Page 2 of 7

দুই ভূত

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

 



লালু আর ভুলুর কোনা কাজ নেই। তারা সারা দিন গল্প করে কাটায়। সবই নিজেদের জীবনের নানান সুখ-দুঃখের কথা বলে। কথা বলতে বলতে যখন আর কথা বলতে ভালো লাগে না তখন দু’জনে খানিক কুস্তি লড়ে। তাদের কুস্তিও খুব একঘেয়ে। কেউ হারে না। কেউ জেতে না। কুস্তি করে তাদের ক্লান্তি আসে না, ঘামও ঝরে না। এর কারণ হলো, লালু আর ভুলু দু’জনই ভূত। প্রায় ১৪ বছর আগে দুই বন্ধু মনুষ্য জন্ম শেষ করে ভূত হয়ে লালগঞ্জের লাগোয়া বৈরাগী দীঘির ধারে আশ-শ্যাওড়ার জঙ্গলে ঘাঁটি গেড়ে আছে। মামলা-মোকদ্দমা থেকেই বাক্য আলাপ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তবে আশ্চর্যের বিষয়, বুড়ো বয়সে মাত্র সাত দিনের তফাতে লালু আর ভুলু পটল তোলে। ভূত হয়ে যখন দু’জনের দেখা হলো তখন দু’জনের মনে হলো পুরনো ঝগড়া জিইয়ে রাখার আর কোনো মানেই হয় না। তাই দু’জনের বেশ ভালো ভাব হয়ে গেল। সময় কাটানোর জন্য তারা মাঝে মধ্যে ইচ্ছা করে ঝগড়া লাগানোর চেষ্টা করেও দেখেছে। কিন্তু দেখা গেল, ঝগড়াটা তেমন জমে না। আরো একটা আশ্চর্যের বিষয় হলো, তারা ভূত হয়ে আজ পর্যন্ত এ তল্লাটে কোথাও কখনো আর কোনো ভূতের দেখা পায়নি।
ভুলু বলে, হ্যাঁ রে লালু, গাঁয়ে গত ১৪ বছরে তো বিস্তর লোক মরেছে। তাদের ভূতগুলো সব গেল কোথায় বল তো?


সেটি তো আমিও ভাবছি, আমরা ছাড়া আর কাউকে তো কখনো দেখিনি! আরো কয়েকজন থাকলে সময়টা একটু কাটতো ভালো।
ব্যাপারটা বড্ড গোলমেলে।


আমারও ভালো ঠেকছে না! বেশিদিন এ রকম চললে আমাদের এ গাঁ ছাড়তে হবে। সেটি কী সোজা! আমি গাঁ ছাড়ার চেষ্টা করে দেখেছি, ভারী সূক্ষ্ম একটা বেড়া আছে। চোখে দেখা যায় না। এতোই মিহি যে, ওই বেড়া ভেদ করা অসম্ভব।
বটে, এ তো ভারী অন্যায় কথা! আমরা কি সব জেলখানার কয়েদি নাকি রে?
মনে হয় এক জায়গার ভূত অন্য জায়গায় গেলে হিসাবের গোলমাল হবে বলেই যমরাজা বেড়া দিয়ে রেখেছে।
তা আটপেয়ে যমরাজাটাই বা কোথায়? আজ পর্যন্ত তো তার দেখাটি পেলাম না।
হবে রে হবে। এই একঘেয়ে বসে থাকাটা আমার আর ভালো লাগছে না। বরং গাঁয়ের ভূতগুলো কোথায় গায়েব হচ্ছে সেটি জানা দরকার। আরো গোটা কয়েক হলে দিব্যি গল্প-টল্প করা যেতো। দল বেঁধে থাকতাম।
তাহলে খুঁজেই দেখা যাক।
তাই চলো।


দুই বন্ধু মিলে অতঃপর ভূত খুঁজতে বের হলো। কিন্তু খুঁজতে খুঁজতে হয়রানিই সার হলো। একটা ভূতের গায়ের আঁশও দেখা গেল না।
বড় চিন্তার কথা হলো রে লালু!
বটেই তো! এ রকম তো হওয়ার কথা নয়।
একটা কথা বলি, যতীন মুৎসুদ্দির বয়স হয়েছে। অবস্থাও ক’দিন ধরে খারাপ যাচ্ছে। এখন-তখন অবস্থা। চল তো গিয়ে তার শিয়রে বসে থাকি। আত্মাটা বের হলেই খপ করে ধরবোক্ষণ।
কথাটা মন্দ বলোনি। তাহলে চলো যাই।
দু’জনেই গিয়ে যতীন মুৎসুদ্দির শিয়রে আস্তানা গাড়লো। খুব সতর্ক চোখে চেয়ে রইলো যতীনের দিকে। যতীন বুড়ো মানুষ, শরীর জীর্ণ, শক্তিও নেই।
দু’দিন ঠায় বসে থাকার পর তিন দিনের দিন যখন গভীর রাত তখন লালু আর ভুলু দেখলো যতীনের আত্মাটা নাকের ফুটোর কাছে বসে সাবধানে বাইরে উঁকি-ঝুঁকি মারছে।
লালু চেঁচিয়ে উঠলো- ‘ওই বেরোচ্ছে। সাবধান রে ভুলু, ঘ্যাঁচ করে ধরতে হবে কিন্তু।’
হ্যাঁ, একবার বেরোক বাছাধন।


তা আত্মাটা বের হলো বটে কিন্তু ধরা গেল না। শরীর ছেড়ে হঠাৎ এমন চোঁ করে এরোপ্লেনের মতোই উড়ে গেল নাকের ফুটো দিয়ে যে, লালু-ভুলু হাঁ করে চেয়ে রইলো। তারপর ‘ধর ধর’ করে ছুটলো পেছনে।
যতীন মুৎসুদ্দির আত্মা সোজা গিয়ে গণেশ গায়েনের বাড়িতে ঢুকে পড়লো। পিছু পিছু লালু আর ভুলু।
যতীনের আত্মা দেখেই গণেশ গায়েন একগাল হেসে বললো, এসেছিস? তোকে নিয়ে ‘সাত হাজার সাতশ’ পনেরোটা হলো। দাঁড়া যতেন, দাঁড়া, তোর শিশিটা বের করি। মলম-টলম ভরে একদম রেডি করে রেখেছি। এই বলে একটা দু’ইঞ্চি সাইজের শিশি বের করে যতীনকে তার ভেতরে পুরে কয়েকটা নাড়া দিয়ে ছিপি বন্ধ করে তাকে রেখে দিল। তারপর আপন মনেই বললো, আর দুটো হলেই কেল্লা ফতে। পরশু ঝুনঝুনওয়ালা লাখখানেক টাকা নিয়ে আসবে। ‘সাত হাজার সাতশ’ সতেরোটা হলেই লাখ টাকা হাতে এসে যেতো। টাইফয়েড হয়ে ১৪ বছর আগে শয্যা নিতে হলো বলে লালু আর ভুলুর ভূত দুটো হাতছাড়া হলো। না হলে আমাকে আজ পায় কে! সে দুটোকে পেলে হতো।
লালু-ভুলু দরজার আড়ালে থেকে কথাটা শুনে ভয়ে সিটিয়ে রইলো।
গণেশ গায়েন ঘুমালে তারা ঘরের তাকে জমিয়ে রাখা সাত হাজার সাতশ’ পরেরোটা শিশি ভালো করে পরীক্ষা করে দেখলো। প্রতিটিতে একটা করে ভূত মলম মেখে ঘুমিয়ে আছে।
লালু, দেখেছিস!


দেখেছি রে ভুলু, কী করবি?
আয়, শিশিগুলোকে তাক থেকে ফেলে আগে ভাঙি।
তাই হলো। দু’জন মিলে নিশুত রাতে ঝন ঝন করে শিশিগুলো ঠেলে ফেলে দিল মেঝেতে। সঙ্গে সঙ্গে ঘুমন্ত ভূতগুলো জেগে মহাকোলাহল শুরু করে দিল।
ভুলু তাদের সম্বোধন করে বললো, ‘ভাই-বোনেরা, তোমরা ভয় পেয়ো না। আমরা তোমাদের উদ্ধার করতেই এসেছি।’
সবাই আনন্দে চেঁচিয়ে উঠলো।
গণেশ গায়েনও ঘুম ভেঙে উঠে ধমকাতে লাগলো- ‘চুপ, চুপ বেয়াদব কোথাকার! তোদের তো মন্তর দিয়ে বেঁধে রেখেছি।’
কে শোনে কার কথা! ভূতগুলো মহানন্দে চিৎকার করতে করতে লালু-ভুলুর সঙ্গে চোখের পলকে হাওয়া হয়ে গেল।
গণেশ দুঃখ করে বললো, ‘সুখে থাকতে ভূতে কিলোয় রে। কতো ভালো কাজ হতো তোদের দিয়ে! ঝুনঝুনওয়ালা তোদের নিয়ে গিয়ে তার আয়ুর্বেদ ওষুধের কারখানায় চোলাই করে কর্কট রোগের ওষুধ বানাতো। তা তোদের কপালে নেই। তা আমি আর কী করবো?’

মানুষের ভাগ্য

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

 

 

মানুষের ভাগ্যটি আজ রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। আর রাজনীতি নিয়ে নতুন চিন্তার যথেষ্ট কারণ আছে। তা হলো এই, বাংলাদেশের দ্বিদলীয় ব্যবস্থাটি এখন আরো অসহ্য হয়ে উঠেছে। দ্বিদলীয় ব্যবস্থাটি আসলে একদলীয়ই। যখন যে দল ক্ষমতায় আসে, রাষ্ট্র ওই দলেরই হয়ে যায়। অপর দল আগের দলের মতোই আচরণ করে। বরং বাংলাদেশের ইতিহাসে দেখা গেছে, পরের সরকার আগের সরকারের চেয়ে ভালো তো নয়ই, বরং আরো খারাপ হয়ে থাকে। দ্বিদলীয় ব্যবস্থাটি একদলীয় আরো এক অর্থে। সেটি হলো, উভয়দলই হচ্ছে বিত্তবানদের দল। সামাজিকভাবে তারা পরস্পরের পরিচিত, ক্ষেত্র বিশেষে আত্মীয়ও, অধিকাংশ সময়ই পরস্পরের ঘনিষ্ঠ, ওঠাবসা একই রকমের, আচার-আচরণও তা-ই। দুটি দল হলেও তারা উভয়ই বড়লোকদেরই দল। এ জন্য তাদের এক দলই বলা যায়। লোকে বিকল্প খোঁজে। ভাবে, এ দুই দলের বাইরে যাবে। কিন্তু যাওয়া সম্ভব হয় না।


