Page 6 of 8

নিঃসঙ্গ

খান অপূর্ব আহমদ 

 

 

কয়েকদিন ধরে তমালের মনে অস্থিরতা বিরাজ করছে। সব সময় বুক ধড়ফড় হয়। মাঝে মধ্যে বুকে চিন চিন ব্যথা করে। কখনো নিঃশ্বাস আটকে আসে। মনে হয়, এই বুঝি ফুসফুসের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাবে। এ জন্য মাথার মধ্যে নানান দুশ্চিন্তা এসে ভর করে। কিছুই ভালো লাগে না। যখন এমন হয় তখনই তমালের মা ফোন করেন। তার খোঁজখবর নেন। আর এতে সে পরিপূর্ণ সুস্থ অনুভব করে। কথায় আছে, সন্তানের কিছু হলে প্রথম মা-ই টের পান। এটি ভেবে তমাল স্বাভাবিক হয়ে যায়। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। তমালের মা ফোন করে জানতে চেয়েছেন সে ভালো আছে কি না। আজ মায়ের সঙ্গে কথা বলেও নিজের ভেতরের অস্থিরতা কাটাতে পারছে না। শুধু ভাবছে কোথাও কারো কোনো বিপদ হলো নাকি!
তমালের বদ্ধমূল ধারণা, বুক ধড়ধড় করা মানে আপনজন কারো কোনো সমস্যা হওয়া। অতীতের অনেক ঘটনায় এমন প্রমাণই পেয়েছে। ফলে ওই ধারণাটি তার মগজে বিঁধে আছে। তাই সে এ সময় মায়ের কথাই বেশি করে মনে করে। কারণ মায়ের বয়স হয়েছে। যখন-তখন তার যে কোনো সমস্যা হতেই পারে। কিন্তু তার মা তো এখন ভালো আছেন। তাহলে? এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ একটি ফোন আসে। নাম্বারটি সেইভ না খাকায় ভয়ে ভয়ে কলটি ধরে।
- হ্যালো।
কেমন আছ? ব্যস্ত নাকি?
- কে বলছেন প্লিজ!
আমি জান্নাত। চিনতে পারছ, নাকি একেবারেই ভুলে গেছ? আর ভুলে যাওয়ারই কথা। কেননা মনে রাখার মতো আমি আসলেই কিছু করিনি।
- না, তা হবে কেন?
না হলে অন্তত নাম্বার সেইভ থাকতো।
- বিষয়টি তা নয়। আসলে ফোনসেট চেঞ্জ করায় অনেক নাম্বারই সেইভ নেই। থাক, সংসার কেমন চলছে?
ভালো-মন্দ মিলিয়েই তো জীবন। আছি এক রকম। আর সংসার নেই। ডিভোর্স হয়ে গেছে প্রায় তিন বছর। নিঃসঙ্গ জীবন কাটাচ্ছি বলতে পারো।
- সত্যিই দঃখজনক। সাত বছর প্রেমের পরিণতি দু’বছরেই সব শেষ!
ওই ভ-কে বিয়ে করিনি। করেছিলাম আমার সহকর্মীকে। সেও প্রতারক। তার শিক্ষাগত যোগ্যতাসহ ফ্যামিলির অনেক কিছুই গোপন করেছিল। তাও চেষ্টা করেছিলাম মানিয়ে নিতে। ‘পারিনি।
- তোমরা কি এক সঙ্গে পড়তে?
হ্যাঁ।
- তারপরও সে এতো কিছু গোপন করলো কী করে? দেখেছ তুমি কতোটা বোকা! অথচ তুমি বিভিন্নভাবে সতর্কতা অবলম্বন করতে। মনে করতে জীবনে কখনো কিছুতেই ভুল করবে না। আমি বলতাম, তুমি খুব সরল। ওই সরলতাই তোমাকে সর্বনাশ করবে। তখন মানতে চাওনি।
এ জন্যই তোমাকে ফোন করা। কয়দিন ধরে শুধু তোমার কথাই মনে পড়ছিল। তাই অনেক দ্বিধা-দ্বন্দ্ব নিয়ে কল করলাম। ভাবছিলাম, তুমি হয়তো অ্যাভয়েড করবে। অবশ্য তোমার ওই কথাটি মনে করেই সাহস পেলাম।
- হ্যাঁ, আমি বলেছিলামÑ সুখের সময় আমাকে খুঁজো না, দুঃখ পেলে মনে করো। তবে এ কথা তুমি মনে রাখবে তা ভাবিনি।
যাক, তোমার কথা বলো।
- আমার অবস্থা একই রকম। মানে, আগের চাকরিতেই আছি। পরিবর্তন শুধু সন্তানের বাবা হয়েছি। আমার ওয়াইফ নির্ভেজাল গৃহিণী।
এখন রাখি। তোমার সঙ্গে কথা বলে মনটা বেশ ফ্রেশ লাগলো। এখন থেকে মাঝে মধ্যে তোমার সঙ্গ চাইবো। তাছাড়া তোমার ধারণা অনেকটাই সঠিক হয়। তাই কিছু সাজেশন নেবো।
- আমার বিশ্বাস হয় না। কারণ তুমি তো খেয়ালি মানুষ। কোন খেয়ালে ফোন করেছ জানি না। ঠিক আছে। তখন তোমার গত পাঁচ বছরের গল্প শোনা যাবে।

তমাল একটি ফার্মে নির্বাহী পদে চাকরি করে। জান্নাত একটি ট্রাভেল এজেন্সির মার্কেটিংয়ে ছিল। ভ্রমণে যাওয়ার সুযোগ-সুবিধা জানানোর জন্য সে একদিন তমালের অফিসে এসেছিল। আর প্রথম দেখাতেই জান্নাতকে ভালো লেগেছিল তমালের। এরপর থেকে নিয়মিত তাদের সঙ্গে কথা হতো। এক পর্যায়ে তমাল বলেই ফেলে তাকে বিয়ে করার কথা। জান্নাত তখন বলেছিল, সে একজনকে ভালোবাসে এবং তাকেই বিয়ে করবে। তবে আমাদের বন্ধুত্ব আজীবন থাকবে। এরপর থেকে তাদের মধ্যে যোগাযোগ কমতে থাকে। এক সময় তা বন্ধ হয়ে যায়।

 চৈত্রের শেষ বিকেল

শায়লা হাফিজ

 

চৈত্রের শেষ দিন নববর্ষের আগমন সুখের সঙ্গে যেন মনে এনে দেয় ঋতুরাজ বসন্তের বিদায়ী ব্যথা মেশানো বিরহ বিধুর লগ্ন। তাই একটি বছরের অনেক অসন্তোষ, অনেক না পাওয়ার দুঃখ-গ্লানি ভুলে বাঙালি প্রাণ নেচে ওঠে নানা আয়োজনে বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণের আনন্দে। জীর্ণ পুরনো সব গ্লানি ধুয়ে-মুছে ‘নব আনন্দ বাজুক প্রাণে- এই মঙ্গল কামনায় বাঙালি বিদায় জানাবে কাটিয়ে দেয়া একটি বাংলা বছর।
বাংলা সনের শেষ মাসের নামকরণ করা হয়েছে চৈত্র। চৈত্র মাসের নাম ‘চৈত্র’ কীভাবে হলো? আদি পুরাণে বর্ণিত আছে, রাজা দক্ষের এক কন্যা ছিল চিত্রা। তার নাম অনুসারে এক নক্ষত্রের নামকরণ করা হয় চিত্রা নক্ষত্র। এই চিত্রা নক্ষত্র থেকে চৈত্র মাসের নামকরণ করা হয়। বাংলা সনের শেষ মাসের নামকরণ করা হয়েছে চৈত্র।
বহুকাল ধরে বাংলা বছরের সমাপনী মাস চৈত্রের শেষ দিনটিতে হিন্দু সম্প্রদায় ‘চৈত্র সংক্রান্তি’ পালন করছে। তাই বাংলা বছরের সমাপনী দিনটি ‘চৈত্র সংক্রান্তি’ নামে সমধিক পরিচিত। সংক্রান্তি কথাটির অর্থ ‘অতিত্রম করা’। সূর্য এক রাশি থেকে অন্য রাশিতে প্রবেশ করে বলেই এটিকে বলা হয় সংক্রান্তি। ফলে মাসের শেষ দিনটিকে বলা হয় সংক্রান্তি। চৈত্র সংক্রান্তি এখন কেবল কোনো ধর্ম বা মতের মধ্যে আবদ্ধ নয়, এটি রূপ নিয়েছে এক সর্বজনীন বর্ণিল উৎসবে।
চৈত্র সংক্রান্তির আসল আর্কষণ থাকে চড়ক পূজা। এটি কেন্দ্র করে দেশের অনেক জায়গায় বসে মেলা। চৈত্র সংক্রান্তির মেলায় বাঁশ, বেত, প্লাস্টিক, মাটি ও ধাতুর তৈরি বিভিন্ন তৈজসপত্র ও খেলনা, বিভিন্ন ফল ও মিষ্টি কেনা-বেচা করা হয়। বায়োস্কপ, সার্কাস, পুতুলনাচ, ঘুড়ি ওড়ানো ইত্যাদি চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থাও থাকে। অঞ্চলভেদে এই মেলা এক থেকে সাত দিন চলে। চড়ক পূজা চৈত্র সংক্রান্তির এক অন্যতম অনুষঙ্গ। লৌকিক আচার অনুযায়ী এই দিনে বিদায় উৎসব পালন করে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়। দোকানপাট ধুয়ে-মুছে বিগত বছরের যতো সব জঞ্জাল, অশুচিতা বিদূরিত করা হয়। পরদিনই খোলা হয় ব্যবসায়িক হিসাব-নিকাশের নতুন খাতা। এ উৎসবের লোকায়ত নাম ‘হালখাতা’।
বাংলার ঋতুচক্রের পালাবদলে চৈত্র আসে গ্রীষ্ম উষ্ণতা নিয়ে। প্রখর তপন তাপে আকাশ তৃষ্ণায় তৃষ্ণার্ত হয়ে ওঠে। মানব মনও তৃষিত হয় প্রকৃতি বরণ ও স্মরণ করতে। বাংলা বছরের সমাপনী মাস চৈত্র। চড়ক গাজন উৎসবের একটি প্রধান অঙ্গ। এ উপলক্ষে এক গ্রামের শিবতলা থেকে শোভাযাত্রা শুরু করে অন্য শিবতলায় নিয়ে যাওয়া হয়, একজন শিব ও একজন গৌরী সেজে নৃত্য করেন এবং অন্য ভক্তরা নন্দি, ভৃঙ্গি, ভূত-প্রেত, দৈত্যদানব প্রভৃতি সেজে শিব-গৌরীর সঙ্গে নেচে চলেন। এ সময় শিব সম্পর্কে নানান লৌকিক ছড়া আবৃত্তি করা হয়। এতে শিবের নিদ্রাভঙ্গ থেকে শুরু করে তার বিয়ে, কৃষিকর্ম ইত্যাদি বিষয় উল্লেখ থাকে। এ মেলায় সাধারণত শূলফোঁড়া, বানফোঁড়া ও বড়শিগাঁথা অবস্থায় চড়ক গাছে ঘোরা, আগুনে হাঁটা প্রভৃতি ভয়ঙ্কর ও কষ্টসাধ্য দৈহিক কলাকৌশল দেখানো হতো।

ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের বর্ষ বিদায় ও বর্ষবরণ উৎসব হলো ‘বৈসুক’। বাংলা বছরের শেষ তিন দিন পার্বত্যবাসী অতি আনন্দের সঙ্গে এই উৎসব পালন করে থাকে। অন্য সম্প্রদায় তথা সব ধর্মের মানুষ এই উৎসবে অংশগ্রহণ করে থাকে। সামর্থ্য অনুযায়ী ঘরের ছেলেমেয়েদের নতুন পোশাক দেয়া হয়, খাবার হিসেবে বিভিন্ন রকমের পিঠা ও পাঁচন তৈরি করা হয়ে থাকে। বৈসুক উৎসবের প্রধান আপ্যায়নের বস্তু হলো পাঁচন। এটি সাধারণত বন-জঙ্গলের হরেক রকমের শাকসবজির মিশ্রণ। তারা মনে করে, বছরের শেষ ঋতু পরিবর্তনের সময় বিভিন্ন শাকসবজি দিয়ে রান্না পাঁচন খেলে পরবর্তী বছরের রোগবালাই থেকে রেহাই পাওয়া যাবে। বছরের শেষ দিনের আগের দিন ‘হারি বৈসুক’ ও শেষ দিনকে বলে ‘বৈসুকমা’ এবং নতুন বছরকে বলে ‘আতাদাকি’।
হারি বৈসুকের দিনে প্রথমে তারা ফুল সংগ্রহ করে বাড়িঘর, মন্দির সাজায়। তারপর গায়ে কুচাই পানি (পবিত্র পানি) ছিটিয়ে স্নান করে আসে। এর সঙ্গে বয়োজ্যেষ্ঠদের পানি তুলে স্নান করিয়ে আশীর্বাদ নেয়। পরের দিনে পাড়ার যুবক ছেলেরা এক ওঝার নেতৃত্বে দলবেঁধে গরয়া নৃত্যের মহড়া দেয়। এই গরয়া দেবতার পূজা দিয়ে আশীর্বাদ বক্ষবন্ধনী কাপড় দিয়ে বেঁধে রাখে। তাদের বিশ্বাস, কারায়া গরয়া হচ্ছে বনের হিংস্র পশুগুলোর নিয়ন্ত্রণকারী দেবতা। তাদের পূজার আশীর্বাদ গ্রহণ করলে পরবর্তী বছরে জুম চাষ ও বিভিন্ন কাজে বন-জঙ্গলে গেলে হিংস্র পশুগুলোর আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।
মাস হিসেবে বৈশাখের প্রথম হওয়ার মর্যাদা খুব বেশি দিনের নয়। বৈদিক যুগে সৌর মতে, বছর গণনার যে পদ্ধতি প্রচলিত ছিল, সেখানেও বৈশাখের সন্ধান মেলে। বৈদিক যুগের ওই তথ্য অনুযায়ী বৈশাখের স্থান ছিল দ্বিতীয়। তৈত্তিরীয় ও পঞ্চবিংশ ব্রাহ্মণের মতে, বৈশাখের অবস্থান ছিল বছরের মাঝামাঝি জায়গায়। অন্যদিকে ব্রহ্মা- পুরাণে অনুষঙ্গপাদের একটি শ্লোক অনুসারে মাসচক্রে বৈশাখের অবস্থান ছিল চতুর্থ। তখন বাংলা সন বলতে কিছু ছিল না।

মোঘল সম্রাট আকবর ‘সুবে বাংলা’ প্রতিষ্ঠার পর বাংলাদেশে ফসল কাটার মৌসুম অনুসারে খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে নতুন একটি সনের প্রবর্তনের জন্য অনুরোধ করেন রাজ জ্যোতিষী ও প-িত আমির ফতেহউল্লাহ সিরাজীকে। সিরাজী হিজরি চন্দ্র মাসের সঙ্গে সম্রাটের সিংহাসনে আরোহণের বছর এবং ভারতীয় সৌর সনের সমন্বয়ে বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। মাসের নামগুলো সৌর মতে রেখেই পুনর্বিন্যাস করেন তিনি। এ অনুযায়ী বৈশাখ বাংলা সনের প্রথমে চলে আসে।
বাংলা সনের শেষ দিনটি বিদায় জানানোর জন্য বাঙালি যেমন প্রস্তুত হবেন তেমনি প্রস্তুত হবেন আরেকটি নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে। একই সঙ্গে খাতা খুলে কষতে বসবেন বিগত বছরের সাফল্য ব্যর্থতা ও পাওয়া, না পাওয়ার হিসাব। সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে নানান আচার অনুষ্ঠানে যেমন বিদায় জানানো হবে চৈত্রকে তেমনি প্রস্তুতি নেবেন চৈত্রের শেষ রাতের প্রহরে সূর্য উদয়ের সঙ্গে সঙ্গে বৈশাখ বরণ করে নিতে। রবীন্দ্র নাথ ঠাকুরের ভাষায় যদি বলিÑ

‘নিশি আবসান প্রায় ঐ পুরাতন বর্ষ হয় গত
আমি আজি ধুলিতলে জীর্ণ জীবন করিলাম নত॥
বন্ধু হও শত্রু হও, যেখানে যে রও
ক্ষমা কর আজিকার মতো
পুরাতন বৎসরের সাথে পুরাতন অপরাধ যত।’

চৈত্রের রুদ্র রূপ ডিঙিয়ে আমাদের মধ্যে এলো বৈশাখ। এলো আরেকটি নতুন একটি বছর। অনেক প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, চড়াই-উতরাই, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও আনন্দ-বেদনার সাক্ষী হয়ে কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে একটি বছর। নতুন বছরের পুব আকাশের নতুন সূর্যটি হোক শান্তির ও স্বপ্নের। পুরনো বছরের জীর্ণতা দূরে ঠেলে নতুন সম্ভাবনার পথে এগিয়ে চলাই হোক আমাদের মূলমন্ত্র।

 

মডেল : রিবা হাসান
পোশাক : অঞ্জনস
মেকওভার : ক্লিওপেট্রা বিউটি স্যালন
ছবি : কৌশিক ইকবাল

কুসুমকুমারী ভিআইপি ফেরি

মাসুদা ভাট্টি

 

ঘাটে ফেরিটা ভিড়েছে ঠিকই কিন্তু কোনো গাড়ি নামতে পারছে না। একেবারে ফেরিতে ওঠার মুখেই পন্টুনের ওপর একটা মালবোঝাই ট্রাক মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। দু’পাশে যতোটুকু জায়গা খালি তা দিয়ে বড় গাড়ি আসতে পারবে, কী পারবে না তা নিয়ে গবেষণা করছে লোকজন। ট্রাকটা আজ পড়েনি হয়তো। তাই কেউ কেউ বলাবলি করছেন, এর আগের ফেরি থেকেও ট্রাক এখান দিয়ে নেমে গেছে। অসুবিধী হওয়ার কথা নয়। কিন্তু বলা তো যায় না- যাত্রীভর্তি বাস, কোরবানির পশুভর্তি ট্রাক, যদি কিছু হয়ে যায়! সবাই খুব সতর্ক সে জন্য। এ রকমই জটলার ভেতর ছেলেটিকে দেখলাম আমরা। আমরা দু’জন। আমি ও সালমা। আমরা গাড়ির ভেতর বসে চারদিকে তাকাই। আমাদের ঠিক সামনেই লুঙ্গি পরা এক লোক তার অ-কোষ থেকে চুলকে ছিঁড়ে আনবে বলে মনে হয়। আমরা হা হা করে হাসি তাকে দেখে। তখন আবারও ছেলেটির দিকে চোখ যায় আমাদের।
আমাদের কথা বলি একটুখানি। আমরা চল্লিশ পেরোলাম কিছুদিন আগে মাত্র। কিন্তু এখনো আমাদের বাইরে-ভেতরে কোথাও চল্লিশের চিহ্ন পড়েনি। আমাদের যারা দেখতে পারে না তারা হয়তো বলবে বা বলেও যে, ‘আরে, সুন্তানাদি তো অয় নাই, অগো আর কী, গায়ে বাতাস লাগায়া ঘোরে-ফেরে।’ ফরিদপুর অঞ্চলের টান থাকায় সহজেই সমালোচনাকারীকে শনাক্ত করা যায়। কারণ তারা আমাদের চেনে ও জানে। আমরা স্বাবলম্বী। দু’জনই চাকরি করি ঢাকায়। আমরা একা যে যার মতো থাকি। সালমার সঙ্গে অবশ্য তার মা থাকেন। আমার সঙ্গে কেউ না। কারণ আমার আসলে কেউ নেই থাকার মতো। আজকাল অবশ্য মনে হয়, ওই কোন এক অতীতকাল থেকে আমার কেউ নেই। সালমা ইদানীং প্রায়ই বলে, ‘কেন এমুন হয় কও তো? কেউ থাকলে কী হইতো আমাদের?’ আমি সালমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। তাকে ঠিক বোঝাতে পারি না, কেউ থাকলেও এর চেয়ে যে খুব বেশি ভালো কিছু হতো তা নয়। তাই চুপ করে থাকি। ঢাকা শহরে একা মেয়েদের থাকার চল শুরু হয়েছে আমাদের হাত ধরেই। এর আগে মেয়েরা সাধারণত ছাত্রী হলে হলগুলো আর কর্মজীবী হলে মেয়ে হোস্টেলগুলোয় থাকতো। কিন্তু এখন কোনো কোনো বাড়িওয়ালা গাঁইগুঁই করলেও ভাড়া দেয়। অনেক বাড়িওয়ালাই এখন স্বীকার করে যে, ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা ঠিকমতো ভাড়া দেয় এবং ঝামেলাও আসলে কম দেয়। মানুষ মিষ্টির স্বাদ পেলে পিঁপড়ারও পাছা চুষে দেখে।

