চিত্রশিল্পের ম্যাজিকম্যান

চিত্রশিল্পের ম্যাজিকম্যান

প্রফেসর ড. মো. আমিরুল মোমেনীন চৌধুরী 

 

সেলফোনের ওপাশ থেকে ভেসে এলো আবেগঘন অনুরোধ, ‘স্যার, ভিনসেন্টকে নিয়ে লিখুন, আমার প্রিয় শিল্পী।’ শাকিল সারোয়ারের বিনম্র অথচ ‘সহজ’ কণ্ঠস্বর। আবার শুরু হলো অসমাপ্ত কাব্যগ্রন্থ ‘কখনো মানুষের গান’-এর শরীর ব্যবচ্ছেদ।

“অনেক দিন হয়ে গেল ভিনসেন্ট ভ্যান গগের শরীরী সত্তা
প্যারিসের ওইভরস গ্রামের মাটির সঙ্গে মিশে গেছে
তার আত্মার সাথে আমার যোগাযোগ মিশে যায়নি
থাকবে এই পৃথিবী ছেড়ে যাবার পরও, যেমন তার সহোদর থিও ভ্যান গগ থিও ছিল ভিনসেন্টের এক ভালোবাসার দ-
এক সহোদর হবার দ-
এ কোন দ- এ কোন দায়
আকাশ প্রমাণ রহস্যই হয়ে থাকলো মাটির পৃথিবীর মানুষের কাছে
কিছু মানুষ জন্মায় যাদের অভিধানে
না পাওয়া শব্দটি ছিল মুদ্রণ প্রমাদ
ভিনসেন্ট কেন এমন এক শব্দবিহীন অভিধান বয়ে বেড়ালো যাপিত জীবনে
আমি নই, কে একজন অস্ফুট শব্দ করে বলে ওঠে
‘দ্য গুড ডাই ফার্স্ট, অ্যান্ড দে হুজ হার্টস আর ড্রাই অ্যাজ সামার ডাস্ট,
বার্ন টু দ্য সকেট”
(‘কখনো মানুষের গান’, কাব্যাংশ-১)

যারা উনিশ শতকের কিংবদন্তি ভিনসেন্ট ভ্যান গগের সম্পর্কে জানতে আগ্রহী তারা অবশ্যই থিউ ভিনসেন্টকে লেখা চিঠিগুলো পড়বেন। ভাইয়ের প্রতি ভাইয়ের, শিল্পের প্রতি শিল্পীর
ভালোবাসার এক মহাকাব্যিক উপাখ্যান। এমনকি থিউ তার প্রথম পুত্র সন্তানের নাম রেখেছিলেন ভিনসেন্ট।

দ্য হেগ, ২৮ জানুয়ারি ১৮৭৩
ব্রাসেলস তোমার ভালো লেগেছে আর ভালো থাকার জায়গা পেয়েছ জেনেও ভালো লাগছে। আঙ্কেল হাইন সুন্দর কিছু ছবি আর ড্রইং নিয়ে প্যারিস থেকে ফিরেছেন। সোমবার পর্যন্ত অ্যামস্টাডার্মে ছিলাম, জাদুঘর দেখতে গিয়েছিলাম। এখানে নতুন আরো বড় একটা জাদুঘর হতে যাচ্ছে। শিল্পী ক্লয়সনের ছবি দেখতে ইচ্ছা করছে, তার যে কয়টা ছবি দেখেছি, আমার খুব ভালো লেগেছে। ইটালিয়ান শিল্পী রোত্তার ছবির ফটোগ্রাফ আমি চিনি। ব্রাসেলসের এক্সিবিশনে দেখেছি। কখন কী ছবি দেখছ, অবশ্যই আমাকে জানাবে। তুমি যে অ্যালবামের নাম দিয়েছ, আমি ওটার কথা বলিনি। বলেছি শিল্পী কোরো-র লিথোগ্রাফের একমাত্র অ্যালবামটির কথা।

