রবীন্দ্রনাথ আবার আসবে বলেছিল

রবীন্দ্রনাথ আবার আসবে বলেছিল

প্রফেসর ড. মো.আমিরুল মোমেনীন চৌধুরী

 

মেয়েটা প্রথম কথা বললো
তুমি কি রঙের জাদুকর?
: জাদুকর নই। আমি শিল্পী। ছবি আঁকি।
তবে রঙ নিয়ে খেলছ যে বড়!
: খেলছি কোথায়, ছবি আঁকছি।
তোমার কাছে কাগজ নেই? তখন থেকে কোরা কাপড়ে কী ঘষছ?
: এটা কোরা কাপড় নয়, প্রিপারেশন করা সাদা ক্যানভাস। আমি তো রঙ-তুলি দিয়ে ছবি আঁকছি।
ছবি না ছাই আঁকছ। কালো রঙ শুধু খরচ হচ্ছে, কিছুই তো হচ্ছে না।
: তেলরঙের ছবি। আদল ফুটে ঊঠতে সময় লাগবে। আমার তো করার কিছুই নেই। আর কালো রঙ কোথায় দেখছ, এ তো লাল রঙ।
আমি দেখছি কালো আর তুমি বলছ লাল।
: নিশ্চয় তোমার পূর্বপূররুষ মৌমাছি ছিল।


তা হবে কেন?
: মৌমাছি লাল রঙ দেখতে পায় না। লালকে কালো দেখে। তাই তো মৌচোর মৌমাছিগুলো লাল ফুলে বসে না। আমাদের চোখে যে ফুল একই রঙের, মৌমাছির কাছে তা ধরা দেয় নানান রঙে।
আমি তো জানতাম না।
: সব কথা জানতে হবে, এর কোনো মানে নেই। আমিও অনেক কিছু জানি না।
তুমি বলছ, তোমার ছবিতে লাল রঙ।
: সে তো সবাই বলবে। তা ছাড়া কালো তো কোনো রঙই নয়।
তাহলে যে কালোকে রঙ বলি! আমার কাজল কালো চোখ, মেঘ কালো চুল, কপালের কালো টিপ সবই কি মিথ্যা?
: কোনোটাই মিথ্যা নয়।
তুমি যে বললে।
: কালো হলো সব রঙের অসমসত্ত্ব মিশ্রণ।
তাহলে সাদা রঙ?
: সাদা হলো সব রঙের সমসত্ত্ব মিশ্রণ।
তাহলে ওই রঙ ছবিতে ঘষে লাভ নেই, বরং আমার কপাল দেখো কেমন হাট হয়ে আছে। এতে লাল রঙ ঘষে দাও।
: তোমার কপালে লাল রঙ ঘষবো!
হ্যাঁ, তাই তো বলছি। দেখছ না, কপালে সিঁদুর নেই। সিঁদুর ছাড়া মেয়েদের কপাল মানায়।
: এ তো রঙ। সিঁদুর নিয়ে এসো পরিয়ে দিই।
সিঁদুরের কৌটা হারিয়ে ফেলেছি সেই কবে রবীন্দ্রনাথ যখন প্রথম এসেছিল।
: তুমি রবীন্দ্রনাথকে দেখেছ?
দেখবো না কেন! সেই তো আমাকে পতিসরে নিয়ে এলো।
: তোমার বয়স কতো? বরীন্দ্রনাথ পতিসরে এসেছিলেন ১৮৯১ সালে।
মেয়েদের বয়স জানতে নেই।
: তুমি কোথায় থাকো?
তা তো বলবো না।


