Page 1 of 3

ঈদে সাজাই ঘর

লেখা : শায়মা হক

 


ঈদ- তা হোক না ঈদুল ফিতর কিংবা ঈদুল আজহা। ঈদ মানেই ওই ছোট্টবেলা। আর ছোটবেলার আনন্দের স্মৃতিতে কিছুটা হলেও হারিয়ে যাওয়া।
ঈদের দু’একদিন আগে ঘরবাড়ি ঝেড়ে-মুছে ঝকঝকে তকতকে করে তোলার নানান প্রস্তুতি। বিছানার চাদর, টেবিল ক্লথ ইস্ত্রি করে ধোপাবাড়ি থেকে ফিরে আসা বা ঈদ উপলক্ষে শত ব্যস্ততার মধ্যেও একটু সময় করে একগোছা ফুল কেনার দৃশ্যগুলো কারই না মনে পড়ে!


শত শত বছর ধরেই ঈদ এলে অন্দর মহলে পড়ে যায় সাজ সাজ রব। অতিথি আপ্যায়নে সেমাই, ফিরনি, জর্দা, কাবাব- নানান সুস্বাদু খাদ্যদ্রব্যের সঙ্গে সঙ্গে ঘরের সাজের দিকেও থাকে যে যার সাধ্যমতো নজর। দিন বদলেছে, বদলেছে নানান আকাক্সক্ষা বা চাহিদাও। এখন শুধু ধোপাবাড়ি থেকে চাদর, পর্দা কাচিয়ে আনাতেই রুচি বা আকাক্সক্ষা সীমাবদ্ধ নয়। এখন নতুন পোশাকের পাশাপাশি উৎসবগুলোয় নতুন কুশন, পর্দা কেনাতেও অনেকেই কার্পণ্য করেন না। তাই তো ঈদের আগের রাতে ফুলের দোকানগুলোতেও দেখা যায় অনেক ভিড়। সবাই চান উৎসবের দিনে একটু তাজা ফুলের সুবাসে সুবাসিত করে তুলতে ছোট্ট গৃহকোণ। কেউ কেউ পুরো বাড়িতে নতুন করে রঙ বা আসবাবপত্র বার্নিশ করে পুরনো জিনিসে নতুনের বৈচিত্র্য এনে ফেলে।


সে যাই হোক। লিখতে বসেছিলাম ঈদের বিশেষ দিনটির বিশেষ গৃহসজ্জা নিয়ে। ঈদের বিশেষ গৃহসজ্জার শুরুটা ভাবতে হবে মূল প্রবেশপথ থেকে। এরপর বসার ঘর, খাবার ঘর, এমনকি শোয়ার ঘর থেকে টয়লেট বা বারান্দা হয়ে কিচেন পর্যন্ত কোনো অংশই অবহেলার যোগ্য নয়। প্রথমেই মূল প্রবেশপথটি সাজানোর দিকে খেয়াল রাখতে হবে এমনই ভাবে যেন সেটি অতিথিকে বাড়িতে স্বাগত জানাতে সহায়তা করে। এখানে বড় বা মাঝারি কারুকার্যময় মাটির পটারি, সবুজ-সতেজ গাছপালা, পাথর, ইদানীংয়ের টেরারিয়াম, ল্যাম্প- এসব ছাড়াও মাটির পাত্রে পানি দিয়ে ফুলের পাপড়ি ছড়িয়ে ফ্লোটিং মোমবাতি জ্বালিয়ে দেয়া যেতে পারে। প্রবেশপথের দেয়াল আয়না ও ছোট কাজ করা টেবিল এবং এতে কিছু শোপিস, ক্যাক্টাস জাতীয় গাছ বা ফোটোফ্রেম সাজিয়ে দেয়া যায়।


এরপরই আসে বসার ঘর বা ড্রয়িং রুমটি। প্রায় সবাই সাধ ও সাধ্যের সমন্বয়ে সাজান ওই ঘর। কেউ কেউ ওই ঘরটি আধুনিক সাজে সাজাতে ভালোবাসেন, কেউ বা দেশীয় উপাদান দিয়ে দেশীয় আঙ্গিকে সাজাতে ভালোবাসেন। সাজের ধরনটি যাই হোক না কেন, উৎসবে প্রতিটি সাজই হওয়া চাই স্নিগ্ধ, উজ্জ্বল, আনন্দময় ও মন ভালো করে দেয়ার মতো।
দেশীয় আঙ্গিকে সাজানো বসার ঘর : এমন একটি ঘরে কাঠ, বেত বা বাঁশের সোফা কিংবা অন্য আরামদায়ক ডিজাইনে বসার ব্যবস্থা করলে ভালো দেখাবে। সোফার কভার, কুশন কভার হতে পারে হালকা বা উজ্জ্বল রঙের। আবার সোফা ও কুশনের কালার কনট্রাস্ট হতে পারে। এখানে পর্দার রঙেরও সামঞ্জস্য থাকতে হবে। পর্দার রঙের সঙ্গে মিলিয়ে মেঝেতে শতরঞ্জি বা শীতলপাটি বিছানো যেতে পারে। দেশীয় ঢঙে সাজানো বসার ঘরে মাটি, কাঠ, বেত বা পাটের তৈরি শোপিস বেশি মানাবে। দেয়ালেও ঝোলানো যেতে পারে কাঠ, পাট বা পেপার ম্যাশের মুখোশ। পটারি ও ল্যাম্পের ব্যবহারও এ ঘরটিকে আলাদা মাত্রা দেবে। আবার ফ্লোরেও বসার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। ফ্লোরে নকশিকাঁথার ম্যাট বিছিয়ে বা শতরঞ্জি পেতে বসার আয়োজন করা যেতে পারে। এর ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা যেতে পারে কিছু রঙিন কুশন ও তাকিয়া। মাটির ফুলদানি বা সিরামিকের বড় জার দিয়ে সাজানো যেতে পারে বসার ঘরের একটা পাশ। দেয়ালে ঝোলানো যায় দৃষ্টিনন্দন আর্ট বা পারিবারিক স্মৃতির ফটোগ্রাফস। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির সামনের দোকানগুলোয় ভিন্ন ধরনের কৃত্রিম ফুল, ঝাড়বাতি, ফুলদানি, টেবিল ল্যাম্প, মাটি দিয়ে তৈরি চিত্রকর্ম ও বাঁশের তৈরি নানান সামগ্রী পাওয়া যায় যা দিয়ে দেশীয় ঢঙে ঘর সাজানো মনোরম হয়ে উঠতে পারে।


আধুনিক ঢঙে সাজানো বসার ঘর : আধুনিক ঢঙে সাজানো বসার ঘরে ঈদের সাজের ক্ষেত্রে সোফা ও কুশন কভারের রঙ ব্ল্যাক, অফহোয়াইট, চকলেট, কফি, মেরুন ইত্যাদি হতে পারে। একই সঙ্গে পর্দার রঙটিও হতে হবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে পর্দার কাপড়ের ক্ষেত্রে একটু ভারী সিল্ক, নেট বা সিল্কের সঙ্গে লেসের ভারী ডিজাইন ভালো লাগবে। সোফা ও পর্দার রঙের সঙ্গে মিল রেখে মেঝেতে বিছিয়ে দেয়া যায় পুরু কার্পেট। সেন্টার টেবিলটি চৌকোনো, ওভাল বা সার্কেল শেইপের হতে পারে। সার্কেল শেইপের সেন্টার টেবিলের মাঝে ক্রিস্টাল বোলে বেশকিছু রঙিন মার্বেল বা আশপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে শোপিস রাখা যেতে পারে। এছাড়া চৌকোণা বা ওভাল টেবিলে মোম, ছোট গাছ বা শোপিস দিয়ে সাজানো যেতে পারে। ওই সঙ্গে সিলিংয়ে ঝোলানো যেতে পারে ক্রিস্টাল ঝাড়বাতি। ঘরের কোণায় কোণায় সবুজ ইনডোর প্লান্টস ঘরটি সজীব ও প্রাণবন্ত করে তুলবে।


খাবার ঘর : ঈদের সাজে বসার ঘরের পরই ভাবতে হবে খাবার ঘরের সাজসজ্জা নিয়ে। কারণ ঈদের দিনে ওই ঘরেই অতিথি আপ্যায়ন করা হয়। ঈদের উৎসব পূর্ণতা পায় খাবার ঘিরে। তাই সুন্দর পরিবেশনার সঙ্গে সঙ্গে খাবার টেবিল ও ঘরটিকেও দিতে হবে পরিপাট্য রূপ। লম্বাটে আকৃতির টেবিলের মাঝে সুদৃশ্য রানার বিছিয়ে দেয়া যায়। একই সঙ্গে রঙিন ম্যাট বিছিয়ে দেয়া যায় আবার রানারের ঠিক মাঝখানে রাখা যেতে পারে ছোট ফুলদানিতে সতেজ ফুল বা সুদৃশ্য রঙিন মোমসহ মোমদানি। উৎসবে তো শোকেস থেকে নামিয়েই উঠিয়ে রাখা হয় সুদৃশ্য ক্রোকারিজ। খাবার টেবিলের কাছাকাছি ছোট একটা টেবিল বা র‌্যাকে প্রয়োজনীয় প্লেট, গ্লাস, চামচ রাখা যায়। টেবিলের ঠিক ওপর রঙিন ল্যাম্পশেড খাবার ঘরটিতে মায়াবী পরিবেশ সৃষ্টি করবে।


শোয়ার ঘর : ঈদের দিন সকাল বেলাটিতেই বিছানাটি চাদর বা বেড কভারে ঢাকুন টান টান করে। সাইড টেবিলে ফুলদানিতে সাজিয়ে দেয়া যায় সুগন্ধি ফুল। বেড কভারের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে পর্দার রঙ ও কাপড় নির্বাচন করা উচিত। বেড সাইড টেবিল ল্যাম্প বা ঘরের কোণে কর্নার ল্যাম্পও ঘরটিকে মায়াময় করে তুলতে পারে। মেঝেতে কার্পেট ও দেয়ালে পেইন্টিং শোবার ঘরটি করে তুলবে আরো আকর্ষণীয় এবং মনমুগ্ধকর। শিশুদের শোবার ঘরটিকে সাজানো যায় কার্টুন বেড কভার, কুশন বা মজাদার পোস্টারে। দেয়ালে কার্টুন একে দেয়া যেতে পারে। ঈদ উপলক্ষে শিশুদের ঘরের দরজা বা কর্নার নিরাপদ দূরত্বে ইলেকট্রিক সুদৃশ্য রঙিন টুনি বাল্ব দিয়ে সাজানো যেতে পারে।
রান্নাঘর : ঈদের অন্যতম আকর্ষণ খাওয়া-দাওয়া। রান্নাঘরে যেন সবকিছু হাতের নাগালেই পাওয়া যায় এদিকে বিশেষ নজর রাখতে হবে। রান্নার প্রয়োজনীয় সব জিনিস জায়গামতো গুছিয়ে রাখতে হবে। এক কোণায় রাখা যেতে পারে ছোট টব বা ফুলদানি। গান শোনার ব্যবস্থা থাকলেও রান্না করা বেশ আনন্দময় হয়। কিচেন ডোরে ঝুলিয়ে দেয়া যেতে পারে টুংটাং চাইম। চাইমের মিঠে সুর রান্নার ক্লান্তি বা পরিশ্রান্তি দূর করে দেবে।
বারান্দা ও সিড়ি বা ছাদ : বারান্দা, সিঁড়ি কিংবা ঘরের দরজার পাশে জীবন্ত গাছ সাজিয়ে দেয়া যায় কিংবা ঝুলন্ত টবে পাটের শিকায় ঝুলিয়ে দেয়া যায় লতার গাছ। টবগুলোর পাশে মাটির শোপিস কিংবা মাটির ল্যাম্প বারান্দায় আলাদা সৌন্দর্য দেবে। এছাড়া বারান্দা বা ছাদের কোণায় মাটির বড় পাত্র বা টবে নানান শোপিস ও প্লান্টস দিয়ে সাজানো যায় ফেইরি গার্ডেন। বারান্দায় সুসজ্জিত জলদেশের কাব্যে অ্যাকুরিয়াম সাজিয়ে দেয়া যায়।

সব ঘরের ঝুল ঝেড়ে ফেলতে হবে। ফ্যান, টিউব লাইট সুন্দর করে মুছে ফেলতে হবে। বসার ঘরের সোফাগুলো পরিষ্কার করে রাখতে হবে। যেসব সোফার কভার ধোয়া যায় সেগুলো ধুয়ে ফেলতে হবে। আর যেসব ধোয়া সম্ভব নয় সেসব ফার্নিচার স্প্রে দিয়ে মুছে ফেলতে হবে।  সপ্তাহখানেক অগেই বিছানার চাদর, কুশন কভার, বালিশের কভার, টেবিল ক্লথ ধুয়ে ইস্ত্রি করে রাখতে হবে। টাইলসের মেঝে পানিতে স্যাভলন বা ডিটারজেন্ট মিশিয়ে কিংবা লিকুইড ক্লিনার দিয়ে মুছে ফেলতে হবে। ঘরের আনাচে-কানাচে ও ছাদে ঝুল ঝেড়ে পরিষ্কার করে ফেলতে হবে। ফ্যান, লাইট, কিচেন ক্যাবিনেট, জানালা-বারান্দার গ্রিল, দরজার কারুকাজ, সিঁড়ি ইত্যাদি আগেই পরিষ্কার করে রাখতে হবে। ঈদের দু’তিন দিন আগে বাড়ির প্রতিটি টয়লেটের মেঝে ভালো করে ঘষে রাখতে হবে। টয়লেটে টয়লেট পেপার, লিকুইড সোপ- এসব প্রয়োজনীয় জিনিস গুছিয়ে রাখতে হবে। তাজা ফুল বা ইনডোর প্লান্ট টয়লেটের বেসিন কিংবা শেলফে রেখে দেয়া যেতে পারে। বারান্দার টবগুলো ধুয়ে-মুছে পারলে রঙ করিয়ে নিলে ভালো হয়। ঈদের আগের দিনই গ্লাস ও প্লেটগুলো নামিয়ে ধুয়ে-মুছে রেখে দিলে ঈদের দিন তাড়াহুড়া থাকবে না। টিশ্যু বক্স, এয়ার ফ্রেশনার, হ্যান্ড ওয়াশ, জরুরি ওষুধ আগেই মজুদ করে রাখা উচিত। এতে কেউ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে ঈদের ছুটিতে আশপাশের মেডিসিন শপ বন্ধ থাকলেও কোনো সমস্যায় পড়তে হবে না।


বাড়ির অন্দর গৃহকর্ত্রীর রুচিশীলতার পরিচয় দেয়। তাই এর প্রায় পুরো কৃতিত্বই দিয়ে দেয়া যেতে পারে গৃহকর্ত্রীকেই।
যাহোক, উৎসবের আনন্দে নান্দনিক গৃহসজ্জা এবং মুখরোচক খানা-খাদ্যের সমাহারে ভরে উঠুক প্রতিটি অন্তর ও হৃদয়। সবাই যে যেখানে আছেন- আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, পরিবার-পরিজন নিয়ে কাটাবেন উৎসবের এদিনটি আনন্দ-উচ্ছলতায়। নিরাপদে ও সুস্থ থাকুন সবাই। সবার প্রতি রইলো ঈদের অনাবিল শুভেচ্ছা।

