ঈদ উৎসব ও নন্দনতত্ত্ব

ঈদ উৎসব ও নন্দনতত্ত্ব

ড. মো. আমিরুল মোমেনীন চৌধুরী




ঈদ ‘আওদ’ শব্দ থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। আওদ-এর আভিধানিক অর্থ পুনরাগমন বা বার বার ফিরে আসা। অষ্টম শতকের প্রথম দিকে বাংলাদেশে মুসলমানদের আগমন ঘটে। ওই সময় সুফি, দরবেশ, তুর্কি- আরব বণিকদের মাধ্যমে বাংলাদেশে রোজা, নামাজ ও ঈদের সূত্রপাত বলে মনে করা হয়। অবশ্য তা ছিল বহিরাগত ধর্ম শাসক, ব্যবসায়ী ও ভ্রমণকারীদের ধর্মীয় উৎসব। বাংলাদেশের ধর্ম সামাজিক পার্বণ নয়। বাংলাদেশে রোজা পালনের প্রথম ঐতিহাসিক বিবরণ পাওয়া যায় ‘তাসকিরাতুল সোলহা’ গ্রন্থে। এই গ্রন্থের বিবরণ থেকে জানা গেছে, আরব দেশের শেখউল খিদা-র ৩৪১ সন মুতাবিক অর্থাৎ ৯৪১ খ্রিস্টাব্দে ঢাকায় আগমন। ঢাকায় ইসলাম ধর্ম প্রবেশের আগে শাহ সুলতান রুমি নেত্রকোনা ও বাবা আদম শহীদ বিক্রমপুরের রামপালে ইসলাম প্রচার শুরু করেন। শেখউল খিদা চন্দ্র বংশীয় রাজা শ্রী চন্দের শাসনকালে (৯০৫- ৯৫৫ খ্রিস্টাব্দ) সবুজ বদ্বীপে আগমন করেন বলে অনুমান করা হয়। তাদের প্রভাবেই বাংলাদেশে রোজা, নামাজ ও ঈদ প্রচলিত হয়েছিল- এটাও প্রমাণ সাপেক্ষ নয়। কারণ ‘নামাজ’, ‘রোজা’, ও ‘খোদা হাফেজ’ শব্দের ব্যাপক প্রচলনে বোঝা যায়, অ্যারাবিয়ানরা নন, ইরানিয়ান সুফি-দরবেশদের দ্বারাই বাংলাদেশে ইসলাম প্রচার শুরু হয়েছে। উপরোক্ত তিনটি শব্দই আরবি নয়, ফার্সি। ১৬৪০ খ্রিস্টাব্দে বাংলার সুবেদার শাহ সুজার নির্দেশে তার প্রধান আমাত্য মীর আবুল কাসেম একটি ঈদগাহ (২৪৫-১৩৭ ফিট আয়তন) নির্মাণ করেন। ভূমি থেকে ১২ ফিট উঁচু ওই ঈদগাহের চতুর্দিকে ১৬ ফিট উঁচু সুদৃশ্য প্রাচীর ঘেরা। ঈদগাহে মেহরাব ও মিনার নির্মিত হয়েছিল। মোগল আমলে রাজদরবার, আদালত, সেনা ছাউনি ও বাজারে কেন্দ্রে অবস্থান ছিল ওই ঈদগাহের। সেখানে শুধু সুবেদার, নায়েবে নাজিম, অভিজাত মুসলমান কর্মকর্তা ও তাদের স্বজনরাই এখানে ঈদের নামাজ পড়তে পারতেন। পরে ঈদগাহ ময়দান জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। ওই ঈদগাহ ময়দানের পাশে ঈদের সময় মেলা বসতো। মোগল আমলে ঈদের দিন জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান ও আনন্দ উৎসব হতো। এর প্রমাণ পাওয়া যায় বাংলাদেশে বিভিন্ন স্থানে গণমুখী শাহী ঈদগাহের উপস্থিতি দেখে। সুফি-সাধকদের ভূমিকাও ছিল এক্ষেত্রে অনন্য এবং অধিকতর জনসচেতন। উনিশ শতকের শেষ দিকে ঈদের আনুষঙ্গিক আনন্দের সঙ্গে যুক্ত হয় একটি নতুন উপাদান ‘লোকজ মেলা’। ওই মেলায় শোলার তৈরি পাখি, ফুল, কুমির, হাতি, ঘোড়া, নকশা তালপাখা, চিত্রিত শখের হাঁড়ি ছাড়াও অনেক লোকজ খেলনা পাওয়া যায়। আর দই, মিষ্টি ও জিলাপির পসরার কোনো তুলনা নেই। ওই ধারা এখনো বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিরাজমান। ঈদ যে বাংলাদেশের মুসলমানদের মহোৎসব এর বড় প্রমাণ উৎসবমুখর ঈদের বাজার। তা নি¤œবিত্ত থেকে উচ্চবিত্তের এক যোগসূত্র। এর সঙ্গে আবার যুক্ত কোরবানির মহোৎসব। ‘কোরবানি’ শব্দের অর্থ অতীব নিকটবর্তী হওয়া। কোরবানির পশুপালনের সঙ্গে যুক্ত নি¤œবিত্তের কোটি কোটি নারী-পুরুষ। বলা চলে, ঈদের প্রস্তুতি সারা বছর ধরে এবং সামাজিক ও আর্থিক উন্নয়নও ঈদ উৎসবের বাইরে নয়।

