলমন্ত্র।

 

মডেল : রিবা হাসান
পোশাক : অঞ্জনস
মেকওভার : ক্লিওপেট্রা বিউটি স্যালন
ছবি : কৌশিক ইকবাল

কুসুমকুমারী ভিআইপি ফেরি

মাসুদা ভাট্টি

 

ঘাটে ফেরিটা ভিড়েছে ঠিকই কিন্তু কোনো গাড়ি নামতে পারছে না। একেবারে ফেরিতে ওঠার মুখেই পন্টুনের ওপর একটা মালবোঝাই ট্রাক মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। দু’পাশে যতোটুকু জায়গা খালি তা দিয়ে বড় গাড়ি আসতে পারবে, কী পারবে না তা নিয়ে গবেষণা করছে লোকজন। ট্রাকটা আজ পড়েনি হয়তো। তাই কেউ কেউ বলাবলি করছেন, এর আগের ফেরি থেকেও ট্রাক এখান দিয়ে নেমে গেছে। অসুবিধী হওয়ার কথা নয়। কিন্তু বলা তো যায় না- যাত্রীভর্তি বাস, কোরবানির পশুভর্তি ট্রাক, যদি কিছু হয়ে যায়! সবাই খুব সতর্ক সে জন্য। এ রকমই জটলার ভেতর ছেলেটিকে দেখলাম আমরা। আমরা দু’জন। আমি ও সালমা। আমরা গাড়ির ভেতর বসে চারদিকে তাকাই। আমাদের ঠিক সামনেই লুঙ্গি পরা এক লোক তার অ-কোষ থেকে চুলকে ছিঁড়ে আনবে বলে মনে হয়। আমরা হা হা করে হাসি তাকে দেখে। তখন আবারও ছেলেটির দিকে চোখ যায় আমাদের।
আমাদের কথা বলি একটুখানি। আমরা চল্লিশ পেরোলাম কিছুদিন আগে মাত্র। কিন্তু এখনো আমাদের বাইরে-ভেতরে কোথাও চল্লিশের চিহ্ন পড়েনি। আমাদের যারা দেখতে পারে না তারা হয়তো বলবে বা বলেও যে, ‘আরে, সুন্তানাদি তো অয় নাই, অগো আর কী, গায়ে বাতাস লাগায়া ঘোরে-ফেরে।’ ফরিদপুর অঞ্চলের টান থাকায় সহজেই সমালোচনাকারীকে শনাক্ত করা যায়। কারণ তারা আমাদের চেনে ও জানে। আমরা স্বাবলম্বী। দু’জনই চাকরি করি ঢাকায়। আমরা একা যে যার মতো থাকি। সালমার সঙ্গে অবশ্য তার মা থাকেন। আমার সঙ্গে কেউ না। কারণ আমার আসলে কেউ নেই থাকার মতো। আজকাল অবশ্য মনে হয়, ওই কোন এক অতীতকাল থেকে আমার কেউ নেই। সালমা ইদানীং প্রায়ই বলে, ‘কেন এমুন হয় কও তো? কেউ থাকলে কী হইতো আমাদের?’ আমি সালমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। তাকে ঠিক বোঝাতে পারি না, কেউ থাকলেও এর চেয়ে যে খুব বেশি ভালো কিছু হতো তা নয়। তাই চুপ করে থাকি। ঢাকা শহরে একা মেয়েদের থাকার চল শুরু হয়েছে আমাদের হাত ধরেই। এর আগে মেয়েরা সাধারণত ছাত্রী হলে হলগুলো আর কর্মজীবী হলে মেয়ে হোস্টেলগুলোয় থাকতো। কিন্তু এখন কোনো কোনো বাড়িওয়ালা গাঁইগুঁই করলেও ভাড়া দেয়। অনেক বাড়িওয়ালাই এখন স্বীকার করে যে, ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা ঠিকমতো ভাড়া দেয় এবং ঝামেলাও আসলে কম দেয়। মানুষ মিষ্টির স্বাদ পেলে পিঁপড়ারও পাছা চুষে দেখে।

