মৃৎশিল্পের স্বরূপ সন্ধান

 মৃৎশিল্পের স্বরূপ সন্ধান

ফয়সাল শাহ

 

বাংলাদেশের লোক-ঐতিহ্যের গৌরবময় সুবিশাল ক্ষেত্রের মৃৎশিল্প অন্যতম। বস্ত্রশিল্পের তাঁত ও তন্তুজাত সৃষ্টিশীলতা, বাঁশের কাজ, লোহা এবং পিতলের কাজ, দারুশিল্প, দড়ি ও বেতের কাজ, পাটজাত দ্রব্যের বহুবিধ ব্যবহারিক কাজের জন্য শিল্প, নকশিকাঁথা শিল্প, লোকজ-স্থাপত্য, রন্ধনশিল্প, নৃত্য-সঙ্গীত, চিত্রশিল্প, সাহিত্য কাব্যÑ মোট কথা, জীবনযাপনের জন্য সাধারণ মানুষের আবেগ, নান্দনিকতা, ব্যবহারিকতা, উপযোগিতা ও উপস্থাপনাসহ একটি সম্পূর্ণ এবং যথার্থ চলমান শিল্পস্রোত আধুনিক শিল্প বহুলাংশে প্রাগুপ্ত ধারা থেকে নিজের জন্য হাত বাড়িয়ে সাহায্য গ্রহণ করে একটি নতুন উপস্থাপনায় হাজির হয়ে ওই শিল্পের একটি নান্দনিক মাত্রা অর্জনে সহায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়।

