Page 2 of 3

নীল অশ্বারোহী

ছবির ভালোবাসার গল্প

ড. মো.আমিরুল মোমেনীন চৌধুরী

 

: বৃষ্টির ভেতর এভাবে আরো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে পায়ে নির্ঘাত গাছের মতো শিকড় গজাবে।
: ভালো হবে। সূর্য উঠলে লোকে দেখবে নদীর পাড়ে নতুন দুটো গাছের জন্ম হয়েছে।
: কোন গাছ হবো?
: অশোক, না হয় নাগলিঙ্গম।
: না, পৌরাণিক কোনো গাছ নয়।
: তাহলে কী?
: অশত্থ, না হয় বট।
: ওতো মহীরুহ। ও গাছে ফুল নেই।
: ফুল দরকার নেই, ফলে ভরা গাছ। ফলভুখ পাখিগুলোর কলরবে মুখর শাখা-প্রশাখা।
: তাহলে মানুষের কী হবে! মানুষ তো ও গাছের ফল খায় না।
: মানুষ গাছের ফল মানুষ খাবে না। পথিক বিশ্রাম নেবে। হুতোমপেঁচা, বুনোহাঁস, কাঠঠোকরা, বক,
পানকৌড়ি বাসা বাঁধবে খোড়লে, বাকলেÑ সেই গাছ।
: স্তন্যপায়ীরা থাকবে না। কাঠবিড়াল, বাদুড়, বানর, কালোমুখ হুনুমান।
: এগুলোও থাকবে।
: গাছ হতে ইচ্ছা করছে না। গাছের জন্ম বৃত্তান্ত বড় কঠিন। গাছে ফুল ফুটবে, ফল হবে। পাকা ফলের বীজ মাটির নিচে পড়বে, ওই মাটির শক্ত আবরণ ভেদ করে বের হওয়া। জল আর সূর্যের আলো শরীরে মেখে শত্রু-মিত্রের চোখ ফাঁকি দিয়ে ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠা। তারপর এক জায়গায় জীবনভর ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকা।

ভাবতেই ভয় করে!
: তাহলে পাখি হও?
: সে মন্দ নয়। কী পাখি!
: আবাবিল।
: আবাবিল অনেক ছোট। এতো উঁচুতে উড়ে বেড়ায়, তাকিয়ে থাকলে চোখ লেগে যায়। ওর শিস আর ডানা ঝাঁপটানোর শব্দ ছাড়া কেউ কি দেখে ওর সবুজ শরীর।
: তাহলে আলবাট্রোস। দুটো বিশাল ডানায় ভর করে সমুদ্রের বাতাসে ভেসে বেড়াবে।
: তাও না। ও তো মৎসভোজী পাখি। মাছ আমার প্রিয় নয়। তাছাড়া অথৈ সমুদ্রের লোনা জলে ভেসে বেড়ানো, বসার ঠাঁই নেই।
: কেন, জাহাজের উঁচু মাস্তুলে বসবে।
: ওখানেও সুবিধা নেই। নাবিক আর ক্রুদের লোভী চোখ ফাঁকি দেওয়াÑ তা বড় শক্ত কাজ।
: তাহলে ছবি হবো আমি।
: সে আরো শক্ত কাজ।
: কেন?
: প্রাকৃতির সৃষ্ট কোনো কিছু ছবি নয়। মানুষ পাহাড়, আকাশ, মেঘ, নদী, চাঁদ, সূর্য।
: আর আমি!
: তুমি তো ছবির মতো সুন্দর।
: তাহলে ছবির গল্প বলো।
: শিল্পীদের ধারণা, প্রকৃতির সবকিছু ছবির মতো নিখুঁত নয়। ওই খুঁতগুলো চিহ্নিত করে, এর উপযুক্ত রূপায়ণ করে প্রকৃতির প্রকৃত সমালোচকের দায়িত্ব পালন করেন শিল্পী। ছবি নিয়ে প্রকৃতির সঙ্গে শিল্পীর এ এক অসম শক্তির লড়াই। সবকিছু ছবির মতো সুন্দর বলতে বোঝায়, প্রকৃতির সৃষ্টি আর ছবি এক নয়। ছবি হলো শিল্পী কতোভাবে নিজেকে প্রকাশ করতে পারেন এরই শেষ ফল। এটি মোটেও শিল্পীর খেয়াল-খুশির সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, বরং শিল্পী উপায় বের করেন মাত্র। মূল প্রকাশের ভাষাটি সমাজের অবকাঠামোয় স্তরীভূত। সমাজের সচেতন ও অসচেতনতার মেলবন্ধন হলো ছবি। তাই ছবিই সমাজের আত্মা। ছবির গঠন যে বিষয়বস্তু থেকে ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে শিল্পী গ্রহণ করেন তা থেকে উদ্ভূত

ভাব নিয়েই ছবির জন্ম দেন। এই সম্পর্কিত সচেতনতা থেকে বোঝা যায়, বিশেষ যে তল থেকে শিল্পী ছবি তৈরি করবে তা সমাজ বিচ্ছিন্ন হলেও এর নিয়ন্ত্রক শিল্পী নিজে এবং নিজেকে কেন্দ্রে রেখে বস্তু বিশেষের সঙ্গে একমাত্রিক বাদানুবাদ থেকে তার ছবি জন্ম নেয়। এই একমাত্রিকতার দিকটির বিশে¬ষণ দেয়া যায় বিশ শতকের চিন্তা থেকেই। ইমানুয়েল কান্ট-এর ডিজইন্টারেস্টেডনেস বা নিষ্কাম দৃষ্টির তত্ত্ব বিশ্লে¬ষণ করে ব্রিটিশ সাইকোলজিস্ট অ্যাডোয়ার্ড বুলফ বলেছেন, বস্তুকে সঠিকভাবে অনুধাবন করতে দুটি বিষয় দরকার এবং কোনো একটি বস্তুকে এর প্রায়োগিক ব্যবহার থেকে দূরে মেনে নিয়ে একটি রোহিতকরণ প্রক্রিয়ার মধ্য থেকে বস্তুটি পর্যবেক্ষণ করা। দুই. এই রোহিতকরণের ফলে যে দূরত্ব জন্ম হয় ওই দূরত্ব থেকে অভিজ্ঞতার নতুন মাত্রা আবিষ্কার শুরু করা। তা ধনাত্মক একটি প্রক্রিয়া। এই চিন্তবিদ প্রথম প্রস্থ প্রক্রিয়ার দূরত্বের কম-বেশি হয় বলে দাবি করেন অর্থাৎ কখনো বস্তুর প্রতি নিষ্কামতার মাত্রা বেশি থাকে, কখনো কম। কান্টিয়ান দর্শনের নিষ্কাম দৃষ্টি দিয়ে দেখার যে নমুনা পাওয়া যায় এর প্রতিফলন উনিশ শতকের মধ্যবর্তী সময়ের মার্কিন প্রকাশবাদীদের মধ্যে দেখা যায়। ড্রইং, রঙ, টেক্সার ছবির অনুভূতির দিকে নির্দেশ করে অর্থাৎ এই উপাদানগুলো নির্দেশবাচক বস্তু। এর মানে, ছবি মনের অনুভূতি নির্দেশ করে। সংগঠনবাদিতার মূল মনন ইমানুয়েল কান্ট বর্ণিত পথে আবিষ্কৃত হয়। বস্তুর সংগঠন কিংবা বুনটের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত এর সভ্যতার শ্রেষ্ঠত্বÑ এমনটি মনে করেন ইমানুয়েল কান্ট। উপস্থাপিত বস্তুর অনুপস্থিতিতে যে সংগঠন রয়ে যায়, বুনট স্পষ্ট হয়Ñ কান্টের মতে তা-ই ওই সভ্যতার মৌল পাওনা। এই চিন্তা পাথেয় করে গড়ে উঠেছে আধুনিকতাবাদীদের বিতরণ প্রক্রিয়া। ক্যানভাসের পরিসর থেকে অথবা এর ক্ষেত্র থেকে বাদ পড়েছে বিষয়। প্রথমে পরিচিত বিষয়, পরে জ্যামিতিক বা বিমূর্ত বিষয়ও। এই বাদ দেয়ার মূল উদ্দেশ্য তলটিই প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে উপস্থাপন করা। রঙ হচ্ছে তলের মূল বিষয়, এমনকি টেক্টাইল ভ্যালুজ অর্থাৎ তলের চরিত্রও তা-ই মূল্যবান বলে বিবেচনা করা শুরু হয়। সৃষ্টিশীল দৃষ্টিতে বস্তু বা উপাদানটি অবলোকন ও বিশে¬ষণ করে ফর্ম সম্পর্কিত স্পষ্ট ধারণার ওপর ভিত্তি করে ড্রইং প্রস্তুত করার যে মৌলিক নীতি রয়েছে এর সার্থক প্রতিফলন ঘটেছে শিল্পীদের ছবিতে। মৌলিক নীতিগুলোর মধ্যে প্রথমেই দৃষ্টির পর্যবেক্ষণ ক্ষমতাটি সুদক্ষ করতে বলা হয়েছে। শিল্পীর দৃষ্টিশক্তি কতোটা সুদক্ষ তা বলার অবকাশ নেই। প্রতিটি বিষয় বা বস্তু শিল্পী এমনভাবেই দেখেন যে, বস্তুর অবয়বগত খুটিনাটি অংশগুলো তার মনের মধ্যে প্রোথিত হয়ে যায় এবং তা তুলি বা ছেনির আঁচড়ে নির্ভুলভাবে প্রকাশ পায়। ছবিকে বুঝতে হলে এর মূল নীতিগুলো বোঝা জরুরি। পাঁচটি মূল নীতি হলো দৃষ্টির পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা সুদক্ষ করা, নিজের কর্মনৈপুণ্যের উন্নয়ন সাধন করা, ছবির প্রচ্ছন্ন সৃষ্টিধর্মিতা অবলোকনকল্পে ফর্মের সুন্দর আকার-আকৃতি সম্পর্কে নিজের কর্মনৈপুণ্য বুদ্ধি করা, ফর্ম যে স্ট্রাকচার বা আকার-আকৃতির ওপর নির্ভরশীল তা সুস্পষ্টরূপে তুলে ধরার বিষয়টি অনুধাবন করা। এ পাঁচটি মূল নীতিতে যেসব তথ্য সন্নিবিশত হয়েছে এগুলো সাধারণ মানুষের আওতার বাইরেই থেকে যায়। যারা সাধারণ তাদের দেখার পালা। আর শিল্পীর দায়িত্ব হচ্ছে সাধারণ দর্শকের দেখানোর।

