স্বপ্নের ফেরিওয়ালা

স্বপ্নের ফেরিওয়ালা

অরিন্দম মুখার্জী বিংকু

 


ভারতের অবহেলিত জাদুবিদ্যাটি শ্রেষ্ঠত্বে সিংহাসন পাইয়ে দেয়ার পর না থেমে জাদুশিল্প সব রাষ্ট্রে ছড়িয়ে দিয়ে বিশ্বের বুকে বাংলা ও বাঙালিকে গৌরবোজ্বল জাতি হিসেবে নতুনভাবে পরিচিত করেছেন পিসি সরকার।
স্বাধীনতা-উত্তর ভারতের দুর্বল আর্থিক কাঠামোর মধ্যেও মানুষ যাকে ঘিরে জীবন চ্যালেঞ্জ জয়ের স্বপ্ন দেখতো তিনিই পিসি সরকার তথা স্বপ্নের ফেরিওয়ালা।
আন্তর্জাতিক ওই জাদুকর ১৯৫০ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত জাদু দেখিয়েছেন। পিসি সরকার শুধু জাদুশিল্পীই ছিলেন না, লেখকও ছিলেন। জাদুশিল্পে পিসি সরকারের কৃতিত্ব হলো, তিনি বহুল প্রাচীন জাদু খেলার মূল সূত্র আবিষ্কার করেন। তার অন্যতম প্রদর্শনী ছিল ‘ইন্দ্রজাল প্রদর্শনী।
ভবিষ্যতের জাদু সম্রাটের জন্মও যেন একটি ম্যাজিক। ১৯১৩ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের টাঙ্গাইল জেলার ছোট্ট একটি গ্রাম অশোকপুরের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন পিসি সরকার অর্থাৎ প্রতুল। বাবা ভগবান চন্দ্র সরকার ও মা কুসুম কামিনী দেবীর প্রথম পুত্র সন্তান তিনি। প্রতুল ছিলেন সাত মাসের প্রিম্যাচুরড বেবি। ওই সময়ের যে চিকিৎসা ব্যবস্থা, এতে তার বেঁচে থাকারই কথা নয়। কিন্তু যিনি ভবিষ্যতে গোটা দুনিয়ায় তাক লাগিয়ে দেবেন, তাকে বাঁচিয়ে রাখতে রাখে হরির ম্যাজিক দেখিয়েছিলেন খোদ ঈশ্বর। তারা ছিলেন দুই ভাই। পিসি সরকার অর্থাৎ প্রতুল চন্দ্র (পিসি) সরকার বড় ও ছোট ভাই অতুল চন্দ্র (এসি) সরকার বা এসি সরকার।
চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বেড়ে ওঠা প্রতুল ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। বাবার ইচ্ছা ছিল, বুইড়া ছেলের আদরের ডাকনাম হবে বুড়ো। বুড়ো বড় হয়ে শিক্ষকতা করবেন। তিনি চাইতেন না ম্যাজিকটি পেশা হিসেবে নিন প্রতুল। সমাজ সাদরে গ্রহণ করবে না ভেবে সরকার পরিবার গোপনে চালিয়ে গেছে নিজেদের জাদু সাধনা। তন্ত্র-মন্ত্রে নয়, প্রকৃত অর্থে বিজ্ঞান সাধনা। সেকালের বিখ্যাত জাদুকর ঘনপতি চক্রবর্তী ছিলেন তার জাদুবিদ্যার গুরু। হাতে-কলমে জাদু জাদুবিদ্যা শেখা ও চর্চার আরো সুযোগ হয় তার। এর সঙ্গে দেশি-বিদেশি বই থেকেও চলতে থাকে জ্ঞান আহরণ। সেই প্রাথমিক শিক্ষাক্রম ডালপালা মেলে একদিন মহীরুহে পরিণত হলো। কিন্তু ভাগ্যের লেখনী একেবারেই আলাদা। তাই অংকের ছাত্র হয়েও জাদুবিদ্যাই হয়ে ওঠে প্রতুলের ধ্যান-জ্ঞান।