যে কোনো দেশের চিত্রশিল্পে সাধারণত দুটি মূল ধারা বিরাজ করে। একটি সনাতন বা লোকজ শিল্প। অন্যটি হচ্ছে সময়ের প্রতিঘাতে আস্তে আস্তে সম্প্রসারিত ও বিবর্তিত সাম্প্রতিক বা আধুনিক শিল্পধারা। একটি অপ্রাতিষ্ঠানিকÑ যুগে যুগে প্রবাহিত সাধারণ মানুষের দ্বারা পালিত ও চর্চিত হয়ে থাকে প্রায় অপরিবর্তিত ধারার শিল্প। তাদের জীবনধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, সামাজিক ঘটনাবহুল আচার-বিচার, বাদ-প্রতিবাদ, জীবন-সংগ্রাম, অন্যায়-অবিচার নিয়ে কাঁচা হাতে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ চিত্র। অন্যটি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিয়ে আগুয়ান প্রাচ্য-প্রতীচ্য আধুনিক জগতের সাম্প্রতিক ইঈিতময় কিংবা বুদ্ধিদীপ্ত মননশীল চিন্তা, বোধ ও উপস্থাপনা দ্বারা একটি যুগোপযোগী শিল্পধারা। এ দুটি ধারা আপাতদৃষ্টিতে ভিন্নমুখী হলেও দ্বিতীয় ধারা সব সময়ই প্রথম ধারাটি দ্বারা প্রভাবিত ও নির্ভরশীল। কিন্তু প্রথম ধারা কখনো দ্বিতীয় ধারার ওপর নির্ভর করে চর্চিত হয় না। তাই আবহমান বাংলার লোকজশিল্প গভীর জীবনভেদী একটি চলমান স্রোত। এটি নীরবে-নিভৃতে কারোর প্রতি দৃষ্টি বা মুখাপেক্ষী না হয়ে একমনে অন্তস্থিত একটি নদীর ফল্গুধারার মতো স্রোতোস্বিনী হয়ে বয়ে যায় কালে কালে। তা বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির একটি ঋদ্ধিমান অবস্থানের অস্তিত্ব প্রমাণ করে। লোকজশিল্প সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এটিকে বাদ দিয়ে তাদের জীবন চলে না। এ জন্য বাংলাদেশের লোকশিল্প খুবই শক্তিশালী ও ঐতিহ্যময় এবং গৌরবের। যেহেতু এটি মৌলিক, আদি ও স্বয়ম্ভূ সেহেতু বহুমাত্রিক। আধুনিক শিল্পের বিকাশ লোকজধারা থেকে আস্তে আস্তে পরিবর্তিত, পরিমার্জিত, বিবর্তিত, উন্মেষিত ও পরিশীলিত হয়ে হয়ে বর্তমান অবস্থায় এসে পৌঁছেছে। পৃথিবীর বিভিন্ন সভ্যতায় প্রাপ্ত শিল্প নিদর্শনের নান্দনিক ও ব্যবহারিক শিল্পের বিভিন্ন ফর্ম দ্বারা উৎসাহিত হয়েছে, ঐতিহ্যটিকে সম্মান জানিয়ে নিজের মতো নতুনতর সময়োপযোগী শিল্প নির্মাণে বিভিন্ন মাধ্যমে জগৎবিখ্যাত সব শিল্পীদের মধ্যেই দেখা যায়। ঐতিহ্য থেকে প্রাপ্ত নিদর্শনের মৌলিক নান্দনিক ও দার্শনিক গুণাবলির সঙ্গে এভাবেই শিল্পীরা একান্তেই নিজস্ব শিল্প আদর্শের ভাবনার উদ্বুদ্ধ হয়ে নতুন কিছু তৈরি করে একদিকে যেমন শিল্প ভাস্করটিকে সমৃদ্ধ করেছেন, অন্যদিকে তেমনি তাদের তৈরি শিল্প মানুষের কল্যাণে মৌলিক রুচি ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনে এগিয়ে নিয়েছেন বিশ্বটিকে। গুহাচিত্রের সহজ-সরল ধারা আধুনিক শিল্পে ব্যবহৃত হয়েছে। মোট কথা, লোকজশিল্প হচ্ছে শিল্পের আদি ও মূল আধার। সেখান থেকে ধারণা, শৈলী, পরিসর ও আঙ্গিক এবং বিষয়বস্তু আহরিত হয়ে থাকে। আমাদের দেশে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, এসএম সুলতান, কামরুল হাসান, শফিউদ্দিন আহমেদ, রশিদ চৌধুরী, কাইয়ুম চৌধুরী প্রমুখ শিল্পী বাংলার লোকজশিল্পধারা থেকে উৎসাহিত হয়েছিলেন। শিল্প নির্মাণে তৈরি হয়েছিল লোকশিল্প মিশ্রিত এক নতুন ধারা। এ দেশের শিল্পীরা স্বাধীন চেতনায় উদ্ধুদ্ধ হয়ে লোক-ঐতিহ্যের বিভিন্ন গুণের বহুবিধ উপাদান-উপকরণ সঙ্গে নিয়ে প্রকাশ করেছেন আধুনিক ভাবধারার শিল্প। তারা ঐতিহ্য রক্ষা করতে সচেষ্ট হয়েছেন। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, এসএম সুলতান, কামরুল হাসানের মতো মহান শিল্পীরা দেশের সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনাটি মূর্ত করেছেন। তাদের শিল্পে মানবতার জয়গান মুখরিত হয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাংলার মানব-মানবী, এ দেশের মূল উৎপাদক কৃষকসহ খেটে খাওয়া মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বিষয়াবলির অন্তর্নিহিত শক্তি।

বাংলার পুতুল, মাটির বহুবিধ পাত্র, গ্রামের নারী, মানুষ, পশু-পাখি, নিসর্গ দৃশ্য থেকে তারা অনায়াসে সহজ-সরল রেখা ও রঙগুলো নিয়ে নিজস্ব শিল্প সৃষ্টি করেছেন। প্রকৃতপক্ষে চিত্রশিল্পে নিজের দেশের শিল্প-নির্যাস শিল্পীর সৃষ্টিশীলতায় ধরা পড়বেই এবং সেটি চিত্রশিল্পের মান বিচারে অন্যতম একটি নান্দনিক মাত্রা গঠন করতে সাহায্য করে। প্রতিটি শিল্পমাধ্যমে এই দেশজ সময়, সমাজ, আবহাওয়া ও উপাদানের ব্যবহার প্রভূতভাবে হয়ে থাকে।

