Page 8 of 8

একটি মৃত্যু ও তৃতীয় পক্ষ 

- লাবণ্য লিপি 

 

ঘটনাটা নাকি ঘটেছে রাত সাড়ে দশটায়। মিতুকে ফোনে খবরটা জানিয়েছে ওর এক সহকর্মী। খবর পেয়ে ওরা রাতেই গিয়েছিল। কিন্তু অত রাতে মিতুর পক্ষে সম্ভব ছিল না ওদের সঙ্গে যাওয়া। তাই ও সকালের আলো ফুটতেই বেরিয়ে পড়েছে। বাড়িটা চিনতে খুব একটা সমস্যা হলো না। যদিও মূল রাস্তা থেকে এগারো নম্বর গলিটা খুঁজে পেতে একটু সময় লেগেছিল। রিক্সা থামিয়ে দু’একজনকে জিজ্ঞেস করতেই দেখিয়ে দিল। লোকজনের আসা যাওয়া দেখেও আন্দাজ করে নেওয়া যায়। উপরন্ত বাসার সামনে বেশ কয়েকটি গাড়ি দেখে নিশ্চিত হওয়া গেল। তবু খানিকটা দ্বিধা নিয়েই সদর দরজা দিয়ে ঢুকে পড়ল মিতু। মনে তখনও ক্ষীন আশা, খবরটা যদি ভুল হয়! পৃথিবীর সব খবর সত্যি হতে হবে কেন! সত্য সব সময় প্রত্যাশিত হলেও কখনও কখনও ভুলটাও যে এত কাক্সিক্ষত হতে পারে, আজকের আগে এমন করে ওর মনে হয়নি কখনও। গেটে দাড়োয়ান ছিল না। ও সহজেই গেট দিয়ে ঢুকে গেল এবং ঢুকেই ওর পা দুটো যেন থেমে গেল। কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করতে হলো না! খবরটা যে মিথ্যে ছিল না এটা বুঝতেও সময় লাগলো না। সামনে রাখা কফিনটাই বলে দিল সব। নাকে এসে লাগলো কর্পূর- আগরবাতির গন্ধ। মৃতবাড়ির অতি পরিচিত এই গন্ধটা মানুষকে ভীষণ দৃর্বল করে দেয়। কেবলই মনে হয় আমারও বুঝি সময় হয়ে এলো। মিতুর মাথাটা হঠাৎ কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছিল। কেমন জানি অনুভূতিশূন্য। কফিনের খুব কাছে কেউ ছিল না। অল্প দূরে ছোট ছোট গ্রুপে ভাগ হয়ে কয়েকজন নিজেদের মধ্যে নিচু স্বরে কথা বলছে। মিতু কফিনটার কাছে বসে পড়ল। নিজের ভার বইবার শক্তি ওর আর অবশিষ্ট ছিল না। বরং কফিনটা হাত বাড়িয়ে আঁকড়ে ধরে সে নিজের পতন ঠেকালো। নিরুচ্চারে নিজেকেই প্রশ্ন করল, কফিনের ভেতরের এই সাদা কাপড়ে মোড়া মানুষটা কি সত্যিই আরিফ? হাসি- খুশি, উচ্ছ্বল মানুষটা এমন স্থির হয়ে পড়ে আছে! মাথা ভর্তি একরাশ রেশমি চুল। চুলগুলো প্রায়ই কপালে চলে আসত। মিতু হাত বাড়িয়ে সরিয়ে দিত। আর কী ফর্সা ওর গায়ের রঙ। রিক্সা দিয়ে রোদে ঘুরলে আরিফের মুখটা লাল হয়ে যেত। মিতু দেখে হাসতে হাসতে বলত, তুমি দেখছি মেয়েদের মতো লজ্জায় লাল হয়ে গেছ। শুনে হাসতো আরিফও। ওর হাত দুটোও কি নিষ্প্রাণ হয়ে গেছে? যে হাতে ও নিঃশব্দে আলপনা আঁকত মিতুর শরীরের ক্যানভাসে! ভীষণ অন্য রকম ছিল ছেলেটা। সব সময় হাসিÑ খুশি প্রাণবন্ত থাকলেও কথা বলতো কম। শুনতো বেশি। রিক্সায় ওরা দু’জন যখন ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকত, মিতুই কথা বলতো। আরিফ শুনতো আর হাসতো। কত গল্প যে মিতু ওর সঙ্গে করতো! ও নিরব শ্রোতা হওয়ায় মিতু মাঝে মাঝে প্রশ্ন করে যাচাই করে দেখত সত্যিই সে শুনছে কি না। যখন জানতে চাইতো, বলো তো আমি কী বলছি? আরিফ ঠিক বলে দিত। আজ কি আরিফ শুনতে পাচ্ছে না ওর নিরব কান্না! কেন আরিফ একবারও হাত বাড়িয়ে ওর হাতটা টেনে নিচ্ছে না নিজের হাতের ভেতর! এতো অভিমান! কেন এভাবে না বলে চলে যেতে হবে?  কেউ একজন এগিয়ে এসে মৃদুস্বরে জানতে চাইলো, আপনি কি মুখ দেখতে চান? মিতু চমকে উঠে দ্রুত মাথা নাড়ল, না! না! পরে দেখব। তারপর বলল, উনি কয়তলায় থাকতেন? দোতলায় চলে যান! লোকটি বলল।

সিঁড়ি দিয়ে উঠতেই বসার ঘর চোখে পড়ল। দুই পাশের সোফায় দু’জন ঘুমিয়ে আছে। একটাতে একটি শিশু। অন্যটাতে একজন বয়স্ক মানুষ। বসে কথা বলছে কয়েকজন। কয়েকজন এ ঘর ও ঘর ছোটাছুটি করছে। মিতু ঠিক বুঝতে পারছে না, কার সঙ্গে কথা বলবে। এক লোক হাঁক দিয়ে বলল, আমার পাঞ্জাবিটা দাও। আর রাস্তায় খাওয়ার জন্য কী নিচ্ছ? একটু বেশি করে নিও। লোক কিন্তু অনেক যাচ্ছে। তখন পাশের ঘর থেকে মাঝবয়সী এক মহিলা বেরিয়ে এলেন। মিতুকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বললেন, তুমি কে মা?

 

