Page 3 of 3

ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্প

ফয়সাল শাহ

 

 

যা কিছু মানুষের প্রাণের রূপ, মনের সৃষ্টি চিত্র, মূর্তি, কবিতা, থালা-বাটি, হাঁড়ি-কলসি, আসপিঁড়ি, পুতুল, খেলনা, হাত, পা, কান, কণ্ঠ, সিঁথি ও শিরের ভূষণ সোনা, রুপা, তামা, পিতল, মণি-মাণিক্য, মুক্তা, শঙ্খ ও পুঁতিতে। জড় যদিও এর উপাদান তবুও চিন্ময় এর ছটা। বস্তুতে বস্তুতে এর নির্মাণ স্বপ্ন সত্যে, আরো সত্য এর স্থিতি ও গতি। সব শিল্প চেষ্টা ও সৃষ্টি অখ- মানব জীবনে অঙ্গীভূত। হৃদয় যদি দেহ, মন, হৃদয়, বৃত্তি বা চেতনায় কোনো একটি ভূমিতে আবদ্ধ না হয়, মানুষের শিল্প চেষ্টা ও সৃষ্টিও তাহলে সর্বতোমুখ। অখ- জীবন উপলব্ধি এবং সেটিকে সুষমাদানের প্রয়াস থেকে আসে যে শিল্প ও সাহিত্য সৃষ্টির প্রেরণা এর মূল সুর এক হলেও বিভিন্ন শাখার আঙ্গিক এবং আবেদনের তারতম্য আছে। নান্দনিক চেতনায় চালিত দৃশ্য, শ্রাব্য বা উচ্চারিত কোনো রূপকল্প ও প্রতীক নিয়ে শিল্পের জগৎ। দর্শন ও শ্রবণেন্দ্রিয় নির্ভর সব সৃষ্টিকর্মের মধ্যে দর্শনেন্দ্রিয়গ্রাহ্য শিল্পের একটি জগৎ। দর্শন ও শ্রবণেন্দ্রিয় শিরোনামে আলোচ্য। এখানে হাত ও হাতিয়ারের সাহায্যে তৈরি কয়েক পর্যায়ের যে শিল্প কর্ম আছে, যথেচ্ছভাবে সেগুলোকে আমরা লোক, কারু, হস্ত, কুটির ও ক্ষুদ্রশিল্প নামে অভিহিত করি। লোকশিল্প প্রাচীন সমাজের যে জাদু ও লৌকিক বিশ^াসের ছাপ বহন করে এর থেকে উদবর্তবাদের জন্ম। প্রাগৈতিহাসিক ও আদিম মানব সমাজের ধ্যান-ধারণা লোকজীবনে আচ্ছন্ন করে আছে। এর অভিব্যক্তি কখনো প্রচ্ছন্নভাবে, কখনো প্রকাশ্যে। লোকবিশ^াসের বৈশিষ্ট্য নিঃসন্দেহে লোকায়ত শিল্পকে করেছে অনন্য, দিয়েছে তাকে নিগূঢ় অর্থ। এ আদিমতার নির্যাস যে আজও লোকশিল্পে বর্তমান এতে সন্দেহের অবকাশ নেই। তাই বলে এ শিল্পের স্বতন্ত্র সত্তা অস্বীকার করা যায় না। ব্যবহারিক ঐন্দ্রজালিক ও ধর্মীয় উদ্দেশ্য ছাড়াও লোকশিল্পটি দেখতে হবে নিছক নান্দনিক দৃষ্টিকোণ থেকে। তাছাড়া প্রাগৈতিহাসিক ও প্রাচীন শিল্পের প্রসার হয়েছিল সমাজের প্রাকস্বাক্ষরতা স্তরে।


বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতির ঐতিহ্যই গড়ে উঠেছে লোকসমাজের অবস্থান, ভূপ্রকৃতি, জলবায়ু, জীবন যাপন প্রণালি, আচার-আচরণ, বিশ^াস-সংস্কার ও মূল্যবোধ কেন্দ্র করে। লোকসমাজ দেশের জনগোষ্ঠীর প্রধান অংশ। তারাই পুরনো ঐতিহ্যের ধারক। তাদের জীবনধারা গড়ে উঠেছে নানান বৃত্তি-পেশা, ধর্ম ও রক্তধারার ভিত্তিতে। তবে এই লোকসমাজের বসবাস যে কেবল গ্রামে তা নয়, অনেকে শহরেরও বাসিন্দা। এই লোকসমাজের শিল্পচর্চার প্রমাণ মেলে বস্তগত উপাদানের মধ্যে। সাধারণ অর্থে এগুলোকে আমরা লোকশিল্প বলতে পারি। অত্যন্ত সহজ, সরলভাবে এসব শিল্পকর্ম তৈরি। এই শিল্পীরা তো সমাজের সাধারণ স্তরের মানুষ।
বাংলাদেশের লোকশিল্পের বিকাশ ও বিবর্তনে তিনটি ধারা দেখা যায়, ধর্মীয় (জরঃঁধষ), আলঙ্করিক (উবপড়ৎধঃরাব) ও ব্যবহারিক (টঃরষরঃধৎরধহ)। লোকশিল্পের উপাদানগুলো শ্রেণীবিন্যস্ত করতে গেলে এই ধারাগুলোর বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আমাদের লোকশিল্পের মূল উপাদান মাটি, বাঁশ, বেত, সুতা, কাপড়, কাঠ। মাটি দিয়ে তৈরি তৈজসপত্র, খেলনা, পুতুল, পিঠার ছাঁচ। কাপড়, সুতা, পাট দিয়ে তৈরি নকশি কাঁথা, নকশি শিকা, নকশি পাখা। কাঠ দিয়ে তৈরি পুতুল, বাদ্যযন্ত্র ও পটচিত্র, পুঁথির পাটাচিত্র। বাঁশ ও বেতের তৈরি ঝুড়ি বোনা শিল্প এক সময় নিত্যদিনের সঙ্গী ছিল। এ দেশের মানুষের এসব লোকশিল্পের ক্ষেত্র বড় বিস্তৃত।
আমাদের লোকশিল্পের সবচেয়ে প্রাচীন নিদর্শন মেলে মৃৎশিল্পে। এই শিল্পের প্রাচীনতম ঐতিহ্য খুঁজে পাওয়া গেছে চৎড়ঃড় ওহফরধহ ঈঁষঃঁৎব-এ সিন্ধু সভ্যতার প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শনের মধ্যে। আনুমানিক পাঁচ হাজার বছর আগে সিন্ধু সভ্যতার ওই পোড়ামাটির পুতুলে যথেষ্ট সাদৃশ্য রয়েছে বাংলাদেশের পাহাড়পুর ও ময়নামতি বৌদ্ধবিহারে প্রাপ্ত পোড়ামাটির ফলক ও পুতুলের সঙ্গে। তারা ওই সাদৃশ্যের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, পোড়ামাটির শিল্পের কাল উত্তীর্ণ (ঞরসবষবংং) যে ধারাটির সূত্রপাত ঘটেছিল সিন্ধু অঞ্চলে তা আমাদের এই গাঙ্গেয় বদ্বীপ অঞ্চল পর্যন্ত পরবর্তীকালে ছড়িয়ে পড়েছিল। পোড়ামাটির শিল্প তৈরির উপকরণগুলো এবং এ প্রযুক্তি (ঞবপযহরয়ঁব) বিশ্লেষণ করলে সব অনুসন্ধ্যিৎসু ব্যক্তির কাছেই বিষয়টি অবশ্য পরিষ্কার হবে।


সূচি শিল্পের কথাও যদি বলি তাহলে সেখানেও দেখবো ওই সিন্ধু সভ্যতায় আবিষ্কৃৃত মূর্তিতে সূচি শিল্পের নকশা করা পোশাকের নিদর্শন। ১৯২৯ সালে পর্তুগিজ মিশনারি সেবাস্তিয়ান ম্যানরিক উল্লেখ করেছেন, বাংলাদেশ থেকে যেসব জিনিস তারা নিয়ে যেতেন এর মধ্যে বিশেষ আকর্ষণীয় ছিল লোকশিল্পজাত সূচি শিল্প। এই সোনারগাঁওয়ের সঙ্গে প্রায় পরিপূরক একটি শব্দ মসলিন কাপড়। সোনারগাঁওয়ে তৈরি এই মসলিন কাপড় দেশ-বিদেশে খ্যাতি অর্জন করেছিল। এটি বিদেশে রফতানি হয়। এই শিল্পকর্ম নিয়ে কিংবদন্তিরও অন্ত নেই। তাই যুগে যুগে বাংলার লোকজশিল্প সব সময় সব শিল্পের অফুরন্ত আধার ও উৎস হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছে। ভবিষ্যতের শিল্পীদেরও এই উৎসের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকতে হবে।
লোকশিল্প ঐতিহ্যবাহী এ কারণে যে, তা মোটিফ, প্রতীক ও অলঙ্করণের ধাঁচ পুরুষানুক্রমে ধরে রাখতে সক্ষম। এ শিল্প সদ্য সব ঐতিহ্যের সৃষ্টি করে। মৌলিক পরিচয় হারিয়ে নিছক অলঙ্করণে রূপান্তরিত হয়েছে এমন সব রূপকল্পে নতুন মর্ম আরোপ করে এর পুনঃপ্রবর্তনে লোকায়ত এ শিল্প। কারণ কোনো গোঁড়া মতবাদ দ্বারা তা শৃঙ্খলিত নয়। লোকশিল্পে শিল্পীর অবস্থান ততোটা উদগত নয়। কেননা এ শিল্পটি নিছক ব্যক্তি বিশেষের সৃজনশীলতা না বলে বলা যায়, একটি সঞ্চিত মৌলিকত্ব। এর আত্মপ্রকাশের স্বীকৃতির পাশাপাশি আছে সম্প্রদায়ের যৌথ অভিব্যক্তি।
একাডেমিক আর্ট বা আধুনিক চিত্রকলার সঙ্গে লোকশিল্পের তফাত হলো, চারুশিল্পী উপযুক্ত শিক্ষাপ্রাপ্ত হয়ে তার শিল্পকর্মে হাত দেন। তার সৃষ্টিতে স্বীয় ‘কপিরাইট’ স্বীকৃত। তার অনুকারী চৌর্যবৃত্তির দায়ে অভিযুক্ত হতে পারেন। তিনি পরিশীলিত ব্যক্তি এবং পরিশীলিতজনের উদ্দেশ্যে তার সৃষ্টি! লোকশিল্পের মালিকানা গোটা গ্রামীণ সমাজের। তার অনুকরণ দোষণীয় নয়। তার কদর সরল-সহজ সমাজে। তবে পরিশীলিতজনের কাছেও তার আবেদন ব্যর্থ নয়। দরবারি অথবা বিদগ্ধ শিল্পের সঙ্গে সঙ্গে লোকশিল্পের আরেকটি পার্থক্য হচ্ছে, প্রথমোক্ত শিল্পের পরস্পরের সম্পর্ক শিথিল। স্থাপত্য, ভাস্কর্য, চিত্রশিল্পÑ প্রতিটির ক্ষেত্র আলাদা এবং একের আঙিনায় অপরের প্রবেশ বড় একটা দেখা যায় না। লোকশিল্পের বিভিন্ন মাধ্যম অন্যান্য নির্ভর পরস্পর প্রবিষ্ট। ওই সূত্র তৈরি করে উদ্দেশ্যের ঐক্য, শ্রম ব্যবস্থা বিন্যাস, সামাজিক পারঙ্গমতা, নির্ভরশীলতা। একই ব্যক্তি বিভিন্ন মাধ্যমের শিল্পী। একই শিল্পী খেলনা পুতুল তৈরি করছেন, অন্য সময় ঘরবাড়ি, কোনো সময় প্রতিমা। এ যোগসূত্রের ফলে গড়ে ওঠে সর্বাশ্রয়ী ডিজাইন। প্রাত্যহিক জীবন সম্পৃক্ত বলে লোকশিল্পের সংক্ষিপ্ত সংযমী গড়ন। বাহুল্যবিহীন বলে, ফর্ম ও ডিজাইন যথাযথ। অধুনা পরিশীলিত পরিবেশে লোকশিল্পের অবস্থান চিহ্নিত করে এর পরিচয় দেয়া হয়।


আবহমান বাংলার লোকজশিল্প গভীর জীবনভেদী একটি চলমান স্রোত। তা নীরবে-নিভৃতে কারোর প্রতি দৃষ্টি বা মুখাপেক্ষী না হয়ে একমনে অন্তস্থিত একটি নদীর ফল্গুধারার মতো স্রোতোস্বিনী হয়ে বয়ে যায় কালে কালে। এটি ওই দেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির একটি ঋদ্ধিমান অবস্থানের অস্তিত্ব প্রমাণ করে। বাংলাদেশের লোকঐতিহ্যময় কারুকাজ মৃৎশিল্প, বস্ত্রশিল্পের তাঁত ও তস্তুজাত সৃষ্টিশীলতা, বাঁশের কাজ, লোহা ও পিতলের কাজ, দারুশিল্প, দড়ি ও বেতের কাজ, পাটজাত দ্রব্যের বহুবিধ ব্যবহারিক কাজের জন্য শিল্প, নকশি কাঁথা শিল্প, লোকজস্থাপত্য, রন্ধন শিল্প, নৃত্যসঙ্গীত, চিত্রশিল্প, সাহিত্য, কাব্য। মোট কথা, জীবন যাপনের জন্য সাধারণ মানুষের আবেগ, নান্দনিকতা, ব্যবহারিকতা, উপযোগিতা ও উপস্থাপনাসহ একটি সম্পূর্ণ এবং যথার্থ চলমান শিল্প স্রোত আধুনিক শিল্প বহুলাংশে প্রাগুক্তধারা থেকে নিজের জন্য অনায়াসে হাত বাড়িয়ে সাহায্য গ্রহণ করে একটি নতুন উপস্থাপনায় হাজির হয়ে ওই শিল্পের একটি নান্দনিক মাত্রা অর্জনে সহায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। আধুনিকধারার শিল্পটি গ্রহণ করে বা না করে সাধারণ কিংবা অসাধারণ মানুষ অনায়াসে জীবন যাপন করতে পারে। কিন্তু লোকজধারার বেলায় অন্য চিত্র। লোকজশিল্প সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এটিকে বাদ দিয়ে তাদের জীবন চলে না। তাই বাংলাদেশের লোকশিল্প খুবই শক্তিশালী ও ঐতিহ্যময় এবং গৌরবের। যেহেতু এটি মৌলিক, আদি ও স্বয়ম্ভূ সেহেতু বহুমাত্রিক। আধুনিক শিল্পের বিকাশ লোকজধারা থেকে আস্তে আস্তে পরিবর্তিত, পরিমার্জিত, বিবর্তিত, উন্মেষিত ও পরিশীলিত হয়ে হয়ে বর্তমান অবস্থায় এসে পৌঁছেছে।
প্রতিনিয়ত মানুষের জীবনে নতুনের আবির্ভাব ঘটেছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উৎকর্ষের কারণে মানুষ বিজ্ঞানমনস্ক হচ্ছে। এতে ব্যাপক পরিবর্তন আসছে চাহিদা ও রুচির ক্ষেত্রে। বিশ^জুড়ে এই যে আবহ তৈরি হয়েছে এর ছোঁয়া আমাদের দেশেও এসে পৌঁছেছে। গ্রামগুলো দ্রুত যেন শহুরে রূপ লাভ করেছে। নিদেনপক্ষে শহরের প্রভাব সেখানে পৌঁছে যাচ্ছে। বাংলাদেশে লোকশিল্পের ইতিহাস পর্যলোচনা করলে দেখা যায়, এর বিকাশ প্রায় রুদ্ধই। এর পেছনে কারণ অনেক। প্রধান কারণ মুক্তবাজার অর্থনীতির ভোগবাদপ্রবণ প্রভাব। ওই প্রভাবই অক্টোপাসের মতো হাত-পা বিস্তার করে অতি দ্রুতই শাখা বেড়ে দীর্ঘকাল ধরে গড়ে ওঠা আমাদের পুরনো সমাজ কাঠামো ভেঙে তছনছ করে দিচ্ছে। আত্মকেন্দ্রিকতা, ব্যক্তিস্বার্থপরতা দীর্ঘকাল ধরে গড়ে ওঠা সামাজিক বন্ধনে চিড় ধরাচ্ছে। প্রযুক্তি ও মিডিয়ার কল্যাণে এর ফল রাতারাতি ছড়িয়ে পড়ছে গ্রামগঞ্জেও। যৌথ পরিবার ছেড়ে অনেকেই এখন আলদা হয়ে ছোট পরিবারে জীবন যাপন করতে আগ্রহী হচ্ছেন।