দেয়। অনেক বাড়িওয়ালাই এখন স্বীকার করে যে, ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা ঠিকমতো ভাড়া দেয় এবং ঝামেলাও আসলে কম দেয়। মানুষ মিষ্টির স্বাদ পেলে পিঁপড়ারও পাছা চুষে দেখে।
এই সেদিনও কতো প্রশ্ন শুনতে হতো বাড়ি ভাড়া নিতে গিয়ে। বাড়িওয়ালা এক ধরনের প্রশ্ন করে তো বাড়িওয়ালি আরেক ধরনের। প্রশ্নের পাহাড় ডিঙিয়ে বাড়ি ভাড়া জুটলেও হয় বাড়িওয়ালা ফোনে যন্ত্রণা দিতে শুরু করে, না হয় বাড়িওয়ালি তার স্বামীকে জড়িয়ে অহেতুক সন্দেহ শুরু করে। তখনকার ফ্যাঁকড়ার সঙ্গে কোনো যন্ত্রণারই মিল নেই। এখন এসব একটু কমেছে। মানুষ অর্থনীতি দিয়ে বিচার করতে শুরু করেছে জীবনকে। তাই যাপনের ক্ষেত্রে যেখান থেকে আদায় বেশি এবং কম ঝামেলার সেদিকেই মানুষের ঝোঁক।
সালমা একটা সফটওয়্যার ফার্মে কাজ করে। আমার নিজের ব্যবসা আছে, সেটিই দেখি। দু’জনের জন্মস্থান দেখতে গিয়েছিলাম আমরা। সেখানে বিশ্বকর্মা পূজায় নৌকাবাইচ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ক্ষমতার দ্বন্দ্বে নৌকাবাইচ তো হলোই না, দুপুর নাগাদ প্রশাসন সেখানে ১৪৪ ধারা জারি করে দিল। কারণ কী? দুই নেতার ঝগড়া- কে পুরস্কার দেবে, কার আধিপত্য বজায় থাকবে। অথচ যে হাজার হাজার মানুষ এই নৌকাবাইচ আর পূজা দেখতে আসার কথা ছিল তাদের কথা কেউই ভাবলো না। তারা বৃষ্টিতে ভিজে ফাঁকা নদীর দিকে তাকিয়ে রইলো অপলক। নদীর ওপর ভাঙাচোরা সেতুর কিনার ঘেঁষে মানুষের ঘোলা জলের দিকে তাকিয়ে থাকাটা কেমন অদ্ভুত আবহের জন্ম দিয়েছিল। আমরা অবশ্য গাড়ি থেকে নামিনি। নেমে কী হবে? শিশুকালের স্মৃতি নষ্ট হবে কেবল।
স্মৃতির কথা যখন এলোই তখন একটু স্মৃতিচারণ হোক। স্মরণ করি সেসব দিনের কথা যখন এই নদী কোনো ভটভটির আওয়াজ শোনেনি- এখন যার ভয়ঙ্কর আওয়াজে দিনমান কুমারপাড়ের এই ছোট্ট শহরটি রীতিমতো আতঙ্কিত থাকে। কিন্তু সেসব ধানের ফুল ফোটা দিনে যখন কৈ মাছের ঝাঁক লক্ষ্মীদীঘা ধানের ঝরে পড়া ফুল খেয়ে খেয়ে শরীরে হলুদ চর্বি জমাতো বলে মাছপ্রিয় মানুষ গল্প করতো। সেই সময় একদিন খুব ভোর থেকেই শুরু হতো কাঁসরের বাজনা, পাশের বিল দিয়ে নৌকা যেতো। মানুষ তখন নৌকাবাইচকেও বলতো আড়ং। আর ওই বাইচের দিনই বিক্রি হতো চালন, কুলো, পলোসহ বছরকার ব্যবহারযোগ্য জিনিসপত্র। মানুষ শুধু নৌকাবাইচ দেখতে নয়, বিশ্বকর্মার অবতার মানুষের তৈরি জিনিসপত্রও কিনতে আসতো আড়ংয়ে। এবারও দেখলাম বাজার বসেছে রাস্তার দু’পাশে, সেতুর ওপর পসরা সাজানো। কিন্তু বেশির ভাগই সস্তার প্লাস্টিক, এমনকি যে কাঠের হেলিকপ্টার ছোটবেলায় ছিল তাও আছে এবং সেটিও প্লাস্টিকের। কেবল বদলায়নি মিষ্টির দোকানগুলো। মিছরির সাজের হাতি-ঘোড়া-ময়ূর-গণেশ, জিভেগজা, আমৃত্তি, ছানার জিলেপি ও ক্ষীরের চমচম- মানুষ এখনো হুমড়ি খেয়ে পড়ছে দোকানগুলোয়। আমার এখনো ভালোবাসার রাজভোগ। আমি নামি না। জানি, নেমে সেই পুরনো মুখ দেখবো না। তারা আছেন কি না তাও তো জানি না। তাই আর রিস্ক নিই না। আনিয়ে নিই ঢাকায় নিয়ে আসার জন্য।

উৎসবের রঙ নাকি বদলায় না। হবে হয়তো। তবে একালেও সকাল থেকে ভটভটিতে প্রমাণ আকারের সাউন্ডবক্স লাগিয়ে, ডেকভর্তি করে বিরিয়ানি তুলে নিয়ে যে উচ্চতায় শব্দ পৌঁছালে কান আর কিছু শুনতে পায় না সে রকম উচ্চ শব্দে হিন্দি সিনেমার সবচেয়ে তালের গানটি দিনভর বাজে। ভটভটি, নাকি হিন্দি গান- কোনটির শব্দ কাকে খুন করে বোঝা না গেলেও আশপাশের মানুষের কানের দফা-রফা। কিন্তু তাতে কী? আনন্দ তো- মানুষ মেনে নেয়, মনে নেয় না।
বেরোতে বেরোতে বিকেল হয়ে যায় আমাদের। আর ফেরিঘাটে দিয়ে কোরবানির পশুবাহী ট্রাকের পেছনে লাইন ধরে অপেক্ষা করতে করতে সন্ধ্যা প্রায় হয়েই যায়। তারপরও পদ্মার পাড়ে অতো বিশাল আকাশকে অন্ধকার কি সহজে ঢাকতে পারে? বিকেলটা অদ্ভুত এক আলো ছড়িয়ে থমকে থাকে অনেক্ষণ যেন বা নদীর জলে শেষবারের মতো নিজেকে দেখে নেয় দিন। পদ্মা সেতুর জন্য জমানো দৈত্যের মতো পাথরের ঢিপি। মনে হয়, আচানক এখানেও পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে। ছুটির দিন বলেই কি না জানি না, ঘাটে তেমন মানুষের ভিড় নেই। তাই হয়তো ছেলেটাকে আমাদের একেবারে আলাদা করে চোখে পড়ে। আমিই দেখাই সালমাকে। বলি, ‘দ্যাখো দ্যাখো, ছেলেটা কী লম্বা দেখতে?’
সালমা বলে, ‘হ্যাঁ রে, এক্কেবারে ইরানি ইরানি চেহারা।’ বোঝা যায়, একটু ফর্সা আর লম্বা চেহারার পুরুষ এখনো এ দেশে ইরান কিংবা তুরান থেকে আসা- এই ধারণা আমাদের জীবনগত হয়ে গেছে। আমি হেসে ফেলি। তখনো আমাদের গাড়ি ফেরিতে ওঠার জন্য কসরত করে যাচ্ছে সমানে। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর চালক বেচারা অধৈর্য হয়ে উঠেছে- কখন উঠবে ফেরিতে। আর যে মুহূর্তে মনে হলো যে, মুখ থুবড়ে থাকা ট্রাকটা কোনো বাধা নয়, ঠিক ওই মুহূর্তেই হুড়মুড় করে নামতে শুরু করলো গাড়িগুলো। প্রথমে এ দেশের কথিত ভিআইপিদের গাড়ি- যারা দরকার হলে ঢাকা থেকে বেরোনোর সময় ফোন করে ফেরি আটকে রাখে। আর হাজার হাজার মানুষ না জেনে অপেক্ষা করে পরবর্তী ফেরির। সে রকমই একটি