মাঝে মধ্যে সামরিক শাসন দেখতে পাওয়া যায়- কখনো প্রকাশ্যে, কখনো ছদ্মবেশে। কিন্তু অচিরেই টের পাওয়া যায়, ভেতরে ভেতরে তারা ওই একই দলের। তারাও বিত্তবানদেরই স্বার্থ দেখে। স্বার্থ দেখার ওই কাজে যুক্ত হয় আরেক অপশক্তি। সেটি হলো ধর্মীয় মৌলবাদ। এটি আরো ভয়ানক। ওই ভয়ানক শক্তিও হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে এই দ্বিদলীয় শাসন ব্যবস্থা। এর ফল সবচেয়ে ভয়াবহ।


আমরা ব্রিটিশ আমলে ছিলাম। অবশ্যই ভালো ছিলাম না। পাকিস্তান আমলও আমাদের জন্য দুঃসহ। এখন বাংলাদেশে আছি। কিন্তু ভালো আছি- এমনটি বলা যাচ্ছে না। কেউ কেউ আছেন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, আগেই ভালো ছিলাম! কখন, কীভাবে ভালো ছিলেন সেটি নির্দিষ্ট করে বলতে পারেন না। তারা আদর্শায়িত করেন পেছনের দিনগুলোর। কারণ বর্তমান অসহ্য, ভবিষ্যৎ অন্ধকারাচ্ছন্ন। অতীতে আমরা মোটেই ভালো ছিলাম না, অসন্তুষ্ট ছিলাম। এ জন্য আন্দোলন করেছি, মুক্তি চেয়েছি। শাসক বদল হয়েছে, এমনকি রাষ্ট্রও ভেঙেছে। পরে দেখা গেছে, মানুষ যেখানে ছিল সেখানেই আছে। তাদের ভাগ্য বদলায়নি। কেবল শাসকই বদলেছে। নতুন যারা শাসক হয়েছেন তাদের কেউ কেউ অতীতে যে খারাপ অবস্থায় ছিলেন তা নয়। তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন ধনবান মানুষ এবং তারা একই দলের। একইভাবে শাসন অর্থাৎ শোষণ করছে। এটি আমরা বুঝি, কথাটি আমরা বলিও। তবে ক্ষোভ প্রকাশ ছাড়া অন্য কিছু করতে পারি না।
দেশে শিক্ষার ক্ষেত্রে অগ্রগতি ঘটেছে। তাকে উন্নতির লক্ষণ বলা হচ্ছে। কিন্তু শিক্ষার্থীরা কী শিখছে? ওই প্রশ্নটি তো থাকেই। এটি শুধু গুণগত উৎকর্ষের বিষয় নয়। বিষয় হচ্ছে শিক্ষার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নিয়ে। শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা সামাজিক মানুষ হিসেবে গড়ে উঠছে, নাকি অসামাজিক হয়ে উঠছে? অসামাজিক হওয়ার অর্থ, এখানে শুধু যে অপরাধপ্রবণ হওয়া তা নয়, বিচ্ছিন্ন হওয়া। খেয়াল করলে দেখা যাবে, শিক্ষা ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত হচ্ছে এবং ব্যক্তিকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে। এটি নতুন কোনো সমস্যা নয়। এটি আগেও ছিল। এখন উন্নতির আলোক উদ্ভাসের আড়ালে এটি আগের চেয়ে অনেক শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। শিক্ষিত মানুষ এখন কেবল নিজের স্বার্থ দেখে, অন্যের স্বার্থ দেখতে চায় না। তার মধ্যে দেশপ্রেম বৃদ্ধি পায় না। সে অসামাজিক হয়ে ওঠে। শিক্ষাকে আমরা জাতির ভবিষ্যৎ বলে বিবেচনা করি। কোন ধরনের মানুষ এ শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে তৈরি হচ্ছে? স্বার্থপর, নাকি সামাজিক- এ প্রশ্নটি প্রাথমিক হওয়া উচিত, হয় না। এই অবস্থা কেমন করে বদল করা যাবে? ছোট ছোট সংস্কার অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। সেসব সংস্কার প্রযুক্ত করতে হবে পুরো ব্যবস্থাটির পরিবর্তনের সঙ্গে। না হলে শিক্ষা ক্ষেত্রে যেমনটি হচ্ছে তেমনটি অন্যত্রও ঘটতে থাকবে এবং ঘটছেও।


বলা হয়, মানুষের চরিত্র ঠিক নেই। অভিযোগ, মানুষের মধ্যে সহনশীলতার বড় অভাব। দুটিই সত্য। কিন্তু মানুষ তার চরিত্র কীভাবে ঠিক রাখবে যেখানে সমাজ চরিত্রহীন! চরিত্রহীনরাই তো এখন সমাজের শীর্ষে রয়েছে। তাদের আদর্শেই সাধারণ মানুষ দীক্ষিত হচ্ছে। সহনশীলতা অবশ্যই নেই। কেননা সমাজে লুণ্ঠনই হচ্ছে প্রধান সত্য। ব্যক্তিগত সম্পত্তি বৃদ্ধির লালসায় এমন কাজ নেই যা করতে লোকে পিছপা হয়। মানবিক সম্পর্কগুলো চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে। রক্ষকরা ভক্ষকে পরিণত হয়েছে। আমরা যে বিকল্পের কথা বলছি সেটি নিশ্চয়ই এ সমাজ এখন যেভাবে চলছে সেভাবে চলতে দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। এ জন্য এ সমাজ ভেঙে সেখানে নতুন সমাজের প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন। এই নতুন সমাজের জন্য যথোপযুক্ত মতাদর্শ প্রয়োজন। ওই মতাদর্শের পরিপ্রেক্ষিতেই বিকল্প সমাজ গড়া সম্ভব। মতাদর্শের ব্যাপারটি দার্শনিক।


এ প্রসঙ্গ উঠলেই বলা হয়, এটি হচ্ছে বড় বড় কথা। এ রকম ধারণার পেছনে যে যুক্তি নেই তা নয়। মতাদর্শ অনেক সময়ই বাস্তবিক সমস্যার মুখোমুখি হতে চায় না। সাধারণ মানুষ ছোট ছোট সমস্যার কারণে মতাদর্শের কথা ভাবার সুযোগ পায় না। আর মতাদর্শে বিশ্বাসীরা সাধারণ মানুষকে তাদের দৈনন্দিন সমস্যাগুলো বিবেচনায় নিয়ে কীভাবে উদ্বুদ্ধ করতে হবে এর পথ খুঁজে পান না।
মূল ব্যাপারটি সোজা। তা হলো ব্যক্তির মুক্তি ব্যক্তিগতভাবে অর্জন করা সম্ভব নয়। সেটি অর্জন করতে হলে সমষ্টিগত ব্যবস্থার পরিবর্তন দরকার। যে কিশোর একদিন মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন, যুদ্ধ শেষে তিনি পেশা নিয়েছেন শিক্ষকতা। কিন্তু দেখলেন, মুক্তি আসেনি। কারণ শাসক বদল হয়েছে ঠিকই, ব্যবস্থার বদল হয়নি। ওই শিক্ষককে আবার আন্দোলনে নামতে হয়েছে। এবার তার আন্দোলনটি পেশাগত। তিনি যে আন্দোলনরত অবস্থায় প্রাণ দিলেন এতে এটিই প্রমাণ হলো, ব্যক্তিগত মুক্তি তো বটেই, পেশাগত মুক্তিও বিদ্যমান ব্যবস্থায় অর্জন সম্ভব নয়।


আমাদের এই বদ্বীপে মাটি শক্ত নয়। তাই খুঁটি গাড়তে হয় এবং খুঁটিই অবলম্বন করা চাই। এ খুঁটি হচ্ছে ব্যক্তিগত সম্পত্তি। সমাজে এখন সবাই ওই খুঁটি গাড়তে ব্যস্ত। এ প্রতিযোগিতা নিষ্ঠুরতায় পরিণত হয়েছে। এমন ব্যাপক নিষ্ঠুরতা সমাজে আগে কখনো দেখা যায়নি। এ ব্যবস্থায় ব্যক্তি কেমন করে সৎ থাকবে! সৎ থাকতে গেলে হয় তিনি বিপদে পড়বেন, না হলে পিছিয়ে পড়বেন। আর যদি ব্যক্তি সৎ থাকতে পারে তাহলেও কি সমাজ বদল হবে? মানুষের মনুষ্যত্ব রক্ষা করার জন্য এ অসুস্থ সমাজ বদল করা চাই। এ জন্যই দরকার বিকল্প রাজনীতি। সংগঠিত আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সমাজ বদলাবে। লক্ষ্যটি থাকবে একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার। এটিকে সমাজতান্ত্রিক বললেও অন্যায় করা হবে না। কেননা এ সমাজে থাকবে অধিকার ও সুযোগের সাম্য, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং সর্বস্তরে প্রকৃত জনপ্রতিনিধিদের শাসন প্রতিষ্ঠা। আমাদের গণমাধ্যম, টেলিভিশন, আলাপ-আলোচনায় অনেক কথাই বলা হয়। সেগুলো ফুলঝুরির মতো। কিন্তু মূল সমস্যাটি যে এ অসুস্থ সমাজ বদল করা সেটি উঠে আসে না।


এখন এ সত্যটি প্রতিষ্ঠিত যে, প্রাইভেট মানেই ভালো আর পাবলিক মানেই খারাপ। এটি শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পায়ন- সর্বক্ষেত্রে দৃশ্যমান। অথচ আমরা যে মুক্তির জন্য লড়েছি তা সব সময়ই ছিল পাবলিকের কাজ, প্রাইভেটের নয়। কিন্তু এখন পাবলিক হেরে গেছে প্রাইভেটের কাছে। এ জন্যই আমাদের এমন দুর্দশা। শেয়ার মার্কেটের কথা ধরা যাক। সেখানে যে কেবল মতলববাজ ও ধড়িবাজরাই যায় তা নয়। নিরুপায় সাধারণ মানুষও ভিড় করে। এর কারণ হলো, পাবলিক বিনিয়োগের স্থান অত্যন্ত সংকুচিত। ওই ক্ষেত্রটি প্রসারিত হলে মানুষ সেখানেই যেতো। এখানে না যেতে পেরে মানুষ প্রাইভেটের কাছে যায় এবং বিপদে পড়ে।
বাংলাদেশে যা দরকার তা হলো পাবলিককে বড় করা প্রাইভেটের তুলনায়। তাহলেই প্রাইভেট নিরাপদ হবে। আসলে ব্যক্তিও তো বিবেচনার চূড়ান্ত বিন্দু। তাকেই সমৃদ্ধ ও সুখী করা চাই। কিন্তু ব্যক্তি জড়িত সমষ্টির সঙ্গে। এ জন্য সমষ্টির ভাগ্য না বদলালে ব্যক্তির ভাগ্যও বদলাবে না এবং যতোটুকু বদলাবে তা সুরক্ষিত থাকবে। বদলটি এখানেই দরকার। দেশের মানুষ এ বদলের জন্যই সংগ্রাম করেছে। বার বার তারা দেখেছেন প্রাইভেট পদদলিত করছে পাবলিককে। তাই বলতে হয়, মুক্তিযুদ্ধ মোটেই শেষ হয়নি। এ যুদ্ধটি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য চাই সমাজ বদলের লক্ষ্যে রাষ্ট্রের মূল চরিত্রের গণতান্ত্রিক পরিবর্তন।


