শিল্পী শেখ মোহাম্মদ সুলতান: এক অনন্য উজান

শিল্পী শেখ মোহাম্মদ সুলতান: এক অনন্য উজান

প্রফেসর ড. মো. আমিরুল মোমেনীন চৌধুরী

 

 

‘দ্য বেস্ট প্লেস ইন দ্য ওয়ার্ল্ড টু লিভ ইন বাংলাদেশ।’ এই সবুজ বদ্বীপের শুকনো কাঁকর বিছানো, কখনো জল-কাদায় একাকার উঠানÑ যেখানে শৈশবে বেড়ে উঠেছে এক অনন্য উজান, লুকিয়ে আছে প্রসবকাতর মায়ের নীল চিৎকার। এ সবুজ বদ্বীপই হচ্ছে বিশ্ব সংস্কৃতির ও ঐতিহ্যের ক্ষেত্রে এক সমৃদ্ধ অঞ্চল। এই সমৃদ্ধির রথে চড়ে যে যার গন্তব্যে পৌঁছাতে চায়। অবশ্য তাদের উপলব্ধি বার বার টেনে নিয়ে গেছে শিকড়ের সন্ধানে। সেখানে প্রোথিত রয়েছে তাদের গৌরব-উজ্জ্বল অতীত, তাদেরই অগ্রজ। যে মৃত্তিকায় তাদের অনন্ত ছোটাছুটি সেই মধুর মৃত্তিকায় উত্থিত তাদেরই আরো এক অগ্রজ স্বমহিমায় অন্য এক আত্ম পরিচয়ে।
সময়ের পার্থক্যের কারণেই এ অসম্ভব উদার ক্ষ্যাপা বোহেমিয়ান শিল্পীর সঙ্গে প্রথম দেখা হয় ১৯৮১ সালে ঢাকায় বাংলাদেশ কলেজ অব আর্টস অ্যান্ড ক্রাফটসে ভর্তি হওয়ার পর। প্রাথমিক পরিচয়ে মাত্রা অতিরিক্ত কোহল ক্লান্ত শারীরিক কম্পনের মধ্যে বুঝতে পারি, এই দুনিয়াটি যারা বাসযোগ্য করে যেতে চায় এর অন্তরালে থেকেও এমন কিছু বিস্ফোরক জীবনের দায় বয়ে যায়। তা আমাদের মতো সাধারণ পতঙ্গ সদৃশ্য মানবের ডানা ছেঁটে দেয়। কাহিল করে তার ইনার স্ট্রেনথ দিয়ে। এই শিল্পী শেখ মোহম্মদ (এসএম) সুলতান। তিনি রাজমিস্ত্রির একমাত্র সন্তান। কৈশোরের আঁকা অসাধারণ স্কেচ ও পেইন্টিং অসাধারণ দক্ষতায়মুগ্ধ নড়াইলের জমিদারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও পৃষ্ঠপোষকতায় কলকাতার সরকারি আর্ট কলেজ পর্যন্ত আসার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন।


এর পরবর্তী অধ্যায়Ñ সুলতানের জীবনসিঁড়ি অন্য আর পাঁচ-দশ-পাঁচশ’ চিত্রশিল্পীর মতোই খ্যাতি ও স্বীকৃতির ডামাডোলে যথানিয়মে একেক ধাপ করে পর্যায়ক্রমে ইউরোপ-আমেরিকার আর্ট অ্যাপ্রিসিয়েশনের দরজা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। সঙ্গে সঙ্গে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যে সুলতান তাঁর চিত্রকলার ডিঙিতে চড়ে চূড়ান্ত উজানে যেতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন। শিল্পমোদীরা ধরেই নেন, এসএম সুলতান প্রতিষ্ঠানের চিরনির্দিষ্ট আর্ট গ্যালারি, স্টুডিও, মিউজিয়াম বা আর্কাইভগুলোয় নিজেকে সচেষ্ট রাখবেন, ক্রমেই বন্দি করে ফেলবেন অন্য পাঁচ খ্যাতিমানের মধ্যে। ঠিক এখান থেকে আমাদের বিস্ময়ের শুরু। এখানেই বোধের বিস্তৃতি। তথাকথিত ধর্তব্যের সম্পূর্ণ বাইরে, শিল্পের অত্যাধুনিক নিরীক্ষাভূমির অকপট স্রোতে ভাসিয়ে দিলেনÑ যেন ওই অহেতুক সভ্যতা, কোলাহলের সভ্যতা, লোক দেখানো সভ্যতা, যুদ্ধবাজদের সভ্যতা থেকে নিজেকে গোপন করে নিলেন, লুকিয়ে ফেললেন আজন্ম সেই মাটির বিষাদ বুকে নিয়ে।


