ঐতিহ্যবাহী কাঁসাশিল্পের সেকাল-একাল

ঐতিহ্যবাহী কাঁসাশিল্পের সেকাল-একাল

নূর কামরুন নাহার

 

বাঙালির ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক বিশাল অংশজুড়ে রয়েছে প্রাচীন চারু ও কারুশিল্প। নন্দনতাত্ত্বিক দিক দিয়েও এই চারু ও কারুশিল্পের রয়েছে ব্যাপক গুরুত্ব। বগুড়ার মহাস্থান গড়, কুমিল্ল¬ার ময়নামতি এবং অতি সম্প্রতি নরসিংদী জেলার ওয়ারী বটেশ্বরীর খননকার্য এই প্রতœতাত্ত্বিক প্রমাণের নিশ্চয়তা প্রদান করেছে। খ্রিস্টপূর্ব আনুমানিক ৫০০ অব্দ থেকে প্রাচীন বঙ্গের অধিবাসীরা মৃৎশিল্প, লৌহ নির্মিত হাতিয়ার, কাঠের তৈরি সামগ্রী, ধাতব বিভিন্ন কৃষি সামগ্রী, ধর্মীয় ও গৃহকর্মের জন্য নানা সামগ্রী প্রস্তত করতো। ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে এগুলো যেমন বাংলার হাজার বছরের সংস্কৃতি ও বিবর্তনের সাক্ষ্য বহন করে তেমনি
মানুষের সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক অবস্থান এবং তাদের আধ্যাত্মিক ও বৌদ্ধিক বিকাশও প্রতিফলিত করে।
চারু ও কারুশিল্প সামগ্রীকে মোটা দাগে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায় Ñ
ক. দৈনন্দিন কাজে ব্যবহৃত সামগ্রী
খ. ধর্মীয় ও উৎসব-অনুষ্ঠানের সামগ্রী
গ. ব্যক্তিগত সাজসজ্জার সামগ্রী
ঘ. সম্প্রদায় বিশেষের জন্য স্থাপত্যশিল্প (যাযাবর, আদিবাসী, পশুপালন, কৃষি)
ঙ. গ্রামীণ বা কোনো সম্প্রদায়ের জন্য স্থাপনা
চ. ব্যবসা-বাণিজ্যের কাজে ব্যবহৃত সামগ্রী (ধাতব মুদ্রা ইত্যাদি) এবং
ছ. দৃষ্টিনন্দন (আনন্দ, উৎসব ও উপভোগের সামগ্রী)। এসব শিল্পকর্মে যাজক সম্প্রদায়, রাজা ও ধনাঢ্য শ্রেণীর পৃষ্ঠপোষকতা ছিল। তামা, ব্রোঞ্জ, পিতল, কাঁসার তৈরি এসব শিল্পকর্মের নানান উদ্দেশ্য ও ব্যবহার থাকলেও এগুলো বাংলার জীবন আচরণ, সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং বাংলার ঐতিহ্য প্রকাশ করে।
প্রাচীন তৈজসপত্র বাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে কাঁসার তৈজসপত্র। একটা সময় ছিল যখন কাঁসা-পিতলের তৈজসপত্র বাড়ি ও বংশের ঐতিহ্য প্রকাশ করতো। অবস্থাপন্ন গৃহস্থ ও বনেদি ঘরে প্রত্যেকের নির্দিষ্ট কাঁসার থালা ছিল। এসব কাঁসার থালা ও সামগ্রীর কোনো
কোনোটির ওপর থাকতো বাহারি নকশা। বাড়ির কর্তার থালাটি হয়তো থাকতো একটু বড় অথবা বেশি কারুকার্যময়। এতে সংসারে কর্তার কর্তৃত্বকে প্রকাশ করতো। কাঁসার এসব সামগ্রী শুধু নিত্যপ্রয়োজনে ব্যবহার করা হতো তা নয়, এগুলো মানুষের শৌখিনতাও প্রকাশ করতো। এসব জিনিসে অনেক সময় ব্যবহারকারীর নাম উৎকীর্ণ করা থাকতো। প্রত্যেকের ঘরেই তখন শোভা পেতো কাঁসার থালা, বাটি, জগ, গ্লাস, পাতিল, গামলা, কলসি, বালতি, পানদানিসহ নানান কিছু। অনেকে কাঁসার তৈরি শৌখিন হুঁক্কাও ব্যবহার করতেন। এমনকি ইঁদারা ও কুয়ার পাড়ে কাঁসার বদনা ব্যবহার হতো। বিয়ে-শাদির অনুষ্ঠানে কাঁসার জিনিসপত্র উপহার দেয়া ছিল বাংলার এক ঐতিহ্যবাহী রেওয়াজ। যাকে উপহার দেয়া হতো তার নাম এবং যিনি উপহার দিতেন তার নাম খোদাই করা থাকতো এসব সামগ্রীতে। শিল্পের মর্যাদায় কাঁসা এতোটাই উপরে ছিল যে, কারো ঘরের আভিজাত্য নির্ণিত হতো বাড়িতে রক্ষিত কাঁসার তৈজসপত্র দেখে। দেশের প্রতিটি শহর ও গ্রামে কাঁসাশিল্পীদেরও ছিল বেশ নামডাক। এই শিল্পীদের আলাদা মর্যাদাও ছিলো সমাজে। এই শিল্পীরা কে কতো নিখুঁত ও ঝকঝকে কাঁসার বাসন বানাতে পারেন এর প্রতিযোগিতা হতো।