প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে লোকশিল্প চর্চা চলে আসছে দুনিয়াব্যাপী। তবে অষ্টাদশ শতাব্দীর আগেকার শিল্প নিদর্শন বড় একটা খুঁজে পাওয়া যায় না। আমাদের দেশে প্রতœ খননের ফলে প্রাপ্ত মহাস্থানগড় তথা প্রাচীন পূর্ণবর্ধনে খ্রিস্টীয় প্রথম থেকে চতুর্থ শতকে প্রকৃতির বিভিন্ন নকশার ছাপ দিয়ে তৈরি করা সুন্দর ধূসর ও লাল রঙের মৃৎপাত্র লোকশিল্পের প্রাচীনতম নিদর্শন। আমাদের কলমি পুঁথিতে মন্ত্র-তন্ত্রের ছক আঁকা দেখা যায় পঞ্চদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে, পুঁথিচিত্র দেখা যায় ১৮০৫ সালে রচিত নারায়ণ দেবের মনসামঙ্গলে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পা-ুলিপি বিভাগে তা সংরক্ষিত আছে। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকের গ্রিক প-িত হেরোডোটাসের কাল থেকে লোকঐতিহ্য সম্পর্কে কৌতূহলের প্রমাণ পাওয়া গেলেও কোনো দেশের, বিশেষ করে স্বদেশের অসংস্কৃত অতীত (ঠঁষমধৎ অহঃরয়ঁরঃরবং) সম্পর্কে অনুসন্ধান ছেলেমি বলে বিবেচিত হতো।

শিল্পকলার বিভিন্ন শাখাÑ মৃৎশিল্প, ভাস্কর্য, স্থাপত্য, চিত্রকলায় নবোপলীয় মানুষ কিছু প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছে। তখন সবচেয়ে এগিয়ে গিয়েছিল মৃৎশিল্প। মিসর, ইরাকের জারমো, ইরানের সিয়াংক, আনাতোলিয়া ও গ্রিসের নবোপলীয় মৃৎপাত্র এর সাক্ষ্য বহন করে। চাকার আবিষ্কার নবোপলীয় যুগের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কুমারের চাকা যে চক্রাকার গতিতে কাজে লাগানো হয় তা পরবর্তী সব সভ্যতার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। এখনো গ্রামবাংলার কুম্ভকার সম্প্রদায়ভুক্ত মৃৎশিল্পীরা ওই চাকে নির্মাণ করে চলেছেন মৃৎপাত্র।
প্রাচীনকাল থেকে মৃৎপাত্র তৈরির প্রধান মাধ্যম ছিল মানুষের হাত। বড় পাত্র তৈরির জন্য প্রয়োজন হতো পাটি অথবা চাঁটাই-জাতীয় দ্রব্য। সভ্যতার বিকাশ ও মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নির্মাণ পদ্ধতির পরিবর্তন হয়। বিভিন্ন উপাদান-উপকরণের আবিষ্কার ও উদ্ভাবনের ফলে মৃৎপাত্র নির্মাণের জন্য চাকার সঙ্গে যুক্ত হয় ছাঁচ। বিভিন্ন দেশে বহু গোষ্ঠীর মানুষ অনেক রকম মাটির দ্রব্য তৈরি ও ব্যবহার শুরু হয়। ফলে অঞ্চলভিত্তিক রঙ, অলঙ্করণ, আকার-আকৃতি ইত্যাদিতে বৈচিত্র্য দেখা যায়। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতœতাত্ত্বিক খননে প্রাপ্ত মৃৎশিল্পে এর প্রমাণ রয়েছে। বাংলাদেশে সভ্যতার মূল উৎস তার নদ-নদী। এ অঞ্চলে বড় পাহাড়-পর্বত না থাকায় পাথরের মূর্তি তৈরির তেমন প্রচলন ছিল না। যে স্বল্প সংখ্যক পাথরের মূর্তি রয়েছে এর কাঁচামালও ভারত থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। ফলে এখানকার শিল্পীরা তাদের শিল্পসত্তার স্বাক্ষর রেখেছে মাটির তৈরি শিল্পকর্মে। নদ-নদী, খাল-বিলে প্রাপ্ত কাদামাটি দিয়ে তৈরি শিল্পকর্মে সাধারণ কৌশল প্রয়োগ করে এ দেশের শিল্পীরা সৃষ্টিশীল শিল্পচর্চায় আত্মনিয়োগ করেছেন। বাংলাদেশের প্রতœক্ষেত্রে যে পোড়ামাটির ফলক পাওয়া গেছে সেসব নির্দশন যেন আজও অনেকাংশে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য বজায় রেখেছে।