কাউকে খুঁজছো ? জ্বি, আমি আরিফের বউয়ের সঙ্গে একটু দেখা করতে চাই! মিতু বলল। সে কি আর স্বাভাবিক অবস্থায় আছে! সারারাত চিৎকার কইরা কানছে। এখন থম মাইরা বইসা আছে। মনে হয় পাথর হইয়া গেছে মেয়েটা। আহারে! সেদিন মাত্র বিয়ে হইলো। এরই মইধ্যে সব শ্যাষ! আল্লাহ জানে মেয়েটার এখন কী হইব! আর ছেলেটাতো দুধের বাচ্চা। বলতে বলতে মহিলা চোখে আঁচল চাপা দিলেন। চোখ মুছে একটা ঘর দেখিয়ে বললেন, ঐ ঘরে যাও। তারপর সে পাঞ্জাবি চাওয়া লোকটার কথার জবাব দিলেন, ভূণা খিচুড়ি আর মাংস রান্না করে নিয়েছি। অত দূরের পথ। সবার তো ক্ষিধা লাগব। ওদের কথা শুনতে শুনতেই পাশের ঘরে ঢুকলো মিতু। থমথমে মুখে বিছানার ওপর বসে আছে এক নারী। খাটের মাথার পাশের দেওয়ালে মাথা ঠেকিয়ে। চোখ খোলা। কিন্তু সে চোখে যেন প্রাণ নাই। মাছের চোখের মতো নিষ্প্রাণ! গাঢ় সবুজ রঙের সালোয়ার কামিজ পরনে। কোলে জড়ো হয়ে আছে ওড়নাটা। কেউ বলে না দিলেও মিতু বুঝতে পারলো সেই- ই আরিফের স্ত্রী। তাকে ঘিরে কয়েকজন বসে আছে। তারা নিচুস্বরে কথা বলছিল। পাশে একটা বাচ্চা ঘুমাচ্ছে। মিতু মনে মনে ভাবল, ওটাই মনে হয় আরিফের ছেলে। কী নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে শিশুটি। ও তো জানেও না কী দুর্যোগ নেমে এসেছে ওর জীবনে। বাচ্চাটা দেখতেও কী সুন্দর হয়েছে। ঠিক যেন দেবশিশু। মিতুর ভীষণ ইচ্ছে করছিল ছুটে গিয়ে বাচ্চাটাকে বুকে জড়িয়ে নিতে। হঠাৎ মনে পড়ল ওর সেই না হওয়া মেয়েটার কথা। আরিফ যার নাম রেখেছিল মায়া। সেদিন অফিস শেষে মিতু অপেক্ষা করছিল আরিফের জন্য। আরিফ ওকে দেখে জানতে চেয়েছিল, কী ব্যাপার? কী হয়েছে? তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন? মিতু রিক্সায় উঠতে উঠতে বলল, আমাদের মনে হয় একবার ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত। আরিফ বলল, কেন? তোমার কি শরীর খারাপ? আমার খুব টেনশন হচ্ছে। যদি কিছু হয়ে যায়! পিরিয়ডের ডেট পার হয়ে গেছে। আরিফ ওর কথা হেসে উড়িয়ে দিল, ধুর! কিচ্ছু হবে না। তুমি কেমন করে এত নিশ্চিত হচ্ছো? মিতু অভিমানের সুরে জানতে চাইলো। আমি জানি! আরিফের সেই একই জবাব। মিতু এবার বলল, আচ্ছা, ধরো আমাদের একটা বাচ্চা হবে। সেটা কী হবে, ছেলে না মেয়ে? আরিফ অকপটে বলল, মেয়ে। কেন? ছেলেও তো হতে পারে! মিতুর গলায় আবারও অভিমানের বাষ্প জমে। আমার মনে হয় না ছেলে হবে। মেয়েই! আরিফের জোরালো মত। এবার অনেকটা হারমানা স্বরে মিতু বলল, মেয়ে হলে ওর নাম কী রাখবে? একটু ভেবে আরিফ বলেছিল, মায়া! বাহ! কী সুন্দর নাম! আমাদের ভালবাসা থেকে জন্ম হবে মায়ার। মিতু একা একাই বিড়বিড় করে। আচ্ছা যদি সত্যিই ওদের বাচ্চাটার জন্ম হতো তাহলে এই মানুষগুলো কি ওর জন্যও এমন আফসোস করত? কিন্তু কেউ কি জানতো ওর পরিচয়? একজন মহিলা ওকে দেখিয়ে অন্যদের কী যেন বলল। আর তখনই ভেসে এলো অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন। সেই সঙ্গে শুরু হলো কান্নার রোল। বাসায় ঢোকার মুখে দেখা হওয়া সেই মহিলা এসে তাড়া দিলেন কাউকে উদ্দেশ্য করে, ও মনা! বউমা আর বাবুর জিনিস পত্র গুছিয়ে নে। অ্যাম্বুলেন্স চইলা আসছে। এখন তো যাইতে হবে। আহারে ওর মায়ের না জানি কী অবস্থা! আমরা মামী হইয়াই মাইনা নিতে পারতাছি না! বলতে বলতে তিনি আবারও কাঁদতে লাগলেন। এবার আরিফের বউও চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করল। মিতু কাউকে কিছু না বলে নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।

নিচে এখন মানুষের প্রচ- ভিড়। সবাই ব্যস্ত হয়ে ওপর নিচ করছে। বার বার গাড়ি থামার শব্দ হচ্ছে। নতুন কেউ আসছে আর থেমে যাওয়া কান্না আবার নতুন করে শুরু হচ্ছে। আবার থেমে যাচ্ছে। এভাবেই চলছে। কফিনটা  ঘিরে রেখেছে কয়েকজন। নতুন কেউ এসে শেষ বারের মতো দেখে নিচ্ছে প্রিয় স্বজনের মুখ। সবাই আফসোস করছে, ইস! কী এমন বয়স ছেলেটার! এই বয়সেই হার্ট অ্যাটাক! আহারে! বাচ্চাটা বাবার কোনও স্মৃতিই মনে করতে পারবে না! আহারে বউটার কী হবে! সংসার কেমন করে চলবে! একজন আবার জানতে চাইলো, অর অফিসের লোকজন আইছিল! তারা কি টাকা পয়সা কিছু দিবে না! দিলে সেটা কে কতটা পাবে, সেটা নিয়েও চললো মৃদু আলোচনা। লাশ নেওয়া হবে গ্রামের বাড়িতে। সেখানে আরিফের বাবা- মা থাকেন। কফিন অ্যাম্বুলেন্সে তোলার আগে সবাই আর একবার দেখে নিচ্ছে। আরও দুটো মাইক্রোবাস যাচ্ছে। যারা সঙ্গে যাবে তারা গিয়ে গাড়িতে উঠছে। এরই মধ্যে শুরু হলো বৃষ্টি। মিতু আনমনে এগিয়ে যাচ্ছিল কফিনটার দিকে। ওর একবার মনে হলো শেষ বারের মতো আরিফের মুখটা দেখি। কিন্তু পা যেন সরছে না। হঠাৎই ওর না হওয়া মেয়েটার জন্য খুব কষ্ট হতে লাগলো। চোখ ভীষণ জ্বালা করছে। ও কি তাহলে কাঁদবে। নাহ! আর দাঁড়ানো যাবে না এখানে! ভাবতে ভাবতেই ও গেট দিয়ে বেরিয়ে গেল। কেউ কেউ অবাক হয়ে দেখলো বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে একটা মেয়ে বেরিয়ে যাচ্চে। এতক্ষণে মিতুও স্বস্তি পেল। বৃষ্টি তখন পরম যতেœ ধুয়ে দিচ্ছে ওর চোখের জল।

 

সেই সবও তুমি 

- শিখা রহমান

 

এক.

‘এই-ই যে সরতো! গরম লাগছে...।’

আশফাক ডান হাতে অরনীর কোমর জড়িয়ে ধরেছেÑ ‘একটু ধরি না! এসি বাড়িয়ে দিই?’

‘উহু... শেভ করোনি তো... ব্যথা লাগছে।’

আশফাক হেসে উঠলোÑ ‘না ছাড়বো না...। এটা আমার ঘুমানোর জায়গা তো।’

 

অরনী চমকে উঠলো। অনেক দিন পর মনে পড়লো রঞ্জনের কথাÑ

রঞ্জন! তুমি কোনদিকে তাকিয়ে আছ বলো তো?

Ñতোমার গ্রীবা শেষে বুকের পাহাড়ের যেখানে শুরু সে জায়গাটা খুব সুন্দর! চোখ ফেরানো কঠিন!

লজ্জায় লাল হয়ে অরনী বলেছিল, তুমি না খুব অসভ্যতা করছ!

 

বাহ! ওটা তো আমার ঘুমানোর জায়গা। আর অসভ্যতা ভালোবাসার সমানুপাতিক। ভালোবাসা বাড়লে অসভ্যতাও বাড়ে।

 

যদিও গলায় আশফাকের নিঃশ্বাসে গরম লাগছিল তবুও অরনী আর মানা করে না। সে এখন ভাবছে রঞ্জনের কথা। শরীরে একটু শিহরণ, একটু নিষিদ্ধ ভালো লাগা নিয়ে আশফাকের মাথা বুকে জড়িয়ে ধরলো সে।

 

দুই.