কারণ সাধারণ দর্শকের চেয়ে কোনো শিল্পী বহির্দৃষ্টিতে যেমন দেখেন তেমনই অন্তর্দষ্টিতেও দেখে থাকেন। ফলে তার দেখায় নুতন নতুন আকার, ফর্ম, রূপ ইত্যাদি উঠে আসে। মানুষকে নতুন করে বাঁচতে শেখায়, নতুন করে দেখতে শেখায়। মানুষকে যা নাড়া দেয়Ñ এমন বিষয় খুঁজে বের করাই হচ্ছে কোনো শিল্পীর দায়িত্ব। ছবি এক অপূর্ব বিদ্যা যা একমাত্র বিশেষ প্রতিভার দিয়েই নির্মাণ করা সম্ভব। সাধারণভাবে সেটিকেই ছবি বলা হয় যার বিকাশ অথবা প্রকাশ মানুষের বুদ্ধিবৃত্তির মাধ্যমে চালিত নয়, বরং একটি সুকুমার বোধ ও কল্পনা প্রতিভার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। মানুষের আদিমতম ছবিতে এর প্রথম জয়যাত্রার আনন্দ এবং উৎসাহের প্রভা ও তেজ দেখা যায়। জড়তা থেকে মুক্তি দেয়া আনন্দ ও ভোগের অধিকার দেয়া এবং মানুষকে ক্ষমতাবান করে তোলা, রস এবং রূপ সৃষ্টি বিষয়ে এই হলো ছবির মূল উদ্দেশ্য। আধুনিককালের অনেক সমালোচক ছবির তত্ত্বের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়েছেন। তারা শিল্পীর কাছে একটি নির্বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গির আশা করেছেন। ছবিটি মানুষ বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে অভ্যস্ত। প্রাচীন থেকে আধুনিকাল পর্যন্ত ছবিকে নানাভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। অবশ্য ছবির প্রকৃত সংজ্ঞা নির্ণয় খুবই দুরূহ যা মুহূর্তে মুহূর্তে মানুষের চিন্তা-ভাবনাকে গোলকধাঁধায় ফেলে। ছবি হতে পারে ধ্যান, ভাবনা, কল্পনা বা বিস্ময়ের প্রকাশ। বৈদিক ঋষিরা তাদের সুর্যমন্ত্রে বর্ণনা করেছেন, ছবি হলো ব্যক্তিত্বের লুপ্তি ও আবেগর প্রস্থান। আধুনিককালে মনস্তাত্ত্বিক গবেষকরাওÑ যেমন গেস্টাল্ট থিওরিতে বলা হয়ে থাকে, ছবি হলো মানব জীবনের আবেগ, অভিজ্ঞতা, অনুভূতি সবকিছুর মিলিত এক প্রত্যয় যা মানুষকে অপার্থিব জগতের দিকে নিয়ে যায়। অকাল্ট ম্যাজিক বা মিস্টিসিজম ইত্যাদি বিষয় প্রাচীন ছবির উৎসমুখ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ছবি অনুকরণ অর্থাৎ ইমিটেশনের প্রসঙ্গ সুপ্রাচীন। গ্রিক শব্দ ‘মাইমেসিস’ ইমিটেশন বা অনুকরণের অনুকরণ। আরেকটি তত্ত্বে ছবি হলো ইশ্বর তার পরিকল্পনা অনুযায়ী নিজস্ব প্রতিরূপ হিসেবে যে বিশ্ব সংসার তৈরি করেছেন ওই বিশ্ব সংসারেরই দ্বিতীয় প্রতিরূপ হচ্ছে ছবি। ছবির প্রেরণা হিসেবে তাঁর ধারণা ছিল, শিল্পী ছবি সৃষ্টির জন্য ঐশ্বরিক অনুভূতির ওপর নির্ভরশীল। শিল্পীর অন্তরে তাঁর নিজস্ব ‘এসেনশিয়াল ক্রিয়েটিভ স্পিরিট’টি অবিশ্বাস করলে এবং ঐশ্বরিক প্রেরণাজাত কোনো বিশেষ তাগিদ শিল্পীর ওপর ভর করলেই ছবি সৃষ্টি সম্ভব। ছবি দর্শনের ক্ষেত্রে এবং ছবির তত্ত্ব বিষয়ে প্রতীচীর দার্শনিকদের অবদান সুদূরপ্রসারী। গ্রিক দার্শনিকরা ছবিকে ভেবেছিলেন অসত্যের জগৎ হিসেবে। কেননা ছবি হচ্ছে ‘বিশেষ প্রতিভাস’-এর অনুকরণ। কিন্তু কেউ আবার ছবিকে সত্যের আধার রূপ ভেবেছিলেন অর্থাৎ ছবির মাধ্যমে মানুষ জীবনের এমন কয়েকটি শাশ্বত অথচ নির্দিষ্ট মূল্যবোধে পৌঁছে যা মানুষকে সত্যের কাছাকাছি নিয়ে যায়। অনুকরণ বিষয়ে ভিন্ন ধারণা হলো, অনুকরণ একটি ব্যাপক বিষয় অর্থাৎ শিল্পী নিছক অনুকরণ করে না, বরং এমনভাবে অনুকরণ করতে সচেষ্ট হয় যেখানে বিষয়টি শিল্পীর কল্পনার সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে একটি নতুন দিগন্তের উন্মেষ ঘটায়। ছবি হলো দৃষ্টিগোচরতায় পৃথিবীকে অনুভব করার এক আবেগময় কৌশল। ছবি একটি ব্যাপক শব্দ। এ কারণে অবস্থানগত বিভক্তি ও ছবির দর্শনে সীমারেখা নির্ণয় খুবই আপেক্ষিক ব্যাপার। কারণ ছবি কোনো হঠাৎ গজিয়ে ওঠা ব্যাপার নয়। মানব সভ্যতার ইতিহাসের সঙ্গে এর সম্পর্ক প্রায় অবিচ্ছেদ্য। সভ্যতার ঊষালগ্নে ছবি গুহামানবের জীবন সংগ্রামের অন্যতম প্রধান অবলম্বন হিসেবে কাজ করেছে। প্রাচীন মিসরীয় সভ্যতায় ছবি ছিল পারলৌকিক সাফল্যের চাবিকাঠি। মধ্যযুগীয় ধর্মীয় সমাজ ব্যবস্থায় ছবি ধর্মীয় প্রচারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। অন্যদিকে প্রাচ্য ঐতিহ্যে ইহলৌকিক নির্বাণ লাভের প্রয়োজনে ধর্মীয় কর্মকা-ের অঙ্গ হয়েছে ছবি কিংবা অন্যভাবে বলা যায়, ছবি শব্দটি প্রায় মানব সভ্যতার মতো সুপ্রাচীন। মানুষ যেদিন থেকে শিল্পচর্চা শুরু করেছিল ওইদিন থেকেই মানুষের সভ্যতার ইতিহাসের গণনা শুরু। প্রাচ্যের ঋষিদের ধারণায় ছবি প্রত্যক্ষরূপে বহ্মস্বরূপের সঙ্গে একাত্ম যার উৎস আনন্দে এবং পরিশেষও আনন্দে। প্রাচ্যেও ছবিতে ইন্দ্রিয় সংবেদনশীলতার সাহায্যে দর্শকমনে অতীন্দ্রিয় জগৎ আলোড়িত করে, মানুষের খ- ভাবনার অপূর্ণতাকে ভরিয়ে তোলে প্রতীক ও সাদৃশ্যের মাধ্যমে। অনুকরণবাদও প্রাচ্যের আচার্যরা সমর্থন দিয়েছিলেন। ভারতীয় নাট্যশাস্ত্রে অনুকরণ, অনুদর্শক, অনুকীর্তন শব্দের উল্লে¬খ রয়েছে। ছবির সূত্রেও বলা হয়েছে ‘যথা নৃত্যে তথাচিত্রে তৈলোক্যানুকৃতিঃস্মতঃ’। নন্দনতত্ত্বের আধুনিকতম মতবাদের স্রষ্টার মতে, ছবির সঠিক সংজ্ঞা হলো ছবি সংজ্ঞা বা প্রতিভা নির্ভর। ছবির উপস্থিতি চিন্তার জগতে নয়, বোধের জগতে। ছবি সত্যের সঠিক অনুলিপি নয়, প্রতীক মাত্র। ছবি এক প্রকার আত্মপ্রকাশ হলেও বিচার ও সঞ্চারের বিষয় হিসেবে শিল্পীর আত্মচরিত্র থেকে তা স্বতন্ত্র। ছবির শৈলীই শিল্পী। শিল্পীর চরিত্র যে কীভাবে শিল্পে প্রকাশিত হবে এর কোনো নির্দিষ্ট সাধারণ নিয়ম নেই। শিল্পীর ছবিতে আধুনিকতার অন্য এক মাত্রা আছে যেখানে সমন্বয় সাধনাই সব নয়। আধুনিক মনন ও জীবনের মধ্যে আছে অনেক তমশালীন গহ্বর। অনুদ্ঘাটিত ওই রহস্যময়তা সৃষ্টি জগৎকে আলোড়িত করেছে ছবি। প্রকৃতির উপস্থিতিকে সম্পূর্ণ অস্বীকার না করেও ছবি বিমূর্ততার দিকে নিয়ে যাওয়ার প্রবণতা বর্তমান প্রজন্মের শিল্পীর মধ্যে দেখা যায়। অভিব্যক্তিমূলক বিমূর্ততার একটি ধারায় নিঃসর্গ বিমূর্তায়িত হচ্ছে আবার জৈবিক কোনো রূপবন্ধ ভেঙে ভেঙে বিমূর্ততার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বিমূর্ততার সঙ্গে প্রকৃতিগতের মূল পার্থক্য এই যে, আঙ্গিক-প্রস্থান হিসেবে ততোটা প্রতিবাদের প্রেরণায় এর সৃষ্টি ও বিকাশ নয়। এর দুর্বলতার ক্ষেত্র সেটিই যেখানে প্রতিষ্ঠিত আঙ্গিক গ্রহণ করা হয়েছে। তা অনুপ্রেরণায় নয়Ñ নতুনত্ব ও অভিনবত্বের প্রত্যাশায়। এর কারণ হয়তো ছবির আত্মপরিচয় সন্ধানের পথপরিক্রমাতেই নিহিত আছে। ছবির রস আস্বাদনে শিল্পীও সাধারণ দর্শকের যে চেতনার পার্থক্য তা তার অভিজ্ঞতার ঘাটতি থেকেই হয়ে থাকে। পদ্ধতিগত শিক্ষা, অভিজ্ঞতা, মননশীলতা ও সৃজনশীল মনের জারকরসে যে কোনো বস্তু বা ভাবকে পরিবর্তন, পরিবর্ধন, পরিমার্জনের মাধ্যমে নানানভাবে উদ্ভাসিত করে তুলতে পারেন কোনো শিল্পী। এই প্রক্রিয়ায় স্বাভাবিকভাবে কোনো দর্শকের অংশগ্রহণ বাস্তব কারণে দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। এ ক্ষেত্রে কোনো দর্শকের যে ব্যাপারটি নিতান্ত প্রয়োজন তা হচ্ছে শিল্পকর্ম দেখার অভিজ্ঞতা। ছবি যেহেতু একটি দৃশ্যমান ব্যাপার সেহেতু দেখার চোখটি তৈরি থাকা চাই। আধুনিক ছবিতে অভিনব বস্তুর সঙ্গে পরিচিত হতে কোনো দর্শকের চোখটি যেমন তৈরি হয়ে ওঠে তেমনি তার অভিজ্ঞতার ঝুলিটিও ধীরে ধীরে পূর্ণ হয়ে ওঠে। দর্শকের অভিজ্ঞতার ভা-ারটি যতোই স্ফীত হতে থাকে ততোই ছবির আপাত অদ্ভুত বস্তুগুলোর সামনে থেকে অদৃশ্য মায়াবী পর্দা সরে যেতে থাকে। তখন আর বিমূর্তচিত্র অজানা গ্রহের কিম্ভূত বস্তু মনে হয় না, আধুনিক ছবি মনে হয়, চিরচেনা ছবি।
: এ তো কঠিন গল্প। আমাকে বরং তুমি ছবি এঁকে দেখাও।
: কিসের ছবি।
: আমার ছবি।
: ছবি আঁকতে কাগজ, রঙ, তুলি, ইজেল, বোর্ডÑ কতো আয়োজন। তারপর...।
: তারপর কী!
: যার ছবি আঁকা হবে, আমাকে সে ভালোবাসে কিনা তা জেনে নিতে হবে। তবেই হবে ছবি।
: আমি তো তোমাকে অনেক ভালোবাসি। তুমি যা জানো এর চেয়ে বেশি।
: পরীক্ষা দিয়ে পাস করতে হবে।
: পরীক্ষা দিলে নির্ঘাত ফেল করবো। তবে ছবি আঁকার কায়দা শিখিয়ে দিতে পারি।
: তুমি শিখিয়ে দেবে ছবি আঁকার কায়দা?
: কেন নয়। আমার সাদা শাড়ির আঁচলে আঁকবে তোমার ছবি। আমার লম্বা চুলের বেণীর ডগা তোমার তুলি। বৃষ্টির জল আর তোমার মনের সব রঙ মিশিয়ে হবে জলছবি।
: কী আশ্চর্য তোমার ছবি আঁকার কায়দা। আমাকে অবাক করলে তুমি। এভাবে কখনো ভাবিনি! ভালোবাসার পরীক্ষায় পাস করেছ।
: ছবি আঁকার কায়দা তোমার পছন্দ হয়েছে?
: হ্যাঁ হয়েছে। তবে তোমার ছবি নয়, শাড়ির আঁচলে নদীর বুকে আকাশের ছবি আঁকি।
: না, তা তো চিরচেনা ছবি হবে।
: তাহলে কিসের ছবি আঁকবো?
: আমার দুঃখের ছবি এঁকে দাও।
: দুঃখের ছবি বুঝি আঁকা যায়! বরং নীল পদ্মের ওপর প্রজাপতির পাখার ছায়ায় তুমি ঘুমিয়ে আছÑ এঁকে দিই।
: ওই ছবির দরকার নেই। আমি তো রাজার মেয়ে নই!
: তুমিও রাজার মেয়ে।
: মিথ্যা কেন বলো তুমি? তোমার মুখে মিথ্যা মানায় না।
: তাহলে ঘোড়ার ছবি আঁকিÑ নীল অভ্রের ডানা।
: এঁকে দাও ঘোড়ার পিঠে তুমি।
: আমি তো রাজপুত্র নই।
: তুমিও রাজপুত্র। শিল্পীরা ছবির রাজপুত্রÑ দ্য ব্লু রাইডার। ওই চেয়ে দেখো নীল মেঘের ভেতর থেকে ছুটে আসছে।
: নীল অশ্বারোহী!
: হ্যাঁ, নীল অশ্বারোহী। তুমিই তো অশ্বারোহী।
: আর তুমি?
: ওই নীল অশ্বÑ তোমার ছবি!

 

বাংলাদেশের শাখা শিল্প ও শঙ্খ সমুদয়

বিলু কবীর

 

 


আমরা সাহিত্য বলতে স্বভাবত এক ধরনের লেখা বা পাঠ রচনা বুঝি। কিন্তু ‘সাহিত্য’ শব্দটি ব্যুৎপত্তিগত পটভূমিকায় ব্যাখ্যা করতে গেলে জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত সব বিষয়ই সাহিত্য। ‘সাহিত্য’ শব্দটি এসেছে ‘সহিত’ থেকে। অতঃপর যা কিছু আমাদের জীবনপ্রবাহের সঙ্গে প্রত্যক্ষে-পরোক্ষে, জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে প্রভাবক ও প্রভাবিত তা-ই আসলে সাহিত্য। এই যদি হয় বাস্তবতা তাহলে কি সাহিত্য ওই জটিলে না গিয়ে প্রধান ও সরল প্রশ্ন দাঁড়াতে পারে যে, কী সাহিত্য নয়। এই অর্থে শামুক-ঝিনুক-শঙ্খ বিষয়ে সব আলোচনা এক কথায় ‘শঙ্খ সাহিত্য’ বললে বেমানান তো হয়ই না, বরং বেশ মানিয়েই যায়। তা করতে গেলে অবাক হয়ে দেখতেই হবে, সামান্য গুগলি-কড়ির মতো আপাততুচ্ছরা আমাদের সৌন্দর্য বোধ, লোকবিশ্বাস, ধর্মাচার, রূপকথা, মিথ-পুরাণ, চারুশিল্প, রাজনীতি, অর্থনীতি, খাদ্য অভ্যাস, চিকিৎসা, নির্মাণ, গদ্য-পদ্য ইত্যাদিতে কী ব্যাপক পরিমাণে জায়গা দখল করে আছে।

ঝিনুক, শঙ্খ প্রাণী হিসেবে বিস্ময়কর। এর বহিরাবরণ যেমন কঠিন, ভেতরটিও তেমনই নরম থলথলে। অতো নরমটি সুরক্ষা দিতেই কী প্রকৃতি এর বাইরে অমন শক্ত পাঁচিল করে দিয়েছে! এর দৈহিক গড়নে রকমফের, রঙ-বর্ণে বিস্ময়কর চারু সৌন্দর্য তো রয়েছেই। কিছু ক্ষেত্রে কয়েকটির বৈপরীত্য ও স্বকীয়তা বিদ্যমান। যেমন এর প্রতিটিরই খোলস শক্ত। কিন্তু সব খোলসের দরজায় পাল্লা নেই। বিশেষ করে এটি ডাঙার শামুকে দেখা যায়। শামুক যখন আত্মরক্ষার্থে বা ঘুমুনোর জন্য ওই দরকারি পাল্লাকে ছিটিয়ে দেয় তখন ভেতর থেকে এমনভাবে খিল এঁটে নেয়ে যে, সে ছাড়া অন্য কেউ তা খুলতে পারে এমন কার সাধ্যি আছে! কারো কারো আছে চিংড়ির মতো লম্বা লম্বা নলো হাত-পা। কারো আছে পা বিহীন চেটো জাতীয় চলৎশক্তি। কারো শিং আছে, চুলের মতো এঁটো ঝিল্লি-ইন্দ্রিয় আছে, কারো বা নেই। কারোর খোলসজুড়ে কতো রকেমের কাঁটা, কারো গা তেলা-মসৃণ। কেউ বহু কোণা, পেছনটি সুচালো। কেউ কোণাহীন, পেছনটি দস্তুর মতো বোঁচা, ঢ্যাপা গোলাকার। কারো কারো বহু বর্ণ, কারো এক বর্ণ, কেউ নিতান্তই বিবর্ণ। এগুলো বিস্ময়কর, ভয়ঙ্কর ও অভয়ঙ্কর।
ঝিনুক, শামুকের চরিত্র-চারিত্র্য ও স্বভাবের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলা সাহিত্যে এর অনেক প্রয়োগ দেখা যায়। বিশেষ করে লোকছড়া, ধাঁধা, সংগীত ও বাগধারায় শামুক-ঝিনুক-শঙ্খের একাধিক উল্লেখ মেলে। যেমন ‘মামারাই রাঁধে-বাড়ে/ মামারাই খায়;/ আমরা গেলি পরে/ ঘরে দুয়ের দেয়।’ যে প্রজাতির শামুকে দরজায় পাল্লা পদ্ধতি আছে সেগুলোর আচরণগত বৈশিষ্ট্য নির্দেশক ওই ধাঁধাটি বাঙালির লোকছড়ায় সমৃদ্ধি, মূল্যবান ভাব সম্পদ ও প্রাকৃতিক কুশীলবের সৌন্দর্য তুলে ধরেছে। ‘হাটে মা টিমটিম/ তারা মাঠে পাড়ে ডিম/ তাদের খাড়া দুটো শিং/ তারা হাটে মা টিমটিম।’ ডাঙার আটপৌরে শামুক নিয়ে অজ্ঞাত প্রাচীন কবির রচনায় ওই পুরনো লোকছড়াটি বাঙালি মাত্রেরই মুখস্থ। শতাব্দীর পর শতাব্দী বাঙালিদের উচ্চারণের ছান্দসিক কোষে ছড়াটির প্রথম পঙ্্ক্তি ‘হাটে মা টিমটিম’ পরিবর্তিত হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘হাট্টিমা টিমটিম’। ফলে এর অর্থ উদ্ধারের ব্যাহতিটাই জটিল হয়ে পড়েছে। মূলত এটি শামুক নিয়ে সুরচিত একটি লোকছড়া। এক ধরনের স্থলচর একরঙা শামুক যা বয়েসী বাঙালির গেঁও জীবনের পরিচিত না থেকেই পারে না। এই শামুকগুলো আকারে সামান্য বড়। এর খোলস পেছনের দিকে চোখা ও রঙ সাদা-বেগুনে ছোপ। এগুলো টিমটিমে গতিতে স্যাঁতসেঁতে মাঠে চলে-ফেরে। অতি মিনমিনে গতিতে যখন এগুলো চলে তখন এর মাংসল মাথায় মাংসেরই দুই প্রস্ত শিং দৃষ্টিগোচর হয়। বলাই বাহুল্য, এগুলোর মাঠেই ডিম পাড়ে। তবে মাঠের মধ্যে নয় ধারে-কিনারে, নিচু ডোবা, আড়ালে-নিভৃতে এবং পরিমাণে ঢের। শামুকের শ্লথের গতির সঙ্গে ধীরগতি তুলনীয় বলে বাংলা বাগধারায় ‘শম্বুক গতি’ বলে একটা কথার চল রয়েছে। ‘সাগরপাড়ে কুড়াই ঝিনুক মুক্তা মেলে না। কতো লোকের আনাগোনা তুমি এলে না।’ বয়সী বাঙালির কে না জানে, ভালোবাসার বক্তব্যে সমৃদ্ধ এই সাগরিকা ঝিনুক।
‘শাঁখের করাত’ বাঙালির আরেকটি চিরায়ত ও বহুল পরিচিতি বাগধারা। এটি সামাজিক-রাজনৈতিকসহ বহু ক্ষেত্রে উদাহরণ। টিপ্পনি, কটাক্ষ হিসেবে উচ্চারিত ও ব্যবহৃত হয়। অন্য যে কোনো করাতের চেয়ে শাঁখারি শিল্পীদের ওই করাতের বিস্ময়কর ব্যতিক্রম হলো, এটি উল্টালেও কাটে, টানলেও কাটে। দেখতে অর্ধচন্দ্রের মতো ওই করাত দড়িতে ঝুলিয়ে দুই হাতে ধরে কোনো শাঁখারি শঙ্খের গয়না ইত্যাদি বানাতে ওই করাত ব্যবহার করে থাকেন।
বাংলার ভৌগোলিক বাস্তবতার প্রকৃতিতে অনেক পাখি আছে। এগুলোর নামকরণ হয়েছে তাদের চরিত্রের প্রধান চারিত্র্যের পেিরপ্রক্ষিতে। মাছরাঙা,
কাঠঠোকরা, গাঙশালিক, মৌটুসী, কাদা খোঁচা প্রভৃতি। এমনই তিনটি পাখির নাম হলো শামুকভাঙা, শঙ্খচিল ও শামুকখোট। শক্ত ঠোঁটে এগুলো শামুক ভেঙে খায়। এগুলোর ঠোঁট শক্ত, বড় ও সুচালো। ‘বানরের গলায় মুক্তার মালা’ বাঙালির আরেকটি সামাজিক অর্থবাচক বাগধারা। এর সঙ্গে শঙ্খ-শামুকের যোগ রয়েছে।
কোনো কোনো শামুক-ঝিনুকের খোলসের দরজা আছে, পাল্লা নেই। কোনো কোনোটায় পাল্লা আছে। কিন্তু যে কথা বলার জন্য এখানে এতোটা
ইনানো-বিনানো তা হলো, এক কিছিমের ঝিনুক আছে যেগুলোর শরীরের পুরো খোলসটাতেই দরজার দুটি সমান পাল্লার মতো। একেবারে সমান দুটি বাটির কৌটাসাদৃশ। বন্ধ করলে কারো সাধ্য নেই তা খোলে। আবার যেগুলোর খোলসে দরজা আছে, পাল্লা
নেই সেগুলোর দরজা খোলা বটে কিন্তু এর মধ্যে খোলসের মালিক, মানে গেরস্ত একবার যদি ঢোকে তাহলে কারো ক্ষমতা হবে না সেটিকে বের করা যদি না নিজ থেকে বের না হয়।
শঙ্খ-শামুক-ঝিনুকের অনেক গুণাগুণ রয়েছে। ‘গুণাগুণ’ বলতে এগুলোর মধ্যে গুণ তো আছেই, অগুণও রয়েছে। হ্যাঁ, এটি মনে রেখেই শব্দটির ব্যবহার করেছি। ‘পঁচা শামুকে পা কাটা’ বলে একটি অতি প্রাচীন বাগধারা রয়েছে বাংলা সাহিত্য বাস্তবতায়। এর মধ্যে অতীতের সমাজচিত্রের অনেক বিশ্লেষণযোগ্য সংবার্তা রয়েছে। জলাভূমির প্রাচুর্য, শামুক-ঝিনুকের আধিক্য, বাঙালির নগ্ন পায়ে হাঁটা-চলা, নিচু জমিতে চাষাবাদ, পচা শামুকে পা কাটলে এর ক্ষতে অধিক ভোগান্তি হয়। আরো অপকারিতা আছে এর। অসাবধানতাবশত বেশি চুন খেয়ে ফেললে জিভ মুখ পুড়ে যায়। বাঙালির একটি বাগধারাই রয়েছে ‘চুন খেয়ে গাল পুড়েছে দই দেখে ভয়’। এর মানে, গোয়াল পোড়া গরুর সিঁদুরে মেঘে ভয় আর কী! ব্যাখ্যা সামান্যই। কিন্তু উদাহরণ প্রয়োগ এবং সামাজিক অর্থব্যঞ্জনা গভীরভাবে জীবন স্পর্শী। কালী দাস প-িত নাকি খাল-বিল-ডোবা হেঁটে পার হওয়ার সময় জুতা পরতেন, অন্য সময় খালি পা। কেন! কারণ জলের মধ্যে কোথায় যে পচা শামুক আছে তা