দেয়। অনেক বাড়িওয়ালাই এখন স্বীকার করে যে, ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা ঠিকমতো ভাড়া দেয় এবং ঝামেলাও আসলে কম দেয়। মানুষ মিষ্টির স্বাদ পেলে পিঁপড়ারও পাছা চুষে দেখে।
এই সেদিনও কতো প্রশ্ন শুনতে হতো বাড়ি ভাড়া নিতে গিয়ে। বাড়িওয়ালা এক ধরনের প্রশ্ন করে তো বাড়িওয়ালি আরেক ধরনের। প্রশ্নের পাহাড় ডিঙিয়ে বাড়ি ভাড়া জুটলেও হয় বাড়িওয়ালা ফোনে যন্ত্রণা দিতে শুরু করে, না হয় বাড়িওয়ালি তার স্বামীকে জড়িয়ে অহেতুক সন্দেহ শুরু করে। তখনকার ফ্যাঁকড়ার সঙ্গে কোনো যন্ত্রণারই মিল নেই। এখন এসব একটু কমেছে। মানুষ অর্থনীতি দিয়ে বিচার করতে শুরু করেছে জীবনকে। তাই যাপনের ক্ষেত্রে যেখান থেকে আদায় বেশি এবং কম ঝামেলার সেদিকেই মানুষের ঝোঁক।
সালমা একটা সফটওয়্যার ফার্মে কাজ করে। আমার নিজের ব্যবসা আছে, সেটিই দেখি। দু’জনের জন্মস্থান দেখতে গিয়েছিলাম আমরা। সেখানে বিশ্বকর্মা পূজায় নৌকাবাইচ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ক্ষমতার দ্বন্দ্বে নৌকাবাইচ তো হলোই না, দুপুর নাগাদ প্রশাসন সেখানে ১৪৪ ধারা জারি করে দিল। কারণ কী? দুই নেতার ঝগড়া- কে পুরস্কার দেবে, কার আধিপত্য বজায় থাকবে। অথচ যে হাজার হাজার মানুষ এই নৌকাবাইচ আর পূজা দেখতে আসার কথা ছিল তাদের কথা কেউই ভাবলো না। তারা বৃষ্টিতে ভিজে ফাঁকা নদীর দিকে তাকিয়ে রইলো অপলক। নদীর ওপর ভাঙাচোরা সেতুর কিনার ঘেঁষে মানুষের ঘোলা জলের দিকে তাকিয়ে থাকাটা কেমন অদ্ভুত আবহের জন্ম দিয়েছিল। আমরা অবশ্য গাড়ি থেকে নামিনি। নেমে কী হবে? শিশুকালের স্মৃতি নষ্ট হবে কেবল।
স্মৃতির কথা যখন এলোই তখন একটু স্মৃতিচারণ হোক। স্মরণ করি সেসব দিনের কথা যখন এই নদী কোনো ভটভটির আওয়াজ শোনেনি- এখন যার ভয়ঙ্কর আওয়াজে দিনমান কুমারপাড়ের এই ছোট্ট শহরটি রীতিমতো আতঙ্কিত থাকে। কিন্তু সেসব ধানের ফুল ফোটা দিনে যখন কৈ মাছের ঝাঁক লক্ষ্মীদীঘা ধানের ঝরে পড়া ফুল খেয়ে খেয়ে শরীরে হলুদ চর্বি জমাতো বলে মাছপ্রিয় মানুষ গল্প করতো। সেই সময় একদিন খুব ভোর থেকেই শুরু হতো কাঁসরের বাজনা, পাশের বিল দিয়ে নৌকা যেতো। মানুষ তখন নৌকাবাইচকেও বলতো আড়ং। আর ওই বাইচের দিনই বিক্রি হতো চালন, কুলো, পলোসহ বছরকার ব্যবহারযোগ্য জিনিসপত্র। মানুষ শুধু নৌকাবাইচ দেখতে নয়, বিশ্বকর্মার অবতার মানুষের তৈরি জিনিসপত্রও কিনতে আসতো আড়ংয়ে। এবারও দেখলাম বাজার বসেছে রাস্তার দু’পাশে, সেতুর ওপর পসরা সাজানো। কিন্তু বেশির ভাগই সস্তার প্লাস্টিক, এমনকি যে কাঠের হেলিকপ্টার ছোটবেলায় ছিল তাও আছে এবং সেটিও প্লাস্টিকের। কেবল বদলায়নি মিষ্টির দোকানগুলো। মিছরির সাজের হাতি-ঘোড়া-ময়ূর-গণেশ, জিভেগজা, আমৃত্তি, ছানার জিলেপি ও ক্ষীরের চমচম- মানুষ এখনো হুমড়ি খেয়ে পড়ছে দোকানগুলোয়। আমার এখনো ভালোবাসার রাজভোগ। আমি নামি না। জানি, নেমে সেই পুরনো মুখ দেখবো না। তারা আছেন কি না তাও তো জানি না। তাই আর রিস্ক নিই না। আনিয়ে নিই ঢাকায় নিয়ে আসার জন্য।

উৎসবের রঙ নাকি বদলায় না। হবে হয়তো। তবে একালেও সকাল থেকে ভটভটিতে প্রমাণ আকারের সাউন্ডবক্স লাগিয়ে, ডেকভর্তি করে বিরিয়ানি তুলে নিয়ে যে উচ্চতায় শব্দ পৌঁছালে কান আর কিছু শুনতে পায় না সে রকম উচ্চ শব্দে হিন্দি সিনেমার সবচেয়ে তালের গানটি দিনভর বাজে। ভটভটি, নাকি হিন্দি গান- কোনটির শব্দ কাকে খুন করে বোঝা না গেলেও আশপাশের মানুষের কানের দফা-রফা। কিন্তু তাতে কী? আনন্দ তো- মানুষ মেনে নেয়, মনে নেয় না।
বেরোতে বেরোতে বিকেল হয়ে যায় আমাদের। আর ফেরিঘাটে দিয়ে কোরবানির পশুবাহী ট্রাকের পেছনে লাইন ধরে অপেক্ষা করতে করতে সন্ধ্যা প্রায় হয়েই যায়। তারপরও পদ্মার পাড়ে অতো বিশাল আকাশকে অন্ধকার কি সহজে ঢাকতে পারে? বিকেলটা অদ্ভুত এক আলো ছড়িয়ে থমকে থাকে অনেক্ষণ যেন বা নদীর জলে শেষবারের মতো নিজেকে দেখে নেয় দিন। পদ্মা সেতুর জন্য জমানো দৈত্যের মতো পাথরের ঢিপি। মনে হয়, আচানক এখানেও পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে। ছুটির দিন বলেই কি না জানি না, ঘাটে তেমন মানুষের ভিড় নেই। তাই হয়তো ছেলেটাকে আমাদের একেবারে আলাদা করে চোখে পড়ে। আমিই দেখাই সালমাকে। বলি, ‘দ্যাখো দ্যাখো, ছেলেটা কী লম্বা দেখতে?’
সালমা বলে, ‘হ্যাঁ রে, এক্কেবারে ইরানি ইরানি চেহারা।’ বোঝা যায়, একটু ফর্সা আর লম্বা চেহারার পুরুষ এখনো এ দেশে ইরান কিংবা তুরান থেকে আসা- এই ধারণা আমাদের জীবনগত হয়ে গেছে। আমি হেসে ফেলি। তখনো আমাদের গাড়ি ফেরিতে ওঠার জন্য কসরত করে যাচ্ছে সমানে। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর চালক বেচারা অধৈর্য হয়ে উঠেছে- কখন উঠবে ফেরিতে। আর যে মুহূর্তে মনে হলো যে, মুখ থুবড়ে থাকা ট্রাকটা কোনো বাধা নয়, ঠিক ওই মুহূর্তেই হুড়মুড় করে নামতে শুরু করলো গাড়িগুলো। প্রথমে এ দেশের কথিত ভিআইপিদের গাড়ি- যারা দরকার হলে ঢাকা থেকে বেরোনোর সময় ফোন করে ফেরি আটকে রাখে। আর হাজার হাজার মানুষ না জেনে অপেক্ষা করে পরবর্তী ফেরির। সে রকমই একটি

কালো গাড়ি নেমে গেল। তারপর একের পর এক ছোট গাড়ি, ট্রাক ও বাস নামছে তো নামছেই। অথচ দূর থেকে ফেরিটিকে বেশ ছোটই মনে হয়। এতো গাড়ি তার পেটে ধরলো কী করে? আমি ভাবি।
ছেলেটির গাড়িও নিশ্চয়ই অপেক্ষা করছে কোথাও। ম্লান আলোয় ছেলেটিকে কি একটু বিষণœ দেখায়? হঠাৎই আমার মাথায় প্রশ্নটি আসে, আচ্ছা, আমার মা কী এ রকম কোনো ছেলেকে দেখে নিজের ভেতর প্রশ্ন নিয়ে ভাবতে বসতেন? সে সুযোগ কি তার হতো কিংবা সাহস? মাত্র তো চল্লিশ বছরের ফারাক। চল্লিশ বছর পরই তার কন্যা এ রকম একটি বেগানা পুরুষকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভাবতে পারছে দ্বিধাহীন- এটাকে কী অর্জন বলবো? মাও হয়তো ভাবতেন, প্রকাশ করতে পারতেন না। মানুষ তো! কতোটা আর বদল হবে। ভেতরে চিন্তার বীজ তো থাকেই, তাই না? আমরা টুকটাক কথা বলি ছেলেটাকে নিয়ে।
‘ছেলেটা কি একা? কী মনে হয়?’ সালমার দিকে তাকিয়ে জানতে চাই।
‘না মনে হয়। মাইক্রোবোঝাই লোকজন। নিশ্চয়ই তার ভিড় ভালো লাগে না। তাই নেমে আসছে।’ সালমা বলে।
ছেলেটার হাতে লম্বা আখ দাঁতে কাটছে। চুষে চুষে ফেলে দিচ্ছে মাটিতে। অন্য সময় হলে ঠিক ব্যাপারটা চোখে লাগতো- কী অসভ্য রে, খেয়ে খেয়ে জায়গা নোংরা করছে। কিন্তু ছেলেটার দিকে তাকিয়ে এসব কথা ভাবতে মন চাইছে না। আর চিবানো আখের ছোবা তো আসলে পচেই মিশে যাবে মাটিতে। এতে বরং মাটিরই উপকার। মনে মনে হেসে ফেলি। সালমার দিকে তাকাই। বুঝতে চাই, সে কী ভাবছে! কিন্তু সে দেখি প্রশ্ন করে গাড়ির চালককে- ‘কী সুমন ভাই, ফেরিতে উঠতে পারবেন তো? ওই যে দ্যাহেন পিছনে আরো ভিআইপি আইছে।’ সত্যিই তাকিয়ে দেখি পেছনে কোনো জেলা প্রশাসক কিংবা জেলা পুলিশ সুপারের গাড়িবহর। আতঙ্কিত হয়ে উঠি ভেতরে ভেতরে। কিন্তু সালমাকে সুমন আশ্বস্ত করে- ‘কোনো ভিআইপি-টিআইপি মানুম না ম্যাডাম, ঠিক টান দিয়া উইঠঠা যামু। তারপর যা হয় দেখা যাইবো।’ আমি আঁতকে উঠি যদি সত্যি সত্যিই কিছু হয়! আমার ভয়, এ পৃথিবীকে বড় ভয় আমার।
আমাদের সামনে কেবল একটি বাস দাঁড়ানো। চাইলে আমরা তারপরই উঠতে পারি। কিন্তু না, ওপার থেকে আসা সব গাড়ি নেমে যাওয়ার পর প্রথমেই বাসটিকে ডেকে নেয় ফেরির লোকজন। তারপরই দেখি, পিল পিল করে অসংখ্য গাড়ি এসে আমাদের পাশে, পেছনে জায়গা করে

দাঁড়িয়ে আছে। ডেকে ডেকে তুলছে প্রথমে বড় গাড়িগুলো যেগুলোর ভেতর বোবা পশুগুলো গায়ের সঙ্গে গা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মায়া হয় দেখে। আমার মনে হয়, যতো দ্রুত তারা উঠতে পারে ততোই ভালো। মৃত্যু যখন অনিবার্য তখন তা এগিয়ে আসাই ভালো। এরপরই শুরু হয় ‘ভিআইপি’দের জায়গা করে দেয়ার পালা। তাদের গাড়ি তুলতে তুলতে তার পেছন পেছন টান মেরে আরো কয়েকটি গাড়ি ঢুকে যায় ফোকটে। আর তখনই আমাদের চালক যেন নিজের শক্তি দিয়েই গাড়িটি টেনে ফেরিতে উঠিয়ে ফেলে। আমি আতঙ্কিত হয়ে ওঠার আগেই দেখতে পাই, আমরা ঠিক জায়গা করে নিতে পারছি। তখনই মনে হয়, আহা রে! বেচারা কি এখনো আখ খাচ্ছে? পারলো কি তাদের গাড়িটা ফেরিতে উঠতে? ফেরির পেট ভরে যাচ্ছে দ্রুতই। তখনই সালমা একটি গাড়ি দেখিয়ে বলে, ‘ওই দ্যাখো, তোমার ইরানি লোকটার গাড়ি উঠছে।’ আমি হেসে ফেলি- ‘যাহ! সে ইরানি হবে কেন? একেবারেই আখ খাওয়া বাঙালি যুবক।’ আমাদের গাড়ি থেকে পুরো ফেরিটা দেখা যায়। তাতেই আমরা দেখি, ছেলেটা তার মোবাইল ফোনটা নিয়ে ফেরির দোতলায় ওঠার সিঁড়ির মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ায়। এক মাথা চুল আর মুখভর্তি দাড়িতে তাকে একটু যিশু যিশু দেখায় বোধ করি। সালমা অবশ্য মুখ বেঁকিয়ে বলে, ‘না রে, ফিগারটা তেমন ভালো না, ক্যাংঠা!!’
আমার হাসি পায় সালমার কথায়। আবারও ভাবি, ভাবনার সত্যিই লাগাম নেই। ছেলেটা নিশ্চয়ই জানে না, তাকে নিয়ে আমরা কতো কিছু ভাবছি। ঢাকা শহর থেকে বাইরে বের হতে আমার সবচেয়ে বড় ভয়, পথে যদি বাথরুম পায়, তবে? ঢাকা শহরে না হয় কোনো রেস্টুরেন্ট কিংবা কফি শপে গিয়ে করে নেয়া যায়। কিন্তু পথে? আতঙ্কে আমার তলপেট কেবলই কুঁকড়ে আসে। এসব ভুলতে আমি কতো কিছু নিয়ে যে ব্যস্ত হওয়ার চেষ্টা করি এর শেষ নেই! কিন্তু সালমার কোনো বিকার নেই। সে বলে, ‘আমার টয়লেট পাইছে। যাই দেখি করে আসি, তুমি যাবা?’
‘পাগল তুমি? আমি এখান থেকে এক চুলও নড়বো না।’ গাড়ির জানালার কাচ নামাতে নামাতে বলি। গুমোট হাওয়া ধক করে এসে মুখে লাগে। পশুদের শরীরের গন্ধ মিশে যায় সে হাওয়ায়। ফেরিতে মানুষ বেশি উঠলো, না পশু উঠলো? অবশ্য মানুষ আর পশুতে পার্থক্য কতোটুকুই বা? গোপাল ভাঁড় আজকের দিনে হলে নিশ্চয়ই বলতেন, আধ হাত মাত্র। কারণ সামান্য দূরেই গরুভর্তি ট্রাকটা দাঁড় করানো। সালমা নেমে যাওয়ার আগে আমি তাকে বলি, ‘শোনো না, ছেলেটাকে একটু বলে যাও যে, ওই লাল গাড়ির ভেতর এক ভদ্রমহিলা বসে আছেন। আপনাকে হয়তো চেনে, একটু যাবেন ওখানে?’
সালমা চোখ বড় বড় করে আমার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘সত্যিই কবো? আমি বলতে পারি, কোনো অসুবিধা হবে না আমার। কিন্তু এখানে এলে তারে তুমি কি কবা?’
‘কী আর বলবো? বলবো, বোর হচ্ছিলাম, গল্প করার কেউ নেই। আপনাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মনে হলো, গল্পের জন্য উপযুক্ত চেহারা। তাই আসতে বলেছি। আপনার গল্প করতে ইচ্ছা না হলে যেখানে দাঁড়িয়েছিলেন সেখানে গিয়ে দাঁড়ানগে আবার’- আমি হাসতে হাসতে বলি। সালমা ধরে নেয়, আমি সত্যিই তাকে বলতে বলেছি। ঠিক সেই মুহূর্তে তার চোখ-মুখে কেমন দুষ্টুমি খেলা করে- আমি দেখতে পাই। সে গাড়ির দরজা খুলে নামে। আমাদের চালক আশপাশেই ছিল। তাকে নিয়ে সালমা সিঁড়ি দিয়ে ছেলেটার পাশ দিয়ে উপরে উঠে যায়। আমি তাকিয়ে থাকি অপলক, দেখি কিছু বলে কি না। অন্ধকার তখনো ঝাঁপিয়ে পড়েনি। তাই দেখা যায়, সালমা তাকে এড়িয়ে উপরে উঠে যায়। কিন্তু একটু পরই আবার নেমে আসে। এসে ফেরির নিচতলায় ভেতরের দিকে যায়। আমি চিন্তা করতে থাকি, উপরের টয়লেট কি বন্ধ? ছেলেটা তখন পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করে আকাশের গায়ে লেগে থাকা লাল, হলুদ, সোনালি রঙের ছবি তোলে। বাহ! ভেতরে সৌন্দর্যজ্ঞান আছে তো? কথা তাহলে বলাই যায়। যে ছেলে আকাশের রঙ বদলানো টের পায় তার সঙ্গে কথা বলতে ভালোই লাগবে মনে হয়। আমি উত্তেজিত ভেতরে ভেতরে। সালমা ফিরে আসে দ্রুতই।
সালমাও উত্তেজিত, ‘জানো, উপরের টয়লেট বন্ধ। ভিআইপিরা রুম আটকে বসে আছে। ভাবো কী ভয়ঙ্কর! আমাকে ওই ভয়ঙ্কর টয়লেটে যাইতে হইলো। নিজেরে নোংরা লাগছে। পানি দাও তো এট্টু হাত ধুই।’ আমি পানির বোতল এগিয়ে দিই আর ভাবি, এ দেশে ভিআইপি হওয়াটা বিশেষ জরুরি। না হলে বর্জ্য ত্যাগেরও সুযোগ পাওয়া যায় না। সালমা নিজেকে ধুয়ে-টুয়ে ভেতরে আসে। গাড়ির ভেতর তখন বিষগরম। নিজেকে মনে হচ্ছে, সিদ্ধ করতে দিয়েছি পাথরপোড়া গরমে। বিদেশে এটিকেই তো সাউনা বলে। আমরা গরমের দেশের লোকজনই কেবল তা বুঝতে চাই না। আমি প্রসঙ্গ বদলাই- ‘এই, তুমি ছেলেটাকে কিছু বললে না যে? ডরাইছ?”
‘ইস! কিসের ডর? আমি ভাবলাম তুমি ঠাট্টা করছ’- সালমা হাসে।
‘ধুর, ঠাট্টা ক্যান করবো? কী মজা হইতো বলো? ছেলেটার চেহারা নিশ্চয়ই বদলায়ে যেতো আমাদের সামনে এসে, তাই না?’ আমি বলি।
‘তাহলে একটা পিচ্চিকে দিয়ে আমরা খবর পাঠাই চলো। ওই যে বাদামওয়ালা আসছে। তাকে বলি।’ সালমা বাদামওয়ালাকে ডাকে- ‘এই বাদাম, এই বাদাম।’
বাদামওয়ালা তখন চেঁচাচ্ছে- ‘এই নেন বাদাম, এই যে বাদাম। লবণ-মরিচ মিশায়া খান। মজা পাইবেন।’ লোকটা এগিয়ে আসে। সালমা কিছু বলার আগে আমিই বলি, ‘কতো কইরা ভাই?’