সমাজ বদলের প্রশ্নে দু’দলই অনড়। কেননা ওই ঘটনাটি ঘটলে তাদের সুযোগ-সুবিধার ভিত্তিটাই নষ্ট হয়ে যাবে। তাই জনগণকে এগোতে হবে মুক্তির দিকে। মুক্তির ওই যাত্রায় কারা নেতৃত্ব দেবেন? তারাই নেতৃত্ব দেবেন যারা দেশপ্রেমিক ও গণতান্ত্রিক। কতো দ্রুত তারা এগিয়ে আসছেন এবং রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হচ্ছেন এর ওপরই আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। ‘বিকল্প চাই’- এ উপলব্ধিটি এখন প্রায় সর্বজনীন। কিন্তু ওই আওয়াজ যেন এর আসল প্রয়োজন সম্পর্কে আমাদের বিভ্রান্ত না করে। এ প্রয়োজনটি হলো সমাজ রূপান্তরের অর্থাৎ সমাজের বৈপ্লবিক পরিবর্তন জরুরি। তবেই মানুষের সত্যটি একদিন প্রতিষ্ঠিত হবে। মানুষের অবস্থানটি নিশ্চিত হবে সবার উপরে।

জলকাচ

রঞ্জনা ব্যানার্জী

 

এক ঝলকেই চিনে ফেলেছিলাম। অল্পক্ষণের দেখা। তাও ভুলিনি। মাথার ভেতর খোদাই হয়ে আছে ওই শেষ বিকেলের সূর্যের পিছলানো আলো, কনকনে ঠান্ডা জলে পাথরের খাঁজ থেকে খুঁচিয়ে বের করা গোলাপি অথবা বেগুনি ওই কাচ!
আমাদের খাবার আসতে দেরি হচ্ছিল। ডিসেম্বরের ১০ তারিখ। আমার জন্মদিন। অনেক দিন পর আমরা বাইরে খেতে এসেছি। বিয়ের পর পর বাইরেই খেতাম বিশেষ দিনগুলোয়। এক সময় বিশেষ দিনগুলো আর বিশেষ রইলো না। কাজের চাপে অদ্রিশ তারিখ নয়, বারের হিসাব রাখতো। আর গুরুত্বপূর্ণ তারিখ ঢুকে গিয়েছিল প্ল্যানারে- গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ের নিকাশে। ওইসব অতি বিশেষ দিনের ক্রমাংকে আমার বিশেষ দিনগুলো বিশেষত্ব হারিয়েছিল।
সেদিন অদ্রিশ মেনু কার্ডে চোখ বোলাচ্ছিল। আমি মেনু দেখছিলাম না। দেখার দরকার নেই। আমি জানি কী খাবো। ফিশ অ্যান্ড চিপস। এবার কন্সিভ করার পর থেকে ওই খাবারটাই আমার পছন্দের চূড়ায়।
কাচটা আসলে বেগুনি, গোলাপি নয়। এই সেদিন লকেটে বাঁধাই করে দিয়েছে অদ্রিশ। এখন আমার গলায় থাকে বুকের মধ্যিখানে গা ছুঁয়ে। ওয়েট্রেস মেনু বুঝে নেয়ার সময়ই চোখ চলে গেল অদূরে। আমার কোণাকুণি বসেছিলেন তারা। কোনো সিনিয়র ক্লাবের ক্রিস্টমাস পার্টি হবে হয়তো। কেউ কেউ মাথায় সান্টা টুপি পরেছে, কেউ রেইন ডিয়ার অ্যান্টলার। আমাদের খাবার চলে এসেছিল মিনিটেই। অদ্রিশের শর্মা আর করোনা বিয়ার। আমার হেডক ‘ফিশ অ্যান্ড চিপস’, সঙ্গে টারটার সস’ আর লেবু দেয়া জল। আমি যেখানে বসেছি সেখান থেকে তাকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। দুটি টেবিল লাগিয়ে বসেছেন তারা। দশজনের মতো। তাদের মধ্যে বেমানান এক সুকেশী তরুণীও আছে। কেবল তার মাথাতেই উৎসবমুখর কোনো টুপি নেই। পরিপাটি চুল। হঠাৎ চেহারাটা মনে পড়ে গেল। এ তো তিনি! শির শির শীত লাগছিল আমার। বিশ্বাস হচ্ছিল না!
আমার চমকানো অদ্রিশের নজর এড়ায়নি- ‘কী ব্যাপার?’ মাছের ফিলেতে সবে ছুরি কাটা গেঁথেছিলাম। জমে রইলো হাত। আমার দৃষ্টি অনুসরণ করে ঘাড় ঘুরিয়ে বোঝার চেষ্টা করছিল অদ্রিশ। পেটের ভেতর ঠিক তখনই আমার রাজকন্যা আলতো নড়ে উঠেছিল। আমি কোনোমতে বলি, ‘সেই ভদ্রলোক!’ অদ্রিশ জিজ্ঞাসু চেয়ে থাকে।
তরুণীকে দেখি জায়গা ছেড়ে ক্যাশ কাউন্টারের দিকে এগোচ্ছে। খাওয়া শেষ তাদের? আমার তর সয় না। হারানো যাবে না তাকে। অদ্রিশের অবাক দৃষ্টি উপেক্ষা করে চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়াই। চলে যাই সটান তাদের টেবিলে। তরুণী তখনো কাউন্টারে। ভণিতা না করেই জিজ্ঞাসা করি, ‘কেমন আছেন?’ তার চোখে বিভ্রান্তি। তড়বড় করে বলি, ‘জলকাচটা আমিই খুঁচিয়ে বের করেছিলাম।’ আমার দিকে তিনি ভাবলেশহীন তাকিয়ে থাকেন। ‘আপনার মনে নেই?’ ঠিক তখনই অনুভব করি আমার পিঠে অদ্রিশের হাত। টেবিলের অন্যরা অবাক তাকিয়ে! তার সামনে ছোট একটা চকোলেট কেক। ‘হ্যাপি বার্থডে টু রন’। মাঝখানের মোমবাতিটা জ্বালানো হয়নি। ম্যানেজার ছুটে আসে। তার সঙ্গে তরুণী- ‘এনিথিং রং?’ লকেটটা তুলে ধরি- ‘মনে পড়ে? এ কাচটা বিরল। কেবল সময়ের হিসাবে নয়, এটিই আমাকে অন্ধকার খাদ থেকে ফিরিয়ে এনেছিল। আমার এই দ্বিতীয় জীবন আপনার দান।’ তিনি অপলক তাকিয়ে থাকেন লকেটটার দিকে। গলা থেকে খুলে লকেট তার চোখের সামনে ধরি। তিনি হাতে নেন, দেখেন। বিড় বিড় করে বলেন, “একশ’ বছরের কাছাকাছি হবে, ভেরি রেয়ার।” আমি অবাক! তিনি জানতেন। ‘আপনি বুঝেছিলেন সেই দিন?’ তিনি মৃদু হাসেন এবং লকেটটা আমাকে ফিরিয়ে দেন। আমার মাথা কাজ করছিল না। চেনা নেই, জানা নেই আমাকে কেন দিয়েছিলেন? তরুণী ও অন্যরা অবাক তাকিয়ে! অদ্রিশ বুঝে গেছে ততক্ষণে। সেই বলে ঘটনাটা- এক কিউরেটর ওই এত্তটুকু পাথরটার জন্য তিন হাজার ডলার চেয়েছিল। ওই থেকে আমরা খুঁজছি তাকে। ‘এটা আপনার কাছে রেখে দিন’- অদ্রিশ অনুরোধ করে। আমার দিকে তিনি তাকিয়েছিলেন। অথচ আমাকে দেখছেন বলে মনে হচ্ছিল না- ‘ওটা তোমার গলাতেই মানাচ্ছে।’ স্থান-কাল ভুলে তাকে জড়িয়ে ধরি। আমার মাথায় আলতো হাত বোলান- ‘গড ব্লেস ইউ মাই চাইল্ড।’ তরুণী জানায়, তিনি তার দাদু। বাকিরা তার দাদুর বন্ধু এবং আজ তার জন্মদিন। আমার বুক ধক করে ওঠে। মনে হতে থাকে, সবকিছু অন্য কারো ছকে ঘটছে! তরুণীকে আমাদের বাড়ির ফোন নম্বর দেয় অদ্রিশ। যদি তিনি মত পাল্টান তাহলে যেন নিঃসংকোচে জানান আমাদের। ফিরে আসি নিজের জায়গায়। পেছনে তখন সবাই গাইছে- ‘হ্যাপি বার্থ ডে টুু রন।’ আমিও মনে মনে গাই, ‘হ্যাপি বার্থডে টু আস।’
তারা বেরিয়ে যাওয়ার মিনিট পাঁচেকের মধ্যে আমরাও উঠে পড়ি। ওই রাতে অনেকক্ষণ বার্কলি বিচে বসে ছিলাম দু’জন। আকাশজুড়ে হাজার তারার বুটি। ঠিক মাঝখানে গোল কাঁসার থালার মতো চাঁদটা জেগে ছিল আমাদের চোখের জলের সাক্ষী হয়ে। ওই সৈকতেই সেদিন তার সঙ্গে দেখা হয়েছিল অথবা আমার দ্বিতীয় জীবনপ্রাপ্তি হয়েছিল।
‘তুমি চাইলে রাখতে পারো। আমি বাবল দেয়া কাচ খুঁজছি’- তিনি বলেছিলেন। কথা বলার সময় সেদিনও আমাকে দেখেছিলেন। অথচ দেখছিলেন না। ভারী কাচের ভেতর দিয়ে তার চোখ আমার চোখ ছুঁতে পারেনি। দৃষ্টিহীনদের মতো আমাকে ছাড়িয়ে অন্য কোথাও ভেসে গিয়েছিল ওই দৃষ্টি। বাবল দেয়া কাচ মানে কী বুঝতে পারিনি, জানতেও চাইনি। হাত বাড়িয়ে চুপচাপ নিয়েছিলাম। গোলাপি মসৃণ ছোট ত্রিভুজ আাকৃতির স্বচ্ছ পাথর। কখনো গোলাপি কাচের পাথর দেখিনি আগে। মাঝে মধ্যে দুধসাদা বা সবুজ চোখে পড়েছে বালিতে অথবা জলের নিচে। ভদ্রলোক পাথরটি আমার হাতে গুঁজেই পা চালিয়েছিলেন উল্টোদিকে। খাকি শটস আর ক্রিম টি-শার্ট ও মাথায় হ্যাট। সূর্য ঢলার আগের তীব্র কমলা আলোয় আমার চোখ ধাঁধিয়েছিল। আমি চোখের ওপর হাত ঢেকে আলো ছেনে তার চলে যাওয়া দেখেছিলাম।
আমি একাই এসেছিলাম সেদিন। আমার কাজ ঠিক বেলা ৩টায় শেষ হয়েছিল। লাইব্রেরিতে তেমন লোকজন ছিল না। বইগুলোর কল নম্বর মিলিয়ে তাকে তুলে রাখার পর তাকে সাহায্য করেছিলাম বই বাছাইয়ে। ছেঁড়া-খোঁড়া, অতি ব্যবহারে বাঁধাই ঢিলে হয়ে যাওয়া বইগুলো ‘ফ্রেন্ডস অফ লাইব্রেরি’র চ্যারিটিতে যাবে। বেলা ১১টার দিকে দুই শিশু এসেছিল তাদের মায়েদের সঙ্গে। হল্লা হয়েছিল খানিকটা। একই পাজল নিয়ে দু’জনেই টানাটানি।
আমি অনিয়মিত। কেবল কেউ ছুটিতে গেলেই ডাক পড়ে। সাধারণত শনি-রবিবারের শিফটেই আমাকে ডাকে। ওই দু’দিন ভিড় থাকে অনেক। সেদিন বুধবার। হঠাৎ করেই আমার ডাক পড়েছিল। কেবল দু’ঘণ্টা। যার শিফট তিনি হঠাৎ অসুস্থ। অনেক দিন পর উইক ডে-তে কাজ। রাজি হয়ে গিয়েছিলাম। বাড়িতে দম বন্ধ লাগছিল।