ঈদ উৎসব ও নন্দনতত্ত্ব

ড. মো. আমিরুল মোমেনীন চৌধুরী




ঈদ ‘আওদ’ শব্দ থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। আওদ-এর আভিধানিক অর্থ পুনরাগমন বা বার বার ফিরে আসা। অষ্টম শতকের প্রথম দিকে বাংলাদেশে মুসলমানদের আগমন ঘটে। ওই সময় সুফি, দরবেশ, তুর্কি- আরব বণিকদের মাধ্যমে বাংলাদেশে রোজা, নামাজ ও ঈদের সূত্রপাত বলে মনে করা হয়। অবশ্য তা ছিল বহিরাগত ধর্ম শাসক, ব্যবসায়ী ও ভ্রমণকারীদের ধর্মীয় উৎসব। বাংলাদেশের ধর্ম সামাজিক পার্বণ নয়। বাংলাদেশে রোজা পালনের প্রথম ঐতিহাসিক বিবরণ পাওয়া যায় ‘তাসকিরাতুল সোলহা’ গ্রন্থে। এই গ্রন্থের বিবরণ থেকে জানা গেছে, আরব দেশের শেখউল খিদা-র ৩৪১ সন মুতাবিক অর্থাৎ ৯৪১ খ্রিস্টাব্দে ঢাকায় আগমন। ঢাকায় ইসলাম ধর্ম প্রবেশের আগে শাহ সুলতান রুমি নেত্রকোনা ও বাবা আদম শহীদ বিক্রমপুরের রামপালে ইসলাম প্রচার শুরু করেন। শেখউল খিদা চন্দ্র বংশীয় রাজা শ্রী চন্দের শাসনকালে (৯০৫- ৯৫৫ খ্রিস্টাব্দ) সবুজ বদ্বীপে আগমন করেন বলে অনুমান করা হয়। তাদের প্রভাবেই বাংলাদেশে রোজা, নামাজ ও ঈদ প্রচলিত হয়েছিল- এটাও প্রমাণ সাপেক্ষ নয়। কারণ ‘নামাজ’, ‘রোজা’, ও ‘খোদা হাফেজ’ শব্দের ব্যাপক প্রচলনে বোঝা যায়, অ্যারাবিয়ানরা নন, ইরানিয়ান সুফি-দরবেশদের দ্বারাই বাংলাদেশে ইসলাম প্রচার শুরু হয়েছে। উপরোক্ত তিনটি শব্দই আরবি নয়, ফার্সি। ১৬৪০ খ্রিস্টাব্দে বাংলার সুবেদার শাহ সুজার নির্দেশে তার প্রধান আমাত্য মীর আবুল কাসেম একটি ঈদগাহ (২৪৫-১৩৭ ফিট আয়তন) নির্মাণ করেন। ভূমি থেকে ১২ ফিট উঁচু ওই ঈদগাহের চতুর্দিকে ১৬ ফিট উঁচু সুদৃশ্য প্রাচীর ঘেরা। ঈদগাহে মেহরাব ও মিনার নির্মিত হয়েছিল। মোগল আমলে রাজদরবার, আদালত, সেনা ছাউনি ও বাজারে কেন্দ্রে অবস্থান ছিল ওই ঈদগাহের। সেখানে শুধু সুবেদার, নায়েবে নাজিম, অভিজাত মুসলমান কর্মকর্তা ও তাদের স্বজনরাই এখানে ঈদের নামাজ পড়তে পারতেন। পরে ঈদগাহ ময়দান জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। ওই ঈদগাহ ময়দানের পাশে ঈদের সময় মেলা বসতো। মোগল আমলে ঈদের দিন জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান ও আনন্দ উৎসব হতো। এর প্রমাণ পাওয়া যায় বাংলাদেশে বিভিন্ন স্থানে গণমুখী শাহী ঈদগাহের উপস্থিতি দেখে। সুফি-সাধকদের ভূমিকাও ছিল এক্ষেত্রে অনন্য এবং অধিকতর জনসচেতন। উনিশ শতকের শেষ দিকে ঈদের আনুষঙ্গিক আনন্দের সঙ্গে যুক্ত হয় একটি নতুন উপাদান ‘লোকজ মেলা’। ওই মেলায় শোলার তৈরি পাখি, ফুল, কুমির, হাতি, ঘোড়া, নকশা তালপাখা, চিত্রিত শখের হাঁড়ি ছাড়াও অনেক লোকজ খেলনা পাওয়া যায়। আর দই, মিষ্টি ও জিলাপির পসরার কোনো তুলনা নেই। ওই ধারা এখনো বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিরাজমান। ঈদ যে বাংলাদেশের মুসলমানদের মহোৎসব এর বড় প্রমাণ উৎসবমুখর ঈদের বাজার। তা নি¤œবিত্ত থেকে উচ্চবিত্তের এক যোগসূত্র। এর সঙ্গে আবার যুক্ত কোরবানির মহোৎসব। ‘কোরবানি’ শব্দের অর্থ অতীব নিকটবর্তী হওয়া। কোরবানির পশুপালনের সঙ্গে যুক্ত নি¤œবিত্তের কোটি কোটি নারী-পুরুষ। বলা চলে, ঈদের প্রস্তুতি সারা বছর ধরে এবং সামাজিক ও আর্থিক উন্নয়নও ঈদ উৎসবের বাইরে নয়।

 


পৃথিবীর ইতিহাসে বিভিন্ন ধর্মের যে উৎসব উদযাপিত হয়, ঈদ উৎসব ওই তুলনায় কনিষ্ঠতম। কিন্তু আয়োজনের ব্যাপকতায় সবচেয়ে বড়। সমকাল থেকে ১৩৮৮ সৌর বছর আগে এই উৎযাপন শুরু হয়। ইসলামের বার্তাবাহক নবী হজরত মুহম্মদ (সা.)-এর মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের অব্যহতি পর প্রথম ঈদুল ফিতর উৎসব পালন শুরু হয়। অ্যারাবিয়ানদের ইহুদি ধ্যান-ধারণা ও জাহেলি প্রথার পরিবর্তে দুই ঈদ ছিল আল্লাহর রাসুলের পক্ষ থেকে মুসলমানদের জন্য ঘোষিত উপহার। ইসলামি আদর্শে উজ্জীবিত আরববাসী পালন শুরু করে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। এর আগে আরবে পৌত্তলিক ভাবনায় অগ্নিপূজকদের ‘নওরোজ’ ও মূর্তিবাদীদের ‘মিহিরজান’ নামে দুটি শ্রেণিবৈষম্য, অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ উৎসব পালিত হতো। এর পরিবর্তে দুই উৎসব বয়ে আনে আনন্দবার্তা। শ্রেণিবৈষম্যহীন, পবিত্র আর ধর্মানুভূতির মেলবন্ধনের মহোৎসব। ঈদুল ফিতর শব্দের অর্থ রোজা ভাঙার দিবস। ঈদুল ফিতরের আগের রাতকে ইসলামি পরিভাষায় বলা হয় ‘লাইলাতুল জায়জা’। এর অর্থ পুরস্কার রজনী। ঈদুল আজহাকে ধর্মীয় পরিভাষায় বলা হয় ‘ইয়ামুজ জায়েজ’। এর অর্থ পুরস্কারের দিবস। এছাড়া আছে আলবেনিয়ান, আরবি, বাংলা, চায়নিজ, গ্রিক, হিন্দি, হিব্রু, সিলেটি নাগরী ও তামিল ভাষায় দুই ঈদের আলাদা নাম প্রচলিত। দেড় হাজার বছরেরও বেশি ঈদ উৎসব পালিত হচ্ছে। ক্যামেরাবিহীন যুগে চিত্রশিল্পীরা ধরে রেখেছেন ঈদ উৎসবের ছবি। অবশ্য ইসলামিক অনুশাসনে ছবি আঁকা নিয়ে বিরোধ-বিতর্ক রয়েছে। ঈদ উৎসবের যতো চিত্রশিল্প রয়েছে এর মধ্যে শোভাযাত্রার ছবি বেশি। বর্ণাঢ্য সাজে সজ্জিত মানুষ দলবেঁধে ঈদগাহ ময়দানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। শোভাযাত্রায় হাতি, ঘোড়া, রাজকীয় পালকি ও নকশাদার ছাতার ব্যবহার রয়েছে। কোনো কোনো ছবিতে আতশবাজি পোড়াচ্ছেন নারীরা। বোরাকের ছবি এঁকেছেন শিল্পীরা। মাথায় চাঁদ-তারাখচিত মুকুট শোভিত বোরাকের বোরাক, ছবির ভেতর ফার্সি ও আরবি ভাষায় ক্যালিগ্রাফি। মোগল আমলের ছবিতে স¤্রাটকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। সব ছবির ভেতর ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যতা ও ঠা-া রঙ ব্যবহারের চাতুর্যতা প্রশংসনীয়। বিশ্বশিল্পে ইসলামিক চিত্রকলার একটি বিশাল স্থান রয়েছে, বিশেষ করে পার্শিয়ান ও মোগল মিনিয়েচার চিত্রশিল্প। ওই চিত্রশিল্প পর্যবেক্ষণে এর ইতিহাস জানা জরুরি।


শিল্প প্রতিভার দ্বারাই নির্মাণ করা সম্ভব। সাধারণভাবে তাকেই শিল্প বলা হয় যার বিকাশ অথবা প্রকাশ মানুষের বুদ্ধিবৃত্তির দ্বারা চালিত নয়, বরং একটি সুকুমার বোধ ও কল্পনা প্রতিভার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। প্রাচীনকাল থেকে আধুনিককাল পর্যন্ত শিল্পকে নানানভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। অস্কার ওয়াইল্ড যেমন ‘আর্ট ফর আর্ট সেক’ তত্ত্বে বিশ্বাসী ছিলেন তেমনি লিও টলস্টয় অথবা বার্নাড শ’ শিল্পের সামাজিক মূল্যমানকে শিল্পের উদ্দেশ্য মনে করেছেন। অস্কার ওয়াইল্ড বলেছেন, ‘সুন্দর সৃষ্টিই হচ্ছে শিল্পের একমাত্র লক্ষ্য- ‘দ্য আর্টিস্ট ইজ দ্য ক্রিয়েটর অ্যা বিউটিফুল থিংক’। শিল্পে নীতির প্রশ্নকে তিনি স¤পূর্ণ উপেক্ষা করেছেন- ‘দেয়ার ইজ নো সাচ থিংক অ্যাজ অ্যা মোরাল অর ইমমোরাল বুক’। লিও টলস্টয় তার ‘হোয়াট ইজ আর্ট’ গ্রন্থে লিখেছেন, শিল্পের মধ্যে প্রকাশিত হবে সেসব ‘ফিলিং ইনডিস পেনসিবল ফর দ্য লাইফ অ্যান্ড প্রগ্রেস টুওয়ার্ডস ওয়েলবিং অ্যা ইনডিভিজুয়ালস অ্যান্ড অ্যা হিউম্যানেটি’। ফ্রেজার তার ‘দ্য গোল্ডেন বাউস’ গ্রন্থে অকাল্ট ম্যাজিক ইত্যাদি বিষয়কে প্রাচীন শিল্পের উৎসমুখ বলে উল্লেখ করেছেন। শিল্পকলায় অনুকরণ অর্থাৎ ইমিটেশনের প্রসঙ্গ সুপ্রাচীন। গ্রিক শব্দ ‘মাইমেসিস’ ইমিটেশন বা অনুকরণের অনুকরণ। প্লেটোর অনুকরণতত্ত্বে শিল্প হলো ‘আর্ট ইজ ডাউলি রিমোভড ফ্রম রিয়ালিটি’ অর্থাৎ ঈশ্বর তার পরিকল্পনা অনুযায়ী নিজস্ব প্রতিরূপ হিসেবে যে বিশ্বসংসার তৈরি করেছেন এরই দ্বিতীয় প্রতিরূপ হচ্ছে শিল্পকলা। শিল্পের প্রেরণা হিসেবে তার ধারণা ছিল শিল্পী শিল্পকর্ম সৃষ্টির জন্য ঐশ্বরিক অনুভূতির ওপর নির্ভরশীল। প্লেটো শিল্পীর অন্তরে নিজস্ব ‘অ্যাসেনসিয়াল ক্রিয়েটিভ স্প্রিট’কে অবিশ্বাস করতেন। ঐশ্বরিক প্রেরণাজাত কোনো বিশেষ তাগিদ শিল্পীর ওপর ভর করলেই শিল্প সৃষ্টি সম্ভব।


নন্দনতত্ত্ব ও শিল্পের নির্মিতিকে কখনোই বিচ্ছিন্নভাবে দেখা যায়নি। এটি ভারতীয় সমাজের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর অপরিহার্য অংশ। সমাজের একদিকের পরিবর্তন অনিবার্যভাবে অপরদিককে প্রভাবিত করে। এটিই হচ্ছে ভারতীয় সমাজ, শিল্প ও শিল্প-কারখানার আন্তঃসম্পর্কের প্রকৃত ‘গতি বিজ্ঞান’। উপনিষদের সৃষ্টি ও জীবন সংক্রান্ত ‘মেটাফিজিকাল’ বা অধিবিদ্যামূলক দর্শন ও ঈশ্বর ধারণা কয়েক হাজার বছর ধরে এই উপমহাদেশে দিয়েছিল এক সাংস্কৃতিক যোগসূত্র। তা প্রতিফলিত হয়েছে সারা ভারতবর্ষের লোকশিল্প, লোকসাহিত্য, সঙ্গীত ও নৃত্যবৈচিত্র্যের মধ্যে একই সুরের খেলা, বহুর মধ্যে একই সুরের স্পন্দন। প্রায় ৫ হাজার বছর আগে আর্যদের আগমন এবং এই উপমহাদেশে আর্য ও দ্রাবিড়দের সহাবস্থানের দ্যোতক ভারতবর্ষের বেদ উপনিষদের স্বীকৃতির পর বহু জনগোষ্ঠী উপমহাদেশে এসেছে। ভারতবর্ষের মহামানবের মূল স্রোতে মিশে গেছে অনেক সময় নিজ নিজ বৈশিষ্ট্য রেখেও।


