রামকিঙ্কর

রামকিঙ্কর

ড. মো.আমিরুল মোমেনীন চৌধুরী

 

 

ভোজসভায় আমন্ত্রিত হয়েছেন কৃষক, দিনমজুর, খনির শ্রমিক ও গ্রামের সাধারণ মানুষ। কারো চেহারা রুক্ষ, কারো তেজদীপ্ত, কারো আবেগময়। বুড়ো, প্রৌঢ়া, যুবক-যুবতী ও শিশু। ঝাড়বাতির কোমল আলো সম্মানীয় করে তুলেছে অতিথিদের অবয়ব। কেউ গান গাইছে, কেউ গল্প-গুজবে, কেউ পানাহারে মত্ত। শিল্পী অনুরোধ করেছেন, অতিথিরা যেন কৃত্রিম আচরণ না করেন। স্বাভাবিক আচরণের মধ্য দিয়েই আনন্দ উপভোগ করার জন্য বলা হচ্ছে। তাদের আনন্দ উৎসবে রেখে সামান্য দূরে চলে এসে ক্যানভাসের সামনে দাঁড়ালেন শিল্পী। সৌন্দর্যের ভেতর ঈশ্বরের অনুভব রচনা করতে হবে।

প্রাজ্ঞতার ভেতর সারল্য তৈরি করতে হবে। যিশু ও তার অনুচরদের এভাবে রচনা করতে হবে যেন তাদের মধ্যে মানবিক ও ঐশ্বরিক গুণাবলি থাকে। সৌন্দর্য ও ঐশ্বরিক স্বাভাবিকতার যোগফল প্রয়োজন যা কোনো মানুষের মধ্যে পাওয়া কঠিন। কারো মুখের আকৃতি, কারো হাত, কারো হাসি, কারো বেদনার্ত মুখাভাস, কারো গ্রীবাÑ এসবের যোগফলে যিশুর রূপ তৈরি করেছিলেন লিউনার্দো দা ভিঞ্চি তার ‘লাস্ট সাপার’ বা শেষ ভোজ ছবিতে।

ষোড়শ শতকের প্রথম দিকে দৃশ্যশিল্প ঘুরে দাঁড়ালো নতুন আঙ্গিকে। লিউনার্দো দা ভিঞ্চি, মাইকেল অ্যাঞ্জেলো ও রাফায়েল হলেন এ সময়ের সবচেয়ে আলোচিত শিল্পী চরিত্র। ‘ভার্জিন অফ দি রকস’ এবং মেরি, যিশু ও সেইন্ট অ্যানের অপূর্ব ড্রইংয়ের প্রেক্ষাপট শারীরযন্ত্র ও শারীর সংস্থানের পরীক্ষা-নিরীক্ষার অপূর্ব উদাহরণ লিউনার্দোর ‘নোট বুকস’। আবার জ্যামিতিক অংকনের চূড়ান্ত হলো গিরলানদাইও-এর

‘শেষ ভোজ’। উলফিনের ভাষায়Ñ ‘এন অ্যাসেমব্লেজ উইথআউট অ্যা সেন্টার’। লিউনার্দোর ছবির নাটকীয় সংহতি আশ্চর্য। তিনজন করে শিষ্যের চারটি দল পিরামিডের আকারে উপস্থাপিত যার শীর্ষবিন্দুতে স্বয়ং যিশু। শিল্পীর সমস্যা কম ছিল না। সব চরিত্রই পুরুষ। ডাইনিং টেবিল ছাড়া কোনো আসবাব নেই। নেই প্রেক্ষাপট বা গতির সম্ভাবনা। শুধু উপবিষ্ট যিশুর পেছনের জানালা দিয়ে অস্পষ্টভাবে দৃশ্যমান প্রকৃতি। অথচ একটি অত্যন্ত উদ্বেগভরা, আত্মজিজ্ঞাসাভরা মুহূর্ত ও ১২ শিষ্যে প্রত্যেকের বিশিষ্ট প্রতিক্রিয়া। যিশুর মুখ শেষ করতে পারেননি শিল্পী। কারণ তিনি কোথায় সন্ধান করবেন জেথসিমানি উদ্যানে ঈশ্বরপুত্রের নিদারুণ ব্যাকুলতা, বীর্যবান ইচ্ছা, প্রশান্ত আত্মসমর্পণ! তিনি তো আর মায়ের কোলে ক্রীড়াচঞ্চল শিশু নন। ঈশ্বরের কাছে ফিরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। অথচ মানুষের জন্য করুণায় বিষণœ ঈশ্বরপুত্র।

