ভাস্কর্য ও একজন হামিদুজ্জামান

ভাস্কর্য

একজন হামিদুজ্জামান

 

 

‘আমি যে গ্রামে বেড়ে উঠেছিলাম সেখানকার প্রায় সবাই ছিলেন শিক্ষিত। একই সঙ্গে দেশ-বিদেশের খবরাখবরও রাখতেন তারা। দৈনিক পত্রিকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ম্যাগাজিন আসতো আমাদের গ্রামে। ভারতীয় ম্যাগাজিনগুলোয় আঁকা থাকতো অনেক ছবি। ভারতীয় শিল্পীদের আঁকা ছবির সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয় এসব ম্যাগাজিনেই। আমি খুব অভিভূত হতাম, মাঝে মধ্যে আঁকার চেষ্টাও করতাম। তখন থেকেই আমার শিল্পের পথে চলার শুরু। পড়ার ফাঁকে ফাঁকে স্কুলের খাতাতেও চলতো এই চেষ্টা’-
কথাগুলো বলছিলেন বিখ্যাত ভাস্কর হামিদুজ্জামান। যার কাছে পরীক্ষার খাতাও কখনো কখনো হয়ে উঠতো ক্যানভাস।
বাবা ধার্মিক মানুষ হলেও রীতিমতো উৎসাহ দিতেন তার কর্মকা-ে। একদিন বাবার অনুরোধে পাড়ার মসজিদের ছবি আঁকলেন তিনি। অভিভূত বাবা ওই ছবি মসজিদের ইমামকে উপহার হিসেবে দিলেন। তিনিও ভারী খুশি হলেন। এরপর তার দাদার মুখাবয়বের সঙ্গে মিলে যায় এমন একটি স্কেচ এঁকে তাক লাগিয়ে দেন সবাইকে। এই ছোট ছোট বিষয়গুলো হামিদুজ্জামানের কাজে অনুপ্রেরণা যোগাতো। বাবার পাশাপাশি আশপাশের অন্য অনেকের উৎসাহে অনুপ্রাণিত হন তিনি।


এ পর্যন্ত হামিদুজ্জামান যতো ছবি এঁকেছেন এর সবই নিজের ভেতর থেকেই এসেছে। তার প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় আর্ট কলেজে ভর্তি হওয়ার পর (বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ)। তার কাছে প্রশ্ন রাখা হয়েছিল, আর্ট কলেজে ভর্তি হওয়ার বিষয়টি কি সহজ ছিল ওই সময়? তিনি উত্তর দিলেন, ‘না, তেমন সহজ ছিল না। ১৯৬২ সালে ম্যাট্রিক পাস করি। এরপর ইন্টারমিডিয়েট ভর্তি হয়েছিলাম ভৈরব কলেজে। আমার সাবজেক্ট ছিল সায়েন্স। দুই মাস ক্লাস করার পর ওই সাবজেক্ট আমার একদম ভালো লাগলো না। কিছুতেই ওইসব ফিজিক্স-কেমিস্ট্রিতে আমার মন বসছিল না। বাড়িতে এসে বাবাকে বললাম, ভালো লাগছে না একদম। আমি পড়তে পারছি না। এর মধ্যে অবশ্য জেনে গিয়েছি ঢাকার আর্ট কলেজের কথা। আর ওই সময়ের মধ্যে আঁকার হাতটা একটু ভালো হয়ে উঠেছিল। তাই বাবার কাছে এসে আর্ট কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য গো ধরলাম। আমাদের ওখানে যে পোস্ট অফিস ছিল সেখানে ভালো এক পোস্ট মাস্টার ছিলেন। তার সঙ্গে আমার বাবার খুব ভালো সখ্য ছিল। গল্পে গল্পে বাবা যখন ওনাকে জানালেন, আমি আর্ট কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য বায়না ধরেছি তখন তিনি বললেন, ছেলে যেখানে ভর্তি হতে চায় সেখানেই ভর্তি করিয়ে দিন। আবার অনেকে বললেন, চারুকলায় গেলে আমি নষ্ট হয়ে যাবো। কিন্তু সব মিলিয়ে বাবা শেষ পর্যন্ত আমাকে আর্ট কলেজে ভর্তি করার জন্য ঢাকায় নিয়ে আসেন।