খ্রিস্টীয় দশম শতাব্দীতে মুসলমানরা এলো এক অতি উচ্চাঙ্গের সংস্কৃতি ও ধর্মবোধ সঙ্গে নিয়ে। তাদের আগমনের পূর্ব পর্যন্ত ভারতবর্ষে কোনো গ-িবদ্ধ ধর্মমত ছিল না। হিন্দু জনসমাজের মধ্যে ছিল বেদ ও উপনিষদের দর্শন। ওই দর্শনের বিস্তৃত অঙ্গনের মধ্যে বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন সময়ে নানান বিশ্বাস বা অবিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ধর্মাচারণ করতো। এই প্রথম এক জনগোষ্ঠী ভারতবর্ষে বাস স্থাপন করেও উপমহাদেশের মূল স্রোতের বাইরে নিজেদের বিশিষ্ট সংস্কৃতি ও ধর্ম নিয়ে স্বতন্ত্র পরিচয় স্থাপন করে। হিন্দু সমাজেও এই সময় ধীরে ধীরে স্বতন্ত্র বোধের উদয় হয়। বহু হিন্দু ধর্মান্তরিত হন। পশ্চিম এশিয়ার ইসলামিক দেশগুলো থেকেও ভারতবর্ষে এসে বসবাস স্থাপন করেছিল বহু জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তি-দার্শনিক, কবি, ঐতিহাসিক ছাড়াও স্থপতি, সঙ্গীতজ্ঞ, চিত্রশিল্পী ও নানান ধরনের পারদর্শী কারুশিল্পী। ধীরে ধীরে ভারতবর্ষে গড়ে ওঠে এক বর্ণাঢ্য সংস্কৃতি। ভারতীয় মুসলিমের সংস্কৃতি এবং পশ্চিম এশিয়া ও ভারতীয় শিল্প-সংস্কৃতির মিলনে গড়ে ওঠে ওই সংস্কৃতি। দুই সামন্ততান্ত্রিক দেশের নাগরিক সংস্কৃতি মুসলিম ও মুসলিম-উত্তর দরবারি শিল্প। আদিম সমাজ থেকে যখন মানুষের সামন্ততান্ত্রিক সমাজে উত্তরণ ঘটে তখন ওই সামন্ততান্ত্রিক সমাজে গ্রামীণ লোকসংস্কৃতির পাশাপাশি গড়ে ওঠে এক নাগরিক সংস্কৃতি, নতুন সমাজের নগর ও জনপদগুলো কেন্দ্র করে। ভারতবর্ষের লোকসমাজ আদিবাসী সংস্কৃতি ও মুসলিম সমাজের দরবারি সমাজ বাদ দিলে বৃহত্তর হিন্দু সমাজ জাতি-বর্ণে বিভক্ত হয়। ওই সমাজে লোকসংস্কৃতির নানান অভিব্যক্তি, বিশেষ করে লোকশিল্পের উপজাত বস্তু ৯টি শিল্পভিত্তিক বর্ণের অবদান। বৃত্তিভিত্তিক বর্ণ-বিভাগের ফলে প্রাচীন ভারতের সামন্ততান্ত্রিক সমাজের নাগরিক সংস্কৃতি
প্রয়োজনীয় সর্ববস্তু সম্ভারের জন্য বংশানুক্রমিক ভাবধারা ও অসাধারণ দক্ষতার


অধিকারী বর্ণাশ্রয়ী শিল্পীদের ওপর নির্ভরশীল ছিল। মধ্যযুগে ইসলামি শিল্প-সংস্কৃতি- যাকে দরবারি শিল্প বলা হয় এর সংস্পর্শে এলো হিন্দু নাগরিক সংস্কৃতির শিল্প। ওই মিলনের ফসল হিসেবে ভারতবর্ষের নাগরিক শিল্প এমন এক নান্দনিক গুণ অর্জনে সমর্থ হয়েছিল যে, পৃথিবীজুড়ে এর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে ওই যুগে। মোগল শাসন আমলে ভারত উপমহাদেশে মুসলমানদের যে স্থাপত্য ধারা প্রবর্তিত হয় তা দেখা যায় উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থানে প্রাসাদ, মসজিদ, দুর্গ, দরবার কক্ষ, স্মৃতিসৌধ্য, মিনার প্রভৃতির বিচিত্র বর্ণ ও অলঙ্করণের মাধ্যমে। ৭১২ খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয়ের মধ্য দিয়ে এই উপমহাদেশে মুসলমানদের আগমন সভ্যতার ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের দ্বার উন্মোচন করে। এতে দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার ক্ষেত্রে তেমন উল্লেখযোগ্য প্রভাব বিস্তার করতে না পারলেও মুসলমান এবং স্থানীয় অধিবাসীদের মধ্যে ভাব ও সংস্কৃতির আদান-প্রদান করতে পূর্ণমাত্রায় সক্ষম হয়েছিল। সিন্ধুর বিশেষ এলাকা ‘মানসুরা’য় (বর্তমানে ধ্বংস্তূপে পরিণত) নির্মিত ক্ষুদ্র পরিসরের মসজিদ ছাড়া ওই সময়ের স্থাপত্যের তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য নিদর্শন পাওয়া যায় না। তবে মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয়-পরবর্তী মুসলিম বিজয় এবং স্থায়ীভাবে তাদের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পথ অনেকটা সহজ করে দিয়েছিল। একাদশ শতাব্দীতে গজনির সুলতান মাহমুদ একাধিকবার ভারতবর্ষে প্রবেশ করেন। কিন্তু যে কোনো প্রাসঙ্গিক কারণেই হোক, তিনি স্থায়ীভাবে এখানে রাজত্ব করেননি এবং তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য নির্মাণে ব্রতী হননি। অবশ্য তিনি গজনিতে অনেক সুরম্য প্রাসাদ ও ধর্মীয় ইমারত ও বিজয়স্তম্ভ নির্মাণ করেছেন। গজনির স্থাপত্যরীতি
পরবর্তীকালে ভারতীয় মুসলিম স্থাপত্যে বহুলাংশে অনুসৃত হয়েছে। এর সাক্ষ্য বহন করে দিল্লির কুতুব মিনারের নির্মাণ কৌশল।


ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিম স্থাপত্যকে সাধারণত  প্রধান তিনটি শৈলীতে ভাগ করা যায়। তা হলো দিল্লির সুলতানি স্থাপত্যরীতি, মোগল রাজকীয় শৈলী ও প্রাদেশিক বা আঞ্চলিক স্থাপত্যশৈলী। শৈলীগত পরিবর্তন ঘটলেও মোগল স্থাপত্য অলঙ্করণে ইসলামি ধারাবিবর্জিত কোনো বিষয় রচিত হয়নি। ইসলামি শিল্পকলার অন্যতম প্রধান গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো অলঙ্করণ। ইসলামি শিল্পকলাকে মূর্তিবিবর্জিত বা আইকনিক শিল্পকলা বলা হয়েছে। অপরাপর শিল্পকলার মতো ইসলাম কেন্দ্র করে কোনো ‘আইকনিক’ বা মূর্তি শিল্প গড়ে ওঠেনি। ইসলামি শিল্পকলায় অলঙ্করণের ব্যবহার দু’দিক থেকে বিচার করা যায়- উপকরণভিত্তিক ও মোটিভভিত্তিক। অলঙ্কণের প্রকারভেদ নির্ভর করে উপকরণের ওপর। উমাইয়া যুগে পাথর ও মার্বেলের সর্বজনীন প্রয়োগের ফলে যে ধরনের অলঙ্করণের উদ্ভব হয়, আব্বাসীয় যুগে ইটের ব্যবহারে তা দেখা যায় না। এ কারণে পাথরের ওপর যে ধরনের নকশা দেখা যায় তা সাধারণত খোদাই বা স্টোন কার্ভিং ‘ফুসাইফিসা’ বা মোজাইক, ওপুস সেকটাইল বা সাদা পাথর কেটে রঙিন পাথর বসিয়ে নকশা করা। পাথরের ওপর বিভিন্ন আকারের নুড়ি, কাচ, মার্বেল প্রভৃতি বসিয়ে যে মোটিভ সৃষ্টি করা হয় তাকে মোজাইক বলে। আব্বাসীয় যুগে মোজাইকের ব্যবহার হ্রাস পেলেও সামারার ভগ্নপ্রাপ্ত বালকুয়ারা প্রাসাদ থেকে প্রচুর মোজাইক উদ্ধার করা হয়। ওপুস সেকটাইল-এর প্রয়োগ ভারত উপমহাদেশে মোগল আমলে, বিশেষ করে সম্রাট আকবরের স্থাপত্যকীর্তিতে (ফতেপুর সিক্রির জামে মসজিদ, সেকেন্দ্রায় আকবরের সমাধি, আগ্রায় ইতিমদল্লার সমাধি) দেখা যায়। এছাড়া মোগল স্থাপত্যগাত্রে ফ্রেস্কো, স্টাকো, টেরাকোটা, রঞ্জিতটালী ও পিয়েত্রা দুরার বহুল ব্যবহার করা হয়েছে। আর শিল্পের ইতিহাস বদলে দিয়েছে আবয়বিক

বিমূর্তলোকের বাসিন্দা : রশিদ আমিন

 

 

ভাবনার বিমূর্তরূপ যাঁর ক্যানভাসে মূর্ত হয়ে ওঠে তিনি রশিদ আমিন।
নিভৃতচারী এই শিল্পী মননে বিমূর্তলোকের বাসিন্দা। ধ্যানস্থ তাঁর আপন কাজে, তবে নির্লিপ্ত নন পারিপার্শ্বিক টানাপড়েনে। এই শিল্পীর মুখোমুখি হয়েছিলেন শাকিল সারোয়ার

 

আপনার শৈশব-কৈশোর কোথায় কেটেছে?
আমার শৈশব কেটেছে টাঙ্গাইলে। আমার শৈশবের টাঙ্গাইল ছিল একটি ছোট্ট মায়াবী শহর। ওই শহরেই আমার বেড়ে ওঠা। একটা চমৎকার সাংস্কৃতিক আবহ ছিল এই শহরে। নাটক, সঙ্গীত, নৃত্যানুষ্ঠানÑ এসব আয়োজনে মুখরিত থাকতো ওই শহর। ছিল অনেক শিশু সংগঠন। এ রকমই একটি শিশু সংগঠন ছিল ‘কচিকাঁচার মেলা’। এখানেই আমার ছবি আঁকার শুরু আমার শিল্পী সত্তার সূচনা।

আপনার পরিবার সম্পর্কে কিছু বলুন
আমার বাবা টাঙ্গাইলে পোস্ট মাস্টার ছিলেন। ৯ ভাইবোন আমরা। বড় একটি পরিবার। আমরা চার ভাই ও পাঁচ বোন। ভাইয়েরা সবাই প্রতিষ্ঠিত। বড় ভাই নাট্যজন মামুনুর রশীদ। মেজভাই সাংবাদিক। বর্তমানে কানাডা প্রবাসী। সেজভাই ডাক্তার। তিনি বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডা. কামরুল হাসান খান। বোনরা সবাই স্নাতক, কেউ কেউ স্নাতকোত্তর পাস এবং চাকরি করছে। বোনরা সাংস্কৃতিক জগতে আসতে পারেননি। কারণ বাবা কিছুটা রক্ষণশীল ছিলেন।

কবে থেকে ছবি আঁকার তাগিদ অনুভব করলেন এবং ছবি আঁকাই বা কেন বেছে নিলেন?
ছবি আঁকায় আমার পরিবারে কোনো পূর্বসূরি ছিলেন না। বলা যেতে পারে আমিই এক্ষেত্রে পথিকৃৎ। তবে আমার বড় ভাই নাটক করতেন। সেক্ষেত্রে কিছুটা প্রেরণা ছিল। আমি একটি শিশু সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম যা আগেই বলেছি। সেখানেই আমার ছবি আঁকার হাতেখড়ি। আমি যখন এসএসসি পরীক্ষার্থী তখন সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম আর্ট কলেজে ভর্তি হবো। তখন থেকেই আমার পেশাদার শিল্প শিক্ষার শুরু। আমার ভাইয়েরা সবাই আমাকে চারুকলায় ভর্তি হওয়ার ব্যাপারে খুব উৎসাহ দিয়েছিলেন। ছবি আঁকা বেছে নেয়ার বড় কারণ হচ্ছে, এটা এমন একটা বর্ণময় ভুবন, এই ভুবনে যে প্রবেশ করেছে তার এখান থেকে নিস্তার নেই। আমিও এই ভুবনের সঙ্গে জড়িয়ে গেলাম। তবে আরো কিছু কারণ ছিল। তা হলো, ছবির মধ্য দিয়ে নিজেকে যতো সহজে প্রকাশ করা যায়, অন্য মাধ্যমে তা সম্ভব নয়। সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম স্বাধীন পেশাদার শিল্পী হবো। তা আর সম্ভব হয়নি। শিক্ষকতায় ঢুকতে হলো। তবে এটিও আমার জন্য একটি আনন্দদায়ক অধ্যায়। আমার একটি বিশাল ছাত্রভুবন তৈরি হয়েছে। তাদের সঙ্গে শিল্প পাঠ দেয়া ছাড়াও নানান সুখ-দুঃখে জড়িয়ে গিয়েছি। তাদের কাছ থেকেও অনেক শেখার আছে।

পেইন্টিংয়ের কোন ধারাটি আপনাকে বেশি টানে?
আমি মনে করি, পেইন্টিং হচ্ছে খুব একটা ইচ্ছা-স্বাধীনের ভুবন। এর মধ্য দিয়ে আমার অন্তরের একেবারের ভেতরের নির্যাসটা বের করে নিয়ে আসতে পারি। তাই সব সময় বিমূর্তধারাটিই বেশি পছন্দ করি। অবশ্য বিমূর্তধারার শিল্পী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা খুব কঠিন। কারণ মানুষ পেইন্টিংয়ের মধ্যে সব সময় একটি আকার অথবা অবয়বই খোঁজে। যখনই দেখে নিরাবয়ব অথবা নিরাকার তখনই মুখ ফিরিয়ে নেয়। এটি একটি সংগ্রাম। মানুষের দৃষ্টি নিরাবয়বের মধ্যে টেনে নিয়ে আসা। আমার গুরু মোহাম্মদ কিবরিয়া তা পেরেছিলেন। বিমূর্তধারার সঙ্গে এক ধরনের আধ্যাত্ম চেতনার সংমিশ্রণ ঘটাতে হয়। অনেকেই ভুল বোঝেন। এটা ঠিক তথাকথিত ধর্মীয় আধ্যাত্ম নয়। এটি প্রকৃতি, বিশ্বব্রহ্মা- ও মহাশূন্যের সঙ্গে শিল্পীর এক নিবিড় খেলা।

শিল্পী হিসেবে বলুন, নিজের শিল্পসত্তা প্রকাশে আপনি কতোটুকু স্বাধীন?
আমি এটুকু নিশ্চিত করে বলতে পারি, আমার শিল্পসত্তা প্রকাশের ব্যাপারে পুরোপুরি স্বাধীন ও আপসহীন। নিজস্ব শিল্প-ভাবনা ও শিল্প-প্রকাশ টিকিয়ে রাখার জন্য সংগ্রাম করেছি। আজ পর্যন্তও তা করছি। অন্যের রুচি অনুযায়ী ছবি আঁকিনি। অনবরত নিজেকেই প্রকাশ করতে চেয়েছি।

স্বদেশ আপনাকে কতোটুকু টানে এবং ওই টান আপনার কাজে কতোটকু প্রভাব ফেলেছে?
স্বদেশ আমার এক গভীর প্রেরণা। যা-ই আঁকি না কেন, সেখানে স্বদেশ থাকে, থাকে স্বদেশের রঙ। সুযোগ পেলেই ভ্রমণ করি। এতো সুন্দর আমাদের দেশ! বর্ষা আমার প্রিয় ঋতু। বর্ষায় ‘বর্ষামঙ্গল’ শিরোনামে ছবি আঁকি এবং গত দুই বছরে অনেক ছবি জমেছে। ভাবছি ভবিষ্যতে একটা প্রদর্শনী করবো।