ভাই অতুল ১৯ বছরের ছোট। দাদার প্রথম দিকের পেশাদার জীবনের সঙ্গী ছিলেন তিনি। পরে মতান্তর হওয়ায় একাই ওই শিল্প মঞ্চস্থ করতেন আলাদাভাবে।
প্রতুলের শিক্ষা জীবন শুরু হয় বাড়ির পাশেই শিবনাথ হাই স্কুলে। স্কুলে যাতায়াতের পথে একটা খালের দু’পাশে ছিল ‘মাদারী’দের বাস। তাদের কাছেই প্রতুলের জাদুবিদ্যার হাতেখড়ি।
পারিবারিক সূত্রে জাদু ছিল তার রক্তেই। সেই আত্মারাম থেকে শুরু ষষ্ঠ প্রজন্মের দ্বারকানাথ সরকার পর্যন্ত সবাই অল্পবিস্তর ম্যাজিক জানতেন। সপ্তম প্রজন্মের ভগবান চন্দ্রও বাবার কাছ থেকে ওই বিদ্যা চর্চা করেন। কিন্তু তখনকার সমাজ জাদুকরদের খুব একটা সুনজরে দেখতো না। আত্মারামের ওপর সেই সময়ের কাপালিক ও তন্ত্র সাধকরা এতোটাই রুক্ষ ছিলেন যে, আজও তাদের তন্ত্র-মন্ত্রে বারবার এগিয়ে আসে তার নাম। ওই থেকেই সরকার পরিবারের কেউ প্রকাশ্যে কখনো জাদু দেখাননি। তবে প্রতুল সপ্তম  অষ্টম শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় স্কুলের অনুষ্ঠানে  ক্লাসের বন্ধুদের কাছে দেখানো শুরু করেন।
কিছুটা বংশগত ঐতিহ্যও পিসি সরকারকে বাল্যকাল থেকেই জাদুবিদ্যার প্রতি কৌতূহল এ পেশায় আগ্রহী করে তোলে। কিন্তু আদতেই জাদুবিদ্যা শিখবেন কি না, তা নিয়ে পরিবারের মধ্যে মত বিরোধ ছিল।
সমাজ তখন কুসংস্কারাচ্ছন্ন, শ্রেণী বৈষম্যে বিভক্ত ছিল। তুকতাক, ঝাড়ফুঁক করে অসাধ্য সাধন বা মন্ত্রবলে স্বপ্ন পূরণ হওয়ার পেছনে আমল রহস্য ধরে ফেলেন বিজ্ঞানমনস্ক দুই ভাই আত্মারাম ও বাঞ্চারাম সরকার। কিন্তু আধুনিকতায় অনভ্যস্ত সমাজ তা মানতে চায়নি। সহজ-সরল ও নিরক্ষর মানুষকে তা বোঝাতে গেলে আত্মারামের প্রাণনাশ হয় ‘মাদারী’ গোষ্ঠীর হাতে। আর বাঞ্চারাম পালিয়ে বাঁচেন। কারণ তাদের জীবন ধারণের অন্যতম উপায় ছিল জাদুবিদ্যা। উপস্থিত বুদ্ধি ও হাতের কারসাজি দিয়ে তিলটি তাল করে সাধারণ মানুষকে এক কল্পনার জগতে ছায়া দেখাতেন তারা।