কাঁসা শিল্প
শিল্পীদের নিবেদন, একনিষ্ঠতা ও প্রতিযোগিতা কাঁসা শিল্পটিকে নিয়ে গিয়েছিল বহুদূর। ইতিহাসের ওই পটভূমিতে দেখা যায় কয়েক হাজার বছর আগে কয়েকটি সভ্যতাজুড়ে রয়েছে এই কাঁসা শিল্প। এর প্রমাণসরূপ প্রতœতত্ত্ববিদরা দেশের অনেক স্থানে খনন করে আজও কাঁসার জিনিস পাচ্ছেন। টাঙ্গাইল, ধামরাই, ঢাকা, মুন্সীগঞ্জ, বিক্রমপুর, মানিকগঞ্জ, নরসিংদী, পাবনা এলাকা ছিল কাঁসার জিনিসপত্রের অন্যতম এলাকা। বিশেষ করে বাংলাদেশের টাঙ্গাইল ও ঢাকার ধামরাই ছিল কাঁসা শিল্পের সূতিকাগার। এছাড়া দেশের প্রতিটি কোণায় গড়ে উঠেছিল কাঁসা শিল্প। টাঙ্গাইল ও ধামরাইয়ের কাঁসা সামগ্রী রফতানি হতো বিদেশেও। সুন্দর কারুকাজ, নান্দনিক ও গুণগত মানে এ দেশের কাঁসার জিনিসপত্র এতোটাই নাম কুড়িয়েছিল যে, ব্রিটিশ শাসকরা কাঁসাশিল্পীদের প্রশংসা করে পুরস্কার ও পদক দিয়েছিল। তাদের মধ্যে আছেন টাঙ্গাইলের মধুসূদন কর্মকার, গণেশ কর্মকার, বসন্ত কর্মকার, যোগেশ কর্মকার ও হারান কর্মকার।