ইউরোপীয় শিল্পকলার উত্তুঙ্গ বিকাশ ঘটে পাশ্চাত্য সভ্যতার উদয়াচল গ্রিসে। তবে গ্রিসের মূল ভূখ-ে শিল্পকলার উৎকর্ষ লাভের অনেক আগেই তার অদূরবর্তী দক্ষিণ ভূমধ্যসাগরের ক্রিট দ্বীপে শিল্পের জয়যাত্রা শুরু হয়। ক্রিটানরা ছবি আঁকতো প্রাসাদ, অট্টালিকার দেয়াল ও তৈজসপত্রের উপরিতলে। প্রাচীন মিসরীয়দের মতো মৃত ফারাও কিংবা সমাজের অভিজাতদের পরলৌকিক কল্যাণ বা পরিত্রাণের জন্য নয়, তাদের উদ্দেশ্য ছিল ইহলৌকিক পরিবেশই রঙে আনন্দময় করে তোলা। গ্রিকরা খ্রিস্ট জন্মের প্রায় ৪০০ বছর আগে শিল্পকলায় মানবদেহ সৌন্দর্য এমন এক ভঙ্গিমায় রূপায়িত করে যা আজও অনতিক্রান্ত। প্রাচীন গ্রিক সভ্যতার অবক্ষয়ের পর শিল্পের ইতিহাসে সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা রোমের অভ্যুত্থান ও ইউরোপের জয়। এক ক্ষয়িষ্ণু সভ্যতার দ্বারা প্রভাবান্বিত রোমানরা ছিল গ্রিস থেকে বহু দূরে মধ্য ইটালির টাইবার নদীর তীরে ল্যাটিনভাষী উপজাতি। রোমান শিল্পীরা গ্রিক শিল্পীদের এমনভাবে অনুকরণ ও অনুসরণ শুরু করে যে, অচিরেই গ্রিক ও রোমান শিল্প একীভূত হয়ে রোমান শিল্প যেন গ্রিক শিল্পেরই অবিচ্ছিন্ন ধারায় পরিণত হয়। আধুনিক ইউরোপের ধ্রুপদী শিল্প বলতে যুগপৎ গ্রিক ও রোমান শিল্পটিই বোঝায়। প্রাচ্য শিল্প প্রধানত দুটি ভাগে বিভক্তÑ নিকট প্রাচ্যের শিল্পকলা অর্থাৎ যা মূলত ভারতীয় শিল্পকলা নামে পরিচিত এবং দূরপ্রাচ্যের শিল্পকলা ফার ইস্টার্ন আর্ট বা চীন ও জাপানের শিল্পকলা। প্রাচ্য শিল্প বৌদ্ধ ও হিন্দু ধর্মের প্রতীকবাদিতা প্রভাষিত। বৌদ্ধ দর্শনে বিশ্বব্রহ্মা-ের মূলীভূত তত্ত্বে পাঁচটি উপকরণ রয়েছে। প্রথম উপকরণ মৃত্তিকা। মৃত্তিকা অর্থাৎ পৃথিবীর প্রতীকগত ব্যঞ্জনা হচ্ছে একটি চতুষ্কৌনিক আয়তক্ষেত্র বা কিউব। কিন্তু এর দ্বিমাত্রিক স্বরূপ হচ্ছে চতুষ্কৌনিক রেখা অঙ্কনের বহুবিধ বিস্তার ও সংকোচনকে ব্যবহার করা হয়। দ্বিতীয় উপকরণ পানি। পানির প্রতীক হচ্ছে গোলক। দ্বিমাত্রিকতায় ওই গোলক একটি বৃত্তে পর্যবসিত হয়। পানি যখন উঁচু থেকে নিচে পড়ে তখন গোলকের আকারে পড়ে। কিন্তু বাধা পেয়ে অগ্রসর হলে গতিধারায়ব বৃত্ত ও অর্ধবৃত্তের আকারে পরিলক্ষিত হয়। তৃতীয় উপকরণ অগ্নি। অগ্নির প্রতীক হচ্ছে ত্রিভুজ বা শঙ্কু। সমদ্বিবাহু ত্রিভুজের ঊর্ধ্বমুখী সুচালো কোণের মতো অগ্নির গতিও ঊর্ধ্বমুখী। চতুর্থ উপকরণ বায়ু। বায়ুর প্রতীক হচ্ছে অর্ধচন্দ্র বা ক্রিসেন্ট। বায়ু যেহেতু অদৃশ্যমান সেহেতু বায়ুর তাড়নায় বস্তুর প্রকৃত আকৃতির যে পরিবর্তন হয়, বায়ুর প্রতীক সেভাবে নির্মিত। পঞ্চম উপকরণ আকাশ। আকাশ বা শূন্যের প্রতীক হচ্ছে ডিম্বাকৃতি। যেহেতু আকাশ শূন্য এবং এর কোনো নির্দিষ্ট আকৃতি নেই সেহেতু ডিম্বাকৃতি সাদৃশ্য নির্মাণ করে আকাশকে বোঝানো হয়েছে।