: রবীন্দ্রনাথ পতিসরে বসে কোন কোন কবিতা, গল্প লিখেছিলেন তা তুমি জানো?
জানি। ঘরে বাইরে, শাস্তি, চৈতালীর ঋতুসংহার, চিত্রার পূর্ণিমা আর সন্ধ্যা।
: তুমি রবীন্দ্রনাথকে ভালোবাসো।
রবীন্দ্রনাথকে সবাই ভালোবাসে।
: তুমি রানু, না কাদম্বরী?
রবীন্দ্রনাথকে ভালোবাসতে রানু বা কাদম্বরী হতে হবে কেন?
: তুমি কি জানো, রবীন্দ্রনাথও বর্ণান্ধ ছিল। রবীন্দ্রনাথ সব রঙকে চিনতে পারতেন না। রঙকানা ছিলেন তোমার রবীন্দ্রনাথ।
তুমি কি আমাকে বোকা বানাচ্ছ?
: বোকা বানাবো কেন? পৃথিবীর অনেক মানুষ আছে যারা বর্ণান্ধ। বর্ণান্ধতা বা ডাল্টনিজম প্রধানত দুই ধরনের হয়। প্রথমত. শ্রেণিভুক্ত মানুষ লাল ও নীল প্রভাবিত বর্ণটি সবুজের মধ্যে দেখে এবং দ্বিতীয়ত. শ্রেণিভুক্ত মানুষ গোলাপি ও হালকা সবুজের পার্থক্য বোঝে না। আর এক ধরনের বর্ণান্ধ আছে, বিশেষ করে দুর্গম সমুদ্র উপকূলে যারা বসবাস করে এমনই উপজাতির মানুষ পৃথিবীকে সাদা-কালোয় দেখে। বর্ণান্ধতা নারীদের চেয়ে পুরুষের মধ্যে বেশি। ফিজি, নিউ গিনি ও কঙ্গোর পুরুষদের মধ্যে বর্ণান্ধতার প্রকোপ বেশি। মানুষ, বানর বা এপম্যান, মাছ, সরীসৃপ ও কীটপতঙ্গেও বর্ণানুভূতি প্রখর বিশেষ করে যেসব প্রাণীর পরাগায়ণের সঙ্গে সম্পর্ক আছে। চতুষ্পদ স্তন্যপায়ী প্রাণীর কোনো বর্ণানুভূতি নেই।
তাহলে ষাঁড় লাল কাপড় দেখলে ক্ষেপে যায় কেন?
: ষাঁড় তো লাল, নীল, সবুজ আলাদা করে চিনতেই পারে না। যে কোনো রঙের কাপড় দিয়েই ষাঁড়কে উত্তেজিত করা যায়।
তাহলে রবীন্দ্রনাথ জীবনের এতো জয়গান করলেন কী করে?
: সে প্রশ্নটি আমারও। আমারও জানতে ইচ্ছা করে রবীন্দ্রনাথ সত্যিই বর্ণান্ধ ছিলেন কি না। সমস্যা হলো...!
কী সমস্যা?
: রবীন্দ্রনাথই জানিয়েছেন, তিনি বর্ণান্ধ। লাল বর্ণ নাকি তার চোখেই পড়ে না অর্থাৎ ‘প্রটানোপিয়া’। তবু তার ছবিতে লাল বর্ণের সমাহার রোজ ম্যাডায়ার, ক্রিমসন লেক, ভারমিলিয়ন রেড, স্কারলেট রেড, ইন্ডিয়ান রেড। রবীন্দ্রনাথ নীল বর্ণও বড় একটা ব্যবহার করতে চাইতেন না। কিন্তু তার অনেক নিসর্গচিত্রে সমুদ্র বর্ণ নীল, প্রুশিয়ার নীল, কোবাল্ট নীল, আলট্রামেরিন, বিশেষ করে আকাশের পটভূমি গড়ে তুলতে ব্যবহার করেছেন। তবে লালের প্রতি আকর্ষণ সত্ত্বেও হলুদ বা সবুজ বর্ণ যথেষ্ট ব্যবহার করেছেন। যেমন নিসর্গচিত্রে প্রতিকৃতি রচনায় অথবা হলুদের ওপর সবুজ। বর্ণান্ধ থিউরিতে বলা হয়, 

"Colour Blindness is the inability to distinguish the difference between certain colours. The condition results from an absence colour-sensitive pigments in the cone cells of retina, the nerve layer at the back of eye. Most colour vision problems are inherited are present at 1 out of 12 men and 1 out of 20 women. A person with colour blindness has trouble seeing red, blue, or mixture of these colours. The most common type is red-green Colour-blindness where red and green are seen as the same colour"