অরনী ছলো ছলো চোখে ড্রইংরুমের সোফায় বসে আছে। পাশে আশফাক উদ্বিগ্ন হয়ে তার হাত ধরে আছে। আজ লিমাকে স্কুলে দিয়ে ফেরার সময় তার গলার সোনার চেইন হ্যাঁচকা টানে কারা জানি নিয়ে গেছে।

Ñমন খারাপ করো না! ভারী তো একটা চেইন...। তোমাকে এর চেয়ে ভালো একটা কিনে দেবো।

অরণী চেইনের জন্য মন খারাপ করেনি। তার খুব ভয় লাগছে, নিজেকে খুব অসহায় আর অনিরাপদ মনে হচ্ছে। সে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলোÑ ‘আমি ভাবিনি কেউ এভাবে গলা থেকে ছিনিয়ে নিতে পারে...! এত্ত চমকে গিয়েছিলাম... আর দেখো, গলায় দাগ হয়ে গেছে।’

অরনীর মাথায় হাত বুলিয়ে আশফাক বললো, আমার লক্ষ্মী বউটা... কাঁদে না প্লিজ... আমি আছি না... সব ঠিক হয়ে যাবে।

অরনীর হঠাৎই মনে পড়লো হারিয়ে যাওয়া বাবার কথা। যখনই মন খারাপ করতো, বাবা তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলতেন, ‘মন খারাপ করিস না মামণি.... আমি আছি না... সব ঠিক হয়ে যাবে।

‘ আশফাককে সে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বুকে মাথা রাখলো।

 

তিন.

Ñঅরু... আমাকে এক নলা দাও না।

উহু... তুমি না একটু আগেই খেলে... আমি খেতে বসলেই যত্ত ঝামেলা!

Ñদাও না প্লিজ! প্লিজ... তোমার ভাতমাখা খেতে খুব মজা হয়।

দিতে পারি... আঙুলে কামড় দেবে না কিন্তু।

Ñআচ্ছা বাবা... দেবো না।

 

আশফাক হাঁ করে আছে। অরনী জানে ভাত দিতে গেলেই সে কামড় দেবে। তারপরও বার বার এ খেলাটা খেলতে তার খারাপ লাগে না। এ সময়টায় পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই ভারিক্কি মানুষটাকে তার একটা ছোট্ট ছেলে মনে হয়Ñ অনেকটাই তাদের ছেলে সৌমিকের মতো।

 

চার.

ভোররাতে ঘুম ভাঙতেই শীত শীত লাগছে। আশফাকের বুকের কাছে গুটিসুটি হয়ে অরনী সরে এলো। আশফাক দু’হাতে তাকে জড়িয়ে ধরলো।

Ñএই-ই-ই যে, কী হচ্ছে?’

আশফাক ঘুম জড়ানো গলায় বললো, ওমচোর ধরেছি... ‘পালাবে কোথায়?’

Ñইস রে... তুমি চোর ধরার কে?

বাহ! আমি ওম পুলিশ না... আমার ওম চুরি করে আবার গলাবাজি!

চুরি হবে কেন? তোমার ওই ভাল্লুক বুকের সব ওম আমার তো...। অরনী আল্লাদী গলায় বললো।

 

অরনীর মধ্যে আশফাক ডুবে যেতে যেতে ফিসফিস করে বললো, ‘অরু... আমাকে ভালোবাসো তো?’

Ñহু-উ-উ-উ... অনেক অনেক ভালোবাসি... তোমার মধ্যে যে তুমি ছাড়াও আমার ভালোবাসার সব মানুষ আছে।

আশফাক শরীরের ভাঁজে সুখ খুঁজতে ব্যস্ত। তাই কথাটা ঠিক শুনতে পেল না।

 

বিশেষ দ্রষ্টব্য : গল্পের নাম পূর্ণেন্দু পত্রীর কবিতার নামে। কারণ ‘তোমাকেই দৃশ্য মনে হয়/তোমার ভিতরে সব দৃশ্য ঢুকে গেছে।’

ঞযব ংঃড়ৎু রং ফবফরপধঃবফ ঃড় ধষষ ঃযব ৎবসধৎশধনষব সবহ রহ ড়ঁৎ ষরাবং.

তারাশঙ্কর গণদেবতা

 মুতাকাব্বির মাসুদ

 

১.            ‘গণদেবতা’ উপন্যাস দু’টো ভাগে বিভক্ত। একটি ‘চন্ডীমন্ডপ’ অপরটি ‘পঞ্চগ্রাম’ দুটো অংশই স্বাতন্ত্র্যে উপস্থাপিত। ‘চন্ডীমন্ডপ’ প্রকাশ পায় ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবরে ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকায়। ‘পঞ্চগ্রাম’ প্রকাশিত হয় ১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দের জুন মাসে একই পত্রিকায়। বস্তুত ‘চন্ডীমন্ডপ‘ গ্রন্থাকারে প্রাকশের সময় ‘গণদেবতা’ শিরোনামে উপস্থাপিত হয় তারাশঙ্কর বিশশতকের আঞ্চলিক কথাসাহিত্যের অনিবার্য দ্যোতক হিসেবে বাংলা সাহিত্যে নিজের কালজয়ী অবস্থান নিশ্চিত করেন। তারাশঙ্কর তাঁর উপন্যাসে দক্ষতার সাথে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনবাস্তবতার নিখুঁত চিত্রটি তুলে ধরতে মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন। সমাজ বাস্তবতায় বিদ্যমান সত্যকে চিত্রিত করতে যেয়ে পরিপূর্ণ সমাজবোধ, ও ইতিহাসের সামগ্রিক সমন্বয়কে বর্ণনার কেন্দ্রে স্থাপন করে নিপুণ বিন্যাসের প্রয়াসের পাশাপাশি উপন্যাসে তা তুলে এনে বিজ্ঞাপিত করেছেন সমাজের অবহেলিত ও নানাভাবে নির্যাতিত অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষ আর তাঁদের দুঃখ-কাতর জীবনের নির্মম চলচিত্র। এ প্রসঙ্গে সাহিত্যিক নারায়ন গঙ্গোপাধ্যায় বলেন “তারাশঙ্কর মুখ্যত জনসাধারণের শিল্পী। এই জনসাধারণ আবার নীচের তলার মানুষ’ (নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়- বাংলা গল্প বিচিত্রা, দ্বি.স. কলকাতা, ১৯৫৭, পৃ-১২২।)

২.           ‘গণদেবতার’ কাহিনী আবর্তিত হয়েছে ‘চন্ডীমন্ডপ’কে কেন্দ্র করে। সমকালে তথাকথিত বুর্জোয়া মোড়ল শাসিত সমাজের কঠিন ও অনিয়ন্ত্রিত সংস্কারাচ্ছন্ন, সমাজজীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে স্তূপীকৃত অন্ধবিশ্বাস ও বোধ যা, জীবনবাস্তবতায় অনৈক্যের সূচনা করেছিল, সেখান থেকেই তারাশঙ্করের ‘গণদেবতা’ উপন্যাসের শুরু। বস্তুত বাইরের অনৃত শক্তির দ্বন্দ্ব-সংঘাত সমাজের মানুষগুলোর জীবন বোধের মধ্যে ঐক্য, সুখ, শাস্তির পরিবর্তে হিংসা, ক্রোধ ও মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে। লক্ষ করা যায় উপন্যাসে উপস্থাপিত ও মুদ্রিত চরিত্রগুলো যথা অনিরূদ্ধ কামার ও গিরীশ ছতারের যৌক্তিক আলোচনায় ও প্রেক্ষিত বিবেচনায় উদ্ভূত পরিবেশ থেকে একটি নতুন কালের আগাম ঢেউ এসে স্পর্শ করেছে শিবকালীপুর গ্রামে। আর এখান থেকেই সমগ্র প্রাচীন প্রথার বিরুদ্ধে তাঁদের বিদ্রোহের শুরু। এ উপন্যাসে সুকৌশলে বিন্যস্ত হয়েছে গ্রাম্যসমাজের প্রাচীন প্রথার ক্রমাগত বিলুপ্তির আলেখ্য। ওঠে এসেছে সমাজে বিদ্যমান আজন্ম লালীত সংস্কারাচ্ছন্নতার নেতিবাচক প্রভাব-চিত্র।         

 