আমাদের আবহমানকাল ধরে গড়ে ওঠা একটি গৌরবময় ও সমৃদ্ধ অতীত রয়েছে, আছে একটি সুদৃঢ় অর্থনৈতিক পরিকাঠামো। আহার-বিহার, পোশাক-পরিচ্ছদ, আচার-বিশ^াসে তো কোনো কৃত্রিমতা নেই। এ জন্যই তো লড়াই করে ভূখ- জয়ের আকাক্সক্ষা জেগেছিল এ দেশের মানুষের। প্রত্যাশা ছিল জনগোষ্ঠীর জীবনের নিজস্ব ‘প্যাটার্ন অফ লাইফ’ সংরক্ষণ করা। আধুনিকতা ও বিশ^ায়নের জোয়ারে তা কি হারিয়ে যাবে?
আমাদের দেশে তো ভৌগোলিক পরিবর্তন হয়েছে। মেঠোপথ দ্রুতই রাজপথ হয়ে যাচ্ছে। লোকযানের পরিবর্তে চলছে যান্ত্রিক যানবাহন। নদীগুলো ক্রমান্বয়ে পলি পড়ে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। নাব্য নদীগুলোয় চলে যান্ত্রিক যানবাহন। এ জন্য সময়ের চাহিদা ও রুচির পরিবর্তনেই হারিয়ে যাচ্ছে জনপ্রিয় লোকশিল্প ও কারুশিল্পের বিভিন্ন নিদর্শনÑ যশোর, ফরিদপুর, রাজশাহীর নকশি কাঁথা, কাগমারী-ধামরাইয়ের পিতল-কাঁসা শিল্প, রাজশাহীর শখের হাঁড়ি, সিলেটের শীতলপাটি, চট্টগ্রামের ঝুড়ি বোনা শিল্প, সোনারগাঁওয়ের দারু ও ঝিনুক শিল্প ও অন্যান্য। এসব পণ্যের বাজার না থাকা এবং নৃতত্ত্বের ভাষায় উপযোগিতা ও ফ্যাশনহীনতার জন্য অধিকাংশ বনেদি লোকশিল্পী পরিবারই পেশা বদল করেছে। জীবিকার জন্য যে পথ তাদের বেছে নিতে হয়েছে এর সঙ্গে পূর্ব পুরুষের পেশার সম্পর্কই নেই। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশ, নগরায়নের দ্রুত বিস্তার সময়ের বিষয়। পরিবর্তনের এই জোয়ার তো অপ্রতিরোধ্য। এ পরিবর্তন চলতেই থাকবে। এক্ষেত্রে আমাদের কাজ হবে একটিই। তা হলো, আমরা যেন নিজেদের ইচ্ছা ও পছন্দমতো ওই পরিবর্তনটি এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি। আমাদের লোকশিল্পের উপাদানটি রূপান্তরের মাধ্যমে সংরক্ষণ করতে হবে। তবে খেয়াল রাখতে হবে, রূপান্তর ততোটুকুই হবে যতোটুকুতে দেশের মাটির স্পর্শ ও ঘ্রাণ থাকবে। শিল্পের উপাদান ঠিক রেখে নকশায় একটু রূপান্তর আনাই যেতে পারে কিংবা নকশার মোটিফ ঠিক রেখে উপাদানে একটু পরিবর্তন আনাই যেতে পারে।
বাংলাদেশের লোকশিল্পের ঐতিহ্য রক্ষা করতে নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা অপরিহার্য বলে আমি মনে করিÑ
 

- লোকশিল্পসহ লোকসংস্কৃতির সব বিষয় চর্চা ও গবেষণার জন্য দেশে জাতীয় লোকশিল্প ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা।
- লোকশিল্প অঞ্চল সনাক্তকরণ।
- লোকশিল্পের প্রদর্শন, ডকুমেন্টেশন ও প্রচারের ব্যবস্থা করা।
- পুনরুজ্জীবিত করার জন্য লোকশিল্পীদের আর্থিক সহায়তা প্রদান।
- লোকশিল্পের দিকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে উদ্বুদ্ধ করা।
- লোকশিল্প বিষয়ক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধন করা।
 পাঠ্যবইয়ে লোকশিল্পের বিষয়ে প্রবন্ধ ও নিবন্ধ অন্তর্ভুক্তকরণ।

ঐতিহ্যবাহী কাঁসাশিল্পের সেকাল-একাল

নূর কামরুন নাহার

 

বাঙালির ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক বিশাল অংশজুড়ে রয়েছে প্রাচীন চারু ও কারুশিল্প। নন্দনতাত্ত্বিক দিক দিয়েও এই চারু ও কারুশিল্পের রয়েছে ব্যাপক গুরুত্ব। বগুড়ার মহাস্থান গড়, কুমিল্ল¬ার ময়নামতি এবং অতি সম্প্রতি নরসিংদী জেলার ওয়ারী বটেশ্বরীর খননকার্য এই প্রতœতাত্ত্বিক প্রমাণের নিশ্চয়তা প্রদান করেছে। খ্রিস্টপূর্ব আনুমানিক ৫০০ অব্দ থেকে প্রাচীন বঙ্গের অধিবাসীরা মৃৎশিল্প, লৌহ নির্মিত হাতিয়ার, কাঠের তৈরি সামগ্রী, ধাতব বিভিন্ন কৃষি সামগ্রী, ধর্মীয় ও গৃহকর্মের জন্য নানা সামগ্রী প্রস্তত করতো। ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে এগুলো যেমন বাংলার হাজার বছরের সংস্কৃতি ও বিবর্তনের সাক্ষ্য বহন করে তেমনি
মানুষের সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক অবস্থান এবং তাদের আধ্যাত্মিক ও বৌদ্ধিক বিকাশও প্রতিফলিত করে।
চারু ও কারুশিল্প সামগ্রীকে মোটা দাগে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায় Ñ
ক. দৈনন্দিন কাজে ব্যবহৃত সামগ্রী
খ. ধর্মীয় ও উৎসব-অনুষ্ঠানের সামগ্রী
গ. ব্যক্তিগত সাজসজ্জার সামগ্রী
ঘ. সম্প্রদায় বিশেষের জন্য স্থাপত্যশিল্প (যাযাবর, আদিবাসী, পশুপালন, কৃষি)
ঙ. গ্রামীণ বা কোনো সম্প্রদায়ের জন্য স্থাপনা
চ. ব্যবসা-বাণিজ্যের কাজে ব্যবহৃত সামগ্রী (ধাতব মুদ্রা ইত্যাদি) এবং
ছ. দৃষ্টিনন্দন (আনন্দ, উৎসব ও উপভোগের সামগ্রী)। এসব শিল্পকর্মে যাজক সম্প্রদায়, রাজা ও ধনাঢ্য শ্রেণীর পৃষ্ঠপোষকতা ছিল। তামা, ব্রোঞ্জ, পিতল, কাঁসার তৈরি এসব শিল্পকর্মের নানান উদ্দেশ্য ও ব্যবহার থাকলেও এগুলো বাংলার জীবন আচরণ, সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং বাংলার ঐতিহ্য প্রকাশ করে।
প্রাচীন তৈজসপত্র বাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে কাঁসার তৈজসপত্র। একটা সময় ছিল যখন কাঁসা-পিতলের তৈজসপত্র বাড়ি ও বংশের ঐতিহ্য প্রকাশ করতো। অবস্থাপন্ন গৃহস্থ ও বনেদি ঘরে প্রত্যেকের নির্দিষ্ট কাঁসার থালা ছিল। এসব কাঁসার থালা ও সামগ্রীর কোনো
কোনোটির ওপর থাকতো বাহারি নকশা। বাড়ির কর্তার থালাটি হয়তো থাকতো একটু বড় অথবা বেশি কারুকার্যময়। এতে সংসারে কর্তার কর্তৃত্বকে প্রকাশ করতো। কাঁসার এসব সামগ্রী শুধু নিত্যপ্রয়োজনে ব্যবহার করা হতো তা নয়, এগুলো মানুষের শৌখিনতাও প্রকাশ করতো। এসব জিনিসে অনেক সময় ব্যবহারকারীর নাম উৎকীর্ণ করা থাকতো। প্রত্যেকের ঘরেই তখন শোভা পেতো কাঁসার থালা, বাটি, জগ, গ্লাস, পাতিল, গামলা, কলসি, বালতি, পানদানিসহ নানান কিছু। অনেকে কাঁসার তৈরি শৌখিন হুঁক্কাও ব্যবহার করতেন। এমনকি ইঁদারা ও কুয়ার পাড়ে কাঁসার বদনা ব্যবহার হতো। বিয়ে-শাদির অনুষ্ঠানে কাঁসার জিনিসপত্র উপহার দেয়া ছিল বাংলার এক ঐতিহ্যবাহী রেওয়াজ। যাকে উপহার দেয়া হতো তার নাম এবং যিনি উপহার দিতেন তার নাম খোদাই করা থাকতো এসব সামগ্রীতে। শিল্পের মর্যাদায় কাঁসা এতোটাই উপরে ছিল যে, কারো ঘরের আভিজাত্য নির্ণিত হতো বাড়িতে রক্ষিত কাঁসার তৈজসপত্র দেখে। দেশের প্রতিটি শহর ও গ্রামে কাঁসাশিল্পীদেরও ছিল বেশ নামডাক। এই শিল্পীদের আলাদা মর্যাদাও ছিলো সমাজে। এই শিল্পীরা কে কতো নিখুঁত ও ঝকঝকে কাঁসার বাসন বানাতে পারেন এর প্রতিযোগিতা হতো।

কাঁসা শিল্প
শিল্পীদের নিবেদন, একনিষ্ঠতা ও প্রতিযোগিতা কাঁসা শিল্পটিকে নিয়ে গিয়েছিল বহুদূর। ইতিহাসের ওই পটভূমিতে দেখা যায় কয়েক হাজার বছর আগে কয়েকটি সভ্যতাজুড়ে রয়েছে এই কাঁসা শিল্প। এর প্রমাণসরূপ প্রতœতত্ত্ববিদরা দেশের অনেক স্থানে খনন করে আজও কাঁসার জিনিস পাচ্ছেন। টাঙ্গাইল, ধামরাই, ঢাকা, মুন্সীগঞ্জ, বিক্রমপুর, মানিকগঞ্জ, নরসিংদী, পাবনা এলাকা ছিল কাঁসার জিনিসপত্রের অন্যতম এলাকা। বিশেষ করে বাংলাদেশের টাঙ্গাইল ও ঢাকার ধামরাই ছিল কাঁসা শিল্পের সূতিকাগার। এছাড়া দেশের প্রতিটি কোণায় গড়ে উঠেছিল কাঁসা শিল্প। টাঙ্গাইল ও ধামরাইয়ের কাঁসা সামগ্রী রফতানি হতো বিদেশেও। সুন্দর কারুকাজ, নান্দনিক ও গুণগত মানে এ দেশের কাঁসার জিনিসপত্র এতোটাই নাম কুড়িয়েছিল যে, ব্রিটিশ শাসকরা কাঁসাশিল্পীদের প্রশংসা করে পুরস্কার ও পদক দিয়েছিল। তাদের মধ্যে আছেন টাঙ্গাইলের মধুসূদন কর্মকার, গণেশ কর্মকার, বসন্ত কর্মকার, যোগেশ কর্মকার ও হারান কর্মকার।

কাঁসা শিল্পের পূর্বকথা
বাংলাদেশ বা অবিভক্ত বাংলায় কাঁসা-পিতলের প্রচলন কবে শুরু হয়েছিল তা সঠিক করে বলা যায় না। প্রতœতাত্ত্বিকদের মতে, প্রাচীন সভ্যতার আমলে ব্রোঞ্জ শিল্প ব্যবহার থেকেই এর শুরু। আবার কেউ কেউ এটিকে মহাস্থানগড়ের সভ্যতার সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছেন। ১৫৭৬-১৭৫৭ সনে মোগল আমলে এ
উপমহাদেশে ব্যাপকভাবে কাঁসা-পিতলের ব্যবহার শুরু হয়। এসব ধাতু দিয়ে ঢাল, তলোয়ার, তীর-ধনুক তৈরি করা হয়। ব্রিটিশ আমলেও এ শিল্পের প্রসার ঘটে। তবে বলা হয়, রাজা গৌড় গোবিন্দের শাসন আমলে উপমহাদেশে ভারতের কংস বণিকদের মাধ্যমে এই দেশে কাঁসা শিল্পের প্রচলন হয়। ওই হিসাবে কংস বণিকরাই কাঁসা শিল্পের উদ্ভাবক।

একটা সময় সব ধর্মের মানুষের কাছে কাঁসা শিল্প ছিল জীবন যাপনের অংশ। সব আচার-অনুষ্ঠানের মর্যাদা বাড়িয়ে দেয় কাঁসার ব্যবহার। মণিকাররা যেমন গহনা বানানোর কারিগর হিসেবে গর্ব করতেন তেমন কাঁসার শিল্পীরাও বনেদিদের আভিজাত্য রক্ষায় গর্ব করতেন। কাঁসার তৈরি ভাস্কর্য প্রচুর সুনাম কুড়ায়। প্রাচীন জিনিসপত্র ও ভাস্কর্য দেখে ধামরাইয়ের শিল্পীরা প্রথমে কাঁসা দিয়ে নানান ভাস্কর্য বানান। এরপর পিতল ও তামার ব্যবহার শুরু করেন। এখন পর্যন্ত কাঁসা, তামা, পিতল দিয়ে ছোট-বড় ভাস্কর্য ধামরাইয়েই বানানো হচ্ছে। রথযাত্রার ওপরও বড় ভাস্কর্য বানিয়েছেন ধামরাইয়ের কাঁসা শিল্পীরা।

অলঙ্কার ও শোপিস সামগ্রী
সোনা-রুপা অলঙ্কারের সঙ্গে তামা-পিতল অলঙ্কারেরও ব্যবহার ছিল এক সময়। এছাড়া পিতলের ফুলদানি, আতরদানি, ট্রে, বিভিন্ন শোপিসের প্রচলন ছিল। গ্রামের কারিগর পাতা, ফুল, পাখি, মাছ, চাঁদ, তারা ইত্যাদির অবিকল নকল করে এক বিশেষ ধরনের অলঙ্কার তৈরি করতেন। পিতল দিয়ে অবিকল বিভিন্ন প্রাণীর অবয়বে তৈরি করা হতো নানান শোপিস। অতীতে অলঙ্কার ও শোপিস সামগ্রী তৈরি একটি পারিবারিক পেশা ছিল। কারিগররা মন্দির ও বিভিন্ন উৎসব-অনুষ্ঠান ও সমৃদ্ধ পরিবার-পরিজনের জন্য হাতে তৈরি সোনা, রুপা, পিতল ইত্যাদি সামগ্রীÑ আতরদানি, গোলাপ জলের পাত্র, চামচ, পানির বোল বা গামলা ও তরবারির খাপ ইত্যাদি তৈরি করতেন।

আধুনিকতার ছোঁয়ার বিলুপ্ত কাঁসা-পিতলের ঐতিহ্য
সত্তরের দশকের মধ্যভাগে সিরামিকের ব্যাপক ব্যবহার শুরু হওয়ায় কাঁসার সামগ্রীর ওপর প্রথম বড় আঘাত আসে। সিরামিকের প্লে¬ট, গ্ল¬াস, কাপ, পিরিচ, জগ নিম্নবিত্ত থেকে উচ্চবিত্তের ঘরে প্রবেশ করে। আসে বাহরি ডিনারসেটসহ বিশেষ ধরনের সিরামিক সামগ্রী ও কাচের তৈরি বাসনে-কোসন। এছাড়া আসে স্টিলের নানান সুন্দর বাসন-কোসন।
আশির দশকে সিরামিক আর স্টিলের সঙ্গে পাল্লা দিতে আসে মেলামাইন। রকমারি ও নজরকাড়া ডিজাইনে সিরামিক, মেলামাইন ঘরে ঘরে প্রবেশ করে কাঁসাটি হটিয়ে দেয়। নতুন প্রজন্মের কাছে কাঁসার বাসন-কোসন হয়ে পড়ে অচেনা। কালেভদ্রে কোনো বাড়িতে এখন কাঁসার যে জিনিস দেখা যায় তা অ্যান্টিকস হিসেবেই সংরক্ষিত। এসব জিনিস হয়তো স্মৃতিকাতরতা আনে। এগুলোর সঙ্গে হয়তো জড়িয়ে আছে পূর্ব পুরুষদের স্মৃতি।

