Page 2 of 8

লেখকের স্বাধীনতাই
তার লেখকসত্তা

হাসান আজিজুল হক

 

১৯৪৭ সালে যখন দেশ ভাগ হয়ে যায় তখন আমার বয়স বেশ কম। অনেকের ধারণা, আমি ওই বাংলা থেকে এই বাংলা এসেছি নিশ্চয় কোনো চাপের মুখে। কথাটি একেবারেই ঠিক নয়। আমি কোনো চাপের সম্মুখীন হইনি।
গ্রাম থেকেই স্কুল ফাইনাল এক্সামিনেশন দিয়েছি ১৯৫৪ সালে। তখন আর ম্যাট্রিকুলেশন বলা হতো না। ১৯৫৪ সাল থেকেই পরীক্ষার নাম হয়ে ছিল স্কুল ফাইনাল। সচ্ছল হলেও আমাদের গ্রামের একটা খ্যাতি ছিল। এই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা কাশিমবাজারের মহরাজা মণীন্দ্র চন্দ্র নন্দী। আমাদের গ্রাম ছিল তার শ্বশুরবাড়ি। গরিব ঘরের মেয়ে কাশীশ্বরী দেবীকে তিনি বিয়ে করেছিলেন। পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার ওই যবগ্রাম মহারানী কাশীশ্বরী উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয় থেকে পাস করেছি। চাপের মুখেই যদি দেশ ছাড়তাম তাহলে ১৯৪৭ সালেই ছাড়তাম। তা না করে আমি সাত বছর ওই পশ্চিমবঙ্গেই ছিলাম। এ থেকে একটা কথা স্পষ্ট, সাম্প্রদায়িকতা নগ্ন চেহারা আমার আশপাশে দেখিনি। সব জায়গাতেই সাম্প্রদায়িকতা শুরু করে চিহ্নিত কতিপয় সাম্প্রদায়িক ব্যক্তি। তারা কখনো স্বার্থ, কখনো হিং¯্রতা থেকে কাজটি করে। এটি এই বাংলাতে দেখেছি, ওপার বাংলাতেও দেখেছি।

১৯৪৬ সালে কলকাতায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় একদিনেই কয়েক লাখ লোক মারা গিয়েছিল ঠিকই কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের একেবারে পশ্চিম সীমান্তবর্তী গ্রাম হওয়ায় আমরা ওই দাঙ্গার বিষয়টি তেমন টের পাইনি। নির্বিঘেœই ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত গ্রামের স্কুলে লেখাপড়া করেছি। যাহোক, স্কুল ফাইনাল এক্সামিনেশন পাস করার পর হয়তো ওখানেই অর্থাৎ বর্ধমানে রাজ কলেজে ভর্তি হতাম। কিন্তু পাস করার পর বিশেষ কারণে এ দেশে এসেছিলাম। বিশেষ কারণ বলতে, আমার ভগ্নিপতি মাইকেল মধুসূদন দত্ত কলেজে এবং তারপর কিছুদিনের মধ্যেই দৌলতপুর বিএল

(ব্রজলাল) কলেজে ইংরেজির অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত হন। আমার একমাত্র বড় বোন ও ভগ্নিপতির ইচ্ছা হলো, আমি যেন বিএল কলেজেই ভর্তি হই। শেষ পর্যন্ত তা-ই হলো। আমি খুলনার দৌলতপুর এসে বিএল কলেজে ভর্তি হয়ে যাই, থাকি বোনের বাড়িতে। কলেজ জীবনে বহু স্মৃতি আছে। কতো স্মৃতির কথা আর বলবো! তখন থেকেই আমার লেখালিখি শুরু। এক বন্ধু জোটানো গেল। ওই বন্ধুর চার আনা আর অনেক কষ্টে জোগাড় করা আমার চার আনাÑ এই আট আনা দিয়ে আমরা কাগজ-কালি কিনতাম। ওই সময়টা দেয়াল পত্রিকার খুব চল ছিল। দেয়ালের গায়ে হাতে লেখা পত্রিকা, গল্প, কবিতা বোর্ডের মতো করে ঝুলিয়ে দেয়া হতো। সেখানে পাঠকরা পড়ে পাশে মন্তব্য লিখে যেতেন।
পত্রিকা এক সপ্তাহ পর পর পরিবর্তন করা হতো। আমি আর আমার বন্ধু বিমল মিলে দেয়াল পত্রিকা বের করতাম। একটু একটু গল্প লিখতাম, কোথাও থেকে কবিতা জোগাড় করতাম। এই মিলে দেয়াল পত্রিকা বের করতাম। ওই দেয়াল পত্রিকা থেকেই আমার সাহিত্যকর্ম শুরু। ওখানে দেখেছিলাম, আমাদের প্রিন্সিপাল এএফ ফজলুর রহমান লিখেছিলেন, ‘আই শ্যাল নট টেক মাই ক্লাস টুডে’। তখন এক ছেলে এসে ক্লাসের ‘সি’টা মুছে দেয়। এর মানে দাঁড়ায় ‘ল্যাস’, মানে বালিকাদের। খুবই  খারাপ কথা।  যখন প্রিন্সিপাল এসে দেখলেন ছাত্ররা মজা করেছে তখন তিনি ‘এল’টাও মুছে দিলেন। তখন মানেটা দাঁড়ালো, ‘আই শ্যাল নট টেক মাই অ্যাস টুডে’। ফলে ছাত্ররা সব গাধা হয়ে গেল। এমন অনেক মজার মজার স্মৃতি রয়েছে। কলেজ ছাত্ররা রাজনীতি করতো দেশের প্রয়োজনেই। কোনো পিটাপিটি-মারামারি, ভাগ বসানোÑ এসবের ব্যাপার ছিল না। স্বার্থ উদ্ধারের জন্য কেউ রাজনীতি করতো না। সম্পূর্ণ আদর্শভিত্তিক রাজনীতি। আমিও এর মধ্যে ঢুকে পড়েছিলাম। তখন সদ্য প্রতিষ্ঠিত ছাত্র ইউনিয়নের সম্ভবত

দ্বিতীয় কমিটিরই সক্রিয় সদস্য ছিলাম। এরপরই গ্রামের স্কুলে পড়াশোনা করা লাজুক ছেলেটি অল্প সময়ের মধ্যে যথেষ্ট রকমের কথাবার্তা বলতে শুরু করলাম। আমাদের কাছে তখন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী প্রধান নেতা ছিলেন। আমাদের লক্ষ্য ছিল, ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র। আমরা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করতাম, পশ্চিম পাকিস্তানে পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন। তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের সম্পূর্ণভাবে শোষণ করার জন্যই ডিভিশনটি ওয়েলকাম করেছিল। তারা তখন মনে করেছিল, এটি হলে আর কোনো সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে না। কলকাতা আর পূর্ব বাংলা একসঙ্গে থাকলে সেখানে অনেক অসুবিধা। তখন আমাদের সাহিত্য তো তেমন হয়ে ওঠেনি। যে ক’জন বড় বড় লেখক ছিলেন তারা কলকাতাতেই চাকরি করতেন। আহসান হাবীব, সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ ও সরদার জয়েন উদ্দীন। তাদের মধ্যে সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ দেশ-বিদেশ  ঘুরে বেড়াতেন। সরদার জয়েন উদ্দীনও কলকাতাতেই চাকরি করতেন। তখন একমাত্র আবু ইসহাককেই আমরা বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক বলতাম। তার ‘সূর্যদীঘল বাড়ি’ উপন্যাসটিই আমরা গৌরবের বলে মাথায় রাখতাম। আমার ওপার বাংলার সাহিত্য নিয়ে বেশি পড়াশোনার কারণ ছিল, সেখানেই আমার প্রথম শিক্ষা জীবন পার করেছি। স্কুলের লাইব্রেরি ছিল। সেখানেই প্রচুর পড়াশোনা হয়ে গেছে। শরৎচন্দ্র, বঙ্কিমচন্দ্র পড়া হয়ে গিয়েছিল। তাছাড়া মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশংকর, বিভূতিভূষণ প্রমুখ ওখানেই শেষ করি।
১৯৫৭ সালে একটি উপন্যাস ‘শামুক’ লিখেছিলাম। সেটি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মৃতি উপন্যাস প্রতিযোগিতায় দিয়েছিলাম। তা এতোকাল চাপা পড়ে ছিল। এখানে খুব বই সংগ্রাহক খোন্দকার সিরাজুল হক একদিন আমাকে দেখান, আমি যে উপন্যাসটি জমা দিয়েছিলাম সেটি তার কাছে আছে। ব্যস, ওই শুরু। তিনি আমার পেছনে লেগে গেলেন বই আকারে প্রকাশ করার জন্য। অবশেষে ২০১৫ সালের বই মেলায় তা প্রকাশ করা  হয়। বইটি বের করে কথা প্রকাশনী।
১৯৫৭ সালে লেখালেখিটা একটু করে চলছিল। ১৯৫৮ সালে যখন বাধ্যতামূলক টিসি নিয়ে আসি তখন আমার অসম্ভব দৈন্যদশা। বাবা পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানে। আমার বড় ভাই খুব ছোট চাকরি করেও দশটি করে টাকা ও অনার্সের একটি করে বই পাঠাতেন। তখন অধ্যাপক আবদুল হাই আমাকে খুব ¯েœহ করে রাজশাহী কলেজের নিরিবিলি একটা সার্ভেন্ট কোয়ার্টার দিলেন। একই সঙ্গে সব সহযোগিতার আশ্বাস দিলেন।