ছোট প্রতুলের ওই খেলা বেশ ভালো লাগতো। আগ্রহ তার এতোটাই ছিল যে, একদিন তাদেরই একটা খেলা দেখিয়ে দিলেন তিনি। প্রথমে তারা বিরক্ত হলেও পরে তাকে অনেক খেলা শেখায়। পরবর্তী সময় টাঙ্গাইলে পড়া অবস্থায় সহপাঠীদের জাদু দেখিয়ে তাক লাগিয়ে দেন। মূলত তখন থেকেই শুরু হয় তার জাদুবিদ্যার পথ চলা।  
১৯২৯ সালে শিবনাথ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক ও করটিয়া সা’দাত কলেজ থেকে ১৯৩১ সালে মানবিক শাখা থেকে আবারও প্রথম বিভাগে পাস করেন। এরপর আনন্দ মোহন কলেজে বিএ ক্লাসে ভর্তি হন। সেখান থেকে বিএ পাস করার পর সম্পূর্ণ মায়ার জগতে প্রবেশ করেন প্রতুল। জাদু সম্রাটের পথটি মোটেও মসৃণ ছিল না। শিল্পের ক্ষেত্রে জায়গা করে নিতে ম্যাজিকের কপালেও কোনো ম্যাজিক জোটেনি। অনেক সংগ্রাম  ও দরিদ্রতার মধ্য দিয়ে রীতিমতো লড়াই করার পর একদিন ওই নাম ছাপিয়ে বড় হয়ে দাঁড়ালো পিসি সরকার।
বঙ্গ তখন অগ্নিগর্ভ। পিসি সরকার বিতাড়িত হয়ে পরিবারকে নিয়ে কলকাতায় এসে হাজির হন প্রতুল সুফিয়া স্ট্রিটের ভাড়া বাড়িতে। ম্যাজিক দেখিয়ে সংসার চালানো এক সময় দুঃসহ হয়ে উঠেছিল। লোহা-লক্কড়ের ব্যবসায়ী তথা তার এক বন্ধু সহ্য করতে না পেরে গ্রামে একটি মাস্টারি চাকরির ব্যবস্থা করলেন। ঠিক ওই সময় আরেকটি চিঠি এসে হাজির। চিঠিতে তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গের গভর্নরের বিদায়ী সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে অনুরোধ করা হয়েছে জাদুকর হিসেবে প্রতুলকে। ফলে আর চাকরি করা হলো না তার।


এরপর পেরিয়ে গেল অনেক বছর। ততোদিনে ইউরোপ-আমেরিকার চোখে কালো জাদু ও তন্ত্র-মন্ত্রের দেশ হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে ভারত। তাই বলে ওই জাদুবিদ্যার লুট করার কোনো ফন্দি ছিল না ব্রিটিশদের। পরাধীন দেশে ইংরেজরা পথঘাটের জাদুকর মাদারী খেলা দেখিয়ে তাদের কারিগরি বেশকিছু শিখে নিয়েছে।
ভারতীয় ঐতিহ্য ও পরম্পরার সঙ্গে মিশে গেছে পশ্চিমি আধুনিকতা। পরে এপার বাংলা থেকে কলকাতায় চলে আসা সরকার পরিবার পারিবারিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ম্যাজিক দেখিয়ে উপার্জন করতে থাকে। এদিকে নিজের ক্যারিশমাও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরো গভীর হতে থাকে। সেই সঙ্গে একটু করে বেড়ে উঠতে থাকে ইন্দ্রজালের মায়া।
পিসি সরকারের জাদু শব্দটিতেই আপত্তি ছিল। তিনি মনে করতেন, ওই শব্দটি বড় তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে ব্যবহৃত হয়। যেহেতু হিন্দু ধর্মের দেবরাজ ইন্দ্র হলেন মায়াবিদ্যার প্রতীক সেহেতু ওই ভাবনা থেকেই তার মঞ্চ উপস্থাপনার নাম হয় ইন্দ্রজাল। এর সঙ্গে যোগ হয় বিনোদন।