মৃৎশিল্পে নান্দনিক ও ব্যবহারিক দুটো বিষয়ের সমন্বয় সব সময় সবক্ষেত্রে রয়েছে। তবে ব্যবহারিক মৃৎপাত্র বাসন-কোসন, থালা-বাটি, হাঁড়ি-পাতিল ইত্যাদির গুরুত্ব যুগে যুগে ধারণ করেছে সর্বস্তরের মানুষ। মৃৎশিল্পীরা ব্যবহারিক মৃৎপাত্র তৈরি করার সময় যথার্থ ব্যবহার উপযোগী আকৃতি তৈরিতে সচেতন থেকেছেন, উপস্থাপন করেছেন বিভিন্ন বৈচিত্র্যপূর্ণ পাত্র। বিভিন্ন সমস্যা ও প্রতিকূলতার মধ্যেও এখনো বাংলাদেশের বিভিন্নি স্থানের মধ্যে সাভার, মানিকগঞ্জ, শিমুলিয়া, কাকরান, কাগজীপাড়া, কুমিল্লা, বরিশাল, ফরিদপুর, শরীয়তপুর, মুন্সীগঞ্জ, টাঙ্গাইল, নেত্রকোনা, রাজশাহী ইত্যাদি অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি মৃৎসামগ্রী তৈরি হয়। এখন বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন হচ্ছে কারখানায় মৃৎশিল্প। কারখানায় উৎপাদিত তৈজসপত্র ও স্থাপত্য মৃৎশিল্প এ দেশের ঘরে ঘরে সমাদৃত। তা স্থানীয় চাহিদা পূরণ করেও বিদেশে রপ্তানির মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রেখে চলেছে।
নদীমাতৃক সভ্যতা থেকে যেমন এ দেশের এই শিল্প মাধ্যমের উৎপত্তি তেমনি মানব সভ্যতার বিকাশেও এর সহায়ক ভূমিকা রয়েছে। শিল্পীরা ধর্মীয় ও ব্যবহারিক সামগ্রী নির্মাণের সমান্তরালে টেরাকোটা ফলক, ত্রিমাত্রিক ভাস্কর্যে সমসাময়িক মানুষের জীবনযাত্রা, জীবজন্তু, পশুপাখি, ফুল-ফল, লতা-পাতা ইত্যাদি দৃশ্যে তাদের শৈল্পিক ও নান্দনিক গুণাবলির যে প্রকাশ করেছেন তা বাংলাদেশের শিল্পচর্চার ইতিহাসে এক ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে।

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের ঐকান্তিক চেষ্টায় ঢাকা আর্ট কলেজ প্রতিষ্ঠা এবং শিল্পী মীর মোস্তফা আলীর উদ্যোগে মৃৎশিল্প বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়। এই মৃৎশিল্প বিভাগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পাশ্চাত্যধারায় আধুনিক উপাদান-উপকরণের সমন্বয়ে সৃজনশীল মৃৎশিল্প নির্মাণের গতিপথ তৈরি হয়। পরে রাজশাহী, চট্টগ্রাম, খুলনা ও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মৃৎশিল্প চর্চা ছড়িয়ে পড়ে। এ দেশের শক্তিশালী পরম্পরার দক্ষতার সঙ্গে ধীরে ধীরে যুক্ত হতে থাকে মৃৎশিল্পের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা।