আত্মীয়স্বজন কেউ নেই, বড় ভাইও ঢাকায় থাকেন। তখন একা আমি। অনেক লড়াই করেছি। কিন্তু কখনো ভয়ে ভীত হইনি। কখনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত করিনি।  যারা সবচেয়ে অগ্রসর তাদের সঙ্গেই থেকেছি। প্রগতিশীল আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকতে ভয়ও পাইনি। আমার কাছে পঞ্চাশের দশকের স্মৃতিটা এক অর্থে বলতে হলে মানুষের পেশিশক্তি পাকিয়ে ওঠার মতো। আমার রাজনৈতিক চিন্তা ও দর্শনচিন্তার বিকাশ ঘটছে। এর প্রভাব আমার পরবর্তী সাহিত্য জীবনে এসে পড়েছে। তাই আমার সাহিত্যকর্মে যতো মর্মান্তিক বিষয়ই থাকুক না, কখনো কোনো ভেজা চোখ দেখা যাবে না, কখনো কোনো দুর্বলতার প্রশ্রয় পাওয়া যাবে না, রোমান্টিক ভাবালুতা মিলবে না।
১৯৬০ সালের মার্চে রাজশাহী শহরের মিয়াপাড়ার একটি ভাড়া বাড়িতে কাঠের তকতায় বুকে তুলার বালিশ দিয়ে ‘শকুন’ গল্পটি লেখা হয়েছিল। ১৯৬০ সালে ‘শকুন’ লেখার পরই মোটামুটি ঠিক করি, লেখালেখিটাই আমার মুখ্য। এখানেই থাকবো। এর পাশাপাশি অধ্যাপনা করবো। কারণ সেখানে আমার স্বাধীনতা কেউ হরণ করতে পারবে না। অন্য কোনো পেশায় তা সম্ভব নয়। তাই সিএসএস পরীক্ষা দেয়া বা অন্য কোনো বড় চাকরির ব্যাপারে চেষ্টাই করিনি, একদম করিনি। শিক্ষকতাই করবো বলে স্থির করি এবং তা-ই করেছি। লেখালেখির জীবনটা বেছে নিয়ে এর মধ্য দিয়ে আজও বেঁচে আছি।

বর্ষা রানীর ঈদ

 

 



পৃথিবীজুড়ে সৃষ্টির উৎসব বৃষ্টিতেই। আর এই বৃষ্টি বর্ষার কন্যা। বর্ষা রানীর সব উপাদান দিয়েই সাজানো আমাদের এই জগৎ। কী জমিনে, কী অন্তরীক্ষে রানীর আগমনে বদলে যায় সব, নদী-খাল-বিল ফিরে পায় যৌবন। মেঘবতী আকাশ জলে টইটুম্বুর।

‘কেমন বৃষ্টি ঝরেÑ মধুর বৃষ্টি ঝরেÑ ঘাসে যে বৃষ্টি ঝরেÑ রোদে যে বৃষ্টি ঝরে আজ/কেমন সবুজ পাতাÑ জামীর সবুজ আরোÑ ঘাস যে হাসির মতোÑ রোদ যে সোনার মতো হাসে/Ñ কবি জীবনান্দ দাশের এই পঙ্ক্তিতে যথার্থই প্রকাশ পেয়েছে ঋতু রানী বর্ষা। মেঘ যেন সেজেই বসে থাকে, ইচ্ছা হলেই নামবে যখন-তখন।

গ্রীষ্মের তাপদাহে বিবর্ণ প্রকৃতির প্রাণ ভিজিয়ে দিতেই বর্ষার আয়োজন। ঝরে অবিরাম বর্ষাধারা। থেমে থেমে মেঘ কল্লোলে নেচে ওঠে প্রাণ। উঠানে জলের নৃত্য। বাতাসে বাতাসে দুলে ওঠে শাপলা-পদ্মের ছন্দমধুর কাব্য। তবে এমন প্রকৃতির দৃশ্যপট কোথায় মিলবে এই শহরে? দিনভর কদম আর রাতজুড়ে মল্লিকার মাতাল সুবাস কে এনে দেবে আমাদের এই প্রিয় ইট-পাথরের জঙ্গলে! বর্ষার রূপ দেখতে হলে যেতে হবে আমাদের শিকড়ে, আমাদের গ্রামে। অবারিত খোলাপ্রান্তর, ঘন-কালো মেঘ, আকাশ যেখানে সেজে আছে দীর্ঘ পরিসরেÑ এমন বিমুগ্ধঘোর, গম্ভীর আবেদন, অন্তর অলিন্দে প্রেমানন্দে গেয়ে ওঠেÑ

‘এমন দিনে তারে বলা যায়/এমন ঘনঘোর বরিষায়!/এমন মেঘস্বরে বাদল-ঝর ঝর/তপনহীন ঘন তমসায়।’

বর্ষার রূপ, রস, সুন্দরে বিমোহিত এই জনপদের কবি-শিল্পী তথা সৃজনশীল মানুষ। বর্ষার অবারিত জল-হাওয়ায় প্রলুব্ধ বাংলার ভাটিয়ালি সুর ও স্বরে প্রকৃতি কাঁদে এবং কাঁদায় বিরহীমন। মেঘের ডাক শুনে বুকের ভেতর গুমরে ওঠে প্রিয়জনকে পাশে না পাওয়ার আকুলতা। রাধারূপী সব প্রেমিকা আভিসারে ছুটতে চায় যেন। বরষার ঝরা জলে আছে এমন আর্তি-কীর্তি, আছে ভাঙন ও ডুবে যাওয়া সমতল সংসার। বর্ষা মানেই কেমন কেমন! বর্ষা মানেই এই মেঘ এই বৃষ্টি, রৌদ্র-ছায়ার আপসহীন লীলা যা অবশ্যই লোকনন্দন বিষয়।

বর্ষা বাংলা বর্ষের দ্বিতীয় ঋতু এবং এর স্থিতি আষাঢ় ও শ্রাবণ (মধ্য জুন থেকে মধ্য আগস্ট)Ñ এই দুই মাস। বর্ষাকাল প্রধানত দক্ষিণ-পশ্চিম বায়ুপ্রবাহের ফল। মূলত অবিরাম বৃষ্টিতে স্ফীত হয় বর্ষার জলধারা। সবুজ লাবণ্যময় হয়ে ওঠে রূপসী বাংলা। বসন্ত আর বর্ষাÑ এই রাজা-রানী বাংলা ঋতু পার্বণ ও রূপ-লাবণ্যে বিপরীত সুন্দর।

পার্বণপ্রিয় বাঙালিদের মধ্যে বর্ষা ধর্মীয় অনুভূতি জাগিয়ে তোলে নানান আঙ্গিকে। আষাঢ়ের পূর্ণিমাতিথি গৌতম বুদ্ধের গৃহী জীবন ও বুদ্ধত্ব লাভের পর তার জীবনের বহুমাত্রিক স্মৃতিতে সমুজ্জ্বল। এদিকে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রকৃতি পূজার অংশ হিসেবে সর্প দেবী মনসা পূজার প্রচলন বোধহয় প্রচীনকাল থেকেই।
এছাড়া সনাতন ধর্মাবলম্বীরা জগন্নাথ পূজা ও রথযাত্রার মতো ধর্মীয় কার্যকরণ পালন করে থাকেন এ বর্ষা ঋতুতেই।

গত কয়েক বছরের মতো এবারেও চন্দ্র মাস হিসেবে মুসলিম সম্প্রদায়ের বিশেষ উপাসনার মাস রমজান শুরু হয়েছে জ্যৈষ্ঠে। তাই বহু কাক্সিক্ষত ঈদুল ফিতর পালিত হবে এ আষাঢ়েই...। ঘনঘোর আষাঢ়ে মেঘের ফাঁক গলে শাওয়াল মাসের বাঁকা-ক্ষীণ চাঁদ দেখা গেলেই শুরু হবে ঈদের আড়ম্বর। ঘরে ঘরে বাঙালি মুসলমানরা দীর্ঘ সিয়াম পালন শেষে আত্মিক আনন্দে নিজদের বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত আরাধনার ঈদে। এই ঈদ ধনী-গরিব সবার। বিশ্ব ভ্রাতৃত্বের এই মেলবন্ধন জগতে বিরল। ঈদুল ফিতর মুসলিম অর্থনীতিতে বেশ তাৎপর্য বহন করে জাকাত ও ফিতরার মাধ্যমে। ব্যক্তি, পরিবার ও সামাজিক হক সম্পর্কে সজাগ করে তোলে প্রতিটি মুসলমানের অন্তর। চন্দ্র মাস হিসেবে বাংলার প্রতিটি ঋতুতে ঘুরে ঘুরে আসে এই ঈদ...। এবারের বৃষ্টিমগ্ন ঈদ হয়তো ভেজাবে আনন্দের শীতলতায়... জলাধারের স্ফটিক স্বচ্ছ জলে শাওয়ালের চাঁদে রঙিন ছায়ার-মায়ায় বাঙালি জনপদ হয়ে উঠুক সব মানুষের আনন্দলোক।