উল্লেখ করা দরকার, পৃথিবীতে প্রায় ৮ হাজার ৫০০ প্রজাতির শঙ্খ-ঝিনুক রয়েছে যেগুলোর সবই সামুদ্রিক। এর বাইরে রয়েছে স্থলবাসী ও অন্যবিধ জলাশয়ের ওই জাতীয় অমেরুদ-ী। এগুলোর খোলস পাত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো বা হয়। যেহেতু এখানে কথা উঠেছে সেহেতু জানা দরকার, আকৃতিতে প্রকৃতিভেদে এগুলোর লম্বায় ০.১ থেকে ১৩৭ সেন্টিমিটার পর্যন্ত দীর্ঘ হয়ে থাকে। আর ওজন? পুঁথির একটি দানার মতো ক্ষুদ্রাকার থেকে শুরু করে ৩০০ কেজি পর্যন্ত ওজন হতে পারে একটি ঝিনুকের। এর মধ্যে কয়েকটি বছরে ৫০ কোটির মতো ডিম পাড়ে। তা থেকে ঘণ্টা দশেকের মধ্যে বাচ্চা বা বাবুসোনারা জন্মগ্রহণ করে। এগুলোর ৬ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত বাঁচে বলে তথ্য পাওয়া যায়। কোনো কোনোটির চোখ-মাথা আছে, কোনোটির নেই। সবচেয়ে রোমাঞ্চকর বিস্ময়ে ভরা হলো, এগুলোর যৌনজীবন বা আতœউপগত হওয়ার বিষয়টি। এক্ষেত্রে কেঁচোর সঙ্গে এর মিল রয়েছে। কেঁচোর যেমন নারী-পুরুষ হয় না, এগুলোরও তা-ই। কেঁচো যেমন আত্মসঙ্গমী, নিজে নিজের সঙ্গে রতিরমণে মিলত হয়, শামুক-শঙ্খও তেমনই। তাই এগুলোকে বলা হয় এক লিঙ্গ বা বহু লিঙ্গ। একই দুই বলে একাই উভয়। আবার উভয়ই এক বলে একা! নিজেই নিজের বউ আবার নিজেই নিজের স্বামী। প্রকৃতি এগুলোর এই বৈধতা দিয়েছে। উভয়লিঙ্গ, জেন্ডার ভারসাম্য।

শাঁখ বা ঝিনুক যে প্রাকৃতিক মুক্তার উৎপাদক এ বিষয়টি বাংলার নিসর্গ, সাহিত্য, বাণিজ্য এবং যাকে বলে ঐতিহ্যের জন্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এছাড়া শাঁখ বা শঙ্খ দিয়ে যেসব গয়না প্রস্তুত করা হয় এর যে কারুমূল্য, কুটির শৌল্পিক ঐতিহ্য এ বিষয়টি পৃথক গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হওয়ার দাবি রাখে। আবার ধর্মীয় বিশ্বাস-অবিশ্বাস ও পৌরাণিক মিথের সঙ্গে এবং আমাদের সনাতন ধর্মে শঙ্খের অনেক যোগ রয়েছে। এমনকি রাজনৈতিক ক্ষেত্রে, আরও উল্লেখ করে বলতে গেলে ১৯৪৭ সাল-পূর্ব স্বরাজ আন্দোলনে শঙ্খানাদি বা শঙ্খধ্বনির খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহারিক ভূমিকা ছিল।
শাঁখের গয়নায় গৌরবের মুক্তা ব্যবহার করতে আমাদের আনন্দের শেষ থাকে না। কিন্তু মুক্তায় আসলে ঝিনুকের কতোটা দুঃখ-কষ্টের ফসল তা যে এর কতোটাই বেদনার লালা, কতোটাই অন্তর্বেদনার জমাট অস্থির পাথর এ কথা ক’জন ভাবে! ঝিনুকের কোনো স্বাভাবিক প্রসব নয় মুক্তা। দুর্ঘটনাবশত ঝিনুকের দেহের ভেতরে যখন কোনো শক্ত বস্তু বিঁধে (বালিকণা, ধারালো পাথরকুচি, হাড় বা অন্য কিছু আটকে যায়) তখন ঝিনুকটি আহত ও বেদনাদগ্ধ হয়। বেশ কিছুদিন ওই ক্ষত নিয়ে যন্ত্রণাসহ অনেক কষ্ট করে চলে। তখন ওই বস্তটি উগড়ে দেয়ার জন্য তার অঙ্গারাভ্যন্তরেই একটি প্রক্রিয়া চলতে থাকে। বিঁধে যাওয়া দানাটির আকর যতো বড় হয়, ঝিনুকের ওই প্রক্রিয়াটিও ততো দীর্ঘদিনের হয়ে থাকে। এ প্রক্রিয়াটি হলো ঝিনুকের ক্ষতস্থানে এক ধরনের লালা নিৎসরিত হয়ে ওই কণা বা দানা আবৃত করে করে একটা গোলাকার কিংবা প্রায় গোলাকার কঠিন পি- তৈরি করে এবং এক সময় স্বয়ংক্রিয়ভাবেই তা ঝিনুকের দেহ থেকে বিযুক্ত হয়। এটিকেই আমরা মুক্তা হিসেবে কুড়িয়ে পাই। এর মসৃণ ওপর পিঠে সুন্দর মনোহারিত্বের একশেষ। ঈষৎ গোলাপি দুধেল হয় এর চকচকে শরীর। বাংলাদেশে এক ধরনের নীলাভ বহু মূল্যবান মুক্তা কদাচিৎ পাওয়া যায়। বিল অঞ্চলের এক বিশেষ প্রজাপতির সিঞ্চন এই নীল পাথরের উৎপাদক। আধুনিককালে যে মুক্তার চাষ হয় তাও পদ্ধতিগতভাবে একই। এটি নিরীহ ঝিনুকগুলোর ওপর অমানবিক অত্যাচারেরই এক নিষ্ঠুর অর্জন। মানুষ কৃত্রিমভাবে ঝিনুকের ভেতরাঙ্গে ক্ষত সৃষ্টি করে ওই ক্ষতে বালিকণা, পাথরকুচি বা ছোট কাচের টুকরো ঢুকিয়ে ঢুকিয়ে দেয়। এবার নিরূপায় ঝিনুক যন্ত্রণাকতর হয়ে যথানিয়মে বেদনার লালায় ওই বর্জ্যটি মুড়িয়ে মুড়িয়ে মুক্তা নামের মণি নির্মাণ করে।

শাঁখার বিষয়টিও আলাদাভাবে আলোচিত হওয়া সমোচিত। শঙ্খ কেটে শাঁখা বা এক ধরনের বিশেষ চুড়ি বানানোর যে প্রাচীন শিল্প, শাঁখারি শিল্প হিসেবে তা বাঙালির অতি পুরনো একটি লোকারুর সাক্ষী। সনাতন হিন্দু ধর্মে ওই শাঁখা-সিঁদুরের বিশেষ সামাজিক বিষয়ের অভিব্যক্তি রয়েছে। মোটা সাদা শঙ্খ কেটে ওই চুড়ি তৈরি করা হয়। শঙ্খর ডায়া যতো চিকন বা মোটা হয়, তা চাক চাক করে কাটলে চুড়ি ততো চিকন বা মোটা হয়ে থাকে। যখন তা খুব চিকন নলের মতো তখন কাটলে কব্জির চুড়ির বদলে আঙুলের আংটি হয়। ওই কাটাকুটির জন্য যে করাতটি ব্যবহার কা হয় এরই ঐতিহ্যবাহী নাম ‘শাঁখের করাত’। করাত লোহার। কিন্তু শাঁখ কাটার কাজে ব্যবহৃত হয় বলে ওই রকমের নাম। ওই করাতের বৈশিষ্ট্য আগেই বলেছি যেতেও কাটে, আসতেও কাটে। এভাবে কাটার পর এতে নকশা আঁকা হয়। ওই নকশা আঁকতে নরুনের মতো ছোট বাটালি এবং এর অনুপাতে হাতুড়ি ব্যবহার করা হয়। এ থেকেই বাঙালি হাতির দাঁতে নকশা খোঁদাইয়ের কাজে এক ধাপ এগিয়ে গিয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। বিশেষত মানকা হাতির কচি দাঁতে নকশা কাটা এবং শাঁখা অলঙ্করণের ধারণাটি একই। অবিভক্ত ভারত আমলের আসাম সংলগ্নতা ব্যাহত হওয়ার পর বাংলার ওই দ- শিল্পের উঠতি কারুশিল্পের বিকাশ সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়। পলিশ করা শাঁখায় আলো পড়লে এক ধরনের ঈষৎ গোলাপি-নীলচে রঙধনুর তির্যক মৃদুতা খেলে যায়। হিন্দু নারীর সিঁদুর ও শাঁখা পরার বিষয়টি তার সধবা অবস্থার পরিচায়ক। বয়েসি নারীর হাতে শাঁখা ও কপালে সিঁদুর না থাকলে বুঝতে হবে তিনি বিধবা। আর কম বয়সীদের ক্ষেত্রে ওই শাঁখা ও সিঁদুরের অনুপস্থিতির মানে হলো মেয়েটি অবিবাহিত। এর সঙ্গে কুসংস্কার ও প্রথা বিশ্বাসের যোগ রয়েছে যে, বিবাহিত নারীর পক্ষে শাঁখা না পরা এবং বিধবার পক্ষে শাঁখা পরা অমঙ্গলের সূচক। বিশেষ করে বিবাহিতার হাত শাঁখাশূন্য হলে স্বামীর আয়ুক্ষয় বা অন্যান্য অমঙ্গল হয় বলে পৌরাণিক মিথ রয়েছে। শাঁখা নিয়ে আরো কিছু লোকবিশ্বাস বাঙালির প্রাচীন জীবন থেকে চলে আসছে। গর্ভবতী গাভী এবং সদ্য প্রসূত বাছুরের গলা একপ্রস্থ সুতায় এক চাকতি শঙ্খখ- বালার মতো করে ঝুলিয়ে দিলে গাভী-বাছুরের জাদু-টোনা, ছুৎ, নজর লাগা, ভূত-প্রেতের আশ্রয়ী ইত্যাদির প্রতিরোধ হয়। হারের লকেটের মতো করে ঝুলিয়ে দেয়া ওই শঙ্খখ-কে শঙ্খবচলয় বলা হয়। আরো একটি গ্রামীণ নাম আছে, মনে করতে পারছি না। অন্যদিকে নকশি কাজ করা সোনার পাত গেঁথে দিয়ে ঝিনুকের লকেট তৈরির শিল্পকৌশল বাঙালি মণিকারের বহু পুরনো সোনারু কর্ম। শঙ্খের পলার ওপর কাজ করা স্বর্ণের পাত বসানো কিংবা স্বর্ণের ওই পাতে মিনা করাও বাঙালির প্রাচীন স্বর্ণ-শঙ্খ শিল্পের ঐতিহ্য। ওই দক্ষতা প্রসঙ্গে এ কথা বলা যেতে পারে, আমাদের মণিকাররা স্বর্ণকারের অন্য নাম যে ‘শেঁকরা’ এটিও এসেছে ‘শাঁখারি’ থেকে। এ শাঁখারির মাতৃশব্দ হলো শঙ্খ  শাঁখ  শাঁখা। শাঁখারি হচ্ছে ওই জাত বংশ যারা শঙ্খজাত গয়নাপত্র বানিয়ে পুরুষ পরস্পরায় জাতি ব্যবসা হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। তাই বলা যেতে পারে, বাঙালি হিন্দু জাতিভেদ সৃষ্টির ক্ষেত্রে শঙ্খের মাটি, স্বর্ণ, জাল, লোহা, তাঁতের মতো একটি বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। যেমন শাঁখারি চুনারি বা চুনে তারা বংশীয় পদবিপ্রাপ্ত হয়েছেন মূলত শঙ্খ কিংবা ঝিনুক থেকে। সুন্দরবন অঞ্চলে মুসলিমদের মধ্যে ‘শামুক খোটা’ নামে একটি জনগোষ্ঠী রয়েছে। ওই গোত্রের মানুষ সুন্দরবন থেকে শামুক, ঝিনুক, শঙ্খ সংগ্রহ করে জীবিকানির্বাহ করে থাকে। যেমনটি বাওয়ালিরা গোলপাতা, মাওয়ালিরা মধু ও মোম সংগ্রহের কাজ করে থাকেন ঠিক ওই রকম।
শঙ্খধ্বনি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্ম বিশ্বাসের বিষয়। গায়ত্রী সন্ধ্যায় শাঁখ বাজানো গৃহস্থের জন্য বিশেষভাবে মাঙ্গলিক। ওই শঙ্খবিধানির বিষয়টি এতোটাই বিশ্বাসের সঙ্গে পালন করা হয় যে, তা এখনো অলঙ্ঘনীয় ধর্মাচার হিসেবে পরিগণিত। হিন্দু ধর্মের কোনো কোনো দেব-দেবী ওই শঙ্খ বা মহাশঙ্খ ধারণ করেন। যেমন বিষ্ণু ভৈরবি, কামাখ্যা, বরাহ, কুর্ম, সূর্যসহ কেউ কেউ। বিশেষ করে বিষ্ণু শঙ্খ, ক্রি, গদা ও পদ্ম ধারণ করেন বলে তার একটি নামই হয়েছে ‘শঙ্খক্রিগদা পদ্মধারী’। বিয়েতে ওই শাঁখ বাজিয়ে নবদম্পতির জীবনের সামগ্রিক মঙ্গল নিশ্চিত করা হয়। যখন ওই শঙ্খনাদকে আশীর্বাদ হিসেবে স্বর্গীয় বিবেচনা করা হয় আবার বাতাসের বিপরীতে মুখ দিয়ে ধরে শাখের পেছনের ছিদ্রে কান পাতলে যে সোঁ সোঁ গভীর আওয়াজ শ্রুত হয় তখন তা নাকি সমুদ্রের নাদ বা ক্রন্দন। এ বিষয়ে লোকবিশ্বাস নির্ভর কিংবদন্তি বা লোককাহিনীর চল রয়েছে যে, এই শঙ্খশব্দ নাকি শাঁখের সমুদ্র ব্যঞ্জনার হাহাকার রোল। আসলে শঙ্খ খোলসের মধ্যে কয়েকটি প্যাঁচ থাকে। এর ভেতর দিয়ে গতি সম্পন্ন বাতাস নির্গত হতে বাধা পায় বলেই এমন গোঙানির শব্দ হয়।