 


পৃথিবীর ইতিহাসে বিভিন্ন ধর্মের যে উৎসব উদযাপিত হয়, ঈদ উৎসব ওই তুলনায় কনিষ্ঠতম। কিন্তু আয়োজনের ব্যাপকতায় সবচেয়ে বড়। সমকাল থেকে ১৩৮৮ সৌর বছর আগে এই উৎযাপন শুরু হয়। ইসলামের বার্তাবাহক নবী হজরত মুহম্মদ (সা.)-এর মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের অব্যহতি পর প্রথম ঈদুল ফিতর উৎসব পালন শুরু হয়। অ্যারাবিয়ানদের ইহুদি ধ্যান-ধারণা ও জাহেলি প্রথার পরিবর্তে দুই ঈদ ছিল আল্লাহর রাসুলের পক্ষ থেকে মুসলমানদের জন্য ঘোষিত উপহার। ইসলামি আদর্শে উজ্জীবিত আরববাসী পালন শুরু করে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। এর আগে আরবে পৌত্তলিক ভাবনায় অগ্নিপূজকদের ‘নওরোজ’ ও মূর্তিবাদীদের ‘মিহিরজান’ নামে দুটি শ্রেণিবৈষম্য, অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ উৎসব পালিত হতো। এর পরিবর্তে দুই উৎসব বয়ে আনে আনন্দবার্তা। শ্রেণিবৈষম্যহীন, পবিত্র আর ধর্মানুভূতির মেলবন্ধনের মহোৎসব। ঈদুল ফিতর শব্দের অর্থ রোজা ভাঙার দিবস। ঈদুল ফিতরের আগের রাতকে ইসলামি পরিভাষায় বলা হয় ‘লাইলাতুল জায়জা’। এর অর্থ পুরস্কার রজনী। ঈদুল আজহাকে ধর্মীয় পরিভাষায় বলা হয় ‘ইয়ামুজ জায়েজ’। এর অর্থ পুরস্কারের দিবস। এছাড়া আছে আলবেনিয়ান, আরবি, বাংলা, চায়নিজ, গ্রিক, হিন্দি, হিব্রু, সিলেটি নাগরী ও তামিল ভাষায় দুই ঈদের আলাদা নাম প্রচলিত। দেড় হাজার বছরেরও বেশি ঈদ উৎসব পালিত হচ্ছে। ক্যামেরাবিহীন যুগে চিত্রশিল্পীরা ধরে রেখেছেন ঈদ উৎসবের ছবি। অবশ্য ইসলামিক অনুশাসনে ছবি আঁকা নিয়ে বিরোধ-বিতর্ক রয়েছে। ঈদ উৎসবের যতো চিত্রশিল্প রয়েছে এর মধ্যে শোভাযাত্রার ছবি বেশি। বর্ণাঢ্য সাজে সজ্জিত মানুষ দলবেঁধে ঈদগাহ ময়দানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। শোভাযাত্রায় হাতি, ঘোড়া, রাজকীয় পালকি ও নকশাদার ছাতার ব্যবহার রয়েছে। কোনো কোনো ছবিতে আতশবাজি পোড়াচ্ছেন নারীরা। বোরাকের ছবি এঁকেছেন শিল্পীরা। মাথায় চাঁদ-তারাখচিত মুকুট শোভিত বোরাকের বোরাক, ছবির ভেতর ফার্সি ও আরবি ভাষায় ক্যালিগ্রাফি। মোগল আমলের ছবিতে স¤্রাটকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। সব ছবির ভেতর ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যতা ও ঠা-া রঙ ব্যবহারের চাতুর্যতা প্রশংসনীয়। বিশ্বশিল্পে ইসলামিক চিত্রকলার একটি বিশাল স্থান রয়েছে, বিশেষ করে পার্শিয়ান ও মোগল মিনিয়েচার চিত্রশিল্প। ওই চিত্রশিল্প পর্যবেক্ষণে এর ইতিহাস জানা জরুরি।