বাংলাদেশে আধুনিক মৃৎশিল্প চর্চার ক্ষেত্রে চারুকলা অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃৎশিল্প বিভাগের ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখান থেকেই ১৯৬১ সালে সৃজনশীল মৃৎশিল্প নির্মাণের যাত্রা শুরু হয়। এই দীর্ঘ সময়ের বিবেচনায় শিল্পকলার অন্যান্য মাধ্যমের মতো ভাস্কর্য, চিত্রকলা, প্রিন্ট ইত্যাদি বিষযের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সমকক্ষতা অর্জন যথেষ্ট সময় লেগেছে। স্বাধীনতা-পরবর্তী এ দেশের কয়েক শিল্পী বিদেশ থেকে মৃৎশিল্পবিদ্যায় ডিগ্রি নিয়ে বিভিন্ন শিল্প শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ফলে পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের বিজ্ঞানভিত্তিক কলাকৌশলের পরিচয় ঘটে এ দেশে। সমকালীন শিল্পীরা মৃৎশিল্পের ব্যবহারিক গ-িতে সীমাবদ্ধ না থেকে নতুনতর ভাবনায় নিজেদের নিয়োজিত রেখেছেন। ফলে শিল্পীরা এক নিবিড় ঐতিহ্য সঙ্গে নিয়ে আধুনিক কলাকৌশলের সহায়তায় সৃজনশীল মৃৎশিল্প নির্মাণ করে চলেছেন। কারণ সম্প্রতি মৃৎশিল্পটি সৃজনশীল বা আধুনিক ভাবধারায় উপস্থাপনে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। কালে কালে এটি ধারণ করেছে আধুনিক থেকে আধুনিকতর রূপ।

বাংলাদেশে ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পের স্বকীয়তায় রয়েছে নিম্নমাত্রায় পোড়ানো গেজবিহীন সামগ্রী। এর পাশাপাশি সৃজনশীল মৃৎশিল্পের বৈশিষ্ট্য অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শিল্পীরা ঐতিহ্য চেতনার সঙ্গে যুক্ত করেছেন আধুনিক কলাকৌশল ও গেজ। কেননা মৃৎশিল্পে কৌশল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিভিন্ন উপাদানের পরিমাণ নির্ধারণ ও মৃৎশিল্পে ব্যবহৃত গেজের সঠিক তাপমাত্রা ইত্যাদি বস্তু নির্মাণে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। আমাদের হাজারো বছরের শিল্প- ঐতিহ্য অনুধাবন করতে হলে এ দেশে মাটি খুঁড়ে পাওয়া মৃত্তিকা সামগ্রী এবং আজও যে চর্চা অব্যাহত রয়েছে এর দিকে গভীর মনোযোগের সঙ্গে তাকাতে হবে।

কত সহস্র বছর আগে মানুষ নিতান্তই প্রয়োজনের তাগিদে মাটি রূপান্তরিত করেছিল তৈজসপত্রে। রূপান্তরের ওই ধারায় এখন তা রূপ নিয়েছে শিল্পে। এর পেছনে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে মূলত এ দেশের মৃৎশিল্পের হাজার বছরের সমৃদ্ধ ইতিহাসটিই। আমাদের মৃৎশিল্পের উপাদান থেকে শুরু করে কারিগরি দিক, নকশা, নির্মাণশৈলীÑ সবই স্বকীয়তায় সমুজ্জ্বল। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মৃৎপাত্রের মধ্যে একটা পার্থক্য থাকলেও এই ভিন্নতার মধ্যেও আছে নিবিড় ঐক্য। এ কারণেই অন্যান্য দেশের মৃৎপাত্র থেকে এটিকে আলাদা করা যায় খুব সহজেই। এছাড়া বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের মাটি অনেক সহজলভ্যও।