রাজনৈতিক ক্ষেত্রে শঙ্খের ব্যবহার বিষয়ের অর্থটি নিশ্চয়ই বেশ কৌতূহল উদ্দীপক। সনাতন ধর্মের বিভিন্ন দেব-দেবীর শঙ্খ ধারণের যে পৌরাণিক ঘটনা তা মূলতই রাজনীতি ও যুদ্ধবিগ্রহ সংক্রান্ত তা বলাই বাহুল্য, রাজনীতিতে রাজনীতিই। যুদ্ধ, জয়, রাজ্য, সিংহাসন, স্বর্গবিচ্যুতি এসবও অতি অবশ্যই রাজনৈতিক বিষয়। আবার তাদের যুদ্ধক্ষেত্রে শঙ্খধ্বনিও আজকের কিউগলেরই নামান্তর। যা সর্বতভাবেই রাজনৈতিক ঘটনা তা যতোই হোক না কেন, পৌরাণিক।
যাহোক, ১৯৪৭ সাল-পূর্ব ব্রিটিশবিরোধী যে ‘স্বরাজ’ আন্দোলন এতে ভারতীয়রা অভিনব প্রতীকী ভাষায় সাবধানতা অবলম্বনে নির্দেশিত ছিল। সব পরিবারে যখন ওই মহল্লায় কোনো গোড়া পুলিশ বা ইংরেজ সৈনিক তল্লাশির জন্য কিংবা রেইট করতে ঢুকবে তখনই গৃহস্থ শঙ্খ ও কাঁসর বাজাবে যেন তাদের বাড়িতে কোনো উৎসব পার্বণের কাজ চলছে। আর ওই শঙ্খধ্বনি শোনার সঙ্গে সঙ্গেই লুকিয়ে থাকা স্বরাজ কর্মী অথবা তাদের আশ্রয়দাতারা দ্রুত সাবধান হয়ে থাকেন। বিশেষ করে স্বরাজ কর্মীরা সঙ্গে সঙ্গে সরে পড়তে বা যথাযথ আতœগোপন করতে পারেন।


রাজনৈতিক ছাড়া অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও শঙ্খ, শামুক, ঝিনুক ও গুগলির উল্লেখযোগ্য ভূমিকা যে ছিল এ কথা বেশি বয়সীদের জানা থাকলেও নতুন প্রজন্মের বাঙালির কাছে জানা না থাকারই কথা। এ অঞ্চলে ধাতব মুদ্রা ও কাগুজে নোটের চল শুরু শুরুর আগে এবং দ্রব্য বিনিময় প্রথা উঠে যাওয়ার পর, মানে, ওই দুটি যুগের মাঝখানে একটা দীর্ঘ কাল ছিল। তখন টাকা বা মুদ্রা হিসেবে কড়ি ব্যবহার করা হতো। কানাকড়ি মূল্য নেই’, ‘কড়ি দিয়ে কিনলাম’, পকেটে টাকাকড়ি নেই’, ফেলো কড়ি নাও মাল’, পাঁচকড়ি বাবু’ এসবই সাক্ষ্য দেয় এক সময় কড়িই ছিল টাকা বা পয়সা।
ওই কড়ি এক প্রকার প্রাকৃতিক শঙ্খ বা ঝিনুক ছাড়া অন্য কিছুই নয়। পরে কড়ি খেলার যে চল হয় তাও কড়ি মুদ্রা আমলে। এই কড়ি খেলা ছিল ওই আমলের জুয়া।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আরো ভূমিকা রয়েছে ঝিনুক বা শঙ্খার। আগে মানুষ জলাভূমি থেকে ঝিনুক সংগ্রহ করে রাখতো। আবার স্থান বিশেষে সংশ্লিষ্ট কারখানার প্রতিনিধি নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে গৃহস্থ বা সংগ্রাহকদের কাছ থেকে ঝিনুক সংগ্রহ করে তা দিয়ে বোতাম, চুলের কাঁটা ইত্যাদি তৈরি করতো। এক সময় আমাদের পোশাক শিল্প লোহার টিপ বোতাম এবং ঝিনুকের গোল ও চৌকা দুই ছিদ্রের বোতামের ওপর নির্ভরশীল ছিল। শাঁখারি, চুনারি ও শামুকখোটাদের জীবিকার প্রধান কাঁচামালও ছিল শঙ্খ বা ঝিনুক এ কথা আগেই বলেছি। কালে কালে চুনারিদের ঘরে ঘরে ঝিনুক পোড়ানো হাঁপর বা চুলার প্রচলন বিলপ্ত হয়। কৃষিতে অপরিণামদর্শী কীটনাশক প্রয়োগের ফলে বিভিন্ন জলাশয়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত হতে থাকে ঝিনুক-শঙ্খর বিবিধ বংশ। আবার বৈজ্ঞানিক ও খামার পদ্ধতিতে মাছ, হাস-মুরগি ইত্যাদি চাষের পরিপ্রেক্ষিতে খাদ্যদ্রব্য হিসেবে শামুক, ঝিনুক ও শঙ্খর ওপর চাপও পড়ে বেশ। ফলে যে কোনো অঞ্চলে যে কোনো জলাশয়ে প্রচুর ঝিনুক-শামুক পাওয়ার ক্ষেত্রে ভাটা পড়তে থাকে। এর পরিণতি এখন চরমে। তাই চুন তৈরিতে চুনারিদের ঝিনুক জোগাড় ও ব্যবহারের পদ্ধতিই পাল্টে গেছে। এখন দেশের দক্ষিণাঞ্চলে সমুদ্রপাড় ছাড়া সুন্দরবন এলাকায় সবচেয়ে বেশি চুনা উপাযোগী ঝিনুক পাওয়া যায়। ওইসব অঞ্চলে (বাগেরহাট, সাতক্ষীরা) বড় মহাজন ভাটা করে ঝিনুক গোড়ানোর বিরাট কারখানা বসিয়েছেন। সেখান থেকে বিভিন্ন জেলায় ট্রাকভরে উৎপাদকরা পোড়া ঝিনুক ক্রয় করে নিজ নিজ জেলায় নিয়ে কেবল ঘোটাঘুটির কাজ করে পাইকারি ও খুচরা দামে কাজ থাকে।
ঝিনুক যে কেবল শাঁখারি, প্যাঁকড়া, চুনারি ও শামুক থেকে সৃষ্টির পটভূমিকা প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে তা নয়। বাংলাদেশের কোনো কোনো অঞ্চলের নামকরণ হওয়ার ক্ষেত্রেও ঝিনুক-শামুক বিশেষ অবদান রয়েছে শাঁখারীবাজার, ঝিনাইগাতি, ঝিনাইদহ, শাঁখবাড়িয়া, মুক্তাগাছা প্রভৃতি। চুনারুঘাটের নামকরণের পেছনেও ঝিনুকের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে। এছাড়া ঝিনুক, শামুক, শঙ্খ, কড়ি ইত্যাদির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশের অনেক গ্রামের নাম নিশ্চয় পাওয়া যাবে। শাঁখারীপট্টি, চুনপাড়া এসব নাম তো সিংসন্দেহে মিলবে।


ঝিনুক, শামুক, শঙ্খের দেহ গড়নই কেবল বিচিত্র সুন্দর নয়, এর রঙ মনোহারি অপূর্ব বর্ণিল। দুটি ক্ষেত্রেই এর রকমফের বিস্ময় উদ্রেককারী সুন্দর। যে প্রজাতি, রঙ, মিঠা বা নোনা পানির হোক না শঙ্খ, এমনকি যে আকৃতিরই হোক না কেন, একটি ক্ষেত্রে এর অপরিহার্য মিল দেখা যায়। প্রতিটির খোলস খুব শক্ত এবং ভেতরটি ভীষণ নরম ও নাজুক। আবার খোলসের ক্ষেত্রে মিল হলো এগুলো একরঙা-বহুরঙা, কাঁটাযুক্ত-কাঁটামুক্ত, লম্বা-বেঁটে, ঢোপা-টেপা, গোল-তেকোণা, ভোঁতা-সুচালো যে আকারেরই হোক না কেন, ওই খোলস হয় আবশ্যিক ভাবেই প্যাঁচ বিশিষ্ট। ওই প্যাঁচ একাধিক এবং অনেক ক্ষেত্রে অগণতি।
শামুক ভাঙা, শঙ্খচিল এই পাখি দুটির নাম যে শঙ্খের সঙ্গে বেশ একটা সম্পর্কিত এ কথা আগেই বলেছি। বিষ্ণু দেবতার কথাও বলা হয়েছে যে, তার আরেক পৌরাণিক নাম হলো শঙ্খক্রিগদা পদ্মধারী। এছাড়া বাংলা সাহিত্য ও শব্দ ভা-ারে কিছু উচ্চারণ রয়েছে যা শঙ্খের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। যেমন শঙ্খকার, শঙ্খচিল, শঙ্খচূড়া, শঙ্খচুনি, শঙ্খবলয়, মহাশঙ্খর তেল, সুতাশঙ্খ, শঙ্খবিষ, শঙ্খমালা, শঙ্খনীল, শঙ্খমুখ। এর প্রতিটি বিষয় ভিত্তি করে ব্যাপক আলোচনার সুযোগ রয়েছে। এ সুযোগটি এখানে বিশেষ বিবেচনায় গ্রহণ করা গেল না। যদি আলোচনা করা যেতো তাহলে নিশ্চয়ই আমাদের কাছে আরো স্পষ্ট উপভোগ হতো যে, শঙ্খ কতো বহুরৈখিক আঙ্গিকে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে অর্থবহ বিষয় হিসেবে জেঁকে আছে। শঙ্খর যে বস্তুমূল্য এর বাইরেও বহুভাবে সাহিত্যিক ও রূপকাল্পনিক ভাবমূল্য রয়েছে। এ জন্য ওই কথা বললে অত্যুক্তি হবে না, শঙ্খ বাহ্যত যতো সামান্যই হোক না কেন তা লোকপৌরাণিক, আর্থসামাজিক এবং রীতিমতো ভাবসাহিত্যিক সম্পদ হিসেবে বহুরেখায় অত্যন্ত মূল্যবান। আসলেই শঙ্খের মাহাত্ম শঙ্খের চেয়েও অনেক। শঙ্খ বাহ্যত যা, আসলে এর চেয়ে বেশি।

 

মডেল : ঐশ্বর্য্য রহমান
পোশাক ও স্টাইলিং : সহজ টিম
মেকোভার : ক্লিওপেট্রা বিউটি স্যালন
ছবি : শোভন আচার্য্য অম্বু

 

পাহাড়ি রাজকন্যা

 

 

গল্পটা এক পাহাড়ি রাজকন্যার। রাঙামাটির তবল ছড়িতে তার জন্ম। যেখানে পাহাড়ের কোল জুড়ে বাস করে কর্ণফুলির শাখা নদী। ভোর বেলায় ঘুম ভাঙতেই জানালায় এসে দাঁড়াত মেয়েটি। দেখত পাহাড় আর নদীর আলিঙ্গন। আকাশের ঘননীল আর গাছের সবুজ পাতা, রঙিন বুনোফুল তাকে রঙ চিনিয়েছে। বাতাসে শুকনো পাতার মর্মর আর পাখির গান তার ভেতরের শিল্পসত্বাকে জাগিয়ে দিয়েছে। তাই তিনি হাতে তুলে নিয়েছেন রঙ- তুলি। তিনি শিল্পী কনকচাঁপা চাকমা। তার বেড়ে ওঠার গল্প, জীবন যাপন, শিল্পভাবনা ইত্যাদি নানা বিষয়ে কথা বলেছেন তিনি। কথোপকথনে ছিলেন লাবণ্য লিপি

 

লাবণ্য লিপি: আপনার ছেলেবেলার কথা বলুন। কেমন ছিল সে দিনগুলো?
কনকচাঁপা: আমার জন্ম রাঙামাটির তবল ছড়িতে। সেখানেই কেটেছে আমার শৈশব- কৈশোর। কী সুন্দর ছিল সে দিনগুলো। আমাদের বাড়ির সামনে দিয়েই বয়ে গেছে কর্নফুলির একটা শাখা। প্রতিদিন ঘুম ভাঙতেই আমি জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়াতাম। নদী, পাহাড়, গাছপালা, আকাশ সব মিলিয়ে সে কী অপরূপ দৃশ্য! মনে হতো যেন স্বর্গের খুব কাছাকাছি আছি আমি। পাহাড়ের গাছে গাছে কত রঙ বেরঙের বুনোফুল ফুটত। একেক ঋতুতে একেক রঙের প্রাধান্য থাকত। সাদা রঙের সদরফ ফুল, হলুদ বিজু ফুল, লাল টকটকে জবা, মাদাঙা, বুনো অর্কিড আরো কত কী! সামনেই তো পয়লা বৈশাখ। এই সময়ে আমরা নানা রঙের সেসব ফুল তুলে মেতে উঠতাম বিজু উৎসবে। এখনকার মতো মানুষ আর প্রকৃতির মধ্যে এত ব্যবধান ছিল না। আমাদের পাশ দিয়ে হেঁটে যেত সাদা হাতি, হরিণের দল, বানর, বুনো হাঁস, বনমোরগ, বনবেড়াল, বাজপাখি। কী বিশাল ছিল বাজপাখির ডানা! আমি তো মনে করি প্রকৃতির এই ভার্জিন বিউটিই আমার ভেতরের শিল্পস্বত্ত্বাকে জাগিয়ে তুলেছে। আদিবাসী নারীদের বৈচিত্রময় জীবন, সাজ সজ্জা- আমাকে অণুপ্রাণিত করেছে।

লাবণ্য লিপি: ছেলেবেলা থেকেই তাহলে আপনার আঁকাআঁকির শুরু?
কনকচাঁপা: সত্যি বলতে তাই। তখন তো আর আমি ছবি আঁকা শিখিনি। কিন্তু সুন্দর কিছু দেখলেই আমার তা আঁকতে ইচ্ছে করত। আমি রঙ পেন্সিল আর কাগজ নিয়ে বসে যেতাম। আর তা দেখেই কিন্তু এসএসসি পাশ করার পর আমার বাবা আমাকে চারুকলায় ভর্তি করে দেন। সেকান থেকে আমি ফাইন আর্টস- এ সাস্টার্স করি ১৯৮৬ সালে। তারপর আমি ১৯৯৩- ৯৪ সালে আমেরিকান পেন- স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে আলিয়ান্স ফেলোশিপ করি।

লাবণ্য লিপি: আপনার ছবিতে আদিবাসী নারীর প্রাধান্য থাকে। এটা কী আপনি নিজে আদিবাসী নারী বলে?
কনকচাঁপা: হ্যাঁ, তা তো বটেই। আমি নিজে আদিবাসী এবং বিশেষ করে নারী বলেই হয়তো আদিবাসী নারীদের বঞ্চনার জায়গাটা খুব ভালো করে জানি এবং বুঝি। ছেলেবেলা থেকে দেখছি, পরিবারের যে কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেন পুরুষেরা। অথচ নারীরা সব কাজেই সমান শ্রম দিচ্ছেন। এখন অবস্থা অনেকটাই বদলেছে। তবু নারীরা সমঅধিকার এবং মর্যাদা পাননি। এ অবস্থা দূর করার জন্য সবার আগে দরকার শিক্ষার। পাশাপাশি পুরুষদের সহযোগিতা। তাদের পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে নারীদের কাজ করার সুযোগ এবং স্বীকৃতি দিতে হবে। আমি নিজে আমার স্বামী খালিদ মাহমুদ মিঠুর কাছে সেই সহযোগিতাটুকু পেয়েছি বলেই আজ এই জায়গায় পৌঁছাতে পেরেছি বলে মনে করি। তবে সমাজে নারীদের অবস্থাও কিন্তু এখন অনেকটাই বদলেছে। আমি আমার ছবিতে সেটা দেকাতে চেষ্টা করি। আমার ছবিতে দেখবেন আলো- আঁধারের খেলা থাকে। অর্থাৎ আলো আসছে।