অন্যদিকে গ্রামীণ রুগ্ন অর্থনীতির ভয়াল চিত্রটিও তারাশঙ্কর তুলে এনেছেন দক্ষতার সাথে। উপন্যাসে চিত্রিত দ্বারকা চৌধুরীর মত প্রবীণ ব্যক্তিত্ব কিংবা নব্য আধুনিকতায় বিশ্বাসী নেতা দেবু ঘোষ পারেনি শিবকালীপুর গ্রামের ভাঙ্গন ঠেকাতে। এখানে বিদ্রোহের আরেক ধাপ গতি নিয়ে এগিয়ে চলে ধর্মীয় আচার-প্রথার বিরুদ্ধে। অনিরুদ্ধ কামার বারোয়ারী পূজায় ধর্মীয় অনাচারের অভিযোগ এনে চন্ডীমন্ডপ কেন্দ্রিক চলমান সমাজ ব্যবস্থাকেই অবশেষে অস্বীকার করে ফেলে।

একদিকে ভোগবাদী সমাজব্যবস্থায় ধনতান্ত্রিক বুর্জোয়া শ্র্রেষ্ট মানুষ এবং তথাকথিত জমিদার ও উচ্চাবিত্ত শ্রেণি অন্য প্রান্তে নির্যাতিত দরিদ্র জনগোষ্ঠী তথা নিরীহ মানুষ। এদেরে সমন্বয়ে শিবকালীপুর গ্রামের যাপিত জীবন ক্রমান্বয়ে বয়ে চলার পথে কখনো প্রাচুর্যে, ঔদার্যে, মিলনে, উৎসবে কোমল উজ্জ্বল আবার কখনো দ্বন্দ্ব সংশয়ে, ও কুসংস্কারে প্রহত ও গতিশূন্য।

৩.           বস্তুত চন্ডীমন্ডপ ছিল শিবকালীপুর গ্রামের মানুষের ঐক্যের প্রতীক। এ ‘মন্ডপে’ সকল সম্প্রদায়ের মানুষের অবাধ বিচরণের অধিকার যেমন ছিল, তেমনি চন্ডীমন্ডপ তাঁদের চিন্তা চেতনায় পুরনো সংস্কৃতি ও আচার বিশ্বাসকে নিবিড় মমতায় ধরে রাখতো। দীর্ঘদিনের এ চলমান প্রথাকে গতিশীল করার লক্ষ্যে এগিয়ে আসে শিবকালীপুর গ্রামেরই দ্বারকা চৌধুরী, ন্যায় রতœ, রাঙা দিদির মতো লোকেরা। অন্যদিকে অনিরূদ্ধ, গিরীশ, তিন কড়ি, ও পাতুর মতো লোক চলমান জীবনবাস্তবতায় সমাজে বিদ্যমান ও প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থার এরূপ অবিচল প্রথার বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করে। এখানেও আবার উভয়ের মধ্যে আপাত ঐক্যের সমন্বয়ে তৈরি করতে এগিয়ে আসে উদার দেবু ঘোষ এবং স্বার্থান্ধ ছিরু পাল।

দীর্ঘদিনের পুরনো সংস্কৃতি ও সেখানকার মানুষের বিশ্বাস-ভালবাসা আর ঐক্যের স্মারক হয়ে স্থির দাঁড়িয়ে আছে ‘চন্ডীমন্ডপ’ শিবকালীপুর গ্রামে। অবশেষে এই ঐতিহ্যবাহী মন্ডপেও পরিবর্তনের জোয়ার আসে। ছিরুপাল বদলে গিয়ে হয় শ্রীহরিঘোষ; আর সকল ঐতিহ্যের প্রতীক চন্ডীমন্ডপ তার বাইরের রূপ ও ধর্মের নতুন নন্দিত আলোয় উদ্ভাসিত হয়। শ্রীহরি ঘোষের কাছারিÑ শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ধর্মচর্চায় ব্যবহৃত হয়। এরই মধ্যে নবীভূত পরিবর্তনের দীপ্ত ছোয়ায় একটি অনবদ্য গণমানুষের পান্ডুলিপি হয়ে ওঠে ‘গণদেবতা’।

৪.           রাঢ় বাংলার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কৃষি নির্ভর জীবন ও ধর্ম নিয়ে সেকেলে ধ্যান-ধারণা ‘গণদেবতা’ উপন্যাসের মৌলিক উপাদান। তারাশঙ্কর এ সকল বিষয়কে উপজীব্য করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনবাস্তবতার নিখুঁত চিত্র দক্ষতার সাথে তুলে এনেছেন ‘গণদেবতা’য়। এ উপন্যাসে শিল্পের বহুমাত্রিক উৎকর্ষ উপস্থাপনের প্রয়াস, কল্পনায় বিনির্মানের উৎস খুঁজেছেন; তার নৈর্ব্যক্তিক চিত্ররূপে রাঢ় বাংলার নির্দিষ্ট জ্যামিতিক সীমারেখায় বিদ্যমান বৈশিষ্ট্য মৌলিকতায় বিজ্ঞাপিত হলেও উল্লিখিত ভৌগলিক রেখাচিত্রে উপস্থাপিত হয়েছে চিরকালীন ভারতের শাশ্বত জীবনবাস্তবতার সামগ্রিক নকশা। তাঁর অবিমিশ্র চেতনায় চিত্রার্পিত সত্যের যে উদ্ভাস, কল্যাণ-অকল্যাণ, আলো-আঁধার, ও বিবিধ  সত্য-ন্যায়ের বোধে তাঁকে নৈয়ায়িক মনে করা যেতে পারে। ঔপন্যাসিকের এ সত্যানুভূতি ভিত্তি পেয়েছে বিবিধ সত্যের সমন্বয়ে। উপন্যাসের মুখ্য চরিত্র দেবু ঘোষের বুদ্ধিদীপ্ত পর্যবেক্ষণেও সে সত্যের সামগ্রিক সমুদ্ভব লক্ষ করা যায়। দেবু তাঁর উপলব্ধিতে আত্মচিন্তায় বিষয়টির ব্যাখ্যা নিজেই করতে পেরেছে। একদিকে গ্রামের সাথে তাঁর মানসিক দূরত্ব বস্তুত অমীমাংসিত সত্যের কারণেই হয়েছে। সে দেখেছে মানুষ তাকে এড়িয়ে চলেছে, আঘাত করেছে, এমন কী তাঁর সাথে তুচ্ছ স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ঝগড়ায় লিপ্ত হয়েছে; সেই মানুষই তাঁকে শ্রদ্ধা করতে শিখেছে, কারামুক্তিতে তাঁর মিলেছে মহত্বের স্তুতি;

“ফুলের মালা গলায় দিয়ে ঘোষ চলেন জেলে,

অধম সতীশ লুটায় এসে তাঁরই চরণ তলে

দেবতা নইলে হায় এ কাজ কেউ পারে না” (তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, ‘গণদেবতা’, নির্বাচিত রচনা, ১ম. প্র. কলকাতা, ১৯৮৬, পৃ. ১২৮)

তবে এ আবেগ, এ সম্মান, স্বল্প সময়ের মধ্যেই স্থায়ীত্ব হারিয়েছিল। প্রসস্তির রেশটুকু কাটতে না কাটতেই সেই কঠিন বাস্তবতা, সেই পুরনো রূপে ফিরে আসে। “পরের দিন হইতে কিন্তু আবার সেই পুরনো শিবকালীপুর। সেই দীনতা-হীনতা, হিংসায় জর্জর মানুষ, দারিদ্র্য দুঃখ রোগ প্রপীড়িত গ্রাম।” (ঐ পৃ. ১২৮) বস্তুত ‘গণদেবতা’ উপন্যাসটি রাঢ় বাংলার গণমানুষের জীবনবাস্তবতার এক কঠিন ধারাবাহিক জীবনের ছবি।

        

 

রাঢ় বাংলার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কৃষি নির্ভর জীবন ও ধর্ম নিয়ে সেকেলে ধ্যান-ধারণা ‘গণদেবতা’ উপন্যাসের মৌলিক উপাদান। তারাশঙ্কর এ সকল বিষয়কে উপজীব্য করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনবাস্তবতার নিখুঁত চিত্র দক্ষতার সাথে তুলে এনেছেন ‘গণদেবতা’য়।

শৈশব স্মৃতি

হাসান আজিজুল হক

 

