যে চলচ্চিত্র জীবনের কথা বলে: আলফ্রেড হিচকক

অরিন্দম মুখার্জী বিঙ্কু

 



টান টান উত্তেজনা, রহস্য, ভয় ও উদ্বেগের চলচ্চিত্র মানে আলফ্রেড হিচকক। ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলচ্চিত্রে স্বতন্ত্র ও জনপ্রিয় একটি ধারার প্রবর্তক তিনি। উদ্বেগ, ভয়, কল্পনা অথবা সহানুভূতি ফ্রেমবন্দি করে চলচ্চিত্রে নতুন মাত্রা যোগ করেন বিশ্ব সিনেমার এই অভিভাবক। ‘সাইকো’, ‘দ্য বার্ড’ কিংবা ‘রেবেকা’র মতো অসংখ্য সিনেমার জনক তিনি। এখনো তার দ্বারা প্রভাবিত বিশ্বের অনেক পরিচালক।
ব্রিটিশ চলচ্চিত্র পরিচালক ও প্রযোজক স্যার আলফ্রেড যোসেফ হিচকক ১৮৯৯ সালের ১৩ আগস্ট লন্ডনের এক রোমান ক্যাথলিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ভক্তিনিষ্ঠ ক্যাথলিক তিনি। তরকারি ও হাঁস-মুরগি বিক্রেতা উইলিয়াম হিচকক ও এমা জেন হোয়েলানের ছেলে আলফ্রেড হিচকক ছিলেন মা-বাবার দ্বিতীয় সন্তান। বড় ভাই উইলিয়াম ও  ছোট ভাই এলেন হিচককের সঙ্গে তিনি লন্ডনের পূর্বপ্রান্তে লেইটন স্টোনে বড় হয়েছেন। ছোটবেলা খুব নিঃসঙ্গতা ও একাকিত্বের মধ্যে কেটেছে তার। তিনি মোটা ছিলেন বলে কেউ তার সঙ্গে খেলতে আসতো না। আর অল্প বয়সে এ রকম অদ্ভুত পরিস্থিতিই পরবর্তীকালে সৃষ্টি করেছে তার সিনেমাজুড়ে আতঙ্ক ও সাসপেন্স। বড় হয়ে তিনি হলেন মাস্টার অব সাসপেন্স ও রহস্যের জাদুকর। দর্শককে নিয়ে পিয়ানোর মতো খেলতে ভালোবাসতেন সাইকোলজিকাল থ্রিলারধর্মী ছবির এই নির্মাতা। চলচ্চিত্র ইতিহাসে তিনিই প্রথম থ্রিলার কিংবা ভৌতিক ছবির সফল ও আধুনিক রূপকার। আজও তার মুভিগুলো দর্শক, সমালোচকদের চিন্তার খোরাক জোগায়।

১৯২০ সালের দিকে এসে আলফ্রেড হিচকক আগ্রহী হয়ে ওঠেন ফটোগ্রাফি ও চলচ্চিত্রের প্রতি। তিনি লন্ডনে ফিল্ম প্রডাক্টশনে কাজ করা শুরু করেন। ‘প্যারামাউন্ট পিকাচার-এর লন্ডন শাখায় টাইটেল কার্ড ডিজাইনার হিসেবে কিছুদিন কাজ করেন। এরপর ‘ইসলিংটন স্টুডিও’তে কাজ করেন। টাইটেল কার্ড ডিজাইনারের কাজ করতে করতে
চিত্রপরিচালক হিসেবে তিনি আত্মপ্রকাশ করেন। চলচ্চিত্র ক্যারিয়ার শুরু করেন ১৯২২ সালে। এ বছর ‘নাম্বার থার্টিন’ চলচ্চিত্রে হাত দেন তিনি। কিন্তু তার জীবনের প্রথম চলচ্চিত্রটি অসম্পূর্ণই থেকে যায়। ১৯২৫ সালে নির্মাণ করেন ‘দ্য প্লেজার গার্ডেন’। এ চলচ্চিত্রটি ছিল ব্রিটিশ-জার্মান প্রডাক্টশনের। এটি দারুণ জনপ্রিয় হয়। এরপর তাকে আর অপেক্ষা করতে হয়নি। তিনি বিভিন্ন প্রডাক্টশনের ব্যানারে একের পর এক চলচ্চিত্র নির্মাণ করে যেতে থাকেন। আর চলচ্চিত্রে ফুটিয়ে তুলতে থাকেন তার নান্দনিকতা। সেই ষাটের দশকে এই মানুষ এমন সব অসাধারণ ছবি নির্মাণ করলেন, প্রযুক্তির এই যুগে তিনি বেঁচে থাকলে অবশ্যই নাড়িয়ে দিতেন গোটা বিশ্ব!

১৯২৭ সালে মুক্তি পায় হিচককের চলচ্চিত্র ‘দ্য লডজার’। একই বছরের ডিসেম্বরে হিচকক বিয়ে করেন আলমা রিভিলিকে। হিচকক ছিলেন ব্রিটেনের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র নির্মাতা। ১৯২৯ সালে তার ‘ব্ল্যাকমেইল’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে ব্রিটেনে সবাক চলচ্চিত্রের যাত্রা শুরু হয়। ১৯৩৮ সালে তিনি নির্মাণ করেন ‘দ্য লেডি ভেনিশেস’ ও ১৯৩৯ সালে ‘জ্যামাইকা ইন’। ১৯৪০ সালে হিচকক নির্মাণ করেন ‘রেবেকা’। মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলার ‘রেবেকা’ সেরা চলচ্চিত্র হিসেবে একাডেমি পুরস্কার পেয়েছিল। তার করা এটিই একমাত্র চলচ্চিত্র যা সেরা চলচিত্রের পুরস্কার লাভ করে। ১৯৪২ সালে ‘সাবটিউর’ মুক্তির পর হলিউডে পরিচালক হিসেবে তার একটা শক্ত অবস্থান হয়। ১৯৪৩ সালে ‘শ্যাডো অফ ডাউট’টি তার পরিচালিত চলচ্চিত্রের সবচেয়ে আলোচিত চলচ্চিত্র। ১৯৪৪ সালে তার আরেকটি আলোচিত ছবি মুক্তি পায় ‘লাইফ বোট’। এতে দেখানো হয় কীভাবে একটি নৌকার আরোহীরা বেঁচে থাকার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে। ১৯৫৫ সালে প্রচারিত ‘আলফ্রেড হিচকক প্রেজেন্ট’-এর মাধ্যমেই তার পরিচিতি মানুষের কাছে বেশি পৌঁছায়। এটি ছিল মূলত একটি টিভি শো। সিরিজটি ১৯৫৫ থেকে শুরু হয়ে ১৯৬১ সাল পর্যন্ত টিভিতে চলাকালে ১৯৫৬ সালে তিনি নাগরিকত্ব পান যুক্তরাষ্ট্রের।

হিচকক ১৯৬০ সালে বিখ্যাত মনোজাগতিক বিকৃতি বিষয় নিয়ে চলচ্চিত্র ‘সাইকো’ নির্মাণ করেন যা বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ‘দ্য মোমেন্ট অফ সাইকো’ উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি করা হয় এটি। গোসলখানার ৪৫ সেকেন্ডের ওই ভয়ঙ্কর দৃশ্য দর্শককে চিরকাল আতঙ্কিত করবে। হিচককের মুভির শেষে টুইস্ট অবশ্যম্ভাবী। ভীতি, ফ্যান্টাসি, হিউমার ও বুদ্ধিদীপ্ততাÑ এই চারের কম্বিনেশনে প্লটগুলো মূলত মার্ডার, অপরাধ, ভায়োলেন্সের ওপর নির্মিত। তিনি গোল্ডেন গ্লোব, সিনেমা জাম্পো অ্যাওয়ার্ড, লরিয়াল অ্যাওয়ার্ড, ডিরেক্টরস গিল্ড অফ আমেরিকা অ্যাওয়ার্ড, আমেরিকান ফিল্ম ইনস্টিটিউট অ্যাওয়ার্ড, একাডেমি অ্যাওয়ার্ড-এর মতো পুরস্কার পেয়েছেন। তবে সেরা পরিচালক হিসেবে কখনোই একাডেমি পুরস্কার পাননি।

১৯৬৮ সাল। হিচককের ক্যারিয়ার তখন পড়তির দিকে। তার সিনেমাগুলোও ঠিক প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না। তখন তার নামের প্রতি সুবিচার করতেই শুরু করলেন ক্যালাইডোস্কপ সিনেমার কাজ। খুন, ধর্ষণ, পেশিশক্তি, সিরিয়াল কিলিংয়ে ভরপুর এক থ্রিলার। ‘দ্য বার্ডস’-এ যে রকম তেমনি এটিতেও নতুন কিছু ফিল্ম টেকনিক প্রয়োগের পরিকল্পনা আঁটলেন। চিন্তা ছিল প্রাকৃতিক আলো ব্যবহার করা, স্ট্যান্ডের বদলে ক্যামেরা হাতে নিয়ে শুট করা এবং পয়েন্ট অফ ভিউ অ্যাঙ্গেলে শুট করার মতো ভাবনাগুলো। প্রি-প্রডাকশনে প্রচ- পরিশ্রম করার পরও শেষ পর্যন্ত সিনেমাটা শেষ করতে পারলেন না তিনি। টাকার অভাবে প্রায় ঘণ্টাখানেকের ফুটেজ নিয়ে অসমাপ্ত পড়ে রইলো ক্যালাইডোস্কপ। এর কিছু অংশ অবশ্য তিনি পরে ‘ফ্রেঞ্জিতে’ (১৯৭২) ব্যবহার করেন।

১৯৭৭ সাল থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত হিচকক পরবর্তী প্রজন্মের লেখকদের সঙ্গে ‘দ্য শর্ট নাইট’ নিয়ে কাজ করেন যা তার মৃত্যুর পর স্ক্রিনপ্লে হয়। তার অনেক চলচ্চিত্রেই নিজের একমাত্র মেয়ে প্যাট্রেসিয়া হিচকককে দেখা যায়। ‘এন্টারটেইনমেন্ট উইকলি’ ম্যাগাজিনে বিশ্বের সেরা ১০০ চলচ্চিত্রের মধ্যে তার চলচ্চিত্র ‘সাইকো’, ‘ভারটিগো’, ‘নর্থ বাই নর্থওয়েস্ট’, ‘নটোরিয়াস’ স্থান পেয়েছে।
১৯৭৯ সালের ৭ মার্চ আলফ্রেড হিচকক আমেরিকান ফিল্ম ইনস্টিটিউট থেকে ‘লাইফ অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড’ পান।
১৯৮০ সালের ২৯ এপ্রিল আমেরিকার ক্যার্লিফোনিয়ায় হিচকক ৮০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর কয়েক মাস আগে রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ-এর কাছ থেকে ‘নাইট’ উপাধি লাভ করেন। স্যার আলফ্রেড হিচককের চলচ্চিত্র, নির্মাণকৌশল পরবর্তীকালে অনেক বিখ্যাত পরিচালককে পথ দেখিয়েছে। চলচ্চিত্র যে কতো বড় একটা শিল্প হতে পারে, মানুষের কাছে এর মাধ্যমে কতোটা গভীরে পৌঁছানো যায় তা তিনি করে দেখিয়েছেন। তাই চলচ্চিত্রে সাসপেন্স, থ্রিলিংয়ের জগৎ সৃষ্টিকারী এ চলচ্চিত্রের বিস্ময়কর নির্মাতা আলফ্রেড হিচকক আজও চলচ্চিত্র দর্শক-নির্মাতাদের কাছে বেঁচে আছেন এবং থাকবেন।

 


ছবি : ইন্টারনেট

অনন্য ইনগ্রিড বার্গম্যান

শিরিন সুলতানা

 



দায়িত্বটা নিজেই নিয়েছিলেন নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার। জন্মের তিন বছেরের মাথায় যার মা এবং ১২ বছরে বাবা মারা যায় তাকে তো এতোটুকু দৃঢ় হতেই হয়। মা ফ্রিডেল এডলর বার্গম্যান কোনো স্থায়ী স্মৃতি রাখতে পারেননি, ছোট্ট শিশুটির মনে কোনো স্থায়ী স্মৃতি রাখতে পারেননি। তবে বাবা জ্যাস্টাস স্যামুয়েল বার্গম্যান মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আগলে রেখেছিলেন মেয়েকে। ফটোগ্রাফির দোকান ছিল তার। মেয়ের প্রতিভা কিছুটা হলেও টের পেয়েছিলেন। তাই ছোট্ট শিশুর কিছু মোশন চিত্র রেকর্ড করেছিলেন তিনি। স্কুলের পাট চুকানোর পর নিজেই সিদ্ধান্ত নেন অভিনেত্রী হওয়ার।


যাকে নিয়ে এতো কথা তিনি হলেন প্রতিথযশা লাস্যময়ী অভিনেত্রী ইনগ্রিড বার্গম্যান। বলা হয়ে থাকে হলিউডকে দেয়া সে এক মহাশঙ্খ সুইডিশ উপহার। ১৯১৫ সালের ২৯ আগস্ট স্টোকহোমে জন্ম নেয়া এই তুখড় অভিনেত্রী মা-বাবা মারা যাওয়ার পর চাচার কাছেই মানুষ হয়েছিলেন। কৈশরেই তিনি বিভিন্ন ছবির এক্সট্রা হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯৩৩ সালে গ্র্যাজুয়েট শেষ করার পর স্টকহোমের রিয়াল ড্রামাটিক থিয়েটার স্কুলে স্কলারশিপ পান। এ সময় তার মঞ্চে অভিষেক ঘটে। চলচ্চিত্রে প্রথম পদার্পণ করে ‘মুন্কব্রোগ্রেভেন’ সুইডিশ ছবিটির মাধ্যমে। খুব একটা নামডাক না হলেও অভিনেত্রী হিসেবে একটা জায়গা তৈরি হয় তার।


১৯৩৬ সালে ইনগ্রিডের জীবনের মোড় ঘুরে যায় গুস্তাফ মোলান্ডারের ‘ইন্টারমেজো’ ছবিতে অভিনয় করে। দারুণ ব্যবসা সফল ছবিটি সাড়া ফেলে সুইডেনে। বিখ্যাত হন ছবির সঙ্গে ইনগ্রিডও। মুগ্ধতায় আবেশিত হয় হলিউড চলচ্চিত্র প্রযোজক ডেভিড সেলজনিকও। ছবিটি হলিউডে পুনর্নির্মাণের প্রস্তাব দেন সেলজনিক। এই একটি ছবি করেই সুইডেনে ফেরার কথা ছিল ইনগ্রিডের। সেখানে তার ডেন্টিস্ট স্বামী ডা. পিটার লিন্ডস্ট্রোম ও কন্যা পিয়াকে রেখে এসেছিলেন। এদিকে হলিউড ভার্সন ‘ইন্টারমেজো : দ্য লাভ স্টোরি’ (১৯৩৯) বক্স অফিস হিট হয়। তারকাখ্যাতি ও হলিউডে থিতু হওয়ার হাতছানি ইনগ্রিডকে মোহাচ্ছন্ন্ করে ফেলে। সেলজনিকের অনুরোধে হলিউডে থিতু হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। জহুরি চোখ ভুল করেনি। প্রযোজক ও চিত্রনাট্যকার সেলজনিক সাত বছরের জন্য চুক্তিবদ্ধ করেন ইনগ্রিডকে। ওই সাত বছরে তিনি মাত্র দুটি ছবিই নির্মাণ করেছিলেন ইনগ্রিডকে নিয়ে। ‘গান উইথ দ্য উইন্ড’ (১৯৩৯) ও ‘রেবেকা’ (১৯৪০) ছবি দুটিই একাডেমি পুরস্কার পায়। ধীরে ধীরে ইনগ্রিডের লস্যময়ী নারীসুলভ, প্রেয়সীর ইমেজের ছোট্ট চারাগাছটি মহীরুহে পরিণত হয় সমগ্র হলিউডে তথা আমেরিকায়।

১৯৪২ সালে নির্মিত হয় কালজয়ী চলচিত্র ‘ক্যাসাব্লাংকা’। ইনগ্রিডের সঙ্গে নায়কের ভূমিকায় ছিলেন হামফ্রে বোগার্ট। হলিউড চলচ্চিত্রে এই ছবিকে মাস্টারপিস হিসেবে গণ্য করা হয়। ছবিতে বোগার্টের সঙ্গে ওই অন্তরঙ্গতা, চুম্বন দৃশ্য, চাহনি, গুমরে ওঠা দীর্ঘশ্বাস সন্তর্পণে লুকানোÑ সবকিছুই যেন দর্শকের মন ও মগজে ঠাঁই করে নেয় অবলীলায়। দর্শক বুঁদ হয়ে আটকে যায় বার্গম্যানের সাবলীল অভিনয়ের ফাঁদে। এলসা নামের সারল্যমাখা রমণীর ওই চরিত্রকে ইনগ্রিডের অভিনিত শ্রেষ্ঠ চরিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তার ঐশ্বর্যময় সৌন্দর্য বহুমুখী অভিনয় প্রতিভা, কাজের প্রতি একাগ্রতা, নিয়মানুবর্তিতাÑ সবকিছুর সমন্বয়ই তাকে শিখরে পৌঁছানোর অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। ওই সময় অন্য অভিনেত্রীরা যখন মেকআপের ভারে, পোশাকের চাকচিক্যে ন্যুব্জ হয়ে থাকতেন তখন ইনগ্রিড প্রায় মেকআপহীন সাধারণ পোশাকের মহিমায় হয়েছে উদ্ভাসিত। সম্পূর্ণ বিপরীতধারা থেকেই তিনি জয় করেছেন হাজারো দর্শকের হৃদয়। চরিত্র বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও দারুণ খুঁতখুঁতে ছিলেন তিনি।


১৯৪৩ সালে একটি মাত্রই ছবি করেন বার্গম্যান। আর্নেস্ট হোমিংওয়ের উপন্যাস অবলম্বনে ‘ফর হোম দ্য বেল টোলস’ ছবির মারিয়া চরিত্রটি প্রায় লুফে নেন তিনি। চরিত্রের ক্ষুধা তখন তাকে পেয়ে বসে। ইনগ্রিডের চিরচেনা রূপ থেকে বেরিয়ে এসেও ছোট করে ছাঁটা সোনালি চুলের মারিয়া দারুণ আবেদনময়ী হিসেবে ধরা দেয়। এ ছবিতে অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর অস্কার মনোনয়ন পান তিনি। ওই বছর খালি হাতে ফিরলেও পরের বছরই শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর অস্কারটি চলে আসে তার ঝুলিতে। দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের পর ইনগ্রিড বার্গম্যান আমেরিকার সবচেয়ে বড় বক্স অফিস সেলিব্রিটি হয়ে ওঠেন। পরবর্তী দুই বছরে আলফ্রেড হিচককের ‘স্পেলবাউন্ড’ ও ‘নটরিয়াস’ ছবি দুটিতে অনবদ্য অভিনয় করেন তিনি। ফলে সাফল্যের মুকুটে হতে থাকে নতুন নতুন পালকের সাবলীল সংযোজন।


প্রত্যেক শিল্পীর কিছু স্বপ্নের চরিত্র থাকে। ‘জায়ান অফ আর্ক’ ছবির জোয়ান চরিত্রটি তেমনই ‘ড্রিম প্রজেক্ট’ ছিল ইনগ্রিডের। দরিদ্র ফরাসি জোয়ান (পরে সন্ন্যাসী হয়ে ওঠে) চরিত্র পাওয়ার জন্য যথেষ্ট কাঠখড় পুরিয়েছেন তিনি। চতুর্থবারের মতো শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর অস্কার মনোনয়ন পায় চরিত্রটি। ইনগ্রিডের পালে তখন নতুন হাওয়ায় তর তর করে এগিয়ে চলছে সাফল্যের তরী। হঠাৎই যেন জমাট মেঘের ষড়যন্ত্র। তিনি ১৯৪৮ সালে ইটালিতে পাড়ি জমান ‘স্টমবলি’ ছবির শুটিংয়ের জন্য। পরিচালক রবার্তো রসেলিনের কাজে আগে থেকেই মুগ্ধ ছিল তিনি। জীবনটা যেন ওলট-পালট হওয়ার অপেক্ষায় ছিল তার। না হলে সাফল্যের চরম শিখরে বসে, স্বামী-সন্তান তুচ্ছ করে প্রেমেই বা পড়বেন কেন রসেলিনের। তুমুল ওই প্রেমের পরিণতিতে সন্তানসম্ভাবা হয়ে পড়েন তিনি। এ খবর চাউর হতে সময় লাগে না। পুরো আমেরিকা হতবাক হয়ে পড়ে এ সম্পর্কে জানার পর। হলিউডপাড়া থেকে সিনেট পর্যন্ত তুমুল ঝড় বয়ে যায়। যাকে সাক্ষাৎ দেবীর আসনে বসিয়েছে বিশ্ববাসী, যে রমণী নারীত্বে মহিমায় উদ্ভাসিত করেছেন নিজেকে তার এমন অধঃপতন (!) দর্শক মেনে নিতে পারে না কিছুতেই। সবাই বয়কট করেন ইনগ্রিডকে। বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়ে ‘স্ট্রমবলি’ (১৯৫০)।


এমনতর প্রক্রিয়ায় ইনগ্রিড আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘মানুষ আমাকে জোয়ান অফ আর্ক হিসেবে, সন্ন্যাসী হিসেবে দেখে। আমি তা নই। আমি শুধু একজন নারী, একজন মানুষই।’ এতো ঘটনায় ইটালিতেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় তিনি। পরবর্তী সাত বছর এখানেই কাটিয়ে দেন রোসেলিনের সঙ্গে। এ সময় তাদের এক পুত্র ও যমজ কন্যা সন্তানের জš§ হয়। সাত বছর পর যেন ফিনিক্সের মতোই উঠে দাঁড়ান ইনগ্রিড। ১৯৫৬ সালে আবারও সদর্পে হাজির হন হলিউডে ‘অ্যানাস্টাশিয়া’ ছবির টাইটেল চরিত্রে অভিনয় করে। পুরো ছবিটি চিত্রায়িত হয় ইংল্যান্ডে। ততো দিনে রবার্তোকে নিয়ে স্ক্যান্ডাল স্তিমিত হয়েছে। অভিমানে মুখ ফেরানো দর্শক আবার ভালোবাসার আলিঙ্গনে বাঁধে ইনগ্রিডকে। এ ছবিতে অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর অস্কার ধরা দেয়। তার জীবনে দীর্ঘ সাত বছরের অভিশাপ যেন ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয় ছবিটি। ষাট থেকে সত্তরের দশক তিনি অক্লান্ত কাজ করে যান। পেছনের ভুল সুধরে নিতেই এ অবিরাম চলা। ১৯৭৪ সালে আবারও ওই প্রাপ্তি। ‘মার্ডার অন দ্য অরিয়েন্ট এক্সপ্রেস’ ছবিতে অভিনয় করে শ্রেষ্ঠ পার্শ্বঅভিনেত্রীর অস্কার ঘরে তোলেন। শেষ বয়সে সাফল্যের মুকুটে আরো একটি পালক যোগ হয় ‘অটাম সানাটা’ দিয়ে।
১৯৭৪ সালে ধরা পড়ে তার ব্রেস্ট ক্যানসার। কর্কট কামড়কে উপেক্ষা করেই টিভি সিরিজ ‘অ্যা ওম্যান কল্ড গোল্ড’ শেষ করে ইনগ্রিড। অবশ্য ছবির সাফল্য দেখে যেতে পারেননি। জীবন নদীর ওপার থেকে তিনি কি শুনতে পেয়েছিলেন, অ্যামি অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে দ্বিতীয়বারের মতো শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে তার নাম ঘোষিত হলো?


ক্যানসার ধরা পড়ার আট বছরের মাথায় ঠিক তার জন্মদিনেই ১৯৮২ সালে ৮৭ বছর বয়সে পরপারে পাড়ি জমান ইনগ্রিড। বরফরাজ্যে জন্ম নেয়া রাজস্বী ওই নারী আজন্মের ঠাঁই করে নিয়েছেন লাখো দর্শকের হƒদয়ে।

ছবি : ইন্টরনেট

হোয়াইট বেলুন

তিয়াষ ইসতিয়াক

 



বহু বছর ধরে ইরানের সিনেমা বিশ্ববাসীর কাছে এক বিস্ময়ের নাম! একদমই সাদামাটা কিছু গল্প যে কী করে হৃদয়ের অলিন্দে ছড়িয়ে যাবে, এক চিলতে কিছু অনুভূতি আশ্চর্য রকম ক্ষিপ্রতায় মগজের কোষে কোষে কখন যে জায়গা করে নেবে তা টেরই পাওয়া যায় না! ইরানের সিনেমাগুলোয় এই এক বৈশিষ্ট্য- দেখার সময় আপনার মনে হবে যেন পাশের বাসায় ঘটে যাওয়া গল্পটা কিংবা নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা দেখছেন।
পরিচালক রিলে ভাসিয়ে আপনাকে নিয়ে যাবে এক আশ্চর্য চেনা জগতে যেখানে সময় স্থির! জীবনটা যে কী আশ্চর্য সহজ কিন্তু রঙিন হয়ে ধরা দেয় তা কল্পনাই করা মুশকিল!
এমনই এক সিনেমার কথা বলবো আজ। এর পার্সিয়ান নাম ইধফশড়হধশব ঝবভরফ এবং ইংরেজিতে তা হয় ঞযব ডযরঃব ইধষষড়ড়হ (সফেদ বেলুন)। এটি ১৯৯৫ সালের ড্রামা সিনেমা। ইরানের অন্য দশটি ছবির মতো এটিও এক অতি সাধারণ নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের কাহিনী। ইরানে নববর্ষের মাত্র কয়েক ঘণ্টা বাকি তখন। মায়ের সঙ্গে বাজারে গিয়ে পরিবারের ছোট্ট মেয়ে রাজিয়ার চোখ আটকে যায় এক সুন্দর গোল্ড ফিশের ওপর। এরপর থেকে মায়ের কান ঝালাপালা করে দিতে থাকে ওই ১০০ তোমান (ইরানের মুদ্রা) দামের গোল্ড ফিশটির জন্য! কিন্তু মা অনড়। দারুণ হিসাবি সংসারে একটা শৌখিন মাছের জন্য ১০০ তোমান খরচ করা বড্ড বোকামি। তাছাড়া বাড়িতে কয়েকটা গোল্ড ফিশ তো আছেই। কিন্তু বাজারের গোল্ড ফিশগুলো বেশ নধরকান্তি। রাজিয়ার ভাষায় নতুন বৌয়ের মতোই সুন্দর!


অবশেষে নানান প্রলোভন দেখিয়ে ভাইকে দিয়ে মাকে রাজি করাতে পারে ছোট্ট মেয়েটি! মা ৫০০ তোমান দিয়ে বলে ৪০০ তোমান যেন ঠিক ঠিক ফিরিয়ে আনে। রাজিয়া যেন হাতে স্বর্গ পেয়ে যায়! তখনই ছুট লাগায় পছন্দের মাছটি কিনতে। পথে বেশকিছু উটকো ঝামেলা পোহানোর পর ওই কাক্সিক্ষত দোকানে পৌঁছায় সে। কিন্তু আরেক সমস্যা বাধায় দোকানি। সে এখন মাছটির জন্য দাবি করে বসেছে বাড়তি দাম। ঠিক যেন উৎসবের সময় আমাদের দেশের দোকানিদের মতো! কঠিন বাস্তবতার ওপর ভীষণ মন খারাপ করে রাজিয়া নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ আবিষ্কার করলো, ওই মহামূল্যবান ৫০০ তোমানের নোটটি উধাও!
এখন ছোট্ট মেয়েটি কী করবে! শখের মাছটা কি কেনা হবে না? বাড়ি গিয়ে মাকেই বা কী বলবে? এই ভরাবাজারে একটা নোট কীভাবে খুঁজে পাবে ছোট মানুষ রাজিয়া?

কী আছে এই সিনেমায়? হলিউডের সিনেমার মতো ঘাগু হাতে করা ক্যামেরার তাজ্জব করে দেয়া কারিকুরি নেই, সিজিআই আর স্পেশাল ইফেক্টের দুর্ধর্ষ কাজ নেই, নেই বলিউডের গ্ল্যামারের চাকচিক্য কিংবা চমকদার কৃত্রিম আবেদন। নামি-দামি কোনো অভিনেতাও নেই। আছে কয়েকটা লং, ক্লোজ ও কিছু মাস্টার শর্টের কাজ। তাহলে এই সিনেমা কেন দেখতে হবে? ওই সিনেমায় আসলে আছে জীবন। আছে আশ্চর্য প্রাণবন্ত অভিনয়! ছোট্ট রাজিয়ার ভূমিকায় আইদা মোহাম্মদখানি-র অভিনয় দেখার জন্যই ওই সিনেমা দশবার দেখা যায়! ওই সময় আইদা-র বয়স ছিল মোটে সাত বছর! সাত বছরের একটি ছোট মেয়ে কীভাবে এতো অসাধারণ অভিনয় করেছে তা ভেবে কূল পাবেন না নিশ্চিত। মিষ্টি একটা চেহারা এবং অমন নিষ্পাপ একটা চাহনি দিয়ে মন জয় করবেই আপনার! আর এক্সপ্রেশন? দশে একশ’! অনেক বড়
অভিনেতার সঙ্গে টক্কর দিতে পারবে সে।

ঠোঁট উল্টে অভিমানি একটা ভঙ্গি করে মায়ের কাছে কীভাবে যে টাকা চায়! টাকা হারিয়ে ফেলার পর তার ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার দৃশ্যগুলায় দর্শকের চোখে বাষ্প জমায়। বড্ড মায়া লাগে। ইচ্ছা হয় রাজিয়াকে মমতায় জড়িয়ে ধরে চোখ-মুছে আদর করে ১০০টি গোল্ড ফিশ কিনে দিতে! টাকাটা হাতে পাওয়ার পর দুনিয়ার সব মায়া নিয়ে এতো চমৎকার একটা হাসি দেয় যে, তা দেখার পর চোখে আরেকবার পানি আসে। এটি অভিনয় নয় যেন অন্য কিছু! কী এক্সপ্রেশন, কী ডায়ালগ থ্রোয়িং! কাঁপিয়ে দেয় ভেতরটা। এর সঙ্গে সঙ্গে আপনাকে হয়তো নিয়ে যাবে ওই ছোট্টবেলার অভিমান মিশ্রিত সব আবদারের সরল দিনগুলোয়। আরেকবার অনুভূত হবে শৈশবের পাওয়া, না পাওয়ার বেদনা। এখানেই তো সিনেমার সার্থকতা।


ইরানের মুভি মায়েস্ত্রো ও সদ্য প্রয়াত আব্বাস কিয়ারোস্তামি অনবদ্য কাহিনীতে তারই অনুসারী ইরানের নয়া স্রোতের জনপ্রিয় পরিচালক জাফর পানাহির
পরিচালনায় প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা ‘সফেদ বেলুন’। আর পহেলা সিনেমাতেই বাজিমাত! এটি বাগিয়ে নিয়েছে বেশ কয়টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার এবং নমিনেশন পেয়েছে কয়টিতে। এর মধ্যে আছে ১৯৯৫ সালের কান ফেস্টিভালের সম্মানিত ক্যামেরা ডি’ওর অর্থাৎ গোল্ডেন ক্যামেরা পুরস্কার। আরো পেয়েছে টোকিও আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভালে গোল্ড অ্যাওয়ার্ড, সাও পাওলো আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভালে জুরি পুরস্কার, কানাডার সাডবারি সিনেফেস্ট-এ সেরা আন্তর্জাতিক সিনেমা ইত্যাদি। তাছাড়া অস্কার পর্যন্ত গড়িয়েছিল এটি। দি গার্ডিয়ান পত্রিকা ওই সিনেমাটিকে সেরা ৫০ ফ্যামিলি মুভির লিস্টে রেখেছে।

দেরি না করে বসে পড়–ন ‘সফেদ বেলুন’ নিয়ে এবং দেখুন আপনার অনুভূতি নিয়ে কেমন খেলা করে সিনেমাটি!

আবিদা সুলতানা

 

 


আবিদা সুলতানার বেড়ে ওঠা একটি স্বনামধন্য সংস্কৃতিমনা পরিবারে। আর এ জন্যই শৈশব থেকেই তার সখ্য গান, নাটক, নাচসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সঙ্গে। ছোটবেলায় গানের চেয়েও নাচের প্রতি বেশি ঝোঁক ছিল তার। রাম গোপাল মহন্ত, ওস্তাদ ফুল মোহাম্মদ, আক্তার সাদমানি, বারীন মজুমদার, ওস্তাদ নারু ও ওস্তাদ সগীরউদ্দীন খানের কাছ থেকে গানের তালিম নিয়েছেন তিনি। সঙ্গীত জীবনে ওই প্রখ্যাত ওস্তাদদের প্রভাব তার গায়কীতে বিশেষভাবে লক্ষ করা যায়। রবীন্দ্র সঙ্গীত ও নজরুল সঙ্গীত- এ দুটির ওপর আবিদা তালিম নিলেও আধুনিক গানেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। পূর্ব পাকিস্তানের একটি সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হন। ১৯৬৮ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারের সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। তখন থেকেই তিনি ওই দুই মাধ্যমে নিয়মিত গান পরিবেশন করে আসছেন। ১৯৭৪ সালে তিনি সর্বপ্রথম প্লেব্যাক করেন। এ পর্যন্ত ৪৫০টিরও বেশি চলচ্চিত্রের গানে কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি।
আবিদা ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের প্রখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী রফিকুল আলমের প্রেমে পড়েন এবং ১৯৭৫ সালে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন। ‘সহজ’কে এই গুণী শিল্পী জানিয়েছেন তার আদ্যোপান্ত

সঙ্গীতের শুরু
কবে থেকে গান করেন এমন প্রশ্ন আমাকে কেউ করলে অবশ্যই বলি, মায়ের পেটে থাকতে গান গাই। এর পেছনে বড় ইতিহাস আছে। আমার গানে বাবা, মামা, খালা, নানি, চাচা অর্থাৎ আমার পরিবারের অবদান অনেক। আমার নানিবাড়িতে পহেলা বৈশাখ থেকে শুরু করে রবীন্দ্র-নজরুলজয়ন্তী, বছরের প্রথম দিন- সব সময় একটা না একটা অনুষ্ঠান থাকতো। আমার অনেক খালাতো ভাইবোন ছিল। সবাইকেই নাচ, গান, নাটক, অভিনয়, আবৃত্তি- সবকিছুই করতে হতো। এভাবেই আমাদের বেড়ে ওঠা। মায়ের অনুপ্রেরণাতেই গানে আসা। নাচটি অবশ্য আমার খুব পছন্দের ছিল। কিন্তু মা চাইতেন আমি গান করি। তাছাড়া আমাদের বাড়িটি ছিল সাংস্কৃতিক পরিম-লে মোড়ানো। আমার বাবা গান ও অভিনয় করতেন। রম্যরচনা ভালো লিখতেন, ছড়ার অনেক বই প্রকাশ হয়েছে তার। আমার মা ছোটগল্প লিখতেন। ওই সময়ে তিনি ‘বেগম’ পত্রিকায় অনেক লেখালেখি করতেন। বাসায় কোনো অনুষ্ঠান হলে মা-বাবাকে দেখতাম এক সঙ্গে গান গাইতে। না হলে কবিতা আবৃত্তি করতেন। ছোটবেলা থেকেই আমাদের রক্তের সঙ্গে মিলেমিশে আছে সাংস্কৃতিক নানান উপাদান। মা-বাবা ও বোনদের প্রভাব আছে বলেই আমি আবিদা সুলতানা এ পর্যায়ে এসেছি। তাদের উৎসাহ না পেলে শিল্পের এক্ষেত্রে কখনোই আসতে পারতাম না। আবৃত্তি করেছি। বাবার চাকরি সূত্রে আমাদের উত্তরবঙ্গে থাকা হতো। শিল্পী পরিবারের সদস্য হওয়ার কারণে সব সময়ই সঙ্গীত আর শিল্প চর্চা দেখে দেখে বড় হয়েছি।

আমার শিক্ষক
রাম গোপাল মহন্ত, ওস্তাদ ফুল মোহাম্মদ, আক্তার সাদমানি, বারীন মজুমদার, ওস্তাদ নারু ও ওস্তাদ সগীরউদ্দীন খানের কাছ থেকে গানের তালিম নিয়েছি। সঙ্গীত জীবনে ওই প্রখ্যাত ওস্তাদদের প্রভাব আমার গানেও পড়ে।

জন্মস্থান
বাড়ি মানিকগঞ্জ। এখানে সেভাবে যাওয়াই হয়নি। ছোটবেলায় বাবা চলে গিয়েছিলেন জলপাইগুড়িতে। মা ছিলেন কলকাতায়। পরে ঢাকায় এসে ওনাদের বিয়ে হয়।

পরিবার
আমাদের পরিবারের সবাই গানের সঙ্গে জড়িত। রবীন্দ্রজয়ন্তী, নজরুলজয়ন্তী- সবকিছুতে আমাদের অংশগ্রহণ করতে হতো ছেলেবেলায়। আমার গানের অনুপ্রেরণা আমার মা। আমার চাচা শিক্ষাবিদ আব্দুর রশীদ বেহালা বাজাতেন। মা ভালো লিখতেন এবং খুব ভালো আবৃত্তি করতেন। সঙ্গীতে আমার মায়ের অবদান অনস্বীকার্য। রফিকুল আলম আমাকে বোঝেন। আমাকে গান বিষয়ে নানানভাবে সহযোগিতা করেন। তার মতো একজনকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পেয়ে সত্যিই নিজেকে ভাগ্যবতী ভাবি।

বিয়ে
১৯৭৪ সালে শিল্পী রফিকুল আলমের প্রেমে পড়ি। ১৯৭৫ সালে আমাদের বিয়ে হয়। এক পুত্র রয়েছে আমাদের। রফিকুল আলম খুব কেয়ারিং ও হেলপিং। তবে ওনাকে অ্যাবসেন্স মাইন্ডেড প্রফেসর বলা যায়।

শিল্পী দম্পতির সুবিধা-অসুবিধা
অনেক বাধার সম্মুখীন হয়েছি। একই প্রফেশন দু’জন থাকলে অসুবিধার চেয়ে সুবিধাই বেশি। ওনার ও আমার কোনো ব্যাখ্যা দিতে হয় না প্রফেশনের বিষয়ে।

বাংলাদেশের সঙ্গীত নিয়ে ভবিষ্যৎ ভাবনা
আমার আসলে গান নিয়ে কোনো প্ল্যান নেই। তবে উপভোগ করি।

মিউজিকের বাইরে নিজের ইচ্ছা
এতিম শিশুদের নিয়ে কিছু করা মিউজিকের বাইরে আমার ইচ্ছা। আর উপস্থাপনার ব্যাপারে আগ্রহ বোধ করি।

ভূপেন হাজারিকার গান
যখন মাত্র ম্যাট্রিক পাস করেছি তখন ১৯৭৪ সালের কথা। বাসায় এলেন আলমগীর কবির ভাই ও ‘চিত্রালী’র সম্পাদক পারভেজ ভাই। ওনাদের সঙ্গে তখনই প্রথম পরিচয়। সীমানা পেরিয়ে ছবিতে ‘বিমূর্ত এই রাত্রে আমার’ গানটি আমার সঙ্গীত জীবনের মাইলফলক। এতো বছর ধরে গানটির জনপ্রিয়তা এতোটুকু কমেনি। এটিই আমার প্রাপ্তি।

বিভিন্ন ভাষায় গান
ক্লাস সেভেনে যখন পড়ি তখন পিটিভি ছিল। আমরা ৪৫ জন ছিলাম যাদের দিয়ে মোট ২০টি ভাষায় গান করানো হয়েছিল। আমি তখন চায়নিজ ও জার্মান ভাষায় গেয়েছিলাম। এটি এক নেশা, বিভিন্ন ভাষায় গানের নেশা। ডিপ্লোম্যাটদের গান শোনানোর সৌভাগ্য আমার হয়েছে। ওমানে ক’দিন আগে গান করে এলাম। এ পর্যন্ত ৩৫টি ভাষায় গান করেছি।

সন্তান
আমার এক ছেলে ফারশিদ আলম। সে বোহেমিয়ান ব্যান্ডে আছে। এছাড়া একটি চ্যানেলেও আছে।

সংসার
পৃথিবীর যেখানেই থাকি, সংসার খুব মিস করি। আমি সংসারে খুব বেশি ইনভলব আর সংসারের প্রতি সবসময় টান অনুভব করি। বিভিন্ন রকম রান্না করতে ভালোবাসি। আমার বাসায় কোনো পার্টি থাকলে চেষ্টা করি নিজে রান্না করতে। আমার ছোট একটি বারান্দা আছে। সেখানে বেশকিছু গাছ আছে। অবসরে সেগুলো পরিচর্যা করি। আর টিভির ভালো অনুষ্ঠানগুলো দেখার চেষ্টা করি।

সঙ্গীতের স্বীকৃতি ও পুরস্কার
আমার ঘরে প্রচুর অ্যাওয়ার্ড আছে দেশ-বিদেশের। তবে মানুষের ভালোবাসা পাওয়ার সৌভাগ্যটাই সবচেয়ে বড়। যদিও ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পাইনি তবুও পুরস্কার পেয়েছি প্রচুর।

উল্লেখযোগ্য ঘটনা
একবার ইটালির রোম থেকে দূরে একটি গ্রামে গিয়েছিলাম। সেখানে একটি পটারির দোকানে ঢুকেছিলাম। ইটালি যাওয়ার ৭ দিন আগে স্বপ্নে দেখেছিলাম ওই দোকানটি। হুবহু ওই দোকান। আমি হতবাক, যাওয়ার সাত দিন আগে দেখা স্বপ্নটি সত্যি হতে দেখা উল্লেখযোগ্য বৈকি!

গান আর সংসার- এই আমার জীবন, আমার বেঁচে থাকা। এ দুটির যে কোনো একটি ছাড়া একটি দিনও কল্পনা করতে পারি না।



ছবি : শোভন আচার্য্য অম্বু

লিভিং ড্রাগন

শিরিন সুলতানা

 

 

বয়স তখন তার ১২ বছর। একদিন রাস্তার কিছু বখাটে ছেলে মারধর করে তাকে। এরপর শরীরের ঘা শুকালেও মনে থেকে যায় অনন্ত দহন। মূলত এই ঘটনাই পাল্টে দেয় ছেলেটির জীবন। প্রতিশোধ স্পৃহা অথবা আত্মরক্ষা যে কারনেই হোক না কেনো ছেলেটি নিজেকে তৈরী করতে থাকে অপ্রতিরোধ্য লৌহ মানব হিসেবে। মার্শাল আর্টসের দীক্ষায় নিজেকে সুরক্ষার সাথে সাথে শত্রু ঘায়েল করার নানা কৌশল নিয়ে আসে ছেলেটি তার নখদর্পনে। বলছিলাম কিংবদন্তি ব্রুস লির কথা, মার্শাল আর্টসকে যিনি নিয়ে গেছেন শিল্পের পর্যায়ে।

১৯৪০ সালের নভেম্বর মাসের ২৭ তারিখে জন্ম হওয়া এই অপ্রতিরোধ্য মার্শাল আর্টিস্টের পুরো নাম ‘ব্রুস ইয়ুন ফান লি’। জন্ম মার্কিন মুল্লুকের সান ফ্রান্সেসকোতে হলেও শরীরে ছিল পুরোটাই চিনা রক্ত। লি হোই চুয়েন এবং গ্রেস হো দম্পতির পাঁচ সন্তানের মধ্যে লি ছিলেন চতুর্থ। তার জন্মের সময়টায় চাইনিজ ক্যালেন্ডারে ড্রাগনকাল চলছিল যা কি না শক্তি ও সৌভাগ্যের প্রতীক। হংকংয়ের চায়নিজ অপেরা স্টার বাবার অনুপ্রেরণায় শৈশব থেকেই তিনি শিশু শিল্পী হিসেবে কাজ করতেন। প্রথম অভিনয় করেন মাত্র ৩ মাস বয়সে, ‘দ্য গোল্ডেন গেট গার্ল’ (১৯৪১) ছবিতে।

১২ বছর বয়সে মার খাবার পর মন প্রাণ ঢেলে মার্শাল আর্টের তালিম নিতে শুরু করেন ব্রুস। শিক্ষাগুরু হিসেবে পান ইপম্যানকে। একটানা পাঁচ বছর দীক্ষা নেবার পর লি নিজেস্ব কিছু কলাকৌশল ও দর্শন যোগ করেন কুংফুর সাথে। নাম দেন- জিৎ কুনে দো (The way of the intercepting fist) অস্বাভাবিক ক্ষীপ্রতা তখন তার শিরায় শিরায়। শুন্যে ছুড়ে দেওয়া চাউলের দানা চ্যাপিষ্টিক দিয়ে ধরে ফেলা কিংবা টেবিল টেনিসে নান চাকু দিয়ে খেলে একসাথে দুই প্রতি পক্ষকে নাকানি চুবানি খাওয়ানো ছিলো তার আমুদে খেলা।


একবার এক প্রতিযোগিতায় ১১ সেকেন্ডেই ধরাশায়ী করে প্রতিপক্ষকে। শুধু কি মারামারি? নাচেও দারুন দক্ষ ছিলেন তিনি। হংকংয়ে ঐতিহ্যবাহী ‘চা চা নৃত্যে’ জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে সবাইকে চমকে দেন লি। লিকলিকে পেশীবহুল পেটানো শরীরের মানুষটার মেজাজটাও ছিল বেশ কড়া। এজন্য হংকং পুলিশের সাথে ঝামেলাও পোহাতে হয় তাকে কয়েকবার। সেগুলো অবশ্য কিশোরোত্তীর্ণ বয়সের কথা। বাবা মা তাই ছেলেকে পাঠিয়ে দেন যুক্তরাষ্ট্রে। বয়স তখন ১৯ বছর। সদ্য যুবক লি সেখানে চায়না টাউনে এক আত্মীয়ের রেস্টুরেন্টে কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে সিয়ালটলে ইউনিভার্সিটি অফ ওয়াশিংটনে ভর্তি হন দর্শন শাস্ত্রে। জীবনে আসে নতুন বাঁক। সখ্যতা হয় একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী লিন্ডা এমেরির সাথে। পরবর্তীতে প্রেম ও সাতপাঁকে বাঁধা। সিয়াটলেই ব্রুস তার প্রথম কুংফু স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। একই সাথে টিভিতে টুকটাক কাজও করতে থাকেন। সেই সুবাদে নাম ডাক হতে শুরু করলে হলিউডের দিকে আস্তে আস্তে অগ্রসর হন লি। হলিউডের ছবিগুলোতে ষ্ট্যানম্যান ও পাশর্^ চরিত্রের কাজ করে আর্থিকভাবে কিছুটা লাভবান হলেও, সেভাবে কারো নজরে আসছিলেন না তিনি। এরপর লি তার পরিবার নিয়ে চলে আসেন হংকংয়ে। ঘরে তখন তার ফুটফুটে দুই সন্তান। ছেলে ব্রান্ডন লি এবং মেয়ে শ্যানোন লি। হংকংএ সময় বেশ কয়েকটি ছবি হয় তাকে নিয়ে। ‘দা বিগ বস’(১৯৭১), ‘ফিস্ট অফ ফিউরি’(১৯৭২) ও দ্য ওয়ে অফ দা ড্রাগন(১৯৭২) তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। শেষোল্লিখিত ছবির রাইটার ডিরেক্টর হিসেবে দুটোতেই সমান দক্ষতা দেখিয়েছিলেন লি। তার নিজের প্রডাকশন হাউজ কনকর্ড পিকচার্স থেকেই রিলিজ হয় ছবিটি।

ব্রুস লি তখন রীতিমত ষ্টার। হলিউডের ঢিসুম ঢিসুম মারামারিকে একহাত দেখিয়ে মার্শাল আর্টসের জয়জয়কার সারাবিশে^। ‘এন্টার দা ড্রাগন’ যে ছবি লি’কে হলিউডে তারকাখ্যাতি এনে দিয়েছে তার কাজ শুরু হয় ১৯৭৩ সালের জানুয়ারী মাসে, হংকংয়ে। শুটিং শেষ হয় মাস ছয়েকের মধ্যেই। সারা বিশ্ব যখন কাপঁছে ব্রুসলি জ্বরে, তখনই ঘটলো সে অপয়া ঘটনা। কয়েকদিন ধরেই মাথায় সেই পুরনো যন্ত্রনা কাতর করছিলো তাকে, সাথে পিঠের ব্যাথা। ডাক্তার অনেক আগেই সনাক্ত করেছিল সেরিব্রাল এডিমা। ব্রেনের একটা অংশে ফ্লুইড জমা হচ্ছিল। অসহ্য ব্যাথাকে পরাভূত করতে ব্যাথা নাশক এ্যাসপিরিন জাতীয় ঔষধ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েন লি। পরের সকাল আর দেখা হয় না তার। ‘এন্টার দা ড্রাগন’ ছবি মুক্তির ছয়দিন আগেই পাড়ি জমান তিনি না ফেরার দেশে। ১৯৭৩ এর ২০জুলাই, সারা পৃথিবী যেনো থমকে যায় কয়েক মুহুর্ত এ সংবাদে। অপাজেয় লি’র এরকম মৃত্যু কেউ যেন মেনে নিতে পারছিলেন না।

শুরু হয় চারদিকে গুঞ্জন। কেউ বলে চায়নিজ মাফিয়া চক্র, কেউ বলে হংকংয়ের ফিল্ম ইন্ডাষ্ট্রির প্রভাবশালীদের হাত আছে এই মৃত্যুর পিছনে। কেউ বলে তার বান্ধবী বিষ ক্রিয়ায় মেরেছে তাকে। ঘটনা যাইহোক মাত্র ৩২ বছর বয়সেই জীবনের ইতি টানতে হয় মার্শাল আর্টসের মহারাজাকে। তার দর্শন, তার কবিতা, তার লেখনি, সবকিছুই অন্তরালে থেকে গেছে। মানুষ বুঁদ হয়ে শুধুই দেখেছে তার অস্ত্রবিহীন যুদ্ধ কৌশল। মৃত্যুর পর লি’র তিনটি ছবি মুক্তি পায়, ‘এন্টার দা ড্রাগন’, গেম অব ডেথ ও সার্কল অব আয়রন’। মার্শাল আর্টিষ্ট, প্রশিক্ষক, ছবি নির্মাতা, মানবহিতৈষী, দার্শনিক, অভিনেতা, একের মধ্যে এ যেন অনেক গুনের আষ্টেপৃষ্টে বাঁধন। এ এক অনন্য কিংবদন্তি ব্রুস লি।

 

মুনলাইট

ফুয়াদ বিন নাসের

 

ব্যারি জেনকিন্স তার ‘মুনলাইট’ ছবিটিকে খুব সহজেই তিনটি পৃথক চলচ্চিত্রের মাধ্যমে প্রকাশ করতে পারতেন। বর্তমানের প্রিক্যুয়াল-সিক্যুয়াল ও রুপালি পর্দার ব্যবসায়িক সাফল্যের যুগে হয়তো সেটিই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু ফ্লোরিডা স্টেট ইউনিভার্সিটির ফিল্ম ডিপার্টমেন্টের ছাত্র ব্যারি যশ-খ্যাতি বা অর্থ-বিত্তের হাতছানিতে সাড়া দেয়ার মানুষ নন। ‘মেডিসিন ফর মেলানকলি’ চলচ্চিত্রেই তার ওই দর্শনের অনেকটা আঁচ পাওয়া গিয়েছিল। মুনলাইট ছবিটি তিনটি পর্বে বিভক্ত- ‘লিটল’, ‘কাইরন’ ও ‘ব্ল্যাক’। তিনটি নামই ছবির মূল চরিত্রের নাম। একই মানুষের ভিন্ন তিনটি বয়সের তিনটি রূপ মায়ামির রৌদ্রস্নাত পটভূমিতে আঁকার চেষ্টা করেছেন পরিচালক ব্যারি জেনকিন্স। মাদকাসক্তি, একাকিত্ব,
সমকামিতার মতো প্রেক্ষাপট নিয়ে পরিচালক খেলা করেছেন মূল চরিত্র কেন্দ্র করে।


মুনলাইট চলচ্চিত্রটির প্রথম পর্ব ‘লিটল’ আবর্তিত হয় মায়ামির এক বস্তি অঞ্চলে যেখানে দেখা, আমাদের মূল চরিত্র কাইরন ব্ল্যাকের শৈশব। সহপাঠীদের কাছে তাড়া খাওয়া, মায়ের অবহেলা ও বাবার অভাবে নিশ্চুপ হয়ে যাওয়া ছেলেটি বাবার ছায়া খোঁজে এলাকার পান্ডা হুয়ানের কাছে। হুয়ানও এই অদ্ভুত ও চুপচাপ ওই শিশুকে পছন্দ করে ফেলে এবং নিজের বাসায় নিয়ে যায়। তাকে হুয়ানের কাছে ঘেঁষতে দিতে চায় না লিটলের মাদকাসক্ত মা। কিন্তু স্নেহের লোভে লিটল বার বার ওই হুয়ানের চৌকাঠেই ফিরে যায়। হুয়ান এলাকার মাদক ব্যবসায়ী। সবাই সমীহ করে তাকে। কিন্তু লিটলের মায়ের অবহেলা থেকে তাকে রক্ষা করতে না পেরে অসহায় বোধ করে। লিটলের জন্য সুস্থ্য-স্বাভাবিক জীবন চায় হুয়ান। আবার মুদ্রার অন্য পিঠে হুয়ানের মাদকের চালানই অন্ধকার নামিয়ে আনে লিটলের


পরিবারে। ওই চক্র চলতেই থাকে।
এরপর দেখতে পাই কৈশোরের কাইরনকে। লিটলের বয়স খানিকটা বেড়েছে। কিন্তু তার একাকিত্ব কাটেনি। সে অনুভব করে, তাকে পছন্দ করে এ রকম কেউ থাকতেই পারে না। নিজের সেক্সুয়ালিটি নিয়েও তার মধ্যে শঙ্কা কাজ করে। এলাকা ও স্কুলে সহপাঠীদের অত্যাচার এবং অপমানের শিকার কাইরন মুখ ফুটে তার আসল রূপ প্রকাশ করতে পারে না। তার কথা বলার একমাত্র সঙ্গী কেভিনের প্রতি যে আকর্ষণ বোধ করে তা নিয়েও সে সন্ত্রস্ত থাকে। তার আশপাশের জগতে সে দেখে মানুষের নরপশুসুলভ আচরণ ও হিংস্রতা। স্বাভাবিক জীবনে ফেরার শেষ আশাটুকুও ছেড়ে দেয় কাইরন।
মুনলাইট-এর শেষ পর্বে দেখি যুবক কাইরন ব্ল্যাককে। এখানেই পরিচালক ব্যারি তার সর্বোচ্চ মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। আগের দুই পর্বের সব ইতিহাস, হতাশা, আবেগ এক হয়ে পূর্ণতা লাভ করে সেলুলয়েডের অন্তিমভাগে। ব্যারি জেনকিন্স কোনো নীতিকথা প্রচার করার চেষ্টা করেননি, কোনো উপদেশ দেয়ার প্রয়াসও দেখাননি। মুনলাইটের এই শেষ অংকে বোঝা যায়, ছোট এক ছেলের বড় হয়ে ওঠার কাহিনী- কোনো পরিবারের ভালোবাসা, বন্ধুদের সমর্থন, সমাজের সাহায্য ছাড়াই। এ রকম অনেক লিটল, কাইরন ও ব্ল্যাকই অশ্রুর মতো সবার অগোচরেই মায়ামির সমুদ্রে হারিয়ে যায়। কিন্তু আমরা বার বার তাকে ফিরে আসতে দেখি সব বাধা, অবহেলা, তাচ্ছিল্য ও অপমান ডিঙিয়ে। তিন বছর বয়সের কাইরন ব্ল্যাককে রূপায়িত করেছেন এলেক্স হিবার্ট, অ্যাশটন স্যান্ডার্স ও ট্রেভান্তে রোডস। পরিচালক জেনকিন্স এখানে তিন অভিনেতার মধ্যে সমন্বয় করার চেষ্টা করেননি, বরং তিনজন তিনটি চরিত্রই রূপায়ণ করেছেন। চমৎকার সংলাপ ও সিনেম্যাটোগ্রাফির কারণে কাইরন ব্ল্যাকের বেড়ে ওঠা আমাদের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠেছে রুপালি পর্দায়। মায়ামির ঝকঝকে রৌদ্রোজ্জ্বল বালুকাবেলায় শত
হাসিমুখের ভিড়েও যে বিষণ্ণতার বীজ লুকিয়ে থাকে সেটিই পরিচালক অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে চিত্রায়িত করেছেন। সেরা ছবির পুরস্কার মুনলাইটেরই প্রাপ্য।

মহাকালের রথের ঘোড়া : সমরেশ বসু

অরিন্দম মুখার্জী বিংকু

 

 

তারাশঙ্কর থেকে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়। আবার সুনীল, শীর্ষেন্দুদের যুগ। এ দু’যুগের মাঝে সমরেশ বসু ছিলেন সেতু হিসেবে। তাঁর জীবন যাপন, ছেলেমানুষি আচরণ অনেকটাই ছিল ফরাসিদের মতো। এক মাথা ঝাঁকড়া চুল আর অপূর্ব একটা ট্রেড মার্ক হাসি। ঢাকা জেলার মুন্সীগঞ্জ মহকুমার অন্তর্গত রাজনগর গ্রামে পৈতৃক বাস্তুভিটায় ১৯২৪ সালের ১১ ডিসেম্বর জন্ম নেন সমরেশ বসু। বাবা ছবি আঁকতে ভালোবাসতেন। কাগজের ম- দিয়ে মূর্তি তৈরী করতেন। বাড়ির পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে সমরেশের আদলটা একটু আলাদা। পাঠ্য বই পড়ায় মন নেই তাঁর। বাঁধাধরা শিক্ষার বাইরের জীবন যাপনই তাঁকে বেশি টানে। তবু তাঁকে পাঠানো হলো গিরিশ মাস্টারের পাঠশালায়। পরে গে-ারিয়া গ্র্যাজুয়েট স্কুলে পড়লেন সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত। পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ায় বাবা তাঁকে পাঠালেন নৈহাটির রেল কোয়ার্টার্সে দাদা মন্মথ’র কাছে। দাদা ১৯৩৯ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি নৈহাটির মহেন্দ্র স্কুলে তাঁকে ভর্তি করালেন অষ্টম শ্রেণিতে। স্কুলের পড়াশোনা বাদ দিয়ে, নাটক অভিনয়, খেলাধুলা, শরীর চর্চা ও সাহিত্য চর্চায় মনোনিবেশ করেন। সেসময় কিছু লেখালেখিও শুরু করেন হাতে লেখা পত্রিকা বীনায়।


দেবশংকর বন্দোপাধ্যায় ছিলেন তখন তাঁর ঘনিষ্ট বন্ধু। বন্ধুর বাসায় যাওয়া আসার সুবাদে প্রেমে পড়ে সমরেশ বন্ধুভগ্নি গৌরীর সাথে। ‘সমরেশ’ নামটি গৌরীরই দেয়া। তাঁরা যখন পালিয়ে বিয়ে করে সমরেশ তখন ১৮ গৌরী ২১। এই বিয়ে দুই পরিবারের কেউই মেনে নিলেন না। ফলে নৈহাটি থেকে চার মাইল দূরে আতপুরের পুলিশ ফাঁড়ির পেছনে ২ টাকায় ঘর ভাড়া নিলেন। আতপুরে সমরেশের জীবন এক বড় বাঁক নেয়। শুরু হয় জীবনযুদ্ধ। জগদ্দল আতপুরের শ্রমিকপাড়া ও জীবিকার জন্য লড়াই নৈহাটির কাঁঠালপাড়ার দিন যাপনের থেকে বহুলাংশেই আলাদা। এক পোলট্রি ফার্মের সঙ্গে কমিশনের শর্তে ডিম, মুরগি, সবজি বিক্রি করে কোনো রকমে টিকে থাকার চেষ্টায় প্রাণপাত পরিশ্রম করতে লাগলেন। সপ্তাহে ৩-৪ দিন খাওয়া জোটে, বাকি দিন অভুক্ত অবস্থায় কাটে।

বিয়ের পর শুরু হয় জীবনের আসল যুদ্ধ সপ্তাহে তিন চার দিন খাবার জোটে তো বাকি দিনগুলোতে অভূক্ত থাকতে হয়। চরম দারিদ্রতায় সাহিত্য চর্চা ছাড়েননি তিনি। ১৯৪৩ সালের জানুয়ারিতে ইছাপুর রাইফেল ফ্যাক্টরির ইন্সপেক্টরেট অব স্মল আর্মস-এর ড্রইং অফিসে ট্রেজারের চাকরি পেলেন সমরেশ। ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত ৬ বছর এখানেই কাজ করেন তিনি। ওই সময় তাঁর জীবনে অনেক ঘটনা ঘটে যায়। প্রথম সন্তান বড় মেয়ে বুলবুলের জন্ম ১৯৪৩ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি। দ্বিতীয় সন্তান বড় ছেলে দেবকুমারের জন্ম ১৯৪৫ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি। তৃতীয় সন্তান মেজছেলে নবকুমারের জন্ম ১৯৪৬ সালের ডিসেম্বর। চতুর্থ সন্তান ছোট মেয়ে মৌসুমীর জন্ম ১৯৪৮ সালের ডিসেম্বর। এর পাশাপাশি বারাকপুরে জুটফ্রন্টে পার্টির ট্রেড ইউনিয়নের কাজ করতেন। সমরেশ আর গৌরী পার্টি সদস্যপদ লাভ করলেন। সংগঠনের কাজের ফাঁকে ‘উদয়ন’ পত্রিকায় আঁকা ও লেখা শুরু করলেন। উদয়ন লাইব্রেরিতে পড়াশোনা। সাহিত্যের ক্ষেত্রে প্রথম ছোটগল্প ‘শের সর্দার’ প্রকাশিত হয় ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকায়। উদয়ন পত্রিকা তো আছেই, সবচেয়ে বড় ঘটনা ১৯৪৬ সালে শারদীয় ‘পরিচয়’ পত্রিকায় ‘আদাব’ গল্প প্রকাশের সময়। উদয়ন পত্রিকার জন্য আদাব গল্পটি তিনি লিখেছিলেন। কিন্তু বন্ধু গৌর জোর করে ‘পরিচয়’ পত্রিকায় গল্প পাঠিয়ে দেন। বাংলা সাহিত্যে ওই অর্থে সমরেশের প্রবেশ এ গল্পের মধ্য দিয়েই। ১৯৪৯ সালে কমিউনিস্ট পার্টি বেআইনি ঘোষিত হলে সমরেশ ও তাঁর পরিবারকে আবারও দারিদ্রের মধ্যে পড়তে হয়। একই বছর চৌদ্দই ডিসেম্বর সমরেশ গ্রেফতার হয়ে প্রেসিডেন্সি জেলে এক বছর কারাবাস করেন। তিনি বন্দি থাকায় সংসার অচল। মুখ্যমন্ত্রী ডাক্তার বিধান রায়ের শরণাপন্ন হয়েছিলেন বিপর্যস্ত গৌরী দেবী। তিনি বন্দি সমরেশের পরিবারের জন্য দেড়শ’ টাকা মাসোয়ারার বন্দোবস্ত করে দিয়েছিলেন। কারমুক্ত হয়ে সমরেশ নিজেকে আবিষ্কার করেন একজন নিঃসঙ্গ ও বেকার মানুষ হিসেবে। এখান থেকেই তাঁর লেখার সংকল্প জেগে ওঠে। লিখেই জীবন বাঁচাতে মনেপ্রাণে তিনি প্রস্তুত হতে থাকলেন। চারটি নাম নিয়ে সাহিত্যের ক্ষেত্রে সমরেশ পদচারণা করেছেন- সমরেশ বসু, কালকূট, অশোক ঠাকুর ও ভ্রমর।

বাল্যকালে সমরেশের দারুণ ইচ্ছা ছিল আর্টিস্ট হওয়ার। তাই ছাত্র জীবনে কয়েক বন্ধু মিলে হাতে লেখা কয়েকটা ম্যাগাজিনে গল্প, বিভিন্ন ধরনের হাতে আঁকা ছবি ছাপাতেন। বিভিন্ন পত্রিকায় অলঙ্করণও করতেন। তারপর কৈশোর থেকে যৌবন। ওই সময় সাহিত্যের দিকে ভীষণ ঝোঁক এলো। বিভিন্ন গল্প, প্রবন্ধ লিখতে শুরু করলেন। তাঁকে ছবি আঁকা থেকে
লেখালেখির জগতে নিয়ে আসেন ‘সত্য মাস্টার’। এদিক থেকে বলা যেতে পারে, ‘সত্য মাস্টার’ এর সঙ্গে সমরেশের সাক্ষাৎ বাংলা সাহিত্যেরই এক মাইলফলক। এর মধ্যেই সমরেশের প্রথম উপন্যাস ‘উত্তরঙ্গ’ প্রকাশ পায়। তিনি এর উপাদান সংগ্রহ করেছিলেন ইছাপুর রাইফেল ফ্যাক্টরির ইন্সপেক্টরেট অব স্মল আর্মস-এ চাকরিকালে। তা রূপ পেয়েছিল প্রেসিডেন্সি জেলে বন্দি থাকাকালে। ‘উত্তরঙ্গ’ উপন্যাস বিক্রি করে শোধ করলেন এক বছরের বাড়ি ভাড়া। দ্বিতীয় উপন্যাস ‘বিটি রোড়েব ধারে’। এরপর ‘শ্রীমতী কাফে’। প্রথম গল্প সংকলন ‘মরশুমের একদিন’।

সমরেশের প্রথম লেখা উপন্যাস ‘নয়নপুরের মাটি’। ‘উত্তরঙ্গ’-এর বহু আগে (১৯৪৬ সালে) ওই বই লেখা। সাহিত্য আসরের দরজার চৌকাঠটা তখন দূর থেকে উঁকি মেরে দেখেছিলেন তিনি। বছরখানেক ধরে উপন্যাসটির অংশ ‘পরিচয়’ মাসিক পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে ছাপা হয়েছিল। নানান কারণে তা মাঝপথেই থেমে যায়। অনেক দিন পর আবার তা বই আকারে প্রকাশিত হয়।  সমরেশ ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর ‘সাতকড়ি মাসী’ আর ‘জয়নাল’সহ বেশ কয়েকটি গল্প লিখেছিলেন ‘তরণি’ পত্রিকায়। গল্পটি দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পর পার্টির বিরাগভাজন হন। পার্টির সঙ্গে ক্রমেই তাঁর দূরত্ব বাড়তে থাকে। অবশেষে তা তলানিতে এসে ঠেকে। তাকে সাহিত্য ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত করে ‘গঙ্গা’ উপন্যাস।

১৯৫৮ সালে সমরেশ সাহিত্যে ‘আনন্দ’ পুরষ্কার পেলেন। উদ্দ্যম গতিতে এগিয়ে চলে লেখলেখির কাজ। এরই মাঝে সমরেশ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন ছোট শ্যালিকা ধরিত্রীর সাথে। সমরেশ তখন চার সন্তানের পিতা। কল্যাণীতে স্ত্রী গৌরী বসু ও ছেলেমেয়েদের নিয়ে ভরা সংসার। ওই সময়ই ছোট শ্যালিকার সঙ্গে শরীর ও মনের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। গৌরী ছিলেন বাড়ির বড় মেয়ে আর ধরিত্রী ওরফে টুনি সবচেয়ে ছোট, প্রায় সমরেশের মেয়ের বয়সীই। লোকলজ্জার কথা ভাবলে, হয়তো সব দায় ঝেড়ে ফেলে তিনি বেরিয়ে আসতেই পারতেন। কিন্তু ওই পথে হাঁটেননি। ভারতীয় প্রখ্যাত বাঙালি লেখক ও ঔপন্যাসিক সমরেশ বসু পরকীয়ার জেরে শ্যালিকাকে বিয়ে করেন ১৯৬৭ সালের ১৪ই মার্চ এবং দুই বোনকে নিয়ে একসঙ্গে সংসার করেছিলেন। এ অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন গৌরী তথা সমরেশের স্ত্রী, ধরিত্রীর দিদি। সমরেশের দ্বিতীয় বিয়েতে সম্মতি দিলেন। বুক ফেটে গেলেও মেনে নিলেন নিজের বোনের সঙ্গে স্বামীর বিয়ে।

বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধের সময় সবার মত সমরেশও আন্দোলিত হয়ে ছিলেন। তখন বাংলা সাহিত্যে রাজা বাদশা ছিল না, তিনিই ছিলেন যুবরাজ। সমরেশ বসুর মত ব্যাক্তিরা বাউ-েলে বলেই জীবনকে দেখতে পেরেছিলেন নানা বৈচিত্র্যে, তুলে আনতে পেরেছিলেন পানাপুকুর, কখনও জমিদার বাড়ির খিলান থেকে কখনও বা ট্রাক ড্রাইভারের ডেরা থেকে জীবনাবর্তন।
জীবনের বৈচিত্র্যতা খুঁজে ফেরার মাঝেই ১৯৮৮ সালের ১২ই মার্চ নিজের জীবনরে পরিসমাপ্তি ঘটে। ৪০ বছরের কিছু সময় ধরে বাংলা সাহিত্যে তাঁর ছিল অবাধ বিচরণ। হয়তো ভবঘুরে হয়েই যদি আরো কিছুকাল আনাগোনা করতেন তাহলে বাংলা সাহিত্য আরো সমৃদ্ধ হতো।

 

পেইনটিং অমিত রায়

এ জীবন সঙ্গীতেরই জীবন...