ব্রাউন আর গার্থ এসেছিলেন লাঞ্চের পর। তারা রোজ আসেন। দু’জনই রিটায়ার্ড। শনি বা রবিবারে তারা আসেন না। তাই আমার সঙ্গে খুব একটা দেখাও হয় না। গার্থ বেশ আলাপী। লাইব্রেরিতে বই পড়ার চেয়ে কথা বলাতেই তার আগ্রহ বেশি। সেদিন আমাকে দেখে নামটা বলার চেষ্টা করলেন বেশ ক’বার। আমার নাম স্নিগ্ধা। ছোট করার কোনো উপায়ই নেই। আমার সুপারভাইজর শুরুতে নামটি ছাঁটাই করে ‘সু’ বলে ডাকার চেষ্টা করেছিলেন। আমি সাড়া দিইনি। আমার নাম নিয়ে কেউ কারিকুরি করুক তা আমার পছন্দ নয়। ‘স্নিগ্ধা’ শেষমেশ তাদের কাছে হয়ে গেছে ‘স্নিডা’। তাও সই। তবে সু কিছুতেই নয়।
গার্থ বিপত্নীক । ছেলেমেয়ে নেই। সেদিন বলেছিলেন সরকারি হোমে চলে যাওয়ার কথা ভাবছেন। কাজের বাইরে আমাদের কথা বলা নিষেধ। সুপারভাইজর সব খেয়াল করেন। তাই গার্থের সঙ্গে কথা এগোয়নি। আসলে সেদিন তার সঙ্গে দেখা না হলে সৈকতে যাওয়া হতো না আর নিকষ কালো বিষন্নগন্ডি থেকে আমিও বের হতে পারতাম না। তিনি যাওয়ার সময় পেয়ারাগন্ধি এক ধরনের লজেন্স দিয়েছিলেন হাতে গুঁজে। তা ছোট ছোট ও দারুণ স্বাদের। আমার চোখে জল জমেছিল। ঘাবড়ে গিয়েছিলাম কোনো অনর্থ না হয়ে যায়! কাজে ইমোশন দেখানো নিষেধ। সবাইকে ছেড়ে আমাকে কেন? কেন যেন মনে হয়েছিল, তিনি জেনেছেন কোনোভাবে। আমার অগোচরে আমার মিসক্যারেজ আর মেল্ট ডাউন নিয়ে কথা হয় আমি জানি। পৃথু বৌদি সুপারভাইজরের পড়শি। পৃথু বৌদির সূত্রেই আমার এ কাজটি পাওয়া।
সে ১৩ সপ্তাহ পূর্ণ হওয়ার আগেই চলে গিয়েছিল। তাল তাল রক্ত। হাসপাতালে পুরোদিন রাখেনি, পাঠিয়ে দিয়েছিল। বাড়িতে ঢুকতেই সাপের মতো পাক খেয়ে খেয়ে ঠা-া গ্রোথ তলপেট বেয়ে উঠছিল। দরজা খুলে বাঁক নিলেই ওই ছবি। এক মাথা ঝাঁকড়া চুল, গাঢ় নীল ঘেঁষা কালো চোখ। আমি তাকাইনি। আমাকে হাতে ধরে বিছানায় দিয়ে এসেছিল অদ্রিশ। ছবিটি চুম্বকের মতো টানছিল। পায়ে পায়ে চলে গিয়েছিলাম আবার প্যাসেজে। ‘মাম্মা’- আমার কানের কাছে কেউ ফিসফিসিয়ে ডেকেছিল। আহা বাবুটা আমার! মায়ের কাছে রইলি না। আমি হাঁটু ভেঙে পড়ে গিয়েছিলাম ছবিটার সামনে। রাতে পৃথু বৌদি আর তপনদা এসেছিলেন। পৃথু বৌদি অনেক বুঝিয়েছিলেন- ‘১৩ সপ্তাহে কিছুই তৈরি হয় না। অযথাই মন খারাপ করছ।’ আমার এসব কথা একদম ভালো লাগছিল না। অদ্রিশকেই ভস্ম করছিলাম মনে মনে। কী দরকার ছিল রাজ্যের লোককে ডাকার!
স্বপ্নটি দেখতে শুরু করি আরো পরে। ফেনা ফেনা ঢেউয়ের চূড়ায় সে বসে আছে। মাথা ঘিরে দেবশিশুর মতো সবুজ শ্যাওলার মালা। মাম্মা!- দু’হাত বাড়িয়ে ডাকছে। এতো কাছে। তাও কিছুতেই তাকে ছুঁতে পারছিলাম না। ‘মাম্মা’!- ধড়মড় করে উঠে বসেছিলাম। বিছানা থেকে নেমে চলে গিয়েছিলাম ছবিটির কাছে। চুলের ডগায় জলের ফেনা লেগে আছে যেন। অদ্রিশ এসেছিল পিছু পিছু। কিছু বলেনি। লিভিংরুমে চলে গিয়েছিল। ফিরে এসেছিলাম শোয়ারঘরে একা। সারা রাত এপাশ-ওপাশ করেছি। সকালের দিকে চোখ লেগে এসেছিল। ঘুম থেকে উঠে দেখি অদ্রিশ নেই। ছবিটি যে নেই তা বুঝেছি অনেক পর। কিন্তু ফাঁকা দেয়ালজুড়ে এক মাথা ঝাঁকড়া চুলে জলের বিন্দু নিয়ে সে জেগেই রইলো। অদ্রিশকে কখনো জিজ্ঞাসা করিনি ছবিটির কথা।
আমার ঘুম হতো না রাতে। কেবল কানভরে ঢেউয়ের গর্জন আর মাম্মা ডাক। মাঝে মধ্যে নোনা জলের গন্ধ ঝাপটা দিতো নাকে। সে কী বলতে চায় আমাকে? ওই শুরু। সময় পেলেই জলের ধারে। বার্কলি বিচ আমার বাড়ি থেকে ১০ মিনিটের ড্রাইভ। পুরো সামার প্রায় প্রতিদিন গিয়েছি। কোনো কোনোদিন দু’বার। মনে হতো হেঁটে চলে যাই ঢেউয়ের চূড়ায় তার খোঁজে।
সেদিন লাইব্রেরি থেকে বেরিয়েও এসেছিলাম গোধূলিবেলায়। দিন ছোট হচ্ছে। গাড়ি পার্ক করে পাথরের সিঁড়ি ভেঙে জলের কাছে যেই এলাম সেই সূর্য ডোবার আনজাম করছে। ভদ্রলোককে শুরুতে খেয়াল করিনি। বালিটা পেরিয়ে হাঁটুজলে দাঁড়িয়েছিলাম। মাংস কেটে হিম ঢোকাচ্ছিল ঠান্ডা কনকনে জল। সূর্যটা বাম কোণায় লাল চোখে শেষ জরিপ করছে। কেউ নেই আশপাশে। মনে হলো আজই ওইদিন! এই অস্থিরতার শেষ হোক আজ। হঠাৎ দেখি তাকে। আমার ডানপাশে। একটু দূরে যেন জল ফুঁড়ে বের হলেন! উবু হয়ে জলের নুড়ির খাঁজ থেকে কিছু একটা বের করার চেষ্টা করছিলেন। আচমকা মাথা তুললেন এবং আমাকে বললেন, ‘সাহায্য করবে একটু?’ আমাকে ঝট করে কেউ যেন টেনে ফেরালো তীরে। এগিয়ে গেলাম। তিনি দেখালেন ছোট, প্রায় দেখা যায় না এমন গোলাপি আভার কাচের টুকরোটি। এবার আমার অবাক হওয়ার পালা! এতো ছোট টুকরো নজরে এলো কীভাবে? তার বাঁকানো লোহার শলাটা দিয়ে টেনে বের করতে পারছিলেন না। হাত ডুবিয়ে নখের খোঁচায় দু’তিনবারের চেষ্টায় বেরিয়ে এলো বাইরে। কী সুন্দর! আমার হাত জমে গিয়েছিল ঠান্ডায়। তিনি উঁচু করে সূর্যের দিকে মেলে ধরলেন টুকরোটি। এরপরই জানালেন, বাবল নেই এতে। চাইলে আমি রাখতে পারি। হাত পেতে নিয়েছিলাম। মুঠোবন্দি করার সঙ্গে সঙ্গে আমার হাতের ওম ফিরে এসেছিল। ভেতরে অন্য রকম প্রশান্তি অনুভব করছিলাম। চোখ তুলতেই দেখি চলে যাচ্ছেন তিনি।
বাড়ি ফিরে লাইটের আলোয় আবিষ্কার করেছিলাম কাচপাথরটি গোলাপি নয়, হালকা বেগুনি। অন্য রকম। অদ্রিশ এলেই তাকে দেখাই। সেও অবাক হয়! নাইটস্ট্যান্ডের ওপর ছোট পোর্সেলিনের বাটিটার ভেতরে রেখেছিলাম। অনেক দিন পর ওই রাতে শিশুর মতো ঘুমিয়েছিলাম। সকালে বেশ দেরি করেই ঘুম ভাঙে। চোখ খুলেই পাথরটার কথা মনে হয়। অদ্রিশ ততোক্ষণে চলে গেছে কাজে। কিন্তু পাথরটা গেল কোথায়! টেবিলের নিচে, আশপাশে তন্ন তন্ন খুঁজি। কোত্থাও নেই। হালকা সন্দেহ ছুঁয়ে যায়। ছবিটি ফেলে দিয়েছিল, কাচটাও কি?
মন খারাপ করে বসে ছিলাম। হঠাৎ মনে পড়লো, তিনি বলেছিলেন- ‘বাবল নেই, তুমি চাইলে রাখতে পারো।’ বাবল দেয়া কাচ মানে কী? আমি ল্যাপটপ নিয়ে বসি। এরপরই খুলে যায় এক অদ্ভুত দুনিয়া। কখন যে বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যা হলো তা জানতেই পারিনি। অদ্রিশ এসে আলো জ্বালে। ঘরের কাজ কিছুই হয়নি। খাওয়া-দাওয়াও না। অদ্ভুত চোখে সে দেখছিল আমাকে। কাচটির কথা আমার মনেই নেই আর। উচ্ছ্বাস চেপে রাখতে পারি না- ‘জানো, বাবল দেয়া কাচগুলোর অনেক দাম এখন। এগুলো হাতে তৈরি কাচ। গ্লাস ব্লো করে কাচের বোতল বানানো হতো তখন। গোলাপি কাচটি কেমন বেগুনে লাগছিল না? ওটা অনেক আগের। ১৯১৫ সালের পর এখানে এমন কাচ আর বানানো হয় না। এতে ম্যাঙ্গানিজ মেশানো। সাদা ছিল এক সময়। সূর্যের আলোয় এমন বেগুনি হয়ে গেছে।’ আমাকে কথায় পায়। অদ্রিশ অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ! তারপর আমার ড্রেসিংটেবিলের ওপর গয়নার বাক্স থেকে কাচের টুকরোটি বের করে হাতে দেয়। ওই অদ্ভুত প্রশান্তি ফিরে আসে।
সেদিন রাতে আমার চোখের পাতা লাগতেই স্বপ্নে দেখি গোধূলিবেলা। চিক চিক বালির ভেতর সবুজ, হলুদ, লাল- আরো কত রঙ! এরপর থেকেই আমার জলকাচের নেশা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়েছি জলের ধারে, সৈকতে। কাচ পাওয়ার সম্ভাব্য সময়গুলো জেনেছি। জেনেছি পূর্ণিমায় যখন চারপাশ ভেসে যায় তখন ঢেউ বয়ে আনে জলকাচ। ভাটার দু’ঘণ্টা আগে বা পরে বেড়ে যায় ওইসব গুপ্তধন পাওয়ার সম্ভাবনা। ভিড় ছাপিয়ে আমার মতো কাচপ্রেমীদের ক্রমেই আলাদা চিনতে শিখেছি। জেনে গিয়েছি কাচ সংগ্রাহকদের অদৃশ্য কঠোর নিয়ম। ঢেউয়ের ওই দান সবটুকু নেয়া যায় না, কিছু রেখে আসতে হয়। মাঝে মধ্যে অদ্রিশও সঙ্গী হয় আমার।
মেয়েটি ফোন দিয়েছিল দু’তিন দিন পর। তার নাম লরা। জানিয়েছিল, তার দাদু তথা রন আলঝেইমারের রোগী। প্রায় ২০ বছর আগে এক দুর্ঘটনায় ওই সাগরেই ডুবে মৃত্যু হয়েছিল তার মেয়ের। তিনি লরার মা। জলকাচের গয়না গড়তেন তিনি। দূর-দূরান্ত থেকে মেয়ের জন্য কাচ কুড়িয়ে আনতেন তিনি। কাচ নিয়ে তার অগাধ পড়াশোনা। চোখের দেখায় নির্ভুল বলে দিতে পারতেন সময় বা কাচের মূল্যমান। আলঝেইমার ধরা পড়েছিল বেশ আগে। ক্রমেই গুটিয়ে নিচ্ছিলেন নিজেকে। গত এক বছর লোকজনের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। স্টেইজ ফাইভ। এমনই হওয়ার কথা। স্মৃতি চলে গেছে এরও আগে। লরা অবাক হয়েছিল সেদিন! কেননা এক বছর পর তার দাদু পুরো অর্থপূর্ণ বাক্য বলেছেন। সে বললো, ‘কাল তোমরা আমার দাদুকেও নতুন জীবন দিলে। ধন্যবাদ তোমাদের।’ লরার ধারণা, রন তার মেয়ের ছাপ দেখেছিলেন আমার মধ্যে। তাই জেনে-বুঝেই অসাধারণ কাচটি আমাকে দিয়েছিলেন তিনি। ফোন রেখে দেয়ার পর লকেটটা হাতে নিয়ে দেখছিলাম। কেমন গাঢ় বেগুনি লাগছে যেন! হয়তো মনের ভুল।
আমার শরীরের ভেতর বাড়ছে আমার কঙ্কাবতী। ‘মাম্মা’- আমি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি। আমি জানি, সে থাকবে এবার।