কাঁসাশিল্পীদের দুর্দিন
কামারের হাতুড়ির আওয়াজে যে গ্রাম আর বাজারগুলো মুখরিত হয়ে থাকতো এক সময়Ñ সেগুলো এখন নীবর এবং কারিগরশূন্য হয়ে জানান দিচ্ছে কাঁসা শিল্পের চরম দুগর্তির কথা।
কাঁসার নির্বাসনে এবং নানান প্রতিকূলতায় কাঁসাশিল্পে নিয়োজিত প্রায় আশি হাজার থেকে এক লাখ কারিগরের ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই অনিশ্চিত। এরই মধ্যে বহু শ্রমিক পেটের দায়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন। অনেকে জীবিকার অন্বেষণে চলে গেছেন পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে। হিন্দুদের বিয়ে-শাদি ও পূজা-পার্বণে কাঁসার ব্যবহারটি পূত-পবিত্র বলে বিশ্বাস করা হয়ে থাকে। বর্তমানে ঢাকার জিঞ্জিরা, ধামরাই, মানিকগঞ্জ, নরসিংদী ও বিক্রমপুরে কাঁসা শিল্প কোনোমতে টিকে আছে।
কাঁসাশিল্পীরা বলেন, এককালে কাঁসা শিল্পের চাহিদা ছিল এবং মানমর্যাদা ছিল শিল্পীদের। ভাগ্যের দুর্বিপাকে এ পেশায় নেমে এসেছে দুর্দিন। মনোরম চোখ ধাঁধানো আকর্ষণীয় স্টিলের সামগ্রী, মেলামাইন ও দেশ-বিদেশের নজরকাড়া কাচের রকমারি সামগ্রীর কারণে কাঁসা শিল্প চরমভাবে মার খাচ্ছে। এছাড়া অন্যান্য সামগ্রীর তুলনায় কাঁসার মূল্য তুলনামূলকভাবে বেশি। এ কারণেও ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। অন্যদিকে কাঁচামালের মূল্যও অত্যন্ত চড়া। ফলে আগের মতো আর পুষিয়ে উঠতে পারছেন না কাঁসারুরা।
কাঁসাশিল্পীরা জানান, তারা ঢাকার বকশীবাজার থেকে ২০০-২২০ টাকা কেজিতে কাঁচামাল কিনে নানান সামগ্রী তৈরি করে তা বিক্রি করেন মাত্র ২৭০ টাকায়। তবে পাইকাররা তাদের কাছ থেকে কম দামে কিনলেও বেশি দামে বিক্রি করেন।
শত প্রতিবন্ধকতা আর চরম হতাশার মধ্যেও কাঁসাশিল্পীরা সযতেœ কাঁসা দিয়ে কলস, বাটি, বালতি, পানদানি, প্রদীপ, ফুলের টব, গামলা, তবলা, ডিশ, থালা-বাসন, মূর্তি ও দাঁড়িপাল্লাসহ সৌন্দর্যবর্ধক নানান সামগ্রী তৈরি করে তা বাজারজাত করছেন। এই শিল্পে ভর করে এখনো দেশের হাজার হাজার কাঁসাশিল্পী বেঁচে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন।

কাঁসা শিল্পের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ
তামা-পিতলে শুধুই বাসন-কোসনই নয়, এই তামা-পিতলে তৈরি হতে পারে নিঁখুত সব ভাস্কর্য। এরই বাস্তব প্রমাণ ঢাকা থেকে মাত্র ২০
কিলোমিটার উত্তরে ধামরাইয়ে।
সত্তরের দশক পর্যন্ত সত্যিকারেরর অ্যান্টিকই কেনাবেচা হতো ধামরাইয়ে। অ্যান্টিক যখন শেষ হয়ে যেতে লাগলো তখন এর মতো ভাস্কর্য তৈরি ও বিক্রি করার আগ্রহ বাড়তে থাকে। এ আগ্রহ থেকেই আশির দশকে এখানে কাঁসা-পিতলের ভাস্কর্য নির্মাণ করা শুরু হয়। আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে এ ভাস্কর্য খুব বেশি আলোচিত না হলেও প্রতি বছর ধামরাইয়ের এই তামাপল্লী ঘুরে দেখে গেছেন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ভাস্কর্যপ্রেমীরা।
ধামরাই মেটাল ক্রাফটের স্বত্বাধিকারী সুকান্ত প্রায় ২২ কর্মীকে নিয়ে মূর্তি গড়ার কাজ করে থাকেন। তামা দিয়ে নিখুঁত নারীমূর্তি, দাবার ছক, হাতির পিঠে রাজাÑ এমন দুর্লভ ও নান্দনিক ভাস্কর্য তৈরি করেছেন তিনি। যে বিশেষ ভাস্কর্যটি তৈরি করা হবে মোম দিয়ে এর একটি অবয়ব বানানো হয়। এরপর এতে নানান নকশা ও সুক্ষ্ম কারুকাজগুলো ফুটিয়ে তোলা হয়। এরপর মোমের ওই মূর্তির ওপরে দেয়া হয় তিন স্তরের মাটির প্রলেপ। এরপর তা পোড়ানো হয়। ভেতর থেকে মোমের মূর্তিটি গলে বেরিয়ে আসে। থেকে যায় শুধু মাটির ছাচে মোমের মূর্তির প্রতিবিম্ব। এরপর ওই মাটির ছাঁচে গলিত তামা ঢুকিয়ে তৈরি করা হয় এই ভাস্কর্যগুলো। বর্তমানে এই ভাস্কর্যগুলোর প্রধান ক্রেতা হলো বিদেশি ভাস্কর্য ব্যবসায়ীরা।
সুকান্ত বণিক জানান, মাত্র ৮০০ ডলারে কেনা মূর্তিগুলো বিদেশিরা ওয়েব সাইটের মাধ্যমে ৫ হাজার ডলার পর্যন্ত দাম চড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করছেন। ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই শিল্পের চাহিদা আছে ব্যাপক। ভারতে এ ধরনের মূর্তি তৈরি হলেও উৎপাদন পদ্ধতি খুব বেশি বাণিজ্যিক হওয়ায় তাদের ওইগুলো আমাদের দেশের ভাস্কর্যের মতো এতোটা নিঁখুত হয় না। তিনি জানান, এক ফরাসি পর্যটকের কাছে ৪ লাখ টাকায় বিক্রি করেন তামা-কাঁসায় গড়া একটি শীতলা মূর্তি। দক্ষ হাতে গড়া অসাধারণ কারুকার্যময় ওই পৌরণিক ভাস্কর্যের রেপ্লিকায় মুগ্ধ ফরাসি পর্যটক দেশে ফিরেই আরো ছয়টি কাজের ফরমায়েশ পাঠান। সেগুলো ফ্রান্সে পাঠানোর সময় বিমানবন্দরের শুল্ক বিভাগ পুরাকীর্তি বলে সন্দেহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠায় সরকারের পুরাতত্ত্ব বিভাগে। এক বছর পর সেগুলো পুরাকীর্তি নয় বলে ছাড়পত্র দেয়া হয়। কিন্তু দীর্ঘ বিলম্বে হতাশ ওই ফরাসি পর্যটক এরই মধ্যে বাতিল করে দেন অর্ডার।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমাদের মেটাল হাউসের নামে রফতানি লাইসেন্স আছে। সব ভাস্কর্যের গায়ে নিয়ম অনুসারে খোদাই করে কারখানা ও উৎপাদনের তারিখও দেয়া থাকে। এরপরও পুরাকীর্তি পাচারের বিষয় আসে কী করে? পাশের দেশ ভারত, নেপালে
একদিনের মধ্যে এসব পণ্যের ছাড়পত্র দেয়া হয়। আমাদের দেশে বড়জোর এক সপ্তাহ লাগতে পারে। তাই বলে এক বছর কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’
ধামরাইয়ের আরেক কাঁসারু প্রকাশ বণিক বলেন, ‘আমাদের এখানে লস্ট ওয়াক্স পদ্ধতিতে এগুলো তৈরি করা হয়। তা পুরোটাই দক্ষ হাতের শৈল্পিক কাজ। এ কারণে আমাদের সামগ্রীগুলো বিদেশিদের কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয়।

হিন্দু দেব-দেবী ও পৌরণিক চরিত্রের রেপ্লিকা বা ভাস্কর্য তৈরির মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়ানো পথে হাঁটছে এই শিল্প। এসব চরিত্রই কেবল গড়া হচ্ছে না, ঘরসজ্জার নান্দনিক উপকরণও তৈরি হচ্ছে ধামরাই এবং পাশের শিমুলিয়ায়। কারিগররা নিপুণ হাতে সৃষ্টি করছেন গৃহসজ্জার উপকরণ, পশু-পাখির মূর্তি, দাবার ছকসহ শৈল্পিক পণ্য। দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যেও এ পণ্যগুলো চাহিদা বাড়ছে।
তামা-পিতল, কাঁসা ও অষ্টধাতুতে গড়া শিল্পকর্মগুলো নিয়ে কোনো প্রচার বা উদ্যোগ নেই। এই ধরনের তামা-পিতলের ভাস্কর্য বানানোর প্রয়াস আমাদের দেশে ধামরাই ছাড়া আর কোথাও নেই। অবশ্য ব্রাক্ষণবাড়িয়ায় কিছু শিল্প তৈরির প্রয়াস থাকলেও তা কেবল নান্দনিক বাসন-কোসনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। রফতানি ছাড়পত্রের জটিলতায় এই শিল্পের বিকাশ বিঘিœত হচ্ছে বলে মনে করেন এই শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা।
পুরাকীর্তি পাচারের অভিযোগে আটক হওয়ার ভয়ে ব্যক্তিগত উদ্যোগে অভিবাসী বাংলাদেশিরাও তামা-কাঁসায় গড়া শিল্পপণ্য বিদেশে নিতে সাহস দেখান না। প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র পেতে কখনো কখনো সময় লাগে এক থেকে দেড় বছর। ফলে বিদেশের বাজারে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও এ পথে পা মাড়াচ্ছেন অনেক আগ্রহী উদ্যোক্তা। কিন্তু কারুকাজ ও শিল্প সৌন্দর্যে আমাদের দেশের কাঁসারুরা অদ্বিতীয়। কারণ নানান
প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বংশ পরম্পরায় দক্ষ এক শিল্পী সম্প্রদায় যুক্ত আছেন এ পেশায়। রফতানি বাজারে এ শিল্প দিয়ে দারুণভাবে অবস্থান করে নিতে পারে বাংলাদেশ। কিন্তু তা এখন পর্যন্ত পড়ে আছে অবহেলায়। সরকার এ শিল্পের প্রসারে বিশেষ নজর দিলে এটি তার হারানো ঐতিহ্য ফেরত পাওয়াসহ দেশের সুনাম ছড়িয়ে দিতে পারে। ওই সঙ্গে আনতে পারে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা।

 

ছবিঃ শোভন আচার্য্য অম্বু 

আমার যতটুকু প্রয়োজন ঠিক ততটুকু অর্জন করি 

নাসরিন বেগম

 

সহজ : আপনার আঁকা ছবির বিষয় ও উৎস সম্পর্কে বলুন।
নাসরিন বেগম : ১৯৯৪ সালে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনে মেডিটেশন করতাম। তখন পাইওনিয়ার ব্যাচে ছিলাম। ওই সময়ের কোয়ান্টাম বর্তমান অবস্থার মতো ছিল না। ওই কোর্সের মধ্যে অনেক বিষয় ছিল। এর মধ্যে আমার যে বিষয়টি সবচেয়ে ভালো লেগেছে তা হলো মহাজাতক আমাদের বলতেন, ‘আপনাদের মধ্যে হীরা, মণি, মুক্তা, জহরতÑ সবই আছে। তবে এগুলো ছড়ানো-ছিটানো। আমি সেগুলোর মালা গেঁথে দিয়ে দিলাম।’ এই কথাগুলো আমার ভীষণ ভালো লাগতো। আরেকটি মজার বিষয় হলো স্পেইসে ভ্রমণ করানো। এটি আমার খুবই প্রিয় বিষয়। মেডিটেশনের মাধ্যমে কাল্পনিক স্পেইসে ঘুরে আবার যখন আমাদের নিয়ে আসা হয় তখন আমি সেখানেই থেকে যাই। এরপর আমাকে ধাক্কা দিয়ে ওঠানো হয়। আরেকটি হলো সমুদ্রে ভ্রমণ করানো। মহাজাতক আমাদের বলতেন, ভাবেন, আপনিই সমুদ্র। ওই সমুদ্রই আমার ছবির মধ্যে প্রধান্য পেয়েছে। সেন্ট মার্টিনসে যখন গিয়েছিলাম তখন একটা জিনিস দেখলাম, ডোবার মতো কিছু গর্ত আছে সেখানে। ভাটার সময় সেখানে বসলাম। পানির মধ্যে থাকা ছোট ছোট শামুক-ঝিনুক আমার পাশ দিয়ে ছুটে যাচ্ছে। পরে এসে তা আঁকলাম এবং রিফ্লেকশ করলাম, আমিই সমুদ্রকন্যা। সবকিছু আমাকে ঘিরেই। এ জন্য আমার সব ছবিই মেয়ে চরিত্র। আসলে সবকিছুরই পেছনে একটা ইতিহাস থাকে। আমি সাধারণত যে কোনো কোর্স করতে গেলে আমার যতোটুকু প্রয়োজন ঠিক ততোটুকু নিই। আমার স্কুল জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষার কথা যদি বলতে হয় তাহলে বলবো কোয়ান্টাম মেথডের কথা।

সহজ : চিত্রকলার মানুষ হিসেবে এর পাঠ্যকলা সম্পর্কে বলুন।
নাসরিন বেগম: আসলে আমার পাঠ্যকলা কিছুই না। সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করতাম। স্কুল থাকলে সকাল ৭টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত। স্কুল থেকে এসে নিজের কাজ নিজেরই করতে হতো।

সহজ : আপনার শিল্পকলায় আসার ব্যাপারে কার অবদান রয়েছে?
নাসরিন বেগম : আমার মা। তিনিই সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছেন। আমার মা খুবই সংস্কৃতিমনা ছিলেন। বাবা ছিলেন খুব সাধারণ মানুষ। বাবার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা ছিল না আমি কী করছি বা না করছি। আমার মা খুবই গুণী ব্যক্তি। তিনি বই পড়া, সেলাই ইত্যাদি করতেন। আরেকটা বিষয় মনে পড়ে গেল, ওরিয়েন্টাল আর্টটা এসেছে এমব্রয়ডারি থেকে।

সহজ : ছোটবেলায় কী ধবনের ছবি আঁকতেন?
নাসরিন বেগম : আমরা সবাই এমব্রয়ডারি করতাম। আমার সব বোনই তা পারতেন। ছোটবেলাতেই অ্যানামেল পেইন্টের কাজ করতাম। এ কাজ করা বেশ কঠিন। তাছাড়া আমাদের পরিবারের সবাই নিজের কাজ নিজেই করতেন। আমি এতো ছবি আঁকতাম যে, অংক করতে পারতাম না। এক সময় আমার মনে হলো, অংকে ফার্স্ট হতে হবে আমাকে। এরপর ফার্স্ট হই। এরপর থেকে অংক কষা ও ছবি আঁকা দুটিই সমানতালে চলতে থাকে।

সহজ : বর্তমান চিত্রগত প্রযুক্তির অগ্রগতি সম্পর্কে আপনার অভিমত কী?
নাসরিন বেগম : আর্ট অ্যানিমেশন সিনেমা আমার অনেক পছন্দের। মনে হয় যেন জীবন্ত। যেমন ‘আইস এইজ’ অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রের কথা বলা যাক। এর প্রতিটি চরিত্র, গ্রাফিক্স কী অসাধারণ! এটি আমার এতো ভালো লেগেছে যে, ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
সহজ : আপনার চারুকলা ইনস্টিটিউট জীবনের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বলুন।
নাসরিন বেগম : চারুকলায় ভর্তি হয়ে প্রথম যেদিন প্রথম ক্লাস করি সেদিন আমার টিচার আমাকে বললেন, সামনে যেহেতু দু’দিন চারুকলা বন্ধ সেহেতু ওই দু’দিন কোয়ার্টার শিট খাতায় দুটি ড্রয়িং এঁকে নিয়ে এসো। কিন্তু আমি একটি ছবি এঁকে নিয়ে গিয়েছিলাম। তিনি জানতে চাইলেন, একটা ছবি এঁকে এনেছি কেন। বললাম, স্যার, আমি তো কিছু রোজগার করি। তাই সময় পাইনি। এ কথা বলতে ভয় পাইনি। কারণ মানুষকে কখনো ভয় পাই না। ফলে অপ্রিয় সত্য বলতেও কখনো ভয় পাই না। ওনার ছাত্র থাকাকালে আর কোনোদিন আমাকে কিছু বলেননি। কেননা আমি খুব আন্তরিকভাবে কাজ করতাম।

সহজ : আপনার রেজাল্ট ভালো হতো কীভাবে?
নাসরিন বেগম : আমাদের ক্লাসের হলরুম ছিল ৮০ জনের। একদিকে ৪০ জন, আরেকদিকে ৪০ জন করে রুমজুড়ে আমরা বসতাম। ছবি আঁকতে না পারলে শিক্ষকদের সামনে কান্নাকাটি শুরু করে দিতাম। এরপর আমার শিক্ষকরা বলতেন, তুমি ভালো রেজাল্ট করবে, সমস্যা নেই। রেজাল্ট বের হওয়ার পর দেখি সত্যিই খুব ভালোভাবে পাস করেছি। আরেকটা বিষয় ছিল, যতোক্ষণ না সঠিকভাবে কাজ করতাম ততোক্ষণ পর্যন্ত কাঁদতাম।