 

_____________________________________
আয়োজনে : স্বাক্ষর জামান ছবি : কৌশিক ইকবাল
পোশাক : সোহান করিম
মেকওভার    : মানামি ইলাহী
মডেল : সাদিয়া রায়হান
লেখা : শাকিল সারোয়ার

মূল্যবোধ পুনরুজ্জীবিত করতে হবে

আলী যাকের

 

 


বয়স যখন বাড়ে, মানুষের কর্মক্ষমতা হ্রাস পেতে থাকে তখন স্বভাবতই তারা পেছনের দিকে তাকান। অনেকে মানুষের এই অতি স্বাভাবিক আচরণের প্রতি তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে। অথচ এটিই মানুষের ধর্ম। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ কেন স্মৃতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে এ সম্পর্কে অনেকে অনেক রকম ব্যাখ্যা দিয়েছেন। আমি নিজের মতো করে বিষয়টি নিয়ে ভাবার চেষ্টা করেছি। এ বিষয়ে আমারও একটি ব্যাখ্যা আছে। আমি মনে করি, মানুষ যখন দুর্বল হয়ে পড়তে থাকে, বয়সের ভারে ন্যুজ্ব দেহ তখন সে অতীতের স্মৃতি থেকে, তার যৌবন থেকে শক্তি সঞ্চয় করার চেষ্টা করে। এতে অন্যায়ের কিছু দেখি না। আমি মনে করি, এটিই স্বাভাবিক। এই যে পেছনে ফিরে তাকানো, এই যে স্মৃতির মেলা ভিড় করে আসা আমাদের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে, এতে এমন অনেক কিছুই খুঁজে পাই স্মরণে যা থেকে আমরা বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য অনেক দিকনির্দেশনা পেতে পারি। আমার মনে পড়ে, বেশ কিছুকাল আগে এই বিষয়ের ওপর ইংরেজি একটি কলাম লিখেছিলাম। এর শিরোনাম ছিল ‘ণবংঃবৎফধু, ড়হপব সড়ৎব!’ এ শিরোনামটি অনেক বছর আগের একটি ইংরেজি গান থেকে নেয়া। এ গানটি আমাদের তারুণ্যে আমরা গুন গুন করে গাইতাম। ইংরেজিতে একটি শব্দ আছে ‘নস্টালজিয়া’। এর কোনো জুতসই বাংলা খুঁজে পাইনি। ‘স্মৃতিনির্ভরতা’ বোধহয় এর সবচেয়ে কাছাকাছি শব্দ। তবে গোল বাধিয়েছে ‘নির্ভরতা’ শব্দটি। নস্টালজিয়া বলতে মনে যে ভাবের সঞ্চার হয় সেটিকে একটি বাক্যে আমরা বর্ণনা করতে পারি এভাবেÑ ‘স্মৃতি সততই সুখের’। এই সুখস্মৃতি সব বয়সের সব মানুষের জন্যই সমান আবেদন সৃষ্টি করে বলে আমার মনে হয়। আমার মনে আছে, আমি অত্যন্ত অপরিণত বয়স থেকে স্মৃতিস্পর্শ। আমার প্রিয় একটি নীল তোয়ালে ছিল। একবার মায়ের সঙ্গে কলকাতায় নানাবাড়ি যাওয়ার সময় ট্রেন থেকে জানালা গলে ওই তোয়ালেটি বাতাসে উড়ে যায়। আমার ইচ্ছা হচ্ছিল চেইন টেনে ট্রেন থামিয়ে তোয়ালেটি খুঁজে নিয়ে আসি। ওই কাজটি করা থেকে আমাকে নিবৃত্ত করেন মা। যা ছিল, এখন নেই এর প্রতি মানুষের আকর্ষণ সর্বদাই সবচেয়ে বেশি। এ কারণেই বোধহয় চিন্তাশীল মানুষের কাছে স্মৃতি বিষয়টি এতো হৃদয়ের কাছাকাছি এসে যায়। এ রকম বেশকিছু স্মৃতি আছে অতীতের যা কখনোই ভুলে যাওয়া যায় না। মুক্তিযুদ্ধের কথাই ধরা যাক। আমাদের প্রজন্মের যারা ওই যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করেছে কিংবা এতে অংশগ্রহণ করেছে তাদের পক্ষে ওই সময়কার স্মৃতি ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়। এ রকম অনেক বিষয় আছে।


ভুলে যাওয়া সম্ভব নয় বাল্যকালের দিনগুলো। আমি নিশ্চিত, প্রত্যেকেরই বাল্যকাল নিয়ে মধুর সব স্মৃতি রয়েছে। অনেক দুঃখজনক স্মৃতিও থাকতে পারে। কিন্তু মানুষ দুঃখের কথা ভাবতে চায় না। ওই সুখস্মৃতিগুলো ধরে রাখে হৃদয়ে। আমার বাল্যকালের অধিকাংশ সময় কেটেছে খুলনা ও কুষ্টিয়ায়। থাকার জন্য খুলনায় বাবা একটা ছোট্ট কিন্তু সুন্দর বাড়ি পেয়েছিলেন খুলনা পুলিশ লাইনসের ঠিক উল্টোদিকে। প্রসঙ্গত উল্লেখ করতে হয়, ওই বাল্যকালের পর অনেকবারই যেতে হয়েছে খুলনায়। ওই শহরে গিয়ে যে ঠিকানাতেই থাকি না কেন, রিকশা করে কিংবা হেঁটে একাধিকবার ওই বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়া-আসা করেছি এবং প্রতিবারই যেন ফিরে গিয়েছি ওই বাল্যকালে। অনেক খ- স্মৃতি মনে এসেছে যেন কোনো নিñিদ্র অন্ধকার থেকে লাফিয়ে উঠে এসে উপস্থিত হয়েছে একেবারে দুই চোখের সামনে। ওই বাড়ির সামনেই পুলিশ লাইনস সংলগ্ন একটি গলি চলে গিয়েছিল ভেতর দিকে। ওই গলির মুখে একটা ছোট্ট মুদির দোকান ছিল। ওই দোকানে এক আনা পয়সা দিলে এক টুকরো গুড় পাওয়া যেতো। কোনো সময় মা আমার কোনো কাজে খুশি হয়ে যদি এক আনা পয়সা আমাকে বখশিশ দিতেন তাহলে দৌড়ে চলে যেতাম ওই দোকানেÑ এক টুকরো গুড় কিনতাম, খেতে খেতে চোখ বুজে আসতো। স্বর্গসুখ কাকে বলে ওই স্বাদ যেন পেতাম গুড়ের টুকরোর মধ্যে। অমন মিষ্টি আর জীবনে কখনো খেয়েছি বলে মনে পড়ে না। প্রাসঙ্গিকভাবে চলে আসে আমার মিষ্টির প্রতি দুর্বলতার কথা। ইংরেজিতে যাকে বলে ঝবিবঃ ঞড়ড়ঃয তা-ই আমার ছিল বাল্যকাল থেকে। আরো পরে আমাদের দল যখন নাটক করতে ঢাকার বাইরে বিভিন্ন শহরে গেছে সেখানকার নাট্যবন্ধুদের প্রথমেই জিজ্ঞাসা করতাম, আচ্ছা, তোমাদের শহরের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ মিষ্টি কী? তারপর হৈ-হুল্লোড় করতে করতে সবাই মিষ্টি খাওয়ার জন্য বেরিয়ে পড়তাম