 

লাবণ্য লিপি: শুনেছি আপনি সপরিবারে ভেজিটেরিয়ান...
কনকচাঁপা: আমি এবং আমার ছেলে- মেয়ে নিরামিশভোজী। মিঠু অবশ্য মাছ মাংস খায়। আমি বরাবরই প্রাণী হত্যার বিপক্ষে। তাই মাছ মাংস খাই না। আমার ছেলে তো দুধ এবং দুধের তৈরি কোনো খাবারও খায় না। ওর ভাবনা হচ্ছে, গরুর দুধে ন্যায্য অধিকার তার বাছুরের। বাছুরকে বঞ্চিত করে সেটা মানুষ খায়। এটা অন্যায়। তাই সে খায় না। এই যে আমরা মাছ মাংস খাই না, তাতে তো আমাদের কোনো সমস্যা হচ্ছে না। বরং আমরা বেশ ভালো আছি। প্রকৃতিকে ভালোবেসে, প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশেই মানুষ ভালো থাকতে পারবে; প্রকৃতিকে ধ্বংস করে নয়। যে কোনো ধ্বংসই মানুষকে শুধু বিপর্য়ের মুখেই ঠেলে দেবে, ভালো কিছু বয়ে আনবে না।

লাবণ্য লিপি: আপনার ছবিতে বিভিন্ন সামাজিক অন্যায় অনিয়মের বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ লক্ষ করা যায়।
কনকচাঁপা: হ্যাঁ, যে কোনো ধ্বংস, অন্যায়- অনিয়ম আমাকে ব্যথিত করে। আমার ভেতরে রক্ত ক্ষরণ হয়। আমি শিল্পী। যে কোনো অন্যায়ের প্রতিবাদ আমি রঙ- তুলিতে করি। ধর্মীয় রেসারেসি আমাকে কষ্ট দেয়। বৌদ্ধ বিহার জ্বালিয়ে দেয়া হলো। পুরে গেল বুদ্ধের মূর্তি। আমি পোড়া বুদ্ধের ছবি এঁকেছি। এটা আমার এক ধরণের প্রতিবাদ। আমরা তো পোড়া বুদ্ধ দেখতে চাই না! বুদ্ধ তো শান্তির কথা বলে, মঙ্গলের কথা বলে। তার ওপর হামলা কেন! এই যে মানুষ নির্বিচারে গাছ কাটছে। এতে পরিবেশ তার ভারসাম্য হারাচ্ছে। পশু- পাখি বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। আমি অবশ্যই এর বিরুদ্ধে। পাহাড়ি জমি নিয়েও যে বিরোধ, আমি মনে করি সরকারের হস্তক্ষেপে সেটারও একটা সুষ্ঠু সমাদান হওয়া দরকার।

লাবণ্য লিপি: একজন শিল্পী হিসেবে আপনি নিজেকে কতটা স্বার্থক মনে করেন?
কনকচাঁপা: শিল্পীরা আজন্ম তৃষ্ঞার্ত। আমি কাজ করে যাচ্ছি। কতটা সার্থক সে কথা সময় বলবে। তবে পেয়েছিও অনেক। দেশি বিদেশি অনেক সম্মাননা পেয়েছি। এগুলো আমার দায়িত্ব আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। আদিবাসী পরিবারে জন্ম নিয়েছি বলে আমি গর্ববোধ করি। তবে যখন আমি বিদেশে যাই, তখন আমি পুরো বাঙালি সমাজেরই প্রতিনিধিত্ব করি।

 

ছবিঃ ফয়সাল সিদ্দিকি কাব্য 

শিল্পী শেখ মোহাম্মদ সুলতান: এক অনন্য উজান

প্রফেসর ড. মো. আমিরুল মোমেনীন চৌধুরী

 

 

‘দ্য বেস্ট প্লেস ইন দ্য ওয়ার্ল্ড টু লিভ ইন বাংলাদেশ।’ এই সবুজ বদ্বীপের শুকনো কাঁকর বিছানো, কখনো জল-কাদায় একাকার উঠানÑ যেখানে শৈশবে বেড়ে উঠেছে এক অনন্য উজান, লুকিয়ে আছে প্রসবকাতর মায়ের নীল চিৎকার। এ সবুজ বদ্বীপই হচ্ছে বিশ্ব সংস্কৃতির ও ঐতিহ্যের ক্ষেত্রে এক সমৃদ্ধ অঞ্চল। এই সমৃদ্ধির রথে চড়ে যে যার গন্তব্যে পৌঁছাতে চায়। অবশ্য তাদের উপলব্ধি বার বার টেনে নিয়ে গেছে শিকড়ের সন্ধানে। সেখানে প্রোথিত রয়েছে তাদের গৌরব-উজ্জ্বল অতীত, তাদেরই অগ্রজ। যে মৃত্তিকায় তাদের অনন্ত ছোটাছুটি সেই মধুর মৃত্তিকায় উত্থিত তাদেরই আরো এক অগ্রজ স্বমহিমায় অন্য এক আত্ম পরিচয়ে।
সময়ের পার্থক্যের কারণেই এ অসম্ভব উদার ক্ষ্যাপা বোহেমিয়ান শিল্পীর সঙ্গে প্রথম দেখা হয় ১৯৮১ সালে ঢাকায় বাংলাদেশ কলেজ অব আর্টস অ্যান্ড ক্রাফটসে ভর্তি হওয়ার পর। প্রাথমিক পরিচয়ে মাত্রা অতিরিক্ত কোহল ক্লান্ত শারীরিক কম্পনের মধ্যে বুঝতে পারি, এই দুনিয়াটি যারা বাসযোগ্য করে যেতে চায় এর অন্তরালে থেকেও এমন কিছু বিস্ফোরক জীবনের দায় বয়ে যায়। তা আমাদের মতো সাধারণ পতঙ্গ সদৃশ্য মানবের ডানা ছেঁটে দেয়। কাহিল করে তার ইনার স্ট্রেনথ দিয়ে। এই শিল্পী শেখ মোহম্মদ (এসএম) সুলতান। তিনি রাজমিস্ত্রির একমাত্র সন্তান। কৈশোরের আঁকা অসাধারণ স্কেচ ও পেইন্টিং অসাধারণ দক্ষতায়মুগ্ধ নড়াইলের জমিদারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও পৃষ্ঠপোষকতায় কলকাতার সরকারি আর্ট কলেজ পর্যন্ত আসার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন।


এর পরবর্তী অধ্যায়Ñ সুলতানের জীবনসিঁড়ি অন্য আর পাঁচ-দশ-পাঁচশ’ চিত্রশিল্পীর মতোই খ্যাতি ও স্বীকৃতির ডামাডোলে যথানিয়মে একেক ধাপ করে পর্যায়ক্রমে ইউরোপ-আমেরিকার আর্ট অ্যাপ্রিসিয়েশনের দরজা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। সঙ্গে সঙ্গে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যে সুলতান তাঁর চিত্রকলার ডিঙিতে চড়ে চূড়ান্ত উজানে যেতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন। শিল্পমোদীরা ধরেই নেন, এসএম সুলতান প্রতিষ্ঠানের চিরনির্দিষ্ট আর্ট গ্যালারি, স্টুডিও, মিউজিয়াম বা আর্কাইভগুলোয় নিজেকে সচেষ্ট রাখবেন, ক্রমেই বন্দি করে ফেলবেন অন্য পাঁচ খ্যাতিমানের মধ্যে। ঠিক এখান থেকে আমাদের বিস্ময়ের শুরু। এখানেই বোধের বিস্তৃতি। তথাকথিত ধর্তব্যের সম্পূর্ণ বাইরে, শিল্পের অত্যাধুনিক নিরীক্ষাভূমির অকপট স্রোতে ভাসিয়ে দিলেনÑ যেন ওই অহেতুক সভ্যতা, কোলাহলের সভ্যতা, লোক দেখানো সভ্যতা, যুদ্ধবাজদের সভ্যতা থেকে নিজেকে গোপন করে নিলেন, লুকিয়ে ফেললেন আজন্ম সেই মাটির বিষাদ বুকে নিয়ে।


সুলতান সম্পূর্ণ অন্তর্গত এক আত্মজৈবনিক সাধনার আহ্বানে সাড়া দিলেন। তা ছিল মধ্য পঞ্চাশের পাশ্চাত্যের অস্থিরতা। বাংলার সামাজিক ভাগ্য প্রকাশে তখনো মন্বন্তরের দগদগে ক্ষতগুলো অক্ষত থেকে গেছে। ইউরোপের সংস্কৃতি রাজপাট ফর্মালিজমের অধিগ্রহণে নতুন এক কালচারাল রিউম্যাটিজমে আক্রান্ত হয়েছে। মহান দুই স্প্যানিশ শিল্পী গোইয়া ও পাবলো পিকাসোÑ উভয়েই কালেক্টরদের সর্বগ্রাসী ব্যবসায় ঐতিহাসিক সব দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছেন। একটি ছবিকে ১৫৬ টুকরো করে নিলাম ডাকা শুরু হয়ে গেছে। ইউরোপীয় অর্থগৃন্ধু সময় কণ্টক গোইয়ার ‘দানব’কে ডাইনিংরুমে সাজিয়ে দিয়েছে অনায়সে। পিকাসোর ‘নৃশংসতা’ ডিজাইনের গ-িতে হাঁপিয়ে উঠেছিল যেন এমনই কোনো সময়। শুধু সুলতানই নন, সারা পৃথিবীর যূথচারী ক্লান্তি তর্পণকারী মানুষ একটু করে বুঝতে শুরু করেছিল সংস্কৃতির মূল নিয়ামক তার মানবীয় উত্থানে। জীবন বিছিন্ন রঙরেখা, সুরছন্দ, গদ্য-পদ্য আসলে আরো নির্বাপিত জনবিক্ষোভের অ্যান্টিবায়োটিক হিসেবে অন্তর্গত স্বপ্নের গভীরে কাজ করে। ঠিক সেই মধ্য পঞ্চাশে কেউ কোথাও বুঝতে না পারলেও আজকের বিশ্ব শিল্পমন্দায় হ্যাকনিড জীবন ভাষ্য ও দার্শনিক যৌনসম্ভার যেন লুপ্তপ্রায় সুররিয়ালিস্টদের তৎকালীন বিযুক্তির দুর্ভাগ্যে কাজ করে গিয়েছিল তা বোঝা সম্পন্ন হয়েছে। পুরনো পাতা ওল্টাতে বড় বেশি কাতর হতে হয় ওই কারণেই। কেরুয়াকের ‘অন দ্য রোড’ কিংবা গিনসবার্গের ‘ফাউল’ পড়লে তেমনই বোঝা যায় উৎসব, সিনেমা, ইমেজ, কল্পনায় ওরিয়েন্টাল জলপ্রপাত কেন এতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছিল। মনে রাখা যেতে পারে, সার্ত্রে যে মধ্যরাতেই কড়া নেড়ে থাকুক না কেন, অ্যাবস্ট্রাকশন তথা অ্যাম্বিগুইটির চূড়ান্ত লোক উচ্ছ্বাস, সেই অষ্টপ্রহরের তর্পণ-অর্পণগুলো, এমনকি বিযুক্ত হওয়ার সর্বাপেক্ষা প্রাচীন ও একই সঙ্গে আধুনিক প্রয়োগ কল্পগুলো এই এশিয়া প্রান্তরের ঘাস-জমিন, জল- পাহাড়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। কালোনিয়াল সংহারবাদী মানসতা নিপাত যাচ্ছে। দৌড়ে বেড়াচ্ছে সাহেব-সুবো, স্পন্সর, কমিটি, গবেষক, বায়ার, প্রডিউসর ও দালাল-ফড়িয়াবাজ।


আমরা প্রত্যেকেই চেয়েছিলাম কিছু একটা ঘটে যাক। সব ছেড়ে চলে যাই। মিশে যাই, বিলিয়ে দিই নিজেকে, মিলিয়ে দিই সাধারণ্যে। বোহেমিয়ান না-ই বা হলাম, অন্তত একটিবারের জন্য লোকে বলুক, ‘আহা, কী করে ফেলল! এমন ধন-মানে উৎসর্গকৃত জীবনটি ছেড়ে বিনা বাক্য ব্যয়ে বেরিয়ে পড়ল? আমাদের উৎকণ্ঠা, পাপবোধ, প্রত্যাখ্যান ও মমতা মাখানো বোধে মননের নিহিত পরিক্রমায় সামান্য শক্তিটুকুও সঞ্চয় করে উঠতে পারিনি। অথচ প্রবল ইচ্ছায় অনাগত সম্ভাবনার দিকে নিষ্ফল চেয়ে থাকছি। এক ব্যর্থ ধ্বস্ত, ক্লেদাক্ত সময়ের অবগুণ্ঠনে শুধু কাতর হয়েছি। আবেগ নিরপেক্ষ হয়েই লিখছিÑ যদি একটিবারের জন্যও পারতাম! পারতাম নিজেকে ছিন্ন করতে, টুকরো টুকরো করতে সেই বোধের সমীপে, শিল্পের যূপকাষ্ঠে যদি পারতাম পা রাখার জায়গাটুকুকে তোয়াক্কা না করে গলা বাড়িয়ে দিতে?


শিল্পী দোমিয়ের কারাবাস থাকাকালীন চিঠিতে লিখেছিলেন তার কালি ফুরিয়ে যাওয়ার নিদাঘ যন্ত্রণার্ত মুহূর্তের কথা। আমরা বুঝতে পারলাম আধুনিকতার চিত্রলেখেটি কেমন করে সহজ হয়ে যায়। পরবর্তীকালে অর্থাৎ ওই গত দশকেই শিল্পী সালভাদর দালির অন্ধকার ক্যাসেলে জীবনটিকে সংকীর্ণ যাপনের মধ্য দিয়ে যে আরেক ফলিত বাস্তবতার সূত্রপাত ঘটল এর বিশ্লেষণ কোন ভাষায় করা যাবে? আমরা খেই হারিয়েছি। মাল্টিমিডিয়ার জয়যাত্রার বিজ্ঞাপনী দুনিয়ার মেগাস্টার দালি যখন ক্যাসেলের মধ্যে ঢুকে পড়লেন তখন কোনো পাপবোধ, কোনো বিচ্ছিন্নতা তাকে মদদ দিয়েছিল। কেনই বা নিঃসঙ্গ এক জীবন চর্চার অস্থির উন্মেষের কথা বললেন দালি? যদি বলা হয়, এও এক পোস্টমোর্ডানিস্ট ভেল্কির চরকিচক্কর, পালিয়ে বাঁচাÑ তাহলে!
আমার বিষয় এটি নয়, বিষয় এক অনন্য উজান শিল্পী সুলতানের ছিটকে যাওয়া, ফিরে আসার দিনপঞ্জিটি আরেকবার খতিয়ে দেখা। হ্যাঁ, ইউরোপ ভ্রমণকালে যখন তিনি খ্যাতির তুঙ্গে তখন মানুষ উত্তেজিত, অস্থির রোমকূপগুলো প্রায় নিয়ন্ত্রণ করে ফেলে। ঠিক যে সময় আর কাঁটা দেয় না শরীরে, জীবনে খ্যাতির মধ্যগগনÑ এমন একটা মুহূর্তেই স্বেচ্ছানির্বাসন নিলেন সুলতান। ক্যাসেলের অন্ধবৈচিত্র্য বা নির্ধারণের চর্চা, সাধনা নয়। তিনি ফিরে এলেন তার উৎসে। জীবনের শুরু যে মৃত্তিকায় সেই বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রাম নড়াইল, নিজের গ্রামÑ যে পবিত্র ভূমিতে দাঁড়িয়ে আছি। তাকে নিয়ে একটি কথাও হলো না বা তিনি বলার সুযোগ দিলেন না। ফিরে এলেন আন্তর্জাতিক শিল্প ময়দানের গৌরবময় দিনগুলো অস্বীকার করে, ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে।
‘ইউরোপ থেকে ফিরে আসার পর সেখানে পাওয়া যাবতীয় যশ ও খ্যাতি আমি পুরোপুরি ভুলে যেতে চেয়েছিলাম। তথাকথিত স্বীকৃতিগুলো আমার গ্রামে নিয়ে আসতে চাইনি, চাইনি এ সম্পর্কে কেউ কিছু জানুক। যখন আমার পুরনো সহপাঠী বা বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করি তখন আমার মনে হয়, আমি যেন আবার সেই শৈশবে প্রত্যাবর্তন করছি। যখন তাদের সঙ্গে কথা বললাম তখন বুঝলাম, তাদের চিন্তা-ভাবনা ও স্বপ্নগুলো যেন আমারই খুব কাছাকাছি। এভাবে আমি যত আমার গ্রামের প্রত্যন্তে জড়িয়ে পড়লাম ততই ঘনিষ্ঠ হতে শুরু করলাম কৃষকদের সঙ্গে। দেন আই ফেলট মাইসেলফ আন্ডার গো অ্যা ডিপ ট্রান্সফরমেশন। আমি নিজেকে আবিষ্কার করলাম। ইউরোপ থেকে তুলে আনা সব আদব-কায়দা ও ভাবনা-চিন্তা অনেক পেছনে পড়ে থাকল। আই বিকেম কমপ্লিটলি হোল ইন টিউন উইথ মাই পিপল অ্যান্ড মাই কান্ট্রি। দিস ট্রান্সফরমেশন গিভ মি ডিপ ফিলিংস অফ পিস অ্যান্ড কনটেনটমেন্ট।’
ফিরে এলেন সুলতান। আশ্রয় নিলেন বুনো গাছগাছালিতে ভরা পরিত্যক্ত স্থাপত্যে। না, কোনো পরিপাটি ঘরদোর তিনি সাজাতে পারেননিÑ যেন নৈঃশব্দ অথবা কোনো শূন্য সময়ের বিনীত জাগরণে একটি করে ভাষার মুকুলগুলো ফুটিয়ে তুললেন তার নিরবচ্ছিন্ন অভিজ্ঞতার মাঠে-প্রান্তরে। অথচ আমরা আছি একই রকম আদি, অকৃত্রিম। অ্যাগ্রারিয়ান ভিজনকে আয়ত্ব করার জন্য বইপত্র ঘেঁটে প্রবন্ধের পর প্রবন্ধ সাজিয়ে, বাকবিত-ার জাবর কেটে, সেমিনার-সভা-সমিতিতে আপ্রাণ বজায় রাখতে চেষ্টা করছি অন্তঃসারশূণ্য র‌্যাডিকালিজম। চেষ্টা করছি বোঝাতে কত বেশি অনুগত আমরা প্রগতির নাড়ির টানে। একবার ভেবেও দেখছি না ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বার্থমগ্নতা এবং শ্রেণি-নিবন্ধ আমলাতান্ত্রিক গণঅহঙ্কারেও আমাদের মর্মান্তিক মানবিক দুর্গতি কি নিদারুণ এক পচন সম্ভব অনুষ্ঠান ঘটিয়ে তুলেছে।