সহজ : এ রকম কি কখনো হয়েছে যে, কোনো কাজ আপনি করতেই পারছিলেন না?
নাসরিন বেগম : হ্যাঁ, হয়েছে। এ রকম সময় আমি টিচারদের সামনে এসে প্রচ- কান্নাকাটি করতাম এবং বলতাম, স্যার, আমাকে দিয়ে কিছু হবে না। শিক্ষক যখন একটু দেখিয়ে দিতেন তখন হয়তো সমাধান হয়েছে। আগে একটা বিষয় ছিল, কে কোন ডিপার্টমেন্টে যাবেন তা শিক্ষকরা ঠিক করে দিতেন। এখন তা হয় না। এখন কাকে নিলে তার পলিটিকাল জায়গাটা পাওয়ারফুল হয় সেটিই বেশি দেখা হয়। মাঝে প্রায় ২০ বছর চারুকলায় ডিটেইল ওয়ার্ক ছিল না। ডিটেইল ওয়ার্ক করলেই শিক্ষকরা বলতেন এগুলো কী আঁকি? ওনারা পরিষ্কারভাবে কোনো কিছু বলতেন না। বলতেন ছেড়ে দাও, ওখানে একটু ঝাপসা করে দাও ইত্যাদি। আমি বলতে গেলে শিক্ষকদের কাছ থেকে তেমন কিছু শিখিনি। কারণ আপনি যা বোঝাবেন তা পরিষ্কার হতে হবে। যখন ৩০ বছর জীবনের আমি প্রথম ফার্স্ট ডিভিশন পেলাম তখন টিচার হলাম। আমার এখনো মনে হয়, আসলেই কি আমি ভালো ছবি আঁকতে পারি? আবার ভাবি, আমি এতো পারছি কেন? ফার্স্ট হয়েছি কেন? নিশ্চয়ই আমি ভালো ছবি আঁকি। আমার সহপাঠীদের প্রত্যেকের ছবি এঁকে দিতাম। মানে, টিচিংয়ের কাজটা আমিই করে দিতাম। আমি এটিই মনে করতাম, সবাই ভালো করুক। সবাইকে নিয়েই আমাদের এগোতে হবে। নিজে একা সামনে যেতে চাই না। কিন্তু আমার এসব চেষ্টা সফল হয়নি। আমার শিক্ষকতা জীবনটা সফল নয়।

সহজ : এমনটি হওয়ার কারণ কী?
নাসরিন বেগম : এই যে আমরা টিচার। আমাদের মধ্যে একজন ভালো হই এবং অন্য দশজন যদি তা না হন তাহলে তো হবে না। আমার ওপর অনেক বাধা আসে কেন আমি এতো দূর এলাম? এছাড়া ভাংচুর থেকে যতো প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা দরকারÑ আমার শিক্ষকতার ক্ষেত্রে তা করা হয়েছে। তবে যতো বেশি প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়েছে, আমিও ততো বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছি এবং ততো বেশি আমার রাস্তা তৈরি হয়েছে। স্টুডেন্টদের সবাই নাম্বার চায়। আমার ক্লাসমেটদের যা করে দিতাম তথা হাত, পা, চোখ ডিটেইলটাÑ ওরা কেউ তা চায়নি। আমার ডিপার্টমেন্ট বা চারুকলার বাইরে আমি যে ওরিয়েন্টে ছবি আঁকতাম সেটিতে বহু প্রতিবন্ধকতা পার হয়ে আসতে হয়েছে। আমাদের সিনিয়ররা তথা বিখ্যাত আর্টিস্টরা বার বারই বলেছেন, কেন এতো ধরে ধরে আঁকো, এগুলো কী করো? এগুলো ছাড়ো, এগুলো টিকবে না। কিন্তু ২০০০ সালে ইউরোপে গিয়ে অনেক বড় সম্মান পেয়েছি। আমাকে তারা বলেছেন, তোমার ছবিতে তোমার দেশ ও দেশের সৌন্দর্য আছে। অথচ ইউরোপ যাওয়ার আগে বিখ্যাত এক টিচার আমাকে খুব অপমান করেছিলেন। তাকে বলেছিলাম, আমি যা আঁকি তা বুঝে-শুনে আঁকি। আমার পেইন্টিংসের এ-টু-জেড, ডট, লাইন, রেখাÑ সবকিছু বলে দিতে পারবো। আপনি সেটি পারবেন না। একদিন যদি ইতিহাস লেখা হয় তাহলে আমার নাম সবার আগে যাবে। এ কথাটি ওনার ওপর প্রচ- রাগ করেই বলেছিলাম। এখন সবাই আমার জায়গায় আসতে বাধ্য হচ্ছে, বাংলাদেশে আমার স্টাইল সবাই অনুসরণ করছে। যখন ডিটেইল ওয়ার্কটা নিয়ে গবেষণা হচ্ছে, পিএউচডি হচ্ছে তখন সবাই জানতে চাইÑ পেইন্টিং ডিপার্টমেন্টে আমার অনুসারী কারা। এ জন্য এখন দেখার অপেক্ষায় আছি, সবাই কখন আমার জায়গায় আসবেন। বিদেশিরা নিজেদের কাজের মূল্য দেন। আমাদের দেশে তা দিতে চায় না। কারণ সবাই চান কীভাবে খ্যাতি এবং কতো দ্রুত অর্থের পাহাড় তৈরি করা যায়। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে তা নয়। জীবদ্দশায় কোনো স্বীকৃতি পাওয়ার আশা করি না। কেননা মনে হয়, আমার কাজ এখনো শেষ হয়নি। আরো কিছু দেয়ার আছে। তা যতো দিন না শেষ হবে ততো দিন মৃত্যুও হবে না।

সহজ : ছেলেবেলার এমন কোনো ঘটনা বলুন যা এখনো আপনাকে নাড়া দেয়।
নাসরিন বেগম : ছোটবেলার কোনো ঘটনা তেমন একটা নাড়া দেয় না। তবে ১৯৭১ সালে যুদ্ধের ৯ মাস আমরা বন্দি ছিলাম কলোনিতে। নিরাপদেই ছিলাম। কোথাও বের হইনি। আমার বাবা যেহেতু সরকারি চাকরি করতেন সেহেতু কলোনিতে তল্লাশি চালানো হয়নি। এটি একটি স্মরণীয় বিষয়। আমার ভাই পলিটেকনিকে ফাইনালের স্টুডেন্ট ছিলেন। ছবি আঁকতেন। ২ এপ্রিল মুক্তিযুদ্ধের পর পরই তিনি রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা যান। আমার ভাইয়ের বড় চুল ছিল। মা বললেন, চুলগুলো ছোট কর। কেননা ধরপাকড় শুরু হয়েছে। ভাই বললেন, ঠিক আছে, ছবি তুলে এসে চুল কাটাবো। তিন বন্ধু মিলে চুল কাটাতে গেছেন। এরপর আমার ভাই আর ফিরে আসেননি। তখন একটা বিষয় মনে হয়েছিল, আমার ভাই যদি মুক্তিযুদ্ধে গিয়ে মারা যেতেন তাহলে বড় শান্তি পেতাম। তখন মুক্তিযোদ্ধাদের কোনো সম্মান দেয়া হয়নি। অস্ত্র জমা দিতে বলা হয়েছে। এরপরও কোনো মূল্যায়ন হয়নি। শেখ মুজিবকে নানানভাবে বোঝানো হয়েছে উল্টোটা। আমরা সব বোন বড় হয়ে গেলাম। সব দায়িত্ব তখন আমাদের মা-বাবার। আমরা পাঁচ বোনের মধ্যে আমি একজন মারা গেলে কী ক্ষতি হতো, ভাইটা যদি বেঁচে থাকতেন! তখন আমার মনে হলো, ছেলে ও মেয়ে বিভেদ করা কেন? ওই হিসেবে বলবো, আমি মেয়ে হয়েও পুরুষের চেয়ে বেশি যোগ্যতা আমার। এছাড়া ছোটবেলাটা আমার জন্য তেমন কোনো আহামরি বিষয় ছিল না। খুবই সাধারণ ছিলাম।

সহজ : আপনার পেইন্টিংসে মুক্তিযুদ্ধ কীভাবে এসেছে?
নাসরিন বেগম : মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে যদি বলতে হয় তাহলে বলবো, বধ্যভূমি বা ১৪ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাকিস্তানি বাহিনী ধরে নিয়ে মিরপুর বধ্যভূমিতে যে মানুষ হত্যা করেছিল এর বাইরে ছবি আঁকতে পারি না। এতো দিন সমালোচনা হয়েছিল যুদ্ধাপরাধের বিচার হচ্ছে না ঠিকমতো। এ বিষয়ে আমার বক্তব্য হলো, মুক্তিযোদ্ধারা শহীদ হয়েছেন। কিন্তু তারা এখনো তাকিয়ে আছেন অপলক। আমরা তা শুনতে পাচ্ছি না। আমার পেইন্টিংসে এই যে গোলাকার দেখা যাচ্ছে তা হলো তাদের বিচার প্রত্যাশার আর্তি। কথাগুলো বুদ্বুদ করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এর পাশে যে পিঁপড়ার সারি দেখা যাচ্ছে তা দিয়ে বুঝিয়েছি ‘পিঁপড়া সমাজবদ্ধ শৃঙ্খল প্রাণী’। পিঁপড়ার সঙ্গে মানুষের অনেক মিল আছে। কিন্তু পিঁপড়ার সুশৃঙ্খলতার এ শিক্ষাটা আমরা নিচ্ছি না। এখানে পিঁপড়া রূপক হিসেবে এসেছে। বাঙালিদের সবই আছে এবং আমরা অনেক সমৃদ্ধ। তবে আমাদের মনটাই ছোট।

 

ছবিঃ শোভন আচার্য্য অম্বু 

চিত্রশিল্পের ম্যাজিকম্যান

প্রফেসর ড. মো. আমিরুল মোমেনীন চৌধুরী 

 

সেলফোনের ওপাশ থেকে ভেসে এলো আবেগঘন অনুরোধ, ‘স্যার, ভিনসেন্টকে নিয়ে লিখুন, আমার প্রিয় শিল্পী।’ শাকিল সারোয়ারের বিনম্র অথচ ‘সহজ’ কণ্ঠস্বর। আবার শুরু হলো অসমাপ্ত কাব্যগ্রন্থ ‘কখনো মানুষের গান’-এর শরীর ব্যবচ্ছেদ।

“অনেক দিন হয়ে গেল ভিনসেন্ট ভ্যান গগের শরীরী সত্তা
প্যারিসের ওইভরস গ্রামের মাটির সঙ্গে মিশে গেছে
তার আত্মার সাথে আমার যোগাযোগ মিশে যায়নি
থাকবে এই পৃথিবী ছেড়ে যাবার পরও, যেমন তার সহোদর থিও ভ্যান গগ থিও ছিল ভিনসেন্টের এক ভালোবাসার দ-
এক সহোদর হবার দ-
এ কোন দ- এ কোন দায়
আকাশ প্রমাণ রহস্যই হয়ে থাকলো মাটির পৃথিবীর মানুষের কাছে
কিছু মানুষ জন্মায় যাদের অভিধানে
না পাওয়া শব্দটি ছিল মুদ্রণ প্রমাদ
ভিনসেন্ট কেন এমন এক শব্দবিহীন অভিধান বয়ে বেড়ালো যাপিত জীবনে
আমি নই, কে একজন অস্ফুট শব্দ করে বলে ওঠে
‘দ্য গুড ডাই ফার্স্ট, অ্যান্ড দে হুজ হার্টস আর ড্রাই অ্যাজ সামার ডাস্ট,
বার্ন টু দ্য সকেট”
(‘কখনো মানুষের গান’, কাব্যাংশ-১)

যারা উনিশ শতকের কিংবদন্তি ভিনসেন্ট ভ্যান গগের সম্পর্কে জানতে আগ্রহী তারা অবশ্যই থিউ ভিনসেন্টকে লেখা চিঠিগুলো পড়বেন। ভাইয়ের প্রতি ভাইয়ের, শিল্পের প্রতি শিল্পীর
ভালোবাসার এক মহাকাব্যিক উপাখ্যান। এমনকি থিউ তার প্রথম পুত্র সন্তানের নাম রেখেছিলেন ভিনসেন্ট।

দ্য হেগ, ২৮ জানুয়ারি ১৮৭৩
ব্রাসেলস তোমার ভালো লেগেছে আর ভালো থাকার জায়গা পেয়েছ জেনেও ভালো লাগছে। আঙ্কেল হাইন সুন্দর কিছু ছবি আর ড্রইং নিয়ে প্যারিস থেকে ফিরেছেন। সোমবার পর্যন্ত অ্যামস্টাডার্মে ছিলাম, জাদুঘর দেখতে গিয়েছিলাম। এখানে নতুন আরো বড় একটা জাদুঘর হতে যাচ্ছে। শিল্পী ক্লয়সনের ছবি দেখতে ইচ্ছা করছে, তার যে কয়টা ছবি দেখেছি, আমার খুব ভালো লেগেছে। ইটালিয়ান শিল্পী রোত্তার ছবির ফটোগ্রাফ আমি চিনি। ব্রাসেলসের এক্সিবিশনে দেখেছি। কখন কী ছবি দেখছ, অবশ্যই আমাকে জানাবে। তুমি যে অ্যালবামের নাম দিয়েছ, আমি ওটার কথা বলিনি। বলেছি শিল্পী কোরো-র লিথোগ্রাফের একমাত্র অ্যালবামটির কথা।

লন্ডন, ৩১ জুলাই ১৮৭৪
তুমি যে ‘মিশেল’ (শিল্পী জর্জ মিশেল) পড়ছ আর ভালো করে বুঝতে পারছ জেনে খুশি হয়েছি। আমরা যা মনে করি, প্রেমের শক্তি এর চেয়ে অনেক বেশি। ওখানে একটা বাক্য আছে, ‘মেয়েরা কখনো বুড়ো হয় না।’ কথাটা একটা প্রত্যাদেশ বা বাণী। এর মানে এই নয় যে, পৃথিবীতে বুড়ো মেয়ে নেই। সে যতোক্ষণ ভালোবাসে এবং ভালোবাসা পায় ততোক্ষণ সে বুড়ো নয়। পুরুষের চেয়ে মেয়েরা আলাদা। আর আমরা মেয়েদের সম্পর্কে খুব কম জানি। ‘এ’ ভালো আছে। আমরা এক সঙ্গে হেঁেট বেড়াই। কারো যদি এক জোড়া খোলা চোখ থাকে আর তার ভেতর রশ্মি থাকে তাহলেই ওই সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবে। ইংল্যান্ডে ফেরার পর থেকে ড্রইংয়ের প্রতি ভালোবাসাটা আর নেই। প্রচুর পড়াশোনা করছি।

লন্ডন, ৬ মার্চ ১৮৭৫
অ্যাডাম বিড’-এর মেয়েটাকে তুমি বুঝতে পেরেছ জেনে ভালো লাগছে। অনাবাদি জমির ল্যান্ডস্কেপ, পাহাড়ের কোল ঘেঁষে গ্রাম চলে গেছে। বালুময় পথ, দু’ধারে মেটে রঙের ঊষর প্রান্তরে চুনকাম করা মাটির কুঁড়েঘর, শ্যাওলা ধরা ছাদ, প্রান্তরে কালো কালো কাঁটা ঝোপ, দিগন্তে সাদা এক ফালি মেঘ নিয়ে বিষণœ আকাশ। বিষয় যদিও জর্জ মিশেল-এর কাছ থেকে ধার করা তবুও এখানে মিশেলের চেয়ে আরো মহৎ ও পবিত্র অনুভূতি আছে।

প্যারিস, ২৪ জুলাই ১৮৮৫
বৃষ্টিতে লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার ব্রিজ ও পার্লামেন্ট হাউসের একটা ছবি পেয়েছি। ছবিটা দ্য নিত্তিস-এর। প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা ওখানে হেঁটে
বেড়াতাম। ওয়েস্টমিনস্টার চার্চ ও পার্লামেন্ট হাউসের পেছনে সূর্য ডোবার সময়টায় কেমন দেখায় তা আমার জানা আছে। শীতকালে ভোরবেলার তুষার ও ঘন কুয়াশা পড়া দৃশ্যও আমার খুব পরিচিত। তবুও আমার ভালোবাসার লন্ডন ছেড়ে আসা আমার জন্য ভালো হয়েছে। তোমাকে ওরা লন্ডনে পাঠাবে তা কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছি না। রকার্ট-এর ‘সিøভ টাইম অব লাইফ’ ও ‘অ্যাট মিড নাইট’-এর জন্য ধন্যবাদ। দ্বিতীয় ছবিটা শিল্পী মুসের ‘সেপ্টেম্বর নাইট’-এর কথা মনে করিয়ে দেয়।