লন্ডন, ৩১ জুলাই ১৮৭৪
তুমি যে ‘মিশেল’ (শিল্পী জর্জ মিশেল) পড়ছ আর ভালো করে বুঝতে পারছ জেনে খুশি হয়েছি। আমরা যা মনে করি, প্রেমের শক্তি এর চেয়ে অনেক বেশি। ওখানে একটা বাক্য আছে, ‘মেয়েরা কখনো বুড়ো হয় না।’ কথাটা একটা প্রত্যাদেশ বা বাণী। এর মানে এই নয় যে, পৃথিবীতে বুড়ো মেয়ে নেই। সে যতোক্ষণ ভালোবাসে এবং ভালোবাসা পায় ততোক্ষণ সে বুড়ো নয়। পুরুষের চেয়ে মেয়েরা আলাদা। আর আমরা মেয়েদের সম্পর্কে খুব কম জানি। ‘এ’ ভালো আছে। আমরা এক সঙ্গে হেঁেট বেড়াই। কারো যদি এক জোড়া খোলা চোখ থাকে আর তার ভেতর রশ্মি থাকে তাহলেই ওই সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবে। ইংল্যান্ডে ফেরার পর থেকে ড্রইংয়ের প্রতি ভালোবাসাটা আর নেই। প্রচুর পড়াশোনা করছি।

লন্ডন, ৬ মার্চ ১৮৭৫
অ্যাডাম বিড’-এর মেয়েটাকে তুমি বুঝতে পেরেছ জেনে ভালো লাগছে। অনাবাদি জমির ল্যান্ডস্কেপ, পাহাড়ের কোল ঘেঁষে গ্রাম চলে গেছে। বালুময় পথ, দু’ধারে মেটে রঙের ঊষর প্রান্তরে চুনকাম করা মাটির কুঁড়েঘর, শ্যাওলা ধরা ছাদ, প্রান্তরে কালো কালো কাঁটা ঝোপ, দিগন্তে সাদা এক ফালি মেঘ নিয়ে বিষণœ আকাশ। বিষয় যদিও জর্জ মিশেল-এর কাছ থেকে ধার করা তবুও এখানে মিশেলের চেয়ে আরো মহৎ ও পবিত্র অনুভূতি আছে।

প্যারিস, ২৪ জুলাই ১৮৮৫
বৃষ্টিতে লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার ব্রিজ ও পার্লামেন্ট হাউসের একটা ছবি পেয়েছি। ছবিটা দ্য নিত্তিস-এর। প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা ওখানে হেঁটে
বেড়াতাম। ওয়েস্টমিনস্টার চার্চ ও পার্লামেন্ট হাউসের পেছনে সূর্য ডোবার সময়টায় কেমন দেখায় তা আমার জানা আছে। শীতকালে ভোরবেলার তুষার ও ঘন কুয়াশা পড়া দৃশ্যও আমার খুব পরিচিত। তবুও আমার ভালোবাসার লন্ডন ছেড়ে আসা আমার জন্য ভালো হয়েছে। তোমাকে ওরা লন্ডনে পাঠাবে তা কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছি না। রকার্ট-এর ‘সিøভ টাইম অব লাইফ’ ও ‘অ্যাট মিড নাইট’-এর জন্য ধন্যবাদ। দ্বিতীয় ছবিটা শিল্পী মুসের ‘সেপ্টেম্বর নাইট’-এর কথা মনে করিয়ে দেয়।

প্যারিস, ২৫ সেপ্টেম্বর ১৮৭৫
পথ এতো সংকীর্ণ! খুব সাবধানী হতে হবে। যেখানে যেতে চাই সেখানে অন্যরা কীভাবে পৌঁছেছে তা তুমি জানো। সেই সহজ পথ আমরাও নেবো। প্রার্থনা ও প্রাত্যহিক কাজÑ আমাদের সব শক্তি দিয়ে হাতে যে কাজ আসবে তাই করবো। বিশ্বাস করবো ঈশ্বর আমাদের ভালো উপহার দেবেন।

