আমার যতটুকু প্রয়োজন ঠিক ততটুকু অর্জন করি

আমার যতটুকু প্রয়োজন ঠিক ততটুকু অর্জন করি 

নাসরিন বেগম

 

সহজ : আপনার আঁকা ছবির বিষয় ও উৎস সম্পর্কে বলুন।
নাসরিন বেগম : ১৯৯৪ সালে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনে মেডিটেশন করতাম। তখন পাইওনিয়ার ব্যাচে ছিলাম। ওই সময়ের কোয়ান্টাম বর্তমান অবস্থার মতো ছিল না। ওই কোর্সের মধ্যে অনেক বিষয় ছিল। এর মধ্যে আমার যে বিষয়টি সবচেয়ে ভালো লেগেছে তা হলো মহাজাতক আমাদের বলতেন, ‘আপনাদের মধ্যে হীরা, মণি, মুক্তা, জহরতÑ সবই আছে। তবে এগুলো ছড়ানো-ছিটানো। আমি সেগুলোর মালা গেঁথে দিয়ে দিলাম।’ এই কথাগুলো আমার ভীষণ ভালো লাগতো। আরেকটি মজার বিষয় হলো স্পেইসে ভ্রমণ করানো। এটি আমার খুবই প্রিয় বিষয়। মেডিটেশনের মাধ্যমে কাল্পনিক স্পেইসে ঘুরে আবার যখন আমাদের নিয়ে আসা হয় তখন আমি সেখানেই থেকে যাই। এরপর আমাকে ধাক্কা দিয়ে ওঠানো হয়। আরেকটি হলো সমুদ্রে ভ্রমণ করানো। মহাজাতক আমাদের বলতেন, ভাবেন, আপনিই সমুদ্র। ওই সমুদ্রই আমার ছবির মধ্যে প্রধান্য পেয়েছে। সেন্ট মার্টিনসে যখন গিয়েছিলাম তখন একটা জিনিস দেখলাম, ডোবার মতো কিছু গর্ত আছে সেখানে। ভাটার সময় সেখানে বসলাম। পানির মধ্যে থাকা ছোট ছোট শামুক-ঝিনুক আমার পাশ দিয়ে ছুটে যাচ্ছে। পরে এসে তা আঁকলাম এবং রিফ্লেকশ করলাম, আমিই সমুদ্রকন্যা। সবকিছু আমাকে ঘিরেই। এ জন্য আমার সব ছবিই মেয়ে চরিত্র। আসলে সবকিছুরই পেছনে একটা ইতিহাস থাকে। আমি সাধারণত যে কোনো কোর্স করতে গেলে আমার যতোটুকু প্রয়োজন ঠিক ততোটুকু নিই। আমার স্কুল জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষার কথা যদি বলতে হয় তাহলে বলবো কোয়ান্টাম মেথডের কথা।

সহজ : চিত্রকলার মানুষ হিসেবে এর পাঠ্যকলা সম্পর্কে বলুন।
নাসরিন বেগম: আসলে আমার পাঠ্যকলা কিছুই না। সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করতাম। স্কুল থাকলে সকাল ৭টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত। স্কুল থেকে এসে নিজের কাজ নিজেরই করতে হতো।

সহজ : আপনার শিল্পকলায় আসার ব্যাপারে কার অবদান রয়েছে?
নাসরিন বেগম : আমার মা। তিনিই সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছেন। আমার মা খুবই সংস্কৃতিমনা ছিলেন। বাবা ছিলেন খুব সাধারণ মানুষ। বাবার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা ছিল না আমি কী করছি বা না করছি। আমার মা খুবই গুণী ব্যক্তি। তিনি বই পড়া, সেলাই ইত্যাদি করতেন। আরেকটা বিষয় মনে পড়ে গেল, ওরিয়েন্টাল আর্টটা এসেছে এমব্রয়ডারি থেকে।

সহজ : ছোটবেলায় কী ধবনের ছবি আঁকতেন?
নাসরিন বেগম : আমরা সবাই এমব্রয়ডারি করতাম। আমার সব বোনই তা পারতেন। ছোটবেলাতেই অ্যানামেল পেইন্টের কাজ করতাম। এ কাজ করা বেশ কঠিন। তাছাড়া আমাদের পরিবারের সবাই নিজের কাজ নিজেই করতেন। আমি এতো ছবি আঁকতাম যে, অংক করতে পারতাম না। এক সময় আমার মনে হলো, অংকে ফার্স্ট হতে হবে আমাকে। এরপর ফার্স্ট হই। এরপর থেকে অংক কষা ও ছবি আঁকা দুটিই সমানতালে চলতে থাকে।

