বাংলাদেশের শাখা শিল্প ও শঙ্খ সমুদয়

বাংলাদেশের শাখা শিল্প ও শঙ্খ সমুদয়

বিলু কবীর

 

 


আমরা সাহিত্য বলতে স্বভাবত এক ধরনের লেখা বা পাঠ রচনা বুঝি। কিন্তু ‘সাহিত্য’ শব্দটি ব্যুৎপত্তিগত পটভূমিকায় ব্যাখ্যা করতে গেলে জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত সব বিষয়ই সাহিত্য। ‘সাহিত্য’ শব্দটি এসেছে ‘সহিত’ থেকে। অতঃপর যা কিছু আমাদের জীবনপ্রবাহের সঙ্গে প্রত্যক্ষে-পরোক্ষে, জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে প্রভাবক ও প্রভাবিত তা-ই আসলে সাহিত্য। এই যদি হয় বাস্তবতা তাহলে কি সাহিত্য ওই জটিলে না গিয়ে প্রধান ও সরল প্রশ্ন দাঁড়াতে পারে যে, কী সাহিত্য নয়। এই অর্থে শামুক-ঝিনুক-শঙ্খ বিষয়ে সব আলোচনা এক কথায় ‘শঙ্খ সাহিত্য’ বললে বেমানান তো হয়ই না, বরং বেশ মানিয়েই যায়। তা করতে গেলে অবাক হয়ে দেখতেই হবে, সামান্য গুগলি-কড়ির মতো আপাততুচ্ছরা আমাদের সৌন্দর্য বোধ, লোকবিশ্বাস, ধর্মাচার, রূপকথা, মিথ-পুরাণ, চারুশিল্প, রাজনীতি, অর্থনীতি, খাদ্য অভ্যাস, চিকিৎসা, নির্মাণ, গদ্য-পদ্য ইত্যাদিতে কী ব্যাপক পরিমাণে জায়গা দখল করে আছে।