অ্যামস্টাডার্ম, ১৮ সেপ্টেম্বর ১৮৭৭
বাবা লিখেছিলেন, তুমি অ্যান্টহবার্গে গিয়েছিলে। খুব জানতে ইচ্ছা করছে, ওখানে কী দেখলে। বহুদিন আগে জাদুঘরের পুরনো ছবিগুলো আমিও
দেখছিলাম। শিল্পী রেমব্রান্ট-এর সুন্দর পোরট্রেইটের কথা এখনো যেন মনে করতে পারি। পরিষ্কার করে জিনিসগুলো মনে রাখতে পারা অবশ্যই ভালো। কিন্তু আমার কাছে যেন একটা সুদীর্ঘপথের ছবির মতো হয়ে আছে। দূর থেকে ঝাপসা আর ছোট হয়ে চোখ আসছে। এক সন্ধ্যায় এখানে নদীতে আগুন লাগতে দেখলাম। অ্যালকোহল বা ওরকম কিছু একটা পানীয় বোঝাই স্টিমার পুড়ে যাচ্ছিল। অতোটা বিপদের কিছু ছিল না। কারণ জ্বলন্ত স্টিমারটাকে ওরা অন্য জাহাজগুলোর ভেতর থেকে বের করে নিয়ে নোঙর করার জায়গায় নিয়ে বেঁধে ফেলেছিল। আগুন যখন দাউ দাউ করে উঠতে লাগল তখন সেই সৈকত আর সেদিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কালো এক সারি মানুষ ও আগুনের চারপাশ দিয়ে ঘুরে-ফিরে চলা ছোট ছোট নৌকা দেখা যাচ্ছিল। আগুনের শিখার প্রতিফলন হচ্ছিল পানিতে। এর ভেতর নৌকাগুলোকে কালো
দেখাচ্ছিল। গ্যালারি ফটোগ্রাফিকে জ্যায়ের যে ফটোগ্রাফগুলো ছিল, তোমার মনে আছে কি না জানি না। পরে অবশ্য নষ্ট করে ফেলেছিল। ‘ক্রিসমাস ইভ’, দি ফায়ার’ এবং অন্যগুলোর মধ্যে এ দৃশ্যটির প্রভাব রয়েছে। চার্লস ডিকেন্স যে বলেছেন, ‘গোধূলির মহিমা, গোধূলি নামছে।’ কথাগুলো বাস্তবিকই যথার্থ। আসলে গোধূলির মহিমা তখনই বিশেষ করে বেরিয়ে আসে যখন একই
মানসিকতার মানুষ এবং ধর্মগুরুরা হৃদয়ের অন্তস্তÍলের পুরনো ও নতুন সম্পদ নিয়ে আলোচনা করে। গোধূলি তখনই মহিমান্বিত হয় যখন দু’জন তার নামে একত্র হয় এবং তিনি তাদের মধ্যে বিরাজ করেন। আর এই জিনিসগুলো যে জানে এবং তাদের অনুসরণ করে চলে সে সত্যিই আশীর্বাদিত।
শিল্পী রেমব্রান্ট এটা জানতেন। কারণ তিনি তার হৃদয়ের সমৃদ্ধ সম্পদ থেকে অন্যান্য জিনিসের সঙ্গে কালচে, বাদামি, কয়লা, কালি দিয়ে বেথানির বাড়ির যে ড্রইংগুলো করেছেন তা তো ব্রিটিশ মিউজিয়ামে আছে। সে বাড়িতে গোধূলি নেমেছে। সে জানালা দিয়ে আলোটুকু আসছে। তারই বিপরীতে গম্ভীর ও আঁধারাচ্ছন্নতায় মহান এবং প্রভাবিত করার মতো একটা শরীর নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন আমাদের প্রভু। যিশুর পায়ের কাছে বসে আছেন মেরি ... আর মার্থা যে ঘরের ভেতর কি না কী নিয়ে ব্যস্ত। যতোদূর মনে পড়ছে, আগুন জ্বালাচ্ছে বা ওই রকম কিছু করছে। ওই ছবি বা ওর বাণী আমি কোনোদিন ভুলবো বলে আমার মনে হয় না। ওখানে যেন বলা হয়েছে, আমি পৃথিবীর আলো। যে অনুসরণ করবে তার অন্ধকারে ঘুচে যাবে এবং সে জীবনের আলো পাবে।