রাস্তায়। এখন অবশ্য মিষ্টি খাওয়ার কথা ভাবাও প্রায় পাপ। আমার রক্তে মিষ্টির আধিক্যে আজ মিষ্টিহীন জীবন যাপন করছি।
যাকগে সে কথা। ফিরে যাই খুলনার গুড়ের টুকরোয়। ওই মিষ্টি ছিল আমার খাওয়া শ্রেষ্ঠ মিষ্টি। খুলনায় আমরা অর্থাৎ আমি, আমার ছোট বোন ও পাশের বাড়ির নাজমা সারা দিন নানান দুষ্টুমি করতাম। সেটি মোরব্বা চুরি থেকে শুরু করে পাশের বাড়ির কিচেন গার্ডেন থেকে গাজর-মুলা চুরি, পাড়ার বন্ধুদের সঙ্গে সাত চাড়া খেলা নিয়ে ফাইট, কিং কং খেলায় সহখেলোয়াড়দের পিঠে ভীষণ জোরে টেনিস বল ছুড়ে দেয়াÑ এসব। খুলনায় পুরনো একটা সার্কিট হাউস বিল্ডিং ছিল যশোর রোডের ধারে বিশাল মাঠের একপাশে। ওই সার্কিট হাউসের সামনে একটা অ্যারোপ্লেনের কঙ্কাল পড়ে ছিল। ওই প্লেন নাকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বিধ্বস্ত হয়েছিল কাছে-পিঠে কোথাও। ব্রিটিশরা ওইখানে ফেলে রেখে গিয়েছিল। আমরা যখন ওই প্লেনের কঙ্কাল আবিষ্কার করি তখনো এর হাড়গোড় সব ক্ষয়ে যায়নি। গদিহীন সিটের খাঁচা ছিল তখনো। এরই ওপর বসে প্লেন চালানোয় মগ্ন হতাম কতো বিকালে। মনে হতো সারা বিশ্ব যেন ঘুরে বেড়াচ্ছি প্লেনে চড়ে। ওই প্লেনের ফাঁকফোকর দিয়ে নানান বুনো লতাগুল্ম মাথা উঁচিয়ে তাকাতো আকাশের দিকে। মনে পড়ে, ওই লতাগুল্মের মধ্যে একটি ঝকঝকে হলুদ কচু ফুল ফুটেছিল। রবীন্দ্রনাথ জোড়াসাঁকোয় ইটের পাঁজার মধ্য দিয়ে মাথা উঁচিয়ে ওঠা রক্তকরবী ফুল আবিষ্কার করেছিলেন। এই আবিষ্কারের অনুপ্রেরণা আমাদের এক অসাধারণ নাটক দিয়েছে ওই ফুলের নামেই। আমার ওই গাঢ় ঝকঝকে হলুদ কচু ফুল দেখলেই তা খেতে ইচ্ছা করতো। ওই প্লেনের কঙ্কালের ভেতরে বসে খেলায় আমার নিত্যসঙ্গী ছিল আমার বোন ঝুনু। তার অনুপ্রেরণা ও আমার লোভের বশবর্তী হয়ে কচরমচর করে ওই ফুল খেয়েছিলাম একবার। মনে আছে, গলা ফুলে ঢোল হয়ে গিয়েছিল। লেবু, তেঁতুল ইত্যাদির সঙ্গে মায়ের হাতে মারও খেতে হয়েছিল প্রচুর। এই মারের চেয়েও ভয়ঙ্কর ছিল কচু ফুলের কণ্ঠরোধ করা ওই বেদনা। মনে পড়ে, মা-বাবার সঙ্গে সরকারি লঞ্চে সুন্দরবনে গিয়েছিলাম একবার। বাবা পাকা শিকারি ছিলেন। তার ছিল একটি অত্যন্ত নামজাদা বিলেতি কোম্পানির তৈরি দোনলা বন্দুক। বাবা অনেক হরিণ শিকার করেছিলেন ওই যাত্রায়। হরিণ শিকার বোধহয় বৈধ ছিল তখন। মনে পড়ে, দারুণ উল্লসিত হয়েছিলাম আমরা সবাই। আজ যখন জীবনানন্দ দাশের ‘ক্যাম্পে’ কবিতাটি পড়ি, ‘ক্যাম্পে শুয়ে, শুয়ে কোনো এক হরিণীর ডাক শুনি, কাহারে সে ডাকে!’Ñ হঠাৎ একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। হরিণের জন্য প্রাণ কাঁদে। হরিণীর জন্য প্রাণ কাঁদে। জীবনের দুই-তৃতীয়াংশ পেরিয়ে এসে অনেক অতীত ভাবনা অথবা কাজ নিয়ে গ্লানিবোধ হয়। এটিই বোধহয় নিয়ম।


বাবা কুষ্টিয়ায় এলেন এরপর। কুষ্টিয়ায় আমার বোধবুদ্ধির উন্মেষ ঘটে বললে বাড়িয়ে বলা হবে না। এই একটি ব্যাপার আছে যা সবার বেলায় এক সময় বা একই পরিস্থিতিতে হয় কি না বলা মুশকিল। বুদ্ধির সঙ্গে হয়তো মানুষের বয়সের একটি সম্পর্ক থাকতে পারে। কিন্তু বোধের সম্পর্ক? মনে হয় তা সম্ভব নয়। প্রসঙ্গ যখন উঠলোই তখন বিষয়টি সম্পর্কে আরো দু’চারটি কথা বলতে চাই। সুকান্তের ওই বিখ্যাত লাইন নিশ্চয়ই অনেকের মনে আছে, ‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়’। তাই তার কাছে পূর্ণিমার চাঁদটি মনে হয়েছিল ঝলসানো রুটি। বোধের সঙ্গে মনের যেমন একটি প্রগাঢ় সম্পর্ক আছে তেমনি দেহেরও একটি সম্পর্ক আছে অবশ্যই। খেয়াল করা সম্ভব হবে, চাঁদ যতোই ঝলসানো রুটি বলে তার কাছে মনে হোক না কেন, ঝলসানো রুটির কথা মনে করে কবিতা ‘ছুটি’ দেয়ার অন্ত্যমিল সম্পর্কে তিনি সচেতন ছিলেন ঠিকই। অর্থাৎ তার দারিদ্র্য বা ক্ষুধা তাকে কাব্যবিমুখ করতে পারেনি। তবুও বলবো, কুষ্টিয়ায় আমার ওই বাল্যকালে নিসর্গের সৌন্দর্যের প্রতি আকর্ষণ এই তীব্রতা পেতো না যদি আমার উদর পূর্ণ না থাকতো। বয়সের তোয়াক্কা না করেই বোধের উন্মেষ হতে পারে। তবে বুদ্ধির স্ফুরন হয় কি না তা বলতে পারবো না। বাল্যকালের এসব স্মৃতি আমাকে আজকের এই জায়গায় আসতে সাহায্য করেছে। অবশ্য আমি স্বীকার করি, আমার জীবনে যদি ভালো কোনো কাজ করে থাকি তাহলে সেটি যে যা-ই বলুক না কেন, অকিঞ্চিৎকর কাজ।


যাহোক, এই কলামে ব্যক্তিগত কথাগুলো বললাম এ কারণে যে, আমাদের অতীত আমাদের সবার জীবনে কোনো না কোনোভাবে স্পর্শ করে যায়। একটু চিন্তা করলে দেখা যাবে, আমাদের সবারই জীবন কিছু মূল্যবোধ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল। ওই মূল্যবোধগুলো নিয়ে কথাবার্তা হয় প্রায়ই এবং দুঃখজনক হলেও সত্য, আমরা বুঝতে পারি, আমাদের জীবনে মূল্যবোধের অবক্ষয় এতো সর্বগ্রাসী হয়েছে যে, আমরা একটি বিপজ্জনক অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছি। সেদিন কোনো একটি টেলিভিশন চ্যানেলে একটি আলোচনাচক্রে আমাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, আমাদের সমাজে ক্রমবর্ধমান অস্থিরতা, দুর্নীতি ও সংঘাতের পেছনে যে পথভ্রষ্ট তরুণ সমাজ আজ ব্যাপৃত আছে এর কারণটি কী এবং এখান থেকে কীভাবে পরিত্রাণ পাওয়া যায়? বলেছিলাম, এই পথ হারানো তরুণদের পথ দেখানোর দায়িত্ব যাদের ছিল অর্থাৎ আমাদের প্রজন্মÑ তারা তাদের কাজটি ঠিকভাবে সম্পন্ন করেনি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর আমাদের প্রজন্ম কেবল অর্থ উপার্জনে নিজেদের সম্পূর্ণভাবে ব্যতিব্যস্ত রেখেছে। পরবর্তী প্রজন্মকে কখনোই তারা সঠিক পথ দেখায়নি। এই অপরাধের মাসুল আজ দেশ ও জাতিকে দিতে হচ্ছে। এখনো যদি আমরা আমাদের কর্তব্যের প্রতি উদাসীন থাকি তাহলে দুই প্রজন্ম পর এ দেশে ভালো মানুষ আর থাকবে না। অথচ আমাদের প্রজন্মের সবাই নিজের গুরুজনদের তত্ত্বাবধানে সব মূল্যবোধ সম্পৃক্ত একটি সমাজ ব্যবস্থা সম্পর্কে শুনে এসেছেন, প্রত্যক্ষও করেছেন। আমরা কেন এখনো ওই মূল্যবোধ পুনরুজ্জীবিত করে একটি সুস্থ ও সুন্দর সমাজ যেখানে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম সৎ চিন্তা নিয়ে বেড়ে উঠতে পারে ওই কাজে ব্রতী হই না?


