Page 2 of 2

দুঃসাহসিক অভিযাত্রী

অরিন্দম মুখার্জী বিংকু

 

বাঙালির এক্সপিডিশন যাত্রার সূচনালগ্নেই দুঃসাহস ও অসম্ভবকে সম্ভব করতে তারা ব্যস্ত আর সেই সময় আর্বিভূত হন এক তরুণ। সাঁতার নিয়ে নিমজ্জিত থাকলেও পারিপার্শ্বিকতা এড়িয়ে চলা যায় না। জীবন তো আর ঢেউয়ের মতো নির্ভেজাল নয়। ঢেউটিকে প্রতিপক্ষ মনে করে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু জীবনের জটিলতার সঙ্গে পেরে ওঠা কঠিন। তাকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তবু এক বুক প্রত্যাশা নিয়ে শুরু হয় সাঁতার। ব্যর্থ হলে ব্যক্তিÑ তার কি-ই বা আসে যায়। তবে তার ওপর নির্ভর করছিল স্বাধীনতাকামী বাংলাদেশের সম্মান। ওই সম্মানটুকু যে করেই হোক রক্ষা করতে হবে। মনে মনে সৃষ্টিকর্তার কছে এই নিবেদন রেখে জলে নামতেই একের পর এক ক্যামেরার ক্লিক। বিশ্ব ক্রীড়া জগতে বাঙালির সাফল্যের স্বীকৃতি প্রথম আদায় করেছিলেন যে ব্যক্তি তিনি আমাদের বাংলাদেশেরই সন্তানÑ ব্রজেন দাস।
বিশ্ব জয়ের আনন্দে ইতিহাসে গৌরব উজ্জ্বল হয়ে থাকার শিরোপা ছিনিয়ে নিতে কে না চান। ওই সূত্র ধরেই অলিম্পিক গেমসের প্রতি পদক্ষেপে পুরো বিশ্ব আন্দেলিত হয়। তবে বাংলাদেশও কেন নয়। বাংলাদেশিরাও পারেন ওই অভিযাত্রার শীর্ষস্থানীয় তীর্থ যাত্রী হতে। অলিম্পিক আসরে যার কাছে পরাজিত হয়ে উত্তাল সমুদ্রের ঢেউটিকে হার মানিয়েছে, যার জয়ের ছাপ ইংলিশ চ্যানেল নীরবে মেনে নিয়েছে তিনি একজন বাঙালি, আমাদের দেশের গৌরব ও দুঃসাহসিক অভিযাত্রী সাঁতারু ব্রজেন দাস।


ইংলিশ চ্যানেল পশ্চিম ইউরোপের একটি সাগর। তা ফ্রান্স ও গ্রেট ব্রিটেন দ্বীপটিকে পৃথক করেছে এবং আটলান্টিক মহাসাগরের সঙ্গে উত্তর সাগরের যুক্ত করেছে। ফরাসি ভাষায় ইংলিশ চ্যানেলকে বলা হয় লা মঁশ। তা ‘কোর্টের হাতা’ নামে পরিচিত। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ৫৬২ কিলোমিটার এবং প্রস্থ অবস্থানভেদে সর্বোচ্চ ২৪০ থেকে সর্বনিম্ন ৩৪ কিলোমিটার হতে পারে ডোভারের প্রণালিতে। পূর্বদিকে এর বিস্তার কমে মাত্র ৩৪ কিলোমিটার হয়ে যায়। সেখানে এটি ডোভার প্রণালির মাধ্যমে উত্তর সাগরের সঙ্গে সংযুক্ত হয়। ইংলিশ চ্যানেলের প্রধান
দ্বীপগুলোর মধ্যে আছে আইল অব ওয়াইট ও চ্যানেল দ্বীপপুঞ্জ।
ইংলিশ চ্যানেল সাঁতরিয়ে গৌরবের অধিকারী দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম সাঁতারু ব্রজেন দাস। ১৯২৭ সালের ৯ ডিসেম্বর মুন্সীগঞ্জের বিক্রমপুরে কুচিয়ামোড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার বাবা হরেন্দ্র কুমার দাস ও মা বিমলা দাস। তার স্ত্রী মধুচন্দা। তাদের ঘরে তিন মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছেন।
গ্রামের স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়ি ব্রজেন দাসের। ছেলেবেলা থেকেই সাঁতারের প্রতি তার খুবই ঝোঁক ছিল। ফুটবল খেলা সবচেয়ে বেশি পছন্দ করতেন। স্কুল জীবনে ক্যাপ্টেন ছিলেন। ক্রিকেটও ছিল তার পছন্দের। কিন্তু সাঁতারটিকে কখনোই তার খেলা মনে হয়নি।


ব্রজেন দাস চলে আসেন ঢাকায়। এখানে আসার পর সাঁতারটি ছিল মজার ও আমোদের ব্যাপার। বুড়িগঙ্গা ছিল তার বাসার কাছেই। সাঁতারে হাতেখড়ি হয় ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীতে। এখানে থেকেই সাঁতারে তার উৎসাহ তৈরি হয়। আন্তঃবিদ্যালয় খেলাধুলায় সাঁতার প্রতিযোগিতায় সব সময়ই প্রথম স্থান দখল করতেন তিনি।
ব্রজেন দাস ১৯৪৬ সালে ঢাকার কেএল জুবিলি স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করে কলকাতার বিদ্যাসাগর কলেজে ভর্তি হন। কলকাতায় যাওয়ার পর বিশেষ কারণেই সাঁতারের প্রতি আগ্রহ জন্মায় তার। কারণ কলকাতায় বাড়ির কাছাকাছি ফুটবল বা ক্রিকেট খেলার মাঠ ছিল না। অথচ সুইমিং পুল ছিল। সন্তরণ ক্রীড়ার বিজ্ঞান, সাঁতারের বিভিন্ন কায়দা ইত্যাদি সেখান থেকেই শেখেন। ১৯৪৮ সালে আইএ পাস করে বিএ-তে ভর্তি হন তিনি।
ব্রজেন দাস ১৯৪৮-১৯৪৯ সালে আন্তঃবিদ্যালয় খেলাধুলায় সাঁতার প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান দখল করেন এবং প্রথম বড় ধরনের জয়ের আস্বাদ পান। ১৯৫২ সালে পশ্চিমবঙ্গে ১০০ মিটার ফ্রিস্টাইল সাঁতার প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হন।
কলকাতায় শিক্ষা জীবন শেষে ঢাকায় ফিরে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও ব্রজেন দাস পড়াশোনা শেষ করতে পারেননি। বাংলাদেশে ফিরে তিনি পূর্ব পাকিস্তান ক্রীড়া ফেডারেশনের প্রতি বার্ষিক সাঁতার প্রতিযোগিতা চালু করতে উদ্বুদ্ধ করেন। এ রকম একটি প্রতিযোগিতা প্রথম অনুষ্ঠিত হয় ১৯৫৩ সালে। ১৯৫৫ সালে পাকিস্তান জাতীয় প্রতিযোগিতায় ১০০ ও ৪০০ মিটার ফ্রিস্টাইল সাঁতারে শিরোপা জেতেন তিনি।
ব্রজেন দাস ১৯৫৫ সালে পাকিস্তান অলিম্পিকে সাঁতার প্রতিযোগিতায় প্রথম তো হন, এবং মোট চারটি খেলায় স্বর্ণপদক লাভ করেন। ১৯৫৬ সালে মেলবোর্নে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অলিম্পিকে তাকে পাঠানো হয়নি। সেখানে পাকিস্তান দল থেকে তাকে বাদ দিয়ে পাকিস্তানি সাঁতারুদের নেয়া হয়েছিল। ওই অপমানজনক পরিস্থিতিই তাকে অলিম্পিকে অংশ না নিয়েও সমতুল্য সম্মান ও সাফল্য অর্জনের চিন্তায় বাধ্য করে। মনস্থির করেন, ইংলিশ চ্যানেল তাকে সাঁতরিয়ে অতিক্রম করতেই হবে। তার ওই ভাবনায় অনুপ্রেরণার শক্তি জুগিয়েছেন ইস্ট পাকিস্তান স্পোর্টস ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক এসএম মহসিন।
১৯৫৮ সালে অনুষ্ঠিত ইংলিশ চ্যানেল সাঁতার প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে আমন্ত্রিত হন ব্রজেন দাস। এরপর চরম হতাশা কাটিয়ে ব্যক্তিগত উদ্যোগে দীর্ঘপথ সাঁতারের অনুশীলন শুরু করেন। ১২ থেকে ১৬, ১৬ থেকে ২৪ এবং ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা টানা সাঁতারের অনুশীলন করেন। শীতলক্ষ্যা ও উন্মত্ত মেঘনায় সাঁতার চর্চা করে নিজেকে তৈরি করেন। এক সময় সাঁতরিয়ে নারায়ণগঞ্জ থেকে চাঁদপুর অতিক্রম করেন তিনি। তখনকার দিনে ওই দূরত্ব অতিক্রম করতে স্টিম শিপ প্রায় আড়াই ঘণ্টা সময় নিতো।


ইংলিশ চ্যানেল সাঁতার প্রতিযোগিতায় ২৩টি বিভিন্ন দেশের প্রতিযোগী অংশ নেন। দক্ষিণ এশিয়ার সাঁতারুদের মধ্যে নারীও ছিলেন পাঁচজন। ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে অংশ নিয়েছিলেন একমাত্রÑ ব্রজেন দাস।
১৯৫৮ সালের ১৮ আগস্ট প্রায় মধ্যরাতে ফ্রান্সের তীর থেকে প্রতিযোগিতা শুরু হয়। অনেকে ক্লান্ত হয়ে মাঝপথে ক্ষান্ত দিলেও ব্রজেন দাস সংকল্পে অটুট থেকে অগ্রগামীদের একজন হয়ে সাঁতার শেষ করেন এবং ইতিহাসে নিজের নাম লেখান।
ইংলিশ চ্যানেল এমনিতেই অশান্ত থাকে। সেদিন বাড়তি ছিলÑ প্রচ- কুয়াশা। প্রতিযোগিতা ছিল- ফ্রান্সের তীর থেকে সাঁতরে ইংল্যান্ডের তীরে এসে উঠতে হবে। প্রতিযোগিতা শেষ হয়েছিল পরের দিন বিকেলে। প্রচ- প্রতিকূল পরিবেশে সাঁতার কেটে পর দিন বিকেলে প্রথম সাঁতারু হিসেবে ইংল্যান্ড তীরে এসে পৌঁছান ব্রজেন দাস। প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন। ১৯৫৮, ১৯৫৯, ১৯৬০ ও ১৯৬১ সালসহ মোট ৬ বার তিনি ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেন। ১৯৬১ সালে ১০ ঘণ্টা ৩৫ মিনিটে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে তিনি বিশ্ব রেকর্ড গড়েন। এ জন্য তাকে ‘লেটনা ট্রফি’ দেওয়া হয় ১৯৮৬ সালে। দেশের উল্লেখযোগ্য প্রায় সব সাঁতার
প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে নিজেকে সেরা সাঁতারু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। ইংরেজরা যখন পুরোপুরি শাসন শুরু করে দিয়েছিল তখন অনেক বাঙালি জীবিকার তাগিদে প্রথম ঘর ছেড়ে বাইরে বের হওয়া শুরু করেন। অনেকেই তখন বিলেতে যেতেন পড়াশোনা বা জীবিকার তাগিদে। দুঃসাহসিক কাজ বা এক্সপিডিশনের জন্য নয়। তবে ইংরেজ আমলেই বাঙালির এক্সপিডিশনের যাত্রা। দুঃসাহস আর অসম্ভবকে সম্ভব করতেই হয়তো ব্রজেন দাস বিলেত যান। ইংলিশ চ্যানেল প্রতিযোগিতার আগেই ১৯৫৮ সালের জুলাইয়ে আরেকটি সাঁতারের আমন্ত্রণ আসে। ভূমধ্যসাগরে ইটালির কাপ্রি থেকে নেপলস্ পর্যন্ত সাঁতার কেটে যেতে হবে। এটি প্রতিযোগিতা ছিল না। ফলে লন্ডন থেকে ইটালি গিয়ে ওই খেলায় অংশ নেন প্রশিক্ষণের পেশা গ্রহণের জন্য। সেখান থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতা ও সাফল্য সাঁতরিয়ে সমুদ্র পাড়ি দেয়ার জন্য তার আত্মবিশ্বাস সুদৃঢ় করে।
বিদেশ থেকে বহু আমন্ত্রণ পাওয়া সত্ত্বেও ব্রজেন দাস কোনো কিছুর মোহে স্বদেশ ছেড়ে চলে যাননি। ১৯৫৯ সালে প্রাইড অফ পারফরম্যান্স পাকিস্তান সরকার তাকে বিশেষ সম্মানে সম্মানিত করে। ১৯৭৬ সালে জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার কওঘএ ঙঋ ঈঐঅঘঘঊখ ঈযধহহবষ ঝরিসসরহম অংংড়পরধঃরড়হ ড়ভ ঃযব টহরঃবফ করহমফড়স অর্জন করেন তিনি।
১৯৯৭ সালে প্রাণঘাতী ক্যানসারে আক্রন্ত হয়ে ব্রজেন দাস বেশ কিছুদিন কলকাতায় চিকিৎসা গ্রহণ করেন। সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে ১৯৯৮ সালে ১ জুন ৭০ বছর বয়সে সেখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ৩ জুন ঢাকার পোস্তগোলায় তাকে সমাধিস্থ করা হয়। তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৯ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার (মরণোত্তর) প্রদান করে।
সাঁতারটিকে পেশা হিসেবে নিয়ে অন্য দশজনের মতো সাধারণ জীবন যাপন করেও ব্রজেন দাস ওই দুঃসাহসিক কাজ করতে পেরেছিলেন কেবল স্বপ্ন ও ইচ্ছাশক্তির জোরে। ওই সঙ্গে সহায় ছিল তার ভাগ্য।
ইচ্ছার ঢেউয়ে ফুলে ওঠে প্রতিভার নদী। ওই নদীতে সাঁতার কেটে যেন ব্রজেন দাস পাড়ি দিয়েছিলেন ইংলিশ চ্যানেল। দেখিয়ে দিয়েছিলেন পাকিস্তানের সিদ্ধান্ত কতোটা ভুল ছিল। কতোটুকু ছিল বাংলার বিপরীত। তার কাছেই তো সেদিন হয়েছিল পাকিস্তানের বড় পরাজয়।


শীতলক্ষ্যা ও বুড়িগঙ্গা নদীর মতোই মানুষ। এত উত্তাল ও খোলামেলা ঢেউ অন্য কোনো নদীর কী আছে! বিক্ষিপ্ত স্রোতে নিজেকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছেন ব্রজেন দাস ইংলিশ চ্যানেল পর্যন্ত। সেখানে বসে না থেকে বাংলাদেশের চাঁদপুরের অরুণ নন্দী ও উত্তর কলকাতার আরতি সাহাকে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেয়ার স্বপ্নে তিনি সাহস জুগিয়েছেন। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের মধ্যে গভীর সুনসান রাতে তিনি জলে ডানা ঝাপটা এক জলাশ্রয়ী মুক্তিযোদ্ধা। এমন গৌরব আছে যে জাতির সে জাতি কি পরাজয় মেনে নিতে পারে?
কৃতী সাঁতারু ব্রজেন দাসকে আজ আমরা গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি।

 

খুঁড়তে খুঁড়তে কতদূর যাও 

মনি হায়দার 

 