দ্য হেগ, ১৫ মার্চ ১৮৮৩
আমাকে অবাক করা ঘটনাটা তো এখনো বলা বাকি। বাবার একটা চিঠি পেয়েছি। চিঠিটা আমার খুব মিষ্টি আর আনন্দের মনে হয়েছে এবং চিঠির ভেতর পঁচিশটা গিল্ডার ছিল। বাবা লিখেছেন, কিছু টাকা পেয়েছেন যার আশা তিনি ছেড়ে দিয়েছিলেন এবং তারই কিছুটা আমাকে দিতে চেয়েছেন। কত ভালো করেছেন, তাই না?
কিন্তু আমার সংকোচ লেগেছে।
অনিচ্ছা সত্ত্বেও একটা চিন্তা আমার মাথায় এলো। বাবা সম্ভবত কারো না কারো কাছ থেকে শুনতে পেয়েছেন, আমি খুব অভাবে আছি? এই উদ্দেশ্যে তিনি টাকা পাঠিয়েছেন এমন যেন না হয়। কারণ আমার অবস্থার এ রকম ধারণা করা ঠিক হবে না এবং এতে বাবার এমন সব দুশ্চিন্তা হতে পারে যা একেবারেই অমূলক। আমার কথার অর্থ বাবাকে বোঝাতে চাইলে তিনি যা বুঝবেন এর চেয়ে ভালো বুঝবে তুমি। আমার ধারণায় আমি অত্যন্ত ধনী। অর্থের দিক থেকে নয়, এই ধনী এ কারণে যে, আমার কাজের মধ্যে এমন কিছু খুঁজে পেয়েছি যার ভেতর আমার হৃদয় ও আত্মা সম্পূর্ণ দিয়ে নিবেদিত থাকতে পারি এবং তা আমার বেঁচে থাকা অর্থময় করে, অনুপ্রাণিত করে। অবশ্যই আমার মেজাজ পাল্টায়। কিন্তু মোটামুটি একটা শান্তি তো আছে। আমার নিশ্চিত বিশ্বাস আছে শিল্পে। এই যে একটা শক্তিশালী স্রোত, এই স্রোত মানুষকে আশ্রয়ের দিকে নিয়ে যায় এবং একটা মানুষ যখন তার কাজ খুঁজে পায়, সে আর দুর্ভাগাদের মধ্যে পড়ে না। যে কোনো অবস্থাতেই এটি এক বিরাট আশীর্বাদ। আমি বলতে চাইছি, আমার হয়তো আপেক্ষিক বড় বড় বিশেষ কিছু অসুবিধা আছে। দুঃখের দিনও হয়তো আছে আমার জীবনে। কিন্তু আমাকে দুর্ভাগাদের একজন মনে করাটা চাইবো না এবং তা সত্যও নয়। তুমি চিঠিতে মাঝে মধ্যে একটা কথা লেখো যা আমারও মনে হয় কখনো কখনোÑ জীবনটা কীভাবে যে চালাবো তা বুঝতে পারি না। দেখো, প্রায়ই আমার বিভিন্ন কারণে এই অনুভূতিটা হয়। কেবল আর্থিক ব্যাপারে নয়, শিল্পের ক্ষেত্রে এবং সাধারণভাবে জীবনের ক্ষেত্রে তো বটেই। কিন্তু এটিকে কি তোমার ব্যতিক্রম কিছু বলে মনে হয়? সামান্য সাহস আর উদ্যম আছে এমন প্রত্যেকেরই কি এমন মুহূর্ত আসে না? দুঃখ, যন্ত্রণা,
বিষণœতার মুহূর্ত আমার মনে হয় সবার জীবনেই আছে এবং তা সচেতন মানুষের জীবনের একটা অবস্থা। কোনো কোনো মানুষের মনে হয়, আত্মসচেতনতা থাকে না। যাদের আছে, তারা মাঝে মধ্যে দুঃখে থাকতে পারে। কিন্তু ওই কারণে তারা অসুখী নয় বা এটা তাদের জীবনের ব্যতিক্রমী কিছুও নয়। কখনো কখনো মুক্তি আসে, কখনো বা অন্তর্গত নতুন উদ্যোগ আসে এবং আবার উঠে দাঁড়ায় মানুষ শেষ পর্যন্ত। তারপর একদিন হয়তো আর দাঁড়াবে না এবং তাও অস্বাভাবিক কিছু নয়। আমি আবার বলছি, আমার ধারণায় মানুষের ভাগ্যই এ রকম। বাবার চিঠিটায় আমার একটা চিঠির উত্তর ছিল। বেশ ভালো মনে আছে, আমার চিঠিটাও আনন্দময় ছিল। কারণ তাতে আমার স্টুডিওর পরিবর্তনগুলোর কথা লিখেছি। এমন কিছু লিখিনি যাতে বাবার মনে আমি যে আর্থিক বা অন্য কোনো অসুবিধায় আছি এমন চিন্তা আসতে পারে। হয়তো বাবাও এসব কিছু লেখেননি। তার চিঠিও খুব সহজ আর উষ্ণ। কিন্তু টাকাটা এতো অপ্রত্যাশিত যে, অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমার মাথায় এই চিন্তাটা এলো, এমন কী হতে পারে, বাবা আমার জন্য চিন্তিত? আমার এ ভাবনাটা যদি ভুল হয় তাহলে এ নিয়ে লেখা অনর্থক হবে। মনে হবে যেন বাবার সহৃদয়তা আমার মনে প্রথমত. এ ধারণাটাই দিয়েছে, আসলে টাকাটা পেয়ে অত্যন্ত কৃতজ্ঞবোধ করছি। না পেলে করতে পারতাম না এমন অনেক কিছুই পারবো এ দিয়ে। কিন্তু আমার ভাবনাগুলো জানালাম। কারণ যদি তুমি দেখো, আমাকে দিয়ে বাবা চিন্তিত তাহলে আমার চেয়ে তুমি ভালোভাবে তাকে আশ্বস্ত করতে পারবে।’