চীন কিংবা জাপান অথবা ভারতীয় শিল্পে যে কোনো বস্তু গঠন নির্মাণের ক্ষেত্রে মৌলিক আকৃতি হিসেবে বৃত্ত আকৃতি বা ডিম্বাকৃতি ফর্ম বেশি দেখা যায়। প্রাচ্যের শিল্পীরা মানব শরীরের মূল কাঠামো বা অস্থি সংস্থানের দিকে খেয়াল করেননি। তারা গাত্র আবরণ সংবলিত সম্পূর্ণ অবয়ব বৃত্ত আকৃতি ও ডিম্বাকৃতি রেখার টানে সুচিহ্নিত করেছেন। পাশ্চাত্য শিল্পের মূল আকৃতি কিউব ও

পলিহেড্রন। কিউব সমান ছয়তলার চতুষ্কৌনিক আকৃতি ও

পলিহেড্রন বহুবিধ তলের একটি ঘনক। শিল্পে প্রেক্ষাপটগত শুদ্ধতা নির্মাণের জন্য তাদের কিউব বা পলিহেড্রনের আকৃতিটি গ্রহণ করতে হয়েছিল। তাছাড়া মানব শরীর আঁকতে শরীরের মূল কাঠামো বা অস্থি সংস্থানটি অধিকতর প্রাধান্য দিয়েছে। শরীরের অভ্যন্তর ভাগের অস্থির সংস্থান বিবেচনার মধ্যে রেখে ইউরোপের শিল্পীরা শারীরিক গঠন নির্মাণ করতেন। এ জন্য রেনেসাঁস যুগের শিল্পীকে শবব্যবচ্ছেদে দক্ষ হতে হতো। পাশ্চাত্য শিল্পে প্রেক্ষাপট অর্থাৎ আলোছায়ার মাধ্যমে রঙ ঘনত্বের তারতম্য সৃষ্টির যে শিল্পবিজ্ঞান রয়েছে, প্রাচ্য শিল্পে ওই পেক্ষাপটের সমর্থন নেই। প্রাচ্যের শিল্পীরা সম্ভবত প্রেক্ষাপটের মূলনীতিগুলো জানতেন এবং এর বাস্তব অবলোকনের প্রচলিত রীতিকে গ্রাহ্য করেননি। কেননা কোনো কোনো সময় উল্টো প্রেক্ষাপটের ব্যবহার দেখা গেছে। অজান্তার ভিত্তিচিত্রে এ ধরনের প্রচুর উদাহরণ রয়েছে। রেনেসাঁসের আগেই পশ্চিম

