ক্যানভাসের কবি কালিদাস

ক্যানভাসের কবি কালিদাস

 

শিল্পরসিকদের নানাভাবে মোহবিষ্ট করার ক্ষমতা রাখেন যে চিত্রশিল্পী তিনি আর কেউ নন বাংলাদেশের প্রথিতযশা নিরীক্ষাধর্মী কাজের জন্য বিখ্যাত কালিদাস কর্মকার। এই চিত্রশিল্পীকে এখনো ছুঁতে পারেনি বার্ধক্য। তাঁর কাজে-কর্মে, শিল্পবোধে তাই ছুঁয়ে যায় তারুণ্যের উচ্ছ্বলতা। তাঁর ছবিতে মানবীয় অভিজ্ঞতা, জ্ঞাতী সম্পর্কের ভাষা ইত্যাদি মুহূর্তেই মূর্ত করে তোলেন। তার ছবির শেকড় গাঁথা এ জনপদেরই মাটিতে। অ্যাক্রিলিক, মিশ্র মাধ্যম, গোয়াশ, কোলাজ, ওয়াশি, মেটাল কোলাজ, ড্রইং, ডিজিটাল লিথো, মিশ্র- নানান মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলেন জীবনের উপজীব্য। জীবন প্রণালি, নানান ধর্মের সমন্বয়, লোকশিল্পের বিভিন্ন প্রতীক উপাদান হিসেবে চলে আসে তাঁর বিস্ময়কর শিল্প সৃষ্টিতে। তাঁর চিত্রকলায় এ জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন উত্থান উপাখ্যান ও আন্দোলনের অনুষঙ্গে এসেছে যখন হাতের যা কাছে পেয়েছেন তা দিয়েই। তাঁর ছবিতে ধরা পড়েছে মৃত্যুমুখ যোদ্ধার যন্ত্রণাকাতর অভিব্যক্তি, এসেছে আবহমান বাঙালির ষোল কলাসহ নানান বিষয়। তাঁর এসব অনবদ্য সৃষ্টির কোথাও অস্পষ্টতাও দেখা যায়নি।

এবছরে একুশে পদকে ভূষিত খ্যাতনামা এ শিল্পীর সাথে সহজের কথোপকথনে উঠে এসেছে শিল্পীজীবনের নানা উপাখ্যান। শিল্পী হয়ে ওঠার গল্পে তিনি বললেন, ‘যেহেতু আমি কর্মকার পরিবারের সন্তান সেহেতু শৈশবেই বড়দের দেখাদেখি আঁকতে শুরু করি। ওই সময় কলকাতা থেকে জয়নুল আবেদিনসহ অন্য কয়েক প্রথিতযশা শিল্পী এসে ঢাকায় আর্ট কলেজ স্থাপন করলে স্কুল জীবন শেষে ঢাকা ইনস্টিটিউট অফ আর্টস-এ ভর্তি হই এবং ১৯৬৩-৬৪ সালে চিত্রকলায় আনুষ্ঠানিক ডিগ্রি লাভ করি। এরপর কলকাতার গভর্নমেন্ট কলেজ অফ ফাইন আর্টস অ্যান্ড ক্রাফট থেকে ১৯৬৯ সালে প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান নিয়ে চারুকলায় ¯œাতক ডিগ্রি অর্জন করি।’

সহজের প্রশ্ন ছিল আপনি নিজেকে কোন ঘরানার শিল্পী বলে মনে করেন? তিনি কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে বলেন, ‘নিজেকে র্শিল্পী মনে করি না আমি। সারা জীবন নতুন কিছু করতে চেয়েছি। যা কিছু করেছি সবই নিরীক্ষা। সারা বিশ্বে ছোটাছুটি করে কাজ করতে পছন্দ করি যাতে আমাদের চিত্রশিল্প আধুনিক থেকে আধুনিক হয়ে ওঠে।’
আপনার ক্যানভাসে কী বলতে চান এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমি ছবি আঁকি নিজের জন্য, দেশের জন্য মানুষ নিয়ে আমার বেদনার কথা বলতে চাই ক্যানভাসে।

প্রদর্শনী বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে, বললেন- দেশে-বিদেশে এ পর্যন্ত আমার নির্বাচিত চিত্র প্রদর্শনীর সংখ্যা ৭১। এছাড়া আন্তর্জাতিক দলবদ্ধ বহু প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেছি।
নিরীক্ষাধর্মী কাজ করতে আপনার কেমন লাগে? তিনি বললেন, ‘আমি দেশে তো করিই। তাছাড়া ভারত, পোলান্ড, ফ্রান্স, জাপান, আমেরিকায় আধুনিক শিল্পের বিভিন্ন মাধ্যমে উচ্চতর ফেলোশিপ নিয়ে সমকালীন দেশ-বিদেশে কাজের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চলেছি। ফ্রিল্যান্স শিল্পী হিসেবে এসব করছি সেই ১৯৭৬ সাল থেকে।’
ছাপচিত্র সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে আমিই প্রথম ছাপচিত্রের প্রচলন করেছি। এটা এখন ঘরে-ঘরে হচ্ছে।’
মূর্ত ও বিমূর্ত প্রশ্নে, তিনি বলেন, ‘পৃথিবীতে বিমূর্ত বলে কিছু নেই। সবকিছুই মূর্ত। সবকিছু নির্ভর করছে আপনার চোখ ও মন ওই জিনিসটিকে কীভাবে বা কত গভীরভাবে দেখছে এর ওপর। আপনি একটি শিশির ফোঁটা একটি ঘাসের ডগাতে দেখলে তা সেভাবেই দেখেন। কিন্তু তা কখন কোন রঙের বিচ্ছুরণ ঘটায় সেটিই কোনো শিল্পী তার চিত্রে ধারণ করেন। এটিকেই আমরা বিমূর্ততা বলি। আসলে সবই মূর্ত।’