তুমি কী বলতে চাও? রাহুল তীব্র চোখে তাকায় মনিকার দিকে। বললেই আমি বিশ্বাস করবো? আমার কি চোখ নেই? কী মনে করো নিজেকে? আমি অফিসে থাকলেও আমার একটা চোখ থাকে তোমার দিকে।
আমার দিকে?
হ্যাঁ, তোমার দিকে।
তুমি আমাকে সন্দেহ করো?
না বললে মিথ্যা বলা হবে। হাতের গ্লাস মুখের কাছে নিয়ে এক চুমুক গ্রহণ করে মনিকার একটু কাছে আসেÑ হ্যাঁ মনিকা, তোমাকে আমি সন্দেহ করি।
আমাকে! আমাকে তুমি সন্দেহ করো? অবিশ্বাস্য চোখে তাকায় মনিকাÑ কেন আমাকে তুমি সন্দেহ করো?
করি... হ্যাঁ তোমাকে সন্দেহ করি... কারণ তুমিÑ
শেষ করো। রাহুল শেষ করোÑ কেন আমাকে তুমি সন্দেহ করো?
বলছি তো করি...
আমিও তো জানতে চাইÑ কেন করো? কী সন্দেহ করো?
রাহুল হাতের গ্লাসটা রাখে টেবিলের ওপর। একটু একটু টলছে। চোখের পাতা কাঁপছে। নিজেকে প্রাণপণে স্থির রাখার চেষ্টা করছে।
মনিকা এগিয়ে যায়। হাত বাড়ায় তার দিকে।
হাতটা সরিয়ে দেয় রাহুলÑ না, আমাকে ধরতে হবে না। আমি ঠিক আছি। তোমার কী মনে হয়, আমি মাতাল? না, আমি একদম মাতাল নই। তুমি স্কুল থেকে বাসায় ফিরতে দেরি করো কেন?
আমি স্কুল থেকে বাসায় ফিরতে দেরি করি!
হ্যাঁ, করো।
তুমি তো থাকো অফিসে। কেমন করে জানো আমি স্বুল থেকে বাসায় ফিরতে দেরি করি!
বললাম না, আমি অফিসে গেলেও একটা চোখ তোমার জন্য বাসায় রেখে যাই।
রাহুল, তুমি ঠিক আছ?
আমি রাহুল সব সময়ে ঠিক থাকি। আমার কোনো দ্বিধা নেই।
তুমি কেন আমাকে সন্দেহ করো? আমরা যদি আমাদের সন্দেহ করি তাহলে দুনিয়ায় আমাদের কেউ বিশ্বাস করবে? কেউ আমাদের মানুষ ভাববে? কোনো বন্ধু আমাদের কাছে আসবে? রাহুল, প্লিজ, বোঝার চেষ্টা করো। আমাদের জায়গা খুব কম। তুমি আর আমি ছাড়া আমাদের কেউ নেই- বলতে বলতে মনিকার গলা ধরে আসে। টেবিল ধরে নিজেকে সামলে নেয়ার চেষ্টা করে। রাহুল জানালার কাছে যায়। তাকায় রাতের ঢাকা নগরীর দিকে। স্রোতের মতো গাড়ি যাচ্ছে। গতিশীল গাড়ির আলোর ফোয়ারা ছুটে চলেছে দিগি¦দিক। হাতের গ্লাস মুখের কাছে নেয়, চুমুক দেয় না, সময় নেয়। তাকায় মনিকার দিকে। মনিকার বিষাদ কান্নাকাতর মুখ রাহুলকে একটুও আকর্ষণ করে না। অথচ মাত্র বছর দুয়েক আগেও মনিকার একটু মন খারাপ হলে দিশাহারা হতো রাহুল। দুই বছর... বছরে বারো মাস... দুই বছরে চব্বিশ মাস... একজন মানুষের জীবনে দুই বছর কি খুব বড়? পরিস্থিতির কারণে কখনো বড়, কখনো খুব ছোট হতে পারে। বাইরে থেকে ফিরে তাকায় রাহুলÑ শ্লেষের সঙ্গে প্রশ্ন করে, তুমি অস্বীকার করতে পারো, তোমার কাছে ওই লোকটা আসে না?
কোন লোকটা আসে আমার কাছে?
ন্যাকা! মনে করো তোমার ন্যাকামিতে আমি সব ভুলে যাবো? কখনোই না।
কে আসে আমার কাছে? মরিয়া হলে জানতে চায় মনিকা। লোকটার নাম বলো।
কে আবার? তোমার আগের স্বামী কুহুক।
মনিকা কোনো কথা বলে না, বলতে পারে না। রাহুলের কথায় মনিকার কথা বলার সব শক্তি হারিয়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত রাহুল এভাবে বলতে পারলো? মাত্র দু’বছরের ব্যবধানে একজন রাহুলের এতো পরিবর্তন! কিন্তু কিসের ওপর ভিত্তি করে রাহুল এমন নির্মম অসত্য বলতে পারলো? কবে থেকে সে এমন ভাবতে শুরু করেছেÑ মনিকা মনে করতে পারছে না। তবে হ্যাঁ মাস ছয়েক আগে দুপুরে স্কুলে গিয়েছিল রাহুল। হঠাৎ যাওয়ায় যেমন বিস্মিত হয়েছিল, আনন্দিতও হয়েছিল। স্কুলের প্রিন্সিপালকে বলে ছুটি নিয়ে রাহুলের সঙ্গে একটা রেস্টুরেন্টে যায়। দু’জন মিলে খেয়েছে, বিকেলে ঘুরেছে রিকশায়। সত্যিই দিনটা অদ্ভুত ভালো লেগেছিল। এ জন্যই কুহককে ত্যাগ করে কুহকেইর বন্ধু রাহুলের হাত ধরে...। সেই আসাটা কি ভুল ছিল? কোনটা ভুল আর কোনটা ফুল? কাঁটার ভেতরই তো ফুলের জন্ম। আবার ফুলের পাশেই কাঁটার অবস্থান।
কুহকের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল বছর আটেক আগে। সামান্য পরিচয় ছিল। কলেজ বন্ধু কামনার বড় ভাই কুহক। কামনাদের বাসায় গেলে দু’একবার দেখা হয়েছে। কুহক একটা বেসরকারি কলেজে পড়ায়। কামনার মা-বাবা বাসায় এসে প্রস্তাব দিলে মনিকার মা-বাবাও রাজি হয়ে যান। মনিকার কারো সঙ্গে প্রেম ছিল না। দেখতে সুন্দরী বলা যায়। গায়ের রঙ হালকা কালো। মুখ অসাধারণ লাবণ্যবালু চিকচিক করে। লম্বা লতানো শরীর। আর বড় সম্পদ তার গভীর দুটো চোখ। দুই পরিবারের যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে বেশ জাঁকজমকের সঙ্গে বিয়েও হলো। বিয়ের পর মনিকা আবিষ্কার করে, কুহক কথা কম বলে। কিন্তু যখন বলে, যা বলে তা খুবই যুক্তিযুক্ত ও পরিবেশের সঙ্গে মানানসই। যদিও গলাটা একটু ফ্যাসফেসে তবুও সহ্য করার মতো। হাসাহাসিও কম করে। এই নীরবতা মনিকার কাছে মনে হয়েছিল, অপার সৌন্দর্র্যের ভিন্ন এক রূপান্তর। যারা বেশি কথা বলে, খিলখিল করে হাসে তাদের ব্যক্তিত্ব থাকে না। কুহক শান্ত-সমুজ্জøল এক প্রসবন। বেশ জমে ওঠে সংসার...। কিন্তু বছর তিনেকের মধ্যেই হাঁপিয়ে ওঠে মনিকা। এ তো মানুষ নয়, পাথর। যে নীরবতাটি মনে হয়েছিল অম্লান সৌন্দর্যের রূপরেখা সেটিই বিষাক্ত বেদনার মতো, শ্রাবণের কান্নার মতো মনিকাকে ঘিরে রাখে। বেচারা একটু ঝগড়াও করে না, রাগ করে না। কঠিন কথাও বলে না। মনিকা কিছু বললে সামান্য দাঁত বের করে হাসে। ভাবটা যেন সে এ যুগের গৌতম বুদ্ধ।
মনিকা মন খারাপ করলে অবশ্য বিচলিত হয় কুহকÑ কি হয়েছে তোমার?
কিছু হয়নি আমার।
তাহলে মন খারাপ করে আছ কেন?
আমি মন খারাপ করে থাকলে তোমার কী?
কুহক একেবারে চুপ। মনে হয়, তার সব কথা শেষ।
মনিকা ভেবে পায় না, এই লোক ক্লাসে পড়ায় কেমন করে? কী পড়ায়? কিন্ত শুনেছে, ক্লাসে ভালোই পড়ায় এবং অনেকের প্রিয় শিক্ষকও। কোনো কাঁটা কম্পাসে মেলাতে পারে না কুহক নামক মানুষটির চরিত্র বা চরিত্র ব্যকরণ। কামনা বা শাশুড়ির কাছে জেনেছে, কুহক সব সময়ই বাসায় কম কথা বলে। এমন দিন গেছে বাসায়, ২৪ ঘণ্টায় কারো সঙ্গে একটা কথা বলেনি। কেমন করে পারে! দিন-রাত, বাসায় যতোটুকু সময় পায়, মুখের সামনে একটা বই নিয়ে বসে থাকে। পড়েও বিচিত্র ধরনের বই। যদিও কুহুক বাণিজ্যের ছাত্র, কলেজে পড়ায় বাণিজ্য সম্পর্কে তবুও পড়ে বিচিত্র প্রকারের বই। মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধুর প্রতি প্রায় প্রশ্নহীন আনুগত্য আছে, জানেও বিস্তর। কিন্তু নিশ্চুপ, মৌন।
রাতে বিছানায় বিশেষ মুহূর্তে কুহক আশ্চর্য সবল, সাবলীল। মনে হয় তেপান্তরের ধাবমান অশ্ব। সে সময়ের কুহককে খুঁজে পায় না পর মুহূর্তে। কামকাতর মুহূর্ত শেষ হলে পাশেই শুয়ে পড়ে এবং মিনিট তিনেকের মধ্যে ঘুমিয়ে যায়। মনিকা বন্ধুদের কাছে শরীরের সংরাগ নিয়ে কতো অবাক ঘটনা শুনেছে। আর সে! তার স্বামী?
বিয়ের বছরখানেক পর কুহক কক্সবাজার নিয়ে গিয়েছিল। প্রথম সমুদ্র দেখার রোমান্স নিয়ে যখন সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়ায় মনিকা তখন গোটা মন-প্রাণ-শরীর আদিগন্ত বিস্তৃত বিপুল জলরাশি দেখে কাপছে। সমুদ্র এতো সুন্দর! এতো বর্ণিল? এতো আনন্দমুখর? কুহককে ছাড়াই সমুদ্রে নেমে গেছে। নিজের মতো করে ভিজেছে। সাঁতার কেটেছে। আশ্চর্য, কুহুক একবারও সমুদ্র স্নান করেনি! অবশ্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা তীরের পানিরেখার ওপর দিয়ে হেঁটেছে। তীরে দাঁড়িয়ে ঢেউ গুনেছে।
হাত ধরে টানছে মনিকাÑ চলো, দু’জনে মিলে স্নান করি।
নাহ, আমার ভালো লাগে না। তুমি করো।
সমুদ্র স্নান ভালো লাগে না কোনো পুরষের! সম্ভবত সমুদ্র এই প্রথম শুনলো। অথচ চারপাশে কতো মানুষÑ স্বামী-স্ত্রী, প্রেমিক-প্রেমিকা, ছেলে-বুড়ো, দাদা-দাদি, নানা-নানি গোসল করছে, সাঁতার কাটছে, ঢেউয়ের বিরুদ্ধে লড়াই করছে আর কুহুক আশ্চর্য নির্বিকার। সমুদ্রপাড় থেকে এসে কুহুক হোটেলের বাথরুমে গোসল সারে। অন্তর্গত বেদনা, ক্ষোভ ও দুঃখে মনিকা ফেটে চৌচির হয়ে গেছে।
রাতে ছোট বোনের সঙ্গে সেলফোনে সমুদ্রপাড়ের অভিজ্ঞতা উচ্ছ্বাসের সঙ্গে বলে মনিকাÑ পিউ, সমুদ্র কী সুন্দর! একবার এসে দেখে যা, ভালো লাগবে। কী বিশাল ঢেউ, কতো মানুষ...
কথা শেষ হলে কুহুক মুদৃকণ্ঠে বলে, সমুদ্র দেখে এতো উচ্ছ্বাসের কী আছে?
মানে? হতভম্ব মনিকাÑ বলে কী লোকটা!
সবকিছুর উচ্ছ্বাস দেখাতে নেই।
তো মানুষের ভেতরে উচ্ছ্বাস-আনন্দ এলে কী করবে? বুকে চেপে ধরে বসে থাকবে?
তা থাকবে কেন? আমি মনে করি, আনন্দ প্রকাশের নয়, আনন্দ একান্ত করে অনুভবের। সমুদ্র দেখেছ, দেখার আনন্দ বা সুখ মনের ভেতরে ধারণ করে রাখা উচিত। অবশ্য আমার এই ধারণার সঙ্গে অধিকাংশ মানুষ একমত নয়, আমি জানি। কিন্তু এটাই আমি, আমার আমি।
এই প্রথম বিবাহিত জীবনে কুহকের ভেতরের কুহককে কিছুটা চিন্তে পারে মনিকা। কিন্তু এই চেনা দিয়ে কী করবে সে? কোথায় রাখবে? মনে হয়, তার ভেতরের চারপাশটা একেবারে ভেঙে আসছে। রুম থেকে বের হয়ে ব্যালকনিতে দাঁড়ায়। হুহু বাতাসে গোটা কক্সবাজার উড়ে যাচ্ছে। চারদিকে নিয়ন আলোর বন্যা... দূরে সমুদ্রের মাঝে টিমটিমে আলো জ্বলছে। সেগুলো মাছ ধরার নৌকাÑ দুুপুরে দেখেছে। কী সাহস জেলেদের? ভাবতে ভাবতে মনিকা অনুভব করে, তার গা ভিজে যাচ্ছে। হাত দিয়ে দেখে, চোখের পানি নামছে।
কক্সবাজার থেকে ফিরে আসার কয়েকদিন পর বন্ধু রাহলকে নিয়ে বাসায় আসে কুহক। রাহুল একেবারে কুহকের উল্টো। সামান্য কারণেও প্রচ-ভাবে হাসে। বড় বড় চোখ। হালকা চুল। চওড়া কপাল। হাসে আর সিগারেট টানে। সিগারেট একদম পছন্দ না মনিকার। গন্ধটা সহ্য করতে পারে না। ড্রয়িংরুমে বসে পরিচয়ের পর চা-নাশতা দেয় মনিকা। চায়ের সঙ্গে সিগারেট টানতে টানতে রাহুল তাকায় মনিকার দিকে। কিন্তু প্রশ্ন করে কুহককেÑ কুহক, তুই কাজটা ঠিক করিসনি?
কোন কাজ?
তুই বিয়ে করলি, আমাকে জানালি না?
কী করে জানাবো? ইউনিভার্সিটির শেষ পরীক্ষার পর আর তোর দেখা পেয়েছি? শুননেছি, তুই বিদেশে চলে গেছিস?
ঠিক শুনেছিস। আর এই ফাঁকে এমন টুকুটুকে সুন্দরী বৌ ঘরে এনেছিস?
মৃদু হাসে কুহক।
বিব্রত মনিকা।
রাহুল হাঁ হাঁ হাসেÑ ভাবী, আপনি ভাবছেন লোকটার বুঝি কা-জ্ঞান নেই। আছে, কা-জ্ঞান আছে। কিন্তু আমি সব সময় সত্যি বলি। আমার যা ভালো লাগে তা অকপটে বলি। অনেকে খারাপভাবে নেয়। তবে আমি অসহায় আমার কাছে। আমি তো আমার মতো, নাকি?
সত্যি সবাই বলতে পারে নাÑ মনিকা মৃদুকণ্ঠে বলে।
রাইট ভাবী। প্রত্যেকে দাবি করে, সে সত্যবাদী। কিন্তু নিজের বিরুদ্ধে গেলে সে ওই সত্যটাকে আর প্রকাশ করে না। বেমালুম খেয়ে ফেলে বলতে বলতে সিগারেট ধরায় রাহুল।
আপনি খুব সিগারেট খান বুঝি?
তা খাই। আপনি কি পছন্দ করেন না?
মৌন মনিকা। কেউ মানুষ সিগারেট খাবেÑ এতে তার কী আসে যায়? আর কতোক্ষণই বা থাকবে? কেন বলতে গেল কথাটা?
তার ভাবনার মধ্যে আবার প্রশ্ন করে রাহুলÑ আপনি সিগারেট খাওযা পছন্দ করেন না?
না খেলেই ভালো হয়।
ঠিক আছে, আপনার আদেশে আজকের এই প্যাকেটের সিগারেটকটা খেয়ে একদম ছেড়ে দেবো।
জগতের সবচেয়ে সহজ কাজ কী জানিস? প্রশ্ন করে কুহক।
কী কাজ?
সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দেওয়া আবার ধরা।
তুই দেখিস, আজ এই প্যাকেটের গুলো খাওয়ার পর আর খাবো না। যদি না পারি তাহলে আর তোর সামনে আসবো না।
কী আশ্চর্য! আপনাকে এতো বড় প্রতিজ্ঞা করতে কে বলেছে? মনিকা প্রতিবাদ করে।
আমিও অনেক দিন ধরে চাইছিলাম সিগারেট ছেড়ে দিই। কিন্তু কোনো ইস্যু পাচ্ছিলাম না। আপনাকে কেন্দ্র করে ইস্যু পেয়ে গেলাম।
আড্ডায় আড্ডায় বিকেল। রাহুল প্রস্তাব করেÑ কুহুক চল, নাটক দেখি।
নাটক?
মনে হয় আসমান থেকে পড়লি? তুই নাটক দেখিস না?
নাহ, ওসব আমার পোষায় না।
পোষায় না মানে কী?
ওসব সাজানো জিনিস আমার ভালো লাগে না। কিছু চোখা চোখা বাক্য থাকে নাটকের সংলাপে। যে লেখে সে ধারণাকে বমির মতো উগড়ে দেয়, চরিত্রগুলো মঞ্চে এসে উগড়ে দিয়ে যায়Ñ সেই অনাধিকালের চর্বিত চর্বণ। নতুন কিছু হলে যাওয়া যেতো।
তুই আগের মতোই রয়ে গেলি রে, কুহকভ রোবোটিক। তাকায় মনিক্রা দিকে, বুঝলেন ভাবী, ওকে আমরা কুহকভ ডাকতাম ইউনিভার্সিটিতে। তখন সোভিয়েত ইউনিয়নÑ দুনিয়া জোড়া সমাজতন্ত্রের জোয়ার, কমিউনিস্টদের মতো সে নিঃশব্দ, নির্চল...। আছে সবার সঙ্গে আবার নেই। তাই সোভিয়েত লোকজনের নাম ধার করে ডাকতাম ‘কুহকভ’। আমার ধারণা ছিল, এতো দিনে তোর পরিবর্তন হয়েছে। তুই কুহকভের জাল ছিঁড়ে বের হয়ে এসেছিস। কিন্তু আমার ধারণা ভুল, তুই এখনো কুহকভ। যাই রে...। ভাবী কি করেনÑ সংসার, না চাকরি-বাকরি কিছু করেন?
আমি একটা স্কুলে পড়াই।
কোন স্কুলে?
মনিংসান।
খুব নামি-দামি স্কুল। যাক, সারা দিন বাসায় থাকতে হয় না, কাজের মধ্যে থাকেন। এটা ভালো। কুহকভ, আমি আসি। এই নে কার্ড। দিলখুশায় আমার অফিস। সময় পেলে আসিস। আমি জানি, তুই আসবি না। কী আর করা, আমিই আসবো মাঝে মধ্যে। ভাবী, এলে বিরক্ত হবেন না তো?
আগে তো আসুন।
গুড।
হাওযার বেগে চলে যায় রাহুল। রেখে যায় মনিকার জন্য কৌতূহল, উচ্ছ্বাস আর ভাবনার ছিন্নপাতা। মানুষের একটাই জীবন। কিন্তু কতোভাবে তার প্রক্ষেপণ হতে পারে? রাহুলের বন্ধু কুহক বা কুহকের বন্ধু রাহুলÑ কতো ব্যবধান দু’জনার!
মাঝে মধ্যে রাহুল বাসায় আসে। কুহকের সঙ্গে আড্ডা দেয়। মনিকারও ডাক পড়ে। চা জোগায়। আর অবাক মনিকাÑ রাহুল সিগারেট খায় না। মনিকার বাবা সিগারেট খেতেন। মা কতো বকেছেন। কতোবার বলেছেন, ঠিক আছে, ছেড়ে দেবো। কিন্তু কোনোদিন ছাড়তে পারেননি। আর রাহুল? মনিকা কিছুটা হলেও বুঝতে পারে, রাহুল এই বাসায় আসে কেবল তার জন্য। না, কোনো প্রমাণ নেই তার কাছে। কিন্তু নারীর মনের ইন্দ্রিয় তাকে পরিষ্কার বলছে, রাহুল তোমার প্রেমে পড়েছে। সত্যি! স্বামী-সংসার থাকার পরও মনিকার ভেতরে নাম না জানা এক অলৌকিক পাখি গাইতে শুরু করে... ‘আমি চিনিগো চিনি তোমারে চিনি...।’
এই চেনা ও অচেনার দরজায় এক দুপুরে রাহুলকে মুখোমুখি আবিষ্কার করে মনিকা। স্কুল ছুটির ঠিক আগ মুহূর্তে গেইটে আসে রাহুল।
আপনি?
এই পথ দিয়ে যাচ্ছিলাম। ভাবলাম, আপনাকে দেখে যাই। কেমন আছেন?
ভালো। আপনি?
আমি? আমি আরো ভালো। কোথায় যাবেন, বাসায়?
হ্যাঁ।
যদি কিছু মনে না করেনÑ আমার সঙ্গে গাড়ি আছে। চলুন কোথাও বসি। মনিকাকে ভাবার কোনো সুযোগ না দিয়ে রাহুল গেইট পার হয়ে হাঁটতে শুরু করে। নিশ্চিত মনিকা আসবে।
হ্যাঁ মনিকা যায়, যেতে বাধ্য হয়। কে তাকে নিয়ে যায়? মনিকা জানে না। কিন্তু যেতে ভালো লাগছে...। গাড়ির দরজা খুলে দাঁড়ায় রাহুল।
মনিকা প্রবেশ করলে দরজা বন্ধ করে নিজের ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ি স্ট্রাট দেয়।
গাড়ি চলতে থাকে। কেউ কোনো কথা বলে না। মনে হচ্ছে, গাড়ি চালানো রাহুলের বড় একটা কাজ। আর মনিকা নির্বাক সামনে তাকিয়ে আছে। প্রায় ১৫-২০ মিনিট পর গাড়ি চমৎকার একটা বাড়ির সামনে থামে।
নামে মনিকা। চারপাশটা দেখে বুঝতে পারে, এটা খুব অভিজাতপূর্ণ একটা রেস্টুরেন্ট। রাহুলের ইশারায় সিঁড়ি বেয়ে তিনতলায় ওঠে। ব্যালকনির সঙ্গে চমৎকার সাজানো একটা টেবিল। বুঝতে পারে মনিকাÑ রাহুল এখানে মাঝে মধ্যে আসে। বেয়ারারা পরিচিত। দু’জন বসে। মনিকার ভেতরটা কাঁপছে। জীবনে এই প্রথম বাইরের কারো সঙ্গে...। রাহুল কি বাইরের কেউ? জানে না... মনের ভেতরে সুরের একটা কম্পন বয়ে যায়... মনিকা ভেতরে ভেতরে টুকরো টুকরো হয়ে যায়।
কী খাবেন?
আপনি এখানে আনলেন কেন?
দুপুরের খাবারের সময় না? দুপুরে প্রিয় অতিথিকে কি না খাইয়ে রাখবো? বলুন, কী খাবেন?
জানি না।
ঠিক আছে, আমিই বলছি।
নানান মাছ আর তরকারিতে ভরে যায় টেবিল। ধীরে ধীরে খায়। খেতে খেতে রাহুল জানায়, আমি দীর্ঘদিন সিঙ্গাপুরে ছিলাম। চাকরি করতাম। প্রায় ১১ বছর। মা-বাবা আছেন গ্রামে, ছোট ভাই একটা ব্যাংকের ম্যানেজার। বোন একটাইÑ বিয়ে হয়েছে। জামাইয়ের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়া থাকে। এই হচ্ছে আমার জীবন।
এসব আমাকে শোনাচ্ছেন কেন?
নিজের সব কাছের মানুষের জেনে রাখা ভালো। সিঙ্গাপুর থেকে এসে একটা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ি তুলেছি। ব্যবসা করছি আর ঘুরে বেড়াচ্ছি।
চমৎকার জীবন আপনার।
হাসে রাহুল। খাওয়া শেষে বেয়ারা সব নিয়ে যায়। দু’জনে মুখোমুখি। রাহুলের দিকে তাকাতেও ভয় পাচ্ছে মনিকা। বাসায় যাওয়া দরকার। স্কুলের পর বাইরে থাকে না মনিকা। অথচ প্রায় দু’ঘণ্টা বাইরে। কুহক ফেরে বিকেলের দিকে। অনেক সময় রাতও হয় ফিরতে। না, কেউ কিছু বলবে না লেটের জন্য। কিন্তু নিজের কাছে...
মনিকা!
রাহুলের নাম ধরে ডাকে মনিকার ভেতরটা একেবারে উল্টে যায়। ভয়ার্ত চোখে তাকায়।
তুমি নিশ্চয়ই জেনে গেছ, তোমার সামনে বসা এই রাহুল বকশী তোমায় ভালোবাসে, প্রচ- ভালোবাসে। প্রথম যেদিন তোমায় রাহুল দেখেছে কুহকের বাসায়, সেই প্রথম দৃষ্টিতে রাহুল তোমাকে ভালোবেসেছে। রাহুল বুঝে গেছে, তুমি কুহকের সংসারের বড় বেমানান একটি প্রজাপতি। রাহুলকে তোমার কি কিছু বলার আছে?
মনিকা মাথাটা টেবিলের ওপর রাখে। মাথার দু’পাশে কালো চুলের বিশাল স্তূপ।
রাহুল ঝুঁকে মাথার ওপর মুখ রাখেÑ আমি বুঝে গেছি, তুমিও রাহুলকে ভালোবাসো। আমি জানতাম। কিন্তু একটু সংশয় ছিল। সেটিও কেটে গেছে। থ্যাংক ইউ, আমি কোনোদিন তোমায় কষ্ট দেবো না। বুকের ভেতরে প্রদীপের মতো জ্বালিয়ে রাখবো তোমাকে, মনিকা। তুমি কেবল আমার অন্তরজুড়ে আলো, আলো আর আলো ছড়াবে। তোমার আলোয় আমি বেঁচে থাকতে চাই।
ঘটনা ঘটার ছয় মাসের মাথায় মনিকা ডিভোর্স দেয় কুহককে। চলে আসে রাহুলের বাসায়। বিয়ে হয়েছে কোর্টে। বিয়ের পর হানিমুনে গেছে মালয়েশিয়া। জীবন, একটাই যে জীবন সে জীবন কতো সুন্দর, কতো বর্ণাঢ্য, আলোকময় হতে পারেÑ রাহুল বুঝিয়ে দিয়েছে। আর ভালোবাসাÑ একজন নারীর জন্য একজন পুরষেরও তীব্র হতে পারে, মনিকা মর্মে মর্মে বুঝতে পারছে।
রাহুলের সঙ্গে সংসার করার মুহূর্তে মনের ভেতরে যে দ্বিধা ছিল তা একদম নেই। কয়েক মাস আগে কক্সবাজার গিয়েছিল মনিকা আর রাহুল। স্মৃতির ভেতরে দুটো পর্ব রেখে মনিকা মনে মনে নিজেকে বলেছে, কতো সার্থক-সুন্দর আর উপভোগ্য এই কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকত? রাহুল আর মনিকা মিলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সাঁতার কেটেছে। দিন-রাতে যখনই সময় পেয়েছে তখনই চলে এসেছে সমুদ্রপাড়ে সমুদ্র মন্থনে।
বাসা নিয়েছে ঢাকার অভিজাত এলাকায়। নিজের গাড়ি...। একটা চকচকে জীবনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিল। সময় কাটানোর জন্য আবার একটা স্কুলে চাকরি নিয়েছে মনিকা। কিন্তু এ কী দুর্যোগ শুরু হলো আবার?

আমি দিব্যি করে বলছি, তোমার সঙ্গে বিয়ের পর আমি এক মুহূর্তের জন্য কুহককে ভাবিনি। আমার জীবন থেকে সে হারিয়ে গেছে চিরকালের জন্য।
আমি বিশ্বাস করি না। তার সঙ্গে তুমি বাইরে যাও।
অসম্ভব।
তুমি আর সে- দু’জন মিলে রেস্টুরেন্টে খেতে যাও, হাসো, আড্ডা দাও। তোমাকে সে আদর করে.. আহ আহ, আমাকে এসবও সহ্য করতে হচ্ছে?
সব তোমার কল্পনা- রাহুল। সব তোমার কল্পনা। তোমার সঙ্গে চলে আসার সময় মা-বাবা সবাইকে ছেড়ে আসতে হয়েছে আমার। কুহকের সঙ্গে ডিভোর্স কেউ মেনে নেয়নি। তোমাকে ছাড়া কাউকে চিনি না, জানি না। তুমি নিশ্চয়ই ভুল করছ রাহুল।
রাহুল বকশী কোনোদিন ভুল করে না।
তাহলে এক কাজ করো...
কী কাজ?
আমার বলতে লজ্জা লাগছে, তারপরও বলছি- যে কুহককে নিয়ে তোমার এতো সন্দেহ, চলো তার কাছে যাই।
কেন? ওই লোকটার কাছে কেন যাবো?
কুহকের কাছে গেলে সত্যি-মিথ্যাটা বুঝতে পারবে।
না, আমি যাবো না। তোমার দরকার থাকলে তুমি যাও।
দরকারটা আবার নয়, তোমার।
না, আমি যাবো না।
হাত ধরে মনিকা বুকের সঙ্গে জড়িয়ে রাখে- চলো একবার, মাত্র একবার। যাওয়ার পর কুহক যদি বলে, তার সঙ্গে আড্ডা দিয়েছি, রেস্টুরেন্টে খেয়েছি তাহলে তুমি যা বলবে, আমি তা-ই শুনবো। যা করতে বলবে, তা-ই করবো।
ঠিক আছে। কিন্তু তার বাসায় যাওয়া যাবে না।
ওকে, চলো তার কলেজে যাই?
পরের দিন কলেজে গিয়ে জানতে পারে মনিকা আর রাহুল - কুহক বছর দুয়েক আগেই চাকরি ছিড়ে দিয়ে গ্রামের বাড়ি চলে গেছে। গ্রামটি ঢাকার উপকণ্ঠে গাজীপুরে। তারা চলে যায় গ্রামে। বাড়ি খুঁজে বের করে জানতে পারেÑ কুহক বছরখানেক আগে মারা গেছে। বাড়ির সামনেই কুহকের কবর। মনিকা হিসাব করে বুঝতে পারেÑ রাহুলের সঙ্গে বিয়ের পর মাত্র মাস তিনেক বেঁচে ছিল কুহক।

শরৎবাবু’র নারী

 

বাঙালি মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত জীবনের নিখুঁত ছবি সরল সুনিপুনতায় ফুটিয়ে তুলেছেন উপমহাদেশের ধ্রপদী কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তার উপন্যাসের পরিধি জুড়ে ছিল বৈচিত্রপূর্ণ নারীচরিত্র। শরৎবাবু’র নারী চরিত্রগুলির সঙ্গে বেশির ভাগ বাঙালিরই আশৈশব পরিচয়। হেঁশেল, অন্দরমহল, উঠোনের লাগোয়া কলতলাতেই ঘুরে ফিরে বেড়ানো সব রকমের চরিত্রের একটি দু'টি। শরৎসাহিত্য নারীত্বের পূর্ণ বিকাশ ঘটিয়েছে চেতনার উন্মেষে নির্মল প্রত্যয়ে। এককথায় তৎকালীন সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত নারী সমাজের সামাজিক রূপ তিনি গভীর মমত্ববোধ ও সহানুভূতির সঙ্গে ব্যক্ত করেছেন। তার সৃষ্টি বহুল আলোচিত চারটি নারী চরিত্র নিয়ে এবারে থাকছে সহজ -এর বিশেষ আয়োজন।

 

 

 

 

শায়লা হাফিজ

 