সহজ : বর্তমান চিত্রগত প্রযুক্তির অগ্রগতি সম্পর্কে আপনার অভিমত কী?
নাসরিন বেগম : আর্ট অ্যানিমেশন সিনেমা আমার অনেক পছন্দের। মনে হয় যেন জীবন্ত। যেমন ‘আইস এইজ’ অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রের কথা বলা যাক। এর প্রতিটি চরিত্র, গ্রাফিক্স কী অসাধারণ! এটি আমার এতো ভালো লেগেছে যে, ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
সহজ : আপনার চারুকলা ইনস্টিটিউট জীবনের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বলুন।
নাসরিন বেগম : চারুকলায় ভর্তি হয়ে প্রথম যেদিন প্রথম ক্লাস করি সেদিন আমার টিচার আমাকে বললেন, সামনে যেহেতু দু’দিন চারুকলা বন্ধ সেহেতু ওই দু’দিন কোয়ার্টার শিট খাতায় দুটি ড্রয়িং এঁকে নিয়ে এসো। কিন্তু আমি একটি ছবি এঁকে নিয়ে গিয়েছিলাম। তিনি জানতে চাইলেন, একটা ছবি এঁকে এনেছি কেন। বললাম, স্যার, আমি তো কিছু রোজগার করি। তাই সময় পাইনি। এ কথা বলতে ভয় পাইনি। কারণ মানুষকে কখনো ভয় পাই না। ফলে অপ্রিয় সত্য বলতেও কখনো ভয় পাই না। ওনার ছাত্র থাকাকালে আর কোনোদিন আমাকে কিছু বলেননি। কেননা আমি খুব আন্তরিকভাবে কাজ করতাম।

সহজ : আপনার রেজাল্ট ভালো হতো কীভাবে?
নাসরিন বেগম : আমাদের ক্লাসের হলরুম ছিল ৮০ জনের। একদিকে ৪০ জন, আরেকদিকে ৪০ জন করে রুমজুড়ে আমরা বসতাম। ছবি আঁকতে না পারলে শিক্ষকদের সামনে কান্নাকাটি শুরু করে দিতাম। এরপর আমার শিক্ষকরা বলতেন, তুমি ভালো রেজাল্ট করবে, সমস্যা নেই। রেজাল্ট বের হওয়ার পর দেখি সত্যিই খুব ভালোভাবে পাস করেছি। আরেকটা বিষয় ছিল, যতোক্ষণ না সঠিকভাবে কাজ করতাম ততোক্ষণ পর্যন্ত কাঁদতাম।

সহজ : এ রকম কি কখনো হয়েছে যে, কোনো কাজ আপনি করতেই পারছিলেন না?
নাসরিন বেগম : হ্যাঁ, হয়েছে। এ রকম সময় আমি টিচারদের সামনে এসে প্রচ- কান্নাকাটি করতাম এবং বলতাম, স্যার, আমাকে দিয়ে কিছু হবে না। শিক্ষক যখন একটু দেখিয়ে দিতেন তখন হয়তো সমাধান হয়েছে। আগে একটা বিষয় ছিল, কে কোন ডিপার্টমেন্টে যাবেন তা শিক্ষকরা ঠিক করে দিতেন। এখন তা হয় না। এখন কাকে নিলে তার পলিটিকাল জায়গাটা পাওয়ারফুল হয় সেটিই বেশি দেখা হয়। মাঝে প্রায় ২০ বছর চারুকলায় ডিটেইল ওয়ার্ক ছিল না। ডিটেইল ওয়ার্ক করলেই শিক্ষকরা বলতেন এগুলো কী আঁকি? ওনারা পরিষ্কারভাবে কোনো কিছু বলতেন না। বলতেন ছেড়ে দাও, ওখানে একটু ঝাপসা করে দাও ইত্যাদি। আমি বলতে গেলে শিক্ষকদের কাছ থেকে তেমন কিছু শিখিনি। কারণ আপনি যা বোঝাবেন তা পরিষ্কার হতে হবে। যখন ৩০ বছর জীবনের আমি প্রথম ফার্স্ট ডিভিশন পেলাম তখন টিচার হলাম। আমার এখনো মনে হয়, আসলেই কি আমি ভালো ছবি আঁকতে পারি? আবার ভাবি, আমি এতো পারছি কেন? ফার্স্ট হয়েছি কেন? নিশ্চয়ই আমি ভালো ছবি আঁকি। আমার সহপাঠীদের প্রত্যেকের ছবি এঁকে দিতাম। মানে, টিচিংয়ের কাজটা আমিই করে দিতাম। আমি এটিই মনে করতাম, সবাই ভালো করুক। সবাইকে নিয়েই আমাদের এগোতে হবে। নিজে একা সামনে যেতে চাই না। কিন্তু আমার এসব চেষ্টা সফল হয়নি। আমার শিক্ষকতা জীবনটা সফল নয়।