ফরিদা পারভীন

 

আমার জন্ম নাটোর জেলার সিংড়া উপজেলার শাঐল গ্রামে ১৯৫৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর। বাবা মৃত ডা. দেলোয়ার হোসেন ও মা মৃত রউফা বেগম। বাবা সরকারি চিকিৎসা পেশায় থাকার কারণে দেশের বিভিন্ন জেলাশহরে আমাদের থাকতে হয়েছে।
ছোটবেলা থেকেই গানের প্রতি আমার একটা টান ছিল। মা-বাবার একমাত্র সন্তান হওয়ায় আদর-যত্ন বেশি পেতাম। আমার আবদার তারা রাখতেন। আমাদের বাসা তখন মাগুরায়। পাশের বাড়িতে হারমোনিয়াম ছিল। আমিও বাবার কাছে হারমোনিয়াম চাইলাম। কিন্তু দিই-দিচ্ছি করে গড়িমসি করতে লাগলেন। অবশ্য ভেতরে ভেতরে চাইতেন তার একমাত্র সন্তান গানের সঙ্গে জড়িত হোক। তিনিও গান পছন্দ করতেন। এক পর্যায়ে বাড়িতে মিস্ত্রি ডেকে এনে হারমোনিয়াম বানিয়ে দিলেন। আর যার কাছে আমার হাতেখড়ি তিনি হচ্ছেন মাগুরার কমল চক্রবর্তী। তার মাধ্যমেই আমার শুরু গানের পথচলা। 


আজ পর্যন্ত কত গান গেয়েছি এর হিসাব রাখিনি। তাছাড়া সংখ্যা দিয়ে তো শিল্পীর মান বিচার করা যায় না! যেমন- বলা যেতে পারে, অনেক গান আছে। তবে শুনতে একটি গানও ভালো লাগে না। ড. আবু হেনা মোস্তফা কামালের ভাষায়- কুকুর অনেকগুলো ছানা প্রসব করে। কিন্তু সিংহের শাবক বেশি হয় না। যে কয়টা গান আজ পর্যন্ত গেয়েছি এর সংখ্যা বেশি না হলেও মানুষের মনে গেঁথে আছে। ভালোবাসা দিয়ে শ্রোতার হৃদয়ের কাছে অবস্থান করে নিয়েছে। সঙ্গীত যেহেতু গুরুমুখী বিদ্যা সেহেতু বেশ কয়েকজন ওস্তাদের কাছে আমার তালিম নেয়া হয়। ওস্তাদ ইব্রাহিম খাঁ, ওস্তাদ রবীন্দ্রনাথ রায়, ওস্তাদ ওসমান গণী, ওস্তাদ মোতালেব বিশ্বাসসহ প্রায় সবাই আমাকে ধ্রুপদী (ক্ল্যাসিকাল) গান শেখাতেন। নজরুল সঙ্গীতের গুরু হলেন ওস্তাদ আব্দুল কাদের ও ওস্তাদ মীর মোজাফফর আলী।

কিন্তু স্বাধীনতার পর আমার লালন সাঁইজির গানের গুরু হচ্ছেন মোকসেদ আলী সাঁই। তার কাছে সাঁইজির গানের শিক্ষা নিই। অনেকটা অনিচ্ছাকৃত ছিল এই তালিম। লালন সাঁইজির জীবদ্দশায় তার অনুসারীদের নিয়ে দোল পূর্ণিমায় মহাসমাবেশ করতেন। এরই ধারাবাহিকতায় এ দেশে স্বাধীনতার পর ওই অনুষ্ঠানে গান করার জন্য আমার গুরু মোকসেদ আলী সাঁই অনুপ্রাণিত করেছিলেন। সেটিও সাঁইজির একটি গান যা শিখে শ্রোতার কাছে উপস্থাপন করি। ‘সত্য বল সুপথে চল ওরে আমার মন’ গানটি তখন এতো জনপ্রিয়তা পেল যে, সঙ্গে সঙ্গেই সিদ্ধান্ত নিলাম সাঁইজির গানই গাইবো। তখন যে অনুভূতি আমার হয়েছিল সেটি বিশ্লেষণ করা যায় না। কিন্তু এখন পর্যন্ত উপলব্ধির মধ্যেই আছে। আর তখন থেকেই লালনকে লালন করে চলেছি।


আগেই বলেছি, লালন সাঁইজির গানে আমার কোনো ভালোবাসা ছিল না। আল্লাহর অভিপ্রায় ছাড়া কোনো কিছুই সম্ভব নয়। তা হলো, এখনো যেখানেই অনুষ্ঠান করি না কেন, সর্বত্রই দেশপ্রেমের গান দিয়েই শুরু করি এবং সঙ্গতকারণেই লালন সাঁইজির গান দিয়ে শেষ করি। কারণ মায়ের কাছে একাধিক সন্তান যেমন স্নেহে আবদ্ধ থাকে ঠিক তেমনি আমার কাছে দেশাত্মবোধক গান আর লালন ফকিরের গান সমানভাবে সন্তানের মতো। আবু জাফর সম্পর্কে আমার কিছু কথা বলবো। তিনি অনেক বড় মাপের গীতিকার ও সুরকার। যেসব গান লিখেছেন, সব কালজয়ী। যদিও তার গানের সংখ্যা খুব বেশি নয় তবুও বাংলা ভাষাভাষীর মানুষ যতদিন থাকবে পৃথিবীজুড়ে ততদিন তাদের কাছে আবু জাফরের দেশপ্রেম ও প্রেম পর্যায়ের গানগুলো কখনোই বিস্মৃত হবে না।


অনেক গীতিকারের গান গাওয়ার সুযোগ আমার হয়েছে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো কবি নাসির আহমেদ, সাবির আহমেদ, কবি জাহিদুল হক, যামিনী কুমার দেবনাথ অন্যতম। আমি চার সন্তানের জননী। সবার বড় হচ্ছে মেয়ে জিহান ফারিয়া মিরপুর বাংলা কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রভাষক, বড় ছেলে ইমাম নিমেরি উপল সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডের সিনিয়র অফিসার, মেজছেলে ইমাম নাহিল অস্ট্রেলিয়ান এমবাসির কর্মকর্তা ও ছোট ছেলে ইমাম জাফর নোমানী উত্তরা ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক।


সংগীতের কথা আমি সব সময়ই বলবো। কারণ সংগীত নিয়েই আমার সব জল্পনাকল্পনা। তবে সংগীতের ক্ষেত্রে বলতে হয়, বিশুদ্ধ সংগীত হলো গুরুমুখী বিদ্যা। এর সঙ্গে নিষ্ঠা, সততা তো লাগবেই, অধ্যবসায়ও জরুরি। এ জন্য গুরুর চরণ ধরে পড়ে থাকতে হয়। কোনো মানুষ- সে যে ধর্মেরই হোক না কেন, তার অভিপ্রায় ছাড়া কোনো কিছুই সম্ভব নয়। মানুষ শুধু চেষ্টা করে যেতে পারে মাত্র। গানের মধ্যে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নিয়ে কিছু কথা না বললেই নয়। অপ্রাপ্তি বলে কিছুই নেই। যা আছে, সবই প্রাপ্তি। আর তা হলো ১৯৮৭ সালে ‘একুশে পদক’, ১৯৯৩ সালে ‘জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার’ (অন্ধপ্রেম), ২০০৮ সালে এশিয়ার নোবেলখ্যাত জাপানের ‘ফুকুওয়াক কালচারাল অ্যাওয়ার্ড’ প্রাপ্তি। এছাড়া দেশ-বিদেশের অসংখ্য পদক-সম্মাননা আমার প্রাপ্তির ভা-ারটি ভরে তুলেছে। ২০১০ সালে বাংলা
একাডেমির ফেলো নির্বাচিত হই।


সঙ্গীত নিয়েই আমার যত ভাবনা। এ জীবন সঙ্গীতেরই জীবন। তাই একটি প্রতিষ্ঠান ‘ফরিদা পারভীন ফাউন্ডেশন’ গড়ে তুলেছি। এখানে বেশ কয়টি প্রজেক্ট চালু আছে। সেগুলো হলো অচিন পাখি, বাঁশি, অন্যান্য যন্ত্র (একুস্টিক), গবেষণা, স্বরলিপির কাজ, স্টাফ নোটেশন, আঁকাআঁকি ইত্যাদি। পর্যায়ক্রমে ওই ফাউন্ডেশনে লালনের দর্শন নিয়ে ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় আছি। এ প্রজন্মের গায়ক-গায়িকাদের কথা বলতে গেলে বলতে হয়, এখন শিকারি হিসেবে অনেক চ্যানেল অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। কাজটি প্রথমত ভালো। কিন্তু পরে ওই ধারা টিকে থাকছে না। এর কারণ হচ্ছে অল্পতেই অর্থ হস্তগত করা, ভালোভাবে না শিখেই নাম করার প্রবণতা। এ জন্য দায়ী করবো তাদের মা-বাবাকে। এ কথা এ কারণেই বলছি, অনেক ছেলেমেয়ে একেবারে অর্থহীনভাবে বেড়ে ওঠে। অথচ ওই পরিমাণ জ্ঞান তারা রাখে না। বলা যায়, কেউ কেউ শুধু অর্থের মোহে পড়ে রেওয়াজ করাই ছেড়ে দেয়। সঙ্গীত যে দীর্ঘ পথপরিক্রমায় প্রতিষ্ঠা পায় এ নিয়ম-নীতি ওইসব বাবা-মা তাদের সন্তানদের শেখান না। আর সন্তানরা তো চিরকালই অবুঝ! সবশেষে একটি কথা না বললেই নয়। তা হলো, সঙ্গীত আধ্যাত্মিকতার বিষয়। এটি এতো সহজে ধরা যায় না। অনেক অধ্যবসায় ও অনুশীলন দিয়েই অর্জন করা যায় সুর। আমি বলবো, আগামী প্রজন্মের যারা গান করবে তাদের বেশি করে জ্ঞান অর্জন করতে হবে। প্রতিদিন রেওয়াজ করতে হবে। সর্বোপরি সবার আগে ভালো মানুষ হতে হবে। তবেই গান হয়ে উঠবে প্রকৃত গান।

গোফ গপ্পো

 

সেই প্রস্তর যুগে পাথরের ক্ষুর দিয়ে মানুষের ক্ষৌরি করার প্রচলন শুরু হয়। সম্ভবত তখনই মানুষের মধ্যে গোঁফ নিয়ে ফ্যাশন করার ধারণার গোড়াপত্তন ঘটে। অবশ্য খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ সালে প্রথম গোঁফ রাখার খোঁজ মিলেছে। গোঁফ হলো পুরুষের নাকের নিচে এক চিলতে রোমশরেখা। তা কারো সরু, কারো মোটা, কারো গাঢ়, কারো আবার পাতলা। অথচ ওই এক চিলতে জিনিসই নারী-পুরুষের মধ্যে বিরাট পার্থক্য গড়ে দেয়ার এক মোক্ষম ‘অস্ত্র’! একই সঙ্গে আলাদা ব্যক্তিত্ব প্রকাশেরও অস্ত্র।
গ্রিক Mustak শব্দ থেকে গোঁফের ইংরেজি Moustache শব্দের উৎপত্তি। Mustak অর্থ উপরের ঠোঁট। পুরুষের মুখে ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার পর্যন্ত চুল গজায়। এর মধ্যে গোঁফে থাকে ৬০০টির মতো। গোঁফ গজানো বা কম-বেশি হওয়ার পেছনে যে হরমোনটি ‘দায়ী’ এর নাম টেস্টোস্টেরন। এই গোঁফ মহাশয় আবার বড্ড আলসে। প্রতিদিন গড়ে মোটে ০.০০১৪ ইঞ্চি করে বাড়ে। আর বছরে বাড়ে ৫-৬ ইঞ্চি করে।


আদিকাল থেকেই গোঁফ মানুষের বড় এক আলোচনার বিষয়বস্তু। জনপ্রিয় ছড়াকার সুকুমার রায় তার ‘গোঁফ চুরি’ ছড়ায় তো ঘোষণাই দিয়ে দিয়েছেনÑ

‘গোঁফকে বলে তোমার আমার, গোঁফ কি কারো কেনা?
গোঁফের আমি গোঁফের তুমি, তাই দিয়ে যায় চেনা।’

অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও তার ‘গোঁফ এবং ডিম’ প্রবন্ধে গোঁফের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।
গোঁফ নিয়ে বাংলায় প্রবাদ-প্রবচনের শেষ নেই। গোঁফ খেজুরে, গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল, গোঁফে তা দেয়া, শিকারি বিড়াল গোঁফে চেনা যায় ইত্যাদি প্রবাদ দৈনন্দিন ঘুরে বেড়ায় আমাদের মুখে। তবে শুধু শিকারি বিড়ালই নয়, গোঁফ দিয়ে চেনা যায় অসংখ্য জনপ্রিয় মানুষকেও। তাদের নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে আশ্চর্য একজোড়া গোঁফ!
যাদের আইকনিক ট্রেডমার্ক গোঁফ তাদের তালিকায় সম্ভবত সবচেয়ে উপরের দিকে থাকবেন স্যার চার্লি চ্যাপলিন ও অ্যাডলফ হিটলার। দু’জনই প্রায় একই রকম অদ্ভুতুড়ে গোঁফধারী ছিলেন। কিন্তু একজন পুরো পৃথিবীতে দিয়েছেন হাসির খোরাক, অন্যজন দিয়েছেন কান্নার উপলক্ষ। জনগণের দৃষ্টি আলাদাভাবে আকর্ষণের জন্য হিটলারের দুর্দান্ত উপায় ছিল তার ওই অদ্ভুত গোঁফের ফ্যাশন। ১৯২৩ সালে নাজি প্রেস সেক্রেটারি ড. সেজুইক অবশ্য হিটলারকে পরামর্শ দিয়েছিলেন একটি স্বাভাবিক গোঁফের ছাঁট লাগাতে। হিটলার উত্তর
দিয়েছিলেন এভাবেÑ ‘আমার গোঁফ নিয়ে একদম ভাবতে হবে না। যদিও এটি এখনো ফ্যাশন হয়নি তবুও এক সময় ঠিকই ফ্যাশন হয়ে দাঁড়াবে!’
গোঁফ থেকে বিচ্ছুরিত আত্মবিশ্বাস!!
রাজা-বাদশাহরা প্রচুর সময় নষ্ট করতেন ওই গোঁফের পেছনে। এছাড়া প্রচুর অর্থও নাকি ঢালতেন। বড় ও বাহারি গোঁফ ছিল শৌর্যের প্রতীক। মোগল বাদশাহদের ছিল শৌখিন গোঁফ। সম্রাট আকবরের গোঁফ ছিল মুগ্ধ হওয়ার মতো। তাছাড়া সুন্দর গোঁফ ছিল টিপু সুলতান, নবাব সিরাজ-উদ-দৌলারও।
বিখ্যাত গুঁফোদের মধ্যে আরো আছেন সালভাদর ডালি, জোসেফ স্টালিন, চে গুয়েভারা প্রমুখ।

 

______________________

লেখা : তিয়াষ ইসতিয়াক
মডেল : নীল
ছবি : শোভন আচার্য্য অম্বু

 

পারফিউম...

 

সুগন্ধি ব্যবহারের প্রচলন সুপ্রাচীনকাল থেকে। মানুষ এক সময় বিভিন্ন সুগন্ধি ফুল আর লতা-পাতার নির্যাস সুগন্ধি হিসেবে ব্যবহার করত। প্রাচীনকাল থেকে সুগন্ধি উদ্ভাবনের ইতিহাস খুঁজলে খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ বছর আগে মেসোপটেমিয়া সভ্যতার এক কেমিস্ট ‘টাপুট্টি’র নাম পাওয়া যায়। তাকে সর্বপ্রথম সুগন্ধি তৈরিকারক হিসেবে ধরা হয়। এরপর সভ্যতা থেকে সভ্যতার হাত ধরে এগিয়েই চলছে সুগন্ধির জয়যাত্রা।
সুগন্ধি এমন একটা অনুষঙ্গ যা মানুষের পঞ্চইন্দ্রিয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ঘ্রাণের সঙ্গে জড়িত। মন খুশিতে ভরিয়ে দিতে পারে একটি ভালো সুগন্ধি। তা এনে দিতে পারে স্নিগ্ধ একটি অনুভব।
আধুনিককালে সুগন্ধির ঊন্মেষস্থল হিসেবে একচ্ছত্র অধিপতি ধরা হয় ইউরোপের ফ্রান্সকে। ওই দেশে এখন পর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সুগন্ধি তৈরি হয়ে থাকে। সুগন্ধি উদ্ভাবন ফ্রান্সের শিল্পসত্তার বিকাশ ও অর্থনীতির সঙ্গে ওতপ্রতভাবে জড়িত। বিশ্বের নামি-দামি সুগন্ধি প্রস্তুতকারকরা ফ্রান্সের অধিবাসী। ২০০৬ সালে টমটাইকার পরিচালিত ‘পারফিউম : দি স্টোরি অফ অ্যা ম্যার্ডারার’ মুভিটি দেখেনি এমন মানুষ খুব কমই খুঁজে পাওয়া যাবে। এ মুভিটিতে আমরা খুঁজে পাই পাগলপ্রায় ঠা-া মাথার এক খুনির সুগন্ধি
উদ্ভাবনের শিহরিত পথচলা।


এ প্রসঙ্গে একটি কথা না বললেই নয়, একটা সময় ছিল যখন সুগন্ধির ব্যবহার শুধু সমাজের অভিজাত শ্রেণির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। সুগন্ধি ছিল শুধু বিলাসিতার অঙ্গ। এর পেছনে কারণও ছিল। আগে সুগন্ধি তৈরির নির্যাস ও কাঁচামাল ছিল দুর্লভ এবং অনেক দামি। এর মানে বিজ্ঞানের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে এখন কৃত্রিম উপায়েই এসব কাঁচামাল ও নির্যাস উৎপাদিত হচ্ছে। ফলে সুগন্ধি তৈরি ও এর ব্যবহার এখন অনেকটাই সহজলভ্য। তাই সুগন্ধির ব্যবহার এখন শুধু বিলাসিতার অংশ নয়, বরং সব বয়সের মানুষের কাছে ফ্যাশনের অন্যতম অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে ব্যবহৃত নিত্যনতুন সুগন্ধি তৈরির ফর্মুলা ও উপকরণ সুগন্ধি ব্যবহারের আবেদনটি বাড়িয়ে তুলেছে সবার মধ্যে।
আমাদের দেশের আবহাওয়া নাতিশীতাষ্ণ হলেও গরমের প্রভাব বেশি। গরমে ঘাম হবেÑ এটিই স্বাভাবিক। কিন্তু সুগন্ধি শুধু যে ঘামের দুর্গন্ধ এড়াতেই কাজ করে তা নয়, বরং এর পরশে আমরা হয়ে উঠতে পারি আরো সতেজ ও প্রাণবন্ত।
এ দেশে নব্বইয়ের দশকের শেষের দিক থেকে বিকশিত হয়েছে সুগন্ধির বাণিজ্য। এর আগে এ দেশের বিশ্বখ্যাত সব ব্র্যান্ডের ভালো ভালো সুগন্ধি তেমন সহজলভ্য ছিল না। অনেকেই তাদের প্রিয় সুগন্ধিগুলো বিদেশ থেকে কিনে নিয়ে আসতেন। কিন্তু এখন আমাদের দেশেই নারী-পুরুষের জন্য আছে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সুগন্ধি।
পুরুষের প্রিয় কিছু সুগন্ধির মধ্যে আছে লাকস্ত রেড, হুগো বস, বারবেরি, আজারো, আরমানি ইত্যাদি। অন্যদিকে নারীদের জন্য আছে গুচি, বুশেরন, স্যানেল, ডলসি গাবানা, এস্কাডা ইত্যাদি। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সুগন্ধি পাওয়া যায় ‘পারফিউম ওয়ার্ল্ড’-এর
আউটলেটগুলোয়।

 

_____________________
লেখা : সোনাম চৌধুরী
মডেল : রিবা হাসান
ছবি : কৌশিক ইকবাল

কিউট ইন কুর্তি

 

ফ্যাশন পরিবর্তন হচ্ছে প্রতিনিয়ত। আর এই পরিবর্তনের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বৈচিত্র্যময় ডিজাইনের পোশাক। তবে ফ্যাশনের কথা আসলেই একটা বড় অংশ জুড়ে থাকে মেয়েদের পোশাকের কথা। নিত্যনতুন ডিজাইনের পোশাকের মাধ্যমে নিজেকে আলাদা ও ব্যতিক্রমী হয়ে ওঠার চেষ্টায় ছুটছে সবাই শপিংমলগুলোতে, কিনছে মনের মতো প্রিয় পোশাক। সব শ্রেণীর মেয়েদের কাছেই সালোয়ার কামিজ বেশ জনপ্রিয়। নারীরা সেলোয়ার কামিজে অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দবোধ করে। উপরি পাওনা হিসেবে জাকজমকপূর্ণ সালোয়ার কামিজে একটি নারী হয়ে ওঠে আরও আকর্ষণীয়। শুধু উৎসবেই নয় যে কোন অনুষ্ঠানে সালোয়ার কামিজ পরে নিজেকে অতুলনীয় করে তোলা যায়। সুতরাং নিজেকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে চলুন বেঁছে নিই পছন্দের সালোয়ার কামিজ। বর্তমান ট্রেন্ড-এ সেলোয়র কামিজের ডিজাইন নিয়ে আমাদের কথা হয়েছিল ‘ক্ষনিকা’র স্বত্ত্বাধিকারী ডিজাইনার মারিয়ান ফয়সালের সাথে।

মেরুন সিল্ক
সিল্কের এই কুর্তিতে রয়েছে একটু বড় চড়ষশধ উড়ঃ এর প্রিন্ট। বল গুলোর উপরে করা স্টোন ওয়ার্ক পোশাকটিতে এনেছে পার্টি আমেজ। ভিন্নতা আনতে কালো ছাড়াও এর সাথে গোল্ডেন কালারের দোপাট্টা ও স্যাটিনের পালাজ্জো ভাল লাগবে।

হলুদ
নজর কাড়া হলুদ এই কুর্তি আপনাকে অফিস কিংবা বন্ধুদের আড্ডায় করবে স্বপ্রতিভ। ফুলস্লিভ হাতা, কর্ড পাইপিং আর ব্যান্ড কলারের সমন্বয়ে লিনেন এই কুর্তির নিচের অংশের বাম পার্শ্বে রয়েছে সাদা এমব্রয়ডারি। সাথে পরতে পারেন অফ হোয়াইট বা সাদা রঙের সেলোয়ার।

 

 

লাল
লাল মানেই মন ভাল করে দেওয়া উজ্জ্বলতা তা সে হোক ‘লাল গোলাপ’ অথবা লাল জামা। ইউনির্ভাসিটি কিংবা অফিস ও সান্ধ্যকালীন আড্ডায় যে কোন ঈড়সঢ়ষবীরড়হ-এর মেয়েকে মানিয়ে যাবে। কাফতান গলা, ফোর কোয়ার্টার হাতার চড়ষশধ উড়ঃ এর লিনেন এই কুর্তিতে রয়েছে ব্ল্যাক এমব্রয়ডারি। সাথে পরতে পারেন গাঢ় নীল বা সাদা পালাজ্জো।

সাদা
যেকোন দাওয়াতের অনুষ্ঠানে সাদা এই কুর্তি আপনার লুক-এ এনে দেবে জৌলুস। কাফতান গলা, লেস আর বাটনের কম্বিনেশনে এই কুর্তিটির গর্জিয়াস উপস্থাপন। সাথে পরতে পারেন বেইজ কালার পালাজ্জো ও দোপাট্টা।

বেগুনী
মেঘলা দিনের একঘেঁয়েমি ও উঁষষহবংং কাটাতে উজ্জ্বল বেগুনী এই কুর্তিটি পড়ে নিমিষেই নিজেকে চনমনে ও আকর্ষনীয় ভাবে উপস্থাপন করতে পারেন। মডেলের পরনে যে কুর্তিটি রয়েছে তা লিনেন কাপড়ের উপর ঈড়ৎফ পাইপিং দিয়ে করা। ইধহফ কলার আর ফুলস্লিভ হাতায় এই কুর্তির প্রধান আকর্ষন গাঢ় বেগুনীর উপর হালকা বেগুনী রঙের এমব্রয়ডারি যা অফিসে কিংবা বন্ধুদের আড্ডায় আপনার উপস্থিতি উজ্জ্বল করবে। কুর্তির সাথে পরতে পারেন বেগুনী অথবা সাদা রঙের শেডেড দোপাট্টা ও সালোয়ার।

ফ্লোরাল প্রিন্ট
ফ্লোরাল প্রিন্টেড এই কুর্তিতে লেস বসিয়ে আনা হয়েছে গর্জিয়াস লুক। যা সহজেই বিভিন্ন গেট টুগেদারে পরে যেতে পারেন। সাথে পরতে পারেন ডেনিম অথবা টাইটস্।

 

____________________________________

লেখা : ফারহাতুল জান্নাত
মডেল : মহতী তাপসী ও সায়মা রুসা
পোশাক : ক্ষনিকা
মেকওভার : ক্লিওপেট্রা বিউটি স্যালন
ছবি : শোভন আচার্য্য অম্বু
সহজ স্টুডিও
কৃতজ্ঞতা : মারিয়ান ফয়সাল

 

বসনে বৈশাখ

 

 

গনগনে গরমে হঠাৎ দমকা হাওয়া, এলোমেলো বৃষ্টি, সুতির শাড়িতে বৃষ্টি ফোঁটার জলকেলি, কিশোর-কিশোরীর আম কুড়ানোর উদ্দামতা, বৃষ্টিতে মনের অবগাহনে বৈশাখ যেন এভাবেই ধরা দেয় আমাদের কাছে।
ফ্যাশন সচেতন বাঙালি সারা বছর নানান পূজা-পার্বণে ভিন্ন ডিজাইন ও কাপড়ে নিজেকে রাঙিয়ে নিলেও বৈশাখ মাসে যেন সুতিকাপড় ছাড়া অন্য কিছু ভাবতেই পারেন না।
তাপদাহের মধ্যে সুতির চেয়ে আরামদায়ক বসন আর হয় না। পহেলা বৈশাখ যেমন প্রাণের উৎসব ঠিক তেমনিভাবেই লাল ও সাদা রঙটি বৈশাখ
উদযাপনের জন্য বেছে নিয়েছেন উৎসবপ্রিয় বাঙালি। তাই বাংলা ও বাঙালির জন্য বৈশাখের চিরায়ত রঙ লাল ও সাদা।
ছোট্ট ছেলেটি যেমন লাল-সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি পরে বাবার কোলে চড়ে মেলা দেখতে যায় তেমনি লাল চুড়ি ছাড়া মা ও মেয়ের বৈশাখী উৎসব অপূর্ণ রয়ে যায়।
চৈত্র মাসের বিদায় দেয়ার মাধ্যমে বাঙালি প্রস্তুত নতুন সনে বৈশাখ মাস বরণ করে নিতে। তাই রুদ্ররূপী চৈত্র ভুলিয়ে কালবৈশাখী আপন করে নিতে বাঙালি খুলে বসেন হালখাতা। একটি বছরের নানান সাফল্য, কিছু ব্যর্থতা আর প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির মেলবন্ধনে সাড়ম্ব^ড়ে পালিত হয় পহেলা বৈশাখ। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে রমনার বটমূলে ছায়ানটের ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো গানটি’ আমাদের বৈশাখ বরণের আয়োজনটি বরাবরই পূর্ণ করে। বৈশাখী মেলা, পিঠা উৎসব, নৃত্য, গান, পুতুলনাচÑ এসব কিছুই যেন বৈশাখটি প্রতি বছরই আবারও নতুনভাবে উপস্থাপন করে। চারদিকে বাঁধভাঙা জোয়ার ও কোলাহল, আনন্দিত কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে নবীন-প্রবীণের মিলিত উল্লাসে শহর এবং গ্রামে বাংলায় হয় বৈশাখ উদযাপন। এ উৎসব চিরায়ত ও জাতীয়। সাধ্যমতো প্রতিটি পরিবার আয়োজন করে পান্তা-ইলিশ, নানান ভর্তা, পায়েস, পিঠা-পুলি ইত্যাদি।

এ তো গেল সর্বজনীন বৈশাখী উৎসব উদযাপনের ভূমিকা মাত্র। আমাদের আজকের বসনে বৈশাখ অপূর্ণ রয়ে যাবে যদি এতে বাঙালির বৈশাখী ফ্যাশন নিয়ে দু’কলম না লেখা হয়। বৈশাখের সঙ্গে আসে প্রচ- গরম। তাই বলে কী আর থেমে থাকবে সাজসজ্জা! বৈশাখজুড়ে বাঙালির আধুনিক সাজসজ্জা ও পোশাকে প্রতিফলিত হয় বাঙালিয়ানা। তপ্ত গরমে চিরায়ত সুতি কিংবা খাদি, একরঙা চিকন পাড়ের শাড়ির সঙ্গেও ব্লক ও বাটিক শাড়ি এখন জনপ্রিয়। লাল ও সাদা ছাড়াও ফ্যাশনে এসেছে হালকা রঙের সঙ্গে উজ্জ্বল রঙের মেলবন্ধন। একই সঙ্গে পরতে পারেন সিøভলেস ব্লাউজ কিংবা বাটিক ব্লাউজ। কানে পরতে পারেন হালকা টপ। তবে উৎসবে ঝুমকাও বেশ মানানসই। গলায় পরতে পারেন লকেট, মাটি কিংবা মেটাল ধরনের গয়না, পায়ে নূপুর, হাতে বিভিন্নরঙা চুড়ি, বালা ও ব্রেসলেট। টিপটাই বা কেন বাদ যাবে! পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে কপালে এঁকে নিতে পারেন টিপ। বাজারে নানান টিপ কিনতে পাওয়া যায়। সেখান থেকেও বেছে নিতে পারেন পছন্দের টিপ। পোশাকের সঙ্গে চুলের স্টাইল অনিবার্য। গরমে অনেকেই সামার লুকের জন্য বেছে নেন ছোট চুলের স্টাইল। আবার লম্বা চুলের মেয়েদের অনেকেই হাতখোঁপা, এর উপর গাঁদা কিংবা বেলি ফুলের সজ্জায় বেশ সাবলীল থাকেন। অন্যদিকে অনেকে এলোচুলেই স্বকীয়।
আধুনিক বাঙালির বৈশাখী ফ্যাশন মানে কিশোরী থেকে নারীÑ সবাই শাড়ি ছাড়াও সুতির আরামদায়ক বিভিন্ন ডিজাইন ও কাটের সালোয়ার-কামিজ, ফতুয়া, ম্যাক্সিড্রেস, লং স্কার্ট, ম্যাগিহাতা টপসে নিজেকে সাজিয়ে নেন।
ছেলেরা গরমে খোঁজেন আরাম। তাই তাদের ফ্যাশনজুড়ে থাকে টিশার্ট, হাফহাতা শার্ট, বারমুডা, সুতি পায়জামা-পাঞ্জাবি ও লুঙ্গি। নারী ও পুরুষÑ উভয়েই পায়ে পরেন কোলাপুরি চপ্পল কিংবা ফ্ল্যাট স্যান্ডেল আর চোখে বিভিন্ন ডিজাইনের সানগ্লাস।

বিগত বছরের দুঃখ, কষ্ট, ক্লেশ ভুলে চলুন এবারও নবআশায় সম্ভাষণ করি বৈশাখ মাসের। উৎসব আয়োজনে যেন নিজের আনন্দ উদযাপনে অন্যের কষ্টের কারণ না হই। অপরের প্রতি হই আরো সহনশীল।

‘মুছে যাক গ্লানি
ঘুচে যাক জরা
অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।’

বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি ধরে রাখার দায়িত্ব প্রত্যেক বাঙালির। এই বৈশাখে চলুন আরেকবার অঙ্গীকারবদ্ধ হই। বিভেদ ভুলে এক হয়ে যাই। এই বৈশাখে আমাদের সব আয়োজন হোক সফল ও নিরাপদ। এভাবেই জেগে উঠুক পোশাকে বাঙালিয়ানা, আপনরূপে উদযাপিত হোক বসনে বৈশাখ। সবাইকে শুভ নববর্ষ।

 

আয়োজনে : স্বাক্ষর ও বর্ণ

ছবি : কৌশিক ইকবাল

পোশাক : লা রিভ

মডেল : তৌসিফ ও নাজমি

লেখা : ফারহাতুল জান্নাত

 

বৈশাখে লোকজ মেলা ও তারুণ্য

অঞ্জন আচার্য

 

 

পহেলা বৈশাখ বাংলা সনের প্রথম দিন, তথা বাংলা নববর্ষ। দিনটি বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিশেষ উৎসবের সাথে পালিত হয় নববর্ষ হিসেবে। এছাড়া এ উৎসবে অংশ নেয় ত্রিপুরায় বসবাসরত বাঙালিরাও। সে হিসেবে এটি বাঙালিদের একটি সর্বজনীন উৎসব। সারা বিশ্বের বাঙালিরা এ দিনে বরণ করে নেয় নতুন বছরকে, ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করে অতীত বছরের যাবতীয় দুঃখ-গ্লানি। সবার কামনা থাকে নতুন বছরটি যেন হয় সমৃদ্ধ ও সুখময়। অন্যদিকে নতুনভাবে ব্যবসা শুরু করার উপলক্ষ্য হিসেবে এ দিনটিকে বরণ করে বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা। গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জি অনুসারে ১৪ এপ্রিল পালিত হয় এ পহেলা বৈশাখ। আধুনিক বা প্রাচীন যেকোনো পঞ্জিকাতেই মিল রয়েছে এই বিষয়ে। বাংলাদেশে প্রতি বছর ১৪ এপ্রিল এই উৎসব পালিত হয়। বাংলা একাডেমি নির্ধারিত আধুনিক পঞ্জিকা অনুসারে নির্দিষ্ট করা হয়েছে এই দিন।
অনেক আগে থেকেই বাংলা বারো মাস পালিত হতো হিন্দু সৌর পঞ্জিকা অনুসারে। গ্রেগরীয় পঞ্জিকায় এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে শুরু হতো এই সৌর পঞ্জিকার। হিন্দু সৌর বছরের প্রথম দিন আসাম, বঙ্গ, কেরলা, মনিপুর, নেপাল, উড়িষ্যা, পাঞ্জাব, তামিলনাড়– এবং ত্রিপুরার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বহুদিন থেকেই পালিত হতো। এখন যেমন নববর্ষ নতুন বছরের সূচনার নিমিত্তে পালিত একটি সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে, একসময় এমনটি ছিল না। তখন নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ পালিত হতো আর্তব উৎসব তথা ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে। তখন এর মূল তাৎপর্য ছিল কৃষিকাজ। প্রযুক্তির যুগ শুরু না হওয়ায় ঋতুর ওপরই নির্ভর করতে হতো কৃষকদের।
ভারতবর্ষে মোঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর সম্রাটরা কৃষি পণ্যের খাজনা আদায় করত হিজরি পঞ্জিকা অনুসারে। কিন্তু হিজরি সন চাঁদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা কৃষি ফলনের সাথে মিলত না। এতে অসময়ে কৃষকদেরকে বাধ্য করানো হতো খাজনা পরিশোধ করতে। তবে খাজনা আদায়ে সুষ্ঠুতা প্রণয়নের লক্ষ্যে মোঘল সম্রাট আকবর প্রবর্তন করেন বাংলা সনের। তিনি মূলত আদেশ দেন প্রাচীন বর্ষপঞ্জিতে সংস্কার আনার। সম্রাটের আদেশ মতে সৌর সন এবং আরবি হিজরি সনের ওপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম বিনির্মাণ করেন তৎকালীন বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহ উল্লাহ সিরাজি। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ মার্চ বা ১১ মার্চ থেকে শুরু হয় বাংলা সন গণনা। তবে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর করা হয় আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় (৫ই নভেম্বর, ১৫৫৬) থেকে। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন। পরে তা পরিচিত হয় বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ নামে। আকবরের সময় থেকেই শুরু হয় পহেলা বৈশাখ উদ্যাপন। তখন প্রত্যেককে চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে পরিশোধ করতে হতো সকল খাজনা, মাশুল ও শুল্ক। এরপর দিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে ভূমির মালিকরা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদেরকে আপ্যায়ন করাতেন মিষ্টান্ন দিয়ে। এ উপলক্ষ্যে আয়োজন করা হতো বিভিন্ন উৎসবের। একসময় এই

 

 

লোকজ সংস্কৃতি : আড়ম্বরপূর্ণ উৎসবের মধ্য দিয়ে এদেশে উদ্যাপন করা হয় পহেলা বৈশাখ। নতুন বছরের এ উৎসবের সঙ্গে রয়েছে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কৃষ্টি ও সংস্কৃতির নিবিড় সম্পর্ক। গ্রামগঞ্জের মানুষ ভোরে ঘুম থেকে ওঠে। নতুন জামাকাপড় পরে বেড়াতে যায় আত্মীয়স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের বাড়িতে। পরিষ্কার করা হয় ঘরবাড়ি-আঙিনা, সাজানো হয় মোটমুটি সুন্দর করে। সেই সঙ্গে থাকে বিশেষ খাবারের ব্যবস্থা। কয়েকটি গ্রামের মিলিত স্থানের খোলা মাঠে আয়োজন করা হয় বৈশাখী মেলার। আবহমান বাংলার চিরায়ত ঐতিহ্য এ মেলা৷ কেবল বাংলাদেশেই বৈশাখের প্রথম সপ্তাহে অন্তত দুই শতাধিক বৈশাখী মেলার আয়োজন বসে৷ সেখানে নানা স্বাদের মুড়ি-মুড়কি আর পিঠাপুলি তো রয়েছেই, সেই আদিকাল থেকে জনপ্রিয় পুতুলনাচের আসরও এই মেলার অন্যতম আকর্ষণ৷ আর নাগরদোলায় হাওয়ায় ভেসে নববর্ষের নতুন মুহূর্তগুলোকে উপভোগ করার অনুভূতি যেন একেবারেই ভিন্ন৷ এছাড়া রয়েছে হরেক রকমের কুটিরশিল্প আর হস্তশিল্পের বাহারি প্রদর্শনী৷ দেখা মেলে বাংলার ঐতিহ্য মাটির তৈরি বিভিন্ন পণ্যেরও৷ অনেক জায়গায় ব্যবস্থা থাকে ইলিশ মাছ দিয়ে পান্তা ভাত খাওয়ার আয়োজন। এই দিনের একটি পুরনো সংস্কৃতি হলো গ্রামীণ ক্রীড়া প্রতিযোগিতা। এর মধ্যে নৌকাবাইচ, লাঠি খেলা ও কুস্তি উল্লেযোগ্য। এদেশে এরকম কুস্তির সবচেয়ে বড় আসরটি বসে ১২ বৈশাখ, চট্টগ্রামের লালদিঘী ময়দানে। এটি জব্বারের বলি খেলা নামে বিশেষভাবে পরিচিত। বৈশাখে এসব মেলা হয়ে থাকলেও মেলাগুলো বর্ষবরণ মেলা, নববর্ষের মেলা, বান্নি মেলা আবার কোথাও এলাকার নামে, ব্যক্তি বা অন্যান্য নামে পরিচিতি পেয়ে থাকে। যার অন্যতম দৃষ্টান্ত এ আবদুল জব্বারের বলি খেলাটি। এছাড়া বর্ষবরণ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে মেলা হয়ে থাকে বৈশাখের প্রথম দিন চট্টগ্রাম নগরীর ডিসি হিল, সিআরবির শিরিষ তলা চত্ত্বরসহ বিভিন্ন স্থানে। চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠিত এসব মেলায় হা-ডু-ডু, কুস্তি লড়াই, লাঠিয়াল নাচ, পুতুল নাচ, সার্কাস, মোরগ লড়াই, ঘুড়ি ওড়ানো, ষাঁড়ের লড়াইসহ থাকে মজার মজার আয়োজন। একসময় এসব মেলায় জনপ্রিয় অনুষঙ্গ ছিল বায়োস্কোপ বাক্স। কিন্তু এখন এটি আর দেখা যায় না। তবে অনেক জায়গায় আয়োজন করা হয় পুতুল নাচ, সার্কাসের। এদিকে ঈশা খাঁর সোনারগাঁওয়ে বসে এক ব্যতিক্রমী মেলা, যার নাম বউমেলা। জয়রামপুর গ্রামের মানুষের ধারণা, প্রায় ১০০ বছর ধরে পহেলা বৈশাখে আয়োজিত হয়ে আসছে এ মেলাটি। পাঁচ দিনব্যাপী এই মেলাটি বসে প্রাচীন একটি বটগাছের নিচে। যদিও হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা সেখানে সমবেত হয় সিদ্ধেশ্বরী দেবীর পূজা উপলক্ষ্যে। বিশেষ করে কুমারী, নববধূ, এমনকি জননীরা পর্যন্ত তাঁদের মনষ্কামনা পূরণের আশায় এই মেলায় এসে পূজা-অর্চনা করে থাকেন। মিষ্টি ও ধান-দূর্বার সঙ্গে মৌসুমী ফল নিবেদন করেন ভক্তরা। এছাড়া মেলাকে ঘিরে পাঁঠাবলির রেওয়াজও বেশ পুরনো। তবে কালের বিবর্তনে বদলে যাচ্ছে পুরনো অর্চনার পালা। এখন ভক্তরা কবুতর উড়িয়ে শান্তির বার্তা প্রার্থনা করেন দেবীর কাছে। অন্যদিকে সোনারগাঁ থানার পেরাব গ্রামের পাশে আয়োজন করা হয় আরেকটি মেলার, যার নাম ঘোড়ামেলা। লোকমুখে প্রচলিত আছে, যামিনী সাধক নামের এক ব্যক্তি ঘোড়ায় চড়ে নববর্ষের এই দিনে সবাইকে প্রসাদ দিতেন।

তাঁর মৃত্যুর পর ওই জায়গাতেই বানানো হয় সাধকের স্মৃতিস্তম্ভ। প্রতি বছর পহেলা বৈশাখে স্মৃতিস্তম্ভে হিন্দুরা একটি করে মাটির ঘোড়া রাখে এবং সেখানে আয়োজন করে মেলার। যার কারণে মেলাটির নাম ঘোড়ামেলা। এ মেলার অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে নৌকায় খিচুড়ি রান্না করা। এরপর সেই খিচুড়ি কলাপাতায় করে খায় আবালবৃদ্ধবনিতা সবাই। সকাল থেকেই মেলাকে ঘিরে ঘটতে থাকে নানা বয়সী মানুষের সমাগম। একদিনের এ মেলাটি জমে ওঠে মূলত দুপুরের পর থেকে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পূজা উপলক্ষ্যে এ মেলার আয়োজন করা হলেও এতে প্রাধান্য থাকে সব ধর্মের মানুষেরই। মেলায় সবচেয়ে বেশি ভিড় লক্ষ করা যায় শিশু-কিশোরদের। মেলাতে বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে রাখা হয় নাগরদোলা, পুতুলনাচ ও সার্কাসের। এছাড়া মেলার ক্লান্তি দূর করতে যোগ হয় কীর্তন গান। খোল-করতাল বাজিয়ে এ কীর্তন গানের আসর চলে মধ্যরাত পর্যন্ত। অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলায় বসবাসরত আদিবাসীদের মধ্যে চলে বর্ষবরণের নানা আয়োজন। সে অঞ্চলের প্রধান তিনটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর রয়েছে স্বতন্ত্র বর্ষবরণ উৎসব। এ উৎসবটি ত্রিপুরাদের কাছে বৈসুক, বৈসু বা বাইসু, মারমাদের কাছে সাংগ্রাই ও চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যাদের বিজু নামে পরিচিত। বর্তমানে এ তিন জাতিগোষ্ঠী একত্রে উৎসবটি পালন করে থাকে। উৎসবের নামের আদ্যাক্ষর দিয়ে যার যৌথ নামকরণ করা হয়েছে ‘বৈসাবি’। এ উৎসবের রয়েছে নানা দিক। ত্রিপুরা সম্প্রদায় শিবপূজা ও শিবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনার মধ্য দিয়ে পালন করেন ‘বৈসুক’ বা ‘বৈসু’ উৎসব। এছাড়া মারমাদের ‘সাংগ্রাই’ উৎসব চলে তিন দিনব্যাপী। উৎসবে মারমাদের সবাই গৌতম বুদ্ধের ছবি নিয়ে নদীর তীরে যান এবং দুধ বা চন্দন কাঠের জল দিয়ে স্নান করান সেটিকে। এরপর আবার ওই ছবিটিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় আগের জায়গায় অর্থাৎ মন্দির বা বাসাবাড়িতে। আদিকাল থেকে অন্যান্য সম্প্রদায় থেকে ভিন্ন আঙ্গিকে পুরনো বছরকে বিদায় এবং নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে এ সাংগ্রাই উৎসব পালন করে আসছে মারমারা। ধারণা করা হয়, ‘সাক্রাই’ মানে সাল শব্দ থেকে ‘সাংগ্রাই’ শব্দটি এসেছে, বাংলায় যা ‘সংক্রান্তি’ নামে পরিচিত। মারমারা ‘সাংগ্রাই জ্যা’র অর্থাৎ মারমা বর্ষপঞ্জি তৈরি মধ্য দিয়ে সাংগ্রাইয়ের দিন ঠিক করে থাকে। 

 

 

১৩৫৯ খ্রিস্টাব্দের আগে থেকেই এ ‘সাক্রাই’ বা সাল গণনা করা হয়, যা ‘জ্যা সাক্রই’ নামে পরিচিত। অন্যদিকে চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যারা উৎসবটি পালন করে চৈত্রের শেষ দুই দিন ও বৈশাখের প্রথম দিন মিলিয়ে মোট তিন দিন ধরে। এর মধ্যে চৈত্রের শেষ দিনটিতে থাকে এ উৎসবের মূল আকর্ষণ। ওই দিন প্রত্যেকের ঘরে পাঁচ প্রকারের সবজি দিয়ে বিশেষ একপ্রকার খাবার রান্না করা হয়। তাদের বিশ্বাস, এই পাঁচনের দৈব গুণাবলী আছে, যা আসছে বছরের সকল রোগবালাই ও দুঃখ-দুর্দশা দূর করে থাকে। এছাড়া এদিন বিকেলে ঐতিহ্যবাহী ঘিলা, বৌচি ইত্যাদি খেলারও আয়োজন করা হয়। কিশোরী-তরুণীরা নদীর জলে ফুল ভাসায়। তিন দিনের এ উৎসবে ওই সম্প্রদায়ের কেউ কোনো জীবিত প্রাণী হত্যা করে না। ‘বৈসাবি’ উৎসবের মূল আয়োজন হলো জলখেলা। উৎসবটি পার্বত্য অঞ্চলে কমবেশি সবার কাছেই জনপ্রিয়। উৎসবে আদিবাসীরা সবাই সবার দিকে জল ছুঁড়ে আনন্দে মাতেন। তাদের মতে, এ জলের মধ্য দিয়ে ধুয়ে যায় বিগত বছরের সকল দুঃখ, পাপ। জলখেলার আগে অনুষ্ঠিত হয় জলপূজা। মারমা যুবকরা এ উৎসবে তাদের পছন্দের মানুষটির গায়ে জল ছিটিয়ে সবার সামনে প্রকাশ করে তাদের ভালোবাসার কথা। এর মধ্য দিয়ে আন্তরিক হয় পরস্পরের সম্পর্কের বন্ধন। তারুণ্যের মেলা : বৈশাখ মানেই বাঙালির উৎসবমুখর একটা দিন। বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসব বৈশাখের প্রথম দিনটি। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি নির্বিশেষে সকলেই অংশ নেয় বৈশাখী আয়োজনে। অসাম্প্রদায়িক চেতনায় ঋদ্ধ এই দিনটিকে বাঙালিরা বরণ করে নেয় অতীত বছরের সব দুঃখ-গ্লানি ভুলে। নতুন বছরটি যেন সুন্দর, সুখময় ও সমৃদ্ধ হয় এই কামনাই থাকে সবার মনে ও প্রাণে। প্রতিবারই এই সর্বজনীন উৎসবটি ভরে ওঠে তারুণ্যের উচ্ছাসে। উৎসবকে ঘিরে প্রস্তুতিরও কমতি থাকে না তরুণদের মধ্যে। রঙিন পোশাকে তরুণ-তরুণীরা হাঁটে আনন্দ-উচ্ছাসে। অস্থায়ী দোকানগুলোতে পসরা সাজানো হয় বাহারি খাবার। থাকে পান্তা-ইলিশ খাওয়া ধূম। বাঙালির ঐতিহ্যের সাথে মিশে গেছে নববর্ষে ইলিশ মাছ দিয়ে পান্তা ভাত। শহুরে জীবনে পান্তা-ইলিশ ছাড়া যেন নববর্ষ অপূর্ণ থেকে যায়। রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ ও মঙ্গল শোভাযাত্রার মধ্য দিয়েই বর্ষবরণ উদযাপন শুরু হয়। ছায়ানটের শিল্পীরা সম্মিলিত কণ্ঠে সূর্যোদয়ের সাথে সাথে গেয়ে ওঠে রবি ঠাকুরের ‘এসো হে বৈশাখ’ গানটি। এ গানের মধ্য দিয়ে বরণ করে নেয়া হয় নতুন বর্ষকে। কণ্ঠশিল্পীদের অধিকাংশই থাকে তরুণ প্রজন্মের। অন্যদিকে বৈশাখী বা নববর্ষ উৎসবের আবশ্যিক একটি অংশ হচ্ছে মঙ্গল শোভাযাত্রা। ১৯৮৯ সাল থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা পহেলা বৈশাখের অন্যতম একটি আকর্ষণ। এটাও তরুণদের একটি অন্যতম বৈশাখী সংযোজন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে যাত্রা শুরু করে এর। পায়ে পা মেলায় লাখো মানুষ। শোভাযাত্রায় ফুটিয়ে তোলা হয় আবহমান গ্রামবাংলা ও জীবনের ছবি। এ মঙ্গল শোভাযাত্রায় স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ করে বিভিন্ন রংবেরঙের মুখোশ পরে তরুণরা। ঢাক-ঢোলের আওয়াজ আর বৈশাখী নানা গানের আয়োজনে এ দিনটি হয়ে ওঠে আরও উৎসবমুখর। মূলত রমনা বটমূল এই উৎসবের কেন্দ্রস্থল। এসব অনুষ্ঠানে তুলে ধরা হয় বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে। এছাড়া বৈশাখ উপলক্ষে প্রতি বছরই মোবাইল কোম্পানিগুলো নিয়ে আসে তরুণদের জন্য হরেক রকম অফার। আর এ অফারগুলোর সঙ্গে নানা রকম উপহার সামগ্রী তো থাকেই। কী গ্রাম কী শহর সব জায়গাতেই সৃষ্টি হয় প্রাণচাঞ্চল্য। আনন্দে মাতে পুরো দেশের তারুণ্য। পহেলা বৈশাখের বেশ কিছু দিন বাকি থাকতেই শুরু হয় এর প্রস্তুতি। বৈশাখ মানে লাল-সাদার মিশেল। বৈশাখ শুধু লালকে ধারণ করে না; বরং পুরো বিশ্বের কাছে আমাদের রঙিন হওয়ার ঐশ্বর্যকে প্রথম মাত্রা দেয়। তাই বহুকাল ধরেই লাল-সাদার ধারাবাহিকতায় এই বৈশাখেও তরুণদের দিনটি হয়ে ওঠে লালের সম্ভাবনায় উজ্জ্বল, লালের ঐশ্বর্যে সুখময় আর লালের দীপ্তিতে রঙিন। ভোরের আলো ফুটতেই তরুণদের শুরু হয় সাজসজ্জা। আর বৈশাখ এলেই গায়ে ওঠে পাটভাঙা তাঁতের শাড়ি। লাল ও সাদা তো থাকেই, সঙ্গে থাকে বাহারি রং। কিংবা অন্য কোনো রঙের শাড়িতে সেজে কপালের টিপ আর হাতের চুড়িটা পরে লাল। অথবা শাড়িতে চাই কোনো বাঙালি মোটিফ। বৈশাখকে ঘিরে তরুণদের চাহিদার থাকে পাঞ্জাবি, ফতুয়া, বৈশাখী শার্ট, গামছাসহ কিছু নতুন ও ব্যতিক্রমী প্রসাধনী সামগ্রী। ফতুয়ায় বাঙালির ঐতিহ্যবাহী ঢোল, একতারার ডিজাইনগুলো কিছুটা ব্যতিক্রম ও নজরকাড়া। আর সেদিকেই ঝুঁকে অধিকাংশ ফ্যাশন-সচেতন তরুণ প্রজন্ম। পহেলা বৈশাখকে আনন্দময় করে গড়ে তুলতে থাকে বৈচিত্র্যময় আয়োজন। ‘এসো এসো এসো হে নবীন, এসো এসো হে বৈশাখ এসো আলো, এসো হে প্রাণ ডাক কাল বৈশাখীর ডাক।’ তারুণ্যের প্রতি সুকান্তের এ আহ্বানই বৈশাখকে করে তোলে আরও বেশি তরুণ। প্রতি বছরেই বৈশাখ আসে নতুন রূপে নতুন সুরে নতুনের আহ্বানে। ‘মুছে যাক গ্লানি ঘুচে যাক জরা, অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা। এসো হে বৈশাখ এসো এসো’ জীর্ণতাকে পেছনে ফেলে নতুনের পথে এগিয়ে চলার গানটি

বৈশাখের প্রথম দিনটিতে তরুণদের মুখে মুখে ফেরে। সূর্য একটু তাতিয়ে উঠলে তরুণেরা গেয়ে ওঠে ফিডব্যাকের ‘মেলা যাইরে’। বছরের সারাটা সময়ে এ আয়োজনে মেতে ওঠার অপেক্ষায় থাকে তরুণরা। আবার অনেকে বৈশাখ আসার আগেই বিভিন্ন হিসাব-নিকাশ করে রাখে বৈশাখের দিনটা কীভাবে কাটাবে ভেবে। ঢাকা কলেজের গণিত বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র অমিতের কাছে বৈশাখের প্রথম দিনটা সবসময়ই অন্যান্য দিনগুলোর চেয়ে আলাদা। এই দিনটাকে নিয়ে সবসময়ই থাকে তার আলাদা পরিকল্পনা। এ ক্ষেত্রে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়াটা প্রাধান্য পায় সবার আগে। এর সাথে যোগ হয় দিনব্যাপী ঘোরাঘুরি। আর খাওয়া-দাওয়া? সেটার কথা তো হিসাবের বাইরে। কোথায় কী খাওয়া হবে, তার নেই ঠিক। একই বিভাগের খায়রুলের দিনটা কাটে আর সবার মতোই। দারুণ আনন্দ নিয়ে সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে বন্ধুদের সাথে বেরিয়ে পড়ে সে। গন্তব্য রমনার বটমূল। তারপর রমনাতে গিয়ে সবাই মিলে পান্তা-ইলিশ খাওয়াটা তো এখন একটা রেওয়াজ। সুতরাং তার পান্তা ইলিশ চাই-ই চাই। আর মেলায় ঘোরাঘুরি ছাড়া পহেলা বৈশাখ জমেই না। তাই রোদে পুড়ে, ঘামে ভিজে বৈশাখ উপভোগ করেন শ্রাবন্তী। এদিকে ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির বিবিএ-এর শিক্ষার্থী ফারিয়া, অনিষা, নাফিম, মোনা, মৌ কথায় ওঠে আসে দিনটি উদ্্যাপনের বিবরণ। তাদের কথা, ওই দিনটি কেবলই নিজেদের মতো করে পালন করার দিন। ওই দিন আত্মীয়দের বাড়িতে যাওয়া হয়ে উঠে না কারো। তাই এ দিনটাকে বেড়ানোর কাজেই সারাদিন কাটায় ওরা। ফারিয়ার কথা, বৈশাখের প্রথমদিনে সকালে গোসল সেরে নতুন শাড়ি পরে মোটামুটি কাছের সব আত্মীয়-স্বজনদের বাসায় অল্প সময়ের একটি পরিকল্পনা করে সে। অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মিথিলা থাকে রোকেয়া হলে। সবসময় বাড়িতে যাওয়া হয়ে উঠে না তার। বৈশাখের এই দিনগুলোতে ছুটি পায় বলে বাসায় চলে যায় সে। ওখানে এই দিনটাতে সকালবেলা সবার আগে বাবা-মায়ের কাছে যায়। এরপর নাস্তা সেরে দেখা করে সব স্কুল ও পাড়ার বান্ধবীদের সাথে। এই দিনটাতে নতুন করে আড্ডায় মেতে উঠে সবাই। তারপর সবচেয়ে প্রিয় আমভর্তা তৈরি করে একসাথে খায় সবাই মিলে। সব মিলিয়ে এই দিনটা তরুণরা হৈ হুল্লর করেই কাটিয়ে দেয়।