রবীন্দ্রনাথের কথায় বলতে হয়, ‘আমি কেবলি স্বপন করেছি বপন আকাশে।’ মাটি ছাড়া কোনো বীজ বপন করা কি যায়? কিন্তু আমরা প্রতিনিয়ত স্বপ্ন-আকাক্সক্ষার বীজ বুনে থাকি। তা না হলে বেঁচে থাকাটা অসম্ভব কষ্টকর হয়।

আমরা বর্তমানে বাঁচি, ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করি, কল্পনা করি। পেছনে যেটি ফেলে আসি সেটি অতীত। তা নিয়ে যখন কথা বলি তখন সেটি হয়ে যায় স্মৃতিচারণ। মানুষের জীবনে কোনটা গুরুত্বপূর্ণÑ অতীত, বর্তমান, না ভবিষ্যৎ? নিশ্চয় বর্তমানটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তা সরাসরি এই মুহূর্তে বেঁচে থাকার সঙ্গে যুক্ত। তাহলে ভবিষ্যৎ কতোটা গুরুত্বপূর্ণ? কিছুটা বটে। কিন্তু বর্তমানের সঙ্গে তুল্য নয়। ভবিষ্যতের একটা বিরাট অংশ স্বপ্ন আর কল্পনা। রবীন্দ্রনাথের কথায় বলতে হয়, ‘আমি কেবলি স্বপন করেছি বপন আকাশে।’ মাটি ছাড়া কোনো বীজ বপন করা কি যায়? কিন্তু আমরা প্রতিনিয়ত স্বপ্ন-আকাক্সক্ষার বীজ বুনে থাকি। তা না হলে বেঁচে থাকাটা অসম্ভব কষ্টকর হয়। এতো যন্ত্রণা? প্রতিনিয়ত ক্ষয়, প্রতিনিয়ত মৃত্যু। আমরা মৃত্যু বলি একটি বিশেষ সময়ে যখন সব স্থির, নিথর হয়ে আসে। এটি তো একদিনে ঘটে না। তা শুরু হয় জন্মের পর থেকেই। মুহূর্ত থেকে মুহূর্তে। এক মুহূর্ত মৃত্যু হলে পরের মুহূর্তের জন্ম হয়। এ মুহূর্তটির মৃত্যু হলে নতুন আরেকটি মুহূর্তের জন্ম হয়। তবু আমি জীবনটাকে আগ্রাসী হয়েই গ্রহণ করি। আমার হিসাব খুব সহজ। জন্মের আগের কোনো স্মৃতি আমার কাছে নেই। মৃত্যুর পরে আলো, না অন্ধকারÑ তা জানি না। যা জানি তা ভুল জানি। তবু জীবনটাকে আমরা মূল্য দিই। প্রতিমুহূর্তে মরি আর প্রতিমুহূর্তে বাঁচি। ওই মৃত মুহূর্তগুলো একত্রে করলে এরই নাম হয়ে যায় স্মৃতি।
আমার অনেকটা বয়স হলো। এর অর্থ হলো, স্মৃতিচারণের জন্য অনেকটাই অতীত আমার রয়েছে। স্মৃতিচারণ করতে তাকেই বলা হয় যে বর্তমানের সমস্যা সমাধান করতে অপারগ, অক্ষম। এক কথায় যে বাতিল মানুষ। কাজেই স্মৃতিচারণটা এক অর্থে বর্তমানে যে মৃত বা প্রায় মৃত অথবা মুমূর্ষু তাকেই তার জীবনটা পর্যালোচনা করে দেখতে বলা হয়। আমি স্মৃতিচারণ করি সুখে। এ কারণে নয়, মৃত্যু ঘনিয়ে আসছে আর বেশি কথা বলার সময় নেই। কেননা প্রতিমুহূর্তে শুধু জীবিত থাকা নয়, প্রবলভাবে জীবিত থাকতে চেষ্টা করি। মৃত্যুর মুহূর্তে কী ঘটবে জানি না। কিন্তু যতোক্ষণ পর্যন্ত আমার চেতন মন কাজ করছে ততোক্ষণ যুক্তি দিয়ে, প্রবৃত্তি দিয়ে সবদিক থেকে প্রবলভাবে বেঁচে থাকা বলতে যা বোঝায় ওই বেঁচে থাকাটায় সম্মান করি। তবে আমি চাইলে কী হবে! জীবনে একটা জিনিস না চাইলেও ঘটে, নিষেধ করলেও শোনে না। তা হচ্ছে বয়সের বৃদ্ধি ঘটা। এ জন্য পরিচর্যা করতে হয় না, আকাক্সক্ষা করতে হয় না, সার দিতে হয় না। আমারও বেড়েছে। আর বেড়েছে বলেই অতীত প্রচুর লম্বা হয়ে গেছে।
আমার ঝুলিটা এখন পরিপূর্ণই বলা যায়। দুর্ভাগ্যক্রমে অনেক কিছুই ভুলি না। একদিক থেকে অনেক জিনিস ভুলে যাওয়া ভালো। কষ্ট দিয়েছ, দুঃখ দিয়েছ, শোক-তাপ দিয়েছÑ এসব ভুলে যাওয়া ভালো।
স্মৃতি সততই মধুরÑ এই কথা ঠিক নয়। তবে এখন আর আমার ওই কষ্ট বর্তমানের নয়। তাই কষ্টগুলো এখন আনন্দের মনে হয়। জীবনে যে সংগ্রাম করতে হয়েছেÑ সংগ্রাম বলতে একেবারে যাকে বলা যায় খাওয়া-পরার জন্য সংগ্রাম, একটা দেশ থেকে আরেকটা দেশে বিরাট একটা পরিবার নিয়ে গিয়ে তারপর সেটি চালানো এটি যে কতােটা কষ্টকর ছিল একটা সময়! সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছি। এখন ভালো লাগে, এতো কষ্ট সার্থক হয়েছে।
আমি কথা বলতে ভালোবাসি। এটি প্রমাণ করেছি আমার লেখায়। চার খ-ে আমার শৈশব-কৈশোর ধরেছি। স্মৃতির কাছে ফিরে গেলেই পরিষ্কার দেখতে পাই রাঢ়ের ওই বিশাল প্রান্তর শেষে চলিয়াছে বায়ু অকূল উদ্দেশে। রাঢ়ের মাঠগুলো দেখতে পাই, প্রান্তরগুলো দেখতে পাই। কতো দূরে যে দিগন্ত মাটি ছুঁয়েছে তা হিসাব করতে পারি না। একটা কল্পনাপ্রবণ বালক মাঠের ধারে এসে বসে থাকে। ঠাকুরমার ঝুলির ওই গল্পের কথা মনে পড়ে যায়। সাত সমুদ্র তেরো নদী পাড়ি দিয়ে তেপান্তরের মাঠ। সেখানে শূন্য একটি রাজপ্রসাদ। রাজপ্রসাদের চারপাশ জঙ্গলাকীর্ণ। ওই রাজপ্রসাদের ভেতরে চিরঘুমে ঘুমিয়ে আছে রাজকুমারী। মাথার কাছে সোনার কাঠি, পায়ের কাছে রুপার কাঠি। বদলাবদলি করে দিলেই সে চোখ মেলবে। তাকে কোনোদিনই জাগাতে চায় না রাক্ষসগুলো। রাক্ষসগুলোর প্রাণ ভ্রমরা আছে। রাজকুমার সেটি তুলে যখন পিষছে তখন হাহাকার করতে করতে ছুটে আসে ডাইনি, রাক্ষসী, পিশাচি। চারদিক থেকে ছুটতে ছুটতে আসে। কিন্তু বাড়ির দরজা পর্যন্ত পৌঁছার আগেই সবাই মারা গেল।
ছোটবেলায় গ্রামে ছিলাম। এখন যেখানে থাকি এর আশপাশের গ্রামগুলোয় যাই। না, রাঢ়ের গ্রাম তো এমন ছিল না। কেমন ছন্নছাড়া গ্রাম। গ্রামে শহর ঢুকেছে। কিন্তু ভালোভাবে ঢুকতে পারেনি। খড়ের ছাউনি দেয়া বাড়ি থাকলেও বেশির ভাগই ভেঙে গেছে কিংবা খড় বাদ দিয়ে টিন দিয়েছে অথবা দাঁত-মুখ বের করে আছে এমন ইট দিয়ে তৈরি বাড়ি। ছন্নছাড়া জীবন। এটিকে গুছিয়ে সুন্দর করে যাপন করার কথা যেন তারা ভাবতেই পারে না। আমাদের রাঢ়ের গ্রামের এমন বাড়ি ছিল না যেটি পরিপাটি ছিল না। এমন সংসার ছিল না যার উঠান ছিল না। উঠান প্রতিদিনই হিন্দুরা গোবর পানি দিয়ে ধুতো, মুসলিমরাও গোবর পানি দিয়ে ধুতো কোনো কোনো সময়। বাড়িতে ঢুকলেই একটা শান্তি। ঢুকতেই সন্ধ্যামালতী ফুলের গাছ।
আমি ছোটবেলা প্রায় উন্মাদ বালকের মতো দিগ-দিগন্তে ছোটাছুটি করেছি। বিরাট বিরাট মাঠে ঘুরে বেড়িয়েছি। মাঠের একেবারে শেষে পর্যন্ত গিয়েছি। মনে পড়ে খলখলির মাঠের কথা। সেখানে গেলে বড় বড় বিষধর সাপের খোলস দেখা যেতো। ঘন তাল গাছের সারি। ওই তাল গাছের তলায় কাঁটা জঙ্গল। এর ভেতর নানান সাপ- খোপের বাসা। একালের ছেলেরা ভাবতেও পারবে না! ভেবেও লাভ হবে না। কেন যেতাম? একেকটা বিশাল দুপুর কেন পার করতাম? গ্রামে থেকে এক মাইল দূরে দুটি অশ্বত্থ গাছ ছিল দূরের খলখলির মাঠে। দুটি অশ্বত্থ গাছকে মনে হতো যমজ ভাই। কী বলিষ্ঠ দুই ভাই!