সহজ : এমনটি হওয়ার কারণ কী?
নাসরিন বেগম : এই যে আমরা টিচার। আমাদের মধ্যে একজন ভালো হই এবং অন্য দশজন যদি তা না হন তাহলে তো হবে না। আমার ওপর অনেক বাধা আসে কেন আমি এতো দূর এলাম? এছাড়া ভাংচুর থেকে যতো প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা দরকারÑ আমার শিক্ষকতার ক্ষেত্রে তা করা হয়েছে। তবে যতো বেশি প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়েছে, আমিও ততো বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছি এবং ততো বেশি আমার রাস্তা তৈরি হয়েছে। স্টুডেন্টদের সবাই নাম্বার চায়। আমার ক্লাসমেটদের যা করে দিতাম তথা হাত, পা, চোখ ডিটেইলটাÑ ওরা কেউ তা চায়নি। আমার ডিপার্টমেন্ট বা চারুকলার বাইরে আমি যে ওরিয়েন্টে ছবি আঁকতাম সেটিতে বহু প্রতিবন্ধকতা পার হয়ে আসতে হয়েছে। আমাদের সিনিয়ররা তথা বিখ্যাত আর্টিস্টরা বার বারই বলেছেন, কেন এতো ধরে ধরে আঁকো, এগুলো কী করো? এগুলো ছাড়ো, এগুলো টিকবে না। কিন্তু ২০০০ সালে ইউরোপে গিয়ে অনেক বড় সম্মান পেয়েছি। আমাকে তারা বলেছেন, তোমার ছবিতে তোমার দেশ ও দেশের সৌন্দর্য আছে। অথচ ইউরোপ যাওয়ার আগে বিখ্যাত এক টিচার আমাকে খুব অপমান করেছিলেন। তাকে বলেছিলাম, আমি যা আঁকি তা বুঝে-শুনে আঁকি। আমার পেইন্টিংসের এ-টু-জেড, ডট, লাইন, রেখাÑ সবকিছু বলে দিতে পারবো। আপনি সেটি পারবেন না। একদিন যদি ইতিহাস লেখা হয় তাহলে আমার নাম সবার আগে যাবে। এ কথাটি ওনার ওপর প্রচ- রাগ করেই বলেছিলাম। এখন সবাই আমার জায়গায় আসতে বাধ্য হচ্ছে, বাংলাদেশে আমার স্টাইল সবাই অনুসরণ করছে। যখন ডিটেইল ওয়ার্কটা নিয়ে গবেষণা হচ্ছে, পিএউচডি হচ্ছে তখন সবাই জানতে চাইÑ পেইন্টিং ডিপার্টমেন্টে আমার অনুসারী কারা। এ জন্য এখন দেখার অপেক্ষায় আছি, সবাই কখন আমার জায়গায় আসবেন। বিদেশিরা নিজেদের কাজের মূল্য দেন। আমাদের দেশে তা দিতে চায় না। কারণ সবাই চান কীভাবে খ্যাতি এবং কতো দ্রুত অর্থের পাহাড় তৈরি করা যায়। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে তা নয়। জীবদ্দশায় কোনো স্বীকৃতি পাওয়ার আশা করি না। কেননা মনে হয়, আমার কাজ এখনো শেষ হয়নি। আরো কিছু দেয়ার আছে। তা যতো দিন না শেষ হবে ততো দিন মৃত্যুও হবে না।