বিচিত্র রূপের হালখাতা

সাইমন জাকারিয়া

 

 

হালখাতা বাংলা নববর্ষ উদযাপনের বিচিত্র রূপ ও সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। সাধারণত বাংলাদেশের গ্রামীণ ব্যবসায়ীরা বাংলা নববর্ষ এলে হালখাতার আয়োজন করেন। তারা এ সময় মূলত নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা দোকানের সুহৃদ ক্রেতা ও বিভিন্ন লেনদেনকারী ব্যক্তিকে আমন্ত্রণের মাধ্যমে মিষ্টিমুখ করান। এই মিষ্টিমুখ করানোর ফাঁকে ব্যবসায়ীরা বিগত বছরের হিসাবের খাতার পাট চুকিয়ে নতুন খাতায় নতুন বছরের ব্যবসার হিসাব শুরু করে থাকেন। সুহৃদ ক্রেতারাও হালখাতার আয়োজনে যোগ দিয়ে সারা বছরের বকেয়া পরিশোধ করেন। হালখাতা নামটির ভেতর সংস্কৃতির এই রহস্য লুকিয়ে আছে। আসলে আরবি ‘হাল’ শব্দের সঙ্গে ফার্সি শব্দ ‘খাতা’ মিলে হালখাতা রূপ ধরেছে। আরবি ভাষার ‘হাল’ শব্দটির অর্থ হলো বর্তমান বা চলতি এবং ফার্সি ‘খাতা’ শব্দটির অর্থ হলো বই বা বহি। তাই সামগ্রিক বিচারে ‘হালখাতা’র অর্থ হলো চলতি বছরের হিসাবের খাতা বা বই। পুরনো বছরের পাট চুকিয়ে নতুন বছরের জন্য নতুন খাতা বা বইয়ে হিসাব লেখার সূচনা করার আনুষ্ঠানিক সংস্কৃতি পালনের নামই ‘হালখাতা’।
বাংলাদেশের এমন কোনো অঞ্চল হয়তো খুঁজেই পাওয়া যাবে না যেখানে বাংলা নববর্ষ উৎসবের অংশ হিসেবে হালখাতার অনুষ্ঠান হয় না। আগে ওই আয়োজন গ্রামীণ সমাজের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী এবং তাদের দরিদ্র ক্রেতার মধ্যে প্রচলিত ছিল। এখন ওই দৃশ্যপট পরিবর্তিত হয়েছে। বর্তমানে বড় ব্যবসায়ীরাও হালখাতার আয়োজন করে থাকেন। একই সঙ্গে হালখাতার আয়োজন গ্রাম ছাড়িয়ে নগর সমাজেও বিস্তৃত হয়েছে। ঢাকা মহানগরের অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে এখন বাংলা নববর্ষের সময় হালখাতার আয়োজন করতে দেখা যায়।
এক সময় গ্রামে হালখাতার আয়োজনে মিষ্টি হিসেবে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তথা দোকানের পাশেই গরম জিলাপি ভাজা হতো এবং ক্রেতারা এসে বকেয়া পরিশোধের মাধ্যমে মজা করে ওই জিলাপি খেতেন। শুধু তা-ই নয়, ক্রেতারা যখন ফিরে যেতে উদ্যত হতেন তখন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা দোকানের মালিক কর্তৃপক্ষ তাদের হাতে তুলে দিতেন বাড়ির সদস্যদের জন্য একটি জিলাপির ঠোঙা।
তাই গ্রামীণ সমাজে হালখাতার জন্য শুধু ব্যবসায়ীরা অপেক্ষা করতেন না, ক্রেতা ও তাদের পরিবারের সদস্যরাও অপেক্ষা করতেন যুগপৎ। শুধু জিলাপিই নয়, হালখাতার আয়োজনে কোথাও কোথাও স্থানীয় বিভিন্ন মিষ্টান্ন তথা ম-া-মিঠাই অভ্যাগতদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। বড়দের পাশাপাশি হালখাতার আয়োজনে শিশুদেরও সরব উপস্থিতি ঘটে। মূলত অভিভাবকদের হাত ধরেই শিশু-কিশোররা হালখাতার আয়োজনে শরিক হয়ে থাকে। বড়দের মতো শিশু-কিশোরদের জন্যও দেওয়া হয় রসে ডুবুডুবু ধবধবে সাদা বড় রাজভোগ যার ভেতরে থাকে ছোট ক্ষীরের পুঁটলিতে পোরা সুগন্ধি একটি এলাচদানা। খুব তৃপ্তি নিয়ে সব বয়সী মানুষ হালখাতার মিষ্টান্ন যেমন আহার করে থাকেন তেমনি কোথাও দেওয়া কালিজিরা ছিটানো হালকা গেরুয়া রঙের নিমকি খেয়ে কারও মন গলে যায়। নিমকির মচমচে ভাজায় অন্তর চাঙ্গা হয়ে ওঠে। কোথাও আবার গন্ধ কর্পূূর মেশানো ঠা-া এক গ্লাস পানি হৃদয়টি শীতল করে দেয়। রাজভোগের মিষ্টতার বিলাসী আবেশের সঙ্গে নোনতা নিমকির নিরপেক্ষ স্বাদ দুই বিপরীত রসের স্রোতে রসনায় বৈচিত্র্য আনে বৈকি।
হালখাতার আয়োজন উপলক্ষে নববর্ষ আসার আগের দিন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করা হয়। নববর্ষের দিন হালখাতা উপলক্ষে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সামনে দুটি বা চারটি কলার গাছ লাগিয়ে একটি প্রবেশপথ তৈরি করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন রঙিন কাগজ দিয়ে দোকান বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটি দারুণভাবে সাজানো হয়। জ্বালানো হয় সুগন্ধি আগরবাতি। ব্যবসায়ী বা তার আমন্ত্রিত ক্রেতারা ওই রঙিন ও সুগন্ধ ছড়ানো আয়োজনের মধ্যে আসেন নতুন রঙিন বা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পোশাক পরে। সব মিলিয়ে একটা ফুরফুরে ও সুন্দর ভাব সৃষ্টি হয় হাতখাতার পুরো আয়োজন ঘিরে।
আরেকটা ব্যাপার উল্লেখ করা প্রয়োজন। তা হলো, হাতখাতার এ ধরনের আয়োজনের আগেও কিছু কাজ থাকে। যেমন আমন্ত্রপত্র তৈরি, বিতরণ অথবা মৌখিকভাবে আমন্ত্রণ জানানোর বিষয়। তবে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হাতখাতার জন্য প্রস্তুতকৃত আমন্ত্রণপত্রের মাথায়, এমনকি কখনো কখনো হালখাতার জন্য সজ্জিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রবেশপথের মুখে একটা না একটা স্বস্তিবচন লেখা থাকে। ওই স্বস্তিবচন মূলত ব্যবসায়ীদের নিজস্ব ধর্ম বিশ্বাস অনুযায়ী নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে অর্থাৎ তারা ইসলাম, সনাতন, বৈষ্ণব, বৌদ্ধ, ক্রিশ্চিয়ান ইত্যাদি যে ধর্ম মতের অনুসারীই হোন না কেন, যার যার ধর্ম মতের প্রচলিত বিশ্বাস ও ভক্তিভাব অনুযায়ী স্বস্তিবচনের শিরোনাম বা বন্দনাস্তবক লেখা হয়ে থাকে। কোথাও হয়তো লেখা থাকে, ‘এলাহি ভরসা’, কোথাও ‘নমো গণেশায় নমঃ’, ‘শ্রীহরি’, ‘জয় রাধা-কৃষ্ণ’ বা ‘বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি’, ‘ধম্মং শরণং গচ্ছামি’, ‘সঙ্ঘং শরণং গচ্ছামি’ ইত্যাদি। কোথাও আবার একটা ‘ক্রুশ’চিহ্নও এঁকে দেওয়া হয়। এ ধরনের স্তবক লিখন দেখে হালখাতার অনুষ্ঠানটি ধর্ম প্রভাবিত বলা চলে না। কারণ এ ধরনের লিখনের ভেতর দিয়ে মূলত ব্যবসায়ীর নিজস্ব বা ব্যক্তিগত ধর্ম বিশ্বাস প্রতিফলিত হয়। কিন্তু আমন্ত্রণপত্রটি বিতরিত হয় সব ধর্মের ক্রেতা বা আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে।
প্রখ্যাত প-িত মুহম্মদ এনামুল হকের মতে, বর্তমানে হালখাতা ব্যবসায়িক অনুষ্ঠান হলেও আসলে এ হচ্ছে একটা কৃষি বিষয়ক অনুষ্ঠান। প্রাচীনকালে ‘দ্রব্য’ বিনিময়ের মাধ্যমে (‘মুদ্রা’ বিনিময়ের মাধ্যমে নয়) যখন ব্যবসা চলতো তখন গৃহস্বামী তার উৎপন্ন দ্রব্যের কতোটুকু নিজের জন্য রেখে অবশিষ্টটুকুর দ্বারা নিজের প্রয়োজনীয় অন্য দ্রব্য নেবেন এ সম্পর্কে একটা হিসাব। তা যে কোনো উপায় হতে পারে। যেমন রাশিতে গেরো দিয়ে, পাথর বা মাটির ঢেলার স্তূপ জমিয়ে তাকে রাখতে হতো। তারপর অনেক পরে তিনি তালের পাতায় ‘টোকা’ রেখে অথবা তুলট কাগজে ‘চোতা’ বানিয়ে ওই কাজ সেরেছেন। বর্তমানে হালখাতা এরই বিবর্তিত রূপ।
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হালখাতা এখন অনেকভাবে হয়ে থাকে। মানিকগঞ্জ ও বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে হালখাতা উপলক্ষে ‘লাঠিখেলা’, ‘বুড়া-বুড়ির সঙ’ ‘কিচ্ছা’ ইত্যাদি পরিবেশনামূলক লোকশিল্পের আয়োজন করা হয়। এতে একই সঙ্গে স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে হালখাতার নিবিড় সম্পর্ক রচিত হয়। আমাদের ধারণা, হালখাতার সঙ্গে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের এ ধরনের আয়োজন নতুনভাবে যুক্ত হয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে হালখাতার এ ধরনের সাংস্কৃতিক আয়োজন বাংলাদেশের সব অঞ্চলের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে বলেই প্রত্যাশা রাখি।

স্বপ্নের ফেরিওয়ালা

অরিন্দম মুখার্জী বিংকু

 


ভারতের অবহেলিত জাদুবিদ্যাটি শ্রেষ্ঠত্বে সিংহাসন পাইয়ে দেয়ার পর না থেমে জাদুশিল্প সব রাষ্ট্রে ছড়িয়ে দিয়ে বিশ্বের বুকে বাংলা ও বাঙালিকে গৌরবোজ্বল জাতি হিসেবে নতুনভাবে পরিচিত করেছেন পিসি সরকার।
স্বাধীনতা-উত্তর ভারতের দুর্বল আর্থিক কাঠামোর মধ্যেও মানুষ যাকে ঘিরে জীবন চ্যালেঞ্জ জয়ের স্বপ্ন দেখতো তিনিই পিসি সরকার তথা স্বপ্নের ফেরিওয়ালা।
আন্তর্জাতিক ওই জাদুকর ১৯৫০ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত জাদু দেখিয়েছেন। পিসি সরকার শুধু জাদুশিল্পীই ছিলেন না, লেখকও ছিলেন। জাদুশিল্পে পিসি সরকারের কৃতিত্ব হলো, তিনি বহুল প্রাচীন জাদু খেলার মূল সূত্র আবিষ্কার করেন। তার অন্যতম প্রদর্শনী ছিল ‘ইন্দ্রজাল প্রদর্শনী।
ভবিষ্যতের জাদু সম্রাটের জন্মও যেন একটি ম্যাজিক। ১৯১৩ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের টাঙ্গাইল জেলার ছোট্ট একটি গ্রাম অশোকপুরের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন পিসি সরকার অর্থাৎ প্রতুল। বাবা ভগবান চন্দ্র সরকার ও মা কুসুম কামিনী দেবীর প্রথম পুত্র সন্তান তিনি। প্রতুল ছিলেন সাত মাসের প্রিম্যাচুরড বেবি। ওই সময়ের যে চিকিৎসা ব্যবস্থা, এতে তার বেঁচে থাকারই কথা নয়। কিন্তু যিনি ভবিষ্যতে গোটা দুনিয়ায় তাক লাগিয়ে দেবেন, তাকে বাঁচিয়ে রাখতে রাখে হরির ম্যাজিক দেখিয়েছিলেন খোদ ঈশ্বর। তারা ছিলেন দুই ভাই। পিসি সরকার অর্থাৎ প্রতুল চন্দ্র (পিসি) সরকার বড় ও ছোট ভাই অতুল চন্দ্র (এসি) সরকার বা এসি সরকার।
চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বেড়ে ওঠা প্রতুল ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। বাবার ইচ্ছা ছিল, বুইড়া ছেলের আদরের ডাকনাম হবে বুড়ো। বুড়ো বড় হয়ে শিক্ষকতা করবেন। তিনি চাইতেন না ম্যাজিকটি পেশা হিসেবে নিন প্রতুল। সমাজ সাদরে গ্রহণ করবে না ভেবে সরকার পরিবার গোপনে চালিয়ে গেছে নিজেদের জাদু সাধনা। তন্ত্র-মন্ত্রে নয়, প্রকৃত অর্থে বিজ্ঞান সাধনা। সেকালের বিখ্যাত জাদুকর ঘনপতি চক্রবর্তী ছিলেন তার জাদুবিদ্যার গুরু। হাতে-কলমে জাদু জাদুবিদ্যা শেখা ও চর্চার আরো সুযোগ হয় তার। এর সঙ্গে দেশি-বিদেশি বই থেকেও চলতে থাকে জ্ঞান আহরণ। সেই প্রাথমিক শিক্ষাক্রম ডালপালা মেলে একদিন মহীরুহে পরিণত হলো। কিন্তু ভাগ্যের লেখনী একেবারেই আলাদা। তাই অংকের ছাত্র হয়েও জাদুবিদ্যাই হয়ে ওঠে প্রতুলের ধ্যান-জ্ঞান।


ভাই অতুল ১৯ বছরের ছোট। দাদার প্রথম দিকের পেশাদার জীবনের সঙ্গী ছিলেন তিনি। পরে মতান্তর হওয়ায় একাই ওই শিল্প মঞ্চস্থ করতেন আলাদাভাবে।
প্রতুলের শিক্ষা জীবন শুরু হয় বাড়ির পাশেই শিবনাথ হাই স্কুলে। স্কুলে যাতায়াতের পথে একটা খালের দু’পাশে ছিল ‘মাদারী’দের বাস। তাদের কাছেই প্রতুলের জাদুবিদ্যার হাতেখড়ি।
পারিবারিক সূত্রে জাদু ছিল তার রক্তেই। সেই আত্মারাম থেকে শুরু ষষ্ঠ প্রজন্মের দ্বারকানাথ সরকার পর্যন্ত সবাই অল্পবিস্তর ম্যাজিক জানতেন। সপ্তম প্রজন্মের ভগবান চন্দ্রও বাবার কাছ থেকে ওই বিদ্যা চর্চা করেন। কিন্তু তখনকার সমাজ জাদুকরদের খুব একটা সুনজরে দেখতো না। আত্মারামের ওপর সেই সময়ের কাপালিক ও তন্ত্র সাধকরা এতোটাই রুক্ষ ছিলেন যে, আজও তাদের তন্ত্র-মন্ত্রে বারবার এগিয়ে আসে তার নাম। ওই থেকেই সরকার পরিবারের কেউ প্রকাশ্যে কখনো জাদু দেখাননি। তবে প্রতুল সপ্তম  অষ্টম শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় স্কুলের অনুষ্ঠানে  ক্লাসের বন্ধুদের কাছে দেখানো শুরু করেন।
কিছুটা বংশগত ঐতিহ্যও পিসি সরকারকে বাল্যকাল থেকেই জাদুবিদ্যার প্রতি কৌতূহল এ পেশায় আগ্রহী করে তোলে। কিন্তু আদতেই জাদুবিদ্যা শিখবেন কি না, তা নিয়ে পরিবারের মধ্যে মত বিরোধ ছিল।
সমাজ তখন কুসংস্কারাচ্ছন্ন, শ্রেণী বৈষম্যে বিভক্ত ছিল। তুকতাক, ঝাড়ফুঁক করে অসাধ্য সাধন বা মন্ত্রবলে স্বপ্ন পূরণ হওয়ার পেছনে আমল রহস্য ধরে ফেলেন বিজ্ঞানমনস্ক দুই ভাই আত্মারাম ও বাঞ্চারাম সরকার। কিন্তু আধুনিকতায় অনভ্যস্ত সমাজ তা মানতে চায়নি। সহজ-সরল ও নিরক্ষর মানুষকে তা বোঝাতে গেলে আত্মারামের প্রাণনাশ হয় ‘মাদারী’ গোষ্ঠীর হাতে। আর বাঞ্চারাম পালিয়ে বাঁচেন। কারণ তাদের জীবন ধারণের অন্যতম উপায় ছিল জাদুবিদ্যা। উপস্থিত বুদ্ধি ও হাতের কারসাজি দিয়ে তিলটি তাল করে সাধারণ মানুষকে এক কল্পনার জগতে ছায়া দেখাতেন তারা।


ছোট প্রতুলের ওই খেলা বেশ ভালো লাগতো। আগ্রহ তার এতোটাই ছিল যে, একদিন তাদেরই একটা খেলা দেখিয়ে দিলেন তিনি। প্রথমে তারা বিরক্ত হলেও পরে তাকে অনেক খেলা শেখায়। পরবর্তী সময় টাঙ্গাইলে পড়া অবস্থায় সহপাঠীদের জাদু দেখিয়ে তাক লাগিয়ে দেন। মূলত তখন থেকেই শুরু হয় তার জাদুবিদ্যার পথ চলা।  
১৯২৯ সালে শিবনাথ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক ও করটিয়া সা’দাত কলেজ থেকে ১৯৩১ সালে মানবিক শাখা থেকে আবারও প্রথম বিভাগে পাস করেন। এরপর আনন্দ মোহন কলেজে বিএ ক্লাসে ভর্তি হন। সেখান থেকে বিএ পাস করার পর সম্পূর্ণ মায়ার জগতে প্রবেশ করেন প্রতুল। জাদু সম্রাটের পথটি মোটেও মসৃণ ছিল না। শিল্পের ক্ষেত্রে জায়গা করে নিতে ম্যাজিকের কপালেও কোনো ম্যাজিক জোটেনি। অনেক সংগ্রাম  ও দরিদ্রতার মধ্য দিয়ে রীতিমতো লড়াই করার পর একদিন ওই নাম ছাপিয়ে বড় হয়ে দাঁড়ালো পিসি সরকার।
বঙ্গ তখন অগ্নিগর্ভ। পিসি সরকার বিতাড়িত হয়ে পরিবারকে নিয়ে কলকাতায় এসে হাজির হন প্রতুল সুফিয়া স্ট্রিটের ভাড়া বাড়িতে। ম্যাজিক দেখিয়ে সংসার চালানো এক সময় দুঃসহ হয়ে উঠেছিল। লোহা-লক্কড়ের ব্যবসায়ী তথা তার এক বন্ধু সহ্য করতে না পেরে গ্রামে একটি মাস্টারি চাকরির ব্যবস্থা করলেন। ঠিক ওই সময় আরেকটি চিঠি এসে হাজির। চিঠিতে তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গের গভর্নরের বিদায়ী সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে অনুরোধ করা হয়েছে জাদুকর হিসেবে প্রতুলকে। ফলে আর চাকরি করা হলো না তার।


এরপর পেরিয়ে গেল অনেক বছর। ততোদিনে ইউরোপ-আমেরিকার চোখে কালো জাদু ও তন্ত্র-মন্ত্রের দেশ হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে ভারত। তাই বলে ওই জাদুবিদ্যার লুট করার কোনো ফন্দি ছিল না ব্রিটিশদের। পরাধীন দেশে ইংরেজরা পথঘাটের জাদুকর মাদারী খেলা দেখিয়ে তাদের কারিগরি বেশকিছু শিখে নিয়েছে।
ভারতীয় ঐতিহ্য ও পরম্পরার সঙ্গে মিশে গেছে পশ্চিমি আধুনিকতা। পরে এপার বাংলা থেকে কলকাতায় চলে আসা সরকার পরিবার পারিবারিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ম্যাজিক দেখিয়ে উপার্জন করতে থাকে। এদিকে নিজের ক্যারিশমাও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরো গভীর হতে থাকে। সেই সঙ্গে একটু করে বেড়ে উঠতে থাকে ইন্দ্রজালের মায়া।
পিসি সরকারের জাদু শব্দটিতেই আপত্তি ছিল। তিনি মনে করতেন, ওই শব্দটি বড় তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে ব্যবহৃত হয়। যেহেতু হিন্দু ধর্মের দেবরাজ ইন্দ্র হলেন মায়াবিদ্যার প্রতীক সেহেতু ওই ভাবনা থেকেই তার মঞ্চ উপস্থাপনার নাম হয় ইন্দ্রজাল। এর সঙ্গে যোগ হয় বিনোদন।


১৯৩০ সাল থেকে জনপ্রিয় হওয়া শুরু হয়। তখন কল্লোলনী বিভক্ত ছিল হোয়াইট ও ব্ল্যাক কলকাতা হিসেবে। ওই বিভেদের বেড়াজাল ভাঙতে জাদু সম্রাট নিউ এম্পায়ার থিয়েটার হলটিই বেছে নেন নিজের ম্যাজিক পরিবেশনের মঞ্চ হিসেবে। উঁচু বর্ণ ও সম্ভ্রমের নিউ এম্পায়ার মাসের পর মাস হাউসফুল হয়েছে ব্ল্যাক কলকাতা। জাদুর জগতে ব্যাপক প্রচার লাভের উদ্দেশ্যে তিনি এক সময় নিজের পদবী সরকার বাদ দিয়ে ইংরেজি ‘সোরসার’ শব্দ ব্যবহার করতে শুরু করের। কারণ শব্দটির অর্থ জাদুকর। তবে জনপ্রিয়তার শীর্ষে আরোহণ করার পর তিনি আবার নিজের সরকার পদবীই গ্রহণ করেন। তা বিদেশিদের ছোঁয়ায় হয়ে ওঠে আরো আকর্ষণীয়। কিন্তু সেসব খেলার উৎস যে আমাদের দেশীয় সেটিই উহ্য থেকে যায়। দরকার ছিল এমন একজনÑ যিনি ওই দেশের জাদুবিদ্যা বিশ্বে ছড়িয়ে দেবেন।
বাংলাদেশ থেকে কলকাতায় চলে যাওয়া ওই কা-ারি চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলেন প্রতুল চন্দ্র সরকার। তিন দশকের মাঝামাঝি থেকেই তিনি প্রচারের আলোয়। ক্রমেই শুরু হলো স্টেজ শো দেশে-বিদেশে। দেশীয় ম্যাজিকগুলো নতুন জাদুতে বুঁদ হলো দুনিয়া।
১৯৩৪ সালে তিনি সর্বপ্রথম বিদেশ গমন করেন। তিনি জাপান, ফ্রান্স, আমেরিকাসহ ৭০টির মতো দেশে জাদু প্রর্দশন করে ব্যাপক খ্যাতি ও জনপ্রিয়তা লাভ করেন। এ সময় তিনি পর্যপ্ত অর্থও উপার্জন করেন। তার জাদুর ছোঁয়ায় বিশ্বের দরবারে নতুন পরিচিত হলো ভারতবর্ষ। উন্নত বিশ্ব জানলো এবং মানলো, বেঁদে, ওঝা, ঝাড়ফুঁক ও বাজিকরের দেশ ভারতবর্ষ বিজ্ঞান নির্ভর ম্যাজিকও দেখাতে পারে। জাদু মানচিত্রে পিসি সরকারই হয়ে দাঁড়ালো আলাদা ব্র্যান্ড, আলাদা প্রতিষ্ঠান।


১৯৩৮ সালে পিসি সরকার কলকাতার বাসন্তী দেবীকে বিয়ে করেন। সংসার জীবনেও তিনি খুব সুখী ছিলেন। তার তিন ছেলে মানিক, প্রদীপ (পিসি সরকার জুনিয়র) ও পি সরকার ইয়ং। বাসন্তী দেবী ২০০৯ সালের ৬ ডিসেম্বর মারা যান।  
‘ওয়াটার অফ ইন্ডিয়া’  কারো অজানা নয়। এটি পিসি সরকারের জনপ্রিয় খেলাগুলোর মধ্যে অন্যতম। কোনো শো-র প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত একটি ছোট চৌবাচ্চা থেকে অনবরত ভরে চলতে থাকে গ্লাসের পর গ্লাস।
তিনিই বলে গেছেন, ‘আমি চিরজীবন শুধু ম্যাজিকের জগতেই বসবাস করেছি। স্বপ্নের রঙ গায়ে মেখে জীবন কাটিয়েছি। পৃথিবীর অনেক দেশেই গিয়েছি। সেখানকার মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করেছি। যতোই তাদের নৈকট্য বেড়েছে, ততোই নিজের দেশকে বেশি করে শ্রদ্ধা করতে ও চিনতে পেরেছি। ম্যাজিক একটি শিল্প। এতে বিজ্ঞান, টেকনোলজি, শারীরিক দক্ষতা ও শোম্যানশিপÑ সবই লাগে। এতে কোনো অলৌকিক কিছুই নেই।’
তাচ্ছিল্য ও অবহেলার বিরুদ্ধে লড়াই করে পথের ধুলায় পড়ে থাকা মাদারীর খেলাটি পিসি সরকার নিয়ে গিয়েছিলেন বিশ্বের দরবারে। ভ- সাধুদের ভোজবাজি মানুষকে ঠকানোর কলমঞ্চে উপস্থাপন করে তিনি প্রমাণ করে দিয়েছিলেন বিজ্ঞানই অলৌকিক পিতা। ডাইনিবিদ্যার নামে অন্ধকারে পড়ে থাকা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সংমিশ্রণ ভারতীয় জাদুটি তিনি তুলে ধরে ছিলেন বিশ্বের দরবারে। আত্মœবিস্মৃত জাতি তাকে ভুলে গেলেও ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে উত্যুজ্জ্বল হয়ে রয়েছে তার নাম।
ভারতীয় জাদু তথা বৌদ্ধতন্ত্র ও হিন্দুতন্ত্রের দশ মহাবিদ্যার মধ্যে দীর্ঘদিন অনাদরে পড়ে ছিল। পথে পথে ঘুরে বেড়াতো মাদারীর ঝোলায়। এগুলো নিয়ে বিশ্বে বিখ্যাত জাদুকরদের সঙ্গে একই মঞ্চে জাদু প্রদর্শন করতে লাগলেন পিসি সরকার।


জাদুবিদ্যার বিষয়ে পিসি সরকারের ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ইংরেজি, বাংলা ও হিন্দি ভাষায় প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ২০। এগুলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ম্যাজিক শিক্ষা, হান্ড্রেড ম্যজিক্স, ইউ ক্যান ডু, ছেলেদের ম্যাজিক, ম্যাজিকের কৌশল, সহজ ম্যাজিক, ম্যাজিকের খেলা, মেস মেরিজাম, জাদুবিদ্যা, হিন্দু ম্যাজিক, হিপনোটিজম, ইন্দ্রজাল প্রভৃতি।
নিউইয়র্কের টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ ‘এক্স-রে আই’ করাত দিয়ে মানুষ দ্বিখ-িত করা খেলাটি দেখানোর জন্য পিসি সরকারকে বিশেষ বিমানে আমেরিকায় নিয়ে আসে। তার ওই খেলাটি দেখে দর্শক অভিভূত হয়ে পড়ে। তার অপূর্ব প্রকাশভঙ্গির অসাধারণ বাস্তবতার গুণে অনেকে অজ্ঞান হয়ে যান। দ্বিখ-িত তরুণীটির খবর জানতে বিবিসি অফিসে এতো টেলিফোন আসতে থাকে যে, দুই ঘণ্টা টেলিফোন লাইন জ্যাম হয়ে যোয়।  খেলাটি দেখানোর পর তিনি অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা ও সম্মান লাভ করেন।
ফোর্স রাইটিংয়ের জাদু খেলাটি দেখিয়ে সংবাদপত্র মহলে অলোড়ন ফেলে দেন পিসি সরকার। কলকাতা ইম্পেরিয়াল রেস্টুরেন্টে এ কে ফজলুল হককে যে জাদু দেখিয়ে মুগ্ধ করেন এর শিরোনাম ছিল, ‘বাংলার মন্ত্রীদের পদত্যাগ’। এ শিরোনামে একটি সাদা কাগজে প্রথমে তিনি শেরেবাংলা ফজলুল হককে কিছু লিখতে বলেন এবং এর নিচে মন্ত্রীরা স্বাক্ষর করেন। কিছুক্ষণ পর শেরে বাংলা ফজলুল হক নিজের লেখার পরিবর্তে দেখেন, ‘এই মুহূর্তে আমরা মন্ত্রীরা পদত্যাগ করলাম এবং আজ থেকে জাদুকর পিসি সরকারই বাংলার মুখ্যমন্ত্রী।’ ঠিক এর পরের দিনই বিদেশে একটি দ্রুতগামী ট্রেন আসার মাত্র ৩৮ সেকেন্ড আগে তিনি হ্যান্ডকাফ বন্ধ অবস্থায় ট্রেনলাইন থেকে মুক্ত হয়ে আসেন। ওই হ্যান্ডকাফটি খুলতে ১৭টি চাবি ব্যবহার করা হতো। এ জন্য তাকে ইংল্যান্ডের জাদুকর সম্মিলনীর তৎকালীন প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি উইল গোল্ড ও স্টোন বলেছিলেন, ‘তুমি জন্মসিদ্ধ জাদুকর।’
পিসি সরকারের জাদু বিভিন্ন টেলিভিশনে যথা অস্ট্রেলিয়ান টেলিভিশন, বিবিসি, শিকাগোর ডাবলিউজিএনটিভি এবং নিউইয়র্কের এনবিসি ও সিবিএস টেলিভিশনে বহুবার প্রদর্শিত হয়েছে।
প্রতুল চন্দ্র সরকার কোনো টাইম ফ্রেম বা সমাজের কোনো শ্রেণীর গ-িতে আবদ্ধ ছিলেন না। ম্যাজিকের মহারাজা হয়েও তিনি ছিলেন সাধারণ মানুষ।
পিসি সরকার ১৯৫৫ সালে পশ্চিমবঙ্গের মহানায়ক উত্তম কুমারকে দিয়ে ‘ছায়া যায় কায়া থাকে’ অত্যাশ্চর্য খেলাটি দেখিয়ে ছিলেন। স্টেজে উত্তম কুমারকে তিনি আমন্ত্রণ জানান এবং পেছনে একটি সাদা স্ক্রিনে তাকে দাঁড় করিয়ে রাখেন। পর্দায় তীব্র সার্চলাইটের আলো ফেলার সঙ্গে সঙ্গে উত্তম কুমারের ছায়া পর্দায় ভেসে ওঠে। স্টেজে তাকে আসন গ্রহণ করতে বলেন। উত্তম কুমার পর্দা থেকে সরে গেলেও তার ছায়াটি বন্দি করে রাখেন। পুরো পৃথিবীতেই ওই খেলা পিসি সরকার ছাড়া অন্য কেউ দেখাতে পারেননি।


নিউ এম্পায়ার প্রেক্ষাগৃহ হয়ে ওঠার পর আর কলকাতায় সেভাবে ম্যাজিক দেখাননি জাদু সম্রাট। এর অন্যতম কারণ ছিল, পর্যাপ্ত পরিকাঠামোযুক্ত হলের অভাব।
১৯৫৭ ও ১৯৬৭ সালে আমেরিকা এবং ১৯৬২ সালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের মস্কো ও লেনিনগ্রাদ শহরে জাদু প্রর্দশন করে পিসি সরকার প্রচুর সুনাম অর্জন করেন। তিনিই প্রথম রাজকীয় পোশাক ও আকর্ষণীয় পাগড়ি পরে জাদু প্রদর্শনের প্রচলন করেন।
পিসি সরকারের জাদুর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে রঙিন চলচ্চিত্র ‘গিলি গিলি গে’ এবং দূরদর্শন তার ফটোগ্রাফির অ্যালবাম প্রকাশ করে। জাদুশিল্পে অসাধারণ পারদর্শীর জন্য বিশ্ববাসীর কাছ থেকে জাদু সম্রাট এবং কালের শ্রেষ্ঠ সম্রাট উপাধী লাভ করেন তিনি।
জাদু দেখিয়ে পিসি সরকার দেশে-বিদেশে অনেক পুরস্কার পেয়েছেন। ১৯৪৬ ও ১৯৫৪ সালে সর্বশ্রেষ্ঠ স্টেজ ম্যাজিকের জন্য আমেরিকার জাদুর অস্কার নামে পরিচিত ‘দ্য ফিনিক্স’ পুরস্কার দু’দুবার লাভ করেন। জার্মান ম্যাজিক সার্কেল থেকে ‘দ্য রয়াল মেডিলিয়ন’ পুরস্কার পান। এছাড়া তিনি গোল্ডবার পুরস্কার, ‘সুবর্ণ লরেন মালা’ নামে জাদুর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় জার্মান পুরস্কার, হল্যান্ডের ট্রিকস পুরস্কার এবং ১৯৬৪ সালে ভারত সরকার প্রদত্ত পদ্মশ্রী উপাধি লাভ করেন। জাদু খেলায় কৃতিত্বে জন্য মিয়ানমারের (বার্মা) তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মার্কিন নু তার নাম দিয়েছিলেন ‘এশিয়ার গর্ব’। ভারত সরকার ‘জাদু সম্রাট পিসি সরাকার নামে কলকাতায় একটি সড়কের নামকরণ করেছে। ১৯১০ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ভারত সরকার তার প্রতি সম্মান জানিয়ে একটি ৫ রুপির স্ট্যাম্প চালু করে।


পিসি সরকার ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের স্বার্থে ১৯৩৭ সালে জাপান সফরের সব অর্থ দান করেন। তিনি ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, জার্মান, বেলজিয়াম ও জাপানে ম্যাজিশিয়ান ক্লাবের সদস্য এবং বিলাতের রয়াল এশিয়াটিক সোসাইটির আজীবন সদস্য ছিলেন। ইউরোপের বিখ্যাত লেখকরা তার ওপর বেশ কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। এগুলোর মধ্যে ‘সোরকার’ ও ‘মহারাজা অফ ম্যাজিক’ গ্রন্থ দুটি উল্লেখযোগ্য।
প্রতুল চন্দ্রের গোটা জীবনই ছিল আক্ষরিক অর্থে জাদুতে মোড়া। পিসি সরকার বিদেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি শো করেন জাপানেÑ ৩৭ বার। তার জীবনের শেষ অধ্যায় রচিত হয় ওই দেশেই। ১৯৭০ সালের শেষ দিকে আরো একবার জাপান সফরে গিয়েছিলেন তিনি। ১৯৭১ সালের ৬ জানুয়ারি তিনি জাপানের আশাহিকা  ওয়ারের নিকটবর্তী জিগেৎসু শহরে হোক্কাইডো মঞ্চে ‘ইন্দ্রজাল’ বিস্তারে ব্যস্ত ছিলেন। মুগ্ধ দর্শকের সামনেই হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মঞ্চ থেকে অদৃশ্য হন চিরকালের জন্য। মাত্র ৫৭ বছর বয়সে তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে। ফলে দেশ হারালো তার বরপুত্রকে। ভারতীয় ম্যাজিকে আমদানি হলো এক নতুনধারা।   
ইন্দ্রজালবিদ্যার অম্বেষণে পরবর্তী প্রজন্মকে তৈরি রাখতে তার পরিকল্পনা ছিল আরও বড়। কিন্তু তার অকাল মৃত্যু তখনকার পরিকল্পনাগুলো ভানুমতির বাক্সেই বন্ধ করে দেয়।
ভারতবর্ষের আধুনিক বাঙালিদের মধ্যে ক্ষণজন্মা আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিখ্যাত জাদুকর ঐন্দ্রজালিক পিসি সরকারকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। তিনি বিশ্বাস করতেন, দ্য  শো মাস্ট গো অন। ঠিক তা-ই হয়েছে। পরিবারের উত্তরসূরিরা বয়ে নিয়ে চলেছে তার জাদু। তাদের সঙ্গে ওই ম্যাজিকের ধারা বয়ে চলেছে ওয়াটার অফ ইন্ডিয়ার অনাবিল গ্রোথের মতো।
অন্ধকার কুস্কারাচ্ছন্ন ওই জাদু বিজ্ঞানটি ঘষে-মেজে প্রতুল চন্দ্র নিয়ে এলেন বিশ্বের জনমঞ্চে। আমেরিকা, ইংল্যান্ড জার্মানির দর্শক অপলক অবোলকন করলো ভারতীয় জাদুকরের ইন্দ্রজাল।
বহু বছর পেরিয়ে গেছে। সরকার দ্য সিনিয়র মায়াপুরের বাসিন্দা হয়েছেন। এতো বছর দাঁড়িয়েও অনেকে তার মতো হয়ে ওঠার স্বপ্ন দেখেন। তাকেই রোল মডেল করে এগিয়ে চলেন নতুন জাদুকররা। অনেক দূরের তারা হয়ে পুরো ভূমিকায় সিনিয়র। আমাদের বাঙালির বুক আজও তার জন্য গর্বে ফুলে ওঠেÑ বাংলাদেশেরই সন্তান তিনি।

মঘেমল্লার



১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। পুরো বাঙালির জন্য ঐতিহাসিক এক বেদনাদায়ক অধ্যায়। তা আমাদের সত্তার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এ পর্যন্ত অনেক চলচ্চিত্র এ দেশে নির্মাণ হয়েছে, হচ্ছে দেশের বাইরেও। সম্প্রতি মুক্তি পায় মুক্তিযুদ্ধের কাহিনী নিয়ে নতুন চলচ্চিত্র ‘মেঘমল্লার’। এর কাহিনিতে আমরা দেখা গেছে, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক আটক অবস্থায় গল্পের মূল চরিত্র নূরুল হুদা (শহীদুজ্জামান সেলিম) বাংলাদেশের একটি মফস্বল শহরের সরকারি কলেজের রসায়ণের শিক্ষক। স্ত্রী আসমা ও পাঁচ বছরের মেয়ে সুধাকে নিয়ে তার সুখ-দুঃখের মধ্যবিত্ত সংসার। তাদের সঙ্গে থাকে নূরুল হুদার শ্যালক মানে আসমার ছোট ভাই মিন্টু। একদিন কাউকে কিছু না জানিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে চলে যায় সে। নূরুল হুদাকে রেখে যায় জীবন-মৃত্যুর কঠিন সংকটের মধ্যে। এরপরও নূরুল হুদা নিয়মিত কলেজে যায় এবং পাকিস্তানপন্থি শিক্ষকদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার চেষ্টা করে। মধ্যবিত্তের শঙ্কা, ভয়, পিছুটান তাকে প্রতিনিয়ত অসহায় করে তোলে।
মুষলধারে বৃষ্টির এক রাতে মুক্তিযোদ্ধারা নুরুল হুদার কলেজ এবং পাশের আর্মি ক্যাম্পে আক্রমণ চালায়। ফলে কোনো কারণ ছাড়াই পাকিস্তানি আর্মিরা নূরুল হুদা ও তার বন্ধু আবদুস সাত্তারকে ধরে নিয়ে যায়। বৃষ্টির মধ্যে যাওয়ার সময় আসমা তার ভাই মিন্টুর একটা ফেলে যাওয়া রেইনকোট নুরুল হুদাকে পরিয়ে দেয়। পাকিস্তানি আর্মির সামনে নূরুল হুদা প্রথমে ভয় পেয়ে যায়। প্রমাণ করার চেষ্টা করে, সে শিক্ষক মাত্র। মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে তার সংশ্রব নেই। কিন্তু নির্যাতনের মাত্রা ক্রমেই বাড়তে থাকে। আঘাতে নূরুল হুদার নাক-মুখ দিয়ে রক্ত ঝরতে থাকে।

রক্তের দিকে তাকিয়ে হঠাৎই তার মিন্টুর কথা মনে হয় এবং নিজেকেও মুক্তিযোদ্ধা ভাবতে শুরু করে। এ জন্য মৃত্যু বা আত্মদান কোনো ব্যাপারই নয়। সে বলেÑ আমি সবকিছু জানি। কিন্তু কিছুই বলবো না। এরপর পাকিস্তানি আর্মির মেজর তাকে গুলি করে হত্যা করে।
চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্যে নুরুল হুদার স্ত্রী আসমা ও তার মেয়ে সুধা চরিত্রে অপর্ণা ঘোষ অভিনয় করেন। চলচ্চিত্রটি গত ১২ ডিসেম্বর সারা দেশে মুক্তি পায়। পরিচালক জাহিদুর রহিম অঞ্জন দীর্ঘদিন ধরে চলচ্চিত্রের ওপর শিক্ষকতা ও গবেষণার সঙ্গে সম্পৃক্ত। কিছুটা দেরিতে এই প্রথম তিনি নির্মাণ করলেন মুক্তিযুদ্ধের গল্প নিয়ে মেঘমল্লার। এটি তার প্রথম ফিচার ফিল্ম। মুক্তিযুদ্ধের গল্প নির্বাচন, সিনেমার মেকিং ও অন্যান্য ক্ষেত্রে যথেষ্ট সফলতা রেখেছেন তিনি। তার চলচ্চিত্রটি যৌথভাবে প্রযোজনা করেছে বাংলাদেশ সরকার ও বেঙ্গল এন্টারটেইনমেন্ট লিমিটেড।
কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছোটগল্প ‘রেইনকোট’ অবলম্বনে নির্মিত ওই চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য রচনা ও পরিচালনা করেছেন জাহিদুর রহিম অঞ্জন। শুরুতে এর নাম রেইনকোট নির্ধারিত হলেও পরে করা হয়েছে ‘মেঘমল্লার’। কারণ ভারতে ঋতুপর্ণ ঘোষ পরিচালিত ‘রেইনকোট’ চলচ্চিত্র রয়েছে। তাই নাম পরিবর্তন করা হয়। বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় চলচ্চিত্র অনুদানের সহযোগিতা ও বেঙ্গল এন্টারটেইনমেন্ট লিমিটেডের প্রযোজনায় চলচ্চিত্রটি পরিবেশন করেছে বেঙ্গল ক্রিয়েশনস।                                                                                     

 

লেখা : দিগন্ত সৌরভ

বিয়ে

 

 

বিয়ে, সাদী, বিবাহ, নিকাহ্ এই চারটি শব্দের সাথে বাঙালি বাংলা ভাষাভাষি সকলেই পরিচিত। বিয়ে সব নারী পুরুষের জীবনেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বা অধ্যায়। পৃথিবীর সকল ধর্মেই বিবাহকে উৎসাহীত করা হয়েছে। এটি একটি প্রাচীন প্রথা, প্রাচীন একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান। অবাধ যৌনাচার শুধু সামাজিক অনাচার তৈরী করে না উৎপাদন ঘটায় এমন কতগুলো রোগ শোক যা সকল অর্থেই ঝুকিপূর্ন এবং অসম্মানজনক। সামাজিক শৃংখলা বংশ ধারা রক্ষায় বিয়ের প্রয়োজনীয়তা উপেক্ষা করার কোনো পথ নেই। বিয়ের আয়োজন সকল ধর্ম জাতি গোষ্ঠির মধ্যেই আনন্দের এক সাজ সাজ রব। বিয়েকে কেন্দ্র করে বর কনে উভয় পক্ষের মধ্যে আনন্দ বেদনা আর নতুন সম্পর্কের সেতু বন্ধন এ এক স্বর্গীয় সুষমা। আধুনিক বিজ্ঞান প্রমান করেছে যে শুধু মানব সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রেম ভালোবাসার সৃষ্টি হয় এমন নয়, মানুষ ছাড়াও অন্যান্য পশু পাখির মধ্যেও প্রেম ভালোবাসার নিদর্শন প্রত্যক্ষ করা যায়। পশু পাখিদের মধ্যে প্রথাগত মন্ত্র উচ্চারণ করে বিয়ে হয় না কিন্তু বিপরীত লিঙ্গের নর ও নারী তারা একত্রে র্দীর্ঘদিন বসবাস করে সুখের সংসার রচনা করে। বিয়ে নিয়ে সারা পৃথিবীজোড়া প্রবাদ প্রবচন সহ অনেক উন্নত মানের সাহিত্য রচনার ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করা যায়।

বিয়ের আয়োজনে প্রত্যেক ধর্ম জাতি গোষ্ঠির মধ্যে নিজ নিজ রীতি নীতি আচার অনুষ্ঠান বিদ্যমান। আজকাল মানুষের জীবন যাত্রার নাগরিক যে তাড়া বেড়েছে তার কোনো বাহানার শেষ নেই ফলে সকল আয়োজনেই তার প্রভাব পড়ছে। এক সময় লক্ষ্য করা যেত যে বিবাহের আয়োজন নিয়ে দু’টি পরিবার শুধু নয় একটি মহল্লা কিংবা একটি পুরো গ্রাম আনন্দের জোয়ারে ভাসছে। বেশ দুরে থেকে মাইকে, কলের গান, বিয়ের গান বিয়ের গীত কখনো রেকর্ড, ক্যাসেট কিংবা সমবেতভাবে নানা বয়সী নারী পুরুষে কণ্ঠে শোনা যেতো। আজ আর সেই ধরনের আয়োজন খুব একটা লক্ষ্য করা যায় না। নানা বর্ণের কাগজ কেটে ত্রিকোণ নিশান, ঝালর কেটে পুরো বাড়ি সাজিয়ে তোলা এ কাজগুলো চলতো দিনের পর দিন অংশ নিতো পাড়া প্রতিবেশী, তরুণী-তরুণ তখনো চলতো নাচ, গান, ছড়াকাটা, ধাঁধাঁ বলা, কবিতা আবৃত্তি ইত্যাদি। আজ আর মানুষের অত সময় নেই তাই খবর দেয়া হচ্ছে ডেকোরেশন কোম্পানীগুলোকে, যে আমাদের বাড়ীতে বিয়ে সাজিয়ে দিয়ে যাও আর অমনি হাজির হয়ে গেলো লাল, নীল, হলুদ বাতি আরো কত কী সাজানোর সরঞ্জাম। আর এখন হাল ফ্যাশনের অনেক প্রতিষ্ঠান কাজ করছে বিবাহের আনন্দ আয়োজনকে কত আধুনিক আরো কত আনন্দঘন করা যায় সেই বিবেচনা মাথায় রেখে।
এমন অনেক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে যে আপনাকে কোনো ঝামেলেই আর যেতে হবে না। আপনি শুধু অর্থের যোগন দেবেন আর কী চাইছেন তাই জানিয়ে দিন, সেই সেই মতো সকল কিছু হাজির হয়ে যাবে আপনার সামনে। ব্রাইডাল ম্যানেজমেন্ট, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানীর কোনো কমতি নেই আপনার হাতের কাছে। 
বিয়ের রীতিনীতি জাতি ধর্ম ভেদে বিবাহের রীতিনীতি বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠানের মধ্যে সম্পন্ন হয়ে থাকে। বাংলাদেশে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ধর্মালম্বীদের বিয়ের আয়োজন প্রায়ই আমাদের চোখে পড়ে এবং আমরা নানা অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণ করে সামাজিক দায়িত্ব পালন ও আনন্দ অনুভব করে থাকি। এই ভারতীয় উপমহাদেশে বিবাহের বহু মাত্রিক আয়োজন বিভিন্ন ধর্মের আচার অনুষ্ঠানের মধ্যে পরষ্পর প্রবেশ করেছে স্বাভাবিক স্বাচ্ছন্দে। কন্যা দর্শন, কন্যা পছন্দ, বর পছন্দ এর সাথে যে সামাজিক আচার অনুষ্ঠানগুলো আমরা লক্ষ্য করি তা মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে কিছু খুব ভিতর গত পার্থক্য ছাড়া প্রায় সব একই রকম। আর এটি সংক্রমিত হয়েছে র্দীর্ঘ দিনের সৌহার্দপূর্ণ সহবস্থানের মধ্যে দিয়ে সাম্প্রদায়ীক সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্তও এটি। মুসলিম বিবাহের প্রাথমিক পর্যায়ে কন্যার বাড়িতে যে প্রস্তাব নিয়ে মুরুব্বীগণ উপস্থিত হন একে প্রস্তাব বা পায়গাম বলা হয়ে থাকে। তারপর কন্যা দর্শনের দিনক্ষন ঠিক করা, ঠিক একই পদ্ধতিতে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে কন্যা দর্শনের রীতি রয়েছে। কন্যা দর্শনের পরে খ্রিষ্ট সম্পদায়ের বিবাহের প্রস্তাবটি কিছুটা ভিন্ন, বর কণে পক্ষ উভয়ে সম্মত হলে পরে বর এবং কণের নাম গির্জায় প্রধান ধর্ম যাযক এর কাছে লিপিবদ্ধ করতে হয় । ফাদার পরপর তিন রোববার তাদের বিস্তারিত পরিচয়সহ বিবাহের প্রস্তবটি তুলে ধরবেন এতে কারো কোনো প্রকার আপত্তি না থাকলে প্রস্তাবটি গৃহীত হবে। পরবর্তী কোনো শুভ দিনক্ষণ দেখে র্গিজায় বিবাহ সম্পন্ন হবে তবে রেওয়াজ আছে যে রবিবার এবং যিশু খ্রিষ্টের জন্মের মাসে কোনো বিবাহ সম্পন্ন হবে না। গির্জায় এই পদ্ধতিতে নাম লেখানোকে বন্দ বা বন্ধন বলা হয়ে থাকে।
হিন্দু বা সনাতন ধর্মের প্রাচীন রীতির মধ্যে ছিল বিবাহ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত পাত্র-পাত্রী কোনো আহারই গ্রহণ করতে না। গায়ে হলুদে ব্যবহৃত হলুদ ছেলের গায়ের স্পর্শ করে কনের বাড়িতে পাঠানো হতো। সেই হলুদ কনের গায়ে লাগানো হতো। নিয়ম ছিল গায়ে হলুদের সময় বর সেলাই করা কোনো কাপড় পরিধান করতো না। পাত্র পাত্রীকে বরণ করতে কালো কাজললতা, দেশলাই, সুতো, হলুদবাটা, চন্দন, পঞ্চ শষ্যসহ আরো নানা বিধ উপকরণ দিয়ে বরণ ডালা সাজানো হতো। (এখানে উল্লেখ্য যে ঠিক একই আয়োজনে মুসলিম, খ্রিষ্ট এবং বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মধ্যে হলুদ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়ে থাকে।)
সম্প্রতিক সময়ে মানুষের জীবনযাত্রায় গতির সঞ্চার বৃদ্ধি পেয়েছে সাথে নানাবিধ কুসংস্কার মুক্ত হয়ে মানুষ নিজেকে আবিষ্কার করেছে আলোর দিকে ফলে অনেক পুরোনো রীতিনীতি এখন আর গ্রাহ্য করা হচ্ছে না। ১৯৬১ সালে জারিকৃত অধ্যাদেশে বলা হয়েছে সকল ধর্ম বর্ণ গোষ্টির বিবাহ অবশ্যই স্থানীয় সরকার প্রশাসনের মাধ্যমে রেজিষ্ট্রি করাতে হবে।

 

বিয়ে, সাদী, বিবাহ, নিকাহ্ এই চারটি শব্দের সাথে বাঙালি বাংলা ভাষাভাষি সকলেই পরিচিত। বিয়ে সব নারী পুরুষের জীবনেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বা অধ্যায়। পৃথিবীর সকল ধর্মেই বিবাহকে উৎসাহীত করা হয়েছে। এটি একটি প্রাচীন প্রথা, প্রাচীন একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান। অবাধ যৌনাচার শুধু সামাজিক অনাচার তৈরী করে না উৎপাদন ঘটায় এমন কতগুলো রোগ শোক যা সকল অর্থেই ঝুকিপূর্ন এবং অসম্মানজনক। সামাজিক শৃংখলা বংশ ধারা রক্ষায় বিয়ের প্রয়োজনীয়তা উপেক্ষা করার কোনো পথ নেই। বিয়ের আয়োজন সকল ধর্ম জাতি গোষ্ঠির মধ্যেই আনন্দের এক সাজ সাজ রব। বিয়েকে কেন্দ্র করে বর কনে উভয় পক্ষের মধ্যে আনন্দ বেদনা আর নতুন সম্পর্কের সেতু বন্ধন এ এক স্বর্গীয় সুষমা। আধুনিক বিজ্ঞান প্রমান করেছে যে শুধু মানব সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রেম ভালোবাসার সৃষ্টি হয় এমন নয়, মানুষ ছাড়াও অন্যান্য পশু পাখির মধ্যেও প্রেম ভালোবাসার নিদর্শন প্রত্যক্ষ করা যায়। পশু পাখিদের মধ্যে প্রথাগত মন্ত্র উচ্চারণ করে বিয়ে হয় না কিন্তু বিপরীত লিঙ্গের নর ও নারী তারা একত্রে র্দীর্ঘদিন বসবাস করে সুখের সংসার রচনা করে। বিয়ে নিয়ে সারা পৃথিবীজোড়া প্রবাদ প্রবচন সহ অনেক উন্নত মানের সাহিত্য রচনার ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করা যায়।

বিয়ের আয়োজনে প্রত্যেক ধর্ম জাতি গোষ্ঠির মধ্যে নিজ নিজ রীতি নীতি আচার অনুষ্ঠান বিদ্যমান। আজকাল মানুষের জীবন যাত্রার নাগরিক যে তাড়া বেড়েছে তার কোনো বাহানার শেষ নেই ফলে সকল আয়োজনেই তার প্রভাব পড়ছে। এক সময় লক্ষ্য করা যেত যে বিবাহের আয়োজন নিয়ে দু’টি পরিবার শুধু নয় একটি মহল্লা কিংবা একটি পুরো গ্রাম আনন্দের জোয়ারে ভাসছে। বেশ দুরে থেকে মাইকে, কলের গান, বিয়ের গান বিয়ের গীত কখনো রেকর্ড, ক্যাসেট কিংবা সমবেতভাবে নানা বয়সী নারী পুরুষে কণ্ঠে শোনা যেতো। আজ আর সেই ধরনের আয়োজন খুব একটা লক্ষ্য করা যায় না। নানা বর্ণের কাগজ কেটে ত্রিকোণ নিশান, ঝালর কেটে পুরো বাড়ি সাজিয়ে তোলা এ কাজগুলো চলতো দিনের পর দিন অংশ নিতো পাড়া প্রতিবেশী, তরুণী-তরুণ তখনো চলতো নাচ, গান, ছড়াকাটা, ধাঁধাঁ বলা, কবিতা আবৃত্তি ইত্যাদি। আজ আর মানুষের অত সময় নেই তাই খবর দেয়া হচ্ছে ডেকোরেশন কোম্পানীগুলোকে, যে আমাদের বাড়ীতে বিয়ে সাজিয়ে দিয়ে যাও আর অমনি হাজির হয়ে গেলো লাল, নীল, হলুদ বাতি আরো কত কী সাজানোর সরঞ্জাম। আর এখন হাল ফ্যাশনের অনেক প্রতিষ্ঠান কাজ করছে বিবাহের আনন্দ আয়োজনকে কত আধুনিক আরো কত আনন্দঘন করা যায় সেই বিবেচনা মাথায় রেখে।
এমন অনেক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে যে আপনাকে কোনো ঝামেলেই আর যেতে হবে না। আপনি শুধু অর্থের যোগন দেবেন আর কী চাইছেন তাই জানিয়ে দিন, সেই সেই মতো সকল কিছু হাজির হয়ে যাবে আপনার সামনে। ব্রাইডাল ম্যানেজমেন্ট, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানীর কোনো কমতি নেই আপনার হাতের কাছে।
বিয়ের রীতিনীতি
জাতি ধর্ম ভেদে বিবাহের রীতিনীতি বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠানের মধ্যে সম্পন্ন হয়ে থাকে। বাংলাদেশে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ধর্মালম্বীদের বিয়ের আয়োজন প্রায়ই আমাদের চোখে পড়ে এবং আমরা নানা অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণ করে সামাজিক দায়িত্ব পালন ও আনন্দ অনুভব করে থাকি। এই ভারতীয় উপমহাদেশে বিবাহের বহু মাত্রিক আয়োজন বিভিন্ন ধর্মের আচার অনুষ্ঠানের মধ্যে পরষ্পর প্রবেশ করেছে স্বাভাবিক স্বাচ্ছন্দে। কন্যা দর্শন, কন্যা পছন্দ, বর পছন্দ এর সাথে যে সামাজিক আচার অনুষ্ঠানগুলো আমরা লক্ষ্য করি তা মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে কিছু খুব ভিতর গত পার্থক্য ছাড়া প্রায় সব একই রকম। আর এটি সংক্রমিত হয়েছে র্দীর্ঘ দিনের সৌহার্দপূর্ণ সহবস্থানের মধ্যে দিয়ে সাম্প্রদায়ীক সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্তও এটি। মুসলিম বিবাহের প্রাথমিক পর্যায়ে কন্যার বাড়িতে যে প্রস্তাব নিয়ে মুরুব্বীগণ উপস্থিত হন একে প্রস্তাব বা পায়গাম বলা হয়ে থাকে। তারপর কন্যা দর্শনের দিনক্ষন ঠিক করা, ঠিক একই পদ্ধতিতে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে কন্যা দর্শনের রীতি রয়েছে। কন্যা দর্শনের পরে খ্রিষ্ট সম্পদায়ের বিবাহের প্রস্তাবটি কিছুটা ভিন্ন, বর কণে পক্ষ উভয়ে সম্মত হলে পরে বর এবং কণের নাম গির্জায় প্রধান ধর্ম যাযক এর কাছে লিপিবদ্ধ করতে হয় । ফাদার পরপর তিন রোববার তাদের বিস্তারিত পরিচয়সহ বিবাহের প্রস্তবটি তুলে ধরবেন এতে কারো কোনো প্রকার আপত্তি না থাকলে প্রস্তাবটি গৃহীত হবে। পরবর্তী কোনো শুভ দিনক্ষণ দেখে র্গিজায় বিবাহ সম্পন্ন হবে তবে রেওয়াজ আছে যে রবিবার এবং যিশু খ্রিষ্টের জন্মের মাসে কোনো বিবাহ সম্পন্ন হবে না। গির্জায় এই পদ্ধতিতে নাম লেখানোকে বন্দ বা বন্ধন বলা হয়ে থাকে।
হিন্দু বা সনাতন ধর্মের প্রাচীন রীতির মধ্যে ছিল বিবাহ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত পাত্র-পাত্রী কোনো আহারই গ্রহণ করতে না। গায়ে হলুদে ব্যবহৃত হলুদ ছেলের গায়ের স্পর্শ করে কনের বাড়িতে পাঠানো হতো। সেই হলুদ কনের গায়ে লাগানো হতো। নিয়ম ছিল গায়ে হলুদের সময় বর সেলাই করা কোনো কাপড় পরিধান করতো না। পাত্র পাত্রীকে বরণ করতে কালো কাজললতা, দেশলাই, সুতো, হলুদবাটা, চন্দন, পঞ্চ শষ্যসহ আরো নানা বিধ উপকরণ দিয়ে বরণ ডালা সাজানো হতো। (এখানে উল্লেখ্য যে ঠিক একই আয়োজনে মুসলিম, খ্রিষ্ট এবং বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মধ্যে হলুদ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়ে থাকে।)
সম্প্রতিক সময়ে মানুষের জীবনযাত্রায় গতির সঞ্চার বৃদ্ধি পেয়েছে সাথে নানাবিধ কুসংস্কার মুক্ত হয়ে মানুষ নিজেকে আবিষ্কার করেছে আলোর দিকে ফলে অনেক পুরোনো রীতিনীতি এখন আর গ্রাহ্য করা হচ্ছে না। ১৯৬১ সালে জারিকৃত অধ্যাদেশে বলা হয়েছে সকল ধর্ম বর্ণ গোষ্টির বিবাহ অবশ্যই স্থানীয় সরকার প্রশাসনের মাধ্যমে রেজিষ্ট্রি করাতে হবে।

বরযাত্রা
বরযাত্রা বিবাহ অনুষ্ঠানের প্রধান আকর্ষনীয় একটি পর্ব। অল্প কিছুদিন আগেও বরযাত্রায় পালকি ঘোড়ার গাড়ি জল পথে বাহারী বাহারী নৌযান ব্যবহার করা হতো। বরযাত্রা সাজানো নিয়েও মানুষের সার্মথ অনুযায়ী আয়োজনের শেষ নেই। একটি বিশেষ দিনকে আরো প্রাণবন্ত স্মরণীয় করে রাখতে, পোশাক থেকে শুরু করে গাড়ীর বহর, আতশবাজী পোড়ানো সব কিছুতেই আনন্দকে ধরে রাখতে প্রাণান্ত চেষ্টা।
বরযাত্রা কণের বাড়ীতে উপস্থিত হওয়ার ক্ষণযেন আরো এক আনন্দের হিলোøাল। সদর দরজা থেকে অন্দরমহল পর্যন্ত এক কলকাকলী গুঞ্জরণ, বর এসেছে বর এসেছে। কণের নিকট আত্মীয় ভাই বোনেরা গেট আগলে ধরে নতুন বরের কাছ থেকে বক্শীস আদায় করা তখন উভয় পক্ষে মিঠে কড়া নানা কথা পরিবেশকে করে তোলে যেন আরো অম্ল-মধুর।
বর বিয়ের গেট থেকে ছাড়া পেয়ে গিয়ে বসলো তো বরের স্টেজে আর অমনি লুকানো হয়ে গেল বরের নতুন নাগরা জুতো। আর এ নিয়ে নানা হাস্যরস , এমনি করেই যেন নতুন সম্পর্ককে আরো নিবীর করে তোলা।
হাল ফ্যাশানেও বরযাত্রার আয়োজনে নানা বৈচিত্র লক্ষ্য করা যায়। মটর শোভাযাত্র ছাড়াও এখন প্রায়ই দেখা যায় ঘোড়ার গাড়ীতে বরযাত্রার আয়োজন। প্রতীকি পালকির ব্যবহারও শহরে-নগরে চোখে পড়ে আজকাল।