কালো গাড়ি নেমে গেল। তারপর একের পর এক ছোট গাড়ি, ট্রাক ও বাস নামছে তো নামছেই। অথচ দূর থেকে ফেরিটিকে বেশ ছোটই মনে হয়। এতো গাড়ি তার পেটে ধরলো কী করে? আমি ভাবি।
ছেলেটির গাড়িও নিশ্চয়ই অপেক্ষা করছে কোথাও। ম্লান আলোয় ছেলেটিকে কি একটু বিষণœ দেখায়? হঠাৎই আমার মাথায় প্রশ্নটি আসে, আচ্ছা, আমার মা কী এ রকম কোনো ছেলেকে দেখে নিজের ভেতর প্রশ্ন নিয়ে ভাবতে বসতেন? সে সুযোগ কি তার হতো কিংবা সাহস? মাত্র তো চল্লিশ বছরের ফারাক। চল্লিশ বছর পরই তার কন্যা এ রকম একটি বেগানা পুরুষকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভাবতে পারছে দ্বিধাহীন- এটাকে কী অর্জন বলবো? মাও হয়তো ভাবতেন, প্রকাশ করতে পারতেন না। মানুষ তো! কতোটা আর বদল হবে। ভেতরে চিন্তার বীজ তো থাকেই, তাই না? আমরা টুকটাক কথা বলি ছেলেটাকে নিয়ে।
‘ছেলেটা কি একা? কী মনে হয়?’ সালমার দিকে তাকিয়ে জানতে চাই।
‘না মনে হয়। মাইক্রোবোঝাই লোকজন। নিশ্চয়ই তার ভিড় ভালো লাগে না। তাই নেমে আসছে।’ সালমা বলে।
ছেলেটার হাতে লম্বা আখ দাঁতে কাটছে। চুষে চুষে ফেলে দিচ্ছে মাটিতে। অন্য সময় হলে ঠিক ব্যাপারটা চোখে লাগতো- কী অসভ্য রে, খেয়ে খেয়ে জায়গা নোংরা করছে। কিন্তু ছেলেটার দিকে তাকিয়ে এসব কথা ভাবতে মন চাইছে না। আর চিবানো আখের ছোবা তো আসলে পচেই মিশে যাবে মাটিতে। এতে বরং মাটিরই উপকার। মনে মনে হেসে ফেলি। সালমার দিকে তাকাই। বুঝতে চাই, সে কী ভাবছে! কিন্তু সে দেখি প্রশ্ন করে গাড়ির চালককে- ‘কী সুমন ভাই, ফেরিতে উঠতে পারবেন তো? ওই যে দ্যাহেন পিছনে আরো ভিআইপি আইছে।’ সত্যিই তাকিয়ে দেখি পেছনে কোনো জেলা প্রশাসক কিংবা জেলা পুলিশ সুপারের গাড়িবহর। আতঙ্কিত হয়ে উঠি ভেতরে ভেতরে। কিন্তু সালমাকে সুমন আশ্বস্ত করে- ‘কোনো ভিআইপি-টিআইপি মানুম না ম্যাডাম, ঠিক টান দিয়া উইঠঠা যামু। তারপর যা হয় দেখা যাইবো।’ আমি আঁতকে উঠি যদি সত্যি সত্যিই কিছু হয়! আমার ভয়, এ পৃথিবীকে বড় ভয় আমার।
আমাদের সামনে কেবল একটি বাস দাঁড়ানো। চাইলে আমরা তারপরই উঠতে পারি। কিন্তু না, ওপার থেকে আসা সব গাড়ি নেমে যাওয়ার পর প্রথমেই বাসটিকে ডেকে নেয় ফেরির লোকজন। তারপরই দেখি, পিল পিল করে অসংখ্য গাড়ি এসে আমাদের পাশে, পেছনে জায়গা করে