খ্যাতিমান শিল্পী হিসেবে বর্তমানে আমাদের শিল্পাঙ্গনে কীসের অভাব বোধ করেন? উত্তরে বলেন, ‘বিশ্বের সব দেশে, এমনকি সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত একটি দেশেও যে জিনিসটি রয়েছে তা আমাদের এই স্বাধীনতাপ্রাপ্তির ৪৭ বছর পরও আমরা পেলাম না। অতি দুঃখ ভরে জানাতে হচ্ছে, আমাদের দেশে কোনো জাতীয় আর্ট গ্যালারি নেই। দেশের বিখ্যাত ১০ শিল্পীর শিল্পকর্ম এক সঙ্গে দেখা যাবে- এমন কোনো চিত্রশালা বা আর্ট মিউজিয়াম নেই। অথচ জাতীয় চিত্রশালা হলো কোনো দেশের সংস্কৃতি ও সভ্যতার ধারক-বাহক। আশা করি, স্বাধীনতার পক্ষের সরকার আমাদের এ দাবিটির বাস্তবতা অনুধাবন করে দ্রুত যথাযথ ব্যবস্থা নেবে। এছাড়া এটি যেহেতু খুব বড় খরচের ব্যাপার নয় সেহেতু ব্যক্তি পর্যায়েও অনেকে এগিয়ে আসতে পারেন।’

মানুষ ধীরে ধীরে এসব প্রর্দশনী ও ললিতকলার ব্যাপারগুলো থেকে দূরে চলে যাচ্ছে এর কারণ কী বলে মনে করেন? ‘এ ব্যাপারে দারিদ্র্যকে দায়ী করা যায় না। কিন্তু আমাদের বর্তমানের অবিশ্রাম যানজট জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। কোথায় কখন পৌঁছাতে

পারবো তা আমরা কেউই জানি না। রাস্তার মধ্যেই মানুষের মন মরে যায়, সুখ উড়ে যায়- সে কীভাবে তখন বিভিন্ন প্রদর্শনীতে যাওয়ার কথা চিন্তা করবে! এই যানজট আমাদের কাজের একটা অন্তরায়। এটি শুধু আমাদেরই নয়, রাষ্ট্রীয় অনেক কাজেই স্থবিরতা নামিয়ে এনেছে। এই অঞ্চলের মানুষের মন পলির মতোই নরম। রাজনৈতিক অস্থিরতা, ক্ষমতার লড়াই, বঞ্চনার শিকার ইত্যাদি কারণে মানুষের মন বসে যাচ্ছে। তবে এত অস্থিরতার পরও শেষ পর্যন্ত মানুষ জেগে উঠছে নিজস্ব পরিক্রমাতেই।’

শিল্পী না হলে কী হতে চাইতেন প্রিয় কালিদাস? ‘আমি কর্মকার পরিবারের সন্তান। জন্মের পরই দেখেছি আমাদের পরিবারের সবাই ভালোবেসে নিজের মন থেকে শিল্প সৃষ্টির কাজ করে যাচ্ছেন এবং সবাই মানসিক আনন্দে রয়েছে। আমিও হাতে কাজ তুলে নিই। শিল্পী হিসেবে কাজ করতে থাকি। দ্বিতীয় কোনো চিন্তা-ভাবনা করার সুযোগ আসেনি, চেষ্টাও করিনি। তাছাড়া আমার ছোট দুই ভাইও শিল্পী। তারা ইউরোপে কাজ করে পুরস্কৃত হয়েছে।’

পরিবার সম্পর্কে জানতে চাইলে শিল্পী জানান, ‘আমার দুই মেয়ে। তারা দু’জনই বিদেশে রয়েছে। আমার স্ত্রী বহুদিন আগেই পরপারে চলে গেছে। আমি এখন নিঃসঙ্গ জীবন কাটাচ্ছি আর শিল্প ভাবনায় ডুবে আছি।’
পুরস্কার ও প্রাপ্তি সম্পর্কে কোনো আক্ষেপ আছে? উত্তরে ক্যানভাসের কবি কালিদাস জানান ‘মানুষের ভালোবাসাই আমার সবচেয়ে বড় পুরস্কার। শিল্পকলার ‘শিল্পী সুলতান পুরস্কার’ পেয়েছি। এ বছর (২০১৮) ‘একুশে পদক’ পেলাম। আন্তর্জাতিকভাবেও অনেক পুরস্কার পেয়েছি।’

শিক্ষকতা করার প্রসঙ্গে বলেন, ‘না, কোথাও শিক্ষকতা করিনি, এখনো করছি না তবে, যাদের না করতে পারি না তারা বাসায় এসে কাজ শেখে। শিক্ষকতা বলতে যা বোঝায় সেটি বাসাতেই করি।’
মনের মতো ছবিটি এঁকেছেন কিনা প্রশ্নের উত্তরে হেসে বললেন, ‘না, তা পারিনি। তবে বহু ভালো ছবি এঁকেছি। বেঁচে থাকলে চেষ্টা চালিয়ে যাবো।’
শিল্পীর চেষ্টা অব্যাহত থাকুক। সহজের পক্ষ থেকে তাঁর প্রতি আমাদের আন্তরিক অভিবাদন।

 

প্রশ্ন ও সম্পাদনা : সহজ ডেস্ক
অনুলিখন : রাশেদ মামুন
ছবি : আরাফাত

Read 120 times

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…