কন্যা দান
বিবাহের যাবতীয় আপ্যায়ন অনুষ্ঠানিকতা শেষে আসে কন্যা দান পর্বটি। এটি একটি বেদনা ভারাক্রান্ত মুহূর্ত এই বিদায় ক্ষণটিতে নিকট আত্মীয় সকলেই অশ্রু সজল হয়ে ওঠে। জীবনের দীর্ঘ সময় পিতা-মাতার অকৃত্রিম ¯েœহে ভালোবাসায় লালিত পালিত হয়ে স্বামীর ঘরে চলে যাবার বিদায় লগ্নটি যেন হৃদয়ের অতলে গিয়ে স্পর্শ করে। পরিবারের মুরুব্বীগণ কন্যাকে স্বামীর হাতে তুলে দেন তাদের ভালোবাসার ধন তখন নানা আবেগঘণ কথা শোনা যায় উভয় পক্ষে। বর পক্ষ থেকে দেয়া হয় নানা প্রবোধ বাণী। মায়ার জাল ছিন্ন করে অশ্রুভরা নয়নে কন্যাকে বিদায় নিতে হয় জীবনের নতুন এক দীর্ঘ
যাত্রাপথের সূচনায়।


চাঁদ দেখা
বিবাহ অনুষ্ঠানের মধ্যে এ পর্বটি বেশ আমোদঘন একটি সময় আপ্যায়নের কিছু পরে এই সুন্দর মুহূর্তটি আসে, বরকে নিয়ে আসা হয় কণের কাছে, তখন কণের হাতে বর গ্রহণ করেন শরবত ও মিষ্টান্ন। মালাবদলও চলে পরস্পর বর কনের মধ্যে। এ সময় উপস্থিত থাকেন সাধারণত আনন্দমহলের নারীগণ মা, খালা, দাদী, মামী, ফুফু, বোন, সই পাড়া-প্রতিবেশি সকলে। তারপর ওড়না কিংবা লাল বেনারসি কাতানে বর ও কণে মাথা ঢেকে আড়াআড়িভাবে নিচে রাখা হয়, আয়নায় তখন এক সাথে বর কণের সুন্দর অবয়ব ভেসে ওঠে। পরস্পর দৃষ্টি বিনিময় হয় একে শাহ্্-নজর Ÿলা হয়ে থাকে।

বৌভাত
এই পর্বটি অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে বরের বাড়িতে। বউ ঘরে তোলার পর বর পক্ষের সকল আত্মীয়-স্বজনসহ পাড়া প্রতিবেশি বন্ধু-বান্ধবদের নিমন্ত্রন করা হয়। বৌভাতের অনুষ্ঠানে নতুন দম্পতি সকলকে স্বাগত জানান আপ্যায়ণ পর্বে। এই অনুষ্ঠাটিতে আর কোন ঝামেলা থাকে না। আপ্যায়ণ তদারকি করা আর উপহার সামগ্রী গুছিয়ে রাখা


বরযাত্রা বিবাহ অনুষ্ঠানের প্রধান আকর্ষনীয় একটি পর্ব। অল্প কিছুদিন আগেও বরযাত্রায় পালকি ঘোড়ার গাড়ি জল পথে বাহারী বাহারী নৌযান ব্যবহার করা হতো। বরযাত্রা সাজানো নিয়েও মানুষের সার্মথ অনুযায়ী আয়োজনের শেষ নেই। একটি বিশেষ দিনকে আরো প্রাণবন্ত স্মরণীয় করে রাখতে, পোশাক থেকে শুরু করে গাড়ীর বহর, আতশবাজী পোড়ানো সব কিছুতেই আনন্দকে ধরে রাখতে প্রাণান্ত চেষ্টা।
বরযাত্রা কণের বাড়ীতে উপস্থিত হওয়ার ক্ষণযেন আরো এক আনন্দের হিলোøাল। সদর দরজা থেকে অন্দরমহল পর্যন্ত এক কলকাকলী গুঞ্জরণ, বর এসেছে বর এসেছে। কণের নিকট আত্মীয় ভাই বোনেরা গেট আগলে ধরে নতুন বরের কাছ থেকে বক্শীস আদায় করা তখন উভয় পক্ষে মিঠে কড়া নানা কথা পরিবেশকে করে তোলে যেন আরো অম্ল-মধুর।
বর বিয়ের গেট থেকে ছাড়া পেয়ে গিয়ে বসলো তো বরের স্টেজে আর অমনি লুকানো হয়ে গেল বরের নতুন নাগরা জুতো। আর এ নিয়ে নানা হাস্যরস , এমনি করেই যেন নতুন সম্পর্ককে আরো নিবীর করে তোলা।
হাল ফ্যাশানেও বরযাত্রার আয়োজনে নানা বৈচিত্র লক্ষ্য করা যায়। মটর শোভাযাত্র ছাড়াও এখন প্রায়ই দেখা যায় ঘোড়ার গাড়ীতে বরযাত্রার আয়োজন। প্রতীকি পালকির ব্যবহারও শহরে-নগরে চোখে পড়ে আজকাল।

কন্যা দান
বিবাহের যাবতীয় আপ্যায়ন অনুষ্ঠানিকতা শেষে আসে কন্যা দান পর্বটি। এটি একটি বেদনা ভারাক্রান্ত মুহূর্ত এই বিদায় ক্ষণটিতে নিকট আত্মীয় সকলেই অশ্রু সজল হয়ে ওঠে। জীবনের দীর্ঘ সময় পিতা-মাতার অকৃত্রিম ¯েœহে ভালোবাসায় লালিত পালিত হয়ে স্বামীর ঘরে চলে যাবার বিদায় লগ্নটি যেন হৃদয়ের অতলে গিয়ে স্পর্শ করে। পরিবারের মুরুব্বীগণ কন্যাকে স্বামীর হাতে তুলে দেন তাদের ভালোবাসার ধন তখন নানা আবেগঘণ কথা শোনা যায় উভয় পক্ষে। বর পক্ষ থেকে দেয়া হয় নানা প্রবোধ বাণী। মায়ার জাল ছিন্ন করে অশ্রুভরা নয়নে কন্যাকে বিদায় নিতে হয় জীবনের নতুন এক দীর্ঘ
যাত্রাপথের সূচনায়।
চাঁদ দেখা
বিবাহ অনুষ্ঠানের মধ্যে এ পর্বটি বেশ আমোদঘন একটি সময় আপ্যায়নের কিছু পরে এই সুন্দর মুহূর্তটি আসে, বরকে নিয়ে আসা হয় কণের কাছে, তখন কণের হাতে বর গ্রহণ করেন শরবত ও মিষ্টান্ন। মালাবদলও চলে পরস্পর বর কনের মধ্যে। এ সময় উপস্থিত থাকেন সাধারণত আনন্দমহলের নারীগণ মা, খালা, দাদী, মামী, ফুফু, বোন, সই পাড়া-প্রতিবেশি সকলে। তারপর ওড়না কিংবা লাল বেনারসি কাতানে বর ও কণে মাথা ঢেকে আড়াআড়িভাবে নিচে রাখা হয়, আয়নায় তখন এক সাথে বর কণের সুন্দর অবয়ব ভেসে ওঠে। পরস্পর দৃষ্টি বিনিময় হয় একে শাহ্্-নজর Ÿলা হয়ে থাকে।

বৌভাত
এই পর্বটি অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে বরের বাড়িতে। বউ ঘরে তোলার পর বর পক্ষের সকল আত্মীয়-স্বজনসহ পাড়া প্রতিবেশি বন্ধু-বান্ধবদের নিমন্ত্রন করা হয়। বৌভাতের অনুষ্ঠানে নতুন দম্পতি সকলকে স্বাগত জানান আপ্যায়ণ পর্বে। এই অনুষ্ঠাটিতে আর কোন ঝামেলা থাকে না। আপ্যায়ণ তদারকি করা আর উপহার সামগ্রী গুছিয়ে রাখা

INTERSTELLAR

ফুয়াদ বিন নাসের আবির

 

 

‘ইন্টারস্টেলার’ মুভিটি দেখতে যাওয়ার সময় বেশ ভয়ে ছিলাম। চলচ্চিত্রটি মুক্তি পাওয়ার প্রায় দুই সপ্তাহ পর দেখতে যাচ্ছি। কাজেই মানুষের খুব প্রশংসায় এটি নিয়ে প্রত্যাশা বেড়ে গিয়েছিল দশগুণ। একজন পাঁড় নোলানভক্ত (মতান্তরে নোলানয়েড) হিসেবে এর আগেও প্রত্যাশার ভারে ইনসেপশন ভালো লাগেনি। তাই ভয়ে থাকাটা স্বাভাবিক। কেমন লাগলো তা হয়তো এখন বোঝানো যাবে না। তবে এতটুকু বলতে পারি, আমরা কয়েকজন হল থেকে বের হয়ে ১৫ মিনিট কোনো কথা বলতে পারিনি। সবার মস্তিষ্কই ব্যস্ত ছিল চলচ্চিত্রটির অন্তিম মুহূর্তগুলো হজম করার দুরূহ কাজে।
ইন্টারস্টেলার ছিল জোনাথান নোলানের মস্তিষ্ক প্রসূত একটি উচ্চাভিলাষী প্রজেক্ট। সে প্রজেক্টটি হাতে নিয়েছিলেন শিতফেন স্পিলবার্গকে মাথায় রেখে। তবে শুরুতেই জুরাসিক ওয়ার্ল্ডের শুটিংয়ে ব্যস্ত হয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিক পছন্দ হিসেবে প্রজেক্টে চলে আসে বড় ভাই ক্রিস্টোফার নোলান। ওই দুই ভাইয়ের জুটির অন্যান্য চলচ্চিত্রের মতো (মেমেন্টো, প্রেস্টিজ, ইনসেপশন, ফলোয়িং) এখানেও স্ক্রিপ্ট লেখার কাজ শুরু করে জোনাহ। ছবির বিজ্ঞান অংশ যথাযথ রাখার জন্য নিয়োগ দেয়া হয় ক্যালটেকের বিখ্যাত অ্যাস্ট্রোফিজিসিস্ট কিপ থর্নকে। কিপ থর্নকে নিয়োগ দেয়া ছিল চলচ্চিত্রটির ‘গুড’ থেকে ‘গ্রেট’ হওয়ার পথে প্রথম ধাপ। স্ক্রিপ্টের সিংহভাগ ও স্পেশাল এফেক্টের প্রায় পুরোটাই কিপ থর্নের থিওরেটিকাল গবেষণার অংশ ছিল। চলচ্চিত্রটি বক্স অফিস মাত করে দিলেও পদার্থ বিজ্ঞান পরীক্ষায় যেন ফেল না করে এ বিষয়ে নোলান আগেভাগেই নিশ্চিত করেছে এভাবেই। কিপ থর্নের মডেল অনুসরণ করে যেভাবে ওয়ার্মহোল, ব্ল্যাকহোল বা ফিফথ ডাইমেনশান নোলান আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন তা নিঃসন্দেহে শ্বাসরুদ্ধকর অভিজ্ঞতা।

মহাকাশবিদ্যাই কি এ চলচ্চিত্রটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক? অবশ্যই নয়। চলচ্চিত্রটির পটভূমিটিই বড় অদ্ভুত। ভবিষ্যতের পৃথিবী। সেখানে ভূমি এমনই ঊষর হয়ে গেছে। এতে গুটিকয়েক শস্য ছাড়া অন্য কিছুই ফলানো সম্ভব নয়। এ পৃথিবীতে মানুষের প্রধান পেশা কৃষি কাজ, জৈবজ্বালানির ভা-ার প্রায় নিঃশেষ। এর মধ্যে ক্ষণে ক্ষণে হানা দেয় ভয়ানক বালুঝড়। মানব জাতি কোনোমতে টিকে আছে পৃথিবীতে। এ রকমই একটি সময় মহাকাশচারী কুপার (ম্যাথু ম্যাককনাহে) ও তার পরিবার নিয়ে শুরু হয় ইন্টারস্টেলারের কাহিনী। ভবিষ্যতের পৃথিবীতে মহাকাশযাত্রা বন্ধ হয়ে গেছে অনেক আগেই। কাজেই সবার মতো কুপারের পেশাও কৃষি কাজ। তার বড় ইচ্ছা ছেলে ও মেয়ে দু’জনই মহাকাশ বিজ্ঞান পড়বে। কিন্তু স্কুল থেকে বলা হয়, পৃথিবীতে এখন মহাকাশচারীর থেকে কৃষক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এরই মধ্যে কুপারের মেয়ে মার্ফের (ম্যাকেঞ্জি ফয়) রুমে এক অশরীরী অস্তিত্ব প্রায়ই হানা দেয়। বই আপনাআপনি পড়ে যায় শেলফ থেকে, মাঝে মধ্যে দুর্বোধ্য সংকেত দেয়ারও চেষ্টা করে। এ রকমই এক সংকেতের মর্ম উদ্ধার করে কুপার আবিষ্কার করে নাসার এক অতি গোপনীয় প্রজেক্ট। সে জানতে পারে, মানব জাতির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার শেষ ভরসা নাসার ওই মিশন। মিশনে তার সঙ্গে যোগ দেন মিশনের হেড প্রফেসর ব্র্যান্ডের মেয়ে (অ্যান হ্যাথওয়ে)। মিশনের সবাই জানে- তারা যাচ্ছে অনেক দূরে। আমাদের এই মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি ছাড়িয়ে অজানা অন্য কোনো গ্যালাক্সিতে বসবাসযোগ্য গ্রহের সন্ধানে। সেখানে হয়তো গড়ে উঠবে মানব জাতির নতুন বাসস্থান। তারা সবাই জানে, ফিরে আসার সম্ভাবনা শূন্যের কোঠায়। যদি ফিরে আসা হয়, তাহলে পৃথিবীতে পেরিয়ে যাবে অনেক সময়। তাই নিজেদের পরিবারকে বিদায় জানিয়ে বেরিয়ে পড়েন অজানার উদ্দেশে।


চলচ্চিত্রটির এই বিন্দু থেকে কাহিনী দু’ভাগে ভাগ হয়ে যায়। এক পটভূমিতে আমরা দেখি, কুপারের নেতৃত্বে মহাকাশযান এন্ডিউরেন্সের অভিযান। সেখানে সময়ের ¯্রােত ধীরে বইছে। কারণ তারা ততক্ষণে পৌঁছে গেছে একটি কৃষ্ণ গহ্বরের খুব কাছাকাছি। অন্যদিকে আমরা দেখতে পাই, পৃথিবীতে যেখানে সময় বইছে খর¯্রােতা নদীর মতো সেখানে ছোট্ট মার্ফ বড় হয়ে (জেসিকা চ্যাসটেইন) কাজ করছে অশীতিপর বৃদ্ধ প্রফেসর ব্র্যান্ডের (মাইকেল কেইন) অধীন। সে মেলানোর চেষ্টা করছে এক দুরূহ ইকুয়েশন। তা দেবে মানবমুক্তির সন্ধান। আরও মেলানোর চেষ্টা করছে তাকে তার বাবা ছেড়ে যাওয়ার বেদনা এবং বাবার প্রতি অভিমানটি এক সুরে।
ইন্টারস্টেলারের বিশ্লেষণ করতে গেলে ভবিতব্য হিসেবেই সবার প্রথম চলে আসবে কুব্রিকের ম্যাগনাম ওপাস ‘২০০১ : আ স্পেস ওডিসি’র সঙ্গে তুলনা। স্পেস ওডিসি ওই সময়ের সাই-ফাই ছবির একটি মাইলফলক ছিল। তা অনেক বছর পর্যন্ত কেউ ছুঁতে পারেনি। তেমনি নোলানের ম্যাগনাম ওপাস ইন্টারস্টেলারও এই যুগের সাইাফাই ছবির মাইলফলক হয়ে থাকবে- এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। এ চলচ্চিত্রটি মাইলফলক হয়ে থাকবে গত বছরের সেরা অভিনেতার অস্কার বিজয়ী ম্যাথু ম্যাককোনাহে, অ্যানে হ্যাথওয়ের ক্যারিয়ারেও। কারণ সেলুলয়েডের ক্যানভাসে ফুটে ওঠা বিজ্ঞানের জটিল থিওরি, ইকুয়েশন বা মহাজাগতিক সত্য ছাপিয়ে দিন শেষে উঠে এসেছে দুই বাবা ও তাদের দুই মেয়ের বিচ্ছেদ এবং তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রামের কাহিনী। মহাজাগতিক একাকিত্ব, অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনার মতো ভয়, অহানায় হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা- এ ধরনের অনন্যসাধারণ কিছু অনুভূতি নিয়ে খেলা করেছেন নোলান। তার বাছাই করা অভিনেতাদের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স সবকিছু ছাপিয়ে আবেগটিই রুপালি পর্দায় সার্থকভাবে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। অস্কারজয়ী সংগীত পরিচালক হান্স জিমারের সুরের মূর্ছনা ও নিউ ডিল স্টুডিওর চোখ ধাঁধানো স্পেশাল ইফেক্টস- সব মিলিয়ে ইন্টারস্টেলার নোলানের ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা কাজ হওয়ার জোর দাবিদার।
সবশেষে যারা এখনো ইন্টারস্টেলার দেখেননি তাদের জন্য ছোট একটা উপদেশ হলো, ছবিটি দেখার আগে ব্ল্যাকহোল, ওয়ার্ম হোল, স্পেশাল ও জেনারেল থিওরি অফ রিলেটিভিটি নিয়ে যদি কিছুমাত্রায় হোমওয়ার্ক করে যান তাহলে মুভিটি উপভোগের আনন্দ দ্বিগুণ হয়ে যাবে। এছাড়া আপনিও আমার মতো ছবি শেষ করার পর ১৫ মিনিট কোনো কথা বলতে পারবেন না- এটি গ্যারান্টি!

নবান্নের দেশে

 

 

“জমি উপড়ায় ফেলে গেছে চাষা
নতুন লাঙ্গল তার পড়ে আছে পুরানো পিপাসা
জেগে আছে মাঠের উপরে;
সময় হাঁকিয়া যায় পেঁচা ওই আমাদের তরে
হেমন্তের ধান ওঠে ফ’লে
দুই পা ছড়ায়ে বস এইখানে পৃখিবীর কোলে ”


‘রূপসী বাংলা’র কবি জীবনানন্দ দাশ তাঁর কবিতার পঙ্তিতে এঁকেছেন বাংলার শাশ্বত রূপের রঙিন অবয়ব যা গ্রাম-বাংলার প্রতিটি জনপদের পরিচিত যাপিত জীবন। সময়ের নাগরদোলায় বৈচিত্র্যে অনিন্দ্য বাংলার মাসগুলো বৃত্তাকারে ঘুরে ঘুরে আমাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক সর্বোপরি প্রাকৃতিক জীবনকে রেখেছে সচল। ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে ছয়টি ঋতুর মোড়কে বারোটি মাস জলে-স্থলে অন্তরীক্ষের ক্যানভাসে আঁকে স্বকীয় রূপ। ষড়ঋতুর এই বঙ্গে হেমন্তের অবস্থান চতুর্থ। ইংরেজী মধ্য অক্টোবর থেকে মধ্য ডিসেম্বর পর্যন্ত কার্তিক ও অগ্রহায়ণ এই দুই মাস হেমন্তের খামে বাঙালির ঘরে-বাইরে হাটে-মাঠে-ঘাটে আচার ও সংস্কৃতিতে নিয়ে আসে অভাব ও সমৃদ্ধির দ্বৈত উপহার। কার্তিক মূলত কৃষিগৃহস্থ জীবনে অভাব-অনটনের মাস হিসেবে পরিচিত। কৃষি প্রধান গ্রাম-বাংলায় এই সময় অকাল বন্যাসহ নানারকম প্রাকৃতিক দূর্যোগের ফলে কৃষকের কাজ থাকে না। গোলাঘর থাকে শূন্য। বহুমুখি ফসল উৎপাদন উপযোগী জমিও প্রস্তুত না থাকায় প্রতিটি জনপদে একরকম হাহাকার লক্ষ্য করা যেত কিছুদিন আগেও। বর্তমানে এই পরিস্থিতির খুব যে ব্যত্যয় ঘটেছে তা বলা যাবে না। শরতের শুভ্র শরীর বর্ণিল হতে থাকে হেমন্তের শুরুতে তবে অগ্রহায়ণের উপস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে দেয় প্রকৃতির দৃশ্যপট। মসৃণ ও স্পষ্টতার অনুভব নিয়ে ষড়ঋতুর এ দেশে ঋতুরানীর পরে হাজির হয় ঋতুকন্যা হেমন্ত। মৌন, শীতল ও অন্তর্মুখী হওয়া এ ঋতুর প্রধান বৈশিষ্ট্য।

উৎসব মানেই আমরা বুঝি হেমন্তকে। এর নেপথ্যে যথার্থ কারণও রয়েছে, সুজলা-সুফলা এ দেশের প্রধান ফসল ধান। বর্ষার শেষ দিকে বোনা আমন-আউশ শরতে বেড়ে ওঠে। আর হেমন্তের প্রথমে তাতে পাক ধরে। হেমন্তের প্রথম মাস কার্তিকের শেষ দিকে পাড়াগাঁয়ের মাঠে মাঠে ধান কাটার ধুম পড়ে। পাকা ধানের গন্ধে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে ম-ম গন্ধ। কবি সুফিয়া কামাল তাঁর কবিতায় সেই ফসল তোলার চিত্রটি এঁকেছেন দারুণভাবে “রিক্তের অঞ্চল ভরি, হাসি ভরি, ক্ষুধার্তের মুখে/ভবিষ্যৎ সুখের আশা ভরি দিল কৃষকের বুকে”। মাঠে মাঠে হেমন্তের ধানক্ষেতের রূপ নিয়ে কবি জসীমউদ্দীন লিখেছেন “সবুজে হলুদে সোহাগ ঢুলায়ে ধানক্ষেত,/পথের কিনারে পাতা দোলাইয়া করে সাদা সঙ্কেত। কৃষাণ কনের বিয়ে হবে, হবে তার হলদি কোটার শাড়ি/হলুদে ছোপায় হেমন্ত রোজ কচি রোদ রেখা-নাড়ি।” এছাড়াও অসংখ্য কবিতা এবং শিল্পীর রকমারি সুর অবিরত গেয়ে চলে উৎসবমুখর হেমন্তের বৈচিত্র্যময় জয়গান। শীতের আগমনী বার্তা ও তেজোদীপ্ত রৌদ্রকিরণের বিদায় নিয়ে আসে হেমন্ত। এসময় দিক পরিবর্তনে বাতাস উত্তর থেকে দক্ষিণে বইতে থাকে, নাতিশীতোষ্ণ। কার্তিকের পরের মাস চিরায়ত বাংলার আমন প্রধান অঞ্চলে অগ্রহায়ণ নিয়ে আসে আশির্বাদ। ধান কাটার ভরা মৌসুম এ অগ্রহায়ণ। ফসলি মাঠের ঢেউ উপচে পড়ে কৃষকের গোলায়, আঙিনায়, চাতালে। এই সময়ে নতুন ধানে কিষাণ-কিষানীদের আনন্দ আর ব্যস্ততার সীমা থাকে না। পুরুষরা সারাদিন মাঠে ধান কাটে। নারীরাই সেই ধান সারাদিন মাড়াই করে সেগুলোকে সেদ্ধ করে ও রোদে শুকায় আর গোলায় ভরে।


যদিও বর্তমান সময়ে কৃষিকাজের সকল ক্ষেত্রেই প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। হেমন্তের এই শেষ মাসটি সারাবছরের পরিশ্রমের ঘামে ফলানো ফসল কৃষকের মরমে সোনালি প্রলেপ মেখে দেয়। তাই যুগযুগ ধরে এই মাসটি ‘নব অন্ন’ নতুন ভাত বা ‘নবান্ন’ নামে পরিচিতি পেয়ে আসছে। এই সময় সকল কৃষকের ঘরে থাকে নতুন ধান। সেই ধানের চাল দিয়ে কৃষকপরিবার পিঠা-পুলির ধুম পড়ে যায়। অগ্রহায়ণ তখন রূপ নেয় উৎবের আমেজে। এই উৎসবে হরেক রকম পিঠা তৈরি হয়। নামের মতই বৈচিত্র্যময় পিঠাগুলো স্বাদে অনন্য, যেমন- চিতই, পাকানো, পাকোয়ান বা পাক্কন, পাটিশাপটা, কুশলি, ভাপা, পাতা, ভাত, কাটা, নকশি, পুলি, দুধ বা ভিজানো, ছিটা, লবঙ্গ, গোকুল, ম্যারা, মুঁঠা, সিদ্ধ, পুতুল, লরি, চাছি, সাগুদানা, ঝুড়িসীতা, তারাজোড়া, জামাই, জামদানি, হাদি, পাটা, তেজপাতা পিঠাসহ আরও অসংখ্য বাহারি নামের পিঠা বাড়িতে বাড়িতে তৈরি করা হয়। এই সময় আতœীয় স্বজনরা বেড়াতে আসে। তাদের নতুন চালের পিঠা দিয়ে আপ্যায়ন করানো হয়। এভাবেই গ্রাম বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে নবান্নের আমেজ। স্মরনাতীত কাল থেকেই ধন-ধান্যে ভরা অগ্রহায়ণ মাসকে বছরের প্রথম মাস ধরে বর্ষ গণনার রীতির প্রচলন ছিল এ অঞ্চলে। অগ্রহায়ণ হলো বছরের অগ্রে যে যায়। তাই অগ্রহায়ণের স্থলে গ্রীষ্মের বৈশাখ কী করে বাংলাবর্ষের প্রথম মাস হলো তা এখনো রহস্য। নতুন ধানে, নতুন অন্নে ধীমান প্রকৃতির মেজাজ বাঙালির ফসল কাটার উৎসবকে উসকে দেয় বহুগুণে। হেমন্তের শেষ মাসটিতে রোদের আঁচ কম থাকায় না শীত, না গরম এমন আরামপ্রদ তাপমাত্রায় সময়ের টানে ছোট হতে থাকে দিন। সকালে সবুজ ঘাঁস ও আমন ধানের পাতায় শিশির বিন্দু মুক্ত দানার মতো চিক চিক করে। বৃন্তচ্যুত শিউলী ফুল এসময় সৌরভ ছড়ায়। বেলি, সন্ধ্যা মালতি, দোপাটি, বক, জুঁই, কামিনী, গোলাপসহ অসংখ্য ফুল হেমন্তে ফুটে প্রকৃতিকে সুরভীত করে তুলে। বর্তমান অর্থনীতিতে বিশেষত আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে যদিও উৎপাদন বেড়েছে তবে পরিবহণের বেহাল দশা ও বাজারে মধ্যসত্ত্বভোগীদের স্বেচ্ছাচারীতার কারনে কৃষক ফসলের নায্য মূল্য থেকে প্রায়ই বঞ্চিত হয়। যার ফলে নবান্নের আনন্দ সর্বজনীন হয়ে ওঠে না। কেবল কৃষি নির্ভর গ্রাম নয়, বাংলাদেশের শহরগুলোতেও কার্তিক ও অগ্রহায়ণ স্বকীয় বৈশিষ্ট্যম-িত। নগরের ইট-কাঠ কংক্রিটের জঞ্জালে বেঁচে থাকা জীবনও সমান তাড়িত হয় কার্তিকের কৃপণতা আর অগ্রহায়ণের সুদিন সন্দেশের পরশে। অগ্রহায়ণের শুরু থেকেই শহরের রাস্তায় মৌসুমী পিঠার দোকান বসে। ভাপা, পটিশাপটা ইত্যাদি পিঠার বেচা বিক্রি নেহাত কম নয়।
আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে জ্বর, খুশখুশে কাশিসহ নানারকম রোগ-
বালাইয়ের কমবেশি প্রাদুর্ভাব দেখা যায় শহর ও গ্রামে। সনাতন ধর্মালম্বী বাড়িগুলোতে হেমন্তকালে কলেরা আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে আকাশবাতি জ্বালানোর প্রচলন ছিল। সময় বদলেছে। বর্তমানে মোটামুটি দৃঢ়তার সাথে বলা যায় খাদ্যাকালের মতো দূর্যোগ আর কলেরার মতো মহামারি বাংলাদেশের জীবন বাস্তবতায় অতীত।

 

লেখা : শাকিল সারোয়ার
মডেল : মুনমুন
পোশাক ও স্টাইলিং : মোঃ রাকিব খান
মেকওভার : ক্লিওপেট্রা বিউটি সেলুন 
ছবি : তানভীর মাহামুদ শোভন
সহযোগিতায় : আলী ইমাদ সরকার

Boyhood - ফিল্ম রিভিউ 

ফুয়াদ বিন নাসের আবির

 

পরিচালক রিচার্ড লিংকলেটার যখন জানান দিয়েছিলেন, ‘বয়হুড’ চলচ্চিত্রটি তার ১২ বছরব্যাপী প্রজেক্ট তখন অনেকে ভ্র কুঞ্চিত করেছিলেন, কী এমন ছবি বানাচ্ছেন যার জন্য এক যুগ ধরে গবেষণা করতে হবে? যারা বয়হুড দেখে ফেলেছেন তারা হয়তো আঁচ করতে পারবেন, কেন ১২ বছর ধরে এর পেছনে শ্রম দিয়েছেন পরিচালক। এ চলচ্চিত্রটি সম্পর্কে বলা যায়, সেলুলয়েডের কাব্য দিয়ে বাস্তব জীবনের যতটা কাছে যাওয়া সম্ভব এর থেকেও এক-দুই পা সামনে এগিয়ে গিয়েছেন রিচার্ড লিংকলেটার।
নাম থেকেই ছবির বিষয়বস্তু সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। ৭ বছর বয়সের ছোট্ট ছেলে মেসন জুনিয়রের (এলার কোলট্রেইন) ছেলেবেলার দিনগুলোর কাহিনী বয়হুড। এখানে গবেষণার সুযোগ কোথায়? ঠিক গবেষণা নয়, পরিচালক ইচ্ছা করলেই ভিন্ন বয়সের মেসনের চরিত্রে অন্য অভিনেতাদের দিয়ে কাজ চালিয়ে নিতে পারতেন। কিন্তু সোজা পথে না গিয়ে তিনি বেছে নিয়েছেন এক অনিশ্চয়তাপূর্ণ এক্সপেরিমেন্ট করার সুযোগ। চলচ্চিত্রটির মুখ্য অভিনেতা এলার কোলট্রেইন ৭ বছর বয়স থেকে শুরু করে টানা এক যুগ প্রায় প্রতি উইকএন্ড কাটিয়েছেন পরিচালক রিচার্ড লিংকলেটারের প্রডাকশন সেটে। এর ফলই হচ্ছে এই অনন্য চলচ্চিত্র।


ওই ছবিটি এগিয়ে গেছে লিনিয়ার টাইমলাইনে ২০০২ সাল থেকে শুরু করে সামনের দিকে। পুরো ছবিটি সত্যিকার অর্থে মেসন জুনিয়র ও তার পরিবারের কাহিনী নিয়ে বানানো কিছু স্বল্পদৈর্ঘ্যরে চলচ্চিত্রের সমন্বয় বলা যায়। কিন্তু গোটা ছবিতে কখনোই আমরা কোনো চরিত্রের মুখ থেকে সরাসরি জানতে পারিনি এটি কোন বছর চলছে। পরিচালক বিভিন্ন কৌশলে দর্শককে জানান দেন সময়ের ব্যাপারে। কখনো ইরাক যুদ্ধের প্রসঙ্গ, কখনো বা হ্যারি পটার মুভির রিলিজ বা ওই আমলের কোনো একটি জনপ্রিয় গান আমাদের মনে করিয়ে দেয় সে বছরটির কথা। হয়তো অন্য কোনো একটি দৃশ্যে মেসনের চুলের কাটিং বা চেহারা দেখে আমরা বুঝতে পারি, কিছু সময় পার হয়েছে। ছোট কিছু ঘটনা যার গুরুত্ব হয়তো দর্শক তৎক্ষণাৎ ধরতে পারে না। কিন্তু অনেক বছর পর এর পুনরাবৃত্তি আবার দর্শককে মনে করিয়ে দেয়। পুরো ছবির ব্যাপারটি যেন নস্টালজিয়া লেইনে এক চক্কর মারার মতো। এক্ষেত্রে কেবল নিজের স্মৃতি সরণিতে না হেঁটে আমরা পরিচালকের হাত ধরে হাঁটছি ছোট্ট এক ছেলের স্মৃতির লেনে।
পুরো ছবি আমরা দেখি মেসন জুনিয়রের দৃষ্টিকোণ থেকে। ইরাক যুদ্ধের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ তার জগতে কোনো ঢেউ খেলায় না, বরং সে পরবর্তী হ্যারি পটার মুভির রিলিজ ডেট নিয়ে বেশি উৎসাহী হয়। আমরাও একই সঙ্গে তার উত্তেজনা উপভোগ করি। সে যখন হাসে-কাঁদে তখন আমরাও হাসি বা কাঁদি। আমাদের চোখের সামনে সে বড় হয়ে ওঠে। আমরা প্রত্যক্ষ করি তার মা-বাবার ভালো গুণগুলো কীভাবে বয়সের সঙ্গে তার মধ্যে প্রস্ফুটিত হচ্ছে। কোনো ভালো গল্পকারের মতো পরিচালক সরাসরি আমাদের কিছু বলে দেন না। তবুও আমরা বুঝতে পারি।


পর্দায় শুধু মেসন জুনিয়র নয়, আমরা দিন গড়ানোর সঙ্গে পরিণত হতে দেখি তার মা-বাবাকেও। মেসনের মা-বাবা ডিভোর্সড। তার মা অলিভিয়া (প্যাট্রিসিয়া আর্কেট) তাকে ও তার বোনকে নিয়ে টেক্সাস চক্কর মারেন। বাবা মেসন সিনিয়র (ইথান হক) সন্তানদের কাস্টডি পাননি। কাজেই তাকেও প্রায়ই চক্কর মারতে হয় নিজের সন্তানদের সঙ্গে দেখা করার জন্য। অলিভিয়া বুদ্ধিজীবী ঘরানার মানুষ, লিবারেল ফেমিনিস্ট ও কলেজের প্রফেসর। দুই সন্তান, বয়ফ্রেন্ড, সাবেক স্বামী- এত সম্পর্কের টানাপড়েনে তার জীবন চক্কর দেয়। মেসন সিনিয়র মধ্যবয়স্ক চাকরীজীবী। কিন্তু তিনি জীবন কাটাতে চান ব্যাচেলরের মতো। দায়-দায়িত্বহীন নির্ভার মানুষের মতো তিনি আনন্দ খুঁজের বাড়ান তার আশপাশ থেকে। মজার ব্যাপার হলো, মেসন তার সামনে দু’জনকে পাশাপাশি দেখে- একজন কর্মক্লান্ত একঘেয়ে জীবনযাপনে অভ্যস্ত, অন্যজন আনন্দ-ফুর্তিতে মত্ত। এই চলচ্চিত্রে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা শুধু মেসনের চিন্তা-ভাবনা পরিণত হতে দেখি তা নয়। আমাদের চোখের সামনে তার মা-বাবার চরিত্রেও পরিবর্তন আসে। তাদের চিন্তা-ভাবনার বিবর্তন দেখি। তাদের ছেলের মতো তারাও বড় হতে থাকেন। মেসনের মতো তারাও বুঝতে পারেন, ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’-এর মর্মার্থ।
বয়হুড চলচ্চিত্রে ছোটখাটো বেশ কিছু খুঁত আছে, বিভিন্ন দৃশ্যায়নে আছে কিছু অসঙ্গতি। কিন্তু দিন শেষে পৌনে ৩ ঘণ্টার রুপালি পর্দার এ যাত্রাটিকে কখনোই আলাদা দৃশ্য বা চরিত্র অথবা সংলাপ দিয়ে বিচার করতে যাওয়া উচিত নয়। এই কাব্যের শক্তি এর সামগ্রিকতা ও সারল্যে। ছবির দ্বিতীয় দৃশ্যেই আমরা দেখতে পাই মেসন সবুজ ঘাসের ওপর শুয়ে আছে, চোখ অসীম আকাশে। কোনো সংলাপ নেই, অভিব্যক্তির কোনো পরিবর্তন নেই। তার ছোট্ট মাথায় কী খেলা করছে তা জানার উপায় নেই।
বিফোর সানরাইজ, সানশেড, মিডনাইটখ্যাত পরিচালক লিংকলেটারের অন্যান্য ছবির মতো এটিও আপনাকে ভাবাবে, খেলা করবে আপনার আবেগ-অনুভূতি নিয়ে। এই ছবির সবচেয়ে ভালো দিক হলো, পরিচালক কোনো কিছুই জোর করে বোঝাতে চেষ্টা করেননি, কোনো কিছুই প্রমট করা হয়নি পর্দার অন্তরাল থেকে। যা হয়েছে তা স্বাভাবিক সারল্যেই হয়েছে। ছবিটি দেখার পর যে অনুভূতির পরশ পাবেন তা একান্তই আপনার নিজস্ব, পরিচালক এখানে ভাগ বসাতে আসবেন না।

জীবন ও পতনের গল্প

 


সিনেমার কাহিনীতে দেখা যায়, নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে মিঠু। চাকরি খোঁজে এখানে সেখানে। বিভিন্ন কোম্পানীর অফিসে সিভি জমা দেয় কিন্তু তার মতো হাবা টাইপের ছেলেকে কেউই পাত্তা দেয় না। কেউ সিভি গ্রহণ করলেও পরক্ষণে তা ফেলে দেয়। এভাবেই চলতে থাকে তার চেষ্টা। ঘটনাচক্রে এক ব্যক্তির মাধ্যমে সে যুক্ত হয় ‘মাল্টি লেবেল মার্কেটিং’ বা এমএলএম ব্যবসার সঙ্গে। সেখান থেকে তাকে হাজারো রঙিন স্বপ্ন দেখানো হয়। একদিন সে অনেক টাকার মালিক হয়ে যাবে, বাড়ী, গাড়ি কোন কিছুরই তার অভাব থাকবে না। এই ভেবে সে শুধু স্বপ্ন দেখতেই থাকে। একদিন চোরাই মোবাইল কিনতে গিয়ে জনপ্রিয় নায়িকা রিমার একটি মোবাইল তার হাতে আসে। মোবাইলটিতে নায়িকা রিমার বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে একটি প্রাইভেট ভিডিও ক্লিপ ছিল। ভিডিও ক্লিপটিতে নায়িকা রিমা ও তার বয়ফ্রেন্ডের ব্যক্তিগত ও অন্তরঙ্গ কিছু সময় ভিডিওতে ধারণ করা আছে। যা কোনভাবে কারও হাতে গেলে ফেসবুক, ইউটিউব এসকল স্যোসাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়তে পারে, এতে রিমার ইমেজ ও ক্যারিয়ারে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে, সেই আতঙ্কে থাকে রিমা। মিঠু সেই সুযোগটি কাজে লাগায়। শুরু হয় রিমার জীবনে নতুন উপদ্রব। একপর্যায়ে একদিন ‘সিনেমাতে স্বামী-স্ত্রী যেভাবে মেলামেশা করে, একজন আরেকজনকে ভালোবাসে, মিঠু এই রকম একটা প্রস্তাব রিমাকে দিয়ে বসে। মিঠুর এই জাতীয় প্রস্তাবে রিমা আকাশ থেকে পড়ে। মিঠু রিমাকে ভিডিওটির কপি আছে বলে ভয় দেখায়। রিমা তার কথায় বাধ্য হয়ে অনেক কিছুই করে কিন্তু সব করতে সে রাজি হয় না। মিঠুকে একপর্যায়ে রিমা চড় মারে, তার অমানবিক আচরণের জন্য। মিঠু অমানবিক হয়ে ওঠে। অনেকটাই ‘সাইকো’! সে শুধু রিমা নয়, টাকা নেয় বিভিন্ন লোকের কাছ থেকে। হঠাৎ পত্র-পত্রিকায় এমএল এম নিয়ে নেতিবাচক লেখালেখি, তদন্ত এসবের কারণে এই বাণিজ্য বন্ধ হয়ে পড়ে। পাওনাদারেরা টাকার জন্য তাগাদা দেয় মিঠুকে। তার বাড়িতে এসে খোঁজে। মিঠু বাড়িছাড়া, ঘরছাড়া। পালিয়ে বেড়ায়। যখন তাকে বাড়িতে দেখা যায়, তখন সে অনেকটাই অপ্রকৃতিস্থ। এদিকে রিমা ও তার ভিডিও ক্লিপটি ফাঁস হওয়ার আতঙ্কে ভয়ে থাকে। এভাবেই এগিয়ে যায় পরবর্তী কাহিনী।

পিঁপড়াবিদ্যা জীবন ও পতনের গল্প। ইঙ্গিত প্রতীকী দৃশ্যে এই সময়ের বাংলাদেশকেই তুলে ধরে। পরিচালক ইঙ্গিত করেছেন অনেক কিছুই, যা সমকালীন নানা বাস্তবতার ওপর ফোকাস করে। এমএলএম কর্মকর্তার দারিদ্র্য জাদুঘর তত্ত্ব, সেক্স ভিডিও ক্লিপ

 

ইত্যাদি। রিমার বাড়িতে খাবার টেবিলে মিঠুর পানি খাওয়ার দৃশ্যটিতে অবদমিত কাম স্পষ্ট
ফুটে ওঠে। চাবি দেওয়া পুতুলটির মাথা নেড়ে অনিচ্ছা ও অনৈতিকতার কথা মনে করিয়ে
দেয়। মিঠুর তিনবার মুখ ধোয়াও সিগনিফিকেন্ট। অসংখ্য পিঁপড়া মিঠুর মুখে কিংবা পিঁপড়া নেই অথচ মেঝেতে পিঁপড়া মারতে চাওয়া লোভের জালে আটকে যাওয়ারই ইঙ্গিত। ম্যানিকুইনের সঙ্গে মিঠুর রাত্রিবাস,
সেলফোন কোম্পানি, করপোরেট পলিটিক্স বাদ যায়নি, মিঠুর বান্ধবীর স্বামী চরিত্রের মধ্য দিয়ে। তার চরিত্রটি বোকা ও ডেমো মনে হলেও, দুর্নীতির নানা চিত্র ফাঁস হয় কল্পিত বর্ণনায়।
লংশট, মিডশট, ক্লোজশট, ব্যাকরণ আর সময়কালের ব্যাপ্তি কখনও ছবির একমাত্র শর্ত হতে পারে না। ভালো ছবির তো অবশ্যই না। ছবি যদি সময়কে ধারণ করে, জীবন যদি উপজীব্য হয়, দর্শক যদি নিজের বা অন্যের জীবনকে মেলাতে পারে ছবির সঙ্গে, তবে তাই ছবি। মনে রাখতে হবে, ছবি জীবনের অনুকরণ। ইমিটেশন অব লাইফ। সরাসরি সম্প্রচার বা লাইভ ব্রডকাস্ট আর যাই হোক, তাকে চলচ্চিত্র বলা যায় না।
বাংলাদেশে গত কয়েক দশক থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণ করে আসছেন মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। একে একে নির্মাণ করেছেন ব্যচেলর, মেইড ইন বাংলাদেশ, থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার, টেলিভিশন ও সর্বশেষ সম্প্রতি মুক্তি পায় ‘পিঁপড়া বিদ্যা’। তার চলচিত্রের গল্প বলার ঢং সব সময়ই একটু আলাদা গৎবাধাঁ নির্মাণ নিয়মের বাইরে। সমাজে গঠিত অনেক কিছুই ঘটে যা কিনা, সেখানে যেমন উঠে আসে পরিবার, মহল্লা, প্রেম, যৌনতা, হটকারিতা, রাজনীতি আরও নানান বিষয়। ‘টেলিভিশন’ ছাড়া তার পূর্বের প্রায় সকল পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে নাগরিক জীবনের নানান অলিগলি ফোকাস হলেও এই চলচ্চিত্রে মধ্যবিত্ত এক তরুণের গল্প, মিডিয়া, মাল্টিলেবেল মার্কেটিং বিষয়গুলোকেই প্রাধান্য দেয়া হয়েছে।

লেখা : দিগন্ত সৌরভ
ছবি : গোলাম মাওলা নবীর ও আব্দুল্লাহ আল মুক্তাদির

আবু হেনা মোস্তফা কামাল
তাঁর গান ও আমি

সুজিত মোস্তফা



আমার বাবা সম্পর্কে কিছু লেখাটা আমার জন্য সব সময়ই একটু কঠিন একটা বিষয়। এ রকম বহুগুণ সম্পন্ন অমিত প্রতিভাধর একটি মানুষ সম্পর্কে লিখতে যে রচনাশৈলী ও প্রজ্ঞার দরকার এর কোনোটিই আমার নেই। কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ছাত্রছাত্রীরা তাঁর কাছে পাঠ নিয়েছেন বা বক্তব্য শুনেছেন বা তাঁর সঙ্গে আড্ডায় মেতেছেন তারা সবাই জানেন কী ধরনের প্রতিভা, ব্যক্তিত্ব, নীতি, জ্ঞান এবং গুণের সমন্বয় ছিল তাঁর। এমন মানুষের মূল্যায়ন করা আমার সাধ্যাতীত। কিন্তু এ রকম ভার্সেটাইল উচ্চমান সম্পন্ন মানুষ খুঁজতে গেলেই বুঝতে পারি, তিনি কী অসাধারণ মানুষ ছিলেন! ছোটবেলায় তাঁর প্রখর ব্যক্তিত্বের সামনে আমরা প্রায় কাচুমাচু অবস্থায় বড় হয়েছি। তবে শাসনের মধ্যেও আমাদের স্বাধীনতা ছিল অপার। যে যার ইচ্ছামতো বিষয় নিয়ে পড়তে পেরেছি। সব কাজের জবাবদিহিতা ছিল না তেমন। সাংসারিক খোঁজখবরের দায়িত্ব মোটামুটি আমার মায়ের ওপর ছেড়ে দিয়েই স্বস্তিতে থাকতেন তিনি। তবে ছোটবেলা থেকেই অর্থকষ্ট ছিল আমাদের সংসারজুড়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরির বেতন আর টুকটাক গান বা কবিতা লিখে এ দেশে তখন ভালো উপার্জন করা ছিল একটা দুরূহ কাজ। আর গান লেখার তার প্রবাহমানতার ধারাটি সবচেয়ে বেশি বহমান ছিল যে সময়, ঠিক সে সময়টি বিভিন্ন রাজনীতির স্বীকার হয়ে তাকে ঢাকা ছাড়তে হয়। সেসব জায়গায় অর্থ জোগানোর জন্য গান লেখার না ছিল চাপ, না ছিল সে রকম প্রেরণা। কিছু গান তিনি ঢাকার বাইরে থাকা অবস্থায় লিখেছিলেন শিক্ষক জীবনে। সেগুলোর মধ্যে অনেক জনপ্রিয় গান আছে। কিন্তু ছাত্র অবস্থায় লেখা তাঁর অনেক গান কালজয়ী হয়েছে। এর মধ্যে ‘আমি সাগরের নীল’, ‘ভ্রমরের পাখনা যতদূরে যাক না’, ‘আমার প্রথম দেখার সে ক্ষণটিরে ভুলবো কেমন করে’, ‘তোমার কাজল কেশ ছড়ালো বলে’, ‘পথে যেতে দেখি আমি যারে’, ‘সেই চম্পা নদীর তীরে’, ‘কথা দিলাম আজকে রাতে’- এ রকম অনেক গান রয়েছে। গান লেখা ছিল অনেকটা তার হাতে ছেলের হাতের মোয়ার মতো। কিন্তু স্বভাবে  বোহেমিয়ান ছিলেন বলে কোনো গান বা লেখার কোনো কপি সংরক্ষণ করতেন না। কবি নজরুলের মতোই বলতেন, সমুদ্র থেকে এক ঘঁটি জল গেলে কিছু আসবে যাবে না।
‘আমি যে তোমার কাছে চৈত্র শেষের ঝরাপাতা/আমার এই দীর্ঘশ্বাসে হয় না কারো মালা গাঁথা॥’


একবার চট্টগ্রাম বেতারে সুর করে গাওয়ানোর জন্য গোটা দশেক গান আমার গুরু মিহির লালার হাতে দিয়েছিলেন তিনি। যথানিয়মে কোনো কপি রাখেননি। এর মধ্যে আমার রেডিওতে কর্মরত চাচা আবুল হায়াৎ মোহাম্মদ কামাল মিহির কাকুর কাছ থেকে গানগুলো নিয়ে একটি গান সৈয়দ আনোয়ার মুফতিকে দিয়ে সুর করে গাইয়েছিলেন। গানটি ছিল-
‘আমি বাতাসে শুনেছি তোমার নিমন্ত্রণ/বহুদিন পর পেয়েছি তোমার চিঠি/যাবো কি যাবো না ভাবি আজ সারাক্ষণ॥’
উমা খানের গাওয়া গানটি বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল তখন। অন্য গানগুলো যে কী হলো সে খোঁজ আর পাইনি কোনদিন। আব্বার ভীষণ জনপ্রিয় গান খুব অবলীলায় অন্য গীতিকারের নামে তার জীবদ্দশাতেই চলতে শুনেছি। এমনকি কয়েকদিন আগেও আমার এক ছাত্রী ইউটিউব থেকে নামিয়ে কণ্ঠে তুলেছে একটি গান- ‘শত জনমের স্বপ্ন তুমি আমার জীবনে এলে’। এটি ‘রাজলক্ষ্মী-শ্রীকান্ত’ ছবির একটি বিখ্যাত গান। বাবার লেখা ও আলাউদ্দিন আলির সুর। অথচ ইউটিউবে উল্লেখ আছে অন্য গীতিকারের নাম। যাই হোক। এসব অবিচার তার প্রতি সারা জীবন হয়েছে, মৃত্যুর পরও হবে, অস্বাভাবিক কী?
আব্বা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকা অবস্থায় রুনা লায়লার জন্য লিখে দিয়েছিলেন, ‘অনেক বৃষ্টি ঝরে তুমি এলে’, ‘হাতের কাঁকন ফেলেছি খুলে’ ইত্যাদি গান। এগুলোর জনপ্রিয়তার ব্যাপারে সবাই জানেন। জনপ্রিয় অনেক গানই হয়। কিন্তু আবু হেনা মোস্তফা কামালের গানগুলো পড়ে দেখলে বোঝা যায়, উপমা অনুপ্রাসের কী দুর্দান্ত ব্যবহার! তার গানের কবিতায় কোনো কম্প্রোমাইজ নেই। এমনকি চলচ্চিত্রের গানও তিনি লিখেছেন দৃশ্য চাহিদা অনুযায়ী কবিতায় কোনো ছাড় না দিয়ে। তার লেখা, ‘তুমি যে আমার কবিতা’ বাংলাদেশে চলচ্চিত্রের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য গান হিসেবে স্বীকৃত। তিনি ঢাকার বাইরে থাকার কারণে চলচ্চিত্রে খুব বেশি গান লেখেননি। কিন্তু যা লিখেছেন তা অসাধারণ মান বজায় রেখে লিখেছেন।


প্রায় দুই হাজার গান লিখেছিলেন আমার বাবা। আমি মাত্র আড়াইশ’র মতো উদ্ধার করতে পেরেছি। এর মধ্যে বেশির ভাগ গানেরই সুর পাইনি। সুর নিজে কিছু করে নিচ্ছি। হয়তো কিছু অন্য কাউকে দিয়ে করাবো। তবে অসাধারণ যেসব পঙ্্ক্তিমালা হারিয়ে গেছে সেগুলোর শোক আমাকে আমরণই বয়ে যেতে হবে।
আব্বার গলা ছিল মধুমাখা। ‘আমি এত যে তোমায় ভালোবেসেছি’ গানটি তিনি এমন এক মাদকতা নিয়ে গাইতেন যার তুলনা নেই। আমরা জানি, এটা শ্যামল গুপ্তের লেখা মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের নিজের সুরে গাওয়া একটি গান এবং আধুনিক বাংলা গানের ইতিহাসে এটি একটি মাইলফলক। অথচ ওই গানটি গেয়ে মানবেন্দ্র আমাকে যতটা আকর্ষিত করেছিলেন এর চেয়ে বেশি করেছিলেন আমার বাবা। কোনো পক্ষপাত নিয়ে বলছি না। তালাত মাহমুদের কণ্ঠের একটু অনুকরণ তুলে তিনি মাতিয়ে দিতে পারতেন শ্রোতাকে। গানটি নিয়ে তাঁর ভাবনার কেন্দ্রটি ছিল হয়তো অনেক আলাদা। এ কারণে সেটি আমার কাছে অন্য মাত্রায় প্রতিভাত হয়েছিল। একবার বাবাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তুমি এত ভালো গাওয়ার পরও গানের লাইনে কেন গেলে না? তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, একাডেমিক লাইনে আমার ক্ষমতা ও সম্ভাবনা বেশি ছিল, তাই। বাংলাদেশে ভালো কবিরা সহজে গান লিখতে চান না। গান লেখা বোধহয় আরও একটু কঠিন। এর সীমাবদ্ধ ফরম্যাটের মধ্যে অল্প কথায় গীতলতার সঙ্গে যে গল্প তুলে আনতে হয় তা সম্ভবত সবাই পারেন না। আমার মনে হয়, আব্বা গাইতে পারতেন বলে গানের কবিতার ব্যাপারে তাঁর অনুভব অনেক গভীর ছিল।
তাঁর গান নিয়ে যে সুরস্রষ্টারা কাজ করেছেন তাদের মধ্যে আবদুল আহাদের সঙ্গে তার কম্বিনেশনটি খুব ভালো কাজ করতো বলে মনে হয়। কোনো মানুষের আসলে বেশি ভার্সেটাইল হওয়া ভালো নয়। সব কাজই যিনি পারেন, কোনো বিশেষ একটি কাজে সম্পূর্ণ নিবিড়ভাবে তো তিনি সময় দিতে পারেন না। ফলে তার কাজের সময় ভাগ হয়ে যায়। বাবা যদি শুধু গীতিকার বা কবি কিংবা গবেষক অথবা উপস্থাপক বা শুধু অন্য কিছু হতেন তাহলে হয়তো ওই একমাত্র চর্চিত মাধ্যমটিকে অসম্ভব কোনো উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারতেন। ‘আমি সাগরের নীল নয়নে মেখেছি’ গানটিতে তিনি যখন লেখেন- ‘অঙ্গ ভরেছি তোমার প্রেমের অপরূপ তন্দ্রাতে’ তখন আমি এই শব্দ কল্পনা ও প্রকাশভঙ্গির অসামান্য সৌন্দর্যে প্রশংসা করার ভাষা হারিয়ে ফেলি। এ রকম অসংখ্য লাইন তাঁর বিভিন্ন গানের মধ্যে অবলীলায় বার বার ব্যবহৃত হয়েছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাকে বা তাঁর সৃষ্টি নিয়ে আমরা আলোচনাবিমুখ হয়ে আছি। সম্ভবত তিনি যথাযথভাবে আলোচিত হলে অনেক মুখোশধারীর প্রকৃত দীনতা প্রকাশ পেয়ে যাবে।

আমার গানের জগতে আসাটা যেন জন্ম থেকেই নির্ধারিত ছিল। ৬ বছর বয়সে আমার হাতে আসে গীতবিতান। এটি যে গানের বই তা জানতাম না। অথচ সেগুলো ওই বয়সেই সুর কল্পনা করে গুন গুন করে গাইতাম। এরপর ১০ বছর বয়সে সঙ্গীতে হাতেখড়ি হলো রাজশাহীর অনুপ কুমার দাশের হাতে। চট্টগ্রামে মিহির লালা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এসে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের তালিম দেয়া শুরু করলেন। কিন্তু উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের মন্দ্রতা, গভীরতা ও সৌকর্য আমাকে টান দিল অন্য কারণে। কলেজে প্রথম বর্ষে পড়া অবস্থায় মোটরসাইকেল চালাতে গিয়ে অ্যাক্সিডেন্ট করি। এরপর পিঠে ব্যথা শুরু হয়। আমাকে দেড় মাস একটি কাঠের তক্তার ওপর চিৎ হয়ে শুয়ে থাকতে হয়েছিল। বাসায় বই ছাড়া সময় কাটানোর জন্য কিছুই ছিল না। এমনকি একটা রেডিও পর্যন্ত ছিল না। যার মোটরবাইকে অ্যাক্সিডেন্ট করেছিলাম সেই অর্থনীতিবিদ স্বপন আদনান কাকা তাঁর অপরাধ বোধ থেকে কি না জানি না, আমাকে তার স্পুল টেপ রেকর্ডারটি ধার হিসেবে দিলেন। বাজানোর মতো পুরনো দুটো স্পুল বাসায় ছিল। আমাদের একটি স্পুল রেকর্ডার ছিল যেটি ১৯৭১ সালে লুট হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু দুটো স্পুল বেঁচে গিয়েছিল। এগুলোয় রেডিও থেকে ধারণ করা কিছু গান ছিল। আমার কলেজের প্রিন্সিপ্যাল হারুন স্যার ছিলেন উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতভক্ত। তাঁর কালেকশনে ছিল অল ইন্ডিয়া রেডিওর শনিবার রাতের ন্যাশনাল ক্ল্যাসিকাল প্রোগ্রামের বড় একটা সংগ্রহ। আমাকে সময় কাটানোর জন্য সেগুলো শুনতে দিলেন তিনি। যেহেতু কিছু করার নেই সেহেতু শোনা শুরু হলো উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত। কানের কাছে ক্রমাগত ঘ্যানর ঘ্যানর ঘ্যান। অসহ্য লাগতো। শিল্পী ছিলেন সব মহীরুহ। যেমন- উস্তাদ আলাউদ্দীন খান, বিলায়েৎ খান, রবিশঙ্কর, নিখিল ব্যানার্জি, এটি কানন, ওঙ্কারনাথ ঠাকুর, ডিভি পালুসকার, করিম খান, ফৈয়াজ খান, আমির খান, গোলাম মুস্তাফা খান, হরিপ্রসাদ চৌরাশিয়া, পান্নালাল ঘোষ, ভীম সেন যোশীসহ অনেকে। ওই নামগুলোর সঙ্গে আমার পরিচয়ই ঘটলো এ স্পুলগুলোর কল্যাণে। আমি অবাক বিস্ময়ে দেখলাম এই ঘ্যানর ঘ্যানর ঘ্যান এক সময় তার অপরূপ রূপ মাধুর্য নিয়ে আমাকে এক অনিন্দ্যসুন্দর জগতে নিয়ে যাচ্ছে। এই শুরু হলো আমার রুচির পরিবর্তন। আমি প্রায় কৈশোরেই বুঝে গিয়েছিলাম কোনো শ্রোতার রুচি তৈরি করতে হলে তাকে প্রয়োজনে বাধ্য করতে হবে ক্রমাগত মানসম্পন্ন সঙ্গীত শুনতে। এখন যেমন টিভি চ্যানেলগুলো ক্রমাগত অধিকাংশ ক্ষেত্রে রুচি ধ্বংসের কাজটি প্রবল মুনশিয়ানার সঙ্গে করে যাচ্ছে।


যাই হোক। ওই সময়েই স্পুল টেপ রেকর্ডারটিতে মান্না দে’র বেশকিছু গান রেকর্ড করে নিয়েছিলাম এক বন্ধুর সংগ্রহ থেকে। ওই গানগুলো শুনতে শুনতে এমনিই গলায় এসে গিয়েছিল। সেগুলো আবার নিজেই শিখে ওই রেকর্ডারে ধারণ করে রাখতাম। আমার রাগী বাবাকে সেগুলো শোনানোর সাহস ছিল না। এ রকম সময়ে আব্বার খুব প্রিয় ছাত্র সারোয়ার জাহান চাচা এসেছিলেন আমাদের বাসায় রাজশাহী থেকে। তিনি গানগুলো শুনে আমাকে যেন আবিষ্কার করেছিলেন। আমাকে না জানিয়ে বাবাকে শুনিয়েছিলেন সেসব গান। ব্যস, আমার গানের সবচেয়ে বড় ভক্ত হয়ে গেলেন বাবা। ঢাকায় এসে ছায়ানটে ভর্তি হলাম এবং বেশকিছু গানের বন্ধু জুটে গেল যারা কম-বেশি সবাই ভালো গান করতো। আমাদের সার্বক্ষণিক আলোচনা ছিল সঙ্গীত নিয়ে। তবে আঁতলামোরও অন্ত ছিল না। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত ছাড়াও আমরা নজরুল, রবীন্দ্র ও আধুনিক বাংলা গান নিয়ে উঠেপড়ে লাগলাম। প্রতিটি গানের চুলচেরা বিশ্লেষণ, ভালো লাগা, মন্দ লাগার অকপট উচ্চারণ, হাকিম চত্বরে বসেই রাগ-রাগিণী বিশ্লেষণ, তান বিস্তারের খেলা- কত কী! বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে ‘ডাকসু’র সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় নাম দিয়ে একের পর এক প্রাইজ আনা শুরু করলাম ঘরে। পড়াশোনা শেষ করেছিলাম হেলাফেলায়। কারণ মনের মধ্যে স্বপ্ন ছিল একটাই, গান শিখবো। ১৯৮৬ সালের ৫ ডিসেম্বর ভারত সরকারের বৃত্তি নিয়ে সঙ্গীত অধ্যয়ন করতে শান্তিনিকেতন যাত্রা করলাম। পরদিন ঢাকায় এলেন আমার স্বপ্নের সঙ্গীতশিল্পী মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়। আব্বার সঙ্গে তাঁর দেখা, গান, গল্প-গুজব আড্ডা হওয়ার খবর পেলাম। কিন্তু আমি তাঁর দেখা পেলাম না। শান্তিনিকেতন থেকে ১৯৮৭ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি কলকাতা গেলাম দুটি উদ্দেশ্য নিয়ে। এক. মানবেন্দ্রর সঙ্গে দেখা করবো এবং দুই. আমার প্রথম স্কেল চেঞ্জার হারমোনিয়াম কিনবো। সারা দিন হারমোনিয়ামের বাজারে কাটিয়ে বিকেলে গেলাম যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে শিল্পীর বাড়িতে। শিল্পী দেখাই দিলেন না। ভেতর থেকে জানিয়ে দিলেন, সময় নেই। আমার আকুতি বুঝেই বোধহয় বললেন পরের দিন সকালে যেতে। তখন মাত্র ৬০০ টাকা স্কলারশিপ পাই। এটাতেই আমার থাকা, খাওয়া ও অন্যান্য খরচ চালাতে হয়। এক রাত কলকাতায় থাকা তখন আমার হিসেবে এক কাঁড়ি টাকার শ্রাদ্ধ। সেখানে যাতায়াতও তখন ছিল কষ্টকর, ব্যয়সাধ্য। কলকাতাজুড়ে কাটা রাস্তা, খানাখন্দর, আন্ডারগ্রাউন্ড রেলওয়ে নির্মাণের কাজ চলছিল। যাই হোক। ওই রাত কোনো রকমে যাপন করে আমি ও আমার সহপাঠী জহর দত্ত সকাল ১০টায় গেলাম মানবেন্দ্র-এর বাড়িতে। ফিনফিনে শাদা ধুতি ও ঘিয়ে রঙের ফতুয়া গায়ে নজরুল সঙ্গীতের রাজকুমার ড্রয়িংরুমে এসে বসলেন। ‘কী চাও তোমরা?’
বাবার পরিচয় দিয়ে বললাম, আমি আপনার গানের ভীষণ ভক্ত, আপনাকে একটু সামনাসামনি দেখতে চেয়েছিলাম।
‘দেখা তো হলো, এখন যাও।’