দাঁড়িয়ে আছে। ডেকে ডেকে তুলছে প্রথমে বড় গাড়িগুলো যেগুলোর ভেতর বোবা পশুগুলো গায়ের সঙ্গে গা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মায়া হয় দেখে। আমার মনে হয়, যতো দ্রুত তারা উঠতে পারে ততোই ভালো। মৃত্যু যখন অনিবার্য তখন তা এগিয়ে আসাই ভালো। এরপরই শুরু হয় ‘ভিআইপি’দের জায়গা করে দেয়ার পালা। তাদের গাড়ি তুলতে তুলতে তার পেছন পেছন টান মেরে আরো কয়েকটি গাড়ি ঢুকে যায় ফোকটে। আর তখনই আমাদের চালক যেন নিজের শক্তি দিয়েই গাড়িটি টেনে ফেরিতে উঠিয়ে ফেলে। আমি আতঙ্কিত হয়ে ওঠার আগেই দেখতে পাই, আমরা ঠিক জায়গা করে নিতে পারছি। তখনই মনে হয়, আহা রে! বেচারা কি এখনো আখ খাচ্ছে? পারলো কি তাদের গাড়িটা ফেরিতে উঠতে? ফেরির পেট ভরে যাচ্ছে দ্রুতই। তখনই সালমা একটি গাড়ি দেখিয়ে বলে, ‘ওই দ্যাখো, তোমার ইরানি লোকটার গাড়ি উঠছে।’ আমি হেসে ফেলি- ‘যাহ! সে ইরানি হবে কেন? একেবারেই আখ খাওয়া বাঙালি যুবক।’ আমাদের গাড়ি থেকে পুরো ফেরিটা দেখা যায়। তাতেই আমরা দেখি, ছেলেটা তার মোবাইল ফোনটা নিয়ে ফেরির দোতলায় ওঠার সিঁড়ির মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ায়। এক মাথা চুল আর মুখভর্তি দাড়িতে তাকে একটু যিশু যিশু দেখায় বোধ করি। সালমা অবশ্য মুখ বেঁকিয়ে বলে, ‘না রে, ফিগারটা তেমন ভালো না, ক্যাংঠা!!’
আমার হাসি পায় সালমার কথায়। আবারও ভাবি, ভাবনার সত্যিই লাগাম নেই। ছেলেটা নিশ্চয়ই জানে না, তাকে নিয়ে আমরা কতো কিছু ভাবছি। ঢাকা শহর থেকে বাইরে বের হতে আমার সবচেয়ে বড় ভয়, পথে যদি বাথরুম পায়, তবে? ঢাকা শহরে না হয় কোনো রেস্টুরেন্ট কিংবা কফি শপে গিয়ে করে নেয়া যায়। কিন্তু পথে? আতঙ্কে আমার তলপেট কেবলই কুঁকড়ে আসে। এসব ভুলতে আমি কতো কিছু নিয়ে যে ব্যস্ত হওয়ার চেষ্টা করি এর শেষ নেই! কিন্তু সালমার কোনো বিকার নেই। সে বলে, ‘আমার টয়লেট পাইছে। যাই দেখি করে আসি, তুমি যাবা?’
‘পাগল তুমি? আমি এখান থেকে এক চুলও নড়বো না।’ গাড়ির জানালার কাচ নামাতে নামাতে বলি। গুমোট হাওয়া ধক করে এসে মুখে লাগে। পশুদের শরীরের গন্ধ মিশে যায় সে হাওয়ায়। ফেরিতে মানুষ বেশি উঠলো, না পশু উঠলো? অবশ্য মানুষ আর পশুতে পার্থক্য কতোটুকুই বা? গোপাল ভাঁড় আজকের দিনে হলে নিশ্চয়ই বলতেন, আধ হাত মাত্র। কারণ সামান্য দূরেই গরুভর্তি ট্রাকটা দাঁড় করানো। সালমা নেমে যাওয়ার আগে আমি তাকে বলি, ‘শোনো না, ছেলেটাকে একটু বলে যাও যে, ওই লাল গাড়ির ভেতর এক ভদ্রমহিলা বসে আছেন। আপনাকে হয়তো চেনে, একটু যাবেন ওখানে?’
সালমা চোখ বড় বড় করে আমার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘সত্যিই কবো? আমি বলতে পারি, কোনো অসুবিধা হবে না আমার। কিন্তু এখানে এলে তারে তুমি কি কবা?’
‘কী আর বলবো? বলবো, বোর হচ্ছিলাম, গল্প করার কেউ নেই। আপনাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মনে হলো, গল্পের জন্য উপযুক্ত চেহারা। তাই আসতে বলেছি। আপনার গল্প করতে ইচ্ছা না হলে যেখানে দাঁড়িয়েছিলেন সেখানে গিয়ে দাঁড়ানগে আবার’- আমি হাসতে হাসতে বলি। সালমা ধরে নেয়, আমি সত্যিই তাকে বলতে বলেছি। ঠিক সেই মুহূর্তে তার চোখ-মুখে কেমন দুষ্টুমি খেলা করে- আমি দেখতে পাই। সে গাড়ির দরজা খুলে নামে। আমাদের চালক আশপাশেই ছিল। তাকে নিয়ে সালমা সিঁড়ি দিয়ে ছেলেটার পাশ দিয়ে উপরে উঠে যায়। আমি তাকিয়ে থাকি অপলক, দেখি কিছু বলে কি না। অন্ধকার তখনো ঝাঁপিয়ে পড়েনি। তাই দেখা যায়, সালমা তাকে এড়িয়ে উপরে উঠে যায়। কিন্তু একটু পরই আবার নেমে আসে। এসে ফেরির নিচতলায় ভেতরের দিকে যায়। আমি চিন্তা করতে থাকি, উপরের টয়লেট কি বন্ধ? ছেলেটা তখন পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করে আকাশের গায়ে লেগে থাকা লাল, হলুদ, সোনালি রঙের ছবি তোলে। বাহ! ভেতরে সৌন্দর্যজ্ঞান আছে তো? কথা তাহলে বলাই যায়। যে ছেলে আকাশের রঙ বদলানো টের পায় তার সঙ্গে কথা বলতে ভালোই লাগবে মনে হয়। আমি উত্তেজিত ভেতরে ভেতরে। সালমা ফিরে আসে দ্রুতই।
সালমাও উত্তেজিত, ‘জানো, উপরের টয়লেট বন্ধ। ভিআইপিরা রুম আটকে বসে আছে। ভাবো কী ভয়ঙ্কর! আমাকে ওই ভয়ঙ্কর টয়লেটে যাইতে হইলো। নিজেরে নোংরা লাগছে। পানি দাও তো এট্টু হাত ধুই।’ আমি পানির বোতল এগিয়ে দিই আর ভাবি, এ দেশে ভিআইপি হওয়াটা বিশেষ জরুরি। না হলে বর্জ্য ত্যাগেরও সুযোগ পাওয়া যায় না। সালমা নিজেকে ধুয়ে-টুয়ে ভেতরে আসে। গাড়ির ভেতর তখন বিষগরম। নিজেকে মনে হচ্ছে, সিদ্ধ করতে দিয়েছি পাথরপোড়া গরমে। বিদেশে এটিকেই তো সাউনা বলে। আমরা গরমের দেশের লোকজনই কেবল তা বুঝতে চাই না। আমি প্রসঙ্গ বদলাই- ‘এই, তুমি ছেলেটাকে কিছু বললে না যে? ডরাইছ?”
‘ইস! কিসের ডর? আমি ভাবলাম তুমি ঠাট্টা করছ’- সালমা হাসে।
‘ধুর, ঠাট্টা ক্যান করবো? কী মজা হইতো বলো? ছেলেটার চেহারা নিশ্চয়ই বদলায়ে যেতো আমাদের সামনে এসে, তাই না?’ আমি বলি।
‘তাহলে একটা পিচ্চিকে দিয়ে আমরা খবর পাঠাই চলো। ওই যে বাদামওয়ালা আসছে। তাকে বলি।’ সালমা বাদামওয়ালাকে ডাকে- ‘এই বাদাম, এই বাদাম।’
বাদামওয়ালা তখন চেঁচাচ্ছে- ‘এই নেন বাদাম, এই যে বাদাম। লবণ-মরিচ মিশায়া খান। মজা পাইবেন।’ লোকটা এগিয়ে আসে। সালমা কিছু বলার আগে আমিই বলি, ‘কতো কইরা ভাই?’