নিজের কাজে আপনার তুষ্টি কতোটুকু?
আমার কাজে মোটেই তুষ্ট নই। অনবরত একটি অতৃপ্তি কাজ করে। অনেক ছবি আছে বছরের পর বছর ফেলে রেখেছি, শেষ করতে পারি না। দেশে কিংবা বিদেশে কার কার কাজ আপনাকে মুগ্ধ করে, ভাবায় এবং প্রাণিত করে? দেশে মোহাম্মদ কিবরিয়া ও মনিরুল ইসলাম আমার প্রিয়। আসলে কিবরিয়া স্যার আমার সরাসরি শিক্ষক ছিলেন। খুব কাছ থেকে দেখেছি, একজন শিল্পী কীভাবে শিল্পের সাধক হয়ে ওঠেন। আমাকে সব সময় তাকে সন্ত শিল্পী হিসেবেই মনে হয়েছে। বিদেশে ক্যান্দেনেস্কি, মার্ক রথকো, পিকাসো, তাপিস আমার প্রিয়। তাদের কাজের ভেতর রঙ ও রেখার সঙ্গে দারুণ এক আধ্যাত্ম বোধের সংমিশ্রণ ঘটেছিল। এটিই আমাকে খুব টানে।

 

_______________________

লেখাঃ শাকিল সারোয়ার

ছবিঃ শোভন আচার্য্য অম্বু

ভাস্কর্য

একজন হামিদুজ্জামান

 

 

‘আমি যে গ্রামে বেড়ে উঠেছিলাম সেখানকার প্রায় সবাই ছিলেন শিক্ষিত। একই সঙ্গে দেশ-বিদেশের খবরাখবরও রাখতেন তারা। দৈনিক পত্রিকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ম্যাগাজিন আসতো আমাদের গ্রামে। ভারতীয় ম্যাগাজিনগুলোয় আঁকা থাকতো অনেক ছবি। ভারতীয় শিল্পীদের আঁকা ছবির সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয় এসব ম্যাগাজিনেই। আমি খুব অভিভূত হতাম, মাঝে মধ্যে আঁকার চেষ্টাও করতাম। তখন থেকেই আমার শিল্পের পথে চলার শুরু। পড়ার ফাঁকে ফাঁকে স্কুলের খাতাতেও চলতো এই চেষ্টা’-
কথাগুলো বলছিলেন বিখ্যাত ভাস্কর হামিদুজ্জামান। যার কাছে পরীক্ষার খাতাও কখনো কখনো হয়ে উঠতো ক্যানভাস।
বাবা ধার্মিক মানুষ হলেও রীতিমতো উৎসাহ দিতেন তার কর্মকা-ে। একদিন বাবার অনুরোধে পাড়ার মসজিদের ছবি আঁকলেন তিনি। অভিভূত বাবা ওই ছবি মসজিদের ইমামকে উপহার হিসেবে দিলেন। তিনিও ভারী খুশি হলেন। এরপর তার দাদার মুখাবয়বের সঙ্গে মিলে যায় এমন একটি স্কেচ এঁকে তাক লাগিয়ে দেন সবাইকে। এই ছোট ছোট বিষয়গুলো হামিদুজ্জামানের কাজে অনুপ্রেরণা যোগাতো। বাবার পাশাপাশি আশপাশের অন্য অনেকের উৎসাহে অনুপ্রাণিত হন তিনি।


এ পর্যন্ত হামিদুজ্জামান যতো ছবি এঁকেছেন এর সবই নিজের ভেতর থেকেই এসেছে। তার প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় আর্ট কলেজে ভর্তি হওয়ার পর (বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ)। তার কাছে প্রশ্ন রাখা হয়েছিল, আর্ট কলেজে ভর্তি হওয়ার বিষয়টি কি সহজ ছিল ওই সময়? তিনি উত্তর দিলেন, ‘না, তেমন সহজ ছিল না। ১৯৬২ সালে ম্যাট্রিক পাস করি। এরপর ইন্টারমিডিয়েট ভর্তি হয়েছিলাম ভৈরব কলেজে। আমার সাবজেক্ট ছিল সায়েন্স। দুই মাস ক্লাস করার পর ওই সাবজেক্ট আমার একদম ভালো লাগলো না। কিছুতেই ওইসব ফিজিক্স-কেমিস্ট্রিতে আমার মন বসছিল না। বাড়িতে এসে বাবাকে বললাম, ভালো লাগছে না একদম। আমি পড়তে পারছি না। এর মধ্যে অবশ্য জেনে গিয়েছি ঢাকার আর্ট কলেজের কথা। আর ওই সময়ের মধ্যে আঁকার হাতটা একটু ভালো হয়ে উঠেছিল। তাই বাবার কাছে এসে আর্ট কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য গো ধরলাম। আমাদের ওখানে যে পোস্ট অফিস ছিল সেখানে ভালো এক পোস্ট মাস্টার ছিলেন। তার সঙ্গে আমার বাবার খুব ভালো সখ্য ছিল। গল্পে গল্পে বাবা যখন ওনাকে জানালেন, আমি আর্ট কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য বায়না ধরেছি তখন তিনি বললেন, ছেলে যেখানে ভর্তি হতে চায় সেখানেই ভর্তি করিয়ে দিন। আবার অনেকে বললেন, চারুকলায় গেলে আমি নষ্ট হয়ে যাবো। কিন্তু সব মিলিয়ে বাবা শেষ পর্যন্ত আমাকে আর্ট কলেজে ভর্তি করার জন্য ঢাকায় নিয়ে আসেন।

আর্ট কলেজে ভর্তির ভাইভা নিয়েছিলেন জয়নুল আবেদিন স্যার।’ উচ্ছ্বসিত হয়ে তিনি বললেন ওই ঘটনা ‘আমি ও বাবা দু’জনে মিলে সরাসরি ওনার বাসায় চলে গিয়েছিলাম। ঢাকায় আসার আগে বাবা বেশ খোঁজখবর করে জয়নুল আবেদিন স্যারের বাসার ঠিকানা নিয়ে আসেন। আমরা যখন তাঁর বাসায় গেলাম দেখা করতে তখন আমাকে তিনি বললেন, দেখি তুমি কী আঁকো? তখন তাঁকে আমার কিছু আঁকা ছবি দেখালাম। এরপর তিনি সেগুলো দেখে আমাকে বললেন, তুমি কাল আর্ট কলেজে গিয়ে আমার নাম বলবে। বলবে জয়নুল আবেদিন ভর্তি করিয়ে নিতে বলেছেন। তারা তোমাকে ভর্তি করিয়ে নেবে।’
শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনকে শিক্ষক হিসেবে পাওয়াটা কম কথা নয়। আর হামিদুজ্জামানকে তিনি ভীষণ ভালোবাসতেন। এর প্রমাণ তিনি তখন পেয়েছিলেন যখন দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন- ‘হঠাৎ একদিন আবেদিন স্যার আমাকে ডাকলেন। একটু ভয় পেয়ে গেলাম। ওনার সামনে যাওয়ার পর তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার এক্সিবিশনে কতোটি ওয়াটার কালার আছে? মুখ কাচুমাচু করে বললাম, বেশ কিছু আছে স্যার। স্যার বললেন-ওগুলো দেবে, আমার ডিপার্টমেন্ট থেকে ফ্রেম করিয়ে দেবো। আমার কাছে যেগুলো ছিল সেগুলো স্যারের কাছে দিয়ে দিলাম। আমাদের প্রিন্ট মেকিংয়ের অনেক বড় বড় ফ্রেম ছিল। টিচাররা ইউজ করতেন মাঝে-মধ্যে। সেখানে গিয়ে দেখি, আমার ছবিগুলা সব ফ্রেম করা হয়ে গেছে। এরপর সেখানে আবেদিন স্যার এসে বললেন- এই শোনো, তোমার যে কয়টি ছবি আছে তা আমি কিনে নিলাম। এগুলো আমার। আমার যে বিভিন্ন গেস্ট আসে তাদের এগুলো প্রেজেন্ট করবো। তুমি অফিস থেকে পয়সা নিয়ে যেও। আমি দ্বিতীয় বর্ষে পড়ি আর আবেদিন স্যার আমার ছবি কিনেছেন! খুশিতে কেঁদে ফেলি। এটি আমার জীবনের অনেক বড় পাওয়া এবং অবশ্যই অনুপ্রেরণা তো বটেই।


ভাস্কর্যের সঙ্গে পরিচয় হলো কবে জিজ্ঞাসা করতেই হামিদুজ্জামান বললেন, ‘এ ভাবনাটা ফাইনাল পরীক্ষা দেয়ার পর যখন বিদেশে যাই তখন মাথায় আসে। ফাইনাল ইয়ারে পড়ার সময় আমার একটা মেজর অ্যাকসিডেন্ট হয়। এতে আমার মাথায় অনেক আঘাত লাগে। এরপর মোটামুটি সুস্থ হওয়ার পর ফাইনাল পরীক্ষা দিই এবং পাস করি। এরপর লন্ডনে চলে যাই চিকিৎসার জন্য। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ডাক্তাররা আমাকে চার মাস লন্ডনে থাকতে বললেন। তবে সব থেকে মজার ব্যাপার হলো, কিছু ছবি বিক্রি করে বেশকিছু টাকা হাতে করেই লন্ডনে গিয়েছিলাম। কিন্তু চিকিৎসা করাতে আমার তেমন কোনো টাকা লাগেনি। আমি স্টুডেন্ট বলে আমাকে চিকিৎসকরা ফ্রি চিকিৎসা করিয়ে দিলেন। আর এর মধ্যে লন্ডনে বেশ কিছুদিন থাকার সুবাদে ফ্রি টাইমে ঘোরাঘুরি করা শুরু করি। এরপর মাঝে বেশ কিছুদিন সময় নিয়ে প্যারিস ও রোমেও ঘুরতে যাই। এ সময় দেখে ফেলি ব্রিটিশ মিউজিয়াম, ভিকটোরিয়া অ্যালবার্ট মিউজিয়াম, পোট্রেইট গ্যালারি, ন্যাশনাল মিউজিয়াম, প্যারিসের ল্যুভর মিউজিয়ামসহ রোমের বিখ্যাত সব গ্যালারি। মূলত ওই সময়টাতেই ভাস্কর্য আমাকে একটু আলাদাভাবে টানতে শুরু করে। বিভিন্ন স্থানে প্রতিস্থাপিত বিভিন্ন ভাস্কর্য দেখে ভাবতাম, এই মেটালের ভাস্কর্যগুলো কতো লড়াই করে প্রকৃতির ভেতর টিকে রয়েছে এবং যুগ যুগ ধরে রয়েছে বিভিন্ন ঘটনার সাক্ষী। এগুলো অনেক ঐতিহ্য বহন করতে পারে। এসব চিন্তা থেকেই ভাস্কর্যের প্রতি আমার এক ধরনের আগ্রহ তৈরি হয়।’
হামিদুজ্জামান যদিও পেইন্টিং নিয়ে পড়াওশানা করেছেন তবুও শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন ও প্রফেসর রাজ্জাকের উৎসাহে ১৯৭০ সালে আর্ট কলেজে ভাস্কর্যের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। শিক্ষক হওয়ার পর ভারতের বড়দা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কলারশিপ নিয়ে পড়াশোনা করেন তিনি।
এরপর ১৯৭৬ সালে বড়দা মহারাজা সাহাজিরাও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএফএ করেন। পরে ১৯৮২-১৯৮৩ সালে স্কাল্পচার সেন্টারে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বহুকাল চারুকলার শিক্ষকতা শেষে অবসর নেন তিনি।
পড়াতে খুব ভালোবাসতেন বলেই অনারারি প্রফেসর হিসেবে এখনো মাঝে মধ্যেই ক্লাস নেন।


দেশে-বিদেশে বহু ভাস্কর্যের জনক হামিদুজ্জামানের উল্লেখযোগ্য কাজগুলোর মধ্যে বঙ্গভবনের ‘পাখি পরিবার’, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সংশপ্তক’ এবং ১৯৮৮ সালে সিউল অলম্পিকের ‘স্টেপস’ কাজগুলো প্রচুর সুনাম এনে দিয়েছে তাকে। ওই কাজগুলো করতে গিয়ে ভাস্কর্য চর্চায় কোনো বিদেশি প্রভাব খুঁজে পেয়েছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিদেশি প্রভাব থাকবে কেন! আমাদের সংস্কৃতির চিরায়ত প্রভাব রয়েছে ওই কাজগুলোয়। এসব ভাস্কর্য বিদেশি ধাতুতে নির্মিত হলেও এতে আমাদের স্বকীয়তা রয়েছে। কারণ ভাস্কর্য চর্চা তো আমাদের কারো কাছ থেকে ধার করা নয়। ভাস্কর্য চর্চায় আমরা নতুন নই। আমাদের টেরাকোটা এ অঞ্চলের ভাস্কর্যের চিরায়ত প্রভাব বহন করে। ওই টেরাকোটা অনেক বছরের পুরনো। নিঃসন্দেহে বলতে পারি, আমাদের ভাস্কর্য চর্চার শিকড় আছে। আমরা চাইলেই আমাদের স্বকীয়তা নিয়ে কাজ করতে পারি। এ জন্য কারো দ্বারস্থ হওয়ার দরকার হয় না।’

হামিদুজ্জামান তাঁর শিল্পে সমৃদ্ধ করুন আমাদের সংস্কৃতি, তাঁর হাত ধরে আলাদা বৈশিষ্ট্য ধারণ করুক উমহাদেশের ভাস্কর্য শিল্প। হামিদুজ্জামানের দীর্ঘায়ু কামনা করছি।

 

_____________________________
সাক্ষাৎকার : শাকিল সারোয়ার
ছবি : শোভন আচার্য্য অম্বু

 

নীল অশ্বারোহী

ছবির ভালোবাসার গল্প

ড. মো.আমিরুল মোমেনীন চৌধুরী

 

: বৃষ্টির ভেতর এভাবে আরো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে পায়ে নির্ঘাত গাছের মতো শিকড় গজাবে।
: ভালো হবে। সূর্য উঠলে লোকে দেখবে নদীর পাড়ে নতুন দুটো গাছের জন্ম হয়েছে।
: কোন গাছ হবো?
: অশোক, না হয় নাগলিঙ্গম।
: না, পৌরাণিক কোনো গাছ নয়।
: তাহলে কী?
: অশত্থ, না হয় বট।
: ওতো মহীরুহ। ও গাছে ফুল নেই।
: ফুল দরকার নেই, ফলে ভরা গাছ। ফলভুখ পাখিগুলোর কলরবে মুখর শাখা-প্রশাখা।
: তাহলে মানুষের কী হবে! মানুষ তো ও গাছের ফল খায় না।
: মানুষ গাছের ফল মানুষ খাবে না। পথিক বিশ্রাম নেবে। হুতোমপেঁচা, বুনোহাঁস, কাঠঠোকরা, বক,
পানকৌড়ি বাসা বাঁধবে খোড়লে, বাকলেÑ সেই গাছ।
: স্তন্যপায়ীরা থাকবে না। কাঠবিড়াল, বাদুড়, বানর, কালোমুখ হুনুমান।
: এগুলোও থাকবে।
: গাছ হতে ইচ্ছা করছে না। গাছের জন্ম বৃত্তান্ত বড় কঠিন। গাছে ফুল ফুটবে, ফল হবে। পাকা ফলের বীজ মাটির নিচে পড়বে, ওই মাটির শক্ত আবরণ ভেদ করে বের হওয়া। জল আর সূর্যের আলো শরীরে মেখে শত্রু-মিত্রের চোখ ফাঁকি দিয়ে ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠা। তারপর এক জায়গায় জীবনভর ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকা।