স্তম্ভিত হয়ে তাঁর উত্তর শুনলাম। অনেক ভয়ে বললাম, ‘আপনার কণ্ঠে সামনাসামনি একটা গান শোনার ভীষণ ইচ্ছা ছিল।’
ভ্রƒ কুঞ্চিত করে মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় বললেন, ‘যে কেউ মানবেন্দ্রর বাসায় আসবে এবং বলবে, আপনার একটা গান শুনতে চাই আর তিনিও       হারমোনিয়ম টেনে সহাস্যে একটা গান শুনিয়ে দেবেন, তাই না? বিষয়টি এতই সহজ?’
আমার মুখে কোনো ভাষা ছিল না। প্রত্যাখ্যানের বেদনা নয়, মানবেন্দ্রর আচরণ আমার স্বপ্নের জগৎ ভেঙে খান খান করে দিচ্ছিল। এরপরও অনেক কষ্ট ও সাহসে বললাম, আপনার গান শুনেই নজরুলের গান গাই। একটা গান যদি অন্তত আপনাকে শোনাতে পারতাম!
তিনি ভ্রƒ দুটি আরো কুঞ্চিত করে আমার দিকে বেশ খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। বিদেশি অতিথি বলেই কি না জানি না, বললেন- ‘বেশ শোনাও।’ স্ত্রীকে উচ্চকণ্ঠে ডাক দিয়ে বললেন হারমোয়িমটি দিয়ে যেতে।
আমি হারমোনিয়মে হাত দিতেই বললেন, ‘এটি আমার খুব শখের যন্ত্র, সাবধানে বাজাবে।’
আমি তখন অপমানে অপমানে প্রায় স্থবির। খুব হালকা আঙুল চালিয়ে চোখ বন্ধ করে নজরুলের ঠুমরি অঙ্গের আমার অসম্ভব প্রিয় একটি গান গাইলাম। গান শেষ হলে চোখ খুললাম। দেখি, শিল্পী আমার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছেন- ‘তুমি কেমন গাও, তুমি জানো?’ আমাকে নিশ্চুপ দেখে বললেন, ‘ইউ আর গুড, টু গুড, ইউ আর টেরিফিক। তুমি আরেকটি গান শোনাও তো?’ পরের গান শুনে বললেন, ‘এইচএমভি থেকে তোমার একটি লং প্লে আমি বের করে দেবো?’
আমার জীবনের অনেক ব্লান্ডারের একটা বোধহয় ছিল সেটি। বললাম, আমি আসলে শিখতে এসেছি। দিল্লি যাওয়ার চেষ্টা করছি প-িত অমরনাথের কাছে পিওর ক্ল্যাসিকাল শেখার জন্য। বাকি গল্প স্বপ্নের মতো। নিজে হারমোনিয়ম টেনে নিয়ে আমাদের ৭ খানা গান শোনালেন তিনি। স্ত্রীকে ডেকে আমাদের সঙ্গে আলাপ করালেন। তাদের মেয়ে মানসীর বয়স তখন ১৪-১৫ বছর হবে। তাকে ডেকে আলাপ করালেন। ভেতর বাড়ি থেকে চা-মিষ্টি এলো। এরপর বললেন দুপুরে খেয়ে যেতে। আমি আর বেশি কিছু চাইনি। ওই সঞ্চয়টুকুই আমাকে বহুদূর নিয়ে যাবে মনে হয়েছিল। আমি সেই বহুদূরের পথের যাত্রী এখনো। জীবনে গান নিয়ে আরো কত ঘটনা, কত গল্প! মনে হয়, শুধু গান শোনা, শেখা বা রেওয়াজের তালিম নয়- এই দুর্বিনীত আকাক্সক্ষায় সঙ্গীতের সূত্র খোঁজার পুরো পরিক্রমণটিই একটা তালিম। এই দুর্গম পথের কণ্টকে কীর্ণ হওয়া আসলে সুন্দরের পথে এক অনবদ্য যাত্রা। আমি এই পথের অক্লান্ত পথিক। তবে পথের অনুপ্রেরণা ছিলেন আমার বাবা, আমার মা। আমি এখনো অনুভব করি আমার সুর, সংগ্রাম, আবিষ্কার, কষ্ট, আনন্দে ছায়ার মতো তাদের হাতগুলো আমার মাথার ওপর অটল প্রহরীর হয়ে অবস্থান করছে।

দর্শকের বিবেক

টুম্পা রায়

 


ছোট নদী। এর রয়েছে খরস্রোতা ঢেউ। জানো কি কেউ? নদীটি সুদূরে কতটুকু গেছে বয়ে? ছোট নদীও অনেক দূর বয়ে যায়। এরও থাকে খরস্রোতা ঢেউ! তাহলে আকার-আকৃতিতে ছোট মানুষও তো উদ্বেল। প্রাণোচ্ছ্বাসে আমাদের নিরানন্দ বুকে তাদের গুণ ও কাজে তরঙ্গ তুলতে পারে। ছোটখাটো দুই পায়ে বিশাল আকারের জুতা, পরনে টাইট কোট, বিরাট ঢোলা প্যান্ট, হাতে বেতের ছড়ি, বিশেষ ভঙ্গিতে নাকের নিচে একটুখানি ছাঁটা গোঁফে গুজে রাখা চুরুট, মাথায় ডার্বি হ্যাট, ছোট আর আঁকা কালো দুই চোখ- আমাদের পরিচিত এই চেহারা চলচ্চিত্র জগতের এক আইকন। বিংশ শতাব্দীর কিংবদন্তি স্যার চার্লস স্পেন্সার চ্যাপলিন আমাদের প্রিয় চার্লি চ্যাপলিন। বিশ্বের চলচ্চিত্র জগতের বিখ্যাত শিল্পী। অসাধারণ অভিনয়শৈলী ও মেধা দিয়ে তিনি জয় করেছেন সারা পৃথিবীর মানুষের হৃদয়। তার উদ্ভট কা--কারখানায় হেসে কুটি কুটি হয় বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ। পাঁচবার মনোনীত হয়ে তিনবার একাডেমি অ্যাওয়ার্ড বা অস্কার পেয়েছেন তিনি। জীবনে কৃতিত্বের জন্য রানী এলিজাবেথ কর্তৃক তিনি নাইট উপাধি লাভ করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যোগ দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু উচ্চতা ও ওজন কম হওয়ায় ওই সুযোগ মেলেনি চার্লি চ্যাপলিনের। এ জিনিয়াসকে নিয়ে লিখেছেন  টুম্পা রায়।
 
চ্যাপলিন ১৮৮৯ সালের ১৬ এপ্রিল লন্ডনের স্ট্রিট ওয়ালওয়ার্থ-এ জন্মগ্রহণ করেন। তার জন্ম নিয়ে সর্বদাই কুয়াশা রয়েছে। তার বাবা ভার্সেটাইল সঙ্গীতশিল্পী ও অভিনেতা চার্লস স্পেন্সার চ্যাপলিন সিনিয়র এবং মা অভিনেত্রী ও সঙ্গীতশিল্পী (লিলি হারলে) হান্না চ্যাপলিন। তারা ছিলেন তিন ভাই- সিডনি জন চ্যাপলিন (জারজ), চার্লি চ্যাপলিন ও জর্জ হুইলার ড্রয়ডেন। ১৮৯১ সালে হান্না চ্যাপলিন প্রেমে পড়েন লিউড্রাইড্রেনের এবং জর্জ হুইলার ড্রয়ডেন গর্ভে থাকা অবস্থায় চার্লস স্পেন্সার মধ্যে বিয়ে বিচ্ছেদ ঘটে। লন্ডনের ক্যানিংটন জেলায় লিউড্রাইড্রেনের বাড়িতে সিডনি ও তিন বছর বয়সী চ্যাপলিনকে নিয়ে মা হান্না বসবাস শুরু করেন। ওই সময় বাবার কাছ থেকে আর্থিক সাহায্য না পাওয়ায় চ্যাপলিনের শৈশব কাটে খুবই দারিদ্র্য ও কষ্টের মধ্যে। দুস্থ শিশুদের (সেন্ট্রাল লন্ডন ডিস্ট্রিক স্কুলের অধীন) নরউড স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। সেখানে ১৮ মাস থাকার পর তার মায়ের কাছে তিনি ফিরে আসেন। তার মা আবার পাঠানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তিনি আর যেতে রাজি হন না। কষ্টের মধ্যে থাকায় তিনি উপলদ্ধি করতেন দেয়া ও পাওয়ায় কী আনন্দ! শৈশব সম্পর্কে তিনি বলতেন, ‘আমার শৈশব ছিল অত্যন্ত কষ্টের। কিন্ত এখন তা আমার কাছে নস্টালজিয়া, অনেকটা স্বপ্নের মতো।’ মানুষের জীবন সম্পর্কে বলতেন, ‘মানুষের জীবন ক্লোজ শটে দেখলে ট্র্যাজেডি। কিন্তু লং শটে সেটিই কমেডি।’
১৮৯৪ সালের কথা। মা গান গাইছেন। গান গাইতে গাইতে ক্রমেই তার গলা বসে যেতে থাকে। এক সময় অবস্থা এমন হয় যে, তার গলা থেকে আর কোনো শব্দই বের হলো না। দর্শক চিৎকার-চেঁচামেচি ও হৈ-হুল্লোড় শুরু করে দিল। বালক চ্যাপলিন স্টেজে পর্দার আড়াল থেকে সব দেখছিল। স্টেজ থেকে মা লিলি নেমে গেলে সে সোজা স্টেজে উঠে গান ধরল। তার চমৎকার গলা শুনে দর্শক অবাক হয়ে যায়! উপস্থিত সবাই, এমনকি তার মাও ছেলের প্রতিভা দেখে অবাক হয়।
১৮৯৮ সালে মা হান্না চ্যাপলিন মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে হাসপাতালে ভর্তি হন। কাজেই অত্যাধিক দারিদ্র্যের জন্যই ন’বছর বয়স থেকেই আয়-রোজগারে নামতে হয় চ্যাপলিনকে। তাকে কাজ করতে হয়েছে মুদি ও ওষুধের দোকানে, ছাপাখানায়, এমনকি অন্যের বাড়িতেও। আমেরিকায় অনেক বিখ্যাত ব্যক্তির মতো তাকেও কাগজ ফেরি করে বেড়াতে হয়েছে।
চ্যাপলিন সেই সময়ের জনপ্রিয় লোকদল ‘জ্যাকসন্স এইট ল্যাংকাসায়ার ল্যাডস’-এর সদস্য হিসেবে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। ১৯০১ সালে মাত্র ১২ বছর বয়সে তিনি উইলিয়াম জিলেট অভিনিত ‘শার্লক হোমস’ নাটকে কাগজ বিলিওয়ালার চরিত্রে অভিনয় করেন। এই সুবাদে ১৯১০ সালে ‘ফ্রেড কার্নো’ থিয়েটার কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে ইংল্যান্ড থেকে চলে যান যুক্তরাষ্ট্রে এবং অভিনয়ের ক্ষমতা দিয়ে বুঝিয়ে দেন আগামীর সম্ভাবনা।
অভিনয়ের সূত্রেই দলের সঙ্গে ১৯১০ সালে নিউইয়র্কে আসেন চ্যাপলিন। ১৯১৩ সালে হলিউড। ১৯১৪ সালের ফ্রেডরিক জনওয়েস্টকট পরিচালিত ‘মেকিং অ্যা লিভিং’ ছবির মাধ্যমে ২৫ বছর বয়সে প্রথম পর্দায় অভিনয় জীবন শুরু করেন তিনি। মুখ্য চরিত্রটি তারই সৃষ্টি। নির্বাক ছায়াছবি ‘ভবঘুরে: দ্য ট্রাম্প’-এ তিনি যেন স্বপ্নের জায়গাটি খুঁজে পেলেন। বিশ্ব চলচ্চিত্রে আলোড়ন সৃষ্টি করলেন। দরিদ্র অথচ সজ্জন, অমায়িক এক ভবঘুরের জীবনে শিল্প, সংস্কৃতি, রাজনীতি থেকে শুরু করে শ্রমিক, সমাজ, প্রেম-প্রীতি, ভালোবাসা ও সামাজিক দুর্দশার কাহিনী নিয়ে এই ছবি। ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, পুর্তগালে ‘শার্লট’ নামে পরিচিত চ্যাপলিনের ট্রাম্প ভবঘুরে হলেও ব্রিটিশ ভদ্রজনোচিত আদব-কায়দায় সুসংস্কৃত এবং সম্মানবোধে অটুট। শার্লটের পরনে চাপা কোট, সাইজে বড় প্যান্ট, বড় জুতা, মাথায় বাউলার হ্যাট, হাতে ছড়ি, টুথব্রাশ ও গোঁফ। তার বর্ণময় ব্যক্তিজীবন তথা সমাজ জীবনে খ্যাতি ও বিতর্ক- দুয়েরই নি¤œ থেকে শীর্ষবিন্দু ছুঁয়ে গেছে।
নাকের নিচের ছোট্ট গোঁফটি আজও ‘চ্যাপলিন গোঁফ’ হিসেবেই পরিচিত। ৭৫ বছরের ক্যারিয়ারে তিনি কৌতুক অভিনয় দিয়ে জয় করেছেন দর্শকের হৃদয়। দেখতে দেখতে অশ্রুও ঝরেছে তাদের। নির্বাক যুগ থেকে শুরু করে সবাক ছবির জগতেও তার মতো অন্য কোনো শিল্পী ছায়াছবির জগতে এতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারেননি। তার ক্যারিয়ারের প্রথম দিকে আয় ছিল সপ্তাহে ১৫০ ডলার। ২ বছরের মধ্যেই ওই আয় বেড়ে দাঁড়ায় সপ্তাহে ১২ হাজার ৮৪৪ ডলার।
নির্বাক চলচ্চিত্র যুগের অন্যতম মৌলিক এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব চ্যাপলিন ছিলেন একাধারে অভিনেতা, পরিচালক, চিত্রনাট্যকার ও সঙ্গীতকার। প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষা তার ছিল না। সবকিছুতেই ছিলেন স্বশিক্ষায় শিক্ষিত। এমনকি চেলো, বেহালা ও পিয়ানো বাজানোতেও ছিলেন সিদ্ধহস্ত। এসবও শিখেছিলেন কোনো গুরুর সহায়তা ছাড়াই। প্রতিটি ছবির সংগীত রচনা করেছেন নিজে।


চ্যাপলিনের শুধু শিল্পী নন, দার্শনিকও! ‘নোংরা ফেলার পাত্রে এক চিলতে রোদ বা নর্দমায় ভেসে যাওয়া একটি গোলাপ ফুল’- সৌন্দর্য নিয়ে এই দর্শনের প্রকাশ ঘটেছে তার সব ছবিতেই। ছোট-বড় সব মিলিয়ে প্রায় ৮০টি ছবি তৈরি করেছেন তিনি। তার ওই ছবিগুলোকে ‘ট্র্যাজিক’ বা ‘কমিক’- এমন কোনো তকমা দিয়ে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই। হলিউডে যখন চৌকস সুপুরুষ বীররা পর্দার নায়ক, চ্যাপলিন তখন হতদরিদ্র এক ব্যর্থ ভবঘুরেকে করলেন তার মূল চরিত্র। খেয়াল করলে দেখা যাবে, ভবঘুরের বরাবর এক সঙ্গী রয়েছে যে তার চেয়ে লম্বা, বলশালী ও নির্মম। তার ওই সঙ্গীর নাম আসলে ‘বাস্তব’। এই পুঁজিবাজারে বিকোয় না। পদে পদে অপদস্ত হয় সে।
বিপরীতের দ্বন্দ্বে সৃষ্টি হয় যে সৌন্দর্য এর মুখোমুখি করেই আমাদের সামনে তিনি খুলে দেন বাস্তবতার খোলস। ক্লেদাক্ত বাস্তবতার নর্দমায় এক নিষ্কলুষ ফুল হয়ে ভেসে বেড়ায় এই ভবঘুরে। তার ‘সেলফ মকারি’র মাধ্যমে স্পষ্ট করে সে বাস্তবতার স্তরে স্তরে জমে থাকা ভ-ামি এবং আমাদের স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের দ্বন্দ্বটি। তাই মানবতার অপমান হিসেবে ভবঘুরের অপমান দেখা দেয় আমাদের কাছে। অর্থ, লোভ, প্রতিযোগিতার রমরমা যে বাস্তব এর অ্যান্টিথিসিস হিসেবে হাজির হয় বেমানান এই ভবঘুরে। যার পুঁজি কেবল আদিম সারল্য, অকৃত্রিম সততা ও অগাধ প্রেম।


চ্যাপলিনের ছবিতে স্বতঃস্ফূর্ত প্রবল হাসি ও অশ্রুর মতো মানুষের মৌলিক দুটি প্রবৃত্তিকে সমান্তরালে উসকে দিয়ে আনন্দ-বেদনার নাগরদোলায় চড়িয়ে তার চলচ্চিত্রগুলো জীবন, রাজনীতি, মানব সম্পর্কের আশ্চর্য জঙ্গমতায় ঠেলে দিয়েছে। ওই ভবঘুরের পোশাকের ভেতর আসলে ঢুকে আছেন এক অনন্যসাধারণ শিল্পী। তার চলচ্চিত্রের সেই অসাধারণ অভিনেতাটি শুধু নন, তিনি ওই চলচ্চিত্রের
চিত্রনাট্যকার, পরিচালক, শিল্পনির্দেশক, সঙ্গীত পরিচালকও। তার চলচ্চিত্রে থাকে বৈচিত্র্য, বিস্তার, গভীরতা, বয়স, মেধা নির্বিশেষে এর সর্বজন মর্মস্পর্শ দক্ষতা।
নির্বাক চলচ্চিত্রের ওই কিংবদন্তি সবাক চলচ্চিত্র সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘শব্দ খুবই দুর্বল। এটিকে হাতির চেয়ে বড় কিছুই বলা যায় না।’
১৯১৮ সালের ২৩ অক্টোবর অভিনেত্রী মিড্রেল হ্যারিসকে বিয়ে করেন চ্যাপলিন। এক সন্তানের জননী। কিন্তু সন্তান জন্মের তৃতীয় দিনের মাথায় সন্তান মারা যায়। তখন চ্যাপলিনের বয়স ২৯ বছর। ১৯২০ সালের তাদের বিয়ে বিচ্ছেদ হয়। তাই হয়তো তিনি বলতেন, বৃষ্টিতে হাঁটা খুবই ভালো। কারণ এই সময় কেউ তোমার চোখের অশ্রু দেখতে পায় না।’
১৯২১ সালে চ্যাপলিন প্রথম প্রযোজনা করলেন ‘দ্য কিড’ ছবি। এতে তিনি হাজির হন তার চিরাচরিত ট্র্যাম্প বা ভবঘুরে স্টাইলে। দ্য ট্র্যাম্প এখানে অনাথ এক শিশুর পালক পিতা! প্রথম অংশে দেখা যাবে বাপ-বেটার খুনসুটি, জোচ্চুরি, বিভিন্ন কিসিমের অদ্ভুত কা-। দ্বিতীয় পর্বে দর্শক আবেগে সিক্ত হবে বাপ-ছেলের বিচ্ছেদের সময় পিতার প্রতি সন্তানের আকুলতা দেখে।
ওই সময়ের জনপ্রিয় অভিনেত্রী লিটা গ্রে-কে ৩৫ বছরের চ্যাপলিন ১৯২৪ সালের ২৬ নভেম্বর বিয়ে করেন। তাদের দুই সন্তানের জন্ম হওয়ার পর ১৯২৭ সালের ২৫ আগস্ট আবার বিয়ে বিচ্ছেদ হয়। তখন চ্যাপলিনের জীবনে নেমে আসে আবার কালো অন্ধকার। ‘না হেসে একটা দিন পার করা মানে একটা দিন নষ্ট করা’- এই বলে নিজেকে সান্ত¡না দিয়ে আবার হাতে নিলেন ‘দ্য সার্কাস’।
ভালোবাসার মানুষকে শুধু নিজের করে পাওয়াই কি জীবনের সার্থকতা লাভ? না। প্রিয় মানুষকে আজীবন নিঃস্বার্থভাবে উজাড় করে ভালোবাসতে পারাই হলো সত্যিকারের ভালোবাসা। চ্যাপলিন ভালোবাসার জয়গানটিকে মূলমন্ত্র করে নির্মাণ করলেন ১৯২৮ সালে দ্য সার্কাস। এক সার্কাসকন্যার প্রেমে মজে আমাদের ভবঘুরে। কিন্তু প্রিয় মানুষকে নিজের করে পেয়েও বাস্তবতার কাছে হার মানে আমাদের ভবঘুরে। তার আর কিছু না থাকুক, আছে বুক ভরা ভালোবাসা।
অস্কার হিসেবে পরিচিত একাডেমি অ্যাওয়ার্ড চলচ্চিত্র পুরস্কারের শুরু হয় ১৯২৯ সালে। অস্কারের প্রথম আসরেই সার্কাস (১৯২৮) ছবিতে অভিনয়, পরিচালনা ও প্রযোজনা ক্ষেত্রে বহুমুখী এবং অসাধারণ প্রতিভার জন্য বিশেষ পুরস্কার পান চ্যাপলিন।


পঞ্চাশের দশকে যুক্তরাষ্ট্রে কমিউনিস্ট-বিরোধী যে গণউন্মাদনা দেখা দিয়েছিল এর শিকার হলেন চ্যাপলিন। ১৯৫২ সালে ‘লাইমলাইট’ ছবির উদ্বোধনী প্রদর্শনীতে পরিবারসহ লন্ডনে গিয়েছিলেন তিনি। প্রদর্শনী শেষে দেশে ঢুকতে পারেননি! একজনকে হত্যা করলে যদি কেউ খুনি হয় তাহলে হাজার জনকে হত্যা করে সে বীর হয় কী করে?
বিশ শতকের প্রথম ভাগে যখন আমেরিকা পুঁজির দাপটে নিজেদের এক স্বপ্নপুরী গড়ে তোলার ঘোরে ব্যস্ত তখন সে দেশের অকাল মন্দরা তামাশার আড়ালে তার চলচ্চিত্রের বিপদের ইশারা দেখতে পান। হলিউডের সংগঠন ‘মোশন পিকচার্স অ্যালায়েন্স ফর প্রিজারভেশন অফ আমেরিকান আইডিয়াল’ চ্যাপলিনকে কমিউনিস্ট ঘোষণা করে মামলা ঠুকে দেয়। স্নায়ুযুদ্ধের ওই দিনগুলোয় আমেরিকায় কমিউনিস্ট অভিধা ছিল গুরুতর অপরাধ। বাকস্বাধীনতার দেশ আমেরিকা এই বিপজ্জনক কৌতুক অভিনেতাকে অবশেষে তার দেশ থেকে বহিষ্কার করে ১৯৫২ সালে। সে সময় কমিউনিস্ট রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত সোভিয়েত ইউনিয়নেও চ্যাপলিন নিষিদ্ধ ছিলেন। সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদে বিশ্বাসী নন বলে সেখানে তিনি প্রতিক্রিয়াশীল শিল্পী হিসেবে চিহ্নিত।


প্রগতি-প্রতিক্রিয়ার ওই দোলাচালে বিরক্ত, হতাশ, ক্ষুব্ধ চ্যাপলিন শেষে আশ্রয় নেন সুইজারল্যান্ডের এক নিভৃত গ্রামে। সেখানে তার সঙ্গী, বন্ধু ও স্ত্রী প্রখ্যাত নাট্যকার ইউজিন ও নিলের মেয়ে উনার সহচর্যে কাটে শেষ জীবন। যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে থাকার সময় দুটি ছবি বানিয়েছেন। তাহলো ‘অ্যা কিং ইন নিউইয়র্ক’ (১৯৫৭) ও ‘অ্যা কাউন্টেস ফরম হংকং’ (১৯৬৭)। শেষ ছবির পর মাত্র ১০ বছর বেঁচে ছিলেন তিনি।
চ্যাপলিন ১৯৩১ সালে তৈরি করেন ‘সিটি লাইটস’ অন্ধ এক মেয়ের জন্য যার বুকে লুকিয়ে আছে সত্যিকারের ভালোবাসা। ভালোবাসার প্রতিদান দেয় ভবঘুরে দুর্দান্তভাবে। সর্বকালের সেরা রোমান্টিক ছবির যে কোনো তালিকায় এটি সব সময়ই উপরের দিকের স্থান দখল করে। মডার্ন টাইম ১৯৩৬ সাল। চল্লিশের দশকে তিনি প্রযুক্তির এ রকম দুর্দান্ত কাজ কী করে দেখালেন তা ভীষণ আশ্চর্যের ব্যাপার! ছবিটির গভীরতাও দুর্দান্ত। প্রযুক্তির অভাবনীয় সাফল্যে মানুষের জীবন বদলে গেছে। জীবন সহজতর হলেও তা হয়ে পড়ছে যান্ত্রিক। এই সময় চ্যাপলিনের বয়স ৪৭ বছর। অভিনেত্রী পাওলেত্তে গোদারদকে ১৯৩৬ সালের ১ জুন বিয়ে করেন। তিনি উপলব্ধি করেন, বেঁচে থাকার জন্য আমাদের যন্ত্রের প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন ভালোবাসার। ছবিতে তৎকালীন সময়ে বিশ্ব অর্থনীতির মন্দা অবস্থা তুলে ধরেন। এমন একটি সময়কে তিনি ফ্রেমে তুলে ধরেছেন যখন অর্থনৈতিক মন্দা ও যান্ত্রিক সভ্যতার বিকাশের কারণে মানুষ চাকরি হারাচ্ছে, পাচ্ছে না কোনো কাজ। বৃহৎ জনগোষ্ঠী ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের কাছে নিজেদের সঁপে দিতে বাধ্য হচ্ছে। ওই ছবিতে একটি নাচের দৃশ্যে তিনি অভিনয় করেন। মজার বিষয় হলো, নাচের সঙ্গে নিজেই যে গানটি করছিলেন তা অর্থবোধক ছিল না। প্রতীকী ওই অংশটি যেন জানান দেয় বেঁচে থাকার জন্য অর্থহীন কত কিছুতেই না জড়িয়ে যেতে হয়! ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের কাছে অসহায় মানুষের যখন টিকে থাকাটাই গুরুত্বপূর্ণ তখন কোনো কিছুই আর অর্থহীন নয়, নয়


অপ্রয়োজনীয়। ১৯৪০ সালে বিশ্বব্যাপী যখন দুঃসময় তাড়া করে ফিরছে, মানবিকতা ও শ্রমিক শ্রেণীর বিরুদ্ধে পুঁজিবাদ-ফ্যাসিবাদ বিষাক্ত থাবা ফেলেছে তখনই তৈরি হলো অমর ছবি ‘দ্য গ্রেট ডিরেক্টর’। ব্যঙ্গের অস্ত্র দিয়ে আঘাত করলেন ফ্যাসিবাদকে। চ্যাপলিনের জনপ্রিয়তা সম্পর্কে হিটলার জানতেন। অনেকের মতে, ওই জনপ্রিয়তা কাজে লাগানোর জন্যই নাকি তার মতো গোঁফ রাখেন হিটলার। পরে অবশ্য তা হিটলারের নামেই পরিচিত হয়ে যায়। হিটলারকে ব্যঙ্গ করেই তিনি তৈরি করেছিলেন দ্য গ্রেট ডিক্টেটর ছবিটি। এটি তার সবাক ছবি। দুর্দান্ত সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন ওই ছবিটি বানিয়ে। ফলে আবারও প্রমাণ করেছিলেন, তিনি পর্দার সামনে আসেন দর্শকের শুধু বিনোদন দিতে নয়, আসেন দর্শকের বিবেক হয়ে। চ্যাপলিনের বিপরীতে ছিলেন তার স্ত্রী পাওলেত্তে গোদারদ। ছবিটির শুরু প্রথম বিশ্বযুদ্ধে এবং শেষ হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে। এতে তিনি দ্বৈতচরিত্রে অভিনয় করেছেন- ইহুদি নাপিত ও ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রনায়কের ভূমিকায়। তিনি একটি স্বপ্ন দেখেছিলেন। তা হচ্ছে সংঘাতমুক্ত সুন্দর পৃথিবীর। ছবিটি ছিল তার ওই চিন্তা-চেতনার বহিঃপ্রকাশ। একটি হৃদয়গ্রাহী ভাষণের মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রটি শেষ হয়। পুরো ছবিটির সার্থকতা খুঁজে পাওয়া যায় একটি ভাষণে। ছবিটির অ্যাডনয়েড হিংকল চরিত্রটি ছিল অ্যাডলফ হিটলারেরই চ্যাপলিন ভার্সন। ছবিটি ১৯৪০ সালে জার্মানিতে নিষিদ্ধ করা হয়।
১৯৪২ সালের ৪ জুন স্ত্রী পাওলেত্তে গোদারদ সঙ্গে চ্যাপলিনের বিয়ে বিচ্ছেদ হয়। তখন ‘শ্যাডো অ্যান্ড সারটেন্স’ মুভি তৈরি পরিকল্পনা চলছিল। ১৯৪৩ সালের ১৬ জুন অনা চ্যাপলিনকে বিয়ে করেন তিনি। তাদের ঘরে আট সন্তান এবং চ্যাপলিনের মৃত্যু পর্যন্ত তারা এক সঙ্গেই ছিলেন।


আমেরিকার তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থার তিক্ত অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে ১৯৪৭ সালে চ্যাপলিন তৈরি করেছিলেন ‘মঁসিয়ে ভের্দু’ ছবি। এতে একটি ব্যঙ্গের অস্ত্র দিয়ে আঘাত করলেন শক্তিশালী রাষ্ট্রটিকে। এটি দিয়েই ধীরে ধীরে চলচ্চিত্র জগতে রাজ্য বিস্তার শুরু। ওই ছবিতে চ্যাপলিন অভিনয় করেছিলেন পেশাদার খুনির চরিত্রে। ত্রিশের দশকের ডিপ্রেশনে আমেরিকার বহু মানুষ চাকরি খুইয়ে নিঃসম্বল হয়ে খুনকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিল। ছবিতে আদালতে দাঁড়িয়ে ভের্দু বলে, নরহত্যার ওপর এই সমাজ ব্যবস্থা দাঁড়িয়ে। আমি তো সামান্য শখের খুনি। সে বলে, একজনকে খুন করলে খুনি বলা হয়। আর গণহত্যা যারা করে তারা হয়ে উঠে বীর। এই হলো সংখ্যার মাহাত্ম্য। ফাঁসির আগে ভের্দুকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তোমার পাপের জন্য তুমি অনুতপ্ত নও? উত্তরে সে বলেছিল, পাপ কাকে বলে আমি জানি না। তাছাড়া পৃথিবীতে পাপ না থাকলে আপনাদের চলত কী করে! এমন একটি ছবির জন্য চ্যাপনিলকে আমেরিকা ছাড়তে হয়েছিল। এ জন্য অবশ্য তাকে অনেক মূল্য দিতে হয়েছে।


শৈশবের সেই বঞ্চনা ও অপমানটিকেই যেন চ্যাপলিন মোকাবেলা করেছেন তার চলচ্চিত্রের ভেতর দিয়ে। প্রবল বঞ্চনার ভেতর দাঁড়িয়েও কী করে পৃথিবীকে ভালোবাসতে হয় সে শিক্ষা তিনি পেয়েছেন তার মায়ের কাছ থেকে। বয়স হয়ে আসছিল। কিন্তু জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কমিক চরিত্রে অভিনয় করে গেছেন। শিল্প কী প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘শিল্প হচ্ছে পৃথিবীর কাছে লেখা এক সুলিখিত প্রেমপত্র।’ তার অনবদ্য চলচ্চিত্রগুলোর মধ্য দিয়ে এমন একেকটি প্রেমপত্রই পাঠিয়েছেন পৃথিবীর মানুষের কাছে। ওই প্রেমপত্রগুলো আজকের এই ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ পৃথিবীতেও সমান প্রাসঙ্গিক। তার চলচ্চিত্রগুলো এখনো প্রাণবন্ত হাসির স্রোতে ভাসতে ভাসতে মহৎ বেদনায় আর্দ্র হওয়া যায়। তাই আজও তিনি চমৎকার।
১৯৫২ সালে আজন্ম মানবতাবাদী শিল্পী চ্যাপলিনকে সমাজতান্ত্রিক আখ্যা দিয়ে আমেরিকা তার দেশ থেকে বহিষ্কার করে। এর পাশাপাশি সোভিয়েতেও তখন তিনি নিষিদ্ধ। ক্ষুদ্ধ চ্যাপলিন অবশেষে তার শেষ জীবন কাটান সুইজারল্যান্ডে। সেখানেই ১৯৭৭ সালের ২৫ ডিসেম্বরে তিনি প্রায় নিঃসঙ্গ অবস্থায় ৮৮ বছর বয়সে ঘুমের মধ্যেই ঘুমিয়ে যান চিরদিনের জন্য।

প্রতিটি আবিষ্কার এক একটি
বিজয়স্তম্ভ

অরিন্দম মুখার্জী বিংকু



বাঙালি বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু, তাঁকে দ্বিধাহীন ভাবে বলা যায় প্রথম সফল বাঙালি বিজ্ঞানী। যার সৃষ্টিকর্মে বিজ্ঞান স্বমহিমায় আর্ভিভুত হয়েছিলো। স্যার জগদীশচন্দ্র বসু। শুধু বিজ্ঞানী নন, ছিলেন সাহিত্যিকও। বিজ্ঞান ও সাহিত্য জ্ঞানের সঙ্গে রসের সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন তিনি। পুরো জীবন কাটিয়েছেন গবেষণায়। প্রমাণ করেছেন  বিশ্বে বিজ্ঞানে বাঙালির অবদান কম নয়। তার গবেষণার প্রধান দিক ছিল উদ্ভিদ ও তড়িৎ চৌম্বক। তাঁর আবিষ্কারের মধ্যে উদ্ভিদের বৃদ্ধিমাপক যন্ত্র ক্রেস্কোগ্রাফ, উদ্ভিদের দেহের উত্তেজনার বেগ নিরুপক সমতল তরুলিপি যন্ত্র রিজোনান্ট রেকর্ডার অন্যতম। ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম ব্যক্তি, যিনি আমেরিকান প্যাটেন্টের অধিকারী। ২০০৪ সালের এপ্রিলে বিবিসি রেডিওর জরিপে তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে সপ্তম স্থান অধিকার করেন। দেশের প্রতি অপরিসীম ভালোবাসা, দেশের মানুষের মধ্যে দায়বদ্ধতা, আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপনসহ মানব কল্যাণে নিয়োজিত ছিলেন দেড়’শ বছর আগে জন্ম নেয়া প্রথম বাঙালি বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু। দেড়’শ বছর আগে অর্থাৎ সিপাহী বিদ্রোহের পরের বছরই ১৮৫৮ সালের ৩০ নভেম্বর, ময়মনসিংহ শহরে এক ধনাঢ্য পরিবারে জগদীশ বসু জন্ম গ্রহণ করেন । তাঁদের আদি নিবাস ছিল ঢাকা জেলার রাঢ়িখালে। ভগবান চন্দ্র বসু ও মা বনসুন্দরী দেবীর প্রথম সন্তান। জগদীশের জন্মের সময় বাবা ভগবান চন্দ্র ছিলেন ফরিদপুরের ম্যাজিস্ট্রেট। সে সময় ইংরেজদের স্কুলে ছেলেমেয়েকে পড়ানো ছিল আভিজাত্যের ব্যাপার। কিন্তু ভগবান চন্দ্র বসু তাঁর সন্তানকে  ফরিদপুর রাখলেন না, পাঠিয়ে দিলেন নিজ গ্রামে। সেই গ্রামে কোন স্কুল না থাকায় ছেলেকে কোথায় পড়াবেন ভাবতে ভাবতে ভগবানচন্দ্র তার মায়ের নামে একটা স্কুল প্রতিষ্ঠা করলেন। জগদীশচন্দ্রের পড়াশোনা শুরু হয় সেই স্কুলে। ১৮৬৯ সালে হেয়ার স্কুল, পরে তিনি কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুলে ভর্তি হন। ১৮৭৫ সালে ষোল বছর বয়সে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশিকা পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন এবং শিক্ষাবৃত্তি লাভ করেন। সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে বিজ্ঞান শিক্ষা শুরু হলো জগদীশ বসুর। সে সময় ফাদার লাঁফো ছিলেন সেন্ট জেভিয়ার্সের নামকরা ফিজিক্সের প্রফেসর। প্রবীণ এই অধ্যাপকের আকর্ষণীয় ক্লাস জগদীশ বসুকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করে। তিনি ক্রমশ পদার্থবিদ্যার প্রতি গভীর আগ্রহ অনুভব করতে শুরু করেন। ১৮৭৭ সালে জগদীশ চন্দ্র বিএ পাশ করার পর ইংল্যান্ডে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। উদ্দেশ্য ছিল আইসিএস পরীক্ষায় পাশ করে দেশে এসে জজ-ম্যাজিস্ট্রেট হওয়া। কিন্তু ভগবান চন্দ্র স্বভাবতই এতে রাজী হননি। ছেলে বিদেশে যাক তা তিনি ঠিকই চেয়েছিলেন, তবে আইসিএস দিতে নয়, আধুনিক কৃষিবিদ্যা শিখে দেশীয় কৃষিকাজের উন্নতি সাধনের জন্য। বাবার ইচ্ছা ও তাঁর আগ্রহের মধ্যে টানাপোড়েনের শেষ পর্যায়ে তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞান পড়বেন বলে স্থির করেন। চিকিৎসাবিজ্ঞান পাঠের উদ্দেশ্যেই লন্ডনের উদ্দেশে পাড়ি জমান ১৮৮০ সালে। ডাক্তারী পড়ার লক্ষ্য স্থির থাকলেও ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে তাঁর স্বাস্থ্য নষ্ট হয়ে যায় ফলে ডাক্তারীতে ভর্তি হয়েও স্বাস্থ্যগত কারণে পড়া হলো না। ন্যাচারাল সায়েন্সে উচ্চতর শিক্ষার জন্য ভর্তি হলেন কেমব্রিজে। উভয় পরীক্ষাতেই পদার্থবিদ্যার পাশাপাশি ল্যাটিন ভাষা ছিল তাঁর অন্যতম বিষয়।

 

১৮৮২ সালে কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি থেকে ফিজিক্সে অনার্স সহ বি-এ পাশ করেন এবং ১৮৮৪ সালে লন্ডন ইউনিভার্সিটি থেকে বি-এসসি পাশ করেন। লন্ডন থেকে ফিরেই ১৮৮৫ সালে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে চাকরিতে যোগদানের চেষ্টা করেন। ‘ভারতীয়রা পড়াতে পারে না’ অজুহাতে কলেজের সেই সময়কার অধ্যক্ষ চার্লস টাউনি এবং বাংলার পাবলিক ইনস্টিটিউটের পরিচালক স্যার আলফ্রেড ক্রফট প্রবল বিরোধিতা করলে জগদীশ চন্দ্র বসু ভারতের ভাইসরয় লর্ড রিপনের শরণাপন্ন হন। শেষমেশ, ভাইসরয়ের হস্তক্ষেপে তিনি শিক্ষক হলেও চার্লস টাউনি এবং স্যার আলফ্রেড ক্রফট তাঁকে অস্থায়ীভাবে নিয়োগ দেন। এমনকি তাঁর বেতন নির্ধারণ করা হয় । মহান বৈজ্ঞানিক গবেষণাসমূহের সূতিকাগার হিসেবে এই কলেজকে আখ্যায়িত করা যায়। আমরা যে জগদীশ চন্দ্রের সাথে পরিচিত ও গবেষণার সূত্রপাতও এখান থেকেই। জগদীশ বসু বৃটিশদের কোন অন্যায়ের সাথেই আপোষ করেননি কখনো। সেই সময় একজন ইংরেজ অধ্যাপককে যে বেতন দেয়া হতো, একজন ভারতীয় অধ্যাপককে দেয়া হতো তার দুই তৃতীয়াংশ। আর চাকরি স্থায়ী না হলে ভারতীয়দের বেতন ছিল সমমর্যাদার ইংরেজদের বেতনের মাত্র এক তৃতীয়াংশ। জগদীশ চন্দ্র এই বৈষম্যের প্রতিবাদ করলেন। ইংরেজ ও ভারতীয়দের বেতন-বৈষম্য না ঘুচলে বেতন নেবেন না ঘোষণা দিলেন। বিনাবেতনে পড়ালেন একটানা তিন বছর। ইংরেজ অধ্যক্ষ বাধ্য হলেন বেতন বৈষম্য ঘোচাঁতে। এতে সব ভারতীয় অধ্যাপক উপকৃত হলেন, কিন্তু ক্ষতি হলো জগদীশের। তিনি ইংরেজ কর্তৃপক্ষের চক্ষুশূলে পরিণত হলেন। এজন্য অনেক অপমান সইতে হয়েছে তাঁকে। ১৮৮৭ সালে জগদীশচন্দ্র বসু আর্থিক কষ্টের মধ্যে ছিলেন একদিকে বাবার  ঋণের বোঝা অন্যদিকে কলেজের বেতন না নেওয়া। এই টানাপোড়েনের মধ্যেই ব্রাহ্ম সমাজের বিখ্যাত সংস্কারক দুর্গা মোহন দাসের কন্যা বিদূষী ডাক্তার ও শিক্ষাবিদ অবলাকে বিয়ে করেন জগদীশচন্দ্র বসু। জগদীশ চন্দ্র বসুর ছাত্রাবস্থাতেই ১৮৭৬ সালের ১৫ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশান ফর দ্যা কালটিভেশান অব সায়েন্স”। ডাক্তার মহেন্দ্র লাল সরকার  ভারতীয় জনসমাজকে বিজ্ঞানের গুরুত্ব স¤পর্কে সচেতন করার উদ্দেশ্যে এই এসোসিয়েশান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৮৮৫ সালে জগদীশ বসু এই এসোসিয়েশানে এক্সপেরিমেন্টাল ফিজিক্সের ক্লাস নিতে শুরু করলেন। এখান থেকেই তাঁর পদার্থবিদ্যার মৌলিক গবেষণা শুরু হয়। এই সময়কালে নিজের মেধা ও পা-িত্য দিয়ে তিনি প্রায় সবার মন জয় করেন। অন্যদিকে নিজের বাড়িতেও একটি গবেষণাগার গড়ে তুলতে থাকেন। তিন বছর পরে কলেজ কর্তৃপক্ষ তাঁকে সসম্মানে, পূর্ণবেতনে অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেয়। আর এই নিয়োগ দেওয়া হয় তিন বছর আগে থেকে। সেই সাথে তিন বছরের বকেয়া বেতনও পরিশোধ করা হয়। সেই টাকা দিয়ে জগদীশ চন্দ্র বসু তাঁর বাবার ঋণ শোধ করেন। সেই সময়ে জগদীশ চন্দ্র বসুর গবেষণার আগ্রহের বিষয়বস্তু ছিল ক্ষুদ্র দৈর্ঘ্যের তরঙ্গ, যা মাইক্রোওয়েভ নামে পরিচিত। সে সময় তিনি কোহেরার নামে একটি ধারণাকে আরেকটু এগিয়ে নিয়ে  সেটিকে মাইক্রোতরঙ্গের গ্রাহক যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন। ১৮৯১ সাল থেকে তিনি বাংলা ভাষায় বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ লিখতে শুরু করেন। মুকুল, দাসী, প্রবাসী, ভারতবর্ষ প্রভৃতি পত্রিকায় লিখেছেন। তাঁর অব্যক্ত বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান রচনার একটি উৎকৃষ্ট নিদর্শন।  বৈষয়িক লোভ-লালসা-মোহ তাঁকে কাবু করেনি এবং বিষয়ী প্রয়োজনও গুরুত্ব পায়নি। জগদীশ বসুই হলেন বিশ্বের প্রথম বৈজ্ঞানিক যিনি ১৮৯৫ সালে বিশ্বে সর্বপ্রথম কৃত্রিম মাইক্রোওয়েভ উৎপাদনে সাফল্য লাভ করেন। রিমোট কন্ট্রোল সিস্টেমের রিমোট সেন্সিং সর্বপ্রথম প্রদর্শন করেন প্রেসিডেন্সি কলেজে। জগদীশ বসু কলকাতার টাউন হলে ৭৫ ফুট দূরে রাখা বারুদের স্তুপে আগুন জ্বালাতে সমর্থ হন নিজের উদ্ভাবিত মাইক্রোওয়েভ কমিউনিকেশানের সাহায্যে। সর্বপ্রথম প্রায় ৫ মিলিমিটার দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট তরঙ্গ তৈরী করেন। এ ধরণের তরঙ্গকেই বলা হয়ে অতি ক্ষুদ্র তরঙ্গ বা মাইক্রোওয়েভ। আধুনিক রাডার, টেলিভিশন এবং মহাকাশ যোগাযোগের ক্ষেত্রে এই তরঙ্গের ভূমিকা অনস্বীকার্য। মূলত এর মাধ্যমেই বর্তমান বিশ্বের অধিকাংশ তথ্যের আদান প্রদান ঘটে থাকে। একই বছর ইতালির গুগ্লিয়েল্মো মার্কনি দুই কিলোমিটার দূর থেকে বেতার তরঙ্গ রিসিভ করতে সমর্থ হন। মার্কনির আবিষ্কারের কথা যতটা প্রচার পায় একই রকম আবিষ্কার হলেও জগদীশ বসুর আবিষ্কারের কথা তদানীন্তন ভারতের বাইরে তেমন একটা প্রচারিত হয় না। এর পেছনে তদানীন্তন ভারতের ইংরেজ শাসকদের একটা প্রকাশ্য ভূমিকা ছিল। “দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে (১৯৩৫) রেডার আবিষ্কারের পর ক্ষুদ্র তরঙ্গদৈর্ঘের বেতার তরঙ্গের নানামুখী প্রয়োগের দিকে বিজ্ঞানীদের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়।

 

কিন্তু এর অনেক আগেই জগদীশ বসুর গবেষণা অন্যদিকে মোড় নেয় সেই সাথে আবিষ্কারে একটা নতুন মাত্রা যোগ হয়। জগদীশ বসু ছিলেন পৃথিবীর প্রথম বায়োফিজিসিস্ট। উদ্ভিদও যে উদ্দীপনায় সাড়া দেয় এ তথ্য জগদীশ বসুর আগে কেউ উপলব্ধি করেননি, প্রমাণ করতে পারেননি। পদার্থবিজ্ঞানে জগদীশ বসুর অনেক মৌলিক অবদান থাকা সত্ত্বেও পরীক্ষামূলক পদার্থ বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু আমাদের কাছে উদ্ভিদ-বিজ্ঞানী হিসেবেই বেশি পরিচিত। তিনি উদ্ভিদের শারীরবৃত্ত স¤পর্কে গবেষণা করেছেন পদার্থবিদ্যার প্রয়োগ ঘটিয়ে। এই পদ্ধতির বিস্তৃত প্রয়োগে উদ্ভিদের প্রাণচক্র ও শারীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিয়া সংক্রান্ত গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপ আমরা জগদীশ বসুকে চিনলাম উদ্ভিদবিজ্ঞানী হিসেবে। পদার্থবিদ্যা থেকে উদ্ভিদের প্রাণ ও সংবেদনশীলতা নিয়ে কাজ শুরু করেন। জগদীশ বসু  স¤পূর্ণ নিজস্ব পদ্ধতিতে এবং দেশীয় উপাদানে তৈরি যন্ত্রপাতি দিয়ে জগদীশ বসু একটা বৈদ্যুতিক সংবেনশীল যন্ত্রের মডেল তৈরি করেন যা অনেকটা ক¤িপউটারের সেন্ট্রাল প্রসেসিং ইউনিটের মত। উদ্ভিদের বৃদ্ধি ও সংবেদনশীলতা মাপার কাজে ব্যবহৃত হয়েছে এই যন্ত্র। আজ আমরা যে এফএম বা রেডিওতে গানের মূর্ছনায় হারিয়ে যাই তার আবিষ্কারক  জগদীশ বসু, রেডিওর প্রকৃত আবিষ্কারক । বাঙালি বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু ১৮৯৪ সালে বেতার তরঙ্গ নিয়ে মৌলিক গবেষণা শুরু করেন। কোলকাতায় প্রথম বিনা তারে বার্তা প্রেরণ এবং তা গ্রহণ করার একটি কৌশল দেখিয়েছিলেন। ১৮৯৬ সালে  ২৪ জুলাই জগদীশ চন্দ্র বসু অদৃশ্য আলোক স¤পর্কে লিভারপুলের ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশনে মাত্র ১৮ মাসের মধ্যে করা পরীক্ষণগুলোর উপর ভিত্তি করেই  বক্তৃতা  করেন যা ইউরোপীয় বিজ্ঞানীদের চমৎকৃত ও আশ্চর্য্যন্বিত করে।  তারপর আরও সাফল্য আসে। এর সূত্র ধরেই লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় মে মাসে তাকে ডিএসসি ডিগ্রী প্রদান করে। ঐ সময় তাঁর পরীক্ষার খুটিনাটি এত বিশদভাবে তুলে ধরেন যে, তা থেকে যে কেউ পরীক্ষাটির পুনরাবৃত্তি করতে পারবেন। মার্কোনি তাঁর আবিষ্কারে অনেক সূক্ষ যন্ত্রপাতি ব্যবহার করেছিলেন যার মধ্যে একটি হচ্ছে কোহেরার (২টি ধাতব পাতের মাঝে খানিকটা পারদ), যা ছিল রেডিও বা তারহীন সংকেত পাঠানোর প্রক্রিয়ার মূল বিষয়। মজার ব্যপার হচ্ছে এই কোহেরার এর প্রকৃত আবিষ্কারক স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু। যদি তিনি নিজের নামে বেতার যন্ত্র পেটেন্ট করতেন,তাহলে মার্কোনি না, তিনিই হতেন বেতার যন্ত্রের সর্বপ্রথম আবিষ্কারক। ১৯০১ সালে রবীন্দ্রনাথকে লিখা একটি চিঠিতে জগদীশ বসু লিখেছিলেন আমি যদি একবার টাকার মোহে পড়ে যাই তাহলে আর কোনদিন আর বের হতে পারব না টাকার প্রতি তাঁর লোভ ছিল না বলেই তিনি পেটেন্ট নিজের নামে করেননি, তবে বিনা তারে বার্তা প্রেরণের জনক   জগদীশ চন্দ্র বসু কাজ করেছেন মাইক্রোতরঙ্গ নিয়ে এবং রেডিও যন্ত্রের উদ্ভাবক মার্কনি কাজ করেছেন বেতারতরঙ্গ নিয়ে। ইউরোপ সফরের সাফল্য জগদীশ বসুকে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করে এবং ১৮৯৮ সালের এপ্রিল মাসে তিনি ইউরোপ সফর শেষে সস্ত্রীক দেশে ফিরে এসে একটা গবেষণাগার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করলেন। কিন্তু কলেজ কর্তৃপক্ষ সহযোগিতা তো দূরে থাক পদে পদে বাধা হয়ে দাঁড়ালো। নিজের বেতনের টাকা দিয়ে আস্তে আস্তে নিজের কাজের একটা ল্যাব তৈরী করলেন ১৮৯৬ সালে প্রথম সায়েন্স ফিকশান ও নিরুদ্দেশের কাহিনী’ বই ও প্রকাশ করেন । ১৮৯৭ সালে কলকাতায় এসেছেন বিজ্ঞানী লর্ড রেইলে।

কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটির ক্যাভেন্ডিজ ল্যাবের এই বিখ্যাত অধ্যাপকের কাছে পড়াশোনা করেছেন জগদীশ বসু। কাজেই প্রিয় স্যারকে নিজের কলেজে পেয়ে নিজের গবেষণা, ল্যাব ঘুরিয়ে দেখালেন জগদীশ। এত সীমিত সুযোগের মধ্যেও জগদীশ যে এত কাজ করছেন দেখে খুব খুশি হলেন লর্ড রেইলে। তিনি জগদীশের অনেক প্রশংসা করলেন কলেজের ইংরেজ প্রিন্সিপালের কাছে। হিতে বিপরীত হলো। লর্ড রেইলে চলে যাবার পর প্রিন্সিপালের কাছ থেকে শো-কজ নোটিশ পেলেন জগদীশ বসু। কারণ দর্শাতে বলা হয়েছে কলেজের অধ্যাপনায় ফাঁকি দিয়ে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া নিজের ইচ্ছে মত গবেষনা করাটা কেন অপরাধের পর্যায় পড়বে না? এবং ল্যাবের যন্ত্রপাতি চুরির অপবাদও সইতে হয়েছে জগদীশ বসুকে। টাকার অভাবে গবেষণা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে  জগদীশ বসুর ল্যাব।সরকারের কাছে দেওয়া  কিছু অনুদানের জন্য , চিঠির উত্তর পেলেন  “ডক্টর বসু এখন মাসে পাঁচশ টাকা মাইনে পান। কোন নেটিভ সরকারি চাকুরের মাসে পাঁচশ টাকায় পোষাচ্ছে না বলাটা নেহায়েৎ        বোকামি”। তিনি বলতেন, সে-ই প্রকৃত বিজ্ঞানী যে তার ল্যাবরেটরির সঙ্গে ঝগড়া করে না। অর্থাৎ প্রকৃতিবিজ্ঞানী সব সময় নিজের ল্যাবরেটরি তৈরি করে নেন, অন্যকে দোষারোপ করেন না।আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন বন্ধু। রবীন্দ্রনাথ জগদীশ চন্দ্র বসুর তিন বছরের ছোট হলেও তাঁদের বন্ধুত্ব ছিল আমৃত্যু। পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ।একজনের হাতে বিকশিত হয়েছে বাংলায় সাহিত্য আর একজন করেছেন বাংলায় বিজ্ঞান রেনেসাঁর সূচনা। বিভিন্ন জনের কাছ থেকে চাঁদা তুলে তিনি জগদীশ বসুর গবেষণার টাকা জুগিয়েছেন। ১৮৯৮ সালের জানুয়ারি ১৯ তারিখে  ইউরোপে "অন দ্য পোলারাইজেশন অফ ইলেকট্রিক রেইস" বিদ্যুৎরশ্মির সমাবর্তন বক্তৃতার সফলতা ছিল সবচেয়ে বেশি।এই ডিসকোর্সগুলোতে আমন্ত্রিত হতেন একেবারে প্রথম সারির কোন আবিষ্কারক। সে হিসেবে এটি জগদীশচন্দ্রের জন্য একটি দুর্লভ সম্মাননা ছিল।

 

এই বক্তৃতার সূত্র ধরেই বিজ্ঞানী জেমস ডিউয়ার-এর সাথে জগদীশচন্দ্রের বন্ধুত্ব সৃষ্টি হয়। ডিউয়ার এই বক্তৃতা সম্বন্ধে "¯েপক্টেটর" পত্রিকায় লিখা হয়েছিল, "একজন খাঁটি বাঙালি লন্ডনে সমাগত, চমৎকৃত ইউরোপীয় বিজ্ঞানীম-লীর সামনে দাঁড়িয়ে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের অত্যন্ত দুরূহ বিষয়ে বক্তৃতা   দিচ্ছেন- এ দৃশ্য অভিনব।" এই বক্তৃতার পর ফ্রান্স এবং জার্মানি থেকে আমন্ত্রণ আসে এবং তিনি সেখানে কয়েকটি বক্তৃতা দেন। সবখানেই বিশেষ প্রশংসিত হন। বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও অধ্যাপক কর্ন তার বন্ধু হয়ে যায় এবং তিনি ফ্রান্সের বিখ্যাত বিজ্ঞান সমিতি ঝড়পরবঃব ফব চযুংবয়ঁব-এর সদস্য মনোনীত হন। ১৮৯৯ সালে বিদ্যুৎ তরঙ্গ নিয়ে নতুন উদ্যমে গবেষণা শুরু করেন, গবেষণায় জগদীশচন্দ্র বসু  জড়বস্তুর মধ্যে প্রাণ¯পন্দনের অনুরূপ সাড়া প্রত্যক্ষ করেন। তিনি লক্ষ্য করেন প্রাণীদের মত জড়বস্তুও বাইরের উত্তেজনায় সংবেদনশীল। জড় ও জীবের এই গোপন ঐক্য স¤পর্কে পরীক্ষালব্ধ ফলাফল পশ্চিমের বিজ্ঞানীদের কাছে প্রকাশের একটা সুযোগ এসে পড়লো। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় এই মৌলিক গবেষণার জন্য তাঁকে ডি .এস.সি উপাধি প্রদান করেন। ১৯০০ সালে প্যারিসে আয়োজিত পদার্থবিজ্ঞান কংগ্রেসে আমন্ত্রিত হলেন জগদীশ। আমন্ত্রণ পেলেও জগদীশের যাওয়ায় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল তদানীন্তন শিক্ষা কর্মকর্তা। তবে এতসব বাধার মুখেও জগদীশ বসুকে সহযোগিতা করেছিলেন লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার জন উডবার্ন। উডবার্নের সহযোগিতায়  জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে জগদীশ বসু দ্বিতীয় বারের মত ইউরোপে গেলেন। বাংলা ও ভারত সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি প্যারিসে পদার্থবিজ্ঞান কংগ্রেসে যোগ দেন এবং জড়বস্তুর সংবেদনশীলতা বিষয়ে তাঁর পরীক্ষালব্ধ ফলাফল তুলে ধরেন। ১৯০৯ সালের শেষের দিকে ইতালির গুগ্লিয়েল্মো মার্কনি আর জার্মানির কার্ল ফার্ডিন্যান্ড ব্রোনকে যখন পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার দেয়া হলো- সারাবিশ্ব জানলো যে বেতার যোগাযোগ ব্যবস্থা আবিষ্কৃত হয়েছে। অথচ আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানী মহলে সাড়া মিললেও তেমন প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পাননি জগদীশ বসু। বিজ্ঞানীরা কেউ স্বীকার করেনি। পশ্চিমাদের একটা ধারণা ছিল বাঙালি আর কী বিজ্ঞান জানে!” জগদীশ চন্দ্র যদি মাইক্রোতরঙ্গ নিয়ে তাঁর কোহেরারকে আরও এগিয়ে নিতেন, তাহলে ১৯০১ সালের প্রথম নোবেল পুরস্কারটি একজন বাঙালি পেলেও পেতে পারতেন। বসুর তৈরি কোহেরারটি সামান্য পরিবর্তন মার্কোনি করেছিলেন। বসুর কোহেরারটি ছিল ‘ট’ আকৃতির মত আর মার্কোনিরটি ছিল সোজা। নানা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও জগদীশ বসু ইংল্যান্ডের ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপনার অফার পান। ইংল্যান্ডের ইউনিভার্সিটিতে পড়ানোর সুযোগ মানে গবেষণার ব্যাপক সূযোগ হাতে পাওয়া। কিন্তু স্বদেশের সাথে, প্রেসিডেন্সি কলেজের সাথে সব স¤পর্ক ছিন্ন করে বিদেশের মাটিতে পড়ে থাকা জগদীশ বসুর পক্ষে সম্ভব হলো না। তিনি তাঁর দেশকে  তাঁর বিজ্ঞান গবেষণার চেয়েও বেশি ভালবাসতেন। লন্ডন প্রবাস কালে ১৯০০ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে ১৯০২ সালের ২০ জুন পর্যন্ত সময়ের মধ্যে লেখা অনেকগুলো চিঠিতে জগদীশ বসু তাঁর প্রিয় বন্ধু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে বার বার তাঁর স্বদেশ প্রেমের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, “আমাদের হৃদয়ের মূল ভারতবর্ষে। যদি সেখানে থাকিয়া কিছু করিতে পারি, তাহা হইলেই জীবন ধন্য হইবে। দেশে ফিরিয়া আসিলে যেসব বাধা পড়িবে তাহা বুঝিতে পারিতেছি না। যদি আমার অভীষ্ট অপূর্ণ থাকিয়া যায়,তাহাও সহ্য করিব”। চিঠির উত্তরে রবীন্দ্রনাথ জগদীশ চন্দ্রকে প্রেরণা জুগিয়েছেন, শুনিয়েছেন অভয়মন্ত্র মুগ্ধ হয়ে  জগদীশচন্দ্র ফিরে আসলেন ভারতবর্ষে। একটি পিছিয়ে পড়া দেশকে জগদীশ চন্দ্র বসু মানব সভ্যতাকে একটি বড় ঝাকুনি দিলেন। ভারতবর্ষেই অধ্যাপনার সাথে সাথে নিজের চেষ্টায় শুরু করলেন গবেষণা। বৈদ্যুতিক উত্তেজনায় উদ্ভিদের সাড়া মাপার জন্য নিজের ওয়ার্কশপেই তৈরি করেছেন স্ফিগমোগ্রাফ, ফটোমিটার, ফটোসিন্থেটিক বাব্লার প্রভৃতি যন্ত্র। এ সব যন্ত্রপাতি তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন সাধারণ বাঙালি মিস্ত্রিরাই।

 

বৈজ্ঞানিক যন্ত্রের উপাদান হিসেবে তিনি শজারুর কাঁটা পর্যন্ত ব্যবহার করেছেন। ১৯০৩ সালে এরই ফলশ্রুতিতে ব্রিটিশ সরকার জগদীশ বসুকে কমান্ডার অব ইন্ডিয়ান এমপ্যায়ার উপাধি দেন। ১৯১৫ সালে অধ্যাপনা থেকে অবসরের পর প্রফেসর ইমেরিটাস মর্যাদা পান। ১৯১৭ সালের ৩০ নভেম্বর কলকাতায় বসু বিজ্ঞান মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। কোলকাতার আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রোডে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ
গবেষণাগার। বসু বিজ্ঞান মন্দির ক্রমে হয়ে ওঠে  একটা আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা কেন্দ্র। যা ইড়ংব ওহংঃরঃঁঃব নামে পরিচিত। এই ইনস্টিটিউট ভারতের প্রথম আধুনিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান। মানব জাতির জন্য তিনি ইহা উৎসর্গ করে গেছেন। বাংলার এই সফল বিজ্ঞানী ১৯১৬ সালে নাইটহুড ও ১৯২০ সালে রয়েল সোসাইটির সদস্যপদ লাভ করেন। ১৯২৭ সালে ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসে সভাপতিত্ব করেন। ১৯২৮ সালে ভিয়েনার একাডেমি অব সায়েন্সের বৈদেশিক সদস্য ও রাজকীয় বিজ্ঞান সমিতির ফেলো নির্বাচিত হন। জগদীশচন্দ্র ছিলেন মাতৃভাষা ও স্বদেশী ভাবধারার বিজ্ঞানচর্চার পথিকৃৎ। এক জীবনেই অনেক কিছু ছিলেন, জ্বালিয়েছিলেন আলোকবর্তিকা। সেই আলোর পথ ধরে বিশ্ব আজো এগিয়ে চলছে । অথচ নিজের সময়ের চেয়ে অর্ধশত বছরের বেশি এগিয়ে ছিলেন মেধা-মনন-কর্ম-অধ্যবসায়-সাধনা ও সৃষ্টিতে জগদীশ চন্দ্র বসু। ভারত বিভক্ত হবার ১০ বছর আগে বিহার প্রদেশের ঝাড়খন্ডে ১৯৩৭ সালের ২৩ নভেম্বর জগদীশ বসু ৭৯ বছর বয়সে মারা যান। তার স্ত্রী অবলা বসু মারা যান ১৯৫১ সালে।  কীর্তিমান এ বিজ্ঞানীর কোনো সন্তান ছিল না। মানুষের স্মৃতিশক্তি মাপার সর্বপ্রথম যান্ত্রিক মডেল আবিস্কার করেছিলেন জগদীশ বসু। আজ আমরা ঠিক সেই মডেল ব্যবহার না করলেও বাঙালির বিজ্ঞান চর্চা যতদিন থাকবে বেঁচে থাকবে জগদীশ বসুর কীর্তি,  থাকবে তাঁর জীবন-স্মৃতি।