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৭৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর-১৯৩৮ সালের ১৬ জানুয়ারি) জনপ্রিয় বাঙালি কথাসাহিত্যিক। বাংলা সাহিত্যের অমর এই শিল্পী নারী চরিত্রের পূর্ণ বিকাশে পাঠক মনে চেতনার উন্মেষ ঘটিয়েছেন আলোকিত নির্মল প্রত্যয়ে! নারীর প্রতি সামাজিক নির্যাতন ও তার সংস্কারবন্দি জীবনের রূপায়ণে তিনি বিপ্লবী লেখক, বিশেষত গ্রামের অবহেলিত ও বঞ্চিত নারীর প্রতি তার গভীর মমত্ববোধ ও শ্রদ্ধা তুলনাহীন। সামাজিক বৈষম্য, কুসংস্কার ও শাস্ত্রীয় অনাচারের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন উচ্চকণ্ঠ। কাহিনী নির্মাণে অসামান্য কুশলতা এবং অতি প্রাঞ্জল ও সাবলীল ভাষা তার কাব্যসাহিত্যের জনপ্রিয়তা ও খ্যাতির প্রধান কারণ। বাংলাসহ ভারতীয় বিভিন্ন ভাষায় তার অনেক উপন্যাসের চিত্রনাট্য নির্মিত হয়েছে। সেগুলো অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছে। তা হলো ‘দেবদাস’, ‘শ্রীকান্ত’, ‘রামের সুমতি’, ‘দেনা-পাওনা’, ‘বিরাজবৌ’ ইত্যাদি। অবশ্য শরৎ সাহিত্য আধুনিক নারীবাদী সাহিত্য নয়! নয় প্রতিবাদী, প্রতিরোধী, বিপ্লবী সাহিত্যের নিদর্শন!
দেবদাসের চন্দ্রমুখী : শরৎ সাহিত্য প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থা ভেঙে ফেলার দিকনির্দেশিকা নয়! আবহমান সমাজ জীবনে প্রলয় আনেননি তিনি! সৎ সাহিত্যের কাজ সাহিত্যের দর্পণে সমাজ ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো ব্যক্তি মানবের চেতনায় স্পষ্ট প্রতিবিম্বিত করা! মানব জীবনের অন্তর্নিহিত মর্মবেদনা সহানুভূতির স্বরে বাজিয়ে তোলাই সাহিত্য! তার কাজ মানুষের মনুষ্যত্ব নিরন্তর জাগিয়ে রাখা! শরৎ সাহিত্য বঙ্গজীবনে ওই কাজটিই করে গেছে বরাবর। বাংলা সাহিত্যের অমর সৃষ্টি শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘দেবদাস’ (১৯১৭)। এ উপন্যাসের তিনটি চরিত্র দেবদাস, পার্বতী ও চন্দ্রমুখী। সময়ের পালাবদলে আজও তারা ফিরে আসে নতুনরূপে, নতুন আবেদনে। উপন্যাসের নায়ক দেবদাসের প্রতি ছিল চন্দ্রমুখীর যথার্থ ভালোবাসা। অনেকেই ওই উপন্যাস পড়তে পড়তে এটা ভাবতে পারেন যে, এমন নিঃস্বার্থ ভালোবাসা কেবল উপন্যাসেই সম্ভব। আবার কেউ যেন এ চন্দ্রমুখীকেই খুঁজে পেয়েছেন বাস্তবের উঠানে। পার্বতীকে দেবদাস ভালোবাসে জেনেও চন্দ্রমুখীর কোনোই ভাবান্তর হয় না। তার ভালোবাসায় বিন্দুমাত্র ভাটা পড়ে না। এমনই স্বর্গীয় অনুভবে একটি চরিত্র এঁকে জীবন্তরূপে তা পাঠকের সামনে তুলে ধরার মতো তুখোড় শিল্পী ছিলেন তিনি। ‘দেবদাস’ উপন্যাসের চন্দ্রমুখী কলকাতার চিৎপুরের পাড়ায় নাম লেখানো পতিতা। তার বয়স চব্বিশ। তার একটু হাসির জন্য বহু নামি-দামি জমিদার উন্মুখ হয়ে থাকতো। কিন্তু এর সবই সে উপেক্ষা করে দেবদাসের প্রতি অগাধ ভালোবাসার কারণে। এমনও জানে সে, কোনোদিন দেবদাসকে পাবে না। পরে ওই বৃত্তি ছেড়ে অশত্থঝুরি গ্রামে গিয়ে মাটির ঘরবাড়ি তৈরি করে বাস করতে থাকে সে। পতিতারাও নারী। কোনো নারী পতিতা হয়েও যে নারীত্বের মমত্ববোধ ধারণ করে এবং অর্থ-বিত্ত তুচ্ছ করে তার কাছেও যে কখনো কখনো ভালোবাসা অমূল্য হয়ে উঠতে পারে তা এই উপন্যাসে স্পষ্ট হয়েছে। পতিতাদেরও মন আছে, বাসনা-কামনা আছে, ভাগ্যের বিড়ম্বনা ও পতিতা জীবন যাপনের জন্য গ্লানিবোধ আছে, সমাজের গৃহবধূদের মতো মাথা উঁচুু করে থাকতে না পারার বেদনাও আছে। তা এ উপন্যাসে তিনি তুলে ধরেছেন সুনিপুনভাবে।
এ কথা ঠিক, প্রেমের অভিনয় করে খরিদ্দার ভোলায় পতিতা। বাস্তবে প্রেম করা তার বৃত্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তবুও সে মাঝে মধ্যে বৃত্তি বা পরিবেশের ঊর্ধ্বে সামাজিক পুরুষকে ভালোবেসে বসে। আর তখনই সমাজের সঙ্গে সংঘর্ষে তার কপালে জোটে দুঃসহ দুঃখ। শরৎ সাহিত্যে অধিকাংশ পতিতার অদৃষ্টে ওই দুঃখভোগ ঘটেছে। দেবদাস উপন্যাসে দেবদাসের দাসী হয়ে সঙ্গে থাকার আকাক্সক্ষাটুকুও চন্দ্রমুখীর পূর্ণ হয়নি। তবুও নিজের আকাক্সক্ষার চেয়ে দেবদাসের চাওয়া-পাওয়াটিই প্রধান্য দিয়েছে। প্রেমিকের চেয়েও ভালোবাসা বড় হতে পারে, এর প্রাপ্তির চেয়েও যে আত্মত্যাগ মনে জাগে তার জ্বলজ্বলে উদাহরণ চন্দ্রমুখী চরিত্রটি।
শরৎচন্দ্র মানব দরদি বলে মানুষের জীবনের সব মূল্যে মানুষকে বিচার করেছেন। তাই নারীর পতিতাবৃত্তি গ্রহণ তার একমাত্র পরিচয় বলে স্বীকার করেননি। অবশ্য এ কথা ঠিক, শরৎচন্দ্রের পতিতাদের চরিত্র সব সময় বাস্তবোচিত হয়নি।
শ্রীকান্তের রাজলক্ষ্মী : বাংলা সাহিত্যের আরেক অনবদ্য সৃষ্টি এই রাজলক্ষ্মী চরিত্র। রাজলক্ষ্মী সাহসী, দৃঢ়, প্রত্যয়ী, দয়াময়ী, আবেগী, সুন্দর রমণী। সামাজিক বিভিন্ন জটিলতার কারণে তাকে বাইজির কাজ বেছে নিতে হয়েছে ঠিকই কিন্তু মনে-প্রাণে সে শুধু শ্রীকান্তেরই ছিল। শ্রীকান্তের প্রতি অপরিসীম ভালোবাসা আর অভিভাবকত্ব বার বার শ্রীকান্তকে তার কাছে টেনে নিয়ে এসেছে। রাজলক্ষ্মী সব সময় চাইতো তাকে শ্রীকান্ত বিয়ে করে এই অনৈতিক জীবন থেকে মুক্ত করুক। পরবর্তী কালে শ্রীকান্তের জীবনে কমললতার আগমন রাজলক্ষ্মীকে অনেকটা দূরে ঠেলে দেয়। শ্রীকান্তকে রাজলক্ষ্মী হাসিল করতে চেয়েছিল, একান্ত নিজের করে পেতে চেয়েছিল। আর কমললতার দৃঢ় বিশ্বাস, শ্রীকান্তের অন্তরে একমাত্র সেই আছে। তার কাছ থেকে শ্রীকান্তকে কেউই দূরে নিতে পারবে না। কমললতাকে ভালোবাসা সত্ত্বেও রাজলক্ষ্মীর নির্ভয় ও নিরাপদ আশ্রয়ে নিজেকে সঁপে দিতেই ভালোবাসতো শ্রীকান্ত। তাই তো রাজলক্ষ্মীর অভিভাবকত্বের আওতায় থেকে শেষ পর্যন্ত শ্রীকান্তের মনে ছবি হয়েই রয়ে গেল কমললতার গোপন স্বপ্ন। নারীর প্রতি সশ্রদ্ধ ভালোবাসা প্রকাশে শরতের যে মনোভাব সেটি তার কাহিনিগুলোয় ছড়িয়ে আছে, বিশেষ করে পতিতার প্রেম ও বিধবার অন্তরে পরম স্নেহে লালিত ভালোবাসার পবিত্রতার তিনি যেভাবে রূপ দিয়েছেন এরই সরলরৈখিক বহিপ্রকাশ আমরা উপভোগ করি রাজলক্ষ্মীর প্রতি শ্রীকান্তের আন্তরিক ভালোবাসায়। রাজলক্ষ্মী ছিল বাল্যবিধবা। উপন্যাসটির পর্যায়ান্তরে শ্রীকান্তের বাল্যকাল শেষ হলে পিয়ারী বাইজিরূপী রাজলক্ষ্মীর সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটে। শৈশবে খেলার সঙ্গী এই রাজলক্ষ্মীকে প্রথম দেখায় চিনতে পারেনি শ্রীকান্ত। কিন্তু শ্রীকান্তকে সে ঠিকই চিনেছে। গানের আসরে সঙ্গীত ও নৃত্যে শ্রীকান্ত অভিভূত হয়ে পড়ে। পরিচয় জানতে চাইলে পিয়ারী জানায়, ‘তোমাকে চিনেছিলাম ঠাকুর, দুর্বুদ্ধির তাড়ায় আর কিসে? তুমি যতো চোখের জল আমার ফেলেছিলে, ভাগ্যি সূর্যিদেব তা শুকিয়ে নিয়েছেন, নইলে চোখের জলের একটা পুকুর হয়ে থাকতো।’ প্রথমে বিস্মিত ও হতবুদ্ধি হলেও অবশেষে শ্রীকান্ত তার বাল্যসখী রাজলক্ষ্মীকে চিনতে পারে। তার তখনকার অনুভবটা দেখে নেয়া যাকÑ ‘এ কী বিরাট অচিন্তনীয় ব্যাপার এই নারীর মনটা, কবে যে এই পিলে রোগা মেয়েটা তাহার ধামার মতো পেট এবং কাটির মতো হাত-পা লইয়া আমাকে প্রথম ভালোবাসিয়াছিল এবং বইচি ফুলের মালা দিয়া তাহার দরিদ্র পূজা নীরবে সম্পন্ন করিয়া আসিতেছিল, আমি টের পাই নাই। যখন টের পাইলাম তখন বিস্ময়ের আর অবধি রহিলো না। নভেল-নাটকে বাল্যপ্রণয়ের কথা অনেক পড়িয়াছি। কিন্তু এই বস্তুটি যাহাকে সে তাহার ঈশ্বরদত্ত ধন বলিয়া সগর্বে প্রচার করিতেও কুণ্ঠিত হইলো না, তাহাকে সে এতো দিন তাহার ঘৃণিত জীবনের শতকোটি মিথ্যা প্রণয়ের অভিনয়ের মধ্যে কোনখানে জীবিত রাখিয়াছিল। কোথা হইতে ইহাদের খাদ্য সংগ্রহ করিতো। কোন পথে প্রবেশ করিয়া তাহাদের লালন-পালন করিতো?’ রাজলক্ষ্মীর অমিত প্রেম, অকৃত্রিম নিবিড় ভালোবাসার ছবি লেখক অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে আঁকতে পেরেছেন বলেই মনে হয়। জাগতিক পাওয়া, না পাওয়ার হিসাব-নিকাশের বাইরে যে প্রেম এর বাস্তব প্রতিফলন আমরা পাই রাজলক্ষ্মীর অনুভবে। প্রবল সংযম আর বুদ্ধিমত্তা দিয়ে রাজলক্ষ্মী যেন জয় করেছে তার আরাধ্য ব্যক্তিকে। বস্তুগত অর্থে হয়তো সে পরাজিত। কিন্তু মনোগত অবস্থানে সে পেয়েছে সব! শ্রীকান্ত শেষতক দূরে সরে গেছে। অবশ্য শ্রীকান্তের কণ্ঠ থেকে আমরা শুনেছি প্রাপ্তির চেয়েও অপ্রাপ্তি বড় আনন্দের।
ভাগ্যলিপি আর সম্ভোগ বিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত শ্রীকান্ত বলেছে, ‘বড় প্রেম শুধু কাছেই টানে নাÑ ইহা দূরেও ঠেলিয়া দেয়। ছোটখাটো প্রেমের সাধ্যও ছিল নাÑ এই সুখৈশ্বর্য পরিপূর্ণ স্নেহ স্বর্গ হইতে মঙ্গলের জন্য, কল্যাণের জন্য আমাকে আজ এক পদও নড়াইতে পারিতো।’ শরৎচন্দ্র দৈহিক ভোগ-বিলাসবর্জিত এক বিশেষ মানসিকতার কথা তার সাহিত্যে প্রচার ও প্রকাশ করতে চেয়েছেন। সত্যি কথা বলতে কী, ওই সত্য উপলব্ধ জীবন দর্শনের দ্বারপ্রান্তেও আমরা আজ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারিনি। আত্মউপলব্ধির সত্যজ্ঞান শ্রীকান্তের মাধ্যমে খানিকটা সাহিত্যরূপ দেয়ার সময় হৃদয়ের আবেগ ও ভাবের গভীরতা ঢেলে দিয়েছেন লেখক। মানব চরিত্রের রহস্য প্রকাশে কোথাও কোথাও ঔপন্যাসিক প্রকৃতির বর্ণনাও করেছেন বটে। ভরা নদীতে নৌকাচালনা কিংবা অন্ধকার রাতের বিবরণ তার কবিমনের এক প্রকার বহিঃপ্রকাশ মাত্র। পিয়ারীরূপী রাজলক্ষ্মীর নবজন্ম, সামাজিকতায় হাস্যরসের বিষয়াদি, সৌন্দর্য বর্ণনায় ভাষার প্রয়োগ-চাতুর্য এবং ভাবের অভিব্যক্তিতে শরৎ এক অভিনব কাহিনী নির্মাণ করেছেন। এর আগে বাংলা সাহিত্যের পাঠক এ ধরনের রোমাঞ্চকর ও আবেগঘন কাহিনীর সঙ্গে পরিচিত হননি। রাজলক্ষ্মীর মতো দ্বৈতচরিত্রের যে ভারসাম্য তিনি দেখিয়েছেন এবং একই সঙ্গে এক নারী কেমন করে দুটি চরিত্রে মিশে যায় এর প্রতি আমাদের পরিচয়ের যে সুযোগ শরৎচন্দ্র ঘটিয়ে দিলেন তা রীতিমতো বিস্ময়কর। সেখানটায় রয়েছে আবেগ ও প্রাপ্তির আনন্দের এক অভূতপূর্ব মিশেল।
শরৎচন্দ্রের শিল্পী মননে রচিত চরিত্রে সব সময় বৈচিত্র্যের কাজ দেখা যায়। ‘নারীর মনের তল বিধাতাও পায় না’ বলে যে কথাটি প্রচলিত ওই গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে শরৎচন্দ্র তার উপন্যাসে নারী চরিত্রের মধ্যে অনুপম মাধুর্য ও আত্মবিশ্বাসের শক্তি সমান্তরালভাবে এঁকেছেন। একাধারে বস্তুগতভাবে কোনো নারীর জীবনটি উপলব্ধি করেছেন। এর পাশাপাশি মনস্তাত্ত্বিক অনুভবেও ভেসে গেছেন। নারীকে একদিকে যেমন উপভোগ্য করে তুলে ধরেছেন, অন্যদিকে তেমনি ওই নারীর ভেতর মমতার সত্তাও সমানভাবে সামনে এনেছেন। নারী চরিত্রের বিচিত্রতার যে দিকগুলো তিনি কলমের আঁচড়ে আঁচড়ে এঁকেছেন, উপন্যাসটি পড়া শেষে পাঠকের মনে এর অনুপম মাধুর্যে আছন্ন থাকতে হয়। শরৎচন্দ্রের এই অপূর্ব গুণের কারণে শুধু নারী নন, পুরুষের মনে স্থান করে নিয়েছেন স্বমহিমায়।

 

মুতাকাব্বির মাসুদ

এক.
শরৎ সাহিত্য পর্যালোচনায় নির্ণিত বিষয়ে যে সত্যটি উঠে আসে তা হলো, বঙ্কিমচন্দ্র (১৮৩৪-১৮৯১) ও রবীন্দ্রনাথের (১৮৬১-১৯৪১) মতোই ওফবধষরংঃ লেখক ছিলেন শরৎচন্দ্র (১৮৭৮-১৯৩৮)। তার সামগ্রিক রচনা পর্যালোচনায় তাকে জীবনবাদী লেখক বলা যায়। তিনি জীবন বাস্তবতায় জবধষরংঃ লেখক হিসেবেও ততোধিক পরিচিত। সমাজ বাস্তবতার কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠিত সমকালের তথাকথিত অভিজাত শ্রেণীর বিরুদ্ধে তার লেখনী ছিল উচ্চকিত। সমকালে এ সমাজে বিদ্যমান অভিজাত শ্রেণীর বেপরোয়া বিলাসবহুল জীবনযাত্রা বঙ্কিমচন্দ্রের রোমান্টিক কল্পনাটি প্রেরণার
উদ্দামপ্রবাহে উদ্দীপ্ত করেছিল। রবীন্দ্রনাথের রচনায় উদ্গত চরিত্রগুলোও গ্রহণযোগ্য মাত্রায় সমাজের উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করেছে। কিন্তু এ ধারায় শরৎচন্দ্র তার রচনায় জীবন চেতনার ব্যতিক্রমী অনুধ্যানের এক ভিন্নতা উদীর্ণ করার প্রয়াস পেয়েছেন যেখানে নিম্নবিত্ত শ্রেণী মুখ্য হয়ে উঠেছে। এই প্রথম আমরা দেখলাম সমাজে অবহেলিত একটি শ্রেণীকে অবলম্বন করেও সাহিত্য রচনা করা যায় এবং তা শিল্পমান বিচারে শতভাগ সফল। সুতরাং সমাজ চেতনার বিনির্ণিত ধারায় শরৎচন্দ্রের নতুন সমাজ বিনির্মাণে তার চেতনার অন্তর্গত সুর আমাদের বোধও জাগ্রত করে। যখন বলেন, ‘সংসারে যারা শুধু দিলে, পেলে না কিছুই; যারা বঞ্চিত, যারা দুর্বল, উৎপীড়িত; মানুষ যাদের চোখের জলের কখনো হিসাব নিলে না, সমস্ত থেকেও কেন তাদের কিছুতেই অধিকার নেই, এদের বেদনা দিলে আমার মুখ খুলে, এরাই পাঠালে আমাকে মানুষের কাছে মানুষের নালিশ জানাতে।’ শরৎচন্দ্রের এ ভাষণ যতোটা আবেগের ততোটাই হৃদয় ও অন্তরের অতলান্তিক গভীরতা থেকে উদ্গত সত্য। অনেকটা ডিকেন্সের (১৮১২-১৮৭০) ও ধস ৎিরঃরহম ভড়ৎ ঃযব যঁসধহ ৎধপব অনুভূতির সঙ্গে সমঞ্জসপূর্ণ। শরৎচন্দ্রের অন্তর ছিল উদার মানবিকতায় পরিপূর্ণ। অনেকেই বলেন, শরৎচন্দ্রের সমাজ চেতনা ও সামাজিক দৃষ্টি রবীন্দ্রনাথ থেকেও প্রগতিশীল। তীব্র আত্মজিজ্ঞাসা, প্রখর বাস্তব দৃষ্টি, সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ শক্তি মানব আদর্শ সম্পর্কে অনুসন্ধিৎসা, সুস্থ-সুন্দর-স্বাভাবিক জীবন ও সমাজের প্রতি ব্যাকুল আকাক্সক্ষা এবং তার সমাজ চেতনা পূর্বসূরিদের তুলনায় অগ্রগামী ছিল। এই স্বল্প পরিসরে উল্লিখিত প্রাসঙ্গিক বিষয়ে কেবল ‘চরিত্রহীন’ (১৯১৭)-এর নারী চরিত্র সাবিত্রী ও কিরণময়ীর ওপর সামান্যই আলোচনার প্রয়াস থাকবে।

দুই.
শরৎচন্দ্রের উপন্যাসের নারীরাই মুখ্য চরিত্রের ভূমিকায় সফল ও সমধিক উজ্জ্বল। তার রচনায় নারী চরিত্রের প্রাধান্য অস্বীকার করার সুযোগ নেই। অন্তর দিয়ে চিত্রিত করেছেন ওই নারীদের। সমাজের অসহায় নারীর ক্রন্দন তাকে ব্যথিত করেছিল। তাই নারীর ওই করুণ ক্রন্দন অন্তর দিয়ে শোনার প্রয়াস পেয়েছিলেন। যেমনটি সমকালে অন্য কারো বেলায় তা দেখা যায়নি। সমকালে নারীকে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা ও তথাকথিত সনাতন প্রথা কঠিন অনুশাসনে বন্দি করে রেখেছিল। কুসংস্কারের অনৈতিক বৃত্তে তারা আবদ্ধ ছিল। শরৎচন্দ্র প্রগতির ধারায় তাদের মুক্তির বাণী শুনিয়েছেন। একটি আলোকিত সমাজ বিনির্মাণে তাদের জাগ্রত করার চেষ্টা করেছেন।

তিন.
শরৎচন্দ্রের একটি বিখ্যাত উপন্যাস ‘চরিত্রহীন’ (১৯১৭)। এর সব চরিত্রই উজ্জ্বলতায় সমানে সমান। এ উপন্যাসের নায়িকা সাবিত্রী হলেও এখানে জীবন বাস্তবতায় এক দীপ্ত উজ্জ্বল চরিত্র কিরণময়ী। তার উপস্থিতি উপন্যাসের সর্বত্রই চোখে পড়ার মতো। তার চলন, কথা-বার্তা, জীবন দর্শন সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী ধারায় উপস্থাপিত। অনেকটা পাশ্চাত্য চেতনার সূক্ষ্ম প্রভাব তার মধ্যে লক্ষ্য করা যায়। নারী স্বাধীনতা, বাকচাতুর্য, একটি ভিন্নমাত্রার জীবন দর্শন কিংবা প্রেম-ভালোবাসা সম্পর্কে তার বিশ্বাস, দর্শন আমাদের সংস্কৃতি বা সমাজ বাস্তবতায় অনেকটাই সাংঘর্ষিক। কিন্তু সে তা গায়ে মাখে না। নিজের মতো চলে। নিজের কথা অকপটে বলে। শরৎচন্দ্রের নায়িকাদের মধ্যে কিরণময়ীই নিয়তিটি অস্বীকার করার দুঃসাহস দেখিয়েছে। অন্যরা ভাগ্যের ছকটি মেনে নিয়েছে। তারা চলমান জীবনের বিদ্যমান দুঃখ-বেদনাটি অমোঘ নিয়তি বলেই মেনে নিতো। এই প্রথম প্রতিবাদী নারী হিসেবে কিরণময়ীর আবির্ভাব। পরে তা অভয়া, কমলের মধ্যেও আমরা দেখেছি। কিরণময়ী তর্ক জানে। সে তার্কিক। তার কথায় যুক্তি থাকে। অনেক সময় দার্শনিকের মতো কথা বলে। প্রেম সম্পর্কে তার অনেক যুক্তি যা তার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থেকে উৎসারিত। যেমন দেহগত কামনায় যে প্রেম সে প্রেমের পক্ষে তার অবস্থান। সে সাফ জানিয়ে দিয়েছে, নিষিদ্ধ প্রেম বলে কিছু নেই। যা সমকালে সমাজ বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে উদ্ধৃত করা ছিল প্রায় অসম্ভব। সে নিষিদ্ধ প্রেমটি যুক্তি দিয়ে গৌরবের সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত করার স্পর্ধা দেখিয়েছে। কিরণময়ী প্রতিবাদী নারী সমাজের একটি বলিষ্ঠ স্বর ও এক প্রতিনিধি। নির্যাতিত নারী সমাজের পক্ষে তার অবস্থান। তাই সমাজে বিদ্যমান তথাকথিত নীতিটি নত শিরে মেনে নেয়নি। সে বিদ্রোহ করেছে সমাজের অযাচিত নিপীড়ন ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে। তার জায়গাতে থেকেই তীব্র প্রতিবাদের মাধ্যমে সমকালে সে নির্যাতিত নারীদের পক্ষে নিজের অবস্থানও নিশ্চিত করেছে। বস্তুত শরৎ সাহিত্যে ‘চরিত্রহীন’ থেকেই প্রতিবাদী নারীর যাত্রা শুরু। আর ওই নারী হচ্ছে কিরণময়ী। তার চরিত্রের জটিল দিকগুলো পাঠককে ভাবনার ক্ষেত্রে বিভ্রান্তিতে ফেলতে পারে। দেখা যায়, তার ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যটি সমুন্নত রাখার জন্যই যেন এ আপসহীন সংগ্রাম। এখানে সে একা। তার পাশে অন্য কেউ যেমন ছিল না তেমনি সমাজ কিংবা সমাজবিধিও ছিল না। উপন্যাসে চলমান ওই সচল চরিত্র দ্রোহের এক প্রতিমূর্তি। জৈবপ্রবৃত্তির মধ্যে সগৌরবে নিজেকে সমর্পণ করে রেখেছে। সে নিষ্কাম প্রবৃত্তিতে বিশ্বাসী নয়। সকাম চেতনায় উদ্বুদ্ধ এবং এক অদৃশ্যমান কামচেতনায় তাড়িত। তা কখনোই কোনো নারী চরিত্রে এ ধরনের প্রবৃত্তিটি কেউ মেনে নিতে পারে না। সমকালীন সংস্কারাচ্ছন্ন সমাজে এরূপ অসামাজিক চেতনার কোনো স্বীকৃতি বা অনুমোদন ছিল না। তাই শরৎচন্দ্র সমকালীন সমাজ ব্যবস্থার ভেতরে থেকে কৌশলে এ চরিত্রের স্বতঃস্ফূর্ততার ভেতর মনোবিকৃতির প্রতীকী স্পর্শ দিয়ে ‘মোর্ছা’ রোগে আক্রান্ত করে কিরণময়ী চরিত্রটি স্বাভাবিক করার আপত প্রয়াসও চালিয়েছেন।
কিরণময়ীর জীবন সম্পর্কে তার যৌক্তিক পর্যবেক্ষণ অনেকটাই সরল আবার তাৎপর্যময় দার্শনীকতায় পরিপূর্ণ। জীবন সম্পর্কে হার্বাট স্পেন্সারের (১৫৫২-১৫৯৯) যুক্তি ও পর্যবেক্ষণ ওই রকমই ছিলÑ ‘কোনো মানুষের তার ন্যায্য বা মৌলিক যে অধিকার তা থেকে বঞ্চিত করা মানেই অন্যায়।’ কিরণময়ী ওই কথাটিই যুক্তির ভেতর উপস্থাপন করে বোঝাতে চেয়েছে, দিবাকরকে আরাকানে নিয়ে এসে কারো অধিকারে সে হস্তক্ষেপ করেনি। তাই অনুশোচনার কোনো কারণ সে দেখে না।

চার.
কিরণময়ী নিজের রূপ ও সৌন্দর্যের বিষয়ে সচেতন। নারীর রূপ সম্পর্কে তার পর্যবেক্ষণ অনেকটাই আধুনিক ও তাত্ত্বিক। ‘ততোক্ষণই রূপ যতোক্ষণ সে সৃষ্টি করতে পারে। এই সৃষ্টি করার ক্ষমতাই তার রূপ-যৌবন। এই সৃষ্টি করবার ইচ্ছাই তার প্রেম’Ñ অসাধারণ উদ্ধৃতি। এই হচ্ছে শরৎ সাহিত্যের নন্দিত নারী চরিত্র। স্বাধীন, কোমল ও অমায়িক আবার কখনো দ্রোহী, প্রতিবাদী ও বাকপটু। উল্লেখ্য, প্রেমটি তিনি তার মতো সংজ্ঞায়িত করেছেন। এ প্রেম তার জীবনে আসেনি। এখানে তিনি ব্যর্থ। কিরণময়ীর তথাকথিত শিক্ষিত স্বামী কখনো তাকে ভালোবেসেছে বলে মনে হয় না। তাকে ভালোবাসার বদলে প্রচুর জ্ঞান দিয়েছে অনেকটা শিষ্যেকে গুরু যেমন দিয়ে থাকেন। ফলে সে বিদুষী হয়েছে,
প্রেমিকা হতে পারেনি। ভালোবাসার পরিবর্তে সে শিখেছে প্রচুর। দর্শন, বিজ্ঞান,
হিন্দুশাস্ত্রÑ সবকিছুই সে পড়েছে। সেখান থেকেই উৎপত্তি তার পা-িত্যের। তার তর্ক ও যুক্তি শুনে প-িতই মনে হয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, সে ভালোবাসা চেয়েছে। কিন্তু পায়নি। এখান থেকেই এ নারীর বিদ্রোহী হয়ে ওঠার যাত্রা। সে আধুনিক শিক্ষিত নারী বলেই তার রূপ, সৌন্দর্য, রুচি, উদ্দাম ও উচ্ছল যৌবনটি ব্যর্থ হতে দিতে চায়নি।