দ্য হেগ, ৭ মে ১৮৮২
এবার শীতে এক সন্তানসম্ভবা মেয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছে। তার পেটে যার সন্তান সে তাকে ত্যাগ করেছে। মা হবে মেয়েটি, রুটির জন্য রাস্তায় হাঁটছেÑ বোঝো কেমন ব্যাপার! মেয়েটাকে মডেল হিসেবে নিয়েছি। পুরো শীতকাল ধরেই আমার মডেল হয়ে সে কাজ করেছে। তার পুরো পারিশ্রমিক তাকে দিতে পারিনি। তবে তার ঘর ভাড়া দিয়েছি। ইশ্বরকে ধন্যবাদ, তাকে আর তার সন্তানকে নিজের খাবার ভাগ করে দিয়ে অনাহার এবং শীত থেকে বাঁচাতে পেরেছি। তার সঙ্গে লিডেনে গিয়েছি। সেখানে একটা মাতৃসদন আছে। সন্তান হওয়ার সময় সে এখানে থাকবে। মনে হয়, যার সামান্য মনুষ্যত্ববোধ আছে এমন সব মানুষই এ অবস্থায় একই ব্যবহার করতো। যা করেছিল তা এতো সহজ আর স্বাভাবিক যে, তা কাউকে বলার দরকার আছে। মেয়েটা মডেলের পাশাপাশি আমার সঙ্গে আমার স্ত্রীসুলভ আচরণ করে। বিয়ে যেহেতু মানুষ একবারই করে, সেহেতু তাকে বিয়ে করার চেয়ে আর ভালো কী করা যায়! কারণ তাকে সাহায্য করার এটাই একমাত্র পথ। তা না হলে দুর্ভাগ্য তাকে পুরনো রাস্তায় যেতে বাধ্য করবে যার শেষ অতল খাঁদ।