সহজ : ছেলেবেলার এমন কোনো ঘটনা বলুন যা এখনো আপনাকে নাড়া দেয়।
নাসরিন বেগম : ছোটবেলার কোনো ঘটনা তেমন একটা নাড়া দেয় না। তবে ১৯৭১ সালে যুদ্ধের ৯ মাস আমরা বন্দি ছিলাম কলোনিতে। নিরাপদেই ছিলাম। কোথাও বের হইনি। আমার বাবা যেহেতু সরকারি চাকরি করতেন সেহেতু কলোনিতে তল্লাশি চালানো হয়নি। এটি একটি স্মরণীয় বিষয়। আমার ভাই পলিটেকনিকে ফাইনালের স্টুডেন্ট ছিলেন। ছবি আঁকতেন। ২ এপ্রিল মুক্তিযুদ্ধের পর পরই তিনি রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা যান। আমার ভাইয়ের বড় চুল ছিল। মা বললেন, চুলগুলো ছোট কর। কেননা ধরপাকড় শুরু হয়েছে। ভাই বললেন, ঠিক আছে, ছবি তুলে এসে চুল কাটাবো। তিন বন্ধু মিলে চুল কাটাতে গেছেন। এরপর আমার ভাই আর ফিরে আসেননি। তখন একটা বিষয় মনে হয়েছিল, আমার ভাই যদি মুক্তিযুদ্ধে গিয়ে মারা যেতেন তাহলে বড় শান্তি পেতাম। তখন মুক্তিযোদ্ধাদের কোনো সম্মান দেয়া হয়নি। অস্ত্র জমা দিতে বলা হয়েছে। এরপরও কোনো মূল্যায়ন হয়নি। শেখ মুজিবকে নানানভাবে বোঝানো হয়েছে উল্টোটা। আমরা সব বোন বড় হয়ে গেলাম। সব দায়িত্ব তখন আমাদের মা-বাবার। আমরা পাঁচ বোনের মধ্যে আমি একজন মারা গেলে কী ক্ষতি হতো, ভাইটা যদি বেঁচে থাকতেন! তখন আমার মনে হলো, ছেলে ও মেয়ে বিভেদ করা কেন? ওই হিসেবে বলবো, আমি মেয়ে হয়েও পুরুষের চেয়ে বেশি যোগ্যতা আমার। এছাড়া ছোটবেলাটা আমার জন্য তেমন কোনো আহামরি বিষয় ছিল না। খুবই সাধারণ ছিলাম।

সহজ : আপনার পেইন্টিংসে মুক্তিযুদ্ধ কীভাবে এসেছে?
নাসরিন বেগম : মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে যদি বলতে হয় তাহলে বলবো, বধ্যভূমি বা ১৪ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাকিস্তানি বাহিনী ধরে নিয়ে মিরপুর বধ্যভূমিতে যে মানুষ হত্যা করেছিল এর বাইরে ছবি আঁকতে পারি না। এতো দিন সমালোচনা হয়েছিল যুদ্ধাপরাধের বিচার হচ্ছে না ঠিকমতো। এ বিষয়ে আমার বক্তব্য হলো, মুক্তিযোদ্ধারা শহীদ হয়েছেন। কিন্তু তারা এখনো তাকিয়ে আছেন অপলক। আমরা তা শুনতে পাচ্ছি না। আমার পেইন্টিংসে এই যে গোলাকার দেখা যাচ্ছে তা হলো তাদের বিচার প্রত্যাশার আর্তি। কথাগুলো বুদ্বুদ করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এর পাশে যে পিঁপড়ার সারি দেখা যাচ্ছে তা দিয়ে বুঝিয়েছি ‘পিঁপড়া সমাজবদ্ধ শৃঙ্খল প্রাণী’। পিঁপড়ার সঙ্গে মানুষের অনেক মিল আছে। কিন্তু পিঁপড়ার সুশৃঙ্খলতার এ শিক্ষাটা আমরা নিচ্ছি না। এখানে পিঁপড়া রূপক হিসেবে এসেছে। বাঙালিদের সবই আছে এবং আমরা অনেক সমৃদ্ধ। তবে আমাদের মনটাই ছোট।

 

ছবিঃ শোভন আচার্য্য অম্বু 

Read 322 times

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…