পাহাড়ি রাজকন্যা

পাহাড়ি রাজকন্যা

 

 

গল্পটা এক পাহাড়ি রাজকন্যার। রাঙামাটির তবল ছড়িতে তার জন্ম। যেখানে পাহাড়ের কোল জুড়ে বাস করে কর্ণফুলির শাখা নদী। ভোর বেলায় ঘুম ভাঙতেই জানালায় এসে দাঁড়াত মেয়েটি। দেখত পাহাড় আর নদীর আলিঙ্গন। আকাশের ঘননীল আর গাছের সবুজ পাতা, রঙিন বুনোফুল তাকে রঙ চিনিয়েছে। বাতাসে শুকনো পাতার মর্মর আর পাখির গান তার ভেতরের শিল্পসত্বাকে জাগিয়ে দিয়েছে। তাই তিনি হাতে তুলে নিয়েছেন রঙ- তুলি। তিনি শিল্পী কনকচাঁপা চাকমা। তার বেড়ে ওঠার গল্প, জীবন যাপন, শিল্পভাবনা ইত্যাদি নানা বিষয়ে কথা বলেছেন তিনি। কথোপকথনে ছিলেন লাবণ্য লিপি

 

লাবণ্য লিপি: আপনার ছেলেবেলার কথা বলুন। কেমন ছিল সে দিনগুলো?
কনকচাঁপা: আমার জন্ম রাঙামাটির তবল ছড়িতে। সেখানেই কেটেছে আমার শৈশব- কৈশোর। কী সুন্দর ছিল সে দিনগুলো। আমাদের বাড়ির সামনে দিয়েই বয়ে গেছে কর্নফুলির একটা শাখা। প্রতিদিন ঘুম ভাঙতেই আমি জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়াতাম। নদী, পাহাড়, গাছপালা, আকাশ সব মিলিয়ে সে কী অপরূপ দৃশ্য! মনে হতো যেন স্বর্গের খুব কাছাকাছি আছি আমি। পাহাড়ের গাছে গাছে কত রঙ বেরঙের বুনোফুল ফুটত। একেক ঋতুতে একেক রঙের প্রাধান্য থাকত। সাদা রঙের সদরফ ফুল, হলুদ বিজু ফুল, লাল টকটকে জবা, মাদাঙা, বুনো অর্কিড আরো কত কী! সামনেই তো পয়লা বৈশাখ। এই সময়ে আমরা নানা রঙের সেসব ফুল তুলে মেতে উঠতাম বিজু উৎসবে। এখনকার মতো মানুষ আর প্রকৃতির মধ্যে এত ব্যবধান ছিল না। আমাদের পাশ দিয়ে হেঁটে যেত সাদা হাতি, হরিণের দল, বানর, বুনো হাঁস, বনমোরগ, বনবেড়াল, বাজপাখি। কী বিশাল ছিল বাজপাখির ডানা! আমি তো মনে করি প্রকৃতির এই ভার্জিন বিউটিই আমার ভেতরের শিল্পস্বত্ত্বাকে জাগিয়ে তুলেছে। আদিবাসী নারীদের বৈচিত্রময় জীবন, সাজ সজ্জা- আমাকে অণুপ্রাণিত করেছে।

লাবণ্য লিপি: ছেলেবেলা থেকেই তাহলে আপনার আঁকাআঁকির শুরু?
কনকচাঁপা: সত্যি বলতে তাই। তখন তো আর আমি ছবি আঁকা শিখিনি। কিন্তু সুন্দর কিছু দেখলেই আমার তা আঁকতে ইচ্ছে করত। আমি রঙ পেন্সিল আর কাগজ নিয়ে বসে যেতাম। আর তা দেখেই কিন্তু এসএসসি পাশ করার পর আমার বাবা আমাকে চারুকলায় ভর্তি করে দেন। সেকান থেকে আমি ফাইন আর্টস- এ সাস্টার্স করি ১৯৮৬ সালে। তারপর আমি ১৯৯৩- ৯৪ সালে আমেরিকান পেন- স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে আলিয়ান্স ফেলোশিপ করি।

