বৈশাখে লোকজ মেলা ও তারুণ্য

বৈশাখে লোকজ মেলা ও তারুণ্য

অঞ্জন আচার্য

 

 

পহেলা বৈশাখ বাংলা সনের প্রথম দিন, তথা বাংলা নববর্ষ। দিনটি বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিশেষ উৎসবের সাথে পালিত হয় নববর্ষ হিসেবে। এছাড়া এ উৎসবে অংশ নেয় ত্রিপুরায় বসবাসরত বাঙালিরাও। সে হিসেবে এটি বাঙালিদের একটি সর্বজনীন উৎসব। সারা বিশ্বের বাঙালিরা এ দিনে বরণ করে নেয় নতুন বছরকে, ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করে অতীত বছরের যাবতীয় দুঃখ-গ্লানি। সবার কামনা থাকে নতুন বছরটি যেন হয় সমৃদ্ধ ও সুখময়। অন্যদিকে নতুনভাবে ব্যবসা শুরু করার উপলক্ষ্য হিসেবে এ দিনটিকে বরণ করে বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা। গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জি অনুসারে ১৪ এপ্রিল পালিত হয় এ পহেলা বৈশাখ। আধুনিক বা প্রাচীন যেকোনো পঞ্জিকাতেই মিল রয়েছে এই বিষয়ে। বাংলাদেশে প্রতি বছর ১৪ এপ্রিল এই উৎসব পালিত হয়। বাংলা একাডেমি নির্ধারিত আধুনিক পঞ্জিকা অনুসারে নির্দিষ্ট করা হয়েছে এই দিন।
অনেক আগে থেকেই বাংলা বারো মাস পালিত হতো হিন্দু সৌর পঞ্জিকা অনুসারে। গ্রেগরীয় পঞ্জিকায় এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে শুরু হতো এই সৌর পঞ্জিকার। হিন্দু সৌর বছরের প্রথম দিন আসাম, বঙ্গ, কেরলা, মনিপুর, নেপাল, উড়িষ্যা, পাঞ্জাব, তামিলনাড়– এবং ত্রিপুরার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বহুদিন থেকেই পালিত হতো। এখন যেমন নববর্ষ নতুন বছরের সূচনার নিমিত্তে পালিত একটি সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে, একসময় এমনটি ছিল না। তখন নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ পালিত হতো আর্তব উৎসব তথা ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে। তখন এর মূল তাৎপর্য ছিল কৃষিকাজ। প্রযুক্তির যুগ শুরু না হওয়ায় ঋতুর ওপরই নির্ভর করতে হতো কৃষকদের।
ভারতবর্ষে মোঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর সম্রাটরা কৃষি পণ্যের খাজনা আদায় করত হিজরি পঞ্জিকা অনুসারে। কিন্তু হিজরি সন চাঁদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা কৃষি ফলনের সাথে মিলত না। এতে অসময়ে কৃষকদেরকে বাধ্য করানো হতো খাজনা পরিশোধ করতে। তবে খাজনা আদায়ে সুষ্ঠুতা প্রণয়নের লক্ষ্যে মোঘল সম্রাট আকবর প্রবর্তন করেন বাংলা সনের। তিনি মূলত আদেশ দেন প্রাচীন বর্ষপঞ্জিতে সংস্কার আনার। সম্রাটের আদেশ মতে সৌর সন এবং আরবি হিজরি সনের ওপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম বিনির্মাণ করেন তৎকালীন বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহ উল্লাহ সিরাজি। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ মার্চ বা ১১ মার্চ থেকে শুরু হয় বাংলা সন গণনা। তবে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর করা হয় আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় (৫ই নভেম্বর, ১৫৫৬) থেকে। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন। পরে তা পরিচিত হয় বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ নামে। আকবরের সময় থেকেই শুরু হয় পহেলা বৈশাখ উদ্যাপন। তখন প্রত্যেককে চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে পরিশোধ করতে হতো সকল খাজনা, মাশুল ও শুল্ক। এরপর দিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে ভূমির মালিকরা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদেরকে আপ্যায়ন করাতেন মিষ্টান্ন দিয়ে। এ উপলক্ষ্যে আয়োজন করা হতো বিভিন্ন উৎসবের। একসময় এই

 

 