১৯৩০ সাল থেকে জনপ্রিয় হওয়া শুরু হয়। তখন কল্লোলনী বিভক্ত ছিল হোয়াইট ও ব্ল্যাক কলকাতা হিসেবে। ওই বিভেদের বেড়াজাল ভাঙতে জাদু সম্রাট নিউ এম্পায়ার থিয়েটার হলটিই বেছে নেন নিজের ম্যাজিক পরিবেশনের মঞ্চ হিসেবে। উঁচু বর্ণ ও সম্ভ্রমের নিউ এম্পায়ার মাসের পর মাস হাউসফুল হয়েছে ব্ল্যাক কলকাতা। জাদুর জগতে ব্যাপক প্রচার লাভের উদ্দেশ্যে তিনি এক সময় নিজের পদবী সরকার বাদ দিয়ে ইংরেজি ‘সোরসার’ শব্দ ব্যবহার করতে শুরু করের। কারণ শব্দটির অর্থ জাদুকর। তবে জনপ্রিয়তার শীর্ষে আরোহণ করার পর তিনি আবার নিজের সরকার পদবীই গ্রহণ করেন। তা বিদেশিদের ছোঁয়ায় হয়ে ওঠে আরো আকর্ষণীয়। কিন্তু সেসব খেলার উৎস যে আমাদের দেশীয় সেটিই উহ্য থেকে যায়। দরকার ছিল এমন একজনÑ যিনি ওই দেশের জাদুবিদ্যা বিশ্বে ছড়িয়ে দেবেন।
বাংলাদেশ থেকে কলকাতায় চলে যাওয়া ওই কা-ারি চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলেন প্রতুল চন্দ্র সরকার। তিন দশকের মাঝামাঝি থেকেই তিনি প্রচারের আলোয়। ক্রমেই শুরু হলো স্টেজ শো দেশে-বিদেশে। দেশীয় ম্যাজিকগুলো নতুন জাদুতে বুঁদ হলো দুনিয়া।
১৯৩৪ সালে তিনি সর্বপ্রথম বিদেশ গমন করেন। তিনি জাপান, ফ্রান্স, আমেরিকাসহ ৭০টির মতো দেশে জাদু প্রর্দশন করে ব্যাপক খ্যাতি ও জনপ্রিয়তা লাভ করেন। এ সময় তিনি পর্যপ্ত অর্থও উপার্জন করেন। তার জাদুর ছোঁয়ায় বিশ্বের দরবারে নতুন পরিচিত হলো ভারতবর্ষ। উন্নত বিশ্ব জানলো এবং মানলো, বেঁদে, ওঝা, ঝাড়ফুঁক ও বাজিকরের দেশ ভারতবর্ষ বিজ্ঞান নির্ভর ম্যাজিকও দেখাতে পারে। জাদু মানচিত্রে পিসি সরকারই হয়ে দাঁড়ালো আলাদা ব্র্যান্ড, আলাদা প্রতিষ্ঠান।


১৯৩৮ সালে পিসি সরকার কলকাতার বাসন্তী দেবীকে বিয়ে করেন। সংসার জীবনেও তিনি খুব সুখী ছিলেন। তার তিন ছেলে মানিক, প্রদীপ (পিসি সরকার জুনিয়র) ও পি সরকার ইয়ং। বাসন্তী দেবী ২০০৯ সালের ৬ ডিসেম্বর মারা যান।  
‘ওয়াটার অফ ইন্ডিয়া’  কারো অজানা নয়। এটি পিসি সরকারের জনপ্রিয় খেলাগুলোর মধ্যে অন্যতম। কোনো শো-র প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত একটি ছোট চৌবাচ্চা থেকে অনবরত ভরে চলতে থাকে গ্লাসের পর গ্লাস।
তিনিই বলে গেছেন, ‘আমি চিরজীবন শুধু ম্যাজিকের জগতেই বসবাস করেছি। স্বপ্নের রঙ গায়ে মেখে জীবন কাটিয়েছি। পৃথিবীর অনেক দেশেই গিয়েছি। সেখানকার মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করেছি। যতোই তাদের নৈকট্য বেড়েছে, ততোই নিজের দেশকে বেশি করে শ্রদ্ধা করতে ও চিনতে পেরেছি। ম্যাজিক একটি শিল্প। এতে বিজ্ঞান, টেকনোলজি, শারীরিক দক্ষতা ও শোম্যানশিপÑ সবই লাগে। এতে কোনো অলৌকিক কিছুই নেই।’
তাচ্ছিল্য ও অবহেলার বিরুদ্ধে লড়াই করে পথের ধুলায় পড়ে থাকা মাদারীর খেলাটি পিসি সরকার নিয়ে গিয়েছিলেন বিশ্বের দরবারে। ভ- সাধুদের ভোজবাজি মানুষকে ঠকানোর কলমঞ্চে উপস্থাপন করে তিনি প্রমাণ করে দিয়েছিলেন বিজ্ঞানই অলৌকিক পিতা। ডাইনিবিদ্যার নামে অন্ধকারে পড়ে থাকা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সংমিশ্রণ ভারতীয় জাদুটি তিনি তুলে ধরে ছিলেন বিশ্বের দরবারে। আত্মœবিস্মৃত জাতি তাকে ভুলে গেলেও ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে উত্যুজ্জ্বল হয়ে রয়েছে তার নাম।
ভারতীয় জাদু তথা বৌদ্ধতন্ত্র ও হিন্দুতন্ত্রের দশ মহাবিদ্যার মধ্যে দীর্ঘদিন অনাদরে পড়ে ছিল। পথে পথে ঘুরে বেড়াতো মাদারীর ঝোলায়। এগুলো নিয়ে বিশ্বে বিখ্যাত জাদুকরদের সঙ্গে একই মঞ্চে জাদু প্রদর্শন করতে লাগলেন পিসি সরকার।