লাবণ্য লিপি: আপনার ছবিতে আদিবাসী নারীর প্রাধান্য থাকে। এটা কী আপনি নিজে আদিবাসী নারী বলে?
কনকচাঁপা: হ্যাঁ, তা তো বটেই। আমি নিজে আদিবাসী এবং বিশেষ করে নারী বলেই হয়তো আদিবাসী নারীদের বঞ্চনার জায়গাটা খুব ভালো করে জানি এবং বুঝি। ছেলেবেলা থেকে দেখছি, পরিবারের যে কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেন পুরুষেরা। অথচ নারীরা সব কাজেই সমান শ্রম দিচ্ছেন। এখন অবস্থা অনেকটাই বদলেছে। তবু নারীরা সমঅধিকার এবং মর্যাদা পাননি। এ অবস্থা দূর করার জন্য সবার আগে দরকার শিক্ষার। পাশাপাশি পুরুষদের সহযোগিতা। তাদের পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে নারীদের কাজ করার সুযোগ এবং স্বীকৃতি দিতে হবে। আমি নিজে আমার স্বামী খালিদ মাহমুদ মিঠুর কাছে সেই সহযোগিতাটুকু পেয়েছি বলেই আজ এই জায়গায় পৌঁছাতে পেরেছি বলে মনে করি। তবে সমাজে নারীদের অবস্থাও কিন্তু এখন অনেকটাই বদলেছে। আমি আমার ছবিতে সেটা দেকাতে চেষ্টা করি। আমার ছবিতে দেখবেন আলো- আঁধারের খেলা থাকে। অর্থাৎ আলো আসছে।

 

লাবণ্য লিপি: শুনেছি আপনি সপরিবারে ভেজিটেরিয়ান...
কনকচাঁপা: আমি এবং আমার ছেলে- মেয়ে নিরামিশভোজী। মিঠু অবশ্য মাছ মাংস খায়। আমি বরাবরই প্রাণী হত্যার বিপক্ষে। তাই মাছ মাংস খাই না। আমার ছেলে তো দুধ এবং দুধের তৈরি কোনো খাবারও খায় না। ওর ভাবনা হচ্ছে, গরুর দুধে ন্যায্য অধিকার তার বাছুরের। বাছুরকে বঞ্চিত করে সেটা মানুষ খায়। এটা অন্যায়। তাই সে খায় না। এই যে আমরা মাছ মাংস খাই না, তাতে তো আমাদের কোনো সমস্যা হচ্ছে না। বরং আমরা বেশ ভালো আছি। প্রকৃতিকে ভালোবেসে, প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশেই মানুষ ভালো থাকতে পারবে; প্রকৃতিকে ধ্বংস করে নয়। যে কোনো ধ্বংসই মানুষকে শুধু বিপর্য়ের মুখেই ঠেলে দেবে, ভালো কিছু বয়ে আনবে না।

লাবণ্য লিপি: আপনার ছবিতে বিভিন্ন সামাজিক অন্যায় অনিয়মের বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ লক্ষ করা যায়।
কনকচাঁপা: হ্যাঁ, যে কোনো ধ্বংস, অন্যায়- অনিয়ম আমাকে ব্যথিত করে। আমার ভেতরে রক্ত ক্ষরণ হয়। আমি শিল্পী। যে কোনো অন্যায়ের প্রতিবাদ আমি রঙ- তুলিতে করি। ধর্মীয় রেসারেসি আমাকে কষ্ট দেয়। বৌদ্ধ বিহার জ্বালিয়ে দেয়া হলো। পুরে গেল বুদ্ধের মূর্তি। আমি পোড়া বুদ্ধের ছবি এঁকেছি। এটা আমার এক ধরণের প্রতিবাদ। আমরা তো পোড়া বুদ্ধ দেখতে চাই না! বুদ্ধ তো শান্তির কথা বলে, মঙ্গলের কথা বলে। তার ওপর হামলা কেন! এই যে মানুষ নির্বিচারে গাছ কাটছে। এতে পরিবেশ তার ভারসাম্য হারাচ্ছে। পশু- পাখি বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। আমি অবশ্যই এর বিরুদ্ধে। পাহাড়ি জমি নিয়েও যে বিরোধ, আমি মনে করি সরকারের হস্তক্ষেপে সেটারও একটা সুষ্ঠু সমাদান হওয়া দরকার।

লাবণ্য লিপি: একজন শিল্পী হিসেবে আপনি নিজেকে কতটা স্বার্থক মনে করেন?
কনকচাঁপা: শিল্পীরা আজন্ম তৃষ্ঞার্ত। আমি কাজ করে যাচ্ছি। কতটা সার্থক সে কথা সময় বলবে। তবে পেয়েছিও অনেক। দেশি বিদেশি অনেক সম্মাননা পেয়েছি। এগুলো আমার দায়িত্ব আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। আদিবাসী পরিবারে জন্ম নিয়েছি বলে আমি গর্ববোধ করি। তবে যখন আমি বিদেশে যাই, তখন আমি পুরো বাঙালি সমাজেরই প্রতিনিধিত্ব করি।

 

ছবিঃ ফয়সাল সিদ্দিকি কাব্য 

Read 298 times

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…