আটকে বসে আছে। ভাবো কী ভয়ঙ্কর! আমাকে ওই ভয়ঙ্কর টয়লেটে যাইতে হইলো। নিজেরে নোংরা লাগছে। পানি দাও তো এট্টু হাত ধুই।’ আমি পানির বোতল এগিয়ে দিই আর ভাবি, এ দেশে ভিআইপি হওয়াটা বিশেষ জরুরি। না হলে বর্জ্য ত্যাগেরও সুযোগ পাওয়া যায় না। সালমা নিজেকে ধুয়ে-টুয়ে ভেতরে আসে। গাড়ির ভেতর তখন বিষগরম। নিজেকে মনে হচ্ছে, সিদ্ধ করতে দিয়েছি পাথরপোড়া গরমে। বিদেশে এটিকেই তো সাউনা বলে। আমরা গরমের দেশের লোকজনই কেবল তা বুঝতে চাই না। আমি প্রসঙ্গ বদলাই- ‘এই, তুমি ছেলেটাকে কিছু বললে না যে? ডরাইছ?”
‘ইস! কিসের ডর? আমি ভাবলাম তুমি ঠাট্টা করছ’- সালমা হাসে।
‘ধুর, ঠাট্টা ক্যান করবো? কী মজা হইতো বলো? ছেলেটার চেহারা নিশ্চয়ই বদলায়ে যেতো আমাদের সামনে এসে, তাই না?’ আমি বলি।
‘তাহলে একটা পিচ্চিকে দিয়ে আমরা খবর পাঠাই চলো। ওই যে বাদামওয়ালা আসছে। তাকে বলি।’ সালমা বাদামওয়ালাকে ডাকে- ‘এই বাদাম, এই বাদাম।’
বাদামওয়ালা তখন চেঁচাচ্ছে- ‘এই নেন বাদাম, এই যে বাদাম। লবণ-মরিচ মিশায়া খান। মজা পাইবেন।’ লোকটা এগিয়ে আসে। সালমা কিছু বলার আগে আমিই বলি, ‘কতো কইরা ভাই?’
- দশ টাকা প্যাকেট।
‘দুই প্যাকেট দ্যান ভাই।’
ততোক্ষণে আঁধার জমেছে একটু। ফেরিও ছেড়েছে বোঝা যায়। কিন্তু বাতাস নেই কোনোদিক থেকেই। বাদামওয়ালা দুই প্যাকেট বাদাম দিতে দিতে একটা ছোট পলিথিনের ব্যাগও ধরিয়ে দেয়। বলে, ‘ম্যাডাম, বাদাম ছিলা এর মইধ্যে ফালাইয়েন। এক্সটা দিলাম। ভেতরে লবণ-মরিচ আছে। মাইখ্যা খাইয়েন, মজা পাইবেন।’ আমি হেসে ফেলি- ‘ঠিক আছে, মাইখ্যাই খামু।’
- আফাদের বাড়ি কোথায়? মানে ঢাকায় কই থাকেন? বাদামওয়ালা আমাদের সঙ্গে কথা বাড়াতে চায়। আমি অন্ধকারেও তাকিয়ে থাকি তার দিকে। বোঝে কথা বাড়বে না। কিন্তু আমি এ জন্য তাকাইনি। আমি তাকে দেখতে চেয়েছিলাম। মানুষের মুখ-চোখ দেখা আমার স্বভাব। বাদামওয়ালা কী ভাবলো কে জানে? মিন মিন করে বললো, ‘আমারও বাড়ি পুরান ঢাকায়। তাই জিগাইছিলাম আর কী!’ আমাদের বাদামের প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে বাদামওয়ালা সরে যায়। আর সালমা ততোক্ষণে বাদামওয়ালাকে জিজ্ঞাসা করে ফেলে- ‘কতোক্ষণ লাগবে পার হইতে?’
- বেশিক্ষণ না আফা, কুসুমকুমারী ভিআইপি ফেরি তো। তাই আড়াই ঘুণ্টা লাগবে। এর বেশি না। আর ফেরিডাও নতুন আনছে আফা।
আমাদের জানা হয়ে যায়, আমরা কুসুমকুমারী নামক ভিআইপি এবং নতুন ফেরিটিতে উঠেছি। আমাদের মনে এক ধরনের উৎফুল্ল ভাব আসে। আর সে ভাবেই আমরা বাদামওয়ালাকে বলি, মানে, আমিই বলি- ‘ওই যে দেখছেন সিঁড়ির মাঝামাঝি একজন ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আছেন, দাড়িওয়ালা। তাকে গিয়ে বলবেন, এই গাড়ির ম্যাডাম তাকে ডাকছে। বলতে পারবেন না?’ ছেলেটা তখনো পদ্মা সেতুর জন্য জমানো পাথুরে

 

পাহাড়ের ছায়াকে মোবাইল ফোনবন্দি করছে। ওমা! পাথরের ওপর তো মানুষের অবয়বও দেখা যাচ্ছে। এক-দু’জন নয়, বেশ মানুষ উঠেছে ওই অত্ত উঁচুতে? বাদামওয়ালা হেঁটে যায়। আমরা দু’জন মূর্তির মতো বসে থাকি। মুখ থেকে গুলি বেরিয়ে গেছে। গুলিতো নয়, বাদামওয়ালা ছুটে যাচ্ছে ছেলেটার দিকে। সিঁড়ি দিয়ে উঠছে, কথা বলছে ছেলেটার সঙ্গে। ততোক্ষণে ফেরির টিমটিমে বাতিও জ্বলতে শুরু করেছে। ছেলেটি আমাদের গাড়ির দিকে তাকাচ্ছে। তারপর হাত দিয়ে চুল ঠিক করলো এবং একটু থেমে থেমে নামতে শুরু করলো। বাদামওয়ালার পেছন পেছন নেমে ছেলেটা আমাদের গাড়ির দিকে এলো আর বাদামওয়ালা অন্যদিকে। ছেলেটি এসে সালমার দিককার জানালায় দাঁড়ালো প্রথমে। তারপর একটু ঝুঁকে জিজ্ঞাসা করলো- ‘ডেকেছেন?’
সালমা আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি সপ্রতিভ হয়ে উঠি- বলি, ‘জি, ডেকেছি। মনে হচ্ছিল আপনাকে চিনি। নেমে গিয়ে জিজ্ঞাসা করতে সংকোচ হচ্ছিল। তাই আসতে বলেছি। কিছু মনে করেননি তো?’
ছেলেটি হাসে। স্বল্প আলোতেও টের পাই হাসিটা মিষ্টি। আমি বয়স ভাবার চেষ্টা করি। ত্রিশের একটু বেশি হবে। হাত চালায় চুলের ভেতর আবার। বুঝতে পারি, তারও ভেতরে প্রশ্ন। তাই চুলের ভেতর হাত দিয়ে তা তাড়ানোর চেষ্টা করছে। আমি নিজের নাম বলি। আর সালমার দিকে দেখিয়ে বলি, ‘ও সালমা। আপনার নাম কি তপু? আপনি কি কোনো টিভি চ্যানেলে আছেন? না হলে এতো পরিচিত মনে হচ্ছে কেন?‘ খুবই দুর্বল ও বানানো শোনায় শেষের প্রশ্নটি। নিজেকে খুব ন্যাকা ন্যাকা লাগে। তাই নিজেকে সংশোধন করে ফেলি দ্রুত। বলি, ‘সত্যি কথা বলি। আসলে আমাদের কথা বলতে ইচ্ছা করছিল কারো সঙ্গে। তাই আপনাকে ডেকেছি। আপনি তো একা একা দাঁড়িয়ে মোবাইল ফোনে আঁধারবন্দি করছিলেন। এ জন্য ভাবলাম, হয়তো কথা বলতে আপনারও ভালো লাগতে পারে।’
ছেলেটির চোখ-মুখে তখনো অবাক ভাব। তা কাটতে সময় নেবে বুঝতে পারি। কিন্তু এর আগেই সালমা বলে, ‘আমার কথা বলতে ইচ্ছা করে নাই কিন্তু। ওর করেছে, বুঝলেন?’
- জি, বুঝেছি। তাহলে নেমে আসুন আপনারা, কথা বলি।
বাহ! গলার স্বরটা তো বেশ। ভরাট। আমি সালমার দিকে তাকাই। বলি, ‘চলো, নেমে ফেরির পেছন দিকে যাই। উপরে তো ভিআইপিরা দরজা বন্ধ করে রেখেছে।’ সালমা বলে, ‘তোমরা নামো, আমি আসছি একটু পরে। একটা ফোন করতে হবে আমার। বুঝতে পারি, সালমা সময় নিচ্ছে। আমি দরজা খুলে নামি। পরনের শাড়িটি সামলে নামতে একটু সময় লাগে। পায়ে স্যান্ডেল গলিয়ে তারপর নামি। তখনো ফেরিজুড়ে ‘গোময়’-এর গন্ধ ম-ম করছে। ছেলেটি এগিয়ে আসে। বলে, ‘এই দিকে আসুন’- হাত দিয়ে দেখিয়ে দেয় ফেরির সামনের দিকটা। সেখানে ইতি-উতি লোকজন দাঁড়ানো। তবে জায়গা আছে ফাঁকা দাঁড়ানোর মতো। আমরা গিয়ে দাঁড়াই এবং সেই প্রথম পদ্মা থেকে বাতাস ওঠে একটুখানি, জলগন্ধ মাখানো। আমার ভালো লাগে। আমি ফিরতে থাকি পেছনে। যখন আমার ষোল, কী সতের বছর তখনকার কোনোদিন। এমন আশ্বিনও হতে পারে। তুমুল বৃষ্টি আর ঢেউ ভেঙে পদ্মা পার হতে হতে আরেকজন মানুষকে দেখছিলাম কেবলই। সেও তাকিয়েই ছিল সারাক্ষণ। কিন্তু কথা বলার সাহস আমাদের কারোরই হয়নি। অথচ আজ কী অনায়াসে আমি একটি ছেলেকে তার অবস্থান থেকে ডেকে সরিয়ে এনে গল্প করছি। নিজেকে আমার সাহাসী মনে হয় একটু। বলি, ‘আমি সত্যিই দুঃখিত আপনাকে এভাবে ডেকে বিরক্ত করার জন্য।’
- বিরক্ত হচ্ছি না, আপনি বলুন।
কী বলবো?
- কথা বলতে চাইছিলেন না?
কথা! খুঁজে পাচ্ছি না তো আর।
আমি সত্যিই কথা খুঁজে পাচ্ছিলাম না আর। তবে আমি ক্রমেই ফিরছিলাম অতীতে। মনে হচ্ছিল, আমি সেই ছেলেটির সঙ্গে কথা বলছি- যখন আমার বয়স ষোল। ছেলেটিরও হয়তো তাই। ভেতর থেকে কি কোনো দীর্ঘশ্বাস বের হচ্ছে? বুঝি না।
আমার কথা শুনে ছেলেটি আবার হেসে ওঠে- বেশ উঁচু ও দরাজ হাসি। অন্ধকার একটু একটু করে গলে পড়ে সে হাসিতে। আমি ছেলেটির মুখ দেখতে পাই না আর। কিন্তু আমার মুখের ওপর আলো পড়ছে বুঝতে পারি। চোখে এসে লাগে। তবুও দাঁড়িয়ে থাকি আমি। বলি, ‘কী নাম আপনার?’
- ওই যে বললেন তপু। আমার নাম ধরুন তপুই।
যাহ! সত্যি নয়। সত্যি নাম বলুন। আচ্ছা থাক, বলতে হবে না। আপনার নাম তপু। তা তপু, কী করেন আপনি?
- আপনিই তো বললেন, টিভি চ্যানেলে কাজ করি। ধরুন, তাই করি।
আচ্ছা, না হয় তা-ই ধরলাম। কোথায় গিয়েছিলেন বা কোথা থেকে ফিরলেন?
- আপনি কি সব সময় এ রকম করে কথা বলেন? বেশ গুছিয়ে?
নাহ বলি না, এখন বলছি ভেবে-চিন্তে ও গুছিয়ে।
ছেলেটি হাসে। ওহ, ছেলেটির নাম তপু। ‘আচ্ছা তপু, এই যে আপনাকে ডেকে আনলাম আমরা। আপনি কি যে কেউ ডাকলেই যেতেন?’
- উনি তো আমাকে ডাকেননি বললেন। আপনিই ডেকেছেন। আসতাম। কারণ আপনাদের আমি দেখেছি যখন আখ খাচ্ছিলাম তখন।
বাহ, বেশ স্মার্ট তো। আমি আগ্রহী হই। আমরা কথা বলতে থাকি। বহু পুরনো কোনো ইতিহাস খুঁড়ে আনা কথামালা। পদ্মার জলের ওপর ঝুলে থাকা আঁধার। ছলাৎ ছলাৎ ঢেউয়ের শব্দ আমাদের কথাগুলোকে আরো উজ্জীবিত করে। আমাদের চারপাশে দইওয়ালা হাঁকে। ছোট্ট ছোট্ট প্লাস্টিকের কাপে করে দই বিক্রি করছে। ছেলেটি বলে, খাবেন? আমি বলি, নিশ্চয়ই। আমরা দই কিনি। মহামিষ্টি দই। খেতে পারি না। সালমার জন্য যেটি কিনি সেটি হাতে ধরে রাখি।
হঠাৎ অন্ধকার ফুঁড়ে সালমা এসে দাঁড়ায়। বলে, ‘ঘাট এসে গেছে। চলো যাই এবার।’ সালমার হাতে দই দিতে দিতে আমরা গাড়ির দিকে এগোই। আমরা কেউ কোনো কথা না বলে যে যার মতো ফিরে যাই। গাড়িতে উঠি। কুসুমকুমারী ফেরি থেকে আমাদের গাড়িটি নামে ভিআইপিদের গাড়িরও বেশ কয়েকটি গাড়ি পর। তারপর রাস্তার ওপর ঝুঁকে থাকা গাছের সারিকে গাড়ির হেডলাইটের আলোয় বিয়ের গেইটের মতো মনে হতে থাকে আমাদের। কিন্তু ফিরতে ফিরতে আমরা দু’জনই আর সেই ছেলেটির কথা বলি না। কেন বলি না সেটি বলতে পারবো না। তবে আমার মাথায় বাদামওয়ালার কাছ থেকে বাদাম কিনে খাওয়া-পরবর্তী আর কোনো স্মৃতি নেই। কিন্তু স্মৃতি না থাকলে কী হবে, আমাদের গাড়ির পেছন ও সামনেটা ভর্তি করে নিয়ে আসি কচুশাক, ডাব, নারিকেল, মিষ্টি, পিপুল পাতা, রুম্বি কলা, আরো কতো কী! যেন পুরো শৈশব আমাদের গাড়িতে। আমরা ঢাকায় ফিরি। যে যার বাড়িতে নামি। কুসুমকুমারী ভিআইপি ফেরির কথা আর কখনো তুলি না আমরা।

 