প্যারিস, ২৫ সেপ্টেম্বর ১৮৭৫
পথ এতো সংকীর্ণ! খুব সাবধানী হতে হবে। যেখানে যেতে চাই সেখানে অন্যরা কীভাবে পৌঁছেছে তা তুমি জানো। সেই সহজ পথ আমরাও নেবো। প্রার্থনা ও প্রাত্যহিক কাজÑ আমাদের সব শক্তি দিয়ে হাতে যে কাজ আসবে তাই করবো। বিশ্বাস করবো ঈশ্বর আমাদের ভালো উপহার দেবেন।

অ্যামস্টাডার্ম, ১৮ সেপ্টেম্বর ১৮৭৭
বাবা লিখেছিলেন, তুমি অ্যান্টহবার্গে গিয়েছিলে। খুব জানতে ইচ্ছা করছে, ওখানে কী দেখলে। বহুদিন আগে জাদুঘরের পুরনো ছবিগুলো আমিও
দেখছিলাম। শিল্পী রেমব্রান্ট-এর সুন্দর পোরট্রেইটের কথা এখনো যেন মনে করতে পারি। পরিষ্কার করে জিনিসগুলো মনে রাখতে পারা অবশ্যই ভালো। কিন্তু আমার কাছে যেন একটা সুদীর্ঘপথের ছবির মতো হয়ে আছে। দূর থেকে ঝাপসা আর ছোট হয়ে চোখ আসছে। এক সন্ধ্যায় এখানে নদীতে আগুন লাগতে দেখলাম। অ্যালকোহল বা ওরকম কিছু একটা পানীয় বোঝাই স্টিমার পুড়ে যাচ্ছিল। অতোটা বিপদের কিছু ছিল না। কারণ জ্বলন্ত স্টিমারটাকে ওরা অন্য জাহাজগুলোর ভেতর থেকে বের করে নিয়ে নোঙর করার জায়গায় নিয়ে বেঁধে ফেলেছিল। আগুন যখন দাউ দাউ করে উঠতে লাগল তখন সেই সৈকত আর সেদিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কালো এক সারি মানুষ ও আগুনের চারপাশ দিয়ে ঘুরে-ফিরে চলা ছোট ছোট নৌকা দেখা যাচ্ছিল। আগুনের শিখার প্রতিফলন হচ্ছিল পানিতে। এর ভেতর নৌকাগুলোকে কালো
দেখাচ্ছিল। গ্যালারি ফটোগ্রাফিকে জ্যায়ের যে ফটোগ্রাফগুলো ছিল, তোমার মনে আছে কি না জানি না। পরে অবশ্য নষ্ট করে ফেলেছিল। ‘ক্রিসমাস ইভ’, দি ফায়ার’ এবং অন্যগুলোর মধ্যে এ দৃশ্যটির প্রভাব রয়েছে। চার্লস ডিকেন্স যে বলেছেন, ‘গোধূলির মহিমা, গোধূলি নামছে।’ কথাগুলো বাস্তবিকই যথার্থ। আসলে গোধূলির মহিমা তখনই বিশেষ করে বেরিয়ে আসে যখন একই
মানসিকতার মানুষ এবং ধর্মগুরুরা হৃদয়ের অন্তস্তÍলের পুরনো ও নতুন সম্পদ নিয়ে আলোচনা করে। গোধূলি তখনই মহিমান্বিত হয় যখন দু’জন তার নামে একত্র হয় এবং তিনি তাদের মধ্যে বিরাজ করেন। আর এই জিনিসগুলো যে জানে এবং তাদের অনুসরণ করে চলে সে সত্যিই আশীর্বাদিত।
শিল্পী রেমব্রান্ট এটা জানতেন। কারণ তিনি তার হৃদয়ের সমৃদ্ধ সম্পদ থেকে অন্যান্য জিনিসের সঙ্গে কালচে, বাদামি, কয়লা, কালি দিয়ে বেথানির বাড়ির যে ড্রইংগুলো করেছেন তা তো ব্রিটিশ মিউজিয়ামে আছে। সে বাড়িতে গোধূলি নেমেছে। সে জানালা দিয়ে আলোটুকু আসছে। তারই বিপরীতে গম্ভীর ও আঁধারাচ্ছন্নতায় মহান এবং প্রভাবিত করার মতো একটা শরীর নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন আমাদের প্রভু। যিশুর পায়ের কাছে বসে আছেন মেরি ... আর মার্থা যে ঘরের ভেতর কি না কী নিয়ে ব্যস্ত। যতোদূর মনে পড়ছে, আগুন জ্বালাচ্ছে বা ওই রকম কিছু করছে। ওই ছবি বা ওর বাণী আমি কোনোদিন ভুলবো বলে আমার মনে হয় না। ওখানে যেন বলা হয়েছে, আমি পৃথিবীর আলো। যে অনুসরণ করবে তার অন্ধকারে ঘুচে যাবে এবং সে জীবনের আলো পাবে।

দ্য হেগ, ১৫ মার্চ ১৮৮৩
আমাকে অবাক করা ঘটনাটা তো এখনো বলা বাকি। বাবার একটা চিঠি পেয়েছি। চিঠিটা আমার খুব মিষ্টি আর আনন্দের মনে হয়েছে এবং চিঠির ভেতর পঁচিশটা গিল্ডার ছিল। বাবা লিখেছেন, কিছু টাকা পেয়েছেন যার আশা তিনি ছেড়ে দিয়েছিলেন এবং তারই কিছুটা আমাকে দিতে চেয়েছেন। কত ভালো করেছেন, তাই না?
কিন্তু আমার সংকোচ লেগেছে।
অনিচ্ছা সত্ত্বেও একটা চিন্তা আমার মাথায় এলো। বাবা সম্ভবত কারো না কারো কাছ থেকে শুনতে পেয়েছেন, আমি খুব অভাবে আছি? এই উদ্দেশ্যে তিনি টাকা পাঠিয়েছেন এমন যেন না হয়। কারণ আমার অবস্থার এ রকম ধারণা করা ঠিক হবে না এবং এতে বাবার এমন সব দুশ্চিন্তা হতে পারে যা একেবারেই অমূলক। আমার কথার অর্থ বাবাকে বোঝাতে চাইলে তিনি যা বুঝবেন এর চেয়ে ভালো বুঝবে তুমি। আমার ধারণায় আমি অত্যন্ত ধনী। অর্থের দিক থেকে নয়, এই ধনী এ কারণে যে, আমার কাজের মধ্যে এমন কিছু খুঁজে পেয়েছি যার ভেতর আমার হৃদয় ও আত্মা সম্পূর্ণ দিয়ে নিবেদিত থাকতে পারি এবং তা আমার বেঁচে থাকা অর্থময় করে, অনুপ্রাণিত করে। অবশ্যই আমার মেজাজ পাল্টায়। কিন্তু মোটামুটি একটা শান্তি তো আছে। আমার নিশ্চিত বিশ্বাস আছে শিল্পে। এই যে একটা শক্তিশালী স্রোত, এই স্রোত মানুষকে আশ্রয়ের দিকে নিয়ে যায় এবং একটা মানুষ যখন তার কাজ খুঁজে পায়, সে আর দুর্ভাগাদের মধ্যে পড়ে না। যে কোনো অবস্থাতেই এটি এক বিরাট আশীর্বাদ। আমি বলতে চাইছি, আমার হয়তো আপেক্ষিক বড় বড় বিশেষ কিছু অসুবিধা আছে। দুঃখের দিনও হয়তো আছে আমার জীবনে। কিন্তু আমাকে দুর্ভাগাদের একজন মনে করাটা চাইবো না এবং তা সত্যও নয়। তুমি চিঠিতে মাঝে মধ্যে একটা কথা লেখো যা আমারও মনে হয় কখনো কখনোÑ জীবনটা কীভাবে যে চালাবো তা বুঝতে পারি না। দেখো, প্রায়ই আমার বিভিন্ন কারণে এই অনুভূতিটা হয়। কেবল আর্থিক ব্যাপারে নয়, শিল্পের ক্ষেত্রে এবং সাধারণভাবে জীবনের ক্ষেত্রে তো বটেই। কিন্তু এটিকে কি তোমার ব্যতিক্রম কিছু বলে মনে হয়? সামান্য সাহস আর উদ্যম আছে এমন প্রত্যেকেরই কি এমন মুহূর্ত আসে না? দুঃখ, যন্ত্রণা,
বিষণœতার মুহূর্ত আমার মনে হয় সবার জীবনেই আছে এবং তা সচেতন মানুষের জীবনের একটা অবস্থা। কোনো কোনো মানুষের মনে হয়, আত্মসচেতনতা থাকে না। যাদের আছে, তারা মাঝে মধ্যে দুঃখে থাকতে পারে। কিন্তু ওই কারণে তারা অসুখী নয় বা এটা তাদের জীবনের ব্যতিক্রমী কিছুও নয়। কখনো কখনো মুক্তি আসে, কখনো বা অন্তর্গত নতুন উদ্যোগ আসে এবং আবার উঠে দাঁড়ায় মানুষ শেষ পর্যন্ত। তারপর একদিন হয়তো আর দাঁড়াবে না এবং তাও অস্বাভাবিক কিছু নয়। আমি আবার বলছি, আমার ধারণায় মানুষের ভাগ্যই এ রকম। বাবার চিঠিটায় আমার একটা চিঠির উত্তর ছিল। বেশ ভালো মনে আছে, আমার চিঠিটাও আনন্দময় ছিল। কারণ তাতে আমার স্টুডিওর পরিবর্তনগুলোর কথা লিখেছি। এমন কিছু লিখিনি যাতে বাবার মনে আমি যে আর্থিক বা অন্য কোনো অসুবিধায় আছি এমন চিন্তা আসতে পারে। হয়তো বাবাও এসব কিছু লেখেননি। তার চিঠিও খুব সহজ আর উষ্ণ। কিন্তু টাকাটা এতো অপ্রত্যাশিত যে, অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমার মাথায় এই চিন্তাটা এলো, এমন কী হতে পারে, বাবা আমার জন্য চিন্তিত? আমার এ ভাবনাটা যদি ভুল হয় তাহলে এ নিয়ে লেখা অনর্থক হবে। মনে হবে যেন বাবার সহৃদয়তা আমার মনে প্রথমত. এ ধারণাটাই দিয়েছে, আসলে টাকাটা পেয়ে অত্যন্ত কৃতজ্ঞবোধ করছি। না পেলে করতে পারতাম না এমন অনেক কিছুই পারবো এ দিয়ে। কিন্তু আমার ভাবনাগুলো জানালাম। কারণ যদি তুমি দেখো, আমাকে দিয়ে বাবা চিন্তিত তাহলে আমার চেয়ে তুমি ভালোভাবে তাকে আশ্বস্ত করতে পারবে।’

দ্য হেগ, ৭ মে ১৮৮২
এবার শীতে এক সন্তানসম্ভবা মেয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছে। তার পেটে যার সন্তান সে তাকে ত্যাগ করেছে। মা হবে মেয়েটি, রুটির জন্য রাস্তায় হাঁটছেÑ বোঝো কেমন ব্যাপার! মেয়েটাকে মডেল হিসেবে নিয়েছি। পুরো শীতকাল ধরেই আমার মডেল হয়ে সে কাজ করেছে। তার পুরো পারিশ্রমিক তাকে দিতে পারিনি। তবে তার ঘর ভাড়া দিয়েছি। ইশ্বরকে ধন্যবাদ, তাকে আর তার সন্তানকে নিজের খাবার ভাগ করে দিয়ে অনাহার এবং শীত থেকে বাঁচাতে পেরেছি। তার সঙ্গে লিডেনে গিয়েছি। সেখানে একটা মাতৃসদন আছে। সন্তান হওয়ার সময় সে এখানে থাকবে। মনে হয়, যার সামান্য মনুষ্যত্ববোধ আছে এমন সব মানুষই এ অবস্থায় একই ব্যবহার করতো। যা করেছিল তা এতো সহজ আর স্বাভাবিক যে, তা কাউকে বলার দরকার আছে। মেয়েটা মডেলের পাশাপাশি আমার সঙ্গে আমার স্ত্রীসুলভ আচরণ করে। বিয়ে যেহেতু মানুষ একবারই করে, সেহেতু তাকে বিয়ে করার চেয়ে আর ভালো কী করা যায়! কারণ তাকে সাহায্য করার এটাই একমাত্র পথ। তা না হলে দুর্ভাগ্য তাকে পুরনো রাস্তায় যেতে বাধ্য করবে যার শেষ অতল খাঁদ।

প্যারিস, ১৯ ফেব্রুয়ারি ১৮৭৬
অ্যান্ডারসনের গল্পের জন্য ধন্যবাদ। এখনো আমার ‘হাইপেরিয়ান’ পড়া হয়নি। এটি এলিয়টের ‘সিনস ফ্রম ক্লারিকাল লাইফ’-এর একটা ‘অনুতপ্ত জ্যানেট’। গল্পটা এক পুরোহিতের জীবন নিয়ে। অধিকাংশ সময়ই সে এক শহরের নোংরা অলি-গলির অধিবাসীদের মধ্যে কাটায়। তার পড়ার ঘরের জানালা দিয়ে বাগানের
বাঁধাকপির ডগা ইত্যাদি চোখে পড়ে। আরো দেখা যায় গরিব ভাড়াটেদের লাল ছাদ আর ধোঁয়া ওঠা চিমনি যারা সাধারণত অসিদ্ধ মাংস ও জলোসিদ্ধ আলু খায়। চৌত্রিশ বছর বয়সে সে মারা যায়। দীর্ঘ অসুস্থতার সময় এক অপ্রকৃতিস্থ নারী তার পরিচর্যা করলো। তার ওপর নির্ভর করে সেই মহিলা রোগমুক্তি লাভ করে এবং শান্তি খুঁজে পায়। পুরোহিতের সমাধি পর্বে রয়েছেÑ ‘যারা আমাকে বিশ্বাস করে তাদের জন্য আমি পুনরুজ্জীবিত এবং জীবন, মৃত হলেও সে বেঁচে থাকবে।’
ভিনসেন্ট এই পুরোহিতের জীবনের প্রতিচ্ছবি নিজের জীবনে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করেছিলেন যেমনভাবে করেন ম্যাজিকম্যানরা। তিনিও যাজক হওয়ার জন্য দু’বার বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করেছিলেন শিক্ষার্থী হিসেবে। ১৮৫৩ সালের ৩০ মার্চ হল্যান্ডের বেলজিয়ান সীমান্তবর্তী গ্রুট জুনভার্ট-এ প্রটেস্টান্ট পল্লী যাজকের অনটনময় সংসারে ভিনসেন্টের জন্ম। ১৮৯০ সালের ২৯ জুলাই প্যারিসের ওইভরস গ্রামে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর ছয় মাসের মধ্যে শোকাহত থিউ-ও হল্যান্ডে মৃত্যুবরণ করেন। ২৩ বছর পর তার দেহবাশেষ সংগ্রহ করে ওইভরস-এ ভিনসেন্টের পাশে সমাধিস্থ করা হয়। ভিনসেন্ট উইলিয়াম-এর মৃত্যুর একশ’ বছর পর থেকে উনিশ শতকের ম্যাজিকম্যান চিত্রশিল্পের মেগাস্টারে রূপান্তরিত হয়েছেন। তার জীবনচরিত সিনেমা, উপন্যাস, নাটক, মিউজিক, প্রামাণ্যচিত্রের বিষয় হয়েছে। তার সম্পর্কে যতো গ্রন্থ রচিত হয়েছে, সমসাময়িক কালের আর কোনো চিত্রশিল্পীকে নিয়ে রেকর্ড বুকে তা নেই।
ভিনসেন্টের চিত্রকর্ম এখন ইউরোপ, আমেরিকা ও দূরপ্রাচ্যের জাদুঘর, আর্ট গ্যালারির গর্বিত সংগ্রহ। একেকটি ছবির মূল্য আমাদের কল্পনারও বাইরে। বিশ্বের সব নিলামঘর তার একটি ছবি সংগ্রহের জন্য হন্যে হয়ে ছুটছে গ্রুট জুনভাট থেকে ওইভরসে। পৃথিবীর শিল্পানুরাগী ও শিল্পোৎসাহী সাধারণ মানুষের কাছে তিনি হয়ে উঠেছেন মহাকাব্যের ট্র্যাজিডি নায়ক। ১৮৭৯ সালে ভিনসেন্টের জীবন ব্যবচ্ছেদ হয়েছে দারিদ্র্য আর সিদ্ধান্তহীনতায়। চিত্রশিল্প দিয়ে জীবিকা অর্জনের কোনো সম্ভাবনা নেই জেনেও তিনি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হলেন শিল্পী হবেন। সহোদর থিউকে লিখলেন, ‘অবশেষে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি শিল্পী হবো, অন্য কিছু নয়। চরম হতাশায় যে রঙ-তুলি নামিয়ে রেখেছিলাম তা আবার হাতে তুলে নিলাম। নিজেকে উৎসর্গ করলাম শিল্প জগতে। ম্যাজিকের মতোই বদলে গেল আমার চারপাশ।’
থিউয়ের অর্থানুকূল্যেই ভিনসেন্ট কাজ শুরু করলেন। নতুন পারিবারিক আবাস নুয়েনেনে পিতার মৃত্যুর সময় তিনি উপস্থিত ছিলেন। অ্যান্টরপে তার পরিচয় হয় জাপানিজ ছাপচিত্রকলার সঙ্গে যা চিত্রশিল্পে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। ১৯৮৬ সালে রোগপা-ুর শরীর নিয়ে প্যারিসে থিউয়ের কাছে আসেন। তার নাটকীয় জীবন উপাখ্যান আরো বর্ণময় হয়ে ওঠে। থিউ এক পৌরাণিক চরিত্র হয়ে ওঠে তার বাউ-ুলে, অবুঝ, বিশৃঙ্খল, অভিমানী ভাইয়ের শাশ্বত সম্পর্কের ছবি তুলে ধরে। থিউয়ের মাধ্যমে এবং অদম্য আগ্রহে ভিনসেন্ট শিল্পী পিসারো, সুরা, তুলজ লোত্রেক, পল গঁগ্যা, পল সেজান-এর মতো খ্যাতি ইমপ্রেশনিস্ট শিল্পীদের সঙ্গে পরিচিত হয়ে ওঠেন। অচিরেই ভিনসেন্ট হয়ে ওঠেন নাগরিক শিল্পী। ইমপেশনিজম প্রবলভাবে নাড়া দেয় তাকে। তার প্যালেট ধূসর ও ভারী রঙ বর্জন করে হয়ে ওঠে হালকা, উজ্জ্বল ও বর্ণময়। জ্যাঁ-বাপিস্ত গুইলামিন ও কামিল পিসারো দুই ইমপ্রেশনিস্ট এবং ডিভিশনিস্ট শিল্পীর অনুপ্রেরণায় তিনি উজ্জ্বল বর্ণে ছোট ছোট স্ট্রোক ব্যবহার করে আঁকতে থাকেন সিটিস্কেপ, ল্যান্ডস্কেপ, সান ফ্লাওয়ার স্টাডি। ১৮৮৬ সালে ব্রিটেন থেকে ফিরে আসা পল গঁগ্যার সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং সখ্যতা তার জন্য আরো গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। গঁগ্যার ব্যক্তিত্ব ও স্বভাবে ছিল উচ্চকিত প্রচ-তা। শিল্প বিশ্বাসে তিনি ছিলেন একরোখাভাবে আত্মবিশ্বাসী। তার কাজেও ছিল প্রচলিত সব নিয়ম উল্টে দেয়ার দুঃসাহস। তিনিই প্রথম বর্ণকে ব্যবহার করেন বস্তুর গাত্রবর্ণ চিত্রণের বদলে আবেগ ও অনুভূতির বাহন হিসেবে। বাস্তবভিত্তিক আলোছায়ার বদলে উজ্জ্বল-দীপ্ত বর্ণের সমতলীয় প্রয়োগে দৃশ্য রচনার উদাহরণও প্রথম সৃষ্টি করেছেন গঁগ্যা। ভিনসেন্ট পরবর্তীকালে তার ছবিতে রেখা, আকৃতি ও রঙের যে অগ্নিগর্ভ সম্মিলন ঘটিয়েছেন, যা তার ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে এ জন্য অবশ্যই তিনি ঋণী গঁগ্যার কাছে। ১৮৮৭ সালের শেষ নাগাদ ভিনসেন্টের কাছে প্যারিস জীবন হয়ে ওঠে ক্লান্তিকর। নাগরিক জীবন তার কাছে দুঃসহ হয়ে ওঠে। তিনি তৃষিত হয়ে ওঠেন তার প্রিয় কিষাণ ও অন্তÍজ শ্রেণীর মানুষের কাছাকাছি যেতে যাদের সঙ্গেই রয়েছে তার প্রাণের যোগ। ১৮৮৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি ফ্রান্সের দক্ষিণাঞ্চলীয় আর্লেতে চলে যান।