শিল্প প্রতিভার দ্বারাই নির্মাণ করা সম্ভব। সাধারণভাবে তাকেই শিল্প বলা হয় যার বিকাশ অথবা প্রকাশ মানুষের বুদ্ধিবৃত্তির দ্বারা চালিত নয়, বরং একটি সুকুমার বোধ ও কল্পনা প্রতিভার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। প্রাচীনকাল থেকে আধুনিককাল পর্যন্ত শিল্পকে নানানভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। অস্কার ওয়াইল্ড যেমন ‘আর্ট ফর আর্ট সেক’ তত্ত্বে বিশ্বাসী ছিলেন তেমনি লিও টলস্টয় অথবা বার্নাড শ’ শিল্পের সামাজিক মূল্যমানকে শিল্পের উদ্দেশ্য মনে করেছেন। অস্কার ওয়াইল্ড বলেছেন, ‘সুন্দর সৃষ্টিই হচ্ছে শিল্পের একমাত্র লক্ষ্য- ‘দ্য আর্টিস্ট ইজ দ্য ক্রিয়েটর অ্যা বিউটিফুল থিংক’। শিল্পে নীতির প্রশ্নকে তিনি স¤পূর্ণ উপেক্ষা করেছেন- ‘দেয়ার ইজ নো সাচ থিংক অ্যাজ অ্যা মোরাল অর ইমমোরাল বুক’। লিও টলস্টয় তার ‘হোয়াট ইজ আর্ট’ গ্রন্থে লিখেছেন, শিল্পের মধ্যে প্রকাশিত হবে সেসব ‘ফিলিং ইনডিস পেনসিবল ফর দ্য লাইফ অ্যান্ড প্রগ্রেস টুওয়ার্ডস ওয়েলবিং অ্যা ইনডিভিজুয়ালস অ্যান্ড অ্যা হিউম্যানেটি’। ফ্রেজার তার ‘দ্য গোল্ডেন বাউস’ গ্রন্থে অকাল্ট ম্যাজিক ইত্যাদি বিষয়কে প্রাচীন শিল্পের উৎসমুখ বলে উল্লেখ করেছেন। শিল্পকলায় অনুকরণ অর্থাৎ ইমিটেশনের প্রসঙ্গ সুপ্রাচীন। গ্রিক শব্দ ‘মাইমেসিস’ ইমিটেশন বা অনুকরণের অনুকরণ। প্লেটোর অনুকরণতত্ত্বে শিল্প হলো ‘আর্ট ইজ ডাউলি রিমোভড ফ্রম রিয়ালিটি’ অর্থাৎ ঈশ্বর তার পরিকল্পনা অনুযায়ী নিজস্ব প্রতিরূপ হিসেবে যে বিশ্বসংসার তৈরি করেছেন এরই দ্বিতীয় প্রতিরূপ হচ্ছে শিল্পকলা। শিল্পের প্রেরণা হিসেবে তার ধারণা ছিল শিল্পী শিল্পকর্ম সৃষ্টির জন্য ঐশ্বরিক অনুভূতির ওপর নির্ভরশীল। প্লেটো শিল্পীর অন্তরে নিজস্ব ‘অ্যাসেনসিয়াল ক্রিয়েটিভ স্প্রিট’কে অবিশ্বাস করতেন। ঐশ্বরিক প্রেরণাজাত কোনো বিশেষ তাগিদ শিল্পীর ওপর ভর করলেই শিল্প সৃষ্টি সম্ভব।