মুক্তিযুদ্ধের সার্থকতার জন্য

যতীন সরকার

 

‘উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ বিরানায়, মুক্তিযুদ্ধ
হায়, বৃথা যায়, বৃথা যায়, বৃথা যায়।’
- শামসুর রাহমান

 

কবির এই খেদোক্তি মিথ্যা নয় নিশ্চয়ই। মুক্ত স্বদেশকে উদ্ভট উটের পিঠে চলতে আমরা সবাই তো দেখেছি ও দেখছি, এখনো সে চলার বিরাম হয়নি। সেই চলাকে আমরা কখনোই যে মেনে নিয়েছি, তাও নয়। উদ্ভট উটের পিঠ থেকে আমার স্বদেশকে নামিয়ে আনার চেষ্টাও আমরা করেছি। আমাদেরই মধ্যে এ রকম চেষ্টা করতে গিয়ে যার বুক-পিঠ ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিল তার নাম নূর হোসেন। মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য নূর হোসেনের আত্মত্যাগের কথা আমরা গর্বের সঙ্গে স্মরণ করি। কবি শামসুর রাহমানও তাই করেছেন। কিন্তু নূর হোসেনের হত্যাকারী ধর্মান্ধের দল এখনো আমাদের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিধর এবং সেই শক্তির প্রকাশ তারা প্রতিনিয়তই ঘটিয়ে যাচ্ছে। শামসুর রাহমানের মতো কবিকেও তাদের শক্তির লক্ষ্যবস্তু করেছিল। এ সম্পর্কে কবি আবু হাসান শাহরিয়ার লিখেছেন- 

“বুকেপিঠে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ লিখে রাজপথে প্রাণ দিয়েছিলেন নূর হোসেন। তাকে নিয়ে একটি কবিতা লিখেছিলেন শামসুর রাহমান- ‘বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়’। ওই বুক শামসুর রাহমানের নিজেরও ছিল। সেখানে সেক্যুলার মানবতার পদ্ম ফুটতো। ওই পদ্ম অসহ্য বলে ধর্মান্ধরা তাকে খুন করতে চেয়েছিল। ছেলে ফায়াজের উপস্থিত বুদ্ধির কারণে বেঁচে গিয়েছিলেন সে যাত্রায়। আরো একটি ওই রকম বুকের মানুষ ছিলেন হুমায়ুন আজাদ। সে বুকও রক্তাক্ত করেছিল ধর্মান্ধরা।”
শামসুর রাহমান ও হুমায়ুন আজাদ- দু’জনই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। কিন্তু তাদেরই মতো যাদের বুকে ‘সেক্যুলার মানবতার পদ্ম’ ফোটে তারা আজও অসহায়। ধর্মান্ধদের কাছে ওই ‘পদ্ম’টি আজও অসহ্য। অথচ ওই সেক্যুলার মানবতার পদ্মটিকে অধিগত করাই ছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
পাকিস্তানি শাসনে ওই পদ্মটি ছিল আমাদের নাগালের বাইরে। তাই ওই পদ্মটিকে পাওয়ার জন্য পাকিস্তানকেই আমরা প্রত্যাখ্যান করেছিলাম, আমরা সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামে নেমেছিলাম এবং স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে ওই সংগ্রামের সমাপ্তি
ঘটিয়েছিলাম। কিন্তু তাতে আমাদের মুক্তি সংগ্রামের সমাপ্তি ঘটেনি, বরং স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই সে সংগ্রামের প্রকৃত সূচনা ঘটেছিল। সেই সূচনাতেই আমরা একটি পাকা দলিল তৈরি করে রাষ্ট্রের ওপর আমাদের (অর্থাৎ জনগণের) মালিকানা পাকা করে

নিয়েছিলাম। সেই দলিলটির নাম ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান’। অভিজ্ঞজনরা বলেন, এমন সংবিধান নাকি পৃথিবীর খুব কম রাষ্ট্রেরই আছে। আমাদের সংবিধানটি তো আসলে লেখা হয়েছে লাখ লাখ শহীদের রক্তের অক্ষরে। এর প্রতিটি বাক্য সেই রক্তের ঋণ পরিশোধের অঙ্গীকারের ধারক। অবিরাম মুক্তি সংগ্রাম চালিয়ে গিয়েই সেই অঙ্গীকার পূরণ করা সম্ভব হতে পারে। দেশের প্রতি মানুষকে ক্ষুধা, নগ্নতা, অশিক্ষা, কর্মহীনতা ও অনিরাপত্তা থেকে মুক্তি দেয়াই অবিরাম এবং অনিঃশেষ মুক্তি সংগ্রামের লক্ষ্য। সে লক্ষ্যকে সামনে রেখেই আমরা স্বাধীন দেশে পথচলা শুরু করেছিলাম। স্বাধীনতাকে সার্থক করে তোলার প্রত্যয়ই ধারণ করেছিল আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধুই হয়েছিলেন মুক্তি সংগ্রামেরও সেনাপতি।
কিন্তু হায়, আমাদের সেনাপতিকেই সপরিবারে নিহত করে অট্টহাস্য করে উঠলো স্বাধীনতা তথা মুক্তিযুদ্ধের ঘৃণ্য দুশমনরা। তাদের অট্টহাস্যকে স্তব্ধ করে দিতে পারলাম না আমরা। কেবল নিষ্ফল ক্ষোভে আঙুল কামড়ানো ছাড়া কিছুই যেন করার রইলো না আমাদের। আমাদের সংবেদনশীল কবিদের কণ্ঠেও হাহাকার ধ্বনিত হয়ে উঠলো। এমনই এক কবি অকাল প্রয়াত রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। ‘বাতাসে লাশের গন্ধ’ অসহ্য হয়ে ওঠায় রুদ্ররোষে তিনি বলে উঠলেন-
‘স্বাধীনতা- এ কি তবে নষ্ট জন্ম?
এ কি তবে পিতাহীন জননীর লজ্জার ফসল!
জাতির পতাকা আজ খামচে ধরছে পুরনো শকুন।
বাতাসে লাশের গন্ধ-
নিয়ন আলোয় তবু নর্তকীর দেহে দোলে মাংসের তুফান।’