এরপর মনে পড়ে কালাগড়ের মাঠের কথা। সেখানে একটা জমি ছিল আমাদের। একটা জমিই সাত বিঘা। সাত বিঘার বাকুড়ি বলা হতো। কালাগড়ের ওখানে ওই শ্যাওড়া শিউলি গাছটা। সবাই বলতো ভূত-প্রেত, দানব আছে ওখানে। খবরদার! ওখানে যাস না, বিরাট একটা সাপ আছে। যে যাবে তাকে সঙ্গে সঙ্গে জড়িয়ে-পেঁচিয়ে মেরে ফেলবে। গা ছমছম করছে। তবু গিয়েছি। কিছু নেই। ভীষণ নির্জন। নির্জনতার একটি শব্দ আছে।
রাঢ়ের দুপুরের একটা শব্দ আছে। অনেক দূরে দেখা যাচ্ছে, ঘূর্ণিঝড় উঠেছে। অল্প একটু জায়গা পাক দিয়ে উপরে উঠছে। লোকজন বিশ্বাস করতো। তারা বলতো, ওগুলো ঘূর্ণিঝড় নয়, মানুষের প্রেতাত্মা। এসব দেখা। তারপর কী কী খাওয়া যায় তা চেখে দেখার শখ। তেতো, মিষ্টি, কষাÑ সবকিছু খেয়ে দেখেছি। বইচি ফল খেতে ভালো। কিন্তু এর ভেতরে বড় বড় বিচি পট পট করে দাঁতে বাধে। বনকুল আছে। কাঁটা জঙ্গলে ভরা। এর মধ্যে মাটি বা ইট দিয়ে ধাপ তৈরি করে সেখানে গিয়ে ভেতরের বনকুলগুলো সংগ্রহ করেছি। সেখানে চন্দ্রবোড়া সাপের মুখোমুখি হওয়া।
মনে পড়ে, একদিন ফুটবল খেলার মাঠ থেকে ফিরে আসছি। ঝোপের ভেতর থেকে হিস শব্দ শুনলাম। এরপরই দেখলাম একটা কালো রঙের সাপ আমার পায়ের ওপর ছোবল মারলো। আমার পায়ের বাম অঙ্গুলির এক ইঞ্চি দূরে পড়লো সে ছোবল। সন্ধ্যার অন্ধকারে মাথা দোলাতে দোলাতে একটা কালকেউটে সাপ বের হয়ে এলো। সাহসী সাপ তো! সেটি ঝোপ থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের সামনে ফণা দোলাচ্ছে। একজনের হাতের নিশানা কী! এমনভাবে একটি ঢিল মারল যে, মাজাটা গেল ভেঙে। আরেকবার এ রকম একটি সাপের লেজ ধরতে গিয়েছিলাম। গর্তের ভেতরে শুয়ে আছে কালো রঙের একটি সাপ। ফোঁস করে উঠলো। পুকুরে স্নান করতে যেতাম। বিরাট একটি দীঘি। লোকে বলে, পুকুরের মধ্যে বিরাট একটা কু-লী আছে। টেনে নিয়ে যাবে। যতো এগিয়ে যাচ্ছি ততোই ঠা-া জল। যতো নামছি ততো হিম ঠা-া জল। একবার তলায় পৌঁছে সেখান থেকে কাদা তোলা। তাল গাছের ওপর বাজ পড়ে মাথাটা গেছে উড়ে। ওই মাথার ওপর দাঁড়িয়ে পুকুরে ঝাঁপ দিয়েছি। আমাদের স্কুল ছিল পাকা। ওখানেই গাছটা ছিল। এগুলো খুব বাল্যবয়েসের স্মৃতি। আমি দুর্দান্ত ছিলাম। কিন্তু কারো ক্ষতি করিনি। মানুষের খুব পছন্দের বালক ছিলাম। হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে আমাকে সবাই ভালোবাসতো। মহরমে আছি, কলেরা লেগেছে গান গেয়ে বেড়াচ্ছি। বাবা বলতেন, কিছু করতে হবে না। পানিটা ফুটিয়ে খা। কোনো খাবার এক মুহূর্তের জন্য খোলা রাখবি না। বাবার ওই ছোট্ট আদেশে আমাদের বাড়িতে কোনো কলেরা হয়নি। লাঠি খেলেছি, মাদার খেলেছি। অদ্ভুত অদ্ভুত খেলা ছিল। মাদার মেয়ে মাঝে মধ্যে ক্ষেপতো। বহুদূর থেকে পতাকা ওড়াচ্ছে দেখে বুঝতাম মেয়ে মাদার ক্ষেপেছে। এরপর একটি বাড়িতে গিয়ে নাক ঘষতো। মুরগিটা না দিলে মাদার বাড়ি থেকে নড়বে না।
এভাবে যার জীবন কেটেছে তার কি খারাপ কেটেছে? একই সঙ্গে আমার পড়ার ঝোঁক। কতো ছোটবেলা থেকে পড়ছি। কতো বই পড়েছি! আমার বয়স কতো কম। তখন কতো ভারী ভারী বই পড়েছি। টলস্টয়, রোমা রঁলা, ডিকেন্সÑ এসব পড়েছি। ভাঙা আলমারিতে প্রচুর বই জোগাড় করেছি। ডিটেক্টিভ ভালো লাগতো। হেমন্দ্র কুমার রায়ের বই দিয়ে ভরে ফেলেছি। একটি সিরিজ ছিল। কাজেই খুব ছেলেবেলা থেকেই মনটা খালি আর ফাঁকা যায়ািন।
দশ বছর বয়সে স্কুলে ক্লাস ফাইভে ভর্তি হয়েছি। স্কুলের সংখ্যা তখন অনেক কম ছিল। মাটির দেয়াল, খড়ের ছাউনি, ছোট ছোট গোটা দুয়েক ঘরÑ এই হলো স্কুল। চার-পাঁচটি গ্রামের জন্য একটি করে স্কুল। আশপাশের অনেক গ্রামই আমাদের গ্রামের চেয়ে উন্নত। কিন্তু স্কুল আছে শুধু আমাদের গাঁয়ে। আর ওই স্কুল হচ্ছে পাকা দালান বাড়িতে। কারণ একটাই। কাশিমবাজারের মহারাজা মনীন্দ্র চন্দ্র নন্দীর বিয়ে হয়েছিল আমাদের গাঁয়ের মেয়ের সঙ্গে। এ কারণেই তিনি এ গ্রামে পাকা দালানের হাই স্কুল তৈরি করে দিয়েছিলেন। তার স্ত্রীর নামে আমাদের গ্রামের স্কুলের নাম যবগ্রাম মহারানী কাশীশ্বরী উচ্চ ইংরেজি ইনস্টিটিউট। এ ছাড়া স্কুলের কাছে বিরাট একটি দীঘি কাটিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। এটির কাকচক্ষু কালো জল। উত্তর-দক্ষিণ দু’পাড়ে তাল আর অশ্বত্থ গাছ। মাছে ভরা ছিল দীঘি। বড়ো জাল দিয়ে ধরা হতো ২০-৩০ সের ওজনের রুই-কাতলা। গাঁয়ে আরো ছিল বিশাল একটি খেলার মাঠ। গাঁয়ের ভেতরে ছিল পাকা শিবমন্দির, প্রচুর ধানের জমি। ওই স্কুলের কারণেই আশপাশের পাঁচ-সাতটি গ্রামের ছেলেরা যবগ্রামে পড়তে আসতো।
ক্লাস ফাইভ থেকে ক্লাস টেন পর্যন্ত টানা ছয় বছর ওই স্কুলে পড়েছি। ছাত্রী একজনও ছিল না। হিন্দু-মুসলমান কেউই তাদের মেয়েদের স্কুলে পাঠাতো না। সময়টা তখন দুঃস্বপ্নে ভরা। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের তীব্রতা বাড়ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছে। ১৯৩৫ সালের আইন প্রচলনের ফলে নির্বাচন হয়েছে বাংলাদেশে, সাম্প্রদায়িকতা বাড়লো। কংগ্রেস ও মুসলিম লীগকে ব্রিটিশ সরকারের উসকানি ও ভেদমূলক নীতির ফলে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি এক রকম করতে হচ্ছে। ১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলন, ১৯৪৩ সালের ভয়ঙ্কর, দুঃসহ, সরকারের ইচ্ছাকৃত দুর্ভিক্ষে বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু, পাকিস্তান আন্দোলনÑ একের পর এক আঘাত আসছে তখন। দূর নিভৃত গ্রামে বসে আমরা এসব তেমন টের পাই না বটে তবে ঢেউ হলেও কিনারা পর্যন্ত আসে। কিন্তু বালকের কোনো কিছুতেই ঘাটতি পড়ে না।
স্কুলটাতেই সব পেয়েছি। মাস্টার মশাইÑ সবাই ভীষণ ভালো। তাদের সবাই ছিলেন পাশের গ্রামের মানুষ। হেঁটেই তারা স্কুলে আসতেন। শুধু সংস্কৃতের প-িত মশাই আসতেন তিন মাইল দূরের একটি গ্রাম থেকে লাল রঙের মাদি ঘোড়া চড়ে। ঘোড়াটা ছেড়ে দেয়াই থাকতো। স্কুলের মাঠে ঘাস খেয়ে পেট ভরিয়ে ফেলতো। দড়ি দিয়ে সামনের পা দুটি বাঁধা থাকতো। লাফিয়ে লাফিয়ে চলতো। খুব ভালো মানুষ ছিলেন প-িত মশাই। একটুও ইংরেজি জানতেন না। এসব নিয়ে বললে অনেক কথাই বলার আছে। কতো স্মৃতি যে মনে পড়ছে!