রঙ নিয়ে আরো কথা আছে। বাইরের জগৎ থেকে আসা তথ্য চোখ সংগ্রহ করে এবং তা মস্তিষ্কে প্রেরণ করার আগে তাৎক্ষণিকভাবে চোখ তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে। চোখ আর মস্তিষ্কের সম্পর্ক খুবই অদ্ভুত ধরনের। চোখের আড়াল হলে মনের আড়াল হওয়া ব্যাপারটি এখানে সম্পূর্ণ উল্টো। এখানে মনের আড়াল হলে চোখের আড়াল অর্থাৎ মন না চাইলে চোখ কী করে দেখবে! এর একটা সহজ প্রমাণ হলো, সাদা কাগজের ওপর লাল রঙের একটি বৃত্ত আঁকতে হবে। এরপর কিছুক্ষণ বৃত্তটির দিকে নির্ণিশেষ তাকিয়ে থেকে হঠাৎ এক সময় দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে আরেকটি সম্পূর্ণ সাদা কাগজে দিকে তাকালে একটি আবছা সবুজ রঙের বৃত্ত দেখা যাবে। এর কারণ হলো, লাল বৃত্তটির দিকে তাকিয়ে থাকার ফলে লাল রঙের প্রতি সংবেদনশীল গ্রাহকযন্ত্র ক্লান্ত হয়ে পড়ে ও স্বল্প সময়ের জন্য তার কর্মক্ষমতা লোপ পায়। তাই আমরা যখন দ্বিতীয় সাদা কাগজটির দিকে তাকাই তখনই ওই কাগজ সমস্ত রঙ প্রতিফলিত করলেও লাল গ্রাহকযন্ত্র ক্লান্ত থাকায় এর কাজ সঠিকভাবে করতে পারে না। অপরপক্ষে নীল ও সবুজ গ্রাহকযন্ত্র সতেজ থাকায় পূর্ণশক্তিতে কাজ করে এবং মুহূর্তের জন্য আমরা লাল রঙের পরিপূরক বলে সবুজ রঙটি দেখতে পাই। এতে এটিই প্রমাণিত হয়, চোখ যে রঙ দেখতে চায়, মন ওই রঙটিই দেখায়।
রঙের এতো কথা!
: আরো কথা আছে। রঙ চিত্রশিল্পে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রঙ কখনো আলো, কখনো প্রতীক, কখনো পরিপ্রেক্ষিত এবং কখনো বিষয়। চোখ খুললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে রঙের ভুবন। অক্ষর ও সংখ্যার মতো রঙ মানুষের সহজ ও স্বাভাবিক জীবনের অঙ্গ। রঙের ভাবার্থ, ভাষা ও ব্যঞ্জনার প্রকাশ সাধারণত এভাবে করা হয়ে থাকে
সাদা : পবিত্রতা, শুভ্রতা, শান্তি, বিশ্বাস, আধ্যাত্মিকতা ও আভিজাত্য।
কালো : শ্রীহীন, মলিন, ধ্বংস, শোক ও বিকৃতি।
লাল : প্রেম, আনন্দ, সৌন্দর্য, বিপ্ল¬ব, আশা ও জীবন।
কমলা : হৃদয়াবেগ, কামনা ও উষ্ণতা।
নীল (কোবাল্ট) : সহনশীলতা, রোমান্টিকতা, অসীমতা ও জ্ঞান।
নীল (প্রুশিয়ান ) : ভয়, অস্বস্তি, উদ্বেগ ও হিংস্রতা।
সবুজ : প্রকৃতি, প্রাণ, মুক্তি, সততা, তারুণ্য ও বিশালতা।
হলুদ (লেমন) : ধর্মীয় আবেগ, প্রজ্ঞা, তাপ, আশ্বাস, নৃশংসতা, কাপুররুষতা ও প্রতারণা।


হলুদ (সোনালি) : ঐশ্বর্য, স্বাস্থ্য, বিস্ময় ও সমৃদ্ধি।
বেগুনি : হতাশা, দুঃখ ও নির্জীবতা।
বাদামি : মন্থরতা ও ঔদাসীন্য।
পিঙ্গল : বিষাদ ও বিস্মৃতি।
ধূসর : মৃত্তিকা ও শূন্য প্রান্তর।
চিত্রশিল্পে ব্যবহার উপযোগী রঙ দু’ভাবে ভাগ করা হয়েছে। তা হলো
মৌলিক (অবিমিশ্র) বা প্রাইমারি রঙ : লাল, নীল ও হলুদ।
মাধ্যমিক বা সেকেন্ডারি রঙ : কমলা, বেগুনি, ধূসর, পিঙ্গল, সবুজ, বাদামি, গোলাপি ইত্যাদি।
এবার ছবির কথা বলো। কার ছবি আঁকছ মডেল ছাড়া? তুমি কি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর?
: আমি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হতে যাবো কেন?
তাহলে যে বড় দেমাগ করে মডেল ছাড়া ছবি আঁকছ!
: রবীন্দ্রনাথ ছাড়া কেউ বুঝি মডেল ছাড়া ছবি আঁকতে পারে না?
না, পারে না।
: আমি যে মেয়েকে ভালোবাসি তাকেই আঁকবো ভেবেছি।
সেই মেয়ে কি আমি?
: তুমি নও, অন্য কেউ। তার জন্যই তো আমি এখানে এসেছি।
সে মনে হয় পালিয়ে গেছে, বরং আমার ছবি আঁকো। তোমার মডেল হবো আমি।
: তা কী করে হয়!
কেন হয় না। আমি বুঝি সুন্দর নই?
: তুমি অনেক সুন্দর। যার ছবি আঁকছি সে আরো সুন্দর।
হতেই পারে না।
: হতে পারে না কেন?
আমি বলছি, তাই। ছবি শেষ করে দেখো।
: আমার ছবি শেষ হতে সময় লাগবে।
আমি অপেক্ষা করবো।
: কোথায় যাচ্ছ তুমি? এই যে বললে অপেক্ষা করবে?
আমার বুঝি কাজ নেই? বসে বসে তোমার ছবি আঁকা দেখবো?
: এই যে বললে আমার মডেল হবে।
বয়েই গেছে তোমার মডেল হতে! ওই দেখো।
: কী?
বৃষ্টি থেমে গেছে। আকাশে রামধনু।
: আমরা বলি রঙধনু।