ইউরোপের উত্তর অঞ্চলের সঙ্গে দক্ষিণ অঞ্চলের প্রকৃতিগত বিরাট পার্থক্য রয়েছে। উত্তর হলো প্রধানত কুয়াশাচ্ছন্ন ও রৌদ্রহীন। প্রকৃতি সেখানে ধূসর ও বর্ণহীন। ভূমধ্যসাগরের কাছাকাছি দক্ষিণাঞ্চলের আবহাওয়া উষ্ণ ও রৌদ্র-আলোকময় এবং প্রকৃতি বর্ণবিভায় ঝলমলে। আর্লেতে এসে ভ্যান গগ যেন তার স্বপ্নের বিষয়বস্তুর সন্ধান পেলেন। যে রঙের উচ্ছ্বাস তিনি তার চিত্রশিল্পে ঘটাতে চেয়েছেন, এখানে প্রকৃতিই তা ছড়িয়ে রেখেছে পথ-প্রান্তরে। শুধু বেছে নিয়ে তা ক্যানভাসে রূপময় করে তোলার অবকাশ মাত্র। যে ধরনের মানুষের সান্নিধ্যে তিনি স্বস্তিবোধ করেন সেই সরল ও সজীব গ্রামীণ মানুষের দেখাও পেলেন এখানে। তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে নিতেও তার দেরি হলো না। প্রতিদিন তিনি গ্রামের মেঠোপথ ধরে অনেক দূর হেঁটে যেতেন এবং একটি বিষয় নির্বাচন করার পর রঙ-তুলি ও ক্যানভাস-ইজেল নিয়ে আবার ফিরে আসতেন সেখানে। এভাবে ঘুরে পাওয়া মানুষের মতো তিনি দিনের পর দিন এঁকে গেছেন ছবি। ক্লান্তি নেই, ক্ষুধা-তৃষ্ণা নেই, প্রখর রোদে, এমনকি একটি হ্যাটও মাথায় নেই। আর্লের পনেরো মাসে ভিনসেন্ট এঁকেছেন প্রায় অসাধ্য দুই শতাধিক তৈলচিত্র। এছাড়া কয়েক হাজার রেখাচিত্র। অবিশ্বাস্য দ্রুততার সঙ্গে আঁকা হয়েছে ছবিগুলো। তুলির উদ্দীপ্ত ক্ষিপ্র আঁচড়ে টালমাটাল সেগুলো। অথচ এগুলোর মধ্যেই রয়েছে শিল্পীর জীবনের অধিকাংশ শ্রেষ্ঠতম শিল্পকর্ম। একটি ছবিতেও নির্মাণ ও সামঞ্জস্যের বিন্দুমাত্র ঘাটতি নেই। প্রতিটি চিত্রশিল্পই গঠন সৌকার্যে শুধু নিটোল নয়, অভিনবও। উজ্জ্বল, স্পন্দিত, রক্তিম লাল, পান্না, সবুজ, রৌদ্রাভ হলুদ ও প্রদীপ্ত নীলের এমন সম্মিলনও আগে কেউ দেখেননি। ইমপ্রেশনিজমের আলোর উদ্ভাসকে অতিক্রম করে ভিনসেন্ট পৌঁছে গেছেন বর্ণের এক নবতর অর্থময়তার জগতে।

‘মাংশল তাঁবুর আবরণে সাদা হাড়ের কাঠামো/ ঘুমকাতর শরীরে অনুভূত হয় কঙ্কাল/ কবে কে প্রথিত করেছে এই নিরেট সাদা অবকাঠামো/ অর্বুদ নদীরেখার জাল বোনা রক্ত নালিকা/ অদৃশ্য এই বস্তু কাঠামো নিয়ে এতো অহঙ্কার/ বাস্তবতা তো এক সুন্দর সর্বনাশ/ অর্থ যশ ক্ষমতা অমৃৃত মন্থনে কাটে জীবন/ পাললিক হাসপাতাল থেকে লাশের মিছিলে শামিল/ আমি জীবিত না মৃত নাকি নিবিড় পর্যবেক্ষণে/ অক্ষিপটলে ঢুকে পড়ে নক্ষত্র কণা/ ঘরের আলো-আঁধারির ভিতর মাকড়সার তাঁত বোনা / মিথের ফেনায় ভাসতে থাকে ভিনসেন্টের ছবি/ মধ্যরাতে মাঘী পূর্ণিমার চাঁদ ওঠে/ স্বর্ণমেষের ডানায় চেপে পৃথিবীতে নেমে আসে স্বর্গের দেবীরা/ মানুষের চোখের আড়ালে নগ্ন হয়ে স্নান করে অধরারা/ যুগল চন্দ্র চকর জলে ভেসে ভেসে/ পান করে ধবল জ্যোৎস্না/ কর্ণকুহরে অশরীরী থিউ ভ্যান গগের কণ্ঠস্বর, ফিনিক্সের মতো ডানা চাই/ তুমি তো বেঁচে আছ, ঈশ্বরকে বলে দাও।/ আমি তার কাছে যাবো, ভিনসেন্টের কাছে যাবো, ওই নক্ষত্রলোকে।’
(‘কখনো মানুষের গান’, কাব্যাংশ-২)

রামকিঙ্কর

ড. মো.আমিরুল মোমেনীন চৌধুরী

 

 

ভোজসভায় আমন্ত্রিত হয়েছেন কৃষক, দিনমজুর, খনির শ্রমিক ও গ্রামের সাধারণ মানুষ। কারো চেহারা রুক্ষ, কারো তেজদীপ্ত, কারো আবেগময়। বুড়ো, প্রৌঢ়া, যুবক-যুবতী ও শিশু। ঝাড়বাতির কোমল আলো সম্মানীয় করে তুলেছে অতিথিদের অবয়ব। কেউ গান গাইছে, কেউ গল্প-গুজবে, কেউ পানাহারে মত্ত। শিল্পী অনুরোধ করেছেন, অতিথিরা যেন কৃত্রিম আচরণ না করেন। স্বাভাবিক আচরণের মধ্য দিয়েই আনন্দ উপভোগ করার জন্য বলা হচ্ছে। তাদের আনন্দ উৎসবে রেখে সামান্য দূরে চলে এসে ক্যানভাসের সামনে দাঁড়ালেন শিল্পী। সৌন্দর্যের ভেতর ঈশ্বরের অনুভব রচনা করতে হবে।

প্রাজ্ঞতার ভেতর সারল্য তৈরি করতে হবে। যিশু ও তার অনুচরদের এভাবে রচনা করতে হবে যেন তাদের মধ্যে মানবিক ও ঐশ্বরিক গুণাবলি থাকে। সৌন্দর্য ও ঐশ্বরিক স্বাভাবিকতার যোগফল প্রয়োজন যা কোনো মানুষের মধ্যে পাওয়া কঠিন। কারো মুখের আকৃতি, কারো হাত, কারো হাসি, কারো বেদনার্ত মুখাভাস, কারো গ্রীবাÑ এসবের যোগফলে যিশুর রূপ তৈরি করেছিলেন লিউনার্দো দা ভিঞ্চি তার ‘লাস্ট সাপার’ বা শেষ ভোজ ছবিতে।

ষোড়শ শতকের প্রথম দিকে দৃশ্যশিল্প ঘুরে দাঁড়ালো নতুন আঙ্গিকে। লিউনার্দো দা ভিঞ্চি, মাইকেল অ্যাঞ্জেলো ও রাফায়েল হলেন এ সময়ের সবচেয়ে আলোচিত শিল্পী চরিত্র। ‘ভার্জিন অফ দি রকস’ এবং মেরি, যিশু ও সেইন্ট অ্যানের অপূর্ব ড্রইংয়ের প্রেক্ষাপট শারীরযন্ত্র ও শারীর সংস্থানের পরীক্ষা-নিরীক্ষার অপূর্ব উদাহরণ লিউনার্দোর ‘নোট বুকস’। আবার জ্যামিতিক অংকনের চূড়ান্ত হলো গিরলানদাইও-এর

‘শেষ ভোজ’। উলফিনের ভাষায়Ñ ‘এন অ্যাসেমব্লেজ উইথআউট অ্যা সেন্টার’। লিউনার্দোর ছবির নাটকীয় সংহতি আশ্চর্য। তিনজন করে শিষ্যের চারটি দল পিরামিডের আকারে উপস্থাপিত যার শীর্ষবিন্দুতে স্বয়ং যিশু। শিল্পীর সমস্যা কম ছিল না। সব চরিত্রই পুরুষ। ডাইনিং টেবিল ছাড়া কোনো আসবাব নেই। নেই প্রেক্ষাপট বা গতির সম্ভাবনা। শুধু উপবিষ্ট যিশুর পেছনের জানালা দিয়ে অস্পষ্টভাবে দৃশ্যমান প্রকৃতি। অথচ একটি অত্যন্ত উদ্বেগভরা, আত্মজিজ্ঞাসাভরা মুহূর্ত ও ১২ শিষ্যে প্রত্যেকের বিশিষ্ট প্রতিক্রিয়া। যিশুর মুখ শেষ করতে পারেননি শিল্পী। কারণ তিনি কোথায় সন্ধান করবেন জেথসিমানি উদ্যানে ঈশ্বরপুত্রের নিদারুণ ব্যাকুলতা, বীর্যবান ইচ্ছা, প্রশান্ত আত্মসমর্পণ! তিনি তো আর মায়ের কোলে ক্রীড়াচঞ্চল শিশু নন। ঈশ্বরের কাছে ফিরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। অথচ মানুষের জন্য করুণায় বিষণœ ঈশ্বরপুত্র।

ইউরোপীয় শিল্পকলার উত্তুঙ্গ বিকাশ ঘটে পাশ্চাত্য সভ্যতার উদয়াচল গ্রিসে। তবে গ্রিসের মূল ভূখ-ে শিল্পকলার উৎকর্ষ লাভের অনেক আগেই তার অদূরবর্তী দক্ষিণ ভূমধ্যসাগরের ক্রিট দ্বীপে শিল্পের জয়যাত্রা শুরু হয়। ক্রিটানরা ছবি আঁকতো প্রাসাদ, অট্টালিকার দেয়াল ও তৈজসপত্রের উপরিতলে। প্রাচীন মিসরীয়দের মতো মৃত ফারাও কিংবা সমাজের অভিজাতদের পরলৌকিক কল্যাণ বা পরিত্রাণের জন্য নয়, তাদের উদ্দেশ্য ছিল ইহলৌকিক পরিবেশই রঙে আনন্দময় করে তোলা। গ্রিকরা খ্রিস্ট জন্মের প্রায় ৪০০ বছর আগে শিল্পকলায় মানবদেহ সৌন্দর্য এমন এক ভঙ্গিমায় রূপায়িত করে যা আজও অনতিক্রান্ত। প্রাচীন গ্রিক সভ্যতার অবক্ষয়ের পর শিল্পের ইতিহাসে সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা রোমের অভ্যুত্থান ও ইউরোপের জয়। এক ক্ষয়িষ্ণু সভ্যতার দ্বারা প্রভাবান্বিত রোমানরা ছিল গ্রিস থেকে বহু দূরে মধ্য ইটালির টাইবার নদীর তীরে ল্যাটিনভাষী উপজাতি। রোমান শিল্পীরা গ্রিক শিল্পীদের এমনভাবে অনুকরণ ও অনুসরণ শুরু করে যে, অচিরেই গ্রিক ও রোমান শিল্প একীভূত হয়ে রোমান শিল্প যেন গ্রিক শিল্পেরই অবিচ্ছিন্ন ধারায় পরিণত হয়। আধুনিক ইউরোপের ধ্রুপদী শিল্প বলতে যুগপৎ গ্রিক ও রোমান শিল্পটিই বোঝায়। প্রাচ্য শিল্প প্রধানত দুটি ভাগে বিভক্তÑ নিকট প্রাচ্যের শিল্পকলা অর্থাৎ যা মূলত ভারতীয় শিল্পকলা নামে পরিচিত এবং দূরপ্রাচ্যের শিল্পকলা ফার ইস্টার্ন আর্ট বা চীন ও জাপানের শিল্পকলা। প্রাচ্য শিল্প বৌদ্ধ ও হিন্দু ধর্মের প্রতীকবাদিতা প্রভাষিত। বৌদ্ধ দর্শনে বিশ্বব্রহ্মা-ের মূলীভূত তত্ত্বে পাঁচটি উপকরণ রয়েছে। প্রথম উপকরণ মৃত্তিকা। মৃত্তিকা অর্থাৎ পৃথিবীর প্রতীকগত ব্যঞ্জনা হচ্ছে একটি চতুষ্কৌনিক আয়তক্ষেত্র বা কিউব। কিন্তু এর দ্বিমাত্রিক স্বরূপ হচ্ছে চতুষ্কৌনিক রেখা অঙ্কনের বহুবিধ বিস্তার ও সংকোচনকে ব্যবহার করা হয়। দ্বিতীয় উপকরণ পানি। পানির প্রতীক হচ্ছে গোলক। দ্বিমাত্রিকতায় ওই গোলক একটি বৃত্তে পর্যবসিত হয়। পানি যখন উঁচু থেকে নিচে পড়ে তখন গোলকের আকারে পড়ে। কিন্তু বাধা পেয়ে অগ্রসর হলে গতিধারায়ব বৃত্ত ও অর্ধবৃত্তের আকারে পরিলক্ষিত হয়। তৃতীয় উপকরণ অগ্নি। অগ্নির প্রতীক হচ্ছে ত্রিভুজ বা শঙ্কু। সমদ্বিবাহু ত্রিভুজের ঊর্ধ্বমুখী সুচালো কোণের মতো অগ্নির গতিও ঊর্ধ্বমুখী। চতুর্থ উপকরণ বায়ু। বায়ুর প্রতীক হচ্ছে অর্ধচন্দ্র বা ক্রিসেন্ট। বায়ু যেহেতু অদৃশ্যমান সেহেতু বায়ুর তাড়নায় বস্তুর প্রকৃত আকৃতির যে পরিবর্তন হয়, বায়ুর প্রতীক সেভাবে নির্মিত। পঞ্চম উপকরণ আকাশ। আকাশ বা শূন্যের প্রতীক হচ্ছে ডিম্বাকৃতি। যেহেতু আকাশ শূন্য এবং এর কোনো নির্দিষ্ট আকৃতি নেই সেহেতু ডিম্বাকৃতি সাদৃশ্য নির্মাণ করে আকাশকে বোঝানো হয়েছে।

