মহাকালের রথের ঘোড়া : সমরেশ বসু

মহাকালের রথের ঘোড়া : সমরেশ বসু

অরিন্দম মুখার্জী বিংকু

 

 

তারাশঙ্কর থেকে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়। আবার সুনীল, শীর্ষেন্দুদের যুগ। এ দু’যুগের মাঝে সমরেশ বসু ছিলেন সেতু হিসেবে। তাঁর জীবন যাপন, ছেলেমানুষি আচরণ অনেকটাই ছিল ফরাসিদের মতো। এক মাথা ঝাঁকড়া চুল আর অপূর্ব একটা ট্রেড মার্ক হাসি। ঢাকা জেলার মুন্সীগঞ্জ মহকুমার অন্তর্গত রাজনগর গ্রামে পৈতৃক বাস্তুভিটায় ১৯২৪ সালের ১১ ডিসেম্বর জন্ম নেন সমরেশ বসু। বাবা ছবি আঁকতে ভালোবাসতেন। কাগজের ম- দিয়ে মূর্তি তৈরী করতেন। বাড়ির পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে সমরেশের আদলটা একটু আলাদা। পাঠ্য বই পড়ায় মন নেই তাঁর। বাঁধাধরা শিক্ষার বাইরের জীবন যাপনই তাঁকে বেশি টানে। তবু তাঁকে পাঠানো হলো গিরিশ মাস্টারের পাঠশালায়। পরে গে-ারিয়া গ্র্যাজুয়েট স্কুলে পড়লেন সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত। পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ায় বাবা তাঁকে পাঠালেন নৈহাটির রেল কোয়ার্টার্সে দাদা মন্মথ’র কাছে। দাদা ১৯৩৯ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি নৈহাটির মহেন্দ্র স্কুলে তাঁকে ভর্তি করালেন অষ্টম শ্রেণিতে। স্কুলের পড়াশোনা বাদ দিয়ে, নাটক অভিনয়, খেলাধুলা, শরীর চর্চা ও সাহিত্য চর্চায় মনোনিবেশ করেন। সেসময় কিছু লেখালেখিও শুরু করেন হাতে লেখা পত্রিকা বীনায়।


দেবশংকর বন্দোপাধ্যায় ছিলেন তখন তাঁর ঘনিষ্ট বন্ধু। বন্ধুর বাসায় যাওয়া আসার সুবাদে প্রেমে পড়ে সমরেশ বন্ধুভগ্নি গৌরীর সাথে। ‘সমরেশ’ নামটি গৌরীরই দেয়া। তাঁরা যখন পালিয়ে বিয়ে করে সমরেশ তখন ১৮ গৌরী ২১। এই বিয়ে দুই পরিবারের কেউই মেনে নিলেন না। ফলে নৈহাটি থেকে চার মাইল দূরে আতপুরের পুলিশ ফাঁড়ির পেছনে ২ টাকায় ঘর ভাড়া নিলেন। আতপুরে সমরেশের জীবন এক বড় বাঁক নেয়। শুরু হয় জীবনযুদ্ধ। জগদ্দল আতপুরের শ্রমিকপাড়া ও জীবিকার জন্য লড়াই নৈহাটির কাঁঠালপাড়ার দিন যাপনের থেকে বহুলাংশেই আলাদা। এক পোলট্রি ফার্মের সঙ্গে কমিশনের শর্তে ডিম, মুরগি, সবজি বিক্রি করে কোনো রকমে টিকে থাকার চেষ্টায় প্রাণপাত পরিশ্রম করতে লাগলেন। সপ্তাহে ৩-৪ দিন খাওয়া জোটে, বাকি দিন অভুক্ত অবস্থায় কাটে।