সুলতান সম্পূর্ণ অন্তর্গত এক আত্মজৈবনিক সাধনার আহ্বানে সাড়া দিলেন। তা ছিল মধ্য পঞ্চাশের পাশ্চাত্যের অস্থিরতা। বাংলার সামাজিক ভাগ্য প্রকাশে তখনো মন্বন্তরের দগদগে ক্ষতগুলো অক্ষত থেকে গেছে। ইউরোপের সংস্কৃতি রাজপাট ফর্মালিজমের অধিগ্রহণে নতুন এক কালচারাল রিউম্যাটিজমে আক্রান্ত হয়েছে। মহান দুই স্প্যানিশ শিল্পী গোইয়া ও পাবলো পিকাসোÑ উভয়েই কালেক্টরদের সর্বগ্রাসী ব্যবসায় ঐতিহাসিক সব দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছেন। একটি ছবিকে ১৫৬ টুকরো করে নিলাম ডাকা শুরু হয়ে গেছে। ইউরোপীয় অর্থগৃন্ধু সময় কণ্টক গোইয়ার ‘দানব’কে ডাইনিংরুমে সাজিয়ে দিয়েছে অনায়সে। পিকাসোর ‘নৃশংসতা’ ডিজাইনের গ-িতে হাঁপিয়ে উঠেছিল যেন এমনই কোনো সময়। শুধু সুলতানই নন, সারা পৃথিবীর যূথচারী ক্লান্তি তর্পণকারী মানুষ একটু করে বুঝতে শুরু করেছিল সংস্কৃতির মূল নিয়ামক তার মানবীয় উত্থানে। জীবন বিছিন্ন রঙরেখা, সুরছন্দ, গদ্য-পদ্য আসলে আরো নির্বাপিত জনবিক্ষোভের অ্যান্টিবায়োটিক হিসেবে অন্তর্গত স্বপ্নের গভীরে কাজ করে। ঠিক সেই মধ্য পঞ্চাশে কেউ কোথাও বুঝতে না পারলেও আজকের বিশ্ব শিল্পমন্দায় হ্যাকনিড জীবন ভাষ্য ও দার্শনিক যৌনসম্ভার যেন লুপ্তপ্রায় সুররিয়ালিস্টদের তৎকালীন বিযুক্তির দুর্ভাগ্যে কাজ করে গিয়েছিল তা বোঝা সম্পন্ন হয়েছে। পুরনো পাতা ওল্টাতে বড় বেশি কাতর হতে হয় ওই কারণেই। কেরুয়াকের ‘অন দ্য রোড’ কিংবা গিনসবার্গের ‘ফাউল’ পড়লে তেমনই বোঝা যায় উৎসব, সিনেমা, ইমেজ, কল্পনায় ওরিয়েন্টাল জলপ্রপাত কেন এতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছিল। মনে রাখা যেতে পারে, সার্ত্রে যে মধ্যরাতেই কড়া নেড়ে থাকুক না কেন, অ্যাবস্ট্রাকশন তথা অ্যাম্বিগুইটির চূড়ান্ত লোক উচ্ছ্বাস, সেই অষ্টপ্রহরের তর্পণ-অর্পণগুলো, এমনকি বিযুক্ত হওয়ার সর্বাপেক্ষা প্রাচীন ও একই সঙ্গে আধুনিক প্রয়োগ কল্পগুলো এই এশিয়া প্রান্তরের ঘাস-জমিন, জল- পাহাড়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। কালোনিয়াল সংহারবাদী মানসতা নিপাত যাচ্ছে। দৌড়ে বেড়াচ্ছে সাহেব-সুবো, স্পন্সর, কমিটি, গবেষক, বায়ার, প্রডিউসর ও দালাল-ফড়িয়াবাজ।