বিচিত্র এই নারী চরিত্র কিরণময়ী অকপটে দিবাকরকে বলে দিয়েছে অনঙ্গ ডাক্তারের সঙ্গে তার নিষিদ্ধ সম্পর্কের আদ্যোপান্ত। শরৎচন্দ্রের এ নারী চরিত্রে কোনো ভণিতা দেখা যায়নি। যখন সে বলে, ‘কতো বৎসরের দুর্দান্ত অনাবৃষ্টির জ্বালা এই বুকের মাঝখানে জমাট বেঁধেছিল বলেই এমন সম্ভব হতে পেরেছিল, কি জানি ঠাকুরপো, যে তৃষ্ণায় মানুষ নর্দমার গাঢ় জলও অঞ্জলি ভরে মুখে দেয়, আমারও ছিল সে পিপাসা।’ একই পিপাসা আমরা বঙ্কিমের রোহিনি-তেও (কৃষ্ণকান্তের উইল-১৮৭৮) দেখেছি। এখানেই শরৎচন্দ্রের কিরণময়ীর জীবন বাস্তবতার সকরুণ ট্র্যাজেডি। উপন্যাসে বর্ণনার ধারাবাহিকতায় সুরবালার পাতিব্রত্য নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে। সুরবালার এরূপ পাতিব্রত্যের উজ্জ্বল স্পর্শ কিরণমীয়কে কিছুটা বদলে দিল। উপেনের কাছে তার ফিরে আসা, অতঃপর আত্মসমর্পণ! কিন্তু উপেনের হৃদয়ে আর কিরণময়ী নেই। কিরণময়ীকে সে অপবিত্র, নাস্তিক, ‘ভাইপার’ বলেই জানে। এভাবেই এ চরিত্রটির উত্থান-পতন। শরৎচন্দ্র নিষ্ঠতার সঙ্গে চরিত্রটি তুলে এনেছেন সমকালীন সংস্কারাচ্ছন্ন সমাজের ভেতর থেকে। সমগ্র উপন্যাসে তার সরব বিচরণ ভিন্ন মাত্রায় উপস্থাপিত হয়েছে। বলা চলে, শরৎচন্দ্রের নারী চরিত্রের মধ্যে কিরণময়ী এক ব্যতিক্রমী নারী চরিত্র।

পাঁচ.
বস্তুত ‘চরিত্রহীন’ শরৎচন্দ্রের একটি কালজয়ী উপন্যাস। এখানে ছোট-বড় সব চরিত্র ঔপন্যাসিক নিষ্ঠতায় উপস্থাপন করেছেন। উপন্যাসের বৃহত্তর পরিবেশে সাবিত্রীর বিচরণ মার্জিত। শান্ত, স্থিতধী, কোমল, মানবিক ও পতিব্রতা নারী চরিত্র সাবিত্রী। এ উপন্যাসের নায়িকাও সে। কিরণময়ীর সম্পূর্ণ বিপরীত একটি নারী চরিত্র সে। শরৎচন্দ্রের নারীদের মধ্যে এ চরিত্রটি স্বল্প পরিসরে ব্যতিক্রমী চেতনায় উপস্থাপিত। অনেকটা ভারতীয় নারী চরিত্রের শাশ্বত রূপের প্রতীকী উপস্থাপন। সে অল্প বয়সেই বিধবা। তার পেছনেও কাহিনী রয়েছে। ভগ্নিপতির প্ররোচনায় পড়ে তার কলকাতায় আসা। এখানে জীবনের প্রয়োজনে একটি মেসে ঝিয়ের কাজ নেয়া যা সে নিপুণভাবে করতে পারার স্বীকৃতিও আদায় করতে পেরেছিল। ঔপন্যাসিক সে সনদ তাকে দিয়েছেন। এ জন্য তাকে মেসের ‘ঝি’ ও ‘গিন্নি’ বলে আপাত সম্মান দেখানোরও প্রয়াস পেয়েছেন। ওই মেসেরই উচ্ছৃঙ্খল ‘বোর্ডার’ সতীশ। সতীশকে এক পর্যায়ে ভালোবেসে ফেলে সাবিত্রী। সতীশ উশৃঙ্খল মদ্যপ। তা জেনেও সাবিত্রী তাকে ভালোবাসে। তাকে তেমন যোগ্য মর্যাদা দেয়নি সতীশ। এতে সাবিত্রীর কিছু যায় এসে না। সতীশের নিরুঙ্কুশ কল্যাণ কামনাই তার জীবনের একমাত্র ধ্যান। সে প্রেমে একনিষ্ঠ নারী। বিনিময় কিংবা কোনো প্রতিদানে সে বিশ্বাসী নয়। অনেকটা ওই রকমÑ ‘সে দিতে জানে, প্রতিদানে তার কোনো মোহ নেই। সতীশের কাছে তার চাওয়ারও কিছু নেই একমাত্র ভালোবাসা ছাড়া।’ সাবিত্রীর মধ্যে প্রেম ছিল। কিন্তু তা কুৎসিত কামনার দ্বারা পরিবৃত ছিল না। তার মধ্যেও কাম ছিল। তবে তা ছিল নিষ্কাম চেতনায় পরিপূর্ণ। সে যে বিধবা এ বিষয়টি কখনো ভুলে যায়নি। এরপরও শরৎচন্দ্র এ নারী চরিত্রে মানুষসত্তার পুরোটাই ঢেলে দিয়েছেন। এ জন্যই ওই নারী শতভাগ মানবিক। প্রেম, স্নেহ, মমতা, ভালোবাসা ও বোধ-বিবেচনায় সে ততোটাই অমায়িক। সতীশ যখন সাবিত্রীকে একান্তই পেতে চেয়েছে তখন তার প্রতি শ্রদ্ধায় নিজের অপবিত্র দেহ সতীশের কাছে সমর্পণ না করে নিজেকে সংযত করে দূরে থাকার চেষ্টা করেছে। বিচিত্র এই নারী চরিত্র! তার হৃদয়ের অন্তর্গত প্রেমের অনুভূতি অনুক্ত থেকেছে। এর ব্যঞ্জনা ব্যাপক এবং এরই সঙ্গে নারীর অন্তর্গত মনের প্রণয়, ইচ্ছা, রুচিশীল, নির্বাক ও নিষ্কাম চেতনায় শৈল্পিক বিভায় দ্যোতিত হয়ে উঠেছে। সাবিত্রীর প্রতি আমাদেরও শ্রদ্ধা ও সহানুভূতি জাগ্রত হয়। সাবিত্রী সমাজবিধির অনুশাসন ও সংস্কারের প্রতি সম্মান এবং আনুগত্য দেখিয়ে সতীশকে বলতে পেরেছেÑ ‘আমি বিধবা, আমি কুলত্যাগিণী, আমি সমাজে লাঞ্ছিতা, আমাকে বিয়ে করবার দুঃখ যে কতো বড় সে তুমি বোঝোনি বটে; কিন্তু যিনি আজন্ম শুদ্ধ, অতলস্পর্শী শোকের আগুন যাকে পুড়িয়ে হীরের মতো নির্মল করেছে, তিনি বুঝেছেন বলেই এই হতভাগিণীকে আশ্রয় দিতে সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছেন।’
দেহ অশুচি হলেও মন পবিত্র। সুতরাং সাবিত্রীর অপবিত্র দেহে পবিত্র প্রেমের মিনার জীবন বাস্তবতায় ততোটাই সমুজ্জ্বল ছিল। শরৎচন্দ্রের মানবিক প্রেমের যে তত্ত্ব এরই জ্বলন্ত উদাহরণ ওই সাবিত্রী। তাই নারীর শাশ্বত চিরপ্রেম কেবল ভোগে নয়, ত্যাগেই মহিমান্বিত হতে পারে। এরই এক উজ্জ্বল বিজ্ঞাপন উদ্ধৃত হয়েছে সাবিত্রীর চরিত্রে। ফলে তার অন্তরের গভীরে লালিত বিমূর্ত প্রেমের মূর্ত সম্পদ সতীশকে তুলে দিতে পেরেছে (আরেক নারী) সরোজিনীর হাতে। এ ত্যাগের করুণ বিজ্ঞাপন বিমূর্ত হলেও আমাদের অন্তর স্পর্শ করেছে নিঃসন্দেহে। এ ত্যাগের উজ্জ্বল বিভা শরৎচন্দ্রের নারী চরিত্রের অন্তর্গত রূপের একটি আলোকিত দিক। সাবিত্রীর এ ত্যাগ সত্যই তুলনাহীন।
বস্তুত শরৎ সাহিত্যে নারীর তুলনামূলক বিচারে সাবিত্রী কোমল ও মায়াবী। অথচ নিরীহ চরিত্র। এ ধৃতাত্মা নারী জেনে-শুনে প্রেমের এক অদৃশ্যমান কঠিন পথে যাত্রা শুরু করে অবশেষে নিজেই নিজেকে বঞ্চিত করে। দেহের অশুচিতা তার মন ও প্রেমের পবিত্রতাটি কোথাও কালিমা লিপ্ত করেনি। নিষ্কাম চেতনায় বিশ্বাসী সাবিত্রী যেন প্রেমের এক ব্রতচারী নারী। নীলিমা ইব্রাহিম যথার্থই বলেছেন, ‘শরৎচন্দ্রের নায়িকাদের মধ্যে সাবিত্রী সবার চেয়ে দুর্ভাগিনী। কারণ তার জীবনের শেষ সম্বল, তার সাধনালদ্ধ ধনকেও শরৎচন্দ্র কেড়ে নিয়েছেন।’
সাবিত্রী তার আজন্ম লালিত সংস্কার আবেগের শূন্যতায় ভেঙে দিতে চায়নি। তাই এ বঞ্চনার ভেতর নিজেকে এক অন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে যা কিরণময়ী পারেনি। তাই শরৎ সাহিত্যে নারী চরিত্র পর্যালোচনায় উঠে আসে ত্যাগ, নিষ্ঠা, সেবা ও কল্যাণের আরেক নাম সাবিত্রী।

ছয়.
বস্তুত বঙ্কিমচন্দ্র যেখানে জমিদার বা অভিজাত সম্প্রদায় থেকে প্রধান চরিত্রগুলো তুলে এনেছেন, রবীন্দ্রনাথ একই ধারায় সমকালীন সমাজের অভিজাত ও উচ্চবিত্ত সম্প্রদায়ের ভেতর তার চরিত্র খুঁজে বেড়িয়েছেন সেখানে শরৎচন্দ্র সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। তার চরিত্র অন্বেষণ করেছেন সমকালীন মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত সম্প্রদায়ের ভেতর। আর সেসব মানুষকেই নিষ্ঠুরতার সঙ্গে তুলে এনে ঠাঁই দিয়েছেন সাহিত্যের পাতায়। শরৎ সাহিত্যেই প্রথম আমরা দেখতে পাই মানুষের জীবনগাথা। শরৎচন্দ্রের আগে এমন জীবন চিত্রণ কারো লেখায় খুঁজে পাওয়া যায় না। এখানেও মৌলিক কারণের যে সম্পর্ক তা ব্যক্তি বিশেষে নিজ নিজ অবস্থান অনুযায়ী পরিষ্কার। বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্রের ব্যক্তিমানস এবং শ্রেণীগত অবস্থানও ভিন্ন। বঙ্কিম ও রবীন্দ্রনাথ অভিজাত সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। নিম্নবিত্ত সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করেছেন শরৎচন্দ্র। সুতরাং তাদের প্রত্যেকেরই চরিত্র নির্বাচনে ভিন্নতা থাকাই স্বাভাবিক। শরৎচন্দ্র গ্রামীণ মধ্যবিত্ত সমাজ থেকে উঠে এসেছেন। তাই তার মানসিকতা ওই শ্রেণীরই অনুকূলে কাজ করেছে। এই জীবন বাস্তবতার মৌলিক উৎস সন্ধানে শরৎচন্দ্র ওই শ্রেণীর মানুষকে তুলে এনে সাহিত্যে নীরিক্ষণ করার চেষ্টা করেছেন। ফলে তার সাহিত্যে নিম্ন-মধ্যবিত্ত সমাজের স্তর থেকে তুলে আনা মানুষের সুখ-দুঃখ, ব্যথা-বেদনার জীবনচিত্র বিজ্ঞাপিত হয়েছে। বস্তুত এরই ধারাবাহিকতায় শরৎচন্দ্র তার আপন শ্রেণী চরিত্র ও সম্প্রদায়গত মানসিকতাটি অন্য উচ্চতায় মেলে ধরার প্রয়াস পেয়েছেন নিজের সব রচনায়। এ কারণেই শরৎ সাহিত্যে তার আঁকা চরিত্রগুলো হয় মধ্যবিত্ত অথবা নিম্নবিত্ত থেকে উঠে আসা। শরৎ সাহিত্যে নারী চরিত্রগুলো যথাক্রমে বিরাজ (বিরাজ বৌ), মাধবী (বড় দিদি), জ্ঞানদা (অরক্ষণীয়া), রমা-জেঠাইমা (পল্লীসমাজ), অন্নদা দিদি-রাজলক্ষ্মী-অভয়া-সুনন্দা-কমল লতা (শ্রীকান্ত), বিজয়া (দত্তা), সুরবালা-সরোজিনী-সাবিত্রী-কিরণময়ী (চরিত্রহীন), অচলা (গৃহদাহ), ভারতী-সুমিত্রা (পথের দাবি), ষোড়শী (দেনা-পাওনা), কমল (শেষ প্রশ্ন), বন্দনা (বিপ্রদাস)। এসব দ্যোতিত চরিত্র মধ্যবিত্ত সমাজ থেকেই শরৎ সাহিত্যে উঠে এসেছে। এ ধারায় সমকালীন সামাজিক সংস্কার রীতি-নীতির মানদ-ে শরৎ সাহিত্যে নারী সমধিক শিল্পসফল চিত্রণ।
এ ধারায় শরৎচন্দ্রের ‘চরিত্রহীন’ সম্পর্কে সমালোচক কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রাজ্ঞ পর্যবেক্ষণÑ ‘বঙ্গ উপন্যাস সাহিত্যের একটি শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ। ইহার পাতায় পাতায় জীবন সমস্যার যে আলোচনা, যে গভীর অভিজ্ঞতা, যে স্নিগ্ধ উদার সহানুভূতি ছড়ানো রহিয়াছে, তাহা আমাদের নৈতিক ও সাময়িক বিচার-বুদ্ধির একটা চিরন্তন পরিবর্তন সাধন করে।’

 

মডেলঃ আফিফা, অথৈ, সারাকা, মনিষা
পোশাকঃ রাকিব’স আর রাফিউর
স্টাইলিংঃ মোঃ রাকিব খান
মেকওভারঃ ক্লিওপেট্রা বিউটি স্যালন
ছবিঃ অনিক রহমান, অনিক ইসলাম

তিনিই আমাদের শক্তি তিনিই আমাদের প্রেরণা

আবেদ খান  

 

বঙ্গবন্ধু ও তার স্বপ্নকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য তৎপর অপশক্তি। ধর্মান্ধতা, সংকীর্ণতা, হিংসা ও ক্ষুদ্রতা আমাদের অস্তিত্বটি ধ্বংস করতে উদ্যত। এই অবস্থায় আমাদের সবাইকে, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ও আদর্শের প্রত্যেক সৈনিককে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী প্রত্যেককে আজ ঐক্যবদ্ধ হয়ে রুখে দাঁড়ানোর শপথ নিতে হবে। নিজেদের ভেতরকার অবিশ্বাসের সব প্রাচীর গুঁড়িয়ে দিয়ে এক লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

 

ইতিহাসের একটি বিচিত্র চিত্র খুব লক্ষ্য করার মতো। রাষ্ট্র বা জাতির নির্মাণে যারা মূল ভূমিকা পালন করে অবিস্মরণীয় নায়ক হয়েছেন, তাদের অধিকাংশেরই অপ্রত্যাশিত ও অনাকাক্সিক্ষত মূল্য দিতে হয়েছে। ধরা যাক উপমহাদেশের মহাত্মা গান্ধীর কথা। তিনি ভারতের জাতির জনক। কিন্তু স্বাধীনতার পর স্বাধীন ভারতে মাত্র এক বছরের মতো বাঁচতে পেরেছিলেন। উগ্রবাদী ঘাতকের নিষ্ঠুর বুলেট তার বক্ষ বিদীর্ণ করেছিল। ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতার প্রধান রূপকার আহমেদ সুকর্ণের অন্তিম সময়ের সুদীর্ঘ অংশ কেটেছে নিঃসঙ্গ অবস্থায় কারাগারে। শ্রীলংকার স্বাধীনতার মূল নায়ক বন্দরনায়েক ঘাতকের হাতে প্রাণ দিয়েছিলেন। ফরাসি শাসনের নাগপাশ ছিন্ন করে আলজেরিয়ার যে মহান পুরুষ সেখানকার জনগণকে স্বাধীনতার স্বাদ দিয়েছিলেন, সেই আহমেদ বেন বেল্লাকেও কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে শেষ দিনগুলো কাটাতে হয়েছে। ইতিহাসের বাঁক নির্মাণে ভূমিকা রাখার পরিণতিতে ঘাতকের হাতে প্রাণ গিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন, জন ফিটজেরাল্ড কেনেডি ও কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের মুক্তির প্রতীক মার্টিন লুথার কিংয়ের। কৃষ্ণ আফ্রিকার প্রথম সূর্যোদয়ের প্রতীক হিসেবে পরিগণিত প্যাট্রিস লুমুম্বাকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল মোশে শোম্বে-কাসাভুবু চক্র। কিউবা বিপ্লবের অন্যতম রূপকার চে গুয়েভারাকে প্রাণ দিতে হয়েছিল বলিভিয়ার জঙ্গলে। চিলির আলেন্দের এভাবে নিঃশেষে প্রাণদানের আরেক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত।

এ ধরনের হত্যাযজ্ঞের সবচেয়ে নির্মম দৃষ্টান্ত সৃষ্টি হয়েছে বাংলাদেশে। বাঙালি জাতিসত্তার প্রথম সফল রূপকার জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যার মাধ্যমে ওই বিচিত্র চিত্রটি ইতিহাসের কাছে ধরা দেয়। কেন এ ধরনের ঘটনা ঘটে এটা যদি বিশ্লেষণ করা হয় তাহলে দেখা যাবে তারা প্রত্যেকেই প্রচলিত স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে লড়াই করে নিজের প্রাণের বিনিময়ে সত্যের প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আরো গভীরভাবে লক্ষ্য করলে এটা বুঝতে কষ্ট হবে না, তারা প্রত্যেকেই শৃঙ্খলিত মানবতার মুক্তির প্রয়োজনে নিজ নিজ ভূমিতে দাঁড়িয়ে সংগ্রাম করেছেন যা কায়েমি স্বার্থবাদী মহলকে ক্রুদ্ধ ও ক্ষুব্ধ করেছে। ফলে তারা সময় ও সুযোগ বুঝে তাদের প্রতিহিংসা চরিতার্থ করেছে।

মানব জাতির এ লড়াই শুধু আজকের নয়Ñ সব সময়ের, সব কালের। ইতিহাসের আদি পর্ব থেকে এর সূচনা। স্পার্টাকাস ক্রুশবিদ্ধ হয়ে কালের পাতায় মহাবিদ্রোহের যে সাক্ষ্য রেখেছিলেনÑ মঙ্গল পান্ডে ও সূর্য সেনের পদচিহ্ন অনুসরণ করে তা এসে পৌঁছেছে এই গাঙ্গেয় বদ্বীপে। আর সেখানেই যার হাতে ধরে ঘটলো একটি বিশাল জাতিগোষ্ঠীর অভ্যুদয় তার নাম শেখ মুজিবুর রহমান। ফরিদপুরের এক প্রত্যন্ত গ্রামের অবস্থাপন্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান তিনি।

আজ ভাবতে অবাক লাগে, ওই অসাধারণ মানুষটি কীভাবে তিল তিল করে নিজেকে তৈরি করেছিলেন! শেখ মুজিবÑ টুঙ্গিপাড়ার সেই কৃশকায় তরুণটি কখনো কোনো বিশাল প্রাপ্তির জন্য তার পথপরিক্রমা নির্ণয় করেননি। প্রথম যে বিশ্বাস তার আত্মাকে বশীভূত করেছিল তা হচ্ছে মানবতা। ওই মানবতাই তাকে ধীরে ধীরে নিয়ে গেছে অমরাবতীর দিকে। এ মানবতাই তাকে চিনিয়েছে ন্যায়, সত্য ও অধিকারের জন্য বিরামহীন সংগ্রামের
মহাসড়কটিকে। আর ওই পথে তিনি হেঁটেছেন নিঃশঙ্কচিত্তে। অতৃপ্ত প্রতœতাত্ত্বিকের মতো মহাকালের গর্ভ থেকে টেনে এনেছেন ধূলিধূসরিত একটি বিস্মৃতপ্রায় জাতিসত্তার অস্তিত্ব। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, বিপরীত স্রোতের বিরুদ্ধে লড়াই করেই মহামানব ইতিহাসের সন্তানে পরিণত হন। তার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ছিল না। প্রতিকূল পরিস্থিতি, যুদ্ধ, ক্ষুদ্রতা, ধর্মীয় সংকীর্ণতা, জাত্যাভিমানÑ সবকিছুর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ওই মানুষটি দিনের পর দিন লড়াই করেছেন। ব্যক্তিস্বার্থ তাকে স্পর্শ করেনি। হিংসা কিংবা লোভ তাকে পরাস্ত করেনি কখনো। যেদিন থেকে তিনি রাজনৈতিক চেতনা ধারণ করলেন অন্তরে সেদিন থেকেই ভেবেছিলেন, বাঙালি জাতির আত্মপরিচয়ের সূত্রটি খুঁজে বের করতেই হবে। এই জাতিসত্তা প্রতিষ্ঠা করতে হবে ইতিহাসের পাতায়। এ জন্য প্রয়োজন একটি ভৌগোলিক ভূখ-ের। বাঙালির জন্য, বাঙালির পৃথক রাষ্ট্র ব্যবস্থার জন্য তার মতো এতো গভীরভাবে অনুভব আর কেউ করেননি। শুধু অনুভবই নয়, নিজের অন্তরের আহ্বানটি বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য এক বিশাল সংগ্রামের রূপরেখা প্রণয়ন করেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। এ জন্য কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন বার বার। মুখোমুখি হয়েছেন মৃত্যুর। কিন্তু আদর্শের প্রশ্নে, সংগ্রামের প্রশ্নে, মানবতার মুক্তির প্রশ্নে ন্যূনতম আপস করেননি। এভাবেই টুঙ্গিপাড়ার সেই শেখ মুজিব ক্রমান্বয়ে মুজিব ভাই, বঙ্গবন্ধু, বাঙালি জাতির জনক, স্বাধীন বাংলাদেশের স্রষ্টা হিসেবে ইতিহাসের অংশ হয়েছেন। প্রতিপক্ষ তার পিছু ছাড়েনি। কখনো প্রকাশ্যে, কখনো অপ্রকাশ্যেÑ প্রতি মুহূর্তে তাকে বিব্রত করেছে, আক্রান্ত করেছে, ব্যথিত করেছে। তবে কখনো পরাস্ত কিংবা বিধ্বস্ত করতে পারেনি। তাই রাতের অন্ধকারে মুখ লুকিয়ে নৃশংস আততায়ী তাকে সপরিবারে হত্যা করেছে। তারা বোঝেনি অমৃতের সন্তানকে কখনো বধ করা যায় না।

পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্টে মানবেতিহাসের অন্যতম নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ বঙ্গবন্ধুকে তার প্রিয় বাংলাদেশ কিংবা বাঙালি থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি এখনো। বরং দিনে দিনে তিনি বিশাল থেকে বিশালতর হয়ে বিশ্বমানবতার পথপদর্শক হয়েছেন। তাই প্রতিটি ১৫ আগস্ট এ জাতির কাছে সত্য ও ন্যায়ের পথে চলার, আদর্শ এবং যুক্তির পথে চলার, লড়াই ও মুক্তির পথে চলার বাতিঘর হিসেবে সবাইকে শক্তি দেয়, সাহস দেয়, প্রেরণা দেয়। আজ বাংলাদেশ এক কঠিন বাস্তবতা ও বিপর্যয়ের মুখোমুখি। নাগিনীদের বিষাক্ত নিশ্বাসে নিঃশেষিতপ্রায় শুভশক্তি। ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তৃত চারদিকে। বঙ্গবন্ধু ও তার স্বপ্নকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য তৎপর অপশক্তি। ধর্মান্ধতা, সংকীর্ণতা, হিংসা ও ক্ষুদ্রতা আমাদের অস্তিত্বটি ধ্বংস করতে উদ্যত। এই অবস্থায় আমাদের সবাইকে, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ও আদর্শের প্রত্যেক সৈনিককে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী প্রত্যেককে আজ ঐক্যবদ্ধ হয়ে রুখে দাঁড়ানোর শপথ নিতে হবে। নিজেদের ভেতরকার অবিশ্বাসের সব প্রাচীর গুঁড়িয়ে দিয়ে এক লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ আমাদের শক্তি, তার পদচিহ্ন অনুসরণেই আমাদের মুক্তি, তার স্বপ্নই আমাদের প্রেরণা।

বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রচিন্তা 

-যতীন সরকার

 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ছিলেন? রাষ্ট্রতত্ত্বের ক্ষেত্রে কোনো মৌলিক অবদানের জন্য কি তিনি দেশ-বিদেশে নন্দিত হয়েছেন? কিংবা মৌলিক কোনো তত্ত্ব দিতে না পারলেও এ যাবৎকালের রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের নানান তত্ত্বের সংশ্লেষণ ঘটিয়ে এ বিজ্ঞানের প্রয়োগিক দিকটিকে সমৃদ্ধ করেছেন?
সব প্রশ্নেরই উত্তর হবে ‘না’। অথচ শেখ মুজিবুর রহমান নামের মানুষটি আবাল্য রাষ্ট্র ও রাজনীতি নিয়েই ভাবনাচিন্তা করেছেন। শুধু অলস ভাবনাচিন্তা নয়, প্রচ- সক্রিয়তা নিয়ে নিজের সমগ্র সত্তাকে দেশের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করে দিয়েছেন। সেই রাজনীতি নিয়ে গেছে ত্যাগের পথে, দুঃখ বরণের পথে। দুঃখ তাকে বিচলিত করতে পারেনি, দেশের দুঃখ বরণের ব্রত তার নিজের দুঃখকে তুচ্ছ করে দিয়েছে। রাজনৈতিক সংগ্রাম করে করেই তাঁর দেশকে তিনি
স্বাধীনতার উপল উপকূলে পৌঁছিয়ে দিয়েছেন, একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের স্থপতি হয়েছেন এবং সেই স্বাধীন রাষ্ট্রটিকে আধুনিক ও প্রগতিশীল করে তোলার নীতিমালা প্রণয়ন করেছেন, সে নীতিমালাকে বাস্তবে রূপায়িত করার জন্য নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে করতেই আত্মবিসর্জন দিয়েছেন।
এই যে একটি নতুন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা দান এবং রাষ্ট্রটির জন্য নীতিমালা ও তার প্রয়োগ পদ্ধতি নির্ধারণ, এর পেছনে ক্রিয়াশীল ছিল তার যে রাষ্ট্রচিন্তা সেটির উৎস কী?
এক কথায় এর দ্ব্যর্থহীন জবাব ‘স্বদেশপ্রেম’। মুজিবের ছিল খাঁটি, নির্ভেজাল, নিরঙ্কুশ ও আপসহীন স্বদেশপ্রেম। সেই স্বদেশপ্রেম থেকেই তার রাষ্ট্রচিন্তার উন্মেষ ও বিকাশ ঘটেছে। বইয়ের পাতা থেকে তিনি আহরণ করতে যাননি কিংবা একান্ত মৌলিক বা অভিনব কোনো রাষ্ট্রচিন্তা দিয়ে পৃথিবীকে হকচকিয়ে দিতেও চাননি।
“মুজিব মৌলিক চিন্তার অধিকারী বলে ভান করেন না। তিনি রাজনীতির কবি, প্রকৌশলী নন। শিল্পকৌশলের প্রতি উৎসাহের পরিবর্তে শিল্পকলার প্রতি ঝোঁক বাঙালিদের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক। কাজেই সব শ্রেণি ও আদর্শের অনুসারীদের একতাবদ্ধ করার জন্য তার ‘স্টাইল’ (পদ্ধতি) সবচেয়ে বেশি উপযোগী ছিল।’’ Mujib does not pretend to be an original thinker. He is a poet of politics not an engineer. but the Bengalis temd to be more artistic than technical, any how, and this style may be just what was needed to unite all the classes and ideologies of the region) ১৯৭১ সালের ৫ এপ্রিল News Week পত্রিকায় সংবাদ ভাষ্যকারের এই মন্তব্য মুজিবের রাষ্ট্রচিন্তার স্বরূপটিকে সঠিকভাবেই অনাবৃত করেছে বলা যেতে পারে।
স্বদেশপ্রেম একটি মহৎ আবেগের নাম। আবেগহীন মানুষ স্বদেশপ্রেমিক হতে পারে না। শেখ মুজিবের সেই আবেগ প্রচুর ও প্রবলই ছিল। কিন্তু আবেগের তোড়ে ভেসে গিয়ে শুধু স্বদেশপ্রেম কেন, কোনো প্রেমেরই সফল ও কাক্সিক্ষত পরিণতি দেয়া যায় না। আবেগের ওপর কা-জ্ঞানের নিয়ন্ত্রণ চাই। শেখ মুজিবের ছিল সেই সবল কা-জ্ঞান। কা-জ্ঞান নিয়ন্ত্রিত স্বদেশপ্রেমই মুজিবের রাষ্ট্রচিন্তাকে ধাপে ধাপে পরিপক্ব করে তুলেছে। তাকে বঙ্গবন্ধু বানিয়েছে।
স্বদেশপ্রেমের আবেগেই শেখ মুজিব প্রথম যৌবনে পাকিস্তান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গেই তার সবল কা-জ্ঞানের বলে পাকিস্তানের প্রতারণাটি তিনি ধরে ফেলতে পেরেছিলেন। স্বদেশপ্রেম মানে তো স্বদেশের মাটি, মানুষ, ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্যÑ সবকিছুর প্রতিই প্রেম। সেসবের প্রতি সংগ্রাম ও তন্বিষ্ঠ দৃষ্টিপাতেই তিনি উপলদ্ধি করে ফেললেন যে, পাকিস্তানের মতো একটি অদ্ভুত ও কৃত্রিম রাষ্ট্রের থাবা থেকে মুক্ত করতে না পারলে তার স্বদেশের মুক্তিলাভ ঘটবে না। ১৯৪৮ সালে যখন বাঙালির ভাষার ওপর আঘাত এলো তখন থেকেই বিষয়টি তার চেতনাকে আলোড়িত করতে শুরু করেছিল। হাজার মাইলের ব্যবধানে অবস্থিত পাকিস্তান রাষ্ট্রটির পূর্ব-
পশ্চিমের মধ্যে বৈষম্যের পাহাড় গড়ে বাংলাকে কার্যত উপনিবেশে পরিনত করে ফেলা, ১৯৫৮ সালের সামরিক স্বৈরাচারের রাষ্ট্রীয় মঞ্চে অবতরণÑ এসব কিছু দেখে-শুনে শেখ মুজিব বাঙালির স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকেই তার রাজনৈতিক সংগ্রামের লক্ষ্যবিন্দুরূপে নির্ধারিত করে ফেলেছিলেন। তার সেই লক্ষ্যের কথাটি বোধহয় সর্বপ্রথম স্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করেছিলেন ১৯৬১ সালের নভেম্বর। অবশ্য একটি গোপন বৈঠকে। বৈঠকটি ছিল সে সময়কার গোপন কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে। আইয়ুবের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের নীতি ও কর্মপদ্ধতি স্থির করার লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত সেই বৈঠকে
কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষে উপস্থিত ছিলেন মণি সিংহ ও খোকা রায় এবং আওয়ামী লীগের পক্ষে শেখ মুজিবুর রহমান ও তফাজ্জল হোসেন মানিক মিঞা। কমরেড খোকা রায় ‘সামরিক শাসন প্রত্যাহার ও রাজবন্দিদের মুক্তিসহ মোট ৪টি জনপ্রিয় দাবির ভিত্তিতে আন্দোলন গড়ে’ তোলার অভিমত ব্যক্ত করলে শেখ মুজিব বলেন, ‘এসব দাবি-দাওয়া কর্মসূচিতে রাখুন, কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু একটা কথা আমি খোলাখুলি বলতে চাই। আমার বিশ্বাস গণতন্ত্র, স্বায়ত্তশাসনÑ এসব কোনো দাবিই পাঞ্জাবিরা মানবে না। কাজেই স্বাধীনতা ছাড়া বাঙালির মুক্তি নেই। স্বাধীনতার দাবিটা আন্দোলনের কর্মসূটিতে রাখা দরকার।’
কমিউনিস্ট পার্টি নীতিগতভাবে স্বাধীনতার প্রস্তাব সমর্থন করলেও তাদের মতে তখনো সে রকম দাবি উত্থাপনের সময় হয়নি। অনেক তর্ক-বিতর্কের পর শেখ মুজিব কমিউনিস্টদের বক্তব্যের সারবত্তা মেনে নেন। ভেতরে ভেতরে তিনি সেই চূড়ান্ত লক্ষ্যের দিকে অগ্রসর হওয়ারই প্রস্তুতি নিতে থাকেন। এরই প্রমাণ পাই ছেষট্টির ছয় দফা ঘোষণায়, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে ও একাত্তরের সেই দুনিয়া কাঁপানো দিন-মাসগুলোয় এবং ষোলোই ডিসেম্বর যুদ্ধজয়ের মধ্য দিয়ে স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায়।
বাংলাদেশই হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র ভাষাভিত্তিক জাতিরাষ্ট্র। বাঙালির এই স্বাধীন রাষ্ট্রটিকে কেন্দ্র করেই এর স্থপতি বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রচিন্তার বহুমুখী উৎসারণ ঘটতে থাকে। ভাষার দাবি প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে জাতির স্বাধীনতা আন্দোলনের সূচনা সেই বাঙালির জাতিরাষ্ট্রটির প্রকৃত মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য বাংলাকে শুধু রাষ্ট্রভাষাই করা হলো না, বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রচিন্তার একটি প্রতীকী প্রকাশ ঘটলো। বাংলা ভাষাকে দিয়ে বলতে পারি, বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘেও বাংলা ভাষাতেই ভাষণ দান করলেন। এর ভেতর দিয়ে বলতে পারি, বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রচিন্তার একটি প্রতীকী প্রকাশ ঘটলো। বাংলা ভাষাকে বাংলা ভাষার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা বাঙালি জাতি এবং বাংলার মানুষের আবহমান সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে দৃঢ়ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠাদানই ছিল বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রচিন্তার মূল লক্ষ্য। সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্যই তিনি তার নিজের মতো করে পথের সন্ধানে ব্রতী হন। এক্ষেত্রেও তার গভীর স্বদেশপ্রেম ও তীক্ষè কা-জ্ঞানই এবং অবিস্মরণীয় ভাষণটি শেষ করেছিলেন যে বাক্যটি দিয়ে সেটি ছিল ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। ৯ মাসে
স্বাধীনতার সংগ্রাম শেষ হয়েছিল অবশ্যই। কিন্তু মুক্তির সংগ্রাম তো এতো সহজে শেষ হওয়ার নয়। মুক্তির সংগ্রাম একটি স্থায়ী, দীর্ঘ ও নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া। সেই প্রক্রিয়ার অপরিহার্য অংশরূপেই বঙ্গবন্ধুর প্রবর্তনায় বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সংবিধানটি রচিত হয় এবং এতে সংযোজিত হয় জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র এ চারটি মৌলনীতি। এ নীতিগুলোর একটিও নিশ্চয়ই বঙ্গবন্ধুর মৌলিক উদ্ভাবন নয়। তবুও এর প্রতিটি সম্পর্কেই ছিল তার নিজস্ব অভিজ্ঞতা-সজ্ঞাত মৌলিক ভাবনা ও প্রয়োগ পদ্ধতি।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কোনো বই লেখেননি, তাই তার রাষ্ট্রচিন্তা তথা জীবনভাবনার স্বরূপ অন্বেষায় বিভিন্নজনের কাছে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত তার অভিমত, তার সম্পর্কে বিভিন্নজনের স্মৃতিচারণ, তার নেতৃত্বাধীন বা প্রভাবাধীন সংগঠনগুলোর ঘোষনাপত্রÑ এ রকম বিচিত্রবিধ উৎসের শরণাপন্ন হতে হয়। ওই সূত্রেই এখানে ‘মুজিববাদ’-এর লেখক খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াসের সাক্ষ্য থেকে আমরা বঙ্গবন্ধুর সম্পর্কে মোটা দাগের কিছু ধারণা পেয়ে যেতে পারি।

১৯৭২ সালেই খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াসের ‘কতিপয় প্রশ্নের জবাবে’ নিজের চিন্তা সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ছাত্র জীবন থেকে আজ পর্যন্ত আমার এই সুদীর্ঘকালের রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা ও সংগ্রাম কতিপয় চিন্তাধারার ওপর গড়ে উঠেছে। এ দেশের কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী তথা সকল মেহনতী মানুষের জীবনে শান্তি, সমৃদ্ধি ও সাম্য প্রতিষ্ঠাই আমার চিন্তাধারার মূল বিষয়বস্তু। একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে আমার জন্ম। কাজেই কৃষকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থেকে আমি জানি শোষণ কাকে বলে। এ দেশে যুগ যুগ ধরে শোষিত হয়েছে বুদ্ধিজীবীসহ সকল মেহনতী মানুষ। শোষণ চলে ফড়িয়া ব্যবসায়ী ও পুঁজিবাদের। শোষণ চলে সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ ও নয়া-উপনিবেশবাদের। এ দেশের সোনার মানুষ, এ দেশের মাটির মানুষ শোষণে শোষণে একবারে দিশাহারা হয়ে পড়ে। কিন্তু তাদের মুক্তির পথ কী? এই প্রশ্ন আমাকেও দিশাহারা করে ফেলে। পরে আমি পথের সন্ধান পাই। আমার কোনো কোনো সহযোগী রাজনৈতিক দল ও প্রগতিশীল বন্ধুবান্ধব বলেন শ্রেণীসংগ্রামের কথা। কিন্তু জাতীয়তাবাদের জবাবে আমি বলি, যার যার ধর্ম তার তারÑ এরই ভিত্তিতে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের কথা। শোষণহীন সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় সমাজতন্ত্র চাই। কিন্তু রক্তপাত ঘটিয়ে নয়Ñ গণতান্ত্রিক পন্থায়, সংসদীয় বিধি-বিধানের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠা করতে চাই সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা। আমার এ মতবাদ বাংলাদেশের বাস্তব অবস্থা ও ঐতিহাসিক পরিস্থিতি বিচার-বিশ্লেষণ করেই দাঁড় করিয়েছি। সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন, যুগোস্লাভিয়া প্রত্যেকে নিজ নিজ পথে, নিজ নিজ অবস্থা মোতবেক গড়ে তুলেছে সমাজতন্ত্র। আমি মনে করি, বাংলাদেশকেও অগ্রসর হতে হবে জাতীয়বাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রÑ এ চারটি মূল সূত্র ধরে, বাংলাদেশের নিজস্ব পথ ধরে। স্বাধীনতার অব্যবহিত পর থেকে বেশ কিছুদিন বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রচিন্তা এ রকমই ছিল। কিন্তু অচিরেই তিনি তার চিন্তায় মূলগত পরিবর্তন না ঘটিয়েই এর কিছুটা পুনর্বিন্যাস করতে বাধ্য হলেন। দেশের অভ্যন্তরের চরম বিশৃঙ্খল অবস্থা ও সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রটির রিরুদ্ধে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রই বঙ্গবন্ধুকে অন্যভাবে ভাবতে বাধ্য করেছিল। সাম্রাজ্যবাদের অভিসন্ধি ও কার্যকলাপ সম্পর্কে তিনি এ সময়ে আরো গভীরভাবে সচেতন হয়ে ওঠেন। পৃথিবীটি যে শোষক ও শোষিতÑ এই দু’ভাগে ভাগ হয়ে গেছে, এ বিষয়টি স্পষ্ট উপলদ্ধি করেন এবং দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা দেন, ‘আমি শোষিতের পক্ষে।’ এই উপলব্ধিজাত ঘোষণাকে নিজের দেশের বাস্তবে রূপায়িত করে তোলার জন্যই তিনি পূর্ব ঘোষিত ‘সংসদীয় বিধি-বিধান’-এর ‘গণতান্ত্রিক পন্থা’ অন্তত সাময়িকভাবে হলেও পরিহার করেন। অবশ্য ১৯৭২ সালে প্রণীত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানটিও ব্রিটিশ ধাঁচের সংসদীয় বিধি-বিধানের গোঁড়া অনুসৃতি ছিল না। সেটিতেও গণতন্ত্রকে কণ্টককমুক্ত করা ও ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক
জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠার স্বার্থেই ধর্মনিরপেক্ষতা বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির অধিকার খর্ব করা হয়েছিল। পাকিস্তানি সাম্প্রদায়িক ভাবধারার পুনরুত্থানকে রোখার জন্যই ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা
হয়েছিল। কিন্তু এতেও খুব একটা কাজ হয়নি, বরং সাংবিধানিক নিষেধ-বিধিকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়েই পাকিস্তানপন্থী সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলো বাংলাদেশের স্বাধীনতার মর্মমূলে আঘাত হেনে যাচ্ছিল এবং এ কাজে বিভ্রান্ত বামদেরর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতা পেয়ে গিয়েছিল। এ রকম অবাঞ্ছিত, বিব্রতকর পরিস্থিতিতেই বঙ্গবন্ধু গণতন্ত্রের
প্রয়োগরীতিতে এক নতুন মাত্রার সংযোজন ঘটালেন এবং এর নাম দিলেন ‘শোষিতের গণতন্ত্র’। এ ব্যবস্থায় সংসদীয় ও মন্ত্রিসভা শাসিত গণতান্ত্রিক কাঠামোর স্থলে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার এলো, বহু দলের বদলে একদলীয় পদ্ধতি প্রবর্তিত হলো এবং এ রকম আরো বিধি-বিধান জারি করা হলো যেগুলোর সঙ্গে গণতন্ত্র সম্পর্কে আমাদের এতো দিনকার অভ্যস্ত ধারণা খাপ খায় না। তবে ষাটের দশক থেকে তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশে সা¤্রাজ্যবাদ বিরোধী রাষ্ট্রনায়কদের নেতৃত্বে প্রায় অনুরূপ শাসন ও রাষ্ট্রনীতি চালু হয়ে গিয়েছিল। এর প্রতি দৃঢ় ও সক্রিয় সমর্থন ছিল সে সময়কার সোভিয়েত নেতৃত্বাধীন সমাজতান্ত্রিক শিবিরের। এ ধরনের শাসন প্রণালির নাম দেয়া হয়েছিল ‘জাতীয় গণতন্ত্র’। অর্থনৈতিক বিচারে এটিকে বলা হতো ‘অপুঁজিবাদী বিকাশের পথ’ অর্থাৎ গণতন্ত্রকে এড়িয়ে সমাজতন্ত্রকে বিনির্মাণের পদ্ধতি।
জাতীয় গণতন্ত্র ও অপুঁজিবাদী বিকাশের তত্ত্ব-প্রচারকরূপে উইলিয়ান্ভস্তি তখন বিশেষ খ্যাতিমান হয়ে উঠেছিলেন। উইলিয়ামন্ভস্কি প্রচারিত তত্ত্বের-কিংবা মিসর ও তানজানিয়াসহ তৃতীয় বিশ্বেও কিছু কিছু দেশের শাসন-প্রণালির সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ‘শোসিতের গণতন্ত্র ও ‘দ্বিতীয় বিপ্লব’-এর কর্মসূচির কিছু কিছু সাযুজ্য থাকলেও, মর্মবস্তু ও বহিরঙ্গ উভয় দিক থেকেই এর প্রকৃতি অনেক পরিমাণে স্পষ্ট স্বতন্ত্র্যম-িত।
‘জাতীয় গণতন্ত্র’ নামে পরিচিত অনেকগুলো রাষ্ট্রের মতো বঙ্গবন্ধুও সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীতে একদলীয় শাসনের বিধান সংযোজিত করেছিলেন বটে, কিন্তু তাঁর নিজেরই এতে পুরোপুরি সায় ছিল বলে মনে হয় না। শামসুজ্জামান খান ১৯৭৫ সালের জুন মাসে ‘বঙ্গবন্ধু সঙ্গে আলাপ’-এর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জানিয়েছেন যে সে-সময়ে তাঁর ও প্রফেসর কবীর চৌধুরীর কাছে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন,
“...ভাগ্যের কি নিষ্ঠুর পরিহাস, সারাজীবন গণতন্ত্রেও জন্য আন্দোলন করলাম, কত জেল খাটলাম আর এখন এক পার্টি করতে যাচ্ছি।...আমি এটা চাইনি। বাধ্য হয়ে করতে হচ্ছে। ...অন্য কোনো পথ খোলা না দেখে আমি স্বাধীনতার পক্ষের লোকদের নিয়ে সমমনাদের একটি রাজনৈতিক মঞ্চ হিসাবে বাকশাল গঠন করছি। আমি সমাজতন্ত্র-বিরোধী ধর্মনিরপেক্ষতা-বিরোধী এবং সর্বোপরি মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী কোনো দল বা ব্যক্তিকে বাকশালে নিব না।...আমার ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার জন্য নয়, দেশকে বাঁচানোর জন্য এই পদক্ষেপ। আমি ক্ষমতা অনেক পেয়েছি, এমন আর কেউ পায় নাই। সে-ক্ষমতা হলো জনগণের ভালোবাসা ও নজিরবিহীন সমর্থন।...আমার এই একদলীয় ব্যবস্থা হবে সাময়িক। দেশটাকে প্রতিবিপ্লবের হাত থেকে রক্ষা করে আমি আবার গণতন্ত্রে ফিরে যাব। বহু দলীয় গণতন্ত্রে ফিরে যাব। তবে চেষ্টা করব আমার গণতন্ত্র যেন শোষকের গণতন্ত্র না হয়। আমার দুঃখী মানুষ যেন গণতন্ত্রেও স্বাদ পায়।”
বঙ্গবন্ধু সত্যি সত্যিই আবার বহুদলীয় গণতন্ত্রে ফিরে যেতেন কি না, সে নিয়ে অলস জল্পনা-কল্পনা করা আর একেবারেই অর্থহীন। তবে, সন্দেহ নেই, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ঘটিয়ে তিনি সমগ্র জনগণের জন্য গণতন্ত্রকে অর্থপূর্ণ করে তুলতে চেয়েছিলেন। বিচার-ব্যবস্থার এমন সংস্কারের পরিকল্পনা করেছিলেন যাতে জনগণ অতি সহজে দ্রুত ন্যায়বিচার পেতে পারে। তাঁর নিজের ভাষায়Ñ“ইডেন বিল্ডিং বা গণভবনের মধ্যে আমি শাসনতান্ত্রিক ক্ষমতা ধরে রাখতে চাইনে। আমি আস্তে আস্তে গ্রামে ইউনিয়নে থানায় জিলা পর্যায়ে এটা পৌঁছে দিতে চাই যাতে জনগণ তাদের সুবিধা পায়।”
‘শোষিতের গণতন্ত্র’ বাস্তাবায়নে বঙ্গবন্ধুর চার দফা কর্মসূচির দিকে তাকালেই তাঁর রাষ্ট্রচিন্তার মর্মকথাটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেগুলো হচ্ছে :
১. বাধ্যতামূলক বহুমুখী গ্রাম সমবায় গঠন;
২. মধ্যস্বত্বভোগী গ্রামীণ জোতদার, মহাজন, ধনিক বণিক শ্রেণীর উচ্ছেদ;
৩. উৎপাদন ব্যবস্থা ও উৎপাদন শক্তির বিকাশ সাধন;
৪. আমলাতন্ত্রের বিলুপ্তি এবং রাষ্ট্রীয় জীবনের ব্যাপক গণতন্ত্রায়ণ।
সমাজের কাক্সিক্ষত পরিবর্তনের জন্য বঙ্গবন্ধু সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছিলেন ‘বহুমুখী সমবায়’-এর ওপর। ’৭৫-এর ২৬ মার্চে স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে ওই সমবায় বা কো-অপারেটিভ জমির মালিকের জমি থাকবে। কিন্তু যে বেকার, প্রত্যেকটি মানুষ, যে মানুষ কাজ করতে পারে তাকে কো-অপারেটিভ সম্পর্কে অনেক কথা বলেছিলেনÑ
“পাঁচ বছরের প্ল্যানÑএ বাংলাদেশের ৬৫ হাজার গ্রাম কো-অপারেটিভ হবে। প্রত্যেকটি মানুষ, যে মানুষ কাজ করতে পারে তাকে কো-অপারেটিভের সদস্য হতে হবে। এগুলি বহুমুখী কো-অপারেটিভ হবে। পয়সা যাবে তাদের কাছে, ফার্টিলাইজার যাবে তাদের কাছে, টেস্ট রিলিফ যাবে তাদের কাছে, ওয়ার্কস প্রোগ্রাম যাবে তাদের কাছে। আস্তে আস্তে ইউনিয়ন কাউন্সিলের টাউটদের বিদায় দেওয়া হবে। তা না হলে দেশকে বাঁচানো যাবে না। এই জন্যই ভিলেজ কো-অপারেটিভ হবে।”
বঙ্গবন্ধু যে-সমবায়ের ভাবনা ভেবেছিলেন, উৎপাদন ও বণ্টন ব্যবস্থার তথা সমাজের কাঠামোর আমূল রূপান্তরই ছিল তার লক্ষ্য। ধনতন্ত্রের তাত্ত্বিকদের দ্বারা উদ্ভাবিত ও প্রচারিত সমবায়-ব্যবস্থার সঙ্গে বঙ্গবন্ধু পরিকল্পিত সমবায়ের কোনো মিল ছিল না। বরং বলা যেতে পারে, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের সমবায়-প্রণালির দ্বারাই গ্রাম আপন সর্বাঙ্গীন শক্তিকে নিমজ্জন দশা থেকে উদ্ধার করতে পারবে, এই আমার বিশ্বাস।” কিন্তু তিনি লক্ষ করেছিলেন, “আক্ষেপের বিষয় এই যে, আজ পর্যন্ত বাংলাদেশে সমবায়-প্রণালি কেবল টাকা ধার দেওয়ার মধ্যেই ম্লান হয়ে আছে, মহাজনী গ্রাম্যতাকেই কিঞ্চিৎ শোধিত আকারে বহর করছে, সম্মিলিত চেষ্টায় জীবিকা উৎপাদন ও ভোগের কাজে সে লাগল না।
তার প্রধান কারণ, যে শাসনতন্ত্রকে আশ্রয় করে আমলাবাহিনী সমবায়নীতি আমাদের দেশে আবির্ভূত হলো সে যন্ত্র, অন্ধ, বধির, উদাসীন।”
বঙ্গবন্ধুর সমবায়-নীতি, রবীন্দ্রনাথ-কথিত এরকম ‘আমলাবাহিনী সমবায়-নীতি’ থেকে স্বতন্ত্র, তাঁর সমবায়-নীতি ছিল সমাজতন্ত্রমুখী তথা শোষণ মুক্তির পথগামী। এ ব্যাপারে শুধু রবীন্দ্রনাথের নয় নজরুলের রাষ্ট্রচিন্তা ও সমাজ-বিপ্লবী ভাবনারও তিনি অনুসারী। ‘শ্রমিক প্রজা স্বরাজ সম্প্রদায়’ নামক একটি রাজনৈতিক দলে সদস্য রূপে নজরুল যে ইশতেহারটি রচনা করেছিলেন, তাতে ছিলÑ
“আধুনিক কলকারখানা, খনি, রেলওয়ে, টেলিগ্রাফ, ট্রামওয়ে, স্টিমার প্রভৃতি সাধারণের হিতকারী জিনিস, লাভের জন্য ব্যবহৃত না হইয়া, দেশের উপকারের জন্য ব্যবহৃত হইবে এবং এতদ্সংক্রান্ত কর্মীগণের তত্ত্বাবধানে জাতীয় সম্পত্তিরূপে পরিচালিত হইবে।
ভূমির স্বত্ব আত্ম-অভাব-পূরণক্ষম স্বায়ত্বশাসন বিশিষ্ট পল্লীতন্ত্রের উপর বর্তিবেÑএই পল্লীতন্ত্র ভদ্র-শূদ্র সকল শ্রেণীর শ্রমজীবীর হাতে থাকিবে।”
নজরুল-কাক্সিক্ষত এই ‘স্বায়ত্বশাসন বিশিষ্ট পল্লিতন্ত্রেও মর্মবাণীই ধারণ করেছিল বঙ্গবন্ধুর শোষিতের গণতন্ত্রেও কর্মসূচি।
নজরুল নন শুধু, গ্রামবাংলার চারণ কবি মুকুন্দ দাসও স্বায়ত্বশাসন বিশিষ্ট পল্লিতন্ত্রেও একটি পরিকল্পনা রচনা করেছিলেন। তাঁর পরিকল্পনাটা ছিল এরকম :
“প্রতি পাঁচখানা গ্রাম লইয়া হইবে এক একটি মৌজা; প্রতি মৌজায় থাকিবে আমানতী ব্যাংকÑএবং ব্যাংকের সাহায্য ও মাধ্যমে এই পাঁচখানি গ্রামে চলিবে যৌথভাবে চাষ, কারবার ও কুটিরশিল্প।”
চারণ কবির এই স্বপ্ন কি বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রচিন্তার মধ্যে সংক্রমিত হয়নি?
কেবল মুকুন্দদাসের মতো চারণকবির কথাই বা বলি কেন? আবহমান বাংলার লোকমানসেই তো বিদ্বেষ-বৈষম্য-মুক্ত শোষণহীন এক সমাজের স্বপ্ন-কল্পনা ও পরিকল্পনা জড়িত-মিশ্রিত হয়ে আছে। স্মরণ করতে পারি লালন ফকিরের সেই আর্তিও কথাÑ
এমন সমাজ কবে গো সৃজন হবে।
যেদিন হিন্দু-মুসলমান
বৌদ্ধ খ্রিস্টান
জাতিগোত্র নাহি রবে।
শোনায়ে লোভের বুলি
নেবে না কাঁধের ঝুলি
ইতর আতরাফ বলি
দূরে ঠেলে না দেবে॥
আমির ফকির হয়ে এক ঠাঁই
গবার পাওনা খাবে সবাই
আশরাফ বলিয়া রেহাই
ভবে কেউ নাহি পাবে॥
আমাদের জনগণের মধ্যে ব্যপ্ত এ-রকম লৌকিক আর্তিই তো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাষ্ট্রচিন্তার অমোঘ অবিচ্ছেদ্য অপরিহার্য উপাদান। কারণ তিনি যে আমাদেরই লোক।