উধাও সন্ধানী এই শিল্পী আপাত বিযুক্তির ভরে নিজেকে সেই জীবন চর্চা ও শিল্পকৃতির ঐকান্তিক যোগসূত্রে চিহ্নিত করলেন। তার জীবন শুরু হয়েছিল ইউরোপিয়ান মাস্টারদের প্রভাব সম্বল ক্যানভাসের রঙরেখায়। তিনি সরে এলেন সম্পূর্ণ জ্যান্ত এক বাস্তবতার অধরায় ধরা দিতে। তার নিশ্চয়ই জানা ছিল, বাস্তবতার সরলতা বিষয়ের বিতর্ক দুনিয়াব্যাপী শৈলী সংস্কারে প্লাবণ ঘটিয়ে ফেলেছে। তার এও জানা ছিল, বিমূর্ত চিত্রপটের বহুমাত্রিক প্রকাশ নিয়ে জল্পনা-কল্পনা সম্প্রতি এক নতুন মাত্রা সংযোজন করেছে। তবু তার আত্মগত বিপন্নতাই শুধু নয়, দুর্গতিক্লিষ্ট গ্রামের সাধারণ মানুষের সঙ্গে অকৃত্রিম সখ্যে নেমে আসেন শিকড়ের দিকে কোনো যৌথ অবচেতনার ঐশ্বর্যের গভীরে।
এভাবেই শুরু হলো এসএম সুলতানের গত ৩০-৩৫ বছরের কৃচ্ছ্র সাধন, শিল্পযোগযাত্রা। অযুত ক্যানভাসের সরসতায় রঙের বৈচিত্র্য, রেখার বিচিত্র সম্পাদনা, পরীক্ষা-নিরীক্ষার সর জটিল ছন্দে চিত্রিত করলেন আধুনিক শিল্পকারুতন্ত্রের এক তৃতীয় ভূবন। বহু মূল্য বিদেশি রঙ পরিহার করে তিনি বেছে নিলেন দেশজ পটুয়াদের গাছগাছালি, শিকড়-বাকড় থেকে উদ্ভূত রঙ। স্বল্প খরচে বেশি ও বড় কাজ করতে হলে অনেক দ্রব্য ব্যবহারই শ্রেয়। তিনি বলেন, ‘প্রথম দিকে আমি ঝুটের কাপড়ে শিরিষের আঠা ব্যবহার করতাম। কিন্তু দেখা গেল বর্ষায় ক্যানভাসগুলোয় ড্যাম্প ধরে যাচ্ছে। তখন গাবের আঠা ব্যবহার করতে শুরু করলাম। তা জেলেরা জালের জন্যে ব্যবহার করেন।’
মধ্য পঞ্চাশে দেশে ফিরে সুলতান প্রাথমিক স্তরে অসম্ভব কিছু ল্যান্ডস্কেপ আঁকতে শুরু করেন। মানুষ সেখানে ততটা গ্রাহ্য নয়Ñ যেন জীবন আনন্দীয় প্রাতিস্বিক বোধ ও শস্য ক্ষেত্রের জৈবিক উপমা সমাহার। প্রগলভ উষ্ণতায় শিল্পী তার কাক্সিক্ষত চিত্রগুলোয় আরোপ করেন এক বাদামি সভ্যতা। তিনি বলেন, ‘তুমি দেখবে, ব্রাউন ইজ দ্য ডমিনেন্ট কালার। কেননা ব্রাউন হলো মাটি, পৃথিবীর ঘরবাড়ির ও কৃষকের রঙ। এই বাদামি রঙ ও কার্ভড ফর্মস ক্রিয়েট অ্যা ফিলিং অফ ইউনিটি ইন মাই পেইন্টিংস। বলা হয়, বাংলাদেশ হলো পৃথিবীর সবচেয়ে গরিব দেশ। কিন্তু তাই-ই বা হবে কেন? এখানে কৃষকের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম সঞ্চালিত হয়ে আসছে স্মরণাতীতকাল ধরে। তেভাগা আন্দোলন, কৃষক বিদ্রোহ, নীল বিদ্রোহ, নানকার বিদ্রোহ, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রাম, কত কী!। অনেকে আমাকে জিজ্ঞাসা করে, এই আধুনিক যুগে কেন আমার ছবিতে কৃষকদের এত সেকেলে করে আঁকি...। তাদের বলি যে তারা আজও প্রাচীন। তারা আজ কী করছে? দিস কালটিভেশন অফ ল্যান্ড ইজ প্রিমিটিভ ওয়ার্ক। সো দেয়ার এন্টায়ার অ্যাকজিসটেন্স ইজ প্রিমিটিভ। দেখো, এসব আদিম মানুষকে বেছে নিয়েছি আমার ছবির বিষয় হিসেবে। কেননা দে আর আউটসাইড দ্য টেরর অফ আওয়ার প্রেজেন্ট ওয়ার্ল্ড। বৃহৎ শক্তির কসমোপলিটন শহরগুলোয় আজ কী হচ্ছে, কীভাবে তারা নিজেদের নিউক্লিয়ার হলোকাস্টের জন্য তৈরি করছে। আমার বিশ্বাস, এসব শহর অভিশপ্ত হয়ে পড়েছে। একদিন তারা নিজেকে ও নিজেদের ধ্বংস করে ফেলবে। আমি ভেবে দেখেছি, আমার ছবির এসব মানুষ এসব ধ্বংসের দিকে আত্মহননের দৌড়ের থেকে অনেক বাইরে। আই ফিল দ্যাট দে উইল অ্যা নিউক্লিয়ার হলোকাস্ট। দে উইল কন্টিনিউ টু কাল্টিভেট দেয়ার ল্যান্ড অ্যাজ অলওয়েজ।’


ইতোমধ্যে মানুষ এসেছে সুলতানের ছবিতে আদমের রূপ নিয়ে। বলিষ্ঠ, সুগঠিত শরীরের মধ্যে বীরত্বের প্রতীকী নিয়ন্ত্রণ। বিস্তৃত ও অনন্ত তার ক্যানভাসে ধরা পড়তে শুরু করে শ্রম এবং কর্ষণের অভিনব সব মুহূর্ত। তিনি ছিলেন পরিবার বিচ্ছিন্ন একাকী জীবনে অভ্যস্ত। তার একা চলার পেছনে কোনো গূঢ় বার্তা কাজ করে ছিল কি না তা আমার পক্ষে জানা সম্ভব হয়নি। তবে জীবনের শেষার্ধে এসে তিনি সামাজিকভাবে দায়িত্ব নেন নিম্নবর্গের মধ্যবয়স্ক হিন্দু বিধবা রমণীর। তার দুই সন্তানের সঙ্গে নিজেকেও গ্রথিত করলেন পারিবারিক আস্তানার সহজিয়া বাস্তবতায়। এর পর পরই যেন দেখা যায় তার ছবিতে মানুষ এক বিশেষ ভূমিকা নিয়ে রঙরেখার বৈশিষ্ট্যে প্রতিভাত হতে শুরু করেছে। এই মানুষ আমাদের চোখে দেখা মানুষ থেকে যেন অনেক বেশি বলবান, মাসকিউলার। তাদের যেন নিরন্তর শ্রমের প্রতীকে চিহ্নিত করে তিনি তৈরি করতে চান এক দুর্দান্ত ‘মিথিকাল ইভেন্ট’। তার ক্যানভাসের মানুষজন, গাছপালা, প্রকৃতি-পাথর যেন আর্কিটাইপাল চিত্র-চেতনার জন্ম দিয়ে যায়। তার কৃষক যেন সেই আদমের আদলে, উৎসের গভীর গোপনে এক ক্লান্তিকারী, স্বপ্নচারী সৃষ্টির জাল বুনে যায় আমাদের বিদ্ধ করে। নিজেদের অজ্ঞানতাতেই বিপন্ন বোধ করি আমরা। বুঝতে চেষ্টা করি, কেন হাজারো ছবি এঁকে একটিও বিক্রি করার তাগিদ অনুভব করলেন না সুলতান।
আমার বিষয় ছিল এক অনন্য সাধারণ শিল্পী মানুষের পরিচয়ের মধ্য দিয়ে আমাদের ক্ষয়িষ্ণু মূল্যবোধ, আমাদেরই অজ্ঞানতা, নষ্ট সভ্যতার বিশ্লেষিত মুহূর্তগুলো খুঁচিয়ে দেওয়া। তাই আপাতত ওই শিল্পী এসএম সুলতানের মুখের কথাগুলো বাঙ্্ময় অভিযোজনে সাজিয়ে এই নিবন্ধের শেষ পর্যায় প্রবেশ করবো। ‘ক্ষমতায় আসীন লোকজন সব সময়ই দরিদ্র কৃষকদের জন্য কুম্ভীরাশ্রু ফেলে। দেখায়, তারা কৃষকের কত বন্ধু। কিন্তু এসবই ভাওতা। তারা কখনোই কৃষকের পাশে দাঁড়ায় না। যদি তা সত্য হতো তাহলে কৃষকের সঙ্গে তাদের কাজ করতে দেখতাম। দেখতাম তাদের সঙ্গে খেতে, খামারে কাজ করতে। তাদের সংগ্রাম ও দুঃখের অংশীদার হতে। বৈদেশিক সাহায্য আমাদের দেশে কৃষকের নামে উপচে পড়ছে। কিন্তু ওই অর্থ কখনোই কৃষকের ঘরে পৌঁছায় না। পুরোটিই শহরে আটকে থাকে এবং তুমি জানো তা দিয়ে কি হচ্ছে? কতিপয় বড়লোকের বিলাস সামগ্রী কেনা হচ্ছে। যদি আজ কিংবা কাল ওই বৈদেশিক সাহায্য বন্ধ হয়ে যায় তাহলে কী হবে? শহর শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু গ্রামে? কিছুই ঘটবে না। কোনো পরিবর্তনই দেখা যাবে না। গ্রামের চাষি সব সময়ই বেঁচে থাকবেন। আরেকটা সমস্যা হলো, কৃষককে বোঝানো হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তি ঐতিহ্যবাহী দেশজ পদ্ধতি থেকে অনেক ভালো! মাঝে মধ্যে টিভির অনুষ্ঠান দেখি। কোনো এক কৃষি বিষয়ের অনুষ্ঠানে কয়েক কৃষককে জিজ্ঞাসা করা হলো, ‘আপনারা জানেন এই গাছের চারা দিয়ে কি হয়? বলতে পারেন এটি কোন জাতীয় গাছ? যখন কোনো কৃষক বলেন, এটি কোন ধরনের বা কী তখন তাকে বলা হয়, ‘ও! নো, এটি তা নয়।’ তারপর এক তরুণীর ছবি ভেসে ওঠে টিভির পর্দায়। তিনি পাঠ করতে থাকেন কিছু বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ। এর পাশাপাশি বলেন, ‘ইউ আর নট রাইট। ইউ হ্যাভ দি রঙ আইডিয়া। দিস প্লান্ট ইজ অ্যাকচুয়ালি...’ ইত্যাদি। যাদের এই কথাগুলো বলা হচ্ছে সেসব কৃষকের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখতে পাই, তাদের প্রাচীন পিতা-প্রোপিতামহের পেশাগত গর্ব ধ্বংস হতে চলেছে। এর পরিবর্তে জায়গা নিচ্ছে নতুন ধরনের হীনম্মন্যতা। তারাই হলো আমার ছবির বিষয়। ‘আই ক্যান নট হেলপ বাট ফিল ফর দেম... ফর দেয়ার ডে টু ডে কনসার্নস, প্রবলেমস, স্ট্রাগলস।’ তুমি কি একটা বিষয় জানো? আজকের কৃষক আর গান করেন না। জারি-সারি, লোকসঙ্গীত আজ আর গ্রামঞ্চলে শোনা যায় না। আসলে কোনো না কোনোভাবে কৃষকের কাছ থেকে তার গানটি ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। ইদানীং শহরের লোকজন তাদের কৃষকদের, নগর বাউলদের দিয়ে ব্যান্ড মিউজিকে লোকসঙ্গীত প্রডিউস করছে। কিন্তু তারা সেগুলো সম্পূর্ণ বিকৃত করে শোনাচ্ছে। এই কৃষকরা গান শোনেন তাদের ওই পুরনো গানগুলো রেডিওতে কিংবা টেলিভিশনে বাজানো হচ্ছে, দে ফিল দেয়ার মিউজিক... হুইচ ওয়াজ দি অরিজিনাল এক্সপ্রেশন অফ দেয়ার জয়েস, দেয়ার পেইনস, দেয়ার সরোজ... দে ফিল দিস মিউজিক ইজ বিইং মেড মকারি অফ অ্যান্ড দে বিকাম টেরিবলি স্যাড।
আপতত শেখ মোহাম্মদ সুলতান আমাদের অপদার্থ দিন যাপনের মুখে কালি মাখিয়ে দেন! অজড় খিলানগুলো শব্দ করে ওঠে। বেজে ওঠে অপদস্থ জীবনের ভাঙা রেকর্ড।


ছেড়ে যেতে হয়, হারাতেই হয়। তবুও শিল্পী এসএম সুলতান এক স্বপ্নচারী অনন্য উজানের দেখা পান কর্ম সংশ্রব, উদ্ধার, স্বপ্ন সম্মোহন, চেতনার হার্দিক যোগসূত্রে। আত্মমগ্ন, অস্ফুট বাক্যে জানা হয়ে যায় তার স্বপ্ন বৃত্তান্ত। অন্য নামের অভাবে আমরা যাকে স্বপ্ন বলি, সেই স্বপ্ন দেখি! কারণ আমি অসাধারণ কেউ নই। তবে আমার স্বপ্ন দেখা চলে কর্ম-কোলাহলের ভেতর, গাছের মতো আকাশের দিকে শাখা-প্রশাখা, পত্র-পুষ্পে বেড়ে ওঠার মতো। আমার স্বপ্নে একটা দ্বীপ আছে। ওই দ্বীপ হলো আমাদের এই সবুজ বদ্বীপ। মহান সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ, আমি জন্মেছিলাম এই দ্বীপে অনেক মানুষ, পশু-পাখি, পোকা-মাকড়, সরীসৃপ ও অরণ্যের গাঢ় আচ্ছাদনের ভেতর। আমার মনে হয়, আবার একদিন নিশ্চয় জন্মাবো এই সবুজ বদ্বীপে, আমার স্বপ্নের দ্বীপে। আমি একা নই, এখন আমার চারপাশে যারা আছে জীব-জগৎ, অরণ্য-প্রকৃতি তারা সবাই জন্মাবে। শুধু ততদিনে আমার স্বপ্নের দ্বীপ পৃথিবী ব্যপ্ত হবে ... এই পৃথিবী সেই দ্বীপ হবে ততদিনে।