মসজিদটি ছোট। তারাফুলের মতো তার গায়ে নকশা। আমরা শুনেছি, মসজিদটি রাতারাতি তৈরি হয় হানিফার বাবা হামজার হাতে। সে ছিল তার ছেলের চেয়েও জবরদস্ত লাঠিয়াল আর গোর্জোদার। গোর্জো তো তাকেই বলে যাকে আমরা বল¬ম বলে জানি। সেই বল¬ম দিয়ে গোর্জোদার হামজা এক আশ্চর্য কাণ্ড করেছিল। কোথা থেকে এক বুনো শুয়োর পবিত্র ফজরের মুহূর্তে মসজিদ প্রাঙ্গণে এসে যায়

কত গল্প হলো, কত গল্প-প্রবন্ধ, এবার গল্পের পট রচনার সময়। হাতের কাছে উজ্জ্বল বিছিয়ে আছে গল্প-পটের গাঢ় নীল জমি। শূন্য সেই জমিতে পৃথিবীর যাবৎ অশুভ প্রাণী সাপ, শেয়াল, কুমিরের দাঁত, হাড়গিলা পাখির চঞ্চু উঁকি দেবার জন্য সারি ধরে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু আমাদের এক নম্বর লাঠিয়াল হানিফার ভয়ে তারা বহু দূরে দাঁড়িয়ে জিভ লকলক করছে আর আকাশের দিকে মুখ তুলে হৌ হৌ শব্দ করে মিলিয়ে যাচ্ছে।
জলেশ্বরীর এ তল¬াটে নবগ্রামের মসজিদের সমুখে আমরা। বড় সুখ্যাতি এই মসজিদের সুরেলা আজানের জন্যে আয়াত পাঠে মাক্কি এলহানের জন্যেথ এতো আছেই। তার ওপরে এই মসজিদে কোনো জায়গাতেই লোক ফাঁকা যায় না।
মসজিদটি ছোট। তারাফুলের মতো তার গায়ে নকশা। আমরা শুনেছি, মসজিদটি রাতারাতি তৈরি হয় হানিফার বাবা হামজার হাতে। সে ছিল তার ছেলের চেয়েও জবরদস্ত লাঠিয়াল আর গোর্জোদার। গোর্জো তো তাকেই বলে যাকে আমরা বল¬ম বলে জানি। সেই বল¬ম দিয়ে গোর্জোদার হামজা এক আশ্চর্য কাণ্ড করেছিল। কোথা থেকে এক বুনো শুয়োর পবিত্র ফজরের মুহূর্তে মসজিদ প্রাঙ্গণে এসে যায়। মসজিদের পুকুরে অজু করতে করতে গোর্জোদার হামজার কাছে জন্তুটা পড়ে। তৎক্ষণাৎ সে লাফিয়ে উঠে পাশে রাখা গোর্জোটা হাতে নিয়ে এমন বিক্রমে ছুড়ে মারে যে, শুয়োর তো প্রাণ হারায়, তার এক ফোঁটা রক্তও মসজিদের প্রাঙ্গণে পড়ে না, বরং আকাশপথে উড়ে গিয়ে আধা মাইল দূরে ভাগাড়ে গিয়ে পতিত হয়।
মসজিদটি গোর্জোদার হামজার হাতে বানানো বলে আমরা শুনেছি। এ তল¬াটের রাজ্যহীন ক্ষমতাহীন রাজার দাপটে প্রজারা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। রাতারাতি তারা মুসলমান হয়ে যায়। হামজা নব মুসলমানদের নিয়ে বাঁশ-কাঠ দিয়ে এই মসজিদটি তৈরি করে। নাম দেয় তারা মসজিদ। এখন হামজা মাটির নিচে চলে গেছে। মাটির ওপরে এখন তার যোগ্য পুত্র লাঠিয়াল হানিফা। হানিফা গোর্জোতে তেমন দক্ষ না হলেও লাঠি খেলায় সে সারা জলেশ্বরীতে এক নম্বরের এক নম্বর। তার লাঠির ঘূর্ণিতে লাঠি অদৃশ্য হয়ে যায়, শুধু ঘূর্ণমান লাঠির চারপাশে চৈত্রের তপ্ত বাতাসের মতো হাওয়া থির থির করে কাঁপতে থাকে।