ভাবতেই ভয় করে!
: তাহলে পাখি হও?
: সে মন্দ নয়। কী পাখি!
: আবাবিল।
: আবাবিল অনেক ছোট। এতো উঁচুতে উড়ে বেড়ায়, তাকিয়ে থাকলে চোখ লেগে যায়। ওর শিস আর ডানা ঝাঁপটানোর শব্দ ছাড়া কেউ কি দেখে ওর সবুজ শরীর।
: তাহলে আলবাট্রোস। দুটো বিশাল ডানায় ভর করে সমুদ্রের বাতাসে ভেসে বেড়াবে।
: তাও না। ও তো মৎসভোজী পাখি। মাছ আমার প্রিয় নয়। তাছাড়া অথৈ সমুদ্রের লোনা জলে ভেসে বেড়ানো, বসার ঠাঁই নেই।
: কেন, জাহাজের উঁচু মাস্তুলে বসবে।
: ওখানেও সুবিধা নেই। নাবিক আর ক্রুদের লোভী চোখ ফাঁকি দেওয়াÑ তা বড় শক্ত কাজ।
: তাহলে ছবি হবো আমি।
: সে আরো শক্ত কাজ।
: কেন?
: প্রাকৃতির সৃষ্ট কোনো কিছু ছবি নয়। মানুষ পাহাড়, আকাশ, মেঘ, নদী, চাঁদ, সূর্য।
: আর আমি!
: তুমি তো ছবির মতো সুন্দর।
: তাহলে ছবির গল্প বলো।
: শিল্পীদের ধারণা, প্রকৃতির সবকিছু ছবির মতো নিখুঁত নয়। ওই খুঁতগুলো চিহ্নিত করে, এর উপযুক্ত রূপায়ণ করে প্রকৃতির প্রকৃত সমালোচকের দায়িত্ব পালন করেন শিল্পী। ছবি নিয়ে প্রকৃতির সঙ্গে শিল্পীর এ এক অসম শক্তির লড়াই। সবকিছু ছবির মতো সুন্দর বলতে বোঝায়, প্রকৃতির সৃষ্টি আর ছবি এক নয়। ছবি হলো শিল্পী কতোভাবে নিজেকে প্রকাশ করতে পারেন এরই শেষ ফল। এটি মোটেও শিল্পীর খেয়াল-খুশির সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, বরং শিল্পী উপায় বের করেন মাত্র। মূল প্রকাশের ভাষাটি সমাজের অবকাঠামোয় স্তরীভূত। সমাজের সচেতন ও অসচেতনতার মেলবন্ধন হলো ছবি। তাই ছবিই সমাজের আত্মা। ছবির গঠন যে বিষয়বস্তু থেকে ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে শিল্পী গ্রহণ করেন তা থেকে উদ্ভূত

ভাব নিয়েই ছবির জন্ম দেন। এই সম্পর্কিত সচেতনতা থেকে বোঝা যায়, বিশেষ যে তল থেকে শিল্পী ছবি তৈরি করবে তা সমাজ বিচ্ছিন্ন হলেও এর নিয়ন্ত্রক শিল্পী নিজে এবং নিজেকে কেন্দ্রে রেখে বস্তু বিশেষের সঙ্গে একমাত্রিক বাদানুবাদ থেকে তার ছবি জন্ম নেয়। এই একমাত্রিকতার দিকটির বিশে¬ষণ দেয়া যায় বিশ শতকের চিন্তা থেকেই। ইমানুয়েল কান্ট-এর ডিজইন্টারেস্টেডনেস বা নিষ্কাম দৃষ্টির তত্ত্ব বিশ্লে¬ষণ করে ব্রিটিশ সাইকোলজিস্ট অ্যাডোয়ার্ড বুলফ বলেছেন, বস্তুকে সঠিকভাবে অনুধাবন করতে দুটি বিষয় দরকার এবং কোনো একটি বস্তুকে এর প্রায়োগিক ব্যবহার থেকে দূরে মেনে নিয়ে একটি রোহিতকরণ প্রক্রিয়ার মধ্য থেকে বস্তুটি পর্যবেক্ষণ করা। দুই. এই রোহিতকরণের ফলে যে দূরত্ব জন্ম হয় ওই দূরত্ব থেকে অভিজ্ঞতার নতুন মাত্রা আবিষ্কার শুরু করা। তা ধনাত্মক একটি প্রক্রিয়া। এই চিন্তবিদ প্রথম প্রস্থ প্রক্রিয়ার দূরত্বের কম-বেশি হয় বলে দাবি করেন অর্থাৎ কখনো বস্তুর প্রতি নিষ্কামতার মাত্রা বেশি থাকে, কখনো কম। কান্টিয়ান দর্শনের নিষ্কাম দৃষ্টি দিয়ে দেখার যে নমুনা পাওয়া যায় এর প্রতিফলন উনিশ শতকের মধ্যবর্তী সময়ের মার্কিন প্রকাশবাদীদের মধ্যে দেখা যায়। ড্রইং, রঙ, টেক্সার ছবির অনুভূতির দিকে নির্দেশ করে অর্থাৎ এই উপাদানগুলো নির্দেশবাচক বস্তু। এর মানে, ছবি মনের অনুভূতি নির্দেশ করে। সংগঠনবাদিতার মূল মনন ইমানুয়েল কান্ট বর্ণিত পথে আবিষ্কৃত হয়। বস্তুর সংগঠন কিংবা বুনটের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত এর সভ্যতার শ্রেষ্ঠত্বÑ এমনটি মনে করেন ইমানুয়েল কান্ট। উপস্থাপিত বস্তুর অনুপস্থিতিতে যে সংগঠন রয়ে যায়, বুনট স্পষ্ট হয়Ñ কান্টের মতে তা-ই ওই সভ্যতার মৌল পাওনা। এই চিন্তা পাথেয় করে গড়ে উঠেছে আধুনিকতাবাদীদের বিতরণ প্রক্রিয়া। ক্যানভাসের পরিসর থেকে অথবা এর ক্ষেত্র থেকে বাদ পড়েছে বিষয়। প্রথমে পরিচিত বিষয়, পরে জ্যামিতিক বা বিমূর্ত বিষয়ও। এই বাদ দেয়ার মূল উদ্দেশ্য তলটিই প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে উপস্থাপন করা। রঙ হচ্ছে তলের মূল বিষয়, এমনকি টেক্টাইল ভ্যালুজ অর্থাৎ তলের চরিত্রও তা-ই মূল্যবান বলে বিবেচনা করা শুরু হয়। সৃষ্টিশীল দৃষ্টিতে বস্তু বা উপাদানটি অবলোকন ও বিশে¬ষণ করে ফর্ম সম্পর্কিত স্পষ্ট ধারণার ওপর ভিত্তি করে ড্রইং প্রস্তুত করার যে মৌলিক নীতি রয়েছে এর সার্থক প্রতিফলন ঘটেছে শিল্পীদের ছবিতে। মৌলিক নীতিগুলোর মধ্যে প্রথমেই দৃষ্টির পর্যবেক্ষণ ক্ষমতাটি সুদক্ষ করতে বলা হয়েছে। শিল্পীর দৃষ্টিশক্তি কতোটা সুদক্ষ তা বলার অবকাশ নেই। প্রতিটি বিষয় বা বস্তু শিল্পী এমনভাবেই দেখেন যে, বস্তুর অবয়বগত খুটিনাটি অংশগুলো তার মনের মধ্যে প্রোথিত হয়ে যায় এবং তা তুলি বা ছেনির আঁচড়ে নির্ভুলভাবে প্রকাশ পায়। ছবিকে বুঝতে হলে এর মূল নীতিগুলো বোঝা জরুরি। পাঁচটি মূল নীতি হলো দৃষ্টির পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা সুদক্ষ করা, নিজের কর্মনৈপুণ্যের উন্নয়ন সাধন করা, ছবির প্রচ্ছন্ন সৃষ্টিধর্মিতা অবলোকনকল্পে ফর্মের সুন্দর আকার-আকৃতি সম্পর্কে নিজের কর্মনৈপুণ্য বুদ্ধি করা, ফর্ম যে স্ট্রাকচার বা আকার-আকৃতির ওপর নির্ভরশীল তা সুস্পষ্টরূপে তুলে ধরার বিষয়টি অনুধাবন করা। এ পাঁচটি মূল নীতিতে যেসব তথ্য সন্নিবিশত হয়েছে এগুলো সাধারণ মানুষের আওতার বাইরেই থেকে যায়। যারা সাধারণ তাদের দেখার পালা। আর শিল্পীর দায়িত্ব হচ্ছে সাধারণ দর্শকের দেখানোর।