আটকে বসে আছে। ভাবো কী ভয়ঙ্কর! আমাকে ওই ভয়ঙ্কর টয়লেটে যাইতে হইলো। নিজেরে নোংরা লাগছে। পানি দাও তো এট্টু হাত ধুই।’ আমি পানির বোতল এগিয়ে দিই আর ভাবি, এ দেশে ভিআইপি হওয়াটা বিশেষ জরুরি। না হলে বর্জ্য ত্যাগেরও সুযোগ পাওয়া যায় না। সালমা নিজেকে ধুয়ে-টুয়ে ভেতরে আসে। গাড়ির ভেতর তখন বিষগরম। নিজেকে মনে হচ্ছে, সিদ্ধ করতে দিয়েছি পাথরপোড়া গরমে। বিদেশে এটিকেই তো সাউনা বলে। আমরা গরমের দেশের লোকজনই কেবল তা বুঝতে চাই না। আমি প্রসঙ্গ বদলাই- ‘এই, তুমি ছেলেটাকে কিছু বললে না যে? ডরাইছ?”
‘ইস! কিসের ডর? আমি ভাবলাম তুমি ঠাট্টা করছ’- সালমা হাসে।
‘ধুর, ঠাট্টা ক্যান করবো? কী মজা হইতো বলো? ছেলেটার চেহারা নিশ্চয়ই বদলায়ে যেতো আমাদের সামনে এসে, তাই না?’ আমি বলি।
‘তাহলে একটা পিচ্চিকে দিয়ে আমরা খবর পাঠাই চলো। ওই যে বাদামওয়ালা আসছে। তাকে বলি।’ সালমা বাদামওয়ালাকে ডাকে- ‘এই বাদাম, এই বাদাম।’
বাদামওয়ালা তখন চেঁচাচ্ছে- ‘এই নেন বাদাম, এই যে বাদাম। লবণ-মরিচ মিশায়া খান। মজা পাইবেন।’ লোকটা এগিয়ে আসে। সালমা কিছু বলার আগে আমিই বলি, ‘কতো কইরা ভাই?’
- দশ টাকা প্যাকেট।
‘দুই প্যাকেট দ্যান ভাই।’
ততোক্ষণে আঁধার জমেছে একটু। ফেরিও ছেড়েছে বোঝা যায়। কিন্তু বাতাস নেই কোনোদিক থেকেই। বাদামওয়ালা দুই প্যাকেট বাদাম দিতে দিতে একটা ছোট পলিথিনের ব্যাগও ধরিয়ে দেয়। বলে, ‘ম্যাডাম, বাদাম ছিলা এর মইধ্যে ফালাইয়েন। এক্সটা দিলাম। ভেতরে লবণ-মরিচ আছে। মাইখ্যা খাইয়েন, মজা পাইবেন।’ আমি হেসে ফেলি- ‘ঠিক আছে, মাইখ্যাই খামু।’
- আফাদের বাড়ি কোথায়? মানে ঢাকায় কই থাকেন? বাদামওয়ালা আমাদের সঙ্গে কথা বাড়াতে চায়। আমি অন্ধকারেও তাকিয়ে থাকি তার দিকে। বোঝে কথা বাড়বে না। কিন্তু আমি এ জন্য তাকাইনি। আমি তাকে দেখতে চেয়েছিলাম। মানুষের মুখ-চোখ দেখা আমার স্বভাব। বাদামওয়ালা কী ভাবলো কে জানে? মিন মিন করে বললো, ‘আমারও বাড়ি পুরান ঢাকায়। তাই জিগাইছিলাম আর কী!’ আমাদের বাদামের প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে বাদামওয়ালা সরে যায়। আর সালমা ততোক্ষণে বাদামওয়ালাকে জিজ্ঞাসা করে ফেলে- ‘কতোক্ষণ লাগবে পার হইতে?’
- বেশিক্ষণ না আফা, কুসুমকুমারী ভিআইপি ফেরি তো। তাই আড়াই ঘুণ্টা লাগবে। এর বেশি না। আর ফেরিডাও নতুন আনছে আফা।
আমাদের জানা হয়ে যায়, আমরা কুসুমকুমারী নামক ভিআইপি এবং নতুন ফেরিটিতে উঠেছি। আমাদের মনে এক ধরনের উৎফুল্ল ভাব আসে। আর সে ভাবেই আমরা বাদামওয়ালাকে বলি, মানে, আমিই বলি- ‘ওই যে দেখছেন সিঁড়ির মাঝামাঝি একজন ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আছেন, দাড়িওয়ালা। তাকে গিয়ে বলবেন, এই গাড়ির ম্যাডাম তাকে ডাকছে। বলতে পারবেন না?’ ছেলেটা তখনো পদ্মা সেতুর জন্য জমানো পাথুরে

