বিচিত্র রূপের হালখাতা

বিচিত্র রূপের হালখাতা

সাইমন জাকারিয়া

 

 

হালখাতা বাংলা নববর্ষ উদযাপনের বিচিত্র রূপ ও সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। সাধারণত বাংলাদেশের গ্রামীণ ব্যবসায়ীরা বাংলা নববর্ষ এলে হালখাতার আয়োজন করেন। তারা এ সময় মূলত নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা দোকানের সুহৃদ ক্রেতা ও বিভিন্ন লেনদেনকারী ব্যক্তিকে আমন্ত্রণের মাধ্যমে মিষ্টিমুখ করান। এই মিষ্টিমুখ করানোর ফাঁকে ব্যবসায়ীরা বিগত বছরের হিসাবের খাতার পাট চুকিয়ে নতুন খাতায় নতুন বছরের ব্যবসার হিসাব শুরু করে থাকেন। সুহৃদ ক্রেতারাও হালখাতার আয়োজনে যোগ দিয়ে সারা বছরের বকেয়া পরিশোধ করেন। হালখাতা নামটির ভেতর সংস্কৃতির এই রহস্য লুকিয়ে আছে। আসলে আরবি ‘হাল’ শব্দের সঙ্গে ফার্সি শব্দ ‘খাতা’ মিলে হালখাতা রূপ ধরেছে। আরবি ভাষার ‘হাল’ শব্দটির অর্থ হলো বর্তমান বা চলতি এবং ফার্সি ‘খাতা’ শব্দটির অর্থ হলো বই বা বহি। তাই সামগ্রিক বিচারে ‘হালখাতা’র অর্থ হলো চলতি বছরের হিসাবের খাতা বা বই। পুরনো বছরের পাট চুকিয়ে নতুন বছরের জন্য নতুন খাতা বা বইয়ে হিসাব লেখার সূচনা করার আনুষ্ঠানিক সংস্কৃতি পালনের নামই ‘হালখাতা’।
বাংলাদেশের এমন কোনো অঞ্চল হয়তো খুঁজেই পাওয়া যাবে না যেখানে বাংলা নববর্ষ উৎসবের অংশ হিসেবে হালখাতার অনুষ্ঠান হয় না। আগে ওই আয়োজন গ্রামীণ সমাজের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী এবং তাদের দরিদ্র ক্রেতার মধ্যে প্রচলিত ছিল। এখন ওই দৃশ্যপট পরিবর্তিত হয়েছে। বর্তমানে বড় ব্যবসায়ীরাও হালখাতার আয়োজন করে থাকেন। একই সঙ্গে হালখাতার আয়োজন গ্রাম ছাড়িয়ে নগর সমাজেও বিস্তৃত হয়েছে। ঢাকা মহানগরের অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে এখন বাংলা নববর্ষের সময় হালখাতার আয়োজন করতে দেখা যায়।
এক সময় গ্রামে হালখাতার আয়োজনে মিষ্টি হিসেবে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তথা দোকানের পাশেই গরম জিলাপি ভাজা হতো এবং ক্রেতারা এসে বকেয়া পরিশোধের মাধ্যমে মজা করে ওই জিলাপি খেতেন। শুধু তা-ই নয়, ক্রেতারা যখন ফিরে যেতে উদ্যত হতেন তখন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা দোকানের মালিক কর্তৃপক্ষ তাদের হাতে তুলে দিতেন বাড়ির সদস্যদের জন্য একটি জিলাপির ঠোঙা।
তাই গ্রামীণ সমাজে হালখাতার জন্য শুধু ব্যবসায়ীরা অপেক্ষা করতেন না, ক্রেতা ও তাদের পরিবারের সদস্যরাও অপেক্ষা করতেন যুগপৎ। শুধু জিলাপিই নয়, হালখাতার আয়োজনে কোথাও কোথাও স্থানীয় বিভিন্ন মিষ্টান্ন তথা ম-া-মিঠাই অভ্যাগতদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। বড়দের পাশাপাশি হালখাতার আয়োজনে শিশুদেরও সরব উপস্থিতি ঘটে। মূলত অভিভাবকদের হাত ধরেই শিশু-কিশোররা হালখাতার আয়োজনে শরিক হয়ে থাকে। বড়দের মতো শিশু-কিশোরদের জন্যও দেওয়া হয় রসে ডুবুডুবু ধবধবে সাদা বড় রাজভোগ যার ভেতরে থাকে ছোট ক্ষীরের পুঁটলিতে পোরা সুগন্ধি একটি এলাচদানা। খুব তৃপ্তি নিয়ে সব বয়সী মানুষ হালখাতার মিষ্টান্ন যেমন আহার করে থাকেন তেমনি কোথাও দেওয়া কালিজিরা ছিটানো হালকা গেরুয়া রঙের নিমকি খেয়ে কারও মন গলে যায়। নিমকির মচমচে ভাজায় অন্তর চাঙ্গা হয়ে ওঠে। কোথাও আবার গন্ধ কর্পূূর মেশানো ঠা-া এক গ্লাস পানি হৃদয়টি শীতল করে দেয়। রাজভোগের মিষ্টতার বিলাসী আবেশের সঙ্গে নোনতা নিমকির নিরপেক্ষ স্বাদ দুই বিপরীত রসের স্রোতে রসনায় বৈচিত্র্য আনে বৈকি।