প্যারিস, ১৯ ফেব্রুয়ারি ১৮৭৬
অ্যান্ডারসনের গল্পের জন্য ধন্যবাদ। এখনো আমার ‘হাইপেরিয়ান’ পড়া হয়নি। এটি এলিয়টের ‘সিনস ফ্রম ক্লারিকাল লাইফ’-এর একটা ‘অনুতপ্ত জ্যানেট’। গল্পটা এক পুরোহিতের জীবন নিয়ে। অধিকাংশ সময়ই সে এক শহরের নোংরা অলি-গলির অধিবাসীদের মধ্যে কাটায়। তার পড়ার ঘরের জানালা দিয়ে বাগানের
বাঁধাকপির ডগা ইত্যাদি চোখে পড়ে। আরো দেখা যায় গরিব ভাড়াটেদের লাল ছাদ আর ধোঁয়া ওঠা চিমনি যারা সাধারণত অসিদ্ধ মাংস ও জলোসিদ্ধ আলু খায়। চৌত্রিশ বছর বয়সে সে মারা যায়। দীর্ঘ অসুস্থতার সময় এক অপ্রকৃতিস্থ নারী তার পরিচর্যা করলো। তার ওপর নির্ভর করে সেই মহিলা রোগমুক্তি লাভ করে এবং শান্তি খুঁজে পায়। পুরোহিতের সমাধি পর্বে রয়েছেÑ ‘যারা আমাকে বিশ্বাস করে তাদের জন্য আমি পুনরুজ্জীবিত এবং জীবন, মৃত হলেও সে বেঁচে থাকবে।’
ভিনসেন্ট এই পুরোহিতের জীবনের প্রতিচ্ছবি নিজের জীবনে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করেছিলেন যেমনভাবে করেন ম্যাজিকম্যানরা। তিনিও যাজক হওয়ার জন্য দু’বার বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করেছিলেন শিক্ষার্থী হিসেবে। ১৮৫৩ সালের ৩০ মার্চ হল্যান্ডের বেলজিয়ান সীমান্তবর্তী গ্রুট জুনভার্ট-এ প্রটেস্টান্ট পল্লী যাজকের অনটনময় সংসারে ভিনসেন্টের জন্ম। ১৮৯০ সালের ২৯ জুলাই প্যারিসের ওইভরস গ্রামে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর ছয় মাসের মধ্যে শোকাহত থিউ-ও হল্যান্ডে মৃত্যুবরণ করেন। ২৩ বছর পর তার দেহবাশেষ সংগ্রহ করে ওইভরস-এ ভিনসেন্টের পাশে সমাধিস্থ করা হয়। ভিনসেন্ট উইলিয়াম-এর মৃত্যুর একশ’ বছর পর থেকে উনিশ শতকের ম্যাজিকম্যান চিত্রশিল্পের মেগাস্টারে রূপান্তরিত হয়েছেন। তার জীবনচরিত সিনেমা, উপন্যাস, নাটক, মিউজিক, প্রামাণ্যচিত্রের বিষয় হয়েছে। তার সম্পর্কে যতো গ্রন্থ রচিত হয়েছে, সমসাময়িক কালের আর কোনো চিত্রশিল্পীকে নিয়ে রেকর্ড বুকে তা নেই।
ভিনসেন্টের চিত্রকর্ম এখন ইউরোপ, আমেরিকা ও দূরপ্রাচ্যের জাদুঘর, আর্ট গ্যালারির গর্বিত সংগ্রহ। একেকটি ছবির মূল্য আমাদের কল্পনারও বাইরে। বিশ্বের সব নিলামঘর তার একটি ছবি সংগ্রহের জন্য হন্যে হয়ে ছুটছে গ্রুট জুনভাট থেকে ওইভরসে। পৃথিবীর শিল্পানুরাগী ও শিল্পোৎসাহী সাধারণ মানুষের কাছে তিনি হয়ে উঠেছেন মহাকাব্যের ট্র্যাজিডি নায়ক। ১৮৭৯ সালে ভিনসেন্টের জীবন ব্যবচ্ছেদ হয়েছে দারিদ্র্য আর সিদ্ধান্তহীনতায়। চিত্রশিল্প দিয়ে জীবিকা অর্জনের কোনো সম্ভাবনা নেই জেনেও তিনি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হলেন শিল্পী হবেন। সহোদর থিউকে লিখলেন, ‘অবশেষে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি শিল্পী হবো, অন্য কিছু নয়। চরম হতাশায় যে রঙ-তুলি নামিয়ে রেখেছিলাম তা আবার হাতে তুলে নিলাম। নিজেকে উৎসর্গ করলাম শিল্প জগতে। ম্যাজিকের মতোই বদলে গেল আমার চারপাশ।’
থিউয়ের অর্থানুকূল্যেই ভিনসেন্ট কাজ শুরু করলেন। নতুন পারিবারিক আবাস নুয়েনেনে পিতার মৃত্যুর সময় তিনি উপস্থিত ছিলেন। অ্যান্টরপে তার পরিচয় হয় জাপানিজ ছাপচিত্রকলার সঙ্গে যা চিত্রশিল্পে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। ১৯৮৬ সালে রোগপা-ুর শরীর নিয়ে প্যারিসে থিউয়ের কাছে আসেন। তার নাটকীয় জীবন উপাখ্যান আরো বর্ণময় হয়ে ওঠে। থিউ এক পৌরাণিক চরিত্র হয়ে ওঠে তার বাউ-ুলে, অবুঝ, বিশৃঙ্খল, অভিমানী ভাইয়ের শাশ্বত সম্পর্কের ছবি তুলে ধরে। থিউয়ের মাধ্যমে এবং অদম্য আগ্রহে ভিনসেন্ট শিল্পী পিসারো, সুরা, তুলজ লোত্রেক, পল গঁগ্যা, পল সেজান-এর মতো খ্যাতি ইমপ্রেশনিস্ট শিল্পীদের সঙ্গে পরিচিত হয়ে ওঠেন। অচিরেই ভিনসেন্ট হয়ে ওঠেন নাগরিক শিল্পী। ইমপেশনিজম প্রবলভাবে নাড়া দেয় তাকে। তার প্যালেট ধূসর ও ভারী রঙ বর্জন করে হয়ে ওঠে হালকা, উজ্জ্বল ও বর্ণময়। জ্যাঁ-বাপিস্ত গুইলামিন ও কামিল পিসারো দুই ইমপ্রেশনিস্ট এবং ডিভিশনিস্ট শিল্পীর অনুপ্রেরণায় তিনি উজ্জ্বল বর্ণে ছোট ছোট স্ট্রোক ব্যবহার করে আঁকতে থাকেন সিটিস্কেপ, ল্যান্ডস্কেপ, সান ফ্লাওয়ার স্টাডি। ১৮৮৬ সালে ব্রিটেন থেকে ফিরে আসা পল গঁগ্যার সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং সখ্যতা তার জন্য আরো গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। গঁগ্যার ব্যক্তিত্ব ও স্বভাবে ছিল উচ্চকিত প্রচ-তা। শিল্প বিশ্বাসে তিনি ছিলেন একরোখাভাবে আত্মবিশ্বাসী। তার কাজেও ছিল প্রচলিত সব নিয়ম উল্টে দেয়ার দুঃসাহস। তিনিই প্রথম বর্ণকে ব্যবহার করেন বস্তুর গাত্রবর্ণ চিত্রণের বদলে আবেগ ও অনুভূতির বাহন হিসেবে। বাস্তবভিত্তিক আলোছায়ার বদলে উজ্জ্বল-দীপ্ত বর্ণের সমতলীয় প্রয়োগে দৃশ্য রচনার উদাহরণও প্রথম সৃষ্টি করেছেন গঁগ্যা। ভিনসেন্ট পরবর্তীকালে তার ছবিতে রেখা, আকৃতি ও রঙের যে অগ্নিগর্ভ সম্মিলন ঘটিয়েছেন, যা তার ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে এ জন্য অবশ্যই তিনি ঋণী গঁগ্যার কাছে। ১৮৮৭ সালের শেষ নাগাদ ভিনসেন্টের কাছে প্যারিস জীবন হয়ে ওঠে ক্লান্তিকর। নাগরিক জীবন তার কাছে দুঃসহ হয়ে ওঠে। তিনি তৃষিত হয়ে ওঠেন তার প্রিয় কিষাণ ও অন্তÍজ শ্রেণীর মানুষের কাছাকাছি যেতে যাদের সঙ্গেই রয়েছে তার প্রাণের যোগ। ১৮৮৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি ফ্রান্সের দক্ষিণাঞ্চলীয় আর্লেতে চলে যান।