ইউরোপের শিল্পীদের প্রধান প্রবণতা ছিল দৃশ্য জগতের হুবহু অনুকরণ করা। এ ছাড়া চিত্রে প্রেক্ষাপট ব্যবহারের কারণে দর্শকের দৃষ্টিকে চিত্রপটের বাইরে একটি বিন্দুতে স্থির করে। দর্শকের দৃষ্টি শেষ পর্যন্ত অদৃশ্য বিন্দুতে গিয়ে মিলিয়ে যায়। ফলে ছবি হয় ত্রিমাত্রিক এবং আকারগুলো চিত্রপটে অনুপ্রবেশ করে। প্রাচ্যের শিল্পীরা চিত্রপটটি দ্বিমাত্রিক ভূমি ও বাস্তব জগৎ ত্রিমাত্রিক হিসেবে গণ্য করেছেন। কিন্তু চিত্রপটে পুনর্চিত্রণ করার সময় দ্বিমাত্রিকতায় এঁকেছেন তারা। পাশ্চাত্যের শিল্পীরা প্রেক্ষাপটের কাছে-দূরের তারতম্য নতুন করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং চিত্রপটের দ্বিমাত্রিক স্বভাব অক্ষুণœ রেখে ত্রিমাত্রিক বস্তুকে দ্বিমাত্রিক স্বভাবে পর্যবসিত করেছেন। অ্যাবস্ট্রাক এক্সপ্রেশনিজম অথবা পোস্ট এক্সপ্রেশনিজমের চিত্রগুলোই এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। প্রাচ্য শিল্পে বিশেষ করে চীনের ভূদৃশ্যের দূরত্ব আছে। দূরত্বের কোনো সীমা-পরিসীমা নেই, আছে অসীমের বিন্যাস। পাশ্চাত্যের শিল্পীরা বস্তুটি আলোছায়ার তারতম্যের মধ্যে আবিষ্কারের চেষ্টা করেছে। কিন্তু প্রাচ্যের শিল্পীরা শুধু প্রমাণিত আকৃতি গ্রহণ করেছেন, আলোছায়ার কথা ভাবেননি। একটি বস্তুর ওপর আলো এসে পড়লে দৃশ্যত এর বর্ণগত ও আকৃতিগত যে পরিবর্তন দৃষ্টিতে ধরা পড়ে, প্রাচ্যের শিল্পীরা তা কখনো বিচার্য ভাবেননি। ফলে প্রাচ্যের শিল্পকলা ডেকোরেটিভ বা অলঙ্কৃত রূপকল্প বলে ইউরোপীয় চিত্র সমালোচকরা আখ্যা দিয়ে থাকেন। এরিখ নিউটন (১৮৯৩-১৯৬৫) এটিকে বলেছেন একটি আদর্শ সত্যের অন্বেষণ। ইউরোপীয় শিল্পীর কাছে সত্য হচ্ছে দৃশ্যগত বাস্তব অবস্থানের রূপব্যঞ্জনা। প্রাচ্যের শিল্পীর কাছে সত্য হচ্ছে আদর্শের রূপায়ণ। ইউরোপীয় শিল্পকলার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, একটি বস্তুর যথার্থ দৃষ্টিগোচর স্বরূপক নির্ণয় করার জন্য শিল্পীরা বহুকাল শ্রমসাধ্য সময় দিয়েছেন। কী দেখছি অর্থাৎ কোন বস্তু দেখছিÑ ইউরোপীয় শিল্পীর কাছে এটি বড় কথা নয়, কীভাবে দেখছি সেটিই বড় কথা। যুগভেদে এভাবে বস্তু দেখার কৌশলের পরিবর্তন হয়েছে এবং বস্তুর নির্ণেয় স্বরূপ নতুন নতুন তাৎপর্য পেয়েছে। প্রাচ্যের যেহেতু বস্তুই উৎকৃষ্ট সেহেতু যুগভেদে বস্তুর স্বরূপের কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। তাই প্রাচ্যের শিল্পীর কাছে একটি সবুজ গাত্র আবরণ সর্বদাই অনাবিল সবুজ। অবশ্য ইউরোপীয় শিল্পীর কাছে তা নয়। ইউরোপীয় শিল্পী আবরণের ওপর আলোছায়ার খেলা দেখেন। সবুজটিকে কোথাও অধিকতর গাঢ় সবুজ, কোথাও সবুজ এবং কোথাও হালকা সবুজ করে উপস্থাপন করেন অর্থাৎ ইউরোপীয় শিল্পীর বিচারে আলোছায়াই একটি বস্তুর রঙ নির্ধারিত করে, প্রাচ্যে তা নয়। বিশ্ব শিল্পকলার ইতিহাসে ভাস্কর্য চর্চা একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। এ ভাস্কর্যকলা একটি সংস্কৃতি, একটি দেশের সভ্যতা ধরে রাখে। ফলে পরবর্তী প্রজন্মের অতীত জানতে সহজ হয়। অবশ্য শিল্পকলার উৎকর্ষতা নিয়ে ছিল বিভিন্ন মত। ভাস্কর্যে ত্রিমাত্রিক গুণের কারণে দর্শকের কাছে বস্তুসাদৃশ্য প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। চিত্র অপেক্ষা ভাস্কর্য অনেকগুণ স্থায়ী ও গতিশীল। তাই শিল্পকলায় এর গুরুত্ব অপরিসীম। সমৃদ্ধ ভারত উপমহাদেশের অংশীভূত বাংলাদেশ বর্তমানে খ-িত হলেও ঐতিহ্য সন্ধানে সুদূর গৌরব উজ্জ্বল অতীতে প্রবেশ অনিবার্য। এখন শিল্পীকুল যে ওই ঐতিহ্য থেকে উৎসাহিত হয়েছে তা