Boyhood - ফিল্ম রিভিউ

Boyhood - ফিল্ম রিভিউ 

ফুয়াদ বিন নাসের আবির

 

পরিচালক রিচার্ড লিংকলেটার যখন জানান দিয়েছিলেন, ‘বয়হুড’ চলচ্চিত্রটি তার ১২ বছরব্যাপী প্রজেক্ট তখন অনেকে ভ্র কুঞ্চিত করেছিলেন, কী এমন ছবি বানাচ্ছেন যার জন্য এক যুগ ধরে গবেষণা করতে হবে? যারা বয়হুড দেখে ফেলেছেন তারা হয়তো আঁচ করতে পারবেন, কেন ১২ বছর ধরে এর পেছনে শ্রম দিয়েছেন পরিচালক। এ চলচ্চিত্রটি সম্পর্কে বলা যায়, সেলুলয়েডের কাব্য দিয়ে বাস্তব জীবনের যতটা কাছে যাওয়া সম্ভব এর থেকেও এক-দুই পা সামনে এগিয়ে গিয়েছেন রিচার্ড লিংকলেটার।
নাম থেকেই ছবির বিষয়বস্তু সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। ৭ বছর বয়সের ছোট্ট ছেলে মেসন জুনিয়রের (এলার কোলট্রেইন) ছেলেবেলার দিনগুলোর কাহিনী বয়হুড। এখানে গবেষণার সুযোগ কোথায়? ঠিক গবেষণা নয়, পরিচালক ইচ্ছা করলেই ভিন্ন বয়সের মেসনের চরিত্রে অন্য অভিনেতাদের দিয়ে কাজ চালিয়ে নিতে পারতেন। কিন্তু সোজা পথে না গিয়ে তিনি বেছে নিয়েছেন এক অনিশ্চয়তাপূর্ণ এক্সপেরিমেন্ট করার সুযোগ। চলচ্চিত্রটির মুখ্য অভিনেতা এলার কোলট্রেইন ৭ বছর বয়স থেকে শুরু করে টানা এক যুগ প্রায় প্রতি উইকএন্ড কাটিয়েছেন পরিচালক রিচার্ড লিংকলেটারের প্রডাকশন সেটে। এর ফলই হচ্ছে এই অনন্য চলচ্চিত্র।


ওই ছবিটি এগিয়ে গেছে লিনিয়ার টাইমলাইনে ২০০২ সাল থেকে শুরু করে সামনের দিকে। পুরো ছবিটি সত্যিকার অর্থে মেসন জুনিয়র ও তার পরিবারের কাহিনী নিয়ে বানানো কিছু স্বল্পদৈর্ঘ্যরে চলচ্চিত্রের সমন্বয় বলা যায়। কিন্তু গোটা ছবিতে কখনোই আমরা কোনো চরিত্রের মুখ থেকে সরাসরি জানতে পারিনি এটি কোন বছর চলছে। পরিচালক বিভিন্ন কৌশলে দর্শককে জানান দেন সময়ের ব্যাপারে। কখনো ইরাক যুদ্ধের প্রসঙ্গ, কখনো বা হ্যারি পটার মুভির রিলিজ বা ওই আমলের কোনো একটি জনপ্রিয় গান আমাদের মনে করিয়ে দেয় সে বছরটির কথা। হয়তো অন্য কোনো একটি দৃশ্যে মেসনের চুলের কাটিং বা চেহারা দেখে আমরা বুঝতে পারি, কিছু সময় পার হয়েছে। ছোট কিছু ঘটনা যার গুরুত্ব হয়তো দর্শক তৎক্ষণাৎ ধরতে পারে না। কিন্তু অনেক বছর পর এর পুনরাবৃত্তি আবার দর্শককে মনে করিয়ে দেয়। পুরো ছবির ব্যাপারটি যেন নস্টালজিয়া লেইনে এক চক্কর মারার মতো। এক্ষেত্রে কেবল নিজের স্মৃতি সরণিতে না হেঁটে আমরা পরিচালকের হাত ধরে হাঁটছি ছোট্ট এক ছেলের স্মৃতির লেনে।
পুরো ছবি আমরা দেখি মেসন জুনিয়রের দৃষ্টিকোণ থেকে। ইরাক যুদ্ধের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ তার জগতে কোনো ঢেউ খেলায় না, বরং সে পরবর্তী হ্যারি পটার মুভির রিলিজ ডেট নিয়ে বেশি উৎসাহী হয়। আমরাও একই সঙ্গে তার উত্তেজনা উপভোগ করি। সে যখন হাসে-কাঁদে তখন আমরাও হাসি বা কাঁদি। আমাদের চোখের সামনে সে বড় হয়ে ওঠে। আমরা প্রত্যক্ষ করি তার মা-বাবার ভালো গুণগুলো কীভাবে বয়সের সঙ্গে তার মধ্যে প্রস্ফুটিত হচ্ছে। কোনো ভালো গল্পকারের মতো পরিচালক সরাসরি আমাদের কিছু বলে দেন না। তবুও আমরা বুঝতে পারি।


পর্দায় শুধু মেসন জুনিয়র নয়, আমরা দিন গড়ানোর সঙ্গে পরিণত হতে দেখি তার মা-বাবাকেও। মেসনের মা-বাবা ডিভোর্সড। তার মা অলিভিয়া (প্যাট্রিসিয়া আর্কেট) তাকে ও তার বোনকে নিয়ে টেক্সাস চক্কর মারেন। বাবা মেসন সিনিয়র (ইথান হক) সন্তানদের কাস্টডি পাননি। কাজেই তাকেও প্রায়ই চক্কর মারতে হয় নিজের সন্তানদের সঙ্গে দেখা করার জন্য। অলিভিয়া বুদ্ধিজীবী ঘরানার মানুষ, লিবারেল ফেমিনিস্ট ও কলেজের প্রফেসর। দুই সন্তান, বয়ফ্রেন্ড, সাবেক স্বামী- এত সম্পর্কের টানাপড়েনে তার জীবন চক্কর দেয়। মেসন সিনিয়র মধ্যবয়স্ক চাকরীজীবী। কিন্তু তিনি জীবন কাটাতে চান ব্যাচেলরের মতো। দায়-দায়িত্বহীন নির্ভার মানুষের মতো তিনি আনন্দ খুঁজের বাড়ান তার আশপাশ থেকে। মজার ব্যাপার হলো, মেসন তার সামনে দু’জনকে পাশাপাশি দেখে- একজন কর্মক্লান্ত একঘেয়ে জীবনযাপনে অভ্যস্ত, অন্যজন আনন্দ-ফুর্তিতে মত্ত। এই চলচ্চিত্রে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা শুধু মেসনের চিন্তা-ভাবনা পরিণত হতে দেখি তা নয়। আমাদের চোখের সামনে তার মা-বাবার চরিত্রেও পরিবর্তন আসে। তাদের চিন্তা-ভাবনার বিবর্তন দেখি। তাদের ছেলের মতো তারাও বড় হতে থাকেন। মেসনের মতো তারাও বুঝতে পারেন, ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’-এর মর্মার্থ।
বয়হুড চলচ্চিত্রে ছোটখাটো বেশ কিছু খুঁত আছে, বিভিন্ন দৃশ্যায়নে আছে কিছু অসঙ্গতি। কিন্তু দিন শেষে পৌনে ৩ ঘণ্টার রুপালি পর্দার এ যাত্রাটিকে কখনোই আলাদা দৃশ্য বা চরিত্র অথবা সংলাপ দিয়ে বিচার করতে যাওয়া উচিত নয়। এই কাব্যের শক্তি এর সামগ্রিকতা ও সারল্যে। ছবির দ্বিতীয় দৃশ্যেই আমরা দেখতে পাই মেসন সবুজ ঘাসের ওপর শুয়ে আছে, চোখ অসীম আকাশে। কোনো সংলাপ নেই, অভিব্যক্তির কোনো পরিবর্তন নেই। তার ছোট্ট মাথায় কী খেলা করছে তা জানার উপায় নেই।
বিফোর সানরাইজ, সানশেড, মিডনাইটখ্যাত পরিচালক লিংকলেটারের অন্যান্য ছবির মতো এটিও আপনাকে ভাবাবে, খেলা করবে আপনার আবেগ-অনুভূতি নিয়ে। এই ছবির সবচেয়ে ভালো দিক হলো, পরিচালক কোনো কিছুই জোর করে বোঝাতে চেষ্টা করেননি, কোনো কিছুই প্রমট করা হয়নি পর্দার অন্তরাল থেকে। যা হয়েছে তা স্বাভাবিক সারল্যেই হয়েছে। ছবিটি দেখার পর যে অনুভূতির পরশ পাবেন তা একান্তই আপনার নিজস্ব, পরিচালক এখানে ভাগ বসাতে আসবেন না।

Read 1927 times

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…