ইউরোপের উত্তর অঞ্চলের সঙ্গে দক্ষিণ অঞ্চলের প্রকৃতিগত বিরাট পার্থক্য রয়েছে। উত্তর হলো প্রধানত কুয়াশাচ্ছন্ন ও রৌদ্রহীন। প্রকৃতি সেখানে ধূসর ও বর্ণহীন। ভূমধ্যসাগরের কাছাকাছি দক্ষিণাঞ্চলের আবহাওয়া উষ্ণ ও রৌদ্র-আলোকময় এবং প্রকৃতি বর্ণবিভায় ঝলমলে। আর্লেতে এসে ভ্যান গগ যেন তার স্বপ্নের বিষয়বস্তুর সন্ধান পেলেন। যে রঙের উচ্ছ্বাস তিনি তার চিত্রশিল্পে ঘটাতে চেয়েছেন, এখানে প্রকৃতিই তা ছড়িয়ে রেখেছে পথ-প্রান্তরে। শুধু বেছে নিয়ে তা ক্যানভাসে রূপময় করে তোলার অবকাশ মাত্র। যে ধরনের মানুষের সান্নিধ্যে তিনি স্বস্তিবোধ করেন সেই সরল ও সজীব গ্রামীণ মানুষের দেখাও পেলেন এখানে। তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে নিতেও তার দেরি হলো না। প্রতিদিন তিনি গ্রামের মেঠোপথ ধরে অনেক দূর হেঁটে যেতেন এবং একটি বিষয় নির্বাচন করার পর রঙ-তুলি ও ক্যানভাস-ইজেল নিয়ে আবার ফিরে আসতেন সেখানে। এভাবে ঘুরে পাওয়া মানুষের মতো তিনি দিনের পর দিন এঁকে গেছেন ছবি। ক্লান্তি নেই, ক্ষুধা-তৃষ্ণা নেই, প্রখর রোদে, এমনকি একটি হ্যাটও মাথায় নেই। আর্লের পনেরো মাসে ভিনসেন্ট এঁকেছেন প্রায় অসাধ্য দুই শতাধিক তৈলচিত্র। এছাড়া কয়েক হাজার রেখাচিত্র। অবিশ্বাস্য দ্রুততার সঙ্গে আঁকা হয়েছে ছবিগুলো। তুলির উদ্দীপ্ত ক্ষিপ্র আঁচড়ে টালমাটাল সেগুলো। অথচ এগুলোর মধ্যেই রয়েছে শিল্পীর জীবনের অধিকাংশ শ্রেষ্ঠতম শিল্পকর্ম। একটি ছবিতেও নির্মাণ ও সামঞ্জস্যের বিন্দুমাত্র ঘাটতি নেই। প্রতিটি চিত্রশিল্পই গঠন সৌকার্যে শুধু নিটোল নয়, অভিনবও। উজ্জ্বল, স্পন্দিত, রক্তিম লাল, পান্না, সবুজ, রৌদ্রাভ হলুদ ও প্রদীপ্ত নীলের এমন সম্মিলনও আগে কেউ দেখেননি। ইমপ্রেশনিজমের আলোর উদ্ভাসকে অতিক্রম করে ভিনসেন্ট পৌঁছে গেছেন বর্ণের এক নবতর অর্থময়তার জগতে।