আমার কথা শুনে ছেলেটি আবার হেসে ওঠে- বেশ উঁচু ও দরাজ হাসি। অন্ধকার একটু একটু করে গলে পড়ে সে হাসিতে। আমি ছেলেটির মুখ দেখতে পাই না আর। কিন্তু আমার মুখের ওপর আলো পড়ছে বুঝতে পারি। চোখে এসে লাগে। তবুও দাঁড়িয়ে থাকি আমি। বলি, ‘কী নাম আপনার?’
- ওই যে বললেন তপু। আমার নাম ধরুন তপুই।
যাহ! সত্যি নয়। সত্যি নাম বলুন। আচ্ছা থাক, বলতে হবে না। আপনার নাম তপু। তা তপু, কী করেন আপনি?
- আপনিই তো বললেন, টিভি চ্যানেলে কাজ করি। ধরুন, তাই করি।
আচ্ছা, না হয় তা-ই ধরলাম। কোথায় গিয়েছিলেন বা কোথা থেকে ফিরলেন?
- আপনি কি সব সময় এ রকম করে কথা বলেন? বেশ গুছিয়ে?
নাহ বলি না, এখন বলছি ভেবে-চিন্তে ও গুছিয়ে।
ছেলেটি হাসে। ওহ, ছেলেটির নাম তপু। ‘আচ্ছা তপু, এই যে আপনাকে ডেকে আনলাম আমরা। আপনি কি যে কেউ ডাকলেই যেতেন?’
- উনি তো আমাকে ডাকেননি বললেন। আপনিই ডেকেছেন। আসতাম। কারণ আপনাদের আমি দেখেছি যখন আখ খাচ্ছিলাম তখন।
বাহ, বেশ স্মার্ট তো। আমি আগ্রহী হই। আমরা কথা বলতে থাকি। বহু পুরনো কোনো ইতিহাস খুঁড়ে আনা কথামালা। পদ্মার জলের ওপর ঝুলে থাকা আঁধার। ছলাৎ ছলাৎ ঢেউয়ের শব্দ আমাদের কথাগুলোকে আরো উজ্জীবিত করে। আমাদের চারপাশে দইওয়ালা হাঁকে। ছোট্ট ছোট্ট প্লাস্টিকের কাপে করে দই বিক্রি করছে। ছেলেটি বলে, খাবেন? আমি বলি, নিশ্চয়ই। আমরা দই কিনি। মহামিষ্টি দই। খেতে পারি না। সালমার জন্য যেটি কিনি সেটি হাতে ধরে রাখি।
হঠাৎ অন্ধকার ফুঁড়ে সালমা এসে দাঁড়ায়। বলে, ‘ঘাট এসে গেছে। চলো যাই এবার।’ সালমার হাতে দই দিতে দিতে আমরা গাড়ির দিকে এগোই। আমরা কেউ কোনো কথা না বলে যে যার মতো ফিরে যাই। গাড়িতে উঠি। কুসুমকুমারী ফেরি থেকে আমাদের গাড়িটি নামে ভিআইপিদের গাড়িরও বেশ কয়েকটি গাড়ি পর। তারপর রাস্তার ওপর ঝুঁকে থাকা গাছের সারিকে গাড়ির হেডলাইটের আলোয় বিয়ের গেইটের মতো মনে হতে থাকে আমাদের। কিন্তু ফিরতে ফিরতে আমরা দু’জনই আর সেই ছেলেটির কথা বলি না। কেন বলি না সেটি বলতে পারবো না। তবে আমার মাথায় বাদামওয়ালার কাছ থেকে বাদাম কিনে খাওয়া-পরবর্তী আর কোনো স্মৃতি নেই। কিন্তু স্মৃতি না থাকলে কী হবে, আমাদের গাড়ির পেছন ও সামনেটা ভর্তি করে নিয়ে আসি কচুশাক, ডাব, নারিকেল, মিষ্টি, পিপুল পাতা, রুম্বি কলা, আরো কতো কী! যেন পুরো শৈশব আমাদের গাড়িতে। আমরা ঢাকায় ফিরি। যে যার বাড়িতে নামি। কুসুমকুমারী ভিআইপি ফেরির কথা আর কখনো তুলি না আমরা।

দুঃসাহসিক অভিযাত্রী

অরিন্দম মুখার্জী বিংকু

 

বাঙালির এক্সপিডিশন যাত্রার সূচনালগ্নেই দুঃসাহস ও অসম্ভবকে সম্ভব করতে তারা ব্যস্ত আর সেই সময় আর্বিভূত হন এক তরুণ। সাঁতার নিয়ে নিমজ্জিত থাকলেও পারিপার্শ্বিকতা এড়িয়ে চলা যায় না। জীবন তো আর ঢেউয়ের মতো নির্ভেজাল নয়। ঢেউটিকে প্রতিপক্ষ মনে করে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু জীবনের জটিলতার সঙ্গে পেরে ওঠা কঠিন। তাকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তবু এক বুক প্রত্যাশা নিয়ে শুরু হয় সাঁতার। ব্যর্থ হলে ব্যক্তিÑ তার কি-ই বা আসে যায়। তবে তার ওপর নির্ভর করছিল স্বাধীনতাকামী বাংলাদেশের সম্মান। ওই সম্মানটুকু যে করেই হোক রক্ষা করতে হবে। মনে মনে সৃষ্টিকর্তার কছে এই নিবেদন রেখে জলে নামতেই একের পর এক ক্যামেরার ক্লিক। বিশ্ব ক্রীড়া জগতে বাঙালির সাফল্যের স্বীকৃতি প্রথম আদায় করেছিলেন যে ব্যক্তি তিনি আমাদের বাংলাদেশেরই সন্তানÑ ব্রজেন দাস।
বিশ্ব জয়ের আনন্দে ইতিহাসে গৌরব উজ্জ্বল হয়ে থাকার শিরোপা ছিনিয়ে নিতে কে না চান। ওই সূত্র ধরেই অলিম্পিক গেমসের প্রতি পদক্ষেপে পুরো বিশ্ব আন্দেলিত হয়। তবে বাংলাদেশও কেন নয়। বাংলাদেশিরাও পারেন ওই অভিযাত্রার শীর্ষস্থানীয় তীর্থ যাত্রী হতে। অলিম্পিক আসরে যার কাছে পরাজিত হয়ে উত্তাল সমুদ্রের ঢেউটিকে হার মানিয়েছে, যার জয়ের ছাপ ইংলিশ চ্যানেল নীরবে মেনে নিয়েছে তিনি একজন বাঙালি, আমাদের দেশের গৌরব ও দুঃসাহসিক অভিযাত্রী সাঁতারু ব্রজেন দাস।


ইংলিশ চ্যানেল পশ্চিম ইউরোপের একটি সাগর। তা ফ্রান্স ও গ্রেট ব্রিটেন দ্বীপটিকে পৃথক করেছে এবং আটলান্টিক মহাসাগরের সঙ্গে উত্তর সাগরের যুক্ত করেছে। ফরাসি ভাষায় ইংলিশ চ্যানেলকে বলা হয় লা মঁশ। তা ‘কোর্টের হাতা’ নামে পরিচিত। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ৫৬২ কিলোমিটার এবং প্রস্থ অবস্থানভেদে সর্বোচ্চ ২৪০ থেকে সর্বনিম্ন ৩৪ কিলোমিটার হতে পারে ডোভারের প্রণালিতে। পূর্বদিকে এর বিস্তার কমে মাত্র ৩৪ কিলোমিটার হয়ে যায়। সেখানে এটি ডোভার প্রণালির মাধ্যমে উত্তর সাগরের সঙ্গে সংযুক্ত হয়। ইংলিশ চ্যানেলের প্রধান
দ্বীপগুলোর মধ্যে আছে আইল অব ওয়াইট ও চ্যানেল দ্বীপপুঞ্জ।
ইংলিশ চ্যানেল সাঁতরিয়ে গৌরবের অধিকারী দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম সাঁতারু ব্রজেন দাস। ১৯২৭ সালের ৯ ডিসেম্বর মুন্সীগঞ্জের বিক্রমপুরে কুচিয়ামোড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার বাবা হরেন্দ্র কুমার দাস ও মা বিমলা দাস। তার স্ত্রী মধুচন্দা। তাদের ঘরে তিন মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছেন।
গ্রামের স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়ি ব্রজেন দাসের। ছেলেবেলা থেকেই সাঁতারের প্রতি তার খুবই ঝোঁক ছিল। ফুটবল খেলা সবচেয়ে বেশি পছন্দ করতেন। স্কুল জীবনে ক্যাপ্টেন ছিলেন। ক্রিকেটও ছিল তার পছন্দের। কিন্তু সাঁতারটিকে কখনোই তার খেলা মনে হয়নি।


ব্রজেন দাস চলে আসেন ঢাকায়। এখানে আসার পর সাঁতারটি ছিল মজার ও আমোদের ব্যাপার। বুড়িগঙ্গা ছিল তার বাসার কাছেই। সাঁতারে হাতেখড়ি হয় ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীতে। এখানে থেকেই সাঁতারে তার উৎসাহ তৈরি হয়। আন্তঃবিদ্যালয় খেলাধুলায় সাঁতার প্রতিযোগিতায় সব সময়ই প্রথম স্থান দখল করতেন তিনি।
ব্রজেন দাস ১৯৪৬ সালে ঢাকার কেএল জুবিলি স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করে কলকাতার বিদ্যাসাগর কলেজে ভর্তি হন। কলকাতায় যাওয়ার পর বিশেষ কারণেই সাঁতারের প্রতি আগ্রহ জন্মায় তার। কারণ কলকাতায় বাড়ির কাছাকাছি ফুটবল বা ক্রিকেট খেলার মাঠ ছিল না। অথচ সুইমিং পুল ছিল। সন্তরণ ক্রীড়ার বিজ্ঞান, সাঁতারের বিভিন্ন কায়দা ইত্যাদি সেখান থেকেই শেখেন। ১৯৪৮ সালে আইএ পাস করে বিএ-তে ভর্তি হন তিনি।
ব্রজেন দাস ১৯৪৮-১৯৪৯ সালে আন্তঃবিদ্যালয় খেলাধুলায় সাঁতার প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান দখল করেন এবং প্রথম বড় ধরনের জয়ের আস্বাদ পান। ১৯৫২ সালে পশ্চিমবঙ্গে ১০০ মিটার ফ্রিস্টাইল সাঁতার প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হন।
কলকাতায় শিক্ষা জীবন শেষে ঢাকায় ফিরে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও ব্রজেন দাস পড়াশোনা শেষ করতে পারেননি। বাংলাদেশে ফিরে তিনি পূর্ব পাকিস্তান ক্রীড়া ফেডারেশনের প্রতি বার্ষিক সাঁতার প্রতিযোগিতা চালু করতে উদ্বুদ্ধ করেন। এ রকম একটি প্রতিযোগিতা প্রথম অনুষ্ঠিত হয় ১৯৫৩ সালে। ১৯৫৫ সালে পাকিস্তান জাতীয় প্রতিযোগিতায় ১০০ ও ৪০০ মিটার ফ্রিস্টাইল সাঁতারে শিরোপা জেতেন তিনি।
ব্রজেন দাস ১৯৫৫ সালে পাকিস্তান অলিম্পিকে সাঁতার প্রতিযোগিতায় প্রথম তো হন, এবং মোট চারটি খেলায় স্বর্ণপদক লাভ করেন। ১৯৫৬ সালে মেলবোর্নে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অলিম্পিকে তাকে পাঠানো হয়নি। সেখানে পাকিস্তান দল থেকে তাকে বাদ দিয়ে পাকিস্তানি সাঁতারুদের নেয়া হয়েছিল। ওই অপমানজনক পরিস্থিতিই তাকে অলিম্পিকে অংশ না নিয়েও সমতুল্য সম্মান ও সাফল্য অর্জনের চিন্তায় বাধ্য করে। মনস্থির করেন, ইংলিশ চ্যানেল তাকে সাঁতরিয়ে অতিক্রম করতেই হবে। তার ওই ভাবনায় অনুপ্রেরণার শক্তি জুগিয়েছেন ইস্ট পাকিস্তান স্পোর্টস ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক এসএম মহসিন।
১৯৫৮ সালে অনুষ্ঠিত ইংলিশ চ্যানেল সাঁতার প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে আমন্ত্রিত হন ব্রজেন দাস। এরপর চরম হতাশা কাটিয়ে ব্যক্তিগত উদ্যোগে দীর্ঘপথ সাঁতারের অনুশীলন শুরু করেন। ১২ থেকে ১৬, ১৬ থেকে ২৪ এবং ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা টানা সাঁতারের অনুশীলন করেন। শীতলক্ষ্যা ও উন্মত্ত মেঘনায় সাঁতার চর্চা করে নিজেকে তৈরি করেন। এক সময় সাঁতরিয়ে নারায়ণগঞ্জ থেকে চাঁদপুর অতিক্রম করেন তিনি। তখনকার দিনে ওই দূরত্ব অতিক্রম করতে স্টিম শিপ প্রায় আড়াই ঘণ্টা সময় নিতো।


ইংলিশ চ্যানেল সাঁতার প্রতিযোগিতায় ২৩টি বিভিন্ন দেশের প্রতিযোগী অংশ নেন। দক্ষিণ এশিয়ার সাঁতারুদের মধ্যে নারীও ছিলেন পাঁচজন। ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে অংশ নিয়েছিলেন একমাত্রÑ ব্রজেন দাস।
১৯৫৮ সালের ১৮ আগস্ট প্রায় মধ্যরাতে ফ্রান্সের তীর থেকে প্রতিযোগিতা শুরু হয়। অনেকে ক্লান্ত হয়ে মাঝপথে ক্ষান্ত দিলেও ব্রজেন দাস সংকল্পে অটুট থেকে অগ্রগামীদের একজন হয়ে সাঁতার শেষ করেন এবং ইতিহাসে নিজের নাম লেখান।
ইংলিশ চ্যানেল এমনিতেই অশান্ত থাকে। সেদিন বাড়তি ছিলÑ প্রচ- কুয়াশা। প্রতিযোগিতা ছিল- ফ্রান্সের তীর থেকে সাঁতরে ইংল্যান্ডের তীরে এসে উঠতে হবে। প্রতিযোগিতা শেষ হয়েছিল পরের দিন বিকেলে। প্রচ- প্রতিকূল পরিবেশে সাঁতার কেটে পর দিন বিকেলে প্রথম সাঁতারু হিসেবে ইংল্যান্ড তীরে এসে পৌঁছান ব্রজেন দাস। প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন। ১৯৫৮, ১৯৫৯, ১৯৬০ ও ১৯৬১ সালসহ মোট ৬ বার তিনি ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেন। ১৯৬১ সালে ১০ ঘণ্টা ৩৫ মিনিটে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে তিনি বিশ্ব রেকর্ড গড়েন। এ জন্য তাকে ‘লেটনা ট্রফি’ দেওয়া হয় ১৯৮৬ সালে। দেশের উল্লেখযোগ্য প্রায় সব সাঁতার
প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে নিজেকে সেরা সাঁতারু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। ইংরেজরা যখন পুরোপুরি শাসন শুরু করে দিয়েছিল তখন অনেক বাঙালি জীবিকার তাগিদে প্রথম ঘর ছেড়ে বাইরে বের হওয়া শুরু করেন। অনেকেই তখন বিলেতে যেতেন পড়াশোনা বা জীবিকার তাগিদে। দুঃসাহসিক কাজ বা এক্সপিডিশনের জন্য নয়। তবে ইংরেজ আমলেই বাঙালির এক্সপিডিশনের যাত্রা। দুঃসাহস আর অসম্ভবকে সম্ভব করতেই হয়তো ব্রজেন দাস বিলেত যান। ইংলিশ চ্যানেল প্রতিযোগিতার আগেই ১৯৫৮ সালের জুলাইয়ে আরেকটি সাঁতারের আমন্ত্রণ আসে। ভূমধ্যসাগরে ইটালির কাপ্রি থেকে নেপলস্ পর্যন্ত সাঁতার কেটে যেতে হবে। এটি প্রতিযোগিতা ছিল না। ফলে লন্ডন থেকে ইটালি গিয়ে ওই খেলায় অংশ নেন প্রশিক্ষণের পেশা গ্রহণের জন্য। সেখান থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতা ও সাফল্য সাঁতরিয়ে সমুদ্র পাড়ি দেয়ার জন্য তার আত্মবিশ্বাস সুদৃঢ় করে।
বিদেশ থেকে বহু আমন্ত্রণ পাওয়া সত্ত্বেও ব্রজেন দাস কোনো কিছুর মোহে স্বদেশ ছেড়ে চলে যাননি। ১৯৫৯ সালে প্রাইড অফ পারফরম্যান্স পাকিস্তান সরকার তাকে বিশেষ সম্মানে সম্মানিত করে। ১৯৭৬ সালে জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার কওঘএ ঙঋ ঈঐঅঘঘঊখ ঈযধহহবষ ঝরিসসরহম অংংড়পরধঃরড়হ ড়ভ ঃযব টহরঃবফ করহমফড়স অর্জন করেন তিনি।
১৯৯৭ সালে প্রাণঘাতী ক্যানসারে আক্রন্ত হয়ে ব্রজেন দাস বেশ কিছুদিন কলকাতায় চিকিৎসা গ্রহণ করেন। সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে ১৯৯৮ সালে ১ জুন ৭০ বছর বয়সে সেখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ৩ জুন ঢাকার পোস্তগোলায় তাকে সমাধিস্থ করা হয়। তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৯ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার (মরণোত্তর) প্রদান করে।
সাঁতারটিকে পেশা হিসেবে নিয়ে অন্য দশজনের মতো সাধারণ জীবন যাপন করেও ব্রজেন দাস ওই দুঃসাহসিক কাজ করতে পেরেছিলেন কেবল স্বপ্ন ও ইচ্ছাশক্তির জোরে। ওই সঙ্গে সহায় ছিল তার ভাগ্য।
ইচ্ছার ঢেউয়ে ফুলে ওঠে প্রতিভার নদী। ওই নদীতে সাঁতার কেটে যেন ব্রজেন দাস পাড়ি দিয়েছিলেন ইংলিশ চ্যানেল। দেখিয়ে দিয়েছিলেন পাকিস্তানের সিদ্ধান্ত কতোটা ভুল ছিল। কতোটুকু ছিল বাংলার বিপরীত। তার কাছেই তো সেদিন হয়েছিল পাকিস্তানের বড় পরাজয়।


শীতলক্ষ্যা ও বুড়িগঙ্গা নদীর মতোই মানুষ। এত উত্তাল ও খোলামেলা ঢেউ অন্য কোনো নদীর কী আছে! বিক্ষিপ্ত স্রোতে নিজেকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছেন ব্রজেন দাস ইংলিশ চ্যানেল পর্যন্ত। সেখানে বসে না থেকে বাংলাদেশের চাঁদপুরের অরুণ নন্দী ও উত্তর কলকাতার আরতি সাহাকে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেয়ার স্বপ্নে তিনি সাহস জুগিয়েছেন। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের মধ্যে গভীর সুনসান রাতে তিনি জলে ডানা ঝাপটা এক জলাশ্রয়ী মুক্তিযোদ্ধা। এমন গৌরব আছে যে জাতির সে জাতি কি পরাজয় মেনে নিতে পারে?
কৃতী সাঁতারু ব্রজেন দাসকে আজ আমরা গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি।

 

খুঁড়তে খুঁড়তে কতদূর যাও 

মনি হায়দার 

 