আর্ট কলেজে ভর্তির ভাইভা নিয়েছিলেন জয়নুল আবেদিন স্যার।’ উচ্ছ্বসিত হয়ে তিনি বললেন ওই ঘটনা ‘আমি ও বাবা দু’জনে মিলে সরাসরি ওনার বাসায় চলে গিয়েছিলাম। ঢাকায় আসার আগে বাবা বেশ খোঁজখবর করে জয়নুল আবেদিন স্যারের বাসার ঠিকানা নিয়ে আসেন। আমরা যখন তাঁর বাসায় গেলাম দেখা করতে তখন আমাকে তিনি বললেন, দেখি তুমি কী আঁকো? তখন তাঁকে আমার কিছু আঁকা ছবি দেখালাম। এরপর তিনি সেগুলো দেখে আমাকে বললেন, তুমি কাল আর্ট কলেজে গিয়ে আমার নাম বলবে। বলবে জয়নুল আবেদিন ভর্তি করিয়ে নিতে বলেছেন। তারা তোমাকে ভর্তি করিয়ে নেবে।’
শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনকে শিক্ষক হিসেবে পাওয়াটা কম কথা নয়। আর হামিদুজ্জামানকে তিনি ভীষণ ভালোবাসতেন। এর প্রমাণ তিনি তখন পেয়েছিলেন যখন দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন- ‘হঠাৎ একদিন আবেদিন স্যার আমাকে ডাকলেন। একটু ভয় পেয়ে গেলাম। ওনার সামনে যাওয়ার পর তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার এক্সিবিশনে কতোটি ওয়াটার কালার আছে? মুখ কাচুমাচু করে বললাম, বেশ কিছু আছে স্যার। স্যার বললেন-ওগুলো দেবে, আমার ডিপার্টমেন্ট থেকে ফ্রেম করিয়ে দেবো। আমার কাছে যেগুলো ছিল সেগুলো স্যারের কাছে দিয়ে দিলাম। আমাদের প্রিন্ট মেকিংয়ের অনেক বড় বড় ফ্রেম ছিল। টিচাররা ইউজ করতেন মাঝে-মধ্যে। সেখানে গিয়ে দেখি, আমার ছবিগুলা সব ফ্রেম করা হয়ে গেছে। এরপর সেখানে আবেদিন স্যার এসে বললেন- এই শোনো, তোমার যে কয়টি ছবি আছে তা আমি কিনে নিলাম। এগুলো আমার। আমার যে বিভিন্ন গেস্ট আসে তাদের এগুলো প্রেজেন্ট করবো। তুমি অফিস থেকে পয়সা নিয়ে যেও। আমি দ্বিতীয় বর্ষে পড়ি আর আবেদিন স্যার আমার ছবি কিনেছেন! খুশিতে কেঁদে ফেলি। এটি আমার জীবনের অনেক বড় পাওয়া এবং অবশ্যই অনুপ্রেরণা তো বটেই।