 

পাহাড়ের ছায়াকে মোবাইল ফোনবন্দি করছে। ওমা! পাথরের ওপর তো মানুষের অবয়বও দেখা যাচ্ছে। এক-দু’জন নয়, বেশ মানুষ উঠেছে ওই অত্ত উঁচুতে? বাদামওয়ালা হেঁটে যায়। আমরা দু’জন মূর্তির মতো বসে থাকি। মুখ থেকে গুলি বেরিয়ে গেছে। গুলিতো নয়, বাদামওয়ালা ছুটে যাচ্ছে ছেলেটার দিকে। সিঁড়ি দিয়ে উঠছে, কথা বলছে ছেলেটার সঙ্গে। ততোক্ষণে ফেরির টিমটিমে বাতিও জ্বলতে শুরু করেছে। ছেলেটি আমাদের গাড়ির দিকে তাকাচ্ছে। তারপর হাত দিয়ে চুল ঠিক করলো এবং একটু থেমে থেমে নামতে শুরু করলো। বাদামওয়ালার পেছন পেছন নেমে ছেলেটা আমাদের গাড়ির দিকে এলো আর বাদামওয়ালা অন্যদিকে। ছেলেটি এসে সালমার দিককার জানালায় দাঁড়ালো প্রথমে। তারপর একটু ঝুঁকে জিজ্ঞাসা করলো- ‘ডেকেছেন?’
সালমা আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি সপ্রতিভ হয়ে উঠি- বলি, ‘জি, ডেকেছি। মনে হচ্ছিল আপনাকে চিনি। নেমে গিয়ে জিজ্ঞাসা করতে সংকোচ হচ্ছিল। তাই আসতে বলেছি। কিছু মনে করেননি তো?’
ছেলেটি হাসে। স্বল্প আলোতেও টের পাই হাসিটা মিষ্টি। আমি বয়স ভাবার চেষ্টা করি। ত্রিশের একটু বেশি হবে। হাত চালায় চুলের ভেতর আবার। বুঝতে পারি, তারও ভেতরে প্রশ্ন। তাই চুলের ভেতর হাত দিয়ে তা তাড়ানোর চেষ্টা করছে। আমি নিজের নাম বলি। আর সালমার দিকে দেখিয়ে বলি, ‘ও সালমা। আপনার নাম কি তপু? আপনি কি কোনো টিভি চ্যানেলে আছেন? না হলে এতো পরিচিত মনে হচ্ছে কেন?‘ খুবই দুর্বল ও বানানো শোনায় শেষের প্রশ্নটি। নিজেকে খুব ন্যাকা ন্যাকা লাগে। তাই নিজেকে সংশোধন করে ফেলি দ্রুত। বলি, ‘সত্যি কথা বলি। আসলে আমাদের কথা বলতে ইচ্ছা করছিল কারো সঙ্গে। তাই আপনাকে ডেকেছি। আপনি তো একা একা দাঁড়িয়ে মোবাইল ফোনে আঁধারবন্দি করছিলেন। এ জন্য ভাবলাম, হয়তো কথা বলতে আপনারও ভালো লাগতে পারে।’
ছেলেটির চোখ-মুখে তখনো অবাক ভাব। তা কাটতে সময় নেবে বুঝতে পারি। কিন্তু এর আগেই সালমা বলে, ‘আমার কথা বলতে ইচ্ছা করে নাই কিন্তু। ওর করেছে, বুঝলেন?’
- জি, বুঝেছি। তাহলে নেমে আসুন আপনারা, কথা বলি।
বাহ! গলার স্বরটা তো বেশ। ভরাট। আমি সালমার দিকে তাকাই। বলি, ‘চলো, নেমে ফেরির পেছন দিকে যাই। উপরে তো ভিআইপিরা দরজা বন্ধ করে রেখেছে।’ সালমা বলে, ‘তোমরা নামো, আমি আসছি একটু পরে। একটা ফোন করতে হবে আমার। বুঝতে পারি, সালমা সময় নিচ্ছে। আমি দরজা খুলে নামি। পরনের শাড়িটি সামলে নামতে একটু সময় লাগে। পায়ে স্যান্ডেল গলিয়ে তারপর নামি। তখনো ফেরিজুড়ে ‘গোময়’-এর গন্ধ ম-ম করছে। ছেলেটি এগিয়ে আসে। বলে, ‘এই দিকে আসুন’- হাত দিয়ে দেখিয়ে দেয় ফেরির সামনের দিকটা। সেখানে ইতি-উতি লোকজন দাঁড়ানো। তবে জায়গা আছে ফাঁকা দাঁড়ানোর মতো। আমরা গিয়ে দাঁড়াই এবং সেই প্রথম পদ্মা থেকে বাতাস ওঠে একটুখানি, জলগন্ধ মাখানো। আমার ভালো লাগে। আমি ফিরতে থাকি পেছনে। যখন আমার ষোল, কী সতের বছর তখনকার কোনোদিন। এমন আশ্বিনও হতে পারে। তুমুল বৃষ্টি আর ঢেউ ভেঙে পদ্মা পার হতে হতে আরেকজন মানুষকে দেখছিলাম কেবলই। সেও তাকিয়েই ছিল সারাক্ষণ। কিন্তু কথা বলার সাহস আমাদের কারোরই হয়নি। অথচ আজ কী অনায়াসে আমি একটি ছেলেকে তার অবস্থান থেকে ডেকে সরিয়ে এনে গল্প করছি। নিজেকে আমার সাহাসী মনে হয় একটু। বলি, ‘আমি সত্যিই দুঃখিত আপনাকে এভাবে ডেকে বিরক্ত করার জন্য।’