আমরা প্রত্যেকেই চেয়েছিলাম কিছু একটা ঘটে যাক। সব ছেড়ে চলে যাই। মিশে যাই, বিলিয়ে দিই নিজেকে, মিলিয়ে দিই সাধারণ্যে। বোহেমিয়ান না-ই বা হলাম, অন্তত একটিবারের জন্য লোকে বলুক, ‘আহা, কী করে ফেলল! এমন ধন-মানে উৎসর্গকৃত জীবনটি ছেড়ে বিনা বাক্য ব্যয়ে বেরিয়ে পড়ল? আমাদের উৎকণ্ঠা, পাপবোধ, প্রত্যাখ্যান ও মমতা মাখানো বোধে মননের নিহিত পরিক্রমায় সামান্য শক্তিটুকুও সঞ্চয় করে উঠতে পারিনি। অথচ প্রবল ইচ্ছায় অনাগত সম্ভাবনার দিকে নিষ্ফল চেয়ে থাকছি। এক ব্যর্থ ধ্বস্ত, ক্লেদাক্ত সময়ের অবগুণ্ঠনে শুধু কাতর হয়েছি। আবেগ নিরপেক্ষ হয়েই লিখছিÑ যদি একটিবারের জন্যও পারতাম! পারতাম নিজেকে ছিন্ন করতে, টুকরো টুকরো করতে সেই বোধের সমীপে, শিল্পের যূপকাষ্ঠে যদি পারতাম পা রাখার জায়গাটুকুকে তোয়াক্কা না করে গলা বাড়িয়ে দিতে?