 

হেমন্তের জলে

 

কার্তিক হেমন্তের প্রথম মাস। এই সময়ে বাংলাদেশের প্রকৃতিতে প্রগাঢ় সবুজ যেমন পাওয়া যায় তেমনি পাওয়া যায় শীতের মিষ্টি আমেজও। কাদায় মাখামখি রাস্তাঘাট ও হাড় কাঁপানো শীত যে মাসে নেই ওই মানের নামই কার্তিক। ষড়ঋতুর এই বংলায় হেমন্তের অবস্থান চতুর্থ। হেমন্তের খামে বাঙালির ঘরে-বাইরে, হাটে-মাঠে-ঘাটে আচার ও সংস্কৃতিতে নিয়ে আসে অভাব এবং সমৃদ্ধির দ্বৈতউপহার। কার্তিক মূলত কৃষি-গৃহস্থ জীবনে অভাব-অনটনের মাস হিসেবে পরিচিত। কৃষিপ্রধান গ্রামবাংলায় এই সময় অকাল বন্যাসহ প্রাকৃতিক বিভিন্ন দুর্যোগের ফলে কৃষকের কাজ থাকে না। গোলাঘর থাকে শূন্য। শরতের শুভ্র শরীর বর্ণিল হতে থাকে হেমন্তের শুরুতে। তবে অগ্রহায়ণের উপস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে দেয় প্রকৃতির দৃশ্যপট। মসৃণ ও স্পষ্টতার অনুভব নিয়ে ষড়ঋতুর এ দেশে ঋতুরানীর পর হাজির হয় ঋতুকন্যা হেমন্ত। মৌন, শীতল ও অন্তর্মুখী হওয়া এ ঋতুর প্রধান বৈশিষ্ট্য। উৎসব মানেই আমরা বুঝি হেমন্তকে। এর নেপথ্যে যথার্থ কারণও রয়েছে। সুজলা-সুফলা এ দেশের প্রধান ফসল ধান। বর্ষার শেষ দিকে বোনা আমন-আউশ শরতে বেড়ে ওঠে। আর হেমন্তের প্রথমে এতে পাক ধরে। এ ঋতুর প্রথম মাস কার্তিকের শেষ দিকে
পাড়াগাঁয়ের মাঠে মাঠে ধান কাটার ধুম পড়ে। পাকা ধানের গন্ধে তখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে ম-ম গন্ধ।

কার্তিকের পরের মাস চিরায়ত বাংলার আমনপ্রধান অঞ্চলে অগ্রহায়ণ নিয়ে আসে আশীর্বাদ। ধান কাটার ভরা মৌসুম হলো এই মাস। ফসলি মাঠের ঢেউ উপচে পড়ে কৃষকের গোলা, আঙিনা ও চাতালে। এই সময়ে নতুন ধানে কিষাণ-কিষাণীদের আনন্দ আর ব্যস্ততার সীমা থাকে না। বর্তমানে কৃষিকাজের সবক্ষেত্রেই প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। হেমন্তে সারা বছরের পরিশ্রমের ঘামে ফলানো ফসল কৃষকের মরমে সোনালি প্রলেপ মেখে দেয়। তাই যুগ যুগ ধরে এ মাসটি ‘নবঅন্ন’ নতুন ভাত বা ‘নবান্ন’ নামে পরিচিতি পেয়ে আসছে। এ সময় সব কৃষকের ঘরে থাকে নতুন ধান। ওই ধানের চাল দিয়ে কৃষক পরিবারে পিঠা-পুলি তৈরির ধুম পড়ে যায়। অগ্রহায়ণ তখন রূপ নেয় উৎবের আমেজে। এ উৎসবে হরেক রকম পিঠা তৈরি হয়। নামের মতোই বৈচিত্র্যময় পিঠাগুলো স্বাদে অনন্য। যেমনÑ চিতই, পাকানো, পাকোয়ান বা পাক্কন, পাটিশাপটা, কুশলি, ভাপা, পাতা, ভাত, কাটা, নকশি, পুলি, দুধ বা ভিজানো, ছিটা, লবঙ্গ, গোকুল, ম্যারা, মুঁঠা, সিদ্ধ, পুতুল, লরি, চাছি, সাগুদানা, ঝুড়িসীতা, তারাজোড়া, জামাই, জামদানি, হাদি, পাটা, তেজপাতাসহ অসংখ্য বাহারি নামের পিঠা বাড়িতে বাড়িতে তৈরি করা হয়। এই সময় আত্মীয়স্বজন বেড়াতে আসে। তাদের নতুন চালের পিঠা দিয়ে আপ্যায়ন করানো হয়। এভাবেই গ্রামবাংলায় ছড়িয়ে পড়ে নবান্নের আমেজ। বেলী, সন্ধ্যামালতী, দোপাটি, বক, জুঁই, কামিনী, গোলাপসহ অসংখ্য ফুল হেমন্তে ফুটে প্রকৃতিকে সুরভিত করে তোলে।
বাংলাদেশের নদীর রূপ, রঙ এক রকম এবং সাগরের অন্য রকম। কিন্তু নদী ও সাগরের যে মিলনস্থল অর্থাৎ মোহনা এর সৌন্দর্য মোহনা এলাকার মানুষ ছাড়া তেমন কেউ জানেন না। কার্তিক মাস ঠিক ওই রকম- দুই ঋতুর মোহনার মতো। এ কারণেই বাংলাদেশের প্রাণ ও প্রকৃতি দেখার সবচেয়ে সুন্দর সময় এই কার্তিক মাস।

হেমন্তে দেখা যায় অখণ্ড নীল আকাশ। শরৎ থেকে হেমন্ত খুব পৃথক নয়, শীত থেকেও তেমন বিচ্ছিন্ন নয় এর প্রকৃতি। এটি শীত-শরতের মাখামাখি একটি স্নিগ্ধ সুন্দর বাংলা ঋতু। হেমন্তের শিশির ভেজা ঘাসের ডগা যেন মুক্তার মেলা। সকাল বা সন্ধ্যায় অদৃশ্য আকারে ঝরে আকাশ থেকে। আবহমানকাল থেকে কমনীয়তার প্রতীক এই শিশির। ভোরের কাঁচারোদ, মৃদু হিমস্পর্শ প্রাণে শিহরণ জাগায়। বাংলাদেশে হেমন্ত আসে ধীর পদক্ষেপে, শীতের পরশ আলতো করে গায়ে মেখে।
স্মরণাতীতকাল থেকেই ধনধান্যে ভরা অগ্রহায়ণ মাসটিকে বছরের প্রথম মাস ধরে বর্ষ গণনার রীতির প্রচলন ছিল এ অঞ্চলে। অগ্রহায়ণ হলো বছরের অগ্রে যে যায়। তাই অগ্রহায়ণের স্থলে গ্রীষ্মের বৈশাখ কী করে বাংলা বর্ষের প্রথম মাস হলো তা এখনো রহস্য। নতুন ধান ও অন্নে ধীমান প্রকৃতির মেজাজ বাঙালির ফসল কাটার উৎসবটিকে উসকে দেয় বহুগুণে। সকালে সবুজ ঘাস ও আমন ধানের পাতায় শিশিরবিন্দু মুক্তদানার মতো চিক চিক করে। বৃন্তচ্যুত শিউলি ফুল এ সময় সৌরভ ছড়ায়। বাংলাদেশের শহরগুলোতেও কার্তিক ও অগ্রহায়ণ স্বকীয় বৈশিষ্ট্যম-িত। নগরের ইট-কাঠ কংক্রিটের জঞ্জালে বেঁচে থাকা জীবনও সমান তাড়িত হয়
কার্তিকের কৃপণতা ও অগ্রহায়ণের সুদিন সন্দেশের পরশে। তবে আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে জ্বর, খুশখুশে কাশিসহ বিিিভন্ন রোগের কমবেশি প্রাদুর্ভাব দেখা যায় শহর ও গ্রামে। সনাতন ধর্মালম্বী বাড়িগুলোয় হেমন্তকালে কলেরা আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে আকাশবাতি জ্বালানোর প্রচলন ছিল। সনাতনী হিন্দু ধর্মীয় মতে, দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎসব হিসেবে ধরা হয়ে থাকে শ্যামাপূজা, দীপান্বিতা বা দীপাবলি। কেউ কেউ এ উৎসবটিকে দেওয়ালি উৎসব বলে থাকেন। ত্রেতা যুগে ১৪ বছর বনবাস থাকার পর নবমীতে শ্রীরাম রাবণ বধের বিজয় আনন্দ নিয়ে দশমীতে অযোধ্যায় ফিরে আসেন। রামের আগমন বার্তা শুনে প্রজাকুল তাদের গৃহে প্রদীপ জ্বালিয়ে আনন্দ উৎসব পালন করে। ওই উৎসবটিকে দীপাবলি উৎসব বলে উল্লেখ করা হয়েছে। দুর্গাপূজার বিজয়ার পরবর্তী অমাবস্যার রাতেই দীপাবলির আয়োজন করা হয়। ওই রাতেই অনুষ্ঠিত হয় শ্যামা-কালীপূজা। অমাবস্যা রজনীর সব অন্ধকার দূর করে পৃথিবীকে আলোকিত করার অভিপ্রায়ে ওই প্রদীপ প্রজ্বলন। পৃথিবীর সব অন্ধকারের অমানিশা দূর করতেই ওই আয়োজন ও আরাধনা। কলুষময় পৃথিবীর আঁধার দূর করে মানুষ কালে কালে, যুগে যুগে রাজটিকা পরে বিজয়তিলক এঁকে আলোকবর্তিকা প্রজ্জ্বলন করেছে, জয় করেছে বিশ্বব্রহ্মা-। কালী বা শ্যামা অথবা আদ্যাশক্তিÑ যে নামেই ডাকা হোক না কেন, মূলত শাক্তদের দ্বারা তারা পূজিতা হন। তিনি তান্ত্রিক দশ মহাবিদ্যার প্রথমা দেবী এবং শাক্ত বিশ্বাস অনুযায়ী বিশ্ব সৃষ্টির আদি কারণ।

বাঙালি হিন্দু সমাজে মাতৃরূপে দেবী কালীর পূজা বিশেষভাবে পালিত হয়ে থাকে। হিন্দুশাস্ত্র মতে, কালিকা বাংলার অধিষ্ঠাত্রী দেবী। বাংলায় শাক্ত ধর্ম অত্যন্ত জনপ্রিয় ও কালীরূপে শক্তির আরাধনাও ব্যাপক। সমগ্র বাংলায় অসংখ্য কালীমন্দির দেখা যায়। এসব মন্দিরে আনন্দময়ী, করুণাময়ী, ভবতারিণী ইত্যাদি নামে কালী প্রতিমা পূজিত হয়। কালীর বিভিন্ন রূপভেদ রয়েছে। অমাবস্যায় দীপান্বিতা কালীপূজা বিশেষ উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পালিত হয়ে আসছে এতো দিন। অমাবস্যার ঘুটঘুটে অন্ধকারে প্রদীপ জ্বালিয়ে আলোকিত করার প্রয়াস অব্যহত থাকুক...

 

লেখাঃ শাকিল সারোয়ার
মডেলঃ সাবা সিদ্দিকা, মৌ মধুবন্তী
পোশাকঃ সহজ ওয়্যারড্রোব
মেকওভারঃ ক্লিওপেট্রা বিউটি স্যালন
স্টাইলিংঃ রিবা হাসান
ছবিঃ কৌশিক ইকবাল

একটি মৃত্যু ও তৃতীয় পক্ষ 

- লাবণ্য লিপি 

 

ঘটনাটা নাকি ঘটেছে রাত সাড়ে দশটায়। মিতুকে ফোনে খবরটা জানিয়েছে ওর এক সহকর্মী। খবর পেয়ে ওরা রাতেই গিয়েছিল। কিন্তু অত রাতে মিতুর পক্ষে সম্ভব ছিল না ওদের সঙ্গে যাওয়া। তাই ও সকালের আলো ফুটতেই বেরিয়ে পড়েছে। বাড়িটা চিনতে খুব একটা সমস্যা হলো না। যদিও মূল রাস্তা থেকে এগারো নম্বর গলিটা খুঁজে পেতে একটু সময় লেগেছিল। রিক্সা থামিয়ে দু’একজনকে জিজ্ঞেস করতেই দেখিয়ে দিল। লোকজনের আসা যাওয়া দেখেও আন্দাজ করে নেওয়া যায়। উপরন্ত বাসার সামনে বেশ কয়েকটি গাড়ি দেখে নিশ্চিত হওয়া গেল। তবু খানিকটা দ্বিধা নিয়েই সদর দরজা দিয়ে ঢুকে পড়ল মিতু। মনে তখনও ক্ষীন আশা, খবরটা যদি ভুল হয়! পৃথিবীর সব খবর সত্যি হতে হবে কেন! সত্য সব সময় প্রত্যাশিত হলেও কখনও কখনও ভুলটাও যে এত কাক্সিক্ষত হতে পারে, আজকের আগে এমন করে ওর মনে হয়নি কখনও। গেটে দাড়োয়ান ছিল না। ও সহজেই গেট দিয়ে ঢুকে গেল এবং ঢুকেই ওর পা দুটো যেন থেমে গেল। কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করতে হলো না! খবরটা যে মিথ্যে ছিল না এটা বুঝতেও সময় লাগলো না। সামনে রাখা কফিনটাই বলে দিল সব। নাকে এসে লাগলো কর্পূর- আগরবাতির গন্ধ। মৃতবাড়ির অতি পরিচিত এই গন্ধটা মানুষকে ভীষণ দৃর্বল করে দেয়। কেবলই মনে হয় আমারও বুঝি সময় হয়ে এলো। মিতুর মাথাটা হঠাৎ কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছিল। কেমন জানি অনুভূতিশূন্য। কফিনের খুব কাছে কেউ ছিল না। অল্প দূরে ছোট ছোট গ্রুপে ভাগ হয়ে কয়েকজন নিজেদের মধ্যে নিচু স্বরে কথা বলছে। মিতু কফিনটার কাছে বসে পড়ল। নিজের ভার বইবার শক্তি ওর আর অবশিষ্ট ছিল না। বরং কফিনটা হাত বাড়িয়ে আঁকড়ে ধরে সে নিজের পতন ঠেকালো। নিরুচ্চারে নিজেকেই প্রশ্ন করল, কফিনের ভেতরের এই সাদা কাপড়ে মোড়া মানুষটা কি সত্যিই আরিফ? হাসি- খুশি, উচ্ছ্বল মানুষটা এমন স্থির হয়ে পড়ে আছে! মাথা ভর্তি একরাশ রেশমি চুল। চুলগুলো প্রায়ই কপালে চলে আসত। মিতু হাত বাড়িয়ে সরিয়ে দিত। আর কী ফর্সা ওর গায়ের রঙ। রিক্সা দিয়ে রোদে ঘুরলে আরিফের মুখটা লাল হয়ে যেত। মিতু দেখে হাসতে হাসতে বলত, তুমি দেখছি মেয়েদের মতো লজ্জায় লাল হয়ে গেছ। শুনে হাসতো আরিফও। ওর হাত দুটোও কি নিষ্প্রাণ হয়ে গেছে? যে হাতে ও নিঃশব্দে আলপনা আঁকত মিতুর শরীরের ক্যানভাসে! ভীষণ অন্য রকম ছিল ছেলেটা। সব সময় হাসিÑ খুশি প্রাণবন্ত থাকলেও কথা বলতো কম। শুনতো বেশি। রিক্সায় ওরা দু’জন যখন ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকত, মিতুই কথা বলতো। আরিফ শুনতো আর হাসতো। কত গল্প যে মিতু ওর সঙ্গে করতো! ও নিরব শ্রোতা হওয়ায় মিতু মাঝে মাঝে প্রশ্ন করে যাচাই করে দেখত সত্যিই সে শুনছে কি না। যখন জানতে চাইতো, বলো তো আমি কী বলছি? আরিফ ঠিক বলে দিত। আজ কি আরিফ শুনতে পাচ্ছে না ওর নিরব কান্না! কেন আরিফ একবারও হাত বাড়িয়ে ওর হাতটা টেনে নিচ্ছে না নিজের হাতের ভেতর! এতো অভিমান! কেন এভাবে না বলে চলে যেতে হবে?  কেউ একজন এগিয়ে এসে মৃদুস্বরে জানতে চাইলো, আপনি কি মুখ দেখতে চান? মিতু চমকে উঠে দ্রুত মাথা নাড়ল, না! না! পরে দেখব। তারপর বলল, উনি কয়তলায় থাকতেন? দোতলায় চলে যান! লোকটি বলল।

সিঁড়ি দিয়ে উঠতেই বসার ঘর চোখে পড়ল। দুই পাশের সোফায় দু’জন ঘুমিয়ে আছে। একটাতে একটি শিশু। অন্যটাতে একজন বয়স্ক মানুষ। বসে কথা বলছে কয়েকজন। কয়েকজন এ ঘর ও ঘর ছোটাছুটি করছে। মিতু ঠিক বুঝতে পারছে না, কার সঙ্গে কথা বলবে। এক লোক হাঁক দিয়ে বলল, আমার পাঞ্জাবিটা দাও। আর রাস্তায় খাওয়ার জন্য কী নিচ্ছ? একটু বেশি করে নিও। লোক কিন্তু অনেক যাচ্ছে। তখন পাশের ঘর থেকে মাঝবয়সী এক মহিলা বেরিয়ে এলেন। মিতুকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বললেন, তুমি কে মা?

 

কাউকে খুঁজছো ? জ্বি, আমি আরিফের বউয়ের সঙ্গে একটু দেখা করতে চাই! মিতু বলল। সে কি আর স্বাভাবিক অবস্থায় আছে! সারারাত চিৎকার কইরা কানছে। এখন থম মাইরা বইসা আছে। মনে হয় পাথর হইয়া গেছে মেয়েটা। আহারে! সেদিন মাত্র বিয়ে হইলো। এরই মইধ্যে সব শ্যাষ! আল্লাহ জানে মেয়েটার এখন কী হইব! আর ছেলেটাতো দুধের বাচ্চা। বলতে বলতে মহিলা চোখে আঁচল চাপা দিলেন। চোখ মুছে একটা ঘর দেখিয়ে বললেন, ঐ ঘরে যাও। তারপর সে পাঞ্জাবি চাওয়া লোকটার কথার জবাব দিলেন, ভূণা খিচুড়ি আর মাংস রান্না করে নিয়েছি। অত দূরের পথ। সবার তো ক্ষিধা লাগব। ওদের কথা শুনতে শুনতেই পাশের ঘরে ঢুকলো মিতু। থমথমে মুখে বিছানার ওপর বসে আছে এক নারী। খাটের মাথার পাশের দেওয়ালে মাথা ঠেকিয়ে। চোখ খোলা। কিন্তু সে চোখে যেন প্রাণ নাই। মাছের চোখের মতো নিষ্প্রাণ! গাঢ় সবুজ রঙের সালোয়ার কামিজ পরনে। কোলে জড়ো হয়ে আছে ওড়নাটা। কেউ বলে না দিলেও মিতু বুঝতে পারলো সেই- ই আরিফের স্ত্রী। তাকে ঘিরে কয়েকজন বসে আছে। তারা নিচুস্বরে কথা বলছিল। পাশে একটা বাচ্চা ঘুমাচ্ছে। মিতু মনে মনে ভাবল, ওটাই মনে হয় আরিফের ছেলে। কী নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে শিশুটি। ও তো জানেও না কী দুর্যোগ নেমে এসেছে ওর জীবনে। বাচ্চাটা দেখতেও কী সুন্দর হয়েছে। ঠিক যেন দেবশিশু। মিতুর ভীষণ ইচ্ছে করছিল ছুটে গিয়ে বাচ্চাটাকে বুকে জড়িয়ে নিতে। হঠাৎ মনে পড়ল ওর সেই না হওয়া মেয়েটার কথা। আরিফ যার নাম রেখেছিল মায়া। সেদিন অফিস শেষে মিতু অপেক্ষা করছিল আরিফের জন্য। আরিফ ওকে দেখে জানতে চেয়েছিল, কী ব্যাপার? কী হয়েছে? তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন? মিতু রিক্সায় উঠতে উঠতে বলল, আমাদের মনে হয় একবার ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত। আরিফ বলল, কেন? তোমার কি শরীর খারাপ? আমার খুব টেনশন হচ্ছে। যদি কিছু হয়ে যায়! পিরিয়ডের ডেট পার হয়ে গেছে। আরিফ ওর কথা হেসে উড়িয়ে দিল, ধুর! কিচ্ছু হবে না। তুমি কেমন করে এত নিশ্চিত হচ্ছো? মিতু অভিমানের সুরে জানতে চাইলো। আমি জানি! আরিফের সেই একই জবাব। মিতু এবার বলল, আচ্ছা, ধরো আমাদের একটা বাচ্চা হবে। সেটা কী হবে, ছেলে না মেয়ে? আরিফ অকপটে বলল, মেয়ে। কেন? ছেলেও তো হতে পারে! মিতুর গলায় আবারও অভিমানের বাষ্প জমে। আমার মনে হয় না ছেলে হবে। মেয়েই! আরিফের জোরালো মত। এবার অনেকটা হারমানা স্বরে মিতু বলল, মেয়ে হলে ওর নাম কী রাখবে? একটু ভেবে আরিফ বলেছিল, মায়া! বাহ! কী সুন্দর নাম! আমাদের ভালবাসা থেকে জন্ম হবে মায়ার। মিতু একা একাই বিড়বিড় করে। আচ্ছা যদি সত্যিই ওদের বাচ্চাটার জন্ম হতো তাহলে এই মানুষগুলো কি ওর জন্যও এমন আফসোস করত? কিন্তু কেউ কি জানতো ওর পরিচয়? একজন মহিলা ওকে দেখিয়ে অন্যদের কী যেন বলল। আর তখনই ভেসে এলো অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন। সেই সঙ্গে শুরু হলো কান্নার রোল। বাসায় ঢোকার মুখে দেখা হওয়া সেই মহিলা এসে তাড়া দিলেন কাউকে উদ্দেশ্য করে, ও মনা! বউমা আর বাবুর জিনিস পত্র গুছিয়ে নে। অ্যাম্বুলেন্স চইলা আসছে। এখন তো যাইতে হবে। আহারে ওর মায়ের না জানি কী অবস্থা! আমরা মামী হইয়াই মাইনা নিতে পারতাছি না! বলতে বলতে তিনি আবারও কাঁদতে লাগলেন। এবার আরিফের বউও চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করল। মিতু কাউকে কিছু না বলে নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।

নিচে এখন মানুষের প্রচ- ভিড়। সবাই ব্যস্ত হয়ে ওপর নিচ করছে। বার বার গাড়ি থামার শব্দ হচ্ছে। নতুন কেউ আসছে আর থেমে যাওয়া কান্না আবার নতুন করে শুরু হচ্ছে। আবার থেমে যাচ্ছে। এভাবেই চলছে। কফিনটা  ঘিরে রেখেছে কয়েকজন। নতুন কেউ এসে শেষ বারের মতো দেখে নিচ্ছে প্রিয় স্বজনের মুখ। সবাই আফসোস করছে, ইস! কী এমন বয়স ছেলেটার! এই বয়সেই হার্ট অ্যাটাক! আহারে! বাচ্চাটা বাবার কোনও স্মৃতিই মনে করতে পারবে না! আহারে বউটার কী হবে! সংসার কেমন করে চলবে! একজন আবার জানতে চাইলো, অর অফিসের লোকজন আইছিল! তারা কি টাকা পয়সা কিছু দিবে না! দিলে সেটা কে কতটা পাবে, সেটা নিয়েও চললো মৃদু আলোচনা। লাশ নেওয়া হবে গ্রামের বাড়িতে। সেখানে আরিফের বাবা- মা থাকেন। কফিন অ্যাম্বুলেন্সে তোলার আগে সবাই আর একবার দেখে নিচ্ছে। আরও দুটো মাইক্রোবাস যাচ্ছে। যারা সঙ্গে যাবে তারা গিয়ে গাড়িতে উঠছে। এরই মধ্যে শুরু হলো বৃষ্টি। মিতু আনমনে এগিয়ে যাচ্ছিল কফিনটার দিকে। ওর একবার মনে হলো শেষ বারের মতো আরিফের মুখটা দেখি। কিন্তু পা যেন সরছে না। হঠাৎই ওর না হওয়া মেয়েটার জন্য খুব কষ্ট হতে লাগলো। চোখ ভীষণ জ্বালা করছে। ও কি তাহলে কাঁদবে। নাহ! আর দাঁড়ানো যাবে না এখানে! ভাবতে ভাবতেই ও গেট দিয়ে বেরিয়ে গেল। কেউ কেউ অবাক হয়ে দেখলো বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে একটা মেয়ে বেরিয়ে যাচ্চে। এতক্ষণে মিতুও স্বস্তি পেল। বৃষ্টি তখন পরম যতেœ ধুয়ে দিচ্ছে ওর চোখের জল।

 

সেই সবও তুমি 

- শিখা রহমান

 

এক.