কারণ সাধারণ দর্শকের চেয়ে কোনো শিল্পী বহির্দৃষ্টিতে যেমন দেখেন তেমনই অন্তর্দষ্টিতেও দেখে থাকেন। ফলে তার দেখায় নুতন নতুন আকার, ফর্ম, রূপ ইত্যাদি উঠে আসে। মানুষকে নতুন করে বাঁচতে শেখায়, নতুন করে দেখতে শেখায়। মানুষকে যা নাড়া দেয়Ñ এমন বিষয় খুঁজে বের করাই হচ্ছে কোনো শিল্পীর দায়িত্ব। ছবি এক অপূর্ব বিদ্যা যা একমাত্র বিশেষ প্রতিভার দিয়েই নির্মাণ করা সম্ভব। সাধারণভাবে সেটিকেই ছবি বলা হয় যার বিকাশ অথবা প্রকাশ মানুষের বুদ্ধিবৃত্তির মাধ্যমে চালিত নয়, বরং একটি সুকুমার বোধ ও কল্পনা প্রতিভার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। মানুষের আদিমতম ছবিতে এর প্রথম জয়যাত্রার আনন্দ এবং উৎসাহের প্রভা ও তেজ দেখা যায়। জড়তা থেকে মুক্তি দেয়া আনন্দ ও ভোগের অধিকার দেয়া এবং মানুষকে ক্ষমতাবান করে তোলা, রস এবং রূপ সৃষ্টি বিষয়ে এই হলো ছবির মূল উদ্দেশ্য। আধুনিককালের অনেক সমালোচক ছবির তত্ত্বের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়েছেন। তারা শিল্পীর কাছে একটি নির্বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গির আশা করেছেন। ছবিটি মানুষ বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে অভ্যস্ত। প্রাচীন থেকে আধুনিকাল পর্যন্ত ছবিকে নানাভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। অবশ্য ছবির প্রকৃত সংজ্ঞা নির্ণয় খুবই দুরূহ যা মুহূর্তে মুহূর্তে মানুষের চিন্তা-ভাবনাকে গোলকধাঁধায় ফেলে। ছবি হতে পারে ধ্যান, ভাবনা, কল্পনা বা বিস্ময়ের প্রকাশ। বৈদিক ঋষিরা তাদের সুর্যমন্ত্রে বর্ণনা করেছেন, ছবি হলো ব্যক্তিত্বের লুপ্তি ও আবেগর প্রস্থান। আধুনিককালে মনস্তাত্ত্বিক গবেষকরাওÑ যেমন গেস্টাল্ট থিওরিতে বলা হয়ে থাকে, ছবি হলো মানব জীবনের আবেগ, অভিজ্ঞতা, অনুভূতি সবকিছুর মিলিত এক প্রত্যয় যা মানুষকে অপার্থিব জগতের দিকে নিয়ে যায়। অকাল্ট ম্যাজিক বা মিস্টিসিজম ইত্যাদি বিষয় প্রাচীন ছবির উৎসমুখ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ছবি অনুকরণ অর্থাৎ ইমিটেশনের প্রসঙ্গ সুপ্রাচীন। গ্রিক শব্দ ‘মাইমেসিস’ ইমিটেশন বা অনুকরণের অনুকরণ। আরেকটি তত্ত্বে ছবি হলো ইশ্বর তার পরিকল্পনা অনুযায়ী নিজস্ব প্রতিরূপ হিসেবে যে বিশ্ব সংসার তৈরি করেছেন ওই বিশ্ব সংসারেরই দ্বিতীয় প্রতিরূপ হচ্ছে ছবি। ছবির প্রেরণা হিসেবে তাঁর ধারণা ছিল, শিল্পী ছবি সৃষ্টির জন্য ঐশ্বরিক অনুভূতির ওপর নির্ভরশীল। শিল্পীর অন্তরে তাঁর নিজস্ব ‘এসেনশিয়াল ক্রিয়েটিভ স্পিরিট’টি অবিশ্বাস করলে এবং ঐশ্বরিক প্রেরণাজাত কোনো বিশেষ তাগিদ শিল্পীর ওপর ভর করলেই ছবি সৃষ্টি সম্ভব। ছবি দর্শনের ক্ষেত্রে এবং ছবির তত্ত্ব বিষয়ে প্রতীচীর দার্শনিকদের অবদান সুদূরপ্রসারী। গ্রিক দার্শনিকরা ছবিকে ভেবেছিলেন অসত্যের জগৎ হিসেবে। কেননা ছবি হচ্ছে ‘বিশেষ প্রতিভাস’-এর অনুকরণ। কিন্তু কেউ আবার ছবিকে সত্যের আধার রূপ ভেবেছিলেন অর্থাৎ ছবির মাধ্যমে মানুষ জীবনের এমন কয়েকটি শাশ্বত অথচ নির্দিষ্ট মূল্যবোধে পৌঁছে যা মানুষকে সত্যের কাছাকাছি নিয়ে যায়। অনুকরণ বিষয়ে ভিন্ন ধারণা হলো, অনুকরণ একটি ব্যাপক বিষয় অর্থাৎ শিল্পী নিছক অনুকরণ করে না, বরং এমনভাবে অনুকরণ করতে সচেষ্ট হয় যেখানে বিষয়টি শিল্পীর কল্পনার সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে একটি নতুন দিগন্তের উন্মেষ ঘটায়। ছবি হলো দৃষ্টিগোচরতায় পৃথিবীকে অনুভব করার এক আবেগময় কৌশল। ছবি একটি ব্যাপক শব্দ। এ কারণে অবস্থানগত বিভক্তি ও ছবির দর্শনে সীমারেখা নির্ণয় খুবই আপেক্ষিক ব্যাপার। কারণ ছবি কোনো হঠাৎ গজিয়ে ওঠা ব্যাপার নয়। মানব সভ্যতার ইতিহাসের সঙ্গে এর সম্পর্ক প্রায় অবিচ্ছেদ্য। সভ্যতার ঊষালগ্নে ছবি গুহামানবের জীবন সংগ্রামের অন্যতম প্রধান অবলম্বন হিসেবে কাজ করেছে। প্রাচীন মিসরীয় সভ্যতায় ছবি ছিল পারলৌকিক সাফল্যের চাবিকাঠি। মধ্যযুগীয় ধর্মীয় সমাজ ব্যবস্থায় ছবি ধর্মীয় প্রচারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। অন্যদিকে প্রাচ্য ঐতিহ্যে ইহলৌকিক নির্বাণ লাভের প্রয়োজনে ধর্মীয় কর্মকা-ের অঙ্গ হয়েছে ছবি কিংবা অন্যভাবে বলা যায়, ছবি শব্দটি প্রায় মানব সভ্যতার মতো সুপ্রাচীন। মানুষ যেদিন থেকে শিল্পচর্চা শুরু করেছিল ওইদিন থেকেই মানুষের সভ্যতার ইতিহাসের গণনা শুরু। প্রাচ্যের ঋষিদের ধারণায় ছবি প্রত্যক্ষরূপে বহ্মস্বরূপের সঙ্গে একাত্ম যার উৎস আনন্দে এবং পরিশেষও আনন্দে। প্রাচ্যেও ছবিতে ইন্দ্রিয় সংবেদনশীলতার সাহায্যে দর্শকমনে অতীন্দ্রিয় জগৎ আলোড়িত করে, মানুষের খ- ভাবনার অপূর্ণতাকে ভরিয়ে তোলে প্রতীক ও সাদৃশ্যের মাধ্যমে। অনুকরণবাদও প্রাচ্যের আচার্যরা সমর্থন দিয়েছিলেন। ভারতীয় নাট্যশাস্ত্রে অনুকরণ, অনুদর্শক, অনুকীর্তন শব্দের উল্লে¬খ রয়েছে। ছবির সূত্রেও বলা হয়েছে ‘যথা নৃত্যে তথাচিত্রে তৈলোক্যানুকৃতিঃস্মতঃ’। নন্দনতত্ত্বের আধুনিকতম মতবাদের স্রষ্টার মতে, ছবির সঠিক সংজ্ঞা হলো ছবি সংজ্ঞা বা প্রতিভা নির্ভর। ছবির উপস্থিতি চিন্তার জগতে নয়, বোধের জগতে। ছবি সত্যের সঠিক অনুলিপি নয়, প্রতীক মাত্র। ছবি এক প্রকার আত্মপ্রকাশ হলেও বিচার ও সঞ্চারের বিষয় হিসেবে শিল্পীর আত্মচরিত্র থেকে তা স্বতন্ত্র। ছবির শৈলীই শিল্পী। শিল্পীর চরিত্র যে কীভাবে শিল্পে প্রকাশিত হবে এর কোনো নির্দিষ্ট সাধারণ নিয়ম নেই। শিল্পীর ছবিতে আধুনিকতার অন্য এক মাত্রা আছে যেখানে সমন্বয় সাধনাই সব নয়। আধুনিক মনন ও জীবনের মধ্যে আছে অনেক তমশালীন গহ্বর। অনুদ্ঘাটিত ওই রহস্যময়তা সৃষ্টি জগৎকে আলোড়িত করেছে ছবি। প্রকৃতির উপস্থিতিকে সম্পূর্ণ অস্বীকার না করেও ছবি বিমূর্ততার দিকে নিয়ে যাওয়ার প্রবণতা বর্তমান প্রজন্মের শিল্পীর মধ্যে দেখা যায়। অভিব্যক্তিমূলক বিমূর্ততার একটি ধারায় নিঃসর্গ বিমূর্তায়িত হচ্ছে আবার জৈবিক কোনো রূপবন্ধ ভেঙে ভেঙে বিমূর্ততার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বিমূর্ততার সঙ্গে প্রকৃতিগতের মূল পার্থক্য এই যে, আঙ্গিক-প্রস্থান হিসেবে ততোটা প্রতিবাদের প্রেরণায় এর সৃষ্টি ও বিকাশ নয়। এর দুর্বলতার ক্ষেত্র সেটিই যেখানে প্রতিষ্ঠিত আঙ্গিক গ্রহণ করা হয়েছে। তা অনুপ্রেরণায় নয়Ñ নতুনত্ব ও অভিনবত্বের প্রত্যাশায়। এর কারণ হয়তো ছবির আত্মপরিচয় সন্ধানের পথপরিক্রমাতেই নিহিত আছে। ছবির রস আস্বাদনে শিল্পীও সাধারণ দর্শকের যে চেতনার পার্থক্য তা তার অভিজ্ঞতার ঘাটতি থেকেই হয়ে থাকে। পদ্ধতিগত শিক্ষা, অভিজ্ঞতা, মননশীলতা ও সৃজনশীল মনের জারকরসে যে কোনো বস্তু বা ভাবকে পরিবর্তন, পরিবর্ধন, পরিমার্জনের মাধ্যমে নানানভাবে উদ্ভাসিত করে তুলতে পারেন কোনো শিল্পী। এই প্রক্রিয়ায় স্বাভাবিকভাবে কোনো দর্শকের অংশগ্রহণ বাস্তব কারণে দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। এ ক্ষেত্রে কোনো দর্শকের যে ব্যাপারটি নিতান্ত প্রয়োজন তা হচ্ছে শিল্পকর্ম দেখার অভিজ্ঞতা। ছবি যেহেতু একটি দৃশ্যমান ব্যাপার সেহেতু দেখার চোখটি তৈরি থাকা চাই। আধুনিক ছবিতে অভিনব বস্তুর সঙ্গে পরিচিত হতে কোনো দর্শকের চোখটি যেমন তৈরি হয়ে ওঠে তেমনি তার অভিজ্ঞতার ঝুলিটিও ধীরে ধীরে পূর্ণ হয়ে ওঠে। দর্শকের অভিজ্ঞতার ভা-ারটি যতোই স্ফীত হতে থাকে ততোই ছবির আপাত অদ্ভুত বস্তুগুলোর সামনে থেকে অদৃশ্য মায়াবী পর্দা সরে যেতে থাকে। তখন আর বিমূর্তচিত্র অজানা গ্রহের কিম্ভূত বস্তু মনে হয় না, আধুনিক ছবি মনে হয়, চিরচেনা ছবি।
: এ তো কঠিন গল্প। আমাকে বরং তুমি ছবি এঁকে দেখাও।
: কিসের ছবি।
: আমার ছবি।
: ছবি আঁকতে কাগজ, রঙ, তুলি, ইজেল, বোর্ডÑ কতো আয়োজন। তারপর...।
: তারপর কী!
: যার ছবি আঁকা হবে, আমাকে সে ভালোবাসে কিনা তা জেনে নিতে হবে। তবেই হবে ছবি।
: আমি তো তোমাকে অনেক ভালোবাসি। তুমি যা জানো এর চেয়ে বেশি।
: পরীক্ষা দিয়ে পাস করতে হবে।
: পরীক্ষা দিলে নির্ঘাত ফেল করবো। তবে ছবি আঁকার কায়দা শিখিয়ে দিতে পারি।
: তুমি শিখিয়ে দেবে ছবি আঁকার কায়দা?
: কেন নয়। আমার সাদা শাড়ির আঁচলে আঁকবে তোমার ছবি। আমার লম্বা চুলের বেণীর ডগা তোমার তুলি। বৃষ্টির জল আর তোমার মনের সব রঙ মিশিয়ে হবে জলছবি।
: কী আশ্চর্য তোমার ছবি আঁকার কায়দা। আমাকে অবাক করলে তুমি। এভাবে কখনো ভাবিনি! ভালোবাসার পরীক্ষায় পাস করেছ।
: ছবি আঁকার কায়দা তোমার পছন্দ হয়েছে?
: হ্যাঁ হয়েছে। তবে তোমার ছবি নয়, শাড়ির আঁচলে নদীর বুকে আকাশের ছবি আঁকি।
: না, তা তো চিরচেনা ছবি হবে।
: তাহলে কিসের ছবি আঁকবো?
: আমার দুঃখের ছবি এঁকে দাও।
: দুঃখের ছবি বুঝি আঁকা যায়! বরং নীল পদ্মের ওপর প্রজাপতির পাখার ছায়ায় তুমি ঘুমিয়ে আছÑ এঁকে দিই।
: ওই ছবির দরকার নেই। আমি তো রাজার মেয়ে নই!
: তুমিও রাজার মেয়ে।
: মিথ্যা কেন বলো তুমি? তোমার মুখে মিথ্যা মানায় না।
: তাহলে ঘোড়ার ছবি আঁকিÑ নীল অভ্রের ডানা।
: এঁকে দাও ঘোড়ার পিঠে তুমি।
: আমি তো রাজপুত্র নই।
: তুমিও রাজপুত্র। শিল্পীরা ছবির রাজপুত্রÑ দ্য ব্লু রাইডার। ওই চেয়ে দেখো নীল মেঘের ভেতর থেকে ছুটে আসছে।
: নীল অশ্বারোহী!
: হ্যাঁ, নীল অশ্বারোহী। তুমিই তো অশ্বারোহী।
: আর তুমি?
: ওই নীল অশ্বÑ তোমার ছবি!

 

বাংলাদেশের শাখা শিল্প ও শঙ্খ সমুদয়

বিলু কবীর

 

 


আমরা সাহিত্য বলতে স্বভাবত এক ধরনের লেখা বা পাঠ রচনা বুঝি। কিন্তু ‘সাহিত্য’ শব্দটি ব্যুৎপত্তিগত পটভূমিকায় ব্যাখ্যা করতে গেলে জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত সব বিষয়ই সাহিত্য। ‘সাহিত্য’ শব্দটি এসেছে ‘সহিত’ থেকে। অতঃপর যা কিছু আমাদের জীবনপ্রবাহের সঙ্গে প্রত্যক্ষে-পরোক্ষে, জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে প্রভাবক ও প্রভাবিত তা-ই আসলে সাহিত্য। এই যদি হয় বাস্তবতা তাহলে কি সাহিত্য ওই জটিলে না গিয়ে প্রধান ও সরল প্রশ্ন দাঁড়াতে পারে যে, কী সাহিত্য নয়। এই অর্থে শামুক-ঝিনুক-শঙ্খ বিষয়ে সব আলোচনা এক কথায় ‘শঙ্খ সাহিত্য’ বললে বেমানান তো হয়ই না, বরং বেশ মানিয়েই যায়। তা করতে গেলে অবাক হয়ে দেখতেই হবে, সামান্য গুগলি-কড়ির মতো আপাততুচ্ছরা আমাদের সৌন্দর্য বোধ, লোকবিশ্বাস, ধর্মাচার, রূপকথা, মিথ-পুরাণ, চারুশিল্প, রাজনীতি, অর্থনীতি, খাদ্য অভ্যাস, চিকিৎসা, নির্মাণ, গদ্য-পদ্য ইত্যাদিতে কী ব্যাপক পরিমাণে জায়গা দখল করে আছে।