জাদুবিদ্যার বিষয়ে পিসি সরকারের ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ইংরেজি, বাংলা ও হিন্দি ভাষায় প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ২০। এগুলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ম্যাজিক শিক্ষা, হান্ড্রেড ম্যজিক্স, ইউ ক্যান ডু, ছেলেদের ম্যাজিক, ম্যাজিকের কৌশল, সহজ ম্যাজিক, ম্যাজিকের খেলা, মেস মেরিজাম, জাদুবিদ্যা, হিন্দু ম্যাজিক, হিপনোটিজম, ইন্দ্রজাল প্রভৃতি।
নিউইয়র্কের টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ ‘এক্স-রে আই’ করাত দিয়ে মানুষ দ্বিখ-িত করা খেলাটি দেখানোর জন্য পিসি সরকারকে বিশেষ বিমানে আমেরিকায় নিয়ে আসে। তার ওই খেলাটি দেখে দর্শক অভিভূত হয়ে পড়ে। তার অপূর্ব প্রকাশভঙ্গির অসাধারণ বাস্তবতার গুণে অনেকে অজ্ঞান হয়ে যান। দ্বিখ-িত তরুণীটির খবর জানতে বিবিসি অফিসে এতো টেলিফোন আসতে থাকে যে, দুই ঘণ্টা টেলিফোন লাইন জ্যাম হয়ে যোয়।  খেলাটি দেখানোর পর তিনি অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা ও সম্মান লাভ করেন।
ফোর্স রাইটিংয়ের জাদু খেলাটি দেখিয়ে সংবাদপত্র মহলে অলোড়ন ফেলে দেন পিসি সরকার। কলকাতা ইম্পেরিয়াল রেস্টুরেন্টে এ কে ফজলুল হককে যে জাদু দেখিয়ে মুগ্ধ করেন এর শিরোনাম ছিল, ‘বাংলার মন্ত্রীদের পদত্যাগ’। এ শিরোনামে একটি সাদা কাগজে প্রথমে তিনি শেরেবাংলা ফজলুল হককে কিছু লিখতে বলেন এবং এর নিচে মন্ত্রীরা স্বাক্ষর করেন। কিছুক্ষণ পর শেরে বাংলা ফজলুল হক নিজের লেখার পরিবর্তে দেখেন, ‘এই মুহূর্তে আমরা মন্ত্রীরা পদত্যাগ করলাম এবং আজ থেকে জাদুকর পিসি সরকারই বাংলার মুখ্যমন্ত্রী।’ ঠিক এর পরের দিনই বিদেশে একটি দ্রুতগামী ট্রেন আসার মাত্র ৩৮ সেকেন্ড আগে তিনি হ্যান্ডকাফ বন্ধ অবস্থায় ট্রেনলাইন থেকে মুক্ত হয়ে আসেন। ওই হ্যান্ডকাফটি খুলতে ১৭টি চাবি ব্যবহার করা হতো। এ জন্য তাকে ইংল্যান্ডের জাদুকর সম্মিলনীর তৎকালীন প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি উইল গোল্ড ও স্টোন বলেছিলেন, ‘তুমি জন্মসিদ্ধ জাদুকর।’
পিসি সরকারের জাদু বিভিন্ন টেলিভিশনে যথা অস্ট্রেলিয়ান টেলিভিশন, বিবিসি, শিকাগোর ডাবলিউজিএনটিভি এবং নিউইয়র্কের এনবিসি ও সিবিএস টেলিভিশনে বহুবার প্রদর্শিত হয়েছে।
প্রতুল চন্দ্র সরকার কোনো টাইম ফ্রেম বা সমাজের কোনো শ্রেণীর গ-িতে আবদ্ধ ছিলেন না। ম্যাজিকের মহারাজা হয়েও তিনি ছিলেন সাধারণ মানুষ।
পিসি সরকার ১৯৫৫ সালে পশ্চিমবঙ্গের মহানায়ক উত্তম কুমারকে দিয়ে ‘ছায়া যায় কায়া থাকে’ অত্যাশ্চর্য খেলাটি দেখিয়ে ছিলেন। স্টেজে উত্তম কুমারকে তিনি আমন্ত্রণ জানান এবং পেছনে একটি সাদা স্ক্রিনে তাকে দাঁড় করিয়ে রাখেন। পর্দায় তীব্র সার্চলাইটের আলো ফেলার সঙ্গে সঙ্গে উত্তম কুমারের ছায়া পর্দায় ভেসে ওঠে। স্টেজে তাকে আসন গ্রহণ করতে বলেন। উত্তম কুমার পর্দা থেকে সরে গেলেও তার ছায়াটি বন্দি করে রাখেন। পুরো পৃথিবীতেই ওই খেলা পিসি সরকার ছাড়া অন্য কেউ দেখাতে পারেননি।