চীন কিংবা জাপান অথবা ভারতীয় শিল্পে যে কোনো বস্তু গঠন নির্মাণের ক্ষেত্রে মৌলিক আকৃতি হিসেবে বৃত্ত আকৃতি বা ডিম্বাকৃতি ফর্ম বেশি দেখা যায়। প্রাচ্যের শিল্পীরা মানব শরীরের মূল কাঠামো বা অস্থি সংস্থানের দিকে খেয়াল করেননি। তারা গাত্র আবরণ সংবলিত সম্পূর্ণ অবয়ব বৃত্ত আকৃতি ও ডিম্বাকৃতি রেখার টানে সুচিহ্নিত করেছেন। পাশ্চাত্য শিল্পের মূল আকৃতি কিউব ও

পলিহেড্রন। কিউব সমান ছয়তলার চতুষ্কৌনিক আকৃতি ও

পলিহেড্রন বহুবিধ তলের একটি ঘনক। শিল্পে প্রেক্ষাপটগত শুদ্ধতা নির্মাণের জন্য তাদের কিউব বা পলিহেড্রনের আকৃতিটি গ্রহণ করতে হয়েছিল। তাছাড়া মানব শরীর আঁকতে শরীরের মূল কাঠামো বা অস্থি সংস্থানটি অধিকতর প্রাধান্য দিয়েছে। শরীরের অভ্যন্তর ভাগের অস্থির সংস্থান বিবেচনার মধ্যে রেখে ইউরোপের শিল্পীরা শারীরিক গঠন নির্মাণ করতেন। এ জন্য রেনেসাঁস যুগের শিল্পীকে শবব্যবচ্ছেদে দক্ষ হতে হতো। পাশ্চাত্য শিল্পে প্রেক্ষাপট অর্থাৎ আলোছায়ার মাধ্যমে রঙ ঘনত্বের তারতম্য সৃষ্টির যে শিল্পবিজ্ঞান রয়েছে, প্রাচ্য শিল্পে ওই পেক্ষাপটের সমর্থন নেই। প্রাচ্যের শিল্পীরা সম্ভবত প্রেক্ষাপটের মূলনীতিগুলো জানতেন এবং এর বাস্তব অবলোকনের প্রচলিত রীতিকে গ্রাহ্য করেননি। কেননা কোনো কোনো সময় উল্টো প্রেক্ষাপটের ব্যবহার দেখা গেছে। অজান্তার ভিত্তিচিত্রে এ ধরনের প্রচুর উদাহরণ রয়েছে। রেনেসাঁসের আগেই পশ্চিম

ইউরোপের শিল্পীদের প্রধান প্রবণতা ছিল দৃশ্য জগতের হুবহু অনুকরণ করা। এ ছাড়া চিত্রে প্রেক্ষাপট ব্যবহারের কারণে দর্শকের দৃষ্টিকে চিত্রপটের বাইরে একটি বিন্দুতে স্থির করে। দর্শকের দৃষ্টি শেষ পর্যন্ত অদৃশ্য বিন্দুতে গিয়ে মিলিয়ে যায়। ফলে ছবি হয় ত্রিমাত্রিক এবং আকারগুলো চিত্রপটে অনুপ্রবেশ করে। প্রাচ্যের শিল্পীরা চিত্রপটটি দ্বিমাত্রিক ভূমি ও বাস্তব জগৎ ত্রিমাত্রিক হিসেবে গণ্য করেছেন। কিন্তু চিত্রপটে পুনর্চিত্রণ করার সময় দ্বিমাত্রিকতায় এঁকেছেন তারা। পাশ্চাত্যের শিল্পীরা প্রেক্ষাপটের কাছে-দূরের তারতম্য নতুন করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং চিত্রপটের দ্বিমাত্রিক স্বভাব অক্ষুণœ রেখে ত্রিমাত্রিক বস্তুকে দ্বিমাত্রিক স্বভাবে পর্যবসিত করেছেন। অ্যাবস্ট্রাক এক্সপ্রেশনিজম অথবা পোস্ট এক্সপ্রেশনিজমের চিত্রগুলোই এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। প্রাচ্য শিল্পে বিশেষ করে চীনের ভূদৃশ্যের দূরত্ব আছে। দূরত্বের কোনো সীমা-পরিসীমা নেই, আছে অসীমের বিন্যাস। পাশ্চাত্যের শিল্পীরা বস্তুটি আলোছায়ার তারতম্যের মধ্যে আবিষ্কারের চেষ্টা করেছে। কিন্তু প্রাচ্যের শিল্পীরা শুধু প্রমাণিত আকৃতি গ্রহণ করেছেন, আলোছায়ার কথা ভাবেননি। একটি বস্তুর ওপর আলো এসে পড়লে দৃশ্যত এর বর্ণগত ও আকৃতিগত যে পরিবর্তন দৃষ্টিতে ধরা পড়ে, প্রাচ্যের শিল্পীরা তা কখনো বিচার্য ভাবেননি। ফলে প্রাচ্যের শিল্পকলা ডেকোরেটিভ বা অলঙ্কৃত রূপকল্প বলে ইউরোপীয় চিত্র সমালোচকরা আখ্যা দিয়ে থাকেন। এরিখ নিউটন (১৮৯৩-১৯৬৫) এটিকে বলেছেন একটি আদর্শ সত্যের অন্বেষণ। ইউরোপীয় শিল্পীর কাছে সত্য হচ্ছে দৃশ্যগত বাস্তব অবস্থানের রূপব্যঞ্জনা। প্রাচ্যের শিল্পীর কাছে সত্য হচ্ছে আদর্শের রূপায়ণ। ইউরোপীয় শিল্পকলার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, একটি বস্তুর যথার্থ দৃষ্টিগোচর স্বরূপক নির্ণয় করার জন্য শিল্পীরা বহুকাল শ্রমসাধ্য সময় দিয়েছেন। কী দেখছি অর্থাৎ কোন বস্তু দেখছিÑ ইউরোপীয় শিল্পীর কাছে এটি বড় কথা নয়, কীভাবে দেখছি সেটিই বড় কথা। যুগভেদে এভাবে বস্তু দেখার কৌশলের পরিবর্তন হয়েছে এবং বস্তুর নির্ণেয় স্বরূপ নতুন নতুন তাৎপর্য পেয়েছে। প্রাচ্যের যেহেতু বস্তুই উৎকৃষ্ট সেহেতু যুগভেদে বস্তুর স্বরূপের কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। তাই প্রাচ্যের শিল্পীর কাছে একটি সবুজ গাত্র আবরণ সর্বদাই অনাবিল সবুজ। অবশ্য ইউরোপীয় শিল্পীর কাছে তা নয়। ইউরোপীয় শিল্পী আবরণের ওপর আলোছায়ার খেলা দেখেন। সবুজটিকে কোথাও অধিকতর গাঢ় সবুজ, কোথাও সবুজ এবং কোথাও হালকা সবুজ করে উপস্থাপন করেন অর্থাৎ ইউরোপীয় শিল্পীর বিচারে আলোছায়াই একটি বস্তুর রঙ নির্ধারিত করে, প্রাচ্যে তা নয়। বিশ্ব শিল্পকলার ইতিহাসে ভাস্কর্য চর্চা একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। এ ভাস্কর্যকলা একটি সংস্কৃতি, একটি দেশের সভ্যতা ধরে রাখে। ফলে পরবর্তী প্রজন্মের অতীত জানতে সহজ হয়। অবশ্য শিল্পকলার উৎকর্ষতা নিয়ে ছিল বিভিন্ন মত। ভাস্কর্যে ত্রিমাত্রিক গুণের কারণে দর্শকের কাছে বস্তুসাদৃশ্য প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। চিত্র অপেক্ষা ভাস্কর্য অনেকগুণ স্থায়ী ও গতিশীল। তাই শিল্পকলায় এর গুরুত্ব অপরিসীম। সমৃদ্ধ ভারত উপমহাদেশের অংশীভূত বাংলাদেশ বর্তমানে খ-িত হলেও ঐতিহ্য সন্ধানে সুদূর গৌরব উজ্জ্বল অতীতে প্রবেশ অনিবার্য। এখন শিল্পীকুল যে ওই ঐতিহ্য থেকে উৎসাহিত হয়েছে তা স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। ঔপনিবেশিক আমলে সরাসরিভাবে ইউরোপীয় স্থাপত্যরীতি, ভাস্কর্য, চিত্রকলার স্বকীয় ও অনুকৃতি আমদানি করে ২০০ বছরের শাসনকালে। অখ-িত ভারতবর্ষে নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে ইউরোপের বহু শিল্পী এসেছিলেন। ভারতবর্ষের সংস্কৃতি, মানুষজন ও সংস্কৃতি বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের শিল্প, সংস্কৃতি, রুচিরও পরিবর্তন ঘটতে থাকে। ইউরোপিয়ান স্থাপত্য, ভাস্কর্য ও চিত্রকলা ভারতীয় শিল্পীদের অবশ্যই প্রভাবিত করে। ফলে শিল্প বিদ্যালয়ের সুনির্দিষ্ট শিক্ষা পদ্ধতির ভিত্তিতে এক সুনির্দিষ্ট শিল্পধারা গড়ে ওঠে। তা একাডেমিক স্টাইল বা রীতি নামে পরিচিত। ব্রিটিশ একাডেমিক রীতির আদর্শে গড়া এই নতুন ভারতীয় শিল্প ক্রমেই জনপ্রিয়তা লাভ করে এ দেশের নতুন শিক্ষায় শিক্ষিত সমাজেও। কলকাতার বেঙ্গল স্কুল অব আর্ট প্রতিষ্ঠা, শিল্পীদের গোষ্ঠী ক্যালকাটা গ্রুপ, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নন্দলাল বসু, যামিনী রায় ও রবীন্দ্রাথ ঠাকুরের কার্যধারা অবিভক্ত বাংলার শিল্পধারাটি বিকশিত করে। এরপর ভাস্কর হিসেবে সমাধিক পরিচিত ভাস্কর রামকিঙ্কর বেইজ (১৯০৬-১৯৮০) ভাস্কর্যকলায় স্বাক্ষর রেখেছিলেন। এর পূর্ণতার পরিচয় পাওয়া যায় তার ১৯৩৮সালে নির্মিত সাঁওতাল পরিবার ভাস্কর্যে। ভাস্কর রামকিঙ্কর বেইজ-এর ভাস্কর্যের সূচনা হয় পাশ্চাত্য শিল্পীদের কাছে। প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের দ্বন্দ্ব, একই সঙ্গে উভয় ধারা থেকে রসদ সংগ্রহ করে নিজেকে পরিশীলিত করেছেন। তার চিত্রকলায় যেমন নিসর্গচিত্রে দেশীয় পটভূমিতে দেখা যায় তেমনি ভিনসেন্ট ভ্যান গগ কিংবা পল সেজানের প্রতিচ্ছায়া ও কিউবিস্টদের পথ ধরে তিনি বিমূর্তাশ্রায়ী। পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছিল কলকাতাতেও। এ প্রসঙ্গে রিবেল আর্ট সেন্টারের কথা বলা যায়। এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিলÑ দেশজ শিল্পের প্রকৃত চরিত্র ও সত্তাটি রক্ষার জন্য পাশ্চাত্যের শিল্পরীতির আঙ্গিক আয়ত্ত এবং রিয়ালিস্টিক বা বাস্তববাদের দিকে ধাবিত করা। রামকিঙ্কর এক মডেল খুঁজছেন। নিজের জন্য, ছবির কৌশলের জন্য প্রয়োজন এক মডেলের। তাকে স্পর্শ, আঘাত ও হৃদয়ে প্রবেশ করে তার হৃদয়ের বাইরে দাঁড়িয়ে ভালোবাসায় ডুবিয়ে, জীবনের দিক থেকে আশ্রয়হীন করে চিনে নেবেন তিনি। শান্তিনিকেতনে মীরা দেবী (ভাস্কর মীরা মুখপাধ্যায়, ১৯২৩-১৯৯৮)-এর কাজে সাহায্য করেন সাঁওতাল এক রমণী। দেখা হলো সাধারণত্বে অসাধারণ রাধারানীর সঙ্গে। রাধারানী তার সাধনা, পরীক্ষার একটি উপকরণ হতে পারে। শিল্পী এদগার দেগা-কে ফরাসি দার্শনিক ও কবি পল ভ্যালোরি প্রশ্ন করেছিলেন, ড্রইংয়ের দ্বারা তিনি কী বোঝেন? উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ড্রইং ইজ নট অ্যা ফর্ম। ইট ইজ ওয়ে অ্যা লুকিং অ্যাট ফর্ম। লুকিং অ্যাট ফর্মের ভেতর ধরতে হবে যন্ত্রণা এবং তার বিস্তৃত বোধ ও সীমানা। ওই সীমানার ভেতর নিজেকে অত্যাচারিত করার প্রবণতায় রামকিঙ্কর মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। তার সঙ্গে রাধারানীর পরিচয় সামান্য সময়ের। এ পরিচয়ের মধ্যেই আহ্বান করেছিলেন তার কাছে আসতে। তিনি জানতেন, রাতে রাধা আসবে তার কাছে। মীরা দেবীর বাড়ি ও রামকিঙ্করের স্টুডিওর মাঝে কাঁটাতারের বেড়া। সন্ধ্যার পর থেকে এপারে তিনি মাঠে বসে একতারায় শব্দ তুলছেন। কিন্তু মনোযোগী নন। সন্ধ্যা পেরিয়ে অস্থির রাত, সময় সমুদ্র তালগোল।

কাঁটাতারের বেড়ার ওপারে অন্ধকারে এক রমণীর লজ্জিত পদক্ষেপ। অস্থির রামকিঙ্কর শিল্পের নতুন আকৃতি ও নিজেকে প্রকাশ করার ব্যগ্রতায় সবকিছু ভূলে গিয়ে রাধারানীকে দু’হাতে তুলে নিয়ে এলেন কাঁটাতারের বেড়ার এপারে। তাকে স্টুডিওর মডেল বক্সের ওপর আধশোয়া করে এমনভাবে রাখলেন, রাধা যেন কলের পুতুল। রাধা স্বপ্নের ঘোরের ভেতরে