শিল্পী দোমিয়ের কারাবাস থাকাকালীন চিঠিতে লিখেছিলেন তার কালি ফুরিয়ে যাওয়ার নিদাঘ যন্ত্রণার্ত মুহূর্তের কথা। আমরা বুঝতে পারলাম আধুনিকতার চিত্রলেখেটি কেমন করে সহজ হয়ে যায়। পরবর্তীকালে অর্থাৎ ওই গত দশকেই শিল্পী সালভাদর দালির অন্ধকার ক্যাসেলে জীবনটিকে সংকীর্ণ যাপনের মধ্য দিয়ে যে আরেক ফলিত বাস্তবতার সূত্রপাত ঘটল এর বিশ্লেষণ কোন ভাষায় করা যাবে? আমরা খেই হারিয়েছি। মাল্টিমিডিয়ার জয়যাত্রার বিজ্ঞাপনী দুনিয়ার মেগাস্টার দালি যখন ক্যাসেলের মধ্যে ঢুকে পড়লেন তখন কোনো পাপবোধ, কোনো বিচ্ছিন্নতা তাকে মদদ দিয়েছিল। কেনই বা নিঃসঙ্গ এক জীবন চর্চার অস্থির উন্মেষের কথা বললেন দালি? যদি বলা হয়, এও এক পোস্টমোর্ডানিস্ট ভেল্কির চরকিচক্কর, পালিয়ে বাঁচাÑ তাহলে!
আমার বিষয় এটি নয়, বিষয় এক অনন্য উজান শিল্পী সুলতানের ছিটকে যাওয়া, ফিরে আসার দিনপঞ্জিটি আরেকবার খতিয়ে দেখা। হ্যাঁ, ইউরোপ ভ্রমণকালে যখন তিনি খ্যাতির তুঙ্গে তখন মানুষ উত্তেজিত, অস্থির রোমকূপগুলো প্রায় নিয়ন্ত্রণ করে ফেলে। ঠিক যে সময় আর কাঁটা দেয় না শরীরে, জীবনে খ্যাতির মধ্যগগনÑ এমন একটা মুহূর্তেই স্বেচ্ছানির্বাসন নিলেন সুলতান। ক্যাসেলের অন্ধবৈচিত্র্য বা নির্ধারণের চর্চা, সাধনা নয়। তিনি ফিরে এলেন তার উৎসে। জীবনের শুরু যে মৃত্তিকায় সেই বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রাম নড়াইল, নিজের গ্রামÑ যে পবিত্র ভূমিতে দাঁড়িয়ে আছি। তাকে নিয়ে একটি কথাও হলো না বা তিনি বলার সুযোগ দিলেন না। ফিরে এলেন আন্তর্জাতিক শিল্প ময়দানের গৌরবময় দিনগুলো অস্বীকার করে, ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে।
‘ইউরোপ থেকে ফিরে আসার পর সেখানে পাওয়া যাবতীয় যশ ও খ্যাতি আমি পুরোপুরি ভুলে যেতে চেয়েছিলাম। তথাকথিত স্বীকৃতিগুলো আমার গ্রামে নিয়ে আসতে চাইনি, চাইনি এ সম্পর্কে কেউ কিছু জানুক। যখন আমার পুরনো সহপাঠী বা বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করি তখন আমার মনে হয়, আমি যেন আবার সেই শৈশবে প্রত্যাবর্তন করছি। যখন তাদের সঙ্গে কথা বললাম তখন বুঝলাম, তাদের চিন্তা-ভাবনা ও স্বপ্নগুলো যেন আমারই খুব কাছাকাছি। এভাবে আমি যত আমার গ্রামের প্রত্যন্তে জড়িয়ে পড়লাম ততই ঘনিষ্ঠ হতে শুরু করলাম কৃষকদের সঙ্গে। দেন আই ফেলট মাইসেলফ আন্ডার গো অ্যা ডিপ ট্রান্সফরমেশন। আমি নিজেকে আবিষ্কার করলাম। ইউরোপ থেকে তুলে আনা সব আদব-কায়দা ও ভাবনা-চিন্তা অনেক পেছনে পড়ে থাকল। আই বিকেম কমপ্লিটলি হোল ইন টিউন উইথ মাই পিপল অ্যান্ড মাই কান্ট্রি। দিস ট্রান্সফরমেশন গিভ মি ডিপ ফিলিংস অফ পিস অ্যান্ড কনটেনটমেন্ট।’
ফিরে এলেন সুলতান। আশ্রয় নিলেন বুনো গাছগাছালিতে ভরা পরিত্যক্ত স্থাপত্যে। না, কোনো পরিপাটি ঘরদোর তিনি সাজাতে পারেননিÑ যেন নৈঃশব্দ অথবা কোনো শূন্য সময়ের বিনীত জাগরণে একটি করে ভাষার মুকুলগুলো ফুটিয়ে তুললেন তার নিরবচ্ছিন্ন অভিজ্ঞতার মাঠে-প্রান্তরে। অথচ আমরা আছি একই রকম আদি, অকৃত্রিম। অ্যাগ্রারিয়ান ভিজনকে আয়ত্ব করার জন্য বইপত্র ঘেঁটে প্রবন্ধের পর প্রবন্ধ সাজিয়ে, বাকবিত-ার জাবর কেটে, সেমিনার-সভা-সমিতিতে আপ্রাণ বজায় রাখতে চেষ্টা করছি অন্তঃসারশূণ্য র‌্যাডিকালিজম। চেষ্টা করছি বোঝাতে কত বেশি অনুগত আমরা প্রগতির নাড়ির টানে। একবার ভেবেও দেখছি না ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বার্থমগ্নতা এবং শ্রেণি-নিবন্ধ আমলাতান্ত্রিক গণঅহঙ্কারেও আমাদের মর্মান্তিক মানবিক দুর্গতি কি নিদারুণ এক পচন সম্ভব অনুষ্ঠান ঘটিয়ে তুলেছে।