লেখক : সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

চিহ্ন

শহীদুল হক খান

 

 


ডিভোর্সের কথা চলছিল কয়েক মাস ধরেই। পলিনা ও পরশকে প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন অনেক বোঝাতে চেষ্টা করেছে। তবে তাদের মতের পরিবর্তন হয়নি। পরশ বলেছে, আমরা একে অপরকে ভালোবেসে বিয়ে করেছি। কিন্তু বিয়ের তিন সপ্তাহ যেতে না যেতেই দেখেছি আমাদের মতের অনেক অমিল, চিন্তার অমিল, পরিকল্পনার অমিল।
বন্ধুবান্ধবরা বলেছে, তোমাদের হাসিমুখ দেখে তো তা মনে হয় না। কী চমৎকার হেলে-দুলে হানিমুন করে এলে! পরশ জবাব দিয়েছে, হানিমুন করা মানেই সুখী সংসার নয়। এক বিছানায় ঘুমানো মানেই সুখী দম্পতি নয়।
এরপর সবার অনুরোধ রাখতে গিয়ে তারা হিসাব করে করে তিনটি বছর পার করলো। তারপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো। সেদিন ছিল তাদের বিয়েবার্ষিকী। সকালে পলিনা নিজ হাতে পরশের জন্য রান্নাবান্না করে এক সঙ্গে খাবার টেবিলে বসলো।  আগে থেকেই ঠিক করা ছিল, তারা আলাদা হয়ে যাবে। কোন কোর্ট-কাচারি নয়, উকিল-ব্যারিস্টার নয়। নিজেরাই নিজেদের ডির্ভোস নিয়ে নেবে। যেহেতু কেউ কারো কাছে কোনো চাহিদা তুলবে না, পাওনা-দেনার কোনো হিসাব-নিকাশ হবে না সেহেতু ভদ্রলোকের মতো দু’জন দু’জনার সঙ্গে সর্ম্পক শেষ করে দিন শেষে দুই পথে চলে যাবে।

খাবার টেবিলে খেতে খেতে প্রথম কথা তুললো পলিনা। বললো, আমার দু’একটি জিনিস নেয়ার ছিল।
নির্দিধায় নিয়ে যেতে পারো। পরশ উত্তর দিলো।
- তোমার সঙ্গে যখন আমার প্রথম পরিচয় হয় তখন তোমার চোখে এই চশমাটা ছিল। আর চশমাটা ছিল বলেই তোমাকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছিল। অনেক ব্যক্তিত্ববান মনে হয়েছিল। তাই এ চশমাটা আমি নিয়ে যেতে চাই।
পরশ চোখ থেকে চশমাটা খুলে রাখলো।
পলিনা বললো, পরে দিলেই হতো, যাওয়ার সময়।
পলিনার চোখের দিকে তাকিয়ে পরশ বললো, যেটা দেয়ার তা আগে দিয়ে দেয়াই ভালো।  
দু’জন ধীরগতিতে খাবার খাচ্ছে। নীরবতা বলে দেয়, এই মুহূর্তে কারো মুখে কথা নেই। আবারও নীরবতা ভাঙলো পরশ। বললো, তোমার পরবর্তী চাওয়া?
পলিনা বললো, গত বছর বই মেলায় তোমাকে একটা হলুদ পাঞ্জাবি কিনে দিয়েছিলাম হিমু সাজার জন্য। ওই পাঞ্জাবিটা আমাকে দাও।
- ওই পাঞ্জাবি দিয়ে তুমি কী করবে? মেয়ে হিমুরা তো হলুদ শাড়ি পরে। আর মেয়েরা তো হিমু হয় না।
আমি কী করবো সেটি তো আমার ব্যাপার, তুমি দিবে কি না বলো?
- আলোচনার শুরুতেই তো বলেছি, যা খুশি তুমি নিতে পারো, আমার আপত্তি নেই।
হ্যাঁ, এ জন্যই আমি তসলিমা নাসরিনের তিনটা বই নিয়ে যাবো।
- কোন তিনটা বই?
আমার ছেলেবেলা, ক আর ফরাসি প্রেমিক।
- এই বই দিয়ে তুমি কী করবে? এগুলো তো অনেক অশ্লীল, নোংরা বই।
না, মোটেও অশ্লীল আর নোংরা বই নয়। এই বইয়ে যা লেখা আছে, সব সত্য।
- তোমার সঙ্গে একমত হতে পারলাম না।
সেটি সম্পূর্ণ তোমার ব্যাপার। কিন্তু আমার কাছে মোটেও তা মনে হয় না।
- তুমি যেহেতু তসলিমাকে পছন্দ করো, তাই এ কথা বলছ।
না, পছন্দ নয়। আমি তাকে সমর্থন করি। আমার মেয়েবেলা বইয়ে তিনি তার ছোটবেলা মামা, চাচা দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিলেন। সে কথা অবলিলায় লিখে পাঠককে জানিয়েছেন। আমি যখন ক্লাস সেভেনে পড়ি তখন আমার এক মামাতো ভাইও আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। কলেজ থেকে ফেরার পথে গাউছিয়ায় এক দুষ্ট ছেলে আমার বুকে হাত দিয়েছিল- কথাগুলো কাউকে বলতে পারিনি।
- এখন যে বলছ?
যেহেতু সর্ম্পক শেষ হয়ে যাবে সেহেতু দু’একটা কথা প্রকাশ করে দিলাম। তাসলিমা ‘ক’ বইয়ে কয়েক কবি

লেখকের সঙ্গে তার আন্তরিকতার কথা বলেছেন। বই ছাপা হওয়ার পর কতো হই চই, কতো মামলা-মোকদ্দমা! পরে দেখা গেল সব চুপচাপ।
- আর কী চাই?
বিশেষ কিছু নয়, একটা ছোট স্মৃতি।
- কী সেই স্মৃতি।
চলো কফি খেতে খেতে বলি।
কফির কাপ হাতে নিয়ে দু’জন গিয়ে বসলো বারান্দায়। কিছুক্ষণ আগে পলিনা গোসল করেছে। তার ভেজা চুলের মিষ্টি গন্ধ এবং বাগান থেকে ভেসে আসা ফুলের গন্ধ একাকার হয়ে গেছে। গাছে গাছে কেমন যেন নেশা লাগানো ভাব।
অনেকক্ষণ পর পলিনার দিকে তাকিয়ে পরশের মনে হলো, পলিনা আসলেই খুব সুন্দর। কিন্তু তার খুব বাজে ধরনের একটা মেজাজ, কোনো কিছুতে আপস না করার জেদ কোনোভাবেই স্বাভাবিক থাকতে দেয় না। ২৪ ঘণ্টার দিনকে মনে হয় যন্ত্রণার ৪৮ ঘণ্টা। অথচ তার সঙ্গে যেদিন পরিচয় হয় সেদিন পরশের এক বন্ধু বলে, তার বোন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। বাংলা বিভাগে। প্রথম দিনের আলাপে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, বাংলা সাহিত্য, বাংলা সংস্কৃতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে দেখেছে পলিনা অনেক বোঝে। শস্তা বিষয় শস্তা জনপ্রিয়তা নয়, অনেক গভীরে যেতে পারে।
পরের সাক্ষাতে আলোচনার বিষয় ছিল খেলাধুলা। এ বিষয়েও তার আগ্রহ ও অভিজ্ঞতা অনেক। তবে খেলা নিয়ে বেশি মাতামাতিটা পছন্দ করে না। যুক্তি দিয়ে দেখিয়েছে, দেশের খেলোয়াড়দের বিজয়ী হিসেবে যতো অতিরিক্ত মাথায় তুলেছে ততোই তারা পচা তালের মতো পড়ে গলে গেছে। পলিনার পরামর্শ- আমাদের সব খেলোয়াড় ভালো, অসম্ভব ভালো। তাদের মাথা নষ্ট না করে ঠিকমতো খেলতে দেয়া দরকার। রাজনীতি, দুর্নীতি নিয়ে সে কোনো মন্তব্য করতে চায়নি। দেশ সম্পর্কে তার ধারণা- এমন দেশ পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই।
প্রেম-ভালোবাসা নিয়ে কথা উঠতেই বলেছিল, কোনো এক সময় হয়তো প্রেম-ভালোবাসা বলে কিছু ছিল। এখন ওসব নেই। যা আছে তা হলো সেক্স। পয়সার বিনিময়ে, কথার বিনিময়ে, প্রেমের নামে, ভালোবাসার নামে, বিয়ের নামে টিকে আছে শুধু ওই সেক্স।
পরশকে দীর্ঘক্ষণ ভাবতে দেখে পলিনা জানতে চাইলো- কী এতো ভাবছ? সিদ্ধান্ত পাল্টাবে নাকি?
পরশ অত্যন্ত জোড় দিয়ে বললো, প্রশ্নই ওঠে না। সিদ্ধান্ত যেটা নেয়া হয়েছে, দ্যাট ইজ ফাইনাল।
- গুড, আমারও তা-ই মত। শুধু একবার তো নয়, এই তিন বছরে আমরা বুঝতে পেরেছি, আমাদের এক সঙ্গে থাকা হবে না।
আমাদের দু’জনের চিন্তা-ভাবনা, পরিকল্পনার এতো পার্থক্য, কোনো অবস্থাতেই দু’জনার এক সঙ্গে থাকা চলে না। এবার তোমার শেষ চাওয়াটা কী বলো। সময় যতো কম নষ্ট হবে ততোই ভালো।
- হ্যাঁ বলছি। তবে এর আগে বলে নিই, এতে যেন আবার সিদ্ধান্ত না বদলাও।
প্রশ্নই ওঠে না।
- তুমি তো ঘুম থেকে দেরিতে ওঠো। আমি আগামীকাল সকালে উঠেই চলে যাবো।
আগামীকাল সকালে কেন? কথা তো ছিল আজই চলে যাবে।
- হ্যাঁ, কথা ছিল। তবে একটা চিহ্ন নিয়ে যাবো।
চিহ্ন?
- হ্যাঁ, বিয়ের পর আমাকে তুমি অনেকবার সন্তান নিতে বলেছ। নিইনি।