কাঁসা শিল্পের পূর্বকথা
বাংলাদেশ বা অবিভক্ত বাংলায় কাঁসা-পিতলের প্রচলন কবে শুরু হয়েছিল তা সঠিক করে বলা যায় না। প্রতœতাত্ত্বিকদের মতে, প্রাচীন সভ্যতার আমলে ব্রোঞ্জ শিল্প ব্যবহার থেকেই এর শুরু। আবার কেউ কেউ এটিকে মহাস্থানগড়ের সভ্যতার সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছেন। ১৫৭৬-১৭৫৭ সনে মোগল আমলে এ
উপমহাদেশে ব্যাপকভাবে কাঁসা-পিতলের ব্যবহার শুরু হয়। এসব ধাতু দিয়ে ঢাল, তলোয়ার, তীর-ধনুক তৈরি করা হয়। ব্রিটিশ আমলেও এ শিল্পের প্রসার ঘটে। তবে বলা হয়, রাজা গৌড় গোবিন্দের শাসন আমলে উপমহাদেশে ভারতের কংস বণিকদের মাধ্যমে এই দেশে কাঁসা শিল্পের প্রচলন হয়। ওই হিসাবে কংস বণিকরাই কাঁসা শিল্পের উদ্ভাবক।

একটা সময় সব ধর্মের মানুষের কাছে কাঁসা শিল্প ছিল জীবন যাপনের অংশ। সব আচার-অনুষ্ঠানের মর্যাদা বাড়িয়ে দেয় কাঁসার ব্যবহার। মণিকাররা যেমন গহনা বানানোর কারিগর হিসেবে গর্ব করতেন তেমন কাঁসার শিল্পীরাও বনেদিদের আভিজাত্য রক্ষায় গর্ব করতেন। কাঁসার তৈরি ভাস্কর্য প্রচুর সুনাম কুড়ায়। প্রাচীন জিনিসপত্র ও ভাস্কর্য দেখে ধামরাইয়ের শিল্পীরা প্রথমে কাঁসা দিয়ে নানান ভাস্কর্য বানান। এরপর পিতল ও তামার ব্যবহার শুরু করেন। এখন পর্যন্ত কাঁসা, তামা, পিতল দিয়ে ছোট-বড় ভাস্কর্য ধামরাইয়েই বানানো হচ্ছে। রথযাত্রার ওপরও বড় ভাস্কর্য বানিয়েছেন ধামরাইয়ের কাঁসা শিল্পীরা।

অলঙ্কার ও শোপিস সামগ্রী
সোনা-রুপা অলঙ্কারের সঙ্গে তামা-পিতল অলঙ্কারেরও ব্যবহার ছিল এক সময়। এছাড়া পিতলের ফুলদানি, আতরদানি, ট্রে, বিভিন্ন শোপিসের প্রচলন ছিল। গ্রামের কারিগর পাতা, ফুল, পাখি, মাছ, চাঁদ, তারা ইত্যাদির অবিকল নকল করে এক বিশেষ ধরনের অলঙ্কার তৈরি করতেন। পিতল দিয়ে অবিকল বিভিন্ন প্রাণীর অবয়বে তৈরি করা হতো নানান শোপিস। অতীতে অলঙ্কার ও শোপিস সামগ্রী তৈরি একটি পারিবারিক পেশা ছিল। কারিগররা মন্দির ও বিভিন্ন উৎসব-অনুষ্ঠান ও সমৃদ্ধ পরিবার-পরিজনের জন্য হাতে তৈরি সোনা, রুপা, পিতল ইত্যাদি সামগ্রীÑ আতরদানি, গোলাপ জলের পাত্র, চামচ, পানির বোল বা গামলা ও তরবারির খাপ ইত্যাদি তৈরি করতেন।

আধুনিকতার ছোঁয়ার বিলুপ্ত কাঁসা-পিতলের ঐতিহ্য
সত্তরের দশকের মধ্যভাগে সিরামিকের ব্যাপক ব্যবহার শুরু হওয়ায় কাঁসার সামগ্রীর ওপর প্রথম বড় আঘাত আসে। সিরামিকের প্লে¬ট, গ্ল¬াস, কাপ, পিরিচ, জগ নিম্নবিত্ত থেকে উচ্চবিত্তের ঘরে প্রবেশ করে। আসে বাহরি ডিনারসেটসহ বিশেষ ধরনের সিরামিক সামগ্রী ও কাচের তৈরি বাসনে-কোসন। এছাড়া আসে স্টিলের নানান সুন্দর বাসন-কোসন।
আশির দশকে সিরামিক আর স্টিলের সঙ্গে পাল্লা দিতে আসে মেলামাইন। রকমারি ও নজরকাড়া ডিজাইনে সিরামিক, মেলামাইন ঘরে ঘরে প্রবেশ করে কাঁসাটি হটিয়ে দেয়। নতুন প্রজন্মের কাছে কাঁসার বাসন-কোসন হয়ে পড়ে অচেনা। কালেভদ্রে কোনো বাড়িতে এখন কাঁসার যে জিনিস দেখা যায় তা অ্যান্টিকস হিসেবেই সংরক্ষিত। এসব জিনিস হয়তো স্মৃতিকাতরতা আনে। এগুলোর সঙ্গে হয়তো জড়িয়ে আছে পূর্ব পুরুষদের স্মৃতি।