বিয়ের পর শুরু হয় জীবনের আসল যুদ্ধ সপ্তাহে তিন চার দিন খাবার জোটে তো বাকি দিনগুলোতে অভূক্ত থাকতে হয়। চরম দারিদ্রতায় সাহিত্য চর্চা ছাড়েননি তিনি। ১৯৪৩ সালের জানুয়ারিতে ইছাপুর রাইফেল ফ্যাক্টরির ইন্সপেক্টরেট অব স্মল আর্মস-এর ড্রইং অফিসে ট্রেজারের চাকরি পেলেন সমরেশ। ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত ৬ বছর এখানেই কাজ করেন তিনি। ওই সময় তাঁর জীবনে অনেক ঘটনা ঘটে যায়। প্রথম সন্তান বড় মেয়ে বুলবুলের জন্ম ১৯৪৩ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি। দ্বিতীয় সন্তান বড় ছেলে দেবকুমারের জন্ম ১৯৪৫ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি। তৃতীয় সন্তান মেজছেলে নবকুমারের জন্ম ১৯৪৬ সালের ডিসেম্বর। চতুর্থ সন্তান ছোট মেয়ে মৌসুমীর জন্ম ১৯৪৮ সালের ডিসেম্বর। এর পাশাপাশি বারাকপুরে জুটফ্রন্টে পার্টির ট্রেড ইউনিয়নের কাজ করতেন। সমরেশ আর গৌরী পার্টি সদস্যপদ লাভ করলেন। সংগঠনের কাজের ফাঁকে ‘উদয়ন’ পত্রিকায় আঁকা ও লেখা শুরু করলেন। উদয়ন লাইব্রেরিতে পড়াশোনা। সাহিত্যের ক্ষেত্রে প্রথম ছোটগল্প ‘শের সর্দার’ প্রকাশিত হয় ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকায়। উদয়ন পত্রিকা তো আছেই, সবচেয়ে বড় ঘটনা ১৯৪৬ সালে শারদীয় ‘পরিচয়’ পত্রিকায় ‘আদাব’ গল্প প্রকাশের সময়। উদয়ন পত্রিকার জন্য আদাব গল্পটি তিনি লিখেছিলেন। কিন্তু বন্ধু গৌর জোর করে ‘পরিচয়’ পত্রিকায় গল্প পাঠিয়ে দেন। বাংলা সাহিত্যে ওই অর্থে সমরেশের প্রবেশ এ গল্পের মধ্য দিয়েই। ১৯৪৯ সালে কমিউনিস্ট পার্টি বেআইনি ঘোষিত হলে সমরেশ ও তাঁর পরিবারকে আবারও দারিদ্রের মধ্যে পড়তে হয়। একই বছর চৌদ্দই ডিসেম্বর সমরেশ গ্রেফতার হয়ে প্রেসিডেন্সি জেলে এক বছর কারাবাস করেন। তিনি বন্দি থাকায় সংসার অচল। মুখ্যমন্ত্রী ডাক্তার বিধান রায়ের শরণাপন্ন হয়েছিলেন বিপর্যস্ত গৌরী দেবী। তিনি বন্দি সমরেশের পরিবারের জন্য দেড়শ’ টাকা মাসোয়ারার বন্দোবস্ত করে দিয়েছিলেন। কারমুক্ত হয়ে সমরেশ নিজেকে আবিষ্কার করেন একজন নিঃসঙ্গ ও বেকার মানুষ হিসেবে। এখান থেকেই তাঁর লেখার সংকল্প জেগে ওঠে। লিখেই জীবন বাঁচাতে মনেপ্রাণে তিনি প্রস্তুত হতে থাকলেন। চারটি নাম নিয়ে সাহিত্যের ক্ষেত্রে সমরেশ পদচারণা করেছেন- সমরেশ বসু, কালকূট, অশোক ঠাকুর ও ভ্রমর।

বাল্যকালে সমরেশের দারুণ ইচ্ছা ছিল আর্টিস্ট হওয়ার। তাই ছাত্র জীবনে কয়েক বন্ধু মিলে হাতে লেখা কয়েকটা ম্যাগাজিনে গল্প, বিভিন্ন ধরনের হাতে আঁকা ছবি ছাপাতেন। বিভিন্ন পত্রিকায় অলঙ্করণও করতেন। তারপর কৈশোর থেকে যৌবন। ওই সময় সাহিত্যের দিকে ভীষণ ঝোঁক এলো। বিভিন্ন গল্প, প্রবন্ধ লিখতে শুরু করলেন। তাঁকে ছবি আঁকা থেকে
লেখালেখির জগতে নিয়ে আসেন ‘সত্য মাস্টার’। এদিক থেকে বলা যেতে পারে, ‘সত্য মাস্টার’ এর সঙ্গে সমরেশের সাক্ষাৎ বাংলা সাহিত্যেরই এক মাইলফলক। এর মধ্যেই সমরেশের প্রথম উপন্যাস ‘উত্তরঙ্গ’ প্রকাশ পায়। তিনি এর উপাদান সংগ্রহ করেছিলেন ইছাপুর রাইফেল ফ্যাক্টরির ইন্সপেক্টরেট অব স্মল আর্মস-এ চাকরিকালে। তা রূপ পেয়েছিল প্রেসিডেন্সি জেলে বন্দি থাকাকালে। ‘উত্তরঙ্গ’ উপন্যাস বিক্রি করে শোধ করলেন এক বছরের বাড়ি ভাড়া। দ্বিতীয় উপন্যাস ‘বিটি রোড়েব ধারে’। এরপর ‘শ্রীমতী কাফে’। প্রথম গল্প সংকলন ‘মরশুমের একদিন’।

সমরেশের প্রথম লেখা উপন্যাস ‘নয়নপুরের মাটি’। ‘উত্তরঙ্গ’-এর বহু আগে (১৯৪৬ সালে) ওই বই লেখা। সাহিত্য আসরের দরজার চৌকাঠটা তখন দূর থেকে উঁকি মেরে দেখেছিলেন তিনি। বছরখানেক ধরে উপন্যাসটির অংশ ‘পরিচয়’ মাসিক পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে ছাপা হয়েছিল। নানান কারণে তা মাঝপথেই থেমে যায়। অনেক দিন পর আবার তা বই আকারে প্রকাশিত হয়।  সমরেশ ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর ‘সাতকড়ি মাসী’ আর ‘জয়নাল’সহ বেশ কয়েকটি গল্প লিখেছিলেন ‘তরণি’ পত্রিকায়। গল্পটি দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পর পার্টির বিরাগভাজন হন। পার্টির সঙ্গে ক্রমেই তাঁর দূরত্ব বাড়তে থাকে। অবশেষে তা তলানিতে এসে ঠেকে। তাকে সাহিত্য ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত করে ‘গঙ্গা’ উপন্যাস।