বাতাসে লাশের গন্ধ এখনো মিলিয়ে তো যায়ইনি, প্রতিনিয়ত সে গন্ধ বরং বাতাসকে কেবলই দূষিত করে চলছে। সেই গন্ধের হাত থেকে কি মুক্তি মিলবে না আমাদের?
মিলবে অবশ্যই। তবে সে মুক্তি আপনাআপনিই আমাদের হাতে এসে ধরা দেবে, আমাদের কিছুই করতে হবে না- এমন ভেবে আত্মপ্রসন্ন হয়ে বসে থাকলে সেটি হবে মূর্খের স্বর্গবাস। ওরকম মেকি স্বর্গ থেকে মাটিতে নেমে আসতেই হবে। আত্মপ্রসাদের সামান্যতম অবকাশও নেই। জাতির পতাকাকে যারা খামচে ধরেছে সেই পুরনো শকুনগুলোর নোংরা হাতগুলো ভেঙে না দেয়া পর্যন্ত আমাদের পরিত্রাণ নেই। শুধু পুরনো শকুন নয়, তাদের নতুন চেলাগুলোও রেয়াত দেয়া চলবে না। মিত্রের বেশ ধরে আমাদের ভেতরে ঢুকে পড়া শত্রুদের যথাসময়ে চিনতে পারিনি বলেই অনেক বিপত্তি এতকাল ধরে পোহাতে হয়েছে। এখনো যদি শত্রু-মিত্র চিনে নিতে না পারি তাহলে সেসব বিপত্তি আরো বহু গুণিত হয়ে দেখা দেবে।
সমস্ত বিপত্তি থেকে পরিত্রাণ লাভের একমাত্র উপায়ই হলো মুক্তি সংগ্রামের মূল্যবোধের আলোয় পথচলা। আমাদের শত্রুদের লক্ষ্যই হলো সেই আলোটি নিভিয়ে ফেলা, অন্তত জনগণের দৃষ্টিসীমা থেকে আলোটিকে দূরে নিয়ে যাওয়া। সেই আলোকবর্তিকাটি আড়াল করে খোঁপ খোঁপ অন্ধকার তারা এখানে-সেখানে ছড়িয়ে দিচ্ছে। এ রকম অন্ধকারের মূল উপাদানই হলো ধর্মান্ধতা। স্পষ্ট করে বলি- ধর্ম নয়, ধর্মান্ধতা। আমাদের মানুষের ধর্মপ্রাণতা হচ্ছে ‘ধর্ম’ শব্দটির মূল মর্মের ধারক আর ধর্মান্ধতা ধর্মের মূল মর্মেরই সংহারক। ধর্মপ্রাণদের চিত্ত শুভবুদ্ধি ও মুক্তবুদ্ধিতে ভরপুর বলেই সাম্প্রদায়িকতা তাদের কাছে একান্তই ঘৃণ্য। অন্যদিকে সাম্প্রদায়িকতাই ধর্মান্ধদের আশ্রয়। জনগণের ইহলৌকিক মঙ্গলবিধায়ক অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রকেও তারা ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িকতার আওতায় নিয়ে আসার কোশেশ করে। দেশের ধর্মপ্রাণ লোকসাধারণের কাছে ধর্ম হচ্ছে তাদের অন্তরের গভীরে সুরক্ষিত অমূল্য সম্পদ। আর ‘হৃদয়ের অন্তস্তলে যে মানিক গোপনে জ্বলে সে মানিক কভু কি কেউ বাজারে বিকায়?’ অথচ ধর্মান্ধরা তো ধর্মকে বাজারের পণ্যেই পরিণত করে ফেলে।
ধর্মের এ রকম বাজারি পণ্য হওয়া রোধ করতেই আমাদের স্বাধীন রাষ্ট্রটিকে আমরা সেক্যুলার মানবতার পদ্ম দিয়ে ভরিয়ে তুলতে চেয়েছিলাম। কারণ ওরকম রাষ্ট্রেই তো ‘গণতন্ত্র’ তার সহস্র দল মেলে সবার জন্য সুবাস ছড়ায় এবং সেই গণতন্ত্রই রাষ্ট্রের সব অধিবাসীর জন্য অন্ন-বস্ত্র-শিক্ষা-বাসস্থান-কর্মসংস্থান-নিরাপত্তার নিশ্চিত ব্যবস্থা করে। কিন্তু একান্ত দুঃখ এই- সেই একান্ত বাঞ্ছিত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় আমরা চূড়ান্ত ব্যর্থ হয়েছি।
হ্যাঁ, গণতন্ত্রের একটা কাঠামো আমরা বজায় রেখেছি বটে কিন্তু তন্ন তন্ন করে খুঁজেও সেই কাঠামোর অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের অন্তঃসারের দেখা মিলবে না। জনগণ তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করে সংসদে বা অন্যত্র পাঠায়। উদ্দেশ্য- প্রতিনিধিরাই গণতন্ত্রকে সার্থক করে তুলবে। আসলে সেটি হয় কী!
হয় না যে, সে কথা বোঝানোর জন্য একটুও বাকবিস্তারের প্রয়োজন পড়ে না। এটি সর্বজনজ্ঞাত সত্য। সংসদকে ফালতু বানিয়ে তোলার ক্ষেত্রে, মাসের পর মাস সংসদে না গিয়ে সংসদ সদস্যের সব সুবিধা গ্রহণের ক্ষেত্রে, সংসদে গিয়েও জনগণের সমস্যা-সংকটের সমাধান খোঁজার বদলে নোংরা খিস্তিখেউড়ের আসর জমিয়ে তোলার ক্ষেত্রে- ‘ক’ দল আর ‘খ’ দলের মধ্যে কোনোই তফাত দেখতে পাওয়া যায় না। ভোটের আগেকার ও পরেরকার জনপ্রতিনিধিদের আচার-আচরণ দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভোটার জনগণকে বলতে হয়- ‘যে যায় লঙ্কায় সে-ই হয় রাবণ।’
এ অবস্থারও অবসান ঘটিয়ে রাষ্ট্রের ওপর জনগণের মালিকানার যথাযথ প্রতিষ্ঠা করা যায় অবশ্যই। এরই সুলুক সন্ধান আমাদের সংবিধানেই পাওয়া যায়। আমাদের সংবিধানে যে ‘বিকেন্দ্রীকরণ’-এর কথা বলা হয়েছে এর তাৎপর্য একান্তই গভীর। শাসক ব্যবস্থার প্রকৃত বিকেন্দ্রীকরণের মধ্য দিয়েই রাষ্ট্রের ওপর জনগণ তার মালিকানার প্রকৃত স্বাদ উপভোগ করতে পারে। কিন্তু সংবিধানের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে যারা ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের বদলে কেন্দ্রীকরণকেই শক্তপোক্ত করে যাচ্ছে তারাও আমাদের অচেনা নয়।
আমাদের ঐতিহ্যবাহী ছাত্র আন্দোলনের কথা এখন আমাদের স্মৃতিতেই আছে কেবল। এখনকার মূলধারার ছাত্র আন্দোলনের অবস্থান অমুক বা তমুক রাজনৈতিক দলের ছত্রচ্ছায়ায়। এসব ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে ছাত্রের চেয়ে অছাত্রেরই সংখ্যাধিক্য। তাদের মূল কাজ চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখলবাজি এবং আরো নানান ধরনের ‘বাজি’। এসব ‘বাজিকর’দের কবলে পড়ে পরিত্রাহি চিৎকার করতে হচ্ছে নিরীহ জনগণকেই। কিন্তু বাজিকররা বাজি দেখায় যাদের সুতার টানে তারা আমাদের অতিচেনা হলেও তাদের কেশাগ্র স্পর্শ করার ক্ষমতাও আমাদের কারোরই নেই।
জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী তার একটি সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রের এসব অনর্থের জন্য আমাদের সরকারগুলোর ‘সামর্থ্যরে অভাব’কে চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেছেন-
“সামর্থ্যরে অভাব যে রয়েছে তার প্রমাণ হ’ল সংসদীয় নির্বাচনে যারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসছেন, একটি জরিপে তাদের সবার জন্য একটি প্রশ্ন ছিল, নির্বাচিত হলে আপনি কী করবেন? জবাব প্রায় এক রকমেই ছিল- এলাকার রাস্তাঘাট, শিক্ষা-স্বাস্থ্য কোনো একটা বিষয়ে কিছু করা। ৩০০ জনের মধ্যে একজনও বলেননি, তিনি নতুন কোনো আইন চান বা প্রচলিত কোনো আইনের সংস্কার চান। এ থেকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তাদের চাওয়ার কোনো প্রকৃত রাজনৈতিক ভিত্তি নেই এবং আইন প্রণেতা হিসেবে তাদের কোনো প্রকৃত প্রস্তুতি নেই বা প্রকৃত যোগ্যতা নেই। অন্য কথায় আমাদের সংসদ গঠিত হয়েছে একদল আইনের প্রশ্নে অজ্ঞ ব্যক্তির সমন্বয়ে। স্বাভাবিক নিয়মে সংসদ সদস্যদের সংখ্যাগুরু অংশ আইন বিষয়ে অভিজ্ঞ হবেন। আমাদের জাতীয় সংসদে এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেছে। ফলে যা হওয়ার তাই-ই হয়েছে।”
এ রকম অবাঞ্ছিত অবস্থার অবসানের জন্য প্রয়োজন সচেতন নাগরিকদের সার্থক কর্মপন্থা গ্রহণ। এ রকম কর্মপন্থা গ্রহণের মানে হলো একটি তীব্র তীক্ষè সামাজিক আন্দোলনের সৃষ্টি করা। মুক্তিযুদ্ধকে সার্থক করে তোলার জন্য এ রকম সামাজিক আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই। এ রকম সামাজিক আন্দোলনের সাফল্যের মধ্য দিয়েই কাক্সিক্ষত বাংলাদেশের সৃষ্টি হতে পারে। সে রকমটি হলেই কোনো কবিকে আর সখেদে বলতে হবে না, ‘মুক্তিযুদ্ধ হায়, বৃথা যায়, বৃথা যায়, বৃথা যায়।’