আছেনÑ শব্দহারা লজ্জায় রক্তহীন। অথচ অভিজ্ঞতা ও নিজস্ব যন্ত্রণার কাছে প্রৌঢ়া। রামকিঙ্করের কাছে স্টুডিওর পরিবেশে এক স্বর্গীয় অনুভূতি। পেন্সিলের টানে ধরে রাখতে হবে রাধার শরীরের ফর্ম। ওই ফর্মের ভেতর ঝলসে উঠবে তীব্র যন্ত্রণা। কোহল-ক্লান্ত রামকিঙ্করও শল্যচিকিৎসকের মতো শুরু করলেন রাধার শরীর ব্যবচ্ছেদ, এক অলৌকিক ময়নাতদন্ত। তা দিয়ে বোঝা যায় এক মানবিকার মনের গভীরতা। শরীরের ভেতর আরেক শরীর। গর্ভের ভেতর বেড়ে ওঠা এক শরীরে আরেক শরীরের মতো অবিকল রূপে। ওই রূপে একটি বিশেষ ফর্ম শিল্পী এদগার দেগা-র কাছে। তার স্নানরতা ছবির বিষয়ের মতো, স্নানের পর এক তরুণী পেছন ফিরে তার চুল থেকে জল মুছে নিচ্ছে খুব স্বাভাবিকভাবে। কিন্তু শিল্পীর ক্যানভাসে মোটা রেখার টানে তা ফুটে উঠেছিল অপূর্ব দেহ ভঙ্গিমায়। তা এখনো মুগ্ধ করে গ্যালারির দর্শককে। রামকিঙ্করের সঙ্গে দীর্ঘ বসবাসের এক সময় সন্তানসম্ভাবা হলেন রাধা। এ সময় রামকিঙ্কর একটি ম্যাডোনা চিত্র আঁকলেন। তার কোল থেকে নেমে আসছে চারটি শিশু। তার একটি চোখের আভাস দৃশ্যামান। অন্যদিকের চোখ ডুবে আছে ঘন চুলের নিচে। তার দুটি স্তন উন্মুক্ত। চারটি শিশুর মুখ সেখানে। বসুন্ধরার প্রতীকী রূপ। সব শিশুর জন্য মায়াবতী দুধঘর নিয়ে প্রস্তুত। রামকিঙ্করের কল্পনা ও রাধারানীকে প্রত্যক্ষ করা এক ম্যাডোনার চিত্র। দীর্ঘদিন সন্তানসম্ভাবার কোনো ইঙ্গিত না পেয়ে রাধারানী এক ব্রাহ্মণ পুত্রকে দত্তক নিয়েছিলেন। দত্তক নেয়ার পর জানতে পারেন তিনি সন্তানসম্ভাবা। ধর্মীয় মতে, দত্তক নেয়ার পর নিজের সন্তান জন্ম দেয়া অনাচার। তাও আবার ব্রাহ্মণপুত্র! একদিকে অনাচার, লজ্জা, ভয়। অন্যদিকে নারীত্বের গর্ব, মা হওয়ার প্রবল ইচ্ছা। একদিকে যন্ত্রণা, অন্যদিকে গর্ভের শিশুকে বাড়িয়ে তোলার আঁতুড় মমতা।

রাধারানীর সংকটকালে শিল্পী রামকিঙ্করের কাছে ছবির বিষয়ের আরেক নুতন দিগন্ত খুলে গেল। নারীত্বের গর্ব ও তার যন্ত্রণা। আঁকতে শুরু করলেন গর্ভযন্ত্রণার নারীচিত্র। তার যন্ত্রণার মধ্যে বসে আছে সেই নারী। ভারী স্তন যুগল ঝুলছে স্মৃতিতে সন্তানের মুখের কাছে। কিন্তু শিশুর অবয়বে চোখ, মুখ, নাক অদৃশ্য। আবার রাধাকে দাঁড় করিয়ে আঁকলেন তার তলপেটে সারা শরীরে আঁচড়। রাধারানী সেই সন্তানকে নষ্ট করে ফেলেছিলেন পালিত পুত্রের জন্য। কারণ ধর্মীয় মতের বিরুদ্ধ স্রোতে যাওয়ার ক্ষমতা তার ছিল না। রামকিঙ্কর ওই সুযোগ হাতছাড়া করেননি। তিনি রাধার কষ্টের অনুভবটি প্লাস্টার দিয়ে তৈরি করলেন অসাধারণ এক ভাস্কর্য ‘মাতৃত্ব’। তার তলপেট স্থূলকায়, দু’হাত উপরে। ওই হাতের ওপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে শিশু। শিশুর মুখ দু’স্তনের আড়ালে যেন দু’স্তনের মাঝে শিশু ঘুমিয়ে আছে। নারী চরিত্রের মুখে হাসি ও সারা শরীরে এক যন্ত্রণাহীন প্রশান্তি। রাধারানীর বিয়ে হয়েছিল অল্প বয়সে। বর ছিল তার চেয়ে তিনগুণ বয়সের। বিয়ের কিছুদিন পর রাধা গিয়েছিলেন স্বামীর ঘর করতে, স্বামীর ভালোবাসায় সিক্ত হতে। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন স্বামী তার প্রেমে অবিচল নন। তার একটি রক্ষিতা আছে। ওই সময় মায়ের মৃত্যু সংবাদ পেয়ে বাড়ি এলেন রাধা। বাবা সব শুনে বললেন, ‘ওখানে গিয়ে কাজ নেই। আমি তোর জন্য অন্য ব্যবস্থা করে দেবো।’ বাবার কথায় সায় দিলেও কিছুদিনের মধ্যে রাধা শরীরের ভেতর এক পুরুষের টান অনুভব করেছিলেন। তা ছিল চিরন্তন। তার স্বামী নিয়মিত যাতায়াত শুরু করেন রাধার বাবার বাড়িতে। ভালোবাসার গল্প করেন, শোনেন রাধা। শরীর ও মনের জন্য বাবার কথা অমান্য করে রাধারানী স্বামীর হাত ধরে আবার নিজের বাড়ি গিয়েছিলেন। যুবতী রাধা। স্বামী তাকে ব্যবহার করেন। না পাওয়ার চেয়ে এ অনেক ভালো। স্বামীর অকাল মৃত্যুর পর রাধার ঠাঁই হলো শান্তিনিকেতনে মীরা দেবীর বাড়িতে। এই হলো রাধারানী ও রামকিঙ্করের অধরা।

শান্তিনিকেতনে রাধারানীর ইন্টারভিউ নিয়েছিলেন (১৯৮৯) রানাঘাটের লিটল ম্যাগাজিন ‘পুনরুত্থান’-এর দুই সম্পাদক আমার বন্ধুজন শান্তিনাথ ও গৌতম চট্টপাধ্যায়। আমি তখন রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের দৃশ্যকলা অনুষদের স্নাতকোত্তর শেষ পর্বের ছাত্র। শান্তি ও গৌতম বলেছিল, চলো যাই তিনজন মিলে এক সঙ্গে। আমার যাওয়া হয়নি রাধারানীকে সম্মান জানানোর জন্য।

 

গৌতম ও শান্তি : এখন আপনার মনে হয় না সন্তান থাকলে ভালো হতো?

লজ্জা মিশ্রিত কষ্টের ভেতর রাধারানীর উত্তর : ভালো হতো। তাকে নিয়ে থাকতাম। এখন ভাবি, কেন নষ্ট করলাম একজন মহান পুরুষের উত্তরাধিকার!

গৌতম ও শান্তি : রামকিঙ্করের কথা মনে হয় না?

রাধারানী : তার মুর্তির সামনে দাঁড়ালে কান্না পায়। এমন মানুষ হয় না। এমন ভালো কেউ বাসতে পারবে না।

গৌতম ও শান্তি: আপনার প্রথম স্বামী ভালোবাসতেন না?

রাধারানী : কারো সঙ্গে কারো তুলনা করতে চাই না। কেউ তো কারো মতো নয়।

গৌতম ও শান্তি : আর কিছু বলবেন তার সম্পর্কে?

রাধারানী : বাবু মৃত্যুর সময় বলেছিলেন, রাধা, শ্মশানে অমৃত (মদ) দিস (রাধারানী তার কথা রেখেছিলেন। শ্মশানে অমৃত ঢেলে দিয়েছিলেন যেখানে রামকিঙ্করের দেহাবশের শেষ চিহ্ন ছিল। কিছু সময় নিমগ্ন থাকার পর আবার কথা বলেন

রাধারানী)। প্রথম দিকে মনে সন্দেহ হতো, বাবু কেন শ্মশানে অমৃত ঢেলে দিতে বলেছিলেন!

গৌতম ও শান্তি : এখন সন্দেহ নেই?

রাধারানী : না।

গৌতম ও শান্তি : কেন?

রাধারানী : তা তো ভেবে দেখিনি!

 

রাধারানীর কাছে এর ব্যাখ্যা না থাকলেও গৌতম ও শান্তিনাথের মতো আমাদের সবার জানা হয়ে গেছে ওই অমৃত কথা।

শিল্প অনুরাগী মানুষ তার শিল্পের ভেতর দিয়ে পান করেন ওই অমৃত।

একজন তপু খান

 

আপনার চোখে ভাস্কর্য শিল্প কী ও কেন?

ভাস্কর্য শিল্প হলো এর অধিক ডাইমেনশনের কাজ। ভাস্কর্য শুধু প্রাণী বা মানুষের দেহ গড়ে তোলা নয়, ইমারতও এক ভাস্কর্য শিল্প। এই শিল্প যে কোনো মাধ্যমে হতে পারে। আগে শিল্পীরা মাটি, পাথর, কাঠÑ এগুলো ব্যবহার করতেন। এখন ইচ্ছামতো মাধ্যম ব্যবহার করা যায়। এই শিল্প ইতিহাসের ধারক ও বাহক।

ভাস্কর্য শিল্পের প্রতি আপনার আগ্রহ কীভাবে তৈরি হলো?

ছোটবেলা থেকেই ভাস্কর্য শিল্পের প্রতি আমার আগ্রহ ছিল। বাসায় কোনো শোপিস আনলে তা ভালো করে খুঁটিয়ে দেখতাম। মাটি দিয়ে তা বানানোর চেষ্টাও করতাম। ভারতে প্রথম ভাস্কর্য দেখার সুযোগ হয়। পরে অনেক দেশ ভ্রমণের সুযোগ হয়েছে। বিভিন্ন জাদুঘর ভিজিট করেছি। ওইসব কাজ দেখে খুবই অভিভূত হই। কীভাবে একটি জাতির কৃষ্টি-সংস্কৃতি, সমাজ ব্যবস্থা ও ঐতিহ্য ভাস্কর্য শিল্পে তুলে আনা যায় তা না দেখলে বোঝা যাবে না। এ জন্যই আমার আগ্রহ সৃষ্টি হয় ভাস্কর্য শিল্পে।

এ শিল্পটি সঙ্গে নিয়ে আপনার পথচলার অভিজ্ঞতা আমাদের বলুন।

মূলত টেরাকোটা স্কাল্পচার করি। আমার স্টুডিওতে দেশি-বিদেশি ভিজিটর সব সময় আসা-যাওয়া করেন। তাদের মধ্যে টেরাকোটা ভাস্কর্য সংগ্রহের আগ্রহ দেখেছি। অনেকেই এ মাধ্যমে ভাস্কর্য তৈরির প্রশিক্ষণ নিতেও আগ্রহী। প্রথম টেরাকোটা স্কাল্পচার ওয়ার্কশপ করাই। পরে ওইসব কাজ দিয়ে প্রদর্শনী করি। তা প্রচুর সাড়া জাগায়।

ভাস্কর্য শিল্প নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

বাংলাদেশ থেকে প্রথম টেরাকোটা মিনিয়েচার স্কাল্পচার এক্সিবিশন করি আমেরিকার মেরিল্যান্ড-এ। এ দেশে প্রথম টেরাকোটা স্কাল্পচার ওয়ার্কশপ করাই। আগামীতে আরো টেরাকোটা স্কাল্পচার ওয়ার্কশপ করাবো এবং এ শিল্পটি সবার কাছে জনপ্রিয় করে তুলবো।

অন্য শিল্পকলা যেমনÑ চিত্রকলা, ছাপচিত্র, প্রাচ্যকলা বা বুনন শিল্পের মধ্যে ভাস্কর্য শিল্পের শক্তিশালী দিক কোনটি বলে মনে করেন?

আমার কাছে ভাস্কর্য শিল্পই সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম মনে হয়। কারণ এই শিল্প দুয়ের অধিক ডাইমেনশন হওয়ায় বক্তব্য ফুটিয়ে তোলা যায় বেশি এবং অনেক সহজে।

 

এটি ওই জায়গায় স্থাপন করা যায় এবং সহজ বোধগম্য।

ভাস্কর্য শিল্পের সঙ্গে আপনার পথচলা কতটুকু সার্থক হয়েছে?

সার্থকতা এখনো বুঝতে পারছি না। কাজ করছি ভাস্কর্য শিল্প নিয়ে। আগ্রহীদের মধ্যে নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করি। অনেক প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। এই পথ অনেক দুর্গম। তবু জানি, এগোতে হবে অনেক দূর।

ভাস্কর্য শিল্পে অবদান রাখার জন্য আপনাকে আপনার পরিবার কোন চোখে দেখে বা তাদের অভিব্যক্তি কী?

পরিবারের সব সদস্য আমাকে আমার কাজে প্রেরণা দেন ও সহযোগিতা করেন। আমার বাসা ও স্টুডিও একই বিল্ডিংয়ে হওয়ায় সবার সহযোগিতা সব সময়ই পাই।

ভাস্কর্য শিল্পে বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়? বিভিন্ন দেশে আপনার ভ্রমণ ও অভিজ্ঞতার কথা বলুন।

বাংলাদেশে ভাস্কর্য শিল্পের অবস্থানের কথা জানাতে গেলে বলতে হয়, উল্লেখযোগ্য কোনো অবস্থান তৈরি হয়নি।

 

সারা দেশে একই শিল্পীর ভাস্কর্য স্থাপন করা হচ্ছে। এতে মনে হয়, এ দেশে আর কোনো ভাস্কর্য শিল্পী নেই। পৃথিবীর বহু দেশ ঘুরেছি। এই শিল্প দেখার তৃষ্ণা মেটাতে চেষ্টা করেছি। ওয়াশিংটন ডিসি-র স্কাল্পচার গার্ডেন-এ বিভিন্ন শিল্পীর ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে। মাঝে মধ্যে তা পরিবর্তন করে অন্য শিল্পীদেরও সুযোগ দেয়া হয়। আমার ইচ্ছা এ দেশেও ওই রকম একটা গার্ডেন স্থাপন করা।

আপনি বিশেষ কোনো শিল্পীকে অনুসরণ করেন কী?

কোনো বিশেষ শিল্পীকে অনুসরণ করি কি না তা জানি না। আমার নিজস্ব চিন্তা ও ধ্যান-ধারণা দিয়ে শিল্পকর্ম করি। তবে আমার ভালো লাগা শিল্পীদের মধ্যে অন্যতম হলেন হেনরি মুর, মাইরন, লরেঞ্জ বারতোলিনি ও পিকাসো। অনেকেই বলেন, মুরের প্রভাব আছে আমার কাজে। থাকতেও পারে নিজ অজান্তেই।

বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে অনুষ্ঠিত আপনার প্রদর্শনীর কথা বলুন।

বাংলাদেশে এ পর্যন্ত অনেক প্রদর্শনী করেছি। ভাস্কর্য প্রদর্শনী দেশে এখনো এককভাবে করা হয়নি। গ্রুপের সঙ্গে করেছি। এ বছর একক ভাস্কর্য প্রদর্শনী করার ইচ্ছা আছে। গত জুনে আমেরিকার মেরিল্যান্ডে একক ভাস্কর্য প্রদর্শনী করেছি। বিপুল সংখ্যক ভিজিটর ছিলেন।

দেশ-বিদেশে আপনার করা ভাস্কর্য কী কী ও গ্রাহক কারা?

আমার ভাস্কর্য সব পোড়া মাটির আকারে। খুব বড় হয় না। দেশ-বিদেশে অনেকের ব্যক্তিগত সংগ্রহে আছে। দেশে এমপি রীমা (তাজউদ্দীন আহমদের মেয়ে), অভিনেতা তারিক আনামসহ অনেকের। দেশের বাইরে যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ড, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া-য় অনেকের সংগ্রহেই আছে আমার ভাস্কর্য।

বর্তমানে আপনি কী করছেন?

এ শিল্প নিয়েই কাজ করছি আমার স্টুডিওতে। এ ছাড়া উড কারভিং, মেটাল ওয়ার্ক, টেরাকোটা টাইলস নিয়েও কাজ করি ও প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকি।

এই পথে চলতে আপনার কোনো বাধা আছে কি?

খুব বড় ধরনের বাধা আছে বলে আমার মনে হয় না। মুসলিমপ্রধান দেশ বলে ইচ্ছামতো কাজ করা যায় না। আমি নারী নিয়ে বেশি কাজ করি। তবে কাজের ধরন কিছুটা বদলাতে হয়েছে। নুডি নিয়ে খুব একটা কাজ করা যায় না। তাই বিমূর্ত বা আধা বিমূর্ত কাজ করি।

তরুণ ভাস্কর্য শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে আপনার কোনো বক্তব্য থাকলে বলুন।

তরুণদের বলি, ভাস্কর্য শিল্প অত্যন্ত শক্তিশালী মাধ্যম। এই শিল্প নিয়ে চর্চা করো। এই শিল্পের মাধ্যমে নিজ দেশের ইতিহাস, শিল্প, সংস্কৃতি, সমাজ ব্যবস্থা নিজেদের ও বিশ্বের কাছে তুলে ধরো। সমাজ পরিবর্তনে ভূমিকা রাখো। সব খারাপ কাজের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াও এই শিল্পকর্মের মাধ্যমে।

মাধ্যমগতভাবে আপনি কোন উপকরণে ভাস্কর্য গড়তে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন (পোড়ামাটি, কাঠ, ধাতব, বালি-সিমেন্ট ইত্যাদি)?

আমি যেহেতু মৃৎ শিল্পী সেহেতু পোড়ামাটিই আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় মাধ্যম।

Page 3 of 3

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…