তুমি কী বলতে চাও? রাহুল তীব্র চোখে তাকায় মনিকার দিকে। বললেই আমি বিশ্বাস করবো? আমার কি চোখ নেই? কী মনে করো নিজেকে? আমি অফিসে থাকলেও আমার একটা চোখ থাকে তোমার দিকে।
আমার দিকে?
হ্যাঁ, তোমার দিকে।
তুমি আমাকে সন্দেহ করো?
না বললে মিথ্যা বলা হবে। হাতের গ্লাস মুখের কাছে নিয়ে এক চুমুক গ্রহণ করে মনিকার একটু কাছে আসেÑ হ্যাঁ মনিকা, তোমাকে আমি সন্দেহ করি।
আমাকে! আমাকে তুমি সন্দেহ করো? অবিশ্বাস্য চোখে তাকায় মনিকাÑ কেন আমাকে তুমি সন্দেহ করো?
করি... হ্যাঁ তোমাকে সন্দেহ করি... কারণ তুমিÑ
শেষ করো। রাহুল শেষ করোÑ কেন আমাকে তুমি সন্দেহ করো?
বলছি তো করি...
আমিও তো জানতে চাইÑ কেন করো? কী সন্দেহ করো?
রাহুল হাতের গ্লাসটা রাখে টেবিলের ওপর। একটু একটু টলছে। চোখের পাতা কাঁপছে। নিজেকে প্রাণপণে স্থির রাখার চেষ্টা করছে।
মনিকা এগিয়ে যায়। হাত বাড়ায় তার দিকে।
হাতটা সরিয়ে দেয় রাহুলÑ না, আমাকে ধরতে হবে না। আমি ঠিক আছি। তোমার কী মনে হয়, আমি মাতাল? না, আমি একদম মাতাল নই। তুমি স্কুল থেকে বাসায় ফিরতে দেরি করো কেন?
আমি স্কুল থেকে বাসায় ফিরতে দেরি করি!
হ্যাঁ, করো।
তুমি তো থাকো অফিসে। কেমন করে জানো আমি স্বুল থেকে বাসায় ফিরতে দেরি করি!
বললাম না, আমি অফিসে গেলেও একটা চোখ তোমার জন্য বাসায় রেখে যাই।
রাহুল, তুমি ঠিক আছ?
আমি রাহুল সব সময়ে ঠিক থাকি। আমার কোনো দ্বিধা নেই।
তুমি কেন আমাকে সন্দেহ করো? আমরা যদি আমাদের সন্দেহ করি তাহলে দুনিয়ায় আমাদের কেউ বিশ্বাস করবে? কেউ আমাদের মানুষ ভাববে? কোনো বন্ধু আমাদের কাছে আসবে? রাহুল, প্লিজ, বোঝার চেষ্টা করো। আমাদের জায়গা খুব কম। তুমি আর আমি ছাড়া আমাদের কেউ নেই- বলতে বলতে মনিকার গলা ধরে আসে। টেবিল ধরে নিজেকে সামলে নেয়ার চেষ্টা করে। রাহুল জানালার কাছে যায়। তাকায় রাতের ঢাকা নগরীর দিকে। স্রোতের মতো গাড়ি যাচ্ছে। গতিশীল গাড়ির আলোর ফোয়ারা ছুটে চলেছে দিগি¦দিক। হাতের গ্লাস মুখের কাছে নেয়, চুমুক দেয় না, সময় নেয়। তাকায় মনিকার দিকে। মনিকার বিষাদ কান্নাকাতর মুখ রাহুলকে একটুও আকর্ষণ করে না। অথচ মাত্র বছর দুয়েক আগেও মনিকার একটু মন খারাপ হলে দিশাহারা হতো রাহুল। দুই বছর... বছরে বারো মাস... দুই বছরে চব্বিশ মাস... একজন মানুষের জীবনে দুই বছর কি খুব বড়? পরিস্থিতির কারণে কখনো বড়, কখনো খুব ছোট হতে পারে। বাইরে থেকে ফিরে তাকায় রাহুলÑ শ্লেষের সঙ্গে প্রশ্ন করে, তুমি অস্বীকার করতে পারো, তোমার কাছে ওই লোকটা আসে না?
কোন লোকটা আসে আমার কাছে?
ন্যাকা! মনে করো তোমার ন্যাকামিতে আমি সব ভুলে যাবো? কখনোই না।
কে আসে আমার কাছে? মরিয়া হলে জানতে চায় মনিকা। লোকটার নাম বলো।
কে আবার? তোমার আগের স্বামী কুহুক।
মনিকা কোনো কথা বলে না, বলতে পারে না। রাহুলের কথায় মনিকার কথা বলার সব শক্তি হারিয়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত রাহুল এভাবে বলতে পারলো? মাত্র দু’বছরের ব্যবধানে একজন রাহুলের এতো পরিবর্তন! কিন্তু কিসের ওপর ভিত্তি করে রাহুল এমন নির্মম অসত্য বলতে পারলো? কবে থেকে সে এমন ভাবতে শুরু করেছেÑ মনিকা মনে করতে পারছে না। তবে হ্যাঁ মাস ছয়েক আগে দুপুরে স্কুলে গিয়েছিল রাহুল। হঠাৎ যাওয়ায় যেমন বিস্মিত হয়েছিল, আনন্দিতও হয়েছিল। স্কুলের প্রিন্সিপালকে বলে ছুটি নিয়ে রাহুলের সঙ্গে একটা রেস্টুরেন্টে যায়। দু’জন মিলে খেয়েছে, বিকেলে ঘুরেছে রিকশায়। সত্যিই দিনটা অদ্ভুত ভালো লেগেছিল। এ জন্যই কুহককে ত্যাগ করে কুহকেইর বন্ধু রাহুলের হাত ধরে...। সেই আসাটা কি ভুল ছিল? কোনটা ভুল আর কোনটা ফুল? কাঁটার ভেতরই তো ফুলের জন্ম। আবার ফুলের পাশেই কাঁটার অবস্থান।
কুহকের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল বছর আটেক আগে। সামান্য পরিচয় ছিল। কলেজ বন্ধু কামনার বড় ভাই কুহক। কামনাদের বাসায় গেলে দু’একবার দেখা হয়েছে। কুহক একটা বেসরকারি কলেজে পড়ায়। কামনার মা-বাবা বাসায় এসে প্রস্তাব দিলে মনিকার মা-বাবাও রাজি হয়ে যান। মনিকার কারো সঙ্গে প্রেম ছিল না। দেখতে সুন্দরী বলা যায়। গায়ের রঙ হালকা কালো। মুখ অসাধারণ লাবণ্যবালু চিকচিক করে। লম্বা লতানো শরীর। আর বড় সম্পদ তার গভীর দুটো চোখ। দুই পরিবারের যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে বেশ জাঁকজমকের সঙ্গে বিয়েও হলো। বিয়ের পর মনিকা আবিষ্কার করে, কুহক কথা কম বলে। কিন্তু যখন বলে, যা বলে তা খুবই যুক্তিযুক্ত ও পরিবেশের সঙ্গে মানানসই। যদিও গলাটা একটু ফ্যাসফেসে তবুও সহ্য করার মতো। হাসাহাসিও কম করে। এই নীরবতা মনিকার কাছে মনে হয়েছিল, অপার সৌন্দর্র্যের ভিন্ন এক রূপান্তর। যারা বেশি কথা বলে, খিলখিল করে হাসে তাদের ব্যক্তিত্ব থাকে না। কুহক শান্ত-সমুজ্জøল এক প্রসবন। বেশ জমে ওঠে সংসার...। কিন্তু বছর তিনেকের মধ্যেই হাঁপিয়ে ওঠে মনিকা। এ তো মানুষ নয়, পাথর। যে নীরবতাটি মনে হয়েছিল অম্লান সৌন্দর্যের রূপরেখা সেটিই বিষাক্ত বেদনার মতো, শ্রাবণের কান্নার মতো মনিকাকে ঘিরে রাখে। বেচারা একটু ঝগড়াও করে না, রাগ করে না। কঠিন কথাও বলে না। মনিকা কিছু বললে সামান্য দাঁত বের করে হাসে। ভাবটা যেন সে এ যুগের গৌতম বুদ্ধ।
মনিকা মন খারাপ করলে অবশ্য বিচলিত হয় কুহকÑ কি হয়েছে তোমার?
কিছু হয়নি আমার।
তাহলে মন খারাপ করে আছ কেন?
আমি মন খারাপ করে থাকলে তোমার কী?
কুহক একেবারে চুপ। মনে হয়, তার সব কথা শেষ।
মনিকা ভেবে পায় না, এই লোক ক্লাসে পড়ায় কেমন করে? কী পড়ায়? কিন্ত শুনেছে, ক্লাসে ভালোই পড়ায় এবং অনেকের প্রিয় শিক্ষকও। কোনো কাঁটা কম্পাসে মেলাতে পারে না কুহক নামক মানুষটির চরিত্র বা চরিত্র ব্যকরণ। কামনা বা শাশুড়ির কাছে জেনেছে, কুহক সব সময়ই বাসায় কম কথা বলে। এমন দিন গেছে বাসায়, ২৪ ঘণ্টায় কারো সঙ্গে একটা কথা বলেনি। কেমন করে পারে! দিন-রাত, বাসায় যতোটুকু সময় পায়, মুখের সামনে একটা বই নিয়ে বসে থাকে। পড়েও বিচিত্র ধরনের বই। যদিও কুহুক বাণিজ্যের ছাত্র, কলেজে পড়ায় বাণিজ্য সম্পর্কে তবুও পড়ে বিচিত্র প্রকারের বই। মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধুর প্রতি প্রায় প্রশ্নহীন আনুগত্য আছে, জানেও বিস্তর। কিন্তু নিশ্চুপ, মৌন।
রাতে বিছানায় বিশেষ মুহূর্তে কুহক আশ্চর্য সবল, সাবলীল। মনে হয় তেপান্তরের ধাবমান অশ্ব। সে সময়ের কুহককে খুঁজে পায় না পর মুহূর্তে। কামকাতর মুহূর্ত শেষ হলে পাশেই শুয়ে পড়ে এবং মিনিট তিনেকের মধ্যে ঘুমিয়ে যায়। মনিকা বন্ধুদের কাছে শরীরের সংরাগ নিয়ে কতো অবাক ঘটনা শুনেছে। আর সে! তার স্বামী?
বিয়ের বছরখানেক পর কুহক কক্সবাজার নিয়ে গিয়েছিল। প্রথম সমুদ্র দেখার রোমান্স নিয়ে যখন সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়ায় মনিকা তখন গোটা মন-প্রাণ-শরীর আদিগন্ত বিস্তৃত বিপুল জলরাশি দেখে কাপছে। সমুদ্র এতো সুন্দর! এতো বর্ণিল? এতো আনন্দমুখর? কুহককে ছাড়াই সমুদ্রে নেমে গেছে। নিজের মতো করে ভিজেছে। সাঁতার কেটেছে। আশ্চর্য, কুহুক একবারও সমুদ্র স্নান করেনি! অবশ্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা তীরের পানিরেখার ওপর দিয়ে হেঁটেছে। তীরে দাঁড়িয়ে ঢেউ গুনেছে।
হাত ধরে টানছে মনিকাÑ চলো, দু’জনে মিলে স্নান করি।
নাহ, আমার ভালো লাগে না। তুমি করো।
সমুদ্র স্নান ভালো লাগে না কোনো পুরষের! সম্ভবত সমুদ্র এই প্রথম শুনলো। অথচ চারপাশে কতো মানুষÑ স্বামী-স্ত্রী, প্রেমিক-প্রেমিকা, ছেলে-বুড়ো, দাদা-দাদি, নানা-নানি গোসল করছে, সাঁতার কাটছে, ঢেউয়ের বিরুদ্ধে লড়াই করছে আর কুহুক আশ্চর্য নির্বিকার। সমুদ্রপাড় থেকে এসে কুহুক হোটেলের বাথরুমে গোসল সারে। অন্তর্গত বেদনা, ক্ষোভ ও দুঃখে মনিকা ফেটে চৌচির হয়ে গেছে।
রাতে ছোট বোনের সঙ্গে সেলফোনে সমুদ্রপাড়ের অভিজ্ঞতা উচ্ছ্বাসের সঙ্গে বলে মনিকাÑ পিউ, সমুদ্র কী সুন্দর! একবার এসে দেখে যা, ভালো লাগবে। কী বিশাল ঢেউ, কতো মানুষ...
কথা শেষ হলে কুহুক মুদৃকণ্ঠে বলে, সমুদ্র দেখে এতো উচ্ছ্বাসের কী আছে?
মানে? হতভম্ব মনিকাÑ বলে কী লোকটা!
সবকিছুর উচ্ছ্বাস দেখাতে নেই।
তো মানুষের ভেতরে উচ্ছ্বাস-আনন্দ এলে কী করবে? বুকে চেপে ধরে বসে থাকবে?
তা থাকবে কেন? আমি মনে করি, আনন্দ প্রকাশের নয়, আনন্দ একান্ত করে অনুভবের। সমুদ্র দেখেছ, দেখার আনন্দ বা সুখ মনের ভেতরে ধারণ করে রাখা উচিত। অবশ্য আমার এই ধারণার সঙ্গে অধিকাংশ মানুষ একমত নয়, আমি জানি। কিন্তু এটাই আমি, আমার আমি।
এই প্রথম বিবাহিত জীবনে কুহকের ভেতরের কুহককে কিছুটা চিন্তে পারে মনিকা। কিন্তু এই চেনা দিয়ে কী করবে সে? কোথায় রাখবে? মনে হয়, তার ভেতরের চারপাশটা একেবারে ভেঙে আসছে। রুম থেকে বের হয়ে ব্যালকনিতে দাঁড়ায়। হুহু বাতাসে গোটা কক্সবাজার উড়ে যাচ্ছে। চারদিকে নিয়ন আলোর বন্যা... দূরে সমুদ্রের মাঝে টিমটিমে আলো জ্বলছে। সেগুলো মাছ ধরার নৌকাÑ দুুপুরে দেখেছে। কী সাহস জেলেদের? ভাবতে ভাবতে মনিকা অনুভব করে, তার গা ভিজে যাচ্ছে। হাত দিয়ে দেখে, চোখের পানি নামছে।
কক্সবাজার থেকে ফিরে আসার কয়েকদিন পর বন্ধু রাহলকে নিয়ে বাসায় আসে কুহক। রাহুল একেবারে কুহকের উল্টো। সামান্য কারণেও প্রচ-ভাবে হাসে। বড় বড় চোখ। হালকা চুল। চওড়া কপাল। হাসে আর সিগারেট টানে। সিগারেট একদম পছন্দ না মনিকার। গন্ধটা সহ্য করতে পারে না। ড্রয়িংরুমে বসে পরিচয়ের পর চা-নাশতা দেয় মনিকা। চায়ের সঙ্গে সিগারেট টানতে টানতে রাহুল তাকায় মনিকার দিকে। কিন্তু প্রশ্ন করে কুহককেÑ কুহক, তুই কাজটা ঠিক করিসনি?
কোন কাজ?
তুই বিয়ে করলি, আমাকে জানালি না?
কী করে জানাবো? ইউনিভার্সিটির শেষ পরীক্ষার পর আর তোর দেখা পেয়েছি? শুননেছি, তুই বিদেশে চলে গেছিস?
ঠিক শুনেছিস। আর এই ফাঁকে এমন টুকুটুকে সুন্দরী বৌ ঘরে এনেছিস?
মৃদু হাসে কুহক।
বিব্রত মনিকা।
রাহুল হাঁ হাঁ হাসেÑ ভাবী, আপনি ভাবছেন লোকটার বুঝি কা-জ্ঞান নেই। আছে, কা-জ্ঞান আছে। কিন্তু আমি সব সময় সত্যি বলি। আমার যা ভালো লাগে তা অকপটে বলি। অনেকে খারাপভাবে নেয়। তবে আমি অসহায় আমার কাছে। আমি তো আমার মতো, নাকি?
সত্যি সবাই বলতে পারে নাÑ মনিকা মৃদুকণ্ঠে বলে।
রাইট ভাবী। প্রত্যেকে দাবি করে, সে সত্যবাদী। কিন্তু নিজের বিরুদ্ধে গেলে সে ওই সত্যটাকে আর প্রকাশ করে না। বেমালুম খেয়ে ফেলে বলতে বলতে সিগারেট ধরায় রাহুল।
আপনি খুব সিগারেট খান বুঝি?
তা খাই। আপনি কি পছন্দ করেন না?
মৌন মনিকা। কেউ মানুষ সিগারেট খাবেÑ এতে তার কী আসে যায়? আর কতোক্ষণই বা থাকবে? কেন বলতে গেল কথাটা?
তার ভাবনার মধ্যে আবার প্রশ্ন করে রাহুলÑ আপনি সিগারেট খাওযা পছন্দ করেন না?
না খেলেই ভালো হয়।
ঠিক আছে, আপনার আদেশে আজকের এই প্যাকেটের সিগারেটকটা খেয়ে একদম ছেড়ে দেবো।
জগতের সবচেয়ে সহজ কাজ কী জানিস? প্রশ্ন করে কুহক।
কী কাজ?
সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দেওয়া আবার ধরা।
তুই দেখিস, আজ এই প্যাকেটের গুলো খাওয়ার পর আর খাবো না। যদি না পারি তাহলে আর তোর সামনে আসবো না।
কী আশ্চর্য! আপনাকে এতো বড় প্রতিজ্ঞা করতে কে বলেছে? মনিকা প্রতিবাদ করে।
আমিও অনেক দিন ধরে চাইছিলাম সিগারেট ছেড়ে দিই। কিন্তু কোনো ইস্যু পাচ্ছিলাম না। আপনাকে কেন্দ্র করে ইস্যু পেয়ে গেলাম।
আড্ডায় আড্ডায় বিকেল। রাহুল প্রস্তাব করেÑ কুহুক চল, নাটক দেখি।
নাটক?
মনে হয় আসমান থেকে পড়লি? তুই নাটক দেখিস না?
নাহ, ওসব আমার পোষায় না।
পোষায় না মানে কী?
ওসব সাজানো জিনিস আমার ভালো লাগে না। কিছু চোখা চোখা বাক্য থাকে নাটকের সংলাপে। যে লেখে সে ধারণাকে বমির মতো উগড়ে দেয়, চরিত্রগুলো মঞ্চে এসে উগড়ে দিয়ে যায়Ñ সেই অনাধিকালের চর্বিত চর্বণ। নতুন কিছু হলে যাওয়া যেতো।
তুই আগের মতোই রয়ে গেলি রে, কুহকভ রোবোটিক। তাকায় মনিক্রা দিকে, বুঝলেন ভাবী, ওকে আমরা কুহকভ ডাকতাম ইউনিভার্সিটিতে। তখন সোভিয়েত ইউনিয়নÑ দুনিয়া জোড়া সমাজতন্ত্রের জোয়ার, কমিউনিস্টদের মতো সে নিঃশব্দ, নির্চল...। আছে সবার সঙ্গে আবার নেই। তাই সোভিয়েত লোকজনের নাম ধার করে ডাকতাম ‘কুহকভ’। আমার ধারণা ছিল, এতো দিনে তোর পরিবর্তন হয়েছে। তুই কুহকভের জাল ছিঁড়ে বের হয়ে এসেছিস। কিন্তু আমার ধারণা ভুল, তুই এখনো কুহকভ। যাই রে...। ভাবী কি করেনÑ সংসার, না চাকরি-বাকরি কিছু করেন?
আমি একটা স্কুলে পড়াই।
কোন স্কুলে?
মনিংসান।
খুব নামি-দামি স্কুল। যাক, সারা দিন বাসায় থাকতে হয় না, কাজের মধ্যে থাকেন। এটা ভালো। কুহকভ, আমি আসি। এই নে কার্ড। দিলখুশায় আমার অফিস। সময় পেলে আসিস। আমি জানি, তুই আসবি না। কী আর করা, আমিই আসবো মাঝে মধ্যে। ভাবী, এলে বিরক্ত হবেন না তো?
আগে তো আসুন।
গুড।
হাওযার বেগে চলে যায় রাহুল। রেখে যায় মনিকার জন্য কৌতূহল, উচ্ছ্বাস আর ভাবনার ছিন্নপাতা। মানুষের একটাই জীবন। কিন্তু কতোভাবে তার প্রক্ষেপণ হতে পারে? রাহুলের বন্ধু কুহক বা কুহকের বন্ধু রাহুলÑ কতো ব্যবধান দু’জনার!
মাঝে মধ্যে রাহুল বাসায় আসে। কুহকের সঙ্গে আড্ডা দেয়। মনিকারও ডাক পড়ে। চা জোগায়। আর অবাক মনিকাÑ রাহুল সিগারেট খায় না। মনিকার বাবা সিগারেট খেতেন। মা কতো বকেছেন। কতোবার বলেছেন, ঠিক আছে, ছেড়ে দেবো। কিন্তু কোনোদিন ছাড়তে পারেননি। আর রাহুল? মনিকা কিছুটা হলেও বুঝতে পারে, রাহুল এই বাসায় আসে কেবল তার জন্য। না, কোনো প্রমাণ নেই তার কাছে। কিন্তু নারীর মনের ইন্দ্রিয় তাকে পরিষ্কার বলছে, রাহুল তোমার প্রেমে পড়েছে। সত্যি! স্বামী-সংসার থাকার পরও মনিকার ভেতরে নাম না জানা এক অলৌকিক পাখি গাইতে শুরু করে... ‘আমি চিনিগো চিনি তোমারে চিনি...।’
এই চেনা ও অচেনার দরজায় এক দুপুরে রাহুলকে মুখোমুখি আবিষ্কার করে মনিকা। স্কুল ছুটির ঠিক আগ মুহূর্তে গেইটে আসে রাহুল।
আপনি?
এই পথ দিয়ে যাচ্ছিলাম। ভাবলাম, আপনাকে দেখে যাই। কেমন আছেন?
ভালো। আপনি?
আমি? আমি আরো ভালো। কোথায় যাবেন, বাসায়?
হ্যাঁ।
যদি কিছু মনে না করেনÑ আমার সঙ্গে গাড়ি আছে। চলুন কোথাও বসি। মনিকাকে ভাবার কোনো সুযোগ না দিয়ে রাহুল গেইট পার হয়ে হাঁটতে শুরু করে। নিশ্চিত মনিকা আসবে।
হ্যাঁ মনিকা যায়, যেতে বাধ্য হয়। কে তাকে নিয়ে যায়? মনিকা জানে না। কিন্তু যেতে ভালো লাগছে...। গাড়ির দরজা খুলে দাঁড়ায় রাহুল।
মনিকা প্রবেশ করলে দরজা বন্ধ করে নিজের ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ি স্ট্রাট দেয়।
গাড়ি চলতে থাকে। কেউ কোনো কথা বলে না। মনে হচ্ছে, গাড়ি চালানো রাহুলের বড় একটা কাজ। আর মনিকা নির্বাক সামনে তাকিয়ে আছে। প্রায় ১৫-২০ মিনিট পর গাড়ি চমৎকার একটা বাড়ির সামনে থামে।
নামে মনিকা। চারপাশটা দেখে বুঝতে পারে, এটা খুব অভিজাতপূর্ণ একটা রেস্টুরেন্ট। রাহুলের ইশারায় সিঁড়ি বেয়ে তিনতলায় ওঠে। ব্যালকনির সঙ্গে চমৎকার সাজানো একটা টেবিল। বুঝতে পারে মনিকাÑ রাহুল এখানে মাঝে মধ্যে আসে। বেয়ারারা পরিচিত। দু’জন বসে। মনিকার ভেতরটা কাঁপছে। জীবনে এই প্রথম বাইরের কারো সঙ্গে...। রাহুল কি বাইরের কেউ? জানে না... মনের ভেতরে সুরের একটা কম্পন বয়ে যায়... মনিকা ভেতরে ভেতরে টুকরো টুকরো হয়ে যায়।
কী খাবেন?
আপনি এখানে আনলেন কেন?
দুপুরের খাবারের সময় না? দুপুরে প্রিয় অতিথিকে কি না খাইয়ে রাখবো? বলুন, কী খাবেন?
জানি না।
ঠিক আছে, আমিই বলছি।
নানান মাছ আর তরকারিতে ভরে যায় টেবিল। ধীরে ধীরে খায়। খেতে খেতে রাহুল জানায়, আমি দীর্ঘদিন সিঙ্গাপুরে ছিলাম। চাকরি করতাম। প্রায় ১১ বছর। মা-বাবা আছেন গ্রামে, ছোট ভাই একটা ব্যাংকের ম্যানেজার। বোন একটাইÑ বিয়ে হয়েছে। জামাইয়ের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়া থাকে। এই হচ্ছে আমার জীবন।
এসব আমাকে শোনাচ্ছেন কেন?
নিজের সব কাছের মানুষের জেনে রাখা ভালো। সিঙ্গাপুর থেকে এসে একটা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ি তুলেছি। ব্যবসা করছি আর ঘুরে বেড়াচ্ছি।
চমৎকার জীবন আপনার।
হাসে রাহুল। খাওয়া শেষে বেয়ারা সব নিয়ে যায়। দু’জনে মুখোমুখি। রাহুলের দিকে তাকাতেও ভয় পাচ্ছে মনিকা। বাসায় যাওয়া দরকার। স্কুলের পর বাইরে থাকে না মনিকা। অথচ প্রায় দু’ঘণ্টা বাইরে। কুহক ফেরে বিকেলের দিকে। অনেক সময় রাতও হয় ফিরতে। না, কেউ কিছু বলবে না লেটের জন্য। কিন্তু নিজের কাছে...
মনিকা!
রাহুলের নাম ধরে ডাকে মনিকার ভেতরটা একেবারে উল্টে যায়। ভয়ার্ত চোখে তাকায়।
তুমি নিশ্চয়ই জেনে গেছ, তোমার সামনে বসা এই রাহুল বকশী তোমায় ভালোবাসে, প্রচ- ভালোবাসে। প্রথম যেদিন তোমায় রাহুল দেখেছে কুহকের বাসায়, সেই প্রথম দৃষ্টিতে রাহুল তোমাকে ভালোবেসেছে। রাহুল বুঝে গেছে, তুমি কুহকের সংসারের বড় বেমানান একটি প্রজাপতি। রাহুলকে তোমার কি কিছু বলার আছে?
মনিকা মাথাটা টেবিলের ওপর রাখে। মাথার দু’পাশে কালো চুলের বিশাল স্তূপ।
রাহুল ঝুঁকে মাথার ওপর মুখ রাখেÑ আমি বুঝে গেছি, তুমিও রাহুলকে ভালোবাসো। আমি জানতাম। কিন্তু একটু সংশয় ছিল। সেটিও কেটে গেছে। থ্যাংক ইউ, আমি কোনোদিন তোমায় কষ্ট দেবো না। বুকের ভেতরে প্রদীপের মতো জ্বালিয়ে রাখবো তোমাকে, মনিকা। তুমি কেবল আমার অন্তরজুড়ে আলো, আলো আর আলো ছড়াবে। তোমার আলোয় আমি বেঁচে থাকতে চাই।
ঘটনা ঘটার ছয় মাসের মাথায় মনিকা ডিভোর্স দেয় কুহককে। চলে আসে রাহুলের বাসায়। বিয়ে হয়েছে কোর্টে। বিয়ের পর হানিমুনে গেছে মালয়েশিয়া। জীবন, একটাই যে জীবন সে জীবন কতো সুন্দর, কতো বর্ণাঢ্য, আলোকময় হতে পারেÑ রাহুল বুঝিয়ে দিয়েছে। আর ভালোবাসাÑ একজন নারীর জন্য একজন পুরষেরও তীব্র হতে পারে, মনিকা মর্মে মর্মে বুঝতে পারছে।
রাহুলের সঙ্গে সংসার করার মুহূর্তে মনের ভেতরে যে দ্বিধা ছিল তা একদম নেই। কয়েক মাস আগে কক্সবাজার গিয়েছিল মনিকা আর রাহুল। স্মৃতির ভেতরে দুটো পর্ব রেখে মনিকা মনে মনে নিজেকে বলেছে, কতো সার্থক-সুন্দর আর উপভোগ্য এই কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকত? রাহুল আর মনিকা মিলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সাঁতার কেটেছে। দিন-রাতে যখনই সময় পেয়েছে তখনই চলে এসেছে সমুদ্রপাড়ে সমুদ্র মন্থনে।
বাসা নিয়েছে ঢাকার অভিজাত এলাকায়। নিজের গাড়ি...। একটা চকচকে জীবনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিল। সময় কাটানোর জন্য আবার একটা স্কুলে চাকরি নিয়েছে মনিকা। কিন্তু এ কী দুর্যোগ শুরু হলো আবার?