ভেবেছি যেখানে সম্পর্কই থাকবে না সেখানে ওইসব আবেগ-অনুভূতি প্রশ্রয় দিয়ে লাভ কী?
তাহলে আজ?
- আজ মনে হলো। দোষ সব তো আমার। মেজাজ বলো, মর্জি বলো, অভিমান বলো- সব তো আমার জন্য। তাই তোমার মতো ভালো মানুষের একটা চিহ্ন যদি আমার কাছে থাকে- সে ছেলে হোক আর মেয়ে হোক, তাকে নিয়ে গর্ব করতে পারবো, অহঙ্কার করতে পারবো।

রাত নেমেছে অনেকক্ষণ। রাতের খাওয়া শেষ করে পরশ বিছানায় চলে গেছে। পলিনা প্রস্তুতি নিচ্ছে বিছানায় যাওয়ার। ঘর বাঁধার পর থেকে বিশেষ রাতে বিশেষ সময়ের জন্য বিশেষ কিছু প্রস্তুতি নিয়ে থাকে। আজও ওই প্রস্তুতি নিতে সে ভুল করলো না। আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। একের পর এক শরীর থেকে পোশাক সব সরিয়ে ফেললো। সবচেয়ে পছন্দের পারফিউমটা এখানে, সেখানে, সবখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে স্প্রে করলো। হালকা করে রেকর্ড প্লেয়ারে একটা গান বাজালো। গানটা হেমন্ত মুখপধ্যায়ের ‘এই রাত তোমার আমার’। গানের শব্দটা একটু বাড়িয়ে, একটু কমিয়ে এমনভাবে ব্যালান্স করলো যাতে বিছানায় শুয়ে  শুনতে পারে এবং এই শোনার মধ্যে যেন শুধু গান শোনা নয়, একটা গানের আমেজ থাকে, মাদকতা থাকে। পরশের পাশে পলিনা গিয়ে তার গায়ে হাত রাখলো।
পরশ বললো, এসেছ?
পলিনা বললো,  হ্যাঁ, এসেছি।
- এটাই তো শেষ আসা, তাই না?
হয়তো বা। আবার নাও হতে পারে।
- তোমাকে যখন কাছে পাই তখন মনে হয় স্বর্গটা আমার খুব কাছে।
আর যখন দূরে থাকি।
দূরে থাকা নয়, যখন তুমি আমার সঙ্গে মেজাজ করো, বাজে ব্যবহার করো, জিদ দেখাও, পাজিপনা করো তখন মনে হয় আমি যন্ত্রণার মহাসমুদ্রে হাবুডুবু খাচ্ছি।
- থাক ওসব কথা। এখন এ রাতটাকে, রাতের এ সময়টাকে তুমি শুধু সুখ দিয়ে ভরে দাও।
সুখ চাইলে কথা বন্ধ করতে হবে।
- কথা বন্ধ করলাম। আর কথা বন্ধ করবো কী? তুমি নিজেই তো ঠোঁটে আটকে দিয়ে আমার কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছ।
দু’জনার কথা থেমে গেল। বাইরে মনে হচ্ছে ঝড়োহাওয়া বার বার আছড়ে পড়ছে। এক সময় গানটা থেমে গেল। তারা দু’জন ক্লান্ত হয়ে যার যার বালিশে মাথা রাখলো। এক সময় ঘুমিয়ে পড়লো।

রাত শেষে ভোর হলো। ভোর বলতে অনেক বেলা হলো। পরশ ঘরময় খুঁজে দেখলো, পলিনা চলে গেছে। টেবিলে তার জন্য নাশতা বানিয়ে রেখে গেছে। ডিভোর্সের দলিলে নিজের দস্তখতটাও করে দিয়ে গেছে। একটা ছোট্ট কাগজে এনগেজমেন্ট রিংটা রেখে লিখে গেছে, ‘তোমার জন্য আমার পক্ষ থেকে স্মৃতিচিহ্ন। ভালো থেকো। সন্তান ছেলে হোক অথবা মেয়ে তার নামটা তুমি রাখবে।’

দুই ভূত

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

 



লালু আর ভুলুর কোনা কাজ নেই। তারা সারা দিন গল্প করে কাটায়। সবই নিজেদের জীবনের নানান সুখ-দুঃখের কথা বলে। কথা বলতে বলতে যখন আর কথা বলতে ভালো লাগে না তখন দু’জনে খানিক কুস্তি লড়ে। তাদের কুস্তিও খুব একঘেয়ে। কেউ হারে না। কেউ জেতে না। কুস্তি করে তাদের ক্লান্তি আসে না, ঘামও ঝরে না। এর কারণ হলো, লালু আর ভুলু দু’জনই ভূত। প্রায় ১৪ বছর আগে দুই বন্ধু মনুষ্য জন্ম শেষ করে ভূত হয়ে লালগঞ্জের লাগোয়া বৈরাগী দীঘির ধারে আশ-শ্যাওড়ার জঙ্গলে ঘাঁটি গেড়ে আছে। মামলা-মোকদ্দমা থেকেই বাক্য আলাপ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তবে আশ্চর্যের বিষয়, বুড়ো বয়সে মাত্র সাত দিনের তফাতে লালু আর ভুলু পটল তোলে। ভূত হয়ে যখন দু’জনের দেখা হলো তখন দু’জনের মনে হলো পুরনো ঝগড়া জিইয়ে রাখার আর কোনো মানেই হয় না। তাই দু’জনের বেশ ভালো ভাব হয়ে গেল। সময় কাটানোর জন্য তারা মাঝে মধ্যে ইচ্ছা করে ঝগড়া লাগানোর চেষ্টা করেও দেখেছে। কিন্তু দেখা গেল, ঝগড়াটা তেমন জমে না। আরো একটা আশ্চর্যের বিষয় হলো, তারা ভূত হয়ে আজ পর্যন্ত এ তল্লাটে কোথাও কখনো আর কোনো ভূতের দেখা পায়নি।
ভুলু বলে, হ্যাঁ রে লালু, গাঁয়ে গত ১৪ বছরে তো বিস্তর লোক মরেছে। তাদের ভূতগুলো সব গেল কোথায় বল তো?


সেটি তো আমিও ভাবছি, আমরা ছাড়া আর কাউকে তো কখনো দেখিনি! আরো কয়েকজন থাকলে সময়টা একটু কাটতো ভালো।
ব্যাপারটা বড্ড গোলমেলে।


আমারও ভালো ঠেকছে না! বেশিদিন এ রকম চললে আমাদের এ গাঁ ছাড়তে হবে। সেটি কী সোজা! আমি গাঁ ছাড়ার চেষ্টা করে দেখেছি, ভারী সূক্ষ্ম একটা বেড়া আছে। চোখে দেখা যায় না। এতোই মিহি যে, ওই বেড়া ভেদ করা অসম্ভব।
বটে, এ তো ভারী অন্যায় কথা! আমরা কি সব জেলখানার কয়েদি নাকি রে?
মনে হয় এক জায়গার ভূত অন্য জায়গায় গেলে হিসাবের গোলমাল হবে বলেই যমরাজা বেড়া দিয়ে রেখেছে।
তা আটপেয়ে যমরাজাটাই বা কোথায়? আজ পর্যন্ত তো তার দেখাটি পেলাম না।
হবে রে হবে। এই একঘেয়ে বসে থাকাটা আমার আর ভালো লাগছে না। বরং গাঁয়ের ভূতগুলো কোথায় গায়েব হচ্ছে সেটি জানা দরকার। আরো গোটা কয়েক হলে দিব্যি গল্প-টল্প করা যেতো। দল বেঁধে থাকতাম।
তাহলে খুঁজেই দেখা যাক।
তাই চলো।


দুই বন্ধু মিলে অতঃপর ভূত খুঁজতে বের হলো। কিন্তু খুঁজতে খুঁজতে হয়রানিই সার হলো। একটা ভূতের গায়ের আঁশও দেখা গেল না।
বড় চিন্তার কথা হলো রে লালু!
বটেই তো! এ রকম তো হওয়ার কথা নয়।
একটা কথা বলি, যতীন মুৎসুদ্দির বয়স হয়েছে। অবস্থাও ক’দিন ধরে খারাপ যাচ্ছে। এখন-তখন অবস্থা। চল তো গিয়ে তার শিয়রে বসে থাকি। আত্মাটা বের হলেই খপ করে ধরবোক্ষণ।
কথাটা মন্দ বলোনি। তাহলে চলো যাই।
দু’জনেই গিয়ে যতীন মুৎসুদ্দির শিয়রে আস্তানা গাড়লো। খুব সতর্ক চোখে চেয়ে রইলো যতীনের দিকে। যতীন বুড়ো মানুষ, শরীর জীর্ণ, শক্তিও নেই।
দু’দিন ঠায় বসে থাকার পর তিন দিনের দিন যখন গভীর রাত তখন লালু আর ভুলু দেখলো যতীনের আত্মাটা নাকের ফুটোর কাছে বসে সাবধানে বাইরে উঁকি-ঝুঁকি মারছে।
লালু চেঁচিয়ে উঠলো- ‘ওই বেরোচ্ছে। সাবধান রে ভুলু, ঘ্যাঁচ করে ধরতে হবে কিন্তু।’
হ্যাঁ, একবার বেরোক বাছাধন।