নিউ এম্পায়ার প্রেক্ষাগৃহ হয়ে ওঠার পর আর কলকাতায় সেভাবে ম্যাজিক দেখাননি জাদু সম্রাট। এর অন্যতম কারণ ছিল, পর্যাপ্ত পরিকাঠামোযুক্ত হলের অভাব।
১৯৫৭ ও ১৯৬৭ সালে আমেরিকা এবং ১৯৬২ সালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের মস্কো ও লেনিনগ্রাদ শহরে জাদু প্রর্দশন করে পিসি সরকার প্রচুর সুনাম অর্জন করেন। তিনিই প্রথম রাজকীয় পোশাক ও আকর্ষণীয় পাগড়ি পরে জাদু প্রদর্শনের প্রচলন করেন।
পিসি সরকারের জাদুর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে রঙিন চলচ্চিত্র ‘গিলি গিলি গে’ এবং দূরদর্শন তার ফটোগ্রাফির অ্যালবাম প্রকাশ করে। জাদুশিল্পে অসাধারণ পারদর্শীর জন্য বিশ্ববাসীর কাছ থেকে জাদু সম্রাট এবং কালের শ্রেষ্ঠ সম্রাট উপাধী লাভ করেন তিনি।
জাদু দেখিয়ে পিসি সরকার দেশে-বিদেশে অনেক পুরস্কার পেয়েছেন। ১৯৪৬ ও ১৯৫৪ সালে সর্বশ্রেষ্ঠ স্টেজ ম্যাজিকের জন্য আমেরিকার জাদুর অস্কার নামে পরিচিত ‘দ্য ফিনিক্স’ পুরস্কার দু’দুবার লাভ করেন। জার্মান ম্যাজিক সার্কেল থেকে ‘দ্য রয়াল মেডিলিয়ন’ পুরস্কার পান। এছাড়া তিনি গোল্ডবার পুরস্কার, ‘সুবর্ণ লরেন মালা’ নামে জাদুর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় জার্মান পুরস্কার, হল্যান্ডের ট্রিকস পুরস্কার এবং ১৯৬৪ সালে ভারত সরকার প্রদত্ত পদ্মশ্রী উপাধি লাভ করেন। জাদু খেলায় কৃতিত্বে জন্য মিয়ানমারের (বার্মা) তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মার্কিন নু তার নাম দিয়েছিলেন ‘এশিয়ার গর্ব’। ভারত সরকার ‘জাদু সম্রাট পিসি সরাকার নামে কলকাতায় একটি সড়কের নামকরণ করেছে। ১৯১০ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ভারত সরকার তার প্রতি সম্মান জানিয়ে একটি ৫ রুপির স্ট্যাম্প চালু করে।