ঝিনুক, শঙ্খ প্রাণী হিসেবে বিস্ময়কর। এর বহিরাবরণ যেমন কঠিন, ভেতরটিও তেমনই নরম থলথলে। অতো নরমটি সুরক্ষা দিতেই কী প্রকৃতি এর বাইরে অমন শক্ত পাঁচিল করে দিয়েছে! এর দৈহিক গড়নে রকমফের, রঙ-বর্ণে বিস্ময়কর চারু সৌন্দর্য তো রয়েছেই। কিছু ক্ষেত্রে কয়েকটির বৈপরীত্য ও স্বকীয়তা বিদ্যমান। যেমন এর প্রতিটিরই খোলস শক্ত। কিন্তু সব খোলসের দরজায় পাল্লা নেই। বিশেষ করে এটি ডাঙার শামুকে দেখা যায়। শামুক যখন আত্মরক্ষার্থে বা ঘুমুনোর জন্য ওই দরকারি পাল্লাকে ছিটিয়ে দেয় তখন ভেতর থেকে এমনভাবে খিল এঁটে নেয়ে যে, সে ছাড়া অন্য কেউ তা খুলতে পারে এমন কার সাধ্যি আছে! কারো কারো আছে চিংড়ির মতো লম্বা লম্বা নলো হাত-পা। কারো আছে পা বিহীন চেটো জাতীয় চলৎশক্তি। কারো শিং আছে, চুলের মতো এঁটো ঝিল্লি-ইন্দ্রিয় আছে, কারো বা নেই। কারোর খোলসজুড়ে কতো রকেমের কাঁটা, কারো গা তেলা-মসৃণ। কেউ বহু কোণা, পেছনটি সুচালো। কেউ কোণাহীন, পেছনটি দস্তুর মতো বোঁচা, ঢ্যাপা গোলাকার। কারো কারো বহু বর্ণ, কারো এক বর্ণ, কেউ নিতান্তই বিবর্ণ। এগুলো বিস্ময়কর, ভয়ঙ্কর ও অভয়ঙ্কর।
ঝিনুক, শামুকের চরিত্র-চারিত্র্য ও স্বভাবের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলা সাহিত্যে এর অনেক প্রয়োগ দেখা যায়। বিশেষ করে লোকছড়া, ধাঁধা, সংগীত ও বাগধারায় শামুক-ঝিনুক-শঙ্খের একাধিক উল্লেখ মেলে। যেমন ‘মামারাই রাঁধে-বাড়ে/ মামারাই খায়;/ আমরা গেলি পরে/ ঘরে দুয়ের দেয়।’ যে প্রজাতির শামুকে দরজায় পাল্লা পদ্ধতি আছে সেগুলোর আচরণগত বৈশিষ্ট্য নির্দেশক ওই ধাঁধাটি বাঙালির লোকছড়ায় সমৃদ্ধি, মূল্যবান ভাব সম্পদ ও প্রাকৃতিক কুশীলবের সৌন্দর্য তুলে ধরেছে। ‘হাটে মা টিমটিম/ তারা মাঠে পাড়ে ডিম/ তাদের খাড়া দুটো শিং/ তারা হাটে মা টিমটিম।’ ডাঙার আটপৌরে শামুক নিয়ে অজ্ঞাত প্রাচীন কবির রচনায় ওই পুরনো লোকছড়াটি বাঙালি মাত্রেরই মুখস্থ। শতাব্দীর পর শতাব্দী বাঙালিদের উচ্চারণের ছান্দসিক কোষে ছড়াটির প্রথম পঙ্্ক্তি ‘হাটে মা টিমটিম’ পরিবর্তিত হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘হাট্টিমা টিমটিম’। ফলে এর অর্থ উদ্ধারের ব্যাহতিটাই জটিল হয়ে পড়েছে। মূলত এটি শামুক নিয়ে সুরচিত একটি লোকছড়া। এক ধরনের স্থলচর একরঙা শামুক যা বয়েসী বাঙালির গেঁও জীবনের পরিচিত না থেকেই পারে না। এই শামুকগুলো আকারে সামান্য বড়। এর খোলস পেছনের দিকে চোখা ও রঙ সাদা-বেগুনে ছোপ। এগুলো টিমটিমে গতিতে স্যাঁতসেঁতে মাঠে চলে-ফেরে। অতি মিনমিনে গতিতে যখন এগুলো চলে তখন এর মাংসল মাথায় মাংসেরই দুই প্রস্ত শিং দৃষ্টিগোচর হয়। বলাই বাহুল্য, এগুলোর মাঠেই ডিম পাড়ে। তবে মাঠের মধ্যে নয় ধারে-কিনারে, নিচু ডোবা, আড়ালে-নিভৃতে এবং পরিমাণে ঢের। শামুকের শ্লথের গতির সঙ্গে ধীরগতি তুলনীয় বলে বাংলা বাগধারায় ‘শম্বুক গতি’ বলে একটা কথার চল রয়েছে। ‘সাগরপাড়ে কুড়াই ঝিনুক মুক্তা মেলে না। কতো লোকের আনাগোনা তুমি এলে না।’ বয়সী বাঙালির কে না জানে, ভালোবাসার বক্তব্যে সমৃদ্ধ এই সাগরিকা ঝিনুক।
‘শাঁখের করাত’ বাঙালির আরেকটি চিরায়ত ও বহুল পরিচিতি বাগধারা। এটি সামাজিক-রাজনৈতিকসহ বহু ক্ষেত্রে উদাহরণ। টিপ্পনি, কটাক্ষ হিসেবে উচ্চারিত ও ব্যবহৃত হয়। অন্য যে কোনো করাতের চেয়ে শাঁখারি শিল্পীদের ওই করাতের বিস্ময়কর ব্যতিক্রম হলো, এটি উল্টালেও কাটে, টানলেও কাটে। দেখতে অর্ধচন্দ্রের মতো ওই করাত দড়িতে ঝুলিয়ে দুই হাতে ধরে কোনো শাঁখারি শঙ্খের গয়না ইত্যাদি বানাতে ওই করাত ব্যবহার করে থাকেন।
বাংলার ভৌগোলিক বাস্তবতার প্রকৃতিতে অনেক পাখি আছে। এগুলোর নামকরণ হয়েছে তাদের চরিত্রের প্রধান চারিত্র্যের পেিরপ্রক্ষিতে। মাছরাঙা,
কাঠঠোকরা, গাঙশালিক, মৌটুসী, কাদা খোঁচা প্রভৃতি। এমনই তিনটি পাখির নাম হলো শামুকভাঙা, শঙ্খচিল ও শামুকখোট। শক্ত ঠোঁটে এগুলো শামুক ভেঙে খায়। এগুলোর ঠোঁট শক্ত, বড় ও সুচালো। ‘বানরের গলায় মুক্তার মালা’ বাঙালির আরেকটি সামাজিক অর্থবাচক বাগধারা। এর সঙ্গে শঙ্খ-শামুকের যোগ রয়েছে।
কোনো কোনো শামুক-ঝিনুকের খোলসের দরজা আছে, পাল্লা নেই। কোনো কোনোটায় পাল্লা আছে। কিন্তু যে কথা বলার জন্য এখানে এতোটা
ইনানো-বিনানো তা হলো, এক কিছিমের ঝিনুক আছে যেগুলোর শরীরের পুরো খোলসটাতেই দরজার দুটি সমান পাল্লার মতো। একেবারে সমান দুটি বাটির কৌটাসাদৃশ। বন্ধ করলে কারো সাধ্য নেই তা খোলে। আবার যেগুলোর খোলসে দরজা আছে, পাল্লা
নেই সেগুলোর দরজা খোলা বটে কিন্তু এর মধ্যে খোলসের মালিক, মানে গেরস্ত একবার যদি ঢোকে তাহলে কারো ক্ষমতা হবে না সেটিকে বের করা যদি না নিজ থেকে বের না হয়।
শঙ্খ-শামুক-ঝিনুকের অনেক গুণাগুণ রয়েছে। ‘গুণাগুণ’ বলতে এগুলোর মধ্যে গুণ তো আছেই, অগুণও রয়েছে। হ্যাঁ, এটি মনে রেখেই শব্দটির ব্যবহার করেছি। ‘পঁচা শামুকে পা কাটা’ বলে একটি অতি প্রাচীন বাগধারা রয়েছে বাংলা সাহিত্য বাস্তবতায়। এর মধ্যে অতীতের সমাজচিত্রের অনেক বিশ্লেষণযোগ্য সংবার্তা রয়েছে। জলাভূমির প্রাচুর্য, শামুক-ঝিনুকের আধিক্য, বাঙালির নগ্ন পায়ে হাঁটা-চলা, নিচু জমিতে চাষাবাদ, পচা শামুকে পা কাটলে এর ক্ষতে অধিক ভোগান্তি হয়। আরো অপকারিতা আছে এর। অসাবধানতাবশত বেশি চুন খেয়ে ফেললে জিভ মুখ পুড়ে যায়। বাঙালির একটি বাগধারাই রয়েছে ‘চুন খেয়ে গাল পুড়েছে দই দেখে ভয়’। এর মানে, গোয়াল পোড়া গরুর সিঁদুরে মেঘে ভয় আর কী! ব্যাখ্যা সামান্যই। কিন্তু উদাহরণ প্রয়োগ এবং সামাজিক অর্থব্যঞ্জনা গভীরভাবে জীবন স্পর্শী। কালী দাস প-িত নাকি খাল-বিল-ডোবা হেঁটে পার হওয়ার সময় জুতা পরতেন, অন্য সময় খালি পা। কেন! কারণ জলের মধ্যে কোথায় যে পচা শামুক আছে তা

উল্লেখ করা দরকার, পৃথিবীতে প্রায় ৮ হাজার ৫০০ প্রজাতির শঙ্খ-ঝিনুক রয়েছে যেগুলোর সবই সামুদ্রিক। এর বাইরে রয়েছে স্থলবাসী ও অন্যবিধ জলাশয়ের ওই জাতীয় অমেরুদ-ী। এগুলোর খোলস পাত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো বা হয়। যেহেতু এখানে কথা উঠেছে সেহেতু জানা দরকার, আকৃতিতে প্রকৃতিভেদে এগুলোর লম্বায় ০.১ থেকে ১৩৭ সেন্টিমিটার পর্যন্ত দীর্ঘ হয়ে থাকে। আর ওজন? পুঁথির একটি দানার মতো ক্ষুদ্রাকার থেকে শুরু করে ৩০০ কেজি পর্যন্ত ওজন হতে পারে একটি ঝিনুকের। এর মধ্যে কয়েকটি বছরে ৫০ কোটির মতো ডিম পাড়ে। তা থেকে ঘণ্টা দশেকের মধ্যে বাচ্চা বা বাবুসোনারা জন্মগ্রহণ করে। এগুলোর ৬ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত বাঁচে বলে তথ্য পাওয়া যায়। কোনো কোনোটির চোখ-মাথা আছে, কোনোটির নেই। সবচেয়ে রোমাঞ্চকর বিস্ময়ে ভরা হলো, এগুলোর যৌনজীবন বা আতœউপগত হওয়ার বিষয়টি। এক্ষেত্রে কেঁচোর সঙ্গে এর মিল রয়েছে। কেঁচোর যেমন নারী-পুরুষ হয় না, এগুলোরও তা-ই। কেঁচো যেমন আত্মসঙ্গমী, নিজে নিজের সঙ্গে রতিরমণে মিলত হয়, শামুক-শঙ্খও তেমনই। তাই এগুলোকে বলা হয় এক লিঙ্গ বা বহু লিঙ্গ। একই দুই বলে একাই উভয়। আবার উভয়ই এক বলে একা! নিজেই নিজের বউ আবার নিজেই নিজের স্বামী। প্রকৃতি এগুলোর এই বৈধতা দিয়েছে। উভয়লিঙ্গ, জেন্ডার ভারসাম্য।

শাঁখ বা ঝিনুক যে প্রাকৃতিক মুক্তার উৎপাদক এ বিষয়টি বাংলার নিসর্গ, সাহিত্য, বাণিজ্য এবং যাকে বলে ঐতিহ্যের জন্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এছাড়া শাঁখ বা শঙ্খ দিয়ে যেসব গয়না প্রস্তুত করা হয় এর যে কারুমূল্য, কুটির শৌল্পিক ঐতিহ্য এ বিষয়টি পৃথক গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হওয়ার দাবি রাখে। আবার ধর্মীয় বিশ্বাস-অবিশ্বাস ও পৌরাণিক মিথের সঙ্গে এবং আমাদের সনাতন ধর্মে শঙ্খের অনেক যোগ রয়েছে। এমনকি রাজনৈতিক ক্ষেত্রে, আরও উল্লেখ করে বলতে গেলে ১৯৪৭ সাল-পূর্ব স্বরাজ আন্দোলনে শঙ্খানাদি বা শঙ্খধ্বনির খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহারিক ভূমিকা ছিল।
শাঁখের গয়নায় গৌরবের মুক্তা ব্যবহার করতে আমাদের আনন্দের শেষ থাকে না। কিন্তু মুক্তায় আসলে ঝিনুকের কতোটা দুঃখ-কষ্টের ফসল তা যে এর কতোটাই বেদনার লালা, কতোটাই অন্তর্বেদনার জমাট অস্থির পাথর এ কথা ক’জন ভাবে! ঝিনুকের কোনো স্বাভাবিক প্রসব নয় মুক্তা। দুর্ঘটনাবশত ঝিনুকের দেহের ভেতরে যখন কোনো শক্ত বস্তু বিঁধে (বালিকণা, ধারালো পাথরকুচি, হাড় বা অন্য কিছু আটকে যায়) তখন ঝিনুকটি আহত ও বেদনাদগ্ধ হয়। বেশ কিছুদিন ওই ক্ষত নিয়ে যন্ত্রণাসহ অনেক কষ্ট করে চলে। তখন ওই বস্তটি উগড়ে দেয়ার জন্য তার অঙ্গারাভ্যন্তরেই একটি প্রক্রিয়া চলতে থাকে। বিঁধে যাওয়া দানাটির আকর যতো বড় হয়, ঝিনুকের ওই প্রক্রিয়াটিও ততো দীর্ঘদিনের হয়ে থাকে। এ প্রক্রিয়াটি হলো ঝিনুকের ক্ষতস্থানে এক ধরনের লালা নিৎসরিত হয়ে ওই কণা বা দানা আবৃত করে করে একটা গোলাকার কিংবা প্রায় গোলাকার কঠিন পি- তৈরি করে এবং এক সময় স্বয়ংক্রিয়ভাবেই তা ঝিনুকের দেহ থেকে বিযুক্ত হয়। এটিকেই আমরা মুক্তা হিসেবে কুড়িয়ে পাই। এর মসৃণ ওপর পিঠে সুন্দর মনোহারিত্বের একশেষ। ঈষৎ গোলাপি দুধেল হয় এর চকচকে শরীর। বাংলাদেশে এক ধরনের নীলাভ বহু মূল্যবান মুক্তা কদাচিৎ পাওয়া যায়। বিল অঞ্চলের এক বিশেষ প্রজাপতির সিঞ্চন এই নীল পাথরের উৎপাদক। আধুনিককালে যে মুক্তার চাষ হয় তাও পদ্ধতিগতভাবে একই। এটি নিরীহ ঝিনুকগুলোর ওপর অমানবিক অত্যাচারেরই এক নিষ্ঠুর অর্জন। মানুষ কৃত্রিমভাবে ঝিনুকের ভেতরাঙ্গে ক্ষত সৃষ্টি করে ওই ক্ষতে বালিকণা, পাথরকুচি বা ছোট কাচের টুকরো ঢুকিয়ে ঢুকিয়ে দেয়। এবার নিরূপায় ঝিনুক যন্ত্রণাকতর হয়ে যথানিয়মে বেদনার লালায় ওই বর্জ্যটি মুড়িয়ে মুড়িয়ে মুক্তা নামের মণি নির্মাণ করে।