লোকজ সংস্কৃতি : আড়ম্বরপূর্ণ উৎসবের মধ্য দিয়ে এদেশে উদ্যাপন করা হয় পহেলা বৈশাখ। নতুন বছরের এ উৎসবের সঙ্গে রয়েছে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কৃষ্টি ও সংস্কৃতির নিবিড় সম্পর্ক। গ্রামগঞ্জের মানুষ ভোরে ঘুম থেকে ওঠে। নতুন জামাকাপড় পরে বেড়াতে যায় আত্মীয়স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের বাড়িতে। পরিষ্কার করা হয় ঘরবাড়ি-আঙিনা, সাজানো হয় মোটমুটি সুন্দর করে। সেই সঙ্গে থাকে বিশেষ খাবারের ব্যবস্থা। কয়েকটি গ্রামের মিলিত স্থানের খোলা মাঠে আয়োজন করা হয় বৈশাখী মেলার। আবহমান বাংলার চিরায়ত ঐতিহ্য এ মেলা৷ কেবল বাংলাদেশেই বৈশাখের প্রথম সপ্তাহে অন্তত দুই শতাধিক বৈশাখী মেলার আয়োজন বসে৷ সেখানে নানা স্বাদের মুড়ি-মুড়কি আর পিঠাপুলি তো রয়েছেই, সেই আদিকাল থেকে জনপ্রিয় পুতুলনাচের আসরও এই মেলার অন্যতম আকর্ষণ৷ আর নাগরদোলায় হাওয়ায় ভেসে নববর্ষের নতুন মুহূর্তগুলোকে উপভোগ করার অনুভূতি যেন একেবারেই ভিন্ন৷ এছাড়া রয়েছে হরেক রকমের কুটিরশিল্প আর হস্তশিল্পের বাহারি প্রদর্শনী৷ দেখা মেলে বাংলার ঐতিহ্য মাটির তৈরি বিভিন্ন পণ্যেরও৷ অনেক জায়গায় ব্যবস্থা থাকে ইলিশ মাছ দিয়ে পান্তা ভাত খাওয়ার আয়োজন। এই দিনের একটি পুরনো সংস্কৃতি হলো গ্রামীণ ক্রীড়া প্রতিযোগিতা। এর মধ্যে নৌকাবাইচ, লাঠি খেলা ও কুস্তি উল্লেযোগ্য। এদেশে এরকম কুস্তির সবচেয়ে বড় আসরটি বসে ১২ বৈশাখ, চট্টগ্রামের লালদিঘী ময়দানে। এটি জব্বারের বলি খেলা নামে বিশেষভাবে পরিচিত। বৈশাখে এসব মেলা হয়ে থাকলেও মেলাগুলো বর্ষবরণ মেলা, নববর্ষের মেলা, বান্নি মেলা আবার কোথাও এলাকার নামে, ব্যক্তি বা অন্যান্য নামে পরিচিতি পেয়ে থাকে। যার অন্যতম দৃষ্টান্ত এ আবদুল জব্বারের বলি খেলাটি। এছাড়া বর্ষবরণ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে মেলা হয়ে থাকে বৈশাখের প্রথম দিন চট্টগ্রাম নগরীর ডিসি হিল, সিআরবির শিরিষ তলা চত্ত্বরসহ বিভিন্ন স্থানে। চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠিত এসব মেলায় হা-ডু-ডু, কুস্তি লড়াই, লাঠিয়াল নাচ, পুতুল নাচ, সার্কাস, মোরগ লড়াই, ঘুড়ি ওড়ানো, ষাঁড়ের লড়াইসহ থাকে মজার মজার আয়োজন। একসময় এসব মেলায় জনপ্রিয় অনুষঙ্গ ছিল বায়োস্কোপ বাক্স। কিন্তু এখন এটি আর দেখা যায় না। তবে অনেক জায়গায় আয়োজন করা হয় পুতুল নাচ, সার্কাসের। এদিকে ঈশা খাঁর সোনারগাঁওয়ে বসে এক ব্যতিক্রমী মেলা, যার নাম বউমেলা। জয়রামপুর গ্রামের মানুষের ধারণা, প্রায় ১০০ বছর ধরে পহেলা বৈশাখে আয়োজিত হয়ে আসছে এ মেলাটি। পাঁচ দিনব্যাপী এই মেলাটি বসে প্রাচীন একটি বটগাছের নিচে। যদিও হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা সেখানে সমবেত হয় সিদ্ধেশ্বরী দেবীর পূজা উপলক্ষ্যে। বিশেষ করে কুমারী, নববধূ, এমনকি জননীরা পর্যন্ত তাঁদের মনষ্কামনা পূরণের আশায় এই মেলায় এসে পূজা-অর্চনা করে থাকেন। মিষ্টি ও ধান-দূর্বার সঙ্গে মৌসুমী ফল নিবেদন করেন ভক্তরা। এছাড়া মেলাকে ঘিরে পাঁঠাবলির রেওয়াজও বেশ পুরনো। তবে কালের বিবর্তনে বদলে যাচ্ছে পুরনো অর্চনার পালা। এখন ভক্তরা কবুতর উড়িয়ে শান্তির বার্তা প্রার্থনা করেন দেবীর কাছে। অন্যদিকে সোনারগাঁ থানার পেরাব গ্রামের পাশে আয়োজন করা হয় আরেকটি মেলার, যার নাম ঘোড়ামেলা। লোকমুখে প্রচলিত আছে, যামিনী সাধক নামের এক ব্যক্তি ঘোড়ায় চড়ে নববর্ষের এই দিনে সবাইকে প্রসাদ দিতেন।