নন্দনতত্ত্ব ও শিল্পের নির্মিতিকে কখনোই বিচ্ছিন্নভাবে দেখা যায়নি। এটি ভারতীয় সমাজের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর অপরিহার্য অংশ। সমাজের একদিকের পরিবর্তন অনিবার্যভাবে অপরদিককে প্রভাবিত করে। এটিই হচ্ছে ভারতীয় সমাজ, শিল্প ও শিল্প-কারখানার আন্তঃসম্পর্কের প্রকৃত ‘গতি বিজ্ঞান’। উপনিষদের সৃষ্টি ও জীবন সংক্রান্ত ‘মেটাফিজিকাল’ বা অধিবিদ্যামূলক দর্শন ও ঈশ্বর ধারণা কয়েক হাজার বছর ধরে এই উপমহাদেশে দিয়েছিল এক সাংস্কৃতিক যোগসূত্র। তা প্রতিফলিত হয়েছে সারা ভারতবর্ষের লোকশিল্প, লোকসাহিত্য, সঙ্গীত ও নৃত্যবৈচিত্র্যের মধ্যে একই সুরের খেলা, বহুর মধ্যে একই সুরের স্পন্দন। প্রায় ৫ হাজার বছর আগে আর্যদের আগমন এবং এই উপমহাদেশে আর্য ও দ্রাবিড়দের সহাবস্থানের দ্যোতক ভারতবর্ষের বেদ উপনিষদের স্বীকৃতির পর বহু জনগোষ্ঠী উপমহাদেশে এসেছে। ভারতবর্ষের মহামানবের মূল স্রোতে মিশে গেছে অনেক সময় নিজ নিজ বৈশিষ্ট্য রেখেও।