‘শিকড় খুঁজি
            মাটির টানে
                             প্রাণের মেলায়’

 

বাংলাদেশের মঞ্চনাটকের অন্যতম সেরা নিরীক্ষাধর্মী নাটক ‘মৈমনসিং গীতিকা’ অবলম্বনে লোকনাট্যদল (বনানী)-র ‘সোনাই মাধব’। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত মঞ্চস্থ প্রযোজনাগুলোর মধ্যে একমাত্র সোনাই মাধব সর্বাধিকবার মঞ্চায়িত হয়েছে। এর ১৫০তম মঞ্চায়ন উপলক্ষে লোকনাট্যদল আয়োজন করে বছরের সেরা নাট্যোৎসবের। তাছাড়া বাংলাদেশে বিষয়ভিত্তিক নাট্য উৎসব হয় না বললেই চলে। সেদিক থেকেও লোকনাট্যদল ‘মৈমনসিং গীতিকা নাট্যোৎসব ২০১৪’ আয়োজন করে বাংলাদেশের দর্শককে তার শিকড়ের কথা, সমৃদ্ধ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। গত ২৫ থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মূল মিলনায়তনে এ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। তবে উৎসব শুধু মিলনায়তনের ভেতরেই আবদ্ধ থাকেনি, এর পরশ ছড়িয়ে পড়েছিল পুরো শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণজুড়ে। ছয় দিনব্যাপী উৎসবের প্রতিদিনই ছিল মিলনায়তনের বাইরে লোকসঙ্গীত, পালা ও নৃত্য পরিবেশনা। আরো ছিল বাংলা নাটকের অন্যতম পুরোধা বিভাস চক্রবর্তীর সঙ্গে আলাপচারিতা। লোকজ আঙ্গিকে উৎসবের বহিরাঙ্গনের সাজসজ্জা উৎসবটিকে প্রাঞ্জল করে তুলেছিল।


‘সোনাই মাধব’-এর দেড়শতম মঞ্চায়নের আনন্দযজ্ঞ উদযাপন করে নাট্যশিল্পীদের নিয়ে লোকনাট্যদল গতানুগতিকতার বাইরে একটি উৎসব আয়োজনের মধ্য দিয়ে। মৈমনসিং গীতিকা অবলম্বনে চলমান ছয়টি নাটক নিয়ে এ উৎসব অনুষ্ঠত হয়।
এ উৎসব সম্পর্কে লোক নাট্যদলের বক্তব্য- বাংলা নাট্যে রয়েছে বিভিন্ন লোককাহিনী এবং তা চর্চার ইতিহাস হাজারো বছরের। বিভিন্ন আঙ্গিক ও কৌশলে এসব লোকনাট্য অভিনীত হয়। এ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রয়েছে বহু উপকথা, আখ্যান, উপাখ্যান, কথ্য ও পদ্য রীতিতে অনেক গল্প। লিখিত নয়, শুধু মুখে মুখেই এসব গল্পগাথা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তর পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। কিন্তু এসব লোককাহিনীর খুব কমই আবিষ্কৃত ও ব্যবহৃত হয়েছে। লোকসংস্কৃতির এ ভা-ার আজ অবহেলিত, এর রস আস্বাদন থেকে বর্তমান প্রজন্ম বঞ্চিত। কারণ এর চর্চা করার মতো গবেষণা নেই, কিছু থাকলেও আমরা তা পড়ি না, ব্যবহার করি না। অথচ একটি দেশের সম্পদ ও ঐতিহ্য সে দেশের লোকসংস্কৃতি। মৈমনসিং গীতিকা এমন একটি ভা-ার যা বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের মানুষের গানে গানে, ছড়া, কবিতা ও শ্লোকের মাধ্যমে চর্চা করা হতো। মৈমনসিং গীতিকার এসব কাহিনী থেকেই এ দেশে বিভিন্ন সময় নাটক মঞ্চস্থ হয়েছে। কিন্তু তা খুব বেশি নয়। আমাদের এসব নাটকের আরো মঞ্চায়ন প্রয়োজন যাতে এ দেশের নতুন প্রজন্ম জানতে পারে, ভালোবাসতে পারে লোকসংস্কৃতিটি। এ ভাবনাও একটি বড় অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে এ উৎসব আয়োজনের। আমরা চেয়েছি, বর্তমানে মঞ্চস্থ হচ্ছে মৈমনসিং গীতিকার এমন নাটকগুলোকে একই ফ্রেমে নিয়ে এসে এ দেশের নাট্যদর্শককে এক সঙ্গে উপহার দেয়া। এ জন্যই এ উৎসব।


গত ২৫ সেপ্টেম্বর অত্যন্ত জাঁকজমক ও আড়ম্বর করে উৎসবের উদ্বোধন করা হয়। এটি উদ্বোধন করেন উপমহাদেশের অন্যতম নাট্যনির্দেশক, নাট্যকার বিভাস চক্রবর্তী। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন আইটিআই বিশ্ব সভাপতি নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার, নাট্যজন নাসির উদ্দীন ইউসুফ, বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশানের সভাপতিম-লীর সদস্য ঝুনা চৌধুরী ও সেক্রেটারি জেনারেল আকতারুজ্জামান। এছাড়া সভাপতিত্ব করেন লোকনাট্যদল সভাপতি ও উৎসব কমিটির আহ্বায়ক অভিজিৎ চৌধুরী। উদ্বোধনীতে সোনাই মাধবের বিভিন্ন অংশের কোলাজ দৃশ্য অভিনীত হয়।
উৎসবের প্রথম দিনে মঞ্চস্থ হয় জাহাঙ্গীরনগর থিয়েটারের প্রযোজনা ‘দস্যু কেনারামের পালা’। এটি নির্দেশনা দেন রাসেল রানা। দ্বিতীয় দিন মঞ্চস্থ হয় লোকনাট্যদল প্রযোজনা ‘সোনাই মাধব’ যা এ নাটকের ১৫০তম মঞ্চায়ন। এটি নির্দেশনা দিয়েছেন ইউজিন গোমেজ। নাট্যপ্রদর্শনী শেষে নাট্যজন বিভাস চক্রবর্তী নাটকের কলাকুশলীকে শুভেচ্ছা জানান ও উৎসব স্মারক প্রদান করেন।
উৎসবের তৃতীয় দিন মঞ্চস্থ হয় শিকড় নাট্যসম্প্রদায় কিশোরগঞ্জের প্রযোজনা ‘চন্দ্রাবতী’। এর নির্দেশনা দিয়েছেন ধনেশ চন্দ্র প-িত। চতুর্থ দিনে মঞ্চস্থ হয় নাট্যধারা প্রযোজিত নাটক ‘আয়না বিবির পালা’। এর নির্দেশনা দিয়েছেন রবিউল আলম। উৎসবের পঞ্চম দিনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের প্রযোজনা ‘মহুয়া’ মঞ্চস্থ হয়। নাটকটির নির্দেশনা দিয়েছেন ড. সোমা মুমতাজ। নাটক শেষে নাট্যজন লাকী ইনাম নাট্যনির্দেশক ও সংগঠনকে শুভেচ্ছা স্মারক প্রদান করেন। ষষ্ঠ দিন মঞ্চস্থ হয় তপন হাফিজ নির্দেশিত ও নাট্যতীর্থ-এর প্রযোজনা ‘কমলা সুন্দরী’।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মতো উৎসবের শেষ দিনেও ছিল আলোচনা। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. রনজিৎ বিশ্বাস এবং বিশেষ অতিথি সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ। তারা নাটকের শিল্পী ও কলাকুশলীর হাতে উৎসব স্মারক তুলে দেন।


মৈমনসিং গীতিকা নাট্যোৎসবের বিশেষ আয়োজন ছিল নাট্যজন বিভাস চক্রবর্তীর সঙ্গে আলাপচারিতা তথা নাট্যআড্ডা। এতে অংশ নেন বাংলাদেশের অগ্রজ ও নতুন প্রজন্মের নাট্যকর্মী, নির্দেশক, নাট্যশিক্ষক এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যপ্রশিক্ষণার্থীরা। প্রায় চার ঘণ্টার ওই আলাপচারিতায় উঠে আসে নাট্যজন বিভাস চক্রবর্তীর নাট্যজীবন ও তার নির্দেশিত নাটকগুলো। এর বেশির ভাগ সময়ই ঘুরে-ফিরে আসে তার নির্দেশিত মৈমনসিং গীতিকা অবলম্বনে ‘মাধব মালঞ্চি কইন্যা’ নাটক মঞ্চায়নের পটভূমি ও অভিজ্ঞতার কথা। এছাড়া উঠে আসে দুই বাংলার নাট্যসংস্কৃতির মেলবন্ধনের কথা, সংকট ও সমাধানের পথ নিয়ে আলোচনা। একেবারেই ঘরোয়া ওই আড্ডায় প্রায় ২০০ নাট্যকর্মী অংশগ্রহণ করেন। আলাপচারিতা প্রথম পর্ব সঞ্চালন করেন নাট্যজন মামুনুর রশীদ এবং দ্বিতীয় পর্ব সঞ্চালন করেন নাট্যজন নাসির উদ্দীন ইউসুফ। এসব আড্ডায় অংশগ্রহণ করেন রামেন্দু মজুমদার, আতাউর রহমান, মান্নান হীরা, ঝুনা চৌধুরী, অনন্ত হীরা, মোহাম্মদ বারী, বাবুল বিশ্বাস, গোলাম শফিক, আকতারুজ্জামান, সুদীপ চক্রবর্তী, অভিজিৎ চৌধুরী, গোলাম সারোয়ার, ঠা-ু রায়হান ও একঝাঁক তরুণ নাট্যকর্মী। তারা এ ধরনের বিষয়ভিত্তিক উৎসব আয়োজনের জন্য লোকনাট্যদলের প্রশংসা করেন।
এ উৎসবে যে নাটকগুলো মঞ্চস্থ হয়েছে তা এ প্রজন্মের নাট্যদর্শক ও নাট্যকর্মীদের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে, ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছে তাদের মধ্যে। এর প্রমাণ প্রতিদিন মিলনায়তনে দর্শকপূর্ণ মঞ্চায়ন। এ অনুপ্রেরণা বেশি করে লোকনাট্য নিয়ে কাজ করতে তরুণদের আগ্রহী করে তুলবে- যে রকম অন্য থিয়েটার ও বিভাস চক্রবর্তীর মাধব মালঞ্চি কইন্যা এখনো আমাদের স্মৃতি ছুঁয়ে যায় এবং লোকনাট্যদলের সোনাই মাধব নাট্যকর্মীদের জন্য হয়ে ওঠে গবেষণা ও শিখনের বিষয়। আমাদের শিকড় থেকে উঠে আসা এ নাটকগুলোর এমন চমৎকার উপস্থাপনা ও অভিনয়ে এক অসাধারণ অনুভূতি জাগায়! সোনাই মাধব এমন একটি সহজ-সরল কাহিনী যা লোকনাট্যদলের উপস্থাপনায় ব্যঞ্জনা পেয়েছে, দর্শকের হৃদয় ছুঁয়েছে। ফলে এটি দুই দশক ধরে মঞ্চস্থ হচ্ছে। এর দেড়শতম মঞ্চায়ন উপলক্ষে লোকনাট্যদল আমাদের উপহার দিয়েছে ‘মৈমনসিং গীতিকা নাট্যোৎসব’-এর মতো একটি আসাধারণ, অবিস্মরণীয় নাট্যোৎসবের। অভিনন্দন লোকনাট্যদল (বনানী)-কে।

 

- আবদুল্লাহ আল হারুন

 বৈশাখ পার্বণ

 শায়মা হক 

 

 


পহেলা বৈশাখ বাঙালির প্রাণের উৎসব। এটি বাঙালির গান ও আনন্দে ঘোরাঘুরির দিন। এর সঙ্গে বাংলার ঐতিহ্যবাহী খানা খাওয়ারও দিন। এ উৎসব ঘিরে থাকে নানান আয়োজন। শহর-বন্দর, গ্রাম-গঞ্জ মেতে ওঠে এ আনন্দ উৎসবে। এদিনটি ঘিরে শহর ও গ্রামে বসে মেলা, পুতুল নাচ, যাত্রাপালা ও নানান সাংস্কৃতিক উৎসব।

পহেলা বৈশাখ ও রমনার বটমূল
রমনার বটমূলে ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’ গানটি দিয়ে বর্ষবরণ ছাড়া যেন আসে না বাঙালির নতুন বছর। খুব ভোরেই দেখা যায় কোলের শিশু থেকে শুরু করে পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষকেও লাল-সাদাসহ বাহারি রঙের পোশাক পরে রমনার বটমূলে জড়ো হতে। এক সঙ্গে কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে তারা গায় গান। শিল্পী, কলাকুশলী, সাধারণ জনতার আনন্দ কোলাহলে ভরে ওঠে চারদিক।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়Ñ যেখানে ফিরে ফিরে আসে বৈশাখ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সেই ফেলে আসা দিনের প্রবীণ থেকে নবজাগরণে জাগরিত তরুণেরও এ প্রাণের বিদ্যাপীঠ। যে কোনো অনুষ্ঠান, আনন্দ, উৎসবেই জেগে ওঠে জনতা এ বিদ্যাপীঠের পাদদেশে। প্রতিবাদ-প্রতিরোধেও গড়ে তোলে সকণ্ঠ প্রতিবাদী কলরোল। বাংলাদেশের ক্রিকেটের জয়লাভ থেকে শুরু করে যে কোনো জাতীয় উৎসবে ওই প্রাঙ্গণটি হয়ে ওঠে আনন্দমুখর জনতার দিন, বাঙালির দিন। চারুকলার শোভাযাত্রা, টিএসসি বা কলা ভবনের অনুষ্ঠানÑ কী নেই এতে? বাঙালির মনের মতো সব আয়োজনেই সাজানো থাকে এখানে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেও চলে যাওয়া যায় কিছুক্ষণ এ বৈশাখের প্রথম দিনের প্রথম লগনে।

পিঠা, পুলি, মুড়ি, মুড়কি ও বাঙালিয়ানায় ফিরে যাওয়ার বিশেষ একটি দিন
পহেলা বৈশাখ ঘিরে বাঙালির খাদ্যেও চলে নানান আয়োজন। রাস্তার পাশের ছোট্ট ঠেলার ওপর সাজানো দোকানটি থেকে শুরু করে বড় বড় ডিপার্টমেন্ট স্টোরগুলোও সেজে ওঠে বৈশাখী উৎসবে। পাওয়া যায় নানান প্যাক বা বাহারি গামছায় মোড়া বেত-কাঠের ডালা-কুলায় সাজানো গ্রামবাংলার বাঙালির ঐতিহ্যবাহী নানান পিঠা-পুলি ও মুড়ি-মুড়কি। আয়োজন করা হয় বাঙালি নানান খাবারের মেলা। এছাড়া প্রায় প্রতিটি পরিবারেই বিশেষ খাবারের আয়োজন করা হয়। সবাই মিলে পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ বা যে কোনো সদস্যের বাড়িতে জড়ো হন এবং মেতে ওঠেন খানা-পিনা, হাসি-আনন্দ ও গানে।

পান্তা-ইলিশ
কয়েক বছর ধরে এ উৎসবে যোগ হয়েছে পান্তা-ইলিশ ও নানান ভর্তা। এ আয়োজনে বৈশাখের প্রথম লগনটি শুরু করা হয়। এ উপলক্ষে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট থেকে শুরু করে পারিবারিক ও নানান ক্লাব প্রতিষ্ঠানেও আয়োজন করা হয় পান্তা-ইলিশ উৎসব। এর সঙ্গে সঙ্গে পিঠা-পুলি, ক্ষীর, পায়েসসহ মুখরোচক নানান খাবারের আয়োজন থাকে।

লাল-সাদা শাড়ি ও পাঞ্জাবি এবং ফুলে ফুলে সুরভিত সকাল
সবাই রঙিন এবং শুদ্ধতার প্রতীক সাদা ও লালে সেজে ওঠেন। বৈশাখের বহু আগে থেকেই শুরু হয় বিপণি বিতানগুলোয় লাল-সাদা পোশাকের নানান আয়োজন। পরিবারের শিশু থেকে শুরু করে বয়স্ক ব্যক্তির কথা মাথায় রেখেই ফ্যাশন হাউসগুলো সাজিয়ে তোলে তাদের অবয়ব লাল-সাদা বা রঙিন উৎসব পোশাকে। ফুলের দোকানগুলো হেসে ওঠে ফুলে ফুলে। রমনার বটমূলে বেলি ফুলের শুদ্ধতম সৌরভের সঙ্গে হাসে টকটকে গোলাপ বা ঝলমলে হলুদ গাঁদা। প্রিয়তমা স্ত্রী বা প্রেমিকার খোঁপা অথবা বেণীতে এক গোছা বেলি ফুলের মালা ছাড়া যেন ওই সকাল বড়ই ম্রীয়মাণ। তাই ওই রঙিন সুরভিত সকালে গেয়ে ওঠে প্রাণÑ ‘সবার রঙে রঙ মেলাতে হবে।’


রবীন্দ্র সরোবর ও বৈশাখের বিকাল-সন্ধ্যা
রাজধানীতে ধানম-ির লেকের পাশে রবীন্দ্র সরোবরে জেগে ওঠে বৈশাখ তার নানান আয়োজনে, বিশেষ করে বৈশাখের আনন্দময় বিকাল এখানে নিয়ে আসে যেন নতুন বারতা। এখানে মুক্তমঞ্চে আয়োজন করা হয় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। মজাদার নানান খাবারের আয়োজনও ছড়িয়ে থাকে চারপাশে। গরু বা মুরগির চাপের সঙ্গে গরম লুচি অথবা চটপটি-ফুচকা সারা দিনের ঘুরাঘুরি ও আনন্দটি করে তোলে আরো মোহনীয়। লেকের ঝিরঝিরি সান্ধ্যকালীন হাওয়া ভুলিয়ে দেয় সারা দিনের ক্লান্তি। মুছে যায় গ্লানি, ঘুচে যায় জরা।


জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও শহর ছেড়ে একটু দূরের বৈশাখ
প্রকৃতির কাছাকাছি থেকে নতুন বছর বরণ করে নিতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় খুবই উপযোগী। নানান সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও মেলা বা আয়োজনে ভরে ওঠে এ বিদ্যাপীঠের প্রাঙ্গণ। এই খোলামেলা হাওয়ায় গেয়ে ওঠে বুঝি প্রাণÑ ‘তোমার খোলা হাওয়া লাগিয়ে পালে বৈশাখী প্রভাতের মুক্ত হাওয়ায়।’

সোনারগাঁও লোকশিল্প জাদুঘর ও বৈশাখী মেলা
পহেলা বৈশাখের সবচেয়ে বড় মেলাগুলোর মধ্যে একটি হলো সোনারগাঁও লোকশিল্প জাদুঘর বা তৎসংলগ্ন মেলা। বাংলাদেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারক ঢাকার অদূরে সোনারগাঁওয়ের লোকশিল্প জাদুঘর। পানামনগর বা আমাদের সোনালি অতীতে এ মেলাগুলো কেমন ছিল তা জানা নেই। তবে বর্তমানের রঙিন বর্ণালি মেলাও কম আকর্ষণীয় নয়।

হালখাতা ও পহেলা বৈশাখ
বৈশাখ ও হালখাতা ভুলে যাওয়া কোনোমতেই চলে না! মূলত এদিন ঘিরেই আসলে বাঙালির জীবনে শুরু হয়েছিল পহেলা বৈশাখের উৎসব বা আয়োজন। ব্যবসায়ীরা এদিনটিতে পুরনো হিসাব-নিকাশের খাতা ফেলে খোলে নতুন হিসাবের খাতা। এ খাতাটিকেই বলা হয় হালখাতা। এ নিয়মটি এখনো বহাল। তাই আজও বৈশাখের সকালে সব দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেই চলে মিষ্টিমুখের আয়োজন এবং তা চলে দিনব্যাপী।

বৈশাখ বাঙালির জীবনে নিয়ে আসে নতুনের বারতা, আনন্দের সঙ্গীত। বৈশাখের নতুন ভোরে শুদ্ধতার প্রতিজ্ঞায় ভরে উঠুক সব বাঙালির জীবন, দূর হয়ে যাক সব গ্লানি; পুরনো বছরের সব জীর্ণতা, ব্যর্থতা কেটে হেসে উঠুক সব বাঙালির প্রাণ। আমরা সবকিছুর সঙ্গে সঙ্গে আনন্দ উৎসবেও ভুলে যাবো না আমাদের বিবেক ও সচেতনতা। আমাদের ক্ষুদ্র গৃহের প্রত্যেক সদস্যের মতোই আমরা সব বাঙালি জাত-পাত নির্বিশেষে একই পরিবারের সদস্য। পরিবারটির নাম বাংলাদেশ। এ দেশের প্রতিটি পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের মান-সম্মান, স্নেহ-মমতা ও বিবেক বড় বেশি মূল্যবান আমাদের কাছে। তাই নিজের জীবন দিয়ে হলেও এসব কিছু রক্ষার দায়িত্ব আমাদেরই। উৎসবে-আয়োজনে সবাই থাকুন নিরাপদ ও সহনশীল। তবে সবাই চোখ রাখুন হীনমানসিকতা ও স্বার্থান্বেষী কিছু চক্রের দিকে। তারা যেন কোনোভাবেই থামিয়ে দিতে না পারে আপনার-আমার আনন্দময় জীবনের আনন্দগুলো।

উৎসব আয়োজনে নারী-পুরুষ, শিশুসহ সবাই থাকুন নিরাপদ ও আনন্দময়! সবার জন্য রইলো নববর্ষের শুভেচ্ছা।

আমি সত্যিই কি গান লিখি?

মিল্টন খন্দকার

 


স্বপ্ন দেখারও লিমিট থাকা উচিত। আবার স্বপ্ন না দেখাও মৃত মানুষের লক্ষণ। তবুও মফস্বল শহর কুষ্টিয়ার এক বালক। বালক বয়সেই স্বপ্নের লিমিট ক্রস করলো সে। ভেতরে ভেতরেই ঘোষণা দিল, বড় হতে হবে। কিন্তু কতো বড়? আমার মাথা এ ঘরের ছাদ ফুটো করে আকাশ স্পর্শ করার মতো বড়! না, আপাতত ততো বড় নয়। বড় হওয়ার সীমানাটা ৫৬ হাজার বর্গমাইল হলেই চলবে। এরপর সময় বুঝে ব্যবস্থা।
এই যার লক্ষ্যমাত্রা, প্রতিগগা, উচ্চাকাক্সক্ষা- ওই বালকের নাম মিল্টন তথা আমি। তখনো খন্দকার হয়ে উঠিনি। খন্দকার হয়ে ওঠা তারও অনেক, অনেক ও অনেক পরে। মনে হয় যখন বছর তিন বয়স, কথা বলি আধো আধো তখনকার কথা মনে পড়ে। সেই সময় আমার সেজভাই আমাকে বলতো, তুই একটা গান গাইলে তোকে পয়সা দেবো। গান গাইতে পারি কী- জানি না। কিন্তু পাঁচ পয়সার লোভে গান গাইতাম, ‘নাইয়া রে... নায়ের বাদাম তুইল্যা...।’
যতো দূর মনে পড়ে, ওই হচ্ছে আমার গান গাওয়া। আজ ভাবি আর হাসি, আমি তিন বছর বয়স থেকে প্রফেশনাল সিঙ্গার। পাঁচ পয়সার জন্য গান গাইতাম। মাঝখানে মুক্তিযুদ্ধ। যুদ্ধের সময় কোথায় কেথায় পালিয়ে বেড়ালাম মায়ের হাত ধরে, ভাইয়ের হাত ধরে! দেশ স্বাধীন হলো। দেশ স্বাধীন হওয়াটা আমার কাছে অতো খুশির ছিল না। খুশির খবর ছিল আমাকে ক্লাস ওয়ান থেকে টু-তে তুলে দিল যখন। সে কী আনন্দ! আনন্দ তখন আরো এক ধাপ বেড়ে গেল যখন স্কুলে আমি ছাড়া জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার লোক ছিল না। আমাকেই গাইতে হতো। এরপর এবাড়ি-ওবাড়িতে যখন বিয়ে হতো তখন মাইক বাজানো অভিজাত পরিবারের রেওয়াজ ছিল। আর অত্র এলাকার গায়ক বলতে ওই সময় বালক মিল্টন অত্যন্ত জনপ্রিয়। তারপর ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টায়। মাস গড়ায়, বছর গড়ায়। আমাকে একদিন ওস্তাদ খন্দকার মিজানুর রহমান বাবলু ডেকে পাঠালেন গান শেখাবেন বলে। প্রথমে মুগ্ধ হলেও পরে হয়েছে দ্বন্দ্ব। বাবলু স্যার আমাকে গান শেখাবেন বলে ডেকেছিলেন বটে তবে আমার পাপী মন বলে, তার সংগঠনে মেয়ের সংখ্যা ছিল বেশি। ছেলের সংখ্যা ছিল নিতান্তই হাতে গোনা। অন্তত একজন মিল্টন বাড়লে একজন ছেলে বাড়ে। কিন্তু না, মিল্টন ছাড়াও আরো ছেলে বাড়লো। এরপরও বাবলু স্যারকে ধন্যবাদ- তিনি আমার ভেতরে গানের বীজটা বুনেছিলেন।


এরপর দ্রুত যেন সময় ফুরিয়ে যায়। আজ এখানে গান করি তো কাল ওখানে নাটক করি। ততো দিনে কুষ্টিয়ায় একটি থিয়েটার ‘বোধন’-এর সঙ্গে নাট্যআন্দোলনে জড়িয়ে পড়ি। বেশকিছু নাটকে অভিনয়ও করি। সঙ্গীত ও নাটকে দ্রুত নাম করলেও মা-বাবার মুখে তখন কালিমা লেপন করলাম যখন ম্যাট্রিকে পর পর দু’বার ফেল করলাম। অবশ্য তিনবারের বেলায় হিমালয় ছোঁয়ার স্বাদ পেলাম। কোনো রকম ডিভিশন ছাড়াই পাস।
পাস তো করলাম। এবার আমি হাঁসফাঁস যে কারণে- বাকিটুকু পড়াশোনা কীভাবে করবো? একজন বুদ্ধি দিল- তুই তো গান জানিস, ঢাকায় মিউজিক কলেজে ভর্তি হয়ে যা। চারটা সাবজেক্ট পড়াশোনা করা লাগবে না।
ওস্তাদ খালিদ হোসেন,ওস্তাদ জহির আলীম, ওস্তাদ আবু বকর সিদ্দিক ও আমার এক বন্ধু নজরুলের সহযোগিতায় মিউজিক কলেজে ভর্তি হলাম। ভর্তি অবশ্য অডিশন দিয়েই হতে হয়েছে। অডিশন যিনি নিলেন তিনি ওস্তাদ নারায়ণ চন্দ্র বসাক।


যাহোক, গান এগোতে লাগলো। একদিকে সঙ্গীত চর্চা, অন্যদিকে গান লেখা ও সুর করার চর্চা। ওই শুরু। ১৯৮৬ সালে আমার কথা ও সুরে প্রথম অ্যালবাম বের হলো ‘সেই তুমি’। কণ্ঠশিল্পী হাসান চৌধুরী। ওই থেকে আজ পর্যন্ত আমার লেখা ও সুরে অ্যালবামের সংখ্যা প্রায় দুইশ’। চলচ্চিত্রে গান আছে পাঁচশ’র বেশি।
অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছি দেশ-বিদেশ থেকে। এর মধ্যে ২০১২ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাই ‘খোদার পরে মা’ সিনেমায় গানের জন্য।
ব্যক্তিগত জীবনে দুই কন্যার বাবা আমি। অবশ্য কন্যা দু’জনই বাবার গানের ভক্ত নন। তারা ভক্ত দেব-এর গানের। নাচতে পারদর্শী মেয়েরা প্রায়ই আমাকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়- বাবা, তুমি নাকি গান লেখো? তুমি গান লিখতে পারো?
আমি পারি না বললে ওরা খুশি হয়। যেদিন জাতীয় পুরস্কার পেলাম, পুরস্কারটি বড় মেয়ের হাতে আর মেডেলটি ছোট মেয়ের গলায় পরিয়ে বললাম, বাবা, আমি সত্যিই কি গান লিখি?
কয়েক সুরকার আছেন যারা গীতিকারদের পেলে ফাই-ফরমায়েশ খাটাতে চান। কারণ যেসব গীতিকার গানের শিক্ষায় শিক্ষিত নন তাদের দিয়ে সুযোগ নিতে চান। ভবিষ্যতে কোনো সুরকার যেন কোনো গীতিকারকে অবহেলা বা তাচ্ছিল্য করার সুযোগ না পান এ জন্য প্রতিষ্ঠা করি ‘গীতিকাব্য চর্চা কেন্দ্র’। এর মূল উদ্দেশ্য- যিনি গান লিখতে পারেন তিনি এসে জানাবেন এবং যিনি জানেন না তিনি জেনে যাবেন।
বর্তমানে গানের পাশাপাশি সিনেমা তৈরির একটি পবিত্র ইচ্ছা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। ইতোমধ্যেই চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় কাহিনীকার জামান আকতার কাহিনী লিখতে শুরু করেছেন। সঙ্গীতনির্ভর ওই সিনেমাটি আশা করছি, আগামী বছরের শুরুর দিকেই দর্শক দেখতে পারবে।


আমরা যখন ইন্টারভিউ বোর্ডে কিংবা টিভি স্টুডিওতে থাকি বা যখন কথাবার্তা বলি তখন মনে হয়, আমার চেয়ে নিষ্পাপ ও সত্যবাদী আর কেউ নেই। নিজেকে ভালো রেখে অন্যকে আঙুল তুলে মন্দ বলায় আমরা পারদর্শী। রক্ত-মাংসের মানুষ, ভালো-মন্দ দুই-ই আমার ভেতরে কাজ করে। জীবনে শুধু ভালো কাজই করেছি- এমন দাবি কখনোই করি না।
কখন, কোন সময় ভুল হয়, কখন শুদ্ধ হয়- ওই হিসাব আছে সৃষ্টিকর্তার খাতায়। আমরা পাপ কুড়িয়ে চলেছি। সাফ মনে একটি কথা বলতে চাই- সৃষ্টিকর্তা বলেছেন, ‘মানুষকে ভালোবাসো, আমাকে পাবে।’ আমি সৃষ্টিকর্তার এ কথাটি অক্ষরে অক্ষরে পালন করে চলেছি। এ জন্য যদি অন্যায় করে থাকি তাহলে আমি করেছি। এতে কারো কিছু বলার থাকলে সে বলুক- আমার কিছু এসে যায় না।

 

 অনুলিখন : জোবায়েদ সুমন

 

স্মৃতিকথা - দি মারশিয়ান

ফুয়াদ বিন নাসের

 

‘দি মারশিয়ান’ চলচ্চিত্রটি দেখতে দেখতেই আমার প্রথম যে কথা বার বার মনে হচ্ছিল তা হলো, এটি একদমই গতানুগতিক ঘরানার একটি ছবি। আপনি যদি বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী ও সাই-ফাই বা থ্রিলার চলচ্চিত্রের ভক্ত হয়ে থাকেন তাহলে দি মারশিয়ান-এর কাহিনীর অন্তিমে কী কী হতে পারে তা আন্দাজ করে মিলিয়ে ফেলাটা খুব একটা কঠিন বা কাকতালীয় কাজ হবে না বলেই মনে করি। রিডলি স্কট-এর এ চলচ্চিত্রটি মঙ্গল গ্রহে এক মহাকাশচারীর একা টিকে থাকার সংগ্রামের কাহিনী। খুব সহজ ভাষায় বলতে গেলে ‘রবিনসন ক্রুসো’ ফরমাটের চিত্রনাট্য এটি। এই ফরমাটের অনেক ভালো চলচ্চিত্র আমরা অনেকই দেখেছিÑ ‘কাস্ট অ্যাওয়ে’, ‘লাইফ অফ পাই’, ‘ইন্টারস্টেলার’, ‘গ্র্যাভিটি’ ইত্যাদি। আমি আগে থেকেই জানতাম, এটি ওই ঘরানার চলচ্চিত্র। এমনকি অ্যান্ডি উইয়ার-এর যে উপন্যাস অবলম্বনে এ ছবির চিত্রনাট্য তাও আমার পড়ার টেবিলে পড়ে আছে প্রায় মাসখানেক হলো। কিন্তু রিডলি স্কট, ম্যাট ডেমন, জেসিকা চ্যাস্টেইন ও শন বিনদের রুপালি পর্দার কারিশমার জৌলুস কমে যাওয়ার ভয়ে ওই বইয়ে হাত দেয়া হয়নি।
ম্যাট ডেমন অভিনয় করেছেন মার্ক ওয়াটনি নামে এক আমেরিকান নভোচারীর ভূমিকায়। কমান্ডার মেলিসা লুইসের (জেসিকা চ্যাস্টেইন) নেতৃত্বে নাসা-র একটি নভোচারীর দল মঙ্গল গ্রহে বেসক্যাম্প স্থাপন করে বিভিন্ন পরীক্ষা চালাচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ এক ভয়াবহ বালুঝড়ে ইমার্জেন্সি টেক অফ করতে বাধ্য হয় কমান্ডার লুইস। ঝড়ে হারিয়ে যাওয়া ওয়াটনি-কে রেখেই তারা মঙ্গল ছাড়তে বাধ্য হয়। এদিকে পৃথিবীতে খবর চলে যায় ওয়াটনি-র মৃত্যুর। সে আসলে তখনো জীবিত, কোনোমতে বেসক্যাম্পে ফিরে আসে। কিন্তু পৃথিবী বা তার সহযাত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ করার উপায় থাকে না। এ জন্য তার লক্ষ্য থাকে যতো বেশিদিন সম্ভব মঙ্গল গ্রহে বেঁচে থাকা। এসব নিয়েই ‘দি মারশিয়ান’ চলচ্চিত্রের কাহিনী এগিয়েছে।
দি মারশিয়ান মুভিটিকে চাইলে আপনি একটি সারভাইভাল টিউটোরিয়াল হিসেবে চালিয়ে দিতে পারেন। পরিচালক রিডলি স্কট সেভাবেই তার চিত্রনাট্য ও সিনেমাটোগ্রাফি সাজিয়েছেন। ওয়াটনি প্রতিদিন নিজের ভিডিও দিনলিপিতে একটি করে অ্যান্ট্রি দেয়। একেকটি ছোট সমস্যা কীভাবে মোকাবেলা বা সমাধান করে এ প্রেক্ষাপটেই তার চরিত্রটি ধীরে ধীরে বিকাশ পেয়েছে রুপালি পর্দায়। ছোট ছোট টিউটোরিয়াল যে কোনো বিজ্ঞান মনস্ক দর্শককেই মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখবে। কীভাবে ফেসপ্লেটের ফাটা সারাবে, নিজের ওপর অপারেশন কীভাবে করবে, মঙ্গলের শুকনো আবহাওয়ায় পানির বন্দোবস্ত কীভাবে করবে, মঙ্গলের মাটিতে কীভাবে আলু চাষ করবে, কীভাবে কথা ছাড়া দ্রুত যোগাযোগ করবে ইত্যাদি ছোট সমস্যার সমাধান করে ওয়াটনির দিন কেটে যায়।


এদিকে পৃথিবীতে নাসা-য় চলছে তোলপাড়। জীবিত এক নভোচারীকে মৃত ঘোষণা দেয়া, তার জীবিত থাকার খবর প্রকাশ করাÑ সব মিলিয়ে নাসার কর্মকর্তারা বিশাল হ্যাপার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। জনগণের কাছে নাসার ভাবমূর্তি ঠিক রাখতে ওয়াটনিকে উদ্ধার করতে অভিযান দল পাঠাতে হবে। এতো অল্প সময়ের মধ্যে কি তারা পারবে মঙ্গল গ্রহের জন্য আরেকটা মিশন পুরোপুরি সম্পন্ন করতে? এসব নিয়েই পৃথিবীর কাহিনী এগিয়েছে।
মঙ্গল ও পৃথিবী ছাড়াও দি মারশিয়ানের আরেকটি কাহিনীর সুতা এগিয়েছে ওয়াটনির বাকি ৫ সহযাত্রীকে নিয়ে। তারা মঙ্গল থেকে পৃথিবীর দিকে যাত্রা করছে ওয়াটনিকে ফেলে আসার গ্লানি বুকে নিয়ে। কাহিনীর এ অংশে চমৎকার একটা চমক আছে যেটা হয়তো একটু অভিজ্ঞ সিনেমাপ্রেমীরা সহজেই আন্দাজ করতে পারবেন।
সাই-ফাই চলচ্চিত্র নির্মাণের ব্যাপারে পরিচালক রিডলি স্কট ওস্তাদ ব্যক্তিই বটে। ‘ব্লেইড রানার’ (১৯৮২), ‘এলিয়েন’ (১৯৭৯) এবং সাম্প্রতিক ‘প্রমিথিউস’ (২০১১) মুভি দিয়েই আমরা বুঝতে পারি, এ ধরনের ছবি তৈরি করতে তার থেকে যোগ্য ব্যক্তি খুব একটা বেশি নেই। এদিকে টিভি সিরিজ ‘লস্ট’ ও ‘ওয়ার্ল্ড ওয়ার জেড’ (২০১৩) খ্যাত চিত্রনাট্যকার ড্রিউ গডার্ড ও বিখ্যাত কল্পবিজ্ঞান লেখক অ্যান্ডি উইয়ার-এর সম্মেলনে চলচ্চিত্রটির যে পটভূমি এবং কাহ্নের বিবর্তন হয়েছে তা যতোই গতানুগতিকই হোক না কেন, যে কোনো দর্শককে ধরে রাখার জন্য যথেষ্ট। ম্যাট ডেমন, জেসিকা চ্যাস্টেইন-এর পাশাপাশি মুভিতে দেখা যাবে শন বিন, ড্যানি গ্লোভার, শিওয়েতেল এজিওফর, কেট মারা-র মতো বড় বড় নাম। শ্রেক, নার্নিয়া, প্রিন্স অফ পারসিয়াখ্যাত সুরকার হ্যারি গ্রেগসন উইলিয়ামস-এর মূর্ছনার ব্যবহার করা হয়েছে খুবই সাবলীলভাবে। মুভিটিতে নখ কামড়ানো উত্তেজনার মুহূর্তগুলোর ব্যাপ্তিকাল কম হলেও আকর্ষণ বেশিই। মার্ক ওয়াটনির প্রতিটি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা, বিপদে পড়া বা বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়ার মুহূর্ত এবং সর্বশেষ ক্লাইম্যাক্সÑ সব জায়গাতেই হ্যারি গ্রেগসন-এর ছোঁয়া মনে দাগ কেটে যাবে।
দি মারশিয়ান চলচ্চিত্রের খারাপ দিক যদি বলতে হয় তাহলে তা আগেই বলেছি, গল্পের প্রেডিক্টিবিলিটি। যা যা ভাববেন, মুভি চলাকালে সেটিই হবে। মুভির চরিত্রগুলোও খানিকটা স্টেরিও টাইপড। সত্যি বলতে কী, ওই মুভিতে নেগেটিভ চরিত্র বলে কিছু নেই। হয়তো নাসার বিজ্ঞাপন প্রজেক্ট বলেই নাসা ও নাসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে একটি ‘ভালো মানুষ’-এর গ-ির মধ্যে নিয়ে আসা হয়েছে। পুরো মুভিতে গতানুগতিক সারভাইভাল মুভির ডার্ক টোনের বদলে হালকা মেজাজ নিয়ে আসার চেষ্টা করা হয়েছে। এক্ষেত্রে অবশ্য অভিনেতাদের সংলাপ ও চিত্রনাট্যকাররা বাহবা কুড়ানোর দাবিদার। ঘন ঘন ওয়াটনি ও অন্যদের হিউমার আপনাকে তার জীবন-মরণ সমস্যার উত্তেজনা থেকে সরিয়ে রাখবে যেটি আসলে মার্ক ওয়াটনিরও উদ্দেশ্য। যেখানে মঙ্গল গ্রহে একা বাকি জীবন কাটানোর ঘোরতর সম্ভাবনা আছে সেখানে সিরিয়াস না হয়ে হালকা মেজাজে থাকাই বরং অধিকতর গ্রহণযোগ্য, কি বলেন?
সব মিলিয়ে দি মারশিয়ান হয়তো রিডলি স্কটের ‘ব্লেড রানার’, ‘এলিয়েন’ বা ‘গ্ল্যাডিয়েটর’-এর মতো তাক লাগানো কোনো চলচ্চিত্র হয়নি। কিন্তু এটিকে আবার ‘প্রমিথিউস’-এর মতো পুরোপুরি হতাশার লাইনেও ফেলে দেয়াটা অন্যায়। যে কোনো দর্শক পুরো ১৪৪ মিনিটই উপভোগ করবে। মুভি শেষে যতো ম্যাট ডেমন বা চ্যাস্টেইন, কেট মারারা থাকুন না কেন, সবচেয়ে ভালোবাসা ও মন খারাপের জন্ম দেবে শ’খানেক আলু!

একুশের চেতনায় রচিত নাটক

‘কবর’

 

 

অনুপম হাসান

 

একুশে ফেব্রুয়ারি ৫২-তে ছাত্ররা পাকিস্তানী তাবেদার প্রশাসন যন্ত্রের ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের করলে সরকারি নির্দেশে মিছিলে গুলি চালানো হয়েছিল; ‘কবর’ নাটকে সেকথা নেতার সংলাপে চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে :
জীবিত থাকতে তুমি দেশের আইন মানতে চাও নি! মরে গিয়ে তুমি এখন পরপারের কানুনকেও অবজ্ঞা করতে চাও। কম্যুনিজমের প্রেতাত্মা তোমাকে ভর করেছে, তাই মরে গিয়েও এখন তুমি কবরে যেতে চাও না। তোমার মত ছেলেরা দেশের মরণ ডেকে আনবে। [নেতা]
পাকিস্তানের দোসর নেতার বক্তব্যে ছাত্রের প্রতি অভিযোগ সম্পূর্ণ অন্যায়, অন্যায্য। কারণ, রাষ্ট্র জোরপূর্বক পূর্ব-পাকিস্তানের জনগণের মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার হরণ করতে চেয়েছিল। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর-পরই পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মি. জিন্নাহ ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে ঢাকা সফরে এসে পাকিস্তানের মাত্র সাড়ে সাত শতাংশ মানুষের মুখের ভাষা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করলে, বাঙালি ছাত্রসমাজ ও সাধারণ জনগণ তাৎক্ষণিকভাবেই গভর্নর জেনারেলের অন্যায় প্রস্তাবের বিরোধিতা করে তা প্রত্যাখ্যান করে। বাঙালি জনগণের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রীয় সমঝোতার স্বার্থে ৫৬% মানুষের মুখের ভাষা বাংলার হওয়ার পরও উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকেও রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেয়ার দাবি উত্থাপিত হয়। কিন্তু মি. জিন্নাহ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, যারা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকার করবে, ধরে নেয়া হবে তারা পাকিস্তান রাষ্ট্রের সংহতি চায় না এবং তারা পাকিস্তানের বিরোধী; আর পাকিস্তানের বিরোধী কাউকে বরদাস্ত করা হবে না। মি. জিন্নাহর এ বক্তব্যে বাঙালি জনগণ ভীষণভাবে নিরাশ হন; সদ্য স্বাধীনতা লাভ করেও বাঙালি জাতি অনুভব করতে থাকে পরাধীনতার শৃঙ্খল। ফলে ভাষার দাবিকে সামনে রেখে বাংলার নেতৃবৃন্দ বিশেষত ছাত্রসমাজ অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। দফায় দফায় ভাষার আন্দোলন তীব্রতর হতে থাকলে এক পর্যায় তা পাকিস্তান রাষ্ট্রের চূড়ান্ত মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পরিণাতে ছাত্রসমাজের ভাষা-আন্দোলনকে চিরতরে নস্যাৎ করে দেয়ার হীন পরিকল্পনা নিয়ে ৫২-র একুশে ফেব্রুয়ারির পূর্বাহ্ণেই ১৪৪ ধারা জারি করা হয়, যাতে ছাত্ররা মিছিল-মিটিং করতে না পারে। দুর্বিনীত যৌবনের সামনে মৃত্যুভয় তুচ্ছ। তাই ছাত্ররা ২১ ফেব্রুয়ারি একে একে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের সামনে জড়ো হয়ে একক বৃহৎ মিছিলের পরিবর্তে খ- খ- মিছিল বের করে এবং পুলিশী বাধার সম্মুখিন হয়। এক পর্যায় পুলিশ গুলি চালালে নিহত হয়Ñ রফিক, সালাম, বরকত, জব্বার ও নাম না জানা অনেকে।

মুনীর চৌধুরী নিজেও ভাষার দাবিতে বাঙালির আন্দোলনের সাথে ওতোপ্রতোভাবে যুক্ত ছিলেন। তিনি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষক। ভাষা আন্দোলনের সাথে যুক্ত থাকার অভিযোগ তিনি গ্রেফতার হয়ে কারাগারে অন্তরীণ হন। প্রতিভাবান শিক্ষক মুনীর চৌধুরী কারারক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে ১৯৫৩ সালের ১৭ জানুয়ারি ‘কবর’ নাটক রচনা করেন। প্রথমবারের মতো ভাষা-শহীদ দিবস পালনের উদ্দেশ্যে ‘কবর’ কারাগারের অন্তরীণ রাজবন্দীদের দ্বারা অভিনয়ের জন্য। ভাষা আন্দোলন নিয়ে রচিত ‘কবর’ই প্রথম সাহিত্যিক প্রতিবাদী প্রয়াস।
একুশে ফেব্রুয়ারি ৫২-তে ছাত্ররা পাকিস্তানী তাবেদার প্রশাসন যন্ত্রের ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের করলে সরকারি নির্দেশে মিছিলে গুলি চালানো হয়েছিল; ‘কবর’ নাটকে সেকথা নেতার সংলাপে চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে :
জীবিত থাকতে তুমি দেশের আইন মানতে চাও নি! মরে গিয়ে তুমি এখন পরপারের কানুনকেও অবজ্ঞা করতে চাও। কম্যুনিজমের প্রেতাত্মা তোমাকে ভর করেছে, তাই মরে গিয়েও এখন তুমি কবরে যেতে চাও না। তোমার মত ছেলেরা দেশের মরণ ডেকে আনবে। [নেতা]
পাকিস্তানের দোসর নেতার বক্তব্যে ছাত্রের প্রতি অভিযোগ সম্পূর্ণ অন্যায়, অন্যায্য। কারণ, রাষ্ট্র জোরপূর্বক পূর্ব-পাকিস্তানের জনগণের মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার হরণ করতে চেয়েছিল। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর-পরই পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মি. জিন্নাহ ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে ঢাকা সফরে এসে পাকিস্তানের মাত্র সাড়ে সাত শতাংশ মানুষের মুখের ভাষা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করলে, বাঙালি ছাত্রসমাজ ও সাধারণ জনগণ তাৎক্ষণিকভাবেই গভর্নর জেনারেলের অন্যায় প্রস্তাবের বিরোধিতা করে তা প্রত্যাখ্যান করে। বাঙালি জনগণের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রীয় সমঝোতার স্বার্থে ৫৬% মানুষের মুখের ভাষা বাংলার হওয়ার পরও উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকেও রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেয়ার দাবি উত্থাপিত হয়। কিন্তু মি. জিন্নাহ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, যারা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকার করবে, ধরে নেয়া হবে তারা পাকিস্তান রাষ্ট্রের সংহতি চায় না এবং তারা পাকিস্তানের বিরোধী; আর পাকিস্তানের বিরোধী কাউকে বরদাস্ত করা হবে না। মি. জিন্নাহর এ বক্তব্যে বাঙালি জনগণ ভীষণভাবে নিরাশ হন; সদ্য স্বাধীনতা লাভ করেও বাঙালি জাতি অনুভব করতে থাকে পরাধীনতার শৃঙ্খল। ফলে ভাষার দাবিকে সামনে রেখে বাংলার নেতৃবৃন্দ বিশেষত ছাত্রসমাজ অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। দফায় দফায় ভাষার আন্দোলন তীব্রতর হতে থাকলে এক পর্যায় তা পাকিস্তান রাষ্ট্রের চূড়ান্ত

মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পরিণাতে ছাত্রসমাজের ভাষা-আন্দোলনকে চিরতরে নস্যাৎ করে দেয়ার হীন পরিকল্পনা নিয়ে ৫২-র একুশে ফেব্রুয়ারির পূর্বাহ্ণেই ১৪৪ ধারা জারি করা হয়, যাতে ছাত্ররা মিছিল-মিটিং করতে না পারে। দুর্বিনীত যৌবনের সামনে মৃত্যুভয় তুচ্ছ। তাই ছাত্ররা ২১ ফেব্রুয়ারি একে একে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের সামনে জড়ো হয়ে একক বৃহৎ মিছিলের পরিবর্তে খ- খ- মিছিল বের করে এবং পুলিশী বাধার সম্মুখিন হয়। এক পর্যায় পুলিশ গুলি চালালে নিহত হয়Ñ রফিক, সালাম, বরকত, জব্বার ও নাম না জানা অনেকে।
মুনীর চৌধুরী নিজেও ভাষার দাবিতে বাঙালির আন্দোলনের সাথে ওতোপ্রতোভাবে যুক্ত ছিলেন। তিনি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষক। ভাষা আন্দোলনের সাথে যুক্ত থাকার অভিযোগ তিনি গ্রেফতার হয়ে কারাগারে অন্তরীণ হন। প্রতিভাবান শিক্ষক মুনীর চৌধুরী কারারক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে ১৯৫৩ সালের ১৭ জানুয়ারি ‘কবর’ নাটক রচনা করেন। প্রথমবারের মতো ভাষা-শহীদ দিবস পালনের উদ্দেশ্যে ‘কবর’ কারাগারের অন্তরীণ রাজবন্দীদের দ্বারা অভিনয়ের জন্য। ভাষা আন্দোলন নিয়ে রচিত ‘কবর’ই প্রথম সাহিত্যিক প্রতিবাদী প্রয়াস।

‘কবর’ মুনীর চৌধুরীর গতানুগতিক নাট্যধারার বাইরে অভিনব রচনা। বাঙালি জাতীয় চেতনার উদ্বোধন এ নাটকে জেলখানার অভ্যন্তরে অভিনয়ের যোগ্য প্রকরণ কৌশলে রচনা করেছিলেন মুনীর চৌধুরী। স্পষ্টতই নাটকটির প্রেক্ষাপট বাঙালি জাতীয় চেতনার উদ্বোধনে যে ভাষার দাবি শুরু হয়েছিল, তা। ৫২-র একুশে ফেব্রুয়ারির পরের বছর [১৯৫৩] মুনীর চৌধুরী তখন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে অন্তরীণ অবস্থায় রচনা করেছিলেন। ‘কবর’ রচনা প্রসঙ্গে রামেন্দু মজুমদার জানিয়েছেন :
১৯৫৩ সাল। আগের বছর একুশে ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী ঢকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাজবন্দী। সে সময় কারাগারে তাঁর সঙ্গে আরও ছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, আবুল হাশিম, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ, মওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ, অধ্যাপক অজিত গুহ প্রমুখ। অপর একটি কক্ষে অন্যদের সঙ্গে ছিলেন প্রগতিশীল সাংবাদিক-সাহিত্যিক রণেশ দাশগুপ্ত। তিনি গোপনে একটি চিঠি পাঠালেন মুনীর চৌধুরীকে। অনুরোধ ছিল একুশের স্মরণে জেলখানার ভেতরে রাজবন্দীরা অভিনয় করতে পারে এমন একটি নাটক মুনীর চৌধুরীকে লিখে দিতে হবে। নাটক হবে রাত ১০টার পর জেলের বাতি নিভিয়ে দিয়ে হারিকেনের আলোয়।
রণেশ দাশগুপ্তের অনুরোধে একুশের প্রেক্ষাপটে ‘কবর’ রচনা করেছিলেন মুনীর চৌধুরী। ‘কবর’ মূলত রচিত হয়েছিল জেলখানার অভ্যন্তরে অভিনয়ের জন্য প্রথম ভাষা-শহীদ দিবস পালনার্থে। ‘কবর’ রচনার প্রসঙ্গে রামেন্দু মজুমদ জানিয়েছেন :
মুনীর চৌধুরী ভাবলেন সেট ও আলোর ব্যবস্থা থাকবে না; তাই সেই সীমাবদ্ধাতাকে কাজে লাগাতে হবে। তিনি নাটকের ঘটনাস্থল হিসেবে বেছে নিলেন গোরস্থানকে, যেখানে সেটের প্রয়োজন নেই। সময় শেষ রাত। [...] জেলখানায় নারী চরিত্রের অভিনেত্রী যাওয়া যাবে না বলে কবর নাটকে নাট্যকার কোনো নারী চরিত্র রাখেন নি। কেবল নাটকীয় মুহূর্তে ইন্সপেক্টর হাফিজ মাথায় চাদর টেনে নারীর অভিনয় করেন।
নাটকের সেট ও পরিবেশ সম্বন্ধে আগে থেকেই অবহিত থাকার কারণে, মুনীর চৌধুরী অত্যন্ত স্বল্প পরিসরে গুটিকয়েক চরিত্রের সহায়তায় বাঙালির ভাষার দাবির যৌক্তিকতা এবং প্রতিবাদ প্রকাশ করেছেন। মেরুদ-হীন পুলিশ ইন্সপেক্টর হাফিজ পাকিস্তান প্রশাসনের অন্যায় [গুলি করে ছাত্র হত্যা এবং লাশ গুম করার ঘটনা] ধামা-চাপা দেয়ার কাজে নিয়োজিত। কিন্তু কবরস্থানের জীবন্ত বাসিন্দা মুর্দা-ফকির লাশের কথা জেনে গেছে ভেবে রাজনৈতিক নেতা ভয় পেলে ইন্সপেক্টর তাকে আশ্বস্ত করে বলে :
মুর্দা-ফকির ঝড়ও বোঝে না, আগুনও বোঝে না। ও ত একরকম কবরের বাসিন্দা। ভাষার দাবিতে মিছিল বেরিয়েছিল বলে পুলিশ গুলি করে কয়েকটাকে খতম করে দিয়েছেÑ এত কথা বোঝার মত জ্ঞান-বুদ্ধি ওর নেই। [হাফিজ]
পুলিশ ইন্সপেক্টর একথার মাধ্য দিয়ে নেতাকে আশ্বস্ত করতে চাইলেও নেতার মনের সংশয় দূর হয় নি। কারণ, কারফিউ শেষ হওয়ার পর যদি মুর্দা-ফকির এই লাশের খবর ছাত্রদের দেয়, তাহলে আবারো গোলমাল বেধে যাবে, ছাত্রসমাজ আবারো মিছিল বের করবে।

 

নাটকের সেট ও পরিবেশ সম্বন্ধে আগে থেকেই অবহিত থাকার কারণে, মুনীর চৌধুরী অত্যন্ত স্বল্প পরিসরে গুটিকয়েক চরিত্রের সহায়তায় বাঙালির ভাষার দাবির যৌক্তিকতা এবং প্রতিবাদ প্রকাশ করেছেন। মেরুদ-হীন পুলিশ ইন্সপেক্টর হাফিজ পাকিস্তান প্রশাসনের অন্যায় [গুলি করে ছাত্র হত্যা এবং লাশ গুম করার ঘটনা] ধামা-চাপা দেয়ার কাজে নিয়োজিত। কিন্তু কবরস্থানের জীবন্ত বাসিন্দা মুর্দা-ফকির লাশের কথা জেনে গেছে ভেবে রাজনৈতিক নেতা ভয় পেলে ইন্সপেক্টর তাকে আশ্বস্ত করে বলে

 

মুনীর চৌধুরী ‘কবর’ নাটকের সংক্ষিপ্ত পরিসরে ব্যবহার করেছেন রূপক। তিনি সচেতনভাবেই নাট্যঘটনায় রূপক আরোপ করেছিলেন। নাট্যঘটনায় দেখা যায়, কবর থেকে ছাত্রদের লাশ উঠে এসে বাঁচার কথা বলেছে, দাবি তুলেছে। অর্থাৎ ভাষার দাবিতে যারা নিহত হয়েছিল তারা কবরে না থাকার কথা বলেছে। এ ঘটনা সম্পূর্ণ রূপক; এ রূপকের মধ্য দিয়ে নাট্যকার একইসাথে দুটো ব্যাপার হাজির করতে চেয়েছেন :
এক. যে ছাত্রদেরকে ভাষার দাবিতে মিছিল করার অপরাধে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল, তাদের কারোই স্বাভাবিক মৃত্যু বয়স হয় নি; অপঘাতে মৃত্যু না হলে স্বাভাবিক নিয়মে তাদের বেঁচে থাকার কথা।
দুই. ভাষার দাবিতে যারা ৫২-র একুশে ফেব্রুয়ারি শহীদ হয়েছিল, তারা দৈহিকভাবে কবরে গেলেও চির অমর হয়ে মানুষের অন্তরলোকে থেকে যাবে; অথবা বলা যায় বেঁচে থাকবে।
নাট্যকার মুনীর চৌধুরীর এই দূরদর্শী ভাবনা যে কতখানি সঠিক ছিল, তা আজকের দিনে বুঝতে অসুবিধা হয় না। কারণ, ৫২-র ভাষা আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছিলেন, তাঁদের পবিত্র স্মৃতির উদ্দেশ্যে দেশব্যাপী শহীদ মিনার তৈরি করা হয়েছে এবং তাঁদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করেই বিশ্বব্যাপী একুশে ফেব্রুয়ারি ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা’ দিবস হিসেবে পালন করা হয়। দৈহিকভাবে হয়তো ৫২-র একুশে ফেব্রুয়ারিতে যারা পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছিল তাদেরকে কবরস্থ করা গেছে; কিন্তু তাদের এই মহান আত্মত্যাগের কোনোদিন মৃত্যু ঘটবে না, তাদের চেতানাকে কবরস্থ করা যায় নি। বরং তা বাংলার ভৌগোলিক সীমা অতিক্রম করে এখন সমগ্র পৃথিবীর মানুষের নিকট পরিচিত লাভ করেছে। অর্থাৎ ভাষার দাবিতে মৃত্যুবরণ করেও রফিক, সালাম, বরকত, জব্বার প্রমুখ ভাষা-শহীদ চির অমরত্ব লাভ করেছে। মুনীর চৌধুরী নাটকে মুর্দা-ফকিরের সংলাপে ভাষা-শহীদগণের সেই অমরত্বের ইঙ্গিত দিয়ে বলেছে :
এ লাশের গন্ধ অন্যরকম। ওষুধের, গ্যাসের, বারুদের গন্ধ। এ-মুর্দা কবরে থাকবে না। বিশ-পঁচিশ-ত্রিশ হাত যত নীচেই মাটি চাপা দাওনা কেনÑ এ মুর্দা থাকবে না। কবর ভেঙে বেরিয়ে চলে আসবে। উঠে আসবে। [মুর্দা-ফকির]
কথাবাহুল্য, মুনীর চৌধুরীর এ ধারণা যে কতখানি সত্য, তা আজ বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে একুশে ফেব্রুয়ারি পালনের মধ্য দিয়েই প্রতীয়মান। মানুষ অমর নয় জগতে, নশ্বর প্রাণী এবং তার মৃত্যু অনিবার্য। যে মানুষের মৃত্যু বৃহৎ অথবা মানব-কল্যাণে কোনো মহৎ চেতনা প্রতিষ্ঠার জন্য হয়, সেই মৃত্যু পরিণামে যে চির-অমরত্ব লাভ করে, তা ভাষা-শহীদগণের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হয়েছে।

‘কবর’ নাটকের মূল্যায়ন করতে গিয়ে নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন : ‘বাংলাদেশের প্রথম প্রতিবাদী রাজনৈতিক নাটক কবর। কবর-এর হাত ধরেই পরবর্তীকালে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর রচিত ও প্রযোজিত হয়েছে অনেক প্রতিবাদী নাটক।’ এই বিবেচনায় বাংলাদেশের নাট্যধারায় ‘কবর’ নাটকের মর্যাদা অনেকটা পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

‘কবর’ একাঙ্ক বিশিষ্ট নাটক। চরিত্র বেশি নেই নাটকে। নেতা, পুলিশ ইন্সপেক্টর হাফিজ, মুর্দা-ফকির, কবরস্থানের একজন গার্ড ও কয়েকটি ছায়া-চরিত্র। অল্প এ কয়েকটি চরিত্রের মাধ্যমে মুনীর চৌধুরী ভাষা আন্দোলনের পূর্বাপর প্রেক্ষাপট এবং তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর অত্যাচারী মানসিকতার পরিচয় তুলে ধরেছেন অত্যন্ত সফলভাবে। নাটকে নেতা হচ্ছেÑ শাসকশ্রেণীর অত্যাচারী ও নিষ্ঠুরতার প্রতীক; মুর্দা-ফকির সেই শাসক শ্রেণীর বিরুদ্ধে বাঙালি জাতিসত্তার জাগ্রত বিবেক। ইন্সপেক্টর হাফিজ শাসক শ্রেণীর তোষামুদে মেরুদ-হীন মধ্যবিত্ত চাকুরে শ্রেণীর প্রতিনিধি। ছায়া-চরিত্রগুলো তারুণ্যের প্রতিনিধিত্ব করেছে, যারা মৃত্যুবরণ করার পরও বেঁচে থাকার আকাক্সক্ষা প্রকাশের মধ্য দিয়ে ইতিহাসের পাতায় অমরত্বের ঘোষণা করেছে। সামগ্রিকভাবে ‘কবর’ ভাষা আন্দোলন নিয়ে রচিত একটি সফল নাটক, যা বাঙালি জাতির বিবেকের প্রতিনিধিত্ব করেছে সমকালে। আজো নাটকটির প্রাসঙ্গিকতা হচ্ছে এইÑ এখানে ভাষার প্রতি মানুষের যে মমত্ববোধ ও সংগ্রামী চেতনার প্রকাশ ঘটেছে, তা কোনো কালেই ম্লান হবে না। ভাষা-সংগ্রামীদের আত্মত্যাগের মাধ্যমে আজকের মানুষ তার মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার চেতনায় উজ্জীবিত হয়।