১৯৫৮ সালে সমরেশ সাহিত্যে ‘আনন্দ’ পুরষ্কার পেলেন। উদ্দ্যম গতিতে এগিয়ে চলে লেখলেখির কাজ। এরই মাঝে সমরেশ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন ছোট শ্যালিকা ধরিত্রীর সাথে। সমরেশ তখন চার সন্তানের পিতা। কল্যাণীতে স্ত্রী গৌরী বসু ও ছেলেমেয়েদের নিয়ে ভরা সংসার। ওই সময়ই ছোট শ্যালিকার সঙ্গে শরীর ও মনের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। গৌরী ছিলেন বাড়ির বড় মেয়ে আর ধরিত্রী ওরফে টুনি সবচেয়ে ছোট, প্রায় সমরেশের মেয়ের বয়সীই। লোকলজ্জার কথা ভাবলে, হয়তো সব দায় ঝেড়ে ফেলে তিনি বেরিয়ে আসতেই পারতেন। কিন্তু ওই পথে হাঁটেননি। ভারতীয় প্রখ্যাত বাঙালি লেখক ও ঔপন্যাসিক সমরেশ বসু পরকীয়ার জেরে শ্যালিকাকে বিয়ে করেন ১৯৬৭ সালের ১৪ই মার্চ এবং দুই বোনকে নিয়ে একসঙ্গে সংসার করেছিলেন। এ অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন গৌরী তথা সমরেশের স্ত্রী, ধরিত্রীর দিদি। সমরেশের দ্বিতীয় বিয়েতে সম্মতি দিলেন। বুক ফেটে গেলেও মেনে নিলেন নিজের বোনের সঙ্গে স্বামীর বিয়ে।

বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধের সময় সবার মত সমরেশও আন্দোলিত হয়ে ছিলেন। তখন বাংলা সাহিত্যে রাজা বাদশা ছিল না, তিনিই ছিলেন যুবরাজ। সমরেশ বসুর মত ব্যাক্তিরা বাউ-েলে বলেই জীবনকে দেখতে পেরেছিলেন নানা বৈচিত্র্যে, তুলে আনতে পেরেছিলেন পানাপুকুর, কখনও জমিদার বাড়ির খিলান থেকে কখনও বা ট্রাক ড্রাইভারের ডেরা থেকে জীবনাবর্তন।
জীবনের বৈচিত্র্যতা খুঁজে ফেরার মাঝেই ১৯৮৮ সালের ১২ই মার্চ নিজের জীবনরে পরিসমাপ্তি ঘটে। ৪০ বছরের কিছু সময় ধরে বাংলা সাহিত্যে তাঁর ছিল অবাধ বিচরণ। হয়তো ভবঘুরে হয়েই যদি আরো কিছুকাল আনাগোনা করতেন তাহলে বাংলা সাহিত্য আরো সমৃদ্ধ হতো।

 

পেইনটিং অমিত রায়

Read 991 times

85 comments

  • bahis siteleri
    18 February 2018

    P.S. аА аАТŽаА аЂааА б‚Т„Т–аАаб‚Т€Тš, аА аБТ”аАааАТƒаАаб‚Т€ТšаА аЂааАаб‚Т€ТšаА аБТ‘, аАааБТ“ аА аАТ†аА аЂааАааАТƒ аА аБТ—аАааАТ‚аА аБТ‘аА аБТ”аА аБТ•аА аЂа›аАааАТŠаА аАТ…аА аБТ• аАааАТƒаА аАТ†аА аЂа•аАааАТ‚аАааАТƒаАаб‚Т€ТšаА аЂааА аАТ…

  • canl1 bahis oyna
    18 February 2018

    You have made some decent points there. I looked on the web for additional information about the issue and found most people will go along with your views on this site.

  • online bahis
    18 February 2018
    posted by online bahis

    I truly appreciate this blog post.Much thanks again. Want more. here

  • canl1 bahis oyna
    18 February 2018

    Perfect piece of work you have done, this site is really cool with fantastic info.

  • canl1 bahis siteleri
    18 February 2018

    Yeah, it is clear now ! Just can not figure out how often do you update your blog?!

  • online bahis siteleri
    18 February 2018

    I truly appreciate this article post.Really looking forward to read more. Fantastic.

  • online bahis _irketleri
    18 February 2018

    I wanted to thank you for this great write-up, I definitely loved every small bit of it. I have bookmarked your internet site to look at the newest stuff you post.

  • plant terpenes
    18 February 2018

    Thanks a lot for the blog.Really thank you! Great.

  • junkyards
    18 February 2018
    posted by junkyards

    Really appreciate you sharing this article.Much thanks again. Really Great.

  • Covenantal apologetics K. Scott Oliphint
    17 February 2018

    Major thankies for the post. Want more.

Leave a comment

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

Twitter feed

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…