স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। ঔপনিবেশিক আমলে সরাসরিভাবে ইউরোপীয় স্থাপত্যরীতি, ভাস্কর্য, চিত্রকলার স্বকীয় ও অনুকৃতি আমদানি করে ২০০ বছরের শাসনকালে। অখ-িত ভারতবর্ষে নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে ইউরোপের বহু শিল্পী এসেছিলেন। ভারতবর্ষের সংস্কৃতি, মানুষজন ও সংস্কৃতি বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের শিল্প, সংস্কৃতি, রুচিরও পরিবর্তন ঘটতে থাকে। ইউরোপিয়ান স্থাপত্য, ভাস্কর্য ও চিত্রকলা ভারতীয় শিল্পীদের অবশ্যই প্রভাবিত করে। ফলে শিল্প বিদ্যালয়ের সুনির্দিষ্ট শিক্ষা পদ্ধতির ভিত্তিতে এক সুনির্দিষ্ট শিল্পধারা গড়ে ওঠে। তা একাডেমিক স্টাইল বা রীতি নামে পরিচিত। ব্রিটিশ একাডেমিক রীতির আদর্শে গড়া এই নতুন ভারতীয় শিল্প ক্রমেই জনপ্রিয়তা লাভ করে এ দেশের নতুন শিক্ষায় শিক্ষিত সমাজেও। কলকাতার বেঙ্গল স্কুল অব আর্ট প্রতিষ্ঠা, শিল্পীদের গোষ্ঠী ক্যালকাটা গ্রুপ, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নন্দলাল বসু, যামিনী রায় ও রবীন্দ্রাথ ঠাকুরের কার্যধারা অবিভক্ত বাংলার শিল্পধারাটি বিকশিত করে। এরপর ভাস্কর হিসেবে সমাধিক পরিচিত ভাস্কর রামকিঙ্কর বেইজ (১৯০৬-১৯৮০) ভাস্কর্যকলায় স্বাক্ষর রেখেছিলেন। এর পূর্ণতার পরিচয় পাওয়া যায় তার ১৯৩৮সালে নির্মিত সাঁওতাল পরিবার ভাস্কর্যে। ভাস্কর রামকিঙ্কর বেইজ-এর ভাস্কর্যের সূচনা হয় পাশ্চাত্য শিল্পীদের কাছে। প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের দ্বন্দ্ব, একই সঙ্গে উভয় ধারা থেকে রসদ সংগ্রহ করে নিজেকে পরিশীলিত করেছেন। তার চিত্রকলায় যেমন নিসর্গচিত্রে দেশীয় পটভূমিতে দেখা যায় তেমনি ভিনসেন্ট ভ্যান গগ কিংবা পল সেজানের প্রতিচ্ছায়া ও কিউবিস্টদের পথ ধরে তিনি বিমূর্তাশ্রায়ী। পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছিল কলকাতাতেও। এ প্রসঙ্গে রিবেল আর্ট সেন্টারের কথা বলা যায়। এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিলÑ দেশজ শিল্পের প্রকৃত চরিত্র ও সত্তাটি রক্ষার জন্য পাশ্চাত্যের শিল্পরীতির আঙ্গিক আয়ত্ত এবং রিয়ালিস্টিক বা বাস্তববাদের দিকে ধাবিত করা। রামকিঙ্কর এক মডেল খুঁজছেন। নিজের জন্য, ছবির কৌশলের জন্য প্রয়োজন এক মডেলের। তাকে স্পর্শ, আঘাত ও হৃদয়ে প্রবেশ করে তার হৃদয়ের বাইরে দাঁড়িয়ে ভালোবাসায় ডুবিয়ে, জীবনের দিক থেকে আশ্রয়হীন করে চিনে নেবেন তিনি। শান্তিনিকেতনে মীরা দেবী (ভাস্কর মীরা মুখপাধ্যায়, ১৯২৩-১৯৯৮)-এর কাজে সাহায্য করেন সাঁওতাল এক রমণী। দেখা হলো সাধারণত্বে অসাধারণ রাধারানীর সঙ্গে। রাধারানী তার সাধনা, পরীক্ষার একটি উপকরণ হতে পারে। শিল্পী এদগার দেগা-কে ফরাসি দার্শনিক ও কবি পল ভ্যালোরি প্রশ্ন করেছিলেন, ড্রইংয়ের দ্বারা তিনি কী বোঝেন? উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ড্রইং ইজ নট অ্যা ফর্ম। ইট ইজ ওয়ে অ্যা লুকিং অ্যাট ফর্ম। লুকিং অ্যাট ফর্মের ভেতর ধরতে হবে যন্ত্রণা এবং তার বিস্তৃত বোধ ও সীমানা। ওই সীমানার ভেতর নিজেকে অত্যাচারিত করার প্রবণতায় রামকিঙ্কর মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। তার সঙ্গে রাধারানীর পরিচয় সামান্য সময়ের। এ পরিচয়ের মধ্যেই আহ্বান করেছিলেন তার কাছে আসতে। তিনি জানতেন, রাতে রাধা আসবে তার কাছে। মীরা দেবীর বাড়ি ও রামকিঙ্করের স্টুডিওর মাঝে কাঁটাতারের বেড়া। সন্ধ্যার পর থেকে এপারে তিনি মাঠে বসে একতারায় শব্দ তুলছেন। কিন্তু মনোযোগী নন। সন্ধ্যা পেরিয়ে অস্থির রাত, সময় সমুদ্র তালগোল।