ঝিনুক, শঙ্খ প্রাণী হিসেবে বিস্ময়কর। এর বহিরাবরণ যেমন কঠিন, ভেতরটিও তেমনই নরম থলথলে। অতো নরমটি সুরক্ষা দিতেই কী প্রকৃতি এর বাইরে অমন শক্ত পাঁচিল করে দিয়েছে! এর দৈহিক গড়নে রকমফের, রঙ-বর্ণে বিস্ময়কর চারু সৌন্দর্য তো রয়েছেই। কিছু ক্ষেত্রে কয়েকটির বৈপরীত্য ও স্বকীয়তা বিদ্যমান। যেমন এর প্রতিটিরই খোলস শক্ত। কিন্তু সব খোলসের দরজায় পাল্লা নেই। বিশেষ করে এটি ডাঙার শামুকে দেখা যায়। শামুক যখন আত্মরক্ষার্থে বা ঘুমুনোর জন্য ওই দরকারি পাল্লাকে ছিটিয়ে দেয় তখন ভেতর থেকে এমনভাবে খিল এঁটে নেয়ে যে, সে ছাড়া অন্য কেউ তা খুলতে পারে এমন কার সাধ্যি আছে! কারো কারো আছে চিংড়ির মতো লম্বা লম্বা নলো হাত-পা। কারো আছে পা বিহীন চেটো জাতীয় চলৎশক্তি। কারো শিং আছে, চুলের মতো এঁটো ঝিল্লি-ইন্দ্রিয় আছে, কারো বা নেই। কারোর খোলসজুড়ে কতো রকেমের কাঁটা, কারো গা তেলা-মসৃণ। কেউ বহু কোণা, পেছনটি সুচালো। কেউ কোণাহীন, পেছনটি দস্তুর মতো বোঁচা, ঢ্যাপা গোলাকার। কারো কারো বহু বর্ণ, কারো এক বর্ণ, কেউ নিতান্তই বিবর্ণ। এগুলো বিস্ময়কর, ভয়ঙ্কর ও অভয়ঙ্কর।
ঝিনুক, শামুকের চরিত্র-চারিত্র্য ও স্বভাবের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলা সাহিত্যে এর অনেক প্রয়োগ দেখা যায়। বিশেষ করে লোকছড়া, ধাঁধা, সংগীত ও বাগধারায় শামুক-ঝিনুক-শঙ্খের একাধিক উল্লেখ মেলে। যেমন ‘মামারাই রাঁধে-বাড়ে/ মামারাই খায়;/ আমরা গেলি পরে/ ঘরে দুয়ের দেয়।’ যে প্রজাতির শামুকে দরজায় পাল্লা পদ্ধতি আছে সেগুলোর আচরণগত বৈশিষ্ট্য নির্দেশক ওই ধাঁধাটি বাঙালির লোকছড়ায় সমৃদ্ধি, মূল্যবান ভাব সম্পদ ও প্রাকৃতিক কুশীলবের সৌন্দর্য তুলে ধরেছে। ‘হাটে মা টিমটিম/ তারা মাঠে পাড়ে ডিম/ তাদের খাড়া দুটো শিং/ তারা হাটে মা টিমটিম।’ ডাঙার আটপৌরে শামুক নিয়ে অজ্ঞাত প্রাচীন কবির রচনায় ওই পুরনো লোকছড়াটি বাঙালি মাত্রেরই মুখস্থ। শতাব্দীর পর শতাব্দী বাঙালিদের উচ্চারণের ছান্দসিক কোষে ছড়াটির প্রথম পঙ্্ক্তি ‘হাটে মা টিমটিম’ পরিবর্তিত হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘হাট্টিমা টিমটিম’। ফলে এর অর্থ উদ্ধারের ব্যাহতিটাই জটিল হয়ে পড়েছে। মূলত এটি শামুক নিয়ে সুরচিত একটি লোকছড়া। এক ধরনের স্থলচর একরঙা শামুক যা বয়েসী বাঙালির গেঁও জীবনের পরিচিত না থেকেই পারে না। এই শামুকগুলো আকারে সামান্য বড়। এর খোলস পেছনের দিকে চোখা ও রঙ সাদা-বেগুনে ছোপ। এগুলো টিমটিমে গতিতে স্যাঁতসেঁতে মাঠে চলে-ফেরে। অতি মিনমিনে গতিতে যখন এগুলো চলে তখন এর মাংসল মাথায় মাংসেরই দুই প্রস্ত শিং দৃষ্টিগোচর হয়। বলাই বাহুল্য, এগুলোর মাঠেই ডিম পাড়ে। তবে মাঠের মধ্যে নয় ধারে-কিনারে, নিচু ডোবা, আড়ালে-নিভৃতে এবং পরিমাণে ঢের। শামুকের শ্লথের গতির সঙ্গে ধীরগতি তুলনীয় বলে বাংলা বাগধারায় ‘শম্বুক গতি’ বলে একটা কথার চল রয়েছে। ‘সাগরপাড়ে কুড়াই ঝিনুক মুক্তা মেলে না। কতো লোকের আনাগোনা তুমি এলে না।’ বয়সী বাঙালির কে না জানে, ভালোবাসার বক্তব্যে সমৃদ্ধ এই সাগরিকা ঝিনুক।
‘শাঁখের করাত’ বাঙালির আরেকটি চিরায়ত ও বহুল পরিচিতি বাগধারা। এটি সামাজিক-রাজনৈতিকসহ বহু ক্ষেত্রে উদাহরণ। টিপ্পনি, কটাক্ষ হিসেবে উচ্চারিত ও ব্যবহৃত হয়। অন্য যে কোনো করাতের চেয়ে শাঁখারি শিল্পীদের ওই করাতের বিস্ময়কর ব্যতিক্রম হলো, এটি উল্টালেও কাটে, টানলেও কাটে। দেখতে অর্ধচন্দ্রের মতো ওই করাত দড়িতে ঝুলিয়ে দুই হাতে ধরে কোনো শাঁখারি শঙ্খের গয়না ইত্যাদি বানাতে ওই করাত ব্যবহার করে থাকেন।
বাংলার ভৌগোলিক বাস্তবতার প্রকৃতিতে অনেক পাখি আছে। এগুলোর নামকরণ হয়েছে তাদের চরিত্রের প্রধান চারিত্র্যের পেিরপ্রক্ষিতে। মাছরাঙা,
কাঠঠোকরা, গাঙশালিক, মৌটুসী, কাদা খোঁচা প্রভৃতি। এমনই তিনটি পাখির নাম হলো শামুকভাঙা, শঙ্খচিল ও শামুকখোট। শক্ত ঠোঁটে এগুলো শামুক ভেঙে খায়। এগুলোর ঠোঁট শক্ত, বড় ও সুচালো। ‘বানরের গলায় মুক্তার মালা’ বাঙালির আরেকটি সামাজিক অর্থবাচক বাগধারা। এর সঙ্গে শঙ্খ-শামুকের যোগ রয়েছে।
কোনো কোনো শামুক-ঝিনুকের খোলসের দরজা আছে, পাল্লা নেই। কোনো কোনোটায় পাল্লা আছে। কিন্তু যে কথা বলার জন্য এখানে এতোটা
ইনানো-বিনানো তা হলো, এক কিছিমের ঝিনুক আছে যেগুলোর শরীরের পুরো খোলসটাতেই দরজার দুটি সমান পাল্লার মতো। একেবারে সমান দুটি বাটির কৌটাসাদৃশ। বন্ধ করলে কারো সাধ্য নেই তা খোলে। আবার যেগুলোর খোলসে দরজা আছে, পাল্লা
নেই সেগুলোর দরজা খোলা বটে কিন্তু এর মধ্যে খোলসের মালিক, মানে গেরস্ত একবার যদি ঢোকে তাহলে কারো ক্ষমতা হবে না সেটিকে বের করা যদি না নিজ থেকে বের না হয়।
শঙ্খ-শামুক-ঝিনুকের অনেক গুণাগুণ রয়েছে। ‘গুণাগুণ’ বলতে এগুলোর মধ্যে গুণ তো আছেই, অগুণও রয়েছে। হ্যাঁ, এটি মনে রেখেই শব্দটির ব্যবহার করেছি। ‘পঁচা শামুকে পা কাটা’ বলে একটি অতি প্রাচীন বাগধারা রয়েছে বাংলা সাহিত্য বাস্তবতায়। এর মধ্যে অতীতের সমাজচিত্রের অনেক বিশ্লেষণযোগ্য সংবার্তা রয়েছে। জলাভূমির প্রাচুর্য, শামুক-ঝিনুকের আধিক্য, বাঙালির নগ্ন পায়ে হাঁটা-চলা, নিচু জমিতে চাষাবাদ, পচা শামুকে পা কাটলে এর ক্ষতে অধিক ভোগান্তি হয়। আরো অপকারিতা আছে এর। অসাবধানতাবশত বেশি চুন খেয়ে ফেললে জিভ মুখ পুড়ে যায়। বাঙালির একটি বাগধারাই রয়েছে ‘চুন খেয়ে গাল পুড়েছে দই দেখে ভয়’। এর মানে, গোয়াল পোড়া গরুর সিঁদুরে মেঘে ভয় আর কী! ব্যাখ্যা সামান্যই। কিন্তু উদাহরণ প্রয়োগ এবং সামাজিক অর্থব্যঞ্জনা গভীরভাবে জীবন স্পর্শী। কালী দাস প-িত নাকি খাল-বিল-ডোবা হেঁটে পার হওয়ার সময় জুতা পরতেন, অন্য সময় খালি পা। কেন! কারণ জলের মধ্যে কোথায় যে পচা শামুক আছে তা

