মুনলাইট - ফিল্ম রিভিউ

মুনলাইট

ফুয়াদ বিন নাসের

 

ব্যারি জেনকিন্স তার ‘মুনলাইট’ ছবিটিকে খুব সহজেই তিনটি পৃথক চলচ্চিত্রের মাধ্যমে প্রকাশ করতে পারতেন। বর্তমানের প্রিক্যুয়াল-সিক্যুয়াল ও রুপালি পর্দার ব্যবসায়িক সাফল্যের যুগে হয়তো সেটিই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু ফ্লোরিডা স্টেট ইউনিভার্সিটির ফিল্ম ডিপার্টমেন্টের ছাত্র ব্যারি যশ-খ্যাতি বা অর্থ-বিত্তের হাতছানিতে সাড়া দেয়ার মানুষ নন। ‘মেডিসিন ফর মেলানকলি’ চলচ্চিত্রেই তার ওই দর্শনের অনেকটা আঁচ পাওয়া গিয়েছিল। মুনলাইট ছবিটি তিনটি পর্বে বিভক্ত- ‘লিটল’, ‘কাইরন’ ও ‘ব্ল্যাক’। তিনটি নামই ছবির মূল চরিত্রের নাম। একই মানুষের ভিন্ন তিনটি বয়সের তিনটি রূপ মায়ামির রৌদ্রস্নাত পটভূমিতে আঁকার চেষ্টা করেছেন পরিচালক ব্যারি জেনকিন্স। মাদকাসক্তি, একাকিত্ব,
সমকামিতার মতো প্রেক্ষাপট নিয়ে পরিচালক খেলা করেছেন মূল চরিত্র কেন্দ্র করে।


মুনলাইট চলচ্চিত্রটির প্রথম পর্ব ‘লিটল’ আবর্তিত হয় মায়ামির এক বস্তি অঞ্চলে যেখানে দেখা, আমাদের মূল চরিত্র কাইরন ব্ল্যাকের শৈশব। সহপাঠীদের কাছে তাড়া খাওয়া, মায়ের অবহেলা ও বাবার অভাবে নিশ্চুপ হয়ে যাওয়া ছেলেটি বাবার ছায়া খোঁজে এলাকার পান্ডা হুয়ানের কাছে। হুয়ানও এই অদ্ভুত ও চুপচাপ ওই শিশুকে পছন্দ করে ফেলে এবং নিজের বাসায় নিয়ে যায়। তাকে হুয়ানের কাছে ঘেঁষতে দিতে চায় না লিটলের মাদকাসক্ত মা। কিন্তু স্নেহের লোভে লিটল বার বার ওই হুয়ানের চৌকাঠেই ফিরে যায়। হুয়ান এলাকার মাদক ব্যবসায়ী। সবাই সমীহ করে তাকে। কিন্তু লিটলের মায়ের অবহেলা থেকে তাকে রক্ষা করতে না পেরে অসহায় বোধ করে। লিটলের জন্য সুস্থ্য-স্বাভাবিক জীবন চায় হুয়ান। আবার মুদ্রার অন্য পিঠে হুয়ানের মাদকের চালানই অন্ধকার নামিয়ে আনে লিটলের


পরিবারে। ওই চক্র চলতেই থাকে।
এরপর দেখতে পাই কৈশোরের কাইরনকে। লিটলের বয়স খানিকটা বেড়েছে। কিন্তু তার একাকিত্ব কাটেনি। সে অনুভব করে, তাকে পছন্দ করে এ রকম কেউ থাকতেই পারে না। নিজের সেক্সুয়ালিটি নিয়েও তার মধ্যে শঙ্কা কাজ করে। এলাকা ও স্কুলে সহপাঠীদের অত্যাচার এবং অপমানের শিকার কাইরন মুখ ফুটে তার আসল রূপ প্রকাশ করতে পারে না। তার কথা বলার একমাত্র সঙ্গী কেভিনের প্রতি যে আকর্ষণ বোধ করে তা নিয়েও সে সন্ত্রস্ত থাকে। তার আশপাশের জগতে সে দেখে মানুষের নরপশুসুলভ আচরণ ও হিংস্রতা। স্বাভাবিক জীবনে ফেরার শেষ আশাটুকুও ছেড়ে দেয় কাইরন।
মুনলাইট-এর শেষ পর্বে দেখি যুবক কাইরন ব্ল্যাককে। এখানেই পরিচালক ব্যারি তার সর্বোচ্চ মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। আগের দুই পর্বের সব ইতিহাস, হতাশা, আবেগ এক হয়ে পূর্ণতা লাভ করে সেলুলয়েডের অন্তিমভাগে। ব্যারি জেনকিন্স কোনো নীতিকথা প্রচার করার চেষ্টা করেননি, কোনো উপদেশ দেয়ার প্রয়াসও দেখাননি। মুনলাইটের এই শেষ অংকে বোঝা যায়, ছোট এক ছেলের বড় হয়ে ওঠার কাহিনী- কোনো পরিবারের ভালোবাসা, বন্ধুদের সমর্থন, সমাজের সাহায্য ছাড়াই। এ রকম অনেক লিটল, কাইরন ও ব্ল্যাকই অশ্রুর মতো সবার অগোচরেই মায়ামির সমুদ্রে হারিয়ে যায়। কিন্তু আমরা বার বার তাকে ফিরে আসতে দেখি সব বাধা, অবহেলা, তাচ্ছিল্য ও অপমান ডিঙিয়ে। তিন বছর বয়সের কাইরন ব্ল্যাককে রূপায়িত করেছেন এলেক্স হিবার্ট, অ্যাশটন স্যান্ডার্স ও ট্রেভান্তে রোডস। পরিচালক জেনকিন্স এখানে তিন অভিনেতার মধ্যে সমন্বয় করার চেষ্টা করেননি, বরং তিনজন তিনটি চরিত্রই রূপায়ণ করেছেন। চমৎকার সংলাপ ও সিনেম্যাটোগ্রাফির কারণে কাইরন ব্ল্যাকের বেড়ে ওঠা আমাদের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠেছে রুপালি পর্দায়। মায়ামির ঝকঝকে রৌদ্রোজ্জ্বল বালুকাবেলায় শত
হাসিমুখের ভিড়েও যে বিষণ্ণতার বীজ লুকিয়ে থাকে সেটিই পরিচালক অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে চিত্রায়িত করেছেন। সেরা ছবির পুরস্কার মুনলাইটেরই প্রাপ্য।

Read 736174 times

53008 comments

Leave a comment

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

Twitter feed

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…