কাঁটাতারের বেড়ার ওপারে অন্ধকারে এক রমণীর লজ্জিত পদক্ষেপ। অস্থির রামকিঙ্কর শিল্পের নতুন আকৃতি ও নিজেকে প্রকাশ করার ব্যগ্রতায় সবকিছু ভূলে গিয়ে রাধারানীকে দু’হাতে তুলে নিয়ে এলেন কাঁটাতারের বেড়ার এপারে। তাকে স্টুডিওর মডেল বক্সের ওপর আধশোয়া করে এমনভাবে রাখলেন, রাধা যেন কলের পুতুল। রাধা স্বপ্নের ঘোরের ভেতরে

আছেনÑ শব্দহারা লজ্জায় রক্তহীন। অথচ অভিজ্ঞতা ও নিজস্ব যন্ত্রণার কাছে প্রৌঢ়া। রামকিঙ্করের কাছে স্টুডিওর পরিবেশে এক স্বর্গীয় অনুভূতি। পেন্সিলের টানে ধরে রাখতে হবে রাধার শরীরের ফর্ম। ওই ফর্মের ভেতর ঝলসে উঠবে তীব্র যন্ত্রণা। কোহল-ক্লান্ত রামকিঙ্করও শল্যচিকিৎসকের মতো শুরু করলেন রাধার শরীর ব্যবচ্ছেদ, এক অলৌকিক ময়নাতদন্ত। তা দিয়ে বোঝা যায় এক মানবিকার মনের গভীরতা। শরীরের ভেতর আরেক শরীর। গর্ভের ভেতর বেড়ে ওঠা এক শরীরে আরেক শরীরের মতো অবিকল রূপে। ওই রূপে একটি বিশেষ ফর্ম শিল্পী এদগার দেগা-র কাছে। তার স্নানরতা ছবির বিষয়ের মতো, স্নানের পর এক তরুণী পেছন ফিরে তার চুল থেকে জল মুছে নিচ্ছে খুব স্বাভাবিকভাবে। কিন্তু শিল্পীর ক্যানভাসে মোটা রেখার টানে তা ফুটে উঠেছিল অপূর্ব দেহ ভঙ্গিমায়। তা এখনো মুগ্ধ করে গ্যালারির দর্শককে। রামকিঙ্করের সঙ্গে দীর্ঘ বসবাসের এক সময় সন্তানসম্ভাবা হলেন রাধা। এ সময় রামকিঙ্কর একটি ম্যাডোনা চিত্র আঁকলেন। তার কোল থেকে নেমে আসছে চারটি শিশু। তার একটি চোখের আভাস দৃশ্যামান। অন্যদিকের চোখ ডুবে আছে ঘন চুলের নিচে। তার দুটি স্তন উন্মুক্ত। চারটি শিশুর মুখ সেখানে। বসুন্ধরার প্রতীকী রূপ। সব শিশুর জন্য মায়াবতী দুধঘর নিয়ে প্রস্তুত। রামকিঙ্করের কল্পনা ও রাধারানীকে প্রত্যক্ষ করা এক ম্যাডোনার চিত্র। দীর্ঘদিন সন্তানসম্ভাবার কোনো ইঙ্গিত না পেয়ে রাধারানী এক ব্রাহ্মণ পুত্রকে দত্তক নিয়েছিলেন। দত্তক নেয়ার পর জানতে পারেন তিনি সন্তানসম্ভাবা। ধর্মীয় মতে, দত্তক নেয়ার পর নিজের সন্তান জন্ম দেয়া অনাচার। তাও আবার ব্রাহ্মণপুত্র! একদিকে অনাচার, লজ্জা, ভয়। অন্যদিকে নারীত্বের গর্ব, মা হওয়ার প্রবল ইচ্ছা। একদিকে যন্ত্রণা, অন্যদিকে গর্ভের শিশুকে বাড়িয়ে তোলার আঁতুড় মমতা।