উল্লেখ করা দরকার, পৃথিবীতে প্রায় ৮ হাজার ৫০০ প্রজাতির শঙ্খ-ঝিনুক রয়েছে যেগুলোর সবই সামুদ্রিক। এর বাইরে রয়েছে স্থলবাসী ও অন্যবিধ জলাশয়ের ওই জাতীয় অমেরুদ-ী। এগুলোর খোলস পাত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো বা হয়। যেহেতু এখানে কথা উঠেছে সেহেতু জানা দরকার, আকৃতিতে প্রকৃতিভেদে এগুলোর লম্বায় ০.১ থেকে ১৩৭ সেন্টিমিটার পর্যন্ত দীর্ঘ হয়ে থাকে। আর ওজন? পুঁথির একটি দানার মতো ক্ষুদ্রাকার থেকে শুরু করে ৩০০ কেজি পর্যন্ত ওজন হতে পারে একটি ঝিনুকের। এর মধ্যে কয়েকটি বছরে ৫০ কোটির মতো ডিম পাড়ে। তা থেকে ঘণ্টা দশেকের মধ্যে বাচ্চা বা বাবুসোনারা জন্মগ্রহণ করে। এগুলোর ৬ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত বাঁচে বলে তথ্য পাওয়া যায়। কোনো কোনোটির চোখ-মাথা আছে, কোনোটির নেই। সবচেয়ে রোমাঞ্চকর বিস্ময়ে ভরা হলো, এগুলোর যৌনজীবন বা আতœউপগত হওয়ার বিষয়টি। এক্ষেত্রে কেঁচোর সঙ্গে এর মিল রয়েছে। কেঁচোর যেমন নারী-পুরুষ হয় না, এগুলোরও তা-ই। কেঁচো যেমন আত্মসঙ্গমী, নিজে নিজের সঙ্গে রতিরমণে মিলত হয়, শামুক-শঙ্খও তেমনই। তাই এগুলোকে বলা হয় এক লিঙ্গ বা বহু লিঙ্গ। একই দুই বলে একাই উভয়। আবার উভয়ই এক বলে একা! নিজেই নিজের বউ আবার নিজেই নিজের স্বামী। প্রকৃতি এগুলোর এই বৈধতা দিয়েছে। উভয়লিঙ্গ, জেন্ডার ভারসাম্য।