আমি দিব্যি করে বলছি, তোমার সঙ্গে বিয়ের পর আমি এক মুহূর্তের জন্য কুহককে ভাবিনি। আমার জীবন থেকে সে হারিয়ে গেছে চিরকালের জন্য।
আমি বিশ্বাস করি না। তার সঙ্গে তুমি বাইরে যাও।
অসম্ভব।
তুমি আর সে- দু’জন মিলে রেস্টুরেন্টে খেতে যাও, হাসো, আড্ডা দাও। তোমাকে সে আদর করে.. আহ আহ, আমাকে এসবও সহ্য করতে হচ্ছে?
সব তোমার কল্পনা- রাহুল। সব তোমার কল্পনা। তোমার সঙ্গে চলে আসার সময় মা-বাবা সবাইকে ছেড়ে আসতে হয়েছে আমার। কুহকের সঙ্গে ডিভোর্স কেউ মেনে নেয়নি। তোমাকে ছাড়া কাউকে চিনি না, জানি না। তুমি নিশ্চয়ই ভুল করছ রাহুল।
রাহুল বকশী কোনোদিন ভুল করে না।
তাহলে এক কাজ করো...
কী কাজ?
আমার বলতে লজ্জা লাগছে, তারপরও বলছি- যে কুহককে নিয়ে তোমার এতো সন্দেহ, চলো তার কাছে যাই।
কেন? ওই লোকটার কাছে কেন যাবো?
কুহকের কাছে গেলে সত্যি-মিথ্যাটা বুঝতে পারবে।
না, আমি যাবো না। তোমার দরকার থাকলে তুমি যাও।
দরকারটা আবার নয়, তোমার।
না, আমি যাবো না।
হাত ধরে মনিকা বুকের সঙ্গে জড়িয়ে রাখে- চলো একবার, মাত্র একবার। যাওয়ার পর কুহক যদি বলে, তার সঙ্গে আড্ডা দিয়েছি, রেস্টুরেন্টে খেয়েছি তাহলে তুমি যা বলবে, আমি তা-ই শুনবো। যা করতে বলবে, তা-ই করবো।
ঠিক আছে। কিন্তু তার বাসায় যাওয়া যাবে না।
ওকে, চলো তার কলেজে যাই?
পরের দিন কলেজে গিয়ে জানতে পারে মনিকা আর রাহুল - কুহক বছর দুয়েক আগেই চাকরি ছিড়ে দিয়ে গ্রামের বাড়ি চলে গেছে। গ্রামটি ঢাকার উপকণ্ঠে গাজীপুরে। তারা চলে যায় গ্রামে। বাড়ি খুঁজে বের করে জানতে পারেÑ কুহক বছরখানেক আগে মারা গেছে। বাড়ির সামনেই কুহকের কবর। মনিকা হিসাব করে বুঝতে পারেÑ রাহুলের সঙ্গে বিয়ের পর মাত্র মাস তিনেক বেঁচে ছিল কুহক।

শরৎবাবু’র নারী

 

বাঙালি মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত জীবনের নিখুঁত ছবি সরল সুনিপুনতায় ফুটিয়ে তুলেছেন উপমহাদেশের ধ্রপদী কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তার উপন্যাসের পরিধি জুড়ে ছিল বৈচিত্রপূর্ণ নারীচরিত্র। শরৎবাবু’র নারী চরিত্রগুলির সঙ্গে বেশির ভাগ বাঙালিরই আশৈশব পরিচয়। হেঁশেল, অন্দরমহল, উঠোনের লাগোয়া কলতলাতেই ঘুরে ফিরে বেড়ানো সব রকমের চরিত্রের একটি দু'টি। শরৎসাহিত্য নারীত্বের পূর্ণ বিকাশ ঘটিয়েছে চেতনার উন্মেষে নির্মল প্রত্যয়ে। এককথায় তৎকালীন সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত নারী সমাজের সামাজিক রূপ তিনি গভীর মমত্ববোধ ও সহানুভূতির সঙ্গে ব্যক্ত করেছেন। তার সৃষ্টি বহুল আলোচিত চারটি নারী চরিত্র নিয়ে এবারে থাকছে সহজ -এর বিশেষ আয়োজন।

 

 

 

 

শায়লা হাফিজ

 