রাধারানীর সংকটকালে শিল্পী রামকিঙ্করের কাছে ছবির বিষয়ের আরেক নুতন দিগন্ত খুলে গেল। নারীত্বের গর্ব ও তার যন্ত্রণা। আঁকতে শুরু করলেন গর্ভযন্ত্রণার নারীচিত্র। তার যন্ত্রণার মধ্যে বসে আছে সেই নারী। ভারী স্তন যুগল ঝুলছে স্মৃতিতে সন্তানের মুখের কাছে। কিন্তু শিশুর অবয়বে চোখ, মুখ, নাক অদৃশ্য। আবার রাধাকে দাঁড় করিয়ে আঁকলেন তার তলপেটে সারা শরীরে আঁচড়। রাধারানী সেই সন্তানকে নষ্ট করে ফেলেছিলেন পালিত পুত্রের জন্য। কারণ ধর্মীয় মতের বিরুদ্ধ স্রোতে যাওয়ার ক্ষমতা তার ছিল না। রামকিঙ্কর ওই সুযোগ হাতছাড়া করেননি। তিনি রাধার কষ্টের অনুভবটি প্লাস্টার দিয়ে তৈরি করলেন অসাধারণ এক ভাস্কর্য ‘মাতৃত্ব’। তার তলপেট স্থূলকায়, দু’হাত উপরে। ওই হাতের ওপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে শিশু। শিশুর মুখ দু’স্তনের আড়ালে যেন দু’স্তনের মাঝে শিশু ঘুমিয়ে আছে। নারী চরিত্রের মুখে হাসি ও সারা শরীরে এক যন্ত্রণাহীন প্রশান্তি। রাধারানীর বিয়ে হয়েছিল অল্প বয়সে। বর ছিল তার চেয়ে তিনগুণ বয়সের। বিয়ের কিছুদিন পর রাধা গিয়েছিলেন স্বামীর ঘর করতে, স্বামীর ভালোবাসায় সিক্ত হতে। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন স্বামী তার প্রেমে অবিচল নন। তার একটি রক্ষিতা আছে। ওই সময় মায়ের মৃত্যু সংবাদ পেয়ে বাড়ি এলেন রাধা। বাবা সব শুনে বললেন, ‘ওখানে গিয়ে কাজ নেই। আমি তোর জন্য অন্য ব্যবস্থা করে দেবো।’ বাবার কথায় সায় দিলেও কিছুদিনের মধ্যে রাধা শরীরের ভেতর এক পুরুষের টান অনুভব করেছিলেন। তা ছিল চিরন্তন। তার স্বামী নিয়মিত যাতায়াত শুরু করেন রাধার বাবার বাড়িতে। ভালোবাসার গল্প করেন, শোনেন রাধা। শরীর ও মনের জন্য বাবার কথা অমান্য করে রাধারানী স্বামীর হাত ধরে আবার নিজের বাড়ি গিয়েছিলেন। যুবতী রাধা। স্বামী তাকে ব্যবহার করেন। না পাওয়ার চেয়ে এ অনেক ভালো। স্বামীর অকাল মৃত্যুর পর রাধার ঠাঁই হলো শান্তিনিকেতনে মীরা দেবীর বাড়িতে। এই হলো রাধারানী ও রামকিঙ্করের অধরা।