‘এই-ই যে সরতো! গরম লাগছে...।’

আশফাক ডান হাতে অরনীর কোমর জড়িয়ে ধরেছেÑ ‘একটু ধরি না! এসি বাড়িয়ে দিই?’

‘উহু... শেভ করোনি তো... ব্যথা লাগছে।’

আশফাক হেসে উঠলোÑ ‘না ছাড়বো না...। এটা আমার ঘুমানোর জায়গা তো।’

 

অরনী চমকে উঠলো। অনেক দিন পর মনে পড়লো রঞ্জনের কথাÑ

রঞ্জন! তুমি কোনদিকে তাকিয়ে আছ বলো তো?

Ñতোমার গ্রীবা শেষে বুকের পাহাড়ের যেখানে শুরু সে জায়গাটা খুব সুন্দর! চোখ ফেরানো কঠিন!

লজ্জায় লাল হয়ে অরনী বলেছিল, তুমি না খুব অসভ্যতা করছ!

 

বাহ! ওটা তো আমার ঘুমানোর জায়গা। আর অসভ্যতা ভালোবাসার সমানুপাতিক। ভালোবাসা বাড়লে অসভ্যতাও বাড়ে।

 

যদিও গলায় আশফাকের নিঃশ্বাসে গরম লাগছিল তবুও অরনী আর মানা করে না। সে এখন ভাবছে রঞ্জনের কথা। শরীরে একটু শিহরণ, একটু নিষিদ্ধ ভালো লাগা নিয়ে আশফাকের মাথা বুকে জড়িয়ে ধরলো সে।

 

দুই.

অরনী ছলো ছলো চোখে ড্রইংরুমের সোফায় বসে আছে। পাশে আশফাক উদ্বিগ্ন হয়ে তার হাত ধরে আছে। আজ লিমাকে স্কুলে দিয়ে ফেরার সময় তার গলার সোনার চেইন হ্যাঁচকা টানে কারা জানি নিয়ে গেছে।

Ñমন খারাপ করো না! ভারী তো একটা চেইন...। তোমাকে এর চেয়ে ভালো একটা কিনে দেবো।

অরণী চেইনের জন্য মন খারাপ করেনি। তার খুব ভয় লাগছে, নিজেকে খুব অসহায় আর অনিরাপদ মনে হচ্ছে। সে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলোÑ ‘আমি ভাবিনি কেউ এভাবে গলা থেকে ছিনিয়ে নিতে পারে...! এত্ত চমকে গিয়েছিলাম... আর দেখো, গলায় দাগ হয়ে গেছে।’

অরনীর মাথায় হাত বুলিয়ে আশফাক বললো, আমার লক্ষ্মী বউটা... কাঁদে না প্লিজ... আমি আছি না... সব ঠিক হয়ে যাবে।

অরনীর হঠাৎই মনে পড়লো হারিয়ে যাওয়া বাবার কথা। যখনই মন খারাপ করতো, বাবা তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলতেন, ‘মন খারাপ করিস না মামণি.... আমি আছি না... সব ঠিক হয়ে যাবে।

‘ আশফাককে সে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বুকে মাথা রাখলো।

 

তিন.

Ñঅরু... আমাকে এক নলা দাও না।

উহু... তুমি না একটু আগেই খেলে... আমি খেতে বসলেই যত্ত ঝামেলা!

Ñদাও না প্লিজ! প্লিজ... তোমার ভাতমাখা খেতে খুব মজা হয়।

দিতে পারি... আঙুলে কামড় দেবে না কিন্তু।

Ñআচ্ছা বাবা... দেবো না।

 

আশফাক হাঁ করে আছে। অরনী জানে ভাত দিতে গেলেই সে কামড় দেবে। তারপরও বার বার এ খেলাটা খেলতে তার খারাপ লাগে না। এ সময়টায় পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই ভারিক্কি মানুষটাকে তার একটা ছোট্ট ছেলে মনে হয়Ñ অনেকটাই তাদের ছেলে সৌমিকের মতো।

 

চার.

ভোররাতে ঘুম ভাঙতেই শীত শীত লাগছে। আশফাকের বুকের কাছে গুটিসুটি হয়ে অরনী সরে এলো। আশফাক দু’হাতে তাকে জড়িয়ে ধরলো।

Ñএই-ই-ই যে, কী হচ্ছে?’

আশফাক ঘুম জড়ানো গলায় বললো, ওমচোর ধরেছি... ‘পালাবে কোথায়?’

Ñইস রে... তুমি চোর ধরার কে?

বাহ! আমি ওম পুলিশ না... আমার ওম চুরি করে আবার গলাবাজি!

চুরি হবে কেন? তোমার ওই ভাল্লুক বুকের সব ওম আমার তো...। অরনী আল্লাদী গলায় বললো।

 

অরনীর মধ্যে আশফাক ডুবে যেতে যেতে ফিসফিস করে বললো, ‘অরু... আমাকে ভালোবাসো তো?’

Ñহু-উ-উ-উ... অনেক অনেক ভালোবাসি... তোমার মধ্যে যে তুমি ছাড়াও আমার ভালোবাসার সব মানুষ আছে।

আশফাক শরীরের ভাঁজে সুখ খুঁজতে ব্যস্ত। তাই কথাটা ঠিক শুনতে পেল না।

 

বিশেষ দ্রষ্টব্য : গল্পের নাম পূর্ণেন্দু পত্রীর কবিতার নামে। কারণ ‘তোমাকেই দৃশ্য মনে হয়/তোমার ভিতরে সব দৃশ্য ঢুকে গেছে।’

ঞযব ংঃড়ৎু রং ফবফরপধঃবফ ঃড় ধষষ ঃযব ৎবসধৎশধনষব সবহ রহ ড়ঁৎ ষরাবং.

তারাশঙ্কর গণদেবতা

 মুতাকাব্বির মাসুদ

 

১.            ‘গণদেবতা’ উপন্যাস দু’টো ভাগে বিভক্ত। একটি ‘চন্ডীমন্ডপ’ অপরটি ‘পঞ্চগ্রাম’ দুটো অংশই স্বাতন্ত্র্যে উপস্থাপিত। ‘চন্ডীমন্ডপ’ প্রকাশ পায় ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবরে ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকায়। ‘পঞ্চগ্রাম’ প্রকাশিত হয় ১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দের জুন মাসে একই পত্রিকায়। বস্তুত ‘চন্ডীমন্ডপ‘ গ্রন্থাকারে প্রাকশের সময় ‘গণদেবতা’ শিরোনামে উপস্থাপিত হয় তারাশঙ্কর বিশশতকের আঞ্চলিক কথাসাহিত্যের অনিবার্য দ্যোতক হিসেবে বাংলা সাহিত্যে নিজের কালজয়ী অবস্থান নিশ্চিত করেন। তারাশঙ্কর তাঁর উপন্যাসে দক্ষতার সাথে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনবাস্তবতার নিখুঁত চিত্রটি তুলে ধরতে মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন। সমাজ বাস্তবতায় বিদ্যমান সত্যকে চিত্রিত করতে যেয়ে পরিপূর্ণ সমাজবোধ, ও ইতিহাসের সামগ্রিক সমন্বয়কে বর্ণনার কেন্দ্রে স্থাপন করে নিপুণ বিন্যাসের প্রয়াসের পাশাপাশি উপন্যাসে তা তুলে এনে বিজ্ঞাপিত করেছেন সমাজের অবহেলিত ও নানাভাবে নির্যাতিত অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষ আর তাঁদের দুঃখ-কাতর জীবনের নির্মম চলচিত্র। এ প্রসঙ্গে সাহিত্যিক নারায়ন গঙ্গোপাধ্যায় বলেন “তারাশঙ্কর মুখ্যত জনসাধারণের শিল্পী। এই জনসাধারণ আবার নীচের তলার মানুষ’ (নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়- বাংলা গল্প বিচিত্রা, দ্বি.স. কলকাতা, ১৯৫৭, পৃ-১২২।)

২.           ‘গণদেবতার’ কাহিনী আবর্তিত হয়েছে ‘চন্ডীমন্ডপ’কে কেন্দ্র করে। সমকালে তথাকথিত বুর্জোয়া মোড়ল শাসিত সমাজের কঠিন ও অনিয়ন্ত্রিত সংস্কারাচ্ছন্ন, সমাজজীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে স্তূপীকৃত অন্ধবিশ্বাস ও বোধ যা, জীবনবাস্তবতায় অনৈক্যের সূচনা করেছিল, সেখান থেকেই তারাশঙ্করের ‘গণদেবতা’ উপন্যাসের শুরু। বস্তুত বাইরের অনৃত শক্তির দ্বন্দ্ব-সংঘাত সমাজের মানুষগুলোর জীবন বোধের মধ্যে ঐক্য, সুখ, শাস্তির পরিবর্তে হিংসা, ক্রোধ ও মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে। লক্ষ করা যায় উপন্যাসে উপস্থাপিত ও মুদ্রিত চরিত্রগুলো যথা অনিরূদ্ধ কামার ও গিরীশ ছতারের যৌক্তিক আলোচনায় ও প্রেক্ষিত বিবেচনায় উদ্ভূত পরিবেশ থেকে একটি নতুন কালের আগাম ঢেউ এসে স্পর্শ করেছে শিবকালীপুর গ্রামে। আর এখান থেকেই সমগ্র প্রাচীন প্রথার বিরুদ্ধে তাঁদের বিদ্রোহের শুরু। এ উপন্যাসে সুকৌশলে বিন্যস্ত হয়েছে গ্রাম্যসমাজের প্রাচীন প্রথার ক্রমাগত বিলুপ্তির আলেখ্য। ওঠে এসেছে সমাজে বিদ্যমান আজন্ম লালীত সংস্কারাচ্ছন্নতার নেতিবাচক প্রভাব-চিত্র।         

 

অন্যদিকে গ্রামীণ রুগ্ন অর্থনীতির ভয়াল চিত্রটিও তারাশঙ্কর তুলে এনেছেন দক্ষতার সাথে। উপন্যাসে চিত্রিত দ্বারকা চৌধুরীর মত প্রবীণ ব্যক্তিত্ব কিংবা নব্য আধুনিকতায় বিশ্বাসী নেতা দেবু ঘোষ পারেনি শিবকালীপুর গ্রামের ভাঙ্গন ঠেকাতে। এখানে বিদ্রোহের আরেক ধাপ গতি নিয়ে এগিয়ে চলে ধর্মীয় আচার-প্রথার বিরুদ্ধে। অনিরুদ্ধ কামার বারোয়ারী পূজায় ধর্মীয় অনাচারের অভিযোগ এনে চন্ডীমন্ডপ কেন্দ্রিক চলমান সমাজ ব্যবস্থাকেই অবশেষে অস্বীকার করে ফেলে।

একদিকে ভোগবাদী সমাজব্যবস্থায় ধনতান্ত্রিক বুর্জোয়া শ্র্রেষ্ট মানুষ এবং তথাকথিত জমিদার ও উচ্চাবিত্ত শ্রেণি অন্য প্রান্তে নির্যাতিত দরিদ্র জনগোষ্ঠী তথা নিরীহ মানুষ। এদেরে সমন্বয়ে শিবকালীপুর গ্রামের যাপিত জীবন ক্রমান্বয়ে বয়ে চলার পথে কখনো প্রাচুর্যে, ঔদার্যে, মিলনে, উৎসবে কোমল উজ্জ্বল আবার কখনো দ্বন্দ্ব সংশয়ে, ও কুসংস্কারে প্রহত ও গতিশূন্য।

৩.           বস্তুত চন্ডীমন্ডপ ছিল শিবকালীপুর গ্রামের মানুষের ঐক্যের প্রতীক। এ ‘মন্ডপে’ সকল সম্প্রদায়ের মানুষের অবাধ বিচরণের অধিকার যেমন ছিল, তেমনি চন্ডীমন্ডপ তাঁদের চিন্তা চেতনায় পুরনো সংস্কৃতি ও আচার বিশ্বাসকে নিবিড় মমতায় ধরে রাখতো। দীর্ঘদিনের এ চলমান প্রথাকে গতিশীল করার লক্ষ্যে এগিয়ে আসে শিবকালীপুর গ্রামেরই দ্বারকা চৌধুরী, ন্যায় রতœ, রাঙা দিদির মতো লোকেরা। অন্যদিকে অনিরূদ্ধ, গিরীশ, তিন কড়ি, ও পাতুর মতো লোক চলমান জীবনবাস্তবতায় সমাজে বিদ্যমান ও প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থার এরূপ অবিচল প্রথার বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করে। এখানেও আবার উভয়ের মধ্যে আপাত ঐক্যের সমন্বয়ে তৈরি করতে এগিয়ে আসে উদার দেবু ঘোষ এবং স্বার্থান্ধ ছিরু পাল।

দীর্ঘদিনের পুরনো সংস্কৃতি ও সেখানকার মানুষের বিশ্বাস-ভালবাসা আর ঐক্যের স্মারক হয়ে স্থির দাঁড়িয়ে আছে ‘চন্ডীমন্ডপ’ শিবকালীপুর গ্রামে। অবশেষে এই ঐতিহ্যবাহী মন্ডপেও পরিবর্তনের জোয়ার আসে। ছিরুপাল বদলে গিয়ে হয় শ্রীহরিঘোষ; আর সকল ঐতিহ্যের প্রতীক চন্ডীমন্ডপ তার বাইরের রূপ ও ধর্মের নতুন নন্দিত আলোয় উদ্ভাসিত হয়। শ্রীহরি ঘোষের কাছারিÑ শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ধর্মচর্চায় ব্যবহৃত হয়। এরই মধ্যে নবীভূত পরিবর্তনের দীপ্ত ছোয়ায় একটি অনবদ্য গণমানুষের পান্ডুলিপি হয়ে ওঠে ‘গণদেবতা’।

৪.           রাঢ় বাংলার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কৃষি নির্ভর জীবন ও ধর্ম নিয়ে সেকেলে ধ্যান-ধারণা ‘গণদেবতা’ উপন্যাসের মৌলিক উপাদান। তারাশঙ্কর এ সকল বিষয়কে উপজীব্য করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনবাস্তবতার নিখুঁত চিত্র দক্ষতার সাথে তুলে এনেছেন ‘গণদেবতা’য়। এ উপন্যাসে শিল্পের বহুমাত্রিক উৎকর্ষ উপস্থাপনের প্রয়াস, কল্পনায় বিনির্মানের উৎস খুঁজেছেন; তার নৈর্ব্যক্তিক চিত্ররূপে রাঢ় বাংলার নির্দিষ্ট জ্যামিতিক সীমারেখায় বিদ্যমান বৈশিষ্ট্য মৌলিকতায় বিজ্ঞাপিত হলেও উল্লিখিত ভৌগলিক রেখাচিত্রে উপস্থাপিত হয়েছে চিরকালীন ভারতের শাশ্বত জীবনবাস্তবতার সামগ্রিক নকশা। তাঁর অবিমিশ্র চেতনায় চিত্রার্পিত সত্যের যে উদ্ভাস, কল্যাণ-অকল্যাণ, আলো-আঁধার, ও বিবিধ  সত্য-ন্যায়ের বোধে তাঁকে নৈয়ায়িক মনে করা যেতে পারে। ঔপন্যাসিকের এ সত্যানুভূতি ভিত্তি পেয়েছে বিবিধ সত্যের সমন্বয়ে। উপন্যাসের মুখ্য চরিত্র দেবু ঘোষের বুদ্ধিদীপ্ত পর্যবেক্ষণেও সে সত্যের সামগ্রিক সমুদ্ভব লক্ষ করা যায়। দেবু তাঁর উপলব্ধিতে আত্মচিন্তায় বিষয়টির ব্যাখ্যা নিজেই করতে পেরেছে। একদিকে গ্রামের সাথে তাঁর মানসিক দূরত্ব বস্তুত অমীমাংসিত সত্যের কারণেই হয়েছে। সে দেখেছে মানুষ তাকে এড়িয়ে চলেছে, আঘাত করেছে, এমন কী তাঁর সাথে তুচ্ছ স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ঝগড়ায় লিপ্ত হয়েছে; সেই মানুষই তাঁকে শ্রদ্ধা করতে শিখেছে, কারামুক্তিতে তাঁর মিলেছে মহত্বের স্তুতি;

“ফুলের মালা গলায় দিয়ে ঘোষ চলেন জেলে,

অধম সতীশ লুটায় এসে তাঁরই চরণ তলে

দেবতা নইলে হায় এ কাজ কেউ পারে না” (তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, ‘গণদেবতা’, নির্বাচিত রচনা, ১ম. প্র. কলকাতা, ১৯৮৬, পৃ. ১২৮)

তবে এ আবেগ, এ সম্মান, স্বল্প সময়ের মধ্যেই স্থায়ীত্ব হারিয়েছিল। প্রসস্তির রেশটুকু কাটতে না কাটতেই সেই কঠিন বাস্তবতা, সেই পুরনো রূপে ফিরে আসে। “পরের দিন হইতে কিন্তু আবার সেই পুরনো শিবকালীপুর। সেই দীনতা-হীনতা, হিংসায় জর্জর মানুষ, দারিদ্র্য দুঃখ রোগ প্রপীড়িত গ্রাম।” (ঐ পৃ. ১২৮) বস্তুত ‘গণদেবতা’ উপন্যাসটি রাঢ় বাংলার গণমানুষের জীবনবাস্তবতার এক কঠিন ধারাবাহিক জীবনের ছবি।

        

 

রাঢ় বাংলার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কৃষি নির্ভর জীবন ও ধর্ম নিয়ে সেকেলে ধ্যান-ধারণা ‘গণদেবতা’ উপন্যাসের মৌলিক উপাদান। তারাশঙ্কর এ সকল বিষয়কে উপজীব্য করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনবাস্তবতার নিখুঁত চিত্র দক্ষতার সাথে তুলে এনেছেন ‘গণদেবতা’য়।

শৈশব স্মৃতি

হাসান আজিজুল হক

 

রবীন্দ্রনাথের কথায় বলতে হয়, ‘আমি কেবলি স্বপন করেছি বপন আকাশে।’ মাটি ছাড়া কোনো বীজ বপন করা কি যায়? কিন্তু আমরা প্রতিনিয়ত স্বপ্ন-আকাক্সক্ষার বীজ বুনে থাকি। তা না হলে বেঁচে থাকাটা অসম্ভব কষ্টকর হয়।