উধাও সন্ধানী এই শিল্পী আপাত বিযুক্তির ভরে নিজেকে সেই জীবন চর্চা ও শিল্পকৃতির ঐকান্তিক যোগসূত্রে চিহ্নিত করলেন। তার জীবন শুরু হয়েছিল ইউরোপিয়ান মাস্টারদের প্রভাব সম্বল ক্যানভাসের রঙরেখায়। তিনি সরে এলেন সম্পূর্ণ জ্যান্ত এক বাস্তবতার অধরায় ধরা দিতে। তার নিশ্চয়ই জানা ছিল, বাস্তবতার সরলতা বিষয়ের বিতর্ক দুনিয়াব্যাপী শৈলী সংস্কারে প্লাবণ ঘটিয়ে ফেলেছে। তার এও জানা ছিল, বিমূর্ত চিত্রপটের বহুমাত্রিক প্রকাশ নিয়ে জল্পনা-কল্পনা সম্প্রতি এক নতুন মাত্রা সংযোজন করেছে। তবু তার আত্মগত বিপন্নতাই শুধু নয়, দুর্গতিক্লিষ্ট গ্রামের সাধারণ মানুষের সঙ্গে অকৃত্রিম সখ্যে নেমে আসেন শিকড়ের দিকে কোনো যৌথ অবচেতনার ঐশ্বর্যের গভীরে।
এভাবেই শুরু হলো এসএম সুলতানের গত ৩০-৩৫ বছরের কৃচ্ছ্র সাধন, শিল্পযোগযাত্রা। অযুত ক্যানভাসের সরসতায় রঙের বৈচিত্র্য, রেখার বিচিত্র সম্পাদনা, পরীক্ষা-নিরীক্ষার সর জটিল ছন্দে চিত্রিত করলেন আধুনিক শিল্পকারুতন্ত্রের এক তৃতীয় ভূবন। বহু মূল্য বিদেশি রঙ পরিহার করে তিনি বেছে নিলেন দেশজ পটুয়াদের গাছগাছালি, শিকড়-বাকড় থেকে উদ্ভূত রঙ। স্বল্প খরচে বেশি ও বড় কাজ করতে হলে অনেক দ্রব্য ব্যবহারই শ্রেয়। তিনি বলেন, ‘প্রথম দিকে আমি ঝুটের কাপড়ে শিরিষের আঠা ব্যবহার করতাম। কিন্তু দেখা গেল বর্ষায় ক্যানভাসগুলোয় ড্যাম্প ধরে যাচ্ছে। তখন গাবের আঠা ব্যবহার করতে শুরু করলাম। তা জেলেরা জালের জন্যে ব্যবহার করেন।’
মধ্য পঞ্চাশে দেশে ফিরে সুলতান প্রাথমিক স্তরে অসম্ভব কিছু ল্যান্ডস্কেপ আঁকতে শুরু করেন। মানুষ সেখানে ততটা গ্রাহ্য নয়Ñ যেন জীবন আনন্দীয় প্রাতিস্বিক বোধ ও শস্য ক্ষেত্রের জৈবিক উপমা সমাহার। প্রগলভ উষ্ণতায় শিল্পী তার কাক্সিক্ষত চিত্রগুলোয় আরোপ করেন এক বাদামি সভ্যতা। তিনি বলেন, ‘তুমি দেখবে, ব্রাউন ইজ দ্য ডমিনেন্ট কালার। কেননা ব্রাউন হলো মাটি, পৃথিবীর ঘরবাড়ির ও কৃষকের রঙ। এই বাদামি রঙ ও কার্ভড ফর্মস ক্রিয়েট অ্যা ফিলিং অফ ইউনিটি ইন মাই পেইন্টিংস। বলা হয়, বাংলাদেশ হলো পৃথিবীর সবচেয়ে গরিব দেশ। কিন্তু তাই-ই বা হবে কেন? এখানে কৃষকের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম সঞ্চালিত হয়ে আসছে স্মরণাতীতকাল ধরে। তেভাগা আন্দোলন, কৃষক বিদ্রোহ, নীল বিদ্রোহ, নানকার বিদ্রোহ, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রাম, কত কী!। অনেকে আমাকে জিজ্ঞাসা করে, এই আধুনিক যুগে কেন আমার ছবিতে কৃষকদের এত সেকেলে করে আঁকি...। তাদের বলি যে তারা আজও প্রাচীন। তারা আজ কী করছে? দিস কালটিভেশন অফ ল্যান্ড ইজ প্রিমিটিভ ওয়ার্ক। সো দেয়ার এন্টায়ার অ্যাকজিসটেন্স ইজ প্রিমিটিভ। দেখো, এসব আদিম মানুষকে বেছে নিয়েছি আমার ছবির বিষয় হিসেবে। কেননা দে আর আউটসাইড দ্য টেরর অফ আওয়ার প্রেজেন্ট ওয়ার্ল্ড। বৃহৎ শক্তির কসমোপলিটন শহরগুলোয় আজ কী হচ্ছে, কীভাবে তারা নিজেদের নিউক্লিয়ার হলোকাস্টের জন্য তৈরি করছে। আমার বিশ্বাস, এসব শহর অভিশপ্ত হয়ে পড়েছে। একদিন তারা নিজেকে ও নিজেদের ধ্বংস করে ফেলবে। আমি ভেবে দেখেছি, আমার ছবির এসব মানুষ এসব ধ্বংসের দিকে আত্মহননের দৌড়ের থেকে অনেক বাইরে। আই ফিল দ্যাট দে উইল অ্যা নিউক্লিয়ার হলোকাস্ট। দে উইল কন্টিনিউ টু কাল্টিভেট দেয়ার ল্যান্ড অ্যাজ অলওয়েজ।’