শান্তিনিকেতনে রাধারানীর ইন্টারভিউ নিয়েছিলেন (১৯৮৯) রানাঘাটের লিটল ম্যাগাজিন ‘পুনরুত্থান’-এর দুই সম্পাদক আমার বন্ধুজন শান্তিনাথ ও গৌতম চট্টপাধ্যায়। আমি তখন রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের দৃশ্যকলা অনুষদের স্নাতকোত্তর শেষ পর্বের ছাত্র। শান্তি ও গৌতম বলেছিল, চলো যাই তিনজন মিলে এক সঙ্গে। আমার যাওয়া হয়নি রাধারানীকে সম্মান জানানোর জন্য।

 

গৌতম ও শান্তি : এখন আপনার মনে হয় না সন্তান থাকলে ভালো হতো?

লজ্জা মিশ্রিত কষ্টের ভেতর রাধারানীর উত্তর : ভালো হতো। তাকে নিয়ে থাকতাম। এখন ভাবি, কেন নষ্ট করলাম একজন মহান পুরুষের উত্তরাধিকার!

গৌতম ও শান্তি : রামকিঙ্করের কথা মনে হয় না?

রাধারানী : তার মুর্তির সামনে দাঁড়ালে কান্না পায়। এমন মানুষ হয় না। এমন ভালো কেউ বাসতে পারবে না।

গৌতম ও শান্তি: আপনার প্রথম স্বামী ভালোবাসতেন না?

রাধারানী : কারো সঙ্গে কারো তুলনা করতে চাই না। কেউ তো কারো মতো নয়।

গৌতম ও শান্তি : আর কিছু বলবেন তার সম্পর্কে?

রাধারানী : বাবু মৃত্যুর সময় বলেছিলেন, রাধা, শ্মশানে অমৃত (মদ) দিস (রাধারানী তার কথা রেখেছিলেন। শ্মশানে অমৃত ঢেলে দিয়েছিলেন যেখানে রামকিঙ্করের দেহাবশের শেষ চিহ্ন ছিল। কিছু সময় নিমগ্ন থাকার পর আবার কথা বলেন

রাধারানী)। প্রথম দিকে মনে সন্দেহ হতো, বাবু কেন শ্মশানে অমৃত ঢেলে দিতে বলেছিলেন!

গৌতম ও শান্তি : এখন সন্দেহ নেই?

রাধারানী : না।

গৌতম ও শান্তি : কেন?

রাধারানী : তা তো ভেবে দেখিনি!

 

রাধারানীর কাছে এর ব্যাখ্যা না থাকলেও গৌতম ও শান্তিনাথের মতো আমাদের সবার জানা হয়ে গেছে ওই অমৃত কথা।

শিল্প অনুরাগী মানুষ তার শিল্পের ভেতর দিয়ে পান করেন ওই অমৃত।

Read 311 times

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…