মাটির সঙ্গে প্রিয় মৃত্তিকার নিবিড় সখ্য মানুষের। বহুকালের পুরনো এই সম্পর্ক বিভিন্ন রঙে রূপে প্রকাশিত। মাটির নম্র স্বভাব মানুষকে বিশেষভাবে কাছে টানে। কাদামাটিতে কল্পনা গড়ে নেয় মানুষ। বিভিন্ন আকৃতি ও অবয়ব দেয়া হয়। দক্ষ হাতের ছোঁয়ায় বহুমাত্রিক ব্যবহারের উপযোগী হয়ে ওঠে নরম কাদামাটি। তবে যিনি শিল্পী, যার শিল্পিত বোধবুদ্ধি তার বেলায় আলাদা কথা।
প্রকৃত শিল্প নির্মাণে যেমন প্রয়োজন ফর্ম ভেঙে নান্দনিক ও দার্শনিক মনোভাব প্রকাশ করা তেমনি মৃৎশিল্পে রয়েছে সব বিষয়ের উপস্থিতি। কোনো মৃৎশিল্পীকে শুধু ফর্ম ভাঙা কিংবা রঙের ইলিউশান তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলে না, জানতে হয় এর উপাদানের স্বভাব, সঠিক তাপমাত্রা ও মৃৎশিল্পে ব্যবহৃত সব সরঞ্জামের প্রকৃত ব্যবহার।

টেরাকোটা শিল্পের অতীত পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এ শিল্পমাধ্যমটি রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা কিংবা ধনাঢ্য শ্রেণির চাহিদা পূরণে প্রসার লাভ করেছে। অন্যদিকে ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক কারণেও প্রসার লাভ করেছে বহু মাত্রায়। মসজিদ, মন্দির থেকে শুরু করে সরকারি পর্যায়ের সুবিশাল ভবন অলঙ্করণে এ মাধ্যমটি বিশেষ ভূমিকা রেখে তৈরি করেছে বিশাল ঐতিহ্য সম্ভার। সম্প্রতি বাংলাদেশে শুরু হয়েছে সুপরিকল্পিত, উন্নততর ব্যবহার উপযোগী স্থাপত্যশৈলী ও নির্মাণ। বেড়ে চলেছে প্রতিনিয়ত মানুষ। তারা হচ্ছে শহরমুখী। তাদের জীবন ও জীবিকার কারণে সংক্ষিপ্ত হতে চলেছে মানুষের আবাসস্থল, অফিস-আদালতসহ সব স্থান। স্থপতিরা নির্মাণ করে চলেছেন স্বল্প পরিসরে জ্যামিতিক ফর্ম বিন্যাসে আধুনিক থেকে আধুনিকতর বসবাস উপযোগী ভবন। এসব ভবনে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যে ঘটছে আন্তর্জাতিকীকরণ। প্রায় প্রতিটি স্থান জীবন ও বাস্তবতার প্রয়োজনটিকে প্রাধান্য দিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক সূত্রে গড়ে তুলছেন স্থপতিরা নাগরিক জীবনের ব্যস্ততম চাহিদায়। এই ব্যস্ততম গতিশীল ধারায় সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন ইন্টেরিয়র। ব্যবহার করা হচ্ছে বিভিন্ন উন্নত উপাদান। বিন্যাস করা হচ্ছে সৃজনশীল ভাবধারায়। মৃৎশিল্পের বিভিন্ন মাধ্যমসহ টেরাকোটাশিল্প উঠে এসেছে গৃহসজ্জায় সাধারণ মানুষের কাছে।
মৃৎশিল্পে বিজ্ঞান ও দর্শনের সমন্বয় অপরিহার্য হওয়ায় কালোত্তীর্ণ টেরাকোটা ফলক নির্মাণ কেবল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সম্পন্ন করা শিল্পীই করতে পারেন। নিয়মিত মৃৎশিল্প মাধ্যমের চর্চা ও গবেষণাই ওই শিল্পের গৌরব উজ্জ্বল ঐতিহ্য অক্ষুণœ রাখতে পারবে। বাংলাদেশে গত চার দশকে আধুনিক শিল্পকলার অগ্রগতি বেশ প্রশংসনীয়। একাধারে এ দেশের শিল্পকলা বলিষ্ঠ, বৈচিত্র্যময় ও উদ্দীপ্ত। সমকালীন আধুনিক মৃৎশিল্পের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এ দেশের শিল্পীদের প্রকৃতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, ঐতিহ্য চেতনার সঙ্গে সম্পৃক্ততা। এ দেশে মৃৎশিল্পের আধুনিক চর্চা খুব বেশিদিন না হলেও এর জটিল ও কঠিন রাসায়নিক সমীকরণ সাপেক্ষের নিয়মিত শিল্পী হাতে গোনা মাত্র কয়েকজন। এ শিল্পমাধ্যমে যারা নিয়মিত চর্চা করেছেন তারাই শুধু শিল্পভাষা ও নতুনত্বের অনুসন্ধান করে শিল্প নির্মাণ করেছেন।