- বিরক্ত হচ্ছি না, আপনি বলুন।
কী বলবো?
- কথা বলতে চাইছিলেন না?
কথা! খুঁজে পাচ্ছি না তো আর।
আমি সত্যিই কথা খুঁজে পাচ্ছিলাম না আর। তবে আমি ক্রমেই ফিরছিলাম অতীতে। মনে হচ্ছিল, আমি সেই ছেলেটির সঙ্গে কথা বলছি- যখন আমার বয়স ষোল। ছেলেটিরও হয়তো তাই। ভেতর থেকে কি কোনো দীর্ঘশ্বাস বের হচ্ছে? বুঝি না।
আমার কথা শুনে ছেলেটি আবার হেসে ওঠে- বেশ উঁচু ও দরাজ হাসি। অন্ধকার একটু একটু করে গলে পড়ে সে হাসিতে। আমি ছেলেটির মুখ দেখতে পাই না আর। কিন্তু আমার মুখের ওপর আলো পড়ছে বুঝতে পারি। চোখে এসে লাগে। তবুও দাঁড়িয়ে থাকি আমি। বলি, ‘কী নাম আপনার?’
- ওই যে বললেন তপু। আমার নাম ধরুন তপুই।
যাহ! সত্যি নয়। সত্যি নাম বলুন। আচ্ছা থাক, বলতে হবে না। আপনার নাম তপু। তা তপু, কী করেন আপনি?
- আপনিই তো বললেন, টিভি চ্যানেলে কাজ করি। ধরুন, তাই করি।
আচ্ছা, না হয় তা-ই ধরলাম। কোথায় গিয়েছিলেন বা কোথা থেকে ফিরলেন?
- আপনি কি সব সময় এ রকম করে কথা বলেন? বেশ গুছিয়ে?
নাহ বলি না, এখন বলছি ভেবে-চিন্তে ও গুছিয়ে।
ছেলেটি হাসে। ওহ, ছেলেটির নাম তপু। ‘আচ্ছা তপু, এই যে আপনাকে ডেকে আনলাম আমরা। আপনি কি যে কেউ ডাকলেই যেতেন?’
- উনি তো আমাকে ডাকেননি বললেন। আপনিই ডেকেছেন। আসতাম। কারণ আপনাদের আমি দেখেছি যখন আখ খাচ্ছিলাম তখন।
বাহ, বেশ স্মার্ট তো। আমি আগ্রহী হই। আমরা কথা বলতে থাকি। বহু পুরনো কোনো ইতিহাস খুঁড়ে আনা কথামালা। পদ্মার জলের ওপর ঝুলে থাকা আঁধার। ছলাৎ ছলাৎ ঢেউয়ের শব্দ আমাদের কথাগুলোকে আরো উজ্জীবিত করে। আমাদের চারপাশে দইওয়ালা হাঁকে। ছোট্ট ছোট্ট প্লাস্টিকের কাপে করে দই বিক্রি করছে। ছেলেটি বলে, খাবেন? আমি বলি, নিশ্চয়ই। আমরা দই কিনি। মহামিষ্টি দই। খেতে পারি না। সালমার জন্য যেটি কিনি সেটি হাতে ধরে রাখি।
হঠাৎ অন্ধকার ফুঁড়ে সালমা এসে দাঁড়ায়। বলে, ‘ঘাট এসে গেছে। চলো যাই এবার।’ সালমার হাতে দই দিতে দিতে আমরা গাড়ির দিকে এগোই। আমরা কেউ কোনো কথা না বলে যে যার মতো ফিরে যাই। গাড়িতে উঠি। কুসুমকুমারী ফেরি থেকে আমাদের গাড়িটি নামে ভিআইপিদের গাড়িরও বেশ কয়েকটি গাড়ি পর। তারপর রাস্তার ওপর ঝুঁকে থাকা গাছের সারিকে গাড়ির হেডলাইটের আলোয় বিয়ের গেইটের মতো মনে হতে থাকে আমাদের। কিন্তু ফিরতে ফিরতে আমরা দু’জনই আর সেই ছেলেটির কথা বলি না। কেন বলি না সেটি বলতে পারবো না। তবে আমার মাথায় বাদামওয়ালার কাছ থেকে বাদাম কিনে খাওয়া-পরবর্তী আর কোনো স্মৃতি নেই। কিন্তু স্মৃতি না থাকলে কী হবে, আমাদের গাড়ির পেছন ও সামনেটা ভর্তি করে নিয়ে আসি কচুশাক, ডাব, নারিকেল, মিষ্টি, পিপুল পাতা, রুম্বি কলা, আরো কতো কী! যেন পুরো শৈশব আমাদের গাড়িতে। আমরা ঢাকায় ফিরি। যে যার বাড়িতে নামি। কুসুমকুমারী ভিআইপি ফেরির কথা আর কখনো তুলি না আমরা।