শাঁখ বা ঝিনুক যে প্রাকৃতিক মুক্তার উৎপাদক এ বিষয়টি বাংলার নিসর্গ, সাহিত্য, বাণিজ্য এবং যাকে বলে ঐতিহ্যের জন্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এছাড়া শাঁখ বা শঙ্খ দিয়ে যেসব গয়না প্রস্তুত করা হয় এর যে কারুমূল্য, কুটির শৌল্পিক ঐতিহ্য এ বিষয়টি পৃথক গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হওয়ার দাবি রাখে। আবার ধর্মীয় বিশ্বাস-অবিশ্বাস ও পৌরাণিক মিথের সঙ্গে এবং আমাদের সনাতন ধর্মে শঙ্খের অনেক যোগ রয়েছে। এমনকি রাজনৈতিক ক্ষেত্রে, আরও উল্লেখ করে বলতে গেলে ১৯৪৭ সাল-পূর্ব স্বরাজ আন্দোলনে শঙ্খানাদি বা শঙ্খধ্বনির খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহারিক ভূমিকা ছিল।
শাঁখের গয়নায় গৌরবের মুক্তা ব্যবহার করতে আমাদের আনন্দের শেষ থাকে না। কিন্তু মুক্তায় আসলে ঝিনুকের কতোটা দুঃখ-কষ্টের ফসল তা যে এর কতোটাই বেদনার লালা, কতোটাই অন্তর্বেদনার জমাট অস্থির পাথর এ কথা ক’জন ভাবে! ঝিনুকের কোনো স্বাভাবিক প্রসব নয় মুক্তা। দুর্ঘটনাবশত ঝিনুকের দেহের ভেতরে যখন কোনো শক্ত বস্তু বিঁধে (বালিকণা, ধারালো পাথরকুচি, হাড় বা অন্য কিছু আটকে যায়) তখন ঝিনুকটি আহত ও বেদনাদগ্ধ হয়। বেশ কিছুদিন ওই ক্ষত নিয়ে যন্ত্রণাসহ অনেক কষ্ট করে চলে। তখন ওই বস্তটি উগড়ে দেয়ার জন্য তার অঙ্গারাভ্যন্তরেই একটি প্রক্রিয়া চলতে থাকে। বিঁধে যাওয়া দানাটির আকর যতো বড় হয়, ঝিনুকের ওই প্রক্রিয়াটিও ততো দীর্ঘদিনের হয়ে থাকে। এ প্রক্রিয়াটি হলো ঝিনুকের ক্ষতস্থানে এক ধরনের লালা নিৎসরিত হয়ে ওই কণা বা দানা আবৃত করে করে একটা গোলাকার কিংবা প্রায় গোলাকার কঠিন পি- তৈরি করে এবং এক সময় স্বয়ংক্রিয়ভাবেই তা ঝিনুকের দেহ থেকে বিযুক্ত হয়। এটিকেই আমরা মুক্তা হিসেবে কুড়িয়ে পাই। এর মসৃণ ওপর পিঠে সুন্দর মনোহারিত্বের একশেষ। ঈষৎ গোলাপি দুধেল হয় এর চকচকে শরীর। বাংলাদেশে এক ধরনের নীলাভ বহু মূল্যবান মুক্তা কদাচিৎ পাওয়া যায়। বিল অঞ্চলের এক বিশেষ প্রজাপতির সিঞ্চন এই নীল পাথরের উৎপাদক। আধুনিককালে যে মুক্তার চাষ হয় তাও পদ্ধতিগতভাবে একই। এটি নিরীহ ঝিনুকগুলোর ওপর অমানবিক অত্যাচারেরই এক নিষ্ঠুর অর্জন। মানুষ কৃত্রিমভাবে ঝিনুকের ভেতরাঙ্গে ক্ষত সৃষ্টি করে ওই ক্ষতে বালিকণা, পাথরকুচি বা ছোট কাচের টুকরো ঢুকিয়ে ঢুকিয়ে দেয়। এবার নিরূপায় ঝিনুক যন্ত্রণাকতর হয়ে যথানিয়মে বেদনার লালায় ওই বর্জ্যটি মুড়িয়ে মুড়িয়ে মুক্তা নামের মণি নির্মাণ করে।