তা আত্মাটা বের হলো বটে কিন্তু ধরা গেল না। শরীর ছেড়ে হঠাৎ এমন চোঁ করে এরোপ্লেনের মতোই উড়ে গেল নাকের ফুটো দিয়ে যে, লালু-ভুলু হাঁ করে চেয়ে রইলো। তারপর ‘ধর ধর’ করে ছুটলো পেছনে।
যতীন মুৎসুদ্দির আত্মা সোজা গিয়ে গণেশ গায়েনের বাড়িতে ঢুকে পড়লো। পিছু পিছু লালু আর ভুলু।
যতীনের আত্মা দেখেই গণেশ গায়েন একগাল হেসে বললো, এসেছিস? তোকে নিয়ে ‘সাত হাজার সাতশ’ পনেরোটা হলো। দাঁড়া যতেন, দাঁড়া, তোর শিশিটা বের করি। মলম-টলম ভরে একদম রেডি করে রেখেছি। এই বলে একটা দু’ইঞ্চি সাইজের শিশি বের করে যতীনকে তার ভেতরে পুরে কয়েকটা নাড়া দিয়ে ছিপি বন্ধ করে তাকে রেখে দিল। তারপর আপন মনেই বললো, আর দুটো হলেই কেল্লা ফতে। পরশু ঝুনঝুনওয়ালা লাখখানেক টাকা নিয়ে আসবে। ‘সাত হাজার সাতশ’ সতেরোটা হলেই লাখ টাকা হাতে এসে যেতো। টাইফয়েড হয়ে ১৪ বছর আগে শয্যা নিতে হলো বলে লালু আর ভুলুর ভূত দুটো হাতছাড়া হলো। না হলে আমাকে আজ পায় কে! সে দুটোকে পেলে হতো।
লালু-ভুলু দরজার আড়ালে থেকে কথাটা শুনে ভয়ে সিটিয়ে রইলো।
গণেশ গায়েন ঘুমালে তারা ঘরের তাকে জমিয়ে রাখা সাত হাজার সাতশ’ পরেরোটা শিশি ভালো করে পরীক্ষা করে দেখলো। প্রতিটিতে একটা করে ভূত মলম মেখে ঘুমিয়ে আছে।
লালু, দেখেছিস!


দেখেছি রে ভুলু, কী করবি?
আয়, শিশিগুলোকে তাক থেকে ফেলে আগে ভাঙি।
তাই হলো। দু’জন মিলে নিশুত রাতে ঝন ঝন করে শিশিগুলো ঠেলে ফেলে দিল মেঝেতে। সঙ্গে সঙ্গে ঘুমন্ত ভূতগুলো জেগে মহাকোলাহল শুরু করে দিল।
ভুলু তাদের সম্বোধন করে বললো, ‘ভাই-বোনেরা, তোমরা ভয় পেয়ো না। আমরা তোমাদের উদ্ধার করতেই এসেছি।’
সবাই আনন্দে চেঁচিয়ে উঠলো।
গণেশ গায়েনও ঘুম ভেঙে উঠে ধমকাতে লাগলো- ‘চুপ, চুপ বেয়াদব কোথাকার! তোদের তো মন্তর দিয়ে বেঁধে রেখেছি।’
কে শোনে কার কথা! ভূতগুলো মহানন্দে চিৎকার করতে করতে লালু-ভুলুর সঙ্গে চোখের পলকে হাওয়া হয়ে গেল।
গণেশ দুঃখ করে বললো, ‘সুখে থাকতে ভূতে কিলোয় রে। কতো ভালো কাজ হতো তোদের দিয়ে! ঝুনঝুনওয়ালা তোদের নিয়ে গিয়ে তার আয়ুর্বেদ ওষুধের কারখানায় চোলাই করে কর্কট রোগের ওষুধ বানাতো। তা তোদের কপালে নেই। তা আমি আর কী করবো?’

মানুষের ভাগ্য

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

 

 

মানুষের ভাগ্যটি আজ রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। আর রাজনীতি নিয়ে নতুন চিন্তার যথেষ্ট কারণ আছে। তা হলো এই, বাংলাদেশের দ্বিদলীয় ব্যবস্থাটি এখন আরো অসহ্য হয়ে উঠেছে। দ্বিদলীয় ব্যবস্থাটি আসলে একদলীয়ই। যখন যে দল ক্ষমতায় আসে, রাষ্ট্র ওই দলেরই হয়ে যায়। অপর দল আগের দলের মতোই আচরণ করে। বরং বাংলাদেশের ইতিহাসে দেখা গেছে, পরের সরকার আগের সরকারের চেয়ে ভালো তো নয়ই, বরং আরো খারাপ হয়ে থাকে। দ্বিদলীয় ব্যবস্থাটি একদলীয় আরো এক অর্থে। সেটি হলো, উভয়দলই হচ্ছে বিত্তবানদের দল। সামাজিকভাবে তারা পরস্পরের পরিচিত, ক্ষেত্র বিশেষে আত্মীয়ও, অধিকাংশ সময়ই পরস্পরের ঘনিষ্ঠ, ওঠাবসা একই রকমের, আচার-আচরণও তা-ই। দুটি দল হলেও তারা উভয়ই বড়লোকদেরই দল। এ জন্য তাদের এক দলই বলা যায়। লোকে বিকল্প খোঁজে। ভাবে, এ দুই দলের বাইরে যাবে। কিন্তু যাওয়া সম্ভব হয় না।


মাঝে মধ্যে সামরিক শাসন দেখতে পাওয়া যায়- কখনো প্রকাশ্যে, কখনো ছদ্মবেশে। কিন্তু অচিরেই টের পাওয়া যায়, ভেতরে ভেতরে তারা ওই একই দলের। তারাও বিত্তবানদেরই স্বার্থ দেখে। স্বার্থ দেখার ওই কাজে যুক্ত হয় আরেক অপশক্তি। সেটি হলো ধর্মীয় মৌলবাদ। এটি আরো ভয়ানক। ওই ভয়ানক শক্তিও হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে এই দ্বিদলীয় শাসন ব্যবস্থা। এর ফল সবচেয়ে ভয়াবহ।


আমরা ব্রিটিশ আমলে ছিলাম। অবশ্যই ভালো ছিলাম না। পাকিস্তান আমলও আমাদের জন্য দুঃসহ। এখন বাংলাদেশে আছি। কিন্তু ভালো আছি- এমনটি বলা যাচ্ছে না। কেউ কেউ আছেন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, আগেই ভালো ছিলাম! কখন, কীভাবে ভালো ছিলেন সেটি নির্দিষ্ট করে বলতে পারেন না। তারা আদর্শায়িত করেন পেছনের দিনগুলোর। কারণ বর্তমান অসহ্য, ভবিষ্যৎ অন্ধকারাচ্ছন্ন। অতীতে আমরা মোটেই ভালো ছিলাম না, অসন্তুষ্ট ছিলাম। এ জন্য আন্দোলন করেছি, মুক্তি চেয়েছি। শাসক বদল হয়েছে, এমনকি রাষ্ট্রও ভেঙেছে। পরে দেখা গেছে, মানুষ যেখানে ছিল সেখানেই আছে। তাদের ভাগ্য বদলায়নি। কেবল শাসকই বদলেছে। নতুন যারা শাসক হয়েছেন তাদের কেউ কেউ অতীতে যে খারাপ অবস্থায় ছিলেন তা নয়। তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন ধনবান মানুষ এবং তারা একই দলের। একইভাবে শাসন অর্থাৎ শোষণ করছে। এটি আমরা বুঝি, কথাটি আমরা বলিও। তবে ক্ষোভ প্রকাশ ছাড়া অন্য কিছু করতে পারি না।
দেশে শিক্ষার ক্ষেত্রে অগ্রগতি ঘটেছে। তাকে উন্নতির লক্ষণ বলা হচ্ছে। কিন্তু শিক্ষার্থীরা কী শিখছে? ওই প্রশ্নটি তো থাকেই। এটি শুধু গুণগত উৎকর্ষের বিষয় নয়। বিষয় হচ্ছে শিক্ষার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নিয়ে। শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা সামাজিক মানুষ হিসেবে গড়ে উঠছে, নাকি অসামাজিক হয়ে উঠছে? অসামাজিক হওয়ার অর্থ, এখানে শুধু যে অপরাধপ্রবণ হওয়া তা নয়, বিচ্ছিন্ন হওয়া। খেয়াল করলে দেখা যাবে, শিক্ষা ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত হচ্ছে এবং ব্যক্তিকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে। এটি নতুন কোনো সমস্যা নয়। এটি আগেও ছিল। এখন উন্নতির আলোক উদ্ভাসের আড়ালে এটি আগের চেয়ে অনেক শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। শিক্ষিত মানুষ এখন কেবল নিজের স্বার্থ দেখে, অন্যের স্বার্থ দেখতে চায় না। তার মধ্যে দেশপ্রেম বৃদ্ধি পায় না। সে অসামাজিক হয়ে ওঠে। শিক্ষাকে আমরা জাতির ভবিষ্যৎ বলে বিবেচনা করি। কোন ধরনের মানুষ এ শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে তৈরি হচ্ছে? স্বার্থপর, নাকি সামাজিক- এ প্রশ্নটি প্রাথমিক হওয়া উচিত, হয় না। এই অবস্থা কেমন করে বদল করা যাবে? ছোট ছোট সংস্কার অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। সেসব সংস্কার প্রযুক্ত করতে হবে পুরো ব্যবস্থাটির পরিবর্তনের সঙ্গে। না হলে শিক্ষা ক্ষেত্রে যেমনটি হচ্ছে তেমনটি অন্যত্রও ঘটতে থাকবে এবং ঘটছেও।