 


আমার কথা শুনে ছেলেটি আবার হেসে ওঠে- বেশ উঁচু ও দরাজ হাসি। অন্ধকার একটু একটু করে গলে পড়ে সে হাসিতে। আমি ছেলেটির মুখ দেখতে পাই না আর। কিন্তু আমার মুখের ওপর আলো পড়ছে বুঝতে পারি। চোখে এসে লাগে। তবুও দাঁড়িয়ে থাকি আমি। বলি, ‘কী নাম আপনার?’
- ওই যে বললেন তপু। আমার নাম ধরুন তপুই।
যাহ! সত্যি নয়। সত্যি নাম বলুন। আচ্ছা থাক, বলতে হবে না। আপনার নাম তপু। তা তপু, কী করেন আপনি?
- আপনিই তো বললেন, টিভি চ্যানেলে কাজ করি। ধরুন, তাই করি।
আচ্ছা, না হয় তা-ই ধরলাম। কোথায় গিয়েছিলেন বা কোথা থেকে ফিরলেন?
- আপনি কি সব সময় এ রকম করে কথা বলেন? বেশ গুছিয়ে?
নাহ বলি না, এখন বলছি ভেবে-চিন্তে ও গুছিয়ে।
ছেলেটি হাসে। ওহ, ছেলেটির নাম তপু। ‘আচ্ছা তপু, এই যে আপনাকে ডেকে আনলাম আমরা। আপনি কি যে কেউ ডাকলেই যেতেন?’
- উনি তো আমাকে ডাকেননি বললেন। আপনিই ডেকেছেন। আসতাম। কারণ আপনাদের আমি দেখেছি যখন আখ খাচ্ছিলাম তখন।
বাহ, বেশ স্মার্ট তো। আমি আগ্রহী হই। আমরা কথা বলতে থাকি। বহু পুরনো কোনো ইতিহাস খুঁড়ে আনা কথামালা। পদ্মার জলের ওপর ঝুলে থাকা আঁধার। ছলাৎ ছলাৎ ঢেউয়ের শব্দ আমাদের কথাগুলোকে আরো উজ্জীবিত করে। আমাদের চারপাশে দইওয়ালা হাঁকে। ছোট্ট ছোট্ট প্লাস্টিকের কাপে করে দই বিক্রি করছে। ছেলেটি বলে, খাবেন? আমি বলি, নিশ্চয়ই। আমরা দই কিনি। মহামিষ্টি দই। খেতে পারি না। সালমার জন্য যেটি কিনি সেটি হাতে ধরে রাখি।
হঠাৎ অন্ধকার ফুঁড়ে সালমা এসে দাঁড়ায়। বলে, ‘ঘাট এসে গেছে। চলো যাই এবার।’ সালমার হাতে দই দিতে দিতে আমরা গাড়ির দিকে এগোই। আমরা কেউ কোনো কথা না বলে যে যার মতো ফিরে যাই। গাড়িতে উঠি। কুসুমকুমারী ফেরি থেকে আমাদের গাড়িটি নামে ভিআইপিদের গাড়িরও বেশ কয়েকটি গাড়ি পর। তারপর রাস্তার ওপর ঝুঁকে থাকা গাছের সারিকে গাড়ির হেডলাইটের আলোয় বিয়ের গেইটের মতো মনে হতে থাকে আমাদের। কিন্তু ফিরতে ফিরতে আমরা দু’জনই আর সেই ছেলেটির কথা বলি না। কেন বলি না সেটি বলতে পারবো না। তবে আমার মাথায় বাদামওয়ালার কাছ থেকে বাদাম কিনে খাওয়া-পরবর্তী আর কোনো স্মৃতি নেই। কিন্তু স্মৃতি না থাকলে কী হবে, আমাদের গাড়ির পেছন ও সামনেটা ভর্তি করে নিয়ে আসি কচুশাক, ডাব, নারিকেল, মিষ্টি, পিপুল পাতা, রুম্বি কলা, আরো কতো কী! যেন পুরো শৈশব আমাদের গাড়িতে। আমরা ঢাকায় ফিরি। যে যার বাড়িতে নামি। কুসুমকুমারী ভিআইপি ফেরির কথা আর কখনো তুলি না আমরা।

Page 6 of 8

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…