শাঁখার বিষয়টিও আলাদাভাবে আলোচিত হওয়া সমোচিত। শঙ্খ কেটে শাঁখা বা এক ধরনের বিশেষ চুড়ি বানানোর যে প্রাচীন শিল্প, শাঁখারি শিল্প হিসেবে তা বাঙালির অতি পুরনো একটি লোকারুর সাক্ষী। সনাতন হিন্দু ধর্মে ওই শাঁখা-সিঁদুরের বিশেষ সামাজিক বিষয়ের অভিব্যক্তি রয়েছে। মোটা সাদা শঙ্খ কেটে ওই চুড়ি তৈরি করা হয়। শঙ্খর ডায়া যতো চিকন বা মোটা হয়, তা চাক চাক করে কাটলে চুড়ি ততো চিকন বা মোটা হয়ে থাকে। যখন তা খুব চিকন নলের মতো তখন কাটলে কব্জির চুড়ির বদলে আঙুলের আংটি হয়। ওই কাটাকুটির জন্য যে করাতটি ব্যবহার কা হয় এরই ঐতিহ্যবাহী নাম ‘শাঁখের করাত’। করাত লোহার। কিন্তু শাঁখ কাটার কাজে ব্যবহৃত হয় বলে ওই রকমের নাম। ওই করাতের বৈশিষ্ট্য আগেই বলেছি যেতেও কাটে, আসতেও কাটে। এভাবে কাটার পর এতে নকশা আঁকা হয়। ওই নকশা আঁকতে নরুনের মতো ছোট বাটালি এবং এর অনুপাতে হাতুড়ি ব্যবহার করা হয়। এ থেকেই বাঙালি হাতির দাঁতে নকশা খোঁদাইয়ের কাজে এক ধাপ এগিয়ে গিয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। বিশেষত মানকা হাতির কচি দাঁতে নকশা কাটা এবং শাঁখা অলঙ্করণের ধারণাটি একই। অবিভক্ত ভারত আমলের আসাম সংলগ্নতা ব্যাহত হওয়ার পর বাংলার ওই দ- শিল্পের উঠতি কারুশিল্পের বিকাশ সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়। পলিশ করা শাঁখায় আলো পড়লে এক ধরনের ঈষৎ গোলাপি-নীলচে রঙধনুর তির্যক মৃদুতা খেলে যায়। হিন্দু নারীর সিঁদুর ও শাঁখা পরার বিষয়টি তার সধবা অবস্থার পরিচায়ক। বয়েসি নারীর হাতে শাঁখা ও কপালে সিঁদুর না থাকলে বুঝতে হবে তিনি বিধবা। আর কম বয়সীদের ক্ষেত্রে ওই শাঁখা ও সিঁদুরের অনুপস্থিতির মানে হলো মেয়েটি অবিবাহিত। এর সঙ্গে কুসংস্কার ও প্রথা বিশ্বাসের যোগ রয়েছে যে, বিবাহিত নারীর পক্ষে শাঁখা না পরা এবং বিধবার পক্ষে শাঁখা পরা অমঙ্গলের সূচক। বিশেষ করে বিবাহিতার হাত শাঁখাশূন্য হলে স্বামীর আয়ুক্ষয় বা অন্যান্য অমঙ্গল হয় বলে পৌরাণিক মিথ রয়েছে। শাঁখা নিয়ে আরো কিছু লোকবিশ্বাস বাঙালির প্রাচীন জীবন থেকে চলে আসছে। গর্ভবতী গাভী এবং সদ্য প্রসূত বাছুরের গলা একপ্রস্থ সুতায় এক চাকতি শঙ্খখ- বালার মতো করে ঝুলিয়ে দিলে গাভী-বাছুরের জাদু-টোনা, ছুৎ, নজর লাগা, ভূত-প্রেতের আশ্রয়ী ইত্যাদির প্রতিরোধ হয়। হারের লকেটের মতো করে ঝুলিয়ে দেয়া ওই শঙ্খখ-কে শঙ্খবচলয় বলা হয়। আরো একটি গ্রামীণ নাম আছে, মনে করতে পারছি না। অন্যদিকে নকশি কাজ করা সোনার পাত গেঁথে দিয়ে ঝিনুকের লকেট তৈরির শিল্পকৌশল বাঙালি মণিকারের বহু পুরনো সোনারু কর্ম। শঙ্খের পলার ওপর কাজ করা স্বর্ণের পাত বসানো কিংবা স্বর্ণের ওই পাতে মিনা করাও বাঙালির প্রাচীন স্বর্ণ-শঙ্খ শিল্পের ঐতিহ্য। ওই দক্ষতা প্রসঙ্গে এ কথা বলা যেতে পারে, আমাদের মণিকাররা স্বর্ণকারের অন্য নাম যে ‘শেঁকরা’ এটিও এসেছে ‘শাঁখারি’ থেকে। এ শাঁখারির মাতৃশব্দ হলো শঙ্খ  শাঁখ  শাঁখা। শাঁখারি হচ্ছে ওই জাত বংশ যারা শঙ্খজাত গয়নাপত্র বানিয়ে পুরুষ পরস্পরায় জাতি ব্যবসা হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। তাই বলা যেতে পারে, বাঙালি হিন্দু জাতিভেদ সৃষ্টির ক্ষেত্রে শঙ্খের মাটি, স্বর্ণ, জাল, লোহা, তাঁতের মতো একটি বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। যেমন শাঁখারি চুনারি বা চুনে তারা বংশীয় পদবিপ্রাপ্ত হয়েছেন মূলত শঙ্খ কিংবা ঝিনুক থেকে। সুন্দরবন অঞ্চলে মুসলিমদের মধ্যে ‘শামুক খোটা’ নামে একটি জনগোষ্ঠী রয়েছে। ওই গোত্রের মানুষ সুন্দরবন থেকে শামুক, ঝিনুক, শঙ্খ সংগ্রহ করে জীবিকানির্বাহ করে থাকে। যেমনটি বাওয়ালিরা গোলপাতা, মাওয়ালিরা মধু ও মোম সংগ্রহের কাজ করে থাকেন ঠিক ওই রকম।
শঙ্খধ্বনি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্ম বিশ্বাসের বিষয়। গায়ত্রী সন্ধ্যায় শাঁখ বাজানো গৃহস্থের জন্য বিশেষভাবে মাঙ্গলিক। ওই শঙ্খবিধানির বিষয়টি এতোটাই বিশ্বাসের সঙ্গে পালন করা হয় যে, তা এখনো অলঙ্ঘনীয় ধর্মাচার হিসেবে পরিগণিত। হিন্দু ধর্মের কোনো কোনো দেব-দেবী ওই শঙ্খ বা মহাশঙ্খ ধারণ করেন। যেমন বিষ্ণু ভৈরবি, কামাখ্যা, বরাহ, কুর্ম, সূর্যসহ কেউ কেউ। বিশেষ করে বিষ্ণু শঙ্খ, ক্রি, গদা ও পদ্ম ধারণ করেন বলে তার একটি নামই হয়েছে ‘শঙ্খক্রিগদা পদ্মধারী’। বিয়েতে ওই শাঁখ বাজিয়ে নবদম্পতির জীবনের সামগ্রিক মঙ্গল নিশ্চিত করা হয়। যখন ওই শঙ্খনাদকে আশীর্বাদ হিসেবে স্বর্গীয় বিবেচনা করা হয় আবার বাতাসের বিপরীতে মুখ দিয়ে ধরে শাখের পেছনের ছিদ্রে কান পাতলে যে সোঁ সোঁ গভীর আওয়াজ শ্রুত হয় তখন তা নাকি সমুদ্রের নাদ বা ক্রন্দন। এ বিষয়ে লোকবিশ্বাস নির্ভর কিংবদন্তি বা লোককাহিনীর চল রয়েছে যে, এই শঙ্খশব্দ নাকি শাঁখের সমুদ্র ব্যঞ্জনার হাহাকার রোল। আসলে শঙ্খ খোলসের মধ্যে কয়েকটি প্যাঁচ থাকে। এর ভেতর দিয়ে গতি সম্পন্ন বাতাস নির্গত হতে বাধা পায় বলেই এমন গোঙানির শব্দ হয়।