 


লেখক : শিক্ষাবিদ ও সমাজচিন্তক

 

এলো বৈশাখ

 

বয়ে যাওয়া সময়ের স্রোতে বসন্ত চলে গেল নীরবে অনেক ঘটনার সাক্ষি হয়ে। আর এই ‘চলে যাওয়া মানেই প্রস্থান নয়’, ফিরে আসার নতুন প্রস্তুতি। বসন্ত যে অপার রূপসুধা রেখে গেল প্রকৃতির ভাঁজে ভাঁজে তাকে ভিন্নমাত্রা দিতে এসেছে বৈশাখ।
ষড়ঋতুর প্রতিটি মাস স্বতন্ত্র। তবে কোথায় যেন মিশ্রিত অদ্ভুত রসায়নে। বৈশিষ্ট্যে আলাদা হলেও রূপ-বৈচিত্র্য প্রকাশে কারো কমতি নেই।

বাংলার বারোটি মাস বাজার অর্থনীতি ও সংস্কৃতির আগ্রাসনে বর্তমান নগর জীবনে তেমন প্রভাব বিস্তার করতে না পারলেও গ্রামবাংলার সামাজিক জীবনে বাংলা সন এখনো সচল। জন্ম, মৃত্যু, বিয়ের মতো সামাজিক অনুষ্ঠানগুলো এবং কৃষকের ফসল বোনা ও তোলা কর্মকা-ে বাংলা সন-তারিখ এখনো কার্যকর। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পূজা-পার্বণ, উপবাস, শ্রাদ্ধ-শান্তি- সব অনুষ্ঠানই বাংলা সন-তারিখের হিসাবে হয়ে থাকে।
মোগল সম্রাট আকবর কর আদায়ের সুবিধার্থে বাংলা সন প্রবর্তন করেছেন বলে কথিত থাকলেও এ নিয়ে বিতর্কের অবকাশ রয়েছে। হিজরি সনের ওপর ভিত্তি করা হলেও বঙ্গাব্দের গঠন পদ্ধতি ভারতীয় শকাব্দের মতো। অথচ এটি শকাব্দের সমগোত্রীয় নয়। শকাব্দ বা বিক্রমাব্দের মাস ও দিনের নামের অনুরূপ বাংলা সনের মাস ও দিনের নাম। তবে শকাব্দের প্রথম মাস চৈত্র আর বিক্রমাব্দের শুরুর মাস কার্তিক। অথচ বাংলা সনের প্রথম মাস হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে শকাব্দের দ্বিতীয় এবং বিক্রমাব্দের সপ্তম মাস বৈশাখকে। পেছনে তাকালে দেখা যাবে, বঙ্গদেশের ফসলি সনের প্রথম মাস অগ্রহায়ণের অবস্থান বাংলা সনে অষ্টম। স্মরণাতীতকাল থেকেই ধন-ধান্যে ভরা অগ্রহায়ণ মাসকে বছরের প্রথম ধরে বর্ষ গণনার রীতি প্রচলন ছিল এ অঞ্চলে। অগ্রহায়ণ হলো বছরের অগ্রে যে যায়। কৃষির দিক বিবেচনায় আনলে ফসল কাটার মাস অগ্রহায়ণ হওয়ার কথা বছরের শুরুর মাস। আবার আনন্দ-উৎসবের জন্যও গ্রীষ্মকাল শীত বা বসন্তের মতো মনোরম নয়। তাহলে নববর্ষ কেন শুরু হলো গ্রীষ্মের বৈশাখে তা এখনো রহস্যময়। তবে যিনিই বাংলা সনের প্রবর্তন করে থাকেন না কেন, তিনি যে হালখাতা ও পুণ্যাহর মাধ্যমে বাঙালির উৎপাদন ও বণ্টন ব্যবস্থার সঙ্গে অর্থনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবন চমৎকার সমন্বয়ে অচ্ছেদ্যভাবে বেঁধে দিয়েছিলেন এতে সন্দেহ নেই। তবে এটিও ঠিক সময়ে সব বাঁধনই শিথিল হয়ে যায়। অনেক ঐতিহ্য বাঙালির জীবন থেকে বিস্মৃত না হলেও ঠাঁই নিয়েছে কাগজ, গল্প ও কবিতায়।

বছরের শুরুটি উৎসবমুখর করে তুলেছেন বাঙালি সাধ্যমতো। শুরুর দিনটি অতীত ও ভবিষ্যতের মেলবন্ধনের রঙিন স্মারক করে রাখতে চায় বাঙালি ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্রীয় জীবনে। কিন্তু বাংলা নববর্ষ পালন হলো কতোটুকু বাঙালিয়ানায়? কতোটা সরে আসতে হয়েছে আবহমান ঐতিহ্য থেকে? কতোটা নিতে গিয়ে কতোটুকু হারালো বাংলা সংস্কৃতি নিজের স্বকীয়তা? এর জবাব আমরা পেয়ে যাবো ষড়ঋতুর বারো মাসে বাঙালির যাপিত জীবনের প্রতিটি দিনে। তবে নতুন বাংলা বছরটি জাতীয় জীবনে বাঙালি খুঁজে পাক আপন ছন্দ, দ্বন্দ্ব ভুলে। সকল পঙ্কিলতা ধুয়ে দেশ এগিয়ে যাক এই হোক প্রর্থনা।

 

লেখা : শাকিল সারোয়ার
মডেল : আইরিন
পোশাক : নিপুন
ছবি : ফারহান ফয়সাল

জলেশ্বরীর ট্রেনের বাঁশি

সৈয়দ শামসুল হক

 

 

গল্পের ঘন নীল পথের ওপর সবুজ সোনালি রঙে একটা বাঁশি এসে পড়ে। আহা, বাঁশি! ওই বাঁশি, বুকে যার সাতটি ছিদ্র। এই ছিদ্র গরম লোহার শিকে পুড়িয়ে পুড়িয়ে তৈরি।
পোড়া ছিদ্রের ভেতর থেকে আগুনের দগ্ধতা ফুলের বাগান করে স্বর্গ থেকে সুর টেনে আনে। কৃষ্ণ বাজায়, রাধা ঘর ছেড়ে যমুনার তীরে বাইরে যায়। আমাদের পল্লী গায়ক টুংসু মামুদের কণ্ঠে গান ফোটে ভাওয়াইয়া অভ্যাসের বিপরীতেÑ

‘ও লো সই, আমি কার কাছে যাই
আমি কার কাছে বা যাই।’

বাঁশির শব্দে প্রাণ করে আইঢাই। কিন্তু আমাদের গল্পপটে ওই বাঁশির ছবি এখন নয়। আমরা কানে শুনতে পাই জলেশ্বরীর দিকে আসা ট্রেনের বাঁশি।
রাজারহাট, নবগ্রাম আর জলেশ্বরীতে পাট ও সুপারির চালান অধিক হয়ে গেলে রাতদুপুরে জলেশ্বরীতে মালগাড়ি আসে। গভীর রাতে স্তব্ধতার ভেতরে আকাশের নক্ষত্র পোড়া অগ্নির নিচে মালগাড়ি এসে রাজারহাটে থামে। ফেরার পথে এখান থেকে মালের চালান তুলবে। নবগ্রামেও তুলবে না। একেবারে জলেশ্বরী এসে থামবে। তারপর মারোয়াড়িদের পাটের গাঁইট আর ব্যাপারীর বস্তা ঘুমজাগা চোখে কুলিরা মালগাড়িতে তুলতে থাকবে। বাঁশি দিয়ে গাড়ি ছেড়ে যাবে।
অসময়ের গাড়ি, মধ্যরাতের গাড়ি নবগ্রাম থেকেই তার বাঁশির আওয়াজ পাওয়া যায়Ñ অ্যা, অ্যা, অ্যা বলে সে ডাকতে থাকে, আমি আসছি। আমি আসছি।
বাঁশির তো এই কাজ। আসার খবর দেয়া। শ্যামের বাঁশি তার ভেতরেও খবর দিয়ে আধকোষার পাড়েÑ না না, যমুনার পাড়ে তমাল তলে ডেকে এনেছিল। বাঁশি দিতে দিতে গাড়ি ফিরে যায়। ক্রমেই তার বাঁশির শব্দ অন্ধকারের নক্ষত্রের ছোট্ট একটি বিন্দু হয়ে মিলিয়ে যায়।
খুব ছোটবেলা থেকেই এই বাঁশির সঙ্গে আমরা পরিচিত। সকাল ১০টায় ব্রিটিশ আমলের কাঁটায় কাঁটায় গাড়ি আসে। ১১টায় ফিরে যায় গাড়ি। আমরা মাগরিবের নামাজের পর সন্ধ্যাকালে ডিস্ট্যান্ট সিগনালের কাছে জলেশ্বরীর দিকে আসা ট্রেনের বাঁশি শুনি। তখন আমাদের পড়তে বসার সময় হয়নি। আমরা দুঃসাহসী বালকেরা কেউ কেউ মা-বাবার চোখ এড়িয়ে স্টেশনে ছুটে যাই গাড়ি দেখতে, মানুষ দেখতে। মানুষের ওঠানামা দেখতে।
ওই বালক বয়সে যাত্রীদের এই আসা-যাওয়া নিয়ে আমাদের মনে একটা ভাবের উদয় হয়। ওই ভাবের সঙ্গে স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িটি এখনই ছেড়ে যাবে। গাড়িটির বাঁশি বেজে ওঠে। সাত ছিদ্রের বাঁশি তো নয়, ইঞ্জিনের খোলের ভেতরে তামার নলের ভেতরে জমে থাকা বাষ্প। ড্রাইভারের হাতে সুতা ঝুলছে। ওই সুতো ধরে টান দিলেই নানান সুরে বেজে ওঠে ইঞ্জিনের বাঁশি। সবার হাতে ইঞ্জিনের ওই কলের বাঁশির সুর ফোটে না। সুতায় টান দিলে মনে হয়, তাদের হাতে পাগলা ঘোড়া হিঃ হিঃ করে ডেকে ওঠে। সামনে বড় চাকার নিচে সাদা বাষ্পের মেঘ তুলে নবগ্রামের দিকে রওনা হয়ে যায়।
আর ওই যে ভাবের কথা আমরা বলেছি, আমরা জানি না এর কী অর্থ। আমরা দুই চোখভরে যাত্রীদের দেখি। এ জন্যই ট্রেনের বাঁশি শুনে জলেশ্বরীর ছোট্ট স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে এসে দাঁড়াই। আমরা ওই তল্লাটের বালক বলে টিকিট মাস্টার আমাদের চ্যালেঞ্জ করেন না। যাত্রী বের হওয়ার গেইট দিয়ে আমাদের বের করে দেয় পিঠে থাবড়া মেরে হাসতে হাসতে বলেন, ‘দুই বেলা ইস্টিশানে আসিয়াও টেরেন দেখিবার হাউস না মিটিল?’
আমাদের ভেতরে দুষ্টু মোফাজ্জল বলে, ‘হাউস কি আপনার মিটিছে?’
‘তুই তো বড় নঙ্গর হইছিস রে?’
মোফাজ্জল দৌড়ে বেরিয়ে যায় টিকিট মাস্টারকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে।
ইঞ্জিনের বাঁশি বেজে ওঠে। গাড়ি ছেড়ে চলে যায়।
এর চেয়ে কতো হাসকাব্য হয়। একবার নবগ্রাম থেকে এক পোয়াতি বৌকে জলেশ্বরী হাসপাতালে আনা হচ্ছিল রাতের গাড়িতে। ব্যথা উঠেছে আর জলেশ্বরী ঘনিয়ে আসছে। ইঞ্জিনটাও বুঝি টের পেয়েছে তার গাড়িতে পোয়াতি বৌ। তীব্রস্বরে ড্রাইভার বাঁশি বাজাচ্ছে। স্টেশন মাস্টার অবাক হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন প্ল্যাটফর্মের কাছে এতো ঘন ঘন বাঁশি? তবে কি কেউ কাটা পড়েছে? আত্মহত্যা করলো কেউ? কিন্তু বাঁশি থেমে যায়। ড্রাইভার লাফ দিয়ে নামে। এদিকে গার্ড তার সাদা গাড়ি থেকেও লাফ দিয়ে নামে। আমরা দেখি স্বপ্নে, কী বাস্তবে, এই বয়সে এখন আর তা মনে নেইÑ দু’জনের হাতে দুই নবজাতক। যমজ শিশু। ইঞ্জিনের বাঁশির শব্দে ভীত ওই নারীর গর্ভ থেকে দুই সন্তান বেরিয়ে এসেছে। তাদের নাম রাখা হয় খুব গোপনে, খুব কানে কানে যেন কেউ শুনতে না পায়। ছেলেটির নাম জয়, মেয়েটির বাংলা। ১৯৭১ সাল।
এটা তো হাসকাব্য নয়। তবু যে বালকবেলায় আমাদের মনে হয়েছিল, কারণ বুঝি, জগতের আমরা তখন বুঝি কিছুই জানি না। সবখানে উজ্জ্বল অকারণ হাসির একটা লাফিয়ে ওঠা চোখেই দেখতে পাই। আমাদের ভেতরে বড় প-িতের প-িত নফলচন্দ্র দাস। সে বলে, ‘আরও শুনিয়া রাখো, টকি সিনেমা যে দেখিতে যাস, ছবির আওয়াজ তো শুনিস, কথা কয়, কাঁই কথা কয়? সিনেমার সাদা পর্দার পেছনে পিতলের থরে থরে গেলাস আর সেই গেলাসের ভেতর হতে আওয়াজ ফুটি ওঠে।’
আমাদের বিশ্বাস হয় বা হয় না। আবার মনে পড়ে, স্টেশন রোডে মিষ্টির দোকানের মালিক হানিফ ভাই বলেন, ‘বাঁশি এমন চিজ। স্তব্ধ মারি পড়ি থাকার নয়। নিশীথ রাইতে একা বাঁশি বাজি ওঠে। আগুনপোড়া বাঁশি সাত ছিদ্র হতে বুড়িয়া আঙুলের ডগার মতো সাত পরি বিরায় আর বিলাপ করে আর বাঁশি বাজায়।’
আমাদের মন বিষণœ হয়ে যায়। আমাদের ভেতরে অতি বড় হাসিওয়ালা বালকও গম্ভীর হয়ে যায়।
হানিফ ভাই রাতের শেষে গাড়িটির ছেড়ে যাওয়ার বাঁশি শুনে হাতঘড়িতে টাইম মেলানÑ ‘রাইতের এখন ১১টা। ব্রিটিশ আমল বলিয়া কথা, টাইম ধরিয়া গাড়ি আসে, গাড়ি যায়। সেই দূর নবগ্রাম হতে তার বাঁশির আওয়াজ পাওয়া যায়।’