 

ফেক আইডি

শিবশংকর দেবনাথ

 

মাথার পেছনে কেউ খোঁচা মারছে। ভাবলাম, কেউ হয়তো ভুল করে মেরেছে। দ্বিতীয়বার ভদ্রতা দেখানোর ভান করে পেছনে তাকালাম না। কিন্তু তৃতীয়বারও মারল। এখন সিরিয়াসলি নিতেই হয়। পেছনের সিটে তাকিয়ে দেখি খুব পরিচিত মুখ। জীবনের চরম এক মঞ্চস্থ গল্পের সহকারী শিল্পী এখন আমার পেছনের সিটে বসা। ফুলের নামে যার নাম, ফুলের মতোই সুন্দর হাসি যার- সেই সুন্দর মনের অধিকারী বকুল। অবশ্য গল্পে আমারও চরিত্র ছিল। একটি নয়, দুটি- নায়ক ও ভিলেন।
হাস্যোজ্জ্বল ভঙ্গিতে বকুল বললেন, কষ্ট করে মাথা ঘুরিয়ে পেছনে তাকানোর জন্য ধন্যবাদ। আমাকে চিনতে নিশ্চয় আপনার কোনো সমস্যাই হয়নি।
-সমস্যা হওয়ার প্রশ্নই আসে না। যে গল্প আমাকে আজও তাড়িয়ে বেড়ায় সেই গল্পের সহকারী শিল্পী আপনি। আর আপনাকেই ভুলে যাবো? এটাও কি সম্ভব! তা যাচ্ছেন কোথায়?
ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে, আপনি?
-আপাতত আমারও লক্ষ্য ময়মনসিংহ। এরপর হয়তো নেত্রকোনায়ও যেতে পারি।
স্বপ্ন ভাই, আপনি কি সেই মেয়েটির পরিবারের সন্ধান পেয়েছিলেন?
-হুম, পেয়েছিলাম। কিন্তু আমিই ভিলেন- এটা বলতে পারিনি। অনেকবার চেষ্টা করেছি বলতে। কিন্তু...।
ভাগ্যচক্রে তারুণ্যের সাপ্তাহিক ‘টিনএজ’ পত্রিকার সহ-সম্পাদকের দায়িত্ব পেয়েছিলাম। সব সহকর্মীকে নিয়ে আনন্দেই কেটে যাচ্ছিল দিনগুলো। যতটা না সময় অফিসে সম্পাদনার কাজে কাটাতাম, এর চেয়ে বেশি কাটাতাম ফেসবুকে। সহকর্মী কাম বন্ধু বকুল মাঝে মধ্যে এসে খোঁচা মারলেও খুব একটা ঝামেলা করতো না। ওই ঝামেলাবিহীন সময়ে নিজের আসল আইডির পাশাপাশি ফেক আইডিতে মেয়েদের সঙ্গে চ্যাট করে সময় কাটানোর নেশায় এক ধরনের আসক্তই হয়ে পড়ি।
একদিন রাতে সাপ্তাহিক পত্রিকার আউটপুট দেয়ার পর আমি ও বকুল অফিসেই থেকে যাই। আমি মগ্ন ফেসবুক ফেক আইডিতে চ্যাটে আর বকুল ঋৎবব ঈবষষ তাস খেলায়।
তানজিনা ফেরদাউস নামে একটি আইডির সঙ্গে আমার ফেক আইডির ‘আমি মানুষ’ ঘনিষ্ঠতা বেশ পুরনো। প্রায় প্রতিদিনই হাই, হ্যালো চলে আমাদের মধ্যে। তানজিনা এবিসি ইউনির্ভাসিটিতে ফ্যাশন ডিজাইনে পড়তো। আর ‘আমি মানুষ’ মানে আমার ফেক আইডির পরিচয় ছিল সদ্য জার্মানি থেকে ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফেরা ধনী বাবার একমাত্র আদরের সন্তান। তানজিনা সেদিন রাতেও অনলাইনে ছিল। কিন্তু আমার চ্যাটে সাড়া দিচ্ছিল না। অনবরত হাই-হ্যালো করতে করতে এক সময় তানজিনা জানালো, তার মন ভালো নেই। তাই চ্যাট করতে তার ইচ্ছা করছে না। কারণ জিজ্ঞাসা করলে সে জানালো, ফিনানশিয়াল প্রবলেম। শিক্ষা সফরে যেতে তার ৩০ হাজার টাকা লাগবে। ২০ হাজার টাকা কোনো রকমে ম্যানেজ হলেও আর ১০ হাজার টাকার জন্য সে যেতে পারছে না। টিউশনি করে যা ইনকাম করে, তা দিয়ে কোনো রকমে হোস্টেল ও নিজের খরচ হয়ে যায়। আর সেমিস্টার ফি আসে গ্রামের বাড়ি থেকে। এ অবস্থায় শিক্ষা সফর তার কাছে কিছুটা বিলাসিতাও বটে।

বলে রাখা ভালো, ফেক আইডির আড়ালে চ্যাট করতে করতে আমারও একটা সফট কর্নার তৈরি হয়েছিল তানজিনার প্রতি। কিন্তু ভয়ও পেতাম এই মনে করে, যদি তানজিনার আইডিও ফেক হয়! মনে মনে ভাবলাম, সুযোগটা হাতছাড়া করা মোটেও উচিত হবে না। তার আইডিও ফেক কি না তা যাচাইয়ের এটিই উত্তম সময়। আমি চালাকি করে তানজিনাকে জানালাম, বন্ধু হিসেবে শিক্ষা সফরের ১০ হাজার টাকা ধার দিতে রাজি আছি। আমার মোবাইল ফোন নাম্বার দিয়ে বললাম সকাল ৯টায় ধানম-ি ৮ নাম্বারে এসে টাকা নিয়ে যেতে।
আমি ভেবেছিলাম, আমার মতো হয়তো তানজিনাও অনেকটা মজা করার জন্য এই নাটক করেছে। কিন্তু তা হয়নি। সকাল ৯টা বাজার আগেই তানজিনার ফোন। সে এখন ধানম-ির ৮ নাম্বারে রবীন্দ্রসরোবরের সামনে দাঁড়িয়ে।
আমি ঘাবড়ে গেলাম। কী করব এখন? সামনে যাবো কী করে? বকুল বললো, চলেন আমরা মেয়েটাকে দেখে আসি। আর দেখতে গেলে টাকা লাগবে কেন? মেয়েটা আপনাকে চিনবে কী করে? ফেক আইডিতে আপনার কি অরিজিন্যাল ছবি আছে?
দু’জন রবীন্দ্রসরোবরে গিয়ে তানজিনার মোবাইল ফোনে কল দিলাম। জানতে চাইলাম, কী ড্রেস পরে এসেছে সে। লক্ষ্মী মেয়ের মতো তানজিনা বললো, লাল কামিজ, ওড়না ও সালোয়ার সবুজ। ফোন কেটে দিয়ে বকুলকে নিয়ে আড়ালে লুকিয়ে তানজিনাকে দেখি।
ছবির থেকেও বাস্তবের চেহারা সুন্দর। তবে কেমন যেন একটা আতঙ্কের ছাপ। লাল কামিজ, সবুজ সালোয়ার-ওড়নায় চমৎকার মানিয়েছে। দেখে ভদ্রঘরের মেয়েই মনে হলো। আর এ দেখা থেকেই সফট কর্নার আরো সফট হয়ে পড়ে। নিজেকে প্রেমিক প্রেমিক ভাবতে লাগলাম। কিন্তু ১০ হাজার টাকা তো আমার পকেটে নেই। টাকা ম্যানেজ করার জন্য এই বন্ধু, ওই বন্ধুকে ফোন করতে লাগলাম। কাছের কোনো বন্ধুকে বাকি রাখিনি। একেকজন একেক ধরনের বাহানা তুলে কেউই টাকা দিতে রাজি হলো না। অবশেষে কিছুটা দূরের এক বন্ধু রিপন টাকা দিতে রাজি হলো। কিন্তু টাকা নিয়ে আসতে কম করে হলেও এক ঘণ্টা সময় লাগবে। এরই মধ্যে বার বার ফোন দিচ্ছে তানজিনা। একবার বলি, রেডি হচ্ছি। অন্যবার বলি, বের হচ্ছি। এমন নানান কথা বলে সময় ক্ষেপণ করতে লাগলাম। কেননা সত্যি কথা বলতে এই মুহূর্তে সৎসাহস আমার হচ্ছে না যদি ভুল বুঝে রাগ করে চলে যায়!
এক ঘণ্টার আগেই রিপন টাকা নিয়ে হাজির। অফিসের সামনে এসেই ফোন দিল আমাকে।
যাক, এবার তাহলে তানজিনার মুখোমুখি হওয়া যাবে। রিপনের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা নিয়ে তানজিনা যেখানে দাঁড়িয়েছিল সেখানে গেলাম। কিন্তু কোথায় সেই লাল ড্রেস পরা তানজিনা? এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখি কোথাও নেই। ফোন দিলাম, সুইচ অফ। বেশ খানিকটা দূরে মানুষের জটলা চোখে পড়লো। আগ্রহ নিয়ে আমরা জটলার কারণ অনুসন্ধানে এগিয়ে গেলাম। জটলা ভেদ করে ভেতরে ঢুকেই আমি হতবাক! বকুল আর আমি একে অন্যের দিকে তাকাচ্ছি। রক্তে লাল হয়ে লাল ড্রেস পরা মেয়েটার নিথর দেহটা পড়ে আছে রাস্তায়। একটু আগেও যে বার বার আমাকে অজানা আতঙ্ক নিয়ে ফোন দিচ্ছিল, এখন সে মহাকালের পথে। গল গল করে চোখ বেয়ে জল পড়ছে। বুক চাপড়ে কাঁদতে ইচ্ছা করছে। এই ভুলের কি প্রায়শ্চিত্ত সম্ভব? একটি মিথ্যা, একটি ভুল, একটু রসিকতা এতো নির্মম বাস্তবতার সম্মুখীন করবে- স্বপ্নেও কখনো চিন্তা করিনি।
বকুলের ধাক্কায় ঘোর কাটলো। এরই মধ্যে বাস ময়মনসিংহের মাসকান্দায়, সঙ্গে আমরাও। এখন নামতে হবে।

 লরেন্স অফ অ্যারাবিয়া: ওমর শরীফ

টুম্পা রায়

 

চলচ্চিত্র সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না। ইউরোপে পড়াশোনা করার ফলে একদিন অভিনয়ের নেশা ঢুকে যায় মাথার ভেতর। গণিত আর পদার্থবিদ্যায় জ্ঞান অর্জন করে কীভাবে একজন অভিনয়ের প্যাশন মাথায় বহন করে ঘুরে বেড়ায় এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বিশ্ব চলচ্চিত্রে এক প্রাজ্ঞজন মিসরীয় অভিনেতা ওমর শরিফ।
‘লরেন্স অব অ্যারাবিয়া’, ‘ডক্টর জিভাগো’, ‘ম্যাকেনাস গোল্ড’ ও ‘ফানি গার্ল’ ছবির অভিনেতা ওমর শরিফ। তার পুরো নাম মাইকেল দিমিত্রি শেলুব। তার অভিনীত বেশকিছু বিখ্যাত চলচ্চিত্রের মধ্যে অস্কার পুরস্কারের জন্য তিনি একবার মনোনীত হয়েছিলেন। তিনবার ‘গোল্ডেন গ্লোব’ ও একবার ‘সিজার’ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।
১৯৩২ সালের ১০ এপ্রিল মিসরের আলেকজান্দ্রিয়া শহরে লেবাননের বংশোদ্ভূত লেবানিজ ক্যাথলিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ওমর শরিফ। তার আসল নাম ছিল মিচেল শালহাউব। তার বাবা জোসেপ শেলুব বিশ শতকের ধনাঢ্য কাঠ ব্যবসায়ী। লেবানন থেকে তিনি বসত গড়েন মিসরে। এখানেই জন্ম হয় বিখ্যাত অভিনেতা ওমর শরিফের। এরপর তার পরিবার চলে যায় কায়রোয়। তখন তার বয়স চার। তার মা ক্লোয়ার সাদা ছিলেন তৎকালিন কায়রোর অভিজাত নারীদের মধ্যে খুবই জনপ্রিয়। তখনকার মিসরের রাজা ফারুক ১৯৫২ সালে সিংহাসনচ্যুত হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রায় নিয়মিতই আসতেন তার মায়ের কাছে।
বিখ্যাত এই অভিনেতা ১৯৬২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ধ্রুপদী চলচ্চিত্র ‘লরেন্স অফ অ্যারাবিয়া‘র মাধ্যমে প্রথম চলচ্চিত্রপ্রেমী মানুষের নজরে আসেন। এ ছবিটি ছিল তারকাবহুল। পিটার ওটুল, আলেগ গিনেস, অ্যান্থনি কুইন, জ্যাক হকিংসের মতো জাঁদরেল অভিনেতাদের সঙ্গে এ ছবিতে ছিলেন ওমর শরিফও। শেরিফ আলি চরিত্রে তার অনবদ্য অভিনয় তাকে তারকাখ্যাতি এনে দেয়। এতে অভিনয়ের জন্য তিনি সেরা পার্শ্বচরিত্রের অভিনয়শিল্পী হিসেবে একাডেমি অ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনীত হন।
মিসরীয় বংশোদ্ভূত এই শিল্পী আলেকজান্দ্রিয়া শহরের ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্র থাকাকালেই নিজের মেধার প্রমাণ দেন ‘ভাষার’ ওপর। কিন্তু তিনি কায়রো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞান ও গণিতে স্নাতক পাস করে পারিবারিক কাঠ ব্যবসা শুরু করেন বাবার সঙ্গে। অভিনয়ে আগ্রহী হয়ে উঠলে লন্ডনের রয়াল অ্যাকাডেমি অফ ড্রামাটিক আর্টে ভর্তি হন নাটক বিষয়ে। এরপর তিনি চলচ্চিত্রজগতে আসেন। ওমর শরিফ শুধু মিসরীয় অভিনেতাই নন, বিশ্ব চলচ্চিত্রের প্রভাবশালীও বটে। অভিনয়ের ঝোঁক থেকে হঠাৎ একদিন রিয়াল লাইফ থেকে রিল লাইফে ঢুকে পড়েন অভিনয় সাম্রাজ্যের এই মহান পুরুষ। এর আগে অভিনয়ের ওপর পড়াশোনাও করেন। লন্ডনে নাট্যকলার ওপর পড়ালেখা করে নিজ ভূমি মিসরে ফেরেন তিনি। ১৯৫৪ সালে মিসরীয় ‘শাইতান আল সাহারা’ অর্থাৎ ‘ডেভিল অব দ্য ডেজার্ট’ ছবিতে প্রথম অভিনয়ও করেন। গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে না হলেও নিজের অজান্তেই যেন তার ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার দাঁড়িয়ে যায় চলচ্চিত্রের পথে। ছোট্ট চরিত্র। তবুও তার অভিনয় ক্ষমতায় মুগ্ধ হন স্বয়ং নির্মাতা ইউসুফ চাহিনি। ওই বছরেই তাকে আরেকটি সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্রের জন্য নির্বাচন করেন ইউসুফ। মাত্র একটি ছবিতে ছোট্ট চরিত্রে অভিনয় করেই কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে যাবেন তা ভাবতেই পারেননি ওমর! প্রকৃতপক্ষে দ্বিতীয় ছবি ‘স্ট্রাগল ইন দ্য ভেলি’র মধ্য দিয়েই রিল লাইফ ও রিয়াল লাইফে গতিসঞ্চার করেন ওমর। এ ছবির শ্যুটিং করতে গিয়ে মোহাবিষ্ট হয়ে পড়েন তিনি। বিভিন্ন কারণেই ছবিটি বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বা লিখনীতে তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দিক বলে উল্লেখ করেছেন। কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে তার প্রথম ছবি বলেই এটি গুরুত্বপূর্ণ নয়। মূলত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে বলা যেতে পারে, এ ছবিতে অভিনয় করতে গিয়েই প্রথম প্রেমে পড়েন তিনি!
ওমর শরিফের সাক্ষাৎ হয় ওই সময়ের জনপ্রিয় ও বিতর্কিত অভিনেত্রী ফাতেন হামামার সঙ্গে। তার রূপে মুগ্ধ ছিলেন তখনকার মিসরীয় ধনাঢ্য ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে খ্যাতিমান তারকারাও। ওই হিসেবে চলচ্চিত্রে নবাগত ওমর শরিফ ছিলেন চুনোপুঁটি। দ্বিতীয় ছবি করতে ক্যামেরার সামনে তিনি যখন দাঁড়িয়েছেন তখন ফাতেন ৪০টিরও বেশি ছবিতে অভিনয় করে ফেলেছেন। ওই ছবিতে প্রেমিক-প্রেমিকার হিসেবে ওমর ও ফাতেন-এর একটি চুমুর দৃশ্য ছিল। প্রথমে ওমর দৃশ্যটি নিয়ে ইতস্তত করছিলেন। কারণ এর আগে তো এমন পরিস্থিতে তাকে পড়তে হয়নি। অবশেষে ক্যামেরার সামনে ফাতেনকে চুমু দিতে দাঁড়িয়ে গেলেন তিনি। খুব সুন্দরভাবে ইউসুফ তা ক্যামেরাবন্দি করলেন। কিন্তু পর্দার ওই চুমু তাদের বাস্তব জীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। এক চুমু দিয়েই প্রেমে হাবুডুবু খান ওমর-ফাতেন। তাদের প্রেম আরো গাঢ় হতে থাকে। এক সময় তারা সিদ্ধান্ত নেন বিয়ে করবেন। কিন্তু তাদের ধর্ম তো এক নয়। ফাতেন মুসলিম ঘরের সন্তান। অন্যদিকে ওমর খ্রিস্টান ক্যাথলিক। ফলে যা হয়! ওমর তার জন্মসূত্রে পাওয়া ধর্ম ত্যাগ করে মুসলিম ধর্ম গ্রহণ করেন। গ্রিক ক্যাথলিক এই অভিনেতা মাইকেল দিমিত্রি মিশেল শেলুব হয়ে যান ওমর শরিফ। ১৯৫৫ সালে ওমর-ফাতেন পরস্পর বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৫৭ সালে তাদের ছেলে তারেক আল শরিফের জন্ম হয়। কিন্তু এতো সাধের সম্পর্কও একদিন ভেস্তে যায়। মাত্র দশ বছর একসঙ্গে বসবাসের পর ১৯৭৪ সালে তাদের মধুর সম্পর্কের যবানিকাপাত ঘটে। ওমরকে ডিভোর্স দেন ফাতেন। স্ত্রী ফাতেনের ছেড়ে যাওয়া ওমরের মধ্যে এক গভীর রেখাপাত করে। এ জন্য ধর্মকর্ম ত্যাগ করলেন তিনি। যাকে ভালোবেসে বিয়ে করলেন তার এভাবে ছেড়ে যাওয়া মেনে নিতে পারলেন না। ফলে আর কোনো নারীর সঙ্গে তিনি সম্পর্কে জড়াননি। এমনকি যতো দিন জীবিত ছিলেন ততোদিন অন্য নারীকে বিয়েও করেননি। একাকী নিঃসঙ্গ কেটেছে তার যাপিত সময়! ভালোবাসার মানুষ ওমরকে ছেড়ে গেলেও নাম, যশ, খ্যাতি তাকে ছেড়ে যায়নি। বরং মিসরের গ-ি পেরিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিতি লাভ করতে থাকেন। ব্রিটিশ মেধাবী নির্মাতা ডেভিড লিনের হাত ধরে বিশ্ব চলচ্চিত্রের পথে যাত্রা করেন তিনি। অভিনয় করেন ‘লরেন্স অব অ্যারাবিয়া’ ছবিতে। ডেভিড লিনের এই ছবিতে অভিনয় করে বিশ্ব খ্যাতি অর্জন ছাড়াও তার ক্যারিয়ারে জোটে অস্কারের মতো সর্বোচ্চ স্বীকৃতি এবং বেস্ট সাপোর্টিং রোলের জন্য জিতে নেন ‘গোল্ডেন গ্লোব অ্যাওয়ার্ড’।
ডেভিড লিনের লরেন্স অব অ্যারাবিয়া-র পর ওমর শরিফ একে একে কাজ করেন ফ্রেইড জেইনম্যানের ‘বিহোল্ড অ্যা পেল হর্স’, যুগোসøাভিয়ার যুদ্ধ নিয়ে ‘ইয়েলো রোলস রয়েস’, মঙ্গোলীয় দিগি¦জয়ী চেঙ্গিস খানকে নিয়ে ‘চেঙ্গিস খান’, জার্মান জেনারেলের জীবনী নিয়ে ‘দ্য নাইট অব দ্য জেনারেলস’ এবং আর্জেন্টাইন ‘প্রলেতারিয়েত’ ও কিউবা বিপ্লবের জনক আর্নেস্টো চে গুয়েভারার জীবনী নিয়ে নির্মিত প্রথম ছবি ‘চে!’তে। তবে তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সমাদৃত ও গুরুত্ব বহন করা ছবি বলা হয় ‘ডক্টর জিভাগো’। বরিস পাস্তরনাকের লেখা উপন্যাসের চিত্রায়ণ এটি। এর সেট সাজানো হয় পুরো প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কার রাশিয়ান বিপ্লবের। অস্কারের বিভিন্ন শাখায় ছবিটি জিতে নেয় একাধিক পুরস্কার।
ওমর শরিফ অভিনীত অনেক ছবি নন্দিত হয়েছে। তা হলো ‘দ্য রেইনবো থিফ’ (১৯৯০), ‘ম্যাকানাস গোল্ড’ (১৯৬৯), ‘চে’ (১৯৬৯), ‘ফানি গার্ল’ (১৯৬৮), ‘দ্য পিংক প্যান্থার স্ট্রাইকস এগেইন’ (১৯৭৬) প্রভৃতি।
ওমর শরিফ ইংরেজি ভাষায় নির্মিত লরেন্স অব অ্যারাবিয়া ছবিতে অভিনয়ের আগে মিসরীয় চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৬৫ সালে ডক্টর জিভাগো চলচ্চিত্রে অভিনয় করে বুঝিয়ে দেন ইংরেজি ছবিতেও অভিনেতা হিসেবে রয়েছে তার পোক্ত আসন। এ দুটি ছবির জন্যই গোল্ডেন গ্লোব অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলেন। ফলে তিনি এক অন্য দুনিয়ার স্বাদ পেয়েছেন। তবে একাকিত্ব ঘোচেনি। তাই তিনি প্রায়ই বলতেন, ‘হলিউড আমাকে সম্মান দিয়েছে। এর সঙ্গে সঙ্গে আরো একাকিত্বও দিয়েছে। এখানে আসার পর আমি আমার ভূমি, আমার দেশের পরিচিত মুখ এবং নিজের স্বদেশটি খুব মিস করি। তাদের সঙ্গ অনুভব করি সব সময়।’
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ওমর শরিফ অভিনয় থেকে অবসর নেয়ার ঘোষণা দেন। তবে ২০০৩ সালে ফরাসি সিনেমা ‘মসিয়ে ইব্রাহিম’-এ অভিনয় করেন। এতে ইহুদি বালককে দত্তক নেয়া প্যারিসের দোকানির চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। এ অভিনয় তার ঝুলিতে এনে দেয় ফ্রান্সের শীর্ষ চলচ্চিত্র পুরস্কার ‘সিজার অ্যাওয়ার্ড’।
শেষ বয়সে এসেও পশ্চিমা ও মিসরীয় চলচ্চিত্রের প্রতি অনুরাগ ছিল ওমর শরিফের। এরপর কয়েক দশক চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনে অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অভিনয় জীবনের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ২০০৬ সালে চলচ্চিত্রের রঙিন দুনিয়া থেকে অবসর নেন তিনি। ওমর শরিফকে ২০১৩ সালে ‘রক দ্য কাসবাহ’ ছবিতে শেষবারের মতো দেখা গিয়েছিল। চলচ্চিত্রে অভিনয়ের পাশাপাশি তাসের প্রতি দারুণ আগ্রহ ছিল তার। তুখোড় কনট্রাক্ট ব্রিজ খেলোয়াড় হিসেবে তার সুনাম ছিল। সত্তর ও আশির দশকে তিনি ব্রিজ খেলা নিয়ে ‘শিকাগো ট্রিবিউন’-এ কলাম এবং কয়েকটি বইও লিখেছেন। ১৯৯২ সালে বাজারজাত হওয়া একটি কম্পিউটার গেম ‘ওমর শরিফ ব্রিজ’ও রয়েছে। ২০০৫ সালের নভেম্বর বিশ্ব চলচ্চিত্রের প্রতি অসামান্য অবদানের জন্য তাকে ‘সের্গেই আইজেনস্টাইন মেডেল’ দেয়া হয় ইউনেস্কোর তরফ থেকে। ওমর শরিফ শেষ জীবনে নিজ দেশেই ফিরে গিয়েছিলেন। একমাত্র ছেলে ও নাতি-
নাতনিদের সঙ্গে খুব চমৎকার সময় কাটিয়েছেন। কিন্তু বরিস পাস্তেরনাক-এর উপন্যাসের নায়কের মতোই নিঃসঙ্গ মৃত্যু হয় তার এবং তা নিজ ভূমেই। ৮৩ বছর বয়সি এই অভিনেতা আলঝেইমারস রোগে ভুগছিলেন। হাসপাতালে ভর্তির পর তার হার্ট অ্যাটাক হয়। এর কিছুক্ষণ পর কায়রোর হাসপাতালে গত ১০ জুলাই এই অভিনেতা শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। এছাড়া ১৭ জানুয়ারি মৃত্যু হয় তার সাবেক সহধর্মিণী ফাতেনেরও।

আমারে দিয়েছ স্বর আমি গাই গান

ফেরদৌসী রহমান

 

মানুষের গান
স্বভাবধর্মে পাখি গায় গান। কিন্তু স্বর আর সুরের সমন্বয়ে মানুষের যে গান তা শুধু তাঁর নিজের জন্য নয়। মানষের গান হৃদয় স্পর্শ করার জন্য। যে গান মন ছুঁয়ে যায় না তা মানুষের গান হয়ে ওঠে না। কিছু গান আছে যা এখনো মানুষের মুখে মুখে ফেরে। কিছু গান আছে যা শুনলে হৃদয় দ্রবীভূত হয়, প্রাণ স্পন্দিত হয়। কথাগুলো যেন নিজের কথা বলেই মনে হয়। সর্বোপরি মানুষের গান হয় আবেগে পরিপূর্ণ। সবার গান কি গান হয়ে ওঠে? গান হয়ে ওঠার জন্য গীতিকবিতাঁর পাশাপাশি সুরের জাদু থাকতে হয়। কথাগুলো ধীরলয়ে বলেন দেশের প্রখ্যাত শিল্পী ফেরদৌসী রহমান।

গানের মানুষ
যাদের গানগুলো এখনো বুকে বাজে, মুখে মুখে ফেরে তাঁরাই গানের মানুষ। যাদের গান মানুষ গ্রহণ করে, সেটিই মানুষের গান। তবে সব গান সব মানুষের জন্য নয়। গান মানুষেরই তৈরি মানুষের শোনার জন্য। ফেরদৌস শব্দের অর্থ স্বগীয়। ফেরদৌসী শব্দের অর্থ ‘শ্রবণের স্বর্গ’। বাস্তবে অর্থাৎ শিল্পী জীবনেও এটিই প্রামাণ করে যাচ্ছেন ফেরদৌসী রহমান। গানের পাখি ফেরদৌসী রহমান সঙ্গীত ভুবনে কিংবদন্তি। জন্ম তাঁর ১৯৪১ সালের ২৮ জুন। এ দেশের সিনেমার গানকে তিনিই প্রথম জনপ্রিয় করে তুলেছেন। সিনেমার স্বর্ণযুগের এই গুণি শিল্পীকে স্বরণীয় করে রাখবে।

সঙ্গীত জীবন
সহজ এর সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি জানান তাঁর গানে হাতেখড়ি হয় তাঁর পিতার কাছে। পরবর্তীকালে ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খসরু, ইউসুফ খান
কোরেইশী, কাদের জামেরী, গুল মোহাম্মদ খান প্রমুখ সঙ্গীতজ্ঞের কাছে তালিম নিয়েছেন। খুব অল্প বয়স থেকে তাঁর স্টেজ পারফরম্যান্স শুরু হয়। মাত্র ৮ বছর বয়সে রেডিওতে ‘খেলাঘর’ অনুষ্ঠানে অংশ নেন। ১৯৬০ সালে ‘আসিয়া’ চলচ্চিত্রে প্রথম প্লে-ব্যাক করেন। ষাট ও সত্তরের দশকের বহু চলচ্চিত্রে তিনি নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী হিসেবে যুক্ত ছিলেন। তাঁর প্লে-ব্যাক করা চলচ্চিত্রের সংখ্যা ২৫০টির কাছাকাছি। তিনি ১৯৪৮ সালে রেডিওতে প্রথম গান করেন। তখন রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতেন। ১৯৫৬ সালে বড়দের অনুষ্ঠানে প্রথম গান করেন। ১৯৬৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি গান করেন। ১৯৫৭ সালে গান প্রথম রেকর্ড করেন এইচএমভি থেকে। ফেরদৌসী রহমানের শিল্পী জীবনের একটি বিরাট সৌভাগ্য এ দেশের গুণী অনেক সুরকারের সুরে গান গাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। আবদুল আহাদের সুর করা আধুনিক গান সবচেয়ে বেশি তিনিই গেয়েছেন। এছাড়া খন্দকার নুরুল আলম, আজাদ রহমান, জালাল আহমদ, আবদুল লতিফ, ওসমান খান, কানাইলাল শীল, আনোয়ার উদ্দিন আহমেদ, সমর দাস, সুবল দাস, অজিত রায় প্রমুখ খ্যাতনামা সুরকারের সুরেও গান গেয়েছেন বলে জানান।
শিল্পী ফেরদৌসী রহমানের জন্ম পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহারে। জন্ম থেকেই গানের সঙ্গে সখ্য তাঁর। বাবা শিল্পী আব্বাস উদ্দীন স্বপ্ন দেখতেন মেয়েও তাঁর মতো গান গাইবে। বাবার কাছেই গানের হাতেখড়ি ফেরদৌসী রহমানের। প্রায় ছয় দশকের গানের ক্যারিয়ারে ফোক, আধুনিক, উচ্চাঙ্গসঙ্গীত, নজরুলগীতি, রবীন্দ্রসংগীত, প্লে-ব্যাকÑ সব ধরনের গানই গেয়েছেন। বিটিভির সূচনালগ্ন থেকে সেখানে গাইছেন। বিটিভির জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘এসো গান শিখি’ দিয়ে সবার কাছে ‘খালামণি’ হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন তিনি। ফেরদৌসী রহমানের গান এক সময় বাংলা ছবিতে শুধু জনপ্রিয়তা ও সফলতাই দেয়নি, দিয়েছিল এক ধরনের সুরমগ্ন মাদকতাঁর। ‘মনে যে লাগে এতো রঙ ও রঙিলা’, ‘নিশি জাগা চাঁদ হাসে কাঁদে আমার মন’, ‘আমি রূপনগরের রাজকন্যা রূপের জাদু এনেছি’, ‘এই সুন্দর পৃথিবীতে আমি এসেছিনু নিতে’, ‘এই রাত বলে ওগো তুমি আমার’, ‘বিধি বইসা বুঝি নিরালে’, ‘এই যে নিঝুম রাত ওই যে মায়াবী চাঁদ’, ‘মনে হলো যেন এই নিশি লগনে’, ‘ঝরা বকুলের সাথী আমি সাথীহারা’, ‘আমার প্রাণের ব্যথা কে বুঝবে সই’, ‘যেজন প্রেমের ভাব জানে না’, ও কী গাড়িয়াল ভাই’, ‘পদ্মার ঢেউ রে’Ñ এমন শত শত গান সিনেমা আর রেকর্ডে গাওয়ার কারণে তাঁর জনপ্রিয়তা হয়ে ওঠে গগনচুম্বী। ১৯৬০ সালে ‘আসিয়া’ চলচ্চিত্রে প্রথম প্লে-ব্যাক করেন। ষাট ও সত্তরের দশকের অনেক চলচ্চিত্রের গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। তিনি চলচ্চিত্রে প্রায় ২৫০ গান গেয়েছেন। ১৯৪৮ সালে প্রথম রেডিওতে গান করেন। তখন রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতেন। ১৯৫৬ সালে তিনি প্রথম বড়দের অনুষ্ঠানে গান করেন। ১৯৬৪ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গান করেছেন। ১৯৫৭ সালে প্রথম গান রেকর্ড করেন এইচএমভি থেকে।

ঢাকার সিনেমা হিট হওয়ার অনিবার্য হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল তাঁর গান। ১৯৫৯ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ফেরদৌসী রহমান ছাড়া সিনেমার গান ছিল প্রায় অচল। ফিল্মে গান গাওয়া তিনি ছেড়ে দিয়েছেন বহু বছর হয়েছে। অথচ তাঁর গাওয়া অতীতের সেসব গান আজও জনপ্রিয় হয়ে আছে। তবে ‘আসিয়া’ ছবিটি একটু বিলম্বে মুক্তি পাওয়ার কারণে প্লে-ব্যাক শিল্পী হিসেবে তাঁর প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি ছিল ‘এ দেশ তোমার আমার’। এটি ১৯৫৯ সালে মুক্তি পায়। এতে গেয়েছিলেন, ‘চুপিসারে এতো করে কামিনী ডাকে’ গানটি। ১৯৫৯ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ফিল্মে যেসব গান করেছেন এর সবই আজও জনপ্রিয় হয়ে আছে। তাঁর সময়ের গানগুলোর আবেদন কোনোদিন ফুরিয়ে যাওয়ার নয়। এ প্রজন্মের শিল্পীরাও তাঁর গাওয়া সেদিনের গান আজও নতুন করে গাইছেন। ১৯৬০ সালে ইউনেস্কো ফেলোশিপ পেয়ে লন্ডনের ট্রিনিটি কলেজ অব মিউজিক থেকে ৬ মাসের সঙ্গীতের ওপর স্টাফ নোটেশন কোর্স সম্পন্ন করেন। প্রথম সুরকার হিসেবে তাঁর আত্মপ্রকাশ ১৯৬১ সালে ‘রাজধানীর বুকে’ ছবির মাধ্যমে। ওই ছবিতে তাঁর সঙ্গে রবীন ঘোষও সুরকার হিসেবে ছিলেন। স্বাধীনতাঁর পর ‘মেঘের অনেক রং’, ‘গাড়িয়াল ভাই’ ও ‘নোলক’ ছবির সঙ্গীত পরিচালক হিসেবেও কাজ করেছেন বলে তিনি সহজকে জানান। বিয়ের পরই (১৯৬৬ সালে) ফেরদৌসী বেগম থেকে তিনি হলেন ফেরদৌসী রহমান। তাঁর দুই ছেলে রুবাইয়াত ও রাজন। নবীন শিল্পীদের লোকসঙ্গীত গাইবার ব্যাপারে উৎসাহ দেয়া ছাড়াও শিশু-কিশোরদের বহু বছর ধরে গান শিখিয়ে আসছেন। এভাবেই একের পর এক কাজ নিয়ে তিনি এখনো ব্যস্ত। বিদেশি গান গাওয়ার স্মৃতি এখনো তাঁর মনে নাড়া দেয়। সহজের সাথে সাক্ষাৎকারে এ প্রসঙ্গে তিনি জানান ১৯৬৩ সালের কথা এখনো আমার বার বার মনে পড়ে। ওই বছর আমি ও লায়লা আরজুমান্দ বানু একত্রে মস্কোয় গিয়ে গান করেছিলাম। এককভাবে এক অনুষ্ঠানে আমি গাইলাম ‘ও মোর চান্দ রে ও মোর সোনা রে’ গানটি। এ গান শেষ হতেই প্রচুর হাততালি শুরু হলো। আমি তো গান গেয়ে চলে এসেছি। কিন্তু হাততালি থামছে না, চলছেই। পরে লোকজন আমাকে টেনে-টুনে আবার স্টেজে পাঠালো। তখন বুঝলাম এই হাততালি মানে আরো গান গাইতে হবে। তাই করলাম। চীনে গান গাইতে গেলাম ১৯৬৬ সালে। চৌ এন লাই তখন চীনের প্রধানমন্ত্রী। তাঁর সামনে গাইলাম ‘চুং ফাং হোং’ গানটি। এটি ছিল চীনা ভাষার গান। এ গান শুনে প্রধানমন্ত্রী আমার প্রশংসা করে বললেন, তুমি তো চীনা ভাষা জানো না। এতো দরদ দিয়ে গাইলে কীভাবে? তিনি বার বার আমার প্রশংসা করে যাচ্ছিলেন। এটা আমার জীবনের স্মরণীয় ঘটনা। সেই কবেকার ঘটনা যা আজও ক্ষণে ক্ষণে মনে পড়ে। ৩টি লং প্লেসহ প্রায় ৫০০টি ডিস্ক রেকর্ড এবং ১৮টিরও বেশি গানের অ্যালবাম বের হয়েছে তাঁর। একটি মাত্র সিডি ‘এসো আমার দরদী’ বের হয়েছে। এ পর্যন্ত তাঁর প্রায় ৫ হাজার গানের রেকর্ড হয়েছে।

প্রাপ্তি
কিছু পাবো ভেবে কখনো গান করিনি। তবে প্রাপ্তির পাল্লাটাই ভারী। বরং আমার মনে হয়, যা দেয়ার ছিল কিংবা যতোটুকু দেয়ার ছিল তা দেয়া হয়নি বা পারিনি। এখনো ভাবি, আমার অনেক কিছু করার আছে, দেয়ার আছে বলেন তিনি। ‘সিটিসেল-চ্যানেল আই সঙ্গীত পুরস্কার ২০১৩’ আয়োজনে আজীবন সম্মাননা পেয়েছেন তিনি। তিনিই প্রথম মহিলা সংগীত পরিচালক। ১৯৬০ সালে রবীন ঘোষের সঙ্গে ‘রাজধানীর বুকে’ চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনা করেন।

স্বপ্ন
স্বপ্ন অনেক। অজগ্র যেমনÑ বাবা আব্বাস উদ্দীনের গানগুলো পরবর্তী প্রজন্মে ছড়িয়ে দেয়া, বাবার নামে বিশাল একটা প্রতিষ্ঠান করার ইচ্ছা, পল্লীগীতি নিয়ে রিসার্চ করা ও গানগুলো দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে দেয়া। এসব গান স্কুল-কলেজ ও মিল-ফ্যাক্টরিতে ছড়িয়ে দিতে হবে। স্বপ্ন সফল না করতে পারলেও শিক্ষার্থীদের মধ্যে এর বীজ বপন করে যাবো। আজকাল ফেরদৌসী রহমান তাঁর বাবার নামে প্রতিষ্ঠিত আব্বাস উদ্দীন সঙ্গীত একাডেমির পেছনেও বেশ সময় দিচ্ছেন। এ একাডেমিটি আরও সম্প্রসারণের জন্য প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। বাবা আব্বাস উদ্দীনের গাওয়া গানগুলো তাঁর মনে আগের মতোই নাড়া দেয়। শুধু তাঁর অন্তরে নয়, এ প্রজন্মের সঙ্গীতশিল্পীরাও আবার গাইছেন আব্বাস উদ্দীনের গান।

সঙ্গীত নিয়ে ভাবনা
এখন সময় এসেছে সঙ্গীত নিয়ে ভাবার। যারা সঙ্গীতে আগ্রহী তাদের আরও মনোযোগী হতে হবে। মনে রাখতে হবে, ধ্যান ও সাধনার চেয়ে ওই বিষয়ে তাদের অন্য কিছুই সাহায্য করতে পারবে না। সাধনাটি আনন্দের সঙ্গে নিতে হবে। শুধু যোগ্যতা থাকলেই চলবে না, তা রেওয়াজের মাধ্যমে শানিত করে তুলতে হবে। প্রচুর গান শুনতে হবে, বিশেষত গান শুনতে শুনতেই আত্মস্থ করতে হবে। শিক্ষা লাভ করে আগে বিকশিত হয়ে পরে প্রকাশের ভাবনা মাথায় রাখতে হবে। উচ্চাঙ্গ শিখলে সব গানই গাওয়া সম্ভব। ইদানীং ‘ট্যালেন্ট হান্ট’ নামে যেসব উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে সেগুলোকে সাধুবাদ জানাই। এসব ট্যালেন্ট যেন সঠিকভাবে নিজেদের গড়ে তুলতে পারে এদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। একটা স্তরে পৌঁছানো সোজা। তবে তা ধরে রাখাটাই বেশি কঠিন। গানের মানে বুঝতে হবে, গানের সঙ্গে মিশে যেতে হবে।

আর্কাইভ
ডকুমেন্টারি করে এক প্রজন্মের গান পরবর্তী প্রজন্মে পৌঁছে দিতে হবে। এমন কিছু উদ্যোগ নিতে হবে যাতে শিল্পীরা কখনোই হারিয়ে না যান। কারণ একটি দেশের শিল্পী ওই দেশের সংস্কৃতির বাহক। সব ভুলে যাওয়ার পরও যা মনে থাকবে সেটিই যদি সংস্কৃতি হয় তাহলে এই মনে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে আমাদের সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখার জন্য।

 

ইনসাইড আউট

ফুয়াদ বিন নাসের আবির

 

হুমায়ূন আহমেদ একবার জানিয়েছিলেন, তিনি এক বাসায় গিয়ে দেখলেন, ওই বাসার বুয়া তার নির্মিত একটি নাটক দেখতে দেখতে হাপুস নয়নে কাঁদছে। তার ভাষায়Ñ এটি ছিল তার সাহিত্যিক জীবনের সেরা দৃশ্যগুলোর একটি। আমিও মনে করি, কোনো চলচ্চিত্র পরিচালকের সাফল্য নির্ভর করে ওই স্বল্প সময়ের মধ্যে রুপালি পর্দায় এমন কিছু তাকে দেখানো, অনুভব করানো যা ওই দর্শকের মনে একটা ছাপ রেখে যাবে, হাসাবে, কাঁদাবে। ‘পিক্সার’ যখন তাদের নতুন মুভি ‘ইনসাইড আউট’-এর ঘোষণা দেয় তখন খুব একটা গা করিনি। এ কথা সত্যি, আমার পছন্দের চলচ্চিত্রের তালিকা করলে সেখানে পিক্সার-এর বেশকিছু অ্যানিমেশন চোখ বন্ধ করেই জায়গা করে নেবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো ২০০৬ সালের ‘আপ’-এর পর থেকে পিক্সার তার আগের অতো তাক লাগানো বা মনে দাগ কাটার মতো কোনো কাজ দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে। কাজেই খুব একটা উচ্চাশা ছাড়াই গিয়েছিলাম ছবিটা দেখতে এবং হল থেকে বেরিয়ে সব বন্ধু একবাক্যে মেনে নিলাম, এটাই সম্ভবত পিক্সারের শ্রেষ্ঠ কাজ।
‘ইনসাইড আউট’ হচ্ছে সেই ঘরানার পিক্সারের চলচ্চিত্র যে চলচ্চিত্র থেকে বড় ও ছোটরা সমানভাবে আন্দোলিত হবে। কিন্তু বড়রা যে অর্থ বের করবেন, ছোটরা হয়তো একদম ভিন্ন কারণে মজা পাবে। ইনসাইড আউট-এর সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো, বড়রা এ মুভির প্রায় প্রতিটি দিকের সঙ্গে নিজেদের স্মৃতি, আবেগ মিলিয়ে দেখে নিতে পারবেন। এটি ১১ বছর বয়সী রাইলি-র জীবনের ক্ষুদ্র অংশ নিয়ে তৈরি একটি অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র। মুভির লোকেশন মাত্র দুটি। একটি হলো সান ফ্রান্সিসকোর বিষণœ, অপরিচ্ছন্ন আবাসিক এলাকা এবং অন্যটি রাইলির মাথার ভেতরের আলো ঝলমলে, বৈচিত্র্যময় একটি অভিনব জগৎ! ওই জগতের শুরু হয় আঁধারময় এক ছোট্ট রুমে। প্লেটো সম্ভবত এটিকেই ঈধাব ড়ভ ঁহভড়ৎসবফ ংবষভ বলেছিলেন।


ওই জগতের শুরু হলো রাইলির জন্মের মাধ্যমে। তার মাথার ভেতর হঠাৎ করেই আবির্ভূত হয় পরীর মতো এক জয় (আনন্দ)। সে দেখে, তার সামনে একটা ছোট স্ক্রিন। সেখানে দু’জন আনন্দিত পুরুষ ও নারীকে দেখা যাচ্ছে। স্ক্রিনের সামনে একটি কন্ট্রোল প্যানেল। এর বড় বাটনটায় ইতস্তত করে চাপ দেয় জয়। হেসে ওঠে ১ মিনিট বয়সী রাইলি। তৈরি হয় তার প্রথম স্মৃতি। এভাবে ক্রমেই আরো কর্মী বাহিনী যোগ দেয় জয়ের সঙ্গেÑ স্যাডনেস, অ্যাঙ্গার ও ডিসগাস্ট। তারা সবাই মিলে ছোট্ট রাইলির আবেগ-অনুভূতি ঠিক করে দেয়, রক্ষণাবেক্ষণ করে রাইলির স্মৃতি। ছোট্ট রাইলি বড় হতে থাকে। মা-বাবা, বন্ধু-বান্ধব, স্কুল, আইস হকিÑ সব মিলিয়ে তার জীবনে আনন্দের পরিমাণই বেশি। তবে হঠাৎ তার মা-বাবা সিদ্ধান্ত নেন বাসা পরিবর্তন করার। সান ফ্রান্সিসকোর এক বিষণœ এলাকায় গিয়ে ওঠে রাইলি। এদিকে তার মনের অন্দর মহলের জগতে এক ম্যালফাংশনের দরুন শুরু হয়ে গেছে মহাগ্যাঞ্জাম। এখান থেকেই শুরু হয় ইনসাইড আউটের মূল কাহিনী।
পিক্সারের লোকজন ৫ বছর ধরে খেটে-খুটে ওই ছবিটি তৈরি করেছে। সাইকোলজি বিষয়ে যদি আপনার খুচরা পড়াশোনা করা থাকে তাহলে ওই শ্রমের ফসল আপনার চোখে পড়তে বাধ্য। মানুষের মনের ভেতরকার অতি জটিল রসায়নগুলোও যে এতো চমৎকারভাবে উপস্থাপন করা যায় তা ইনসাইড আউট দেখার আগে আমার ধারণাতেই ছিল না। ব্যক্তিত্বের দ্বীপ, স্বপ্ন প্রডাকশন হাউস, চিন্তার ট্রেইন, লং টার্ম মেমোরি লেইন, বিমূর্ত চিন্তার ঘর ইত্যাদি বিমূর্ত ধারণা চোখের সামনে তুলে ধরা হয়েছে।
পরিচালক পিটার ডক্টর অবশ্য ওই ধরনের আলাদা জগৎ তৈরি করার ব্যাপারে ওস্তাদ। ‘মুনস্টারস ইনকরপোরেটেড’ চলচ্চিত্রে কাল্পনিক শহর মনস্ট্রাপোলিস তৈরি করে যেভাবে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন দর্শককে, এবারো এর ব্যত্যয় ঘটেনি।


জয় চরিত্রটির কণ্ঠ দিয়েছেন ‘পার্কস অ্যান্ড অ্যামিউজমেন্ট’খ্যাত এমি পোয়েলার। আমার ধারণা, এর থেকে ভালো কণ্ঠাভিনয় আর কেউ হতো করতে পারতেন না।
ছবিটিতে দুই রকম আবহ সৃষ্টি করা হয়েছে। সান ফ্রান্সিসকোর বিমর্ষ, বিষণœœ, ধূসর ধরনের শহুরে এলাকা ও আলো ঝলমলে রাইলির
মনোজগৎ। আরেকটি মজার ব্যাপার হলো, সাদা চোখে দেখলে (কাল্পনিক মনোজগতের ব্যাপারটি বাদ দিয়ে) এর কাহিনী খুবই সাধারণ একটা গল্প। নতুন জায়গায় মানিয়ে নিতে না পারা, একাকিত্ব, বাড়ি থেকে পালানোÑ এ রকম ঘটনা আমার-আপনার অনেকেরই হয়তো ১১ বছর বয়সীর জীবনে ঘটেছে। অন্যদিকে ওই স্বাভাবিক ঘটনার পর্দার অন্তরালে এই ১১ বছর বয়সীর মনের ভেতরে যে তোলপাড়টা হয় তা কি কেউ মনে রেখেছে? ওই ব্যাপারটিই পিক্সার বাহিনী নিয়ে এসেছে আমার-আপনার চোখের সামনে। অনেকে এই মুভির জগৎটাকে ডক্টরের আগের মুনস্টারস ইনকরপোরেটেডের সঙ্গে তুলনা করলেও ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, এই মুভির তুলনা হতে পারে আরেকটি অ্যানিমেশন মুভির সঙ্গে যেটিকে অনেক আগেই আমার দেখা সেরা চলচ্চিত্রগুলোর একটির আসনে বসিয়ে রেখেছি। ওই ছবিটিও একজন ১১ বছর বয়সী মেয়ের কাল্পনিক জগৎ নিয়ে তৈরি। তবে প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণই ভিন্ন। চলচ্চিত্রটি হলো হায়াকো মিয়াজাকির ‘স্পিরিটেড অ্যাওয়ে’।
ওই চলচ্চিত্র যারা দেখতে যাবেন তাদের জন্য কিছু উপদেশÑ প্রথমত. ভালো হয় মানুষের ব্যক্তিত্ব, স্বপ্ন, স্মৃতি কীভাবে তৈরি হয় এসব ব্যাপারে টুকটাক পড়াশোনা করে গেলে অন্যদের থেকে একটু বেশিই মজা পাবেন (যেমন আমি পেয়েছি)। দ্বিতীয়ত. মুভি দেখে কান্নাকাটি করার স্বভাব থাকলে টিস্যু নিতে ভুলবেন না। এটি দরকার হবে। সবশেষে বলাবো, অবশ্যই মুভিটি নির্দ্বিধায় দেখে ফেলুন। আমার মতে, এটিই এখন পর্যন্ত পিক্সারের সেরা সৃষ্টি। আশা করি, ইনসাইড আউটের দেড় ঘণ্টার সফর শেষে আপনিও আমার সঙ্গে একমত হবেন।

সিনেমা-আমার

হামীম কামরুল হক

 

ছোটবেলা থেকেই আমরা কতো না সিনেমা দেখেছি যেগুলো আসলে সিনেমাই ছিল না। এগুলোর বরং মুভি বা মোশান পিকচার বলা যায়। বাংলায় বলা যায় ছায়াছবি বা ছবি। বাংলায় টকি বা বায়োস্কোপ কথাটাও এক সময় খুব চালু ছিল। আর সিনেমার নামে কাহিনীচিত্রের এতোই প্রকোপ ছিল যে, লোকে সিনেমাকে বলতো ‘বই’। ‘একটা বই দেখলাম। হলে এবারের নতুন বইটা খুবই ভালো।’ তো এ বই-ই আসলে আমরা দেখছিলাম। সেলুলয়েডে এই যে স্রেফ একটা কাহিনী দেখা- এটা যে সিনেমা নয়, বুঝতে সময় লেগেছে। এমনকি হলিউডের অসাধারণ নির্মাণ কৌশল সমৃদ্ধ শ্বাসরুদ্ধকর অনেক ছবি- সেগুলোও সিনেমা নয়, কাহিনীচিত্র মাত্র। রোমান্স, থ্রিলারের সঙ্গে উপন্যাসের পার্থ্যক যা, এসব কাহিনীচিত্রর সঙ্গে সিনেমার ততোটাই তফাত কিংবা এর চেয়েও বেশি।


নবম-দশম শ্রেণীতে পড়ার সময় যখন মৃণাল সেনের ‘খারিজ’ সিনেমা দেখি তখন সেটিও বই হিসেবেই দেখেছিলাম। এরও অনেক আগে বিটিভিতে ‘হীরকরাজার দেশে’ও দেখিয়েছিল। ওই সময় আমার দেখা হয়নি। তখনো সিনেমা এবং এসব মুভির তফাত জানা হয়নি। জানাটা শুরুটা হয় ঋত্বিক ঘটকের ‘সুবর্ণরেখা’ দিয়ে। সত্যিকারের সিনেমা বলতে যা বোঝায়, ‘সুবর্ণরেখা’ দেখার অভিজ্ঞতাটা আমাকে সিনেমা দেখার নেশায় ফেলে দেয়।
তখন অনার্সের ছাত্র। পরীক্ষাও কাছে এসেছে। এদিকে আমার মাথায় সিনেমা দেখার পোকাগুলো কিলবিল করতে শুরু করে। জহির রায়হান চলচ্চিত্র সংসদ, চলচ্চিত্রমসহ আরো কারা যেন নানান পরিচালকের রেট্রোস্পেকটিভ করে। শুরুতে ঋত্বিকেরই একটা পর একটা ছবি- ‘সুবর্ণরেখা’, ‘কোমলগান্ধার’, ‘অযান্ত্রিক’। তারপর দেখা হয় সত্যজিতের ‘জনঅরণ্যে’, ‘সীমাবদ্ধ’, বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের ‘লাল দরজা’। শ্যাম বেনগালের কী একটা ছবিও দেখা হয়েছিল ওই পর্বে। ছিল প্রিয়দর্শনের হিন্দি ছবি ‘বিরাসাত’। এরপর গ্যেটে ইনস্টিটিউটেই মূলত সিনেমা দেখার পর্ব চলেছে। মাঝখানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চে বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের রেট্রোস্পেকটিভে একের পর এক সিনেমা দেখার সুযোগ। দেখলাম ‘দূরত্ব’, ‘গৃহযুদ্ধ’, ‘চরাচর’, ‘সংক্রমণ’, ‘বাঘবাহাদুর’-এর মতো সিনেমা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন অডিটোরিয়াম তৈরি হলে সেখানে আইজেনস্টাইনের কয়েকটি সিনেমাসহ আরো কী কী যেন দেখা হয়!
একটি সেশনটা খুবই স্মরণীয়। বিখ্যাত গল্প-উপন্যাস বা সাহিত্য থেকে করা সিনেমার একটা রেট্রোস্পেকটিভের আয়োজন করে জহির রায়হান চলচ্চিত্র সংসদ। এতে প্রথম দেখা হয় ‘পথের পাঁচালী’, ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’, ‘সূর্যদীঘল বাড়ি’, ‘জাগো হুয়া সাবেরা’, ‘দ্য টিন ড্রাম’, ‘আন বিয়ারেবল লাইটনেস অব বিইংস’, ‘ডোনা ফ্লোরা অ্যান্ড আর টু হাসব্যান্ডস’, ‘থর্ন অব ব্লাড’। মার্কেসের বিখ্যাত গল্প ‘দি ইনক্রিডিবল অ্যান্ড স্যাড টেল অব ইনোসেন্ট এরিন্দিয়েরা অ্যান্ড হার হার্টলেস গ্রান্ডমাদার’ থেকে করা ছবিরটাও দেখা হয় এই পর্বে। আলবার্তো মেরাভিয়ার কী একটা গল্প থেকে করা জাঁ লুক গোদারের একটা সিনেমাও দেখেছিলাম। এরপর থেকে সুযোগ পেলেই গ্যেটে ইনস্টিটিউটে যাওয়া-আসা শুরু হয়।
সিনেমা দেখানো আয়োজনের খবর পেলেই ছুটে যেতাম। এর অনেক পর লুই বুনুয়েল রেট্রোস্পেকটিভে প্রায় ৯টা সিনেমা দেখা হয়। এর আগে কী পরেই হতে পারে, আন্দ্রে তারকাভস্কির দু’তিনটি ছবি দেখেছিলাম ‘স্টকার’, ‘মিরর’। ওই গ্যেটে-তে এবং এবারও আয়োজক জহির রায়হান চলচ্চিত্র সংসদ। এগুলো মাঝখানে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র গোদারের ‘ব্রেথলেস’ দেখি। নানান সময় দেখা হয় ফেলিনির ‘লা ডলচে ভিটা’, জ্যাঁ রেনোয়ার ‘দি রুলস অব দ্য গেম’, ইঙ্গমার বার্গম্যানের ‘ওয়াইল্ড স্টবেরিস’সহ কিছু ছবি। সবই প্রায় গ্যেটেতে। অ্যালা রেনের ‘হিরোমিশা মনা আমুর’। এখানে বলে রাখা ভালো, এগুলোর বেশির ভাগই যে খুব বুঝ-জ্ঞান নিয়ে দেখেছিলাম তা তো নয়। সত্যিকার অর্থে অনেক ছবির অনেক কিছুই প্রায় বুঝিইনি।
যতো দিন ঘরে বসে ডিভিডি-তে সিনেমা দেখার সুযোগ হয়ে ওঠেনি ততো দিন পর্যন্ত এভাবে সিনেমা দেখা চলেছে। ডিভিডিতে অবশ্য সিনেমা দেখাটা কোনো সিনেমা দেখা নয়, এমনকি গ্যেটেতে যেভাবে ছবি দেখা হয়েছে তাও ডিভিডির বদৌলতে। সিনেমা হলে বসে সিনেমা দেখা না হলে এর সত্যিকারের নির্মাণ কৌশল, বিশেষ করে আলোক প্রক্ষেপণ, লেন্সের কাজ এবং অনেক কিছু নাকি বাদ পড়ে যায়।
সেদিক থেকে সুন্দর সুন্দর সিনেমা ভালো করে দেখাটা আমাদের এখনো হয়ে ওঠেনি। আরো জোর দিয়ে বললে বলতে হয়, আজও সিনেমার মতো করে সিনেমা দেখার সুযোগই হলো না। তারপরও দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মতো করে এই যে ডিভিডিতে সিনেমা দেখা- এর কাছে কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। এরই কল্যাণে কয়েক চলচ্চিত্র পরিচালকের বলতে গেলে প্রায় সব ছবিই দেখার সুযোগ ঘটেছে।
এখন কথা হলো, কেন এতো সিনেমা দেখা? কী আছে এসব সিনেমায়? কে বড় পরিচালক? সত্যজিৎ, না ঋত্বিক- এমন তর্কে মাতা কেন? বুনুয়েলের মতো এমন আক্রমণাত্মক সিনেমা কী আমাদের দেশে কেউ নির্মাণ করতে পারবেন? আরে, আগে সিনেমাটাই তো বানাতে জানুন, তারপর না হয় বুনুয়েল? বাংলাদেশে সিনেমা প্রায় নেই-ই বলতে গেলে। এর কারণ কী? এমন বিচিত্র সব প্রশ্ন নিজেকে যে নিত্যই করে দেখেছি তাও নয়। স্রেফ ভালো লাগা থেকে ছবিগুলো দেখা বা দেখার জন্য দেখা তাও নয়। তবু কেন যে মনে হয়েছে, আমরা যারা লেখালেখি করি তাদের জন্য সিনেমা দেখাটা বেশ কাজে দেয়। ক্যামেরা ও কলম ধরা মানুষের জীবনের এমন কিছু অনুষঙ্গ, এমন আবহ নিয়ে আমাদের মনে প্রায় সময়ই কিছু না কিছু ঘটিয়ে দিয়ে চলে যায়। এর কিছুটা সচেতনাভাবে টের পাওয়া যায়, বেশির ভাগটাই পাওয়া যায় না।


হলিউডি কাহিনীধর্মী চলচ্চিত্রও তো কম দেখা হয়নি। কম দেখা হয়নি ভারতীয় হিন্দি, বাংলাদেশি বাংলা কোমর দোলানো নাচা-গানাময় ছবি। তবে হলে গিয়ে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র দেখার ভরসা হয়েই ওঠে না। এক সময় সরকারি অনুদান, পরে এক বা একাধিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতায় যেসব চলচ্চিত্র বাংলাদেশে তৈরি হয়েছে এর বেশির ভাগই অপচয় ছাড়া আর কিছু নয়। কারণ সিনেমা নির্মাণের জন্য যে মেধা, প্রতিভা ও সাহসের দরকার পড়ে এর সমন্বয় এ দেশে খুব একটা দৃষ্টান্ত নেই। সততাটাই তো সবার আগে দরকার। সেটিই তো নেই। সততা মানে সৎ শিল্পী হওয়ার সততা। সিনেমা যে একটি মিশ্র মাধ্যম, এতে সাহিত্য-নাটক-সঙ্গীত-চিত্রকলা-নৃত্য থেকে শুরু করে সমাজ-রাজনীতি-অর্থনীতি-বিজ্ঞান কী নেই! দেখা যায়, এ দেশের বেশির ভাগ চলচ্চিত্রকারের সঙ্গীতবোধটাই নেই। কোনো সঙ্গীত পরিচালকের হাতে তা ছেড়ে দিয়ে বসে থাকেন তিনি।
এ দেশে ভালো সিনেমা তৈরি না হওয়ার অনেক কারণ নিশ্চয়ই আছে। অর্থলগ্নিটাই বিশাল প্রশ্ন হয়ে সামনে ঝুলে থাকে। ভালো অভিনেতা, সঙ্গীতজ্ঞ, শব্দ প্রকৌশলী, সম্পাদনার কাজ করা তেমন মানের ব্যক্তিরও অভাব আছে। কিন্তু এর কোনোটাই বোধ করি প্রধান সমস্যা নয়। প্রধান সমস্যা হলো যারা সিনেমার নামে যা করতে আসেন সেসব তথাকথিত পরিচালক। সিনেমার মতো একটি জটিল ও মিশ্র মাধ্যমে কাজ করার জন্য শিল্পবোধ এবং নান্দনিকতার যে স্তরে পৌঁছানো দরকার, সিনেমা সংক্রান্ত জ্ঞান-বুদ্ধি অর্জনের জন্য প্রচুর পরিশ্রম ও পড়ালেখা করার দরকারÑ এর লেশ মাত্রও তাদের কেউ করেন কি না সন্দেহ। সন্দেহটা নিশ্চিত হয়ে যায় তাদের নির্মিত নামকাওয়াস্তে চলচ্চিত্রগুলো দেখার পর। মনে হয়, এফডিসি-তে একেবারেই সিনেমা সম্পর্কে অজ্ঞ এককালের যেসব পরিচালকের যে ফিল্ম সেন্স ছিল, তাদের চলচ্চিত্রবোধ এর চেয়েও নিম্নস্তরের। অনেকে আছেন রেডিওতে শুনে শুনে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে পারেন। তারা যদি পৃথিবীর সেরা সিনেমাগুলো দেখেও কিছু একটা করতে পারতেন! তাও না। মূল সমস্যা চেতনাগত। মূলত ফিল্ম সেন্সের প্রচুর ঘাটতিই এর কারণ।