বাংলাদেশের সমকালীন মৃৎশিল্প ভুবনের কর্মকা- নিঃসন্দেহে বিশালায়তন। প্রায় তিন দশকের বিভিন্ন প্রজন্মের অসংখ্য শিল্পস্রষ্টার কর্মনিষ্ঠার বৈচিত্র্যতায় সমৃদ্ধ হয়েছে সৃজনশীল মৃৎশিল্প। ধারাবাহিকভাবে অপেক্ষাকৃত তরুণ মৃৎশিল্পীদের সৃজন ও সাফল্য উত্তর উত্তর এ দেশের মৃৎশিল্প তথা সৃজনশিল্পের পরিম-ল সম্প্রসারণ করছে। এটি উপকরণ ও মাধ্যমের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য আনায় সহায়তা করলেও প্রধান ও অগ্রজ শিল্পস্রষ্টাদের সামগ্রিক সাফল্যেরই প্রতিধ্বনি।
প্রথম সারির তথা পূর্বসূরি মৃৎশিল্পীদের শ্রেষ্ঠত্বের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রজন্মের মৃৎশিল্পী ও সমকালের অপেক্ষাকৃত নবীনরা শিল্পাঙ্গনে নব নব মাত্রা যোগ করে অগ্রজ শিল্পস্রষ্টাদের সাফল্যের পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন। এখনো ওই ধারা অব্যাহত রয়েছে। বলা যায়, গত তিন দশকের মৃৎশিল্প নির্মাণ সাধনায় নিসর্গ, প্রকৃতি, বস্তু ও অবয়বভিত্তিক বাস্তুবাদী ব্যবহার উপযোগী নির্মাণরীতির সঙ্গে যুগোপযোগী আধুনিক নির্মাণ কৌশলের, বিশেষত টেরাকোটায় সমবিমূর্ত ও বিমূর্ত এবং প্রকাশবাদী ধারা প্রভৃতির সম্মিলন ঘটেছে। বাংলাদেশের মৃৎশিল্প অঙ্গনে ওই ধারা বা কৌশলে সফলতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন শিল্পী অলক রায়। তার প্রতিটি ক্ষেত্রে রয়েছে বস্তু, বিষয় ও উপাদান-উপকরণের সৃজনশীল উপস্থাপনা। ফলে উন্মোচিত হচ্ছে মৃৎশিল্প বিন্যাসের নতুন ধারা। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পের পরম্পরায় যোগ হচ্ছে আধুনিক রীতি ও নির্মাণ কৌশলের নবতর আবিষ্কার।

 

Read 562 times

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…