রাজনৈতিক ক্ষেত্রে শঙ্খের ব্যবহার বিষয়ের অর্থটি নিশ্চয়ই বেশ কৌতূহল উদ্দীপক। সনাতন ধর্মের বিভিন্ন দেব-দেবীর শঙ্খ ধারণের যে পৌরাণিক ঘটনা তা মূলতই রাজনীতি ও যুদ্ধবিগ্রহ সংক্রান্ত তা বলাই বাহুল্য, রাজনীতিতে রাজনীতিই। যুদ্ধ, জয়, রাজ্য, সিংহাসন, স্বর্গবিচ্যুতি এসবও অতি অবশ্যই রাজনৈতিক বিষয়। আবার তাদের যুদ্ধক্ষেত্রে শঙ্খধ্বনিও আজকের কিউগলেরই নামান্তর। যা সর্বতভাবেই রাজনৈতিক ঘটনা তা যতোই হোক না কেন, পৌরাণিক।
যাহোক, ১৯৪৭ সাল-পূর্ব ব্রিটিশবিরোধী যে ‘স্বরাজ’ আন্দোলন এতে ভারতীয়রা অভিনব প্রতীকী ভাষায় সাবধানতা অবলম্বনে নির্দেশিত ছিল। সব পরিবারে যখন ওই মহল্লায় কোনো গোড়া পুলিশ বা ইংরেজ সৈনিক তল্লাশির জন্য কিংবা রেইট করতে ঢুকবে তখনই গৃহস্থ শঙ্খ ও কাঁসর বাজাবে যেন তাদের বাড়িতে কোনো উৎসব পার্বণের কাজ চলছে। আর ওই শঙ্খধ্বনি শোনার সঙ্গে সঙ্গেই লুকিয়ে থাকা স্বরাজ কর্মী অথবা তাদের আশ্রয়দাতারা দ্রুত সাবধান হয়ে থাকেন। বিশেষ করে স্বরাজ কর্মীরা সঙ্গে সঙ্গে সরে পড়তে বা যথাযথ আতœগোপন করতে পারেন।