হালখাতার আয়োজন উপলক্ষে নববর্ষ আসার আগের দিন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করা হয়। নববর্ষের দিন হালখাতা উপলক্ষে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সামনে দুটি বা চারটি কলার গাছ লাগিয়ে একটি প্রবেশপথ তৈরি করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন রঙিন কাগজ দিয়ে দোকান বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটি দারুণভাবে সাজানো হয়। জ্বালানো হয় সুগন্ধি আগরবাতি। ব্যবসায়ী বা তার আমন্ত্রিত ক্রেতারা ওই রঙিন ও সুগন্ধ ছড়ানো আয়োজনের মধ্যে আসেন নতুন রঙিন বা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পোশাক পরে। সব মিলিয়ে একটা ফুরফুরে ও সুন্দর ভাব সৃষ্টি হয় হাতখাতার পুরো আয়োজন ঘিরে।
আরেকটা ব্যাপার উল্লেখ করা প্রয়োজন। তা হলো, হাতখাতার এ ধরনের আয়োজনের আগেও কিছু কাজ থাকে। যেমন আমন্ত্রপত্র তৈরি, বিতরণ অথবা মৌখিকভাবে আমন্ত্রণ জানানোর বিষয়। তবে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হাতখাতার জন্য প্রস্তুতকৃত আমন্ত্রণপত্রের মাথায়, এমনকি কখনো কখনো হালখাতার জন্য সজ্জিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রবেশপথের মুখে একটা না একটা স্বস্তিবচন লেখা থাকে। ওই স্বস্তিবচন মূলত ব্যবসায়ীদের নিজস্ব ধর্ম বিশ্বাস অনুযায়ী নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে অর্থাৎ তারা ইসলাম, সনাতন, বৈষ্ণব, বৌদ্ধ, ক্রিশ্চিয়ান ইত্যাদি যে ধর্ম মতের অনুসারীই হোন না কেন, যার যার ধর্ম মতের প্রচলিত বিশ্বাস ও ভক্তিভাব অনুযায়ী স্বস্তিবচনের শিরোনাম বা বন্দনাস্তবক লেখা হয়ে থাকে। কোথাও হয়তো লেখা থাকে, ‘এলাহি ভরসা’, কোথাও ‘নমো গণেশায় নমঃ’, ‘শ্রীহরি’, ‘জয় রাধা-কৃষ্ণ’ বা ‘বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি’, ‘ধম্মং শরণং গচ্ছামি’, ‘সঙ্ঘং শরণং গচ্ছামি’ ইত্যাদি। কোথাও আবার একটা ‘ক্রুশ’চিহ্নও এঁকে দেওয়া হয়। এ ধরনের স্তবক লিখন দেখে হালখাতার অনুষ্ঠানটি ধর্ম প্রভাবিত বলা চলে না। কারণ এ ধরনের লিখনের ভেতর দিয়ে মূলত ব্যবসায়ীর নিজস্ব বা ব্যক্তিগত ধর্ম বিশ্বাস প্রতিফলিত হয়। কিন্তু আমন্ত্রণপত্রটি বিতরিত হয় সব ধর্মের ক্রেতা বা আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে।
প্রখ্যাত প-িত মুহম্মদ এনামুল হকের মতে, বর্তমানে হালখাতা ব্যবসায়িক অনুষ্ঠান হলেও আসলে এ হচ্ছে একটা কৃষি বিষয়ক অনুষ্ঠান। প্রাচীনকালে ‘দ্রব্য’ বিনিময়ের মাধ্যমে (‘মুদ্রা’ বিনিময়ের মাধ্যমে নয়) যখন ব্যবসা চলতো তখন গৃহস্বামী তার উৎপন্ন দ্রব্যের কতোটুকু নিজের জন্য রেখে অবশিষ্টটুকুর দ্বারা নিজের প্রয়োজনীয় অন্য দ্রব্য নেবেন এ সম্পর্কে একটা হিসাব। তা যে কোনো উপায় হতে পারে। যেমন রাশিতে গেরো দিয়ে, পাথর বা মাটির ঢেলার স্তূপ জমিয়ে তাকে রাখতে হতো। তারপর অনেক পরে তিনি তালের পাতায় ‘টোকা’ রেখে অথবা তুলট কাগজে ‘চোতা’ বানিয়ে ওই কাজ সেরেছেন। বর্তমানে হালখাতা এরই বিবর্তিত রূপ।
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হালখাতা এখন অনেকভাবে হয়ে থাকে। মানিকগঞ্জ ও বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে হালখাতা উপলক্ষে ‘লাঠিখেলা’, ‘বুড়া-বুড়ির সঙ’ ‘কিচ্ছা’ ইত্যাদি পরিবেশনামূলক লোকশিল্পের আয়োজন করা হয়। এতে একই সঙ্গে স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে হালখাতার নিবিড় সম্পর্ক রচিত হয়। আমাদের ধারণা, হালখাতার সঙ্গে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের এ ধরনের আয়োজন নতুনভাবে যুক্ত হয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে হালখাতার এ ধরনের সাংস্কৃতিক আয়োজন বাংলাদেশের সব অঞ্চলের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে বলেই প্রত্যাশা রাখি।

Read 333 times

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…