ইতোমধ্যে মানুষ এসেছে সুলতানের ছবিতে আদমের রূপ নিয়ে। বলিষ্ঠ, সুগঠিত শরীরের মধ্যে বীরত্বের প্রতীকী নিয়ন্ত্রণ। বিস্তৃত ও অনন্ত তার ক্যানভাসে ধরা পড়তে শুরু করে শ্রম এবং কর্ষণের অভিনব সব মুহূর্ত। তিনি ছিলেন পরিবার বিচ্ছিন্ন একাকী জীবনে অভ্যস্ত। তার একা চলার পেছনে কোনো গূঢ় বার্তা কাজ করে ছিল কি না তা আমার পক্ষে জানা সম্ভব হয়নি। তবে জীবনের শেষার্ধে এসে তিনি সামাজিকভাবে দায়িত্ব নেন নিম্নবর্গের মধ্যবয়স্ক হিন্দু বিধবা রমণীর। তার দুই সন্তানের সঙ্গে নিজেকেও গ্রথিত করলেন পারিবারিক আস্তানার সহজিয়া বাস্তবতায়। এর পর পরই যেন দেখা যায় তার ছবিতে মানুষ এক বিশেষ ভূমিকা নিয়ে রঙরেখার বৈশিষ্ট্যে প্রতিভাত হতে শুরু করেছে। এই মানুষ আমাদের চোখে দেখা মানুষ থেকে যেন অনেক বেশি বলবান, মাসকিউলার। তাদের যেন নিরন্তর শ্রমের প্রতীকে চিহ্নিত করে তিনি তৈরি করতে চান এক দুর্দান্ত ‘মিথিকাল ইভেন্ট’। তার ক্যানভাসের মানুষজন, গাছপালা, প্রকৃতি-পাথর যেন আর্কিটাইপাল চিত্র-চেতনার জন্ম দিয়ে যায়। তার কৃষক যেন সেই আদমের আদলে, উৎসের গভীর গোপনে এক ক্লান্তিকারী, স্বপ্নচারী সৃষ্টির জাল বুনে যায় আমাদের বিদ্ধ করে। নিজেদের অজ্ঞানতাতেই বিপন্ন বোধ করি আমরা। বুঝতে চেষ্টা করি, কেন হাজারো ছবি এঁকে একটিও বিক্রি করার তাগিদ অনুভব করলেন না সুলতান।
আমার বিষয় ছিল এক অনন্য সাধারণ শিল্পী মানুষের পরিচয়ের মধ্য দিয়ে আমাদের ক্ষয়িষ্ণু মূল্যবোধ, আমাদেরই অজ্ঞানতা, নষ্ট সভ্যতার বিশ্লেষিত মুহূর্তগুলো খুঁচিয়ে দেওয়া। তাই আপাতত ওই শিল্পী এসএম সুলতানের মুখের কথাগুলো বাঙ্্ময় অভিযোজনে সাজিয়ে এই নিবন্ধের শেষ পর্যায় প্রবেশ করবো। ‘ক্ষমতায় আসীন লোকজন সব সময়ই দরিদ্র কৃষকদের জন্য কুম্ভীরাশ্রু ফেলে। দেখায়, তারা কৃষকের কত বন্ধু। কিন্তু এসবই ভাওতা। তারা কখনোই কৃষকের পাশে দাঁড়ায় না। যদি তা সত্য হতো তাহলে কৃষকের সঙ্গে তাদের কাজ করতে দেখতাম। দেখতাম তাদের সঙ্গে খেতে, খামারে কাজ করতে। তাদের সংগ্রাম ও দুঃখের অংশীদার হতে। বৈদেশিক সাহায্য আমাদের দেশে কৃষকের নামে উপচে পড়ছে। কিন্তু ওই অর্থ কখনোই কৃষকের ঘরে পৌঁছায় না। পুরোটিই শহরে আটকে থাকে এবং তুমি জানো তা দিয়ে কি হচ্ছে? কতিপয় বড়লোকের বিলাস সামগ্রী কেনা হচ্ছে। যদি