রাজনৈতিক ছাড়া অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও শঙ্খ, শামুক, ঝিনুক ও গুগলির উল্লেখযোগ্য ভূমিকা যে ছিল এ কথা বেশি বয়সীদের জানা থাকলেও নতুন প্রজন্মের বাঙালির কাছে জানা না থাকারই কথা। এ অঞ্চলে ধাতব মুদ্রা ও কাগুজে নোটের চল শুরু শুরুর আগে এবং দ্রব্য বিনিময় প্রথা উঠে যাওয়ার পর, মানে, ওই দুটি যুগের মাঝখানে একটা দীর্ঘ কাল ছিল। তখন টাকা বা মুদ্রা হিসেবে কড়ি ব্যবহার করা হতো। কানাকড়ি মূল্য নেই’, ‘কড়ি দিয়ে কিনলাম’, পকেটে টাকাকড়ি নেই’, ফেলো কড়ি নাও মাল’, পাঁচকড়ি বাবু’ এসবই সাক্ষ্য দেয় এক সময় কড়িই ছিল টাকা বা পয়সা।
ওই কড়ি এক প্রকার প্রাকৃতিক শঙ্খ বা ঝিনুক ছাড়া অন্য কিছুই নয়। পরে কড়ি খেলার যে চল হয় তাও কড়ি মুদ্রা আমলে। এই কড়ি খেলা ছিল ওই আমলের জুয়া।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আরো ভূমিকা রয়েছে ঝিনুক বা শঙ্খার। আগে মানুষ জলাভূমি থেকে ঝিনুক সংগ্রহ করে রাখতো। আবার স্থান বিশেষে সংশ্লিষ্ট কারখানার প্রতিনিধি নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে গৃহস্থ বা সংগ্রাহকদের কাছ থেকে ঝিনুক সংগ্রহ করে তা দিয়ে বোতাম, চুলের কাঁটা ইত্যাদি তৈরি করতো। এক সময় আমাদের পোশাক শিল্প লোহার টিপ বোতাম এবং ঝিনুকের গোল ও চৌকা দুই ছিদ্রের বোতামের ওপর নির্ভরশীল ছিল। শাঁখারি, চুনারি ও শামুকখোটাদের জীবিকার প্রধান কাঁচামালও ছিল শঙ্খ বা ঝিনুক এ কথা আগেই বলেছি। কালে কালে চুনারিদের ঘরে ঘরে ঝিনুক পোড়ানো হাঁপর বা চুলার প্রচলন বিলপ্ত হয়। কৃষিতে অপরিণামদর্শী কীটনাশক প্রয়োগের ফলে বিভিন্ন জলাশয়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত হতে থাকে ঝিনুক-শঙ্খর বিবিধ বংশ। আবার বৈজ্ঞানিক ও খামার পদ্ধতিতে মাছ, হাস-মুরগি ইত্যাদি চাষের পরিপ্রেক্ষিতে খাদ্যদ্রব্য হিসেবে শামুক, ঝিনুক ও শঙ্খর ওপর চাপও পড়ে বেশ। ফলে যে কোনো অঞ্চলে যে কোনো জলাশয়ে প্রচুর ঝিনুক-শামুক পাওয়ার ক্ষেত্রে ভাটা পড়তে থাকে। এর পরিণতি এখন চরমে। তাই চুন তৈরিতে চুনারিদের ঝিনুক জোগাড় ও ব্যবহারের পদ্ধতিই পাল্টে গেছে। এখন দেশের দক্ষিণাঞ্চলে সমুদ্রপাড় ছাড়া সুন্দরবন এলাকায় সবচেয়ে বেশি চুনা উপাযোগী ঝিনুক পাওয়া যায়। ওইসব অঞ্চলে (বাগেরহাট, সাতক্ষীরা) বড় মহাজন ভাটা করে ঝিনুক গোড়ানোর বিরাট কারখানা বসিয়েছেন। সেখান থেকে বিভিন্ন জেলায় ট্রাকভরে উৎপাদকরা পোড়া ঝিনুক ক্রয় করে নিজ নিজ জেলায় নিয়ে কেবল ঘোটাঘুটির কাজ করে পাইকারি ও খুচরা দামে কাজ থাকে।
ঝিনুক যে কেবল শাঁখারি, প্যাঁকড়া, চুনারি ও শামুক থেকে সৃষ্টির পটভূমিকা প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে তা নয়। বাংলাদেশের কোনো কোনো অঞ্চলের নামকরণ হওয়ার ক্ষেত্রেও ঝিনুক-শামুক বিশেষ অবদান রয়েছে শাঁখারীবাজার, ঝিনাইগাতি, ঝিনাইদহ, শাঁখবাড়িয়া, মুক্তাগাছা প্রভৃতি। চুনারুঘাটের নামকরণের পেছনেও ঝিনুকের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে। এছাড়া ঝিনুক, শামুক, শঙ্খ, কড়ি ইত্যাদির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশের অনেক গ্রামের নাম নিশ্চয় পাওয়া যাবে। শাঁখারীপট্টি, চুনপাড়া এসব নাম তো সিংসন্দেহে মিলবে।