শাঁখার বিষয়টিও আলাদাভাবে আলোচিত হওয়া সমোচিত। শঙ্খ কেটে শাঁখা বা এক ধরনের বিশেষ চুড়ি বানানোর যে প্রাচীন শিল্প, শাঁখারি শিল্প হিসেবে তা বাঙালির অতি পুরনো একটি লোকারুর সাক্ষী। সনাতন হিন্দু ধর্মে ওই শাঁখা-সিঁদুরের বিশেষ সামাজিক বিষয়ের অভিব্যক্তি রয়েছে। মোটা সাদা শঙ্খ কেটে ওই চুড়ি তৈরি করা হয়। শঙ্খর ডায়া যতো চিকন বা মোটা হয়, তা চাক চাক করে কাটলে চুড়ি ততো চিকন বা মোটা হয়ে থাকে। যখন তা খুব চিকন নলের মতো তখন কাটলে কব্জির চুড়ির বদলে আঙুলের আংটি হয়। ওই কাটাকুটির জন্য যে করাতটি ব্যবহার কা হয় এরই ঐতিহ্যবাহী নাম ‘শাঁখের করাত’। করাত লোহার। কিন্তু শাঁখ কাটার কাজে ব্যবহৃত হয় বলে ওই রকমের নাম। ওই করাতের বৈশিষ্ট্য আগেই বলেছি যেতেও কাটে, আসতেও কাটে। এভাবে কাটার পর এতে নকশা আঁকা হয়। ওই নকশা আঁকতে নরুনের মতো ছোট বাটালি এবং এর অনুপাতে হাতুড়ি ব্যবহার করা হয়। এ থেকেই বাঙালি হাতির দাঁতে নকশা খোঁদাইয়ের কাজে এক ধাপ এগিয়ে গিয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। বিশেষত মানকা হাতির কচি দাঁতে নকশা কাটা এবং শাঁখা অলঙ্করণের ধারণাটি একই। অবিভক্ত ভারত আমলের আসাম সংলগ্নতা ব্যাহত হওয়ার পর বাংলার ওই দ- শিল্পের উঠতি কারুশিল্পের বিকাশ সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়। পলিশ করা শাঁখায় আলো পড়লে এক ধরনের ঈষৎ গোলাপি-নীলচে রঙধনুর তির্যক মৃদুতা খেলে যায়। হিন্দু নারীর সিঁদুর ও শাঁখা পরার বিষয়টি তার সধবা অবস্থার পরিচায়ক। বয়েসি নারীর হাতে শাঁখা ও কপালে সিঁদুর না থাকলে বুঝতে হবে তিনি বিধবা। আর কম বয়সীদের ক্ষেত্রে ওই শাঁখা ও সিঁদুরের অনুপস্থিতির মানে হলো মেয়েটি অবিবাহিত। এর সঙ্গে কুসংস্কার ও প্রথা বিশ্বাসের যোগ রয়েছে যে, বিবাহিত নারীর পক্ষে শাঁখা না পরা এবং বিধবার পক্ষে শাঁখা পরা অমঙ্গলের সূচক। বিশেষ করে বিবাহিতার হাত শাঁখাশূন্য হলে স্বামীর আয়ুক্ষয় বা অন্যান্য অমঙ্গল হয় বলে পৌরাণিক মিথ রয়েছে। শাঁখা নিয়ে আরো কিছু লোকবিশ্বাস বাঙালির প্রাচীন জীবন থেকে চলে আসছে। গর্ভবতী গাভী এবং সদ্য প্রসূত বাছুরের গলা একপ্রস্থ সুতায় এক চাকতি শঙ্খখ- বালার মতো করে ঝুলিয়ে দিলে গাভী-বাছুরের জাদু-টোনা, ছুৎ, নজর লাগা, ভূত-প্রেতের আশ্রয়ী ইত্যাদির প্রতিরোধ হয়। হারের লকেটের মতো করে ঝুলিয়ে দেয়া ওই শঙ্খখ-কে শঙ্খবচলয় বলা হয়। আরো একটি গ্রামীণ নাম আছে, মনে করতে পারছি না। অন্যদিকে নকশি কাজ করা সোনার পাত গেঁথে দিয়ে ঝিনুকের লকেট তৈরির শিল্পকৌশল বাঙালি মণিকারের বহু পুরনো সোনারু কর্ম। শঙ্খের পলার ওপর কাজ করা স্বর্ণের পাত বসানো কিংবা স্বর্ণের ওই পাতে মিনা করাও বাঙালির প্রাচীন স্বর্ণ-শঙ্খ শিল্পের ঐতিহ্য। ওই দক্ষতা প্রসঙ্গে এ কথা বলা যেতে পারে, আমাদের মণিকাররা স্বর্ণকারের অন্য নাম যে ‘শেঁকরা’ এটিও এসেছে ‘শাঁখারি’ থেকে। এ শাঁখারির মাতৃশব্দ হলো শঙ্খ  শাঁখ  শাঁখা। শাঁখারি হচ্ছে ওই জাত বংশ যারা শঙ্খজাত গয়নাপত্র বানিয়ে পুরুষ পরস্পরায় জাতি ব্যবসা হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। তাই বলা যেতে পারে, বাঙালি হিন্দু জাতিভেদ সৃষ্টির ক্ষেত্রে শঙ্খের মাটি, স্বর্ণ, জাল, লোহা, তাঁতের মতো একটি বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। যেমন শাঁখারি চুনারি বা চুনে তারা বংশীয় পদবিপ্রাপ্ত হয়েছেন মূলত শঙ্খ কিংবা ঝিনুক থেকে। সুন্দরবন অঞ্চলে মুসলিমদের মধ্যে ‘শামুক খোটা’ নামে একটি জনগোষ্ঠী রয়েছে। ওই গোত্রের মানুষ সুন্দরবন থেকে শামুক, ঝিনুক, শঙ্খ সংগ্রহ করে জীবিকানির্বাহ করে থাকে। যেমনটি বাওয়ালিরা গোলপাতা, মাওয়ালিরা মধু ও মোম সংগ্রহের কাজ করে থাকেন ঠিক ওই রকম।
শঙ্খধ্বনি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্ম বিশ্বাসের বিষয়। গায়ত্রী সন্ধ্যায় শাঁখ বাজানো গৃহস্থের জন্য বিশেষভাবে মাঙ্গলিক। ওই শঙ্খবিধানির বিষয়টি এতোটাই বিশ্বাসের সঙ্গে পালন করা হয় যে, তা এখনো অলঙ্ঘনীয় ধর্মাচার হিসেবে পরিগণিত। হিন্দু ধর্মের কোনো কোনো দেব-দেবী ওই শঙ্খ বা মহাশঙ্খ ধারণ করেন। যেমন বিষ্ণু ভৈরবি, কামাখ্যা, বরাহ, কুর্ম, সূর্যসহ কেউ কেউ। বিশেষ করে বিষ্ণু শঙ্খ, ক্রি, গদা ও পদ্ম ধারণ করেন বলে তার একটি নামই হয়েছে ‘শঙ্খক্রিগদা পদ্মধারী’। বিয়েতে ওই শাঁখ বাজিয়ে নবদম্পতির জীবনের সামগ্রিক মঙ্গল নিশ্চিত করা হয়। যখন ওই শঙ্খনাদকে আশীর্বাদ হিসেবে স্বর্গীয় বিবেচনা করা হয় আবার বাতাসের বিপরীতে মুখ দিয়ে ধরে শাখের পেছনের ছিদ্রে কান পাতলে যে সোঁ সোঁ গভীর আওয়াজ শ্রুত হয় তখন তা নাকি সমুদ্রের নাদ বা ক্রন্দন। এ বিষয়ে লোকবিশ্বাস নির্ভর কিংবদন্তি বা লোককাহিনীর চল রয়েছে যে, এই শঙ্খশব্দ নাকি শাঁখের সমুদ্র ব্যঞ্জনার হাহাকার রোল। আসলে শঙ্খ খোলসের মধ্যে কয়েকটি প্যাঁচ থাকে। এর ভেতর দিয়ে গতি সম্পন্ন বাতাস নির্গত হতে বাধা পায় বলেই এমন গোঙানির শব্দ হয়।


রাজনৈতিক ক্ষেত্রে শঙ্খের ব্যবহার বিষয়ের অর্থটি নিশ্চয়ই বেশ কৌতূহল উদ্দীপক। সনাতন ধর্মের বিভিন্ন দেব-দেবীর শঙ্খ ধারণের যে পৌরাণিক ঘটনা তা মূলতই রাজনীতি ও যুদ্ধবিগ্রহ সংক্রান্ত তা বলাই বাহুল্য, রাজনীতিতে রাজনীতিই। যুদ্ধ, জয়, রাজ্য, সিংহাসন, স্বর্গবিচ্যুতি এসবও অতি অবশ্যই রাজনৈতিক বিষয়। আবার তাদের যুদ্ধক্ষেত্রে শঙ্খধ্বনিও আজকের কিউগলেরই নামান্তর। যা সর্বতভাবেই রাজনৈতিক ঘটনা তা যতোই হোক না কেন, পৌরাণিক।
যাহোক, ১৯৪৭ সাল-পূর্ব ব্রিটিশবিরোধী যে ‘স্বরাজ’ আন্দোলন এতে ভারতীয়রা অভিনব প্রতীকী ভাষায় সাবধানতা অবলম্বনে নির্দেশিত ছিল। সব পরিবারে যখন ওই মহল্লায় কোনো গোড়া পুলিশ বা ইংরেজ সৈনিক তল্লাশির জন্য কিংবা রেইট করতে ঢুকবে তখনই গৃহস্থ শঙ্খ ও কাঁসর বাজাবে যেন তাদের বাড়িতে কোনো উৎসব পার্বণের কাজ চলছে। আর ওই শঙ্খধ্বনি শোনার সঙ্গে সঙ্গেই লুকিয়ে থাকা স্বরাজ কর্মী অথবা তাদের আশ্রয়দাতারা দ্রুত সাবধান হয়ে থাকেন। বিশেষ করে স্বরাজ কর্মীরা সঙ্গে সঙ্গে সরে পড়তে বা যথাযথ আতœগোপন করতে পারেন।


রাজনৈতিক ছাড়া অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও শঙ্খ, শামুক, ঝিনুক ও গুগলির উল্লেখযোগ্য ভূমিকা যে ছিল এ কথা বেশি বয়সীদের জানা থাকলেও নতুন প্রজন্মের বাঙালির কাছে জানা না থাকারই কথা। এ অঞ্চলে ধাতব মুদ্রা ও কাগুজে নোটের চল শুরু শুরুর আগে এবং দ্রব্য বিনিময় প্রথা উঠে যাওয়ার পর, মানে, ওই দুটি যুগের মাঝখানে একটা দীর্ঘ কাল ছিল। তখন টাকা বা মুদ্রা হিসেবে কড়ি ব্যবহার করা হতো। কানাকড়ি মূল্য নেই’, ‘কড়ি দিয়ে কিনলাম’, পকেটে টাকাকড়ি নেই’, ফেলো কড়ি নাও মাল’, পাঁচকড়ি বাবু’ এসবই সাক্ষ্য দেয় এক সময় কড়িই ছিল টাকা বা পয়সা।
ওই কড়ি এক প্রকার প্রাকৃতিক শঙ্খ বা ঝিনুক ছাড়া অন্য কিছুই নয়। পরে কড়ি খেলার যে চল হয় তাও কড়ি মুদ্রা আমলে। এই কড়ি খেলা ছিল ওই আমলের জুয়া।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আরো ভূমিকা রয়েছে ঝিনুক বা শঙ্খার। আগে মানুষ জলাভূমি থেকে ঝিনুক সংগ্রহ করে রাখতো। আবার স্থান বিশেষে সংশ্লিষ্ট কারখানার প্রতিনিধি নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে গৃহস্থ বা সংগ্রাহকদের কাছ থেকে ঝিনুক সংগ্রহ করে তা দিয়ে বোতাম, চুলের কাঁটা ইত্যাদি তৈরি করতো। এক সময় আমাদের পোশাক শিল্প লোহার টিপ বোতাম এবং ঝিনুকের গোল ও চৌকা দুই ছিদ্রের বোতামের ওপর নির্ভরশীল ছিল। শাঁখারি, চুনারি ও শামুকখোটাদের জীবিকার প্রধান কাঁচামালও ছিল শঙ্খ বা ঝিনুক এ কথা আগেই বলেছি। কালে কালে চুনারিদের ঘরে ঘরে ঝিনুক পোড়ানো হাঁপর বা চুলার প্রচলন বিলপ্ত হয়। কৃষিতে অপরিণামদর্শী কীটনাশক প্রয়োগের ফলে বিভিন্ন জলাশয়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত হতে থাকে ঝিনুক-শঙ্খর বিবিধ বংশ। আবার বৈজ্ঞানিক ও খামার পদ্ধতিতে মাছ, হাস-মুরগি ইত্যাদি চাষের পরিপ্রেক্ষিতে খাদ্যদ্রব্য হিসেবে শামুক, ঝিনুক ও শঙ্খর ওপর চাপও পড়ে বেশ। ফলে যে কোনো অঞ্চলে যে কোনো জলাশয়ে প্রচুর ঝিনুক-শামুক পাওয়ার ক্ষেত্রে ভাটা পড়তে থাকে। এর পরিণতি এখন চরমে। তাই চুন তৈরিতে চুনারিদের ঝিনুক জোগাড় ও ব্যবহারের পদ্ধতিই পাল্টে গেছে। এখন দেশের দক্ষিণাঞ্চলে সমুদ্রপাড় ছাড়া সুন্দরবন এলাকায় সবচেয়ে বেশি চুনা উপাযোগী ঝিনুক পাওয়া যায়। ওইসব অঞ্চলে (বাগেরহাট, সাতক্ষীরা) বড় মহাজন ভাটা করে ঝিনুক গোড়ানোর বিরাট কারখানা বসিয়েছেন। সেখান থেকে বিভিন্ন জেলায় ট্রাকভরে উৎপাদকরা পোড়া ঝিনুক ক্রয় করে নিজ নিজ জেলায় নিয়ে কেবল ঘোটাঘুটির কাজ করে পাইকারি ও খুচরা দামে কাজ থাকে।
ঝিনুক যে কেবল শাঁখারি, প্যাঁকড়া, চুনারি ও শামুক থেকে সৃষ্টির পটভূমিকা প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে তা নয়। বাংলাদেশের কোনো কোনো অঞ্চলের নামকরণ হওয়ার ক্ষেত্রেও ঝিনুক-শামুক বিশেষ অবদান রয়েছে শাঁখারীবাজার, ঝিনাইগাতি, ঝিনাইদহ, শাঁখবাড়িয়া, মুক্তাগাছা প্রভৃতি। চুনারুঘাটের নামকরণের পেছনেও ঝিনুকের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে। এছাড়া ঝিনুক, শামুক, শঙ্খ, কড়ি ইত্যাদির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশের অনেক গ্রামের নাম নিশ্চয় পাওয়া যাবে। শাঁখারীপট্টি, চুনপাড়া এসব নাম তো সিংসন্দেহে মিলবে।


ঝিনুক, শামুক, শঙ্খের দেহ গড়নই কেবল বিচিত্র সুন্দর নয়, এর রঙ মনোহারি অপূর্ব বর্ণিল। দুটি ক্ষেত্রেই এর রকমফের বিস্ময় উদ্রেককারী সুন্দর। যে প্রজাতি, রঙ, মিঠা বা নোনা পানির হোক না শঙ্খ, এমনকি যে আকৃতিরই হোক না কেন, একটি ক্ষেত্রে এর অপরিহার্য মিল দেখা যায়। প্রতিটির খোলস খুব শক্ত এবং ভেতরটি ভীষণ নরম ও নাজুক। আবার খোলসের ক্ষেত্রে মিল হলো এগুলো একরঙা-বহুরঙা, কাঁটাযুক্ত-কাঁটামুক্ত, লম্বা-বেঁটে, ঢোপা-টেপা, গোল-তেকোণা, ভোঁতা-সুচালো যে আকারেরই হোক না কেন, ওই খোলস হয় আবশ্যিক ভাবেই প্যাঁচ বিশিষ্ট। ওই প্যাঁচ একাধিক এবং অনেক ক্ষেত্রে অগণতি।
শামুক ভাঙা, শঙ্খচিল এই পাখি দুটির নাম যে শঙ্খের সঙ্গে বেশ একটা সম্পর্কিত এ কথা আগেই বলেছি। বিষ্ণু দেবতার কথাও বলা হয়েছে যে, তার আরেক পৌরাণিক নাম হলো শঙ্খক্রিগদা পদ্মধারী। এছাড়া বাংলা সাহিত্য ও শব্দ ভা-ারে কিছু উচ্চারণ রয়েছে যা শঙ্খের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। যেমন শঙ্খকার, শঙ্খচিল, শঙ্খচূড়া, শঙ্খচুনি, শঙ্খবলয়, মহাশঙ্খর তেল, সুতাশঙ্খ, শঙ্খবিষ, শঙ্খমালা, শঙ্খনীল, শঙ্খমুখ। এর প্রতিটি বিষয় ভিত্তি করে ব্যাপক আলোচনার সুযোগ রয়েছে। এ সুযোগটি এখানে বিশেষ বিবেচনায় গ্রহণ করা গেল না। যদি আলোচনা করা যেতো তাহলে নিশ্চয়ই আমাদের কাছে আরো স্পষ্ট উপভোগ হতো যে, শঙ্খ কতো বহুরৈখিক আঙ্গিকে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে অর্থবহ বিষয় হিসেবে জেঁকে আছে। শঙ্খর যে বস্তুমূল্য এর বাইরেও বহুভাবে সাহিত্যিক ও রূপকাল্পনিক ভাবমূল্য রয়েছে। এ জন্য ওই কথা বললে অত্যুক্তি হবে না, শঙ্খ বাহ্যত যতো সামান্যই হোক না কেন তা লোকপৌরাণিক, আর্থসামাজিক এবং রীতিমতো ভাবসাহিত্যিক সম্পদ হিসেবে বহুরেখায় অত্যন্ত মূল্যবান। আসলেই শঙ্খের মাহাত্ম শঙ্খের চেয়েও অনেক। শঙ্খ বাহ্যত যা, আসলে এর চেয়ে বেশি।

 

মডেল : ঐশ্বর্য্য রহমান
পোশাক ও স্টাইলিং : সহজ টিম
মেকোভার : ক্লিওপেট্রা বিউটি স্যালন
ছবি : শোভন আচার্য্য অম্বু

 

Page 1 of 3

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

Twitter feed

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…