আজ কিংবা কাল ওই বৈদেশিক সাহায্য বন্ধ হয়ে যায় তাহলে কী হবে? শহর শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু গ্রামে? কিছুই ঘটবে না। কোনো পরিবর্তনই দেখা যাবে না। গ্রামের চাষি সব সময়ই বেঁচে থাকবেন। আরেকটা সমস্যা হলো, কৃষককে বোঝানো হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তি ঐতিহ্যবাহী দেশজ পদ্ধতি থেকে অনেক ভালো! মাঝে মধ্যে টিভির অনুষ্ঠান দেখি। কোনো এক কৃষি বিষয়ের অনুষ্ঠানে কয়েক কৃষককে জিজ্ঞাসা করা হলো, ‘আপনারা জানেন এই গাছের চারা দিয়ে কি হয়? বলতে পারেন এটি কোন জাতীয় গাছ? যখন কোনো কৃষক বলেন, এটি কোন ধরনের বা কী তখন তাকে বলা হয়, ‘ও! নো, এটি তা নয়।’ তারপর এক তরুণীর ছবি ভেসে ওঠে টিভির পর্দায়। তিনি পাঠ করতে থাকেন কিছু বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ। এর পাশাপাশি বলেন, ‘ইউ আর নট রাইট। ইউ হ্যাভ দি রঙ আইডিয়া। দিস প্লান্ট ইজ অ্যাকচুয়ালি...’ ইত্যাদি। যাদের এই কথাগুলো বলা হচ্ছে সেসব কৃষকের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখতে পাই, তাদের প্রাচীন পিতা-প্রোপিতামহের পেশাগত গর্ব ধ্বংস হতে চলেছে। এর পরিবর্তে জায়গা নিচ্ছে নতুন ধরনের হীনম্মন্যতা। তারাই হলো আমার ছবির বিষয়। ‘আই ক্যান নট হেলপ বাট ফিল ফর দেম... ফর দেয়ার ডে টু ডে কনসার্নস, প্রবলেমস, স্ট্রাগলস।’ তুমি কি একটা বিষয় জানো? আজকের কৃষক আর গান করেন না। জারি-সারি, লোকসঙ্গীত আজ আর গ্রামঞ্চলে শোনা যায় না। আসলে কোনো না কোনোভাবে কৃষকের কাছ থেকে তার গানটি ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। ইদানীং শহরের লোকজন তাদের কৃষকদের, নগর বাউলদের দিয়ে ব্যান্ড মিউজিকে লোকসঙ্গীত প্রডিউস করছে। কিন্তু তারা সেগুলো সম্পূর্ণ বিকৃত করে শোনাচ্ছে। এই কৃষকরা গান শোনেন তাদের ওই পুরনো গানগুলো রেডিওতে কিংবা টেলিভিশনে বাজানো হচ্ছে, দে ফিল দেয়ার মিউজিক... হুইচ ওয়াজ দি অরিজিনাল এক্সপ্রেশন অফ দেয়ার জয়েস, দেয়ার পেইনস, দেয়ার সরোজ... দে ফিল দিস মিউজিক ইজ বিইং মেড মকারি অফ অ্যান্ড দে বিকাম টেরিবলি স্যাড।
আপতত শেখ মোহাম্মদ সুলতান আমাদের অপদার্থ দিন যাপনের মুখে কালি মাখিয়ে দেন! অজড় খিলানগুলো শব্দ করে ওঠে। বেজে ওঠে অপদস্থ জীবনের ভাঙা রেকর্ড।