আমরা একটা বিষয় নিরাবেগভাবেই দেখতে চাই। কারণ শূন্যের মধ্যে ঢাক বাজিয়ে কোনো লাভ নেই। তেমন আবেগহীনভাবে দেখলে আমরা একটি সত্য স্বীকার না করে পারি না যে, বাংলাদেশে ঔপন্যাসিক নেই। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ ও আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের মধ্যে আমরা কেবল উপন্যাসের দিকে যাত্রা করার উদ্যোগটা দেখেছিলাম মাত্র। কিন্তু যে পূর্ণতার বিকাশ নিয়ে উপন্যাসের জন্ম হবে ওই উপন্যাস এখানে কোথায়? আকারে বিশাল উপন্যাসের কথা বলা হচ্ছে না। নতুন বোধ, ভাষা, চরিত্র ও আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে যে উপন্যাসের উদ্ভব হয় এমন উপন্যাস কোথায় (কথাটা ওয়ার অ্যান্ড পিস, আনা কারেনিনা, ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট, দ্য ব্রাদার্স কারামাজভ, দ্য ম্যাজিক মাউন্টেইন, দ্য ট্রায়াল, ইউলিসিস, দ্য সাউন্ড অ্যান্ড দ্য ফিউরি, মিসেস ডালওয়ে, দ্য আউটসাইডার, দ্য আনবিয়ারেবল লাইটনেস অব বিইংস, দ্য টিন ড্রাম, ওয়ান হান্ড্রেড ইয়াস অব সলিচুড, ব্লাইন্ডনেস প্রভৃতি উপন্যাসের কথা মনে রেখেই বলা)? তেমনি কোনো ডিরেক্টরেরও আগমন ঘটেনি (ডিরেক্টর বলতে আমরা আইজেনস্টাইন, ফেলিনি, বুনুয়েল, কুরাশাওয়া, বার্গম্যান, জ্যাঁ রেনোয়া, জাঁ লুক গোদার, ফ্রাঁসোয়া ক্রফো, অ্যাল রেনে, সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, তারকাভস্কি, আব্বাস কিরোস্তয়ামি, মহসিন মাখমালবাফ, মজিদ মাজেদি, ওসমান সেমবেনের মতো ডিরেক্টরদের কথা মনে রেখেই বলা)।


বাঙালি মুসলমানদের ভেতরে ঔপন্যাসিক ও ডিরেক্টররা কেন এলেন না এখানো পর্যন্ত? এ দুটি নিয়ে আরো গভীরভাবে ভাবার আছে। এর ঠিক উল্টোদিকে আছে কার জন্য উপন্যাস ও চলচ্চিত্রটা নির্মিত হবে? সর্বক্ষেত্রে সমঝদারের মারাত্মক অভাব। সমাজে কতো ব্যক্তি আছেন যারা জানেন সত্যিকার উপন্যাস বলতে কী বোঝায়, এর লক্ষণগুলো কেমন- এসব জানেন-বোঝেন? একেবারে হুবহু কথা খাটে চলচ্চিত্রের গ্রহীতাদের নিয়েও। কয়েকজন আছেন যারা সিনেমা বিষয়টির মূল্যয়ান বা আপ্রিসিয়েশন-এর ক্ষমতা সম্পন্ন? বড় বড় ডিগ্রি পাওয়া বা অর্থনীতির জটিল মারপ্যাঁচ বোঝা ব্যক্তি মাত্রই যে চলচ্চিত্র বুঝবেন তা তো নয়। চলচ্চিত্র দেখার জন্য ও দেখে বোঝার জন্য যে চর্চা এবং চর্চার জন্য যে আগ্রহ ওই আগ্রহের ঘাটতি এতোটাই ব্যাপক যে, এর ভেতর থেকে কোনো চলচ্চিত্রকারের জন্মগ্রহণ করাটা প্রায় অসম্ভব। চলচ্চিত্র সংসদগুলোর কার্যক্রমও গুটিকয়েক ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ।
এ তো গেল ভেতরবার বাধা-বিপত্তির কথা। বাইরের বাধাগুলোও কম প্রবল নয়। আমরা ছোটবেলায় শুনেছি, মসজিদে যাওয়ার লোক বেশি নয়, সিনেমায় যাওয়ার লোক বেশি। এই দিয়ে সমাজের সৎ-অসৎ, ভালো মানুষ-মন্দ মানুষ যাচাই করা হতো। সিনেমা দেখাটা একটা ‘পাপ’ ছাড়া আর কিছু নয়। বিশ্ববিদ্যাবিদ্যালয়ে পড়ার সময় আমাদের অতিশয় ভালো মানুষ এক বন্ধুর কথা বলা যাক। তাকে তার প্রয়াত পিতা বলেছিলেন জীবনে দুটি কাজ না করতে। এক. সিনেমা হলে না যেতে এবং দুই. কোনো রকম রাজনীতির সঙ্গে না জড়াতে। আমাদের সেই বন্ধু প্রয়াত পিতার ওই আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন। গ্রামের বলতে গেলে একেবারেই সাধারণ পরিবার থেকে আসা সেই বন্ধুকে দেখেছি টিউশুনি করে নিজের খরচ নিজে চালাতে। কোনো নম্র-ভদ্র ছেলের দৃষ্টান্ত ছিলেন তিনি। পড়লেখা ও টিউশুনি করা ছাড়া আর কোনোদিকে মনোযোগ দেননি। কোনো রকম বিরোধে জড়াতে দেখিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ সময়ে গভীর মনোযোগ সেসব পড়ালেখা করেছেন যা তাকে সরকারের একটি ভালো চাকরির জন্য পুরোপুরি তৈরি করে দেবে এবং পাস করার পর কিছুদিন কষ্টে-সৃষ্টে জীবন চালালেও শেষ পর্যন্ত তিনি অত্যন্ত সম্মানজনক একটি জীবিকার ব্যবস্থা করে নিতে পারেন। তার ঈপ্সিত জীবিকা গ্রহণেরই সুযোগও পান। পরে জানতে পারি, তিনি যে চাকরি করেন এতে পদে পদে আপস করে চলা ছাড়া উপায় নেই। সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তি, রাজনৈতিক ও বিভিন্ন ক্ষমতাপ্রবল অধিকারীর সামনে তার চুপ হয়ে যাওয়া ছাড়া আর কিছু করার থাকে না। মেনে নেন এ জীবন তার নিজের হাতে গড়া।


যাই হোক। আমি মূলত দেখাতে চেয়েছি, এই যদি হয় বিশ্ববিদ্যালয় পাস করা একজনের পরিণতি তাহলে সে দেশে চলচ্চিত্র বা উপন্যাসের গ্রহীতার কারা হবেন? গল্পের বই পড়া অন্যায়, সিনেমা দেখা পাপ। ফলে ওই সিনেমায় বানানো ও অভিনয় করা সম্পর্কে মানুষের ধারণা কী হতে পারে? এ প্রসঙ্গে আরেকটি ঘটনার কথাও মনে পড়ে গেল। আমার এক আত্মীয়। তিনি একটি নামকরা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশিত একটি বিনোদন পত্রিকার উচ্চপদে কাজ করেন। চাকরি জীবনে তার সততটার কারণে তিনি চলচ্চিত্র অঙ্গনে সম্মানিত। একটি বিয়ের নিমন্ত্রণপত্র দিতে তাকে নিয়ে আমাদের আরেক আত্মীয়ের বাসায় গিয়েছি। বাড়িতে দুই বৃদ্ধা ছাড়া আর কেউ তখন ছিলেন না। তাকে পরিচয় করিয়ে দেয়ার সময় আমি বলি, তিনি সিনেমা পত্রিকায় কাজ এবং টিভিতে অনুষ্ঠান করেন। কিন্তু নিজের কর্মস্থল হিসেবে ওই ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের নাম ও পরিচয় বলেন। এক পর্যায়ে বসার ঘরে যখন কেউ ছিল না তখন আমাকে তিনি বলেন, সিনেমা-টিভিতে কাজ করার কথা শুনলে সবাই ভালো চোখে দেখে না। ওটা বলার দরকার নেই। জাস্ট...তে চাকরি করিÑ এটা বললেই চলে, তাই না? এমন পরিস্থিতিতে চলচ্চিত্রের অবস্থা অনুমেয়। যে দেশে সিনেমা দেখা পাপ, সিনেমার সঙ্গে কোনো সংশ্লিষ্টতা দেখা হয় খারাপ চোখে সে দেশে সিনেমার বিকাশ হবে কোন পথে? এই বাস্তবতা একেবারে ভিত্তিহীন নয়।
স্বাধীনতার পর পরই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত এবং একেবারে শিল্পবোধহীন প্রযেজোক-পরিচালকের চক্র এতোটাই শক্তি অর্জন করে যে, সেখানে ভালো কোনো কাজের কথা ভাবাও বাতুলতার পর্যায়ে পৌঁছে যায়। চলচ্চিত্র হয়ে ওঠে স্রেফ লগ্নিকৃত অর্থের মুনাফা আদায়ের ক্ষেত্র। ভারতীয় ছবির চিত্রনাট্য থেকে শুরু করে সঙ্গীত- সবই নকল করে সত্তরের দশকের শেষে এক বছরে দেড়শ’-দুইশ’ ছবি করার মাত্রায় পৌঁছে গিয়েছিল আমাদের চলচ্চিত্র শিল্প। এতে শিল্পমান স¤পন্ন সিনেমা গোয়েন্দা লাগিয়েও আবিষ্কার করা সম্ভব নয়। দিনে দিনে পরিস্থিতি করুণ থেকে করুণতর হতে থাকে। নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত এই ধারাই চলে। এরপর বিংশ শতাব্দীর শেষ অংশে যেন বাংলাদেশে বাংলা চলচ্চিত্রের এক রকম মৃত্যুঘণ্টা বেজে ওঠে। সিনেমা ব্যবসায়ীদের বদলে সিনেমা শিল্প চলে যায় কালো টাকা সাদা করনেওয়ালা লোকদের দখলে। একের পর এক সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যেতে থাকে। এর মানে দেশে পুণ্যবান মানুষের সংখ্যা বাড়ছিল এবং সিনেমা যে পাপ এ সম্পর্কে ধারণা প্রকট থেকে প্রকট আকার হচ্ছিল তাও নয়। স্যাটেলাইট, ঘরে ঘরে সিডি-ডিভিডিতে সিনেমা দেখা সহজ হয়ে ওঠাটাও বোধ করি কারণ নয়। তাই যদি হতো তাহলে ইউরোপ-আমেকিরায় একজনও সিনেমা দেখতে যেতো না। এর কারণ আমাদের অন্যত্র খুঁজতে হবে। স্যাটেলাইট, সিডি-ডিভিডিতে সহজেই ছবি দেখার সুযোগ মেলে বলে মানুষ সিনেমা হলে যায় নাÑ এ ধারণা মূলে আপাত সত্য থাকলেও মূল কারণ হলো, আমাদের দেশের চলচ্চিত্র মাধ্যমে জড়িত ব্যক্তিরা এমন একটি পরিবেশ ও পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছেন যেখানে সৃষ্টিশীলতার পথ প্রায় রুদ্ধ হয়ে গেছে। বাইরে কোনো কিছু নয়, এর ভেতরের ব্যক্তিরাই এটিকে তিলে তিলে ধ্বংসের পথে নিয়ে দাঁড় করিয়েছেন। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে রাজনৈতিক দলাদলি।


এদিকে সুস্থধারা নামে যেসব চলচ্চিত্র নির্মিত হচ্ছে এর কাহিনী, চিত্রনাট্য ও পরিচালনার মান আমাদের ওই কাক্সিক্ষত মানের কাছাকাছিও নয়। এর মানে আমরা আমাদের দেশের চলচ্চিত্র দেখার ক্ষেত্রে বিশাল এক শূন্যতার ভেতর অবস্থান করছি। সিনেমায় আমরা এ দেশের মানুষের মুখ ও বাস্তবতা দেখতে চাই, বানোয়াট কোনো কিছু নয়। স্বাধীনতার পর থেকে ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পারিবারিক বিবর্তনগুলোর নিরিখে মানব সম্পর্কে যে বিচিত্র বিন্যাস এ দেশের শহর-নগর, গ্রাম-গঞ্জে ঘটেছে সেটুকুর বিশ্বস্ত চিত্রায়ণই তো যথেষ্ট ছিল। কিন্তু ওই চিত্রায়ণের জন্য অবলম্বন কোথায়? যেসব গল্প-উপন্যাসের অনুসারে সিনেমাটির চিত্রনাট্য তৈরি হবে তা কোথায়? আর সাহিত্য ছাড়া চিত্রনাট্য তৈরি করার মতো মেধাবী ব্যক্তিরাই বা কোথায়? বিচ্ছিন্নভাবে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নামে কিছু ভালো কাজ কেউ কেউ করেছেন। কিন্তু এর ধারাবাহিকতাও কেউ ধরে রাখতে পারেননি। বাংলাদেশের মানুষের দক্ষতার সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে কন্সিস্টেন্সি না থাকা। এ বিষয়টি এ দেশের হেন বিষয় নেই যাতে পরিলক্ষিত হয়নি। তা ওই ক্রিকেট খেলাই বলি, কী চলচ্চিত্র! কেউ কেউ দু’একটি চলচ্চিত্র তৈরি করে সম্ভবনার ইঙ্গিত দেন। এরপর পুরস্কার, নাম-খ্যাতি আর আত্মতৃপ্তির কোন গহ্বরে যে তারা তলিয়ে যান তা কে জানে। তাই বাধ্য হয়ে আমরা যারা ভালো ছবির সঙ্গে থাকতে চাই তাদের সম্বল হয়ে ওঠে আইজেনস্টাইন, ফেলিনি, বুনুয়েল, কুরাশাওয়া, বার্গম্যান, জ্যাঁ রেনোয়া, জাঁ লুক গোদার, ফ্রাঁসোয়া ক্রফো, অ্যালা রেনে, সত্যাজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, তারকাভস্কি, আব্বাস কিরোস্তয়ামি, মহসিন মাখমালবাফ, মজিদ মাজেদি, ওসমান সেমবেনের মতো পরিচলকদের নির্মিত চলচ্চিত্র। সিনেমার কাছে আমাদের যা কিছু চাওয়া তা তাদের চলচ্চিত্র থেকেই আমরা পেতে চাই।


বার বার ঘুরে-ফিরে দেখা হয় কখনো ‘ব্যাটেলশিপ পটেমকিন’, ‘লা ডলচে ভিটা’, ‘দ্য ডিসক্রিট চার্ম অব বুর্জোয়া’, ‘রশোমন’, ‘দ্য রুল অব দ্য গেম’, ‘বেথ্রলেস’, ‘ডে ফর নাইট’, ‘লাস্ট ইয়ার ইন মেরিয়েনবাদ’, ‘পথের পাঁচালী’, ‘সুর্বণরেখা’, ‘খ-হর’, ‘মিরর’, ‘টেস্ট অব চেরি, কান্দাহার’, ‘চিলড্রেন অব হ্যাভেন’, ‘দ্য মানিঅর্ডার’-এর মতো কতো সিনেমা। কিন্তু এতো সিনেমা দেখার পরও কোথায় যেন একটা খামতি ও অতৃপ্তি রয়ে যায়। কারণ এর ভেতরে আমার দেশের আমাদের চলচ্চিত্রকারের নির্মাণ করা আমাদের সিনেমা নেই যে সিনেমা ফিরে ফিরে বার বার দেখা যায়। যে সিনেমার প্রতিটি দৃশ্য আমার দেশের মানুষের মুখ, প্রকৃতি ও প্রতিবেশ তুলে আনে। স্বদেশের সত্যিকারে ওই স্বরূপ দেখে আমরা এ দেশের সঙ্গে আরো ঘনিষ্ঠ হই। এক অচ্ছেদ্য নান্দনিক বন্ধনে আবদ্ধ হই। ওই সিনেমার জন্য তৃষিত হয়ে থাকি। হয়তো পরিস্থিতির বদলাবে। এটুকু আশা না রাখলে তো আর এতো সিনেমা দেখে কী বা পেলাম প্রশ্নও ওঠে। নিশ্চয়ই এমন অনেকেই এভাবে এসব ডিরেক্টর ও তাদের নির্মিত সিনেমা দেখে থাকেন এবং ভবিষ্যতেও দেখবেন। তাদের কারো ভেতর থেকে জন্ম নেবেন ওইসব ডিরেক্টর যারা মেধা, প্রতিভা ও সাহসে অনন্য এবং সিনেমা করা জন্য বোধ করবেন প্রচ- তাড়না। এ জন্য শ্রম দেবেন এবং তাদের হাতেই সিনেমা আমার হয়ে উঠবে আমার সিনেমা, আমাদের সিনেমা হয়ে উঠবে।
হ্যাঁ, খেয়াল করুন পাঠক, আমরা একক চলচ্চিত্রকারদের কথা বলছি না। এ জন্য সম্মিলিতভাবে একযোগে একদল চলচ্চিত্রকারকে এগিয়ে আসতে হবে। যেমনটা ঘটেছে ফ্রান্স, ইটালি, জার্মানি, স্পেন, জাপান, ভারত, ইরান, এমনকি সেনেগালের মতো দেশে। আমাদের দেশেও একদল পরিচালকের মাধ্যমে হয়তো ভবিষ্যতে বদলে যাবে বাংলাদেশের সিনেমা জগৎ। তাদের হাত দিয়ে নির্মিত সিনেমায় আমাদের আরো নিবিড়ভাবে তখন পাবো। আমাদের চলচ্চিত্রকাররা এবং তাদের চলচ্চিত্র বিশ্ব চলচ্চিত্রের জগতে চিরদিনের জন্য ঠাঁই করে নেবে।

এভার বার্নিং

 

হলিউডে ‘ভেতরে-বাইরে সমান সৌন্দর্য’-এর অধিকারীর নামের তালিকায় প্রথমেই যে নামটি উঠে আসে, তা হলো অড্রে হেপবার্ন। ১৯২৯ সালের ৪ মে বেলজিয়ামে জন্ম নেওয়া এ সুন্দরীর নাগরিকত্ব ব্রিটেনে হলেও চোস্ত ইংরেজিসহ ডাচ, ফ্রেঞ্চ, ইটালিয়ান, স্প্যানিশ ও জার্মান ভাষায় ছিল অগাধ দখল। শুধু হলিউড নয়, গোটা বিশ্বের কোটি কোটি দর্শকের হৃদয়ে বাস নিয়েছিলেন হেপবার্ন তার রূপ ও প্রতিভা দিয়ে। দুর্দান্ত অভিনয়ের সঙ্গে ফ্যাশন আইকনে স্থান করে নেন পাকাপোক্তভাবে।

বাবা জোসেফ এন্টনি রাস্টন-এর চাকরির সুবাদে বিভিন্ন দেশে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ হয় হেপবার্ন-এর। অবশ্য সুখকর শৈশব স্থায়ী হয়নি তার। ১৯৩৫ সালে তার বাবা যেন হঠাৎ করেই হাওয়া হয়ে গেলেন একদিন। এরপরই ১৯৩৮ সালে মা ব্যারোনেস এলা ভ্যান হিমস্টা-র সঙ্গে বিয়ে বিচ্ছেদ। ঘটনা দুটি ছোট্ট হেপবার্নের হৃদয়ে বিশাল ক্ষত তৈরি করে। যদিও তিনি ২০-২৫ বছর পর বাবাকে খুঁজে পান তবুও ছোটবেলার ওই বাঁধন কবেই না জীর্ণ হয়ে গেছে! এরপরও হেপবার্ন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বাবাকে আর্থিক সহয়তা দিয়েছেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর পর অড্রে হেপবার্নের পরিবার আর্থিকসহ রীতিমতো খাবার ও জ্বালানি সংকটে পড়ে। তিনি এ সময় অ্যানিমিয়া ও অপুষ্টিজনিত রোগে আক্রান্ত হন। যুদ্ধ শেষে ১৯৪৫ সালে মা ও ভাইয়ের সঙ্গে আমস্টাডারম-এ আসেন। সেখানেই বিখ্যাত ব্যালে ডান্সার সোনিয়া গাস্কেলের কাছে নতুন করে ব্যালে শুরু করেন তিনি। পাঁচ বছর বয়সে শুরু করা ব্যালের প্রতি নিদারুণ আকর্ষণ তাকে বেশি পারদর্শী করে তোলে। প্রাইভেটে ছোটদের নাচ শিখিয়ে কিছু আয়-রোজগারও শুরু করেন। কিন্তু খাবারের অভাব তাকে এতোটাই দুর্বল করে যে, সাময়িকভাবে নাচ বন্ধ করতে হয় তার। পরে ১৯৪৯ সালে ‘ব্যালে রাম্বারটে’ স্কলারশিপ নিয়ে লন্ডনে যাত্রা করেন। ব্যালেতে অসামান্য প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও শুধু শারীরিক গঠন তার জন্য পাহাড়সম বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়।

হাল ছাড়ার পাত্রী নন হেপবার্ন মনোযোগী হন মডেলিং ও অভিনয়ে। প্রথম দিকে কয়কটি ব্রিটিশ ফিল্মে ছোটখাটো চরিত্রে অভিনয় করলেও ১৯৫৩ সালে প্রিন্সেস এনা-র চরিত্রে ‘রোমান হলিডে’ ছবিতে অভিনয় করে তারকা বনে যান তিনি। এ ছবিতে অভিনয়ের সুবাদে তারকা খ্যাতিসহ বহু পুরস্কারে ঝুলি ভরে ওঠে তার। শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর অস্কার, শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর একাডেমি অ্যাওয়ার্ড, শ্রেষ্ঠ ব্রিটিশ অভিনেত্রীর ‘বাফটা’ অ্যাওয়ার্ড, গোল্ডেন গ্লোব অ্যাওয়ার্ডÑ কী নেই ওই ছবিতে? বিধাতা যেন সুদ-আসলে পুষিয়ে দিলেন ভাগ্য বিড়ম্বিত কৃশকায় মেয়েটিকে।

এ ছবির জন্য প্রথমে এলিজাবেথ টেলর-এর কথা চিন্তা করা হলেও পরিচালক উইলিয়াম ওয়েলার গোঁ ধরলেন সেই মেয়ের জন্য যিনি স্ক্রিন টেস্টে অভিনয়শৈলী ও সরলতামাখা মুখে মুগ্ধ করেছিলেন তাকে। পরে উইললিয়াম বলেছিলেন, ‘রোমান হলিডের জন্য আমরা শিশুসুলভ, সরল, নিষ্পাপ, একই সঙ্গে বুদ্ধিদীপ্ত ম্যাজিকাল চেহারা খুঁজছিলাম। হেপবার্নকে দেখে মনে হয়েছিল, আরে, এ তো সেই মেয়ে!’

যাহোক, যারা রোমান হলিডে দেখেছেন, তারা জানেনÑ বহুবার দেখার মতো ওই ছবিতে প্রাসাদের নিয়মানুবর্তিতায় হাঁপিয়ে ওঠা রাজকুমারী এনার পালিয়ে যাওয়া এবং পরে আমেরিকার এক রিপোর্টারের (গ্রেগরি পেক) সঙ্গে প্রেম কী দুর্দান্তভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন হেপবার্ন! তাকে ছাড়া আর কাকেই বা কল্পনা করা যায়?

১৯৫৪ সালে আবার মঞ্চে ফিরে যায় অড্রে হেপবার্ন। ‘অন্ডিন’ নাটকে অভিনয়ের জন্য সেরা অভিনেত্রী টনি অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন তিনি। এই প্রডাকশনে কাজ করতে গিয়ে মন দেয়া-নেয়া হয় কো-আর্টিস্ট মেল ফেরের-এর সঙ্গে। এর পরিণাম ওই বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর বিয়ের পিঁড়িতে বসা। এরপর বেশ কয়কটি সফল চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন তিনি।

যেমনÑ ‘সাবরিনা’, দি নানস স্টোরি’, ‘ব্রেকফাস্ট অ্যাট টিফানিস’, ‘চ্যারেড’, ‘মাই ফেয়ার লেডি, ‘ওয়েট আনটিল ডার্ক’।

‘দি নানস স্টোরি’ (১৯৫৯) ছবিতে অড্রে হেপবার্ন-কে রীতিমতো যুদ্ধ করতে হয়েছে তার শিশুসুলভ নারীর ইমেজ থেকে বেরিয়ে এসে পরিপূর্ণ নান-এর অভিব্যক্তিগুলো ফুটিয়ে তুলতে। নিন্দুকের মুখে ছাই দিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো ‘বাফটা’ ও তৃতীয়বারের মতো ‘একাডেমি’ পুরস্কারের মনোনয়ন পান এ ছবির জন্য। ‘ওয়েট আনটিল ডার্ক’ ছবির জন্য দ্বিতীয় একাডেমি অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন এবং ‘গোল্ডেন গ্লোব’ ও ‘বাফটা’ মনোনয়ন পান তিনি।

শুধু অভিনয় আর সৌন্দর্যেই নয়, মানবসেবায়ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত রেখেছেন অড্রে হেপবার্ন। অভিনয় জগৎ থেকে সরে আসার পর ইউনিসেফ-এর হয়ে জনহিতৈষী কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন। অবশ্য ১৯৫৪ সাল থেকেই ওই সংগঠনের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন। ১৯৮৮ থেকে ১৯৯২ সালের মধ্যে আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা ও এশিয়ার প্রতিকূল সম্প্রদায়ের জন্য কাজ করে যান। জাতিসংঘের হয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিশুদের জন্য কাজ করেছেন তিনি। ১৯৮৯ সালের শুরুতে ঢাকায় আসেন ওই ব্রিটিশ অভিনেত্রী ইউনিসেফের দূত হয়ে। ইউনিসেফের গুডউইল দূত হিসেবে কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৯২ সালে তাকে ‘প্রেসিডেনশিয়াল মেডেল ও ‘ফ্রিডম’ পদকে ভূষিত করা হয়।

অড্রে হেপবার্ন হাতে গোনা সেই তারকাদের মধ্যে একজন যিনি এতো আঙ্গিকে এতো পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। এরই মধ্যে ন্যাচারাল বিউটিখ্যাত ওই অভিনেত্রীর শরীরে ক্যানসার বাসা বাঁধে। ১৯৯৩ সালের ২০ জানুয়ারি ঘুমের মধ্যে খুব

নিশ্চিন্তেই না ফেরার দেশে পা বাড়ান ৬৩ বছর বয়সী কালজয়ী এই

 

‘অনন্ত প্রেম’ কবিতাটি তার খুব প্রিয় ছিল

 

 

‘তোমারেই যেন ভালােবাসিয়াছি শতরূপে শতবার

জনমে জনমে যুগে যুগে অনিবার।

চিরকাল ধরে মুগ্ধ হৃদয় গাঁথিয়াছে গীতহার

কতরূপ ধরে পরেছ গলায়, নিয়েছ সে উপহার

জনমে জনমে যুগে যুগে অনিবার।’

 

এই কবিতার চরণগুলো কোথাও কি একাকার হয় অড্রে হেপবার্নের সঙ্গে?

 

 

 

নজরুলের গান ও আমি

 

বয়স তখন পাঁচ কী ছয় বছর। আমরা থাকি জলপাইগুড়িতে। আমার আব্বার ব্যবসার সুবাদে সেখানে ছোটবেলাটা কেটেছে। ওই সময়ই আমার আম্মা এক ওস্তাদের হাতে আমাকে তুলে দেন গান শেখানোর জন্য। বলা যায়, তখনই আমার গানের হাতেখড়ি। এরপর আমরা রংপুরে চলে আসি। রংপুরে এসে ওস্তাদ রামগোপাল-এর কাছে আবার শেখা শুরু করি। আসলে মা-বাবা দু’জনেরই প্রবল আগ্রহ ছিল আমার গানের ব্যাপারে। রংপুরে গার্লস স্কুলে পড়ার সময় একটি প্রতিযোগিতায় বেশ মনে আছে ফার্স্ট

হয়েছিলাম। তখন ক্লাস থ্রিতে পড়ি।

এরপর আমরা ঢাকায় চলে আসি। ঢাকায় এসে আমাদের বাসা নেয়া হয় লালবাগে। আমরা ছিলাম ৩ ভাই ও ৩ বোন। ঢাকার বাসায় উঠেই মা-বাবা আমাদের সব ভাইবোনের জন্য আবার গানের ওস্তাদ দিলেন। তৎকালীন শাস্ত্রীয় সংগীতের বিখ্যাত ওস্তাদ ফজলুল হক-ই আমাদের শিক্ষক। ওস্তাদজী বাসায় এসে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শেখাতেন। ১৯৬৬ সালে ছায়ানটে ভর্তি হই। ছায়ানটে ওই সময় ওস্তাদ ফুল মোহাম্মদ ছিলেন। পর্যায়ক্রমে মরহুম ওস্তাদ সোহরাব হোসেন, মরহুম শেখ মনসুর রহমান, অঞ্জলি রায়-কে শিক্ষাগুরু হিসেবে পাই। পরে রবীন্দ্রভারতী থেকে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়ে এলেন আজাদ রহমান। তার কাছ থেকেও তালিম নিলাম।

গানের ভুবনে নজরুল সংগীত বেছে নিলাম কেনÑ অনেকেই এ প্রশ্ন করেন। আসলে ওই সময় টেলিভিশন বলতে একমাত্র বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) আর একমাত্র রেডিও বাংলাদেশ বেতার। তখনকার দিনে অনুরোধের আসরগুলোয় নজরুলের গান শুনতাম। ওই সময় সুপারস্টার ছিলেন সোহরাব হোসেন, লায়লা আরজুামান বানু, ফিরোজা বেগম, শেখ লুৎফর রহমান, ফেরদৌসী রহমান প্রমুখ। তখন আমি যদিও ছোট তবুও খুব সহজেই সুরগুলো বুঝতে পারতাম। তখনই নজরুলের গানের প্রতি আমার ভালোবাসা প্রকাশ পেতে থাকে। কারণ নজরুলের গানের যে বৈচিত্র্যময়তা তা আমাকে মুগ্ধ করতো। কোনো কবি যে তার জীবদ্দশায় তারই গানে-সুরে কতো রকম স্টাইল ব্যবহার করতে পারেন অতোটা না বুঝলেও একটা ভালোবাসার জায়গা তৈরি হয়ে যায়। পরে নজরুলের গানেই মনোনিবেশ করি। যেহেতু শাস্ত্রীয় সংগীতের ধারায় আমার গানের ভুবন সেহেতু নজরুলের গানের মধ্যে ছোট ছোট কাজ, বোল, তান আমার জন্য সহজ হয়ে ওঠে। সর্বোপরি ছায়ানটের মধ্য দিয়ে গানের ভুবনে আমার আসা।

আমার বড় বোন বাংলায়, ছোট বোন সাইকোলজিতে, বড় ভাই ইকোনমিকসে মেজভাই ইংলিশে, ছোট ভাই জুওলজিতে মাস্টার্স করেছে। আমি অনার্স শেষ করে চলে যাই দেশের বাইরে।

আমার ছোট ভাই ছায়ানটে গান শিখতো। বড় বোনও শিখতো। ছোট বোন শিখতো নাচ। অবাক করা ব্যাপার হলো, তখন একমাত্র মুসলিম মেয়ে হয়ে আমার বোন পুরো ইন্ডিয়ায় প্রতিযোগিতায় ফার্স্ট হতো। পরে যখন আমরা ঢাকায় চলে এলাম তখন আব্বা তাকে ‘জাগুয়া সেন্টার’-এ ভর্তি করিয়ে দিলেন। তার নাচ দেখে শিক্ষকরা বললেন, ‘ওকে আর কী শেখাবো। ও তো সবই ভালো পারে।’ তবে তার বিয়ের পর নাচ আর কন্টিনিউ করেনি। আমার বড় বোনও ভালো গান গাইতেন। কিন্তু তিনিও বিয়ের পর আর গান করেননি। বড় ভাই পেইন্টিং করতেন। ফটোগ্রাফিতে খুব ভালো ছিলেন। ছোট ভাই নিয়মিত গান করতো। অবশ্য সে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকে চাকরি করতো। আমাদের পরিবার ছিল সাংস্কৃতিক পরিবার। মা-বাবা চাইতেন আমরা যেন নাচ-গানে মুখরিত থাকি। বড় বড় শিল্পীরা বাসায় নিয়মিত যাতায়ত করতেন। আমার ছোট ভাই ফিরোজা আপার ছেলে শাফিনের সঙ্গে মাইলস ব্যান্ডের ড্রামার ছিল।

গান গাওয়ার পাশাপাশি টেলিভিশনে নাটক করেছি। আমি রেডিওর খেলাঘরের সদস্য ছিলাম। যখন বড়দের আসরে গেলাম তখন রীতিমতো অডিশন দিয়ে তারপর স্থান পেয়েছি। পরিবারের সবার এতো সহযোগিতা পেয়েছি, আমার মনে হয় অন্য কেউ এতোটা পাননি। বিশেষ করে বিয়ের পর স্বামীর অনুপ্রেরণা ও উৎসাহ আমাকে ত্বরান্বিত করেছে। ছায়ানটে ওই যে ১৯৬৬ সালে ঢুকেছি, এখনো সেখানেই আছি। ছায়ানটের একটি সিস্টেম আছে। যারা ফার্স্ট হয়, তারা নিচের ক্লাসের শিক্ষক হয়। আমি ফিফথ ইয়ার ও সমাপনী ক্লাস নিই। অনেকে আমাকে প্রশ্ন করেন, আলাদা স্কুল করলাম না কেন? আমি বলতে চাই, ছায়ানট আমাকে যেভাবে শিখিয়েছে, ছায়ানটেই ঠিক সেভাবেই শেখাচ্ছি। অবাক করা ব্যাপার হলো, মিডিয়ায় যারা স্বনামে উজ্জ্বল, তাদের অধিকাংশ ছায়ানটের। তাদের ছেড়ে আলাদা কিছু করার ইচ্ছা আমার কখনোই জাগেনি।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ যখন সাড়ে সাত কোটি বাঙালির মনে স্বাধীনতা যুদ্ধের ডাক দেয় তখন সিদ্ধান্ত নিলাম, আমিও যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবো। রাইফেল-বন্দুক নয়, আমার অস্ত্র আমার গলা। এরই ধারাবাহিকতায় ২৫ মার্চ কালরাতে যে হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হলো তা আমার মনে আরো গভীরভাবে দাগ কাটলো। আগেই বলেছি, ওই সময় আমরা থাকি পলাশী ব্যারাক সংলগ্ন বাসায়। ২৬ মার্চ সকালে আশপাশের মৃত্যুপুরীর দৃশ্য বর্ণনা শুনেই সিদ্ধান্ত নিই, আর বসে থাকলে চলবে না। পরে ১৭ এপ্রিল বাসার কাউকে কিছু না বলে পালিয়ে যাই। ওই রাতেই আমার বিয়ে হয় মগবাজারের কাজি বাড়িতে। কারণ আমি মেয়ে মানুষ হয়ে কীভাবে শরণার্থীদের দলে ঠাঁই পাবো! তাই শুধু যাওয়ার বাসনায় আমি যে কোনো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতেও পিছপা হইনি।

যুদ্ধের সময় প্রায় এক কোটি মানুষ ভারতে চলে যায়। তাদের তিনবেলা খাবার দেয়া, বাসস্থান, চিকিৎসা সহয়তা করে পার্শ্ববর্তী দেশটি। প্রায় ২৬ হাজার সেনা নিহত হন তাদের। অথচ দেখুন, তাদের স্মৃতির উদ্দেশে কোনো ম্যুরাল বা স্ট্যাচু নেই। পরবর্তী প্রজন্ম আমার মনে হয়, এসবের কিছুই জানে না।

যা হোক, আগরতলা হয়ে আমরা দিল্লিতে যাই। সেখানে গিয়ে ১৪৪ নম্বর লেনে লেখক ও সাহিত্যিক দীপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাসায় উঠি। অবাক হয়ে যাই সেখানে বেশ কয়েকজন পরিচিত মুখ দেখে! আলী যাকের, আসাদুজ্জামান নূর, শারমিন মোরশেদ, জলিয়া আপু, বিপুল ভট্টাচার্য, নওসাদ আলী, গোবিন্দ কলরেডি, স্বপন চৌধুরী, এনামুল হকসহ অনেকেই। ওনারা অনেকেই

পরিবারসহ গিয়েছেন। কিন্তু আমি শুধু পরিবার ছাড়া, মা-বাবা ছাড়া। যদিও বার বার পরিবারের কথা মনে পড়ছিল তবুও ততো দিনে বাংলাদেশকে শত্রুমুক্ত করার প্রত্যয়ে নিজেকে তৈরি করে নিচ্ছিলাম। তখন সেখানে একটি সংগঠন তৈরি হয়েছিল ‘বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ সহায়ক সমতি’। পরবর্তীকালে ওই নাম বদলে করা হয় ‘বাংলাদেশ মুক্তিসংগ্রামী শিল্পী পরিষদ’।

১৯৭৪ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত ছিলাম লন্ডনে। সেখানে থেকেও এ দেশের সব উৎসব-আয়োজন পালন করেছি। নজরুলের গান গেয়ে ওই দেশেও বেশ জনপ্রিয় ছিলাম। বিভিন্ন দেশের অনুষ্ঠান-শোতে অন্যান্য দেশের বাঙালিরাও চলে আসতেন।

নজরুলের গানে বৈচিত্র্যময় একটা বিষয় ছিল, এখনো আছে এবং থাকবেও অনেক দিন। বাংলা গানে যতো ধরণ আছে, আমার মনে হয় এর সবই নজরুলের গানে আছে। খুব ছোটবেলায় সংকল্প করেছিলাম, আমি সংগীতশিল্পীই হবো। অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়েছি। কিন্তু কখনো শিক্ষা গ্রহণকালে ফাঁকি দিইনি।

জন্ম : ১৯৫২ সালের ২৭ ডিসেম্বর

পিতা : মরহুম শামসুল হুদা

মা : মরহুম শামসুন্নাহার রহিমা খাতুন

স্বামী : হাবিবুস সামাদ

সন্তান : বড় মেয়ে নাহিন আলীম টুম্পা। স্বামীর সঙ্গে মেরিল্যান্ডে থাকে। ছোট মেয়ে উজমা সামাদ। সদ্য লন্ডন থেকে পড়াশোনা শেষ করে দেশে ফিরেছে।

সম্মাননা : ২০০৯ সালে নজরুল ইনস্টিটিউট থেকে আজীবন সম্মাননা। ২০১৪ সালে নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মাননা। ২০১৬ সালে একুশে পদক।

নজরুল সংগীতশিল্পী পরিষদের ভাইস প্রেসিডেন্ট।

প্রকাশিত অ্যালবাম : ‘অভিসার’, ‘সন্ধ্যা মালতী’, ‘রূপান্তরের গান’, ‘নহে নহে প্রিয়’, ‘নিশিরাত’। এ বছর চারটি অ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছে লেজার ভিশন থেকে। এ দেশের প্রথম সিডি শাহীন সামাদের উর্দু গানের অ্যালবাম ‘মহব্বত এ ক্যায়া’।

SUN OF SAUL

 

‘সান অফ সোল’ চলচ্চিত্রটি শুরু হয় ‘সোলজার কমান্ডো’র সংজ্ঞা দিয়ে। সোলজার কমান্ডো হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে বন্দি সেসব ইহুদী বন্দি যারা নাৎসি বাহিনীকে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের বিভিন্ন কাজে সহায়তা করে নিজেদের মৃত্যুদ-ের দিনক্ষণ পেছানোর জন্য। ওই ছবির নায়ক সোল আউসল্যান্ডার ১৯৪৪ সালের আউশউইৎস ক্যাম্পের সোলজার কমান্ডো। চলচ্চিত্রটি শুরু হয় একটি লম্বা টানা ক্যামেরা শট দিয়ে যেখানে দেখতে পাই, একদল বন্দি ইহুদির নগ্ন করে গ্যাস চেম্বারে ঢোকানোর কাজে অন্যান্য সোলজার কমান্ডোদের সাহায্য করছে প্রধান চরিত্র সোল। সোল বা অন্যান্য সোলজার কমান্ডোদের চেহারা ভাবলেশহীন। বোঝাই যায়, তারা নিয়মিত এ কাজ করে অভ্যস্ত। এদিকে অ্যাড্রেসিং সিস্টেমে ঘোষণা দেয়া হচ্ছে। এ সময় বন্দিদের নগ্ন করা হচ্ছে মেডিকেল পরীক্ষা ও গোসলের জন্য। পরে তাদের বিভিন্ন ক্যাম্পে পাঠানো হবে। এ রকম নির্জলা মিথ্যা শুনেও সোল নির্বিকার। একই দৃশ্য দেখতে দেখতে তার অনুভূতি পাথর হয়ে গেছে। সে নির্বিকারভাবে ফেলে যাওয়া জামাকাপড় হাতড়ে মূল্যবান কিছু খোঁজে। গ্যাস চেম্বারের দরজা বন্ধ হয়। কিছুক্ষণ ভেতরে চেঁচামেচি। তারপর সব নিশ্চুপ। দরজা খুলে যায়। সোলজার কমান্ডোরা একে একে লাশ বের করতে থাকে। ওই সময়ে দেখা যায়, ১১-১২ বছরের এক কিশোর বেঁচে আছে কোনো রকমে। নাৎসি ডাক্তারকে একজন ডেকে আনে। ডাক্তার কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে নির্বিকারভাবে ছেলেটিরে

শ্বাসরোধ করে মৃত্যু নিশ্চিত করে। সোল-কে সে নির্দেশ দেয়

পোস্টমর্টেমের জন্য লাশটা যেন ল্যাবে পৌছে দেয়। ঠিক তখনই কোনো এক অজানা কারণে সোল-এর মনে হয় টেবিলের ওই প্রাণহীন কিশোর তার সন্তান। তাকে অন্যান্য বন্দির মতো গণচুল্লিতে পোড়ালে হবে না, যথাযোগ্য ইহুদি ধর্মরীতিতে কবর দিতে হবে। এখান থেকেই শুরু হয় চলচ্চিত্রের কাহিনী।

পরিচালক লাজলো নেমেস রুপালি পর্দার কাজে একেবারেই নবীন। কিন্তু তার চিত্রায়ণ ও দৃশ্যকল্পগুলো দেখে তা একবারের জন্যও মনে হবে না কারো। পুরো ছবিটি দেখানো হয়েছে প্রধান চরিত্র সোলের দুষ্টিকোণ থেকে। ক্যামেরার অবস্থান সোলের এক-দেড় হাত পেছনে এবং বেশির ভাগই টানা ও লম্বা ক্যামেরার শট। পুরো চলচ্চিত্রে সংলাপের সংখ্যা ও ব্যাপ্তি খুবই কম। পরিচালক পুরো ঘটনাটির ভয়াবহতা কেবল তার ক্যামেরার কাজেই অত্যন্ত চমৎকারভাবে দর্শকের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। চাপাকণ্ঠের সংলাপ, ত্রস্ত এদিক-সেদিক চাউনিÑ সব মিলিয়ে সরাসরি কোনো নাৎসি সৈনিকের চরিত্র বড় আকারে দেখানো হয়নি। চিরাচরিত কোনো খলনায়কী উপেক্ষা করে তিনি ওই ছবিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের যুদ্ধবন্দি ও কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের যে ভয়াবহতার চিত্র তৈরি করেছেন তা সত্যিই অসামান্য।

 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের ভয়াবহতা নিয়ে গত ৬০ বছরে অগণিত চলচ্চিত্র তৈরি হয়েছে। কিন্তু হলিউড এ ধরনের চলচ্চিত্রে মানবিকতা ও নাৎসি বাহিনীর নৃশংসতা মুখ্য উপাদান করে তুলেছে সব সময়ই। লাজলো নেমেস তার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রেই সব ট্রাডিশনের ঊর্ধ্বে গিয়ে তৈরি করলেন ‘সান অফ সোল’। এখানে কিছুক্ষণের মধ্যে দর্শকও সোলের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যান। সোলের মতো দর্শকেরও মনে হয়, এই ভয়ানক দৈনন্দিন জীবনের মধ্যে সোলের মানসিক বিচ্যুতি মোটেও অস্বাভাবিক কিছু নয়। সোলও সবার মতো সব অস্বাভাবিকতার ভিড়ে বিন্দু পরিমাণ স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনার জন্যই লড়ছে। একটি অজানা কিশোরের লাশটি যথাযথভাবে দাফন করলে হয়তো তার পুরনো জীবনের স্বাভাবিকতা ফিরে আসবে বলে সে মনে করে তার আশপাশের অন্যান্য বন্দি বিভিন্ন পরিকল্পনা করে। তারা বিদ্রোহ করবে, ক্যাম্প থেকে পালাবে। কিন্তু কোনো কিছুই কেন যেন সোল-কে স্পর্শ করে না, করে না দর্শকেরও। বন্দিরা ক্যাম্প থেকে পালানোর পরিকল্পনা করছেÑ এটি যে কোনো চলচ্চিত্রেরই সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত। তবে সোলের কাহিনী শেষ দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকেন সবাই। সোল পালাতে পারবে কিনা তা নিয়ে দর্শক বা

সোলÑ কারোই মাথা ব্যথা থাকে না। সোল তার ছেলেকে কবর দিতে পারবে কিনা এ আশঙ্কা বুকে নিয়ে সবাই দেখতে থাকে লাজলো নেমেসের ওই অপূর্ব সৃষ্টি।

 

প্রথম ছবিতেই কান চলচ্চিত্র উৎসবে মাতিয়ে পরবর্তীকালে সেরা বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্রের অস্কার জিতে সাড়া ফেলে দিয়েছেন লাজলো নেমেস। বিখ্যাত হাঙ্গেরিয়ান পরিচালক বেলা টার-এর সহকারী হিসেবে কাজ করা লাজলো-কে এখনই সবাই এ যুগের হিচকক বা পন্টেকর্ভো-র সঙ্গে তুলনা করা শুরু করেছেন। প্রশংসার দাবি রাখেন মূল চরিত্রে অভিনয় করা হাঙ্গেরিয়ান অভিনেতা গেজা ররিগও। ওই দুই হাঙ্গেরিয়ানের আরো কাজ দেখার জন্য সিনেমাপ্রেমী সব দর্শক উন্মুখ হয়ে থাকবে এতে সন্দেহ নেই।

নাইট কুইনঃ সুমন কল্যাণপুর

 

গানের প্রতি ভালোবাসা, শ্রোতার প্রতি দায়বদ্ধ থেকে যিনি গানের সম্রাজ্যে মুম্বাইয়ের সিনেমায় সঙ্গীত জগৎ প্লাবিত করেছিলেন মায়াবী কণ্ঠের জাদুতে বিখ্যাত কণ্ঠশিল্পী ‘নাইট কুইনÑ সুমন কল্যাণ’।

শিশির ধোয়া মাঠ পেরিয়ে সকাল আসে দোয়েল পাখির গানে, ওইসময় আমাদের হৃদয় একটি সময় আটকেছিল সুমন কল্যাণের গানে। পঞ্চাশের দশক থেকে শুরু করে আশির দশক পর্যন্ত তিনি ছিলেন ভারতীয় সঙ্গীতের অন্যতম সঙ্গীত শিল্পী।

সুমন কল্যাণের জন্ম ১৯৩৭ সালের ২৬ জানুয়ারি। ঢাকায় তৎকালীন সুপ্রতিষ্ঠিত ‘হেমাদি’ পরিবারে জন্মগ্রহন করেন। তার নাম রাখা হয় সুমন হেমাদী। তার বাবা শঙ্কর রাও হেমাদী ও মা সীতা হেমাদীর গর্ভাাকাশে উদিত হয় তাদের দ্বিতীয় কন্যা সুমন হেমাদী। তারা ছিলেন ৫ বোন। ঊষা, সুমন, মুক্তা ও নীলা হেমাদী। বাবা শঙ্কর রাও সে সময় সেন্ট্রাল ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ায় চাকরি করতেন। ওই সুবাদেই ঢাকায় পোস্টিং।

১৯৪৩ সাল। বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা তখন বঙ্গ প্রদেশের অর্ন্তগত। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ডামাডোল তখন চারদিকে। দুর্ভিক্ষ ওই সময় তেড়ে এলে সুমন পরিবারসহ ঢাকা ছেড়ে পাড়ি জমায় মুম্বাইয়ে। বাংলাদেশ থেকে চলে যাওয়া মেয়েটির রক্তে ছিল সঙ্গীতের পিপাশা। কলম্বিয়া হাই স্কুলে ভর্তি হয়ে পাশাপাশি উচ্চাঙ্গ ও লঘু সঙ্গীতের শিখতে শুরু করেন। ওখানেই মূলত তার উচ্চাঙ্গ ও লঘু সঙ্গীত শিক্ষার সূচনা হয়। ১৯৫২ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান স্যার জে জে স্কুল অফ ফাইন আর্টসে পেন্টিং নিয়ে পড়া লেখা শুরু করেন তিনি। কিন্তু রঙে অ্যালার্জি থাকায় তা আর শেষ করতে পারেননি।

ছোটবেলায় বাংলাদেশে থাকা অবস্থাতেই কেএল সায়গল ও কানন দেবীর গানে প্রভাবিত হন সুমন। শচীন দেব বর্মণও তার হৃদয়ে একটা বিশেষ জায়গা করে নেয়। শচীনের পরিচালনায় গান গাওয়ার স্বপ্ন দেখতেন তিনি।

সুমন স্বতঃস্ফূর্তভাবেই ‘পুনে প্রভাত ফিল্মস’-এর মিউজিক ডিরেক্টরের কাছে ক্ল্যাসিকাল সঙ্গীতের তালিম নেয়া শুরু করেন। পরে পারিবারিক বন্ধু প-িত কেশব রাও বোলের কাছেও তালিম নেন। ১৯৫২ সালে অল ইন্ডিয়া রেডিওতে সুযোগ আসে গান গাওয়ার জন্য। অত্যন্ত সুরেলা ও সুমিষ্ট কণ্ঠের জন্য ১৭ বছর বয়স থেকেই তার নাম পরিচিত হয়ে ওঠে। ওই সূত্র ধরেই মারাঠি ছবি ‘সুক্রচি চাঁদনী’ ছবিতে গান গাওয়ার সুযোগ আসে। ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৫৩ সালে।

সঙ্গীত পরিচালক মোহাম্মদ সাফি ‘সুক্রাচী চাঁদনী’ সিনেমার গান শুনেই মুগ্ধ হয়ে ‘মাঙ্গু’ ছবিতে সুমনকে তিনটি গানের জন্য অনুরোধ করেন। আর মাঙ্গুতেই তার রেকর্ডিং ও প্লেব্যাক দিয়েই ক্যারিয়ার সুচনা। অতি দ্রুত জনপ্রিয়তা পেয়ে যান তিনি।

১৯৫৪ সালে সুমনকে ‘দারওয়াজা’ ছবিতে পাঁচটি গান গাওয়ালেন আরেক সঙ্গীত পরিচালক নাসাদ। ওই পাঁচটি গানের মধ্য দিয়েই হিন্দি ছবির জগতে পা রাখেন তিনি। মোহাম্মদ রফি, তালাত মাহমুদ, মান্না দে, মুকেশের সঙ্গে তার বেশকিছু দ্বৈতগান জনমনে জায়গা করে নেয়। পূর্ববঙ্গ থেকে যাওয়া সুমন কল্যাণ মুম্বাইয়ে ভালোভাবেই প্রতিষ্ঠা পেয়ে যান অতি অল্প সময়ের মধ্যেই। ওই বছরই ‘আরপার’ ছবিতে ওপি নায়ার সিদ্ধান্ত নেন তাকে দিয়ে গান গাওয়ানোর। ওই সময়ই নিজের গাওয়া একটি গান সিনেমায় নতুন করে কম্পোজ করেন সুমনের কথা মাথায় রেখে।

১৯৫৮ সালের ১৩ এপ্রিল সুমন পুনের বিশিষ্ট শিল্পপতি রমানন্দ এস কল্যাণকে বিয়ে করেন। ঢাকার প্রসিদ্ধ হেমাদী পরিবারে বাংলাদেশের সুমন হেমাদী হয়ে গেলেন সুমন কল্যাণ।

১৯৬৬ সালে সলিল সেন পরিচালনা করলেন ‘মনিহার’ ছবিটি। এর গানে মুকুল দত্ত ও পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায় সুর দেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। সুমন গাইলেন ‘দূরে থেকো না/আরো কাছে এসো।’ তবে এরই মধ্যে রেকর্ড করলেন কিছু অবিস্মরণীয় ও দুঃখজাগানিয়া গান

নিজের জাদুকরী কণ্ঠের মাধ্যমে প্লেব্যাক শিল্পী হিসেবে ১৯৫২ সাল থেকে বিশ্বের শ্রোতাকে মুগ্ধ করে আসছেন সুমন। এক হাজারেরও বেশি হিন্দি ছবির গানসহ ৩৬টি ভাষায় গান গেয়েছেন তিনি যা একটি বিস্ময়কর ব্যাপার।

সুমনের ক্যারিয়ারে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ সময় পঞ্চাশের দশক থেকে শুরু করে আশির দশক পর্যন্ত। দুঃখ যতো বাড়ে ততোই উজ্বলতর হয়ে ওঠে শিল্প। কৃষ্ণ প্রেমে সমর্পিত সুমন বিশ্বাস করেন, ভালোবাসা পাওয়াটাই জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। অসংখ্য মানুষের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধায় তার মতো আর কে-ই বা এতো সিক্ত হতে পেরেছে! ২৮ বছরের সঙ্গীত জীবনে তিনি শুধু জনপ্রিয়তাই অর্জন করেননি। একই সঙ্গে অর্জন করেছেন তার মখমলি কণ্ঠের স্বীকৃতি।

সুমন ১৯৬১ সালে পালকী, নাসিক ছবির জন্য রং সরং পুরস্কার পান। ১৯৬৫ ও ১৯৭০ সালে সুর সিঙ্গার সংসদ মিয়ান তানসেন পুরস্কার পান দু’বার এবং ১৯৬৫ ও ১৯৭৩ সালে গুজরাট ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড পান।

সুমন কল্যাণের গানে আর্তির মধ্যেও ধ্রুপদ সঙ্গীতের অনায়াস নৈপুণ্য, কণ্ঠে জুঁই ফুলের সৌরভের সঙ্গে সূক্ষ্ম অলঙ্করণÑ এসবই আমাদের সঙ্গীত জগতের পরম ঐশ্বর্য হয়ে আছে। ১৯৮১ সালে ‘লাভ ৮৬’ ছবিতে শেষ কণ্ঠ দেন তিনি।

এক সময় বাংলাদেশের থেকে চলে যাওয়া সুচিত্রা সেনের মতোই সুমন কল্যাণও গানের সুখ পাখিটি হয়ে অন্তরালে চলে গেলেন।

২০০৯ সালে মহারাষ্ট্র সরকারের কাছ থেকে পুরস্কার নেয়ার সময় সুমনকে শেষবারের মতো দেখা যায়। তিনি শুধু সঙ্গীতেই পারদর্শী ছিলেন নাÑ পেইন্টিং, সেলাই, বাগান পরিচর্চায়ও ছিলেন প্রগতিশীল।

পূজার গানের যুগটি ধাবমানকালে জড়িয়ে ধরে নিয়ে চলে গেছে অনেক দূরে। আকাশপারে ইথার তরঙ্গে কিছু গান আজও জড়িয়ে আছে। কিছু গান পেয়েছে অমরত্বের শিরোপা। কিছু স্থান পেয়েছে অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে। কিছু গান হয়তো বা নীল কাগজে লেখা কাঁপা কাঁপা হাতে লেখা প্রেমপত্রের মতো, টেলিগ্রাফের তারে বসা লেজ ঝোলা পাখির মতো। সদ্য যুবতীর পীড়িত চোখের চাউনির মতো সুমন হারিয়ে গেছেন আধুনিক অতি উজ্বলতার অন্ধকারে।

বাঙালির স্বভাব যেমন পাল্টে গেছে তেমনি গানেরও স্বভাব-চরিত্র অনেকটাই পাল্টেছে। সুমন তার কণ্ঠের মন্ত্রমুগ্ধতা ছড়িয়ে রেখেছেন সংগীত জগতে। সুরের ছন্দে মুখর কণ্ঠ আজও সবার হৃদয়ে ভালো লাগার দোলা দিয়ে যায়। এ কারণেই ভারতীয় সংগীতে তিনি এখন আর শুধু কণ্ঠশিল্পী নন, একটি প্রতিষ্ঠানও বটে। সুদীর্ঘ ধারাবাহিকতা, শিল্পের প্রতি নিষ্ঠার কারণে তিনি শুধু উঠতি শিল্পীদের কাছেও অনুপ্রেরণা। আমাদের গর্ব যে, তার জন্ম এই বাংলাদেশে। আমাদের প্রজন্মের কাছেই তিনি নয়, আগামী প্রজন্মেরও অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবেন।

থার্ড আই পারস্পেক্টিভ - আব্বাস কিয়ারোস্তমি

 

দুনিয়ার সোনালি পর্দা ছেড়ে গত ৪ জুলাই আব্বাস কিয়ারোস্তামি চলে গেলেন অন্য জগতে। ‘ইরানিয়ান নিউ ওয়েভ অফ সিনেমা’র জনক কিয়ারোস্তামি ষাটের দশকে যে কাজ করে গেছেন তা আরো হয়তো এক শতাব্দী ধরে শুধু ইরান নয়, গোটা বিশ্বের চলচ্চিত্রকারদেরই অনুপ্রেরণা জুগিয়ে যাবে। ব্যক্তিগত জীবনে কবি ও শিল্পী কিয়ারোস্তামির প্রতিটি কাজই কবিতার মতো ছন্দবদ্ধ, বিমূর্ত শিল্পের মতো বহুমুখী। এ কারণে রুপালি পর্দায় তার প্রতিটি কাজেই বিভিন্ন চলচ্চিত্র সমালোচকের কাছ থেকে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার দেখা পেয়েছে। কিন্তু কালের অবগাহনে তার সৃষ্টিগুলোই টিকে গেছে। তার এ রকমই একটা অনন্যসাধারণ সৃষ্টি ১৯৯৭ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসবে স্বর্ণপাম বিজয়ী  ‘টেস্ট অফ চেরি’।

ঘণ্টাব্যাপী টেস্ট অফ চেরি ছবির মূল কাহিনী একদমই সোজাসাপ্টা আপাতদৃষ্টিতে। একজন তার গাড়ি নিয়ে তেহরানের রাস্তায় চক্কর দিচ্ছে। সে একটা কাজ করাবে। এ জন্য লোক খুঁজছে। কিন্তু কাজটির কথা সরাসরি বলতেও পারছে না। রাস্তার মানুষকে ডেকে বলছে অনেক টাকার কাজ। তবে কেউ তেমন একটা আগ্রহ দেখাচ্ছে না আবার কেউ সরাসরি গালাগালিও করছে। কাজটা কী? বদি আত্মহত্যা করতে চায়। সে ঘুমের ওষুধ খাবেন রাতে। তার কবর খোঁড়াই আছে। সেখানে রাতেই ওষুধ খেয়ে শুয়ে থাকবে সে। কাজটি হলো সকালে কবরের সামনে গিয়ে বদির নাম ধরে ডাকতে হবে। সে যদি সাড়া দেয় তাহলে ভালো। আর সাড়া না দিলে কবরে মাটি দিয়ে চলে আসতে হবে। খুবই সহজ কাজ! এ কাজের জন্য সে প্রথম পাকড়াও করে এক কিশোর বয়সী আর্মির ক্যাডেটকে। তারপর এক যুবক বয়সী ইসলামি স্কলারকে। সবশেষে এক বৃদ্ধ ট্যাক্সি ডার্মিস্টকে। কাজের কথা শুনে প্রত্যেকের রি-অ্যাকশন এবং তাদের চিন্তাভাবনা নিয়েই এ ছবির কাহিনী।

টেস্ট অফ চেরি চলচ্চিত্রটির সংলাপ অনেক ক্ষেত্রেই বেশ খাপছাড়া। যেন আনাড়ি কোনো পরিচালক আনাড়ি অভিনেতাদের দিয়ে কোনোমতে কাজটি সেরেছেন। কিন্তু কিয়ারোস্তামি এখানে বদির মনস্তত্ত্ব ও তার আজব ওই অনুরোধের পর ভিন্ন বয়সী তিন আগন্তুকের প্রতিক্রিয়া নিয়ে কাজ করেছেন বলেই এমনভাবে ব্যাপারটি চিত্রায়িত করেছেন। বদির মনস্তত্ত্ব¡ বুঝতে খেয়াল রাখতে হবে কিয়ারোস্তামির ক্যামেরার কাজের দিকে। প্রথম আগন্তুককে গাড়িতে ওঠানোর আগ পর্যন্ত ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল ছিল বদির চোখ থেকে। প্রথমজনের সঙ্গে কথাবার্তার সময় ক্যামেরা ছিল ড্রাইভিং সিটের আশপাশে। দ্বিতীয়জনের সময় গাড়ির বাইরে এবং সর্বশেষ জনের সঙ্গে কথোপকথনের সময় ক্যামেরা ছিল এরিয়াল শটে। আত্মহত্যার পরিকল্পনা মাথায় আসা মাত্রই কেউ আত্মকেন্দ্রিক চিন্তা করতে থাকে। এরপর বিভিন্ন অপরিচিত মানুষের সঙ্গে কথাবার্তা বলার পর সে আসলে আরেকটু দূর থেকে থার্ড আই পারস্পেক্টিভে নিজেকে এবং নিজের জীবন যাচাই করা শুরু করে। এ ব্যাপারটিই সুচারু শিল্পীর মতো করেই পরিচালক সেলুলয়েডে ফুটিয়ে তুলেছেন। আবহ সঙ্গীতের বালাই নেই বলে শুরুর দিকে চলচ্চিত্রটি সবার কাছে বদির ইতস্তত রাস্তায় ঘোরাঘুরির মতোই উদ্দেশ্যহীন মনে হতে পারে। অজানা মানুষের সঙ্গে কথাবার্তা যতোই এগোতে থাকে, ক্যামেরার কাজ ও সংলাপ ততোই স্থিতিশীলতার দিকে এগোয়। বদি চরিত্রে রূপদানকারী হুমায়ুন এরশাদি চমৎকারভাবে পুরো ব্যাপারটি শুধু কণ্ঠস্বর ও বাচনভঙ্গির পরিবর্তনের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন যাতে করে ফার্সি জানা না থাকলেও দর্শক তার মনোজগৎ পরিবর্তনের পয়েন্টগুলো সহজেই ধরতে পারে।

দর্শক হিসেবে সবার জানতে ইচ্ছা করবে বদির সম্পর্কে। কেন সে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিল? তার জীবনে কী হয়েছে? কীভাবে সে শহরের বাইরে কারো সাহায্য ছাড়া কবর খুঁড়ে ফেললো? এসব প্রশ্নের উত্তর দেয়ার চেষ্টা কিয়ারোস্তামি করেননি।

 

ধীরগতির ওই চলচ্চিত্র নিয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে, আছে অনেক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ। সাধারণ চলচ্চিত্রের দর্শক হিসেবে আমার মতামতটুকু সবার কাছে পৌঁছে দিলাম। কবিসত্তার কারণে কখনোই কিয়ারোস্তামির ছবির আসল ব্যাখ্যা প্রকাশ করেননি। দর্শকের কাছে যা ভালো মনে হবে সেটিই চলচ্চিত্রের আসল ব্যাখ্যাÑ এমনটিই তার দর্শন।

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…