‘মাংশল তাঁবুর আবরণে সাদা হাড়ের কাঠামো/ ঘুমকাতর শরীরে অনুভূত হয় কঙ্কাল/ কবে কে প্রথিত করেছে এই নিরেট সাদা অবকাঠামো/ অর্বুদ নদীরেখার জাল বোনা রক্ত নালিকা/ অদৃশ্য এই বস্তু কাঠামো নিয়ে এতো অহঙ্কার/ বাস্তবতা তো এক সুন্দর সর্বনাশ/ অর্থ যশ ক্ষমতা অমৃৃত মন্থনে কাটে জীবন/ পাললিক হাসপাতাল থেকে লাশের মিছিলে শামিল/ আমি জীবিত না মৃত নাকি নিবিড় পর্যবেক্ষণে/ অক্ষিপটলে ঢুকে পড়ে নক্ষত্র কণা/ ঘরের আলো-আঁধারির ভিতর মাকড়সার তাঁত বোনা / মিথের ফেনায় ভাসতে থাকে ভিনসেন্টের ছবি/ মধ্যরাতে মাঘী পূর্ণিমার চাঁদ ওঠে/ স্বর্ণমেষের ডানায় চেপে পৃথিবীতে নেমে আসে স্বর্গের দেবীরা/ মানুষের চোখের আড়ালে নগ্ন হয়ে স্নান করে অধরারা/ যুগল চন্দ্র চকর জলে ভেসে ভেসে/ পান করে ধবল জ্যোৎস্না/ কর্ণকুহরে অশরীরী থিউ ভ্যান গগের কণ্ঠস্বর, ফিনিক্সের মতো ডানা চাই/ তুমি তো বেঁচে আছ, ঈশ্বরকে বলে দাও।/ আমি তার কাছে যাবো, ভিনসেন্টের কাছে যাবো, ওই নক্ষত্রলোকে।’
(‘কখনো মানুষের গান’, কাব্যাংশ-২)

Read 264 times

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…