ছেড়ে যেতে হয়, হারাতেই হয়। তবুও শিল্পী এসএম সুলতান এক স্বপ্নচারী অনন্য উজানের দেখা পান কর্ম সংশ্রব, উদ্ধার, স্বপ্ন সম্মোহন, চেতনার হার্দিক যোগসূত্রে। আত্মমগ্ন, অস্ফুট বাক্যে জানা হয়ে যায় তার স্বপ্ন বৃত্তান্ত। অন্য নামের অভাবে আমরা যাকে স্বপ্ন বলি, সেই স্বপ্ন দেখি! কারণ আমি অসাধারণ কেউ নই। তবে আমার স্বপ্ন দেখা চলে কর্ম-কোলাহলের ভেতর, গাছের মতো আকাশের দিকে শাখা-প্রশাখা, পত্র-পুষ্পে বেড়ে ওঠার মতো। আমার স্বপ্নে একটা দ্বীপ আছে। ওই দ্বীপ হলো আমাদের এই সবুজ বদ্বীপ। মহান সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ, আমি জন্মেছিলাম এই দ্বীপে অনেক মানুষ, পশু-পাখি, পোকা-মাকড়, সরীসৃপ ও অরণ্যের গাঢ় আচ্ছাদনের ভেতর। আমার মনে হয়, আবার একদিন নিশ্চয় জন্মাবো এই সবুজ বদ্বীপে, আমার স্বপ্নের দ্বীপে। আমি একা নই, এখন আমার চারপাশে যারা আছে জীব-জগৎ, অরণ্য-প্রকৃতি তারা সবাই জন্মাবে। শুধু ততদিনে আমার স্বপ্নের দ্বীপ পৃথিবী ব্যপ্ত হবে ... এই পৃথিবী সেই দ্বীপ হবে ততদিনে।

 

Read 257 times

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…