আমরা বর্তমানে বাঁচি, ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করি, কল্পনা করি। পেছনে যেটি ফেলে আসি সেটি অতীত। তা নিয়ে যখন কথা বলি তখন সেটি হয়ে যায় স্মৃতিচারণ। মানুষের জীবনে কোনটা গুরুত্বপূর্ণÑ অতীত, বর্তমান, না ভবিষ্যৎ? নিশ্চয় বর্তমানটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তা সরাসরি এই মুহূর্তে বেঁচে থাকার সঙ্গে যুক্ত। তাহলে ভবিষ্যৎ কতোটা গুরুত্বপূর্ণ? কিছুটা বটে। কিন্তু বর্তমানের সঙ্গে তুল্য নয়। ভবিষ্যতের একটা বিরাট অংশ স্বপ্ন আর কল্পনা। রবীন্দ্রনাথের কথায় বলতে হয়, ‘আমি কেবলি স্বপন করেছি বপন আকাশে।’ মাটি ছাড়া কোনো বীজ বপন করা কি যায়? কিন্তু আমরা প্রতিনিয়ত স্বপ্ন-আকাক্সক্ষার বীজ বুনে থাকি। তা না হলে বেঁচে থাকাটা অসম্ভব কষ্টকর হয়। এতো যন্ত্রণা? প্রতিনিয়ত ক্ষয়, প্রতিনিয়ত মৃত্যু। আমরা মৃত্যু বলি একটি বিশেষ সময়ে যখন সব স্থির, নিথর হয়ে আসে। এটি তো একদিনে ঘটে না। তা শুরু হয় জন্মের পর থেকেই। মুহূর্ত থেকে মুহূর্তে। এক মুহূর্ত মৃত্যু হলে পরের মুহূর্তের জন্ম হয়। এ মুহূর্তটির মৃত্যু হলে নতুন আরেকটি মুহূর্তের জন্ম হয়। তবু আমি জীবনটাকে আগ্রাসী হয়েই গ্রহণ করি। আমার হিসাব খুব সহজ। জন্মের আগের কোনো স্মৃতি আমার কাছে নেই। মৃত্যুর পরে আলো, না অন্ধকারÑ তা জানি না। যা জানি তা ভুল জানি। তবু জীবনটাকে আমরা মূল্য দিই। প্রতিমুহূর্তে মরি আর প্রতিমুহূর্তে বাঁচি। ওই মৃত মুহূর্তগুলো একত্রে করলে এরই নাম হয়ে যায় স্মৃতি।
আমার অনেকটা বয়স হলো। এর অর্থ হলো, স্মৃতিচারণের জন্য অনেকটাই অতীত আমার রয়েছে। স্মৃতিচারণ করতে তাকেই বলা হয় যে বর্তমানের সমস্যা সমাধান করতে অপারগ, অক্ষম। এক কথায় যে বাতিল মানুষ। কাজেই স্মৃতিচারণটা এক অর্থে বর্তমানে যে মৃত বা প্রায় মৃত অথবা মুমূর্ষু তাকেই তার জীবনটা পর্যালোচনা করে দেখতে বলা হয়। আমি স্মৃতিচারণ করি সুখে। এ কারণে নয়, মৃত্যু ঘনিয়ে আসছে আর বেশি কথা বলার সময় নেই। কেননা প্রতিমুহূর্তে শুধু জীবিত থাকা নয়, প্রবলভাবে জীবিত থাকতে চেষ্টা করি। মৃত্যুর মুহূর্তে কী ঘটবে জানি না। কিন্তু যতোক্ষণ পর্যন্ত আমার চেতন মন কাজ করছে ততোক্ষণ যুক্তি দিয়ে, প্রবৃত্তি দিয়ে সবদিক থেকে প্রবলভাবে বেঁচে থাকা বলতে যা বোঝায় ওই বেঁচে থাকাটায় সম্মান করি। তবে আমি চাইলে কী হবে! জীবনে একটা জিনিস না চাইলেও ঘটে, নিষেধ করলেও শোনে না। তা হচ্ছে বয়সের বৃদ্ধি ঘটা। এ জন্য পরিচর্যা করতে হয় না, আকাক্সক্ষা করতে হয় না, সার দিতে হয় না। আমারও বেড়েছে। আর বেড়েছে বলেই অতীত প্রচুর লম্বা হয়ে গেছে।
আমার ঝুলিটা এখন পরিপূর্ণই বলা যায়। দুর্ভাগ্যক্রমে অনেক কিছুই ভুলি না। একদিক থেকে অনেক জিনিস ভুলে যাওয়া ভালো। কষ্ট দিয়েছ, দুঃখ দিয়েছ, শোক-তাপ দিয়েছÑ এসব ভুলে যাওয়া ভালো।
স্মৃতি সততই মধুরÑ এই কথা ঠিক নয়। তবে এখন আর আমার ওই কষ্ট বর্তমানের নয়। তাই কষ্টগুলো এখন আনন্দের মনে হয়। জীবনে যে সংগ্রাম করতে হয়েছেÑ সংগ্রাম বলতে একেবারে যাকে বলা যায় খাওয়া-পরার জন্য সংগ্রাম, একটা দেশ থেকে আরেকটা দেশে বিরাট একটা পরিবার নিয়ে গিয়ে তারপর সেটি চালানো এটি যে কতােটা কষ্টকর ছিল একটা সময়! সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছি। এখন ভালো লাগে, এতো কষ্ট সার্থক হয়েছে।
আমি কথা বলতে ভালোবাসি। এটি প্রমাণ করেছি আমার লেখায়। চার খ-ে আমার শৈশব-কৈশোর ধরেছি। স্মৃতির কাছে ফিরে গেলেই পরিষ্কার দেখতে পাই রাঢ়ের ওই বিশাল প্রান্তর শেষে চলিয়াছে বায়ু অকূল উদ্দেশে। রাঢ়ের মাঠগুলো দেখতে পাই, প্রান্তরগুলো দেখতে পাই। কতো দূরে যে দিগন্ত মাটি ছুঁয়েছে তা হিসাব করতে পারি না। একটা কল্পনাপ্রবণ বালক মাঠের ধারে এসে বসে থাকে। ঠাকুরমার ঝুলির ওই গল্পের কথা মনে পড়ে যায়। সাত সমুদ্র তেরো নদী পাড়ি দিয়ে তেপান্তরের মাঠ। সেখানে শূন্য একটি রাজপ্রসাদ। রাজপ্রসাদের চারপাশ জঙ্গলাকীর্ণ। ওই রাজপ্রসাদের ভেতরে চিরঘুমে ঘুমিয়ে আছে রাজকুমারী। মাথার কাছে সোনার কাঠি, পায়ের কাছে রুপার কাঠি। বদলাবদলি করে দিলেই সে চোখ মেলবে। তাকে কোনোদিনই জাগাতে চায় না রাক্ষসগুলো। রাক্ষসগুলোর প্রাণ ভ্রমরা আছে। রাজকুমার সেটি তুলে যখন পিষছে তখন হাহাকার করতে করতে ছুটে আসে ডাইনি, রাক্ষসী, পিশাচি। চারদিক থেকে ছুটতে ছুটতে আসে। কিন্তু বাড়ির দরজা পর্যন্ত পৌঁছার আগেই সবাই মারা গেল।
ছোটবেলায় গ্রামে ছিলাম। এখন যেখানে থাকি এর আশপাশের গ্রামগুলোয় যাই। না, রাঢ়ের গ্রাম তো এমন ছিল না। কেমন ছন্নছাড়া গ্রাম। গ্রামে শহর ঢুকেছে। কিন্তু ভালোভাবে ঢুকতে পারেনি। খড়ের ছাউনি দেয়া বাড়ি থাকলেও বেশির ভাগই ভেঙে গেছে কিংবা খড় বাদ দিয়ে টিন দিয়েছে অথবা দাঁত-মুখ বের করে আছে এমন ইট দিয়ে তৈরি বাড়ি। ছন্নছাড়া জীবন। এটিকে গুছিয়ে সুন্দর করে যাপন করার কথা যেন তারা ভাবতেই পারে না। আমাদের রাঢ়ের গ্রামের এমন বাড়ি ছিল না যেটি পরিপাটি ছিল না। এমন সংসার ছিল না যার উঠান ছিল না। উঠান প্রতিদিনই হিন্দুরা গোবর পানি দিয়ে ধুতো, মুসলিমরাও গোবর পানি দিয়ে ধুতো কোনো কোনো সময়। বাড়িতে ঢুকলেই একটা শান্তি। ঢুকতেই সন্ধ্যামালতী ফুলের গাছ।
আমি ছোটবেলা প্রায় উন্মাদ বালকের মতো দিগ-দিগন্তে ছোটাছুটি করেছি। বিরাট বিরাট মাঠে ঘুরে বেড়িয়েছি। মাঠের একেবারে শেষে পর্যন্ত গিয়েছি। মনে পড়ে খলখলির মাঠের কথা। সেখানে গেলে বড় বড় বিষধর সাপের খোলস দেখা যেতো। ঘন তাল গাছের সারি। ওই তাল গাছের তলায় কাঁটা জঙ্গল। এর ভেতর নানান সাপ- খোপের বাসা। একালের ছেলেরা ভাবতেও পারবে না! ভেবেও লাভ হবে না। কেন যেতাম? একেকটা বিশাল দুপুর কেন পার করতাম? গ্রামে থেকে এক মাইল দূরে দুটি অশ্বত্থ গাছ ছিল দূরের খলখলির মাঠে। দুটি অশ্বত্থ গাছকে মনে হতো যমজ ভাই। কী বলিষ্ঠ দুই ভাই!
এরপর মনে পড়ে কালাগড়ের মাঠের কথা। সেখানে একটা জমি ছিল আমাদের। একটা জমিই সাত বিঘা। সাত বিঘার বাকুড়ি বলা হতো। কালাগড়ের ওখানে ওই শ্যাওড়া শিউলি গাছটা। সবাই বলতো ভূত-প্রেত, দানব আছে ওখানে। খবরদার! ওখানে যাস না, বিরাট একটা সাপ আছে। যে যাবে তাকে সঙ্গে সঙ্গে জড়িয়ে-পেঁচিয়ে মেরে ফেলবে। গা ছমছম করছে। তবু গিয়েছি। কিছু নেই। ভীষণ নির্জন। নির্জনতার একটি শব্দ আছে।
রাঢ়ের দুপুরের একটা শব্দ আছে। অনেক দূরে দেখা যাচ্ছে, ঘূর্ণিঝড় উঠেছে। অল্প একটু জায়গা পাক দিয়ে উপরে উঠছে। লোকজন বিশ্বাস করতো। তারা বলতো, ওগুলো ঘূর্ণিঝড় নয়, মানুষের প্রেতাত্মা। এসব দেখা। তারপর কী কী খাওয়া যায় তা চেখে দেখার শখ। তেতো, মিষ্টি, কষাÑ সবকিছু খেয়ে দেখেছি। বইচি ফল খেতে ভালো। কিন্তু এর ভেতরে বড় বড় বিচি পট পট করে দাঁতে বাধে। বনকুল আছে। কাঁটা জঙ্গলে ভরা। এর মধ্যে মাটি বা ইট দিয়ে ধাপ তৈরি করে সেখানে গিয়ে ভেতরের বনকুলগুলো সংগ্রহ করেছি। সেখানে চন্দ্রবোড়া সাপের মুখোমুখি হওয়া।
মনে পড়ে, একদিন ফুটবল খেলার মাঠ থেকে ফিরে আসছি। ঝোপের ভেতর থেকে হিস শব্দ শুনলাম। এরপরই দেখলাম একটা কালো রঙের সাপ আমার পায়ের ওপর ছোবল মারলো। আমার পায়ের বাম অঙ্গুলির এক ইঞ্চি দূরে পড়লো সে ছোবল। সন্ধ্যার অন্ধকারে মাথা দোলাতে দোলাতে একটা কালকেউটে সাপ বের হয়ে এলো। সাহসী সাপ তো! সেটি ঝোপ থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের সামনে ফণা দোলাচ্ছে। একজনের হাতের নিশানা কী! এমনভাবে একটি ঢিল মারল যে, মাজাটা গেল ভেঙে। আরেকবার এ রকম একটি সাপের লেজ ধরতে গিয়েছিলাম। গর্তের ভেতরে শুয়ে আছে কালো রঙের একটি সাপ। ফোঁস করে উঠলো। পুকুরে স্নান করতে যেতাম। বিরাট একটি দীঘি। লোকে বলে, পুকুরের মধ্যে বিরাট একটা কু-লী আছে। টেনে নিয়ে যাবে। যতো এগিয়ে যাচ্ছি ততোই ঠা-া জল। যতো নামছি ততো হিম ঠা-া জল। একবার তলায় পৌঁছে সেখান থেকে কাদা তোলা। তাল গাছের ওপর বাজ পড়ে মাথাটা গেছে উড়ে। ওই মাথার ওপর দাঁড়িয়ে পুকুরে ঝাঁপ দিয়েছি। আমাদের স্কুল ছিল পাকা। ওখানেই গাছটা ছিল। এগুলো খুব বাল্যবয়েসের স্মৃতি। আমি দুর্দান্ত ছিলাম। কিন্তু কারো ক্ষতি করিনি। মানুষের খুব পছন্দের বালক ছিলাম। হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে আমাকে সবাই ভালোবাসতো। মহরমে আছি, কলেরা লেগেছে গান গেয়ে বেড়াচ্ছি। বাবা বলতেন, কিছু করতে হবে না। পানিটা ফুটিয়ে খা। কোনো খাবার এক মুহূর্তের জন্য খোলা রাখবি না। বাবার ওই ছোট্ট আদেশে আমাদের বাড়িতে কোনো কলেরা হয়নি। লাঠি খেলেছি, মাদার খেলেছি। অদ্ভুত অদ্ভুত খেলা ছিল। মাদার মেয়ে মাঝে মধ্যে ক্ষেপতো। বহুদূর থেকে পতাকা ওড়াচ্ছে দেখে বুঝতাম মেয়ে মাদার ক্ষেপেছে। এরপর একটি বাড়িতে গিয়ে নাক ঘষতো। মুরগিটা না দিলে মাদার বাড়ি থেকে নড়বে না।
এভাবে যার জীবন কেটেছে তার কি খারাপ কেটেছে? একই সঙ্গে আমার পড়ার ঝোঁক। কতো ছোটবেলা থেকে পড়ছি। কতো বই পড়েছি! আমার বয়স কতো কম। তখন কতো ভারী ভারী বই পড়েছি। টলস্টয়, রোমা রঁলা, ডিকেন্সÑ এসব পড়েছি। ভাঙা আলমারিতে প্রচুর বই জোগাড় করেছি। ডিটেক্টিভ ভালো লাগতো। হেমন্দ্র কুমার রায়ের বই দিয়ে ভরে ফেলেছি। একটি সিরিজ ছিল। কাজেই খুব ছেলেবেলা থেকেই মনটা খালি আর ফাঁকা যায়ািন।
দশ বছর বয়সে স্কুলে ক্লাস ফাইভে ভর্তি হয়েছি। স্কুলের সংখ্যা তখন অনেক কম ছিল। মাটির দেয়াল, খড়ের ছাউনি, ছোট ছোট গোটা দুয়েক ঘরÑ এই হলো স্কুল। চার-পাঁচটি গ্রামের জন্য একটি করে স্কুল। আশপাশের অনেক গ্রামই আমাদের গ্রামের চেয়ে উন্নত। কিন্তু স্কুল আছে শুধু আমাদের গাঁয়ে। আর ওই স্কুল হচ্ছে পাকা দালান বাড়িতে। কারণ একটাই। কাশিমবাজারের মহারাজা মনীন্দ্র চন্দ্র নন্দীর বিয়ে হয়েছিল আমাদের গাঁয়ের মেয়ের সঙ্গে। এ কারণেই তিনি এ গ্রামে পাকা দালানের হাই স্কুল তৈরি করে দিয়েছিলেন। তার স্ত্রীর নামে আমাদের গ্রামের স্কুলের নাম যবগ্রাম মহারানী কাশীশ্বরী উচ্চ ইংরেজি ইনস্টিটিউট। এ ছাড়া স্কুলের কাছে বিরাট একটি দীঘি কাটিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। এটির কাকচক্ষু কালো জল। উত্তর-দক্ষিণ দু’পাড়ে তাল আর অশ্বত্থ গাছ। মাছে ভরা ছিল দীঘি। বড়ো জাল দিয়ে ধরা হতো ২০-৩০ সের ওজনের রুই-কাতলা। গাঁয়ে আরো ছিল বিশাল একটি খেলার মাঠ। গাঁয়ের ভেতরে ছিল পাকা শিবমন্দির, প্রচুর ধানের জমি। ওই স্কুলের কারণেই আশপাশের পাঁচ-সাতটি গ্রামের ছেলেরা যবগ্রামে পড়তে আসতো।
ক্লাস ফাইভ থেকে ক্লাস টেন পর্যন্ত টানা ছয় বছর ওই স্কুলে পড়েছি। ছাত্রী একজনও ছিল না। হিন্দু-মুসলমান কেউই তাদের মেয়েদের স্কুলে পাঠাতো না। সময়টা তখন দুঃস্বপ্নে ভরা। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের তীব্রতা বাড়ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছে। ১৯৩৫ সালের আইন প্রচলনের ফলে নির্বাচন হয়েছে বাংলাদেশে, সাম্প্রদায়িকতা বাড়লো। কংগ্রেস ও মুসলিম লীগকে ব্রিটিশ সরকারের উসকানি ও ভেদমূলক নীতির ফলে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি এক রকম করতে হচ্ছে। ১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলন, ১৯৪৩ সালের ভয়ঙ্কর, দুঃসহ, সরকারের ইচ্ছাকৃত দুর্ভিক্ষে বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু, পাকিস্তান আন্দোলনÑ একের পর এক আঘাত আসছে তখন। দূর নিভৃত গ্রামে বসে আমরা এসব তেমন টের পাই না বটে তবে ঢেউ হলেও কিনারা পর্যন্ত আসে। কিন্তু বালকের কোনো কিছুতেই ঘাটতি পড়ে না।
স্কুলটাতেই সব পেয়েছি। মাস্টার মশাইÑ সবাই ভীষণ ভালো। তাদের সবাই ছিলেন পাশের গ্রামের মানুষ। হেঁটেই তারা স্কুলে আসতেন। শুধু সংস্কৃতের প-িত মশাই আসতেন তিন মাইল দূরের একটি গ্রাম থেকে লাল রঙের মাদি ঘোড়া চড়ে। ঘোড়াটা ছেড়ে দেয়াই থাকতো। স্কুলের মাঠে ঘাস খেয়ে পেট ভরিয়ে ফেলতো। দড়ি দিয়ে সামনের পা দুটি বাঁধা থাকতো। লাফিয়ে লাফিয়ে চলতো। খুব ভালো মানুষ ছিলেন প-িত মশাই। একটুও ইংরেজি জানতেন না। এসব নিয়ে বললে অনেক কথাই বলার আছে। কতো স্মৃতি যে মনে পড়ছে!


মসজিদটি ছোট। তারাফুলের মতো তার গায়ে নকশা। আমরা শুনেছি, মসজিদটি রাতারাতি তৈরি হয় হানিফার বাবা হামজার হাতে। সে ছিল তার ছেলের চেয়েও জবরদস্ত লাঠিয়াল আর গোর্জোদার। গোর্জো তো তাকেই বলে যাকে আমরা বল¬ম বলে জানি। সেই বল¬ম দিয়ে গোর্জোদার হামজা এক আশ্চর্য কাণ্ড করেছিল। কোথা থেকে এক বুনো শুয়োর পবিত্র ফজরের মুহূর্তে মসজিদ প্রাঙ্গণে এসে যায়

কত গল্প হলো, কত গল্প-প্রবন্ধ, এবার গল্পের পট রচনার সময়। হাতের কাছে উজ্জ্বল বিছিয়ে আছে গল্প-পটের গাঢ় নীল জমি। শূন্য সেই জমিতে পৃথিবীর যাবৎ অশুভ প্রাণী সাপ, শেয়াল, কুমিরের দাঁত, হাড়গিলা পাখির চঞ্চু উঁকি দেবার জন্য সারি ধরে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু আমাদের এক নম্বর লাঠিয়াল হানিফার ভয়ে তারা বহু দূরে দাঁড়িয়ে জিভ লকলক করছে আর আকাশের দিকে মুখ তুলে হৌ হৌ শব্দ করে মিলিয়ে যাচ্ছে।
জলেশ্বরীর এ তল¬াটে নবগ্রামের মসজিদের সমুখে আমরা। বড় সুখ্যাতি এই মসজিদের সুরেলা আজানের জন্যে আয়াত পাঠে মাক্কি এলহানের জন্যেথ এতো আছেই। তার ওপরে এই মসজিদে কোনো জায়গাতেই লোক ফাঁকা যায় না।
মসজিদটি ছোট। তারাফুলের মতো তার গায়ে নকশা। আমরা শুনেছি, মসজিদটি রাতারাতি তৈরি হয় হানিফার বাবা হামজার হাতে। সে ছিল তার ছেলের চেয়েও জবরদস্ত লাঠিয়াল আর গোর্জোদার। গোর্জো তো তাকেই বলে যাকে আমরা বল¬ম বলে জানি। সেই বল¬ম দিয়ে গোর্জোদার হামজা এক আশ্চর্য কাণ্ড করেছিল। কোথা থেকে এক বুনো শুয়োর পবিত্র ফজরের মুহূর্তে মসজিদ প্রাঙ্গণে এসে যায়। মসজিদের পুকুরে অজু করতে করতে গোর্জোদার হামজার কাছে জন্তুটা পড়ে। তৎক্ষণাৎ সে লাফিয়ে উঠে পাশে রাখা গোর্জোটা হাতে নিয়ে এমন বিক্রমে ছুড়ে মারে যে, শুয়োর তো প্রাণ হারায়, তার এক ফোঁটা রক্তও মসজিদের প্রাঙ্গণে পড়ে না, বরং আকাশপথে উড়ে গিয়ে আধা মাইল দূরে ভাগাড়ে গিয়ে পতিত হয়।
মসজিদটি গোর্জোদার হামজার হাতে বানানো বলে আমরা শুনেছি। এ তল¬াটের রাজ্যহীন ক্ষমতাহীন রাজার দাপটে প্রজারা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। রাতারাতি তারা মুসলমান হয়ে যায়। হামজা নব মুসলমানদের নিয়ে বাঁশ-কাঠ দিয়ে এই মসজিদটি তৈরি করে। নাম দেয় তারা মসজিদ। এখন হামজা মাটির নিচে চলে গেছে। মাটির ওপরে এখন তার যোগ্য পুত্র লাঠিয়াল হানিফা। হানিফা গোর্জোতে তেমন দক্ষ না হলেও লাঠি খেলায় সে সারা জলেশ্বরীতে এক নম্বরের এক নম্বর। তার লাঠির ঘূর্ণিতে লাঠি অদৃশ্য হয়ে যায়, শুধু ঘূর্ণমান লাঠির চারপাশে চৈত্রের তপ্ত বাতাসের মতো হাওয়া থির থির করে কাঁপতে থাকে।

মসজিদটিকে নিজের ছেলের মতোই যতœ করে লাঠিয়াল হানিফা। তার একটি কন্যা সন্তান হয়েছিল। তাকে নিয়ে একটা গল্পই রচনা করা যায়। কিন্তু না, আমরা পটের পট রচনা করছিথ গল্পপট।
ওই যে আমরা বলেছি, মসজিদটিকে বড় যতœ করে লাঠিয়াল হানিফা। তার যতেœই কি না মসজিদটির এত সুনাম। সুনামের মধ্যে কী আশ্চর্য সুনাম, এই মসজিদ থেকে কখনোই কারও জুতা চুরি যায় নাই। নামাজিরা নিশ্চিন্তে জুতা বাইরে খুলে মসজিদে প্রবেশ করে। আল¬ার কাছে সেজদায় প্রণত হয়।
লাঠিয়াল হানিফা বা তাকে আমরা তার পিতার সূত্রে গোর্জোদার হানিফা বলেই জানি, পা দু'খানি তার বড় চাষাড়ে। এলাকায় সরকারি কর্মচারী এলে পায়ে তার এক জোড়া স্যান্ডেল ওঠে। আর জুতোও সে পরে, তবে শুধু শুক্রবারে। শুক্রবার আল¬ার সাথে সাক্ষাৎ তো আর খালি পায়ে বা স্যান্ডেল পায়ে করা যায় না, তাই পায়ে তার জুতা ওঠে।
হানিফা একটা পুণ্যের কাজ করে। প্রতি শুক্রবারে এলাকার অনাহারী বিশ-পঁচিশজন মানুষকে সে মসজিদ প্রাঙ্গণে বসিয়ে খিচুড়ি খাওয়ায়। খিচুড়ির এই টাকা আসে জাতীয় দিবসগুলোতে সরকারি হাকিমের খুশি হয়ে দেওয়া তোফায়। হানিফা বলে, দানের ট্যাকা দানে লাগুক। ইয়ার চেয়ে সওয়াবের আর কী আছে রে। সেদিন শুক্রবারে জুমার নামাজ পড়ে হানিফা বাইরে এসে একবার চিন্তা করল, জুতা পায়েই খিচুড়ি খাওয়াবে, না খালি পায়ে।¬

মন বলল, দানের কাজে সহবত থাকা দরকার, অতএব মসজিদের বাইরে রাখা জুতার ভেতরে হানিফা তার পা রাখে। কুট করে কী একটা যেন কামড় দেয়। লাল পিঁপড়ের সময়। পিঁপড়েই কাটল নাকি। পা বের করে ঝাড়া দিতেই জুতার ভেতর থেকে টুকুস করে আঙুল তিন-চার লম্বা কালো কেউটে বাচ্চা বেরোয়।
বাচ্চাটি এতই ছোট, না ফুটেছে দাঁত, না এসেছে বিষ। শুধু পশুর জন্মবোধে ছোট্ট একটুখানি কামড়। সাপের বাচ্চাটি বেরিয়ে ছোট্ট একটি ফণা তোলে। আই বাপ, ইয়ার মইদ্যে ফণা তুলিতে শিখিছিস? সাপের বাচ্চাটি তিল ফুলের মতো লাল চোখে হানিফার দিকে তাকিয়ে থাকে।
মসজিদ প্রাঙ্গণে অনাহারী মানুষেরা অস্থির হয়ে ওঠেথ ও বাপ হানিফা, ভোখে মরি যাও। জলদি আহার দ্যান। পশুর চেয়ে মানুষের আহ্বান হানিফাকে চঞ্চল করে তোলে। সে একবার ইতস্তত করে বাঁ হাতে সাপের বাচ্চার ঘাড়টি ধরে দূরে জঙ্গলের দিকে ছুড়ে মারে। সাপের বাচ্চাটিকে আর দেখা যায় না। তৎক্ষণাৎ বিদ্যুতের মতো হানিফার মনে পড়ে যায়, একাত্তরে তার একমাত্র কোলের সন্তান মেয়েটিকে সে হারিয়েছে। গোর্জো আর লাঠি নিয়ে সে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়েছিল। ফিরে এসে সংবাদ শোনে, তার স্ত্রীকে পাঞ্জাবিরা নির্যাতন করে মেরে ফেলেছে। আর পাশেই যে শিশুকন্যাটি ছিল তার বুকেও কি তারা ছুরি বসিয়ে দিয়েছিল, নাকি কন্যাটিকে তুলে ধরে নিঃসন্তান কোনো বিহারি পরিবারে ছুড়ে মেরেছিল।
হানিফার লাঠি গর্জে ওঠে। হানিফার গোর্জে সূর্যের ত্রুক্রদ্ধ আলো ঝলসায়। কিন্তু তার চোখ দিয়ে আধকোশার ধারার মতো পানি বইতে থাকে।
হানিফা মাটিতে বসে পড়ে। তারপর পঁচাত্তরের আগস্ট মাসথ শ্রাবণ বৃষ্টির শেষ দিন রক্ত ঝরেথ হানিফার হাতের লাঠি মাটিতে প্রোথিত হয়ে যেতে থাকে। তার গোর্জো মাটির বুকে গভীর থেকে গভীরতম প্রদেশে ঢুকে যায়।
হানিফা এক হাতে লাঠি আরেক হাতে গোর্জো, অনেক শুনেছি সেই লাঠি আর গোর্জো মাটির বুক থেকে আর ওঠে না, প্রায় সাত বছর সে মাটির ওপর উবু হয়ে দুই হাতে লাঠি আর গোর্জো নিয়ে বসে থাকে।

তারপর একদিন তেরোশো নদীর জলোচ্ছল শব্দ আকাশ-বাতাস ভেঙে হানিফার কানে বাজে। আমরা শুনেছি, ধীরে তার গোর্জো আর লাঠি মাটির গভীর থেকে উঠে আসে। সে এক হাতে লাঠি ঘোরায় আরেক হাতে গোর্জো নাচায়থ চিৎকার করে বলে, কই কোনঠে পলেয়া আছেন, আইসেন হামার সামোতে, গোর্জের ফলায় তোর বুক চিরিয়া রক্ত পান করিম।
হানিফা উঠে দাঁড়ায়। কাছারির মাঠে হাটে বাজারে মসজিদের প্রাঙ্গণে তাকে অবিরাম ঝড়ের গতিতে লাঠি খেলতে দেখা যায়। আমরা অবাক হয়ে লক্ষ্য করি, সেই লাঠির দৈর্ঘ্য ক্রমেই দুই কাঁধে লম্বা থেকে লম্বা হচ্ছে। আর হানিফা উচ্ছল স্বরে ডাকছে, আয় বাচ্চারা আয়, হামার কাছে আয়। এই বাঁশের লাঠি ধরিয়া ঝুলি পড়।
চারদিক থেকে জলেশ্বরীর শিশুরা ছুটে আসে। একে একে তারা হানিফার ক্রমঊর্ধ্বমান লাঠি ধরে ঝুলে পড়ে। কারও সঙ্কুলান হয় না। মুরুব্বিরা বলে, ও হানিফা, তুই কোন বাচ্চাদের ডাকিস? তোর বাচ্চা তো একাত্তরেই গেইছে আর আইজ দশ বছর পর তোর বেটি কি এলাও ছয় মাসে আছে?
হানিফা বলে আছে, আছেথ বাপের বয়স বাড়ে, মা ও জননীর বয়স বাড়ে, বাচ্চার বয়স বাড়ে না। ঐ দ্যাখ, মোর চারিদিকে কত বাচ্চা। যত বাচ্চা আসিবে, সবার স্থান হইবে আমার এই লাঠিতে। এই বলে সারা জলেশ্বরীতে হানিফা তার দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতম লাঠিতে শত বাচ্চাকে নিয়ে নাচ করতে থাকে। জীবনের নাচ। শিশুদের বড় হয়ে ওঠার নাচ।
আমাদের গল্পপটে শূন্য স্বপ্নিল জমিতে হানিফা নেচে চলে আজ, কাল, আগামীকাল আর অবিরাম সম্মুখের দিনগুলোর দিকে। শিশুদের আনন্দ কলরবে জগৎ ভেসে যায়।
আমাদের গল্প-পট বাংলার বুকে মেলন হয়ে পড়ে থাকে।

অনুলিখন : আনোয়ারা সৈয়দ হক

২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬। সকাল ১০টা। ইউনাইটেড হসপিটাল, ঢাকা।

 

Page 2 of 2

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…