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৭৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর-১৯৩৮ সালের ১৬ জানুয়ারি) জনপ্রিয় বাঙালি কথাসাহিত্যিক। বাংলা সাহিত্যের অমর এই শিল্পী নারী চরিত্রের পূর্ণ বিকাশে পাঠক মনে চেতনার উন্মেষ ঘটিয়েছেন আলোকিত নির্মল প্রত্যয়ে! নারীর প্রতি সামাজিক নির্যাতন ও তার সংস্কারবন্দি জীবনের রূপায়ণে তিনি বিপ্লবী লেখক, বিশেষত গ্রামের অবহেলিত ও বঞ্চিত নারীর প্রতি তার গভীর মমত্ববোধ ও শ্রদ্ধা তুলনাহীন। সামাজিক বৈষম্য, কুসংস্কার ও শাস্ত্রীয় অনাচারের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন উচ্চকণ্ঠ। কাহিনী নির্মাণে অসামান্য কুশলতা এবং অতি প্রাঞ্জল ও সাবলীল ভাষা তার কাব্যসাহিত্যের জনপ্রিয়তা ও খ্যাতির প্রধান কারণ। বাংলাসহ ভারতীয় বিভিন্ন ভাষায় তার অনেক উপন্যাসের চিত্রনাট্য নির্মিত হয়েছে। সেগুলো অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছে। তা হলো ‘দেবদাস’, ‘শ্রীকান্ত’, ‘রামের সুমতি’, ‘দেনা-পাওনা’, ‘বিরাজবৌ’ ইত্যাদি। অবশ্য শরৎ সাহিত্য আধুনিক নারীবাদী সাহিত্য নয়! নয় প্রতিবাদী, প্রতিরোধী, বিপ্লবী সাহিত্যের নিদর্শন!
দেবদাসের চন্দ্রমুখী : শরৎ সাহিত্য প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থা ভেঙে ফেলার দিকনির্দেশিকা নয়! আবহমান সমাজ জীবনে প্রলয় আনেননি তিনি! সৎ সাহিত্যের কাজ সাহিত্যের দর্পণে সমাজ ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো ব্যক্তি মানবের চেতনায় স্পষ্ট প্রতিবিম্বিত করা! মানব জীবনের অন্তর্নিহিত মর্মবেদনা সহানুভূতির স্বরে বাজিয়ে তোলাই সাহিত্য! তার কাজ মানুষের মনুষ্যত্ব নিরন্তর জাগিয়ে রাখা! শরৎ সাহিত্য বঙ্গজীবনে ওই কাজটিই করে গেছে বরাবর। বাংলা সাহিত্যের অমর সৃষ্টি শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘দেবদাস’ (১৯১৭)। এ উপন্যাসের তিনটি চরিত্র দেবদাস, পার্বতী ও চন্দ্রমুখী। সময়ের পালাবদলে আজও তারা ফিরে আসে নতুনরূপে, নতুন আবেদনে। উপন্যাসের নায়ক দেবদাসের প্রতি ছিল চন্দ্রমুখীর যথার্থ ভালোবাসা। অনেকেই ওই উপন্যাস পড়তে পড়তে এটা ভাবতে পারেন যে, এমন নিঃস্বার্থ ভালোবাসা কেবল উপন্যাসেই সম্ভব। আবার কেউ যেন এ চন্দ্রমুখীকেই খুঁজে পেয়েছেন বাস্তবের উঠানে। পার্বতীকে দেবদাস ভালোবাসে জেনেও চন্দ্রমুখীর কোনোই ভাবান্তর হয় না। তার ভালোবাসায় বিন্দুমাত্র ভাটা পড়ে না। এমনই স্বর্গীয় অনুভবে একটি চরিত্র এঁকে জীবন্তরূপে তা পাঠকের সামনে তুলে ধরার মতো তুখোড় শিল্পী ছিলেন তিনি। ‘দেবদাস’ উপন্যাসের চন্দ্রমুখী কলকাতার চিৎপুরের পাড়ায় নাম লেখানো পতিতা। তার বয়স চব্বিশ। তার একটু হাসির জন্য বহু নামি-দামি জমিদার উন্মুখ হয়ে থাকতো। কিন্তু এর সবই সে উপেক্ষা করে দেবদাসের প্রতি অগাধ ভালোবাসার কারণে। এমনও জানে সে, কোনোদিন দেবদাসকে পাবে না। পরে ওই বৃত্তি ছেড়ে অশত্থঝুরি গ্রামে গিয়ে মাটির ঘরবাড়ি তৈরি করে বাস করতে থাকে সে। পতিতারাও নারী। কোনো নারী পতিতা হয়েও যে নারীত্বের মমত্ববোধ ধারণ করে এবং অর্থ-বিত্ত তুচ্ছ করে তার কাছেও যে কখনো কখনো ভালোবাসা অমূল্য হয়ে উঠতে পারে তা এই উপন্যাসে স্পষ্ট হয়েছে। পতিতাদেরও মন আছে, বাসনা-কামনা আছে, ভাগ্যের বিড়ম্বনা ও পতিতা জীবন যাপনের জন্য গ্লানিবোধ আছে, সমাজের গৃহবধূদের মতো মাথা উঁচুু করে থাকতে না পারার বেদনাও আছে। তা এ উপন্যাসে তিনি তুলে ধরেছেন সুনিপুনভাবে।
এ কথা ঠিক, প্রেমের অভিনয় করে খরিদ্দার ভোলায় পতিতা। বাস্তবে প্রেম করা তার বৃত্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তবুও সে মাঝে মধ্যে বৃত্তি বা পরিবেশের ঊর্ধ্বে সামাজিক পুরুষকে ভালোবেসে বসে। আর তখনই সমাজের সঙ্গে সংঘর্ষে তার কপালে জোটে দুঃসহ দুঃখ। শরৎ সাহিত্যে অধিকাংশ পতিতার অদৃষ্টে ওই দুঃখভোগ ঘটেছে। দেবদাস উপন্যাসে দেবদাসের দাসী হয়ে সঙ্গে থাকার আকাক্সক্ষাটুকুও চন্দ্রমুখীর পূর্ণ হয়নি। তবুও নিজের আকাক্সক্ষার চেয়ে দেবদাসের চাওয়া-পাওয়াটিই প্রধান্য দিয়েছে। প্রেমিকের চেয়েও ভালোবাসা বড় হতে পারে, এর প্রাপ্তির চেয়েও যে আত্মত্যাগ মনে জাগে তার জ্বলজ্বলে উদাহরণ চন্দ্রমুখী চরিত্রটি।
শরৎচন্দ্র মানব দরদি বলে মানুষের জীবনের সব মূল্যে মানুষকে বিচার করেছেন। তাই নারীর পতিতাবৃত্তি গ্রহণ তার একমাত্র পরিচয় বলে স্বীকার করেননি। অবশ্য এ কথা ঠিক, শরৎচন্দ্রের পতিতাদের চরিত্র সব সময় বাস্তবোচিত হয়নি।
শ্রীকান্তের রাজলক্ষ্মী : বাংলা সাহিত্যের আরেক অনবদ্য সৃষ্টি এই রাজলক্ষ্মী চরিত্র। রাজলক্ষ্মী সাহসী, দৃঢ়, প্রত্যয়ী, দয়াময়ী, আবেগী, সুন্দর রমণী। সামাজিক বিভিন্ন জটিলতার কারণে তাকে বাইজির কাজ বেছে নিতে হয়েছে ঠিকই কিন্তু মনে-প্রাণে সে শুধু শ্রীকান্তেরই ছিল। শ্রীকান্তের প্রতি অপরিসীম ভালোবাসা আর অভিভাবকত্ব বার বার শ্রীকান্তকে তার কাছে টেনে নিয়ে এসেছে। রাজলক্ষ্মী সব সময় চাইতো তাকে শ্রীকান্ত বিয়ে করে এই অনৈতিক জীবন থেকে মুক্ত করুক। পরবর্তী কালে শ্রীকান্তের জীবনে কমললতার আগমন রাজলক্ষ্মীকে অনেকটা দূরে ঠেলে দেয়। শ্রীকান্তকে রাজলক্ষ্মী হাসিল করতে চেয়েছিল, একান্ত নিজের করে পেতে চেয়েছিল। আর কমললতার দৃঢ় বিশ্বাস, শ্রীকান্তের অন্তরে একমাত্র সেই আছে। তার কাছ থেকে শ্রীকান্তকে কেউই দূরে নিতে পারবে না। কমললতাকে ভালোবাসা সত্ত্বেও রাজলক্ষ্মীর নির্ভয় ও নিরাপদ আশ্রয়ে নিজেকে সঁপে দিতেই ভালোবাসতো শ্রীকান্ত। তাই তো রাজলক্ষ্মীর অভিভাবকত্বের আওতায় থেকে শেষ পর্যন্ত শ্রীকান্তের মনে ছবি হয়েই রয়ে গেল কমললতার গোপন স্বপ্ন। নারীর প্রতি সশ্রদ্ধ ভালোবাসা প্রকাশে শরতের যে মনোভাব সেটি তার কাহিনিগুলোয় ছড়িয়ে আছে, বিশেষ করে পতিতার প্রেম ও বিধবার অন্তরে পরম স্নেহে লালিত ভালোবাসার পবিত্রতার তিনি যেভাবে রূপ দিয়েছেন এরই সরলরৈখিক বহিপ্রকাশ আমরা উপভোগ করি রাজলক্ষ্মীর প্রতি শ্রীকান্তের আন্তরিক ভালোবাসায়। রাজলক্ষ্মী ছিল বাল্যবিধবা। উপন্যাসটির পর্যায়ান্তরে শ্রীকান্তের বাল্যকাল শেষ হলে পিয়ারী বাইজিরূপী রাজলক্ষ্মীর সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটে। শৈশবে খেলার সঙ্গী এই রাজলক্ষ্মীকে প্রথম দেখায় চিনতে পারেনি শ্রীকান্ত। কিন্তু শ্রীকান্তকে সে ঠিকই চিনেছে। গানের আসরে সঙ্গীত ও নৃত্যে শ্রীকান্ত অভিভূত হয়ে পড়ে। পরিচয় জানতে চাইলে পিয়ারী জানায়, ‘তোমাকে চিনেছিলাম ঠাকুর, দুর্বুদ্ধির তাড়ায় আর কিসে? তুমি যতো চোখের জল আমার ফেলেছিলে, ভাগ্যি সূর্যিদেব তা শুকিয়ে নিয়েছেন, নইলে চোখের জলের একটা পুকুর হয়ে থাকতো।’ প্রথমে বিস্মিত ও হতবুদ্ধি হলেও অবশেষে শ্রীকান্ত তার বাল্যসখী রাজলক্ষ্মীকে চিনতে পারে। তার তখনকার অনুভবটা দেখে নেয়া যাকÑ ‘এ কী বিরাট অচিন্তনীয় ব্যাপার এই নারীর মনটা, কবে যে এই পিলে রোগা মেয়েটা তাহার ধামার মতো পেট এবং কাটির মতো হাত-পা লইয়া আমাকে প্রথম ভালোবাসিয়াছিল এবং বইচি ফুলের মালা দিয়া তাহার দরিদ্র পূজা নীরবে সম্পন্ন করিয়া আসিতেছিল, আমি টের পাই নাই। যখন টের পাইলাম তখন বিস্ময়ের আর অবধি রহিলো না। নভেল-নাটকে বাল্যপ্রণয়ের কথা অনেক পড়িয়াছি। কিন্তু এই বস্তুটি যাহাকে সে তাহার ঈশ্বরদত্ত ধন বলিয়া সগর্বে প্রচার করিতেও কুণ্ঠিত হইলো না, তাহাকে সে এতো দিন তাহার ঘৃণিত জীবনের শতকোটি মিথ্যা প্রণয়ের অভিনয়ের মধ্যে কোনখানে জীবিত রাখিয়াছিল। কোথা হইতে ইহাদের খাদ্য সংগ্রহ করিতো। কোন পথে প্রবেশ করিয়া তাহাদের লালন-পালন করিতো?’ রাজলক্ষ্মীর অমিত প্রেম, অকৃত্রিম নিবিড় ভালোবাসার ছবি লেখক অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে আঁকতে পেরেছেন বলেই মনে হয়। জাগতিক পাওয়া, না পাওয়ার হিসাব-নিকাশের বাইরে যে প্রেম এর বাস্তব প্রতিফলন আমরা পাই রাজলক্ষ্মীর অনুভবে। প্রবল সংযম আর বুদ্ধিমত্তা দিয়ে রাজলক্ষ্মী যেন জয় করেছে তার আরাধ্য ব্যক্তিকে। বস্তুগত অর্থে হয়তো সে পরাজিত। কিন্তু মনোগত অবস্থানে সে পেয়েছে সব! শ্রীকান্ত শেষতক দূরে সরে গেছে। অবশ্য শ্রীকান্তের কণ্ঠ থেকে আমরা শুনেছি প্রাপ্তির চেয়েও অপ্রাপ্তি বড় আনন্দের।
ভাগ্যলিপি আর সম্ভোগ বিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত শ্রীকান্ত বলেছে, ‘বড় প্রেম শুধু কাছেই টানে নাÑ ইহা দূরেও ঠেলিয়া দেয়। ছোটখাটো প্রেমের সাধ্যও ছিল নাÑ এই সুখৈশ্বর্য পরিপূর্ণ স্নেহ স্বর্গ হইতে মঙ্গলের জন্য, কল্যাণের জন্য আমাকে আজ এক পদও নড়াইতে পারিতো।’ শরৎচন্দ্র দৈহিক ভোগ-বিলাসবর্জিত এক বিশেষ মানসিকতার কথা তার সাহিত্যে প্রচার ও প্রকাশ করতে চেয়েছেন। সত্যি কথা বলতে কী, ওই সত্য উপলব্ধ জীবন দর্শনের দ্বারপ্রান্তেও আমরা আজ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারিনি। আত্মউপলব্ধির সত্যজ্ঞান শ্রীকান্তের মাধ্যমে খানিকটা সাহিত্যরূপ দেয়ার সময় হৃদয়ের আবেগ ও ভাবের গভীরতা ঢেলে দিয়েছেন লেখক। মানব চরিত্রের রহস্য প্রকাশে কোথাও কোথাও ঔপন্যাসিক প্রকৃতির বর্ণনাও করেছেন বটে। ভরা নদীতে নৌকাচালনা কিংবা অন্ধকার রাতের বিবরণ তার কবিমনের এক প্রকার বহিঃপ্রকাশ মাত্র। পিয়ারীরূপী রাজলক্ষ্মীর নবজন্ম, সামাজিকতায় হাস্যরসের বিষয়াদি, সৌন্দর্য বর্ণনায় ভাষার প্রয়োগ-চাতুর্য এবং ভাবের অভিব্যক্তিতে শরৎ এক অভিনব কাহিনী নির্মাণ করেছেন। এর আগে বাংলা সাহিত্যের পাঠক এ ধরনের রোমাঞ্চকর ও আবেগঘন কাহিনীর সঙ্গে পরিচিত হননি। রাজলক্ষ্মীর মতো দ্বৈতচরিত্রের যে ভারসাম্য তিনি দেখিয়েছেন এবং একই সঙ্গে এক নারী কেমন করে দুটি চরিত্রে মিশে যায় এর প্রতি আমাদের পরিচয়ের যে সুযোগ শরৎচন্দ্র ঘটিয়ে দিলেন তা রীতিমতো বিস্ময়কর। সেখানটায় রয়েছে আবেগ ও প্রাপ্তির আনন্দের এক অভূতপূর্ব মিশেল।
শরৎচন্দ্রের শিল্পী মননে রচিত চরিত্রে সব সময় বৈচিত্র্যের কাজ দেখা যায়। ‘নারীর মনের তল বিধাতাও পায় না’ বলে যে কথাটি প্রচলিত ওই গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে শরৎচন্দ্র তার উপন্যাসে নারী চরিত্রের মধ্যে অনুপম মাধুর্য ও আত্মবিশ্বাসের শক্তি সমান্তরালভাবে এঁকেছেন। একাধারে বস্তুগতভাবে কোনো নারীর জীবনটি উপলব্ধি করেছেন। এর পাশাপাশি মনস্তাত্ত্বিক অনুভবেও ভেসে গেছেন। নারীকে একদিকে যেমন উপভোগ্য করে তুলে ধরেছেন, অন্যদিকে তেমনি ওই নারীর ভেতর মমতার সত্তাও সমানভাবে সামনে এনেছেন। নারী চরিত্রের বিচিত্রতার যে দিকগুলো তিনি কলমের আঁচড়ে আঁচড়ে এঁকেছেন, উপন্যাসটি পড়া শেষে পাঠকের মনে এর অনুপম মাধুর্যে আছন্ন থাকতে হয়। শরৎচন্দ্রের এই অপূর্ব গুণের কারণে শুধু নারী নন, পুরুষের মনে স্থান করে নিয়েছেন স্বমহিমায়।

 

মুতাকাব্বির মাসুদ

এক.
শরৎ সাহিত্য পর্যালোচনায় নির্ণিত বিষয়ে যে সত্যটি উঠে আসে তা হলো, বঙ্কিমচন্দ্র (১৮৩৪-১৮৯১) ও রবীন্দ্রনাথের (১৮৬১-১৯৪১) মতোই ওফবধষরংঃ লেখক ছিলেন শরৎচন্দ্র (১৮৭৮-১৯৩৮)। তার সামগ্রিক রচনা পর্যালোচনায় তাকে জীবনবাদী লেখক বলা যায়। তিনি জীবন বাস্তবতায় জবধষরংঃ লেখক হিসেবেও ততোধিক পরিচিত। সমাজ বাস্তবতার কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠিত সমকালের তথাকথিত অভিজাত শ্রেণীর বিরুদ্ধে তার লেখনী ছিল উচ্চকিত। সমকালে এ সমাজে বিদ্যমান অভিজাত শ্রেণীর বেপরোয়া বিলাসবহুল জীবনযাত্রা বঙ্কিমচন্দ্রের রোমান্টিক কল্পনাটি প্রেরণার
উদ্দামপ্রবাহে উদ্দীপ্ত করেছিল। রবীন্দ্রনাথের রচনায় উদ্গত চরিত্রগুলোও গ্রহণযোগ্য মাত্রায় সমাজের উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করেছে। কিন্তু এ ধারায় শরৎচন্দ্র তার রচনায় জীবন চেতনার ব্যতিক্রমী অনুধ্যানের এক ভিন্নতা উদীর্ণ করার প্রয়াস পেয়েছেন যেখানে নিম্নবিত্ত শ্রেণী মুখ্য হয়ে উঠেছে। এই প্রথম আমরা দেখলাম সমাজে অবহেলিত একটি শ্রেণীকে অবলম্বন করেও সাহিত্য রচনা করা যায় এবং তা শিল্পমান বিচারে শতভাগ সফল। সুতরাং সমাজ চেতনার বিনির্ণিত ধারায় শরৎচন্দ্রের নতুন সমাজ বিনির্মাণে তার চেতনার অন্তর্গত সুর আমাদের বোধও জাগ্রত করে। যখন বলেন, ‘সংসারে যারা শুধু দিলে, পেলে না কিছুই; যারা বঞ্চিত, যারা দুর্বল, উৎপীড়িত; মানুষ যাদের চোখের জলের কখনো হিসাব নিলে না, সমস্ত থেকেও কেন তাদের কিছুতেই অধিকার নেই, এদের বেদনা দিলে আমার মুখ খুলে, এরাই পাঠালে আমাকে মানুষের কাছে মানুষের নালিশ জানাতে।’ শরৎচন্দ্রের এ ভাষণ যতোটা আবেগের ততোটাই হৃদয় ও অন্তরের অতলান্তিক গভীরতা থেকে উদ্গত সত্য। অনেকটা ডিকেন্সের (১৮১২-১৮৭০) ও ধস ৎিরঃরহম ভড়ৎ ঃযব যঁসধহ ৎধপব অনুভূতির সঙ্গে সমঞ্জসপূর্ণ। শরৎচন্দ্রের অন্তর ছিল উদার মানবিকতায় পরিপূর্ণ। অনেকেই বলেন, শরৎচন্দ্রের সমাজ চেতনা ও সামাজিক দৃষ্টি রবীন্দ্রনাথ থেকেও প্রগতিশীল। তীব্র আত্মজিজ্ঞাসা, প্রখর বাস্তব দৃষ্টি, সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ শক্তি মানব আদর্শ সম্পর্কে অনুসন্ধিৎসা, সুস্থ-সুন্দর-স্বাভাবিক জীবন ও সমাজের প্রতি ব্যাকুল আকাক্সক্ষা এবং তার সমাজ চেতনা পূর্বসূরিদের তুলনায় অগ্রগামী ছিল। এই স্বল্প পরিসরে উল্লিখিত প্রাসঙ্গিক বিষয়ে কেবল ‘চরিত্রহীন’ (১৯১৭)-এর নারী চরিত্র সাবিত্রী ও কিরণময়ীর ওপর সামান্যই আলোচনার প্রয়াস থাকবে।

দুই.
শরৎচন্দ্রের উপন্যাসের নারীরাই মুখ্য চরিত্রের ভূমিকায় সফল ও সমধিক উজ্জ্বল। তার রচনায় নারী চরিত্রের প্রাধান্য অস্বীকার করার সুযোগ নেই। অন্তর দিয়ে চিত্রিত করেছেন ওই নারীদের। সমাজের অসহায় নারীর ক্রন্দন তাকে ব্যথিত করেছিল। তাই নারীর ওই করুণ ক্রন্দন অন্তর দিয়ে শোনার প্রয়াস পেয়েছিলেন। যেমনটি সমকালে অন্য কারো বেলায় তা দেখা যায়নি। সমকালে নারীকে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা ও তথাকথিত সনাতন প্রথা কঠিন অনুশাসনে বন্দি করে রেখেছিল। কুসংস্কারের অনৈতিক বৃত্তে তারা আবদ্ধ ছিল। শরৎচন্দ্র প্রগতির ধারায় তাদের মুক্তির বাণী শুনিয়েছেন। একটি আলোকিত সমাজ বিনির্মাণে তাদের জাগ্রত করার চেষ্টা করেছেন।

তিন.
শরৎচন্দ্রের একটি বিখ্যাত উপন্যাস ‘চরিত্রহীন’ (১৯১৭)। এর সব চরিত্রই উজ্জ্বলতায় সমানে সমান। এ উপন্যাসের নায়িকা সাবিত্রী হলেও এখানে জীবন বাস্তবতায় এক দীপ্ত উজ্জ্বল চরিত্র কিরণময়ী। তার উপস্থিতি উপন্যাসের সর্বত্রই চোখে পড়ার মতো। তার চলন, কথা-বার্তা, জীবন দর্শন সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী ধারায় উপস্থাপিত। অনেকটা পাশ্চাত্য চেতনার সূক্ষ্ম প্রভাব তার মধ্যে লক্ষ্য করা যায়। নারী স্বাধীনতা, বাকচাতুর্য, একটি ভিন্নমাত্রার জীবন দর্শন কিংবা প্রেম-ভালোবাসা সম্পর্কে তার বিশ্বাস, দর্শন আমাদের সংস্কৃতি বা সমাজ বাস্তবতায় অনেকটাই সাংঘর্ষিক। কিন্তু সে তা গায়ে মাখে না। নিজের মতো চলে। নিজের কথা অকপটে বলে। শরৎচন্দ্রের নায়িকাদের মধ্যে কিরণময়ীই নিয়তিটি অস্বীকার করার দুঃসাহস দেখিয়েছে। অন্যরা ভাগ্যের ছকটি মেনে নিয়েছে। তারা চলমান জীবনের বিদ্যমান দুঃখ-বেদনাটি অমোঘ নিয়তি বলেই মেনে নিতো। এই প্রথম প্রতিবাদী নারী হিসেবে কিরণময়ীর আবির্ভাব। পরে তা অভয়া, কমলের মধ্যেও আমরা দেখেছি। কিরণময়ী তর্ক জানে। সে তার্কিক। তার কথায় যুক্তি থাকে। অনেক সময় দার্শনিকের মতো কথা বলে। প্রেম সম্পর্কে তার অনেক যুক্তি যা তার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থেকে উৎসারিত। যেমন দেহগত কামনায় যে প্রেম সে প্রেমের পক্ষে তার অবস্থান। সে সাফ জানিয়ে দিয়েছে, নিষিদ্ধ প্রেম বলে কিছু নেই। যা সমকালে সমাজ বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে উদ্ধৃত করা ছিল প্রায় অসম্ভব। সে নিষিদ্ধ প্রেমটি যুক্তি দিয়ে গৌরবের সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত করার স্পর্ধা দেখিয়েছে। কিরণময়ী প্রতিবাদী নারী সমাজের একটি বলিষ্ঠ স্বর ও এক প্রতিনিধি। নির্যাতিত নারী সমাজের পক্ষে তার অবস্থান। তাই সমাজে বিদ্যমান তথাকথিত নীতিটি নত শিরে মেনে নেয়নি। সে বিদ্রোহ করেছে সমাজের অযাচিত নিপীড়ন ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে। তার জায়গাতে থেকেই তীব্র প্রতিবাদের মাধ্যমে সমকালে সে নির্যাতিত নারীদের পক্ষে নিজের অবস্থানও নিশ্চিত করেছে। বস্তুত শরৎ সাহিত্যে ‘চরিত্রহীন’ থেকেই প্রতিবাদী নারীর যাত্রা শুরু। আর ওই নারী হচ্ছে কিরণময়ী। তার চরিত্রের জটিল দিকগুলো পাঠককে ভাবনার ক্ষেত্রে বিভ্রান্তিতে ফেলতে পারে। দেখা যায়, তার ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যটি সমুন্নত রাখার জন্যই যেন এ আপসহীন সংগ্রাম। এখানে সে একা। তার পাশে অন্য কেউ যেমন ছিল না তেমনি সমাজ কিংবা সমাজবিধিও ছিল না। উপন্যাসে চলমান ওই সচল চরিত্র দ্রোহের এক প্রতিমূর্তি। জৈবপ্রবৃত্তির মধ্যে সগৌরবে নিজেকে সমর্পণ করে রেখেছে। সে নিষ্কাম প্রবৃত্তিতে বিশ্বাসী নয়। সকাম চেতনায় উদ্বুদ্ধ এবং এক অদৃশ্যমান কামচেতনায় তাড়িত। তা কখনোই কোনো নারী চরিত্রে এ ধরনের প্রবৃত্তিটি কেউ মেনে নিতে পারে না। সমকালীন সংস্কারাচ্ছন্ন সমাজে এরূপ অসামাজিক চেতনার কোনো স্বীকৃতি বা অনুমোদন ছিল না। তাই শরৎচন্দ্র সমকালীন সমাজ ব্যবস্থার ভেতরে থেকে কৌশলে এ চরিত্রের স্বতঃস্ফূর্ততার ভেতর মনোবিকৃতির প্রতীকী স্পর্শ দিয়ে ‘মোর্ছা’ রোগে আক্রান্ত করে কিরণময়ী চরিত্রটি স্বাভাবিক করার আপত প্রয়াসও চালিয়েছেন।
কিরণময়ীর জীবন সম্পর্কে তার যৌক্তিক পর্যবেক্ষণ অনেকটাই সরল আবার তাৎপর্যময় দার্শনীকতায় পরিপূর্ণ। জীবন সম্পর্কে হার্বাট স্পেন্সারের (১৫৫২-১৫৯৯) যুক্তি ও পর্যবেক্ষণ ওই রকমই ছিলÑ ‘কোনো মানুষের তার ন্যায্য বা মৌলিক যে অধিকার তা থেকে বঞ্চিত করা মানেই অন্যায়।’ কিরণময়ী ওই কথাটিই যুক্তির ভেতর উপস্থাপন করে বোঝাতে চেয়েছে, দিবাকরকে আরাকানে নিয়ে এসে কারো অধিকারে সে হস্তক্ষেপ করেনি। তাই অনুশোচনার কোনো কারণ সে দেখে না।