রামধনু বলতে দোষ কী?
: হিন্দু ধর্মের মানুষ ভাবে, ওটা রামচন্দ্রের ধনুক। তাই রামধনু।
মুসলিমরা তা মানতে নারাজ, তাই।
রঙের ধনুক রঙধনু।
: রঙের আবার জাতি-ধর্ম!
জাতি-ধর্মের নয়, ব্যাপারটি বিশ্বাসের। ইংরেজিতে এর নাম রেইনবো। বাংলা নামের অর্থের সঙ্গে এর কোনো মিল নেই। রঙধনুর সাতটি রঙ বেগুনি, নীল, আসমানি, সবুজ, হলুদ, কমলা ও লাল। ইংরেজিতে এর সংক্ষেপ ‘ভিবজিওর’ আর বাংলায় ‘বেনীআসহকলা’।
: কোথায় তুমি? আমি কার সঙ্গে কথা বলছি? ছবি আঁকা শেষ হয়ে গেছে।
ক্যানভাসের ছবির দিকে তাকিয়ে দেখো।
: কী আশ্চর্য! এ তো তোমার ছবি।
তুমি তো আমার ছবিই একেঁছ।
: আমি তো অন্য কারো ছবি আঁকতে চেয়েছিলাম। এটি কী করে সম্ভব হলো!
পৃথিবীতে অসম্ভব বলে কিছু নেই।
: আমার কাছে এসো। তোমাকে তো দেখতে পাচ্ছি না।
আমাকে আর কখনো দেখবে না তুমি।
: তা কী করে হয়!
আমি যে এ রকমই।
: আমি তো তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি।
এই যে বললে, তুমি অন্য কাউকে ভালোবালো?
: সেই মেয়ে যে তুমি তা আমিও জানতাম না।
ভালোবাসার আগে আমার মনের খবর জানা উচিত ছিল।
: তবু তোমাকেই যে আমি ভালোবেসেছি!
আমি যে ক্যানভাসের ছবি হয়ে গিয়েছি।
: ক্যানভাস থেকে বেরিয়ে এসো।
আমি যে তোমার হতে পারবো না!
: কেন পারবে না?
আমি যে অপেক্ষায় আছি!
: কার জন্য অপেক্ষা করে আছ তুমি?
রবীন্দ্রনাথের জন্য।
: রবীন্দ্রনাথের জন্য! তুমি কি পাগল? রবীন্দ্রনাথ আর কখনো আসবে না।
রবীন্দ্রনাথের জীবনে কোনো মিথ্যা নেই।
: এটি সত্য-মিথ্যার কথা নয়। একটি বড় ভুলের মধ্যে আছ তুুমি।
আমি জানি। তবুও আমার কাছে রবীন্দ্রনাথ আবার আসবে বলেছিল।
: পতিসরে অনেক খুঁজেছি তাকে। দেখা হয়নি। শুধু মনে পড়ে
‘জীবন যদি শুকায়ে যায়, করুণা ধারায় এসো, সকল মাধুরী লুকায়ে যায় গীতসুধা রসে এসো ...’

রবীন্দ্রনাথ কি সত্যি আবার আসবে? সে যে বলে গেল!

Read 381 times

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…