কাঁসাশিল্পীদের দুর্দিন
কামারের হাতুড়ির আওয়াজে যে গ্রাম আর বাজারগুলো মুখরিত হয়ে থাকতো এক সময়Ñ সেগুলো এখন নীবর এবং কারিগরশূন্য হয়ে জানান দিচ্ছে কাঁসা শিল্পের চরম দুগর্তির কথা।
কাঁসার নির্বাসনে এবং নানান প্রতিকূলতায় কাঁসাশিল্পে নিয়োজিত প্রায় আশি হাজার থেকে এক লাখ কারিগরের ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই অনিশ্চিত। এরই মধ্যে বহু শ্রমিক পেটের দায়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন। অনেকে জীবিকার অন্বেষণে চলে গেছেন পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে। হিন্দুদের বিয়ে-শাদি ও পূজা-পার্বণে কাঁসার ব্যবহারটি পূত-পবিত্র বলে বিশ্বাস করা হয়ে থাকে। বর্তমানে ঢাকার জিঞ্জিরা, ধামরাই, মানিকগঞ্জ, নরসিংদী ও বিক্রমপুরে কাঁসা শিল্প কোনোমতে টিকে আছে।
কাঁসাশিল্পীরা বলেন, এককালে কাঁসা শিল্পের চাহিদা ছিল এবং মানমর্যাদা ছিল শিল্পীদের। ভাগ্যের দুর্বিপাকে এ পেশায় নেমে এসেছে দুর্দিন। মনোরম চোখ ধাঁধানো আকর্ষণীয় স্টিলের সামগ্রী, মেলামাইন ও দেশ-বিদেশের নজরকাড়া কাচের রকমারি সামগ্রীর কারণে কাঁসা শিল্প চরমভাবে মার খাচ্ছে। এছাড়া অন্যান্য সামগ্রীর তুলনায় কাঁসার মূল্য তুলনামূলকভাবে বেশি। এ কারণেও ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। অন্যদিকে কাঁচামালের মূল্যও অত্যন্ত চড়া। ফলে আগের মতো আর পুষিয়ে উঠতে পারছেন না কাঁসারুরা।
কাঁসাশিল্পীরা জানান, তারা ঢাকার বকশীবাজার থেকে ২০০-২২০ টাকা কেজিতে কাঁচামাল কিনে নানান সামগ্রী তৈরি করে তা বিক্রি করেন মাত্র ২৭০ টাকায়। তবে পাইকাররা তাদের কাছ থেকে কম দামে কিনলেও বেশি দামে বিক্রি করেন।
শত প্রতিবন্ধকতা আর চরম হতাশার মধ্যেও কাঁসাশিল্পীরা সযতেœ কাঁসা দিয়ে কলস, বাটি, বালতি, পানদানি, প্রদীপ, ফুলের টব, গামলা, তবলা, ডিশ, থালা-বাসন, মূর্তি ও দাঁড়িপাল্লাসহ সৌন্দর্যবর্ধক নানান সামগ্রী তৈরি করে তা বাজারজাত করছেন। এই শিল্পে ভর করে এখনো দেশের হাজার হাজার কাঁসাশিল্পী বেঁচে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন।