চার.
কিরণময়ী নিজের রূপ ও সৌন্দর্যের বিষয়ে সচেতন। নারীর রূপ সম্পর্কে তার পর্যবেক্ষণ অনেকটাই আধুনিক ও তাত্ত্বিক। ‘ততোক্ষণই রূপ যতোক্ষণ সে সৃষ্টি করতে পারে। এই সৃষ্টি করার ক্ষমতাই তার রূপ-যৌবন। এই সৃষ্টি করবার ইচ্ছাই তার প্রেম’Ñ অসাধারণ উদ্ধৃতি। এই হচ্ছে শরৎ সাহিত্যের নন্দিত নারী চরিত্র। স্বাধীন, কোমল ও অমায়িক আবার কখনো দ্রোহী, প্রতিবাদী ও বাকপটু। উল্লেখ্য, প্রেমটি তিনি তার মতো সংজ্ঞায়িত করেছেন। এ প্রেম তার জীবনে আসেনি। এখানে তিনি ব্যর্থ। কিরণময়ীর তথাকথিত শিক্ষিত স্বামী কখনো তাকে ভালোবেসেছে বলে মনে হয় না। তাকে ভালোবাসার বদলে প্রচুর জ্ঞান দিয়েছে অনেকটা শিষ্যেকে গুরু যেমন দিয়ে থাকেন। ফলে সে বিদুষী হয়েছে,
প্রেমিকা হতে পারেনি। ভালোবাসার পরিবর্তে সে শিখেছে প্রচুর। দর্শন, বিজ্ঞান,
হিন্দুশাস্ত্রÑ সবকিছুই সে পড়েছে। সেখান থেকেই উৎপত্তি তার পা-িত্যের। তার তর্ক ও যুক্তি শুনে প-িতই মনে হয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, সে ভালোবাসা চেয়েছে। কিন্তু পায়নি। এখান থেকেই এ নারীর বিদ্রোহী হয়ে ওঠার যাত্রা। সে আধুনিক শিক্ষিত নারী বলেই তার রূপ, সৌন্দর্য, রুচি, উদ্দাম ও উচ্ছল যৌবনটি ব্যর্থ হতে দিতে চায়নি।

বিচিত্র এই নারী চরিত্র কিরণময়ী অকপটে দিবাকরকে বলে দিয়েছে অনঙ্গ ডাক্তারের সঙ্গে তার নিষিদ্ধ সম্পর্কের আদ্যোপান্ত। শরৎচন্দ্রের এ নারী চরিত্রে কোনো ভণিতা দেখা যায়নি। যখন সে বলে, ‘কতো বৎসরের দুর্দান্ত অনাবৃষ্টির জ্বালা এই বুকের মাঝখানে জমাট বেঁধেছিল বলেই এমন সম্ভব হতে পেরেছিল, কি জানি ঠাকুরপো, যে তৃষ্ণায় মানুষ নর্দমার গাঢ় জলও অঞ্জলি ভরে মুখে দেয়, আমারও ছিল সে পিপাসা।’ একই পিপাসা আমরা বঙ্কিমের রোহিনি-তেও (কৃষ্ণকান্তের উইল-১৮৭৮) দেখেছি। এখানেই শরৎচন্দ্রের কিরণময়ীর জীবন বাস্তবতার সকরুণ ট্র্যাজেডি। উপন্যাসে বর্ণনার ধারাবাহিকতায় সুরবালার পাতিব্রত্য নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে। সুরবালার এরূপ পাতিব্রত্যের উজ্জ্বল স্পর্শ কিরণমীয়কে কিছুটা বদলে দিল। উপেনের কাছে তার ফিরে আসা, অতঃপর আত্মসমর্পণ! কিন্তু উপেনের হৃদয়ে আর কিরণময়ী নেই। কিরণময়ীকে সে অপবিত্র, নাস্তিক, ‘ভাইপার’ বলেই জানে। এভাবেই এ চরিত্রটির উত্থান-পতন। শরৎচন্দ্র নিষ্ঠতার সঙ্গে চরিত্রটি তুলে এনেছেন সমকালীন সংস্কারাচ্ছন্ন সমাজের ভেতর থেকে। সমগ্র উপন্যাসে তার সরব বিচরণ ভিন্ন মাত্রায় উপস্থাপিত হয়েছে। বলা চলে, শরৎচন্দ্রের নারী চরিত্রের মধ্যে কিরণময়ী এক ব্যতিক্রমী নারী চরিত্র।

পাঁচ.
বস্তুত ‘চরিত্রহীন’ শরৎচন্দ্রের একটি কালজয়ী উপন্যাস। এখানে ছোট-বড় সব চরিত্র ঔপন্যাসিক নিষ্ঠতায় উপস্থাপন করেছেন। উপন্যাসের বৃহত্তর পরিবেশে সাবিত্রীর বিচরণ মার্জিত। শান্ত, স্থিতধী, কোমল, মানবিক ও পতিব্রতা নারী চরিত্র সাবিত্রী। এ উপন্যাসের নায়িকাও সে। কিরণময়ীর সম্পূর্ণ বিপরীত একটি নারী চরিত্র সে। শরৎচন্দ্রের নারীদের মধ্যে এ চরিত্রটি স্বল্প পরিসরে ব্যতিক্রমী চেতনায় উপস্থাপিত। অনেকটা ভারতীয় নারী চরিত্রের শাশ্বত রূপের প্রতীকী উপস্থাপন। সে অল্প বয়সেই বিধবা। তার পেছনেও কাহিনী রয়েছে। ভগ্নিপতির প্ররোচনায় পড়ে তার কলকাতায় আসা। এখানে জীবনের প্রয়োজনে একটি মেসে ঝিয়ের কাজ নেয়া যা সে নিপুণভাবে করতে পারার স্বীকৃতিও আদায় করতে পেরেছিল। ঔপন্যাসিক সে সনদ তাকে দিয়েছেন। এ জন্য তাকে মেসের ‘ঝি’ ও ‘গিন্নি’ বলে আপাত সম্মান দেখানোরও প্রয়াস পেয়েছেন। ওই মেসেরই উচ্ছৃঙ্খল ‘বোর্ডার’ সতীশ। সতীশকে এক পর্যায়ে ভালোবেসে ফেলে সাবিত্রী। সতীশ উশৃঙ্খল মদ্যপ। তা জেনেও সাবিত্রী তাকে ভালোবাসে। তাকে তেমন যোগ্য মর্যাদা দেয়নি সতীশ। এতে সাবিত্রীর কিছু যায় এসে না। সতীশের নিরুঙ্কুশ কল্যাণ কামনাই তার জীবনের একমাত্র ধ্যান। সে প্রেমে একনিষ্ঠ নারী। বিনিময় কিংবা কোনো প্রতিদানে সে বিশ্বাসী নয়। অনেকটা ওই রকমÑ ‘সে দিতে জানে, প্রতিদানে তার কোনো মোহ নেই। সতীশের কাছে তার চাওয়ারও কিছু নেই একমাত্র ভালোবাসা ছাড়া।’ সাবিত্রীর মধ্যে প্রেম ছিল। কিন্তু তা কুৎসিত কামনার দ্বারা পরিবৃত ছিল না। তার মধ্যেও কাম ছিল। তবে তা ছিল নিষ্কাম চেতনায় পরিপূর্ণ। সে যে বিধবা এ বিষয়টি কখনো ভুলে যায়নি। এরপরও শরৎচন্দ্র এ নারী চরিত্রে মানুষসত্তার পুরোটাই ঢেলে দিয়েছেন। এ জন্যই ওই নারী শতভাগ মানবিক। প্রেম, স্নেহ, মমতা, ভালোবাসা ও বোধ-বিবেচনায় সে ততোটাই অমায়িক। সতীশ যখন সাবিত্রীকে একান্তই পেতে চেয়েছে তখন তার প্রতি শ্রদ্ধায় নিজের অপবিত্র দেহ সতীশের কাছে সমর্পণ না করে নিজেকে সংযত করে দূরে থাকার চেষ্টা করেছে। বিচিত্র এই নারী চরিত্র! তার হৃদয়ের অন্তর্গত প্রেমের অনুভূতি অনুক্ত থেকেছে। এর ব্যঞ্জনা ব্যাপক এবং এরই সঙ্গে নারীর অন্তর্গত মনের প্রণয়, ইচ্ছা, রুচিশীল, নির্বাক ও নিষ্কাম চেতনায় শৈল্পিক বিভায় দ্যোতিত হয়ে উঠেছে। সাবিত্রীর প্রতি আমাদেরও শ্রদ্ধা ও সহানুভূতি জাগ্রত হয়। সাবিত্রী সমাজবিধির অনুশাসন ও সংস্কারের প্রতি সম্মান এবং আনুগত্য দেখিয়ে সতীশকে বলতে পেরেছেÑ ‘আমি বিধবা, আমি কুলত্যাগিণী, আমি সমাজে লাঞ্ছিতা, আমাকে বিয়ে করবার দুঃখ যে কতো বড় সে তুমি বোঝোনি বটে; কিন্তু যিনি আজন্ম শুদ্ধ, অতলস্পর্শী শোকের আগুন যাকে পুড়িয়ে হীরের মতো নির্মল করেছে, তিনি বুঝেছেন বলেই এই হতভাগিণীকে আশ্রয় দিতে সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছেন।’
দেহ অশুচি হলেও মন পবিত্র। সুতরাং সাবিত্রীর অপবিত্র দেহে পবিত্র প্রেমের মিনার জীবন বাস্তবতায় ততোটাই সমুজ্জ্বল ছিল। শরৎচন্দ্রের মানবিক প্রেমের যে তত্ত্ব এরই জ্বলন্ত উদাহরণ ওই সাবিত্রী। তাই নারীর শাশ্বত চিরপ্রেম কেবল ভোগে নয়, ত্যাগেই মহিমান্বিত হতে পারে। এরই এক উজ্জ্বল বিজ্ঞাপন উদ্ধৃত হয়েছে সাবিত্রীর চরিত্রে। ফলে তার অন্তরের গভীরে লালিত বিমূর্ত প্রেমের মূর্ত সম্পদ সতীশকে তুলে দিতে পেরেছে (আরেক নারী) সরোজিনীর হাতে। এ ত্যাগের করুণ বিজ্ঞাপন বিমূর্ত হলেও আমাদের অন্তর স্পর্শ করেছে নিঃসন্দেহে। এ ত্যাগের উজ্জ্বল বিভা শরৎচন্দ্রের নারী চরিত্রের অন্তর্গত রূপের একটি আলোকিত দিক। সাবিত্রীর এ ত্যাগ সত্যই তুলনাহীন।
বস্তুত শরৎ সাহিত্যে নারীর তুলনামূলক বিচারে সাবিত্রী কোমল ও মায়াবী। অথচ নিরীহ চরিত্র। এ ধৃতাত্মা নারী জেনে-শুনে প্রেমের এক অদৃশ্যমান কঠিন পথে যাত্রা শুরু করে অবশেষে নিজেই নিজেকে বঞ্চিত করে। দেহের অশুচিতা তার মন ও প্রেমের পবিত্রতাটি কোথাও কালিমা লিপ্ত করেনি। নিষ্কাম চেতনায় বিশ্বাসী সাবিত্রী যেন প্রেমের এক ব্রতচারী নারী। নীলিমা ইব্রাহিম যথার্থই বলেছেন, ‘শরৎচন্দ্রের নায়িকাদের মধ্যে সাবিত্রী সবার চেয়ে দুর্ভাগিনী। কারণ তার জীবনের শেষ সম্বল, তার সাধনালদ্ধ ধনকেও শরৎচন্দ্র কেড়ে নিয়েছেন।’
সাবিত্রী তার আজন্ম লালিত সংস্কার আবেগের শূন্যতায় ভেঙে দিতে চায়নি। তাই এ বঞ্চনার ভেতর নিজেকে এক অন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে যা কিরণময়ী পারেনি। তাই শরৎ সাহিত্যে নারী চরিত্র পর্যালোচনায় উঠে আসে ত্যাগ, নিষ্ঠা, সেবা ও কল্যাণের আরেক নাম সাবিত্রী।

ছয়.
বস্তুত বঙ্কিমচন্দ্র যেখানে জমিদার বা অভিজাত সম্প্রদায় থেকে প্রধান চরিত্রগুলো তুলে এনেছেন, রবীন্দ্রনাথ একই ধারায় সমকালীন সমাজের অভিজাত ও উচ্চবিত্ত সম্প্রদায়ের ভেতর তার চরিত্র খুঁজে বেড়িয়েছেন সেখানে শরৎচন্দ্র সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। তার চরিত্র অন্বেষণ করেছেন সমকালীন মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত সম্প্রদায়ের ভেতর। আর সেসব মানুষকেই নিষ্ঠুরতার সঙ্গে তুলে এনে ঠাঁই দিয়েছেন সাহিত্যের পাতায়। শরৎ সাহিত্যেই প্রথম আমরা দেখতে পাই মানুষের জীবনগাথা। শরৎচন্দ্রের আগে এমন জীবন চিত্রণ কারো লেখায় খুঁজে পাওয়া যায় না। এখানেও মৌলিক কারণের যে সম্পর্ক তা ব্যক্তি বিশেষে নিজ নিজ অবস্থান অনুযায়ী পরিষ্কার। বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্রের ব্যক্তিমানস এবং শ্রেণীগত অবস্থানও ভিন্ন। বঙ্কিম ও রবীন্দ্রনাথ অভিজাত সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। নিম্নবিত্ত সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করেছেন শরৎচন্দ্র। সুতরাং তাদের প্রত্যেকেরই চরিত্র নির্বাচনে ভিন্নতা থাকাই স্বাভাবিক। শরৎচন্দ্র গ্রামীণ মধ্যবিত্ত সমাজ থেকে উঠে এসেছেন। তাই তার মানসিকতা ওই শ্রেণীরই অনুকূলে কাজ করেছে। এই জীবন বাস্তবতার মৌলিক উৎস সন্ধানে শরৎচন্দ্র ওই শ্রেণীর মানুষকে তুলে এনে সাহিত্যে নীরিক্ষণ করার চেষ্টা করেছেন। ফলে তার সাহিত্যে নিম্ন-মধ্যবিত্ত সমাজের স্তর থেকে তুলে আনা মানুষের সুখ-দুঃখ, ব্যথা-বেদনার জীবনচিত্র বিজ্ঞাপিত হয়েছে। বস্তুত এরই ধারাবাহিকতায় শরৎচন্দ্র তার আপন শ্রেণী চরিত্র ও সম্প্রদায়গত মানসিকতাটি অন্য উচ্চতায় মেলে ধরার প্রয়াস পেয়েছেন নিজের সব রচনায়। এ কারণেই শরৎ সাহিত্যে তার আঁকা চরিত্রগুলো হয় মধ্যবিত্ত অথবা নিম্নবিত্ত থেকে উঠে আসা। শরৎ সাহিত্যে নারী চরিত্রগুলো যথাক্রমে বিরাজ (বিরাজ বৌ), মাধবী (বড় দিদি), জ্ঞানদা (অরক্ষণীয়া), রমা-জেঠাইমা (পল্লীসমাজ), অন্নদা দিদি-রাজলক্ষ্মী-অভয়া-সুনন্দা-কমল লতা (শ্রীকান্ত), বিজয়া (দত্তা), সুরবালা-সরোজিনী-সাবিত্রী-কিরণময়ী (চরিত্রহীন), অচলা (গৃহদাহ), ভারতী-সুমিত্রা (পথের দাবি), ষোড়শী (দেনা-পাওনা), কমল (শেষ প্রশ্ন), বন্দনা (বিপ্রদাস)। এসব দ্যোতিত চরিত্র মধ্যবিত্ত সমাজ থেকেই শরৎ সাহিত্যে উঠে এসেছে। এ ধারায় সমকালীন সামাজিক সংস্কার রীতি-নীতির মানদ-ে শরৎ সাহিত্যে নারী সমধিক শিল্পসফল চিত্রণ।
এ ধারায় শরৎচন্দ্রের ‘চরিত্রহীন’ সম্পর্কে সমালোচক কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রাজ্ঞ পর্যবেক্ষণÑ ‘বঙ্গ উপন্যাস সাহিত্যের একটি শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ। ইহার পাতায় পাতায় জীবন সমস্যার যে আলোচনা, যে গভীর অভিজ্ঞতা, যে স্নিগ্ধ উদার সহানুভূতি ছড়ানো রহিয়াছে, তাহা আমাদের নৈতিক ও সাময়িক বিচার-বুদ্ধির একটা চিরন্তন পরিবর্তন সাধন করে।’

 

মডেলঃ আফিফা, অথৈ, সারাকা, মনিষা
পোশাকঃ রাকিব’স আর রাফিউর
স্টাইলিংঃ মোঃ রাকিব খান
মেকওভারঃ ক্লিওপেট্রা বিউটি স্যালন
ছবিঃ অনিক রহমান, অনিক ইসলাম

Page 6 of 8

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…