খ্রিস্টীয় দশম শতাব্দীতে মুসলমানরা এলো এক অতি উচ্চাঙ্গের সংস্কৃতি ও ধর্মবোধ সঙ্গে নিয়ে। তাদের আগমনের পূর্ব পর্যন্ত ভারতবর্ষে কোনো গ-িবদ্ধ ধর্মমত ছিল না। হিন্দু জনসমাজের মধ্যে ছিল বেদ ও উপনিষদের দর্শন। ওই দর্শনের বিস্তৃত অঙ্গনের মধ্যে বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন সময়ে নানান বিশ্বাস বা অবিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ধর্মাচারণ করতো। এই প্রথম এক জনগোষ্ঠী ভারতবর্ষে বাস স্থাপন করেও উপমহাদেশের মূল স্রোতের বাইরে নিজেদের বিশিষ্ট সংস্কৃতি ও ধর্ম নিয়ে স্বতন্ত্র পরিচয় স্থাপন করে। হিন্দু সমাজেও এই সময় ধীরে ধীরে স্বতন্ত্র বোধের উদয় হয়। বহু হিন্দু ধর্মান্তরিত হন। পশ্চিম এশিয়ার ইসলামিক দেশগুলো থেকেও ভারতবর্ষে এসে বসবাস স্থাপন করেছিল বহু জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তি-দার্শনিক, কবি, ঐতিহাসিক ছাড়াও স্থপতি, সঙ্গীতজ্ঞ, চিত্রশিল্পী ও নানান ধরনের পারদর্শী কারুশিল্পী। ধীরে ধীরে ভারতবর্ষে গড়ে ওঠে এক বর্ণাঢ্য সংস্কৃতি। ভারতীয় মুসলিমের সংস্কৃতি এবং পশ্চিম এশিয়া ও ভারতীয় শিল্প-সংস্কৃতির মিলনে গড়ে ওঠে ওই সংস্কৃতি। দুই সামন্ততান্ত্রিক দেশের নাগরিক সংস্কৃতি মুসলিম ও মুসলিম-উত্তর দরবারি শিল্প। আদিম সমাজ থেকে যখন মানুষের সামন্ততান্ত্রিক সমাজে উত্তরণ ঘটে তখন ওই সামন্ততান্ত্রিক সমাজে গ্রামীণ লোকসংস্কৃতির পাশাপাশি গড়ে ওঠে এক নাগরিক সংস্কৃতি, নতুন সমাজের নগর ও জনপদগুলো কেন্দ্র করে। ভারতবর্ষের লোকসমাজ আদিবাসী সংস্কৃতি ও মুসলিম সমাজের দরবারি সমাজ বাদ দিলে বৃহত্তর হিন্দু সমাজ জাতি-বর্ণে বিভক্ত হয়। ওই সমাজে লোকসংস্কৃতির নানান অভিব্যক্তি, বিশেষ করে লোকশিল্পের উপজাত বস্তু ৯টি শিল্পভিত্তিক বর্ণের অবদান। বৃত্তিভিত্তিক বর্ণ-বিভাগের ফলে প্রাচীন ভারতের সামন্ততান্ত্রিক সমাজের নাগরিক সংস্কৃতি
প্রয়োজনীয় সর্ববস্তু সম্ভারের জন্য বংশানুক্রমিক ভাবধারা ও অসাধারণ দক্ষতার


অধিকারী বর্ণাশ্রয়ী শিল্পীদের ওপর নির্ভরশীল ছিল। মধ্যযুগে ইসলামি শিল্প-সংস্কৃতি- যাকে দরবারি শিল্প বলা হয় এর সংস্পর্শে এলো হিন্দু নাগরিক সংস্কৃতির শিল্প। ওই মিলনের ফসল হিসেবে ভারতবর্ষের নাগরিক শিল্প এমন এক নান্দনিক গুণ অর্জনে সমর্থ হয়েছিল যে, পৃথিবীজুড়ে এর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে ওই যুগে। মোগল শাসন আমলে ভারত উপমহাদেশে মুসলমানদের যে স্থাপত্য ধারা প্রবর্তিত হয় তা দেখা যায় উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থানে প্রাসাদ, মসজিদ, দুর্গ, দরবার কক্ষ, স্মৃতিসৌধ্য, মিনার প্রভৃতির বিচিত্র বর্ণ ও অলঙ্করণের মাধ্যমে। ৭১২ খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয়ের মধ্য দিয়ে এই উপমহাদেশে মুসলমানদের আগমন সভ্যতার ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের দ্বার উন্মোচন করে। এতে দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার ক্ষেত্রে তেমন উল্লেখযোগ্য প্রভাব বিস্তার করতে না পারলেও মুসলমান এবং স্থানীয় অধিবাসীদের মধ্যে ভাব ও সংস্কৃতির আদান-প্রদান করতে পূর্ণমাত্রায় সক্ষম হয়েছিল। সিন্ধুর বিশেষ এলাকা ‘মানসুরা’য় (বর্তমানে ধ্বংস্তূপে পরিণত) নির্মিত ক্ষুদ্র পরিসরের মসজিদ ছাড়া ওই সময়ের স্থাপত্যের তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য নিদর্শন পাওয়া যায় না। তবে মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয়-পরবর্তী মুসলিম বিজয় এবং স্থায়ীভাবে তাদের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পথ অনেকটা সহজ করে দিয়েছিল। একাদশ শতাব্দীতে গজনির সুলতান মাহমুদ একাধিকবার ভারতবর্ষে প্রবেশ করেন। কিন্তু যে কোনো প্রাসঙ্গিক কারণেই হোক, তিনি স্থায়ীভাবে এখানে রাজত্ব করেননি এবং তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য নির্মাণে ব্রতী হননি। অবশ্য তিনি গজনিতে অনেক সুরম্য প্রাসাদ ও ধর্মীয় ইমারত ও বিজয়স্তম্ভ নির্মাণ করেছেন। গজনির স্থাপত্যরীতি
পরবর্তীকালে ভারতীয় মুসলিম স্থাপত্যে বহুলাংশে অনুসৃত হয়েছে। এর সাক্ষ্য বহন করে দিল্লির কুতুব মিনারের নির্মাণ কৌশল।


ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিম স্থাপত্যকে সাধারণত  প্রধান তিনটি শৈলীতে ভাগ করা যায়। তা হলো দিল্লির সুলতানি স্থাপত্যরীতি, মোগল রাজকীয় শৈলী ও প্রাদেশিক বা আঞ্চলিক স্থাপত্যশৈলী। শৈলীগত পরিবর্তন ঘটলেও মোগল স্থাপত্য অলঙ্করণে ইসলামি ধারাবিবর্জিত কোনো বিষয় রচিত হয়নি। ইসলামি শিল্পকলার অন্যতম প্রধান গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো অলঙ্করণ। ইসলামি শিল্পকলাকে মূর্তিবিবর্জিত বা আইকনিক শিল্পকলা বলা হয়েছে। অপরাপর শিল্পকলার মতো ইসলাম কেন্দ্র করে কোনো ‘আইকনিক’ বা মূর্তি শিল্প গড়ে ওঠেনি। ইসলামি শিল্পকলায় অলঙ্করণের ব্যবহার দু’দিক থেকে বিচার করা যায়- উপকরণভিত্তিক ও মোটিভভিত্তিক। অলঙ্কণের প্রকারভেদ নির্ভর করে উপকরণের ওপর। উমাইয়া যুগে পাথর ও মার্বেলের সর্বজনীন প্রয়োগের ফলে যে ধরনের অলঙ্করণের উদ্ভব হয়, আব্বাসীয় যুগে ইটের ব্যবহারে তা দেখা যায় না। এ কারণে পাথরের ওপর যে ধরনের নকশা দেখা যায় তা সাধারণত খোদাই বা স্টোন কার্ভিং ‘ফুসাইফিসা’ বা মোজাইক, ওপুস সেকটাইল বা সাদা পাথর কেটে রঙিন পাথর বসিয়ে নকশা করা। পাথরের ওপর বিভিন্ন আকারের নুড়ি, কাচ, মার্বেল প্রভৃতি বসিয়ে যে মোটিভ সৃষ্টি করা হয় তাকে মোজাইক বলে। আব্বাসীয় যুগে মোজাইকের ব্যবহার হ্রাস পেলেও সামারার ভগ্নপ্রাপ্ত বালকুয়ারা প্রাসাদ থেকে প্রচুর মোজাইক উদ্ধার করা হয়। ওপুস সেকটাইল-এর প্রয়োগ ভারত উপমহাদেশে মোগল আমলে, বিশেষ করে সম্রাট আকবরের স্থাপত্যকীর্তিতে (ফতেপুর সিক্রির জামে মসজিদ, সেকেন্দ্রায় আকবরের সমাধি, আগ্রায় ইতিমদল্লার সমাধি) দেখা যায়। এছাড়া মোগল স্থাপত্যগাত্রে ফ্রেস্কো, স্টাকো, টেরাকোটা, রঞ্জিতটালী ও পিয়েত্রা দুরার বহুল ব্যবহার করা হয়েছে। আর শিল্পের ইতিহাস বদলে দিয়েছে আবয়বিক

Read 341 times

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…