ঝিনুক, শামুক, শঙ্খের দেহ গড়নই কেবল বিচিত্র সুন্দর নয়, এর রঙ মনোহারি অপূর্ব বর্ণিল। দুটি ক্ষেত্রেই এর রকমফের বিস্ময় উদ্রেককারী সুন্দর। যে প্রজাতি, রঙ, মিঠা বা নোনা পানির হোক না শঙ্খ, এমনকি যে আকৃতিরই হোক না কেন, একটি ক্ষেত্রে এর অপরিহার্য মিল দেখা যায়। প্রতিটির খোলস খুব শক্ত এবং ভেতরটি ভীষণ নরম ও নাজুক। আবার খোলসের ক্ষেত্রে মিল হলো এগুলো একরঙা-বহুরঙা, কাঁটাযুক্ত-কাঁটামুক্ত, লম্বা-বেঁটে, ঢোপা-টেপা, গোল-তেকোণা, ভোঁতা-সুচালো যে আকারেরই হোক না কেন, ওই খোলস হয় আবশ্যিক ভাবেই প্যাঁচ বিশিষ্ট। ওই প্যাঁচ একাধিক এবং অনেক ক্ষেত্রে অগণতি।
শামুক ভাঙা, শঙ্খচিল এই পাখি দুটির নাম যে শঙ্খের সঙ্গে বেশ একটা সম্পর্কিত এ কথা আগেই বলেছি। বিষ্ণু দেবতার কথাও বলা হয়েছে যে, তার আরেক পৌরাণিক নাম হলো শঙ্খক্রিগদা পদ্মধারী। এছাড়া বাংলা সাহিত্য ও শব্দ ভা-ারে কিছু উচ্চারণ রয়েছে যা শঙ্খের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। যেমন শঙ্খকার, শঙ্খচিল, শঙ্খচূড়া, শঙ্খচুনি, শঙ্খবলয়, মহাশঙ্খর তেল, সুতাশঙ্খ, শঙ্খবিষ, শঙ্খমালা, শঙ্খনীল, শঙ্খমুখ। এর প্রতিটি বিষয় ভিত্তি করে ব্যাপক আলোচনার সুযোগ রয়েছে। এ সুযোগটি এখানে বিশেষ বিবেচনায় গ্রহণ করা গেল না। যদি আলোচনা করা যেতো তাহলে নিশ্চয়ই আমাদের কাছে আরো স্পষ্ট উপভোগ হতো যে, শঙ্খ কতো বহুরৈখিক আঙ্গিকে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে অর্থবহ বিষয় হিসেবে জেঁকে আছে। শঙ্খর যে বস্তুমূল্য এর বাইরেও বহুভাবে সাহিত্যিক ও রূপকাল্পনিক ভাবমূল্য রয়েছে। এ জন্য ওই কথা বললে অত্যুক্তি হবে না, শঙ্খ বাহ্যত যতো সামান্যই হোক না কেন তা লোকপৌরাণিক, আর্থসামাজিক এবং রীতিমতো ভাবসাহিত্যিক সম্পদ হিসেবে বহুরেখায় অত্যন্ত মূল্যবান। আসলেই শঙ্খের মাহাত্ম শঙ্খের চেয়েও অনেক। শঙ্খ বাহ্যত যা, আসলে এর চেয়ে বেশি।

 

মডেল : ঐশ্বর্য্য রহমান
পোশাক ও স্টাইলিং : সহজ টিম
মেকোভার : ক্লিওপেট্রা বিউটি স্যালন
ছবি : শোভন আচার্য্য অম্বু

 

Read 496 times

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…