মসজিদটিকে নিজের ছেলের মতোই যতœ করে লাঠিয়াল হানিফা। তার একটি কন্যা সন্তান হয়েছিল। তাকে নিয়ে একটা গল্পই রচনা করা যায়। কিন্তু না, আমরা পটের পট রচনা করছিথ গল্পপট।
ওই যে আমরা বলেছি, মসজিদটিকে বড় যতœ করে লাঠিয়াল হানিফা। তার যতেœই কি না মসজিদটির এত সুনাম। সুনামের মধ্যে কী আশ্চর্য সুনাম, এই মসজিদ থেকে কখনোই কারও জুতা চুরি যায় নাই। নামাজিরা নিশ্চিন্তে জুতা বাইরে খুলে মসজিদে প্রবেশ করে। আল¬ার কাছে সেজদায় প্রণত হয়।
লাঠিয়াল হানিফা বা তাকে আমরা তার পিতার সূত্রে গোর্জোদার হানিফা বলেই জানি, পা দু'খানি তার বড় চাষাড়ে। এলাকায় সরকারি কর্মচারী এলে পায়ে তার এক জোড়া স্যান্ডেল ওঠে। আর জুতোও সে পরে, তবে শুধু শুক্রবারে। শুক্রবার আল¬ার সাথে সাক্ষাৎ তো আর খালি পায়ে বা স্যান্ডেল পায়ে করা যায় না, তাই পায়ে তার জুতা ওঠে।
হানিফা একটা পুণ্যের কাজ করে। প্রতি শুক্রবারে এলাকার অনাহারী বিশ-পঁচিশজন মানুষকে সে মসজিদ প্রাঙ্গণে বসিয়ে খিচুড়ি খাওয়ায়। খিচুড়ির এই টাকা আসে জাতীয় দিবসগুলোতে সরকারি হাকিমের খুশি হয়ে দেওয়া তোফায়। হানিফা বলে, দানের ট্যাকা দানে লাগুক। ইয়ার চেয়ে সওয়াবের আর কী আছে রে। সেদিন শুক্রবারে জুমার নামাজ পড়ে হানিফা বাইরে এসে একবার চিন্তা করল, জুতা পায়েই খিচুড়ি খাওয়াবে, না খালি পায়ে।¬

মন বলল, দানের কাজে সহবত থাকা দরকার, অতএব মসজিদের বাইরে রাখা জুতার ভেতরে হানিফা তার পা রাখে। কুট করে কী একটা যেন কামড় দেয়। লাল পিঁপড়ের সময়। পিঁপড়েই কাটল নাকি। পা বের করে ঝাড়া দিতেই জুতার ভেতর থেকে টুকুস করে আঙুল তিন-চার লম্বা কালো কেউটে বাচ্চা বেরোয়।
বাচ্চাটি এতই ছোট, না ফুটেছে দাঁত, না এসেছে বিষ। শুধু পশুর জন্মবোধে ছোট্ট একটুখানি কামড়। সাপের বাচ্চাটি বেরিয়ে ছোট্ট একটি ফণা তোলে। আই বাপ, ইয়ার মইদ্যে ফণা তুলিতে শিখিছিস? সাপের বাচ্চাটি তিল ফুলের মতো লাল চোখে হানিফার দিকে তাকিয়ে থাকে।
মসজিদ প্রাঙ্গণে অনাহারী মানুষেরা অস্থির হয়ে ওঠেথ ও বাপ হানিফা, ভোখে মরি যাও। জলদি আহার দ্যান। পশুর চেয়ে মানুষের আহ্বান হানিফাকে চঞ্চল করে তোলে। সে একবার ইতস্তত করে বাঁ হাতে সাপের বাচ্চার ঘাড়টি ধরে দূরে জঙ্গলের দিকে ছুড়ে মারে। সাপের বাচ্চাটিকে আর দেখা যায় না। তৎক্ষণাৎ বিদ্যুতের মতো হানিফার মনে পড়ে যায়, একাত্তরে তার একমাত্র কোলের সন্তান মেয়েটিকে সে হারিয়েছে। গোর্জো আর লাঠি নিয়ে সে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়েছিল। ফিরে এসে সংবাদ শোনে, তার স্ত্রীকে পাঞ্জাবিরা নির্যাতন করে মেরে ফেলেছে। আর পাশেই যে শিশুকন্যাটি ছিল তার বুকেও কি তারা ছুরি বসিয়ে দিয়েছিল, নাকি কন্যাটিকে তুলে ধরে নিঃসন্তান কোনো বিহারি পরিবারে ছুড়ে মেরেছিল।
হানিফার লাঠি গর্জে ওঠে। হানিফার গোর্জে সূর্যের ত্রুক্রদ্ধ আলো ঝলসায়। কিন্তু তার চোখ দিয়ে আধকোশার ধারার মতো পানি বইতে থাকে।
হানিফা মাটিতে বসে পড়ে। তারপর পঁচাত্তরের আগস্ট মাসথ শ্রাবণ বৃষ্টির শেষ দিন রক্ত ঝরেথ হানিফার হাতের লাঠি মাটিতে প্রোথিত হয়ে যেতে থাকে। তার গোর্জো মাটির বুকে গভীর থেকে গভীরতম প্রদেশে ঢুকে যায়।
হানিফা এক হাতে লাঠি আরেক হাতে গোর্জো, অনেক শুনেছি সেই লাঠি আর গোর্জো মাটির বুক থেকে আর ওঠে না, প্রায় সাত বছর সে মাটির ওপর উবু হয়ে দুই হাতে লাঠি আর গোর্জো নিয়ে বসে থাকে।

তারপর একদিন তেরোশো নদীর জলোচ্ছল শব্দ আকাশ-বাতাস ভেঙে হানিফার কানে বাজে। আমরা শুনেছি, ধীরে তার গোর্জো আর লাঠি মাটির গভীর থেকে উঠে আসে। সে এক হাতে লাঠি ঘোরায় আরেক হাতে গোর্জো নাচায়থ চিৎকার করে বলে, কই কোনঠে পলেয়া আছেন, আইসেন হামার সামোতে, গোর্জের ফলায় তোর বুক চিরিয়া রক্ত পান করিম।
হানিফা উঠে দাঁড়ায়। কাছারির মাঠে হাটে বাজারে মসজিদের প্রাঙ্গণে তাকে অবিরাম ঝড়ের গতিতে লাঠি খেলতে দেখা যায়। আমরা অবাক হয়ে লক্ষ্য করি, সেই লাঠির দৈর্ঘ্য ক্রমেই দুই কাঁধে লম্বা থেকে লম্বা হচ্ছে। আর হানিফা উচ্ছল স্বরে ডাকছে, আয় বাচ্চারা আয়, হামার কাছে আয়। এই বাঁশের লাঠি ধরিয়া ঝুলি পড়।
চারদিক থেকে জলেশ্বরীর শিশুরা ছুটে আসে। একে একে তারা হানিফার ক্রমঊর্ধ্বমান লাঠি ধরে ঝুলে পড়ে। কারও সঙ্কুলান হয় না। মুরুব্বিরা বলে, ও হানিফা, তুই কোন বাচ্চাদের ডাকিস? তোর বাচ্চা তো একাত্তরেই গেইছে আর আইজ দশ বছর পর তোর বেটি কি এলাও ছয় মাসে আছে?
হানিফা বলে আছে, আছেথ বাপের বয়স বাড়ে, মা ও জননীর বয়স বাড়ে, বাচ্চার বয়স বাড়ে না। ঐ দ্যাখ, মোর চারিদিকে কত বাচ্চা। যত বাচ্চা আসিবে, সবার স্থান হইবে আমার এই লাঠিতে। এই বলে সারা জলেশ্বরীতে হানিফা তার দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতম লাঠিতে শত বাচ্চাকে নিয়ে নাচ করতে থাকে। জীবনের নাচ। শিশুদের বড় হয়ে ওঠার নাচ।
আমাদের গল্পপটে শূন্য স্বপ্নিল জমিতে হানিফা নেচে চলে আজ, কাল, আগামীকাল আর অবিরাম সম্মুখের দিনগুলোর দিকে। শিশুদের আনন্দ কলরবে জগৎ ভেসে যায়।
আমাদের গল্প-পট বাংলার বুকে মেলন হয়ে পড়ে থাকে।

অনুলিখন : আনোয়ারা সৈয়দ হক

২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬। সকাল ১০টা। ইউনাইটেড হসপিটাল, ঢাকা।

 

Page 8 of 8

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…