পিসি সরকার ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের স্বার্থে ১৯৩৭ সালে জাপান সফরের সব অর্থ দান করেন। তিনি ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, জার্মান, বেলজিয়াম ও জাপানে ম্যাজিশিয়ান ক্লাবের সদস্য এবং বিলাতের রয়াল এশিয়াটিক সোসাইটির আজীবন সদস্য ছিলেন। ইউরোপের বিখ্যাত লেখকরা তার ওপর বেশ কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। এগুলোর মধ্যে ‘সোরকার’ ও ‘মহারাজা অফ ম্যাজিক’ গ্রন্থ দুটি উল্লেখযোগ্য।
প্রতুল চন্দ্রের গোটা জীবনই ছিল আক্ষরিক অর্থে জাদুতে মোড়া। পিসি সরকার বিদেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি শো করেন জাপানেÑ ৩৭ বার। তার জীবনের শেষ অধ্যায় রচিত হয় ওই দেশেই। ১৯৭০ সালের শেষ দিকে আরো একবার জাপান সফরে গিয়েছিলেন তিনি। ১৯৭১ সালের ৬ জানুয়ারি তিনি জাপানের আশাহিকা  ওয়ারের নিকটবর্তী জিগেৎসু শহরে হোক্কাইডো মঞ্চে ‘ইন্দ্রজাল’ বিস্তারে ব্যস্ত ছিলেন। মুগ্ধ দর্শকের সামনেই হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মঞ্চ থেকে অদৃশ্য হন চিরকালের জন্য। মাত্র ৫৭ বছর বয়সে তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে। ফলে দেশ হারালো তার বরপুত্রকে। ভারতীয় ম্যাজিকে আমদানি হলো এক নতুনধারা।   
ইন্দ্রজালবিদ্যার অম্বেষণে পরবর্তী প্রজন্মকে তৈরি রাখতে তার পরিকল্পনা ছিল আরও বড়। কিন্তু তার অকাল মৃত্যু তখনকার পরিকল্পনাগুলো ভানুমতির বাক্সেই বন্ধ করে দেয়।
ভারতবর্ষের আধুনিক বাঙালিদের মধ্যে ক্ষণজন্মা আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিখ্যাত জাদুকর ঐন্দ্রজালিক পিসি সরকারকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। তিনি বিশ্বাস করতেন, দ্য  শো মাস্ট গো অন। ঠিক তা-ই হয়েছে। পরিবারের উত্তরসূরিরা বয়ে নিয়ে চলেছে তার জাদু। তাদের সঙ্গে ওই ম্যাজিকের ধারা বয়ে চলেছে ওয়াটার অফ ইন্ডিয়ার অনাবিল গ্রোথের মতো।
অন্ধকার কুস্কারাচ্ছন্ন ওই জাদু বিজ্ঞানটি ঘষে-মেজে প্রতুল চন্দ্র নিয়ে এলেন বিশ্বের জনমঞ্চে। আমেরিকা, ইংল্যান্ড জার্মানির দর্শক অপলক অবোলকন করলো ভারতীয় জাদুকরের ইন্দ্রজাল।
বহু বছর পেরিয়ে গেছে। সরকার দ্য সিনিয়র মায়াপুরের বাসিন্দা হয়েছেন। এতো বছর দাঁড়িয়েও অনেকে তার মতো হয়ে ওঠার স্বপ্ন দেখেন। তাকেই রোল মডেল করে এগিয়ে চলেন নতুন জাদুকররা। অনেক দূরের তারা হয়ে পুরো ভূমিকায় সিনিয়র। আমাদের বাঙালির বুক আজও তার জন্য গর্বে ফুলে ওঠেÑ বাংলাদেশেরই সন্তান তিনি।

Read 337 times

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…