বলা হয়, মানুষের চরিত্র ঠিক নেই। অভিযোগ, মানুষের মধ্যে সহনশীলতার বড় অভাব। দুটিই সত্য। কিন্তু মানুষ তার চরিত্র কীভাবে ঠিক রাখবে যেখানে সমাজ চরিত্রহীন! চরিত্রহীনরাই তো এখন সমাজের শীর্ষে রয়েছে। তাদের আদর্শেই সাধারণ মানুষ দীক্ষিত হচ্ছে। সহনশীলতা অবশ্যই নেই। কেননা সমাজে লুণ্ঠনই হচ্ছে প্রধান সত্য। ব্যক্তিগত সম্পত্তি বৃদ্ধির লালসায় এমন কাজ নেই যা করতে লোকে পিছপা হয়। মানবিক সম্পর্কগুলো চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে। রক্ষকরা ভক্ষকে পরিণত হয়েছে। আমরা যে বিকল্পের কথা বলছি সেটি নিশ্চয়ই এ সমাজ এখন যেভাবে চলছে সেভাবে চলতে দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। এ জন্য এ সমাজ ভেঙে সেখানে নতুন সমাজের প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন। এই নতুন সমাজের জন্য যথোপযুক্ত মতাদর্শ প্রয়োজন। ওই মতাদর্শের পরিপ্রেক্ষিতেই বিকল্প সমাজ গড়া সম্ভব। মতাদর্শের ব্যাপারটি দার্শনিক।


এ প্রসঙ্গ উঠলেই বলা হয়, এটি হচ্ছে বড় বড় কথা। এ রকম ধারণার পেছনে যে যুক্তি নেই তা নয়। মতাদর্শ অনেক সময়ই বাস্তবিক সমস্যার মুখোমুখি হতে চায় না। সাধারণ মানুষ ছোট ছোট সমস্যার কারণে মতাদর্শের কথা ভাবার সুযোগ পায় না। আর মতাদর্শে বিশ্বাসীরা সাধারণ মানুষকে তাদের দৈনন্দিন সমস্যাগুলো বিবেচনায় নিয়ে কীভাবে উদ্বুদ্ধ করতে হবে এর পথ খুঁজে পান না।
মূল ব্যাপারটি সোজা। তা হলো ব্যক্তির মুক্তি ব্যক্তিগতভাবে অর্জন করা সম্ভব নয়। সেটি অর্জন করতে হলে সমষ্টিগত ব্যবস্থার পরিবর্তন দরকার। যে কিশোর একদিন মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন, যুদ্ধ শেষে তিনি পেশা নিয়েছেন শিক্ষকতা। কিন্তু দেখলেন, মুক্তি আসেনি। কারণ শাসক বদল হয়েছে ঠিকই, ব্যবস্থার বদল হয়নি। ওই শিক্ষককে আবার আন্দোলনে নামতে হয়েছে। এবার তার আন্দোলনটি পেশাগত। তিনি যে আন্দোলনরত অবস্থায় প্রাণ দিলেন এতে এটিই প্রমাণ হলো, ব্যক্তিগত মুক্তি তো বটেই, পেশাগত মুক্তিও বিদ্যমান ব্যবস্থায় অর্জন সম্ভব নয়।


আমাদের এই বদ্বীপে মাটি শক্ত নয়। তাই খুঁটি গাড়তে হয় এবং খুঁটিই অবলম্বন করা চাই। এ খুঁটি হচ্ছে ব্যক্তিগত সম্পত্তি। সমাজে এখন সবাই ওই খুঁটি গাড়তে ব্যস্ত। এ প্রতিযোগিতা নিষ্ঠুরতায় পরিণত হয়েছে। এমন ব্যাপক নিষ্ঠুরতা সমাজে আগে কখনো দেখা যায়নি। এ ব্যবস্থায় ব্যক্তি কেমন করে সৎ থাকবে! সৎ থাকতে গেলে হয় তিনি বিপদে পড়বেন, না হলে পিছিয়ে পড়বেন। আর যদি ব্যক্তি সৎ থাকতে পারে তাহলেও কি সমাজ বদল হবে? মানুষের মনুষ্যত্ব রক্ষা করার জন্য এ অসুস্থ সমাজ বদল করা চাই। এ জন্যই দরকার বিকল্প রাজনীতি। সংগঠিত আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সমাজ বদলাবে। লক্ষ্যটি থাকবে একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার। এটিকে সমাজতান্ত্রিক বললেও অন্যায় করা হবে না। কেননা এ সমাজে থাকবে অধিকার ও সুযোগের সাম্য, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং সর্বস্তরে প্রকৃত জনপ্রতিনিধিদের শাসন প্রতিষ্ঠা। আমাদের গণমাধ্যম, টেলিভিশন, আলাপ-আলোচনায় অনেক কথাই বলা হয়। সেগুলো ফুলঝুরির মতো। কিন্তু মূল সমস্যাটি যে এ অসুস্থ সমাজ বদল করা সেটি উঠে আসে না।


এখন এ সত্যটি প্রতিষ্ঠিত যে, প্রাইভেট মানেই ভালো আর পাবলিক মানেই খারাপ। এটি শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পায়ন- সর্বক্ষেত্রে দৃশ্যমান। অথচ আমরা যে মুক্তির জন্য লড়েছি তা সব সময়ই ছিল পাবলিকের কাজ, প্রাইভেটের নয়। কিন্তু এখন পাবলিক হেরে গেছে প্রাইভেটের কাছে। এ জন্যই আমাদের এমন দুর্দশা। শেয়ার মার্কেটের কথা ধরা যাক। সেখানে যে কেবল মতলববাজ ও ধড়িবাজরাই যায় তা নয়। নিরুপায় সাধারণ মানুষও ভিড় করে। এর কারণ হলো, পাবলিক বিনিয়োগের স্থান অত্যন্ত সংকুচিত। ওই ক্ষেত্রটি প্রসারিত হলে মানুষ সেখানেই যেতো। এখানে না যেতে পেরে মানুষ প্রাইভেটের কাছে যায় এবং বিপদে পড়ে।
বাংলাদেশে যা দরকার তা হলো পাবলিককে বড় করা প্রাইভেটের তুলনায়। তাহলেই প্রাইভেট নিরাপদ হবে। আসলে ব্যক্তিও তো বিবেচনার চূড়ান্ত বিন্দু। তাকেই সমৃদ্ধ ও সুখী করা চাই। কিন্তু ব্যক্তি জড়িত সমষ্টির সঙ্গে। এ জন্য সমষ্টির ভাগ্য না বদলালে ব্যক্তির ভাগ্যও বদলাবে না এবং যতোটুকু বদলাবে তা সুরক্ষিত থাকবে। বদলটি এখানেই দরকার। দেশের মানুষ এ বদলের জন্যই সংগ্রাম করেছে। বার বার তারা দেখেছেন প্রাইভেট পদদলিত করছে পাবলিককে। তাই বলতে হয়, মুক্তিযুদ্ধ মোটেই শেষ হয়নি। এ যুদ্ধটি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য চাই সমাজ বদলের লক্ষ্যে রাষ্ট্রের মূল চরিত্রের গণতান্ত্রিক পরিবর্তন।


সমাজ বদলের প্রশ্নে দু’দলই অনড়। কেননা ওই ঘটনাটি ঘটলে তাদের সুযোগ-সুবিধার ভিত্তিটাই নষ্ট হয়ে যাবে। তাই জনগণকে এগোতে হবে মুক্তির দিকে। মুক্তির ওই যাত্রায় কারা নেতৃত্ব দেবেন? তারাই নেতৃত্ব দেবেন যারা দেশপ্রেমিক ও গণতান্ত্রিক। কতো দ্রুত তারা এগিয়ে আসছেন এবং রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হচ্ছেন এর ওপরই আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। ‘বিকল্প চাই’- এ উপলব্ধিটি এখন প্রায় সর্বজনীন। কিন্তু ওই আওয়াজ যেন এর আসল প্রয়োজন সম্পর্কে আমাদের বিভ্রান্ত না করে। এ প্রয়োজনটি হলো সমাজ রূপান্তরের অর্থাৎ সমাজের বৈপ্লবিক পরিবর্তন জরুরি। তবেই মানুষের সত্যটি একদিন প্রতিষ্ঠিত হবে। মানুষের অবস্থানটি নিশ্চিত হবে সবার উপরে।

Page 2 of 8

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…