একদিন বাঁশির আওয়াজ আর আসে না। ইঞ্জিনের বাঁশি আর বাজে না। কিন্তু গাড়ি আসার ঘড় ঘড় খড় খড় শব্দ পাওয়া যেতে থাকে। এতো সংকেতময় ওই শব্দ যেন সে স্তব্ধ হয়ে এগোতে পারলেই আরাম পেতো। আমরা কান পেতে থাকি। ট্রেনের বাঁশি বিকল হয়ে গেছে, নাকি এটা ভূতের গাড়ি? রাতদুপুরে আপনমনে জংশন থেকে জলেশ্বরীর দিকে আসছে?
জলেশ্বরীতে ট্রেন লাইন বসার হুকুম যখন হয় তখন পয়সার বরাদ্দে টান পড়ে। তাই রেললাইনের জন্য পুরনো ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের আঁকাবাঁকা নরম রাস্তার ওপর লাইন পাতা হয়। তাই রাজারহাট থেকে জলেশ্বরী পর্যন্ত গাড়ি সাত-আট মাইলের বেশি বেগে চলতে পারে না।
আমরা আতঙ্কে বিছানায় বসে থাকি। ঘরে ঘরে মানুষ জেগে ওঠে। তারাও জেগে বসে থাকে। যুবকরা লাঠি নিয়ে পথে নামে। তারা কী করে যেন টের পায় রংপুর থেকে মিলিটারির গাড়ি নিঃশব্দে জলেশ্বরীর দিকে আসছে শত শত খুনি পাঞ্জাবি সৈন্য নিয়ে।
গাড়ির গতি ধীর এগিয়ে আসছে। থামা নেই। এগিয়ে আসছেই। রাতের শেষ অন্ধকারেও ট্রেনের জানালা দিয়ে তাদের উঁচিয়ে ধরা রাইফেলগুলোর নল চোখে পড়ছে। যুবকরা চৌরাস্তায় বেরিয়ে এসে পুরনো দিনের কলের গানের চোঙ খুলে চিৎকার করে ডাকছেÑ ‘মা-বোনেরা, মাও-জননীরা ঘর হতে বির হয়া আসেন, পাঞ্জাবিরা আসিচ্ছে। কাউকে না ছাড়ান দিবে। যার যা আছে ঘরে থুইয়া বির হয়া আসেন।’
তারপর জলেশ্বরীর নারী-যুবতীরা দীর্ঘ সারি বেঁধে আধকোষা নদীর ওপারে ভোগডাঙায় চলে যায়। এদিকে ভোর হয়ে আসে। ভোরের আলো পাপী-পুণ্যবান সাধু বা শয়তান বিচার করে না। সবার ওপর আলো পড়ে। জলেশ্বরীর প্ল¬্যাটফর্মে খুনি ট্রেন এসে থামে। জানালায় জানালায় রাইফেলের ফলায় সূর্যের আলো পড়ে ঝিকমিক করে ওঠে যেন আলো নয়, রক্তেই ওদের পিপাসা। ঠিক তখন একাত্তরে শেষবারের মতো জলেশ্বরীর দিকে আসা ট্রেনটিতে বাঁশি বেজে ওঠে। তীব্র-তীক্ষè ওই স্বর। সঙ্গীতের স্বর নয় যেন একটি চিৎকারÑ ‘আদমি নেহি, মিট্টি চাহিয়ে, মিট্টি চাহিয়ে, আদমি নেহি। সব মুক্তিকো তালাশ কর, তালাশ কর।’ তারা সারা শহরে ছড়িয়ে যায়। তারপর থেকে জলেশ্বরীতে আসা-যাওয়া আর কোনো ট্রেনেরই বাঁশি বাজে না। নীরবে, নিস্তব্ধে জলেশ্বরী লাশ হয়ে যেতে থাকে। গানের গলা ছিল আমাদের খোকা ভাইয়ের। সে গাইতোÑ ‘শোনো একটি মুজিবরের কণ্ঠ থেকে...।’ তার গলাচেরা লাশ জলেশ্বরীর রাস্তায় পড়ে থাকে। কিন্তু তার গান আকাশ-বাতাসে মানুষের মধ্যে ভাসে।
চাঁদ বিবির পুকুরে চাঁদ বিবির লাশ পড়ে থাকে উপুড় হয়ে। হাই স্কুলের কমনরুমে মুমূর্ষু বাঙালিদের হাতের রক্তাক্ত ছাপ। কেউ একজন খুব বড় করে ‘বর্গীয় জ’ লিখেছিল। তারপর আর লিখতে পারেনি। সম্ভবত তার রক্ত ফুরিয়ে গিয়েছিল। এরপর পাশেই কে একজন শক্ত হাতে খুব বড় করে ‘অন্তস্ত অ’ লেখে। দেয়ালে ফুটে ওঠে বিশাল অক্ষরে জয়। রক্তের রঙ লাল। ওই লাল দিনে দিনে শুকিয়ে কালো হয়ে যায়। যেন পৃথিবীর সব রঙ শোষণ করে যে সাদা এর বিপরীতে এই কালো রঙ দুষ্ট-নষ্ট রঙ হয়ে পৃথিবীকে এখনো শাসন করতে চায়। পারে না।
হঠাৎ চারদিক থেকে বাঁশির শব্দ শোনা যায়। ট্রেনের বাঁশি যেন শত শত গাড়ি এখন জলেশ্বরীর দিকে। এই ট্রেনেরও জানালায় জানালায় বাংলার যুবকরা, সঙ্গে তাদের সাইকেল, সাইকেলের ডগায় নতুন সূর্যের আলো। তারা চুপ চুপ করে জলেশ্বরীতে নামে আর চিৎকার করে বলে, ‘জয় বাংলা’। এরই সঙ্গে সুর মিলিয়ে ট্রেনের শত শত বাঁশি বেজে ওঠে। পৃথিবী আচ্ছন্ন হয়ে যায়। বাঁশির ওই শব্দে ট্রেনের বাঁশি নয় যেন উত্তাল একপাল ঘোড়া আকাশের দিকে মুখ তুলে হ্রেষা নয়, বাঁশির শব্দ করছে আর একটি বাঁশি তার বুকে সাত ছিদ্র থেকে বাংলার চোখের অশ্রু আধকোষা নদীর ঢলের মতো সরছে, ঝরে পড়ছে।

(২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে হাসপাতালে লেখক রোগশয্যায় গল্পটি রচনা করেছেন।)
অনুলিখন : লেখকের স্ত্রী কথাশিল্পী আনোয়ারা সৈয়দ হক

Page 2 of 7

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

Twitter feed

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…