 

 মৃৎশিল্পের স্বরূপ সন্ধান

ফয়সাল শাহ

 

বাংলাদেশের লোক-ঐতিহ্যের গৌরবময় সুবিশাল ক্ষেত্রের মৃৎশিল্প অন্যতম। বস্ত্রশিল্পের তাঁত ও তন্তুজাত সৃষ্টিশীলতা, বাঁশের কাজ, লোহা এবং পিতলের কাজ, দারুশিল্প, দড়ি ও বেতের কাজ, পাটজাত দ্রব্যের বহুবিধ ব্যবহারিক কাজের জন্য শিল্প, নকশিকাঁথা শিল্প, লোকজ-স্থাপত্য, রন্ধনশিল্প, নৃত্য-সঙ্গীত, চিত্রশিল্প, সাহিত্য কাব্যÑ মোট কথা, জীবনযাপনের জন্য সাধারণ মানুষের আবেগ, নান্দনিকতা, ব্যবহারিকতা, উপযোগিতা ও উপস্থাপনাসহ একটি সম্পূর্ণ এবং যথার্থ চলমান শিল্পস্রোত আধুনিক শিল্প বহুলাংশে প্রাগুপ্ত ধারা থেকে নিজের জন্য হাত বাড়িয়ে সাহায্য গ্রহণ করে একটি নতুন উপস্থাপনায় হাজির হয়ে ওই শিল্পের একটি নান্দনিক মাত্রা অর্জনে সহায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়।

যে কোনো দেশের চিত্রশিল্পে সাধারণত দুটি মূল ধারা বিরাজ করে। একটি সনাতন বা লোকজ শিল্প। অন্যটি হচ্ছে সময়ের প্রতিঘাতে আস্তে আস্তে সম্প্রসারিত ও বিবর্তিত সাম্প্রতিক বা আধুনিক শিল্পধারা। একটি অপ্রাতিষ্ঠানিকÑ যুগে যুগে প্রবাহিত সাধারণ মানুষের দ্বারা পালিত ও চর্চিত হয়ে থাকে প্রায় অপরিবর্তিত ধারার শিল্প। তাদের জীবনধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, সামাজিক ঘটনাবহুল আচার-বিচার, বাদ-প্রতিবাদ, জীবন-সংগ্রাম, অন্যায়-অবিচার নিয়ে কাঁচা হাতে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ চিত্র। অন্যটি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিয়ে আগুয়ান প্রাচ্য-প্রতীচ্য আধুনিক জগতের সাম্প্রতিক ইঈিতময় কিংবা বুদ্ধিদীপ্ত মননশীল চিন্তা, বোধ ও উপস্থাপনা দ্বারা একটি যুগোপযোগী শিল্পধারা। এ দুটি ধারা আপাতদৃষ্টিতে ভিন্নমুখী হলেও দ্বিতীয় ধারা সব সময়ই প্রথম ধারাটি দ্বারা প্রভাবিত ও নির্ভরশীল। কিন্তু প্রথম ধারা কখনো দ্বিতীয় ধারার ওপর নির্ভর করে চর্চিত হয় না। তাই আবহমান বাংলার লোকজশিল্প গভীর জীবনভেদী একটি চলমান স্রোত। এটি নীরবে-নিভৃতে কারোর প্রতি দৃষ্টি বা মুখাপেক্ষী না হয়ে একমনে অন্তস্থিত একটি নদীর ফল্গুধারার মতো স্রোতোস্বিনী হয়ে বয়ে যায় কালে কালে। তা বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির একটি ঋদ্ধিমান অবস্থানের অস্তিত্ব প্রমাণ করে। লোকজশিল্প সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এটিকে বাদ দিয়ে তাদের জীবন চলে না। এ জন্য বাংলাদেশের লোকশিল্প খুবই শক্তিশালী ও ঐতিহ্যময় এবং গৌরবের। যেহেতু এটি মৌলিক, আদি ও স্বয়ম্ভূ সেহেতু বহুমাত্রিক। আধুনিক শিল্পের বিকাশ লোকজধারা থেকে আস্তে আস্তে পরিবর্তিত, পরিমার্জিত, বিবর্তিত, উন্মেষিত ও পরিশীলিত হয়ে হয়ে বর্তমান অবস্থায় এসে পৌঁছেছে। পৃথিবীর বিভিন্ন সভ্যতায় প্রাপ্ত শিল্প নিদর্শনের নান্দনিক ও ব্যবহারিক শিল্পের বিভিন্ন ফর্ম দ্বারা উৎসাহিত হয়েছে, ঐতিহ্যটিকে সম্মান জানিয়ে নিজের মতো নতুনতর সময়োপযোগী শিল্প নির্মাণে বিভিন্ন মাধ্যমে জগৎবিখ্যাত সব শিল্পীদের মধ্যেই দেখা যায়। ঐতিহ্য থেকে প্রাপ্ত নিদর্শনের মৌলিক নান্দনিক ও দার্শনিক গুণাবলির সঙ্গে এভাবেই শিল্পীরা একান্তেই নিজস্ব শিল্প আদর্শের ভাবনার উদ্বুদ্ধ হয়ে নতুন কিছু তৈরি করে একদিকে যেমন শিল্প ভাস্করটিকে সমৃদ্ধ করেছেন, অন্যদিকে তেমনি তাদের তৈরি শিল্প মানুষের কল্যাণে মৌলিক রুচি ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনে এগিয়ে নিয়েছেন বিশ্বটিকে। গুহাচিত্রের সহজ-সরল ধারা আধুনিক শিল্পে ব্যবহৃত হয়েছে। মোট কথা, লোকজশিল্প হচ্ছে শিল্পের আদি ও মূল আধার। সেখান থেকে ধারণা, শৈলী, পরিসর ও আঙ্গিক এবং বিষয়বস্তু আহরিত হয়ে থাকে। আমাদের দেশে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, এসএম সুলতান, কামরুল হাসান, শফিউদ্দিন আহমেদ, রশিদ চৌধুরী, কাইয়ুম চৌধুরী প্রমুখ শিল্পী বাংলার লোকজশিল্পধারা থেকে উৎসাহিত হয়েছিলেন। শিল্প নির্মাণে তৈরি হয়েছিল লোকশিল্প মিশ্রিত এক নতুন ধারা। এ দেশের শিল্পীরা স্বাধীন চেতনায় উদ্ধুদ্ধ হয়ে লোক-ঐতিহ্যের বিভিন্ন গুণের বহুবিধ উপাদান-উপকরণ সঙ্গে নিয়ে প্রকাশ করেছেন আধুনিক ভাবধারার শিল্প। তারা ঐতিহ্য রক্ষা করতে সচেষ্ট হয়েছেন। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, এসএম সুলতান, কামরুল হাসানের মতো মহান শিল্পীরা দেশের সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনাটি মূর্ত করেছেন। তাদের শিল্পে মানবতার জয়গান মুখরিত হয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাংলার মানব-মানবী, এ দেশের মূল উৎপাদক কৃষকসহ খেটে খাওয়া মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বিষয়াবলির অন্তর্নিহিত শক্তি।

বাংলার পুতুল, মাটির বহুবিধ পাত্র, গ্রামের নারী, মানুষ, পশু-পাখি, নিসর্গ দৃশ্য থেকে তারা অনায়াসে সহজ-সরল রেখা ও রঙগুলো নিয়ে নিজস্ব শিল্প সৃষ্টি করেছেন। প্রকৃতপক্ষে চিত্রশিল্পে নিজের দেশের শিল্প-নির্যাস শিল্পীর সৃষ্টিশীলতায় ধরা পড়বেই এবং সেটি চিত্রশিল্পের মান বিচারে অন্যতম একটি নান্দনিক মাত্রা গঠন করতে সাহায্য করে। প্রতিটি শিল্পমাধ্যমে এই দেশজ সময়, সমাজ, আবহাওয়া ও উপাদানের ব্যবহার প্রভূতভাবে হয়ে থাকে।

প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে লোকশিল্প চর্চা চলে আসছে দুনিয়াব্যাপী। তবে অষ্টাদশ শতাব্দীর আগেকার শিল্প নিদর্শন বড় একটা খুঁজে পাওয়া যায় না। আমাদের দেশে প্রতœ খননের ফলে প্রাপ্ত মহাস্থানগড় তথা প্রাচীন পূর্ণবর্ধনে খ্রিস্টীয় প্রথম থেকে চতুর্থ শতকে প্রকৃতির বিভিন্ন নকশার ছাপ দিয়ে তৈরি করা সুন্দর ধূসর ও লাল রঙের মৃৎপাত্র লোকশিল্পের প্রাচীনতম নিদর্শন। আমাদের কলমি পুঁথিতে মন্ত্র-তন্ত্রের ছক আঁকা দেখা যায় পঞ্চদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে, পুঁথিচিত্র দেখা যায় ১৮০৫ সালে রচিত নারায়ণ দেবের মনসামঙ্গলে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পা-ুলিপি বিভাগে তা সংরক্ষিত আছে। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকের গ্রিক প-িত হেরোডোটাসের কাল থেকে লোকঐতিহ্য সম্পর্কে কৌতূহলের প্রমাণ পাওয়া গেলেও কোনো দেশের, বিশেষ করে স্বদেশের অসংস্কৃত অতীত (ঠঁষমধৎ অহঃরয়ঁরঃরবং) সম্পর্কে অনুসন্ধান ছেলেমি বলে বিবেচিত হতো।

শিল্পকলার বিভিন্ন শাখাÑ মৃৎশিল্প, ভাস্কর্য, স্থাপত্য, চিত্রকলায় নবোপলীয় মানুষ কিছু প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছে। তখন সবচেয়ে এগিয়ে গিয়েছিল মৃৎশিল্প। মিসর, ইরাকের জারমো, ইরানের সিয়াংক, আনাতোলিয়া ও গ্রিসের নবোপলীয় মৃৎপাত্র এর সাক্ষ্য বহন করে। চাকার আবিষ্কার নবোপলীয় যুগের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কুমারের চাকা যে চক্রাকার গতিতে কাজে লাগানো হয় তা পরবর্তী সব সভ্যতার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। এখনো গ্রামবাংলার কুম্ভকার সম্প্রদায়ভুক্ত মৃৎশিল্পীরা ওই চাকে নির্মাণ করে চলেছেন মৃৎপাত্র।
প্রাচীনকাল থেকে মৃৎপাত্র তৈরির প্রধান মাধ্যম ছিল মানুষের হাত। বড় পাত্র তৈরির জন্য প্রয়োজন হতো পাটি অথবা চাঁটাই-জাতীয় দ্রব্য। সভ্যতার বিকাশ ও মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নির্মাণ পদ্ধতির পরিবর্তন হয়। বিভিন্ন উপাদান-উপকরণের আবিষ্কার ও উদ্ভাবনের ফলে মৃৎপাত্র নির্মাণের জন্য চাকার সঙ্গে যুক্ত হয় ছাঁচ। বিভিন্ন দেশে বহু গোষ্ঠীর মানুষ অনেক রকম মাটির দ্রব্য তৈরি ও ব্যবহার শুরু হয়। ফলে অঞ্চলভিত্তিক রঙ, অলঙ্করণ, আকার-আকৃতি ইত্যাদিতে বৈচিত্র্য দেখা যায়। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতœতাত্ত্বিক খননে প্রাপ্ত মৃৎশিল্পে এর প্রমাণ রয়েছে। বাংলাদেশে সভ্যতার মূল উৎস তার নদ-নদী। এ অঞ্চলে বড় পাহাড়-পর্বত না থাকায় পাথরের মূর্তি তৈরির তেমন প্রচলন ছিল না। যে স্বল্প সংখ্যক পাথরের মূর্তি রয়েছে এর কাঁচামালও ভারত থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। ফলে এখানকার শিল্পীরা তাদের শিল্পসত্তার স্বাক্ষর রেখেছে মাটির তৈরি শিল্পকর্মে। নদ-নদী, খাল-বিলে প্রাপ্ত কাদামাটি দিয়ে তৈরি শিল্পকর্মে সাধারণ কৌশল প্রয়োগ করে এ দেশের শিল্পীরা সৃষ্টিশীল শিল্পচর্চায় আত্মনিয়োগ করেছেন। বাংলাদেশের প্রতœক্ষেত্রে যে পোড়ামাটির ফলক পাওয়া গেছে সেসব নির্দশন যেন আজও অনেকাংশে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য বজায় রেখেছে।

মৃৎশিল্পে নান্দনিক ও ব্যবহারিক দুটো বিষয়ের সমন্বয় সব সময় সবক্ষেত্রে রয়েছে। তবে ব্যবহারিক মৃৎপাত্র বাসন-কোসন, থালা-বাটি, হাঁড়ি-পাতিল ইত্যাদির গুরুত্ব যুগে যুগে ধারণ করেছে সর্বস্তরের মানুষ। মৃৎশিল্পীরা ব্যবহারিক মৃৎপাত্র তৈরি করার সময় যথার্থ ব্যবহার উপযোগী আকৃতি তৈরিতে সচেতন থেকেছেন, উপস্থাপন করেছেন বিভিন্ন বৈচিত্র্যপূর্ণ পাত্র। বিভিন্ন সমস্যা ও প্রতিকূলতার মধ্যেও এখনো বাংলাদেশের বিভিন্নি স্থানের মধ্যে সাভার, মানিকগঞ্জ, শিমুলিয়া, কাকরান, কাগজীপাড়া, কুমিল্লা, বরিশাল, ফরিদপুর, শরীয়তপুর, মুন্সীগঞ্জ, টাঙ্গাইল, নেত্রকোনা, রাজশাহী ইত্যাদি অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি মৃৎসামগ্রী তৈরি হয়। এখন বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন হচ্ছে কারখানায় মৃৎশিল্প। কারখানায় উৎপাদিত তৈজসপত্র ও স্থাপত্য মৃৎশিল্প এ দেশের ঘরে ঘরে সমাদৃত। তা স্থানীয় চাহিদা পূরণ করেও বিদেশে রপ্তানির মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রেখে চলেছে।
নদীমাতৃক সভ্যতা থেকে যেমন এ দেশের এই শিল্প মাধ্যমের উৎপত্তি তেমনি মানব সভ্যতার বিকাশেও এর সহায়ক ভূমিকা রয়েছে। শিল্পীরা ধর্মীয় ও ব্যবহারিক সামগ্রী নির্মাণের সমান্তরালে টেরাকোটা ফলক, ত্রিমাত্রিক ভাস্কর্যে সমসাময়িক মানুষের জীবনযাত্রা, জীবজন্তু, পশুপাখি, ফুল-ফল, লতা-পাতা ইত্যাদি দৃশ্যে তাদের শৈল্পিক ও নান্দনিক গুণাবলির যে প্রকাশ করেছেন তা বাংলাদেশের শিল্পচর্চার ইতিহাসে এক ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে।

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের ঐকান্তিক চেষ্টায় ঢাকা আর্ট কলেজ প্রতিষ্ঠা এবং শিল্পী মীর মোস্তফা আলীর উদ্যোগে মৃৎশিল্প বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়। এই মৃৎশিল্প বিভাগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পাশ্চাত্যধারায় আধুনিক উপাদান-উপকরণের সমন্বয়ে সৃজনশীল মৃৎশিল্প নির্মাণের গতিপথ তৈরি হয়। পরে রাজশাহী, চট্টগ্রাম, খুলনা ও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মৃৎশিল্প চর্চা ছড়িয়ে পড়ে। এ দেশের শক্তিশালী পরম্পরার দক্ষতার সঙ্গে ধীরে ধীরে যুক্ত হতে থাকে মৃৎশিল্পের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা।