তাঁর মৃত্যুর পর ওই জায়গাতেই বানানো হয় সাধকের স্মৃতিস্তম্ভ। প্রতি বছর পহেলা বৈশাখে স্মৃতিস্তম্ভে হিন্দুরা একটি করে মাটির ঘোড়া রাখে এবং সেখানে আয়োজন করে মেলার। যার কারণে মেলাটির নাম ঘোড়ামেলা। এ মেলার অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে নৌকায় খিচুড়ি রান্না করা। এরপর সেই খিচুড়ি কলাপাতায় করে খায় আবালবৃদ্ধবনিতা সবাই। সকাল থেকেই মেলাকে ঘিরে ঘটতে থাকে নানা বয়সী মানুষের সমাগম। একদিনের এ মেলাটি জমে ওঠে মূলত দুপুরের পর থেকে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পূজা উপলক্ষ্যে এ মেলার আয়োজন করা হলেও এতে প্রাধান্য থাকে সব ধর্মের মানুষেরই। মেলায় সবচেয়ে বেশি ভিড় লক্ষ করা যায় শিশু-কিশোরদের। মেলাতে বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে রাখা হয় নাগরদোলা, পুতুলনাচ ও সার্কাসের। এছাড়া মেলার ক্লান্তি দূর করতে যোগ হয় কীর্তন গান। খোল-করতাল বাজিয়ে এ কীর্তন গানের আসর চলে মধ্যরাত পর্যন্ত। অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলায় বসবাসরত আদিবাসীদের মধ্যে চলে বর্ষবরণের নানা আয়োজন। সে অঞ্চলের প্রধান তিনটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর রয়েছে স্বতন্ত্র বর্ষবরণ উৎসব। এ উৎসবটি ত্রিপুরাদের কাছে বৈসুক, বৈসু বা বাইসু, মারমাদের কাছে সাংগ্রাই ও চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যাদের বিজু নামে পরিচিত। বর্তমানে এ তিন জাতিগোষ্ঠী একত্রে উৎসবটি পালন করে থাকে। উৎসবের নামের আদ্যাক্ষর দিয়ে যার যৌথ নামকরণ করা হয়েছে ‘বৈসাবি’। এ উৎসবের রয়েছে নানা দিক। ত্রিপুরা সম্প্রদায় শিবপূজা ও শিবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনার মধ্য দিয়ে পালন করেন ‘বৈসুক’ বা ‘বৈসু’ উৎসব। এছাড়া মারমাদের ‘সাংগ্রাই’ উৎসব চলে তিন দিনব্যাপী। উৎসবে মারমাদের সবাই গৌতম বুদ্ধের ছবি নিয়ে নদীর তীরে যান এবং দুধ বা চন্দন কাঠের জল দিয়ে স্নান করান সেটিকে। এরপর আবার ওই ছবিটিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় আগের জায়গায় অর্থাৎ মন্দির বা বাসাবাড়িতে। আদিকাল থেকে অন্যান্য সম্প্রদায় থেকে ভিন্ন আঙ্গিকে পুরনো বছরকে বিদায় এবং নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে এ সাংগ্রাই উৎসব পালন করে আসছে মারমারা। ধারণা করা হয়, ‘সাক্রাই’ মানে সাল শব্দ থেকে ‘সাংগ্রাই’ শব্দটি এসেছে, বাংলায় যা ‘সংক্রান্তি’ নামে পরিচিত। মারমারা ‘সাংগ্রাই জ্যা’র অর্থাৎ মারমা বর্ষপঞ্জি তৈরি মধ্য দিয়ে সাংগ্রাইয়ের দিন ঠিক করে থাকে। 