কাঁসা শিল্পের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ
তামা-পিতলে শুধুই বাসন-কোসনই নয়, এই তামা-পিতলে তৈরি হতে পারে নিঁখুত সব ভাস্কর্য। এরই বাস্তব প্রমাণ ঢাকা থেকে মাত্র ২০
কিলোমিটার উত্তরে ধামরাইয়ে।
সত্তরের দশক পর্যন্ত সত্যিকারেরর অ্যান্টিকই কেনাবেচা হতো ধামরাইয়ে। অ্যান্টিক যখন শেষ হয়ে যেতে লাগলো তখন এর মতো ভাস্কর্য তৈরি ও বিক্রি করার আগ্রহ বাড়তে থাকে। এ আগ্রহ থেকেই আশির দশকে এখানে কাঁসা-পিতলের ভাস্কর্য নির্মাণ করা শুরু হয়। আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে এ ভাস্কর্য খুব বেশি আলোচিত না হলেও প্রতি বছর ধামরাইয়ের এই তামাপল্লী ঘুরে দেখে গেছেন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ভাস্কর্যপ্রেমীরা।
ধামরাই মেটাল ক্রাফটের স্বত্বাধিকারী সুকান্ত প্রায় ২২ কর্মীকে নিয়ে মূর্তি গড়ার কাজ করে থাকেন। তামা দিয়ে নিখুঁত নারীমূর্তি, দাবার ছক, হাতির পিঠে রাজাÑ এমন দুর্লভ ও নান্দনিক ভাস্কর্য তৈরি করেছেন তিনি। যে বিশেষ ভাস্কর্যটি তৈরি করা হবে মোম দিয়ে এর একটি অবয়ব বানানো হয়। এরপর এতে নানান নকশা ও সুক্ষ্ম কারুকাজগুলো ফুটিয়ে তোলা হয়। এরপর মোমের ওই মূর্তির ওপরে দেয়া হয় তিন স্তরের মাটির প্রলেপ। এরপর তা পোড়ানো হয়। ভেতর থেকে মোমের মূর্তিটি গলে বেরিয়ে আসে। থেকে যায় শুধু মাটির ছাচে মোমের মূর্তির প্রতিবিম্ব। এরপর ওই মাটির ছাঁচে গলিত তামা ঢুকিয়ে তৈরি করা হয় এই ভাস্কর্যগুলো। বর্তমানে এই ভাস্কর্যগুলোর প্রধান ক্রেতা হলো বিদেশি ভাস্কর্য ব্যবসায়ীরা।
সুকান্ত বণিক জানান, মাত্র ৮০০ ডলারে কেনা মূর্তিগুলো বিদেশিরা ওয়েব সাইটের মাধ্যমে ৫ হাজার ডলার পর্যন্ত দাম চড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করছেন। ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই শিল্পের চাহিদা আছে ব্যাপক। ভারতে এ ধরনের মূর্তি তৈরি হলেও উৎপাদন পদ্ধতি খুব বেশি বাণিজ্যিক হওয়ায় তাদের ওইগুলো আমাদের দেশের ভাস্কর্যের মতো এতোটা নিঁখুত হয় না। তিনি জানান, এক ফরাসি পর্যটকের কাছে ৪ লাখ টাকায় বিক্রি করেন তামা-কাঁসায় গড়া একটি শীতলা মূর্তি। দক্ষ হাতে গড়া অসাধারণ কারুকার্যময় ওই পৌরণিক ভাস্কর্যের রেপ্লিকায় মুগ্ধ ফরাসি পর্যটক দেশে ফিরেই আরো ছয়টি কাজের ফরমায়েশ পাঠান। সেগুলো ফ্রান্সে পাঠানোর সময় বিমানবন্দরের শুল্ক বিভাগ পুরাকীর্তি বলে সন্দেহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠায় সরকারের পুরাতত্ত্ব বিভাগে। এক বছর পর সেগুলো পুরাকীর্তি নয় বলে ছাড়পত্র দেয়া হয়। কিন্তু দীর্ঘ বিলম্বে হতাশ ওই ফরাসি পর্যটক এরই মধ্যে বাতিল করে দেন অর্ডার।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমাদের মেটাল হাউসের নামে রফতানি লাইসেন্স আছে। সব ভাস্কর্যের গায়ে নিয়ম অনুসারে খোদাই করে কারখানা ও উৎপাদনের তারিখও দেয়া থাকে। এরপরও পুরাকীর্তি পাচারের বিষয় আসে কী করে? পাশের দেশ ভারত, নেপালে
একদিনের মধ্যে এসব পণ্যের ছাড়পত্র দেয়া হয়। আমাদের দেশে বড়জোর এক সপ্তাহ লাগতে পারে। তাই বলে এক বছর কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’
ধামরাইয়ের আরেক কাঁসারু প্রকাশ বণিক বলেন, ‘আমাদের এখানে লস্ট ওয়াক্স পদ্ধতিতে এগুলো তৈরি করা হয়। তা পুরোটাই দক্ষ হাতের শৈল্পিক কাজ। এ কারণে আমাদের সামগ্রীগুলো বিদেশিদের কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয়।