বাংলাদেশে আধুনিক মৃৎশিল্প চর্চার ক্ষেত্রে চারুকলা অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃৎশিল্প বিভাগের ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখান থেকেই ১৯৬১ সালে সৃজনশীল মৃৎশিল্প নির্মাণের যাত্রা শুরু হয়। এই দীর্ঘ সময়ের বিবেচনায় শিল্পকলার অন্যান্য মাধ্যমের মতো ভাস্কর্য, চিত্রকলা, প্রিন্ট ইত্যাদি বিষযের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সমকক্ষতা অর্জন যথেষ্ট সময় লেগেছে। স্বাধীনতা-পরবর্তী এ দেশের কয়েক শিল্পী বিদেশ থেকে মৃৎশিল্পবিদ্যায় ডিগ্রি নিয়ে বিভিন্ন শিল্প শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ফলে পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের বিজ্ঞানভিত্তিক কলাকৌশলের পরিচয় ঘটে এ দেশে। সমকালীন শিল্পীরা মৃৎশিল্পের ব্যবহারিক গ-িতে সীমাবদ্ধ না থেকে নতুনতর ভাবনায় নিজেদের নিয়োজিত রেখেছেন। ফলে শিল্পীরা এক নিবিড় ঐতিহ্য সঙ্গে নিয়ে আধুনিক কলাকৌশলের সহায়তায় সৃজনশীল মৃৎশিল্প নির্মাণ করে চলেছেন। কারণ সম্প্রতি মৃৎশিল্পটি সৃজনশীল বা আধুনিক ভাবধারায় উপস্থাপনে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। কালে কালে এটি ধারণ করেছে আধুনিক থেকে আধুনিকতর রূপ।

বাংলাদেশে ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পের স্বকীয়তায় রয়েছে নিম্নমাত্রায় পোড়ানো গেজবিহীন সামগ্রী। এর পাশাপাশি সৃজনশীল মৃৎশিল্পের বৈশিষ্ট্য অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শিল্পীরা ঐতিহ্য চেতনার সঙ্গে যুক্ত করেছেন আধুনিক কলাকৌশল ও গেজ। কেননা মৃৎশিল্পে কৌশল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিভিন্ন উপাদানের পরিমাণ নির্ধারণ ও মৃৎশিল্পে ব্যবহৃত গেজের সঠিক তাপমাত্রা ইত্যাদি বস্তু নির্মাণে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। আমাদের হাজারো বছরের শিল্প- ঐতিহ্য অনুধাবন করতে হলে এ দেশে মাটি খুঁড়ে পাওয়া মৃত্তিকা সামগ্রী এবং আজও যে চর্চা অব্যাহত রয়েছে এর দিকে গভীর মনোযোগের সঙ্গে তাকাতে হবে।

কত সহস্র বছর আগে মানুষ নিতান্তই প্রয়োজনের তাগিদে মাটি রূপান্তরিত করেছিল তৈজসপত্রে। রূপান্তরের ওই ধারায় এখন তা রূপ নিয়েছে শিল্পে। এর পেছনে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে মূলত এ দেশের মৃৎশিল্পের হাজার বছরের সমৃদ্ধ ইতিহাসটিই। আমাদের মৃৎশিল্পের উপাদান থেকে শুরু করে কারিগরি দিক, নকশা, নির্মাণশৈলীÑ সবই স্বকীয়তায় সমুজ্জ্বল। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মৃৎপাত্রের মধ্যে একটা পার্থক্য থাকলেও এই ভিন্নতার মধ্যেও আছে নিবিড় ঐক্য। এ কারণেই অন্যান্য দেশের মৃৎপাত্র থেকে এটিকে আলাদা করা যায় খুব সহজেই। এছাড়া বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের মাটি অনেক সহজলভ্যও।

মাটির সঙ্গে প্রিয় মৃত্তিকার নিবিড় সখ্য মানুষের। বহুকালের পুরনো এই সম্পর্ক বিভিন্ন রঙে রূপে প্রকাশিত। মাটির নম্র স্বভাব মানুষকে বিশেষভাবে কাছে টানে। কাদামাটিতে কল্পনা গড়ে নেয় মানুষ। বিভিন্ন আকৃতি ও অবয়ব দেয়া হয়। দক্ষ হাতের ছোঁয়ায় বহুমাত্রিক ব্যবহারের উপযোগী হয়ে ওঠে নরম কাদামাটি। তবে যিনি শিল্পী, যার শিল্পিত বোধবুদ্ধি তার বেলায় আলাদা কথা।
প্রকৃত শিল্প নির্মাণে যেমন প্রয়োজন ফর্ম ভেঙে নান্দনিক ও দার্শনিক মনোভাব প্রকাশ করা তেমনি মৃৎশিল্পে রয়েছে সব বিষয়ের উপস্থিতি। কোনো মৃৎশিল্পীকে শুধু ফর্ম ভাঙা কিংবা রঙের ইলিউশান তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলে না, জানতে হয় এর উপাদানের স্বভাব, সঠিক তাপমাত্রা ও মৃৎশিল্পে ব্যবহৃত সব সরঞ্জামের প্রকৃত ব্যবহার।

টেরাকোটা শিল্পের অতীত পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এ শিল্পমাধ্যমটি রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা কিংবা ধনাঢ্য শ্রেণির চাহিদা পূরণে প্রসার লাভ করেছে। অন্যদিকে ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক কারণেও প্রসার লাভ করেছে বহু মাত্রায়। মসজিদ, মন্দির থেকে শুরু করে সরকারি পর্যায়ের সুবিশাল ভবন অলঙ্করণে এ মাধ্যমটি বিশেষ ভূমিকা রেখে তৈরি করেছে বিশাল ঐতিহ্য সম্ভার। সম্প্রতি বাংলাদেশে শুরু হয়েছে সুপরিকল্পিত, উন্নততর ব্যবহার উপযোগী স্থাপত্যশৈলী ও নির্মাণ। বেড়ে চলেছে প্রতিনিয়ত মানুষ। তারা হচ্ছে শহরমুখী। তাদের জীবন ও জীবিকার কারণে সংক্ষিপ্ত হতে চলেছে মানুষের আবাসস্থল, অফিস-আদালতসহ সব স্থান। স্থপতিরা নির্মাণ করে চলেছেন স্বল্প পরিসরে জ্যামিতিক ফর্ম বিন্যাসে আধুনিক থেকে আধুনিকতর বসবাস উপযোগী ভবন। এসব ভবনে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যে ঘটছে আন্তর্জাতিকীকরণ। প্রায় প্রতিটি স্থান জীবন ও বাস্তবতার প্রয়োজনটিকে প্রাধান্য দিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক সূত্রে গড়ে তুলছেন স্থপতিরা নাগরিক জীবনের ব্যস্ততম চাহিদায়। এই ব্যস্ততম গতিশীল ধারায় সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন ইন্টেরিয়র। ব্যবহার করা হচ্ছে বিভিন্ন উন্নত উপাদান। বিন্যাস করা হচ্ছে সৃজনশীল ভাবধারায়। মৃৎশিল্পের বিভিন্ন মাধ্যমসহ টেরাকোটাশিল্প উঠে এসেছে গৃহসজ্জায় সাধারণ মানুষের কাছে।
মৃৎশিল্পে বিজ্ঞান ও দর্শনের সমন্বয় অপরিহার্য হওয়ায় কালোত্তীর্ণ টেরাকোটা ফলক নির্মাণ কেবল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সম্পন্ন করা শিল্পীই করতে পারেন। নিয়মিত মৃৎশিল্প মাধ্যমের চর্চা ও গবেষণাই ওই শিল্পের গৌরব উজ্জ্বল ঐতিহ্য অক্ষুণœ রাখতে পারবে। বাংলাদেশে গত চার দশকে আধুনিক শিল্পকলার অগ্রগতি বেশ প্রশংসনীয়। একাধারে এ দেশের শিল্পকলা বলিষ্ঠ, বৈচিত্র্যময় ও উদ্দীপ্ত। সমকালীন আধুনিক মৃৎশিল্পের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এ দেশের শিল্পীদের প্রকৃতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, ঐতিহ্য চেতনার সঙ্গে সম্পৃক্ততা। এ দেশে মৃৎশিল্পের আধুনিক চর্চা খুব বেশিদিন না হলেও এর জটিল ও কঠিন রাসায়নিক সমীকরণ সাপেক্ষের নিয়মিত শিল্পী হাতে গোনা মাত্র কয়েকজন। এ শিল্পমাধ্যমে যারা নিয়মিত চর্চা করেছেন তারাই শুধু শিল্পভাষা ও নতুনত্বের অনুসন্ধান করে শিল্প নির্মাণ করেছেন।

বাংলাদেশের সমকালীন মৃৎশিল্প ভুবনের কর্মকা- নিঃসন্দেহে বিশালায়তন। প্রায় তিন দশকের বিভিন্ন প্রজন্মের অসংখ্য শিল্পস্রষ্টার কর্মনিষ্ঠার বৈচিত্র্যতায় সমৃদ্ধ হয়েছে সৃজনশীল মৃৎশিল্প। ধারাবাহিকভাবে অপেক্ষাকৃত তরুণ মৃৎশিল্পীদের সৃজন ও সাফল্য উত্তর উত্তর এ দেশের মৃৎশিল্প তথা সৃজনশিল্পের পরিম-ল সম্প্রসারণ করছে। এটি উপকরণ ও মাধ্যমের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য আনায় সহায়তা করলেও প্রধান ও অগ্রজ শিল্পস্রষ্টাদের সামগ্রিক সাফল্যেরই প্রতিধ্বনি।
প্রথম সারির তথা পূর্বসূরি মৃৎশিল্পীদের শ্রেষ্ঠত্বের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রজন্মের মৃৎশিল্পী ও সমকালের অপেক্ষাকৃত নবীনরা শিল্পাঙ্গনে নব নব মাত্রা যোগ করে অগ্রজ শিল্পস্রষ্টাদের সাফল্যের পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন। এখনো ওই ধারা অব্যাহত রয়েছে। বলা যায়, গত তিন দশকের মৃৎশিল্প নির্মাণ সাধনায় নিসর্গ, প্রকৃতি, বস্তু ও অবয়বভিত্তিক বাস্তুবাদী ব্যবহার উপযোগী নির্মাণরীতির সঙ্গে যুগোপযোগী আধুনিক নির্মাণ কৌশলের, বিশেষত টেরাকোটায় সমবিমূর্ত ও বিমূর্ত এবং প্রকাশবাদী ধারা প্রভৃতির সম্মিলন ঘটেছে। বাংলাদেশের মৃৎশিল্প অঙ্গনে ওই ধারা বা কৌশলে সফলতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন শিল্পী অলক রায়। তার প্রতিটি ক্ষেত্রে রয়েছে বস্তু, বিষয় ও উপাদান-উপকরণের সৃজনশীল উপস্থাপনা। ফলে উন্মোচিত হচ্ছে মৃৎশিল্প বিন্যাসের নতুন ধারা। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পের পরম্পরায় যোগ হচ্ছে আধুনিক রীতি ও নির্মাণ কৌশলের নবতর আবিষ্কার।

 

বৈঠকখানা ...

হুমায়রা মোস্তফা সোহানী

 

একটি বাসার ইন্টেরিয়র ডিজাইন করার সময় ফয়ারের পরে আসে লিভিংরুম কিংবা ড্রয়িংরুম ডিজাইন প্রসঙ্গ। প্রথমেই আসে রঙের ব্যবহার। লিভিংরুমে যে রঙই ব্যবহার করা হোক না কেন, এর প্রভাব পড়ে আমন্ত্রিত অতিথিদের ওপর। তাই সচেতনভাবে ড্রয়িংরুমের রঙ নির্ধারণ করা উচিত। কারণ ভুল রঙের ব্যবহার একদিকে যেমন অতিথিদের বিব্রত করে, অন্যদিকে তেমনি সঠিক রঙের ব্যবহার তাদের মন শান্ত বা আরামদায়ক করে তোলে। যেমন হালকা আকাশি ও সাদার ব্যবহার রুমটিকে আরো প্রশস্ত, স্নিগ্ধ এবং আরামদায়ক করে তেমনই লাল ও কমলার ব্যবহার রুমের আবহ অনেকটা উত্তপ্ত করে।
চিরায়তভাবে বিল্ডিংয়ের অন্যান্য রুম থেকে ড্রয়িংরুমের দেয়াল একটু ব্যতিক্রম হয়। লিভিংরুম হচ্ছে সাধারণ খোলা জায়গা। তাই লিভিংরুমটি এমন হওয়া উচিত যাতে এর নিজস্বতা প্রকাশ পায়।
আজকাল বাজারে অনেক সুন্দর ও বিভিন্ন মানের ওয়াল পেপার পাওয়া যায়। তবে অবশ্যই ওয়াল পেপার বাছাইয়ে সচেতন থাকতে হবে। এর বেমানান ডিজাইন প্রয়োগ আপনার ও পরিবারের পুরো রুচিবোধ নষ্ট করে দিতে পারে। ওয়াল পেপার ছাড়াও বাজারে কালার কোম্পানিগুলো টেকচার্ড, মেটালিক ও নন-মেটালিকসহ বিভিন্ন ডিজাইন বাজারজাত করছে। এসব ডিজাইনও আনতে পারে আধুনিকতার ছোঁয়া। এসব ইলিউশন পেইন্ট আজকাল কেবল দেয়ালেই নয়, বরং সিলিংয়েও ব্যবহারে দেয় শৈল্পিক ছোঁয়া। তবে সিলিংয়ে ব্যবহারের ক্ষেত্রে হালকা রঙ নির্বাচন করা বাঞ্ছনীয়।
এতোক্ষণ লিভিংরুমের রঙ এবং ওয়াল পেপারের ব্যবহার সম্পর্কে জানলাম। এবার আসা যাক ফার্নিচারে কাঠ ও বোর্ডের ব্যবহারে। লিভিংরুমে হালকা বোর্ডের কাজ তথা ওয়াল পেনেলিং ফলস সিলিং ডিজাইন করা হয়। তবে তা অবশ্যই খুব অল্প পরিসরে ডিজাইন করতে হবে। না হলে পুরো ঘরটিই ঘুমোট মনে হবে।

দুই.
আমাদের দেশে একটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। তা হচ্ছে, যতো বেশি কাঠ বা বোর্ডের কাজ করা হয় ততো বেশি সুন্দর হয়। বস্তুত সিলিংয়ে সামান্য কিছু ডিজাইন করাই যায়। কিন্তু অপরিকল্পিতভাবে বিল্ডিং প্ল্যান পরিবর্তন করায় কিছু বিম এলোমেলোভাবে বেরিয়ে রুমের সৌন্দর্য ব্যাহত করে। তাই ফলস সিলিংয়ের প্রচলন বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলস সিলিংয়ে হালকা লাইটের ব্যবহার লিভিংরুমের আবেদন বাড়ায় ছাড়া কমায় না। তবে খেয়াল রাখা জরুরি যাতে তা কমার্শিয়াল স্পেসগুলোর মতো জাঁকজমক না হয়। হালকা আলোর উৎসেও লিভিংরুমে নান্দনিক আবহ আনা সম্ভব।
এরপরই আসে ফ্লোর বা মেঝের সজ্জা। বাজারে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন কার্পেট পাওয়া যায়। রুমের আবহ আনুযায়ী কার্পেটের ব্যবহার লিভিংরুমকে আরো জীবন্ত করে তোলে। অনেকে আবার বাহারি টাইলস অথবা মার্বেল দিয়ে লিভিংরুমের মেঝের ডেকোরেশন করে থাকেন। এছাড়া আজকাল উডেন ফ্লোরের এফেক্ট দেয়ার জন্য অনেকে এমডিএফ-এর ওপর ভিনিয়ার্ড উড পেস্ট করা আর্টিফিশিয়াল ফ্লোর ব্যবহার করেন। তবে এমডিএফের ওপর ভিনিয়ার্ড উড পেস্ট করা আর্টিফিশিয়াল ফ্লোরের চেয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং উডের ওপর পেস্টিং ভিনিয়ার্ড ফ্লোর বেশি টেকসই হয়।
লিভিংরুমের ফার্নিচার কেনার সময় অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে তা যেন রুমের সঙ্গে মানানসই হয়। অনেক সময় আমরা ভালো লাগা থেকে এমন সব ফার্নিচার কিনে আনি যা হয়তো রুমের আকার আনুযায়ী বড় কিংবা তুলনামূলক ছোট হয়ে যায়। এ দুটি ব্যাপারই অসামঞ্জস্যপূর্ণ। আবার হয়তো ঘরের ইন্টেরিয়র ডিজাইন করা ক্ল্যাসিকাল মুডে। অথচ ফার্নিচার আনা হলো কনটেম্পোরারি। তখন ঘর সাজানোর পুরো কাজটিই ভেস্তে যায়।
সবশেষে যা না বললেই নয় তা হলো, লিভিংরুমে যাতে প্রাকৃতিক আলো-বাতাস সঞ্চালনের ব্যবস্থা থাকেÑ অবশ্যই এ বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে। বড় একটি খোলা জানালা অনেক দামি আসবাব সাজানোর চেয়ে অনেক সময় বেশি আবেদন সৃষ্টি করতে পারে।

 

ছবি: সোহানী’স ইনটেরিয়র

Page 2 of 3

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…