 

 

১৩৫৯ খ্রিস্টাব্দের আগে থেকেই এ ‘সাক্রাই’ বা সাল গণনা করা হয়, যা ‘জ্যা সাক্রই’ নামে পরিচিত। অন্যদিকে চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যারা উৎসবটি পালন করে চৈত্রের শেষ দুই দিন ও বৈশাখের প্রথম দিন মিলিয়ে মোট তিন দিন ধরে। এর মধ্যে চৈত্রের শেষ দিনটিতে থাকে এ উৎসবের মূল আকর্ষণ। ওই দিন প্রত্যেকের ঘরে পাঁচ প্রকারের সবজি দিয়ে বিশেষ একপ্রকার খাবার রান্না করা হয়। তাদের বিশ্বাস, এই পাঁচনের দৈব গুণাবলী আছে, যা আসছে বছরের সকল রোগবালাই ও দুঃখ-দুর্দশা দূর করে থাকে। এছাড়া এদিন বিকেলে ঐতিহ্যবাহী ঘিলা, বৌচি ইত্যাদি খেলারও আয়োজন করা হয়। কিশোরী-তরুণীরা নদীর জলে ফুল ভাসায়। তিন দিনের এ উৎসবে ওই সম্প্রদায়ের কেউ কোনো জীবিত প্রাণী হত্যা করে না। ‘বৈসাবি’ উৎসবের মূল আয়োজন হলো জলখেলা। উৎসবটি পার্বত্য অঞ্চলে কমবেশি সবার কাছেই জনপ্রিয়। উৎসবে আদিবাসীরা সবাই সবার দিকে জল ছুঁড়ে আনন্দে মাতেন। তাদের মতে, এ জলের মধ্য দিয়ে ধুয়ে যায় বিগত বছরের সকল দুঃখ, পাপ। জলখেলার আগে অনুষ্ঠিত হয় জলপূজা। মারমা যুবকরা এ উৎসবে তাদের পছন্দের মানুষটির গায়ে জল ছিটিয়ে সবার সামনে প্রকাশ করে তাদের ভালোবাসার কথা। এর মধ্য দিয়ে আন্তরিক হয় পরস্পরের সম্পর্কের বন্ধন। তারুণ্যের মেলা : বৈশাখ মানেই বাঙালির উৎসবমুখর একটা দিন। বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসব বৈশাখের প্রথম দিনটি। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি নির্বিশেষে সকলেই অংশ নেয় বৈশাখী আয়োজনে। অসাম্প্রদায়িক চেতনায় ঋদ্ধ এই দিনটিকে বাঙালিরা বরণ করে নেয় অতীত বছরের সব দুঃখ-গ্লানি ভুলে। নতুন বছরটি যেন সুন্দর, সুখময় ও সমৃদ্ধ হয় এই কামনাই থাকে সবার মনে ও প্রাণে। প্রতিবারই এই সর্বজনীন উৎসবটি ভরে ওঠে তারুণ্যের উচ্ছাসে। উৎসবকে ঘিরে প্রস্তুতিরও কমতি থাকে না তরুণদের মধ্যে। রঙিন পোশাকে তরুণ-তরুণীরা হাঁটে আনন্দ-উচ্ছাসে। অস্থায়ী দোকানগুলোতে পসরা সাজানো হয় বাহারি খাবার। থাকে পান্তা-ইলিশ খাওয়া ধূম। বাঙালির ঐতিহ্যের সাথে মিশে গেছে নববর্ষে ইলিশ মাছ দিয়ে পান্তা ভাত। শহুরে জীবনে পান্তা-ইলিশ ছাড়া যেন নববর্ষ অপূর্ণ থেকে যায়। রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ ও মঙ্গল শোভাযাত্রার মধ্য দিয়েই বর্ষবরণ উদযাপন শুরু হয়। ছায়ানটের শিল্পীরা সম্মিলিত কণ্ঠে সূর্যোদয়ের সাথে সাথে গেয়ে ওঠে রবি ঠাকুরের ‘এসো হে বৈশাখ’ গানটি। এ গানের মধ্য দিয়ে বরণ করে নেয়া হয় নতুন বর্ষকে। কণ্ঠশিল্পীদের অধিকাংশই থাকে তরুণ প্রজন্মের। অন্যদিকে বৈশাখী বা নববর্ষ উৎসবের আবশ্যিক একটি অংশ হচ্ছে মঙ্গল শোভাযাত্রা। ১৯৮৯ সাল থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা পহেলা বৈশাখের অন্যতম একটি আকর্ষণ। এটাও তরুণদের একটি অন্যতম বৈশাখী সংযোজন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে যাত্রা শুরু করে এর। পায়ে পা মেলায় লাখো মানুষ। শোভাযাত্রায় ফুটিয়ে তোলা হয় আবহমান গ্রামবাংলা ও জীবনের ছবি। এ মঙ্গল শোভাযাত্রায় স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ করে বিভিন্ন রংবেরঙের মুখোশ পরে তরুণরা। ঢাক-ঢোলের আওয়াজ আর বৈশাখী নানা গানের আয়োজনে এ দিনটি হয়ে ওঠে আরও উৎসবমুখর। মূলত রমনা বটমূল এই উৎসবের কেন্দ্রস্থল। এসব অনুষ্ঠানে তুলে ধরা হয় বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে। এছাড়া বৈশাখ উপলক্ষে প্রতি বছরই মোবাইল কোম্পানিগুলো নিয়ে আসে তরুণদের জন্য হরেক রকম অফার। আর এ অফারগুলোর সঙ্গে নানা রকম উপহার সামগ্রী তো থাকেই। কী গ্রাম কী শহর সব জায়গাতেই সৃষ্টি হয় প্রাণচাঞ্চল্য। আনন্দে মাতে পুরো দেশের তারুণ্য। পহেলা বৈশাখের বেশ কিছু দিন বাকি থাকতেই শুরু হয় এর প্রস্তুতি। বৈশাখ মানে লাল-সাদার মিশেল। বৈশাখ শুধু লালকে ধারণ করে না; বরং পুরো বিশ্বের কাছে আমাদের রঙিন হওয়ার ঐশ্বর্যকে প্রথম মাত্রা দেয়। তাই বহুকাল ধরেই লাল-সাদার ধারাবাহিকতায় এই বৈশাখেও তরুণদের দিনটি হয়ে ওঠে লালের সম্ভাবনায় উজ্জ্বল, লালের ঐশ্বর্যে সুখময় আর লালের দীপ্তিতে রঙিন। ভোরের আলো ফুটতেই তরুণদের শুরু হয় সাজসজ্জা। আর বৈশাখ এলেই গায়ে ওঠে পাটভাঙা তাঁতের শাড়ি। লাল ও সাদা তো থাকেই, সঙ্গে থাকে বাহারি রং। কিংবা অন্য কোনো রঙের শাড়িতে সেজে কপালের টিপ আর হাতের চুড়িটা পরে লাল। অথবা শাড়িতে চাই কোনো বাঙালি মোটিফ। বৈশাখকে ঘিরে তরুণদের চাহিদার থাকে পাঞ্জাবি, ফতুয়া, বৈশাখী শার্ট, গামছাসহ কিছু নতুন ও ব্যতিক্রমী প্রসাধনী সামগ্রী। ফতুয়ায় বাঙালির ঐতিহ্যবাহী ঢোল, একতারার ডিজাইনগুলো কিছুটা ব্যতিক্রম ও নজরকাড়া। আর সেদিকেই ঝুঁকে অধিকাংশ ফ্যাশন-সচেতন তরুণ প্রজন্ম। পহেলা বৈশাখকে আনন্দময় করে গড়ে তুলতে থাকে বৈচিত্র্যময় আয়োজন। ‘এসো এসো এসো হে নবীন, এসো এসো হে বৈশাখ এসো আলো, এসো হে প্রাণ ডাক কাল বৈশাখীর ডাক।’ তারুণ্যের প্রতি সুকান্তের এ আহ্বানই বৈশাখকে করে তোলে আরও বেশি তরুণ। প্রতি বছরেই বৈশাখ আসে নতুন রূপে নতুন সুরে নতুনের আহ্বানে। ‘মুছে যাক গ্লানি ঘুচে যাক জরা, অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা। এসো হে বৈশাখ এসো এসো’ জীর্ণতাকে পেছনে ফেলে নতুনের পথে এগিয়ে চলার গানটি