হিন্দু দেব-দেবী ও পৌরণিক চরিত্রের রেপ্লিকা বা ভাস্কর্য তৈরির মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়ানো পথে হাঁটছে এই শিল্প। এসব চরিত্রই কেবল গড়া হচ্ছে না, ঘরসজ্জার নান্দনিক উপকরণও তৈরি হচ্ছে ধামরাই এবং পাশের শিমুলিয়ায়। কারিগররা নিপুণ হাতে সৃষ্টি করছেন গৃহসজ্জার উপকরণ, পশু-পাখির মূর্তি, দাবার ছকসহ শৈল্পিক পণ্য। দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যেও এ পণ্যগুলো চাহিদা বাড়ছে।
তামা-পিতল, কাঁসা ও অষ্টধাতুতে গড়া শিল্পকর্মগুলো নিয়ে কোনো প্রচার বা উদ্যোগ নেই। এই ধরনের তামা-পিতলের ভাস্কর্য বানানোর প্রয়াস আমাদের দেশে ধামরাই ছাড়া আর কোথাও নেই। অবশ্য ব্রাক্ষণবাড়িয়ায় কিছু শিল্প তৈরির প্রয়াস থাকলেও তা কেবল নান্দনিক বাসন-কোসনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। রফতানি ছাড়পত্রের জটিলতায় এই শিল্পের বিকাশ বিঘিœত হচ্ছে বলে মনে করেন এই শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা।
পুরাকীর্তি পাচারের অভিযোগে আটক হওয়ার ভয়ে ব্যক্তিগত উদ্যোগে অভিবাসী বাংলাদেশিরাও তামা-কাঁসায় গড়া শিল্পপণ্য বিদেশে নিতে সাহস দেখান না। প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র পেতে কখনো কখনো সময় লাগে এক থেকে দেড় বছর। ফলে বিদেশের বাজারে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও এ পথে পা মাড়াচ্ছেন অনেক আগ্রহী উদ্যোক্তা। কিন্তু কারুকাজ ও শিল্প সৌন্দর্যে আমাদের দেশের কাঁসারুরা অদ্বিতীয়। কারণ নানান
প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বংশ পরম্পরায় দক্ষ এক শিল্পী সম্প্রদায় যুক্ত আছেন এ পেশায়। রফতানি বাজারে এ শিল্প দিয়ে দারুণভাবে অবস্থান করে নিতে পারে বাংলাদেশ। কিন্তু তা এখন পর্যন্ত পড়ে আছে অবহেলায়। সরকার এ শিল্পের প্রসারে বিশেষ নজর দিলে এটি তার হারানো ঐতিহ্য ফেরত পাওয়াসহ দেশের সুনাম ছড়িয়ে দিতে পারে। ওই সঙ্গে আনতে পারে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা।

 

ছবিঃ শোভন আচার্য্য অম্বু 

Read 375 times

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…