ভাস্কর্যের সঙ্গে পরিচয় হলো কবে জিজ্ঞাসা করতেই হামিদুজ্জামান বললেন, ‘এ ভাবনাটা ফাইনাল পরীক্ষা দেয়ার পর যখন বিদেশে যাই তখন মাথায় আসে। ফাইনাল ইয়ারে পড়ার সময় আমার একটা মেজর অ্যাকসিডেন্ট হয়। এতে আমার মাথায় অনেক আঘাত লাগে। এরপর মোটামুটি সুস্থ হওয়ার পর ফাইনাল পরীক্ষা দিই এবং পাস করি। এরপর লন্ডনে চলে যাই চিকিৎসার জন্য। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ডাক্তাররা আমাকে চার মাস লন্ডনে থাকতে বললেন। তবে সব থেকে মজার ব্যাপার হলো, কিছু ছবি বিক্রি করে বেশকিছু টাকা হাতে করেই লন্ডনে গিয়েছিলাম। কিন্তু চিকিৎসা করাতে আমার তেমন কোনো টাকা লাগেনি। আমি স্টুডেন্ট বলে আমাকে চিকিৎসকরা ফ্রি চিকিৎসা করিয়ে দিলেন। আর এর মধ্যে লন্ডনে বেশ কিছুদিন থাকার সুবাদে ফ্রি টাইমে ঘোরাঘুরি করা শুরু করি। এরপর মাঝে বেশ কিছুদিন সময় নিয়ে প্যারিস ও রোমেও ঘুরতে যাই। এ সময় দেখে ফেলি ব্রিটিশ মিউজিয়াম, ভিকটোরিয়া অ্যালবার্ট মিউজিয়াম, পোট্রেইট গ্যালারি, ন্যাশনাল মিউজিয়াম, প্যারিসের ল্যুভর মিউজিয়ামসহ রোমের বিখ্যাত সব গ্যালারি। মূলত ওই সময়টাতেই ভাস্কর্য আমাকে একটু আলাদাভাবে টানতে শুরু করে। বিভিন্ন স্থানে প্রতিস্থাপিত বিভিন্ন ভাস্কর্য দেখে ভাবতাম, এই মেটালের ভাস্কর্যগুলো কতো লড়াই করে প্রকৃতির ভেতর টিকে রয়েছে এবং যুগ যুগ ধরে রয়েছে বিভিন্ন ঘটনার সাক্ষী। এগুলো অনেক ঐতিহ্য বহন করতে পারে। এসব চিন্তা থেকেই ভাস্কর্যের প্রতি আমার এক ধরনের আগ্রহ তৈরি হয়।’
হামিদুজ্জামান যদিও পেইন্টিং নিয়ে পড়াওশানা করেছেন তবুও শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন ও প্রফেসর রাজ্জাকের উৎসাহে ১৯৭০ সালে আর্ট কলেজে ভাস্কর্যের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। শিক্ষক হওয়ার পর ভারতের বড়দা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কলারশিপ নিয়ে পড়াশোনা করেন তিনি।
এরপর ১৯৭৬ সালে বড়দা মহারাজা সাহাজিরাও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএফএ করেন। পরে ১৯৮২-১৯৮৩ সালে স্কাল্পচার সেন্টারে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বহুকাল চারুকলার শিক্ষকতা শেষে অবসর নেন তিনি।
পড়াতে খুব ভালোবাসতেন বলেই অনারারি প্রফেসর হিসেবে এখনো মাঝে মধ্যেই ক্লাস নেন।


দেশে-বিদেশে বহু ভাস্কর্যের জনক হামিদুজ্জামানের উল্লেখযোগ্য কাজগুলোর মধ্যে বঙ্গভবনের ‘পাখি পরিবার’, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সংশপ্তক’ এবং ১৯৮৮ সালে সিউল অলম্পিকের ‘স্টেপস’ কাজগুলো প্রচুর সুনাম এনে দিয়েছে তাকে। ওই কাজগুলো করতে গিয়ে ভাস্কর্য চর্চায় কোনো বিদেশি প্রভাব খুঁজে পেয়েছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিদেশি প্রভাব থাকবে কেন! আমাদের সংস্কৃতির চিরায়ত প্রভাব রয়েছে ওই কাজগুলোয়। এসব ভাস্কর্য বিদেশি ধাতুতে নির্মিত হলেও এতে আমাদের স্বকীয়তা রয়েছে। কারণ ভাস্কর্য চর্চা তো আমাদের কারো কাছ থেকে ধার করা নয়। ভাস্কর্য চর্চায় আমরা নতুন নই। আমাদের টেরাকোটা এ অঞ্চলের ভাস্কর্যের চিরায়ত প্রভাব বহন করে। ওই টেরাকোটা অনেক বছরের পুরনো। নিঃসন্দেহে বলতে পারি, আমাদের ভাস্কর্য চর্চার শিকড় আছে। আমরা চাইলেই আমাদের স্বকীয়তা নিয়ে কাজ করতে পারি। এ জন্য কারো দ্বারস্থ হওয়ার দরকার হয় না।’

হামিদুজ্জামান তাঁর শিল্পে সমৃদ্ধ করুন আমাদের সংস্কৃতি, তাঁর হাত ধরে আলাদা বৈশিষ্ট্য ধারণ করুক উমহাদেশের ভাস্কর্য শিল্প। হামিদুজ্জামানের দীর্ঘায়ু কামনা করছি।

 

_____________________________
সাক্ষাৎকার : শাকিল সারোয়ার
ছবি : শোভন আচার্য্য অম্বু

 

Read 239 times

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…