বৈশাখের প্রথম দিনটিতে তরুণদের মুখে মুখে ফেরে। সূর্য একটু তাতিয়ে উঠলে তরুণেরা গেয়ে ওঠে ফিডব্যাকের ‘মেলা যাইরে’। বছরের সারাটা সময়ে এ আয়োজনে মেতে ওঠার অপেক্ষায় থাকে তরুণরা। আবার অনেকে বৈশাখ আসার আগেই বিভিন্ন হিসাব-নিকাশ করে রাখে বৈশাখের দিনটা কীভাবে কাটাবে ভেবে। ঢাকা কলেজের গণিত বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র অমিতের কাছে বৈশাখের প্রথম দিনটা সবসময়ই অন্যান্য দিনগুলোর চেয়ে আলাদা। এই দিনটাকে নিয়ে সবসময়ই থাকে তার আলাদা পরিকল্পনা। এ ক্ষেত্রে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়াটা প্রাধান্য পায় সবার আগে। এর সাথে যোগ হয় দিনব্যাপী ঘোরাঘুরি। আর খাওয়া-দাওয়া? সেটার কথা তো হিসাবের বাইরে। কোথায় কী খাওয়া হবে, তার নেই ঠিক। একই বিভাগের খায়রুলের দিনটা কাটে আর সবার মতোই। দারুণ আনন্দ নিয়ে সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে বন্ধুদের সাথে বেরিয়ে পড়ে সে। গন্তব্য রমনার বটমূল। তারপর রমনাতে গিয়ে সবাই মিলে পান্তা-ইলিশ খাওয়াটা তো এখন একটা রেওয়াজ। সুতরাং তার পান্তা ইলিশ চাই-ই চাই। আর মেলায় ঘোরাঘুরি ছাড়া পহেলা বৈশাখ জমেই না। তাই রোদে পুড়ে, ঘামে ভিজে বৈশাখ উপভোগ করেন শ্রাবন্তী। এদিকে ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির বিবিএ-এর শিক্ষার্থী ফারিয়া, অনিষা, নাফিম, মোনা, মৌ কথায় ওঠে আসে দিনটি উদ্্যাপনের বিবরণ। তাদের কথা, ওই দিনটি কেবলই নিজেদের মতো করে পালন করার দিন। ওই দিন আত্মীয়দের বাড়িতে যাওয়া হয়ে উঠে না কারো। তাই এ দিনটাকে বেড়ানোর কাজেই সারাদিন কাটায় ওরা। ফারিয়ার কথা, বৈশাখের প্রথমদিনে সকালে গোসল সেরে নতুন শাড়ি পরে মোটামুটি কাছের সব আত্মীয়-স্বজনদের বাসায় অল্প সময়ের একটি পরিকল্পনা করে সে। অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মিথিলা থাকে রোকেয়া হলে। সবসময় বাড়িতে যাওয়া হয়ে উঠে না তার। বৈশাখের এই দিনগুলোতে ছুটি পায় বলে বাসায় চলে যায় সে। ওখানে এই দিনটাতে সকালবেলা সবার আগে বাবা-মায়ের কাছে যায়। এরপর নাস্তা সেরে দেখা করে সব স্কুল ও পাড়ার বান্ধবীদের সাথে। এই দিনটাতে নতুন করে আড্ডায় মেতে উঠে সবাই। তারপর সবচেয়ে প্রিয় আমভর্তা তৈরি করে একসাথে খায় সবাই মিলে। সব মিলিয়ে এই দিনটা তরুণরা হৈ হুল্লর করেই কাটিয়ে দেয়।

Read 346 times

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…